Wednesday, July 15, 2015

রাজন হত্যা: পুলিশের সঙ্গে বৈঠক ১২ লাখ টাকায় রফা by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

চুক্তি হয়েছিল ১২ লাখ টাকায়। অর্ধেক পরিশোধ হয়েছিল। বাস্তবায়নও হয়েছিল অর্ধেক। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সামিউল আলম রাজন হত্যা ঘটনার মূল নায়ক কামরুল। পুলিশের এমন ঠাণ্ডা মাথায় আঁকা ছকে হঠাৎ যেন গোলমাল বাধে। গোপন কথা গোপন থাকে না। ফাঁস হয়ে যায়। বুধবার এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও শুরুতে এ নিয়ে তেমন কোন রা হয়নি। তবে নির্মম নির্যাতনে ২৮ মিনিটের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পরই তোলপাড় শুরু হয় চারদিকে। সংবাদমাধ্যমে বড় আকারে প্রকাশিত হয় নিষ্ঠুর এ ঘটনার খবর। প্রতিবাদী হয়ে উঠে মানুষ। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি।
রাজনের বাবা আজিজুর রহমান অভিযোগ করেন, জালালাবাদ থানা পুলিশ ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার ছেলে রাজনের হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, রাজনকে হত্যার পর বুধবার রাত ১০টার দিকে জালালাবাদ থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। আমাকে থানা থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এসআই আমিনুল।
মানবজমিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮ই জুলাই বুধবার সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে রাজনকে চুরির মিথ্যা অপবাদে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে সামিউল আলম রাজন মারা গেলে তার লাশ গুম করার চেষ্টাকালে জনতার হাতে আটক হয় মুহিদ আলম। ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করেন জালালাবাদ থানার এসআই আমিনুল। পৈশাচিক নির্যাতনে রাজনের মৃত্যুর বিষয়ে পুরোপুরি অবহিত থাকার পরও ঐদিন সন্ধ্যায় জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এসআই আমিনুলের সঙ্গে বৈঠক করে কামরুল ও মুহিত। চুক্তি হয় ১২ লাখ টাকার। ৬ লাখ টাকা হাতে পেয়ে জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন ও এসআই আমিনুল মামলার প্রধান আসামি কামরুলকে সৌদি আরব পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। বাকি ৬ লাখ টাকা হাতে পেলে জনতার হাতে আটকের পর গ্রেপ্তার হওয়া কামরুলের বড় ভাই মুহিত আলমকেও ছেড়ে দেবে বলে কথা দেয় পুলিশ। ১০ই জুলাই বিজি-৪০৪ যোগে সিলেট বিমানবন্দর ছাড়ে কামরুল। নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিতের দায়িত্ব পালন করেন ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন। হত্যাকাণ্ডের পর দুইদিন পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ না নিয়ে চুপ করে থাকে। কামরুলের  দেশত্যাগ ও লেনদেনের ঘটনা একসময় ফাঁস হয়ে যায়। ১১ই জুলাই এলাকাবাসী ঘেরাও করে জালালাবাদ থানা। টনক নড়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের।

নিহত রাজনের বাবা আজিজুর রহমান জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসআই আমিনুল রাজনের লাশের ছবি  দেখায় তার মোবাইলফোনে। এরপর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করে থানায় যাই মামলা করতে। তিনি জানান, ‘ততক্ষণে এসআই আমিরুল অজ্ঞাতদের নামে আগেই মামলা করে বসে আছেন। আমি আসামিদের নাম ধরে মামলা করতে চাইলে এক পর্যায়ে এসআই আমিনুল আমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেয়।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কোন উদ্যোগ নেয়নি। চারদিন পর পত্রিকায় খবর বের হলে পুলিশ তৎপর হয়। পুলিশ  কোন আসামিকে ধরেনি। মুহিত আলমকে পাবলিক ধরেছে।’
জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আখতার হোসেন এসআই আমিনুলের এই আচরণের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঘটনার দিন থানায় ছিলাম না। মামলার সাক্ষ্য দিতে গিয়েছিলাম। পরে এসে রাজনের বাবার লিখিত অভিযোগকে এজাহার হিসেবে নিয়েছি।
মঙ্গলবার বিকালে সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা (জনসংযোগ) মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আজই অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. রুকনউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবেন। তিন দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
বেঁধে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শেখ সামিউল আলম রাজন নামে ১৩ বছরের শিশুকে
সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, মামলা দায়ের নিয়ে একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। লাশ পাওয়ার পর ঐদিন রাত সোয়া ১০টায় এসআই আমিনুল বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন, যাতে মুহিতকে ১ নম্বর ও ময়নাকে ২ নম্বর আসামি করা হয়। আসামি ‘অজ্ঞাত’ লেখা হয়নি। পরে রাজনের বাবা এজাহার দিলে তা নেয়া হয়। রাজনের বাবা আজিজুর রহমানের দায়ের করা এজাহারে ঐ দুজন ছাড়াও আলী হায়দার ও কামরুলকে আসামি করা হয়। এখন রাজনের বাবা যদি পুলিশের মামলা দায়েরের আগে থানায় এসে থাকেন তবে জালালাবাদ থানা পুলিশ  কেন এমনটি করেছে তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি তথ্য দেন এ মামলায় মুহিত আলম ছাড়াও কামরুলকে সৌদি আরবে এবং দুই প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ আলী ও আজমত উল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আজ আদালতে ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত তদারকির জন্য আরও একটি তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে-আমি এর প্রধান।
সিলেট নগরীর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের পাশে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদে আলী গ্রামের বাসিন্দা গাড়িচালক শেখ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান আলমের ছেলে সামিউল আলম রাজন। স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করা রাজন সবজি বিক্রি করতো। কুমারগাঁও এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে ভ্যান চুরির অভিযোগে বুধবার তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একটি মাইক্রোবাসে তুলে রাজনের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় মুহিত আলম নামের একজনকে ধরে পুলিশে  দেন স্থানীয়রা। মুহিত শেখপাড়া গ্রামের মৃত আবদুল মালিকের ছেলে। ঐ ঘটনায় মুহিতের ভাই কামরুল সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়ার পর সেখানে গ্রেপ্তার হয়।
কাঁদছে বাংলাদেশ। ক্ষুব্ধ, স্তব্ধ পুরো দেশবাসী। পাশবিক নির্যাতনে শিশু সামিউল আলম রাজনকে হত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে বাংলাদেশীরা। রাজপথে নেমে এর ন্যায়বিচার দাবি করছে তারা। ১৩ বছরের শিশু রাজন হত্যার ঘটনা এভাবেই উঠে এসেছে বিশ্ব গণমাধ্যমে। বিবিসির খবরে বলা হয়, রাজন হত্যার প্রতিবাদে পুরো সিলেটজুড়ে চলছে প্রতিবাদ। হাজার হাজার বাংলাদেশী ন্যায়বিচারের জোর দাবি জানাচ্ছে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ বছরের সামিউলের নির্মম হত্যার পর বাংলাদেশ জুড়ে প্রতিবাদ দানা বেধে উঠেছে। সিলেটে রাজপথে নেমেছে শত শত মানুষ। ময়নাতদন্তে রাজনের শরীরে ৬০টিরও বেশি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। ডাক্তাররা বলেছেন, মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেছে শিশু রাজন। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, রাজন হত্যা মামলার অন্যতম আসামী কামরুল সৌদি আরবে গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এদিকে হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশে আরও প্রতিবাদ কর্মসূচী চলছে। বাংলাদেশের পুলিশ এখন পর্যন্ত ৫ আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যার নির্মম ভিডিওটি ছড়িয়ে যাওয়ার পর ক্ষোভে ফুসতে থাকে পুরো দেশ। হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবিতে বিভিন্ন আবেদন, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে। স্থানীয় পুলিশ প্রধান আখতার হোসেইন বার্তা সংস্থা এএএফপিকে বলেছেন, এটা নির্মম, অত্যন্ত গর্হিত এক হত্যাকা- আর আমরা কাউকে ছাড় দেবো না।

পিটিয়ে শিশু হত্যা: অসুস্থ সমাজের চেহারা বেরিয়ে এসেছে -ডয়চে ভেলে

সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষ স্তম্ভিত৷ সাধারণ মানুষ বিচারের দাবিতে মাঠে নেমেছেন৷ আর অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন বিচারহীনতা এবং অসুস্থ সমাজের পরিণতি হল এই নির্মমতা৷
গত বুধবার সকালে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ১৩ বছরের রাজনকে৷ নির্যাতনকারীরা শিশুটিকে পেটানোর ২৮ মিনিটের ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়৷ সেই ভিডিও দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে৷ মূলধারার সংবাদমাধ্যমও তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে৷ আর দাবি উঠেছে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের৷
সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে রাজন স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে৷ পরিবারকে সাহায্য করতে সে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করত৷
ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই রাজনের মৃত্যুর কারণ৷ তার শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন রয়েছে৷
সিলেটের জালালাবাদ থানা পুলিশ এরইমধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে৷ আরেকজনকে সন্দেহজনক হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ ভিডিও ফুটেজ দেখে মোট চারজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাকিরা পলাতক৷
মন্ত্রী ও পুলিশের বক্তব্য
জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আক্তার হোসেন ডয়চে ভেলেকে জানান, পুলিশ নিজেই বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে৷ মামলায় নির্যাতনকারী মুহিত, তার ভাই কামরুল ইসলাম, তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে আসামি করা হয়েছে৷ এদের মধ্যে মুহিতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ তিনি জানান, এই ঘটনায় কোনো আসামিই রেহাই পাবেনা৷ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে৷
এদিকে সোমবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালও বলেছেন, ঘটনাটি হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী৷ একজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে৷ আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ বাকিদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে৷ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না৷
বিক্ষোভ
এদিকে সোমবার মুহিতকে রিমান্ডের জন্য আদালতে আনা নেয়ার পথে সাধারণ মানুষ ব্যাপক বিক্ষোভ এবং ঘৃণা প্রকাশ করেন৷ তারাঁ অপরাধীদের ফাঁসি চেয়ে স্লোগান দেন৷ সিলেটের সাংবাদিক ওয়ায়েস খসরু ডয়চে ভেলেকে জানান, এই ঘটনায় সিলেটবাসী স্তম্ভিত এবং ব্যথিত৷ তারা বিচার চেয়ে স্বত:স্ফূর্তভাবে মাঠে নেমেছেন৷
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নির্মম নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর তা ইউটিউবেও আপলোড করা হয়৷ তবে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের নীতিমালার কারণে রোববার বিকেলে ভিডিওটি তাদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেয়৷ তবে ফেসবুকসহ আরো অনেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি এখনো আছে৷
অপরাধ বিজ্ঞানীর প্রতিক্রিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন ডয়চে ভেলেকে বলেন, সমাজে বিচারহীনতা এবং অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ এই নির্মম শিশু নির্যাতন৷ বিচারহীনতার সংস্কৃতি শেকড় গেঁড়ে বসায় একটি শিশুকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করতে তারা সাহস পেয়েছে৷
তিনি বলেন, যারা এই কাজ করেছে তারা ভয়ংকর বিকৃত মানসিকতার৷ তবে তাদের এই কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের অসুস্থ সমাজের চেহারা বেরিয়ে এসেছে৷ শিশুদের প্রতি সমাজ যে দরদি নয় তারই প্রকাশ ঘটেছে৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমাদের দেশের আইনে ৯ বছর পর্যন্ত শিশুরা কোনো অপরাধ করে বলে গণ্য করা হয় না৷ আর ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে৷ কিন্তু আইনের এই কথা হৃদয়ে নেই৷ ফলে এই নির্মমতা ঘটেছে৷
মানবাধিকার কর্মীর দৃষ্টিতে
মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান ডয়চে ভেলেকে বলেন, এই বর্বরতা সীমাহীন৷ শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই দায়ী৷ তিনি বলেন, শিশুটিকে বুধবার প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় অনেক লোকের সামনে৷ আর তা ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে৷ কিন্তু সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদের ঝড় উঠলে চারদিন পর রোববার পুলিশ তৎপর হয়৷ আমার প্রশ্ন, প্রকাশ্যে ঘটা এই নির্মমতার খবর কী তখন পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি? নিশ্চয়ই পৌঁছেছে৷ তাহলে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?
এলিনা খান বলেন, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বীজ লুকানো রয়েছে৷ তিনি বলেন, নির্যাতনকারীরাই নির্যাতনের ভিডিও করেছে৷ এটা প্রমাণ করে এই দেশে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া৷
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মত
এদিকে শুধুমাত্র নির্মমভাবে শিশু নির্যাতনের এই ঘটনাই নয়, এর আগে দুই নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতনের ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে৷ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য ও ছবি ধরেই মূলধারার সংবাদমাধ্যম ছবি ও খবর প্রকাশ করে৷
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির ডয়চে ভেলেকে বলেন, এর দুটো দিক আছে৷ একটা হলো অপরাধীরাই এসব ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে তাদের ক্ষমতা দেখাতে চায়৷ আবার সাধারণ মানুষই এসব অপরাধের ছবি তুলে বিচারের আশায় তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়৷ মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের প্রসার এটাকে সহজ করেছে৷ তবে এই ফুটেজ ও ছবি প্রকাশে কোনো নীতিমালা মানতে চান না সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা৷
তিনি বলেন, তবে ইতিবাচক দিক হলো মানুষ আর মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের অপেক্ষা করছেনা৷ তারা তাৎক্ষণিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেই সম্প্রচার কর্মী হয়ে উঠছে৷ ফলে এখন আর অনেক অপরাধের ঘটনাই চাপা রাখা যায়না৷

জাতীয় ঈদগাহ প্রস্তুত, বৃষ্টিতেও সমস্যা নেই by কমল জোহা খান

আজ সকালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ার সময়ও চলেছে
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাতের
প্রস্তুতির কাজ। ছবি: কমল জোহা খান
‘বৃষ্টি হওয়ায় ভালোই হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি থেকে পানি ছিটিয়ে চেক করা লাগবে না।’
আজ বুধবার সকালে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের প্রস্তুতির কাজ তদারক করার সময় সহকর্মীদের এ কথা বলেন পেয়ারু সর্দার অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক। ঈদের প্রধান জামাতের জন্য জাতীয় ঈদগাহ মাঠের প্রস্তুতির দায়িত্ব পেয়েছে পুরান ঢাকার এই ডেকোরেটর। দরপত্রের মাধ্যমে ৬৮ লাখ টাকায় এই কাজটি তারা পেয়েছে। তাদের দাবি, বৃষ্টি মহাবিপর্যয়ে রূপ না নিলে এক লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে পারবেন।
ঈদের দিন সকাল সাড়ে আটটায় এই প্রধান জামাতে ইমামতি করবেন চট্টগ্রামের জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা জালালুদ্দিন আল কাদেরী।
যেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে: ২৯ জুন থেকে ঈদগাহের বিশাল মাঠের প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিদিন ১২০ জন শ্রমিক দিনরাত কাজ করে প্রস্তুতি শেষ করে এনেছেন বলে জানান মোজাম্মেল হক।
প্রথমে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বালু ফেলে মাঠটি সমান করা হয়েছে। এর পর বাঁশ বসানোর পর্ব শুরু হয়। ঈদগাহ মাঠের দুই লাখ ৬৯ হাজার বর্গফুট জায়গায় ৪৩ হাজার ছোট-বড় আকারের বাঁশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। এর সঙ্গে রয়েছে লোহার পাইপ ও গজারি কাঠ। তার পর এক হাজার ৬০০ পিস ত্রিপল দিয়ে মাঠটি ঢেকে দেওয়া হয়। প্রতি পিস ত্রিপলের আকার প্রায় ৪৩০ বর্গফুট।
মাঠ ঢেকে ফেলার পর এখন চলছে কার্পেট, বাতি ও ফ্যান বসানোর কাজ। এবার গরমের কথা চিন্তা করে ঈদগাহ ময়দানে ফ্যানের সংখ্যা গতবারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। মোজাম্মেল হক জানান, গত বছর সিলিং ও স্ট্যান্ড ফ্যান ছিল ৪৬৪ টি। এবার প্রায় ৮০০ ফ্যান রাখা হবে। এর মধ্যে ভিআইপিদের জন্য ১০০টি স্ট্যান্ড ফ্যান বসানো হবে। রাষ্ট্রপতির নামাজ আদায় করার স্থানে একটি কুলিং মেশিনও বসানো হবে। ভিআইপিদের জন্য ১১ হাজার বর্গফুট জায়গায় লালগালিচা ও কার্পেট বিছানো হবে।
সাধারণ মানুষ যেখানে নামাজ পড়বেন, সেখানে ত্রিপল, ম্যাট ও চাদর বিছানো হবে।
আকাশ অন্ধকার থাকলেও আলোর অভাব হবে না ঈদগাহ ময়দানে। ৫০০টি টিউব লাইট, ৭৪টি হ্যালোজেন ও ধাতব বাতি থাকবে। ছোট আকারের ৬৪টি ফ্লাড লাইট বসানো হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড একটি ৫০০ কিলোওয়াটের জেনারেটরের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
ঈদগাহ মাঠে পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার ও ১৪০টি অজুখানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে নারীদের জন ৵ ৩৫টি অজুখানা রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এক লাখ মসুল্লির মধ্যে পাঁচ হাজার নারীর জন্য আলাদাভাবে নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২৯ রোজা, অর্থাৎ, ১৭ জুলাই চূড়ান্ত পরীক্ষা করা হবে ঈদগাহ ময়দান। এর আগে পুলিশ-র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।

শিশু সামিউল হত্যা: ৫ লাখ টাকায় আপসের চেষ্টা

নির্যাতনকারীদের বর্বরতা ও নৃশংসতায় হারিয়েছেন
এক ছেলেকে। আরেক ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায়
ভেঙে পড়েন সামিউলের মা রুবনা বেগম। চাইলেন
নির্যাতকদের বিচার। গতকাল সিলেট সদর উপজেলার
বাদেয়ালি গ্রামের নিজ বাড়িতে l প্রথম আলো
সিলেটে শিশু শেখ মো. সামিউল আলমকে (রাজন) হত্যার ঘটনা পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে আপসের প্রস্তাব দিয়ে দেশ ছাড়ে অন্যতম অভিযুক্ত কামরুল ইসলাম (২৮)। সৌদি আরবের জেদ্দায় আটক ওই কামরুলকে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক।
এদিকে প্রধান আসামি মুহিত আলমের শ্যালক সন্দেহভাজন ইসমাইল হোসেন আবলুচকে (৩২) গতকাল মঙ্গলবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আর প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া আজমত উল্লা ও ফিরোজ আলী আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। পুলিশের বিরুদ্ধে সামিউলের বাবা শেখ আজিজুর রহমানের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সামিউলের বাবা আজিজুর রহমান ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে বাদেয়ালি গ্রামে গিয়ে কামরুলের আত্মীয় পরিচয় দেওয়া তিনজন লোক পাঁচ লাখ টাকা আজিজুরকে দেওয়ার প্রস্তাব করে। এতে আজিজুর সম্মত না হওয়ায় ওই তিনজন ফিরে যায়। পরে সামিউলের পরিবারের পক্ষ থেকে কামরুলের প্রস্তাবের বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, ঘটনার পরপরই গা-ঢাকা দিলেও কামরুল পুলিশের হাতে আটক বড় ভাইকে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করে। এ চেষ্টার শুরুতে প্রথম দফা পরিচিত আওয়ামী লীগের নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে লোক মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এতে ব্যর্থ হয়ে শেষে সামিউলের পরিবারের সঙ্গে আপসের প্রস্তাব পাঠায়। পরে সৌদি আরব পালিয়ে যায়।
হত্যার কারণ সম্পর্কে সামিউলের বাবা আজিজুর যৌন নির্যাতনকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, সামিউলকে যৌন নির্যাতন করতে চেয়েছিল চৌকিদার ময়না ওরফে বড় ময়না। রাজি না হওয়ায় চৌকিদার চুরির অভিযোগ তুলে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি সদস্য গিয়াসউদ্দিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কামরুল পালানোর ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে ইউপি সদস্য মধ্যস্থতার অভিযোগও করেন তিনি।
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, কামরুল গত শুক্রবার বেলা আড়াইটায় বাংলাদেশ বিমানের বিজি ৪০৪ ফ্লাইটে দেশ ছাড়ে। ইমিগ্রেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, কামরুলের সৌদি আরবের রি-এন্ট্রি ভিসা থাকায় শুধু টিকিট করে সহজে চলে যেতে সক্ষম হয়।
সামিউলকে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে দেখে সৌদি আরবের জেদ্দায় গত সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত আটটায় কামরুলকে আটক করেন স্থানীয় বাংলাদেশিরা।
আইজিপি শহীদুল হক গতকাল গাজীপুরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড় এলাকায় মহাসড়ক পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, শিশু সামিউল হত্যায় অভিযুক্ত কামরুলকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। সামিউলের বাবা আজিজুর শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিলেন, তিনি ঘটনার দিন বুধবার রাতে থানায় মামলা করতে গেলে সিলেট মহানগরের জালালাবাদ থানার পুলিশ তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। মামলা নিতেও অপারগতা প্রকাশের পাশাপাশি প্রকৃত খুনিদের আড়ালের চেষ্টা চালিয়েছেন। এ ছাড়া মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলার অন্যতম আসামি কামরুলকে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতেও পুলিশ সাহায্য করেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন: সামিউলের বাবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল পুলিশের তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এম রুকন উদ্দিনকে তদন্ত কমিটির প্রধান করে এ কমিটি গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছে।
এ ব্যাপারে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ‘শিশু সামিউলের বাবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের গাফিলতি এবং ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখার জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
মুহিতের শ্যালকও রিমান্ডে: মুহিত আলমের শ্যালক সন্দেহভাজন ইসমাইল হোসেন আবলুচকেও (৩২) রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ইসমাইলকে হাজির করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিলেটের জালালাবাদ থানার পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেন সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদালতে জবানবন্দি: ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া আজমত উল্লা ও ফিরোজ আলী আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. সাহেদুল করিম তাঁদের জবানবন্দি ১৬১ ধারায় রেকর্ড করেন। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়। গত সোমবার গ্রেপ্তার হওয়া মুহিতের স্ত্রী লিপি বেগমকেও গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়।
সামিউলের বাড়িতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার: শিশু সামিউলের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন ও সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার মো. কামরুল আহসান। গতকাল বেলা ১১টায় তাঁরা সামিউলের বাড়িতে গিয়ে খুনিদের যথাযথ বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে আশ্বাস দেন। এ সময় জেলা প্রশাসক সামিউলের পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সোলাইমান রুবেল এবং ব্রিটিশ বাংলা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের পক্ষ থেকেও সামিউলের পরিবারকে অর্থসহায়তা দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, সামিউল হত্যার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে। তিনি জানান, শিশু সামিউলের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আজ বুধবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি সিলেট আসছেন।
প্রতিবাদ অব্যাহত: শিশু সামিউল হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দিনভর সিলেটে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টায় নগরের চৌহাট্টা এলাকার সিলেটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে সিলেটের বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে সামিউল হত্যায় জড়িতদের বিচার ও চিহ্নিতদের ফাঁসির দাবি জানানো হয়। কর্মসূচিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্লাস্ট, এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো), সিএসআইডি, সচেতন নাগরিক কমিটি, ইয়েস, টিআইবি, সিলেট যুব একাডেমি, মহিলা পরিষদ, দুর্বার নেটওয়ার্ক, মেলা সমাজকল্যাণ সংস্থাসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন অংশ নেয়। বেলা দুইটার দিকে নগরের সুবিদবাজার এলাকায় সিলেট প্রেসক্লাবের সামনে সিলেট ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্টের উদ্যোগে সামিউল হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
বেলা আড়াইটায় ঘটনাস্থল কুমারগাঁও-সংলগ্ন তেমুখী পয়েন্টে সামিউল হত্যার প্রতিবাদে সিলেট সদর উপজেলাবাসীর ব্যানারে একটি প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সিলেটের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গত বুধবার খুঁটির সঙ্গে সামিউলকে (১৪) বেঁধে রোলার দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নির্যাতনকারীরাই সামিউলকে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ধারণ করে। সামিউলের লাশ ফেলতে গিয়ে ধরা পড়ে কামরুলের বড় ভাই মুহিত আলম (৩৫)। এ ঘটনায় সিলেট মহানগর পুলিশের জালালাবাদ থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। মামলায় মুহিত ও কামরুল ছাড়াও হায়দার আলী ওরফে আলী নামে তাদের আরও এক ভাই ও কুমারগাঁওয়ের চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে আসামি করা হয়।

রিমান্ডে মুহিতের লোমহর্ষক বর্ণনা by ওয়েছ খছরু

সৌদি প্রবাসী কামরুল বেধড়ক পিটিয়েছে রাজনকে। সকাল থেকেই কামরুল নির্যাতন চালাতে থাকে। বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে যায় মুহিত। এ সময় অন্যদের সঙ্গে সেও নির্যাতনে অংশ নেয়। একপর্যায়ে রাজন মারা গেলে লাশ গুমের চেষ্টা চালায়। রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য দিয়েছে মুহিত। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুহিত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। বলেছে, বেলা ১১টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি রাজন মাটিতে পড়ে আছে। তখন শ্বাস নিচ্ছিল। তবে, কথা বলতে পারছিল না। ১০মিনিট পর দেখি কোন নড়াচড়া নেই। শরীরে হাত দিয়ে দেখি দেহ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।’ সামিউল আলম রাজন খুনের সঙ্গে তারা ৫জন জড়িত ছিল বলে পুলিশের কাছে জানিয়েছে মুহিত আলম। সে ছাড়াও সেখানে তার সৌদি প্রবাসী ভাই কামরুল, আরেক ভাই ছাত্রলীগ নেতা আলী আহমদ, শামীম আহমদ ও পাহারাদার ময়না মিয়া ছিল। রিমান্ডে মুহিত জানিয়েছে, ‘সৌদি প্রবাসী ভাই কামরুল বেধড়কভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে রাজনকে। সকাল থেকে কামরুল রাজনের উপর অত্যাচার চালায়। মুহিত জানায়, ‘রাজন খুনের পর লাশ গুমের পরিকল্পনা করে। নিজেদের রক্ষা করতে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করে। এ কারণে তারা মাইক্রোবাস নিয়ে আসে। এবং লাশ নিয়ে তারা টিলার কাছে যেতে চাইছিল। কিন্তু পথিমধ্যে স্থানীয় জনতা আটক করে।’ মুহিত পুলিশকে জানিয়েছে, সে এ ঘটনার সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত নয়। তার ভাই কামরুল হচ্ছে রাজনের মূল ঘাতক। সিলেটের জালালাবাদ থানার ওসি আক্তার হোসেন গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, কামরুলকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় সোমবার দুপুরে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল নিজেকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে কামরুলকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মুহিতের স্ত্রী লিপি বেগমকে আটক করে নিয়ে আসে। লিপিকে থানায় নিয়ে আসার পর মুহিত মুখ খুলতে শুরু করে। রাতে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদে মুহিত খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। তিনি বলেন, মুহিতকে থানা হাজতে রেখেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ওদিকে, গতকাল সকালে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে গ্রেপ্তারকৃত মুহিতের তালতো ভাই ইসমাইল হোসেন আবলুসকে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম দ্বিতীয় ফারহানা ইয়াসমীনের আদালতে প্রেরণ করেন জালালাবাদ থানা পুলিশ। আদালত শুনানি শেষে তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত থেকে বেরিয়ে এসে জালালাবাদ থানার ওসি তদন্ত আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, সোমবার ভোরে গ্রেপ্তার করা হয় আবলুসকে। এজাহারভুক্ত আসামি না হলেও পুলিশ ধারণা করছে সে ওই খুনের সঙ্গে জড়িত। ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে জানান তিনি। ওসি আক্তার জানান, পুলিশ কামরুলের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার কামরুলকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কামরুল দেশে এলে দুই ভাইকে মুখোমুখি করলে পুরো সত্য বেরিয়ে আসবে। পাশাপাশি শামীম, ময়না ও আলীকে গ্রেপ্তারে পুলিশের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। এদিকে গতকাল সকালে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন বাইয়ারপাড়স্থ রাজনের গ্রামের বাড়িতে যান। জেলা প্রশাসককে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তার মা ও বাবা। তাদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠে সুরমার তীরবর্তী বাইয়ারপাড়ের পরিবেশ। জেলা প্রশাসক এ সময় কামরুলের পিতার কাছে সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া ২০ হাজার টাকার অনুদান তুলে দেন। জেলা প্রশাসক এ সময় জানান, নির্মম এ ঘটনায় সান্ত্বনার কোনো ভাষা নেই। তবে, দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে সরকার আন্তরিক রয়েছে।

মুহিতের বিচার চাইলেন লিপিও: মুহিতের স্ত্রী লিপি বেগম। সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মুহিত আলমের স্ত্রী লিপি বেগমও বিচার চেয়েছেন নির্মম এই খুনের ঘটনার। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন খুনের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার স্বামী জড়িত থাকলে তারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। জালালাবাদ থানার ওসি আখতার হোসেন জানান, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে লিপি অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়।

এলাকাজুড়ে বিক্ষোভ: সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা মামলার সব আসামির গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে এলাকাবাসী। সোমবার রাতে টুকেরবাজারে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এদিকে, রাজনের সকল খুনিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘রাজন হত্যা বিচার বাস্তবায়ন সংগ্রাম পরিষদ।’ সোমবার রাতে সিলেট সদর উপজেলার বাদেয়ালি গ্রামে রাজনের বাড়িতে সংগ্রাম পরিষদের এক সভা হয়। সভা থেকে বেলা ২টায় টুকেরবাজার তেমুখী এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ আহ্বান করা হয়। টুকেরবাজারে বিক্ষোভ মিছিলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- বৃহত্তর টুকেরবাজার এলাকার বাসিন্দা কাজী জুনেদ আহমদ, মালেক মেম্বার, আব্দুল হাকিম, মোস্তাক আহমদ, অ্যাডভোকেট সৌরভ আরেফিন, গোলাম মোস্তফা জানু, আনছার মিয়া, জাহেদ, মাছুম, জুবায়ের, শাহেদ, আলতাফ মিয়া, শুভ প্রমুখ।

পুলিশের তদন্ত কমিটি: সিলেটে সামিউল আলম রাজন হত্যা তদন্তে সহায়তার জন্য সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) রহমত উল্যার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। এডিসি রহমত উল্লাহ জানান, তিনি ছাড়াও কমিটির অপর সদস্যরা হলেন-ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার আফম নিজাম উদ্দিন, জালালাবাদ থানার এসি কামরুল ইসলাম, ওসি আখতার হোসেন ও সেকেন্ড অফিসার এসআই জাকির হোসেন। সোমবার রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নিজেই এ তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন।

বাংলাভাই ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন -হিন্দুস্তান টাইমসের রিপোর্ট

ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আট বছর পর এখন জানা গেল শীর্ষ জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই বিএনপি সরকারের আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন। গত ৯ই জুলাই ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সির (এনআইএ) বরাত দিয়ে ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস এই খবর দিয়েছে।
ভারতীয় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সি বলেছে, বাংলাদেশী সন্ত্রাসী সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই ২০০৫ সালে বাংলাদেশী নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা চরম দাবড়ানির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তখন জেএমবি’র নেতারা তাকে একসঙ্গে দুটি উদ্দেশ্য হাসিলে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাভাইকে নিরাপদ আত্মগোপনে রাখা এবং  নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাত-উল-মুজাহিদীন (জেএমবি)-এর ভারতীয় শাখা খুলতে তাকে তৃণমূল পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে প্রেরণ করা হয়। বাংলাভাই ওই সময় পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। ভারতীয় ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সি (এনআইএ) হিন্দুস্তান টাইমস-এর কাছে এ সপ্তাহে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
পত্রিকাটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাভাই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় তিন মাস অবস্থান করেছিলেন। ২০১৪ সালের অক্টোবরে সংঘটিত বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে এনআইএ নয় বছর আগের বাংলাভাই বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাভাই মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর তিনি জেলাতেই অবস্থান নিয়েছিলেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।
বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় দেয়া চার্জশিটে বলা হয়েছে জেএমবি বর্ধমান, নদীয়া, ঝাড়খণ্ড, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, আসাম অঞ্চলে তার নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। এবং এখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে, বাংলাভাইয়ের মাধ্যমে তারা ৯ বছর আগেই এই প্রস্তুতি শুরু করেছিল। হিন্দুস্তান টাইমসের এই রিপোর্টে বলা হয়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জাগ্রত মুসলিম জনতার মিলিটারি কমান্ডার ছিলেন বাংলাভাই আর এটি ছিল আল কায়েদার একটি অঙ্গ সংগঠন। তারা সবাই মিলে বাংলাদেশে একটি ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাভাই ২০০৬ সালে তার বাংলাদেশের আত্মগোপন স্থল থেকে গ্রেপ্তার হন এবং পরের বছরই তিনি মৃত্যুদণ্ড ভোগ করেন। বাংলাভাই মুর্শিদাবাদে জেএমবি’র ব্রাঞ্চ খোলার উদ্যোক্তা হাতকাটা নাসিরুল্লাহর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে এসেছিলেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মুর্শিদাবাদেই জেএমবি তার প্রথম শাখা খুলেছিল। এই জেলার দমকলের ঘাঁটিতে অবস্থানকালে বাংলাভাই নদীয়া ও বীরভূমে অবস্থানরত জেএমবি’র অন্য নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাভাই তাদেরকে বলেছিলেন, সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং তাদের কাজ হবে সীমান্তের জেলাগুলোতে এই ধারণা ছড়িয়ে দেয়া।’ বাংলাভাই তাদেরকে স্থানীয়ভাবে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে বন্দুক চালনা ও বিস্ফোরণ ঘটানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের উপদেশ দিয়েছিলেন। বাংলাভাই এমনকি এই আশ্বাসও দিয়েছিলেন যে, আল কায়েদার নেতারা তাদেরকে সাহায্য করবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একটি মাদরাসায় অভিযানকালে আমরা কিছু বইপত্র ও খাতা উদ্ধার করি। এতে দেখা যায়, প্রশ্ন এসেছে আল কায়েদা ও জেএমবি’র মধ্যে পার্থক্য কি? যারা উত্তর দিয়েছে যে, আল কায়েদার আরেক নাম জেএমবি তাদেরকে সর্বোচ্চ নম্বর দেয়া হয়েছে।’
মণিপুরে কারফিউ
উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্য মণিপুরের ইম্ফলে গতকাল তথাকথিত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ন্ত্রণে পারমিট প্রথা চালু করাকে কেন্দ্র করে ৫ম দিনের মতো কারফিউ বলবৎ ছিল। হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার সংবাদদাতা শোভাপতি স্যামন গত ১৩ই জুলাই লিখেছেন, রাজ্যে ‘‘বহিরাগতদের’’ নিয়ন্ত্রণে পারমিট প্রথা চালু করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিক্ষোভ ও উত্তেজনায় একাদশ শ্রেণীর এক ছাত্র নিহত হয়। মণিপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা ‘বহিরাগত’ কথাটি বাংলাদেশ থেকে যারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে তাদেরসহ সকল অভিবাসীকে বোঝানো হয়ে থাকে।

জাকাত, ২৭টি লাশ এবং নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ by সোহরাব হাসান

ময়মনসিংহের জর্দা কারখানায় জাকাতপ্রার্থীর ২৭টি লাশ
শুক্রবার ভোরবেলা। স্থান ময়মনসিংহ শহরের অতুল চক্রবর্তী সড়কের একটি বাড়ি। ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু ফটক। সেই ফটক খুলে দেওয়া হলো জাকাতপ্রার্থীদের জন্য। আর মেঘনার ভয়াল স্রোতের মতো মানুষ সেখানে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ আগেও যাঁরা ছিলেন জীবন্ত মানুষ, মুহূর্তে তাঁরা হয়ে গেলেন লাশ। মানুষের পদতলে পিষ্ট হয়ে একটি-দুটি নয়, ২৭ জন নারী ও শিশু মুহূর্তে লাশ হয়ে গেলেন।
প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে অনেকগুলো নতুন-পুরোনো স্যান্ডেলের ছবি। বাড়ির আঙিনায় স্যান্ডেলগুলো পড়ে আছে। কিন্তু সেই স্যান্ডেল পরে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। তাঁরা এখন আর কেউ মানুষ নন, নিষ্প্রাণ নিস্তব্ধ মরদেহ। তাদের মধ্যে দুই বছরের শিশু যেমন আছে, তেমনি আছেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধা। কিন্তু শুক্রবারের ঘটনায় একজন পুরুষও মারা যাননি। বাংলাদেশে যেকোনো প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের প্রথম ও প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জাকাতপ্রার্থী পুরুষেরা সবাই পেছনে ছিলেন। নারীরা সামনে। ফলে পেছন থেকে আসা জনস্রোতের প্রচণ্ড ঢেউ গিয়ে পড়ে নারীদের ওপরই। দুর্বল, রুগ্‌ণ ও ক্ষীণ স্বাস্থ্যের নারী ও শিশুরা কীভাবে সামলে নেবেন সেই জনস্রোত? কারও হাত-পা-মাথা থেঁতলে গেছে। কারও পুরো শরীর রক্তাক্ত।
আমরা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি। মানবতার সাচ্চা সেবক বলে বড়াই করি। অথচ প্রতিদিন আমাদের চারপাশে যেসব অমানবিক ও নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে চলছে, আমরা তার প্রতিকারের চেষ্টা করি না। কেবল মানুষই পদদলিত হচ্ছে না। পদদলিত হচ্ছে মানবতাও।
জাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। ধনীরা তাঁদের অর্জিত সম্পদের একটি অংশ গরিবকে দেবেন, সেটাই ইসলামের বিধান। কিন্তু এভাবে মাইকে ঘোষণা দিয়ে, কার্ড বিলি করে, মহা শোরগোল তুলে জাকাতের শাড়ি দেওয়ার কী যুক্তি থাকতে পারে? কোরবানির সময়েও দেখি, দরিদ্র মানুষ ধনীদের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন এক টুকরো মাংসের জন্য। আর বাড়ির মালিকেরা কখনো তাঁদের হাতে এক টুকরো মাংস তুলে দেন, কখনো দূর দূর বলে তাড়িয়ে দেন। অথচ কোরবানির মূল কথাই হলো ত্যাগ।
পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ময়মনসিংহের জর্দা কারখানার মালিক শামীম তালুকদার প্রতিবছর জাকাতের শাড়ি বিলি করেন। এবারও জাকাতের শাড়ি বিলি করার জন্য কার্ড বিলি করেছেন। লোকমুখে শুনে সেই কার্ড পাওয়া লোকদের পাশাপাশি কার্ড না পাওয়া মানুষগুলোও ভিড় জমিয়েছেন। ছোট্ট গেট। অনেক মানুষ। কিন্তু তাঁদের সামাল দিতে কোনো ব্যবস্থা রাখেননি তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ডাকার প্রয়োজনও বোধ করেননি। কোনো কোনো পত্রিকা লিখেছে, তাঁর বাসার দুই নিরাপত্তাকর্মী বিরাট জনস্রোতকে ঠেকাতে লাঠিপেটা করেছেন। তারপর একসময় লাঠিপেটা বন্ধ করেছেন এ কারণে যে তাতে আরও বেশি মানুষ মারা যেতে পারেন। গরিব মানুষের প্রতি কী নিষ্ঠুর আচরণ! মারা না যাওয়া পর্যন্ত লাঠিপেটাও জায়েজ!
এই নারীরা গিয়েছিলেন জাকাতের কাপড় নিতে। কিন্তু কাপড় না নিয়ে কাফনের কাপড় পরেই সেখান থেকে তাঁদের চলে আসতে হলো। বাংলাদেশে এখন সর্বত্র চলছে প্রদর্শনবাদিতা। ধনীরা তাঁদের ধনদৌলত জাহির করতে নানা কিছু করেন। এমনকি জাকাত দেন, তা-ও সবাইকে জানিয়ে। যদিও পবিত্র হাদিসে আছে, তুমি যখন ডান হাত দিয়ে কাউকে সাহায্য করবে, তখন খেয়াল রাখবে যেন বাঁ হাত জানতে না পারে।
এটিকে আমরা কী বলব? দুর্ঘটনা? হ্যাঁ, দুর্ঘটনা। তবে সেটি মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা। আমাদের অসমতল সমাজ সৃষ্ট দুর্ঘটনা। বিকট বৈষম্যময় অর্থনীতি সৃষ্ট দুর্ঘটনা। আমরা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছি, যেখানে প্রতিনিয়ত মানবতা লাঞ্ছিত হয়। বেঘোরে নিরীহ ও গরিব মানুষ প্রাণ হারায়। আমরা সম্পদের জৌলুশ দেখাতে ভালোবাসি, কিন্তু মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে চাই না।
তবে একটি সান্ত্বনা নিয়ে হয়তো জাকাতের কাপড়প্রার্থী ওই ২৭ জন নারী ও শিশু মারা গেছেন। বেঁচে থাকতে তাঁরা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে কিছু না পেলেও মৃত্যুর পর অন্তত ১০ হাজার কিংবা ২০ হাজার করে টাকা পেয়েছেন। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে আমরা যে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি।

মন্ত্রিসভার আকার বাড়লেও চমক নেই

বঙ্গভবনে গতকাল মন্ত্রিপরিষদের নতুন সদস্যদের শপথের পর
তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ l ছবি: বাসস
মন্ত্রিসভার আকার বাড়লেও গুণগত পরিবর্তন হয়নি। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে থাকা বর্তমান মন্ত্রিসভার এই ছোট রদবদলে কোনো চমক নেই বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় কাল মঙ্গলবার নতুন একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী যোগ হয়েছেন। আর পুরোনো দুজন প্রতিমন্ত্রী পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পড়ান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
শপথ নেওয়া পাঁচজনের মধ্যে আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইয়াফেস ওসমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরা পদোন্নতি পেয়ে আগের মন্ত্রণালয়েরই পূর্ণ মন্ত্রী হলেন। আর শিল্পপতি নুরুল ইসলাম বিএসসি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ তারানা হালিম এবং সাংসদ নূরুজ্জামান আহমেদ। তারানা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং নূরুজ্জামান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এখন মন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়াল ৩২ এবং প্রতিমন্ত্রী ১৭।
কথিত নিষ্ক্রিয়তার কারণে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং এই পটভূমিতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের বিষয়ে কিছুটা কৌতূহল তৈরি হয়। কিন্তু বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন মন্ত্রী স্বপদে বহাল থাকায় মন্ত্রিসভার কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। এ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো সাফল্য না থাকলেও দুজন প্রতিমন্ত্রী পদোন্নতি পেলেন।
আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও সাংসদ মনে করেন, মন্ত্রিসভার এই রদবদলে সরকারের কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এই রদবদল অনেকটা প্রসাধনমূলক। এতে সরকার সুদৃঢ় বা মজবুত হবে না।
এই রদবদল সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই পরিবর্তনে ইতিবাচক কিছু দেখছি না। মন্ত্রিসভা থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুন মুখ নেওয়া হলে সরকার গতিশীল হতো। সবার জন্য কল্যাণ হতো।’ তিনি বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে বিতর্কিত দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠল। অথচ সৈয়দ আশরাফকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে ভালো লোকদের কোণঠাসা করা হলো।
মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও বাদ পড়েননি কেউ। বিশেষ করে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ আহরণের দায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৩ বছরের সাজা হাইকোর্ট বাতিল করলেও আপিল বিভাগ সেই রায় বাতিল করে দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠে। একইভাবে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের গম কেলেঙ্কারি নিয়ে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ছাড়া মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগও আছে। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই।
ইয়াফেস ওসমান সাড়ে ছয় বছর ধরে টেকনোক্র্যাট কোটায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি একজন স্থপতি ও ছড়াকার। মন্ত্রিসভার বৈঠকে মাঝেমধ্যে তিনি স্বরচিত ছড়া আবৃত্তি করেন। এবার তিনি একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হলেন। ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার টানা দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর আসাদুজ্জামান খান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এবার তিনি এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ দায়িত্ব পেলেন।
নুরুল ইসলাম বিএসসি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি একজন শিল্পপতি ও সানোয়ারা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তিনি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরোধী হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বন্দর নগরের একটি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তারানা হালিম নবম ও বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত আসনে নারী সাংসদ। তিনি একসময় নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করতেন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুজ্জামান আহমেদ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবারের মতো সাংসদ হয়েছেন। তিনি একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। চেয়ারম্যান থাকাকালে থানায় কর্তব্যরত পুলিশের এক উপপরিদর্শককে মারধরের অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
এই রদবদল সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা গতানুগতিক মনে হয়েছে আমার কাছে। নতুন কিছু মনে হয়নি। সবকিছু নির্ভর করছে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হলো তাঁদের কর্মদক্ষতার ওপর।’
শপথ অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তবে সদ্য দপ্তর হারানো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যাননি।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। সরকার গঠনের পর এই মন্ত্রিসভায় এটাই কার্যত প্রথম রদবদল। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি এ এইচ মাহমুদ আলীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নজরুল ইসলামকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর গত দেড় বছরে আর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর আগে পবিত্র হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকী গত বছরের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বাদ পড়েন। ৯ জুলাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় মন্ত্রিসভারই আরেক সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে।

অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি ও জালিয়াত চক্র by মইনুল ইসলাম

কুখ্যাত হল-মার্ক কেলেঙ্কারি-সম্পর্কিত সংসদের আলোচনায় অভিযুক্ত জালিয়াতদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও কেন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে ‘নিজেদের লোকের কারণেই ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।’ তাঁর এই স্বীকারোক্তি সরকারের সব মহলে সাধুবাদ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতার কিছুটা স্বীকৃতি এতে রয়েছে বলে তাঁকে ধন্যবাদ। সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, জনতা ব্যাংকের বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি এবং সর্বশেষ বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানের যোগসাজশে ব্যাপক লুটপাট এই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান দুর্নীতিগ্রস্ততা ও সামগ্রিক পরিচালনার গুণগত মানের ধস নামার প্রমাণ। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার বিপর্যস্ত অবস্থার নেহাত খণ্ডচিত্র এই কয়েকটি কেলেঙ্কারি, ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’।
প্রকৃতপক্ষে সবগুলো রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকেই ব্যবস্থাপনার সংকট ক্রমে বেড়ে চলেছে, দুর্নীতির বিস্তারও ঘটছে হু হু করে। এই ব্যাংকগুলোর এহেন শোচনীয় অবস্থার জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সরকার মনোনীত ‘রাজনৈতিক’ চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের অবৈধ হস্তক্ষেপ ও ট্রেড ইউনিয়নের দাপটকেই বেশি দায়ী মনে করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগ কর্তৃক নিযুক্ত হলেও এই চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের মনোনয়ন যে প্রধানত প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই হয়ে থাকে, এটা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয়। রাজনৈতিক হালুয়া-রুটি বিতরণের এই বহুল-ব্যবহৃত বন্দোবস্ত ক্ষমতাসীন পূর্বাপর সব সরকারের আমলেই সরকারপ্রধানের নিয়ন্ত্রণাধীন মেকানিজমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছে। (ফাইলগুলো প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় ঘুরে আসাটাই নিয়ম!) অর্থমন্ত্রী কদাচিৎ তাঁর পছন্দসই দু-চারজনকে এসব ‘রাজনৈতিক প্রসাদের’ ভাগ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন হয়তোবা।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর জেনারেল ম্যানেজার থেকে শুরু করে উচ্চতর সব পদের ব্যাংকারদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম চালু হয়ে গেছে ক্রমে ক্রমে। অতএব, উল্লিখিত কেলেঙ্কারিগুলোতে যেসব রাজনৈতিকভাবে বাছাই করা চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং উঁচু পদের ব্যাংক-আমলার যোগসাজশ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের মাথার ওপর ক্ষমতাসীন সরকারের মহাশক্তিধর ছত্রচ্ছায়া থাকাতেই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ আটকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। অর্থমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি তাঁর দলের অনেককেই যে নাখোশ করবে, সেটা আগেভাগেই বলে দেওয়া যায়।
আসলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন হোক আর ব্যক্তি খাতের ব্যাংক হোক, ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা যে মোটেও স্বস্তিকর নয়, এটা ওয়াকিবহাল মহলের অজানা থাকার কথা নয়। প্রধানত প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের কারণে ব্যাংক আমানতের প্রবাহের যে অব্যাহত স্ফীতি, সেটা ব্যাংকঋণের আদায়-সম্পর্কিত ক্রমবর্ধমান ব্যর্থতাকে আড়াল করে চলেছে। ব্যাংকগুলোতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য এবং বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাতের স্থবিরতা নিয়েই যেহেতু শঙ্কা বেশি দেখা যাচ্ছে, তাই পুরো ব্যাংকিং সেক্টরের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রটা যতখানি গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তা পাচ্ছে না। কিছুদিন পরপর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ক্লাসিফাইড ঋণের যে হিসাব প্রকাশ করা হয়, সেটাকে আমি বরাবর প্রতারণামূলক আখ্যায়িত করে আসছি, কারণ ওই প্রকাশিত হিসাবে খেলাপি ঋণের যে অংশটা অবলোপন (রাইট-অফ) করা হয়েছে, তার সুদাসলে স্থিতি কত হয়েছে, সে পরিমাণটা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। ফলে অবলোপনকৃত ঋণের সুদাসলে পরিমাণ ক্লাসিফাইড ঋণের সঙ্গে যোগ করে মোট খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ কত, তা লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। ২০০২ সালে রাইট-অফ ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ২০০৪ সাল পর্যন্ত অবলোপনকৃত মন্দঋণের হিসাবটা নিয়মিতভাবে প্রতি তিন মাস পরপর প্রকাশ করা হতো, কিন্তু যখন ওই হিসাব পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছিল যে কোনো ব্যাংকই অবলোপনকৃত মন্দঋণ তেমন আদায় করতে পারছে না, তখন হঠাৎ করে ওই হিসাবটা আর প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এরপর থেকে আমি বেশ কয়েকবার রাইট-অফ করা ঋণের হালনাগাদ হিসাব নিয়মিতভাবে প্রকাশের দাবি জানিয়েছি, কোনো ফল পাইনি।
অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, কোনো সাংসদ লিখিতভাবে ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের অনুরোধ জানালে তা প্রকাশ করা হবে। সাংসদদের মধ্যে কেউ কি এগিয়ে আসবেন? এলে জানতে চাওয়া উচিত, ২০০২ সাল থেকে যে ৩৬ হাজার কোটি টাকা অবলোপন বা রাইট-অফ করা হয়েছে বলা হচ্ছে, ওই অবলোপনকৃত মন্দঋণ কারা নিয়েছেন তাঁদের নামের তালিকা। তাহলে ফাঁস হয়ে যাবে যে এ দেশের রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদদের একটা বিশাল অংশ শুধু পাঁচ বছর নয়, দশ-পনেরো-কুড়ি-ত্রিশ বছরের পুরোনো রাইট-অফ করা মন্দঋণ পরিশোধ না করেও দিব্যি আছে এবং তাদের অনেকেই সাধু সেজে যত্রতত্র কথার ফুলঝুরি ছড়াতে সিদ্ধহস্ত! সম্প্রতি যেসব রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিকে তাঁদের ‘ঋণ পুনর্গঠন’ বা ‘লোন রিস্ট্রাকচারিং’-এর সুযোগ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক এঁদের অনেকেই ওই তালিকায় ধরা পড়বে—এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, ৪০ বছর ধরে যেসব ব্যাংক-ঋণ জালিয়াত ও পুঁজি-লুটেরা দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে পুঁজি লুণ্ঠনের প্রধান রথী-মহারথীর ভূমিকা পালন করে চলেছে, তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘লোন রিস্ট্রাকচারিং’ সুবিধা দিয়ে তাঁদের খেলাপি ঋণের রিশিডিউলিং বা পুনঃতফসিলীকরণের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কিন্তু আমার দৃঢ় অভিমত হলো: এই সুবিধা ভোগের পূর্বশর্ত হওয়া উচিত, যাঁদের নামে অবলোপনকৃত মন্দঋণ রয়েছে, প্রথমে সেটা সুদাসলে সম্পূর্ণ শোধ করে তারপর ‘লোন রিস্ট্রাকচারিং’ সুবিধা গ্রহণের জন্য আবেদন জানানো যাবে। তাহলেই এঁদের প্রকৃত জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের বিষয়টি সত্যিই খুব দুঃখজনক। এই ব্যাংকটিকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা প্রশংসনীয় ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হতো কয়েক বছর আগেও। শুধু রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক নয়, প্রায় সব প্রাইভেট ব্যাংকের তুলনায়ও এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল কম—৫ শতাংশের মতো। ছোট ব্যাংক হলেও প্রতিবছর সরকারকে মুনাফা জোগান দিয়ে আসছিল ব্যাংকটি। অথচ শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর চেয়ারম্যান পদ লাভের কয়েক বছরেই ভোজবাজির মতো ব্যাংকটি লুটপাটের আখড়া হয়ে উঠল। এখন ব্যাংকটির ক্লাসিফাইড ঋণ ৫৭ শতাংশ। অবশ্য ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মজিদ ব্যাংকটিতে বহুদিন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন, এবারও হয়তো তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ব্যাংকটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর গায়ে টোকাও দেওয়া যাচ্ছে না, রহস্য কী?
২০০৯ থেকে ২০১৫—এই সাড়ে ছয় বছরের ক্ষমতাসীন মহলের এই দুরারোগ্য ব্যাধিটা কি ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির নয়? কারও ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না, কিন্তু এ ধরনের ক্রোনি ক্যাপিটালিজম দেশের যে চিরস্থায়ী ক্ষতি ঘটিয়ে চলেছে, তা থেকে আমাদের পরিত্রাণ কি মিলবে না?
প্রধানমন্ত্রী কয়েকবারই বলেছেন, তাঁকে কেনা যায় না। কিন্তু এসব কি দুর্নীতি নয়? ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ক্ষমতার পালাবদলের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই জাতির। প্রতি নির্বাচনেই ধরাশায়ী হয়ে যেত ক্ষমতাসীন দল বা জোট। ক্ষমতাসীন হয়েই নতুন সরকার পুরোনো রেকর্ডটাই বারবার বাজানো শুরু করত যে তাদের আগেরবারের সব সুকৃতি প্রতিপক্ষ দল বা জোট নস্যাৎ করে দিয়েছে। এবার কিন্তু শেখ হাসিনা সাড়ে ছয় বছর ধরে ক্ষমতাসীন রয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আরও অনেক দিন তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন। কিন্তু তাঁর সরকারের আমলের দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন, স্বজন-তোষণ, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির দায়ভার তাঁর ওপরেই বর্তাচ্ছে। জনগণের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে চলেছে। সময় থাকতে সুশাসন প্রদানে ব্রতী হওয়ার জন্য তাঁর প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।
সবশেষে, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করার অনুরোধ করছি: রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের কেলেঙ্কারি এবং খেলাপি ঋণের খবরগুলো পত্রিকায় ফলাও করে আসতে শুরু করলে ব্যাংকগুলো প্রাইভেটাইজেশনের পক্ষে অনেককে নতুন করে ওকালতি শুরু করতে দেখা যায়। সবগুলো ব্যাংক প্রাইভেটাইজ করা আমার মতে কোনো ভালো সমাধান দেবে না। আমাদের অর্থনীতির জন্য রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যাংক জাতীয়করণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল, তা যেন আমরা বিস্মৃত না হই। ব্যাংক জাতীয়করণের কোনো সুফল জনগণ পায়নি, তা তো ডাহা মিথ্যা কথা। অন্যদিকে, জাতীয়করণ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সেটা বলাও যৌক্তিক হবে না, যদিও এর ব্যর্থতাগুলোকে ফলাও করে প্রচার করাটাই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে গত সাড়ে তিন দশকের মুক্তবাজার অর্থনীতির ডামাডোলে।
৩৩ বছর ধরে গড়ে ওঠা দেশের প্রাইভেট ব্যাংকগুলোতে অন্য ধরনের পুঁজি-লুণ্ঠনের সমস্যা রয়েছে। সমস্যাগুলোর চেহারা ভিন্ন হলেও প্রাইভেট ব্যাংকের মালিকেরা এবং ওই ব্যাংকগুলোর ঋণ-সুবিধা ভোগকারী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা পুঁজি লুণ্ঠনে অনেক বেশি কামেলিয়ত প্রদর্শন করে চলেছেন, এটুকুই শুধু বলব এক্ষণে। ওই লুটপাটের চেহারাটা উন্মোচন করা যাবে আরেকবার। তবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক এখন যতগুলো রয়েছে, অতগুলো না রাখলেও চলবে। সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক রাষ্ট্রমালিকানাধীন খাতে রেখে অন্যগুলোকে পর্যায়ক্রমে এগুলোর সঙ্গে একীভূত (মার্জার) করার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। নানাবিধ বিশেষায়িত ব্যাংকের সংখ্যাও কমিয়ে ফেলা যায় ক্রমান্বয়ে। আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা বৃদ্ধি করে প্রাইভেট ব্যাংকের ক্ষেত্রে তাদের যে ক্ষমতা, তার সমস্তরে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন সমুন্নত করা একই সঙ্গে গুরুত্ববহ। মাঝখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগটিকে তুলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকার সেটা আবার পুনর্বহাল করেছে ক্ষমতার প্রসাদ বিতরণের সুযোগ লাভের জন্য। ফলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দক্ষতায় যে ধস নেমেছে, সেটা তারা দেখেও দেখছে না। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ব্যাংকিং সেক্টর রিফর্মস কমিশন’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি৷

ডিবি পরিচয়ে গ্রেপ্তারের পর মিলল লাশ by রুদ্র মিজান

পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করাই কাল হয়ে দাঁড়ায় ব্যবসায়ী মোমেন বক্সের। পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়েরের পরই ডিবি পরিচয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। এর তিন দিন পরেই রাজধানীর পল্লবী এলাকায় লাশ পাওয়া যায় তার। এ ঘটনার পর আবারও পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করতে ভয় পাচ্ছে মোমেনের পরিবার।
গত ৮ই জুলাই মোহাম্মদপুরের তাজমহল সড়ক থেকে ডিবি পরিচয়ে অপহরণ করা হয় মোমেন বক্সকে। অপহরণের প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী মতিউর রহমান। ওই আইনজীবীর সি ব্লকের তাজমহল সড়কের ৭/৪ নম্বর বাড়ির সামনেই ঘটে এ ঘটনা। আইনজীবীর বরাত দিয়ে মোহাম্মদপুর থানার এসআই মাসুদ পারভেজ ও নিহতের স্বজনরা জানান, মোমেন বক্সকে বিদায় জানাতে গেইট পর্যন্ত গিয়েছিলেন তিনি। ওই গেইটের কাছাকাছি সড়কেই মোমেন বক্সের গাড়ির সামনে ছাই রঙের একটি হাইয়েছ গাড়ি থামে। ওই গাড়ি থেকে চার যুবক বের হয়েই নিজেদের ডিবির লোক পরিচয় দিয়ে মোমেন বক্স ও তার গাড়ি চালক সোহেলকে হ্যান্ডকাপ পরায়। পরে মুখে কালো কাপড় বেঁধে টেনে তাদের গাড়িতে তোলে নিয়ে যায়। মতিউর রহমান জানিয়েছেন, এতো দ্রুত ঘটনা ঘটেছে যে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। তারা চারজন ছিল। বয়স ৩০ থেকে ৩২ বছর হবে। চুল ছোট ছিল তাদের।
মোমেনের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, কিছু সময়ের মধ্যেই আইনজীবী মতিউর রহমান ফোনে বিষয়টি তাদের জানান। তারপরই ডিবি ও র‌্যাবে খোঁজ নেন তারা। কিন্তু কারও কাছেই মোমেন বক্সের কোন সন্ধান পাননি। পরদিন সকাল ১১টায় মোমেনের ভাগ্নে মনোয়ার হোসেন সুমনকে কল করেন মোমেন বক্সের গাড়ি চালক সোহেল। তিনি ওই সময়ে জানান, তাকে অপহরণের পর ভোরে বসুন্ধরা এলাকা সংলগ্ন তিনশ ফিট রাস্তায় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। ফোন পেয়ে তাকে উদ্ধার করে মোহাম্মদপুর থানায় নিয়ে যান মোমেন বক্সের পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, থানায় সোহেলকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ওসি। এ সময় সোহেলের কথায় গড়মিল পাওয়া যায়। তিনি প্রথমে ভোরে দুর্বৃত্তরা তাকে ফেলে গেছে জানালেও ওসির কাছে স্বীকার করেন, দুর্বৃত্তদের ভয়ে তিনি মিথ্যা বলেছেন। মূলত অপহরণের প্রায় দুই ঘণ্টা পরে তাকে ছেড়ে দেয় তারা। এরপরেই সন্দেহমূলকভাবে সোহেলকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোহেল পুলিশকে জানিয়েছেন গাড়িতে তোলার পরই বেদম প্রহার করা হয়েছে মোমেনকে। এমনকি তাকেও মারধর করা হয়েছে বলে জানান সোহেল। সোহেলকে ছেড়ে দেয়ার আগে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দুর্বৃত্তরা বলেছে, তুই মিরপুরে যাবি না। হুমকিতে ভয় পেয়েই ছেড়ে দেয়ার পরও মোমেনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি তিনি। রোববার ভোরে লোকমুখে লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে পল্লবী থানায় যোগাযোগ করেন মোমেনের পরিবারের সদস্যরা। পরবর্তীতে মোমেনের লাশ শনাক্ত করেন তারা।
মোমেন বক্স একজন ব্যবসায়ী। পৈতৃক সূত্রেই কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক তিনি। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায়  দেশব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারা, কেন তাকে হত্যা করেছে এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। গতকাল সরজমিনে মোমেন বক্সের বাড়িতে গেলে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাড়ির আঙিনায় পারিবারিক কবরস্থানেই দাফন করা হয়েছে মোমেন বক্সকে। বাড়ির আঙিনায় বসেই কথা হয় মোমেন বক্সের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। শোকে নিস্তব্ধ মোমেন বক্সের স্ত্রী নার্গিস আক্তার। তিনি কোন কথা বলতে পারছিলেন না। কান্নার মতো করে চিৎকার করছিলেন কখনও কখনও। নার্গিস আক্তার বলছিলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলাটাই কাল হলোরে। পুলিশ আমার স্বামীকে কেড়ে নিছে। মোমেন বক্সের ভাগ্নির জামাই মুহাম্মদ মিনাল জানান, গত ২৮শে জুন নিহতের ভাগ্নি লাবনী আক্তার বাদি হয়ে পল্লবী থানার এসআই জাহিদুল ইসলাম ও জুবায়ের হোসেনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজির মামলা করেন। সূত্রে জানা গেছে, ১২ই মে বুড়িরটেক এলাকায় মোমেন বক্সের জমি দখলের চেষ্টা চালায় আলী নগর এলাকার শাইনুদ্দিন ও তার লোকজন। সূত্রমতে, শাইনুদ্দিন মোমেন বক্সের আত্মীয়। এ ঘটনায় মোমেন বক্সের ভাগ্নে রাজিব গুরুতর আহত হয়। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে চঞ্চল নামক কলেজছাত্রের লাশ উদ্ধার হয়। এরপরেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মোমেন বক্সের ভাগ্নির জামাই মিনালকে গ্রেপ্তার করেন এসআই জাহিদ। ওই সময়ে তিনি এক লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেন। অন্যথায় তাকে চঞ্চল হত্যা মামলায় জড়ানো হবে বলে হুমকি দেন। টাকা দিতে দেরি হলে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে রিমান্ডের আগে উৎকোচ দাবি করেন এসআই জাহিদ। ওই সমেয় বাধ্য হয়ে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ দেয়া হয়। মিনাল জানান, চঞ্চল সম্পর্কে কিছুই জানতেন না তারা। চঞ্চল বা তার স্বজনরা তাদের প্রতিপক্ষও না। অথচ এই মামলাতেই শেষ পর্যন্ত মোমেন বক্সসহ তাদের জড়ানো হয়। এতে প্রতিপক্ষ ও পুলিশের ইন্ধন ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, উৎকোচ আদায়ের জন্যই আমাদেরকে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখাতো পুলিশ। তিনি জানান, এসআই জাহিদ ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ পাওয়ার পর তার পিতা আহমেদুর সর্দারকে গ্রেপ্তার করে উৎকোচ দাবি করে পল্লবী থানার এসআই জুবায়ের হোসেন। তাৎক্ষণিকভাবে এসআই জুবায়েরকে নগদ ২১ হাজার টাকা দিলে  থানায় নিয়ে যাওয়ার আগেই ছেড়ে দেয়া হয় তাকে। মিনাল জানান, এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েই পুলিশের দুই এসআই ও অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার স্ত্রী লাবনী আক্তার।
লাবনী জানান, মামলা দায়েরের পরই পুলিশ হয়তো তার মামাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তা যাতে কেউ বুঝতে না পারে এজন্য অভিনয়ও করেছেন এসআই জাহিদ। লাবনী জানান, মামলা দায়েরের পর এসআই জাহিদ তাদের বাড়িতে যান। কৃতকর্মের জন্য মোমেন বক্সের বৃদ্ধা মায়ের কাছে ক্ষমা চান। এ সময় জাহিদ বলেছিলেন, উপরের নির্দেশে মোমেন বক্সের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে।
এসব বিষয়ে এসআই জুবায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গ্রেপ্তার করলেই যদি মামলা হয়ে যায় তাহলেতো কোন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারবে না পুলিশ। তিনি জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন। অন্যদিকে এ বিষয়ে এসআই জাহিদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, বর্তমানে ডিবিতে রয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির বলেন, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে একজনকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। সেখানে একজন আইনজীবী প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন কারা তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে।
মোমেন বক্সের পরিবারের সদস্যরা জানান, ৮ই জুলাই সকালে নিজের নোয়া গাড়ি নিয়ে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের উদ্দেশ্যে বের হন মোমিন বক্স। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই আতিক বক্স, এলাকার দুই ব্যক্তি হায়দার ও শহীদ। গাড়ি চালাচ্ছিলেন সোহেল। সকাল ৯টার পরেই আদালতে পৌঁছেন তারা। পরে সোহেলকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে তাজমহল সড়কে আইনজীবী মতিউর রহমানের বাসায় যান। নিহত মোমেন বক্সের দুই সন্তান রয়েছে। গত রোববার সকালে কালশীর বাউনিয়া বাঁধ সড়কের একটি সেতুর নিচে নালা থেকে মোমেন বক্সের লাশ উদ্ধার করা হয়।

যানজটে অচল ঢাকা by মোর্শেদ নোমান ও কমল জোহা খান

পথে নামলেই যানজটের এই নিত্য দুর্ভোগে ত্যক্ত-বিরক্ত
রাজধানীবাসী। গত শনিবার বিকেলে ফার্মগেট
এলাকার চিত্র এটি l ছবি: প্রথম আলো
রাজধানী ঢাকার যান চলাচলব্যবস্থা প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এ থেকে উত্তরণের পথ নেই। নগর পরিকল্পনাবিদ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা এমনটাই মনে করেন। রাজধানীর দুই মেয়রও জানালেন, এ সমস্যা সমাধানে তাঁদের সরাসরি তেমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
দুই মেয়রের মতে, রাজধানীতে এমনিতেই রাস্তার ধারণক্ষমতার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অযান্ত্রিক যানের অবাধ বিচরণ, যত্রতত্র পার্কিং, ফুটপাত দখল, পরিকল্পনাহীন ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, শহরের ভেতর দিয়ে ট্রেন চলাচল, চালক ও পথচারীদের নিয়ম না মানার সংস্কৃতি। আরও আছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অসহ্য যানজটে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে রাজধানীর জীবনযাত্রা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের মতে, ঢাকার ট্রাফিক-ব্যবস্থা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই যানজট সমস্যার স্বল্পমেয়াদি কোনো সমাধান নেই। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত ও এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব। তারই অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা গণপরিবহন-ব্যবস্থাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এক হিসাবে দেখা গেছে, রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে ক্ষতি প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। দেড় কোটি মানুষের ‘মেগাসিটি’ ঢাকায় জনসংখ্যার সঙ্গে বাড়ছে যানবাহন। বাড়ছে না শুধু রাস্তা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি শহরের রাস্তার পরিমাণ হওয়া উচিত মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ। অথচ ঢাকায় এই পরিমাণ মাত্র ৭-৮ শতাংশ। এর একটি বড় অংশ আবার পার্কিং ও হকারদের দখলে।
ট্রাফিক বিভাগের হিসাবে, রাজধানীতে যে পরিমাণ রাস্তা আছে তাতে তিন লাখের মতো গাড়ি চলতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা প্রায় নয় লাখ। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ ২০০৯ পর্যন্ত রাজধানীতে মোটরযানের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের কিছু বেশি। এর পাশাপাশি ঢাকা মহানগরে ৭৯ হাজার লাইসেন্সধারী রিকশার বিপরীতে প্রায় ১০ লাখ রিকশা চলছে বলে ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, রাজধানীতে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ব্যক্তিগত ছোট গাড়ি (প্রাইভেট কার)। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি কার চলাচল করে। অথচ গণপরিবহন হিসেবে বিবেচিত বাসের সংখ্যা ২২ হাজার ৮১৪ এবং মিনিবাসের সংখ্যা ৯ হাজার ৯৯৫।
এ অবস্থায় পরিবেশবান্ধব যান হিসেবে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাংলাদেশের বাইসাইকেল ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে কয়েক বছরে সাইকেল বিক্রি ৩০-৪০ শতাংশ বেড়েছে। তবে সাইকেল চলাচলে সুবিধার জন্য আলাদা লেন করার কথা ভাবছে না ট্রাফিক বিভাগ। ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সাইকেলের লেন হলে তো ভালোই হয়। তবে আমাদের এখানে তো রাস্তাই নেই, সাইকেলের লেন কীভাবে করবেন?’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, যানজট কমাতে হলে ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে। আর তা করতে হলে গণপরিবহন বাড়ানোরও বিকল্প নেই।
যানজটের কারণ হিসেবে অনেকে দায়ী করেন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও গাফিলতিকে। কিন্তু ট্রাফিক বিভাগের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কোনোভাবেই ট্রাফিক-ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। তারা ঢাকার বুকে অনেকটা ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার হয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাফিক বিভাগের সূত্রমতে, সোয়া তিন হাজার ট্রাফিক সদস্যের মধ্যে ২ হাজার ৮০০ কনস্টেবল তিন পালায় দিনরাত কাজ করেন ঢাকা শহরের প্রায় ৬০০ ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে। প্রথম পালায় প্রতিদিন ভোর ছয়টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত কাজ করেন ১ হাজার ৩৫০ জন কনস্টেবল। বিকেলের পালার কাজ বেলা দুইটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন ১ হাজার ৪০০ কনস্টেবল। এ ছাড়া ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রাত ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত ১৫০ জন ট্রাফিক কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করেন।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ছুটির কারণে মোট জনবলের মাত্র ৮০ ভাগ সদস্যকে প্রতিদিন কাজে পাওয়া যায়। সেই হিসাবে প্রতিদিন একেক পালায় ৯৫০ জন ট্রাফিক কনস্টেবল ঢাকার ৬০০ পয়েন্টে কাজ করেন। অর্থাৎ প্রতিটি পয়েন্ট দুজনেরও কম ট্রাফিক কনস্টেবল ঢাকার রাজপথ সামাল দিয়ে আসছেন। এ ছাড়া ট্রাফিক সার্জেন্টের ৩৫০টি পদ শূন্য রয়েছে।
মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের মতে, শুধু ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ালে যানজটের সমস্যা সমাধান হবে না। এতে হয়তো ট্রাফিক সদস্যদের ওপর চাপ কমবে। চাপ সামলাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ সারওয়ার জাহান বলেন, মেট্রোরেল বাস্তবায়ন হলে যানজট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখবে। তবে অ্যালিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার না দিলে ছোট গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়াবে। যানজট নিরসনে তেমন কোনো ভূমিকাই রাখবে না। এ ছাড়া সড়কে পার্কিং বন্ধ করা, গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তাকে নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে পুলিশের কর্মকর্তারা ট্রাফিক বিভাগের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব কর্মকর্তা বলেন, ট্রাফিক বিভাগের নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন তাঁরা কাজ বুঝে ওঠার আগেই বদলি হয়ে যান। ফলে নীতিনির্ধারণে সমস্যা থেকেই যায়।
মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, যানবাহন চলাচলের সঙ্গে সমন্বয় করে আধুনিক সিগন্যাল-পদ্ধতি, বাস বে ও বাস স্টপেজ সংখ্যা বাড়ানো, আন্ডারপাস ও পদচারী-সেতু স্থাপন, গণপরিবহন বাড়িয়ে ছোট গাড়ি কমানো, বহুতল ভবনে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর) মেয়র আনিসুল হক তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে গণপরিবহন-ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার, সড়ক সংস্কার ও ফুটপাত প্রশস্ত করে গাছ লাগানো, পথচারীদের জন্য জেব্রা ক্রসিংসহ আরও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জানতে চাইলে আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় গাড়ি বেশি, রাস্তা কম। এটাই যানজটের অনেক বড় কারণ। এ ক্ষেত্রে মেয়রের সরাসরি কিছু করার ক্ষমতা নেই। তবে আমার এখতিয়ারের মধ্যে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি।’ তেজগাঁও থেকে ট্রাক টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া, কারওয়ান বাজার থেকে কাঁচাবাজার সরানো, আমিন বাজারে ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধ করা, মোহাম্মদপুরের বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো এক বছরের মধ্যে সুরাহা করা গেলে যানজট কমার ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকনও তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে যানজট নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কার ক্ষমতা কী, সেটার কথা চিন্তা না করে সবাইকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
যানজটের কারণ
* রাস্তার ধারণক্ষমতার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কয়েক গুণ
* অযান্ত্রিক যানবাহনের অবাধ বিচরণ
* ৭৯ হাজার লাইসেন্সধারী রিকশার বিপরীতে প্রায় ১০ লাখ রিকশার চলাচল
* যেখানে সেখানে পার্কিং এবং ফুটপাত ও রাস্তা দখল
* সেকেলে ট্রাফিক ব্যবস্থা
* অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিকল্পনাহীন ব্যবস্থাপনা
* অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ছোট গাড়ির উপস্থিতি
* অপর্যাপ্ত গণপরিবহন
* শহরের ভেতরে থাকা বাস টার্মিনাল
* রেলক্রসিংয়ে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা
* ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও গাফিলতি
* প্রভাবশালীদের গাড়ির চলাচলে নিয়ম না মানার সংস্কৃতি
যানজটের প্রতিকার
* গণপরিবহনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া
* ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ কমানো
* ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
* বাস বে ও বাস স্টপেজ সংখ্যা বাড়ানো
* আন্ডারপাস ও পদচারী-সেতু স্থাপন
* অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা
* ট্রাফিক বিভাগের দক্ষতা বাড়ানো
* মেট্রোরেল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন
* ভিআইপি চলাচলের নামে রাস্তা বন্ধ না রাখা
* প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
* রাজধানী থেকে শিল্পকারখানা সরিয়ে নেওয়া

দুর্ভোগ নিয়েই ঈদযাত্রা

নাড়ির টানে ছুটছে মানুষ। বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও। নানা দুর্ভোগ আর কষ্ট সঙ্গী করে উৎসব আনন্দে বাড়ি ফিরছে মানুষ। গতকাল ট্রেনের আগাম টিকিটের যাত্রীরা দ্বিতীয় দিনের মতো নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায় দেশের সব রুটে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলেন, ঈদের আগাম টিকিট নেয়া যাত্রীরা গন্তব্যে যেতে শুরু করেছেন সোমবার থেকেই। তবে, গতকাল থেকে লোকের চাপ বাড়ছে বলে তারা উল্লেখ করেন। বুধবার সরকারি ছুটি থাকায় কিছু মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন আগেই। গতকাল ও তার আগের দিন যারা ঢাকা ছেড়েছেন তারা অনেকটাই স্বাচ্ছন্দ্যেই বাড়ি যেতে পেরেছেন। বাস মালিক ও চালকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া ভিড় থাকবে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত। তবে, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ঈদ ভিড় একটু কম। এখানার হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টার প্রতিনিধি বলেন, দেশের সকল রুটের টিকিট বিক্রি প্রায় শেষ। বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রীদের বেশি ভিড় হবে। এজন্য পর্যাপ্ত বাসও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জসিম উদ্দিন যাবেন কুষ্টিয়া। আগেই টিকিট কেটেছেন। গাবতলী আসতে রাস্তায় যানজট ও সিএনজির ভাড়া বেশি লেগেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কমলাপুর এবং এয়ারপোর্ট স্টেশনে হাজার হাজার যাত্রী অপেক্ষার প্রহর গুনছেন বাড়িতে যাওয়ার আশায়। গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, যারা ১০ই জুলাইয়ের আগাম টিকিট নিয়েছেন তারা গতকাল যাত্রা করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার থেকেই কিছু ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তবে, অধিকাংশ ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্ত্তী। জামালপুর কমিউটার ট্রেন। ভেতরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাধ্য হয়ে মানুষ ট্রেনের ছাদে উঠছেন। বেশি যাত্রী নিয়ে ট্রেনগুলোকে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেতে হচ্ছে। ছাদে ওঠা এক যাত্রী বলেন, টিকিট পাননি। কিন্তু বাড়িতে তো যেতে হবে। ট্রেনের দরজায় ঝুলে, ছাদে উঠে অনেকে গন্তব্যে গেছেন। ভিড়ের কারণে কেউ কেউ চেষ্টা করেও ট্রেনে উঠতে পারেননি। আর টিকিট করে সিট পেলেও অনেকে সিট খুঁজে পাননি। 
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা জানান, বিকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সদরঘাটে যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু করে। জানা গেছে, সদরঘাট থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টির মতো লঞ্চ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালীগামী কয়েকটি লঞ্চে যাত্রীরা ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরছেন। বিকাল ৫টার দিকে গোসেরহাটগামী লঞ্চ এমভি রাসেল, কর্ণফুলী-৪, ভোলাগামী লঞ্চ বালিয়ার ছাদে প্রচুর লোক উঠেছে। গতকাল ভোলাগামী লঞ্চ এম. বালিয়া, দিঘলদিয়া ও সম্পদ নদীর মাঝখানে থাকা অবস্থায় যাত্রীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগে লঞ্চে ওঠেন। তারা ডেকে বেডসিট বিছিয়ে সিট করেন। এমন একজন ইউসুফ। তার সঙ্গে রয়েছেন তার ভাই। তিনি বলেন, লঞ্চে আগে না এলে সিট (ডেকে) পাওয়া যায় না। তাই ঝুঁকি হলেও নৌকা দিয়ে নদীর মাঝখানে এসে বালিয়ায় সিট করে বাড়ি যাচ্ছেন তিনি।

ফুরিয়ে যাওয়া গ্যাসের বিকল্প কত মূল্যে? by মুশফিকুর রহমান

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত ২৮ জুন জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি গ্যাসের মজুত বর্তমানে যে হারে উত্তোলিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে, তাতে আগামী ১৬ বছরে তা শেষ হয়ে যাবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ দশমিক ১৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুত রয়েছে এবং বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে ১৬ বছর সময়জুড়ে বিদ্যমান মজুত জোগান দেবে, তা ধরে নেওয়া যায়। তবে মজুত গ্যাসের পুরোটা আহরণ করা যায় না এবং গ্যাসের ব্যবহার ও চাহিদা স্থির অঙ্ক নয়। বর্তমানে দেশের মজুত গ্যাস থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হচ্ছে। উত্তোলিত গ্যাসের সিংহভাগ (৫৮%) বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় করা হয়। এক অর্থে, বর্তমানে দৈনিক উত্তোলনের ক্ষমতা কাজে লাগানোর বিবেচনায় দেশের গ্যাস উৎপাদনের প্রায় সর্বোচ্চ সামর্থ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী দুই-এক বছরের মধ্যেই গ্যাস উত্তোলনের সামর্থ্য হ্রাস পেতে থাকবে এবং পর্যায়ক্রমে সেই সামর্থ্য সংকুচিত হবে। ফলে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকবে (বর্তমানে এ ব্যবধান দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস)। ২০১৯ সাল নাগাদ গ্যাসের সরবরাহ-ঘাটতি (দেশের উৎপাদন থেকে) দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৩৪২ ঘনফুটে উত্তীর্ণ হবে বলে পেট্রোবাংলার অনুমান। ২০৩১ সাল নাগাদ পুরোপুরি নিঃশেষিত না হয়ে দেশের উৎপাদন-কূপগুলো থেকে নগণ্য পরিমাণ গ্যাস উৎপাদন বহাল থাকার কথা।
দেশের সিংহভাগ শিল্পকারখানা, পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের ব্যবসা, গৃহস্থালি সুবিধাভোগী মানুষ নগণ্য মূল্যে পাইপলাইনে গ্যাস পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে (১২% গ্যাস গৃহস্থালি খাতে ব্যবহার হয়)। এ কারণে গ্যাসের ঘাটতি বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে চারপাশে হাহাকার রব ওঠে। জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকেরা দীর্ঘদিন ধরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর কথা বলছেন। এ-সংক্রান্ত কাজের বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় আগামী দুই-তিন বছরেও আমদানি করা তরল গ্যাস পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত করে দেশের পাইপলাইনে সঞ্চালন করা সম্ভব হবে না। ফলে গৃহস্থালি গ্যাস-সংযোগসহ শিল্পকারখানায় বাড়তি গ্যাস রেশনিং অবধারিত হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সহজ ভাষায় বলে দিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের জোগান না পাওয়ায় গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ করা হবে এবং গ্যাসের অধিকতর মূল্য সংযোজন হয় বলে শিল্পে গ্যাস-সংযোগ অগ্রাধিকার পাবে।
স্থলভাগে নতুন বড় আকৃতির গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে দেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের উপর্যুপরি তাগিদ সত্ত্বেও বড় পরিসরে সে অনুসন্ধান এখনো শুরু করা যায়নি। আগামী শুকনো মৌসুমে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে এবং কোনো আশাপ্রদ আবিষ্কার সম্ভব হলে সমুদ্র থেকে সে গ্যাস সরবরাহ পাইপলাইনে আসতে ৯ থেকে ১০ বছর লেগে যাবে। আর ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এই অনুসন্ধান সফলভাবে কোনো বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার অবধারিত করবে, এমন গ্যারান্টি নেই। সে কারণে প্রাথমিক জ্বালানির বহুমুখিনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এবং বিদ্যমান জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো দরকার। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো, অপাত্রে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস সরবরাহ না দেওয়া ও জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারে মনোযোগ দেওয়া খুবই জরুরি।
আমাদের প্রাথমিক জ্বালানি খাতের নাজুক অবস্থা ক্রমেই বেশি বেশি আমদানি করা তেলনির্ভর হয়ে উঠছে। বিদ্যমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আমদানি করা তেল দিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন (বর্তমানে ২৯%) অবধারিত হয়ে উঠবে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নির্ভার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণে সরকার নজর দেবে এবং সরকার এ নিয়ে খুব উদ্বেগে নেই। কেননা, জাপান এবং ইউরোপের অনেক দেশ জ্বালানি আমদানি করেই অর্থনীতির চাহিদা মেটাচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে আবাসিক খাতের ৭০ শতাংশ বাসাবাড়িতে পাইপ-গ্যাসের বদলে সিলিন্ডার গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তরলীকৃত গ্যাস আমদানি নিয়ে যে বিস্তর কথা তিন-চার বছর ধরে চলছে, এখনো তা বাস্তবায়নের আবশ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজে হাতই দেওয়া হয়নি। পেট্রোবাংলা কেবল একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে তা গ্যাসে রূপান্তর ও পাইপলাইনে সরবরাহ করার একটি বাণিজ্যিক বিনিয়োগ চুক্তি এখনো স্বাক্ষর করতে পারেনি। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে এলএনজি আমদানি করে তা দিয়ে স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ও অন্যান্য ব্যবহারকারীর ক্রয় সামর্থ্যে কতটুকু সরবরাহ করা যাবে, সেটিও প্রশ্ন। ভারতীয় রিলায়েন্স কোম্পানির আলোচিত মহেশখালীর প্রস্তাবিত আমদানি করা এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী প্রায় সাড়ে আট টাকা হবে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের মূল্য বিবেচনায় তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা নিয়েও বিস্তর কথা হচ্ছে বেশ কয়েক বছর। এ লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকও অনেকগুলো স্বাক্ষর করা হয়েছে। তবে জাপানের সহায়তায় মহেশখালীর ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি (অর্থায়নসহ) ছাড়া আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুতের অন্য উৎপাদনব্যবস্থার উদ্যোগ এখনো অনির্দিষ্ট। দেশের আবিষ্কৃত কয়লা উত্তোলন নিয়ে অতি রাজনীতির আঁচ আমদানি করা কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন উদ্যোগেও ভালোভাবে লেগেছে। ফলে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা-ব্যাংকগুলো এ প্রকল্পে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে চাইছে না। আমদানি করা কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সে কারণেও দ্রুত, নাটকীয় অগ্রগতি আশা করা যাচ্ছে না।
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় মাথাপ্রতি উচ্চ আয় এবং ক্রয় সামর্থ্যের কারণে আমদানি করা তরল গ্যাস (এলএনজি), তেল, কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন উৎসে মনোযোগ দিতে পেরেছে। একই সঙ্গে জাপান এবং ইউরোপের অনেক জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ তাদের দেশের বিদ্যমান সব উৎসের প্রাকৃতিক জ্বালানিও আহরণ ও ব্যবহার করছে।
আমাদের প্রাথমিক জ্বালানি খাতের নাজুক অবস্থা ক্রমেই বেশি বেশি আমদানি করা তেলনির্ভর হয়ে উঠছে। বিদ্যমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আমদানি করা তেল দিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন (বর্তমানে ২৯%) অবধারিত হয়ে উঠবে। আপাতত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সহনীয় হলেও বিশেষজ্ঞ অনুমান, কয়েক বছরের মধ্যেই জ্বালানি তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হবে। তেমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য আমাদের কত ব্যয় করতে হবে?
ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশ-বিষয়ক লেখক।

আমেরিকার গভীর অসুখ by হাসান ফেরদৌস

অন্যের অসুখের দাওয়াই বাতলানোর আগে নিজের
অসুখটাই আমেরিকার সারানো দরকার সবার আগে
এক বিন্দু বাড়িয়ে বলছি না। আমেরিকা, যে নিজেকে বিশ্বে সবকিছুতে সবার সেরা ভাবতে ভালোবাসে, দীর্ঘদিন থেকে এক গভীর অসুখে সে ভুগছে। এই অসুখের নাম বর্ণবাদ। কাগজ-কলমে এ দেশে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়েছে দেড় শ বছর আগে, কিন্তু তার মনের ভেতর এই অসুখ এখনো জেঁকে বসে। দুই সপ্তাহ আগে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার চার্লসটনে এক গির্জায় ঢুকে ২১ বছরের ডিলান রুফের ঠান্ডা মাথায় প্রার্থনারত নয়জন কালো নারী-পুরুষকে হত্যা ছিল সেই অসুখের সর্বশেষ প্রমাণ।
কথাটা ভুল বললাম। হত্যার ঘটনা নয়, সেই অসুখের সর্বশেষ প্রমাণ মিলল তার দুই দিন পর, পুলিশের হাতে ডিলান ধরা পড়ার পর। নর্থ ক্যারোলাইনার শেলবিতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ডিলানকে ফেরত পাঠানো হয় চার্লসটনে। সেখানে জেলে এক রাত কাটানোর আগেই তাকে এক লাখ ডলার জামিন দিয়ে বের করে আনা হয়। টাকাটা আসে সেখানকার মস্ত ধনী ও বর্ণবাদী বলে সুপরিচিত রোনাল্ড উইলকিন্সনের পকেট থেকে। ডিলান যা করেছে ভালো করেছে, সে কথা সগর্বে ঘোষণা করে উইলকিন্সন জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের ফলে চার্লসটনের রাস্তা এখন সামান্য হলেও আগের চেয়ে অধিক নিরাপদ।
চার্লসটনের ঘটনার পর থেকে অবশ্য চারদিক থেকে নিন্দা প্রকাশের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। দেড় শ বছর আগে দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে আমেরিকায় যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্য ছিল তার আসল ঘাঁটি। আমেরিকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন কনফেডারেসি গঠন ছিল সে যুদ্ধের লক্ষ্য। যুদ্ধে দাস মালিকদের পরাজয় হলেও সে দাসপ্রথার প্রতীক, তাদের কনফেডারেসি ফ্ল্যাগ, এই দেড় শ বছর সগর্বে দক্ষিণের রাজ্যসমূহে ঝোলানো হয়েছে। কয়েক বছর আগে সাউথ ক্যারোলাইনার উচ্চ আদালত থেকে সে পতাকা সরানো হয়, কিন্তু আইন পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে সে পতাকার স্থান নির্ধারিত হয় সে রাজ্যের আইন পরিষদের মাথায়। যেমন তেমন নয়, ৪০ ফুট লম্বা সে পতাকা, অন্য সব পতাকার ঊর্ধ্বে সগর্বে সে ঝুলেছে। চার্লসটনের ঘটনার পর সে পতাকা সরানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
এই পতাকা হয়তো নামানো হবে, কিন্তু এই প্রতীকের আড়ালে আমেরিকার বর্ণবাদী মানসিকতা যে রাতারাতি বদলে যাবে, তা ভাবা বাতুলতা। সে কথার প্রমাণও মিলেছে হাতেনাতে। বর্ণবাদী কু ক্লাক্স ক্ল্যানের একদল সমর্থক সাউথ ক্যারোলাইনার আইন পরিষদের সামনে বিক্ষোভ করে সে পতাকা নামানোর প্রতিবাদ করেছে। এই আইন পরিষদের সদস্য রিপাবলিকান দলের লি ব্রাইট বলেছেন, কনফেডারেসি ফ্ল্যাগ নামানোর চেষ্টা স্ট্যালিনের নিগ্রহের সঙ্গে তুলনীয়। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, যেকোনো মূল্যে এই পতাকা টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ তিনি চালিয়ে যাবেন।
বলা বাহুল্য, লি-ই একমাত্র রিপাবলিকান নন, যিনি এই পতাকার পক্ষে। সিনেটর টেড ক্রুজ ও সিনেটর র্যান্ড পল, যাঁরা আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁদের দলের মনোনয়ন চাচ্ছেন, তাঁরা দুজনেই এই সেদিন পর্যন্ত কনফেডারেসি ফ্ল্যাগের পক্ষে ছিলেন। বর্ণবাদী বলে পরিচিত একাধিক ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছ থেকে তাঁরা মোটা চাঁদা নিয়েছেন। রক্ষণশীল এসব রিপাবলিকানের সমর্থনেই দক্ষিণ ক্যারোলাইনাসহ দক্ষিণের মোট নয়টি অঙ্গরাজ্যে কনফেডারেসি ফ্ল্যাগ এখনো সরকারি ভবনে সদর্পে উড়ছে।
এই পতাকা শুধু একটি প্রতীক মাত্র। তা নামিয়ে ফেলা হলেও যা আমেরিকায় বদলাবে না, তা হলো এ দেশের বর্ণভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। ক্লিনটন আমলে শ্রমমন্ত্রী ছিলেন রবার্ট রাইস। তিনি সম্প্রতি লিখেছেন, আজকের আমেরিকার যে আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, তার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী ‘অ্যাপারথেইড’ ব্যবস্থার কোনো ফারাক নেই। এ দেশে দাসপ্রথার অবসান হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে এক ভিন্ন দাসপ্রথা চালু হয়েছে এই দেশে। কালোরা এখনো আমেরিকার সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর জনসংখ্যা। সবচেয়ে অনুন্নত, অসুস্থ ও সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় তাদের বাস। সবচেয়ে দুর্বল স্কুলে পড়ার সুযোগ পায় এ দেশের কৃষ্ণকায়দের সন্তান। অধিকাংশ কালো ছেলেমেয়ে শুধু সেই সব স্কুলের ছাত্র, যার ৯০ শতাংশেরও অধিক হয় কালো নয়তো অভিবাসী। শহুরে এলাকায়, যেখানে অধিকাংশ কালো মানুষের বাস, তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতায় আক্রান্ত। কালো বলেই তারা অপরাধী বা মাদকাসক্ত নয়। তাদের আসল অপরাধ দারিদ্র্য। যে বিষাক্ত চক্রে এরা নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তা থেকে বেরোনোর কোনো উপায় নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাপারথেইড ব্যবস্থার সঙ্গে আমেরিকার আরেক মিল খুঁজে পাওয়া যায় এ দেশের বিচারব্যবস্থায়। শুধু কালো এই অপরাধে এ দেশের পুলিশ আপনাকে—তা আপনি বিখ্যাত অভিনেতা বা রাজনীতিবিদ যে-ই হোন না কেন—যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে আটকাতে পারে, প্রতিবাদ করলে জেলে ঢোকাতে পারে। এ দেশের অনেক অঙ্গরাজ্যে এই ‘রেশিয়াল প্রোফাইলিং’ এখনো একটি বৈধ আইনি ব্যবস্থা।
এ দেশের বিচারব্যবস্থা কালোদের প্রতি কী রকম বৈষম্যপূর্ণ তা বুঝতে কিছু পরিসংখ্যান নেওয়া যাক। পৃথিবীর ৫ শতাংশ মানুষের বাস আমেরিকায়, অথচ পৃথিবীর কারাবন্দী এমন মানুষের ২৫ শতাংশ আমেরিকায়। আর এই যে ২৫ শতাংশ বা ২২ লাখ বন্দী, তার ৪০ শতাংশই হলো এ দেশের কালো মানুষ। কী এমন অপরাধে এত মানুষ জেলে? নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ব্রেনন সেন্টার ফর জাস্টিস তাদের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অধিকাংশই খুব সামান্য পরিমাণ মাদকদ্রব্য রাখার অভিযোগে জেলে পচে মরছে। এদের হিসাব অনুসারে, ২০-৩৪ বছর বয়সী এমন প্রতি নয়জন আফ্রিকান-আমেরিকানের একজন এখন জেলে। অনেক ক্ষেত্রে জামিনের জন্য অর্থ না থাকায়, জেলই কালোদের একমাত্র আশ্রয়। যে অপরাধে এরা জেলে, একই অপরাধে সাদা বা বাদামি রঙের মানুষেরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়।
কালো মানুষদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টারও কোনো কমতি নেই এ দেশে। এ দেশের আইন পরিষদ প্রতি ১০ বছর অন্তর কে কোন জেলা থেকে ভোট দেবে, নতুন জনগণনার ভিত্তিতে তার হিসাব ঠিক করে দেয়। যেহেতু এ দেশের অধিকাংশ রাজ্য পর্যায়ের আইন পরিষদ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে, তারা এমনভাবে ভোটের সীমানা নির্ধারণ করে, যাতে কৃষ্ণকায়দের ভোট নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব না ফেলতে পারে। এর ওপর রয়েছে নানা উপায়ে কালোদের ভোট দিতে যেতে না দেওয়ার পাঁয়তারা। দক্ষিণের অনেক রাজ্যেই আইন হয়েছে—ভোটার পরিচয়পত্র ছাড়া ভোট দেওয়া যাবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কালো মানুষদের সরকারি পরিচয়পত্র নেই। পরিচয়পত্র সংগ্রহে যে সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, তার কোনোটাই তাদের নেই। ফলে এদের অনেকেই ভোট দিতে পারে না। কোনো কোনো রাজ্যে আগাম ভোট দেওয়ার সুযোগ কাটছাঁট করা হয়েছে শুধু কালোরা যাতে সে সুযোগ গ্রহণ না করতে পারে।
এসব চেষ্টার মোদ্দা ফল হয়েছে এই যে অনেক ক্ষেত্রে কালোদের ভোটের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় সামান্য ব্যবধানে রিপাবলিকান প্রার্থীরা জিতে গেছেন। ব্রেইন সেন্টারের গবেষণা থেকে শুধু একটি উদাহরণ দিই। নর্থ ক্যারোলাইনায় ২০১৪ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে সে রাজ্যের আইন পরিষদ নতুন আইন পাস করিয়ে নেয়, যার ফলে আগাম ভোটের দিন কমিয়ে দেওয়া হয়, ভোটের দিন ভোট প্রদানের জন্য নথিভুক্তির আইন বাতিল করা হয় এবং নতুন নিয়ম চালু করা হয় যে নিজের থানার বাইরে ভোট দেওয়া চলবে না। এই তিনটি নতুন আইন করা হয় শুধু কালোদের ভোট দিতে অনুৎসাহিত করতে। এর ফলে পূর্ববর্তী নির্বাচনে তুলনায় প্রায় এক লাখ লোক, যার দুই-তৃতীয়াংশই হয় কৃষ্ণকায় বা মহিলা—ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেল, রিপাবলিকান প্রার্থী তাঁর ডেমোক্রেটিক প্রার্থীকে প্রায় ৪৮ হাজার ভোটে হারিয়েছেন।
প্রায় ২৪০ বছর আগে আমেরিকা যখন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবমতে আত্মপ্রকাশ করে, তখন এর শ্বেত সভ্যতার আধিপত্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। দাস ব্যবসা নিয়েও কোনো মতভেদ ছিল না। মার্কিন শাসনতন্ত্রেই কালো মানুষদের সাদাদের তুলনায় তিন-পঞ্চমাংশ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। সেই আইন এখন আর বলবৎ নেই, কিন্তু বাস্তবে এ দেশে সাদা-কালোর তফাত এখনো যোজন পরিমাণ। আইনের চোখে ব্যবধান কমেছে, বাস্তবেও কালোদের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এ দেশের অনেক শ্বেতকায়ই কালো মানুষদের তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে এখনো প্রস্তুত নয়। বারাক ওবামার নির্বাচনে শ্বেতকায়দের মধ্যে যে সহিংস প্রতিক্রিয়া হয়, তা থেকেই সে কথার প্রমাণ মেলে।
আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতিবছর বিশ্বের নানা দেশের মানবাধিকারের অবস্থার ওপর এক সবিস্তার প্রতিবেদন পেশ করে থাকে। এবারও হয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ সে প্রতিবেদনে স্থান পেলেও তাতে থাকে না খোদ আমেরিকায়। সে ভুল শোধরাতে চীন সরকার যে পাল্টা মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে আমেরিকার এই বর্ণবাদী চেহারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। বস্তুত, অন্যদের মানবাধিকার বিষয়ে ওয়াজ-নসিহত করার আগে বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যদি আমেরিকা আয়নায় নিজের চেহারাখানা দেখে নেয়। অন্যের অসুখের দাওয়াই বাতলানোর আগে নিজের অসুখটাই আমেরিকার সারানো দরকার সবার আগে।
৩০ জুন ২০১৫, নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।