Showing posts with label সানজানা চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label সানজানা চৌধুরী. Show all posts

Friday, September 25, 2020

নিজের পুরো বাড়ি যারা ছেড়ে দিয়েছেন কুকুর বেড়ালদের জন্য by সানজানা চৌধুরী

ঢাকার উত্তর কাফরুলের বাড়িটিতে প্রবেশ করতেই আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে ৫/৬টি কুকুর । তবে অভয় দেন বাড়ির মালিক মিথিলা শারমিন চৈতি।
রাস্তা থেকে এনে আশ্রয় দেয়া এই কুকুরগুলোকে তিনিই দেখাশোনা করেন।
তেমনি বাড়ির বাইরে এমন আরও ৫০টিরও বেশি কুকুর রয়েছে যাদের তিনি নিয়মিত খাবার খাওয়ান, গোসল করান এমনকি চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন। আবার বাড়ির ভেতরে তিনি পালছেন একটি দুটি নয়, মোট আটটি বেড়াল।
ছোটবেলা থেকে এই প্রাণীদের জন্য কিছু করার কথা ভাবতেন তিনি।
প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি কুকুরের দেখাশোনা করেন মিথিলা শারমিন চৈতি
"রাস্তায় যাওয়া আসার সময় যখন দেখতাম ওরা ইনজুরড হয়ে পড়ে আছে, খুব খারাপ লাগতো। ইচ্ছা হতো যদি আমি কিছু করতে পারতাম। সেই ইচ্ছা থেকেই আমার চেষ্টার শুরু।"
"কখনও ভেটের (পশু চিকিৎসক) কাছে নিয়ে যেতাম। আমি এখন এদের রেগুলার খাওয়াই। মাসে একবার গোসল করাই, ট্রিটমেন্ট করাই।"-বলেন শারমিন চৈতি
এই কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ দুটি স্কুলের চাকরির থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন তিনি।
"আগে আমি একটা স্কুলে টিচিং করতাম। কিন্তু আমার এই কাজ করে পেরে উঠছিলাম না। তাই চাকরি ছেড়ে এখন কয়েকটা টিউশনি করছি। সেখান থেকে যা টাকা পাই সেটা দিয়েই এদের খাবার চিকিৎসা চলছে।"
তবে মিস শারমিনের এই পথচলা এতোটাও সহজ ছিল না। একবার স্থানীয় এক প্রভাবশালীর তোপের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান সৌরভ শামীম।
"সেই লোক এই এলাকার প্রভাবশালী। আসলে ওই লোকটার ইনটেনশন ছিল আমাকে রাস্তায় হ্যারাস করা। তার কথা হল, আমার জন্য কুকুর তাকে জ্বালাচ্ছে। তার প্রশ্ন আমি যে কুকুরদের খাওয়াই, এই টাকা আমি কোথা থেকে পাই।"
"কেউ কেউ বলে কোরিয়ায় কুকুর সাপ্লাই দেই, কেউ বলে এনজিও থেকে আসে, কেউ বল সরকার টাকা দেয়। একদিন তো রাস্তায় লোক জড়ো করে ফেলেছিল। আসলে মানবতা থেকেও যে মানুষ কিছু করতে পারে, এটা এখনও কেউ ভাবতে পারেনা।"- অনেকটা আক্ষেপের স্বরেই বলেন মিস শারমিন।

প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সংগঠন

বাংলাদেশের রাস্তায় বিচরণ করা পশুদের ওপর মানুষের নিষ্ঠুরতার বেশ কয়েকটি খবর সম্প্রতি সংবাদের শিরোনামে হয়ে উঠেছে। নাহলে ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার একদল তরুণ সংগঠন এই বিষয়গুলোকে সামনে আনে।
রাস্তার এসব প্রাণীর প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এখন এগিয়ে এসেছে এমন বেশ কয়েকটি সংগঠন।
যার মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান এরিমধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত হয়েছে, সেগুলো হল অভয়ারণ্য, কেয়ার ফর পজ, এনিমেল লাভার্স অব বাংলাদেশ এবং পিপল ফর অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
এছাড়া ফেসবুকভিত্তিক আরও কয়েকটি সংগঠন স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
এই সংগঠনগুলো মূলত এসব প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। যেমনটি বলছিলেন কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান সৌরভ শামীম।
কেরানিগঞ্জের একটি শেল্টার হোমে আশ্রিত কুকুর ও বেড়াল
"কোন প্রাণীকে আহত অবস্থায় পাওয়া গেলে আমরা প্রথমে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করি, কোথাও প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার খবর পেলে সেখানে ছুটে যাই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কিংবা যেসব প্রাণীর জরুরি আশ্রয়ের প্রয়োজন, রাস্তায় ছাড়া যাচ্ছেনা। তাদেরকে শেল্টারে নিয়ে যাই না'হলে অ্যাডপশনের ব্যবস্থা করি।"
এই এই কাজগুলোর বেশিরভাগ পরিচালিত হয় কর্মীদের নিজেদের অর্থায়নে। সরকারি নিবন্ধিত সংস্থা হিসেবে সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকলেও, এমনটা না হওয়ায় অনেকটা হতাশা প্রকাশ করেন মিস্টার শামীম।
"আমার কেরানীগঞ্জের শেল্টারে এখন ৬০টা কুকুর আর ৫০টা বেড়াল আছে, এগুলোর পেছনে মাসে খরচই হয় দুই লাখ টাকা। আমার ব্যক্তিগত যে রেস্টুরেন্টটা আছে সেটার লাভের পুরো টাকাটা এসবের পেছনে চলে যায়।"
"কিছু ডোনেশন আসে, হাসপাতাল থেকে কিছু আসে। এভাবে সংস্থাটা কতদিন চালাতে পারবো জানিনা। সরকার যদি আমাদের কিছু অনুদান দিতো, শেল্টারের একটা জায়গা দিতো, যেখানে প্রাণীগুলো থাকবে। তাহলে তো আমাদের ভাড়াটা অন্তত বেঁচে যায়। তাছাড়া বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিও সাহায্য করতে পারে।"

নিজের পুরো বাড়িটাই ছেড়ে দিয়েছেন কুকুর বেড়ালদের জন্য

এনিমেল লাভার্স অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান দীপান্বিতা হৃদি নারায়ণগঞ্জে নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িটিতেই কুকুর বেড়ালের থাকার ব্যবস্থা করেছেন।
এছাড়া ঢাকার টিএসসি এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকার কুকুর বেড়ালদের স্বেচ্ছায় দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
দীপান্বিতা হৃদি নারায়ণগঞ্জে নিজের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতেই কুকুর বেড়ালের থাকার ব্যবস্থা করেছেন।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রচারণাও চালিয়ে আসছেন গত কয়েকবছর ধরে।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "আমার পক্ষে যদি সম্ভব হতো তাহলে আমি পৃথিবীর সব স্ট্রে ডগ আর ক্যাটদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতাম, কিন্তু আমারও লিমিটেশনস আছে। তাই নিজের দ্বারা যেটুকু সম্ভব সেটুকুই করি।"
"এই যে রাস্তায় অনেক কুকুর বেড়াল পড়ে থাকে যাদের শেল্টার দরকার কিন্তু যাওয়ার জায়গা নাই। তাদের কথা ভেবেই আমার এই শেল্টারটা বানানো।"
এতো কাজ করতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে বিসর্জন দিতে হয়েছে মিস হৃদিকে। এক্ষেত্রে তিনি সবসময় তার পরিবারকে কাছে পেয়েছেন।
এসব প্রাণীর লালন পালনের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ খরচ বহন করছে তার পরিবারই।
তবে বাংলাদেশের মানুষ যদি বিদেশি কুকুর বিড়ালের পরিবর্তে আমাদের দেশি প্রাণীগুলোকে অ্যাডপ্ট করে তাহলে, এই সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে বলে মিস হৃদি আশা করেন।

প্রাণী নিষ্ঠুরতা চলছেই

প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত এসব বিষয়েও এক ধরণের বড় ভূমিকা রাখছে এই বেসরকারি সংগঠনগুলো।
আর সেই কাজে তাদের মূল শক্তি হিসেবে অর্থাৎ প্রতিবাদ থেকে শুরু করে তাদের সচেতনতামূলক প্রচারণা-প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
ফেসবুকে তাদের পোস্টগুলো ঘেঁটে দেখা যায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাণী নিষ্ঠুরতার ঘটনা উঠে আসছে। এমনই এক নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল সিথি রহমানের কুকুর।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান তার সেই বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা।
কেয়ার ফর পজের ক্লিনিকে নিজেদের পোষা বেড়াল বা কুকুরের চিকি'সা করাতে ভীড়
"আমার কুকুর কিন্তু তার কোন ক্ষতি করেনি। কারণ আমরা তাকে ট্রেনিং দিয়ে রেখেছি যেন সে কাউকে ডিস্টার্ব না করে। খুব ফ্রেন্ডলি ছিল। কিন্তু মানুষের ওকে নিয়ে এতো সমস্যা যে এলাকাই ছাড়তে হয়। কিন্তু লাভ হয়নি। একদিন আমাদের দারোয়ান ডেকে বলল যে আমাদের কুকুরের চিৎকার আওয়াজ পেয়েছে। আমরা গিয়ে দেখি কেউ কার মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে। তারপর অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি"
তবে প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ বলে জানান কেয়ার ফর পজের জেনারেল সেক্রেটারি জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব নির্যাতনকারীদের পরিচয় খুঁজে বের করা যায়না।
"আমাদের কাছে প্রতিদিন তিনটা থেকে ছয়টা অভিযোগ আসে। সেটাও আবার আমাদের গ্রুপের মেম্বারদের থেকে। সারা দেশব্যাপী এই এনিমেল ক্রয়েলটি হয় আরও অন্তত ১০গুণ বেশি।
"এই বিষয়ে কেউ মুখ খোলেনা, তেমন কোন এভিডেন্সও থাকেনা। তাও আমরা চেষ্টা করি আশেপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে, সিসিটিভি ক্যামেরা দেখতে।" বলছিলেন জাহিদ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত রাস্তার কুকুর নিধন করা আইনগতভাবে বৈধ ছিল। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে সিটি কর্পোরেশন ঘাড় মটকে হত্যা করতো
প্রতি কুকুর হত্যা বাবদ অর্থও পেতেন এসব কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভেটরা।
পরে অভয়ারণ্যের প্রতিবাদের মুখে বন্ধ হয় রাস্তার কুকুর নিধন। কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি, নিউটারিংসহ অন্যান্য উপায় অবলম্বনের কথা জানান তারা।

প্রাণীদের প্রতি মানুষের এই বিদ্বেষের কারণ কি

সম্প্রতি রাস্তার এই কুকুর বেড়ালগুলোর প্রতি মানুষের বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের অভিযোগ উঠেছে, এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে আমার।
তবে তারা সেই বক্তব্য মাইক্রোফোনে রেকর্ড করার অনুমতি দেননি। তাদের কেউ কেউ ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন। 
কেয়ার ফর পজের জেনারেল সেক্রেটারি জাহিদ হোসেন
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জান্নাতি শহীদ আশা মনে করেন এই প্রাণীগুলো হিংস্র এবং রোগজীবাণু ছড়ায়।
"আমার এই কুকুরগুলোকে দেখলেই গা ঘিন ঘিন করে। এগুলো তো রাস্তায় থাকে। এগুলো যে আমাকে দেখে কামড়াতে আসবে না তার কোন গ্যারেন্টি নাই। মানে এতো নোংরা একটা প্রাণী। আমার একদমই পছন্দ না।"
যদিও মিস্টার শামীম যিনি কিনা কেয়ার ফর পজের চেয়ারম্যান তিনি এই মনোভাবকে অযৌক্তিক বলে দাবি করছেন।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানিয়েছেন যে মানুষ সাধারণত ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এ ধরণের কাজ করে থাকে। যার ভুক্তভোগী হয় অসহায় প্রাণীগুলো।
এই ধরণের নিষ্ঠুরতা বন্ধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মিস্টার শামীম বলেন, "এই যে বাচ্চারা কুকুর বেড়াল দেখে ঢিল ছোড়ে, এটা যদি বাবা মায়েরা মানা করে, বোঝায় যে কোন প্রাণীকে কষ্ট দেয়াটা ঠিক না, সেটাও কিন্তু কাজে আসে।"
"স্কুলগুলো প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়ার শিক্ষা দিতে পারে। তাছাড়া কোন ধর্মে প্রাণীদের কষ্ট দেয়ার কথা বলা হয়নি। ধর্মের প্রপার শিক্ষাটাও পৌঁছে দিতে হবে। আপনি এদের পছন্দ নাই করতে পারেন। তাই বলে আঘাত করবেন না।"

বাংলাদেশের আইন কি বলে?

সামাজিক সচেতনতার অভাব সেইসঙ্গে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দেশে যে একটি আইন আছে সেটা নিয়ে অজ্ঞতার কারণেই এ ধরণের ঘটনা ঘটছে বলে জানান আইনজীবী জান্নাতুল আরা তিথি।
প্রাণীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রচলিত আইনটি যথেষ্ট নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বর্তমানে যে আইনটি কার্যকর আছে, সেটি হল ১৯২০ সালের একটি আইন।
সেখানে কোন প্রাণীকে হত্যা করা হলে শাস্তি হিসেবে তিন থেকে ছয় মাসের জেল ও সবোর্চ্চ ২শ টাকা দণ্ড ধার্য করা হয়েছে। 
আইনজীবী জান্নাতুল আরা তিথি
"ওই ব্রিটিশ আমলের ২শটাকা অনেক টাকা। এখন এটা কিছুই না। তিন মাস, ছয় মাসের কারাদণ্ডেও তেমন কিছু হয়না।" বলেন জান্নাতুল আরা।
তার মতে শুধু আইন দিয়েই কিন্তু সমাধান হবেনা। এই যে একটা আইন আছে এটা মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। যে প্রাণীদের নির্যাতন করলে পার পাওয়া যাবেনা।
এক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন জান্নাতুল আরা।
তবে প্রাণী নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে আইনকে আরও কঠোর করতে বেসরকারি সংগঠনগুলার জোরালো দাবির মুখে বর্তমানে প্রাণী কল্যাণ আইনের একটি খসড়া মন্ত্রীসভায় চূড়ান্ত হয়েছে।
তবে এটি এখনও গেজেট আকারে পাস হয়নি। সেখানে কোন প্রাণীকে হত্যার জরিমানা ৫০ হাজার টাকা এবং ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এই আইনটিকে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করেন জান্নাতুল আরা।
"বর্তমানে যে আইনটি আছে এটা যদি গেজেট আকারে আসে, তাহলে আশা করা যায় পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাবে। যে পরিমাণ জরিমানা আর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে এতে কিন্তু মানুষের ভয়ভীতিও বেড়ে যাবে।"
"আগে যারা ভাবতো তিন মাসের সাজা, ছয় মাসের সাজা। ব্যাপারনা। এই ব্যাপার না সংস্কৃতি থেকে হয়তো এই প্রাণী কল্যাণের ক্ষেত্রটা বেরিয়ে আসতে পারবে।"

মামলা নাকি মুচলেকা

প্রাণী নিষ্ঠুরতার যে কটি অভিযোগ আসছে তার বেশিরভাগই মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারছে না প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রমাণের অভাবে।
আবার যেগুলোর প্রমাণ মেলে সেগুলো মুচলেকার মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করা হয় বলে জানান অ্যাডভোকেট জান্নাতুল আরা। 
প্রাণীদের প্রতি সদয় হওয়ার আহ্বান জানান এই সংগঠকরা।
তার অভিযোগ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যাপ্ত সহযোগিতা করছেনা।
যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ধানমন্ডি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ।
তার দাবি, পুলিশ সব ধরণের অভিযোগ গ্রহণ করেন এবং অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রমাণ সাপেক্ষে মামলা গ্রহণ করেন।
"আমাদের কাছে কেউ মামলা করতে চাইলে আমরা সেটা করি। আইনানুগ সহযোগিতা আছে আবার মানবিক কারণ। সবমিলিয়ে আমরা চেষ্টা করি। মানুষ যদি আসে, তাদের সহায়তা করার জন্য। পশুপ্রাণীর ইস্যু বলে এড়িয়ে যাই বিষয়টা তা না। আমরা আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি।"

লালন পালনেও চাই সচেতনতা

পোষা প্রাণীদের যারা লালন পালন করেন তাদেরও যথেষ্ট সচেতনতার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন এই প্রাণী সংগঠকরা।
তার মতে, এমনভাবে প্রাণীদের পালতে হবে যেন সে অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়।
এজন্য এসব প্রাণীকে, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দেয়া, নিয়মিত হাটাহাটি করানো, পটি ট্রেনিং দেয়া, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শ দেন তারা।
তবে এসব বিষয়ে মানুষ আগের চাইতে অনেক সচেতন বলে তারা স্বীকার করেন। তাদের মতে মানুষ এখন এসব অবহেলিত প্রাণীর প্রতি আগের চাইতে অনেকটাই মানবিক।
পোষা প্রাণীকে ঠিকভাবে দেখভাল করাটাও জরুরি।

Thursday, September 10, 2020

মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কেন উদ্বেগে থাকেন বাংলাদেশের কর্মজীবী মায়েরা by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশে একজন মা যখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকেন, তখন তার দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এই ছুটি শেষ হওয়ার পর তার সন্তানের দেখভাল কিভাবে হবে।

যখন অফিস শুরু করবেন তখন তার সন্তানকে কার কাছে রেখে যাবেন-এমন আরও নানা বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্নতায় ভোগেন এই মায়েরা।

তেমনই একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাইদা হক।

তার মাতৃত্বকালীন ছুটি শুরু হয়েছে সন্তান জন্ম দেয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই।

কিন্তু এখন থেকেই তিনি দুশ্চিন্তা করছেন যে এই ছুটি শেষ হওয়ার পর তার সন্তানের দেখভাল কিভাবে হবে।

মাতৃত্বকালীন ছুটি পর্যাপ্ত না থাকা সেইসঙ্গে সন্তানকে কার কাছে রেখে যাবেন সেটাই যেন এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যখন অফিস শুরু করবেন তখন তার সন্তানকে কার কাছে রেখে যাবেন-এমন আরও নানা বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্নতায় ভোগেন কর্মজীবী মায়েরা
"প্রেগনেন্সি লিভ শুরু হওয়ার আগেও আমি বেশ কয়েকবার অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তারপরও ছুটি নেইনি। চেয়েছি যে ছুটির পুরো সময়টা যেন বাচ্চাকে দিতে পারি। এখন ভাবি ছুটি শেষ হওয়ার পর কি করবো?"

"সবাই ডে কেয়ার সেন্টারের কথা বলছে, কেউ বলছে গভর্নেস রাখতে। কিন্তু কোনটাতেই ভরসা পাচ্ছিনা। আবার চাকরিও ছাড়া সম্ভব না। কিন্তু কোন না কোনভাবে ম্যানেজ তো করতেই হবে।"

একই ধরণের দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নাদিয়া নদীকে।

স্বামীর পরিবার বা কর্মস্থল থেকে প্রয়োজনীয় সাপোর্টের অভাব সেইসঙ্গে পর্যাপ্ত ডে কেয়ার সেন্টার না থাকা, এছাড়া যে কয়েকটি ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে, সেগুলোর সময়সূচী, কর্মস্থলের সময়সূচীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হতেই সন্তানের দেখাশোনা করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় তাকে।

এমন অবস্থায় দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা থাকলেও সেটা নিয়ে এখন যেন তিনি ভাবতেই পারছেন না।

"ম্যাটারনাল লিভ শেষ হওয়ার পর কষ্টটা বাচ্চাটার যেমন, তেমনি মায়েরও। বাচ্চাকে আমার শ্বশুড় শাশুড়ির কাছে যে রেখে যাব, সেই সুযোগ আমার ছিল না।। আর আজকাল যা দেখছি, বিশ্বস্ত মানুষ পাওয়া ভীষণ কঠিন। "

"আবার চাইলেই আপনাকে অফিস ছুটি দেবে না। একজন ওয়ার্কিং মাদার কখনোই ওভাবে কো অপারেশন পায়না।"

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস নির্ধারিত থাকলেও বাংলাদেশ শ্রম আইনানুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটি কেবল ১৬ সপ্তাহ, অর্থাৎ চার মাসেরও কম সময়।

তবে এই সব প্রতিষ্ঠানের নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে চিন্তাহীনভাবে যোগ দেয়া রীতিমত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর সন্তানকে কার কাছে রেখে যাবেন সেটাই এখন মায়েদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক নারী চাকরি ছাড়তেও বাধ্য হন। তবেএ বিষয়ে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা যথেষ্ট বলে দাবি করছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের।

তিনি বলেন, "ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হওয়ার পরে মায়েরা যেন নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে ফিরতে পারে সেজন্য সরকার দেশব্যাপী ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন করছে সেইসঙ্গে কেউ যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, তাদের উৎসাহিত করতে সরকার শিগগিরই একটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে।"

সেই আইনে প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে যে, কেউ যদি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অথবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ডে কেয়ার সেন্টার চালু করতে চান তাহলে সরকার তার সহজ অনুমোদন দেবে।

মিস্টার খায়ের বলেন, বাংলাদেশে প্রায় একশটি ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা শহরে রয়েছে ৬০টির মতো।
মিসেস নাদিয়া নদীর মতে, "ওয়ার্কিং মাদার কখনোই ওভাবে কো অপারেশন পায়না।"
এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের ব্যাপারে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।

তবে সব প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে সদ্য মায়েদের ক্যারিয়ার নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নজিরও কম নেই।

তবে সেজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয় বলে জানান নাদিয়া নদী।

"আমি আমার বাচ্চাকে মা আর বোনের কাছে রেখে যেতাম। তারা আবার দুজনই চাকরি করতো। সময়টা এমনভাবে ঠিক করেছিলাম যেন বাই রোটেশনে কেউ না কেউ তার সাথে থাকে। তারপর একটা ডে কেয়ার সেন্টার খুঁজে বের করি। এজন্য খরচ অনেক বেড়ে গেলেও কিছু করার ছিলনা।"

মাতৃত্বকালীন ছুটির পর শিশুর দেখভালের বিষয়টিকে যদি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হতো, তাহলে মায়েদের এমন মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যেতো বলে জানান মিসেস নদী।
সব প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে সদ্য মায়েদের ক্যারিয়ার নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নজিরও কম নেই।

Saturday, August 15, 2020

অগাস্ট ১৯৭৫-এর পর শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রচার মাধ্যম থেকে মুছে দেয়ার চেষ্টা যেভাবে করা হয়েছিল by সানজানা চৌধুরী

শেখ মুজিবুর রহমান
১৫ অগাস্ট ২০১৯ বিবিসি বাংলা:: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা-রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের কোন প্রচার মাধ্যম এমনকি চলচ্চিত্রেও তাঁর নাম বা ছবি প্রকাশ হতে দেখা যায়নি।
তৎকালীন সরকারি প্রচার মাধ্যমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শেখ মুজিবকে হত্যার পর এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা নানাভাবে ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

বেতারে শেষবারের মতো শেখ মুজিবের নাম

শেখ মুজিবকে হত্যার পর পর ভোর বেলায় শাহবাগের বাংলাদেশ বেতারের ব্রডকাস্ট শাখা থেকে হত্যাকাণ্ড সেই সঙ্গে সামরিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা প্রচার করা হয়েছিল।
ঘটনার দিন বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ ব্রডকাস্ট শাখার শিফট ইনচার্জ হিসেবে কাজ করছিলেন প্রণব চন্দ্র রায়।
''সেদিনই শেষবারের মতো উচ্চারিত হয় শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি। এরপর থেকে বেতারে কখনও তার নাম শোনা যায়নি'', মি. রায় বিবিসিকে বলেন ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান যে, ভোরবেলা সেনাবাহিনী বেতার অফিসের ভেতরে ট্রান্সমিশন কক্ষে প্রবেশ করে এবং তার মাথার ওপর বন্দুক ঠেকিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার ঘোষণাটি প্রচারের ব্যবস্থা করে দিতে বলে।
"মেজর ডালিম আমার মাথায় বন্দুক ঠেকায়, তারা পুরো শরীর তখন রক্তে ভরা। আমি তখনও জানতাম না কি হয়েছে। এরপর তিনি আমাকে বলেন, শেখ মুজিব অ্যান্ড হিজ গ্যাং অল হ্যাজ বিন কিল্ড। আর্মি হ্যাজ টেকেন পাওয়ার। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে যাই। তখন বুঝলাম যে ক্যু হয়েছে।" বলেন মিঃ রায়।
তারপর তিনি সেনাবাহিনীর নির্দেশ মতো রেডিওর সব ইকুইপমেন্টগুলো খুলে দেন এবং মিরপুরের ট্রান্সমিশন স্টুডিওকে বলেন ঘোষণাটি প্রচার করার জন্য।
মেজর শরীফুল হক ডালিম একটা লগ বুকের কাগজে বিবৃতি লিখেন এবং সেটাই প্রচার করেন।
যেখানে বলা হয়েছিল, "শেখ মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে এবং খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। দেশবাসী সবাই শান্ত থাকুন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।"
পর পর কয়েকবার এই ঘোষণা দেয়া হয়। পরবর্তী রেকর্ডিংয়ে শেখ মুজিবকে "হত্যা করা হয়েছে" বলার পরিবর্তে "উৎখাত করা হয়েছে" বলে ঘোষণা দেয়া হয়।
জানুয়ারি ৮, ১৯৭২: লন্ডনের ক্ল্যারিজ'স হোটেলে গণমাধ্যমের মুখোমুখি শেখ মুজিব
ওই মুহূর্তে মেজর শাহরিয়ার রশিদ কড়া নির্দেশনা দেন যেন শেখ মুজিবুর রহমান বা তার দলের নাম, রবীন্দ্র সংগীত, জয় বাংলা স্লোগান কিছুই প্রচার করা না হয়।
পরে খন্দকার মুশতাক তার মৌখিক নির্দেশে বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও বাংলাদেশ রাখেন।

বাংলাাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হয়নি শেখ মুজিবের নাম ও ছবি

এই সময়ের মধ্যে বিটিভিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারিত হতে শোনেননি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ।
তিনি সে সময় বিটিভির প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
সেখানে থাকাকালীন তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন, যেখানে শেখ মুজিবের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রামাণ্য চিত্রটি প্রচারের আগ মুহূর্তে নামটি কেটে দেয়া হয়।
২৬শে মার্চ বা ১৬ই ডিসেম্বরের মতো বিশেষ দিনগুলোয় হাতে গোনা দুই একটি অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গটি জোড়াতালি দিয়ে কোন রকম দাঁড় করানো হতো বলে উল্লেখ করেন মিঃ হামিদ।
এমনকি পাঠ্যবইতে শেখ মুজিবের নাম মুছে খণ্ডিত ইতিহাস পড়ানো হতো বলে তিনি জানান।
১৫ আগস্টে পালন করা হতো জাতীয় নাজাত (মুক্তি) দিবস। ওই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ইতিহাস বা তাকে হত্যার ঘটনা কিছুই প্রচার করা হতো না।
মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৭৪ সালে ধারণ করা একটি ছবিতে শেখ মুজিব
উল্টো বিটিভিতে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তৃতা এবং আলোচনায় শেখ মুজিবকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হতো বলে জানা যায়।
"বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে যারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় এসেছিল তারা বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে পুরোপুরি বিপরীত ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ আসলেই তারা ভয় পেতো, মানুষ যদি আবার তাঁর ব্যাপারে জানতে শুরু করে। এজন্য প্রচার প্রোপাগান্ডার মধ্যে দিয়ে তার নাম ও আদর্শকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার সার্বিক প্রয়াস চালানো হয়েছিল,'' বলেন ম হামিদ।

চলচ্চিত্রে সেন্সর বোর্ডের কাটছাট

পঁচাত্তর পরবর্তী চলচ্চিত্রেও শেখ মুজিবের নাম ছবি এমনকি জয় বাংলা স্লোগান ব্যবহার হতে দেখা যায়নি।
সেসময় বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সারাহ বেগম কবরী।
তার অভিনীত রক্তাক্ত বাংলা এবং আমার জন্মভূমি চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটি অংশ এবং সংলাপ সেন্সর বোর্ড থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল।
যার মধ্যে ছিল শেখ মুজিবের নাম, তাঁর ছবিযুক্ত শট, তাঁর ভাষণের অংশবিশেষ এবং জয় বাংলা স্লোগান।
"সে সময় যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা ইচ্ছামত রাজনৈতিকভাবে চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি জায়গা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। তাদের কথা ছিল যে বঙ্গবন্ধুর নাম বা তার দলের কোন চিহ্ন যেন কোথাও না থাকে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভিত্তিক ছবিতেও এই বিষয়গুলো বাদ দেয়া হয়েছিল,'' সারাহ বেগম কবরী বিবিসিকে বলেন।

পুনরায় বাংলাদেশ বেতার, তথ্য পুনরুদ্ধার

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন আবু সাঈদ।
সে সময় তিনি 'রেডিও বাংলাদেশ'-এর নাম, মৌখিক নির্দেশে পুনরায় 'বাংলাদেশ বেতার' রাখেন।
নতুন প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবের ইতিহাস তুলে ধরতে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
"আমি বেতারের ডিজি সাহেবকে ডেকে প্রশ্ন করেছিলাম দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নাম বাংলাদেশ বেতার রাখা হয়েছিল। এটা রেডিও পাকিস্তানের আদলে রেডিও বাংলাদেশ কিভাবে হল? ডিজি সাহেব এ নিয়ে আমাকে লিখিত কোন নথি বা আদেশনামা দেখাতে পারেননি। কেবল একটি মৌখিক নির্দেশে এই নাম পরিবর্তন হয়েছিল। তারপর আমি পাল্টা নির্দেশ দিলাম এটাকে আবার বাংলাদেশ বেতার করতে,'' বলেন মি. সাঈদ।
মি. সাঈদ সে সময় ডিএফপি এর আর্কাইভ থেকে শেখ মুজিবের সব রেকর্ডগুলো কয়েক বছর ধরে পুনরুদ্ধার করেন এবং রেডিও টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রচার করা শুরু করেন।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেখ মুজিবের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাষণ।
"আমি আর্কাইভে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের রিলগুলো অযত্ন অবহেলায় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে নষ্ট হচ্ছে। তখন আমি সেগুলো বের করে ওয়াশ করার জন্য ভারতের পুনেতে পাঠাই। কারণ বাংলাদেশে ওই প্রযুক্তি ছিলনা। এখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যতো ভিজুয়াল দেখেন, বেশিরভাগ সেই সময়ের উদ্ধার করা,'' তিনি বলেন।
পরিবারসহ শেখ মুজিবুর রহমান

Sunday, March 29, 2020

মাংসপেশিতে টান পড়লে কী করবেন by সানজানা চৌধুরী

Add caption
মাংসপেশিতে টান পড়া বা শরীরের কোন অংশ মচকানো বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। যাকে বিশেষজ্ঞের ভাষায় মাসল পুল, মাসল সোরনেস, স্ট্রেইন, স্প্রেইন, ক্র্যাম্প, স্প্যাজম ইত্যাদি বলা হয়ে থাকে।

মাসল পুল কেন হয়, কাদের হয়:

মাংসপেশিতে অতিরিক্ত টান খেলে বা টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে এমনটা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন ফিজিওথেরাপিস্ট ড. আফরোজা সুলতানা।
এতে শরীরের ওই অংশটিতে ভীষণ ব্যথা হয়। ল্যাকটিক অ্যাসিড নি:সরণের জন্য জ্বালাপোড়া করে। এ কারণে মাংসপেশি নাড়াচাড়া করা যায়না।
মাসল পুলের প্রধান কয়েকটি কারণ হল:
১. শরীরের যেকোনো একটি মাংসপেশি অনেকক্ষণ ধরে ব্যবহৃত হলে।
২. ব্যায়াম, খেলাধুলা বা যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে ওয়ার্মআপ বা শরীর গরম না করলে।
৩. পেশী ক্লান্ত থাকা অবস্থায় আকস্মিক নড়াচড়া করলে।
৪. হঠাৎ অতিরিক্ত ভারী কিছু ওঠালে।
৫. পেশীর অতিরিক্ত ও অনুপযুক্ত ব্যবহার।
৬. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা।
৭. অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস বিশেষ করে পানি কম খেলে এবং শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিলে মাংসপেশিতে টান পড়তে পারে।
যারা অতিরিক্ত শারীরিক কসরত করে থাকেন যেমন অ্যাথলেটরা মাসল পুলের সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।
যারা দীর্ঘসময় ধরে কম্পিউটারের সামনে কিংবা চেয়ারে বসে কাজ করেন কিংবা লম্বা সময় যানবাহন চালান, তাদের কাঁধ, ঘাড়, পিঠের মাংসপেশিতে টান পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

কখন বুঝবেন মাসল পুল হয়েছে:

১ যদি পেশীতে অনেক ব্যথা হয়। পেশী অনেক দুর্বল হয়ে যায়।
২. আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটি যদি ফুলে ওঠে বা লালচে দাগ পড়ে যায়।
৩. যদি আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে স্বাভাবিক ওজন নিতে কষ্ট হয়।
৪. মাংসপেশি আপনা আপনি অনেক শক্ত হয়ে পড়লে।

মাসল পুল হলে কি করবেন:

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার তথ্য মতে, মাংসপেশিতে টান খাওয়ার প্রথম কয়েকদিন চারটি ধাপে এর চিকিৎসা করতে হবে। যাকে সংক্ষেপে রাইস থেরাপি বলা হয়। এর মাধ্যমে ব্যথা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।
রাইস থেরাপির ৪টি ধাপ হল: রেস্ট, আইস, কমপ্রেশন ও এলিভেট।
১. রেস্ট বা বিশ্রাম: সব ধরণের শারীরিক ব্যায়াম বা ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখতে হবে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে কখনও কোন ওজন নেয়া যাবেনা।
২. আইস বা বরফ - আঘাতের স্থানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর ২০ মিনিটের জন্য বরফের ব্যাগ দিয়ে রাখুন।
৩. কমপ্রেশন সংকোচন - আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটির নাড়াচাড়া নিয়ন্ত্রণে একটি ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়িয়ে নিতে হবে।
৪. এলিভেট বা উঁচু করা - অর্থাৎ আঘাতের স্থানটি যতটা সম্ভব বালিশের উপরে উঠিয়ে রাখতে হবে।
মাংসপেশির ফুলে ওঠা প্রতিরোধে কোন অবস্থাতেই আঘাত পাওয়ার প্রথম কয়েকদিন ওই স্থানে গরম সেক দেয়া বা গরম পানি দেয়া এড়িয়ে যেতে হবে।
এছাড়া আঘাতের স্থানে কোন অবস্থাতেই মালিশ করা যাবেনা।
যখন আপনি ক্ষতস্থানটি স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করতে পারবেন। খুব একটা বেশি ব্যথা নেই। তখন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক কাজ করার চেষ্টা করুন। নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করুন যাতে জয়েন্ট বা পেশী শক্ত না হয়ে যায়।

চিকিৎসা:

মাংস পেশিতে টান পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত বলে মনে করেন ডা.আফরোজা সুলতানা।
বিশেষ করে, মাংসপেশিতে অতিরিক্ত ব্যথা হলে, ব্যথায় জ্বর উঠে গেলে, কয়েকদিন পরও সেই ব্যথা না কমলে, মাংসপেশির ফুলে ওঠা না কমলে বা বাড়লে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, মাথা ঘুরতে থাকলে, শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে কাঁপতে থাকলে বিশেষজ্ঞের কাছে নিতে কোন অবস্থাতেই দেরী করা যাবেনা।
মাসল পুল হওয়ার পর পেশির ওই অংশ যদি টান টান করতে গিয়ে ব্যথা পান, তাহলে সেই চেষ্টা আর করা যাবেনা। এতে পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে বলে জানান মিসেস সুলতানা।
অনেক সময় মচকানোর এই প্রভাব সাত দিন থেকে শুরু করে ছয়মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও হতে পারে বলেও তিনি জানান।
প্রাথমিক অবস্থায় ক্ষতস্থানে তাৎক্ষণিক ব্যথা কমানোর জন্য এনেস্থেটিক ক্রিম, জেল বা স্প্রে ব্যবহার করা হয়।
পরিস্থিতি স্বাপেক্ষে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হতে পারে।
এরপর বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার মাধ্যমে মাসল পুলের কারণ ও মাত্রা জানার চেষ্টা করেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথমত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য অর্থাৎ সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মাত্রা ঠিক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করা হয়।
সেখানে সমস্যা থাকলে রোগীকে বিশ্রামের পাশাপাশি ডাবের পানি, স্যালাইন, কিশমিশ এবং মিনারেলস জাতীয় খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
এছাড়া আলট্রাসাউন্ড ইমেজিং এক ধরণের শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে সারা শরীরের পেশী, রগ, লিগামেন্ট, স্নায়ু এবং জয়েন্টগুলির ছবি ধারণ করে থাকে ।
এটি মূলত পেশিতে আচমকা টান খাওয়া, মচকানো টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়া, স্নায়ুতে বাধা, বাত বা পেশী সংক্রান্ত অন্যান্য যেকোনো সমস্যা নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়।
অনেক সময় চিকিৎসকরা আক্রান্ত স্থান বিশেষভাবে ব্যান্ডেজ করে ক্রাচ নিয়ে চলার কথাও বলে থাকেন।
ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে দ্রুত এই সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ফিটনেস সেন্টারে ফিজিওথেরাপি দেয়া হয়ে থাকে।

মাসল পুল এড়াতে কি করবেন:

১. যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে বা ভারী কিছু তোলার আগে অবশ্যই ওয়ার্মআপ করে মাংসপেশিগুলোকে সচল করে নিতে হবে।
২. নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
৩. দীর্ঘক্ষণ না বসে, ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্টা পর পর কয়েক মিনিট কিছুক্ষণ পায়চারি করতে হবে।
৪. প্রচুর পানি পান করতে হবে।
>>>বিবিসি নিউজ বাংলার স্বাস্থ্য সিরিজের এটি তৃতীয় পর্ব।
রাইস থেরাপির ৪টি ধাপে মাসল পুলের ব্যথা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায়

Wednesday, November 20, 2019

বাংলাদেশের পাট নিয়ে ভারত কিভাবে লাভ করছে? by সানজানা চৌধুরী

পাট ছিল বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরি ফসল
লাস্ট আপডেট- ১৭ এপ্রিল ২০১৯: বহির্বিশ্বে বাংলাদেশে উৎপাদিত পাট দিয়ে তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বাস্তবতা হলো, বছরের পর বছর দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। অথচ ভারত বাংলাদেশ থেকে পাটের কাঁচামাল কিনে সেটা প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বিদেশে বিক্রি করছে এবং মুনাফা গড়ছে।
বাংলাদেশের এই পাটের খ্যাতি রয়েছে বিশ্বব্যাপী। ফ্রান্সের প্যারিসে গত ৯ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন তৃণা খান।
সেখানে স্থানীয়দের নানান ধরণের পাটজাত পণ্য ব্যবহার করতে দেখেছেন তিনি।
অথচ পাট-পণ্য ব্যবহারকারী সেই বিদেশি ক্রেতাদের অধিকাংশই জানেন না এই পাটের উৎপাদন হয় বাংলাদেশে।
মিসেস খান বলেন, "আমি প্যারিসসহ আশেপাশের ছোট শহরগুলোতে মানুষকে পাটের জিনিসপত্র ব্যবহার করতে দেখেছি।"
"এমনকি ফাইভস্টার হোটেলগুলোতেও দেখি আমাদের দেশের পাটের তৈরি কার্পেট। কিন্তু তারা এই সব জিনিসই কিনেছে ভারতের কাছ থেকে। কেউ জানেই না যে পাট বাংলাদেশে উৎপাদন হয়।"
বিশ্বের নানা দেশে দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের নানা ধরণের পণ্য। অথচ সম্ভাবনাময় এই খাতে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে।
বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ২২টি পাটকল চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে ৩৯৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
দক্ষ জনশক্তির অভাব, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং বিপণনে দক্ষতা না থাকার কারণে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে করেন জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ।
ঢাকায় পাটপণ্যের মেলায় পাটের কার্পেট সাজিয়ে বসেছেন দোকানি।
"বাজার ধরার মতো স্ট্রং মার্কেটিং আমাদের নেই, এটা পলিসি লেভেলের ব্যাপার। ভারত আধুনিক মেশিনে পাট প্রসেস করে বিদেশে রপ্তানি করছে। আর আমাদের মেশিন সেই মান্ধাতার আমলের।"
"এছাড়া পাটকলগুলোয় দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। আমাদের দক্ষ লোক দরকার। দক্ষ বলতে , টেকনিক্যাল ম্যানপাওয়ার।"
পাটের উৎপাদনে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় দেশ হলেও পাটের বর্তমান বিশ্ব বাজার দখল করছে ভারত।
বাংলাদেশে উৎপাদিত এসব পাটের কাঁচামাল ভারতেই সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় এবং বিদেশি ক্রেতারা এই পণ্যগুলো সরাসরি বাংলাদেশ থেকে নয় বরং ভারতের কাছ থেকে কিনে থাকে।
ফলে বাংলাদেশ পাট প্রক্রিয়াজাত করে লাভ গুনছে ভারতের বাজার।
বৈদেশিক চাহিদা অনুযায়ী তৈরি পণ্য রপ্তানি, সেইসঙ্গে সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন পশ্চিমবঙ্গের পাট ব্যবসায়ী তপন দাস।
"ভারত পাট আমদানি করে সেটা নিজেদের মেশিনে প্রসেস করে পণ্য বানায় বিক্রি করে। আর তারা তাদের নিজেদের পুরো বাজারের চাহিদা নিজেরা মেটায়। তারমানে তাদের একটা মার্কেট প্রটেকশনের জায়গা পাচ্ছে।"
এছাড়া বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে দেন-দরবার করতে না পারা সেইসঙ্গে সবচেয়ে ভাল মানের পাট রপ্তানি করে দেয়ার ফলে মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে না পারায় বাংলাদেশ তার বাজার তৈরি করতে পারছে না বলে মনে করেন পাট পণ্যের উদ্যোক্তা শাফিয়া সামা।
নানা ধরণের পাটপণ্য তৈরি করছেন এক নারী।
"ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় বড় দেশগুলোয় কার ইন্ড পাটের বড় একটা বাজার আছে। অথচ বাংলাদেশ সেই বাজারটা দখল করতে পারছে না দুটো কারণে।"
"প্রথমত ভাল মান নিশ্চিত না করা ও দ্বিতীয়ত দাম নির্ধারণ করতে না পারা। বিদেশি বায়াররা এই দুটো জিনিসই সবার আগে দেখে।"
এছাড়া পাট চাষিদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াকেও পাটের বাজার পড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পাটের বাজার পড়ে যাওয়ার পেছনে বিশ্বব্যাংকের একটি কারসাজিকে দায়ী করছেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের বিপণন মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ।
বিশ্বব্যাংকের সেই ফর্মুলায় বাংলাদেশের আদমজি জুটমিল বন্ধ হয়ে যায় এবং সে সময় বাংলাদেশের পুরো বাজার ভারত দখল করে নেয় বলে জানান তিনি।
"২০০২ সালের দিকে আদমজি জুট মিল বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বব্যাংকের ফর্মুলায়। ওইসময় বিশ্বব্যাংকের লোনে ইন্ডিয়াতে বড় মিল স্থাপিত হয়েছে। এতে ইন্ডিয়া লাভবান হলো, আমাদের সব বায়ার তারাই পেল।"
বর্তমানে বাংলাদেশে পাটের বহুমাত্রিক ব্যবহার দেখা গেলেও দৃশ্যপট খুব একটা বদলায়নি।
পাটের তৈরি বিভিন্ন আকারের ফ্লোরম্যাট ও টেবির ম্যাট।

Tuesday, November 12, 2019

জামদানি শাড়ি: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ির আসল-নকল চিনবেন যেভাবে by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশের যেসব নারী শাড়ি পছন্দ করেন, তাদের সংগ্রহে অন্তত একটি হলেও জামদানি শাড়ি থাকে।
নান্দনিক ডিজাইন এবং দামে বেশি হওয়ার কারণে জামদানির সঙ্গে আভিজাত্য এবং রুচিশীলতা - এই দুটি শব্দ জড়িয়ে আছে।
ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননের কারণে ২০১৬ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে আজকাল বিভিন্ন মার্কেটে জামদানির নামে বিক্রি হচ্ছে নকল শাড়ি, ফলে ঐতিহ্যবাহী জামদানির আবেদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
অনেক বিক্রেতা জামদানি বলে ভারতীয় কটন, টাঙ্গাইলের তাঁত, পাবনা ও রাজশাহীর সিল্ক শাড়ি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
২০১৬ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
প্রশ্ন হল আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায় তাহলে কী?
এক্ষেত্রে শাড়ি কেনার আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নজর দেয়ার কথা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনার শারমিন শৈলী এবং নারায়ণগঞ্জের জামদানি বিসিক শিল্প নগরীর তাঁতি মোঃ মনির হোসেন।

আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায়:

জামদানি শাড়ি কেনার আগে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে - শাড়ির দাম, সূতার মান এবং কাজের সূক্ষ্মতা।
আসল জামদানি শাড়ি তাঁতিরা হাতে বুনন করেন বলে এগুলো তৈরি করা অনেক কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই এগুলোর দামও অন্যান্য শাড়ির তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।
একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুইজন কারিগর যদি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন, তাহলে ডিজাইন ভেদে পুরো শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সাধারণত শাড়ি তৈরির সময়, সূতার মান ও কাজের সূক্ষ্মতা বিবেচনায় একটি জামদানির দাম ৩,০০০ টাকা থেকে এক লাখ ২০,০০০ টাকা কিংবা তারচেয়েও বেশি হতে পারে।
নারায়নগঞ্জে জামদানির পাইকারি বাজারে শাড়ি তুলে দাম হাকানো হয়
কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়িতে তেমন সময় বা শ্রম দিতে হয় না। এজন্য দামও তুলনামূলক অনেক কম।
জামদানি শাড়ি হাতে বোনা হওয়ায়, শাড়ির ডিজাইন হয় খুব সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত। ডিজাইনগুলো হয় মসৃণ।
কারিগর প্রতিটি সুতো হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুনন করেন। সূতার কোন অংশ বের হয়ে থাকে না। এ কারণে জামদানি শাড়ির কোনটা সামনের অংশ আর কোনটা ভেতরের অংশ, তা পার্থক্য করা বেশ কঠিন।
মেশিনে বোনা শাড়িতে কেবল জামদানির অনুকরণে হুবহু নকশা সেঁটে দেয়া হয়। এই শাড়িগুলোর উল্টো পিঠের সূতাগুলো কাটা কাটা অবস্থায় বের হয়ে থাকে।
জামদানি শাড়ি চেনার আরেকটি উপায় হতে পারে এর সূতা ও মসৃণতা যাচাই করা। জামদানি শাড়ি বয়নে সুতি ও সিল্ক সূতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সূতার ব্যবহারের দিক থেকে জামদানি সাধারণ তিন ধরণের হয়ে থাকে।
১. ফুল কটন জামদানি - যেটা তুলার সূতা দিয়ে তৈরি করা হয়।
২. হাফ-সিল্ক জামদানি - যেখানে আড়াআড়ি সুতাগুলো হয় রেশমের আর লম্বালম্বি সূতাগুলো হয় তুলার।
৩. ফুল-সিল্ক জামদানি - যেখানে দুই প্রান্তের সূতাই রেশমের হয়ে থাকে।
শাড়ি কেনার আগে এই সূতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি, কেননা নকল জামদানি শাড়ি সিল্কের পরিবর্তে পলেস্টার বা নাইলনের মতো কৃত্রিম সূতা ব্যবহার করে থাকে।
সূতার মান যাচাই করতে শাড়ির আঁচলের শেষ প্রান্তে যে কিছু সুতা বের হয়ে থাকে, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে।
জামদানি শাড়ির কোনটা সামনের অংশ আর কোনটা ভেতরের অংশ সেটা পার্থক্য করা বেশ কঠিন।
নাইলনের সূতা মসৃণ হয়, আর জামদানির সিল্ক সূতায় মাড় দেয়া থাকায় সেটা হবে অপেক্ষাকৃত অমসৃণ। সাধারণ পিওর সিল্কের সূতা টানাটানি করলে ছিঁড়ে যায় এবং এই সূতা আগুনে পোড়ালে চুলের মতো পোড়া গন্ধ বেরোয়।
আঁচলের শেষ প্রান্তের সূতাগুলো আঙ্গুল দিয়ে মোড়ানোর পর যদি সুতাগুলো জড়িয়ে যায়, তবে সেটা সিল্ক সূতার তৈরি আর যদি সূতাগুলো যেকোনো অবস্থায় সমান থাকে, তবে তা নাইলন।
এছাড়া কাউন্ট দিয়ে সূতার মান বোঝানো হয়। যে সুতার কাউন্ট যত বেশি, সেই সুতা তত চিকন। আর সূতা যতো চিকন, কাজ ততই সূক্ষ্ম হবে - যা ভাল মানের জামদানি শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
জামদানি শাড়ির সূতাগুলো সাধারণত ৩২-২৫০ কাউন্টের হয়ে থাকে।
জামদানির মান মূলত কাজের এই সূক্ষ্মতার উপর নির্ভর করে। আর শাড়ি কতোটা সূক্ষ্ম হবে, তা নির্ভর করে এই সূতা এবং তাঁতির দক্ষতার উপর।
সাধারণত যে শাড়িটা কাজ যতো সূক্ষ্ম, স্বাভাবিকভাবেই তার দামও ততো বেশি হয়ে থাকে। আবার সুতা যত চিকন, শাড়ি বুনতে সময়ও লাগে তত বেশি - কাজেই দামও বেশি পড়ে।
অন্যদিকে মেশিনে বোনা শাড়ির সুতা ২৪-৪০ কাউন্টের হয়ে থাকে।
তবে মেশিনে বোনা শাড়িগুলোর বুনন অনেক ঘন হয়। তাঁতে আর যাই হোক মেশিনের মতো ঘন বুনন দেয়া সম্ভব না।
জামদানির সূতায় মাড় দেয়া থাকে
জামদানি শাড়িতে যে অংশটুকু কোমরে গুঁজে রাখা হয়, ওই অংশটায় অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ হাত পর্যন্ত কোন পাড় বোনা থাকে না। কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়ির পুরো অংশ জুড়েই পাড় থাকে।
হাতে বোনা জামদানি ওজনে হালকা হয়ে থাকে এবং পরতেও আরামদায়ক।
তবে জামদানি খুব যত্ন করে রাখতে হয়, না হলে বেশিদিন টেকসই হয় না।
অন্যদিকে কোনও রকম হাতের ছোঁয়া ছাড়া, জামদানির ডিজাইন নকল করা, মেশিনে বোনা শাড়ি কৃত্রিম সুতোয় তৈরি হয় বলে এই শাড়িগুলো হয় ভারি এবং খসখসে।
তবে এই শাড়িগুলো বছর বছর ধরে পরা যায়।

জামদানির বৈশিষ্ট্য:

জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। এই জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরণের ফুল, লতাপাতা, কলকাসহ নানা ডিজাইন।
জামদানির ডিজাইন বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। তারমধ্যে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলি, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড় ইত্যাদি বেশি প্রচলিত।
জামদানিতে ছোট ছোট ফুল বা লতাপাতার ডিজাইন যদি তেরছা ভাবে সারিবদ্ধ থাকে, তাহলে তাকে তেরছা জামদানি বলে।
ফুল, লতার বুটি জাল বুননের মতো সমস্ত জমিনে থাকলে তাকে জালার নকশা বলা হয়।
পুরো জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি ফুলওয়ার নামে পরিচিত। ডুরিয়া জামদানি ডোরাকাটা নকশায় সাজানো থাকে।
তেমনি পাড়ে কলকির নকশা থাকলে তা হবে কলকাপাড়।
দীর্ঘ সময় ও কঠোর শ্রমের কারণে জামদানির দাম তাই অন্যান্য শাড়ির তুলনায় বেশি পড়ে।

Friday, October 11, 2019

প্রাথমিক শিক্ষা: ৬৫% শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারেনা by সানজানা চৌধুরী

৩৫% শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে
বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮% হলেও এই শিশুরা কতোটা মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৫% শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারেনা। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা তার চাইতেও বেশি।

"কিছু বাচ্চা অক্ষরই চিনে না"

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই অন্তঃসারশূন্য পাঠের কথা জানিয়েছেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার নতুন বসতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আকলিমা সুলতানা।
সরকারি নিয়মানুযায়ী শিশুদের বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভর্তি করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ওই শ্রেণীতে পরার দক্ষতা শিশুটির নেই।
"আমরা হয়তো বয়স দেখে একটা বাচ্চাকে ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি করলাম, কিন্তু পরে দেখা যায় যে তারা বাংলা ইংরেজি রিডিং পড়তে পারেনা। কিছু বাচ্চা অক্ষরই চিনেনা। এজন্য আমরাও তাদের পড়াতে পারিনা, কিছু বোঝোতে পারিনা। এটা তো আমাদের জন্যও দুর্ভোগ।" বলেন মিসেস সুলতানা।
এর কারণ হিসেবে তিনি জানান এই শিশুদের কখনোই বাড়িতে আলাদাভাবে যত্ন করা হয়না।
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী রয়েছে, তাদের সবার প্রতি আলাদা আলাদাভাবে নজর দেয়া রীতিমত অসম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মিসেস সুলতানা বলেন, "আমাদের একেকটা ক্লাসে মনে করেন ৫০জন ৬০জন ছাত্র ছাত্রী। এতোজন শিক্ষার্থীদের ধরে ধরে বোঝানো তো সম্ভবনা। একটি শিশুর বাসাতেও কিছু প্র্যাকটিস করতে হয়, পড়তে হয়, হোমওয়ার্ক করতে হয় সেই সাপোর্টটা তারা পায়না। কারণ অনেক বাচ্চার বাবা-মা পড়াশোনা জানেন না।"

"গ্রামের পাকা পায়খানা বানানোর কাজটাও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা করেন"

দুর্বল শিক্ষার্থীদের কাছে পঠন প্রক্রিয়া সহজ করে তুলতে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষকের সেই প্রশিক্ষণ নিয়মিত হয়না। মিসেস সুলতানারও সর্বশেষ প্রশিক্ষণ হয়েছিল ২০১৪ সালে। তাও প্রশ্নপত্র নিয়ে।
এরমধ্যে বিষয়ভিত্তিক তার আর কোন প্রশিক্ষণ হয়নি।
এই শিক্ষিকার মতো বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষকের বছরের পর বছর কোন ধরণের প্রশিক্ষণ হয়না।
বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের এই হার এশিয়ায় মধ্যে সবচেয়ে কম। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন তথ্য জানা গেছে।
একে তো শিক্ষার্থীদের অনুপাতে প্রয়োজনীয় দক্ষ শিক্ষকের অভাব। তারমধ্যে যে ক'জন আছেন তারাও তাদের পুরো সময় পাঠদানে দিতে পারেন না।
সব মিলিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শেখ ইকরামুল কবির।
"সরকারের এমন কোন কাজ নাই যেমন ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটগ্রহণ এমনকি গ্রামের পাকা পায়খানা বানানোর কাজটাও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা করেন। এবং এই সব কাজ স্কুল খোলা থাকার সময় হয়। ফলে শিক্ষকদের যতো শিক্ষা ঘণ্টা পাঠদান করানোর কথা ততোক্ষণ তারা পাঠদান করাতে পারছেনা।" বলেন মিঃ কবির।
শিক্ষকদের অল্প বেতন, সেইসঙ্গে মর্যাদাও কম হওয়ায় এই পেশার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এসব কারণে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া একজন শিক্ষার্থীর যে পরিমাণ জ্ঞান থাকা দরকার তার অর্ধেকও তারা অর্জন করতে পারেনা।

দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ

এমন অবস্থায় শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রাথমিকের প্রতিটি দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জানিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিশ্বব্যাংক এবং ইউনেস্কোর প্রতিবেদনগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী বছরের মধ্যে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের সবল করে তোলার বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আকরাম আল হোসেন।
এতো কম সময়ে এবং এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যে তারা এই লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মিঃ হোসেন বহুমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেয়ার কথা জানান।
"প্রথমত আমাদের স্কুলগুলোর শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবাইকে বলা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষার মান তদারকি করতে। আমাদের লক্ষ্য দুর্বল স্কুল এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা। এবং বিশেষ মনোযোগের মাধ্যমে তাদের সবল করে তোলা।" বলেন মিঃ হোসেন।
এজন্য প্রাথমিক ও প্রাক প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষকতার বাইরে তাদের যেন বাড়তি কাজ করতে না হয় সেদিকটাও মনিটর করা হবে বলে জানান তিনি।
"প্রতিটি স্কুলে গণিত অলিম্পিয়াড চালুর ব্যাপারেও আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া শিশুদের রিডিং ও রাইটিং এর উন্নয়নে 'ওয়ান ডে ওয়ান ওয়ার্ড' কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। যেখানে প্রতিটি শিশুকে একদিন একটা ইংরেজি শব্দ এবং একটি বাংলা শব্দ শেখানো হবে।"
সব মিলিয়ে ২০২০ সাল নাগাদ প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিটি শিশুকে দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে বলে আশাবাদী মিঃ হোসেন।

সরকারের মনযোগ সংখ্যায়, মানের দিকে নয়

বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় দুই কোটি ১৯ লাখের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে ২০২০ সালের মধ্যে মান সম্মত শিক্ষা দেয়া রাতারাতি সম্ভব নয় বলে মনে করেন গণস্বাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী।
কেননা প্রাথমিক শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্য জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রবর্তন করা হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই।
এ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের সমন্বয়হীনতার সেইসঙ্গে বিনিয়োগের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন
এছাড়া শ্রেণীকক্ষে গুণগত পাঠের বিষয়টি শিক্ষকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করলেও সেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
"সরকার সবার জন্য শিক্ষা বিষয়টার দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে শুধু সংখ্যার দিকে মনযোগ দিয়েছে। সংখ্যা কিন্তু আমরা অর্জন করতে পেরেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুরা কতোটা জ্ঞান অর্জন করল, সেটার দিকে দৃষ্টি দেয়া।"
এজন্য শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগী পাঠ্যক্রম সাজানোর পাশাপাশি তাদের উপযোগী শিক্ষা উপকরণ প্রতিটি স্কুলের প্রতিটি শ্রেণীকক্ষে সরবরাহ করা জরুরি বলে তিনি জানান।
যার জন্য মোটা অংকের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু পুরো এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ জিডিপির হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে সবচেয়ে কম।
এই খাতে বিনিয়োগ না করলে, শিক্ষকদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে না তুললে, সর্বোপরি প্রাথমিক শিক্ষার আধুনিকায়ন করা না হলে মানোন্নয়ন সম্ভব হবেনা বলে জানান মিসেস চৌধুরী।
এবারের এসডিজি প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ানো নয় বরং তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরকার কীভাবে সেই লক্ষ্য অর্জন করবে সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
যে পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রাথমিকে রয়েছে তাদের সবার প্রতি আলাদা মনযোগ দেয়া কঠিন

Saturday, October 5, 2019

ইলিশের বাড়ি আসলে কোথায়: চাঁদপুর না বরগুনায়? by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার আলাদা ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সেইসঙ্গে স্বীকৃত পণ্য আছে। সে হিসাবে চাঁদপুর জেলা ব্যাপকভাবে সমাদৃত ইলিশ উৎপাদনের জন্য।
এজন্য এই জেলাকে "ইলিশের বাড়ি" বলা হয়ে থাকে।
তবে ইলিশের মোট উৎপাদনের হিসেবে এবার বরগুনা জেলা থেকে দাবি তোলা হয়েছে যেন তাদেরকে "ইলিশের জেলা" ঘোষণা করা হয়।
ইলিশের বাড়ি কোথায় এ নিয়ে হঠাৎ এই বিতর্কের কারণ কী?

বরগুনা কেন হতে চায় ইলিশের জেলা

বিতর্কের শুরু হয়েছিল গতকাল বুধবার বরগুনায় অনুষ্ঠিত এক ইলিশ উৎসবে।
সেখানে আয়োজকরা দাবি করেন যে বরগুনা জেলার ৬টি উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার মৎস্যজীবী রয়েছেন, এবং ইলিশ উৎপাদনেও তাদের অবস্থান চাঁদপুরের চাইতে কয়েক ধাপ এগিয়ে।
তারা বলছেন, সেকারণে বরগুনাই "ইলিশের জেলা" হওয়ার দাবিদার।
ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের প্রায় ৮৫% উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ও সাগর থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়।
ইলিশ উৎপাদনের হিসেবে বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলার স্থান শীর্ষে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই জেলায় মোট ইলিশ আহরণ হয় এক লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টনের মতো।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বরগুনা। গত অর্থ বছরে এই জেলা থেকে আহরিত ইলিশের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন।
বরগুনার প্রধান তিনটি নদী বিষখালী, বুড়িশ্বর (পায়রা) ও বলেশ্বর নদী থেকে আহরণ করা হয় ৪৯০০ মেট্রিক টন। এবং সাগর থেকে ৯১,০০০ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে, একই অর্থবছরে চাঁদপুর থেকে ইলিশ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। ইলিশ আহরণের হিসাবে এই জেলার অবস্থান ষষ্ঠ স্থানে, এবং এই চাঁদপুর 'ইলিশের বাড়ি' বলে পরিচিত।
তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চাঁদপুরকে ইলিশের বাড়ি কেন বলা হয় এটা নিয়ে কোন আপত্তি নেই বরগুনাবাসীর।
বরগুনা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা চাই বরগুনাকে ইলিশের জেলা হিসেবে দেখতে। কারণ আমরাই সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদন করছি। দেশের প্রায় এক পঞ্চমাংশ ইলিশ এই বরগুনায় আহরিত হয়। এবং সারা দেশে যত ইলিশ পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ যায় বরগুনা থেকে।"
এছাড়া বরগুনার নদী থেকে আহরিত ইলিশের স্বাদ পদ্মার ইলিশের চাইতে অনেক সুস্বাদু বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, "বরগুনার ইলিশ অন্য যেকোনো জেলার ইলিশের চাইতে সুস্বাদু। আর এই জেলার ইলিশ সাইজেও বড় থাকে। একেকটা ইলিশ প্রায় এক কেজির মতো। তেলও হয় প্রচুর। এখন উৎপাদন, স্বাদ, গড়ন সবদিক থেকে বরগুনা এগিয়ে আছে, আমরাই ইলিশের ভাণ্ডার, তাই ইলিশের জেলা হওয়ার দাবি আমরা করতেই পারি।"
জাতীয় মাছ ইলিশকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করার পেছনে বরগুনা সবচেয়ে বেশি ভূমিকার রেখেছে বলেও দাবি সেখানকার মানুষের।
বরগুনার পাথরঘাটায় রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য পাইকারি ও বাজারকেন্দ্র বিএফডিসি।
এরকম আরেকটি ইলিশ-বন্দর (যেখানে ইলিশ এনে রাখা হয়) স্থাপন এবং একটি ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণের প্রচেষ্টা রয়েছে বলে ইলিশ উৎসবে আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় একজন সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।
মাছ ধরার নৌকা, ঘাটগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে বরগুনাকে ইলিশের জেলা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করবেন বলেও জানান।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে: রগুনার এত অর্জন থাকা সত্ত্বেও এখনও চাঁদপুরকেই কেন ইলিশের বাড়ি বলা হয়।

চাঁদপুর কেন ইলিশের বাড়ি

চাঁদপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আসাদুল বাকি জানান, বরগুনা উপকূলের কাছাকাছি জেলা হওয়ায় সেখানকার জালে মাছ ধরা পড়ে বেশি তবে প্রজননের সময় মা ইলিশগুলো এই চাঁদপুরের আশেপাশের নদীতেই আসে। এ কারণেই এই জেলাকে ইলিশের বাড়ি বলা হয়।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ইলিশ বিচরণ করে লোনা পানিতে, কিন্তু ডিম পাড়ার সময় তারা মিঠা পানির মোহনায় আসে। চাঁদপুরের পদ্মা নদীতে প্রচুর পরিমাণে প্ল্যাঙ্কটন আছে, যেটা মা ইলিশের প্রধান খাবার। এই প্ল্যাঙ্কটন আর অন্য কোন জেলায় নেই। পানির মান আর খাবার থাকায় মা ইলিশ এখানে ডিম ছাড়তে আসে। তার মানে এটা তাদের বাড়ি।"
মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় চাঁদপুরে ইলিশের আহরণ কম হয়।
অন্যদিকে ডিম ছাড়ার মৌসুম শেষে যখন আবার ইলিশ ধরা শুরু হয় ততদিনে এই ইলিশগুলো উপকূলীয় জেলাগুলোর দিকে চলে যাওয়ায় সেখানে স্বাভাবিকভাবে ইলিশ বেশি ধরা পড়ে বলে তিনি জানান।
এদিকে, চাঁদপুরে ইলিশ আহরণ তুলনামূলক কম হলেও ইলিশের সবচেয়ে বড় বাজার এই জেলাতেই।
স্থানীয় সাংবাদিক ফারুক আহম্মদ বলেন, " দেশের ৩০% ইলিশ চাঁদপুর থেকে আহরণ করা হয়। তাছাড়া ভোলা, বরিশাল, নোয়াখালিসহ অন্যান্য কয়েকটি জেলায় আহরণ করা সব ইলিশ আগে আনা হয় চাঁদপুরের বাজারে। এখান থেকেই সারা দেশে মাছ সরবরাহ করা হয়। দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় অর্ধেক এই বাজারগুলো থেকেই সারাদেশে পাঠানো হয়।"
তাই চাঁদপুর অন্য যেকোন জেলার চাইতে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
২০১৫ সালে চাঁদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুস সবুর মণ্ডল ইলিশের ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম শুরু করেন । চাঁদপুর জেলাকে 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর' নামে ব্র্যান্ডিং করেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকেও পরে এই দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

Friday, October 4, 2019

একাকী মা কিংবা একাকী বাবাদের জীবনের গল্প by সানজানা চৌধুরী

একাকী মায়েদের জীবনযুদ্ধ অনেক কঠিন
ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা আয়েশা সিদ্দিকার স্বামী মারা যাওয়ার সময় তার বড় মেয়ের বয়স ছিল আট এবং ছোট মেয়ের মাত্র তিন বছর।
এরপর দীর্ঘ ২৭ বছর স্বামীকে ছাড়া দুই মেয়েকে নিয়ে এক হাতে সংসার সামলেছেন তিনি। যা কখনোই সহজ ছিল না।
মেয়েদের পড়াশোনা, বাড়ি ভাড়া, মাসের খরচ- সেইসঙ্গে সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কঠোর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। চলার পথের সেইসব বাধা কিভাবে তিনি সামাল দিয়েছেন সেই অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মিসেস সিদ্দিকা।
"যখন আমার স্বামী মারা যান, আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম যে কি করবো। দুটো মেয়েকে বড় করবো কিভাবে। তখন পরিবারের অনেক কাছের মানুষও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।"
"আবার অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছি বলে অনেক পুরুষই নানা সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করতো। কিন্তু আমি মনকে শক্ত করে চাকরি করে গেছি। সবাই বলতো মেয়েদের ছোট অবস্থাতেই বিয়ে দিয়ে দিতে। আমি কারও কথা শুনিনি। কারণ আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে আমি আমার মেয়েদের কারও মুখাপেক্ষী করবো না।"
মিসেস সিদ্দিকার দুই মেয়েই এখন বড় বড় প্রতিষ্ঠানে বড় চাকরি করেন। তারাই এখন মায়ের দেখাশোনা করছে। তিনি যে এভাবে সন্তানদের বড় করতে পারবেন এটা তার কাছের মানুষরাই কখনও ভাবতে পারেনি।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নজরুল ইসলামও তার স্ত্রীকে হারিয়েছেন প্রায় দুই দশক হল। দুই ছেলের বয়স তখন খুব কম থাকায় পরিবার থেকে বার বার চাপ আসে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য।
সবাই প্রশ্ন করতো পুরুষ হয়ে একা কিভাবে সংসার সামলাবেন। কিন্তু নজরুল ইসলাম ছিলেন অটল। কাছের মানুষদের সাহায্যে একা একাই তিনি পালন করেছেন বাবা ও মায়ের ভূমিকা।
"আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সবাই চাপ দিতে শুরু করে বিয়ে করতে। ভাবতো যে পুরুষ মানুষ একা সংসার সামলাতে পারবেনা। কিন্তু আমি তা কখনোই চাইনি। এটা ঠিক যে একজন মায়ের অভাব কখনোই পূরণ করা সম্ভব না। কিন্তু আমি অফিস শেষে সংসারের কাজ করেছি। ছেলেদের পড়িয়েছি। আমার ছেলেরাও বুঝে গিয়েছিল তাদের মনকে শক্ত রাখতে হবে। আসলে সংসার চালানোর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে হবে, এমনটা আমি ভাবতেই পারিনি।"
বাংলাদেশে সামাজিকভাবে পরিবারের সংজ্ঞা মানেই মা এবং বাবা। সিঙ্গেল প্যারেন্টিংয়ের যুতসই কোন শব্দও বাংলা অভিধানে নেই। বাংলাদেশে একক মা কিংবা একক বাবার ধারণাটিকে স্বাভাবিকভাবে নেয়ার জন্য যে সামাজিক পরিবেশ বা মানসিকতার প্রয়োজন, সেটার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন।
"আমাদের সমাজে ধরেই নেয়া হয় যে একা মা অথবা একা একজন বাবা সন্তান মানুষ করতে পারবেনা, সংসার করতে পারবেনা। সিঙ্গেল প্যারেন্টিং কনসেপ্টটাকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতাই আমাদের মধ্য তৈরি হয়নি। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় কিছু সুযোগ সুবিধার বিষয়ও আছে, যেটা কিনা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে একক বাবা মায়েদের দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে এমন কোন সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে কোন আলোচনাই হয়না।"
এক্ষেত্রে অভিভাবকের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন। সমাজে একক অভিভাবকত্বের বিষয়টিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমেরও এগিয়ে আসার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
"পাঠ্যসূচিতে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে একজন বাবা কিংবা মা চাইলেই সংসার করতে পারেন, সন্তানকে দেখাশোনা করতে পারেন, ভরনপোষণ করতে পারেন। যেসব দেশে সলো মাদার সলো ফাদার কনসেপ্ট আছে, সেইসব দেশে রাষ্ট্র তাদেরকে কিভাবে সহায়তা করে সেখান থেকে ধারণা নেয়া যেতে পারে। তাদের থেকে উদাহরণ নিয়ে আমরা কিছু আইনগত দিক তৈরি করতে পারি। এছাড়া সিঙ্গেল প্যারেন্টিংয়ের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গনমাধ্যমেরও ভূমিকা রাখতে হবে।"
বাবা অথবা মায়ের মধ্যে কোন একজনের মৃত্যু হলে বা , কাজের প্রয়োজনে কেউ আলাদা বসবাস করলে অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে অনেক অভিভাবককেই একা সন্তান লালন পালন করা হয়। বাংলাদেশে সিঙ্গেল প্যারেন্টসদের নিয়ে কোন গবেষণা না হলেও এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

Saturday, September 28, 2019

বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো প্রবাসীদের আদৌ কতোটা সেবা দেয় by সানজানা চৌধুরী

ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভেতরে এক ব্যক্তিকে মারধর করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস কর্মকর্তাদের প্রবাসীদের প্রতি আচরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশে বাংলাদেশের শ্রমিকরা কাজ করতে যান তাদের বেশিরভাগেরই অভিযোগ থাকে যে, তারা সেখানকার দূতাবাস থেকে ন্যূনতম সহায়তাটুকু পান না।

"যে কাজ একবারে করা যায়, ওইটা ঘুরায় ঘুরায় করবে"

পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে কাজ করতে গেলেও দেশটির আবহাওয়া এবং কাজের চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না রানী দাস।
নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসা এক প্রবাসী নারী শ্রমিক
এমন অবস্থায় তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইলেও দূতাবাস থেকে তাকে কোন ধরণের সহায়তা করা হয়নি।
তার মতো এমন ছয়জন নারীকে এখন ভিক্ষাবৃত্তি করে খেতে হচ্ছে বলে জানান রানী দাস।
দেশে ফিরতে পারলেও কাজের পুরো পারিশ্রমিক ছাড়াই ফিরতে হয়েছে দিনাজপুরের মোর্শেদা বেগমকে। প্রায় দেড় বছর সৌদি আরবে কাজ করলেও বেতনের মাত্র অর্ধেক তুলতে পেরেছেন তিনি।
"অ্যাম্বাসিওয়ালা মনে করেন জেলখানা থেকেও বেশি কষ্ট দেয়। যে কাজ একবারে করা যায়, ওইটা ঘুরায় ঘুরায় করবে। আমাদের টাকা কেমনে পাব, কোন খোঁজ নেয়না, আমরা কী খাই, কেমনে আছি। বাংলাদেশে তো কল করা যায়না। আমি বাঁইচা আছি না মারা গেছি এইটা বাংলাদেশের কেউ জানেনাই এতদিন।"- বলেন মোর্শেদা বেগম।

দূতাবাসের ভেতরে মারধর

ব্রুনেই দূতাবাসে নির্যাতনের সর্বশেষ যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এক প্রবাসী ব্যক্তিকে দূতাবাস কর্মকর্তার সামনেই একে একে কয়েকজন মারধর করছে।
মারধরের শিকার ওই ব্যক্তি একজন দালাল এবং তাকে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরাই পেটাচ্ছিলেন বলে দাবি করেছেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি জিলাল হোসেইন।
প্রবাসে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হন।
ব্রুনেই লেবর উইং-এর ফেসবুক পেইজেও দেখা যায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজ দেয়ার নামে যে দালাল চক্র বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় তাদেরই এক সদস্যের প্রতি উদ্ধত হয়েছিল শ্রমিকরা।
কিন্তু প্রশ্ন রাখা হয় একটি দূতাবাসের ভেতরে এ ধরণের ঘটনাকে প্রশ্রয় দেয়া হল কেন।
এ ব্যাপারে মি. হোসেইন জানান, দূতাবাসে এ ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা তারাও প্রত্যাশা করেন না।
"ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। যেটুকু জানি যে, আমাদের কোন কর্মকর্তা কারও গায়ে হাত তোলেনি। যারা পিটিয়েছে তারা হল ক্ষুব্ধ শ্রমিক। কারণ তারা এই দালালদের মাধ্যমে এসেও দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে কোন কাজ পাচ্ছেনা।"
ব্রুনেই সরকারকে এই দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেও কোন ফল যায়নি বলে তিনি জানান।
মধ্যপ্রাচ্যে নির্মাণ শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি।
"আমরা এই শ্রমিকদের মতোই হেল্পলেস। আমাদের এখানে ম্যাজিটেরিয়াল পাওয়ার আছে, পুলিশি পাওয়ার নেই। আমরা শুধু এই দেশের সরকারকে রেফার করতে পারবো। দালালদের চিহ্নিত করে দিতে পারবো। অনেক সুপারিশও করেছি। কিন্তু তারা কোন ব্যবস্থা নেয়নি।"

কী বলছে সরকার?

ব্রুনেইয়ের এই ঘটনাটিকে নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা গতকাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. কে. আব্দুল মোমেন।
বিষয়টি নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা করা হবে বলেও বিবিসি বাংলাকে জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ফারুক খান ।
শ্রমিকরা দূতাবাসে যে নিগ্রহের শিকার হন সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বৈঠকে আলোচনা করার কথাও জানান তিনি।
যেখানে দূতাবাসের কাজ প্রবাসীদের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সেবা দেয়া, সেখানে তাদের কার্যক্রম এবং আচার আচরণ কতোটা নজরদারি করা হয়।
এ বিষয়ে মি. খান বলেন, "বাংলাদেশের দূতাবাসে যে সরকারি কর্মকর্তারা কাজ করেন, তারা যেই মন্ত্রণালয়েরই হোক না কেন, প্রবাসীদের যথাযথ সাহায্য করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কেউ যদি এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে থাকে। তাহলে অবশ্যই এর তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিক।
প্রতিটি দূতাবাসের সেবা আরও জোরদার করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় প্রবাসীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

দূতাবাসগুলোয় সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা কেন

দূতাবাসে জনবল নিয়োগে যে মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব সেইসঙ্গে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির।
এক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে নজর দেয়ার কথা জানান তিনি।
প্রথমত, যে মন্ত্রণালয়গুলো এই দূতাবাসগুলোয় লোক পাঠায়, ঢাকায় তাদের মধ্যে একটা সমন্বয় করা।
বাংলাদেশে এই সমন্বয়ের যথেষ্ট অভাব আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, যারা দূতাবাসে কাজ করতে যাবেন, তাদের জন্য যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
যেন তারা নতুন দেশের, নতুন পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও কাজের ধরণের সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
প্রবাসে শ্রমিকদের মানবেতন জীবন যাপন।
যারা এই প্রশিক্ষণে উত্তীর্ণ হবেন, শুধুমাত্র তাদেরকেই মিশনে পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি। না হলে এ ধরণের অবাঞ্ছিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
ব্রুনেইতে যে ঘটনা ঘটে গেল এজন্য সেই দূতাবাসের রাষ্ট্রদূতের পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন মি. কবির।
"দূতাবাসের প্রধান যিনি আছেন তিনি এই ব্যাপারটা বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন যে কি ব্যবস্থা নেয়া দরকার। কিন্তু এই ধরণের ঘটনা এক মিশনে বা বিভিন্ন মিশনে যদি বার বার ঘটতে থাকে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের বিষয়টা দেখা উচিত। এবং এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে দেয়া উচিত যে প্রবাসীদের সঙ্গে আচরণ কিভাবে করতে হবে। তাদেরকে কিভাবে সেবাগুলো দিতে হবে।"
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকরা একটি বড় ভূমিকা রাখলেও প্রবাসে দূতাবাসগুলোতে তাদের বঞ্চনার খবরই বার বার উঠে আসে।
এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাসের বাণী এলেও বাস্তবে কোন প্রতিফলন দেখা যায়না।