Thursday, August 20, 2026
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিচ ফল
বেশ বড় আকারের এই পিচ জন্মেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি বাগানে। বাগানটি ভার্জিনিয়ার ক্রোজে, নাম চিলস পিচ অর্চাড।
বাগান কর্তৃপক্ষ বলেছে, রেকর্ড গড়ার জন্য পরিকল্পনা করে বা গাছের খুব যত্নআত্তি করে তাঁরা পিচ ফলিয়েছে, বিষয়টা এমন নয়; বরং প্রাকৃতিকভাবে এ বছর উপযুক্ত আবহাওয়া সেটিকে এতটা বড় হতে সাহায্য করেছে।
এ মাসের শুরুতে বাগান থেকে ওই পিচ পাড়া হয়। সেটির আকার বাগান কর্তৃপক্ষকে বেশ অবাক করেছিল। এ জন্য তারা সেটির ওজন দেয়। ফলটির ওজন হয় ১ দশমিক ৮৩ পাউন্ড বা ৮২৮ দশমিক ৫ গ্রাম।
এত ওজন দেখে প্রথমবার তাদের মাথায় ঢুকে এটি কি বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে।
বিশাল আকারের পিচটি জন্মেছে হেনরি চিলসের বাগানে। তিনি স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ‘আমরা জেনেবুঝে পরিকল্পনা করে সবচেয়ে বড় পিচ ফলানোর চেষ্টা করিনি। শুধু এ বছর যে আবহাওয়া ছিল, তা আমাদের খুব ভালোভাবে সহায়তা করেছে। এ কারণে বাগানে একটি বিশাল পিচ বেড়ে উঠেছে।’
হেনরি পিচটির নাম দেন ‘পিএফ-২৭এ’। সবচেয়ে বেশি ওজনের পিচের স্বীকৃতি চেয়ে এরপর তাঁরা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ পিএফ-২৭একে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ওজনের পিচের স্বীকৃতি দেয়।
আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বাগান কর্তৃপক্ষ লিখেছেন, ‘এখন এটা আনুষ্ঠানিক। আমরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ওজনদার পিচ ফলানোর রেকর্ডের মালিক।’
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘এত বিশাল আকারের ফলটি জন্মানোর জন্য হেনরি চিলসকে অভিনন্দন। আর তাদের স্বীকৃতির জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসকেও আমাদের ধন্যবাদ।’
| পাশাপাশি রাখা একটি কুমড়া, বড় আকারের পিচ (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), আপেল এবং একটি সাধারণ আকারের পিচ। ছবি: ইউটিউব ভিডিও থেকে নেওয়া |
Wednesday, July 8, 2026
‘আমার খেজুরবাগানের এখন যে অবস্থা, তাতে চৌদ্দ পুরুষ বসে খেতে পারবে’ by মোস্তাফিজুর রহমান
আবদুল মোতালেব ময়মনসিংহের ভালুকার উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিন বছর খেজুরবাগানে কাজ করেছেন। ২০০১ সালের শেষ দিকে নিজে খেজুর চাষের পরিকল্পনা দেশে ফেরেন। এ সময় উন্নত জাতের খেজুরের প্রায় ৩৫ কেজি বীজ নিয়ে আসেন। বাড়ির আঙিনায় ৭০ শতাংশ জমিতে রোপণ করে ২৭৫টি চারা। বর্তমানে মোতালেবের ৭ বিঘা খেজুরবাগানে প্রায় ৩ হাজারের বেশি খেজুরগাছ আছে। এগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের আজোয়া, শুক্কারি, আম্বার, লিপজেল ও মরিয়ম জাতের দেখা মেলে।
গত বুধবার মোতালেবের খেজুরবাগানে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের গাছে গাছে ঝুলছে নানা জাতের খেজুর। মোতালেব জানান, আজোয়া খেজুর ৩ হাজার টাকা, শুক্কারি এক হাজার, আম্বার আড়াই হাজার, লিপজেল সাড়ে ৪ হাজার ও মরিয়ম খেজুর ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেন। এ ছাড়া বিক্রি হয় খেজুরের চারাও। কাটিং করা প্রতিটি চারা ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এ ছাড়া বীজ থেকে তৈরি চারা ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন।
আবদুল মোতালেব বলেন, ‘আমি পড়ালেখা করি নাই। দেশেও কৃষিকাজ করি এবং সৌদি আরবে গিয়ে আমি কৃষিকাজ পাই। সেখানে খেজুরবাগানে কাজ করে খেজুর খেয়ে মনে হলো, যদি দেশে একবার এই খেজুর চাষ করতে পারি তাহলে জীবন সার্থক, আর বিদেশে যেতে হবে না। ২০০১ সালে বাড়িতে আসার সময় ৩৫ কেজি বীজ নিয়ে আসি, সেখান থেকে মাত্র ২৭৫টি গাছ তৈরি করা হয়। দীর্ঘ ১৮ বছর গবেষণা করে ৭টি মাতৃগাছ পাই, বাকিগুলো সব পুরুষ গাছ। পুরুষ গাছগুলো কেটে মাতৃগাছগুলো থেকে কাটিং করে চারা উৎপাদন শুরু করি। এখন আমার বাগানের যে অবস্থা, তাতে আমার পরবর্তী চৌদ্দ পুরুষ বসে খাবে, আমার সন্তানদের আর কষ্ট করতে হবে না। বাগানে এখন শুধু মাতৃ গাছ আছে। আমাদের বাগানে উৎপাদিত খেজুর পুরোপুরি সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাদে-গন্ধে মেলে।’
বাবার পাশাপাশি মোতালেবের ছেলে মিজানুর রহমানও পড়ালেখার পাশাপাশি খেজুরবাগান নিয়ে কাজ করছেন। দেশি ও বিদেশি জাতের চারা ক্রস করে রসের জন্য ৮ বিঘা জমিতে প্রায় ৮ হাজার গাছ নিয়ে নতুন একটি বাগান করেছেন বাবা-ছেলে। এর মাধ্যমে গুড় উৎপাদন করার কথা জানিয়েছেন।
অনার্স প্রথম বর্ষ পড়ুয়া মিজানুর রহমান বলেন, ‘২০২৩ সাল থেকে বাবার সঙ্গে খেজুরবাগানে কাজ শুরু করি। আমি খেজুর গাছে কাটিং করে নতুন চারা উৎপাদন কৌশল শিখেছি। এ ছাড়া দেশি ও সৌদি খেজুরগাছ ক্রস করে একটি জাত উদ্ভাবন করেছি, যেটি থেকে প্রচুর রস উৎপাদন সম্ভব।’
মোতালেবের খেজুর চাষ দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার আরও অনেকে খেজুর বাগান করতে শুরু করেছেন। তাঁর বাগানে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্যোক্তারা গিয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ধারণা নেন ও গাছের চারা কেনেন। মোতালেবের বাগানের পাশেই ২০০৮ সাল থেকে বাগান শুরু করেন আফাজ পাঠান। তিনি বলেন, মোতালেবের কাছ থেকে চাষ প্রযুক্তি শিখে এখন চারটি স্থানে ১০ একরের বাগান করেছেন। বাগানগুলোয় ভালো ফলন হচ্ছে। বছরে ২০-৩০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। শিক্ষিত বেকার তরুণ-যুবকেরা এই খেজুরবাগান করে জীবন পাল্টে দিতে পারে।
বাগানটিতে ঘুরতে আসা শফিউল্লাহ আনসারি নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘এখানে উৎপাদিত খেজুরগুলো তুলনামূলকভাবে বড় ও খেতে সুস্বাদু। দেশের চাহিদা পূরণের জন্য সৌদি খেজুর আমদানি করতে হয়। কিন্তু দেশে এটি সম্প্রসারিত হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং কৃষকেরাও লাভবান হবেন।’
সৌদি খেজুর চাষের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ভালুকা উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘খেজুরে রোগবালাই খুব কম হয়। আমরা এমন উদ্যোক্তাদের নিয়মিতভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকি। তবে সরাসরি কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে খেজুরবাগানে আমরা কোনো সহযোগিতা দিতে পারি না। সরকারিভাবে প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসলে তাঁরা উপকৃত হবেন ও চাষি বৃদ্ধি পাবে।’
গত বুধবার দুপুরে খেজুরবাগানটি দেখতে যান ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার মোখতার আহমেদ। তিনি বলেন, মোতালেব সৌদি আরবে চাকরি করতে গিয়ে সেখান থেকে প্রযুক্তিজ্ঞান নিয়ে দেশের মাটিতে চাষাবাদ শুরু করেন। সৌদি খেজুর চাষের সম্প্রসারণ ও প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনার বিষয়টি নিয়ে কেবিনেট মিটিংয়ে উত্থাপন করা হবে।
![]() |
| ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজের বাগানে খেজুরগাছের পরিচর্যা করছেন চাষি আবদুল মোতালেব ও তাঁর ছেলে। সম্প্রতি উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো |
Saturday, June 27, 2026
রংপুরে ‘লিভিং ব্লু’র কারখানায় তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক নীল রং by রয়া মুনতাসীর
রাজেন্দ্রপুরে যখন পৌঁছালাম, রোদের তাপে চারদিক তখন ঝলসে যাচ্ছিল। কোনো দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়ল ছোট ছোট মাচা। তার ওপর পাতা ট্রেতে নীল রঙের গাদের দিকে তাকিয়ে চোখ যেন আরাম পেল।
এই আরাম মনকেও ছুঁয়ে গেল যখন নীল রঙের নকশা করা শাড়িগুলো দেখলাম। কারখানার একদিকে নীল পাতা জাগ দেওয়া হচ্ছে, আরেক পাশে বড় চুলায় নীল জ্বাল দিচ্ছেন কর্মীরা। আরেক দিকে গাদটাকে ট্রেতে করে রোদে শুকানো হচ্ছে।
চারদিকে চলছে পোশাকে প্রাকৃতিকভাবে টাই-ডাই করার প্রস্তুতি। গোছানো, ছিমছাম এই পরিবেশেই বানানো হচ্ছে অভিজাত নানা পণ্য।
বাংলাদেশে অনেক বছর ধরেই টাই-ডাই নিয়ে কাজ হচ্ছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুনামও কুড়িয়েছে। ‘লিভিং ব্লু’ তাদের মধ্যে অন্যতম। ২০০৮ সালে কেয়ার বাংলাদেশের একটি প্রজেক্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করে লিভিং ব্লু।
বর্তমানে এটি স্বতন্ত্র উদ্যোগ। রংপুরের রাজেন্দ্রপুরের গোয়ালপাড়া এলাকায় তাদের নিজস্ব কারখানাতেই তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক নীল রং।
একসময় এই নীল ছিল কৃষকের বঞ্চনা ও নিপীড়নের উৎস। সেটাই এখন হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় এক উপকরণ। তবে নীলের বাইরেও নানা রং ব্যবহার করে লিভিং ব্লু।
কারখানায় টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরের ভেতর রাখা বড় বড় ট্রাংকগুলো খুলতেই তার কিছু ঝলক দেখা গেল, যখন ‘নকশা’র ফটোশুটের জন্য নানা রঙের শাড়ি, স্কার্ফ, স্টোল, কাঁথা বের করছিলেন শিল্পীরা।
লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর এলাকার প্রায় ২০০ শিল্পী শুধু টাই-ডাইই নয়, বুনে চলেছেন নানা নকশার কাঁথা। রপ্তানি হচ্ছে ফ্রান্স, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়। জানা গেল কাঁথা, স্টোল, স্কার্ফ, পোশাক, শাল, টোট ব্যাগের পাশাপাশি নীলের কেক বা গুঁড়াও বিক্রি করা হয় নিয়মিত।
ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি থেকে গ্রাহকেরা নিয়মিত কেক বা ডাস্ট আকারে কেনেন নীল। এ বছর এখন পর্যন্ত এক হাজার কেজি নীল বিক্রি হয়ে গেছে।
লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর এলাকার শিল্পীদের কাজের ভাগ করা আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাঁথা স্টিচিংয়ের মধ্যে ‘সাদার ওপর সাদা’ কাঁথার কাজ দিনাজপুর এলাকায় করা হয়।
সেখানকার সাইতারা ইউনিয়নের শিল্পীরা এ কাজের জন্য বিখ্যাত। সাদা কাপড়ের ওপর কাজ করার জন্য তাঁরা বিশেষ ব্যবস্থা নেন, যাতে কোনো দাগ না পড়ে কাজ করার সময়। কাঁথার ওপর ডব্লিউ ডব্লিউ ডিজাইন ভালো করে লালমনিরহাটে।
রংপুরের শিল্পীরা আবার বহুমুখী। এখানে দাবার নকশা, শিবরির ডিজাইন, শাড়ির ওপর সব ধরনের কাঁথা স্টিচ করা হয়। এখান থেকে ফরমাশ দিয়ে পণ্য বানিয়ে নেন দেশীয় নামীদামি বেশ কিছু দোকান।
পণ্যের ওপর নকশাগুলো কীভাবে নির্ধারণ করেন? উত্তরে লিভিং ব্লুর চিফ কো-অর্ডিনেটর গোলাম রাব্বানী জানান, ‘লিভিং ব্লু যে পণ্যই বানায়, সেখানে বাংলাদেশ থাকে। বিশেষ করে দেশের বাইরের পণ্যগুলোতে ঐতিহ্যবাহী নকশার ওপর প্রাধান্য দিই আমরা। বেশির ভাগ সময় আমাদের দেওয়া নকশাই পছন্দ করেন বাইরের গ্রাহকেরা। কিছু সময় আমরা তাঁদের দেওয়া নকশার ওপর কাজ করি।’
কথা বলতে বলতেই বারান্দার এক কোণে বসা শিল্পীদের ওপর চোখ চলে যায়। পা ছড়িয়ে গুটগুট করে গল্প করতে করতে সুই-সুতায় ৩২ গজের সাদা কাঁথার ওপর ফুল, লতাপাতার নকশা ফোটাচ্ছিলেন তাঁরা। এ নকশা যে অনেক চিন্তাভাবনা করে সব সময় আসে, তা–ও নয়। কাজের অভিজ্ঞতায় হাতের টানেও চলে আসে অনেক সুন্দর নকশা।
আছে আরও ১১ রং
লিভিং ব্লুর কাজের অনেক বড় একটা অংশজুড়ে থাকে নীল। তবে এই নীলের বাইরে আরও ১১টি রং নিয়ে তারা কাজ করে। মেরুন, সবুজ, কালো, লাল, কমলা, জলপাই, সোনালি, ছাই, বেগুনি ইত্যাদি রং আছে। প্রতিটি রঙের উপকরণই প্রাকৃতিক। যেমন ডালিমের খোসা আর হরীতকী থেকে পাওয়া যায় সোনালি রং।
নীলের হরীতকী ও ডালিমের খোসার মিশ্রণে পাওয়া যায় সবুজ রং। সবুজ রঙের যেকোনো পণ্য বানাতে এ কারণে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়, জানালেন রাব্বনী। কারণ, এখানে তিনবার ডাই করতে হয়। মঞ্জিষ্ঠার ডাল থেকে পাওয়া যায় মেরুন রং।
পেঁয়াজের খোসা থেকে আসে বাদামি রং। মঞ্জিষ্ঠার ডাল আর নীল রং থেকে আসে কালো রং। কলার মোচা থেকে পাওয়া যায় ছাই রং।
কাজের জন্য সাধারণত নানা কাউন্টের সুতায় বানানো রাজশাহী সিল্ক আর কুমিল্লার খাদি বেছে নেওয়া হয়। নতুন যোগ হয়েছে টাঙ্গাইলের নরম সুতির শাড়ি। প্রচ্ছদের ছবির জন্য সায়রা আক্তার জাহানকে সেটাই পরানো হলো।
সুতির শাড়িটি এতই হালকা যে দুপুরের কড়া রোদেও পরে আরাম পেলেন। বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছবি তুললেন নীলের গাদ বিছানো ট্রের সামনে দাঁড়িয়ে।
অর্থনীতি
কারখানার পাশেই ধানখেত। নীলের গাদ ছাঁকার পর যে পানি বের হয়, সেটা নাকি এখানে দিয়ে দেওয়া হয়। ভালো সার হিসেবে কাজ করে। কোনো রকম কেমিক্যাল ডাই ব্যবহার করা হয় না বলেই জানা গেল। প্রতিষ্ঠানটিতে স্থায়ী কর্মী আছেন ৩০ জন। কাজের ওপর ভিত্তি করে এ সংখ্যা ২০০-ও ছাড়িয়ে যায়।
শিল্পীরা ছাড়াও ২০০ কৃষক পরিবার পাতা সংগ্রহের কাজ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি, স্থানীয় ঐতিহ্য ও নকশাকে পুনর্জাগরিত করা, প্রাকৃতিক উপায়ে কাজ করা এবং কারিগর-কৃষক—সবার ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয় লিভিং ব্লু।
![]() |
| সুতির শাড়ি আর সিল্কের স্কার্ফে ইন্ডিগোর নকশা। মডেল হয়েছেন সায়রা আকতার জাহান। শাড়ি: লিভিং ব্লু, সাজ: শাহানাজ মেকওভার, রংপুর, স্থান: লিভিং ব্লুর কারখানা, রাজেন্দ্রপুর, রংপুর। ছবি: সুমন ইউসুফ |
Sunday, June 14, 2026
বাজেটে অবহেলিত কৃষি by ফরিদা-আখতার
কৃষির নামে বরাদ্দকৃত এই বাজেটে আরো দুটি ভাগীদার আছে। ভাগীদাররা হচ্ছে খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তিনটি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়, কিন্তু এবারে সরকার কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ গুচ্ছ করে একসঙ্গে করেছে। একজন পূর্ণ মন্ত্রী আছেন, যিনি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় দেখছেন, আর একজন প্রতিমন্ত্রী দেখছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারের বাজেট ঘোষণায় এখনো পরিষ্কার নয়, কৃষি আলাদাভাবে কত বরাদ্দ পাচ্ছে; তেমনি খাদ্য আলাদাভাবে এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ কত পাচ্ছে, তা আমরা এখনো জানি না। তাদের কাজ আলাদা, অতএব তাদের বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। প্রয়োজনের তুলনায় এই বরাদ্দ সব সময়ের মতো এবারও অপ্রতুল।
সরকার খাদ্য মজুত ও সংগ্রহের প্রতি নজর দেয় অনেক বেশি। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এবং সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ৪১ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীতকরণের পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাদ্যশস্য সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ লাখ ১৯ হাজার মেট্রিক টন।
এখানে তিনটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটা হচ্ছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ খাদ্যফসলসহ সব ধরনের কৃষি ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। বড় দাগে এই মন্ত্রণালয়ের মূল দায়িত্ব হচ্ছে খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে তিনটি মৌসুমে বছরে প্রায় ৩.৯ কোটি মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে বার্ষিক ধানের চাহিদা হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে তিন কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। বন্যা, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদনে ঘাটতি হলে খাদ্য মন্ত্রণালয় চাল আমদানি করে বাজার স্থিতিশীল রাখে। তাদের লক্ষ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ খাদ্যফসল বিশেষ করে ধান উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের সহায়তা করা এবং সেটা করা হয় বিদ্যমান কৃষিনীতি, যা আসলে কৃষির নীতি নয়, বরং ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফুড প্রোডাকশন’। এই কৃষি মূলত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, গভীর নলকূপ দিয়ে সেচ এবং ধান লাগানো থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত যন্ত্রের ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। এই বিকৃত কৃষিব্যবস্থার ত্রুটি এবারের বোরো মৌসুমে দেখা গেছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলের অবৈধ ও আগ্রাসী যুদ্ধের কারণে সারা দেশে জ্বালানি সংকটের সময়ে বোরো ফসলে ডিজেল সংকটের কারণে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি; এবং হাওরে অসময়ে বৃষ্টিতে প্রায় পাকা ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই সময় দ্রুত ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যায় নি, এমনকি এতদিন কৃষকদের মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া সেই কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিনও কাদায় নামতে পারেনি। হাওরের একটি মাত্র কৃষি ফসল বোরো ধান, কৃষকের চোখের সামনে পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেল। বলাবাহুল্য, হাওরে এখন যে ধান উৎপাদিত হয়, তা অধিকাংশ উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের। বর্তমানে ধানের তিনটি মৌসুমের মধ্যে বোরো মৌসুম থেকে আসে ৫৫ শতাংশ এবং হাওরে মোট বোরো ধানের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয়।
এ বছর হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির পরিমাণ পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে দুই লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন এবং প্রায় দুই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কৃষিতে কৃষকের বিপর্যয়সহ টিকে থাকার নানা চ্যালেঞ্জের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কোনো প্রণোদনা দিলেন না। আফসোস।
কৃষিতে বরাদ্দ মানে সার-কীটনাশকে ভর্তুকি দেওয়া, অর্থাৎ বিষ কোম্পানি ও সার কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ ও উৎপাদন খরচ কমানোর লক্ষ্যে সার ও কীটনাশকের ওপর বিদ্যমান সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট ও কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করছে সরকার। কিন্তু বুঝতে হবে এই সুবিধা কৃষকের জন্য আসছে না, আসছে সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের জন্য। যেখানে সার ও বিষনির্ভর কৃষিব্যবস্থা থেকে সরে আসা কৃষিনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হওয়ার কথা ছিল, সরকার তার উল্টোটা সবসময় করে আসছে। সার-কীটনাশকের খরচ আছে অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু অন্যান্য খরচও তো আছে। যেমন ধান লাগানো ও ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিকের খরচ, সেচের পানির খরচ, উৎপাদন-পরবর্তী প্রক্রিয়ার খরচ প্রভৃতি। কিন্তু সেসব খরচের দায় সরকার নিচ্ছে না। তার চেয়েও জরুরি বিষয় হচ্ছে, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, যা বেশিরভাগ সময় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম থাকে এবং তাই কৃষকের দেনা কমে না। খাদ্য আমদানিসহ সরকারের বাণিজ্যনীতি সবসময়ই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং সরাসরি কৃষকের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। অথচ বাজেটে এ বিষয়ে কোনো কথা নেই। ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করা এবং কৃষক কার্ডের সুবিধা সব কৃষক পাবে, তার কোনো গ্যারান্টি কি আছে?
তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি সমস্যাসহ কৃষির উৎপাদনশীলতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেজন্য সার-কীটনাশকে ভর্তুকির চেয়েও বেশি দরকার কৃষিনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো। এই কৃষিব্যবস্থা ১৮ কোটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য জোগান দিতে পারছে না। খাদ্যে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত হবে না, যদি খাদ্য উৎপাদন নিরাপদ করা না হয়।
জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ক্রমেই কমে আসছে, এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৯ শতাংশে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল, যেখানে কৃষির অবদান ছিল ৬২ শতাংশ। কিন্তু দেশ ক্রমে শিল্পায়ন (৩৪ শতাংশ) এবং সেবা খাতের (৫১ শতাংশ) দিকে এগোচ্ছে। শিল্পায়ন বলতে তৈরি পোশাকশিল্পই মূলত বোঝায়, যা আমাদের অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে কিছু অর্থের জোগান দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীল খাত তৈরি করছে না। কৃষির প্রতি সরকারের মনোযোগের অভাবে জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে যাওয়া দ্রুত গতিতে ঘটছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এক দশকে কমেছে ১৭ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০ বছরে পাঁচ শতাংশ অবদান কমে গেছে। কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা। কৃষি থেকে উৎখাত হলে তাদের শহরে চলে আসতে হয়। তাদের মেয়েরা যায় গার্মেন্ট কারখানায় আর ছেলেরা যায় প্রবাসে শ্রমিক হয়ে। এই সুযোগও ক্রমে সীমিত হয়ে আসছে।
কৃষি বরাদ্দের মধ্যে আর এক ভাগীদার হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। এ খাতের মাধ্যমে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করা হয়। কৃষির মতোই এ খাতের সঙ্গে যুক্ত আছে বিশাল গোষ্ঠী; যেমন জেলে/মৎস্যজীবী, গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনকারী গরিব নারী এবং লাখ লাখ ছোট খামারি। তারা কী ধরনের বাজেট সুবিধা পাবে, তার কোনো উল্লেখ নেই।
জিডিপিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের অবদান একত্রে প্রায় ৪.৩ শতাংশ। কর্মসংস্থানের দিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের ২৫ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্য খাতে প্রায় ১৮ লাখ নিবন্ধিত মৎস্যজীবী আছে। প্রাণিসম্পদে যুক্ত আছে প্রায় ১৪ লাখ খামার, যেখানে প্রায় এক কোটি মহিলা গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালনে নিয়োজিত আছে। এক বিশাল জনগোষ্ঠী এ খাতে যুক্ত হয়েও বাজেটের সময় উপেক্ষিত থাকছে।
এবার বাজেটে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ভাগে কত বরাদ্দ হবে, তা জানা যায়নি, তবে গত বাজেটের ৩৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকার মধ্যে কৃষিফসল খাতে বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা (৬৮ শতাংশ), আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, মাত্র ৮.৫ শতাংশ ।
সামগ্রিক বাজেটে কৃষিতে অবহেলা বিপজ্জনক। তার মধ্যে আরো বিশেষভাবে অবহেলিত হচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। অথচ দুটো খাত মিলেই শুধু খাদ্যের জোগান দিচ্ছে না, পুষ্টি নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও প্রধান ক্ষেত্র হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ধারণ করে।
কৃষির অবহেলা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অনিশ্চিত করে তুলবে—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবহেলা দেশের অর্থনীতির জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে না।
লেখক : অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

Friday, June 5, 2026
খামারের মাছ-মাংস আর ফল-ফসলে স্বপ্নের মতো জীবন হান্নানের by আকমল হোসেন
আবদুল হান্নান ছিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মাটির প্রতি টান ছিল শৈশব থেকেই। পড়াশোনার সময় ধান চাষে হাতেখড়ি। পরে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের সিলেট অঞ্চলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালে অবসর নেন। অবসরজীবনে তিনি মাটির টানেই ফিরে গেছেন চাষাবাদে। শুরু করেন শাকসবজি, মসলা, দেশি-বিদেশি ফল, মাছ এবং দেশি জাতের মোরগ পালন। তাঁর বাগানে শোভা পাচ্ছে সৌদির খেজুর থেকে শুরু করে অ্যাভাকাডো, জলপাই, আতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ফল।
সম্প্রতি এক দুপুরে বাহারমর্দ্দানে আবদুল হান্নানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একজন শ্রমিক নিয়ে তিনি নিজেই গাছের পরিচর্যা করছেন। বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক জাতের গাছ লাগানো। কোনোটাতে ফল এসেছে। কোনোটা নতুন লাগানো। বাগানের চৌহদ্দির মধ্যে পুকুর। পুকুরেই চাষ হচ্ছে রুই-কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, পাঙাশসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। প্রয়োজন হলেই পুকুরে বড়শি ফেলেন তিনি।
এই সৌখিন খামারি বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর চাষাবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে শাকসবজি ও মসলার চাষ শুরু করেন। ধান চাষ আগে থেকেই করতেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শর্ষে, দারুচিনি, মরিচ, ধনিয়া, তেজপাতা—সবই নিজে উৎপাদন করেন। শর্ষে থেকে পরিবারের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এবার মাছের খাবারের চাহিদা মেটাতে ভুট্টা চাষও শুরু করবেন। ৬০ শতাংশ জমিতে দেশি-বিদেশি ফলের চাষ করেছেন। সৌদি খেজুরের একটি গাছে এবার এক থোকা খেজুর এসেছে। অনেক খেজুরগাছ নিজেই চারা তৈরি করে লাগিয়েছেন। বাড়ির আশপাশের ৬০ শতাংশ জমিতেও আছে নানা প্রজাতির গাছ। ১০০ থেকে ১৫০টি দেশি জাতের মোরগ–মুরগি পালেন। সেখান থেকেই ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথম আলোকে বলেন, যখন যে মৌসুম, তখন সেই রকম সবজি চাষ করেন আবদুল হান্নান। ফসল, ফল আর মাছে ভরা সংসার তাঁর। তেমন কিছু তাঁকে কিনে খেতে হয় না।
আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুর সময় তেমন কিছু জানতাম না। ধীরে ধীরে শিখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। এখন অনেকে আমার কাছ থেকে চাষাবাদের পরামর্শ নিতে আসেন। আমি নিজের মতো করে মাছের খাবার বানাই, ওষুধ দিই, জৈব সার উৎপাদন করি। বাগান ও খামারের সব কাজ নিজেই তদারক করি।’
পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফল ও পণ্য বাজারেও বিক্রি করেন আবদুল হান্নান। জানালেন, এখন পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এখন শুধু পরিচর্যার খরচ। বেশ তৃপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘লবণ-চিনি ছাড়া আর কিছু কিনি না। মাছ-মাংস, ফল-ফসল—সব নিজেরই উৎপাদন। চেষ্টাটাই আসল। খুব বেশি টাকা খরচ না করেও অনেক কিছু সম্ভব।’
![]() |
| আবদুল হান্নানের বাগানে আছে নানা জাতের দেশ–বিদেশি ফল। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, April 5, 2026
চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফলের চাষ, এখন হোসেনের বাগানে কাজ করেন ৫ জন by নেয়ামতউল্যাহ
ভোলার লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ গ্রামের হোসেন বিশ্বাস ১৮০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি মিশ্র ফলের বাগান। এখানে ফল কিনতে এখন আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।
মো. হোসেন বিশ্বাসের বাবা জালাল আহমেদ বিশ্বাস (৭১) বলেন, করোনার লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে বেকার হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। ফল চাষের জন্য জমি চাইলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৮০ শতাংশ জমিতে যেখানে ৬০–৭০ মণ ধান হয়, সেখানে ফল চাষ করে লাভ কী। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘ফল তো পাখি ছাড়া কেউ খায় না।’ কিন্তু ছেলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এখন বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বিমুখ করে না, প্রথম বছরেই লাভ হলো। এখন তো আর কথা নেই।’
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ডাওরী–বাহাদুর চৌমহনী–রায়চাঁদ বাজার সড়কের পূর্ব পাশে ধানি জমিতে মাটি ফেলে কাঁটা মান্দারের ডাল পুঁতে সুপারির চারা লাগানো হয়েছে। মান্দার পাতা পচে সারে পরিণত হয়—এটি ভোলার শত বছরের পুরোনো চাষপদ্ধতি। এই সুপারিবাগানের পাশেই নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে মো. হোসেনের মিশ্র ফলের বাগান।
যাঁরা একসময় হোসেন বিশ্বাসকে ‘পাগল’ বলতেন, তাঁরাই এখন ফলের বাগান করার কথা ভাবছেন। লালমোহন ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের বাগান থেকে বরই কিনতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, সুপারিবাগানের তুলনায় অন্যান্য ফলের বাগানে আয় অনেক বেশি।
হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেল, ভারত সুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুলের চাষ করেছেন। এসব চারা তিনি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর এক বন্ধুর খামার থেকে। এ ছাড়া বাগানে আছে ১৩০টি হলুদ মাল্টা, ৬০টি দার্জিলিং কমলা ও ১৪০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ।
ভোলায় আগে থেকেই বাউকুল, নারকেলি কুল, টক বোল, মিষ্টি বোল ও খুদে আপেল কুলের চাষ হলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বলসুন্দরী, চায়না টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের আবাদ শুরু হয়। এসব জাতের ফলন ও দাম দুটিই ভালো। মো. হোসেন এ বছর বাড়ি থেকেই কুল বিক্রি শুরু করেছেন ২০০ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে বলসুন্দরী বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি।
মো. হোসেন বিশ্বাস বলেন, তিনি দীর্ঘদিন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদরুল আমিনের অধীনে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ফল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে মেট্রোরেলে চাকরি করলেও করোনায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,‘আল্লাহ প্রথম বছরেই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। গত বছর ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ বছর শুধু কুল থেকেই ১৮ লাখ টাকার বিক্রি আশা করছি।’
হোসেনের বাগানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি ও চারবার নাশতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে বাগান করতে পারেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ফলের আবাদ হয়। এর মধ্যে নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল ও তরমুজের আবাদ প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে সারা বছর বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়।
লালমোহন উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেলে দোআঁশ মাটি ও আবহাওয়া বলসুন্দরী, টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের জন্য খুবই উপযোগী। এমনকি লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও কুল ভালো হয়। তাই বেকার যুবকেরা সহজেই এই চাষে স্বাবলম্বী হতে পারেন। মো. হোসেনের বাগান দেখে ইতিমধ্যে ওই গ্রামের বেকার যুবকেরা প্রায় ১২ একর জমিতে ফলের আবাদ শুরু করেছেন।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুল উচ্চফলনশীল। ভোলার উর্বর জমিতে এসব জাতের ফলন আরও বেশি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ভোলায় ফল চাষের সম্ভাবনা ও চাহিদা—দুটিই আছে। কৃষি বিভাগ ফলের আবাদ বাড়াতে নানা প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের পাশে আছে।
![]() |
| হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেলের চাষ করেছেন। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, March 19, 2026
পাথরের গ্রামে এখন মাঠভরা ফসল, পুকুরভরা মাছ, সব কৃতিত্ব মনিরের by সুমনকুমার দাশ
সমন্বিত আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির এই দৃশ্য দেখা গেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে। দেশের বৃহত্তম পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ–সংলগ্ন এ গ্রামের মানুষ কয়েক বছর আগেও পাথরকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা আমন ধান ছাড়া কিছুই চাষ করতেন না। এখন গ্রামটিতে রীতিমতো সবুজের বিপ্লব চলছে। এর নায়ক মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর দেখানো পথেই গ্রামের প্রায় সবাই চাষাবাদে এগিয়ে এসেছেন।
৪০ ছুঁই ছুঁই মনিরুজ্জামানের বাড়ি উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের কালীবাড়ি গ্রামে। বাড়ির পাশেই পাথরকোয়ারি। আশপাশের অনেকের মতো তিনিও ছিলেন পাথর ব্যবসায়ী। স্থানীয় পাথর কেনার পাশাপাশি তিনি পাথর আমদানিকারকও ছিলেন। ২০১৮ সালে যখন সরকারি নির্দেশনায় কোয়ারির পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন অনেকের মতো তিনিও বেকার হয়ে পড়েন। তাঁর বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনেরা কাজের আশায় যেতে থাকেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। মনিরুজ্জামান কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।
ঘরে স্ত্রী আর ছোট তিন সন্তান। তাদের ফেলে রেখে প্রবাসী হওয়ার বিষয়টিও মনিরের মনে সায় দিচ্ছিল না। ওই সময়টাতে একদিন কালীবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের রাধানগর গ্রামে যান। সেখানে দেখেন, বিঘার পর বিঘা অনাবাদি জমি। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক তাঁর মাথায় আসে। যেই ভাবা, সেই কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে কিছু জমি কিনে আর কিছু জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন চাষাবাদ।
শুরুর দিকটায় রাধানগর গ্রামের বাসিন্দারা মনিরের কাজকে ‘অসাধ্য ও পাগলামি’ বলে মনে করতেন; কিন্তু পরিশ্রম আর একাগ্রতায় অসাধ্য সাধন করেন তিনি। এখন ‘পাথরের পৃথিবী’খ্যাত সীমান্তবর্তী রাধানগর গ্রামে ফোটালেন ফুল, ঘটালেন সবুজের বিপ্লব। স্বপ্ন এখন তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দী। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন চাইছেন, রাধানগর গ্রামটি কৃষিজ আর প্রাণিজ সম্পদের এক আধারে পরিণত করবেন।
শুরুর গল্প
শুরুটা ২০১৯ সালে। রাধানগর গ্রামে তিনি পরিত্যক্ত একটা দোতলা বাড়ি কম দামে কেনেন। আটটি কবুতর কিনে সে বাড়িতে তৈরি করেন খামার। কিছুদিন পর সিলেটের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কম টাকায় কেনেন মিসরীয় ফাউমি মুরগি। ধীরে ধীরে তাঁর পসার বাড়ে। এরপর কেনেন গ্রামের কিছু অনাবাদি জমি। বর্গাও নেন কিছু পরিত্যক্ত পতিত জমি। সেসব জমিতে ধানের পাশাপাশি শুরু করেন শাকসবজির ফলন।
প্রথম বছরেই সাফল্য আসে। মনিরুজ্জামানের উৎপাদিত শাকসবজি কিনতে পাশের হাটবাজার থেকে পাইকারেরা আসেন। মুখে মুখে সে খবর রটে। চাহিদা বাড়ে তাঁর মুরগি আর সবজির। পরের বছর আরও অনাবাদি জমির ইজারা নেন। সেখানে শর্ষে, গম, ভুট্টা, লালশাক, ঝিঙা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, আলু, খিরা, শসা, সূর্যমুখী, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা সবজি ফলান। বস্তার মধ্যে উৎপাদন করেন আদা। এ ছাড়া আমনের পাশাপাশি আউশ ও বোরো ধানের আবাদও করেন। তাঁর হাত ধরে যেন সোনা ফলে। সব চাষেই ধরা দেয় অভাবনীয় সাফল্য।
মনিরকে সাফল্যের নেশায় পেয়ে বসে। কৃষিতে সাফল্য পেয়ে তৈরি করেন গরুর খামার। সেখানেও পান সফলতা। এরপর প্রায় মরা দুটি পুকুর খনন করে মাছের পোনা ছাড়েন। কয়েক মাস যেতেই তাঁর পুকুরজুড়ে লাফালাফি করতে থাকে হাজারো কার্ফু, ব্রিগেড, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, গ্রাস কার্প। মাছ যত লাফায়, মনিরের মুখের হাসি তত চওড়া হয়। এখন তো উপজেলা ছাড়িয়ে জেলায়ও তিনি এক আদর্শ চাষি হিসেবে সুপরিচিত। এরই স্বীকৃতি মেলে ২০২৫ সালে। সেবার তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁকে দিয়েছে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। সবাইকে ডিঙিয়ে তিনি হয়েছেন প্রথম।
পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু
যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি বলেন, এখন দুটি পুকুরে তিনি মাছের চাষ করছেন। এসব মাছ পাইকারি দরে ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যান। মাছের ব্যবসায় লাভ বেশি। অল্প দামে পোনা কিনে পুকুরে ছেড়ে দিলে পরে বেশি দামে বেচা যায়। এ জন্য কয়েক দিন আগে আরেকটি পরিত্যক্ত পুকুর খনন করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানেও মাছ চাষ শুরু করবেন।
মনির বলেন, তিনি কিছুদিন আগে পুকুরে ১৬ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এরই মধ্যে ওই পোনা কেনার সমপরিমাণ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। পুকুরে আরও এক লাখ টাকার বেশি মাছ আছে। মাছের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় তিনি রেণু পোনা উৎপাদনও শুরু করবেন। এসব রেণু পোনা তাঁর পুকুরে ছাড়ার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও তাঁর আছে।
বর্তমানে তাঁর খামারে ১০টি গরু আছে। এসব গরুর দুধ আশপাশের এলাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া বড় পরিসরে ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে একটি খামার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। দ্রুতই এখানে আরও গরুর পাশাপাশি ছাগল পালনও শুরু করবেন। এসব গরু, ছাগল পাইকারি দরে বেচবেন।
‘ক্ষেতে-ক্ষেতে ঝরিতেছে’ ফসল
এক বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাধানগর গ্রামটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি। ওই চেরাপুঞ্জির আকাশ আর পাহাড়ের সম্মিলন পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নৈসর্গিক পরিমণ্ডলে রাধানগর গ্রামের অবস্থান। গ্রামের যেখানে শেষ, এর পরেই মনিরুজ্জামানের কৃষিজমি শুরু।
গ্রামের শেষ সীমানার মেঠো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনিরুজ্জামান দেখান তাঁর কৃষিজমি। জানান, প্রায় ৬০০ শতাংশ জায়গায় তিনি নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন। আমন, আউশ ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি অন্তত ২০ প্রজাতির সবজি ফলাচ্ছেন। এক দিনের জন্যও কোনো জমি অনাবাদি রাখছেন না। ধান কাটা শেষ হলেই পরদিন ওই জমিতে শাক কিংবা শসার বীজ ফেলছেন, আবার শর্ষে কাটার পরদিনই বুনছেন অন্য কোনো ফসল। যখন যে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সময়, তখনই তিনি সেটিই ফলাচ্ছেন।
পানির তীব্র সংকটের কারণে শুরুর দিকটায় চাষাবাদ খুব মুশকিল ছিল বলে মনিরুজ্জামান জানান। তিনি বলেন, ‘পানি ছাড়া চাষাবাদ কঠিন। রাধানগর গ্রাম থেকে নদীও অনেক দূরে। ২০২৩ সালে সরকারি উদ্যোগে এখানে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের একটি সংযোগ চালু করে। ওই সংযোগ থেকে আটটি সাব-সংযোগ আশপাশের জমিতে নেওয়া হয়। যেহেতু আমার দেখাদেখি এখন অনেকেই পতিত জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন, ফলে এসব চাষিও এখন ওই পানি ব্যবহার করে ফলন ভালোভাবে করতে পারছেন।’
মনির একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। ভুট্টার পাশাপাশি লালশাক করেছেন। এখন এক বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি একই সঙ্গে কলা গাছও রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া আগামীতে কুল ও পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফলের আবাদের চিন্তা আছে তাঁর।
আরও যত সফলতা
সবজি, মাছের চাষ বা গরু, কবুতর ও মুরগির খামার ছাড়াও অনেক কাজে সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কোম্পানীগঞ্জের সহায়তায় ৩ শতাংশ জায়গায় ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার) উৎপাদন করছেন। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এক বছর আগে এ উদ্যোগ নেন তিনি।
মনিরুজ্জামান বলেন, গত এক বছরে তিনি চারবার জৈব সার উৎপাদন করেছেন। জমিতে জৈব সার ব্যবহার করায় তাঁর ফলন বেড়েছে। বিষমুক্ত এ সার ব্যবহারের কারণে তাঁর উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের চাহিদাও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া নিজের জমিতে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত সার তিনি গ্রামের অন্য চাষিদের কাছে বিক্রি করছেন। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার বিক্রির জন্য তিনি উৎপাদন আরও বাড়াবেন বলে ভাবছেন।
ছোট একটি অটো রাইসমিলও বসিয়েছেন মনির। এখানে ধান থেকে চাল করার পাশাপাশি ভুট্টা, গম, হলুদ, মরিচ ও জিরাগুঁড়া করেন। রাধানগর গ্রামসহ আশপাশের মানুষেরা অল্প টাকায় এ মিল ব্যবহার করেন। এ ছাড়া শর্ষে থেকে তেল করার জন্য ছোট একটি মেশিনও আছে তাঁর। এর বাইরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ভর্তুকি মূল্যে আধুনিক বেশকিছু কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। কিছু যন্ত্রপাতি সরকারিভাবে বিনা মূল্যে পেয়েছেন। সেসব তিনি গ্রামবাসীকেও ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।
আলোর দিশা পেলেন অন্যরাও
রাধানগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, মনির এক ফসলি জমিকে একাধিক ফসলি জমিতে রূপ দিয়েছেন। সফলতা আসায় তাঁর দেখাদেখি এখন অন্যরাও চাষাবাদে উৎসাহী হচ্ছেন। বিশেষ করে চলতি বছর গ্রামের অনেকে শর্ষে চাষ করেছেন। শতাধিক চাষি অন্তত ১৫ হাজার শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন।
রাধানগর গ্রামের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, তিনি মনিরুজ্জামানকে দেখে উৎসাহিত হয়ে চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে শর্ষে আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফসল কাটবেন। লাভ হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে শর্ষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি চাষের চিন্তা আছে তাঁর।
মো. এনামুল হক নামের আরেক কৃষক জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন। মনিরুজ্জামানের হাত ধরে কৃষিতে যে সফলতা এসেছে, সেটি এখন রাধানগরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন অনেকেই পতিত জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন।
রাধানগর গ্রামের মানুষ জানলেন, একজন আদর্শ কৃষকের পাশাপাশি মনির সমাজকর্মীও। তাঁদের কয়েকজনের অর্থায়নে স্থানীয়ভাবে একটি মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটা দুস্থ পরিবারের ভরণপোষণও করছেন তাঁরা কয়েকজন। মনিরুজ্জামান কোম্পানীগঞ্জ টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি। এ ছাড়া সিলেট স্বপ্ন রক্তদান ও সমাজকল্যাণ সংস্থার একজন সদস্য হিসেবে এ পর্যন্ত রক্তদান করেছেন ৪২ বার।
তৈরি করতে চান অ্যাগ্রো রিসোর্ট
আগামী বর্ষার মধ্যে একটি অ্যাগ্রো রিসোর্ট (কৃষি খামার ও পর্যটনের সংমিশ্রণ) তৈরির পরিকল্পনা আছে বলে জানান মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের গ্রাম কালীবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন সকালে রাধানগরে আসি। দুপুরে বাড়িতে খেতে যাই। পরে বিকেলে আবার আসি। ফিরি সন্ধ্যা সাতটা কিংবা রাত আটটার দিকে। আসলে সীমান্তলাগোয়া এ জায়গার মায়ায় পড়ে গেছি। কী সুন্দর জায়গা!’
মনির বলেন, ‘সামনে তাকালেই মেঘালয়ের সারি সারি সুউচ্চ পাহাড়। বর্ষায় সেই পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ ভেসে বেড়ায়। তখন পুরো এলাকাটি অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ নেয়। এটি মাথায় রেখেই অ্যাগ্রো রিসোর্ট তৈরি করতে চাই। মানুষ এখানে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি নির্ভেজাল শাকসবজি, মাছ, মাংস খাবেন। বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেবেন। এরই মধ্যে জায়গাও প্রস্তুত করেছি। দ্রুতই রিসোর্ট তৈরির কাজ শুরু করব।’
আক্ষেপহীন সুন্দর জীবন
মনির বলেন, ‘পাথরের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কেন আমি গেলাম না, এ নিয়ে তখন সাময়িক সময়ের জন্য আক্ষেপ ছিল; কিন্তু এখন আর আক্ষেপ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন আমার। প্রাকৃতিক পরিবেশে মনের আনন্দে নিজের কাজ করছি। বিদেশে গেলে অন্যের দোকানে কাজ করতে হতো, এখন আমার এখানে তিনজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। প্রতিদিন সাত থেকে আটজন শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। অন্যের কর্মসংস্থানের উপলক্ষ আমি হতে পারছি, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?’
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে মনির বলেন, ‘দেশ ঘোরা আমার নেশা। প্রতিটি জেলা সফর করেছি। অন্তত ২১টি জেলায় নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিষয়ে হাতে–কলমে পাঠ নিয়েছি। সেসব আমার চাষাবাদ-পরিকল্পনায় প্রয়োগও করছি। সফলতার এটিও একটি কারণ।’
মনিরুজ্জামানের সাফল্যের প্রশংসা করলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান। তিনি বলেন, যে এলাকার সবাই কমবেশি পাথরের ব্যবসা কিংবা উত্তেলনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় এনে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করেছেন মনিরুজ্জামান। পরিত্যক্ত জমিও তিনি চাষাবাদের আওতায় এনেছেন। তাঁর মতো কৃষকই আমাদের আদর্শ। তিনি এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা।
| সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান। ছবি: আনিস মাহমুদ |
Monday, February 9, 2026
কুল উৎপাদনে রাজশাহী শীর্ষে, এরপরেই ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা by ইয়াহইয়া নকিব
বর্তমানে দেশি জাতের টক–মিষ্টি বরই থেকে শুরু করে আপেল কুল, বাউকুল, থাইকুল, বনসুন্দরীসহ উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের মিষ্টি বরইয়ের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। কুলের মৌসুম শুরু হয় জানুয়ারিতে, যা শেষ হয় এপ্রিলে। বছরের এই সময় অন্য দেশি ফল তুলনামূলক কম থাকায় ভালো বাজার পায় কুল।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপযোগী মাটি ও আবহাওয়ার কারণে দেশে সবচেয়ে বেশি কুল উৎপাদন হয় রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিসিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে কুল উৎপাদন হয় ১ লাখ ১ হাজার ৫২৩ টন। এর ভিত্তিতে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি কেজির দাম ১০০ টাকা করে ধরলেও দেশে উৎপাদিত কুলের বাজারমূল্য এক হাজার কোটি টাকার বেশি হবে।
আগের ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১ লাখ ৮১৮ টন কুল উৎপাদন হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২২–২৩ ও ২০২১–২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল যথাক্রমে ৯৭ হাজার ও ৯৫ হাজার টন। কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অবশ্য বলেন, প্রকৃত উৎপাদন সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।
বাজারদর ও লাভ
মৌসুমের শুরুতে এখন ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কুল (বড়) ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ছোট আকারের দেশি বরই বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা নাহিদ হোসেন বলেন, কিছুদিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে।
মাগুরার নাসির অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী নাসির হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তিনি এবার পাঁচ বিঘা জমিতে কুল চাষ করছেন। প্রতি একরে খরচ পড়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতি মণ কুল এখন আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাতে একরপ্রতি ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার কুল বিক্রি হতে পারে। এ থেকে তিনি একরে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লাভ হবে বলে আশা করছেন।
শীর্ষে রাজশাহী
২০২৩–২৪ অর্থবছরের উৎপাদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজশাহী জেলায় সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৭৫৯ টন কুল উৎপাদন হয়েছে। ৭ হাজার ২২৯ টন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ ছাড়া ৪ হাজার ১২৮ টন উৎপাদন নিয়ে কুমিল্লা আছে তৃতীয় স্থানে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া ৩ হাজার ৬৩৬ টন ও চট্টগ্রাম ৩ হাজার ৫৯৪ টন নিয়ে যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, উপযোগী মাটি ও সহজ বাজারজাতের ব্যবস্থার কারণে রাজশাহী ও ময়মনসিংহে কুল চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ জেলার উপপরিচালক মো. এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এখানকার মাটি কুল চাষের উপযোগী। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বাজারজাতকরণ সহজ হয়। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান। তাই ফুলবাড়িয়া ও ভালুকায় ব্যাপকভাবে কুলের চাষ হচ্ছে।
বিভিন্ন জাত
কৃষিবিদদের মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় বনসুন্দরী, আপেল কুল ও স্থানীয় জাত ঢাকা–১৯ ও বাউকুল। ১ ফুট উচ্চতার একটি গাছে এক বছরের মধ্যেই ২০ কেজি পর্যন্ত কুল পাওয়া যায়। প্রতি একর জমিতে গড়ে ৩০০টি গাছ লাগানো যায়। পরের বছর গাছের গোড়া থেকে এক হাত পর্যন্ত রেখে বাকিটা ছেঁটে দিতে হয়। সেখান থেকে নতুন ডালপালা গজায়। তবে ডালপালা সঠিকভাবে ছাঁটাই না হলে ফলন কমে যায়।
দেশে বাণিজ্যিক কুল চাষের সূচনা সম্পর্কে কৃষিবিদ মো. মেহেদী মাসুদ জানান, ২০১৪ সালের দিকে ভারতের মহারাষ্ট্র ও কাশ্মীর থেকে আনা জাত দিয়ে দেশে কুলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। পরে স্থানীয় হর্টিকালচার সেন্টার থেকে এসব চারা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
বাউকুলে বিপ্লব
কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, কুল মূলত বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার অঞ্চলের ফল। আশির দশকে ভারত থেকে উন্নত জাত আমদানির পর চাষ বাড়তে থাকে। কুল খরাসহিষ্ণু, রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। অর্থাৎ এটি সহজে উৎপাদন করা যায়। শীতের শেষ দিকে অন্য দেশি ফল না থাকায় কুল ভালো কদর পায়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান বলেন, বারি থেকে পাঁচটি কুলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে নারিকেলি জাতটি কুমিল্লা এলাকায় বেশি চাষ হচ্ছে। আপেল কুল এনেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে বাউকুল জাত উদ্ভাবনের পর কুল চাষে বিপ্লব ঘটে।
মো. মসিউর রহমান বলেন, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অন্য দেশি ফল তেমন থাকে না। জানুয়ারির পর দেশি কমলাও পাওয়া যায় না। বিদেশি আপেল ও কমলার দাম বেশি। এ ছাড়া ফল খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে এবং কুলের স্বাদও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। এসব কারণে কুল জনপ্রিয় ফল হয়ে উঠেছে।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, কুল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এটি রক্ত শোধন ও হজমে সহায়ক। পেটের গ্যাস ও অরুচি দূর করতে কুলের ফুল থেকে তৈরি ওষুধও ব্যবহৃত হয়।
![]() |
| মৌসুমের শুরুতেই রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে এখন হরেক রকমের কুল-বরইয়ের সমাহার দেখা যাচ্ছে। ছবি : প্রথম আলো |
Sunday, January 18, 2026
দূষণ আগরতলায়, ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by মোস্তফা ইউসুফ ও শাহাদৎ হোসেন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাজ্যটির রাজধানী আগরতলায় শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে সেখানকার নদী ও খাল দূষণের শিকার হচ্ছে। সেই দূষিত পানি আসছে বাংলাদেশে। ভুগছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ।
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ আখাউড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের পাশ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে কালন্দি খাল। সেই খাল দিয়ে আসছে কুচকুচে কালো পানি। আশপাশে তীব্র দুর্গন্ধ। চিকিৎসক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিনের এ দূষণে ত্বক ও পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ১৫ গ্রামের মানুষ।
সব মিলিয়ে পাঁচটি খাল ও দুটি নদী দূষণের শিকার হচ্ছে। সেগুলো হলো কালন্দি, মরা গাঙ, কাটা খাল, কালিকাপুর ও গঙ্গাসাগর খাল এবং হাওড়া ও জাজী নদী।
দূষণ নতুন নয়, তিন দশক ধরে চলছে। এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে দূষণ বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
২০২০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কমিটি প্রথমবারের মতো এসব খাল ও নদীর পানি পরীক্ষা করে দূষণের প্রমাণ পায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভরা বর্ষাতেও সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ অংশের খালগুলোতে দূষণ ছিল মাত্রাতিরিক্ত। দূষণের প্রভাব তিতাস নদ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কমিটির প্রতিবেদনে দূষণ বন্ধে ভারতীয় অংশে বর্জ্য পরিশোধনাগার (সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) বসানোর ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করার সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তর গত এপ্রিলেও পানি পরীক্ষা করে। সেখানেও দূষণ পাওয়া যায়।
২০২০ সালের কমিটির প্রধান ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক ফাহমিদা খানম। তিনি এখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০২০ সালের অক্টোবরে আমরা প্রথম সীমান্তবর্তী খাল ও নদীর পানির নমুনা পরীক্ষা করে মানমাত্রা–বহির্ভূত দূষণ পাই। তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে এটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছিলাম।’
ফাহমিদা বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে তখন যৌথ নদী কমিশনকে এসব দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলি। তারা নিয়মিত বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে উত্থাপন করে আসছে। সর্বশেষ ফলাফল কী, সেটা যৌথ নদী কমিশন ভালো বলতে পারবে।’
জানতে চাইলে যৌথ নদী কমিশনের পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরে যৌথ নদী কমিশনের সভায় দূষণ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারতকে বলা হচ্ছে। প্রতিবারই ভারত দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও দূষণ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
মোহাম্মদ আবু সাঈদ আরও বলেন, সর্বশেষ এ বছরের মার্চে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের সভায় ভারত জানিয়েছে, দূষণ বন্ধে আগরতলা শহরে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এটি নির্মাণাধীন। কাজ শেষে বাংলাদেশ থেকে একটা দলের সেটি পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
দূষণের চিত্র
পানিতে জলজ প্রাণী ও অণুজীবের শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো দ্রবীভূত অক্সিজেন। প্রতি লিটারে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) দরকার অন্তত ৫ মিলিগ্রাম।
পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বছরের এপ্রিলের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৭টি জায়গা থেকে নেওয়া নমুনার ৬টিতেই দ্রবীভূত অক্সিজেন গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক কম পাওয়া গেছে। ৫টিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৬১ থেকে ১ দশমিক ২০ মিলিগ্রামের মধ্যে। একটি জায়গায় এ হার ছিল ৪ দশমিক ১৫ মিলিগ্রাম। গ্রহণযোগ্য মানমাত্রায় পাওয়া গেছে একটি জায়গায়।
পানিতে জৈব দূষণ কতটা, তা মাপার সূচক হচ্ছে বিওডি (বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। এটির গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা হলো প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার সব কটিতেই গ্রহণযোগ্য মাত্রার বেশি পাওয়া গেছে। পরিমাণ ৮ থেকে ২৭ মিলিগ্রাম।
দূষণের মাত্রা পরীক্ষার আরেকটি সূচক হলো সিওডি (কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড)। পানিতে সিওডি থাকতে হয় প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৫০ মিলিগ্রাম। সাতটি নমুনার মধ্যে একটিতে সিওডি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গেছে। ছয়টিতে পাওয়া গেছে বেশি, ৫২ থেকে ১১৬ মিলিগ্রাম।
আখাউড়া প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্লাবের আহ্বায়ক রুবেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে দূষিত পানি আসছে। বিগত তিন দশকে দূষণ বেড়েছে।
স্বাস্থ্যের ক্ষতি, সম্পদের ক্ষতি
দূষণের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় জনজীবনে নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিমেল খান প্রথম আলোকে বলেন, আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে দূষিত ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত পানি আসছে। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও চর্মরোগ হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া ওই পানিতে থাকা রাসায়নিকের কারণে ক্যানসারের মতো রোগ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষাক্ত মাছ ও সবজি খাচ্ছি। স্বাস্থ্যের সব ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সীমান্তবর্তী ১৫টি গ্রামে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে দূষিত পানি দিয়ে ধানের চাষ হয়। উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নে ধানি জমি বেশি। মোগড়া ইউনিয়ন ও আখাউড়া পৌরসভারও কিছু জমি আছে।
উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের সাহেবনগর গ্রামের কৃষক মুসা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার লোকজন জ্বর, পাতলা পায়খানা, চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। কারও কারও পায়ে ঘা দেখা দিচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আখাউড়া উপজেলা কার্যালয় থেকে জানা যায়, উপজেলায় ৪ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে আমন, ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ও ২১০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়। উপজেলায় চাষযোগ্য ৬ হাজার ৬৬৬ হেক্টর জমি রয়েছে। কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১৬ হাজার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা কত একর জমি এ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তথ্য দিতে পারেননি।
মাছ চাষের জন্য আখাউড়া উপজেলা সুপরিচিত। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বছরে ৫ হাজার টনের বেশি মাছ উৎপাদিত হয়। সেখানে ১ হাজার ৪৩০ জন মৎস্যজীবী ও ৩ হাজার ৫৫৭ জন মাছচাষি রয়েছেন।
উপজেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ভারত থেকে আসা কালো বিষাক্ত পানি মাছের জন্য খুব ক্ষতিকারক। এই পানিতে অক্সিজেন থাকে না, পরিমাণ প্রায় শূন্য। এই পানিতে বিষাক্ত গ্যাস ও অ্যামোনিয়া থাকে বলে মাছ বাঁচে না। উপজেলার খালগুলোতে কোনো মাছ নেই।
‘কোনো সুরাহা হয়নি’
ভারত থেকে আসা দূষিত বায়ু বাংলাদেশের বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও এই বায়ুদূষণ ঠেকানো কঠিন। তবে আগরতলায় দূষণ বন্ধ করতে পারলে বাংলাদেশে পানিদূষণ কমানো যায়।
নদী ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পানি আইন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, যৌথ নদী কমিশন শুধু গঙ্গার পানি ও তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা করে না, দুই দেশের অভিন্ন সব নদী নিয়ে আলোচনা করে। যৌথ নদী কমিশনে বিভিন্ন পর্যায়ের সভায় দুই দেশের প্রকৌশলীরা এ বিষয়টি (দূষণের) তুলতে পারেন।
আইনুন নিশাত বলেন, আগরতলা হয়ে যে বর্জ্যটা আসে, সেখানে প্রচুর ময়লা পানি ও পলিথিন থাকে। এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ভারতকে বহু অভিযোগ (কমপ্লেন) করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।
![]() |
| ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসছে কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত বিষাক্ত পানি। গত বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন পুলিশ চেকপোস্ট-সংলগ্ন উত্তর পাশের খালে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন |
Wednesday, January 14, 2026
রাজশাহীতে আলু বেচে হিমাগার ভাড়াও উঠছে না, কমেছে আবাদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
এদিকে গত মৌসুমের আলু বিক্রিতে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এই জেলায় যেখানে ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল, সেখানে এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে নেমেছে। জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কমিয়েছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার হয়েছে ১২ হাজার ২৬৫ হেক্টরে।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে আলু নিয়ে শুধু হতাশার গল্পই শোনা গেল। তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের চাষি মো. মইদুল ইসলাম জানান, তিনি হিমাগারে ১২১ বস্তা আলু রেখেছিলেন। সেই আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঘর থেকে ১৬ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে।
একই উপজেলার তালন্দ গ্রামের আলুচাষি সাফায়েত হোসেন জানান, তিনি হিমাগারে দেড় হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন ডিসেম্বরের শেষে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে হিমাগারের ঋণ শোধ করতে ঘর থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। গত বছর তিনি ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, এবার সর্বস্বান্ত হওয়ায় মাত্র আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।
তালন্দ গ্রামের আরেক চাষি আসাদুজ্জামান সুমন জানান, গত বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আলু বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। হিমাগারে রাখা তিন হাজার বস্তা আলু থেকে তিনি একটি টাকাও পাননি। আলু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি মাত্র পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।
একই গ্রামের সৈকত কুমার দাস নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি করে তাঁর লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি এজেন্টের মাধ্যমে হিমাগারে ২৭৮ বস্তা আলু রেখেছিলেন। আলু বিক্রির পরও এজেন্টের কাছে তাঁর প্রায় ১৬ হাজার টাকা দেনা রয়েছে।
তানোরের চাষি মাহবুব আলম জানান, গত বছর তিনি ৩২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি শেষে তাঁর লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ টাকা। হিমাগারে রাখা ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু বিক্রি করার পরও হিমাগারের মালিকের কাছে তাঁর ৩৫ হাজার টাকা দেনা রয়েছে। এবার তিনি অর্ধেক জমিতে অর্থাৎ ১৭ বিঘায় আলু চাষ করেছেন।
তালন্দ গ্রামের চাষি কলিমুদ্দিন জানান, গত বছর ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর ৯ লাখ টাকা লোকসান হয়। হিমাগারে রাখা এক হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেও হিমাগারের কাছে তাঁর দেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা। নিজের ঘর থেকেই এই টাকা পরিশোধ করেছেন।
এই হতাশার মধ্যেও ব্যতিক্রমী এক চাষির দেখা মিলেছে। তিনি চোরখৈর গ্রামের রানা চৌধুরী, যিনি গত বছর ২৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। হিমাগারে ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখে তাঁকে ঘর থেকে ২২ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। তবু তিনি এবার ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ভাষায়, যেখানে টাকা হারিয়েছে সেখানেই খুঁজতে হবে—এই ভাবনা থেকেই তিনি এবার বেশি করে আলু চাষ করেছেন।
রহমান কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক আবদুল হালিম জানান, তাঁদের পাঁচটি হিমাগারে এখনো প্রায় ৪২ হাজার বস্তা আলু রয়ে গেছে। সরকারি দামে আলু বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভে তিনি ২২ টাকা কেজির ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত আলু চাষের কারণে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতিতে চাষের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন হলে চাষিরা এ ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
প্রসঙ্গত, যে এলাকায় যে মাটিতে যে ফসল ভালো হয়, সেখানে সেটির আবাদ করাকেই ক্রপ জোনিং।
![]() |
| রাজশাহীতে সবচেয়ে বেশি আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে এবার চাষিরা আলু চাষ কমিয়ে দিয়েছেন। শুধু তানোরেই এক হাজার হেক্টর কম জমিতে আলু চাষ হয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি ২০২৬ উপজেলার চোরখৈর গ্রামে একজন চাষি আলুখেতে সেচ দিচ্ছেন। ছবি: প্রথম আলো |
Monday, January 5, 2026
পঙ্খিরাজ, ভাষামানিকসহ ১০ জাতের ধান সংরক্ষণ করতে চান কৃষক সোহেল by আজাদ রহমান
ওই কৃষি খামারে সোহেল রানা এবার দেড় শতাংশ করে প্লট বানিয়ে ১০টি প্লটে মোট ১৫ শতাংশ জমিতে ওই ১০টি জাতের ধানের চাষ করেছেন।
সোহেল রানার ভাষায়, হারিয়ে যেতে বসা ধানগুলো বাঁচিয়ে রাখতেই তাঁর এ উদ্যোগ। এ বছর ওই সামান্য জমিতে তিনি ধান চাষ করেছেন। এরপর পর্যাপ্ত বীজ তৈরি করে ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে ওই সব ধান চাষ করবেন। পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা আরও একাধিক জাতের ধানবীজ সংগ্রহ করে চাষ করার ইচ্ছা আছে তাঁর।
হরিণাকুণ্ডুর দুর্লভপুর গ্রামের মৃত গোলাম রব্বানীর ছেলে সোহেল রানা। তিনি গ্রামের স্কুল থেকে প্রাইমারি, মাধ্যমিক পড়ালেখা শেষ করে ঝিনাইদহ শহরের কেসি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন। পরে তিনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে চাকরি নেন। কর্মজীবনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশে ‘টেকসই পুষ্টির লক্ষ্যে বৈশ্বিক জোট প্রকল্পের কো-লিডার হিসেবে কর্মরত আছেন।
সোহেল রানা বলেন, ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্টের নানা প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন আমাদের মধ্য থেকে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ অনেক জাতের ধান হারিয়ে যাচ্ছে। যেগুলোর ওপর গবেষণা করলে ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। অথচ আমরা ভালো ফলনের কথা বলে নতুন নতুন জাতের ধান চাষ করে যাচ্ছি। জিংকসমৃদ্ধ ধান হারিয়ে ফেলতে বসেছি।’ এসব দেখে সিদ্ধান্ত নেন হারিয়ে যাওয়া ধান চাষের মাধ্যমে তিনি তা ফিরিয়ে আনবেন। সেই চিন্তা থেকেই স্থপতি খন্দকার হাসিবুল কবির, স্থপতি সুহায়েলী পারভিন, শিক্ষক আলমগীর কবিরের সহায়তায় তিনি হারিয়ে যাওয়া ওই ১০টি জাতের ধান চাষের পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরু করেন খামার প্রতিষ্ঠা ও বীজ সংগ্রহ। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, দেশি বীজ সংরক্ষণ, কৃষি পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বনির্ভর আবাসন তৈরিতে স্থানীয় জ্ঞানের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা এই খামার গড়ে তোলেন।
মাসুদ রানা আরও জানান, প্রথমে ভাদড়া গ্রামের মাঠে ৫ বিঘা জমিতে খামার প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই খামারের নাম দেন ‘আদান–প্রদান’। এরপর শুরু হয় বীজ সংগ্রহ। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী এলাকা থেকে পঙ্খিরাজ, দাদখানি, বেগুনবিচি, ভাষামানিক, কলমকাটি, দোলাভোগ, এলাই, রানাশাইল, পরাঙ্গী, কৃষ্ণকলি নামের ১০টি জাতের বীজ সংগ্রহ করেন। বীজ পাওয়ার পর জমি তৈরি করে সেখানে চাষ শুরু করেন। চলতি আউশ মৌসুমে ১০টি প্লটে মোট ১৫ শতাংশ জমিতে ওই ১০টি জাতের ধানের চাষ করেন। বর্তমানে ধান পাকতে শুরু করেছে। অল্পদিনের মধ্যে এই ধান কেটে তাঁরা বীজ তৈরি করবেন। বর্তমানে কৃষকের খেতে যেসব জাতের ধান চাষ হচ্ছে একই নিয়মে তাঁরা ওই সব ধান চাষ করেছেন। অন্য জাতের ধান চাষের চেয়ে এই জাতগুলো চাষে খরচ কিছুটা কম হয়। ফলন বিঘায় ১৪ থেকে ১৫ মণ হয়ে থাকে। এই জাতের ধানগুলো পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে বিক্রির মূল্য বেশি পাওয়া যায়।
মাসুদ রানা আরও বলেন, ‘রানাশাইল ধান সম্পূর্ণ লাল চাল হয়। অনেক সময় চিকিৎসকেরা এই চাল খাওয়ার পরামর্শ দেন, অথচ আমরা এই ধান হারিয়ে ফেলছি।’ প্রথম বছর এই ধান চাষ করেছেন, আশা করছেন এই চাষ থেকে অধিক পরিমাণে বীজ তৈরি করে ভবিষ্যতে আরও বেশি বেশি ধান চাষ করবেন। মূলত ’৭০-এর দশক থেকে বোরো ধান চাষ শুরু হলে এসব জাত কমতে শুরু করে। কিন্তু ৭৫ থেকে ৮৫ দিন জীবনকালের এই ধানগুলো দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই বিধায় এগুলো চাষ করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক তেমন প্রয়োজন পড়ে না। কবি যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর কাজের ছেলে কবিতায় দাদখানি চালের কথা উল্লেখ করেছেন। বেগুনবিচি সুগন্ধিযুক্ত ধান, দেখতে বেগুনের বিচির মতো গোল। কলমকাটি লম্বা সরু ধান, যা অতিথি আপ্যায়নের জন্য ব্যবহার হয়।
ভাদড়া গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আদান–প্রদান’ খামারে পুরোনো দিনের ধানের চাষ হচ্ছে জানতে পেরে তাঁরা মাঝেমধ্যেই দেখতে আসেন। খেতে ধানগাছও ভালো হয়েছে, এখন ফলন কেমন হবে, সেটা দেখার অপেক্ষায় আছেন। বাজারে বিক্রিমূল্য হিসাব করে এই ধান চাষে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলে ভবিষ্যতে তাঁরাও চাষ করবেন বলে জানান। ইতিমধ্যে বীজ চেয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান, ‘এসব ধানের জাতের কৃষিক্ষেত্রে বেঁচে থাকা জরুরি। ধান গবেষণায় এগুলো কাজে লাগে। তবে এ ধানের ফলন কম হওয়ায় কৃষক চাষ করতে আগ্রহী হন না। এ ছাড়া বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা চিন্তা করে ধান গবেষণা বিভাগ অধিক ফলনশীল জাত আবিষ্কার করছে। তবে সোহেল রানার হারিয়ে যাওয়া ধানের চাষের উদ্যোগটা বেশ প্রশংসনীয়।’
![]() |
| ‘আদান-প্রদান’ কৃষি খামারে ধানখেতে কৃষক সোহেল রানা। ছবি : প্রথম আলো |
ধাপে ধাপে চাষ করেন জাহাঙ্গীর, ১৩ বিঘা জমিতে লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো by শফিকুল ইসলাম
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। একসময় তিনি বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে চাকরি করতেন। রাজশাহী বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন প্রায় ৯ বছর। ২০২১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নামেন কৃষিকাজে। শুরুটা হয়েছিল মাত্র ১০ কাঠা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ দিয়ে। পাঁচ বছরের মাথায় এখন তাঁর চাষ করা জমির পরিমাণ ১২ থেকে ১৩ বিঘা। এসব জমিতে চাষ করেছেন বিটরুট, পুদিনাপাতা, লেটুস, আইস লেটুস, থাইপাতা, চেরি টমেটো, রেড ক্যাবেজ, ক্যাপসিকাম ও বালচিং অনিয়ন।
চেনা পথ ছেড়ে ভিন্ন কিছু
জাহাঙ্গীর চাকরি ছেড়ে প্রচলিত ফসল চাষের পথে হাঁটেননি। তিনি বেছে নিয়েছেন চায়নিজ বিভিন্ন সবজি। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জমিতে আছে বিটরুট। তিনি ১০ বিঘায় চাষ করেছেন বিটরুট। জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘ধান-গম কেজিতে দাম বাড়ে না, কিন্তু সবজিতে কেজিতেই দাম বাড়ে। এই চিন্তা থেকেই ভিন্নপথে হাঁটলাম।’ তিনি জানান, এই উদ্যোগে শুরু থেকেই পাশে ছিল পবা উপজেলা কৃষি অফিস। ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন দেওয়ান নিয়মিত মাঠে এসে পরামর্শ দিচ্ছেন। জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন দেওয়ান বলেন, জাহাঙ্গীর খুব বিচক্ষণ কৃষক। তিনি বাজার বুঝে চাষ করেন, নিজেই বাজারজাত করেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন।
ধাপে ধাপে চাষ
সব ফসল একসঙ্গে চাষ না করে ধাপে ধাপে চাষ করে ফলন বাজারে আনেন জাহাঙ্গীর। আগাম চাষ করা কয়েক বিঘার বিটরুট ইতিমধ্যে তুলে বিক্রি করেছেন। মাঠে কোথাও বিটরুট তোলার শেষ পর্যায়, কোথাও গাছ বড় হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য বীজ বপন করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সব একসঙ্গে বাজারে আনলে দাম পাওয়া যায় না। তাই পর্যায়ক্রমে চাষ করি, যেন সব সময় কিছু না কিছু বাজারে থাকে। বর্তমানে বিটরুটের পাইকারি দাম কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা। ভালো বাজার পেলে এক বিঘা জমি থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব। এতে জমি ভাড়াসহ খরচ পড়ে ৭০-৭৫ হাজার টাকা।’
পুদিনাপাতায় আলাদা বাজার
তিন বিঘা জমিতে পুদিনাপাতা চাষ করছেন জাহাঙ্গীর। বর্ষাকালে পুদিনাপাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, বগুড়া, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বাসের মাধ্যমে পুদিনাপাতা পাঠান তিনি। জাহাঙ্গীরের ভাষ্য, পুদিনাপাতা রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয়। রাজশাহী ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় পুদিনাপাতা পাঠান। এই পাতা চাষে খরচ কম, আয় বেশি।
বর্তমানে তাঁর খামারে প্রতিদিন পাঁচজন শ্রমিক কাজ করেন। প্রয়োজনে আরও লোক নেন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘একসময় আমি পরাধীন ছিলাম। অন্যের চাকরি করতাম। আজ আমার কাজ দিয়ে পাঁচটা পরিবার চলছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।’
সরেজমিনে মাঠে
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের সকালের রোদে থালতা গ্রামের মাঠজুড়ে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততা। কয়েকজন শ্রমিক মাটির নিচ থেকে তুলে আনছেন লালচে বিটরুট। পাশে বস্তায় ভরে রাখা হচ্ছে সবজি। একটু দূরে কাঁচা সবুজের সারি পুদিনাপাতা। বাতাসে ভেসে আসছে তাজা সবজির গন্ধ। পাশাপাশি সারি সারি লেটুসপাতা নজর কাড়ছে। কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন মাঠে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছেন। কখনো বিটরুট তোলা দেখছেন, কখনো বস্তায় ভরছেন। আবার পুদিনাপাতার বস্তা ঠিকঠাক করছেন। স্থানীয় কৃষক তবুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ফসল আগে এলাকায় কেউ করতেন না। জাহাঙ্গীরই শুরু করেছেন। এখন তিনি একাই ১০ বিঘায় বিটরুট চাষ করছেন। এলাকায় এ উদাহরণ হয়ে গেছে।’
ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ ও কর্মসংস্থান তৈরির স্বপ্ন জাহাঙ্গীরের। তিনি বলেন, ‘কষ্টের কোনো বিকল্প নেই। মাটি ধরলে মাটি আপনাকে ফিরিয়ে দেবে—এই বিশ্বাসেই সামনে এগোচ্ছি। চাকরির অনিশ্চয়তার জীবন ছেড়ে মাটির ওপর ভরসা রেখেছি।’
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম এ মান্নান বলেন, ‘জাহাঙ্গীর একজন শিক্ষিত উদ্যোক্তা। তিনি যে ফসলগুলো চাষ করছেন, সেগুলো লাভজনক ও ব্যতিক্রমী। আমরা নিয়মিত তাঁকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি। জাহাঙ্গীরের মতো উদ্যোক্তা যদি আরও বাড়ে, তাহলে কৃষি আরও আধুনিক হবে।’
![]() |
| বিটরুট বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার থালতা গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, January 4, 2026
মাঠে সার-কীটনাশক দিচ্ছে ড্রোন, সময় লাগে কম, খরচেও সাশ্রয়ী by ইয়াহইয়া নকিব
কৃষিকাজেও প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সনাতনী পদ্ধতির কাস্তে দিয়ে ধান বা শস্য কাটার বদলে এখন হারভেস্টারের সাহায্যে একসঙ্গে কাটা, মাড়াই ও ঝাড়াই—তিনটি কাজই করা যাচ্ছে। ড্রোন দিয়ে কীটনাশক ও সার প্রয়োগের অত্যাধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিও এসে গেছে।
কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকেরা জানান, ড্রোনের সাহায্যে করলে জমিতে পরিমিত মাত্রায় সার–কীটনাশক ছিটানো যায়। এতে কৃষকের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব। এক বিঘা জমিতে কীটনাশক ছিটাতে একজন মানুষের যেখানে দুই ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে ড্রোনের লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট, খরচও কম পড়ে।
জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড ও ফ্লাইমেক নামের দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রাথমিকভাবে মাঠপর্যায়ে ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক প্রয়োগ করছে। এতে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে দেশে তৈরি এসব ড্রোন পাঁচ কেজি ওজনের কীটনাশক বহনে সক্ষম।
নরসিংদীর বেলাব উপজেলা ও মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় কৃষকদের স্থানীয় দুটি সমিতির মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। আপাতত দুটি ড্রোন দিয়ে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে কৃষকেরা এ সেবা নিতে পারছেন। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এসএমই মেলায় এই ড্রোন প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়।
ড্রোনের মাধ্যমে মাঠে কীটনাশক দেওয়ার সুবিধা সম্পর্কে জানতে চাইলে জিনিয়াস ফার্মসের কৃষি বিভাগের প্রধান সমীরণ বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ড্রোনের সাহায্যে প্রতি বিঘা জমিতে কীটনাশক দিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। আর কৃষিশ্রমিকের মাধ্যমে খরচ হয় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মতো। এ কাজে একজন মানুষের দুই ঘণ্টা লাগে। অথচ ড্রোনে মাত্র তিন থেকে পাঁচ মিনিটে কাজটি করা যায়।
জানা গেছে, বর্তমানে আলোচ্য দুই উপজেলার প্রায় ২০০ কৃষকের ৫০ থেকে ৬০ একর জমিতে এই আধুনিক প্রযুক্তিতে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে সাভারের বিরুলিয়াতেও একই কাজে ড্রোন ব্যবহার হচ্ছে। এ নিয়ে কৃষক মোক্তার হোসেন জানান, রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ড্রোন চালিয়ে জমিতে কীটনাশক দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে কীটনাশক প্রয়োগের দিন শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। মাস্ক ব্যবহার করলেও ক্ষতি হয়। কিন্তু যন্ত্র দিয়ে স্প্রে করলে সেই ঝুঁকি কম মনে হয়। তা ছাড়া প্রতি বিঘা জমিতে কীটনাশক দিতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেড ও ফ্লাইমেকের কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা ভবিষ্যতে ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক প্রয়োগকে একটি ব্যবসায়িক মডেলে রূপ দিতে চান। সে অনুযায়ী, গ্রামে কৃষক সমিতির মাধ্যমে ড্রোন পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা গেলে একটি ড্রোনে মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা ভাড়া পাওয়া যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা জানান, হাতে প্রয়োগ করলে বেশি সময় লাগে। আবার কীটনাশকের ব্যবহারও হয় বেশি। ড্রোনে জিপিএসের মাধ্যমে কীটনাশকের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ড্রোন না কিনেও ভাড়ায় সেবা নিতে আগ্রহী হচ্ছেন অনেক কৃষক। একটি লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করানো গেলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোও বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হবে।
ফ্লাইমেকের কর্মকর্তারা জানান, কৃষিতে ব্যবহৃত এসব ড্রোন এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। ফলে তা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে ড্রাগনবাগানে গাছে বেশি কাঁটা থাকায় হাতে কীটনাশক দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে ড্রোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্লাইমেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাওয়াদ রশিদ প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা ড্রোন বিক্রিও করেন। কেউ চাইলে অর্ধেক মূল্য, অর্থাৎ পৌনে দুই লাখ টাকা জমা দিয়ে ড্রোন নিতে পারবেন। বাকি টাকা পরে সার্ভিস ফি থেকে পরিশোধ করা যাবে। আগামী বছর থেকে ফ্লাইমেক পুরোদমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে। পাশাপাশি ড্রোনের কীটনাশক বহনের সক্ষমতা ১০ থেকে ২০ লিটারে উন্নীত করার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
তবে দেশে কৃষিজমির আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় ড্রোন ওড়ানো একটু কঠিন। সে জন্য কয়েকটি জমির কৃষক একসঙ্গে ড্রোন ব্যবহার করলে সুবিধা পাওয়া যাবে।
জিনিয়াস ফার্মস মূলত একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান। কৃষিতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে তারা। ‘ডাক্তার চাষি’ নামের একটি ফ্রি অ্যাপের মাধ্যমে ৪১টি প্রধান ফসলের রোগ ও কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ‘ড্রোন বাংলাদেশ’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানও কৃষিকাজে ব্যবহারের উপযোগী ড্রোন বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত অস্ট্রেলিয়ার তৈরি ডিজিআই ড্রোন বাজারজাত করে। ২০১৫ সাল থেকে দেশে ড্রোন বিক্রি করছে তারা। তবে এখনো সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও প্রকল্পের কাজেই মূলত এসব ড্রোন বেশি ব্যবহার করছে বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান।
ড্রোন বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী কামরান আহমেদ জানান, তাঁদের কাছে ১৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা দামের ড্রোন রয়েছে। ২০ থেকে ৩০ লিটার, এমনকি ১০০ লিটার কীটনাশক বহনে সক্ষম ড্রোনও আছে। তবে দেশে ১০ লিটারের ছোট ড্রোনের চাহিদা বেশি। ভবিষ্যতে নিজস্ব অ্যাসেম্বল প্ল্যান্ট বা সংযোজন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন বলে জানান এ উদ্যোক্তা।
![]() |
| সার ও কীটনাশক ছিটাতে ব্যবহার হচ্ছে ড্রোন। ছবি : সংগৃহীত |
Wednesday, December 17, 2025
শিশু সাজিদের করুণ মৃত্যু ও রুষ্ট কৃষকদের বিপদ by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
এর কয়েক বছর পরের কথা। ২০২২ সালের মার্চ মাসে সেচের পানি না পেয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দুই সাঁওতাল কৃষক অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি বিষ পান করে আত্মহত্যা করলেন। এরপর আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ওই চিকিৎসক কতটা দূরদর্শী ছিলেন। আবার বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটা গবেষণা তথ্য দেখে চমকে উঠলাম, ‘এক কেজি ধান উৎপাদনে নাকি বরেন্দ্র অঞ্চলে তিন হাজার লিটার পানি খরচ হয়।’
এদিকে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে তুলতে মাটির নিচের জলধারক স্তর (অ্যাকুইফার) মারা যাচ্ছে। যে স্তরে পানি থাকে, সেই স্তরে মোটা বালু থাকে। তাকে অ্যাকুইফার বলা হয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অ্যাকুইফারের মোটা বালু যখন ধুলা হয়ে যায়, তখন ওই অ্যাকুইফারকে মৃত বলা হয়। তারপর ওপর থেকে যতই বৃষ্টি হোক, ওই স্তরে আর পানি জমে না। রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও গোমস্তাপুর উপজেলা এবং নওগাঁর পোরসা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের মাটির নিচের অবস্থা এখন সেই রকম।
সুইজারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় বেসরকারি সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন ও সুইস রেডক্রস যৌথভাবে ‘সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতায় ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একটি জরিপ সম্পন্ন করেছে। এই জরিপ থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের এই তথ্য জানা গেছে। তার আলোকে গত ২৫ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ নির্বাহী কমিটি এলাকাটিকে পানি সংকটাপন্ন ঘোষণার নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। গত ৬ নভেম্বর সরকার এই এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। তার আগে ওয়ারপো ২০১৮ সালে পানি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এখন এই বিধিমালা অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হবে। এতে অগ্রাধিকার পানি খাওয়ার পানি।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার শুরু করে। তারা মাটির নিচের পানি শূন্যতার অবস্থা আন্দাজ করে ২০১৫ সাল থেকে বরেন্দ্র এলাকায় সেচের জন্য আর নতুন নলকূপ না বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ রয়েছে, সেই ঘোষণা ষোলো আনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা যেখানে–সেখানে সেচপাম্প বসানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বোরিং করে দেখছেন মাটির নিচে কোথায় অ্যাকুইফার পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলছেন, কোথাও কোথাও পকেট অ্যাকুইফার রয়েছে। তাতে কিছু পানি অবশিষ্ট রয়েছে। তা যেকোনো সময় ফুরিয়ে যেতে পারে। আর ফুরিয়ে গেলেই সেই এলাকার মানুষকে পানি কিনে খেতে হবে। কিন্তু কার কথা কে শোনে! ওই এলাকার কৃষকেরা এতে রুষ্ট হচ্ছেন। আমি যেমন ওই চিকিৎসককে কঞ্জুস ভেবে মনে মনে রুষ্ট হয়েছিলাম।
কৃষকেরাও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ জারি করায় সরকারের ওপর মনে মনে রুষ্ট। তাঁরা উপজেলা সেচ কমিটির অনুমতি ছাড়াই পানির সন্ধানে জমিতে ‘বোরিং’ করেই যাচ্ছেন। কেউ কেউ বোরিংয়ের মুখটাও বন্ধ করার কথা ভাবছেন না। গত বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সেই রকম একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায়। সাজিদের মা রুনা খাতুন দোষী ব্যক্তির বিচার দাবি করেছেন। তাঁর আহাজারি দেখে হাজার হাজার মানুষ চোখের পানি ফেলেছেন। শিশুটি উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের প্রাণান্তকর চেষ্টা দেখতেও অনলাইনে চোখ রেখেছিলেন সারা দেশের মানুষ। শিশুটি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছে না–ফেরার দেশে।
এখন কার কথা বলবেন—সেচের পানি না পেয়ে আত্মহত্যাকারী কৃষক অভিনাথ মারান্ডি, রবি মারান্ডি, তাঁদের মামলার আসামি গভীর নলকূপের অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন আর তানোরের পানির খোঁজে সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করে বোরিং করা কৃষক কছির উদ্দিন—কাকে কী বলবেন? আসামি সাখাওয়াত হোসেন ৪ মাস ৯ দিন হাজত খেটে বেরিয়েছেন। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। সাজিদের মা শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুর পর্যন্ত মামলা করেননি। করেন আর না করেন, দায়িত্ব অবহেলার দায় কিছুতেই কৃষক কছির উদ্দিন এড়াতে পারেন না। এই সবকিছু ঘটছে পানির জন্য। পানি দিয়ে ধান চাষের জন্য।
বাংলাদেশ সরকারের একজন উপসচিব রাজ্জাকুল ইসলাম ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি শাসনব্যবস্থা’ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘এই এলাকায় ধান চাষের চেয়ে অন্য ফসল করা কৃষকের জন্য লাভজনক। কিন্তু কৃষক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ধান ছাড়তে চান না। অন্য ফসল চাষের ঝুঁকি নিতে চান না। তা ছাড়া তিনি ধান চাষের টেকনোলজি ঐতিহ্যগতভাবেই জানে। গোলাভরা ধান থাকবে—এটা তাঁর মানসিক শান্তি ও সামাজিক মর্যাদা।’
তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে তাঁরা গাছের ডালে বসে গোড়া কাটছেন। মানে ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন। এভাবে পানির স্তর নেমে যেতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে তাঁদের ধান চাষ ছাড়তে হবে, তা–ই নয়, বোতলজাত পানিও কিনে খেতে হবে।
এবার শিশু সাজিদের মায়ের কান্না সারা দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। সরকার পানিনীতি বাস্তবায়ন করুক। বিএমডিএ পানি রেশনিং করুক। আমাদের চোখের পানি আর সেচের পানি মিলেমিশে যেন একাকার না হয়।
* আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| গত ১০ ডিসেম্বর বুধবার এক কৃষকের খোঁড়া একটা বোরিংয়ে পড়ে যায় তানোরের শিশু সাজিদ। উদ্ধারের পর শিশুটি পরে মারা যায় |
Wednesday, September 24, 2025
রংপুরের তারাগঞ্জ: আলুর দামে ধস, সরকারি দর ২২, কৃষক পান ৫ টাকা by রহিদুল মিয়া
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌসুমে তারাগঞ্জে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। তিনটি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৬ হাজার মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু বের হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন। অথচ গত বছর এ সময় তিন ভাগের দুই ভাগ আলু বের করা হয়েছিল।
ইকরচালীর বড় আলুচাষি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারে জায়গা না পেয়ে গোডাউনে, ঘরে আলু সংরক্ষণ করেছি। তা পচে যাওয়ায় ট্রাকে ট্রাকে সড়কের ধারে ফেলেছি। হিমাগারে যে আলু আছে, দাম না থাকলে ছেড়ে আসতে হবে।’
চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আলু উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২২ টাকা। বস্তা, গাড়িভাড়া, শ্রমিকের খরচ, হিমাগারে সংরক্ষণ খরচসহ এ খরচ দাঁড়াচ্ছে কেজিপ্রতি ২৯ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আলুর দাম প্রতি কেজি ১২ টাকা। হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর দাম ১২ টাকা হলেও হিমাগারভাড়া বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ৫ টাকার কিছু বেশি। ফলে সরকারি ক্রয় দর ২২ টাকা আর বাস্তবে কৃষকের প্রাপ্তি ৫ টাকার মধ্যে বিশাল বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এতে হিমাগার পর্যায়ে কেজিতে কৃষকের ১৮ টাকা লোকসান থাকছে।
গত শুক্রবার তারাগঞ্জের তিনটি হিমাগার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকারভেদে প্রতি কেজি আলু সাড়ে ১০ থেকে ১২ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা না থাকায় তেমন কর্মব্যস্ততা দেখা যায়নি। হিমাগারের শেডগুলো অধিকাংশ ফাঁকা। সিনহা হিমাগারে কথা হয় বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। জমিতে তাঁর উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ টাকা পড়েছে। মৌসুমের শুরুতে ১৪ টাকা কেজি হওয়ায় লোকসানের ভয়ে আলু হিমাগারে রেখেছেন। সরকার ২২ টাকা দাম বেঁধে দিলেও, সেই দামে কেউ আলু নেন না।
তারাগঞ্জের প্রামাণিকপাড়ার কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ছে ২০ টাকা, বস্তা, গাড়িভাড়া, হিমাগারভাড়াসহ ৩০ টাকা। অথচ বাজারে পাচ্ছি ১২ টাকা। হিমাগারের খরচ বাদ দিয়ে হাতে আসে ৫ টাকা। এভাবে লোকসান হলে কৃষকেরা আলু চাষ ছেড়ে তামাক চাষে ঝুঁকবেন।’
সিনহা হিমাগারের ব্যবস্থাপক দুলাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারের আলু সংরক্ষিত আছে১ লাখ ৫১ হাজার বস্তা। এই সময়ে গত বছর তিন ভাগের বেশি আলু বের হয়েছিল। এবার আজ পর্যন্ত মাত্র ২৮ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। আলুর অবস্থা খুবই ভয়াবহ।’
তারাগঞ্জের এন এম হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ ডিসেম্বরে মধ্যে হিমাগারের সব আলু বের হয়ে যায়। কিন্তু এবার যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হয় না আলু সব বের হবে। ২ লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা থাকলেও এ পর্যন্ত আলু বের হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, সরকারিভাবে রংপুরে আলু কেনা হলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন। আগামী মৌসুমে আলুর চাষ কমবে। কৃষকেরা যাতে পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করেন, তা নিয়ে মাঠে কাজ করছেন, যাতে কৃষকেরা লোকসানে না পড়েন।
| আলুর দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ক্রেতা না পাওয়ায় হিমাগারের বারান্দায় এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে আলু। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারে। ছবি: প্রথম আলো |
Friday, August 8, 2025
ইসরায়েলের হামলার মুখে গাজায় অবশিষ্ট আছে মাত্র দেড় শতাংশ ফসলি জমি
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের শুরু দিক থেকে গাজায় নতুন করে অবরোধ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তখন থেকে উপত্যকাটির কৃষিজমিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। গত এপ্রিলে টিকে থাকা ফসলি জমির হার ছিল চার শতাংশ। এখন তা দেড় শতাংশে এসে ঠেকেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগে উপত্যকাটির বাসিন্দারা বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, বাদাম ও খাদ্যশস্য উৎপাদন করতেন। এফএওর হিসাবে, গাজায় অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশ জুড়ে ছিল কৃষিকাজ। উপত্যকার ২০ লাখের মধ্যে ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ আংশিকভাবে কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভর করতেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলেছে, ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত গাজার প্রায় ৩২ হাজার একর কৃষিজমি ধ্বংস করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। এখন মাত্র ২৩২ একর কৃষিজমি টিকে আছে। এফএওর প্রধান কু ডংইউ বলেন, গাজা এখন পুরোপুরি দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ইসরায়েলের অবরোধ ও স্থানীয় কৃষিখাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে ফিলিস্তিনিরা অনাহারে রয়েছেন।
আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, সংঘাত বন্ধে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বারবার আহ্বানের পরও গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উপত্যকাটিতে হামলায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ দিন অনাহারে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। এ নিয়ে না খেতে পেয়ে উপত্যকাটিতে মোট ১৯৭ জনের মৃত্যু হলো। তাঁদের মধ্যে ৯৬ জনই শিশু।
![]() |
| ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স |
Saturday, June 14, 2025
যে আমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দরী নারীর গল্প by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
সেই গল্প জানতে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি অ্যান্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। ভারতের বৈশালী নগরের (এখনকার বিহারে নগরটি ছিল) আমবাগানে এক মেয়েশিশুর জন্ম হয়। তাকে লালন-পালন করেন সেই নগরের উদ্যানপালক। আমের বাগানে জন্ম এবং উদ্যানপালকের ঘরে লালিত-পালিত বলে শিশুটির নাম হয় আম্রপালি। আম্রপালি দেখতে যেমন সুন্দর ছিলেন, তাঁর নানা গুণও ছিল। তিনি ভালো গাইতে ও নাচতে পারতেন, বীণা বাজাতেন, পালি ভাষায় কবিতা লিখতেন। সভানর্তকী ছিলেন তিনি। রূপে-গুণে অনন্য আম্রপালি শেষজীবনে তাঁর সব ধনসম্পদ বিলিয়ে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের শিষ্য হয়ে যান।
আম্রপালি নামকরণের পর এই জাতের আমের চারা প্রথম লাগানো হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলায়। আম–গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, উত্তর ভারতের বিখ্যাত আমের জাত দোসেরির ফুলের পুরুষ পরাগ এবং দক্ষিণ ভারতের নীলমের স্ত্রী পরাগের সংকরায়ণের মাধ্যমে হয়েছে আম্রপালি।
ভারত থেকে আম্রপালি জাতের আমের চারা বাংলাদেশে আনা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০১) এম এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একজন কর্মকর্তা ভারতে গিয়ে আম্রপালির কিছু চারা নিয়ে আসেন। তিনি নিজে সেখান থেকে কয়েকটি চারা নিয়ে খামারবাড়িতে রোপণ করেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ১৯৯৬ সালে আম্রপালি জাতকে বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করে। কৃষিবিদেরা জানিয়েছেন, বিদেশি জাতের দেশি সংস্করণের এই রীতিকে বলা হয় পরিচিতি বা ইন্ট্রোডাকশন। আম্রপালি অবমুক্তের পেছনে ছিলেন কৃষিবিদ কাজী বদরুদ্দোজা।
ইন্ট্রোডাকশন পদ্ধতি হলো বিদেশি কোনো উন্নত জাতের গাছ নিয়ে এসে এ দেশে কয়েক বছর পর্যবেক্ষণ ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করা হয়। আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলে সেটি আমের জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে আম্রপালির ক্ষেত্রে তা–ই করা হয়েছে।
বারির ফল বিভাগের ‘আমের জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি’–বিষয়ক প্রকাশনা ২০২১-এ এ অঞ্চলের আমের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আম পৃথিবীর প্রাচীনতম ফলগুলোর একটি। প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে এই উপমহাদেশে আমের চাষ হয়। এশিয়ার দেশগুলোতেও ফল হিসেবে আমের গ্রহণযোগ্যতা আছে।
এখন থেকে আড়াই হাজার আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ভারতের মালয় থেকে পূর্ব এশিয়ায় আমের চাষাবাদ ছড়িয়ে দেন। চীনের পর্যটক হিউয়েন সাং প্রথম পর্যটক হিসেবে ৬৩২ থেকে ৬৪৫ সালের মধ্যে চীন তথা দূরপ্রাচ্যে আমের পরিচিত তুলে ধরেন। এ ছাড়া আরব বণিক ও পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা আম ছড়িয়ে দেন বিশ্বের নানা জায়গায়।
বাংলাদেশের আনাচকানাচে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রায় ৮০০ জাতের আম। আমের উন্নত ও উচ্চফলনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনে চলে গবেষণা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণাকেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, বারি এখন পর্যন্ত আমের ৩টি হাইব্রিড জাতসহ মোট ১৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ১৪টি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণা থেকে, বাকি চারটি রাজশাহীসহ অন্যান্য ফল গবেষণাকেন্দ্র থেকে হয়েছে।
![]() |
| আম্রপালি আম। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, May 11, 2025
চিরিরবন্দরে ৪০ মণের ‘সম্রাট’
তার আরেক ছেলে রমেল হক জানান, এমনিতেই ষাঁড়টির স্বভাব শান্তপ্রকৃতির হলেও মাঝেমধ্যে চড়াও হয়ে ওঠে। তাই সম্রাটকে বাড়ি থেকেই বিক্রি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া ষাঁড়টির উচ্চতা সাড়ে ৭ ফুট ও দৈর্ঘ্য ৯ ফুট হওয়ায় দরজা দিয়ে বের করা যাবে না। তাই ষাঁড়টি বিক্রি হলে দরজা কেটে বের করে ক্রেতার হাতে তুলে দেয়া হবে।
ষাঁড়টিকে দেখতে আসা সাবেরউদ্দিন ও রাজীব উদ্দিন বলেন, ফেসবুকে ছবি দেখে দেখতে আসলাম। ছবি দেখে আসলে বুঝতে পারিনি ষাঁড়টি কতো বড়! ছবির চেয়ে বাস্তবে ষাঁড়টি দেখতে অনেক বড় ও সুন্দর। উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান বলেন, সম্ভবত সম্রাটই দিনাজপুরের মধ্যে সবচেয়ে বড় গরু। ফ্রিজিয়ান জাতের গরুটি লালন-পালনে খামারিকে সর্বদা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এ বছর গরুটি বিক্রি করতে না পারলে খামারির অনেক লোকসান হয়ে যাবে। এতবড় গরু লালন-পালন করা যেমন খুব কষ্টকর তেমনি ব্যয়বহুলও।

Thursday, March 20, 2025
বাড়ি তো নয় যেন মৌমাছির অভয়ারণ্য
স্থানীয় লোকজনের দাবি, তাঁদের গ্রামে এত মৌচাক একসঙ্গে আগে কখনো দেখা যায়নি। সম্প্রতি রশিদ মোল্লার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের কার্নিশ, বারান্দা, আড়ার কাঠসহ বাড়ির উঠানের মেহগনি, বরই ও কাঁঠালগাছে ছোট-বড় ২৮টির মতো মৌচাক। মৌমাছির ঝাঁক ঘুরে বেড়ালেও তারা কাউকে কামড়ায় না। লোকজন নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
চার থেকে পাঁচ বছর আগে রশিদ মোল্লার বাড়িতে চার থেকে পাঁচটি মৌচাক দেখা যায় বলে জানালেন চরমহিদাপুর গ্রামের আলমগীর মোল্লা, আনোয়ার হোসেন, মানিক শেখসহ কয়েকজন। এখন প্রতিবছরই মৌচাকের সংখ্যা বাড়ছে।
বাড়ির মালিক কৃষক রশিদ মোল্লা বলেন, তিনি সাধারণ কৃষক। কৃষিকাজ তাঁর মূল পেশা। চার থেকে পাঁচ বছর আগে তাঁর বাড়িতে প্রথম কয়েকটি মৌচাক হয়। এরপর প্রতিবছরই চাকের সংখ্যা বেড়েছে। এখন সব মিলিয়ে ২৮টির মতো মৌচাক আছে। মৌমাছিগুলো প্রতিবছর কার্তিক মাসে আসে, জ্যৈষ্ঠ মাসে চলে যায়। মৌচাকগুলো থেকে ২০ থেকে ২৫ দিন পরপর ১০ থেকে ১৫ কেজি মধু পাওয়া যায়। মৌয়ালরা নেওয়ার পর তিনি ৮ থেকে ১০ কেজি মধু পান। প্রতি কেজি মধু তিনি এক হাজার টাকা করে বিক্রি করেন। খাঁটি মধু হওয়ায় বিক্রি করতে কোনো বেগ পেতে হয় না। এলাকার লোকজন নেন, দূরদূরান্ত থেকে এসেও অনেকে নিয়ে যান।
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. খোকন উজ্জামান বলেন, প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই মধুর গুণমান অনেক ভালো। এ ধরনের মধুর চাহিদাও সবার কাছে অনেক বেশি। মৌমাছিগুলো একেবারে নিরীহ প্রকৃতির, ফলে মানুষ নিরাপদে মধু সংগ্রহ করতে পারছেন। মৌমাছিদের যেন বিরক্ত না করা হয়, সেই পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
![]() |
| রশিদ মোল্লার বাড়ি ও গাছে ছোট-বড় ২৮টির মতো মৌচাক আছে। চার থেকে পাঁচ বছর আগে রশিদ মোল্লার বাড়িতে প্রথম কয়েকটি মৌচাক হয়। মৌমাছিদের যেন বিরক্ত না করা হয়, সেই পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। ছবি: প্রথম আলো |
Monday, March 17, 2025
বেশি মাংস, বেশি ডিম দেয় নতুন প্রজাতির এই হাঁস—বলছেন গবেষকেরা by ইসরাত জাহান
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার চয়ড়া গ্রামে আবদুস সালামের খামার। একসময় দেশি হাঁস পালতেন, কিন্তু মৃত্যুহার বেশি বলে লাভের মুখ দেখাটা কঠিন হয়ে উঠেছিল। সম্প্রতি পালা শুরু করেছেন নতুন জাতের হাঁস ‘বাউ-ডাক’। অভিজ্ঞতা কী, জানতে চাইলে আবদুস সালাম বলেন, ‘আগে হাঁস পালনে যা আয় করতাম, তা দিয়ে চলা কঠিন ছিল। আর এখন মাত্র ১০-১২ সপ্তাহেই দুই-আড়াই কেজি হয়ে যায় বাউ-ডাক, আর বছরে ২২০ থেকে ২৩০টি ডিম দেয়। দেশি হাঁসের তুলনায় এটাতে লাভ বেশি।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক ২০১৪ সালে হাঁসের জাত উন্নয়নে গবেষণা শুরু করেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামছুল আলম ভূঁঞার নেতৃত্বে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
অধ্যাপক সামছুল আলম ভূঁঞা বলেন, ‘হাঁসের ডিম ও মাংস উৎপাদনে খামারিরা যেন লাভবান হন, সে জন্যই দেশি-বিদেশি জাতের হাঁসের সংকরায়ণ নিয়ে গবেষণা হয়। গবেষণাগার ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা শেষে ২০২০ সালে জাতটি সরকারিভাবে অনুমোদন পায়। এরপর পল্লি কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক এনজিও মানব মুক্তি সংস্থার (এমএমএস) মাধ্যমে গবেষণাটি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়।’
নতুন জাতটির বিষয়ে গবেষক জানান, উন্নত জাত উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জাতের হাঁস নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। চীনের পেকিন জাতের হাঁস ও দেশি নাগেশ্বরী জাতের হাঁসের ক্রস ব্রিডিং করে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়। পেকিন হাঁস বেশি মাংস উৎপাদনকারী হলেও কেবল বদ্ধ পদ্ধতিতে টিকে থাকে। এটি দেশের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পরিবেশগত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না বলে আধা-বদ্ধ বা উন্মুক্ত রাখলে দৈহিক বৃদ্ধি কম হয়। আবার ডিমও কম দেয়। অন্যদিকে দেশি নাগেশ্বরী হাঁস পরিবেশ সহনশীল হলেও মাংস উৎপাদন কম। এ সমস্যা সমাধানে দুটি জাতের সংকরায়ণ করে উদ্ভাবিত হয় ‘বাউ-ডাক’। বাউ-ডাক বদ্ধ ও উন্মুক্ত দুই জায়গাতেই সুবিধাজনক।
উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শেখ এম এ মতিন বলেন, ‘বাউ-ডাক দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। ওজন দ্রুত বাড়ে, রোগবালাই কম, আর ডিমও দেয় বেশি। তাই এটি খামারিদের জন্য লাভজনক।’ পল্লি কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে খামারিরা এই হাঁস পালনে অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। অন্যদিকে খামারিরা যেন দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন, সে জন্য মানব মুক্তি সংস্থা নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে বলে জানান মানব মুক্তি সংস্থার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান।
মাঠপর্যায়ে গবেষণার সাফল্য নিয়ে গবেষক অধ্যাপক সামছুল আলম ভূঁঞা বলেন, ‘আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি উন্নত জাতের হাঁস উদ্ভাবন, যা দেশি হাঁসের মতো পরিবেশ সহনশীল হবে, আবার বিদেশি জাতের মতো বেশি মাংস ও ডিম উৎপাদন করবে। দীর্ঘ ছয় বছরের গবেষণায় আমরা সেটি করতে পেরেছি। বাউ-ডাক এখন খামারিদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, যা আমাদের কাজেও অনুপ্রেরণা জোগায়।’
![]() |
| নতুন জাতের হাঁস ‘বাউ-ডাক’ |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...













