Thursday, August 1, 2013

এক বিচারপতির প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ by আসিফ নজরুল

বিচারপতি খায়রুল হক নানা কারণে আলোচিত ছিলেন। প্রথা ভেঙে প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিচারপতি থাকা অবস্থায় তিনিসহ অন্য কয়েকজন বিচারপতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। তাঁর আচরণের চেয়েও বেশি বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল তাঁর কয়েকটি রায়। তিনি অনেকাংশে রাজনৈতিক একটি বিষয়কে আদালতের আওতাধীন করে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক নন বলে রায় দিয়েছিলেন। এই রায় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি অংশকে যেমন প্রীত করেছিল, অন্য অংশকে তেমনি ক্ষুব্ধ করেছিল।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী রায় প্রদান করে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন, অথচ একই মামলায় সামরিক ফরমানবলে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের জন্য প্রদত্ত কিছু সুবিধা বহাল রেখেছেন। অবসর গ্রহণ করার কয়েক দিন আগে তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করায় দেশে রাজনৈতিক সংঘাতের পথ উন্মুক্ত হয়। এই মামলায় নিজেরই দেওয়া সংক্ষিপ্ত আদেশ থেকে বিতর্কিতভাবে সরে এসে তিনি যে রায় দেন, তা ছিল আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক পাসকৃত পঞ্চদশ সংশোধনীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
তাঁর অনেক রায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য সুবিধাজনক বা এর সমর্থনসূচক। এসব রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, প্রশ্ন উঠেছিল তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়েও। তিনি নিজে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানাভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁকে প্রধান বিচারপতি করা হয়েছিল কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে। প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ত্রাণ তহবিলের টাকা গ্রহণ করে নিজের চিকিৎসা করে তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর রায়ের সঙ্গে তাঁর প্রতি সরকারের বিশেষ সুদৃষ্টির সম্পর্ক নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন অস্বস্তিকর সন্দেহ ছিল। এই সন্দেহ তিনি সম্প্রতি আবারও উসকে দিলেন তাঁর অবসর গ্রহণের প্রায় দুই বছর পর আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করে।
বিচারপতি হকের আগে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে আরও কয়েকজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু তাঁরা বিচারপতি হকের মতো আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন না। তাঁদের কেউ নিজের বিভিন্ন রায়ে এমন অবস্থানও গ্রহণ করেননি, যার পরিপ্রেক্ষিতে অবসর-পরবর্তী কোনো সরকারি নিয়োগ অনৈতিক মনে হতে পারে।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বিচারপতি হকের নিয়োগ গ্রহণ তাই প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁর নিয়োগ ভবিষ্যতে আইন কমিশন কর্তৃক কোনো সাংবিধানিক বা আইনি প্রশ্নে সুপারিশ দেওয়া হলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করবে। এটি উচ্চ আদালতে বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী সময়ে নিয়োগ-সুবিধাদির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার নতুন তাগিদও সৃষ্টি করেছে।
দুই
উচ্চ আদালতের কোনো বিচারকের অবসর গ্রহণের পর পুনরায় সরকারি চাকরিতে তাঁর নিয়োগকে ১৯৭২ সালের সংবিধানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। গণপরিষদ বিতর্কে চাকরিকালীন বিচারকদের নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য এটি প্রয়োজন বলে অভিমত দেওয়া হয়। আবদুল বারী শিকদার বনাম বাংলাদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয় যে যদি অবসরের পর বিচারকদের সরকারি কোনো পদে নিয়োগের বিধান থাকে, তাহলে বিচারকেরা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের দিকে চোখ রেখে কর্তৃপক্ষগুলোর পক্ষে রায় দিতে প্রভাবিত হতে পারেন (২০০৫ সালে মানবজমিন বনাম বাংলাদেশ মামলায় অনুরূপ পর্যবেক্ষণ করা হয়)। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৭ সালের এক সামরিক ফরমানবলে সম্ভবত এই সম্ভাবনাকে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের অবসর-পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় (জুডিশিয়াল অর কোয়াসি-জুডিশিয়াল) পদে সরকারি চাকরিতে (প্রজাতন্ত্রের কর্মে) নিয়োগদানের বিধান করা হয়। ১৯৯৬ সালে বিচারকদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগদানের বিধানও করা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান পদে বিচারপতিদের নিয়োগ রাজনৈতিক সমঝোতাপ্রসূত একটি বিষয় ছিল এবং এই পদটি প্রচলিত অর্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত পদের মতো নয়। তবু বিচারপতি খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় এই পদে বিচারকদের অবসর-পরবর্তী সময়ে নিয়োগ উচ্চ আদালতের নিরপেক্ষতার জন্য হুমকিস্বরূপ হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁরই নির্দেশক্রমে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে বিচারকদের অবসর গ্রহণ করার পর প্রজাতন্ত্রের সব ধরনের কর্মে নিয়োগকে অবৈধ করা হয়, যদিও এ-সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট উল্লেখ তাঁর রায়ে ছিল না।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদে তাঁর নিয়োগ গ্রহণ স্ববিরোধিতামূলক। তিনি পঞ্চম সংশোধনী মামলায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালের সব সামরিক আদেশ ও ফরমানকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেন। অবৈধ ঘোষিত ফরমানবলে প্রতিষ্ঠিত অবসর-পরবর্তী নিয়োগ-সুবিধা তিনি অন্তত নিজে গ্রহণ করতে পারেন কি না, এই প্রশ্ন তাই করা যেতে পারে। তা ছাড়া যে বিবেচনায় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিচারপতিদের নিয়োগ অনাকাঙ্ক্ষিত মনে করেন, সেই একই বিবেচনায় তাঁর কর্তৃক একটি লাভজনক নিয়োগ গ্রহণ নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমাকে দেওয়া মিজানুর রহমান খানের তথ্যানুযায়ী বিচারপতি হক তাঁকে একবার বলেছিলেন যে তাঁর কোনো একটি রায়ে তিনি অবসর গ্রহণের দুই বছরের মধ্যে কোনো সরকারি নিয়োগ গ্রহণ অনুচিত বলেছিলেন। তাহলে কি দুই বছর সময়কাল পূরণের জন্য ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর থেকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদটি খালি রাখা হয়েছিল তাঁকে নিয়োগদানের লক্ষ্যকে সামনে রেখে?
তিন
পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসারে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের প্রজাতন্ত্রের বিচারিক বা আধা বিচারিক কর্মে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্যপদে নিয়োগ বিচারিক বা আধা বিচারিক পদে নিয়োগ কি না, এ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা যায়।
বাংলাদেশ আইন কমিশন আইন, ১৯৯৬ অনুসারে আইন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয় অচল আইনগুলো বাতিল, প্রচলিত অন্যান্য আইন সংস্কার এবং ক্ষেত্রবিশেষে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করার জন্য। এসব কাজের কোনোটিই সরাসরিভাবে বিচারিক বা আধা বিচারিক নয়। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্যপদে নিয়োগ ও অপসারণ-প্রক্রিয়ার মধ্যেও এমন কোনো প্রতিফলন নেই। নির্বাচন কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলির মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি বা অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের মতো আধা বিচারিক কার্যাবলি অন্তর্ভুক্ত এবং এসব পদে অপসারণ-প্রক্রিয়াও উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ-প্রক্রিয়ার অনুরূপ। অন্যদিকে, আইন কমিশনের নিয়োগ বা অপসারণ এককভাবে সরকারের নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছাধীন। কমিশনের কার্যাবলি এবং এতে নিয়োগ বা এ থেকে অপসারণ—কোনো প্রক্রিয়ার মধ্যে বিচারিক বা আধা বিচারিক বৈশিষ্ট্যগুলো নেই। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বা সদস্যপদে বিচারপতিদের নিয়োগ নিয়ে তাই প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে বিচারপতি খায়রুল হকের মতো পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে কিছু মহল থেকে সমালোচিত কোনো বিচারপতিকে স্পষ্টভাবে বিচারিক বা আধা বিচারিকও নয়, এমন পদে নিয়োগ তাঁর প্রতি সরকারের বিশেষ সুদৃষ্টি কি না, এ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা যেতে পারে। এমনকি এই ‘সুদৃষ্টি’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মামলায় বর্তমান সরকারের পছন্দ মোতাবেক রায় প্রদানের স্বার্থে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের (নিজের সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদানে অস্বাভাবিক সময় গ্রহণ, পূর্ণাঙ্গ রায় একবার ফেরত নিয়ে তাতে আবারও পরিবর্তন আনা) পুরস্কার কি না, এ প্রশ্নেরও উদ্রেক করতে পারে।
চার
বিচারপতি খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের ৩১১ ও ৩১২ নম্বর পৃষ্ঠায় তাঁর একটি সন্দেহের কথা লিখে গেছেন। ২০০১ সালের ১১ জানুয়ারির এই ঘটনায় আপিল বিভাগে একজন বিচারকের নিয়োগের প্রতিবাদে একদল আইনজীবী (সম্ভবত বিএনপিপন্থী) করিডরে শুয়ে পড়ে তাঁদের ক্ষোভ জানাতে থাকেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি (বিচারপতি লতিফুর রহমান) তাঁদের সরে যাওয়ার অনুরোধ করতে অনীহা প্রকাশ করলে জাজেস লাউঞ্জে প্রায় ৫০ জন বিচারককে অন্তত দুই ঘণ্টা আটক থাকতে হয়। উল্লিখিত প্রধান বিচারপতি পরে নিয়মানুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ লাভ করেন। খায়রুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তাঁহার অবচেতন মনে প্রধান উপদেষ্টা হইবার আকাঙ্ক্ষাই কি তাঁহাকে প্রয়োজনীয় দৃঢ় পদক্ষেপ লইতে বাধা সৃষ্টি করিয়াছিল? তাঁহার মানসিক অবস্থান জানা সম্ভব নয়, কিন্তু ইহা একটি সম্ভাবনা বটে। নিশ্চিত হইবার প্রয়োজন নাই, এইরূপ সম্ভাবনাই বিচার বিভাগের জন্য সম্মানহানিকর এবং স্বাধীনতার পরিপন্থী।’
বিচারপতি লতিফুর রহমান শুধু বিক্ষোভরত আইনজীবীদের সরে যেতে বলেননি বলে বিচারপতি খায়রুল হকের এমন সন্দেহ হয়েছিল এবং তিনি তা তাঁর রায়ে লিখিতভাবে দেশবাসীকে জানিয়েছেন। তাঁর কাছে আমাদের বিনীত প্রশ্ন, সিনিয়রদের ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি পদে তাঁকে নিয়োগের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল প্রশ্নে তিনি যেভাবে নিজের সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বর্তমান সরকারের পঞ্চদশ সংশোধনীর অনুরূপ রায় দিয়েছেন, তাতে তাঁর ক্ষেত্রেও কি অনুরূপ সন্দেহ প্রকাশ করার অবকাশ নেই? বিশেষ করে অবসর গ্রহণের পর তিনি বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রধান বিচারপতির মর্যাদা ও সুবিধা নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে ‘পুরস্কৃত’ হওয়ার পর এই সন্দেহ কি আরও প্রগাঢ় হওয়া স্বাভাবিক নয়?
আইন কমিশনের একটি কাজ হচ্ছে সরকার কর্তৃক প্রেরিত আইনি বিষয়ে সুপারিশ করা। ফলে ভবিষ্যতে নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনি জটিলতা নিয়েও সরকার কমিশনের কাছে কোনো সুপারিশ চাইতে পারে। আমার আশঙ্কা, কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বিচারপতি খায়রুল হকের নিয়োগের কারণে কমিশনের কোনো সুপারিশ নতুন রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর নিয়োগ রাজনৈতিক বিষয়গুলোয় তাঁর রায়গুলোর গ্রহণযোগ্যতাকেও নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বিচারপতি খায়রুল হক শুধু একা নন। সরকারের সুদৃষ্টি পেয়েছেন এবং সরকারের অনুকূলে রায় দিয়েছেন এমন বিচারক আরও কেউ কেউ ছিলেন এবং আছেন বিচার বিভাগে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দুদক by এমএইচ খান মঞ্জু

দুর্নীতি দমন ব্যুরো দিয়ে কার্যকরভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ তথা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না বিধায় যুগের প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক গঠন করা হয়। কিন্তু সরকারের নানামুখী হস্তক্ষেপ ও হিসাব-নিকাশের জাঁতাকলে পড়ে দুদক আরেকটি নখদন্তহীন শ্বেতহস্তী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দুদককে নিজের মতো করে ব্যবহার করায় তা এখন আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নেই। দুর্নীতি ও দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকার সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বদলে নিজেদের মনগড়া ব্যবস্থা চালু করে নিজেরা দুর্নীতির দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ার নানা নির্লজ্জ কসরত চালিয়ে আসছে। দুদক যে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ সে সম্পর্কে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান কিছু মূল্যবান পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমি যোগদানের পর তিন মাস পর্যবেক্ষণ করি, দুদকের মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী। তখন দেখতে পাই, একজন ব্যক্তির মামলা ছাড়া আর কোনো মামলার রায় দুদকের পক্ষে আসেনি। কারও শাস্তি হয়নি। আমাদের আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থের বিনিময় থাকলে বিচার ঝুলে যায়। আইনের এ প্রক্রিয়া যতদিন থাকবে, ততদিন দুদক দন্তহীন বাঘই থাকবে। দুদক চেয়ারম্যানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বলতে হয়, দুদক আসলে কাগুজে বাঘ। কারণ আমরা দেখেছি পদ্মা দুর্নীতি, হলমার্ক, ডেসটিনির মতো প্রতারণার ঘটনায় দুদকের কঠোর হুশিয়ারির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে আÍগোপনে চলে গেছেন। দুদকের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের হইচইয়ের কারণে জামিন পাওয়া অপরাধীদের আবার ধরার জন্য র‌্যাব ও পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের অনেক আশা ছিল। দেশের সর্বগ্রাসী দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ মানুষ মনে করেছিল, নির্মূল না হোক, অন্তত কমে আসবে দুর্নীতি। কিন্তু তা যে হয়নি সেটা প্রতি বছর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান জানিয়ে দেয়। তাই মানুষ একটা শক্তিশালী ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনের উপস্থিতি চায় দেশে। কিন্তু দুদকের কাছে মানুষের বড় আকাক্সক্ষার জায়গা যেটা, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রতিরোধ, সেখানে তারা হতাশার কারণ হচ্ছে।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলায় সংস্থাটি প্রধান সন্দেহভাজন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে একবেলা কথা বলেই তাকে ‘নির্দোষ’ সনদ দিয়েছিল। সাবেক রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে পাওয়া প্রায় ৭০ লাখ টাকার বিষয়েও একই ঘটনা ঘটেছে। অথচ পরের ইতিহাস সবাই জানেন। দুদকের সেসব বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত যে মোটেই সঠিক নয়, তা দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট। বর্তমান সরকারের আমলে দুদক সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতাগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।
পদ্মা সেতু দুর্নীতি
এ সরকারের আমলে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা ছিল পদ্মা সেতু দুর্নীতি। এই প্রকল্পে দুর্নীতির সন্দেহ করে বিশ্বব্যাংকের আশংকার পর পদ্মা সেতু দেশে-বিদেশে আলোচনায় উঠে আসে। আর আন্তর্জাতিভাবে দুদক আলোচনায় আসে, যখন দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু দুর্নীতির তদন্তে দুদকের কার্যক্রম যথাযথ হয়নি বলে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। অভিযোগ আছে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সুপারিশ অনুযায়ী দুদক কাজ করেনি। বিশেষজ্ঞ কমিটি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি দুদক।
মন্ত্রী সুরঞ্জিতের এপিএসের গাড়িতে ৭০ লাখ টাকা
রেলের নিয়োগ-বাণিজ্যের ৭৪ লাখ টাকা মন্ত্রীর বাড়িতে নেয়া হচ্ছিল বলে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান দাবি করেছিলেন। তাকে আজও খুঁজে পায়নি দুদক। এ ঘটনার তদন্তে প্রথম দিকে দুদকের গা ছাড়া ভূমিকা তখন ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এমনকি রেলমন্ত্রী ও তার এপিএসকে বাঁচানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল দুদকের বিরুদ্ধে।
হলমার্ক কেলেঙ্কারি
এ সরকারের আমলে একটি আলোচিত বিষয় ছিল সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্কসহ পাঁচটি কোম্পানির প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা। এ ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তের পর ফান্ডের এক হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে গত বছরের ৪ অক্টোবর হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের ২৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন এখনও জমা দিতে পারেনি দুদক।
ডেসটিনি গ্রুপের মানি লন্ডারিং
বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনির দুটি প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ও ট্রি-প্লান্টেশন লিমিটেডের তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে গত বছরের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় দুটি মামলা করে দুদক। এরপর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি দুদকের তদন্ত কমিটি।
বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি
বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। এ ঘটনায় পাঁচ ব্যাংকের ৬০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। গত ২৬ ফেব্র“য়ারি অনুসন্ধানের কাজ শুরু করে এ ঘটনায় গঠিত অনুসন্ধান কমিটি। বিষয়টির এখনও কোনো সুরাহা হয়নি।
আইনি জটিলতায় রানা প্লাজা ট্রাজেডির অনুসন্ধান
সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আবদুল খালেক ও মা মরজিনা বেগমের অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদকের অনুসন্ধান আইনি জটিলতায় থেমে আছে। সোহেল রানা ও তার বাবা জেলে থাকায় সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ করতে পারেনি দুদক।
জনগণ দুদককে নখদন্তযুক্ত হিংস কিংবা নখদন্তহীন কাগুজে বাঘ- এ দুইয়ের কোনোটির রূপেই দেখতে চায় না। জনগণ চায়, দুদক একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতি দমনে সুষ্ঠু ভূমিকা পালন করুক।
দুর্নীতি দমনে দুদককে কার্যকর করতে হলে এর আইনি সংস্কার খুবই জরুরি। আইনত এটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে কাজের কাজ কিছুই হবে না- শুধুই বিরোধী মতের মানুষকে দমনে এটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহত হবে। দুদককে শক্তিশালী করতে হলে এর আইনকে যুগোপযোগী করতে হবে। একে স্বাধীন করতে হবে। সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে বা সরকারের ইশারায় চললে বা বিরোধী দল বা মতকে দমনে এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করলে দুদক কোনো দিনই স্বাধীন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না। এটা জনগণের কাক্সিক্ষতও হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই এই বিষয়ের লোক নন। দুর্নীতি তদন্তের উচ্চতর কোনো অভিজ্ঞতা তাদের নেই, নেই দুর্নীতিবিষয়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা দুর্নীতি সংক্রান্ত অপকর্ম খতিয়ে দেখার যথাযথ যোগ্যতা। কেন জানি দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগ হচ্ছে ওই পদের জন্য উপযুক্ত বিশেষ কোনো যোগ্যতা ছাড়াই।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকে সত্যিকারের সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। দুদক যেন আবার কোনো অনির্বাচিত সরকারের সুযোগে অতি নখদন্তযুক্ত অথবা নির্বাচিত সরকারের আজ্ঞাবহ নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয়। এজন্য দুদককে যথার্থই একটি স্বাধীন ও দুর্নীতি দমনে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। জনগণ আশা করে, যাদের জন্য দেশ ও জাতিকে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়, দেশের সম্পদ ধ্বংস হয়, দেশের সুনাম নষ্ট হয়- তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য দুদক কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কাগজে কলমে নয়, বাস্তবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে দুদক।
এমএইচ খান মঞ্জু : সাবেক সংসদ সদস্য, গোপালগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল

ফলের রস আর কোমল পানীয়ের প্রতারণায় ক্রেতারা ঠকছে by আবম ফারুক

প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে বা যে কোনো টিভি চ্যানেলের সামনে বসলে বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়ের বিজ্ঞাপন আমাদের দেখতে হয়। ব্যবসায়ী তার উৎপাদিত পণ্যকে ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরবেন, তার গুণাগুণ বর্ণনা করবেন তাতে দোষের কিছু নেই। বরং এতে ক্রেতাদেরই সুবিধা। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাজারে যাওয়ার আগে ঘরে বসেই তো কোন পণ্যটি কিনবেন তার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বাজারে গিয়ে সহজেই পণ্যটি কিনে ফেলা যায় বলে সময় ও ঝামেলা থেকে বাঁচা যায়। বিজ্ঞাপন তাই পণ্যটির গুণাগুণ সম্পর্কে নানা তথ্য সরবরাহ করে তাকে আকর্ষণ করে, তার মনে আগ্রহ সৃষ্টি করে এবং পণ্যটি কিনতে তার মনে ইচ্ছা জাগায়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে প্রচারিত খাদ্য ও পানীয়ের বিজ্ঞাপনে আমরা কী দেখছি? আমাদের দেখা অধিকাংশ বিজ্ঞাপনই মিথ্যায় ঠাসা, ক্রেতাকে সঠিক তথ্য সরবরাহের বদলে এগুলো ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করে, যে লক্ষ্য বা চাহিদা নিয়ে পণ্যটি ক্রেতা কিনেছিল, তা না পেয়ে প্রতারিত হয়। উপরন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বিজ্ঞাপিত খাদ্য ও পানীয় তার স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে।
‘তাজা আমের রস’, ‘তাজা কমলার রস’, ‘আসল আমের মজা’ ইত্যাদি বলে যেসব বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, সেগুলোর অধিকাংশতেই শুধু তাজা আমের বা কমলার ছবিটাই থাকে, তাজা বা আসল ফলের কিছুই থাকে না। পানির সঙ্গে কিছু সিএমসির দ্রবণ, সরবিটল, ম্যানিটল, কৃত্রিম মিষ্টিকারক, প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম রং এবং আম বা কমলার কৃত্রিম সুগন্ধ- এই হল এসব ‘তাজা’ ও ‘আসল’ রসের ফর্মুলা। ‘কোনো কৃত্রিম রং নেই’ বলে যারা বিজ্ঞাপন দেন, তারা কিন্তু ক্রেতাকে জানাচ্ছেন না তারা শতকরা কতভাগ আসল আমের বা কমলার রস দিচ্ছেন। ‘হাতের স্পর্শ নেই বলে কোনো প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় না’ এ কথাটার মানে কি? প্রিজারভেটিভ কি হাত লাগলে ব্যবহার করতে হয়, নাকি জীবাণুর গ্রোথ ঠেকানোর জন্য? বিজ্ঞান বিষয়ে যাদের সাধারণ জ্ঞান আছে, তারাও এসব বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত হবেন। এসব বিজ্ঞাপনের কারণে মনে হয় ক্রেতাকে বিজ্ঞানও এখন আবার নতুন করে পড়তে হবে।
এসব বিজ্ঞাপিত ফলের রসে আসল ফলের রস না থাকায় আপনি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব কৃত্রিম ফলের রসে ওপরে বর্ণিত যেসব উপাদান দেয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে প্রধান ক্ষতিকারকগুলো হল কৃত্রিম রং, কৃত্রিম মিষ্টিকারক ও প্রিজারভেটিভ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে কৃত্রিম রং। কৃত্রিম মিষ্টিকারক খেলে মূত্রথলিতে ক্যান্সার, মায়োকার্ডিয়াল ক্যালসিফিকেশন অর্থাৎ সহজ কথায় হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া, করোনারি ভেসেলসের স্কে¬রোসিস অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের ধমনি-শিরাগুলো চর্বি জমে শক্ত হয়ে যাওয়া, রিনাল হাইপারপ্লেসিয়া অর্থাৎ কিডনি বড় হয়ে যাওয়া, ফুসফুস, লিভার এবং লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের টিউমার, ফটোসেনসিটাইজেশন তৈরি অর্থাৎ এটি খেয়ে রোদে বের হলে গায়ের রং কালো হয়ে যাওয়া, কোনো কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের বিশোষণে বাধা দেয় বলে কোনো কোনো জীবাণুজনিত অসুখ জটিল আকার ধারণ করা, ক্রোমোজমের ক্ষতি অর্থাৎ বাবা-মা এটি খেলে তাদের বিকলাঙ্গ বা অস্বাভাবিক বাচ্চা জন্ম নেয়া, গর্ভবতী মায়েরা এটি খেলে বাচ্চা ডাউনস সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি ক্ষতিকর প্রভাবের বৈজ্ঞানিক অভিযোগ রয়েছে।
দুই
আজকাল পত্রিকা ও টিভিতে দেশী-বিদেশী হরেক নামের কোলা পানীয়ের বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়া যায়। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, কোলাজাতীয় পানীয়গুলো শিশুদের ক্ষতি করে। অথচ এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে শিশু-কিশোররা প্রলুব্ধ হয়। কোলাজাতীয় পানীয়ে এদের কোনো উপকার না হয়ে বরং স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়ে থাকে। এ ধরনের পানীয়ে অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানের কথা বাদ দিয়ে শুধু ক্যাফেইনের কথাই ধরা যাক। এক কাপ চায়ে প্রায় ২০-২৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে, এক কাপ/মগ কফিতে থাকতে পারে ৫০ মিগ্রা পর্যন্ত ক্যাফেইন। অথচ কোনো কোনো কোল্ড ড্রিংকসের এক বোতল/ক্যানে থাকে ১০০ মিগ্রা পর্যন্ত ক্যাফেইন। আপনি আপনার বাচ্চাকে চা খেতে দেন না তার ক্ষতি হবে ভেবে। অথচ এই বাচ্চাকেই তার আবদারে বা আপনি নিজে থেকে অনায়াসে একটি কোল্ড ড্রিংকস কিনে দিচ্ছেন। তার মানে ক্যাফেইনের হিসেবে আপনি তাকে একেকবারে প্রায় ৪-৫ কাপ চা খেতে দিচ্ছেন। কোলা জাতীয় ড্রিংকস বাচ্চাকে কিনে দেয়ার চেয়ে বাচ্চাকে চা খেতে দিলে ক্ষতি কম হতো না কি?
বিজ্ঞাপনগুলো না দেখলে আপনি হয়তো বাচ্চাকে এসব কোলা ড্রিংকস্ কিনে দিতেন না, কিংবা আপনার বাচ্চাও হয়তো এগুলো খেতে চাইত না। বিজ্ঞাপনে ভুল মেসেজ দেয়া হচ্ছে। এগুলো যে শিশু-কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর (এবং বেশি খেলে বড়দের জন্যও), বিজ্ঞাপনে তা লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অবিশ্বাস্য ও নাটুকে সব কাণ্ডকারখানার চমকে পানীয়টি সম্পর্কে তার মনে একধরনের মোহময়তা তৈরি হয়। ফলে ক্রেতা অবচেতনভাবে এর দিকে হাত বাড়ায়, অবচেতনভাবে সে সেই অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মতো নিজেকে ভেবে এক ধরনের তৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, বিজ্ঞাপনের প্রতারণাকে সে আমলে নিতে চায় না।
অল্প ক্যাফেইন নিমিষে শরীরকে চাঙ্গা করে। নিয়মিত কোলাজাতীয় ড্রিংকস অর্থাৎ বেশি পরিমাণে ক্যাফেইন খেলে মেজাজ খিট্খিটে হয়ে যাওয়া, ঘুম কম হওয়া, ক্ষুধা কমে যাওয়া, প্রাত্যহিক খাবার ভালো না লাগা, কিডনিতে চাপ পড়ার কারণে ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, নেশা হওয়ার কারণে বারবার কোলাজাতীয় ড্রিংকস খেতে চাওয়া- এসব জটিলতা দেখা দেয়। তাছাড়া গভীর মনোযোগ প্রয়োজন হয় এমন কাজে অনীহা ও অক্ষমতা দেখা দেয়ার ফলে আপনার বাচ্চার লেখাপড়া কম করা, পরীক্ষায় খারাপ করা, বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজিতে গভীর মনঃসংযোগ প্রয়োজন হয় বলে এগুলোতে অনীহা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। বিজ্ঞাপনের মোহে পড়ে কোলাজাতীয় ড্রিংকস খুব অল্প বয়স থেকেই নিয়মিত ও ‘বেশি বেশি’ পছন্দ করার কারণে তার যে মানসিক অবস্থার সৃষ্টি হয় সেটি আসলে এক ধরনের নেশাই। বড় হলে সে যে আরও বড় কোনো নেশা করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ এসব কিছুই হয়তো ঘটত না যদি কোলাজাতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন তাকে প্রলুব্ধ না করত। আমরা তাই দাবি করছি, কোলাজাতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপনে শিশুদের ব্যবহার বা তাদের প্রলুব্ধ করা অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।
আমরা বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে বলছি না। আমরা শুধু বলছি, যা সত্য নয়, বিজ্ঞাপনে তা বলা বন্ধ হোক। মানুষকে বিভ্রান্ত করে নয়, বরং তাদের সঠিক তথ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হোক। সঠিক তথ্য জানা ভোক্তার একটি আন্তর্জাতিক ও জাতিসংঘ স্বীকৃত অধিকার। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যা কিছু ক্ষতিকর, তা প্রচারে সরকারের পক্ষ থেকে বাধা দিতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে এবং মানুষকে বিজ্ঞাপনের কোনো অসত্য প্রচারণা থেকে রক্ষা করতে সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে একটি বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি করা। বিজ্ঞাপন নীতিমালা থাকলে পত্রিকাগুলো এবং টিভি চ্যানেলগুলো কোন বিজ্ঞাপন প্রচার করবে আর কোনটা করবে না, তা নিজেরাই বাছাই করে নিতে পারবে। বিজ্ঞাপনে নীতিমালাবহির্ভূত কিছু থাকলে বিজ্ঞাপনদাতাকে তা সংশোধনের জন্য বলতে পারবে। প্রতারিত না হওয়ার ফলে বা স্বাস্থ্যহানি না ঘটায় মানুষের মধ্যেও একদিকে পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল, অন্যদিকে পণ্য উৎপাদকের প্রতি আস্থা বাড়বে। এর ফলে পণ্যের প্রতি বর্তমানের অনাস্থা ও অবিশ্বাস কেটে গেলে পণ্যের বাজারও বিকশিত হবে। সরকার এ রকম একটি কাজ করলে মানুষ নিশ্চয়ই ধন্যবাদ জানাবে।
তাই আসুন, বিজ্ঞাপনে ভুল মেসেজ দেয়া বন্ধের জন্য ভোক্তা হিসেবে জনস্বার্থে আমরা সবাই অবিলম্বে একটি কার্যকর বিজ্ঞাপন নীতিমালার জন্য সরকারের কাছে বলিষ্ঠ দাবি জানাই। ভোক্তা হিসেবে আমরা আমাদের এবং আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের উৎপাদকদের ভুল ও স্বাস্থ্যহানিকর বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ঠেলে দিতে পারি না। যেসব দেশে খাদ্যে নকল-ভেজাল মেশানো হয় না, সেসব দেশে খাদ্যপণ্যের অসত্য বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর কঠোর বিধিনেষধ থাকে। কারণ অসত্য বিজ্ঞাপনের ফলে ক্রেতা-ভোক্তা বিভ্রান্ত হয়, অসত্যকে সত্য বলে সরল মনে গ্রহণ করে। ইংল্যান্ডে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে ‘অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি’। এটি সেখানে অসত্য বিজ্ঞাপনের হাত থেকে ক্রেতা-ভোক্তাদের রক্ষা করে থাকে। ইংল্যান্ডে তাই খাদ্য ও পানীয়ের বিজ্ঞাপনের মান অত্যন্ত উঁচু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞাপনে অসত্য তথ্য দেয়ার ব্যাপারে সেখানকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ অত্যন্ত সতর্ক। আমাদের দেশে এরকম একটি এফডিএ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সেই ১৯৯৮ সাল থেকে দাবি জানিয়ে আসছি। জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে যত দ্রুত সম্ভব এটি হওয়া উচিত।
আ ব ম ফারুক : অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন by মোঃ মুজিবুর রহমান

২৮ জুলাই এক অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার মান সবচেয়ে খারাপ। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও দুর্বল মাধ্যমিক শিক্ষা।’ তিনি শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতেই। অনুষ্ঠানে সরকারের শিক্ষা বিভাগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালকও। মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন শুধু অর্থমন্ত্রীর একার নয়। আমার ধারণা, সাধারণ মানুষের মনেও মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। যেমন- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, স্কুলগুলোয় মানসম্মত পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, শিক্ষা উপকরণের অভাব, সরকারের দেয়া বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তে নোট-গাইডের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়া, স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করা ইত্যাদি। এত কিছুর পরও দেখা যাচ্ছে, প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ছে। এমনকি আগে যেসব স্কুল ও মাদ্রাসা থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করত না, এখন সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেও জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। পরীক্ষায় পাসের হার বেড়ে যাওয়ায় আমরা আশান্বিত। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে সবাই পাস করবে, এটা সব অভিভাবকই চান। তবে পরীক্ষায় কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, তা দিয়ে যেমন পরীক্ষার ফলাফলের পরিমাণগত দিক বোঝায়, তেমনি যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করছে তারা শিক্ষাক্রমে বর্ণিত শিখন অভিজ্ঞতা কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে কিংবা আদৌ অর্জন করতে পারছে কি-না, সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখার স্বার্থেই। পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেই যে গুণগত মান বাড়বে, এমনটি সব সময় সত্য বলে ধরে নেয়া যায় না। এ পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক শিক্ষার মান নিয়ে অর্থমন্ত্রীর অভিমত বিবেচনা করতে হবে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে।
মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানের সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়ে থাকে, তাতে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নানামুখী চাপে পড়ে কখনও কখনও অযোগ্য ব্যক্তিকেও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এভাবে শিক্ষক নিয়োগ হলে পরে একসময় চাপ আসে ওই শিক্ষকদের সরকারি বেতনের আওতায় (এমপিওভুক্তি) নিয়ে আসার জন্য। অর্থমন্ত্রী এমপিওভুক্তির বিষয়টিও সেদিনের আলোচনায় তুলে এনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদিও সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয় এ খাতে, কিন্তু এমপিও পদ্ধতি মাধ্যমিক শিক্ষাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আগামী ৫ বছর এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ (সমকাল, ২৯.০৭.১৩)। অর্থমন্ত্রীর অভিমত মেনে নিয়ে আমরা বলব, বর্তমানে যে পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হয়, তার পরিবর্তন জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ দেখা যায়, অযোগ্য ব্যক্তি একবার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেলে পরে কোনো না কোনো সময় এমপিওভুক্ত হয়ে যান। আবার সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমেও অনেক সময় অযোগ্য ও দুর্বল ব্যক্তিরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। ফলে শিক্ষার মানের আশানুরূপ উন্নয়ন ঘটে না। দুর্বল শিক্ষক দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন আশা করা যায় না। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকার এনটিআরসিএ’র (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করলেও এ প্রক্রিয়াটি মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে বলে মনে হয় না। কারণ এটি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক হিসেবে আবেদন করার যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয় মাত্র। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলে যাদের নিবন্ধন রয়েছে তারা আবেদন করতে পারেন। কিন্তু নিয়োগের বিষয়টি অনেক সময় চাপ প্রয়োগকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ করার আশংকা বেড়ে যায়। এভাবে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত হয় না। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বলই থেকে যাচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায় যখন দেখা যায়, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী ন্যূনতম নম্বর পেতে ব্যর্থ হয়। পড়ালেখার মান কী পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১১ সালের অনার্স পার্ট-১ পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে। ওই পরীক্ষায় শতকরা ৪৬ ভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এবং বহুসংখ্যক শিক্ষার্থী পাঁচটিরও বেশি কোর্সে ফেল করেছে। একপর্যায়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা প্রমোশনের জন্য আন্দোলন শুরু করলে পরীক্ষায় অবতীর্ণদের মধ্যে যারা সর্বোচ্চ ৫টি কোর্সে শতকরা ৪০ নম্বরের নিচে অর্থাৎ ‘এফ’ গ্রেড পেয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ বিবেচনায় শর্ত সাপেক্ষে ২য় বর্ষে প্রমোশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনার্স পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ফেল করল, এর সঠিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ পরীক্ষায় ফেল করা এবং পরবর্তীকালে প্রমোশন দেয়ার সঙ্গে উচ্চশিক্ষার মানের প্রশ্নটি জড়িয়ে রয়েছে গভীরভাবে। এখন খুঁজে দেখতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত গ্রেডিং পদ্ধতিতে কোনো ত্র“টি রয়েছে কি-না। কারণ ফেল করার দায় এককভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। শিক্ষার্থীরা যাতে ভালোভাবে পড়ালেখা করতে পারে, সে পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া এবং নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখন আমাদের ভাবতে হবে শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য কী কী উপায় অনুসরণ করা যায়। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে বলব, আগস্টে ওই সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সমিতি ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছে। এটি পেশাজীবী হিসেবে শিক্ষকদের সংগঠন হওয়ায় দেশ ও জাতি গঠনে এ সমিতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ সংগঠনের কাছে জাতির প্রত্যাশাও অনেক বেশি। আমরা আশ্চর্য হই যখন দেখি, এ ধরনের সংগঠন নির্বাচন উপলক্ষে দেশজুড়ে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে কিংবা কীভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজিত সমস্যা নিরসন করা যায়, সেসব বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের কোনো উদ্যোগ নিতে সচরাচর দেখা যায় না। এমনকি নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে মাঠপর্যায়ে তাদের কোনো তৎপরতাও তেমন একটা দেখা যায় না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি মাঝে মাঝে শুধু শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময়ের আয়োজন করত, তাহলে শিক্ষার মান নিয়ে আজ এত বড় প্রশ্ন উঠত না।
বর্তমান সরকার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোটি কোটি বই বিনামূল্যে বিতরণ করছে, একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে একটি দুরূহ কাজ হিসেবে মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ১৭ বছরের পুরনো শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করে আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করেছে, নবপ্রবর্তিত শিক্ষাক্রমের আওতায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া অব্যাহত রয়েছে। তারপরও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হলে কী করা দরকার, সে বিষয়টি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যরা ভেবে দেখবেন বলে আশা করি। প্রয়োজনে এসব বিষয় নিয়ে দেশজুড়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা যেতে পারে।
শেষ করার আগে শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের পদোন্নতি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার। কারণ ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকদের পদোন্নতির বিষয়টিও সেদিন আলোচিত হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ১৩শ বিসিএস পর্যন্ত অধ্যাপক, ১৮শ বিসিএস পর্যন্তদের সহযোগী অধ্যাপক এবং ২৪তম বিসিএসপ্রাপ্তদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে (দৈনিক যায়যায়দিন)। এখানে বলা দরকার, শুধু ১৩শ বিসিএস পর্যন্তদের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদান করা হলেও পদোন্নতির বাইরে থেকে যাবে পরবর্তী বিসিএসের আরও বহুসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক। এর মধ্যে দেখা যায়, ১৪শ বিসিএস পর্যন্ত অনেকেই সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির পর বর্তমানে প্রায় ৭ বছর ধরে একই পদে কর্মরত রয়েছেন। এমনকি অনেক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত রয়েছেন বহু বছর ধরে। এ অবস্থায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক পদে ২ বছরের এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ৩ বছরের কর্মকাল পূর্ণ হওয়ার পর যথাক্রমে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে শুধু ৭ বছর নয়, বরং আরও বেশি সময় ধরে অনেক শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক পদে এবং ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত রয়েছেন। বিশেষ করে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোয় কর্মরত অনেক শিক্ষক ৭-৮ বছর ধরে সহযোগী অধ্যাপক এবং সমমর্যাদার উপাধ্যক্ষ পদে কাজ করছেন। এসব শিক্ষক অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্তির নির্ধারিত সময় অনেক আগেই পার করলেও তাদের অবসর গ্রহণের আগে চাকরিজীবনের শেষ পদোন্নতি পাবেন কি-না তা নিশ্চিত নয়। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের স্বার্থেই এসব বিষয় ভেবে দেখতে হবে।
মোঃ মুজিবুর রহমান : টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সহযোগী অধ্যাপক

বিসিএসের ভাইভা ও কোটা দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়েছে by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে দক্ষ, প্রশিক্ষিত, কল্যাণকামী, নিরপেক্ষ ও সুযোগ্য আমলাতন্ত্রের ওপর। কারণ, প্রশাসনে নিয়োজিত আমলারাই একটি সরকারের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আমলাদের কেবল দক্ষ ও যোগ্য হলেই হয় না, তাদের মানবিক ও জনকল্যাণকামীও হতে হয়। সে কারণে এদের ‘সিভিল সার্ভেন্ট’ বলা হয়। আমলাদের কেবল ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসক হলে হয় না, কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে তাদের জনগণের সেবকও হতে হয়। দেশের সাধারণ মানুষের সেবা না করে কেবল ঔপনিবেশিক আমলের আমলার মতো নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মুনাফা নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সফল আমলা হওয়া যায় না। যে জনগণের করের অর্থে আমলারা সরকারি চাকরি করেন, তাদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও আমলাদের প্রশাসকের পরিবর্তে সেবকের ভূমিকা পালন করতে হয়। আর ওই সেবাও দিতে হয় জনগণের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে, তাদের সামান্যতম হয়রান না করে শান্তভাবে। সেজন্য ‘সিভিল সার্ভেন্টে’র বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে ‘সুশীল সেবক’। তারা জনগণকে কষ্ট না দিয়ে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে সেবা প্রদান করেন। প্রশাসনে এ রকম দক্ষ, যোগ্য, নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা নিয়োগে সব দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা আরোপ করা হয়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে লোক নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনতা দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হয়।
বাংলাদেশে দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবী সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করা হয়েছে। এ কমিশনের ওপর স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা হলেও বাস্তবে এর কর্মকাণ্ডে সে চরিত্র ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় না। এ কমিশনের সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকায় সরকার যাকে খুশি পিএসসির সদস্য নিয়োগ করতে পারে। এ সুযোগে সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের আÍীয়স্বজনরাই এ পদে অধিক হারে নিয়োগ পান। পিএসসির চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রেও বিধি-বিধান লংঘিত হয়। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পিএসসিতে প্রথম চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয় প্রফেসর একিউএম বজলুল করিমকে। কর্মচারী প্রশাসনের বিশেষ অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে এ নিয়োগ দেয়া হয়। সৈয়দ গিয়াসউদ্দীন আহমেদ তার ‘পাবলিক পারসনেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন বাংলাদেশ’ গ্রন্থে এ নিয়োগের পেছনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওই সময়ের রাজনৈতিক সচিবের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করেন। তখন থেকে পিএসসিতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের যে সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয় তা ৪২ বছরে ক্রমান্বয়ে কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। এর মধ্যে যুগপৎ সামরিক ও বেসামরিক শাসনামলে পিএসসিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি আÍীয়করণ, দলীয়করণ এবং প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। এর ফলে পিএসসি তার পেশাদারিত্ব যেমন হারিয়েছে, তেমনি প্রশাসনও ক্রমান্বয়ে হয়েছে দুর্বল থেকে দুর্বলতর। পিএসসিতে নিরপেক্ষভাবে যোগ্য ও দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে না পারায় সংস্থাটি বস্তুনিষ্ঠভাবে মেধাবী প্রশাসক নির্বাচন করতে পারছেÑ বলা যায় না।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ দেশের ছাত্রসমাজের সরকারি চাকরি পাওয়ার প্রধান ভরসাস্থল হল পিএসসি আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক বিসিএস পরীক্ষা। এ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করে ক্যাডারভুক্ত চাকরি লাভ করা যায়। কাজেই বিসিএস পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই এ দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজের কর্মজীবন গড়ে তোলার স্বপ্ন আবর্তিত হয়। অথচ এই স্বপ্নের জায়গাটিতে সব সরকারই প্রত্যাশিত শৃংখলা, পেশাদারিত্ব ও নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। দিন বদলের স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা মহাজোট সরকারও এ ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি। এ সরকার চাইলে সংবিধান সংশোধনের সময় সহজেই পিএসসিকে আরও দক্ষ ও যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এ ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আনতে পারত। পিএসসির সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব এড়াবার লক্ষ্যে কিছু যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে পারত। কিন্তু তা না করে এ সরকার প্রথম থেকেই পিএসসিকে একটি দলীয়করণ ও আÍীয়করণের আখড়ায় পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করায় পিএসসির স্বাধীন ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়। পিএসসির সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মহাজোট সরকার ১৫ জন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যাদের বেছে নিয়েছে, তাদের প্রায় সবাই হয় সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রী-এমপিদের আÍীয় হিসেবে, না হয় দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ লাভ করেছেন।
উল্লেখ্য, মহাজোট সরকারের সময় পিএসসির সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ও আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবাত, প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানকের বড় বোন অধ্যাপক রাশিদা বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও যুবলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক এমরান কবীর চৌধুরী, জনতার মঞ্চের কথিত রূপকার হিসেবে পরিচিত এটি আহমেদুল হক চৌধুরী (বর্তমানে চেয়ারম্যান, ২০১০-এর এপ্রিলে সাবেক পিএসসির চেয়ারম্যান ড. সাদত হোসেনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে রাষ্ট্রপতির কাছে ‘কর্মকমিশনে স্থবিরতা’ শীর্ষক চিঠি প্রদানকারী হিসেবে সমালোচিত), প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে সৈয়দ হাসিনুর রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ভাগ্নি অধ্যাপক ডা. ফরিদা আদিব খানম, সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি তারানা হালিমের ভগ্নিপতি ইকরাম আহমেদ প্রভৃতি। আরও যেসব সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাদের শানে নজুল খোঁজ করলেও হয়তো একই রকম তথ্য পাওয়া যাবে। কাজেই এই যদি হয় পিএসসির সদস্য নিয়োগের চিত্র, তাহলে সে সংগঠনের পক্ষে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা কতটা সম্ভব, তা অনুমান করা যায়। এরকম দলীয় পরিচয়ে নিয়োজিতরা যখন পিএসসির মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের সভাপতিত্ব করবেন, তখন তারা যে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রভাবিত হবেন না সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
এসব কারণে সরকারি কমকর্তা নিয়োগে পিএসসি তার সুনাম প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। একাধিকবার বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে এবং সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা পিএসসির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। এর ওপর কোটা সুবিধা বাড়াতে বাড়াতে শতকরা ৫৫ ভাগে নিয়ে যাওয়ায় সাধারণ গ্রামগঞ্জের মেধাবী চাকরিপ্রার্থীরা একেবারেই হতাশ হয়ে পড়েছেন। শতকরা ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থী পাওয়া না গেলেও ওই কোটা বহাল রাখা হয়েছে এবং ওই কোটা পূরণে যে সবসময় স্বচ্ছভাবে সবকিছু হচ্ছে, তাও বলা যায় না। অনেক সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধা মানবেতর জীবনযাপন করছেন, অনেকে রিকশা চালাচ্ছেন। সরকার তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা না দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল তাদের সম্মানিত করতে চাইছেন কেন, সে বিষয়টি বোধগম্য নয়। তা ছাড়া এ কোটা কতদিন পর্যন্ত বহাল থাকবে, সে বিষয়টিও সুনিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মানিত করে চাকরি ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া সমর্থনযোগ্য, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরও না হয় কিছুটা ছাড় দেয়া যেতে পারে, কিন্তু বংশ পরম্পরায় এ কোটা আজীবন চলমান রাখা যৌক্তিক হবে কি-না, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। একজন সৎ লোকের সন্তান সবাই যে সৎ হবেন সে নিশ্চয়তা যেমন দেয়া যায় না, তেমনি একজন সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধার পরবর্তী প্রজন্মর সবাই যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন হবেন, সে নিশ্চয়তা দেয়াও অযৌক্তিক। একজন মুক্তিযোদ্ধার পরবর্তী প্রজন্মর কেউ কি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে চিন্তাভাবনার ধারক হতে পারেন না? তেমন হলে সেক্ষেত্রে তাকে কেন কোটা সুবিধা দেয়া হবে? এ ছাড়া উপজাতীয় ও নারী কোটার যৌক্তিকতা কি আগের মতো আছে? তারা তো এমনিতেই এখন লেখাপড়া ও শিক্ষা-দীক্ষায় অনেকটা এগিয়ে এসেছেন এবং প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেও তারা প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে যে একেবারেই সুযোগ পাচ্ছেন না এমন নয়। সেক্ষেত্রে এমন কোটা যদি রাখতেও হয়, তাহলে তা আরও কমিয়ে আনা উচিত কি-না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কেবল প্রতিবন্ধীদের কোটা ঠিক রেখে আর সব কোটা কমিয়ে সব মিলিয়ে শতকরা ১০ বা ১৫ ভাগের বেশি সরকারি ক্যাডারভুক্ত পদে কোটায় চাকরি দেয়াকে সুবিবেচনাপ্রসূত বলা যায় না। এমনটা হলে গ্রামের মেধাবী ছেলেমেয়েরা আরও অধিক হারে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত হয়ে দেশসেবার সুযোগ পাবেন। শতকরা ৫৫ ভাগ কোটা রাখায় ইতিমধ্যেই প্রশাসনের মানের যে ক্ষতি হয়েছে, আগামী অনেক বছর তার ফল ভোগ করতে হবে। কোটার হার উল্লেখযোগ্যভাবে না কমালে যে প্রশাসনের মান আরও ধসে পড়বে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
মহাজোট সরকার বিসিএস পরীক্ষার ক্ষেত্রে চলমান মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করে আরেকটি মারাত্মক ক্ষতিকর কাজ করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সুপারিশ ও তদবির সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল এবং প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের কেউই এ কাজটি সমর্থন করেননি। এর ফলে বিসিএসে দুর্নীতি করার সুযোগ অধিক প্রসারিত হয়েছে। এজন্য নানা-মামা বা খুঁটির জোর নেই এমন লাখ লাখ সাধারণ চাকরিপ্রার্থী সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ করায় তাদের বিসিএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন অনেকটাই ধূসর হয়ে গেছে। চাকরিপ্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, সিদ্ধান্তগ্রহণ যোগ্যতা এবং বুদ্ধি যাচাই করার জন্য মৌখিক পরীক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়ে বলা যায়, দেশের চলমান বাস্তবতা বিচার করে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ থেকে কমিয়ে ৫০ নম্বরে আনতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু তা না করে ২০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা এ ক্ষেত্রে তদবির ও সুপারিশ কালচারের মাধ্যমে দুর্নীতি করার সুযোগ প্রসারিত করেছে। যেহেতু পিএসসির মোখিক পরীক্ষার বোর্ডগুলো সাধারণত একজন পিএসসি সদস্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এবং যেহেতু পিএসসি সদস্যরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয়স্বজন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ে, কাজেই তারা যে মৌখিক পরীক্ষায় সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করবেন, এমন নিশ্চয়তা দেয়া কঠিন।
কোটা, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর, পরীক্ষা ক্ষেত্রের অনিয়মানুবর্তিতা ও বিশৃংখলা- সব মিলিয়ে বিসিএস পরীক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্যে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ায় তারা যখন কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেমেছেন, তখন তাদের বক্তব্য না শুনে পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করেছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্যের যৌক্তিকতা যাচাই না করে প্রধানমন্ত্রী কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে যারা ‘ভাংচুর করেছে’ তাদের ছবি সংরক্ষণ করে পরবর্তীকালে তাদের সব রকম চাকরিতে ডিসকোয়ালিফাই করার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত ছিল যে, এ আন্দোলনটি একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন এবং এতে সবাই রাজপথে না নামলেও লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থী শিক্ষিত বেকার এ আন্দোলনে জড়িত। আন্দোলনটি যেমন দলীয় পরিচয়ভিত্তিক নয়, তেমনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করা বা সরকারকে বিপদে ফেলা নয়। ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত করে চাকরি না দেয়ার ভয় দেখিয়ে কি তাদের ন্যায্য দাবি আদায় থেকে সরিয়ে রাখা যাবে? নির্বাচনের আগে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে এভাবে আহত করলে তার কী পরিণাম হতে পারে সে সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভেবে দেখা উচিত ছিল। তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের না ক্ষেপিয়ে সরকারের উচিত অচিরেই পিএসসির সদস্য নিয়োগে আত্মীয়করণ, কোটা ব্যবস্থা, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর এবং বিসিএস পরীক্ষার অন্যান্য অনিয়ম চিহ্নিত করে ওইসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা। এভাবে সরকারি চাকরি প্রদানের ক্ষেত্রে শৃংখলা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বর্ধিত মনোযোগ দিয়ে প্রশাসনসহ সব সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে মেধাবীদের নিয়োগ সুনিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়