Tuesday, September 2, 2025

কিমের চীন সফর: নীল ও স্বচ্ছ তরল, সিগারেট, মার্সিডিজ গাড়ি—কী নেই বুলেটপ্রুফ ট্রেনটিতে

প্রথম আলোঃ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন গতকাল সোমবার রাজধানী পিয়ংইয়ং থেকে তাঁর চিরচেনা সবুজ রঙের ব্যক্তিগত ট্রেনে করে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের পথে রওনা হয়েছেন। ধীরগতির হলেও বিশেষভাবে নকশা করা ট্রেনটি উত্তর কোরিয়ার নেতারা কয়েক দশক ধরেই ব্যবহার করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়ার পুরোনো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের তুলনায় এই বুলেটপ্রুফ ট্রেন অনেক বেশি নিরাপদ ও আরামদায়ক। এতে কিমের বিশাল সফরসঙ্গী, নিরাপত্তাকর্মী, খাবার ও অন্যান্য সুবিধার বন্দোবস্ত রয়েছে। পাশাপাশি আছে কোনো বৈঠকের আগে আলোচ্য বিষয় বা এজেন্ডা নিয়ে আলাপ–আলোচনার জায়গা।
২০১১ সালের শেষ দিকে উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর কিম এ ট্রেনেই চীন, ভিয়েতনাম ও রাশিয়া সফর করেছেন।

ট্রেনের ভেতরে কী

অনেক বছর ধরেই উত্তর কোরিয়ার নেতারা ঠিক কতগুলো ট্রেন ব্যবহার করছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে উত্তর কোরিয়ার পরিবহন বিষয়ে দক্ষিণ কোরীয় বিশেষজ্ঞ আন বিয়ং–মিনের মতে, নিরাপত্তার কারণে একাধিক ট্রেন ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আন বিয়ং–মিন জানান, প্রতিটি ট্রেনে ১০ থেকে ১৫টি কামরা থাকে। কিছু কামরা শুধু নেতার জন্য, যেমন শয়নকক্ষ। অন্য কামরাগুলোতে থাকেন নিরাপত্তাকর্মী ও চিকিৎসাকর্মীরা।

‘সাধারণত ট্রেনে কিমের কার্যালয়, যোগাযোগের সরঞ্জাম, রেস্তোরাঁ ও দুটো সাঁজোয়া মার্সিডিজ গাড়ি রাখার কামরাও থাকে’, বলেন বিয়ং–মিন।

আজ মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, কিম জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি সবুজ কামরার পাশে সিগারেট খাচ্ছেন। কামরাটির গায়ে সোনালি নকশা ও প্রতীক আঁকা। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, কাঠের প্যানেল দেওয়া একটি কক্ষে বসে আছেন কিম। পেছনে সোনালি প্রতীক ও পাশে উত্তর কোরিয়ার পতাকা।

কিমের টেবিলে রাখা ছিল সোনালি অক্ষরে খোদাই করা ল্যাপটপ, কয়েকটি টেলিফোন, সিগারেটের বাক্স এবং নীল ও স্বচ্ছ তরলভর্তি বোতল। জানালায় ছিল নীল–সোনালি রঙের পর্দা।

২০১৮ সালে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচার করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, প্রশস্ত এক কামরায় গোলাপি সোফার সারির মধ্যে বসে চীনা শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন কিম।

২০২০ সালে টাইফুনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার সময় টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, ট্রেনের এক কামরায় ফুল আকৃতির আলো আর জেব্রা প্রিন্ট দেওয়া কাপড়ের চেয়ার।

রুশ কর্মকর্তা কনস্টান্টিন পুলিকোভস্কি তাঁর ২০০২ সালের বই ‘অরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’–এ কিম জং–ইল (কিম জং–উনের বাবা ও সাবেক উত্তর কোরীয় নেতা) ট্রেনে করে মস্কো যাওয়ার তিন সপ্তাহের যাত্রার চিত্র তুলে ধরেন। তাতে লেখা রয়েছে, সফরে কিম ইল ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আনা ওয়াইন ও জীবন্ত লবস্টার পরিবেশন করেছিলেন ট্রেনটিতে।

সীমান্ত অতিক্রম করে কীভাবে

দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ আন জানান, ২০২৩ সালে রাশিয়া সফরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় কিমের ট্রেনকে সীমান্ত স্টেশনে চাকা বদলাতে হয়েছিল। কারণ, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার রেললাইনের মাপ এক নয়।

চীনের ক্ষেত্রে এমন দরকার হয় না। তবে সীমান্ত পার হওয়ার পর স্থানীয় রেলব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ও সংকেত বোঝার সুবিধার্থে ট্রেন টেনে নেয় চীনের লোকোমোটিভ (ট্রেনের ইঞ্জিন)। এ তথ্য দেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক রেল প্রকৌশলী কিম হান–তায়ে। তিনি উত্তর কোরিয়ার রেলপথ নিয়ে বই লিখেছেন।

সাম্প্রতিকতম এ সফরের আগে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন কিম। ওই সফরে চীনের তৈরি সবুজ রঙের ডিএফ১১জেড লোকোমোটিভ কিমের ট্রেনের বিশেষ কামরাগুলো টেনে নেয়। রাষ্ট্রীয় চায়না রেলওয়ে করপোরেশনের প্রতীক আঁকা ছিল এ ইঞ্জিনে। গণমাধ্যমের ছবিতে দেখা গেছে, অন্তত তিনটি ভিন্ন সিরিয়াল নম্বরযুক্ত ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।

আনের মতে, এসব নম্বর সাধারণত ০০০১ বা ০০০২ হয়, যা ইঙ্গিত দেয়—চীন তাঁকে এমন ইঞ্জিন দিচ্ছে, যা শুধু শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভিয়েতনামে বৈঠক করতে চীনের ভেতর দিয়ে যাত্রার সময় কিমের ট্রেন টেনে নেয় লাল–হলুদ রঙের এক লোকোমোটিভ, যাতে চীনের জাতীয় রেলওয়ের প্রতীক আঁকা ছিল।

আন বলেন, চীনের রেলপথে এ ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) গতিতে চলতে পারে। তবে উত্তর কোরিয়ার রেলপথে এর গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ কিলোমিটার (২৮ মাইল)।

কারা ব্যবহার করেছেন এই ট্রেন

উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা কিম ইল–সুং (কিম জং–উনের দাদা) ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত নিয়মিত ট্রেনে করে বিদেশ সফর করতেন।

কিম জং–ইল (কিম জং–উনের বাবা) তিনবার রাশিয়া সফরে শুধু ট্রেনই ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে ২০০১ সালে ২০ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে মস্কো যান তিনি।
২০১১ সালের শেষদিকে এক ট্রেনযাত্রার সময় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কিম জং–ইল। তাঁর ব্যবহৃত সেই কামরা এখনো তাঁর সমাধিক্ষেত্র প্রদর্শিত হচ্ছে।

দীর্ঘ ট্রেনযাত্রাকে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কিম পরিবারের দেখা–সাক্ষাৎ করার মাধ্যম বা প্রতীক হিসেবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়।

২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কিম জং–উনের এক সফরকে আখ্যা দিয়েছিল ‘দেশজুড়ে কষ্টসাধ্য ট্রেন ভ্রমণ’। ওই সফরে তিনি ভুট্টাক্ষেত ঘুরে দেখেন এবং ‘কমিউনিস্ট স্বপ্নরাজ্য’ গড়ে তোলার প্রচারণা চালান।
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-02%2F18znay0s%2FUntitled-3.jpg?rect=14%2C0%2C984%2C656&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন চীন সীমান্তের কাছে বন্যাকবলিত এলাকায় ভ্রমণের সময় ট্রেন থেকে নামছেন। উত্তর পিয়ংগান প্রদেশ, উত্তর কোরিয়া। ছবিটি ৩১ জুলাই ২০২৪ উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) প্রকাশ করে। ছবি: রয়টার্স

১০ বছরের জন্য গাজার নিয়ন্ত্রণ চায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রথম আলোঃ যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য গাজা উপত্যকা পরিচালনা করার এবং এটিকে একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট গাজার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একটি সংঘাতপরবর্তী পরিকল্পনার বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই পরিকল্পনা গাজা উপত্যকাকে কমপক্ষে ১০ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে পরিচালিত একটি ট্রাস্টিশিপে পরিণত করবে। একই সঙ্গে একে পর্যটন অবকাশকেন্দ্র এবং উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদন ও প্রযুক্তিকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা করছে।

এ পরিকল্পনা গত ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পের করা এক মন্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে, অধিবাসীদের অন্যত্র সরিয়ে নেবে এবং উপত্যকাটি পুনর্নির্মাণ করবে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার আওতায় গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষকে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। তারা স্বেচ্ছায় সরে যেতে পারে অথবা উপত্যকার ভেতরে সীমিত ও সুরক্ষিত এলাকার মধ্যে থাকতে পারে।

ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখলে নেবে

যুক্তরাষ্ট্র যেখানে গাজার দখল নিতে চাচ্ছে, সেখানে পশ্চিম তীরের দখল নিতে চাইছে ইসরায়েল। তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে এএফপি জানায়, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইসরায়েল পশ্চিম তীরকে নিজের সঙ্গে একীভূত করবে। এএফপি

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সেনাবাহিনীর অভিযান
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সেনাবাহিনীর অভিযান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরান–আমেরিকা ‘দ্বিতীয় যুদ্ধ’ যে চার কারণে আসন্ন by জসিম আল-আজাজি

কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যকে দ্বিতীয় দফা যুদ্ধের ঠেলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেফ্রি ক্রুজকে ‘অসুবিধাজনক সত্য’ উচ্চারণের কারণে তিনি বরখাস্ত করেছেন।

অবাধ্যতা বা অযোগ্যতার মতো কোনো পাপ করেননি ক্রুজ। তাঁর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি; বরং তা ছিল সামান্য। অথচ ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে ওই স্থাপনাগুলো।

জেনারেল ক্রুজের এ অপসারণ এবং ভাইস অ্যাডমিরাল ন্যান্সি লাকোর ও রিয়ার অ্যাডমিরাল মিলটন স্যান্ডসের বরখাস্তের ঘটনা শুধু জনবল বদল নয়, এটি প্রজ্ঞার চেয়ে আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল। আর এ ঘটনা অনিচ্ছাকৃতভাবেই হয়তো সে যুদ্ধে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, যেটি ঠেকানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি একটি লেখায়  বলেছিলাম, ইরানে দ্বিতীয় দফা মার্কিন হামলার আশঙ্কা রয়েছে। সে আশঙ্কা আরও দৃঢ় হচ্ছে। জেনারেল ক্রুজকে বাস্তব তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বরখাস্ত করা অত্যন্ত অশুভ সংকেত। যখন সত্য বানানো গল্পকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন বার্তাবাহককেই হত্যা করার পথ বেছে নেয়।

যে প্রতিবেদন ক্রুজের কর্মজীবনের অবসান ঘটাল, তাতে অভিযোগ করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি মতো কয়েক বছরের জন্য নয়; বরং মাত্র কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেছে। আরও উদ্বেগজনক হলো ওই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে, হামলার আগেই ইরান গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক উপকরণ সরিয়ে নিতে পেরেছিল, আর ‘বৃহৎ বোমাবর্ষণ’ মূলত ওপরের দিকের অগভীর লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হেনেছিল। গভীর ভূগর্ভস্থ বাংকার ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক অক্ষত থেকে গেছে।

এ গোয়েন্দা ব্যর্থতা ট্রাম্প প্রশাসনকে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে জেতার কোনো পথ নেই। মিশন সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়ার পরও সেটি শেষ না হওয়ায় এখন ট্রাম্পের সামনে কেবল দুটি বিকল্পই খোলা আছে। এক. পরাজয় স্বীকার করা অথবা আরও এক ধাপ এগিয়ে আবারও আক্রমণ করা।

ক্রুজের এ অপসারণ তেহরানের দৃষ্টিতেও এসেছে। খবরে এসেছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ইরান পশ্চিমাদের কূটনৈতিক প্রলুব্ধতার ফাঁদে পড়ে ‘প্রতারণার শিকার হবে না’। এ বক্তব্য ইরানের কৌশলগত চিন্তায় যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, তারই ইঙ্গিত দেয়। ইরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষার দিকে যেতে পারে।

ইরানের যেসব সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে ইসরায়েল ১২ দিনের যুদ্ধের সূচনা করেছিল, তাঁদের উত্তরসূরি ইরানি কমান্ডাররা প্রকাশ্যে যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো অভূতপূর্ব। পূর্বসূরিদের সংযমের বিপরীতে নতুন কমান্ডাররা বলছেন, নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু হলে একেবারে প্রথম মিনিট থেকেই ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করবেন তাঁরা।

ইরান ঝুঁকি নিচ্ছে। আগের মতো প্রথমে আঘাত সহ্য করে পরে পাল্টা আঘাত করার পরিবর্তে তেহরান এবার টিকে থাকার জন্য আগাম হামলার কৌশল নিচ্ছে। ইরানের যুক্তি হলো, যদি যুদ্ধ অনিবার্য হয়, তবে আগাম আঘাত ইরানের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইসরায়েলি ও মার্কিন কৌশলবিদদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আখির আল-জামান’। এটি এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র, যার অনেকগুলো ওয়ারহেড রয়েছে এবং এর গতি শব্দের গতির ১২ পর্যন্ত হতে পারে। এসব তথ্য সত্য হলে এটি ইরানের আক্রমণ সক্ষমতায় গুণগত পরিবর্তন আনবে। কেননা এটি এমন এক অস্ত্র, যা ইসরায়েলের আয়রন ডোম কিংবা প্যাট্রিয়টের মতো উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে দিতে সক্ষম।

এ পরীক্ষার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাথমিক হামলার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটি সম্পন্ন হয়েছে, অর্থাৎ ইরান এখনো অচল হয়ে পড়েনি, তাদের সামরিক শিল্পের ভিত্তি চাপের মধ্যেও দ্রুত নতুন উদ্ভাবনে বাধাগ্রস্ত হয়নি।

ইরানের এই আরও আগ্রাসী ভূমিকা নেওয়ার আত্মবিশ্বাসের পেছনে দেশটির কৌশলগত অংশীদারদের ক্রমবর্ধমান সমর্থনও কাজ করছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, চীন ইরানের কাছে উন্নতমানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রি করছে, আর রাশিয়া সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে।

এ সহযোগিতা সংঘাতের প্রক্সি মাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমে এটি শুরু হয়েছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরায়েলি অভিযানের মধ্য দিয়ে। সেটি এখন আরও বিস্তৃত দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়েছে। চীনের অংশগ্রহণ এ সংঘাতকে আঞ্চলিক মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যায় রূপান্তরিত করেছে এবং এটিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করেছে।

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-মার্কিন দ্বিতীয় দফার সংঘাত প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক আগেই ঘটতে পারে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।

গোয়েন্দা চাপ: ট্রাম্প এখন এমন গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারেন, যা তাঁর পছন্দের বর্ণনাকে অস্বীকার না করে; বরং সেটা নিশ্চিত করে। ফলে বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়ার চক্র তৈরি হতে পারে।

ইরানের নীতি পরিবর্তন: তেহরান কৌশলগত ধৈর্য ত্যাগ করে আগাম আক্রমণের পথে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইরান যদি মনে করে, আক্রমণ অনিবার্য, তাহলে দেরি করার কোনো কৌশলগত উপকার নেই।

প্রযুক্তিগত সুযোগ: ইরানের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মার্কিন বা ইসরায়েলি সফল অভিযান করার সম্ভাব্য সময়সীমা কমিয়ে দিয়েছে। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা যত বেশি অপেক্ষা করবে, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা তত শক্তিশালী হবে।

মিত্রশক্তির গতিশীলতা: চীন ও রাশিয়ার ইরানের প্রতি বাড়ানো সমর্থন মার্কিন হস্তক্ষেপকে উৎসাহিত করতে পারে।

আমি কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলাম, আমরা যে পরিস্থিতি দেখছি, সেটা শান্তি নয়; বরং একটি বিরতি। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চলছেই, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অগ্রসর হচ্ছে এবং আঞ্চলিক মিত্রশক্তিগুলোর সমর্থন আরও দৃঢ় হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

* জসিম আল-আজাজি, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে সাংবাদিক ও লেখক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে তেহরানে বিক্ষোভ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে তেহরানে বিক্ষোভ। ছবি : রয়টার্স