Wednesday, June 13, 2018

ফুটবল উন্মাদনা by সাজেদুল হক

বাঙালি হয়তো বিভক্তি ভালোবাসে। রাজনীতি থেকে খেলার মাঠ। বিদ্যায়তন থেকে সংস্কৃতি অঙ্গন। বিভক্তি সর্বত্র। সব জায়গায় আমরা দুই ভাগ।
আওয়ামী লীগ-বিএনপি । আবাহনী-মোহামেডান। দরজায় কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। পৃথিবী নামক ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। রাশিয়া বিশ্বকাপে আমাদের অংশগ্রহণ নেই। অতীতে কোনো বিশ্বকাপে ছিলো না। ভবিষ্যতেও থাকবে না- এটা মোটামুটি হলফ করে বলে দিতে পারি। কিন্তু, ফুটবল জ্বর আর উন্মাদনার কথায় যদি আসি সম্ভবত পৃথিবীর কোনো দেশ থেকেই আমরা পিছিয়ে নেই। এবং যথারীতি এখানেও দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বাংলাদেশ। অন্যান্য দলের সাপোর্টার যে একেবারে নেই তা বলা যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও যেমন আওয়ামী লীগ-বিএনপি’র বাইরেও দল আছে, সাপোর্টার আছে। কিন্তু কে না জানে, এখনও মোটাদাগে আওয়ামী লী-বিএনপি এই দুই ক্লাবেই বিভক্ত বাংলাদেশ।
ফুটবলেও বাংলাদেশ ভাগ হয়ে গেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়। সোশ্যাল মিডিয়া এ বিভক্তিতে ভালোই রসদ জোগাচ্ছে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাপোর্টাররা এখানে অনেকটাই মুখোমুখি। পবিত্র রমজান মাসেও ফুটবল নিয়ে যেন উন্মাদনা চলছে। পতাকা লাগাতে গিয়ে মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে। কেউ নিজের জমি বিক্রি করে বানাচ্ছেন পতাকা। কেউবা আবার বাড়ি রাঙাচ্ছেন প্রিয় দলের পতাকার রঙে। ভদ্রলোকের নাম দিয়েগো ক্রুসিয়ানি। বাংলাদেশ ফুটবল দলের কোচ ছিলেন এই আর্জেন্টাইন। ১১ বছর আগে বাংলাদেশ ছাড়লেও এ দেশ এখনো তার হৃদয়ে আঁকা। ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপের সময় ঢাকায় ছিলেন তিনি। সে সময় তিনি বিস্মিত হয়ে দেখেন ঢাকার বাড়িঘরের ছাদে ছাদে আর্জেন্টিনার পতাকা। আকাশি-নীল-সাদার এই ঢেউ তার হৃদয়ে এখনো আঁচড় কাটে। বুয়েন্স আয়ার্সেও আর্জেন্টিনার এতো পতাকা তিনি কখনো দেখেননি। আরেকটি খবরও এরই মধ্যে চাউর হয়েছে। বাংলাদেশে ফুটবলের এই উন্মাদনার খবর সংগ্রহ করতে খোদ ব্রাজিল থেকে তিন সাংবাদিক আসছেন। ব্রাজিলের গ্লোবো টিভি’র তিন সাংবাদিক ঢাকায় পা রাখবেন আগামী ১৫ই জুন।
ফুটবলের কালো মানিক পেলে। বহুবছর আগেই স্থান করে নিয়েছেন এদেশের পাঠ্যবইয়ে। আর ম্যারাডোনা। বিটিভি’র বদৌলতে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যান এ যাদুকর। তার নান্দনিক ফুটবলের প্রেমে মত্ত হন লাখ লাখ বাঙালি। পরে তিনি রীতিমতো পরিণত হন এক মিথে। যে কারণে দুইযুগের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে না পারলেও আর্জেন্টিনার সমর্থনে আজো ভাটা পড়েনি এ ভূমে। মূলত পেলে-ম্যারাডোনা প্রেমে বুঁদ হয়েই এ অঞ্চলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার একচ্ছত্র আধিপত্য।
কেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এ উন্মাদনা। একটা জবাবতো পাওয়াই গেলো। পেলে-ম্যারাডোনার বড় ভূমিকা এখানে। এমনিতে ফুটবল খুব সহজ খেলা। আগেই বলেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিশ্বজনীন খেলাও বটে। ফুটবলের কোনো ধর্ম নেই, জাত নেই। দ্য বিউটিফুল গেম। নোংরা রাজনীতি যে এখানে একেবারে নেই তা নয়। রাজনীতির কাছে কখনো কখনো ফুটবল হেরে গেছে। তবুও মাঠের চৌহদ্দিতে জীবনের মানে খোঁজেন অনেকে। কত হাঁসি, কত কান্না। কত তারকার পতন দেখেছে বিশ্বকাপ। কত তারকার উত্থান। পেনাল্টি মিস করে কত বিখ্যাত ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে। মাদক কেড়ে নিয়েছে কত জীবন, ভালোবাসা। যদিও ভালোবাসারও জয় হয়েছে শেষ পর্যন্ত। দিয়েগো ম্যারাদোনার সে কান্না আজো কী ভুলতে পেরেছে মানুষ। কোনদিন কী ভোলা যাবে?
বিশ্বকাপ এখনো মাঠে গড়ায়নি। তবে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় এরই মধ্যে রীতিমতো কম্পন শুরু হয়ে গেছে ৫৬ হাজার বর্গ মাইলে। রাশিয়াতেও এতো উত্তেজনা আছে কি-না কে জানে? বিশ্বকাপের এই সময়ে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তৈরি হবে কত আখ্যান। কেউ বা আনন্দে উদ্বেলিত হবেন। কারো চোখের জল পড়বে নীরবে, কারো বা প্রকাশ্যে। হুমায়ূন থেকে ধার করে বলি, চোখের জল মানুষের কোনো ক্ষতি করে না।
হাসি-কান্না যাই হোক এটা গ্যারান্টি দিয়েই বলা যায়, আগামী দেড় মাস বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল খাবে, পান করবে। কেননা, এই সময়টা ফুটবলই তাদের জীবন।

বিশ্ব কুদস-দিবস ও পলাশী বিপর্যয়: বিজাতীয় ষড়যন্ত্র রুখতে মুসলিম-ঐক্যের শিক্ষা দেয়

২৩ জুন ২০১৭ এর বিশ্ব কুদস-দিবসের আলোচনাঃ আজ বিশ্ব কুদস দিবস ও একইসঙ্গে ঐতিহাসিক ২৩ জুন তথা ঐতিহাসিক পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। ৫০ বছর আগে মুসলমানরা ইসরাইলের কাছে হারায় তাদের প্রথম কিবলা কুদস। আর প্রায় ৭০ বছর আগে ব্রিটেনের মদদে গজিয়ে-তোলা ইসরাইল নামক সেই ক্যান্সার এখন বিশ্ব-শান্তি ও সভ্যতার জন্য হয়ে ওঠেছে অন্যতম প্রধান হুমকি।
২৬০ বছর আগে এ দিনে পলাশীর আম বাগানে ইংরেজদের সঙ্গে এক প্রহসনের যুদ্ধে বৃহত্তর 'বাঙ্গালা' তথা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ঘটে। ফলে অস্তমিত হয় বৃহত্তর বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য।
ইরানি বংশোদ্ভূত ও শিয়া মুসলিম এই নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যু হলেও উপমহাদেশের মানুষ নবাবকে আজও শ্রদ্ধা জানায়। তার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি।
নানা ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবাবের সেনা বাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত।
সে যুগে ইংরেজরা বাণিজ্যের অজুহাতে এবং ছলে-বলে কৌশলে বিশ্বের নানা দেশে সার্বিক কর্তৃত্ব ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। মোঘলদের দুর্বলতার সুযোগে তারা বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার পায় ভারতে। এরপর অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও নাক গলাতে থাকে ইংরেজরা। তাদের ষড়যন্ত্রমূলক ও উস্কানিমূলক পদক্ষেপ ক্ষুব্ধ করেছিল স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজকে।
খ্রিস্টীয় ১৭৫৬ সনের ২০ জুন সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজদের শিক্ষা দিতে ও তাদের দম্ভ কমাতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করেন। কারণ, সামরিক আস্তানায় পরিণত হওয়া এ দুর্গ হয়ে পড়েছিল বাংলার স্বাধীনতার প্রতি মারাত্মক হুমকি। এ দুর্গের সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন নবাব। কিন্তু ইংরেজকে তার এই আপত্তিকে অগ্রাহ্য করায় দুর্গটি দখল করতে বাধ্য হন নবাব সিরাজ।
এ সময় জন জেপানিয়াহ হলওয়েল নামের এক ধূর্ত ইংরেজ 'কোলকাতার অন্ধকূপ হত্যা' নামের একটি আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে নবাবকে গণহত্যাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এই গাঁজাখুরি কাহিনীতে বলা হয় যে, ১৪৬ জন ইংরেজকে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি গর্তে রাখায় তারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে। হলওয়েল নিজে ওই ঘটনায় বেঁচে যায় বলে দাবি করে। গবেষক ও ঐতিহাসিকরা এই কাহিনীকে একটি পুরোপুরি মিথ্যা কাহিনী হিসেবে অস্বীকার করে আসছেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার লেখা "An Advanced History of India" শীর্ষক বইয়ে অন্ধকূপ হত্যা বা 'ব্ল্যাক হোল স্টোরি'-কে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশ পণ্ডিত ও গবেষক জে.এইচ লিটলও "The 'Black Hole'—The Question of Holwell's Veracity" বা 'অন্ধকূপ হত্যা- হলওয়েলের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন' শীর্ষক প্রবন্ধে হলওয়েলের বর্ণিত এই কাহিনীকে 'বড় ধরনের ধোঁকা' বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতবর্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে ও এই লক্ষ্যে ব্রিটেনের লোকদের ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই কাহিনী রচনা করা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
আলীবর্দী খাঁর পর তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বা মতান্তরে ১৮ বছর। ইংরেজরা ছাড়াও তরুণ নবাবের শত্রু ছিলেন রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা পাকাপোক্ত করে।
ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে ‘এজেন্ট' নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীর জাফর তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে সেনাপতি করেন। কিন্তু কূটচালে পারদর্শী মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য ‘কাল' হয়ে দাঁড়ায়।
[মুসলিম বিশ্বে কুরআনকে অপব্যবহারের রাজনীতি শুরু করেছিল ইসলামের ইতিহাসের ম্যাকিয়াভেলি তথা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও তার সুযোগ্য উপদেষ্টা আমর ইবনে আস। সিফফিনের যুদ্ধে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র সেনাদলের হাতে যখন মুয়াবিয়ার বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল তখন আমর ইবনে আস মুয়াবিয়ার একদল সেনার বর্শা বা তরবারির আগায় কুরআনের পৃষ্ঠা বেঁধে আলীর সেনাদলকে বিভ্রান্ত করার কৌশল প্রয়োগ করে। এ কৌশল সফল হয়েছিল। হযরত আলী যতই বোঝাচ্ছিলেন যে এটা হচ্ছে ধোঁকাবাজি, ওরা তথা মুয়াবিয়া-চক্র প্রথমেই কুরআনের শান্তির বাণীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিন্তু বিভ্রান্ত সরলমনা সেনারা যুদ্ধ না থামালে উল্টো আলীকেই হত্যা করবে বলে হুমকি দিতে থাকে। কবি নজরুল এ প্রসঙ্গে এনেছেন তার কবিতায় এভাবে: এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !]
ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, বিদ্রোহী কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল প্রায় ৮ টার দিকে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মীর মর্দান ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। ফলে বাংলার স্বাধীনতা প্রায় দু'শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার বা মতান্তরে এক লাখ সেনা আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীরজাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি।
ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র লিখেছেন, ‘নবাব ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর যদি মীর জাফরকে বন্দি করতেন, তবে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারী ভয় পেয়ে যেতো এবং ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে পলাশীর যুদ্ধ হতো না।'
ঘৃণ্য মীর জাফরের কুষ্ঠরোগে মারা যায়। ইংরেজরা প্রথমদিকে ইয়ার লতিফকে হাত করে তাকে নবাব বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে তারা মীরজাফরকেই তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য বেশি উপযোগী ভেবে মীরজাফরের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে এগিয়ে যায়।
বাংলাপিডিয়ায় পলাশীর যুদ্ধের পটভূমি ও যুদ্ধের বিবরণ সম্পর্কে লেখা হয়েছে:
"১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজউদ্দৌলার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নওয়াব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। নবীন নওয়াব প্রথম বারের মত বাংলায় কোম্পানির অবৈধ কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর তিনটি প্রধান অভিযোগ ছিল: অনুমতি ব্যতীত ফোর্ট উইলিয়মে প্রাচীর নির্মাণ ও সংস্কার, ব্যক্তিগত অবৈধ ব্যবসা এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা দস্তকের নির্লজ্জ অপব্যবহার এবং নওয়াবের অবাধ্য প্রজাদের বেআইনিভাবে আশ্রয় প্রদান। উল্লিখিত অভিযোগসমূহের মীমাংসার জন্য পদক্ষেপ নিতে নওয়াব ব্রিটিশদের আহবান জানান এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের জন্য কলকাতায় অনেক প্রতিনিধিদল পাঠান। নওয়াব কোম্পানির নিকট কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে সমর্পণের দাবি করেন এবং নতুন প্রাচীর ভেঙে ফেলতে ও কলকাতার চারদিকের পরিখা ভরাট করতে নির্দেশ দেন। নওয়াবের যে বিশেষ দূত এ সকল দাবি সম্বলিত চিঠি নিয়ে কলকাতায় যান ইংরেজরা তাকে অপমানিত করে। কলকাতার ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক যে চরম অপমানজনকভাবে নওয়াবের প্রতিনিধি নারায়ণ সিংহকে বিতাড়িত করে তা সবিস্তার শুনে নওয়াব অত্যন্ত রাগান্বিত হন। নওয়াব তৎক্ষণাৎ কাসিমবাজার কুঠি অবরোধের আদেশ দেন। কুঠির প্রধান আত্মসমর্পণ করে কিন্তু কলকাতার ইংরেজ গভর্নর অবাধ্যতা ও একগুঁয়েমি প্রদর্শন করেন। ফলে নওয়াব কলকাতা অভিযান করে তা দখল করে নেন। এ পরাজয়ের পর বাংলায় কোম্পানির পুনঃপ্রতিষ্ঠা দুই উপায়ে করা সম্ভবপর ছিল, হয় নবাবের নিকট আত্মসমর্পণ নচেৎ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বল প্রয়োগ। বাংলায় যে সকল ব্রিটিশ ছিল তারা অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর জন্য মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জে জরুরি খবর পাঠায়। সেখান হতে রবার্ট ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াটসনের অধীনে একদল ব্রিটিশ সৈন্য বাংলায় পাঠানো হয়। তারা ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা পুনরুদ্ধার করে এবং নওয়াবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের সঙ্গে আলীনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ...
কিন্তু ইংরেজরা সন্ধির শর্তাদি অগ্রাহ্য করতে থাকায় যুদ্ধের চাপা উত্তেজনা চলতে থাকে। তারা নওয়াবের প্রতি বিরূপ পারিষদদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মুর্শিদাবাদ দরবারে কিছু প্রভাবশালী অমাত্য নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি যে অসন্তুষ্ট ছিল তা অস্বীকার করা যায় না। নওয়াবকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তবে ব্রিটিশগণ সক্রিয়ভাবে এ ষড়যন্ত্রে জড়িত না হলে আদৌ কোন পলাশী ‘বিপ্লব’ সংঘটিত হওয়া সম্ভব হতো কিনা তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। ....
অনেক ঐতিহাসিক যদিও দৃঢ়ভাবে মত পোষণ করেন যে, ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীগণই সহযোগিতা লাভের আশায় পরিকল্পিত ‘বিপ্লব’ ঘটানোর জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তবুও দলিলাদির সঠিক ও সতর্ক বিশ্লেষণে সন্দেহাতীত ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশরাই তাদের পরিকল্পিত ‘বিদ্রোহ’ বাস্তবায়নের জন্য নওয়াব দরবারের বিরুদ্ধবাদীদের সমর্থন আদায়ের জন্য যোগাযোগ করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। …. 
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। মীর মর্দান, মোহন লাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নব সিং হাজারী প্রমুখের অধীন নওয়াব সেনা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালায়, অন্যদিকে মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভরামের অধীন নওয়াবের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সেনা নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ও পরিস্থিতি অবলোকন করে। এমনকি বেশ কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পরও চূড়ান্ত কিছু ঘটে নি। ক্লাইভ এমন প্রতিরোধ পাবেন আশা করেন নি এবং এই মর্মে জানা যায় যে, ‘দিনে যথাসম্ভব তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে’ ক্লাইভ রাতের অন্ধকারে কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন। কিন্তু বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলা মীর মর্দানকে আঘাত হানে এবং এতে তাঁর মৃত্যু হয়।
মীর মর্দানের মৃত্যুতে হতভম্ব নওয়াব মীরজাফরকে ডেকে পাঠান এবং তাঁর জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্য তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। মীরজাফর নওয়াবকে ঐ দিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং পরদিন সকালে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেয়, আর এ খবর শীঘ্র ক্লাইভের নিকট পৌঁছানো হয়। পরামর্শমত নওয়াবের সেনানায়কেরা পিছুতে থাকলে ইংরেজ সেনারা নতুন করে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায় এবং ফলে নওয়াব বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র পালিয়ে যায়। অপরাহ্ণ ৫টার দিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় এবং বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে তখনই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন। জন উড নামে জনৈক ব্রিটিশ সৈন্য পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিল, তার মতে ‘এটাই ছিল সেই বিশিষ্ট ও চূড়ান্ত যুদ্ধ যেখানে কোন ব্যাপক আক্রমণ ছাড়াই রাজ্য জয় করা হয়’।
ষড়যন্ত্র এবং পরবর্তীকালে ‘পলাশী-বিপ্লব’ ইংরেজদের দ্বারা শুধু উদ্ভাবিত ও উৎসাহিতই হয় নি, বরং যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা দেশিয় ষড়যন্ত্রকারীদের ব্রিটিশ পরিকল্পনা সমর্থন করতে প্রলুব্ধ করে। সাধারণ ধারণা - ষড়যন্ত্রটি ছিল ভারতজাত, এর পেছনে ব্রিটিশদের পরিকল্পিত কোন কূটকৌশল ছিল না, ষড়যন্ত্রের মূলে বা এর উত্তরণে তাদের অতি সামান্য ভূমিকা ছিল কিংবা কোন ভূমিকাই ছিল না, এটি ছিল বাংলার ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ যা ‘অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্রিটিশদের জড়ায়’ এবং বাংলায় ব্রিটিশ বিজয় ছিল প্রায় সম্পূর্ণ আকস্মিক, এ কথাগুলি এখন ধোপে টেকে না। ইংরেজরা তাদের ষড়যন্ত্রের জোরে ও সিরাজউদ্দৌলার সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ পলাশীতে বিজয়ী হয়। নওয়াবের পরাজয় ছিল রাজনৈতিক, সামরিক নয়।"
পলাশীর বিপর্যয়ের ফলে গোটা ভারতবর্ষে ব্রিটেনের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ভারতে নানা সময়ে ব্রিটেনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ এবং শত্রুতামূলক নানা নীতির কারনে কোটি কোটি বাঙ্গালীসহ অন্তত দশ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। দেশীয় শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজ-ব্যবস্থারও হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে, মুসলমানরা হয়ে পড়ে সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর। অথচ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর বাংলার মুর্শিদাবাদসহ ভারতের নানা শহরের সম্পদ লুট করে ইংরেজরা সংগ্রহ করেছে তাদের দেশকে সম্পদশালী করার নানা উপাদান।
ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হল এই ইতিহাস থেকে যুগে যুগে খুব কম মানুষই শিক্ষা নিয়েছে।  যে ব্রিটেন ও ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য এবং পরে পর্যায়ক্রমে পুরো ভারতের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটেছিল সেই ব্রিটেনের ষড়যন্ত্রেই ফিলিস্তিনের বুকে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরাইল। পলাশী ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল স্থানীয় কিছু লোভী  আর  বিশ্বাসঘাতক হিন্দু ও মুসলিম আমির-ওমরাহ বা পুঁজিপতি। তেমনি ফিলিস্তিনে  অবৈধ ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহযোগী হয়েছিল সৌদি-ওয়াহাবি শাসকগোষ্ঠীসহ কিছু বিশ্বাসঘাতক আরব নেতা। এদের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ও আপোষকামী চরিত্র আজও বদলায়নি।  এদের ষড়যন্ত্রেই বিলুপ্ত হয়েছে বিশাল ওসমানি খিলাফত।
এ্কই ধরনের ষড়যন্ত্র ও অনৈক্যের কারণে বিলুপ্ত হয়েছিল স্পেনে প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম শাসন। অথচ স্পেনের কোনো কোনো মুসলিম নেতা সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু সে সময় দুই বড় মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান স্পেনের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে নিজেদের মধ্যে দেশদখলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যস্ত ছিলেন।  একই ধরনের ভুল আর অনৈক্যের কারণে ক্রুসেডের হামলায় ও মোঙ্গল হামলায় বিপর্যন্ত হয়েছিল মুসলিম বিশ্ব।  কিন্তু এতোসব বিপর্যয়ের পরও ঐক্যবদ্ধ হয়নি মুসলিম বিশ্ব।
স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্তে ও বিজাতীয়দের যোগসাজশেই এখনকার ইরান থেকে অন্তত ৫ গুণ বড় ইরানি সাম্রাজ্য বিপর্যয়ের শিকার হয় কাজার শাসনামলে। অথচ কাজার শাসনামলেই তাদের পক্ষ থেকে ভারতের বীর মুসলিম শাসক টিপু সুলতানকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সহয়তার জন্য পাঠানো হয়েছিল তিন হাজার ইরানি সেনা। তা করা হয়েছিল টিপুর সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে। দুঃখজনকভাবে এই সেনারা সাগর-পথে যখন মহিশুরের কাছে পৌঁছে ততক্ষণে পরাজিত ও শহীদ হন বীর টিপু সুলতান। 
তাই নানা যুগে ও  বার বার ঘটে-যাওয়া একই ধরনের বিপর্যয়ের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে মুসলিম উম্মাহকে। মুসলিম বিশ্বে গজিয়ে-ওঠা নতুন মীরজাফরদের সনাক্ত করতে হবে এবং মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ রেখেই বিজাতীয়দের চক্রান্ত মোকাবেলা করতে হবে মুসলমানদেরকে। আজ যখন ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী হওয়ার কারণে ইসলামী ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে একতরফা মার্কিন ও পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞা তখন কেন অন্য বড় বড় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সরকার ও নেতৃবৃন্দ তার বিরোধিতা করেন না?  ফিলিস্তিনি সংগ্রামীদের আর্থিক সহায়তা দিতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়েছিল লিবিয়ার গাদ্দাফি এবং এখন কাতারও সেই একই শক্তির রোষানলের শিকার হয়েছে। অথচ বিশ্ব কুদস দিবসের প্রবক্তা ইমাম খোমেনী (র) বলেছিলেন, আরবরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিতভাবে এক বালতি করেও পানি ঢালতো তাহলে ইহুদিবাদী ইসরাইল ভেসে যেত!
কেন মুসলিম বিশ্ব ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরাইলের মুরব্বিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না? কেন ইসরাইল পরমাণু অস্ত্রধারী হতে পারলেও মুসলিম দেশগুলো শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তিও রাখতে পারবে না? ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের মদদদাতা পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে আরব সরকারগুলোর তেল-অবরোধের ফলে মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় সৌদি বাদশাহ ফয়সালকে তারই এক ভাতিজার মাধ্যমে হত্যা করতে সক্ষম হয় সিআইএ। কারণ সৌদি বাদশাহ তেল-অবরোধে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখছিলেন। সৌদিতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন অনভিজ্ঞ নেতৃত্ব কাদের ইশারায় দিন দিন ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে এবং ইসরাইলের সঙ্গে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে? ওই একই শক্তির ইশারায় তারা ইয়েমেনের স্বাধীনচেতা ও বিপ্লবী জনগণ আর সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং বাহরাইনি জনগণের স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দমনের জন্যই তারা সেখানে পাঠিয়েছে সৌদি সেনা।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ ইসরাইল বিরোধী হওয়ায় এবং তার সরকার ফিলিস্তিনি সংগ্রামী দলগুলোসহ ইরান আর হিজবুল্লাহর মত ইসরাইল-বিরোধী শক্তিগুলোকে সহায়তা দিয়ে আসছে বলেই দেশটির ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে পশ্চিমাদের মদদে গড়ে তোলা নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী যুদ্ধ। আর এইসব নৃশংস সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পবিত্র হিসেবে দেখানোর জন্যই তারা গোষ্ঠীগুলোর নাম হিসেবে 'ইসলামী সরকার' বা 'খিলাফত'-এর মতো পবিত্র শব্দকে অপব্যবহার করছে যাতে সার্বিকভাবে পাশ্চাত্যের অমুসলমানদের কাছে ইসলামকে সন্ত্রাসের সমার্থক হিসেবে তুলে ধরে এ পবিত্র ধর্মের বদনাম করা যায়।
ব্রিটেনেরই একটি সূত্র কিছুকাল আগে ফাঁস করেছিল যে ইরাকে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির জন্য দেশটির সুন্নি ও শিয়া মুসলমানদের মসজিদে বোমা পেতে রাখতো ব্রিটিশ সেনারা! বর্তমান যুগে বুড়ো শয়তান ব্রিটেনের সব শয়তানি তৎপরতা ও কুমন্ত্রণার আলোকে বড় শয়তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে মার্কিন সরকার। জাপানের হিরেশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ব্যবহারকারী এই দেশটির সরকারগুলো ইসরাইলের কেনা গোলামের মত আচরণ করে থাকেন। তারা ইসরাইলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখতে চান। একই লক্ষ্যে মুসলিম দেশগুলোকে টুকরো টুকরো করাও তাদের একটি বড় লক্ষ্য। তাই মুসলিম বিশ্বের বিবেকবান শিক্ষিত সমাজ ও আলেম সমাজকে এইসব বাস্তবতার আলোকে সাম্রাজ্যবাদী নানা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সচেতন করার কাজে সক্রিয় হতে হবে।
আজ অনেক বিবেকবান পশ্চিমা অমুসলিম নাগরিক যখন ইসরাইলি পণ্য-বর্জনের আন্দোলন ও ফিলিস্তিনিদের ত্রাণ সহায়তা দেয়াসহ ইসরাইলি দখলদারিত্ব আর  বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার মতো নানা গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন তখন মুসলিম বিশ্বের আলেমরা নীরব থাকলে তারা অবশ্যই পরকালে মুক্তির আশা করতে পারবেন না।

প্রসঙ্গ চিকিৎসা, ব্যয়ভার বহন করতে চায় বিএনপি: খালেদা চান ইউনাইটেডে সরকারের বিকল্প প্রস্তাব

কারাগারে অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসার জন্য প্রস্তাব দেবে সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানানোর প্রেক্ষিতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। অন্যদিকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার দাবিতে অনড় বিএনপি।
সোমবার ডিআইজি প্রিজন্সের একটি বক্তব্যের সূত্র ধরে বিএনপি’র তরফে জানিয়ে দেয়া হয়েছে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হলে বিএনপিই তার খরচ বহন করবে। খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার দাবি জানিয়ে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করেন তার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার। দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মন্ত্রীর একান্ত সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবের একান্ত সচিবের কাছে আবেদনটি জমা দেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার, একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং তার ভাগনে ডা. মোহাম্মদ মামুন। তবে রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শহীদ মিনারে শত নাগরিক জাতীয় কমিটি আয়োজিত মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি পুলিশ। বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে গেলে আয়োজকদের কাছে অবস্থান কর্মসূচির অনুমতি ছিল কিনা জানতে চায় পুলিশ। এরপর কেড়ে নেয়া হয় ব্যানার।
ইউনাইটেডেই চিকিৎসা নিতে চান খালেদা : বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি খালেদা জিয়ার অস্বীকৃতির কারণে চিকিৎসার জন্য গতকালও তাকে নেয়া হয়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। মঙ্গলবার সকালে তাকে ওই হাসপাতালে নেয়ার সরকারি প্রস্তুতি ছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গতকাল দ্বিতীয় দফায় প্রস্তুত ছিল বিএসএমএমইউ। সেখানে তাকে নেয়ার জন্য ভোর ৬টা থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগার থেকে শাহবাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয় পুলিশি নিরাপত্তা। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেয়ার নির্ধারিত সড়কে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ভিড় করেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। খালেদা জিয়াকে নেয়ার জন্য কারাফটকে যায় গাড়ি। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে প্রতীক্ষার ইতি ঘটান কারা অধিদপ্তরের প্রধান। কারা অধিদপ্তরের গেটে বেলা পৌনে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন। তিনি বলেন, আজকে (মঙ্গলবার) আমাদের প্রস্তুতি ছিল। বেলা ১১টার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে নেয়ার কথা ছিল। আমাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়া ছিল। কিন্তু তিনি যেতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া চিকিৎসা নেবেন না। আইজি প্রিজন্স বলেন, আমি নিজেই গতকাল (সোমবার) গিয়ে উনাকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছি। আজ (মঙ্গলবার) সকালেও চিকিৎসক পাঠিয়েছি। উনি বলে দিয়েছেন, ইউনাইটেড হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও যাবেন না। উনি যদি মত পরিবর্তন করেন, তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবো। তবে বিএসএমএমইউতে অনাস্থার বিষয়টি তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি বলে জানান তিনি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আইজি প্রিজন্স বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী সরকারের হাইয়েস্ট যে রেফারেল মাল্টি ডিসিপ্লিনারি হাসপাতাল আছে, সেখানেই আমরা পাঠাতে পারি।
সেখানে যদি কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকে, তাহলে প্রাইভেট হাসপাতালে করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকলে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। কারাবিধি অনুযায়ী বিএসএমএমইউ সর্বোচ্চ। বেসরকারি হাসপাতালের বিষয়ে কারাকর্তৃপক্ষ কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। পরিবার আবেদন করলে তা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবালয়ে বলেছেন, তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসার দেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়া হবে। এদিকে বিএনপি খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে না নেয়ার ঘোষণা আসার পর মোতায়েন করা বাড়তি পুলিশ সদস্যদের সরিয়ে নেয়া হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ায় পুলিশ সদস্যরা পুরান ঢাকা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা প্রহরা থেকে সরে যান।
চিকিৎসার ব্যয়ভার নেবে বিএনপি: মোশাররফ
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে তার পছন্দ অনুযায়ী ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হলে প্রয়োজনে দলের পক্ষ থেকে চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার বহন করা হবে। গতকাল দুপুরে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। খন্দকার মোশাররফ বলেন, আইজি প্রিজন্স গণমাধ্যমে বলেছেন- কারাবিধি অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। খালেদা জিয়াকে প্রাইভেট হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করবে সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। এমন কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় খালেদা জিয়াকে পিজি হাসপাতালেই নিতে হবে। এই বক্তব্যই প্রমাণ করে কেন এতদিন খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি। এরই প্রেক্ষিতে খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানোর আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে দেশনেত্রীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই- দেশনেত্রীর সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না। দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ। খন্দকার মোশাররফ বলেন, দুইদিন ধরে খালেদা জিয়াকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউতে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এর আগে তাকে সেখানে নেয়া হলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং চিকিৎসা সেবার বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই বলেই গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই, প্রয়োজনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সব ব্যয় বিএনপিই বহন করবে। কাজেই কালবিলম্ব না করে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হোক। তিনি বলেন, তথাকথিত ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময়ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুতরাং খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের বিষয়ে এতদিনেও সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক এবং নিন্দনীয়।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে শুধু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিতই করা হয়নি বরং তার স্বাস্থ্যের অবনতির কথাও গোপন রাখার অপচেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যায়, সরকার তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়ার জীবন বিনা চিকিৎসায় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তার দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাকে সবসময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ড. মোশাররফ বলেন, ৩ বারের নির্বাচিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে তাকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরি বলে মতামত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনগণ। আমাদের দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে দুইবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসব জানিয়েছি। অনতিবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর দাবি করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি। এখন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি তার অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তার উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। আমরা এটাও সরকারকে জানিয়েছি। কিন্তু তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এই পরিস্থিতিতে গত ৫ই জুন তিনি হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জেল কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের কোনো সদস্যকেও জানায়নি এবং কেন তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন তা পরীক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত ৮ই জুন তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত সাক্ষাতে গিয়ে এই বিষয়টি জানতে পারেন। ৫ দফা আবেদনের পর গত ৯ই জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে ঢাকা সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে দেখা করার অনুমতি পান দেশনেত্রীর চিকিৎসা করতেন এমন ৪ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। তারা জানতে পারেন- ৫ই জুন দুপুর ১টার দিকে দেশনেত্রী ৫/৭ মিনিট চেতনা হারান এবং সে সময়ের কোনো কিছু মনে করতে না পারছেন না। এ বিষয়টিকে চিকিৎসকরা মারাত্মক বলে মনে করেন। তাদের মতে এটা ছিল ট্রানজিয়েন্ট স্কিমিক অ্যাটাক-টিআইএ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এফএম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- আগামীতে একটা বড় ধরনের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এই ৪ জন তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত লিখিতভাবে কারাকর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তারা বিশেষ কিছু পরীক্ষা ও যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়ার জন্য দেশনেত্রীকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর এ বিষয়ে সরকারের আইনমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ খোলেন। তারা এখন বলছেন যে, ৫ই জুন রোজা রাখার কারণে খালেদা জিয়ার সুগার কমে যাওয়ায় তার মাথা ঘুরে গিয়েছিল মাত্র এবং একটা চকোলেট খেয়ে তিনি ভালো হয়ে যান। আইজি প্রিজন্সও একই কথা বললেও স্বীকার করেছেন যে, দেশনেত্রীর আর্থাইটিস সমস্যা বেড়েছে। ড. মোশাররফ বলেন, গত ৫ই জুন সংঘটিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীবর্গ, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় ১ সপ্তাহ পরে ১১ই জুন মুখ খুললেন কেন? কেন এতদিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো? কেন ইতিমধ্যে তার হঠাৎ এত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি? অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন- ৯ই জুন চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার অজ্ঞান হওয়ার কথা বলে নাকি আদালতের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, চিকিৎসকদের সাক্ষাতের দিনক্ষণ স্থির করে সরকার। তারা ৯ তারিখে সাক্ষাতের দিন স্থির করেছে বলেই ওই দিন চিকিৎসকরা প্রেস ব্রিফিং করেছেন। মামলার দিন তারিখ সরকার ও কারা কর্তৃপক্ষের জানার কথা-ডাক্তারদের নয়। ড. মোশাররফ বলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া এই দলবাজ অ্যাটর্নি জেনারেল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েও অশোভন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করায় আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তিনি বলেন, মানবিক কারণে ঈদের আগেই দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে দেশের বিশিষ্টজনদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটি আজ (মঙ্গলবার) সকাল ১০টায় জাতীয় শহীদ মিনারে মৌন অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। যথাসময়ে শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসক ও আইনজীবীরা শহীদ মিনারে উপস্থিত হলে পুলিশ বিনা উস্কানিতে মৌন অবস্থান কর্মসূচি পণ্ড করে দেয়। ড. এমাজউদ্দীন আহমেদসহ দেশের বিশিষ্ট জনদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ আলী চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ মিনারে শত নাগরিক জাতীয় কমিটির মৌন অবস্থানে পুলিশের বাধা
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শত নাগরিক জাতীয় কমিটি আয়োজিত মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি পুলিশ। গতকাল বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিল আয়োজকরা। তবে এ সময় আয়োজকদের কাছে অবস্থান কর্মসূচির অনুমতি ছিল কিনা জানতে চায় পুলিশ। এরপর কেড়ে নেয়া হয় ব্যানার। এসময় শত নাগরিক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক তাজমেরী ইসলাম, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের বাধার পরে শত নাগরিক জাতীয় কমিটির কিছু সংখ্যক সদস্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে বসে প্রতিবাদ করেন। এ সময় তারা পৌনে ১২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ‘মানবিক কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ঈদের আগে মুক্তি দেয়ার দাবিতে আমরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শত নাগরিক জাতীয় কমিটি একটি মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে আমাদের কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি। দেশের মানুষ ইতিমধ্যেই জেনেছে যে বেগম জিয়া মাইল্ড স্ট্রোক করেছেন। তার উন্নত চিকিৎসা দরকার। তাই আমরা চেয়েছি মানবিক কারণে সরকার যেন বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয়।’ এদিকে শত নাগরিক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘শত নাগরিক জাতীয় কমিটির উদ্যোগে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ঈদের আগে মানবিক কারণে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য যে মৌন অবস্থান কর্মসূচি করতে চেয়েছিলাম, তা পুলিশি বাধার মুখে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছি। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের এমন একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি করতে না দেয়া দুর্ভাগ্যজনক এবং নিন্দনীয়। এতে বোঝা যায় গণতন্ত্রের কি অবস্থা এখন বাংলাদেশে।’

ঐতিহাসিক হ্যান্ডশেক

অসম্ভবকে সম্ভব করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। রণ প্রস্তুতি থেকে আলোচনার টেবিলে এসে মুখোমুখি বসলেন তারা। হাতে হাত রাখলেন। তারপর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাখবেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে সৃষ্টি হলো এক নতুন অধ্যায়। প্রচণ্ড বৈরী এই দুই নেতার সিঙ্গাপুর সামিটের দিকে গতকাল তাকিয়ে ছিল বাকি বিশ্ব। সেন্তোসা দ্বীপের বৈঠকে কোরিয়া অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেন কিম জং উন। দু’নেতা স্বাক্ষর করলেন একটি ‘কমপ্রিহেনসিভ’ ডকুমেন্ট। তাতে রয়েছে চারটি মূল পয়েন্ট। তাহলো- ১. যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে দুই দেশ। দু’দেশের জনগণের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যই তা করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তারা। ২. কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে একটি টেকসই ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা তৈরিতে যৌথভাবে ভূমিকা রাখবে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া। ৩. ২০১৮ সালের ২৭শে এপ্রিল পানমুনজোম ঘোষণা নিশ্চিতকরণ। এর অধীনে উত্তর কোরিয়া পুরোপুরি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ৪. অবশিষ্ট যুদ্ধবন্দিদের উদ্ধারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া। এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার যে নেতাকে কয়েকদিন আগেও ট্রাম্প ‘লিটল রকেটম্যান’ বলে উপহাস করেছিলেন, তার প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ হয়েছেন। তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেছেন তিনি। তবে যারা কিম জংয়ের সঙ্গে তার এ বৈঠককে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন তাদের জবাব দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, কিমের সঙ্গে আলোচনায় তিনি কিছুই ত্যাগ করেন নি। তার ভাষায়, আমি ২৫ ঘণ্টা ঘুমাই নি। তবু আমি ভেবেছি এই বৈঠকটাই ছিল যথার্থ। ১২ই জুনের ওই বৈঠককে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া উভয়ের জন্যই শুভ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা ডনাল্ড ট্রাম্পকে পছন্দ করেন না শুধু তারাই বলবেন ট্রাম্প এই বৈঠকে কিছুই অর্জন করতে পারেন নি। এ সময় তিনি কিম জং উনের পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি, তিনজন মার্কিন বন্দিকে ফেরত পাওয়া সহ বেশকিছু প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার জন্য তিনি উত্তর কোরিয়াকে চাপ দেবেন। তবে স্বীকার করে নেন এ কাজটি সম্পন্ন করতে বেশ লম্বা সময় লাগতে পারে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে এ কাজটি শেষ করতে অবশ্যই একটি সময়ের প্রয়োজন হবে। কিন্তু যখনই এ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে তখন ধরে নেয়া যাবে যে কাজটি শেষ হচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তকরণ কাজ শিগগিরই শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এরপর যখন তিনি নিশ্চিত হবেন পারমাণবিক বিষয় আর কোনো ফ্যাক্টর নয় তখনই উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করা হতে পারে। 
ওদিকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন তিনি কিম জং উনকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন কিম। তবে সেই সফর হবে একটি যথার্থ সময়ে। পাশাপাশি তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার নেতার ওপর বাস্তবেই তিনি আস্থা রাখেন। আপনি কি কিমের ওপর আস্থা রাখতে পারেন? সিএনএনের সাংবাদিক জিম অ্যাকস্টার এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন- আমি আস্থা রাখি। তাছাড়া তারা দু’জনে যে ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করেছেন কিম তা মেনে চলবেন বলে আস্থা রাখেন ট্রাম্প। এ সময় কিমকে তিনি একজন অত্যন্ত মেধাবী ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যুবক বয়সে দেশকে দক্ষ হাতে পরিচালনা করছেন কিম এ জন্যও তার প্রশংসা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিম জংয়ের ন্যক্কারজনক কৌশলগুলো নিয়ে মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি এমন মন্তব্য করেন। ঐতিহাসিক ওই বৈঠকের পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন ৭০ বছরের বেশি সময় আগে শুরু হওয়া কোরিয়া যুদ্ধ চূড়ান্তভাবে ইতি ঘটবে। তার ভাষায়, চরম ওই রক্তাক্ত যুদ্ধ কোরিয়া অঞ্চলকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। এতে নিহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এর মধ্যে রয়েছেন কয়েক লাখ সাহসী মার্কিনি। অতীত দিয়ে ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। গতকালের যুদ্ধ আগামীকালের যুদ্ধ হতে পারে না। বার বার ইতিহাসে প্রমাণ মিলেছে যে, প্রতিকূলতা হয়ে ওঠে বন্ধুর মতো। ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বন্ধ করবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি এমন কথা বলেন। এমন সামরিক মহড়াকে উত্তর কোরিয়া দেখে থাকে উস্কানি হিসেবে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়ার কথাও ঘোষণা করেন ট্রাম্প। 
অবশেষে গুডবাই: আলোচনা শেষে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একে অন্যকে গুডবাই জানান। ট্রাম্প যখন মঞ্চে দাঁড়ানো ঠিক তখন মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায় কিম জং উনকে। এর মধ্য দিয়ে দৃশ্যত দুই দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরের বহুল প্রতীক্ষিত সামিটের শেষ হয়। গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় এয়ারফোর্স ওয়ানে করে সিঙ্গাপুর থেকে উড়াল দেয়ার কথা ট্রাম্পের। তার সঙ্গে আলোচনা শেষে সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপ ত্যাগ করে কিম জং উনকে বহনকারী গাড়িবহর। এদিন দু’নেতা শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। সব মিলিয়ে এ আলোচনা হয়েছে প্রায় ৫ ঘণ্টার মতো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন। ডকুমেন্টে স্বাক্ষরের পর পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি কিম জং উনকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানাবেন। আরো বলেছেন, কিম জং উনের সঙ্গে তিনি একটি অত্যন্ত ‘স্পেশাল বন্ড’ বা বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছেন। তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনার সঙ্গে এখানে উপস্থিত হতে পারা সম্মানের। ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করার পর তারা দু’জনেই যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার পতাকার সামনে দাঁড়ান। এ দিনে শেষবারের মতো আবার তারা করমর্দন করেন। এ সময় সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি (কিমের) চমৎকার একজন সমঝোতাকারী। তার দেশের মানুষের পক্ষে এই সমঝোতা। সাংবাদিকরা এ সময় তার কাছে জানতে চান উত্তর কোরিয়ার নেতার কাছ থেকে তিনি কি শিক্ষা পেলেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি শিখেছি যে, তিনি একজন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। আমি আরো শিখেছি, তিনি নিজের দেশের মানুষকে খুবই ভালোবাসেন। ট্রাম্প আবার আশস্ত করেন তারা আবারও সাক্ষাতে মিলিত হবেন। উত্তর কোরিয়া খুব দ্রুততার সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তকরণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ইস্যুতে কি কিম রাজি হয়েছেন? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমরা এ প্রক্রিয়া খুব, খুব দ্রুততার সঙ্গে শুরু করছি।
ঐতিহাসিক করমর্দন: সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তাকে উড়িয়ে দিয়ে অবশেষে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় সিঙ্গাপুরের সেন্টোসা দ্বীপে বৈঠক শুরু করেন দুই নেতা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের করমর্দন প্রত্যক্ষ করে পুরো বিশ্ব। এ খবর দিয়েছে বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান। খবরে বলা হয়, বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে তার বোন কিম ইয়ো জং উপস্থিত ছিলেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ জন কেলি, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ও হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব সারাহ স্যান্ডার্স অংশ নিয়েছেন। বৈঠকের শুরুতেই হাত মেলান কিম ও ট্রাম্প। ১২ সেকেন্ড পরস্পরের হাত ধরে রেখে বিশ্বকে নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত দেন তারা। বৈঠক কক্ষে প্রথমে প্রবেশ করেন কিম জং। তিনি সেখানে ট্রাম্পের জন্য অপেক্ষা করেন। পরে ট্রাম্প সেখানে প্রবেশ করলে তাকে স্বাগত জানান। উষ্ণ অভিবাদন জানান একে অপরকে। পরে একান্তে কথা বলেন দুই নেতা। বৈঠক শুরুর আগে ট্রাম্প বলেন, এটা খুবই ভালো বৈঠক হবে। আর কিম বলেন, এ পরিস্থিতি তৈরি সহজ ছিল না।

ঢাকা মেডিকেলে মাদক চক্র! by শুভ্র দেব

৩রা মে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ইয়াবাসহ এক আনসার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ৩৫ বছর বয়সী ওই আনসার সদস্যের নাম মো. আসাদুজ্জামান। গ্রেপ্তারকালে তার কাছ থেকে ৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসাদুজ্জামান স্বীকার করে দীর্ঘদিন ধরে সে হাসপাতালে ইয়াবা বিক্রি করছে। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে র‌্যাব তাকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করে। এছাড়া ৫ই মে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এলাকা থেকে ৭ জন মাদকসেবী ও বিক্রেতাকে আটক করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। তারা হলো- আলম মিয়া, শামীম, সোহেল, রনি, লিটন, সুবির বিশ্বাস ও শামীম মিয়া। পরে তাদের ৬ মাস করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওদিকে গত শনিবার রাতে ইয়াবাসহ তুলি নামের ৩০ বছর বয়সী এক মহিলাকে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। এসব ঘটনাই জানান দেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলছে মাদকের ছড়াছড়ি। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা। হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও বহিরাগতদের যোগসাজশে দেদার বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। খোদ হাসপাতালের কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসক, সেবিকা, রোগীর স্বজন, বিভিন্ন শ্রেণির স্টাফ ও এম্বুলেন্স চালক ইয়াবার সেবক ও ক্রেতা। দিনের বেলা কমবেশি হলেও রাতে জমে উঠে ইয়াবার আসর। দিন-রাতে অন্তত ১০/১২টি স্পটে বসানো হয় ইয়াবার আসর। শুধু ইয়াবাই নয় হাসপাতালের পরিত্যক্ত অনেক স্থানেই পাওয়া যায় ফেনসিডিলের খালি বোতল। আর ইয়াবার আসরের পাশাপাশি গাঁজার আসরের কমতি নাই। বিভিন্ন অলিগলিতে দাঁড়িয়ে বা কয়েকজন একসঙ্গে বসেই গাঁজা সেবন করছেন। সূত্র মতে ইয়াবা ও গাঁজার এসব আসর বসাতে উৎকোচ দিতে হয় হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়িকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলাকালীন সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপাতালে ইয়াবা বিক্রি ও সেবন চলছে সমান তালে। দেশের অন্য সব জায়গায় মাদক সেবন ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকলেও এখানে কোনো রকম ভয়ভীতি ছাড়াই চলছে মাদকের অবাধ বিচরণ। জনগুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে মাদক নির্মূলে নেই কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগ। কিন্তু হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, মাদক নির্র্মূলে তারা কাজ করে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দেয়াসহ, রাতের বেলা পুলিশি টহল, বিভিন্নস্থানে সিসি ক্যামেরা বসানোসহ নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
মানবজমিনের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে ঢামেকে মাদক প্রবেশের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। এখানকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও আনসার সদস্যরাই বহিরাগতদের মাধ্যমে মাদক প্রবেশে সহযোগিতা করেন। গত কয়েকদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে, চাঁনখারপুল, শাহবাগ, চকবাজার, বংশাল এলাকার নামকরা মাদক ব্যবসায়ীরা হাসপাতালের ভেতর মাদক সাপ্লাই দেয়। আবার তাদের নিজস্ব সোর্সদের দিয়ে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল পৌঁছে দেয় হাসপাতালের ভেতরের ক্রেতার কাছে। হাসপাতালে মাদক সরবরাহের পেছনে যারা অন্যতম তাদের মধ্যে রয়েছে জাহাঙ্গীর, হাসান, পাপন, অনিক, জাফর, আসিক সুমন। তাদের আবার হাসপাতালের ভেতরে আলাদা আলাদা বিক্রেতা রয়েছে। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট এলাকায় রনি ও স্বপন। নতুন ভবনের সামনে চিনচিন, বিল্লাল হেদায়েত, মোমেন। ডা. মিলন অডিটরিয়াম এলাকায় বুলবুলি ও লাবু। এছাড়াও আয়েশা, বুলবুলি, বিল্লাল, লাভলুসহ আরো অনেকে রয়েছে। মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে, যে সব স্থানে ইয়াবা-গাঁজার আসর বসে তার অন্যতম হচ্ছে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের পেছনের গাড়ি ও মোটরসাইকেল পার্কিং এরিয়া, মর্গ এলাকা, মেডিকেল কলেজ ভবন থেকে নতুন ভবনে যাওয়ার রাস্তা, শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়াম এলাকা, মেডিকেল ২ এর ছাদ, পিজি হাসপাতালের কিচেন, নার্সিং হোস্টেল এলাকা, জরুরি বিভাগ সংলগ্ন পানির ট্যাংকি ও শহীদ মিনার এলাকা। রাতের বেলা এসব এলাকায় হাসপাতালের স্টাফ ও বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এসব আসর থেকে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বাচ্চু মিয়া ও তার সহযোগীরা টাকা নিচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই বাচ্চু মিয়া মানবজমিনকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগই মিথ্যা। এসবের সঙ্গে আমি জড়িত না। এছাড়া মাদকের সঙ্গে আমার কোনো আপস নাই। তবে মেডিকেলের ভেতরে মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের আনাগোনার বিষয়ে বাচ্চু মিয়া বলেন, মেডিকেলটা অনেক বড়। এখানে অনেক কিছুই খেয়াল রাখা সম্ভব নয়। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একে এম নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, মেডিকেলের ভেতরে মাদক নিয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই কাজ করছি। হাসপাতালের ভেতরের কেউ কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত এটা আমরা জানতাম। তবে নির্দিষ্টভাবে আসলে কোন ব্যক্তি জড়িত তা জানতাম না। তাই হাসপাতালের পক্ষ থেকে ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়েছিলাম। এজন্য কিছুদিন আগে একজন আনসার সদস্য ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। ঢামেকের এই পরিচালক বলেন, এর বাইরে আমরা সন্ধ্যার পর থেকে পুলিশ ও আনসারের টহল বাড়িয়েছি। বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে যাতে ফুটেজ দেখে বহিরাগতদের চিহ্নিত করা যায়।
পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি। তিনি বলেন, ঢামেকে প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ আসে। এদের মধ্যে কে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত তা চিহ্নিত করা কঠিন। তারপরও আমরা মাদক নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (ক্লিনিক ও হাসপাতাল) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, মাদক নির্মূল হোক এটা আমরা চাই। তবে মাদকের সঙ্গে যারা জড়িত তারা হচ্ছে উচ্চ ও নিম্ন পর্যায়ের। কেউ ফ্যাশনের জন্য আবার কেউ বিনোদনের জন্য মাদক সেবন করে। তবে মাদকের সরবরাহ বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও চাহিদা কমাতে আমরা কাজ করতে পারি।

আমেরিকার সঙ্গে মিত্রদের তীব্র কথার লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির প্রথাগত মিত্র রাষ্ট্রগুলোর তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ৭ শিল্পোন্নত দেশের সংগঠন জি৭-এর বার্ষিক সম্মেলন থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগেভাগে বিদায় নেয়ার পর থেকে শুরু হয় এই কথার লড়াই। কানাডায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন নিয়ে চাপা উত্তেজনা ছিল। তবে সাময়িকভাবে মনে হয়েছিল সব দেশ কিছুটা হলেও ঐক্যে পৌঁছেছে। কিন্তু সম্মেলন শেষে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর একটি সংবাদ সম্মেলন শেষে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কানাডা থেকে বিমানে করে সিঙ্গাপুর যাওয়ার পথেই বিমানেই তিনি নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে নিজের ক্ষোভ ঝাড়েন তিনি। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের পর তার উপদেষ্টারাও ট্রুডোর ওপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। জি৭-এর যৌথ বিবৃতি থেকে ট্রাম্প প্রথমে নিজ সরকারের সমর্থন প্রত্যাহার করেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায় ফ্রান্স ও জার্মানি। বাণিজ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির পুরনো মিত্ররাষ্ট্র সমূহের মধ্যে যেই মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, যৌথ বিবৃতিতে তা-ই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে সেখান থেকেও সরে আসেন। মূলত, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ট্রাম্প প্রশাসন যেই শুল্ক আরোপ করেছে, তারই বিরোধিতা করছে প্রায় সকল মার্কিন মিত্ররাষ্ট্র। জি৭ সম্মেলন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্কিন শুল্কের ব্যাপারে নিজের আপত্তি পুনর্ব্যক্ত করেন। ১লা জুলাই আমেরিকা থেকে পণ্য আমদানির ওপরও পাল্টা শুল্ক আরোপের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘কানাডিয়ানরা নম্র ও যৌক্তিক। তবে আমরা হুমকির মুখে নতি স্বীকার করবো না।’ মূলত, ট্রুডোর এই বক্তব্যেই ক্ষিপ্ত হন ট্রাম্প। এয়ারফোর্স ওয়ানে করে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময়ই তিনি টুইটারে জানিয়ে দেন যে, সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর না করতে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, গাড়ি আমদানির ওপরও শুল্ক আরোপের কথা ভাবছেন তিনি। তিনি বলেন, ট্রুডোর ‘মিথ্যা বিবৃতি’র প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি, মার্কিন কৃষক, শ্রমিক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কানাডা যেই বিপুল শুল্ক আরোপ করে রেখেছে, আমেরিকার শুল্ক তারই প্রতিক্রিয়া মাত্র। এরপর ট্রাম্পের শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ল্যারি কুডলো ও বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো টিভি পর্দায় উপস্থিত হয়ে ট্রুডোর বিরুদ্ধে আরো আক্রমণ দাগান। কুডলো বলেন, ‘তিনি (ট্রুডো) আমাদের পেছন থেকে ছুরি মেরেছেন।’ অপরদিকে নাভারো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কূটনীতিতে লিপ্ত হয়ে পরে আবার পেছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা করবেন যেসব নেতা, তাদের জন্য নরকে আলাদা স্থান বরাদ্দ আছে।’ ওদিকে ট্রুডোর কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে এমন কিছু বলেন নি, যা তিনি আগে প্রকাশ্যে বলেননি। বিবৃতিতে বলা হয়, জি৭ সম্মেলনে গৃহীত সমঝোতা মেনে চলবে কানাডা। ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া দেখে জি৭ সদস্যভুক্ত বাকি ৫ দেশও কানাডার মতো স্তম্ভিত। আমেরিকা ছাড়া সবাইই চূড়ান্ত বিবৃতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রন বলেন, রাগ বা ক্ষোভ দিয়ে বা অসতর্ক মন্তব্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রভাবিত করা যাবে না। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আসুন সিরিয়াস হই। আমাদের জনগণের উপযুক্ত আচরণ করি। আমরা যেসব অঙ্গীকার করি, সেসব আমরা রাখি।’ জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেইকো মাস বলেন, ‘স্রেফ ২৮০ শব্দের এক টুইটার বার্তায় নিমিষেই আপনি বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে পারেন।’ সম্মেলনের চূড়ান্ত বিবৃতিতে, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও জার্মানি ‘মুক্ত, সুষ্ঠু ও পারস্পরিক লাভজনক বাণিজ্যে’র প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সম্মত হয়। এছাড়া সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্ব নিয়েও সবাই একমত হয়। বিবৃতিতে অন্যান্য অনেক বিষয়ে ৭ দেশের নেতা প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছিলেন। যেমন, রাশিয়ার ‘অস্থিতিশীল আচরণ বন্ধ’ ও সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি দেশটির সমর্থন প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। তেহরানের পারমানবিক প্রকল্প যাতে শান্তিপূর্ণ হয়, তা ‘চিরস্থায়ীভাবে’ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। জলবায়ু ইস্যুতে ‘দ্বিমত পোষণ করা’র ব্যাপারে দেশগুলো একমত হয়েছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। দৃশ্যত, এখানে ট্রাম্পের অবস্থানকে মেনে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের দরিদ্রতম নারী ও মেয়েদের শিক্ষার জন্য ৩০০ কোটি ডলার অর্থায়নেও সম্মত হয় সব দেশ। তবে প্রাথমিক সম্মতি সত্ত্বেও শেষ অবধি যুক্তরাষ্ট্র এই বিবৃতি থেকে সরে আসে। ১লা জুন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও মেক্সিকো থেকে স্টিল আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেছেন, এই পদক্ষেপ ঘরোয়া উৎপাদনকারীদের সুরক্ষার জন্য নেয়া হয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই পদক্ষেপের পর ইইউ হার্লে ডেভিডসন মটোরসাইকেলসহ নানাবিধ মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। কানাডা ও মেক্সিকোও পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জি৭ হলো বিশ্বের শীর্ষ শিল্পোন্নত ৭টি দেশের সংগঠন। এই ৭টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের ৬০ শতাংশ বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। জি৭ সম্মেলনে মূলত অর্থনীতি প্রাধান্য পায়। তবে অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যু নিয়েও এখন এই সম্মেলনে প্রায়ই আলোচনা হয়। ২০১৪ সালের আগে এটি ছিল জি৮। তখন রাশিয়াও ছিল এর সদস্য। তবে ওই বছর ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া দখলে নেয়ার পর রাশিয়াকে এই গ্রুপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। শুক্রবার ট্রাম্প মেক্সিকোকে এই গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়ে সকলকে চমকে দেন। তবে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল জানান বাকি কোনো সদস্য রাষ্ট্রই এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নয়।

ঈদেও ওদের মুখ যন্ত্রণায় নীল by মরিয়ম চম্পা

সড়কে এখন মানুষের জীবনই যেন সবচেয়ে সস্তা, তুচ্ছ। পরিবহন এখানে অপ্রতিরোধ্য। মৃত্যু কারণ শূন্য। চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘনায় নিহত রাজীব, রোজিনা, আহত রাসেল, হৃদয়দের পরিবারে আর ঈদের আনন্দ নেই। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনো শোকাচ্ছন্ন। দুই বাসের চাপায় কলেজছাত্র রাজীব হোসেনের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাজীবের পর বাসচাপায় পা হারান রোজিনা আক্তার। এই দুজনের মৃত্যুর পর নগর পরিবহনের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। কিন্তু তার পরও হাত-পা হারিয়েছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন খালিদ হাসান হৃদয়, রাসেল সরকার, পুলিশ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন, রুনি আক্তার ও আয়েশা খাতুন। কিন্তু কোনো প্রতিকার মিলছে না। দুই বাসের প্রতিযোগিতায় প্রথমে হাত হারালেন রাজীব, শেষে জীবনও। মা-বাবা হারানো পরিবারে বড় ভাই রাজীব হোসেনই ছিলেন ছোট দুই ভাই মেহেদী ও হৃদয়ের একমাত্র আশ্রয়। এ বছর ভাইকে ছাড়া কীভাবে ঈদ করবে মেহেদী হাসান ও আবদুল্লাহ হৃদয়। মেহেদী বলেন, ঈদের ছুটিতে আমি আর ছোট ভাই হৃদয় গ্রামের বাড়ি যেতাম। গ্রামের বাড়ি বলতে পটুয়াখালীর বাউফলে নানাবাড়ী। মা-বাবার কবর এখানেই। তাই ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছাটা তীব্র হতো। আমাদের ভীষণ ইচ্ছা ছিল তিন ভাই মিলে কোনো এক ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাব। যেতে যেতে অনেক আনন্দ করব। বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার কবরের পাশে দাঁড়াব। কিন্তু এবার বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাইয়ার কবরের পাশেও যে দাঁড়াতে হবে কখনোই ভাবতে পারিনি। ৩রা এপ্রিল সার্ক ফোয়ারার কাছে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় ডান হাত হারানো রাজীব হোসেন ১৬ই এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজেই মারা যান। রাজিবের বড় খালা জাহানারা বেগম বলেন, ভাইকে ছাড়া এবছর রাজিবের ছোট দুই ভাইয়ের প্রথম ঈদ আসতেছে। আমরা দুই বোন মিলে মেহেদী ও হৃদয়কে নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছি। তারপরেও ওদের দুই ভাইয়ের কান্না যেন থামছে না। ওরা বলে, সবাই যাবে ঈদের আনন্দ করতে আর আমরা যাবো ভাইয়ার কবর জিয়ারত করতে। গত বছরও ঈদে ভাইয়া বেঁচে ছিল। এবছর সেই ভাইয়ার কবর জিয়ারত করবো কীভাবে।
রাজিবের মেজো খালা খাদিজা বেগম বলেন, ওদের মাদরাসা বন্ধ থাকায় এখন বড় খালার বাসায় আছেন। আমার বাসায়ও বেশ কিছুদিন ছিল। রাজিবের দুই ভাই সবসময় বাড়িতে ঈদ করলেও রাজীব রোজার ঈদে ঢাকায় আমাদের সঙ্গে ঈদ করতো আর কোরবানিতে বাড়ি যেত। প্রতি বছর ঈদে ছোট দুই ভাইকে ঈদের জামা-কাপড় কিনে দেয়া, লঞ্চে তুলে দেয়া- তারা ঠিকভাবে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছে কি না সব খোঁজখবরই রাজীব করতেন। গত বছর রাজীব আর মেহেদী ঢাকায় ঈদ করেছিল। শুধু ছোট ভাই হৃদয় আব্দুল্লাহ গ্রামের বাড়িতে ছিল। প্রতি বছর কোরবানিতে বাড়িতে যাওয়ার সময় রাজীবই আমাদের লঞ্চে যাওয়ার ব্যবস্থা করতো। অথচ এ বছর ওকে ছাড়াই আমাদের ঈদ করতে হবে। ওর বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে প্রতিটা ঈদই আমরা এক সঙ্গে করেছি। আজ আমরা সবাই আছি শুধু রাজীব নেই আমাদের মাঝে। ঈদে রাজীব পোলাও-মাংস আর নুডুলসটা বেশি পছন্দ করতো। মিষ্টি জাতীয় খাবারও রাজীবের অনেক পছন্দের ছিল। রাজিব অনেক ভোজনরসিক ছিল। সব ধরনের খাবারই খেতে পছন্দ করতো। ঈদের দিন সকালে বড় খালার বাসায় খেয়ে দুপুরে আমার বাসায় খেতে আসতো। গত বছর ঈদের তিন দিনই আমরা সবাই বড় আপার বাসায় ছিলাম বলে জানান রাজীবের মেজো খালা খাদিজা।
ট্রাকচাপায় ১৭ই এপ্রিল টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস বাসের কর্মচারী খালিদ হাসান হৃদয়ের ডান হাত কাটা পড়ে। হৃদয়ের বাবা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, হৃদয় এখন অনেকটা সুস্থ্য। বার্ন ইউনিটের ডাক্তার ওকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার ছাড়পত্র দিয়েছে। এখন শুধু কেবিনের টাকাপয়সার আনুষ্ঠানিকতার জন্য আমাদের যেতে দেয়া হচ্ছে না। পরবর্তীকালে কেবিনের খরচের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা বলার পর দুপুর আড়াইটার দিকে তাদের হাসপাতাল থেকে বাসায় যাওয়ার চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়। এ সময় মুঠোফোনে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন হৃদয়ের বাবা। তিনি বলেন, এখন হৃদয়কে নিয়ে আমরা বাড়ি যাবো। ওর মা খুলনাতে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে। ছেলে বাসায় যাওয়ার পর তাকে নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করবেন হৃদয়ের মা। আমার ছেলেটা গত বছরও সুস্থ্যভাবে সবার সঙ্গে ঈদ করেছে। অথচ দেখেন এ বছর ছেলেটা একটি হাত বিহীন অবস্থায় ঈদ করবে। তার পরেও আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে আমার ছেলে প্রাণে বেঁচে আছে। তবে সরকারের কাছে আবেদন থাকবে যেন আর কোনো বাবা-মাকে সড়ক দুর্ঘটনায় সন্তানের অঙ্গহানী বা সন্তানহারা হতে না হয়। হৃদয় বলেন, আন্টি আজ আমি বাড়ি যাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করবেন। ঈদের পর সুস্থ্য হয়ে ঢাকায় এসে আপনার সঙ্গে দেখা করবো।
২০শে এপ্রিল রাতে বিআরটিসির দোতলা বাসের চাপায় ডান পা হারিয়ে ২৯শে এপ্রিল মারা যান গৃহকর্মী রোজিনা আক্তার। রোজিনার বাবা মো. রসুল মিয়া বলেন, ভালো নাইগো মায়া (মেয়ে)। গত বছর ঈদে আমার মায়া (রোজিনা) আমাদের সঙ্গে ঈদ করেছে। অথচ এ বছর তাকে ছাড়াই ঈদ করতে হবে। আমাদের কোনো ঈদ নাইরে মায়া। আপনে আমারে ঈদের কথা জানতে চাইছেন এদিকে আমার কইলজাডা ভাইঙ্গা যাইতেছে। গত বছর রোজার সময় রোজিনা প্রত্যেক দিন ভোররাতে ঠিক সাহরির সময় ফোন দিয়ে ওর মায়ের সঙ্গে কথা কইতো। মায়ের কাছে জানতে চাইত আজ রাতে কী রান্না করছো। এ বছর আমার সোনামণি তো আর তার মায়েরে ফোন দিয়া জানতে চায় না, কী রানছে। ওর মা এমনিতেই অসুস্থ্য, তার ওপর মেয়ের জন্য কান্না করতে করতে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। রোজিনার মায়ের লিভারে সমস্যা আছে। ঈদের পর অপারেশন। মেয়ের শোকে ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া নেই। গত বছর ঈদে রোজিনা ১২ হাজার টাকা দিয়েছিল। আমার জন্য আর ওর মায়ের জন্য নতুন পাঞ্জাবি শাড়ি কিনে পাঠিয়েছিল। এ বছর আর কেউ আমাদের জন্য জামা-কাপড় কিনে পাঠাবে না। কিছুদিন আগে রোজিনা যে বাসায় কাজ করতেন সেই বাসার সাহেব ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দিলেও আমার মায়ারে নিয়া তো আর ঈদ করতে পারমু না। এ বছর আমার রোজিরে ছাড়া ঈদ করতে হবে ভাবতেই পারি না। আমার রোজি হাতে অনেক সুন্দর করে মেহেন্দি দিতে পারতো। কোথায় গেল আমার রোজি, আর কোথায় গেল তার মেহেন্দি পরা হাত। মারা যাওয়ার আগেও আমার রোজির হাতে অনেক নকশা করা মেহেন্দি পরা ছিল।
২৭শে এপ্রিল রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভারের ধোলাইপাড় ঢালে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাসচাপায় রাসেল নামের এক প্রাইভেট কার চালকের বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রাসেলের স্ত্রী মিম আক্তার বলেন, এখন রাসেলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে এসেছি পায়ের ড্রেসিং করাতে। ২৯শে মে রাসেলকে এ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়েছে। পায়ের ঘা এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। একদিন পরপর পায়ের ড্রেসিং করতে হয়। সারা দিন বাসায় শুয়ে থাকে আর ব্যথায় চিল্লাচিল্লি করে। গ্রিন লাইন বাস মালিক কর্তৃপক্ষ ক্ষতিপূরণ দেয়া তো দূরের কথা, একবার ফোন দিয়ে খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। পুরো খরচ আমরাই বহন করছি। গত বছর রাসেল মালয়েশিয়াতে ছিল আর এ বছর ঈদের আগে তো পা-টাই হারালো। আসলে আমার কপালে গত বছর থেকেই ঈদের সুখটা জোটেনি। এ বছর যতই ঈদের দিন ঘনিয়ে আসছে ততই আমার কষ্টটা বাড়ছে। ঈদের কেনাকাটা করেছেন কি না জানতে চাইলে মিম বলেন, ঈদের কেনাকাটা তো দূরের কথা এখন আমার ছেলেটার ভবিষ্যৎ কী হবে, কীভাবে বাসা ভাড়া দিব, কী খাবো- এটা নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। প্রতিবার রাসেলের পায়ের ড্রেসিং-এর জন্য প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। আমার বাবার বাড়ির সম্পত্তি বন্ধক দিয়ে ওর চিকিৎসা খরচ চালাচ্ছি। এভাবে কত দিন পারবো জানি না।
ঢাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে গত শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টায় ছামিরুন আক্তার নামে এক নারী খিলগাঁও-মোহাম্মদপুর রুটে চলাচলকারী মিডলাইন পরিবহন বাসের চাপায় নিহত হন। হাইকোর্টের মাজার মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে সূত্রাপুরের বাসা থেকে বাসে করে এখানে এসেছিলেন। তার ছোট বোন সালমা জানান, তার বোন ছামিরুন প্রতি শুক্রবারই হাইকোর্ট মাজার মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন। ছমিরুনের ছেলে মো. উজ্জল বলেন, এখন যাচ্ছি মায়ের কবর জিয়ারত করতে। দুর্ঘটনার দিন রাতে মাকে নিয়ে একসঙ্গে সাহরি করেছিলাম। সকালে মাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে কর্মস্থল গাজীপুরে ফ্যাক্টরিতে চলে যাই। ওটাই যে মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হবে- কে জানতো। পরে থানা থেকে ফোন দিয়ে জানালো আপনার মা এক্সিডেন্ট করেছে, তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়েছে- তাড়াতাড়ি আসেন। পরে গিয়ে দেখি আমার মা আর বেচে নেই। খুব আশা ছিল এ বছর ঈদে মাকে নিয়ে অনেক ঘুরবো। মায়ের জন্য শাড়িও কিনেছিলাম দুটা। কিন্তু সব কিছুতো শেষ হয়ে গেছে। এখন আর কীসের ঈদ? আমার আর কোনো ঈদ নাই। দুই ভাই বোনের মধ্যে উজ্জ্বল ছোট। বড় বোন পারভিন ব্যবসায়ী স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর শ্যামপুরে থাকে। পুরান ঢাকায় ছেলে উজ্জ্বলের সঙ্গেই থাকতেন মা ছমিরুন। সাত বছর আগে গার্মেন্টকর্মী বাবা আব্দুল বারেক লিভার সিরোসিসে মারা যাওয়ার পর মাই ছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়। আজ মা নেই। এ বছর ঈদটা আমার জীবনে আনন্দ নয়, অভিশাপ হয়ে এসেছে বলে জানান উজ্জ্বল।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, মানুষ মারা যাবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার নামে এই যে হত্যাকাণ্ড এটাকে তো কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। শুধু আমাদের সড়ক ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণেই এমনটা হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে অনেকবার বলেছি যে, সড়কের অবস্থাপনা ও দুর্নীতি যদি কমিয়ে আনা যায় তাহলে একদিকে এই অপমৃত্যুগুলো কমানো সম্ভব। ঠিক একইভাবে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেয়া সম্ভব। সড়কে এই যে অনেকগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, কাল যে আপনে বা আমি যাবো না- সেটাওতো সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় না। কাজেই সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সরকারের কর্তাব্যক্তিদের এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।

‘তোমরা একলা খাইও না আমরার সবরে লইয়া খাও’

শ্রীমঙ্গল মির্জাপুর ইউনিয়নে বালুর ঘাট দখল নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বৌলাছড়া, মুড়াছড়া, ঝলমছড়া ও কালিছড়া- এ চারটি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে মির্জাপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার মনু মিয়ার ছেলে যুবলীগ নেতা জুয়েল মিয়া ও ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বৌলাসী গ্রামের সভাপতি আব্দুর রশিদ গ্রুপ এখন মুখোমুখি। এনিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
মির্জাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ফিরোজ মিয়া মাস্টার বলেন, বালুর ঘাট দখল নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৈশাখের প্রথম থেকে বালুঘাট দখল নিয়ে বৌলাশীর দক্ষিণ পাঁচাউন ও উত্তর বৌলাছড়া গ্রামের দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। পরে দুপক্ষের সমঝোতায় বালু তুলবে বলে শ্রীমঙ্গলে ও স্থানীয়ভাবে দুবার শালিস বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত কয়েক দিন ধরে বৌলাছড়ার বালুমহালে একপক্ষের বালু উত্তোলন করতে গিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়। জুয়েল মিয়া বৌলাছড়ার ভাঙ্গাপুল এলাকা থেকে বালু তুলে আর রশিদ মিয়া একই ছড়ার চা-বাগানের পাশে নন্দর পতিত জমি থেকে বালু তোলা শুরু করে। এ ঘটনায় দুপক্ষের মধ্যে নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়। এ ঘটনায় ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি কলিম মিয়া হামলার শিকার হয়, এতে তার মাথায় চারটি সেলাই দেয়া হয়েছে।
এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে উপজেলার ১নং মির্জাপুর ইউপির ৭, ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডেও বাসিন্দারা গতকাল মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এতে বলা হয়, এলাকার প্রভাবশালী মেম্বার মনু মিয়ার ছেলে জুয়েল মিয়া, জিতু মিয়া, রুবেল মিয়া জোরপূর্বক প্রাকৃতিক ছড়ার বালু অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে। এ কারণে এলাকার ব্রিজ, রাস্তাঘাট ও ছড়ার পাড় ভেঙে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। দীর্ঘদিন এর বিরুদ্ধে আপত্তি করেও কোনো লাভ হয়নি।
পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা’র উচ্চ আদালতে দায়ের করা একটি রিটের কারণে উপজেলার সবকটি ছড়ার বালু উত্তোলনের ইজারা বন্ধ রয়েছে। তারপরও প্রভাবশালীরা সংঘবদ্ধ হয়ে এসব ছড়ার বালু উত্তোলন করছে।
রোববার দুপুরে উত্তর বৌলাছড়া গ্রামে সরজমিনে দেখা গেছে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে গ্রামের যোগাযোগের একমাত্র ব্রিজটি গোড়া থেকে ওপর পর্যন্ত হেলে পড়েছে। ব্রিজের পাশে ছড়া থেকে বালু তুলে রাস্তার ধারে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ট্রাক্টরে করে এসব বালু প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনে জড়িত শ্রমিক একই গ্রামের জুমান বলেন, ৩০০ টাকা রোজে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এখানে বালু তুলছি। জুমান বলেন, মনু মেম্বারের ছেলে জুয়েল এসব বালু তোলাচ্ছে।
একইভাবে দক্ষিণ পাঁচাউন এলাকার যাত্রাপাশা গ্রামে আঞ্চলিক সড়কের পাশে ঝলমছড়া থেকে বালু তুলতে দেখা গেছে। এলাকার প্রণব চন্দ্র দেব (৫০) বলেন, বাবার শ্মশানের ওপর তারা বালু তুলে জমা করছে। এখানে ভৈরবতলীও রয়েছে। আমরা আপত্তি দেয়ার পরও মনু মেম্বারের ছেলে জুয়েল ও রুবেল জোর করে বালু তুলছে। প্রদীপ দেব (৫৫) বলেন, এখানে বালু তোলার কারণে ছড়ার পাড় ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের বাধা কেউ মানছে না। সাবেক ইউপি সদস্য আছকির মিয়া বলেন, শ্মশানের ওপর বালু তুলে রাখায় এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত।
এ ব্যাপারে যুবলীগ নেতা জুয়েল মিয়া বলেন, ‘আমাদের ৪০-৫০ জন লোক আছে, সবমিলে মির্জাপুরে একটি সিন্ডিকেট হয়েছে। এতে সবদলের মানুষ আছে। স্থানীয় কোন সমস্যা হলে আমরা দেখবো। আমার একার কিছু না। অনেক জনের বিষয়-আশয় আছে’। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রশিদ মিয়া বলেন, ‘জুয়েলকে বলেছি ‘তোমরা একলা খাইও না, আমরার সবরে লইয়া খাও’। সিন্ডিকেটরে ২০ হাজার টাকাও দিছি। এরপরও হেরা বালু তুলে একলা খায়। তিনি বলেন, ‘দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও মার্ডার হওয়া থেকে বালু তোলা বন্ধ থাকা ভালো। আমরা চাই না এলাকায় ভেজাল সৃষ্টি হোক। এখন যে অবস্থা আমরা বাজার-হাটে উঠতে পারি না। সুফি মিয়া নামে এক ছেলে আমাকে হাত-পা কেটে ফেলার হুমকি দিছে’। এই ভয়ে বাজারে যেতে পারছি না।
এ প্রসঙ্গে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম বলেন, ‘মনু মেম্বারের ছেলে জুয়েল বালু অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে এমন অভিযোগ স্থানীয় এলাকাবাসী থেকে পেয়েছি। এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে’।

জামদানি পল্লীতে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা by জয়নাল আবেদীন জয়

ঈদ দরজায় কড়া নাড়লেও রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীতে তাঁতিদের কর্মব্যস্ততা কমেনি। কাকডাকা ভোর থেকে মধ্য রাত অবধি এখনো চলছে অভিজাত এ বস্ত্র বুননের ব্যস্ততা। নাওয়া-খাওয়া ভুলে বছরের সবচেয়ে চাহিদার সময়টাতে একটু বাড়তি পরিশ্রম করে দু’পয়সা উপার্জনে ব্যস্ত সবাই। জামদানি পল্লীতেও রয়েছে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। চলতি ঈদ মৌসুমে দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়েছে প্রত্যাশা অনুসারে। শীতলক্ষ্যা পাড়ের বাতাসের অবাক যাদুর পরশেই তৈরি হয়েছে বিশ্ব মাতানো এ জামদানি কাপড়। তাঁতিরা খুশি কাঙ্ক্ষিত বিক্রি-বাট্টায়। খুশি মহাজন আর জামদানি সংশ্লিষ্টরা। এবারের ঈদে শত কোটি টাকার জামদানি কাপড় বিক্রি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এখনো পল্লীতে আগমন ঘটছে সব ক্রেতাদের।
বিসিকের হিসাব মতে কেবল চলতি ঈদকে সামনে রেখে দেশের বাইরে রপ্তানি হয়েছে অন্তত ৪০-৪৫ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি।
সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের শেষ সময়েও কর্মমুখর নোয়াপাড়ার জামদানি পল্লী। এছাড়া পার্শ্ববর্তী কাজীপাড়া, দক্ষিণ রূপসী, বরাব, খালপাড়, পবনকুল, মোগরাকুল, সাদিপুর, বেহাকুর, মৈকুলী, নাওরা ভিটা, খাদুন, রূপসী, গন্ধর্বপুর, মুড়াপাড়া, ব্রাহ্মণগাঁও, গঙ্গানগরসহ আশেপাশের গ্রামগুলোতে ঈদকে ঘিরে চলছে তাঁতিদের ব্যস্ততা। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শিল্পীরা এখন কাপড় বুনে যাচ্ছেন এক মনে। এবারের ঈদে দেশের বিভিন্ন বিপনী বিতান ও বিদেশে আগের তুলনায় দ্বিগুণ কাপড় যাচ্ছে তাদের। কারো হাতে ফুসরত নেই, নেই কথা বলার দোদণ্ড সময়। একেকটি কাপড় শেষ করার পরই হাতে আসছে নতুন অর্ডার। যত কাজ তত উপার্জন নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে কারিগরেরা। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের স্থানীয় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঈদে বাড়তি আকর্ষণ জুড়তে কারিগরেরা জামদানির ডিজাইনে এনেছেন নতুনত্ব। তৈরি হচ্ছে চোখ জুড়ানো ফুলতেরছি, ছিটার তেরছি, ছিটার জাল, সুই জাল, হাঁটু ভাঙ্গা, ডালম তেরছি, পার্টিরজাল, পান তেরছি, গোলাপ ফুল, জুঁই ফুল, পোনা ফুল, শাপলা ফুল, গুটি ফুল, মদন পাইরসহ প্রায় শতাধিক নকশার জামদানি। এগুলোর মধ্যে ছিটার জাল, সুই জাল ও পার্টির জাল জামদানির মূল্যে সব চেয়ে বেশি। এসব জামদানি শাড়ির দাম পড়ে ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। এবারের ঈদে দেশের বাজারের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রপ্তানি হয়েছে। ঈদ সামনে রেখে জামদানির মেলা বসেছে রাজধানীর কয়েকটি জায়গায়সহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায়, ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোর ও ইউরোপের ৩-৪টি দেশে। শুধু এই ঈদেই রূপগঞ্জ থেকে অন্তত ৪০-৪৫ কোটি টাকার জামদানি রপ্তানি হয়েছে বলে ধারণা করছে বিসিক। এছাড়া নোয়াপাড়া জামদানি প্রজেক্টের ভিতরের এবং ডেমরা বাজারের সাপ্তাহিক দুটি হাটেও ক্রেতাদের ছিল উপড়ে পরা ভিড়। এসব হাটে অন্তত আরো ৪০-৫০ কোটি টাকার বিক্রিবাট্টা হয়েছে বলে ধারণা বিসিক ও জামদানি ব্যবসায়ীদের।
কাউসার জামদানি উইভিংয়ের মালিক হামিদুল্লাহ মিয়া জানান, এবারের ঈদের বেচাকেনায় সন্তুষ্ট তিনিসহ স্থানীয় জামদানি ব্যবসায়ীরা। কিন্ত জামদানি তার অতীতের গৌরব অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন উল্লেখ্য করে তিনি বলেন জামদানিতে সরকারি নজরদারি বাড়িয়ে তাঁতি এবং ব্যবসায়ীদের সুযোগ সুবিধা দিলে এ শিল্পটি আবার স্বরুপে ফিরবে আসবে। রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী কবির হোসেন বলেন, রপ্তানি বেশ ভালোই হয়েছে। কিন্ত দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বিকাশ করা জন্য আমরা যারা দেশের বাইরে মেলায় অংশগ্রহণ করে জামদানিকে বিকাশের চেষ্টা করছি। আমাদের কাস্টমসে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বিদেশে গিয়ে মেলা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আরেক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখন জামদানির আদলে তৈরি হচ্ছে নকল জামদানি। আমাদের একটি সস্তা শাড়ি তৈরি করতে সপ্তাহখানেক সময় লেগে যায় সেখানে ভারত থেকে আমদানি করা সস্তা মানের সুতোয় আর মেশিনে একটি নকল জামদানি তৈরি হয়ে যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। এতে করে বদনাম হচ্ছে জামদানি শাড়ির।
কথা হয় জামদানি শিল্প নগরী বিসিকের উপব্যবস্থাপক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, জামদানি এ দেশের ঐতিহ্য। এ শিল্পকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যে জামদানি প্লট কল্যাণ সমিতি ৮ দফা দাবি পেশ করে আবেদন করেছেন। এসব জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া প্রকৃত জামদানি তাঁতি আর ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। আমরা কারিগরদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজাত জামদানিতে এনেছি নতুনত্ব। এ কারনে বর্তমানে দেশ বিদেশে চাহিদা বাড়বে জামদানির। চলতি ঈদে দেশ বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মতো জামদানি শাড়ি কেনাবেচা হবে বলে আমাদের ধারণা। যা বিগত সময়ের চেয়ে বেশি। এটাই আমাদের সফলতা।