Friday, February 20, 2015

মমতার সফর অমীমাংসিত বিষয় সমাধানে সহায়ক হবে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ সফর দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। শুক্রবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে যান মমতা ব্যানার্জী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত শেষে রাষ্ট্রপতি এ আশা প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব এহসানুল করিম এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
এহসানুল করিম জানান, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মমতা বন্দোপাধ্যায় বেশ হাসিখুশি ছিলেন। তারা দুইজন পরস্পরের সঙ্গে আলাপের সময় দুইদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
রাষ্ট্রপতিকে মমতা জানান, দুইদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও প্রাচীন। দুইদেশের মধ্যে তিস্তা, স্থল সীমানা চুক্তি, ছিট মহল বিনিময়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যা চলছে। সেসব বিষয় মীমাংসার জন্য বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করবেন মমতা।
দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রসঙ্গে মমতা বলেন, একসঙ্গে বসে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব সমস্যার সমাধান করা যাবে। এ সময় তিনি দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিশেষ করে পশ্চিবঙ্গের সঙ্গে পর্যটন খাতে পারস্পরিক সম্পর্ক বিকাশের সুযোগ রয়েছে। এই খাত বিকশিত হলে বিদেশি পর্যটকেরা দুই দেশেই সফরে আসতে আরও আগ্রহী হবে।
আগরতলা-ঢাকা-কলকাতার মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস ও খুলনা-কলকাতার মধ্যে ট্রেন সার্ভিস চালুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে মমতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতায় ‘নজরুল তীর্থ’ ও আসানশোলে ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনে পদক্ষেপ নিয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ প্রতিষ্ঠা এবং ‘নজরুল তীর্থ’ ও ‘কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগ্রহ প্রকাশ করায় ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি হামিদ। তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
এর আগে সকালে রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বাংলাদেশ-ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ওই মতবিনিময় সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাদেশ-ভারত একে অপরের বন্ধু। এ দুই দেশ যাতে ভাল থাকতে পারে, সে জন্য মনের দরজা খুলে দিতে হবে। এতে বন্ধুত্ব আরও সুদৃঢ় হবে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মনের বেড়া আটকানো যাবে না।
তিস্তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বলেন, আমার উপর আস্থা রাখুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাপ করে এর সমাধান করবো। তিস্তা নিয়ে দুই দেশেরই সমস্যা রয়েছে। আমাদের উপর ছেড়ে দিন। এই চুক্তি নিয়ে চিন্তা করবেন না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর আমন্ত্রণে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে বাংলাদেশে এসে পৌছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম অর্ভ্যথনা জানান। বিমান বন্দরে নেমেই আতিথেয়তায় মুগ্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মনে হচ্ছে নিজের দেশে এসেছি। তিনি বলেন, দুই বাংলার সম্পর্ক অনেক পুরোনো। সামনের দিনগুলোতে এই সম্পর্ক আরও গাঢ় হবে।
মমতা বন্দোপাধ্যায় শুক্রবার মধ্যরাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। রোববার সন্ধ্যায় তিনি পশ্চিমবঙ্গের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে যাবেন।

‘মধ্যবর্তী নির্বাচনই সঙ্কট সমাধানের উপায়’ -এমাজউদ্দীন

মধ্যবর্তী ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ। বলেছেন, জনমতবিহীন শাষণ ব্যবস্থায় কোন সুশাসন আসতে পারে না।  দেশের মধ্যে এমন একটি প্রতিষ্ঠানও পাওয়া যাবে না যেখানে সুশাসন চলছে, এমন উদাহরণ কোন মন্ত্রীও দিতে পারবেন না। দ্রুত একটি মধ্যবর্তী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেই চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবে। আজ দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অলি আহাদ স্মৃতি সংসদ আয়োজিত ভাষাসৈনিক অলি আহাদের স্মরণসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, এখনও রাজনৈতিক সব দলের মধ্যে ভাল ও উত্তম ব্যক্তিরা আছেন। তাদের কাছে আমার আবেদন আজকের সঙ্কটময় অবস্থা দূর করতে রাজনীতিকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে ও মানুষের কল্যাণের জন্য আপনারা রাজনীতি করুণ। দেশের বর্তমান সঙ্কট উত্তরণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পর্যাপ্ত খাবার ছাড়া নিজ কার্যালয়ে বন্দি আছেন- এটা কোন ধরনের মানবিকতা। কেউ অন্তরীণ থাকলেও তার খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া খাবার পাবেন না- এটা ভাবা যায় না। তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ হচ্ছে দেশের শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করা। এ বাহিনী শুধু বিরোধী দলকে দমনের জন্য কাজ করছে। দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশে  দেখছি। অলি আহাদ সম্পর্কে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, তিনি ছিলেন মুক্ত মনের অধিকারী। যা মনে করতেন স্পষ্ঠভাবে তাই উচ্চারণ করতেন। ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আব্দুল মতিন, গাজীউল হক ও অলি আহাদ- এ তিন ভাষাসৈনিক সকলের কাছেই বিভিন্নভাবে সুপরিচিত ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাদের অবদানের জন্য আজ বাংলা ভাষা বিশ্বের ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাত পোহালে ২১শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এখন বিএনপির পক্ষ থেকে অবরোধ তুলে দেয়ার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। আমি মনে করি, ২১শে ফেব্রুয়ারিতে অবরোধ চলতে পারে না। সরকার বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করবে না বলে জেদি আচরণ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আপনারা খালেদা জিয়াকে মানছেন না, ২০ দলকে মানছেন না, কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকান ফরেন মিনিস্টার, জাতিসংঘকে এত সহজে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। সরকারের উদ্দেশে মাহমদুর রহমান মান্না বলেন, আপনারা বলছেন, ডাকাতের সঙ্গে কিসের কথা? আপনারা বিডিআরের সঙ্গে কথা বলতে পারলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে পারলেন, আমার নেতা ও আপনাদের নেতা বঙ্গবন্ধু, ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে ১৫ বছর পর্যন্ত কথা বলতে পারলেন, আপনারা পারবেন না কেন? অলি আহাদ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ভাষাসৈনিক অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সভাপতিত্বে স্মরণসভায় ভাষাসৈনিক রওশন আরা বাচ্চু, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেন, ব্যারিস্টার পারভেজ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

জাতিসংঘের উদ্যোগে আওয়ামী লীগে অশ্বস্তি by জাকির হোসেন লিটন

চলমান সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সংলাপ প্রস্তাবকে মুখে পাত্তা না দিলেও অশ্বস্তিতে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সেজন্য চিঠির চুলচরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে দলটিতে। এ চিঠির জবাব দেয়া হবে কীনা এবং দিলে কি ভাষায় দেয়া হবে তা নিয়ে বিস্তর আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে দলটির নীতি নির্ধারকদের মধ্যে। দলের কট্রপরপন্থী বলে পরিচিত নেতাদের মতে, এ চিঠিকে আমলে নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সেজন্য জবাব দেয়ারও প্রশ্ন আসেনা।
কিন্তু অপেক্ষাকৃত মধ্যমপন্থী নেতাদের মতে, এ চিঠিকে তাচ্ছিল্য করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং চিঠির জবাব দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করাই শ্রেয়। না হলে শান্তিরক্ষী মিশনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ইস্যুতে জাতিসংঘ থেকে পুনরায় দায়িত্ব পাওয়া অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশ সফরে আসলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দুই দলের মধ্যে হওয়া অলিখিত সমঝোতা চুক্তির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসতে পারে। এছাড়া দুই দলকে সংলাপে বসতেও বাধ্য করা হতে পারে। সেজন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠি আসলেও তারানকো যাতে বাংলাদেশ সফরে না আসেন সেই লক্ষে সব ধরণের ক’টনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ি প্রতিনিধি আব্দুল মোমেন বিষয়টি দেখভাল করছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে শুরু হওয়া অচলাবন্থার অবসানে দেশী বিভিন্ন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও জাতিসংঘসহ ক’টনৈতিক মহল সংলাপের তাগিদ দিলেও সরকার কোনোভাবেই তা আমলে নেয়নি। আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে দেয়া সুশীল সমাজের সংলাপের উদ্যোগও ক্ষমতাসীন দলের অনীহার কারণে এক রকম চাপা পড়ে আছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে দুই নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীজোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সঙ্কট নিরসনে সংলাপের তাগিদ দিয়ে চিঠি দেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। কিন্তু রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেই চিঠির কথা প্রকাশ করেনি। মঙ্গলবার রাতে চিঠির কথা গণমাধ্যমে জানাজানি হলেও দল ও সরকারের কোনো নেতা বা কর্মকর্তাই চিঠির বিষয়টি স্বীকার করেন নি।
অবশেষে বিভিন্ন সূত্রসহ গতকাল গণমাধ্যমে চিঠির কথা প্রকাশ হলে সরকারও তা স্বীকার করে নেয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল চিঠির বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে সহিংসতার প্রতি নিন্দা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চিঠিতে জাতিসংঘ মহাসচিব রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্যোগ নিতে বলেছেন। চিঠিটি আরো দুই সপ্তাহ আগে লেখা হয়েছে। কিন্তু আমরা গত পরশুদিন (সোমবার) পেয়েছি।’
সূত্রগুলো জানায়, চিঠি পওয়ার পর সরকারপক্ষ কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। আর কৌশলগত কারণেই ওই চিঠির কথা কাউকে জানানো হয়নি। কিন্তু গণমাধ্যমে চিঠির কথা প্রকাশ হলে খানিকটা নড়েচড়ে বসেন সরকারের নীতি নির্ধারকেরা। গতকাল সব আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে বান কি মুনের ওই চিঠির প্রসঙ্গ আলোচনা হয়। এ সময় কেউ কেউ চিঠি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন। কেউ কেউ মনোবল ঠিক রেখে চিঠিকে পাত্তা না দিয়ে সরকারকে কঠোর অবস্থানে অটল থাকার যুক্তি তুলে ধরেন। তাদের মতে, অন্যান্য সব উদ্যোগের মতো আন্তর্জাতিক এ উদ্যোগটিও ব্যর্থ হবে। কারণ, বর্তমানে দেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে না, যা চলছে তা হচ্ছে-বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে জঙ্গিবাদি তৎপরতা। মানুষ পুড়িয়ে হত্যা কোনো রাজনীতি হতে পারেনা। এগুলো জঙ্গিবাদি তৎপরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই জাতিসংঘের চিঠির আহবানে সাড়া দেয়ার কোনো মানে নেই।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘অনেকে অনেকভাবে আশা প্রকাশ করতে পারেন। আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল। যারা দানবের মতো মানুষের ওপর হামলা করে তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না। সংলাপের প্রশ্নই আসে না।’
বাংলাদেশে এখন যুদ্ধ চলছে মন্তব্য করে জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, যুদ্ধে জয়ী না হয়ে সংলাপ হবে না। দানবের বিরুদ্ধে মানবের এ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পরে সংলাপ-সমঝোতা বৈঠক, তার আগে নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলাপ হয়েছে। সরকার এই পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম। সরকার কোনো সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসবে না। কোনো ধরণের সংলাপের প্রশ্নই আসে না। কোনো খুনির সঙ্গে সংলাপ করতে চাই না।’
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, দল ও সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে যাই বলুকনা কেন বাস্তব অবস্থা ভিন্ন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের চিঠি নিয়ে সরকার রীতিমতো অশ্বস্তিতে রয়েছে। সেজন্য চিঠির ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়।
দলের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য আলাপকালে বলেন, সঙ্কট নিরসনে অন্যান্য সব উদ্যোগের মতো জাতিসংঘের এ উদ্যোগকে এক করে দেখলে চলবে না। গায়ের জোরে সব কিছু নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা ঠিক নয়। এ চিঠির গুরুত্ব অনুভব করে বান কি মুনকে তার জবাবও দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন এ নেতা।
সম্পাদক মন্ডলীর একজন সিনিয়র সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুশীল সমাজ ও ক’টনৈতিক সব উদ্যোগকে আমরা উড়িয়ে দিলেও জাতিসংঘের উদ্যোগকে সেটা করা সম্ভব নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে এ নেতা আরো বলেন, ওই সময় আমরা কেউ সংলাপে বসতে রাজি হইনি। কিন্তু জাতিসংঘের উদ্যোগে তারানকোর মধ্যস্থতায় অবশেষে দুই দল সংলাপে বসতে বাধ্য হয়েছে। তাই এবারো সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে ফেরাতে সহযোগিতার প্রস্তাব কেরির

বাংলাদেশে চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। একই সঙ্গে তিনি সব রাজনৈতিক দলের ‘নির্বিঘেœ মত প্রকাশের’ অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে সার্বিক মানবাধিকার রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা পালনের জন্য মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী গতকাল এক বৈঠকে বাংলাদেশে চলমান পরিস্থতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক অন্যান্য ইস্যুতে আলোচনা করেন। গতকাল সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রশংসা করেন কেরি। তাদের আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে অর্জিত সাফল্য প্রসঙ্গ। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও শ্রম পরিস্থিতি উন্নয়ন ইস্যুতে আমাদের যৌথ প্রচেষ্টার বিষয়েও আলোচনা করেন তারা। আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন কেরি। তিনি বাংলাদেশের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
শান্তিপূর্ণভাবে সাম্প্রতিক সহিংসতা অবসানে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সব রাজনৈতিক দলকে শান্তিপূর্ণভাবে তাদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। মানবাধিকার রক্ষায় গঠনমূলক ভূমিকা পালনের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও জোর দেন তিনি। রাজনৈতিক দলগুলো বেসামরিক মানুষকে টার্গেটে পরিণত করার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন কেরি। তিনি বিরোধী দলগুলোকে অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে নিরীহ মানুষকে টার্গেটে পরিণত করার কৌশল বা রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয়গুলো সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণের অবকাশ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ যাতে একটি রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে, যা বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ভিত্তিমূলে ফেরাবে, সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন করে সমর্থন ও সহযোগিতার প্রস্তাব দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার দ-াদেশ প্রাপ্ত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দিতে জন কেরির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঢাকা সফরের আহ্বান জানালে জন কেরি ইতিবাচক মনোভাব ব্যাক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম জিয়া উদ্দিন, পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হক  ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আমেরিকাস) মাহফুজুর রহমান এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সহকারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক) নিশা দেশাই বিসওয়াল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউস কাউন্টারিং ভায়ালেন্স এক্ট্রিমিজম সামিটে যোগ দিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাহমুদ আলী ওয়াশিংটন সফর করছেন। বৃহস্পতিবার চরমপন্থা বিরোধী ওই সম্মেলনে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন তিনি। সম্মেলনের সাইড-লাইনে দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বৈঠক হয়।

আবুধাবিতে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশীসহ ১০ জনের মৃত্যু

আবুধাবির মোসাফফাহ নামক স্থানে অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০জন। হতাহতদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ঠিক কতোজন বাংলাদেশী মারা গেছেন এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন নিহতদের অন্তত তিনজন বাংলাদেশী। নিহতদের শরীর পুড়ে যাওয়ায় তাদের সনাক্ত করা যাচ্ছে না। স্থানীয় সূত্র জানায়, মোসাফফাহ এলাকার সাত নম্বর রোডের ১নম্বর গলিতে একটি টায়ারের দোকানে আগুন লাগে। এসময় নিহতরা ওই দোকানের উপরের তলায় ঘুমে ছিলেন। আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর আমান উল্লাহ চৌধুরী ঘটনা সম্পর্কে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করতে পারলেও তাৎক্ষণিক হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি। নিহতদের মরদেহ আবুধাবী শেখ খলিফা মেডিকেল কলেজ মর্গে রাখা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, আগুনের ঘটনায় ৪জন বাংলাদেশী নিখোঁজ রয়েছেন। তারা হলেন, এনামুল হক, ইসমাইল, আবদুস শুকুর ও মোহাম্মদ সেলিম।

ই-বুক এবং কাগজের বই by ফজলুল হক সৈকত

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগে আধুনিক জীবন-ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছে ব্যাপক পরিবর্তনের হাওয়া। মানুষের আচার-আচরণ, অনুশীলন এবং চিন্তা-প্রকাশে এসেছে নতুনত্ব; পাঠাভ্যাসে প্রবেশ করেছে ভিন্নতর ভঙ্গি। কলকারখানায় প্রযুক্তির প্রয়োগে মানুষের কায়িক পরিশ্রমের জায়গা দখল করেছে মেশিন, রোবট প্রভৃতি। যন্ত্র যখন উৎপাদনে সরাসরি প্রচুর কাজ করছে, স্বাভাবিক-ভাবেই বহু মানুষ তখন বেকার হয়ে পড়ছে। তাই আধুনিক ছাপাখানায় নানান বিবর্তন পরিলক্ষিত হলেও প্রকাশনাশিল্পের শ্রমিকদের জায়গা দিনে দিনে সংকীর্ণ করে দিচ্ছে ই-বুক বা ইলেকট্রনিক বুক। কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং ইন্টারনেট সুবিধার কারণে বাজারে এসেছে ই-বুক পদ্ধতি। যেন হাতের ওপরে রাখা কম্পিউটারের ভেতরে ঢুকে গেছে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লাইব্রেরি। কেউ কেউ মনে করছেন, ই-বুক সনাতন পদ্ধতিতে প্রকাশিত ও প্রচলিত কাগজের বই-এর বাজারকে ধ্বংস করছে নীরবে। অনেকের ধারণা ই-বুক হাতের নাগালের মধ্যে থাকায় অগ্রসর পাঠক কাজগের বই পড়া কমিয়ে দিচ্ছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারেই পড়া ছেড়ে দিচ্ছে। তবে এর বিপরীত মেরুর কথাও রয়েছে। এমন অনেকে আছেন, যারা ই-বুক পড়লেও কাগজে ছাপা বই-এর গন্ধ থেকে দূরে সরে যাননি। হাতের আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় পাতা উল্টে উল্টে বই পড়ার আনন্দ থেকে তারা নিজেকে কিছুতেই বঞ্চিত করতে চান না।
এখনও পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে রয়েছে। দেশে-দেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও চালু হয়নি ডিজিটাল ক্লাসরুম। বাংলাদেশের মতো অনগ্রসর দেশে তো ডিজিটাল ক্লাসরুম এখনও স্বপ্নের মতো ব্যাপার। মেগাসিটিতে হাতেগোনা কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া বা অনলাইন সুবিধার আওতায় এলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর কাছে আজও এগুলো অপরিচিত শব্দ। আবার সাধারণ পাঠক কিংবা ভোক্তাসমাজ বিপুলভাবে ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় আছে, তাও নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ই-বুক একটি ধারণা মাত্র। তবে, দিনে দিনে তার প্রসার, পরিচিতি ও প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা ই-বুক ধারণাকে শক্তভাবে সমর্থন করেন, তারা বলছেন ওয়েবে বই পড়লে কাগজ কম খরচ হবে। আর যেহেতু কাগজ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে গাছ-কাঠ প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তাই কাগজের বই না পড়লে বৃক্ষনিধন কমে আসবে।
তবে, হয়তো একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বই ঠিকই ইলেকট্রোনিক ফরমেটে উৎপাদন করা যাবে, কিন্তু বিপুল বই থেকে যাবে কাগজে ছাপা আকারে। প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নও দেখা দিবে সাধারণ ভোক্তার মনে। ই-বুক সমৃদ্ধ এই আধুনিক বিশ্বে কি লাইব্রেরির কোনো প্রয়োজন আছে?- যে-কোনো গ্রন্থাগারিক কিংবা কোনো সাধারণ পাঠকের কাছে এইটি একটি অতি প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসা। একটা সময় ছিল যখন বড় বড় শহরের পথের ধারে বিপুল আকারের বইয়ের দোকান দেখা যেত, কিংবা রাস্তার মোড়ে চোখে পড়তো বইয়ের বিজ্ঞাপন অথবা পোস্টার। এখন হয়তো প্রকাশকরা খুঁজছেন বেশি লাভের প্রকাশনার খাত। যে-কোনো ধরনের ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন চ্যালেঞ্জের পথ ধরে অগ্রসর হয়। প্রকাশনাশিল্পের দীর্ঘদিনের পথ-পরিক্রমার ক্ষেত্রেও এই কথাটি সত্য। পঞ্চদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শুরু করে সমগ্র পৃথিবীতে গত কয়েক শতকে পাবলিকেশন সেক্টর নানান প্রতিবন্ধকতার পথ পারি দিয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে যদি আমরা এই প্রশ্ন করি যে, আমাদের লাইব্রেরিগুলোর কি প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোনিক বই ক্রয় করার আর্থিক সামর্থ্য আছে? কিংবা আমাদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশা অনুযায়ী কি গ্রন্থাগারগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ ও যোগ্য কর্মচারী রয়েছে? প্রতিটি লাইব্রেরিতে কি প্রচুর পরিমাণে জায়গা রয়েছে? সবগুলো লাইব্রেরি কি উপযুক্ত জায়গায় স্থাপিত? আমাদের সকল প্রতিষ্ঠানে, বিদ্যালয়ে, স্বাস্থ্য কিংবা রিসার্চ সেন্টারে অথবা সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে কি প্রয়োজন মতো সব বই আমাদের প্রকাশক বন্ধুরা সরবরাহ করতে পারছেন?
২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লজ অ্যাঞ্জেলস-এ অনুষ্ঠিত টাইম ফেস্টিভ্যালে বুক প্যানেল সেশনের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে, মাত্র কয়েক বছরে ই-বুক রিডারের সংখ্যা অবিশ্বাস্যরকমভাবে বেড়েছে। প্যানেল মনে করছে, সহজলভ্যতা ও অপেক্ষাকৃত কম মূল্য ই-বুক-এর বাজার সম্প্রসারণের মূল কারণ। সাম্প্রতিকালের অন্য একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত বিশ বছরে কাগজে ছাপা বইয়ের দোকানের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। কম্পিউটার প্রযুক্তি, ইন্টারনেট এবং টেলিভিশনের ফরমেট পরিবর্তন হওয়ার ফলে যেমন কমেছে সিনেমা হল, তেমনি কমছে বইয়ের দোকানও। লোকেরা এখন ঘরে বসে সিনেমা দেখে এবং কম্পিউটারের স্ক্রিনে বই পড়ে। আর আধুনিক ও নগরবাসী ক্রেতার জন্য বাজারে বা দোকানে গিয়ে কাগজের বই কেনার চেয়ে অনলাইনে বই ক্রয় করাটা সহজ। পাঠকের কাছে বই পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ই-বুক প্রকাশকরাও পাচ্ছেন বাড়তি সুবিধা। আর প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে প্রডাকশন ফরমেটে পবির্তন আনতে পারছে ই-বুক প্রকাশকরা। যেটা কাগজে ছাপার বই প্রকাশকদের পক্ষে বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে ই-বুক ধারণা ও পদ্ধতিটি নতুন হওয়ায় এখনও এখানে বিরাজ করছে বহু রকম সমস্যা। আর এই সমস্যাকে বাজারে নিজেদের অনুকূলে প্রচারণা হিসেবে নানানভাবে কাজে লাগাতে পারছে কাগজে ছাপা বইয়ের প্রকাশকবন্ধুরা।
লাইব্রেরি সব সময় টেকস্টকে গুরুত্ব দেয়। একটা সময় ছিল যখন আমাদের পুরনো বই খুঁজতে বাজারে যেতে হতো এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর হয়তো একটা ময়লাধরা ছেঁড়া-ফাটা-কাটা পুরাতন বই আমরা হাতে পেতাম। কিন্তু আজকের বিশ্বে, যখন ই-বুক ছড়িয়ে পড়েছে প্রযুক্তি বিস্তারের পথ ধরে, তখন মুহূর্তের মধ্যে আমরা ই-বুক ফরমেটে পুরনো বই (নতুনের মতোই) ডাউনলোড করতে পারছি আমাদের ডেক্সটপ, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে। ই-বুক কাউকে ধার দেওয়া চলে না, বিক্রিও করা যায় না। অবশ্য বন্ধুর লাইব্রেরি কিংবা পাড়ার পাঠাগারে তাকে সাজানো বইয়ের মতোও এটি নয়। আর তাই, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত নাগরিক কিংবা ওই ধরনের পরিবারের শিশুদের পক্ষে ই-বুক পড়াটা কঠিন ব্যাপার। তবে তারা অনায়াসে পাশের গণগ্রন্থাগারে গিয়ে অথবা কারো কাছ থেকে বই নিয়ে বা রাস্তা থেকে কাগজের বইয়ের ছেঁড়া পাতা কুড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু ই-বুক তো যেখানে-সেখানে সকলের নাগালের মধ্যে নেই! প্রসঙ্গত আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন লগ কেবিনে এবং বেড়ে উঠেছিলেন প্রবল দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে, স্বশিক্ষিত এই লোকটি সামান্য সঞ্চয়ের বই থেকে জীবনের অনেক পাঠ নিয়েছিলেন। তাঁর সামনে ই-বুকের বিরাট ভুবন খোলা ছিল না। আমাদের দেশের জ্ঞানতাপস ঈশ্বরচন্দ বিদ্যাসাগরের কথাও আমরা মনে করতে পারি।- এঁদের জ্ঞানপিপাসা মিটিয়েছিল কাগজে ছাপা বই! অবশ্য বলা যেতে পারে- লিংকন বা বিদ্যাসাগরের যুগ এটা নয়। দিকে দিকে চলছে এখন বসন্ত ও বিদ্রোহ। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ওপর ভর করে পৃথিবী এখন দারুণ গতিতে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। বদলে যাচ্ছে পড়াশোনার মাধ্যম ও উপাদান। একুশ শতকের এই প্রবণতার প্রবাহে আমাদেরকে ‘ডিজিটাল ডিভাইস’ গ্রহণ করতে হচ্ছে একরকম নিরুপায় হয়ে। উপকার যে আমরা পাচ্ছি না, তা নয়। তবে সনাতনী গন্ধ মন থেকে মুছে ফেলতে খানিকটা সময় লাগছে, এই আর কি!
প্রখ্যাত লেখক জন পিনকিন, কিছুকাল আগে, ই-বুক বাণিজ্যের মডেল সম্বন্ধে একপ্রকারে হতাশাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন: ‘একজন লেখক হিসেবে পরিবারকে ফুলটাইম সাপোর্ট দিতে গেলে আমাকে আমার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’ তাঁর এই মন্তব্যের পথ ধরে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ডিজিটাল বিপ্লব কেবল ট্র্যাডিশনাল ছাপাখানার মডেলকে বিপন্ন করছে তা না, নতুন লেখকরা এখন প্রকাশকদের নজরে আসতে পারছে না। কাজেই তারা জনগণের লেখক হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। ই-বুকের মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের লেখক সম্প্রদায় কেবল একটা বিশেষ শ্রেণির লেখক হয়ে উঠছেন। ই-বুকের দাম কাগজে ছাপা বইয়ের চেয়ে কম হওয়ায় প্রকাশকরা লাভ করছে সামান্য। বড় বড় পাইকারি বিক্রেতারাও কিছু নির্দিষ্ট ধরনের বই ক্রয় করছে। ফলে বইয়ের বাণিজ্যটা হয়ে পড়ছে একঅর্থে সীমাবদ্ধ। ই-বুক অর্থনীতি বর্তমান প্রজন্মের লেখকদের জন্য কিছুটা ব্যথা ও ক্লান্তি বয়ে আনছে। বেস্ট সেলার বই থেকে একজন লেখক যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারতেন, এখন তার অর্ধেকও তিনি পাচ্ছেন না। ২০১২ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে বিগত ২ বছরের তুলনায় ই-বুক থেকে আয়ের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কাগজে ছাপা বইয়ের বাজারকে অতিক্রম করতে পারে ডিজিটাল বিপ্লব ও ই-বুক কনসেপ্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইইউর হুঁশিয়ারি

গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ক্রমবর্ধমান সহিংসতার অবসান এবং রাজনৈতিক সঙ্কটের সুরাহার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার উপ-কমিটির সদস্যরা গতকাল এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলপূর্বক গুম, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সুশীল সমাজের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক  অধিকারের বিনিময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। যেসব বেসরকারি সংগঠন বিপন্ন মানুষের উন্নতির জন্য পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে ফরেন ডোনেশন অ্যাক্টের আওতায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নের জন্য এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওদিকে, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন উদ্বেগ নেই বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের দেয়া বক্তব্য নাকচ করে দিয়েছেন প্রতিনিধিদলের প্রধান ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেডা। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের সামনে শাহরিয়ার আলমের বক্তব্য সংবলিত সংবাদের কপি দেখিয়ে বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণেই আমরা এ দেশ সফরে এসেছি। বৈঠকে গণগ্রেপ্তার নিয়েও প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে যা বলা হয়েছে:  ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক তিন সদস্যের একটি সাব কমিটি ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদশে সফর করেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেডা (দ্য ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি)। তার সঙ্গে ছিলেন ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য জোসেফ ওয়েডেনহোলজার (দ্য প্রেগ্রেসিভ এলায়েন্স অব সোশালিস্টস অ্যান্ড ডেমোক্রেটস), ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সদস্য ক্যারল কারস্কি (ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফরমিস্টস গ্রুপ)। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। ২০০১ সালের কো-অপারেশন এগ্রিমেন্টের ধারা-১ অনুসারে এটা করা হয়। প্রতিনিধিদলের সফরের উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেয়া। শ্রম অধিকার, শিশু ও নারী অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়ে ধারণা নেয়া। বিশেষ করে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় যে সহিংসতা সৃষ্টি তার পরিপ্রেক্ষিতে সুশীল সমাজের ও রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়ে প্রতিনিধিদের ছিল বিশেষ মনোযোগ। তারা সাক্ষাৎ করেছেন সরকার ও বিরোধী  দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ যে আহ্বান জানাচ্ছেন তারাও সেই আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানান। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট অব্যাহতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রতিনিধিদল তা তুলে ধরেন। বহুজনের সঙ্গে তারা আলোচনা করেন। তাতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক  অধিকারের বিনিময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। বহুদলীয় ও বলিষ্ঠ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। পার্লামেন্ট সদস্যরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন জোর দিয়ে। যেসব বেসরকারি সংগঠন বিপন্ন মানুষের উন্নতির জন্য পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে ফরেন ডোনেশন অ্যাক্টের আওতায়। তারা এ প্রত্যাশা আবারও তুলে ধরেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্বিঘ্নে বাস্তবায়নের জন্য এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রতিনিধিদল আরও সাক্ষাৎ করেছেন ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যবসায়ী নেতা, পরিবেশ কর্মী, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সুশীল সমাজের সঙ্গে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে, রাজনৈতিক সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে। প্রতিনিধিদল ঢাকায় একটি তৈরী পোশাক কারখানা পরিদর্শন করেন। একর্ড গ্রুপের প্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়ন ও শিল্পপতিদের সঙ্গে বিনিময় করেন। অনুসন্ধান ও পরামর্শ করে যেটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তাকে স্বাগত জানিয়ে তারা একর্ডকে আরও সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শ্রমিকরা যাতে দরকষাকষি করতে পারেন সে জন্য কার্যকর অধিকার নিশ্চিত করতে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করার কথা বলেন। এর মাধ্যমে ইপিজেডসহ সব স্থানে যাতে সংশোধিত শ্রম আইন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয় তার ব্যবস্থায় সমর্থন দেয়ার কথা বলেন তারা। এছাড়া প্রতিনিধিদল মিরপুরে একটি স্কুল ও প্রকল্প পরিদর্শন করেন। শহরে পাড়ি জমানো শিশুদের নিয়ে গড়ে ওঠা এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন। তারা পরিচালনা করছে বেসরকারি সংগঠন ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’। শিশুদের মৌলিক শিক্ষায় অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তারা। প্রতিনিধিদল আলোচনা করেন নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে। তারা সরকারের কাছে আহ্বান জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য। সরকার বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রাখবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠকে তারা যেকোন অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করার ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল অবস্থান তুলে ধরেন। প্রতিনিধিদলের প্রধান বলেছেন, আমরা বাংলাদেশে এসেছি। কারণ, এখানকার মানবাধিকার নিয়ে আমাদের মাঝে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে দেখতে চাই। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। তা বাস্তবায়ন করতে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হবে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ।
সহিংসতা ও সংলাপ একসঙ্গে চলতে পারে না: আওয়ামী লীগ
সহিংসতা ও সংলাপ এক সঙ্গে চলতে পারে না বলে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় উপ-কমিটির প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ আরও জানিয়েছে, দেশে সহিংসতা চলছে, যারা এমনটা করছে তাদের সঙ্গে সংলাপ হতে পারে না। এক সঙ্গে এই দুটি হয় না। গতকাল বিকালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ইইউ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। তিনি বলেন, সহিংসতা, নাশকতা ও সংলাপ এক সঙ্গে চলতে পারে না। আগে নাশকতা, সহিংসতা বন্ধ হতে হবে। এসব বিষয়ে আমরা প্রতিনিধি দলকে অবহিত করেছি। গওহর রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী আগেই বলেছেন- নির্বাচনের সময় যখন আসবে, তখন সবার সঙ্গেই কথা বলা যাবে, আলোচনা হবে। আমরা চাই দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু একটি নির্বাচন হোক। সে নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে। বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলে ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে ছিলেন দলের উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, এইচ টি ইমাম, এম জমির, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফারুক খান, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ ও উপ-প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। বৈঠক শেষে ইইউ প্রতিনিধি দলের কেউ কথা বলেননি।
ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক : সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার বিষয়ক পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত পিয়ারে মায়দুনের গুলশানের বাসায় এ বৈঠক অনুষ্টিত হয়। বৈঠক শেষে তিনি নৈশভোজেও অংশ নেন।
আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক: এদিকে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের সঙ্গেও বৈঠক করে ইইউ প্রতিনিধি দল। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী জানান, হরতাল-অবরোধে সারা দেশে যে পেট্রলবোমা হামলা হয়েছে এ বিষয়ে প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয়েছে। মানবাধিকারের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। মানবাধিকারের শিকড় যেন আরও শক্ত হয় সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। এ বিষয়টি প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয়েছে।
স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক: বাংলাদেশের চলমান সহিংসতা নিয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে জানতে চায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদল। একই সঙ্গে এ নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে কি না সে প্রশ্নও রাখেন তারা। স্পিকার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন, সহিংসতা গণতন্ত্র বা রাজনীতির অংশ হতে পারে না। সহিংসতা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধিদল গতকাল স্পিকার এবং সিপিএ নির্বাহী কমিটির চেয়ারপারসন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক সাব-কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান ড্যান প্রেদার নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন সংসদ সদস্য জোসেফ ওয়েডেইনহোলজার ও ক্যারল কারস্কি। সাক্ষাৎকালে তারা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। এ সময় তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ শাখার পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রতিনিধিদলটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে উভয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এদিকে সাক্ষাৎকালে স্পিকার বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তৈরী পোশাকশিল্পকে আরও উন্নত করে এ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্পিকার আরও বলেন, তৈরী পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর। এ সেক্টরে কর্মরতদের ৮০ শতাংশই নারী। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাই সরকার তাদের সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা প্রদান, আবাসিক সুযোগ-সুবিধাসহ ডে কেয়ার সেন্টার, দুগ্ধ-মাতা (ল্যাক্টেটিং মাদার) ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায়সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, নারী অধিকার মানবাধিকারেরই অংশ। সব নীতিমালা ও আইন নারী সংবেদনশীল করে তৈরি করে নারীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বাংলাদেশ সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। সামাজিক ও স্বাস্থ্যসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুহার হ্রাস এবং বাল্যবিয়ে রোধে অগ্রগতি হয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে বৈঠক: সকাল ১১টায় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে যান। প্রতিনিধিদল দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি, শ্রমিক অধিকার, নারী ও শিশু অধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার, চলমান সহিংসতা ও সন্ত্রাস এবং গ্রেপ্তার বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের করণীয় ও অবস্থান সম্পর্কে জানতে চান। সূচনা বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান প্রতিনিধিদলকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের পটভূমি ও কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কমিশন মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করে আসছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণ, তথ্যানুসন্ধান ও তা প্রতিকারের জন্য কমিশন রাষ্ট্রকে সুপারিশ করে আসছে। তিনি উল্লেখ করেন, মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, তবে কমিশনের কোন নির্বাহী ক্ষমতা নেই। কমিশন মূলত একটি সুপারিশকারী প্রতিষ্ঠান। চলমান সহিংসতা প্রসঙ্গে ড. মিজানুর রহমান মন্তব্য করেন যে, জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সহিংসতা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোন উপায় নয়। সহিংসতা শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য হুমকি স্বরূপ। মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য সন্ত্রাস ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। কমিশন সকল স্টেট ও নন-স্টেট ক্রীড়নকদের সহিংসতা ও সন্ত্রাস বন্ধের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করে আসছে। কমিশন মনে করে কোন ন্যায্য দাবি অর্জনের জন্যও সহিংসতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিনিধিদল সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তুলে ধরে মন্তব্য করেন ‘সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়’। ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টার বিষয়ে কমিশনের অবস্থান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে জানানো হয়, কমিশনের অবস্থান সর্বদা বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিপক্ষে। কমিশন বিচারবর্হিভূত হত্যকাণ্ড বন্ধে নিয়মিত সুপারিশ করে আসছে। সম্প্রতি সংঘটিত বেশ কয়েকটি বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্বারা অনুসন্ধান করে কমিশনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রতিনিধিদল সংবাদপত্রে প্রকাশিত আটকের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশনের বক্তব্য জানতে চাইলে কমিশন জানায়, বিদ্যমান আইনে সন্দেহজনক যেকোন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পার। তবে সেক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। কিন্তু আইনের ব্যতয় ঘটিয়ে যখন গণগ্রেপ্তারের মতো ঘটনা ঘটে তা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। নিরীহ নাগরিককে কিছুতেই গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না। আটক বাণিজ্য চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে জনমনে আস্থার সঙ্কট তৈরি হবে। মতবিনিময়ে প্রতিনিধিদল এনজিওদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সরকারের যে উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য কাজী রিয়াজুল হক প্রতিনিধিদলকে দেশের শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি এবং কমিশনের করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেন। কমিশনের অপর সদস্য মাহফুজা খানম প্রতিনিধিদলকে নারী অধিকার সুরক্ষায় কমিশনের কার্যক্রম ও উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করেন। কমিশন সদস্য অ্যারমা দত্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিনিধিদলকে অবহিত করেন ও অপর সদস্য অ্যাডভোটক ফৌজিয়া করিম প্রতিনিধিদলকে জানান যে, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিশন অনেক সময় আদালতে যাচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরে দিনভর তৎপরতা: দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (ইপি)’র মানবাধিকার বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যরা স্পষ্ট ভাষায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। বিরোধী রাজনীতিক, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিবর্গসহ ঢাকা সফরে যাদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে সবখানেই প্রসঙ্গটি এসেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট-সহিংসতা এবং এটি মোকাবিলায় সরকারের অ্যাকশন প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তা কিভাবে বন্ধ করা যায়? সেই প্রশ্নও রেখেছেন তারা। পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই আয়োজনের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও ব্রাসেলস-এ নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইসমত জাহানসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের প্রতিনিধিরা সহিংসতার জন্য একতরফাভাবে বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি তাদের দেখানো হয়েছে। ইপি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সরকারের বক্তব্য শুনেছেন, তারা তাদের উদ্বেগও জানিয়ে গেছেন। বৈঠক শেষে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিরা কোন কথা না বললেও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। সেখানে তিনি বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখতে আসা প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশ করেননি বলে দাবি করেন। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিদলের প্রধানের গণমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা ছাড়াও কূটনৈতিক চ্যানেলে গতকালই বিষয়টি পররাষ্ট্র দপ্তরের নজরে আনা হয়। এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইইউর সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা বিষয়টি তাৎক্ষণিক প্রতিমন্ত্রীকে জানান। যদিও প্রতিমন্ত্রী সেই সময়ে সফররত ইতালীর উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে গণমাধ্যমে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। বিকাল পর্যন্ত কর্মকর্তা পর্যায়ে এ নিয়ে দফা দফায় আলোচনার পর প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব, ইউরোপ উইংয়ের মাহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা। ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠক শেষে টেলিফোনে ইইউকে মিটিং, ব্রিফিং এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দেন এক কর্মকর্তা। তাৎক্ষণিক এটাকে ডেমেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা হিসাবে আখ্যায়িত করে এক কর্মকর্তা বলেন, একটি টেলিভিশন চানেলের সাংবাদিকের প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী ওই বক্তব্যটি দিয়েছিলেন। সেখানে প্রশ্ন ও জবাব দুটিই অনেক বিস্তৃত ছিল। সরকারের তরফে ওই প্রশ্ন এবং জবাব দেয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা ছাড়াও পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে ওই বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ নিয়ে তার নতুন কিছু বলার আছে কি না জানতে চাওয়া হয়। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোন ব্যাখ্যা দেয়া হবে কি-না? তাও জানতে চাওয়া হয়। জবাবে মন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এদিকে রাত পৌনে ৮টার দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে একটি সংশোধনী গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। ‘জয়েন্ট কারেকটিভ স্টেটমেন্ট’ শিরোনামে পাঠানো সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা খালেদা বেগম প্রেরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রকাশিত কিছু রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা যৌথভাবে এটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ঘণ্টার মিটিংয়ে প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি। শ্রম অধিকারের পাশাপাশি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে চলমান সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা। এটা দেখাই ছিল তাদের সফরের উদ্দেশ্য।

হারবে বাংলাদেশ! by আসিফ নজরুল

পৃথিবীর সব খেলার নিয়ম থাকে। খেলা আনন্দময়, তবু তা শেষ করতে হয় নির্দিষ্ট সময়ে। সে তুলনায় রাজনৈতিক আন্দোলন কখনো কখনো খুব নিষ্ঠুর। তবে এটিও একটি খেলার মতো, এখানেও দুই পক্ষ থাকে, থাকে জয়-পরাজয় এবং খেলার কিছু নিয়ম। থাকে এমনকি অনুমিত বা প্রত্যাশিত সময়কালও।
রাজনৈতিক আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হলে তার কুফল হয়ে ওঠে মারাত্মক, বিশেষ করে তা যদি হয় অপুষ্ট গণতন্ত্রের দেশে এবং দুই পক্ষই যদি হয় নৈরাজ্যকর চরিত্রের। এমন আন্দোলনে মানুষের জীবন আর জীবিকার ওপর আঘাত আসে, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ ধ্বংস হয়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, দেশের অগ্রগতি আর সম্ভাবনা দারুণভাবে হোঁচট খায়। জোর করে ক্ষমতায় থাকার জন্য মরিয়া সরকার আর জোর করে তাকে নামানোর জন্য মরিয়া বিরোধী দলের লড়াইয়ে নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষ আর রাষ্ট্রযন্ত্রের।
এই লড়াই তাই যত স্বল্পস্থায়ী হয় ততই ভালো। না হলে একটি রাষ্ট্র কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে, তার উদাহরণ একালেই আমরা আরবের বিভিন্ন দেশে দেখছি। বাংলাদেশে কখনোই এমন সর্বনাশা লড়াই হয়নি। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫-এর মাঝামাঝি সময় আওয়ামী লীগ বনাম জাসদের প্রাণঘাতী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় বাদে এ দেশে সরকার আর বিরোধী দলের দ্বৈরথ ছিল স্বল্পস্থায়ী। তাতে জীবন-জীবিকা আর সম্পদহানি ঘটেছে অনেকাংশে সহনীয় মাত্রায়।
এবার সরকার আর বিরোধী দলের হানাহানিতে এমন কোনো লক্ষণ নেই। বিরোধী দলের অবরোধ চলছে মাস দেড়েক ধরে। এর মধ্যে হরতাল হচ্ছে নিয়মিত, পেট্রলবোমা, ককটেল আর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে প্রাণ যাচ্ছে মানুষের, নানাভাবে হয়রানি হচ্ছে আরও বহু মানুষ, ধ্বংসলীলা চলছে সারা দেশে। তার পরও দুই পক্ষের লড়াই চলছে অবিরাম। এই যুদ্ধ হয়তো সমঝোতাহীনভাবে শেষ হবে একদিন। হয়তো সরকারের পতন হবে বা বিরোধী দলের শক্তি নিঃশেষিত হবে। এই নিষ্ঠুর খেলায় হয়তো সাময়িকভাবে জিতবে কোনো একটি পক্ষ। কিন্তু তাতে পরাজিত হবে বাংলাদেশ।
দুই
সরকারের পক্ষ থেকে এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল খুব পরিষ্কার। সরকারের প্রধান কৌশল হচ্ছে বিরোধী দলের আন্দোলনের রাজনৈতিক বৈধতা আড়াল করে এটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচারণা চালানো। অথচ বিরোধী দলের আন্দোলনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছিল ২০১৪ সালের প্রহসনমূলক নির্বাচনের প্রতিবাদ করা এবং সরকারকে অবিলম্বে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। একই কাজ আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর করেছিল, ২০০৬ সালেও সাজানো নির্বাচনের আশঙ্কা থেকে আওয়ামী লীগ সহিংস আন্দোলন করেছিল।
আগের যেকোনো আন্দোলনের তুলনায় এবারে সহিংসতার মাত্রা অবশ্য অনেক বেশি, অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-নির্যাতনও। প্রচারণা যুদ্ধে বহুগুণ এগিয়ে থাকার কারণে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেও সরকার জায়েজ বলতে পারছে পেট্রলবোমার দায় পুরোপুরিভাবে বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপিয়ে দিয়ে। অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলোয় বোমা, ককটেলসহ বিএনপি-জামায়াতের লোকদের গ্রেপ্তারের খবর যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে আওয়ামী লীগের লোকদের বোমাসহ প্রেপ্তারের সংবাদও। পার্থক্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগের লোকজন অনেক ক্ষেত্রে ছাড়া পাচ্ছেন পুলিশ হেফাজত থেকেই, তাঁদের পক্ষে সাফাই গাইছে স্বয়ং পুলিশই। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ভয়াবহ পেট্রলবোমা হামলার পর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে পেট্রলবোমাসহ যে মানিক ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করেছিল, তারা ছিল যুবলীগের নেতা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়। পুলিশের বক্তব্য ছিল: অপরাধীরা হয়তো মানিককে জড়ানোর জন্য তার বাসার পেছনে বোমা রেখেছিল এবং তাই আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি (নিউএজ, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। এ রকম উদাহরণ আরও রয়েছে। তবে এসব সংবাদকে ধর্তব্যের মধ্যে না নিয়ে সংসদ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে শুধু বিএনপি-জামায়াতের গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের ঢালাওভাবে বোমাবাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে মানুষের মনোযোগ নিবদ্ধ করা যাচ্ছে বোমাবাজির নৃশংসতার ওপর।
প্রচারণা কৌশলের সুফল নেওয়ার জন্য সহায়ক বিভিন্ন শক্তিও আওয়ামী লীগের রয়েছে। অতীতে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ সফল হতে পেরেছিল অন্যান্য শক্তির (আমলা, বিভিন্ন বাহিনী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়) সমর্থন বা নিরপেক্ষতার জন্য। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সুচিন্তিত পদক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত বা একাত্ম করতে পেরেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ দমন ও সন্ত্রাস ইস্যুতে সুকৌশলী প্রচারণা চালিয়ে বিএনপিকে অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলে ধরতে পেরেছে। ফলে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অপ্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন করেও ক্ষমতায় থাকার দৃঢ়চেতা ও একগুঁয়ে মনোভাব দেখাতে পারছে।
তিন
বর্তমান রাজনৈতিক মোকাবিলায় তাই আওয়ামী লীগের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে এই জয়ের প্রতিফল অন্য অনেকের জন্য হবে মারাত্মক। ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগ এখন নির্ভর করছে মূলত রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর। নির্বিচার মামলা, গ্রেপ্তার, হত্যা ও হামলা চলছে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর দ্বারা। এসব বাহিনীতে পছন্দসই ব্যক্তিদের উঁচু আসনে বসিয়ে একটি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে। বাহিনীগুলোর নেতৃত্বে থাকা এসব ব্যক্তি সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন, অমিত ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন এবং সীমাহীন নানা সুবিধা ভোগ করছেন। তাঁরা জানেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকতে পারলে তাঁরা যে শুধু পদচ্যুত হবেন তা নয়, তাঁদের কঠিন বিচারের সম্মুখীনও হতে হবে। ফলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এঁরা বদ্ধপরিকর হয়েছেন নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে। বিরোধী দলের আন্দোলন পরাজিত হলে জিতবেন এঁরাই।
নানা ধরনের সুবিধা, পদমর্যাদা, সম্মান ও ক্ষমতা প্রদান করে এমন সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করা হয়েছে সংসদ, বিভিন্ন কমিশন, রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেও। আওয়ামী লীগ আন্দোলন দমন করে ক্ষমতায় থাকলে আরও বাড়বে এদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর অর্থবিত্ত অর্জনের সুবিধা। এই গুটি কয়েক মানুষের অসম সুবিধা লাভের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চরিত্র, রাষ্ট্রের বদলে এরা আরও বেশি পরিণত হবে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতিষ্ঠানে, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সুবিধাভোগী অংশটি হয়ে উঠবে আরও বেশি একচোখা ধরনের, সরকারের ওপর গোটা রাষ্ট্র ও সমাজের তদারকির শক্তি হবে আরও অনেক দুর্বল। বিভিন্ন ধরনের সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের একচ্ছত্র দাপট আর অন্ধ সমর্থনে সরকার হয়ে উঠবে আরও অত্যাচারী, নিপীড়নমূলক ও স্বেচ্ছাচারী।
চার
আর যদি বিএনপি জিতে যায় এই আন্দোলনে? যদি নতি স্বীকার করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ায় সরকার? এই সম্ভাবনা আসলেই কম। বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল হচ্ছে জনজীবন ও অর্থনীতিকে জিম্মি করে সরকারকে হটে যেতে বাধ্য করা। কিন্তু এই সরকারকে আপাতদৃষ্টিতে তা নিয়ে বিচলিত মনে হয় না। ক্ষমতা থেকে হটে গেলে সরকার ও আওয়ামী লীগকে চরম মূল্য দিতে হবে। ক্ষমতায় থাকলে যতই আন্দোলন হোক, এতে ক্ষতি হবে আসলে জনসাধারণ বা বড়জোর তৃণমূলের কিছু নেতা-কর্মীর। এই হিসাব আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের না বোঝার কথা নয়।
আন্দোলন একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও ব্যাপক হলেই হয়তো আওয়ামী লীগকে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিতে হতে পারে। বিএনপির এমন বিজয়ের সম্ভাবনা কম হলেও আছে, তবে সত্যি এটি হলে তার পরিণতিও হতে পারে মারাত্মক। বিএনপি-জামায়াতের প্রতিশোধস্পৃহা, ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি, দলীয়করণ আর সন্ত্রাসের যে চিত্র আমরা অতীতে দেখেছি, তা এমন পরিস্থিতিতে আরও বাড়তে পারবে। তা ছাড়া সহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপি বিজয়ী হলে, বিরোধী দলে গেলে আওয়ামী লীগও একই কাজ করবে। দেশে কুশাসন, সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা তখন আরও বাড়তে পারে।
বিএনপি বিজয়ী হলে তাতেও তাই হারতে পারে বাংলাদেশ। জাতি হিসেবে আমাদের পরাজয় আর পিছিয়ে পড়া শুধু রোধ হতে পারে দুই দলের মধ্যে একটি স্বতঃস্ফূর্ত সমঝোতার মাধ্যমে। ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামোর ভিত্তিতে এই সমঝোতা হলেই কেবল বিবদমান দুই পক্ষের কমবেশি বিজয় হতে পারে, এগোতে পারে বাংলাদেশ।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম এখন।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

টেকসই সমাধানে চাই ‘জাতীয় সনদ’ by বদিউল আলম মজুমদার

জাতি হিসেবে আমরা দুটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন। প্রথম সমস্যাটি হলো ব্যাপক বোমাবাজি, সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা। ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪২ দিনের অবরোধে বোমা হামলাসহ সহিংসতায় ৮৯ জন নিরপরাধ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে (পেট্রলবোমা ও আগুনে ৫২ জন) এবং সহস্রাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে। এর মধ্যে ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন ১৯ জন। এ সময় ১ হাজার ১২৭টি যানবাহনে আগুন দেওয়া হয় ও ভাঙচুর চালানো হয় এবং ১৩ দফায় নাশকতা চালানো হয় রেলে (প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি)। যারা পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করে, তারা ঘৃণিত অপরাধী এবং তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে জরুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান।
দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো রাজনৈতিক। ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মসূচি পালনে বিধিনিষেধ আরোপ ও তাদের দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যমের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক সমস্যার মূল কারণ। আর বিতর্কিত নির্বাচনের পেছনের কারণ হলো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, যা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। আর রাজনীতির ভাষা হলো সংলাপ ও সমঝোতা। আমরা আশা করি যে বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সংলাপের আয়োজন করা হবে, যার মাধ্যমে কতগুলো বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য গড়ে উঠবে, একটি ‘জাতীয় সনদ’ প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে।
আমরা মনে করি যে বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যার টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে মোটাদাগে তিনটি ক্ষেত্রে জাতীয় মতৈক্য সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। সম্ভাব্য মতৈক্যের ক্ষেত্রসমূহ হতে পারে: ক. নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা; খ. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনী আইনের সংস্কার; এবং গ. নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের করণীয়।
নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহে দলতন্ত্রের ভয়াবহ প্রভাব বিস্তারের কারণে অতীতের মতো ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোও যে কারচুপি ও কারসাজিমুক্ত হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাই ভবিষ্যতের নির্বাচন যাতে দলীয় প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে, সেই লক্ষ্যে এই মুহূর্তেই নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি সমঝোতা হওয়া জরুরি। আর সংশ্লিষ্ট সবার মতৈক্যের ভিত্তিতে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব হবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন, ৯০ দিনের) মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত হতে পারে। আর শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হলে দেশে কোনো দিন শান্তি আসবে না।
নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনী আইনের সংস্কার
সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের এবং কমিশনের সদস্যরা যোগ্য ও নিরপেক্ষ না হলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা করা দুরাশা মাত্র। তাই সঠিক ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন আবশ্যক। এ লক্ষ্যে অবশ্য কমিশনে নিয়োগদান–সম্পর্কিত একটি আইন প্রণয়ন করতে হবে, যে ব্যাপারে সুস্পষ্ট সাংবিধানিক (অনুচ্ছেদ ১১৮) বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ‘হুদা কমিশন’-এর রেখে যাওয়া আইনের একটি খসড়া কাজে লাগানো যেতে পারে। কমিশন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি অনুসন্ধান কমিটির সহায়তা নিতে হবে, যে কমিটি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিয়োগদানের জন্য সুপারিশ করবে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কমিশনে নিয়োগ প্রদান করবেন।
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য শুধু নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচন কমিশনের দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, এর জন্য নির্বাচনকালীন আইনকানুন ও বিধিবিধানও যথার্থ হতে হবে। বিদ্যমান আইনি কাঠামো বহুলাংশে গ্রহণযোগ্য হলেও এগুলোতে কিছু সংস্কার আনতে হবে এবং নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার লক্ষ্যে মোটাদাগের কিছু সংস্কারের ব্যাপারেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আরপিওতে ‘না ভোটের’ এবং দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের সুস্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়ে লাগাম টানার লক্ষ্যেও আইনি সংস্কারের প্রয়োজন হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কলুষমুক্ত করতে হলে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মানদণ্ড আরও কঠোর করতে হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য অবশ্য প্রয়োজন হবে যুদ্ধাপরাধী, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ ও অসৎ ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার। এ ছাড়া হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রদত্ত তথ্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পদ্ধতিগতভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করতে হবে।
নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের করণীয়
নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকার ও একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারলেও আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান অসহিষ্ণুতা ও হানাহানি তথা অচলাবস্থার সমস্যা দূরীভূত হবে না। এর জন্য প্রয়োজন হবে নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের করণীয় সস্পর্কে একটি মতৈক্য সৃষ্টি। আর তা করতে পারলেই আমরা সমস্যার টেকসই সমাধান আশা করতে পারি।
পরবর্তী সরকারের সম্ভাব্য করণীয় বিষয়সমূহ হতে পারে: (১) যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন ও রায় কার্যকর করা; (২) জাতীয় সংসদকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যাতে সংসদ যথাযথভাবে সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে; (৩) রাজনৈতিক দলের সংস্কারের মাধ্যমে দলগুলোকে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সব স্তরে দলতন্ত্রের অবসান ঘটানো; (৪) রাজনৈতিক দলসমূহের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন বিলুপ্ত করা; (৫) বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত ও উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য একটি আইন প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগের সত্যিকার পৃথক্করণের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা; (৬) আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা; (৭) দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের মতো দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে একটি সর্বব্যাপী দুর্নীতি দমন অভিযান পরিচালনা করা, বিদেশে পাচার করা কালোটাকা ফেরত আনার এবং ন্যায়পাল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া; (৮) একটি সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট প্রণয়ন, পুলিশ আইনের আধুনিকায়ন এবং সরকারি কর্মকমিশনে সংস্কারের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা, পেশাদারত্ব ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা; (৯) প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে একটি বলিষ্ঠ কর্মসূচি গ্রহণ, অন্তত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে স্থানীয় সাংসদদের অযাচিত হস্তক্ষেপ তথা এমপিতন্ত্র ও দলতন্ত্রের অবসান করা; (১০) সরকারি ও বেসরকারি সব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং নাগরিক সমাজের কাজের পরিধি যাতে সংকুচিত না হয়, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া; (১১) গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সংখ্যালঘুসহ সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখা; (১২) প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে ‘পলিটিক্যাল ফাইন্যান্স’ বা রাজনীতির অর্থায়ন–প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, যাতে নির্বাচনী ব্যয় ও রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের ওপর লাগাম টানা সম্ভব হয়; (১৩) একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’তে উপনীত হওয়া, যাতে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদে তাদের ন্যায্য হিস্যা পেতে পারে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; এবং (১৪) সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা, যে কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকার উদ্যোগ নেবে।
জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিবিদদের দায়িত্বশীল আচরণ করার উদাহরণ আমাদের রয়েছে। যেমন, ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ‘তিন জোটের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেছিল, যার ভিত্তিতে ১৯৯১ সালে একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন ঘটেছিল। আশা করি, আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে ও কার্যকর করতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সম্মানিত রাজনীতিবিদেরা আবারও সংলাপ ও সমঝোতার লক্ষ্যে এগিয়ে আসবেন।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক।

মিয়ানমার ছেড়ে পালাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ

মিয়ানমারের লক্ষাধিক বাসিন্দা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চীনে পালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধাতঙ্কে মিয়ানমার ছেড়ে চীনে পালিয়ে যাচ্ছে দেশটির লাখ লাখ নাগরিক। বুধবারও প্রায় ৯০ হাজার বাসিন্দা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেছে। পলাতকদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি কর্মকর্তাদের আনুমানিক ধারণা, ‘প্রায় কয়েক লাখ নাগরিক মিয়ানমার থেকে পালিয়ে গেছে।’ সম্প্রতি চীন সীমান্ত সংলগ্ন শান প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মির (এমএনডিএএ) লড়াইয়ের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৯ সালের পর থেকে চীনসমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী এমএনডিএএ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছে। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছিল এমএনডিএএ। তবে ২০০৯ সালে এ শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। জাতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে নিজেদের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিই তাদের মূল দাবি। এরপর থেকেই দু’পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে আসছে। গত ৯ ফেব্র“য়ারি শান প্রদেশের কংগিয়ান এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে মর্টার হামলা চালালে ৪৭ সেনাসদস্য নিহত হয়। এরপর থেকেই ওই এলাকার লোকজন সীমান্ত পাড়ি দিতে শুরু করে।
বুধবার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ২ ফেব্র“য়ারি থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের নাগরিকদের ৩০ হাজার বার সীমান্ত পাড়ির ঘটনা ঘটেছে। চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে। এই প্রথমবারের মতো শরণার্থীদের সংখ্যা প্রকাশ করল চীন সরকার। লিস সেন নামে এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, তার ধারণা গত এক সপ্তাহে সংঘাতকবলিত কোকাং এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং মিয়ানমার সরকার ও এমএনডিএএকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। কোকাং প্রদেশে সামরিক আইন জারি : মিয়ানমারের কোকাং প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে তিন মাসের জন্য সামরিক আইন জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইনসেইন। খবর বিবিসি, এএফপি। স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশটির রাজধানী লোকাইয়ে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশটির সেনাবাহিনী ও কোকাং বিদ্রোহীদের মধ্যে সিরিজ সংঘর্ষের পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, ১২ ফেব্র“য়ারি থেকে কারফিউ চলার পরও প্রদেশটিতে বিদ্রোহীদের অব্যাহত সংঘর্ষে সরকার সেখানে সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ মিন অং হ্লেইংকে কোকাংয়ের প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। হ্লেইংকে তার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ বা হস্তান্তরের অধিকারও দেয়া হয়েছে।

সেই স্যুট নিলামে দর সোয়া কোটি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আলোচিত মনোগ্রামকৃত গলাবদ্ধ সেই স্যুট ও তাকে দেয়া ৪৪৫টি উপহার নিলামে ওঠানো হয়েছে। গুজরাটের সুরাটে তিন দিনব্যাপী নিলামের প্রথম দিনেই বুধবার এটির দাম প্রায় সোয়া কোটি ছুঁয়েছে। রাজেশ জানেজা নামে সুরাটেরই এক ব্যবসায়ী কোটটির দাম হাঁকিয়েছেন এক কোটি ২১ লাখ রুপি। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, নীল রঙের গাঢ় স্ট্রাইপড কোটটির নিলামে বিক্রিতে যে অর্থ পাওয়া যাবে তা গঙ্গা দূষণরোধ প্রকল্পসহ স্বচ্ছ ভারত অভিযানে ব্যয় করা হবে। নিলামের শুরুতে রাজুভাই আগারওয়াল নামে এক ব্যক্তি কোটটির দাম ৫১ লাখ রুপি হাঁকান। তারপর সুরেশ আগারওয়াল নামে সুরাটের আরেক ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রী পরিহিত কোটটির দাম এক কোটি রুপি পর্যন্ত হাঁকান।
এরপর এক কোটি ১১ লাখ রুপি হাঁকেন বিরাল চৌকেশি নামে আরেক গুজরাটি ব্যবসায়ী। চৌকেশির পরই রাজেশ জানেজার হাঁকানো এক কোটি ২১ লাখ রুপি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ দরে আছে। সুরেশ আগারওয়াল বলেন, নিলামে প্রাপ্ত অর্থ ‘গঙ্গা পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ ভারতের’ মতো মহান কাজে ব্যয় হবে জেনেই আমি এই কোটটি কিনতে আগ্রহী হয়েছি। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরে নজর কেড়েছিল কোটটি। ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় হায়দ্রাবাদ হাউসে আয়োজিত ডিনার পার্টিতে মোদি প্রায় দশ লাখ রুপির এই দামি কোট গায়ে দেন। কোটটির স্ট্রাইপে ছোটো ছোটো অক্ষরে তার নাম ‘নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি’ খোদাই করে লেখা রয়েছে। এই লেখা প্রায় হাজার বারেরও বেশি রয়েছে, যা ক্যামেরায় ধরা পড়ে অনেকটা স্পষ্টভাবে। এদিকে গুজরাটের একজন ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, আলোচিত কোটটি তিনি মোদিকে উপহার দিয়েছিলেন। এনডিটিভি।

মুম্বাইয়ে ১১৭ তলা ভবন

ভারতের মুম্বাইয়ে তৈরি হচ্ছে ১১৭ তলা একটি ভবন। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়ান টাওয়ার’ নামের এই ভবনটির নির্মাণ শেষ হবে আগামী বছর। তখন এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু আবাসিক আকাশচুম্বী ভবন। এর মধ্যে লন্ডনে এর অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের সর্বনিু দাম হাঁকা হচ্ছে ১৭০ কোটি টাকা (১৪ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড)। ৪৪২ মিটার উঁচু ভবনটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা।
এতে থাকবে ৩০০টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট যার অনেকগুলো থেকেই আরব সাগর দেখা যাবে। ভবনটিতে রয়েছে সুইমিং পুল, জিম, হেলথ ক্লাব। এর বেশিরভাগ ইউনিটেই থাকবে ক্রিকেট পিস ও প্যাভিলিয়ন। প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকবে অভ্যর্থনা কক্ষ, কিচেন ও ব্রেকফাস্ট রুম, বিলাসবহুল বেডরুম স্যুট এবং নান্দনিক বাথরুম। ধারণা করা হচ্ছে, ব্রিটেনে বসবাসরত ধনাঢ্য অনাবাসী ভারতীয়দের অনেকেই ওয়ার্ল্ড ওয়ান টাওয়ারের গর্বিত মালিক হবেন। এনডিটিভি, পিটিআই, টেলিগ্রাফ।

পাইকারি গ্রেপ্তার-মামলা বন্ধ করুন- ভুল অভিযান কখনোই সঠিক ফল দেয় না

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ ও উপর্যুপরি হরতালের শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলো সন্ত্রাস ও নাশকতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও বাস্তবে তারা কদাচিৎ অপরাধীদের ধরতে পেরেছে। পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্য কিংবা গয়রহ মামলার পাশাপাশি কথিত বন্দুকযুদ্ধ জনমনে ভরসা না জাগিয়ে বরং আতঙ্কই সৃষ্টি করেছে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ৯ জনই অরাজনৈতিক ব্যক্তি। অথচ এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত থাকার কথা নয়। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এসব নাশকতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করা হচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন, তাহলে এই অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা কেন কথিত বন্দুকযুদ্ধের বলি হলেন? আর তাঁরা রাজনৈতিক ব্যক্তি হলেও বিচারের আগেই এভাবে বিচার করার এখতিয়ার কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আছে?
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পূর্বশর্ত। আর সেটি যে বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা পাইকারি গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে সম্ভব নয়, সে কথা নিশ্চয়ই কর্তাব্যক্তিদের অজানা নয়। তার পরও বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ারের গল্প চলে আসছে বহুদিন ধরে। এটি অবিলম্বে বন্ধ করুন। হরতাল-অবরোধের নামে যারা নাশকতা করছে, তাদের ধরুন। কিন্তু হুকুমের আসামি করে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই বিবেচিত হয়। হুকুমের আসামিরা গ্রেপ্তার হবেন, যাঁরা যাঁরা অপকর্ম করছেন তাঁদের টিকিটিও ধরতে পারবেন না, এই স্ববিরোধিতা অগ্রহণযোগ্য। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে সংঘটিত সন্ত্রাসী ঘটনায়ও হাজার হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও আটক করা হলেও বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড তথা বাড়াবাড়ি পরিস্থিতিকে যেমন নাজুক করে তুলেছে, তেমনি প্রকৃত অপরাধীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের ভাষায়ই কথা বলতে হবে। ভুল অভিযান কখনোই সঠিক ফল দেয় না।

‘সর্বাত্মক’ হরতাল বা হরতাল থাকা না-থাকা by এ কে এম জাকারিয়া

সপ্তাহের শুরুর দিন, মানে রোববার থেকে টানা ৭২ ঘণ্টার হরতালের ঘোষণা আসবে আর মঙ্গলবার জানব যে তা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, এতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মানে ছুটির দুই দিন ছাড়া বাকি পাঁচ দিন দেশে টানা হরতাল চলবে। আর দেশজুড়ে অবরোধ তো আছেই, এর কোনো শুক্র-শনি নেই।
জনগণের কথা শোনে বা বিবেচনায় নেয়, এমন দল তো এখন আর দেশে নেই। এই যে চারদিকে এত মৃত্যু, এত বর্বরতা—এসব নিয়ে এত হাহাকার, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আবেদন, অনুনয়-বিনয়—সবই তো অরণ্যে রোদন। তার পরও বলি, দুই দফায় হরতাল ডেকে পুরো সপ্তাহ কাভার করার দরকার কী! একবারে ঘোষণা দিয়ে দিলেই তো হয় যে দুই দিন বিরতি দিয়ে টানা পাঁচ দিন হরতাল চলবে। এতে অন্তত কেউ কোনোভাবেই এই আশা করবেন না যে বুধ বা বৃহস্পতিবার হরতাল থেকে মুক্তি পেলেও পেতে পারেন! আশা ভঙ্গের তো কিছু কষ্ট আছে, তা থেকে কি অন্তত জনগণকে মুক্তি দেওয়া যায় না? সপ্তাহে দুই দিন হরতাল নেই, এটা ধরে নিয়েই নাহয় আমরা চলব! কিন্তু এই শান্তিটুকুও যেন আমাদের পাওনা নয়! ৭২ ঘণ্টা করে দুই দফায় হরতাল ডেকে সপ্তাহ পার করা হবে।
আমাদের মতো জনগণের কথা থাক, কিন্তু বিএনপি তো অন্তত তাদের কাজ ও কষ্ট কিছু কমাতে পারে! দলের বড় নেতাদের সবাই প্রায় জেলে। যাঁরা বাইরে আছেন, তাঁরাও আত্মগোপনে বা পালিয়ে। সরকার যে অবস্থা করে রেখেছে, তাতে বৈঠক করে হরতাল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেবে, সেই সুযোগটিও দলটির নেই। যাঁর নির্দেশেই হোক, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে হরতাল বাড়াতে হয়। একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ড্রাফট করা, বানান, ভাষা—এসব দিকে নজর দেওয়া, তারপর পত্রপত্রিকায় মেইল করা কম ঝক্কির কাজ নয়। আর সরকার কত দিন তাঁকে এই কাজটি করে যেতে দেবে, সেটাই বা কে জানে! ফলে অবরোধ যেমন চলছে, তেমনি ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত’ সপ্তাহে টানা পাঁচ দিন, মানে রোববার থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত হরতাল চলতেই থাকবে, এমন একটি ঘোষণা দিলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়।
অথবা অবরোধের পাশাপাশি সপ্তাহে সাত দিনের হরতাল ডেকে দিলেই বা সমস্যা কী! এ সপ্তাহের শুরুতে যখন হরতালের ডাক দেওয়া হয়, তখন বিএনপির প্রেস রিলিজে বলা হয়েছিল, ২০ দলের শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বাধা দিলে ‘সর্বাত্মক’ হরতাল। সরকারের পক্ষে পুলিশ অনেকটা আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল যে এই জোটকে কোনো বিক্ষোভ মিছিল করতে দেবে না তারা। পুলিশকে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। দেশের দু-এক জায়গায় ঝটিকা মিছিল ছাড়া ‘বিক্ষোভ’ মিছিলের কোনো চেষ্টাও হয়নি। তবে রোববার থেকে যথারীতি ‘সর্বাত্মক’ হরতালের ঘোষণা এল ঠিকই। কিন্তু এই সপ্তাহে বুধবার পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতা হলো তাতে ‘সর্বাত্মক’ হরতাল বিষয়টি আসলে কী, তা নিয়ে সত্যিই বড় ধন্দে পড়ে যাওয়ার দশা হয়েছে। ‘সর্বাত্মক’ হরতালে এভাবে গাড়িঘোড়া চললে বা দোকানপাট খোলা থাকলে সপ্তাহে পাঁচ দিন আর সাত দিন হরতালের মধ্যে কীই–বা ফারাক হবে!
সব রাজনৈতিক কর্মসূচির একটি সৌন্দর্য থাকে। সংঘাত-সহিংসতার মধ্যেও নানা সময়ে আমরা হরতালের সৌন্দর্য উপভোগ করেছি। হরতাল মানে দোকানপাট বন্ধ বা ঝাঁপ অর্ধেক নামানো থাকবে, ব্যাংকে গ্রাহকেরা ঢুকবেন পেছনের দরজা দিয়ে, রাস্তা থাকবে ফাঁকা, অল্প গাড়িঘোড়া, কিছু অ্যাম্বুলেন্স আর পত্রপত্রিকার স্কুটার চলবে, ভিআইপি রাস্তাগুলোতে চলবে রিকশা। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ—এসব হরতালে কম থাকে। বড় দলগুলোর যারাই হরতাল ডাকত, সেই হরতালের প্রতি জনগণ কিছুটা হলেও ‘সম্মান’ দেখাত। এবার দেখা যাচ্ছে হরতাল তার ‘সৌন্দর্য’ ও ‘সম্মান’ দুটিই হারিয়েছে।
দুর্যোগসহ জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সুনাম আছে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় এ দেশের জনগণ সব সময়ই ভালো করেছে। বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। রাজনৈতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও যে তারা সাফল্য দেখাবে, সেটাই স্বাভাবিক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা সিডর-আইলার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত জনগণ এখন হরতাল-অবরোধের সঙ্গে বসবাসেও সম্ভবত অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সপ্তাহে পাঁচ দিন হরতাল হলে মানুষের সামনে আর উপায় কী!
হরতালে এখন ঢাকা শহরে যানজট হয়, ভিআইপি রোডে রিকশা চলাচলের সুযোগ পায় না। দোকানপাটগুলো বন্ধ বা ঝাঁপ অর্ধেক টানা থাকে না, ব্যাংকে সামনের দরজা দিয়েই ঢোকা যায়, মার্কেটগুলো খোলাই থাকে। আগে হরতাল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ‘অনিবার্য কারণে’ নানা কিছু স্থগিতের ঘোষণা আসত, এখন তেমন কিছু চোখে পড়ে না। একমাত্র শিক্ষার্থীরাই, সম্ভবত এখনো হরতালের প্রতি ‘সম্মান’ দেখিয়ে যাচ্ছে বা দেখাতে বাধ্য হচ্ছে। বাচ্চাদের স্কুলসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক ক্লাস হচ্ছে না। এখন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে। ৭২ ঘণ্টা হরতাল বাড়ার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসামাত্র সেই দিনগুলোর পরীক্ষা শুক্র বা শনিবারে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এভাবেই যেহেতু চলছে বা চলবে বলেই মনে হচ্ছে, শিক্ষার্থী বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নিশ্চয়ই হরতালের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল বা পথ বের করে নেবে। এখন স্কুলগুলোতে শুক্র ও শনিবার ক্লাস হচ্ছে। হরতালের দিন স্কুলড্রেস ছাড়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসতে বলা যায় কি না এমন ভাবনাও ভাবতে শুরু করেছে কিছু স্কুল। সপ্তাহে পাঁচ দিন যেহেতু হরতাল, তাই এ সময়ের ক্লাসনোটগুলো মা-বাবাদের কাছে পাঠাতে শুরু করেছে অনেক স্কুল। উদ্দেশ্য, বাসায় বসে যাতে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া যায়। সামনে হয়তো স্কাইপে শিক্ষক ক্লাস নেবেন আর শিক্ষার্থীরা বাসায় বসে ক্লাস করবে—এ ধরনের কোনো পথ ধরতে হবে।
আমরা জেনে গেছি যে সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবে না বা সমঝোতার চেষ্টা করবে না। আর বিএনপিও পরিষ্কার করেছে যে আন্দোলনের ‘চূড়ান্ত’ বিজয় ছাড়া অবরোধ-হরতাল তুলবে না। ফলে ৭২ ঘণ্টা পর পর হরতাল বাড়বে কি বাড়বে না, হরতালের চরিত্র ‘সর্বাত্মক’ হবে কি না—এসব দুশ্চিন্তায় না থেকে এই দুর্যোগকে স্থায়ী ধরে নিয়ে এর সঙ্গেই বসবাস ও ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার’ পরিকল্পনা করে নেওয়াই তো ভালো! সরকার বা বিরোধী পক্ষ যা-ই ভাবুক না কেন, জনগণ কিন্তু সেভাবেই এগোচ্ছে।
আগামীকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টা হরতাল বাড়ানোর যে ঘোষণা মঙ্গলবার বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তাতে আর হরতালের আগে ‘সর্বাত্মক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। আসলে হরতাল, সর্বাত্মক হরতাল বা হরতাল থাকা না-থাকা—এসব নিয়ে ভাবার সময় সম্ভবত এখন জনগণের আর নেই। জনগণের জীবন আছে, তাদের জীবিকা আছে—এসব এত মানতে গেলে তাঁদের চলবে কীভাবে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

গণঅধিকার ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা কিংবা জাতীয়তাবাদ দুটিই স্রেফ ধাপ্পা by ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

'Then professor, You are against your country!
- There is no country colonel! Only rivers, mountains and people!'

আশির দশকে একটি ইংরেজি ছবি দেখেছিলাম। 'Escape to Athena'। ফ্যাসিস্ট কবলিত ইতালির পটভূমিতে নির্মিত এ ছবির কাহিনীটি গড়ে উঠেছে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটকে ঘিরে। পুরনো একটি দুর্গের পাশে খনন কার্য চালিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে মহামূল্যবান সব ঐতিহাসিক নিদর্শন। গড়ে উঠেছে একটা ছোটখাটো জাদুঘর। জাদুঘরের কিউরেটর একজন নিবেদিতপ্রাণ ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক।
মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট বাহিনী আর তার মুরব্বি জার্মান নাৎসি বাহিনী এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করছে। ওই দুর্গে তারা বহু অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট লোকজনকে ধরে এনে আটকে রেখেছে। আর সেই সঙ্গে একের পর এক মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী পাচার হয়ে যাচ্ছে জার্মানিতে। ইতালীয় ও জার্মান জেনারেলরা মিলেমিশেই কারবারটা চালাচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপক চোখের সামনে এসব দেখছেন। কিন্তু তিনি ঝুটঝামেলায় যেতে চান না। ফ্যাসিজমবিরোধী বিদ্রোহীরা তাদের বন্দি সহযোগীদের মুক্ত করার জন্য মাঝে মধ্যে হামলা চালায়। প্রত্নতাত্ত্বিক অধ্যাপকের কাছ থেকে তারা কোনো সহায়তা পায় না। তিনি নিজের কাজের ভেতরেই নিমগ্ন। বিদ্রোহীরা তার এ কাপুরুষতায় ক্ষুব্ধ।
কিন্তু একদিন এ নির্বিরোধ মানুষটিও বেঁকে বসলেন। যোগ দিলেন বিদ্রোহীদের সঙ্গে, যারা বন্দি শিবির থেকে তাদের সহকর্মীদের মুক্ত করতে অস্ত্র ধরেছে। তিনি তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আর তখনই ইতালীয় সেনাপতির সঙ্গে তার এ সংলাপ।
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক দেশদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন- এ বিসদৃশ ঘটনায় যেন চমকে উঠেছেন ইতালীয় বাহিনীর অধিনায়ক। অধ্যাপককে ডেকে ভর্ৎসনার সুরে বললেন,
- 'Then Professor, You are against your country!' (তাহলে প্রফেসর সাহেব, আপনি নিজের দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন!)
এতদিনের নির্বিরোধ প্রত্নতাত্ত্বিক শান্তস্বরে জবাব দিলেন,
- 'There is no country Colonel! Only rivers, mountains and people!'
(দেশ কোথায় কর্নেল সাহেব। আছে কেবল কিছু নদী, কিছু পাহাড় এবং কিছু মানুষ)
সুঅভিনেতা ডেভিড নিভেনের অপূর্ব বাচনভঙ্গিতে উচ্চারিত সংলাপটি সেই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের দেয়াল থেকে দেয়ালে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। ফ্যাসিস্ট কবলিত ইতালির অবয়বে যেন সেদিনের সেনাশাসক কবলিত বাংলাদেশকেই দেখতে থাকলাম।

বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ।
কিন্তু এ কোন বাংলাদেশ?
যে দেশে প্রাণ খুলে কথা বলা যায় না, যে দেশে বন্দুকই রাজা, খলনায়করাই মঞ্চের পাদপ্রদীপ দখল করে আছে, সে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি যদি কেউ আনুগত্য অনুভব না করে, তবে কি তাকে দেশদ্রোহী বলা যাবে?

১৯৭১ সালের এক ভোরে যখন আগরতলায় বসে শুনলাম, আগের রাতে ভৈরবের ব্রিজ ডিনামাইটে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে তখন আমাদের মনে কী প্রচণ্ড আনন্দ। একবারও মনে হয়নি এ ব্রিজ আমাদেরই জাতীয় সম্পদ। ওটা আবার গড়তে অনেক মূল্য দিতে হবে।
তখনও ওই ছবিটা আমার দেখা হয়নি। কিন্তু বোধহয় আমাদের তখনকার মানসিক অবস্থাটাও ছিল ওই অধ্যাপকের মতোই। কোথায় দেশ? কার দেশ?
দেশের ভেতরে একের পর এক রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, পাওয়ার হাউস ধ্বংস হচ্ছে, আর আমরা শত্র“ হননের সাফল্যে আত্মহারা হচ্ছি। যে রাষ্ট্রযন্ত্র কেবলই উৎপীড়নের, কেবলই শোষণের, কেবলই শৃংখলের- সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি আনুগত্য আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সেদিন পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রযন্ত্রটি আমাদের দুশমন ছিল- আর এসব রাস্তাঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট-পাওয়ার হাউস ছিল ওই রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তির জোগানদার। তাই এগুলোকে ধ্বংস করে শত্র“ রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে আমরা কাবু করতে চেয়েছি।

কেবল বিদেশী শাসকের হাতেই নয়, স্বদেশবাসীর হাতেও রাষ্ট্রযন্ত্র রীতিমতো গণবিরোধী হয়ে উঠতে পারে।
১৯৭৫-এ একদলীয় স্বৈরশাসন এসেছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের সিঁড়ি বেয়ে। যেদিন সংসদের ওই সিদ্ধান্ত পাস হয়ে গেল, ওসমানী সাহেব আর ব্যারিস্টার মইনুল ছাড়া আর সব গণপ্রতিনিধি সেই গণবিরোধী পদক্ষেপে দুহাত তুলে সমর্থন জানালেন, সেদিন নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয়েছিল। আমি তখন জাতীয় লীগের সদস্য। ১৯৭০ সালে আমরা হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নিয়ে দলটি গড়েছিলাম। আমাদের চোখে ছিল স্বাধীন স্বদেশের স্বপ্ন। আতাউর রহমান খান ছিলেন ওই দলের সভাপতি। ৭৩-এর সংসদে তিনি আমাদের একমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু বাকশাল প্রতিষ্ঠার কদিনের মধ্যেই তিনি আমাদের হতচকিত করে বাকশালে যোগ দিয়ে বসলেন। আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে অনেকবার বেশ বড়সড় আঘাত সয়েছি। এ ছিল তন্মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক। নিজেকে এবারে কেবল অসহায় নয়, একাও মনে হতে লাগল।
এ কোন বাংলাদেশ? এ দেশেরই কি স্বপ্ন দেখেছিলাম আমরা? এ স্বৈরতন্ত্র দেখার জন্যই কি জীবনের সুন্দরতম দিনগুলো কারাগারে-আত্মগোপনে-রাজপথে হারিয়ে এসেছি? কোথায় চলেছি আমরা? কোথায়?
আমার মনটা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেই সচরাচর লিখতে বসি। সেদিনও কিছু লিখেছিলাম। ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে ওটা দিয়েছিলাম ছাপাতে। সে লেখায় সরাসরি আক্রমণ কিছুই ছিল না। ওই পরিবেশে কতটা লেখা যায়, ছাপা যায়, সে মাত্রাজ্ঞান আমার ছিল। যতদূর মনে পড়ে, ওই লেখায় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যে কথাটা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম তা ছিল : সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে এক দল গড়ার এ পদক্ষেপে আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়বে, বিভিন্ন মতের বারোয়াড়ি লোকজন নিয়ে বিকল্প কিছুই গড়ে উঠবে না। পরিণামে সরকারের এক দলের ভেতরেই মাথাচাড়া দেবে বহু দল। আসলে এক দল মানে কোনো দলই নয়। এতে আমও যাবে, ছালাও যাবে। ইত্যাদি।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আমাকে কথা দিয়েছিলেন লেখাটা ছাপবেন। কিন্তু ছাপেননি। কয়েকদিন পর জিজ্ঞাসা করতেই তার স্বভাবসুলভ উচ্চহাসি দিয়ে বললেন,
ওটা ছাপিনি, কিন্তু যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছি।
বললাম, মানে?
- মানে যার উদ্দেশ্যে লিখেছেন তাকে শুনিয়েছি।
- বলো কী? উনি কী বললেন?
- ঠোঁটে পাইপ চেপে কেবল বললেন- হুম।
লেখাটা কোথাও কোনো ডাস্টবিনে পচে গলে মাটি হয়ে গেছে।
১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি, সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর সারা দেশে সে কী অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। কে কার আগে সরকারি দল বাকশালে নাম লেখাবে। আমাদের সংবাদপত্র জগতের মধ্যমণিগণ, বিদগ্ধ অধ্যাপক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা কাতারবন্দি হয়ে বাকশাল অফিসে গিয়ে দীক্ষা নিতে থাকলেন।
ছাত্রজীবনের সহকর্মীরা কেউ পাশে নেই। জাতীয় লীগ নামে যে দলটি খাড়া করার জন্য নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেশ কবছর কাজ করেছি- আতাউর রহমান খান সাহেবের বাকশালে যোগদানের মধ্য দিয়ে সেই দলটিও বিলুপ্ত। কয়েকটি সরকারি কাগজ ছাড়া সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষণার কালাকানুনে দেশবাংলার অফিসেও তালা ঝুলছে। সেই দুঃসহ দিনগুলোতে ইতালীয় অধ্যাপকের মতো অমন সুন্দর করে কথাটা বলতে পারিনি। কিন্তু মনের ভেতরের অব্যক্ত যন্ত্রণার সুরটি ছিল একেবারেই অভিন্ন।
এই কি আমার স্বদেশ? আমি কি এই দেশের?

১৯৭৫-এর ২৪ জানুয়ারির পর ১৫ আগস্ট, তারপর ৭ নভেম্বর। পুরো বছরটাই যেন নাটকের বছর। ভয়ংকর সব পালাবদলের নাটক।
এসব নাটকের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে একটু একটু করে আবার যখন দরজা-জানালা খুলতে শুরু করেছে, সেই খোলা দরজা-জানালা দিয়ে কিছুটা বাতাস ঢুকছে রুদ্ধ গুহায়- তখনই এলো ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ।
একনায়ক এবারে আর মুখোশ পরে নয়, একেবারে সমূর্তিতে হাজির। অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সারা দেশ। অবশেষে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান। জনতার বিজয়।
৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক, এ অভ্যুত্থান ঘটেছে জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ-দুঃখ-বেদনার সশব্দ বিস্ফোরণে। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বের আন্দোলনে নয়। জনতার মিছিলে নেতাদের নেমে আসতে হয়েছে। ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটে না।
কিন্তু ইতিহাসে এমন ঘটনা যখনই ঘটেছে- ফরাসি বিপ্লবের মতো, রাশিয়ার দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনের মতো তার সমাপ্তিটা প্রায়শ প্রবাহিত হয়েছে ভিন্নখাতে। অন্য কোথাও চলে গেছে ঘটনা প্রবাহের ফসল। আর জনতাকে ফিরে যেতে হয়েছে তার পুরনো অবস্থানে। হাতুড়ি, শাবল কিংবা লাঙ্গলের পেছনে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম হল না।

৮৩র পাঁচ-দফার ভিত্তিতে গোটা ৮০র দশক একনায়কের বিরুদ্ধে লড়েছে জাতি। ৯০-এর পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পালাক্রমিক শাসন-অপশাসনের ২৩ বছর। মাঝখানে দুই বছরের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সবমিলিয়ে ২৫ বছরের গণতান্ত্রিক শাসনের শেষে আজকের বাংলাদেশে নিত্যদিন কী দৃশ্য দেখছি?
একদিকে তথাকথিত হরতাল-অবরোধে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস, পেট্রলবোমার আগুনে ছাই হয়ে যাচ্ছে বাস-ট্রাক-মোটরগাড়ি-সিএনজি, অতর্কিত আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ মানুষ শিশু-বৃদ্ধ-নারী নির্বিশেষে। ঝলসে যাওয়া শরীর নিয়ে বার্ন ইউনিটে কিংবা পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে সাধারণ মানুষ। দুপক্ষের ক্ষমতার যুদ্ধে যাদের অধিকাংশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কে বা কারা এ নারকীয় বর্বরতা চালাচ্ছে তা কেউ জানে না- কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। অপরদিকে সরকার পক্ষের লক্ষ্যহীন প্রতিরোধ এবং নিরন্তর হুংকার। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। কোথায় চলেছে দেশ? এ একটি মাত্র প্রশ্ন সবার মুখে।
পাকিস্তানের শেষ দিনগুলোতে ছিল এমন দৃশ্য। সেটা তো ছিল ভাঙনের সময়। পরস্পরকে হননের সময়।
একাত্তরে আমরা ভেঙেছি একটি দানব রাষ্ট্র। আজকের ভাঙন-হননের লক্ষ্য কী? এখন কি আমরা লাখো প্রাণের মূল্যে অর্জিত এ জাতিকেই দ্বিধাবিভক্ত করার ব্রত নিয়েছি? স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের কল্পিত, আরোপিত ও আত্মবিনাশী বিভাজনে?
আজকের এ যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে কি সেই ইতালীয় অধ্যাপকের ভাষায় বলতে হবে-
-দেশ কোথায়? জাতি কোথায়? চারদিকে দেখছি কেবল যুদ্ধরত আওয়ামী লীগ-বিএনপি- দুই নেত্রী, পেট্রলবোমা, আর ১৬ কোটি অসহায় দিশাহীন মানুষ!
●●
ক্ষমা প্রার্থনা :
২৯ জানুয়ারি যুগান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে শীর্ষক কলামে একটি মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে একটি জেলা ছিলর স্থলে চট্টগ্রাম জেলার অধীনে একটি মহকুমা হয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কোনো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ছিল না, চট্টগ্রাম বিভাগের অধীনে ছিল, একথা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। এ গুরুতর ভুলের জন্য পাঠকদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com

তত্ত্ব ধূসর বন্ধু হে, জীবনবৃক্ষই চিরসবুজ by মাহবুব কামাল

’৯১-এর প্রথম সংসদ অধিবেশনের যে রাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতি থেকে দেশকে সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরিয়ে এনেছিল, সে রাতে রাজধানী থেকে ৫০০ কিমি. দূরের এক উপজেলায় আমিও অন্য অনেকের মতো টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলাম। তিন জোটের রূপরেখার বাস্তবায়ন হলো ভেবে অধিবেশনের সবাই উল্লসিত, মধ্যরাতের সেই উল্লাসে মেতেছিলেন আমার পাশে বসা একজন কলেজ-অধ্যাপকও। আমি মাতিনি। গেল শতাব্দীর গোটা সত্তর দশক বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম বলে উপহার হিসেবে আমি পেয়েছি একটা পলিটিক্যাল মাইন্ড। সেই রাজনৈতিক মানসের সুবাদেই অধ্যাপক মহোদয়কে বলেছিলাম- হাতির রমণ দেখছেন তো এখন, দু’দিন পর তাদের যুদ্ধ দেখবেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত অট্টহাসির বিপরীতে ঈশ্বরও বুঝি হেসেছিলেন সে রাতে। তবে সেটা মুচকি হাসি। তিনি হয়তো দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন- ওহে বান্দারা, আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না। আর সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেছিলেন- তোমরা প্রপোজ করেছো তো; ওয়েট করো, আমি ডিসপোজ করে দেবো। নূর হোসেনকে আজ গালি দিতে ইচ্ছে করে। করে তো খাচ্ছিলি ব্যাটা, তবে কেন দিতে গেলি প্রাণ? বল কেন গেলি? আরে আহাম্মক, তোকে আর ‘শহীদ’ বলবো না। শহীদ তাকেই বলে, যিনি আদর্শের জন্য প্রাণ দেন। তুই কি জানতিস না, যাদের জন্য প্রাণ দিলি তাদের আদর্শ-ফাদর্শ বলে কিছু নেই? কবর ফুঁড়ে এসে দেখে যা, তোর সাধের গণতন্ত্রের প্রতিমা চিত্র থেকে এখন শুধুই পোড়া গন্ধ বেরোয়। তুই মরেছিলি গুলিতে, এতদিন বেঁচে থাকলে মরতি পেট্রলবোমায়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের বর্তমান পর্বে অর্থাৎ ২০১৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উত্তরপত্রে কোনো ছাত্র যদি লেখে- হাসিনা-খালেদার সংসদীয় গণতন্ত্র এরশাদের রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির চেয়ে ভালো- শিক্ষক উপযুক্ত হলে তিনি পাস মার্ক দেবেন কি-না সন্দেহ। হ্যাঁ, কোন্ সেই প্যারামিটার, যা দিয়ে মেপে বলা যাবে এরশাদের আমল এখনকার চেয়ে খারাপ ছিল? আমরা বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র দেখেছি, দেখেছি হাসিনা-খালেদার গণতন্ত্র। বিতর্কটা আমিই তুলছি যে, এ দেশে বর্তমান ধারার গণতন্ত্র উপযুক্ত, নাকি বিনেভোলেন্ট ডিক্টেটরশিপ ভালো? হ্যাঁ, বিতর্ক করা ছাড়া সিদ্ধান্ত টানা চলবে না। কারণ সামরিক শাসনের ‘মারো ডাণ্ডা, করো ঠাণ্ডা’ আর এখনকার ‘মারো বোমা, পাল্টাও খোমা’- এ দুয়ের পার্থক্যটা বের না করে সোজা বলে দিলাম- হাসিনা-খালেদার গণতন্ত্রই ভালো- তা হবে না। যা হোক।
আমরা এখন দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলবো। টেলিভিশনের টকশো ও পত্রিকার কলামে অনেকেই চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার। প্রথমেই বলতে হয়, মিথ্যার একটা বড় গুণ এই যে, সে শ্রোতার কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করে। যে মিথ্যায় বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, তা মিথ্যা নয়, উদ্ভট। আবার সত্যের একটি দোষ আছে, কখনো কখনো সে মিথ্যার মতো বেজে ওঠে। বক্তা বা লেখক কীভাবে মিথ্যার বিশ্বাসযোগ্যতা দাবি করছেন অথবা তাদের সত্য কীভাবে মিথ্যার রঙ ছড়ায়, তা ধরতে না পারলে টকশো শুনে কিংবা কলাম পড়ে কিছুই বোঝা যাবে না।
বর্তমান অবস্থাটা আসলে কীভাবে তৈরি হয়েছে? রাজনীতি হচ্ছে এক ধরনের ফসকা গেরো, সুতোর ঠিক প্রান্ত ধরে টানলেই ফক্কা; কিন্তু সূত্র ভুল হলেই তৈরি হয় ফাঁস। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই ভুল সূত্রে নিজ নিজ গলায় ফাঁস লাগিয়েছে। একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ আর পেট্রলবোমা চালু করে বিএনপি। বলা বাহুল্য, এই দুই দলের গলার ফাঁস সমগ্র দেশবাসীকেও ফাঁসিয়ে দিয়েছে। দল দুটি তাদের ফাঁস কীভাবে খুলবে অথবা আদৌ খুলতে পারবে কি-না, সেটা তারাই স্থির করুন। কথা হচ্ছে, আমাদের গলায় যে ফাঁস পরিয়ে দেয়া হয়েছে, তা কি আমরা খুলতে পারবো?
এ বড় কঠিন টাস্ক। দেশে নির্দলীয় মানুষের চেয়ে দলভুক্ত মানুষের সংখ্যা বেশি, না কম, সেই হিসাবে না গিয়ে বলা যায়, দলভুক্তরা সংঘবদ্ধ বলে তারা নির্দলীয়দের চেয়ে বেশি শক্তি ধারণ করে। জাতি ফাঁসমুক্ত হতে পারে কেবল তখনই, যদি দলভুক্তদের একটা বড় অংশ এবং নির্দলীয়রা অকৃত্রিম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিনা টান করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাঠে নামতে পারে। স্বপ্নটা মধুর, তবে অলীক। প্রথমত, দেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর অন্যতম হলেও এ দেশবাসীর দেশপ্রেম এখন লুপ্তপ্রায়, পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে তা। আমরা এখন যেমন মসলিন কাপড়ের গল্প করি, একটা সময় হয়তো আসবে, যখন বাঙালি গল্প করবে- একদা এ দেশে এক ধরনের মানুষ ছিল, যারা ভাষার জন্য বুকের জামা খুলে হাঁক ছেড়েছিল- করো গুলি; স্বাধীনতার জন্য দালাল চিৎকারে নিজের বাবাকে পর্যন্ত গুলি করেছিল। সেই দেশপ্রেমিক মানুষ ধীরে ধীরে আপনপ্রেমিক হয়ে উঠেছে। পরার্থ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই তার মধ্যে। সে এখন রাষ্ট্র বোঝে না, গৃহ বোঝে; সমষ্টি বোঝে না, ব্যক্তি বোঝে; টোকাই বোঝে না, সন্তান বোঝে; হৃদয় বোঝে না, বস্তু বোঝে; দায়িত্ব বোঝে না, প্রতিষ্ঠা বোঝে; প্রতিবাদ বোঝে না, পলায়ন বোঝে; বমি করতে জানে না, হজম জানে- সে এখন দুই নয়ন মেলে তাকাতেও পারে না, চোখ বন্ধ করে থাকতে ভালোবাসে।
বস্তুত সারা জাতি আজ এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত, দেশপ্রেমের ঘাটতির অসুখ। AIDS-এর চেয়ে ভয়ংকর এ অসুখের নাম APDS (Acquired Patriotism Deficiency Syndrome)। কেন ভালোবাসবে মানুষ রাষ্ট্রকে? রাষ্ট্র কি ভালোবাসে তাকে? একতরফা প্রেম কখনও, কোনোকালে হয়েছে কোথাও? যদি বলি রাষ্ট্র তার সকল বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে এক অতি মামুলি ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে, খুব কি বাড়াবাড়ি হবে সে কথা? রাষ্ট্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে বলেই চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীকে পুলিশের হাতে দিতে চায় না মানুষ, আইন তুলে নেয় নিজের হাতে। এতই বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে মানুষ রাষ্ট্রের সঙ্গে। দুই নেত্রী যখন জনতাকে কাছে টানতে দেশপ্রেমের আবেগ উসকে দিতে চান, তখন হাসি চেপে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আবেগেরও একটি বস্তুগত ভিত্তি থাকে। গনগন আগুনের পাশে বসে প্রেমালাপ করবো, নাকি চামড়া বাঁচাবো? মানুষের দেশপ্রেমকে এখন হংসলতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। শীতে (মুক্তিযুদ্ধের সময়) একরাশ ফুল ফুটিয়ে শুকিয়ে গেছে; অবশ্য গোড়া সজীব রয়েছে। বর্ষার জল (পরিশুদ্ধ নেতৃত্ব) নামবে যখন, তখন ডাল বেরিয়ে নতুন ফুলের জন্ম হবে আবার। সেই নেতৃত্ব এমন হবে, যার বক্তৃতা শুনে অন্ধ শ্রোতা চক্ষুষ্মান হয়ে সামনের দিকে তাকাবে, বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পেয়ে দৌড়াবে কলকারখানার দিকে, খঞ্জ উঠে হেঁটে যাবে ক্ষেতে-খামারে, আতুর (নবপ্রজন্ম) প্রাণ সঞ্জীবনী সুধা পেয়ে দাপাদাপি করে মাতিয়ে রাখবে দেশ।
ফিরে আসি বর্তমান অবস্থায়। একটি বেসরকারি মন্তব্য এখন আদালতের রায়ের সমান মর্যাদা ভোগ করছে। মন্তব্যটি- এরা কি মানুষ? টেলিভিশনে নাটক দেখতে দেখতে কখনও নিজের অজান্তেই বলে উঠতে হয়- এসব কী? এর নাম নাটক? ঠিক তেমন, মানুষ এখন অহর্নিশ বলে চলেছে- এর নাম রাজনীতি? লক্ষ করার বিষয়, পেট্রলবোমা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে সাধারণ গতরখাটা মানুষের ওপর, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর নয়। কারণটা রাজনীতির আলিফ-বে-তে-ছে জানা লোকটাও ধরতে পারে। বোমা নিক্ষেপকারীরা এমন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে চায় না, যে নিয়মের বলে তারা ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের অবরোধকারীরা তাদের ওপর বোমা মারবে। ফলে মরে মরুক সাধারণ মানুষই। পাঠক আরও লক্ষ করুন, বর্তমান সরকার যে সংসদ কর্তৃক বিচারপতি অপসারণের আইন করেছে, বিএনপি সেই কালাকানুনের বিরোধিতা করছে না। কারণ, এটি তাদেরও কাজে লাগবে। আবার দেখুন, সাংবিধানিক আরও অনেক সংস্থা থাকতে বিএনপি শুধু নির্বাচন কমিশনের সংস্কার চায়, বাকিগুলোর নয়। এখানেও কারণটা না বোঝার মতো বেকুব নেই নিশ্চয়ই। নির্বাচন কমিশন হলো ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম। দুর্নীতি দমন কমিশন? এর সংস্কার করলে ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতি করবো কীভাবে?
হ্যাঁ, পেট্রলবোমা হামলা সরকার যেহেতু বন্ধ করতে পারছে না, তাই চলুন আমরা একটা কাজ করি। কোরআনের সূরা লাহাবের এক জায়গায় বলা হয়েছে- লাহাবের ওপর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক। আমরাও সেভাবে প্রার্থনা করতে পারি- পেট্রলবোমাবাজদের ওপর আল্লাহর গজব নাজিল হোক।
বিএনপি নেতৃত্ব কেন অবরোধ তুলে নিচ্ছে না, বোঝা ভার। নিজেদের স্বার্থেই তো বন্ধ করা উচিত এভাবে সাধারণ মানুষ হত্যা। ধরা যাক, পেট্রলবোমায় আরও দু’চারশ মানুষ দগ্ধ হওয়ার পর সরকার একটা আপস ফর্মুলায় এলো এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন হলো, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতাও পেয়ে গেল তাতে। সেক্ষেত্রে তারা কতদিন ধরে রাখতে পারবেন ক্ষমতা? কারণ ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে যে মাস দেড়েক-দুয়েক অবরোধ, পেট্রলবোমা ইত্যাদি অব্যাহত রাখতে পারলে সরকারের কাছ থেকে যে কোনো দাবি আদায় করা সম্ভব। আওয়ামী লীগ কি তখন সেই সুযোগ নিতে চাইবে না? আর যদি চায়, এই দলের কর্মীদের চেয়ে বেশি পেট্রলবোমা আর কে নিক্ষেপ করতে পারবে? সুতরাং বিএনপির উচিত হবে না এমন কোনো নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা, যে নিয়মের ফাঁদে একদিন তাদেরই পড়তে হবে।
নেতা-নেত্রীদের কথায় এখন ‘ই’ প্রত্যয়ের ছড়াছড়ি। তারা ‘ই’ যোগ না করে বাক্য শেষ করতে পারেন না। যেমন, তারা বলেন না- এ সরকারের পতন হবে; বলেন- পতন হবেই। ওদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা বলেন- বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা বন্ধ হবেই। ইতিহাসে এই ‘ই’ প্রত্যয় যে কতবার মার খেলো, তার হিসাব কি তারা রাখেন? ভদ্রলোক অথবা বিবেচকরা কখনো যেখানে-সেখানে ‘ই’ প্রত্যয় ব্যবহার করেন না। এটা ব্যক্তিত্বের প্রশ্নও বটে। একটা কথা ফললো না- এ কি কম অবমাননাকর?
তাই বলি কী, এসব ছাড়েন। রবীন্দ্রনাথ একটা দামি কথা বলেছিলেন (অবশ্য তার কোন্ কথাটা দামি নয়?)। বলেছেন, মানুষ পণ করে পণ ভাঙ্গিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিবার জন্য। আপনারাও পণ ভেঙ্গে হাঁফ ছাড়ুন। হ্যাঁ, দুই পক্ষই।
পুনশ্চঃ সম্প্রতি এক টকশোতে আমার এক অনুজপ্রতিম পণ্ডিত, যিনি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছাড়া কথা বলতে পারেন না, নানা তত্ত্বকথা ঝেড়ে যা বললেন, তার মানে দাঁড়ায় অনতিবিলম্বেই এ সরকারের পতন ঘটবে। তার কথা শুনতে শুনতে জার্মান কবি গ্যয়টের (Goethe) একটি কোটেবল কোট মনে পড়লো : All theory is gray my friend. But forever green is the tree of life- বাংলায়- তত্ত্ব ধূসর বন্ধু হে, জীবনবৃক্ষই চির হরিৎবর্ণের। রুশ বিপ্লবের আগে অতি তাত্ত্বিকরা যখন অতিমূল্যায়নে পরিস্থিতির অপব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, লেনিন এই কথাগুলোর উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন তখন। হ্যাঁ, তত্ত্ব দিয়ে সবকিছু বোঝা যায় না। জীবনঘনিষ্ঠতাই জ্ঞানের প্রকৃত উৎস।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

সাধারণ ক্ষমার সুযোগ আর নয় -সৌদি আরব

সৌদি আরবে অবৈধ অভিবাসীদের আর কোন সাধারণ ক্ষমার সুযোগ দেয়া হবে না। বিভিন্ন মিডিয়ায় নতুন করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তার জবাবে এ কথা বলেছে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়। অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতার লক্ষ্যে আবারও সুযোগ দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার- এমন খবরের প্রতিবাদে শ্রম মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে আরব নিউজ। শ্রম মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তায়সির আল মোফরেজ বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনকারীদের সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত সময় দেয়ার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত বা আদেশ জারি করা হয়নি। বেশ কিছু গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশিত হলে শ্রম মন্ত্রণালয় বিষয়টি পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়। তায়সির আল মোফরেজ বলেন, মন্ত্রণালয় বহুদিন ধরেই শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনকারী অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করছে। এ ধরনের অবস্থান শুদ্ধিকরণের সর্বশেষ তারিখ ছিল ২০১৩ সালের ৫ই নভেম্বর। তবে বহু কর্মী আশা করছেন, সংশোধনের জন্য অতিরিক্ত সময় আবার চালু করা হবে। বিশেষ করে যাদের স্পন্সর পরিবর্তনের অনুমতি দেয়া হয়নি, যেমন খামার শ্রমিক, মেষপালক, জেলেদের বেলায় এ সুযোগের আশা করছেন অনেকে। অবৈধদের সাধারণ ক্ষমা করার মেয়াদ ২০১৩ সালের ৫ই জুলাই শেষ হয়ে গেলেও, ওই বছরের ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত তা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। এজন্যই অনেকে নিজেদের নতুন কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য স্পন্সরশিপ পরিবর্তনের জন্য ওই সুযোগ চাইছেন। ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন নাইফের উদ্ধৃতি দিয়ে জননিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল অথমান আল-মোহরেজ জানিয়েছেন, শ্রম আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায় আগামী মাসে শুরু হবে। অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, শুদ্ধি অভিযানের ফলে দেশে অপরাধের হার নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।