Thursday, November 12, 2009

ডেনমার্কের নোভো নরডিস্কের সঙ্গে এসকেএফ চুক্তি করেছে

ডায়াবেটিস স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বসেরা ডেনমার্কের নোভো নরডিস্ক এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক এসকেএফের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে।
চুক্তি অনুসারে ডেনমার্ক থেকে প্রস্তুতকৃত ইনসুলিনের ক্রিস্টাল নোভো নরডিস্ক সরবরাহ করবে এবং এসকেএফ নোভো নরডিস্কের পরামর্শ অনুযায়ী ফরমুলেশন, ফিলিং, ইনসপেকশন এবং প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা নেবে। স্থানীয় এই উত্পাদনব্যবস্থা নোভো নরডিস্কের আন্তর্জাতিক মানসম্মত রাখার জন্য নোভো নরডিস্ক এসকেএফকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে।
গত মঙ্গলবার ঢাকার একটি পাঁচতারা হোটেলে ‘উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এই চুক্তি সম্পাদিত হয়। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ এবং বাংলাদেশের ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি এ কে আজাদ খান উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এই উত্পাদনব্যবস্থা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ইনসুলিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে এবং নোভো নরডিস্ক ও ট্রান্সকমের মধ্যকার পারস্পরিক সমঝোতাকে আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে নোভো নরডিস্কের দূরপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট সঞ্জীব শিশু বলেন, ‘ইনসুলিন উত্পাদনের ক্ষেত্রে এই কৌশলগত অংশীদারির ঘোষণা দিতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। এই চুক্তি বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অসংখ্য রোগীর কাছে বিশ্বমানের ইনসুলিন পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।’
এই চুক্তির অপর প্রতিনিধি এসকেএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম ফারুক বলেন, ‘তিন বছর ধরে ট্রান্সকম গ্রুপ নোভো নরডিস্কের সঙ্গে দায়িত্বপূর্ণভাবে কাজ করে আসছে। নতুন এই চুক্তি আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাস ও মর্যাদার একটি স্মারকপত্র মাত্র। এই চুক্তি আমাদের পারস্পরিক সমঝোতাকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের রোগীদের জন্য বিশ্বমানের ইনসুলিন তৈরিতে সহায়তা করবে।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এসকেএফ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান, ভারতের পণ্ডিচেরীর জেআইপিএমইআরের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ও পরিচালক অশোক কুমার দাস এবং নোভো নরডিস্ক ফার্মা প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ রাজন কুমার এবং ভারতে নোভো নরডিস্কের প্রধান মেলভিন অসকার।

আদমজী ইপিজেডে জার্মান কোম্পানির ৪৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ

জার্মানির কোম্পানি মেসার্স ক্যানকুন ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় হাইটেক ফুড প্রসেসিং কারখানা স্থাপন করবে।
এই কোম্পানি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি করবে। এ ব্যাপারে সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও ক্যানকুন ফুড প্রোডাক্টসের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. মোয়েজ্জদ্দীন আহমেদ এবং মেসার্স ক্যানকুন ফুড প্রোডাক্টসের চেয়ারম্যান শেখ বাদল আহমেদ চুক্তিতে সই করেন।

থাকসিনকে হস্তান্তরের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে কম্বোডিয়া

থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে হস্তান্তরের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে কম্বোডিয়া। থাইল্যান্ডের তিনজন কূটনীতিক গতকাল বুধবার কম্বোডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে থাকসিনকে থাই সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান।
থাইল্যান্ডে ২০০৬ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর থেকে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যাংককের আদালত থাকসিনকে দুর্নীতির দায়ে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। সাজা এড়াতে তিনি পলাতক রয়েছেন।
থাকসিন গত মঙ্গলবার কম্বোডিয়ায় গেছেন। সে দেশের সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর কাজ শুরু করার কথা। দুর্নীতির সাজা এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, এমন ব্যক্তিকে আশ্রয়দান এবং সে দেশের সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করায় কম্বোডিয়ার কড়া সমালোচনা করছে ব্যাংকক। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে কম্বোডিয়ার দর্শানো কারণগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একে-৪৭ রাইফেলের উদ্ভাবক কালাশনিকভের ৯০তম জন্মদিন পালিত

সারা বিশ্বে জনপ্রিয় অস্ত্র একে-৪৭ রাইফেলের উদ্ভাবক রাশিয়ার মিখাইল কালাশনিকভ গত মঙ্গলবার তাঁর ৯০তম জন্মদিন পালন করেছেন। এই রাইফেল কালাশনিকভ রাইফেল হিসেবেও পরিচিত।
জন্মদিনে কালাশনিকভ বলেন, ‘বয়স কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আমার প্রচুর জীবনীশক্তি রয়েছে। তার পরও আমার জন্মদিনটি পালন করার একটা বিশেষত্ব আছে, দরকারও আছে।’
মস্কো থেকে প্রায় এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার পূর্বের আইঝেভশক শহরে মিখাইল কালাশনিকভের জন্মদিনের উত্সবে গণমাধ্যমকর্মীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। এই শহরেই তিনি ১৯১৯ সালের ১০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি হিলারির আহ্বান

মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাঁদের উত্সাহিত করার জন্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
হিলারি বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই এশিয়ার দেশগুলো পৃথকভাবে এবং আসিয়ানের মাধ্যমে মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এবং ২০১০ সালে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য পরিকল্পনা শুরু করতে তাঁদের বোঝাবে।’ মিয়ানমারকে বর্মা হিসেবে উল্লেখ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
হিলারি বলেন, নিশ্চিতভাবেই চীনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। থাইল্যান্ড, ভারত ও অন্য আসিয়ান দেশগুলোরও এ সুযোগ আছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরের সমস্যা শুধু ওই দেশের সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। হিলারি উল্লেখ করেন, শরণার্থীর স্রোত থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়ও গেছে। তিনি বলেন, এ অস্থিতিশীলতা কারও জন্যই ভালো নয়।
নতুন করে সংলাপ শুরুর চেষ্টায় গত সপ্তাহে মিয়ানমার সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। এ সম্পর্কে হিলারি বলেন, আটক গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিসহ মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে ‘আনুপুঙ্খিক ও গঠনমূলক’ বৈঠক সত্ত্বেও আরও অনেক কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, অগ্রগতি ‘সহজ ও দ্রুত’ হবে না।
এদিকে হিলারি বলেছেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সব জঙ্গি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘আমরা চাপ বজায় রাখতে যাচ্ছি। এটা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

পীতসাগরে আরও দুটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া

পীতসাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় দুই কোরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির পর দক্ষিণ কোরিয়া সেখানে গতকাল বুধবার আরও দুটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। মঙ্গলবার দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে ওই গোলাগুলির ঘটনার পর পরই দক্ষিণ কোরিয়া এ সিদ্ধান্ত নিল। এ ঘটনায় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তারা যেন নতুন করে আর কোনো বিরোধে না জড়ায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সূত্র এএফপিকে জানায়, পীতসাগরের জলসীমায় টহল জোরদার করতে আরও দুটি এক হাজার ৮০০ টন ওজনের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে সংক্ষিপ্ত অথচ ভয়বাহ ওই গোলাগুলির সময় উত্তর কোরিয়ার একজন নাবিক নিহত ও আরও তিনজন আহত হয়েছেন। একই সময় উত্তর কোরিয়ার একটি টহল বোটও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
অতীতে দুই কোরিয়া বিরোধপূর্ণ পীতসাগরের জলসীমা নিয়ে দুবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার এশিয়া সফরের কয়েক দিন আগে দুই কোরিয়ার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উত্তেজনা আরও বাড়ল। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, ওবামার এশিয়া সফরে তাঁর আলোচনার অন্যতম বিষয় হবে উত্তর কোরিয়া। ওবামা ইতিমধ্যে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য বিশেষ মার্কিন দূত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সাবমেরিন কেনার সময় ঘুষ নিয়েছিলেন জারদারি -ফরাসি দৈনিকের খবরে অভিযোগ

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ১৯৯৪ সালে নৌবাহিনীর জন্য তিনটি ফরাসি সাবমেরিন কেনার সময় দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। ওই সাবমেরিন কিনতে গিয়ে তিনি লাখ লাখ ডলার নিজের পকেটে পুরেছেন। ফরাসি একটি দৈনিক পত্রিকায় জারদারির দুর্নীতি নিয়ে এই খবর প্রকাশিত হয়।
কিছু নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে লিবারেশন-এর মঙ্গলবারের সংস্করণে দাবি করা হয়, ৮২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো মূল্যের অগোস্তা-৯০ নামের ওই সাবমেরিন বিক্রির সময় জারদারি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি উেকাচ নেন।
পত্রিকাটির খবরে বলা হয়, উেকাচের পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ওই অর্থ পরিশোধ না করার সঙ্গে ২০০২ সালে করাচিতে ১১ জন ফরাসি নাগরিককে হত্যার যোগসূত্র থাকতে পারে।
ইসলামাবাদে সরকারের একজন মুখপাত্র অবশ্য ফরাসি পত্রিকার ওই খবর নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে যথাযথ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র বাহিনী এই সরঞ্জাম কিনেছে। ওই সময় জারদারি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন না।
মুখপাত্র বলেন, তত্কালীন অ্যাডমিরাল ওই সাবমেরিন কেনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জবাবদিহি ব্যুরো (সিবি) ওই ক্রয়ের ঘটনার তদন্ত করেছে। ওই তদন্তে জারদারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

পিছু ছাড়ছে না খাদ্যসংকট, বরং প্রকট হয়ে উঠছে by হাসিব মাহমুদ

২০০৭-০৮ সময়ের খাদ্যসংকট এখনো স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে যায়নি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছিল তখন পুরো বিশ্ব। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ, পশ্চিমা বিশ্বের বায়োফুয়েলে বিশাল ভর্তুকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অনেক কারণ একত্রে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে সংকট তৈরি করেছিল। ৩০টির বেশি দেশে তখন এ নিয়ে দাঙ্গা হয়।
২০০৮ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা, বায়োফুয়েল উত্পাদনে ভর্তুকি হ্রাস ইত্যাদি কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমতে শুরু করায় সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তবে সেই স্বস্তি ছিল সাময়িক। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা খাদ্য নিয়ে নতুন করে চিন্তিত হতে শুরু করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম বৃহত্ ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উত্পাদক ভারতে প্রলম্বিত খরা ও বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারক ফিলিপাইনে টাইফুন খাদ্যদ্রব্যের বিশ্ববাজারকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ফিলিপাইনের কৃষিসচিব আরথার ইয়াপ সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই হুমকির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ২০০৮-এর সংকটের পুনরাবৃত্তি থেকে বিশ্ব বেশি দূরে নয় বলে মত দিয়েছেন। তিনি একটি আন্তর্জাতিক খাদ্য মজুদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
ফিলিপাইন এর মধ্যেই তাদের হিসাবে ১০ শতাংশ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চাল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ হিসেবে সাম্প্র্রতিক মৌসুমে পর পর বেশ কয়েকটি ঝড়ের কথা বলা হয়। এ কারণে সাড়ে আট লাখ মেট্রিক টন চাল নষ্ট হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা প্রথম পর্যায়ে চাল আমদানির কথা উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া অন্যতম বৃহত্ চাল উত্পাদনকারী দেশ থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সমপ্রতি তাদের চাল রপ্তানিতে লাগাম দিয়েছে। ফিলিপাইনে ভর্তুকি দিয়ে কমানো নিম্নমানের চাল কিনতে অসংখ্য লোক লাইন দিচ্ছে। সঙ্গে মজুদদারেরাও আরও দাম বাড়ার আশায় চাল মজুদ করছে।
পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ফিলিপাইনের পাশাপাশি ভারত বিশ্ববাজারে বৃহত্ চাল উত্পাদক ও রপ্তানিকারক। সেই ভারত ২০১০ সাল নাগাদ চাল আমদানিকারক দেশে পরিণত হবে। ফিলিপাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ সমরেন্দু মোহান্তি এ প্রসঙ্গে বলেন, এই পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশের বাজারে হঠাত্ করে আগুন লাগতে পারে।
ভারতে সাম্প্রতিক খরায় ঠিক কতটা শস্যহানি হয়েছে, তার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তবে ২০০২ সালে একই রকম খরায় ২১ মিলিয়ন মেট্রিক টন শস্যহানির ইতিহাস আছে। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ভারতে নিদেনপক্ষে ২০ মিলিয়ন কম উত্পাদনের আশঙ্কা করাই যায়। সমরেন্দু মোহান্তি ভারতের বিশাল খাদ্য মজুদের কথা উল্লেখ করলেও সেই সঙ্গে এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই মজুদের বেশির ভাগই ব্যয় হয় ক্ষুধাপীড়িত দরিদ্র জনগণের ভর্তুকি হিসেবে। এই রিজার্ভ ঘাটতি পুষিয়ে দেবে এমন আশা না করাই ভালো।
গোটা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর এর জন্য ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ চাল উত্পাদন প্রবৃদ্ধির দরকার পড়ে। এই মুহূর্তে এই বৃদ্ধির হার এক শতাংশেরও কম। মোহান্তি এর জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পানির দুষ্প্রাপ্যতা, বায়োফুয়েলের কাঁচামালের জন্য উত্পাদিত কৃষিপণ্যের চাষ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার গুণগত পরিবর্তন ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন।
এশিয়ার প্রধান উত্পাদকদের ছাড়াও ল্যাটিন আমেরিকার উরুগুয়ে, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাও খরার কারণে পাঁচ শতাংশ কম খাদ্যশস্য সরবরাহ করবে। এর মধ্যে ব্রাজিল তাদের আমদানি বাড়িয়ে আট লাখ থেকে নয় লাখ মেট্রিক টন করবে।
এসব খবরই জানান দেয় যে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের পড়তি দাম খুব বেশি দিন থাকবে না। বাড়তি আমদানির চাপ গত বছরের মতো এ বছরও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা নতুনভাবে জনগণের বিক্ষোভ উসকে দিতে পারে।

রাজশাহীতে তিন দিনব্যাপী সুজুকি গাড়িমেলা শুরু

রাজশাহীতে উত্তরা মোটরস লিমিটেডের তিন দিনব্যাপী সুজুকি গাড়িমেলা শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নগর ভবনের গ্রিন প্লাজায় এই মেলার উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান।
উত্তরা মোটরস লিমিটেডের পরিচালক (বিক্রয় ও বিপণন) মীর মোহাম্মদ হোসাইনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্থানীয় দৈনিক সোনালী সংবাদ-এর সম্পাদক লিয়াকত আলী, বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি মেরাজুল আলম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র শরিফুর রহমান।
বক্তারা বলেন, দামে ও জ্বালানি খরচ কম হওয়ায় বাংলাদেশে সুজুকি গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সে জন্য তাঁরা ভারতের মতো এই দেশেও সুজুকি গাড়ি তৈরির পূর্ণাঙ্গ কারখানা স্থাপনের আহ্বান জানান।
মেলার আয়োজকেরা বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের মানুষকে সুজুকি গাড়ির নতুন মডেলের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য ২০০৮ সাল থেকে এ মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।
মেলায় আট ধরনের গাড়ির মূল্যহ্রাস করা হয়েছে। সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সব দর্শনার্থীর জন্য মেলাটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ মেলা চলবে।

আগাসি ইচ্ছে করে ম্যাচ হেরেছিলেন

খেলোয়াড়ি জীবনে ড্রাগ নেওয়ার কথা লিখে টেনিস বিশ্বে শোরগোল ফেলেছেন। এবার আত্মজীবনীতে আরেকটি বোমা ফাটানো অধ্যায় তুলে ধরলেন আন্দ্রে আগাসি—ইচ্ছে করেও হেরেছেন ম্যাচ! ফাইনালে বরিস বেকারের মুখোমুখি না হতে ১৯৯৬ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেমিফাইনালে মাইকেল চ্যাংয়ের বিপক্ষে ইচ্ছে করে হেরে যাওয়ার কথা বলেছেন আগাসি। বরিস বেকার তাঁর সাবেক স্ত্রীকে একবার উড়ন্ত চুমো দিয়েছিলেন, এ কারণে জার্মানির এই টেনিস তারকাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে পছন্দ করতেন না আগাসি। তবে ইচ্ছে করে ম্যাচ হারা যে খুব সহজ কাজ নয়, সেটা চ্যাংয়ের বিপক্ষে হারতে গিয়ে ভালোই টের পেয়েছেন আগাসি, ‘ইচ্ছে করে ম্যাচ হারা জেতার চেয়ে কঠিন।

ফিরেছেন জহির-শ্রীশান্ত

জহির খানের ফেরাটা অনুমিতই ছিল। ইনজুরিতে পড়ার আগে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভারতীয় পেসারদের দুর্দশা দেখার পর কোচ নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছিলেন জহিরের ফেরার। সেই অপেক্ষার অবসান হলো। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট দলে ডাক পেয়েছেন এই বাঁহাতি পেসার। গতকাল ঘোষিত শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম দুই টেস্টের ১৫ সদস্যের ভারত দলে চমক বলতে শান্তাকুমারন শ্রীশান্তের ফেরা। ওয়েবসাইট।
ভারত দল: মহেন্দ্র সিং ধোনি (অধিনায়ক), বীরেন্দর শেবাগ, গৌতম গম্ভীর, রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার, ভিভিএস লক্ষ্মণ, যুবরাজ সিং, মুরালি বিজয়, সুব্রামানিয়াম বদ্রিনাথ, হরভজন সিং, জহির খান, ইশান্ত শর্মা, শান্তাকুমারন শ্রীশান্ত, প্রজ্ঞান ওঝা ও অমিত মিশ্র।

ইমরান খানের ক্ষুদ্রান্তে সফল অস্ত্রোপচার

পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ইমরান খানের ক্ষুদ্রান্তে গত সোমবার একটি সফল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
লাহোরের শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালে এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। ৫৬ বছর বয়সী ইমরান খান তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি লাহোরে তাঁর মায়ের নামে এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন।
অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, ‘ইমরান খান এখন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত।’
ইমরান খানকে ক্রিকেট দুনিয়ার অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯২ সালে তাঁরই নেতৃত্বে পাকিস্তান বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর তিনি ক্রিকেটের জগত্ থেকে বিদায় নেন। ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের রাজনীতির জগতে পদার্পণ করেন এই সাবেক ক্রিকেট তারকা। তিনি তেহরিক-ই-ইনসাফ নামের একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বর্তমানে পাকিস্তান পার্লামেন্টের একজন সদস্য

জার্মান জাতীয় দলের গোলরক্ষক রবার্ট এনকের ‘আত্মহত্যা’

জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের গোলরক্ষক রবার্ট এনকে গতকাল মঙ্গলবার হ্যানোভারে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন।তবে পুলিশ মনে করছে, এনকে আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৩২ বছর। তিনি জার্মান বুন্দেসলিগাতে হ্যানোভারের হয়ে খেলতেন।
জার্মান ফুটবল ফেডারেশন এনকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে, জার্মান ফুটবল দল রবার্ট এনকের দুঃখজনক মৃত্যুকে গভীর দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে গ্রহণ করেছে।
জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের ম্যানেজার অলিভার বিয়েরহফ বলেন, ‘এনকের মৃত্যু অচিন্তনীয়। আমরা শোকাহত।’
এদিকে জার্মান পুলিশ জানিয়েছে, রবার্ট এনকে নরডিচ থেকে হ্যানোভারগামী একটি ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন। আলামত বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে এনকে আত্মহত্যা করেছেন।
রবার্ট এনকের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় ২০০৮ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের পরপরই। তিনি অসুস্থতার কারণে জার্মানির সর্বশেষ চারটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিতে পারেননি।
জার্মান ফুটবল দলের কোচ জোয়াকিম লো কিছুদিন আগে জানিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে জার্মানির এক নম্বর গোলরক্ষক হিসেবে রবার্ট এনকের খেলার সম্ভাবনা বেশি।

পশ্চিম তীরের দেয়াল ভাঙল ফিলিস্তিনিরা

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নির্মাণ করা দেয়ালের অংশবিশেষ ভেঙে ফেলেছেন ফিলিস্তিনি ও বিদেশি শান্তিকর্মীরা। বার্লিন প্রাচীর পতনের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। ২৬ ফুট উঁচু এই দেয়াল ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর থেকে আলাদা করে রেখেছিল।
দেয়াল ভাঙার কাজে রশি ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি ও শান্তিকর্মীরা। এ কাজে একটি ট্রাকও ব্যবহার করা হয়। কর্মসূচি শুরুর প্রায় পরপরই ইসরায়েলি পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বিক্ষোভকারীদের থামাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
রামাল্লার কাছে কালানদিয়া এলাকায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি সমন্বয়ে সহায়তা করেন আবদুল্লাহ আবু রাহমা নামের একজন ফিলিস্তিনি। তিনি বলেন, বার্লিন প্রাচীর পতনের বার্ষিকী উপলক্ষে পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আবদুল্লাহ আবু রাহমা বলেন, কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণকে জেরুজালেমে যেতে সহায়তা করা। তিনি বলেন, ‘এটা আন্দোলনের সূচনা মাত্র। ভূমির ওপর আমাদের অধিকার এবং দেয়ালের বিরুদ্ধে মনোভাব প্রকাশের উদ্দেশ্যেই আমরা এই কর্মসূচি পালন করেছি। দেয়ালটি এক ধরনের নির্যাতন ও অবমাননা।’
ইসরায়েলি সরকার এই দেয়াল নির্মাণের অনুমতি দেয়।

পীতসাগরে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে গুলিবিনিময়

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার পীতসাগরে গুলিবিনিময় হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার একটি টহল জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া কর্তৃপক্ষ এ তথ্য দিয়েছে। সংঘর্ষের পর দুই কোরিয়ার মধ্যে আবারও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এক বিবৃতিতে সিউল জানিয়েছে, ‘গতকাল উত্তর কোরিয়ার একটি টহল জাহাজ নর্দান লিমিট লাইন অতিক্রম করে। আমাদের নৌবাহিনী ওই টহল জাহাজটিকে কয়েক দফা সতর্কসংকেত পাঠিয়ে ব্যর্থ হয়ে গুলি ছোড়ে। এর জবাবে টহল জাহাজটি থেকেও পাল্টা গুলি ছোড়া হয়। এতে হতাহতের কোনো খবর তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘উভয় পক্ষ বেশ দূরে থেকে গোলাগুলি করেছে। আমাদের কামানের আঘাতে উত্তর কোরিয়ার টহল জাহাজে আগুন ধরে যায়। পরে সেটি পিছু হটে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে তিনটি দূতাবাসে পাউডারসহ চিঠি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে উজবেকিস্তান, অস্ট্রিয়া ও ফরাসি দূতাবাসে সাদা পাউডারসহ তিনটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ওই চিঠি প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে ওই পাউডার কী, সেটা এখনো জানা যায়নি। এ ব্যাপারে পরীক্ষা চলছে।
সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে তিন দূতাবাসের ৪০ কর্মীকে দূষণমুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৩ জনই ফরাসি দূতাবাসের কর্মী। ২০০১ সালে অ্যানথ্রাক্স মিশ্রিত চিঠি পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচজন প্রাণ হারায়। ওই ঘটনায় সেখানে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ফেইসবুকে বার্লিন প্রাচীরের ছবি প্রকাশ করলেন সারকোজি

ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি বার্লিন প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একটি ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেছেন। গত রোববার বার্লিন প্রাচীর পতনের দুই দশক পূর্তির দিনে তিনি ছবিটি ফেইসবুকে প্রকাশ করেন।
ছবির ক্যাপশনে সারকোজি লিখেছেন, এটি তোলা হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর। তিনি বলেন, ‘একদল ফরাসি রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ওই দিন সকালে আমি পশ্চিম বার্লিন পৌঁছাই। তারপর চারলি চেক পয়েন্ট পার হয়ে পূর্ব জার্মানিতে ঢুকি। তারপর যাই ব্রানডেনবুর্গ গেটে। আমাদের স্বাগত জানাতে সে দিন বহু মানুষ জড়ো হয়েছিল। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য! আমরা শহরের পূর্বাঞ্চল ঘুরে দেখি।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, ছবিটি ওই বছরের ১০ নভেম্বর তোলা হয়। তখন সারকোজির বয়স ছিল ৩৪ বছর। তিনি তখন ফ্রান্সের এমপি ছিলেন।
মন্তব্যে সারকোজি বলেন, ‘ওই দিন দুই জার্মানির মানুষ আবার একত্র হয়েছিল। স্নায়ুযুুদ্ধের পর ইউরোপে আবার তাঁরা স্বাধীন সময় পার করছিলেন। যে স্বাধীনতাকে আমরা এখনো সমর্থন করি। আমরা ঘটা করে তাই বার্লিন প্রাচীর পতনের ২০ বছর পূর্তি পালন করছি।’

চেহারা নয়, হূদয়টাই আসল

সুন্দরকে কে না পছন্দ করে? কিন্তু সুদর্শন পুরুষকে কতজন নারী পছন্দ করেন? এ প্রশ্নের উত্তরে অনেক নারী হাত ওঠালেও অন্তত মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার সাফ কথা ‘না’। তিনি বলেছেন, ‘চেহারায় মজে নয়। যাকে পছন্দ করব, তাঁর ভেতরের মানুষটাকে জানা চাই। তাহলেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে।’
নারীদের উদ্দেশে চিরন্তন এই জানা কথাগুলো আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিলেন মিশেল ওবামা। দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে চাইলে কেমন পুরুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া চাই, সে সম্পর্কে বলতে গিয়েই তিনি এসব কথা বললেন। জনপ্রিয় গ্লামার ম্যাগাজিন মিশেলের এই কথাগুলো জানিয়েছে।
মিশেল বলেন, সঙ্গী হিসেবে সুদর্শন পুরুষ অবশ্যই ভালো। কিন্তু দিনের শেষে চেহারা নয়, ব্যক্তি হিসেবে সে কেমন, সেটাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। মিশেল আরও একটা সত্য জানিয়ে দিলেন, টাকাপয়সায় সুখ মেলে না। তিনি বলেন, ব্যাংকে কী পরিমাণ অর্থ আছে, কে কত বড় পদে আসীন—স্বামী হিসেবে কাউকে পছন্দের ক্ষেত্রে নারীদের এ বিষয়গুলো অবশ্যই পরিহার করা উচিত। মিশেল আরও বলেন, পছন্দের পুরুষটার হূদয়টা কত বড়, সেটাই আগে দেখতে হবে।
দুই সন্তানের জননী মিশেল (৪৫) নারীদের একটা বিষয়ে স্পষ্ট সতর্ক করে দিয়েছেন, যাকে মনে হবে আপনাকে সুখী করতে পারবে না, তাকে অন্তত কখনোই বিয়ে করার মতো পাগলামি করা যাবে না।
এ ক্ষেত্রে বিয়ের আগে পছন্দের পুরুষ বাছাইয়ের একটা পথও বাতলে দিয়েছেন মিশেল। বলেছেন, ‘পছন্দের পুরুষটি তাঁর মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, নারীদের কোন দৃষ্টিতে দেখেন, শিশুদের সঙ্গে কেমন আচারণ করেন, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আর সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো তিনি আপনার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছেন, আপনাকে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন—এই জিনিসগুলো বিবেচনা করেই একজন নারীর জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া উচিত।
মিশেল বলেন, ‘আপনি যখন কোনো পুরুষের সঙ্গে মধুর আবেশে একাকার হবেন, তখন অবশ্যই আপনারও কিছু দায়িত্ব আছে। আর তা হলো, আপনি যার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েছেন, তিনি যেন আপনার সঙ্গ উপভোগ করতে পারেন, সেভাবেই আচরণ করতে হবে।’
মিশেল শুধু সুন্দর মনের মানুষের কথাই বলেননি। পুরুষদের গুণের কথাও বলেছেন। এ ক্ষেত্রে মিশেল তাঁর স্বামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথা বলেছেন। তিনি জানান, ‘বারাক ওবামার যোগ্যতাই আমাকে টেনেছে।’
মিশেল ও ওবামার প্রথম সাক্ষাত্ ১৯৮৯ সালে শিকাগোর একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে। এর পর থেকেই দুজনের মন দেওয়া-নেওয়া এবং প্রেম। অবশেষে ১৯৯২ সালে পরিণয়।
স্বামী সম্পর্কে বলতে গিয়ে মিশেল বলেন, ‘ওবামা সব সময়ই ছিল একটু অন্যরকম, একটু আলাদা। ওবামার বিশেষত্ব বলতে আমি তাঁর সততা, আন্তরিকতা ও মানুষের প্রতি সমবেদনার কথা বলছি।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা নিয়ে ওবামা ও নেতানিয়াহুর বৈঠক

মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়া আবার শুরু করার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আলোচনা করেছেন। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে দুই নেতার মধ্যে এ বৈঠক হয়েছে। অধিকৃত এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি ওবামা প্রশাসন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে মতদ্বৈধতা বেড়েছে। মার্কিন ইহুদি গোষ্ঠীর একদল নেতাকে নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি এ ব্যাপারে একটি চুক্তি করতে রাজি।
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরই তাঁদের মধ্যকার এ বৈঠক ঘোষণা করা হয়। তবে এর আগে হোয়াইট হাউস কর্তৃপক্ষ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করতে রাজি হয়নি। ওয়াশিংটনে একটি অনুষ্ঠানে মার্কিন ইহুদি নেতাদের নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাসকে বলেছি; আসুন, একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। দ্রুত এ ব্যাপারে আলোচনা শুরু করি। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে দ্রুত একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি করাই আমার প্রধান লক্ষ্য।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টেরও ওই অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল। তবে ফোর্ট হুডে এক শোকসভায় অংশ নেওয়ার কারণে তিনি সেখানে যেতে পারেননি।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে ওবামা প্রশাসন। তবে এরই মধ্যে এ ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ দুবার ধাক্কা খেয়েছে। প্রথমটি ছিল ইহুদি বসতি স্থাপন কার্যক্রম নিয়ে। ফিলিস্তিনিদের দাবি, শান্তি আলোচনা শুরু করার আগে ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। ওবামা প্রশাসনও তাদের দাবি সমর্থন করছিল। তবে গত সপ্তাহে ইসরায়েল সফরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বসতি স্থাপন কার্যক্রম সীমিত করার প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানান।
দ্বিতীয় ধাক্কাটি আসে গত মাসে হঠাত্ করে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলে। আব্বাস দাবি করেন, শান্তি আলোচনা নিয়ে অচলাবস্থা চলার কারণেই তিনি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, বসতি স্থাপন কার্যক্রম বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছে না।

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনে পাকিস্তানে কর্মরত এক মার্কিন সাংবাদিকের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে সে দেশের একটি পত্রিকা। প্রায় আট বছর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি ড্যানিয়েল পার্লের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ এনে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল, যে কারণে পাকিস্তানের উগ্রপন্থীদের হাতে তাঁকে জীবন দিতে হয়েছিল।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে ড্যানিয়েলের বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল যে তিনি সিআইএর গুপ্তচর এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করেন। তাঁরই উত্তরসূরি ম্যাথু রোজেনবার্গের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ এনে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর ম্যাথুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে গত সপ্তাহে সংবাদ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের রক্ষণশীল দৈনিক পত্রিকা দ্য নেশন, যা নিয়ে আতঙ্কিত বোধ করছে ম্যাথুর পত্রিকা ও মার্কিন সাংবাদিকেরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বিভাগের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত নেশন পত্রিকায় ম্যাথুর বিরুদ্ধে সংবাদটি প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, ‘ম্যাথু সিআইএর অপারেশন-প্রধান হিসেবে এবং ব্ল্যাকওয়াটার নামের কুখ্যাত মার্কিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে পেশোয়ারে কাজ করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি টের পেয়েছে।’
ড্যানিয়েল পার্লের বিরুদ্ধে প্রকাশিত খবরে তীব্র বিদ্রূপাত্মক ভাষায় বলা হয়েছিল, তিনি ইহুদি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেন। ধারণা করা হয়, পার্লের মতো রোজেনবার্গও আল-কায়েদা এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মধ্যে যোগসূত্রের বিষয়টি নিয়ে কাজ করায় তাঁকে ফাঁদে ফেলা হয়েছে, যে ফাঁদে পড়ে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শিরশ্ছেদে প্রাণ দিয়েছিলেন ড্যানিয়েল।
ড্যানিয়েলকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় পাকিস্তানের আদালত ওমর সাহেদ শেখ নামের এক ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত পাকিস্তানিকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। যদিও সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

১৮ জুলাইকে ‘ম্যান্ডেলা দিবস’ ঘোষণা করল জাতিসংঘ

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৮ জুলাইকে ‘ম্যান্ডেলা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। গণমানুষের মুক্তির আন্দোলনে নেলসন ম্যান্ডেলার অবদানের কথা মনে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সাধারণ পরিষদে দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধি বাসো সাংকো এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন।তিনি তাঁর দেশের সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে আশার মূর্তি ও প্রতীক উল্লেখ করে বলেন, তাঁর জীবনটা হলো জাতিসংঘের আদর্শের আয়না।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি, লিবীয় কূটনীতিক ড. আলী আবদুস সালাম ত্রেকি বলেন, সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত গণমানুষের মুক্তির প্রশ্নে এর অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।
মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও মানুষের মুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার এই অবিসংবাদিত নেতার অবদান স্মরণ করে জাতিসংঘ তার জন্মদিন ১৮ জুলাইকে ম্যান্ডেলা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাঁর ৬৭ বছরের রাজনৈতিক জীবন স্মরণ করে প্রতিবছর ১৮ জুলাই সারা পৃথিবীর মানুষকে অন্তত ৬৭ মিনিট কোনো জনহিতকর কাজে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।

বুদ্ধদেবকে বনবাসে যাওয়ার পরামর্শ মমতার

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ১০টি আসনের উপনির্বাচনে বিপুল জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে বনবাসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন তিনি এ পরামর্শ দেন।
এই ১০টি আসনের মধ্যে মমতার দল সাতটিতে এবং কংগ্রেস একটি আসনে জয়ী হয়। সিপিএম পাঁচটি আসনে লড়ে হেরে গেলেও বামফ্রন্টের শরিক ফরোয়ার্ড ব্লক একটি আসনে জয়ী হয়। এই অভাবনীয় জয়ে মমতা ঘোষণা দেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে আর রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করে নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। জনগণের ভোটেই আমরা জিতছি এবং জিতব।’
মমতা মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘৩৩ বছর ধরে জনগণের অনেক সেবা করেছেন আপনারা। এবার বিশ্রামে যান। আপনাদের গুন্ডাগিরির জবাব মানুষ ব্যালটে দিয়েছে। এবার শিক্ষা নিন। গদি ছেড়ে এবার বনবাসে চলে যান।’ মমতা বলেন ‘এই রাজ্যে আর রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রয়োজন নেই। আমরা জনগণের ভোটে জিততে চাই। পঞ্চায়েত, লোকসভা, পৌরসভা নির্বাচনে আমাদের যে জয়ের ধারা অব্যাহত আছে, তা আগামী দিনেও থাকবে।

বিশ্বকাপের মতোই

সিরিজ জয়ের মোক্ষম একটা সুযোগ হাতছাড়া করার হতাশা এখন ভারতজুড়ে। নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে সর্বশেষ যখন হারিয়েছিল ভারত, তখন এই দলের রায়না-জাদেজা-ইশান্ত-কোহলিদের জন্মই হয়নি। চোখে অপার স্বপ্ন নিয়ে শিবাজি পার্কে প্র্যাকটিস করেন ১৩ বছরের শচীন টেন্ডুলকার। দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ ছিল এবার। অথচ ২-১-এ এগিয়ে গিয়েও সিরিজ হারল ধোনি-বাহিনী। ভারতজুড়ে অবশ্য জোর সমালোচনা চলছে উইকেটের। কিন্তু উইকেটকে রক্ষাকবচ বানানোর চেষ্টা করেননি মহেন্দ্র সিং ধোনি, ‘উইকেটে এমন কিছু ছিল না। শুরুতে একটু স্যুইং করেছে, সে তো করতেই পারে। এমন নয় যে খুব বেশি সিম মুভমেন্ট ছিল। একটু সহায়তা পেয়েই সেটিকে কাজে লাগিয়েছে ওদের পেসাররা। পরে উইকেট ভাঙবে বলেই টস জিতে ব্যাটিং নিয়েছিলাম। আধঘণ্টা দেখে খেললেই হতো।’
এটা না হয় গেল পরশুর ম্যাচ হারার কারণ। আর সিরিজ হার? ‘আমরা ধারাবাহিক হতে পারিনি। এক ম্যাচ ভালো খেলেছি তো পরের ম্যাচেই খারাপ। সুযোগ এসেছিল, আমরা কাজে লাগাতে পারিনি’—নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নিলেন ভারত অধিনায়ক।
অন্যদিকে সিরিজ জিতে যেন হাওয়ায় ভাসছেন রিকি পন্টিং। শুধু ভারত নয়, হাজারো প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন বলেই পন্টিংয়ের উচ্ছ্বাসটা হলো বাঁধভাঙা, ‘ভারতের মাটিতে আমরা অনেক সিরিজ জিতেছি, কিন্তু এই জয়টা বিশেষ কিছু। আমি এটাকে বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ের পাশেই রাখতে চাই। এতসব প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ছেলেদের একটা দল হিসেবে খেলতে দেখাটা তৃপ্তিদায়ক। ভারতে খেলাটা সব সময়ই কঠিন, এতগুলো খেলোয়াড়কে না পাওয়া ব্যাপারটাকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। কিন্তু কেউ এসব নিয়ে ভাবেনি, দায়িত্ব এড়িয়ে চলেনি। আমরা শুধু মাঠে গিয়ে আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’
২০০৩ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ঠিক আগে ডোপ পরীক্ষায় পজিটিভ হয়ে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলেন শেন ওয়ার্ন। ২০০৭ বিশ্বকাপের আগে ইনজুরিতে পড়লেন ব্রেট লি। এ ছাড়া অনেক সময়ই অনেক সমস্যা পার করতে হয়েছে। কিন্তু ছয় বছরের অধিনায়কত্ব জীবনে এমন সমস্যায় খুব কমই পড়েছেন পন্টিং। ইনজুরির জন্য দেশে রেখে এসেছেন চারজনকে। ভারতে এসেও পিছু ছাড়েনি ইনজুরি। একজন দেশে ফিরে যাচ্ছেন তো পরের ফ্লাইটেই আরেকজন ভারতে এসে ভ্রমণক্লান্তি কাটার আগেই নেমে পড়ছেন মাঠে। কে আসছে, কে যাচ্ছে মুশকিল হয়ে পড়ছিল এই হিসাব রাখাই।
এর পরও কি না এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয়! অধিনায়ক হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছেন, ছিলেন আরও একটি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। এই জয়টাকেও ওইসব সাফল্যের পাশে রাখাই বলে দিচ্ছে, সিরিজ জয়টা পন্টিংয়ের কাছে কতটুকু। এমন দল নিয়েও জয় পাওয়াটাকে ভবিষ্যতের জন্যও ইতিবাচক মনে করছেন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক।

ভারতকে দিয়েই শুরু বাংলাদেশের বিশ্বকাপ

২০০৭ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতকে হারিয়ে। সেই ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই ২০১১ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে বাংলাদেশ। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের দুই আয়োজকের ম্যাচটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচও। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে।
১৫ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরছে উপমহাদেশে। মুম্বাইয়ে কাল ঘোষণা হলো বিশ্বকাপের সূচি। গত বিশ্বকাপের মতো বাংলাদেশ এবারও আছে ‘বি’ গ্রুপে। ভারত ছাড়াও এই গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ড। গ্রুপ ‘এ’তে আছে আরেক স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা, গত তিনবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া ও কানাডা। গ্রুপ পর্যায়ে বাংলাদেশের সবগুলো ম্যাচই হবে নিজেদের মাটিতে। চারটি মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে, দুটি চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে। এ ছাড়া টুর্নামেন্টের প্রথম ও তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনালও হবে ঢাকায়। শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বা ম্যাচই নয়, টুর্নামেন্টের ট্রফি উন্মোচনও হবে বাংলাদেশেই। আগামী ৯ জানুয়ারি ঢাকায় বসছে কেন্দ্রীয় আয়োজক কমিটির সভা। সেদিনই হবে ট্রফি উন্মোচন।
কাল ফিকশ্চার ঘোষণার অনুষ্ঠানের আগে বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির সভায় বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় ৮টি ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে আইসিসি। স্টেডিয়াম দুটিতে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কারের পরামর্শও আছে বাংলাদেশের জন্য। সংস্কারের অগ্রগতি কিছুদিন পরপর জানাতে হবে আইসিসিকে। তিন দেশের মোট ১৩টি ভেন্যুতে ৪৩ দিন ধরে চলবে বিশ্বসেরার লড়াই।
কাগজে-কলমে টুর্নামেন্টের আরেক স্বাগতিক পাকিস্তানের সবগুলো গ্রুপ ম্যাচ হবে শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কার মাটিতে প্রথম ম্যাচটি হবে ২০ ফেব্রুয়ারি, বিশ্বকাপের জন্য তৈরি নতুন ভেন্যু হামাবানটোটাতে স্বাগতিকেরা প্রথম খেলবে কানাডার বিপক্ষে। একটি কোয়ার্টার ফাইনালও হবে শ্রীলঙ্কায়। ভারতের মাটিতে প্রথম ম্যাচটিও হবে একই দিনে, কেনিয়ার বিপক্ষে খেলবে নিউজিল্যান্ড। ২৯ ও ৩০ মার্চ দুটি সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে কলম্বো ও মোহালিতে। ২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ফাইনাল।
ভারতের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে শ্রীলঙ্কা দল এখন ভারতেই। কাল সূচি ঘোষণার জাঁকালো অনুষ্ঠানে মহেন্দ্র সিং ধোনি, বীরেন্দর শেবাগ, হরভজন সিংদের সঙ্গে ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা, তিলকরত্নে দিলশানরাও। ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান আ হ ম মোস্তফা কামাল। বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় প্রথম বিশ্বকাপ নিয়ে গোটা জাতির প্রত্যাশার কথা জানালেন তিনি, ‘বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষ এই বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা করছে। আশা করি, আমরা সফলভাবে এটি আয়োজন করতে পারব। বাংলাদেশ দলও আশা করি, গত বিশ্বকাপের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।’

রোনালদোকে দলে নিলেন কুইরোজ

রিয়ালের চোখরাঙানিতে কাজ হয়নি। পর্তুগাল কোচ কার্লোস কুইরোজ তাঁর কথায় অটল থাকলেন। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফের ২৩ সদস্যের পর্তুগাল দলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে রেখেছেন তিনি।
গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে চ্যাম্পিয়নস লিগে মার্শেইয়ের বিপক্ষে ম্যাচে অ্যাঙ্কেলে চোট পান রোনালদো। পুরোনো চোটেই আবার আঘাত পান বিশ্বকাপ বাছাইয়ে হাঙ্গেরির বিপক্ষে পর্তুগালের ম্যাচ খেলতে গিয়ে। এর পর থেকেই মাঠের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দামি খেলোয়াড়। সম্প্রতি রিয়াল শিবির থেকে জানানো হয়েছে, চোট থেকে সেরে উঠতেই কমপক্ষে আরও দুই সপ্তাহ লাগবে তাঁর। কথাটি কুইরোজ কীভাবে নিয়েছিলেন কে জানে! রিয়ালের ওই কথা শুনেই বলে দেন, ‘রোনালদোকে আমি দলে রাখছি এবং আশা করছি ও আমাদের সাহায্য করতে পারবে। সেটা কয়েক মিনিটের জন্য হলেও।’
বসনিয়ার সঙ্গে পর্তুগালের মহাগুরুত্বপূর্ণ প্লে-অফ ম্যাচ দুটি ১৪ ও ১৮ নভেম্বর। ১৪ নভেম্বর প্রথম লেগ পর্তুগালের মাঠে। আর দ্বিতীয় লেগ বসনিয়ায়।
রোনালদো এ মৌসুমে রিয়ালের জার্সি গায়ে ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ৭টি। এই ৭ ম্যাচেই ৯ গোল করে দেখিয়েছেন যেকোনো দলের ত্রাতা হতে পারেন। কিন্তু মাঠে নামার জন্য ফিট তো তাঁকে থাকতে হবে!
রোনালদোর সেই ফিটনেসটা দেখছেন রিয়ালের মহাপরিচালক জর্জ ভ্যালডানো ও কোচ হোসে ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি। ভ্যালডানো তো রোনালদোর এ অবস্থার জন্য পর্তুগালকেই দায়ী করে সতর্ক করে দিয়েছেন রোনালদোর চোটের অবস্থা আরও খারাপ হয় তাহলে পর্তুগালকেই দায় নিতে হবে।
রোনালদো ছাড়া পর্তুগাল দলে চমক আরও দুজনের অন্তর্ভুক্তি—প্রথমবারের মতো পর্তুগাল দলে ডাক পেয়েছেন বেনফিকার ফাবিও কোয়েন্ত্রাও ও চেলসি গোলরক্ষক হিলারিও।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ তাঁর দেশের সেনাবাহিনীকে প্রতিবেশী কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গত রোববার সাপ্তাহিক বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান আলো প্রেসিদান্তেতে তিনি এ আহ্বান জানান। সম্প্রতি কলম্বিয়ার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ক্রমবর্ধমান সীমান্তবিরোধের কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। শাভেজের এ আহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় কলম্বিয়া জাতিসংঘের সহায়তা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
গত জুলাইয়ে কলম্বিয়া দেশটির মাদক-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সে দেশের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তখন থেকেই ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। ভেনেজুয়েলা-কলম্বিয়া সীমান্তে কলম্বিয়ার মাদক ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় এবং ক্রমবর্ধমান সহিংসতার মুখে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট সীমান্তে সৈন্যসংখ্যা ১৫ হাজারে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
হুগো শাভেজ বলেন, ‘আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নেই। মাতৃভূমি রক্ষায় আমাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে এবং দেশের জনগণকেও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে হবে। যুদ্ধ এড়ানোর সবচেয়ে ভালো পন্থা হলো, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়া।’ প্রতিবেশী কলম্বিয়ার সঙ্গে এই সীমান্তবিরোধের কারণ হিসেবে কলম্বিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সখ্যকে দায়ী করেছে ভেনেজুয়েলা।
এদিকে হুগো শাভেজের এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় কলম্বিয়া জানিয়েছে, তারা এ ব্যাপারে জাতিসংঘের সহায়তা নেবে। এক বিবৃতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আলভারো ইউরাইব বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার সরকারের এই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে তার সরকার অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস (ওএএস) এবং জাতিসংঘের শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভাবছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘কলম্বিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা প্রতিবেশী লাতিন আমেরিকার কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার কথা বলেনি এবং যুদ্ধে জড়াতেও চায় না। আমাদের একমাত্র স্বার্থ দেশ থেকে মাদকচক্র ও মাদক পাচারকারীদের নির্মূল করা।’ কলম্বিয়া যেকোনো বিষয়ে মতভেদ দূর করতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে আলোচনায় বসতে আগ্রহী বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সখ্যের বিষয়টি অস্বীকার করে কলম্বিয়া জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কেবল তাদের মাদক-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযানে কলম্বিয়ার সেনাবাহিনীকে সহায়তা করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক দম্পতি হিসেবে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন উড দম্পতি। বের্টি উড ও জেসি উড, দুজনই ৯৮ বছর বয়সে তাঁদের ৩৬ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটান। ১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যের হার্ডফোর্ডশায়ারের এলসট্রিতে তাঁরা বিয়ে করেন। ২০০৮ সালে দুজনের বয়স যখন ৯৭ বছর, তখন তাঁদের সম্পর্কে চিড় ধরে এবং বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। উডদের প্রতিবেশীরা জানান, উডের স্ত্রী এখন একটি বৃদ্ধাশ্রমে বাস করেন। আর উড সম্প্রতি মারা গেছেন। উডদের মেয়ে পলিন রোয়ে ও ছেলে টেরেন্স উড এই বিচ্ছেদ সম্পর্কে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে ডেভোনে গত মাসে বিয়ে করা এক দম্পতি, যাদের সমন্বিত বয়স ১৮১ বছর, ব্রিটেনের সবচেয়ে বয়স্ক নবদম্পতি হিসেবে দাম্পত্য জীবনের সূচনা করেছেন। লেস অ্যাটওয়েল (৯৪) ও শেইলা ওয়ালসের (৮৭) বিয়েতে পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা অংশ নেন। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বয়সে দাম্পত্য জীবনের সূচনা করার রেকর্ডটি এক ফরাসি দম্পতির। ২০০২ সালে ফ্রাঙ্কো ফার্নান্দেজ (৯৬) ও মাদেলিন (৯৪) বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

জার্মানরা এখনো ঐক্যবদ্ধ হয়নি: মার্কেল -বার্লিন প্রাচীর পতনের দুই দশক পূর্তি

জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছেন, বার্লিন প্রাচীরের পতনের ২০ বছর পার হলেও জাতি হিসেবে জার্মানরা এখনো ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। বার্লিন প্রাচীরের পতনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল সোমবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব জার্মানির নিয়ন্ত্রণ নেয় তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। স্নায়ুযুদ্ধ চলার সময় পশ্চিম জার্মানির পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রভাব ঠেকাতে ১৯৬১ সালে বার্লিন প্রাচীর নির্মাণ করেন পূর্ব জার্মানির শাসকেরা।
পূর্ব জার্মানিতে সমাজতান্ত্রিক শাসনের শৃঙ্খলে বেড়ে ওঠা বর্তমান চ্যান্সেলর মার্কেল বলেন, ‘জার্মানির একীভূত হওয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। দুই অংশের জীবনযাত্রার মানে সমতা আনার জন্য আমাদের এখনো এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, পশ্চিমের তুলনায় জার্মানির পূর্ব অংশে বেকারত্বের হার এখনো দ্বিগুণ।
গত রোববার রাত থেকে বার্লিন প্রাচীর পতনের বার্ষিকী উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
গতকাল রাতে জার্মানির একীভূত হওয়ার প্রতীক হিসেবে ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রান্ডেনবার্গ গেট’-এ মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সরাকোজি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
অনুষ্ঠানে গর্ডন ব্রাউন বার্লিন, জার্মানি ও ইউরোপের একীভূত হওয়াকে একটি ‘অনন্যসাধারণ’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেন। বার্লিন প্রাচীরের পতনের দিনটির কথা স্মরণ করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট সারকোজি সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট ‘ফেসবুক’-এ লিখেছেন, ওই দিন তিনি বার্লিনে ছিলেন এবং প্রাচীরটি ভেঙে ফেলার কর্মযজ্ঞে অংশ নিয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রাচীরের পতনের দিনটিতেই ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেনি। শোষিত জনগণের অধিকার আদায়ে আমাদের আরও সচেষ্ট হতে হবে।’
সম্প্রতি জার্মান পত্রিকা লাইপসিগের ফোলকসাইটুং পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ জার্মান এখনো বার্লিন প্রাচীরের পতনকে স্মরণ করে এবং সে জন্য কৃতজ্ঞ তারা। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলেও বার্লিন প্রাচীরের পতন-বার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। এ উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার সমাজতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচারপত্র বিলি করে তারা।

আফগানিস্তানে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব রয়েছে -সিএনএনকে পারভেজ মোশাররফ

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ অভিযোগ করেছেন, আফগানিস্তান ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা প্রভাবিত। তিনি স্বীকার করেন, প্রতিটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। সম্প্রতি সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে পারভেজ মোশাররফ এসব কথা বলেন।
মোশাররফ বলেন, ‘আফগান গোয়েন্দা, আফগান প্রেসিডেন্ট, আফগান সরকার সম্পর্কে বলবেন না। আমি জানি তারা কী করছে। পরিকল্পনামাফিক তারা বিশ্বকে বিভ্রান্ত করছে।’
মার্কিন গোয়েন্দা, আফগান সরকার ও আফগান গোয়েন্দা সংস্থা সবাই বলছে, তালেবান নেতা মোল্লা ওমর পাকিস্তানে রয়েছেন। এ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ বলেন, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলছে। কারণ তারা সবাই ভারতীয় গোয়েন্দাদের দ্বারা প্রভাবিত।
মোশাররফ আরও বলেন, ‘আফগানিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগ পুরোপুরি ভারতীয় গোয়েন্দাদের দ্বারা প্রভাবিত। আমরা তা জানি। এ সম্পর্কিত দালিলিক প্রমাণ আমি সবাইকে দিয়েছি। আমার কাছে দালিলিক প্রমাণ আছে। এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের জড়িত থাকার বিষয়টি আমরা জানি।’
সাবেক এই পাকিস্তানি সেনাপ্রধান স্বীকার করেছেন, প্রতিটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে আইএসআই। তবে আইএসআই এখনো তালেবান জঙ্গিদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যম ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা যে অভিযোগ করছেন, তা অস্বীকার করেছেন পারভেজ মোশাররফ।
পারভেজ মোশাররফ বলেন, সন্ত্রাসীদের সমর্থন দিচ্ছে না আইএসআই। এটা সরকার কিংবা সেনাবাহিনীর নীতি নয়। যদিও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে গোয়েন্দারা। এটা হচ্ছে আইএসআইয়ের দক্ষতা ও কার্যকারিতার প্রমাণ। গোষ্ঠীগুলোকে প্রভাবিত করতে হলে অবশ্যই তাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হবে। তিনি বলেন, এটা হচ্ছে ওই ধরনের প্রবেশ। এর অর্থ এই নয় যে, গোয়েন্দারা সন্ত্রাসীদের সমর্থন দিচ্ছে।

আফ্রিকাকে এক হাজার কোটি ডলার ঋণ দেবে চীন

চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর দেশ আফ্রিকায় স্বল্প সুদে এক হাজার কোটি ডলার ঋণ দেবে। আগামী তিন বছরে এই ঋণ দেওয়া হবে। আফ্রিকায় নয়া উপনিবেশ স্থাপন করছে—চীন পশ্চিমা বিশ্বের এই দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
মিসরে চীন-আফ্রিকার সম্মেলনে গত রোববার এ ঘোষণা দেন জিয়াবাও। ২০০৬ সালের সম্মেলনে চীন দেশটিকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এবার এই ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচনা সম্পর্কে জিয়াবাও বলেন, ‘অভিযোগ রয়েছে, চীন আফ্রিকার সম্পদ লুফে নেওয়ার চেষ্টায় আছে, সেখানে নয়া উপনিবেশ স্থাপন করতে চায় বেইজিং। আমার বিবেচনায় এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।

এডুইনা-নেহরুর প্রেম নিষ্কাম ছিল না

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং ব্রিটিশ-ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রী এডুইনার প্রেম সব সময় নিষ্কাম ছিল না। ফরাসি লেখিকা ও দার্শনিক ক্যাথেরিন ক্লেমেন্ট সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডয়াকে এ কথা বলেছেন। তিনি এডুইনা-নেহরু প্রেমকাহিনী নিয়ে প্রস্তাবিত চলচ্চিত্র ইন্ডিয়ান সামার-এর চিত্রনাট্য কাটছাঁট করার সরকারি উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন।
এডুইনা-নেহরুর রোমান্স নিয়ে এডুইনা অ্যান্ড নেহরু: এ নোবেল নামক একটি বই লিখেছেন ক্যাথেরিন। বইটি ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।
ক্যাথেরিন ক্লেমেন্ট বলেন, এডুইনা নিজেই স্বীকার করেছেন যে নেহরুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ‘প্রায় নিষ্কাম’। তাঁর এ স্বীকারোক্তি এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাঁদের প্রেম সব সময় নিষ্কাম ছিল না।
৭৪ বছর বয়সী এই লেখিকা বলেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে লেখা চিঠিতে এডুইনা বলেছেন, নেহরুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রধানত নিষ্কাম। ‘প্রধানত’ কিন্তু ‘সব সময়’ নয়।
ক্যাথেরিন মনে করেন, ওই রোমান্সের চলচ্চিত্রে রূপায়ণের ব্যাপারে সরকারের জড়িত হওয়ার বিষয়টি অপ্রয়োজনীয়। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ কেন বিভ্রান্ত হবে? এডুইনা ও নেহরু উভয়েই ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক এবং এ সম্পর্কের বিষয়টি চিঠি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে উঠে এসেছে। আমি নিজে নেহরুর ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীর সঙ্গে কথা বলেছি। নেহরুর ঘনিষ্ঠরা তাঁদের নেতার জীবনের সব ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন।

মঙ্গল গ্রহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যৌথভাবে গবেষণা চালাবে

নাসা এবং ইউরোপের মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র ইসা মঙ্গল গ্রহে যৌথভাবে গবেষণা ও মিশন চালানোর লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গত রোববার ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মহাকাশ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মঙ্গল গ্রহে যৌথ গবেষণা চালানোর অনেক দিনের প্রচেষ্টা বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে।
এই যৌথ গবেষণা শুরু হবে ২০১৬ সালে, ইউরোপভিত্তিক একটি মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশে পাঠানোর মাধ্যমে। ২০১৮ সালে সেটি মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ গবেষণার লক্ষ্য হলো, মঙ্গল-পৃষ্ঠের বিভিন্ন উপাদান পৃথিবীতে নিয়ে আসা।
ওয়াশিংটনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন নর্থ আমেরিকান স্পেস এজেন্সিজের (নাসা) প্রধান প্রশাসক চার্লস বোল্ডেন ও ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সিজের (ইসা) মহাপরিচালক জিন জ্যাকুয়েস ডরডেইন।
মঙ্গল গ্রহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এই যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় বেশ কিছুদিন আগে। তখন প্রাথমিক আলোচনায় উঠে আসে কীভাবে, কোন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ উদ্যোগকে সফল করবে। উদ্যোগটিতে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তহবিল। কারণ, এর আগে মঙ্গল গ্রহসংক্রান্ত আরও অনেক গবেষণা কেবল তহবিলসংকটের কারণেই থমকে গেছে। ওয়াশিংটনে নাসা ও ইসার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মঙ্গল গ্রহে যৌথ গবেষণার স্বপ্ন পূরণের প্রথম পদক্ষেপ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একমত হয় যে সব ধরনের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ বিনিময়ের মাধ্যমে তহবিলসংকট সহজেই কাটিয়ে ওঠা যাবে এবং মঙ্গল গ্রহ নিয়ে একটি সফল গবেষণা চালানোও যাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এরই মধ্যে এ অভিযানের জন্য ৮৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি তহবিল গঠন করেছে। শিগগির এই তহবিলের পরিমাণ এক বিলিয়ন ইউরোতে উত্তীর্ণ করার ব্যাপারে সম্ভব সবকিছুই করতে রাজি আছে ইউরোপীয় দেশগুলো।
নাসা আগামী ২০১৬ সালের মঙ্গল গ্রহ অভিযানে একটি উেক্ষপণযোগ্য রকেট প্রদান করবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ আছে।

ভারতে সোয়াইন ফ্লুতে আরও দুজনের মৃত্যু

ভারতের গুজরাটে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সোমবার আরও দুই মহিলার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এইচ১এন১ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪২ জনে। রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তকর্তারা এ তথ্য জানান।
নিহতরা হলেন কুচ জেলার গান্ধীঘাম এলাকার হেমলতা রাজভাট (৪০) ও রাজস্থানের সিরোহি জেলার ভানুবেন পারিয়া (৩০)।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, রাজ্যে বর্তমানে সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৯২।

সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা -স্মরণ by দীপংকর চন্দ

সুপরিকল্পিত এক বিকেলের সূচনালগ্ন। মতিঝিলের কর্মক্লান্ত জনস্রোত, যন্ত্রযানের দীর্ঘ মিছিল পেছনে ফেলে ইত্তেফাক ভবনের দিকে এগোলাম আমরা। অভিসার সিনেমা হল অতিক্রম করে পৌঁছালাম রাজধানী সুপার মার্কেটের কাছেই আর্ট হ্যাভেন নামের একটি ছোট্ট দোকানের সামনে। দোকানটির স্বত্বাধিকারী ইকরাম হোসেন একজন অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু নিয়তির বিচিত্র খেয়ালে কত অবিশ্বাস্য ঘটনাই যে ঘটে পৃথিবীতে! ধনতান্ত্রিক সমাজের বিবেচনায় ইকরাম হোসেনের মতো আপাতদৃষ্টিতে অপাঙেক্তয়, একজন অতি সাধারণ মানুষের হাতেও লেখা হয় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’
আর্ট হ্যাভেনের স্বল্পায়তন পরিসরে প্রবেশ করি আমরা। কথা হয় একহারা গড়নের ইকরাম হোসেনের সঙ্গে। শুরুতেই ব্যক্তিজীবনের বর্ণনা। ১৯৬৮ সালে মহানগর ঢাকায় জন্ম তাঁর। অল্প বয়সে পিতৃবিয়োগের কারণে ইকরাম হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ পরিপূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে বিভিন্ন কাজ করার চেষ্টা করেন তিনি। লেদ মেশিন, গ্যাস ওয়েলডিং, ইঞ্জিন ডেন্টিংয়ের কাজ করতে করতে একদিন যুক্ত হন মতিঝিল শাপলা চত্বরের কাছেই আশরাফ মোটরস নামের একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে। এই ওয়ার্কশপেই অঙ্কনশিল্পী বাদশা মিয়ার সঙ্গে পরিচয়। মূলত বাদশা মিয়ার হাত ধরেই পেশা বদল ঘটে ইকরাম হোসেনের। এরপর বছর চারেক অতিক্রান্ত হয়।
দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় বিসিআইসি ভবনের উল্টো দিকের ফাঁকা জায়গায় তখন সুউচ্চ ভবন ছিল না; ছিল গাড়ির ওয়ার্কশপ, গ্যারেজ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্প ব্যয়ে নির্মিত প্রান্তনিবাস এবং কয়েকটি ছোট দোকান। এখানেই পপুলার পাবলিসিটি নামের একটি আর্টের দোকানে কাজ শুরু করলেন ইকরাম হোসেন। পপুলার পাবলিসিটির কাছেই ক্যাফে চায়নার গলি। বনগ্রাম রোড থেকে এখানে আড্ডা মারতে আসতেন নূর হোসেন। মতিঝিল-দিলকুশার বিভিন্ন অফিসে পুরোনো কাগজ, পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত জলিল ভাইয়ের সঙ্গে ভীষণ সখ্য ছিল ঝাঁকড়া চুলের এই যুবকটির। নূর হোসেনের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হতো ইকরাম হোসেনের, সৌজন্যমূলক বাক্যবিনিময়ও হতো, তবে বেশি ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হয়নি কর্মব্যস্ততার কারণেই। ইকরাম হোসেন জানতেন, নূর হোসেন আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী। রাজনৈতিক যেকোনো কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
১৯৮৭ সাল তখন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অগণতান্ত্রিকভাবে অধিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ দেশের সব রাজনৈতিক জোট। প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্তাশক্তির স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ জনসাধারণ। বিক্ষোভ-আন্দোলনে প্রায় প্রতিদিনই উত্তাল রাজপথ। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের জীবনহানির সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিরোধী দলগুলো ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিল। শুরু হলো কর্মসূচি সফল করার প্রস্তুতি।
৮ নভেম্বর সকালে দোকানে কাজ করছিলেন ইকরাম হোসেন। এমন সময় কয়েকজন বন্ধুসহ সেখানে উপস্থিত হলেন নূর হোসেন। একটা কাজ করে দেওয়ার কথা বললেন ইকরাম হোসেনকে। সে সময় ব্যস্ত ছিলেন ইকরাম হোসেন। তাই তিনি পরদিন বিকেলে নূর হোসেনকে দোকানে আসতে বললেন। ৯ নভেম্বর। শীতের পড়ন্ত বিকেলে নূর হোসেন এলেন পপুলার পাবলিসিটিতে। ঘণ্টাখানেক বসলেন। তারপর সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে ইকরাম হোসেনকে নিয়ে চললেন ক্যাফে চায়নার গলির পাশের প্রান্তনিবাসের একটি অংশে। সেখানে জামা খুললেন নূর হোসেন। ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত করে ইকরাম হোসেনকে বললেন, আজ আপনি এমন এক জায়গায় কিছু কথা লিখবেন, যা আপনি আপনার জীবনে কোনো দিন লেখেননি। নূর হোসেনের কথায় খানিকটা বিভ্রান্ত হলেন ইকরাম হোসেন। দ্বিধাগ্রস্ত হলেন। নূর হোসেনের অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিশ্চিত হতে চাইলেন লেখার স্থান সম্পর্কে! হ্যাঁ, নিশ্চিত করলেন নূর হোসেন, জানালেন লিখতে হবে এই শরীরেই। কাছের একটা দেয়ালে চক দিয়ে ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক’ (এই বানানেই) কথাগুলো লিখলেন। তারপর এ কথাগুলো লিখে দিতে বললেন তাঁর বুকে-পিঠে। কারণ, আগামীকালের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে এভাবেই অংশ নিতে চান তিনি। কিন্তু এই দুঃসাহসী কাণ্ড যে নূর হোসেন নামের প্রাণোচ্ছল যুবকটির মৃত্যুর কারণ হতে পারে!—না! না! এ কাজ কিছুতেই করতে পারেন না ইকরাম হোসেন! তিনি ফিরে যেতে উদ্যত হতেই তাঁর হাত চেপে ধরলেন নূর হোসেন, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য তাঁর মতো শত প্রাণের বলিদান ভীষণ প্রয়োজন আজ। নূর হোসেনের এ কথায় আকস্মিকভাবে দ্বিধামুক্তি ঘটল ইকরাম হোসেনের। আপত্তির প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কম্পিত হাতে তিনি তুলি তুলে নিলেন, সাদা অ্যানামেল পেইন্টের কৌটার মুখ খুললেন, তারপর মিনিট বিশেকের মধ্যে লিখে ফেললেন সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা।
১০ নভেম্বর। সকাল থেকেই ঢাকায় জারি ছিল ১৪৪ ধারা। কিন্তু সেই ধারা অগ্রাহ্য করে পথে নামলেন নূর হোসেন। স্বৈরাচার নিপাতের লক্ষ্যে, গণতন্ত্র মুক্তির দাবিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত ঊর্ধ্বে তুলে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করলেন দশদিগন্ত। অবধারিতভাবে পুলিশ গুলি চালাল। সেই গুলিতে নূর হোসেনের নিষ্প্রাণ দেহ মাটিতে লুটাল ঠিকই, কিন্তু সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা শরীরে ধারণ করে নূর হোসেন পৌঁছে গেলেন অমরাবতীর অনিন্দ্য সুন্দর উপকূলে।

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নৌযুদ্ধ

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পশ্চিম সমুদ্র উপকূলে নৌযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র এ কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে পারেননি।
দুই দেশ সমুদ্র উপকূলের কোথায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে তা জানা যায়নি। তবে ১৯৯৯ ও ২০০২ সালে পীত সাগরে এ দুটি দেশের মধ্যে ভয়াবহ নৌযুদ্ধ হয়েছিল।
উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনী গত মাসে দাবি করেছিল, দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সমুদ্র সীমান্তে যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে। এ ধরনের সামরিক উসকানির ফলে দেশ দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।

নির্বাচনে বাধা ও একটি অকপট স্বীকারোক্তি -রসঙ্গ ডাকসু by মাহমুদুর রহমান মান্না

গত ২৩ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি গোলটেবিলে যোগ দিতে। যোগাযোগ স্কুল নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগঠন এর আয়োজক। গোলটেবিল বৈঠকের শিরোনাম ছিল: ডাকসু নির্বাচনে বাধা ও করণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোলটেবিলে সভাপতিত্ব করেছিলেন। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন আর ডাকসুর প্রাক্তন ভিপি-জিএসরা আমন্ত্রিত ছিলেন। মোটামুটি ভালোই জমেছিল আলোচনা।
১৮ বছর বা দেড় যুগ ধরে ডাকসুর নির্বাচন হয় না। কী অদ্ভুত ব্যাপার, না! ১৮ বছর ‘কী দুঃসহ সময়’! ১৮ বছর ধরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে কত পানি গড়িয়ে গেছে, ১৮ বার পৃথিবী তার কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেছে, ১৮ বছরে চারবার দেশের সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়নি। অথচ এই ১৮ বছরে ১৮ দুগুণে ৩৬ জন ডাকসুর ভিপি-জিএস হতে পারতেন, সারা দেশে কত ছাত্রনেতার জন্ম হতো। আমাদের তো অসংখ্য নেতার প্রয়োজন। সেই নেতৃত্ব আমরা পাব কোথায়? সে জন্যই তো আমরা ডাকসুকে সেকেন্ড পার্লামেন্ট বলি। ডাকসুর পরে যে চাকসু, রাকসু, জাকসু ইত্যাদি—এসবগুলোও তো একেকটা নেতা তৈরির কারখানাই বটে।
দেড় যুগ ধরে ডাকসুর নির্বাচন হলো না কেন? এরশাদের আমলে নির্বাচন হয়নি, তার একটা কারণ বোঝা যায়। কিন্তু তারপর তো নির্বাচিত সরকার এসেছে পরপর দুটি। তারা নির্বাচন দেয়নি কেন? তাদেরও কি পছন্দের ভিত্তিতে তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব পছন্দ নয়? কেন? তারাই না নবীন নেতৃত্বের স্লোগান দেয়। ভবিষ্যত্ রাজনীতি, সংগঠন ও নেতৃত্বের জন্য ছাত্রদের চেয়ে ভালো শক্তি আর কোথায় আছে? অনেক বিতর্কের পর এ কথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ছাত্ররাজনীতির নেতির চেয়ে ইতির দিক বেশি। তাহলে এতগুলো বছর পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন হলো না কেন? তার চেয়ে বড় কথা, নির্বাচিত দুটি সরকারের আমলেও এ অবস্থা চলল না কেন।
উপস্থিত ছাত্রনেতারা বক্তৃতা করলেন। তাঁরা সবাই বললেন, ডাকসু নির্বাচন চান। উপাচার্য যে ডাকসু নির্বাচন চান সে কথাও খুব স্পষ্টভাবেই বললেন। দুটি বড় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একে অপরকে দোষারোপ করার চেষ্টা করল। কিন্তু তারা ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দ্বিমত করল না। প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে তা হলো, ডাকসু নির্বাচনটা হচ্ছে না কেন।
স্বাধীনতার পরের প্রথম ডাকসুর ভিপি এবং তত্কালীন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বললেন মূল্যবান কথা। তিনি বললেন এবং প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা সবাই ডাকসু নির্বাচন চান। ভালো। কিন্তু আপনারা কি হারতে রাজি আছেন? হার মেনে নিতে রাজি আছেন?’ ১৯৭২-এ ডাকসুর ভিপি ছিলেন তিনি (সেই সময় আমি চাকসুর জিএস)। পরের বছর অর্থাত্ ১৯৭৩ সালে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন-মুজিববাদী ছাত্রলীগ যৌথ প্যানেল দিয়েছিল। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ ছাত্রলীগের মাহবুব-জহুর পরিষদ।
নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল লেনিন-গামা যৌথ পরিষদের। তখন পরাজয়ের বেদনা ও গ্লানি মুছতে ডাকসু নির্বাচনের ব্যালটবাক্স হাইজ্যাক করা হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই প্রথম নির্বাচন ছিনতাই, সেই শুরু। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বললেন সেই ঘটনার কথা। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলাম তাঁর কথা।
এই সেই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা কলেজের মেধাবী ছাত্র, তখন থেকেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে থাকতেই এক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকেসহ চারজনকে টিসি দেন। তখন থেকেই সেলিম ভদ্র-মেধাবী ছাত্রনেতা হিসেবে ছাত্রপ্রিয় ছিলেন। আমি তখন ঢাকা কলেজে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি।
’৭৩-এ যখন ডাকসু নির্বাচন হয়, তখন আমি জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। তখনো সেলিমকে আমি তাঁর অতীত ভূমিকার জন্য শ্রদ্ধা করি। অথচ সেই সেলিম সাহেব ডাকসু নির্বাচনের পরদিন পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলেন, ‘ডাকসুর ব্যালট বাক্স হাইজ্যাক করেছে জাসদ ছাত্রলীগ।’
সেলিম ভাই বললেন, “ডাকসু নির্বাচন হবে যদি আমরা পরাজয় মানতে রাজি থাকি। ’৭৩-এ আমরা পরাজয় মেনে নিতে রাজি ছিলাম না, তাই আমরাই ব্যালটবাক্স ছিনতাই করেছিলাম। আজ আমি আপনাদের সামনে স্বীকার করছি, সে দিন আমরা অন্যায় করেছিলাম। আমি ঘটনা জানতাম না, তাই ঘটনার জন্য জাসদকে দায়ী করে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছিলাম। আজ আমি এও স্বীকার করছি, আমি ভুল বলেছিলাম। ছিনতাই জাসদ করেনি, করেছিল ছাত্রলীগ।”
তাঁর বাঁয়ে বসেছিল ছাত্রদল আর ডাইনে ছিল ছাত্রলীগ। সেলিম ডানে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা কিছু মনে করবেন না। আমি আপনাদের কেবল বলছি না। এই যে আপনারা বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সহাবস্থান আছে, সেটা কী? হলে হলে সিট ভাগাভাগি তো। এটাকে সহাবস্থান বলে না, এটা হলো সুবিধা ভাগাভাগি করা, স্বার্থ ভাগাভাগি করা। এটাকে বড়জোর সমঝোতা বলা যায়।’
সেলিম এখন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক। সিপিবি দীর্ঘদিন বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত মিত্র ছিল। আওয়ামী লীগের বি-ডিম হিসেবে একটা কুখ্যাতি অর্জন করেছিল দলটি। কিন্তু এখন সিপিবি আওয়ামী লীগের ক্ষমতার ভাগীদার নয়। চিন্তাভাবনা করেই দলটি মহাজোটে যোগদান থেকে বিরত থেকেছে। এখন সিপিবি আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে আপদ আর বিপদ মনে করে। তারা মনে করে, বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করেছে। আওয়ামী লীগ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে জোট গড়েছিল। সেটা এখন আর নেই, কিন্তু ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে মহাজোট এখনো টিকে আছে। সেই এরশাদ এখন প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিরোধিতা করছেন শিক্ষানীতিতে ধর্ম নেই এই অভিযোগে। সিপিবি এখন বাম জোট নিয়ে কাজ করছে, মহাজোট সরকার গভীর সমুদ্রে গ্যাসক্ষেত্র বিদেশিদের কাছে লিজ দিতে যাচ্ছে—এ অভিযোগে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির সঙ্গে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
আলোচনা শেষে সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে সৌজন্য হাসিবিনিময়। ডান হাতের বুড়ো আঙুল উঁচু করে দেখালাম তাঁকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক আছে? আমি মাথা নাড়লাম।
আমি মনে করেছিলাম, বড় একটা নিউজ হবে তাঁর বক্তৃতা। কিন্তু পরদিন পত্রিকাগুলোতে তাঁর বক্তব্য পেলাম না।
আমার এক পরিচিত বন্ধু বললেন সিপিবিওয়ালদের কথা। পত্রিকাওয়ালারা মনে হয় বিশ্বাস করতে পারেনি। মনে নেই ’৭২-এ এই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বঙ্গবন্ধুর ডাকসুর সদস্যপদ বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন। মতিউল, কাদের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন। তারপরও সেলিম সাহেবরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে মাফ-টাফ চেয়ে নিয়েছিলেন।
কিন্তু ৩১ অক্টোবর জাসদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সেই একই কথা বললেন। তার মানে ’৭৩-এর সেলিম এবং ২০০৯ সালের সেলিম সাহেবকে একইভাবে নেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু এবারও কোনো পত্রিকা এটা নিউজ করল না। কেন?
আমি এই বিষয়টা নিয়ে এ জন্য লিখছি যে এটা আমার কাছে মস্ত বড় একটা নিউজ। আমাদের রাজনীতিতে এখন সত্য প্রায় নির্বাসিত। সাহস করে আমরা প্রায় কেউ-ই সত্য কথা বলতে চাই না, মিথ্যাকে অনর্গল চিবাতে থাকি। আমরা অতীতের মধ্যে বসবাস করতে পছন্দ করি, কিন্তু তা থেকে সত্য খুঁজতে যাই না। কারণ আমরা যতই অতীতের ওপর রং লাগাই না কেন, অতীত তার দাঁত বের করে আমাদের ব্যঙ্গ করে। নইলে ১৮ বছরে একবার ডাকসু নির্বাচন হবে না কেন।
আমি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে তাঁর ওই বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ জানাই। এ ধরনের অকপট সত্যের স্বীকার মানুষকে বড় করে, রাজনীতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে। রাজনীতিকে একটি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আমি আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই। তেল-গ্যাস কমিটির আন্দোলনের প্রতি বিএনপি সমর্থন জানিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সে সমর্থন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিএনপির এই নৈতিক সমর্থন মানে নীতিগত সমর্থন কি না। তাঁদের মতে, বিএনপিও বর্তমান সরকারের মতোই গ্যাসক্ষেত্র লিজ দেওয়ার পক্ষে। তাঁরা যে এখন তাদের সমর্থন দিচ্ছেন, তা একটি কুটকৌশল মাত্র।
আমাদের রাজনীতিতে এ রকম স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার রেওয়াজ প্রায় উঠে গেছে। আমরা কেবল ক্ষমতা বিবেচনা করি, রাজনীতি বিবর্জিত জোট, মহাজোট গড়ি। রাজনীতিতে নীতিহীনতার চাষ করি। এখানে তেল-গ্যাস কমিটি একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তাদেরও আন্তরিক অভিনন্দন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি অনুরোধ জানিয়ে আমি আমার এ লেখার ইতি টানতে চাই। এই ১৮ বছরে ছয় হাজার ৫৭০ বার সূর্য উঠেছে আর ডুবেছে। কিন্তু ডাকসুর নির্বাচন হয়নি। আমি শুনেছি ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদ কয়েকবার বসেছে। এখন তো আর ডাকসু নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মাহমুদুর রহমান মান্না: ডাকসুর সাবেক সভাপতি। রাজনীতিবিদ।

আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি -এম এন লারমা স্মরণ by মঙ্গল কুমার চাকমা ও রোবায়েত ফেরদৌস

সাবেক সাংসদ ও জুম্ম জনগণের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ২৬তম মৃতুবার্ষিকী আজ। সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর বিশ্বাসঘাতকতামূলক অতর্কিত হামলায় তিনি নৃশংসভাবে শাহদাত্বরণ করেন। এম এন লারমাকে হত্যা করা হলেও তাঁর শাশ্বত দর্শন ও বিপ্লবী চেতনাকে নিঃশেষ করা যায়নি। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, শহীদ এম এন লারমা জীবন্ত এম এন লারমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি দুর্বার। এম এন লারমার ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী পালনসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এ বছর মৃত্যুবার্ষিকীর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেছে ‘আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি।’
এম এন লারমার সংগ্রামের অন্যতম অংশ ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও দেশের অবহেলিত গণমানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতিগোষ্ঠীকে জাতীয় চেতনায় জাগরিত করে যেভাবে তিনি জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব সংরক্ষণের দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তা মুক্তিকামী মানুষের কাছে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তিনি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সংকীর্ণ পরিসরে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের পাশাপাশি দেশের শোষিত-বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিক-মাঝিমাল্লা-কামার-কুমার-জেলে-তাঁতিদের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ও প্রতিবাদী ছিলেন।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় তাঁর সেই স্বপ্ন বারবার উচ্চারণ করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল, দেশের সংবিধান জাতি-ধর্মনির্বিশেষে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সব ধরনের জাতিগত-শ্রেণীগত নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। তাঁর বুকভরা আশা ছিল, সংবিধানে জাতি-শ্রেণীনির্বিশেষে সবারই অধিকার সংরক্ষিত হবে এবং ঔপনিবেশিক অপশাসনের সব কালাকানুন ও দমন-পীড়নের চির অবসান হবে।
তিনি সাংসদ হিসেবে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে বরাবরই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও স্বায়ত্তশাসন আদায়ে ছিলেন সদা সোচ্চার। পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসন কাঠামো এবং জুম্ম জনগণের স্বতন্ত্র জাতীয় সত্তা ও বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে সংবিধানে সংবিধিব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য তিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কাছে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলে ধরেন। তিনি ১৬ সদস্যের এক জুম্ম প্রতিনিধিদল নিয়ে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও দেখা করেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৭২ সালের ২ নভেম্বর সংবিধান বিলে ‘৪৭ক’ নামের নতুন অনুচ্ছেদের সংযোজনী প্রস্তাব এনে স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেন। ওই সংযোজনী অনুচ্ছেদে তিনি প্রস্তাব করেন: ‘৪৭ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি উপজাতীয় স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হইবে।’ এর পক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি সেদিন গণপরিষদে ঐতিহাসিক যুক্তি তুলে ধরেন। সে সময় গণপরিষদে তিনি অ-আওয়ামী লীগ ও নির্দলীয় সদস্য হিসেবে কোনোরূপ ভয়ভীতিকে তোয়াক্কা না করে অকুতোভয়চিত্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র শাসনপদ্ধতির পক্ষে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক দাবি তুলে ধরেন।কিন্তু সেদিন তত্কালীন শাসকগোষ্ঠীর উগ্র জাতীয়তাবাদী দাম্ভিকতায় জুম্ম জনগণের সব ন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
কিন্তু দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ, সব জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত করা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি সময়ের দাবিতে বর্তমানে আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদ’-এ অঙ্গীকার করা হয়েছে:
‘১৮.১ ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা-বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মানমর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনী অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃজাতিগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। ১৮.২ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’
সরকারের ওই নির্বাচনী অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আদিবাসীদের ভূমি অধিকারসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি সময়ের দাবিতে আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ একটি বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। এ দেশে বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও প্রায় ৪৫টি আদিবাসী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি এসব জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি নেই। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংহতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিরিখে এসব জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি যারপরনাই জরুরি। আমাদের দাবি তাই স্পষ্ট: ক. সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতিসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক। খ. সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদের প্রারম্ভে ‘দেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী বা’ শব্দগুলো সন্নিবেশ করা হোক এবং এই অনুচ্ছেদের আওতায় সংবিধানে নতুন তফসিল সংযোজন করে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নামের তালিকা সন্নিবেশ করা হোক। গ. সংবিধানের ৪৭(১)(চ) অনুচ্ছেদের পর নিম্নলিখিত দফা (ছ) সংযোজন করা হোক—‘পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি আদিবাসী বিশেষ শাসিত অঞ্চল হইবে।’ ঘ. পার্বত্যাঞ্চলের তিনটি সংসদীয় আসনসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক। ঙ. আদিবাসী অধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
মঙ্গল কুমার চাকমা: তথ্য ও প্রচার সম্পাদক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
রোবায়েত ফেরদৌস: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সরকার কেন ঘড়ির কাঁটা আর পিছিয়ে নিচ্ছে না -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

ঘড়ির কাঁটা যখন এগিয়ে নেওয়া হয়, তখন আমাদের বলা হয়েছিল, অন্তত আমরা যা বুঝেছিলাম, শীতকালে আবার কাঁটা পিছিয়ে নেওয়া হবে। এখন শীত এসে যাচ্ছে, তবু ঘড়ির কাঁটা পেছাচ্ছে না। পৃথিবীর যেসব দেশে দিবালোক সাশ্রয় কর্মসূচি আছে, সেসব দেশে ঘড়ির কাঁটা বছরে একবার এগোনো হয়, আরেকবার পেছানোও হয়। আমাদের সরকার এগোনোর বেলায় এগোল, পেছানোর বেলায় পেছাচ্ছে না কেন?
এই বিষয়ে কৌতুক বলার চেষ্টা করব। এই রকম গুরুতর বিষয় নিয়ে কৌতুক আমার পাঠকেরা পছন্দ করবেন না আমি জানি। বিশেষ করে যে স্কুলছাত্রের মাকে ফজরের আজানের সময় ঘুমন্ত বাচ্চা কোলে নিয়ে স্কুলের পথে নামতে হচ্ছে, তাঁদের জন্যে এই সব রসিকতা রীতিমতো গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠবে। একজনের জন্যে যা রসিকতা, আরেকজনের জন্যে তা জীবনমরণ সমস্যা!
কৌতুক নম্বর এক। একটা বনে আগুন লেগেছে। দাবানল। পত্রিকার সম্পাদক তাঁর আলোকচিত্রীকে নির্দেশ দিলেন, এক্ষুনি এয়ারপোর্টে যাও। দেখবে, একটা বিমান অপেক্ষা করছে। সেটাতে উঠে পড়ো। বনের ওপর দিয়ে ওটা উড়াল দেবে। তুমি গিয়ে আকাশ থেকে দাবানলের ছবি তুলবে। আমরা এক্ষুনি সেই ছবিটা ছাপাখানায় পাঠিয়ে দেব।
আলোকচিত্রী ছুটলেন বিমানবন্দরের দিকে। সত্যি একটা বিমান অপেক্ষা করছে।
তিনি বিমানটাতে লাফ দিয়ে উঠলেন। পাইলটের পাশের সিটে বসলেন। বললেন, তাড়াতাড়ি। তাড়াতাড়ি। চলো। সময় নাই।
বিমানটা আকাশে উঠল।
নিচে দাবানলে জঙ্গল পুড়ে যাচ্ছে। মনে আগুন লাগলে কেউ দেখে না বটে, বনে আগুন লাগলে সবাই দেখে। পাইলট আর ফটোগ্রাফার আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ থেকে দেখছেন।
আলোকচিত্রী বললেন, প্লেনটা একটু নিচের দিকে নাও, যাতে আমি ভালো করে ছবি তুলতে পারি।
পাইলট বললেন, আমি তো প্লেন নামাতে পারি না। ওটা তো স্যার আমাদের এখনো শেখানো হয় নাই।
মানে?
মানে, আমি এই কয়টা ক্লাসে এখন পর্যন্ত প্লেন শুধু ওপরে তোলা শিখেছি, নামানো শিখিনি। আপনি বলে দেন, কীভাবে নিচে নামাব।
আমি শেখাব কী করে? আমি পাইলট নাকি! আমি তো ফটোগ্রাফার।
কী বলেন? আপনি বিমান-প্রশিক্ষক নন?
না, আমি ফটোগ্রাফার। আমি ছবি তুলি।
হায় হায়, আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ইন্সট্রাকটর। আমাকে অর্ডার করেছেন উড়তে। আমি উড়েছি।
এখন নামান।
আমি প্লেন নিচে নামানোটা শিখিনি।
এই সরকার রাত ১১টায় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নিয়ে ১২টা বানাতে জানে। কিন্তু ১২টার কাঁটা কীভাবে আবার ১১টায় আনতে হয়, সেটা জানে না।
এই সমস্যার সমাধান আমি দিতে পারি। সরকারের ঘড়ির কাঁটা যদি কেবল সামনের দিকেই ঘোরে, পেছনের দিকে ঘোরানোর অপশন যদি তার না থাকে, তাহলে সামনের দিকে ১১ ঘণ্টা এগিয়ে নিলেই চলবে।
আচ্ছা, সরকার ঘড়ির কাঁটা শীতকালে পেছানোর অঙ্গীকার থেকে সরে এল কেন?
আমরা সঠিক কারণ জানি না। ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বিদেশে ছিলেন। শোনা গেল, তাঁর অনুপস্থিতিতে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না ভেবে তাঁর প্রত্যাবর্তনের জন্যে অপেক্ষা করা হচ্ছে। তিনি এলেন। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত জানলাম, ঘড়ির কাঁটার আর নড়চড় হবে না।
এত দিন আমরা জানতাম, সময় ও স্রোত কারও জন্যে অপেক্ষা করে না। এখন আমরা শিখলাম, সময় প্রধানমন্ত্রীর জন্যে অপেক্ষা করে।
একবার কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান স্যার ডন ব্রাডম্যান ব্যাট করতে নামবেন। হাজার হাজার দর্শক সেই খেলা দেখতে এসেছেন। তিনি নেমেই শূন্য রানে বোল্ড আউট হয়ে গেলেন। তখন তিনি স্টাম্প আর উইকেট আবার সাজিয়ে বললেন, খেলা এখন থেকে শুরু হলো। আগেরটা খেলার অংশ না। হাজার হাজার দর্শক তোমার বোলিং দেখতে আসেনি, আমার ব্যাটিং দেখতে এসেছে।
অর্থাত্ বড় মানুষদের জন্যে নিয়ম পাল্টানো যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটা নিয়ম এই দেশে পাল্টে দিয়েছিলেন। আগে বয়স্কাউটরা হ্যান্ডশেক করত বাম হাতে। কারণ তাদের স্লোগান তারা ‘সদা প্রস্তুত’। ডান হাতে কখন কী কাজ করতে হয়, তাই বাম হাত এগিয়ে তারা করমর্দন করত। তো স্কাউটরা একবার গেছে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি করমর্দনের জন্যে ডান হাত এগিয়ে দিলেন। ছেলেরা বাম হাত এগিয়ে দিল। জিয়া বিব্রত। ছেলেরা জানাল, স্যার, এটা আমাদের নিয়ম। স্কাউটরা বাম হাতে করমর্দন করে থাকে। দুনিয়াজোড়া এই কেতাই মানা হচ্ছে। তিনি বললেন, দুনিয়ার নিয়ম এই দেশে চলবে না। আমরা ভদ্র জাতি, আমাদের বয়স্কাউটরা এখন থেকে ডান হাতে করমর্দন করবে। সেই থেকে এই দেশের বয়স্কাউটরা ডান হাতে করমর্দন করে।
আমরা জানি না, কার মর্জিতে শীতকালে ঘড়ির কাঁটা পেছানোর পূর্বঘোষিত অন্তত পূর্ব-অনুমিত ঘোষণা থেকে আমরা সরে আসছি। কেউ কি নেই, যিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে পারেন, এটা ঠিক হচ্ছে না। দেশের মানুষ এটা পছন্দ করছে না। (গ্রীষ্মকালে দিবালোক সাশ্রয় কর্মসূচিতে আমার সমর্থন আছে।)
এই বিষয়ে একটা রুশ কৌতুক বলব। একজন রুশ, একজন মার্কিনি আরেকজন ইংরেজ গল্প করছে নিজেদের দেশের চিকিত্সা কত উন্নত, তা নিয়ে। মার্কিনি বলল, আমরা মস্তিষ্কের অপারেশনে খুব উন্নতি করেছি, করোটি না খুলেই এখন ব্রেন অপারেশন হয় আমেরিকায়।
ইংরেজ বলল, আমরা হূদযন্ত্রের সার্জারিতে এত উন্নত হয়েছি যে, আমাদের আর চেস্ট ওপেন করতে হয় না।
আর রুশ বলল, আমরা দাঁতের চিকিত্সায় খুব উন্নতি করেছি। রোগীকে মুখ হাঁ করতে হয় না, দাঁতের অপারেশনের কাজ করা চলে।
মুখ হাঁ করতে কী অসুবিধা? মুখ খুলতে তো কাটাছেঁড়া করতে হবে না, রক্তপাত ঘটবে না। ইংরেজ ও আমেরিকান জিজ্ঞেস করল।
আমাদের দেশে মুখ খোলা নিষেধ কিনা! রুশ জবাব দিল।
বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকেরা সবাই কি মুখ বন্ধ রেখে শুধু মাথা নেড়ে ‘জি হ্যাঁঁ’ ‘জি হ্যাঁ’ করেন?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ইতিহাস, উপন্যাস ও হাফ-আখড়াই -সহজিয়া কড়চা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

মুখবন্ধ: বিপ্লবের নিচে বাঙালি নামতে পারে না। বিপ্লবের চেয়ে ছোট কিছুতে সে সন্তুষ্ট নয়। গণতন্ত্রী হোক আর কমিউনিস্ট হোক, সমাজবাদী হোক আর ইসলামবাদী হোক—সবাই বিপ্লববাদী। ফরাসি দেশে বিপ্লব হয়েছিল মাত্র একবার, রুশ দেশে বিপ্লব হয়েছিল স্রেফ একটি, চীনে বিপ্লব হয়েছিল কোনো রকমে একখানা। ভিয়েতনামিরা বিপ্লবের কথা মুখ দিয়েও আনে না। ভারতে কোনো বিপ্লব হয়নি। ব্রিটেনে বিপ্লবের প্রয়োজন হয়নি, জার্মানিতে হয়নি, জাপানে বিপ্লব শব্দটি বোধ হয় প্রচলিতই নয়, মালয়েশিয়ায় বিপ্লবের কোনো প্রয়োজনই নেই।
বাংলাদেশে প্রথম বিপ্লব কবে হয়েছিল তা কেউ জানে না, হঠাত্ একদিন শুনলাম ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ শুরু হচ্ছে। কিন্তু অনেকের দ্বিতীয় বিপ্লবেও মন ভরল না। মধ্য-আগস্টে তারা ঘটিয়ে দিল তৃতীয় বিপ্লব। সেটা আনফিনিশড্ বা অসমাপ্ত থাকতেই নভেম্বরের প্রথম হপ্তায় ঘটে গেল বিপ্লব তিনটি: একটি ৩ নভেম্বর আর একটি ৬ নভেম্বর এবং পরিপূর্ণটি ৭ নভেম্বর। অর্থাত্ ’৭১ থেকে ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বিপ্লব হলো সাকল্যে ২+৩=৫টি।
নভেম্বরের বিপ্লবগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। সুতরাং নভেম্বরের বিপ্লবত্রয় নিয়ে রোমাঞ্চকর ত্রিলজি রচিত হতেই পারে। ফি-বছর ইতিহাস পর্যালোচিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তা হচ্ছে না। বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, ইতিহাসের বিষয়বস্তু নিয়ে ইতিহাস লেখা হচ্ছে না—রচিত হচ্ছে উপন্যাস। ইতিহাসের বিষয়বস্তু নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাসও রচিত হতে পারে। কিন্তু যা হচ্ছে তা আসলে উপন্যাসও নয়, রচিত হচ্ছে আখড়াই বা হাফ-আখড়াই। উনিশ শতকে কলকাতা ও তার আশপাশে যেমন আসর বসত আখড়াইয়ের, নভেম্বর নিয়েও বাংলাদেশের কাগজগুলোয় বসেছে পাঁচালি ও আখড়াইয়ের আসর—শুধু রমণীঘটিত আদিরসাত্মক উপদানটুকু অনুপস্থিত। একদল ৩ তারিখের মহাবীর খালেদ বিন ওয়ালিদের পাঁচালি গাইছে, আর একদল ৭ তারিখের বীরকে চে গুয়েভারার সারিতে নিয়ে বসিয়ে দিচ্ছে। একশ্রেণীর কলাম লেখক বলছেন, ৭ তারিখ থেকে ‘প্রথম ও শেষ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; আর একদল উপসম্পাদকীয় রচনা লেখক অব্যাহত গাইছে: পনেরোই আগস্টের আগে ‘কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’।
আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের তিরিশ বছর পরপর অবমুক্ত করা দলিলপত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী রচনা লেখা হয়। বাংলাদেশও একটা স্টেট। এই স্টেটেরও রয়েছে নানা দলিলপত্র। সেগুলো অবমুক্ত করাই আছে। জোগাড় করে সেগুলোর বক্তব্য দিয়ে রচনা লেখা সম্ভব। আমেরিকার সঙ্গে আমার ভাব নেই বলে বাংলাদেশের কাগজপত্রের ওপরই আমি নির্ভর করতে চাই। পঁচাত্তর-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কিছু লিফলেট আমার রচনার মূল উপাদান। অর্থাত্ আমার কথা কম, লিফলেটের কথাই বেশি। আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এ জন্য যে লেখাটি হবে উদ্ধৃতিনির্ভর।
প্রথম পরিচ্ছেদ: পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ছয় দফা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে আগরতলা মামলার পর থেকে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তাঁর খুব ছোট অথচ শক্তিশালী প্রতিপক্ষও ছিল। সেই প্রতিপক্ষ ছিল ডানে এবং বাঁয়ে। ষোলোই ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের পতন হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের ওই প্রতিপক্ষগুলো থেকেই যায়। যখন সবাইকে নিয়ে একটি সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রে সংহত জাতি গঠনের কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না, তখন ওই বাম ও ডান শক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হতে থাকে। তারই পরিণতিতে বিনা বাধায় ঘটতে পারে পনেরোই আগস্টের মতো নির্মম ঘটনা। ১৯৭২-৭৫ সময়ের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলো বিশ্লেষণ করলেই তা বোঝা সহজ হবে। তখনকার রাজনৈতিক স্রোতের পরিচয় পাওয়ার উপায় সে সময়ের সংবাদপত্র ও প্রচারপত্র পর্যালোচনা করা। ওই সময়ের দৈনিক গণকণ্ঠ, জনপদ ও বঙ্গবার্তা-র নির্বাচিত লেখার একটি সংকলন আগামী বইমেলার সময় প্রকাশের সম্ভাবনা আছে। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রচারপত্র আরও নির্ভরযোগ্য। হাজার দেড়েক লিফলেটের সংগ্রহ আমার কাছে আছে, তার থেকে সামান্য কিছু উদ্ধৃতি দেওয়া যাবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হলেও জামায়াত, মুসলিম লীগ প্রভৃতি পাকিস্তানপন্থী ছাড়া ডান-বাম প্রায় সব দলই কমবেশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। স্বাধীনতার পর সরকার সেই দলগুলোকে মূল্যায়ন করেনি। দেশ গঠনে তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করেনি। ফলে স্বাধীনতার সপক্ষের ওই সব দলও সরকারের প্রতিপক্ষে পরিণত হয়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মো), ছাত্র ইউনিয়ন সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। তাদেরও অগ্রাহ্য করা হয়। ১৯৭২ সালের ২০ মে অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত’ শীর্ষক এক প্রচারপত্রে বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন লিখেছিল:
‘বাংলাদেশ পাকিস্তানী ঔপনিবেশিকদের শাসন ও শোষণের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে বটে, কিন্তু আজো আমাদের দেশে বৈদেশিক প্রভুত্ব, পররাজ্য লোভীদের বল্গাহীন উলঙ্গ শোষণ, সাম্রাজ্যবাদীদের কুটিল চক্রান্তের ফাঁদ, আমলাতন্ত্রের জুলুম ও নির্যাতন, লোভী-ব্যবসায়ী মজুতদার ও মুনাফাখোরদের শোষণ, চোরাচালান ও চোরাকারবারীদের সীমান্তের মধ্য দিয়ে সম্পত্তি পাচার, জোতদার মহাজনদের কৃষকের ওপর নির্দয় শোষণ, স্বাধীন মত প্রকাশে কণ্ঠরোধ, ফ্যাসিবাদের ভয়াল ভ্রূকুটি, শ্রমিকের কৃষকের রক্তপাত, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রাণনাশ, মা-বোনের অশ্রুজল, পিতার বক্ষে বিদীর্ণ হাহাকার, ক্ষুধাতুর শিশুদের দুমুঠো অন্নের আহাজারী, বেকারত্বের অভিশাপ, ...অনাগত জীবনের অনিশ্চয়তা আজো অব্যাহত রয়েছে। সমাজতন্ত্রের বুলি কপচিয়ে একশ্রেণীর রাজনীতিকরা জনগণকে ক্রমাগতভাবে ভাঁওতা দিয়ে যাচ্ছে। কৃষক শ্রমিক রাজ কায়েম হয়ে গেছে—এই আপ্তবাক্য উচ্চারণ করে কেউ আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, কিন্তু এতে জনগণের উদরপূর্তি হয় না।’
শেষ করা হয়েছিল কয়েকটি স্লোগান দিয়ে: ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘বাংলাদেশ-ভারতের সর্বহারা মানুষের ঐক্য জিন্দাবাদ’, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’, ‘জয় হোক জনতার’ প্রভৃতি। আজকাল প্রায়ই বলা হয় ‘জিন্দাবাদ’ শব্দটিকে একাত্তরে কবর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার পরেও বাম সংগঠনগুলোও ‘জিন্দাবাদ’ ব্যবহার করেছে।
স্বাধীনতার কয়েক মাস পরেই বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি দেবেন সিকদার ও সম্পাদক আবুল বাসার ‘ব্যর্থ অযোগ্য সরকারকে উত্খাত কর’ শীর্ষক এক প্রচারপত্রে সরকারের অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার দীর্ঘ তালিকা দিয়ে বলেন, ‘অযোগ্য, ব্যর্থ, পুতুল সরকারের কীর্তিকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে জনগণ তার অবসান চায়, এর পদত্যাগ দাবী করছে। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে আবেদন নিবেদনে এর ইতি হবে না, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার অবসান হবে না। একে উত্খাত করতে হবে আপোসহীন সংগ্রাম করে বিপ্লবের মাধ্যমে।
‘...শোষণহীন সমাজ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে ফাঁকা বুলি আওয়ামী লীগ দিচ্ছে, তা জনগণকে শোষণের নূতন জালে বাঁধা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
মেজর এম এ জলিল ‘সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর প্রতি আবেদনে’ বাহাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই বলেন: ‘লে. কর্নেল জিয়াউদ্দিনকে ও লে. কর্নেল তাহেরকে আর্মি থেকে বিনা বিচারে dismiss করা হয়েছে। অন্যায়, অবিচার ও দুর্নীতির একটা সীমা থাকে বঙ্গবন্ধু। হয়তো এইভাবে ধীরে ধীরে একদিন বাংলার গোটা সামরিক বাহিনী স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু কেন? এটা কি তা হলে তোমার ক্ষমতা লোভের প্রকাশ, না কোনো বন্ধু মহলের কু ইঙ্গিত। ...হক কথা, মুখপত্র, স্পোকম্যান ও বাংলার মুখকে তুমি বন্ধ করেছো। তুমি বাংলার মানুষকে ভালোভাবেই চেনো, পারবে কি তুমি সাড়ে সাত কোটি মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠকে রুদ্ধ করে আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার মতো একনায়কের শোষণ চালাতে। অসম্ভব। তোমার স্বপ্ন হয়তো আগামী দিনেই ভেঙে যাবে।’
এভাবেই তৈরি হচ্ছিল জনমত ও পনেরোই আগস্টের পটভূমি। সরকার সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন মনে করেনি। কঠিন ভাষায় নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে ২৪/১২/৭২ ‘সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লবী যুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে’ আসার আহ্বান জানায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। তাঁরা ‘দখলদারী সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের আজ্ঞাবহ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে উচ্ছেদ’ এবং ‘মুজিবের পুতুল সরকারকে উচ্ছেদ’ করার আহ্বান জানান। নির্বাচন বর্জনের ডাক আসে আরও অনেকগুলো কমিউনিস্ট গ্রুপ থেকে। ’৭৩-এ আ ফ ম মাহবুবুল হক (সভাপতি) ও মাহমুদুর রহমান মান্নার (সাধারণ সম্পাদক) ছাত্রলীগের প্রচারপত্রগুলোর ভাষাও বিপ্লবাত্মক ও সরকার উত্খাতের অঙ্গীকারে পরিপূর্ণ।
১৯৭৪ সালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সরকারবিরোধী তত্পরতা খুবই বলিষ্ঠ ছিল। ২৬ এপ্রিল দেশব্যাপী গণবিক্ষোভ দিবসের আগে এক প্রচারপত্রে বলা হয়: ‘ভারত-রুশ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আজ বিপন্ন। প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার পাট, চামড়া, চাউল, মাছ ও অন্যান্য আমদানিকৃত দ্রব্য পাচার হয়ে যাচ্ছে সীমান্তের ওপারে।’
জাসদের শক্তিকে সরকার খুব ছোট করে দেখে বিরাট ভুল করে। বামপন্থীদের দিক থেকে যখন সরকার ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল, তখন নিষিদ্ধঘোষিত ইসলামি দলগুলোও বসে ছিল না। জামায়াত গোপনে ছাত্রসমাজের মধ্যে কাজ করছিল। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ একদলীয় শাসনের মধ্যে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে সিরাতুন্নবী উপলক্ষে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আয়োজক ‘বাংলাদেশ ছাত্র ইসলামী মিশন’। মিশনের সভাপতি মুহম্মদ আবু তাহের এক প্রচারপত্রে প্রশ্ন রাখেন, ‘আমাদের (মুসলমানদের) এ দুরবস্থা কেন?’ জবাবে তিনি বলেন: “আমাদের সামনে এ জিজ্ঞাসার জবাব নিয়ে হাজির হয়েছে ‘বাংলাদেশ ছাত্র ইসলামী মিশন’।...আল্লাহর দেওয়া নীতিমালা থেকে বিচ্যুতির কারণেই যে আমাদের সার্বিক অধঃপতন ঘটেছে—এ কথা উপলব্ধির সময় এসেছে।” তখন নাকি বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। ওই সেমিনারে বক্তা ছিলেন ‘মোফাচ্ছেরে কোরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং বিচারপতি কে এম বাকের।’ বাংলাদেশে পাকিস্তানি ইসলামি রাজনীতির শুরু ১২ মার্চ ১৯৭৫ থেকে।
২৬ মার্চ ’৭৫ বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভা করেন। জনসভা উপলক্ষে দল থেকে নয় তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে বহু প্রচারপত্র প্রকাশ করে। মন্ত্রণালয় থেকে এক সার্কুলার জারি করে এই নির্দেশ দিয়ে যে ওই দিন ‘ঢাকার এক শ মাইলের মধ্যে’ কেউ কোনো জনসভা করতে পারবে না। ওই বিজ্ঞপ্তিটি ছিল অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক। সেটা বঙ্গবন্ধুর জ্ঞাতসারে হয়েছিল কি না বলা যায় না। অতি উত্সাহীদের কাজও হতে পারে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: সাড়ে তিন বছর ধরে গণতান্ত্রিক পথে না গিয়ে বল প্রয়োগ করে সরকার উত্খাতের যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত এবং চেষ্টা হয়েছে তার সামান্য নমুনা দেওয়া হলো। সুতরাং ’৭৫-পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে যে তেমন কোনো প্রতিবাদ হলো না বরং প্রকাশ্য ও নীরব সমর্থন পাওয়া গেল প্রচুর, তা অস্বাভাবিক নয়। নভেম্বরের প্রথম হপ্তায় ঘন ঘন বিপ্লব সংঘটিত হওয়ায় মানুষ স্থিতিশীলতা চাইছিল। জিয়া সেটা দিতে পেরেছিলেন। আমেরিকাসহ বহির্বিশ্বের পূর্ণ সমর্থন তিনি পান। দেশের মধ্যে মাঠপর্যায়ে থেকে সচিব পর্যায়ের আমলা পর্যন্ত, ব্যবসায়ী-পেশাজীবী থেকে বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত সবাইকেই তিনি মোটামুটি কাছে পান।
মিলিটারি ডিকটেটর জিয়াউর রহমান ইতিহাসের কাছে বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলেন এইটুকু যে তিনি নিজে ক্যু করেননি। বন্দী অবস্থায় ক্যু করা যায় না। একটি সিপাহি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের সমর্থন নিয়ে তিনি ক্ষমতা পান। তিনি গণতান্ত্রিক নেতা খালেদা জিয়ার মতো ছিলেন না। সবার সঙ্গেই একটি সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও জাসদের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীকে জেলে ঢোকালেও আওয়ামী বুদ্ধিজীবীদের তিনি পুরস্কৃত করেছেন। বেগম জিয়া যেমন বিএনপি-ইসলামপন্থী ছাড়া আর কাউকে টেলিভিশন, রেডিও, বাংলা একাডেমীর ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেননি তাঁর দশ বছরে, জিয়া তা করেননি। আল কুদ্স কমিটির তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য, কয়েকদিন বাদ দিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় যেতেন। আমেরিকার পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি জায়গা করে নিয়েছিলেন।
কিছুদিন যাবত্ লক্ষ করছি জিয়াকে নিন্দা করতে গিয়ে প্রবল রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী কেউ কেউ বলতে চাইছেন, ৩ থেকে ৬ নভেম্বরের উত্তম বীরেরা যদি কোনো রকমে সরকার গঠন করতে পারতেন, তা হলে বাংলাদেশ যে সোনার বাংলা হতো তাই নয়, তা হতো সোনায় সোহাগা। সব ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে, দানাপানি তো দূরের কথা, চা খাওয়ার অবসরও পাওয়া যায়নি পাঁচ দিন। ৩ থেকে ৬-এর দুর্বল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকগুলো দেশের যে সর্বনাশটা করেছেন তা হলো: ভারতবিরোধী চেতনাকে একটি স্থায়ী রূপ দিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার পর থেকেই সে চেতনা কিছুটা ছিল, কিন্তু ৫-৬ নভেম্বরের ঘটনায় তা দৃঢ়মূল হয়। এখনো জামায়াত-বিএনপি তাই পুঁজি করে রাজনীতি করছে। সেই সাংঘাতিক ভারতবিরোধী জোয়ারের মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন যে ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, তা তুলনাহীন।
সেই সংকটময় সপ্তাহে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষিয়ে তুলতে পশ্চিমী প্রচারমাধ্যম জঘন্য ভূমিকা পালন করে। ৮ নভেম্বর রয়টার এক ডেসপাচে জানায়, ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধ আসন্ন। সে যুদ্ধও বন্দুক আর টোটা-গুলতির যুদ্ধ না। তাদের ভাষায়, তা হবে thermo-nuclear বা হাইড্রোজেন বোমার যুদ্ধ। ভারতের হাতে কি তখন হাইড্রোজেন বোমা ছিল? আর থাকলেও কি তারা তা বাংলাদেশের মানুষের মাথায় ফেলত? ওই খবরের প্রতিক্রিয়া যা হয়েছিল তা হলো, দোকানের বস্তা বস্তা চাল বিক্রি হয়ে গেল। যুদ্ধ কত দিন চলে! আর একটি বিষয় হলো, ৩ নভেম্বরের বীরেরা লম্ফ না দিলে জিয়া কোনোদিন রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন না।
১৯ নভেম্বর ’৭৫ জাসদ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও বিপ্লবী গণবাহিনী এক ইশতেহারে বলে: ‘ভারত, রাশিয়া ও আমেরিকার চর ও দালালরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে খর্ব করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।...ভারতীয় আধিপত্যবাদ, রাশিয়ার সংশোধনবাদ এবং আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবমুক্ত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করেই জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা সম্ভব।’
জিয়ার বিরুদ্ধে যখন একদল মাথা চাড়া দিচ্ছে সুতরাং তারও বন্ধু দরকার। পরের সপ্তাহে ২৬ নভেম্বর ইউনাইটেড পিপলস পার্টির সভাপতি ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর আহমদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল আকবর হোসেন ও যুগ্ম সম্পাদক রাশেদ খান মেনন রাষ্ট্রপতি সায়েমের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এক দীর্ঘ স্মারকলিপিতে তাঁরা বলেন: ‘গত ৭ই নভেম্বর দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর বীর সিপাহী ও জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রশ্নে দেশবাসীর দৃঢ় সংকল্পের কথা পুনরায় ব্যক্ত হয়েছে।...স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য দেশপ্রেমিক জনতা ও সশস্ত্রবাহিনীর এই ঐক্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।...১৫ আগস্টের পর যে বিপদসমূহ জনগণের সামনে এসে দাঁড়ায় তা হলো (১) ১৫ই আগস্টের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রুশ-ভারত শক্তির তত্পরতা ও দেশের অভ্যন্তরে তাদের ভাড়াটিয়া অনুচরদের সাবোটাজ, ষড়যন্ত্র ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা, ..।’
অসংখ্য দল, সংগঠন ও ব্যক্তি জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে জিয়া সাহস পান তাঁর প্রতিপক্ষকে নির্মূল বা নির্জীব করতে। ২৮ জুন ’৭৬ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ‘দেশবাসী, সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ বাহিনীর অফিসার ও সিপাহীদের নিকট কর্নেল তাহেরের আবেদন’-এ বলা হয়: “১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ভারতের ইঙ্গিতে একটি নীরব ‘ক্যু’ (সামরিক অভ্যুত্থান) ঘটিয়ে দেশকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেবার এক জঘন্য চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। সেদিন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর পবিত্র দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পদত্যাগ করে অসহায়ের মত হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। ...গোটা জাতির জন্য সে দিনগুলো ছিল চরম হতাশা ও আতঙ্কের দিন। ঠিক সে সময়ে বাংলাদেশের বীর বিপ্লবী সিপাহীরা এগিয়ে এসেছিল বুকে সাহস, হূদয়ে ঈমান আর দেশমাতাকে বাঁচাবার এক অগ্নিশপথ নিয়ে।’
উপসংহার: পুরোনো কাসুন্দি ঠিকমতো ঘোটা দিলে ভালো, বেঠিক ঘোটা দিলে তা বিপজ্জনক বিষে পরিণত হয়। মহাজোটের অসাম্প্রদায়িক নির্বাচিত সরকার এখন ক্ষমতায়। সবারই উচিত, এখন এমন নীতি ও পথ অনুসরণ করা, যাতে গণতন্ত্র সুসংহত হয়। এবং এমন কিছু না করা, যাতে প্রতিহিংসার বসে নতুন ষড়যন্ত্র দানা বাঁধে। দলমত-নির্বিশেষে আমাদের সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত, আর যেন কোনো সামরিক জান্তা অথবা সেনা-সমর্থিত দৈব সরকার জাতির কাঁধে চেপে না বসে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সময়মতো উদ্যোগ ধর্মঘট এড়াতে পারত -ভোগান্তির নৌপরিবহন ধর্মঘটের অবসান

যেকোনো পরিবহন ধর্মঘট নাগরিক জীবনে চরম ভোগান্তি ডেকে আনে। সোমবার নৌপরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের আগে হাজারো যাত্রী দুই দিন ধরে অবর্ণনীয় সমস্যার মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের একাংশের ডাকে রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের প্রথম দিন সারা দেশের নৌযোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামা ও কর্ণফুলীর ১৬টি বেসরকারি ঘাটে পণ্য খালাস বন্ধ থাকে। অনেকে লঞ্চঘাটে এসে গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়ে।
নৌযান শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা, নৌপথে ডাকাতি বন্ধসহ নৌ-নিরাপত্তা বাড়ানো, মাস্টার-চালকদের সনদের মেয়াদীকরণ, মেরিন আইনের সঠিক বাস্তবায়নসহ ২২ দফা দাবিতে এ ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব দাবি আদায়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন। কিন্তু এত দিনেও তাঁদের দাবিগুলোর বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় তাঁরা ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি দিয়েছিলেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের এসব দাবি যৌক্তিক কি না তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দেশবাসীকে ধর্মঘটের দুর্ভোগই নিতে হলো।
শ্রমিক-কর্মচারীরা বলছেন, দাবি মেনে নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েক দিন আগে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। আমাদের প্রশ্ন, এই সময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন। ধর্মঘট ডাকার পর দুই দিন ধরে যে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ দেখা গেছে, সেটা যদি আগে নেওয়া হতো তাহলে হয়তো শ্রমিকদের এ ধর্মঘট ডাকার প্রয়োজন পড়ত না; কর্তৃপক্ষ, নৌযানের মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারী মিলে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতো এবং যাত্রীদেরও এ দুর্ভোগে পড়তে হতো না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমরা আরও তত্পর দেখতে চাই।
জনসাধারণের ভোগান্তি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে এ ধরনের ধর্মঘট যেন ভবিষ্যতে এড়ানো যায়, সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

জাতীয় নিরাপত্তা ও বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন না হয় -বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি

বাংলাদেশে তত্পর বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের নিবিড় সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে, এমন খবর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই প্রকাশিত হয়। প্রথম আলোর নিজস্ব অনুসন্ধানেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে: বাংলাদেশের জঙ্গিদের অনেকেই আফগানিস্তানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, অনেক জঙ্গি সংগঠনের অর্থের জোগান আসে বিদেশ থেকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও বিপজ্জনক তথ্য হচ্ছে, বিদেশি জঙ্গিরাও এ দেশে অবস্থান করে স্থানীয় জঙ্গিদের জিহাদি শিক্ষা ও অস্ত্রচালনা এবং শারীরিক প্রশিক্ষণ দেয়, নাশকতামূলক তত্পরতার ষড়যন্ত্র করে। সম্প্রতি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়া এবং সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি আটকের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য থেকে এ দেশে বিদেশি জঙ্গিদের অবস্থান ও তত্পরতার আরও একটি প্রমাণ মিলল।
এর আগে গত মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাফিয়া নেতা দাউদ ইব্রাহিমের দুবাইভিত্তিক অপরাধচক্রের দুই সদস্য দাউদ মার্চেন্ট ও জাহিদ শেখ, যাঁদের সঙ্গে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের যোগাযোগ ধরা পড়ে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ প্রায় দেড় মাস অনুসন্ধান চালিয়ে জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় দুর্ধর্ষ ভারতীয় জঙ্গি ওবায়দুল্লাহকে। তিনি ভারতীয় নাগরিক। আফগানিস্তানে গিয়ে ভারী মেশিনগান, বিমানবিধ্বংসী কামান, রকেট লঞ্চার, মর্টারশেল নিক্ষেপসহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের মাদারীপুরের শিবচরে একটি মাদ্রাসায় ‘জিহাদি ভাই’ গড়ে তোলার কাজে লিপ্ত ছিলেন কয়েক বছর ধরে। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা ও ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। একই সংগঠনের আরেক জঙ্গি মনসুর আলী ওরফে হাবিবুল্লাহও জুলাই মাসেই ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। এমদাদুল্লাহ নামে আরেক ভারতীয় জঙ্গি ঢাকায় গ্রেপ্তার হন সেপ্টেম্বরের শেষে।
বাংলাদেশে বিদেশি জঙ্গিদের তত্পরতার বিষয়টির দুটি তাত্পর্য আছে, যা অনুধাবন করা আমাদের জন্য খুব জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত উপাদানগুলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর অবস্থান নিয়ে তত্পর হলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখোমুখি হতে পারে, জনজীবনের স্বাভাবিক শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে, জনমনে সৃষ্টি হতে পারে নিরাপত্তার অভাববোধ; মুক্তভাবে চলাফেরা ও জীবন-জীবিকা আহরণের জন্য যে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ নিরুদ্বেগ পরিবেশ অপরিহার্য, তা ক্ষুণ্ন হতে পারে। এসব বিবেচনায় এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী তত্পরতা চলছে—এমন নেতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ইতিমধ্যে ছড়িয়েছে বহির্বিশ্বে। এর সঙ্গে যদি এটা যুক্ত হয় যে শুধু স্থানীয় জঙ্গিরাই এখানে তত্পর নয়, বিভিন্ন দেশের জঙ্গিরাও এ দেশে আশ্রয় নিতে এবং তত্পরতা চালাতে পারছে—তাহলে আমাদের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ: ব্যবসা-বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশে মর্যাদা—সবকিছুর ওপরই দেশের ভাবমূর্তির প্রভাব পড়ে। আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো ভাবমূর্তি বাংলাদেশের প্রাপ্য নয়, প্রত্যাশিতও নয়।
যদিও জঙ্গিবাদ দমনের ব্যাপারে সরকারের তত্পরতা লক্ষণীয়, তবু পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হওয়া যায় না। কারণ, জঙ্গিবাদী তত্পরতায় লিপ্ত সংগঠন ও তাদের সদস্যদের ব্যাপকতার যে আভাস গোয়েন্দা সূত্রেই পাওয়া যায়, গ্রেপ্তারের সংখ্যা সে তুলনায় বেশ কম। এ ছাড়া, গোয়েন্দা-পুলিশের জানার বাইরেও তো গোপন জঙ্গি আস্তানা থেকে থাকতে পারে। জঙ্গি দমন তত্পরতা তাই আরও ব্যাপক ও কঠোর উদ্যোগ দাবি করে।

জঙ্গিরা এ দেশে কী চায় by আব্দুল কাইয়ুম

বিশ্বের কোনো দেশেই ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি, আল-কায়েদা বা তালেবানপন্থীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই। আফগানিস্তানে ছিল, এখন ক্ষমতাচ্যুত। চেষ্টা করছে আবার ক্ষমতা ফিরে পেতে। শুধু কি আফগানিস্তানেই তারা সীমিত? ক্ষমতাচ্যুত হিংস্র তালেবানরা একটা রাষ্ট্র দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাহলে তারা কি বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখছে? তারা হয়তো ভাবছে, এখানে গণতন্ত্র দুর্বল, তাই এখানেই সুযোগ। ব্যাপারটা গুরুতর। যাঁরা গণতন্ত্রের পতাকা বহন করছেন, তাঁদের ভেবে দেখতে হবে।
সম্প্রতি সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি যুবক ধরা পড়ায় প্রশ্নটি সত্যিই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, তবে কি আফগানিস্তানের পর এবার বাংলাদেশ? আটকদের মধ্যে দুজন নাকি পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য। তাঁদের যোগাযোগে দুই বিদেশি জঙ্গি নাকি কয়েক দিন আগে বারিধারায় আমেরিকান দূতাবাস এলাকা রেকি (হামলা চালানোর আগে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ) করে গেছেন। সেখান থেকে মোবাইল ফোনে চট্টগ্রামে কথা বলেছেন। তারই সূত্র ধরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামে চোরাচালানের ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণসহ সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে উগ্র ধর্মীয় চরমপন্থীরা কতটা শক্তি রাখে, তাদের হাতে কি গণতন্ত্র বিপন্ন হতে পারে? এসব জঙ্গি তত্পরতা স্থিতিশীল রাজনীতির জন্য কতটা হুমকি তার একটা হিসাব করা দরকার। কারণ, গণতন্ত্র অতীতে অনেকবারই বিপন্ন হয়েছে। ধ্বংসের দোরগোড়ায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও তারপর ৩ নভেম্বর জেলহত্যা, ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহের নামে সামরিক কর্মকর্তা হত্যা, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব আমরা দেখেছি। আবার গণতন্ত্র উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটাও দেখেছি। এ অবস্থায় আমরা কি বলব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র এত চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে, এত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও এখন সত্যিই ভঙ্গুর দশায়? যদি তা-ই হতো, তাহলে তো অনেক আগেই বাংলাদেশের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা যখন হয়নি, তাহলে হয়তো আমরা সাহস করে বলতে পারি, আমাদের গণতন্ত্র অত সহজে ধ্বংস হওয়ার নয়। এত ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও টিকে থাকতে পারাটা আমাদের গণতন্ত্রের শক্তির দিক, যা ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আশাবাদী হওয়ার মতো একটি উপাদান।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আমেরিকা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট রাজনীতি-বিজ্ঞানী, সমাজ বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছুকাল ধরে তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। লেখালেখি করছেন। নিউইয়র্ক টাইমস (২৩ জানুয়ারি, ২০০৫) পত্রিকায় নিউইয়র্ক-ভিত্তিক লেখক এলিজা গ্লিজওয়াল্ড ‘দি নেক্সট ইসলামিস্ট রেভ্যুলুশন?’ (পরবর্তী ইসলামি বিপ্লব?) নামে একটি নিবন্ধে মূলত দেখান যে বাংলাদেশ যেন ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের পরিণতি বরণ করতে চলেছে। তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে বাংলাদেশ আল-কায়েদার মুঠোয় চলে যাওয়ার বাস্তব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সে সময় রাজশাহীর বাগমারায় বাংলা ভাই (সিদ্দিকুর রহমান) ও শায়েখ আবদুর রহমানের দল জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) যে সহিংস তত্পরতা চালাচ্ছিল, তারই পটভূমিতে গ্লিজওয়াল্ড ওই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
ভারতীয় বিশেষজ্ঞ হিরণ্ময় কারলেকারও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লেখেন, ‘বাংলাদেশ: দি নিউ আফগানিস্তান?’। সে সময় সারা দেশে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণে সবাই হতভম্ব। মনে হয়েছিল, আল-কায়েদা গোষ্ঠী বুঝি এসেই গেল। ওই পটভূমিতে বাংলাদেশের মানুষের উদার ধর্মীয় মনোভাবের (মডারেট মুসলিম) প্রতি আস্থাশীল হয়েও কারলেকার বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পরিণতি সম্পর্কে শঙ্কামুক্ত হতে পারেননি। সেই উদ্বেগের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বইয়ে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত। তিনিও লেখেন, ‘বাংলাদেশ: এ ফ্র্যাজাইল ডেমোক্রেসি’ (বাংলাদেশে ভঙ্গুর গণতন্ত্র)। একানব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই নেত্রীর মধ্যে ব্যক্তিত্বের সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি এবং তার পটভূমিতে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যদিকে ইসলামি চরমপন্থী শক্তির উদ্ভবের বিপদ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন।
এভাবে দেখা যায়, বিগত চার-পাঁচ বছরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু তার পর দেখা গেল পরিস্থিতি তত খারাপ না, যতটা অন্যরা বাইরে থেকে মনে করেছেন। বিশেষত, বাংলা ভাই ও শায়খ রহমানসহ জঙ্গি তত্পরতায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় এটা অন্তত বলা যায়, এখানে জঙ্গিদের চেয়ে গণতন্ত্রের শক্তি এখনো বেশি। আত্মতৃপ্তির জন্য নয়, পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা লাভের জন্যই এটা বলা দরকার।
কিন্তু এর পরও বলতে হয় যে বিশ্বের চোখে বাংলাদেশ এখনো ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে। ইংল্যান্ডের রয়েল কলেজ অব ডিফেন্স স্টাডিজের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ঢাকা সফরে এসেছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ড-আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের বেসামরিক ও কর্নেল-ব্রিগেডিয়ার পদবির উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। গত ৩ অক্টোবর তাঁদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের একটি সৌজন্য সাক্ষাত্ অনুষ্ঠানে আমি যাই। নানা কথার মধ্যে প্রতিনিধি দলের সদস্য একজন সেনাকর্মকর্তা জিজ্ঞেস করেন, বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমরা কতটা উদ্বিগ্ন? বলার অপেক্ষা রাখে না, বাইরে যে ধরনের আলোচনা রয়েছে, তার ভিত্তিতেই তিনি ওই প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সুষ্ঠু নির্বাচনের পর হয়তো এ প্রশ্নটি ওভাবে আসত না, যদি ২৬ ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় রক্তক্ষয়ী ঘটনা না ঘটত। এই হলো আমাদের গণতন্ত্রের সমস্যা। এখানে যেমন আছে সংসদ, তেমন আছে বর্জন। যেমন আছে ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করার গৌরব, তেমনি আবার আছে ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি সম্ভবত একটা ৫০: ৫০ হ্যাঁ-না মনোভাব নিয়ে গেছেন।
এটা ঠিক যে ২০০৬ সালের অক্টোবরে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পটভূমিতে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল, সেটা গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ রূপেই আবির্ভূত হয়। কারণ, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা হবে কি না সে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। সরাসরি সেনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা মূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিপদও পার হয়েছে বাংলাদেশ। এ সম্পর্কে এক-এগারোর তিন উদ্যোক্তার একজন লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর একটি সাক্ষাত্কার গত তিন অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়। এটি নেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনলাইন পত্রিকা এন ওয়াই এবং কানাডা থেকে প্রকাশিত নতুন দেশে প্রচারিত সাক্ষাত্কার থেকে। সেখানে তিনি বলেন, ‘মার্শাল ল জারি করে দেশ শাসনের ইচ্ছার সাথে আমি কখনো একমত ছিলাম না। তা ছাড়া দেশে তো আমরা সামরিক শাসন জারি করিনি।’ সাক্ষাত্কারে আরও অনেক চমকপ্রদ কথা ছিল, কিন্তু পরে জেনারেল মাসুদ সাক্ষাত্কারের কথা অস্বীকার করেছেন বলে একটি পত্রিকায় জানানো হয়। যা হোক, আমরা একটি ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি যে, ক্ষমতা দখলের কোনো বাস্তব উদ্যোগ তাঁদের ছিল না; বা থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় সেদিকে তাঁরা যাননি। আর সেটা যদি না হয়, তাহলে তো আমরা বলতে পারি, আমাদের গণতন্ত্র বেশ মজবুত, ভঙ্গুরের প্রশ্ন ওঠে না। আসলে গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয় নির্বাচনে। গত ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে যে ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে তাতে বোঝা যায়, আমাদের গণতন্ত্র ভাঙে তবু মচকায় না।
এখন সরকারি ও বিরোধী দলের কর্তব্য হবে, গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের সমর্থন আরও শক্তিশালী করা। মানুষের পাশে থাকা। তাহলে জঙ্গিবাদীরা দূরে সরে যেতে বাধ্য হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

বার্লিন দেয়ালের পতন -স্নায়ুযুদ্ধের অবসান -মিখাইল গর্বাচেভ

সোভিয়েত ইউনিয়নে পিরিস্ত্রোইকার ফলে বার্লিন দেয়ালের পতন ও ইউরোপের বিভক্তির অবসান ঘটে। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত ইউনিয়নে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রাশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নতুন সোভিয়েত কংগ্রেস গড়ার জন্য নির্বাচনে জনগণ বিপুল উদ্দীপনাসহকারে অংশ নেয়। কমিউনিস্ট পার্টির ৩৫ জন আঞ্চলিক সম্পাদক পরাজিত হন। অবশ্য সহযোগী হিসেবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ৮৪ শতাংশ ছিল কমিউনিস্ট। কারণ দলে তখন ছিল অনেক সাধারণ মানুষ।
নির্বাচনের পরদিন আমি পলিটব্যুরোর সঙ্গে বৈঠকে বসি। তাঁদের অভিনন্দন জানাই। তাঁরা খুব বিপর্যস্ত ছিলেন। কয়েকজন বললেন, ‘কিসের জন্য অভিনন্দন?’ আমি বলি, ‘এ নির্বাচনে পিরিস্ত্রোইকার জয় হয়েছে। আমরা জনগণের জীবনকে ছুঁতে পারছি। এখন তারা কঠিন সময় অতিক্রম করছে, তবুও তারা কমিউনিস্টদের ভোট দিয়েছে।’ এ নির্বাচনগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বোঝা যাচ্ছিল গণতন্ত্র, গ্লাসনস্ত, বহুত্ববাদের দিকে আমাদের আন্দোলন জারি আছে।
পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে সেই সময় একই ধরনের প্রক্রিয়া ছিল। ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসের যেদিন আমি সোভিয়েতের নেতৃত্ব গ্রহণ করি, সেদিন ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশের নেতাদের সঙ্গে আমার বিশেষ বৈঠক ছিল। আমি তাঁদের উদ্দেশে বললাম, ‘আপনারা স্বাধীন, আমরাও স্বাধীন। আপনাদের নীতিমালার দায় আপনাদের, আমাদের নীতিমালার দায় আমাদের। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনাদের কাজে আমরা হস্তক্ষেপ করব না।’ আমরা প্রতিশ্রুতি রেখেছিলাম। আমরা হস্তক্ষেপ করিনি, একবারের জন্যও নয়; এমনকি একসময় তাঁরা আমাদের হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানানোর পরও না। তাঁদের সমাজ পিরিস্ত্রোইকার প্রভাবে নিজে থেকেই ক্রিয়া করতে শুরু করে। সোভিয়েতের যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রয়োজনীয় ছিল, সেটি এই পিরিস্ত্রোইকা। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে আমার হস্তক্ষেপ না করার নীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একবার ভেবে দেখুন, শুধু পূর্ব জার্মানিতে ছিল তিন লাখ সোভিয়েত সেনা। তারা বিশেষভাবে বাছাই করা ও অস্ত্রসজ্জিত। তবুও সেখানে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হলো। অন্য দেশগুলোতেও পরিবর্তন ঘটতে লাগল।
কিন্তু বিভক্ত জার্মানির সমস্যা রয়েই গেল। এ অবস্থাকে জার্মান জনগণ স্বাভাবিক মনে করেনি। আমার কাছেও এটি স্বাভাবিক মনে হতো না। পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানিতে তখন নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তাদের মধ্যে সম্পর্কেও পরিবর্তন আসে। পূর্ব জার্মানির নেতা এরিক হনেকার এতটা একগুঁয়ে না হলে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারতেন। তাঁর একগুঁয়েমির জন্য আমাকে অনেক ভুগতে হয়েছে। কিন্তু তিনি পূর্ব জার্মানিতে নিজেদের পিরিস্ত্রোইকা শুরু করেননি। ফলে তাঁদের দেশে লড়াই ছড়িয়ে পড়ে।
জার্মানরা জাতি হিসেবে খুব দক্ষ। হিটলারের অধীনে এবং পরে তারা যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, তার পরও এক নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। হনেকার যদি তাঁর জনগণের সামর্থ্যের সুযোগ নিয়ে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করতেন, তাহলে পরিণতি অনেক অন্য রকম হতে পারত।
আমার সামনে আমি এসব ঘটেতে দেখেছি। ১৯৮৯ সলের ৭ অক্টোবর পূর্ব জার্মানিতে হনেকারের সঙ্গে আমি ও ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করছিলাম। কাছেই পূর্ব জার্মানির ২৮টি অঞ্চল থেকে আসা গ্রুপ মশাল ও স্লোগানসংবলিত ব্যানার হাতে মিছিল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। পোল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়েজেস্লাভ রাকভস্কি জানতে চান আমি জার্মান বুঝি কি না। আমি বলি, ‘ব্যানারে কী লেখা, সেটা বোঝার মতো জানি। পিরিস্ত্রোইকার কথা আছে তাতে। তারা গণতন্ত্র আর পরিবর্তনের কথা বলছে। তারা বলছে, গর্বাচেভ, আমাদের দেশে অবস্থান করুন!’ তখন রাকভস্কি বলেন, ‘এঁরা পূর্ব জার্মানির ২৮টি অঞ্চলের জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি হয়ে থাকলে, এর অর্থ হলো দিন ঘনিয়ে আসছে।’ আমারও তেমনটাই মনে হয়েছিল।
১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে সোভিয়েত নির্বাচনের পর বার্লিন দেয়ালের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
১৯৮৯ সালের জুন মাসে পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর হেলমুট কোহলের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের পর এক সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হয়, জার্মান প্রশ্নে আলোচনা হয়েছে কি না? আমার উত্তরটা ছিল, ‘ইতিহাস এটি তৈরি করেছে, আর ইতিহাসই তার সমাধান বাতলাবে।’
পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে আমি তাঁদের আবারও বলি, ‘এ বিষয়টি আপনাদের নিজস্ব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বও আপনাদের।’ আমি তাঁদের সতর্ক করি, ‘ইতিহাসের শিক্ষা কী? কাজে যে দেরি করে সে ঠকে।’ তারা যদি সংস্কারের, পরিবর্তনের পথে হাঁটত, জার্মানির দুই অংশের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা বা চুক্তি থাকত, তবে ধীরে ধীরে জার্মানির একত্রীকরণ ঘটানো যেত। কিন্তু ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশের জার্মানরা তখনই একত্রীকরণের কথা জোরেশোরে বলতে শুরু করে। তাদের ভয় ছিল এ সুযোগ যদি আর না আসে।
১৯৮৫-৮৮ সময়কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও আমি যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর ও আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে সফল না হতাম, তবে পরের এই অগ্রগতিগুলো অচিন্ত্যনীয় হতো। এগুলোও সম্ভব হতো না, যদি না সোভিয়েত ইউনিয়নে আমরা আগেই পিরিস্ত্রোইকা শুরু করতাম। পিরিস্ত্রোইকা না হলে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটতই না। এরপর কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি পুরোদস্তুর জারি থাকার কারণে দুনিয়া বেশি দূর এগোতে পারেনি।
অনেকে জানতে চায়, কেন আমি পিরিস্ত্রোইকা শুরু করেছিলাম। কারণগুলো কি প্রধানত অভ্যন্তরীণ, না বৈদেশিক? অভ্যন্তরীণ কারণ অবশ্যই প্রধান ছিল, কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কা এত গুরুতর ছিল যে এটির তাত্পর্যও কম ছিল না। নিজেদের ধ্বংস করে ফেলার আগে কিছু একটা করতে হবে তো। এ কারণেই আমি ও রিগ্যান যেসব বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছিলাম, সেগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ। রিগ্যানের উত্তরসূরি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছিলেন। এটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে মাল্টায় আমরা ঘোষণা করি, আমরা আর পরস্পরের শত্রু বা বৈরী নই। এর মধ্য দিয়েই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। এ বিষয়ে ইতিহাসবিদেরা একমত নাও হতে পারেন। তাঁরা তাঁদের মতো ভাবুন। কিন্তু যে ঘটনাগুলো আমি এখানে বললাম, এগুলো না ঘটলে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটত না।
রিগ্যান আর আমি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছাই। মতাদর্শিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে কিছু বিষয় থাকে। ১৯৮৫ সালে জেনেভায় আমরা যৌথভাবে ঘোষণা করি, ‘পারমাণবিক যুদ্ধ অগ্রহণযোগ্য, এতে কেউ জয়ী হতে পারে না।’ ১৯৮৬ সালে রিকিয়াভিকে পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করা উচিত এ বিষয়ে আমরা মতৈক্যে পৌঁছি। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে, এমন ভাবনা উভয় পক্ষেই তখন জোরদার হচ্ছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়েই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছে, এ দাবি ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সাংবাদিক, রাজনীতিক ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, স্নায়ুযুদ্ধে আমেরিকা জয়লাভ করেছে; এটি ঠিক নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে নতুন নেতৃত্বে না এলে এবং নতুন বৈদেশিক নীতি গ্রহণ না করলে এসবের কিছুই ঘটত না। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান কোনো একক ঘটনা নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া। বুশ ও আমি মাল্টায় বৈরিতা অবসানের ঘোষণা দিয়েছি, কিন্তু রিগ্যানের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে রিগ্যানের মনোভাবের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছিল। অতএব, আমরা সবাই বিজয়ী। আমরা সবাই স্নায়ুযুদ্ধে জয়লাভ করেছিলাম। স্নায়ুযুদ্ধের জন্য উভয় পক্ষের প্রতিবছর ১০ ট্রিলিয়ন ডলার করে ব্যয় করা তো আমরা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নেশন পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাত্কার থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: আহসান হাবীব
মিখাইল গর্বাচেভ: সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট।

নারী আসনের সীমানা

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের ৪৫ নারী সাংসদের সংসদের আসা-যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজকর্ম নেই। সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও এলাকার জন্য কিংবা জনগণের জন্য কিছু করতে পারছেন না। এক অর্থে তাঁরা সংসদীয় উদ্বাস্তু। একমাত্র কাজ হলো সংসদে এসে কোরাম পূর্ণ করা। এটিই যেন সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদের একমাত্র রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমানা নির্ধারণ না হওয়ায় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংরক্ষিত মহিলা সাংসদেরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এ জন্য সারা দেশের নির্বাচনী এলাকাকে ৪৫ বা ৫০টি ভাগে ভাগ করে তাঁদের এলাকা নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু দীর্ঘদিন আটকে আছে সংরক্ষিত আসনের সীমানা নির্ধারণ বিষয়টি। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংসদ থেকেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বহাল ছিল। ১৯৭২ সালে সংবিধানে ১০ বছরের এ বিধান রাখা ছিল। পরবর্তী সময়ে নানা পরিবর্তনের ফলে এখন সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫টিতে। সংরক্ষিত নারী আসনকে মর্যাদাপূর্ণ করতে ভবিষ্যত্ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার অধিকার ও তাঁদের জন্য সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আসকার ইবনে সাঈদ
ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা -অনিয়ম ও দুর্নীতি যেন জেঁকে না বসে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ স্থানীয় সাংসদ ও জনপ্রতিনিধিনির্ভর নাকি প্রশাসনিক কর্মকর্তানির্ভর হবে, তা নিয়ে বিতর্কও চলেছে। এসবের মূলে ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগে যে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়, তা দূর করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সব মহলে সমাদৃত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে আসার ব্যবস্থা এখনো করা যায়নি। ফলে পরিচালনা পর্ষদের ওপর প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়।
গতকাল প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বরিশাল শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হয়েছে দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিকে এবং বরিশালের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদে ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সভাপতি হিসেবে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো ফৌজদারি অপরাধের কারণে দণ্ডিত কেউ পর্ষদের সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু অর্থ আত্মসাত্ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একটি পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করা হলো। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর নিয়ম না মেনে বরিশালের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদ করা অত্যন্ত দুঃখজনক।
অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে দলীয় নেতা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে এসব পর্ষদ গঠন কার্যত অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের সুযোগ করে দেয়। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি, প্রতিষ্ঠানের জন্য কেনাকাটা—অনেক ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দলীয়করণ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুযোগ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি যেন কোনোভাবেই জেঁকে বসতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় সাংসদের সুপারিশে এখন এসব পর্ষদ গঠিত হচ্ছে। তাই তাদের আরও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, বিদ্যানুরাগী তথা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের জড়িয়ে এ ধরনের পর্ষদ করার কথা ভাবতে হবে।