Friday, August 28, 2020

ইমাম হোসাইন (আ)-এর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান বিশ্বে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা by মাহদী মাহমুদ

ইমাম হুসাইনের কারবালা মহাবিপ্লব বিশ্বকে হুসাইনি ধারা ও ইয়াজিদি ধারা এ দু'ভাগে ভাগ করেছে। এ বিষয় সংশ্লিষ্ট 'ইমাম হোসাইন (আ)-এর বিপ্লবের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান বিশ্বে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা' শীর্ষক প্রামাণ্য তথ্য-সমৃদ্ধ ও চিন্তা-উদ্দীপক একটি প্রবন্ধ সবার জন্য তুলে ধরা হল:

বর্তমান মুসলিম সমাজে বিরাজমান দুরবস্থা তথা রাজতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক এবং ইহুদিবাদী আগ্রাসন, ভ্রাতৃঘাতী মাজহাবী সংঘাত ও সেক্যুলারিজমের ছোবলের শেকড় খুঁজতে গেলে কেবল অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতক কিংবা তার পূর্বে ক্রুসেডের যুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করাটা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। কেননা, মুসলমানদের পতন ইংরেজ, খ্রিস্টান, ইহুদি, সাম্রাজ্যবাদী কারো হাতেই নয়; বরং খোদ মুসলমান নামধারী মুনাফিক জালেম শাসক,আলেম এবং বুদ্ধিজীবীদের হাতেই।

ড. কলিম সিদ্দিকী এ বিষয়ে তাঁর ‘উপনিবেশবাদ কবলিত মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও আচরণ’ শীর্ষক বক্তৃতায় বলেন, ‘এটা জেনে রাখা প্রয়োজন  যে, উপনিবেশী শক্তিগুলো আসলে ইসলামের রাজনৈতিক শক্তিকে পরাজিত করতে পারেনি। ইসলামের রাজনৈতিক শক্তির পতন ঘটেছিল ঔপনিবেশিকদের রঙ্গমঞ্চে আসার অনেক অনেক আগে,রাজতন্ত্রী ও বংশীয় মুসলিম শাসকদের হাতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উল্লেখ্য যে, মুসলিম ভূখণ্ডে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা মুলুকিয়াহ বা বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রেরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।”

আর এই রাজতন্ত্রের সূচনা-বিন্দুতে ছিল বনি উমাইয়া। রাসূল(সা)-এর ওফাতের পর থেকে ইমাম হোসাইনের নির্মম শাহাদাতের মধ্যকার ৫০টি বছরে এমন কিছু ঘটেছে যার ফলে ইসলামে রাজতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের উত্থান ঘটে এবং একইসাথে মুসলমানদের মাঝে শিয়া-সুন্নি সহ হাজারো মাজহাবী দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। সমস্যার মূল তথা ঐ ৫০টা বছরই ছিল কারবালার মহা-ঘটনার প্রেক্ষাপট।

ড.কলিম সিদ্দিকী তাঁর ভাষণের অন্যত্র বলেছেন, ‘ধর্মকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের অধিকতর শক্তিশালী হওয়া ইসলামে অসম্ভব। তাই ধর্মের মুখোশ পরে রাষ্ট্রনীতির কূটকৌশল শুরু করে সর্বপ্রথম উমাইয়ারা। তখন থেকেই অন্য শাসকরা নিজেদের বংশগত স্বার্থে ইসলামকে ব্যবহারের প্রয়াস পায়। কালক্রমে এই ধরনের বংশীয় শাসকেরা অধিক হারে সেক্যুলার ধারার রাজনৈতিক আচরণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে ইসলাম থেকে দূরে সরে পড়ে।’

ইমাম হোসাইনের আন্দোলন ছিল পুরোভাগে রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক।তিনি তাঁর কারবালা-পূর্ব ভাষণে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘জেনে রাখ, এ শাসকদল (বনি উমাইয়া) শয়তানের আদেশ মেনে চলছে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করছে এবং দুর্নীতিকে প্রতিদিনকার নিয়ম বানিয়েছে।তারা অধিকারগুলোকে এক জায়গায় জমা করেছে। মুসলমানদের সম্পদের ভাণ্ডারকে(বাইতুল মা’লকে) তাদের নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নিয়েছে এবং আল্লাহর হারামকে বৈধতা দিয়েছে এবং তাঁর হালালকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাদের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে সব মানুষের মধ্যে আমিই সবচেয়ে যোগ্য।’ (তাবারী)

আর ইমাম হোসাইনই সে সময় ছিলেন জান্নাতের যুবকদের সর্দার এবং আহলে বায়েতের জীবিত সদস্য। আর তাই ইমাম হোসাইন রাসূলের সুন্নাহ এবং পাক কুরআনের নির্দেশাবলী পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।
ইমাম হোসাইন বলেছিলেন,‘আমি কোনো ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি কিংবা ক্ষমতার লোভে বিদ্রোহ করছিনা। আমি শুধু আমার নানার উম্মতের মধ্যে সংস্কার করতে চাই। আমি চাই সৎকাজের নির্দেশ দিতে এবং অসৎকাজে নিষেধ করতে। আর আমার নানা এবং বাবা আলীর পথ ধরে চলতে।’

এই সৎকাজের নির্দেশ এবং অসৎকাজে বাধা দেয়া বা নিষেধ করাই হচ্ছে ইসলামি সমাজব্যবস্থা, ইসলামি ন্যায়বিচার এবং ইসলামি রাজনীতির মূলমন্ত্র। সৎকাজের নির্দেশ এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার যে সংকীর্ণ এবং ক্ষুদ্র ধারণা মুসলমানদের, তা থেকে আমরা মনে করি যে,এটি বোধ হয় মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করা কিংবা নামাজ-রোযা বা ইসলামি আহকাম পালনে দায়েশীয়(ISIS-terrorist group) পন্থায় মানুষকে বাধ্য করা।

কিন্তু ইমাম হোসাইন এ বিষয়টি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, ‘সৎকাজের নির্দেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ হল অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া অধিকার ফিরিয়ে দেয়া (এর জন্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করা),জালিমের বিরোধিতা, বাইতুল মা’ল ও গনিমত বণ্টন, যাকাতের নিসাব থেকে যাকাত গ্রহণ এবং তা যথার্থ খাতে ব্যয় করা।’

ইমাম হোসাইনের উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্রের বিপরীতে রক্তের বিজয়। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঘুমন্ত মুসলিম উম্মাহকে ধাক্কা দেয়া ও বলা, ‘জাগো!আবারো সাক্ষ্য দাও।’ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। তিনি চেয়েছেন যেন অনাগতকালের রাজতন্ত্র-পীড়িত জনগণ ও আলেম-বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষেরা এই ইতিহাস চর্চা করে এবং ইমাম হোসাইনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজতন্ত্র, উপনিবেশ আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের জান-মাল-পরিবার নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। ইসলামি সমাজে ব্যাধির উপর বিরাট একটা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ইমাম হোসাইনের আন্দোলন।

আমরা যদি কারবালার পূর্বের ইতিহাস বিশ্লেষণ করি তাহলে কয়েকটা জিনিস দেখব। যার কেন্দ্র হচ্ছে ইসলামি রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিনাশ এবং স্বৈরাচার,স্বেচ্ছাচার ও রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকরণ। ইসলামি রাষ্ট্রের জনগণের বাইতুল মা’লকে আম ও খাস বাইতুল মালে ভাগ করে,এর এক অংশ(আ’ম) আমীরের জন্যে রেখে দেয়া এবং সেই অর্থ খরচ করে ইয়াজিদের মতো শাসকের পক্ষে বায়াত(ভোট) কেনা এবং বিদ্রোহ দমনের প্রচেষ্টা। রাসূল(সা)-এর নিকটতম সাহাবীদেরকে হত্যা করা, হাত কেটে দেয়া,লাঞ্ছিত এবং নির্বাসিত করা এবং কারাগারে নিক্ষেপ করা। ইসলামি রাষ্ট্রের গভর্নরের দায়িত্ব এবং অন্যান্য শীর্ষ পদে রাসূল কর্তৃক অভিশপ্ত, জারজ কিংবা যিনাকার (ব্যভিচারী ) এ ধরনের ব্যক্তিদের বসানো। প্রত্যেক মসজিদের মিম্বর থেকে খুতবায় হযরত আলী(কা)-কে গালমন্দ এবং অভিসম্পাত করা। কোরআনের নির্দেশ এবং রাসূলের সুন্নাতসমূহকে সুস্পষ্টভাবে পরিবর্তন সাধন করা।

সংক্ষিপ্ত এই নিবন্ধে আমরা তেমনি কিছু ঘটনার উদাহরণ টানব যাতে আমরা বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অবস্থার সাথে ইমাম হোসাইনের সময়ের প্রেক্ষাপটের মিল খুঁজে পাই।

রাজতন্ত্রীকরণ

মাওলানা মুঈনউদ্দিন নদভী তাঁর কিতাবে লিখেছেন, ‘আমীর মুয়াবিয়া কর্তৃক খলিফা  হযরত আলী(আ)-এর মুকাবেলায় যুদ্ধে জয়লাভের অভিপ্রায়ে বৈধ-অবৈধ সব ধরনের পন্থা অবলম্বন করা, পরবর্তী খলিফা হযরত হাসানের (আ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা,ইসলামি খেলাফতকে রাজতন্ত্রে পরিবর্তন করা, তার শাসনামলের প্রতিটি ঘটনা এমন প্রকাশ্য ভ্রান্তিময় যাকে সত্যাশ্রয়ী লোক কখনো সমর্থনযোগ্য ও পছন্দনীয় বলে গণ্য করতে পারেনা। বিশেষত ইয়াজিদের মনোনয়নে খেলাফতের ফেতনা চিরতরে শেষ হয়ে যায় এবং ইসলামে বংশানুক্রমিক রাজতান্ত্রিক প্রথা চালু হয়।’ (সিয়ারুস সাহাবা)

এছাড়াও ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, আমীরে মুয়াবিয়া পরবর্তী শাসকরূপে ইয়াজিদকে মনোনয়নে সম্মতিলাভের উদ্দেশ্যে ইবনে ওমর এবং আব্দুর রহমান বিন আবি বকরের কাছে এক লক্ষ দিরহাম করে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।(ইবনে আসিরের আল কামিল,ইবনে কাসিরের আল বিদায়া আন নিহায়া,তাবাকাতে ইবনে সা’দ)

গভর্নরদের অত্যাচার

আমীর মুয়াবিয়া ৪০ হিজরির প্রথমদিকে বুশর বিন আরতাতকে ইয়ামেন ও হেযাজে পাঠায়। হযরত আলীর কোনো অনুসারীর দেখা পেলেই তাকে ধবংস করার জন্যে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়।বস্তুত বুশর তাই করেছিলো।(আল ইসাবায় ইবনে হাযারের মন্তব্য)

অপর এক গভর্নর যিয়াদ বিন আবিহ সম্পর্কে ইতিহাসে এসেছেঃ ‘যে লোকই যিয়াদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরোধিতা করত তাকে সে হত্যা করত। হাজ্জাজের চেয়েও সে ছিল অধিক রক্তপিপাসু।’ (এলামুল নুবালা।)

সাহাবীদের উপর নির্যাতন

যিয়াদের পক্ষ থেকে সাহাবী হাকামের (রা) কাছে আমীর মুয়াবিয়ার একটি পত্র আসে। সেই চিঠিতে গনীমতের মাল থেকে সোনা-রুপা মুয়াবিয়ার বাইতুল মালের জন্যে রাখার নির্দেশ ছিল। হাকাম(রা) আল্লাহর নির্দেশকে আমীরের নির্দেশের উপরে প্রাধান্য দিয়ে বলেন,‘সে কি রাসূলের এ কথা শোনে নি যে, কোনো কাজে আল্লাহর অবাধ্যতার প্রশ্ন দেখা দিলে তখন কারো কথা মানা যাবেনা?’ অতঃপর তিনি সমস্ত মালে গনীমত সৈন্যদের মধ্যে বিতরণ করে দেন। বলা হয়,তাতে হযরত হাকাম(রা) কারা প্রকোষ্ঠেই মৃত্যুবরণ করেন।(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

খলিফা উসমানের শাসনামলে সিরিয়ায় আমীর মুয়াবিয়ার স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, বণ্টন-বৈষম্য এবং কোরআন ও সুন্নাতবিরোধী কার্যক্রমের কারণে রাসূলের প্রবীণতম সাহাবী আবুযর গিফারীর সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরোধ এবং দূরত্বের সুচনা হয়। যার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়ে সাহাবী আবুযর গিফারী স্বেচ্ছা-নির্বাসনে যান। স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকাকালীন জনমানুষশূন্য মরুভূমিতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর নামাজে জানাজায় অংশ নেন আরেক প্রবীণতম সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ। ইতিহাস সূত্রে দেখা যায় যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ কুফায় নিযুক্ত  খলিফা উসমানের গভর্নর ওয়ালিদ বিন উকবা এবং সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রীয় খেলাফতে অর্থনৈতিক-সামাজিক অনিয়ম,নৈতিক অবক্ষয় এবং স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে  ক্ষণে ক্ষণে অসন্তোষ জানাতে থাকলে এবং আবুযার গিফারির জানাজায় অংশ নেয়ার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁর ওপর নাখোশ হয়ে পড়ে।

মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত আলী(কা)-এর নামে অভিসম্পাত ও গালাগালের প্রতিবাদ জানানোতে রাসূল(সা)-এর সাহাবী হুজর বিন আদীকে ছয় সঙ্গীসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

দেওবন্দের অন্যতম বুজুর্গ মাওলানা মানাজির আহসান গিলানী তাঁর ‘তাদবীনে হাদীস’ গ্রন্থের ৪২৩ পৃষ্ঠায় হযরত হুজর(রা)-কে একজন সাহাবী হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর শাহাদাতের ঘটনা বিবৃত করেছেন। বিবরণের শেষে তিনি লিখেন, ‘হযরত হুজর(রা)-কে কুফায় গ্রেফতার করে সিরিয়া পাঠিয়ে দেয়ার খবর মদীনায় পৌঁছামাত্র মহানবীর (সা) স্ত্রী আয়েশা বিনতে আবুবকর অনতিবিলম্বে দূত পাঠিয়ে কোনো অবস্থায় তাঁকে হত্যা না করার সুপারিশ করেন। কিন্তু দূত পৌঁছার আগেই তাঁর শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যায়।এ ঘটনা দ্বারা হুজর বিন আদী(রা)-এর উচ্চ মর্যাদা আন্দাজ করতে কষ্ট হবার কথা নয়।’

এছাড়াও এই মুয়াবিয়ার  শাসনামলে আমর বিন হামাক,মালিক আল আশতার,মোহাম্মদ ইবনে আবি বকর,মাইসাম বিন তাম্মার প্রমুখ খোদাভক্ত সাহাবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

ইমাম আলী(কা)-কে মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে গালাগাল

মুয়াবিয়া যখন তার বিরোধীদেরকে হত্যা করতে এবং স্বপক্ষীয়দেরকে রক্ষার উদ্দেশ্যে বুশর বিন আরতাতকে বসরা নগরীতে পাঠাল, তখন বুশর সেখানে উপস্থিত হয়ে মিম্বরে চড়ে গালমন্দ, ভর্ৎসনা এবং অবজ্ঞার সাথে হযরত আলীর নাম উল্লেখ করে বলল,‘সমবেত জনতা! আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি কি সত্য কথা বলিনি?’ আবু বাকরাহ নামের এক বিশিষ্ট ব্যক্তি (ইনি প্রথম খলিফা আবুবকর নন) তখন জবাবে বললেন,‘তুমি মস্তবড় সত্তার কসম করেছ। আল্লাহর কসম!তুমি সত্য কথা বলনি। কোনো ভালো কাজও করনি।’ তাতে বুশর আবু বকরাহকে প্রহার করার নির্দেশ দিলে তিনি এমনভাবে প্রহৃত হন যে তাঁর সংজ্ঞা লোপ পায়।’ (আনসাবুল আশরাফ,পৃ. ৪৯২,দারুল মাআরিফ,মিশর)

হযরত আলীকে গালমন্দ করার কথা ইতিহাস ছাড়াও হাদীস গ্রন্থেও পাওয়া যায়।যেমন মুসনাদে হাম্বালে উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (রা)-এর কয়েকটি রেওয়ায়াতে আছে, তিনি কতিপয় সাহাবীর কাছে অভিযোগ করেন, ‘তোমাদের সামনে রাসূল(সা)-কে উদ্দেশ্য করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে গালমন্দ করা হয় কি?’

লোকেরা বলল, ‘কেমন করে?’

উম্মে সালামাহ(রা) বললেন, ‘আলীকে কি গালি দেয়া হয়না?’ (যদি দেয়া হয়)এভাবে কি তাঁকেও(রাসূল-সা.) গালমন্দ করা হচ্ছেনা, যিনি তাঁকে(আলী) মহব্বত করতেন।আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,রাসূল(সা) তাঁকে ভালোবাসতেন।’

সুন্নাতের পরিবর্তন

বুখারী শরিফের দুই ঈদের অধ্যায়ে এসেছে, মারওয়ান যখন ঈদের খুৎবা দিতে ঈদের নামাজের জামায়াতের আগেই মিম্বরটিতে ওঠা শুরু করে তখন আবু সাঈদ খুদরী তার জামা টেনে ধরে ধরে রাখেন।কিন্তু মারওয়ান তার জামা ছাড়িয়ে নিয়ে মিম্বরে আসীন হয়। তারপর আবু সাঈদ বলেছিলেন, “আমি মারওয়ানকে বললাম, ‘আল্লাহর কসম!(তুমি শরীয়া বিধানে) পরিবর্তন এনেছ ‘ তখন মারওয়ান বলল, ‘আবু সাঈদ! তুমি যা জান তার যুগ পার হয়ে গিয়েছে।’ আমি জবাবে বললাম, ‘আল্লাহর কসম! আমার জানা বিষয় না-জানা বিষয় অপেক্ষা উত্তম’।”

এই যুগে অমুসলমানের রক্তমূল্য কমিয়ে অর্ধেক করে বাকি অর্ধেক খলিফার নিজের বা ব্যক্তিগত বাইতুল মালে জমা করা, কিংবা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে সোনা-রুপা আলাদা করে খলিফার নিজের হাতে রাখা কিংবা আহলে বায়েতের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিজের জায়গীর বানানো, ঈদের নামাজের পূর্বে আলী(কা)-কে গালি দেয়ার উদ্দেশ্যে বিশেষ খুৎবা চালু করার মতো বেদআতের সূচনা করা হয়।

নারীদের দাসী বানানো

এ লোকটি ইয়ামেনের হামাদান শহরটি লুটতরাজ করে সেখানকার মহিলাদের ক্রীতদাসীতে পরিণত করে। এ দুর্ভাগা নারীরাই সর্বপ্রথম মুসলমান পরিচিতি বহন করে দাসত্বের জিঞ্জিরে আবদ্ধ হন।(তাদেরকে প্রকাশ্যে কেনাবেচা করা হতো-এলামুল নুবালা)। লোকটি মদীনা শহরটি ধবংস করে দেয়। ঘটনা ইতিহাস খ্যাত হওয়ায় এর বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। (আল কামিল, যাহাবীর এলামুল নুবালাতেও অনুরূপ বর্ণিত)

সর্বোপরি উমাইয়া পরিবার এবং তাদের অনুদাসদের হাতে সরকারি প্রত্যেকটি পদ তুলে দেয়া হয়। যার মধ্যে বুশর বিন আরতাত-যার হত্যাযজ্ঞের কথা আমরা আগেই বলেছি। যিয়াদ বিন আবিহ-যাকে আমীরে মুয়াবিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘ভাই’ এর মর্যাদা দেয়।  যিয়াদের পুত্র ওবায়দুল্লাহ কুফার গভর্নর হয়।   সে মুসলিম বিন আকিলের হত্যার নির্দেশদাতা এবং কুফার শত শত জনগণকে হত্যা করে ইমাম হোসাইনের পক্ষে বিপ্লবে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক দলটির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়। এ ছাড়াও সে  কারবালায় ইমাম হোসাইনের হত্যার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা এবং তদারককারী। মারওয়ান বিন হাকাম-যাকে রাসূল(সা) অভিসম্পাত করেছিলেন- সে ইমাম হোসাইনের মৃত্যুর পরের বছর মদিনায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং ধর্ষণ চালানোতে মদদ দেয়। মুগীরা বিন শো’বা, ইবনে গাইলান, কিংবা আমর বিন আস- এরা ছিল মিশরে আলীপন্থী গভর্নর খলিফা আবু বকরের সন্তান তথা বিশিষ্ট সাহাবী মোহাম্মাদ বিন আবি বকর এবং সাহাবী মালিক বিন আশতারকে হত্যায় প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা।

এভাবে ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে রাজতন্ত্রে পরিণত করা এবং সুন্নাত পরিবর্তনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে বনি উমাইয়ার শাসনকালে। উমাইয়া ইসলামে দীক্ষিত এলিট-বুদ্ধিজীবী এবং আলেমদের অনুসরণ করেই আজকে মুসলিম মিল্লাতের বিভিন্ন প্রান্তে রাজতন্ত্রের ব্যাপক উত্থান ঘটেছে। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে সগর্বে এই কুফরি রাজতন্ত্রকে ইসলামের শাসনব্যবস্থা হিসেবে জায়েয বা বৈধ হওয়ার ইসলামিক এবং বৈজ্ঞানিক ফতোয়াও দিয়ে দেয়া হয়েছে। জনগণের মনে এই বিশ্বাস জন্মানো হয়েছে যে, আদতে রাসূল(সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদার শাসনব্যবস্থার সাথে উমাইয়া রাজতন্ত্রের কোনো গুণগত পার্থক্য নেই।

রাজতন্ত্রের পথ ধরে এসেছিল ঔপনিবেশিক লুটেরারা। আর উমাইয়াদের নিজেদের ব্যক্তি-জীবনে নৈতিকতাহীনতা-ধর্মহীনতা এবং সমাজ জীবনে কপট ধার্মিকতা-মুনাফিকীর রীতি অবলম্বনে মুসলিম দেশগুলোর শাসক, বুদ্ধিজীবী ও এক শ্রেণির আলেমদের মধ্যে লেবাসী ধার্মিকতা, রাষ্ট্রীয় সেক্যুলারিজম এবং ফ্যাসিবাদী-স্বেচ্ছাচারী রূপ গড়ে উঠেছে। যুগের উমাইয়াদের মতো তারা নিজ নিহ দেশে ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর আগ্রাসনের রাজনীতি গড়ে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে ব্যক্তিগত সম্পদের মতো ব্যবহার করছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যয় না করে সেসব অর্থে ব্যক্তিগত ব্যবসা গড়ে তুলেছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যবহার করে তারা রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভোট কিংবা জনসমর্থন কিনছে। বুদ্ধিজীবী এবং আলেমদের কিনে নিয়ে তাদের মুখ থেকে নিজেদের কুকর্মের পক্ষে সাফাই আদায় করে জনগণের কাছে সেগুলোকে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহার করছে। উমাইয়াপন্থী আলেমদের ব্যবহার করে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরায়েল এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের পক্ষে শিয়া-সুন্নি বিভেদ, ফেরকাবাজী এবং পরস্পরকে কাফের ফতোয়া দেয়ার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়েছে-যার ফল ভোগ করছে ফিলিস্তিন,আরাকান কিংবা কাশ্মীরের মজলুম জনগণ।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর আলেম সমাজ এবং ইসলামি বুদ্ধিজীবীদেরকে উমাইয়া নিগড় থেকে বেরিয়ে আসা। আর সে লক্ষ্যে রাসূল(সা)-এর ওফাতের পর থেকে ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের মধ্যকার সময়ে মুসলিম উম্মাহের মধ্যে যেসব মতবিরোধের সূচনা হয়েছিল সেগুলোর ওপর আলোকপাত করে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে ডায়ালগের সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। আর একইসঙ্গে ‘ইসলামি’ বলে মনে-প্রাণে গৃহীত ইয়াজিদী সংস্কৃতি ফেলে সব মাজহাবকেই সামাজিক ন্যায়বিচার তথা আমর বিল মা’রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে সাম্রাজ্যবাদ, ইসরায়েল ও জালেম শাসক এবং তাদের অনুসারী আলেমেছু‘দেরও (মন্দ আলেমদের) বয়কট করতে হবে। আর এভাবেই ইমাম হোসাইন (আ) যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সেই আন্দোলনকে সফল বিপ্লবে রূপ দান করা সম্ভব হবে। (লেখক: মাহদী মাহমুদ, গবেষক ও বিশ্লেষক)

Thursday, August 27, 2020

দিল্লি ক্রাইম: একটি অকথিত কাহিনী by সামা ফারুকি

দিল্লি ক্রাইম আলোড়ন সৃষ্টি করে লোকমুখে নির্ভয়া নামে পরিচিত জ্যোতি সিং নামের ২৩ বছরের এক নারীর নৃশংস গণধর্ষণবিষয়ক পুলিশ প্রতিবেদনের জের ধরে। সাত পর্বের দীর্ঘ নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার প্রথম মওসুমের সর্বশেষ ক্রাইম সিরিজটি তাৎক্ষণিক কষ্টসাধ্য, তবে চূড়ন্তভাবে দেখার মতো ছিল। ধর্ষণের চিত্রটি একবারের জন্য না দেখানো হলেও (এর বদলে ক্যামেরায় দিল্লি আকাশ থেকে তোলা ছবি দেখানো হয়, যাতে দিল্লির লোকজন দৈনন্দিন কাজ করছে বলে মনে হয়, সবকিছুই ঠিকমতো চলছে বলেও মনে হতে থাকে) ভয়ঙ্কর ঘটনাটি এত যন্ত্রণাদায়কভাবে উপস্থাপন করা হয় যে দর্শকরা যা দেখানো হচ্ছে এবং যা দেখানো হচ্ছে না, তার মধ্যকার অস্বস্তিকর সংযোগে মনোনিবেশন করতে বাধ্য হয়।
ঘটনা সবার জানা। ২০১২ সালে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় চলন্ত বাসে ছয় লোক মিলে জ্যোতিকে ধর্ষণ করে। এর জের ধরে প্রতিবাদ ওঠে, আরো কঠোর ধর্ষণ আইন প্রণীত হয়। অনেকে জানতে চাইতে পারেন, সমাপ্তির পর এখন আবার কেন ওই ঘটনা সামনে আনা হচ্ছে? ঘটনার শিকার নারীটি আর আমাদের মধ্যে নেই, কাজেই কেন ওই মর্মান্তিক ঘটনা সামনে আনা হচ্ছে?
কিন্তু দিল্লি ক্রাইম আসলে জ্যোতিকেন্দ্রিক নয় (যদিও তিনিই এর মূলে রয়েছেন), বরং তাকে যারা ধর্ষণ করেছে, তাদের পাকড়াও করা নিয়েই। এতে পুলিশের ডিসি বর্তিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত দলের দিকেই বেশি নজর দেয়া হয়েছে। মামলাটি তার নজরে আসার পর তিনি অপরাধী যারাই হোক না কেন, তাদের পাকড়াও করতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হন। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো বিশ্বের বোঝা তার কাঁধে ন্যস্ত হয়।
কাহিনীটির শুরু ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক শীতের রাতের ঘটনা দিয়ে শুরু। পুলিশ কর্মকর্তারা দিপিকা ও আকাশ (তারা জ্যোতি ও তার বন্ধু অবিন্দ্র প্রতাপ পান্ডে চরিত্র রূপ দিয়েছেন) প্রধান রাস্তার খাদে পড়ে আছে দেখতে পান। হেড কনস্টেবল রাম প্রতাপ (খান) তাদেরকে সাদা বেড শিটে ঢেকে কাছের হোটেলে নিয়ে যান, তাদের ঠিকানা যোগার করার চেষ্টা করেন। তাদেরকে পুলিশ ভ্যানের পেছনে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মুর্ছা যাওয়া দিপিকার ফিসফিস কণ্ঠ শোনা যায়: ‘তারা আমার সাথে ভয়ঙ্কর আচরণ করেছে। প্লিজ আমার বাবাকে বলো না।’
পরের দৃশ্য চলে যায় ১২ ঘণ্টা আগের ঘটনায়: রাম প্রতাপ প্রতিদিন সকালের মতোই জেগে ওঠেছিলেন, প্রতিদিনকার মতোই দাঁত ব্রাশ করেন, নাস্তার টেবিলে তার স্ত্রীর সাথে হালকা কথাবার্তা বলেন। তিনি ৩৪ বছর চাকরি করেছেন। সিরিজের যে কারো চেয়ে বেশি দিনই তা করেছেন, তবে সম্ভবত সংগ্রাম এখনো চলছে। বড় চিত্রে ছোট চরিত্রে তিনি নিম্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার ভেতরের অবস্থা তুলে ধরেছেন। তারা অনেক বেশি পরিশ্রম করেন, কিন্তু বেতন পান কম, মূল্যায়নও হয় না। তাদের কর্মস্থল থানায় বিদ্যুৎ থাকে না, বাজেটে থাকে টানাপোড়েন। তাদেরকে কর্মস্থলে যেতে হয় বাসে করে, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তিরস্কার খেতে হয়।
প্রথম পর্বে এই রাম প্রতাপের মাধ্যমেই পরিচালক অন্যান্য বড় চরিত্রকে সামনে এনেছেন। যেমন আমরা স্টেশন হাউস অফিসার বিনোদ তিওয়ারিকে চন্ডিগড় থেকে আসা বড় চোখের নবাগতের সাথে কথা বলতে দেখি। ওই লোক বড় নগরীতে উদ্দীপনা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে আগ্রহী। আরেক দৃশ্যে রাম প্রতাপকে তার রাতের খাবার ফেলে এক সন্ত্রাসীর পেছনে ধাওয়া করতে দেখি।
সিরিজটি সব পূর্ণ ক্রাইম থ্রিলারের মতো এগুতে থাকে। একটার পর একটা নতুন তথ্য আসতে থাকে, দর্শক রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তম্ভের ভেতরে কী ঘটছে তা দেখতে থাকে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাজনীতিবিদ, বিচার বিভাগ, মিডিয়া এবং সর্বোপরি জনগণও ট্রাজেডিতে এসে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে কেন সিস্টেম কখনো কাজ করে, কখনো কাজ করে না, তা সামনে চলে আসে। অনেক কিছুই থাকে যা বইপত্রে দেখা যায় না।
গল্পে সহানুভূতিশীল পুলিশের কথা দেখা যায়। তাদের অধৈর্য, অবহেলা অনিচ্ছাকৃত হিসেবেই তুলে ধরা হতে থাকে। তারা তাদের স্বাভাবিক গতিতে কাজ করে গেলেও মিডিয়া তাদেরকে পুরোপুরি নেতিবাচক আলোতেই সামনে নিয়ে আসে।
এতে সমাজের ভূমিকার ওপরও যথাযথ আলো ফেলা হয়েছে। লোকজন ক্ষেপে গেলে তারাও গণধর্ষণকারীদের মতোই রক্তলোলুপ, ক্রুদ্ধ আর মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে হতবিহ্বল ভুপেন্দ্র সিং জানতে চান: তারা ক্রুদ্ধ, কিন্তু তারা আসলে কী চায়? এই শোয়ের তারকাই হলেন শাহ। তার আবেগময় চোখ, নিয়ন্ত্রিত শারীরিক ভাষা তাকে সামনে নিয়ে আসে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অধীনস্তদের একেকজনের সাথে একেক রকম সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন তিনি। আবার তাকেই তার মেয়েকে আগলে রাখার জন্য প্রান্তকর প্রয়াস চালাতে দেখা যায়।
অনেক দর্শক হয়তো দিল্লি ক্রাইমকে আরেকটি স্যাকরেড গেমস (মুম্বাইয়ের দেবতা ও অপদেবতদের নিয়ে করা সিরিজ) হবে বলে আশা করেছিলেন। না তা হয়নি। এটি ভারতের রাজধানীর ক্ষমতার করিডোরের ছবিই সামনে এনেছে। এখানে অতিলৌকিক কিছু নেই, বরং বাস্তব জগতের কথাই সামনে চলে এসেছে।
দিল্লির বাস্তব জগতকে সামনে আনার কারণেই দিল্লি ক্রাইম দশর্কপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানকার কুয়াশায় ঢাকা শীতের বিকেল, ট্রাফিক জ্যাম, বেওয়ারিশ কুকুর, শ্রেণি বৈষম্য দশর্কদের সামনে ফুটে ওঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ লোকের কাছে এগুলো একেবারেই চেনা জগত।

Wednesday, August 26, 2020

ডিম কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নাকি এটি হৃদরোগের কারণ?

আদর্শ খাবার বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সে তালিকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সবার আগে এগিয়ে থাকবে ডিম। কারণ ডিম হাতের নাগালেই পাওয়া যায়, রান্না করাও সহজ, দামও কম এবং প্রোটিনে ভরপুর।
"দেহ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদানই রয়েছে ডিমে, আর তাই স্বাভাবিকভাবেই এটি অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ব্লেসো।
অন্যান্য খাবারের সাথে ডিম খেলে তা আমাদের শরীরে বেশি পরিমাণে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সালাদের সাথে ডিম খেলে তা সালাদ থেকে ভিটামিন এ গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল থাকার কারণে দশকের পর দশক ধরে, ডিম খাওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে-অনেক গবেষণার ফলাফলে বলা হয় যে, ডিম খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ১৮৫ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে, যা মার্কিন খাদ্য নীতিতে থাকা দৈনিক গ্রহণযোগ্য কোলেস্টেরলের মাত্রার অর্ধেক। এই নীতি অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল গ্রহণ করা যায়।
তার মানে কি এটা যে, ডিম আসলে আদর্শ খাবারের তুলনায় আমাদের ক্ষতিই বেশি করছে?
কোলেস্টেরল বা এক ধরণের হলুদাভ চর্বি যা আমাদের যকৃত এবং অন্ত্রে তৈরি হয়, তা সব মানুষের দেহকোষেই পাওয়া যায়।
সাধারণত আমরা একে 'খারাপ' মনে করি। কিন্তু কোষের মেমব্রেন বা পর্দা গঠনের অন্যতম উপাদান কোলেস্টেরল। দেহে ভিটামিন ডি এবং টেসটসটেরন ও অয়েস্ট্রোজেন হরমোনের উৎপাদনেও এটি দরকারি।
আমাদের দরকারি সব কোলেস্টেরল আমাদের দেহেই তৈরি হয়। তবে প্রাণীজ খাবার যেগুলো আমরা গ্রহণ করি যেমন গরুর মাংস, চিংড়ি, ডিম, পনির এবং মাখনেও কোলেস্টেরল পাওয়া যায়।
রক্তের লাইপোপ্রোটিন অণু আমাদের দেহে কোলেস্টেরল বহন এবং স্থানান্তরিত করে। প্রত্যেক মানুষের দেখে এসব লাইপোপ্রোটিনের আলাদা আলাদা ধরণ থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা তা নির্ধারণ করে এ ধরণের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের উপর।
কম ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল কোলেস্টেরলকে খারাপ কোলেস্টেরল হিসেবে ধরা হয়-যা কিনা যকৃত থেকে ধমনী এবং কোষে পরিবাহিত হয়। গবেষকরা বলেন যে, এর ফলে রক্তনালীতে কোলেস্টেরল জমা হয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তবে গবেষকরা অবশ্যই কোলেস্টেরল গ্রহণের মাত্রার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সংশ্লিষ্টতা আছে বলে উল্লেখ করেননি। এ কারণেই, মার্কিন খাদ্য বিধিতে কোলেস্টেরল গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি; যুক্তরাজ্যেও এমন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
এর পরিবর্তে, সম্পৃক্ত চর্বি খাওয়া কমানোর উপর জোর দেয়া হয়েছে, এর কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে বলে সতর্ক করা হয়। যেসব খাবারে ট্র্যান্স ফ্যাট বা কৃত্রিমভাবে তৈরি চর্বি থাকে, সেগুলো বেশি পরিমাণে এলডিএল থাকে।
যদিও কিছু ট্র্যান্স ফ্যাট পশু থেকে প্রাপ্ত বা উৎপাদিত খাবারে প্রাকৃতিক ভাবেই পাওয়া যায়, তবুও এ ধরণের চর্বির বেশিরভাগই কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়। সবচেয়ে বেশি মাত্রায় এ চর্বি পাওয়া যায় মার্গারিনস, স্ন্যাক্স এবং ডুবো তেলে ভাজা এবং বেক করা খাবার যেমন পেস্ট্রি, ডোনাট এবং কেক-এ।
এরমধ্যে, চিংড়ি ছাড়া ডিম হচ্ছে একমাত্র খাবার যাতে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরল থাকে কিন্তু সম্পৃক্ত চর্বি থাকে নগণ্য মাত্রায়।
"যদিও ডিমে মাংস এবং অন্যান্য প্রাণীজ খাবারের তুলনায় কোলেস্টেরল বেশি থাকে, তবুও সম্পৃক্ত চর্বি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। বহু বছর ধরে অনেক গুলো গবেষণায় এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়া লুজ ফার্নান্দেজ। যার সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, ডিম খাওয়ার সাথে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কোন সম্পর্ক নেই।
ডিমের স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা একটু ভিন্ন খাতে গড়িয়েছে। কারণ আমরা যে কোলেস্টেরল গ্রহণ করি তা পুষিয়ে নিতে সক্ষম আমাদের দেহ।
"এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে শরীরে, তাই বেশিরভাগ মানুষের জন্য খাদ্য তালিকায় কোলেস্টেরল থাকাটা কোন সমস্যা নয়," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ট্রাফটস ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণা বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক এলিজাবেথ জনসন।
২০১৫ সালে ৪০টি গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করেন জনসনের নেতৃত্বে একদল গবেষক। তারা খাদ্য তালিকায় কোলেস্টেরল থাকার সাথে হৃদরোগের কোন ধরণের সম্পর্ক খুঁজে পাননি।
"খাবারের সাথে মানুষ কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তখন যে বিষয়টি ঘটে তা হলো দেহ কোলেস্টেরল উৎপাদন কমিয়ে দেয়," তিনি বলেন।
আর এটি যখন ডিমের ক্ষেত্রে হয়, তখন বলা যায় যে, এই কোলেস্টেরল সাধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকির চেয়েও কম ঝুঁকিপূর্ণ। কোলেস্টেরল যখন আমাদের ধমনীতে জারিত হয় তখন এটি আরো বেশি ক্ষতি করে। কিন্তু ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল জারিত হয় না, বলেন ব্লেসো।
"কোলেস্টেরল যখন অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে ভাঙে বা জারিত হয়, তখন এটি প্রদাহ সৃষ্টি করে, আর ডিমে সব ধরণের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে যা একে জারিত হওয়া থেকে রক্ষা করে," তিনি বলেন।
এছাড়া, কিছু কিছু কোলেস্টেরল আমাদের জন্য ভালো। উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল কোলেস্টেরল যকৃতে পরিবাহিত হয়, যেখানে এটি ভেঙ্গে যায় এবং শরীর থেকে নির্গত হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে, এইচডিএল রক্তে কোলেস্টেরল জমতে দেয় না বিধায় এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে প্রভাব রাখে।
"রক্তে কি ধরণের কোলেস্টেরল প্রবাহিত হচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষের জানা উচিত। তা না হলে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে," বলেন ফার্নান্দেজ।
দেহে এইচডিএল এবং এলডিএলের পার্থক্যের হার কত তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এলডিএল এর ক্ষতিকর প্রভাবকে রুখে দেয় এইচডিএল।
যাই হোক, আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই আমরা যে কোলেস্টেরল খাই সেটিকে যকৃতে উৎপন্ন কোলেস্টেরলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও ব্লেসো বলেন যে, এক তৃতীয়াংশ মানুষ খাবারের সাথে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০% থেকে ১৫% বেড়ে যায়।
পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে, রোগা এবং স্বাস্থ্যবান মানুষদের মধ্যে খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে তাদের রক্তে এলডিএলের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, স্থূলকায় এবং ডায়াবেটিক রয়েছে তাদের রক্তে এলডিএল কম পরিমাণে বাড়ে, কিন্তু এইচডিএল বেশি পরিমাণে বাড়ে, ব্লেসো বলেন।
তাই আপনি যদি স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকেন তাহলে ডিম খাওয়াটা স্থূলকায় ব্যক্তির তুলনায় আপনার জন্য বেশি ক্ষতিকর। কিন্তু যেহেতু আপনার স্বাস্থ্য ভালো তাই আপনার রক্তে এইচডিএলের মাত্রাও বেশি থাকবে, তাই এলডিএলের মাত্রা বাড়াটা খুব ক্ষতিকর হবে না।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত গবেষণা, ডিম যে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। গবেষকরা ৩০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ১৭ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। তারা দেখেন যে, প্রতিদিন অর্ধেক ডিম বেশি খেলে তা উল্লেখ জনক হারে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় এমনকি মৃত্যুও ঘটায়। (অবশ্য এ পরীক্ষায় তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ও শারীরিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে যাতে করে তাদের উপর ডিমের প্রভাব আলাদা করে লক্ষ্য করা যায়।)
"আমরা দেখেছি যে, কোন ব্যক্তি প্রতি ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল অতিরিক্ত গ্রহণ করলে, তা সে যে খাবার থেকেই হোক না কেন, তা তার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে ১৭%, মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে ১৮%," বলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রিভেনটিভ মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক নরিনা অ্যালেন।
"আমরা আরো পেয়েছি যে, প্রতিদিন অর্ধেক পরিমাণ ডিম বেশি খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৬% এবং মৃত্যু ঝুঁকি ৮% বাড়ে।"
যদিও এটি এ খাতের বড় গবেষণাগুলোর একটি ছিলো, যা কিনা ডিম এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বিষয় দুটির মধ্যে নির্দিষ্ট সম্পর্ক খুঁজে পায়, তবুও এটি ছিলো আসলে পর্যবেক্ষণমূলক একটি গবেষণা। এটিতে কারণ এবং প্রভাব সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি।
এটি তৈরি করা হয়েছিলো একমাত্র অংশগ্রহণকারীদের স্ব-প্রণোদিত হয়ে দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে-এখানে অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসা করা হতো যে, তারা আগের মাসে বা বছরে কি খেয়েছিলো, তারপর বিগত ৩১ বছরে তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে খোঁজ নিয়েছিলো।
তার মানে হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীরা কি খাচ্ছে, গবেষকরা তার আংশিক জানতে পেরেছিলো, যদিও সময়ের সাথে সাথে আমাদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়।
এই গবেষণা আগের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলো। অসংখ্য গবেষণা রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে ডিম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। চীনে ৫ লাখ মানুষের উপর পরিচালিত এক বিশ্লেষণ যা ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়, সেখানে ওই গবেষণার পুরো উল্টো চিত্র পাওয়া গেছে।
এতে বলা হয় যে, ডিম খাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকিকে কমিয়ে দেয়। যারা প্রতিদিন ডিম খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৮% কমে যায়। একইসাথে যারা ডিম খান না তাদের তুলনায় স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে দেয় ২৮%।
তবে আগের মতোই এই গবেষণাটিও ছিলো পর্যবেক্ষণমূলক-অর্থাৎ কারণ এবং প্রভাব আলাদাভাবে বোঝাটা আসলে খুবই কঠিন ছিলো। (চীনের স্বাস্থ্যবান লোকেরা বেশি ডিম খান নাকি ডিম তাদেরকে বেশি স্বাস্থ্যবান করে?) এটি আসলেই বিভ্রান্তির একটি বড় অংশ হতে পারে।

ভালো ডিম

যদিও এসব গবেষণা আমাদের শরীরে ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলের প্রভাব নিয়ে বিতর্ককে উস্কে দিয়েছে, তবু কিছু উপায় রয়েছে যা আমাদের রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদের মধ্যে একটি হচ্ছে কোলাইন নামে এক ধরণের ডিম যা আলঝেইমার রোগ থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। এটা যকৃতকেও সুরক্ষা দেয়।
কিন্তু এটার নেতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। কোলাইন ভালো মাইক্রোবায়োটার মাধ্যমে বিপাকিত হয়ে টিএমও নামে অণুতে পরিণত হয়। যা পরে মানুষের যকৃতে শোষিত হয়। এই রূপান্তরিত টিএমএও এমন এক ধরণের অণুতে পরিণত হয় যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ব্লেসো বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, ডিম থেকে বেশি পরিমাণে কোলাইন খেলে তা টিএমএও-এর উন্নয়ন ঘটায় কিনা। তিনি এক গবেষণায় দেখেন যে, ডিম খাওয়ার পর মানুষ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত টিএমএও-র মাত্রার উন্নয়ন ঘটায়।
ডিম খাওয়া এবং টিএমএও নিয়ে এক গবেষণায় এ পর্যন্ত যা পাওয়া গেছে তা হলো, এতে টিএমএও সাময়িকভাবে বাড়ে। যাই হোক, শুধুমাত্র প্রাথমিক পর্যায়েই হৃদরোগের সাথে টিএমএও-এর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, যা শুধু রোজার সময়ই সনাক্ত করা সম্ভব।
এর থেকে ব্লেসো দেখেন যে, কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার পর কিভাবে আমাদের রক্তে শর্করা বেড়ে যায়, কিন্তু রক্তে শর্করার বৃদ্ধি শুধু ডায়াবেটিকের সাথে যুক্ত যা একটি চলমান প্রক্রিয়া।
এর কারণ এটি হতে পারে যে, যখন আমরা ডিম খাই, তখন কেবল ডিমের কোলাইনের ইতিবাচক সুবিধা পাই আমরা, তিনি বলেন।
"সমস্যা হয় যখন রক্তে মেশার পরিবর্তে কোলাইন বৃহদন্ত্রে চলে যায় যেখানে এটি প্রথমে টিএমও এবং পরে টিএমএও-তে পরিণত হয়," ফার্নান্দেজ বলেন।
"কিন্তু ডিমে, কোলাইন শোষিত হয় এবং বৃহদন্ত্রে যায় না, তাই এটি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় না।"
এরইমধ্যে বিজ্ঞানীরা ডিমের অন্যান্য স্বাস্থ্যকর দিক সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করেছেন। লুটিনের সবচেয়ে ভালো উৎস হচ্ছে ডিমের কুসুম। চোখে দেখা এবং চোখের রোগ নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কিত লুটিন।
"চোখের রেটিনায় দুই ধরণের লুটিন পাওয়া যায়, যা নীল আলোর ফিল্টার হিসেবে কাজ করে আলো থেকে রোখের রেটিনাকে রক্ষা করে, কারণ আলো চোখের জন্য ক্ষতিকর," জনসন বলেন।
তবে ডিম কেন আমাদের উপর আলাদা আলাদা ভাবে প্রভাব ফেলে তা বুঝতে এখনো ঢের বাকি গবেষকদের, সম্প্রতি পরিচালিত অনেকগুলো গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ডিম স্বাস্থ্যের প্রতি কোন ঝুঁকি হিসেবে কাজ করে না, উল্টো স্বাস্থ্যের জন্য এটি ভালো।
এরপরেও, প্রতিদিন সকালের নাস্তায় ডিম রাখাটা স্বাস্থ্যকর কোন বিকল্প হতে পারে না যদি না অন্যসব খাবার বাদ দিয়ে শুধু ডিমকেই প্রাধান্য দেয়া হয়।

একজন অনন্য চাচা ও ভাতিজার পারস্পরিক ভালোবাসার অমর কাহিনী

ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর জীবনের শেষ রাতে যখন সঙ্গীদের জানালেন, জালিম ও বলদর্পী খোদাদ্রোহী শত্রুরা শুধু তাঁকেই (ইমামকে) চায় হত্যা করতে। তাঁর কাছ থেকে জোর করে ইয়াজিদের জন্য আনুগত্য আদায় অথবা তাঁকে হত্যা করাই তাঁদের মূল টার্গেট। তাই অন্যরা চাইলে সবাই তাঁকে ত্যাগ করতে পারেন জীবন বাঁচানোর জন্য।

তাঁর একদল ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সঙ্গী যাদের সংখ্যা ১০০’রও কিছু কম বা সামান্য বেশি ছিল- তাঁদের সবাই যখন সকলেই এক জায়গায় ও এক বাক্যে সুস্পষ্ট ভাষায় তাঁদের নিষ্ঠা ও আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন এবং বললেন যে, আমরা কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাবো না, তখন সহসাই পট পরিবর্তিত হয়ে গেলো।

ইমাম (আঃ) বললেন, ব্যাপার যখন এই, তখন সকলেই জেনে রাখো যে, আমরা নিহত হতে যাচ্ছি। তখন সকলে বললো, আলহামদুলিল্লাহ-আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করছি যে, তিনি আমাদেরকে এ ধরনের তাওফীক দান করেছেন। এটা আমাদের জন্য এক সুসংবাদ, একটি আনন্দের ব্যাপার।

ইমাম হুসাইনের (আ) মজলিসের এক কোণে একজন কিশোর বসে ছিলেন; বয়স বড় জোর তেরো বছর হবে। এ কিশোরের মনে সংশয়ের উদয় হলোঃ আমিও কি এ নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? যদিও ইমাম বলেছেন ‘তোমরা এখানে যারা আছা তাদের সকলে’,কিন্তু আমি যেহেতু কিশোর ও নাবালেগ, সেহেতু আমার কথা হয়তো বলা হয় নি। কিশোর ইমাম হুসাইনের দিকে ফিরে বললেন: অর্থাৎ,চাচাজান! আমিও কি নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? এ কিশোর ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের (আ) পুত্র হযরত কাসেম।

ইতিহাস লিখেছে, এ সময় হযরত ইমাম হুসাইন (আ) স্নেহশীলতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথমে জবাব দানে বিরত থাকেন, এরপর কিশোরকে জিজ্ঞেস করেন, ভাতিজা! প্রথমে তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, এরপর আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। তুমি বলো, তোমার কাছে মৃত্যু কেমন; মৃত্যুর স্বাদ কী রকম? কিশোর জবাব দিলেন,আমার কাছে মধুর চেয়েও অধিকতর সুমিষ্ট। আপনি যদি বলেন যে, আমি আগামী কাল শহীদ হবো তাহলে আপনি আমাকে সেই সুসংবাদই দিলেন। তখন ইমাম হুসাইন (আঃ) জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ভাতিজা! কিন্তু তুমি অত্যন্ত কঠিন কষ্ট ভোগ করার পর শহীদ হবে। কাসেম বললেন: আল্লাহর শুকরিয়া, আল-হামদুলিল্লাহ-আল্লাহর প্রশংসা যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটবে।

এবার আপনারা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর এ ভূমিকা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন যে, পরদিন কী বিস্ময়কর এক বাস্তব কঠিন দৃশ্যের অবতারণা হওয়া সম্ভব! হযরত আলী আকবরের শাহাদাতের পর এই তেরো বছরের কিশোর হযরত ইমাম হাসানের পুত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) এর নিকট এগিয়ে এলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন নাবালেগ কিশোর, তার শরীরের বৃদ্ধি তখনো সম্পূর্ণ হয় নি, তাই তার শরীরে অস্ত্র ঠিকভাবে খাপ খাচ্ছিলো না;কোমরে ঝুলানো তলোয়ার ভূমি স্পর্শ করে কাত হয়ে ছিলো। আর বর্মও ছিলো বড়, কারণ বর্ম পূর্ণ বয়স্ক পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো, কিশোরদের জন্য নয়। টুপি বড়দের মাথার উপযোগী, ছোট বাচ্চাদের উপযোগী নয়। কাসেম বললেন, চাচাজান! এবার আমার পালা। অনুমতি দিন আমি রণাঙ্গনে যাই।

কোনো কোনা বর্ণনায় এসেছে, ইমাম হাসান (আ) যখন শহীদ হন তখন কাসেমের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। সেই থেকে তিনি চাচা হুসাইন (আ)'র ঘরে তাঁরই সান্নিধ্যে থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত বড় হয়েছেন। তাই ভাইয়ের নয়নের মনি ছিল তাঁরও স্নেহের ধন। চাচা কখনও যুদ্ধে যেতে অনুমতি দিবেন না তা জেনে কাসেম ফুপু যাইনাবের শরণাপন্ন হন। ফুপু জানান যে তাঁর চাচার কাছে প্রিয় কিশোর ভাতিজার যুদ্ধ-যাত্রার অনুমতি আদায় করার মত মানসিক অবস্থা তাঁরও (যাইনাবের) নেই। এক পর্যায়ে কাসেম লক্ষ্য করেন তার বাহুতে তাবিজের মত কিছু একটা আছে। কৌতুহল বশে তা খুলে দেখেন যে তাতে রয়েছে ভবিষ্যতের কারবালা যুদ্ধ সম্পর্কে বাবা ইমাম হাসানের ওসিয়ত। তাতে কাসেমকে বলা হয়েছে, তোমার চাচা তোমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিবেন না, কিন্তু তুমি মাথা ও ঘাড়  নিচু করে বার বার অনুরোধ করলে শেষ পর্যন্ত তোমার চাচা তোমাকে অনুমতি দেবেন। কাসেম ওই ওসিয়ত চাচা হুসাইনকে দেখালে তিনি খুব কাঁদেন।

এখানে উল্লেখ্য যে,আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর সঙ্গী সাথীদের কেউই তার কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে রণাঙ্গনে যান নি। প্রত্যেকেই তাঁর কাছে এসে তাকে সালাম করেন এবং এরপর অনুমতি চান; বলেন: ‘‘আস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ। আমাকে অনুমতি দিন।’’

ইমাম হুসাইন (আঃ) সাথে সাথেই কাসেমকে অনুমতি দিলেন না। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কাসেম ও তাঁর চাচা পরস্পরকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে:  অর্থাৎ,অতঃপর তিনি (কাসেম) তাঁর (ইমাম হুসাইনের) হাত ও পা চুম্বন করতে শুরু করলেন। ‘‘মাক্বাতিল’’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে লেখা হয়েছে: ‘‘তাকে যতক্ষণ না অনুমতি দেয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কিশোর তার (ইমাম হোসেনের) হাত ও পা চুম্বন অব্যাহত রাখেন।’’ (মাকতালু খরাযমী,খণ্ড: ২,পৃষ্ঠা: ২৭)

এ ঘটনার অবতারণা কি এ উদ্দেশ্যে হয়নি যাতে ইতিহাস পুরো ঘটনাকে অধিকতর উত্তম রূপে বিচার করতে পারে? কাসেম অনুমতির জন্য পীড়াপীড়ি করেন আর ইমাম হুসাইন (আঃ) অনুমতি দানে বিরত থাকেন। ইমাম মনে মনে চাচ্ছিলেন কাসেমকে অনুমতি দেবন এবং বলবেন,যদি যেতে চাও তো যাও। কিন্তু মুখে সাথে সাথেই অনুমতি দিলেন না। বরং সহসাই তিনি তার বাহুদ্বয় প্রসারিত করে দিলেন এবং বললেন, এসো ভাতিজা! এসো, তোমার সাথে খোদা হাফেযী করি। কাসেম ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কাঁধের ওপর তাঁর হাত দুটো রাখলেন এবং ইমামও কাসেমের কাঁধের ওপর হাত দুটি রাখলেন। এরপর উভয়ে কাঁদলেন। ইমামের সঙ্গী সাথীরা ও তাঁর আহলে বাইতের সদস্যরা এ হৃদয় বিদারক বিদায়ের দৃশ্য দেখলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে, উভয়ে এতই ক্রন্দন করলেন যে, উভয়ই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর এক সময় তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন এবং কিশোর কাসেম সহসাই তাঁর ঘোড়ায় আরোহণ করলেন।

ইয়াযীদী পক্ষের সেনাপতি ওমর ইবনে সা‘দের সেনাবাহিনীর মধ্যে অবস্থানকারী বর্ণনাকারী বলেন,সহসাই আমরা একটি বালককে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে আমাদের দিকে আসছে যে তার মাথায় ধাতব-টুপির পরিবর্তে একটি পাগড়ী বেধেছে। আর তার পায়ে যোদ্ধার বুট জুতার পরিবর্তে সাধারণ জুতা এবং তার এক পায়ের জুতার ফিতা খোলা ছিলো; আমার স্মৃতি থেকে এটা মুছে যাবে না যে,এটা ছিলো তার বাম পা। তারপর বর্ণনাকারী বলেন: সে যেন চাঁদের একটি টুকরা। (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব,খণ্ড: ৪,পৃষ্ঠা: ১০৬,এ’লামুল ওয়ারা, পৃষ্ঠা: ২৪২,আল-লুহুফ, পৃষ্ঠা: ৪৮, ইরশাদ-শেখ মুফিদ, পৃষ্ঠা: ২৩৯,মাকতালু মুকাররাম, পৃষ্ঠা: ২৩১,তারীখে তাবারী, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৫) একই বর্ণনাকারী আরো বলেন,কাসেম যখন আসছিলো তখনো তার গণ্ড দেশে অশ্রুর ফোটা দেখা যাচ্ছিলো।

সবাই অনুপম সুন্দর এ কিশোর যোদ্ধাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো এবং ভেবে পাচ্ছিলো না যে, এ ছেলেটি কে! তৎকালে রীতি ছিলো এই যে, কোনো যোদ্ধা রণাঙ্গনে আসার পর প্রথমেই নিজের পরিচয় দিতো যে,আমি অমুক ব্যক্ত । উক্ত রীতি অনুযায়ী কাসেম প্রতিপক্ষের সামনে এসে পৌঁছার পর উচ্চস্বরে বললেন:

"যদি না চেনো আমাকে জেনো আমি হাসান তনয় সেই নবী মুস্তাফার নাতি যার ওপর ঈমান আনা হয় ঋণে আবদ্ধ বন্দী সম এই যে হুসাইন প্রিয়জনদের মাঝে,পানি দেয়া হয় নি যাদের উত্তম রীতি মেনে।’’

কাসেম রণাঙ্গনে চলে গেলেন, আর হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) তার ঘোড়াকে প্রস্তুত করলেন এবং ঘোড়ার লাগাম হাতে নিলেন। মনে হচ্ছিলো যে তিনি তার দায়িত্ব পালনের জন্য যথা সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। জানি না তখন হযরত ইমামের মনের অবস্থা কেমন ছিলো। তিনি অপেক্ষমাণ; তিনি কাসেমের কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সহসাই কাশেমের কণ্ঠে ‘‘চাচাজান!’’ ধ্বনি উচ্চকিত হলো। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝতে পারলাম না ইমাম হুসাইন কত দ্রুত গতিতে ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রণাঙ্গনের দিকে ছুটে এলেন। তার এ কথা বলার তাৎপর্য এই যে,ইমাম হুসাইন (আঃ) এক শিকারি বায পাখীর মত রণাঙ্গনে পৌঁছে যান।

ইতিহাসে লিখিত আছে,কাসেম যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান তখন শত্রুপক্ষের প্রায় দুই শত যোদ্ধা তাঁকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কাশেমের মাথা কেটে ফলেতে চাচ্ছিলো। কিন্তু তারা যখন দেখলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) তীব্র গতিতে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে আসছেন তখন তাদের সকলেই সেখান থেকে পালিয়ে গেলো। আর যে ব্যক্তি কাশেমের মাথা কাটতে চাচ্ছিলো সে তাদেরই ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট হলো। যেহেতু তারা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো সেহেতু তারা তাদের বন্ধুর ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক লোক একবারে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো;কেউ কারো দিকে তাকাবার অবকাশ পাচ্ছিলো না। মহা কবি ফেরদৌসীর ভাষায়:

‘‘সেই বিশাল প্রান্তরে কঠিন ক্ষুরের ঘায়ে ধরণী যেন হলো ছয় ভাগ আর আসমান আট।’’ কেউ বুঝতে পারলো না যে, কী ঘটে গেলো। ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে সৃষ্ট ধুলার কুণ্ডলী যখন বসে গেলো এবং হাওয়া কিছুটা স্বচ্ছ হলো তখন সবাই দেখতে পেলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) কাসেমকে কোলে নিয়ে আছেন। আর কাসেম তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছিলেন এবং যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে মাটিতে পা আছড়াচ্ছিলেন। এ সময় শোনা গেলো,ইমাম হুসাইন (আঃ) বলছেন: ‘‘আল্লাহর শপথ, এটা তোমার চাচার জন্য কতই না কষ্টকর যে, তুমি তাকে ডাকলে কিন্তু তার জবাব তোমার কোনো কাজে এলো না।’’

Friday, August 21, 2020

২১শে অগাস্ট গ্রেনেড হামলা: শেখ হাসিনার সমাবেশে বোমা হামলার সেনা মোতায়েনের চিন্তা ছিল বিএনপি সরকারের by আকবর হোসেন

২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রায়ই সমাবেশ করতো আওয়ামী লীগ। তবে সব সমাবেশ দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকতেন না।
২১শে অগাস্ট-এর সে সমাবেশ শেখ হাসিনা উপস্থিত থাকবেন - এ কথা আগেই প্রচার করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সে সমাবেশে থাকবেন বলেই দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতারাও সমাবেশ উপস্থিত হয়েছিলেন। একই সাথে দলের কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিও ছিল বেশি।
সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা সবাইকে একদিকে যেমন চমকে দিয়েছিল, তেমনি জনমনে ব্যাপক আতঙ্কও তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই দেশর বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেন।
শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অন্য সিনিয়র নেতাদের অবস্থা জানার জন্য উদগ্রীব ছিলেন দলটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের নেতা-কর্মীরা।
ঘটনার পরদিনই দেশের চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম এবং সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় হরতালের ডাক দেয় স্থানীয় আওয়ামী। হরতালের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশংকা ভর করেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপর।
২৪ এবং ২৫শে অগাস্ট দেশজুড়ে হরতালের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত চলতে থাকে।
তখন টানা দিনের হরতাল এতোটাই জোরালো ছিল যে তৎকালীন বিএনপি সরকার বিষয়টি নিয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়ে উঠে।
দৈনিক প্রথম আলো তখন সংবাদ শিরোনাম করেছিল, " স্বতঃস্ফূর্ত হরতালে অচল সারা দেশ।"
আওয়ামী লীগের এই হরতালে সমর্থন দেয় গণফোরাম, জাসদ এবং তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে 'রেড অ্যালার্ট' জারি করে। স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য দেশের সকল জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের বিশেষ বার্তা দেয়া হয়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের চিন্তা-ভাবনা ছিল তৎকালীন সরকারের।
২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড
গ্রেনেড হামলার কয়েকদিন পরে বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের সাথে বৈঠক করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে লুৎফুজ্জামান বাবরকে।
গ্রেনেড হামলার পর একদিকে যখন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল চাপের মুখে পড়ে তৎকালীন বিএনপি সরকার।
বিএনপির সরকারের সময় একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ রা করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেন, গ্রেনেড হামলায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য ভারত এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে থেকে।
বিশেষ করে তখন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঠিক তিন মাস আগে সিলেট সফররত ব্রিটিশ হাইকমিশনার মি: চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা হয়েছিল।
এদিকে দেশের ভেতরে প্রবল অস্থিরতা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক চাপ - এই দুই পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য শেখ হাসিনার সাথে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনার দিক থেকে কোন আগ্রহ দেখানো হয়নি।
শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে দৈনিক প্রথম আলো লিখেছিল, "আসলে খালেদা জিয়াকে রক্ষার জন্য একটি বিশেষ মহল মাঠে নেমেছে। যারা সমঝোতার কথা বলবে, আমি বলব তারাই খুনি।"
খালেদা জিয়া যখন একদিকে সংলাপের মনোভাব করছিলেন, তখন বিএনপির কোন কোন নেতা গ্রেনেড হামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে নানা বক্তব্য দেন।
গ্রেনেড হামলার এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগসহ ১১ দল এবং জাসদ এ সভায় এক দফা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেয়।
তাদের এই এক দফা ছিল - সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল বিএনপি সরকার।

গ্রেনেড হামলা :দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র by ড. এম এ মান্নান

ঘটনাটি একেবারেই অকল্পনীয়। রাজনীতিতে যে বিশাল ঘুণপোকা ধরেছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল এ ঘটনায়। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের উপর দমন-নিপীড়ন চালাতে পারে তার নজিরবিহীন প্রমাণ সেদিন সৃষ্টি করেছিল তত্কালীন সরকার যার নেতৃত্বে ছিল আক্ষরিক অর্থেই স্বাধীনতাবিরোধীরা। এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ আর মানবতাবিরোধী ঘটনা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ ঘটাতে পারে তা একেবারেই অকল্পনীয়। কিন্তু অকল্পনীয় ঘটনাই ঘটে গেল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আওয়ামী লীগ আহূত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে, যার সামনের সারিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যিনি তখন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী। বিশ্বে নজিরবিহীন এ ঘটনাটি দৃশ্যতই ঘটানো হয়েছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ তথা বিরোধী দলকে নেতৃত্ব শূন্য করে দেওয়ার লক্ষ্যে, যেমনটা তারা চেয়েছিল পঁচাত্তরে। সে বছরের ১৫ আগস্ট তারাই শেষ করে দিয়েছে জাতির জনককে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকারকে, এ দেশের ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের উদ্যোগকারীকে। বিশ্বের কেউ ভাবতে পেরেছে বলে মনে হয় না এমন বর্বরোচিত আর নারকীয় ঘটনা কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থেকে ঘটাতে পারে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দুর্বৃত্তরা এদেশে সেরূপটা ঘটিয়েছে; তাও ঘটিয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে এবং তাদের পেছনের ইন্ধনদাতা আর সরাসরি সাহায্যকারী পাকিস্তান থেকে সমরাস্ত্র আর্জেস গ্রেনেড এনে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এরূপ বিধ্বংসী আর্জেস গ্রেনেড নামক বোমা-অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে মেরে ফেলা হলো চব্বিশ জনকে আর আহত করা হলো পাঁচ শতাধিক মানুষকে। শরীরে স্প্লিন্টারের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে এখনও ১৫ বছর পরেও বহু আহত হওয়া নাগরিক যারা দেশকে ভালোবেসে গিয়েছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির দলের কর্মপরিকল্পনার কথা শুনতে সেদিনের জনসভায়। তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যাসহ তারা চেয়েছিল দেশে একটা অরাজক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে মানুষ তখনকার দেশবিরোধী শক্তির তৈরি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো টু শব্দটিও না করে। গণতন্ত্র তো অনেক আগেই তাদের পূর্বসুরি সামরিক সরকার হত্যা করে শুধু কঙ্কালটা রেখে গিয়েছিল।

তবে বিগত ১৯১৮ সালের ১০ অক্টোবর সন্ধ্যায় বোমা হামলা সংক্রান্ত মামলার রায়ের বিষয়টি শোনার পর স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, যাকে মূল টার্গেট বানানো হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যার হাতেই হামলাকারী আর ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার হয়েছে, সকল আইন মেনে, দেশের প্রচলিত আইনের আওতায়।

অনেক দেরিতে হলেও বিচার হয়েছে এ মর্মান্তিক, পৈশাচিক ঘটনার। প্রমাণ হয়েছে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে সব সময় কাঁদে না। বিচার হয় এবং হবে এমন ধরনের হামলার, নৃশংসতার। তবে সে সময়কার সরকার কোনোভাবেই চায়নি বিচার হোক। কারণ তারাই তো ছিল নাটেরগুরু, তারাই তো ঘটিয়েছে পুরো ঘটনা, স্বেচ্ছায়, অবলীলায়। বরং মামলা না নিয়ে এবং জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে সরকার পক্ষ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে; এক সদস্যবিশিষ্ট কমিশন তৈরি করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসতে না পারলে তারা সফল হতো নিঃসন্দেহে। দুর্ভাগ্য তাদের। তাদের ইচ্ছা মাটিতে ডেবে গেল। ১৪ বছর পরে বিচার হয়েছে সেই শেখ হাসিনার আমলেই, যাকে তারা নির্মূল করতে চেয়েছিল। একেই বলে ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। ষড়যন্ত্রকারীদের গডফাদার ও বোমা হামলার নির্দেশকারী তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্যেষ্ঠ সন্তান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন আর ১৯ জনের ফাঁসির রায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে।

হামলাকারীরা চেয়েছিল তারা সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে। আছেই তো মাত্র দুই জন। এ দুই জনকে শেষ করতে পারলেই তো তাদের পোয়াবার। ১৯৭৫ সালের একই মাসের সাত দিন আগেই তো শেষ করে দিয়েছে তাদেরই দোসররা জাতির জনককে। আসলে আগস্ট মাসটিই যেন দেশ বিরোধীদের আঁচলে বাঁধা একটি মাস। এ মাসকেই কেন তারা সব সময় বেছে নেয়? এজন্যই কি যে, এ মাসের চৌদ্দ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস, ব্রিটিশদের সৃষ্ট একটি আজগুবি রাষ্ট্রের জন্মদিবস। পরবর্তীকালেও তারা এ মাসটিকে বেছে নিয়েছিল সারা দেশের সব জেলায় বোমা হামলার জন্য। সিরিজ বোমা হামলা। ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল সারা দেশের মেরুদণ্ড। জঘন্য মনোবৃত্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সারা দেশের মানুষের ওপর। কারো জানের মায়া নেই তাদের মধ্যে। আসলে তারা জনসাধারণের তোয়াক্কা করে না, কদর করে শুধু তাদের হীনস্বার্থকে। দেশকে তাদের কবজায় নিয়ে আসা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টাকেই তারা গুরুত্ব দেয় সব সময়, জনমানুষের স্বার্থ নয়। তারা এখনো ভুলতে পারেনি তাদের একাত্তরের পরাজয়ের গ্লানি। এরা কিন্তু কখনোই চুপ করে থাকবে না। সুযোগ পেলেই তারা ফণা তুলবে। এদের ব্যাপারে সাবধানতা সব সময়ের জন্য। নতুবা সর্বনাশ হয়ে যাবে দেশের। বিপন্ন হবে জনমানুষের ভবিষ্যত্। সময় এসেছে এসব বর্বর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার।

বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা অনেকেই সবকিছু বিস্তারিত জানতাম না। বিচারের রায়ের বিবরণ থেকে জানতে পারি, ভালো মানুষের উর্দি গায়ে দেওয়া ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের জঘন্য আর নোংরা মনের পরিচয়। পত্রিকা থেকেই জানতে পারলাম, ষড়যন্ত্রকারী আর হামলাকারীদের মধ্যে ছিল তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, হুজির আমির ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এবং দেশ-বিদেশ থেকে জঙ্গিপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক জঙ্গি। এরা সবাই পঁচাত্তরে জাতির জনককে হত্যার পর থেকে তাদের ষড়যন্ত্র আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে চক্রান্তের জাল বুনতেই থাকে। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তারা অনেক বেশি তত্পর হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার পর যখন তিনি সামনের দিকে দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তারা দিশেহারা হয়ে শুরু করে গভীর ষড়যন্ত্র।

বিচার হয়েছে। তাই বলে ষড়যন্ত্র থেমে যায়নি। বোমা হামলার কুশীলবরা ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। এরাই দেশে জঙ্গিপনাকে উসকে দিচ্ছে, নিজেরাও জঙ্গিদের সঙ্গে মিলেমিশে অরাজকতার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছে। তারই নজির আমরা পেয়েছি রায় দেওয়ার পরপরই। মাস্টারমাইন্ডের বাপের বাড়ির এলাকায় বগুড়াতে ষড়যন্ত্রকারীদের দোসররা নীলফামারী থেকে ঢাকাগামী বাসে পেট্রোলবোমা হামলা করে তিন জনকে আহত করে এবং অন্যান্য নাশকতার চেষ্টা চালায়। নারায়ণগঞ্জের তিনটি এলাকায়ও বোমা ছুঁড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে। পরের বছরই অর্থাত্ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টে দেশের ৪৫০টি স্পটে চালানো হয় বোমা হামলা। এ হামলার ঘটনায় জড়িত ৫০ জন জঙ্গিকে এখনও ধরা হয়নি এবং বিচার কার্যক্রম ১৪ বছরেও শেষ হয়নি। ৩৩টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এসব দুর্বৃত্তরা বিগত কয়েক মাসের মধ্যে রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশসহ অন্যান্য পুলিশের ওপর বোমা হামলা করেছে।

আমরা চাই, এ দেশে এমনতরো নৃশংস বর্বরোচিত রাজনৈতিক হামলা চিরতরে নিপাত হোক; সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাভাব তৈরি হোক; আজকের এবং আগামীর প্রজন্ম রাজনীতির প্রতি উত্সাহী হয়ে উঠুক। আমরা মনেপ্রাণে কামনা করি, রাজনীতি করা মানুষদের প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব দূর হোক; জনগণের মন থেকে রাজনীতি-আতঙ্ক সরে যাক। আমরা আরো চাই, দুর্বৃত্ত শ্রেণির লোকেরা রাজনীতিতে না আসুক, রাজনীতির নদীটার স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় আর অর্থের যোগান দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করার মতো পরিবেশ তৈরি না করুক; আর্জেস গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র সরবরাহ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী আর জনগণকে হত্যার ধারা চালু রাখার সংস্কৃতি চিরতরে বিদূরিত হোক এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জনগণের কাছে আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির হোক। আমরা সর্বান্তকরণে কামনা করি, জনগণ নিশ্চিন্ত মনে রাজনৈতিক সমাবেশে, সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করুক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ, উদ্দেশ, কর্মসূচি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করুক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, সে দেশের মাটি থেকে চিরতরে লুপ্ত হোক সকল প্রকার হানাহানি, অপরাজনীতি, জঙ্গিপনা আর সাধারণ মানুষ হত্যার ঘৃণ্য খেলা। আলো ছড়িয়ে পড়ুক বাংলার আকাশে, মেধাবী তরুণরা এগিয়ে আসুক রাজনীতিতে এবং তৈরি করুক উজ্জ্বল আলোদীপ্ত রাজনীতির পুষ্পধাম। প্রত্যাশা করি, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করুক, চাকরিজীবীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করুক, কৃষকরা মাঠে থাকুক, শ্রমিকরা কলকারখানায় নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাক, মাঝি তার নৌকায় পাল তুলে দিয়ে মনের আনন্দে ভাটিয়ালী সুরের ঝলক তুলুক, আলেম-মাশায়েখরা মানুষের অন্তরে মহান সৃষ্টিকর্তার নুরানী আলোর দীপ্তি ছড়িয়ে দিক আর রাজনীতির ময়দানে থাকা ব্যক্তিরাই শুধু রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক, ঠিক যেমনটি হয় উন্নত দেশগুলোতে। এ দেশের জনগণ উন্নয়ন চায়; চায় দেশ এগিয়ে যাক চলমান প্রগতির পথ ধরে আর প্রতিষ্ঠিত হোক সুশাসনের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ।

>>>লেখক :কলামিস্ট, উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা: যেভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা

আপডেট- ২১ অগাস্ট ২০১৭: বাংলাদেশের ইতিহাসেএখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা তার একটি। ঐ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাবও ফেলেছে। ২০০৪ সালের ঐ দিনে যা ঘটেছিল এবং যেভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছিল বিবিসি বাংলার চল্লিশে বাংলাদেশ অনুষ্ঠানমালার জন্য।
২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট শনিবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে জড়ো হয়েছিলেন সিনিয়র নেতারা। দলটির প্রধান এবং তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন ঐ সমাবেশের প্রধান অতিথি।
আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে রাস্তায় একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বিকেল তিনটা থেকে দলটির কিছু মধ্যম সারির নেতা বক্তব্য দেয়া শুরু করেন।
বিকেল চারটার দিকে শুরু হয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য দেয়ার পালা। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখনও এসে পৌঁছাননি। দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরা শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় ছিলেন।
ঐ সমাবেশে তখন উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের তৎকালীন সদস্য ও বর্তমানে শিল্পমন্ত্রী আমির হেসেন আমু।
২০১১ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আমির হোসেন আমু বলেন, "নেত্রীর বক্তব্য শেষ হবার সাথে সাথে হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনলাম। প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, এদিক-ওদিক তাকালাম। তখন চারপাশে চিৎকার শুনতে পেলাম।"
এভাবে দফায়-দফায় বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠে। সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রথমে বুঝতে পারেননি যে এটি ছিল গ্রেনেড হামলা। অনেকেই ভেবেছিলেন বোমা হামলা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করেছিলেন।
গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা
যখন গ্রেনেড হামলা শুরু হলো, তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেন - যাতে তাঁর গায়ে কোন আঘাত না লাগে।
যেসব নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তখন মি: হানিফের মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি মারা যান।
গ্রেনেড হামলার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নেতা-কর্মীরা জীবন দিয়ে তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন।
কান্না জড়িত কণ্ঠে বিবিসি বাংলাকে শেখ হাসিনা বলেন, "আমার নেতা-কর্মীরা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে অনেকেই ইনজিউরড (আহত) হয়েছে। তাদের রক্ত এখনও আমার কাপড়ে লেগে আছে। আমার নেতা-কর্মীরা তাদের জীবন দিয়েই আমাকে বাঁচিয়েছে।"
ঐ গ্রেনেড হামলায় ২৪জন নিহত, আর আহত হয় আরও অনেকে।
গ্রেনেড হামলার দিন বিবিসি বাংলার জন্য আওয়ামী লীগের ঐ সমাবেশের খবর সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন তৎকালীন সংবাদদাতা হাসান মাসুদ।
ঘটনার ভয়াবহতা দেখে তিনি রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যান তখন।
হাসান মাসুদের বর্ণনা ছিল এ রকম: "আমি প্রথম যে দৃশ্যটা সেখানে দেখেছিলাম আইভি রহমানের। আমি ওনাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। উনি বসা, চোখ দুটো খোলা, নির্বাক। ঠিক মঞ্চের সামনে দু'পাশে দু'জন লোক তাকে ধরে রেখেছে।"
"আইভী রহমানকে দেখে আমি ঘটনার ভয়াবহতা বুঝে গেলাম। মঞ্চের চারপাশে প্রচুর স্যান্ডেল-জুতা পড়ে ছিল। প্রচুর নিহত ও আহত মানুষ ছিল চারপাশে। কারো হাত নাই, কারো পা নাই।"
২১শে অগাস্টে গ্রেনেড হামলার পর বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউতে পরে ছিল জুতা, স্যন্ডেল - এমনকি অবিস্ফোরিত গ্রেনেড
হাসান মাসুদের বর্ণনা অনুযায়ী ১২টির বেশি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়েছিল। আরো কয়েকটি গ্রেনেড অবিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
গ্রেনেড হামলায় আহত অনেকেই এখনও শরীরে আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন। এদের একজন নাসিমা ফেরেদৗসি। তাঁর শরীরে এখনও দেড় হাজারের মতো গ্রেনেডের স্প্লিনটার রয়েছে। শরীরের ভেতর এসব স্প্লিনটার নিয়ে যন্ত্রণা-কাতর জীবন পার করছেন নাসিমা ফেরদৌসি।
ঘটনার দিন মঞ্চের খুব কাছেই অবস্থান করছিলেন নাসিমা ফেরদৌসি।
২০১১ সালে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নাসিমা ফেরদৌসি বলেন, "হঠাৎ করে এক বিকট আওয়াজ শুনলাম। এরপর আরেকটি আওয়াজ। আমি দৌঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমরা পা নড়ছিল না।"
"দ্বিতীয় আওয়াজের সাথে সাথে দেখলাম আমার শরীর রক্তে ভেসে গেছে। এরপর আমি সেন্সলেস (অজ্ঞান) হয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে দেখলাম লাশ আর লাশ। আমি বলছিলাম বাঁচাও-বাঁচাও।"
কিছুক্ষণ পরে আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন নাসিমা ফেরদৌসি। আশপাশের সবাই ভেবেছিল নাসিমা ফেরদৌসি মারা গেছে। তাকে মৃত ভেবে একটি মৃতদেহবাহী ট্রাকে তোলা হয়। তখন আবারও জ্ঞান ফিরে আসে নাসিমা ফেরদৌসির। ব্যথায় চিৎকার করে তিনি আবারও বলতে থাকেন 'বাঁচাও-বাঁচাও'।
গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভী রহমান, যিনি পরে মারা যান
গ্রেনেড হামলায় নাসিমা ফেরদৌসির দুটো পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার পা দু'টো কোন রকমে টিকে যায়। কিন্তু চার বছর তাকে কাটাতে হয়েছে হুইল চেয়ারে।
ভয়ানক ঐ দিনের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নাসিমা ফেরদৌসি।
২১শে অগাস্টের হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ উল্টো তাদের হেনস্থা করেছে। সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা বিতর্ক এবং প্রশ্ন রয়েছ।
ঘটনার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "আমাদের নেতা-কর্মীরা যখন আহতদের সাহায্য করতে গেছে, ঠিক সে সময় পুলিশ উল্টো টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও তাদের গ্রেফতার করতে শুরু করেছে।"
শেখ হাসিনা বলেন, আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে না এসে পুলিশ যখন উল্টো টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও গ্রেফতার করতে শুরু করলো, তখন বুঝতে পারা যায় যে এ ঘটনা তাদের মদদে হয়েছে।
এই মামলার বিচার কাজ এখনও নিম্ন আদালতে চলছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে দুই প্রধান দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রদূতরা গ্রেনেড হামলার পর শেখ হাসিনাকে দেখতে গিয়েছিলেন
আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, তাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার জন্যই সেদিনের গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল।
এই ধারণার সাথে অনেকেই একমত পোষণ করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি'র মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তিক্ত, যার একটি বড় কারণ হচ্ছে ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা। গ্রেনেড হামলার ঘটনা দুই দলকে আরও বেশি বিপরীত মেরুতে ঠেলে দিয়েছে।
গ্রেনেড হামলার সময় এবং তারপরের তদন্ত নিয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় প্রশ্ন উঠেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।
জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার ঘটনায় পুনরায় তদন্ত হয়।
সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুনরায় তদন্ত হয়।
ঐ তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি'র অন্যতম শীর্ষ নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সহ বেশ কয়েকজন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং পুলিশের সাবেক তিনজন মহাপরিদর্শক বা আইজিপি'র নাম আসে।
বিএনপি অবশ্য এই তদন্তকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক' বলে বর্ণনা করে।
ঘটনার পরের দিন শেখ হাসিনা যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, তখনও তিনি হত-বিহ্বল

২১ আগস্ট ও শেখ হাসিনা by অধ্যাপক ড. নাসিম বানু

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুরতম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি বর্হিভূত বর্বরোচিত ঘটনা হলো— ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ওপরে গ্রেনেড হামলা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা করার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসন করা। বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কারণ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির কাছে অন্যতম প্রধান বাধার নাম হলেন শেখ হাসিনা। কখনো তার নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো তার গাড়িবহরে হামলা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে আর এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে তাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা করার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে একটি ট্রাক এনে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার আগে সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণ শেষে তিনি “জয় বাংলা” “জয় বঙ্গবন্ধু” বলার সঙ্গে সঙ্গে পর পর দুটি আর্জেস গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। এরপর সামান্য বিরতি দিয়ে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ শুরু হয়, শুরু হয় গুলির আওয়াজ। হামলায় আহত নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরা সাহায্য করতে গেলে পুলিশ তাদের ওপরে টিয়ারসেল ছুড়ে উদ্ধার কাজে সাহায্য না করে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। শুধু তাই নয় পুলিশ সেই সময় মামলার আলামত সংরক্ষণ না করে তা নষ্ট এবং বিলীন করে দিতে উদ্যোগী হয় বলেও অভিযোগ উঠে আসে। মঞ্চে উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে সেদিন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে গ্রেনেড হামলার হাত থেকে রক্ষা করেন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। অপূরণীয় ক্ষতি হয় ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের। দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন।

এদের মধ্যে আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ২৪ আগস্ট মারা যান। এবং প্রায় দেড় বছর পরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জালড়ে ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যু হয়। প্রায় কয়েকশ জন নেতাকর্মী আহত হন যারা হয় শরীরে স্প্লিন্টার বহন করে যন্ত্রণায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে অথবা পঙ্গু জীবনযাপন করছে। যার ফলশ্রুতিতে কয়েকশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রেনেড হামলার বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ২১ শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার যে ষড়যন্ত্র তার মূল পরিকল্পনা হয়েছিল হাওয়া ভবনে। ইনডেমনিটি বিলের মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার ২৩ বছর দুই মাস পর জাতি, জাতির পিতা হত্যার দায় থেকে কলঙ্কমুক্ত হয় বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতির পিতাকে হত্যা করার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র থেমে না গিয়ে বহমান থাকে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট শনিবার আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়। শেখ হাসিনাকে হালকা নাসতা করানো হবে: এই উদ্ধৃতি দিয়ে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনের কতিপয় সদস্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় হামলা করে। তত্কালীন রাষ্ট্রযন্ত্রীয় সহায়তায় প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটনাস্থল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ-এর সম্মুখে যুদ্ধে ব্যবহূত স্পেশালাইজড মরণাস্ত্র, আর্জেন্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশ্ন ওঠে কেন এই মরণাস্ত্রের ব্যবহার? রাজনীতি মানেই কি বিরোধী দলের ওপর পৈশাচিক আক্রমণ? শুধু আক্রমণই নয় দলকে নেতৃত্বশূন্য করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা। রাজনীতিতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে শত বিরোধ থাকবে। তাই বলে বিরোধী দলকে নেতৃত্বশূন্য করার প্রয়াস চালানো হবে এটা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যে দলই থাকবে, বিরোধী দলের প্রতি তাদের উদার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে। বিরোধীদলীয় নেতাদের হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন করা মোটেও গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।

আমাদের জাতির পিতার কন্যা বেঁচে গেলেন, বেঁচে গেলেন আমাদের জন্য, বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দেবার জন্য, মুক্তি যুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য, তারুণ্যের বাংলাদেশ গড়ার জন্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য।

>>>লেখক : ডিন, ফ্যাকাল্টি অব স্যোশাল সায়েন্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

‘তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল’ by আশরাফুল ইসলাম

আইভি রহমান। পুরো নাম জেবুন্নাহার আইভি। ২১শে আগস্টে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪শে আগস্ট আজন্ম রাজনৈতিক এই নেতা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার চির প্রস্থানে জন্মস্থান ভৈরবের মানুষ হারায় তার একান্ত সুহৃদ, প্রিয় আইভি আপাকে। পৈশাচিক গ্রেনেড হামলায় প্রিয় আইভি আপার গুরুতর আহত হওয়ার খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো ভৈরব। পরদিন ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। হরতালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবদুল কুদ্দুস (৩২) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী।
নিহত কুদ্দুসের পরিবার বিচার না পেলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয় ৩টি মিথ্যা মামলা।

ওই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক মানবজমিন-এর ভৈরব প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২২শে আগস্ট দিনটি ভৈরববাসীর জন্য এক কালোদিন। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান আহতসহ হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এ হরতাল আহ্বান করে। হরতালের সমর্থনে ভোর থেকে নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজার আওয়ামী লীগ অফিসে জড়ো হন। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি ভৈরব বাজার রেলজংশনের মনমরা রেলসেতুর কাছে পিকেটারদের কবলে পড়ে। উত্তেজিত জনতা ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ও টিয়ার শেল ছোড়ে। গুলিতে আবদুল কুদ্দুস নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। ঘটনার পর উত্তাল হয়ে পড়ে ভৈরব। এ ঘটনায় পুলিশ ভৈরবের ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৩টি মিথ্যা মামলা করে। মিথ্যা মামলা করায় আওয়ামী লীগ লাগাতার কর্মসূচি দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালায়। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে ভৈরব ছাড়তে বাধ্য হন। পুলিশ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে।

সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বদা পরিশ্রমী, অক্লান্ত ছুটে চলা আইভি রহমান আজ স্মৃতির সাদা ফ্রেমে বাঁধা নিশ্চুপ ছবি হলেও, ভৈরববাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে তিনি জীবন্ত, চলমান। তিনি বেঁচে আছেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে।

ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক উলফাত আরা জাহান জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি যখন ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন, আইভি রহমান তখন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান। ভৈরবে আসলেই তিনি ডাকতেন। কথা ও কাজে এক ছিলেন তিনি। দেশীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। শুঁটকির ভর্তা ছিল তার প্রিয় খাবার। ১৯৯৮ সালে মহিলা সংস্থার অফিস নির্মাণ ছাড়াও মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি ভৈরব বাজারে মহিলা সমবায় মার্কেটের জন্য জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। উলফাত আরা জাহান বলেন, নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার এমন মানুষ আর দেখা যায় না। গ্রেনেড হামলার ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি ভৈরবে এসেছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উলফাত আরা জাহান বলেন, ওই বছর ভৈরবে বন্যা হয়েছিল। নিজ এলাকার দুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জলাবদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি বাড়ি ছুটে গিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ত্রাণসামগ্রী। জন্মস্থান ভৈরবে তিনি আজীবন এভাবে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে এখানকার নারীদের উন্নয়ন এবং সমাজের অবহেলিত শিশু, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে তিনি ব্যাপক কাজ করেন। সেসব অসহায় মানুষের কাছে আইভি রহমান এখনো দেবীতুল্য। উলফাত আরা জাহান জানান, একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন করতেন আইভি রহমান। পরতেন সুতির শাড়ি। আমৃত্যু মানুষকে ভালোবেসে গেছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষকে অকাতরে দান করলেও সেসব প্রচার করতেন না তিনি। তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল।

১৯৪৪ সালের ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব শহরের চণ্ডিবের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সভ্রান্ত এক পরিবারে তার জন্ম। পিতা মরহুম জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। মা হাসিনা বেগম ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। ৮ বোন ও ৪ ভাইয়ের মধ্যে আইভি পঞ্চম। ছেলেবেলা থেকেই আইভি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, তবে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের জন্য তাকে বাইরে থেকে খুব কঠিন মনে হলেও, আদতে তিনি ছিলেন খুবই দরদি মনের মানুষ। যারা মিশেছে, কাছে গেছে তারাই পেয়েছে অপরিসীম ভালোবাসা, আদর, মমতা আর সহযোগিতা। প্রথম দর্শনেই আইভিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নবম শ্রেণি পড়ুয়া আইভির সঙ্গে ১৯৫৮ সালের ২৭শে জুন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের বিয়ে হলে নামের পরে ‘রহমান’ যুক্ত হয়। এ নামেই তিনি পরিচিতি পান দেশব্যাপী। শুধু আওয়ামী রাজনীতির জন্য নয়, আইভি রহমান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও জড়িত ছিলেন। তার বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। একমাত্র ছেলে বিসিবি সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন, দুই মেয়ে তানিয়া বখ্‌ত ও তনিমা রহমান ময়না এবং তাদের ছেলেমেয়ে ও স্বামী জিল্লুর রহমানকে নিয়ে তার পারিবারিক জীবন ছিল খুবই গোছানো। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে আইভি রহমানের মৃত্যুর পর তাই বিষাদভরা কণ্ঠে মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছিলেন, ‘আইভিকে ছাড়া আমি জীবন্মৃত।’ ভৈরবের বাড়ির ‘গৃহকোণ’ নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আইভি ভবন’। এই বাড়িটিতে ভৈরববাসীর সঙ্গে আইভি রহমানের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আইভির অসামপ্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই সঙ্গে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে আইভি রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আইভি রহমান চলে গেছেন বার বছর হলো। কিন্তু ভৈরবে ‘আইভি ভবন’ আছে আগের মতোই। সেখানে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এসে অশ্রু-পুষ্পে ভৈরববাসী স্মরণ করেন তাদের প্রিয় নেত্রী আইভি রহমানকে। বাংলার এই কৃতী সন্তানের স্মরণে ভৈরবের কমলপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নির্মাণ করা হয়েছে ‘আইভি রহমান গেইট’। চণ্ডিবের গ্রামের নিজ বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ভৈরব জিল্লুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজের একটি ছাত্রীনিবাসের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। আইভি রহমান নিহত হওয়ার পর তার নামে ভৈরবে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল এলাকাবাসী। কিন্তু সেটি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

বিবিসির অনুসন্ধান: তাজমহল কি কখনো হিন্দু মন্দির ছিল?

লাখ লাখ মানুষ তাজমহল দেখতে ভারতে যায়
বিতর্কিত দাবি: তাজমহল ছিল হিন্দু মন্দির!
লাস্ট আপডেট- ৩ নভেম্বর ২০১৭: একজন ভারতীয় এমপি এবং কিছু ডানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করছে তাজমহল ছিল একটি হিন্দু মন্দির। ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির ভিনয় কাটিয়ার এমনকি তাজমহলের নাম বদলে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। তিনি বলছেন, একজন হিন্দু শাসক তাজমহল তৈরি করেছেন।
ভারতের গণমাধ্যমে তার এই দাবি ব্যাপক প্রচার পায়। অনেক ডানপন্থী গোষ্ঠী তাঁর এই দাবি সমর্থন করে।
বিবিসির 'রিয়েলিটি চেক' অনুসন্ধানের রায়:
এই দাবির পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য কোন প্রমাণ নেই। বরঞ্চ ইতিহাসবিদদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, এমনকি ভারত সরকার পর্যন্ত মনে করেন, এই সৌধ ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক চমৎকার নিদর্শন।

তাজমহল কে তৈরি করেছে?

ভারতের সরকারীভাবে সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট শাহ জাহান তাজমহল তৈরি করেছিলেন তাঁর মৃত স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মরণে।
ভারতের মোগল শাসকরা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে তারা ভারত শাসন করে।
মোগল শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে ইসলামী শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।
শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ব্যাপারে মোগলদের যে অনুরাগ, তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন বলে গণ্য করা হয় তাজমহলকে।
ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ তাজমহলকে বর্ণনা করেছে 'মোগল স্থাপত্যকলার চূড়ান্ত নিদর্শন' হিসেবে।
আর তাজমহল নিয়ে ভারত সরকারের যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে বলা হচ্ছে, "ইসলামী স্থাপত্যকলার সঙ্গে ভারতের স্থানীয় স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে গড়ে উঠা সেসময়ের স্থাপত্য রীতির সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহারণ এটি।"
এতে আরও বলা হয়, মোগলরা যখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ করে, তখনও তারা তাদের পারস্য এবং তুর্কী-মোঙ্গল শেকড় নিয়ে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু ততদিনে তারা একই সঙ্গে নিজেদের ভারতীয় বলেও ভাবতে শুরু করেছে।
ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বিবিসিকে বলেন, "তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না। সেখানে যে কখনো কোন মন্দির ছিল তার কোন প্রমাণ নেই।"
"তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিং এর একটি 'হাভেলি' (প্রাসাদোপম বাড়ি) ছিল।"
"শাহজাহান এই হিন্দু শাসক জয় সিং এর কাছ থেকে হাভেলিটি কিনে নেন। এ নিয়ে একটি 'ফরমান' জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে। এই ফরমানে দেখা যাচ্ছে মোগলরা তাদের বিভিন্ন চুক্তি এবং ইতিহাস রক্ষায় বেশ সচেতন ছিল।"
রানা সাফভি বলেন, ডাব্লিউ ই বেগলি এবং জেড এ ডেসাহাসের লেখা একটি বইতে এসব দলিল সংকলন করা আছে।.
" এসব বই পড়ে আমি উপলব্ধি করি, এসব ভবন এবং সৌধের ইতিহাস কত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই বই পড়েই আমি যুক্তি দিতে পারি যে তাজমহল তৈরি হয়েছে রাজা জয় সিং এর বাড়ির জমির ওপর, এবং সেখানে কোন ধর্মীয় ভবন থাকার কোন উল্লেখ কোথাও নেই।
আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হারবনস মুখিয়াও রানা সাফভির সঙ্গে একমত।
'শাহজাহান যে তাঁর স্ত্রীর স্মরণে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।"
ভারতের স্কুল পাঠ্য বই এবং বিভিন্ন সরকারী সাইটেও তাজমহলকে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

মন্দির তত্ত্ব:

তাহলে তাজমহল যে মন্দির ছিল সেই কাহিনী কোত্থেকে আসলো?
তাজমহলের ইতিহাস নতুন করে লেখার দাবি ভিনয় কাটিয়ারই যে প্রথম জানিয়েছেন তা নয়।
এর আগে ডানপন্থী ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা 'তাজমহল: দ্য ট্রু স্টোরি' বইতে এই সৌধকে 'তেজো মহল' বলে দাবি করেন।
বইতে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এটি ছিল আদতে একটি হিন্দু মন্দির এবং একজন রাজপুত শাসক এটি তৈরি করেন।
মিস্টার ওক মনে করেন, সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন।
লেখক সচ্চিনানন্দ শেভডে ইতিহাসবিদ পিএন ওকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বিবিসির মারাঠী সার্ভিসকে বলেন, সরকারের উচিত 'প্রকৃত সত্য' উন্মোচনের জন্য একটি দল নিয়োগ করা।
"তাজমহল কোন মুসলিম স্থাপত্য নয়। এটি আসলে একটি হিন্দু স্থাপত্য", দাবি করছেন তিনি।
কিন্তু সরকারের তাজমহল ওয়েসবাইটে দাবি করা হচ্ছে, এই স্থাপত্য পারস্য, ভারতীয় এবং ইসলামী স্থাপত্যকলার সংমিশ্রন।

স্থাপত্য রীতি:

মিস্টার কাটিয়ারএবং মিস্টার শেভডে, উভয়েই যুক্তি দেন যে, তাজমহলের স্থাপত্যে অনেক হিন্দু স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।
"তাজমহলের শীর্ষে একটি অর্ধাকৃতি চাঁদ আছে। ইসলামিক স্থাপত্যে এই চাঁদটি সাধারণত বাঁকা থাকে। কিন্তু তাজমহলের চাঁদ বাঁকা নয়। এই চাঁদ আসলে হিন্দু দেবতা শিবের সঙ্গে সম্পর্কিত।"
"এছাড়া এই সৌধ চূড়ায় একটি কলসও আছে। সেখানে আমের পাতা এবং উল্টে রাখা নারকেলও আছে। এগুলো হিন্দু প্রতীক। ইসলামী সংস্কৃতিতে ফুল, পশুর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও তাজমহলে এসব ব্যবহার করা হয়েছে।
মিস্টার মুখিয়া অবশ্য এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
"স্থাপত্য রীতি সব সময় বদলায় এবং সেখানে বহু সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। মোগল স্থাপত্যকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। কলস হিন্দু স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অনেক মোগল স্থাপত্যেও এটি দেখা যায়, তাজমহলেও। মোগলদের তৈরি আরও অনেক স্থাপত্যে কলস এবং পাতা দেখা যাবে।"

এখন কেন এই বিতর্ক:

বহু যুগ ধরে ভারতের পর্যটন বিভাগ সেদেশে পর্যটক টেনে আনার জন্য তাজমহলকে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে তুলে ধরছে। শাহজাহান এবং মমতাজ মহলের প্রেম নিয়ে অনেক কবি-লেখক রচনা করেছেন অনেক কাহিনী।
কাজেই হঠাৎ ভিনয় কার্টিয়ার এরকম কিছু দাবি তুলে কি অর্জন করতে চাইছেন?
ভারতে যখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে, তখন তিনি এরকম একটা বিতকির্ত দাবি তুলেছেন। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলটির রাজনীতিকরা 'হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব' প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ধরণের বিতর্কিত দাবি একই সঙ্গে রাজনীতিকদের একটা সুযোগ করে দেয় কর্মসংস্থান বা অর্থনীতির অবস্থার মতো বাস্তব ইস্যু থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে।
যদিও সরকার এখনো পর্যন্ত তাজমহল বিষয়ক এই দাবিকে সমর্থন করেনি, ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো এ নিয়ে সরব।
এরকম একটি গোষ্ঠী এমন দাবিও তুলেছে যে, তাজমহলে হিন্দুদের পুজা করতে দিতে হবে।
(বিবিসি নিউজের 'রিয়েলিটি চেক' নানা বিতর্কিত দাবি এবং 'ফেইক নিউজে'র মধ্য থেকে প্রকৃত ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করে)
তাজমহল: স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতি অম্লান রাখতে সম্রাট শাহজাহান তৈরি করেন এই সৌধ।

ভয়াল ২১শে আগস্ট আজ

ভয়াল ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার বার্ষিকী আজ। ২০০৪ সালের এই দিনে  ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ সমাবেশ রক্তাক্ত হয় সন্ত্রাসের থাবায়। বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতা-কর্মী শাহাদাত বরণ করেন। গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হন পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী। আহত হন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ। আহত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী-সমর্থকদের অনেকে এখনও স্প্লিন্টারের আঘাত নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আওয়ামী লীগ জানিয়েছে, দলকে নেতৃত্ব শূন্য করতে সংগঠনের সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ দলের প্রথম সারির নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ওই ঘৃণ্য হামলা চালায় ঘাতকচক্র। শুধু গ্রেনেড হামলাই নয়, সেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাড়ি লক্ষ্য করে চালানো হয় ছয় রাউন্ড গুলি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আহত হন। তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দিবসটি উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, মোমবাতি প্রজ্জ্বলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে দলের নেতা কর্মীরা আজ সকাল ৯ টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত বেদীতে পুস্পার্ঘ নিবেদন করবেন।

একইদিন বিকাল ৪টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বক্তব্য রাখবেন দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্টের কালরাতের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তপিপাসু বিএনপি-জামায়াত অশুভ জোটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওইদিন  শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আকস্মিক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশৃংখলা, দিনের আলো মুছে গিয়ে এক ধোয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঢাকা’র তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতা এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তাৎক্ষণিকভাবে এক মানব বলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে শেখ হাসিনাকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন। মেয়র হানিফের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপচার করার কথা থাকলেও গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে থাকার কারণে তার অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ব্যাংকক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় উল্লেখযোগ্য নিহতরা হলেন- আইভি রহমান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অবঃ) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া। মারাত্মক আহতরা হলেন শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক (প্রয়াত), সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (প্রয়াত), ওবায়দুল কাদের, এডভোকেট সাহারা খাতুন, মোহাম্মদ হানিফ, এএফএম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা পারভীন, এডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ।

ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টার অভিযোগ ছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন ছিল তদন্ত কার্যক্রম নিয়েও। সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকার এ হামলার পুনারায় তদন্তের নির্দেশ দিলে এবং সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জশিট নথিভুক্ত করা হয়। পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে গত বছরের ১০ই অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত। এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এক বিবৃতিতে সকল নেতা, কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে কর্মসূচি পালনের আহবান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব শাখার নেতৃবৃন্দকে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করে দিবসটি স্মরণ ও পালন করার আহ্বান জানান।

Thursday, August 20, 2020

ঊর্ধ্বলোকে সংযোগ পাওয়ার পথ -মওলানা রুমির মসনবি শরিফ by ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

তুমি দুনিয়াপূজার রোগে আক্রান্ত। তাই মন বাজে চিন্তার আখড়া। জীবনটা চলে যাচ্ছে অর্থহীন কাজের পেছনে। কাজেই তোমাকে সংযমের জীবন বেছে নিতে হবে। চিন্তা ও কর্মে শয়তানি মন্ত্রণা সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নচেৎ তা হবে তোমার আত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্য বিষ-জহর-হলাহল। ডায়াবেটিস রোগীর দেহে মিষ্টান্ন খাবার মরণ ডেকে আনে। নফসের রোগে আক্রান্ত রুহে ভোগ বিলাসিতা, শয়তানি চিন্তামগ্নতা রুহানি মৃত্যু ঘটায়।
মওলানা রুমি (রহ.) এর জীবনদর্শনের মূলকথা, আধ্যাত্মিক স্বাদে হৃদয় পরিতৃপ্ত কর আর যে দেশ থেকে এসেছ সে দেশে ফিরে যেতে উড়াল দাও। মওলানার কাছে একজন প্রশ্ন করে, সে দেশ কোথায়? কীভাবে উড়াল দেব এই জগৎ ছেড়ে? মওলানা বলেন, তোমার প্রশ্নের জবাব আমি হাকিম সানায়ির ভাষায় দিতে চাই।
গর রা’হ রওয়ী রা’হ বরত বগুশা’য়ন্দ
ওয়ার নীস্ত শওয়ী বে হাস্তিয়ত বেগ্রা’য়ন্দ
যদি সম্মুখে এগিয়ে চল তোমার জন্য রাস্তা খুলে দেবে
যদি ‘অস্তিত্বহীন’ হতে পার ‘অস্তিত্ব’ তোমায় দেওয়া হবে।

সেই দেশে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে হলে সম্মুখে এগিয়ে চলো। দেখবে, তোমার পথের বাধা একেক করে সরে যাচ্ছে। রাস্তা খুলে যাবে। নিজেকে তার কাছে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে অস্তিত্বহীন হয়ে যাও। তোমাকে মানবিক গুণাবলিতে সজ্জিত নতুন জীবন দেওয়া হবে। তার দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। আল্লাহ তো বলেছেন, ‘আর যারা আমার পথে প্রাণান্ত সাধনা করে, জিহাদ করে, তাদের অবশ্যই আমার পথগুলোয় পরিচালিত করব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্র্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)।
তুমি পথ খুঁজে না পাওয়ার কারণ হলো, তোমার হুঁশজ্ঞান, চিন্তা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছ। আজেবাজে অনর্থক চিন্তায় ও কাজে নিজেকে মহাব্যস্ত করে রেখেছ। তোমার অস্তিত্বের বাগানে জ্ঞানবুদ্ধির যে পানি আছে, তা কাঁটাগুল্মের শিকড় চুষে নিচ্ছে। অনর্থক বিষয়, আজেবাজে চিন্তা, সৎ-উদ্দেশ্যহীন তৎপরতা কাঁটাগুল্মস্বরূপ। এগুলো তোমার জ্ঞানের বুদ্ধিমত্তার রস চুষে খাচ্ছে। ভোগ-বিলাসিতা, আত্মপূজা ও অহঙ্কারের নানা অনুষঙ্গের পেছনে তোমার ধ্যান-জ্ঞান, চেষ্টা ও সাধনা উজাড় হচ্ছে। ফলে তোমার অস্তিত্বের ভালো গুণ, উপাদেয় উপকারী বীজ ও চারাগাছ, তোমার জ্ঞানবুদ্ধির পানি দ্বারা সিঞ্চিত হতে পারছে না।
তোমার গোটা অস্তিত্ব শস্যক্ষেতের মতো। এখানে আগাছা আছে, ভালো ফল-ফুলের চারাগাছও আছে। বাজে বাতিল চিন্তা ও কর্মের আগাছা, যদি শস্যক্ষেতের পানি চুষে নেয়, আসল চারাগাছ তো পানি পাবে না। কাজেই ভালো ফল কীভাবে আশা করতে পার? তুমি আল্লাহর কথা নিত্যস্মরণ রেখে অস্তিত্বের চারাগাছে পানি দাও। অন্তরের জমি জিকির ও ফিকিরে তরতাজা রাখ। চোখ-কান খাড়া রেখে ক্ষেতের যত আগাছা শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেল।
বাগানের পানি আগাছার জন্য হারাম আর চারাগাছের জন্য হালাল- এই পার্থক্যটুকু তোমাকে বুঝতে হবে। বাগানের পানি মানে আকল বুদ্ধি, হুঁশজ্ঞান, যা তোমাকে দেওয়া আল্লাহর নেয়ামত। এ নেয়ামতের সদ্ব্যবহার কর, হক আদায় কর, কদর কর, যথাস্থানে কাজে লাগাও। এটি হালাল। অযথা অপাত্রে অপব্যবহার করা হারাম।
নে‘মতে হক রা’ বে জা’ন ও আকল দেহ
না বে তাবএ পুর যহীর ও পুর গেরেহ
আল্লাহর নেয়ামত উৎসর্র্গ কর প্রাণ ও আকলের কাজে
রোগশোকের আখড়া দেহের সেবায় উজাড় কর না তাকে।

তোমার রূহের উন্নয়নের কাজে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামত ব্যবহার কর, কেবল দেহের সেবায় ব্যয় করলে তা হবে ‘উলু বনে মুক্তা ছড়ানো’। চোখের শোভা ও জ্যোতির জন্য আমরা সুরমা মাখি। এই সুরমা যদি চোখের পরিবর্তে কানে ঢাল, কী অবস্থা হবে? কেউ যদি বুঝতে পারে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে তাহলে সংযম অবলম্বন করতেই হবে। চিনি ও মিষ্টান্ন পরিহার করে চলতে হবে। তুমি দুনিয়াপূজার রোগে আক্রান্ত। তাই মন বাজে চিন্তার আখড়া। জীবনটা চলে যাচ্ছে অর্থহীন কাজের পেছনে। কাজেই তোমাকে সংযমের জীবন বেছে নিতে হবে। চিন্তা ও কর্মে শয়তানি মন্ত্রণা সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নচেৎ তা হবে তোমার আত্মিক ও নৈতিক জীবনের জন্য বিষ-জহর-হলাহল। ডায়াবেটিস রোগীর দেহে মিষ্টান্ন খাবার মরণ ডেকে আনে। নফসের রোগে আক্রান্ত রুহে ভোগ বিলাসিতা, শয়তানি চিন্তামগ্নতা রুহানি মৃত্যু ঘটায়।
হে সাধক! তোমার অস্তিত্বের জমিনে দুই ধরনের গাছ আছে, দেখতে একই রকম সবুজাভ লিকলিকে। এক রকম চারাগাছ ফুলের বা ফলের, আরেক রকম চারাগাছ আগাছার। আগাছার শিকড় বিস্তৃত দোজখের আগুন ও ধোঁয়া থেকে। আর ফল-ফুলের চারাগাছের গোড়া সাত আসমানের উপরে। দূর থেকে মনে হবে, খামার বাড়িতে উভয় চারাগাছে সবুজের সমারোহ জেগেছে। যদি আগাছা আর চারাগাছের মাঝে ফারাক করতে না পার, জীবন বৃথা যাবে। ফারাক করতে চাইলে চোখ মেলে তাকাতে হবে। এই তাকানো বাহ্যদৃষ্টিতে নয়। কারণ, বাহ্যইন্দ্রিয়ের চোখ সাধারণত ভুল দেখে। যেমন অনেক দূরে হলে দেখে না, চোখের একেবারে কাছে ধরলেও দেখা যায় না। তাই তোমাকে দিলের চোখ খুলতে হবে। দিব্যদৃষ্টি খুলতে হলে তোমাকে আসতে হবে যিনি প্রাণের প্রাণ তার কাছে।
আগন্তুক প্রশ্ন করে, কীভাবে আসব? আমাকে যে জড়িয়ে ধরেছে দুনিয়ার সহায় সম্পদ, নামধাম, পদবি খ্যাতির মোহ? মওলানা রুমি বলেন, দৌড় দাও, তাহলে ছিঁড়ে যাবে দুনিয়ার বাঁধন। তারপরের প্রশ্ন, দৌড় কীভাবে দেব? মওলানা বাতলে দিচ্ছেন-
গর যুলায়খা বস্ত দরহা’ হার তরফ
ইয়াফত ইউসুফ হাম যে জুম্বিশ মুনসারাফ
জুলায়খা যদিও বন্ধ করেছিল সবদিক থেকে দরজা
ইউসুফ চেষ্টার দৌড়ে পেয়েছিল বাঁচবার আশ্রয় রাস্তা।

মওলানা এখানে কোরআন মজিদে বর্ণিত হজরত ইউসুফ (আ.) এর জীবনের একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সৎভাইরা খেলার নাম করে বাবা ইয়াকুব (আ.) এর কাছ থেকে ইউসুফকে মাঠে নিয়ে পরিত্যক্ত কুয়ায় নিক্ষেপ করেছিল। একটি বাণিজ্য কাফেলা যাত্রাবিরতিকালে কুয়ার পানি সংগ্রহে গিয়ে ফুটফুটে বালক ইউসুফকে পেয়ে মিসরের দাস বাজারে বিক্রি করে। পাল্লার একদিকে স্বর্ণ অন্যদিকে ইউসুফের ওজনে ইউসুফকে খরিদ করেন প্রধানমন্ত্রী আজিজ। রাজপ্রাসাদে নিয়ে গেলে আজিজপতœী জুলায়খা আসক্ত হয়ে পড়ে অনিন্দ্য সুন্দর ইউসুফের প্রতি। জুলায়খা ইউসুফের কাছে বারবার প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়। মনিবের ঘরে অসহায় ইউসুফকে একদিন জুলায়খা নানা ছলে অন্দর মহলে আটকায়। শাহী মহলের সব দরজায় তালা লাগায়। তারপর নিজেকে নিবেদন করে ইউসুফের কাছে। কোথাও ছিদ্রপথ পর্যন্ত ছিল না স্বপ্নপুরীতে। হঠাৎ ইউসুফ দৌড় দেন প্রেমাসক্ত জুলায়খার হাত থেকে বাঁচার জন্য। তখই দেখেন, তালা খোলা, দরজা মেলা, পালানোর রাস্তা সম্মুখে। কারণ, ইউসুফ তাওয়াক্কুল করেছিল আল্লাহর ওপর, তারপর চেষ্টার বদৌলতে জুলায়খার ফুসলানোর বাঁধনমুক্ত হতে পেরেছেন আল্লাহর সাহায্যে।
তুমিও যদি দেখ, দুনিয়ার বাঁধন থেকে মুক্তির পথ খোলা নেই, ফাঁকফোকর দেখা যায় না পালানোর, তাহলে ইউসুফের মতো বিচলিত হয়ে তাঁর আশ্রয় পেতে দৌড় দাও। মন থেকে বল, আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজিমÑ ‘আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে।’ তখন তোমার সামনেও খুলে যাবে মুক্তির পথ। খুলে যাবে ওই জগতের তালা। দেখবে, দরজা খোলা। তোমাকে তখন এমন জায়গায় নিয়ে যাবে, যার কোনো নাম-ঠিকানা নেই।
মওলানা এখন প্রশ্ন করেন, এই যে দুনিয়াতে এসেছ, জান কি কোত্থেকে এসেছ? তুমি হকিকতের এক বিশাল জগতে ছিলে। সেখান থেকে জড় জগত, উদ্ভিদ জগতের পথপরিক্রমা শেষে পরীক্ষার জন্য নেমে এসেছ পার্থিব জগতে, দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে, সমাজে, সংসারে।
তো যে জা’য়ী আ’মাদী ওয়ায মাওতনী
আ’মদন রা’ রা’হ দানী হীচ নয়ী
তুমি এসেছে এমন অঞ্চল হতে এমন এক দেশ ছেড়ে
কীভাবে এখানে, নিশ্চয়ই জান না, এসেছ কোন পথে।

তুমি আগে ছিলে অন্য দেশের নাগরিক। বাস করতে এমন এলাকায়, যার পরিচয় এখন তোমার মনে নেই। কোন পথে এখানে এসেছ তাও অচেনা।
সেই আদি নিবাসের কথা বা আসার পথের কথা তোমার এখন মনে নেই। তাই বলে সেই দেশ ও পথের অস্তিত্বই নেই- এমন কথা তুমি বিশ্বাস কর না। কাজেই তোমাকে যে পথে, যে দেশে যাওয়ার জন্য বলছি তা তুমি চিন না বলে বলতে পার না যে, সেই দেশ ও পথের অস্তিত্ব নেই।
মওলানা আরও বলেন, সেই দেশ সেই ঠিকানার কথা তো আমি আগেই বলেছি।
মা যে বা’লা’য়ীম ও বা’লা’ মী রওয়ীম
মা’ যে উ য়ীম ও বে সূয়ে উ রওয়ীম
আমরা সেই ঊর্ধ্বলোকের, যাব সেই ঊর্ধ্বপানে
এসেছি যেখান থেকে ফিরে যাব তার সন্নিধানে।
ইন ওয়াতান মিসরো ইরাকো ও শা’ম নীস্ত
ইন ওয়াতান জা’য়ী স্ত কূ রা’ না’ম নীস্ত
এই দেশ বলতে মিসর সিরিয়া ও ইরাক নয়
এই দেশ এমন জায়গা, যার নাম-ঠিকানা নেই।
(এই বয়েত দুটি নিকলসন সংকলনে নেই)

সে জগতের একটু পরিচয় নাও। রাতে নিদ্রায় স্বপ্নের জগতে তুমি বিচরণ কর বিশাল প্রান্তরে। বল তো, স্বপ্নের জগতের বিশাল ভুবন কোথায় আছে, তার পথঘাট কোন দিকে? নিশ্চয়ই জান না। হকিকতের জগতের বাস্তবতা স্বপ্নের বিশাল ভুবনের সঙ্গে তুলনা করে বোঝার সাধনা কর। এই বুঝে সমৃদ্ধ হওয়ার জন্যÑ
তো বেবন্দ অ’ন চশমো খোদ তসলীম কুন
খেশ রা বীনী দর অ’ন শহরে কুহুন
তুমি বন্ধ করো এই চোখ সঁপে দাও নিজেকে
তখন দেখবে নিজেই উপস্থিত সেই পুরোনো দেশে।

দুনিয়ার চাকচিক্য, ভোগ, মোহ, দম্ভ আরও যতকিছু হকিকতের পথে ডাকাত সেজে আছে সব বন্ধন ছিন্ন করে তার দিকে ছুটে যাও, নিজেকে তাঁর কাছে সঁপে দিয়ে বল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন’, ‘আমরা তো একান্ত আল্লাহরই এবং নিশ্চিতই আমরা তাঁর কাছে ফিরে যাব।’ (সূরা বাকারা : ১৫৬)।
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত-১০৮৪-১১১৮)