Monday, November 4, 2024

‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধের শতবর্ষ by এমরান কবির

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুই কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। সে হিসাবে এখন বই দুটি নিষিদ্ধের শতবর্ষ...

‘কোনো বইয়ের প্রচার নিষিদ্ধ না করে তাকে বরং জনমতের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া উচিত,’ বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারক কুটিক রক। ১৯৪৮ সালে অশ্লীলতার প্রশ্নে একটি মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ালে রায় দিতে গিয়ে কথাটি উল্লেখ করেন তিনি। কথা সত্যও বটে! বই আসলে জনমতের সঙ্গে সংগ্রাম করেই টিকে থাকে। যেমন আজ থেকে শতবর্ষ আগে কাজী নজরুল ইসলামের বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান বই দুটি নিষিদ্ধ করেছিল ব্রিটিশ সরকার। বই ও লেখালেখি নিয়ে ব্রিটিশদের মনোভাব ছিল কঠোর। ব্রিটিশ শাসনামলে বাজেয়াপ্ত বই নিয়ে গবেষণা করেছেন বিষ্ণু বসু, অশোক কুমার মিত্র প্রমুখ। শিশির কর এ ক্ষেত্রে এক কিংবদন্তি। নিষিদ্ধ নজরুল আর ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই নামের দুই গ্রন্থ লিখে সাহিত্যের ইতিহাসে প্রণম্য হয়ে আছেন তিনি। ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বইয়ে তিনি জানাচ্ছেন, ‘ইংরেজ আমলে ভারতের প্রায় সব প্রাদেশিক ভাষার গ্রন্থই রাজরোষে পড়েছে।’ এ কথা থেকে প্রমাণিত হয় যে ব্রিটিশ সরকার বই ও তার প্রভাব নিয়ে কতটা চিন্তিত ছিল। বই আর লেখালেখি নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা প্রণয়ন করেছিল কয়েকটি আইন। ইন্ডিয়ান প্রেস অ্যাক্ট ১৯১০, নিউজপেপার অ্যাক্ট ১৯০৮, সেডিশিয়াস পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট ১৮৮২, ইন্ডিয়ান প্রেস ইমার্জেন্সি পাওয়ার অ্যাক্ট ১৯৩০ প্রভৃতি।

এই বাস্তবতায় ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয় নজরুলের দুটি বই বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান। বই দুটি নিষিদ্ধও হয়েছিল একই বছর ফৌজদারি বিধির ৯৯-এ ধারা অনুসারে। বিষের বাঁশী নিষিদ্ধ হয় ২২ অক্টোবর আর ভাঙার গান এর তিন সপ্তাহের মধ্যেই—১১ নভেম্বর ১৯২৪। সেই হিসাবে নজরুলের বই দুটি নিষিদ্ধের এখন শতবর্ষ। তবে শতাব্দী পেরিয়ে জনতার মধ্যে আদৃত হতে হতে কালজয়ী হয়ে গেছে এসব বই। বই দুটি শুধু প্রভাব বিস্তারকারীই নয়, প্রবল আলোচিতও। আর এই ১০০ বছরেও বই দুটির প্রাসঙ্গিকতা একবিন্দু কমেনি। কিন্তু গোরা আমলে বই দুটিকে কেন নিষিদ্ধ করেছিল শাসক? কী ছিল তার পরিপ্রক্ষিত?

‘বিষের বাঁশী’র বিষ

কাজী নজরুল ইসলামের বাজেয়াপ্ত পাঁচটি বইয়ের মধ্যে অন্যতম বিষের বাঁশী। বইটি ১৯২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিলেন স্বয়ং কবি। প্রচ্ছদ করেছিলেন কল্লোল–এর সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। নজরুল তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমার ঝড়ের রাতের বন্ধু।’ এ বইয়ের ‘কৈফিয়ত’ শিরোনামে ভূমিকায় কবি জানান, ‘“অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড” নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেই সব কবিতা ও গান দিয়ে এই বিষের বাঁশী প্রকাশ করলাম। নানা কারণে “অগ্নিবীণা দ্বিতীয় খণ্ড” নাম বদলে বিষের বাঁশী নামকরণ করলাম। এ বিষের বাঁশীর বিষ জুগিয়েছেন আমার নিপীড়িতা দেশমাতা আর আমার ওপর বিধাতার সকল রকম আঘাতের অত্যাচার।’

ভূমিকার এ অংশ থেকে জানা যাচ্ছে, অগ্নিবীণার পরিবর্ধিত রূপ বিষের বাঁশী। আর কবির স্বীকারোক্তির মধ্যেই রয়েছে এই কাব্যের বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ শিল্পিত মনোভাব। বইটি প্রকাশের পর প্রভাবশালী সাময়িকী প্রবাসীতে বলা হয়েছিল, ‘কবিতাগুলি যেন আগ্নেয়গিরি, প্লাবন ও ঝড়ে রূদ্ররূপ ধরিয়া বিদ্রোহী কবির মর্মজ্বালা প্রকটিত করিয়াছে। জাতির এই দুর্দিনে মুমূর্ষু নিপীড়িত দেশবাসীকে মৃত্যুঞ্জয়ী নবীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করিবে।’

এই যে ‘নবীন চেতনায় উদ্বুদ্ধ’ করা, এটি আমাদের দেশমাতার জন্য শুভকর হলেও ব্রিটিশ শাসকের জন্য মোটেও শুভকর ছিল না। দেশবাসী লুফে নিলেও কেউ কেউ বৈরী হয়ে উঠলেন। এমন একজন অক্ষয় কুমার দত্ত গুপ্ত। পেশায় তিনি ছিলেন বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। ১৯২৪ সালের ২১ আগস্ট বইটি নিয়ে সরকারের পাবলিক ইনস্ট্রাকশন বিভাগকে চিঠি লেখেন তিনি। সে চিঠির কিছু অংশ এ রকম, ‘অস্বচ্ছ ধারণার ওপর ভয়াবহ উদ্দেশ্য সাধন করতে বারংবার যেসব উত্তেজক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে রক্ত, স্বৈরাচার, মৃত্যু, আগুন, নরক, দানব ও ব্রজের মতো শব্দ।’ অক্ষয়বাবুর আবেদন বিফলে যায়নি। কয়েক দফা চিঠি–চালাচালির পর একই বছরের ২২ অক্টোবর চিফ সেক্রেটারি এ এস মোবারলের স্বাক্ষরে বিষের বাঁশী বাজেয়াপ্ত করার আদেশ জারি হয় এবং তা প্রজ্ঞাপন আকারে ছাপা হয়।

এ আদেশের পর বই আটকাতে নেমে পড়ে পুলিশ। কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কাজী নজরুল ইসলামকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন।

তবে কী আছে বইটিতে, যে জন্য প্রবাসী থেকে লাইব্রেরিয়ান হয়ে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা মারফত শেষ পর্যন্ত এটি বাজেয়াপ্ত হলো? বিষের বাঁশীর প্রথম কবিতা ‘অভিশাপ’-এর  প্রথম লাইন ‘আমি বিধির বিধান ভাঙিয়াছি, আমি এমনি শক্তিমান!’ বলা ভালো, নজরুলের ‘বিধি’ কোনো একক অর্থের প্রতিনিধি নয়। শব্দটি নানান অর্থ তুলে ধরে। ব্রিটিশরাজের কাছে এই ‘বিধি’ নিশ্চয়ই তাদের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। বিধির বিধান ভাঙতে যে নিজের শক্তিমত্তার প্রকাশ করবে, সে তো আসলেই ভয়ানক! একই কাব্যগ্রন্থের ‘চরকার গান’-এ কবি লিখেছেন, ‘ঘোর রে ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর/ ওই স্বরাজ রথের আগমনী শুনি চাকার শব্দে তোর।’ নজরুল চরকার শব্দে স্বরাজ রথের আগমনী  শুনতে পান বলেই এ কবিতায় বলেন— ‘ঘুচুক ঘুমের ঘোর’। আবার ‘ঝড়’ নামের দীর্ঘ কবিতার এক জায়গায় আছে— ‘ঝড় কোথা? কই?—/ বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ওই ডাকে ওই—’।

বিপ্লবের লাল-ঘোড়া ডাকার কথা যিনি বলেন, তিনি আর যা–ই হোন, নিরাপদ হবেন না।

‘ভাঙার গান’–এর ভয়াল সুর

ভাঙার গান প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে (১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে)। প্রকাশক ছিলেন কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি এবং যুগবাণী পত্রিকার আর্য পাবলিশিং হাউস। একই বছর ১১ নভেম্বর তৎকালীন বঙ্গীয় সরকার বইটি নিষিদ্ধ করে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ থাকলেও বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে।

ভাঙার গান–এর সবচেয়ে বিখ্যাত গান—‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’। এই গান রচনার প্রেক্ষাপটও ঐতিহাসিক। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় বের হয় বাঙ্গালার কথা পত্রিকা। এ সময় মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে একের পর এক কারারুদ্ধ হচ্ছেন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামীরা। চিত্তরঞ্জন দাশও কারারুদ্ধ হলেন। তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী দ্বারস্থ হলেন ২২ বছর বয়সী কাজী নজরুল ইসলামের। এ বিষয়ে নজরুলের বাল্যবন্ধু কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা বইয়ে লিখেছেন, ‘আমার সামনেই দাশ পরিবারের শ্রী সুকুমাররঞ্জন দাশ বাঙ্গালার কথার জন্য একটি কবিতা চাইতে এসেছিলেন। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নজরুল তখনই কবিতা লেখা শুরু করে দিল। সুকুমাররঞ্জন ও আমি আস্তে আস্তে কথা বলতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে নজরুল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তার সেই মুহূর্তে রচিত কবিতাটি পড়ে শোনাতে লাগল।’ হুগলির জেলে দেশবন্ধুর সঙ্গে অন্য বন্দীরাও গাইতেন এই ‘কারার ঐ লৌহ–কবাট’।

ব্রিটিশ শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে তখন আন্দোলন শুরু হয়েছে দিকে দিকে। বিপ্লবীদের বন্দী করে পাঠানো হচ্ছে জেলে। এভাবে পুরো দেশটাই যেন হয়ে উঠেছিল কারাগার। এমন এক সময় বের হয় নজরুলের ভাঙার গান। বইটি ব্রিটিশ শাসনের মর্মমূলে আঘাত হেনেছিল। এই কাব্যগ্রন্থে কবি যখন বলেন, ‘বাঙলার শের বাঙলার শির/ বাঙলার বাণী বাঙলার বীর’ কিংবা ‘দুঃশাসনের রক্ত চাই।/ দুঃশাসনের রক্ত চাই।/ অত্যাচারী সে দুঃশাসন/ চাই খুন তার চাই শাসন’ কিংবা ‘আয় ভীম আয় হিংস্র বীর’, তখন ব্রিটিশরাজের সিংহাসন কি টলে ওঠে না? বাংলা তো শোষণের ক্ষেত্র, তারা বীর হবে কেন? এরা দুঃশাসনের রক্ত চায় কীভাবে! আবার ভীমকে ডাকে! পাগলা ভোলাকে আহ্বান করে প্রলয়ের টানে সব গারদের আগল ভেঙে দেওয়ার জন্য! সবচেয়ে বড় কথা, সবকিছুকে পায়ের ভৃত্য করে বন্দী বিপ্লবীদের সব কারাগারের তালা লাথি মেরে ভেঙে ফেলার কথা বলা হয় এখানে।

স্বভাবতই ব্রিটিশরা এগুলো ভালোভাবে নেয়নি। ভাঙার গান–এর প্রভাব ছিল গভীরতর। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘জেলে যখন ওয়ার্ডাররা লোহার দরজা বন্ধ করে, তখন মন যে কী আকুলি-বিকুলি করে, কী বলব। তখন বারবার মনে পড়ে কাজীর সেই গান—“কারার ঐ লোহ-কবাট”।’

পরাধীন ভারতে গানটির প্রভাব বুঝতে ওপরের ঘটনাটিই যথেষ্ট।

‘কারার ঐ লোহ-কবাট’–এর বহিরাঙ্গিকে কবাট ভাঙার কথা থাকলেও আদতে এতে বলা হয়েছে বৈষম্য ভাঙার কথা। সাম্প্রতিক কালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও এই গানের প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। গ্রাফিতিতে এখনো গানটির কথা ও ভাব-চিত্র দৃশ্যমান। শতবর্ষ পরে বৈষম্যহীন সমাজের জন্য ছাত্র-জনতা আজ যে নিজের রক্ত ঝরাচ্ছে, জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, তার শুরুটা তো করেছিলেন নজরুল নিজেই। কারাবন্দী অবস্থায় কবি যখন গানটি গাইতেন, তখন বন্দীদের জমানো ক্ষোভ গর্জে উঠত। একই দৃশ্য যেন দৃশ্যায়িত হলো শতবর্ষ পর। সেখানে কেবল শারীরিকভাবেই নজরুল অনুপস্থিত। বাকি সব আগের মতোই। আদতে ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। হয়তো সে কারণেই নজরুলকে দিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যে সূচনা, শতবর্ষ পরেও তা চলমান।

ভাঙার গান মূলত গানের বই। এসব গানে আছে সব ধরনের অচলায়তন-দুর্বৃত্তপনা ও বৈষম্য ভাঙার কথা। ব্রিটিশরাজের ভয় ছিল যে এসব ভাঙলে তাদের সিংহাসনও ভেঙে যাবে। তাই তো আটকে দেওয়া হয়েছিল এ গানের সুর। কিন্তু যা শাশ্বত অধিকারের অংশ, তাকে কি নিষেধের বাধা দিয়ে আটকানো যায়! আটকানো যায়নি ভাঙার গান–এর সুরকেও। কোথাও কোনো অন্যায়–নিপীড়ন হলেই ওই সুর এখন আরও তীব্রভাবে বাজে।

বই কি কখনো নিষিদ্ধ করা যায়? এই প্রশ্নের এক জুতসই উত্তর দিয়েছেন রুশ লেখক মিখাইল বুলগাকভ তাঁর বই মাস্টার অ্যান্ড মার্গেরিটার মধ্যে, ‘পাণ্ডুলিপি কখনোই পোড়ে না।’ বই নিষিদ্ধ নিয়ে এর চেয়ে সত্য আর নেই।

বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ গ্রন্থের ইতিহাস ও পরিণতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেগুলোর প্রচার, প্রসার, পঠন, সংরক্ষণ কোনোটাই শেষ পর্যন্ত রহিত করা যায়নি; বরং নিষিদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর বেশির ভাগই পেয়েছে ব্যাপক প্রচার। বিষের বাঁশী বা ভাঙার গান–এর ক্ষেত্রেও এটি সমসত্য। আর এই দুই বইয়ের মধ্যে শৈল্পীর সৌকর্যের পাশাপাশি বিদ্রোহ ও বিপ্লবের যে চিরায়ত উপাদান, সেটিই একে কালোত্তীর্ণ করে তুলেছে। শিকল পরে শিকলকে বিকল করার কথা আছে নজরুলের গানে। এই বই দুটিও যেন নিষিদ্ধ হওয়ার ‘শিকল’ পরে প্রকারান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসকের ‘শিকল’ ভেঙে ফেলতে উৎসাহ জুগিয়েছে কালে কালে, বারবার।

নিষিদ্ধের শতবর্ষ

হাজার হাজার ইসরায়েলি সেনা মিলেও দখল করতে পারেনি লেবাননের একটি গ্রাম

লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযানের এক মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন নেই ইসরায়েলের। উল্টো ৯৫ জনের বেশি ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে লেবাননে। গেল মাসের শুরুতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সীমিত পরিসরে এই অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েল।

হিব্রু ভাষার পত্রিকা ইয়েদিয়থ আহরোনোথের বরাতে মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে এখনও পর্যন্ত একটি গ্রামও দখল করতে পারেনি ইসরায়েলি বাহিনী। অথচ সেখানে ৫০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে সাম্প্রতিকতম ইসরায়েলি এই অভিযানে ৫টি ডিভিশন মোতায়েন করা হয়েছে। ২০০৬ সালের তুলনায় এই সংখ্যা তিনগুণ। তবুও ব্যর্থ ইসরায়েল। এখনও লেবাননে উল্লেখযোগ্য কোনো অঞ্চল দখলে নিতে পারেনি তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কৌশলের কাছেই মার খাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। বিশেষ করে কয়েক ধাপের প্রতিরক্ষা এবং সাঁজোয়া যানের ওপর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের নিখুঁত হামলায় ইসরায়েলি বাহিনী দিশাহারা।

প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দাবি, তারা এরই মধ্যে ইসরায়েলের ৪২টি মেরকাভা ট্যাংক, ৪টি বুলডোজার, দুটি হুমার, একটি সাঁজোয়া যান এবং একটি ট্রুপ ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছে। এছাড়া ৯৫ জনের বেশি ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং ৯০০ আহত বলেও দাবি করেছে প্রতিরোধ যোদ্ধারা। 

ইসরায়েলি সেনা। ছবি : সংগৃহীত

ইসরাইলি হামলায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে জীবন-মরণ লড়াই করছে লেবাননের ছোট্ট ইভানা

এখনও ফোটেনি মুখের ভাষা। বয়স মাত্র দুই বছর। এমন একটি শিশুর কি-ইবা অপরাধ থাকতে পারে। তবুও এমন নিরপরাধ শিশুও রক্ষা পায়নি ইসরাইলি সেনাদের হাত থেকে। তাদের বোমার আঘাতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মরণ লড়াই করছে শিশু ইভানা। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয় কোন অপরাধে অবুঝ এই শিশুটির ওপর হামলা হলো, তাহলে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া হয়তবা কোনো উত্তর দেয়া কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। হাসপাতালের বিছানায় অর্ধেক শরীর প্লাস্টারে মোড়ানো শিশুটিকে দেখে যে কেউ মুর্ষে যেতে পারেন। ইসরাইলের বোমার আঘাতে ইভানার মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক শরীরই পুড়ে গেছে।

স্কাই নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ লেবাননের আল আলিয়াতে বিমানহামলা চালায় ইসরাইল। ওই হামলার সময় বিমান থেকে ফেলা মরণঘাতী বোমার আঘাতে মারাত্মকভাবে পুড়ে যায় অবুঝ ওই শিশুটির অর্ধেক শরীর। এরপর থেকেই হাসপাতালের বিছানায় গভীর যন্ত্রণায় ছটফট করছে মাত্র দুই বছরের ইভানা।

তার মা ফাতিমা গণমাধ্যমকে ওই মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণনার সময় ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তিনি বলেছেন, ‘সেদিন আমি সকালের নাস্তা তৈরি করছিলাম। আমি রান্না ঘরে ছিলাম আর আমার শিশুটি ছিল দোতলার বারান্দায়। ঠিক ওই সময়টাতেই আমাদের বাড়িতে আছড়ে পড়ে ইসরাইলের বোমা। এতে সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে আগুন জ্বলে ওঠে। কালো ধোঁয়ায় প্রায় অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ। যতক্ষণে আমি ইভানার কাছে পৌঁছাই ততক্ষণে আমার বাচ্চাটির শরীরের অর্ধেক পুড়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরো বাড়ি কালো ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার পর আমি একা আমার বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনে তাকে উদ্ধার করেছি। ওই দিনটা আমার জন্য ভয়াবহ যন্ত্রণার একটি দিন ছিল। মনে হয় এখনও আমি দুঃস্বপ্নের মধ্যে বেঁচে আছি।’

দিশেহারা হয়ে ফাতিমা এবং তার স্বামী মোহাম্মদ দুই সন্তান নিয়ে জানালা থেকে লাফিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন। এরপর তারা দ্রুত টায়ার শহরে পৌঁছাতে সক্ষম হন। তবে তাদের সন্তানের অবস্থা এতটাই গুরুতর ছিল যে, তাদের বৈরুতের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ইভানাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তার মা জানিয়েছেন, তিনি ভাবতেই পারেনি তার মেয়েটা বেঁচে থাকবে। একদম হতাশায় ডুবে গিয়েছিলেন ফাতিমা এবং তার স্বামী।
ইভানার অবস্থা এতটাই করুণ যে সে তার পা নাড়াতে পারছে না। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অসহনীয় এক যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে বেঁচে আছে লেবাননের ওই শিশুটি।

mzamin

মার্কিন নির্বাচনী প্রচারে উল্লেখযোগ্য কিছু মুহূর্ত

রাত পোহালেই আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যা প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে প্রার্থী পরিবর্তনসহ একাধিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে আমেরিকানবাসী। এখানে সবচেয়ে বড় কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সংক্ষিপ্ত বিবরণ  তুলে ধরা হলো।

সমাবেশে  ট্রাম্পের ওপর গুলি
১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগানের পর ডনাল্ড ট্রাম্প প্রথম প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী যাকে লক্ষ্য করে গত ১৩ জুলাই গুলি চালানো হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প   পেনসিলভানিয়ার বাটলারে যখন সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিটি তার কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়ায় অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন ট্রাম্প। সিক্রেট সার্ভিস কাউন্টার স্নাইপারের হাতে নিহত হওয়ার আগে ২০ বছর বয়সী থমাস ক্রুকস কাছাকাছি একটি ভবনের ছাদ থেকে আটটি গুলি ছুড়েছিলেন। সাবেক স্বেচ্ছাসেবক ফায়ার চিফ কোরি কমপেরেটোর ভিড়ের মধ্যে গুলিবদ্ধ হন।  তিনি সেইসময়ে তার পরিবারকে গুলি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন। ট্রাম্পকে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টরা যখন উদ্ধার করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন সমর্থকদের কাছে  ‘লড়াই’ করার জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে  এক সমাবেশে বলেছিলেন ‘আমি গণতন্ত্রের জন্য বুলেট হজম করেছি।’

মাস্কের সমর্থন ট্রাম্পকে
ট্রাম্পকে  শুটিংয়ের রাতে টেসলার প্রধান বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক এক্স-এ পোস্ট করেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পুরোপুরি সমর্থন করি এবং তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি’। বিষয়টি  ট্রাম্পের জন্য বেশ লাভজনক। এক্স মালিকের বিপুল সামাজিক মিডিয়া উপস্থিতি তার ওয়ালেটের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাস্ক একটি প্রচারাভিযান গোষ্ঠীকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার এবং অক্টোবরের প্রথমার্ধে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট বিডকে সমর্থন করার জন্য। তিনি  ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি সমাবেশে বক্তৃতাও করেছেন।

দৌড় থেকে বাদ বাইডেন
জো বাইডেন  জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট পদের দৌড় থেকে নাম প্রত্যাহার করার আগে তার ওপর বেশ চাপ ছিল। ২৭ জুন প্রথম টিভি বিতর্কে অংশ নেন দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন। কিন্তু সেখানে একেবারেই খেই হারিয়ে ফেলেন ৮১ বছর বয়সী বাইডেন। তোতলামি, অস্পষ্ট কথাবার্তা, কথার মাঝখানে কী বলছেন তা ভুলে যাওয়া—কার্যত এই বিতর্ক ‘সার্কাসেই’ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে বাইডেনের নামটি চলে যায় বাতিলের খাতায়। এরপরেই বাইডেনের জায়গাটি নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস। হ্যারিসকে সমর্থন দেওয়ার এবং ডেমোক্র্যাটদের তার প্রচারে অনুদান দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান বাইডেন।  

হ্যারিসের দৌড়
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সমর্থন পেলেও  কমালা হ্যারিসকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের নতুন প্রেসিডেন্ট  মনোনীত প্রার্থী হিসাবে বেছে নেওয়া দরকার ছিল। বাইডেন বাদ পড়ার পরেই ৬০ বছর বয়সী হ্যারিসের কয়েকজন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে সমর্থন করার পরে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আর কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেনি। শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী আনুষ্ঠানিকভাবে সময়সীমার আগে নিজেদের উপস্থাপন করেনি যার জেরে  হ্যারিসকে আগস্টের শুরুতে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। মনোনয়ন গ্রহণের পর তার প্রথম বক্তৃতায় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে হ্যারিস বলেছিলেন, তার একটি নতুন পথ তৈরি করার সুযোগ উপস্থিত।

'কমালা  আইএস ব্র্যাট'
হ্যারিসের মনোনীত প্রার্থী হওয়ার জন্য তার দলের সমর্থনের প্রয়োজন ছিল, তবে তার পক্ষে সম্ভাব্য ডেমোক্র্যাটিক ভোটারদের সমর্থন জোগাড়ও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্রান্ডিংয়ের দরকার ছিল। যে কাজটি সহজ করে দেন বৃটিশ পপ তারকা চার্লি। এক্সসিএক্স তাকে সমর্থন করে এক্স-এর একটি পোস্টে চার্লি লেখেন,'কমালা আইএস ব্র্যাট'।  নামটা উদ্ভট শোনালেও  এক্সসিএক্স  ছিল গ্রীষ্মে প্রকাশিত চার্লির একটি হিট অ্যালবাম।  তাই চার্লির সমর্থন কমালাকে বিশেষ সুবিধা এনে দেয়।

'সন্তানহীন বিড়াল'
২০২১ সালে ট্রাম্পের রানিং মেট জেডি ভ্যান্সের করা মন্তব্যগুলিও শিরোনামে এসেছে। সেই সময়ে ফক্স নিউজের সাথে কথা বলার সময় ভ্যান্স বলেছিলেন,' মিসেস হ্যারিস এবং অন্যান্য ডেমোক্র্যাটরা অনেকটা সেইসমস্ত বিড়ালদের মতো যারা  নিঃসন্তান। তারা নিজেরাই নিজেদের জীবনকে দুঃখী করে তুলেছেন। ‘ডেমোক্র্যাটদের পুরো ভবিষ্যত সন্তানহীন লোকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলেও উল্লেখ করেন ভ্যান্স। ফ্রেন্ড স্টার জেনিফার অ্যানিস্টন ভ্যান্সের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ’আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন সম্ভাব্য ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এরকম মন্তব্য  আসছে।'

হ্যারিস তার প্রচারাভিযানে  ভ্যান্সের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েব বলেছিলেন, ‘প্রতিটি আমেরিকানই এই দেশের ভবিষ্যতের অংশীদার।’

হ্যারিসের জাতিগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প
শিকাগোতে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্ল্যাক জার্নালিস্ট দ্বারা আয়োজিত একটি কনভেনশনে শ্রোতাদের সামনে  ট্রাম্প হ্যারিসের জাতিগত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘তিনি কি ভারতীয় নাকি তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ?’ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি তাকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি, পরোক্ষভাবে প্রত্যক্ষভাবে নয়... এবং তিনি সর্বদা ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রচার করে এসেছেন। আমি জানতাম না  কয়েক বছর আগে  তিনি কিভাবে কৃষ্ণাঙ্গ  হয়ে গেলেন  এবং এখন তিনি কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে পরিচিত হতে চান। তাই আমি জানি না, তিনি  কি ভারতীয় নাকি কৃষ্ণাঙ্গ ? কমালা হ্যারিসের বাবা একজন জ্যামাইকান এবং মা একজন ভারতীয়। উভয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী। জবাবে,  হ্যারিস বলেছিলেন এই মন্তব্যগুলি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে।

'ইনি আমার বাবা!'
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ছিলেন যতক্ষণ না  হ্যারিস তাকে তার ভাইস প্রেসিডেন্টের রানিং মেট  হিসাবে আগস্টের শুরুতে বেছে নিয়েছিলেন।কিন্তু তিনি সত্যিই কয়েক সপ্তাহ পরে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে একটি যুগান্তকারী বক্তৃতা দিয়ে বিশেষ ছাপ ফেলতে সক্ষম হন। তিনি তার দলের বিশ্বস্তদের বলেছিলেন যে ডনাল্ড ট্রাম্পের অধ্যায় শেষ। পাতা উল্টানোর সময় উপস্থিত। আপাতদৃষ্টিতে ওয়ালজ তার ছেলে গাসের কাছ থেকে সবথেকে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন , যখন বক্তৃতার মাঝপথে দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল হয়ে গর্বিতভাবে গাস বলেছিলেন, ‘ইনি আমার বাবা!’

টেলর সুইফটের  হ্যারিসকে সমর্থন
পপ সুপারস্টার টেলর সুইফট তার ২৮৩ মিলিয়নেরও বেশি অনুগামীদের ইনস্টাগ্রামে একটি পোস্টে বলেন - ‘আমি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমালা হ্যারিস এবং ওয়ালজকে আমার ভোট দেব।’

ট্রাম্পের নির্বাচনী পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে টেলর সুইফট বলেন, ‘আসল পরিকল্পনা সম্পর্কে আমাদের খুব স্বচ্ছ হওয়া দরকার’। পোস্টটির সাথে শিল্পী তার বিড়াল বেঞ্জামিনকে আগলে রাখার একটি ছবি দেন। অনেকে মনে করেন চাইল্ডলেস ক্যাট লেডি বিতর্কের জন্যই এই অর্থবহ ছবি দিয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী। উত্তরে ট্রাম্প শুধু একটি কথাই বলেছিলেন তিনি ‘টেলর ভক্ত নন’। সুইফটের পোস্টের কয়েকদিন পরে, জনমত জরিপে দেখা গেছে যে, হ্যারিস  গুরুত্বপূর্ণ জনসমর্থন  অর্জন করতে সক্ষম হন। যার জেরে সাবেক প্রেসিডেন্ট  তার ট্রুথ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন : ‘আমি টেলর সুইফটকে ঘৃণা করি!’

গলফ মাঠে ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা
এবার আততায়ী গুলি ছোঁড়ার আগেই সিক্রেট সার্ভিসের নজরে পড়েন। ১৫ সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডায় গলফ খেলার সময় ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেন রায়ান রুথ নামের এক ব্যক্তি। পরবর্তীতে তদন্তে জানা যায়, গাছের আড়াল থেকে ট্রাম্পের দিকে বন্দুক তাক করার সময়ই তাকে দেখে ফেলে সিক্রেট সার্ভিস এবং তাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এই আততায়ীকেও ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়। এই হত্যাচেষ্টার জন্য বাইডেন ও হ্যারিসের ‘উস্কানিমূলক কথাবার্তাকে’ দায়ী করেন ট্রাম্প।

মঙ্গলবার ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করবেন। জরিপগুলি প্রমাণ করে যে, এটি বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত প্রতিযোগিতা হতে চলেছে।এখন দেখার শেষ হাসি কে হাসে।

সূত্র : স্কাই নিউজ

mzamin

১০ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না -চ্যানেল আই ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে মতিউর রহমান

রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেছেন, ‘জুলাই-আগস্টে মানুষের যে ক্ষোভ দেখেছি, এটা আমরা অতীতে জানতাম। কিন্তু, এটা প্রকাশ্যে এমনভাবে  আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়নি। মানুষের মধ্যে যে ঘৃণার উদ্রেক হয়েছে, অনাস্থা তৈরি হয়েছে সেখানে আগামী দিনে ফিরে এসে নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম দেখা যায়। আমি মনে করি, আগামী দশ বছরের মধ্যে তাদের ফিরে আসা, দল পুনর্গঠন ও দল পরিচালনা করা এবং নির্বাচন বা গণআন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।’

রোববার দিবাগত রাতে চ্যানেল আই আজকের সংবাদপত্র অনুষ্ঠানে মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা দেখতে পেয়েছি, স্বৈরতান্ত্রিক সরকার পতনের পর তারা আবার ফিরে এসেছে। এমনকি বিদেশে পলায়নের পরও ফিরে এসেছে, ফিলিপিনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সেটা। হাইতি বা দুয়েকটা দেশের কথা শুনেছি, তারা ফিরে এসেছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং তার দলের একটা বড় অংশ যারা মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন তারাও পালিয়ে গেছেন। দেশের ভেতরে যারা আছেন তাদের বড় অংশ জেলে বা লুকিয়ে আছেন। বর্তমান সরকার তাদের বিচার করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন। বিচার হবে, বিচারে জন্য হয়ত আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।’

বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘আমার ৫২ বছরের অভিজ্ঞতায় সত্যিকার অর্থে কোনো সময় আমরা স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে পারিনি।’

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন মাস পূর্ণ হতে চলেছে-এই সময়ে সাংবাদিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত তিন মাসেও নানা রকম অস্থিরতা, ভয় ও দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। নানা রকম চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অতীতে দেখেছি কিছু আইন-কানুন বা ব্যবস্থা সরকার নিয়েছিল বা নেয়ার পথে ছিল। আমরা অবশ্য সেই আইন বাতিল দাবি করবো। বিশেষ করে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন-এটা বাতিল করার দাবি ছিলো। এই আইনে অনেক মামলা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে এখনো একটা মামলা চলমান। এই আইনগুলো বাতিল করা অত্যন্ত জরুরি।’

সাংবাদিকদের ভয়ে থাকতে হবে না, এমন একটা পরিবেশ চান প্রথিতযশা এই সাংবাদিক।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত পাশাপাশি দুটি দেশ। একটা বৃহৎ দেশ, তার পাশে আমরা ছোট একটা দেশ। ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব গত এক-দুই দশকে অনেক বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা চাই, অর্থাৎ বিগত কোনো সরকার এটা অস্বীকার করতে পারেনি যে-দুটো দেশের মধ্যে একটা স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিত। কারণ আমাদের অবশ্যই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আসা-যাওয়া, শিল্পকারখানা, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক অব্যাহত থাকুক এটা আমরা চেয়েছি। তবে আমরা চাইলেও দুই দেশের সরকারের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হয়নি।’

তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি, বিগত সময়গুলোতে দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের কথা বলা হলেও তিস্তা নদীর পানি কিন্তু আমরা পাইনি। এমনকি গঙ্গা নদীর পানি নিয়েও আমাদের আলোচনা শেষ হয়নি। আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশের যৌথ নদীর পানিবণ্টন বিষয়য়ক যে বিষয়গুলো আছে, সেখানেও সমস্যা রয়েছে এবং এটা পূর্ণতা হয়নি।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে এই সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, ‘সীমান্তে যে অস্থিরতা, বাংলাদেশিদের নিহতের ঘটনা এখনো চলছে। বার বার ভারতের পক্ষ থেকে বলা হলেও এটা এখনো বন্ধ হয়নি।’

মতিউর রহমান বলেন, ‘বিগত স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতন ভারত স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। আমাদের সবার এটা জানা। বিগত সময়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে ভারত খুবই নিশ্চিন্তবোধ করেছে। তারা মনে করেছে এটা তাদের জন্য একটা ভালো এবং স্থায়ী ব্যবস্থা। এটার জন্য তারা বিগত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছিল।’ 

mzamin
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। ছবি: ভিডিও থেকে নেয়া।

আমেরিকার দিকে তাকিয়ে যেন পুরো বিশ্ব! by সিদ্দিকুর রহমান সুমন

আমেরিকার দিকে থাকিয়ে যেন পুরো বিশ্ব ! কে হচ্ছেন বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধান? ডেমোক্র্যাট কমালা হ্যারিস না রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্র্যাম্প? কার নেতৃত্বে চলবে যুক্তরাষ্ট্র? আসলে কেবলই একটি দেশের নির্বাচন মাত্র নয়। আমেরিকার ভোটবাক্সে লুকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্বের অভিমুখ।

শেষ লগ্নে দু’পক্ষের মধ্যে প্রচারের লড়াইও জমে উঠেছে। নির্বাচন ৫ তারিখে হলেও অপেক্ষায় থাকতে হবে আগামী কয়েকদিন। কারন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী পদ্ধতির কারনে ফল পেতে কয়েকদিন এমনকি কয়েক সাপ্তাহ লেগে যায়। ইলেকটরাল ভোটের চুড়ান্ত ফল পাওয়ার পরই জানা যাবে কে হয়েছেন বিজয়ী। সব মিলিয়ে যিনি অন্তত: ২৭০টি বা তার বেশী ইলেক্টরাল ভোট পাবেন তিনিই হবেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।

কমলাকে জিতানোর জন্য ওবামা, ক্লিন্টন এবং বাঘা বাঘা শিল্পীরা, এইসঙ্গে মিশেল ওবামা এবং হিলারি ক্লিন্টনও মাঠে নেমেছেন। ওদিকে দুই শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক ও বিল গেটস অর্থের ভাণ্ডার নিয়ে নেমেছেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে জিতিয়ে নিজের ব্যবসায় আরো শিখরে উঠতে। জো বাইডেনের বয়সের ভারসাম্যহীনতার জন্য তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরতে হয়েছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও বয়স একটি ফ্যাক্টর, এদিক থেকে কমলা সুবিধাজনক অবস্থানে। তবে বয়সে প্রবীণ হলেও ট্রাম্প আক্রমণাত্নক, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ও সফল ব্যবসায়ী যা মার্কিনিদের পছন্দ। আবার জেনারেশন গ্যাপেও কমলার অবস্থান সুবিধাজনক।

৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্য ১৯টি ডেমোক্র্যাটদের যেখানে ইলেকটরাল ভোট ২২৬টি, আর রিপাবলিকানদের দখলে ২৪টি অংগরাজ্যে যাদের ভোট ২১৯টি, অন্যদিকে ৭টি দোদুল্যমান রাজ্যের ভোট ৯৩টি, এখান থেকে ৪৪টি পেলে কমলা জয়ী আর ট্রাম্পকে পেতে হবে ৫১টি। এখানেই দোদুল্যমান রাজ্যগুলির মাহাত্ম্য। তাই দুইজনই আদা-জল খেয়ে নেমেছেন ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জন করতে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে কেন পৃথিবীব্যাপী এমন উৎসাহ? কারণ, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক - যুদ্ধ কিংবা যে কোনো সংকট-সমস্যা বা যে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক-মানবাধিকার সমস্যা - সবখানেই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র জড়িত এবং তা গুরুত্ব বহন করে। ইউক্রেন, গাজা, লেবানন, তাইওয়ান, এমনকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানেও আমেরিকা সক্রিয়। তাছাড়া, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সবগুলি সংস্থার উপরও মোড়লিপনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান, রাশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্তান সবাই নিজ নিজ স্বার্থে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশি আমেরিকানরাও ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান শিবিরে বিভক্ত, তবে ডেমোক্র্যাট সমর্থক বেশী।

নির্বাচনী অ্যাজেন্ডা ও প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে কমালা-ট্র্যাম্প দুইজন কিছুটা দুই মেরুর, বিশেষ করে অভিবাসী ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায়। কমলা মধ্যবিত্তদের প্রতি সদয়, আর ট্রাম্প ধনী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে উন্নয়নে বিশ্বাসী।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে কেউ জিতুক তাতে মার্কিন পররাষ্ট্র ও ভূরাজনৈতিক নীতিতে তেমন পরিবর্তন হবে না তবুও ব্যক্তি ট্রাম্প ও কমলার দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটুকু প্রভাব ফেলবে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সব সময় নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পর মঙ্গলবার হয়। এ বছর সেই অগ্নিপরীক্ষার দিন ৫ নভেম্বর। বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী ১১ ঘণ্টা পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হবে ভোটাভুটির পর্ব।

mzamin

রিকশার জঞ্জাল রাজধানী by নাজমুল হুদা

হঠাৎ করে রিকশার নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। লাখ লাখ রিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহর জুড়ে। লাইসেন্সবিহীন প্যাডেল ছাড়াও চলছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব রিকশার দৌরাত্ম্যে সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এত সংখ্যক রিকশা নিয়ন্ত্রণ করতেও হিমশিম খাচ্ছে ঢাকার ট্রাফিক বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকায় এখন ব্যাঙের ছাতার মতো তৈরি হচ্ছে রিকশা। যার কোনো পরিসংখ্যান সরকারি- বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণেও নেয়া হচ্ছে না কোনো কার্যকরী উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি আয়ের আশায় এখন অল্প টাকায় রিকশা বানিয়ে অনেকেই সড়কে নেমে পড়ছেন। প্রতিদিন শত শত রিকশা তৈরি হচ্ছে শহরের বিভিন্ন ছোট-বড় গ্যারেজে।

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঢাকায় অন্তত ১২ লাখ প্যাডেলচালিত রিকশা রয়েছে। অবৈধ অটোরিকশা রয়েছে ৬-৭ লাখের মতো। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, রাজধানীতে বর্তমানে প্যাডেলচালিত রিকশার লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজারেরও কম। এর মধ্যে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে লাইসেন্স দেয়া বৈধ রিকশার সংখ্যা ১ লাখ ৪৫ হাজারের মতো। অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ৩০ হাজারের মতো। তবে নতুন করে ঢাকায় এখন রিকশার লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না। দক্ষিণ সিটির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে নতুন করে কোনো রিকশার লাইসেন্স দেয়া হয়নি। এ ছাড়া উত্তর সিটিতে ২০১৯ সালের পর আর কোনো রিকশার লাইসেন্স দেয়া হয়নি। বর্তমানে উত্তরের সব রিকশাই লাইসেন্সবিহীন চলছে। দুই সিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় মোট কতোটি রিকশা রয়েছে তার হিসাব নেই সিটি করপোরেশনের কাছে।

বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, আগস্টের পর থেকে সড়কের এনফোর্সমেন্ট ঢিলেঢালা। এই সুযোগে বেশি আয়ের আশায় যেসব রিকশা পাড়া-মহল্লায় চলতো তা মূল সড়কে চলছে। তাই সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী জেলার অসংখ্য রিকশা ঢাকায় চলে এসেছে। তবে এসব রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেকে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের দিকে ঝুঁকছেন বলে মনে করেন এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই ৬০-৭০ হাজার টাকা জোগাড় করে আয়ের জন্য রিকশা নিয়ে সড়কে নামছেন। এজন্য স্থানীয় গ্যারেজে প্রতিদিন অসংখ্য রিকশা তৈরি হচ্ছে। এগুলো না থামানো গেলে এর সংখ্যা আরও বাড়বে। এই রিকশাগুলো কোন সড়কে চলবে? কী পরিমাণ চলবে? তার বিজ্ঞানভিত্তিক হিসাব করে বৈধতা দিতে হবে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো এখন যেভাবে চলছে সেভাবে বৈধতা দেয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকায় চলাচল করা রিকশার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। অলিগলি ছাপিয়ে মূল সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন চাকার এই বাহন। ভিআইপি সড়ক, ফ্লাইওভার কিংবা সড়কের উল্টোপথেও দিন-রাত চলছে রিকশা। ট্রাফিক পুলিশ থাকলেও তাদের সামনে দিয়ে মহাসড়কে উঠছে কম গতির বাহনটি। এতে সড়কের গতিরোধ, বিশৃঙ্খলা ও যানজট তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ঢাকায় রিকশা নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ গত মে মাসে হাসিনা সরকারের আমলে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধের কথা জানান তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে রিকশাচালকদের আন্দোলনের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসা হয়। এরপর থেকেই ঢাকার রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে থাকে ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো। গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর তা আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।

চাঁদাবাজির কারণে সড়কের রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না উল্লেখ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, রিকশা নিয়ন্ত্রণ করার কথা সিটি করপোরেশন আর পুলিশের। কিন্তু এখানে অনেক চাঁদাবাজি হয়। প্রত্যেকটা ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে প্রতিদিন বা সপ্তাহভিত্তিক চাঁদা তোলা হয়। এসবের ভাগও যায় সব জায়গায়। তাই তারা এসব নিয়ন্ত্রণ করে না।

একটি প্যাডেলচালিত রিকশা বানাতে ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা বানাতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। নিম্নআয়ের মানুষ এই অর্থ ধারদেনা করে জোগাড় করে রিকশা বানিয়ে সড়কে নেমে পড়েন বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া ব্যাটারি রিকশা নিয়ে সড়কে উঠতে পারার সুযোগে এর চাহিদাও বেড়েছে অনেক। এসব রিকশা চার্জ করার জন্য ঢাকায় কয়েক হাজার চার্জিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। এরমধ্যে গত ২০২১ সালে ট্রাফিক পুলিশের একটি তালিকায় ৭৫২টি চার্জিং স্টেশনের হিসাব রয়েছে। ট্রাফিকের ওয়ারি, তেজগাঁও, মতিঝিল, লালবাগ, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে সবচেয়ে বেশি চার্জিং স্টেশন রয়েছে। সরকারিভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন না থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবে ও চাঁদা দিয়ে চালাতে হয় এসব রিকশা।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে রিকশায় সয়লাব হয়েছে ঢাকা। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ ও পুলিশসহ সবার যৌথ অভিযান দরকার বলেও মনে করেন তারা। এ ছাড়া চাঁদাবাজির কারণেও ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বলেও মনে করছেন তারা। শুধু পুলিশের পক্ষে রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন উল্লেখ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) খোন্দকার নজমুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। রিকশা বন্ধের জন্য আমাদের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত কাজ করছে। প্রতিদিন আমরা অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু ফলাফল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

পুলিশের সঙ্গে এই রিকশা বন্ধ করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন দায়িত্ব নিচ্ছে না। এই রিকশার যে উপকরণ এগুলো কীভাবে আসে। এগুলোর বৈধতা কীভাবে পায়। দিনশেষে এটার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। শুধু পুলিশ দিয়ে রিকশা বন্ধ করা সহজ নয়। এত সংখ্যক রিকশা ডাম্পিং করার পর্যাপ্ত জায়াগায়ও নেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মীর খায়রুল আলম মানবজমিনকে বলেন, সিটি করপোরেশন নতুন করে কোনো রিকশাকে লাইসেন্স দেয় নাই। লাইসেন্সবিহীন রিকশা সরানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ব্যবস্থা নেবে। এখন পুলিশ সেভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। আমরা মোবাইল কোর্ট করার ক্ষেত্রে পুলিশ পাচ্ছি না। রিকশা তো অনেক। এত রিকশা উচ্ছেদ করতে গেলে অনেক ধরনের মানবাধিকারের বিষয়ও চলে আসে। 

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রে মহারণ কাল by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

কাল মহারণ। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদের লড়াই। এ গ্রহে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ যুদ্ধ এটা। এতে বিজয়ীর হাতে উঠবে হোয়াইট হাউসের চাবি। ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্টের চেয়ার আগামী চার বছর দখলে রাখার লাইসেন্স পেয়ে যাবেন। এ জন্য সারাবিশ্বের কোটি কোটি চোখ তাকিয়ে আছে সেদিকে। সঙ্গে আছে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ভয়। কঠিন এক অনিশ্চয়তা। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোটযুদ্ধ। প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মহারণ হতে যাচ্ছে। তার একদিকে ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস। বিপরীতে রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্প। দু’জনের মধ্যে যে ভোটযুদ্ধ হচ্ছে তাতে জয়ের সুযোগ দু’জনেরই ফিফটি ফিফটি। সমানে সমান। কার গলায় উঠবে জয়ের মালা। কেউ পূর্বাভাস দিতে পারছেন না। এই নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে বাকি বিশ্ব। বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি- সবই ঘুরে যেতে পারে। এ জন্যই বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে সবাই। তারা দেখতে চায়- কার হাতে ওঠে হোয়াইট হাউসের চাবি। এবারের নির্বাচনের মতো এমন অনিশ্চিত অবস্থা, উত্তেজনা সাম্প্রতিক সময়ে আর দেখা যায়নি। কমালা হ্যারিস-ডনাল্ড ট্রাম্প দু’জনের সামনেই ইতিহাস গড়ার হাতছানি। কমালা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন যুক্তরাষ্ট্রের এ যাবৎকালের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট, যার শুরু একজন প্রসিকিউটর থেকে। একই সঙ্গে তিনি হবেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হলে তিনি হবেন ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার পর নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। নতুন এক ইতিহাস গড়ার প্রত্যয় নিয়ে দুই প্রার্থীই মাঠ চষেছেন। পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন। তবে এই লড়াইয়ে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য ট্রাম্পের চেয়ে অনেক কম সময় পেয়েছেন কমালা হ্যারিস। তার দল ডেমোক্রেট থেকে প্রথমে নির্বাচন করার অঙ্গীকার করেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। শারীরিক অবস্থা ও বয়সের কথা মাথায় নিয়ে ডেমোক্রেট শীর্ষ নেতারা তাকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। জো বাইডেন অনড় থাকেন অবস্থানে। কিন্তু প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি লেজেগোবরে করে ফেলেন। ফলে তার সরে দাঁড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়। এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। অনুমোদন দিয়ে যান কমালা হ্যারিসকে। তখন কমালার হাতে সময় মাত্র তিন মাস। এ সময়ে ট্রাম্পের মতো একজন জাঁদরেল নেতার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়া তার জন্য সত্যিই খুব সামান্য। তবু কমালা হ্যারিস নিজেকে লৌহকঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়। তিনি সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। পর্নো তারকা ডানিয়েল স্টর্মিকে অর্থের বিনিময়ে ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে মুখ বন্ধ করিয়ে রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি। ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে তার উস্কানিতে দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি। তাছাড়া তার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আছে। পুতিনকে দেখা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে। ২০২০ সালের নির্বাচনের পর কমপক্ষে সাতবার পুতিনের সঙ্গে ট্রাস্প সরাসরি ফোনে কথা বলেছেন বলে ‘ওয়ার’ বইয়ে দাবি করেছেন বিখ্যাত সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও সুইং স্টেট যেমন গুরুত্ব বহন করছে, একই ভাবে নারী ভোটাররাও গুরুত্ব বহন করছেন। আগাম ভোটে তারা সেই জানান দিয়েছেন। ট্রাম্পের দখলে থাকা মিশিগান রাজ্যে সর্বশেষ জরিপে এগিয়ে আছেন কমালা। গতকাল এটা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে পশ্চিমা মিডিয়ায়। এ খবর কমালা শিবিরে স্বস্তির। ট্রাম্প যেভাবে বিভক্তি ঘটিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে, এমনটা খুব কমই দেখা গেছে। তিনি শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, অভিবাসীদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তার গ্রুপ নির্বাচন নিয়ে অপপ্রচারে নেমেছে। ভুয়া পোস্ট দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের অনুভূতিকে উস্কানি দিয়ে সুবিধা নিতে চাইছেন। কারণ, বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ট্রাম্প নির্বাচিত হলে প্রথম দিনেই এই যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি আসলে ভোটের কৌশল অবলম্বন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ভোটারদের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতিহাস কি বলে! ডনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষী বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। প্রথম মেয়াদে তিনি ক্ষমতায় আসার পর পরই সাতটি মুসলিম দেশকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করেন। যে গাজাবাসীকে এবার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন যুদ্ধ বন্ধের, তাদের প্রাণের দাবি জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণার। কিন্তু তার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে একতরফাভাবে স্বীকৃতি দেন। নির্বাচনে ভারত, চীন, রাশিয়া বড় ইস্যু। রাশিয়া যেমন তার পক্ষে রয়েছে, তেমনি ভারত কোন পক্ষে তা স্পষ্ট নয়। কারণ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেমন ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছেন, তেমনি জো বাইডেনের সঙ্গে। ট্রাম্প যদি হেরে যান, তাহলে তিনি ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারির মতো দাঙ্গা লাগিয়ে দিতে পারেন বলে অনুমান করছেন অনেকে। তিনি এরই মধ্যে আভাস দিয়েছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে জয়ী হবেন। তার অর্থ তিনি পরাজিত হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না! আইনি লড়াইয়ে যেতে পারেন। এ জন্য শীর্ষ সব আইনজীবীকে আগে থেকেই ভাড়া করেছে উভয় শিবির। ট্রাম্প আইনি লড়াই শুরু করলে তা আইনসম্মত। কিন্তু যেসব আভাস মিলছে, যেসব ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট তিনি হেরে গেলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারেন তিনি বা তার সমর্থকরা। এই ভয়ই এখন মার্কিনিদের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গণতান্ত্রিক। এ নির্বাচনে কোনো হাঙ্গামা, দাঙ্গা স্মরণকালে হয়েছে বলে জানা যায় না। কিন্তু ট্রাম্প এই ধারা শুরু করেছেন ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি। তাছাড়া তিনি নির্বাচিত হলেও আশঙ্কার ব্যাপার আছে। তার বিরুদ্ধে ডেমোক্রেট সরকার যেভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তিনিও ঠিক একই রকম ব্যবস্থা নিতে পারেন- এমন আশঙ্কা শীর্ষ ডেমোক্রেটদের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে সহিংসতার ভয় করছেন অনেকে। প্রতিহিংসা নেয়ার আশঙ্কা করছেন। এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কড়াকড়ি করা হয়েছে। নির্বাচনে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো অর্থের ছড়াছড়ি করেছে রিপাবলিকান শিবির। বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রচারণায় থাকা টেসলার মালিক ইলন মাস্ক প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার করে অর্থ দিয়েছেন ভোটারদের। তিনি একটি গ্রুপের মাধ্যমে ভোটারদের নিবন্ধিত হওয়ার টোপ দিয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে লটারি করে প্রতিদিন একজনকে দেয়া হয়েছে ১০ লাখ ডলার করে। এই পদ্ধতি এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যায়নি। ইলন মাস্কের এই চর্চার কারণে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। একে বেআইনি বলে ঘোষণা করেছেন অনেক আইনজীবী। ৫৩৮টি ইলেক্টোরাল ভোটের লড়াইয়ে সমান তালে লড়াই করছেন কমালা-ট্রাম্প। সেখানে মোট প্রাপ্ত ভোটের ওপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটে। একজন প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পেতে হয়। যদি দু’জনের কেউই এই সংখ্যা স্পর্শ করতে না পারেন তাহলে হিসাব অন্যদিকে ঘুরে যাবে। যদি দু’জনেই সমান সংখ্যক ২৬৯-২৬৯টি করে ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পান তাহলে সিদ্ধান্ত নেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস। প্রথমে ৫০টি রাজ্যের প্রতিটি থেকে একজন করে প্রতিনিধি ভোট দেবেন দুই প্রার্থীর ওপরে। তাতে যদি কোনো প্রার্থী কমপক্ষে ২৬ ভোট পান তাকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। তারপর ভাইস প্রেসিডেন্ট বাছাই করবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট। এতে যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন তিনি হবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।  
mzamin

দেশে দেশে দুর্বল কূটনীতির কবলে বাংলাদেশ by এম এস সেকিল চৌধুরী

দেশে নতুন পট পরিবর্তনের পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে বিশেষ করে দল-অনুগত কর্মকর্তাদের মধ্যে “আছি কি নেই, আছি কি নেই”- এই অবস্থা বিরাজমান। অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ চাইলেও পুরোদমে কাজ করতে পারছে না। সুতরাং এই অবস্থার আশু সমাধান প্রয়োজন।

বিশ্বায়নের কারণে প্রতিটি দেশ একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সংযুক্তির মূল চালক কূটনীতি। যে দেশের কূটনীতিবিদরা কূটনীতিতে দক্ষ সে দেশ তত বেশি লাভবান। তবে শুধু দক্ষ কূটনীতিবিদ নয়, দেশের সৎ, দেশপ্রেমিক ও সুদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা বহু অংশে সফল কূটনীতির জন্য অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর গতিশীলতার কারণে ধীরগতির কূটনীতি আজ অচল। পৃথিবীর সকল অগ্রবর্তী দেশ ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ অবিক্রয়যোগ্য দেশপ্রেমিক জনবল দিয়ে দেশের কূটনীতি সাজায়। এই শ্রেণির মানবসম্পদ দেশের অন্য অংশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত চৌকস ও কর্মক্ষম হয়ে থাকে। তারা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিভাজনের চেয়ে দেশের সামগ্রিক স্বার্থ সর্বাগ্রে রাখে।

এজন্য কূটনীতি-সফল দেশগুলো ঘন ঘন জনবল পরিবর্তন করে না। এক্ষেত্রে আমরা একটু ভিন্ন, আমরা দলের অনুগত লোকদের দিয়ে কূটনীতি পরিচালনা করি। ফলে সরকারি দলের পরিবর্তন হলে গোটা কূটনীতিবিদদের পরিবর্তন ঘটে যায়। প্রতিযোগিতা-সক্ষম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও দক্ষ জনবলকে পরিবর্তনের ফলে কূটনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে মূলত দর্শনগত যে পরিবর্তন হয় সেটুকু অর্জনের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কূটনীতিক পরিবর্তনের রেওয়াজ আছে, কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া অচল করে দেয়ার বিধান কোথাও নেই। তবে কূটনীতিকদের দলবাজি অন্যান্য দেশে এত প্রকট নয় যা আমাদের মিশনগুলোতে আছে।
শুধু দলীয় অনুগত লোক দিয়ে কূটনীতি চলে না, এখানে ব্যক্তির পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা অগ্রগণ্য হওয়া উচিত। সামপ্রতিক ছাত্র-জনতা ও সর্বস্তরের জনগণের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমাদের কূটনীতি খুব নাজুক অবস্থায় আছে।

জনবলের মনোবলের অভাবে দেশে দেশে দুর্বল কূটনীতির কবলে বাংলাদেশ আজ নিপতিত। এই অবস্থা খুবই ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের প্রতিযোগী ও প্রতিবেশী দেশগুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। এমনিতেই পেছন থেকে ঘাড়ের উপর স্বার্থান্বেষী বাংলাদেশ-বিরোধীদের নিঃশ্বাসের শব্দ অনুমান করা যাচ্ছে।

বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে সর্বত্রই আজ “যোগ্যতমের বেঁচে থাকা’’ নীতি চলে, কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। অনেক দক্ষ কূটনীতিক গত কয়েক বছরে “দলবাজ কূটনীতিক”-এ পরিণত হয়েছেন, কেউ কেউ নিজের বাড়তি সুবিধা আদায়ের জন্য,  আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে এই অবস্থায় গেছেন। এরা বিদেশে দেশের কাজ ও সাধারণ মানুষের সেবা প্রদানের পরিবর্তে রাজনৈতিক দল, দলের নেতা ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সেবা প্রদানে ব্যস্ত থেকেছেন তাতে দেশের কূটনীতি ও সাধারণ প্রবাসীদের সেবাপ্রাপ্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষ পেশাজীবী কূটনীতিবিদরা দলবাজ ও তদবিরবাজদের দাপটে পেছনে পড়ে গেছেন।

দল-অনুসারী কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে নির্মূল করা বেশ কঠিন কাজ। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তত সামনের দিকের দল-অনুগত কূটনীতিবিদদের কাজের স্থান পরিবর্তন করে দেশের কূটনীতি গতিশীল করা আজ খুবই জরুরি।

বেশ কিছু পরিবর্তন ও জরুরি সংস্কার আজ আলোচনায় আছে এগুলো সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক মতামত পক্ষে নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী সফল কূটনীতি আজ অত্যাবশ্যকীয়। এই বিবেচনা মাথায় রেখে সমাজের অভিজ্ঞ ও নানা জ্ঞানে সুদক্ষ জনবলকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্ত করা অতি জরুরি। আমাদের অত্যাবশ্যকীয় সকল উদ্যোগ ও ইতিবাচক সংস্কারের নতুন চিন্তাগুলোকে কার্যকর করার স্বার্থে দেশে ও প্রবাসে আধুনিক জ্ঞান-সম্পন্ন তরুণ ও কিছু সংখ্যক প্রবীণ মানুষকে কূটনীতিতে যুক্ত করা দরকার, এমনকি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত করা প্রয়োজন।

কালবিলম্ব না করে বাজপাখির ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করে আরও এগিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহায়ক কার্যক্রম গ্রহণ করে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া প্রয়োজন।  

অর্থনীতি, সমাজনীতি ও বাণিজ্য নীতি  সবই দেশে-বিদেশে কূটনীতির মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। কেউ যেচে কিছু দেয় না। সুতরাং “যাহা চাই যেন জয় করে পাই” এই নীতিকে পুঁজি করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

mzamin

শ্বেতপত্র কমিটিকে সচিবরা: রাজনীতির কাছে জিম্মি ছিল প্রশাসন

আগের সরকারের আমলে প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে জিম্মি ছিল বলে অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিকে জানিয়েছেন সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলারা। গতকাল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের একথা বলেন। বৈঠকে ৩২ জন সিনিয়র সচিব ও সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ৮৫ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অংশ নেন।

বৈঠক শেষে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, উনারা (সরকারি কর্মকর্তারা) বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিকভাবে জিম্মি অবস্থার মধ্যে ছিল। তবে কেউ কেউ বলেছেন, এর ভেতরেও কেউ কেউ সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। যারা দাঁড়িয়েছেন তারা সেক্ষেত্রে কিন্তু ব্যত্যয় করতে পেরেছেন। একেবারেই যে তারা পারেননি তা না। তবে সাহস করে দাঁড়াতে গিয়ে কেউ কেউ পেশাগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন বলেও বৈঠকে তারা তুলে ধরেছেন।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, এতে পেশাজীবনের অনুগমন বা অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, জবাবদিহির অভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দুর্বলতা ছিল। উন্নয়ন প্রশাসনের মধ্যে কিছু অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়ীদের প্রভাব ছিল। অনেক আমলা রাজনৈতিক অভিলাষের কারণে এই ধরনের কাজে জড়িত ছিলেন বলেও তারা তুলে ধরেছেন। তারা জানিয়েছেন পেশাগতভাবে আমাদের ভঙ্গুর করে ফেলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্নভাবে বদলি করে ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

যে কারণে তারা পেশাদারি ও দলগতভাবে কাজ করতে পারেননি। এই কারণে প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে। বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তাদের তুলে ধরা অভিজ্ঞতার বিষয়ে দেবপ্রিয় বলেন, উনাদের ওপর প্রবীণরা (সিনিয়র ও সাবেক আমলারা) চাপ সৃষ্টি করেছেন বলে শ্বেতপত্র কমিটির সামনে বর্তমান দায়িত্বশীলরা তুলে ধরেন।

বৈঠকে হাইটেক পার্ক, কর্ণফুলী টানেল, জ্বালানি খাত, কর আহরণ, সামাজিক খাত, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানান। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আলোচনায় উঠে এসেছে পেশাদারি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা খুবই দরকার। সক্ষম, স্বাধীন এবং যোগ্য পেশাজীবীদের উন্নয়নের জন্য ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি না হয় বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমইডি অনেক সময় খুব ভালো কিছু প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। কিন্তু তার জন্য আবার তাদের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। অনেক সময় সিনিয়র আমলারা জুনিয়র আমলাদের চাপ দিতেন। অনেক আমলার মধ্যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়েছিল। এখন নানা সংস্কার হচ্ছে। ফলে মূল কাঠামো শক্তিশালী হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

কমিটির আরেক সদস্য ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশের রাজনীতি ঠিক না থাকলে আমলাতন্ত্র ঠিক হবে না। রাজনীতি ঠিক করা হলে তখন আমলাতন্ত্রও ঠিক হবে।

mzamin

৭ উদ্দেশ্যে সংবিধান সংস্কার -ড. আলী রীয়াজ

দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাসহ ৭ উদ্দেশ্যে সংবিধান সংস্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. আলী রীয়াজ। আর এ সংস্কার করা সংবিধান পাস বা অনুমোদন দিতে কোনো নির্বাচিত সরকার বা পার্লামেন্টের প্রয়োজন হবে না, এটি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ সংবিধানের বৈধতা দেবে বলে জানিয়েছেন সংস্কার কমিটির অন্যতম সদস্য শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মাহফুজ আলম। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা দেখতে চায় না সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে গঠিত কমিশন। একই সঙ্গে সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অভাবনীয় এককেন্দ্রিকক্ষমতা হ্রাস করা, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ করার মতো সুপারিশ থাকবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের।  রোববার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার কমিশনের লক্ষ্য ও রূপরেখা তুলে ধরেন কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। এ সময় কমিশনের সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম, সদস্য অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকরামুল হক, ড. শরীফ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী, ফিরোজ আহমেদ ও মো. মুসতাইন বিল্লাহ প্রমুখ।

সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলী রীয়াজ বলেন- ক. দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। খ. ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। গ. রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা। ঘ. ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার উত্থান রোধ। ঙ. রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন। চ. রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন। ছ. রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
তিনি আরও বলেন, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করবো লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর জন্য। সরকার বিভিন্ন কমিশনের কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে। ফলে কমিশনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করবে না। কিন্তু তাদের দেয়া প্রতিটি লিখিত প্রস্তাব ও মতামত কমিশন নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করবে এবং কমিশনের সুপারিশে তার যথাসাধ্য প্রতিফলন ঘটাতে সচেষ্ট থাকবে।
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ সংস্কারের পরিধি নিয়ে বলেন, সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত হবে বর্তমান সংবিধান পর্যালোচনাসহ জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের লক্ষ্যে সংবিধানের সামগ্রিক সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পুনর্বিন্যাস এবং পুনর্লিখন। সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত উদ্দেশ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এবং ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আলোকে  বৈষম্যহীন জনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রকাশিত অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো হবে সুপারিশে। পাশাপাশি রাজনীতি এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় সর্বস্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান রোধ, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের পৃথক্‌করণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ ও পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের সুপারিশ থাকবে কমিশনের। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক এবং আইন দ্বারা সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ থাকবে বলে জানায় কমিশন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, কমিশন সংস্কারের সুপারিশ তৈরিতে বিভিন্ন অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাব গ্রহণ করবে। পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের মতামত ও প্রস্তাব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হবে। সংস্কারের অংশ হিসেবে কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত মতামত এবং সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ করবে। সুপারিশ পাওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কমিশন। এ ছাড়া সংবিধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, পেশাজীবী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, তরুণ চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করবে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনায় বসবে কমিশন। তবে, যেসব ব্যক্তি, সংগঠন, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বা দল জুলাই-আগস্ট ছাত্র- জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সক্রিয়ভাবে হত্যাকাণ্ডে যুক্ত ছিল, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নকে সমর্থন করেছে, ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমকে বৈধতা প্রদানে সহযোগিতা করেছে কমিশন তাদের সংস্কার প্রস্তাবের সুপারিশ তৈরিতে যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

mzamin

প্রবাসী মুন্না কার কর্মী?

সিলেটের সোনারপাড়ার বাসিন্দা ও ফিনল্যান্ড প্রবাসী সাজ্জাদুর রহমান মুন্না কার কর্মী? বিএনপি? না আওয়ামী লীগের-  এ নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নগরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতারা মুন্নাকে ‘যুবলীগকর্মী’ হিসেবে দাবি করেছেন। তারা বলেছেন; গ্রেপ্তারের পর এখন তাকে বিএনপি’র কর্মী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। ফিনল্যান্ড প্রবাসী মুন্না সিলেট নগরে আলোচিত ব্যক্তি। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এর আগে তিনি একাধিকবার আলোচিত হয়েছেন। এমনকি গত বছরের প্রথম দিকে তিনি এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন  সোনারপাড়ার এসপি টাওয়ার-২ এর স্বত্বাধিকারী কুলাউড়ার ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বুধবার মধ্যরাতে কোতোয়ালি থানার বিস্ফোরক মামলায় সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ থেকে সাজ্জাদুর রহমান মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে ফিনল্যান্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি হচ্ছে মুন্না। সে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের অবৈধ আয়ের অর্থ ফিনল্যান্ড পাচার করার মূলহোতা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়া; তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর ফিনল্যান্ড বিএনপি’র তরফ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে বিবৃতি পাঠানো হয়। ওই বিবৃতিতে দলের নেতারা মুন্নাকে ফিনল্যান্ড বিএনপি’র কর্মী হিসেবে দাবি করেন। বৃহস্পতিবার পাঠানো বিবৃতিতে ফিনল্যান্ড বিএনপি’র সভাপতি কামরুল হাসান জনি ও সাধারণ সম্পাদক জামান সরকার জানিয়েছেন, মুন্নাকে ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করায় ফিনল্যান্ড বিএনপি’র নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হতাশ হয়েছেন। এ জন্য মুক্তির ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এদিকে, ফিনল্যান্ড বিএনপি’র এই বিবৃতিতে হতাশ সিলেট মহানগরের ২১নং ওয়ার্ডের বিএনপি’র নেতারা। শনিবার ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিক সেবুর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুবলীগ নেতাকে বিএনপিকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়ার নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে- ফিনল্যান্ডপ্রবাসী যুবলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অর্থদাতা সাজ্জাদুর রহমান মুন্নাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলাও আছে। কিন্তু  গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে মুন্নাকে বিএনপিকর্মী বানানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ২১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতারা তা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে ওয়ার্ড বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে আসছিল সাজ্জাদুর রহমান মুন্না। সেইসঙ্গে গ্রেপ্তারের তথ্য ও টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর খোলস পাল্টে বিএনপিকর্মী সাজার নাটক শুরু করে দিয়েছে মুন্না। তার এই নাটক মামলা থেকে বাঁচার জন্য। অথচ ফ্যাসিবাদী হাসিনার আমলে আওয়ামী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে দেখা গেছে তাকে। দিনরাত তাদের পেছনে সময় ও টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া মুন্নার মূলবাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। সিলেট নগরের সোনারপাড়া নবারুন আবাসিক এলাকায় তার বাসা রয়েছে। বিগত কয়েক বছর মুন্না যখনই ফিনল্যান্ড থেকে সিলেটে এসেছে তখন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তিনি কখনোই নিজেকে বিএনপি’র কর্মী হিসেবে পরিচয় তুলে ধরেননি। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বাসার রাস্তা নিয়ে কুলাউড়া উপজেলার ভাটের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ২০২৩ সালে প্রথমে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া সাজ্জাদুর রহমান মুন্না। পরে এসপি টাওয়ার-২ এর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলামও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে মুন্নার বিরুদ্ধে বিষোদাগার করেছিলেন। সিলেট থেকে এই বিরোধের রেশ গিয়ে পড়েছিল এলাকায়ও। তখন উভয়পক্ষের মধ্যে মামলা, পাল্টা মামলাও ছিল। ঘটনাটি গড়েছিল কুলাউড়ার সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেল পর্যন্ত। তবে তাদের মধ্যে বিবদমান বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি।
mzamin

প্রসিকিউটর থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী

ঠিক তিন মাসের কিছু বেশি সময় আগের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। ঘোষণা করলেন তার অতীত ও ভবিষ্যৎ। এর মাত্র একদিন আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এবারের নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হিসেবে কমালা হ্যারিসকে সমর্থন দিয়ে যান। তখন কমালা হ্যারিসের সামনে প্রচারণা চালানোর সময় খুব কম। অনেকটা সময় নষ্ট করে ফেলেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ফলে যে তিন মাসের একটু সামান্য সময় বেশি ছিল, তার মুহূর্তও নষ্ট করেননি কমালা। রাজনীতিতে একটি কথা আছে- হয়তো নিজেকে পরিচিত করো না হয় তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীই তোমাকে পরিচিত করে তুলবে। ঠিক ওই মুহূর্তে কমালা হ্যারিস মার্কিন জনগণের সামনে প্রথম বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে তার রেকর্ড অথবা একজন সিনেটর হিসেবেই পরিচয় দেননি। একই সঙ্গে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার একজন প্রসিকিউটর হিসেবে অনেক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তাও জানিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ডনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে কমালা বলেন, সব রকম অপরাধীকে দেখে নিয়েছি। তার মধ্যে আছে নারী নির্যাতনকারী, ভোক্তাদের অধিকার ছিনিয়ে নেয়া প্রতারক, নিজেদের লাভ অর্জনের জন্য যারা আইন ভেঙে প্রতারণা করেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব কথা তিনি বার বার বলেছেন। ৬০ বছর বয়সী কমালা এই নির্বাচনকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা একজন প্রসিকিউটর এবং একজন দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির মধ্যে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

তিনি অব্যাহতভাবে ডনাল্ড ট্রাম্পের আইনি ঝামেলাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন  ভোটারদের। ক্যালিফোর্নিয়ার কোর্টরুমের  ভেতরে এবং বাইরের দিনগুলোর দিকে যদি ফিরে তাকানো যায় তাহলে দেখা যাবে কমালা নিজেকে সংগ্রামের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার বিরোধী পক্ষ তাকে নিয়ে যা বলেন তা তার রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে। তারা তার সেই অধ্যায়টিকে স্পর্শ করতে পারেন না। ক্যালিফোর্নিয়ার আলামেডা কাউন্টিতে একটি আইনি স্কুল থেকে আইন প্রয়োগের যাত্রা শুরু হয়েছিল কমালা। এর অধীনে পড়ে বার্কলে এবং তার নিজের শহর ওকল্যান্ড। ১৯৯০-এর দশকে সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় সহিংস অপরাধের বিরুদ্ধে লড়ছিল ওকল্যান্ড। কমালা হ্যারিসের মতো তখনকার একজন জুনিয়র প্রসিকিউটরের জন্য এ কাজটি ছিল দুঃসাধ্য। ওই সময় কমালার সঙ্গে কাজ করেছেন তেরেসা ড্রেনিক। তিনি বলেন, কিন্তু এসব মামলার ভয়াবহতার অর্থই হলো একজন তরুণ ও উচ্চাভিলাষী অ্যাটর্নির জন্য এটা ছিল একটি টপ জব। পরিবেশটা ছিল পট বয়লারের মতো। প্রতিদিন যে বেদনা ও ক্ষোভের বিষয় তার মুখোমুখি হওয়া ছিল কঠিন। আমাদের জন্য এটা ছিল আরও তীব্র। অপরাধের মাত্রা ছিল খুবই ভয়াবহ। বিষয়টি ছিল কোকেন মহামারির মতো। গ্যাং মার্ডার হচ্ছিল। রাস্তার কোণায় হত্যাকাণ্ড হতো। মিস ড্রেনিক এবং হ্যারিস একই ট্রায়াল টিমে কাজ করেছেন। তিনি স্বীকার করেন, জুরিদের সামনে কমালা হ্যারিস থাকতেন আত্মবিশ্বাসী। তার সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা ক্রমাগত বেড়েছে। শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয় দেখে এমন একটি কোর্টে কমালাকে অন্য একটি টিমে স্থানান্তরিত করা হয়। কমালা ছিলেন নির্যাতিত শিশুর প্রতি খুব, খুব বেশি যত্নশীল। তিনি তাদের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন যে, তারা তার সঙ্গে মিশে যেতো এবং সব কথা প্রকাশ করে দিতো।

এটা ওই সময় ছিল যখন কমালা হ্যারিস ডেটিং দিচ্ছিলেন স্থানীয় রাজনীতির কিংমেকার এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট অ্যাসেম্বলির স্পিকার উইলি ব্রাউনের সঙ্গে। বর্তমান গভর্নর গাভিন নিউসম, সান ফ্রান্সিসকোর মেয়র লন্ডন ব্রিড সহ রাজ্যের সবচেয়ে সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতাদের ক্যারিয়ার গড়তে সহায়তা করেছেন উইলি ব্রাউন। ওই সময় কমালা হ্যারিসকে দুটি রাজ্যের বোর্ডে নিয়োগ দিলেন এবং তাকে সান ফ্রান্সিসকোর হাইপ্রোফাইল ডেমোক্রেট ডোনারদের কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ১৯৯৫ সালে ওই শহরের মেয়র নির্বাচিত হন উইলি ব্রাউন। এরপরই কমালার সঙ্গে তার স্বল্প সময়ের মন দেয়া-নেয়ার ইতি ঘটে। এর তিন বছর পরে সান ফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের দায়িত্বে আসেন কমালা হ্যারিস। উইলি ব্রাউন ছিলেন তার চেয়ে ৩০ বছরের বড়। তাদের সম্পর্কের সময় শহরের কিছু হেভিওয়েট রাজনীতিকের সঙ্গে মেশা শুরু করেন। সান ফ্রান্সিসকোর রাজনীতিতে রাজনৈতিক মেশিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর কারণ, দেশের সবচেয়ে সেরা কিছু রাজনীতিকের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছে এই রাজ্যে। তার মধ্যে আছেন প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, প্রয়াত সিনেটর ডিয়ানে ফেইনস্টেইন। তাদের দু’জনের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন কমালা। গাভিন নিউসমের মতোই তিনি উঠে আসতে থাকেন। রাজনীতির বিশ্বে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করে ফেলেন। সান ফ্রান্সিসকোর রাজনীতি ছিল রাফ অ্যান্ড টাফ। সেখান থেকে দ্রুততার সঙ্গে উঠে আসেন কমালা। এ সময়েই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ অন্যতম একজন বন্ধুর সাক্ষাৎ পান তিনি। তিনি ডেমোক্রেটদের উল্লেখযোগ্য সবচেয়ে বড় ডোনার। তিনি হলেন অ্যাপল কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবসের বিধবা স্ত্রী লরেন্স পাওয়েল। সান ফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি পদে ২০০৩ সালে প্রচারণার সময় কমালা হ্যারিসের তহবিলে তারা দান করেন ৫০০ ডলার। তাকে হায়ার করেছিলেন যে ব্যক্তি তাকে হারিয়ে তিনি নির্বাচিত হন। তার ২০ বছর পরে বিলিয়নিয়ার এই হিতৈষী বাইডেন-কমালার পুনঃনির্বাচনী প্রচারণায় প্রায় ১০ লাখ ডলার দান করেন। এ তথ্য ফরচুন ম্যাগাজিনের। তবে এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কমালাকে কতো অর্থ ডোনেট করেছেন লরেন্স পাওয়াল তা এখনো জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, এই অঙ্ক অনেক বেশি হবে।

২০০৪ সালে ইস্টারের একদিন আগে সান ফ্রান্সিসকোতে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে কমালা হ্যারিসের দায়িত্বের ঠিক চার মাসের মধ্যে একটি গ্যাংয়ের এক সদস্য একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করে ২৯ বছর বয়সী পুলিশ কর্মকর্তা আইজাক এসপিনোজা’কে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড পুরো শহরকে বিস্মিত করে। অনেক রাজনীতিক এবং পুলিশের প্রথম সারির অনেক সদস্য এর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন। কিন্তু এর বিরোধিতা করেন কমালা হ্যারিস। এটাই ওই শহরে শীর্ষ প্রসিকিউটর হওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক যাত্রা। তিনি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন জেল দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনি এই মত প্রকাশ করেন। আইজাক এসপিনোজার স্ত্রী বলেন, কিন্তু তিনি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা না করে কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন আমরা বুঝতে পারছি না। দ্রুততার সঙ্গে এমন বিরোধিতা সামনে চলে আসে। ওই কর্মকর্তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিনেটর ফেইনস্টেইন। তিনি খুনিকে চূড়ান্ত মূল্য দেয়ার দাবি তোলেন। গির্জায় প্রার্থনা সভা শেষে তিনি বেরিয়ে আসেন। বলেন, তিনি জানতেন কমালা হ্যারিস মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী হবেন। কিন্তু সান ফ্রান্সিসকো ক্রোনিকলে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে একটি মতামত কলাম লেখেন কমালা। তাতে তিনি বলেন, নীতির ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম নয়। ওই সময় কমালার সিদ্ধান্তের সমর্থন করেছিলেন দীর্ঘদিনের নাগরিক অধিকার বিষয়ক অ্যাটর্নি জন বারিস। তিনি বলেন, কমালার জন্য রাজনৈতিকভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ঠিক হয়নি বলে মনে করেন। তা সত্ত্বেও তিনি একজন হিতৈষী হিসেবে এটা করেছেন। তাই কমালা তার সিদ্ধান্তে একেবারেই জোরালো অবস্থানে ছিলেন। তিনি যথেষ্ট বিতর্ক সয়েছেন। এই ঘটনা তার রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ শেষ করে দিতে পারতো। কিন্তু কমালা তার ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। এই কমালা ওকল্যান্ড শহরে একটি কর্মজীবী পরিবারে একজন সিঙ্গেল মা হিসেবে বড় হয়েছেন। ২০১০ এবং ২০১৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কমালা হ্যারিসের দু’টি সফল প্রচারণা বিষয়ক ম্যানেজার ছিলেন ব্রায়ান ব্রোকাউ। তিনি বলেন, কমালা হ্যারিস কি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব? উত্তরে বলতে হয়, একেবারেই নয়। যদি প্রশ্ন করা হয় তিনি কি প্রাকৃতিকভাবেই দক্ষ? উত্তরে বলতে হয়- হ্যাঁ। তিনি শেষের ফলের দিকে দৃষ্টি দেন। সান ফ্রান্সিসকো ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে প্রথম যে বড় সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন তা থেকে তিনি কিছু শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে হয়। চার বছর পরে তিনি আবারো এক নাটকীয় হত্যাকাণ্ডের পর মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেন। কিন্তু এবার তার সিদ্ধান্ত কীভাবে প্রতিফলিত হবে বলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। সান ফ্রান্সিসকোতে তিন ছেলেকে নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন টানি বোলোগনা। এক পর্যায়ে অস্ত্রধারী তাদের গাড়ি থামায়। তার দুই ছেলেকে হত্যা করে সে। তৃতীয় জন মারাত্মক আহত হয়। এর অল্প পরেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে এডউইন র‌্যামোন উমানা নামের একজন এমএস-১৩ গ্যাংয়ের সদস্যকে। তার একজন শত্রু ছিল। তাকে খুন করার মিশনে নেমেছিল উমানা। কিন্তু ভুল করে সে ৪৯ বছর বয়সী বোলোগনাকে টার্গেট করে ফেলে।

mzamin


অন্তর্বর্তী সরকারকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কে জড়িয়ে দুর্বল করা হচ্ছে by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

বিশ্বের সংগ্রাম-লড়াইয়ের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে বাংলাদেশে। মৃত্যুকে সংবর্ধিত করা, ভয়কে তুচ্ছ করার বিস্ময়কর ইচ্ছা শক্তির জোরে ছাত্র-জনতার অসামান্য দৃঢ়তা, পরাক্রমশালী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শোষণ, নিপীড়ন ও অমর্যাদার শৃঙ্খল ছুড়ে ফেলার জন্য নির্বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা অবিশ্বাস্য সাহসিকতায় রাজপথে রুখে দাঁড়িয়ে ছিল। দু’হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়িয়ে বুলেট গ্রহণের উৎসব, মা এবং সন্তান হাতে হাত ধরে সশস্ত্র শক্তির সামনে নিঃশঙ্ক চিত্তে মিছিলে যোগদান, রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি বিরল ঘটনা।

জুলাই-আগস্টে রাজনৈতিক লড়াইয়ের তীব্রতায়, গণমানুষের সম্পৃক্ততায় যখন আন্দোলনের স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে উৎকর্ষ, বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য এবং অজস্রতায় অত্যুচ্চ রূপ লাভ করেছিল, সেই অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে  দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে গণঅভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তোলে। দেশের সকল মানুষের অসাধারণ লড়াইয়ের প্রেরণায় অসাধ্য সাধনে আমরা জয়লাভ করি। এখনো আমরা জুলাই গণহত্যার ভয়াবহতা প্রকাশ করতে পারিনি। সাঁজোয়া যান থেকে আহত ছাত্রকে ছুড়ে ফেলে দেয়া, আহত এবং জীবন্ত অবস্থায় লাশ পুড়ে ফেলাসহ- নির্বিচার হত্যাকারীদের অনেককেই যেমন শনাক্ত করতে পারিনি তেমনি  কে বা কারা আন্দোলনে আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান না করতে বর্বরোচিত নির্দেশ দিয়েছিল, এবং কারা কারা সেই নির্দেশ অনুসরণ করেছিল  তাদেরকেও আমরা আজ পর্যন্ত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারিনি। কতোজন আহত আর কতোজন বাকি জীবন সূর্যের আলো দেখবে না- তাও আমরা সুস্পষ্ট করতে পারিনি। আহতদের বিশেষ করে দৃষ্টিহীনদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার কী ভাবছে তাও এখনো জানা যায়নি। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর কতো লক্ষ গুলি বর্ষিত হয়েছে তাও প্রকাশ করা দরকার।

আমাদের সন্তানরা জীবন উৎসর্গ করে আমাদেরকে বেঁচে থাকার পরিসর অবারিত করে দিয়ে গেছে, আর আমরা তাদেরকে ভুলে গিয়ে, ক্ষমতার প্রতিযোগী হয়ে গেলে নিজেরাই অভিযুক্ত হয়ে পড়বো। এর মাঝে কতো অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ককে আমরা হাজির করছি। প্রশ্ন উঠেছে- গণঅভ্যুত্থানে সৃষ্ট সরকারের বৈধতা নিয়ে। যখন জনগণের সম্মতিতে প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের সমস্ত সম্ভাবনা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছিল, তখন ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতার আত্মবলিদান এবং প্রজাতন্ত্রের সকল জনগোষ্ঠীর নৈতিক সমর্থন- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বৈধতা দিয়েছে। সংবিধানবিরোধী অবৈধ সরকারকে উৎখাত করাই হচ্ছে বৈধ এবং আইনসম্মত।

মালিকানার সূত্রে জনগণের ক্ষমতা প্রতিনিধিদের নিকট হস্তান্তর- অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। অর্থাৎ রক্ত বা ব্যালট দিয়ে যে সরকারই নির্ধারণ করা হোক- তা কোনোক্রমেই সীমাহীন নয়। জনগণের ক্ষমতা কাউকেই অনির্দিষ্ট করে দেয়া যায় না। কারণ যে ক্ষমতা সময়ে-সময়ে জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ বিনষ্ট করে তা জনগণের মালিকানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ফলে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা থাকে। যেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রচণ্ড সংঘাত, সংঘর্ষ ও রক্তপাত অতিক্রম করে আবির্ভূত হয়েছে সেহেতু সরকারকে ক্রমাগতভাবে তার অবস্থান সুনির্দিষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার এবং নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। অন্তর্ভুক্ত জনগণের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় নিতে হবে। জনগণের আবেগ এবং অনুভূতিকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। সামাজিক ইচ্ছার  প্রতিফলন থাকতে হবে সরকারের প্রতিটি কর্মে। জনপ্রিয়তা বা গণসমর্থন কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়, বরং সতত পরিবর্তনশীল। যেহেতু রাষ্ট্র এবং সরকার জনগণের  অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে, সেহেতু সকল ক্ষেত্রে সরকারের বিশ্বস্ততা এবং নিষ্ঠা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সরকারকে জনগণ ভালোবাসা ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে সংরক্ষণ করবে না। সম্মতি মানে নিঃশর্ত নয়। বাংলাদেশ যেহেতু রাজতান্ত্রিক বা অভিজাত তান্ত্রিক নয়, সেহেতু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অভিপ্রায় এবং আনুগত্যকে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের মনন, চিন্তার স্তর, জটিল প্রকৃতি, বিভেদ, অনৈক্য, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পথ চলতে হবে। জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু চাপিয়ে দিলে বা অতীতের মহান অর্জন যা জনগণের গভীর মনস্তত্ত্বে গ্রথিত হয়ে আছে তা সরিয়ে দিলে জনগণ তীব্র প্রতিবাদ করবে, রক্ত দিয়ে পুনরায় প্রতিহত করবে।

বিদ্যমান বাস্তবতা কোনো কোনো অতিবিপ্লবীর বিবেচনায় থাকছে না। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কে জড়িয়ে দুর্বল করা হচ্ছে, জনসমর্থনে ফাটল ধরানো হচ্ছে, যা অপশক্তির ষড়যন্ত্রের পথকে প্রশস্ত করছে।
এবার একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করতে চাই। দেশের একজন প্রথিতযশা চিন্তাবিদ বলেছেন- এই যে সরকার, সেটা সেনা-সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার। এই সরকার এখনো পর্যন্ত টিকে আছে, যেহেতু আমাদের সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান একজন ভালো মানুষ এবং তিনি সাপোর্ট করে যাচ্ছেন বলে। তিনি যদি সমর্থন না করেন এই সরকার পড়ে যাবে। তার শুভবুদ্ধির উপর ভিত্তি করে সরকার দাঁড়িয়ে আছে। ফলে সেনা-সমর্থিত উপদেষ্টা সরকার চাই না। আমাদের সৈনিকেরাও চায় না। তিনি আরও বলেছেন- ‘অবিলম্বে এই সংবিধান বাতিল করে, সেনাবাহিনী সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণা থেকে বের হয়ে এসে- পরিপূর্ণ স্বাধীন সরকার হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে।’

উল্লেখ থাকে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সৃষ্টি হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং এই গণঅভ্যুত্থানের সমর্থনে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সেনা সমর্থন দেয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং অযৌক্তিক বক্তব্য। কারণ গণতান্ত্রিক স্বদেশ বা প্রজাতন্ত্রের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী ’৭১ সালে লড়াই করেছিল বীরত্ব ও দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়ে। তাদের সমর্থন থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেরিয়ে আসার নৈরাজ্যকর এক পরিস্থিতি জন্ম দেবে, যা কারও কাম্য নয়। ‘রাষ্ট্রকাঠামো’ বা ‘পরিবর্তন’ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। তা মানতেই হবে।
উক্ত চিন্তাবিদ নিজেই বলেছেন- ‘সেনা-সমর্থন প্রত্যাহার করলে সরকার পড়ে যাবে।’ আবার তিনিই দাবি করছেন, ‘সেনা-সমর্থিত সরকারের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে’। সেনাবাহিনী প্রজাতন্ত্রের তথা রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী এবং সমগ্র জনগোষ্ঠীর অংশীজন। জনগণের সরকারকে সমর্থন না দিয়ে সেনাবাহিনী নির্বিকার হয়ে বাইরে অবস্থান করলে আজকের দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্র টিকে থাকবে কিনা তা ভেবে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়! বিরাজিত বাস্তবতায় সেনা-সমর্থন ছাড়া রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়বে কি না- এসবের কোনো কিছুই বিবেচনায় না নেয়া রাষ্ট্রের জন্য কতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না।

সংবিধান বাতিল করে সেনা-সমর্থন প্রত্যাহার করলেই সরকার স্বাধীন হয়ে যাবে, এটা রাষ্ট্রের কাঠামোগত দর্শনের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইতিহাসের আলোকে রাষ্ট্রের অপরিবর্তনীয় কিছু কাঠামো নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, বৈধ সরকারের প্রতি তার আনুগত্য নিশ্চিত করার মধ্যদিয়েই সরকার স্বাধীন হবে। কোনো ধরনের শূন্যতায় গণবিরোধীদের বড় ধরনের উস্কানির পথ প্রশস্ত করে কিনা, অপশক্তির উত্থানকে ত্বরান্বিত করে কিনা, তা আমাদেরকে প্রতি মুহূর্তে বিবেচনায় নিতে হবে।
আমরা দখলদার অবৈধ সরকারকে উৎখাত করেছি। পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকার সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে অবৈধভাবে ও অনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। এজন্য খুনি সরকার পরিবর্তন করে, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দখলকৃত প্রতিষ্ঠানকে জনগণ রক্ত দিয়ে রাহুমুক্ত করেছে। সুতরাং এই বঙ্গভবন, গণভবন- জনগণের এবং রাষ্ট্রের। বঙ্গভবনে শপথ নিলেই সরকার বিপ্লবী হয় না, কিংবা শহীদ মিনারে শপথ নিলেই কেউ বিপ্লবী হয়ে যাবে- এমন ধারণা কোনোক্রমেই প্রাসঙ্গিক নয়। বিশ্বব্যবস্থায় সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। যে শর্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পূরণ করেছে। একদিনে এককভাবে কোনো রাষ্ট্র- রাষ্ট্রের বিধি, নিয়ম-শৃঙ্খল ছুড়ে ফেলতে পারবে না, এর মাঝেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নির্মাণে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পাদন করতে হবে। এই বিদ্যমান বাস্তবতা থেকেই ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার হস্তান্তর নয়, রূপান্তর করতে হবে। জনগণকে অবশ্যই আদর্শিক এবং নৈতিক মূল্যবোধে জাগ্রত রাখতে হবে। ক্রমাগতভাবে নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। ঘোষণা দিলেই রাষ্ট্রের মৌলিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে যায় না, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বিলোপ ঘটে না, তার জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন।

আজকের বিশ্বব্যবস্থায় সকল রাষ্ট্রের সংবিধান বা কনস্টিটিউশন রয়েছে। ১৯৭১ সালে আমাদের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হয়েছিল- এ ভূখণ্ডের মানুষের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধান রচনার জন্য। সুতরাং সারা বিশ্বব্যাপী, এমনকি মুক্তিকামী মানুষের কাছেও কনস্টিটিউশন বা সংবিধান কাম্য। সংবিধানকে গঠনতন্ত্র বলার ব্যক্তিগত মনোভাব যেকারও থাকতেই পারে কিন্তু সর্বজন স্বীকৃত ‘সংবিধান’কে গঠনতন্ত্র বলে চিহ্নিত করা প্রয়োজনীয় আলোচনা নয়।
বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতির অংশ, বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে গণ-অভ্যুত্থানের অভিপ্রায় সহায়ক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জনগণের সকল অংশের সঙ্গে সেনাবাহিনীরও নিরঙ্কুশ সমর্থন অপরিহার্য। মনে রাখতে হবে, অবাস্তব বা নৈরাজ্যকর এমন কোনো চিন্তাধারাকে প্রশ্রয় বা উস্কে দেয়া যাবে না, যা রাষ্ট্র বা সরকারকে বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সৃষ্ট এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি প্রজাতন্ত্রের সকলকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক সমর্থন দিতে হবে।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

লেবাননে ধ্বংস্তূপে চাপা মরদেহ উদ্ধার করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল

লেবাননের দক্ষিণ ও পূর্বের বিভিন্ন স্থানে আরও বিমান হামলা করেছে ইসরায়েল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিডন শহরের উপকণ্ঠে হারেত সাইদা নামক এলাকায় একটি আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। সেই হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ৯ জন আহত হওয়ার খবর জানা গেছে। আহতদের কয়েকজনকে হাসপাতালে আনা সম্ভব হলেও মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। শুধু তাই নয় ওই সব এলাকায় গত এক সপ্তাহ আগে নিহতদের মরদেহও উদ্ধার করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল।

রোববার (৩ নভেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিডনে একাধিকবার বোমা হামলা হয়েছে। গত কয়েক দিনে অন্তত দুবার বড় ধরনের বিমান হামলা হয়। এসব লেবাননের আরও দক্ষিণে অভিযানের চেয়ে উত্তরে হামলা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

সংবাদমাধ্যমটির সংবাদদাতারা বলেন, দক্ষিণ লেবাননের খিয়াম শহরে প্রায় এক সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে দুটি পরিবার। তাদের বিষয়ে আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি। তাদের উদ্ধারের অনুমতি বা সুযোগ দেয়নি ইসরায়েলি বাহিনী।

সংবাদদাতারা আরও বলেন, ওই ঘটনায় ২১ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। আমরা এখন শুনছি, ৫টি লাশ (গোপনে) উদ্ধার করা হয়েছে। অন্তত আরও ১৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। সেই হামলার পরও কেউ বেঁচে থাকবে বলে কেউ আশা করছে না। বেসামরিক প্রতিরক্ষা এবং রেড ক্রস বলছে, লাশ উদ্ধারে ওই এলাকায় তাদের প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিচ্ছে না ইসরায়েল। এতে উদ্ধারকারীরা দীর্ঘ সময় ধরে এই হামলারস্থলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু এত দিনেও ইসরায়েলি বাহিনীর সবুজ সংকেত মিলছে না।

এদিকে পাল্টা আক্রমণে ইসরায়েলকে ঘায়েলের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। এবার প্রায় একই সময় ১৪০টি রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তিন দেশে থেকে এ হামলা চালানো হয়। শনিবার (২ নভেম্বর) টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার লেবানন থেকে উত্তর ইসরায়েলে ১৩০ টিরও বেশি রকেট ছোড়া হয়েছে। এর ফলে সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের ভিড়ের তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে একই সময়ে দেশটিতে অন্তত ১০টি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। দেশটিতে ছোড়া এ ড্রোনের ছয়টি লেবানন থেকে, তিনটি ইরাক ও অপর একটির ঠিকানা স্পষ্ট জানা যায়নি। মধ্য ইসরায়েলের তিরাত এলাকায় একটি বাড়িতে রকেট হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। 

লেবাননের বৈরুতের উত্তরে মায়েসরা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার হতাহতদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি : এপি
লেবাননের বৈরুতের উত্তরে মায়েসরা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার হতাহতদের স্বজনদের আহাজারি। ছবি : এপি

পুতিনের সাহায্য চাইছেন নেতানিয়াহু

মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সংঘাতে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন মদদেই গাজায় এক বছরের বেশি সময় ধরে আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরায়েল। নতুন করে যোগ হয়েছে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান। এমতাবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের আরেক পরাশক্তি ইরানের সঙ্গেও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল।

আগুনে ঘি ঢালতে সিদ্ধহস্ত যুক্তরাষ্ট্র যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বীজ বপন করছে, তখন ত্রাতার ভূমিকায় রাশিয়াকে পাশে চাইছে ইসরায়েল। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইরানভিত্তিক মেহের নিউজ জানিয়েছে, লেবাননের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে চান নেতানিয়াহু।

আর এ জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দ্বারস্থ হয়েছে তেল আবিব। খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া এগিয়ে এলে ভবিষ্যত কোনো চুক্তির এটা দারুণ কাজে দেবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরায়েলের নির্ভরতাও কমবে।

রুশ গণমাধ্যম আরটি জানিয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং আরও উত্তেজনা রোধে রাশিয়ানদের বিশেষ ভূমিকা থাকবে। এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পর, তড়িঘড়ি ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইসরায়েলের একজন সাবেক কর্মকর্তা। তিনি দাবি করেন, আমেরিকাকে প্রাধান্য দেয় ইসরায়েল।

তবে ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েল কোনো চুক্তিতে পৌঁছলে, সেই সম্পর্ক কাজে লাগানো যাবে বলে বিশ্বাস ইসরায়েলের। শোনা যাচ্ছে, ইসরায়েল খুব দ্রুতই লেবাননের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছবে। 

ভ্লাদিমির পুতিন ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
ভ্লাদিমির পুতিন ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক ছাত্রীকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগে শাখা ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া মারুফুল ইসলাম শাকিল ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের ‘বাংলার মুখ’ (বিএম) গ্রুপের নেতা।

রোববার (৪ নভেম্বর) দুপুর ২টার দিকে ভুক্তভোগী ছাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করে হাটহাজারী থানা পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাটহাজারী থানার ওসি হাবিবুর রহমান।

মামলার এজহারে ভুক্তভোগী ছাত্রী উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে বিবাদীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। পরিচয়ের সুবাদে কথাবার্তা এবং চলাফেরার একপর্যায়ে যখন আমি জানতে পারি সে ছাত্রলীগের রাজনীতির করে এবং একাধিক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তখন আমি সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে সে তার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আমাকে প্রেমের সম্পর্কে যেতে বাধ্য করে।

এজহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ওই ঘটনার বিষয়ে কাউকে কিছু বললে সে আমাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেয় প্রতিপন্ন করার হুমকি দেয়।

এর আগে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, মারুফুল ইসলাম শাকিলের সঙ্গে আমার পাঁচ বছরের একটি সম্পর্ক ছিল। সে রাজনীতির ভয় দেখিয়ে আমাকে সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করে। আমি যতবার এ থেকে বের হয়ে আসতে চেয়েছি ততবার সে আমার গায়ে হাত তোলে এবং মানসিক নির্যাতন করে। এ ছাড়াও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সে আমাকে জোর করে হাত-পা বেঁধে শারীরিক সম্পর্ক করে। আমাকে প্রতিনিয়ত যৌন হেনস্তা করে এবং আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ করে। আমি ছাড়াও আরও অনেক মেয়েদের সঙ্গে সে পাঁচ-ছয় বছরের সম্পর্কে জড়িত এবং তাদের থেকেও একইভাবে ছবি, ভিডিও নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করে। বর্তমানে সে আমাকে পারিবাবিক এবং সামাজিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ছাত্রী গণমাধ্যমকে জানান, মারুফুলের সঙ্গে প্রথমে ফেসবুকের মাধ্যমে সম্পর্কে জড়াই। আমার কিছু ছবি সে গোপনে ধারণ করে এবং এগুলো পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেবে বলে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে। সে আমাকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করে। আমাকে বিয়ের কথা বলে জোর করে বেশ কয়েকবার শারীরিক সম্পর্ক করার চেষ্টা করে ও ধর্ষণ করে। পাশাপাশি গায়ে হাত তোলে নির্যাতন ও টাকার জন্য হেনস্তা করেছে।

অভিযুক্ত মারুফুল ইসলাম শাকিল এ ব্যাপারে বলেন, তার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। সে বেশকিছু সমস্যার মধ্যে ছিল আমি তাকে সাহায্য করেছি। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে সেগুলোর কোনো সত্যতা নেই। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।

চবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ কালবেলাকে বলেন, আমাদের কাছে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ জানিয়েছিল যে তার সঙ্গে আরেকজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ধরে অনৈতিক সম্পর্ক করে আসছে। সে অভিযোগের যাবতীয় প্রমাণ আমাদের কাছে দিয়েছে। বিষয়টি হাটহাজারী থানার ওসিকেও জানিয়েছিলেন। রোববার ওই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসা হয়। তার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ছেলেটিকে আটক দেখিয়ে থানায় নিয়ে যায়। পরে ভুক্তভোগী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা করে।

হাটহাজারী থানার ওসি হাবিবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, চবি ছাত্রীর মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সোমবার (৪ নভেম্বর) আদালতে পাঠানো হবে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার। ছবি : কালবেলা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার। ছবি : কালবেলা

রহস্যময় জাহাজ বানাচ্ছে চীন, স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল সেই ছবি

রহস্যময় একটি জাহাজ বানাচ্ছে চীন। আর তাতে বাড়ছে শঙ্কা। বিশ্লেষকরা বলছেন নতুন এবং অস্বাভাবিক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বানাচ্ছে চীন। এ ধরনের জলযান এটাই প্রথম।

এতে সমুদ্রে বেইজিংয়ের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। প্লানেট ল্যাবের স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা যায়, একটি শিপইয়ার্ডে ওই জাহাজের নির্মাণকাজ চলছে।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের লংশুয়ে দ্বীপের গুয়াংঝৌ শিপইয়ার্ড ইন্টারন্যাশনালে ওই জাহাজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির ফেলো মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক একজন সাবমেরিন কমান্ডার থমাস শুগার্ট বলেন, নতুন এই এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার দেখতে কিছু অস্বাভাবিক। চীনের আগের এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারের চেয়ে আকারে অনেক ছোট নতুন এই জাহাজটি।

নতুন এই জাহাজ চীনের নৌবাহিনীর ব্যবহার করা টাইপ জিরোসেভেনফাইভ উভচর অ্যাসল্ট শিপের চেয়েও ছোট। আর এ কারণেই বিশ্লেষকদের ধারণা, সবম্ভত বিশ্বের প্রথম বেসামরিক এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার বানাচ্ছে চীন। সেক্ষেত্রে এই জাহাজকে সামুদ্রিক গবেষণার মতো কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ওই জাহাজ নিয়ে সর্বপ্রথম খবর প্রকাশ করে দ্য ওয়ার জোন।

যুক্তরাষ্ট্রকে টক্কর দিতে চায় চীন। আর তাই দেশটির ক্যারিয়ার টেকনোলজিকে টেক্কা দিতে একের পর এক যুদ্ধজাহাজ বানাচ্ছে বেইজিং। এখন পর্যন্ত চীনের বানানো সবচেয়ে বড়, আধুনিক ও শক্তিশালী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হলো ফুজিয়ান। এ বছরই প্রথম পরীক্ষামূলক সমুদ্র অভিযানে নেমেছিল এটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভির বহরে যুক্ত হবে ফুজিয়ান।

এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় উভচর অ্যাসল্ট শিপ নির্মাণের ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন। ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এ তথ্য জানিয়েছে। টাইপ জিরোসেভেনসিক্সের ডেক প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ স্কয়ার মিটারের বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল মাঠের প্রায় তিনগুণ। স্যাটেলাইট ইমেজ ঘেঁটে এ তথ্য জানিয়েছে থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানটি।

তবে সামরিক জাহাজের ভিড়ে নতুন এই এয়ারক্রাফট বেইজিংয়ের নীতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক-বেসামরিক সংমিশ্রণে নতুন এই জাহাজ দু ধরনের কাজেই ব্যবহার করা যাবে। এতে ব্যয় যেমন কমবে তাতে কম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও ব্যবহার করা যাবে এই জাহাজ। নতুন এই জাহাজ চীনের কোস্টগার্ডের হেলিকপ্টার বা ড্রোন ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। 

স্যাটেলাইটে ধরা পড়া ছবি

বকেয়া পরিশোধে বাংলাদেশকে সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি : আদানি গ্রুপ

বাংলাদেশের কাছ থেকে পুরো বকেয়া পেতে ৭ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে আদানি গ্রুপের কোম্পানি আদানি পাওয়ার।

একটি পিআর ফার্মের মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, আদানি সাত দিনের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ডলারের পূর্ণ পেমেন্ট দাবি করেনি। বিষয়টির সমাধানে আদানি বাংলাদেশের পিডিবির সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।

রোববার (০৩ নভেম্বর) রাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা ইউএনবি।

এর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করে, আদানি গ্রুপ বাংলাদেশকে বকেয়া পরিশোধের জন্য ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। তারা বাংলাদেশের কাছে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার পাবে। যা বাংলাদেশি অর্থে ১০ হাজার কোটি টাকার সমান।

সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে ভারতের আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ড লিমিটেড। সময়মতো বকেয়া বিল না পেয়ে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় রণধীর জয়সওয়ালের কাছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও আদানি পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যকার ইস্যুতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। এটি একটি বেসরকারি সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার চুক্তি। তাই এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে আদানি প্ল্যান্ট অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বর্তমানে একটি ইউনিট থেকে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যা জাতীয় উৎপাদনকে প্রভাবিত করেছে। এর আগে তারা বিদ্যুৎ সচিবকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধ করতে বলেছিল।

বর্তমানে আদানি পাওয়রের কাছে বাংলাদেশ প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রেখেছে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে এই পাওনা পরিশোধ এবং ভবিষ্যতের সরবরাহকৃত বিদ্যুতের অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা হিসেবে ১৭০ মিলিয়ন ডলারের একটি লেটার অফ ক্রেডিট (এলসি) জমা দেওয়ার শর্ত দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলার উদ্যোগ নেয়। কিন্ত তা চুক্তিমতো হয়নি বলে দাবি করা হয়।

এর আগে ১১ অক্টোবর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘আদানি পাওয়ার’সহ আরও কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থার কাছে বাংলাদেশের মোট বকেয়ার পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্থের কিছুটা এখনই পরিশোধ না করা গেলে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এমন উদ্বেগকে পাশে রেখে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি রাখতে পারে বাংলাদেশ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আদানি পাওয়ারের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো কতটুকু যৌক্তিক এবং জাতির স্বার্থের কথা কতটুকু চিন্তা করেছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি প্যানেল নিয়োগ দিয়েছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে দ্রুত আইনের অধীনে যে প্রকল্পগুলো শুরু করা হয়েছিল, সেগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রকল্পগুলোও খতিয়ে দেখা হবে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়।

সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত তাদের যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করে থাকে

বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের এক কর্মকর্তা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সর্বশেষ অডিট রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, আদানি পাওয়ারের বাংলাদেশে প্রতি ইউনিট প্রায় ১২ টাকা খরচ হয়, যা ভারতের অন্যান্য বেসরকারি উৎপাদকদের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি এবং ভারতীয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্ল্যান্টের তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি।

বিগত চুক্তির অধীনে, বাংলাদেশ ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে আদানি এবং অন্যান্য ভারতীয় প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

ভারতের গোড্ডায় স্থাপিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের গোড্ডায় স্থাপিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ছবি : সংগৃহীত



দুই সিটির ব্যর্থতায় মৃত্যু বেশি ডেঙ্গুতে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

মৌসুম শেষে এসেও ডেঙ্গু চোখ রাঙাচ্ছে। প্রায় ঘরে ঘরে ডেঙ্গু জ্বরে কাতরাচ্ছে মানুষ। ২রা নভেম্বর সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবছর।  আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬৪ হাজার। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৩১৪ জন মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। এরমধ্যে ঢাকার দক্ষিণ সিটিতে সর্বাধিক ১৪৭ জন মৃত্যুর তালিকায় রয়েছেন। দেশে মোট আক্রান্তের ৪১ শতাংশই এই দুই সিটিতে রয়েছেন। চলতি ডেঙ্গু মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সতর্ক করেছিল। রাজধানীর দুই সিটির ১৮টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার ঝুঁকিতে ছিল। কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন- নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে দেশে।

এদিকে, মশার উপদ্রবে রীতিমতো অতিষ্ঠ ঢাকার দুই সিটির বাসিন্দারা। নতুন দুই সিটিতে প্রশাসক আসার পর নানা উদ্যোগ, অভিযানসহ নিত্যনতুন কার্যপরিচালনা করেও হার মানতে হচ্ছে মশার কাছে। মশার অত্যাচার থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে পারছে না সংস্থা দু’টি। দিন নেই, রাত নেই, ঘরে কিংবা বাইরে, বাসা কিংবা অফিস সব জায়গাতেই মশার উপদ্রব। শুধু রাত নয়, দিনেও কয়েল জ্বালাতে হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। ওষুধ বা স্প্রে- কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না এর উপদ্রব।

প্রতি বছরই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের ভোগায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীর চাপে ঠাঁই নেই অবস্থা। বিগত কয়েক বছরে ধারাবাহিকতায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা রুখতে পারেনি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর ওপর ?এ বছর ঢাকার দুই সিটিতে নেই কোনো মেয়র ও কাউন্সিলর। সিটি করপোরেশন পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ দিলেও মাঝে অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়ে কার্যক্রম। মশক নিধনসহ ডেঙ্গু মোকাবিলার কাজে কিছুটা ভাটা পড়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে নাজুক।? বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ রূপ নিলে প্রাণহানি ঘটবে বহু মানুষের। অথচ ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গতানুগতিক প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ রেখেছে তাদের কার্যক্রম।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের পর থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র, প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলররা অফিস করছেন না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দুই সিটি করপোরেশনের সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করা হয়। ফলে ভেঙে পড়ে মশক নিধন কার্যক্রম। এরপর থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলার সাধারণ কার্যক্রমগুলোও সেভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। আর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়রের স্থলে প্রশাসক বসিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

নগরবাসী অভিযোগ করে বলেন, প্রতি বছর শতকোটি টাকা খরচ করেও রাজধানীবাসীকে মশার কবল থেকে মুক্তি দিতে পারছে না দুই সিটি করপোরেশন। সবকিছু ব্যর্থ করে দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে বিস্তার হচ্ছে এডিস মশা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার দুই সিটির ১৮টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের পরিমাণ নির্দিষ্ট মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। সেখানে বলা হয়- দুই সিটির ৯৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর হার বেশি। এর অর্থ হচ্ছে এসব এলাকার ১০০টির মধ্যে ২০টির বেশি পাত্রে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এলাকাগুলো ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৪ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৪ জনে। ডেঙ্গুতে একদিনে ১৩০৬ রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৪৭১ জনে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে আক্রান্ত সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ৭৮৭ আর দক্ষিণে ১২ হাজার ৪২৯ জন। যা মোট আক্রান্তের ৪১ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত মৃত ৩১৪ জনের মধ্যে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ নারী। গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মারা যান রেকর্ড এক হাজার ৭০৫ জন।

ঢাকার দক্ষিণ সিটির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, আগে মেয়রসহ কাউন্সিলররা মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করতেন। আবার মশা বাড়লে আমরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান সময়ে কোনো কাউন্সিলর নেই। এদিকে ডেঙ্গু বাড়ছে, মশার অত্যাচারও বেড়েছে অনেক। কিন্তু আমরা অভিযোগ জানানোর জায়গা পাচ্ছি না। এ ছাড়া মশক নিধন কর্মীদেরও মাঠে দেখতে পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে করে আমরা সবাই আতঙ্কিত।

ঢাকা উত্তর সিটি  করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী এ ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, উত্তর সিটিতে ডেঙ্গু রোগীর যে পরিসংখ্যান প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিচ্ছে তাতে সংখ্যার গরমিল রয়েছে। এতে সংখ্যাগত ভুল পাওয়া যাচ্ছে। যে সংখ্যা দেখানো হয় প্রকৃত রোগীর সংখ্যা কম। তিনি দাবি করে বলেন, বিষয়টি হবে উত্তর সিটিতে ভর্তিকৃত রোগী। প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, মশক নিধনে উত্তর সিটিতে সবচেয়ে ভালো ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। মানুষকে সচেতন থাকতে হবে। মশা নিধনে আমাদের কোনো কার্যক্রমই থেমে নেই। মশক নিধনে ১লা জানুয়ারি থেকে যাবতীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও আমরা পরিচালনা করছি। ফলে গত বছরের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কীটতত্ত্ববিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার মানবজমিনকে বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে দেশে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জলবায়ুর প্রভাব, মাঠে এডিস মশার ঘনত্ব, রোগীও আছে এর সঙ্গে। সব ফ্যাক্টর একত্রে হওয়ার কারণে প্রকোপ কমছে না। তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি কার্যকর হতে হবে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসন এখনো তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঠেকাতে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। ডেঙ্গু রোগীর বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে প্রতিটি বাড়ির চতুর্দিকে ফগিং করে উড়ন্ত মশাকে মেরে ফেলতে হবে। যাতে কোনোভাবেই ডেঙ্গু বহনকারী মশাটি অন্য কাউকে আক্রান্ত করতে না পারে। ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হাসপাতালগুলোর চতুর্দিকে নিয়মিত ফগিং করতে হবে। যাতে সেখানে কোনো এডিস মশা বেঁচে না থাকে। হাসপাতাল এবং বাড়িতে থাকা যেকোনো ডেঙ্গু রোগীকে সবসময় মশারির ভেতরে রাখাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব এলাকায় এখনো ডেঙ্গু ব্যাপক আকার ধারণ করেনি, সেসব এলাকায় লার্ভা ধ্বংসের কীটনাশক ব্যবহারে জোর দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইইডিসিআর’র সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ডেঙ্গু প্রসঙ্গে বলেছেন, গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এ বছর বেশি না হলেও মৃত্যুহার বেশি। সুতরাং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা ডেঙ্গু আক্রান্তের হার কমে আসছে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। এ বছর এখন পর্যন্ত একদিকে প্রচণ্ড তাপ, অন্যদিকে প্রচণ্ড বৃষ্টি। এ রকম উত্তপ্ত ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এডিস মশার ডিম ও প্রজনন খুব দ্রুত হয়। বৃষ্টি হচ্ছে, আবার গরম পড়ছে। কাজেই একদিকে মশা নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আমাদের জোর দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, মশক নিধনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণ ও প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া। কাজেই জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান যদি পরিচালনা করা না যায়, তাহলে ইতিমধ্যে যতটুকু অর্জন ছিল, তাও ভেস্তে যাবে।

ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেশি প্রসঙ্গে সংস্থাটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. ফজলে শামসুল কবির সম্প্রতি আলাপকালে মানবজমিনকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন জাতির সামনে ডেঙ্গু নিয়ে হিসাবে ভুল তথ্য দিচ্ছে। তিনি জানান, এই এলাকায় দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলো থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলার রোগীরা এখানে ভর্তি হন। যা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় পড়ে। ডেঙ্গুর এসব তথ্য ঢালাওভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছে অধিদপ্তর। এতে আমাদের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানোর পরও সংশোধন না করে তারা প্রতিদিন ভুল তথ্য দিচ্ছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে বছরের শুরু থেকে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মসজিদে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। এলাকায় মাইকিং, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন থানায় ও বড় বড় হাসপাতালে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। নির্মাণাধীন ভবন প্রসঙ্গে রিহ্যাবকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তিনি দাবি করে বলেন, তাদের এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

mzamin

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাদের সময়কাল by ডা. ওয়াজেদ খান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। কে হচ্ছেন ৪৭তম প্রেসিডেন্ট। এ নিয়ে ভীষণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় গোটা বিশ্ববাসী। ৫ই নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন ঘিরে চলছে টানটান উত্তেজনা। এ নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী কমালা হ্যারিস ও রিপাবলিকান প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্প। তাদের মধ্যে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। নির্বাচনের আগে এক নজরে দেখে নেয়া যাক অতীতে কারা ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৫ বছরের ইতিহাসে ৫৯টি নির্বাচনে ৪৬ জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন এবং শেষ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এদের মধ্যে ১৯ জন প্রেসিডেন্ট পুনঃনির্বাচিত হন।

ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট: ডেমোক্রেটিক পার্টি ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ১৬ জন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র শাসন করেন। দেশটির ৭ম প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন প্রথম এবং বর্তমান ৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট: রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৫৪ সাল। দলটির মোট ২০ জন প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণে ছিল হোয়াইট হাউস। আব্রাহাম লিংকন প্রথমবারের মতো রিপাবলিকান পার্টি থেকে ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ১৮৬১ সালে। দলটির শেষ এবং ২০তম প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সাবেক এই প্রেসিডেন্ট এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী। প্রেসিডেন্টরা ছিলেন প্রথম দিকে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকান পার্টি ও স্বতন্ত্র।

জর্জ ওয়াশিংটন            ১৭৮৯-১৭৯৭
জন অ্যাডাম                  ১৭৯৭-১৮০১
থমাস জেফারসন           ১৮০১-১৮০৯
জেমস ম্যাডিসন            ১৮০৯-১৮১৭
জেমস মনরো                ১৮১৭-১৮২৫
জন কুইন্সী অ্যাডাম         ১৮২৫-১৮২৯
এন্ডু জ্যাকসন                ১৮২৯-১৮৩৭
মার্টন বারেন                  ১৮৩৭-১৮৪১
ইউলিয়াম হ্যারিসন          ১৮৪১
জন টাইলাম                  ১৮৪১-১৮৪৫
জেমস পুলক                 ১৮৪৫-১৮৪৯
জ্যাকরি টেইলর             ১৮৪৯-১৮৫০
শিরার্ড ফিলমোর            ১৮৫০-১৮৫৩
ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্স             ১৮৫৩-১৮৫৭
জেমস বুকানন              ১৮৫৭-১৮৬১
আব্রাহাম লিংকন            ১৮৬১-১৮৬৫
এন্ডু জনসন                  ১৮৬৫-১৮৬৯
ইউসিমেস গ্রান্ট             ১৮৬৯-১৮৭৭
রাদার ফোর্ড হেইস         ১৮৭৭-১৮৮১
জেমস গ্যারফিল্ড           ১৮৮১-১৮৮৫
চেস্টার আর্থার                ১৮৮৯-১৮৮৯
বেঞ্জামিন হ্যারিসন           ১৮৮৯-১৮৯৩
ক্লীভল্যান্ড                      ১৮৯৩-১৮৯৭
ইউলিয়াম ম্যাককিনলে      ১৮৯৭-১৯০১
থিয়োডর রুজভেল্ট          ১৯০১-১৯০৯
ইউলিয়াম টাফট                ১৯০৯-১৯১৩
উড্রু উইলসন                    ১৯১৩-১৯২১
ওয়ারেল হার্ডিং                 ১৯২১-১৯২৩
ক্যালভিন কলিজ               ১৯২৩-১৯২৯
হারভার্ট হুভার                   ১৯২৯-১৯৩৩
ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট           ১৯৩৩-১৯৪৫
হ্যারি ট্রম্যান                     ১৯৪৫-১৯৫৩
ডুইয়িট আইসেন হাওয়ার     ১৯৫৩-১৯৬১
জন এফ কেনেডি              ১৯৬১-১৯৬৩
লিন্ডন জনসন                  ১৯৬৩-১৯৬৯
রিচার্ড নিক্সন                     ১৯৬৯-১৯৭৪
জেরাল্ড ফোর্ড                   ১৯৭৪-১৯৭৭
জিমি কার্টার                      ১৯৭৭-১৯৮১
রোনাল্ড রিগ্যান                  ১৯৮১-১৯৮৯
জর্জ বুশ                           ১৯৮৯-১৯৯৩
বিল ক্লিনটন                     ১৯৯৩-২০০০
জর্জ ডব্লিউ বুশ                 ২০০১-২০০৪
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা      ২০০৯-২০১৭
ডনাল্ড জে. ট্রাম্প              ২০১৭-২০২০

জো বাইডেন ২০২১- বর্তমান
এক নজরে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যতিক্রমধর্মী তথ্য: ৮ জন প্রেসিডেন্টের জন্ম বৃটিশ শাসনামলে। তারা হলেন- জর্জ ওয়াশিংটন, জন অ্যাডমস, জেফারসন, ম্যাডিসন, মনরো, কিউ অ্যাডামস, জ্যাকসন ও হ্যারিসন।
৯ জন প্রেসিডেন্ট কখনো কলেজেই যাননি। তারা হলেন- ওয়াশিংটন, জ্যাকসন, ভ্যান বুরেন, টেলর, ফিলমোর, লিংকন, জনসন, ক্লিভল্যান্ড ও ট্রুম্যান।  
হার্ভার্ড থেকে ডিগ্রি নিয়েছে ৬ জন। তারা হলেন-অ্যাডামস, কিউ অ্যাডামস, টি রুজভেল্ট, এফ রুজভেল্ট, কেনেডি ও জর্জ ডব্লিউ বুশ।

আমেরিকার ৪৩ জন প্রেসিডেন্ট পর্তুগিজ, ইংরেজ, আইরিশ, স্কটিশ, ওয়েলস, সুইস অথবা জার্মান-এ ৭টি জাতের উত্তরসূরি।
সবচেয়ে বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ৬৯ বছর বয়সে এবং সর্বকনিষ্ঠ কেনেডি ৪৩ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।  
সবচেয়ে লম্বাকৃতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন লিংকন। তার উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি। আর সবচেয়ে খাটো ছিলেন ম্যাডিসন।
অনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের ২ বছর আমেরিকা শাসন। ১৯৭৩ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট স্পাইরো ক্রানিত পদত্যাগ করলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন জেরাল্ড ফোর্ডকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে নিক্সন পদত্যাগ করলে ফোর্ড প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন যারা আততায়ীর হাতে নিহত হন, তারা হলেন- লিংকন, গারফিল্ড, ম্যাককিনলে ও কেনেডি।
আততায়ীর হাত থেকে যারা বেঁচে যান, তারা হলেন-জ্যাকসন, টি রুজভেল্ট, এফ রুজভেল্ট, ট্রুম্যান, ফোর্ড ও রিগ্যান।  
প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন যে ৮ জন মারা যান, তারা হলেন- হ্যারিসন, টেলর, গারফিল্ড, ম্যাককিনলে, হার্ডিং, এফ রুজভেল্ট ও কেনেডি।
৪ঠা জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে মারা যান প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস, জেফারসন এবং মনরো।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ