Saturday, January 25, 2014

তাসের ঘরে বাঁশের খুঁটি অন্তরালে কিসের ঝুঁকি! by গোলাম মাওলা রনি

তাসের ঘর নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কম কীর্তি হয়নি। তাস ও বাঁশ নিয়ে নানারকম কৌতুকপূর্ণ কল্পকাহিনী লিখা হয়েছে। কোনটা হাস্যকর আবার কোনটা সর্বনেশে ট্র্যাজেডীর করুণ গল্প।
তাস সাধারণত জুয়া খেলায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাঁশ ব্যবহৃত হয় নানা কাজে- ঘরবাড়ী, ব্রিজ পুল-কালভার্ট এবং সর্বপরি মৃত ব্যক্তির কবর রচনা করার কাজে। এতো উপকারী বাঁশ নিয়ে কেনো যে বাঙালী উপহাস করে তা আজো আমার বোধ গম্য নয়।
আমার কৈশর বেলায় একটি সিনেমা দেখেছিলাম। নাম- তাসের ঘর। ফারুক-রোজিনা ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। দু’জনই আমার অসম্ভব প্রিয় মানুষ ছিলেন। বিশেষ করে রোজিনার জন্য ছিলাম পাগল। সিনেমাটির মধ্যে একটি গান ছিলো এরূপ- রুপসী গো রূপসী, কেন দিলে ফাঁসি! প্রেমেরও ফাঁসি সর্বনাশী- লাগিয়ে হলেম দোষী!

আজ এতো বছর পর তাসের ঘর আর বাঁশের খুটির কথা বারবার মনে পড়ছে সাম্প্রতিক কালের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর কারণে। আমরা গ্রাম বাংলার হাদারাম পোলাপান। ছোট কাল থেকে লাথি গুতো খেতে খেতে এ পর্যন্ত এসেছি। গ্রামে দেখেছি বাউন্ডেলে প্রকৃতির বাজে মানুষেরা তাস পাশা খেলত। এসব নিয়ে তাদের পরিবারে রাতদিন অশান্তি লেগে থাকত। যে পরিবারে একবার তাস ঢুকত সেই পরিবারের সর্বনাশ ঘটা ছিল সময়ের ব্যাপার। বাজে লোকেরা বউ ছেলে এমনকি বাপ মা পর্যন্ত ত্যাগ করতো তাস খেলার নেশায়। আর প্রতিবেশিরা তাস পাশার নায়ক নায়িকাদের অর্ন্তদ্বন্দ এবং কলহ দেখে দূর থেকে হাতে তালি দিত। কারন পরিবারটি শেষ হয়ে গেলে তাদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিগুলো পানির দামে বিক্রি হয়ে যেতো প্রতিবেশিদের নিকট। আর জুয়ারিদের পরিবারে যদি সুন্দরী কোন বউ বা মেয়ে থাকতো-তবে সেগুলোও গনীমতের মাল হিসেবে পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা ভোগ করার জন্য ইতি উতি করতো।
আমাদের এলাকায় ছিল অসংখ্য বাঁশবন। লোকজন বলত বাঁশঝাড়। দুই ধরনের বাঁশ আমরা চিনতাম- বয়রা বাঁশ আর তল্লা বাঁশ। বয়রা বাঁশ মোটা মোটা এবং শক্ত প্রকৃতির অন্যদিকে তল্লাবাঁশ ছিল চিকন এবং হালকা প্রকৃতির। গ্রাম বাংলায় প্রায়শই মারামারি হতো বাঁশ দিয়ে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে শিক্ষকগণ পিটাতেন ছাত্রদেরকে। অনেক প্রভাবশালী লোকদের আবার ৩/৪ টা বউ থাকত। গৃহস্বামী বউ পেটানোর জন্য বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করতেন। অনেকে আবার তাদের বাঁশের লাঠি বা কঞ্চিকে আকর্ষনীয় এবং অধিকতর ব্যবহার উপযোগি করার জন্য নিয়মিত তেল মাখতো। এসব কারণে হয়তো বাঁশের নানামূখি ভাল ব্যবহার সত্বেও আবহমান বাংলায় এটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
সাম্প্রতিক হয়ে যাওয়া নির্বাচন নির্বাচন খেলার পর একটি সরকার গঠিত হয়েছে বলে দেশবাসী লক্ষ্য করলো। সবাই বলছে- এটি একটি তাসের ঘর। টিকবে না। সরকারি দলের অনেক নামকরা নেতা বলছেন- টিকবে না মানে? অবশ্যই টিকবে। পুরো পাঁচ বছর টিকবে। পাবলিক বলছে- বাঁশ দেখেছেন! বাঁশ! পাবলিকের এই কথা আবার নেতাদের কানে ঢুকছেনা। কারন বাঁশে বাঁশে প্রতিঘাত হয়ে শব্দগুলো ফেরত চলে আসছে। কারন তারা যে তাসের ঘর তৈরী করেছে তাতে খুটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ। কিছু বাঁশ রয়েছে বয়রা প্রকৃতির। আবার কিছু তল্লা প্রকৃতির। আবার বেশ কিছু রয়েছে ঘুনে ধরা। ঘুনে ধরা বাঁশগুলি ইতিপূর্বে একাধিক তাসের ঘরে বহুবার খুঁটি হিসেবে ভাড়ায় খেটে এসেছে।
তাসের ঘরের বড় পরিচয় এটি সাধারণভাবে নির্মিত হয়না। চালাকি, ভাওতাবাজী আর প্রতারণার মাধ্যমে নির্মিত হয়। এই ঘরের বাসিন্দারা কখনো শান্তিতে থাকতে পারে না। সারাক্ষণ ইতি উতি করতে থাকে এবং তাদের নিজেদের দূর্বলতা ঢাকতে গিয়ে একের পর এক অন্যায় এবং ভুল করতে থাকে। সেগুলো চাপা দেওয়ার জন্য আবার নানা রকম অপরাধও করে বসে। ফলে একসময় প্রকৃতি থেকে শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় আর তাতেই লন্ড ভন্ড হয়ে যায় সবকিছু।
তাসের ঘরের বাসিন্দারা কখনোই নিজেদের বিশ্বাস করে না। আর যে ব্যক্তিগণ নিজেদেরকে বিশ্বাস করেনা তারা কখনো অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে ঘরের ভেতরে ও বাইরে চলতে থাকে নানা সন্দেহ আর অবিশ্বাসের দোলাচল। ফলে ঘর এবং ঘরের বাসিন্দারা কাপতে থাকে অস্থিরতায়। এই অস্থিরতায় একসময় তাদেরকে নিয়ে যায় চরম পরিনতির দিকে।
এবার তত্ত্ব কথা রেখে বাস্তবে ফিরে আসি। বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে তা কারো কখনোই কারো জন্য মঙ্গল জনক নয়। কে দায়ী বা কে দায়ী নয় -সে প্রশ্ন অবান্তর। প্রশ্ন হলো যা ঘটেছে তা কি কাম্য ছিলো? আমি বলবো না। অবশ্যই কাম্য ছিলোনা। যে সভ্যতা , গণতন্ত্রের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সফলতার দ্বারপ্রান্তে আমরা উপনিত হয়ে ছিলাম তা আমাদের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডে ভন্ডুল হতে চলেছে। এ পথে যতবেশী সময়ক্ষেপণ করবো ততোই দুর্গন্ধ ছড়াবে এবং নিজেদেরকে আমরা জাতি হিসেবে ব্যর্থ প্রমান করবো।
প্রতিটি মানুষের মনেই চাপা ক্ষোভ। একজন রিক্সাওয়ালা কিংবা সবজী বিক্রেতা সমাজ ও রাষ্ট্রের মানীলোকদেরকে নিয়ে যে ভাষায় কথা বলছে তা যদি চলতে থাকে সেক্ষেত্রে আগামী দিনে কোন ভদ্রলোক রাজনীতিতে আসবেননা। কিছু লোকের ব্যক্তিগত লাভ ক্ষতি বা জেদাজেদির দায় পুরো জাতি নিতে পারে না। অথচ জাতিকে সে দায় নিতে হচ্ছে। এর থেকে বাঁচার উপায় কি? মানুষ আপাতত কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেনা। তাই হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একটি অবোধ শিশু বলছে আমি আল্লাহকে সব বলে দিবো। এক রিক্সাওয়ালা বলছে হে আল্লাহ তুমি তাদেরকে জান্নাতের সবচেয়ে ভালো জায়গায় স্থান দাও এবং বিনিময়ে আমাদেরকে রক্ষা করো।
নতুন মন্ত্রীপরিষদ নিয়ে অনেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন নানাভাবে। এ ব্যাপারে আমার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কারন কোন মন্ত্রীই সুস্থভাবে এবং সুষ্ঠভাবে পরিকল্পনা করে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য স্থির করতে পারবেননা। কেবলমাত্র একটি ভয়ে-এই সরকার আসলে কতদিন টিকবে। ফলে নতুন সফলতা তো দূরের কথা বরং পুরোনো সফলতাকেও তারা ম্লান করে দিবেন নিজের সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অস্থিরতা দিয়ে।

নতুন মস্ত্রীসভার দূর্নীতি রোধ করা হবে প্রধামন্ত্রীর জন্য সব চেয়ে বড় সমস্যা। অতীতের মন্ত্রীদের অনেকেই ছিলেন গ্রাম বাংলা থেকে উঠে আসা ভোলে ভালা প্রকৃতির অভাবী মানুষ। কাজেই দূর্নীতির পথ ঘাট চিনতে তাদের সময় লেগেছে প্রায় বছর দুয়েক। অর্থাৎ বিগত সরকারের প্রথম দুই বছর কোন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেনি। অন্যদিকে তারা মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকে ভয় পেতেন আজরাইলের মতো। ফলে কোন অন্যায় করার পূর্বে তারা দশবার চিন্তা করতেন। প্রথম প্রথম যখন কয়েকজনের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ উঠলো তখন প্রধানমন্ত্রী কৌশলগত কারণে ঐসব মন্ত্রীদের পক্ষ না নিলে অতীতের মন্ত্রী সভা হতো সম্পূর্ন দূর্নীতিমুক্ত।

অন্যদিকে বর্তমান মন্ত্রী সভার প্রবীন নবীনেরা প্রায় সবাই দশ ঘাটের পানি খাওয়া দক্ষ প্রকৃতির লোক। নৈতিক, অনৈতিক সকল বিষয়েই তাদের রয়েছে অপার দক্ষতা। কয়েকজন ত আছেন দূর্নীতি অনিয়ম আর অনৈতিক জীবন যাপনের প্রিন্সিপ্যাল বা অধ্যক্ষ। কোন পত্রিকা অফিস বা গোয়েন্দা সংস্থায় তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যাবার পূর্বেই সবকিছু আপন দক্ষতায় ম্যানেজ করার অসাধারণ ক্ষমতা তারা অতীতে অনেকবার দেখিয়েছিল। ফলে এসব দক্ষ লোক যদি মনে করেন যে, সরকারের স্থায়িত্ব ক্ষনস্থায়ী বা আনসার্টেন তবে তারা ২/৩ দিনের মধ্যে যেসব কর্ম করে ফেলবেন তা আগের সরকারের মন্ত্রীরা ২/৩ বছরেও করতে পারেননি। আর এ কারনেই তাদেরকে আমার মনে হয়েছে তাসের ঘরে বাঁশের খুঁটি।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বিরোধী দল ব্যর্থ এবং সরকারকে বিপদে ফেলার মতো কোন শক্তিই তাদের নেই। আমি কিন্তু এই ধারনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। আমার ভয় অন্য যায়গায়। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের ৪টি ঘটনা আমাকে বার বার ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে। সম্মানিত পাঠক গণকে কাহিনীগুলো স্মরন করিয়ে দিয়ে আজকের লেখা শেষ করবো।

১। ১৪ ই আগষ্ট রাত বারোটা পর্যন্ত খোন্দকার মোস্তাক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্য রান্না করে এনেছিলেন হাঁসের মাংস যা কিনা বঙ্গবন্ধু খুবই পছন্দ করতেন। এই ঘটনার ৪ ঘন্টা পর ঘটেছিলো ইতিহাসের সেই নিমর্ম দূর্ঘটনা। অথচ ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশ ছিলো সরকারের নিয়ন্ত্রনে। কোন বিরোধী দল ছিলোনা। রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগে সরকারের কর্তৃত্ব ছিলো সীমাহীন।
২। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাকালীন সময়ে তার জন্য বিষফোঁড়া ছিলো একের এক সেনা বিদ্রোহ। কম করে হলেও ৩০টি সেনা বিদ্রোহ দমন করে তিনি আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললেন- এবার বোধ হয় স্বস্তি পাওয়া যাবে। ১৯৮১ সালের ২৯ শে মে তারিখে চট্টগ্রাম গেলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য। রাতে চট্টগ্রামের জিওসি এবং জিয়ার কোর্সমেট জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে গল্প গুজব এবং খানা দানা সেরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ফিরলেন পরিতৃপ্ত আত্মা নিয়ে সম্ভবত রাত্রি একটার দিকে। এর ঠিক ৪ ঘন্টা পর ঘটলো সেই দুর্ঘটনা।
৩। পরবর্তী ঘটনা ৬ ই ডিসেম্বর ১৯৯০ সালের। এরশাদ ক্যান্টনমেন্ট থেকে খোশ মেজাজে বঙ্গ ভবনে ফিরলেন। বিকেলে চলছিলো জাতীয় পার্টির জনসভা। শাহ মোয়াজ্জেম হুমকী ছাড়ছিলেন আগামী এক যুগেও সরকারের পতন হবেনা। অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফেরার পর ৪ ঘন্টা সময়ও পেলেন না এরশাদ। পদত্যাগ করতে হলো। প্রথমে মওদুদ হলেন রাষ্ট্রপতি তারপর বিচারপতি শাহাবুদ্দিন। শাহ মোয়াজ্জেমরা পালাবার সময়টুকুও পেলেন না।
৪। ১/১১ এর জরুরী অবস্থা জারীর কোন খবরই জানতো না হাওয়া ভবনের কর্তা ব্যক্তিরা। তারা তখন পুরোদমে ইয়াজ উদ্দিন এবং তার সচিব মোখলেছের উপর নির্ভর করে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে এবং পুনরায় ক্ষমতায় আসার স্বপ্নে বিভোর হচ্ছে। হঠাৎ করেই দেখলেন রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন দেশে জরুরী অবস্থা জারী করছে। তারা ভেবে পেলেন না পালাবেন কি পালাবেন না। এসব ভাবতে ভাবতে তারা যখন পালানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন ঠিক তখনি আইন শৃংখলা বাহিনী উপস্থিত হলো তাদেরকে গ্রেফতার করার জন্য।
একটি ধর্মের কথা বলে লেখা শেষ করছি। আল্লাহ পাক ওহীর মাধ্যমে হযরত ইয়াকুব (আঃ)কে জিজ্ঞাসা করলেন বলতে পার, আমি তোমার কলিজার টুকরা ইউসুফকে কেন তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছি? তিনি আরজ করলেন- জানিনা। এরশাদ হলো কারন, তুমি তার ভাইদেরকে বলেছিলে আমার ভয় হয় বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে অথচ তোমরা থাকবে অসর্তক। তুমি বাঘের ভয় করেছ। আমার আশা করনি। তুমি ভাইদের গাফলতির কথা চিন্তা করেছ, আমার হেফাজতের প্রতি লক্ষ করনি।
আল্লাহ পাক আবার প্রশ্ন করলেন তুমি জান, আমি ইউসুফকে কেন ফেরত দিয়েছি। তিনি আরজ করলেন না, জানিনা। এরশাদ হলো তুমি বলেছিলে ক) হয়ত আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। খ) তুমি আরো বলেছিলে- যাও ইউসুফ ও তার ভাইকে খোঁজ কর। তোমরা আল্লাহর কৃপা থেকে নিরাশ হয়ো না।
-গোলাম মাওলা রনির ফেচবুক স্ট্যাটাস থেকে -

তাসের ঘরে বাঁশের খুঁটি অন্তরালে কিসের ঝুঁকি! by গোলাম মাওলা রনি

তাসের ঘর নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কম কীর্তি হয়নি। তাস ও বাঁশ নিয়ে নানারকম কৌতুকপূর্ণ কল্পকাহিনী লিখা হয়েছে। কোনটা হাস্যকর আবার কোনটা সর্বনেশে ট্র্যাজেডীর করুণ গল্প।

আর নয় বিষবাষ্প by সাযযাদ কাদির

মানুষের মূল্যবোধ ও বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এর পরিবর্তন এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ১৯৮১ সাল থেকে নানা ধরনের গবেষণা, সমীক্ষা ও জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড ভ্যালু সারভে
(ডবলিউভিএস) নামের একটি সংগঠন। জারমানি, সুইডেন, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এ সংগঠনটি প্রায় ১০০টি দেশে (অর্থাৎ বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ অধ্যুষিত অঞ্চলে) নিবিড়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে সমাজবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক মুক্তি মানুষকে কম বা বেশি সাম্প্রদায়িক করে তোলে কিনা- এ নিয়ে গবেষণায় নেমে সম্প্রতি দু’জন সুইডিশ অর্থনীতিবিদ বুঝতে পারেন, আগে তাঁদের প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতার মাত্রা নির্ণয়ের একটা উপায় খুঁজে পাওয়া। তখন তাঁরা সহায়তা চান ডবলিউভিএস-এর কাছে। কারণ এ সংগঠনটিই গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছে বৈশ্বিক প্রবণতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত নিয়ে। আর তাদের গবেষণার ফল গুরুত্বের সঙ্গে গৃহীত ও ব্যবহৃত হয় যাবতীয় আন্তর্জাতিক সংস্থায়, বহু দেশে ও সংগঠনে। ওই সূত্রেই ডবলিউভিএস বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে জরিপ চালিয়েছে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে। এতে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণু দেশ (মাত্রা অনুসারে ক্রমনিম্ন)- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, আরজেনটিনা, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, বৃটেন, সুইডেন, নরওয়ে, লাটভিয়া, অসট্রেলিয়া, নিউ জিল্যান্ড (০-৪.৯%); চিলি, পেরু, স্পেন, মেকসিকো, জারমানি, বেলজিয়াম, বেলারুশ, ক্রোয়েশিয়া, জাপান, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা (৫-৯.৯%); ফিনল্যান্ড, পোলান্ড, ইউক্রেন, ইতালি, গ্রিস, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া (১০-১৪.৯%); ভেনেজুয়েলা, হাঙ্গারি, সারবিয়া, রোমানিয়া, মেসেডোনিয়া, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, জিমবাবুয়ে, রাশিয়া, চীন (১৫-১৯.৯%)। আর সবচেয়ে বেশি অসহিষ্ণু দেশ (মাত্রা অনুসারে ক্রমোচ্চ) - ফ্রান্স, তুরস্ক, বালগেরিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মালি, জামবিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, বাংলাদেশ, হংকং (২০-৩৯.৯%); মিশর, সউদি আরব, ইরান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া (৩০-৩৯.৯%); ভারত, জর্দান (৪০%+)।

এ জরিপের ফল কয়েকটি ক্ষেত্রে বিস্মিত করতে পারে অনেককে, কিন্তু সেদিকে না গিয়ে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোই ভাল। এই তাকাতে গিয়েই ঘা লাগতে পারে আমাদের স্থায়ী কতকগুলো বিশ্বাসে, ধারণায়। সে বিশ্বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে- আমাদের এখানে সাম্প্রদায়িকতার মাত্রা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম; সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে স্বার্থবুদ্ধির অপরাজনীতি; এ দেশ শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব, প্রেম ও সাম্য ধর্মে উজ্জীবিত- তাই এখানে সবাই ধর্মপ্রাণ, নগণ্যসংখ্যক ধর্মান্ধ; বাঙালিত্বের মহিমা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের নির্দেশক শক্তি। তবে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে পালটে গেছে পরিস্থিতি। সব কিছু আর আগের মতো নেই। তাই আমাদের বিশ্বাস ও অঙ্গীকারগুলোর পাশাপাশি নগ্ন নিষ্ঠুর সত্যগুলোকেও মেনে নেয়ার সময় এসেছে। এসব বাস্তবতাকে অস্বীকার করার যো নেই আর। কয়েকটি মাত্র উদাহরণ দেই এখানে। নির্বাচনের আগে-পরে বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দুরা শিকার হন হামলার, মারমুখো আচরণ দেখি আহমদিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি, হেনস্থা হতে দেখি বাউলদের, মাঝেমধ্যে হঠাৎ সহিংসতার লক্ষ্য হয়ে পড়ে বৌদ্ধ, খৃস্টান, উপজাতি-অদিবাসী মানুষ। বিহারি ও রোহিঙ্গাদের প্রতি অনেকের বিদ্বেষ খুব স্পষ্ট। আঞ্চলিকতার বিষবাষ্প-ও ছড়ায় হঠাৎ কখনও। সাম্প্রতিককালে রাজনীতির উথলে পড়া বমনে সৃষ্ট নাস্তিক-আস্তিক দ্বন্দ্ব ঘনিয়ে তুলছে ধর্মভিত্তিক সন্ত্রস্ততা। ইসলাম-বিদ্বেষের ধুয়া ছড়িয়ে পড়ছে ক্রোধের আগুনে। তারপর রাজনীতির বিকার যে জাতীয় বিভাজন সৃষ্টি করেছে তা তীব্র হয়ে উঠছে ক্রমে। ফলে একটির পর একটি পরিকল্পিত অথবা অসতর্ক ঘটনা-দুর্ঘটনার সূত্রে বেড়েই চলেছে অসহিষ্ণুতার মাত্রা। তাই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেয়ে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতা এখন আমাদের সামনে বড় বিপদ হয়ে ঝুলছে ডেমোক্লিস-এর তরবারির মতো। এ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রেখে বা একে উপেক্ষা করে ক্ষমতা, সম্পদ, আপাত সুখ উপভোগের মতো বিপজ্জনক প্রবণতা আর কিছু হতে পারে না। আমাদের বুঝতে হবে সমাজ-জীবনে এখন যে অস্থিরতা তার মূলে রয়েছে ওই ঝুলন্ত তরবারির হুমকি। আমাদের রাজনীতিতে, সমাজে, জীবনে যাবতীয় অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি অমন এক উদ্যত হুমকি থেকেই।

আর নয় বিষবাষ্প by সাযযাদ কাদির

মানুষের মূল্যবোধ ও বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এর পরিবর্তন এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ১৯৮১ সাল থেকে নানা ধরনের গবেষণা, সমীক্ষা ও জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে ওয়ার্ল্ড ভ্যালু সারভে

রাজনীতির খেলা আর কত by মীর আবদুল আলীম

রাজনীতির খেলা, কথার খেলা আর কত দিন? এ খেলায় কে হেরেছে কে জয়ী হয়েছে তা বলে দেবে ভবিষ্যৎ। তবে এ মুহূর্তে মানুষ দেখেছে শত সংঘাতের মাঝেও বিএনপিকে ছাড়াই দশম সংসদের ভোট হয়ে গেছে।
নতুন সরকার গঠন হয়েছে। আগামী ২৯শে জানুয়ারি নতুন সংসদও বসবে। বিভিন্ন দেশ সরকারকে অভিনন্দনের পাশাপাশি সংলাপের তাগিদ দিচ্ছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিচ্ছে। তার মানে কারও কাছেই এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে সরকারের মন্ত্রীরা অবলীলায় বলে যাচ্ছেন নির্বাচন হয়েছে ৫ বছরের জন্য। সুতরাং ৫ বছরই সরকার ক্ষমতায় থাকবে। গতকাল স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, এ সময়ের মধ্যে সংলাপেরও কোন সুযোগ নেই। অন্যদিকে বিএনপিসহ সমমনারা সরকারকে ছাড় দেবে না- ইতিমধ্যে তা বলেও দেয়া হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি চেয়ারপারসন সরকারকে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত সংলাপের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশ ছিল অন্ধকারে। সহিংসতা আর অবরোধে অচল ছিল অর্থনীতির চাকা। বর্তমানে বিএনপি সরকারকে আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে। হয়তো তারা ক’মাস দেখবে। এর মধ্যে যদি সরকার সংলাপের উদ্যোগ না নেয় তাহলে দেশ ফের হরতাল-অবরোধের কবলে পড়বে এটা নিশ্চিত। রাজনীতির ইতিহাস তো তাই বলে। কয়েক মাস ধরে দেশে যে অশান্তি চলেছে তাতে দেশবাসী অতিষ্ঠ। তবে এ সময়ে খুনখারাবি হচ্ছে না তা নয়। গুম হচ্ছে। হচ্ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। পরিস্থিতি আসলে কতটুকু ভাল, দেশবাসী বুঝতে পারছেন না। তবে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক সংঘাত কম হচ্ছে। ১৫ই জানুয়ারির বেগম জিয়ার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে দেশবাসীর মনে শঙ্কা ছিল। আবার কোন আন্দোলনে যাচ্ছেন তিনি? কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে বেগম জিয়ার নমনীয়তা দেশবাসীকে কিছুটা হলেও শান্তি দিয়েছে। স্বস্তি দিয়েছে। অবরোধ-হরতালে না গিয়ে তিনি অন্য কর্মসূচি দিয়েছেন। একতরফা পাতানো নির্বাচনে সরকারকে পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচির কথা বলেছেন। এখন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে খোলা মন নিয়ে। সরকারকে সংলাপের, সমঝোতার উদ্যোগ নিতে হবে। মন্ত্রীদের অতিকথন বন্ধ করতে হবে। তাহলে দেশ রক্ষা পাবে। কিন্তু সরকারের লক্ষণ তো ভাল দেখা যাচ্ছে না। দেশে আগের মতো সংঘাত-সংঘর্ষ না হলেও এখন চলছে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কসরত। নানা কৌশল আর কূট-কৌশলের খেলা। রাজনৈতিক খেলায়ই চলছে দেশ। এ খেলার একটাই কারণ- ক্ষমতা। গদি দখলের লড়াইয়ে কেউ হারে কেউ জেতে। ক্ষমতার বাইরে থাকা দল ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশল খোঁজে। আর সরকার কৌশল খোঁজে ক্ষমতায় থাকার। ক্ষমতার বাইরে থাকারা লাগাতার হরতাল অবরোধ দিয়ে দেশের অর্থনীতি, দেশের সম্পদ ধ্বংস এমনকি মানুষ হত্যার মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। কখনও বিএনপি ও সমমনারা, কখনও আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গীয় দল দেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালায়। কয়েক মাস ধরে পেট্রল বোমা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর আর জ্বালাও পোড়াওয়ের যে নজির সৃষ্টি হয়েছে তাতে দেশবাসী চরমভাবে উদ্বিগ্ন। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতায় থাকা দল আর বিরোধী দলের এ খেলায় বলির পাঁঠা কেন হতে যাবে আমজনতা? রাজনৈতিক খেলা আর যুদ্ধে আমজনতাকে কেন মাঝখানে টেনে আনা হচ্ছে? কেন তাদের জানমালের ক্ষতি করা হচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের জানমাল নষ্ট করার কি অধিকার আছে রাজনীতিকদের? অনেক হয়েছে। আর নয়। এবার ক্ষান্ত হোন। দেশের মানুষের কথা ভাবুন। আর এ ভাবনা থেকে সংলাপে বসুন। সমঝোতায় পৌঁছুন। দেখবেন খুব দ্রুত দেশ এগিয়ে যাচ্ছে করে। মনে রাখতে হবে ভোট জালিয়াতির পথ সঠিক নয়। জনবিরোধী কর্মসূচিও বাদ দিতে হবে। জানমাল নষ্ট আর মানুষ পুড়িয়ে মারার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। জনমুখী হতে হবে সবাইকে। দেশের মানুষ শান্তিতে বিশ্বাসী। এ শান্তিটা অন্তত দিন তাদের।

রাজনীতির খেলা আর কত by মীর আবদুল আলীম

রাজনীতির খেলা, কথার খেলা আর কত দিন? এ খেলায় কে হেরেছে কে জয়ী হয়েছে তা বলে দেবে ভবিষ্যৎ। তবে এ মুহূর্তে মানুষ দেখেছে শত সংঘাতের মাঝেও বিএনপিকে ছাড়াই দশম সংসদের ভোট হয়ে গেছে।

অস্থির রাজনীতি, স্থবির অর্থনীতি by আলী ইদ্‌রিস

সাম্প্রতিককালের হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পোৎপাদনের যেমন অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তেমনি বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ম্লান হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাবলী দেশকে হানাহানি, মারামারির দেশ হিসেবে তুলে ধরেছে। তদুপরি একতরফা নির্বাচন দেশের গণতন্ত্র চর্চাকে কলঙ্কিত করেছে বিশ্বের দরবারে বিজিএমই-এর এক প্রতিবেদন মতে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্প তৈরী পোশাক খাতে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ৯,২৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে, রপ্তানি আদেশ কমেছে ৩০-৩৫%, অনেক কারখানার হাতে রপ্তানি আদেশ না থাকায় শ্রমিক ছাঁটাই চলছে অথবা বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, কোন কোন কারখানা শ্রমিকদের বসিয়ে না রেখে আগামী জুন-জুলাই মাসের কাজ এখনই শেষ করে ফেলছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তিন মাসের একটি শূন্যতা সৃষ্টি হবে যদি রপ্তানি আদেশ ৭০% কমে যায়। এফবিসিসিআই-এর প্রতিবেদন মতে চামড়া শিল্পে ৭০০ কোটি টাকা, পোল্ট্রিতে ৩৮২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। হিমায়িত খাদ্যে ৩৩% রপ্তানি কমেছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রতি হরতালে ৭৫০ কোটি টাকা, পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ কোটি হিসাবে ২০,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে, আবাসন খাতে ৫০% ছাড় দিয়েও ক্রেতা মিলছে না, প্রায় ২০,০০০ ফ্ল্যাট অবিক্রীত পড়ে আছে। এ খাতের ব্যাংক লোন ১৮,০০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে। সব কিছু বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন হরতাল-অবরোধে ১৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। আমার মতে, লাগাতার হরতাল-অবরোধে প্রতিদিন প্রায় ২০০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। একটানা হরতাল না হলে একদিনের ক্ষতি পরের ৩ দিনে পুষিয়ে নেয়া যায়, কিন্তু লাগাতার হলে সেটা সম্ভব নয়। কারণ সময়সীমা, পচনশীলতা, উৎপাদন ক্ষমতা, পরিবহন ইত্যাদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সব কিছু বিবেচনা করে এফবিসিসিআই বলেছে ২০১৩ সালে ক্ষতি হয়েছে ১০০,০০০ কোটি টাকা। অঙ্কটির কলেবর দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়। এই বিরাট ক্ষতি দায়ী রাজনৈতিক দলগুলো বা ক্ষমতাসীন সরকার পুষিয়ে দিতে পারবে কি? না। তাহলে দেশের ও জনগণের ক্ষতি করার অধিকার তাদেরকে কে দিলো? জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছে দেশের ও জনগণের মঙ্গল সাধনের জন্য, ক্ষতি করার জন্য নয়। বিনিয়োগের পরিস্থিতিও হতাশাব্যঞ্জক। বিদেশী বিনিয়োগ তো নেই-ই, ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১,০০,০০০ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে, বিনিয়োগের উদ্যোক্তা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে কু-ঋণ, খেলাপি ঋণ ও অর্থ কেলেঙ্কারির প্রভাবে ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে পারছে না, সুদের হার কমালে ব্যাংকগুলোকে লোকসান গুনতে হবে। এর মধ্যে নতুন আরও ৮টি ব্যাংক বাজারে এসে অসম প্রতিযোগিতার আবহ সৃষ্টি করেছে। সুতরাং অর্র্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং পুঁজি ও ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংকিং সেক্টর ঝুঁকির মধ্যে আছে। অত্যন্ত দুর্ভাগ্য ও হতাশার বিষয় যে, দেশটি অর্থনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিচ্ছিল, প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, দারিদ্র্য বিমোচন, জন্ম হার, মিলেনিয়াম লক্ষ্য অর্জন ইত্যাদিতে দ্রুতবেগে অগ্রসর হচ্ছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতায় সব কিছু এখন স্থবির হয়ে আছে। এই স্থবিরতা কাটিয়ে উন্নতির পথে গতি পেতে অনেক দিন লেগে যেতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের পরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি অগ্রসরমান ছিল, বিরাট আয়তন ও বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতের প্রবৃদ্ধিও বাংলাদেশের চেয়ে কম ছিল। এবার প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৬-এ নেমে যেতে পারে। ক্ষমতাসীন সরকারি ও প্রধান বিরোধী দল উভয়ের এখন বিবেক জাগ্রত করা উচিত, যা ক্ষতি হওয়ার হয়েছে, অর্থনীতির ক্ষতি আর নয়। এখন উভয় দলকে সহনশীল হয়ে, ত্যাগ স্বীকার করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

অস্থির রাজনীতি, স্থবির অর্থনীতি by আলী ইদ্‌রিস

সাম্প্রতিককালের হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতায় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পোৎপাদনের যেমন অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তেমনি বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ম্লান হয়েছে।

‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে স্থিতিশীলতা আসবে না’ by কাজী সুমন

সদ্য কারামুক্ত বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, অতিমাত্রায় ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের’ মাধ্যমে দেশের জনগণকে বিভক্ত করেছে ফেলেছে সরকার। এই বিভক্তি থেকে সহসা উত্তরণ সম্ভব নয়।
তবে এই বিভক্তি দূর করতে হলে প্রয়োজন একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। মানবজমিনকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের এ উপদেষ্টা। গত বছরের ৮ই নভেম্বর রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে এলে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে কাটে ৭৬ দিন। কারাগারে থাকাকালীন তার লেখা ‘বাংলাদেশ রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটির বেশির ভাগ অংশ লিখেছেন ওয়ান-ইলেভেন জমানায় প্রথমবার কারাগারে গিয়ে। এবার দ্বিতীয়বার কারাগারে গিয়ে বইটি প্রকাশ করেন। গত ২৩শে জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। সাবেক এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। এই অস্থিতিশীলতা কাটাতে না পারলে কোনভাবেই অর্থনীতির চাকা সামনের দিকে যাবে না। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ। এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে জড়িত। তাই যতদ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে তত দেশের জন্য মঙ্গল। দেশের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, এই মুহূর্তে আমরা দেশী বিনিয়োগ নিয়েই চিন্তিত। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি যেখানে ১৭ শতাংশের কথা বলা হয়েছিল সেখানে ৫-৬ শতাংশের বেশি হবে না। তিনি বলেন, দেশী বিনিয়োগই হচ্ছে না। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি না বাড়ে তাহলে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে। সরকারের আয় কমলে স্বাভাবিকভাবে বিনিয়োগও কমে যাবে। আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, প্রতি বাজেটেই বলা হয়, এডিবিতে ৩০ শতাংশ থাকে। পরে এটা রিভাইজ করার পর দেখা যায়, ২৩-২৪ শতাংশের বেশি হয় না। যেখানে সরকারি বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে না সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ গত ২০ বছরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বাড়ছিল। এই প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ ১ শতাংশ কমে গেছে। ২০ পয়েন্ট থেকে কমে ১৮.৯৯তে চলে গেছে। যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে সেখানে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আর বিদেশী বিনিয়োগের তো প্রশ্নই আসে না। কারণ বিদেশী বিনিয়োগ সবসময় নির্ভর করে সরকারি বিনিয়োগ ও বেসরকারি বিনিয়োগের অবকাঠামোর ওপর। প্রথিতযশা এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করতে না পারলে কোন অবস্থানেই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না। কারণ সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু, মানবতাবিরোধীর পক্ষে-বিপক্ষে, মৌলবাদীর পক্ষে-বিপক্ষে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি- এভাবে জনগণ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভ বিভক্ত। বিএনপি নেত্রী বলেছিলেন, দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। আমি খালেদা জিয়ার এ কথায় বিশ্বাস করি। সংখ্যালঘু শব্দটাকে আমরা অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ করে ফেলেছি। সংখ্যালঘু শুধু আওয়ামী যেমন আছেন বিএনপিতেও আছেন। এসব ইস্যুতে দেশটা বিভক্ত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, কোন রাষ্ট্র উন্নতি করতে পারে না যদি সেদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকে। এখন আমাদের দেশের মূল সমস্যা হলো- জনগণের মধ্যে অতিমাত্রায় বিভক্তি ও হিংসা-বিদ্বেষ এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। এগুলো দেশটাকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে সেখান থেকে সহসা উত্তরণ সহজ হবে না। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারি দলের নেতাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, দেশটা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি। এগুলো তো রাজনৈতিক বক্তব্য হওয়ার কথা নয়। প্রধানমন্ত্রী যশোরের জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন দেশের একজন প্রধামন্ত্রী হিসেবে তার মুখে এসব কথা মানায় না। আমাদের স্বাধীনতায় জিয়াউর রহমানের যেমন অবদান রয়েছে তেমনি শেখ মুজিবুর রহমানেরও রয়েছে। তাদের অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু এসব ইস্যুতে আমরা বিভক্ত হয়ে গেছি। রাষ্ট্রীয় পার্লামন্টে, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন সব প্রতিষ্ঠানই বিভক্ত হয়ে গেছে। এই বিভক্ত সমাজকে একত্র করার জন্য দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দরকার। এই বিভক্তই বাংলাদেশের মূল আশঙ্কার কারণ। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে অর্থনৈতিক চাকাকে এগিয়ে নেয়া দুষ্কর হবে।
কারাগার জীবনের স্মৃতিচারণ করে আবদুল আওয়াল মিন্টু বলেন, প্রথমবার কারাগারে গিয়েছিলাম ওয়ান-ইলেভেন জমানায়। এবার গেলাম দ্বিতীয়বার। কারাগারে ভালই সময় কেটেছে। আমার বাসা থেকে অসংখ্য বই পাঠানো হয়েছিল। বই পড়ে সময় কাটিয়েছি। তবে বেশির ভাগ সময় কেটেছে লেখাপড়া করে। কারাগারে থাকা অবস্থায় আমার একটা বই বেরিয়েছে। বিএনপির আন্দোলনের কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপি আন্দোলন থেকে সরে গেছে বা আন্দোলন হবে না- এটা একেবারেই অবান্তর কথা। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন রণকৌশল পরিবর্তন করা হয় তেমনি আমাদেরও আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করা হয়েছে। দিন দিন বেশি লোক আন্দোলনের পক্ষে কথা বলছে। ভোটাধিকারের অর্জনের দাবিতে অহিংস আন্দোলন কখনও স্তিমিত হবে না। এটা দিন দিন বাড়বে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এত হাইলেবেলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আমরা দেখেছি। হাজার হাজার মিথ্যা মামলা হয়েছে। বিরোধী দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে কারাগারে নেয়া হয়েছে। অসংখ্য নেতাকর্মীকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।

‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে স্থিতিশীলতা আসবে না’ by কাজী সুমন

সদ্য কারামুক্ত বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, অতিমাত্রায় ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের’ মাধ্যমে দেশের জনগণকে বিভক্ত করেছে ফেলেছে সরকার। এই বিভক্তি থেকে সহসা উত্তরণ সম্ভব নয়।

ক্ষতিগ্রস্ত আওয়ামী লীগ এবং পরাজিত শেখ হাসিনা by আমীর খসরু

একের পর এক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ওয়াদার বরখেলাপ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নানাবিধ দুর্নীতি - কেলেঙ্কারি, লুটপাটসহ সামগ্রিক দুঃশাসনের কারণে শেখ হাসিনার সরকার ক্রমাগত জনসমর্থন হারাচ্ছিল এ কথা ঠিক, জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল তাও বলা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে অবস্থা যে এতই করুণ তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সরকার, দল কখনই স্বীকার করেনি। জনপ্রিয়তা যে একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে তা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি না হলে বুঝতে পারা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না। বোঝা সম্ভব হতো না জনপ্রিয়তার এমন দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি। দলের কিংবা মহাজোটে যারা রয়েছে তারাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হবে জনপ্রিয়তাহীন ‘নড়বড়ে’ ঘরে তাদের বসবাস। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে নানা বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে, কাজেই সে সব বিস্তারিত হিসাব-পত্রে না গিয়ে বলা যায়, ক্ষমতাসীন দল এবং এর জোট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে এমন একটি নির্বাচনে ভোট দিতে যাবে না তা বিশ্বাস করাও কঠিন হচ্ছিল। শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রণাদাতাদের ধারণা ছিল, অন্তত অতীত দুটো নির্বাচন অর্থাৎ ২০০৮ এবং ২০০১-এর গড় ভোট প্রাপ্তি ধরলেও আওয়ামী লীগের নিজস্ব ভোট রয়েছে ৩০ থেকে ৩২ শতাংশের কম-বেশি। এছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধসহ নানাবিধ চেতনার সমর্থকদের কারণে ওই ভোটের সঙ্গে উদার ধারার ভোটারদের ভোট সংখ্যা যোগ দিলে তা আরো বেড়ে যাবে বলেই ধারণা করেছিলেন স্বয়ং শেখ হাসিনা। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণদের মনে যুদ্ধাপরাধের বিচার তাদের চিন্তায়-চেতনায় বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। এই তরুণদের ভোটের হিসেবও আওয়ামী লীগ ধরে নিয়েছিল ওই হিসাবের মধ্যে। আওয়ামী লীগ ধারণা করেছিল “২০২১-এর রূপকল্প” তরুণদের আন্দোলিত এবং মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণরা যুদ্ধাপরাধের বিচারে নিঃসন্দেহে আনন্দিত ও আন্দোলিত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের সন্দেহ খোদ আওয়ামী লীগকে নিয়ে। কারণ কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের সময় সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতের সঙ্গে যে আঁতাত প্রচেষ্টা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকার আসলেই আন্তরিক নয় - তা তারা আগেই বুঝে ফেলেছে। এ কারণেই চাপ হিসেবে গণজাগরণ মঞ্চসহ নানা প্রচেষ্টা জন্ম নিয়েছিল ওই আঁতাত ঠেকানোর জন্য। ওই যে ধাক্কা তা তরুণদের মনে দগ-দগে ঘা হিসেবে এখনো রয়ে গেছে। এ কারণে তরুণদের সমর্থন আওয়ামী লীগ তো পায়ইনি বরং প্রতিশ্রুতি, ওয়াদা ভঙ্গ, দুর্নীতি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিসহ সামগ্রিক দুঃশাসনের কারণে তারা আওয়ামী লীগের ওপরে ভীষণভাবে বিতশ্রদ্ধ। প্রথমবারের মতো ভোটাররা এবার নিজ চোখে দেখে বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগের শাসন কি এবং কেমন হয়। এছাড়া বেকারত্ব হ্রাসের যে মোহনীয় স্লোগান দেয়া হয়েছিল তা যে শ্রেফ কথার কথা তাও তারা বুঝতে পেরেছে। কাজেই তরুণদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠার বদলে বরং বৈরী সম্পর্কই তৈরি হয়েছে এবং এখনো তা বিদ্যমান রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি বাড়বে বৈ কমবে না।
ব্যবসায়ীদের একাংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্যতার সম্পর্ক অনেক দিনের। বিশেষ করে যারা ধনাঢ্য কৃষক, মধ্যবিত্ত, পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী থেকে আগত তাদের সঙ্গে এ সম্পর্কটির সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতার ঠিক পরপরই। কিন্তু বর্তমানে দেশের বিদ্যমান ব্যবসায়িক ও আর্থিক পরিস্থিতি এবং একশ্রেণীর আওয়ামী সমর্থকদের ব্যবসা-বাণিজ্য দখলে তারা হয়ে পড়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। অসহায় হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগ পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের অক্ষমতায় এবং ব্যর্থতায়। প্রশাসনসহ সর্বত্রই দলীয়করণে আপন-আপন পেশাজীবীদের সামান্য কোনো মোহ যদি আওয়ামী লীগের ওপরে থেকেই থাকে তা ভঙ্গ হয়েছে ব্যাপক মাত্রায়, অনেক আগেই। গ্রামীণ জনপদে আওয়ামী লীগ এখন একটি আতঙ্কের নাম। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অত্যাচার-নির্যাতন, সার-কীটনাশক সম্পর্কে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার মূল্যে না পেয়ে তারা এমন মাত্রায় আতঙ্কিত যে অতীতে আর এমনটি তাদের ক্ষেত্রে ঘটেনি।
শেখ হাসিনার শাসন দেশের জন্য যতোটা ক্ষতির কারণ হয়েছে, তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে দীর্ঘদিনের দল আওয়ামী লীগের। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দলের হ্রাস আছে, স্ফীতি নেই। দলে যারা নতুন এসেছেন, তাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়, তারা আদর্শিক কারণে নয়, বরং ক্ষমতার মোহ এবং প্রাপ্তির প্রত্যাশাই এসে জুটেছে। তারা এসে উঠে গেছে অনেক উপরে, দলের পোঢ় খাওয়া দীর্ঘকালের নেতা-কর্মীদের কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে, অন্য জোরে। আওয়ামী লীগ এখন আর পোঢ় খাওয়া নেতা-কর্মী নির্ভর না হয়ে বরং হয়ে উঠেছে সুযোগ সন্ধানী সাইবেরিয়ান পাখীদের মতো নেতা এবং আমলা নির্ভর। আওয়ামী লীগের মতো কোনো রাজনৈতিক দলের এমন আমলা নির্ভর হয়ে পড়াটা যে কতোটা বিপজ্জনক তা আওয়ামী লীগ এখনও বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না। বরং এদের আওয়ামী লীগে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে দলের সদস্য থাকার পরেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার ব্যবস্থাটিও নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে তুলে দেয়া হয়েছে। এটা আওয়ামী লীগ তো অবশ্যই, পুরো রাজনীতির জন্যই এক দুঃসংবাদ। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ী-শিল্পপতির সংখ্যা ছিল শতকরা ৪ শতাংশের নিচে। এখন তা ৭০ শতাংশেরও বেশি হবে।
দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি এবং ভাগ-বাটোয়ারা, সম্পদের স্ফীতির কারণে আওয়ামী লীগের নব্য এবং পুরনো বিভাজনের পাশাপাশি আরেকটি বিভাজন তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ যারা পেয়েছেন এবং যারা পাননি। বিগত ৫ বছরে যাদের সম্পদের স্ফীতি ঘটেছে তারা একদিকে এবং যারা কিছুই পাননি বা চাননি তারা অন্য পক্ষে। এভাবে পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন সৃষ্টি হওয়ায় আসল ক্ষতি হয়েছে খোদ আওয়ামী লীগ নামক দলটির। কারণ এখন আওয়ামী লীগ যদি কোনো সঙ্কটে পরে তখন যারা নব্য কিংবা ক্ষমতাবান অথবা যাদের সম্পদের স্ফীতি ঘটেছে বহুগুণে তারা কেন রাস্তায় নামবেন বা সঙ্কট মোকাবেলায় সক্রিয় থাকবেন? কারণ তাদের প্রাপ্ত সম্পদ রক্ষা দল রক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আর যারা বঞ্চিত তারাই বা কেন নামবেন রাস্তায় বা সঙ্কট মোকাবেলায়?
আওয়ামী লীগেও পরিবার এবং উত্তরাধিকারের রাজনীতি নিয়ে ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রগুলোর উত্থান হয়েছে। এসব কেন্দ্রকে ঘিরে নতুন নতুন উপকেন্দ্রেরও জন্ম হচ্ছে। এ সম্পর্কে ভবিষ্যতে বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
এ সব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ক্ষমতার কর্তৃত্ব, সম্পদের অংশীদারিত্ব নিয়ে ভাগাভাগি, নব্য-পুরনোসহ নানা কারণে বিভাজন সৃষ্টির জন্য আওয়ামী লীগের ইতোমধ্যেই যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে। সুষ্ঠু ধারায় রাজনীতি করলে, উইনার টেকস অল অর্থাৎ ক্ষমতায় যিনি থাকবেন তিনি সবটাই নিয়ে নেবেন- এমন ধারণার রাজনীতি না করে সামান্য সুশাসনকে প্রাধান্য দিয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনকেন্দ্রীক রাজনীতি করলে দলটির এ পরিস্থিতি হতো না। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে দলটি কবে পারবে তা বলা কঠিন।
২০০৮-এ নির্বাচনের পরে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথমদিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়মাত্রায় বিজয়ী হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশটি। করিডোরের নামে ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার, নৌ-সড়ক, রেলপথ উন্মুক্ত করে দেয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মধ্যদিয়ে এবং সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ না করাসহ বিভিন্ন কারণে ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছিল, পার্শ্ববর্তীর বিজয়ের আসল রহস্য কি? আসলে তারা কি চায়? কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পড়ে এটা ভালো করেই দেশের মানুষ বুঝতে পেরেছে শাসক বাস্তবে কতোটা নতজানু এবং এ কারণে কতোটা অসহায় হয়ে পড়েছে এই ভূখণ্ডটি এবং এর মানুষ। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব আসলেই কতোটা স্বাধীন এবং সার্বভৌম? একটি ভূখন্ড, জনগোষ্ঠী আর জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্খা এবং এটি বিদ্যমান থাকাটাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আসল গ্যারান্টি নয়। বাংলাদেশ তার স্বাধীন স্বকীয় সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছে কিনা তাই হচ্ছে মূল বিষয়, মৌল উপাদান। যদি স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাগ্রস্ত হতে হয় বা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে তাহলে সে দেশটি কি স্বাধীন এবং সার্বভৌম?
৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার যে কারো সঙ্গে কোনো সঙ্কট দেখা দিলেই তখন হয় বিরোধী দল অথবা ড. ইউনূসকে দায়ী করা হতো। আর একদল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী দলদাস বুদ্ধিজীবী এবং বাক্সজীবী সে সব কথা অতি উচ্চস্বরে প্রচার করতো। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে বিষয়টি ব্যক্তির বা দলের নয় - বিষয়গুলো ওই সব দেশের নীতিমালা এবং আকাঙ্খার প্রতিফলন। শুধু পশ্চিমা নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ তামাম দুনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের এখন কোনো সুসম্পর্ক নেই। বাংলাদেশকে যে কৌশলে একঘরে ফেলা হয়েছে এ সরকারের বহিদেশীয় মন্ত্রণাদাতা, তা এখন সরকার প্রধান মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারলেও করার কিছু নেই। বরং মনে করা হচ্ছে তারাই সব ঠিক করে দেবে। এটির সম্ভাবনা খুবই কম। যে কারণে এখন আন্তর্জাতিক বৈধতার সন্ধানে এই সরকারটিকে ছুটতে হচ্ছে দেশ থেকে দেশে অভিনন্দন বার্তা জোগাড়ের জন্য। সরকার আপাত তৃপ্ত চীন এবং রাশিয়ার অভিনন্দন বার্তায়। তবে আসল বিষয় হচ্ছে, এ দুটো দেশের অভিনন্দন বার্তা যে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থেই তা অনেকেই বুঝতে পারছেন।
বর্তমান দুনিয়ায় প্রতিনিধিত্বশীল শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিকেন্দ্রায়নের মধ্যে দিয়ে সমন্বিত উদ্যোগে সরকার পরিচালনা করতে হয়। তাহলে সরকারটির ভালো-মন্দ, সাফল্যে বা ব্যর্থতার দায় সবার উপরেই বর্তায়। যদিও টিম লিডার বা সরকার প্রধান হিসেবে কিছুটা বেশী দায় তো থাকবেই। কিন্তু বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাগুলো যেহেতু অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার অর্থাৎ এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক ও কর্তৃত্বেরই পরিচালিত সে কারণে সরকারটির পুরো দায়দায়িত্ব ওই একজনকেই পুরোটা নিতে হয়। কাজেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসহ পুরো সরকারের ব্যর্থতার দায় একজনকেই বহন করতে হচ্ছে। একমাত্র তিনিই চিন্তাযুক্ত সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের বিজয় হয়েছে। চিন্তা করলে দেখা যাবে, আসলে শেখ হাসিনাই পরাজিত হয়েছেন - আর কেউই নয়। তার পরিবারের বা দলেরও কেউ নয়। পরাজয়ের নানা কারণ ইতোমধ্যে বলা হয়েছে। তবে একটি বিষয় চিন্তা করুন - যে শেখ হাসিনা বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে ১৯৯৬-এর নির্বাচনটি নিয়ে যারপরনাই সমালোচনা করতে পারতেন, কিন্তু এখন তার পক্ষে সেটি আর সম্ভব হচ্ছে না। হবেও না আর কোনোদিন। তাহলে কে পরাজিত হয়েছেন?

বিএনপি ও ব্লেম গেম

বিএনপির প্রতি অভিযোগ আর উপদেশের বন্যা বইছে দেশে। সঙ্গে আছে হুমকিও। বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে হবে, ছাড়তে হবে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা আর সহিংসতা। বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে হবে, খেসারত দিতে হবে, নেতৃত্বের কমান্ড ঠিক করতে হবে। বিএনপি গণতন্ত্রের ক্লাব থেকে বের হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক হামলায় ইন্ধন দিচ্ছে, বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, বিএনপির নেত্রীর বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহমূলক। ৫ জানুয়ারি একটি প্রহসনমূলক ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করার পর আওয়ামী লীগ নয়, বেশি করে তোপের মুখে পড়ছে উল্টো বিএনপি। অতীত ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি একটি প্রহসনমূলক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করার পর শেখ হাসিনা সেই সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীকে খালেদা জিয়ার সরকারের কোনো নির্দেশ না মানার আহ্বান জানান। তাঁর দল, জাতীয় পার্টি আর জামায়াত মিলে লাগাতার হরতাল আর আন্দোলন করে তখন খালেদা জিয়ার ‘অবৈধ’ সরকারকে দুই মাসের মধ্যে হটাতে পেরেছিল। অথচ ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের চেয়েও প্রহসনমূলক নির্বাচন করার পর খালেদা জিয়াকে প্রথমেই সরকারকে ছয় মাসের সময় দিয়ে দিতে হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে পিছু হটতে হয়েছে, সহিংসতা ছাড়ার ইঙ্গিত দিতে হয়েছে,
এমনকি ২৯ জানুয়ারি নতুন সংসদ বসার দিনটিতে একটি সাদামাটা কর্মসূচি ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে। বিএনপির এই নরম রাজনীতির পরও বিএনপির নেতাদের বক্তব্য নতুন নির্বাচনের আলোচনা শুরু করার জন্য যথেষ্ট ‘সহায়ক’ কি না, তা নিয়ে নানাভাবে অভিযোগ করছে আওয়ামী লীগ! নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশও তা-ই করছে। আগের পর্বে তাদের কট্টর সমালোচনার বিষয়বস্তু ছিল ১৯৯৬ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচন, সেই নির্বাচন ঠেকাতে তখনকার আওয়ামী লীগ আর জামায়াতের সহিংসতা নয়। এখন তারা তীব্রভাবে সমালোচনা করছে ২০১৪ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের নয়, বরং এই নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াতের সহিংস আন্দোলনের ধরনকে। ব্লেম গেম হোক আর প্রচারণা কৌশলে হোক, বিএনপি এখনো কুলিয়ে উঠতে পারছে না আওয়ামী লীগের সঙ্গে। দমনমূলক আইনের মাধ্যমে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল একের পর এক বন্ধ করে, বিরাজমান গণমাধ্যমকে ভয়ের আবহের মধ্যে রেখে, জামায়াত ও জঙ্গিবিরোধী সেন্টিমেন্ট চতুরভাবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ প্রচার-প্রচারণায় হারিয়ে দিচ্ছে বিএনপিকে। সরকারকে দ্রুত নির্বাচন দিতে বাধ্য করার সংগ্রামে সফল হতে হলে বিএনপিকে এই দোষারোপ-যুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল বের করে হবে।
২. প্রচার-প্রচারণায় আওয়ামী লীগের এগিয়ে থাকা অবশ্য বিস্ময়কর কিছু নয়। স্বাধীনতাসংগ্রামে দলটির অতুলনীয় অবদানের কারণে বাংলাদেশের সরব নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশের চিরস্থায়ী সমর্থন দলটির প্রতি রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক শক্তিগুলোর প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বিএনপির জোরালো উদ্ভব হলে এবং পরে কমিউনিস্ট বিশ্বের পতন ঘটলে বাম ঘরানার অধিকাংশ আওয়ামী লীগ সমালোচকও আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক হয়ে ওঠেন নানা পর্যায়ে। এরশাদ-উত্তর রাজনীতিতে বিএনপি রাখঢাকহীনভাবে জামায়াতের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে তুললে নাগরিক সমাজের মধ্যে বিএনপির প্রতি বিরাগ বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে, জামায়াত ও উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রচারণাযুদ্ধে বিএনপিকে আরও কোণঠাসা করে ফেলে। অবস্থা একপর্যায়ে এমন হয়ে দাঁড়ায় যে আওয়ামী লীগের যেকোনো সমালোচনা মানে যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতের পক্ষ গ্রহণ—এমন একটি প্রচারণাযুদ্ধ সরকার নাগরিক সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে বা চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এই যুদ্ধে আওয়ামী লীগবিরোধীদের বিপক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এমন কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিও, যাঁরা নিজেরাই তরুণ বয়সে আওয়ামী লীগের অন্ধ সমালোচক ছিলেন। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনুকূল পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জন্য প্রচারণাযুদ্ধ আরও সহজ করে ফেলে। ওয়ান-ইলেভেন উত্তর বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে মুসলিম বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সেসব রাষ্ট্রের দলগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে কট্টর অবস্থান নিচ্ছে, সেই প্রশ্নটি। গণতন্ত্রের চর্চার হূদয়ের চেয়ে তাদের জন্য মূল্যবান হয়ে ওঠে জঙ্গিবাদ দমনের হুংকার। এই হুংকার কতটা আদর্শিক কারণে, কতটা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চিন্তা থেকে, তার বিচার-বিবেচনাও খুব একটা করা হয় না অনেক ক্ষেত্রে। এই পরিস্থিতিতে গত পাঁচ বছর ইসলামি জঙ্গিবাদ দমন, বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মূলোৎপাটন এবং যুদ্ধাপরাধী ইসলামি রাজনীতিকদের শক্ত বিচার করে আওয়ামী লীগ দেশের মতো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সমর্থন আদায় করে নিতে সক্ষম হয়।
আওয়ামী লীগ যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখত এবং ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি দলকে বিতর্কহীনভাবে অংশ নেওয়াতে পারত, তাহলে এই নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে যে সমালোচনা হচ্ছে এখন, তাও আর হতো না অনেকাংশে। আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যা হচ্ছে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের জনবিচ্ছিন্নতা, কারচুপি এবং অনিয়ম খুবই দৃষ্টিকটু রকমের হয়ে গেছে। এই নির্বাচনে খুবই অল্পসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছে। এই নির্বাচন যে আওয়ামী লীগের বহু সমর্থকও বর্জন করেছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে দেশের অর্ধশতাধিক কেন্দ্রে একটি ভোটও না পড়া! এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো দুর্বল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও কখনো ঘটেনি। এমন একটি জনবিচ্ছিন্ন নির্বাচন করতেও সরকারকে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে হয়েছে। নির্বাচনের আগের তিন মাসে সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর হাতে যত লোক মারা গেছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি। এই মৃত্যু এখনো অব্যাহত আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ঘটছে এমনভাবে যে তাকে স্রেফ হত্যাকাণ্ড ছাড়া অন্য কিছু ভাবা কঠিন। এর পাশাপাশি সরকার যেভাবে বিরোধী দলের কার্যালয় অবরুদ্ধ এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ঢালাও মামলা ও হামলা করেছে, অতীতে এতটা কখনো হয়নি। সরকার একতরফা নির্বাচন করতে বেপরোয়া ছিল এবং এ জন্য যেকোনো ধরনের শক্তি প্রয়োগেও তারা পিছপা হয়নি। কিন্তু এত কিছুর পরও এই নির্বাচনের অসারতা ঢাকতে পারেনি সরকার। প্রচারণাযুদ্ধে আওয়ামী লীগ বহুদূর এগিয়ে না থাকলে এমন একটি নির্বাচন করার পর পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকব, এ কথা ঠাট্টা করেও বলার সাহস পেত না আওয়ামী লীগের কেউ।
৩. বিএনপির নেতারা হয়তো ভাবছেন যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আসল জয় হয়েছে তাঁদের। তাঁরা দলের এবং জোটের ঐক্য ধরে রাখতে পেরেছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ করতে পেরেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত করতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় যা সাফল্য আওয়ামী লীগের দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না, তা তাঁরা হাতে-কলমে প্রমাণ করতে পেরেছেন। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ব্রিটেনের হাউস অব কমন্সের প্রস্তাবে সরাসরিভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে আসলে তেমন লাভ হলো কি? সত্যিই কি আওয়ামী লীগকে দ্রুত কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে রাজি বা বাধ্য করাতে পারবে বিএনপি? আমি মনে করি বিএনপির জন্য এটি করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি অতীতে এরশাদ ও হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দুবার ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল। কিন্তু তখন খালেদা জিয়া নেত্রী হিসেবে বেশি সক্রিয় ও ওয়াকিবহাল ছিলেন, বিএনপির নেতৃত্বের একটি বিরাট অংশকে তখনো বয়স, জেলে যাওয়ার ভীতি ও সম্পত্তি রক্ষার চিন্তা কাবু করে ফেলেনি। সর্বোপরি বিএনপির তখন ছিল রাজপথে জান-প্রাণ সংগ্রাম করার মতো নিবেদিতপ্রাণ একটি ছাত্র ও যুব সংগঠন। গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতারা একমাত্র স্বেচ্ছাসেবক দল ছাড়া বাকি কোনো সংগঠনকে শক্তিশালী হিসেবে দাঁড় করাতে পারেননি। বিএনপিকে তাই নিজের শক্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে। আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি সারা দেশে, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে এবং ঢাকা শহরে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে হবে। বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকবে কি না বা তার ধরন কী হবে, তা নিয়েও গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।
দলটির অতীত অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সুখের নয়। ১৯৮৬ সালে বিএনপিকে আকস্মিকভাবে একঘরে করে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করেছিল, ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে সহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কাজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ হলে পুনর্গঠিত বা ‘সাফসুতরো’ জামায়াতের সঙ্গে প্রয়োজনে পুনরায় সমঝোতার চেষ্টা করবে না আওয়ামী লীগ, এই গ্যারান্টি দেওয়া যাবে কি সুনিশ্চিতভাবে? সত্যি সত্যি বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংলাপ হলে এবং তাতে এ ধরনের লিখিত কোনো সমঝোতা হলে অবশ্যই জামায়াতকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বিএনপির। জামায়াতকে বাদ দিলে বিএনপির ভোট খুব একটা বাড়বে কি না জানি না, তবে দলের ইমেজ তাতে বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। জামায়াতহীন বিএনপিকে প্রচারণাযুদ্ধে নাকাল করা কঠিন হবে আওয়ামী লীগের জন্য। সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ এতে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে উদারনৈতিক এবং বাম দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। বিএনপির সঙ্গে উদারপন্থীদের ঐক্য সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং অপপ্রচারের হুমকি দূরীকরণে বিএনপির সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রচারণাযুদ্ধে টিকে থাকতে হলে আর কী কী করতে হবে, তা বিএনপিকে গভীরভাবে চিন্তা করে বের করতে হবে। না হলে বাংলাদেশে সত্যিকারের একটি নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্রমেই আরও ক্ষীণ হয়ে উঠবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জামায়াতমুক্ত বিএনপি! দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে কি?

নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশে যে সংঘাত, সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, বাড়ি জ্বালানোর ঘটনা ঘটেছে; তার মূল হোতা যে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির—এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই। সরকারের দমন-পীড়নও এর পক্ষে কোনো সাফাই হতে পারে না। এসব নারকীয় ঘটনা অস্বীকার কিংবা সেই ঘটনাকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা—দুটোই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি প্রায় গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল, সারা দেশে যাদের জনসমর্থন এখন ৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যার অংশ নেওয়ারই যোগ্যতা ছিল না এবং নবম জাতীয় সংসদে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল, সেই দলটি কীভাবে বছরজুড়ে এত সব তাণ্ডব ঘটাল? এটি কি নিছক বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার জন্য, না আরও গভীরে এর কারণ লুকিয়ে আছে? নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ কেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার জামায়াতের একজন রুকনকে ফুলের মালাসমেত দলে নিয়ে এলেন, তার ব্যাখ্যা নেই। এখন যদি ওই রুকনের পথ অনুসরণ করে জামায়াতের সব নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য লাইন দেন, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি তাঁদের সাদরে বরণ করে নেবে? ক্ষমতার রাজনীতির অঙ্ক এমন সরলরেখায় চালিত হলেও আদর্শের রাজনীতি বড় কঠিন। সেই কঠিনকে আওয়ামী লীগ ভালোবাসতে প্রস্তুত আছে বলে মনে হয় না।
বিএনপি জামায়াতে ইসলামী নামের দলটির সঙ্গে গাঁটছড়া রাখবে কি রাখবে না, সেটি তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে যে জামায়াতের কারণেই আজ তাদের মৌলবাদের দোসর, জঙ্গিবাদের সহযোগী এবং যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষকের যে বদনাম হয়েছে, তা ঘোচানো কঠিন হবে। মধ্যপন্থী বিএনপি কী করে একটি মৌলবাদী দলের সঙ্গে একীভূত হলো? এসব কথা বললে নিশ্চয়ই বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা হইচই করে উঠবেন এবং জানান দিতে চাইবেন, জামায়াতের সঙ্গে কেবল বিএনপিই জোটবদ্ধ হয়নি; আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগও জোট বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগ ছিয়াশি সালে ও পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধেনি। ছিয়াশিতে দলটি তার নিজের স্বার্থেই নির্বাচন করেছিল; যেমনটি করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সেই আন্দোলনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে। এরশাদ আমলে তিন জোটের পাশাপাশি জামায়াত যে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তার যোগসূত্রটি ছিল বিএনপিই। ১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনে জামায়াত সহযাত্রী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনেও জোরালো ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে সেই আন্দোলনের কারণে বিএনপি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। বিএনপির বাকি আমল সেই মামলা ঝুলে ছিল;
বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তা প্রত্যাহার করে নেয়। এখন বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করত, তাহলে কারও কিছু বলার থাকত না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিএনপির নেতৃত্ব কেবল জামায়াতকেই আন্দোলনের সহযাত্রী করেনি, ১৮-দলীয় জোটে এমন কিছু ধর্মান্ধ দলকে যুক্ত করেছে, যারা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায়। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা যত কমজোরিই হোক না কেন, তারা চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী। দুই জোটের মৌলিক পার্থক্যটাও এখানে। তবে আমরা একইভাবে সাবেক স্বৈরাচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বিপদে ফেলেছে এরশাদ। তার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডই নির্বাচনকে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজাকারের মতো স্বৈরাচারও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। বিএনপির নেতৃত্ব স্বীকার করুক আর না করুক জামায়াত-শিবির যে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই সরকার ও প্রশাসনকে অকেজো করে দিতে তারা একের পর এক বোমা হামলা চালিয়েছে, বাস-ট্রাক পুড়িয়েছে, পুলিশ খুন করেছে।
বিএনপির মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক দল কেন সেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করল সেটাই বড় প্রশ্ন। শত্রুর শত্রু যে সব সময় মিত্র হয় না, সেটা আবার প্রমাণিত হলো। বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতা হলো, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনটিকে জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে পরিচালিত আন্দোলন থেকে পৃথক করতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জোটের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতায় তারা সমভাবে মৌনতা অবলম্বন করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তিন মাস ধরে চললেও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও নাশকতা চলেছে বছরজুড়েই; নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে এবং পরে যা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কীভাবে ঘটল? গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যতটুকু দূরত্ব, তার চেয়ে কম দূরত্ব নয় সাম্প্রদায়িকতার। আমাদের দুর্ভাগ্য, এক পক্ষ কেবল স্বৈরতন্ত্রকে গণতন্ত্রের বিপদ মনে করে, সাম্প্রদায়িকতাকে নয়। অন্য পক্ষ সাম্প্রদায়িকতাকে বিপদ ভাবলেও স্বৈরতন্ত্রের বিপদ আমলে নেয় না। প্রধানমন্ত্রী অভয়নগরের মালোপাড়ায় আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই মাটির সন্তান আপনারা। অধিকার নিয়েই আপনারা এখানে থাকবেন। কেউ আপনাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না। মনে জোর নিয়ে আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ প্রধানমন্ত্রীর কথায় আবেগ ও আন্তরিকতা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী কি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য হূদয়ে ধারণ করেন? করেন না। করলে আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাহায্য চেয়েও কেন পায়নি? কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সময়মতো এগিয়ে এলেন না। কেন প্রশাসন ও পুলিশ নির্বিকার ছিল?
আসলে সাম্প্রদায়িকতা যখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনের গভীরে বাসা বাঁধে, তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি থাকে না; সব এক হয়ে যায়। কেউ আক্রমণ করে, কেউ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ৪২ বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের ওপর এ নির্যাতন চলে আসছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওহাবের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ আছে। সরকার কি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? এ রকম একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে কীভাবে গেলেন? সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কারণ এই বিচারহীনতা। অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়া। সরকার সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িঘর দ্রুত নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, ইটপাথরের দেয়াল তা মুছে ফেলতে পারবে না। সে জন্য চাই সরকার, রাজনৈতিক দল ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ। মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। সেই কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতাও কারও গায়ে লেখা থাকে না। খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির অন্যান্য নেতা যখন কথায় কথায় ভারতীয় জুজুর ভয় দেখান, তখন তার মধ্যে বৃহৎ প্রতিবেশী সম্পর্কে ক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিও দলটির প্রচ্ছন্ন হুমকি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যাঁরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে বলে বক্তৃতা করেন এবং যাঁরা ভোটের হিসাবে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়ে রাখেন; সংখ্যালঘুরা কোন ভরসায় তাঁদের ভোট দেবেন? ডেইলি স্টার-এ মাহ্ফুজ আনাম বিএনপিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, পুরোনো ধ্যানধারণা, পুরোনো কৌশল, পুরোনো মিত্র কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং বোঝা হয়ে থাকবে। তবে এটি কেবল বিএনপির জন্য নয়, ক্ষমতাসীন দলটির জন্যও সমান সত্য।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে সবকিছুর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপালে দেশে শান্তি আসবে না, সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে না। প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে জামায়াতমুক্ত হতে বলেছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, জামায়াতমুক্ত হলে বিএনপি সন্ত্রাসমুক্ত হবে। কিন্তু দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার এবং রাখার দায়িত্ব সরকারেরই। অতএব আওয়ামী লীগকেও পুরোনো কৌশল, দোষারোপের পুরোনো রাজনীতি পরিহার করে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সমালোচনা সহ্য করার ধৈর্য থাকতে হবে। সবকিছু বিএনপি-জামায়াতের কাজ বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা কাজে দেবে না। বিএনপি সংসদে থাকুক বা না থাকুক, তার সঙ্গে একটি কর্মসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচনে না গিয়ে যে ভুল করেছেন, এখন তাঁকে খেসারত দিতে হবে। খেসারত দিচ্ছেনও। তবে একটি রাজনৈতিক দল বা নেত্রী ভুল করলে তার খেসারত দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে যে, একটি সরকার ভুল করলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি

বর্তমানে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে, তা স্বস্তিদায়ক নয়। বিশেষত, ব্যবসা-বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পছন্দের দেশের তালিকা থেকে অনেক পেছনে। সবাই মিলে দ্রুতই এর ইতি টানতে হবে। তাজরীন ফ্যাশনসের আগুনে পুড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের মুখ। রানা প্লাজার ভবনধসের তলায় চাপা পড়েছিল পোশাকশিল্পে বিনিয়োগকারী ও বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এল রাজনৈতিক কারণে সৃষ্টি হওয়া সার্বিক অচলাবস্থা। এ পরিস্থিতিতে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ে ব্যবসায়ী নেতারা তাঁদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের নিজস্ব স্বার্থের বিচারে হলেও, এর মধ্যে দেশের স্বার্থের কথাও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সভায় ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিদেশি ক্রেতাদের এ দেশ সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে কেবল পোশাকশিল্পের ক্রেতারাই বিদেশে চলে যাবেন না, অন্যান্য খাতেও বিরূপ প্রভাব পড়বে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অন্যান্য কারণে এই প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও কমে গেছে। এই অশনিসংকেত পাঠ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার এখনই সময়। মনে রাখতে হবে, বিশ্ব মুখ ফিরিয়ে নিলে সবারই ক্ষতি। পোশাকশিল্পে অনাস্থা সৃষ্টির দায় প্রধানত উদ্যোক্তাদেরই। নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের মানুষের মর্যাদায় কর্ম করিয়ে নেওয়া এবং জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যর্থতার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত অর্থনীতিকে প্রায় অবশ করে ফেলার পর্যায়ে চলে যাওয়ার দায় রাজনীতিকদের।
রাজনীতি শেষ বিচারে অর্থনীতিরও ব্যবস্থাপনা। সরকার ও বিরোধী দলের রেষারেষির জন্য সেই ব্যবস্থাপনায়ও বিপর্যয় নেমেছিল। এর ফল হলো প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে যাওয়া। ব্যবসায়ীরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণে দ্রুতই একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন বাণিজ্যমন্ত্রীকে। এই টাস্কফোর্সের লক্ষ্য হবে দুটি: এক, প্রধান প্রধান অর্থকরী খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে উত্তরণের পদক্ষেপ নেওয়া এবং দুই, ব্যবসা ও উৎপাদনসহায়ক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাধাগুলো চিহ্নিত করা। এই কাজটির দায়িত্ব প্রধানত সরকারের হলেও, বিনিয়োগকারীদের সহায়তাও প্রয়োজন। এই দুটি কাজ মোটামুটি করা গেলে ভাবমূর্তির ফাটল দ্রুতই বুজিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতার মধ্যেই মুনাফা করেন। বাণিজ্যিক রেষারেষির মধ্যেও তাঁরা একধরনের স্থিতিশীল বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, রাজনীতির প্রতিযোগিতা বারবারই পরস্পরের বিনাশের দিকে চলে যায়। এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে, রাজনীতির সব পক্ষকে ‘খেলার নিয়ম’ নতুন করে ঠিক করতে হবে এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার শর্তগুলো মানার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে সমঝোতা প্রয়োজন। কেবল এর ভিত্তিতেই শ্রমের মজুরি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ঋণ ও অবকাঠামোর মতো বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করা সম্ভব। সময়ের প্রয়োজন মেটানোর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। তাদের দেখাতে হবে, দায়িত্ব নিতে তারা সক্ষম।

‘শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায়বিচার পদানত হতে দেয়া যায় না’ -সৈয়দ আবুল মকসুদ

বিশিষ্ট লেখক ও কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে সালিশ-বিচার হচ্ছে, বৈধতা, অবৈধতার প্রশ্ন উঠছে। এটাই প্রমাণ করে এই নির্বাচনে গোলমাল আছে।

‘শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায়বিচার পদানত হতে দেয়া যায় না’ -সৈয়দ আবুল মকসুদ

বিশিষ্ট লেখক ও কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, একটি নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে সালিশ-বিচার হচ্ছে, বৈধতা, অবৈধতার প্রশ্ন উঠছে। এটাই প্রমাণ করে এই নির্বাচনে গোলমাল আছে।
তিনি বলেন, একটি স্বৈরাচারী সরকার মেনে নেয়া যায় কিন্তু কোন তাঁবেদার মানা যায় না, অর্থনৈতিক সঙ্কট মানা গেলেও অগণতন্ত্রিক অনাচার মেনে নেয়া যায় না। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ন্যায়বিচার পদানত হতে দেয়া যায় না। সংলাপের জন্য জামায়াত ছাড়ার শর্তকে মূল্যহীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াতের সাংবিধানিক অবস্থান কি তা আগে সরকার ঠিক করুক। যদি জামায়াত আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যায় তা হলে আপনা আপনিই জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে বিএনপি। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দেশের সঙ্কটের জন্য প্রধান দুই দল, অপ্রধান দলসমূহ, একশ্রেণীর গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দালালি ভূমিকা দায়ী। গত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার আইনসম্মত কিনা, বৈধ কিনা- এমন প্রশ্ন উঠছে। এর আগে বাংলাদেশের আর কোন নির্বাচিত সরকার নিয়ে এই প্রশ্ন কেউ করেননি। এসব প্রশ্ন ওঠে সামরিক শাসকদের সম্পর্কে। সামরিক শাসকরা অসাংবিধানিক শাসক বা জবরদখলের শাসক। কিন্তু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার সম্পর্কে যখন আইনগত বৈধতার প্রশ্ন ওঠে তখন বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও গোলমাল হয়েছে। হয় নির্বাচনে আইনগত গোলমাল হয়েছে, নয়তো অন্য কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে সরকারি দলের নেতারাই বলছেন- ‘সংবিধান রক্ষার নির্বাচন’, ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন’ ইত্যাদি। যদি ধরে নিই সরকারের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে সেটাই ঠিক- তাহলে সমস্যা কোথায়? তখন দেখা যাচ্ছে, আইনি সব বিষয়ই ঠিক আছে, কিন্তু কয়েকটি দল সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বেশ, তা না নিতে পারে। কিন্তু সেই দলগুলো কারা? বাংলাদেশে ৪০টির বেশি নিবন্ধিত দল রয়েছে। সবদলকেই নির্বাচনে আসতে হবে তা সংবিধানে লেখা নেই। বেআইনি যদি নাও হয়ে থাকে, কিন্তু অনৈতিক কাজ করেছে ১৪ দলীয় মহাজোট নিযুক্ত ও মহাজোটপন্থি নির্বাচন কমিশন।

তিনি বলেন, শতকরা ৫২ ভাগ ভোটারকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই দেয়া হলো না। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৫৩ জন প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে গেলেন। বাকি যে ১৪৭ আসন সেখানে ভোট পড়ল ১০-১২ শতাংশ। বহু কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। এই নির্বাচনকে আপনি কিভাবে বলবেন আইনগতভাবে বৈধ? নৈতিকভাবে বৈধ বললে তো নৈতিকতা শব্দটিকেই অসম্মান করা হয়। তারপরেও যদি আমরা বলি এবং বলবোই যে, সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছে। তখনই আসে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। এভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সরকারকে কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করে না। তবে কেউ গ্রহণযোগ্য মনে করুক বা না করুক কোন সরকার যখন প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র চালায় তাকে মেনে নিতে হবে, তাই নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ অভিনন্দন না জানালেও অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য মনে না করলেও সরকারের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে অস্বীকার করেনি। সঙ্গে সঙ্গে তারা তাগিদ দিচ্ছে- অতি দ্রুত আর একটি নির্বাচন করা। যে নির্বাচনে অধিকাংশ মানুষের ভোট প্রয়োগের সুযোগ থাকবে। সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হবে একটি সরকার একটি পার্লামেন্ট।
এখন দুই দলের মধ্যে সমঝোতা আদৌ সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে বিশিষ্ট এ নাগরিক বলেন, হানাহানি-মারামারি ও দেশী-বিদেশী চাপ সত্ত্বেও সমঝোতা হয়নি দু’টি পক্ষের মধ্যে। ভবিষ্যতে যে হবে তার শতকরা এক ভাগও নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে যে ইস্যু থেকে বিরোধের সৃষ্টি, সেই ইস্যুর ন্যায্যতা যদি সরকারি পক্ষ স্বীকার না করে তা হলে তো তারা আলোচনা বা সংলাপেই বসবেন না। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দলও যদি কোন কোন বিষয়ে ছাড় দিতে না চায় তা হলে সরকারের পক্ষেও অনড় থাকাই স্বাভাবিক। যার পরিণাম সমঝোতা না হওয়া। একটি নির্দলীয় এবং মোটের উপর নিরপেক্ষ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক- সেটাই অধিকাংশ মানুষের আশঙ্কা এবং দাতাগোষ্ঠীর চাপ। তা হলে ধারণা করা যায়, ১৪ দলীয় মহাজোটের পুনঃনির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়। সুতরাং তারা তাতে সম্মত হবে না। ভারতের মিডিয়া ও কর্মকর্তাদের কথাবার্তা থেকে জানা গেছে তারা শেখ হাসিনার সরকারকেই ক্ষমতায় দেখতে চান। সেই মোতাবেকই নির্বাচন হয়েছে এবং গঠিত হয়েছে সরকার। সুতরাং, সমঝোতা আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে হবে? তারপরেও বড় দলগুলোর নেতারা যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন তা হলে নিজেদের ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির বাইরে গিয়ে দেশের স্বার্থে তারা একটি সমঝোতার পথ বের করতেন। এখন মন্ত্রীরা বলছেন, পাঁচ বছর পরে নির্বাচন হবে। এর আগে নির্বাচনের কোন সম্ভাবনা নাই। তা যদি না থাকে, তা হলে সমঝোতা কি?
দেশে যে একটা সর্বাত্মক সঙ্কট আছে, তা কি নেতারা উপলব্ধি করেন? বর্তমানে পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের মুখ দেখাবার উপায় নেই। এই দেশের কংগ্রেসে, ওই দেশের পার্লামেন্টে, প্রভৃতি জায়গায় বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, বিচার-সালিশ হচ্ছে, প্রস্তাব পাস হচ্ছে, আরও কতো কি হচ্ছে- কিন্তু সরকার তা তিন তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ আজ অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সঙ্কটে আবর্তিত। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্বের সঙ্কটে। জনগণ বুঝতে পারছে, নেতারা বুঝতে পারছেন না- তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমরা অতীতে অনেক সঙ্কট পার হয়ে এসেছি। নেতারাই তা সমাধান করেছেন। আজকের সঙ্কট আর যে কোন সঙ্কটের চেয়ে গভীর। একাত্তরে মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছিল, অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছিল, কিন্তু তাদের সামনে স্বপ্ন ছিল তারা তার বিনিময়ে পাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রে থাকবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে কম। আজ কি দেখছি। একাত্তরের চেতনার লেশমাত্র নেই কোথাও।
তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের বড় বড় নেতারা দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলছেন। অতীতে অনেক রকম সমস্যা ছিল কিন্তু স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোন সংশয় ছিল না। আজ মানুষের সেটা নিয়েই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এ অবস্থায় শুধু একটি সুযোগ্য নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনই রাষ্ট্রকে আবার স্বাভাবিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে বলে মত দেন তিনি। আলোচনার জন্য ‘জামায়াত’ ছাড়ার শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব শর্তের কোন মূল্য নেই। সমঝোতার ইচ্ছা থাকলে বসেই অনেক বিষয়ের ফয়সালা সম্ভব। জামায়াত ইস্যু নিয়েও আলোচনা হতে পারে। অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। কোন পক্ষেরই শর্ত দিয়ে অনড় থাকা ঠিক নয়।
জাতীয় পার্টির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে যেভাবে সংসদ নির্বাচন হয়েছে সেটা অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া গঠনের পরে জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারের যে সম্পর্ক তাতে তাকে কোনক্রমেই বিরোধী দলের পর্যায়ে ফেলা যায় না। রওশন এরশাদকে বিরোধী দলের নেতার মর্যাদা দেয়া আর এরশাদকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা সম্পূর্ণ এক গোঁজামিলের ব্যাপার। নির্বাচিত হলেও, যতো কম ভোটেই নির্বাচিত হোক, এই সংসদকে গণতান্ত্রিক সংসদ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় না। একে ভবিষ্যতে ইতিহাসবিদরা অত্যন্ত খারাপভাবে চিত্রিত করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
তিনি বলেন, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করেও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সংসদীয় রীতিনীতি সম্মত একটি পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠা করা যেত। জাতীয় পার্টিকে প্রকাশ্যে একটি বিরোধীদলের রূপ দিতে পারতো। তলে তলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার যতোই বোঝাপড়া থাক। কিন্তু এখন যা করা হয়েছে তা গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করা ছাড়া আর কিছু নয়।
এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা বড় দুই দলের কাছেই দেশটিকে ইজারা দিয়ে রেখেছি। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে যতোভাবে অপব্যবহার করা সম্ভব তা তারা করে আসছে। এই অবস্থায় ছোট দলগুলোর একটি গঠনমূলক ভূমিকা থাকতে পারত। কিন্তু তারা রুটিন সভা, সংবাদ সম্মেলন সেগুলো করেই মনে করছে তাদের দায়িত্ব পালন হলো। ছোট দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ চাপ থাকলে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি স্বৈরাচারী হতে পারতো না। এবং আর যে দু’টি দল-জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী তারাও বড় দুই দলের লেজুড় হয়ে ক্ষমতায় ভাগ বসাতে পারতো না। বড় দুই দলের সঙ্গে মাঝারি ওই দুই দল, যুক্ত হয়ে নানান অপকীর্তি করে এখন গণতন্ত্রকে একেবারে কবর দিয়ে দিলো। তিনি বলেন, বিকল্প ধারা, কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণফোরাম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জেএসডি প্রভৃতি দল সংঘবদ্ধ থাকলে তা খুব ছোট রাজনৈতিক শক্তি নয়। কিন্তু তারা এখন আর কোন সংগ্রামী সংগঠন নয়। নেতারা সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন, কিন্তু জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা তাদের নেই। তা থাকলে এবং তাদের যদি এই বড় দুই দলের সঙ্গে কোনরকম জোট থাকতো তাহলে, এই বড় দুই দল, যা-খুশি তাই করতে পারতো না। এখন অপ্রধান দলগুলোর নিষ্ক্রীয়তার সুযোগে বড় দুই দল স্বেচ্ছাচারী, অগণতান্ত্রিক শক্তি পরিণত হয়েছে। আজকে দেশের এই দুর্দশার জন্য অপ্রধান দলগুলোও কম দায়ী নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে নাগরিক সমাজ, অন্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশী নাগরিক সমাজ স্বাধীনতার আগে এবং আশির দশক পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তাদেরকে সহযোগিতা দিয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে নাগরিকরা সমাজের বুদ্ধিজীবীরা দুই বড় দলের ব্যাপারে বিভক্ত হয়ে গেছে। তারা উঁচু চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অধিকাংশই ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদদের এমন নির্লজ্জ দালালিমূলক ভূমিকা আর কখনও দেখা যায়নি। নামকরা বুদ্ধিজীবীরা সরকারকে অন্ধভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন। একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতে হবে। দেশী বিদেশী শক্তির এজেন্ট হিসেবে তাদের যে ভূমিকা তা পাকিস্তান বাহিনীর দালালদের প্রায় কাছাকাছি। এই অবস্থাটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আজ বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতা করতে একশ্রেণীর মিডিয়াকে খুবই তৎপর দেখা যায়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় যখন বাম ও অন্যান্য দলগুলো আন্দোলন করে সেসব সংবাদ তারা সুকৌশলে চেপে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি সঠিকভাবে প্রচারিত হতে পারছে না। সুতরাং আজকের যে সঙ্কট, এই সঙ্কটের জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেমন দায়ী অপ্রধান রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজও কম দায়ী নয়।

কায়রোয় দফায় দফায় বোমা হামলা

কায়রোর পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে বোমা হামলায় আহত
এক শিশুকে প্রাথমিক চিকিত্সার পর সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এএফপি
মিসরের রাজধানী কায়রোয় পুলিশ সদর দপ্তরসহ তিনটি স্থানে গতকাল শুক্রবার দফায় দফায় বোমা হামলায় পুলিশের চার সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হন ৭০ জন। এর মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়। ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের বার্ষিকীর আগের দিন সিরিজ বোমা হামলা চালানো হলো। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে কায়রোতে পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে প্রথম আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলা চালানো হয়। এতে পুলিশের তিন সদস্যসহ চারজন নিহত ও অন্তত ৫১ জন আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকট শব্দে ওই বোমা বিস্ফোরণে পরপরই একদল মোটরসাইকেল আরোহী ঘটনাস্থলের আশপাশের ভবন লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পালিয়ে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর কায়রোর কাছে দ্বিতীয় দফায় শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এতে পুলিশের এক সদস্য নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, এক ব্যক্তি নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহর লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারেন। এতে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। এরও কয়েক ঘণ্টা পর পশ্চিম কায়রোর তালেবিয়া এলাকায় একটি থানার কাছে তৃতীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার ঘনিষ্ঠ জঙ্গি সংগঠন আনসার বেইত আল-মাকদিস এক বিবৃতিতে পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। তবে কর্তৃপক্ষ এসব হামলার জন্য নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডকে দায়ী করছে। যদিও ব্রাদারহুড অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, সরকার স্বৈরাচারী শাসন শুরু করেছে। এর প্রতিবাদে আজ ২৫ জানুয়ারি মোবারকবিরোধী গণ-আন্দোলনের বার্ষিকী সামনে রেখে গতকাল থেকেই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ব্রাদারহুড। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হাজেম আল-বেবলাওয়ি গতকাল সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘জঙ্গিরা’ রাজনৈতিক ‘রূপরেখা’ লাইনচ্যুত করার উদ্দেশে এসব হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু এতে তারা সফল হবে না। প্রথম বোমা হামলার পর পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে কয়েক শ লোক মুরসিরবিরোধী স্লোগান দেন। তাঁরা মুরসির ফাঁসি দাবি করেন। এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসি।

বাংলাদেশে অর্থহীন নির্বাচন- কূলদীপ নায়ার

ভাগ্যের পালাবদল হয়, কোন সন্দেহ নেই। আজ যে শাসক, কাল সে প্রতিপক্ষ। তারপরও বাংলাদেশে রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক প্রতিহিংসা দৃশ্যমান। একজন স্বৈরশাসক তো খারাপ বটেই।
কিন্তু সেটা আরও খারাপ হয় যখন তিনি ক্ষমতা ছাড়তে চান না। এটা বাংলাদেশের অত্যন্ত জটিল এক সমস্যা। পাকিস্তানভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভারে’র অনলাইন সংস্করণে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামনিস্ট, মানবাধিকার কর্মী ও লেখক কুলদীপ নায়ার ‘পয়েন্টলেস পোলস ইন বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশে অর্থহীন নির্বাচন’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা লিখেছেন। কুলদীপ নায়ার লিখেছেন, বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছিল। এর পরিবর্তে হাসিনা তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন সম্পন্ন করে। এর আগে সংবিধান সংশোধন করে বাতিল করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। প্রহসনের এ নির্বাচনে, একটিও ভোট পড়ার আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ১৫৪ জন প্রার্থী। আর একতরফা ভোটে আরও ১০৩ জন। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের একটি দৈনিক সংবাদপত্রের চালানো মতামত জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ মানুষই নির্বাচনের বিপক্ষে। বিএনপিসহ অধিকাংশ দল যখন নির্বাচন বর্জন করেছে ও নতুন সরকারকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তখন হাসিনার এ বিজয় তেমন কোন অর্থ বহন করে না। এদিকে জামায়াতে ইসলামী তাদের নীতি অনুসরণ করে সমাজে মেরুকরণ ও মৌলবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। জামায়াতের মতো সংঘবদ্ধ দল সমাজের বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায়ের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছে। ক্যাডারদের দিয়ে সহিংসতাই তাদের অবদান। কুলদীপ নায়ার আরও লিখেছেন, দুর্ভাগ্যবশত ভারত পরিষ্কারভাবেই হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। কোন সন্দেহ নেই, হাসিনা তার পিতা ও বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই ধর্মনিরপেক্ষ ও তিনি একনিষ্ঠভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক। কিন্তু যে কোন মূল্যে তার ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার দৃঢ় সঙ্কল্প সব আদর্শকে হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছে। নয়া দিল্লির উচিত ছিল একটি সৌহার্দমূলক ভূমিকা পালন করা। শুরুর দিকে নয়া দিল্লি সেটাই করেছিল। কিন্তু এখন তাদের একচোখা নীতি বা ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রায় ৮০ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠী তার উত্তাপ অনুভব করছে। ভারতের যদি কারও প্রতি অনুরাগ বা সমর্থন জানাতেই হয়, তবে তার উচিত তৃতীয় ফ্রন্ট হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ও নোবেল জয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে সমর্থন দেয়া। কলামের শুরুতে নায়ার লিখেছেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমেদ যখন ঢাকার একটি হোটেল থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার অপরাধ তিনি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। আওয়ামী লীগ প্রধান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের দুই জনকেই অত্যন্ত অপছন্দ করেন। মওদুদ শেষবার আটক হয়েছিলেন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের সময়। এখন এরশাদও কার্যত আটক। এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন না দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে কুলদীপ নায়ার বলেন, যে দলের অধীনে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তাদের উচিত যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। তা সত্ত্বেও ৮০ বছরের বেশি বয়সী কোন ব্যক্তিকে ফাঁসিতে ঝোলানোর যৌক্তিকতা খুবই সামান্য। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যা দিয়ে সর্বসম্মতভাবে যে বিলটি পাস করা হয়, তাতে পাকিস্তানের পক্ষপাতিত্বমূলক মনোভাবের বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে। অনুশোচনা প্রকাশের পরিবর্তে পাকিস্তান এমনভাবে ভূমিকা অবলম্বন করে চলেছে যেন তারা তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে অনুতপ্ত নয়। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভুল নীতি অনুসরণ করছে পাকিস্তান। পাকিস্তান বারবার প্রমাণ করছে যে, তারা কায়েদ-এ-আজম মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছতে পারেনি। তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্কে রাজনীতিকে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। আফগানিস্তান ও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তালেবানকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল ইসলামাবাদ। সেই তালেবানরাই এখন পাকিস্তানের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলছে। পাকিস্তানে মৌলবাদ বেড়ে চলেছে ও নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর সেখানে প্রায় নেই বললেই চলে। আইনজীবীরা যখন পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর তাসির হত্যা মামলায় অভিযুক্তের ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটায়, তাতেই পাকিস্তানে জঙ্গিবাদ যে কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে তা প্রকাশ পায়। কুলদীপ নায়ার বলেন, সবচেয়ে আতঙ্কজনক বিষয়টি হচ্ছে, বাংলাদেশে একটানা চলতে থাকা সহিংসতা। নির্বাচন বয়কটে বিভিন্ন কর্মসূচি ও হরতালে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবেই, যেখানে গত ৫ বছর ধরে ৬ শতাংশ হারে সুষম প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বেকারত্ব, দরিদ্রতা ও মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। খালেদা বা হাসিনা কেউই এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নন যা দিন দিন আরও অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে অর্থহীন নির্বাচন- কূলদীপ নায়ার

ভাগ্যের পালাবদল হয়, কোন সন্দেহ নেই। আজ যে শাসক, কাল সে প্রতিপক্ষ। তারপরও বাংলাদেশে রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক প্রতিহিংসা দৃশ্যমান। একজন স্বৈরশাসক তো খারাপ বটেই।

এএপির বিতর্কিত পদক্ষেপে স্বস্তি খুঁজছে বিজেপি

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
ভারতের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আম আদমি পার্টির (এএপি) উত্থান প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছিল। এখন এএপির কিছু পদক্ষেপ আগামী লোকসভা নির্বাচনে সাফল্যের ব্যাপারে আশান্বিত করে তুলেছে দলটিকে। এএপির উত্থানে বিজেপির চিন্তার কারণ, কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু জনসমর্থনের বেশির ভাগই এএপির ঝুলিতে গেলে বিজেপির দিল্লি দখলের স্বপ্ন অধরা থেকে যেতে পারে। তবে বিজেপি এখন সেই আশঙ্কা থেকে বেরিয়ে এসে এএপির সাম্প্রতিক বিতর্কিত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরছে জনগণের সামনে। এএপিকে প্রবল সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছে দুই মন্ত্রীর নৈশ অভিযান আর দলীয় প্রধান মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ধরনা। একটি ঘটনায় রাজ্যের আইনমন্ত্রী সোমনাথ ভারতী রাজধানীর খিড়কি অঞ্চলে বসবাসকারী আফ্রিকার নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঝরাতে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালালেও তাঁর নির্দেশ মেনে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অস্বীকার করে।
অন্য ঘটনার নেতৃত্ব দেন মহিলা কল্যাণমন্ত্রী রেখা বিড়লা। সেখানেও পুলিশ তাঁর নির্দেশ মানেনি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশ মানতে পুলিশের অস্বীকৃতির পর ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী ধরনায় বসেন। মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনে আইনমন্ত্রী সোমনাথ যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন, তাঁরা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। উগান্ডার দুই নারী সোমনাথকে শনাক্ত করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে বয়ান দিয়েছেন। ফলে সোমনাথের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কেজরিওয়ালের ওপর চাপ বাড়ছে। ওই ঘটনা ভারত-উগান্ডা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। মন্ত্রীদের নৈশ অভিযান ও সরকারের ধরনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষিত, শালীন, শহুরে মানুষ যাঁরা এএপিকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের মনেও প্রশ্ন উঠছে, এ কাজ কোনো সরকারকে মানায় কি না। এএপির মধ্যেও এর সমালোচনা হচ্ছে। বিজেপি মনে করছে, এএপির উত্থানের পেছনে আবেগ ছিল, রাজনীতি ছিল কম। বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা অরুণ জেটলির মতে, লোকসভার ভোটের সময় দেশের মানুষ অবশ্যই এই আবেগের মোহজাল থেকে বেরিয়ে দৃঢ়, বলিষ্ঠ নেতৃত্বের হাতে দেশের ভার তুলে দেবে।

‘আদর্শগত ঐক্য আছে বলেই ১৮ দলে যাচ্ছি’ -কাজী জাফর আহমদ

জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, যে কোন মুহূর্তে গণ-অভ্যুত্থানে পড়তে পারে সরকার। আর সেই আগুনের বহ্নিশিখা সারা দেশে ছড়িতে পড়তে পারে।
তাসের ঘরের মতো ভেঙে যেতে পারে তাদের স্বপ্ন। তাই বিরোধী জোটের হতাশার কিছু নেই। আমরা শর্টকাট রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার একদিন আগে গতকাল দুপুরে গুলশানের নিজ বাসভবনে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ চলমান আন্দোলন নিয়ে তার আশার কথা জানিয়ে বলেন, বৃহস্পতিবার চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুনের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। চীন বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ও সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চেয়েছে। আমরা তা তুলে ধরেছি। কাজী জাফর বলেন, শনিবার দুপুরে আমাদের দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক। বৈঠকে আমরা ১৮ দলীয় জোটে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবো। নির্বাহী কমিটিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে রাতেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে ১৮ দলে যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে। ১৮ দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে এরশাদকে ত্যাগকারী এ নেতা বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমাদের মতাদর্শগত ঐক্য রয়েছে। আমরা উভয়ই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। এ সম্পর্ককে স্থায়ী রূপ দিতে চাই। কাজী জাফর আহমদ বলেন, ২৪শে জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান দিবস। আইয়ুবের মার্শাল ল’ সরকার যখন বাংলাদেশের জনগণের ওপর তাদের বিজাতীয় শাসন ও শোষণ নিয়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। ঠিক তখন; যখন কোথাও কোন আশার আলো দেখা যাচ্ছিল না। আজকের মতোই হতাশার অমানিশার ঘোর অন্ধকার রাজনীতিকে গ্রাস করে নিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের দলের কমরেড আসাদের ২০শে জানুয়ারি আত্মদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। এ স্ফুলিঙ্গ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। গণ-অভ্যুত্থানের লেলিহান শিখায় আইয়ুবের মসনদকে ছারখার করে দিয়েছিল। ২০শে জানুয়ারি আসাদ ও ২৪শে জানুয়ারি নবকুমার হাই স্কুলের ছাত্র মতিউর রহমানের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে চরম শিখরে পৌঁছেছিল আমাদের আন্দোলন। শহীদ মতিউরের আত্মদানের দিনকে আমরা গণ-অভ্যুত্থানের দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম। তিনি বলেন, আজকেও মনে রাখতে হবে একদলীয় বাকশালী ও ফ্যাসিবাদী শাসনে জনজীবন- অতিষ্ঠ, চারদিকে আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। ঠিক তেমনি আমাদের ’৬৮-৬৯ সালের কথা মনে রাখতে হবে। যে কোন স্থানে যে কোন সময় স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হলে সেখান থেকে গণ-অভ্যুত্থানের বহ্নিশিখা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা মনে রাখতে হবে। হতাশা নয়। গভীর আশাবাদ ও বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ের মাধ্যমে চলমান আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানের দিকে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে অনেকেই আসতে চায়, আমরা শর্টকাট রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমাদের রাজনীতি শাশ্বত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে একদিন এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টির সব নেতাকর্মীই আমাদের জাতীয় পার্টিকে প্রকৃত জাতীয় পার্টি মনে করবে। গত কয়েক মাস ধরে ১৮ দলের কর্মসূচিতে সমর্থন দিচ্ছেন কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির একাংশ।

বর্ধিত সভা: জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভা আজ দুপুর ১২টায় বাড়ি নং-২, রোড নং-৬৮-এ, গুলশান ২-এ অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রেসিডিয়াম সদস্য, উপদেষ্টা, ভাইস চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সব সদস্য এবং জেলা কমিটির সভাপতি সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সভায় দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে করণীয় সম্পর্কে নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

‘আদর্শগত ঐক্য আছে বলেই ১৮ দলে যাচ্ছি’ -কাজী জাফর আহমদ

জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ বলেছেন, যে কোন মুহূর্তে গণ-অভ্যুত্থানে পড়তে পারে সরকার। আর সেই আগুনের বহ্নিশিখা সারা দেশে ছড়িতে পড়তে পারে।

অন্যরকম আড্ডায় এবিএম মূসা by কাজল ঘোষ

দু’মাস হয়ে গেছে মূসা ভাই টকশোতে আসছেন না। চারপাশের এন্তার জিজ্ঞাসা। মূসা ভাই কোথায়? এক টকশো দর্শক প্রায়ই ফোনে জানতে চান, আপনার বয়স্ক বন্ধু কি নিষিদ্ধ?
গলার আওয়াজ ক্ষীণ করে বলি, মূসা ভাইয়ের শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। না হলে রাতে আসবেন কি না আমি ফোন দেয়ার আগে মূসা ভাই-ই জানতে চাইতেন। গম্ভীর কণ্ঠে সেলফোনে বলে উঠতেন সোমবারের সকালে, ‘আছি... না... নাই।’ আসছে ফেব্রুয়ারিতে সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই মানুষটি পা দেবেন তিরাশিতে। তাতে কি, তিনি যেন সবারই বন্ধু। বয়স যেন কোন বাধা নয়। আপন করে নেন মুহূর্তেই। আড্ডা দেন। হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখেন ছেলেবুড়ো সকলকেই। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় তিরিশে ডিসেম্বর ভর্তি হন ল্যাবএইডে। পাঁচতলায় ৫০২ নং কক্ষে গিয়ে মূসা ভাইকে তার ব্যতিক্রম পাইনি। চিরচেনা মানুষটির শরীর রোগভারে নুয়ে পরলেও ভেতরে একইরকম তারুণ্য। ভিভিআইপি ৫০২ নং কক্ষটি ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়ে গেছে এবিএম মূসার নামেই।
ছুটির সকালে একটু দেরি করেই সেন্ট্রাল রোডের ল্যাব এইড হাসপাতালের কার্ডিয়াকে পৌঁছি। সঙ্গী আলোকচিত্রী শাহীন কাউসার। লিফটে ওঠতে ওঠতে বলি, সুযোগ পেলে তবেই কিন্তু ছবি তুলবেন। মূসা ভাইকে কোনভাবেই বিরক্ত করা যাবে না। অনেকরকম ওষুধ আর পথ্যের ভিড়ে ঘুম ভাঙতে খানিকটা দেরি হয় তা আগেই জেনেছিলাম। বন্ধুবর সাইদুজ্জামান শাহীন আগেই জানিয়েছিলেন মান্না ভাই আছেন। বুঝলাম, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এসেছেন। কেবিনে নক করার প্রয়োজন হয়নি। দরোজা খোলাই ছিল। ঢুকতেই মূসা ভাইয়ের থেমে থেমে জিজ্ঞাসা, মিডিয়ার অবস্থা কি? টকশো কেমন চলছে? কারা কারা এখন আসে? বিস্তারিত নামগুলো শুনতেও চাইলেন ঘাড় কাত করে। হাতে পত্রিকা। চোখ বুলাতে বুলাতে মান্না ভাই তার নিজের ট্যাবে ছবি তুলতে অনুমতি চাইলেন মূসা ভাইয়ের। নিজের ফেসবুক একাউন্টে ছবিটি আপলোড করতে চান। সুযোগ হাতছাড়া না করে শাহীন কাউসারকে ক্লিক করতে বলি। মূসা ভাইও ক্যামেরার লেন্সকে সুযোগ করে দিলেন প্রত্যাশিত ছবির জন্য। টুকটাক কথার মধ্যেই সপ্রাইটের ক্যান দিতে ইশারা করলেন। চলমান রাজনীতির কথা আসতেই কিভাবে সামনে এগুবে নাগরিক ঐক্য তা জেনে নিলেন মান্না ভাইয়ের কাছ থেকে। জাতির পিতা নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গ আসতেই সবাইকে থামিয়ে দিয়ে মান্না ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবার নাম কি? আসরার উদ্দীন বলতেই মূসা ভাইয়ের দৃষ্টি আমাদের দিকে। বাবার নাম স্থায়ী। এটা কোন বিতর্কের বিষয় নয়। বিএনপি এখন কি করবে? ঘুরেফিরে কথা ওঠতেই বলেন, শুধু অপেক্ষা। কিছুই করতে হবে না। এক ফাঁকে দু’তিন সহযোগী নিয়ে ড. বরেণ চক্রবর্তীর প্রবেশ। স্যার কেমন আছেন? ক’বছর থাকতে হবে- পাল্টা প্রশ্ন এবিএম মূসার। আপনিতো আগের চেয়ে অনেক ভাল। এইতো এখন কথা বলতে পারছেন। বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট বরেণ চক্রবর্তী একজন ভ্রমণ লেখক হিসেবেও খ্যাত। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও। এবার বইমেলায় কি আসছে? আমার প্রশ্নে অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠেন, বাংলাদেশের সবচে’ দীর্ঘ উপন্যাস আসছে। নাম দিয়েছি, ‘রাশিয়ার মেয়ে’। রুশ বিপ্লব নির্ভর উপন্যাসটি প্রায় সাড়ে বারো শো পৃষ্ঠার হবে।
ভাঙা গলায় মূসা ভাই- বরেণতো অনেক ভ্রমণ কাহিনী লিখেছো, আমাদের সময় কার ভ্রমণ কাহিনী জনপ্রিয় ছিল। ইনিয়ে বিনিয়ে আমরা সঞ্জীব চট্ট্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা বললেও না ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে মূসা ভাই বললেন, রমানাথ বিশ্বাস-এর ভ্রমণ কাহিনী ছিল সবচে’ মজার। সৈয়দ মুজতবা আলী কতটা কৌতুকপ্রিয় ছিলেন তাও আমাদের শোনালেন। একবার এক ঘোড়ার গাড়ির কোচওয়ানকে মুজতবা আলী বললেন, তুমি যখন জোরে গাড়ি ঘুরাও আমি তখন ভয়ে দু’চোখ বন্ধ করে রাখি। কোচওয়ানের ফিরতি জবাব ছিল, স্যার আমিও তখন চোখ বন্ধ রাখি। একে একে ৫০২ নং কক্ষে আলোচনায় আসে অস্কার ওয়াইল্ড, চার্লস ডিকেন্স, অলিভার ট্যুইস্ট, বার্নার্ড শ থেকে বাংলাদেশের ভাল লেখক কে আর ভোগাস লেখক কে তাও। একসময় মান্না ভাই বিদায় নেন। বলে যান, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তায় নাগরিক ঐক্যের সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে চান। মূসা ভাইকে প্রধান অতিথি করবেন। সাগ্রহে সম্মতি জানালেন। বললেন, তুমি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চাইলে এখানেও করতে পারো। এটাই প্রথমবার আসেননি, আগেও অন্তত বিশবার এসেছেন ল্যাবএইডে। আর কটা দিন থাকতে হবে। এই বলে বেরিয়ে যান বরেণ দা-ও। খুব ক্লান্ত লাগছে, বিশ্রাম দরকার- মূসা ভাইয়ের স্বগতোক্তি।
বিদায় নেব দাঁড়াতেই উদাস দৃষ্টি মূসা ভাইয়ের। আমি আবার হাঁটতে পারবোতো? বাসায় গিয়ে চেয়ারে বসতে পারবোতো? আর্থোপেডিকস-এর সমস্যা চেপে ধরেছে মূসা ভাইকে। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমেছে। ডায়াবেটিস ছাড়া প্রায় সব রোগই এক আধটু বাসা বেঁধেছে মূসা ভাইয়ের শরীরে। মিরপুর রোডের সদর রাস্তাটি দেখা যায় ৫০২ নং কক্ষের বড় কাঁচের দেয়াল দিয়ে। যেখানে শীতের এক মুঠো দুপুরের রোদেলা আলো এসে ঠাঁই নিয়েছে মূসা ভাইয়ের কপালে।

অন্যরকম আড্ডায় এবিএম মূসা by কাজল ঘোষ

দু’মাস হয়ে গেছে মূসা ভাই টকশোতে আসছেন না। চারপাশের এন্তার জিজ্ঞাসা। মূসা ভাই কোথায়? এক টকশো দর্শক প্রায়ই ফোনে জানতে চান, আপনার বয়স্ক বন্ধু কি নিষিদ্ধ?

আগাম নির্বাচনে রাজি না হলে কঠোর আন্দোলন

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গতকাল সংঘর্ষের সময় দাঙ্গা পুলিশকে
লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ছেন একজন বিক্ষোভকারী। অন্যরা পুলিশের
হাত থেকে বাঁচতে নিজেদের আড়াল করেন ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের সরকারবিরোধীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট আগাম নির্বাচন দিতে রাজি না হলে তাঁদের আন্দোলন আরও কঠোর হবে। চলমান সংকট নিরসনে প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সঙ্গে বিরোধী নেতাদের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো। গত বুধবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানী কিয়েভের গ্রুশেভস্কি স্ট্রিটে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। এতে পাঁচ বিক্ষোভকারী নিহত হন। আহত হন বেশ কয়েকজন।
বুধবার রাতভর দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে শত শত বিক্ষোভকারীর সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। জবাবে পুলিশ গ্রেনেড ও গুলি ছোড়ে এবং জলকামান ব্যবহার করে। গতকাল সকালে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীর উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী (ইইউ) নেতা ভিটালি ক্লিচকো বলেন, সরকারের সামনে এখন একটা পথই খোলা। আর তা হলো আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া। প্রেসিডেন্ট যদি আগাম নির্বাচন দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে চলমান আন্দোলন আরও কঠোর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী মিকোলা আজারোভ বলেছেন, এখনো সমঝোতা হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বিরোধীদের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসা উচিত। রাশিয়ার চাপের মুখে গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ ইইউর সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে অস্বীকৃতি জানালে ইইউপন্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এএফপি ও বিবিসি।

ম্যান্ডেলার ভাস্কর্যের কানে খরগোশ

ম্যান্ডেলার ভাস্কর্য
বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নন্দিত নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার বিশাল একটি ভাস্কর্যের মধ্যে স্থাপিত একটি ব্রোঞ্জের খরগোশ অপসারণ করা হবে। ম্যান্ডেলার ‘মূর্তির ভাবগাম্ভীর্য’ বজায় রাখতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খরগোশের ভাস্কর্যটি ম্যান্ডেলার ৩০ ফুট উঁচু মূর্তির কানের মধ্যে স্থাপন করেছিলেন শিল্পী রুহান জ্যান্স ভব ভুরেন ও আন্দ্রে প্রিন্সলু। তাঁরা বলেন, মূর্তিতে তাঁদের স্বাক্ষর খচিত করতে বাধা দেওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ তাঁরা এই কাজ করেছিলেন। আফ্রিকান ভাষায় খরগোশকে ‘হ্যাস’ বলা হয়।
শব্দটির আরেকটি মানে হচ্ছে ত্বরা বা দ্রুত কাজ সম্পাদন করা। প্রিন্সলু বলেন, ভাস্কর্যটির কাজ শেষ করতে তাঁদের তাড়া দেওয়া হয়েছিল। দ্রুততম সময়ে কাজটি শেষ করা ছিল সত্যিই কঠিন। সেটির প্রতীকী প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা খরগোশটি স্থাপন করেন। এ জন্য তাঁরা এখন দুঃখ প্রকাশ করছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা গত ৫ ডিসেম্বর জোহানেসবার্গে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর ১১ দিন পর ওই ব্রোঞ্জমূর্তি উদ্বোধন করা হয়। এতে খরগোশ স্থাপনের বিষয়টি গত সপ্তাহে ধরা পড়ে। রয়টার্স।

মোড়লদের নির্দেশে গণধর্ষণ!

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলায় গ্রামের মোড়লদের নির্দেশে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক আদিবাসী তরুণী (২০)। ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের ‘অপরাধে’ ওই তরুণীকে প্রায় ১২ জন পুরুষ ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় গ্রামের প্রধানসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার সি সুধাকর গতকাল বৃহস্পতিবার এ খবর নিশ্চিত করে বলেন, বীরভূমের সুবলপুর গ্রামে ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক তরুণের সঙ্গে একজন আদিবাসী তরুণীকে গত সোমবার বিকেলে একসঙ্গে আটক করা হয়। এরপর গ্রাম্য মোড়লদের সমন্বয়ে গঠিত একটি অবৈধ আদালতের (ক্যাঙারু কোর্ট) বিচারের রায়ে প্রথমে ওই তরুণীকে ২৫ হাজার রুপি জরিমানা করা হয়। কিন্তু ওই জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করায় গ্রাম্য মোড়লেরা ওই তরুণীকে গণধর্ষণের নির্দেশ দেয়। এরপর সোমবার দিবাগত রাতে ওই তরুণীকে জোর করে একটি ঘরে আটকে রেখে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত গণধর্ষণ করা হয়। শান্তিনিকেতন থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে লাভপুর থানার এক গ্রামে ওই তরুণী গণধর্ষণের শিকার হন। তাঁর প্রেমিক চৌহাট্টা গ্রামের। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীর মা বলেন, ওই জরিমানার অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য তাঁদের নেই।
তাঁদের গ্রামের লোকজনই তাঁর মেয়েকে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। পুলিশে খবর না দিতে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়। গুরুতর আহত তরুণীকে হাসপাতালে নিতেও ধর্ষকেরা বাধা দেয়। তাঁর অবস্থার অবনতি হতে থাকলে বুধবার বিকেলে এক ফাঁকে তাঁরা ঘর থেকে পালিয়ে তাঁকে প্রথমে লাভপুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখান থেকে বোলপুর ও পরে সুরি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, ‘কঠোর পরিশ্রমী আদিবাসী’ বলেই ভয়াবহ নির্যাতনের পরও ওই তরুণী বেঁচে আছেন। পুলিশ কর্মকর্তা সুধাকর বলেন, মঙ্গলবার রাতে দুজনকে আটকের পর সালিস ডেকে গ্রাম্য মোড়লেরা ওই তরুণীর বিচার করেন। তাঁর প্রেমিককেও সেখানে হাজির করা হয়। দুজনকে দুটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। বিচারে দুজনকে ২৫ হাজার রুপি করে জরিমানা করা হয়। তরুণীর মা-বাবাকে ওই জরিমানা পরিশোধ করতে বলা হয়। কিন্তু তাঁরা এ অর্থ পরিশোধের সামর্থ্য নেই বলে অনুনয়-বিনয় করেন। এ সময় মোড়লদের প্রধান ক্ষিপ্ত হয়ে ওই তরুণীকে গণধর্ষণের জন্য গ্রামের লোকজনকে নির্দেশ দেন।
আর ওই প্রেমিক এক সপ্তাহের মধ্যে জরিমানা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তি পান। হাসপাতালে কাতরাতে কাতরাতে ওই তরুণী ক্ষীণ স্বরে বলেন, ‘একজনের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিছু লোক আমাদের দুজনকে ধরে গ্রামপ্রধানের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সালিস করে আমাকে ৫০ হাজার রুপি দিতে বলেন। আমি দিতে পারব না বললে, আমার ওপর পাশবিক নির্যাতন শুরু হয়।’ চাঞ্চল্যকর এই গণধর্ষণের পর ভারতে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতার বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। দিল্লিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে চলন্ত বাসে এক মেডিকেল ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হন। পরে গুরুতর আহত ওই তরুণী সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। এরপর ধর্ষণবিরোধী আরও কঠোর আইন হলেও দেশটিতে একের পর এক যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলছে। নয়াদিল্লিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে একজন ডেনিশ নারী পর্যটক তাঁর হোটেলে ফেরার পথ হারিয়ে দুর্বৃত্তদের কবলে পড়েন এবং গণধর্ষণের শিকার হন।

জীবন দিয়ে জ্বালা মেটালো রানা প্লাজায় আহত সালমা

জীবন দিয়ে জ্বালা মেটালো রানা প্লাজায় আহত গার্মেন্ট শ্রমিক সালমা। দীর্ঘ নয় মাস দেহের যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছেন তিনি। একদিকে অর্থাভাব অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয় মেটানো ছিল তার জন্য দুঃসাধ্য।
তারপরও বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি। এজন্য নিয়েছিলেন অন্য একটি গার্মেন্টে চাকরিও। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কিছু দিন কাজও করেছেন। নয় মাস আগে এক ভোরে সাভারের রানা প্লাজায় স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন সালমা। সেদিন দেয়ার কথা ছিল বেতন। সে স্বপ্ন মিইয়ে যায় রানা প্লাজার কংক্রিটের সঙ্গে। গত বছরের ২৪শে এপ্রিল ভয়াবহ সেই ধসের সময় অন্যদের মতো তিনিও আটকা পড়েছিলেন ভেতরে। তিন দিন পর উদ্ধার করা হয় তাকে। মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পেয়েছিলেন মারাত্মক আঘাত। এনাম মেডিকেল, সিআরপিসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাও করানো হয়েছে তাকে। তারপরও পুরোপুরি সুস্থ হননি সালমা। স্বামী বাবুকে নিয়ে উঠেন তুরাগ থানাধীন বামনারটেক ফজলু মিয়ার টিনশেড এক বাড়িতে। বাসের হেলপার স্বামী বাবুর আয়ও নিতান্ত হাতেগোনা। তার ওপর অসুস্থ সালমার চিকিৎসা। যেন এক মস্ত বোঝা বাবুর ওপর। ইতিমধ্যে সরকার থেকে পাওয়া অর্থও শেষ করেছে তার চিকিৎসায়। কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। বাবু জানায়, যখন শরীরের ব্যথা আঁকড়ে ধরতো সালমা তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতো। অসহ্য হয়ে মাথা ঠুকতো দেয়ালে। শেষ ক’দিনও মৃত্যুকে ডেকেছে সে। আত্মহত্যা করেই জীবন জ্বালা মিটিয়েছে সে। ঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে  সালমা। গতকাল সকালে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
নিহত সালমার স্বামী বাবুর বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তিনি নিজে গাড়িচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তার স্ত্রী সালমা কাজ করতো রানা প্লাজার সপ্তম তলার একটি গার্মেন্টে। ধসের পর থেকে তার মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু অর্থাভাবে ভালভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। চলতি মাসের প্রথম দিন তারা সাভার থেকে বাসা পরিবর্তন করে রাজধানীর তুরাগ থানাধীন বামনারটেক এলাকায় আসেন। স্থানীয় ফজলুর রহমানের টিনশেড বাড়ির ছোট দুটি কক্ষ ভাড়া নেন। বৃহস্পতিবার রাতেও স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছেন। রাত ১২টার দিকে দু’জনে একসঙ্গে ঘুমাতে যান। ভোরে স্বামী ঘুম থেকে উঠে দেখেন স্ত্রী সালমা তার পাশে নেই। কক্ষের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। এ সময় তিনি প্রতিবেশীদের ডাক দিলে প্রতিবেশী ইউনুস বাইরের ঘরের দরজা খুলতে গেলে সেটি ভেতর থেকে আটকানো দেখতে পান। পরে জানালা দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন সালমার স্বামী বাবু। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় তুরাগ থানার পুলিশ। সকাল দশটার দিকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

সরজমিন ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ঘরের বিছানার পাশের একটি বাটিতে বেশ কয়েক ধরনের ওষুধপত্র পড়ে আছে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধগুলো খেতে হতো সালমাকে। নিহত সালমার ভাই শফিক ও তার স্ত্রী ঘরের জিনিসপত্রগুলি নিয়ে যাওয়ার জন্য গোছাচ্ছিলেন। ভাই শফিক জানান, রানা প্লাজা ধসে আহত হওয়ার পর তার বোন সরকারি ও বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার কাছ থেকে মোট এক লাখ ২০ হাজার টাকা পেয়েছিল। কিন্তু পুরো টাকাই সালমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। নিরূপায় হয়ে তুরাগের একটি কোরিয়ান গার্মেন্টে নতুন কাজও নেয়। কিন্তু মাথার যন্ত্রণার কারণে নিয়মিত কাজ করতে পারতো না।
প্রতিবেশী ইউনুস জানান, রানা প্লাজায় আহত হওয়ার পর থেকে সালমা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। দুই-তিন দিন পরপরই মাথা ব্যথায় সে নিজের চুল নিজেই টেনে ছিঁড়ত। একই সঙ্গে দেয়ালে মাথা আছড়িয়ে যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করতো। তাদের কোন পারিবারিক কলহ ছিল না।
এদিকে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রাথমিক তদন্তে ও প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে, নিহত সালমা রানা প্লাজার গার্মেন্টে চাকরি করত। রানাপ্লাজা ধসের কারণে তার মাথায় ও শরীরে আঘাত পায়। এতে তার শারীরিক যন্ত্রণা হতো। যার প্রেক্ষিতে সালমা একটু অস্বাভাবিক ছিল। বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে যে কোন সময়ে সে নিজের ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে। তুরাগ থানার এসআই কামাল হোসেন বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সালমা মাথায় আঘাত পেয়েছিল বলে তার স্বামী জানিয়েছে। এতে তার মাথায় যন্ত্রণা হতো। ওই যন্ত্রণার কারণেই সে আত্মহত্যা করে। সালমার স্বামী বাবুকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। ফজলুর বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক হালিমা নামে এক নারী  মামলার বাদী হয়েছেন। সালমার আত্মহত্যার কারণ ও অন্য বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, নিহত সালমার এটি দ্বিতীয় বিয়ে। এর আগে প্রথম ঘরে তার এক ছেলে রয়েছে। ওই ছেলে চট্টগ্রামে একটি মাদরাসায় পড়াশুনা করছে। দুই বছর আগে বাবুর সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। এই ঘরে তাদের কোন সন্তান নেই। তার বাবার নাম ফটিক জোয়ার্দ্দার। মা নুরজাহান বেগম। তাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসা থানাধীন বসুরা পশ্চিম পাড়ায়। এ ছাড়া তার স্বামী বাবুর গ্রামের বাড়ি জামালপুরের সদর থানার চর সরিষাবাড়িতে।