Showing posts with label মরিয়ম চম্পা. Show all posts
Showing posts with label মরিয়ম চম্পা. Show all posts

Sunday, January 5, 2025

ভিসা বৈধকরণের হিড়িক: প্রতিদিন গড়ে ২৫০ বিদেশির আবেদন by মরিয়ম চম্পা

বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ বৈধকরণে রীতিমতো হিড়িক লেগেছে। ভিসা বৈধকরণের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২৫০টিরও বেশি আবেদন পড়ছে। এর মধ্যে মোট ৩৩ ক্যাটাগরির ভিসাধারী রয়েছেন। যাদের অধিকাংশ আবেদনকারীর ভিসার মেয়াদ শেষ। অর্থাৎ অবৈধ বলে জানিয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পাসপোর্ট অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্র। পাসপোর্ট কার্যালয় সূত্র জানায়, আবেদনকারীদের মধ্যে বেশির  ভাগই বাংলাদেশে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি নাগরিক, ফুটবলারসহ নানা কাজ করছেন। এসব অবৈধ নাগরিককে প্রতিদিন গুনতে হবে ৩ হাজার টাকা জরিমানা। সেই হিসেবে ৯০ দিন অতিক্রান্ত হলে ৯১ দিনের জন্য ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এমনিতে বিভিন্ন উৎসব, পালাপার্বণ-ধর্মীয় অনুষ্ঠান, দীর্ঘ ছুটি উপলক্ষে ভিসা বৈধকরণের চাপ বেশি থাকলেও ডিসেম্বর মাসে এটা তুলনামূলক বেশি ছিল। এবং জানুয়ারিতে এটা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে দাবি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ গত ৪ঠা ডিসেম্বর জরিমানার বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বৈধ ভিসায় আসা বিদেশি নাগরিকরা অবৈধভাবে অবস্থান করলে প্রথম ১৫ দিনের ক্ষেত্রে ১ হাজার টাকা জরিমানা। ১৫ দিনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন ২ হাজার টাকা অর্থাৎ ৯০ দিনে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা জরিমানা। এবং অবৈধভাবে অবস্থানের মেয়াদ ৯০ দিনের বেশি ৯১ দিন থেকে প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা করে ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা করে জরিমানা আদায় করা হবে। এবং একই সঙ্গে এসব বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের (১৯৪৬ সালের ৩১ নম্বর আইন) আওতায় সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করা যাবে। এসব মামলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ও বিশেষ শাখা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক অথবা বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের অবৈধ অবস্থানের জরিমানা মওকুফ করা যাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের ৩ মাস পর্যন্ত অবৈধ অবস্থানের জন্য জরিমানা মওকুফ করা যাবে। তিন মাসের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হবে।

এক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতার কারণে অবৈধভাবে অবস্থান করা ব্যক্তি বাংলাদেশি সিভিল সার্জন, অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক কর্তৃক দেয়া চিকিৎসা সনদ বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে পাঠালে তারা যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপযুক্ত সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগে পাঠাবেন। এটা পাঁচদিনের বেশি হলে হাসপাতালে ভর্তি আছে এমন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে অবৈধ অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিক মহাপরিচালক এবং পরিচালকের স্বাক্ষরসহ জরিমানা মওকুফের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ছাড়া ৩০ দিন পর্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় অবস্থান করলে সংশ্লিষ্ট পাসপোর্টধারী বিদেশি নাগরিককে বিমান-স্থল বন্দরে বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর-ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে জরিমানা, সার্ভিস চার্জ এবং ভিসা ফি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা রসিদ জমা দিয়ে দেশ ত্যাগ করতে হবে। এই জরিমানার আওতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, ফ্লাইট বাতিল ইত্যাদি কারণে কেউ অবস্থান করলে তাকে অবৈধ বলে গণ্য করা হবে না। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই পরিপত্র কার্যকর হওয়ার পর ইতিপূর্বে এ বিষয়ে জারিকৃত সকল পরিপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ এর আগে ১৫ থেকে ৯০ দিন এবং এর বেশি সময় অবস্থান করলে সর্বোচ্চ জরিমানা ছিল মাত্র ৩০ হাজার টাকা। সেটা বর্তমানে বাতিল করা হয়েছে। এদিকে গত ২৪শে ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকদের আগামী ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে বৈধতা অর্জন করতে বলা হয়েছে। ৩১শে জানুয়ারির পর অবৈধ অবস্থানকারী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাসপোর্টের প্রধান কার্যালয় (পাসপোর্ট, ভিসা ও পরিদর্শন) পরিচালক নাদিরা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, আমাদের কাছে প্রতিদিন অসংখ্য বিদেশি নাগরিক ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করার আবেদন করেন। তাদের মধ্যে যাদের অবৈধ বা ভিসার মেয়াদ অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে তারাও আবেদন করেন। তাদেরকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানা পরিশোধের প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে আবেদন করতে হয়।

mzamin

Thursday, November 28, 2024

লেজেগোবরে আইনশৃঙ্খলা by মরিয়ম চম্পা

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দেশের শাসন ক্ষমতায় পরিবর্তনের পর থেকেই চারদিকে অস্থিরতা। দাবি-দাওয়া, হাহাকার তুলে মাঠে স্বার্থান্বেষী নানা গোষ্ঠী। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তারা সক্রিয়। যারপর নাই চাপ তৈরি করছে নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। এখনই তাদের সবার সব দাবি পূরণ করতে হবে। দাবি-দাওয়া পার্টির কারণে দেশ জুড়ে যখন তখন সড়কে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনার তরুণ ছাত্রদের আন্তঃক্যাম্পাস কলহ। এটা এক নৈরাজ্যকর অবস্থার জানান দিচ্ছে। কলেজে কলেজে সংঘর্ষ থামাতে উদ্যোগী হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সচিবালয়ের সবচেয়ে উঁচু ভবনে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। সেই সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় উস্কানিদাতাদের খুঁজে বের করতে মাঠে সরকারি সংস্থাগুলো। যখন অবস্থা তখন আচমকা সক্রিয় সনাতনীরা। তাদের জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তারে উদ্বেগ ছড়িয়েছে সীমান্তের ওপারেও। রক্তাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের আদালত। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিবাদীর সমর্থকরা। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল-নীতি কৌশলের কারণেই দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজ এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বিশেষ করে সরকারের সকাল-বিকাল আদেশ- নিষেধ পরিবর্তন এবং সিদ্ধান্তহীনতাই এর জন্য দায়ী। আইনশৃঙ্খলা রীতিমতো লেজেগোবরে অবস্থা! তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বরতদের নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। বলাবলি আছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নির্দেশনা আসে অন্য উপদেষ্টা ও দপ্তর থেকে। মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত অবস্থান করে অভিভাবকহীনতার প্রমাণও মিলে। ওই সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) সদ্য নিয়োগ পাওয়া মো. খোদা বকস চৌধুরীকে মন্ত্রণালয়ে পাওয়া যায়নি। তারা মিটিংয়ের কাজে বাইরে ছিলেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র সূত্র। এদিন ঢাকার বাইরে ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। বুধবারও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অফিস করে বেরিয়ে যান উপদেষ্টা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কোন কৌশলে এগোচ্ছে? এ বিষয়ে জানতে কথা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি মাসের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মো. খোদা বকস চৌধুরীকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) নিয়োগ দেয়া হয়। এর কিছুদিন পর নতুন করে আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। এত কিছুর পরেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এনটিএমসি অনুবিভাগ) নাসির-উদ-দৌলা মানবজমিনকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সারা দেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা-সচিবের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরেক যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, তারা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে কথা বলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সিনিয়র সচিব গণমাধ্যমে কেন কথা বলছেন না- এটা একান্ত তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বিগত আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনার দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেকটা ব্যর্থ হয়েছেন। এ সময় সদর দপ্তরে নানান বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। নতুন করে আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ দেয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সাম্প্রতিক ইস্যুতে সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডিএমপিসহ সকল বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ডিএমপিসহ বিভাগীয় শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদ-মন্দির-গির্জা ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিশেষ টহলের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কেউ আইন এবং রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করলে তাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না। জিরো টলারেন্স। অপরাধীরা কোন রাজনৈতিক দল-মতের সেটা বিবেচনা করা হবে না। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর মানবজমিনকে বলেন, পুলিশকে মাঠ পর্যায়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে কিংবা জনজীবনে ব্যত্যয় ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাঠ পর্যায়ে সকল কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সচিব মমিনউল্লাহ পাটোয়ারী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যস্ত কাকে বদলি, ওএসডি, কাকে পদায়ন করবেন এটা নিয়ে। পুলিশে এত ঘনঘন বদলি করার দরকার ছিল না। মাঠ পর্যায়ে পুলিশের অনেকেই আতঙ্কের মধ্যে আছেন। কে কখন বদলি, ওএসডি- গ্রেপ্তার হন। পুলিশের মধ্য থেকে এই ভীতি দূর করে তাদের মধ্যে মনোবল ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও মনোযোগী হতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. খোদা বকস চৌধুরীকে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপদেষ্টা হিসেবে দেশের অভ্যন্তরে বর্তমান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা টোট্যালি ফেলিওর। তিনি কিন্তু যেসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলে সাধারণ মানুষ খুশি হবে সেটা করছেন না। এবং করেন নি। তিনি বিডিআর বিদ্রোহের হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই করেন নি। একটির পর একটি বিশৃঙ্খলার ঘটনায় রীতিমতো লেজেগোবরে অবস্থা। 

mzamin

Saturday, November 2, 2024

এনটিএমসি’র সোর্স কোড গায়েব! by মরিয়ম চম্পা

ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর পাসওয়ার্ড (সোর্স  কোড) নষ্ট করে দিয়েছে এনটিএমসি’র সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) জিয়াউল আহসান। এ ছাড়া বিভিন্ন অপারেটরের মোবাইল ফোনের সফটওয়্যারে ঢুকে বিভিন্ন সময়ে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা চালাতো ন্যাশনাল এনটিএমসি। পাসওয়ার্ড বা সোর্স কোড উদ্ধার করতে না পারায় বর্তমানে এনটিএমসিতে কর্মরত একাধিক সংস্থার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা  বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফোন কল রেকর্ড (পিসিআর) সংগ্রহ করে কাজ চালাচ্ছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্র। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর সংলগ্ন এনটিএমসি কার্যালয় অবস্থিত। গত ৬ই আগস্ট চাকরিচ্যুত করা হয় এনটিএমসি’র ডিজি মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে। গ্রেপ্তারের আগে অনেকটা সময় পর্যন্ত এনটিএমসি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। এনটিএমসি সূত্র জানায়, গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর পর এনটিএমসিতে রীতিমতো ধ্বংসযোগ্য চালিয়েছেন জিয়াউল। সোর্স কোড নষ্ট করার পাশাপাশি অপারেটরের হার্ডওয়ার কাঠামো ব্যতীত গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। যাতে করে বিগত সরকারের আমলের অপকর্মের গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য ফাঁস না হয়।

সূত্র জানায়, রিমান্ডে জিয়াউল আহসানকে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এনটিএমসি’র মাস্টারমাইন্ড জিয়াউল আহসানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী থেকে শুরু করে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, সেনা কর্মকর্তারা তার কাছে ছিল জিম্মি। কথায় কথায় তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ফোনালাপ ফাঁস করার হুমকি দিয়ে নানা ভাবে সুবিধা আদায় করতেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এনটিএমসিতে টাস্কফোর্স হিসেবে ডেপুটেশনে থাকা বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত নির্দিষ্ট সংখ্যক নিজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে এনটিএমসি পরিচালিত হয়। গোয়েন্দা হেফাজতে থাকাকালীন দফায় দফায় মেজর জিয়াউল আহসানকে এনটিএমসি’র (পাসওয়ার্ড) সোর্স কোড সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি, মনে নেই, ভুলে  গেছি, হারিয়ে গেছেসহ একেক সময় একেক বক্তব্য প্রদান করেছেন। এদিকে সরকার পতনের আগে এবং পরে যতটুকু সময় পেয়েছেন এই সময়ের মধ্যে জিয়াউল আহসান গুরুত্বপূর্ণ ড্যাটাবেজ নষ্টসহ তার মিশন সম্পন্ন করেন। এনটিএমসিতে কর্মরত এক সূত্র জানায়, মূল সোর্স কোড না থাকায় তারা বিভিন্ন সিম কোম্পানির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পিসিআর সংগ্রহ করে কাজ চালাচ্ছেন। এতে করে সময় বেশি লাগছে। এ ছাড়া সিম কোম্পানিগুলো অনেক সময় তাদের সহযোগিতা করছেন না। সোর্স কোড না থাকায় বর্তমানে, এনটিএমসিতে কর্মরত সদস্যদের পৃথক পৃথকভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

এর আগে সকল বাহিনীর সমন্বিত ড্যাটাবেজ একসঙ্গে করে কাজ করার সুযোগ ছিল। এখন সেটা ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, সোর্স কোড নষ্ট করে  ফেলায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরের দেশের লোকদের হাতে চলে যেতে পারে। এতে দেশের সাধারণ নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকির সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে অসংখ্য গুম খুনের সঙ্গে জড়িত সাইলেন্ট কিলার জিয়াউল আহসানের মোবাইল ফোনে অনেক অপকর্মের তথ্য থাকলেও তাকে গ্রেপ্তারের সময় তার মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে পারেনি গোয়েন্দা সংস্থা। মহানগর  গোয়েন্দা পুলিশ  মানবজমিনকে জানায়, জিয়াউল আহসানকে আরেক দফায় রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বর্তমানে গোয়েন্দা কার্যালয়ে বন্দি সংখ্যা অনেক বেশি। তিনটি কক্ষের সবগুলোই আসামিতে পূর্ণ। পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তাকে রিমান্ডে আনতে আদালত বরাবর আবেদন করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তাকে পুনরায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এনটিএমসি অনুবিভাগ) নাসির-উদ-দৌলা ও যুগ্মসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব, এনটিএমসি অধিশাখা) মোহা. আলমগীর হোসেনকে ফোন দিলে তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

mzamin

Sunday, September 15, 2024

মুজিবুলে ভর করে কোটিপতি তারা by মরিয়ম চম্পা

সাবেক রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক দায়িত্বে থাকার সময়ে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। স্ত্রী হনুফাকে খুশি করতে শ্বশুরবাড়ির লোকদের কোটিপতি বানিয়েছেন সাবেক রেলমন্ত্রী। স্ত্রী হনুফা ছিল তার দুর্নীতির ক্যাশিয়ার। সম্প্রতি সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুলের বিছানায় টাকার বান্ডিলের ছড়াছড়ি এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ও রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড়ের নমুনা হিসেবে শুক্রবার বিকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুজিবুল হকের বিছানায় ছড়িয়ে থাকা টাকার বান্ডিলের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। তবে ভাইরাল ওই ছবিটি কবেকার সে সময় সম্পর্কে জানা যায়নি। ছবিতে দেখা যায়, বিছানায় বসে আছে মুজিবুল হকের তিন শিশু সন্তান। সন্তানদের সামনে ৫০০ এবং ১০০০ টাকা নোটের কয়েকটি বান্ডিল পড়ে আছে। মুজিবুল হক তার এক সন্তানকে কোলে নিচ্ছিলেন। এক শিশু একটি শপিং ব্যাগে থাকা টাকার বান্ডিল নিয়ে খেলা করছে। মুজিবুল হকের স্ত্রী হনুফা আক্তার দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হকের কোনো এক সন্তানের জন্মদিনের ছবি এটি। সন্তানের জন্মদিন উৎসবকে আরও আনন্দময় করতে কয়েক বান্ডিল টাকা ছড়িয়ে দেন বিছানায়। এ সময় মুজিবুল হকের খুব কাছের কেউ সেই ছবিটি তুলেছেন। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর গা ঢাকা দেন চৌদ্দগ্রাম আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী মুজিবুল হক। সূত্র জানায়, নির্বাচনী হলফনামায় নগদ ২০ হাজার টাকাসহ স্থায়ী-অস্থায়ী সম্পদের পরিমাণ প্রায় এককোটি টাকার হিসেব দেখালেও এখন তার শত শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রেলমন্ত্রী হওয়ার পরই তিনি অবৈধ পন্থায় এসব সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার এই অবৈধ টাকায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন আলিশান ফ্ল্যাট-বাড়ি, জমির মালিক হয়েছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। মুজিবুলের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কমিশন বাণিজ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলিসহ বিদেশে ব্যবসা, নেতাকর্মীদের কাছ থেকে ব্যবসার মুনাফা, টেন্ডারের কমিশন, চাঁদাবাজির ভাগসহ নানা উপায়ে শত শত কোটি টাকা অর্জন করেছেন মুজিবুল হক। এগুলো দেখভাল করতেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রী হনুফা বেগম।

মুজিবুল হকের শাশুড়ির নামেও কিনে দিয়েছেন ফ্ল্যাট- বাড়ি। তার স্ত্রীর অন্য তিন বোন আগে সাধারণ জীবনযাপন করলেও মুজিবুল হকের সঙ্গে বোনের বিয়ের পর তাদেরও কপাল যেন খুলে যায়। তারা এখন আলিশান বাসায় থাকেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। শ্বশুরের পরিবারের সকলকে বিলাসবহুল চলাচলের অর্থের জোগানদাতা সাবেক এই মন্ত্রী। আর এসব কাজে সহায়তা করেছেন সাবেক এই মন্ত্রীর স্ত্রী হনুফা বেগম, তার ভাগ্নে এবং শ্যালক নাসির। সূত্র জানায়, রেলের বেশির ভাগ নিয়োগ বাণিজ্যের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত মুজিবুল হকের স্ত্রী হনুফা বেগম ও তার নিকটাত্মীয়রা। মিষ্টির প্যাকেটে করে, মাছের ঝুড়িতে করে লাখ লাখ টাকা নিকটাত্মীয়রা হনুফা বেগমের কাছে হস্তান্তর করতেন। মুজিবুল হক অবৈধ সম্পত্তির বেশির ভাগ শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামে গড়ে তুলেছেন যাতে কেউ তাকে ধরতে না পারে। তার এই কাজে সহযোগিতা করেছেন মুজিবুলের ফুফাতো ভাই লুৎফর রহমান খোকন। খোকন একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য নগদ ৭৬ লাখ টাকা খোকনকে দেন মুজিবুল হক। যদিও এখন পর্যন্ত খোকনকে ওই ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরই রেলমন্ত্রী হন মো. মুজিবুল হক। মন্ত্রী হওয়ার পরই ধানমণ্ডির ২৮ নম্বরে  (রোড-এ) বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেন তিনি। যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ১২ কোটি টাকা। এটি তার শাশুড়ির নামে ক্রয় করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় জমি ক্রয় করে ১০ তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ৪ তলা বাড়ি নির্মাণ করেন। যার ঠিকাদার মো. লুৎফর রহমান খোকন। কুমিল্লার ঝাউতলায় ২৯৫ নম্বর বাড়িতে ২/৩টি ফ্ল্যাট, কালীগঞ্জ এলাকায় বাণিজ্যিক জায়গাতে কয়েকটি দোকান ক্রয় করেন। রাজধানীর কমলাপুরে বহুতল ভবন প্রথমে স্ত্রী ও ভাগ্নে বিপ্লবের নামে ক্রয় করা হয়। পরে শাশুড়ির নামে স্থানান্তর করা হয়। এ ছাড়াও কুমিল্লার নিমসার কাবিলাতে স্ত্রীর দ্বিতীয় বোন শিরীন আক্তারকে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন সাবেক এই মন্ত্রী। চান্দিনার মিরাখলা শ্বশুরবাড়ির অন্যসব বসতি তুলে দিয়ে রাজকীয় বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি। একইভাবে চান্দিনার মিরাখলাতে মন্ত্রী তার স্ত্রীর তৃতীয় বোনকে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন। তারা এর আগে খুব সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। সূত্র জানায়, চান্দিনার বিলাসবহুল কমপ্লেক্স এলাকায় মন্ত্রী তার স্ত্রীর চতুর্থ বোনকে জমি ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছেন। রাজধানীর ৬০ ফিট আগারগাঁওয়ে বাড়ি ক্রয় করেন মন্ত্রী। যেখানে মন্ত্রীর স্ত্রীর বড় বোন বসবাস করছেন। বগুড়াতে বিভিন্ন কমার্শিয়াল ভবনে দোকান ক্রয় করেছেন মন্ত্রী। যার পরিচালনা করেন মন্ত্রীর স্ত্রীর ভাগ্নে বিপ্লব। বিভিন্ন নেতাকর্মীকে নগদ টাকা দিয়ে ব্যবসার সুযোগ করেও দিয়েছেন মন্ত্রী। যেখান থেকে প্রতি মাসে মুনাফা নিয়ে থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। দেশের বাইরে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা পরিচালনা করছেন মুজিবুল হক। তার বিরুদ্ধে এ বিষয়ে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ সম্পত্তি মন্ত্রীর শাশুড়ি জ্যোৎসা বেগমের নামে দিয়েছেন। এ ছাড়াও শ্যালক নাসির মুন্সী, শাহপরান মুন্সীসহ অন্যদের নামে- বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। মুজিবুল হক চৌদ্দগ্রাম থেকে টানা তিনবারসহ মোট চারবারের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের হুইপ ছিলেন। ২০১৪ সালের ৬ই জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকারের রেলপথমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবুল হক ৬৭ বছর বয়সে দীর্ঘ কুমার জীবনের ইতি টেনে ২০১৪ সালের ৩১শে অক্টোবর হনুফা আক্তার রিক্তাকে বিয়ে করেন। তিনি ২০১৬ সালের মে মাসে ৬৯ বছর বয়সে প্রথম কন্যাসন্তানের বাবা হন। ২০১৮ সালের ১৫মে তার জমজ সন্তানের জন্ম হয়। সাবেক রেলমন্ত্রী সম্পর্কে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা মানবজমিনকে বলেন, সম্প্রতি সাবেক রেলমন্ত্রীর বিছানায় টাকার দৃশ্য এটা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে। কারণ তার দুর্নীতি ও সম্পদের পরিমাণ এর চেয়েও শতগুণ বেশি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দুবাই পাড়ি জমান। মুজিবুলের পরিবার ছিল দরিদ্র এবং কৃষক পরিবার। যেটা তিনি বিভিন্ন সভা সমাবেশে নিজেই বলে বেড়াতেন। একসময় ভাত খাবার প্লেট না থাকলেও তিনি হুইপ নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত আদর্শগত দিক থেকে পরিচ্ছন্ন ছিলেন। শেষ বয়সে এসে স্ত্রী হনুফাকে বিয়ে করার পর তিনি ধীরে ধীরে দুর্নীতিতে জড়ান। স্ত্রী হনুফা ছিলেন মূলত তার দুর্নীতির ক্যাশিয়ার। এলাকায় ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচন করতে হলে তাকে ২ কোটি টাকা দিয়ে মনোনয়ন নিতে হতো। এরপর থেকে তার সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়। ঘুষ দুর্নীতির কারণে তিনি স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন এবং কোনঠাসা হয়ে পড়েন। মুজিবুল হক কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এ বিষয়ে জানতে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুলকে মুঠোফোনে ফোন দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন ও এসএমএস পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। 

mzamin

Friday, September 13, 2024

যেভাবে এগুবে সংস্কার কমিশন by মরিয়ম চম্পা

রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ছয় সেক্টরের জন্য ৬টি সংস্কার কমিশন গঠন করছে সরকার। আগামী ১লা অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কমিশন কাজ শুরু করবে। কমিশন প্রধান হিসেবে ৬ জন বিশিষ্ট নাগরিককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের কাজের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করে দিয়েছেন। তারা বলছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চান দায়িত্বপ্রাপ্তরা। সরকারি সূত্র জানায়, প্রতিটি কমিশনে বিশেষজ্ঞ সদস্য যুক্ত করা হবে। তারা আলোচনা করে, জনসাধারণের মতামত নিয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করবেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি হবে সংস্কারের রূপরেখা। যে ছয় কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে আগামী তিন মাসের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হবে। কমিশন প্রধানের দায়িত্ব পাওয়া বিশিষ্টজনরাও জানিয়েছেন, কম সময়ের মধ্যেই যাতে ভালো প্রস্তাবনা দেয়া যায় সেই চেষ্টা তারা করবেন। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনে সময়োপযোগী পরামর্শ দিতে চান তারা।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, আমাদের যাত্রা এখনো শুরু হয়নি। প্রথম কাজ হচ্ছে- কমিশন গঠন করতে হবে। কমিশনের কিছু ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। তারা এ কাজে সহায়তা করবে। কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা একটি প্রিভিলাইজড। সম্মান। কর্মপরিধি নিয়ে আমাদের অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ- আলোচনা করতে হবে। আমাদের একটি সুপারিশমালা তৈরি করতে হবে।  

সংস্থাপন (জনপ্রশাসন) সচিব এবং পরে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেন সফর রাজ হোসেন। পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান এর দায়িত্ব পাওয়া এই বিশিষ্টজন বলেন, আমি প্রধান উপদেষ্টার বক্তৃতা শুনেছি। এখন পর্যন্ত কোনো অফিসিয়াল চিঠি পাইনি। তবে এটা ১লা অক্টোবর থেকে শুরু করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে। অফিসিয়াল চিঠিতে কর্মপরিধি এবং পরিকল্পনা তারা ঠিক করে দিবেন। এবং আমরা একসঙ্গে বসে এর ভিত্তিতে কাজ করবো। অর্থাৎ ১লা অক্টোবর থেকে আমরা আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করবো। আমি বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমি সচিব ছিলাম। এখানে ’ল অ্যান্ড পুলিশ ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে ছিলাম। পুরো কাজের একটি অংশ হচ্ছে পুলিশ। নিজস্ব পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে যেভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান চলে সেভাবে চলুক। আইন-কানুন পরিবর্তন হবে। আমরা সবসময় স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশটি আরও উন্নত হবে। আর্থিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে উন্নত হবে। সেটা করতে গিয়ে খণ্ডিত একটি দায়িত্বও যদি হয় সেটাই করবো। উন্নত দেশে যেভাবে হয় সেভাবে আমাদের নাগরিক সুবিধা যেন পায় সেটার চেষ্টা করবো। জনসাধারণ যেন তাদের অধিকার ফিরে পায় তার জন্য কাজ করবো। পুলিশ প্রশাসনকে জনবান্ধব করতে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে বসবো। এবং পুলিশের যারা সেবা পাচ্ছে তাদের সঙ্গেও বসবো। পুলিশ কতটুকু সেবা দিতে পারবে এবং সাধারণ মানুষ কতখানি চান? এছাড়া মানবসম্পদসহ কিছু সীমাবদ্ধতা তো রয়েই গেছে। ঘটনাচক্রে বাংলাদেশ সরকার আমাকে অনেকবার আমেরিকা, লন্ডন পাঠিয়েছে। পড়াশোনা করেছি। আমরা চাই আমাদের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষা এটা কাজে লাগুক।

দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জানা যাচ্ছে- আমাদের এই কমিশনে আরও সদস্য নিযুক্ত হবেন। তাদের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করবো। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তাদের জন্মলগ্ন থেকে সম্পৃক্ততা আমাদের ছিল। কাজেই আমাদের একটি স্টেক (অংশীজন) আছে। যে কারণে দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং তখন থেকেই আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এখন পর্যন্ত যে বিষয়গুলো দুদক কার্যকর করতে পারেনি সে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবো। প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের যে ব্যর্থতা সেগুলো চিহ্নিত করা। এর মধ্যে দুদকের নিজস্ব কিছু প্রতিকূলতা আছে। দুদকের কর্ণধার হিসেবে চেয়ারম্যানসহ যাদের নিয়োগ দেয়া হয় আমরা দেখেছি এ পর্যন্ত দলীয় প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে শীর্ষ পর্যায়ে নিয়োগ হয়েছে। দু’-একটি ঘটনা ছাড়া। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থেকে দলীয় প্রভাব এবং তার ফলে যারা নিযুক্ত হয়েছেন তাদের যে দলীয় আনুগত্য এর কারণে যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের ক্ষেত্রে দুদক কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। কীভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন করা যায় তা নিয়ে কাজ করবো। পাশাপাশি দুদক আমলাতন্ত্রের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তা যারা রয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত আনুগত্য থাকে আমলাতন্ত্রের প্রতি। যে কারণে দুদকের যে সত্তা সেটার সঙ্গে একত্রিত হতে পারেনি। আমলাতন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়ার একটি প্রবণতা আছে। এই প্রক্রিয়াকে ভাঙতে হবে। দুদকের অভ্যন্তরে যারা কর্মীবাহিনী তাদের অনেকেই সততার সঙ্গে কাজ করে থাকেন। কিন্তু তারা কোণঠাসা অবস্থায় থাকেন। এটা কেন এবং কীভাবে হয় সেটা দেখা হবে। দুদকের আইন এবং নীতিমালা এমনভাবে আছে যেগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটাকে সংশোধন করা দরকার সেটা দেখা হবে এবং পরিবর্তন করা হবে। দুদকের নিজস্ব আইনের বাইরে, মানিলন্ডারিং, কর, সিভিল সার্ভিস আইন রয়েছে। এগুলোর প্রতি নজর দিতে হবে। দেশে এবং দেশের বাইরে যে অর্থ পাচার এক্ষেত্রে দুদকের সঙ্গে আরও কয়েকটি সংস্থা তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডি। তাদের দুদকের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা। আমরা যদি স্বপ্নের দুদক দেখতে চাই বা পেয়েও যাই এই সংস্কারের বাস্তবায়নের মাধ্যমে যদি হয় এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উপাদান আমাদের রাজনীতি এবং আমলাতন্ত্র এই দু’টি থেকে উত্তরণ করতে না পারলে দুদক কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে- এটা আশা করা যাবে না। দুদকের সংস্কার কার্যক্রম দুদকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এতে আমাদের কাজে সুফল আসবে না। এখানে পরিধিটা বৃদ্ধির চেষ্টা করবো। আমলাতন্ত্রের দলীয়করণ প্রতিহত করার উপায় কি? সেটা দেখা হবে।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান এক প্রতিক্রিয়ায় মানবজমিনকে বলেন, বিচার বিভাগে থাকা অবস্থায় যেভাবে দায়িত্ব পালন করেছি একইভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করবো। আরও বেশি এবং আমার সর্বোচ্চটা দিয়েই দায়িত্ব পালন করবো।

mzamin

Sunday, September 1, 2024

মনিরুলের আনা ২৫ কোটি টাকা গেল কোথায়? by মরিয়ম চম্পা

নিয়োগ, টেন্ডার বাণিজ্য, কেনাকাটা, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ উঠছে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর প্রধান কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শেষের দিকে পুরোটা সময় মনিরুল পুলিশ সদরদপ্তর ও ডিএমপি’র কন্ট্রোলরুমে কাটিয়েছেন। সূত্রমতে, আন্দোলন দমন-পীড়নের কাজে খরচের জন্য গণভবন থেকে সর্বশেষ গত ৪ঠা আগস্ট সকালে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আনেন এই মনিরুল। পুরো টাকাটাই তার এসবি অফিসের নিজস্বকক্ষে সুরক্ষিত ছিল। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর পর মনিরুল আর অফিস করেননি। এসবি সূত্র জানায়, এ সময় এসবি’তে কর্মরত তার হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে পরিচিত দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পুরো টাকাটাই গায়েব করে দেন। সূত্র জানায়, জঙ্গি অভিযান নাটকের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীতে নাম ছড়িয়ে পড়ে মনিরুলের। এ সময় তার প্রধান ও বিশেষ সহযোগী হিসেবে ছিলেন সাবেক কাউন্টার টেরোরিজম (সিটিটিসি) প্রধান এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান ও পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অ্যাডমিন) পদে দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা। সূত্র জানায়, গত ৪ঠা আগস্ট গণভবন থেকে ২৫ কোটি টাকা ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রণোদনা হিসেবে এসবি’র ডিউটিরত সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করতে এ টাকা আনেন মনিরুল। এসবি’র এসএস (অর্থ) এবং এসবি প্রধানের স্টাফ অফিসার পুরো বিষয়টি জানতেন।

এসবি’র অতিরিক্ত ডিআইজিকে (প্রশাসন ও অর্থ) তারা বিষয়টি জানালে তিনজন মিলে সব অর্থ আত্মসাৎ করার সিদ্ধান্ত নেন। গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট আছে অজুহাতে এই টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর এসবি প্রধানের অফিস কক্ষ, তার বেইলি রোডের বাসা এবং সিটি এসবি’র ডিআইজি অফিসে তারা তিনজন তালা লাগান। ৬ই আগস্ট এসবি কার্যালয়ের সকল সিসিটিভি ও ডিশ লাইন কেটে দেন। ৬ই আগস্ট থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত এই সময়ের ভেতর এসবি প্রধান মনিরুলের দপ্তরে রাখা ২৫ কোটি টাকা তিনজন মিলে আত্মসাৎ করেছেন বলে জানিয়েছে সূত্র।
এসবি’র একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, মনিরের নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট ছিল। যেই সিন্ডিকেটে সাবেক মহানগর গোয়েন্দা প্রধান হারুন অর রশীদ, মনির, সারোয়ার নজরুলসহ একাধিক কর্মকর্তা ছিলেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুলিশের পোস্টিং, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাণিজ্য চালিয়েছেন। জানা গেছে, মনিরুলের কানাডায় নিজস্ব দু’টি বাড়ি এবং সিঙ্গাপুরে রয়েছে নিজস্ব ব্যবসা। ঢাকা, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বাজারের ব্যাগে করে টাকা আসতো মনিরুলের বাসায়। এসব টাকার ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করতেন এসবি’র বর্তমান এক ডিআইজি, এসএস ফাইন্যান্স এবং আরেক কর্মকর্তা। মনিরুলের ছিল স্থায়ী দুই রক্ষিতা। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। সম্প্রতি তিনি এক নির্মাতাকে ঘটা করে বিয়ে করেন। এই অভিনেত্রীকে মনিরুল বেইলি রোডে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন। যেখানে মনিরুল নিয়মিত অবকাশ যাপন করতেন। আরেকজন বতর্মান সময়ের খ্যাতিমান বিজ্ঞাপন নির্মাতা এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র পরিচালকের সাবেক স্ত্রী এবং অভিনেত্রী। সরজমিনে দেখা গেছে, রাজকীয়ভাবে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে এসবি প্রধান মনিরুলের নিজস্ব অফিস ও মিটিংরুম সাজিয়েছেন। মনিরুলের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার বাহাড়া গ্রামে। মনিরুলের বড় ছেলে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করছেন এবং ছোট মেয়ে কানাডায়। তার স্ত্রী সংশ্লিষ্ট এক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদে কর্মরত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন মনিরুল। এ ইউনিটের প্রধান হিসেবে তিনি পরবর্তীতে দায়িত্ব পালন করেন। ডিএমপি ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর প্রধান থাকা অবস্থায় জঙ্গি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে তার কপাল খুলে যায়। এ সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের নামে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মনিরুল। সিটিটিসিতে থাকা অবস্থায় তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এক ডিআইজি (এডমিন)। মনিরুলের ঘনিষ্ঠ এক এসবি সূত্র জানায়, ৫ই আগস্ট পর্যন্ত মনিরুল, সাবেক পুলিশের মহাপরির্দক, গোয়েন্দা প্রধান হারুন, সিটিটিসি’র ডিআইজি মনির, ডিএমপি কমিশনার, সিআইডি প্রধানসহ একাধিক কর্মকর্তা পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি’র অপারেশন কর্নার এবং কন্ট্রোলরুমে অবস্থান করেন। সরকার পতনের শেষের দিকে তারা এই দুই স্থানে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। ফিল্ডে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধরনের দিক- নির্দেশনা দিতেন। ১লা আগস্ট থেকে অফিসে আসা বন্ধ করে দেন মনিরুল, সারোয়ার এবং নজরুল। মনিরুলের প্রতারণা থেকে বাদ যায়নি একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একজন ঠিকাদারকে দিয়ে মনিরুল প্রায় ৪১ লাখ টাকার কাজ করালেও পরবর্তীতে তিনি বিল পরিশোধ করেননি। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ঠিকাদার হতাশায় ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি মানবজমিন’র সঙ্গে মনিরুলের হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়। তিনি বলেন, ২৫ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে। ছাত্র আন্দোলনের সময় আমি আমেরিকায় ছিলাম একটি সেমিনারে। ২০শে জুন দেশে ফিরি। গণভবন থেকে টাকা আনার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ভিত্তিহীন। এটার কোনো সুযোগ নেই। কানাডায় ২টি বাড়ি, সিঙ্গাপুরে নিজস্ব ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কখনো কানাডা যাইনি সেখানে বাড়ি থাকার প্রশ্নই আসে না। কানাডা কেন দেশেও আমার নিজ নামে কোনো ফ্ল্যাট নেই। নিয়োগ বাণিজ্য, ব্যাগভর্তি টাকা, টেন্ডার বাণিজ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা। বর্তমানে এসবিতে যারা কর্মরত আছেন বিশেষ করে ডিআইজি সারোয়ার তিনি এসব দেখে থাকেন। এগুলো আমার বিষয় না। তিনি বলেন, অভিনেত্রী-মডেলদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা বলে চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্তমানে কোথায় আছেন জানতে চাইলে মনিরুল প্রথমে বলেন, ৫ই আগস্ট সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে  ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন তিনি। বর্তমানে এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন।

Thursday, August 29, 2024

৬ বছরে ৫১,৬৮০ অস্ত্রের লাইসেন্স: নজরদারিতে মালিকরা by মরিয়ম চম্পা

নিজস্ব সুরক্ষায়, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষায় বিত্তশালী ব্যক্তিরা বেসামরিকভাবে লাইসেন্সের মাধ্যমে বৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। গত ছয় বছরে সারা দেশে এই তিন ক্যাটাগরিসহ বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ৫১ হাজার ৬৮০টি। এর মধ্যে ব্যক্তির নামে ৪৫ হাজার ২২৬টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫ হাজার ৮৪টিরও বেশি। ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী। বিভিন্ন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে রয়েছে ২১ হাজার ৬৮০টি বৈধ অস্ত্র। এসব মালিকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। বৈধ অস্ত্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেয়া বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬৮০। কিন্তু এর প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বৈধ অস্ত্রের হিসাব সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সম্মিলিত তথ্য আসেনি।

দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকার টানা ক্ষমতায় থাকায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। বৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও রাজস্ব সেভাবে আদায় করা হয়নি। যাদের অনেকেরই আয়কর ফাইলে দেখানো আয় ও সম্পদের হিসাবে কৌশলে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র ব্যবহার করেছেন বলে জানিয়েছে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সূত্র জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসামরিক জনগণকে প্রদানকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইতিমধ্যে স্থগিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত করা ও জমা দেয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে আগামী ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে গোলা-বারুদসহ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬ অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় ব্যবহার গ্রহণ করে থাকেন। স্পেশাল ব্রাঞ্চ কর্তৃক তৈরি করা বেসামরিক আগ্নেয়াস্ত্র্ত্রের তথ্য সংরক্ষণ সফটওয়্যার এ আগ্নেয়াস্ত্রের হাল নাগাদ তালিকা সম্পর্কে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৫১,৬৮০টি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ধরন অনুযায়ী পিস্তল ৪,৮৪০টি, রিভলবার ২,৬৯২টি, একনলা বন্দুক ২১,৩৯৫৪টি, দোনলা বন্দুক ১১,০২২টি, শটগান ৫,৯৩৮টি, রাইফেল ১,৮৬৪টি। এ ছাড়া এর আগের বছরগুলোর আগ্নেয়াস্ত্রের বিষয়ে হালনাগাদ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একইসঙ্গে এ সকল আগ্নেয়াস্ত্রে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলার অন্তর্গত থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে অগ্নিসংযোগ ভাঙচুর, আগ্নেয়াস্ত্র লুটপাটসহ গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় পুলিশের স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় গত ১৫ বছরের ইস্যুকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের বিষয়ে পুলিশ এখনো স্বাভাবিক কাজ শুরু করতে পারেনি। অনেক থানায় লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রে জমা নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতাসহ অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্রশস্ত্র্ত্র এখনো সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

২০১৬ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যক্তিপর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে হলে ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক ‘ব্যক্তি শ্রেণির’ আয়করদাতা হতে হবে। আবেদনকারীকে আবেদনের পূর্ববর্তী তিন বছর ধারাবাহিকভাবে পিস্তল, রিভলবার, রাইফেলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম তিন লাখ এবং শটগানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম এক লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। আবেদনকারী কর্তৃক পরিশোধিত আয়করের পরিমাণ উল্লেখসহ এনবিআর কর্তৃক ইস্যুকৃত প্রত্যয়নপত্র আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হয়। এদিকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স স্থগিত এবং আগামী ৩রা সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশের পর থেকে বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করছেন ব্যবহারকারীরা। তারা কীভাবে অস্ত্র জমা দেবেন, সে বিষয়ে জানতে চাইছেন। রাজধানীর মিরপুরের একটি থানায়, পাঁচজন বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারী সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা অস্ত্র জমা দেয়ার প্রক্রিয়া জানতে চেয়েছেন। যেকোনো সময়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করে অস্ত্র জমা দেয়া যাবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর জননিরাপত্তা বিভাগ এর উপসচিব (রাজনৈতিক-৪ শাখা) মো. আরিফ-উজ-জামান এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জমাদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নির্ধারিত তারিখের মধ্যে যারা অস্ত্র জমা না দিবেন তাদের বিরদ্ধে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে সেটা পরবর্তীতে জানানো হবে।  

Wednesday, August 28, 2024

জীবন শঙ্কায় গুলিবিদ্ধ মামুন by মরিয়ম চম্পা

৫ই আগস্ট দুপুর ২টা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর বনানী থেকে বিজয় মিছিলের সঙ্গে গণভবনে যান মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন।  বিকাল সাড়ে ৫টায় বনানী হয়ে উত্তরা থানা এলাকায় জসিমউদ্দিন পৌঁছলে হঠাৎ একটি গুলি এসে মামুনের ডান পাশের গাল দিয়ে ঢুকে বাম গাল দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিন-চার টুকরো হয়ে যায় তার জিহ্বা। এক তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে কেটে বাদ দেয়া হয়েছে। বাকি অংশে সংক্রমণ হওয়ায় কালো হয়ে যাওয়া জিহ্বার সামনের পুরো অংশ কেটে বাদ দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। গুলিতে মামুনের নিচের চোয়াল এবং দাঁতের মাড়িসহ পুরোটা ভেঙে গেছে। নিচের চোয়ালে কোনো দাঁত নেই। রক্তে ইতিমধ্যে ইনফেকশন ধরা পড়েছে। এতে করে মুখসহ শরীরের অন্যান্য অংশে পচন ধরতে পারে বলে দাবি মামুনের পরিবার এবং চিকিৎসকদের। এদিন একদল অস্ত্রধারী লোক এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে বিমানবন্দর এলাকায় প্রবেশ করে বলে দাবি করেন মামুনের পরিবার। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের উইমেন্স হাসপাতালে ভর্তি করে। এ বিষয়ে মামুনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। তার স্ত্রী বলেন, মামুনের জিহ্বায় সেলাই দেয়া হলে দুই চোয়ালের মাংস পচে গিয়ে সেলাই খুলে গেছে। এখন পর্যন্ত খোলা অবস্থায় আছে। রোববার হঠাৎ করে তার ব্লাডে ইনফেকশন ধরা পড়ে। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। এর আগে দুই দিন ভেন্টিলেশন এবং ৭ দিন আইসিইউতে ছিলেন। পরে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হলে হঠাৎ করে রোববার অজ্ঞান হয়ে যায়। শরীরে খিঁচুনি শুরু হয়। ব্লাড সার্কুলেশন ও পালস শূন্যতে চলে আসে। বর্তমানে মামুনের জীবন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইতিমধ্যে মামুনের চিকিৎসায় প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। মামুনের গ্রামের বাড়ি মাগুরা। আহত মামুন মাগুরার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন। বনানীতে একটি মেসে ভাড়া থাকতেন। গুলি লাগার পর থেকে মামুন আর কথা বলতে পারেনি। পরবর্তীতে তিনি কথা বলতে পারবেন কি না সেটা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। গত ৬ মাস আগে মামুন বিয়ে করেন। গ্রামের বাড়ি মাগুরাতে দুই ভাই-বোন মা-বাবা এবং স্ত্রী থাকেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মামুন। ছোট ভাই অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার বাবা কৃষক। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলছে মামুনের চিকিৎসা। এ বিষয়ে মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে মামুনের স্ত্রী বলেন, আমরা কার বিরুদ্ধে মামলা করবো। এখন পর্যন্ত মামুনের পরিবার তার চিকিৎসার জন্য কোনো আর্থিক সাহায্য কিংবা অনুদান পাননি। মামুনের স্ত্রী বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকে মাঠে থাকলেও মামুনের খোঁজ নেয়নি কেউ। আমরা ঢাকা শহরে কাউকে চিনি না। কার মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের কাছে পৌঁছবো সেটা বুঝে উঠতে পারছি না। আমাদের একটিই চাওয়া মামুন আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠুক। তার পরিবার এবং দেশের জন্য কাজ করার অনেক স্বপ্ন ছিল। এভাবে তাকে আমরা কতোদিন চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারবো জানি না।     

Tuesday, August 20, 2024

তাকসিম চক্রের পেটে ৫০০০ কোটি টাকা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা by মরিয়ম চম্পা

ঢাকা ওয়াসা ভবনে তাকে বলা হয় সম্রাট। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামকে বলা হতো তার পকেট মন্ত্রী। ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ভয়ে তটস্থ থাকতেন মন্ত্রী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্রাট তাকসিমের বিদায় হলেও তার উজির নাজির পাইক পেয়াদা হিসেবে রয়েছেন র‌্যামস ও বাঁছুর গ্রুপ। তাদের দিয়েই গত ১৫ বছরে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাজস্ব লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি। এদিকে পদত্যাগের পর তাকসিম এ খানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার সংস্থাটি থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পুলিশের বিশেষ শাখায় পাঠানো হয়। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র দৈনিক মানবজমিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রকল্পে দুর্নীতিসহ বেশ কিছু অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।

সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর আগে গত বছর ২৩শে মে ওয়াসায় অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে মামলার অনুমোদনের জন্য সুপারিশ চেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এতে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় পরিচালক (উন্নয়ন) ও পরিচালক (কারিগর) এই দুটি পদ ওয়াসার অর্গানোগ্রামে না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির এমডি প্রভাব খাটিয়ে দুজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। আর চার বছরের বেশি সময় ধরে তাদের বেতন বাবদ ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার ৯৮০ টাকা দেয়া হয়েছে।

নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ হওয়ায় এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। দুদক সূত্র মতে, ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। এরপর একাধিকবার সময় বাড়িয়ে ওই পদে আছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বারবার নিয়োগবিধি অমান্য করার অভিযোগ উঠে। এ ছাড়া ওয়াসার এমডিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সংস্থাটির পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, গুলশান-বারিধারা লেক দূষণ প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই অনুসন্ধান করছেন।

এদিকে তাকসিমের বিদায় হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে তার দুর্নীতির সিন্ডিকেট র‌্যামস ও বাছুর গ্রুপ। তারা ইতিমধ্যে তাকসিমের দুর্নীতি সংক্রান্ত ফাইল গায়েব করা, তাকসিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াসার এমডি’র পদ থেকে পদত্যাগ করার পর ঢাকা ওয়াসার সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীরা তাকসিমপন্থি কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হন। তাদের মারধর ও হেনস্তা করতে গেলে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা এসে তাদের বাঁচিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার আগের দিন অর্থাৎ সর্বশেষ গত ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত অফিস করেন তাকসিম এ খান। এরপর থেকে তাকে আর অফিসে দেখা যায়নি। জনরোষে পড়ার ভয়ে নিজ বাসায় না থেকে এ সময় তিনি রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ভিন্ন নামে রুম বুক করে ওয়াসার দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং করতেন। বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিতেন। সেখান থেকে অনলাইনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দিচ্ছেন। পরবর্তীতে তিনি রাজধানীর বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে আত্মগোপনে চলে যান। সেখান থেকে তিনি তার অনুসারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব করান। কিছু ফাইল তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাকসিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ওয়াসায় কর্মরত বদরুল আলমই মূলত এসব ফাইল সরানোর কাজ করছেন।

এদিকে ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেখানে দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। ওয়াসা সূত্র জানায়, তাকসিমের দুর্নীতিতে সক্রিয় ছিল তার স্টাফ অফিসার বদরুল আলম। তরুণ নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানকে তিনি ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পিডি বানিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জয়নাল আবেদিন গত ৬ বছরে ওয়াসার যত টেন্ডারবাজি ও লুটপাটসহ সকল প্রকার দুর্নীতি করেছেন। এই তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছেন। এবং প্রত্যেকেই বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ওয়াসাতে তাদেরকে বাঁছুর গ্রুপ নামে ডাকা হয়। তাদের আগে গত ৮ থেকে ৯ বছর যারা তাকসিমের দুর্নীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদেরকে বলা হতো র‌্যামস গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্য রফিকুল ইসলাম পদ্মা প্রকল্পের ডিজি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কয়েক শ’ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই গ্রুপের আরেক সদস্য অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান। তিনি বর্তমানে অবসরে গেছেন। তিনিও একটি প্রকল্পের পিডি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ রয়েছে। রফিক এবং আক্তারকে দুদকে ডাকা হলেও তাকসিন তার ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে চাপা দিয়ে রেখেছেন। আরেকজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মহসেন আলী মিয়া দাসেরকান্দি প্রকল্পের পিডি ছিলেন। তিনিও বর্তমানে অবসরে গেছেন। তার বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান এসি তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর সাত্তার সবুজ। তার বিরুদ্ধে টানা ৯ বছর সংগ্রহ বিভাগে (কেনাকাটায়) কয়েকশ’ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফা মানবজমিনকে বলেন, ওয়াসা তো দুর্নীতির চারণভূমি। এটা সকলেই জানে। তাকসিমকে দুর্নীতির পুরো বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত। এবং অনুতপ্ত। তাকে আমি নিজ দায়িত্বে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেও পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার সুযোগের অপব্যবহার করেন। এ বিষয়ে আমি তখন মন্ত্রণালয়কে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়ার ৪ দিনের মাথায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌ. এ.কে.এম সহিদ উদ্দিন বলেন, ওয়াসার সাবেক এমডিসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এটার আমি প্রমাণ চাই। অনুমানভিত্তিক কথা বললে হবে না। যথাযথ প্রমাণ দিতে পারলে আমি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে এ বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ তুলে ধরলে তৎকালীন সরকার এটার গুরুত্ব দেয়নি। তার ক্ষমতার বলয় এত বেশি উচ্চ পর্যায়ে ছিল যে, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রেখে অবারিতভাবে দুর্নীতি করেছেন। দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা অবারিতভাবে করে গেছেন তিনি। এখন প্রথম কথা হচ্ছে সাবেক এমডি তাকসিম পদত্যাগ করলেই তো হবে না। তিনি পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকুন না কেন আমাদের আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব এবং অবশ্যই প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। এর মাধ্যমে জনস্বার্থে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। অনিয়ম-দুর্নীতি তিনি এককভাবে করেছেন এটার কোনো সুযোগ নেই। তার সঙ্গে একটি চক্র ছিল এই প্রতিষ্ঠানের। যারা বহাল তবিয়তে থাকলে নিজেদের এবং তাকসিমের দুর্নীতিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এটা প্রতিরোধ করার সুযোগ আছে। এবং যারা এই দুর্নীতি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে তাদেরকেও চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিচার সুনিশ্চিত ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। 

Saturday, August 3, 2024

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর অর্ণব বলছিল, আমি বাঁচবো না, আমাকে হাসপাতালে নিও না by মরিয়ম চম্পা

আমি আর বাঁচবো না। আমাকে হাসপাতালে নিও না। হুজুর আমাকে কালেমা পড়ান। আমি পানি খাবো। পানি দাও। ছেলের শেষ মুহূর্তের কথাগুলোর স্মৃতিচারণ করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন র‌্যাবের গুলিতে নিহত মোহাম্মদপুরের বসিলার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের মা সাহিদা বেগম। মানবজমিন’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আর্তনাদ করে অর্ণবের মা বলছিলেন, আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। ওদের একটুও মায়া হলো না?  প্রথমে পায়ে গুলি করে। পরে বুকের বাম পাশে গুলি করে। যেটা বুকের একপাশ ভেদ করে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমাদের বাসা মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‌্যাব ২ কার্যালয় সংলগ্ন। আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকি তার সামনে মূল সড়কে গত ১৯শে জুলাই সকাল থেকে দফায় দফায় ছাত্রদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় অর্ণব বাসাতেই ছিল। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় কিছুক্ষণ ফোনে ডাউনলোড করা গেমস খেলার পর নিচে নামে। এরপর আবার বাসায় আসলে দুপুরে গোসল করতে বলি। অনেক সময় নিয়ে গোসল শেষ করে। এরপর ৩ তলায় থাকা এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাসায় এসে ভাত খায়। ওই শিক্ষার্থী মেসে থাকায় মাঝে মধ্যেই অর্ণব বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে ডেকে খাওয়াতো। খাওয়া শেষ করলে আমি মসজিদে যাওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেই। ও বাইরে চলে যায়।

এ সময় ওর বোন জামাইয়ের দেয়া আইফোনটি সঙ্গে ছিল। আমরাও কিছুক্ষণ পরপর গুলির শব্দ শুনে রাস্তায় ছুটে আসি। চোখের সামনে দিয়ে হতাহতদের নিয়ে যাচ্ছিল। দুপুরে মূল সড়কে দাঁড়িয়ে সংঘর্ষের ঘটনা দেখছিল অর্ণব। এ সময় হঠাৎ র‌্যাব গুলি করে। অর্ণবের সঙ্গে থাকা ছেলেটি দৌঁড় দেয় এবং অর্ণবের পায়ে প্রথমে গুলি লাগে। এরপর বুকে গুলি লাগলে মাটিতে ঢলে পড়ে। সঙ্গে থাকা ছেলেটি অনেক কষ্টে টেনেহিঁচড়ে অর্ণবকে স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়ে যায়। এই মসজিদেই দুপুরে নামাজ পড়েছিল অর্ণব। এ সময় মসজিদের হুজুর অর্ণবকে কালেমা পড়ান। হুজুরের কাছে পানি খেতে চায়। তাকে পানি খাওয়ানো হয়। পানি খাওয়ার পর একটি ভ্যানে তোলা হয়। অর্ণব তখন বারবার বলছিল আমি বাঁচবো না। আমাকে হাসপাতালে নিও না। এদিকে অর্ণবের বুক পিঠ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছিল। ভ্যানে করে প্রথমে দুই হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি করতে না পেরে পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে অর্ণবকে আমরা পাগলের মতো খুঁজছিলাম। সঙ্গে থাকা ছেলেটি আমাদের কারও ফোন নম্বর জানে না। বিকালে হঠাৎ অর্ণবের ফোনে ফোন দিলে সঙ্গে থাকা ছেলেটি জানায় অর্ণব গুলিতে আহত। এ সময় আমরা হাসপাতালে ছুটে যাই। ততক্ষণে সব শেষ। অর্ণব মারা যায়। সময়টা আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট।
তিনি বলেন, বুক থেকে রক্ত পড়ছে। মনে হচ্ছিল ওর বুকের গুলি পিঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত গর্ত হয়ে গেছে। এতটা কষ্ট দিয়েও মানুষ মানুষকে মারতে পারে। আমার ছেলে তো কোনো আন্দোলনে ছিল না। ওর কি দোষ ছিল। ওকে বড়জোড় পায়ে একটি গুলি করতে পারতো। কিন্তু বুক কেন ঝাঁঝরা করে দিলো। আমি এর বিচার চাই। আমার সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিল ২৩ বছরের এই ছেলেটি। এখন আমাদের কী হবে? কে দেখবে আমাদের সংসার। আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা নাই। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সহমর্মিতা কিংবা আর্থিক সহযোগিতা পাইনি। এ ঘটনায় মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে অর্ণবের মা সাহিদা বেগম বলেন, কার বিরুদ্ধে মামলা করবো? তাছাড়া আমার তো মামলা চালানোর সামর্থ্য নেই। এ সময় তিনি ছেলে হত্যার সঠিক তদন্তসহ বিচারের পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য কামনা করেন। অর্ণবের মা বলেন, এইচএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক কারণে আর ভর্তি হতে পারেনি। সংসারের হাল ধরেছিল। ওর আয়েই সংসার চলতো। ছেলেকে বিয়ে করাবেন তাই সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে পাত্রী দেখছিলেন। অর্ণবের বাবা ইতালি প্রবাসী হলেও বর্তমানে তিনি বেকার এবং অসুস্থ জীবনযাপন করছেন। মা সাহিদা বেগমও শারীরিকভাবে অসুস্থ। তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে অর্ণব ছোট। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অর্ণবের সঙ্গে সঙ্গে গোটা একটি পরিবারের সকল স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মা সাহিদা।

Thursday, August 1, 2024

সাংবাদিক মেহেদীর ভাইয়ের প্রশ্ন কার বিরুদ্ধে মামলা করবো by মরিয়ম চম্পা

কার বিরুদ্ধে মামলা করবো? রাষ্ট্রের? রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে পারবো তো। কেউ পেরেছে এখন পর্যন্ত। গণমাধ্যমকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে? আমরা অসহায়। মেহেদীর দুই শিশু কন্যা, তার স্ত্রীর এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের এখন কী হবে সেটা ভেবেই আমরা চারদিকে অন্ধকার দেখছি। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা টাইমস-এর নিহত সাংবাদিক হাসান মেহেদীর ছোট ভাই জাহিদ হাসান আশিক। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে আশিক বলেন, আমরা তিন ভাই। মেহেদী ছিল সবার বড়। ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বাবাও পেশায় একজন গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। মা গৃহিণী। দীর্ঘদিন চাকরি করার পর আমরা বাবাকে সাংবাদিকতা থেকে অবসর নিতে বলি। হাসান মেহেদীর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফলে। রাজধানীর একটি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। আশিক বলেন, ভাইয়া তার স্ত্রী এবং দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের ভাড়া বাসায় থাকতেন। ঘটনার দুই দিন আগে বাসা থেকে অফিসের কথা বলে বেরিয়ে আসেন। ১৮ই জুলাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ একটি ফোন পেয়ে আমরা হাসপাতালে ছুটে আসি। এসে দেখি সব শেষ। ভাইয়ার মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের একটি ট্রলিতে পড়ে আছে। তার বুক- পেট-গলা-মাথাসহ পুরো অংশ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি পেশায় একজন অভিনেতা। আমি আর ভাইয়ার টাকায় মূলত আমাদের সংসার চলতো। বাবা-মা ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি থাকেন। ঘটনার পর তারা ঢাকায় এসেছেন। এরপর থেকে তারা দু’জনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাবার হার্টের সমস্যা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তাকে অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়। মায়ের শরীর ভালো নেই। ভাইয়ার অবর্তমানে এখন সংসারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে। অভিনয় করে তেমন কোনো আয়- রোজগার নেই যেটা দিয়ে তিনটি পরিবারের খরচ চালাবো। তিনি বলেন, মেহেদীর স্ত্রী তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ভাবীর হাতে একটি দশ লাখ টাকার চেক ডিপোজিট ও নগদ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেয়া হয়।

ভাইয়ার অফিস থেকে তারা সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। এই অবস্থায় মেহেদীর অসহায় পরিবারের প্রতি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দায়িত্ব নিলে হয়তো দুই সন্তান এবং স্ত্রী-বাবা-মা তারা মোটামুটি একটি স্বাভাবিক জীবন পেতেন। এবং আমার জন্য উপকার হতো। এর আগে পটুয়াখালীর হোসনাবাদ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেহেদী অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা টাইমসে কর্মরত ছিলেন। ১৮ই জুলাই সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মী ইমাম হোসেন ইমন জানান, ওইদিন অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে থেকে পুলিশের পাশে দাঁড়িয়েই সংবাদ সংগ্রহ করেন হাসান মেহেদী। বিকালে পুলিশের একটি এপিসি থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে টিয়ারশেল ও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। এ সময় হাসান মেহেদী গুলিবিদ্ধ হন। তার মুখ, গলা ও বুক ও শরীরে অসংখ্য ছররা গুলির চিহ্ন দেখা যায়। ঢাকা টাইমসের সিনিয়র রিপোর্টার হাসান মেহেদী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিটে কর্মরত ছিলেন। ঢাকায় তিনি কেরানীগঞ্জ এলাকায় পরিবারসহ থাকতেন। তার সাত মাস ও চার বছর বয়সী দুই কন্যা শিশু রয়েছে। ঢাকা টাইমস-এর নিউজ এডিটর দিদার মালিকি মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু তার বাসা কেরানীগঞ্জে তাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে মেহেদী সেখানে ডিউটি করেন। এবং কিছুক্ষণ পরপর অফিসে আপডেট দিচ্ছিলেন। বিকাল ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত তাকে ফোনে পাওয়া যায়। এ সময় সর্বশেষ তিনি জানান, একটি মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে আছে। এরপর আর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ফোনটি বারবার বন্ধ দেখাচ্ছিল। পরবর্তীতে আমরা ভেবে নেই হয়তো চার্জ ছিল না। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক অফিসে বিষয়টি জানালে আমরা ছুটে যাই। মেহেদীর নিথর দেহ হাসপাতালে পড়ে থাকতে দেখি। তিনি বলেন, একজন সহকর্মী হিসেবে সে অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু এরকম একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমারই সহকর্মীর সঙ্গে ঘটবে এমনটা প্রত্যাশা করিনি। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। আমরা অফিসের পক্ষ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওর পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

Tuesday, September 1, 2020

হালিমার শত সন্তান, কালী খালার ক্ষোভ by মরিয়ম চম্পা

দাই মা। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ শব্দটি অচেনা। এক সময় গ্রামে গ্রামে দাই মা’দের কদর ছিল। মায়ের মতোই দেখতো তার সন্তানরা। আর এতে দাই মা’রা গর্ব করতেন। কিন্তু এখন গ্রামেও দাই মা’র সংখ্যা অনেক কমে গেছে। শহরে তো দেখা ভার। দাই মা’র জায়গা দখল করেছে হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোর ডাক্তার ও নার্সরা।
তারা অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েই দায় সারেন। কখনোই দাই মা হতে পারেন না। হতে চানও না। রাজধানীর নিম্ন মধ্যবিত্তদের বাসস্থানের এলাকাগুলোতে এখনো দুয়েকজন দাই মা’র দেখা মেলে। তারা অন্তঃসত্ত্বা মায়ের খবর পেলেই ছুটে যান। নিজ থেকেই উপদেশ দেন। পুরো দশ মাস দেখাশুনা করেন। তার হাতেই জন্ম নেয় সন্তান। বিনিময়ে একটি শাড়ি কাপড়, কিছু টাকা পান।

এতেই তারা খুশি। এমনই একজন মিরপুর ভাষানটেকের হালিমা। এ পর্যন্ত তার হাতে জন্ম নিয়েছে শতাধিক সন্তান। কীভাবে দাই মা হয়ে উঠলেন হালিমা? নিজ মুখেই জানান তার কথা। বলেন, মাত্র ১৩ বছর বয়সে একই এলাকার হাসেম হাওলাদারের সঙ্গে বিয়ে হয় আমার। মা মারা যাওয়ার পর সৎ মায়ের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে অল্প বয়সেই বিয়ে দেন বাবা। কিন্তু দুঃখ তার পিছু ছাড়েনি। প্রথম সন্তান হানিফার জন্মের সময় প্রসব বেদনা উঠলে কাউকে কাছে পাননি তিনি। অনেক কষ্টে নিজে নিজেই সন্তানের জন্ম দেন হালিমা। এভাবেই তার দাই জীবনের গল্পের শুরু। সুখেই চলছিল তার সংসার। এরই মধ্যে কয়েক বছরের মাথায় স্বামীও মারা যান। হালিমার বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে।
হালিমা বলেন, এই দু’হাতে কতো সন্তানের যে জন্ম দিয়েছি তার কোনো হিসাব নেই। নিজ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের পাশাপাশি আশেপাশের উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে আমার ডাক আসতো। অঙ্গুল গুনে হিসাব করে বলেন, এ পর্যন্ত ১শ’ সন্তানের উপরে জন্ম দানের সাক্ষী হয়েছি আমি। তিনি বলেন, এসব কাজে সময়-অসময় নেই। রাত তিনটা চারটায় দূর-দূরান্তে যেতে হতো। তবে বেশির ভাগ প্রসবই হতো রাতের বেলা। এতে আমি মোটেই বিরক্ত হতাম না। বরং কোনো জটিলতা ছাড়া স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের পর মা ও পরিবারের সদস্যদের আনন্দ দেখে খুশি হয়েছি।

তারা এখন অনেকেই অনেক ভালো অবস্থানে আছেন। এর মধ্যে আছে- ব্যাংকার, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী। অনেকেই আবার কপাল দোষে ভ্যান চালায়। অন্যের খেতে খামারে দিনমজুরের কাজ করে। আবার অনেকেই হয়তো জানে না যে, তাদের জন্মের সাক্ষী আমি। আমার হাতেই তাদের জন্ম। তবে কেউ কেউ তাদের মায়ের কাছে জন্মের গল্প শুনে ঈদ, কোরবানি বা বিয়েতে দাওয়াত করে। নতুন কাপড় দেয়। টাকা দেয়। আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগে গ্রামে ওভাবে সিজারের প্রচলন ছিল না। তখন দাই’রা ছিল একমাত্র ভরসা। বাচ্চা কনসিভ থেকে শুরু করে জন্মগ্রহণের আগ পর্যন্ত সপ্তাহ অন্তর কয়েক বার বাড়ি বাড়ি গিয়ে মায়ের স্বাস্থ্যের খবর নিতেন হালিমা। বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ার কাজও তিনি করতেন। তখন হাসপাতাল কিংবা ডাক্তার এত ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। যারা মোটামুটি সচ্ছল ছিল তারা বড় নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করে শেষ মুহূর্তে গর্ভবতী মাকে বরিশাল নিয়ে যেতেন। তখন সকাল সাড়ে ৬টা আর বিকাল ৪টা এই দুই বেলা আমাদের ঘাট থেকে বরিশালে লঞ্চ যেত। একসময় মেয়েকে নিয়ে জীবন বাঁচাতে ঢাকায় পাড়ি জমান। মেয়ে বড় হয়। বিয়ে হয়। তার ঘরেও আসে ঘর আলো করে পুত্র সন্তান। নাম রাখা হয় নীরু। এই নীরুর পরিচয়েই এখন পরিচিত ভাষানটেক এলাকায়। কারো প্রসব বেদনা উঠলেই ডাক পড়ে নীরুর দাদির। হালিমাও পরম মমতায় দাই মা’র কাজ করেন। হালিমা বলেন, আমি মনে করি এটি একটি সেবামূলক কাজ।

গ্রামে যখন দাই মা’র কাজ করেছি তখন, বিনিময়ে একটি নতুন কাপড়, একটি সাবান, ২০ বা ৫০ টাকা আর একবেলা খাবার জুটতো। অনেক সময় গরিব মায়েদের কাছ থেকে কোনো উপহার তো নিতামই না বরং তাকে উল্টো সাহায্য করতাম। তবে সবক্ষেত্রেই যে সফল হয়েছি এমনটা নয়। তিনি বলেন, এখনকার মায়েরা তো সন্তান গর্ভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে রাখে সিজারে বাচ্চা জন্ম দিবে। পুরনো দিনের মানুষ হলেও আমি আধুনিকায়নের বিপক্ষে না। তবে কথায় কথায় মায়েদের সিজারের বিষয়টি আমি ভালো চোখে দেখি না। কারণ গত কয়েক বছর আগে একটি এনজিওর পক্ষ থেকে আমাদের ধাত্রী বিদ্যার ওপর একটি ট্রেনিংয়ে জেনেছি সিজার পরবর্তী একজন মায়ের কি কি সমস্যা হয়। যেটা একসময় পরবর্তী সন্তান জন্মদানে মায়ের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে হয়। এখন আর আগের মতো আমাদের কদর নেই। আগের মতো আর ডাক আসে না। ।

এমনই আরেকজন দাই মা কাঞ্চনীর মা কালী। থাকেন ভাষানটেক বস্তিতে। সবার কাছে কালী খালা নামেই পরিচিত। হালকা পাতলা ফুরফুরে শরীর নিয়ে বস্তির এ গলি থেকে ও গলি ছুটে চলাই তার কাজ। বস্তির কার ছেলে নতুন বিয়ে করেছে, কার মেয়ের বিয়ে হয়েছে তাদের কেউ পোয়াতি কিনা এসবই তার নেশার বস্তু। কালী খালা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এখন বস্তির মানুষও কথায় কথায় সিজার শিখে গেছে। কি সিজার আইলো দেশে। কালী খালা বলেন, কাঞ্চনীর জন্মের পর ওর বাপ মারা গেলে দ্বিতীয় স্বামীর সুখও আমার কপালে সয়নি। কাঞ্চনীরা মোট ৪ ভাই বোন। এই কাজ করেই ওদের বড় করেছি। বিয়ে দিয়েছি।

বছর দশ-বারো আগে গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনের ভিটামাটি হারিয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে ভাষানটেক বস্তিতে উঠি। আজ থেকে একযুগ আগেও এই এলাকায় শিয়াল কুকুর দৌড়াতো। তখন মাটিকাটা, বালুঘাট, মিরপুর কালসি এলকায় দাই মা’র কাজ করেছি। বস্তির অনেক ছেলে মেয়েরই জন্ম আমার হাতে। এমন ঘটনাও আছে মা-মেয়ে দুজনেরই বাচ্চা হয়েছে আমার হাতে। একটা সময় আমাদের অনেক কদর ছিল। এখন আর আগের মতো ডাকে না। তিনি বলেন, এটাতো একধরনের সেবা। আমরা মানুষের সেবা করে থাকি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ ভাবে না। সরকারের পক্ষ থেকেও আমরা কোনো সাহায্য পাই না। মাঝে মধ্যে কিছু এনজিও এসে টুকিটাকি প্রশিক্ষণ দেয়। সঙ্গে সামান্য কিছু টাকা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একসময় হারিয়ে যাবে ধাত্রী পেশা। এমনিতেই এখন দাই মা প্রচলন উঠে গেছে সমাজ থেকে। গ্রামেগঞ্জে এখনো দাই মারা সামলাচ্ছেন। কিন্তু সংখ্যায় একেবারে কম। বিভিন্নভাবে তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমাজ যে বদলে গেছে। এখনকার মেয়েরা দাই মা’র চেয়ে হাসপাতালেই বেশি আগ্রহী। তাই তো ব্যথা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ায় হাসপাতালে। ডাক্তারের কাছে। একটু ধৈর্য ধরার ক্ষমতাও নেই তাদের।

Thursday, November 14, 2019

‘জীবনের দাম’ বাড়বে কবে? by মরিয়ম চম্পা

ট্রেন দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রীর প্রাণহানি হলে কিংবা কেউ আহত হলে ৭৬ বছর আগে করা রেলওয়ে আইনে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ মাত্র ১০ হাজার টাকা। গত বছর রেল কর্তৃপক্ষ এই ক্ষতিপূরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। বৃটিশ আমলের ক্ষতিপূরণ আইনে এখনো চলছে রেল। অথচ প্রতিবেশি দেশ ভারতে ট্রেন দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে ক্ষতিপূরণ ৪ লাখ রুপি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থ দিয়ে জীবনের মূল্য হয় না ঠিক। কিন্তু দূর্ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষতিপূরণটা জরুরি। ৭৬ বছর আগে যে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো এর বর্তমান বাজার দর ধরলেও প্রায় কোটি টাকা হয়ে যায়। তারা বলছেন, সবকিছুরই মূল্য বাড়ছে, জীবনের মূল্য বাড়বে কবে?

১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ৮২-এ ধারায় যাত্রীবাহী ট্রেনের দুর্ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি সর্বশেষ ১৯৪৩ সালে সংশোধন করা হয়। এতে বলা হয়, রেল কর্তৃপক্ষের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রীর প্রাণহানি কিংবা আহত হলে অথবা যাত্রীর কর্মক্ষমতা নষ্ট হলে এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি যাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি এবং মালামালের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আইনে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চাইলে আহতদের আরও কম ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব। এদিকে রেলওয়ে আইনে শুধু টিকিটধারী যাত্রীদেরই ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনায় ট্রেনের যাত্রীর বাইরে (ট্রেনে কাটা পড়ে বা ট্রেনের সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষে) কেউ নিহত বা আহত হলে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই। রেলওয়ের তথ্য বলছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৯ বছরে ৪০০ মানুষ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এবারের বাজেটে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে।

বর্তমান আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে ক্ষতিপূরণের হার পুনর্নিধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে গবেষক-অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেন, ক্ষতিপূরনের টাকার অংক কেন বাড়ছে না সেটা বলা সহজ নয়। মানুষের মৃত্যুর ক্ষতি টাকা দিয়ে পূরণ করা কঠিন। যেহেতু আমাদের সমাজ টাকার ওপর ভর করে আছে সেক্ষেত্রে মানুষের বেঁচে থাকতে টাকা লাগে। দুর্ঘটনায় একজন বাবা যদি নিহত হন সেক্ষেত্রে তার সন্তানদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা লাগে। তবে এখানে আমাদের সমাজ যেহেতু শ্রেণি বিভক্ত। কাজেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক মাপকাঠি এবং আর্থিক দিক থেকে তিন থেকে চার শ্রেণির মানুষ রয়েছে সমাজে। ধনী, গরিব, মধ্যেবিত্তসহ অন্যান্য। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় ক্ষতিপূরণ যাদের সবচেয়ে দরকার তারা হলো যাদের কিছু নেই। যাদের পরিবারে উপার্জনক্ষম একজন ব্যক্তি। আহত-নিহত হলে তাদের জন্য একটি কাঠামো হওয়া উচিৎ। শ্রেণিগত যত নিচের দিকের মানুষ হবেন অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণটা তত বেশি হওয়া উচিৎ।

দ্বিতীয়ত, কোনো নারী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হলে সেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিপূরণ হওয়া উচিৎ। বিত্তের মাপকাঠিতে যত উপরের দিকে উঠবেন তত কম ক্ষতিপূরণ পেতে হবে তার। তৃতীয় হচ্ছে, দুর্ঘটনায় কোনো পরিবারের সকল সদস্য মারা গেছে কিন্তু শিশুটি বেঁচে রয়েছে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে উক্ত শিশু বা সন্তানের দায়িত্ব নিতে হবে। টাকা দিয়ে নয় বরং তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আলোকিত ভবিষ্যত ইত্যাদির দায়িত্ব রাষ্ট্রের নিতে হবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ১৯৪৩ সালে সংশোধনী আইনে রেলওয়ে ক্ষতিপূরণ যদি ১০ হাজার টাকা করা হয় সেটা এখন কতো টাকা হওয়ার কথা। কমপক্ষে ত্রিশ থেকে চল্লিশ লাখ টাকা। তখনকার সময়ে স্বর্ণের দাম দিয়ে তুলনা করলে তখন ১০ হাজার টাকা দিয়ে যতটুকু স্বর্ণ পাওয়া যেত এখন সেই পরিমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেটা হলে ক্ষতিপূরণের পরিমান প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমি মনে করি আমাদের আয় বেড়েছে, জীবন মান বেড়েছে, পরিবহন খরচ বেড়েছে সে তুলনায় একজন নিহতের পরিবারকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া খুবই সামান্য। কোন আইনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সেটা আমার জানা নেই। যদি রুলস এ থাকে তাহলে সেটা পরিবর্তন করতে হবে। একটি পেয়াজের দাম যেখানে এখন ১২ টাকা সেখানে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এর পরিবর্তে ক্ষতিপূরণের পরিমান বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর পাল্লায় রেলওয়ে যাত্রী বীমার একটি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে টিকেটের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ টাকা যুক্ত করে যাত্রী বীমা করা হলে এই ধরনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি সহায়তা করতে পারবে বলে মনে করছি।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, দেশ যখন উন্নত হয় চাহিদা তত বাড়ে। অর্থনৈতিক অবস্থা মানানসই করতে হয়। এগুলো অনেক ক্ষেত্রে এখনো হয়নি। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন আইন পরিবর্তন করা হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে। এবং রেলওয়ের আইনটি কিন্তু সেই পুরানো অবস্থাতেই আছে। রেলওয়ের ১শ বছরের কালভার্ট এখনো ঠিকঠাক করা হয়নি। অর্থাৎ উপরে যতই ফিটফাট হোক না কেন ভেতরে এলোমেলো থাকলে তো হবে না। এই উন্নয়নের গুরুত্ব মানুষের কাছে ওভাবে আসবে না। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সব জায়গাতেই উন্নত করতে হবে। রেলওয়ে আইন যেটা আছে সেটা অনেক পুরানো। সে হিসেবে এই ক্ষতিপূরণের কোনো মূল্যই হয় না। এখানে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের মূল্য দিয়ে আইন প্রণয়ন করা দরকার ছিল। যারা এটা করেনি এটা তাদের ব্যর্থতা। এখন দেশ ডিজিটাল হয়েছে। কাজেই সকল ক্ষেত্রে এটা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের একটি মাপকাঠি রয়েছে। আমাদের দেশে সেরকম ব্যবস্থা নেই। যে সামান্য পরিমান ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় তার একটি স্ট্যান্ডার্ড মান থাকা উচিৎ। রেলওয়ে আইনে যে ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলা আছে সেটা এখন আপডেট করতে হবে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন আইন যেভাবে আপডেট হয়েছে একইভাবে রেলপরিবহন আইনটি যতদ্রুত সম্ভব আপডেট হওয়া উচিৎ বলে মনে করি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া এটা যাত্রী সাধারণের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। বর্তমানে রেলওয়েতে হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবং লক্ষ কোটি টাকা উন্নয়ন প্রকল্প চলমান আছে। এরমধ্যে অনেক প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। অর্থাৎ বাজেট যেখানে মেগা হয় সেখানে শুধু যাত্রী সাধারণের সহায়তার বিষয় আসলে সেটা ঠেকে যায়। বর্তমান সরকারের আমলে রেলের ভাড়া তিন দফা বেড়েছে। কাজেই ১শ বছর আগে যে দশ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে সহায়তা দেয়া হত সেটা এখন দিলে হবে না। এখন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আমরা চাই। আমরা মনে করি এই ক্ষতিপূরণের পরিমান নিহতের ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা, পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদেরকে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।

Thursday, November 7, 2019

যেসব কারণে বাড়ছে ক্যানসার by মরিয়ম চম্পা

জাকিয়া সুলতানা। পরিবারের সদস্যদের কাছে পরিচিত ছিলেন জাকি নামেই। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে সংসারের হাল ধরেন। বিয়েও হয়ে যায় অল্প বয়সেই। স্বামী-সংসার সামলিয়েছেন দুই হাতে। নিজে শিক্ষিত না হলেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সবে জীবনটা তার সামলে উঠেছিল। সন্তানরা সংসারের হাল ধরার চেষ্টায় ছিলেন।
ঠিক এ সময় ৪৮ বছরের এই নারীর জীবনে হানা দেয় ঘাতক ব্যাধি ক্যানসার। শুধু একটি মানুষের জীবনই নয়, তছনছ হয়ে যায় পুরো একটি পরিবার পরিবারের স্বপ্ন।
ক্যানসার এমন এক রোগ যা ব্যক্তির পাশাপাশি পুরো পরিবারের আর্থিক সংগতিতেও আঘাত হানে। তার ছেলে জহিরুল ইসলাম চন্দন বলেন, আমরা পরিবারের সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ভেঙ্গে পড়লেও মানসিকভাবে সবাই প্রস্তুত হই দ্রুতই। লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। গত বছর আমাদের কোনো ঈদ ছিল না। আমাদের কোরবানি ছিল লঞ্চে লঞ্চে। ঢাকায় আসি। এরপর এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতাল। একের পর এক টেস্টের কারণে মা’কে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বিলম্ব হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সিট পেতেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। শেষ পর্যন্ত সিটের ব্যবস্থা হয়। চিকিৎসকরা অবশ্য তার ক্যানসারের জন্য ভুল চিকিৎসাকে দায়ী করেন। এই লড়াইয়ে হেরে যান জাকিয়া সুলতানা। দুই মাস ১০ দিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে ইন্তেকাল করেন তিনি। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। চিকিৎসকরা এর জন্য পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করেছেন।
সাঈদার বয়স মাত্র ১১ বছর। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। গ্রামের বাড়ি বগুড়া। দেড় বছর আগে তার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ে। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সহায় সম্বল হারিয়ে পথে বসেছেন বাবা মুস্তাক আলী। তার পরেও মনোবল হারাননি। ভেঙ্গে পড়েননি মানসিকভাবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে সাহায্য তুলে মেয়ের চিকিৎসা করাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এ পর্যন্ত মেয়ের চিকিৎসাবাবদ প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কেমোথেরাপির পার্শপ্রতিক্রিয়ায় তার একটি চোখের আলো অনেকটা ফুরিয়ে এসেছে। অপর চোখটিতেও কম দেখতে পায়। তার বাবা বলেন, এখন তো আর পারি না। আগে যারা সাহায্য সহযোগিতা করতো তারাও এখন অনেকটা এড়িয়ে চলে। বাধ্য হয়ে স্কুল, কলেজ ও মসজিদ মাদ্রাসায় সাহায্য তুলি। বয়স কম হওয়াতে চিকিৎসকরা আশ্বস্ত করেছেন নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে থাকলে সাঈদা হয়তো সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাবে। এখন দুই শতাংশ জমির ওপর নিজের বসতভিটা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি হাসপাতালে এসেছেন সালাম। পেশায় রিকশা চালক। তিনি বলেন, দু-বছর আগে যখন স্ত্রী জামিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন তখন পরিবারে যেন এক দুর্যোগ নেমে এলো। ক্যানসার আমাদের মতো পরিবারের জন্য একটা বিরাট ধাক্কা। আমাদের তেমন পয়সা কিংবা সামর্থ্য নাই। স্ত্রীর ক্যানসার হওয়ার পর থেকে পরিবারের বাকি সব কিছুই যেন থমকে গেছে। এই যে চিকিৎসা করাতে ঢাকায় এসেছি, বাসায় তালা। আমার সংসার বলতে কিছুই নাই।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম মানসিক ধাক্কা সামলে ওঠার পর শুরু হয় আসল সংগ্রাম। অর্থের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। শুধু আর্থিক বিষয় নয়, একজন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘ দিনের সেবা, ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি- অনেক পরিবারেই সকল কর্মকাণ্ডে ছেদ তৈরি করে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে ক্যানসার ও কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিমাত্রায় রাসায়নিকযুক্ত ভেজাল খাদ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি। রোগী অনুপাতে চিকিৎসা সুবিধা এখনও পর্যাপ্ত নয়। ক্যানসার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোল্লা ওবায়দুল্লাহ বাকি বলেন, খাদ্যাভ্যাস দায়ী পাকস্থলী ক্যানসারের জন্য। এক্ষেত্রে শুধু ভেজাল খাবার নয় শাকসবজি কম খেলে পাকস্থলী এবং খাদ্যনালীর ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছ মাংস বেশি খেলেও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থকে। তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখ, খাদ্যনালী, কিডনি, পায়ুপথে ক্যানসারসহ সকল ধরনের ক্যানসার হতে পারে। ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি দায়ী হচ্ছে ধূমপান। অর্থাৎ পুরুষদের ফুসফুসে, মুখগহ্বরে, খাদ্যনালী ক্যানসার এগুলোর জন্য সবটাই দায়ী ধূমপান। মেয়েদের জরায়ু, ব্রেস্ট, মুখগহ্বরে বেশি হয়ে থাকে। ঘনঘন বাচ্চা হলে, কম বয়সে বিয়ে ইত্যাদি কারণে জরায়ু ক্যানসার হয়ে থাকে। আনুপাতিক হারে পুরুষরাই আক্রান্ত বেশি হয়। মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যানসারের জন্য স্থূলাকার, ওজন বেশি, জন্মনিয়ন্ত্রণকারী খাবার পিল, বংশগত কারণ দায়ী। ধূমপান, পান জরদা, গুল ইত্যাদি কারণে মুখগহ্বরে ক্যানসার হতে পারে। একক কোনো কারণে মানবদেহে ক্যানসার হয় না। সমষ্টিগত কারণে হয়ে থাকে। একেক দেশের আর্থসামাজিক কারণে একেক ধরনের ক্যানসার হয়ে থাকে। আমাদের সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী আমাদের দেশে মোট প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় দুই থেকে তিন লাখ মানুষ নতুন আক্রান্ত হচ্ছে। যার মধ্যে ৫০ ভাগই মারা যায়।
ক্যানসার সচেতনা বৃদ্ধিতে আমরা ঢাকা এবং ঢাকার বাহিরে প্রতি সপ্তাহে দুই বার ফ্রি ক্যাম্পেইন করে থাকি। এবং প্রতি এক থেকে দুই মাস পরপর আমরা বিভিন্ন স্কুল কলেজে ‘ক্যানসার এনসার’ নামে একটি অনুষ্ঠান করি। ক্যানসার সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে আমরা প্রায় ৫০ ভাগ ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারি।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেন বলেন, বর্তমানে ক্যানসারের জন্য আমাদের পরিবেশ সবচেয়ে বড় দায়ী। এর সঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপার আছে। আমাদের দেশে যত্রতত্র এক্সরে মেশিন রয়েছে। কোথাও দেখা যাবে টিনের বেড়া দিয়ে এক্সরে শুরু করে দিয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কারণ এই এক্সরে আমাদের পরিবেশের ব্যাকগ্রাউন্ডের যে রি-অ্যাকশন সেটা আরো উসকে বা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মানুষ আরো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া তামাকের কারণে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিদেশে প্রতি ১শ জনে তিন জন আক্রান্ত হয়। সেখানে আমাদের দেশে প্রায় ৩০ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে মানুষ তামাক বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করে। কাজেই আমরা এই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করলে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। যেহেতু পরিবেশ এর জন্য দায়ী। তাই ক্যানসার অসুখটা এমন এটা এক শ্রেণির মানুষের হবেই। এভয়েড করতে পারবে না। কিন্তু আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে। কারণ, যারা শুরুর দিকে চিকিৎসা করাতে আসে তারা চিকিৎসা সেবা নিয়ে বহু বছর পর্যন্ত বেঁচে আছে।
আমাদের দেশে সাধারণ আক্রান্ত হওয়ার পরে প্রথমে পানি পড়া, এরপর হুজুরের কাছে যায়। এরপর বিভিন্ন রকমের কবিরাজি করে। এই করতে করতে দুই বছর শেষ। তারপর যখন আমাদের কাছে আসে তখন শেষ পর্যায়ে। রোগীকে তিন থেকে চার জনে ধরে নিয়ে আসে। এই পর্যায়ে ক্যানসার না হয়ে আলসার হলেও তার বাঁচার কথা না। কাজেই শরীরে শক্তি থাকা অবস্থায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে আসতে হবে। অসুখ দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে স্থায়ী থাকলে স্থানীয় কোনো হাসপাতালে গিয়ে এক্সরে করিয়ে ডা. দেখালেই বোঝা যাবে তার ক্যানসার হয়েছে কি না। কারো তিন মাস ধরে কাশি হচ্ছে, কারো শরীরে বড় চাকা দেখা দিয়েছে। তারপরেও সে সচেতন না। এক্ষেত্রে আমরা চিকিৎসক, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মিডিয়া যদি বিষয়টি আরো বেশি করে প্রচার করি এবং রোগী শুরুতেই চলে আসে তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জিল্লুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগে আমাদের দেশে হাসপাতালগুলোতে ক্যানসারের এত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এখন হরহামেশাই ক্যানসারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাচ্ছে। এখন এমআরআই, সিটিস্ক্যান ও রক্তের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই ক্যানসার নিরূপণ করতে পারি। যেটা ১০ বছর আগে মানুষ করতে পারতো না। তা ছাড়া এখন মানুষ অনেক সচেতন। একজন অশিক্ষিত মানুষ শরীরে কোনো অংশে চাকা অনুভব করলে নিজে নিজেই ডায়াগনসিস করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। এখন মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে শরীরের কোথাও একটি চাকা হলেই সেটা থেকে টিউমার বা ক্যানসার হতে পারে।
সার্ভিক্যাল ক্যানসারের আক্রান্ত হয়ে একসময় আমাদের দেশের নারীরা অনেক বেশি সাফার করতো। আমাদের সার্ভিকাল ক্যানসার প্রজেক্ট বা নারীদের জরায়ুমুখে ক্যানসার এবং ব্রেস্ট ক্যানসার অ্যাওয়ার্নেস প্রোগ্রাম রয়েছে। এই দুটি ক্যানসারের সচেতনতা বেড়ে যাওয়াতে এখন প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করতে পারলে ক্যানসার শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। লিভার ক্যানসারের ক্ষেত্রে আমরা হেপাটাইটিস বি ভাইরাসটি যদি প্রতিরোধ করতে পারি তাহলে লিভার সিরোসিসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ফাস্টফুড বা ভাজাপোড়া খাবার, ঝাল খাবার, গ্রিল চিকেন-বিফ, স্পাইসি চিকেন-বিফ এগুলো পরিহার করতে হবে। এসব খাবারের সঙ্গে আমাদের পায়খানার রাস্তায় ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভেজাল খাদ্যের জন্য শুধু মাত্র ক্যানসার নয় অন্যান্য অসুখের পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পেতে আমাদের সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে আমরা যারা দায়িত্বশীল অবস্থানে আছি প্রত্যেককে সম্মিলিতভাবে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্যানসারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশ্ব ক্যানসার দিবসে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কতগুলো বেসিক বিষয়ে আমরা বিভিন্ন র‌্যালি এবং সমাবেশের মাধ্যমে জনগণকে ক্যানসারের কুফল সম্পর্কে জানিয়ে থাকি। পান, সিগারেট, জরদা, সুপারি, গুল এসব তামাকজাত দ্রব্যের কারণে মুখের ক্যানসার থেকে শুরু করে স্টোমাক, খাদ্যনালী, পায়খানার রাস্তায় পুরো জায়গাতেই ক্যানসারের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

Tuesday, October 22, 2019

প্রেস কর্মচারী থেকে ক্যাসিনো মালিক by মরিয়ম চম্পা

হাসান উদ্দিন জামাল মতিঝিলের স্থানীয় একটি প্রেসে সামান্য বেতনে কাজ করতেন। প্রেসের এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় পরবর্তীতে দেয়ালে নেতাদের পোস্টার সাঁটানোর কাজ পান। এর পরেই খুলে যায় জামালের কপাল। নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে নিজের ভাগ্য বদলাতে থাকেন তিনি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এর ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ এর ডান হাত বলে পরিচিত তিনি। মাথার উপর আর্শিবাদ ছিল গ্রেপ্তার হওয়া ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের। তার বদৌলতে ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদটিও বাগিয়ে নেন জামাল। ওয়ার্ড নেতা হয়েই তিনি অবৈধভাবে বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন।
ক্যাসিনো কাণ্ডে কাউন্সিলর সাঈদ এলাকাছাড়া হলে তার সম্রাজ্য দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন জামাল। তিনি এখন এ ওয়ার্ডে সভাপতি হওয়ার দৌঁড়ে আছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরে থাকা যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা ও কাউন্সিলর সাঈদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় তার। হাসান উদ্দিন জামালের গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন থানার পক্ষিয়া ইউনিয়নে। তার বাবার নাম হাবিবুল্লাহ।
তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। তিন ছেলে ও স্ত্রী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভোলায় থাকেন। সেখানে প্রায় ৭০ লাখ টাকা খরচ করে বিলাশবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। রয়েছে ভোলা শহরে আলিশান বাড়ি। সূত্র জানায়, নানা অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত জামাল অবৈধ উপায়ে অর্থ কামিয়েছেন। আরামবাগ ক্লাবে কাউন্সিলর সাঈদ যে ক্যাসিনো চালাতেন তার দেখভালের দায়িত্ব ছিল জামালের ওপর। মূলত জামালই সেখান থেকে টাকা সংগ্রহ করে সাঈদকে দিতেন। নিজে একটি বড় অংশ পেতেন। অনেকে জামালকেই এই ক্যাসিনোর মালিক বলে জানতেন। জামালের আরেকজন অন্যতম সহযোগী হচ্ছেন, মতিঝিল থানা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আবুল কাশেম মন্টু। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার কাজটি জামালের হয়ে করেন মন্টু। ভবন নির্মান থেকে শুরু করে যাবতীয় নির্মাণ কাজের জন্য তাদেরকে চাঁদা দিতে হয়। তাদের নির্যাতনের ভয়ে স্থানীয় লোকজন মুখ খুলতে ভয় পান। ফকিরাপুল ক্লাবের পাশে আজাদ বয়েস ক্লাব। সেখান থেকে প্রতি মাসে জোর পূর্বক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন। টাকা দিতে না চাইলে মারধর করেন। ঢাকার শনির আখড়া ও রায়েরবাগে রয়েছে জামালের নিজস্ব বাড়ি ও ফ্ল্যাট। সোনারগাঁয়ে তার নিজস্ব জমি আছে। ভোলায় তার কয়েক কোটি টাকার ইলিশের ব্যবসা আছে। ৪০ থেকে ৫০টি ট্রলারের মালিক তিনি। ৮ থেকে ৯ টি ড্রেজার মেশিন রয়েছে তার। রয়েছে নামে বেনামে অনেক টাকা ও সম্পদ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জামাল এবং মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের নেতা মাহমুদুল হাসান কাউন্সিলর সাঈদের অবর্তমানে তার কাজ করছেন। মাহমুদুল হাসান কাউন্সিলর সাঈদের ভাগিনা। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার আগে সাঈদের বাসা থেকে ক্যাসিনোর যাবতীয় সরঞ্জামাদি সরিয়ে ফেলেন জামাল ও হাসান। কাউন্সিলর সাঈদের বাসার চাবি থেকে শুরু করে কাউন্সিলর কার্যালয়ের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন জামাল। এখনো তিনি আরামবাগ হাজির বিল্ডিং, মতিঝিল মার্কেটসহ একাধীক স্থানের ভাড়া তোলেন। ভুক্তভোগী যুবলীগের একজন নেতা বলেন, প্রতিনিয়ত হুমকি ধামকির মধ্যে আছি। একেক সময় একেক নাম্বার দিয়ে ফোন করে হুমকি দেয়। কখনো বলা হয় দুই দিন কখনো তিন দিন কখনোবা সাত দিনের মধ্যে খুন করা হবে বলে হুমকি দেয়। ভুক্তভোগী আরেক নেতা বলেন, জামালের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিবাদ করলে সে আমাকে হুমকি দিত। বলতেন, ‘আপনি এলাকায় আমাকে সময় দেন না! রাজনীতিতে সময় দেন না।
বিষয়টি ভালো হচ্ছে না। আমার বিষয়ে কোথাও মুখ খুললে ভালো হবে না। চুপচাপ থাকেন। দলের আরেক নেতা ও মতিঝিলের বাসিন্দা বলেন, আমার পুরোনো ব্যবসা আছে। মিছিল মিটিং এ যেতে না চাইলে বাধ্য করে। দলীয় কিছু ছেলেদের দিয়ে লাঞ্চিত করে। তিনি বলেন, আমরা দুর্দীনের কর্মী। কিন্তু কোনো মূল্যায়ন আমরা পাইনা। সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। জামালকে ক্যাসিনোর মালিক বানানো হয়েছে। বাফুফের পিছনে ভ্যানগাড়ির স্ট্যান্ড, পুরো ৯ নং ওয়ার্ডের সিকিউরিটি নিয়ন্ত্রণের নামে বড় একটি অংকের টাকা যেত জামালের পকেটে। জামাল ওয়ার্ড যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে নেতাকর্মীদের নিয়ে নৌ বিহারে যান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। নৌবিহারেই সম্রাট জামালকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির ঘোষণা দেন বলে নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। সম্রাটের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই মুলত জামাল চাঁদাবাজিতে নামেন। অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করতে জামালকে এলাকায় পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত তিনটি ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ পাওয়া যায়।

Friday, October 18, 2019

রক্তাক্ত ক্যাম্পাস: সনি থেকে আবরার by মরিয়ম চম্পা

বুয়েট ক্যাম্পাসে সাবিকুন নাহার সনি স্মৃতিফলক ফিরিয়ে নেয় প্রায় দেড় যুগ আগে। বুয়েটে সে সময় ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ হারান মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি। সনির রক্তমাখা দেহ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। ২০০২ সালের ৮ই জুন টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে  গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সনি। কেমিকৌশল বিভাগের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনির মৃত্যুতে সেদিনও জ্বলে উঠেছিল গোটা দেশ। শোকে, বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। এরপর ২০১৩ সালে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে বুয়েট। আর সম্প্রতি গভীর রাতে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্যে দিয়ে নতুন করে যুক্ত হলো এক কালো অধ্যায়।
২০০২ সালে সনি হত্যার বিচারের দাবিতে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।
দেশের সচেতন মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন জানান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিবাদ ও আন্দোলনের একপর্যায়ে গঠিত হয় ‘সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্য’। ৬৩ দিন বন্ধ থেকে বুয়েট খোলার পরে শুরু হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। একদিকে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। অন্যদিকে আন্দোলনে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে আন্দোলন না করার জন্য শিক্ষকদের হুমকি, কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনের বিরোধিতা ছিল প্রকাশ্যে। এতকিছুর পরও সনির হত্যাকারীদের শাস্তি আজও হয়নি। হাইকোর্টে দন্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।  সে সময় টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বুয়েট ছাত্রদল সভাপতি মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের টগর গ্রুপ। দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের সামনে সাবেকুন নাহার সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। নিম্ন আদালতে মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০০৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত এসএম মাসুম বিল্লাহ ও মাসুমকে খালাস দেন হাইকোর্ট। পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ প্রাপ্ত মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত পালিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। পলাতক রয়েছেন নুরুল ইসলাম সাগর ওরফে শুটার নুরু। জেলে রয়েছেন টগর।
২০১৩ সালে এক সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বুয়েটের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকে। দ্বীপ বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দ্বীপের ওপর হামলার ঘটনায় চকবাজার থানায় তার ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেজবাহকে আটক করে। গ্রেপ্তারের পর থেকে  মেজবাহ কারাগারে আছেন।
সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর গভীর রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের ভেতরে তাকে হত্যা করা হয়। কক্ষটিতে ছাত্রলীগের নেতারা থাকতেন। বুয়েটের শেরেবাংলা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী একদল নেতাকর্মী তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। হল শাখা ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, আবরারকে জেরা ও পেটানোর সময় ওই কক্ষে অমিত সাহা, মুজতাবা রাফিদ, ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরও কয়েক শিক্ষার্থী ছিলেন। একই কক্ষে এসে দ্বিতীয় দফায় আবরারকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ অনেকে। ইতোমধ্যে আবরার হত্যার অভিযোগে পুলিশ ১৬ জনকে আটক করেছে।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সত্যিকার অর্থে যারা বুয়েটের মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তারা তো অনেক মেধাবী। মেডিকেল ইঞ্চিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়াটা একটি কঠিন ব্যাপার। ভাল ছাত্র না হলে পারে না। সেখানে ভিসি বা অন্যান্য শিক্ষক যারা আছেন তাদের অজান্তে এই ধরনের ঘটনা ঘটে এটা তো দুঃখজনক। আমার মনে হয় আবরার হত্যাকান্ডের বিষয়টি প্রশাসন খুব শক্ত হাতে গ্রহণ করেছেন। যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিচার হবে। সেটা আমরা প্রত্যাশা করছি। এসকল হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে বিচার না হওয়াটাই দুঃখজনক। আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলাম যে, নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে হবে। বিচার একবার শুরু হলে কোনো অবস্থায় মূলতবি করা যাবে না। এবং সাক্ষী হাজির করা যার দায়িত্ব তাকে অবস্যই সঠিক সময়ে হাজির করতে হবে। না হলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এবং তারাতারি বিচার কাজ শেষ করা হবে। মনে হচ্ছে, তদন্তকারী সংস্থা অতি দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দিবেন। এবং বিচার কার্য শুরু হবে।
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার যে আধিপত্য, সরকারের যে ভূমিকা সেখান থেকেই সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার সবসময়ই ভয় পায়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণ শিক্ষার্থীদের যে শক্তি সেটার যে কোনো ধরনের বিকাশকে তারা সবসময় রুদ্ধ করতে চেষ্টা করে। শিক্ষকদের স্বাধীন মত যেন না থাকে সেটার বিষয়েও তাদের একটি উদ্বেগ থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যে কোনো ক্ষমতাশীল ছাত্র সংগঠনের অনুমোদিত হয়ে থাকে। তার মানে সরকারের ভূমিকাটা হচ্ছে এখানে কেন্দ্রীয়। এক্ষেত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠন এবং দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের সঙ্গে একটি জোট তৈরি হয়। যেখানে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে পরে। সমস্ত স্বাধীন তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হয়। সেটার কারনে আমরা দেখি আবরার হত্যাকান্ডের আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের নির্যাতন নীপিড়নের অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেহেতু সরকার এবং ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এগুলো হয়। তাদের নীরব সম্মতিতে এই ঘটনাগুলো ঘটে। অপরাধিরা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পায় সে কারনে এই হত্যাকান্ডের বিচার হয় না।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, এটা যেহেতু একটি ক্রিমিনাল কেইস কাজেই সেখানে তো রাজনৈতিক কোনো কিছু কাজ করার কথা না। এক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো দলই মনে হয় না বাধার সৃষ্টি করবে। একটি মামলা ট্রায়ালে উঠলে বিচারিক প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে আবরার হত্যাকান্ডের ঘটনাটি আসলেই দুঃখজনক। এখানে পুলিশ কিংবা তদন্ত কার্যের গাফিলতি হওয়ার কথা না। বা এখানে রাজনৈতিকভাবে কেউ ইন্টারফেয়ার করবে এটা আমার মনে হয় না।

Tuesday, October 15, 2019

আবরারের ছবিতে ভিজেছে হাজারো চোখ by মরিয়ম চম্পা

সম্প্রতি বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নাড়া দিয়েছে সারা দেশের মানুষকে। দলমত নির্বিশেষে কাঁদিয়েছে সবাইকে। আবরারের জন্য কেঁদেছে পুরো দেশ। আবরারের খুনিদের বিচারের দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল হয়ে গেল বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দুই ধাপে এ পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ হাজার শিক্ষার্থী। এসেছিলেন কয়েক হাজার অভিভাবক। আবরারের খুনীদের শাস্তির দাবিতে চলা আন্দোলনে বুয়েট ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে এখন শুধু আবরারের ছবি। নির্মম নির্যাতনের শিকার জীবন হারানো আবরারের এই মুখ দেখে গতকালও কেঁদেছেন হাজারো মানুষ।
পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের অনেকে হয়েছেন আবেগ আপ্লুত।
আবরারের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এক পরীক্ষার্থীর মা। তিনি বলেন, আমার মেয়ে মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে পাশ করেছে। তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে এসেছি। ওর সঙ্গে আবরারের বিষয়ে খুব একটা আলোচনা করিনি। ঘটনার পরে সবাইতো আমরা ওর জন্য কেঁদেছি। এখন মনে হয় ও যেন আমাদের সবার নিজেদেরই ‘আবরার’। এখন সে আমাদেরই। আমি ওর মা হলে বলতাম, আবরারকে যেভাবে মারা হয়েছে ওদেরকে যেন ঠিক একইভাবেই মারা হয়। তাহলে ওরা বুঝবে যে আবরার কতটুকু কষ্ট পেয়ে মরেছে। ওই মূহুর্তে ওর কত কষ্ট হয়েছে। অন্যভাবে মরলেতো ওরা আবরারের মৃত্যুর কষ্ট বুঝবে না। এটা নিয়ে এতো আলোচনা সমালোচনার কিছু নেই। আবরারের আরেক মা হিসেবে আমি বলবো, আবরারের মত করেই খুনিদের মারা হোক। আবরারও নেই। কাজেই ওরাও থাকবে না। আবরারের তো কোনো দোষ ছিল না। ও কোনো দোষ না করে যেহেতু নেই। তাহলে দোষ করে ওরা কেনো থাকবে। ওদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। ওরা বেঁচে থেকে আবার কোনো নিরপরাধ মানুষকে থেকে থেকে মারবে। এটা তো হয় না। এক পরীক্ষার্থী কান্না করে বলেন, আবরার হত্যার ঘটনায় আমি অনেক কেঁদেছি। এখানে এসে আমি আর মা দেয়ালের গ্রাফিতি দেখে কেঁদেছি। আজ হয়তো সে বেঁচে থাকলে পরিবেশটা অন্যরকম হতো। আমরা চাই, আবরারের নামে একটি হল তৈরি করা হোক। যেটার নাম থাকবে ‘শহীদ আবরার হল’। মা-বাবা আমাকে কোনো মোবাইল ফোন দেখতে দেয়নি। মোবাইল সবসময় তাদের কাছে রেখেছে। এগুলো দেখে মন মানসিকতা খারাপ হয়ে গেলে হয়তো পরীক্ষা খারাপ হতে পারে।
একজন পরীক্ষার্থী সঙ্গে আসা তার বোন বলেন, আমি গাজিপুরে জয়দেবপুর গভ. গার্লস হাইস্কুলে পড়ি। ভবিষ্যতে এখানে পড়তে চাই। তাই ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে এসেছি। ক্যাম্পাস ভালো লেগেছে। আবরার ভাইয়াকে যেভাবে মারা হলো এবং তাকে যারা মেরেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিৎ দ্রুততম সময়ের মধ্যে। পরীক্ষা দিতে আসা এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমরা স্বীকার করি আর না করি বুয়েট প্রশাসন তো আসলেই খারাপ। একটি ভালো শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র পড়া দিয়ে আটকালে হবে না। পাশাপাশি তাকে অনেক কিছু শিখাতে হবে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে যে সকল মন্তব্য করা হচ্ছে ভিসি তো আসলেই তাই। একজন পরীক্ষার্থীর ব্যাংকার বাবা বলেন, আমার ছেলে পরীক্ষা দিতে এসেছে। সে যদি চান্স পায় তাহলে এখানেই ভর্তি করাবো। আমার বিশ্বাস যে এর একটি সঠিক বিচার হবে। সঠিক বিচার হলে ছাত্ররা এখানে নিরাপদে পড়ালেখা করতে পারবে। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে রাজনীতি নেই এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বুয়েট ছিল অন্যতম। এখানে নেই কোনো সেশন জট। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখা শেষ করে চার বছরের মধ্যে কৃতিত্বের সঙ্গে ভালো ফলাফল করে বের হয়ে যাচ্ছে। বাকী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে অপরাজনীতি রয়েছে সেখানে সবসময় একটি টেনশন কাজ করে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে। আমার মনে হয়, সারা বাংলাদেশে সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। এখন ছাত্র রাজনীতি মানে ক্যাম্পাসের হলে বসে মদ, গাজা খাচ্ছে। জুয়া খেলছে। নানা ধরনের অঘটন ঘটাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপর টর্চার করছে। পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট করছে। বাংলাদেশের সেরা মেধাবী ছাত্রগুলো বুয়েটে পড়ে। সেই বুয়েটে আমরা জীবন্ত ছেলেকে পড়তে দিচ্ছি আর তার মৃত লাশ এখান থেকে নিতে হচ্ছে। উত্তরা রাজউক কলেজের শিক্ষার্থী এবং বুয়েটের পরীক্ষার্থী বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে খুনিদের গ্রেপ্তার করার পর মনে হয়েছে, এখন মনে হয় এখানে (বুয়েটে) পড়া যাবে। নিরাপদে পড়তে পারবো। এর আগের পরিবেশ সম্পর্কে ভালো জানা ছিল না। তবে আবরার হত্যাকাণ্ডের কারণে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছিল। আমরা চাই আবরার হত্যাকারিদের উপযুক্ত শাস্তি হোক। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থী বলেন, আবরার ভাই যে হলে থাকতেন সেই শেরে বাংলা হল দেখতে গিয়েছিলাম। অনেক খারাপ লেগেছে। কান্না পেয়েছে। আইটি ফার্মে কর্মরত এক নারী অভিভাবক বলেন, আমার ছোট বোন মিরপুর হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে পাস করেছে। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আমরা ওর পরীক্ষা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। বুয়েটের মতো যায়গায় শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে সেটা জানা ছিল না।

Sunday, October 13, 2019

ছাত্ররাজনীতির লাগাম টানার পক্ষে বিশিষ্টজনরা by মরিয়ম চম্পা

শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার জেরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়ে দেশের বিশিষ্টজনরা বলছেন, এভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ করে এসব অনাকাঙ্খিত হত্যাকাণ্ড এবং দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা সম্ভব নয়। বরং আইন প্রয়োগের কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম শৃঙ্খলা পালনে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এড়ানো গেলে পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নি:সন্দেহে আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় নির্দেশ করে। তরুণদের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করবে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক মানুষেরা। যতক্ষণ পর্যন্ত না এই মানবিক গুণ তাদের মধ্যে সঞ্চার করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি কোনো উন্নতির আশা করি না। যেটা খুবই কঠিন কাজ মনে হয়। আমি মনে করি না যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা দরকার।
কারণ খুন-যখম করা তো ছাত্ররাজনীতি না। টেন্ডারবাজিতো ছাত্ররাজনীতি না। রাজনীতির নামে এগুলো হচ্ছে। রাজনীতি মানেই সুস্থ্য রাজনীতি। গুন্ডামি বা অসুস্থ্যতা চলে না রাজনীতিতে।

ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা না। কথা হল রাজনীতির যে অধ:পতন হয়েছে ওটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। কতগুলো লোক দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস করছে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনাটা কর্তব্য। এখন এখানে রাজনীতি বলতে তারা কি বোঝায় সেটাওতো তারা বলছে না। রাজনীতি বলতে মানুষ কি রাজনৈতিক আলোচনা করবে না। রাজনীতির চিন্তা থাকবে না। রাষ্ট্র আছে। এর বাইরে রাজনৈতিক দল আছে, অন্য রাজনৈতিক দল আছে। বুয়েটে যেটা ঘটেছে সেটা হল এক দলীয় নির্যাতন। সরকার সমর্থক একটি মাত্র দল ওখানে আছে। তারা অন্য সকল মতের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, নির্যাতন করে, মানুষ মেরে ফেলে সেটা এখন বন্ধ করা দরকার। এখন মাথায় ব্যাথা হয়েছে বলে মাথাই কেটে ফেলতে হবে এটা তো কোনো কথা হল না। এটা করলেই তো রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে না। গোপনে চলবে। এটাতে মৌলবাদীদের খুব সুবিধা হবে। ওরা তৎপরতা চালাবে। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। মসজিদে আলোচনা করবে। এতে করে ওদেরই সুবিধা হবে। আর যারা গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল রাজনীতি করে তারা মুখ থুবড়ে পড়বে। গোপন রাজনীতি তো চলবে। মৌলবাদী রাজনীতি গোপনে চলবে। এটা না বুঝে ঢালাওভাবে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা ঠিক না। অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। তাদের শাস্তি দিলেই তো বোঝা যাবে অপরাধ করা চলবে না।

গণসাক্ষরতা অভিযানের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনে একটি কারণ হিসেবে তো চিহ্নিত। কিন্তু এখন আরেকটি দিক আছে যেটা হল মাথা ব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলবে কি না। না কি এটার চিকিৎসা করবে। মূল কারণটি আবিষ্কার করতে হবে। কারণ দূর করার জন্য মনে করা হচ্ছে এটি একটি পন্থা। কিন্তু এটা যে অন্যরূপে আবার দেখা দিবে না তার নিশ্চয়তা কি। এক্ষেত্রে যাতে কোনোভাবেই এটা ক্যাম্পাসকে কুলসিত না করতে পারে। ছাত্রদের মন মানসিকতাকে যাতে নিকৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে না পারে সেই জায়গাটিতে হাত দেয়া খুব প্রয়োজন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হয়তো এটাকে একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী একটি ব্যবস্থা নিতে হবে। যেটার ফলাফল আরো ভালো হবে।

অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ছাত্ররাজনীতি আর সরকারি ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতিতো এক কথা না। ছাত্র রাজনীতি আর সন্ত্রাস এক কথা না। আবরার হত্যাকাণ্ডের পরে যে ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ করেছে এই প্রতিবাদের কারণেই কিন্তু এখন আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচারের অগ্রগতি হচ্ছে। এবং নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো সেগুলো প্রকাশিত হচ্ছে। এই প্রতিবাদের কারণেই নির্যাতন নিয়ে নির্যাতন বিরোধী একটি সামাজিক জনমত তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আজকে যে আন্দোলনটা করছে এটা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া মানে হচ্ছে এই ধরণের প্রতিবাদ করা যাবে না। রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া মানে হচ্ছে স্ট্যাটাসকো। স্ট্যাটাসকো মানে হচ্ছে ক্ষমতাবানদের যে আধিপত্য সেটাকে প্রশ্ন করার যে রাজনীতি সে রাজনীতি। সে রাজনীতিটা থাকতে হবে। এটা হচ্ছে একটি বিপদজনক পরিস্থিতি। তিনি বলেন, প্রশাসনে শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি গণতান্ত্রিক সম্পর্ক বিকশিত হবে এটাই হচ্ছে সমাধান। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আরো ক্ষমতায়ন করা। প্রশাসনের সঙ্গে আরো বেশি যুক্ত করা। প্রশাসনকে স্বচ্ছ করা। হলগুলোতে যে ভয়ের রাজনীতি তৈরি হয়েছে সেটা থেকে শিক্ষার্থী, প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করা। এটাই হচ্ছে পথ। সেই পথটিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আমরা এই অরাজক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত পেতে পারি।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, বুয়েটে রাজনীতি ছিলোই না। বুয়েটে এতদিন পর্যন্ত একটি দলের কিছু গুন্ডাপান্ডা ছিল। কিন্তু অন্য কোনো দল ওখানে যেতে পারত না। বুয়েটে রাজনীতি এমনিতেই ছিল না। রাজনীতি নামক যে জিনিসটি সেটা এমনিতেই বন্ধ ছিল। রাজনীতি বন্ধ মানে হচ্ছে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ভিক্তিক ছাত্ররাজনীতিক দল তাদের রাজনীতি বন্ধ। তারা এখানে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। রাজনীতি জিনিসটি এমন এটা কেউ বন্ধ করে রাখতে পারে না। রাজনীতি এখানে বেরিয়ে আসেই। এখানে যদি বলে যে ছাত্ররাজনীতি নামক যে প্রতিষ্ঠানগুলো সেগুলো রাজনীতির চেয়ে গুন্ডামি খুন-খারাবি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি এগুলো করছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা দিতে হবে কতটুকু করতে পারবে আর পারবে না। আমাদের এখানে ছাত্ররাজনীতি বলতে যেটা আছে সেটা কোনো রাজনীতি না। এটা খুন-খারাবি। ক্যাম্পাস পলিটিকস-এ অংশগ্রহণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরকম ভাবে আছে। এবং সেজন্য রাজনীতি কেউ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। রাজনীতি তার নিজস্ব পথে বিকাশিত হয়। কিন্তু এখানে বুয়েট কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা উচিৎ যে তারা কি এটা মিন করছেন।

তিনি বলেন, যখন ছাত্রদের আঠারো বছর বয়স হবে তারা দেশের ভোটার হবে। তাদের পছন্দমত রাজনৈতিক দলে যোগদান করতে পারবে। সেখানে তারা রাজনীতি করবে। কাজেই ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলের হয়ে পার্টি করতে হবে, দলের হয়ে মারামারি করবে এটা কোনো প্রয়োজন নেই। যারা রাজনীতি করার তারা করবেই। সংগঠন করুণ। কিন্তু কোনো সংগঠনের কাজ ক্যাম্পাসে করতে পারবে না। ক্যাম্পাসের খাতিরে এতটুকু সীমাবদ্ধতা মানতে হবে। যেটা হয়েছে সেটা ক্যাম্পাসের শান্তি ভঙ্গকারী কর্মকাণ্ড হয়েছে। এটাকে রাজনীতি বলা হয় না।

Thursday, October 10, 2019

বুয়েটে জুনিয়রদের ভয়ঙ্কর রাত by মরিয়ম চম্পা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দু’দিনের সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয় বৃহস্পতিবার থেকে। সারা সপ্তাহ ক্লাস শেষে বৃহস্পতি এবং শুক্রবার দু’দিন তাদের সাপ্তাহিক ছুটি। বুধবার সন্ধ্যা থেকে দু’দিনের জন্য ক্লাস-পরীক্ষার চাপ কমে যায়। কিন্তু এই বুধবার রাতই বিভিন্ন হলের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে আতঙ্ক হয়ে আসে। কারণ এই রাতেই হলের ছাত্রলীগ নেতা বা সিনিয়রদের কাছে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ বিষয়ে শেরে বাংলা হলের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, বুয়েটে মূলত সে সকল শিক্ষার্থীরাই চান্স পেয়ে থাকেন যাদের মাথা ঠান্ডা। কারণ মাথা গরম শিক্ষার্থী কখনোই ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো বিষয়ে পড়তে পারে না। আমাদের ক্লাসের পড়া থেকে শুরু করে জীবনের সব সিদ্ধান্তগুলোই ঠান্ডা মাথায় নিতে হয়।
সপ্তাহে ছুটির দুদিন শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটা ঈদের মতো। কারণ এই সময়টাতে আমরা নিজেদের মতো করে সময় কাটাই। আর সাপ্তাহিক ছুটি মানে আমরা বুধবার রাত থেকে হিসাব করি। কিন্তু এই রাতটিই আমাদের কাছে ভয়ের এবং আতঙ্কের। কারণ হলের সিনিয়র ভাইয়েরা বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা এই রাতটিকে তাদের টর্চার বা র‌্যাগিংয়ের উপযুক্ত রাত হিসেবে ব্যবহার করে। এই রাতে তারা মদসহ যাবতীয় নেশা করে এক্সট্রা পেনিক হিসেবে জুনিয়রদের পিটিয়ে বাড়তি আনন্দ পায়।

একই হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমি যখন প্রথম বর্ষে তখন আমার ভাগ্যে এই ভয়ংকর বুধবার রাতটি একবার এসেছিল। হলের প্রতিটি রুমে মূলত চারজন করে শিক্ষার্থী থাকে। আমাদের রুমে বাকী দুজন রুম মেটের মাথা ঠান্ডা থাকলেও আমার আর আমার পাশের বেডের রুম মেট উত্তপ্ত মেজাজের। কোনো অন্যায় দেখলে মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। আমরা নিজেদের মতো করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতাম। কিন্তু এটার জন্য যে বড় ভাইদের ভয়ংকর র‌্যাগিংয়ের শিকার হব সেটা বুঝতে পারিনি।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কোনো এক বুধবার রাতে আমি আর আমার রুমমেটের ডাক আসে। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাম্প দিয়ে আমাদের পিঠে আর নিতম্বে এলোমেলো ভাবে পিটানো শুরু করে। এরপর আমাদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়। আমাদের দোষ ছিল একটাই আমরা তখন সমসাময়িক রাজনৈতিক কোনো একটা বিষয় নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।

তিতুমীর হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি এখনো রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনা। প্রায় রাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। হলে আসার পর বড় ভাই এবং তাদের দলের নেতাদের সঙ্গে কেন রুমে গিয়ে দেখা করিনি। সালাম-আদাব দেইনি। অজান্তে কোনো এক বড় ভাইয়ের সামনে দিয়ে তার আগে হেঁটে গিয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার দোষ। হঠাৎ এক ছুটির দিন রাতে আমাকে ডাকা হয়। গণরুমে গিয়ে বড়ভাইদের সালাম দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি না করাতে মূলত আমাকে ডাকা হয়। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাকে বললো, রাখি সাওয়ান্তের মতো নেচে দেখা। আমি লজ্জায় কেঁদে ফেলি। এসময় হঠাৎ একজন এসে আমাকে পেছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। সেও জুনিয়র ছিল। উঠে দাঁড়ালাম। এরপরে কি হয়েছে মনে করতে চাই না।

সোহরাওয়াার্দী হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। কারণ, হলে আসার পরেই যে সকল জুনিয়ররা রাজনীতিতে যোগ দেয় তারা প্রথম দিকে একটু ভীতু প্রকৃতির থাকে। ভয় ভাঙ্গানো, হাত পাকানো এবং সাহস বাড়াতে তাদের দিয়ে জুনিয়রদের পিটানো হয়। এসময় বড় ভাইরা পাশ থেকে বলেন, ভালো করে হাত পাকা। ভবিষ্যতে কাউকে মারতে যেন হাত বা বুক না কাপে। আমরা আছি। চালিয়ে যা। এভাবে জুনিয়রদের দিয়ে জুনিয়রদের পেটানো হয়।
ড. এম. এ. রশীদ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসের হলগুলোতে জুনিয়রদের র‌্যাগিং-এর বিষয়টি খুবই কমন। আবাসিক হলে আছে অথচ ছোট বড় র‌্যাগিং এর শিকার হয় নি এমনটা নেই বললেই চলে। চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, বাজে গালি শোনা এগুলো নিত্য নৈমত্যিক। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে হলে ভিন্নমতাদর্শী বিকল্প কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। ফলে একচোটিয়াভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন রাজত্ব করে যাচ্ছে। কাজেই হলে থেকে তাদের মতাদর্শের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কথা বলার দুঃসাহস দেখানো প্রায় অসম্ভব। যারা কোনো রকমের দলাদলি এড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করতে চায়, তারাই মূলত ছাত্রলীগ নেতাদের রোষানল এবং নির্যাতনের শিকার বেশি হন। কেউ নিয়মিত নামাজ-রোজা করলেই তাকে ‘শিবিরকর্মী’ ট্যাগ দেয়া হয়। সে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হলেও।

আহসান উল্লাহ হলের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, যখন প্রথম বর্ষে তখন বড় ভাইদের দ্বারা র‌্যাগিং এর শিকার হয়েছি। এখন সিনিয়র হয়েছি। কিন্তু কাউকে তো কখনো র‌্যাগিং করিনি। এটা সম্পূর্ণরূপে কুরুচিপূর্ণ একটি কাজ। এটা যারা করে তারা একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার জন্যই মূলত করে। বুয়েটে পড়ালেখার এতো চাপ থাকা সত্বেও তারা এসব করার সময় পায় কখন ভেবে পাই না।

Wednesday, October 9, 2019

হলে হলে টর্চার সেল by মরিয়ম চম্পা

হলে হলে টর্চার সেল। কোথায় নেই? বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা কলেজের হোস্টেলগুলোতে রয়েছে টর্চার সেল। সব হলে শাস্তি পদ্ধতি প্রায় একই ধরনের। টার্গেটে থাকা শিক্ষার্থীকে টর্চার করার আগে দেয়া হয় বিরোধী কোনো সংগঠনের তকমা। এরপর বড় ভাইয়ের কক্ষে কিংবা তার পরের পদ পদবিধারি ভাইয়ের কক্ষকেই মূলত টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাঝে মাঝে হলের ছাদকে নিরাপদ টর্চার সেল বানানো হয়। বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার হোসেন ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের সবগুলো হলে মানবজমিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। হলে থাকা শিক্ষার্থীরা জানান, প্রায় সবগুলো হলেই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের টর্চার সেল।
শেরে বাংলা হলেই তিনটি টর্চার সেল বা রুমের খোঁজ মিলেছে।   
এসকল সেলে বসে ছাত্রদের মারের টু শব্দটিও জানতে পায় না পাশের রুমের শিক্ষার্থীরা। হলে থাকা ভুক্তভোগী একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, মারার সময় তাদের মুখ গামছা দিয়ে বেধে নেয়া হয়। আবরারের বেলাতে তাই ঘটেছিল। আবরারকে যে ভবনে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ওই ভবনের শিক্ষার্থীরা জানায় তাকেও মুখে গামছা বেধে নেয়া হয়েছিল বলে তারা মনে করছেন। শেরে বাংলা হলে টর্চারের শিকার ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের হলে ২০০৫, ২০১১, ৩০০৮ নং তিনটি রুমই মূলত টর্চার সেল হিসেবে একেক সময় ব্যবহার করা হয়। জিএস রাসেলসহ আরো কয়েকজন মিলে এই টর্চারের লিড দিতেন। দেড় বছর আগে আমাকে শিবির বলে মারা হয়েছিল। ওরা কাউকে টার্গেট করলে প্রথমেই তার ফোন, ল্যাপটপ অনুসন্ধান করে দেখে সে ভিন্ন কোনো দলের সমর্থক কি না। ফেসবুকে কি ধরনের পোস্ট দেয়। কোন পেইজে লাইক দেয়। কোনো শিক্ষার্থী ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর যদি তাদের মনে হয় এটা তাদের পছন্দ হয়নি। তখনই তাকে রুমে ডেকে মারধর করে। ২০১১ নং কক্ষের তিনজন এখনো পলাতক। যারা আবরারকে মারের সময় ছিল। বুয়েটের জিমনেশিয়ামে নিয়েও মারা হয়। মারের ঘটনাগুলো মূলত শুরু হতো রাত ১২ টার পর। সম্প্রতি দুই শিক্ষার্থীর কান ফাটানোকে কেন্দ্র করে আমরা বিচার চাইলেও ভিসি গুরুত্ব দেননি। আবরারকে যে কক্ষে নির্যাতন করা হয় তার পাশের রুমে থাকা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী বলেন, আমি প্রায়ই বাসায় যাই। আবার হলেও থাকি। ঘটনার দিন রাতে আমি রুমে পড়ছিলাম। যখন বুয়েটের ডাক্তার আসে তখন আবরারের বিষয়টি জানতে পারি। এ ধরনের মারধরের ঘটনা নতুন নয়। এই কক্ষে প্রায়ই এই ধরনের ঘটনা ঘটে। চলতি সপ্তাহে একই কক্ষে আরো দুজনকে মার ধরের ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি চোখের সামনে দেখছি একজনকে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটানো হচ্ছে, তখন যদি থামাতে যাই আমার অবস্থা কি হবে একবার ভেবে দেখেন। আমি গেলে আমাকেও তারা শিবির বানিয়ে দিবে।
আবরার যে ফ্লোরে থাকতেন সেখানকার দুই শিক্ষার্থী বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আমরা দুজনেই ওদের টর্চারের শিকার হয়েছি। ওরা শিক্ষার্থীদের মারধরের জন্য ছুটির সময়টা বেছে নেয়। বুধবার, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার রাতগুলোকে ওরা মারের জন্য উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয়। বিশেষ করে বুধবার রাত হচ্ছে প্রথম বর্ষের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ংকর রাত। গত এক বছর আগে র‌্যাগিং এর কারণে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। যখন যেখানে সুবিধা সেখানে নিয়ে তারা র‌্যাগ দেয়।
সোহরাওয়ার্দী হলের সিএসসির শিক্ষার্থী বলেন, র‌্যাগিংয়ের ঘটনা প্রত্যেকটি হলেই আছে। কোনোটা প্রকাশ পায় কোনোটা পায় না। একমাস আগে আমাদের হলে একজন শিক্ষার্থীর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। আমাদের হলে নির্দিষ্ট কোনো রুম মেনটেন করা হয় না। এটা নির্ভর করে তাদের ইচ্ছার ওপর। তারা দেখে কোন রুম ফাঁকা আছে সেখানে নিয়েই ছেলেদের পিটানো হয়।
ড. এম. এ. রশীদ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, মারামারির ঘটনা এখানে প্রতিমাসেই কম বেশি হয়। তবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। আবরার মারা যাওয়াতে তার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। বাকিদেরটা পায় না। পাঁচ মাস আগে আমাদের হলে ডাইনিং ম্যানেজার শিক্ষার্থীকে এক জুনিয়রকে দিয়ে পিটানো হয়েছে। আমাদের হলেও টর্চারের জন্য রুম আছে। যেটা সব হলেই থাকে। ভবনের দুপাশের চার তলায় টর্চার রুম আছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের রুমগুলোই মূলত টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমাদের হলে প্রায় পাঁচ শ’র মতো শিক্ষার্থী আছে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে এই ধরনের ঘটনার কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। আমাদের ১৫ তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীকে সাত থেকে আট মাস আগে একটি রুমে নিয়ে হাত পা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে।   
একই হলের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী বলেন, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েকদিন আগে আহসানউল্লাহ হলে, সোহরাওয়ার্দী হলে টর্চারের ঘটনা ঘটেছে। একজনকে মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে একজন শিক্ষার্থীর হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে। এর আগে এমন অনেক ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে।
বুয়েটে হলের সংখ্যা মোট ৮টি। আহসান উল্লাহ হল, তিতুমীর হল, কাজী নজরুল ইসলাম হল, ছাত্রী হল, শের-এ-বাংলা হল, সোহরাওয়াার্দী হল, ড. এম. এ. রশীদ হল, শহীদ স্মৃতি হল। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সারে পাঁচ হাজার। এসব হলের মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় র‌্যাগিং হচ্ছে শেরে বাংলা হলে। এ হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, হলের কোনো শিক্ষার্থী যদি বিরুদ্ধ মত দেয় কিংবা কাউকে যদি অপছন্দ হয় তাকেই শিবির বলে রুমে আলাদাভাবে ডেকে নেয়া হয়। আমি নিজ চোখে আমার রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চার থেকে পাঁচবার দশ বারোজন ছেলেকে অন্তত পিটাতে দেখেছি। একজন দৌঁড়াচ্ছে আর বাকীরা হল থেকে পিটিয়ে নামাচ্ছে। পিটিয়ে আধমরা করে পুলিশে খবর দিয়ে তুলে দিয়েছে। এক সপ্তাহ আগে জুনিয়র একজন শিক্ষার্থীকে দিয়ে সিনিয়র শিক্ষার্থীকে পিটিয়েছে। পরবর্তীতে তাকে হল থেকে বের করে দিয়েছে। র‌্যাগিং সবগুলো হলে রেগুলার একটি ঘটনা। তিতুমীর হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, অন্যান্য হলের মতো আমাদের হলে খুব বেশি টর্চারের ঘটনা না ঘটলেও একেবারেই যে ঘটেনা সেটা বলা যাবে না। তবে শেরে বাংলায় যেটা হয়েছে সেটা একেবারেই ব্যক্তিগত আক্রোস থেকে হয়েছে। আমাদের হলে মারা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। কিছু কিছু সময় পলিটিক্যাল ভাইয়েরা ডেকে ছাদে নিয়ে যায়। নিজেদের রুমে নিয়ে যায়। এরপর স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো, চড় থাপ্পর মারা হয়। হলে সিসি ক্যামেরা থাকায় ভয়ে অনেক সময় ছাদে নিয়ে যায়। মেয়েদের হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, মেয়েদের হলে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে না। আমাদের হলে সিকিউরিটি নিয়ে কিছু সমস্যা থাকলেও র‌্যাগিয়ের বিষয়টি একদমই নেই। আমাদের হলে প্রায় সাড়ে ৪শ থেকে ৫শ মেয়ে রয়েছে। কখনো র‌্যাগিং-এর শিকার হইনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা শুনিনি। মেয়েদের হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, মেয়েদের হলে ওভাবে রাজনীতির বিষয়টি নেই। কাজেই এটা হওয়ারও সুযোগ নেই। তবে ছেলেদের হলের অবস্থা এতোটা ভয়াবহ হয়েছে এটা আবরারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদেরও জানা ছিল না। নজরুল ইসলাম হলের একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের হলে জুনিয়ররা ভর্তির পরে পরিচয় পর্বের নামে টর্চার বা বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। আবরার যদি মারা না যেত তাহলে এখন হয়তো হাত পা ভেঙ্গে হাসপাতালে শুয়ে থাকতো। আমরা কেউ জানতে পারতাম না। এমনকি মিডিয়াও না। প্রায়ই এই টর্চারের ঘটনা ঘটে কিন্তু বুয়েট প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয় না।