Showing posts with label ইয়েমেন. Show all posts
Showing posts with label ইয়েমেন. Show all posts

Tuesday, September 22, 2026

লক্ষ্যবস্তু ঠিক, বোমা তোলা হচ্ছিল যুদ্ধবিমানে—শেষ মুহূর্তে হুতিদের ওপর হামলা বন্ধ করলেন ট্রাম্প

গালফ নিউজঃ লক্ষ্যবস্তু ঠিক করা হয়েছিল। মার্কিন যুদ্ধবিমানে তোলা হচ্ছিল বোমা। ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা যেকোনো মুহূর্তে শুরু হতে পারে—এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তা ও অভিযান সম্পর্কে জানেন এমন ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিধি বাড়ছে। এমন এক পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিতে সংঘাতের আরেকটি ফ্রন্ট খোলার অনেকটা কাছাকাছি চলে গিয়েছিল ওয়াশিংটন।

ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সম্প্রতি সৌদি আরবে হামলা জোরদার করেছে। পাশাপাশি তারা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র সৌদি আরব সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের জন৵ ওয়াশিংটনের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। একপর্যায়ে ট্রাম্প হুতিদের ওপর হামলার কথা বিবেচনা করছিলেন।

রাজধানী রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার পর বিষয়টি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। একই সময়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের অগ্রযাত্রায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের ক্রমবর্ধমান হুমকি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। এর এক দিন আগে ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টাদের জানিয়েছিলেন, তিনি হুতিদের ওপর মার্কিন হামলার পক্ষে নন। কিন্তু পরে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

অভিযান শুরুর প্রস্তুতি যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, তখন কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনুমোদন করেছিলেন। নির্ধারিত অভিযানের জন্য নির্বাচিত যুদ্ধবিমানগুলোতে তখন বোমা তোলার কাজ চলছিল।

কিন্তু এই মুহূর্তে এসে গতকাল রোববার আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। আপাতত হুতিদের ওপর মার্কিন বিমান হামলা চালানো হবে না—এটাই সিদ্ধান্ত হয়।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা করা থেকে বিরত রয়েছে।

১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ড সফরের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘হুতিরা আমাদের ফোন করে জানিয়েছে, তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। তারা চায় না যে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিই।’

এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট রশিদুল আল-আলিমি গতকাল রোববার ফোনে ট্রাম্পের কাছে মার্কিন সামরিক সহায়তার আবেদন জানান। এদের মধ্যে ইয়েমেনি ও পশ্চিমা—দুইটি সূত্র জানিয়েছে, ফোনালাপের সময় ট্রাম্প সহায়তার কোনো সরাসরি প্রতিশ্রুতি দেননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি বৈঠকে। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে একটি বৈঠকে। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, September 21, 2026

হামলার প্রস্তুতি নিয়েও কেন সরে এলেন ট্রাম্প?

ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুরোধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও অনুমোদিত হয়েছিল এবং যুদ্ধবিমানে বোমা তোলা হচ্ছিল। তবে হামলা শুরুর ঠিক আগে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত বদলে অভিযান থেকে সরে আসেন বলে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের জানানো হয়েছে।

এদিকে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা ও সৌদি আরবের ওপর হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের চাপ বাড়ছে। রয়টার্সও জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ ট্রাম্পের কাছে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় রাজি না হয়ে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয়।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি আরবের অনুরোধ নিয়ে ট্রাম্প বেশ কিছুদিন ধরেই দ্বিধায় ছিলেন। সৌদি আরবের ওপর হুতিদের চাপ বাড়ার মধ্যে গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ আবারও ট্রাম্পকে ফোন করে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন।

এর মাত্র এক দিন আগে ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের জানিয়েছিলেন, হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যকার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানো উচিত নয়। কিন্তু সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনালাপের পর তিনি অবস্থান বদলে পেন্টাগনকে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলার প্রস্তুতি নিতে বলেন।

তবে আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, অন্তত আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো মার্কিন বিমান হামলা চালানো হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে। ততক্ষণে কমান্ডাররা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা অনুমোদন করেছিলেন, নির্ধারিত যুদ্ধবিমানগুলোতে বোমা তোলা হচ্ছিল এবং হামলার প্রথম ধাপ শুরু হওয়ার অপেক্ষা চলছিল।

হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তবে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে এবং ওয়াশিংটন তার মিত্রদের রক্ষা করবে।

আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বেশির ভাগ সদস্যই ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে সৌদির হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ানোর বিষয়ে গভীরভাবে সন্দিহান অথবা সরাসরি বিরোধী।

এদিকে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট জানান, ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন হুতিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং গোষ্ঠীটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না।

এর আগেও একই ধরনের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। ১২ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ড সফরের সময় তিনি বলেছিলেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রকে ফোন করে জানিয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চায় না।

তবে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সময় সৌদি আরব হুতিদের হামলার মুখে ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে সৌদি রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে হুতিরা। রয়টার্স জানিয়েছে, এ হামলার পর রিয়াদে রাতভর নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়।

ইয়েমেনের ভেতরেও হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রিত বড় অংশের ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। তাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তার ওপরও নতুন চাপ তৈরি করেছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চাইলেও ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

এদিকে ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্ট জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরান ইস্যুতেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে রয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে ট্রাম্প বলেছেন, খুব বেশি দূরে নয়, শিগগিরই বড় কিছু ঘটতে পারে।

ইরানকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছেন, দেশটির নেতৃত্বকে সতর্ক হতে হবে এবং তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

সৌদি যুবরাজ সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: গেটি ইমেজস
সৌদি যুবরাজ সালমান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: গেটি ইমেজস

সৌদি আরবের এমন অবস্থারই অপেক্ষায় ছিল ইসরায়েল

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য পেতে রিয়াদ ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে এ যোগাযোগ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত আন্তর্জাতিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আরটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের যোগাযোগ সত্যিই হয়ে থাকলে তা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এতদিন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় ছিল।

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালির নৌপথের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এতে সৌদি আরবের সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি দেশটিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও লজিস্টিকসের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

হুতিদের মোকাবিলায় ইসরায়েল কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে হুথি ও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। স্যাটেলাইট নজরদারি, সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা ও অস্ত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য এসব তথ্য হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর বিনিময়ে রিয়াদকে রাজনৈতিকভাবে কতটা মূল্য দিতে হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের ওপর হামলার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়িয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে সৌদি যুবরাজের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা দিতে আগ্রহী হলেও ইয়েমেনে নতুন করে সরাসরি যুদ্ধের মূল দায়িত্ব নিতে এখনই প্রস্তুত নয়।

ইরানকে ঘিরে বদলে যেতে পারে সৌদি অবস্থান

সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা ধরে রেখেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে রিয়াদ।

এ নীতির ফলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে। এমনকি বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হওয়ার পরও রিয়াদ নিজেকে সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ হিসেবে দেখাতে চায়নি এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু হলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরান সৌদি আরবের কাছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য হস্তান্তরকে শুধু হুতিদের বিরুদ্ধে কারিগরি সহযোগিতা হিসেবে না দেখে তেহরানবিরোধী আঞ্চলিক জোটে রিয়াদের যোগদানের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কারণ ইরানের দৃষ্টিতে হুতিরা বিচ্ছিন্ন কোনো শক্তি নয়, তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর অংশ।

ফিলিস্তিন ইস্যুও বড় বাধা

ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সহযোগিতা শুধু ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে না। আরব বিশ্বে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক শর্তের কথা বলে আসছে। ফলে রাজনৈতিক সমাধানের আগে ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা কেন প্রয়োজন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে রিয়াদকে।

এখানেই সেন্টকমের মধ্যস্থতার গুরুত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড দুই দেশের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে সৌদি আরব সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ঘোষণা না দিয়েও ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারে। একইভাবে ইসরায়েলও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারবে।

ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত সুযোগ

ইসরায়েলের জন্য এমন সহযোগিতা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগেই সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।

একই সঙ্গে ইসরায়েল দেখাতে পারবে, ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলায় দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরব দেশগুলোর জন্যও প্রয়োজনীয়।

ফলে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ শুধু রাজনৈতিক প্রকল্প না থেকে বাস্তব নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

গত কয়েক বছর ধরে উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছে ইসরায়েল। কয়েক বছর আগেও এমন সহযোগিতা প্রায় অকল্পনীয় মনে হলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বাস্তবতা বদলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সৌদির সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

হুতিদের হামলা, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের ঝুঁকি এবং সৌদি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা রিয়াদকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

সৌদি আরবকে হয় ইয়েমেনে আবারও জটিল ও অনিশ্চিত সামরিক অভিযানে একা যেতে হবে, নয়তো প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে এমন দেশগুলোর সহযোগিতা নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক। যুক্তরাজ্য মূলত পরামর্শক পাঠানোর মধ্যেই সীমিত রয়েছে। আবার সৌদি আরবের আঞ্চলিক অংশীদাররাও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।

আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও এখন পর্যন্ত রিয়াদের তাৎক্ষণিক সামরিক প্রয়োজন মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলই হয়তো হুতিদের অবস্থান, অবকাঠামো এবং সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য দিতে সক্ষম হতে পারে।

যদি ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য সৌদি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে প্রথম কার্যকর সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হতে পারে। শুরুতে এটিকে জরুরি পরিস্থিতির সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হলেও তা কার্যকর প্রমাণিত হলে পরে ভেঙে ফেলা কঠিন হতে পারে।

ইরানের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি

সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে ইরানের প্রতিক্রিয়া। তেহরান সম্ভবত হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানের সঙ্গে ইসরায়েলের বৃহত্তর ইরানবিরোধী কৌশলের বিষয়টি আলাদা করে দেখবে না।

ইরান যদি মনে করে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতায় যাচ্ছে, তাহলে সৌদি সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি তেল স্থাপনা, বন্দর, ট্যাংকার চলাচলের পথ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এসব অবকাঠামো সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জোটের পথে কতটা এগিয়েছে রিয়াদ?

তবে এখনই বলা কঠিন যে সৌদি আরব ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে স্থায়ী জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরং রিয়াদ আপাতত একটি নির্দিষ্ট সামরিক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা খুঁজছে; এমনটাই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সৌদি নেতৃত্ব ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য, মার্কিন সহায়তা এবং ব্রিটিশ পরামর্শ নিতে আগ্রহী হলেও অন্য কোনো পক্ষের যুদ্ধে নিজেদের সরাসরি সম্মুখসারিতে দেখতে চাইবে না।

তবে হুতিদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা যদি ধীরে ধীরে ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে।

তখন বিষয়টি শুধু ইয়েমেন, লেবানন বা লোহিত সাগরের পৃথক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ইসরায়েল, সৌদি আরব ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের একদিকে এবং ইরান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোকে অন্যদিকে রেখে দুটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বর্তমান যোগাযোগকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের আরেকটি ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এটি ভবিষ্যতে পুরো আঞ্চলিক সংঘাতের কাঠামো বদলে দেওয়ার একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে।

তবে এখনো রিয়াদ চূড়ান্ত কোনো সীমা অতিক্রম করেছে; এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। বরং বর্তমান যোগাযোগকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সূত্র : আরটি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

Saturday, September 19, 2026

হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের মিত্র হুথিদের হাতে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চলে গেছে। কৌশলগত দ্বীপ ও লোহিত সাগরের দীর্ঘ উপকূলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবেও নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে গোষ্ঠীটি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। বৈঠকে হুথিরা আশ্বস্ত করেছে, লোহিত সাগরে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

হুথিদের এমন আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। তাদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানও রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই।

সৌদি আরবের চাপ

হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গত সপ্তাহে তিনি ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হামলার অনুরোধ করেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জরুরি সমন্বয়ের জন্য রিয়াদ যান। এতে বোঝা যায়, সৌদিকে সমর্থন করলেও সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরাইলও সৌদির হয়ে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর এসেছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও ইরান নিয়ে একসঙ্গে চাপ সামলাতে হচ্ছে দেশটিকে। এর মধ্যে ইয়েমেন নতুন আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে।

ওয়াশিংটনের ওপর সৌদির আস্থা কমছে

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার পর সম্পর্ক বহুমুখী করার উদ্যোগ নেয় দেশটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি। পরে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও বাড়ানো হয়।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নয়। বরং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরো বহুমুখী করার চেষ্টা।

ইরান যুদ্ধেই চাপে যুক্তরাষ্ট্র

ইয়েমেনে সরাসরি না জড়ানোর বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ইরান যুদ্ধ। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে তেল ও যুদ্ধের খরচ বেড়েছে।

পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই খরচ হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলার গেছে গোলাবারুদে। অসংখ্য মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভান্ডারে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার খবরও এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলছে, তাদের হাতে এখনো বিপুল অস্ত্র রয়েছে।

এর মধ্যে ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক চাপ আরো বাড়বে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প নিজেই দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বাব আল-মান্দাবে চাপে কারা?

হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—দুটি নৌপথই এখন ঝুঁকিতে। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে যায়। আর বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও চীনের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাব আল-মান্দাব দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে চীনের ওপর চাপ বেশি পড়তে পারে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রও রেহাই পাবে না। সৌদি অবকাঠামো ও জাহাজে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাড়বে পরিবহন ও জ্বালানির খরচ, যার প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও।

অধ্যাপক মাবনের মতে, হুথিদের বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেওয়া চীনকে দুর্বল করা বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। ইরান যুদ্ধেই চাপে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র

Friday, September 18, 2026

বাব আল-মান্দাবে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে ইতালি

বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) যৌথ সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করেই ইতালি এ পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে ক্রোসেত্তো বলেন, বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা ইতালির রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ অচল হয়ে পড়লে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হবে গুরুতর।

বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে এটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ। সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াতকারী তেল, গ্যাস ও কনটেইনারবাহী জাহাজের জন্যও প্রণালিটি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গত কয়েক সপ্তাহে বাব আল-মান্দাবের কৌশলগত গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগর উপকূলে দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে পুরো উপকূলীয় এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

এ পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দাব দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটি নিজেদের বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সূত্র: আলজাজিরা

বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ। ছবি: এএফপি
বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ। ছবি: এএফপি

সৌদি-হুতি পাল্টাপাল্টি হামলায় নিহত ৫

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩টি শিশু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে জানা গেছে। খবর আল জাজিরার।

সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইফ গভর্নরেটে হুতিদের একটি ড্রোন বাধা দিয়ে ধ্বংস করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তি সৌদি আরবে বসবাসকারী একজন ইয়েমেনি নাগরিক।

চলতি মাসে হুতিদের হামলা জোরদার হওয়ার পর সৌদি আরবে এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বৃহস্পতিবার ইয়েমেনে সৌদি আরবের হামলার অভিযোগ করেছে হুতিরা। তাদের দাবি, সৌদি যুদ্ধবিমান তাইজ প্রদেশের ৩টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে।

হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেল আলমাসিরাহ জানিয়েছে, ইয়েমেনের আবস শহরে সৌদি হামলায় একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।

পরে হুতিদের সমর্থক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর হামলায় তিন শিশু নিহত এবং বেশ কয়েকজন ইয়েমেনি আহত হয়েছেন। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীকে বোঝাতে তারা ‘সৌদি-সমর্থিত ভাড়াটে বাহিনী’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা-পাল্টা হামলা বেড়েছে। এতে ইয়েমেনের সংঘাতের পাশাপাশি সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

সৌদিতে ড্রোন হামলার পর। ছবি: আল জাজিরা
সৌদিতে ড্রোন হামলার পর। ছবি: আল জাজিরা

মক্কাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে সৌদি: হুতি নেতা

মক্কাকে রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যবহার করে সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন হুতিদের নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি। বৃহস্পতিবার এক ঘণ্টার ভাষণে তিনি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন।

তার বক্তব্য আলজাজিরার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

আল-হুতি বলেন, সৌদি আরব মক্কাকে ‘নিপীড়নের প্রতীক’ হিসেবে ব্যবহার করছে। তিনি একে মিথ্যা ও প্রতারণামূলক প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করেন।

সম্প্রতি সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, আনসার আল্লাহ গোষ্ঠী মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা করেছে। তবে আল-হুতি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম বিশ্বের প্রতি সৌদি আরবের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে ইয়েমেনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

হুতি নেতা বলেন, ইয়েমেনে সৌদি আরবের আগ্রাসনের এটি ১২তম বছর। তার দাবি, বর্তমান সংঘাতের এই পর্যায় সৌদি আরবই শুরু করেছে। মক্কা ও অন্যান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি সামরিক অভিযান চালানোর পর ইয়েমেনে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

আল-হুতির ভাষ্য অনুযায়ী, সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে মোচা দখল ও আনসার আল্লাহর অগ্রযাত্রার মধ্য দিয়ে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এর ধারাবাহিকতায় আনসার আল্লাহ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে মোচা, ধাবাব ও বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে দাবি করেন তিনি।

হুতি নেতা বলেন, সৌদি আরব ইয়েমেনকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে। তার দাবি, বর্তমানে ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতা এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ, যারা ইয়েমেনকে অধীন ও নিপীড়িত অবস্থায় রাখতে চায়।

আল-হুতি আরও অভিযোগ করেন, সৌদি আরবের সামরিক কর্মকাণ্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদীরা’ নেতৃত্ব দিচ্ছে। তার দাবি, তারাই সৌদি আরবের ওপর রাজনৈতিক নীতি চাপিয়ে দিচ্ছে এবং সামরিকভাবে পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করছে।

সূত্র: আলজাজিরা

পবিত্র কাবা শরিফ। ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র কাবা শরিফ। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, September 17, 2026

হুথিদের মোকাবিলায় সৌদির পাশে নেই মিত্ররা, কঠিন পরিস্থিতিতে রিয়াদ

স্থল ও আকাশপথে একযোগ সৌদি আরবে হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এসব হামলার মুখে ক্রমেই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ছে সৌদি আরব । সৌদি আরব এখন একসঙ্গে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি।

ইয়েমেনে তাদের মিত্ররা হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে, একই সময়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকও সীমিত হয়ে আসছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সৌদি আরব যে মার্কিন নিরাপত্তাবলয়ের ওপর নির্ভর করে আসছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্র এখন এ বিষয়ে অনেকটা নিষ্ক্রিয় বা উদাসীন।

সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ‘হুথিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং তারা আমাদের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না।’ বুধবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ওমানের মধ্যস্থতায় হুথি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব তার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতোই সৌদি আরবের নতুন মিত্ররাও হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

চ্যাথাম হাউসের উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নীল কুইলিয়াম মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘সৌদি আরব এখন চরম সংকটে এবং তারা অনেকটাই একা। যুক্তরাষ্ট্র পাশে নেই, মক্কা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোও এগিয়ে আসেনি। তাদের হাতে এখন খুব কমই বিকল্প বা কৌশল অবশিষ্ট আছে।’

ইরাকভিত্তিক ইরান-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়ার ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হুথিরা সৌদি শহরগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। ফলে তেল রপ্তানি ও দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলোর অবস্থাও দুর্বল। হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাইজ ও মারিবের দিকে এগোচ্ছে। একদিকে ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠাতে অনিচ্ছুক সৌদি আরব, অন্যদিকে কার্যকর স্থানীয় মিত্রের অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সও হুথিদের অগ্রযাত্রার মুখে ভেঙে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) তুলনামূলকভাবে কার্যকর যোদ্ধাশক্তি হলেও তাদের সমর্থক সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের মতপার্থক্য রয়েছে।

রিয়াদ আবারও দীর্ঘস্থায়ী ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সৌদি আরব সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল। এখন সম্ভাব্য কৌশল হিসেবে সীমিত বিমান হামলা, হুথিদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখার কথা বলা হচ্ছে।

হুথিদের দাবি, তাদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দর অবাধে পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে সৌদি আরবের জন্য তা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে; আবার সামরিক সংঘাত বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মিত্ররা কতটা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত তার ওপর। সম্ভাব্য পথগুলোর মধ্যে সীমিত বিমান অভিযান এবং বাব আল-মান্দেবকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আওতায় আনার উদ্যোগও রয়েছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

হুথিদের মোকাবিলায় সৌদির পাশে নেই মিত্ররা, কঠিন পরিস্থিতিতে রিয়াদ
ছবি: সংগৃহীত

Wednesday, September 16, 2026

সৌদির যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি, মক্কায় হামলার অভিযোগ নাকচ হুতিদের

এএফপিঃ সৌদি আরবের একটি যুদ্ধবিমান বুধবার ভূপাতিতের দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। একইসঙ্গে মুসলিমদের পবিত্র নগরী মক্কা লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি।

হুতির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারে বলেন, স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি অস্ত্র দিয়ে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে। এটি মারিব প্রদেশে অভিযান চালানোর জন্য ইয়েমেনের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল।

ইয়াহিয়া সারে অভিযোগ করেন, সৌদি আরব এখন পর্যন্ত ৪৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা মক্কা লক্ষ্য করে হামলার যে অভিযোগ তুলেছে, সেটি ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিযানগুলো সৌদির তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। সেগুলো পবিত্র স্থান থেকে অনেক দূরে।’

গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে পুনরায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে হুতিরা। তারা সৌদি আরবের ওপর সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা ও সম্প্রতি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব এল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় বাব এল-মান্দেব জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পরিণত হয়েছে। এটি সৌদির অপরিশোধিত তেল রপ্তানির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পথ।

সৌদির যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি, মক্কায় হামলার অভিযোগ নাকচ হুতিদের
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় গ্র্যান্ড মসজিদ। ফাইল ছবি: সৌদি প্রেস এজেন্সি/সিএনএন

ইয়েমেনের সঙ্গে এখনই সংঘাতে জড়াতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র

ইয়েমেনের পরিস্থিতি বিষয়ে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক অধ্যাপক লরেঞ্জো কামেলের মতে, ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে ইয়েমেন সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে আগ্রহী নয়। বুধবার কতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান।

কামেল বলেন, যুদ্ধের আগের বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে; এর কারণ হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি।

তিনি যুক্তি দেখান যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের প্রভাব—অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য—এর একটি উদাহরণ।

তিনি বলেন, বিশেষ করে আমরা দেখেছি যে, এই পর্যায়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার লক্ষ্যে বিশ্ববাজারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই তারা—বিশেষ করে ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে—জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায় যা সেখানকার বাস্তবতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

কামেল উল্লেখ করেন, নিজেদের শাসনব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে এবং রিয়াদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করে নিতে হুতিরা পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়া অব্যাহত রেখেছে।

অধ্যাপক আরো বলেন, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রিয়াদের দীর্ঘদিনের নির্ভরতার কারণে তাদের এখন এর ‘মাশুল গুনতে হচ্ছে’।

তিনি আরো জানান, ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে সংঘাতে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। এছাড়া, সম্ভবত সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মিশর সফর খুব একটা ফলপ্রসূ নাও হতে পারে, কারণ কায়রোর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে কাজ করে আসছে।

ইয়েমেনের সঙ্গে এখনই সংঘাতে জড়াতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র
হুথিদের দ্বারা দখলকৃত ‘গ্যালাক্সি লিডার’ বাণিজ্যিক জাহাজের ডেকে মানুষ নাচছে, ইয়েমেনের আল-সালিফ উপকূলে, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৩। ছবি: রয়টার্স।

মারিবে সৌদির এফ-১৫ ভূপাতিতের দাবি হুতিদের, মক্কামুখী ড্রোন নিয়েও উত্তেজনা

ইয়েমেনের মারিব গভর্নরেটের আকাশসীমায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান নিজেদের তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুতিরা। একই সময়ে পবিত্র নগরী মক্কামুখী একটি হুতি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে সৌদি আরব। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে বলেন, ইয়েমেন ও দেশটির জনগণের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসনের’ জবাব দিতে গিয়ে তাদের সশস্ত্র বাহিনী সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।

সারি দাবি করেন, মারিবের আকাশসীমায় সৌদি যুদ্ধবিমানটি ‘শত্রুতামূলক অভিযান’ চালাচ্ছিল। এ সময় নিজেদের তৈরি একটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বিমানটি ভূপাতিত করা হয়।

তিনি আরও বলেন, সৌদি যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর এর ধ্বংসাবশেষের সন্ধানে থাকা আরও দুটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের সঙ্গেও হুতিদের সংঘর্ষ হয়।

ইয়াহিয়া সারির দাবি, চলতি সপ্তাহে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ইয়েমেনের তাইজ, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, মারিব, সাদাহ ও আল-বায়দা এলাকায় ৪৫০টির বেশি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

সারি বলেন, ইয়েমেনের আকাশসীমা ও সার্বভৌমত্বকে যে কোনো আগ্রাসন বা লঙ্ঘন থেকে রক্ষায় ‘সম্ভাব্য সব উপায়’ ব্যবহার করা হবে।

এদিকে পবিত্র নগরী মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা চালানোর সৌদি অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার দিকে অগ্রসর হওয়া একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ড্রোনটি ধ্বংস করা হয়।

সৌদি জোটের দাবি, মক্কাকে লক্ষ্য করে এটি হুতিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা। এর আগে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই মক্কাকে লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল বলেও দাবি করেছে তারা।

তবে হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হিজাম আল-আসাদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, মক্কার মতো পবিত্র নগরীকে লক্ষ্য করার অভিযোগ ‘মিথ্যা’ এবং এ ধরনের দাবি আগেও করা হয়েছে।

মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে হামলার অভিযোগে হুতিদের নিন্দা জানিয়েছে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। সংস্থাটি পবিত্র স্থান ও বেসামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

ওআইসির বিবৃতিতে বলা হয়, পবিত্র স্থান ও মসজিদকে লক্ষ্য করে যে কোনো হামলা বেসামরিক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, পবিত্র স্থান, উপাসনালয় ও বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামী মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির পরিপন্থি।

সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানিয়ে ওআইসি দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা বজায় রাখতে নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

এসব হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়েছে। গত সপ্তাহেও হুতিরা সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছিল।

২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করার পর দেশটিতে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে।

এরপর থেকে ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব ও হুতিদের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে।

সূত্র : আলজাজিরা

সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স
সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। ছবি: রয়টার্স

মক্কা অভিমুখে ড্রোন হামলায় ওআইসির নিন্দা, অস্বীকার হুতিদের

ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কা অভিমুখে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সৌদি আরব। এ ঘটনার নিন্দা তীব্র জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের এই অভিযোগকে ‘পুরোনো মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে তা অস্বীকার করেছে হুতিরা। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ডের।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জানিয়েছে, মক্কার কাছে ইয়েমেনের হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেন, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটের দিকে ড্রোনটি শনাক্ত করা হয়। নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই সেটিকে ভূপাতিত করা হয়। পরে ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ মক্কার দক্ষিণে পড়ে।

আল-মালিকি এটিকে মক্কাকে লক্ষ্য করে হুতিদের দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন। এর আগে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগও হুতিদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল।

তিনি বলেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হজযাত্রীদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘লাল রেখা’। ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি ‘পুরোনো মিথ্যা’, যা এর আগেও ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, এ ধরনের অভিযোগ এখন আর কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।

এদিকে মক্কা ও মদিনা অঞ্চলে হুতিদের হামলার অভিযোগে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ওআইসি। সংস্থাটির মহাসচিবালয়ের এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের চলমান হামলারও নিন্দা করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, পবিত্র স্থান ও মসজিদ লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা লঙ্ঘন করে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে।

ওআইসি বলেছে, পবিত্র স্থান, উপাসনালয় ও বেসামরিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামি মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির পরিপন্থি।

পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা লঙ্ঘনকে অগ্রহণযোগ্য ও অসহনীয় উল্লেখ করে এর জন্য দায়ীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়ে ওআইসি বলেছে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা বজায় রাখতে রিয়াদ যেসব পদক্ষেপ নেবে, তাতে সংস্থাটির সমর্থন রয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় সৌদির খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফে ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এসব হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা ও দেশের কয়েকটি অঞ্চল দখল করার পর ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।

সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ডআনাদোলু এজেন্সি

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরী। ছবি: গেটি ইমেজেস
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরী। ছবি: গেটি ইমেজেস

Tuesday, September 15, 2026

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন কেন বৈশ্বিক তেলের বাজারে এত গুরুত্বপূর্ণ

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনে বিশাল একটি পাইপলাইন রয়েছে। নাম ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। গত বৃহস্পতিবার পাইপলাইনটিতে ড্রোন হামলা হয়। পরে সৌদি সরকার পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার জেরে পাইপলাইনটি বন্ধের ঘটনা জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারের জন্য আরেকটি ধাক্কা।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৬ মাইল। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল এ পাইপলাইন দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন করা তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয় পাইপলাইনটি দিয়ে। পরে তেল ট্যাংকারে ভরে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।

পাইপলাইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

এ পথে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় লাভ হয়। সেটা হলো, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পুরো উপসাগরীয় এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনার পর ‘সতর্কতামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা লোহিত সাগর এলাকায় হামলা জোরদার করেছে। সেখানেও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে হুতিরা। অতিগুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের বাজারে যখন টালমাটাল অবস্থা, সে পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

ক্ষয়ক্ষতি কতটা, কবে চালু হবে

হামলায় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কতটা ক্ষতি হয়েছে, এখনো জানা যায়নি। পাইপলাইনটির কার্যক্রম কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সেটা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে।

ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজন রয়টার্সকে জানান, মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগেই পাইপলাইনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানান, রিয়াদ ও পবিত্র মদিনার কাছে দুটি এলাকায় ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।

এর আগে গত মার্চে ইয়ানবুতে সৌদি আরামকো-এক্সন মোবিলের তেল শোধনাগারের কাছে হামলা হয়েছিল। এতে লোহিত সাগরের বন্দরটি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ট্যাংকারে তোলার কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।

ওই হামলার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়েনি। কয়েক দিনের মধ্যেই তেল পরিবহন স্বাভাবিক হয়। তবে ওই হামলা দেখিয়ে দিয়েছিল, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোগুলো হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়।

কত তেল পরিবহন হচ্ছিল

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত। এটি ১৯৮১ সালে নির্মাণ করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন হওয়া জ্বালানি তেল পুরো আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়ার জন্য এটি চালু করা হয়। হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করা ছিল এটি চালুর উদ্দেশ্য।

পাইপলাইনটি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা যায়। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ পাইপলাইন ব্যবহার করে জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ অনেকটা কমেছে।

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে। জানুয়ারির পর এটিই জ্বালানি তেল পরিবহনের সর্বনিম্ন মাসভিত্তিক হিসাব। হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে লোহিত সাগরের এ পথে জ্বালানি তেল পরিবহন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব পশ্চিমমুখী পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়েছিল। তখন প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে পরিবহন করা হতো। এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের চার থেকে পাঁচ শতাংশ।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার পরও বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব এ পাইপলাইনের কল্যাণে পণ্যটির রপ্তানি অব্যাহত রাখার সুযোগ পেয়েছিল।

বাজারে প্রভাব কতটা

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে ঘটেছে।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের এক-পঞ্চমাংশের বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছিল। এর পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এখন এ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন হচ্ছে। অর্থাৎ জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কাজেই এ পথের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বেছে নিয়েছিল লোহিত সাগরকে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল পাঠাচ্ছিল তারা। যদিও পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া নির্ভর করছে পাইপলাইন, মজুতাগার ও তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপর। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এসব অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে।

সৌদির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ইয়ানবুতে এরই মধ্যে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তা দিয়ে পণ্যটির রপ্তানি পাঁচ থেকে সাত দিন অব্যাহত রাখতে পারবে সৌদি আরব।

এ ছাড়া মিসরের আইন সোখনা ও সিদি কেরিরে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখান থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে আরও কয়েক দিন রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে সৌদি আরব। তাই বলা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির সরকার কিছুটা সময় হাতে পাচ্ছে।

সরবরাহ ও দাম নিয়ে শঙ্কা


বিশ্বে জ্বালানি তেলের মজুত এরই মধ্যে অনেকটা কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার জের ধরে গত মাসে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

আইইএ জানিয়েছে, এ বছর বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। এ পরিমাণ বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ।

সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে কৌশলগত মজুত থেকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে বিভিন্ন দেশ। এ কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়েনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ যত কমে আসবে, মজুতও তত কমবে। এটি শঙ্কার কারণ। কেননা, মজুত কমতে থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করবে।

গত জুনে আইইএ সতর্ক করে বলেছিল, কৌশলগত মজুত থেকে এভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ চালু রাখা হলে তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, মজুত অস্বাভাবিক কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেই সঙ্গে ইয়ানবু বন্দর ও সেখানকার তেল পরিবহন পথে হামলার হুমকি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকলে, সৌদি আরবের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কমে যাওয়া জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াটাও কঠিন হতে পারে।

হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গাভেকাল রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, হুতিদের ড্রোন হামলার হুমকির কারণে যদি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াজাতকারী ইয়ানবু কেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ে, তবে তা বিশ্বের জন্য ‘ভয়াবহ বিপর্যয়’ হবে।

সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে হামলার ক্ষত। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ স্যাটেলাইট থেকে তোলা
সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে হামলার ক্ষত। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ স্যাটেলাইট থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

সৌদি আরবের তিন শহরে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ১৩ জন আহত

এএফপিঃ সৌদি আরবের তিন শহরে ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় ১৩ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আজ মঙ্গলবার এ দাবি করেছে।

জোটের মুখপাত্র বলেন, গতকাল সোমবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় হুতিরা।

মুখপাত্র এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরও বলেন, হুতিরা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এসব হামলা চালিয়েছে। এতে ১৩ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হুতিরা বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালিয়েছে। তবে হামলায় আহত ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বে সামরিক জোট অভিযান শুরু করে। তবে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা কমে আসে।

অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রায় সেই যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। হুতিরা লোহিত সাগর তীরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের পর বাব আল-মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও বেড়েছে উদ্বেগ।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে বলে জোটের দাবি।

একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথ নিয়ে বিরোধ বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংঘর্ষে ইয়েমেনে নতুন করে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন
হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন। ছবি: রয়টার্স

হুতি–সৌদির সংঘাতে ট্রাম্প কি নতুন বিপদে পড়ছেন

ইরান-সমর্থিত হুতিরা কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। গত শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরে পুরো ইয়েমেন উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখলও নেয়।

ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর এর বিকল্প বাণিজ্যিক পথ হিসেবে সামনে চলে আসে বাব আল-মানদেব। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ইরান যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ইরানের সমর্থনে হুতিরা সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করতে ইরানও হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিম দিকে হুতিদের অব্যাহত হামলার বিষয়টি ওয়াশিংটন হয়তো আর উপেক্ষা করতে পারবে না। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় অস্থিতিশীল ফ্রন্টটি বন্ধ করতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত একটি জোটের প্রয়োজন হতে পারে।

হুতিরা সৌদি আরবে হামলা করছে কেন

হুতি বিদ্রোহীরা সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানির বাজার বারবার উল্টেপাল্টে দিয়েছে।

ইয়েমেনে হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার জেরে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় হামাসের সমর্থনে বাব আল-মানদেবে চলাচল করা জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোষ্ঠীটি আবার আলোচনায় আসে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল-মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকেও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

২০২৫ সালে লোহিত সাগর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে একটা উত্তেজনাকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে সেবার হুতিরা আন্তর্জাতিক জাহাজে তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এতে খরচ হয় প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।

এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের পরও এ অভিযান কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ওপর এ অভিযানের তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি। অভিযানে ইয়েমেনে আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছিল।

ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে হুতিরা যে সে সময়ে শুধু টিকে ছিল, তা নয়; বরং বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। হুতিদের এ আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। হুতিরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও বারবার হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযান শুরুর দুই মাসের মাথায় ওই বছরের ৬ মে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওই এলাকা শান্ত হয়ে আসে।

কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানের পক্ষে আবারও হুতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সংকীর্ণ এ প্রণালি সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাগুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগর থেকে এডেন উপসাগর দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে হলে সরু এ প্রণালিই একমাত্র পথ।

হুতিরা বলেছে, ইরানের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোকে যুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমুন্ড ফিটন-ব্রাউন দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, হুতিরা যে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করবে, এতে কোনো সন্দেহ কখনোই ছিল না।

ফিটন-ব্রাউন আরও বলেন, কয়েক মাস ধরে সমুদ্রে হামলা চালানোর পর হুতিরা হয়তো মনে করছে, সৌদি আরব তাদের যেসব হুমকি দিয়ে রেখেছে, বাস্তবে সেগুলো যাচাই করার সময় এসেছে। হয়তো তারা মনে করছে, সৌদি আরব লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারা মনে করছে, ইরানিদের সামনে সৌদিরা নিজেদের দুর্বল ও ভীত হিসেবে তুলে ধরেছে।

হুতিরা এ সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক ফিটন–ব্রাউন। তিনি বলেন, ‘হুতিরা মনে করছে, এটাই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে তাদের (হুতি) আগের দাবিদাওয়ার চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় এবং প্রতিপক্ষকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।’

সৌদি আরব বহু বছর ধরে হুতিদের দমন করার চেষ্টা করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে গোষ্ঠীটিকে রাজধানী থেকে হটিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

তবে এখন পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভয় দেখিয়ে ওই পথে চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা থেকে হুতিদের বিরত রাখতে পারেনি।

হামলাগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী প্রভাব ফেলছে

গত মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো। কিন্তু এতে বহু মানুষ হতাহত হন। বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ছিল সৌদি আরবে সবচেয়ে বড় হামলা।

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, এই হামলাগুলো নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতেরই অংশ।

দ্য ইনডিপেনডেন্টকে লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, বড় একটি প্রশ্ন হলো, পুরো অঞ্চলে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কতটা প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা গেছে। কিন্তু নানা চেষ্টা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক শাখাকে ঠেকানো ‘আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে’।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে হুতিদের বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে চাপ দিয়ে আসছিল।

লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে একটি সমাধান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত অবসানের যেকোনো উদ্যোগের অংশ হতে হবে। তা না হলে এসব গোষ্ঠী আবার অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে এবং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম হবে।

এরপর কী হতে পারে

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ হুতিদের হামলার নিন্দা করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ হয়নি।’

যদিও হুতিরা দাবি করেছে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-জওফ, আল-বায়দা, মারিব ও তাইজ প্রদেশে হামলা চালিয়েছে।

এ নিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকবে। তবে নিজেদের ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এ রাষ্ট্র কখনোই পিছপা হবে না। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমরা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করব।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড হুতিদের ‘শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করার অঙ্গীকার করেছে।

সৌদি আরবের বিশ্লেষক আলী শিহাবি হুতিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে, হুতিরা যুক্তিসংগত আচরণ করছে না। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।’

এ বিষয়ে ফিটন-ব্রাউন বলেন, সৌদি আরব পাল্টা লড়াই করতে প্রস্তুত বলেই তাঁর মনে হচ্ছে। হুতিদের আগ্রাসন ঠেকাতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় (মক্কা চুক্তি) তারা একটি নৌ জোট গঠন করেছে।

যদিও এখনো আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ রিয়াদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এদিকে ইয়েমেনে কারা শাসন করবে, তা নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সর্বশেষ এ উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান ওয়াশিংটনে ফোন করে হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন বলে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

ফিটন-ব্রাউন বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব চাইছে। তারা চায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত যে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করুক এবং সেখানে হস্তক্ষেপ করুক। কারণ, সৌদি আরব সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরকে উপেক্ষা করে, হুতিদের কাছ থেকে সৌদি আরবের ওপর তৈরি হওয়া এই হুমকিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি আসলে পুরো বিষয়কে নিজেদের জন্যই আরও কঠিন করে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় মার্কিন নাগরিকেরা ক্ষুব্ধ। তবে আমার মনে হয়েছে, সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করতে একটি জোট গড়ে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই চেষ্টা করেছে।’

ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হুতিরা তাদের নৌ সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারবে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াস আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটারের বেশি হওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ও এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। ইরানের ওপর কোনো বড় হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন চেষ্টাকে আটকে দিতেই মূলত এ কৌশল নিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এ অব্যাহত হামলা মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি ও সেনাসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন)।

ইরাক থেকে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পাইপলাইনের একটি অংশে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন শুক্রবার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও এ পাইপলাইনের ভূমিকা অনেক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। কারণ, হুতি বিদ্রোহীদের শক্তিশালী করতে সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসংক্রান্ত সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠিয়েছে ইরান।

(দ্য ইনডিপেনডেন্ট, রয়টার্স, আল–জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন শামিমা নাসরিন)

পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: কোলাজ/রয়টার্স ফাইল ছবি

Monday, September 14, 2026

হুতিদের অগ্রযাত্রায় কারও লাভ, কারও ক্ষতি

আল–জাজিরাঃ ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরোটা এখন দেশটির হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গত সপ্তাহান্তে তারা বন্দরনগর মোখা দখল করে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয়।

এখন আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে হুতি বাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপরও তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেনের বাইরে হুতিরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশেও পড়তে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গতকাল রোববার জানিয়েছে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে ২ হাজারের বেশি মানুষ আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।

ইয়েমেনের উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে জিবুতির শহর ওবকে ইয়েমেনিরা পৌঁছাচ্ছেন। সেখানে তাঁদের খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে আইওএম সতর্ক করে বলেছে, আরও সহায়তা প্রয়োজন।

সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ বাব আল-মানদেব দিয়ে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৮ শতাংশও এই পথ দিয়ে যায়।

অন্যদিকে হুতিদের মিত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে নৌ চলাচলসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে।

ইরান বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিরা একটি স্বাধীন গোষ্ঠী।

তবে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি হরমুজ প্রণালির চেয়ে সরু।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর ফলে আগের তুলনায় জাহাজ নিশানা করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হলো, সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপকূলে থাকা এক হুতি কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ওই এলাকায় কামান বসিয়ে ইয়েমেনের উপকূলের কাছের জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ও পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে জাহাজে হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগরে উত্তেজনা আবার বেড়ে গিয়েছিল।

বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছে। এতে একটি যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

লোহিত সাগরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আটালান্টা’ টাস্কফোর্স কাজ করছে। তবে লোহিত সাগরে আবার জাহাজে হামলা শুরু হলে নির্ধারিত দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাহিনীর পক্ষেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, এই অঞ্চলে নৌবহরের রসদসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে অনেক দেশের নৌবাহিনী জিবুতিকে বন্দর হিসেবে ব্যবহার করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে অপারেশন আটালান্টার মতো চলমান অভিযানের আওতায় থাকা জাহাজগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন।

হুদিস্তেয়ানু আরও বলেন, ‘তবে আমি বলব না যে এসব জাহাজ শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে রয়েছে।...হুমকির জবাব দিতে দেরি করলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালির দিকে বেশি পাঠানো হয়েছিল। এর ফলে হর্ন অব আফ্রিকার উপকূলের কাছে নিরাপত্তার কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সংগঠিত সামুদ্রিক অপরাধী চক্রগুলো।

হুদিস্তেয়ানু সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে সোমালিয়ার উপকূলজুড়ে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। বহুস্তরীয় এই সংকটের সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’

মিসরের দুশ্চিন্তা

লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না বলে হুতিরা আশ্বস্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিশানা করে হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। হুতিদের দাবি ছিল, এসব জাহাজ ইসরায়েল বা দেশটির মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মিসরের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সুয়েজ খালের টোল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। এই অর্থ সুয়েজ খালের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের এই অভিযান ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। লোহিত সাগর দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করত, সেগুলোর বড় একটি অংশ একপর্যায়ে পুরোপুরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে হুতিরা জাহাজে হামলা বন্ধ করার কথা জানায়। কিন্তু অনেক কোম্পানি কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখে। তারা আর আগের পথে ফিরে আসেনি।

আফ্রিকা অধ্যয়নের অধ্যাপক ও সংঘাত নিরসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই বলেন, এই সময়ে ক্ষতি সত্ত্বেও মিসর কৌশলগতভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল।

আল-শাফেই আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তাতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করে মিসর। ২০১৫ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের সময় থেকেই এটি মিসরের একটি স্থায়ী অবস্থান।’

আল-শাফেই আরও বলেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এসব সত্ত্বেও মিসর হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও এতে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ইরিত্রিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে

ইয়েমেনিরা এখন লোহিত সাগরে প্রবেশের পথে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনের অপর পাশে বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কির শাসনামলে দেশটি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছে। এ কারণে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগও সীমিত ছিল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফওয়ার্কি লোহিত সাগরে ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করেছেন তিনি।

আল-শাফেই বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করছেন আফওয়ার্কি। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরে যা ঘটছে, তা থেকে তিনি অনেক সুবিধা পাচ্ছেন।’

হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা
হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Sunday, September 13, 2026

এক দেশ, বহু শক্তির লড়াই: ইয়েমেন কীভাবে বারবার যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে by অনিন্দ্য সাইমুম

বিস্তীর্ণ আরব উপত্যকার একেবারে দক্ষিণ–পশ্চিম কোণের দেশ ইয়েমেন। আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বড়। ভূপ্রকৃতি, পাহাড় আর মরুভূমি ঘেরা। দেশটিতে চার কোটির কিছু বেশি মানুষের বসবাস। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির রাজধানী সানা।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা করে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেশটির দুদিকে স্থলভাগ, দুদিকে সাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, উত্তরে সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির বিশাল সীমানা। পূর্বে ওমান। পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও আরব সাগর হয়ে ভারত মহাসাগরের সুনীল জলরাশি।

লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগর হয়ে আরব সাগরে চলাচলের জন্য ইয়েমেন ঘেঁষে সরু একটি করিডর রয়েছে। এ জলপথকে বাব আল–মানদেব প্রণালি নামে ডাকা হয়। প্রণালির এক পাশে ইয়েমেন, অন্য পাশে আফ্রিকার জিবুতি। এই সরু জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচল করে।

লোহিত সাগর থেকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য বাব আল–মানদেব প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। আর এমন বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইয়েমেনের ভূরাজনৈতিক আবেদন বহু গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আফ্রিকা ও আরবের (বৃহত্তর এশিয়ার) অন্যতম সংযোগস্থল বলা হয় ইয়েমেনকে।

সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইয়েমেনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ, হাজারো বছরের পুরোনো। অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী ভূখণ্ড ছিল ইয়েমেন। প্রাচীনকালে এ অঞ্চলে সাবা, মাইন ও হিময়ারের মতো রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভারত মহাসাগর, পূর্ব আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যকার বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে ইয়েমেন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলার বাণিজ্য ছিল এ সমৃদ্ধির বড় উৎস।

সপ্তম শতাব্দীতে ইয়েমেন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশ ও ধর্মীয় নেতা দেশটির বিভিন্ন অংশ শাসন করেন। নবম শতাব্দীর শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে ‘জায়দি’ শিয়া ইমামদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান হুতি আন্দোলনের সামাজিক ও ধর্মীয় ভিত্তি বুঝতে এই জায়দি ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতিমান ভূগোলবিদ টলেমি একসময় ইয়েমেনকে ‘সুখী আরব’ বলেছিলেন। রোমানরাও ইয়েমেনকে ‘সুখী অঞ্চল’ বলেই চিনত। সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, সম্পদশালী অর্থনীতি, সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ইয়েমেনিরা বরাবরই বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে।

যদিও আধুনিক ইয়েমেন অনেকটা আলাদা। দেশটির সমৃদ্ধির ইতিহাস ফিকে হয়ে এসেছে। এখন ইয়েমেন বলতে বিশ্বের মানুষ বোঝে, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ও সংঘাতকবলিত এক ভূখণ্ড; যেখানে অর্থের বদলে অস্ত্রের ঝনঝনানি এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ঔপনিবেশিকতা থেকে স্বাধীনতা

ইয়েমেনকে ঘিরে বিদেশি শক্তিগুলোর আগ্রহের ইতিহাস কয়েক শ বছরের পুরোনো। ষোড়শ শতকের দিকে তখন অটোমান সাম্রাজ্যের জয়জয়কার। ইয়েমেনের একটি অংশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে তুর্কিরা; কিন্তু স্থায়ী হয়নি। মোটামুটি এক শতাব্দীর মধ্যে ইয়েমেন থেকে অটোমানরা বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

লোহিত সাগরে এরপর অনেক জল গড়িয়েছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একে একে আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়েছে। ইয়েমেনের এডেন (বিখ্যাত বন্দর) ১৮৩৯ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীন আসে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয়। তখন এডেন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্র বা রিফুয়েলিং বন্দর হয়ে ওঠে। এর আগে ১৮৪৯ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেয় অটোমানরা। আর দক্ষিণাঞ্চল থাকে ব্রিটিশদের হাতে।

বিংশ শতকের শুরুর দিক। রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তখনো দগদগে। ১৯১৮ সালে ইয়েমেন থেকে অটোমান সাম্রাজ্য বিদায় নেয় (এ সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯২২ সালে)। স্বাধীন হয় উত্তর ইয়েমেন। শাসনভার যায় ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদ এদ্দিনের হাতে। তাঁকে মুতাওয়াক্কিলি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তিন দশক দেশ শাসন করেন তিনি। তখন সামন্ততান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে ইয়েমেনে।

১৯৪৮ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন ইমাম ইয়াহিয়া। বিদ্রোহীদের দমন করে উত্তরসূরি হন তাঁর বড় ছেলে আহমদ বিন ইয়াহিয়া। তিনি বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ১৯৬২ সালে মারা যান। ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর। অভিষেকের পরপর সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে তাঁকে ক্ষমতা হারাতে হয়।

অবসান ঘটে ইয়েমেনি রাজতন্ত্রের। সেনা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ইয়েমেনে আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এতে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ও মিসর প্রজাতন্ত্রপন্থীদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়।

দুই দেশের এক হওয়া

গত শতকের ষাটের দশকে পুরো ইয়েমেন অঞ্চল ছিল বেশ উত্তাল। সশস্ত্র আন্দোলনের মুখে ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা দক্ষিণ ইয়েমেন ছেড়ে চলে যায়। ব্রিটিশশাসিত অঞ্চলগুলো এক ছাতার নিচে এনে নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। সেটাও বেশি দিন টেকেনি। দুই বছরের মাথায় (১৯৬৯ সালে) সফল কমিউনিস্ট বিদ্রোহ হলে এটির নতুন নাম রাখা হয় ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন’।

নতুন এ দেশ স্পষ্টতই সোভিয়েত প্রভাব বলয়ে ছিল, যা ওই সময় আরব বিশ্বের একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ছিল পরিচিত। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে তখনো রক্ষণশীল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। দুই অংশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও আলাদা। চলছিল সীমান্তবিরোধ। এর মধ্যেই দুই অংশকে এক করার একটি প্রচেষ্টা চালু ছিল।

১৯৭৮ সাল। উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। পরের বছরই উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন সংঘর্ষে জড়ায়। আশির দশকের মাঝামাঝি দক্ষিণ ইয়েমেনে ক্ষমতার লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হন। ফলে দেশটির প্রথম প্রজন্মের নেতাদের বড় অংশ ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।

এমন উত্তাল পরিস্থিতিতে দুই ইয়েমেনকে এক করার প্রচেষ্টা জোরেশোরে শুরু হয়। সেটা আরও জোরালো হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ে। সফলতা আসে ১৯৯০ সালে। ওই বছরের ২২ মে দুই ইয়েমেন এক হয়। নতুন রাষ্ট্রের নাম রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব ইয়েমেন’। প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ।

একীভূত হলেও দুই অংশের মধ্যে বিরোধ আর উত্তেজনা রয়ে যায়। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট সালেহ জরুরি অবস্থা জারি করেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী সালেম আল-বেইদসহ দক্ষিণের কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন তিনি। জবাবে তাঁরা দক্ষিণে নতুন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেন। তবে সালেহর বাহিনী তাঁদের পরাস্ত করে। দেশটি আবার ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায়।

সালেহর দীর্ঘ শাসন ও হুতিদের উত্থান

প্রেসিডেন্ট সালেহ দক্ষিণ ইয়েমেনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অনেক মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বঞ্চনা, জমি ও সম্পদ হারানো এবং সরকারি চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের ক্ষোভ রয়ে যায়। এসবই পরে অঞ্চলটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ ছড়ানোর পেছনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

আলী আবদুল্লাহ সালেহ প্রথমে উত্তর ইয়েমেনের শাসক, পরে দুই ইয়েমেন এক হলে প্রেসিডেন্ট হন। সব মিলিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী, উপজাতীয় নেতা, রাজনৈতিক মিত্র ও পৃষ্ঠপোষকতার জটিল সম্পর্কের ওপর।

সালেহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মিত্র বানিয়েছেন। আবার প্রয়োজন ফুরালে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কৌশল তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রাখে। কিন্তু দেশটিতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পানি ও সম্পদের সংকট এবং আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়তে থাকে। সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাব।

নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে ‘জায়দি’ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবে হুতি আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তিনি সালেহ সরকারের বিভিন্ন নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের প্রভাবের সমালোচনা করতেন। তখন থেকেই হুতিদের সমর্থন জোগায় ইরান।

নতুন শতকে ইয়েমেন

একবিংশ শতকের শুরুতে ইয়েমেনে ব্যাপক রক্তপাত দেখা দেয়। ২০০০ সালে এডেন বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে প্রাণঘাতী হামলা চালায় আল–কায়েদা। পরের বছর নির্বাচন ঘিরে দেশটিতে বড় ধরনের সহিংসতা হয়। ২০০২ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে বেশ বড়সড় অভিযানে নামে ইয়েমেন সরকার। আল–কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দেশটি থেকে কয়েক শ ইসলামিক স্কলারকে বহিষ্কার করা হয়।

উত্তরাঞ্চলে ২০০৪ সালের জুন–আগস্টে হুতিদের নেতৃত্বাধীন শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে শত শত মানুষ নিহত হন। নিহত হন হুসেইন আল-হুতিও। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে হুসেইন আল-হুতির সমর্থকদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০০৭ সালের জানুয়ারি–মার্চ মাসে ইয়েমেনের উত্তরে নিরাপত্তা বাহিনী ও হুতিদের সংঘর্ষে বহু মানুষ হতাহত হন। গ্রীষ্মে বিদ্রোহী নেতা আবদুল মালিক আল-হুতি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সানায় মার্কিন দূতাবাসে আল-কায়েদার হামলায় হামলাকারীসহ ১৬ জন নিহত হন।

২০০৯–১০ সালজুড়েও ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা যায়। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন বাহিনীর হামলায় দেশটিতে আল–কায়েদার নেতা আনোয়ার আল–আওলাকি নিহত হন। এত কিছুর পরও ইয়েমেনে আল–কায়েদা ও হুতি, কারও প্রভাব কমেনি।

আরব বসন্তের ছোঁয়া

আরব বিশ্ব ২০১১ সালে এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হয়। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত একে একে আরব দেশগুলোয় ছড়িয়ে পড়ে। বাদ যায়নি ইয়েমেনও। ওই বছর দেশটিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীরা সালেহর পদত্যাগ, দুর্নীতির অবসান ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।

দীর্ঘ আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পর সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন। ২০১২ সালে আবেদরাব্বো মানসুর হাদি ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল, নতুন সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক পক্ষকে ক্ষমতায় যুক্ত করা।

রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। সরকার অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও ক্ষমতা বণ্টনের প্রস্তাবেও ঐকমত্য হয়নি। এতে হুতিরা অভিযোগ করে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করবে।

এ পরিস্থিতিতে হুতিরা উত্তরাঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে থাকে। একসময় পুরোনো শত্রু সালেহ ও তাঁর অনুগত সেনাসদস্যদের সঙ্গে হুতিদের সমঝোতা হয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুতিরা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাদি সানা ছেড়ে এডেনে চলে যান। এডেনকে অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়। পরে প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

গৃহযুদ্ধ থেকে আঞ্চলিক সংঘাত

আরব বসন্তের পর থেকে ইয়েমেন টালমাটাল ছিল। এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। হুতিরাও একের পর এক এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে। এ অবস্থায় ২০১৫ সালে নতুন করে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে ইয়েমেনে।

হুতিরা এডেনের দিকে অগ্রসর হলে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল, হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। যুক্তরাষ্ট্র জোটকে গোয়েন্দা ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

সৌদিরা হুতিদের উত্থানকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি এবং ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বিস্তার হিসেবে দেখে থাকে। সৌদি জোটের বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধের মধ্যেও হুতিরা সানা আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। সৌদি আরবের ভেতরেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুতিরা। পরে যুদ্ধ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।

২০১৭ সালে হুতি আর সালেহপন্থীদের জোট ভেঙে যায়। সালেহ হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর সংঘর্ষে নিহত হন। এরপরও তাঁর অনুগত বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইয়েমেনের সংঘাতে সক্রিয় থাকে।

শান্তি এখনো আসেনি

ইয়েমেনে সংঘাত শুধু হুতি ও সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে ঘটছে, তা নয়। দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) গড়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে সমর্থন জোগায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেয় সৌদি আরব।

২০১৯ সালে এসটিসি এডেনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় সরকার ও এসটিসির মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এরপরও বাহিনীগুলো একীভূত করা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির অনেক শর্ত কার্যকর হয়নি। চলতে থাকে সংঘাত। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে দুই মাসের অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। পরে এর মেয়াদ কয়েক দফায় বৃদ্ধি করা হয়।

একই বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট হাদি প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। হুতিবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা থেকে পিএলসি গঠন করা হয়। কিন্তু কাউন্সিলের সদস্য ও সমর্থক শক্তিগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দূর হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত শান্তিও আসেনি।

ফিলিস্তিনের গাজা ও ইরান যুদ্ধ

২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। হুতিরা অসহায় গাজাবাসীর পক্ষে দাঁড়ায়। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে লোহিত সাগর ও আব আল–মানদেব প্রণালিতে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।

বসে থাকেনি ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্ররা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর ব্যাপকভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। ওই দিন ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইরান। স্বাভাবিকভাবে ইরান–সমর্থিত হুতিরা যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। তেহরানের পক্ষে রণাঙ্গনে নেমেছে তারাও।

গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে শুরু করে। হুতিদের লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং উপকূলীয় এলাকায় অগ্রযাত্রা নতুন সংকট তৈরি করে। লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী রণতরিগুলোর অবাধ চলাচল ব্যাহত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।

হুতিদের হুমকি ও প্রতিক্রিয়া

জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল–মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকে তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

হুতিদের এসব সক্ষমতা ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারে। মার্কিন রণতরিগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে।

তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াসে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর দখল করে নিয়েছে। এত দিন বন্দরটি ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

জবাবে সৌদি আরব মোখায় বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে হুতিরাও বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আগে থেকেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব আল–মানদেব পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকটে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনকে আবার বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, সংঘাত ও গৃহযুদ্ধে ইয়েমেনের অবস্থা শোচনীয়। লাখো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থনীতির অবস্থা তথৈবচ। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট। ভেঙে পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রশাসনব্যবস্থা। খাদ্যসংকটে দেখা দিয়েছে তীব্র মানবিক সংকট।

অপুষ্টি–দুর্ভিক্ষ–মহামারিতে ইয়েমেনে আরও অনেক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও ত্রাণ সরবরাহে বাধা পাচ্ছে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইয়েমেনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখন যদি গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে ইয়েমেন সংকট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা ভেবে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।

{তথ্যসূত্র: বিবিসি, টাইম, দ্য গার্ডিয়ান, এপি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, আরব সেন্টার ও ব্রিটানিকা}

টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে
টানা সংঘাতে ইয়েমেনের রাজধানী সানার বড় অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী কারা, কীভাবে উত্থান

এএফপির এক্সপ্লেইনারঃ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি দখল করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুতিদের শক্ত অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হলো।

একসময় হুতিদের তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তারা এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়

হুতিরা জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত। জায়দিরা শিয়াদের একটি শাখা। ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নি। আর দেশটিতে জায়দিরা সংখ্যালঘু।

গত শতকের নব্বই দশকে জায়দিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা প্রতিরোধে নামে। জায়দিদের বেশির ভাগই ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।

হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। প্রয়াত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে এই সংগঠনের নামকরণ হয়। তাঁর ছেলে হুসেইনও এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন।

বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক পরে সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।

এখন হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তারা প্রশিক্ষিত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে।

ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় অংশ যে এলাকাগুলোতে বসবাস করে, হুতিরা সেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এখনো দেশটির বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।

হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের জন্যও তারা হুমকি। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর হুতিরা বারবার ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে উত্থান

২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেনের তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে লড়েছে। আর ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও তারা লড়াই করে। সে সময় তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবে ঢুকে পড়েছিল।

আরব বসন্তের বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে হুতিরা অংশ নেয়। পরে অবশ্য তারা সালেহর সঙ্গে জোট গড়ে। তবে আবার তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ২০১৭ সালে হুতিরা সালেহকে হত্যা করে।

হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি হয়। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ তখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

গত জুলাইয়ে আবার সংঘাত শুরু হয়। সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের আকাশসীমা অমান্য করে হুতিরা একটি ইরানি উড়োজাহাজকে অবতরণের অনুমতি দেয়। এর জবাবে বিমানবন্দরে হামলা হয়। এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে হুতিরা।

‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক

হুতিরা তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ। এই অক্ষে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের অভিযোগ, তেহরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ করে। ইরান অবশ্য এই অভিযোগ অতীতে অস্বীকার করেছে।

হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে মানে না। তবে বছরের পর বছর ধরে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে। গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালানোর কথা জানায়।

এই হামলার কারণে অনেক জাহাজকে গন্তব্যে যেতে দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

গত মার্চে ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হুতিরাও যোগ দেয়। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। তবে এসব হামলায় ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুতিরা তাদের সমর্থনদাতা দেশটির কাছ থেকে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছে। সামরিক সহায়তার জন্যই তারা মূলত ইরানের ওপর নির্ভর করে।

বাব আল-মানদেব দখলের লড়াই

লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হামলা চালিয়ে হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।

সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করেছে লোহিত সাগর। সৌদি আরবের জন্যও এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহন অনেকটাই বন্ধ করে দেয়। এরপর তেল রপ্তানি চালু রাখতে সৌদি আরব এই জলপথের ওপর নির্ভর করছে।

গত জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজে বারবার হামলা চালিয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আবার সংঘাত শুরুর কিছুদিন পর ৩ সেপ্টেম্বর হুতিরা বাব আল-মানদেব দখলের লক্ষ্যে বড় ধরনের হামলা শুরু করে।

এক সপ্তাহের মধ্যেই হুতিরা পুরো লোহিত সাগর উপকূল এবং প্রণালিটির ভেতর ও আশপাশের কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। এতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ সৌদির তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও বেড়েছে।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রায় নতুন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

রয়টার্সের বিশ্লেষণঃ ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের সপ্তম মাসে নতুন এক সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইয়েমেনের উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা। শুক্রবার তারা ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী ওই প্রণালির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।

বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে গেলে ইরান আরব উপদ্বীপের দুই পাশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব নিয়ে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে নতুন করে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দরগুলো দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি করছে। বাব আল-মান্দেবও হুমকির মুখে পড়ায় সৌদির বিকল্প এই রপ্তানি পথও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। তার জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিফেন ওয়ার্থেইম রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছিলেন, যাতে সামরিক সংঘাত সীমিত রেখে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যায়। কিন্তু হুতিদের অগ্রযাত্রা সেই পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি বেশ কঠিন। হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দিলে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন চাপ তৈরি হবে। আবার তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে ইরানে ইতোমধ্যে ব্যস্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে তিনটি সূত্র। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না বলে তাকে জানানো হয়েছে। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করা হবে।

শনিবার ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন, সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। একই সঙ্গে হুতিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ করেছে বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাসহ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় অংশীদারদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

ইরানের সঙ্গে যুক্ত হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হতো। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে আরও প্রায় ৭ শতাংশ বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহ এবং প্রায় ১২ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড শেনকার রয়টার্সকে বলেন, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে বিশ্বের দুটি প্রধান জ্বালানি চোকপয়েন্ট তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর মাধ্যমে তেহরান বিপুল প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ; হুতিদের ঠেকাতে মার্কিন সেনা ও সীমিত আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র ব্যবহার করা, অথবা সৌদি আরব, তার মিত্র এবং দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে একাই হুতিদের মোকাবিলা করতে দেওয়া।

হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান শুরু হলে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর বড় ধরনের সম্পদ মোতায়েন করতে হতে পারে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সক্ষমতাও ব্যবহার করতে হবে, কারণ গত বছরের তুলনায় হুতিদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে।

হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানকে সক্রিয় হতে হলে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতও আরও কমে যেতে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ ও মজুত রয়েছে এবং কৌশলগত সব লক্ষ্য পূরণে সম্পদের ঘাটতি হবে না।

ইয়েমেনে সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ট্রাম্প সরাসরি সামরিকভাবে হুতিদের বিরুদ্ধে যেতে অনিচ্ছুক হলে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা জোরদার করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন একসময় জানতে চেয়েছিল, ‘ইয়েমেন আমাদের জন্য কী করতে পারে?’ এখন বাস্তবতা হলো, ‘ইয়েমেন আমাদের দিনটাই নষ্ট করে দিতে পারে।’

সূত্র : রয়টার্স

রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি
রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি