Wednesday, September 30, 2009

ব্রাজিল দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি হন্ডুরাস সরকারের

হন্ডুরাসের অন্তর্বর্তী সরকার সে দেশে ব্রাজিল দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। গত রোববার দূতাবাসে বেশ কিছু নাগরিকসেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের (ওএএস) একটি প্রতিনিধিদলকেও দূতাবাসে ঢোকার অনুমতি দেয়নি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রবার্তো মিশেলেত্তির সরকার। হন্ডুরাসের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া দেশে ফিরে ব্রাজিল দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলন কর্মসূচির সংবাদ প্রকাশের ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি ডিক্রিও জারি করেছে সরকার।
গত ২৮ জুন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেলায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠায় দেশটির সামরিক বাহিনী। এক সপ্তাহ আগে আকস্মিকভাবে দেশে ফিরে তেগুচিগালপায় ব্রাজিল দূতাবাসে আশ্রয় নেন তিনি। এর পর থেকেই হন্ডুরাসের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্রাজিল দূতাবাস ঘিরে রেখেছে এবং জেলায়াকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। এ জন্য গত শনিবার ব্রাজিল সরকারকে ১০ দিনের একটি সময়সীমাও বেঁধে দেয় সেনা সমর্থিত সরকার।
তবে ব্রাজিল মিশেলেত্তির সরকারের ওই হুমকি আমলে নিচ্ছে না। শনিবার দেশটির প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা ডি সিলভা বলেছেন, অবৈধ পন্থায় ক্ষমতায় আসা কোনো সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা মানতে বাধ্য নয় ব্রাজিল। তিনি এ ব্যাপারে মিশেলেত্তি সরকারকে ক্ষমা চাইতে বলেন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের ওই দাবির জবাবে অবশ্য হন্ডুরাস জানিয়েছে, জেলায়াকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া না হলে ব্রাজিল সে দেশে কোনো দূতাবাস পরিচালনার অধিকার হারাবে।
ব্রাজিল সরকার জানিয়েছে, জেলায়া যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণ তাদের দূতাবাসে অবস্থান করতে পারবেন। তবে মিশেলেত্তির সরকার চাইছে, ব্রাজিল জেলায়াকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, এমন ঘোষণা দিক অথবা জেলায়াকে তাদের হাতে তুলে দিক। এদিকে ওএএসের প্রতিনিধি জন বিহল জানান, চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের উপায় বের করতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি দল চলতি সপ্তাহে হন্ডুরাস সফর করতে পারে।

সুড়ঙ্গপথে গাড়ি পাচারের রমরমা ব্যবসা

পশ্চিম তীরের গাজার এবড়োথেবড়ো একটি রাস্তা। শ্রীহীন ক্ষয়িষ্ণু ওই রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি উজ্জ্বল সবুজ রঙের ভক্সওয়াগন। গাড়িটি এসেছে মিসর থেকে। তবে কোনো স্বাভাবিক পন্থায় নয়, এসেছে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে। অবরুদ্ধ গাজায় পণ্য আনার কাজে ব্যবহূত হয় ওই সুড়ঙ্গপথ। সম্প্রতি সুড়ঙ্গপথগুলো গাজায় গাড়ি পাচারের জন্য লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
মিসর থেকে গাজায় পণ্য নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয় কয়েক শ সুড়ঙ্গপথ। এর মধ্যে কয়েকটি সুড়ঙ্গপথ ব্যবহূত হয় শুধু গাড়ি নেওয়ার কাজে। সুড়ঙ্গপথে গাড়ি নেওয়ার কাজ শুরু হয় কয়েক বছর আগে। সুড়ঙ্গপথ নিয়ন্ত্রণকারীরা বলছেন, গত কয়েক মাসেই ৩০ থেকে ৪০টি গাড়ি আনতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা।
২০০৭ সালে সশস্ত্র লড়াইয়ের পর গাজায় হামাসের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। সুড়ঙ্গপথ পরিচালনাকারী এক ব্যক্তি বলেন, গাড়ি আনার কাজে ব্যবহূত হয়—এ রকম অন্তত দুটি সুড়ঙ্গপথ নিয়ন্ত্রণ করে হামাস।
আবু বিল্লাল নামের একজন মোটর মিস্ত্রি বলেন, ‘একটি গাড়ি আমাদের কাছে আসে চারটি ভাগে ভাগ হয়ে। সঙ্গে থাকে মোটর। প্রথমেই আমরা যাচাই করে দেখি, সবকিছু ঠিক আছে কি না। এরপর গাড়ি সংযোজনের কাজ করা হয়।’
২০০৪ মডেলের একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি সংযোজন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আবু বিল্লাল ও তাঁর সহকর্মীরা। তিনি জানান, একটি গাড়ি সংযোজন করতে তাঁদের দুই সপ্তাহ লাগে। গাড়ির ক্রেতারাই রং পছন্দ করেন। আবু বিল্লাল বলেন, জ্বালানি পাচারের চেয়ে গাড়ি পাচার অনেক বেশি কঠিন। তবে গাড়ি পাচারের ব্যবসা অনেক লাভজনক।
আবু সায়িদ নামের অন্য এক পাচারকারী বলেন, মিসর থেকে ছয় থেকে ১০ হাজার ডলারে একটি গাড়ি কেনা হয়। প্রায় দ্বিগুণ দামে গাড়িগুলো গাজায় বিক্রি হয়, তবে এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা।
অন্য এক পাচারকারী জানান, গত সপ্তাহে এ রকম একটি সুড়ঙ্গপথে আঘাত হেনেছিল ইসরায়েলি জঙ্গি বিমান। ওই হামলার পর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গাড়ি আনার কাজ বন্ধ রাখা হয়।
গাজা থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সময় রকেট হামলা হয়। এর জবাবে এসব সুড়ঙ্গপথে বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি সুড়ঙ্গপথগুলো দিয়ে অস্ত্রও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
হামাস সরকারের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আদনান আবু ওতাহ বলেন, লড়াইয়ের কারণে কয়েক শ গাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। খুচর যন্ত্রাংশের অভাবে অনেক গাড়ি রাস্তায় নামানো যাচ্ছে না।
হামাস সরকার বলেছে, গাজার ওপর থেকে অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত সুড়ঙ্গপথগুলো বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

শতবর্ষী ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরি by আঞ্জুমান আরা

বই মনের দরজা-জানালা খুলে দেয়। একনিমেষেই নিয়ে যায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে। সাদা কাগজের রঙিন মলাটে সাঁটা বর্ণগুলো মানুষকে জানিয়ে দেয় তার অনেক অজানা তথ্য। নাটোরের কাপুড়িয়াপট্টিতে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে আসা একজন পাঠক উপল দেব বইপড়া নিয়ে এ কথাগুলো বলেন।
বই উপলের নিত্যসঙ্গী। পড়ার অভ্যাস থাকলেও সব বই তো আর কিনে পড়া সম্ভব নয়, তাই লাইব্রেরির সদস্য হয়েছেন। শুধু বিভিন্ন ধরনের বই নয়, প্রতিদিন পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন ও চাকরির খবরাখবর পড়ার জন্য উপলের মতো অনেকেই আসে লাইব্রেরিতে। কারণ, এ লাইব্রেরির ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ। প্রায় ১৪ হাজার বই রয়েছে। এছাড়া ১২টি দৈনিক, চারটি সাপ্তাহিকসহ লাইব্রেরিতে প্রতিদিন সংযোজিত হচ্ছে বিভিন্ন দপ্তরের প্রকাশনা।
পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক আতিকুল হক বলেন, ‘চাকরির ব্যস্ততা আর বাড়িতে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের একঘেয়েমির মধ্যে এখানে আসি কিছুটা সময় নিজের করে পাওয়ার জন্য।’
আকাশসংস্কৃতির কারণে বই যখন পাঠক হারাচ্ছে, তখন পাঠকনন্দিত এই লাইব্রেরির পাঠচক্রের ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়। ইতিমধ্যে এ লাইব্রেরি তার পথচলায় শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। এই পথপরিক্রমার মধ্য দিয়ে লাইব্রেরিটি নাটোরের গৌরবময় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর হবেই বা না কেন, লাইব্রেরির পথপরিক্রমায় যে অনেক বিখ্যাত মানুষ জড়িয়ে আছেন। ভাবা যায়, এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠার মহোত্তম পরামর্শক ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নাটোরের মাহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায় ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও সুসাহিত্যিক। ‘সন্ধ্যাতারা’র কবি নামে খ্যাত জগদিন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে কবিগুরুর সুসম্পর্ক ছিল। মহারাজার আমন্ত্রণে নাটোরে বিশ্বকবির আগমন ঘটেছে বারবার। ১৮৯৭ সালে নাটোরে এসে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যানুরাগী মহারাজাকে পরামর্শ দেন একটি লাইব্রেরি করার জন্য। রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে ১৯০১ সালে জগদিন্দ্রনাথ রায় প্রতিষ্ঠা করেন ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি। শহরের লালবাজারে মহারাজা কর্তৃক প্রদত্ত কিছু বই, একটি ঘড়ি আর এককালীন সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরি।
মহারাজা লাইব্রেরির গ্রন্থ নির্বাচনের দায়িত্ব দেন তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্র ও ভারতবর্ষ প্রত্রিকার সম্পাদক রায়বাহাদুর জলধর সেনকে। লাইব্রেরির সংগ্রহশালায় সংযোজিত হয় এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত বিদ্যাসাগর রচনাবলী, নিয়মিত পত্রপত্রিকা মানসী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ ইত্যাদি।
১৯৩০ সালে লালবাজার থেকে ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরি স্থানান্তরিত হয় কাপুড়িয়াপট্টি এলাকায়। একটি চারচালা টিনের ঘরে নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় এর পথ চলা। এ সময় কিছু জ্ঞানানুরাগী মানুষের সান্নিধ্যে লাইব্রেরিতে সমৃদ্ধি আসে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ডা. নলিনী কান্ত সাহা, নিরঞ্জন কুমার সাহা, সুবীর চন্দ্র রায়, শিক্ষাবিদ শীতেন্দ্র মোহন প্রমুখ। এ সময় লাইব্রেরিতে সংযোজিত হয় দেশ-বিদেশের নানা গ্রন্থসহ বাংলার ইতিহাস ও বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলী। ওই সময় প্রতি চান্দ্রমাসের পূর্ণিমা তিথিতে ‘পূর্ণিমা সম্মিলনী’ নামের সাহিত্য আসর চালু হয়। আয়োজন করা হতো বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলনেরও। এসব সম্মেলনে বিভিন্ন সময় অতিথি হয়ে এসেছেন কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা যুগান্তর-এর সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, আনন্দবাজার-এর সম্পাদক চপলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ গুণীজন।
লাইব্রেরির ছন্দপতন ঘটে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পর থেকে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেশ ত্যাগে শূন্যতা নেমে আসে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে বইপুস্তক, আসবাব লুটপাট ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে লাইব্রেরিটি প্রায় নিঃশেষ হয়ে পরে। তবে সে সময় লাইব্রেরিতে সংগীতচর্চা কার্যক্রম চালু হওয়ার ফলে এটি তখন ভিক্টোরিয়া ক্লাব হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৮০ সালে তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক এ এইচ এস সাদিকুল হক লাইব্রেরির দৈন্যদশা উত্তরণে এগিয়ে আসেন। এ সময় গঠণতন্ত্র প্রণয়নসহ প্রশাসনিক সহযোগিতায় নতুন আঙ্গিকে প্রাণ ফিরে পায় লাইব্রেরিটি। ১৯৮৬ সালে গঠণতন্ত্র অনুযায়ী পদাধিকারবলে লাইব্রেরির সভাপতি হন নাটোরের জেলা প্রশাসক জালাল উদ্দিন আহম্মেদ। তাঁর উদ্যোগে লাইব্রেরির আমূল পরিবর্তন ঘটে। সেই টিনের চারচালা লাইব্রেরি পরিণত হয় দ্বিতল ভবনে।
নাটোর ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক রাশিদুজ্জামান সাদী বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ও লাইব্রেরির যৌথ উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি মাসে সপ্তাহব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা হচ্ছে। প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক দেয়ালিকা বনলতা। এ ছাড়া জাতীয় দিবস, সাহিত্য আসর, বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের জন্ম-মৃত্যু দিবস পালনসহ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
লাইব্রেরির নিয়মিত সদস্য পাঠক প্রায় দেড় হাজার। আর প্রতিদিন গড় পাঠক ১৫০ জন। শনিবার ছাড়া বিকেল চারটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত সর্বস্তরের পাঠকের জন্য এটি খোলা থাকে। তবে শতবর্ষী এই লাইব্রেরিতে পাঠকের জন্য ইন্টারনেটব্যবস্থা এখনো চালু করা যায়নি। এ ছাড়া রয়েছে আসবাবের অপর্যাপ্ততা। তার পরও বটবৃক্ষের ছায়াস্বরূপ শতবর্ষী এই লাইব্রেরি সুস্থ ও সুন্দর জীবনবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সচেতন সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। জ্ঞানের সেবা ও কল্যাণে ভিক্টোরিয়া পাবলিক লাইব্রেরি পথ চলুক অম্লান ধারায় অবিরত।

আসন্ন দুর্ভোগ আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব -জলবায়ুর পরিবর্তন by আসাদউল্লাহ খান

সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত ১৫৫টি দেশের জলবায়ু সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে সম্মেলনে যোগদানকারী দেশসমূহকে কার্বন নির্গমণের একটা মাত্রা নির্ধারণের ব্যাপারে স্বল্পতম সময়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ মহলের উদ্ধৃতি দিয়ে বান কি মুন বলেছেন, এ ব্যাপারে ব্যাপক অগ্রগতি না হলে এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন না ঘটাতে পারলে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব পানি ফোরামের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী মার্টিন সমারকর্ন সুমেরু অঞ্চলে তাঁর পর্যবেক্ষণ অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন, সুমেরু অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার দ্বিগুণ। ফলে অত্যধিক মাত্রায় বরফ গলে যাচ্ছে। মোদ্দা কথা, সুমেরু সাগরে ভাসমান বরফের তাক গলে যাওয়া এবং একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম আন্টার্কটিকায় বরফ গলার কারণে এ শতাব্দীর শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আধা মিটার থেকে দুই মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
উল্লিখিত অঞ্চলে এ রকম মাত্রাতিরিক্ত বরফ গলে যাওয়ার কারণে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়বে। এ ধরনের দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাগরের উপকূলে অবস্থিত স্বল্পোন্নত বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল যথা মুম্বাই, গুজরাট, চেন্নাই, কেরালা প্রভৃতি অঞ্চল। পৃথিবীর উন্নত দেশসমূহে কার্বন নির্গমণের মাত্রা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানোর কথা খুবই জোরেশোরে বলা হচ্ছে। কিন্তু কাজটা কে শুরু করবে এবং কোন কোন দেশ এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে? উল্লেখ্য, প্রায় ২৮ কোটি জন-অধ্যুষিত বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং শিল্পোন্নত দেশ আমেরিকার অবদান বিশ্বে মোট কার্বন নির্গমণের প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও এই নির্গমণ হ্রাস করার ব্যাপারে আমেরিকা বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে অনীহা দেখিয়ে আসছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমণের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে এবং বিশ্বব্যাপী জনজীবন, বাসস্থান, খাদ্য উত্পাদন এবং কৃষিব্যবস্থার ওপর এই পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের মতে, ‘আমরা এক্সিলারেটরে পা চেপে বসে আছি’।
বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো শুধু যে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে তা-ই নয়, এসব দেশ বর্তমান মুহূর্তে অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশসমূহে কার্বন নির্গমণের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং কোনো রকম দায় ছাড়া বাংলাদেশের জন্য এটা হবে এক অশনি সংকেত। প্রতীয়মান হয়, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে এ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। আইপিসিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার থেকে দুই মিটার পর্যন্ত বেড়ে গেলে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ সাগরের নিচে তলিয়ে যাবে এবং এর ফলে নতুন আশ্রয় খোঁজার জন্য মানুষ ধেয়ে চলবে দেশের উত্তরাঞ্চলের দিকে। কিন্তু সেখানে কি এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে ঠাঁই করে দেওয়ার মতো জায়গা আছে? এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য সংস্থানের জন্য শস্য ফলানোর মতো প্রচুর জমি পাওয়া যাবে? পরিস্থিতি যেটা হবে সেটা হলো: অল্প জমি এবং সীমিত সম্পদের ওপর মারাত্ম্যক চাপ সৃষ্টি হবে। সৃষ্টি হবে রাষ্ট্রের জন্য এক দুর্লঙ্ঘ সংকট। কারণ, প্রায় চার কোটি লোক তাদের জীবিকা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর শক্তিধর দেশ আমেরিকার বিগত সময়ের বুশ প্রশাসন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় অন্যান্য দেশও কার্বন নির্গমণ হ্রাসের ব্যাপারে তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে অনেক পিছিয়ে গেছে। চীন এখন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ব্যাপারে শীর্ষে চলে এসেছে। স্বস্তির বিষয়, ওবামা প্রশাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু আগামী ডিসেম্বরে কোপেনহেগেন সম্মেলনে এই সদিচ্ছার কতটা প্রতিফলন ঘটবে সে বিষয়ে কেউ খুব বেশি আশাবাদী এখনো হতে পারেননি।
বাংলাদেশ এই বিপর্যয় কিংবা অনভিপ্রেত পরিস্থিতির জন্য দায়ী না হলেও বাংলাদেশকে এ সমস্যার পূর্ণ দায়ভার বহন করতে হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবল থেকে এ দেশের জনগোষ্ঠী তথা মাটি ও পানিসম্পদ রক্ষা করার জন্য সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সরকার অনেক আইনি ব্যবস্থা, নীতি প্রণয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিপর্যয় ঠেকাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার নিজস্ব সংস্থান থেকে এক ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। সম্প্রতি জেনেভা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুই ধরনের ড্রেজিং (ক্যাপিটাল এবং মেইনটেনান্স ড্রেজিং)-এর মাধ্যমে ভরাট হওয়া দেশের বড় নদীগুলোর তলদেশ উন্মুক্ত করতে পারলে নদীগুলোর প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং বন্যার ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসবে। এই বিরাট কর্মকাণ্ডে সরকারের অর্থের সংস্থান নিয়ে প্রশ্ন আছে। অর্থের সংস্থান হলেও আগের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মাঠ পর্যায়ে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে একেবারে সংশয়মুক্ত হওয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, কাজ যাঁরা পর্যবেক্ষণ করবেন, যাঁরা দিকনির্দেশনা দেবেন, তাঁদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতাও প্রশ্নাতীত নয়। কারণ আশির দশক থেকে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ে এ দেশের সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রাজ্ঞজনেরা বক্তৃতায় যা বলেন, যেসব প্রতিশ্রুতি জনগণকে দেন তা কোনো সময় কাজে পরিণত করে দেখাতে পারেননি।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংকট সৃষ্টিকারী ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সাহায্য-সহযোগিতা আশা করতে পারে। অবশ্য এ ধরনের আশ্বাসবাণী প্রতিটি দুর্যোগের পর শোনা গেছে। কিন্তু প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য সব সময় রয়ে গেছে এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ দেশটা গরিব, তার ওপর ‘দুর্নীতি’ নামের একটি অপসংস্কৃতি দেশটাকে সবদিক থেকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। অন্যদিকে দেশের নেতা-নেত্রীদের বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকার কারণে বিশ্বসভায় আমাদের যুত্সই লবিংও নেই। বর্তমানে আমেরিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছ থেকে জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে দুর্ভোগ ও ক্ষতি এড়ানোর জন্য অনেক আশ্বাস হয়তো পাবেন, কিন্তু সে সাহায্য এ দেশে পৌঁছানোর আগেই হয়তো আরেকটা দুর্যোগ আমাদের আঘাত করবে।
নদীভাঙন, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আগামী দিনের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজেদের কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা ও সতততার মাধ্যমে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে, কেউ আমাদের মূল্যায়ন করবে না। তাই বাংলাদেশকে তার নিজস্ব সম্পদ, মনোবল, প্রযুক্তিগত ধারণা ও কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মোতাবেক, উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বলয় সৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর মতো সঠিক উচ্চতাসহ মজবুত করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, বাঁধের দুই পাশে গাছ লাগানো, উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, বিশেষভাবে বেড়িবাঁধের নিচে ছিদ্র করে চিংড়ির ঘেরে পানি ঢোকানোর উদ্যোগ প্রতিহত করা—এসব স্থানীয় প্রচেষ্টা সফল হতে হবে।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ পরিবেশের ওপর প্রশিক্ষিত একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। প্রতিমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, সরকারি উদ্যোগে দেশে সাত লাখ একরেরও বেশি জমিতে বন সৃষ্টি করা হবে। যত দূর বুঝতে পারা গেছে, এই বনজ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত লাভ এলাকাভিত্তিক জনগোষ্ঠী পাবে। হিসাবটা বড় দূরের এবং জটিলও। বন যেখানে সৃজন করা হবে, সে এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠী হতদরিদ্র। জীবন ধারণের ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা না করা গেলে, তাকে আগামীর প্রাপ্তির লোভ দেখিয়ে পরিবেশ রক্ষা কিংবা বনজ সম্পদ ধ্বংস করা থেকে নিবৃত্ত করা যাবে না। তাই এ বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে।
আসাদউল্লাহ খান: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক।
aukhanbd@gmail.com

সংযোজনের জন্য কিছু প্রস্তাব -শিক্ষানীতি by মুহাম্মদ ইব্রাহীম

প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অপরিহার্য কিছু সংস্কারের চেষ্টা রয়েছে। বিশেষ করে অর্থবহ ও কার্যকর শিক্ষার লক্ষ্যে সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সমানভাবে আবশ্যকীয় করা, পঠন-পাঠন ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে সনাতনভাবে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি থেকে বের হয়ে গিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রচলন এবং বিভিন্ন পছন্দ ও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে থাকা ছাত্রছাত্রীদের সব পর্যায়েই উপযুক্ত মানের কারিগরি বিকল্পের দিকে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া—এগুলো এই শিক্ষানীতির খুবই যথার্থ ও বলিষ্ঠ দিক। একে তাই অভিনন্দন জানাচ্ছি ও এর দ্রুত সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কামনা করছি। সেই সঙ্গে এই সংস্কারগুলোকে আরও কার্যকর ও সফল করে তুলতে শিক্ষানীতিতে সংযোজনের জন্য কিছু প্রস্তাব রাখছি।

অগ্রাধিকার
শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেই ভিত্তিতেই বাকি নীতিগুলো প্রণীত হয়েছে। এটি বিশ্বজনীনভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থা এবং এটিই হওয়া উচিত। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষানীতির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শুরুতে এর জন্য ভৌত সুবিধাদি ও জনবল স্থানান্তরের বিশাল ব্যয়বহুল যজ্ঞে না গিয়ে এর অন্তর্নিহিত সংস্কার, অর্থাত্ এর পঠন-পাঠন-পরীক্ষাসহ প্রস্তাবিত কার্যক্রমকে, আপাতত যা যেখানে আছে সেখানে রেখেই বাস্তবায়িত করা। এতে প্রারম্ভিক গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও মনোযোগটি প্রকৃত শিক্ষা ও যথাযথ মানের দিকে যাবে, প্রশাসনিক পরিবর্তন ও ভৌত নির্মাণের দিকে যাবে না। যেসব ক্ষেত্রে সে রকম বড় পরিবর্তন, নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা কম হবে সেখান থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে এই স্থানান্তরের কাজটি দীর্ঘ মেয়াদে করা যাবে। আসলে অন্যান্য সব ক্ষেত্রেও শিক্ষানীতির অন্তর্নিহিত সংস্কারগুলোকে শুরু থেকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা শিক্ষানীতিতেই না থাকলে, পরিবর্তনগুলো বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতাগুলোতে গিয়েই ঠেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

প্রাথমিক শিক্ষা
১। প্রাথমিক শিক্ষাতেও পঠন-পাঠন-পরীক্ষা পদ্ধতিকে সেই বয়সের উপযুক্ত সৃজনশীল, শিক্ষার্থীর নিজের প্রশ্ন উত্থাপন ও অনুশীলনভিত্তিক হবে। এ জন্য মাধ্যমিকের মতো এখানেও শিক্ষানীতির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।
২। বিজ্ঞান শিক্ষার অনেকখানি নিজে করে দেখা ও নিজের পর্যবেক্ষণভিত্তিক হবে। এ জন্য পাঠ্যসূচি, পাঠ্যবই ও পঠন-পাঠন পদ্ধতিতে উপযুক্ত পরিবর্তন আনতে হবে। অতীতে এ রকম চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু যথাযথ নীতি ও সহযোগিতার অভাবে তা ধরে রাখা যায়নি। এর জন্য শিক্ষাসামগ্রী-সাপোর্ট হিসেবে অতি সাধারণ ও সহজলভ্য কিছু সরঞ্জামের একটি বিজ্ঞান কিট-বাক্স প্রত্যেক ক্লাসে থাকতে পারে।
৩। পঞ্চম শ্রেণীতে যে সমাপনী পরীক্ষা হবে তাতে বাংলা-ইংরেজি পঠন, লিখন, হিসাব এই রকম কয়েকটি মৌলিক দক্ষতার (কম্পিটেন্স) ওপর সরাসরি যাচাইটিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। এ পর্যায়ে এগুলো অর্জন নিশ্চিত না করলে অন্যান্য অনেক কিছুই নিরর্থক হবে।
৪। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ উদ্যোগ। এটি যেন নেহাত প্রতীকী কিছুতে পরিণত না হয় সে জন্য এর উপায় সম্পর্কে একটি নির্দেশনা থাকা উচিত। আমার প্রস্তাব হলো এর জন্য মাত্র দু-একটি ট্রেডের জন্য স্থায়ী কারিগরি শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে বিভিন্ন উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া যারা সম্ভবমতো বিভিন্ন ট্রেডের কারিগরদের দিয়ে স্বল্পস্থায়ী কোর্সগুলো দেবে এবং ছাত্রের দক্ষতা প্রমাণিত হওয়ার ওপর তাদের নিয়োগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে।
৫। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে পদোন্নতির যোগসূত্র স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। আমার প্রস্তাব হলো প্রশিক্ষণ গ্রহণের সঙ্গে নয়, যথাযথ টেস্টের মাধ্যমে নির্ণিত শিক্ষকতা পারফরমেন্সের সঙ্গেই বরং এ যোগসূত্র স্থাপন করা উচিত। এটি অন্যান্য পর্যায়ের শিক্ষার পক্ষেও প্রযোজ্য।

মাধ্যমিক
১। মাধ্যমিকের শুরু থেকে বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য ইত্যাদি ধারায় বিভক্ত হয়ে গেলে আধুনিক যুগের সম্পূর্ণ নাগরিক গড়া বাধাগ্রস্ত হয়। এই বিভাজন একাদশ শ্রেণীতে হওয়া উচিত এবং তার আগে পর্যন্ত বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলার মৌলিক বিষয়গুলো সবার পড়া উচিত। এ ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ গণিত আবশ্যকীয় বিজ্ঞান শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। তা ছাড়া একেবারে অল্প বয়সে বিশেষায়ন শুরু না করলে ভবিষ্যতের বিশেষায়িত জ্ঞানে কুলাতে পারা যাবে না এমন ধারণা ঠিক নয়, অভিজ্ঞতায় সমর্থিতও নয়। যদি এভাবে দশম শ্রেণী পর্যন্ত একই ধারা প্রবর্তন করতে একান্তই অনীহা প্রকাশ করা হয়, তাহলে আমার বিকল্প প্রস্তাব হলো আপাতত বিজ্ঞান ধারার শিক্ষার্থীর জন্য ‘বিশ্ব সভ্যতা’ নামক এবং বিজ্ঞান ব্যতীত অন্যান্য ধারার জন্য ‘আধুনিক বিজ্ঞানে অগ্রগতি’ নামক একটি আবশ্যকীয় বিষয় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত রাখা।
২। মাধ্যমিক শিক্ষার সৃজনশীলতা, কার্যকারিতা, মান ইত্যাদি যেহেতু অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দরদি তত্ত্বাবধানের দাবি রাখে, তাই এর ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ উপযুক্ত শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবকদের হাতে রাখার ব্যবস্থা নীতিতে থাকা উচিত, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা নির্বাচনভিত্তিক প্রতিনিধির হাতে না রেখে।

উচ্চশিক্ষা
১। উচ্চশিক্ষার যাবতীয় সংস্কার একটি মাত্র জিনিসের ওপর বিপুলভাবে নির্ভর করে বলে মনে করি, তা হলো শিক্ষার পরিবেশ, পরিবেশ এবং পরিবেশ। শিক্ষা ছাড়া বাকি সবকিছুই প্রকৃত গুরুত্ব পেলে কোনো নীতিই কাজ করবে না। এ ব্যাপারে শিক্ষানীতিতে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা ও কৌশল থাকতে হবে।
২। পঠন-পাঠন, পরীক্ষা সব কিছু সৃজনশীল ও বিশ্লেষণমূলক ব্যবস্থার ভিত্তিতে হতে হবে, যা শিক্ষার্থীকে পুরো কোর্সেই এই বিষয়ে নিবেদিত ও অনুসন্ধিত্সু রাখবে। সময় এলে মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা কাউকে শিক্ষিত করে না। এ জন্য সারা দুনিয়ায় প্রচলিত দৈনন্দিন অ্যাসাইনমেন্ট, সমস্যা সমাধানমূলক কাজ ইত্যাদিকেই পরীক্ষার বড় অংশ করতে হবে, মূল পরীক্ষাকেও সৃজনশীল করতে হবে।
৩। দুই-একটি ব্যতিক্রমী বিষয় ছাড়া অন্যগুলোর অন্তত আংশিক পরীক্ষা ইংরেজিতে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নইলে আমাদের উচ্চশিক্ষা বিশ্ববাজারে আদৃত নাও হতে পারে।
৪। বিভিন্ন মানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিশ্চিত করার চেষ্টায় একটি স্বাধীন এডুকেশন টেস্টিং সার্ভিসের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর গ্র্যাজুয়েট মান নির্ণয় পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এটি সারা দুনিয়ায় রয়েছে।
৫। উচ্চশিক্ষার সব বিষয়ে অন্তত ছয় মাস দীর্ঘ ইন্টার্ন ব্যবস্থা চালু করা উচিত। এ সময়ে শিক্ষার্থী বাস্তব কর্মস্থলে কাজ করে শিক্ষা নেবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত এসে এ সম্পর্কে অ্যাসাইনমেন্ট লিখবে। এ জন্য বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক কর্মস্থলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতার চুক্তি থাকবে।

বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা
১। বিভিন্ন পর্যায় থেকে কারিগরি বিকল্প ধারায় যাওয়ার যে অভিনন্দনযোগ্য ব্যবস্থা শিক্ষানীতিতে রাখা হয়েছে তাকে শুধু উপযুক্ত মানে নয়, উপযুক্ত সম্মানেও অভিষিক্ত করতে হবে। মূল ধারার সঙ্গে এর সমতা শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, চাকরির মর্যাদা, প্রমোশন ইত্যাদির মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থা নীতিতে থাকা উচিত।
২। কারিগরি শিক্ষার এক একটি পর্যায় থেকে কোনো শিক্ষার্থী যদি মূল ধারায় ফিরে আসতে চায় তা হলে তাকে ক্ষেত্রবিশেষে এক বা দুই বছরের একটি অন্তবৃর্তীকালীন প্রস্তুতি কোর্স ও পরীক্ষা দিয়ে ফিরে আসার সুযোগ ‘কারিগরি শিক্ষার পথনির্দেশিকায়’ থাকতে হবে। এটি ডিপ্লোমা করার ও ডিপ্লোমা থেকে প্রফেশনাল ডিগ্রি করার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য হবে, কারিগরি ধারা থেকে সাধারণ বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
৩। অংশত শিক্ষাকেন্দ্রে এবং অংশত বাস্তব কর্মস্থলে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে স্যান্ডউইচ বৃত্তিমূলক শিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এরও মান ও সম্মান একই রকম হতে হবে।
৪। বৃত্তিমূলক শিক্ষা যাতে কেউ চাকরিতে অথবা ব্যবসায় রত থেকেই প্রয়োজনে দীর্ঘতর সময়ে লাভ করতে পারে তার জন্য আরও নমনীয়তা এতে থাকতে পারে।
৫। প্রাইভেট ব্যবস্থাগুলোকে তাদের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা বজায় রেখে প্রমিতকরণের এবং এ ক্ষেত্রে প্রাইভেট-পাবলিক সহযোগিতা সৃষ্টির কাজগুলো অধিদপ্তরে না করে সরকার ও প্রাইভেট প্রতিনিধিত্ব সম্পন্ন একটি মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠান এর জন্য সৃষ্টি করা উচিত।

বয়স্ক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা
বিভিন্নমুখী প্রয়োজনের এই ব্যাপক কর্মকাণ্ড নানা অভীষ্ট গোষ্ঠীর প্রয়োজনে নানা কৌশলে হতে হয়। বড় বড় সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে ঢালাও প্রক্রিয়ায় এর প্রকৃত বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তাই এর মধ্যে বহুমুখিতা, নমনীয়তা এবং বহু রকম কৌশল ও সৃজনশীলতাকে যাতে স্থান করে দেওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে স্বতঃপ্রণোদিত যারা বেসরকারিভাবে কাজ করছে তাদের সহায়তা দেওয়ার নীতিই বেশি কাম্য। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বকীয়তার ও আত্মনিবেদিত যোগ্যতার মূল্য অনেক। সেটি উপযুক্তভাবে নির্ণয় করে তাদের সর্বতোভাবে সহায়তা দেওয়া ও প্রয়োজনে তাদের সফল কাজগুলোকে সম্প্রসারণ করার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার ব্যবস্থা শিক্ষানীতিতে থাকা উচিত। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোকে একটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধিত্বমূলক মধ্যবর্তী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়ে এ রকম উদ্যোগ নেওয়া যায়।
মুহাম্মদ ইব্রাহীম: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ডলারের বিপরীতে ইয়েন আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দরে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন

মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দর আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রতি ডলার ৮৮ দশমিক ২৩ ইয়েনে লেনদেন হয়েছে।
এর আগে জানুয়ারি মাসে একপর্যায়ে প্রতি ডলারের দর দাঁড়িয়েছিল ৮৭ দশমিক ১০ ইয়েন, যা ছিল ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইয়েন শক্তিশালী হওয়ায় জাপানের রপ্তানি কিছুটা প্রতিযোগিতাক্ষমতা হারিয়েছে।
তবে জাপানি ভোক্তাদের জন্য আমদানি করা পণ্য কিছুটা ব্যয়সাশ্রয়ী করে তুলেছে।
জাপানের অর্থমন্ত্রী হিরোহিসা ফুজির এক মন্তব্যের পর ইয়েন গতকালের লেনদেনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তিনি ডাও জোনসের এক সংবাদে বলেন, কৃত্রিমভাবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার প্রভাবিত করা হবে ভুল নীতি।
অতীতে জাপান সরকার ইয়েনের দর দুর্বল করে রাখার জন্য বিভিন্ন সময় বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। তবে ২০০৫ সাল থেকে আর মুদ্রা বিনিময় হারের ক্ষেত্রে জাপান সরকার হস্তক্ষেপ করেনি।
কিন্তু ফুজি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকেই বলতে থাকে, তিনি ইয়েনের ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠা থামিয়ে দিতে উদ্যোগী হতে পারেন।
তবে গতকালের ঘটনায় সে আশঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এদিকে ইয়েন শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রভাব পড়েছে জাপানের শেয়ারবাজারে। ইয়েন শক্তিশালী হওয়ায় হোন্ডা মোটরস ও কিয়োসেরার মতো রপ্তানিমুখী বড় কোম্পানির শেয়ারদর গতকাল ব্যাপকভাবে পড়ে গেছে।
এর প্রভাবে সার্বিকভাবে নিক্কি সূচক ২৫৬ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট পড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে ১০ হাজার ৯ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। গত জুলাই মাসের পর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় পতন।

আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি সেমিফাইনালে চোখ ভেট্টোরির

মাত্র একটা জয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরশুর ৩৮ রানের এই জয়ে দারুণ উদ্দীপিত নিউজিল্যান্ড। এতটাই যে অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি এখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালের স্বপ্নে বিভোর। আজ জোহানেসবার্গে ইংল্যান্ডকে হারালেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত হবে ভেট্টোরিদের। এ ম্যাচ জিতে শেষ চারে যাওয়ার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক, ‘আমাদের ভাগ্যটা এখন আমাদেরই হাতে। ওয়ান্ডারার্সের যে উইকেটে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা হবে, সে উইকেটও আমাদের চেনা।’
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের যে ব্যাটিংকে খোঁড়াতে দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সে ব্যাটিংই দুর্দমনীয়! কেউ সেঞ্চুরি পাননি, অথচ স্কোরবোর্ডে ৭ উইকেটে ৩১৫ রান। আর এটাই সেমিফাইনালে খেলার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকে।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বড় রানের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন দুই ওপেনিং ব্যাটসম্যান ব্রেন্ডন ম্যাককালাম (৪৬) ও জেসি রাইডার (৭৪)। তাঁদের ১২৫ রানের জুটির পর মার্টিন গাপটিলের ৭৬ বলে ৬৬ ও ভেট্টোরির ৪৪ বলে ৪৮ রান নিউজিল্যান্ডের স্কোরকে তিন শ পেরোতে সাহায্য করে।
নিউজিল্যান্ডের এই রানের পাহাড়েই চাপা পড়েছে শ্রীলঙ্কা। চার ও আট নম্বরে উইকেটে আসা মাহেলা জয়াবর্ধনে ও নুয়ান কুলাসেকেরা ৭৭ ও ৫৭ রান করলেও এই দুটি ফিফটি পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনা ছাড়া কোনো কাজে আসেনি। ৪৬.৪ ওভারে শ্রীলঙ্কা অলআউট ২৭৭ রানে। তাদের সেমিফাইনাল খেলাটা এখন তাই নির্ভর করছে আজকের ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের ফলাফলের ওপর। আজ ইংল্যান্ড জিতলেই কেবল সেমিফাইনালে যেতে পারবে শ্রীলঙ্কা, নিউজিল্যান্ড জিতলে নিতে হবে বিদায়।
শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা মনে করেন সেমিফাইনাল নিয়ে অনিশ্চয়তার বড় একটা কারণ বাজে ফিল্ডিং, ‘চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো টুর্নামেন্ট জিততে ফিল্ডিংয়ে উন্নতি করতে হবে আমাদের। গত কয়েক মাসের মধ্যে এখনই আমাদের অবস্থাটা সবচেয়ে বাজে।’ ব্যাটসম্যানদের কারও বড় ইনিংস খেলতে না পারাটাকেও নিউজিল্যান্ডের কাছে হারের কারণ মনে হচ্ছে সাঙ্গাকারার কাছে, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য ম্যাচ জেতার মতো বড় কোনো ইনিংস ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে আসেনি।’
আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জেসি রাইডারকে পাচ্ছে না নিউজিল্যান্ড। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বাইরে চলে যাওয়া রাইডারের বদলি হিসেবে ডাক পেতে যাচ্ছেন অ্যারন রেডমন্ড।

বাংলাদেশ সফরে দুর্বল ইংল্যান্ড দল

ব্যস্ত মৌসুমে মূল ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে বাংলাদেশ সফরে দুর্বল দল পাঠাতে পারে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শেষ হবে আগামী মধ্য জানুয়ারিতে। এর পর ফেব্রুয়ারি-মার্চে বাংলাদেশ সফর। এর পর আছে বাংলাদেশের ফিরতি সফর, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ, পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ, বছর শেষে অ্যাশেজ, ২০১১-র ফেব্রুয়ারিতে আবার বিশ্বকাপ।
এমন ব্যস্ত সূচিকে সামনে রেখে ক্রিকেটারদের বিশ্রাম দিয়ে দিয়ে খেলানোর কথা জানিয়েছেন ইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিউ মরিস, ‘আমাদের এমন একটা উপায় বের করতে হবে যাতে ক্রিকেটাররা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত ম্যাচ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। এ জন্য আমরা কোনো সিরিজ বা সিরিজের মাঝে ক্রিকেটারদের বিশ্রাম দিতে চাই।’ এই নীতিতেই বাংলাদেশ সফরে বিশ্রাম দেওয়া হতে পারে অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস, টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক পল কলিংউড, স্টুয়ার্ট ব্রড ও জেমস অ্যান্ডারসনকে। সে ক্ষেত্রে সহ-অধিনায়ক অ্যালিস্টার কুক টেস্ট দলের নেতৃত্ব দেবেন। ওয়ানডে সহ-অধিনায়ক পল কলিংউডকেও বিশ্রাম দেওয়া হলে ওয়ানডে নেতৃত্বে দেখা যেতে পারে নতুন কাউকে।

আনুষ্ঠানিকতার দলবদল আজ থেকে

অধিকাংশ দলেরই ঘর গোছানো শেষ। তার পরও আনুষ্ঠানিকতা বলে একটা কথা আছে। আজ থেকে শুরু প্রিমিয়ার ডিভিশন ও প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগের দলবদল সেই আনুষ্ঠানিকতারই উপলক্ষ। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সভাকক্ষে তিন দিনব্যাপী দলবদল চলবে আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে খেলোয়াড়দের নাম নিবন্ধন।
দলবদলের বাজার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল এবার এক মাস আগেই। জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ২০ লাখ টাকায় রেখে দিয়েছে আবাহনী, একই পারিশ্রমিকে তারা দলে ভিড়িয়েছে বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডারও জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকেও। অনেক নাটকের পর মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গে মোহামেডানে গেছেন বাঁহাতি ওপেনার তামিম ইকবাল। প্রথমে পুরোনো দল আবাহনীতে খেলার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে ২০ লাখ টাকায় তামিম চলে গেছেন মোহামেডানে। মোহামেডানে পুলের অন্য খেলোয়াড় মাহমুদউল্লাহ। আবাহনী তামিমের বিকল্প হিসেবে নিশ্চিত করেছে ইমরুল কায়েসকে। জাতীয় দলের উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম গেছেন বিমানে। আর আইসিএলের ক্রিকেটারদের অধিকাংশ যোগ দিচ্ছেন গাজী ট্যাংকে।
দলবদলে এবার টাকার ছড়াছড়ি হলেও সেটা যেন কেবল ব্যাটসম্যানদের পকেট ভারী করতেই। পেস বোলারদের জন্য বরাবরের মতোই হতাশার উপলক্ষ হয়ে এসেছে দলবদল। মাশরাফি ব্যতিক্রম, নইলে কত টাকায় সূর্যতরুণে যাচ্ছেন সেটা বলতে জাতীয় দলের পেসার মাহবুবুল আলমকেও বিব্রত হতে হয়। রুবেল হোসেন আর কোনো দল না পেয়ে ওল্ড ডিওএইচএসে, এই দলে যাচ্ছেন মোহামেডানের ছেড়ে দেওয়া ডলার মাহমুদও। আর সৈয়দ রাসেল তো কাল পর্যন্ত দল পাননি বলেই খবর!
আরেক তারকা পেসার শাহাদাত হোসেন এবার খেলবেন কলাবাগানে। মহারাষ্ট্র সফরে যাওয়ায় ‘এ’ দলের অন্য ক্রিকেটারদের সঙ্গে তাঁর দলবদলের আনুষ্ঠানিকতাও সারা হয়ে গেছে আগেই।

ফেডারেশন কাপ আবার মাঠে

নজরুল-রজনীদের নিয়ে আবাহনীর
ট্রেনার ডিয়েগো আলভারোর অনুশীলনেও
যেন ঈদ-পূজার আমেজ। দুই সপ্তাহের
ছুটি কাটিয়ে আজ আবার মাঠে
ফিরছে ফেডারেশন কাপ
ঈদ-পূজার ছুটি শেষ। ঢাকার ক্লাবপাড়াও ফিরে পেয়েছে পুরোনো মেজাজ। সিটিসেল ফেডারেশন কাপ ফুটবলের প্রস্তুতির জন্য জোর অনুশীলন চলছে সব ক্লাবেই। গত ১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ফেডারেশন কাপ এরই মধ্যে দেখে ফেলেছে ১০টি ম্যাচ। দুটি ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে মোহামেডানের। প্রথমটায় ফেনী সকার ক্লাবের বিপক্ষে তারা জিতেছিল ৪-০ গোলে। পরেরটিতে আরও বড় জয়—তারুণ্যনির্ভর ব্রাদার্সকে হারিয়েছিল ৭-১ গোলে। দুই জয়ে সেমিফাইনালের পথে অনেকটাই এগিয়ে গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। অন্য বড় দল আবাহনী খেলেছে একটাই ম্যাচ। প্রাণতোষের একমাত্র গোলে বাংলাদেশ পুলিশকে হারায় তারা।
দুই সপ্তাহ পর আজ আবারও মাঠে গড়াচ্ছে ঘরোয়া ফুটবল। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বিকেল ৩টায় শুরু হবে আরামবাগ-শুকতারা যুব সংসদের ম্যাচ। বিকেল ৫টায় একই মাঠে চট্টগ্রাম মোহামেডানের প্রতিপক্ষ রহমতগঞ্জ। ঈদের পর অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর ম্যাচ দিয়ে ফেডারেশন কাপ শুরু হলেও পাদপ্রদীপের আলোতে রয়েছে আবাহনী-মোহামেডানই। আগামী ১ অক্টোবর আবাহনী নামবে চট্টগ্রাম আবাহনীর বিপক্ষে। পরদিন মোহামেডান-বিকেএসপির ম্যাচ।
এমিলি, এমেকা, মামুনের মতো তারকা খেলোয়াড় হারিয়ে প্রথম ম্যাচে একটু দিশেহারাই দেখাচ্ছিল আবাহনীকে। বিদেশি খেলোয়াড় সামাদ ইউসুফ, ইব্রাহিম আইডু ও ফুয়াদ আলীর ওপরও খুব বেশি ভরসা করতে পারছে না তারা। কাল তাই আরও দুজনকে উড়িয়ে আনা হয়েছে ঘানা থেকে। স্ট্রাইকার শেরিফ মোহাম্মদ ও মিডফিল্ডার আওয়াল মোহাম্মদের কাগজপত্র এসে গিয়েছিল আগেই, কাল তাঁরা আকাশি-নীল শিবিরে যোগ দিয়েছেন। তবে পরের ম্যাচে তাঁদের খেলা এখনো নিশ্চিত নয়। আবাহনীর ম্যানেজার সত্যজিত্ দাস রুপু জানালেন, ‘আগে আমরা ওদের অনুশীলনে দেখি। যাচাই-বাছাই করি। তারপর মাঠে নামাব।’ এমিলি-এমেকা-মামুনদের অনুপস্থিতিতে দলে কোনো প্রভাবই পড়ছে না বলে দাবি করলেন তিনি, ‘একজন যাবে একজন আসবে এটাই তো নিয়ম। তাতে শক্তিতে এতটুকু ঘাটতি হবে বলে মনে করি না।’ বি-লিগ মাথায় রেখেই আবাহনী মূলত তাদের বিদেশি খেলোয়াড় আনিয়েছে। ফেডারেশন কাপকে এসব খেলোয়াড় ঝালাইয়ের উপযুক্ত জায়গা বলে মনে করছেন রুপু।
বড় দুই জয়ের পর মোহামেডান এখন আরও আত্মবিশ্বাসী। কোচ মারুফুল হকের দৃষ্টি ফেডারেশন কাপ ছাড়িয়ে বি-লিগে, ‘দলে এখন পর্যন্ত কোনো ইনজুরি নেই। অনুশীলনও চলছে জোরেশোরেই। আপাতত আমাদের লক্ষ্য ফেডারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। দলবদলের আগে যেহেতু প্রস্তুতির জন্য কম সময় পেয়েছি, এখন তাই একসঙ্গে দুটি কাজই সেরে ফেলতে চাই। ফেডারেশন কাপের প্রস্তুতি এবং ম্যাচে খেলোয়াড়দের মান দেখে সেই অনুযায়ী বি-লিগের দল গড়ব আমরা।’ মোহামেডানের পরের প্রতিপক্ষ বিকেএসপি। এর আগে বিকেএসপি ০-৭ গোলে সকার ক্লাবের কাছে হেরেছিল। এই দলটাকে তবু অবহেলা করছেন না মারুফ, ‘তারাও ফেডারেশন কাপে খেলছে। তাদের অবহেলার চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই।’
গতবারের সেমিফাইনালিস্ট চট্টগ্রাম মোহামেডান এবারও শেষ চারে দেখতে চায় নিজেদের। তবে দলের ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ হতাশ নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে, ‘নারায়ণগঞ্জ শুকতারার বিপক্ষে ২-১ গোলে জিতলেও দলের পারফরম্যান্সে খুব বেশি খুশি নই আমি। তারেক, শুভ্র আর মনুকে হারিয়ে আমরা এমনিতেই একটু বেকায়দায় পড়েছি। এরপর নতুন তিন খেলোয়াড় প্রদীপ, ধীমান ও চামদিন রাখাইনকে পেয়েও হারালাম। ওরা চুক্তি করেও শেষ পর্যন্ত অন্য ক্লাবে খেলছে। ব্যাপারটা বাফুফের প্লেয়ার স্ট্যাটাস কমিটিকে জানিয়েছি। ওদের রায়ে আমি সন্তুষ্ট না। ভাবছি একটা উকিল নোটিশ পাঠাব, কেন বাফুফে আমাদের সঙ্গে এমন বিমাতাসুলভ আচরণ করল।’ মোহামেডানের কাছে সাত গোলের লজ্জাজনক হারে বিব্রত ব্রাদার্স ম্যানেজার আমের খান, ‘আমাদের বড় মাপের খেলোয়াড় নেই। তাই বিদেশিদের ওপরই ভরসা রাখছি। যে ছেলেরা খেলছে ওরা এখনো পুরো পরিণত হয়নি। তা ছাড়া দলের ভেতরে টিম ওয়ার্কও গড়ে ওঠেনি। তার পরও পরের ম্যাচগুলো লড়াই করার চেষ্টা করব।’
এ পর্যন্ত হওয়া ফেডারেশন কাপের দশ ম্যাচে মোট গোল হয়েছে ৪১টি। হ্যাটট্রিক করেছেন মোহামেডানের এমেকা, ফেনী সকারের আনোয়ার ও মোনায়েম। একটা মাত্র ম্যাচে আবাহনী নিজেদের ভালোভাবে মেলে ধরতে না পারলেও গোল পাচ্ছে মোহামেডান। তবে বড় দল হিসেবে দর্শক-সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণের পরীক্ষার অনেকটাই এখনো বাকি তাদের।