Saturday, September 13, 2025

নেপালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকি

মানবজমিনঃ ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী পেলো নেপাল। তিনি দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকি। শুক্রবার দিবাগত রাতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে উত্তাল নেপালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর ইতিহাস রচনা করলেন তিনি। তবে তিনি দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিন দিন আগে বিক্ষোভের মধ্যে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। কারকির নিয়োগ নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশের মুখপাত্র বিনোদ ঘিমিরে জানিয়েছেন, এ সপ্তাহের সহিংসতায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১ জন নিহত হয়েছেন। তার মধ্যে কমপক্ষে ২১ জন বিক্ষোভকারী ও ৩ জন পুলিশ। দেশজুড়ে কারাগার ভেঙে পালিয়েছে প্রায় ১২,৫০০ বন্দি। তারা এখনো পলাতক। ওদিকে ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের ৫৭ বছর বয়সী রাজেশ দেবী গোলা কাঠমান্ডুর হায়াত রিজেন্সি হোটেল থেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারান। হোটেলটিতে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। তার স্বামী বেঁচে গেলেও তিনি নিচে নামতে গিয়ে পড়ে মারা যান। এই অস্থিরতায় নেপালের পর্যটননির্ভর হোটেল শিল্পে ২৫ বিলিয়ন রুপি ক্ষতি হয়েছে। প্রায় দুই ডজন হোটেল ভাঙচুর, লুট বা অগ্নিসংযোগের শিকারে পরিণত হয়েছে। শুধু কাঠমান্ডুর হিলটন হোটেলেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ বিলিয়ন রুপি। দুই হাজারের বেশি হোটেলকর্মীর কর্মসংস্থান অনিশ্চিত।
mzamin

ওদিকে সুসিলা কারকির স্বামী ১৯৭৩ সালে এক বিমান ছিনতাইয়ে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। ওদিকে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত শপথ অনুষ্ঠানটিই দিন কয়েকের জল্পনা-কল্পনা ও নেপথ্যের সমঝোতার ইতি টেনে দিল, আর এর মধ্য দিয়েই দেশ প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী পেল। শপথ নেওয়ার পরই ঘোষণা করা হয় যে সাধারণ নির্বাচন হবে ৫ই মার্চ ২০২৬।  শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল ও প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কারকির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট রাম সহায় যাদব এবং প্রধান বিচারপতি প্রকাশ মান সিং রাওয়াত। ভারতের নেপালস্থ রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব’ও নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে এই সিদ্ধান্ত এসেছে প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাউডেল, নেপাল সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল এবং জেনারেশন জেড আন্দোলনের প্রতিনিধিদের মধ্যে ঐকমত্যের মাধ্যমে। এই আন্দোলনের চাপেই গত সপ্তাহে পদত্যাগে বাধ্য হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। এই ঘটনাবলির সূত্রপাত হয় কয়েকদিনের ব্যাপক বিক্ষোভ থেকে, যেখানে দুর্নীতি ও বেকারত্বে ক্ষুব্ধ তরুণ নেপালিরা নেতৃত্ব দেয়। পুলিশি দমনপীড়নে কমপক্ষে ৫১ জন নিহত হন এবং এর ফলেই অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। যদিও সুশীলা কারকির নাম কয়েকদিন ধরেই ঐকমত্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিল, তিনি একমাত্র সম্ভাব্য মুখ ছিলেন না। এক পর্যায়ে প্রতিবাদকারীদের মধ্যেই বিভাজন দেখা দেয়- কিছু অংশ সমর্থন দেয় প্রকৌশলী কুলমান ঘিসিংকে, যিনি নেপালের বিদ্যুতের ঘাটতি কাটিয়ে তোলার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। আরেকটি নাম ছিল বালেন্দ্র শাহ। তিনি ‘বলেন’ নামেই বেশি পরিচিত ৩৫ বছর বয়সী কাঠমান্ডুর মেয়র, র‌্যাপার ও রাজনীতিক। শহুরে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নেপালের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুশীলা কারকিকে তরুণ প্রজন্ম অনেকটা আপসহীন চরিত্র হিসেবেই দেখে। বিচারকালে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য সুনাম অর্জন করেন। তবে তার বিচারিক ক্যারিয়ার ঝড়ঝাপটাহীন ছিল না। দায়িত্ব নেয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হয়। শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। তবে এই ঘটনার পর কারকি হতাশ হয়ে পড়েন এবং অবশেষে পদত্যাগ করেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/179796_Untitled-1.jpg

মিসরে হামাস নেতাদের হত্যার চক্রান্ত করেছিল ইসরায়েল: গোয়েন্দা তথ্য

মিডল ইস্ট আইঃ মিসরের রাজধানী কায়রোতে হামাস নেতাদের নিশানা করে ইসরায়েলি হামলার চক্রান্ত রুখে দেওয়া হয়েছে। কায়রো ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। মিসরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

একজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ইসরায়েল বেশ কিছুদিন ধরেই কায়রোতে হামাস নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করছে। মিসর গত দুই বছরে যুদ্ধবিরতির আলোচনার সময় ইসরায়েলের এ ধরনের একটি চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল।

কাতারের রাজধানী দোহায় গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে আবাসিক ভবনে প্রায় ১২টি বিমান হামলা চালায় উগ্রবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েল। হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যা পুরো অঞ্চলে নিন্দার ঝড় তুলেছে।

ইসরায়েলের কট্টর ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে মিসরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে এই বিবৃতি দিয়েছেন। নেতানিয়াহু হুমকি দিয়েছিলেন, ইসরায়েল অন্যান্য দেশেও হামাসকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে।

মিসরের নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, ‘মিসরীয় ভূখণ্ডে হামাস নেতাদের জীবনের ওপর যেকোনো হামলাকে মিসর তার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে বিবেচনা করবে। এর বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দিতে আমরা একমুহূর্তও দ্বিধা করব না।’

হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতারা মিসরে বসবাসের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে নিরাপত্তা সূত্রটি জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলার আগে থেকেই বেশ কয়েকজন নেতা বছরের পর বছর ধরে মিসরে বসবাস করছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের পরিচয়, সংখ্যা ও সঠিক অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র মতে, এই অঞ্চলকে অন্তহীন যুদ্ধ ও উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবর্তে আলোচনায় ফিরে আসার এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কাজ করতে মিসরীয় কর্মকর্তারা তাঁদের ইসরায়েলি প্রতিপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্রটি উল্লেখ করেছে, গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির বিষয়ে তেল আবিবের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বেশ কয়েক মাস ধরে এমনিতে মিসর-ইসরায়েল সম্পর্কে উত্তেজনা রয়েছে।

গাজার ভবিষ্যতের দায়িত্ব মিসরের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের উত্তর সিনাইয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার ব্যাপারে মিসরের কর্মকর্তারা সব সময়ই সতর্ক রয়েছেন।

১৯ আগস্ট মিডল ইস্ট আই প্রতিবেদন করেছিল, সিনাইয়ে ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য প্রবেশ ঠেকাতে মিসর গাজার সঙ্গে মিসর সীমান্তে প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে।

মিডল ইস্ট আই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছিল, ভেঙে পড়া গাজা যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে কায়রোকে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ, মিসর আশঙ্কা করছে ছিটমহলটিতে বড় ধরনের ইসরায়েলি হামলার কারণে ফিলিস্তিনি সিনাই সীমান্ত ভেঙে ঢোকার চেষ্টা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বাধ্য হতে পারে।

দোহার হামলার আগে গত সপ্তাহে একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছিলেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

মিসর হামাসকে রক্ষা করছে না

মিসরের একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, দোহার হামলায় মিসরের আকাশসীমা ব্যবহার করেনি ইসরায়েল। তিনি বলেন, ‘দোহার হামলায় জড়িত কোনো ইসরায়েলি বিমান মোটেই মিসরের আকাশসীমা অতিক্রম করেনি।’

সেনাবাহিনীর ওই কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেছেন, দোহার হামলা সম্পর্কে মিসরের আগে থেকে কোনো ধারণা ছিল না এবং এই অভিযান সম্পর্কে মিসর, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না।

মিসরের কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, বর্তমানে ইসরায়েল সীমান্তে সিনাই উপদ্বীপে চীনা বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে, যাতে পূর্বানুমতি ছাড়া বা শনাক্ত না হয়ে কোনো বিমান সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে।

দোহায় হামলার পর নেতানিয়াহু তাঁর ভিডিও ভাষণে হামাসকে যেকোনো জায়গায় নিশানা করার হুমকি দেন।

উগ্রবাদী নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি কাতার ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া সব দেশকে বলছি, হয় তাদের বহিষ্কার করুন অথবা তাদের বিচারের আওতায় আনুন। আপনারা তা না করলে আমরা করব।’

গাজায় গণহত্যার দায় ওঠা ইহুদিবাদী নেতা নেতানিয়াহু হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদের’ বিরুদ্ধে একটি বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের অংশ বলে দাবি ধরেন।

গাজায় গণহত্যা চালানো নেতানিয়াহু যুক্তি দেখান, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আফগানিস্তানে আল-কায়েদা সন্ত্রাসীদের পেছনে ছুটেছিল এবং পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল, আমরা ঠিক সেভাবে কাজ করেছি।’

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনি মনে করেন—এই সতর্কবার্তাগুলো মূলত হামাসকে নয়, বরং কায়রো নিজেকে এই অঞ্চলে কীভাবে দেখে, সেটাকেই বেশি বোঝায়।

এই বিশ্লেষক মনে করেন, এই সতর্কতাগুলো হামাসের জন্য ততটা নয়, যতটা কায়রো এই অঞ্চলে নিজের অবস্থানকে কীভাবে দেখে তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক যুক্তি দেন, মিসর হামাসকে রক্ষা করছে না। এই দেশ দলটিকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং মিসরে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে হামাসের সম্পর্ক আছে বলে মনে করে।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, মিসর নিজেকে সবচেয়ে কৌশলগত আরব দেশ হিসেবে দেখে এবং তার মাটিতে যেকোনো ইসরায়েলি হামলাকে একধরনের অপমান হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি মিসরের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করবে এবং সেই আঞ্চলিক অবস্থানকে বিপন্ন করবে।

ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী, বিশেষ করে হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মিসর কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। তবে বিগত কয়েক মাস গাজা যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে মিসরকে ক্রমবর্ধমানভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। কায়রোর ভয়, সিনাই উপদ্বীপে ইসরায়েলি স্থল হামলা মিসরকে এই সংঘাতে টেনে আনতে পারে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক তাঁর ব্যাখ্যায় বলেন, ইসরায়েলকে যদি কায়রোতে নির্বিঘ্নে হত্যাকাণ্ড চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়, তবে গাজায় একজন বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মিসরের কাজ করার গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, দেশের শাসকেরা এই ভূমিকার জন্য অনেক বিনিয়োগ করেছে। রাজধানীতে একটি হামলা সেই ভাবমূর্তিকে চুরমার করে দিতে পারে। এই অঞ্চলে দেখিয়ে দেবে, মিসর নিজের উঠানও রক্ষা করতে পারে না।

মিসরই প্রথম আরব দেশ যারা ১৯৭৯ সালে জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন-মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। মিসরীয়রা বেশির ভাগই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে শাসকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে এসেছে এবং ইসরায়েলকে শত্রু ও ফিলিস্তিনের দখলদার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (বাঁয়ে) ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ফাইল ছবি–রয়টার্স

৩৩ বছর কাটল, কথা রাখছেন না জাকসুর কেউ by অনিন্দ্য সাইমুম

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি’—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এই পঙ্‌ক্তি জীবনের নানা সময়ে মনে পড়ে যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) আর হল সংসদ নির্বাচনে ভোট গণনার দীর্ঘসূত্রতা দেখে আর এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের একেক সময় একেক রকম প্রতিশ্রুতি শুনে আজ এই কবিতা বারবার মনে পড়ছে।

জাকসু ও হল সংসদে ভোটও হচ্ছে ৩৩ বছর পর। জাকসুতে ১৯৯২ সালের পরের নির্বাচন বাতিল হয়েছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। তখনকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ ছিল। ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের জন্য নির্ধারিত শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন চলছিল। ওই নির্বাচন বানচালের জন্য শিক্ষকদের একটি গ্রুপ জাকসুর প্রতিনিধি ও ছাত্রদের দিয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায়। ওই হামলায় কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। পরে সভাপতি (উপাচার্য) জাকসু ভেঙে দেন।

এরপর ৩৩ বছর কেটে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার জাকসুতে ভোট গ্রহণ হয়। ওই দিন রাত সোয়া ১০টা থেকে চলছে গণনা। সেই সঙ্গে চলছে ফলাফলের জন্য অনন্ত অপেক্ষা।

কে কী কথা দিয়েছিলেন

অব্যবস্থাপনা, অভিযোগ আর বর্জনে জাকসুর এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে আলোচনা আরও প্রকট হয় ভোট গণনায় দীর্ঘসূত্রতায়। বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ হলেও শুক্রবার পেরিয়ে আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত কয়েক হাজার ভোট গুনে শেষ করতে পারেনি জাকসুর নির্বাচন কমিশন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১০টা থেকে টানা ভোট গণনা চলছে।

গণনা শুরুর পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোট গণনা করতে আজ সারা রাত লেগে যাবে। আশা করছি, কাল (শুক্রবার) দুপুরের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করা সম্ভব হবে।’

পরদিন শুক্রবার সকাল আটটা নাগাদ একটি দুঃসংবাদ জানা যায়। ভোট গণনার কাজে অংশ নিতে এসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। তিনি প্রীতিলতা হলে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এ খবরে গণনা কক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েন জান্নাতুলের সহকর্মীরা।

শোকের মধে৵ও চলতে থাকে ভোট গণনা। সকাল ১০টার পরে জাকসু নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা জানান, হল শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শুরু হবে।

এ কে এম রাশিদুল আলম জানান, রাতে (শুক্রবার) গণনা শেষ হতে পারে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে সম্পূর্ণ গণনা শেষ করে বেসরকারিভাবে ফল প্রকাশ করতে পারবেন তাঁরা।

দুপুরে নামাজ ও মধ্যাহ্নভোজের জন্য দেওয়া এক ঘণ্টার বিরতিতে রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘আমাদের সব কটি হল সংসদের মধ্যে কেবল তিনটি হল ছাড়া বাকি হলগুলোর গণনা শেষ হয়েছে বা চলছে।’

ভোট গণনায় এত দেরি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকের মধে৵ ক্ষোভ দেখা যায়। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী উম্মে হাবীবা শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সন্ধ্যা থেকে নির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা করছি। কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কখন ভোট গণনা শেষ হবে। এভাবে অপেক্ষার কারণে জাকসু নির্বাচনের আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলাভবনের সামনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নির্বাচনে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা আক্তার বলেন, ‘হল সংসদে একটিমাত্র ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হচ্ছে; কিন্তু জাকসুতে তিনটি করে, অর্থাৎ যদি আট হাজার ভোট কাস্ট (প্রদত্ত ভোট) হয়ে থাকে, তবে ২৪ হাজার কাউন্ট (গণনা) করতে হবে ম্যানুয়াল (হাতে গোনা) পদ্ধতিতে। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব, তিন দিনেও তো এটা সম্ভব হবে না। এই পদ্ধতির আমরা পরিবর্তন চাই।’

বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ‘নির্বাচনের ফল প্রকাশ না করে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে’ বলে অভিযোগ করে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।

অবশেষে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শুরু হয়েছে বলে জানান জাকসু নির্বাচন কমিশনার রেজোয়ানা করিম স্নিগ্ধা।

ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘রাতের মধ্যেই ভোট গণনা শেষ করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে সেটির নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। রাতের শেষভাগেও (ফল ঘোষণা) করা হতে পারে।’

জাকসু নির্বাচনের ফল স্থগিত করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষণা দেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবদুর রশিদ জিতু।

অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের নিচে এক সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার।

শুক্রবার পেরিয়ে শনিবার

আজ শনিবার, তৃতীয় দিনের মতো ভোট গণনা চলছে। গণনা কখন শেষ হবে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। নির্বাচন কমিশন একেকবার একেক সময়সীমার কথা বলে আসছেন।

জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বলেন, মোট ১৫টি হলের ভোট গণনা শেষ। আশা করছি, বাকি হলগুলোর ভোট গণনা বেলা ১টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

বেলা সাড়ে ১১টার কিছু আগে অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী জানান, ১৭ হলে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। বাকি আর চারটির।

সর্বশেষ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আশা করছি, সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে জাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে।’

ভোট গণনা শেষ হওয়ার সময় আর ফলাফল নিয়ে কর্তৃপক্ষের বারবার এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও রাখতে না পারা দেখে মনে পড়ে যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’। সুনীল বলেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি’। ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ভোট গণনা আর ফলাফল নিয়ে প্রতিশ্রুতি শুনে মনে হয় কথা রাখছে না জাকসুর নির্বাচন কমিশনও।

ভোটার ১১ হাজার ৭৪৩ জন


জাকসুতে মোট ভোটার ১১ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৭২৮ এবং ছাত্র ৬ হাজার ১৫ জন। কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ২৫টি পদে লড়ছেন ১৭৭ জন প্রার্থী। একই সঙ্গে ২১টি হল সংসদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।

সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী ৯ জন। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

একেকটি হলে পদসংখ্যা ১৫। ২১টি হল সংসদে মোট পদ ৩১৫টি। এতে ৪৭৭ জন প্রার্থী হয়েছেন। ছাত্রীদের ১০টি আবাসিক হলে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৯টিতে কোনো প্রার্থী নেই। একজন করে প্রার্থী রয়েছে ৬৭টি পদে। সে হিসেবে মাত্র ২৪টি পদে ভোট হয়েছে।

জাকসুতে মোট সাতটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে চারটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ও তিনটি আংশিক প্যানেল রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্যানেলগুলো হলো ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল, ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম।

আংশিক প্যানেল দিয়েছে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ এবং ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের সংশপ্তক পর্ষদ। এ ছাড়া অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।

পাঁচ প্যানেলের ভোট বর্জন

ভোট গ্রহণ শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকাল নয়টায়। সকালের দিকে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরাও ভোট দিতে ক্যাম্পাসে আসেন। জাকসু ভোটের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার রাতে জানায়, ভোট পড়তে পারে ৬৮ শতাংশের আশপাশে।

এর আগে নির্বাচনে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে ভোট গ্রহণের সময় শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল। এরপর প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের সংশপ্তক পর্ষদ, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ এবং ছাত্রফ্রন্টের একাংশের একটি প্যানেল নির্বাচন বর্জন করে। কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচন বর্জন করেছেন।

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে সরে আসেন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত তিন শিক্ষকও।

ইতিহাস যা বলে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জাকসু প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরই জাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪—পরপর তিন বছর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে আর ধারাবাহিকতা থাকেনি।

১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে জাকসু নির্বাচন হয়। ১৯৯২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে ছাত্রদল একচেটিয়াভাবে জয়লাভ করেছিল। তারা জাকসু ও হল সংসদের ১০৭টি পদের মধ্যে ১০৫টি পেয়েছিল। সব মিলিয়ে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে নির্বাচন হয়েছে ৯ বার। তারপর টানা ৩৩ বছরের অপেক্ষা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ভোট গণনা চলছে। আজ শনিবার সকালে, সিনেট হলে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ভোট গণনা চলছে। আজ শনিবার সকালে, সিনেট হলে। ছবি: প্রথম আলো

নেপালে এই বিদ্রোহের পেছনের কারণ কী, পরিণতি কী by আলতাফ পারভেজ

প্রথমে কম বয়সীদের দিয়ে শুরু হলেও ক্রমে নেপালের বিক্ষোভে মধ্যবয়সী যুবারাও শামিল হন এবং শেষমেশ এটা অনেকটা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের চেহারা নেয়। নেপালে বিক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান করেছেন আলতাফ পারভেজ

নেপালে রাজনৈতিক অসন্তোষের ব্যাপকতা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে চমকে দিয়েছে। সমকালীন ইতিহাসে একদিনে রাজনৈতিক কারণে এত মানুষের মৃত্যুর নজির ছিল না এ দেশে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কাঠমান্ডুসহ দেশের অনেক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে।

প্রাথমিক খবরগুলোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করাকে তরুণসমাজের অসন্তোষের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আসল সমস্যা দেশটির দুর্নীতি ও প্রধান প্রধান দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে গভীর হতাশা। বিক্ষোভের ব্যাপকতায় ভূরাজনৈতিক উপাদানও যুক্ত আছে বলে অনুমান করছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা।

বিক্ষোভের উৎস দুর্নীতির ব্যাপকতা

বৃহস্পতিবার ছাব্বিশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা থেকে সর্বশেষ ঘটনার সূত্রপাত। মূলত এর প্রতিবাদেই কিশোর-তরুণেরা বিক্ষোভে নামেন। কাঠমান্ডুর পাশাপাশি বিক্ষোভ ছড়ায় আরও অনেক শহরে। মানুষ দ্বিতীয় দিনের মতো কারফিউ অগ্রাহ্য করে বিক্ষোভ করছে। সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও কতটা সফল হবে, তা বলা মুশকিল। এ ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্য চাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।

তরুণসমাজের আন্দোলনে নামার নৈতিক ও আইনগত যুক্তি হিসেবে ছিল সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ। যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদ, বাংলাদেশের মতো এটাও যুক্ত আছে, সরকার সামাজিক শান্তির প্রয়োজনে মতামতের প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেই সূত্রেই যোগাযোগমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়েছিল সরকার। এর বাইরে গোয়েন্দা বিভাগকে টেলিফোনে আড়ি পাতার অধিকার দিয়ে একটা আইন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে সম্প্রতি। সেটা শহুরে শিক্ষিত সমাজকে অসন্তুষ্ট করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের ঘোষণাকে মিছিল আহ্বানকারীরা শ্রেণিগতভাবে দুইভাবে নিয়েছিল। অনেক নিম্নবিত্ত তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যবসা করেন। তাঁরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তানেরাও এতে খেপে যান, কারণ তাঁদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসের ছন্দপতন ঘটায় এটা। অনেকের পড়ালেখার ধরনেও সমস্যা বাধে সরকারের সিদ্ধান্তে।

নেপালের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশের মতোই বিভিন্ন দলের কর্মী-সমর্থকদের রাজনৈতিক কথাবার্তার বড় এক পরিসর। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা যদিও শুরুতে বিক্ষোভের সংগঠক ছিলেন না এবং মিছিলেও সংখ্যায় কমই ছিল—কিন্তু সরকারের মিডিয়া নিষিদ্ধের পেছনে দুর্নীতির আলাপ বন্ধের ষড়যন্ত্র দেখছিল তারা।

প্রথমে কম বয়সীদের দিয়ে শুরু হলেও ক্রমে বিক্ষোভে মধ্যবয়সী যুবারাও শামিল হন এবং শেষমেশ এটা অনেকটা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের চেহারা নেয় এবং দ্বিতীয় দিন সেটা অনিয়ন্ত্রিত দাবানলের মতো পোড়াচ্ছে নেপালকে। বিক্ষোভের ধরনে প্রধান বিরোধী দলগুলোর বয়োবৃদ্ধ নেতাদের জন্যও গভীর সতর্কবার্তা রয়েছে। ফলে এটা থেকে তাদের ফায়দা নেওয়া এখনই সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বব্যাপী জেন-জিদের আন্দোলনে যা দেখা যায়, নেপালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি—তাৎক্ষণিকভাবে অনেক তারকাশিল্পী বিক্ষোভকারীদের পক্ষ নিয়েছেন। তারকারা বরাবরই পেশাগত স্বার্থে তরুণদের সঙ্গে থাকতে চান। আবার তরুণেরাও তাঁদের প্রিয় তারকার সমর্থন দেখলে বাড়তি চাঙা হন।

নেপালেও সোমবার তা-ই হলো। তবে নিজস্ব ন্যায্য ক্ষোভ বা প্রিয় তারকাদের সমর্থন ও অংশগ্রহণ যে কারণেই হোক বিক্ষোভকারীরা আন্দোলন শুরুর কিছু সময় পরই হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করেন। এ সময় রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রক্ষীরা গুলি চালালে তাৎক্ষণিকভাবে মারা গেছেন ১৯ জন। আহত মানুষের সংখ্যাও বিপুল। দ্বিতীয় দিন শেষে পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে, তা কেউ বলতে পারছে না।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় নজর রাখছে পরাশক্তিগুলো

কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন চলতি জোট সরকারের জন্য প্রথম দিনের ঘটনাবলি নিশ্চিতভাবে বড় এক ধাক্কা ছিল। পরদিন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগই করতে হয়। গত বছর জুলাইয়ে অলির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে অদ্ভুত এক মেরুকরণের মাধ্যমে। অলির দল ইউএমএল (ইউনাইটেড মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী পার্টি) জোট করেছে নেপালি কংগ্রেসের সঙ্গে। অলি নিজে চীনঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে নেপালি কংগ্রেসের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির সঙ্গে। পার্লামেন্টে দলগুলোর আসন-ক্ষমতা এমন যে কেউই সেখানে এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারায় অনেকটা ভিন্ন আদর্শের হয়েও অলির সঙ্গে জোট করেছিল নেপালি কংগ্রেস।
২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে নেপালি কংগ্রেসের সদস্য আছেন ৮৮ জন, অলির দলের আছেন ৭৬ জন এবং মাওবাদী কেন্দ্রের আছেন ৩২ জন। অলির আগে মাওবাদী প্রচণ্ড একই পার্লামেন্টে ভিন্ন আরেক মেরুকরণে প্রধানমন্ত্রী থেকেছিলেন কিছুদিন।

দেশটিতে ক্ষমতার এ রকম পালাবদলে ভারত ও চীনের ভূমিকা অনেক সময়ই বেশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

সোমবারের সহিংসতায় ভারত ও চীনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাতটি দেশের দূতাবাস একটা বিবৃতি দিয়েছিল। বিবৃতির ভাষায় বিক্ষোভকারীদের দাবির প্রতি সহানুভূতি দেখা গেছে। অলি সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে পুরো বিষয়টা চীনের জন্য একটা আঘাত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

কাঠমান্ডুর কূটনৈতিক পল্লিতে অনেকে নেপালের ঘটনাকে বাংলাদেশের গত বছর আগস্ট অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করতে চাইছেন এবং ভূরাজনীতির যোগ-বিয়োগ মিলাতেও সচেষ্ট এখন।

নেপালের দৈনিকগুলোয় গতকাল খোলামেলাভাবেই লেখা হয়েছে তাদের বিক্ষুব্ধ তরুণেরা বাংলাদেশের গত বছরের আন্দোলন এবং ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক জনবিক্ষোভ দেখে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ। বলা হচ্ছে, এই তিন দেশের তরুণসমাজের দুর্নীতিবিরোধী আওয়াজ নেপালের জেন-জিকে বিশেষভাবে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করেছে।

নেপালে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের বিশেষ খরা চলছে বহুদিন থেকে। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজনের বিলাসী জীবনের ছবি দেখে দেখে মানুষ ক্লান্ত। বেশ কয়েক মাস ধরে রাজনীতিবিদদের পুত্র-কন্যাদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিষোদ্‌গার চলছে। এ রকম বিলাসী সমাজকে ‘নেপো-কিড’ নামে ট্রল করে থাকে নেপালি জেন-জিরা।

প্রভাবশালী পরিবারগুলোর এ রকম ‘নেপো-কিড’দের দুর্নীতির প্রায় প্রতিটি ঘটনায় প্রশাসনের উদাসীনতায়ও জেন-জি ক্ষুব্ধ ছিল। এসবই এই বিক্ষোভের সামাজিক প্রধান জ্বালানি ছিল। তবে বিক্ষোভের পেছনে আরেকটি ভূরাজনৈতিক যোগসূত্র থাকতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। নেপালের দাবি করা একটা সীমান্ত অঞ্চলে ভারত ও চীন যৌথ ‘বর্ডার হাট’ করতে চাওয়ায় সাধারণ নেপালিরা দুই সপ্তাহ ধরে ব্যাপক ক্ষুব্ধ।

কালাপানি নামের এই এলাকাটি যদিও ভারতের দখলে এবং তারা চীনের সঙ্গে সেখানকার লিপুলেখ এলাকায় বাজার বসাতে চাইছে এখন—কিন্তু নেপালিরা মনে করে এই অঞ্চল আগে তাদেরই ছিল। ২০১৯ থেকে ভারত এটা তাদের মানচিত্রে দেখাচ্ছে এবং চীন সেটা মেনে নিচ্ছে। সাধারণ নেপালিরা চাইছিল তাদের সরকার শক্তভাবে এই দাবিতে ভারত ও চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াক।

কিন্তু বর্তমান জোট সরকারের প্রধান দল নেপালি কংগ্রেস ভারতপন্থী এবং দ্বিতীয় শরিক ইউএমএল চীনপন্থী হওয়ায় এ নিয়ে খুব বেশি প্রতিবাদ ওঠেনি। অন্যান্য প্রধান বিরোধী দলও সম্ভবত এ বিষয়ে ভারতকে বেশি চটাতে চাইছিল না। নেপালে অতীতেও এ রকম হয়েছে—প্রথম সারির রাজনীতিবিদেরা বিদেশি বন্ধুদের খুশি রাখতে গিয়ে দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার দায় এড়িয়ে গেছেন।

আবার যে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সরকার আয়কর না দেওয়া এবং নথিভুক্ত না হওয়ার দায়ে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, তারাও এই বিক্ষোভের পরোক্ষ ইন্ধনদাতা হিসেবে আছে। নিষিদ্ধের মাধ্যমে তাদের বিপুল মুনাফার বাজার হারানোর অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তারাও চাইছিল শক্ত ধাঁচের এক দফা বিক্ষোভ হোক।

বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন সংগঠক বলছেন, পার্লামেন্টে আক্রমণের কোনো লক্ষ্য ছিল না তাদের। কিছু গোষ্ঠী জমায়েতকে ব্যবহার করে ভাঙচুরের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় দিন থেকে পরিস্থিতিতে তাদের আর নিয়ন্ত্রণ নেই।

জনজীবন এবং রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা

প্রথম দিনের বিক্ষোভ শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগকালে তিনি বলেন, রক্তপাতের নৈতিক দায় তার। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির পদত্যাগের দাবিও বেশ সমর্থন পেতে শুরু করে। তৃতীয় প্রধান দল ‘মাওবাদী কেন্দ্র’ এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিল। এখন অলি পদত্যাগের পর নতুন সরকার—নাকি নতুন নির্বাচন হবে, সেটা অস্পষ্ট। কারণ, রাজধানীতে স্পষ্টত এখন কারও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেই।

সাধারণ মানুষ মনে করছে, বিক্ষোভ দমনে সরকার অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করেছে। কেউ কেউ সরকারকে শিশু হত্যাকারী বলেও উল্লেখ করছিল। পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী অলির জন্য একটা সুবিধার দিক ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দলের ছিলেন না। যেহেতু দেশটিতে জোট সরকার চলছে, সেই সূত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন নেপালি কংগ্রেস থেকে। তবে দ্বিতীয় দিন অলি দায় এড়ানোর সব সুবিধার বাইরে চলে গেছেন। পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলে হয়তো তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বই বিপন্ন হলো।

বয়স ৭৪ বছর বয়স হওয়ায় গত সপ্তাহ পর্যন্ত অলিকে অবসরে যাওয়ার জন্য চাপে রেখেছিলেন দলীয় তরুণেরা। এখন হত্যাকাণ্ডের ও পদত্যাগের পর নিশ্চিতভাবে দলের ভেতর থেকে নতুন করে তাঁকে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হবে।

ইউএমএলেতে নিয়ম ছিল বয়স ৭৪ হলে এবং পরপর দুবার কোনো পদে থাকলে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হবে। অলি সেটা মানতে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং চলতি বিক্ষোভের আগের দিনই তাঁর প্রভাবে দলের একটা কমিটি এই নিয়ম পাল্টানোর ঘোষণা দেয়। মূলত পুনরায় দলের চেয়ারম্যান হতে তাঁকে পথ করে দিতেই দলীয় নিয়ম পাল্টানো হয়।
এসব ঘটনাও নেপালজুড়ে বিরক্তি তৈরি করেছে। সবাই ভাবছে প্রবীণেরা কোনোভাবেই জায়গা ছাড়তে ইচ্ছুক নন। এখন মনে হচ্ছে তরুণেরা নিজেরাই রাজনীতিবিদদের তাড়াতে নেমেছেন।

প্রধানমন্ত্রী সোমবারের সহিংসতার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিষেধাজ্ঞা সরাননি। তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তাঁর পদত্যাগে সেটা সহজ হলো। সরকারের অংশীদার নেপালি কংগ্রেসও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে। এই দলের প্রভাবশালী নেতা শেখর কৈরালা সরকার থেকে কংগ্রেসকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন।

দলটির সম্পাদক গগন কুমার থাপা বলেছেন, রক্তপাতের দায় প্রধানমন্ত্রীরও। অলির ছোঁয়া থেকে সবাই এখন দূরে সরতে চাইছেন।

বিরোধী দলগুলো বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারলে শিগগিরই হয়তো আগাম নির্বাচন আদায় করতে পারবে। যদিও স্বাভাবিক নিয়মে পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছর। সোমবারের রক্তপাতের পরই সবার আগে নির্বাচন চেয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। তারা পার্লামেন্টে চতুর্থ বড় দল। বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন হলে তরুণদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা দলগুলো বাড়তি ভোট পেতে পারে। অন্তত শহরাঞ্চলে।

তবে নির্বাচন হলে বিশেষভাবে লাভবান হবে রাজতন্ত্রপন্থী দল—যাদের নাম আবার ‘প্রজাতন্ত্রী পার্টি’। শেষোক্ত এই দলও চলতি সামাজিক অসন্তোষকে নির্বাচন পর্যন্ত গড়িয়ে নিতে ইচ্ছুক। তারা কংগ্রেস, ইউএমএলের পাশাপাশি বিরোধী দল মাওবাদীদেরও বিরোধী।

রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী নাগরিক সমাজের অনেক প্রভাবশালীও জেন-জিদের চলতি আন্দোলনে বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছে। এর মধ্যে আছেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী দুর্গা প্রসাই। দুর্গা এবং সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্রের নাতি হিরেন্দ্র শাহ জেন-জি বিক্ষোভে শামিল হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেন-জিরা তাদের আসতে নিষেধ করেন। অনেকের সন্দেহ দ্বিতীয় দিনের সহিংসতায় তাদের হাত আছে।

২০০৮ সালে রাজার হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান দলগুলো প্রায় সবাই একাধিকবার করে সরকারে নেতৃত্ব দিয়েও দেশটির জনজীবনে অর্থনৈতিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য বদল ঘটাতে পারেনি। ফলে রাজতন্ত্রীদের প্রতি জনসমাজে একরূপ পক্ষপাতও বাড়ছে।

মাওবাদী কেন্দ্রের প্রচণ্ড এবং অপর মার্ক্সবাদী নেতা কে পি শর্মা অলি ইতিমধ্যে তিনবার করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবা এ পর্যন্ত পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বলা হয়, নেপাল এই তিন নেতার হাতে বন্দী। ঘুরেফিরে তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, কিন্তু দেশটির ভাগ্যের বদল ঘটছে না। মূলত এই হতাশা থেকেই নেপালে ৮ সেপ্টেম্বরের রক্তপাত এবং পরের দিনের সহিংসতা হলো।

এসব ঘটনায় দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো পুরো ভেঙে না পড়লেও আমূল এক ঝাঁকুনি খেল। এতে করে দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে জেন-জির অভিষেক ঘটল। ভবিষ্যতের ভোটের রাজনীতিতে এর প্রভাব হতে পারে বিপুল—যার পুরোটা এখনই অনুমান করা যাচ্ছে না।

তবে নেপালের তরুণেরা স্পষ্টত কোনো দলের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের আর দেখতে চাইছেন না। তাঁরা মনে করছেন, তাঁরা নেপালে আর্থসামাজিক রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তরুণেরা একই সঙ্গে দেশটিকে গভীর এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ও ফেলেছেন।

* আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2F7cpj8oyl%2F12.jpg?rect=0%2C0%2C4160%2C2773&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন আন্দোলনকারীরা। সে সময় অনেকের গায়ে জড়ানো ছিল দেশটির জাতীয় পতাকা। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এএফপি

চিরকাল কেউ বন্ধু বা শত্রু থাকে না, এই বক্তব্য দিয়ে কাকে বোঝাতে চাইলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

শুল্কযুদ্ধের আবহে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়ে দিলেন, স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু হয় না। স্থায়ী শুধু স্বার্থ। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি আয়োজিত ‘ডিফেন্স সামিট’ বা প্রতিরক্ষা সম্মেলনে যোগ দিয়ে আজ শনিবার রাজনাথ সিং এই মন্তব্য করেন।

ভারতের রপ্তানির ওপর একসময়কার ‘প্রিয় বন্ধু’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো ও তার পাল্টা ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দেশ চীনের সঙ্গে মিত্রতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনাথের এই মন্তব্য যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ।

ট্রাম্পের শুল্কনীতির পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভারত নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করছে চীনের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধেছিল। আগামীকাল রোববার চীন যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

চীনের তিয়ানজিনে এসসিও সম্মেলনের অবসরে মোদির সঙ্গে বৈঠক হবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ওই আসরে উপস্থিত থাকবেন। মোদির সঙ্গে বৈঠক হবে পুতিনেরও। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধের মোকাবিলায় এই তিন দেশ আপাতত জোটবদ্ধ।

সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে রাজনাথ বলেন, পৃথিবীতে চিরকালীন বন্ধু বা চিরকালের শত্রু বলে কিছু নেই। স্থায়ী শুধু স্বার্থ। দেশের মানুষের স্বার্থ, শ্রমিক–কৃষকদের স্বার্থ, উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষাই দেশের কাজ। দেশের সব মানুষের স্বার্থরক্ষাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যা করছে, তা দেশের স্বার্থরক্ষার জন্যই।

রাজনাথ বলেন, আজকের বন্ধু কালকের শত্রু হতে পারে। ভারত যদিও কাউকেই শত্রু মনে করে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আজকের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি বুঝিয়ে দিচ্ছে, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অন্য দেশের প্রতি নির্ভরতা আমাদের জন্য বিকল্প হতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের স্বনির্ভর হওয়া জরুরি।’

কেন জরুরি সেই ব্যাখ্যায় রাজনাথ বলেন, ‘পৃথিবী আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমাদের সামনে উঠে আসছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। মহামারি হোক, সন্ত্রাসবাদ হোক কিংবা আঞ্চলিক সংঘাত—এই শতাব্দীতে এখনো অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাকে চিনতে হবে। তবে আত্মনির্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। আত্মনির্ভরতাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়তা।’

ভারত যে সেদিকেই এগোচ্ছে তা জানিয়ে রাজনাথ বলেন, ২০১৪ সালে ভারেতর প্রতিরক্ষা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭০০ কোটি রুপিরও কম। সেই প্রতিরক্ষা রপ্তানি আজ বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার কোটি রুপি। এ থেকেই বোঝা যায়, ভারত আত্মনির্ভর হয়ে উঠছে। ভারতের পরিচয় আমদানিকারক থেকে রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠছে।

দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের দূরত্ব বেড়ে গেছে। পেহেলগামকাণ্ড ও অপারেশন সিঁদুরের পর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ সেই দূরত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। ‘বন্ধু’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেড়ে যাওয়া দূরত্ব ঘোচাতে ভারত দ্রুত ঝুঁকেছে ‘শত্রুভাবাপন্ন’ চীনের দিকে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কালক্ষেপণ না করে ভারতে এসে দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। মোদিও এসসিও সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভারতকে সার ও ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ পদার্থ বিক্রির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ছিল, চীন তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

পরিস্থিতির মোকাবিলায় দ্রুত কাছাকাছি আসছে ভারত, চীন ও রাশিয়া। কাছাকাছি আসছে পারস্পরিক স্বার্থরক্ষায়। রাজনাথ এই স্বার্থেরই উল্লেখ করে বলেছেন, এটাই একমাত্র স্থায়ী।

সীমান্ত সংঘাত ভুলে ভারতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জু ফেইহংও বলেছেন, ভারতের পণ্য যুক্তরাষ্ট্র না কিনলে চীন তা কিনবে।

শুল্কযুদ্ধের অবসান কীভাবে ঘটবে, তা এখনো অজানা। ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য অতিরিক্ত যে ২৫ শতাংশ শুল্ক জরিমানা হিসেবে চাপানো হয়েছে, তা তুলে না নিলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রও নানাভাবে বোঝাচ্ছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের ওপর চাপানো ৫০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়ে দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপের কাছে ভারত কখনো মাথা নোয়াবে না। এমন কিছু করবে না, যাতে মনে হয় ভারত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভারত বৈষম্য মেনে নেবে না। ১৪০ কোটি মানুষের আত্মসম্মান নষ্ট করে কিছু করবে না। ভারত বরং নতুন বাজার খুঁজবে, যেখানে পণ্য রপ্তানি করা যাবে।

গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে এই কথা জানিয়ে পীযূষ গোয়েল বলেন, ২০২৪–২৫ সালে ভারতের রপ্তানি যা ছিল, চলতি অর্থবর্ষে তার চেয়ে বেশি রপ্তানি হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-30%2F4pkv9xpq%2FRajnath.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। ছবি: এএনআই

বন্যারোধে খাল খনন কর্মসূচি ফিরিয়ে আনতে হবে by মোহাম্মদ সফি উল্যাহ

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। ওই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সহজ যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের মডেল তৈরি করা। ওই মডেলকে মানুষ ‘জিয়া মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করে।

ওই কর্মসূচি ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ মডেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল যাতে গ্রামের মানুষ খাদ্য বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বিনিময়ে খাল খননের কাজে অংশগ্রহণ করেছিল।

এভাবে স্থানীয় জনগণ দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়ে সহানুভূতি, আন্তরিকতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলেছিল। এটি আধুনিক যুগে সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিটিভিত্তিক মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বর্তমানে যেখানে সায়েন্টিফিক মডেল গ্রহণযোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি, সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী মডেল স্থাপন করেন।

এই মডেল বাস্তবায়ন করে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বে পরিচিত করেছিলেন। যদি এই মডেল চালু থাকত, তবে বর্তমানে বর্ষাকালে প্রতিবছর হওয়া বন্যা এবং শীতকালে পানির অপর্যাপ্ততা এতটা তীব্র হতো না।

একাডেমিক ফিল্ডে নিষ্কাশনব্যবস্থার মডেল যেমন ডেনড্রাইটিক, ট্রেলিস, রেডিয়াল বা আয়তক্ষেত্রাকার নিয়ে আলোচনা করার সময়, ‘জিয়া মডেল’ একটি অত্যন্ত সফল ও অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পায়।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার ডেনড্রাইটিক নিষ্কাশনব্যবস্থা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খালের ট্রেলিস নিষ্কাশনব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে—এর বাস্তব প্রমাণ হিসেবে জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি অতুলনীয় সাফল্যের সাক্ষী।

এই মডেল শুধু পানি ব্যবস্থাপনায় নয়, গ্রামীণ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তাতেও একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।

-----২.

এই খাল খনন কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল এবং এই সময়ে মোট ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল। এর মাধ্যমে লক্ষাধিক একর জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালে এই কর্মসূচি চালু হয়, যা কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খাল খনন করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন এবং খাদ্য স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করেছিল।

এই কর্মসূচির ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং গ্রামীণ স্বনির্ভরতা বাড়ে, যেখানে বিভিন্ন এলাকার মানুষ অংশগ্রহণ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।

ফলে এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিবিপ্লবের এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। যদি এটি অব্যাহত থাকত, তবে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারত। তাই বর্তমান সরকারের উচিত হবে এই কর্মসূচি পুনরায় চালু করা।

আমরা আশা করব, ভবিষ্যৎ সরকার এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করবে। এই কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের চরম ক্ষতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ফেনীর বন্যার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার একটি প্রধান কারণ সেখানকার নিষ্কাশনব্যবস্থার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এ ছাড়া দেশের বরেন্দ্র অঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলেও এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

-----৩.

কৃষিকাজে সেচের জন্য বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের (বরেন্দ্র অঞ্চলের) খালগুলো শীতকালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু বর্তমানে খাল ও নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে, এই অঞ্চলে পানির অভাব দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে, একই সঙ্গে বর্ষাকালে বন্যার সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে পানি-নিরাপত্তা অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ ঝুঁকির মাত্রা ১৯৮০ সালের দিকে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, তা ২০২১ সালের গিয়ে দাঁড়ায় ১৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে এবং ২০২৬ সালে এটি ৩০ দশমিক ৪২ শতাংশে দাঁড়াবে। যদি খালগুলো রক্ষা করা যেত, তবে এই সংকট এতটা তীব্র হতো না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে, যা শীতকালে সাধারণ মানুষ হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ডিপ টিউবওয়েল বা শ্যালো টিউবওয়েল বসাচ্ছে। যেসব পরিবার তা করতে পারছে না, তারা অন্যদের থেকে পানি কিনে ব্যবহার করছে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ওই অঞ্চলে যারা পানি কিনে ব্যবহার করছে, তাদের মাসিক গড় খরচ প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা। এর ফলে পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ বাড়ছে এবং তারা ক্রমেই দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদি খালগুলো রক্ষিত থাকত, তবে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্নবায়ন হতো এবং সহজেই পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যেত।

এ অঞ্চলে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে শুধু পানিসংকট নিরসন হতো না; বরং তা এসডিজি লক্ষ্যসমূহও যেমন এসডিজি ১, এসডিজি ৬, এসডিজি ১৩ ও এসডিজি ১৫ অর্জন করতে সহায়তা করত।

মধ্যাঞ্চলের নদী, খাল ও প্লাবন ভূমি অতিরিক্ত বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনে সাহায্য করত। একই সঙ্গে শীতকালে পানি ধরে রেখে সেচের সুবিধা নিশ্চিত করত। কিন্তু খালগুলোর ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণে বর্তমানে বর্ষাকালে তীব্র বন্যা দেখা দেয় এবং শীতে পানির সংকট তৈরি হয়। এর ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে। ১৯৭০-এর দশক থেকে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদের ওপরের দিক থেকে সুপেয় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এর ফলে ১৯৭০ থেকে ২০২০ মধ্যে প্রায় অতিরিক্ত ৪ লাখ হেক্টর জমিতে নতুন করে লবণাক্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে এ লবণাক্ততা ৫০-১০০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে প্রসারিত হয়, যা মাটির উর্বরতা ও পানির গুণমানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ফলে খাওয়ার পানি তীব্র সংকট সৃষ্টি ও কৃষিজমিতেও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যদি কর্মসূচি চালু থাকত, তবে খালগুলো মিষ্টি পানি ধরে রাখতে সাহায্য করত এবং নদীগুলো সঠিকভাবে খনন হলে লবণাক্ততা এতটা বিস্তার লাভ করত না। খাল খননের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় মিঠাপানির সংরক্ষণ শুধু কৃষিতে নয়, মাছ চাষেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলত।

-----৪.

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিল এক যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাল খনন/পুনঃ খনন এবং কৃষি উৎপাদনে সফলতা এনেছিল। এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে জনসম্পৃক্ত এবং শৃঙ্খলাভিত্তিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।

বন্যা ও খরা প্রতিরোধে খাল ও নদীর খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি এখন সময়ের দাবি। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে দেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে, কৃষিকাজে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং সুপেয় খাবারের পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি ‘জিয়া মডেল’ আবার জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে।

* মোহাম্মদ সফি উল্যাহ, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এবং কনভেনর, সাদা দল, আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-20%2Fkuxen8dw%2Fcanalkk.JPG?rect=13%2C0%2C539%2C359&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বন্যা নিয়ন্ত্রণে খাল কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ খাল এখন দখল, দূষণে মৃতপ্রায়। ছবি : প্রথম আলো

ডাকসু ও জাকসু: তাহলে চব্বিশ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিলাম by সোহরাব হাসান

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষকের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) নির্বাচনে বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, সেখানকার অবস্থা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও খারাপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত প্রতিরোধ মঞ্চ থেকে একজন জয়ী হয়েছেন, জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু জিততে না পারলেও প্রতিযোগিতায় ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগরে এমন কেউ প্রতিযোগিতায় আসবে বলে মনে হয় না।

ঘণ্টাখানেক পরই খবর পেলাম, জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রদল ও বাম সমর্থকসহ পাঁচটি প্যানেল ভোট বর্জনের আওয়াজ দিয়ে লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে যে তাঁরা ফলাফল ঘোষণার আগেই নিজেদের নৈতিক পরাজয় স্বীকার করে নিলেন, এই বোধও সম্ভবত নেতাদের নেই।

ভোট গ্রহণের পর আরেক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি, যিনি চব্বিশের গণ–আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগরে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর বক্তৃতা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশবাসীকেও উদ্দীপ্ত করেছে। তিনি জাকসুর নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম–অব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনকেই দুষলেন। যাঁরা এই নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও দক্ষতা আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি স্টার মার্ক পেয়ে থাকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাস নম্বরও পায়নি। বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় ভোট গ্রহণ শেষ হলেও গণনার কাজ এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত শেষ হয়নি।

বেদনাদায়ক ঘটনা হলো জাহাঙ্গীরনগরে ভোট গণনাকালে শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি পোলিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে ডাকসু নির্বাচনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ভেতর অসুস্থ হয়ে মারা যান এস টিভির সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম শিবলী।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি সাধারণ নির্বাচনই নয়, এটি একটি “ফাউন্ডেশনাল ইলেকশন”, যার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের অবশ্যই মৌলিক সংস্কারগুলো চূড়ান্ত করে ফেলতে হবে।’

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এটাও পুরোনো কথা। এরই মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদে রদবদলের গুঞ্জনও আছে। প্রধান উপদেষ্টা যদি মনে করেন, নির্বাচনের অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে উপদেষ্টা পরিষদের যোগ–বিয়োগ করা দরকার, সেটা এখনই করতে হবে।

ডাকসু নির্বাচনের ফল অনেককেই চমকে দিয়েছে। এখানে জাতীয় রাজনীতির চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও নমনীয়তা, সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিপদে আপদে যাঁকে কাছে পেয়েছেন তাঁকে ভোট দিয়েছেন। ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছে ছাত্রশিবির। শিবিরের বিশাল জয়ের বিষয়ে এনসিপির এক নেতার মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘প্রথাগত ধর্মীয় রাজনীতির বাইরে এসে লিবারেল ধারায় মধ্যমপন্থী জায়গা থেকে প্রচার ও প্যানেল সাজিয়েছিল শিবির। ডানপন্থী বা ধর্মভিত্তিক বক্তব্য না টেনে মধ্যপন্থী জায়গা থেকে তারা প্রচার চালিয়েছে, এ বিষয়টিও তাদের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।’

অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে ডাকসু ও জাকসুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেই প্যানেলকে বেছে নিয়েছে, তাকে সম্মান জানাতে হবে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কী কারণে তারা পরাজিত হলো সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। ইতিমধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিবের আঁতাত আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের এই আবিষ্কারের পেছনে তথ্যপ্রমাণ থাকলে সেটা দেশবাসীকে জানানো হোক। কিন্তু এটিও প্রশ্ন, তারা গত এক বছরে কী করেছে?

নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। আমাদের রাজনীতিকেরা গত ৫৪ বছরে এই ধাপটিই পার হতে পারেননি। তাঁরা ক্ষমতায় গিয়ে এমন কাজ করে দেখাতে পারেননি, যাতে মানুষ মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব। রাজনীতিকেরাই আন্দোলন সংগ্রাম করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে ২০০৭ সালের নির্বাচনটিই করতে পারল না। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে গিয়ে তাদের আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবাধায়ক ব্যবস্থাটিই বাতিল করে দিল। তার পরিণামও তারা ভোগ করছে।

এখন আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। বিএনপি মাঠে আছে। মাঠে আছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য দলও। কিন্তু এসব দল গত কয়েক মাস ধারাবাহিক আলোচনা করেও নির্বাচন তথা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর বিষয়ে মতৈক্যে আসতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় ‘পতিত স্বৈরাচারের’ ওপর চাপিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করা যাবে, গণতন্ত্র এক পাও এগোবে না।

আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকেরা, ছাত্রনেতারা কেউ অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেন না। তাঁদের অনেকে বিতাড়িত আওয়ামী লীগকে নিয়ে প্রতিদিনই কথা বলেন। তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু নিজেরা কীভাবে একটি নির্বাচন করবেন, সে বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে পারছেন না।

ছাত্রদল, বাম ছাত্রসংগঠন ও বাগছাসের নেতারা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এখনো বলছেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে তাঁরা খুব কম কথাই বলেছেন। নানা সূত্রে জানতে পেরেছি, এই কাজটি ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা করেছেন। ছাত্রদল তো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই বলে নির্বাচনই ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছিল। পরে সব ছাত্রসংগঠনের দাবির মুখে তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে রাজি হয়। অন্যদিকে বাম ও চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতৃত্ব বহু ভাগে ভাগ হয়ে গেল, যার সুফলটা এককভাবে শিবির–সমর্থিত প্যানেল পেয়েছে।

ছাত্রদলের নেতারা মনে করতেন, জাতীয় নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। একসময় বামপন্থী রাজনীতিকেরাও এই কাজটি করতেন। তাঁরা বলতেন, আগে সমাজ বদলাও। এরপর মানুষের ভাগ্যও বদলে যাবে। কিন্তু তাঁরা এ কথা কখনো ভাবেননি যে মানুষ না বদলালে সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা কিছুই বদলায় না।

চব্বিশে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেই ছাত্রনেতৃত্ব একটি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকারকে হটিয়ে দিতে পেরেছে, তারা কেন সুন্দরভাবে একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে পারবে না। ডাকসু নির্বাচনটি মোটামুটি উতরে গেলেও জাকসুতে এসে প্রলয়কাণ্ড ঘটল, যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এড়াতে পারবে না। দুর্ভাগ্য, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর যাঁরা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছেন, তাঁরাও পুরোনো পথে হাঁটছেন।

মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, যদি ছাত্রনেতৃত্ব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় কিংবা নির্বাচন হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের রায় না মেনে নেয়, তাহলে সামনে আরও অনেক বিপদ অপেক্ষা করে আছে।

* সোহরাব হাসান, সাংবাদিক ও কবি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জাকসু নির্বাচনে ভোট দিতে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল কেন্দ্রে
জাকসু নির্বাচনে ভোট দিতে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল কেন্দ্রে। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলে চুক্তিতে সই নেতানিয়াহুর, ভেঙে যাবে পশ্চিম তীর

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি বাড়াতে চান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে একটি চুক্তিতে সই করেছেন তিনি। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দখলকৃত পশ্চিম তীর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওই চুক্তিতে সই করেন গতকাল বৃহস্পতিবার, মালে আদুমিম বসতি এলাকায় একটি অনুষ্ঠানে। এলাকাটি জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত। অনুষ্ঠানে দম্ভ প্রকাশ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র থাকবে না—এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যাচ্ছি আমরা। এই জায়গা আমাদের।’

ইসরায়েলের নতুন ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন ৩ হাজার ৪০০টি বাড়ি নির্মাণ করা হবে। এর ফলে পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিত তীরের বেশির ভাগ অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফিলিস্তিনিদের কাছে পূর্ব জেরুজালেমের বড় গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে এই এলাকা চান তাঁরা।

১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীরে বসতি গড়ছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইনে এই বসতিগুলোকে অবৈধ বিবেচনা করা হয়। বৃহস্পতিবার ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেন, এই অঞ্চলে শান্তির জন্য পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর নতুন পদক্ষেপের পর দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ‘অনিবার্য’ হয়ে পড়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পুরো এলাকাকে ‘নরকের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছেন উল্লেখ করে নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেন, জাতিসংঘের ১৪৯টি সদস্যদেশ এরই মধ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। যেসব দেশ এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, সেগুলোকে দ্রুত এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

যে পথে নতুন চুক্তি

দীর্ঘ সময় ধরেই দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের পক্ষে নেতানিয়াহু। আগে থেকেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সব প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। এ ছাড়া অসলো চুক্তিতে স্বাক্ষরের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন নেতানিয়াহু। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ফলে আশা জেগেছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে।

১৯৯৭ সালে ইসরায়েলে প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নেতানিয়াহু। তখন তিনি পূর্ব জেরুজালেমে হার হোমা নামের বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছিলেন বলে সিএনএনের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এনআরজিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কখনোই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হবে না।

সম্প্রতি একই ধরনের কথা বলেছিলেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ। তাঁর ভাষ্যমতে, পশ্চিম তীরে ‘ই-১’ নামের একটি বসতির মতো বিভিন্ন অবৈধ বসতিগুলো মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলতে সহায়তা করবে। স্মোতরিচ বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কিছু নেই এবং স্বীকৃতি দেওয়ার মতো কেউ নেই।’

এরই মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। তাতে পশ্চিম তীর থেকে দ্রুত ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার, নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ এবং এরই মধ্যে যাঁরা বসতি স্থাপন করেছেন, তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলা হয়। ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল শতাধিক দেশ। আর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪।

এ ছাড়া চলতি মাসে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও মাল্টা। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ আরও বেশ কিছু দেশ শর্তের আওতায় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছে। যদিও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশগুলো সেটি করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

সহিংসতার মাঝেই নতুন পরিকল্পনা

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের খবর যখন সামনে এল, তখন সেখান সহিংসতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। গত সোমবার জেরুজেলেমে গোলাগুলিতে ছয়জন নিহত হন। সেখানকার রামোত এলাকায় দুই ফিলিস্তিনি গুলি চালানোর পর এ ঘটনা ঘটে। আহত হন বেশ কয়েকজন। এরপর ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।

বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, পশ্চিম তীরের তুলকারেম এলাকা থেকে প্রায় ১০০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এক হামলায় দুজন ইসরায়েলি সেনা আহত হওয়ার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। গাজা উপত্যকায়ও চলছে ইসরায়েলের নৃশংস হামলা। সেখানে গত ২৩ মাসে ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনে হত্যা করা হয়েছে। আহত ১ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি।

 ইসরায়েলের দখল করা পশ্চিম তীরে ইহুদিদের অবৈধ মালে আদুমিম বসতি
ইসরায়েলের দখল করা পশ্চিম তীরে ইহুদিদের অবৈধ মালে আদুমিম বসতি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

৫০০ মানুষের সার্ক দ্বীপে বিশ্বের ‘সর্বোচ্চ’ বিদ্যুৎ বিল কেন

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ইংলিশ চ্যানেলের মাঝামাঝি অংশে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ সার্ক। এই দ্বীপে বাস করছেন ৫০০ জনের কম মানুষ। এটি ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের অংশ হলেও এর নিজস্ব সরকার রয়েছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর থাকলেও দ্বীপটির মানুষদের মন ভালো নেই। কারণ, এখানকার মানুষ এমন পরিমাণে বিদ্যুতের দাম দিচ্ছেন, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বিশ্বের সর্বোচ্চ। সর্বশেষ গত দুই সপ্তাহে দ্বীপটিতে এক কিলোওয়াট ঘণ্টা, অর্থাৎ বিদ্যুতের এক ইউনিটের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। খবর বিবিসির

বাংলাদেশের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি

দ্বীপটিতে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ১ দশমিক ১৩ ব্রিটিশ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮৬ টাকা (প্রতি পাউন্ড ১৬৪ টাকা ৪০ পয়সা ধরে)। এটি বাংলাদেশের বিদ্যুতের দামের তুলনায় অনেক বেশি। যেমন ঢাকায় গড় বিদ্যুৎ খরচ প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টায় ৭ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

সার্ক দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সার্ক ইলেকট্রিসিটি লিমিটেড (এসইএল) নামের একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যালান উইটনি-প্রাইস জানান, দ্বীপে বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ হলো সরকারের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ এবং কোম্পানির সেই আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলার ব্যয়ভার।

সার্কের স্থানীয় সরকারকে বলা হয় চিফ প্লিয়াজ। এটি ১৮ জন নির্বাচিত সদস্য, ১ জন প্রেসিডেন্ট ও ১ জন উত্তরাধিকারী লর্ড নিয়ে গঠিত। সরকার চাইলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি জোরপূর্বক ক্রয়ের জন্য আদালতে যেতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির অর্থনীতির প্রভাষক দিলীপ জেনা বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল এতটা বাড়ার পরে আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল “এটি অত্যধিক”। এমন ছোট দ্বীপেও এ রকম দাম হওয়া উচিত নয়।’ দিলীপ জেনা আরও জানান, এটি তাঁর দেখা সর্বোচ্চ বিদ্যুতের দাম।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ এনার্জি ইকোনমিস্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা টম মিলারও জানান, এটি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের দাম। মিলার বলেন, ‘আমি বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দেখেছি। কিন্তু সার্ক দ্বীপের বিদ্যুতের দাম দেখে সত্যিই অবাক হয়েছি।’

মূল্যবৃদ্ধির কারণ

দ্বীপে কম জনসংখ্যার কারণে সার্ক ইলেকট্রিসিটি লিমিটেডের (এসইএল) তেমন কোনো মুনাফা বা আর্থিক সুবিধা নেই। এ ছাড়া গত দুই দশকে দ্বীপটির গ্রিডে প্রায় কোনো ধরনের বিনিয়োগ হয়নি। ফলে ডিজেল জেনারেটরে নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। সেই ডিজেল জ্বালানি প্রথমে পার্শ্ববর্তী গার্নসির দ্বীপে নেওয়া হয়, তারপর তা সার্কে আনা হয়। এসব কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়তি। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রশাসনিক জটিলতা।

জ্বালানি–বিশেষজ্ঞরা সার্ক দ্বীপের বর্তমান বৈদ্যুতিক অবকাঠামোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘জীবনকাল অতিক্রান্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।

যেভাবে সংকটের শুরু

সার্ক দ্বীপে অধিবাসীদের সঙ্গে বিদ্যুৎ কোম্পানির (এসইএল) সাম্প্রতিক যে উত্তেজনা চলছে, তা নতুন কিছু নয়। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সার্ক সরকারের টেবিলে আসে। এরপর সার্কের চিফ প্লিয়াজ ও এসইএলের মধ্যে ছয় বছরের দর-কষাকষির পরে একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নাম সার্ক ইলেকট্রিসিটি প্রাইজ কন্ট্রোল কমিশনারের কার্যালয়।

২০১৮ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৬৬ পেন্স (ব্রিটিশ মুদ্রা, পাউন্ডের ভগ্নাংশ মূল্য) নির্ধারণ করে। ওই বছরেই এসইএল কোম্পানির অন্যতম মালিকানা অংশীদার ডেভিড গর্ডন-ব্রাউন সার্কে বিদ্যুৎ বন্ধ করার হুমকি দেন। তাঁর দাবি ছিল, বিদ্যুতের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কোম্পানির ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট নয়। এরপর দুই পক্ষ এক বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির একটি সমাধানে আসে। আর সেটি হলো, সার্কের সরকার কোম্পানিটি কিনে নেবে। কিন্তু সাত বছর ধরে এই কেনাবেচার প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।

এসইএলের আগের মালিক ডেভিড গর্ডন-ব্রাউন ২০১৯ সালে মারা গেলে কোম্পানিটি কিনে নেন অ্যালান উইটনি-প্রাইস নামের একজন। এসইএলের বর্তমান মালিক উইটনি-প্রাইস অবশ্য কেনাবেচার ধীরগতিতে সন্তুষ্ট নন। তিনি এই সময়ক্ষেপণের আর্থিক ক্ষতি মেটাতে ‘আইনি প্রক্রিয়ায়’ বাড়তি শুল্ক যোগ করেন। অর্থাৎ এর মাধ্যমে ক্রয়প্রক্রিয়া চলাকালে তাঁর বাড়তি ব্যয়গুলো যেন মেটানো যায়। মূলত এটিই দ্বীপটিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সর্বশেষ কারণ।

এদিকে বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দ্বীপের ব্যবসা কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের খোলার সময় পরিবর্তন করছে। যেমন টাইম অ্যান্ড টাইড নামের দ্বীপের একটি রেস্তোরাঁ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎ বিল প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এ জন্য তারা এখন প্রতি সপ্তাহে রেস্তোরাঁ খোলার সময় পর্যালোচনা করবে।

‘আমি বাড়তি দাম দেব না’

সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির জবাবে সার্কের বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণ–বিষয়ক কমিশনার শেইন লিঞ্চ বলেছেন, নতুন দামটি ‘ন্যায্য বা যুক্তিসংগত নয়’। অন্তত অক্টোবরের আগে তিনি বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে পারবেন না।

সাবেক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতা টনি লে লিভরে সেই বাসিন্দাদের একজন, যিনি বলছেন যে উচ্চতর বিদ্যুতের দাম তিনি দিতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে অধিকাংশ বাসিন্দাও একই কাজ করবে (বাড়তি দাম দেবে না)।’ বরং এসইএল কীভাবে এত বড় মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক মনে করতে পারে, সেটি ভেবে বিস্ময় প্রকাশ করছেন টনি লে।

একটি গেস্ট হাউসের মালিক হেলেন লে পোয়েডভিন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সম্প্রতি দ্বীপের প্রায় ৮০ জন বাসিন্দাকে নিয়ে একটি সভার আয়োজন করেছেন। সেখানে তাঁরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। ওই সভায় তিনি বলেন, ‘আমি রাগান্বিত। আমরা এখন টিভি চালাতে পারি না, আমাদের যা করণীয়, তা সব সময় ভেবে নিতে হচ্ছে। আমি এ পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’

এসইএল কেনায় কতটা এগিয়েছে চিফ প্লিয়াজ

চিফ প্লিয়াজ (সার্ক সরকারের অংশ) যখন ঘোষণা করেছিল, তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কিনতে চায়, তখন থেকে ক্রয়প্রক্রিয়ায় খুব ধীরগতিতে অগ্রগতি হয়েছে। অর্থাৎ তারা কেন্দ্রটি কিনতে চাইলেও সে জন্য অনেক সময় নিচ্ছে।

অন্যদিকে এর মধ্যেই সরকার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করেছে সার্ক দ্বীপের জন্য একটি নতুন শক্তি (বিদ্যুৎ) ব্যবস্থার নকশা করতে, যা নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর ভিত্তি করে হবে। এই নতুন পদ্ধতিতে ব্যয় হতে পারে ৮৬ লাখ পাউন্ড।

পাশাপাশি চিফ প্লিয়াজ সরকার একটি আইন পাস করেছে, যা তাদের বাধ্যতামূলক ক্রয় করার অনুমতি দেয়। সরকার অবশ্য আশা করছে, এসইএলের ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করতে হবে না। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হলেও হতে পারে।

চিফ প্লিয়াজের পক্ষে দ্বীপের বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করা কমিটির কাউন্সেলর মাইক লক সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটি আমাদের কমিউনিটির সংবেদনশীল সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়েছে এবং ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। যেমন সম্প্রতি সার্কে স্থানান্তরিত একজন অধিবাসী বলেন, যাদের ছোট পরিবার আছে, তারা এত ব্যয়বহুল পরিস্থিতির মধ্যে কেন সার্কে বসবাস করবে? কেন বিনিয়োগ করবে?

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2Fhle75xmk%2FShark-1.JPG?rect=223%2C0%2C729%2C486&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সার্ক দ্বীপের সরকারি ওয়েবসাইটের সৌজন্যে

ট্রাম্পের ধাক্কায় হতভম্ব মোদি যে কঠিন শিক্ষা নিচ্ছেন by মুকুল কেশবন

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারতের শাসকশ্রেণি ভেতরে-ভেতরে খুশিই হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে প্রকাশ্যে ও আড়ালে ‘কিং ডোনাল্ড’-কে খুশি করার চেষ্টা করতেন, তাতে মনে হয়েছিল, এই দুই ডানপন্থী ‘দানবের’ মধ্যে বিশেষ রসায়ন তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্প যখন শুল্ককে অস্ত্র বানিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাতে শুরু করলেন, তখন ভারত বেকায়দায় পড়ে। ভারত ব্যতিব্যস্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বসেছিল। তবে দিল্লি জানত, এসব আলোচনা সহজ হবে না; কারণ কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভারতের কঠিন শর্ত ছিল। তারপরও আশা ছিল, ভারতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্র মাথায় রাখবে এবং চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেশটি তার কৌশলগত প্রয়োজন মেনে নিয়ে একটা ভালো চুক্তি করবে।

কিন্তু হলো উল্টোটা। ট্রাম্প প্রথমে এপ্রিল মাসে ভারতের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসালেন, যা কিনা অনেক মার্কিন মিত্রদেশের ওপর আরোপিত শুল্কের চেয়েও অনেক বেশি। এরপর শাস্তি হিসেবে সেই হার দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা হলো। এর কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বলা হলো, ভারত ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন রাশিয়ার তেল কিনে তা শোধন করে আবার রপ্তানি করছিল। এই নতুন শুল্কহার ভারতের সব অ-মুক্তপণ্যের (নন–এক্সেম্পট) মার্কিন বাজারে রপ্তানি প্রায় অপ্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। এর মানে দাঁড়ায়, ভারত থেকে যেসব পণ্য মার্কিন বাজারে রপ্তানির সময় শুল্কছাড় পায় না (মানে যেগুলো অ-মুক্তপণ্য), সেসব পণ্যের ওপর এখন নতুন করে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

শুল্কের বাইরেও আরও বিষয় আছে। এপ্রিল মাসে পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের ঘটনায়ও ট্রাম্প ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত ও পাকিস্তানকে এমনভাবে তুলে ধরলেন, যেন দেশ দুটি ঝগড়াটে প্রতিবেশী এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না।

ট্রাম্প পরে জোর দিয়ে বললেন, তিনি টেলিফোনে হুমকি দেওয়ার কারণেই ভারত ও পাকিস্তান লড়াই বন্ধ করেছে। এতে ভারত ও পাকিস্তানকে একই কাতারে ‘অশান্ত ঝামেলাবাজ’ হিসেবে দাঁড় করানো হলো। এটি ভারতের জন্য ছিল ভীষণ অপমানজনক। ফলে ভারত ট্রাম্পের এসব দাবি অস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্প ভারতীয় রপ্তানির ওপর যে ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছিলেন, তার আসল কারণ ছিল অন্য। তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব নিতে চেয়েছিলেন; তিনি চেয়েছিলেন সবাই তাঁকে শান্তির নায়ক মনে করুক এবং এর মাধ্যমে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পথ সুগম হোক। কিন্তু ভারত তাঁকে সে কৃতিত্ব দিতে চায়নি এবং সে কারণেই তিনি মোদির ওপর খেপে গিয়ে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।

ট্রাম্প শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এটা ভারতের ওপর শাস্তিমূলক আঘাত। তিনি ভারতকে ‘মৃত অর্থনীতি’ বলে উপহাস করেছেন এবং তাঁর প্রধান বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো অভিযোগ তুলেছেন, ভারত সস্তায় রাশিয়ার তেল কিনে মুনাফা করছে, অর্থাৎ যুদ্ধ থেকে দিল্লি লাভ তুলছে। এমনকি ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘মোদির যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

এই লজ্জাজনক সম্পর্কচ্ছেদ মোদির এক দশকের পরিশ্রমে তৈরি করা ‘বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত রাষ্ট্রনায়ক’ ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি যে উদ্যম নিয়ে বিদেশি নেতাদের জড়িয়ে ধরতেন আর বাড়াবাড়ি রকমের বন্ধুত্ব দেখাতেন, এখন সেসব হাস্যকর মনে হচ্ছে। তবে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের এই মোড় কেবল দুই ক্ষমতাবান নেতার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

ভারত বড় দেশ; তার ভূরাজনৈতিক অবস্থান একদিনে বদলানো সহজ নয়। শীতল যুদ্ধের সময় ভারত পুঁজিবাদী ব্লক বা সমাজতান্ত্রিক ব্লকে—কোনোটাতেই যোগ দেয়নি। এটাকেই তখন বলা হয়েছিল জোটনিরপেক্ষ নীতি (নন-অ্যালায়েনমেন্ট)। মোদির আমলে এই শব্দটা খুব একটা জনপ্রিয় নয়, কারণ শব্দবন্ধটি নেহরুর সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে মোদির পররাষ্ট্রনীতি আসলে একই রকম। মোদির নীতি হলো ভারতকে বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিজের মতো কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া। এখন এই নীতিকে বলা হচ্ছে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি)।

তবে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ আর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর লক্ষ্যটা একই।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—ভারত রাশিয়া থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কিনছে, সেটা শোধন করে আবার ইউরোপে রপ্তানি করছে। বাইডেন প্রশাসন বিষয়টা জানত, তবু চুপ ছিল। এটাকেই ভারতের ‘দুই দিক সামলানোর ক্ষমতা’র প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা বড় পরিবর্তন এসেছে।

গত ২৫ বছরে ভারতের রাজনীতিক শ্রেণি যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। শাসকশ্রেণির সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নও জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।

মনমোহন সিংয়ের (যিনি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন) আমল থেকেই ভারত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। পরে কোয়াড (যেখানে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একসঙ্গে আছে) গঠিত হয় চীনকে ঠেকানোর জন্য। এটাকে সবার কাছে ভারতের পশ্চিমমুখী ঝোঁকের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।

এই ঝোঁক ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একধরনের অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। বাইরে থেকে দেখা যায় ভারত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ মেনে চলে, কিন্তু আসলে সে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকেছে। ভারত এমন সব জোট করেছে, যেগুলো পুরোপুরি জোট নয়, সম্পর্কও খুব ঘনিষ্ঠ দেখানো হলেও ভেতরের আসল ভিত্তি ততটা মজবুত নয়।

মোদির শাসনামলে নীতিনির্ধারকেরা ভেবেছিলেন, ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি আর প্রবৃদ্ধির হার এতটাই বড় যে এখন ভারত বিশ্বের শীর্ষ শক্তিগুলোর টেবিলে বসার যোগ্য হয়ে গেছে।

কিন্তু আসল কথা হলো—ভারত না এত ধনী, না পশ্চিমা দেশগুলোর মতো শ্বেতাঙ্গ, না পুরোপুরি ইংরেজিভাষী। তাই আসল সত্যটা হলো, পশ্চিমা দুনিয়ার বা অ্যাংলো-আমেরিকান ব্লকের ভিআইপি ক্লাবের স্থায়ী সদস্য হওয়ার মতো জায়গায় ভারত এখনো পৌঁছায়নি।

মোদির কর্মকর্তারা ভুলে গিয়েছিলেন, পশ্চিমের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের আসল কোনো ‘মিত্র’ নেই; তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, ওখানে সবাইকে ‘ক্লায়েন্ট’ বা নির্ভরশীল দেশ হিসেবে দেখা হয়।

ট্রাম্প ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক বসালেন একেবারে রাগ করে। এটা আবারও মনে করিয়ে দিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অনেক সময় ভারতকে হয় ভিখারি নয়তো ঝামেলাবাজ হিসেবেই দেখে এসেছেন।

অনেকে বলেন, ট্রাম্প আসলে অন্য রকম নেতা। তাই তিনি যেভাবে ভারতকে নিয়ে ঝগড়া করছেন, সেটা সাময়িক। যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সম্পর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ (অর্থনীতি ও রাজনীতির কারণে) যে, এই সম্পর্ক দীর্ঘদিন খারাপ থাকবে না।

কিন্তু আসলে ব্যাপারটা উল্টো। ট্রাম্প আসলে সেই সত্যটা বলে ফেলেছেন, যা অন্য পশ্চিমা নেতারা ভব্যতার খাতিরে এত দিন মুখে আনতে পারেননি।

পশ্চিমা দেশগুলো সব সময় ভারতকে সাহায্য করেছে। কিন্তু সেই সাহায্য ছিল তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার কৌশল। এখন জলবায়ু পরিবর্তন আর চীনের উত্থান প্রমাণ করে দিয়েছে, পশ্চিমাদের ক্ষমতা চিরকাল টিকবে না। তার ওপর তাদের অর্থনীতিও আর আগের মতো বাড়ছে না। তাই তারা ধীরে ধীরে সেই নিয়মকানুন আর ব্যবস্থাগুলো থেকে সরে আসছে, যেগুলো একসময় নিজেরাই বানিয়েছিল এবং অন্যদের মানতে বাধ্য করেছিল।

গাজা হলো এই পরিস্থিতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিদেশি সাহায্য, শরণার্থী আইনি ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, জাতিসংঘ—সবকিছু এখন তারা অগ্রাহ্য করছে। দরিদ্র ও অস্থির বিশ্ব থেকে নিজেদের বাঁচাতে ধনী দেশগুলো নিজেদের চারপাশে সুরক্ষা বলয় তৈরি করছে।

ফলে পশ্চিমা দেশগুলোয় উগ্র ডানপন্থী দলগুলো দ্রুত বাড়ছে। ট্রাম্প-ঘরানার নেতারা সামনে আসছেন। নাইজেল ফারাজ, জর্ডান বারদেলা, অ্যালিস ভাইডেল, ভিক্টর অরবানের মতো নেতারা দেখাচ্ছেন, ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদ ও সুরক্ষাবাদ অমোচনীয়। ভারতের মতো অ-পশ্চিমা দেশগুলোকে এ ধরনের বাস্তবতাকে দীর্ঘ সময় ধরে মোকাবিলা করতে হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপীয় নেতারা শুধু ট্রাম্পকে খুশি করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেকে ছোট করতেও রাজি আছেন।

পশ্চিমা উদারপন্থীরা যত সমালোচনা করুক না কেন, ট্রাম্প যেদিক নেতৃত্ব দেবেন, ইউরোপ তা অনুসরণ করবে। ট্রাম্পের শুল্ক শুধু খেয়ালি বিষয় নয়। এটা ইঙ্গিত। সে ইঙ্গিতের মানে হলো—পশ্চিমারা নিজেদের চারপাশে দেয়াল বানাচ্ছে।

ভারতের আগের প্রধানমন্ত্রীদের মতো মোদিও শিখছেন—ভূগোলকে এড়িয়ে সামনে যাওয়া যায় না। আর জোটনিরপেক্ষ থাকাটা ভারতের কোনো পছন্দের বিষয় নয়; এটা আদতে তার জন্য বাধ্যতামূলক বিষয়। মোদি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ভারতের অবস্থান বিশ্বের মানচিত্রে দেশটিকে অনেক সময় কঠিন এবং সীমিত বিকল্পের সামনে দাঁড় করায়।

মোদি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ভারত কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের মতো সমানতালে দাঁড়াতে পারবে না। আবার ট্রাম্পের কাছে ইউরোপের মতো মাথা নত করেও থাকতে পারবে না। তাই ভারতকে বাধ্য হয়ে এক দড়ির ওপর হাঁটতে হবে। একটি বৈরী বিশ্বকে মোকাবিলা করতে করতে তাকে একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে দুলতে হবে।

- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* মুকুল কেশবন, ভারতীয় ইতিহাসবিদ, ঔপন্যাসিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মোদি যে উদ্যম নিয়ে বিদেশি নেতাদের জড়িয়ে ধরতেন আর বাড়াবাড়ি রকমের বন্ধুত্ব দেখাতেন, এখন সেসব হাস্যকর মনে হচ্ছে।
মোদি যে উদ্যম নিয়ে বিদেশি নেতাদের জড়িয়ে ধরতেন আর বাড়াবাড়ি রকমের বন্ধুত্ব দেখাতেন, এখন সেসব হাস্যকর মনে হচ্ছে। ছবি : রয়টার্স

‘ফিলিস্তিন বলে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না, এই ভূমি আমাদের’, বললেন নেতানিয়াহু

প্রথম আলোঃ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিম তীরে একটি বসতি সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একটি রূপরেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।

এ উদ্যোগ পশ্চিম তীরকে কার্যত দ্বিখণ্ডিত করে দেবে এবং ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথ কার্যত অসম্ভব করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

গতকাল জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত ইসরায়েলি বসতি মা’আলে আদুমিমে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। সে সময় তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যাচ্ছি যে ফিলিস্তিন বলে কোনো রাষ্ট্র থাকবে না। এই ভূমি আমাদেরই।’

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমরা এই শহরের জনসংখ্যা দ্বিগুণ করব।’

জেরুজালেমের পূর্বে প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় অবস্থিত এ বসতি ‘ইস্ট ১’ বা ‘ই ওয়ান’ নামে পরিচিত।

উন্নয়ন পরিকল্পনাটির আওতায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন করে ৩ হাজার ৪০০ নতুন বাড়ি নির্মাণের কথা আছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ওই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা হাজারো ইসরায়েলি বসতির মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম থেকে পশ্চিম তীরের বড় অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনিদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শহরটিকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করেন তাঁরা।

১৯৬৭ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা ইসরায়েলি সব বসতিকেই আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় অবৈধ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে আল–জাজিরার প্রতিনিধি হামদাহ সালহুত বলেন, আল–জাজিরার জন্য পশ্চিম তীর ও ইসরায়েল থেকে সংবাদ সংগ্রহ নিষিদ্ধ করেছে ইসরায়েল। তিনি আরও বলেন, ওই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ, এর ফলে পশ্চিম তীরের সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এ ছাড়া এর কারণে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো সম্ভাবনা ভেস্তে যাবে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনাহ গতকাল বলেছেন, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনই এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি। তিনি মনে করেন, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ‘অনিবার্য’।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছেন রুদেইনাহ। তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ‘পুরো অঞ্চলকে বিপদের দিকে ঠেলছেন’। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের ১৪৯টি সদস্যদেশ ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যারা এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, তাদের অবিলম্বে তা করার আহ্বান জানান তিনি।

ইসরায়েলের মা’আলে আদুমিম বসতি সম্প্রসারণে একটি রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে হাত নাড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
ইসরায়েলের মা’আলে আদুমিম বসতি সম্প্রসারণে একটি রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে হাত নাড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ছবি: এএফপি