Monday, February 4, 2019

সুন্দরবনে হরিণ শিকারি চক্র বেপরোয়া

শীত মৌসুমে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংঘবদ্ধ হরিণ শিকারি চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেও চোরাশিকারিরা কৌশলে নাইলনের ফাঁদ, জাল, স্প্রিং বসানো ফাঁদ, বিষটোপ, গুলি ছুড়ে, কলার মধ্যে বর্শি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা ফাঁদসহ পাতার ওপর চেতনানাশক ওষুধ দিয়ে হরিণ শিকার করছে। আর এর গোশ্‌ত খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা, বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ , মংলা, সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরসহ দেশের ভিন্ন স্থানে চড়া দামে বিক্রি করছে। সর্বশেষ গত ৩০ জানুয়ারি গভীর রাতে চড়াপুটিয়া থেকে ৩৫ কেজি ওজনের একটি জবাইকৃত হরিণ ও ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে গত এক মাসে ১২২ কেজি গোশ্‌ত, জবাইকৃত হরিণের চামড়া, মাথা ও ফাঁদ উদ্ধার হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত দু’সপ্তাহের ব্যবধানে বনবিভাগ ও কোস্টগার্ড পৃথক চারটি অভিযান চালিয়ে জবাইকৃত হরিণ, ৬৩ কেজি গোশ্‌ত, মাথা, চামড়াসহ শিকারিদের ব্যবহৃত হরিণ শিকারের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করে। এর আগে গত ২১ থেকে ২৩শে নভেম্বর রাসমেলা চলাকালে বনবিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে হরিণের গোশ্‌ত, ফাঁদ, সরঞ্জাম ও নৌকাসহ ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের বন আইনে মামলাও দেয়া হয়। এ সময় হরিণের মাথা ও চামড়াসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে বনবিভাগ।
এ ছাড়া ২২ জনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।
চড়াপুটিয়ার অফিস ইনচার্জ মো. ইসমাইল হোসেন জানান, ৩০শে জানুয়ারি রাতে মরাপশুরের কাগাখালে ভারানী দিয়ে টহলরত অবস্থায় একটি নৌকা, তার একটু উপরে ৩৫ কেজি ওজনের একটি জবাইকৃত হরিণ ও ২০০ হাত ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। এ সময় নৌকায় থাকা চাদপাই স্টেশন থেকে ১৫ই জানুয়ারি নেয়া একটি মাছের পাসসহ মংলার দক্ষিণ চাঁদপাই ইউনিয়নের হাকিম হাওলাদারের ছেলে একলাস (৩৫), ইলিয়াস (৩২) ও ইয়াসীন হাওলাদার (২৯)কে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা। এছাড়া গত ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সুন্দরবন থেকে আট কেজি হরিণের গোশ্‌তসহ একটি চামড়া ও একটি মাথা উদ্ধার করে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন।
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট আবদুুল্লাহ আল-মাহমুদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার রাতে অভিযান চালিয়ে হরিণের মাথা, গোশ্‌ত ও চামড়া উদ্ধার করা হয়। তবে পাচারকারিরা পালিয়ে যায়। এর আগে ১৭ই জানুয়ারি পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের তেরকাটি খাল এলাকা থেকে এলাকা থেকে ২৫ কেজি হরিণের গোশ্‌ত জব্দ করে বন বিভাগ। এ ছাড়া ৭ জানুয়ারি বনবিভাগ মংলার পশুর নদীর চিলাবাজার সংলগ্ন কানাইনগর এলাকা থেকে একটি ডিঙ্গি নৌকাসহ ৩০ কেজি হরিণের গোশ্‌ত উদ্ধার করে। অবশ্য এসব ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি বন বিভাগ।
এদিকে রাসমেলা ও পরবর্তী সময়ে বিপুল সংখ্যক হরিণ শিকারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন। ‘সেভ দ্য সুন্দরবনের চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগ ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় এবার রাস মেলায় অনেক বেশি হরিণ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। বন বিভাগ ও প্রশাসনকে হরিণ শিকার রোধে আরো বেশি কঠোর হতে হবে। বন আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বনসংলগ্ন লোকালয়গুলোতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারেরও আহ্বান জানান তিনি।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা ও লোকবল সংকটের মধ্যেও হরিণ শিকারিদের অপতৎপরতা রোধ করতে বনবিভাগ সব সময় তৎপর। বনরক্ষীদের পাশাপাশি আমাদের স্মার্ট পেট্রোল দল সব সময় কাজ করছে। যাদের আমরা আটক করে আদালতে প্রেরণ করি তারা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা গেলে এই জাতীয় অপরাধ সংঘটনের হার বহুলাংশে হ্রাস পাবে। এছাড়া আমরা বিভিন্ন ভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়গুলোতে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করছি।

মদ পান করে দিশাহারা এক চিকিৎসক

ভাবুন তো একজন ডাক্তারের হাতে মদের বোতল। তা থেকে মদ পান করে তিনি মদ্যপ। কোনটা পুলিশ স্টেশন, আর কোনটা হোটেল তিনি চিনতে পারছেন না। হোটেল মনে করে সোজা পুলিশ স্টেশনে গিয়ে হাজির হলেন তিনি। চাইলেন রুমে প্রবেশের চাবি। তাকে নিয়ে বিব্রতকর এক অবস্থায় পড়ে গেলো পুলিশ।
হ্যাঁ, এমনটা শুধু কল্পগল্পই নয়। এমন একটি ঘটনা বাস্তবে ঘটেছে ভারতে।
সেখানকার শ্রীনগর গাড়োয়াল মেডিকেল কলেজের একজন ডাক্তার ঠিক এই কাজটিই করেছেন। সম্প্রতি তিনি মদ পান করে মাতাল হয়ে পড়েন। কিছুই ঠাহর করতে পারছিলেন না। তাই হোটেল মনে করে তিনি গিয়ে সোজা প্রবেশ করলেন একটি পুলিশ স্টেশনে। ফলে সেখানে একটি বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হলো। পুলিশ বলেছে, ওই ডাক্তার পুলিশ স্টেশনে গিয়ে শুরু করেন নানা নাটকীয় ঘটনা। তিনি মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের ওপর নির্যাতন ও অশোভন আচরণ শুরু করেন। বাধ্য হয়ে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা করে পুলিশ। জব্দ করে তার এসইউভি প্রাইভেট কার। কিন্তু ওই গাড়ি ছাড়া ওই চিকিৎসক থানা থেকে বেরিয়ে যেতে রাজি হলেন না। তিনি ঘাড় বাঁকিয়ে বসলেন। বললেন, গাড়ি দাও। না হলে ফিরে যাবো না।
শ্রীনগর কোতোয়ালি পুলিশের স্টেশন হাউজ অফিসার এনএস বিস্ত বলেন, ওই চিকিৎসক পুলিশ স্টেশনের ভিতর প্রবেশ করেন। তার রুম কোনটা তা খোঁজা শুরু করেন। যখন তাকে বলা হলো যে, এটা হোটেল নয়, এটা একটা পুলিশ স্টেশন, অমনি তিনি আমাদের সদস্যদের ওপর নির্যাতন ও অশোভন ব্যবহার শুরু করেন। এক পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে আমরা একটি মামলা করলাম। জব্দ করলাম তার গাড়ি। ফলে তিনি ওই অবস্থায় পুরো রাত তার গাড়ির দাবিতে অবস্থান করলেন পুলিশ স্টেশনে। তিনি দাবি করলেন, কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ছেড়ে দিতে হবে গাড়ি।
ওই মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. চন্দ্র মোহন রাওয়াত ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ওই চিকিৎসক শহরে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার আগে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবো। তাতে ওই চিকিৎসককে দোষী পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এখানে উল্লেখ্য, ওই একই চিকিৎসক গত বছরও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে ধরা পড়েছিলেন।

স্বাস্থ্যের কুমিরদের এত টাকা! by মারুফ কিবরিয়া

তাদের কেউ তৃতীয় কেউ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। বেতনের টাকায় যাদের কোনোমতে জীবন ধারণের কথা। অথচ তারা একেক জন যেন টাকার কুমির। আছে আলিশান বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি। নামে-বেনামে আছে হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মচারী। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হাজার কোটি টাকার  সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ উঠলেও এখনো তারা কর্মক্ষেত্রে বহাল। শুধু তাদের বদলি করা হয়েছে আগের কর্মস্থল থেকে।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা- কর্মচারীর দুর্নীতির তথ্য। বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ পদের কর্মচারী আবজাল হোসেনের সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফাঁস হয় বিপুল পরিমাণ  অবৈধ সম্পদের তথ্য। মাত্র ১২শ’ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা আবজাল গত দুই যুগে দুর্নীতির মাধ্যমে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। তার ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের এতই সম্পদ যে, দুদক কর্মকর্তারা মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সম্প্রতি বরখাস্ত হওয়া আবজাল দীর্ঘদিন কর্মরত থাকলেও তার স্ত্রী ২০০৯ সালে চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,  এই দম্পতির নামে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কেই ৪টি পাঁচতলা বাড়ি ও একটি প্লট রয়েছে। ১১ নম্বর সড়কের ১৬, ৪৭, ৬২ ও ৬৬ নম্বর বাড়িটি তাদের নামে। সড়কের ৪৯ নম্বর প্লটটিও তাদের। মিরপুর পল্লবীর কালশীর ডি-ব্লকে ৬ শতাংশ জমির একটি, মেরুল বাড্ডায় আছে আরো একটি প্লট। মানিকদি এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছেন। ঢাকার দক্ষিণখানে আছে ১২ শতাংশ জায়গায় দোতলা বাড়ি। আবজালের নিজ জেলা ফরিদপুর শহরে টেপাখোলা লেকপাড়ে ফরিদের স’মিলের পাশে নিজে কিনেছেন ১২ শতাংশ জমি। ওই জমির প্রায় পাশাপাশি টেপাখোলায় ওই এলাকার কমিশনার জলিল শেখের আবাসন প্রকল্পে ৬ শতাংশ করে নিজে প্লট কিনেছেন দুটি। ফরিদপুরে ওইসব ভূ-সম্পদ ছাড়াও শহরের গোপালপুর এলাকার বনলতা সিনেমা হলের পাশে মাস্টার কলোনিতে ১৫ শতাংশ জায়গায় একটি একতলা বাড়ি ও ভাড়ায়চালিত ৩০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক এই আবজাল। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, গুলশান, বনানী ও বারিধারায় আবজালের বাবা-মা, ভাইবোন ও নিকট আত্মীয়দের নামে ২০টিসহ সারা দেশে তাদের প্রায় শতাধিক প্লট ও বাড়ি রয়েছে।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় ২ একর জমি, অস্ট্রেলিয়ায় ট্রাভেল এজেন্সি, ব্যবসা-বাড়ি, কানাডায় কেসিনোর মালিকানা-ফার্ম হাউজ এবং যুক্তরাষ্ট্রে হোটেল রয়েছে তার। অ্যাকাউন্টস অফিসার থাকা অবস্থায় আবজাল ব্যবহার করেছেন লেক্সাস গাড়ি। যা বাংলাদেশের মন্ত্রী ও সচিব পদের কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন। আবজাল দম্পতি নানা কাজের জন্য বছরে ২০ থেকে ২৫ বার দেশের বাইরে ভ্রমণ করেন বিজনেস ক্লাসের টিকিটে।
এদিকে রাজধানীর মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী (হিসাবরক্ষক) লিয়াকত হোসেন ও তার স্ত্রী লাকি আক্তার চৌধুরীর নামে রয়েছে শত কোটি টাকার সম্পদ। গত ১৫ বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন লিয়াকত। জানা গেছে তিনি সেই টাকার কুমির আবজাল হোসেনেরই ভাই। ২০০৩ সালে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের হিসাব সহকারী পদে চাকরিতে যোগদান করেন লিয়াকত হোসেন। সে হিসাবে গত ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। এই ১৫ বছরেই অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যান তিনি। ৩১শে জানুয়ারি সম্পদের হিসাবের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ। শহরের টেপাখোলার লক্ষ্মীপুর এলাকায় স্ত্রী লাকির নামে রয়েছে একটি আলিশান বাড়ি। টেপাখোলার ফরিদাবাদে ‘মাহি মাহাদ ভিলা’ নামে রয়েছে আরেকটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। এই বাড়িতে বসবাস করছেন জুয়েলের শ্বশুরবাড়ির লোকজন। শহরতলীর বায়তুল আমান এলাকায় পাঁচ কাঠার আবাসিক প্লট রয়েছে স্ত্রীর নামে। নর্থ-চ্যানেল গোলডাঙ্গীর চরে এল অ্যান্ড এমএম নামে রয়েছে তার একটি ইটভাটা। বড় বোন নাসরিন আক্তারের নামে সিঅ্যান্ডবি ঘাটের ওপারে নাজিরপুরে এঅ্যান্ডআর ব্রিকস নামে আরেকটি ইটভাটা রয়েছে। এ ছাড়া সিঅ্যান্ডবি ঘাটের বাজারে রয়েছে ১৭ শতাংশ জমিতে দোতলা ভবন। এ ছাড়া শহরের ভাটি লক্ষ্মীপুরে ২৪ কাঠা জমিতে রয়েছে তার বাগান বাড়ি। শহরতলীর আদমপুর এলাকার বেরহমপুর মৌজায় ১৭ বিঘা জমি রয়েছে স্ত্রীর নামে। তার ছোট কার্গো জাহাজ রয়েছে ১৬টি, তবে এসব জাহাজ শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনদের নামে।
এ ছাড়া পারিবারিকভাবে ব্যবহারের জন্য রয়েছে আধুনিক মডেলের তিনটি প্রাইভেটকার। লিয়াকত ছাড়াও তার ভাই আবজালের এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছে তাদের আরেক ভাই। তিনি ফরিদপুর টিভি হাসপাতালের ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া এই সিন্ডিকেটের মধ্যে রয়েছেন আবজালেরই আরো তিন শ্যালক। এরা হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক রকিবুল ইসলাম, উচ্চমান সহকারী বুলবুল ইসলাম এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফিস সহকারী শরিফুল ইসলাম। ৩১শে জানুয়ারি দিনভর তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট করে টেন্ডার বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতি করে আবজাল হোসেন ও তার পাঁচ সহযোগী ব্যাপক সম্পদের মালিক হয়েছে। দেশে-বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর এসব সম্পত্তির অনুসন্ধানেও নেমেছে দুদক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে ২৩ জন কর্মকর্তা- কর্মচারীকে দুদকের সুপারিশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি করে দিয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী প্রধান মীর রায়হান আলীও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এরই মধ্যে দুদকের সুপারিশের ভিত্তিতে বদলি করা হয়েছে তিনিসহ একই অধিদপ্তরের ২৩ কর্মকর্তাকে। এই দপ্তরেই টানা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত এই ব্যক্তি ঢাকাতেই গড়েছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে জমা রয়েছে রায়হানের শত কোটি টাকা। এসব অবৈধ সম্পদ থাকার বিষয়টি একেবারেই অস্বীকার করেন তিনি। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, আমি জীবনভর সৎ পথে উপার্জন করেছি। কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না। নির্ভেজাল মানুষ। দুদকের সুপারিশে বদলি করা হয়েছে কেন জানতে চাইলে রায়হান বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। শুধু বদলির নোটিশ পেয়েছি। আর কিছু আমাকে জানানো হয়নি। টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তিনি বাজেট বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান। দুদক সূত্রে জানা যায়, বাজেট বিভাগের এই কর্মকর্তা ভুয়া টেন্ডারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তবে  গত ১৪ই জানুয়ারি দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের পর নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন ডা. আনিসুর রহমান।
তিনি বলেছেন, আমি বাজেট শাখায় কাজ করি। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে বাজেট পত্রে স্বাক্ষর করি। যে কাজটার জন্য বলা হয়েছে টেন্ডার জালিয়াতিতে জড়িত, আমি তো টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত না। বাজেটটা এখান থেকে কীভাবে ডিসপাস (ছাড়) হয়েছে, সে বিষয়ে আমাকে দুদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। তাহলে কি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জড়িত এ প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রমাণিত না হওয়া ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না। এসময় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন।  
বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ঢাকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলীকে বরিশালে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হাসানকে রাঙ্গামাটি, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি, প্রধান সহকারী সাজেদুল করিমকে সিরাজগঞ্জ এবং উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমানকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সাইফুল ইসলামকে হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী ফয়জুর রহমানকে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হককে নেত্রকোনা সিভিল সার্জন কার্যালয়, কম্পিউটার অপারেটর আজমল খানকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়, প্রধান সহকারী-কাম হিসাবরক্ষক আবদুল কুদ্দুসকে ভোলার চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সিলেটের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রধান সহকারী নুরুল হককে জামালপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গৌস আহমেদকে সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদকে কুড়িগ্রামের চিলমারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর নেছার আহমেদ চৌধুরীকে নেত্রকোনার বারহাট্টা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয়েছে। খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, অফিস সহকারী মো. মাসুমকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেনকে নওগাঁ সিভিল সার্জন অফিস, বরিশাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মো. রাহাত খানকে মানিকগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিস, উচ্চমান সহকারী মো. জুয়েলকে কক্সবাজারের মহেশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, রংপুর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমানকে শেরপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয়, স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলামকে গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিসে বদলি করা হয়েছে।

কারা অভ্যন্তরে দিন কাটে যেভাবে by কাফি কামাল

বন্দি আধিক্যের কারণে অমানবিক এক পরিবেশ বিরাজ করছে দেশের প্রতিটি কারাগারে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে লকআপ অবস্থায় দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে বন্দিদের। সকালের নাস্তার পর কিছুক্ষণের জন্য কারাঅভ্যন্তরের আঙ্গিনায় যাওয়া যায় পর্যায়ক্রমে। ঘণ্টা দুই মুক্ত হাঁটাচলার সুযোগ মেলে পড়ন্ত বিকালে। রাতের খাবার সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হয় ওয়ার্ডের লকআপে।
৫টার পর সব ওয়ার্ড বন্ধ করে দেয়া হয়। দিনে তিনবার বসতে হয় গুনতি ফাইলে। সন্ধ্যাকালীন ফাইল গুনতির পর দ্রুত খাবার-দাবার সেরে রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই বাধ্যতামূলক শুয়ে পড়তে হয় বিছানায়। অন্যথায় হজম করতে হয় কটুকথা বা মারপিট।
এককাত হয়ে ঘুমোতে হয় ইলিশ ফাইলে। বন্দিদের ঝগড়া-বিবাদ, বাল্বের তীব্র আলো আর মশার উৎপাতে ঘুম ভেঙে যায় বারবার। বাথরুমে যাতায়াতের পথে একের পা পড়ে অন্যের শরীরে। কারাগারের দিনগুলো হয় নিয়ন্ত্রিত, রাতগুলো দীর্ঘ। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম, চিকিৎসা ও বিনোদনের অভাব, নতুনদের ওপর পুরনোদের এবং হাজতি-কয়েদিদের সঙ্গে কারারক্ষীদের দুর্ব্যবহার মিলিয়ে অমানবিক এক জগৎ প্রতিটি কারাগার। রাজনৈতিক ও অন্যান্য মামলায় নানা মেয়াদে কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্ত বেশ কয়েকজন পুরুষ ও নারী কারাগার সম্পর্কে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ব্যবসা সংক্রান্ত মামলায় কিছুদিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক ব্যবসায়ী জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডেই প্রথম রাত কাটে বন্দিদের। ফলে সব সময় এই ওয়ার্ডে বিরাজ করে অন্যরকম এক অমানবিক পরিবেশ। আমদানি ওয়ার্ডের নেয়ার পর রাতেই সওদা বসে সেখানে। যারা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান তাদের ভালো থাকা ও ভালো খাওয়ার টোপ দিয়ে মক্কেল ওয়ার্ডে (কারাবন্দিদের ভাষায়) নেয়া হয়। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা যান মেডিকেল বা নির্দিষ্ট সেলে। মক্কেল ওয়ার্ডে সিটের জন্য (সোজা হয়ে শোয়ার জায়গা) প্রথম সপ্তাহে পাঁচ হাজার ও পরে প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে মেডিকেল প্রথম সপ্তাহে ১৫ হাজার ও পরে আলোচনা সাপেক্ষে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
আর যারা সাধারণভাবে কারাকর্তৃপক্ষের মর্জি অনুযায়ী যেকোনো ওয়ার্ডে যায় তাদেরও প্রথমবার সিটের জন্য এক হাজার ও ওয়ার্ড পাস হিসেবে ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ওই ব্যবসায়ী জানান, কারাকর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাজাপ্রাপ্ত ও প্রভাবশালী পুরোনো কয়েদি বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা ওয়ার্ডগুলোর আনুষ্ঠানিক ইজারা নেন। তারপর নির্দিষ্ট সময় ধরে তারা সাধারণ হাজতিদের কাছে এ অর্থ আদায় করেন। যারা নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে পারেন না তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। বাথরুমের আশেপাশে শুতে বাধ্য করার পাশাপাশি তাদের দিয়ে করানো হয় বাথরুম পরিষ্কারসহ নানা ধরনের কায়িক কাজকর্ম।
দেশের নানা কারাগার থেকে মুক্ত কয়েকজন জানান, কারাগারে নারী ও পুরুষ বন্দিদের আলাদা কমপ্লেক্সে রাখা হলেও তাদের ব্যবস্থাপনা ও নিয়মকানুন একইরকম। কারাবন্দিদের প্রতিটি দিন শুরু হয় ভোরবেলা ঘুম ভাঙা চোখে গণনার জন্য ফাইলে বসার মাধ্যমে। কয়েকজন নারী জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডেই কাটে যেকোনো বন্দির প্রথম রাত। সকালে গুনতি শেষে তাদের মামলার তথ্য, রক্ত পরীক্ষা, পিরিয়ডের তারিখসহ নানা শারীরিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তারপর নতুন বন্দিদের নানা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে যারা সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী প্রথমদিনই তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় পছন্দমতো ওয়ার্ডে বা সেলে। কারাবন্দিদের প্রতিটি দিন শুরু হয় ভোরবেলা ঘুম ভাঙা চোখে গণনার জন্য ফাইলে বসার মাধ্যমে। সবক’টি ওয়ার্ডে গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর এক ওয়ার্ড থেকে একবারে ৭-৮ জনের মতো করে পর্যায়ক্রমে আঙ্গিনায় যেতে পারে।
তখন কেউ কেউ মনিং ওয়ার্ক করেন। এরই মধ্যে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আসে সকালের নাস্তা লাল আটার রুটি ও গুড় বা সপ্তাহে একদিন খিচুড়ি। তারপর প্রতিদিনের কর্ম, কারা আঙ্গিনাজুড়ে বন্দিদের হাঁটাচলা, গালগল্প বা সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্তদের কাজকর্ম চলে। বেশ আগেভাগেই সংগ্রহ করতে হয় দুপুরের খাবার। বেলা ১২টায় দিনের দ্বিতীয় দফা গুনতি চলে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। এভাবে প্রতিদিন ভোরে, দুপুর ১২টায় এবং সন্ধ্যার পর তিন দফা ফাইলে গুনতি হয় কারাবন্দিদের। সপ্তাহে একবার হয় সুপার ফাইল। শীতকালে লকআপ হয় বিকাল সাড়ে চারটায়। সন্ধ্যা ফাইলের পর আটকে দেয়া হয় ওয়ার্ডের দরোজা। রাত সাড়ে আটটার মধ্যে শুয়ে পড়তে হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডেই বন্দিদের ঘুমাতে হয় তিনটি সারি করে। দুই দেয়ালের দিকে মাথা রেখে দুই সারি এবং মধ্যখানে আরেক সারি। ওয়ার্ডে প্রতিজন বন্দি পান দুইটি কম্বল। সাম্প্রতিক সময়ে কারাবন্দিদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ হচ্ছে একটি করে বালিশ। বন্দিদের গোসলের জন্য রয়েছে দুইটি পানির হাউস। একটি কয়েদিদের, অন্যটি হাজতিদের। পানির অপর্যাপ্ততা নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে থাকেন কারাবন্দিরা। দিনে তিন বেলা পানি মেলে। একই পানিতে খাবার, গোসলসহ সবকিছুই সারতে হয়। পানির অপর্যাপ্ততা নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে থাকেন কারাবন্দিরা।
রাজনৈতিক মামলায় ৬ মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এক নেতা। তিনি জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক একটি ওয়ার্ডে সাধারণত ২০-২৫ জন বন্দি রাখার কথা। বর্তমানে একেকটি ওয়ার্ডে ৬০-৭০ জন বন্দি কারাভোগ করছেন। বিশেষ করে ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কারগারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০০’র বেশি। প্রতিটি ওয়ার্ডের বারান্দাগুলোতে পা ফেলার জায়গা ছিল না। নির্বাচনের ৪-৫ দিন আগে থেকে বন্দি আধিক্যের কারণে রাতে কারা আঙ্গিনায় তাঁবু টাঙানো হয়েছিল। রাতে তাঁবু টাঙানো হতো, দিনে সেসব সরিয়ে নেয়া হতো। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেখানে সাধারণ ৬ হাজার বন্দি রাখার কথা। কিন্তু নির্বাচনের আগে গণগ্রেপ্তারের কারণে সেখানে প্রায় ১৫ হাজার বন্দি রাখা হয়েছিল।
কাশিমপুর-২ এ নারী বন্দিদের জন্য রয়েছে একটি আলাদা কমপ্লেক্স। সেখানে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন প্রায় সাড়ে নয়শ’ নারী। যার মধ্যে মায়ের সঙ্গে ৩৫ জন শিশুবন্দি হিসেবে রয়েছে। যদিও শিশু সন্তানসহ মায়েদের রাখা হয় আলাদা একটি ওয়ার্ডে। প্রতিটি ওয়ার্ডেই বন্দিদের ঘুমোতে হয় তিনটি সারি করে। দুই দেয়ালের দিকে মাথা রেখে দুই সারি এবং মধ্যখানে আরেক সারি। ওয়ার্ডে প্রতিজন বন্দি পান দুইটি কম্বল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বা কারাঅভ্যন্তরে শাস্তিপ্রাপ্ত সেলের বাসিন্দাদের জীবন আরো কঠিন। দিনে মাত্র এক ঘণ্টা সেলের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ মেলে তাদের। মুক্তি পাওয়া নারীরা জানান, তিনটি জিনিসের ব্যাপক চল রয়েছে কারাগারে। সেগুলো হচ্ছে- ‘ডাইল, ফাইল ও গাইল’। প্রতি বেলায় খাবারে মেলে ডাইল (ডাল)। প্রতিদিন তিনবার এবং সপ্তাহে বিশেষ একবারসহ চারবার বন্দিদের নিজেদের সাজাতে হয় ফাইলে। আর গাইল (গাল) প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তের বিষয়। কে কেমন জোরালোভাবে গাল দিতে পারে তার ওপর নির্ভর করে ওয়ার্ডে তার প্রভাব। প্রাত্যহিক কাজগুলো সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্তদের করার কথা থাকলেও হাজতিদের দিয়েই সেগুলো করানো হয়। বিশেষ করে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ইচ্ছা করেই এমন দুর্ব্যবহার করা হয় যাতে তাদের আত্মসম্মানবোধে লাগে এবং আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। দুইজন নারী জানিয়েছেন, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তারা মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। 
বন্দিজীবন কাটানো কয়েকজন পুরুষ জানান, সব কারাগারেই চিকিৎসা সমস্যা নিয়ে দিন কাটে বন্দিদের। প্রতিটি কারাগারে মেডিকেল ওয়ার্ড থাকলেও সেগুলো দখলে থাকে প্রভাবশালী বন্দিদের। কিছু কিছু অসুস্থ এবং কারাবন্দি পাগলদের বসবাসও হয় সেখানে। কারাগারে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সহজে চিকিৎসকের দেখা মেলে না।
প্রাথমিকভাবে মেডিকেল ওয়ার্ডে চিকিৎসার কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে তেমন কয়েদিরাই হন প্রাথমিক ভরসা। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে দেখা মেলে চিকিৎসকদের। রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যথাসময়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসা না মেলায় হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ কারাবন্দিদের জীবন সংকটাপন্ন হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে কারাঅভ্যন্তরে মৃত্যুবরণের পর আনুষ্ঠানিকতা সারতে হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রতিবেদনে লেখা হয় হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু। অন্যদিকে একজন নারী জানান, দীর্ঘদিন ধরে কোনো চিকিৎসক নেই কাশিমপুর কারাগারের নারী কমপ্লেক্সে। কারাগারের মহিলা চিকিৎসক বদলি হয়েছেন দীর্ঘদিন হলো। কাশিমপুর কারাগারে কোনো নারী বন্দি অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেয়ার কেউ নেই। মেডিকেল বন্দি দুয়েকজন নারী কয়েদিই তাদের ভরসা। মাঝে মধ্যে বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয় হাতুড়ে ডাক্তার। বিশেষ করে রাতে কোনো বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা প্রায় হয় না বলেই চলে।
রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তেত্রিশ দিন কাশিমপুর কারাগারে কাটিয়ে কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন একজন নারী নেত্রী। তিনি জানান, কারাগারের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই বন্দিদের। দিনে তিন বেলা খাবারই মেলে। সকালে রুটি-গুড় কিংবা খিচুড়ি। অন্য দুই বেলায় তরকারি হিসেবে ডাল-সবজি এবং সপ্তাহে দুইদিন তেলাপিয়া বা পাঙ্গাশ মাছ ও মাংস। যদিও ঝোল-ঝালের মধ্যে মাছ-মাংসের টুকরো খুঁজে পাওয়া কঠিন। সীমিত ও বৈচিত্র্যহীন খাবার খেয়েই দিনযাপন করতে হয় বন্দিদের।
এর বাইরে কেউ বাড়তি বা উন্নত খাবার সংগ্রহ করতে চাইলে রয়েছে পিসি (পুলিশ ক্যান্টিন)। বন্দিদের নামে সেখানে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজন টাকার জোগান দিলে বন্দি নিজের চাহিদা অনুযায়ী কারাঅভ্যন্তরে নিষিদ্ধ জিনিসগুলো সবই সংগ্রহ করতে পারে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান বন্দিরা কারাগারে যাওয়ার পর প্রথমদিনই নিজের নামে খুলে নেন। পিসি থেকে সংগৃহীত প্রতিটি খাবার বা জিনিসের কয়েকগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জামিনে মুক্ত বন্দিরা জানান, কারাগার ভেদে এ মূল্য সামান্য কমবেশি হয়। তবে পিসি থেকে একটি মুরগি রান্না করে নিলে পরিশোধ করতে হয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। এক কেজি গরুর মাংসের জন্য চার থেকে পাঁচ হাজার ও এক কেজি মাছের জন্য দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়।
তিনি জানান, কাশিমপুর কারাগার-২ এর নারী কমপ্লেক্সটি চারদিকে ফুলের বাগানসহ গাছপালায় সাজানো গোছানো খুবই দৃষ্টিনন্দন। প্রতি সপ্তাহে একদিন জেলসুপারের পরিদর্শনের দিনে সকালে পরিচ্ছন্নতা অভিযান হওয়ায় ওয়ার্ডের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন। সপ্তাহের যেদিন সুপার ফাইল হয় সেদিন সকাল থেকেই নানামুখী তৎপরতা শুরু হয় কারগারে। ওয়ার্ডের সবকিছু পরিষ্কার, ধোয়া মোছার মাধ্যমে ঝকঝকে ও সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা হয়। চারতলাবিশিষ্ট কলমিলতা নামের মূল ভবনটির দোতলা থেকে চারতলা প্রতিটি ফ্লোরেই দুইটি করে ৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই রয়েছে দুইটি করে কক্ষ এবং বারান্দা। কক্ষে একটি করে অ্যাটাচড বাথরুম। প্রতিটি কক্ষে বসবাস করতে হয় ৬০-৭০ জন। কখনো কখনো এ সংখ্যা একশ’ পেরিয়ে যায়। প্রতিটি ওয়ার্ডের সামনে থাকা একচিলতে বারান্দায়ও রাত কাটাতে হয় শত শত বন্দিকে। গরমের দিনে বারান্দায় ঘুমানো সহজ হলেও শীতের দিন সেটা হয় বাড়তি সাজা। যদিও কারাগারে সরবরাহকৃত কম্বল দিয়ে জানালার গ্রিল আটকে দেয়া হয় কিন্তু তাতে আটকে রাখা যায় না শীতল হাওয়া। তারপরও কম্বলে গুটিসুটি মেরে রাত কাটানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।
একজন করে মেড ও রাইটার (সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি) প্রতিটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বলেন, কমপ্লেক্সের মূল ভবন ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি বাংলো। সবচেয়ে বড় বাংলোটি হচ্ছে ভিআইপি ও ভিভিআইপি বন্দিদের। এর বাইরে অন্য বাংলোগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে পিসি, মেডিকেল, টেইলার্স, পার্লার ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে কারাসেল। সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কারামুক্ত কয়েকজন জানান, কারাগারে বড় বড় অপরাধীর জন্য রয়েছে সেল। সামর্থ্যবান বন্দিরা একটি প্রাইভেসি নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে থাকার জন্য অর্থের বিনিময়ে সেসব সেলে যান। আবার সাধারণ ওয়ার্ড থেকে নানা অপরাধের জন্য কাউকে কাউকে পাঠানো হয় এসব সেলে। এছাড়া ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরাও থাকেন সেলে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সেলে কয়েক মাস বন্দি জীবন কাটানো একজন জানান, একটি সেলে এক বা দুইজন থাকার কথা। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে সেলগুলোতে বন্দি রাখা হয়েছিল ৬-৭ জন করে।
রাজনৈতিক মামলায় কয়েক মাস কারাভোগের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত একজন জানান, কারাগারে সবচেয়ে বড় একটি সংকট বিনোদনের অভাব। কারাবন্দিরাও যে মানুষ, তাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য যে বিনোদনের প্রয়োজন সেটা কর্তৃপক্ষ ভাবেন না। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে টেলিভিশন সেট থাকলেও সেখানে প্রচারিত হয় কেবল বিটিভির অনুষ্ঠান। তাও রাত ৮টা পর্যন্ত। পত্রিকা পাওয়া যায় দুইটি। ফলে বন্দিদের সময় কাটে না। বন্দিদের মধ্যে যারা বিত্তশালী তারা কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে টিভি সেট নেন। দুয়েকজন ঝুঁকি নিয়ে পেন ড্রাইভের মাধ্যমে নাটক-সিনেমা দেখেন। কিন্তু ধরা পড়লে তাদের আর্থিক জরিমানা (অনানুষ্ঠানিক) ও কারাঅভ্যন্তরে শাস্তি দেয়া হয়। সে শাস্তির মধ্যে রয়েছে অন্য কারাগারে চালান, সেলে স্থানান্তর, হাতকড়া পরানো, মারধরসহ নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মামলায় দুই মাস কারাভোগ করে কিছুদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন একজন ছাত্রনেত্রী। তিনি জানান, কারাবন্দিদের বেশির ভাগই টিনেজ ও কমবয়সী। যাদের বেশির ভাগই কারাভোগ করছেন মাদক মামলায়। অনেকেই কারাভোগ করছেন রাজনৈতিক মামলা, খুন, চেক জালিয়াতি, অবৈধ দেহ ব্যবসার অভিযোগে। স্বামী ও কাজের মেয়ে হত্যার অভিযোগে বন্দি রয়েছেন কয়েকজন অভিজাত ঘরের সুন্দরী নারী। তিনি জানান, কারাগারের বন্দিরা নিরাপদ থাকলেও কাউন্সেলিং না থাকায় অপরাধীদের মনে অনুশোচনা নয়, রাগ-ক্ষোভ-হতাশা বাড়ে। কারাগারে যাওয়ার পর অনেক অপরাধী আছে যাদের অন্যান্য অপরাধীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং তাদের অপরাধের জগৎ সম্প্রসারিত হয়।
বিশেষ করে যারা মাদক ও দেহ ব্যবসার অভিযোগে কারাগারে যান তারা জামিনে বের হয়ে ফের পুরনো পেশায় জড়িয়ে পড়েন। ফের গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ফেরত আসেন। ওই ছাত্রনেত্রী জানান, কারাগারে বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা নেই। একটিমাত্র টিভি সেট আর একটি লাইব্রেরি। সাজাপ্রাপ্ত পুরনো বন্দি ছাড়া নতুনদের সেখান থেকে বইপত্র সরবরাহ করা হয় না। হ্যান্ডবল-ভলিবলের মতো খেলাধুলা ও শরীর চর্চার কোনো সুযোগ নেই। কমপ্লেক্সে রয়েছে একটি ডে কেয়ার সেন্টার। তবে তা প্রায়ই বন্ধ থাকে।
কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত একজন জানান, কারাগার এমন একটি জায়গা যেখানে একই সঙ্গে ইবাদত বন্দেগি ও নানারকম অনিয়ম হয়। বন্দিদের একাংশ নিয়মিত নামাজ রোজা করেন। আরেকাংশ সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তাস পেটানো, গালগল্প আর হৈ চৈ ঝগড়া-বিবাদ করে। একজন নারী জানান, কারাবন্দিদের অনেকে এবাদত বন্দেগি বা ছোটখাটো কুটির শিল্পের কাজ করলেও বেশির ভাগের সময় কাটে গালগল্প আর ঝগড়া-বিবাদে। এছাড়া কারাগারে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার কারণে বন্দিদের অনেকেই সমলিঙ্গের প্রতি অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কারাগারে মাঝে মধ্যেই দেখা মেলে তেমন জুটির। ধরা পড়লেই বিচারের মাধ্যমে তাদের সেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

গর্ভের সন্তান বিক্রি না অন্য কিছু? by মরিয়ম চম্পা

১০৬ নং ওয়ার্ড। ম্যাট-০৬। বেড নং-৩৭। দুপুর পৌনে ১২টা। ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগ। ওয়ার্ডে প্রবেশ করতেই দরজার সঙ্গে লাগোয়া এক নবজাতকের মা হাতের ইশারায় জ্যোৎস্নার বেডটি দেখিয়ে দিলেন। ওয়ার্ডে ঢুকে মনে হলো একটি শিশু কানন। গোটা রুমটিই দখল করে আছে নবজাতক শিশু আর তাদের মায়েরা ।
একত্রে ৪ থেকে ৫ জন শিশুর কান্নায় চারপাশ মুখরিত। মায়েরা কেউ বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন। কেউ প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। কারো দাদি-নানী তাদের নাতনীকে সামলাচ্ছেন।
নার্সদের পেছনে কর্নারে একটি বেডে সদ্য জন্ম নেয়া সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন জ্যোৎস্না। মুখ দেখে মনে হয়েছে গত কয়েকদিন ধরে তার ওপর বেশ ধকল গেছে। নবজাতকের গায়ে কমলা রং-এর সোয়েটার। মাথার কানটুপিতে ছোপ ছোপ শুকনো রক্ত লেগে আছে। কেমন আছেন? ভালো আছি, ‘হ’। বাচ্চা কেমন আছে? বাচ্চাও ভালো আছে ‘হ’। থাকেন কোথায়? বস্তিতে থাকি। রাস্তায় থাকি। গ্রামের বাড়ি? গ্রামের বাড়ি নাই। কথার ফাঁকে ফাঁকে জ্যোৎস্নার চোখে কিছুটা আতঙ্কের ছাপ দেখা গেছে। বার বার পেছনে তাকাচ্ছেন। বলেন, এই ব্যাডারে নিয়া দুইজন ব্যাডা।
আরেকজন প্রতিবন্ধী। হেরে একটা এতিমখানায় পড়তে দিয়েছি। স্বামী ভিক্ষা করে। মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তোলে। আমি আগে বাসাবাড়িতে কাজ করতাম। কমলাপুরে থাকতাম। সন্তান বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে জ্যোৎস্না বলেন, পেটের সন্তানকে কেউ বিক্রি করে বলেন? ঠ্যাকায় পইরা কিছু ট্যাকা নিছিলাম। হে জন্য কি পেডের ব্যাডারে (পেটের সন্তানকে) মানসেরে দিমু নাকি।
এক পর্যায়ে জ্যোৎস্না চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করেন। এসময় তিনি নার্সদের ডেকে বলেন, আমার স্বামীরে ফোন দেন। আমি এইহানে থাকমু না। হে আইসা হাসপাতালের বিল মিডাইয়া আমারে নিয়া যাক। আমার বাচ্চা কইলাম আবার নিয়া যাইবো।
মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায়ই দু’দিন বয়সী এক শিশু বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেই নবজাতককে নিতে আসা সোনিয়া (২৮) নামের এক নারীকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার রাত ৮টার দিকে হাসপাতালের ১০৬ নং গাইনি ওয়ার্ড থেকে সোনিয়াকে আটক করা হয়। জ্যোৎস্নার স্বামীর নাম টুকু মিয়া। তারা গাজীপুর টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ফুটপাথে থাকেন। জ্যোৎস্না এক সময় কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় দোকানে দোকানে পানি দেয়ার কাজ করতেন। তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকাবস্থায় সেখানে সোনিয়া নামের এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়।
জ্যোৎস্না বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সোনিয়া ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমার পেটের সন্তানকে কেনার জন্য প্রস্তাব দেয়। গরিব বিধায় টাকার বিনিময়ে সন্তান বিক্রি করতে রাজি হই। অগ্রিম হিসেবে সোনিয়া আমাকে তিন হাজার টাকাও দেয়। মঙ্গলবার সিজারের (অপারেশন) মাধ্যমে আমার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। ‘বুধবার রাতেই সোনিয়া ঢামেক হাসপাতালে আমার সন্তানকে নিতে আসে। এসময় তাকে সন্তান না দেয়ার কথা বলে অগ্রিম তিন হাজার টাকা ফেরত দেয়ার কথা বলি। কিন্তু সোনিয়া তারপরও জোর করে আমার সন্তান নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে হাসপাতালের লোকজন তাকে আটক করে।’
আটক সোনিয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের নাসির উদ্দিন সরদার লেনের একটি বাসায় থাকেন। জ্যোৎস্না এক সময় তার বাসায় কাজ করতেন। তার অন্তঃসত্ত্বার সময় চিকিৎসার জন্য ৩ হাজার টাকা দেন। বুধবার জ্যোৎস্নাকে ফোন করে আসতে বলায় তিনি হাসপাতালে এসেছিলেন। সকাল থেকে সারা দিনই জ্যোৎস্নার পাশে ছিলেন তিনি। সন্ধ্যায় ঢামেক হাসপাতালের গাইনি বিভাগের ওয়ার্ডে জ্যোৎস্নার ২য় স্বামী টুকু মিয়ার অভিযোগে আনসার সদস্যরা তাকে আটক করেছে।
ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স কামরুন নাহার ও টুম্পা হাওলাদার বলেন, হঠাৎ সোনিয়া নামের ওই নারী নবজাতকটিকে কোলে নিয়ে ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে যায়। হাসপাতালের মূল গেটের দিকে যেতে থাকলে আমরা তাকে আটক করি। এসময় আমরা তার কাছে ‘ডিওআরবি’ বা আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র দেখতে চাই। কারণ অনেক নিয়মকানুন সম্পন্ন করে নবজাতক নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে হয়। এসব কিছু না করেই সোনিয়া নবজাতককে নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগের চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়।
ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের ওয়ার্ড মাস্টার মোহাম্মদ রিয়াজ জানান, সোনিয়াকে আটক করার পরপরই শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও অবগত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, যতোদূর জেনেছি তাদের দু’পক্ষের মধ্যে টাকা পয়সার কিছু একটা লেনদেন আছে। ঘটনার পরপরই আমরা অভিযুক্ত নারীকে পুলিশে সোপর্দ করি। পাশাপাশি নবজাতক ও মা জ্যোৎস্না বেগমকে আরো কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখতে চাই। কারণ জ্যোৎস্না বেগম এখনো শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ নয়। তাকে আরো দু-তিন দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। যদিও বাচ্চা নিয়ে তারা এখন চলে যেতে চায়। এক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছায় তারা যেতে চাইলে ‘স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি’ এই মর্মে পেপারে বন্ড স্বাক্ষর করে অতঃপর যেতে হবে।
শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই) ভজন বিশ্বাস বলেন, জ্যোৎস্না বেগম নিজে বাদী হয়ে বাচ্চা চুরির একটি মামলা দায়ের করেছে। মানবপাচার ২০১২ সালের ১০/২ খ ধারা অনুযায়ী মামলা হয়েছে। আসামি সোনিয়াকে ইতিমধ্যে আদালতে পাঠানো হয়েছে। উভয়ের মধ্যে টাকা পয়সার লেনদেনের কথা কতোটা সত্যি তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে আসামি সোনিয়া জ্যোৎস্না বেগমকে কিছু টাকা দিয়েছে। কি উদ্দেশ্যে দিয়েছে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।

দিনে ক্যানসার আক্রান্ত হচ্ছে চার শতাধিক মানুষ by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বছরে দেশে এক লাখ ৫০ হাজার লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। মারা  যায় এক লাখ ৮ হাজার। বাংলাদেশে ১৬ থেকে ১৭ লাখ ক্যানসার রোগী রয়েছেন বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। প্রতিবছর নতুনভাবে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয় ২৬ হাজার ৭৯২ জন। এরমধ্যে ১১ হাজার ৯৫৬ জন মহিলা জরায়ুমুখ ক্যানসারে এবং ১৪ হাজার ৮৩৬ জন মহিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। মারা যায় প্রায় ১৪ হাজার। এ হিসাবে দিনে আক্রান্ত হচ্ছে কমপক্ষে ৪১০ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় তামাকজাত দ্রব্য সেবনের কারণে আক্রান্ত হচ্ছে ফুসফুস ক্যানসারে।
আবার অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণকেও চিকিৎসকরা ক্যানসারের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। কৃষিতে রাসায়নিক ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের খাদ্যদ্রব্যকে করে তুলছে অনিরাপদ। এর উপর রয়েছে ফলমূল ও মাছে ফরমালিনের ব্যবহার। বায়ুদূষণকেও ক্যানসার বিস্তারের আরো একটি কারণ বলে মনে করেন তারা। বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি ক্যানসারের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, ক্যানসার আক্রান্ত প্রতি ২ লাখ মানুষের জন্য দুটি রেডিও থেরাপি সেন্টার প্রয়োজন। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি রেডিও থেরাপি সেন্টার আছে ১৫টি। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এর মধ্যে সরকারি আছে ৯টি ও বেসরকারি ৬টি। যার সবগুলোর মেশিন আবার সমভাবে সচল নয়। জানা গেছে, মোট ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৬০ শতাংশই পুরুষ। পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৩ শতাংশ আক্রান্ত হচ্ছে ফুসফুস ক্যানসারে, লিপ অ্যান্ড ওরাল ক্যানসারে ১২ শতাংশ, অন্ননালির ক্যানসারে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া আছে পাকস্থলী, হস্কিন লিম্ফোমা, মূত্রনালি, লিভার ও লিউকোমিয়া ক্যানসার। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা জানান, ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীরাই ক্যানসারে আক্রান্ত হন সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে থেমে নেই শিশুরাও। শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত লিউকোমিয়ায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভেজাল খাবার, শস্য উৎপাদনে কীটনাশকের ব্যবহার, পরিবেশ দূষণ, ধূমপানসহ নানা কারণে মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। জরায়ু ও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে অনেক মা-বোন মারা যান। তারা জানেনই না যে, তাদের জরায়ু বা স্তনে ক্যানসার হয়েছে। এ জন্য এই প্রাণঘাতী রোগের বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ প্রতিরোধের দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। বিএসএমএমইউ’র সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান এক অনুষ্ঠানে বলেন, ক্যানসারের প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সত্যিই উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৭ সালে প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০১২ সালে ৩০২০ জন এবং মারা গেছেন ৬৫ জন, ২০১৩ সালে ৩০৪৫ জন এবং মারা গেছেন ১১৮ জন, ২০১৪ সালে ৪০৫৭ জন এবং মারা গেছেন ১২৮ জন, ২০১৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৮৫ জনে এবং মারা গেছেন ১৭৪ জন। ২০১৬ সালে হাসপাতালে ভর্তি সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩৬৫ জন। মারা গেছেন ২৩০ জন। হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগ দিয়ে সেবা নেয়া রোগীর সংখ্যা ২০১২ সালে ছিল ৫৯ হাজার ২২১ জন এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে এমন শিশুর সংখ্যা ১৮০৩ জন। এই সংখ্যা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯১ হাজার এবং পাঁচ বছর বয়সের নিচে এমন শিশুর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৮৭ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যানসারের লক্ষণ দেখা দেয়া মাত্রই দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।  হঠাৎ করে গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, শরীরের যেকোনো জায়গায় চাকা হলে তা বৃদ্ধি পাওয়া। অস্বাভাবিক রক্তপাত। যেকোনো ঘা না সারা। পায়খানা ও প্রস্রাবের অভ্যাসের পরিবর্তন। দীর্ঘদিন ধরে খুসখুসে কাশি থাকা। দীর্ঘদিনের জ্বর। কারণ ছাড়া ওজন অতিরিক্ত পরিমাণে হ্রাস পাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।  এ বিষয়ে বিএসএমএমইউ অনকোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, সারা বিশ্বে ক্যানসার রোগী বাড়ছে। বাংলাদেশেও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৩০ সালে এটা ১২ শতাংশে ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য খাত এ জন্য প্রস্তুত না। সচেতনতার অভাবে রোগের একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে আসে মানুষ।  ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ রোগীর রেডিয়েশন থেরাপি দরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ লাখ ক্যানসার আক্রান্ত রোগী আছে। জনগণের চাহিদার তুলনায় যন্ত্রপাতিসহ সব কিছুই অপ্রতুল। সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। কিছু লোক বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলেও অনেকে আধুনিক মাত্রার চিকিৎসা পাচ্ছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। দেশে স্বাস্থ্য বীমাও নেই। সরকারকে এদিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যানসার ইপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন তার এক প্রবন্ধে বলেন, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতি বছর ৮২ লাখ মানুষ ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে। এর মধ্যে ৪০ লাখ ঘটে অকালমৃত্যু, ৩০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে কিছু কাজ সম্মিলিতভাবে সফল করতে পারি। আবার ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই পারি ক্যানসারের বোঝা লাঘবে ভূমিকা রাখতে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর ক্যানসারের ক্ষতিকর প্রভাব লাঘবে সবারই সুযোগ আছে ব্যবস্থা নেয়ার। বাংলাদেশের বর্তমান ক্যানসার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন,  আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি)’র অনুমিত নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশে এক লাখ ৫০ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, মারা যায় এক লাখ ৮ হাজার। এর আগে সংস্থাটির দেয়া বাংলাদেশের ক্যানসার সম্পর্কে পুরনো হিসাব ছিল- প্রতি বছর এক লাখ ২২ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়, মারা যায় ৯১ হাজার।
যেকোনো দেশে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য দরকার ক্যানসারে আক্রান্তের হার, মৃত্যুর হার, কারা কোন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে সেই সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান। এর জন্য প্রয়োজন জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার নিবন্ধন। ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ‘জাতীয় ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল’ প্রায় অকার্যকর। দীর্ঘদিন এই পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। প্রাথমিক প্রতিরোধ, সূচনায় ক্যানসার নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রশমন সেবা বা পেলিয়েটিভ চিকিৎসা। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে ক্যানসারের জন্য বরাদ্দের সিংহভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পেছনে। ক্যানসার নির্ণয় ও স্ক্রিনিং খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। প্রাথমিক প্রতিরোধের প্রধান উপাদান ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও টিকা সহ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা। এ ক্ষেত্রটি সবচেয়ে অবহেলিত। সরকারের কিছু উদ্যোগ আছে বিভিন্ন প্রোগ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে, সমন্বয়ের অভাবে তা দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারছে না। বেসরকারি সংগঠনগুলো মূলত সচেতনতা কার্যক্রমকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ ৪ঠা  ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশেও নানা উদ্যোগে ক্যানসার দিবসটি পালন করা হবে। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে আমি আছি, আমি থাকবো।’

‘মিস্টার বিন’-এর অবাধ যৌনতা, ভিন্ন রকম এক সিদ্ধান্ত

‘মিস্টার বিন’কে চেনেন না এমন মানুষ সম্ভবত দুনিয়ায় খুবই কম আছেন। ওই সিরিজে অভিনয় করার কারণে তিনি যেন নিজের আসল নামটিই হারিয়ে ফেলেছেন। তাকে বেশির ভাগ মানুষ চিনে থাকেন মিস্টার বিন হিসেবেই। তবে তার আসল নাম রোয়ান অ্যাটকিনসন। তার বয়স এখন ৬৪ বছর। হলে কি হবে তার মধ্যেও উথাল পাতাল প্রেম। চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছেন তার থেকে অর্ধেক বয়সী প্রেমিকা, অভিনেত্রী লুইস ফোর্ডের (৩৫) সঙ্গে। বিয়ে নয়, চুটিয়ে প্রেম।
উভয়ের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক। আর যা যা প্রয়োজন তার সবটাই মিটিয়ে নিচ্ছেন এই যুগল। তাদের অবাধ যৌন সম্পর্কে জন্ম নিয়েছে একটি মেয়ে সন্তান। তাকে ডাকা হয় ‘বেবি বিন’ নামে। এখন খবর হলো, প্রেমিকা লুইস ফোর্ড তার ক্যারিয়ার যাতে ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারেন সেজন্য নিজে এক বছরের জন্য কাজ থেকে অবসর নেবেন ‘মিস্টার বিন’। এ সময়ে ‘বেবি বিনের’ দেখাশোনা করবেন তিনি। ‘বেবি বিনের’ বয়স এখন এক বছর। তাকে বাসায় রেখে দু’জনই কাজে যাওয়া দুরূহ বিষয়। তাই ‘মিস্টার বিন’ তার বন্ধুদের বলেছেন, আমি বেবি বিনের দেখাশোনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যাতে লুইস তার অভিনয়ের দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
রোয়ান অ্যাটকিনসন ১০ কোটি পাউন্ডের মালিক। ২০১২ সালে ওয়েস্ট এন্ড-এর দ্য কোয়ার্টারমাইনস টিম-এ একসঙ্গে অভিনয় করছিলেন রোয়ান ও লুইস। এ সময় তাদের জানাশোনা। সেই জানাশোনা আস্তে আস্তে প্রেমে রূপ নিতে থাকে। তারা অবাধে ডেটিং করতে থাকেন। এখানে সেখানে প্রেমিকাকে বগলদাবা করে ঘুরতে থাকেন রোয়ান অ্যাটকিনসন। চলতে থাকে তাদের অবাধ যৌনাচার। ২০১৪ সালে একেবারে ঢাকে বাড়ি দিয়ে তাদের প্রেমের কাহিনী ফাঁস হয়ে পড়ে। এ সময় রোয়ান বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন সুনেত্রা স্যাস্ত্রি (৫৫) এর সঙ্গে। সুনেত্রার সঙ্গে তখন রোয়ানের ২৩ বছরের বিবাহিত সংসার। তাদের তখন রয়েছে দুটি সন্তান। তারা অনেকটা বড় হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। লুইসের প্রেমে উন্মাতাল হয়ে ওঠেন রোয়ান। তাকে ছাড়া একটি মুহূর্তও থাকতে পারেন না তিনি। ফলে ২০১৬ সালে লন্ডনের দ্য সান পত্রিকা রিপোর্ট করে যে, লুইসকে নিয়ে নর্থ লন্ডনের একটি ৫০ লাখ পাউন্ডের কটেজে উঠেছেন রোয়ান। সেখানেই সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়েন লুইস। অবশেষে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করেন। তার নাম রাখা হয় ইসলা মে। তাকে আদর করে রোয়ান অ্যাটকিনসন বা ‘মিস্টার বিন’ ডাকেন ‘বেবি বিন’ নামে।
ওদিকে গত বছর জেমস বন্ড প্যারোডি ছবি ‘জনি ইংলিশ স্ট্রাইকস এগেইন’-এ অভিনয় শুরু করেছেন রোয়ান অ্যাটকিনসন। লুইসও অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত। এ অবস্থায় রোয়ান অ্যাটকিনসন বলেছেন, লুইস আগামী একটি বছর মেয়ের দেখাশোনা করতে বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে চ্যানেল ফোরে কমেডি সিরিজ ‘দ্য উইন্ডসোরস’-এ কেট মিডলটন চরিত্রে অভিনয় করে ক্যারিয়ারের তুঙ্গে রয়েছেন লুইস। তাতে ছন্দপতন ঘটুক এটা চান না অ্যাটকিনসন। একটি সূত্র বলেছেন, মানুষকে চমকে দেয়াটাই রোয়ানের স্বভাব। তিনি আবারও তাই করলেন এক ঘোষণার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন, লুইস নয়, তিনিই বাসায় থাকবেন মেয়ে ইসলাকে দেখাশোনার জন্য। এজন্য নিজেই কাজ থেকে অবসরে থাকবেন এক বছর। আর এ সময়ে লুইসকে তার ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্য সাপোর্ট দিয়ে যাবেন তিনি। ওই সূত্রটি বলেছে, মেয়ে ইসলার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসেন রোয়ান অ্যাটকিনসন। তিনি তার সঙ্গে নানা রকম মজা করেন। ‘মিস্টার বিন’-এ যেমন কৌতুক করে মানুষ হাসান, তেমনি নানা রকম অঙ্গভঙ্গি ও মজা করে মেয়েকে আনন্দ দেন।

প্লিজ, এম্বুলেন্সকে যেতে দিন by শাহনেওয়াজ বাবলু

এম্বুলেন্স চলছে না এক চুলও। অবিরাম বেজে চলছে সাইরেন। কেউ শুনছে না। সামনের গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁই। সিগন্যাল পাহারায় থাকা ট্রাফিক পুলিশও নিরুপায়। এম্বুলেন্সের ভেতরে রোগীর অবস্থা যায় যায়। আর অপেক্ষা করতে পারছে না স্বজনরা। কিন্তু কিছু যে করারও নেই।
সামনের গাড়ির চাকা বন্ধ। সিগন্যালে একের পর এক লাল, নীল বাতি জ্বলছে। কিন্তু গাড়ি চলছে না। আর চলবেই বা কীভাবে? সিগন্যালের সামনে গাড়ি চলার জায়গা নেই। যানজটে কলাপস হয়ে আছে রাজপথ। শনিবার বিকাল ৫টা। কাওরান বাজার মোড় থেকে পান্থপথ সিগন্যাল পর্যন্ত গাড়ির লম্বা লাইন। আধা ঘণ্টা পরেও সিগন্যাল ছাড়ার নাম নেই। এই জটে আটকা পড়েছে দুটি এম্বুলেন্স। অনেকক্ষণ সাইরেন বাজিয়েও কাজ হয়নি। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। ফের বাজতে থাকে এম্বুলেন্সের সাইরেন। এক সময় একটি এম্বুলেন্স থেকে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। স্বজনরা কাঁদছেন। মুমূর্ষু রোগীদের   দ্রুত চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে নেয়ার পথে যানজট বড় বাধা। সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিতে না পারায় পথেই মৃত্যু হয় অনেক রোগীর। তাই তো হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তারদের বলতে শোনা যায়-বড্ড দেরি করে ফেলেছেন।
এখন আর কিছুই করার নেই। অথচ রাজধানীর যানজট এড়াতে এম্বুলেন্সের জন্য আলাদা লেন থাকলে চোখের সামনে রোগীদের এভাবে মরতে হতো না। অন্ততপক্ষে স্বজনরা বলতে পারতেন, চেষ্টা করেছি। ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু যানজটের কারণে সান্ত্বনার এ বক্তব্যটুকুও রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ট্রাফিক পুলিশের কথা- কখনও কখনও সিগন্যালের সামনের দিকে এম্বুলেন্স থাকলে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেন তারা। কিন্তু মাঝে পড়লে তাদের সে সুযোগ হয় না। কখনো কখনো উল্টো পথেও যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয় এম্বুলেন্সগুলোকে। যানজটের কারণে কত মানুষ সঠিক সময়ে হাসপাতালে না যেতে পেরে মারা গেছেন? তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে কখনো কখনো রাস্তায় রোগীর মৃত্যু হলেই আলোচনায় উঠে আসে।
গত বছর ২রা নভেম্বর রাজধানীর ওয়ারী ও শ্যামলী থেকে পৃথক দুই রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয়।  দুপুর ২টার দিকে ওয়ারীর আর কে মিশন রোড এলাকায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন এনামুল হক। তাকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে বাসা থেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ছুটেন মেয়ে এলিনা আক্তারসহ স্বজনরা। সেদিন যানজটে গুলিস্তানেই কেটে যায় আড়াই ঘণ্টা। গাড়ি থেকে নেমে বাবাকে কাঁধে-কোলে করে হাসপাতালে পৌঁছেন বিকাল সোয়া ৫টায়। চিকিৎসক জানান, কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
একই দিনে শ্যামলীর রিং রোডে লেগুনার ধাক্কায় আবদুল নামের এক ব্যক্তি আহত হলে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যান তারই চাচাতো ভাই মাহফুজুল আলমসহ কয়েকজন। সেখানে অবস্থা গুরুতর দেখে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ শেষে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা। এম্বুলেন্সে করে আহত ভাইকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটেন মাহফুজুল আলম। যানজটের কারণে সাড়ে তিনঘণ্টা পর পৌঁছেন দোয়েল চত্বর এলাকা পর্যন্ত। যানজটে আর এগুতে না পেরে রোগীকে একটা স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে ছুটেন তারা। কিন্তু ততক্ষণে আবদুল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে। ডাক্তার এসে এ কথাই জানালেন। স্বজনদের চিৎকারে হাসপাতালের বাতাস ভারি হয়ে উঠে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন মানবজমিনকে বলেন, রাস্তায় এম্বুলেন্স আটকে থাকার জন্য বিশেষ করে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো- অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অশিক্ষিত ড্রাইভার। আমি মনে করি অন্যান্য গাড়ির ড্রাইভারের চেয়ে এম্বুলেন্স চালকদের আরো প্রাপ্তবয়স্ক এবং ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। দেখা যায় এম্বুলেন্স ড্রাইভাররা রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় তাদের দায়িত্ববোধের বিষয়টা পুরোপুরি ভুলেই যায়। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, গাড়িতে রোগী না থাকলেও অনেক সময় ড্রাইভাররা সামান্য জ্যাম হলেও সাইরেন বাজায়। যা আস্তে আস্তে মানুষের চোখে পড়ে। আর এখন রোগী থাকলেও অন্যান্য গাড়িগুলো এম্বুলেন্সকে সাইড দেয় না। আমি মনে করি এসব বিষয়ে আগে এম্বুলেন্স মালিক সমিতির লোকদের কারণগুলো মনিটরিং করে সমাধান করা উচিত।
বাংলাদেশ এম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমাদের হিসাব মতে সারা দেশে বৈধ নম্বরের এম্বুলেন্স রয়েছে ১০ হাজার। এ ছাড়া আরো হাজার দুয়েক রয়েছে মাইক্রোবাস।
ওইগুলোও এম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যানজটের কারণে রাস্তায় প্রতিদিন অনেক রোগী মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকায় যানজটের মাত্রা অনেকটাই বেশি। এ কারণে প্রতিদিন বহু এম্বুলেন্স আটকে থাকে। যদিও রাস্তায় অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে এম্বুলেন্সগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এই সুযোগ নিয়ে রোগী না থাকলেও চালকরা খালি রাস্তায় অথবা জ্যামে পড়লে সাইরেন বাজায়। তাই এখন অন্যান্য গাড়িগুলো এম্বুলেন্সকে সাইড দেয় না। আর ট্রাফিক পুলিশও সিগন্যাল দেয়া বা ছাড়ার সময় এম্বুলেন্সগুলোকে অগ্রাধিকার দেয় না। মহাসড়কগুলোতে খালি এম্বুলেন্স পেলে পুলিশ বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করে। কখনো কখনো মামলা দেয়।   
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ট্রাফিক) যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, যানজট রোধে পুলিশ নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। তবে রাস্তায় রোগী বহনকারী এম্বুলেন্স থাকলে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আমাদের সব পয়েন্টে বলা আছে, যদি সিরিয়াস রোগীবাহী এম্বুলেন্স থাকে, সোজা পথে ছাড়া গেলে সোজাভাবে ছাড়তে হবে। প্রয়োজনে উল্টো পথে হলেও হাসপাতালে দ্রুত যেতে সহায়তা করতে হবে। বাস্তবে সেভাবেই আমরা কাজ করি। দ্রুত রোগী হাসপাতালে নিতে সহায়তা করতে আমাদের অফিসাররা খুবই মানবিক। এ ছাড়া বেশি সমস্যা হলে ৯৯৯ নম্বরে কল দিলেও তারা পুলিশ এবং ট্রাফিক পুলিশের কাছ থেকে সব ধরনের সুবিধার ব্যবস্থা পাবে। আর বেশি জ্যামের মধ্যে থাকলে তো কিছুটা কষ্ট করতেই হয়। 
এম্বুলেন্স চালক আবদুর রহিম বলেন, রোগী গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নেয়ার পথে যানজট হলে তো সমস্যাই হয়। কিন্তু তার আগে রোগীর পরিবারের ফোন পেয়ে তাদের ঠিকানা পর্যন্ত যেতেও যানজটে পড়তে হয়। যানজটে রোগী হাসপাতালে নিতে রাস্তায় দুই-তিন ঘণ্টা পার হয়ে যায়। এখন একজন লোক স্ট্রোক করার পর কত সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেন সে কথা ডাক্তাররা ভালো বলতে পারবেন। অনেক সময় দেখি অসুস্থ রোগী এম্বুলেন্সে বেঁচে আছেন কিন্তু হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার বলেন রোগী বেঁচে নেই।
এ প্রসঙ্গে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের ডাক্তার লেলিন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, নানা সমস্যা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসেন। একজন মুমূর্ষু রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা দেয়া জরুরি। এক্ষেত্রে দেরি হলে রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের উচিত নির্দিষ্ট কোনো হাসপাতালের কথা চিন্তা না করে কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া। এতে অন্তত রোগীর জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।

মুমূর্ষু রোগী, চিকিৎসা শুরু হতেই সময় লাগলো দুই ঘণ্টা by শুভ্র দেব

শনিবার বেলা সাড়ে ১২টা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে ভেসে আসছিল কান্নার শব্দ। কাছে গিয়ে দেখা গেল মধ্যবয়সী একজন এম্বুলেন্সে বসে কাঁদছেন, সঙ্গে তার স্ত্রীও। কাদতে কাদতে মোবাইল ফোনে কাউকে বলছিলেন, আমার ছেলেটারে আর বাঁচাতে পারবো না। আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি একটা ট্রলি পাচ্ছি না। কখন ট্রলি পাবো আর কখন তার চিকিৎসা শুরু হবে। কথা বলতে বলতে তিনি মূর্ছা যাচ্ছিলেন। পরে এক সাংবাদিকের সহযোগিতায় ট্রলির ব্যবস্থা হয়।
কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় নিউরো সার্জারি জরুরি বিভাগে। ভুক্তভোগী ওই বাবার নাম আবদুস সাত্তার আর অসুস্থ ওই রোগীর নাম তৌহিদ। ১০ বছর বয়সী এই শিশুর মাথায় গাছের আঘাত লাগে। কুমিল্লার হোমনা থেকে গুরুতর অবস্থায় তাকে নিয়ে আসা হয় ঢামেকে।
তৌহিদের বাবা আবদুর সাত্তার মনে করেছিলেন জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে তার ছেলের চিকিৎসা শুরু হবে। কিন্তু না জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে একটি সিটিস্ক্যান করতে দেন। স্লিপ নিয়ে জরুরি বিভাগের সিটিস্ক্যান রুমে গিয়ে জানা যায় দুপুর ২টার আগে সিটিস্ক্যান করা হবে না। মেডিকেল-২ থেকে করাতে হবে। মুমূর্ষু তৌহিদের অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল।
একটি ট্রলি দিয়ে ফের তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মেডিকেল-২ সিটিস্ক্যান রুমের সামনে। কাউন্টারে টাকা জমা দিয়ে রিসিট জমা দিলে দেখা যায় সেখানে আরো ১০-১২ জন রোগী অপেক্ষা করছেন। তাদের অনেকেই আগে থেকে ভর্তি ছিলেন। উপায়ান্তর না পেয়ে তৌহিদের বাবা কাঠ মিস্ত্রি আবদুর সাত্তার উপস্থিত একজন সাংবাদিকের সহায়তায় কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে বেলা ১টা ৪০ মিনিটে ছেলের সিটিস্ক্যান করান। সিটিস্ক্যানের ফিল্ম নিয়ে ফের জরুরি বিভাগে এলে চিকিৎসকরা অবস্থা সুবিধাজনক না হওয়াতে দুপুর ২টার দিকে তাকে নিউরো সার্জারির ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করার সুপারিশ করেন। ২০৪ নম্বর ওয়ার্ডে সেবিকারা দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে  তৌহিদকে গ্রহণ করেন। সেখানে পুনরায় ফাইলপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে ২টা ৪০ মিনিটে তৌহিদকে স্যালাইন পুশ করেন। গুরুতর আহত এই রোগী ঢাকা মেডিকেলে আসার প্রায় দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট পর প্রথম চিকিৎসা পায়। সরকারি চিকিৎসাসেবার জন্য দেশের সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠানে জরুরি সেবার এটাই চিত্র। এ অবস্থা শুধু শিশু তৌহিদের ক্ষেত্রে নয়। প্রতিদিনই এমন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে নিরীহ, গরিব সাধারণ রোগীদের।
গত ৬ই জানুয়ারি নতুন আঙ্গিকে ঢামেকের জরুরি বিভাগের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক। উদ্বোধনের দিন ঢামেক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, জরুরি বিভাগে ১৫ শয্যার একটি আধুনিক ও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা কেন্দ্র নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। এখানে রাখা হয়েছে ৪টি আইসিইউ বেড, ৬টি এইচডিইউ বেড ও ৫টি অবজারভেশন বেড। এই কেন্দ্রটির নাম দেয়া হয়েছে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টার। বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাসহ আহত রোগীদের ক্যাজুয়ালটি চিকিৎসার জন্য ৫ শয্যবিশিষ্ট একটি ক্যাজুয়ালটি অবজারভেশন কক্ষ রয়েছে। যেখানে ইসিজি, নেবুলাইজেশন, কার্ডিয়াক মনিটরসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। গাইনি এন্ড অবস ও শিশু রোগীদের কনসালটেশন কক্ষ নতুনভাবে করা হয়েছে। নিউরো সার্জারি ও হেড ইনজুরিসহ বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল রোগীদের জন্য একটি জেনারেল সার্জারি ও নিউরো সার্জারি জরুরি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এখানে ৩টি শয্যাসহ একটি মাইনর ওটি রয়েছে।
কেমিক্যাল দূষণজনিত রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য একটি ডিকন্টামিনেশন কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে আগত রোগীদের দ্রুত রোগ নিরূপণের জন্য এই কমপ্লেক্সে ১২৮ স্লাইস সিটি স্ক্যান মেশিন নতুনভাবে স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া ডিজিটাল এক্সরে, আল্টাসনোগ্রাফিসহ একপি মিনি প্যাথলজি ল্যাবরেটরি নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে যেকোনো মুমূর্ষু রোগীর দ্রুত রোগ নিরূপণ করে চিকিৎসা দেয়া যাবে। কিন্তু তৌহিদের বেলায় এমনটি দেখা যায়নি। পুরাতন রীতিনীতি মেনেই তৌহিদকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
জানতে চাইলে জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, জরুরি বিভাগের সিটিস্ক্যান রুম সার্বক্ষণিক খোলা রাখার কথা থাকলেও দুপুর ২টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। এ সময়টা মেডিকেল-২ এর জরুরি সিটিস্ক্যান খোলা রাখা হয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নতুন আঙ্গিকে জরুরি বিভাগ চালু করা হলেও এখনো সবকিছু চালু করা হয়নি। শুধুমাত্র উদ্বোধন করে রাখা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে নিউরো সার্জারি ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের নার্সিং স্ট্রেশনের সামনে রোগীর ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মধ্যবয়সী শাহিনা বেগম। কাছে যেতেই বললেন আপনি কি এখানকার। জবাবে না শুনে তিনি কিছুটা আশাহত হলেন। কাউকে খুঁজছেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, নিউরো সার্জারি ইউনিট ৩ অধীনে ২১ নম্বর বেডে আমার ছেলে হানিফ চিকিৎসাধীন রয়েছে। মাথার যন্ত্রণা ও খিচুনির কারণে তাকে ৭ই জানুয়ারি ভর্তি করা হয়েছে। ছেলেকে ইঞ্জেকশন দেয়ার সময় হয়েছে। কিন্তু প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। চিকিৎসক, নার্স কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না। শাহিনা বেগমের সঙ্গে আরো ১৫ মিনিট কথা বলার পর বিশ্রামাগার থেকে একজন ব্রাদার এসে হাজির হন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট পরে শাহিনা বেগম একজন ব্রাদারের দেখা পান।
নিউরো সার্জারি ইউনিট ২ অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন বরিশালের সোহাগ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে গত ১৩ই জানুয়ারি তাকে ভর্তি করা হয়েছে। সোহাগের শাশুড়ি রহিমা বেগম বলেন, পুরোপুরি ভালো হওয়ার আগেই আমাদের রোগীকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। মাথার আঘাত ভালো হয়েছে কিন্তু এখনো অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকে। কথা বলতে পারে না নিজের হাতে খেতে পারে না। আমরা চাই আরো ক’দিন রেখে তাকে ভালোভাবে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক নেই- যার কাছে গিয়ে পরামর্শ করে তাকে আরো কিছুদিন রাখা যাবে। যারা আছে তারা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না বলে জানিয়েছেন। রহিমা বলেন, শুক্রবার হলে কোনো চিকিৎসক আসেন না। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আছি কিন্তু কোনো ছুটির দিনে কেউ আসেন না। তাই রোগী নিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। চিকিৎসকের পাশাপাশি সেবিকাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এতগুলো রোগী অথচ ১-২ জন সেবিকা ছুটির দিনে দায়িত্ব পালন করেন।
মেডিকেল-২ এর মেডিসিন ওয়ার্ড ৭০২  নম্বর ওয়ার্ডের রোগী শিমুলিয়ার প্রভাষক এসএ হোসাইন বলেন, ছুটির দিনে কোনো চিকিৎসক আসেন না। সেবিকারা বসে বসে গল্প করেন। কোনো কাজে গেলে ধমক দিয়ে বলেন বেডে যান আসতেছি। ওষুধের দরকার হলে পাই না। ৮টার ওষুধ সকাল সাড়ে ১০টায় পাই। আয়া ভুয়ারা ঝাড়ি দেন। ওয়াশরুমে প্রবেশ করা কষ্টকর। ময়লা আবর্জনা দুর্গন্ধ। ময়লা রাখার কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই। যে যেখানে পারছে সেখানেই ময়লা ফেলছে। তিনি বলেন, বেডের নিচে, ওয়ার্ডের মেঝেতে ময়লা পড়ে থাকে। কেউ পরিষ্কার করে না। সাধারণ রোগীদের সঙ্গে নার্স থেকে শুরু করে আয়া পর্যন্ত খারাপ ব্যবহার করে।
শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অন্তত ২০টি ওয়ার্ড ঘুরে কোনো চিকিৎসকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এছাড়া বেশিরভাগ ওয়ার্ডেই সেবিকাদের উপস্থিতি কম ছিল। কিছু কিছু ওয়ার্ডের নার্সিং স্ট্রেশন পুরোপুরি ফাঁকা ছিল। বিভিন্ন ওয়ার্ডের ওয়ার্ড বয়রা দাবি করেন ছুটির দিনে কোনো সিনিয়র চিকিৎসকরা আসেন না। জরুরি প্রয়োজন হলে মোবাইল ফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ডিউটি ডাক্তাররা সব সময় থাকেন। যদিও তাদের দাবি অস্বীকার করেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগের ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডের রোগী হেমায়েত উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা বলেন, আমার বাবাকে নিয়ে অনেকদিন ধরে হাসপাতালে আছি। ছুটির দিন সিনিয়র জুনিয়র কোনো চিকিৎসকই আসেন না। রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেলেও পরামর্শের জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেবিকাদের বললে তারা কোনো দায়িত্ব বা পরামর্শ দিতে রাজি হন না। জেনারেল সার্জারি ২২২ নম্বর ওয়ার্ডের রোগীর স্বজন পারভিন বেগম বলেন, নার্সরা এসে বেশিরভাগ সময় মোবাইল ফোনে কথা বলে না হয় বিশ্রামাগারে গিয়ে দরজা আটকিয়ে রাখে। প্রয়োজন হলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বেশি ডাকাডাকি করলে ধমক দেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ খান আবুল কালাম আজাদ মানবজমিনকে বলেন, শুক্রবারে জরুরি অপারেশনসহ সবকিছুই হয়। সিনিয়র চিকিৎসকরা ছুটিতে থাকলেও অনকলে থাকেন। এছাড়া যাদের ভর্তি রোগী থাকে তারাই দায়িত্ব পালন করেন। ছুটির দিনে অন্তত ২০টি ওয়ার্ড ঘুরে কোনো ডিউটি ডাক্তারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। তবে এমন হওয়ার কথা না। যদি এরকম হয় সুনির্দিষ্টভাবে আমাকে জানাবেন। আমি আর পরিচালক মিলে বসবো। আমরা সিরিয়াসলি বিষয়টি দেখবো। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে কাজ না করে উপায় নেই। এখানেই রোগীদের শেষ ভরসা। কাজ না করলে এত রোগী ম্যানেজ হয় কীভাবে। গাছের আঘাত পেয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় আসা শিশু তৌহিদের চিকিৎসা পেতে সময় লাগে ২ ঘণ্টারও বেশি। এ সময়ের ভেতরে তাকে কোনো চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ ছিল কি-না এমন প্রশ্নে- অধ্যক্ষ বলেন, অবশ্যই দেয়া যেত। এসবের জন্যই আমরা ওয়ানস্টপ ইমার্জেন্সি সার্ভিস চালু করেছি। এখানে রোগী এলেই ওয়ার্ডে যাওয়ার আগেই চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে নিউরো সার্জারির রোগীদের জন্য সুবিধা করা হয়েছে। মানুষকে আরো বেশি সুবিধা দেয়ার জন্য এগুলো করা হয়েছে। শিশু তৌহিদের নাম ঠিকানা দেয়ার অনুরোধ করে তিনি বলেন, আমি নিউরো সার্জারির খোঁজ নেবো- তার ক্ষেত্রে কি হয়েছিল? আমি খুব খুশি হবো আপনারা যদি সহযোগিতা করেন।
উল্লেখ্য, সরকারিভাবে দেশের চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বড় প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক)। ২ হাজার ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপে এমনিতে এখানকার চিকিৎসক ও কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়।

খাদ্যে ভেজাল দেয়াও এক ধরনের দুর্নীতি -প্রধানমন্ত্রী

খাদ্যে ভেজাল দেয়াকে এক ধরনের দুর্নীতি আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানুষের জীবন রক্ষায় খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল দেয়া বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সফলতা অর্জন করেছি, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। খাদ্যে ভেজাল দেয়াও এক ধরনের দুর্নীতি, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি। কারণ কোনো বিষ খেয়ে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক এটা আমরা চাই না। প্রধানমন্ত্রী গতকাল নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০১৯ উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যে ভেজাল দেয়াটা মনে হয় কিছু কিছু শ্রেণির মানুষের চরিত্রগত বদঅভ্যাস। এটা বন্ধ করতে হবে। এই ভেজাল খাদ্য খেলেতো মানুষের উপকার নয়, অপকারই হয়।
তিনি বলেন, দেশে ভেজাল খাদ্য বিরোধী অভিযান চলছে এবং এটিকে ভালোভাবে পরিচালনার জন্য আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছি এবং তাদের লোকবলের যে সমস্যা রয়েছে তা আমরা দূর করে দেব।
হাটে, মাঠে, ঘাটে সর্বত্রই যেন এই ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও নেবো। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে ভেজালের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে এসব বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। বিভিন্ন হোটেল-রেস্তরাঁয় ভেজাল, বাসি খাবার বা পচা খাবার সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে নাগরিক সচেতনতা একান্তভাবে দরকার। জনগণ যদি সচেতন হয় তাহলে তাদের এভাবে কেউ ঠকাতে পারবে না। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা একটু লাভ যদি নিতে চান লাভ নেন, কিন্তু ভালো জিনিসটা দেন, ভেজাল কেন দেবেন। মানুষকে ঠকিয়ে, মানুষের জীবন ধ্বংস করা, এটার কোনো অধিকার কারো নেই বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ইতিমধ্যে আমরা নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেছি এবং আমরা চাই আমাদের দেশের মানুষকে নিরাপদ খাদ্য দেবো। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা বিধান করার কথা বলেছি। নির্বাচনী ইশতেহার যথাযথভাবে পূরণ এবং সেটা আমরা বাস্তবায়ন করবো। এজন্য সকল বিভাগীয় শহরে সরকারের উদ্যোগে খাদ্যদ্রব্য পরীক্ষাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভেজাল রোধে খাদ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
আমাদের একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরি যেমন থাকবে তেমনি প্রতিটি বিভাগেও এর একটি করে শাখা থাকবে, যাতে করে যেকোনো জায়গায় যেকোনো ভেজাল খাবার যেন সঙ্গে সঙ্গে আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছেন সেই ভোটের মর্যাদা যেমন আমরা রক্ষা করবো, সেইসঙ্গে দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকেও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি খাদ্য সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের ভর্তুকিসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, এবারের নিরাপদ খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ-সবল জাতি চাই, নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নাই’ যা খুবই সময়োপযোগী। আমরা প্রথমবার সরকারে আসার পরই দেশে পুষ্টিহীনতা দূর করার জন্য নানা ধরনের প্রকল্প হাতে নিই। যদিও পরবর্তী সরকার এসে তা বন্ধ করে দেয়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ, সবজিতে তৃতীয় এবং মৎস্য উৎপাদনেও দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ।
এ সময় তার সরকার দেশীয় মাছ উৎপাদন গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জানিয়ে বলেন, ‘ডিম-মাংস উৎপাদনেও বিশেষ নজর দিয়েছি আমরা। আমিষ জাতীয় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কাজ করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্য চাহিদা কখনো শেষ হয়ে যায় না। যেহেতু আমাদের জমি বেশ উর্বর সেজন্য আমরা ফসল ফলানোর জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা দেশজুড়ে খাদ্য গুদাম নির্মাণ করেন, যাতে কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসল মজুদ করতে পারেন। আমরাও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কাজ করছি। সরকার নতুন করে দেশজুড়ে সাইলো তৈরি করে দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি, ২৭ লাখ টন খাদ্য মজুদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জনগণের পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টিকর খাবারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। মা-শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে অতি দরিদ্রদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মা যাতে তার শিশুর পরিচর্যা করতে পারেন সেজন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করে দিয়েছি। বলেন, একদিকে চিকিৎসা অপর দিকে পুষ্টিকর খাদ্য। এই দুটোর সমন্বয় হলেই আমাদের দেশের মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে।
আজকের শিশু আগামী দিনে যেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে পারে সেজন্য সরকার দরিদ্র মা বা কর্মজীবী মা এবং সন্তানসম্ভবা মায়েদের ভাতা প্রদান করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আবার সন্তান প্রসবের পর মা তার সন্তানকে যেন দেখলাভ করতে পারে তার জন্য আমরা ভাতা দিচ্ছি। যাতে করে ওই শিশুটা একটু হৃষ্টপুষ্ট হয়। আর হাটে-মাঠে-ঘাটেও যেন এই ভেজালবিরোধী অভিযানটা অব্যাহত থাকে। তার ব্যবস্থাও আমরা নিচ্ছি। ভবিষ্যতে আরো নেবো।
নৌকায় ভোট দিয়ে পুনরায় দেশ পরিচালনার সুযোগ দেয়ায় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে চলমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ কারো কাছে হাত পেতে চলবে না, বাংলাদেশ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলবে এবং উন্নত সমৃদ্ধ জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ ইনশাআল্লাহ আমরা গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এবং খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হক স্বাগত বক্তব্য দেন।

কলকাতা পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআইয়ের হানা

কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে নজিরবিহীন ভাবে সিবিআই হানা নিয়ে রোববার সন্ধ্যায় এক নাটকীয় পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। সিবিআইয়ের ডিএসপির নেতৃত্বে ৪০ জনের একটি দল কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে লাউডন স্ট্রীটে পুলিশ কমিশনারকে জেরা করতে তার বাড়ির সামনে এসেছিলেন। সেখানে পুলিশ আধিকারিকরা তাদের বাধা দেয়। সিবিআইয়ের কাছে প্রযোজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হয়েছিল। সিবিআই অফিসারা জানিয়েছেন, তাদের কাছে প্রযোজনীয় নথি রয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পরেই কলকাতা পুলিশের উচ্চ আধিকারিকরা সিবিআই আফিসারদের আটক করে সেক্সপীয়র রোড থানায় নিয়ে গিয়েছেন বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে সিবিআই অফিসারদের সঙ্গে কলকাতা পুলিশের আধিকারিকদের রীতিমত ধ্বস্তাষ¦স্তি হয়েছে। বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে, সিবিআই অফিসারদের মুক্ত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী যে কোনও সময় আসরে নামতে পারে।
সিবিআই অফিসারদের থানায় নিয়ে যাওয়ার পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজীব কুমারের বাড়িতে গিয়েছেন। সেখানে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইপিএস অফিসারও রয়েছেন বলে জানা গেছে। মনে করা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলার পরবর্তী রণকৌশল ঠিক করা নিয়ে বৈঠক চলছে। মুখ্যমন্ত্রী এদিনই সকালে  টুইট করে রাজীবকুমারকে নিয়ে মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর খবরের ব্যাপারে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতির সমালোচনা করে রাজীব কুমারকে বিশ্বের একজন সৎ ও সাহসী অফিসার বলে বর্ণণা করেছেন। অন্যদিকে এদিন বিকেলে সিবিআই আধিকারিকরা লাউডন স্ট্রিটে পৌঁছোনর ঠিক এক ঘণ্টা আগেই লালবাজারে কলকাতা পুলিশের সদর দফতরে বসে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (১) জাভেদ শামিম বলেছেন, রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের খবর ভুয়ো। যারা এই খবর ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর এক ঘন্টার মধ্যেই পুলিশ কমিশনারের সিবিআই হানা দেওয়ায় অনেকেই অবাক করেছে।  গত শনিবার থেকে জল্পনা চলছিল যে সারদা এবং রোজভ্যালি চিট ফান্ড মামলায় কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে জেরা করতে চায় সিবিআই। সংবাদ সংস্থা পিটিআই সিবিআই সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, সিবিআই অফিসারদের তরফে তাদের জানানো হয়েছে, রাজীব কুমারকে একাধিক বার হাজিরার জন্য নোটিস পাঠানো হলেও তিনি আসেননি। ‘সর্বশেষ উপায়’ হিসেবে গ্রেপ্তারের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপের সংস্থান আছে বলেও ওই অফিসারেরা ওই সংবাদসংস্থাকে জানিয়েছেন। এদিকে সল্টলেকে সিজিও কমপ্লেক্সে সিবিআইয়ের সদর দপ্তরের সামনে গোটা এলাকা ঘিরে রেখেছেন রাজ্য পুলিশের উচ্চ পদস্থ আধিকারিকরা। এছাড়া নিজাম প্যালেসে সিবিআইয়ের আরেকটি অফিস এলাকা এবং কোল ইন্ডিয়ার গেস্ট হাউসে সিবিআইয়ের জয়েন্ট ডিরেক্টরের বাড়ির সামনেও কড়া পুলিশ প্রহরা মজুত করা হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, যাতে নতুন করে কোনও সিবিআই আধিকারিক ঘটনাস্থলে যেতে না পারেন সেজন্যেই এই সিদ্ধান্ত। সিবিআই সুত্রে জানা গেছে, সারদা চিটফান্ডের মামলায়  ধৃত দেবযানি মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সিবিআই আধিকারিকরা জানতে পারেন সংস্থার মিডল্যান্ড পার্কের অফিস থেকে একটি লাল ডায়েরি এবং পেন ড্রাইভ অভিযানের সময় বাজেয়াপ্ত করেন কলকাতা পুলিশের আধিকারিকরা। সিবিআইয়ের দাবি, তদন্তভার হস্তান্তেরের সময় সেই ডায়েরি এবং পেন ড্রাইভ দাদের দেওয়া হয় নি। কোথায় গেল সেগুলি? তদন্তে এই বিষয়ে পুলিশ কমিশনার সঠিক উত্তর দিতে পারবে বলে মনে করছে সিবিআই।তবে সিবিআই যে পদ্ধতিতে পুলিশ কমিনারের বাড়িতে হানা দিয়েছিল তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নানা আইনি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এদিকে পুলিশ প্রধানের বাড়ি থেকে বের হয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এটি একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত।

নতুন প্রেমে হাবুডুবু সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেলের

নিজের থেকে ২৩ বছরের ছোট লিয়াম পাইনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন সুপারমডেল নাওমি ক্যাম্পবেল। এমন প্রেমকে ইংরেজিতে মাইন্ড ব্লোয়িং বা হৃদয় হরণকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। প্রেমে ডুবে তারা যে শুধু ভাবই বিনিময় করছেন তা নয়। সারারাত সমুদ্র সৈকতে কাটিয়েছেন ‍দু’জনে। যেখানে সেখানে তাদেরকে দেখা যাচ্ছে একসঙ্গে। তা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে। বলাবলি হচ্ছে, এমন সম্পর্ক শুধু প্রেম বা ভালবাসা নয়, এর পরিণতি গড়ায় বিছানায়। আর লিয়াম পাইনে এমন একজন তারকা যাকে নাওমি ‘ইটেন এলাইভ’ করে ফেলতে পারেন।
অর্থাৎ জীবিত গিলে খেতে পারেন। যারা বোদ্ধা তারা এর অর্থ বুঝে নিতে পারেন। দুই মাস ধরে তাদের এমন গোপন অভিসার। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া তো চুপ করে বসে নেই। অনবরত তারা এমন সব সুপারমডেলের পিছু নিয়ে থাকে। তারাই আবিষ্কার করে ফেলেছে সেই গোপন অভিসারের কথা।
লিয়াম পাইনে ২৫ বছর বয়সী ‘ওয়ান ডিরেকশন’ তারকা। আর নাওমি ক্যাম্পবেল ৪৮  বছর বয়সী সুপারমডেল। লিয়াম সম্প্রতি চুটিয়ে প্রেম করেছেন চেরিল টুইডির সঙ্গে। তাদের রয়েছে একটি সন্তান। অন্যদিকে নাওমি ক্যাম্পবেলকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। তিনি মাত্র কয়েকদিনে এক ফ্যাশনশোতে হাজির হয়ে সবার চোখ টাটিয়ে দিয়েছেন। এতে তিনি পরেছিলেন স্বচ্ছ পোশাক, যার ভিতর দিয়ে তার শরীরের প্রতিটি অংশ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। তো, ২৩ বছরের ব্যবধান থাকা এই যুগলকে সম্প্রতি লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে দেখা গেছে।  লিয়ামের বন্ধুমহল বলছেন, তাকে নাওমি তাজা গিলে খেতে পারেন। যেন তিনি নাওমির কাছে একটি খেলনা। গত মাসেও তাদেরকে একসঙ্গে ঘানায় নৈশভোজে দেখা গেছে। নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনে হুগো বসের মতো জায়ান্ট ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লিয়ামকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন নাওমি।

পুরো নগ্ন হয়ে ক্যামেরার সামনে কেন্দাল জেনার

ক্যামেরার সামনে পুরোপুরি নগ্ন হয়ে দাঁড়ালেন ২৩ বছর বয়সী মডেল কেন্দাল জেনার। এ সময় তার শরীরে পোশাক বলতে হাতে একজোড়া মেরিগোল্ড আর দু’পায়ে হাই হিল। ফটোগ্রাফার মার্ট অ্যালাসের ক্যামেরায় এভাবেই ধরা পড়েছেন কেন্দাল জেনার। ভৌগ ইতালি ম্যাগাজিনের জন্য তিনি এমন পোজ দিয়েছেন। আর সেই ছবি নিজের ইন্সটাগ্রাম পেজে শেয়ার দিয়েছেন ফটোগ্রাফার মার্ট অ্যালাস। ওই ছবিতে ‘কিপিং আপ উইথ দ্য কারদাশিয়ানস’ তারকা কেন্দাল জেনারের শরীরের অন্য কোথাও কোনো পোশাক বলতে কিছু দেখা যায় নি। শরীরে উপরের অংশ বা নিচের অংশ কোত্থাও না। তাকে দেখা গেছে একটি দরজার ফ্রেমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছেন।
ক্যামেরার দিকে পিছন ফেরা কেন্দাল জেনার। কাঁধের ওপর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার দিকে।  কোনো কোনো ছবিতে তাকে ভারি মেকাপে দেখা গেছে। তার চুলের স্টাইলকে মার্ট অ্যালার্ট ক্যাপশনে লিখেছেন ‘নক নক’।
এখানে বলা অপ্রয়োজনীয় যে, মার্ট অ্যালার্টের অনুসারীরা রগরগে ওই ছবি পেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছেন। তারা নানা রসালো কমেন্ট লিখছেন এতে। একজনতো লিখেছেন, হলি বুটিÑ আমি আপনাকে বলছি। আমার পরবর্তী জীবনে আমি আপনার হতে চাই। আরেকজন লিখেছেন, কেন্দাল জেনারের গর্জিয়াস শরীরে চমৎকার আলো ছড়াচ্ছে। বিস্ময়কর। আরো একজন লিখেছেন, আমার প্রিয় তিনি। কেন্দালকে চমৎকার দেখাচ্ছে। তাকে নিয়ে আমি ভীষণ গর্বিত।
এর আগে ভৌগ ইতালি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদের একটি ছবি শেয়ার করেছিলেন কেন্দাল জেনার। সে সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, এটা তার অন্যতম প্রিয় ফটোশুট। জীবনে যত ফটোশুট করেছেন ওই ফটোশুট ছিল তার অন্যতম সেরা। কেন্দাল আরো লিখেছিলেন, আমি আপনাদের জন্য সময় নষ্ট করতে চাই নি। স্বপ্ন সত্য হয়েছে। উল্লেখ্য, ভৌগ ইতালি ম্যাগাজিন এই তারকার সাক্ষাতকার নিয়েছে। তা ওই ম্যাগাজিনে প্রচার হওয়ার কথা ৫ই ফ্রেব্রুয়ারি।

আর কতদিন কাঁদবেন কান্দুরা বেওয়া

ভিখারিনী কান্দুরা বেওয়া। প্রকৃত বয়স প্রায় ৮৫ বছর। এনআইডি কার্ডে তার বয়স ধরা হয়েছে ৭১ বছর। বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার একটি গ্রামে লাঠি ভর করে ভিক্ষাবৃত্তি করছিলেন কান্দুরা বেওয়া। এসময় দেখা হয় তার। সাংবাদিক জেনেই কথা বলতে আগ্রহী হন কান্দুরা বেওয়া। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, “মোর শরিল আর চলে না বাহে। ট্যাকা-পসার অভাবে অসুক হলেও অসুধ কিনে খাতে পাম না।
মোর একনা বেটা ছাওয়াল তামারও সংসার চলে না বাবা। বউ নিয়্যা বালুগাঁও কাম করে খায়। অসুক শরিল নিয়ে মুই আর ভিক্ষাও করতে পাম না। মোর একনা ভাতা কাট করি দেও বাহে। তোমার বেটা-বেটির জন্নে আল্লার কাছে দোয়া করিম।” এভাবেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কান্দুরা বেওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদকের কাছে আকুতি জানান একটা বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতা কার্ডের জন্য। গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার ৪নং জামালপুর ইউনিয়নের বুজরুক রসুলপুর গ্রামের (পিরোজপুর) মৃত মহির উদ্দিনের স্ত্রী এ হতদরিদ্র, বিধবা কান্দুরা বেওয়ার ভাগ্যে আজও জোটেনি বয়স্কভাতা কিংবা বিধবাভাতা কার্ড। ফলে নানা অভাব-অনটনের মধ্য দিয়েই খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন তিনি। শেষ বয়সে একটি ভাতা কার্ডের প্রত্যাশা করেন কান্দুরা বেওয়া। বৃদ্ধা এই কান্দুরা বেওয়ার এক সময়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ভিক্ষা করে দিনাতিপাত করতো। এখন চোখেও দেখেন কম। এমনকি লাঠিতে ভর দিয়েও চলতে পারে না। দিন-রাত প্রায় বিছানায় তিনি শয্যাশয়ী। সম্প্রতি কান্দুরা বেওয়ার সারা শরীরে নানা অসুখে বাসা বেঁধেছে। ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই। সেই সঙ্গে অর্থ সংকটে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন্‌ও জোটে না তার।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী কান্দুরা বেওয়ার জন্ম তারিখ ১৯৪৮ সালের ১৪ই নভেম্বর। প্রায় ১৫ বছর আগেই স্বামী মহির উদ্দিরকে হারিয়ে বিধবা হয়েছেন। সেই থেকে ছেলে ও মেয়েদের নিয়ে নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছেন। যদিও মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। আর একটিমাত্র ছেলে জেলার বাইরে দিনমজুরি করে যা রোজগার করে তা দিয়েই তাদের সংসার চলে না। তবে মৃত্যুর আগেই একটি ভাতা কার্ডের আকুতি জানান কান্দুরা বেওয়া। এদিকে কান্দুরা বেওয়ার অভিযোগ, বিধবা ও বয়স্কভাতা কার্ডের জন্য জামালপুর ইউনিয়র পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারের নিকট দু’বছর ধরে  ঘুরেও কোনো কাজ হয়নি। তার অসহায়ত্বের কথা কেউ শোনে না বলে জানান তিনি। জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মণ্ডল বলেন, বৃদ্ধা কান্দুরা বেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

শিক্ষকদের এ কেমন ভুল! by ইব্রাহিম খলিল

এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো গেলেও অব্যবস্থাপনা ঠেকানো যায়নি। পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বশীল শিক্ষকরা ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছে চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন সাত কেন্দ্রের কিছু কক্ষে। এতে বিপাকে পড়েছে প্রায় তিন শতাধিক পরীক্ষার্থী। 
তবে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেয়ায় শিক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না বলে আশ্বস্ত করেছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। ভুলের কারণ জানতে সাত কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিবদের তিন দিনের মধ্যে কারণ জানাতে শোকজ করা হয়েছে বোর্ডের পক্ষ থেকে।
শোকজ হবে, শোকজের জবাবও হবে। কিন্তু ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষা দিতে এসে যদি ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিতে হয়- এটা কেমন হলো? এটা কেমন ভুল শিক্ষকদের? কেমন দায়িত্বশীলতা? এমন হাজারো প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে।
বিশেষ করে সাতটি কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক মহলের মাঝে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। কেন্দ্রগুলো হচ্ছে-ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যাল মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, পতেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়, গরীবে নেওয়াজ উচ্চ বিদ্যালয় এবং কক্সবাজারের পেকুয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উখিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।
এসব কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্র বিলি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ দেয়ার পরও অনেক কেন্দ্রের পরিদর্শকরা প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করে দেয়নি।
এসব পরীক্ষা কেন্দ্রে বাস্তবে কি হয়েছিল জানতে চাইলে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কেন্দ্র সচিব ও প্রধান শিক্ষক সাহেদা বেগম বলেন, আমাদের পরীক্ষা কেন্দ্রের কয়েকটি কেন্দ্রে ভুলক্রমে গত বছরের প্রশ্নপত্র বিলি হয়েছে। এতে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের গত বছরের সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। আমাদের হিসেবে তা ১৯ জন হতে পারে। তবে ১৪ জন শিক্ষার্থী রিপোর্ট করেছে।
কেন এমন হলো- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুলক্রমে গত বছরের সিলেবাসের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটটি নিয়মিত প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের সঙ্গে মিশে যায়। এতেই সমস্যা হয়েছে।
বোর্ডের নির্দেশনা রয়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীরা থাকতে পারবে না-তাহলে কি আপনার কেন্দ্রে নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের একই কক্ষে সিট বসানো হয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, শুধুমাত্র এফ গ্রেডের শিক্ষার্থীদের আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। এতে কি বোর্ডের আদেশ ভঙ্গ হলো না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটু ভুল হয়ে গেল।
একই অভিযোগ অন্যান্য পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতেও। নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের কাছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র বণ্টন করা হয়েছে। তবে এ ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র বাংলা প্রথম পত্রের নৈর্ব্যত্তিক প্রশ্নপত্রে। সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে কোনো সমস্যা হয়নি।
কেন এমন ঘটলো- জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান বলেন, এবারের পরীক্ষায় ২০১৬, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের সিলেবাসের পরীক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছে। নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নপত্র বণ্টন নিয়ে সমস্যা হতে পারে বিবেচনা করে আমরা অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের পৃথক রুমে সিট বসানোর জন্য কেন্দ্র সচিবদের নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, বোর্ডের আওতায় ১৯০ পরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে সাতটি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও এ সমস্যা হয়নি। ওই সাত কেন্দ্রের সচিবরা নির্দেশনা না মানার কারণেই এ সমস্যা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র বিলি করার সময় কক্ষ পরিদর্শক তো দেখছেন এটি কোন্‌ সালের পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রশ্নপত্র। তারপরও কেন এমন হলো- জবাবে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অবশ্যই কক্ষের পরিদর্শকরা দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এখানে শিক্ষকের দায়িত্ব এবং অজ্ঞতারও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এ ছাড়া পরিদর্শক প্রশ্নপত্র পরিবর্তন করে দিতে পারতেন। এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষার্থীরা বলার পরও অনেক কক্ষ পরিদর্শক তা পরিবর্তন করে দেননি।
এ বিষয়ে বোর্ডের পদক্ষেপ কি জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান বলেন, আমরা তিন কার্যদিবসের মধ্যে পুরো ঘটনা জানাতে কেন্দ্র সচিবদের নোটিশ দিয়েছি। তাদের শোকজ করা হয়েছে। কোন কোন শিক্ষার্থী ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের রোল নম্বর চাওয়া হয়েছে। সবকিছু পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে প্রায় ৩০০ পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে হয়তো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
এই পরীক্ষার্থীদের ভাগ্যে কী ঘটবে-উত্তরে তিনি বলেন, তাদের আশঙ্কা বা চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। পরীক্ষার্থীরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।