Wednesday, April 9, 2025

বানরের রুটি ভাগের খেলায় মেতেছেন আরবের শেখরা

বানরের রুটি ভাগের খেলায় মেতেছেন আরবের শেখরা। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ছোট্ট এক খণ্ড নিয়ে গঠিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। কিন্তু সেই রাষ্ট্রের ভেতর নিজের শেকড় গেড়েছে ইসরায়েল। ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে, পুরো ফিলিস্তিনকে। তবে ইসরায়েলের স্বপ্ন শুধু ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই ছড়ি ঘোরাতে চায় ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি। এজন্য নিজের গ্রেটার ইসরায়েল প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে তেল আবিব। আর ইসরায়েলি এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে পশ্চিমারা যেমন মদদ দিচ্ছে তেমনই সঙ্গ দিচ্ছেন আরবের শেখরা।

ফিলিস্তিনে একটি বোমাও ফেলেনি আরব কোনো দেশ। ফিলিস্তিনকে বাঁচাতেও এগিয়ে আসেনি কেউ। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকটি প্রতিবেশী থাকার পরও ফিলিস্তিনের এমন অবস্থা হবে তা কেউ ভাবতেও পারছে না। কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এই আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন নিয়ে পুরোপুরি নির্বিকার। মুসলিম ভাইয়ের রক্ত দেখে প্রতিবেশী আরব শেখদের মন কাঁদছে কেন না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরে ফিরছে।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে মিসরের। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই দেশ তারপরও ইসরায়েলের অভিযান নিয়ে নিশ্চুপ। সামরিক সরকারের অধীনে থাকা মিসরের জনগণের ফিলিস্তিনিদের প্রতি সফট কর্নার রয়েছে। তবে মসনদের মালিক আবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মিত্র। এর বাইরেও গাজায় নিজের স্বার্থও রয়েছে মিসরের শাসক গোষ্ঠীর। অথচ মিসর সামরিক বা কূটনৈতিক- যেকোনো একটি পদক্ষেপ জোরালোভাবে নিলেই বন্ধ হয়ে যাবে গাজায় ইসরায়েলি হামলা।

ইসলাম ধর্মের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরবে শাসনক্ষমতায় রয়েছে বয়োবৃদ্ধ বাদশাহ সালমান। কিন্তু দেশ আসলে চালান তার ছেলে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। প্রশাসনে অনুগতদের নিয়োগ এবং প্রতিবাদী যেকোনো কণ্ঠস্বর ঠাণ্ডা করার ক্ষেত্রে জুড়ি নেই তার। তর তর করে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তার নমুনাও দেখিয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ। যুক্তরাষ্ট্রের আনুকূল্য চাওয়া সৌদির স্বপ্ন বিশ্বের ব্যবসা-বিনোদন রাজধানী হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত। বলা যেতে পারে, সৌদির কথার বাইরে কোনো কাজই করে না দেশটি। সেই আমিরাতেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ঘাঁটি। দেশটি থেকে কোটি কোটি ডলার খরচ করে অস্ত্রশস্ত্রও কেনে আমিরাত। আবার সেই দেশটিই প্রায় অর্ধ দশক আগে ইসরায়েলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধে। সৌদির বন্ধু হলেও আমিরাতেরও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন রয়েছে।

বিগত কয়েক দশকে মধ্যস্থতাকারীর তকমা ভালোই গায়ে লাগিয়েছে কাতার। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ আসলেই জটিল সমীকরণে চলে। এই দেশেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক ঘাঁটি। আবার ইসরায়েলের সঙ্গেও দেশটির ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের প্রতি সহমর্মী হলেও কাতার সব সময়ই দ্বৈত ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাই গাজা নিয়ে উপসাগরীয় এই দেশগুলোর নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য নিজের স্বার্থেই এই দেশগুলো ঝিইয়ে রেখেছে গাজার সংঘাত। কেননা যে দেশ গাজা সংকটের সমাধান করতে পারবে, তারাই মুসলিম বিশ্বের নেতা হবে। 

কাতারের আমির, সৌদি যুবরাজ ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। ছবি : সংগৃহীত
কাতারের আমির, সৌদি যুবরাজ ও আমিরাতের প্রেসিডেন্ট। ছবি : সংগৃহীত

পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের মুখোশ খসে পড়েছে by আব্বাস নাসির

যখন ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসবিদ আমাদের এই সময় নিয়ে লিখবেন, তখন তাঁর মনে হবে, এই সময়ে সব আন্তর্জাতিক আইন অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল। মুছে গিয়েছিল ন্যায় আর মানবতার ধারণা। আর পশ্চিমা বিশ্ব যে গণতন্ত্র আর মানবাধিকারের মুখোশ পরে থাকে, সেই মুখোশ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল।

যখন জেগে থাকা প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সামনে এক ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে, তখন আর কীই–বা বলা যায়? যখন শিশুদের থেঁতলানো মুখ, বিচ্ছিন্ন অঙ্গ, আহত মায়েদের কান্না আর চিহ্নহীন মৃতদেহগুলো আমাদের চোখের সামনে ঘুরতে থাকে.... মানুষ আর তার মানবিক সত্তা যেন নিখোঁজ হয়ে গেছে।

যাদের হাতে রয়েছে ধ্বংসের সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্র, সেই সব ক্ষমতাধর রাষ্ট্র নিঃসংকোচে, নির্লজ্জভাবে তা ব্যবহার করছে। শুধু তা–ই নয়, নিজেদের এই রক্তপিপাসাকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করতে তারা তৈরি করছে বানানো তথ্য, বিকৃত ইতিহাস।

ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকার যেন অবাধ ছাড় পেয়েছে এই জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানোর জন্য। ঘরবাড়ি ধ্বংস, খাদ্য ও চিকিৎসার সরবরাহ বন্ধ, পরিকল্পিত অনাহার ও মৃত্যুর ফাঁদ—সবই চলছে একেবারে নির্লজ্জভাবে। আর এই নৃশংসতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, গোলাবারুদ ও ‘স্মার্ট বোমা’ পাঠাচ্ছে। যুক্তরাজ্য থেকেও প্রতিদিন সাইপ্রাসে অবস্থিত একটি ঘাঁটি থেকে বিমান দিয়ে গাজায় নজরদারি চালানো হচ্ছে, যাতে ইসরায়েল তাদের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে। এসব খবর গণমাধ্যমেই এসেছে। কোনো সরকার তা অস্বীকারও করেননি। ইসরায়েলে পুরো ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি ও ইতালি অস্ত্র রপ্তানি করে যাচ্ছে অব্যাহতভাবে।

বেশির ভাগ ইসরায়েল-সমর্থকের কাছে ফিলিস্তিন সমস্যা যেন হঠাৎ করেই ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। তাঁরা দেখতে চান না কিংবা স্বীকার করেন না যে এর সূচনা বহু আগেই—১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা ফিলিস্তিনিদের উৎখাত থেকে। সেই সঙ্গে এসেছে দখলদারত্ব। ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা ফিলিস্তিনিদের ভূমি, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সমতার অধিকারের নিরন্তর অস্বীকৃতি।

ইসরায়েল তার কার্যকলাপ গোপনে করে না। বরং তারা এমনভাবে কাজ করে, যেন বিশ্ব জানতে পারে তারা কতটা নির্লজ্জ ও দায়মুক্তভাবে কাজগুলো করে যেতে পারে। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত—গাজায় ১৫ জন জরুরি সেবা ও উদ্ধারকর্মীর গণহত্যা, যাঁদের মরদেহ পাওয়া গেছে একটি অগভীর গণকবরে।

ইসরায়েলের দাবি ছিল, অ্যাম্বুলেন্সগুলো ‘সন্দেহজনক ও বিপজ্জনকভাবে’ চলছিল। তাই তাঁদের গুলি করা হয়। কিন্তু তারা ব্যাখ্যা দেয়নি যে কেন নিহত ব্যক্তিদের কারও কারও হাত পেছনে বাঁধা ছিল।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মেডিকেলকর্মী জীবিত ছিলেন। তাঁকেও ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তারপর সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, যেন তিনি বেঁচে ফিরে গিয়ে বিশ্বকে জানাতে পারেন, কী ভয়াবহ বর্বরতা চালানো হয়েছে। এটা কি কোনো বিকৃত, অসুস্থ মানসিকতার পরিকল্পনা?

এই দৃশ্যপট মনে করিয়ে দেয় ১৯৮০-৯০ দশকের দক্ষিণ আফ্রিকার আন্দোলনের কথা। তখন সারা বিশ্বে বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে বর্জনের ডাক উঠেছিল।

কিন্তু তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে ‘গঠনমূলক সম্পৃক্ততা’ নামক এক শব্দবন্ধ তুলে আনেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে বাণিজ্য ও সম্পর্ক রাখলে সেই দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়।

আজ অনেক ইসলামি ও আরব রাষ্ট্রও হয়তো একই নীতি অনুসরণ করছে। এমনকি যখন গাজায় গণহত্যা আবার শুরু হলো, তখনো ইসরায়েলে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত তেল আবিবে এক জমকালো ইফতারের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে লোকজন খাবারে ভরপুর টেবিল ঘিরে বসে ভোজে মত্ত। অথচ ঠিক সেই সময় গাজার দিকে মানবিক সহায়তা, খাদ্য বা ওষুধ কিছুই প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না।

এটা কি আরব রাষ্ট্রগুলোর ‘গঠনমূলক সম্পৃক্ততা’? নাকি আত্মপ্রবঞ্চনা? এই দৃশ্যপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে, পশ্চিমা গণতন্ত্র আর মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কি নিজেদের বিবেককে কোনো হিমঘরে রেখে দিয়েছে? পুরো ফিলিস্তিন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত সেই বিবেক কি আর জাগবে না?

আব্বাস নাসির ডন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক

ডন থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন এক স্বজন। কাফনে মোড়ানো তাঁর মরদেহের পাশে ফিলিস্তিনি এক নারীর আহাজারি। প্রিয়জনের মৃত্যুতে শিশুর কান্নাও থামছে না। গতকাল উত্তর গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতাল চত্বরে
ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন এক স্বজন। কাফনে মোড়ানো তাঁর মরদেহের পাশে ফিলিস্তিনি এক নারীর আহাজারি। প্রিয়জনের মৃত্যুতে শিশুর কান্নাও থামছে না। গতকাল উত্তর গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতাল চত্বরে। ছবি: এএফপি

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে আরব দেশগুলোর কার কী অবস্থান

ফিলিস্তিনিদের দাবিগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করে আরব দেশগুলো। তবে নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীগত উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক জটিল করে তুলেছে। এতে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক ও সামরিক সংকট।

জর্ডান

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার সময় অন্তত ৭ লাখ ফিলিস্তিনি নিজেদের ভূখণ্ড ছেড়ে পালিয়েছিলেন বা তাঁদের চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে আশ্রয় দিয়েছিল জর্ডান। এ ছাড়া ১৯৬৭ সালের আরব দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েল জয় পাওয়ার পর ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) জর্ডানে আশ্রয় নেয়।

জর্ডান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ইসায়েলে হামলা চালাত পিএলও। দেশটির তৎকালীন বাদশাহ হুসাইনকেও হুমকি দিয়েছিল তারা। ১৯৭০ সালে বাদশাহর মোটর শোভাযাত্রায় এলোপাতাড়ি গুলি চালায় বন্দুকধারীরা। তবে বেঁচে যান বাদশাহ। পরে তিনি পাল্টা আঘাত করেন এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তখন হাজার হাজার মানুষ নিহত হন এবং ফিলিস্তিনিদের লেবাননের রাজধানী বৈরুতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে একটি শান্তিচুক্তিতে সই করে জর্ডান। এর আগে একটি দেশই কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল। সেটি ছিল মিসর।

লেবানন

পিএলও জর্ডান থেকে লেবাননে চলে আসার পর ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত দেশটি বহুমুখী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েল, সিরিয়া ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ফিলিস্তিনিদের বিভিন্ন শরণার্থীশিবির। এককালে মধ্যপ্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড হিসেবে খ্যাত লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য লড়াই করছিল ওই গোষ্ঠীগুলো।  

লেবাননে ওই সংঘাত চলেছিল ১৫ বছর ধরে। সে সময় সবচেয়ে নৃশংস ঘটনাগুলোর একটি ছিল—লেবাননের খ্রিষ্টান সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থীশিবিরে অন্তত ৮০০ বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা। ওই গোষ্ঠীটির সমর্থন ও অর্থ দিয়েছিল ইসরায়েল। তবে ফিলিস্তিনিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় নিহত হন কয়েক হাজার মানুষ।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে বরাবরই সোচ্চার লেবানন সরকার। তবে তাঁদের নাগরিক অধিকার দিতে নারাজ। এ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সমালোচনার মুখেও পড়েছে দেশটি। লেবানন সরকারের ভাষ্য, তাদের এই নীতির লক্ষ্য হলো—শরণার্থী ফিলিস্তিনিরা যেন লেবাননে স্থায়ী না হয় এবং নিজেদের জন্মভূমিতে ফেরত যেতে পারে।

মিসর

আরব দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল মিসর নিজেদের ফিলিস্তিনের বড় সমর্থক বলে মনে করে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যে নৃশংসতা চলছে, তা বন্ধের জন্য ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে দেশটি। এর আগেও সেখানে বিভিন্ন সংঘাত থামাতে এবং শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রেখেছে কায়রো।

হামাসসহ ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিসরের ভালো যোগাযোগ রয়েছে। ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনের আইনসভার নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকেই গাজা শাসন করে আসছে হামাস। হামাস মিসরের রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি শাখা। এই সংগঠন থেকে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ মুরসি। ২০১৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি।

মিসরের অগ্রাধিকার হলো গাজা ও সিনাই উপদ্বীপের মধ্যে নিরাপত্তা বজায় রাখা। গাজায় হামাস ক্ষমতায় আসার পর থেকে উপত্যকাটি অবরোধ করে রাখতে ইসরায়েলকে সাহায্য করছে মিসর। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রথম কোনো আরব দেশ হিসেবে ১৯৭৯ সালে শান্তিচুক্তি করে মিসর। দেশটিতে বসবাস করা ফিলিস্তিনিদের ভাষ্য, দিন দিন তাঁরা ক্রমবর্ধমান আমলাতান্ত্রিক ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

আঞ্চলিকভাবে ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দেশটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডের (চুক্তি) মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করার যে রীতি আরব দেশগুলোর মধ্যে ছিল, তা ওই চুক্তির মাধ্যমে লঙ্ঘন করে ইউএই।

ইসরায়েল ও ইউএইর মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশ একে অপরকে প্রতিরক্ষাবিষয়ক সহযোগিতাও করে। গাজায় চলমান হামলার মধ্যেই গত জানুয়ারিতে ইউএইভিত্তিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ইডিজিই’ ইসরায়েলের ‘থার্ডআই সিস্টেম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে ৩০ শতাংশ শেয়ারের বিনিময়ে ১ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। ড্রোনসহ চালকবিহীন বিভিন্ন আকাশযান শনাক্তের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে থার্ডআই সিস্টেম।

সুদান

সুদানের রাজধানী খার্তুম থেকে ১৯৬৭ সালে ‘থ্রি নো’ প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়। ‘থ্রি নো’ বা ‘তিন না’ ঘোষণায় ছিল—ইসরায়েলকে কোনো স্বীকৃতি নয়, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তি নয় ও ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নয়।

তবে ২০২০ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি হয় সুদান। তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের সঙ্গে সুদান সম্পর্ক স্বাভাবিক করায় দেশটির নাম ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক’ তালিকা থেকে সরিয়ে নিতে রাজি হয় তাঁর প্রশাসন। ওই তালিকায় থাকার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে একঘরে হয়ে ছিল খার্তুম।

কুয়েত

১৯৯০ সালে পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ কুয়েত দখলের সিদ্ধান্ত নেন ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। তাঁর ওই সিদ্ধান্তের প্রতি পিএলওপ্রধান ইয়াসির আরাফাতের সমর্থন ছিল বলে মনে করা হয়। এর জেরে আরাফাতের সঙ্গে কুয়েতের সম্পর্ক ভেঙে যায়।

ইয়াসির আরাফাতের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ও অর্থদাতা ছিল কুয়েত। ১৯৬৪ সালে দেশটিতে কাজ করার সময় ফাতাহ গড়ে তোলেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে ইরাকের পরাজয়ের পর লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করা হয়।

ইরাক

সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাকে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিরা ভর্তুকিতে আবাসন সুবিধা পেত। তাঁদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চাকরি করার অধিকারও পেয়েছিলেন ফিলিস্তিনিরা। ভিন্ন কোনো দেশের মানুষের জন্য এসব ছিল বিরল সুযোগ–সুবিধা। তবে ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর ইরাকে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দমন–পীড়ন ও সহিংসতার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের অনেককে দেশটি থেকে বিতাড়িতও করে নতুন করে শক্তি অর্জন করা শিয়াপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো।

 ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ফিলিস্তিনের গাজায়
ইসরায়েলি হামলায় ঘরবাড়ি হারিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে শিশুসন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এক ফিলিস্তিনি নারী। ফিলিস্তিনের গাজায়। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজায় ইসরায়েলের হামলায় আরও ৫৮ ফিলিস্তিনি নিহত

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২১৩ জন। আজ মঙ্গলবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ হালনাগাদ তথ্য দিয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত ১৮ মার্চ নতুন করে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর অব্যাহত হামলায় ১ হাজার ৪৪৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৬৪৭ জন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ৫০ হাজার ৮১০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৮৮ জন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত ভবন ও স্থাপনার ধ্বংসস্তূপে এবং সড়কে এখনো অনেক মরদেহ পড়ে আছে। অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে না পারায় এসব মরদেহ উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

এদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আহত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ মনসুর মারা গেছেন। গাজার নাসের হাসপাতালের কাছে সাংবাদিকদের অস্থায়ী তাঁবুতে গত সোমবার হামলা চালায় ইসরায়েল। তাঁবুতে আগুন ধরে গেলে তিনি গুরুতর দগ্ধ হন। এ ঘটনায় আরও দুই সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন হেলমি আল-ফাকাবি ও ইউসুফ আল-খাজানদার। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত আটজন।

‘নতুন চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে’

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও জিম্মিদের মুক্ত করতে নতুন চুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাশে বসা ছিলেন। দুই নেতা গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে বিতাড়িত করা নিয়েও কথা বলেছেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখন আরেকটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছি এবং আমরা আশা করছি, তা করতে পারব। সব জিম্মিকে মুক্ত করে আনতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

এ সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিম্মিদের মুক্ত করতে কঠিন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা আরেকটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। দেখি কী হয়।’

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান নেতানিয়াহু। ওই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত ১৮ মার্চ গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির সময় আট মরদেহসহ ৩৩ জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিপরীতে ইসরায়েলি কারাগার থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফিলিস্তিনি মুক্তি পান।

জিম্মিদের মুক্ত করতে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। তবে তাঁদের দাবি উপেক্ষা করে বাকি জিম্মিদের জীবিত অথবা মৃত উদ্ধার করতে হামাসের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার।

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ মনসুরের কফিনে রাখা হয়েছে তাঁর ‘প্রেস’ লেখা পোশাক। তাঁর কফিন ঘিরে স্বজনদের আহাজারি
ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ মনসুরের কফিনে রাখা হয়েছে তাঁর ‘প্রেস’ লেখা পোশাক। তাঁর কফিন ঘিরে স্বজনদের আহাজারি। ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরাই এখন শুল্ক আরোপের সমালোচনা করছেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপের ঘোষণা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন খোদ তাঁর ঘনিষ্ঠ ধনকুবের ব্যবসায়ী নেতারা। গত বুধবার ট্রাম্পের ওই শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকে সারা বিশ্বে পুঁজিবাজারগুলোয় ব্যাপক দরপতন হচ্ছে।

ট্রাম্পের সমর্থক ধনকুবের বিনিয়োগকারী বিল অকম্যান গত রোববার সতর্ক করে বলেছেন, নতুন শুল্ক আরোপ নিয়ে সামনে অগ্রসর হলে সেটা অর্থনৈতিকভাবে পরমাণু যুদ্ধ শুরু করার শামিল হবে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিলেন অকম্যান।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি বিশ্বের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার কথা বলে ২ এপ্রিল বেশ কয়েকটি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তালিকায় থাকা কয়েকটি দেশের ওপর তিনি উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’–এ এক পোস্টে অকম্যান লিখেছেন, যদি নতুন শুল্ক কার্যকর হয়, তবে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ক্রমশ গতি হারাবে এবং ক্রেতারা অর্থ ব্যয় বন্ধ করে দেবেন।

অকম্যান আরও লিখেন, ‘বাকি বিশ্বের কাছে আমাদের যে সুনাম রয়েছে, আমরা সেটির গুরুতর ক্ষতি করব এবং এই সুনাম পুনরুদ্ধার করতে কয়েক বছর এবং সম্ভবত কয়েক দশক লেগে যাবে।’

অকম্যানের এই পোস্ট ১ কোটি ৬০ লাখ বার দেখা হয়েছে।

পারশিং স্কয়ার ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অকম্যান আরও বলেছেন, ‘যদি ট্রাম্প তাঁর পথ পরিবর্তন না করেন, তবে আমরা নিজেদের তৈরি করা একটি অর্থনৈতিক পরমাণু দুর্যোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এবং আমাদের আশ্রয় খোঁজা শুরু করা উচিত।’

কেন তিনি এ কথা বলছেন, তার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন অকম্যান। তিনি বলেন, ‘একটি অর্থনৈতিক পরমাণু যুদ্ধের মাঝখানে কোনো সিইও এবং কোনো পরিচালনা পরিষদ আমাদের দেশে বড়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিতে কি স্বস্তিবোধ করবেন? প্রেসিডেন্ট বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়িক নেতাদের আস্থা হারাতে শুরু করেছেন।’

ট্রাম্প বুধবার সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা সব পণ্যের ওপর যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, তা গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ আরোপ করা শুল্ক কার্যকর হবে আগামীকাল বুধবার থেকে।

অন্যান্য লাখো কোটিপতি ও ধনকুবের ব্যবসায়ীরাও খোলাখুলি ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের একজন জেমি ডিমোন। তিনি জেপিমরগ্যান চেজ–এর চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনিও ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

গতকাল সোমবার ডিমোন সতর্ক করে বলেন, শুল্কের ফলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হওয়ার এবং বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানো বার্ষিক চিঠিতে ডিমোন আরও লেখেন, ‘সাম্প্রতিক শুল্ক খুব সম্ভবত মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি করবে এবং অনেকেই মনে করছেন, এতে মন্দার সম্ভাবনাও অনেক বাড়বে। শুল্কের কারণে মন্দা দেখা দেবে কি দেবে না, তা নিয়ে এখনো হয়তো প্রশ্নের অবকাশ আছে, কিন্তু এটা অর্থনীতির গতি হ্রাস করবে।’

আরেক কোটিপতি বিনিয়োগকারী স্ট্যানলি ড্রুকেনমিলার গতকাল এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, তিনি ১০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপের পক্ষে নন।

গতকাল রাতে ফিশার ইনভেস্টমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান ধনকুবের কেন ফিশার এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, ‘ট্রাম্প (গত) বুধবার যে ঘোষণা দিয়েছেন, সেটা বোকামি, ভুল, চরম উদ্ধত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করা এবং সমস্যাই নয়—এমন একটি বিষয়কে ভুল যন্ত্র দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এটা ব্যর্থ হবে এবং সমস্যা যতটা তার চেয়ে আতঙ্ক বেশি এবং এখান থেকে এটা অতিরঞ্জিত।’

ফিশার এদিন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, তিনি সাধারণত প্রেসিডেন্টদের কার্যক্রম নিয়ে জনসম্মুখে কথা বলেন না। কিন্তু শুল্ক নিয়ে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প যা করেছেন, সেটা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

এমনকি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইলন মাস্ক পর্যন্ত এ নিয়ে কথা বলেছেন। গত রোববার তিনি বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে ‘শুল্কবিহীন অবস্থার’ ব্যাপারে আশাবাদী।

অনলাইনে ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মাস্ক আরও বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি কার্যকর মুক্ত-বাণিজ্য অঞ্চল তৈরি হোক, সেটা দেখতে চান তিনি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ধনকুবের জেমি ডিমোন, বিল অকম্যান, ইলন মাস্ক এবং স্ট্যানলি ড্রুকেনমিলার (ঘড়ির কাঁটার দিকে)
ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ধনকুবের জেমি ডিমোন, বিল অকম্যান, ইলন মাস্ক এবং স্ট্যানলি ড্রুকেনমিলার (ঘড়ির কাঁটার দিকে) ছবি: রয়টার্স, এএফপি

ফের তামাশা ট্রাম্পের: বললেন যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ নিলে তা ভালোই হবে

ফিলিস্তিনের গাজা নিয়ে ফের তামাশা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিবাহিনী গাজার নিয়ন্ত্রণ নিলে তা ভালোই হবে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত করা যেতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। হোয়াইট হাউসে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এমন মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গাজার ভবিষ্যতের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে কথা বলেছেন নেতানিয়াহু। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের গাজা দখলের বিষয়টি ইঙ্গিত করেছেন তিনি। এর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই একাধিকবার গাজা দখলের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে তার ওই পরিকল্পনাকে জাতিগত নিধনের প্রস্তাব হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে গোটা বিশ্ব।  সোমবার ওভাল অফিসে পুনরায় আগের সুর তুললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিবাহিনী উপত্যকাটিতে নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা নিলে তা একটা ভালো জিনিস হবে। আর ফিলিস্তিনিদের বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত করা যেতে পারে।  

এসময় সাংবাদিকরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, গাজা যুদ্ধ বন্ধ করতে তিনি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন কিনা। জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি যুদ্ধের অবসান দেখতে চাই। আমি মনে করি যুদ্ধ এক পর্যায়ে থামবে এবং এতে দেরি হবে না। ট্রাম্প সাংবাদিকদের সামনে জিম্মি মুক্তির বিষয়ে জোর দেন। তিনি বলেন, হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মুক্তির বিষয়টি চলমান রয়েছে। তবে সকল জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের সামনে জানুয়ারির যুদ্ধবিরতির সময় জিম্মি মুক্তির বিষয়টিকে নিজেদের সফলতা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি জানিয়েছেন, আরেকটি সফল যুদ্ধবিরতির চুক্তির জন্য কাজ করছে ইসরাইল। নেতানিয়াহু বলেন, আমরা সকল জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তবে গাজায় হামাসের ‘দুষ্ট অত্যাচারকেও’ নির্মূল করতে হবে। গাজার মানুষ স্বাধীনভাবে যেখানে খুশি সেখানে যেতে চলে যেতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস দখলদার ইসরাইলের বিরুদ্ধে এক নজিরবিহীন হামলা চালায়। এতে ১২০০ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করে আসছে ইসরাইল। সে সময় যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ২৫১ জন ইসরাইলিকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস। যাদের অনেককেই মুক্তি দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে গাজায় প্রতিশোধমূলক বর্বরতা শুরু করে তেল আবিব। তারা যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে গাজার বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ইসরাইলের হামলায় এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। 

mzamin

গ্রেপ্তার এড়াতে ৪০০ কিমি ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী

গ্রেপ্তার এড়াতে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক আরোপে তোলপাড় গোটা বিশ্ব। রেহাই পায়নি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু দেশ ইসরাইলও। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছেন বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। যদিও তাদের টপকে বন্ধু ইসরাইল সবার আগে পেয়েছেন ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। সেই মতো সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন নেতানিয়াহু। তবে তেল আবিব থেকে অতিরিক্ত ৪০০ কিলোমিটার ঘুরে আমেরিকা পৌঁছায় তার বিমান।

ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে বেশ কিছু দেশের আকাশসীমা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া ইসরাইল ও হামাস যুদ্ধের জেরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক আদালত। ফলে আদালতের এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে মান্যতা দিতে পারে যেকোনো দেশ।

নেতানিয়াহুর আশঙ্কা ছিল হাঙ্গেরি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সহজ পথে এমন কিছু দেশ রয়েছে যারা সুযোগ পেলে এই পরোয়ানা জারি করে তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই হাঙ্গেরি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ৪০০ কিলোমিটার বা ২৪৮ মাইল পথ বাড়তি ঘুরতে হয়েছে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে। যদিও হাঙ্গেরি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বিমানে তেল ভরে দিয়েছে। কিন্তু বাকি যাত্রাপথে থাকা আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসকে নিয়ে ইসরাইল সরকারের আশঙ্কা ছিল। সেই কারণেই এই তিন দেশকে এড়িয়ে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স ও আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে আমেরিকা যান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী। অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করে আমেরিকা পৌঁছান নেতানিয়াহু।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

ইসরাইলের বর্বরতা বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান ফ্রান্স, মিশর ও জর্ডানের

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে মিশর, জর্ডান এবং ফ্রান্স। মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহের আমন্ত্রণে কায়রোতে এক বৈঠকে উপস্থিত হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রন এবং জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আব্দুল্লাহ। ওই বৈঠক থেকেই ইসরাইলি বর্বরতা বন্ধে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান তারা। এ খবর দিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু। এতে বলা হয়, তিন দেশের শীর্ষ বৈঠকের নেতৃত্ব দেন মিশরের প্রেসিডেন্ট। সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছেন, বৈঠকে সকল দেশের নেতারা অবিলম্বে যুদ্ধবন্ধের আহ্বান জানান। ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করতে এবং অবিলম্বে জরুরি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দেন তারা।

জর্ডানের রয়্যাল কোর্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিন নেতাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজায় ইসরাইলের হামলা বন্ধে চাপ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পুনরায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে এর সকল ধাপ বাস্তবায়নের আহ্বানও জানানো হয়েছে। যেন গাজাবাসীর মানবিক সংকট দূর হয়। বাদশাহ আব্দুল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, ইসরাইলের ক্রমাগত হামলা সংকট অবসানের সকল কূটনৈতিক এবং মানবিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল এবং বাধাগ্রস্ত করেছে। যার ফলে গাজাবাসী আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এতে সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আঞ্চলিক শান্তি স্থাপনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন জর্ডানের বাদশাহ। এ লক্ষ্যে সবরকম রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক তৎপরতা সন্ধানের কথা বলেছেন তিনি। আব্দুল্লাহ বলেছেন, এমন পথ খুঁজে বের করতে হবে যাতে ফিলিস্তিন এবং ইসরাইল উভয় পক্ষই শান্তির সন্ধান পায়। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন দেয়ায় মিশরের প্রশংসা করেছেন জর্ডানের বাদশাহ। এছাড়া গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরব বিশ্বকে সমর্থন দেয়ায় ফ্রান্সকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

mzamin

'শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাবো': ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিতে প্রতিক্রিয়া চীনের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনা আমদানির উপর অতিরিক্ত ৫০% শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। জবাবে চীন জানিয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে এবং নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই তথাকথিত 'পারস্পরিক শুল্ক'" আরোপ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এটি  হুমকি দেবার কৌশল। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন প্রতিশোধমূলক শুল্ক ঘোষণা করেছে এবং মন্ত্রণালয় তার সর্বশেষ বিবৃতিতে ইঙ্গিত দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, "চীন যে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে তা তার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের  স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে। এটি  সম্পূর্ণ বৈধ। চীনের উপর মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি একটি ভুল পদক্ষেপ। এটি   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাকমেইলিং মনোবৃত্তির  প্রকাশ । চীন কখনই এটি মেনে নেবে না। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব পথে চলতে থাকে, চীন শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। '

বিশ্লেষক এবং ব্যবসায়ীরা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্নঃ
চীনের উপর ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি  আর্থিকভাবে ধ্বংসাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধকে আরও তীব্রতর করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা ।শুল্ক যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার সাথে সাথে টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত শেয়ার বাজারগুলো  আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্পের ঘোষণা করা মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে চীন প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলার পর ট্রাম্পের নতুন এই  হুমকি সামনে  এলো। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন- 'চীন যদি  ২০২৫ এর  ৮ই এপ্রিলের  মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার না করে , তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৯ই এপ্রিল থেকে কার্যকরভাবে চীনের উপর ৫০% অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে। উপরন্তু, আমাদের সাথে চীনের অনুরোধকৃত   সমস্ত আলোচনা বাতিল করা হবে।' যদি ট্রাম্প চীনা পণ্যের উপর তার নতুন শুল্ক কার্যকর করেন, তাহলে চীনা পণ্যের উপর মার্কিন শুল্ক সম্মিলিতভাবে ১০৪% এ পৌঁছাবে। এতে কেবল আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য দামই বাড়বে না, বরং চীনকে অন্যান্য দেশে  সস্তা পণ্য সরবরাহ করতে এবং   বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আরও গভীর সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উৎসাহিত করতে পারে।

চীনা জনগণ চিন্তিত, কিন্তু তাদের দেশের প্রতি আস্থা আছেঃ
বেইজিংয়ের মানুষ বলছে ,   তাদের কাছে এতো শুল্কের হিসেবে রাখা  কঠিন।  তবে  ঝড় মোকাবেলা করার জন্য নিজের দেশের সরকারের উপর আস্থা রাখছে তারা।    ৩৭ বছর বয়সী চীনা নির্মাণকর্মী উ কি মনে করেন -  'ট্রাম্প আজ এক কথা বলেন, কাল আরেক কথা বলেন। যাই হোক, তিনি কেবল সুবিধা চান, তাই তিনি যা খুশি বলতে পারেন। '৩০ বছর বয়সী পল ওয়াং, যিনি ইউরোপে নেকলেস, ব্রেসলেট এবং টাং  স্টাডসহ   আনুষাঙ্গিক গহনা বিক্রি করেন, তিনি বলছেন -অতিরিক্ত  ৫০% মার্কিন শুল্কের পরে ইউরোপীয় বাজার এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতার বাজার কোন দিকে যায় সেদিকে তিনি নজর রাখবেন।  জেসি হুয়াং এবং ইয়াং আইজিয়া, যাদের কোম্পানিগুলো  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাসায়নিক আমদানি করে, তারা বলেছেন যে এই শুল্ক যুদ্ধের জেরে  তাদের হয়তো  দোকান বন্ধ করতে হতে পারে। হুয়াং উদ্বেগের সঙ্গে জানাচ্ছেন , " কোম্পানি থেকে ছাঁটাই হলে আমি হয়তো আর কোনও চাকরিও  খুঁজে পাব না।"

চীনের সামনে  একাধিক বিকল্প রয়েছেঃ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটনকে  পাল্টা আক্রমণ করার জন্য চীনের কাছে এখনও বিভিন্ন বিকল্প রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ফেন্টানাইলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা স্থগিত করা, কৃষি পণ্যের উপর উচ্চ কোটা স্থাপন করা। ২০২৪ সালে চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট পণ্য বাণিজ্য ছিল আনুমানিক ৫৮২ বিলিয়ন ডলারের , যা এটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পণ্যের শীর্ষ বাণিজ্যকারী করে তুলেছে।২০২৪ সালে চীনের সাথে পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২৬৩ বিলিয়ন থেকে ২৯৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সংলাপের সম্ভাবনা  এড়িয়ে গেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। লিন বলেছেন- ' আমি মনে করি না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তা আন্তরিক সংলাপের জন্য আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ । যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই সংলাপে অংশগ্রহণ করতে চায়, তাহলে তাদের সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সুবিধার মনোভাব গ্রহণ করা উচিত। 'মঙ্গলবার হংকংয়ে, যেখানে স্টক মার্কেট অন্যান্য দিনের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল, প্রধান নির্বাহী জন লি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শুল্ক আরোপকে  "গুন্ডামি" বলে উল্লেখ করেছেন।  তাঁর মতে  এই   "কঠোর  আচরণ" বিশ্বব্যাপী এবং বহুপাক্ষিক বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং  বিরাট অনিশ্চয়তা ডেকে এনেছে। লি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় হংকং তার অর্থনীতিকে চীনের উন্নয়নের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করবে, আরও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করবে। শুল্কের প্রভাব মোকাবেলায় হংকং  আরও বিদেশি কোম্পানি এবং মূলধন আকর্ষণ করবে , সেইসাথে  স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে সহায়তা করবে।
সূত্র : এপি নিউজ

চীনের ওপর ট্রাম্পের অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্কারোপের হুমকি

বেইজিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে চীনা পণ্যের ওপর আমেরিকার শুল্ক বেড়ে দাঁড়াল ৮৪ শতাংশে, যা সর্বকালের সর্বোচ্চ। এর বাইরে আছে একটি ১০ শতাংশের ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’, যা বিশ্বের সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এর ফলে চীনের  জন্য আমেরিকার মোট শুল্ক দাঁড়াল ৯৪ শতাংশে।

ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যান্ডেলে এই সংক্রান্ত একটি পোস্ট করে লেখেন, ‘চীন আমাদের পণ্যের ওপর ৩৪ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এর আগে থেকেই তারা রেকর্ড পরিমাণ শুল্ক, অ-আর্থিক প্রতিবন্ধকতা, বেআইনি কোম্পানি ভর্তুকি এবং দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রা কারসাজির মাধ্যমে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতা ও অন্যায় করে এসেছে। আমি আগেই সতর্ক করেছিলাম, যেকোনো দেশ যদি আমাদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে, তাহলে তার জবাবে আমরা আরও বেশি পরিমাণ শুল্ক আরোপ করব।’

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, ‘যদি চীন ৮ এপ্রিল-এর মধ্যে তাদের অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার না করে, তাহলে ৯ এপ্রিল থেকে ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর হবে।’ বিশ্বব্যাপী শুল্ক যুদ্ধের মধ্যে বেইজিংয়ের সংলাপের অনুরোধের বিষয়ে চীনের সঙ্গে সমস্ত আলোচনা বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছেন ক্ষুব্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি আরও বলেন, ‘যেসব দেশ মার্কিন আমদানি শুল্কের প্রেক্ষিতে প্রতিশোধমূলক শুল্ক চাপায়নি, তাদের আলোচনার সুযোগ দেয়া হবে। এছাড়াও, আমাদের সঙ্গে চীনের সমস্ত আলোচনা বাতিল করা হবে!’

আমেরিকার ওপর শুল্ক আরোপকারী দেশগুলোর ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পারস্পরিক শুল্ক আরোপের নির্দেশের পর গত ৭২ ঘণ্টা ধরে বিশ্বব্যাপী শেয়ার বাজার এবং তেলের দামে অনবরত পতন দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘এই শুল্ক শুধুই পারস্পরিক ভিত্তিতে—যারা আমাদের সঙ্গে যেমন করবে, আমরাও তাদের সঙ্গে তেমন করব।’

ট্রাম্প আক্রমণাত্মক সুরে বলেন, ‘চীন কয়েক দশক ধরে আমেরিকার বিরুদ্ধে শুল্কের নামে চরম অন্যায় করে আসছে।’ চীনের পাল্টা পদক্ষেপে তারা অতিরিক্ত ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা ট্রাম্পের আরোপিত শুল্কের সমান। তবে এই ঘটনার আগেই বেইজিং সতর্ক করেছিল, এই পারস্পরিক শুল্ক যুদ্ধে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির সংঘাত শুরু হতে পারে, যা হবে ‘বেদনাদায়ক’ এবং ‘কারও লাভ হবে না’। সূত্র: এনডিটিভি

mzamin

বিলুপ্তির ১২ হাজার বছর পর ডায়ার উলফের ‘পুনর্জন্ম’ ঘটালেন বিজ্ঞানীরা

আজ থেকে সাড়ে ১২ হাজার বছর আগে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু আর নয়। বিজ্ঞানের দৌলতে আবার তাদের পুনর্জন্ম হয়েছে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১২,৫০০ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডায়ার উলফ প্রজাতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। নেকড়ের যে দু’টি শাবক বৈজ্ঞানিক জগতে ঝড় তুলেছে তাদের নাম রোমুলাস ও রেমাস। তাদের বয়স মাত্র ছয় মাস, কিন্তু ইতিমধ্যেই তাদের উচ্চতা প্রায় চার ফুট এবং ওজন ৩৬ কেজিরও বেশি। টেক্সাসের একটি সংস্থা কলোসাল বায়োসায়েন্সেস এই অভাবনীয় কীর্তিটি সম্পন্ন করেছে।

প্রাণীর জিনগত পরিবর্তন নিয়ে কাজ করে থাকে সংস্থাটি। একটি প্রেস বিবৃতির মাধ্যমে সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়েছে, এটি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি মাইলফলক। অন্যান্য বিশেষ প্রজাতির প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে ফেরানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

‘নন-ইনভেসিভ ব্লাড ক্লোনিং’ কৌশল ব্যবহার করে কলোসাল বায়োসায়েন্সেস বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন নেকড়ে প্রজাতির দু’টি শাবকের সফলভাবে ক্লোন তৈরি করেছে। সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ডায়ার উলফের তিনি শাবকের জন্ম দেয়া হয়েছে। রোমুলাস এবং রেমাস পুরুষ এবং খালিসি মেয়ে। সংস্থার তরফ থেকে এক্স হ্যান্ডলে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময় পর পৃথিবীর বুকে ডাকছে ডায়ার উলফ। একসময় উত্তর আমেরিকার শিকারি প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম ছিল এই ডায়ার উলফ। এর বিশাল আকার, শক্তিশালী চোয়াল এবং ঘন পশম এই প্রাণীকে  অনন্য করে তুলেছিল।

কলোসাল বায়োসায়েন্সেস জানিয়েছে, তারা ১৩,০০০ বছর পুরনো একটি দাঁত এবং ৭২,০০০ বছর পুরনো একটি খুলি থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে সফলভাবে ডায়ার উলফের তিনটি শাবকের জন্ম দিতে পেরেছে।হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি) উভয়েরই জেনেটিক্সের অধ্যাপক এবং কলোসালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জর্জ চার্চ টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘ক্লোনিং-এর ধারণাটি আমাদের কাছে গেম চেঞ্জার বলে মনে হয়েছে।’

এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল কলোসাল বায়োসায়েন্সেসের জন্যই একটি বিশাল মাইলফলক নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে আধুনিক জিন-সম্পাদনা এবং ক্লোনিং প্রযুক্তির সাহায্যে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিদেরও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর আগে কলোসাল প্রাথমিকভাবে ম্যামথ, ডোডো পাখি এবং তাসমানিয়ান বাঘের পুনরুজ্জীবনের কাজ শুরু করলেও, ডায়ার উলফ ছিল তাদের প্রথম সফল বাস্তবায়ন। বর্তমানে এই ডায়ার উলফের শাবকগুলোকে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘেরাটোপে একটি সুরক্ষিত পরিবেশে রাখা হয়েছে। ড্রোন ও লাইভ ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের ওপর সারাক্ষণ নজরদারি করা হচ্ছে।  

সূত্র: এনডিটিভি

mzamin

ভাঙচুর-লুটপাটের নেপথ্যে কারা?

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কারা কেন এভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যই বা কি ছিল? সোমবার এসব ঘটনার পরপরই তৎপর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সারা দেশে ৫৬ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।  গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে- দেশে বিনিয়োগ সম্মেলন চলার সময় এভাবে বিদেশি মালিকানা প্রতিষ্ঠানে হামলা-লুটপাটে কারও উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এ ছাড়া চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুযোগ নেয়ার লক্ষ্যেও কোনো পক্ষ এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সোমবারের কর্মসূচিতে কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ছিল, তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও কর্মসূচিতে অংশ নেন। তাদের মিছিল-সমাবেশ থেকেই হামলা-ভাঙচুরে উস্কানি দেয়া হয়। পরে লুটপাটকারীরা সুযোগ নেয়।

সিলেটে ভাঙচুর-লুটপাটকারী কারা?
স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে জানান, সিলেটে রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ বলছে; ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তারা সবাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল। শুধু এই ১৪ জনই নয় আরও অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলছে। আপাতত পরিস্থিতি শান্ত। তবে ক্ষত চিহ্ন রয়ে গেছে নগরে। ঘটনায় ক্ষুব্ধ মানুষ। শুধু যে কেএফসি কিংবা বাটাতে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে তা নয়। রেস্টুরেন্ট, মিষ্টির দোকান, ফার্মেসিসহ নানা পণ্যের দোকানে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। নগরে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তাদের বাধা কোনো কাজেই আসেনি। শেষে সেনা সদস্যরা মাঠে নামায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সিলেটে। বন্দরের বাটা জুতার দোকানে লুট করতে ভেতরে ছিল ১৫-২০ জন যুবক। এমন সময় সেনা সদস্যরা সেখানে যান। তারা যেতেই পালাচ্ছিলো লুটপাটকারীরা। সব ঘটনারই ভিডিও ছবি আছে।

এজন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পুলিশের জন্য সহজ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জিয়াউল হক। তিনি বলেন- ঘটনার পরপরই পুলিশ সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। এরপর আসামিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। সোমবার বিকাল থেকেই ঘটনা শুরু। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে সিলেট নগরীর মীরবক্সটুলা এলাকায় কেএফসি পরিদর্শন করেছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. রেজাউল করিম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- যারাই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পুলিশ কমিশনারের কথার সত্যতা রাতে মিলেছে। সন্ধ্যার পর থেকেই পুলিশ অভিযান শুরু করে। আর এই অভিযানে ধরা পড়ে কয়েকজন চিহ্নিত আসামি। কেউ কেউ আবার লুটের ছবি নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দেন। উল্লাসের দৃশ্য দেখান।

যারা পোস্ট দিয়েছেন তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। চৌহাট্টার আল পাইন রেস্টুরেন্ট। জাসদ নেতা জাকির আহমদের মালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী এই হোটেল। সেখানেও হামলা, লুটপাট হয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি জানান- ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেছেন। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। সিলেট নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ মহানগর নেতারা বিকালে ট্রাক নিয়ে নগরে নামেন। যেখানেই লুটপাটের দৃশ্য দেখেছেন সেগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। কয়েস লোদী মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে বিকালে সিলেট বিএনপি’র তরফ থেকে মিছিল বের করা হয়। এ মিছিলটি আম্বরখানা এলাকায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে শেষ হয়ে নেতাকর্মীরা যার যার বাড়ি চলে যান। এই সময় খবর আসে ভাঙচুরের। প্রথমে আমরা শুনতে পারি হাউজিং এস্টেট, আম্বরখানা এলাকায় ভাঙচুর হচ্ছে।

এ খবর পেয়ে আমিসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করি। এরপর আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙচুরের খবর পাই। তিনি বলেন- একের পর এক খবর আসতে থাকায় বিএনপি’র নেতাকর্মীরা নগরে নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীরা কাজ করেছেন। এদিকে- ভাঙচুরের খবর পেয়ে সিলেটের সাবেক মেয়র ও বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নগরে নামেন। লুটপাট ঠেকাতে তিনি নগরবাসীকে সোচ্ছার হওয়ার আহ্বান জানান। সন্ধ্যায় তিনি সিলেটের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন অভিযোগ করেন- কেএফসি ভাঙচুর করার পরপরই কিছুসংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল যুবক মুখে কাপড় বেঁধে নগরে তাণ্ডব শুরু করে। তারা শুধু তাণ্ডব চালায়নি, লুটপাটও করেছে।

এতে করে ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে দাবি করেন তিনি। সাবেক মেয়র আরিফ ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন- যারা ভাঙচুর করছে তারা দুর্বৃত্ত। সম্মিলিতভাবে সবাইকে এক হয়ে ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলতে হবে। না হলে সিলেটের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এজন্য সিলেট বিএনপি পরিবারের প্রতিটি সদস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি। সিলেটে ভাঙচুর করলো কারা?- এটি এখন প্রশ্ন। কারা ভাঙচুর করেছে সেটি নিয়েও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মুখ বন্ধ। তবে রাজনৈতিক নেতারা জানিয়েছেন- বিকালে নগরে সভা শেষে একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করে। আর এই প্রতিবাদ মিছিল বের করার পরপরই নগরের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে।

ওই মিছিল থেকে কর্মীরা এসে মুখে কাপড় বেঁধে ভাঙচুর শুরু করে। কেউ কেউ বলছেন; পরাজিত শক্তিরা প্রতিবাদ কর্মসূচির আড়ালে সিলেটকে অশান্ত করতে এই ভাঙচুর করেছে। তারা বিভিন্ন গ্রুপের ভাগ হয়ে এ মিশনে অংশ নেয়। সেনা সদস্যরা মাঠে নামার পর তারা চলে যায়। এদিকে- নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক রাতে নগরব্যাপী ট্রাকযোগে মাইক নিয়ে সচেনতার লক্ষ্যে নগর বিএনপি’র পক্ষ থেকে প্রদক্ষিণ করা হয়। ফিলিস্তিন ও ইসরাইল ইস্যুতে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা না করে শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য সিলেটবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্‌ সিদ্দিকী। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন- আমরা কোনো যুদ্ধ বা বিশৃঙ্খলা চাই না। আমরা সর্বত্র শান্তি চাই। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে সিলেটের তথা দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে, এদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। যারাই সুযোগ নিয়ে সিলেটের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে চায় তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাই।

গ্রেপ্তার হলো যারা: সিলেটে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলো- কাজীটুলা এলাকার মো. রাজা মিয়ার ছেলে মো. রাজন, একই এলাকার আরব আলীর ছেলে ইমন, দীন ইসলামের ছেলে মো. রাকিব, লাল সাদ আহমদের ছেলে মিজান আহমদ, সওদাগরটুলা এলাকার মৃত আবুল বাশার মিয়ার ছেলে মো. আব্দুল মোতালেব, গোয়াইটুলা এলাকার লিয়াকত আলীর ছেলে সাব্বির আহমদ, কোম্পানীগঞ্জের ফরিদ মিয়ার ছেলে জুনাইদ আহমদ, মিরের ময়দান এলাকার মৃত মোস্তফা মিয়ার ছেলে মো. রবিন মিয়া,  শাহী ঈদগাহ এলাকার মো. মহছন আহমদের ছেলে মোস্তাকিন আহমদ তুহিন, দরগাহ গেইট এলাকার আব্দুল ছাত্তারের ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেন, শেখঘাট এলাকার শামীম আহমদের ছেলে মো. রিয়াদ, বালুচর নতুন বাজার এলাকার দুলাল মিয়ার ছেলে মো. তুহিন, বটেশ্বর বাজারের সেলিম রেজার ছেলে আল নাফিউ এবং নোয়াখালীর চাদমিল থানার পশ্চিম নাহার কিল গ্রামের সৈয়দ আলতাফ মানিকের ছেলে সৈয়দ আল আমিন তুষার।

খুলনায় হামলাকারীদের নিয়ে যা বললেন প্রত্যক্ষদর্শীরা:   
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, খুলনার শিববাড়ি মোড়ে হোটেল টাইগার গার্ডেনে অবস্থিত বাটা শোরুম ও ময়লাপোতা মোড় এলাকায় কেএফসিতে  বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। বর্তমানের শোরুমটি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ, র?্যাব এবং যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে বাটা শোরুমের সামনে পুলিশ এবং র?্যাবের সদস্যরা অবস্থান করছে। এ ঘটনায়  সিসি ফুটেজ দেখে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অন্তর নামে বাটার একজন কর্মচারী বলেন, মাগরিবের নামাজের পর দেড়শ’ থেকে দুইশ’ বিক্ষুব্ধ জনতা শোরুমের  ভেতর ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় শোরুমের ম্যানেজার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বাধা দিতে গেলে তাকে মারধর করে আহত করা হয়। এ ছাড়া একজন নিরাপত্তাকর্মীও আহত হয়েছেন। হামলাকারীদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা টোকাই শ্রেণির লোক আবার  কিছু লুটপাটকারী ঘাট এলাকার শ্রমিক মনে হচ্ছিল।

তিনি বলেন, হামলাকারীরা এ সময় শোরুমের ৮০ শতাংশ মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায় যার আনুমানিক মূল্য ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া হামলাকারীরা শোরুমের অধিকাংশ আসবাবপত্র, চেয়ার, টেবিল, গ্লাস, কম্পিউটার ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। একইভাবে অভিজাত রেস্টুরেন্ট কেএফসি ভাঙচুর লুটপাট করার সময় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে দেখা যায়।

সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে বাটার শোরুমটি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। শোরুমের সামনে পুলিশ এবং র?্যাবের সদস্যরা অবস্থান করছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) আহসান হাবীব  বলেন, ভাঙচুর ও লুটপাট হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে রাতভর অভিযান চালিয়ে ৩১ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারে বিক্ষোভ থেকে একদল যুবক ইটপাটকেল মারা শুরু করে:
স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার থেকে জানান, ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল থেকে পাঁচ প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের পর প্রশ্ন উঠেছে, কারা করেছে এ ঘটনা? তৌহিদি জনতার ব্যানারে মূলত এই বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সমন্বয়কদের একটি অংশ। কিন্তু তাদের মিছিল থেকেই এ ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল।
খোদ কেন্দ্রীয় বিএনপি’র শীর্ষ নেতা ও কক্সবাজার সদর রামু আসনের সাবেক এমপি লুৎফুর রহমান কাজল তার ফেসবুক ওয়ালে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, “ফিলিস্তিনের পক্ষে অহিংস কর্মসূচি পালন করুন। ঢাকায় বহুজাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন হচ্ছে। বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার জন্য, ভাঙচুর লুটপাটেরউস্কানিতে ষড়যন্ত্রকারীরা জড়িত আছে কিনা?

আরেক ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মিছিলের নেতৃত্বে ছিল শিবির ও তাদের অনুসারী সমন্বয়ক নেতারা। আগে পিছে পুলিশও ছিল। বাইর থেকে কেউ মিছিলে ঢুকে ভাঙচুর করার সুযোগ নেই। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাটি পরিকল্পিত এবং তা মিছিলে অংশগ্রহণকারীরাই করেছে।
এদিকে কক্সবাজার শহরে ৫টি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ছবি দেখে শনাক্ত করে তাকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আটক ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ হাসিম। তিনি সদরের ভারুয়াখালীর বাইন্না পাড়ার বাসিন্দা।
এদিকে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মিছিল থেকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিক্ষোভকারীরা। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকেই হোটেল মোটেল জোনের এ ঘটনাকে স্যাবোটাজ হিসেবে দেখছেন। পর্যটন ব্যবসায় বিপর্যয় ঘটাতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার জেলা রেস্তরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ ইকবাল জানিয়েছেন, ইসরাইলি পণ্য রাখার অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল থেকে কিছু উশৃঙ্খল লোকজন কেএফসি, পিজ্জা হাট, কাঁচা লঙ্কা, পানশি রেস্টুরেন্ট, মেরিন ফুড রেস্টুরেন্টে ভাঙচুর চালিয়েছে। তার মতে, বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিলে কিছু দুর্বৃত্ত ঢুকে পড়ে এবং তারা পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর চালিয়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা-ই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস খান জানিয়েছেন, জনতার মিছিল থেকে ঢিল ছুড়ে মারার ঘটনায় ১ জনকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এসব ঘটনায় অন্যকোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা তা গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।  

বরিশালে মিছিলের একটি অংশ কেএফসিতে হামলা চালায়:
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, বরিশালে কেএফসিতে ভাঙচুর নিয়ে কোনো গ্রেপ্তার নেই। স্থানীয়রা জানিয়েছেন কেএফসিতে হামলার আগে সেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন নামাজ পড়েছেন। এর পরপরই হামলার ঘটনা ঘটে।

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে সোমবার বরিশালে গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা কর্মসূচি পালনকালে বগুড়া রোডস্থ কেএফসিতে হামলার ঘটনাটি ঘটে। ছাত্র জনতার ব্যানারে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও সড়কে নামাজ আদায়সহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে দিনভর কর্মসূচি পালন করেন। এসময় বিক্ষুব্ধরা ইসরাইলকে অর্থ সহায়তা দেয়ার অভিযোগে কেএফসির বরিশাল ব্রাঞ্চে ভাঙচুর চালান। মিছিল থেকে একটি অংশ ধেয়ে যায় কেএফসির দিকে। কেএফসির কার্যক্রম বরিশাল থেকে সরিয়ে নেয়ার দাবি জানায়। তারা কেএফসির দেয়ালে ‘বয়কট কেএফসি’ লিখে দেয়। এরপর সড়কে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করে আন্দোলনকারীদের কয়েকজন। এরপর কয়েকজন দ্রুত দোতালায় উঠে পড়ে। সেখান থেকে কেএফসি’র নিয়ন সাইনবোর্ড ভাঙার চেষ্টা করে। সেনাবাহিনীর একটি দল দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। তারা কেএফসি থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয়।

গাজীপুরে বাটা শোরুমসহ হোটেল ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রেপ্তার ৪:
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে জানান, গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় ইসরাইলের বর্বরতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলের সময় পূর্ব পূর্বপরিকল্পিতভাবে তৃপ্তি হোটেল, রাধুনী হোটেল এবং বাটা কোম্পানি ডিলারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নাশকতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন,  সিয়াম খান (অনিক),  শিমুল আহাম্মেদ শাওন,  শাহীন ও  জয়নাল আবেদীন। এ ব্যাপারে গাছা থানায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সহকারী উপ-কমিশনার হাফিজুল ইসলাম।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গতকাল দুপুরে বোর্ডবাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ইসরাইালি আগ্রাসনবিরোধী মিছিল বের হয়। মিছিলের সুযোগ নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত এসব নাশকতা ও লুটপাট চালায়।  খবর পেয়ে  থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীতে এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গাছা থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরে থানা পুলিশ এবং সেনাবাহিনী সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ ব্যাপারে গাছা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

হামলা-লুটপাটে জড়িত ৫৬ জন গ্রেপ্তার:
গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ চালাকালে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি মামলা দায়ের হয়েছে। গতকাল বিকালে বাংলাদেশ ইনভেস্ট সামিট-২০২৫ এর এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, গতকালের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া চারটি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

এর আগে সোমবার রাতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দোষীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। আইজিপি বলেন, আমাদের কাছে হামলাকারীদের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে এবং অতিদ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশ টিম এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। সরকার কোনো আইনসম্মত প্রতিবাদে বাধা দেয় না। তবে প্রতিবাদের নামে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশ্‌ত করা হবে না।

mzamin
সোমবার সিলেট শহরতলীতে কেএফসি ভাঙচুর -ফাইল ছবি

আমেরিকায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে চীন by মাইকেল বার্নার্ড

২০২৫ সালের এপ্রিলে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পারস্পরিক শুল্ক আরোপ নিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের রাতের ঘুম হারিয়ে যেতে বসেছে তখন চীন তথাকথিতভাবে শান্ত থেকে আমেরিকায় বোল্টের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।   বোল্টগুলো ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, টাংস্টেন, ইন্ডিয়াম এবং ইট্রিয়াম দিয়ে তৈরি- যে উপাদানগুলো ছাড়া আপনার বৈদ্যুতিক গাড়ি চলবে না, আপনার যুদ্ধবিমান উড়বে না, এমনকি সৌর প্যানেলগুলোর জন্যও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, টাংস্টেন, ইন্ডিয়াম এবং ইট্রিয়াম হলো খনিজ পদার্থ যা বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে অথবা ক্লিনটেক প্রকল্পগুলো নিঃশব্দে  বাতিল হওয়ার আগে থেকেই আলোচনায় ছিল।

সম্প্রতি আমি খনিজ পদার্থ সম্পর্কে এবং আমাদের অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছি। বৃটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে-এর ক্রিটিক্যাল মিনারেল ইন্টেলিজেন্স সেন্টারের পরিচালক গ্যাভিন মাডের সাথে আমার ৯০ মিনিট সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। কথা বলে আমি জানতে পেরেছি শক্তি-প্রযুক্তির এই সংমিশ্রণ ছাড়া মহাকাশে ক্ষমতা পুনর্নির্মাণ করা পশ্চিমাদের জন্য কতটা কঠিন। চীনের পদক্ষেপ আমাকে আরও গভীরে যেতে সাহায্য করেছে। আমি লাইল ট্রিটেনের নিকেল নার্ড-এর সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। যার খনিজ উত্তোলন এবং প্রক্রিয়াকরণের ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ার বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ।

চীন যা করেছে তা কোনও নিষেধাজ্ঞা ছিল না, অন্তত নামে নয়। তারা এটিকে রপ্তানি লাইসেন্সিং বলে উল্লেখ করেছে। আসলে এটি ছিল একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এই লাইসেন্সগুলো বেইজিংকে কেবল এই উপকরণগুলো কোথায় যায় তা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেয় না, বরং কত দ্রুত, কত পরিমাণে এবং কোন রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক গ্রাহকদের কাছে যায় তার উপরও নিয়ন্ত্রণ দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। তাদের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে গেলে ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, টাংস্টেন, ইন্ডিয়াম এবং ইট্রিয়াম দিয়ে তৈরি   বোল্টগুলোর  চূড়ান্ত ব্যবহারের স্থানও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে শেষ ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। চীন দশকের পর দশক ধরে এই সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর তার আধিপত্য গড়ে তুলেছে।  যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আউটসোর্সিংয়ের দিকে মনোনিবেশ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহের ক্ষেত্রে চীন যেসব উপকরণ নিষিদ্ধ করেছে, সেগুলো হঠাৎ করে নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়।  ঠান্ডা মাথায় নির্ভুলতার সাথে বিবেচনা করে তবে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মার্কিন পণ্যের স্পেসিফিকেশন শিটে প্রথম যে নামটি আসে সেটি হলো ডিসপ্রোসিয়াম। যদি আপনার বৈদ্যুতিক মোটরকে উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করতে হয় তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিসপ্রোসিয়ামযুক্ত নিউওডিয়ামিয়াম চুম্বক ব্যবহার করা হয়। ডিসপ্রোসিয়াম না থাকলে তাপীয় স্থিতিশীলতা আসে না। চীন মূলত ডিসপ্রোসিয়ামের সম্পূর্ণ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এটিকে বিদ্যুতায়নের মেরুদণ্ড বলা যেতে পারে। এই মুহূর্তে চীন সেই মেরুদণ্ডকে ধরে রেখেছে।

তারপর আছে টাংস্টেন। যে ধাতু বুলেটকে বুলেটপ্রুফ করে। আক্ষরিক অর্থেই। কিছু কাটতে, ড্রিল করতে, বা ভেদ করতে এটিকে ব্যবহার করা হয়। ওবামা প্রশাসনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এর উৎপাদনে মনোনিবেশ  করেনি এবং চীন বিশ্বব্যাপী উৎপাদনের ৮০ শতাংশ অর্জন করে। আপনি ভিয়েতনাম বা পর্তুগাল থেকে টাংস্টেন আনতেই পারেন তবে তার জন্য গুনতে হবে তিন গুণ টাকা। টাংস্টেন কেবল গোলাবারুদে ব্যবহার হয় না। এটি সেমিকন্ডাক্টর চিপ, সিএনসি মেশিন টুলস এবং উচ্চ-কার্যক্ষমতাসম্পন্ন অ্যালয়গুলোর সার্কিট তৈরিতে কাজে লাগে। জেট ইঞ্জিন থেকে শুরু করে ডিপ-ড্রিলিং রিগ পর্যন্ত সবকিছুতে এর ব্যবহার রয়েছে।

ডিসপ্রোসিয়ামের মতো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ টার্বিয়াম। আপনি কি আপনার ইভি এবং অফশোর উইন্ড টারবাইনে উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন মোটর চান? নাইট-ভিশন গগলস, সোনার সিস্টেম, ম্যাগনেটোস্ট্রিকটিভ অ্যাকচুয়েটরেও লাগবে  টারবিয়াম। ডিসপ্রোসিয়ামের মতো, টারবিয়াম প্রায় একচেটিয়াভাবে চীনা খনি থেকে আসে, সেখানেই প্রক্রিয়াকরণ করা হয় এবং চীনা আমলাদের থেকে তার লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়। ইন্ডিয়ামও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি স্বচ্ছ পরিবাহী যা আপনার স্ক্রিনগুলিকে আলোকিত করে, আপনার ফাইবার অপটিক্স যোগাযোগ সংঘটিত করে। ইন্ডিয়াম ছাড়া, টাচস্ক্রিন ফোনগুলো আদতে পেপারওয়েট হয়ে যায় এবং ৫জি বেস স্টেশনগুলো কর্মক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে  ইন্ডিয়াম উৎপন্ন হয় না। কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান কিছু উৎপাদন করলেও, বিশ্ব বাজার এখনও চীনা সরবরাহের উপর নির্ভরশীল।

তারপর আছে ইট্রিয়াম। এই উপাদানটি  ছাড়া উচ্চ-তাপমাত্রার জেট ইঞ্জিনের আবরণ কাজ করে না, উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি রাডার সিস্টেম টিউন করে না এবং  লেজারগুলো  সারিবদ্ধ হয় না। এটি  টারবাইন ব্লেডের উপর তাপীয় বাধার  আবরণ হিসেবে কাজ করে  যা বিমানের ইঞ্জিনগুলোকে উড্ডয়নের মাঝখানে গলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। সাশ্রয়ী মূল্যের বিমান বানাতে গেলে ইট্রিয়াম ছাড়া তা বানানো সম্ভব নয়। এই খনিজটিও মেলে চীনা মাটিতে। সুতরাং এই খনিজগুলো ছাড়া প্রতিরক্ষা খাত অনেকটাই পঙ্গু হয়ে যাবে। এটা কেবল আপনি পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবেন কিনা তার প্রশ্ন নয়। আপনার পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্রটি সোজা উড়ে যাবে কিনা, নির্দিষ্ট জায়গায় আঘাত করবে কিনা  এবং তাপের প্রভাবে ভেঙে পড়বে কিনা সেই প্রশ্নও উত্থাপন করে।

তারপর আছে সেমিকন্ডাক্টর। সবাই চিপস নিয়ে কথা বলতে ভালোবাসে কিন্তু কেউ উল্লেখ করে না যে আপনার উন্নত চিপস ইন্টারকানেক্টের জন্য টাংস্টেন এবং উচ্চ-গতির অপটোইলেকট্রনিক ইন্টারফেসের জন্য ইন্ডিয়াম প্রয়োজন। সেমিকন্ডাক্টর ছাড়া কেউ ৫জি অবকাঠামো তৈরি করতে পারবে না। চীন এক্ষেত্রে কৌশলগত দর কষাকষির অন্যতম মাধ্যম। মার্কিন উন্নত সামরিক ব্যবস্থা? তাদেরও চিপসের প্রয়োজন। এরপরই আসছে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি বা ক্লিন টেকনোলজি এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের দেশীয় বাজারের জন্য ইভি, সৌর প্যানেল এবং বায়ু টারবাইন তৈরির স্বপ্নকে কঠিনভাবে আঘাত করতে চলেছে। ডিসপ্রোসিয়াম এবং টার্বিয়াম ছাড়া, আপনার ইভি মোটরটির কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। টেলুরিয়াম ছাড়া, ফার্স্ট সোলারের ক্যাডমিয়াম-টেলুরাইড প্যানেল- যা মার্কিন সৌর উৎপাদনের গর্ব-নির্মাণের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ইট্রিয়াম ছাড়া অফশোর বায়ু প্রকল্পের টারবাইন ব্লেডলোর আয়ুষ্কাল কমে যায়।  

অর্থনৈতিক প্রভাবও মাথায় রাখতে হবে। এই উপকরণগুলোর দাম ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে এবং মোটরগাড়ি সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা বাজেট পর্যন্ত সবকিছুতেই খরচ বাড়তে শুরু করেছে। ছয় মাস আগে কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা সাহায্য করতে আগ্রহী ছিল, যদিও তারা রাতারাতি চীনকে প্রতিস্থাপন করতে পারেনি। এখনও সময় আছে সঠিক পথ বেছে নেয়ার, যদিও তা অসম্ভব। এর জন্য ট্রাম্পকে প্রথমে তার মার্কিন অর্থনীতি ধ্বংসকারী, মন্দা সৃষ্টিকারী, শত্রু উৎপন্নকারী শুল্কনীতি প্রত্যাহার করতে হবে এবং সেই বাণিজ্য চুক্তিগুলোতে ফিরে যেতে হবে যা যুক্তরাষ্ট্রর জন্য এতদিন  অবিচ্ছেদ্য ছিল। পরিশেষে বলা যায়, চীন ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু উপাদানের মার্কিন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো ঠাণ্ডা মাথায় পারস্পরিক শুল্ক নিয়েই ভেবে যাচ্ছে।

সূত্র : ক্লিনটেকনিকা

mzamin

নোঙর কোথায় ফেলবেন আরিফ by ওয়েছ খছরু

সিলেটের রাজনীতিতে বরাবরই রহস্য জিইয়ে রাখেন বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। কখন কি করেন সেটি বলা মুশকিল। তার দাবার ঘুঁটি থ্রি-সিক্সটি ডিগ্রিও ঘুরে যায়। সাবেক মেয়র কামরান তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ওই সময়ে তিনি নিজেকে নিয়ে বাজি ধরেন সিলেট সিটি নির্বাচনের ভোটের মাঠে। স্রোতের বিপরীতে থেকেও জয় ছিনিয়ে নেন। যদিও বলা হয়, আওয়ামী লীগের তৎকালীন মন্ত্রী পরিবারের ছায়া তার ওপর ছিল। বন্যায় সিলেটে পরিদর্শনে আসা তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরিফের প্রশংসা করে গিয়েছিলেন। সেই আরিফ ২০২৩ সালের মে মাসে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে নিজেই রহস্যময় হয়ে উঠেছিলেন। কী করবেন তিনি। একদিকে জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে দলের সিদ্ধান্ত। মেয়র প্রার্থী হবেন কি হবেন না, সে নিয়ে চারদিকে তুমুল আলোচনা। বিএনপি তাকিয়ে ছিল আরিফের সিদ্ধান্তের দিকে। অবশেষে আরিফ দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ভোটের মাঠ থেকে সরে গেলেন। থেকে গেলে লাভবান হলেও হতে পারতেন। আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বেশিদিন টিকেননি। গণ-অভ্যুত্থানের পর পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে। জয় না পেলেও এখন তার সেই সুযোগ ছিল। সব কিছু বিসর্জন দিয়ে বিএনপি’রই হয়ে থাকলেন আরিফ। নিলেন না ঝুঁকি। সিলেটে সম্প্রীতির রাজনৈতিক পরম্পরায় সবসময় কেউ না কেউ জনগণের জন্য দুয়ার খোলা রাখেন। যেমনটি একসময় রেখেছিলেন বাবরুল হোসেন বাবুল, আফম কামাল ও সর্বশেষ বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। এমএ হকও ছিলেন সবার গ্রহণযোগ্য নেতা। বাবুল ছাড়া এখন কেউ বেঁচে নেই। অসুস্থতায় কাবু বাবুল এখন আমেরিকার বাসিন্দা। ফলে ৫ই আগস্টের পর সিলেটে এখন যে একটি দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত সেটি হচ্ছে আরিফুল হক চৌধুরীর বাসা। দলমত নির্বিশেষে সিলেটের মানুষ যেকোনো প্রয়োজনে তার কাছে ছুটে যান। পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা ব্যস্ত আরিফুল হক চৌধুরী। গোটা জেলার যখন যেখানে প্রয়োজন তিনি ছুটছেন। নিজের দল বিএনপি’র সব প্রয়োজনে থাকছেন অগ্রভাগে। জাতীয় নির্বাচন সামনে। সিলেট বিএনপি’র নেতারা ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই অবস্থায় এবার আরও রহস্যময় আরিফুল হক। অবারিত সুযোগ সামনে। কিন্তু পলিসির কথা বলছেন না। তার ভাষ্য, সময় এলেই জানতে পারবেন। সিলেট নগর নিয়ে ব্যস্ত এখন। নগরের সব প্রয়োজনে তিনি মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। প্রশাসন থেকে ডাক এলে সহযোগিতা করছেন। তবে সিটি নির্বাচনে ফের মেয়র প্রার্থী হবেন কিনা- সেটি এখনো পরিষ্কার করেননি। সিটিতে তার শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। বিএনপি’র বর্তমান পদবিধারী নেতারাও বসে নেই। অনেকেই চাচ্ছেন বিএনপি’র হয়ে মেয়র প্রার্থী হতে। এর মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সাবেক প্যানেল মেয়র ও নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। এ ছাড়া আরও কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে। তারাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। সবার শঙ্কায় আরিফ। যদি তিনি প্রার্থী হন দল ও ভোটের মতামত তার পক্ষেই বেশি যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন নেতারা। এমপি হওয়ারও সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে আরিফুল হক চৌধুরীর সামনে। সিলেট-৪ আসনে ইতিমধ্যে তাকে নিয়ে তুমুল আলোচনা। গত ৭-৮ মাস ধরে ওই আসনে দলীয় অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়ে যাচ্ছেন আরিফ। তবে প্রার্থী হওয়া নিয়ে তার মুখবন্ধ। এ আসনে এক সময় প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। তখন আরিফ ছিলেন সাইফুরের সঙ্গী। ফলে এ আসনের দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ রয়েছে আরিফের। আসনের নানা বিরোধপূর্ণ কর্মকাণ্ডে তিনি ইতিমধ্যে পাশে দাঁড়িয়েছেন। হরিপুরে আলেম উলামাদের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে তিনি উদ্যোগী হয়ে সালিশের মাধ্যমে ঘটনার নিষ্পত্তি ঘটান। এবার সেনাবাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় স্থানীয়রা তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিষয়টি সমাধানে আগ্রহ দেখাননি আরিফুল হক চৌধুরী। এ আসনের রাজনৈতিক নেতাদের মতে, আরিফুল হক চৌধুরী প্রার্থী হলে কোনো হিসেবই ধূপে টিকবে না। তার পক্ষে ইতিমধ্যে বিএনপি’র ঘরানার নেতাকর্মীরা একাট্টা। এ আসনে বিএনপি’র টিকিট চাইতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন নগর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, বিএনপি থেকে পদত্যাগকারী কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান, জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি আব্দুল হেকিম চৌধুরী। এ ছাড়া, জামায়াত থেকে জেলার সেক্রেটারি জেনারেল জয়নাল আবেদীন, জমিয়ত থেকে এডভোকেট মোহাম্মদ আলী, খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি আলী হাসান ওসামাও প্রস্তুতি চালাচ্ছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে সিলেট-১ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ আসনকে কেন্দ্র করে তিনি সিলেটের রাজনীতি করছেন। জেলা ও নগর বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে একাট্টা। ঘনিষ্টজনরা জানিয়েছেন, এ আসনের দিকেও চোখ রয়েছে আরিফের। সবকিছু নির্ভর করবে দলের সিদ্বান্তের উপর। আগামীতে কোথায় নোঙর ফেলবেন আরিফুল হক চৌধুরী সেই রহস্য তিনি এখনো খোলাসা করছেন না। জানালেন, সময় এলেই বোঝা যাবে। দল যেখানে ভালো মনে করবে, সেখানেই কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছেন তিনি। আপাতত সিলেটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দলকে চাঙ্গা করার কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান। 
mzamin

জুলাই সনদের আলোকে আগামী নির্বাচন -আলী রীয়াজ

রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও জনমতের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন যে জুলাই সনদ প্রকাশ করতে যাচ্ছে তার আলোকেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ। মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় সংসদের এলডি হলে নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বিকাল ৩টার পর নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে বৈঠকে বসে ঐকমত্য কমিশন। নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর চৌধুরী দীপুর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেন।

আলী রীয়াজ বলেন, স্বাধীনতা- উত্তর এই প্রথমবারের মতো আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সকলের অংশগ্রহণের একটা পথ-পদ্ধতি তৈরি করেছি। এটা সম্ভব হয়েছে এ দেশের গণমানুষের সংগ্রামের কারণে ও রাজনৈতিক দলের জন্য, যার অন্যতম অংশীদার নাগরিক ঐক্য। আমরা আশা করছি এই প্রক্রিয়াটা (আলোচনার) অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে আমরা একটা জায়গায় দাঁড়াতে পারবো, যেখানে আমরা একটা জাতীয় সনদ তৈরি করতে পারবো। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ জুলাই ১৪ তারিখ পর্যন্ত, আমরা এর মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করতে চাই। এর একটি অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে- জুলাই সনদ, যাতে আগামীর বাংলাদেশের একটি পথরেখা তৈরি হয়। এরই একটি অংশ হিসেবে নির্বাচন হবে।

তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে জুলাই সনদের একটা বড় রকমের ভূমিকা থাকবে। জাতীয় সনদের একটা বড় রকমের ভূমিকা থাকবে, এটা আমরা আশা করি। আমরা পথ খুঁজছি যাতে করে আমাদের লক্ষ্যগুলো অর্জনের পথ আমরা সুনির্দিষ্ট করতে পারি। একত্রে অগ্রসর হতে পারি, ঐক্যের মধ্য দিয়ে আমরা অগ্রসর হতে পারি।

আলোচনায় নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর চৌধুরী দীপু বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার আর গণতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা, এগুলো শুধু মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। চুয়ান্ন বছর পার হওয়ার পরে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার সে উদ্যোগটা নিয়েছে, এই উদ্যোগটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র, মানুষের আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার, সুশাসনের অধিকার অর্থাৎ শতভাগ গণতন্ত্র মানুষ অর্জন করতে পারবে।

ছক আকারে ঐকমত্য কমিশনের মতামত চাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আপনাদের দেয়া স্প্রেড শিটে আমরা ১৬৬ টার মধ্যে ১১৪টাতে (সুপারিশ) একমত হয়েছি, ১১টিতে আংশিক একমত হয়েছি। বাকিগুলোতে একমত হতে পারিনি। আশা করি আলোচনায় আপনাদের ব্যাখ্যা জানতে পারবো।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু করে। এতে সহ-সভাপতি হিসেবে রয়েছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

mzamin

ইসরায়েলের বন্দী নির্যাতন: ‘গায়ে আগুন দেওয়ার পর তা নেভাতে আমি পশুর মতো এদিক-ওদিক ছুটছিলাম’

ইসরায়েলের কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীরা সেখানকার সেনাসদস্য ও কারাকর্মীদের দুর্ব্যবহার ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন বিবিসির কাছে। দেশটির সেনাব্যারাক ও বিভিন্ন কারাগারে বন্দী নির্যাতন নিয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশিত খবরগুলোর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হলো এ প্রতিবেদন।

মুক্তি পাওয়া বন্দীদের একজন মোহাম্মদ আবু তাইলেহ। ৩৬ বছর বয়সী গাজার বাসিন্দা তাইলেহ একজন মেকানিক। তিনি বলছিলেন, বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে আগুন ধরে যায় শরীরে। এরপরের ঘটনা তিনি বর্ণনা করেন এভাবে, ‘গায়ে আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেষ্টায় আমি পশুর মতো এদিক-ওদিক ছুটছিলাম।’

বিবিসি জানায়, মুক্তি পাওয়া বন্দীদের মধ্যে পাঁচজনের বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছে তারা। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস পর ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। ইসরায়েলের ‘আনলফুল কমব্যাট্যান্টস ল’–এর অধীন গ্রেপ্তার করা হয় এই ফিলিস্তিনিদের। এ আইনে দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি, এমন ব্যক্তিদের কোনো অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক করার বিধান আছে।

মুক্তি পাওয়া ওই পাঁচজন বলেছেন, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ করা হয়েছিল। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকাকালে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গাজায় ইসরায়েলি জিম্মিদের অবস্থান ও বিভিন্ন সুড়ঙ্গ সম্পর্কে। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলার সঙ্গে তাঁদের যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ পায়নি কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় তাঁরা মুক্তি পেয়েছেন।

এই ফিলিস্তিনিদের কেউ কেউ ইসরায়েলিদের হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করেছেন। তাঁরা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও ইসরায়েলি কারা সার্ভিসের (আইপিএস) কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তাতে সাড়া দেয়নি।

বন্দীদের দেওয়া সাক্ষ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ

সাক্ষাৎকার দেওয়া বন্দীদের প্রত্যেকে বিবস্ত্র হওয়া, চোখ বাঁধা, হাতকড়া পরানো ও মারধরের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

এই ফিলিস্তিনিরা কেউ কেউ এ-ও বলেছেন, তাঁদের বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, কুকুর দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে। অসুস্থ হলেও তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলেছেন, তাঁরা চোখের সামনে মরতে দেখেছেন অন্য বন্দীদের।

একজন বলেছেন, তিনি বন্দীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে দেখেছেন। অপর একজন বলেন, তাঁর মাথা রাসায়নিক পদার্থে চুবানো হয় এবং শরীরের পেছনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ড. লরেন্স–হিল কোথর্ন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ল’–এর সহপরিচালক। তিনি বলেন, ‘এই ব্যক্তিরা নির্যাতনের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক আইন ও ইসরায়েলি আইন উভয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’

লরেন্স হিল-কোথর্ন বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সশস্ত্র সংঘাত নিয়ে থাকা আইনে সব বন্দীকে মানবিকভাবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বন্দীদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা কোনো ধরনের অপরাধ বা ত্রুটির অভিযোগেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।’

বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেওয়া পাঁচ ফিলিস্তিনিকে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আওতায় এ বছরের শুরুর দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল। গাজা থেকে ৩৩ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৯০০ ফিলিস্তিনি বন্দীকে ছেড়ে দিয়েছে। ৩৩ জনের মধ্যে জীবিত ফিরেছেন ২৫ জন। বাকি আটজনের মরদেহ হস্তান্তর করেছে হামাস।

সাক্ষাৎকার দেওয়া পাঁচ ফিলিস্তিনির সবাই একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন—তাঁদের গাজা থেকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে সামরিক ব্যারাকে নেওয়া হয়। পরে কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক মাস পর ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁরা বলেছেন, গ্রেপ্তার করা থেকে মুক্তি—এ প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে নির্যাতন করা হয়েছে তাঁদের।

গাজায় ফেরত আসা ফিলিস্তিনি বন্দীদের মধ্যে আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তাঁরাও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে ও কারাগারে থাকাকালে মারধরের শিকার হওয়া, ক্ষুধার কষ্ট ভোগ করা ও অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন বে’তসালেম ও জাতিসংঘকে মুক্তি পাওয়া অন্য ফিলিস্তিনি বন্দীদের দেওয়া সাক্ষ্যের সঙ্গে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্যের মিল রয়েছে। বে’তসালেম ও জাতিসংঘ গত বছরের জুলাই মাসে ফিলিস্তিনি বন্দী নির্যাতন নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বন্দীদের বিবস্ত্র করা; খাবার, পানি ও ঘুমাতে না দেওয়া; বৈদ্যুতিক শক ও সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া এবং কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।

গত মাসে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, হুমকি হিসেবে এগুলোর ব্যবহার আইডিএফের ‘মানসম্মত পরিচালনা পদ্ধতি’র অংশ। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।

গাজায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ ইসরায়েলের তরফে বাধাহীন না থাকায় মুঠোফোনে ও খুদেবার্তার মাধ্যমে ওই ফিলিস্তিনিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে বিবিসি। পাশাপাশি গাজায় চুক্তিবদ্ধ ফ্রিল্যান্সারদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

এই পাঁচজনই বলেছেন, তাঁদের ওপর নির্যাতনের শুরু গ্রেপ্তার হওয়ার মুহূর্তটি থেকে। পরে তাঁদের বিবস্ত্র করা, চোখ বাঁধা ও মারধর করা হয়েছে।

এ পাঁচজনের একজন মোহাম্মদ আবু তাইলেহ বলেন, তাঁকে দিনের পর দিন নির্যাতন করে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

তাইলেহ বলেন, গত বছরের মার্চে গাজা থেকে গ্রেপ্তার করার পর কাছাকাছি একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। একটি কক্ষে তিনি একা বন্দী ছিলেন। তিন দিন ইসরায়েলি সেনারা তাঁকে জিজ্ঞাসবাদ করেন।

এই ফিলিস্তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহার করা রাসায়নিক একটি পাত্রে মিশিয়ে সেনারা তাঁর মাথা চুবিয়ে রাখেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদকারীরা ঘুষি মারেন। এতে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মেঝেতে তিনি পড়ে যান এবং চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর একটি কাপড় দিয়ে তাঁরা চোখ বাঁধলে ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হয়।

তাইলেহ বলেন, সেনারা তাঁর শরীরে আগুনও ধরিয়ে দেন। তাঁর কথায়, ‘গায়ে আগুন লাগার পর তা নেভাতে আমি পশুর মতো এদিক-ওদিক ছুটছিলাম। এতে আগুন আমার ঘাড় থেকে পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।’ তখন সেনারা বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমাকে বারবার আঘাত করেন। তাঁদের সঙ্গে লাঠিও ছিল। তা দিয়ে তাঁরা আমাকে পেটাতেন ও খোঁচা দিতেন’, বলেন তাইলেহ। তিনি আরও বলেন, ‘তাঁরা আমাকে অ্যাসিড দিয়েও হামলা করেছেন। আর সে অবস্থায় আমি দেড়টা দিন কাটিয়েছি। চেয়ারে বসিয়ে তাঁরা আমার মাথায় অ্যাসিড ঢেলেছেন এবং তা আমার শরীরে গড়িয়ে পড়েছে।’

আবু তাইলেহর ওপর হামলার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে বিবিসি কথা বলতে পারেনি। তবে গাজায় ফেরার পর তাইলেহর চিকিৎসা করা একজন চক্ষুবিশেষজ্ঞ রাসায়নিকে তাঁর চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, আবু তাইলেহর দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে। এটি রাসায়নিক পদার্থ বা অন্য আঘাতজনিত কারণে হতে পারে।
তাইলেহর ক্ষতস্থানের ছবি ও তাঁর সাক্ষ্যের বিস্তারিত বিবিসি যুক্তরাজ্যের কয়েকজন চিকিৎসককে পাঠিয়েছে। তাঁরা বলেছেন, দৃশ্যত তাঁর শারীরিক অবস্থার সঙ্গে বক্তব্যের মিল রয়েছে। তবে ছবি দেখে তাঁরা যে মূল্যায়ন করেছেন, সেটির সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

বিবিসি তাইলেহর সাক্ষ্যের বিস্তারিত আইডিএফকে দিয়ে তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। আইডিএফ তাইলেহর অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো সাড়া দেয়নি। অবশ্য বলেছে, ‘তাদের মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো কর্মকাণ্ডকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নেয় তারা।’

ফিলিস্তিনি বন্দীদের এভাবে নিপীড়নের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল
ফিলিস্তিনি বন্দীদের এভাবে নিপীড়নের ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ভিডিও থেকে নেওয়া

ফিলিস্তিনি বন্দীদের কোথাও চোখ বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে, আবার কোথাও বসিয়ে রাখতে দেখা গেছে
ফিলিস্তিনি বন্দীদের কোথাও চোখ বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে, আবার কোথাও বসিয়ে রাখতে দেখা গেছে। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ভিডিও থেকে নেওয়া

চোখের সামনে যাকে পেয়েছি, তাকেই হত্যা করেছি: ইসরায়েলি সেনার স্বীকারোক্তি

‘যত দূর চোখ গেছে, চোখের সামনে যা কিছু পেয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে। যেখানেই কোনো ধরনের নড়াচড়া চোখে পড়েছে, গুলি করে তা স্তিমিত করে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা যেন আর কোনো দিনই এখানে ফিরতে না পারেন, সে ব্যবস্থাই করেছে সেনারা।’

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সেনাদের গণহত্যার বিবরণ এটি। পরিচয় গোপন করে নিজেদের অপরাধের এই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা।

শুধু তা–ই নয়, বাফার জোনকে (সংঘাতের প্রভাব এড়াতে বিশেষ অঞ্চল) ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার ‘কিলিং জোনে’ পরিণত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের ট্যাংক স্কোয়াডে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা। ট্যাংকগুলোর ৫০০ মিটারের মধ্যে কেউ এলেই তাকে গুলি করা হতো, হোক সে নারী বা শিশু।

হতভাগ্য ফিলিস্তিনিরা জানেনও না ঠিক কোন পর্যন্ত এই বাফার জোনের বিস্তৃতি। না জেনেই হয়তো প্রবেশ করতেন মরণফাঁদে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইসরায়েরি সেনা বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে তারা (হামাস যোদ্ধারা) আমাদের মেরেছে, তাই আমরা তাদের মারতে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে দেখছি, আমরা তাদের স্ত্রী, সন্তান, কুকুর, বিড়াল—সবকিছুই মারছি।’

অনেকেই ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতিশোধ নিতে এভাবে বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে বলে কাঁপা গলায় স্বীকার করেছেন ওই সেনা।

স্থানীয় সময় সোমবার ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের এক প্রতিবেদনে বাফার জোনে থাকা কয়েকজন সেনার স্বীকারোক্তি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দখলবিরোধী এই গ্রুপের প্রতিবেদনে জানা গেছে, গাজার ভূমি দখল করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই গাজাকে এভাবে ধ্বংস করেছে ইসরায়েল।

ওই সেনাদের মধ্যে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা সংস্থা এপিকে সাক্ষাৎকার দেন পাঁচজন। এপির খবরে সেনাদের বয়ানে দখলদার ইসরায়েলের ভয়াবহতার এক অসহনীয় চিত্র উঠে আসে। তাঁরা বলেন, ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর নিজ দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই তাঁরা এখানে যুদ্ধ করতে এসেছেন।

অবিরাম বোমাবর্ষণ আর স্থল অভিযানে গাজার প্রায় সব কটি শহর ও নগর ধ্বংস করা হলেও বাফার জোনের ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা সবকিছুকে হার মানিয়েছে।

যুদ্ধের প্রথম দিকে সীমান্তের নিকটবর্তী গাজার এক কিলোমিটারের বেশি এলাকায় বাস করা ফিলিস্তিনিদের জোর করে সরিয়ে একটি বাফার জোন তৈরি করেন ইসরায়েলি সেনারা। এ জন্য সেখানে থাকা সব স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

ইসরায়েলি সেনারা ‘নেতজারিম করিডোর’ নামে পরিচিত গাজার একটি বিশাল ভূমিও দখল করেছে। এই করিডোরটি গাজা সিটিসহ উত্তরাঞ্চলকে সংকীর্ণ ও উপকূলীয় উপত্যকাটির বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

এপির খবরে ওই পাঁচ সেনা জানান, বাফার জোনের ফসলের মাঠ, সেচের পাইপ, শস্য, গাছপালা, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাগুলো ধ্বংসের জন্য ইসরায়েল প্রশাসন থেকে বিশেষ নির্দেশ পেয়েছিলেন তারা। যাতে সেখানে হামাসের কোনো যোদ্ধা লুকিয়ে থাকার সুযোগ না পান। সেনারা জানান, তারা এত পরিমাণ স্থাপনা ধ্বংস করেছে, তা গুনেও বলতে পারবেন না।

ধ্বংসক্ষেত্র বাফার জোন, নিঃস্ব বাসিন্দারা

ইসরায়েলি সেনারা গাজার যে অংশে বাফার জোন তৈরি করেছে, সেটি এক সময় লাখ লাখ ফিলিস্তিনির পদচারণায় মুখরিত ছিল। গাজার কৃষিকাজের জন্য এই ভূমি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে দেখা যায়, ওই এলাকাগুলোর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বাফার জোন। যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গত ১৮ মার্চ নতুন করে গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করলে বাফার জোনে অতিরিক্ত আরও সেনা মোতায়ন করে ইসরায়েল।

এর আগে গত ১৯ জানুয়ারি ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বাফার জোনের নিজ বসতবাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন ৫৫ বছর বয়সী কৃষক নিদাল আলজানিন। তবে তাঁর বসতভিটা আগেই ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা।

বাড়ি বলতে সেই অর্থে আর কিছুই ফিরে পাননি নিদাল। পেয়েছেন কেবল স্ত্রীর সঙ্গে বিয়ের সময়কার একটি ছবি। তাঁর ছেলের আকা মুখ, আর ১৫০ বছরের পুরোনো একটি ডুমুর গাছ।

নাদিল জানান, ‘এই বাড়িটি বানাতে আমার ২০ বছর সময় লেগেছিল। অথচ মাত্র ৫ মিনিটে তারা এটি শেষ করে দিয়েছে। তারা শুধু আমার বাড়িই নয়, আমার স্বপ্ন, আমার সন্তানদের স্বপ্নও শেষ করে দিয়েছে।’

এই আর্তনাদ কেবল নাদিলের একার নয়, গাজা উপত্যকার প্রতিটি মানুষের। স্বজন, সম্পদ ও আশ্রয় সব হারিয়ে নিঃস্ব গাজাবাসী। যুদ্ধবিরতির পর নিজ বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপরই তাঁবু টানিয়ে থাকতে শুরু করেছিলেন নাদিলের মতো অনেক ফিলিস্তিনি।

কিন্তু অভাগাদের কপালে তাও সইলো না। যুদ্ধবিরতি নিয়ে নানা টালবাহানার মধ্যেই ১৮ মার্চ সেহেরির সময় অসহায় গাজাবাসীর ওপর পূর্ণমাত্রায় অভিযান চালানোর আদেশ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আবার প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।

নতুন করে চালানো এসব হামলায় অন্তত ১ হাজার ৩৩৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ৩ হাজার ২৯৭ জন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে হামাসশাসিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ হাজার ৬৯৫ জন ফিলিস্তিনি, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আর পোলিও টিকার অভাবে গাজার ৬ লাখ ২ হাজার শিশু স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

গাজায় বিধ্বস্ত একটি বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। জুলাই ২০২৪
গাজায় বিধ্বস্ত একটি বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। জুলাই ২০২৪ ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে
ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স