Saturday, February 9, 2019

থাইল্যান্ডের নির্বাচনে লড়বেন প্রিন্সেস

থাইল্যান্ডে আগামী মাসে বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে প্রিন্সেস উবোলরাতানা রাজাকানিয়াকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল থাই রক্ষা চার্ট পার্টি। ৬৭ বছর বয়সী উবোলরাতানা রাজা বিজরালঙ্কর্ন এর বোন। গণতান্ত্রিক থাইল্যান্ডে রাজপরিবারের সদস্যদের সরাসরি দেশ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার নজির নেই। তাই থাই রক্ষা চার্ট পার্টির এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দেশীয় রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে প্রিন্সেসকেই এগিয়ে রাখছেন তারা। অন্যদিকে, সেনা সমর্থিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান ও চাও এবারের নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, প্রিন্সেস ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেই মূল নির্বাচনী লড়াই হবে।
প্রিন্সেসের প্রার্থিতার খবর নিশ্চিত করেছেন রক্ষা চার্ট পার্টির প্রধান লেফটেন্যান্ট প্রিচাপন পংপানিক।
তিনি বলেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে আমরা প্রিন্সেস উবোলরাতানাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনি একজন জ্ঞানী ও যোগ্য ব্যক্তি। বৈঠক শেষে আমরা তার কাছে গিয়েছি। তিনি আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। থাইল্যান্ডের সাবেক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা এই রক্ষা চার্ট পার্টির নেতা ছিলেন।
৮৬ বছর আগে থাইল্যান্ডে পূর্ণ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছে। এর পরে রাজপরিবারের কোনো সদস্য রাজনীতি করেছেন বা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এমন নজির নেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভবত নতুন রাজা প্রিন্সেসের প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়েছেন। থাইল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিশ্লেষক পল চেম্বার্স বলেন, এটা ঐতিহাসিক। আমার মনে হয়, দেশে নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করার জন্য এটা বর্তমান রাজার পরিকল্পনার অংশ। প্রিন্সেস নিজে থেকে প্রার্থী হননি। রাজাই নিজের বোনকে প্রার্থী বানিয়েছেন। এটা বুঝিয়ে দেয় যে, এখন রাজা ক্রমবর্ধমানভাবে থাই রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।
উল্লেখ্য, গত ৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডে সামরিক জান্তা দেশ পরিচালনা করছে। অভ্যুত্থানের নেতা প্রায়ুত চান ও চা-ই সামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেছেন। গণতান্ত্রিক সরকারে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আগামী ২৪শে মার্চ দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী শাসন বনাম গণতন্ত্রের ভোট হিসেবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দৃষ্টিতে: খালেদা জিয়ার কারাজীবনের এক বছর by ব্রাড এডামস

এক বছর আগে, বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানো হয়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেয়া হয়েছে। ওই সময় আদালত তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের মামলাগুলোতে ব্যবস্থা নিয়েছে।
মামলাগুলোর অন্তর্নিহিত যোগ্যতার (আন্ডারলাইং মেরিটস) বিষয়ে কোনো অবস্থান নেয় নি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। খালেদা জিয়ার সমর্থকরা দাবি করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০০৭-২০০৮ সালে সেনা সমর্থিক সরকার যে দুর্নীতির মামলা করেছিল, তারাই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলীয় সদস্যদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি সরকারের শুধু সমালোচকদের বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেয়া হয়। ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেছেন।
সরকারি ফলাফলে দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে তার মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগেরও বেশি আসনে জয়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন দল।
‘ক্রিয়েটিং প্যানিক: বাংলাদেশ ইলেকশন ক্র্যাকডাউন অন পলিটিক্যাল অপোনেন্টস অ্যান্ড ক্রিটিকস’ শীর্ষক সাম্প্রতিক  এক রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বর্ণনা করেছে নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার পর্যায়ক্রমে প্রচ- আক্রমণ হেনেছে (সিস্টেমেটিক অনস্লট)। বিএনপি বলেছে, তাদের দলের সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে তিন লাখেরও বেশি ফৌজদারি মামলা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তার করেছে কয়েক হাজারকে। বিরোধী দলগুলোর ঐক্যফ্রন্ট রিপোর্ট করেছে, তাদের ৮ হাজার দুই শতাধিক সদস্য ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অনেক মামলায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। এমন অনেক মামলাকে ‘ভৌতিক মামলা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এসব মামলায় অপরাধ সংঘটনের সময়ে অভিযুক্তদের কেউ কেউ মৃত, বিদেশে অথবা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আবু তাহেরের কথা। তিনি এক সময় বিএনপির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মারা গেছেন ক্যান্সারে। কিন্তু ২০১৮ সালের ১২ই ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্ত করা হয় যে, তিনি বেআইনিভাবে সমাবেশ করেছেন এবং আওয়ামী লীগের যুব শাখা যুবলীগের একজন সদস্যকে আগের দিন হত্যা করেছেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দুই দলের নেতাকর্মীরাই সহিংসতায় যুক্ত ছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পক্ষপাতহীনভাবে তাতে সাড়া দেয় নি। পুলিশ গ্রেপ্তার ও আটক করেছে বিরোধী দলের সদস্যদের। কিন্তু নিরাপত্তারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক, যারা বিরোধী দলীয় প্রার্থী ও সদস্যদের টার্গেট করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা বিরল।
নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পরিবর্তে, কর্তৃপক্ষ নির্বাচনে জালিয়াতির রিপোর্টিংয়ের জন্য সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করেছে। গুরুত্বর অভিযোগগুলোকে দ্রুততার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। তারা নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে অভিহিত করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে যেসব গুরুত্বর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তার নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতিত্বহীন তদন্তের সুপারিশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যরা। এসব সুপারিশ গ্রহণ করা উচিত নির্বাচন কমিশন ও সরকারের।
(ব্রাড এডামস আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক। তার এ লেখাটি সংগঠনটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে)

‘আনরেস্ট ইন বাংলাদেশ’ -গার্মেন্ট খাত নিয়ে ওয়েবওয়্যারের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। যেসব শ্রমিককে সম্প্রতি বরখাস্ত করা হয়েছে তার যথার্থতা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক ইউনিয়ন, খুচরা ক্রেতা, সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মিলে সংঘাতময় পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবওয়্যার অনলাইন।
এতে ‘আনরেস্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- গার্মেন্ট শ্রমিকদের হতাশা পরিষ্কারভাবে দেশে শিল্প সংশ্লিষ্ট সম্পর্ককে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়কে জোরালোভাবে তুলে ধরে। যখন শ্রমিকদের কথা শোনা হবে, যখন শ্রম বাজারের পক্ষগুলো শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধের সমাধান নিয়ে কাজ করবে এবং যখন নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের সর্বনি¤œ বেতন কাঠানো পর্যালোচনা (রিভাইস) করা হবে, তখনই এরকম পরিস্থিতির মতো একটি পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব।
যাই হোক, গার্মেন্ট শ্রমিকদের হতাশার বিষয়টি আমরা যদিও বুঝি এবং তাদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতিশীল, তবুও আমরা ভাঙচুর ও সহিংসতাকে শেষ উপায় হিসেবে উৎসাহিত করতে পারি না। সব পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে সংঘাতময় অবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করতে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে উৎসাহিত করি।
আমরা এমন ঘটনায় নিজেদের এভাবেই দেখতে চাই। এ জন্যই আমরা গ্লোবাল ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের অধীনে গ্লোবাল ইউনিয়ন ইন্ডাস্টিঅল ও সুইডেনের ট্রেড ইউনিয়ন আইএফ মেটঅল-এর সঙ্গে সৃষ্টি করেছি ন্যাশনাল মনিটরিং কমিটি। সংঘাতময় পরিস্থিতির একটি শান্তিপূর্ণ প্লাটফরম এটি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠন আইএলও এবং বৈশ্বিক ইউনিয়নগুলোর নির্দেশনার অধীনে আমরা গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধিকে সমর্থন করি। এসব নির্দেশনায় প্রয়োজনে শ্রমিক ও নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সমন্বিত দর কষাকষির বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। সেই দর কষাকষি হলো শ্রমিকদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিয়ে।
বৈশ্বিক ইউনিয়ন ইন্ডাস্ট্রিঅল এবং ন্যাশনাল মনিটরিং কমিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংলাপে যুক্ত এইচঅ্যান্ডএম। এর উদ্দেশ্য সংঘাতময় পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ একটি সমাধান বের করা। (বাংলাদেশে) এই অস্থিরতার পর কারখানা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, ইন্ডাস্ট্রিঅলসহ সংশ্লিষ্ট ট্রেড ইউনিয়নগুলো এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, তিনটি কারখানা থেকে সম্প্রতি গার্মেন্ট শ্রমিকদের বরখাস্ত করা হয়েছে।
এসব কারখানা এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপসহ অন্যদের জন্য পোশাক তৈরি করে। আমরা ঘনিষ্ঠভাবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি, যেসব ডকুমেন্ট ও চুক্তি সব পক্ষ মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করেছে এবং অনুমোদন দিয়েছে, তাতে শ্রমিকদের বরখাস্তের বিষয়ে কতটুকু বৈধ তথ্য ও যথার্থতা আছে তা জানতে। এই ইস্যুটি হবে আমাদের এজেন্ডার মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। আমরা সরবরাহকারী, কারখানা সংশ্লিষ্ট এসোসিয়েশন, ট্রেড ইউনিয়ন ও অন্যান্য ক্রেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি।
(অনলাইন ওয়েবওয়্যারে প্রকাশিত ‘আনরেস্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুবাদ)

বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০ বছর উদ্‌যাপন

‘একটা কুঁড়িকে দেখে যেমন পুরো প্রস্ফুটিত ফুলকে ভাবা খুবই কঠিন, তেমনি ৪০ বছর আগে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শুরুটা হয়েছিল, কুঁড়িটা হয়েছিল। কিন্তু এইভাবে এত বড় হবে এটা আমরা ভাবিনি। এটা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি এটা (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র) আরো বড় হবে।’ গতকাল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০ বছর পূর্তি উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ৪০ বছর আগে আমাদের স্বপ্নের জায়গা ছিল যে, সারা দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে আমরা আলো পৌঁছে দিতে চাই। সেইজন্য তারা যদি নিজে আসে খুব ভালো। আর তারা যদি না আসে ঘরে ঘরে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা তার কাছে আলো দিয়ে আসবো। কিন্তু বাংলাদেশকে আলোকিত হতেই হবে। আমি একবার লিখেছিলাম যে, একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশ হবে।
এটা শুনে সবাই তখন মুখ টিপে হেসেছিল। তারা ভেবেছিল আমি এতে বুঝাচ্ছি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইট কাঠ সব বাংলাদেশ হবে। কিন্তু সেটা নয়। আমি বলতে চেয়েছিলাম আমরা যে আজকে আলোকিত মানুষের স্বপ্ন দেখেছি, উন্নত মানুষের স্বপ্ন দেখেছি, একদিন সারা জাতিকে সেই স্বপ্ন দেখতে হবে। তা না হলে আমরা পঙ্কিলতা থেকে উঠতে পারবো না। আমাদের একটা বড় জাতি চাই, একটা গৌরবময় জাতি চাই, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি চাই। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কাজ করে যাচ্ছে।
আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্নদ্রষ্টা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের হাত ধরেই সত্তর দশকের শেষের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে তার। সংগঠনটির ৪০ বছর পূর্তির আয়োজন ছিল বর্ণাঢ্য। সকালে রাজধানীর পাবলিক লাইব্রেরির সামনে থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য কার্নিভাল। তাশের দেশের রাজার পোশাক পরে র‌্যালির নেতৃত্ব দেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সঙ্গে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, শিল্পী মোস্তাফা জামান আব্বাসী, টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, নাট্যাভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ, টিভি ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার এবং নাগরিক টিভি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক প্রমুখ।  কার্নিভালে বর্ণিল, মনোজ্ঞ ও সুসজ্জিত র‌্যালিটি ১৮টি ভাগে সাজানো হয়। র‌্যালির ২য় ধাপে রঙিন শাড়িতে সজ্জিত ছিলো ৩২ জন মেয়ে শিশু। বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলো, ঢাক-ঢোলবাদক দল, ভরত নাট্যম, কত্থক, মণিপুরী এবং গৌড়িও নাচের দল, রংধনুর আদলে সাতটি রঙে সজ্জিত শিশুর দল, রঙিন শাড়ি পরে কলস কাঁখে মেয়ের দল, রোমান বাদক দলের সঙ্গে পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাজে সজ্জিত দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, শিশুতোষ গল্পের চরিত্রে সজ্জিত দল, রঙিন পতাকা হাতে মানুষ ও সুসজ্জিত মোবাইল লাইব্রেরি। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিলো র‌্যালির নবম ভাগ। এ ভাগে ছিল বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সব চরিত্র। চরিত্রগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সত্যি সত্যিই র‌্যালিতে হাঁটছেন সফোক্লিস, সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ফ্রয়েড, মহাকবি ফেরদৌসী, রুমী, মহাকবি গ্যাটে, শেখ সাদী, হাফিজ।
আরও ছিলেন গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, হেগেল, ডারউইন, নিউটন, গ্যালিলিও, আর্কিমিডিসসহ আরও অনেকে। জোয়ান অব আর্ককেও দেখা গেছে র‌্যালিতে। আর বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখকদের মধ্যে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম। চৌদ্দতম ভাগে ছিল বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের জনপ্রিয় রূপকথার বেশ কয়েকটি চরিত্র। ছিল হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, পিনোকিও, অরুণ-বরুণ-কিরণ-মালা, সিনডারেলা, আলাদিনের জীন, এমনকি শিয়াল পণ্ডিতও।
র‌্যালি শেষে দিনব্যাপী চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে কণ্ঠশিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়, প্রিয়াংকা গোপ, চন্দনা মজুমদারসহ প্রায় ৫০ জনের অধিক শিল্পী মাতিয়ে রাখে মঞ্চ। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলে গৌড়ীয়, মণিপুরী, কত্থকসহ বিভিন্ন ধরনের নাচ, ফাঁকে ফাঁকে চলে আলোচনাও। উৎসব আয়োজনে প্রায় ৩০ হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের আপ্যায়নের জন্য বাঙালিয়ানা ধাঁচে পরিবেশন করা হয় দেশীয় সব খাবার। আকর্ষণীয় বাঁশের ঝুড়িতে করে অতিথিদের হাতে তুলে দেয়া হয় পাটিশাপটা, তেলের পিঠা, সিঙ্গাড়া, কদমা, খই, চিঁড়ার মোয়া, নিমকপাড়া, মুড়লী, নকুল দানা, দানাদার, গজা, জিলাপিসহ আরও কিছু খাবার। অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আমরা পাইনি আমাদের ছেলে-মেয়েরা পেয়েছে। আলোকিত মানুষ গড়ার যে উদ্যোগ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিয়েছিলেন তা দেশ গড়ার প্রত্যয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী একটি ভূমিকা ছিল। 
চিত্রশিল্পী মুস্তফা মনোয়ার বলেন, মানুষের উপকার করবো এই চিন্তা নয়, আমি উপকৃত হবো এই চিন্তা  থেকেই কাজ করলেই হয়। তাহলে দায়বদ্ধতা নয় কাজ করার আনন্দ নিয়ে কাজ করতে হবে। আমিই আমার উপকার করবো। ভালোলাগা, এটা করতে ভালো লাগে তাই করছি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যেটা করেছেন। এখানে প্রগাঢ় একটা অনুভূতি কাজ করছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আরো অনেক দূর এগিয়ে যাক- এই কামনা করি।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এমন একটা প্রতিষ্ঠান যেটার কোনো তুলনা নাই। এখন সারা পৃথিবীর সব থেকে বড় সমস্যা হলো কেউ বই পড়ে না। আমাদের দেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এককভাবে এই কাজটিই করে যাচ্ছে।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, মানুষের মন পরিবর্তনে এবং সৃষ্টিশীল ভাবনার বিকাশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র অবদান রেখে যাচ্ছে সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে। এটি একটি বিশাল ব্যাপার।  এদিকে চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রকে সাজানো হয় বর্ণিল সাজে। উৎসব উপলক্ষে চারুশিল্পী মিলন রায়ের নেতৃত্বে একঝাঁক স্বেচ্ছাসেবী শিল্পী মাসব্যাপী কেন্দ্রকে সাজিয়ে তোলে মনোমুগ্ধকর রূপে। দেয়াল পেইন্টিং, ক্যানভাস, আলপনায় বর্ণিল করে তোলা হয় বিশ্বসাহ্যি কেন্দ্র। প্রবেশদ্বারে চমৎকার একটি তোরণ। তোরণ দিয়ে ঢুকতেই হাতের দু’পাশের দেয়ালে চোখে পড়বে নানান চিত্রকর্ম। এতে ফোক এবং রূপকথার বিভিন্ন চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আরেকটি টিম শিল্পী আবদুর রহমান নূর ও স্থপতি সায়ইদা শারমিন সেতুর নেতৃত্বে কেন্দ্রের পুরাতন বিল্ডিং এর রেপ্লিকাসহ নানান রকম কারুশিল্পে সাজিয়ে তোলে উৎসব স্থল। এতে ব্যবহার করা হয় কাগজের ফুল, পমপম বল, মাটির হাঁড়ি, মটকি, মঙ্গল প্রদীপসহ লোকজ সব উপকরণ। এছাড়াও সন্ধ্যার পর ঝলমলে আলোকসজ্জায় দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে কেন্দ্র। আর সবুজায়নের জন্য ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে ফ্লোরে টবে শোভা পায় নানান প্রজাতির গাছ।

মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুতদের সংখ্যা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন- ইউএনএইচসিআর

মিয়ানমারজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এমন যে, তার সংখ্যা নির্ধারণ অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। মিয়ানমারে আরো বাড়ছে আভ্যন্তরীণ বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা। একই সঙ্গে সেখান থেকে দলে দলে মানুষের দেশত্যাগের ঘটনার বিষয়েও সতর্কতা দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) অফিস। শুক্রবার ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেচিক এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেছেন। এতে মিয়ানমারের ভিতরে বেসামরিক মানুষের আভ্যন্তরীণভাবে পালাতে এবং সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ইউএনএইচসিআর তার বিবৃতিতে বলেছে, মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্যে ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় এমন ঘটনা ঘটছে।
২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিক থেকে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নৃশংসতা শুরু হয়। তারপর থেকে কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
এর মধ্যে বেশির ভাগই মুসলিম রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে ক্রমবর্ধমান সহিংসতায় মানবাধিকারের ওপর যে প্রভাব পড়েছে তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন আন্দ্রেজ মাহেচিক। উদ্বেগ প্রকাশ করেন দেশের ভিতরে বাস্তুচ্যুত ও দেশ থেকে বিদেশমুখী শরণার্থীদের বিষয়ে। তিনি আরো বলেন, আন্তঃএজেন্সি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইউএনএইচসিআর মিয়ানমারের আক্রান্ত এলাকাগুলোতে মানবিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়। ওই সময় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে। আন্দ্রেজ মাহেচিক বলেন, যে পরিমাণে মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে মানুষ তার সংখ্যা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। আমরা আমাদের রিপোর্টে জানতে পেরেছি যে, ২০০ মানুষ আশ্রয় খুঁজেছেন। তারা রাখাইনে কার্যকর কোনো সুবিধা পান নি। অন্য রাজ্যেও তা পান নি। বর্তমানে সেখানে সহিংসতার ফলে আভ্যন্তরীণভাবে যে পরিমাণ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাদেরকে সংখ্যা আমরা নির্ধারণ করতে পারছি না।
এমন অবস্থায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। নির্যাতনের শিকার এসব বেসামরিক মানুষের সংখ্যা নির্ধারণ ও তাদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানানো হয়েছে, যারা গত কয়েক সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের উদারতার প্রশংসা করেছে ইউএনএইচসিআর।

ফায়ারিং স্কোয়াডে দুই যুবককে হত্যা

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের রাজধানীতে একটি স্টেডিয়ামে কয়েক শত মানুষ। না, কোনো খেলা দেখতে নয়। ভয়াবহ এক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে তারা উপস্থিত হয়েছেন। তাদের সামনে হাজির করা হলো দুই যুবককে। তাদের হাত পিছন দিকে বাঁধা। নীল শার্ট ও ট্রাউজার পরা তারা। মাটিতে বিছানা বিছানার চাদরের মতো একটা কিছুর ওপর তাদেরকে উপর করে শুইয়ে দেয়া হলো। পাশে দাঁড়ানো অস্ত্রহাতে আরো কয়েকজন যুবক।
তারা ওই দুই যুবকের পিঠ বরাবর উঠে এলেন। অস্ত্র তাক করলেন ওই দুই যুবকের পিঠে। গর্জে উঠল অস্ত্র। রক্তে ভেসে গেল মাটি। মারা গেল ওই দুই যুবক। হ্যাঁ, প্রকাশ্যে এভাবেই ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়েছে দুই যুবক ওয়াদাহ রেফাত (২৮) ও মোহাম্মদ খালেদ (৩১)কে।

অভিযোগ তারা ১২ বছর বয়সী একটি বালক মোহাম্মদ স্বাদকে বলাৎকার শেষে হত্যা করেছে। এ অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়। গত বছর মে মাসে তারা ওই বালকটির সঙ্গে অনৈতিক কাজ করে। ওই বালকটি রেফাত ও খালেদের একজনের বাড়ির কাছেই খেলছিল ঘটনার সময়। তখন তাকে তাদের একজন একটি ভবনের ভিতর নিয়ে যায় টেনে হিঁচড়ে। সেখানে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। এক পর্যায়ে স্বাদ সাহায্যের জন্য কান্না শুরু করে। এ সময় ওই দুই যুবকের একজন একটি ছুরি নিয়ে যায় এবং স্বাদের গলা কেটে ফেলে। নিহত স্বাদের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলায় সাহায্য করার জন্য অভিযুক্তদের এক আত্মীয়া (৩৩)কেও মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তার মৃত্যুদ- স্থগিত করা হয়েছে।

আল মাহমুদের দেখা মিললো তবে... by মরিয়ম চম্পা

গায়ে খদ্দরের পোশাক। হাতে সুটকেস। অথবা টিনের বাক্স। ভেতরে পুরো বাংলাদেশ। নারী, নদী, পাখি, গাছ। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আল মাহমুদ তার এই ভাঙা সুটকেস থেকে একে একে বের করেছেন জাদুর কাঠি। আমরা ছুটে চলেছি তার পেছনে। কখনো কখনো সমালোচনায় মুখর হয়েছি।
কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা যায়নি।
বিচিত্র এক জীবন তার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্ম নেয়া শিশুটি ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠতে থাকে। তিতাসপাড়। রাখালের পেছনে ছুটে চলা। তিতফুল, সরষে ফুল, তেলিয়াপাড়ার চা বাগানের কচি পাতার সান্নিধ্য। পুলিশের ভয়ে কলকাতাযাত্রা। এভাবেই জন্মাতে থাকেন সমকালীন বাংলা ভাষার প্রধানতম কবি। খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন সোনালী কাবিন লিখে। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন সরাসরি। স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যেতে হয় কারাগারে। পরে অবশ্য মত আর পথে আসে পরিবর্তন।
আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা।’ কেমন আছেন অপরাজেয় এই কবি? ৩০শে জানুয়ারি, ২০১৯। বুধবার। অলস দুপুর। মগবাজারের গোমতি আয়েশা ভিলা। এখানেই একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন কবি আল মাহমুদ। কলিংবেল টিপতেই কবিপুত্র শরীফ আল মাহমুদ দরজা খুলে দেন। ড্রইংরুমে ঢুকতে চোখ আটকে যায় দেয়ালে কবিকে দেয়া একটি বাঁধানো মানপত্রের ফ্রেমে। ড্রইংরুমের খাটের লাগোয়া একটি সেলফে সোনালী কাবিনের কবির সারাজীবনের যতো অর্জন সবই যেন থরে থরে সাজানো। অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার ও কলকাতার ভানুসিংহ সম্মাননা। রয়েছে কবি শামসুর রাহমান ও কবির দাম্পত্য সঙ্গী সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে ছবি।
অন্দরমহল থেকে কবিপুত্রের স্ত্রী শামীমা আক্তার বকুলের গলার আওয়াজ ভেসে আসলো....‘আব্বা...আব্বা.....ও আব্বা ওঠেন। আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে।’ আলো আঁধারের মাঝে কবির ঘুম ঘরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল হালকা আকাশি নীল রংয়ের  ফতুয়া ও বিস্কিট রংয়ের লুঙ্গি পড়ে খাটের পাশে বসে আছেন। ছোট বাচ্চাদের মতো পিঠে বালিশের ঠ্যাকা দেয়া। চোখে শোভা পাচ্ছে কালো খয়েরি রংয়ের মোটা ফ্রেমের চশমা।
কবি এখন চোখে তেমন কিছুই দেখতে পান না। এমনকি কানেও খুব একটা শুনতে পান না। মাঝে মাঝে শরীরের রক্তচাপ ওঠানামা করে। নিজ হাতে খাবার খাওয়া, গোসল করা, চলাফেরা কোনো কিছুই করতে পারেন না। স্মৃতিশক্তিও কিছুটা লোপ পেয়েছে। কিছু জানতে চাওয়া হলে অনেক সময় নিয়ে অল্প দু-চারটি কথা বলেন। জানতে চাওয়া হলো ভালো আছেন? বাম চোখ খানিকটা খুলে বললেন, আছি কোনোরকম। শরীরের অবস্থা কেমন? মোটামুটি ভালোই। সারাদিন কিভাবে কাটে? এই পড়াশোনা করে। চোখে দেখতে পান? হুম...এখনো দেখতে পাই। পাশ থেকে ছেলের বউ শুধরে দিয়ে বলেন, আসলে আব্বাতো চোখে দেখতে পান না, তাই হাতে কোনো বই দিলে শুধু পাতা উল্টান আর নেড়ে চেড়ে দেখেন। সকালে নাস্তা করেছেন? এই সামান্য কিছু। আপনিতো একসময় সাংবাদিকতা করেছেন? আমার দেশের জনগণের মাধ্যমেই.....। কী বলতে চাইলেন বুঝা গেল না। আপনার স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগমের কথা মনে পরে? পড়ে.....। কবিতার প্রতি আপনার ভালোবাসা এখনো আছে? হ্যাঁ।
কবির জ্যেষ্ঠপুত্র শরীফ আল মাহমুদ বলেন, পাঁচ ভাই, তিন বোনের মধ্যে আমি বড়। প্রত্যেকের বাসা বলতে গেলে কাছাকাছি। সবাই নিয়মিত বাবার খোঁজ-খবর রাখেন। বাবা গত কয়েক বছর ধরে আমার বাসায় থাকেন। আমার স্ত্রী শামীমা আক্তার বকুল ও বড় ছেলেই তাকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন। আমি বর্তমানে বেকার জীবন যাপন করছি। ৩৬ বছর সাংবাদিকতা করার পর পত্রিকার অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমাকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে বিদায় জানানো হয়। বর্তমানে আব্বার দিন কাটে শুয়ে, বসে আর ঘুমিয়ে। নিজ থেকে কোনো কথা বলেন না। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন। তার কোনো সিরিয়াস অসুখ নেই। ডায়াবেটিস বা হার্টে কোনো সমস্যা নেই। এখন বই পড়তে না পারলেও বই হাতে দিলে পড়ার ইচ্ছাটা প্রকাশ পায়। বই নাড়াচাড়া করেন। পৃষ্ঠা উল্টান। আমরা ভাই বোন ও আমাদের ছেলে মেয়েরা সবাই আব্বার বইয়ের পাঠক। তবে, দুঃখের বিষয় আমরা কেউ লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত নই।
সত্যি বলতে আমাদের দেশে সাহিত্য চর্চাটা খুব সুখের নয়। আব্বা অনেক চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। আমরা খুব দুঃখ কষ্টে বড় হয়েছি। তার উপর সাংবাদিকতা তো আরো ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি কিংবা বিরোধী দল কেউই আব্বার খোঁজ-খবর রাখেন না। এমনকি কেউ একদিন তাকে দেখতে পর্যন্ত আসে নি। মাঝে মধ্যে আব্বার ভক্ত অনুরাগিরা তাকে দেখতে আসেন। কবি আল মাহমুদের গোলাপফুল আঁকা ভাঙা টিনের বাক্স সম্পর্কে তিনি বলেন, আসলে ওই টিনের বাক্সের বাস্তবিক কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা আব্বার বন্ধু ও লেখক শহীদ কাদরীর একটি উক্তি ছিল। তিনি ঠাট্টা করে আব্বাকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, ‘আল মাহমুদ টিনের বাক্স নিয়ে ঢাকায় এসেছে, যার মধ্যে পুরো বাংলাদেশ ছিল’।
১৯৩৬ সালের ১১ই জুলাই প্রবল বর্ষণের এক রাতে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি আল মাহমুদ। তার পিতার নাম আব্দুর রব মীর এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখি শুরু। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকায় আসেন। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী এই কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে একের পর এক সাফল্য লাভ করেন।
কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় প্রায় একবছর কারাগারে কাটাতে হয় তাকে। মুক্তির পর নিয়োগ পান শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তিনি কবিতায় অবলম্বন করেন। সমকালীন বাংলা সাহিত্যাকাশে আল মাহমুদের সমতুল্য মেলা ভার। বিগত কয়েক দশক বাংলা কবিতা তার হাত ধরে আজ চরম উৎকৃষ্ট ও উন্নত শিখরে অবস্থান করছে। কবিতার সঙ্গেই গড়ে তুলেছেন ঘর-সংসার। তিনি বলেছেন, ‘কবিতা আমার জীবন’। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন, ‘বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।’
তার লেখনীর ব্যতিক্রম স্বাদের জন্য তিনি বারবার আলোচিত হয়েছেন। হয়েছেন অসংখ্যবার পুরস্কৃত। মাত্র দু’টি কাব্যগ্রন্থ্যের জন্য ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যিক জীবনে তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনীসহ নানা বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাসসহ শ’খানেকের মতো গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে তার। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, কবিতা: লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতর নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ, তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, ইত্যাদি। এ ছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ তার উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনী গ্রন্থ।
সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে অবস্থান নেয়ার কারণে কারাভোগ করলেও পরবর্তী আল মাহমুদের বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে পড়েন তিনি। এ নিয়ে কেউ কেউ তার সমালোচনাও করেন। নাসির আলী মামুনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এর জবাব দেন আল মাহমুদ। বলেন, তারা আমাকে অন্যায়ভাবে মৌলবাদী বলেছে। তারা খুব ভালো করে জানে, কোনো একজন কবি মৌলবাদী হতে পারে না। এটাতো ঠিক নয় যে, আমি ধর্মে বিশ্বাস করেছি বলে আমি মৌলবাদী।
আসলে আল মাহমুদের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা যায় না। বেলাল চৌধুরী যেমনটা লিখেছেন, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ দুজনই সমসমায়িককালের কবি। কিন্তু মত ও পথ আলাদা। এই দুই কবির সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের। শামসুর রাহমানকে আমি সম্বোধন করি ‘স্যার’। আর অতীতে বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু নীতিগত কারণে আল মাহমুদ থেকে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু শামসুর রাহমানের লেখা যেভাবে গুরুত্ব সহকারে আমি পাঠ করি, সেভাবে আল মাহমুদকেও পাঠ করি।

আফগান শান্তি আলোচনা: উদ্বিগ্ন ভারত

যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা ভারতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এমনটাই মনে করছেন কয়েকজন ভারতীয় বিশ্লেষক। ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। আফগান সরকারকেও আলোচনা থেকে সরিয়ে রেখেছে জঙ্গি সংগঠনটি। অথচ বর্তমান ও সাবেক আফগান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিল ভারত। তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্র এখন খসড়া শান্তি কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে। আমেরিকান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খসড়া কাঠামোতে ১৮ মাসের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। এর বিনিময়ে আফগান ভূখণ্ডে ইরাক ও সিরিয়ার ইসলামপন্থি জঙ্গি সংগঠন আইএসকে কার্যক্রম চলতে না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তালেবান।
সাউথ এশিয়া মনিটর জানিয়েছে, গত বুধবার তালেবান ও দেশটির সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইসহ আফগান রাজনীতিবিদেরা রাশিয়ায় আরেকটি শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় রাউন্ডে অংশ নেয়।
তবে তালেবান অব্যাহতভাবে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। ভারত এখনো তালেবানকে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা গত বছর রুশ-আয়োজিত আলোচনায় অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের পাঠিয়েছিল। এর মাধ্যমে তালেবানের সঙ্গে ভারতের অস্বস্তির বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়। উল্লেখ্য, ওই আলোচনায় তালেবান প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের অবস্থান হলো, তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনাকে সমর্থন করবে, আফগান সরকারও তাই চায়। তালেবান এখন পর্যন্ত আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। জওয়াহেরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক গুলশান সাচদেব বলেন, ভারত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। আফগানিস্তানে ভারতীয় সম্পৃক্ততার কঠিন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে ভারত। আফগানিস্তানে যা কিছু ঘটছে, তা বিশৃঙ্খল। কেউ জানে না, কী ঘটতে যাচ্ছে।
তবে কিছু কিছু নির্দেশনা স্পষ্ট। প্রায় সবাই এখন তালেবানের শক্তিকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আফগান সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর তা ভারতের জন্য ভালো বিষয় নয়। তালেবানের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা দিল্লির মধ্যে এই ভীতি জাগিয়েছে যে এর ফলে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়বে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য অবস্থা উপলব্ধি করতে ভারত এখন ইরান, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছে ছুটছে।

ওয়াশিংটনে জরুরি অবস্থা: শীতকালীন তুষারঝড়ের পূর্বাভাষ

তুষারঝড়ের কারণে ওয়াশিংটনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজ্যের ওপর দিয়ে শীতকালীন প্রচ- তুষারঝড় প্রবাহিত হয়। এর ফলে সিয়াটলে ২০০ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। লোকজনকে রাস্তায় বের হতে বারণ করা হয়। তাদেরকে ঘরের ভিতরে আশ্রয় গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
শুক্রবার সিয়াটলের উত্তরে ভারি তুষারপাগ শুরু হয়। কোথাও কোথাও ৮ ইঞ্চি তুষার পড়ে।
এতে শহরের অনেক এলাকা ঢেকে যায়। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কর্মচারীদের বাসায় ফিরে যেতে বলা হয়। এ অবস্থায় গভর্নর জে ইনস্লি রাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি রাজ্যের সবাইকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি ঝড়ে রূপ নিতে পারে, যা অনেক বছরে আমরা একবার দেখে থাকি।
ওদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অবকাশযাপন কেন্দ্রে ৫ দিন ধরে তুষারের কারণে আটকে পড়েছিলেন কমপক্ষে ১২০ জন পর্যটক ও বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা। তাদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইউএস ফরেস্ট সার্ভিসের মুখপাত্র অ্যালিসিয়া এমব্রে বলেছেন, কিংস ক্যানিয়ন ন্যাশনাল পার্কের মন্টিসিটো সিকুওইয়া লজে রোববার থেকে আটকা পড়েন অতিথিরা ও স্টাফরা। সেভানে ৭ ফুট পর্যন্ত তুষারপাত হয়েছে। তাতে আটকা পড়েন তারা। ফ্রেসনোর পূর্বদিকে পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা ¯েœামোবাইলে চড়ে পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে তাদের কাছে পৌঁছেন। তারপর তারা পথের ওপর পথে থাকা ২০টিরও বেশি গাছ সরান। ৮ মাইল এলাকায় রাস্তার ওপর থেকে তুষার পরিষ্কার করেন, যাতে অতিথিরা ও স্টাফরা বৃহস্পতিবার রাতে ফিরে যেতে পারেন।
পূর্বাভাষে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলের ওপর দিয়ে আরেকটি শীতকালীন তুষারঝড় আসতে পারে। ওদিকে ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কে তুষারপাতের ফলে ঘরের ওপর গাছ পড়ে হাফ ডোম ভিলেজের ৫০টি আবাসিক ভবনের অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১৬০ জনেরও বেশি ত্রাণকর্মী। তারা বিভিন্ন জনকে খাদ্য, আশ্রয় ও সেবা দিতেন।
মিশিগানে এক লাখ ৪৮ হাজারের বেশি কাস্টমার বিদ্যুতবিহিন রয়েছেন। কারণ, সেখানে ফ্রিজিং রেইন হচ্ছে কয়েক দিন ধরেই। তবে কনজুমার এনার্জি থেকে বরা হয়েছে, রোববার শেষের দিকে বিদ্যুত সংযোগ স্থাপন করা হতে পারে। সিয়াটলে কর্মকর্তারা লোকজনকে রাস্তায় বেরুতে অনুৎসাহিত করেছেন। বলা হয়েছে, তুষারপাতের ফলে অনেক স্থানে ট্রাফিক ধীর গতির হয়েছে। তুষারঝড়ে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি তুষারপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা করে সব স্কুল, কলেজের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। সিয়াটল-টাকোমা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহু ফ্লাইট বাতিল অথবা বিলম্বিত করা হয়েছে। রোববার ও সোমবারও একই অবস্থা থাকতে পারে। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে চলে যেতে পারে। ওদিকে সিয়াটল রেল স্টেশনে বৃহস্পতিবার ৫৯ বছর বয়সী একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শহরে অতিরিক্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্য সুবিচারের দাবি -যুক্তরাষ্ট্রে সম্মেলন

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিচার দাবি করেছেন। তাঁরা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিচারের দাবি তুলে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেন।
‘বার্মায় নিরাপত্তা ও জবাবদিহি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলন ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। প্রথম দিন মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক তথ্য-অনুসন্ধানী গ্রুপের সদস্য রাধিকা কুমারস্বামী বাংলাদেশের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে তাঁর অভিজ্ঞতার মর্মস্পর্শী বিবরণ দেন। তিনি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্য নিয়েই এই গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করা যায়। জাতিসংঘ প্রক্রিয়ার বাইরে জাতীয় আইনের ভিত্তিতেও এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব। এই গণহত্যায় উসকানিদাতা হিসেবে তিনি ফেসবুককে অভিযুক্ত করেন এবং তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান।
সকালের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় আশ্রয়প্রাপ্ত বিভিন্ন রোহিঙ্গা ব্যক্তি তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর অত্যাচারে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের সংকট সমাধানে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় তাঁরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
গণহত্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক গ্রেগরি স্টানটন বলেন, তিনি আশাবাদী যে আগামী বছরগুলোয় এই গণহত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তবে শুধু এই বিচারের মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না; রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতির পাশাপাশি এই অমানবিক কার্যকলাপের শিকার হিসেবে তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
রোমভিত্তিক পিপলস ট্রাইব্যুনালের সাধারণ সম্পাদক জিয়ানি তগনানি বলেন, গণহত্যার মুখে সবচেয়ে বড় অপরাধ নীরব থাকা। তিনি দাবি করেন, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি নিজেও এ গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত, তাঁকেও বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক একাত্তরের গণহত্যার স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, যে বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের এক ভয়ংকর গণহত্যার শিকার, তারাই আজ রোহিঙ্গাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সমর্থনে স্থানীয় নাগরিক সংস্থাগুলো যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তিনি সেসবের সচিত্র বিবরণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন শিবির, বিদ্যালয় স্থাপন ও অনাথ রোহিঙ্গা শিশুদের দত্তক গ্রহণের ব্যবস্থা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সহযোগিতায় বিখ্যাত ফুটবলার মেসি ও রোনালদো রোহিঙ্গাদের সমর্থনে অর্থ সংগ্রহে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি আর আবরার রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে বাংলাদেশ সরকারের নজিরবিহীন সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, পশ্চিমা ও আরব দেশগুলো যেখানে নামমাত্র আর্থিক সাহায্য দিয়েই নিজের দায়িত্ব শেষ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়দানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রশ্নে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, রোহিঙ্গাদের সেই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাঁর মত, বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত রোহিঙ্গাদের ‘উদ্বাস্তু’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তৃতীয় কোনো দেশে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
সম্মেলনের সূচনাপর্বে বিখ্যাত মানবাধিকারকর্মী এঞ্জেলা ডেভিস ও মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ র‍্যাপোর্টিয়ার ইয়াং লি ভিডিওর মাধ্যমে পাঠানো বার্তায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি নিজেদের সংহতি প্রকাশ করেন।
আজ শনিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘ, ইসলামিক কনফারেন্স ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এ ছাড়া সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী সমাপ্তি ভাষণ দেবেন।

মোদী-মমতার তরজায় জমজমাট পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি

লোকসভা নির্বাচনের আর দুই-আড়াই মাস বাকি। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতিকে তাতিয়ে দিয়েছেন বিজেপির নেতারা। মাত্র সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দু’দুবার পশ্চিমবঙ্গে এসে মোট তিনটি জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। প্রতিটি সভা থেকেই মমতা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ তো পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে উপড়ে ফেরার ডাকও দিয়েছেন। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পাল্টা জবাব দিয়েছেন। ফলে মোদী-মমতার তরজায় সরগরম হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক নির্বাচনী রাজনীতি।  মমতা রীতিমত হুঁশিয়ারি দিয়ে বুঝিয়েছেন বিজেপির দিন সমাগত। গত শুক্রবার জলপাইগুঁড়ির ময়নাগুঁড়িতে এক জনসভায় দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মমতার বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে বলেছেন, চিটফান্ড(বেআইন অর্থলগ্নী সংস্থা) কেলেঙ্কারিতে কাউকে ছাড়া হবে না।  মোদী বলেছেন, দিদির নজর এখন দিল্লির দিকে।
আর তাই পশ্চিমবঙ্গে সরকার এখন দালাল ও সিন্ডিকেটের হাতে। বাংলায় দাদাগিরির সরকার চলছে। মোদী প্রশ্ন করেছেন, চিটফান্ড দুর্নীতির তদন্ত নিয়ে মমতার এত ভয় কেন? দুর্নীতিগ্রস্তদের বাঁচাতে আর কোথায় কোথায় ধর্না দেবেন? এরপরেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ঠগবাজদের শিকার সব পরিবারকে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, যারা গরিব মানুষের টাকা লুটেছেন, এই চৌকিদার একজনকেও ছাড়বে না। এদিন সভার শুরুতেই মোদী চায়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেছেন, উত্তরবঙ্গের সঙ্গে তার ‘চায়ের সম্পর্ক’। কারণ, তিনি চা-ওয়ালা। আর উত্তরবঙ্গ চায়ের জোগানদার। তার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে বলেছেন, একজন চাওয়ালাকে এত ভয় কিসের? এ দিনের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ হতো, আজ সেখানে হিংসা ঢুকেছে। বাংলার সংস্কৃতি নষ্ট করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এই মাটির বদনাম করে দিয়েছে। ময়নাগুড়ির সভায় জনসমাগম দেখে আপ্লুত মোদী বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সরকার ভয় পেয়ে গিয়েছে। কলকাতায় বসে থাকা দিদি যে ভয় পেয়েছেন, তা মোদীর জন্য নয়, আপনাদের জন্য। আপনাদের শক্তি, আমার প্রতি ভালবাসা দেখে ভয়ে পেয়েছেন উনি। তিন তালাক আইনের বিরোধিতা করার জন্য কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে মোদী আক্রমণ করেন। মোদীর মতে, ত্রিপুরার মতো পশ্চিমবঙ্গেও এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসবে। এর আগে গত সপ্তাহে মোদী ঠাকুরনগর ও দুর্গাপুরেও জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। মমতা দুর্নীতিগ্রস্তদের আড়াল করছেন বলে মোদী যে অভিযোগ করেছেন তার পাল্টা জবাব দিয়ে এদিনই মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, যে নিজে দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত, অন্যের দিকে আঙুল তোলা সাজে না তার। মমতা বলেছেন, অনেকে ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না, কিন্তু আমি ম্যাডিবাবুকে ভয় পাই না। মমতার মতে, আসলে ওঁর ঘুম  উবে গিয়েছে। এত ভয় পেয়েছেন।

বেসামরিক ব্যক্তিদের গুলি করার স্বাধীনতা পেয়েছিল ব্রিটিশ সেনা সদস্যরা

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, অস্ত্র হাতে না থাকা বেসামরিক ব্যক্তিদেরও তারা গুলি করতে পারবে, যদি তাদেরকে সন্দেহজনক মনে হয়। ফলে মোবাইল ফোন বা কুড়াল হাতে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর সুযোগ পেয়ে যায় যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মিডিল ইস্ট মনিটর লিখেছে, মূল বিষয়টি হচ্ছে সন্দেহের। সেনা সদস্যরা যদি মনে করতেন যে তাদের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নজরদারি করছে এবং মোবাইল ফোনে সংবাদ পাঠাচ্ছে তাহলে তাকে গুলি করার স্বাধীনতা পাওয়া যেত। আবার হাতে কুড়াল থাক ব্যক্তিরাও ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। কারণ ধরে নেওয়া হতো এমন ব্যক্তি, রাস্তার পাশে বোমা পুঁতে রাখার কাজ করে।
অস্ত্র হাতে না থাকলেও নজরদারি করা নিরস্ত্র ব্যক্তিদের শত্রুপক্ষের হিসেবে চিহ্নিত করার ইতিহাস রয়েছে ৩০ বছরব্যাপী চলা নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সংঘাতে। ওই সময় ব্রিটিশ সেনা সদস্যেদের অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার কাজ করত স্থানীয়দের অনেকে। তারা তথ্য দিত আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিকে। সেসময় থেকে ব্রিটিশ সেনা সদস্যরা এমন ব্যক্তিদের ‘ডিকার্স’ নামে আখ্যায়িত করতে থাকে।
ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও ডিকার্সদের উপস্থিতি দেখে, ব্রিটিশ সেনা বাহিনী তাদেরকে গুলি করার অনুমতি দেয়। এমন ঘটনা তখনই ঘটেছে যখন ব্রিটিশ সেনা সদস্যরা চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েছে। ইরাকে ডিকার্সদের গুলি করে হত্যার ঘটনা শুরু হয় ২০০৪ সালের জুন মাসে আমারাহ নামক স্থানে। সেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল শিয়ারা।
সাবেক ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের সাক্ষাৎকার থেকে মিডিল ইস্ট মনিটর জেনেছে, এভাবে সন্দেহের বশে বেসামরিক নাগরিকদের গুলি করার কারণে শিশু থেকে শুরু করে কিশোরদেরও প্রাণ গেছে। ইরাকে মোতায়েন থাকা সাবেক এক ব্রিটিশ সেনা সদস্য জানিয়েছেন: তাদেরকে বলা হয়েছিল, হাতে মোবাইল বা কোদাল থাকা যে কাউকে সন্দেহ হলে তারা গুলি করতে পারবে। কারণ তখন মনে করা হতো, বেসামরিক নাগরিকরা মোতায়েন করা ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের ওপর নজরদারি চালায়, যার ভিত্তিতে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা তাদের ওপর হামলা চালায়। মোতায়েন থাকা ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তারা তাই সেনা সদস্যদের জন্য যুদ্ধের নিয়ম শিথিল করে দিয়েছিলেন।
একজন ব্রিটিশ মেরিন সদস্য তার সহকর্মীদের কাছে স্বীকার করেছিলেন, তার গুলিতে আট বছর বয়সী এক বালক প্রাণ হারিয়েছে। আফগানিস্তানের ওই ঘটনায় ছেলেটির বাবা লাশ নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে এসে হত্যাকাণ্ডের জন্য জবাবদিহিতা দাবি করেছিল।
আরেকজন সেনা সদস্য মিডিল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন এমন একটি ঘটনার বিষয়ে যেখানে তাদের গুলিতে নিহত দুই আফগান বালকের মৃত্যুর ঘটনা ঢাকতে গল্প ফাঁদা হয়েছিল। অথচ ওই হত্যার ঘটনার সাক্ষী তিনি নিজে। আফগান বালক দুইটির হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা দুইটি পুরাতন রাশিয়ান অস্ত্র তাদের মৃতদেহের কাছে রেখে দাবি করেছিল, তারা আফগান তালেবানের সদস্য।
তিনি আরও বলেছেন, বিভিন্ন ঘাঁটিতে তিনি পুরাতন রাশিয়ান অস্ত্র এভাবে জমিয়ে রাখতে দেখেছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই ওই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করা হত। সেগুলো সহজেই হেডকোয়ার্টারে পাঠানোর সুযোগ থাকলেও তা করা হতো না।
আরেকজন সাবেক ব্রিটিশ সেনা সদস্য জানিয়েছেন, ইরাকের বসরাতে এক ঘটনায় তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসামরিক নাগরিককে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। অথচ তাদের সবাইকে নজরদারির জন্য দায়ি করা যায় না। যুদ্ধের নিয়ম শিথিল করায় তাদের সবাইকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয়েছে।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, যেকোনও তদন্ত হলে তারা সেনা সদস্যদের পাশে থাকবেন। তাদেরকে শুধু বলতে হবে, তারা আসলেই মনে করেছিলেন, তাদের নিজেদের প্রাণ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাই তারা গুলি চালিয়েছেন।

সুচির স্কুল ব্যাগ নিয়ে মা-বাবার মাতম by মরিয়ম চম্পা

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টা। উত্তরা রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের সুরমা-১ বিল্ডিংয়ের ২০৫ নম্বর ফ্ল্যাটে কেবলই কান্নার সুর-আহাজারি। মাইক্রোবাস চাপায় নিহত স্কুলছাত্রী ফাইজা তাহসিনা সুচির ঘুম ঘরের খাটে বসেই আর্তনাদ করছিলেন পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা। খাটের ওপর সুচির গোলাপি রং-এর ব্যাগ আর বারবি ডল আঁকা হার্ডবোর্ড পড়ে আছে। নেই শুধু সুচি। ‘আমার সুচি ডাক্তার হতে চেয়েছিল। সে সব সময় বলতো আম্মু আমি ডাক্তার হয়ে গ্রামে চলে যাবো। গ্রামের গরিব মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করবো।
সুচি গ্রাম খুব ভালোবাসতো। স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তায় কোনো ভিক্ষুক দেখলেই বলতো আম্মু ওদেরকে টাকা দাও। বাবা বলেছে ভিক্ষুককে টাকা দিলে তার দ্বিগুণ আল্লাহ ফিরিয়ে দেয়। আমার সুচিতো আর তার বাবার পকেটে চকলেট খুঁজবে না’। সুচির মায়ের এমন আর্তনাদে চারপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
সুচির মা নার্গিস ইসলাম বলেন, ওর বাবা যত রাত করেই বাসায় ফিরতো না কেন সুচি জেগে থাকতো। কখন বাবা আসবে। বাবার পকেট থেকে চকলেট নেবে। বাবাকে বলতো, বাবা মাথা নিচু করে আমার মুখের কাছে তোমার কানটা দাওতো। গোপন কথা আছে। আম্মু শুনতে পাবে। তাই চুপি চুপি বলবো।
তিনি বলেন, সুচি খুবই অভিমানী মেয়ে ছিল। রাতে ওর বাবা আর আমার মাঝখানে ঘুমাতে পছন্দ করতো। ছোট ছেলে নাকিব মুনসিফ বর্ণকে একপাশে রেখে মেয়েকে আমাদের মাঝে রাখতাম। ছোট ভাই আর বাবার সঙ্গে ছিল তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। যেকোনো বিষয়ে বাবাকে আগে জানাতো। ওর বাবাতো পাগল হয়ে যাবে। একটি চকলেট হলেও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে খেতো। ভাইয়ের সঙ্গে কখনো ঝগড়া করতো না। আমার ছেলে শুধু বোন নয় একটি ভালো বন্ধুকে হারালো। সুচি এর আগে মণিপুরিপাড়া স্কুলে পড়ালেখা করতো। তার পরীক্ষার ফলাফল সবসময়ই ভালো ছিল। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে গত এক সপ্তাহ আগে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়েছে। ওকে সবসময়ই বলতাম, মাগো তোমাকে আরো বেশি পড়ালেখা করতে হবে। ও বলতো, মা আমিতো খুব ভালো রেজাল্ট করছি। তারপরও তুমি কেন বেশি পড়তে বলো। আমার মা পাখির স্কুলব্যাগ পড়ে আছে। পরীক্ষায় লেখার হার্ডবোর্ড পড়ে আছে। কিন্তু আমার সুচি নেই। সে মৃত্যুর আগে একবার মা কিংবা বাবা বলে চিৎকার করার সুযোগ পায় নি। স্কুল ব্যাগে থাকা হার্ডবোর্ডটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। না জানি আমার মেয়ে কত কষ্টটাই না পেয়ে মারা গেছে।
বোনকে হারিয়ে সুচির ৫ বছর বয়সী ভাই নাকিব মুনসিফ বর্ণ অনেকটা হতবিহব্বল হয়ে পড়েছে। কোনো কথা বলছে না। গালে হাত দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ছোট্ট বর্ণ বোনের সঙ্গে একই স্কুলে পড়ে। বোন ছিল তার খেলার সঙ্গী। তার গল্প করার, দুষ্টুমি করার মানুষটা আজ হারিয়ে গেছে। বোনের কথা জানতে চাইলে বর্ণ বলে, আপু মরে গেছে। সে এখন কবরে।
সুচির বাবা ফাইজুল ইসলাম বলেন, উত্তরা রাজউকের প্রকল্পে নতুন বাসা নিয়েছি। আমার মা খোলামেলা ও সুন্দর পরিবেশে বিকশিত হবে এই ভেবে। সে প্রকৃতি প্রেমিক ছিল। ফুল, ফল, গাছপালা, নদী, পুকুর, জলাশয় এসব পছন্দ করতো। মেয়ের আবদার রাখতে অনেক ভেতরে হওয়া সত্ত্বেও এখানে বাসা নিয়েছি। এখানে পাশেই জলাশয় রয়েছে। আছে বিল। গাছপালা ও আলো হাওয়াসহ গ্রামীণ আবহ। সবই পড়ে আছে। আমার মামনি নেই। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। কোর্ট-কাচারি পছন্দ করি না। কিন্তু যে গাড়িটি আমার মেয়েকে চাপা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তাদের মনুষ্যত্ববোধ বা মানবিকতা নেই। তারা একটিবার আমার কাছে আসে নি। এমনকি নিজেদের ভুল স্বীকার করে সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। তাই মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে আমি ঘাতক চালক ও গাড়িতে থাকা টিভি অভিনেতার বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঘটনার দিন সুচির সঙ্গে থাকা নাজিফা আলম বলে, মাইলস্টোন স্কুলে আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। তার সঙ্গে গল্প করতাম। খেলতাম। ওইদিন আমি আর সুচি একসঙ্গেই হাঁটছিলাম। হঠাৎ ও আমার একটু আগে চলে যায়। এ সময় আঙ্কেল (সুচির বাবা) সুচিকে বলে সুচি সাবধানে যাও। তার কথা শুনে সুচি পেছন পানে ঘুরতেই বিপরীত দিক থেকে একটি মাইক্রোবাস এসে প্রথমে তাকে বাড়ি মেরে ফেলে দেয়। এরপর গাড়িটি সুচির শরীরের ওপর চাপা দিয়ে চলে যায়। আমি তখন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কি যে হয়ে গেলো। কিছুই বুঝতে পারিনি।
সুচিদের এক প্রতিবেশি বলেন, কি প্রাণবন্ত তরতাজা একটি ফুলের মতো নিষ্পাপ জীবন আমাদের চোখের সামনে নিভিয়ে দেয়া হলো। এটাতো স্বাভাবিক মিত্যু নয়। সুচিকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার পর আমাদের ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। কম্যুউনিটির অনেক ছেলে মেয়ে গতকাল স্কুলে যায় নি। কোনো বাচ্চা স্বাভাবিক হতে পারছে না। সবার ভেতরে একটি চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। আমরা এই হত্যাকান্ডের সঠিক বিচার চাই। নইলে আজকে সুচি গেছে। আগামীকাল আমার বাচ্চার বেলাতেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
নিহত ফাইজা তাহাসিনা সুচি (১০) উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার সময় রাস্তা পার হচ্ছিল তারা। রাস্তা পারাপারের সময় বেপরোয়া গতিতে একটি মাইক্রোবাস তাকে চাপা দিলে এ ঘটনা ঘটে। ওই গাড়িতে করেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রক্তাক্ত সুচিকে দ্রুত উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করার পরপরই গাড়ির চালক ও যাত্রীরা পালিয়ে যায়। এসময় ঘাতক মাইক্রোবাসটিকে (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৪১৫৭) জব্দ করে তারা। নিহত ফাইজা তাহাসিনা সুচির বাবা ফাইজুল ইসলাম দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক।

কারাগারে খালেদার একবছর by কাফি কামাল

কারাবন্দিত্বের একবছর পূর্ণ হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫ বছরের সাজার রায় দেন বিশেষ আদালত। রায়ের পরপরই কড়া প্রহরায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। আগেই পরিত্যক্ত ঘোষিত ওই কারাগারের ডে কেয়ার সেন্টারে শুরু হয় খালেদা জিয়ার কারাবাস। সেই থেকে পরিত্যক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে দিন কাটছে তার।
২০১৯ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি একবছর পূর্ণ হয়েছে তার কারাভোগের। কারাগারে খালেদা জিয়াকে প্রথম ডিভিশন দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে রাখা হয়েছে সাধারণ কয়েদিদের মতো।’ বয়স বিবেচনা করে একজন সহায়তাকারী হিসেবে গৃহকর্মী ফাতেমাকে তার সঙ্গে থাকার সুযোগ দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে বিভিন্ন সময় দলটির নেতা ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন ‘নির্জন কারাবাস বলতে যা বোঝায়, কারাবাসে খালেদা জিয়ার দিন কাটছে তেমন। খাবার থেকে আবাস কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ সুবিধা পাননি তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৭৪ বছর বয়স্ক খালেদা জিয়া।’
ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে দায়েরকৃত এ মামলায় সাড়ে ৯ বছর আইনি লড়াই করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ২০১৪ সালে এ মামলায় অভিযোগ গঠনের পর মামলাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা আখ্যায়িত করে বিএনপি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক উত্তাপ গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। বিচারিক কার্যক্রমের শেষের দিকে মামলার কার্যক্রম চলে দ্রুত। এ সময় খালেদা জিয়াকে বকশিবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজির হতে হয়েছে সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন।
নিম্নআদালতের রায়ের পর সে রায় বাতিল ও জামিনের জন্য উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। কিন্তু নিম্নআদালত থেকে রায়ের কপি উচ্চ আদালতে পৌঁছাতেই সময় লাগে বেশ কয়েকদিন। ১২ই মার্চ হাইকোর্ট চার মাসের জামিনের আদেশ দিলেও তার বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। চেম্বার জজ মামলাটি পাঠিয়ে দেন আপিল বিভাগে। আপিল বিভাগ তার জামিন বহাল রাখেন। কিন্তু ততদিনে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় কুমিল্লায় দায়েরকৃত একটি নাশকতার মামলায়। যে মামলায় খালেদা জিয়াকে করা হয়েছিল হকুমের আসামি। জিয়া অরফানেজ মামলায় ৫ দফা জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আটকে যায় তার মুক্তির পথ। ৩০শে অক্টোবর উচ্চ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয়।
সেখানে নিম্নআদালতের দেয়া ৫ বছর সাজার রায় বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট। তার আগের দিন ২৯শে অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন বিশেষ আদালতের বিচারক। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে কারাকর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে বকশীবাজার প্যারেড গ্রাউন্ডের আদালতে না আনায় চ্যারিটেবল মামলার চূড়ান্ত বিচার কার্যক্রমে পরিচালিত হয় কারাগারের অভ্যন্তরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। পরিবেশ ও নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে বারবার কারাঅভ্যন্তরে স্থাপিত আদালতের হাজির হওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ পোষণ করেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের একবছর পূর্ণ হওয়ার দিন গতকাল গ্যাটকো মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, কেবল ন্যায়বিচার হলেই হবে না- জনগণের কাছে প্রতীয়মান এবং জনমনে আস্থা জন্মাতে হবে যে ন্যায়বিচার হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তিরিশের অধিক মামলা চলমান রয়েছে। প্রথম দুটি মামলায় সঠিক বিচার হলেও আমার ধারণা জনগণের একটি বিরাট অংশ এ মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার হচ্ছে বলে মনে করছে না। বলাবাহুল্য, সরকার এবং সরকারি দলের সমর্থকদের কাছে ন্যায়বিচার হয়েছে বলে আস্থা জন্মেছে। এই যে দ্বিধাবিভক্তি এটা দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার পক্ষে বিরাট অন্তরায়। যতদিন জনগণের একটি বিরাট অংশ মনে করবে যে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, ততদিন তার জনপ্রিয়তা বহাল থাকবে।
ওদিকে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দিতে অব্যাহত দাবি জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও তার নেতৃত্বাধীন দল বিএনপির নেতারা।
কিন্তু কারাকর্তৃপক্ষ সে দাবি নাকচ করছে বারবার। পরে কারাকর্তৃপক্ষ সরকারি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। সে বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৮ই এপ্রিল তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। দুই মাস কারাভোগের পর প্রথমবারের মতো তাকে দেখা যায় জনসম্মুখে। তার জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হলেও তিনি গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই কেবিন ব্লকে যান। কয়েকটি এক্সরে করিয়ে সেদিনই তাকে ফেরত নেয়া হয় কারাগারে। এদিকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সরকারি চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবনে অনীহা প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। কারাগারে ধীরে ধীরে অবনতি ঘটে তার স্বাস্থ্যের। এক পর্যায়ে তার আইনজীবী ও দলের নেতাকর্মীরা বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করে তার চিকিৎসার দাবি তোলেন। এমনকি তার চিকিৎসার খরচ বহনের ঘোষণাও দেন।
কিন্তু সে দাবি বারবার অগ্রাহ্য করে কারাকর্তৃপক্ষ। বিএনপির তরফে অভিযোগ করা হয়, ওয়ান ইলেভেনের সময় কারাবন্দি হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু এখন খালেদা জিয়াকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ নিয়ে দীর্ঘ বাহাসের পর উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিএনপি নেতারা দাবি করেন ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছে খালেদা জিয়ার। এ সময় রিউম্যাটিকআর্থ্রাইটিসের কারণে হাত-পা ফুলে যায়, ফ্রোজেন শোল্ডার, পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ায় একবার তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া পরিবারের স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেননি। তার শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার দাবি থেকে সরে আসে বিএনপি।
অন্যদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে ৬ই অক্টোবর তাকে স্থানান্তর করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। তবে এবার গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে করেই তাকে নেয়া হয় ছয়তলার কেবিন ব্লকে। সেখানে ভর্তি করে তাকে কেবিন ব্লকের একটি ভিআইপি কেবিনে রাখা হয়। কেবিন ব্লকের ৬১২ নম্বর কেবিনে তার চিকিৎসা চলে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে। বিএনপির তরফে অভিযোগ করা হয়, মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি। পরবর্তী দুই মাস সেই কেবিনেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। হাসপাতালের কেবিন ব্লকে ভিআইপি কেবিনগুলো দুই রুমের। কিন্তু একরুমে পাহারাদার কারারক্ষীরা অবস্থান করায় সেখানেও ছোট একটি রুমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার চলাচল। তবে কারাগারের চেয়ে কিছুটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পান হাসপাতালে।
জেলখানার চেয়ে হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন এক মাস দুই দিন তিনি কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময় এক বছরের বেশি সময় তিনি কারাভোগ করলেও সেবার শীর্ষ দুই নেত্রীকে রাখা হয়েছিল সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দুটি ভবনে। এদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ৮ই নভেম্বর হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়াকে ফিরিয়ে নেয়া হয় কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডে কেয়ার সেন্টারে বন্দি রয়েছেন। কারাগারে নেয়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একবার দেখা করার সুযোগ পান। কারাগারে নেয়ার প্রথমদিকে ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দুইবার বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের কয়েকজন তার সঙ্গে দেখার করার সুযোগ পান। তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একা কয়েকবার দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন।
এদিকে কারাগারে যাওয়ার আগে নেতাকর্মীদের রাজপথ উত্তপ্তকারী কোনো আন্দোলন কর্মসূচি না দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। ফলে বিগত এক বছরে কয়েকটি মানববন্ধন, অনশন, স্মারকলিপি পেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে বিএনপি। অন্যদিকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। কিন্তু সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিজের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান দলটির নীতিনির্ধারকদের।
এমন কি কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাচনে লড়ার জন্য তিনটি আসনে তিনি দলের প্রার্থীও হন। কিন্তু তার প্রার্থিতা বাতিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তটি উচ্চ আদালত বহাল রাখলে নির্বাচনে লড়তে পারেননি তিনি। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ কখনো দীর্ঘসূত্রিতা, কখনো অতিদ্রুততা, কখনো নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো আবার কখনো অন্য মামলায় জামিন বাতিলের কারণে তার জামিনে মুক্তির আইনি পথের প্রতিবন্ধকতা এখনো কাটেনি। কুমিল্লার একটি মামলায় অভিযুক্তদের সবাই জামিনে থাকলেও জামিন মেলেনি খালেদা জিয়ার। একাদশ জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার কারামুক্তি।