Thursday, April 30, 2026

পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার গোপন বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা ও যুদ্ধের ভয়াবহতা

পার্সটুডে : পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার অপরাধ একটি জটিল এবং বিতর্কিত বিষয়- যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

পার্সটুডে'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার এবং পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা চালানো, যা মানুষের জীবন ও পরিবেশে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো:  

পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার বায়োলজিক্যাল পরীক্ষা

১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে চীন ও কোরিয়ায়, প্লেগ এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগসহ জৈবিক অস্ত্র পরীক্ষার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষাগুলো বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহারের ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক নথিপত্র ও রিপোর্ট দেখায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কোরিয়ার কিছু অঞ্চলে প্লেগসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী। অনেক পরীক্ষা গোপনে ও সামরিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, যেখানে লক্ষ্য ছিল বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্রের প্রভাব মানুষের উপর এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উপর পরিমাপ করা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধগুলোর মধ্যে একটি ছিল কোরিয়া ও উত্তর-পূর্ব চীনে, যেখানে ব্যাপক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া, কীটপতঙ্গ, পশুর ক্ষয়িষ্ণু অংশ এবং মাছের দেহ ঝড়ানো হয়েছিল মানুষের উপর ও কৃষিভূমিতে। এর ফলে প্লেগ, অ্যানথ্রাক্স ও এনসেফালাইটিসের মত রোগের দ্রুত প্রাদুর্ভাব হয় এবং ব্যাপক মৃত্যু ঘটে। এই অপরাধগুলোর প্রভাব এখনও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে জেনেটিক্যাল রোগের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টেনে চলেছে। এই পরীক্ষা কখনো খোলাখুলি এবং কখনো গোপনে চালানো হতো। এই পরীক্ষায় রোগগুলো সচেতনভাবেই মানুষের ও পশুর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হতো যাতে এর প্রভাব পরিবেশ ও দেশের নিরাপত্তার ওপর মূল্যায়ন করা যায়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বায়োলজিক্যাল অস্ত্রের ব্যবহার

ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫–১৯৭৫) চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করা হয় কেমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস, শত্রু দমনে এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে আঘাত করার জন্য। এর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হচ্ছে 'অরেঞ্জ এজেন্ট' নামক রাসায়নিক। এই পদার্থে ডাইঅক্সিন ছিল, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং মানুষের স্বাস্থ্যে, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যদিও এটি সরাসরি দুর্ভিক্ষ বা রোগের সৃষ্টিকারী ছিল না, তবে এর পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব ব্যাপক ছিল।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব স্বাস্থ্য ও পরিবেশে

চীন, কোরিয়া ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্রের ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদী ও বিধ্বংসী প্রভাব ফেলে। প্লেগ, কলেরা, ম্যালেরিয়া ও শ্বাসকষ্টের মত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়। এই রোগগুলো শুধু তখনকার সময়ের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে, যুদ্ধ শেষে অনেক মানুষ এখনো রাসায়নিক ও বায়োলজিক্যাল পদার্থের কারণে বিভিন্ন রোগে ভুগছে। অনেকেই ত্বকের রোগ, ক্যান্সার ও জন্মগত বিকলাঙ্গতায় আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবেশও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বনাঞ্চল ও কৃষিজমির ধ্বংস।

উপসংহার

পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ, বিশেষ করে বায়োলজিক্যাল ও কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর গভীর ও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। প্লেগসহ মারাত্মক রোগের প্রাদুর্ভাব ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে এসব অস্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে, এই অস্ত্রগুলো শুধু তাত্ক্ষণিক ক্ষতি করে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক ফলাফল বয়ে আনে। এই ঘটনা গুলোকে আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন যাতে আন্তর্জাতিক স্তরে এর ফলাফল ও দায়িত্ববোধ স্পষ্ট হয় এবং যারা এই মানবতাবিরোধী কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

https://media.parstoday.ir/image/4c99fea2d0889c2n67h_800C450.jpg
মার্কিন বিমান থেকে ভিয়েতনামে রাসায়নিক বোমা হামলা

কেন লাতিন আমেরিকান এত নেতা আইনি জটিলতায়?

ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ের বোলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচন উল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২৭ বছরের বেশি কারাদণ্ডের শাস্তি পেয়েছেন। আইনি জটিলতায় পড়া লাতিন আমেরিকার প্রথম নেতা তিনি নন। পেরুতে বর্তমানে কমপক্ষে চারজন সাবেক প্রেসিডেন্ট লিমার বারবাদিলো কারাগারে বন্দি। কলোম্বিয়ায় সম্প্রতি সাবেক প্রেসিডেন্ট আলভারো উরিবে সাক্ষী প্রভাবিত করা ও বিচারিক প্রক্রিয়া ভাঙচুরের অভিযোগে ১২ বছরের গৃহবন্দির সাজা পেয়েছেন। তবে এই সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তিনি।

এ খবর দিয়ে অনলাইন সিএনএন বলছে, আসলে লাতিন আমেরিকার প্রায় দেশেই কমপক্ষে একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারিক তদন্তের মুখোমুখি। ব্যতিক্রম মাত্র একটি দেশ। ইকুয়েডরে ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিজন প্রেসিডেন্ট (মোট আটজন) আইনি তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। রাফায়েল কোরেয়া ঘুষকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে বেলজিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন। পেরুতে নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে সাতজন প্রেসিডেন্ট দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচার বা তদন্তের সম্মুখীন। পুলিশ গ্রেপ্তার করতে গেলে অষ্টমজন আত্মহত্যা করেন। আর্জেন্টিনা, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো ও এল সালভাদর- প্রতিটি দেশে পাঁচজন সাবেক প্রেসিডেন্ট আইনি ঝামেলায় পড়েছেন। আর্জেন্টিনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার ২০২২ সালে প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে গৃহবন্দি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ। ব্রাজিল, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও কোস্টারিকা- প্রতিটি দেশে চারজন সাবেক নেতা আইনি তদন্তের মুখে পড়েছেন। পানামা ও হন্ডুরাসে এ সংখ্যা তিনজন করে। নিকারাগুয়া, হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ভেনিজুয়েলা, চিলি ও কলোম্বিয়ার প্রতিটি দেশে কমপক্ষে একজন করে প্রেসিডেন্ট আইনি তদন্তের মুখে।

একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে: উরুগুয়ের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি, কারও বিরুদ্ধে উন্মুক্ত তদন্তও হয়নি। বরং দেশটি গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে শীর্ষে। দ্য ইকোনমিস্ট ডেমোক্রেসি ইনডেক্স ২০২৪ এ উরুগুয়ে বিশ্বে ১৫তম এবং এ অঞ্চলের একমাত্র ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উরুগুয়ের ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যানজেল আরেয়ানো বলেন, এর পেছনে রয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি’। মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, সাধারণ বাড়িতে বসবাস এবং বিলাসী সুবিধার অভাব এ সংস্কৃতির অংশ।
উরুগুয়ে ছাড়া বাকি লাতিন আমেরিকায় নেতাদের আইনি জটিলতার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন- দুর্নীতি ও ঘুষকাণ্ড, দুর্বল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রেসিডেন্ট-কেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার দেশগুলো গড়ে ১০০ এর মধ্যে মাত্র ৪২ পয়েন্ট পেয়েছে। যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায় ২২ পয়েন্ট কম। আরেয়ানোর মতে, লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণ দুর্নীতির বড় কারণ।
গবেষকরা বলছেন, ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর থেকে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিচারের প্রবণতা বেড়েছে। আর্জেন্টিনার অধ্যাপক ক্যাটালিনা স্মুলোভিত্জের মতে, দুর্নীতি নিয়ে জনসচেতনতা আগে কম থাকায় আগের তুলনায় এখন মামলার সংখ্যা বেড়েছে নাকি নজরদারি বেড়েছে-তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ল’ফেয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মামলার ফাঁদে ফেলার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে থেকে দুর্নীতির সুযোগ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অধিকাংশ নেতা আইনি জটিলতায় জড়ান। তবে উরুগুয়ে প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকলে ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব।

mzamin