Showing posts with label ইয়েমেন. Show all posts
Showing posts with label ইয়েমেন. Show all posts

Tuesday, October 13, 2026

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা

এএফপিঃ ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটনকে ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুথি বিদ্রোহীদের এক নেতা।

ইয়েমেনে নিজেদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছে বলে খবর প্রকাশের পর সোমবার এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এদিকে, ধারাবাহিক হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে দেশটির সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কয়েক মাস পর গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। ওই সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে আরো গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পরপরই হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, তেলবাহী ট্যাংকার ও পরিবহনকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। সৌদি রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলায় বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সোমবার রাতেও সৌদি রাজধানীতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, তারা হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।

অন্যদিকে, হুথিরা দাবি করে, তারা আবারও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

পরে সৌদি জোট জানায়, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জোট জানায়, হুথি গোষ্ঠীর ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র খামিস মুশাইত শহর লক্ষ্য করে আসার সময় প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। শহরটিতে আগে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছিল।

শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করছেন তিনি। এর আগে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়া হলেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন বলে খবর রয়েছে।

সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘হুথিরা খুবই খারাপ আচরণ করছে। তারা অত্যন্ত খারাপ আচরণ করছে। এটা মোটেও ভালো নয়।’

হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে অংশ নেয়, তাহলে জবাব দেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো দীর্ঘ আলোচনা করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’

সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও সতর্ক করে দেন তিনি। আল-বুখাইতি বলেন, ‘সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এসব স্থান থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ, এখন এগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’

শনিবার বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলাটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এতে শত শত মানুষ আহতও হন।

ট্রাম্প ওই হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন এবং সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন।

সোমবারও রিয়াদের উপকণ্ঠে অবস্থিত বিশাল বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

‘কঠোর’ জবাবের হুঁশিয়ারি

আল-বুখাইতি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার উদ্দেশ্য হলো যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এই বার্তা দেওয়া যে, নিরাপদ অবস্থানে থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আর আগ্রাসন চালানো যাবে না।

সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী যুবরাজ আবদুল আজিজ বিন সালমান সোমবার রিয়াদে এক সম্মেলনে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের জবাবও সমানভাবে কঠোর হতে হবে।’

শনিবারের হামলার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এতে দেখা যায়, ধর্মীয় পোশাক পরা মুসলিম তীর্থযাত্রীরা বিমানবন্দরের যাত্রী অপেক্ষাকক্ষে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বিস্ফোরণে ভবনের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে।

সোমবারও রিয়াদে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়া জানায়, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি মোকাবিলায় সামরিক জোট পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে ‘শত্রুপক্ষের আকাশপথে হামলার হুমকি’ সম্পর্কে সতর্কবার্তা আসে। এর কিছুক্ষণ পর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই সতর্কবার্তার কারণে উজবেকিস্তানের নেফচি ফেরগানা ও সৌদি ক্লাব আল নাসরের মধ্যকার একটি ফুটবল ম্যাচের খেলা শুরুর সময় পিছিয়ে যায়। আল নাসরের হয়ে খেলেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রিয়াদে এই প্রথম মোবাইল ফোনভিত্তিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলো। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাজধানী লক্ষ্য করে হামলার সময় কেন এ ধরনের বার্তা দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

হুথিরা আরো দাবি করেছে, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত

সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, দেশটির যেকোনো বিমানবন্দর ব্যবহার করার আগে মার্কিন সরকারি কর্মীদের দূতাবাসের অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নিলে মার্কিন নাগরিকদের ‘সতর্কতা’ অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

দূতাবাস আরো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির ছবি তোলার কারণে কয়েকজন মার্কিন নাগরিককে আটক করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় বিমান সংস্থা ইতিহাদ এয়ারওয়েজ সোমবার ঘোষণা করেছে, আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি দাম্মাম ও জেদ্দাগামী ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে।

বাহরাইনের জাতীয় বিমান সংস্থা গালফ এয়ার জানিয়েছে, তারাও শনিবার পর্যন্ত রিয়াদের সব ফ্লাইট বাতিল করছে।

মার্কিন বিমান সংস্থা ডেল্টা এয়ারলাইনস ২৩ অক্টোবর থেকে আটলান্টা ও রিয়াদের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম কেনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ, মরুভূমিপ্রধান ভূখণ্ডজুড়ে তেল স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও পরিবহনকেন্দ্রে হুথিদের হামলা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, কিছু ক্ষেত্রে সফলতা থাকলেও সৌদি আরবের আয়তন এত বড় যে, দেশটির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সর্বত্র নিজেদের স্থাপনা রক্ষা করা কার্যত অসম্ভব।

২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট ইয়েমেনের সরকারকে সহায়তা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ইয়েমেনের আকাশসীমা এবং হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানার বিমানবন্দরের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাও রয়েছে।

জুনোর মতে, হুথিরা এখন সৌদি আরবের সঙ্গে সেই আচরণই করতে চায়, যা সৌদি আরব তাদের সঙ্গে করে আসছে।

দীর্ঘদিনের ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ দেশটিতে গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। দারিদ্র্যপীড়িত দেশটির সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সৌদি আরবে বারবার হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতে জড়িত উভয় পক্ষকে হামলা বন্ধ করে পিছু হটার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, লড়াই অব্যাহত থাকলে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে, অথচ এ সংঘাতের অবসানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে সর্তক করলেন হুথিরা
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

দ্য গার্ডিয়ানঃ রিয়াদকে চাপে ফেলতে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইয়েমেনের হুথিরা। পাল্টা অভিযানে নেমেছে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী, বাড়ছে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে সৌদি আরব। রাজধানী রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পাশাপাশি দেশটির অন্যান্য বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিমান চলাচল, প্রশ্ন উঠেছে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের এই আক্রমণ কেবল সামরিক সংঘাতের অংশ নয়; এর মাধ্যমে রিয়াদের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নিরাপদ বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে দেশটির ভাবমূর্তিতেও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত এলাকাগুলো পুনর্দখলে অভিযান জোরদার করেছে। ফলে সংঘাতটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা

গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন রোববার একই বিমানবন্দর এলাকায় আরেকটি হামলায় একজন নিহত হন এবং প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন।

শনিবারের হামলার পর প্রকাশিত নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে বিমানবন্দরের টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। হামলার অভিঘাতে টার্মিনালের ভেতরে ধোঁয়া ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

রিয়াদ বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানী থেকে প্রায় ২২ মাইল উত্তরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরে হামলার কারণে দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সময় বাড়িয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাও রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে। এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামো ঘিরে হুথিদের হামলা বাড়ছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই অভিযানের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়গুলোর একটি।

এখনই হামলা জোরদার করল কেন হুথিরা?

হুথিদের হামলার সময় নির্ধারণের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ এবং বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত—দুইয়েরই প্রভাব রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধে হুথিরা প্রথমদিকে সরাসরি জড়ায়নি। তবে গত মাসে গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের অবস্থানে পৌঁছায়।

বাব আল-মান্দেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি এবং এশিয়া-ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনে এই পথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। বাব আল-মান্দেবের আশপাশ থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য অবস্থানেও আঘাত হানা হচ্ছে।

সৌদি আরব ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করায় হুথিদের প্রধান প্রতিপক্ষের একটি হয়ে উঠেছে। ফলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে রিয়াদকে সরাসরি যুদ্ধের মূল্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। রাজধানীর বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ হচ্ছে কীভাবে?

পরপর হামলার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সৌদি আরবের শক্তিশালী বলে পরিচিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কীভাবে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তবে হামলাগুলো কেন প্রতিহত করা যায়নি, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবকে একই সঙ্গে সরকারি ভবন, তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার জন্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত রাখতে বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র এবং কার্যকর নজরদারি সক্ষমতা প্রয়োজন।

হুথিদের হামলার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপও বাড়ছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে একযোগে বা ধারাবাহিকভাবে হামলা হলে কোন লক্ষ্যবস্তু আগে সুরক্ষিত করা হবে, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এর আগে রিয়াদ বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক ও সংশ্লিষ্ট গুদামগুলোও হামলার লক্ষ্য হয়েছিল। এসব হামলায় বিমানবন্দরে থাকা একটি এয়ারবাস এ৩২০ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ধ্বংস হয় এবং অন্তত আরো পাঁচটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হুথিরা দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ফলে বিমান চলাচলের নিরাপত্তার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করার কৌশল কী?

বিমানবন্দর এমন একটি অবকাঠামো, যার ওপর হামলা হলে শুধু যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হয় না; আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব পড়ে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন ও বড় বৈশ্বিক আয়োজনের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ২০৩২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।

এমন সময়ে রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা দেশটির নিরাপত্তা-ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট বাতিল করলে ব্যবসায়ী, পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট অব পিসের উপদেষ্টা ও সংঘাত বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি মনে করেন, হুথিদের হামলা বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; তেল পাইপলাইন ও জ্বালানি অবকাঠামোও তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেসামরিক বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দৃশ্যমান প্রভাব এবং জনমনে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া হুথিদের আরও হামলায় উৎসাহিত করতে পারে। সৌদি আরবের কাছ থেকে বাড়তি রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় আদায় করাও তাদের লক্ষ্য হতে পারে।

তবে হামলার প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুর পেছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে হুথিদের সামরিক পদক্ষেপ, তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

সংঘাতের প্রভাব ছড়াতে পারে বিশ্ব অর্থনীতিতে

সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো বা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়তে পারে।

বিশেষ করে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হলে জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জ্বালানির দাম এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি আরবের জন্য সংকটটি আরো জটিল, কারণ দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা সেই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আয়োজন চলার মধ্যেই হামলাগুলো ঘটেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব আয়োজন চালু রেখে স্বাভাবিক পরিস্থিতির বার্তা দিতে চাইলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কিছু জ্যেষ্ঠ ব্যবসায়ী সরাসরি অংশ নেননি বা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছেন।

ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান, বাড়ছে প্রাণহানি

সৌদি আরবের ওপর হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত তীব্র হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এবং আশপাশের এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সৌদি বিমানবাহিনী হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালিয়েছে। রোববারের সংঘর্ষে উভয় পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

তাইজের গভর্নর নাবিল শামসান শহরটিতে হুথিদের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। ওষুধের সংকটের কারণে জরুরি অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যা সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। হুথিদের দাবি, রোববার সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে ১২৪টি হামলা চালিয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অন্যদিকে সৌদি আরব হুথিদের সর্বোচ্চ নেতা আবদুল মালিক আল-হুতিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। তার অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ গোয়েন্দা তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

সংঘাতের বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সৌদি আরবের পক্ষে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনার কথা বলেছেন।

এর জবাবে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে অংশ নিলে ওয়াশিংটনকে দ্রুত ও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত ব্যক্তিদেরও এসব এলাকা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গোষ্ঠীটি এসব স্থাপনাকে তাদের হামলার বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে বলে দাবি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সংঘাতটি ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। তবে ওয়াশিংটন কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য নেই।

মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ইরান

সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগও চলছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে কথা বলেছেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে তেহরান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে গোষ্ঠীটির সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগকে সম্ভাব্য সমঝোতার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য আল-বুখাইতির দাবি, সৌদি আরব ইরানের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছিল এবং প্রথমে এক মাস, পরে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে হুথিরা উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আল-বুখাইতির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাত আগের লড়াইগুলোর মতো নয় এবং পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার দাবি, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে রিয়াদ ও সানার মধ্যে বিস্তৃত সমঝোতা প্রয়োজন। অন্যথায় সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ক্ষয়ক্ষতি তত বাড়বে। এদিকে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে হুথিদের বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের শক্তিগুলোও সক্রিয় হচ্ছে

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) নির্বাসিত নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি দক্ষিণাঞ্চলের বাহিনীগুলোকে শুধু সাবেক দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমান্ত রক্ষায় নয়, বরং সব ফ্রন্টে লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরো দেশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে আনার পর তার এই বক্তব্য এসেছে। সৌদি আরবও ওই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে।

এসটিসি এমন একটি স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন প্রতিষ্ঠার পক্ষে, যা ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান পৃথক রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সমতুল্য হবে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর ইয়েমেন একীভূত হলেও সম্পদ বণ্টন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়ে গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যেও কর্তৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। ফলে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হলেও ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা, ইয়েমেনে পাল্টা সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে হুথিদের হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। একদিকে রিয়াদকে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হচ্ছে। কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল না হলে সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন আরো বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৌদি-হুথি সমঝোতায় মধ্যস্থতা করছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র জড়ালে পাল্টা আঘাতের হুমকি

যেভাবে সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে হামলা চালায় হুতিরা

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কীভাবে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে রিয়াদে পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলাটি প্রতিহত করতে না পারার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। ওই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা।

সোমবার ওই কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রথমে ঝাঁকে ঝাকে ড্রোন ছোড়ে হুতিরা। এর মাধ্যমে রিয়াদের দিকে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর পথ তৈরি করা হয়। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা এসব তথ্য জানান, কারণ প্রকাশ্যে মন্তব্য করার অনুমতি তাদের নেই।

হুতিদের কাছে এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্রব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সৌদি আরবের ব্যবহৃত প্যাট্রিয়টসহ বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সেগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এক কর্মকর্তা জানান, হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা কেন দেওয়া যায়নি, সেটিও তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য। হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ৬২০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছিল বলে জানান তিনি।

এদিকে ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়লে দ্রুত ও বেদনাদায়ক জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হামলায় অংশ নিলে তাদের এবং অঞ্চলটিতে থাকা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখাইতি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা দীর্ঘ আলোচনা করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও বেদনাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’

একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি। বুখাইতি বলেন, ‘এসব স্থাপনা এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’

সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুখাইতি বলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বার্তা দেওয়া যে তিনি আর নিরাপদ অবস্থানে থেকে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে পারবেন না।

সূত্র : সিবিএস নিউজ
সৌদির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা। ছবি: এএফপি
সৌদির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা। ছবি: এএফপি

Monday, October 12, 2026

সৌদি-হুতি সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের, কূটনীতির আহ্বান

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংলাপ শুরুর উদ্যোগে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।

সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সময় রোববার (১১ অক্টোবর) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি বলেন, রাজনৈতিক সমাধানের পথ উপেক্ষা করে সামরিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলোর সামরিক কোনো সমাধান নেই।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ শুরু এবং রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ইরান প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

এর আগে রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইয়েমেন নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা পুনর্বিবেচনার কথা বলেন। ইরানের ওপর আবার হামলা চালানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আবার হামলা চালানো হবে না। নতুন বক্তব্যে সেই অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেখা গেছে।

দীর্ঘদিনের মতবিরোধ সত্ত্বেও ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু রয়েছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়। এর আগে সাত বছর ধরে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন ছিল।

তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর তেহরানের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ওই যুদ্ধের পর ইরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের তেলক্ষেত্রও এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

গত মার্চে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলার বিষয়টি আর অনির্দিষ্টকাল সহ্য করা হবে না। তিনি তেহরানকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সূত্র: আলজাজিরা

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: মেহর নিউজ এজেন্সি
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ছবি: মেহর নিউজ এজেন্সি

যুবরাজের একের পর এক ভুল হিসাব—সৌদি আরব কীভাবে নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল

সিএনএনঃ ইয়েমেনে সৌদি আরবের নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একের পর এক ভুল হিসাব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোট ভাঙন, হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত ভূমিকা রিয়াদকে আরও বিপাকে ফেলেছে। কমবেশি সামরিক সাফল্য এলেও সৌদির বিভক্ত মিত্রবাহিনী ও রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে এ সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর দেশকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, পর্যটন ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষায় এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন থেকে ইরান–সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র।

এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানছে। ফলে যুবরাজ যে আঞ্চলিক অশান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চেয়েছিলেন, এখন বাধ্য হয়ে সেই সংঘাতের গভীরেই জড়িয়ে পড়ছে তাঁর দেশ।

গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থা ভেঙে চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গত মাসে তা তীব্র রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি ও কূটনীতি—উভয়টির মাধ্যমে তাদের দক্ষিণ সীমান্তের এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে আসছিল। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রিয়াদ প্রথমে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালায় এবং হুতিদের মূল পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত সব প্রচেষ্টার পরও ধারাবাহিকভাবে কিছু ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে রিয়াদ ইয়েমেনের এ নতুন সংঘাতের মুখে নিজেদের অরক্ষিত করে ফেলেছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার জের ধরে গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটায়। এ ছাড়া সংকটের সময় পাশে পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতেও রিয়াদ ভুল করেছে। আবার ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সৌদি আরবকে।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এখন ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া এ সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।

এক দশকের বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের সৌদি আরবকে বদলে দেওয়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে সৌদির তেল অবকাঠামোয় বহুমুখী হামলার কারণে তেল রপ্তানি কমে যাচ্ছে, বড় বড় প্রকল্প বাতিল করতে হচ্ছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট পথ ছাড়াই দেশটি একটি যুদ্ধের দিকে টানাহেঁচড়ার শিকার হচ্ছে। ফলে যুবরাজের সেই পরিকল্পনাগুলো এখন আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে হুতি বাহিনীর হামলায় একজন সৌদি পাইলটসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে দেশটিতে এ বছর তারকাবহুল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অক্টোবরের শেষে সৌদির ফ্ল্যাগশিপ আর্থিক সম্মেলন (মরুভূমির দাভোস নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক এ হামলার কারণে সম্মেলনটি এখন চরম চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরবের শুধু এতটুকুই দরকার ছিল, যেন ইয়েমেন সংঘাত তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে এবং হুতিরা যেন তাদের (সৌদি আরব) রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকস্মিক বিদায়

গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানের একটি চালানের ওপর সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান হামলা চালালে দুই দেশের এক দশকের পুরোনো জোটে ফাটল ধরে। ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব রুখতে এ দুই দেশ একসঙ্গে লড়ছিল। তবে ওই ঘটনার পর আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে সৌদি আরব ইয়েমেন সংকটে একেবারে একা হয়ে পড়ে।

ইউএইর সঙ্গে এ সম্পর্কচ্ছেদ পুরো অঞ্চলকে চমকে দিয়েছিল।

সৌদি আরব তখন এ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এক বিরল গণমাধ্যম যুদ্ধ শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সৌদির বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যে ইউএইকে এমন এক ছোট ভাই হিসেবে চিত্রায়িত করতে থাকেন, যে কিনা বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক দাউদ আল-শিরিয়ান লিখেছিলেন, সৌদি আরব হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যার ওপর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যদি (সৌদি আরব) হোঁচট খায়, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে ও উপসাগরীয় অঞ্চল ছিটকে যাবে।’

রিয়াদ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য চাপ দিচ্ছিল, তখন ইয়েমেনের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। হুতিদের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। তার ওপর রিয়াদের দাবিতে ইউএইর দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের ফলে এক চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ, ইয়েমেনে যে হাজার হাজার যোদ্ধা এক দশক ধরে আবুধাবির অধীনে লড়াই করছিলেন, তাঁরা সৌদির নতুন কৌশল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

আরব আমিরাতের মিত্র যোদ্ধাদের দাবি, আবুধাবির চলে যাওয়ার ফলে ইয়েমেন যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সৌদিরা তা পূরণ করতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমিরাতিরা (ইউএইর সেনা) যখন চলে যায়, তখন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি। এরপর পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। আমিরাতের সেনা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দক্ষ, সৌদিরা সেই দক্ষতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।’

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে লড়াইরত বাহিনীগুলো পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছিল কি না ও দায়িত্ব হস্তান্তর ঠিকঠাক হয়েছিল কি না, তা জানতে সিএনএন সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রস্তুতির ঘাটতি

ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র ইসরায়েল, যা এ অঞ্চলে নজিরবিহীন অশান্তি ডেকে এনেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে সৌদি আরবসহ মার্কিন মিত্ররা সরাসরি ইরানের নিশানায় পরিণত হয়।

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মত, সৌদির জন্য ওই সময়টা ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ইয়েমেনে ইউএইর মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপ সামলানোর পরপরই সৌদি আরবকে এ আঞ্চলিক যুদ্ধের (ইরান যুদ্ধ) মুখোমুখি হতে হয়। বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করলেও, ইরানের ওপর ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের ফলে ইরানপন্থী হুতিরা যে সৌদির ওপর চড়াও হবে, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনি বলেন, নিজের ভূখণ্ডে শত্রু বাহিনীর হামলার পর সৌদিদের পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না...তাই এখানে একটি প্রতিক্রিয়া হওয়াটা অবধারিত ছিল।’

পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদিতে আঘাত হানলেও, রিয়াদের পুরো মনোযোগ ছিল দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্তে। হুতিরা তখনো সৌদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে থাকায় প্রথমে তাদের ইরানি মিত্রদের সাহায্য করতে অনিচ্ছুক বলেই মনে হচ্ছিল। তবে তেহরান সৌদিদের এ যুদ্ধে (হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে) টেনে আনে।

গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদির বিমান অবরোধ অমান্য করে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় নিয়ে আসার জন্য একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠায় ইরান। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় রিয়াদ। এর জবাবে বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় ও সৌদির জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে এক ঝটিকা অভিযান শুরু করে। নিয়ন্ত্রণে নেয় গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত এ অঞ্চলের। ২০২২ সালের পর এটিই ছিল ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা।

হুতিরা সৌদির তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালালে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বেশ কিছু ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’ রিয়াদ হুতিদের এমন আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আহমেদ নাগি আরও বলেন, ‘(ইয়েমেনে) যেসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, তার ফলে মিত্রদের মনোবল ভেঙে গেছে। এটি এখন সৌদিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, হুতিদের কাছে এখন আরও উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদির বেশ কয়েকটি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।’

‘অনিশ্চিত’ ট্রাম্পের ওপর ভরসা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল হিসাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন ও হুতিদের ওপর হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা। হুতিরাও এটি স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের লড়াই শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ফলে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে চলাচলের সুযোগ পায়।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত।

র‍্যাটনি আরও বলেন, ‘নিজেদের শক্তিতে একা একা এ যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না। সাধারণ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে এমন পরিস্থিতি হলে, আমরা একটি যৌক্তিক ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের অংশীদারকে (সৌদি আরব) সাহায্য করতাম।’

র‍্যাটনি বলেন, ‘এখন আমাদের সেই প্রক্রিয়া নেই এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ের ওপরই এসে ঠেকেছে, তা হলো ট্রাম্প কী ভাবছেন? আর এর ফলেই সৌদি আরব সম্ভবত নিজেদের অরক্ষিত বোধ করছে।’

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অন্যদিকে নজর দিয়েছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে দেখা করতে কায়রো যান। এর কয়েক সপ্তাহ পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্স তাদের সামরিক কর্মীসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েনে রাজি হয়েছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠাবে তারা। এ ছাড়া নবগঠিত যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য বর্তমানে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদিতে কাজ করছেন।

রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকের পর গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীন ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে’ সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে করা এ চুক্তির উদ্দেশ্য, এ তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া ইউএইর অনুগত ইয়েমেনি বাহিনীও হুতিবিরোধী এ অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা সৌদি ও ইউএইর মধ্যকার সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলার আভাস দিচ্ছে।

আঞ্চলিক সমাধান জরুরি

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের দেশের সমর্থন এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের প্রাথমিক সাফল্য চলতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না। বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো খুবই সাধারণ বিষয় এবং যুদ্ধের (সৌদি–হুতি লড়াই) কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিণতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে হলে সুশৃঙ্খল সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, তহবিল ও লজিস্টিকস বা রসদ সহায়তার প্রয়োজন, যা বর্তমান সৌদি জোট ধরে রাখতে পারবে কি না, এখনো নিশ্চিত নয়।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে বলেন, ‘তাদের কমান্ড সেন্টারগুলো একীভূত করতে হবে এবং এ জোটের ভেতরের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি (হুতিদের কাছ থেকে) মুক্ত করা অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তবে এ ভূখণ্ডগত অর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।’

অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য মনে করেন, ইয়েমেনের এ লড়াই মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। আর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এ সংঘাত যত দিন চলবে, তত দিন সৌদি আরবকে বিপর্যস্ত রাখতে হুতিদের উসকে দেওয়ার শক্তিশালী কারণ ইরানের থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে অথবা হুতি নেতৃত্বকে নির্মূল করতে তাদের সামরিক হামলা আরও জোরদার করতে পারে।

তবে র‍্যাটনি বলেন, ‘এ দুটি পরিস্থিতির কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করবে না। সৌদি আরবকে শুধু একটি ত্রুটিপূর্ণ পথ ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।’

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্

সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক যোদ্ধা গাড়িতে বসানো অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রাভিযানের সময় গত সোমবার ধারণ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থির চিত্র এটি। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের ধুবাবের কাছে
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক যোদ্ধা গাড়িতে বসানো অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রাভিযানের সময় গত সোমবার ধারণ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থির চিত্র এটি। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের ধুবাবের কাছে। ছবি: রয়টার্স

Sunday, October 11, 2026

একের পর এক ভুলে ইয়েমেন যুদ্ধে আবার জড়াল সৌদি আরব

সিএনএনের বিশ্লেষণঃ বহু বছর ধরে ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও আবারও দেশটির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি আরব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে বিরোধ, হুতিদের হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা; একের পর এক ভুলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের লক্ষ্য, দেশটিকে পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় সেই পরিকল্পনা আবারও ঝুঁকিতে পড়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে কয়েকটি বড় প্রকল্প বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি কনসার্ট, চলচ্চিত্র উৎসব ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানও স্থগিত করা হয়েছে। শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততা ১১ বছরের। শুরুতে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও পরে তাদের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে রিয়াদ। বিদ্রোহীদের সমর্থক ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে দেশটি। কিন্তু এখন আবারও সংঘাতের কেন্দ্রে চলে এসেছে সৌদি আরব।

সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি সিএনএনকে বলেন, নিজেদের রূপান্তর পরিকল্পনায় মনোযোগ দিতে ইয়েমেনের সংঘাতকে সীমান্ত থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চেয়েছিল রিয়াদ।

তিনি বলেন, ‘হুতিরা যাতে তাদের রূপান্তর পরিকল্পনায় বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সে জন্য সংঘাতকে যতটা সম্ভব নিজেদের থেকে দূরে রাখাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এখন তারা নিজেরাই সংঘাতের মাঝখানে পড়ে গেছে।’

ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছে সৌদি আরব ও ইউএই। কিন্তু দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের পরিকল্পনায় মতবিরোধ দেখা দেয়। ইউএই সমর্থন দেয় সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি), যারা দক্ষিণ ইয়েমেনকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সৌদি আরব এর বিরোধিতা করে।

গত বছর ইউএইর পাঠানো সামরিক যানবাহী একটি চালানে সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা চালানোর পর বিরোধ আরও তীব্র হয়। ওই যানগুলো এসটিসির জন্য পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইয়েমেন নিয়ে দুই দেশের অংশীদারত্বের অবসান ঘটে। নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে নেয় ইউএই, ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব অনেকটাই সৌদি আরবের ওপর পড়ে।

দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমিরাতিরা চলে যাওয়ার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না।’ তার মতে, নিজেদের বাহিনী পরিচালনায় ইউএইর সুসংগঠিত ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু সৌদি আরব সেই ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।

ইয়েমেনে হুতিদের নতুন করে হামলা শুরু হলে সৌদি আরবের সংকট আরও বাড়ে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এর আগে সৌদি আরবে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিল হুতিরা। তবে জুলাইয়ে ইরান হুতি নেতাদের বহনকারী একটি বিমান খামেনির জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে পাঠালে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। বিমানটি ইয়েমেনে আকাশপথে চলাচল নিয়ে সৌদি আরবের আরোপিত বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করেছিল।

এরপর বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন সানার বিমানবন্দরে হামলা চালায় সৌদি আরব।

জবাবে সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি প্রত্যাহার করে দেশটির জাহাজ চলাচলে অবরোধ ঘোষণার কথা জানায় হুতিরা। পরে ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় নতুন অভিযান চালিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা দখল করে তারা। আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

এরপর সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা চালায় হুতিরা। জবাবে সৌদি আরব শত শত বিমান হামলা চালায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদিরা বেশ কিছু ভুল করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। হুতিদের অভিযানের জন্য রিয়াদ প্রস্তুত ছিল না। ইউএইর কাছ থেকে পাওয়া মিত্র ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর সঙ্গে সমন্বয়েরও ঘাটতি ছিল।’

সৌদি আরবের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা।

গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি করে রিয়াদ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে ন্যাটোর বাইরের প্রধান মিত্রের মর্যাদা দেয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তায় মার্কিন সহায়তা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছে সৌদি নেতৃত্ব।

সিএনএনের উদ্ধৃত সূত্রগুলোর দাবি, গত মাসে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুই দফা কথা বলেন। তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাতে রাজি হননি। এর পরিবর্তে নিজেদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি সুরক্ষিত রাখতে ওমানে হুতিদের সঙ্গে আলোচনা করে ওয়াশিংটন।

হুতিরা জানায়, তাদের লড়াই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয় তারা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। গত মাসে মিসরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন যুবরাজ মোহাম্মদ। পরে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান তিনি।

ফ্রান্স সামরিক সদস্যসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠাতে সম্মত হয়েছে। সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি উড়োজাহাজ পাঠানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টাও সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।

রিয়াদে জরুরি বৈঠকের পর মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমেইসি সিএনএনকে বলেন, বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং নিজেদের বিরোধ মেটাতে হবে।

তিনি বলেন, ‘তাদের কমান্ড সেন্টারগুলোকে একীভূত করতে হবে এবং গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশের মধ্যকার সমস্যার সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি দখল করা এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে সেসব এলাকা দখলের কোনো মূল্য থাকবে না।’

সূত্র : সিএনএন

সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি : রয়টার্স
সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি : রয়টার্স

যে কারণে সৌদির বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করছে হুতিরা

সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দায় এখনো স্বীকার করেনি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সামরিক মুখপাত্র। তবে সৌদির বিমানবন্দরগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে বলে আগেই জানিয়েছিল গোষ্ঠীটি। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। খবর আল জাজিরার।

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার না করতে বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের সতর্ক করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত হওয়ার পর রোববার এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

হুতিদের মতে, তাদের ‘অবরোধের বদলে অবরোধ’ এবং ‘বিমানবন্দরের বদলে বিমানবন্দর’ নীতির অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। গোষ্ঠীটির দাবি, ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি বিমান হামলার জবাব দিতেই তারা এ কৌশল নিয়েছে।

প্রতিশোধের অংশ হিসেবে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে হুতিরা। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির তেল স্থাপনা আরামকো এবং রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দর, যা সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান বিমান চলাচলকেন্দ্র।

সৌদি আরব পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেও ইয়েমেনে দেশটির চালানো একাধিক বিমান হামলার কথা উল্লেখ করেছে হুতি গোষ্ঠী। তাদের বক্তব্য, এসব হামলার পরও সৌদি আরবের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সক্ষমতা ধরে রেখেছে তারা।

এদিকে সৌদি আরবের রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার পর ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি না, তা শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শনিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতে পারি। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। হামলার খবর আমরা মাত্রই জেনেছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিই।’

সূত্র : আল জাজিরা

হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

হুথিদের অবরোধে ধুঁকছে তাইজের হাসপাতাল, মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা

আল-জাজিরাঃ ইয়েমেনের তাইজ শহর অবরোধ করে রেখেছে হুথিরা। এতে হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, চিকিৎসাসামগ্রী ও জ্বালানির মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, ডায়ালাইসিস ও নবজাতকের সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি চলতে থাকলে শহরটিতে ‘আসন্ন স্বাস্থ্য ও মানবিক বিপর্যয়’ দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।

দেশটির জনস্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, তাইজের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ওষুধ, শিরায় দেওয়ার তরল, চিকিৎসাসামগ্রী ও জ্বালানির মজুত প্রায় শেষ। এতে রোগী, আহত ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও নবজাতকের জীবন তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

জ্বালানির অভাবে হাসপাতালের বিদ্যুৎ জেনারেটর, অ্যাম্বুলেন্স এবং ওষুধ ও টিকা সংরক্ষণের শীতলীকরণব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এড়ানো সম্ভব এমন মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়বে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

অবিলম্বে অবরোধ তুলে নেওয়া, সরবরাহের পথ খুলে দেওয়া এবং রোগী, অ্যাম্বুলেন্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও ত্রাণকর্মীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইয়েমেন সরকার। জাতিসংঘ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর প্রতি তাইজের হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, অক্সিজেন, চিকিৎসাসামগ্রী ও জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি বিলম্বে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ছে।

অবরোধে বিচ্ছিন্ন তাইজ

ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত। ২০১৪ সালে তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে।

২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাইজে হুথিদের অবরোধে শহরের কেন্দ্রস্থলের একটি এলাকায় ইয়েমেন সরকারের বাহিনী আটকা পড়েছিল। ২০১৬ সালে অবরোধের প্রধান অংশ ভাঙা সম্ভব হলেও অন্য প্রবেশপথগুলোতে আংশিক অবরোধ বজায় রাখে হুথিরা।

২০২৪ সালে পূর্ব দিকের একটি সড়ক খুলে দিতে সম্মত হয়েছিল তারা। তবে নতুন করে লড়াই শুরু হলে সড়কটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। চলতি অক্টোবরের শুরুতে তাইজে নতুন করে অবরোধ জোরালো হয়।

গত সেপ্টেম্বরে তাইজ প্রদেশের লোহিত সাগর উপকূল ধরে অভিযান শুরু করে হুথিরা। তারা বন্দরনগরী মোখা দখল করে। ৪ অক্টোবরের মধ্যে আত তুরবাহ শহরও তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে তাইজ শহরের সঙ্গে সরকার-নিয়ন্ত্রিত অন্য এলাকাগুলোর সংযোগকারী সর্বশেষ প্রধান সড়কটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এর জবাবে অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে।

পেট্রলের দাম তিন গুণ

তাইজ প্রদেশে ইয়েমেন সরকারের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের মহাপরিচালক নাবিল জামিল আল-জাজিরাকে বলেন, ২০১৫ সালের অবরোধের তুলনায় এবারের অবরোধ আরো ব্যাপক এবং এর প্রভাবও বেশি গুরুতর।

জামিলের হিসাবে, প্রদেশটির সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ বসবাস করেন। সাম্প্রতিক সময়ে আরো প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

অবরোধের কারণে জ্বালানির সংকট তীব্র হয়েছে। কালোবাজারে ২০ লিটার পেট্রলের দাম ৩০ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল (১৯ ডলার) থেকে বেড়ে ৯০ হাজার রিয়ালে (৫৮ ডলার) দাঁড়িয়েছে।

জামিল বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো সাড়া বা মাঠপর্যায়ে হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় আছি।’

এদিকে লড়াইয়ে ইয়েমেনের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরো বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

জাস্টিস ফর রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রধান ও আইনজীবী নাবিল শারিয়ান বলেন, ‘কোনো সংঘাতে বেসামরিক মানুষকে কখনোই চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।’

হুথিদের অবরোধে ধুঁকছে তাইজের হাসপাতাল, মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাইজের একটি বাজার। ৮ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক এবং দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন।

শনিবার এক বিবৃতিতে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আল জাজিরার। বিবৃতি অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন একজন মার্কিন, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানীয়, একজন সিরীয়, একজন ফিলিস্তিনি ও একজন সুদানি নাগরিক। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর উপসাগরীয় কোনো আরব দেশে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। এ কারণে সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথিদের ধারাবাহিক হামলা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনায় বড় আঘাত হেনেছে। রিয়াদকে বৈশ্বিক ভ্রমণ ও ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করতে চান তিনি।

এসব হামলায় আগামী কয়েক সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হুথিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তার দাবি, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

আল-বুখাইতি বলেন, হুতিরা এই হামলা চালিয়েছে ‘যেন বিশ্ব বুঝতে পারে ইয়েমেনের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিয়ের অনুষ্ঠান ও শোকসভার হল, হাসপাতাল এবং বাজার বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো বা ক্ষতি করা উচিত নয়। ইয়েমেনের এসব স্থাপনার ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য, বিশ্বের অন্য কোথাও একই ধরনের স্থাপনার ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম প্রযোজ্য হতে হবে।’

হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর একজন প্রতিবেদক বিমানবন্দরের দিকে অন্তত ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স যেতে দেখেছেন। এ সময় পুলিশ বিমানবন্দরে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

Saturday, October 10, 2026

ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে সতর্ক করলেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত

ইয়েমেনে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ পরিস্থিতি ফিরে এসেছে বলে সতর্ক করেছেন দেশটিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ। হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনীর মধ্যে লড়াই অব্যাহত থাকায় সংঘাত বন্ধে দ্রুত রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সংলাপ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে গ্রুন্ডবার্গ সেসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান সহিংসতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে বেসামরিক মানুষকে। এর মধ্যে নারী ও শিশুরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা ইয়েমেনের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। একইভাবে ইয়েমেনের ঘটনাপ্রবাহও পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলছে।

গ্রুন্ডবার্গ আরও বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ইয়েমেন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশটির বাস্তব পরিস্থিতি এবং জনগণের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

যুদ্ধকে ইয়েমেনের স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হতে না দিতে এখনই রাজনৈতিক সমাধানের কৌশল নিয়ে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত।

তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য সংঘাতের অবসানের বিকল্প হতে পারে না। সংকটের স্থায়ী সমাধানে শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতেই হবে। এ জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে মধ্যস্থতার উদ্যোগে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৩০ জনের বেশি। হতাহতদের মধ্যে শিশুরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা ইয়েমেনের সংঘাতে হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধি দেশটিতে রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

সূত্র: আল জাজিরা

ইয়েমেনের মানচিত্র। ছবি: আল জাজিরা
ইয়েমেনের মানচিত্র। ছবি: আল জাজিরা

এডেন বিমানবন্দরে হামলা, জাতিসংঘের পদক্ষেপ চায় ইয়েমেন

ইয়েমেনের এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার নিন্দা জানাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। একই সঙ্গে হুথিদের ওপর আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে তারা।

শনিবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইয়েমেনের জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আল-সাদি জানান, গত ৭ অক্টোবর এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়। ওই সময় একটি বেসামরিক বিমান বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে আসছিল।

ইয়েমেন সরকারের দাবি, এ হামলায় বিমানের যাত্রী, বিমানবন্দরের কর্মী এবং উড়োজাহাজের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। বেসামরিক বিমান চলাচলকে লক্ষ্য করে এমন হামলা সংঘাতের ক্ষেত্রে গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিতে হুথিদের কাছে অস্ত্র, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা পৌঁছানো বন্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারের মতে, হুথিদের ওপর আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ সীমিত করা সম্ভব হবে। এ জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সক্রিয় ভূমিকা চেয়েছে সরকারটি।

সূত্র: আল জাজিরা

ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনের বিমানবন্দর। ছবি: এএফপি
ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনের বিমানবন্দর। ছবি: এএফপি

৩৩০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল: রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা পাইলটসহ নিহত ৩

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দেশটির রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি উড়োজাহাজে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন পাইলটও রয়েছেন। সবাই সৌদির নাগরিক। এছাড়া আহত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন নাগরিক।

গত বৃহস্পতিবার জোড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিমানবন্দরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নিরাপত্তার কারণে ৩৩০টির বেশি ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। তবে বাতিলের এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, রিয়াদ বিমানবন্দর ছাড়াও ইয়েমেন সীমান্তবর্তী নাজরান শহরের একটি বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ হামলার জন্য দায়ীদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি বিমানবন্দরের স্থাপনায় আঘাত হানে। দ্বিতীয়টি আঘাত করে বিমানবন্দরে মাটিতে থাকা সৌদিয়ার একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে। হামলার সময় বিমানটিতে কোনো যাত্রী ছিলেন না। আগুনে উড়োজাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জরুরি সেবাদানকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে নেয়।

ফ্লাইট চলাচলে বিপর্যয়: হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত আগমন ও প্রস্থানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়। অনেক ফ্লাইটের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়।

নিরাপত্তার উদ্বেগে ভারতের কয়েকটি বিমান সংস্থা এবং জার্মানির লুফথানসা রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করে। সৌদি জানিয়েছে, জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে।

সৌদি-হুতি সংঘাতের শুরু: সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট ও গৃহযুদ্ধ থেকে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। পরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে হাদি দেশ ছেড়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

হাদির সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।

এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। ২০১৫ সালের মে মাসে ইয়েমেন থেকে সৌদি শহর নাজরানে মর্টার হামলায় তিনজন নিহত হন। এরপর সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।

যুদ্ধবিরতির পর আবার উত্তেজনা: ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইয়েমেনে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষ কিছুটা কমলেও সংকটের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। হুতিরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও তাদের সমর্থক বাহিনী দেশের বিভিন্ন অংশে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি: ইয়েমেনের সংঘাত শুধু সৌদি আরব ও দেশটির প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির পশ্চিম উপকূলের কাছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ।

এ অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচল, পণ্য পরিবহন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা পাইলটসহ নিহত ৩
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা পাইলটসহ নিহত ৩

Friday, October 9, 2026

সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে না তুরস্ক

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় ইয়েমেনে হামলা চালানোর জন্য সৌদি আরবে সেনা পাঠাবে না আঙ্কারা। বৃহস্পতিবার আঙ্কারায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

ফিদান বলেন, ‘এটি কোনো আক্রমণাত্মক চুক্তি নয়। অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে তুরস্ক সেখানে সেনা পাঠাবে না।’ সৌদি আরবে তুরস্কের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের বিষয়টি কেবল প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলেও জানান তিনি।

ইয়েমেন থেকে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং দেশটির নিরাপত্তা জোরদার করতে চলতি সপ্তাহে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান যৌথভাবে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের বিষয়ে সম্মত হয়।

ফিদান জানান, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষার জন্য কী ধরনের সামরিক সহায়তা প্রয়োজন, তা মূল্যায়ন করতে তিন দেশের সামরিক প্রতিনিধিরা কাজ করবেন। এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে তুরস্ক ও পাকিস্তান কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে, তা নির্ধারণ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘মক্কা চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এটি পার্লামেন্টে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের নিজস্ব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন।’

মঙ্গলবার মিডল ইস্ট আই জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় অতিরিক্ত জনবল, পাইলট ও উড়োজাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে তুরস্ক। তবে আরো সেনা মোতায়েনের বিষয়টি পার্লামেন্টের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর থেকেই সৌদি আরবে কারিগরি দল, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন রেখেছে তুরস্ক। জ্বালানি স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমইইকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, জরুরি সাড়াদানকারী দল এবং তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় লড়াইয়ে সক্ষম সেনাসদস্য পাঠানো হবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ২০১০ সালে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সামরিক প্রশিক্ষণ চুক্তির আওতায় কারিগরি কাজে সীমিতসংখ্যক সেনা সৌদি আরবে পাঠাতে পারে আঙ্কারা। তবে এর বাইরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের জন্য তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।

আরেক তুর্কি কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সহায়তা দিতে দেশটির এক বা একাধিক সামরিক কমান্ড ঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কেবল প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকবে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তুরস্কের পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলে সীমিতসংখ্যক বিশেষ বাহিনীর সদস্যও সৌদি আরবে মোতায়েন করা হতে পারে। চলতি মাসের শেষের দিকে এ অনুমোদন পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পৃথক সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, পার্লামেন্টের অনুমোদনের পর সৌদি আরবে অভিজ্ঞ পাইলট ও উড়োজাহাজ পাঠাবে তুরস্ক। তবে উড়োজাহাজ ও জনবলের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ছোড়া ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় এসব সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে।

তুরস্কের জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছি না। ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপেরও কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।’

তিনি আরো বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সফল হতে পারে বলে এখনো মনে করে আঙ্কারা।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

সৌদির হয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাবে না তুরস্ক
ছবি: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

সংঘাত বাড়ায় রিয়াদে বিস্ফোরণের শব্দ, ফ্লাইটে বিঘ্ন

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলা আরও জোরালো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিকট শব্দ শোনা যায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। নিরাপত্তার কারণে কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

হুতিরা দাবি করেছে, রিয়াদ বিমানবন্দর লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের আকাশপথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তারা। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার পর দুই পক্ষের সংঘাত আরও বেড়েছে।

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণে বিলম্ব হয়। রাজধানীর কিং আবদুল্লাহ ফাইন্যান্সিয়াল ডিস্ট্রিক্টের কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বাড়ি থেকে কাজ করতে বলে।

কিছু কূটনীতিকও নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। রিয়াদের কয়েকটি স্কুল অভিভাবকদের সন্তানদের নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব সতর্কতার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেয়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আবহা বিমানবন্দরে হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। তবে হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ইয়েমেনে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর সংঘাত তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলের বেশ কিছু এলাকা দখলে নিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাব আল মান্দাব প্রণালির কাছেও তাদের অবস্থান শক্ত হয়েছে।

হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। তবে সংঘাতের বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিরাও অগ্রগতি করেছে। তারা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজকে ঘিরে ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এদিকে সৌদি আরবকে সহায়তায় তুরস্ক ও পাকিস্তান এগিয়ে এসেছে। তুরস্ক প্রতিরক্ষামূলক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি সীমান্ত রক্ষায় সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি ইয়েমেনে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে বলে সূত্রের বরাতে জানা গেছে।

সিরিয়াও সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে। তবে দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিজেদের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতিও আরও খারাপ হয়েছে। যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর প্রায় দুই লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

ইয়েমেনের তাইজে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অভিযান। ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনের তাইজে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর অভিযান। ছবি: রয়টার্স

Thursday, October 8, 2026

সৌদির দুই বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ৩, আহত ৩৬

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই সৌদি আরবের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৃথক হামলায় তিনজন নিহত ও ৩৬ জন আহত হয়েছেন।

বুধবার (৭ অক্টোবর) দেশটির জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিএসিএ) এ তথ্য জানিয়েছে।

জিএসিএ জানায়, মঙ্গলবার ও বুধবার পৃথক সময়ে দুই বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা ঘটে। আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় মরক্কো ও আলজেরিয়ার দুই নাগরিক নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৮ জন। আহতদের মধ্যে দুজন সৌদি নাগরিক এবং বাংলাদেশি ও ফিলিপাইনের নাগরিকও রয়েছেন। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

অন্যদিকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় সুদানের এক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও আটজন আহত হন। আহতদের মধ্যে পাঁচজন সৌদি, দুজন মিশরীয় এবং একজন পাকিস্তানি নাগরিক রয়েছেন।
সৌদির দুই বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ৩, আহত ৩৬
গাজায় গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি: জাতিসংঘের বিশেষ দূত

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলা দুটিতে বিমানবন্দর দুটির অবকাঠামো ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নেওয়া হয়। যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দুই বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, ড্রোন দিয়ে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছে।

ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে এই হামলার ঘটনা ঘটল।

সূত্র: আনাদোলু

সৌদি আরবের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পুরোনো ছবি
সৌদি আরবের আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পুরোনো ছবি

Monday, October 5, 2026

হুতিদের লক্ষ্য করে ১১২২ অবস্থানে হামলার দাবি ইয়েমেনি বাহিনীর

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সশস্ত্র বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ১ হাজার ১২২টি হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। এসব হামলায় হুতিদের ১ হাজার ৭৪৭ সদস্য নিহত বা অক্ষম হয়েছেন বলেও জানিয়েছে তারা।

সোমবার ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু হওয়া ‘মুক্তির যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে এসব অভিযান চালানো হচ্ছে।

আল-নুজাইলির ভাষ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের সাদা, আল-জাওফ ও তাইজসহ বিভিন্ন এলাকায় এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলজুড়ে এসব হামলা চালানো হয়েছে।

হামলায় হুতিদের কামান ও রকেট নিক্ষেপের অবস্থান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সরবরাহ ও চলাচলের পথ, রসদ পৌঁছানোর পথ, সেনাদের অবস্থান এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করা হয়েছে।

অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট লঞ্চার ও স্নাইপার ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ইয়েমেনি বাহিনী আরও দাবি করেছে, এসব অভিযানে সামরিক পরিবহন ও সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত যানসহ ৩৬৪টি যান ও সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর আগে রোববার ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি হুতিদের নিয়ন্ত্রিত বাকি এলাকাগুলো পুনর্দখলে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, এ অভিযান সানা, সাদা বা দেশের অন্য কোনো প্রদেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়।

সূত্র: শাফাক নিউজ

ছবি: শাফাক নিউজ থেকে নেওয়া
ছবি: শাফাক নিউজ থেকে নেওয়া

Sunday, October 4, 2026

হুথিদের হামলায় পুড়ছে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনা

আল-জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সিঃ ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে তারা। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোট এই দাবি ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

শনিবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, রিয়াদে আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে চালানো অভিযান ‘সফলভাবে লক্ষ্য অর্জন করেছে’। হামলার পর লক্ষ্যবস্তু এলাকায় আগুন লাগার কথাও দাবি করেন তিনি।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও অন্যান্য প্রদেশে সৌদি হামলার জবাবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সানা ও অন্যান্য প্রদেশে ৬০টি বিমান হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন ইয়াহিয়া সারি।

তার দাবি, এসব হামলা নিয়ে মোট হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৪২০-এ দাঁড়িয়েছে।

হুথি মুখপাত্র আরো বলেন, ‘অবরোধের জবাব অবরোধ দিয়ে, উত্তেজনার জবাব উত্তেজনা দিয়ে’ দেওয়া হবে।

তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি হুথিদের দাবি নাকচ করেছেন। সৌদি গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শনিবার রিয়াদে হামলার বিষয়ে হুথিদের দাবি ‘বিভ্রান্তিকর’।

আল-মালিকির ভাষ্য, নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি এবং হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাড়তে থাকা জনঅসন্তোষ থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই দাবি করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার রিয়াদে আরামকোর একটি স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডুলি দেখা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি রয়টার্সকে বলেন, আরামকোর একটি স্থাপনার আশপাশে আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আরামকোর কাছেও মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

তাই রিয়াদের ওই আগুনের সঙ্গে হুথিদের দাবি করা হামলার সরাসরি সম্পর্ক এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।

এর আগে গত সপ্তাহে হুথিরা দাবি করেছিল, সৌদি আরবের ইয়ানবুতে আরামকোর স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে তারা। সে সময় সৌদি আরব জানিয়েছিল, তায়েফ ও ইয়ানবু এলাকার দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। তবে আরামকোর স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কথা জানায়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।

রিয়াদে নতুন করে এই হামলার দাবি এমন সময় এল, যখন সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের শহর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিদের হামলায় দেশটির বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, প্রতিহত করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আসির প্রদেশে এক এশীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। এতে একটি মসজিদ ও কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া শুক্রবার নাজরান শহরের একটি স্কুল ভবনে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে বলে জানিয়েছে সৌদি সিভিল ডিফেন্স। এতে ভবনটি ও আশপাশে থাকা কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০১৫ সালের মার্চ থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির কয়েকটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

হুথিদের হামলায় পুড়ছে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনা
ছবি: এএফপি

Saturday, October 3, 2026

ইয়েমেনের তাইজে তীব্র লড়াইয়ে ৮০ যোদ্ধা নিহত

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথের কাছে ইয়েমেনের তাইজ এলাকায় হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

উভয় পক্ষের সূত্র এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছে।

ইরান-সমর্থিত হুথিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে আকস্মিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই তাইজে তীব্র লড়াই চলছে।

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত অনেকটা থেমে ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জুলাইয়ে ইয়েমেনে আবারও সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে।

হুথিরা মূলত জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ভিত্তিক একটি সংগঠন। দেশটির উত্তরাঞ্চল তাদের প্রধান ঘাঁটি। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ইয়েমেনের অধিকাংশ জনবহুল এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোট সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। সরকার বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চল, যার মধ্যে বন্দরনগরী এডেনও রয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করে।

গত মাসে হুথিদের অভিযানের সময় তারা ইয়েমেনের অবশিষ্ট লোহিত সাগর উপকূলেরও নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর মধ্যে বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকাও রয়েছে। এই প্রণালী শুধু সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী নৌবাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুক্রবার বিকেলে হুথিরা দাবি করে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বাহিনী ৯৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত হামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫০টি।

এদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অস্ত্র সীমান্তবর্তী শহর নাজরানের একটি স্কুলে আঘাত হেনে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শহরটি ইয়েমেন সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে।

সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হামলার পরের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে একটি গর্তসহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা যায় বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

হুথিদের সামরিক সূত্রের দাবি, গত ২৪ ঘণ্টায় তাইজ এলাকায় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে অন্তত ৫৫ জন সরকারবিরোধী যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ইয়েমেন সরকারের সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, তাদের পক্ষের ২৬ জন সেনা নিহত হয়েছেন।

তাইজের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চলছে। এর মধ্যে এমন কিছু উঁচু পাহাড়ি এলাকাও রয়েছে, যেখান থেকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিদের দখলে যাওয়া উপকূলীয় অঞ্চল দেখা যায়।

হুথিরা বিশাল এলাকা দখল করলেও এখনো তাইজ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। সানা ও এডেনের পর তাইজ ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর।

সরকারি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার হুথিরা সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ও সরকারের প্রধান ঘাঁটি এডেনের সঙ্গে যোগাযোগকারী একটি সেতু ধ্বংস করেছে।

ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বৃহস্পতিবার তাইজ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, হুথিদের সামরিক অভিযান বেসামরিক জনগণের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। মানুষের আরো ক্ষতি ঠেকাতে এবং প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে নিরাপদ ও বাধাহীনভাবে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে সব ধরনের চেষ্টা চালাতে হবে।

এদিকে শুক্রবার জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ইয়েমেনে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

সংস্থাটি বলেছে, ইয়েমেনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ তাদের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

ইয়েমেনে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো জনশুমারি হয়নি। তবে জাতিসংঘের হিসাবে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ।

ইয়েমেনের তাইজে তীব্র লড়াইয়ে ৮০ যোদ্ধা নিহত
ছবি: সংগৃহীত

লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের সঙ্গে ইয়েমেনি বাহিনীর লড়াই, নিহত ৮০

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কাছে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৮০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (০২ অক্টোবর) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে উভয় পক্ষের সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

তাইজ প্রদেশের লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে সংঘর্ষ চলছে। কয়েক সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে আকস্মিক অভিযান শুরু করে হুতিরা।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরের পুরো ইয়েমেনি উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতিরা। এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের এলাকাও রয়েছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এই প্রণালিটি সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির পাশাপাশি বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পথ।

হুতিদের সামরিক সূত্র জানিয়েছে, তাইজ এলাকায় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫৫ জন সরকারবিরোধী যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, তাদের পক্ষের ২৬ সেনা নিহত হয়েছেন।

তাইজের আশপাশে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই চলছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের দখলে যাওয়া উপকূলীয় এলাকার ওপর নজর রাখা পার্বত্য এলাকাগুলোতেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজের নিয়ন্ত্রণ এখনো নিতে পারেনি হুতিরা। রাজধানী সানা ও এডেনের পর তাইজ দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর।

ইয়েমেনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বৃহস্পতিবার তাইজের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, হুতিদের সামরিক অভিযান বেসামরিক জনগণের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

সূত্র : সিবিএস নিউজ

হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর উপর হামলা চালাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর উপর হামলা চালাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, September 29, 2026

রাশিয়া-ইরানের গোয়েন্দা সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছিল হুতিরা, এবার সেই ব্যবস্থাই হামলার মুখে

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুতিদের অগ্রযাত্রা শুধু তাদের সংখ্যাগত শক্তির কারণে হয়নি; বরং রাশিয়া ও ইরানের সমন্বিত গোয়েন্দা ও কমান্ড কাঠামো এতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ওই কাঠামোয় রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা তথ্য ও সংকেত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরান-নেতৃত্বাধীন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর সঙ্গে তারিক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) ভেতরে মানব গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত হয়ে হুতিদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছিল বলে আলজাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী মতামতে বলা হয়েছে।

‘প্রজেক্ট অরোরাহ’ নামে একটি ভূ-স্থানিক ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য একীভূতকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের ওপর রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা নজরদারির ধরণ শনাক্ত করা হয়।

এই প্রকল্পের আওতায় একটি বিশেষভাবে সীমিত প্রবেশাধিকারযুক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে রাশিয়ার কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা তৎপরতাকে একটি সমন্বিত বহুসেন্সর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুনর্গঠন করা হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আগে রুশ গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তৎপরতার ধারাবাহিকতাও এতে শনাক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় রুশ সামরিক ভূ-স্থানিক স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়ে সিএনএনের একটি বড় অনুসন্ধানেও তা উঠে আসে।

ইরান যুদ্ধের সময়ই এর মূল কৌশলটি স্পষ্ট হয়। সেখানে কক্ষপথভিত্তিক গোয়েন্দা, নজরদারি ও অনুসন্ধান ব্যবস্থা শুধু সামরিক অভিযানকে সহায়তা করেনি; বরং হামলার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

রাশিয়ার ভূ-স্থানিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বিভিন্ন বাহিনীর অবস্থান, চলাচলের পথ, সদর দপ্তর ও রসদ ব্যবস্থার পরিবর্তন শনাক্ত করে। একই সঙ্গে সংকেত গোয়েন্দা ব্যবস্থা ইলেকট্রনিক সংকেতের উৎস, যোগাযোগের ধরন এবং কমান্ড কাঠামোর সম্পর্ক চিহ্নিত করে থাকে।

স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত ব্যবহার

এই ব্যবস্থার মূল সুবিধা কোনো একটি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের তথ্য সময়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিভিন্ন রিকনেসান্স স্যাটেলাইটের পরিপূরক ভৌগোলিক ও তড়িৎচৌম্বকীয় কাভারেজের মাধ্যমে বাহিনীগুলোর চলাচল ও কার্যক্রমের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।

ইরান যুদ্ধের সময় এই সমন্বিত স্যাটেলাইট গোয়েন্দা ব্যবস্থাই দেখিয়েছিল, রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য কীভাবে ইরানের সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানকে আরও কার্যকর করতে পারে।

ইয়েমেনে এই গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর সমন্বয় করেছিল ইরান। রাশিয়া থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য এবং গোয়েন্দা তৎপরতা যুক্ত করে তারিক সালেহর কমান্ড কাঠামোর বিস্তারিত চিত্র তৈরি করা হয়েছিল।

এর মাধ্যমে কোন সদর দপ্তর কার্যকর ছিল, কোথায় অবগত অবস্থান বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে মিলছিল না, কোন ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় দুর্বল ছিল এবং ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের মধ্যে কোথায় কমান্ড, তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে; এসব শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পশ্চিম উপকূলে কীভাবে ভেঙে পড়ে প্রতিরোধ

এই পরিস্থিতিতেই ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলীয় ফ্রন্টে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সদর দপ্তরের সঙ্গে এনআরএফের কিছু ইউনিটের একটি কমান্ড চ্যানেল ছিল। অন্য একটি চ্যানেলের মাধ্যমে এসব বাহিনী নিজেদের মধ্যে এবং নিজ নিজ ঊর্ধ্বতন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করত। দুটি ব্যবস্থাই যখন অবিশ্বস্ত হয়ে পড়ে, তখন ভুল তথ্য ওপরের দিকে যেতে থাকে এবং বিভ্রান্তিকর বা নিয়ন্ত্রিত নির্দেশ নিচের দিকে পৌঁছাতে থাকে।

এর প্রভাব ছিল সরাসরি। এনআরএফের এক কমান্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেও পরে সেখান থেকে সরে যান। আরেকজন জানান, এনআরএফের বাইরের একটি ইয়েমেনি বাহিনী সামরিক বিমানঘাঁটি ছেড়ে গেছে, যদিও সেখানে তখনো ওই বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। ফলে মিত্র বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে কমান্ডারদের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছায় এবং বিমান হামলার পর হতাহতের ঘটনা ঘটে।

মোখায় অবস্থানরত সৌদি বিশেষ বাহিনীর একটি টাস্কফোর্সই প্রথম বুঝতে পারে যে মাঠপর্যায়ে বাহিনীগুলোর যে অবস্থান জানানো হচ্ছে, বাস্তবে তার সঙ্গে তা মিলছে না।

সৌদি বাহিনীর বিমান হামলার প্রস্তুতি থাকলেও মিত্র বাহিনীর অবস্থান নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা না গেলে বিমানশক্তি অবাধে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর সঙ্গে আরও সমস্যা তৈরি হয় যখন এনআরএফের কয়েকটি ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় দেখতে পায়, নিবন্ধিত সদস্যদের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দায়িত্বে যোগ দেননি।

জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড কয়েক মাস ধরে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন, বেতন পুনর্বহাল ও বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে এসব সদস্যকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি জাবাল আল-নারকে ঘিরে সমন্বয় ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এনআরএফের বিভিন্ন ইউনিট মূল হুতি বাহিনী পৌঁছানোর আগেই অবস্থান ছেড়ে যেতে শুরু করে।

মোখার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা

এই ব্যর্থতাকে এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যৌথ সৌদি-ইয়েমেনি এবং সৌদি-পাকিস্তানি জয়েন্ট টার্মিনাল অ্যাটাক কন্ট্রোলার বা জেটিএসি দলগুলোকে এখন গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাঞ্চলীয় বাহিনীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

এর লক্ষ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা বাহিনী এবং জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের হামলা ব্যবস্থার মধ্যে একটি যাচাইকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি সৌদি অপারেশনাল মেন্টরিং অ্যান্ড লিয়াজোঁ টিমগুলো জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ইয়েমেনি বাহিনীর জনবল, অবস্থান ও প্রস্তুতির স্বাধীন যাচাই করছে।

একই সঙ্গে নির্দেশের পরিচয় যাচাই, সীমিত পরিসরে তথ্য আদান-প্রদান এবং বিকল্প এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মোখায় প্রকাশ পাওয়া দুর্বলতাগুলো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে।

সৌদি আরব এর আগেও ভিন্ন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের সামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স দক্ষিণ ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) অভিযানকে সহায়তা করা আবুধাবির কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শনাক্ত ও দুর্বল করে দিয়েছিল।

তখনও মাঠপর্যায়ের অভিযান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত রাখতে যোগাযোগ ও লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল। বাইরের ওই সহায়তা কাঠামো দুর্বল হওয়ার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের টাস্কফোর্স ও তাদের মিত্র বাহিনীগুলো দ্রুত কার্যকর স্বাধীনতা হারিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের চাপে পিছু হটে।

হুতিদের কমান্ড কাঠামোতে আঘাত

তবে বর্তমানে হুতিদের সহায়তা করা ব্যবস্থা আরও জটিল। রাশিয়া স্যাটেলাইট ও সংকেত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে এবং ইরান সেই তথ্য হুতিদের কমান্ড ও সামরিক অভিযানের সঙ্গে একীভূত করছে।

কিন্তু এই জটিলতাই ব্যবস্থাটিকে কিছু দুর্বলতার ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। নিরাপদ যোগাযোগ, বিশেষজ্ঞ জনবল, গোয়েন্দা তথ্য একীভূত করার কেন্দ্র, কারিগরি পরামর্শক এবং সানা ও যুদ্ধক্ষেত্রের সদর দপ্তরগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ; সবই এই ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন এসব দুর্বলতাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সানায় ইরান-নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় ধরনের আঘাত হানে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী। হুতিদের নিহত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত দুই মেজর জেনারেল, সাত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ৩২ কর্নেল রয়েছেন। তাদের অনেকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সহকারী, স্টাফ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সদস্যরাও নিহত হন।

মেজর জেনারেলের চেয়েও উচ্চপদমর্যাদার কিছু কর্মকর্তা হুতিদের সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামোয় নিহত হয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্মকর্তারাও নিহত হয়েছেন। তবে এসব তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আনা হয়নি।

তবে নিহতের সংখ্যা নয়, এর প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামনের সারির কমান্ড কাঠামো যখন ধারাবাহিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে, একই সময়ে সানার উচ্চপর্যায়ের কমান্ড কেন্দ্রগুলো সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার মুখে পড়ছে। এতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলা পরিচালনা; পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

সদর দপ্তরগুলো বাধ্য হয়ে স্থান পরিবর্তন করলে, বেঁচে থাকা কমান্ডাররা অধীনস্থ ইউনিটগুলোর সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে এবং অবশিষ্ট জুনিয়র ইরানি পরামর্শকরা বিকল্প যোগাযোগপথ তৈরির চেষ্টা করলে নতুন নতুন সংকেত তৈরি হয়। এসব সংকেত শনাক্ত, সমন্বয় ও অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব ।

এ কারণেই পশ্চিম উপকূলে হুতিরা যে গতিতে অগ্রসর হয়েছিল, এখন সেই গতি ধরে রাখতে পারছে না বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। হুতিরা যে কমান্ড যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সুবিধা পেয়েছিল, তা এখন শক্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে তাদের নিজস্ব বাহ্যিক সহায়তাপ্রাপ্ত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে অন্ধ ও উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।

ফলে পশ্চিম উপকূলের ব্যর্থতা এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য স্থায়ী দুর্বলতা নয়, বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া একটি শিক্ষা হয়ে উঠেছে।

বদলে যাচ্ছে সামরিক সমীকরণ

২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের কমান্ড, যোগাযোগ, গোয়েন্দা ও যুদ্ধ সক্ষমতার সমন্বিত ব্যবস্থা সিক্সসিআইএসআর ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হচ্ছে। একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা এবং সেন্সর থেকে দ্রুত অস্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা হুতি উত্তেজনা সৌদি নীতির ওপর থাকা সংযমও অনেকটা ক্ষয় করেছে। ফলে সৌদি নেতৃত্বাধীন বড় ধরনের যে সামরিক অভিযান এখন গড়ে উঠছে, তা এমন এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুরু হতে পারে যার বাহ্যিক কমান্ড সহায়তা ইতোমধ্যে ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে রয়েছে।

এটাই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া রাশিয়া-ইরান সমর্থিত ব্যবস্থা বড় ধরনের সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই দুর্বল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোখায় প্রকাশ পাওয়া কৌশলগত ও কমান্ডগত ব্যর্থতাগুলোও সৌদি নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ডের ভেতরে সংশোধন করা হচ্ছে।

অর্থাৎ হুতিরা একবার একটি দুর্বল কমান্ড ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নিয়েছিল। এখন তাদের এমন এক পরিস্থিতিতে লড়তে হচ্ছে, যেখানে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া বাহ্যিক কমান্ড ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাটিকেই পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র : আলজাজিরা

রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি
রাইফেল ও আরপিজি লঞ্চার হাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধরা। ছবি: এএফপি