Showing posts with label বগুড়া. Show all posts
Showing posts with label বগুড়া. Show all posts

Monday, May 12, 2025

পীযূষ কান্তির বিরুদ্ধে বেপরোয়া দুর্নীতির অভিযোগ by প্রতীক ওমর ও ইফতেখায়রুল ইসলাম

বগুড়ার শিবগঞ্জে দেউলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর সকল শিক্ষক কর্মচারীদের স্বাক্ষর সম্বলিত লিখিত অভিযোগপত্র প্রদানের দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন শিক্ষকমণ্ডলী। অভিযোগ সূত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে করোনার কারণে এসএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য ৯ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে ফেরত আসে। সে টাকা শিক্ষার্থীদেরকে না দিয়ে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি আত্মসাৎ করেন। স্কুলের হিসাবে ২০২২ সালে ২২ হাজার ৫০০ ও ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৫০০ টাকা স্কুল ফান্ডের অ্যাকাউন্টে জমা রাখার কথা বলে নিজ পকেটে উঠান তিনি। ২০২৩ সালে স্কুল সভাপতি ফজলুল বারি কাটুর স্বাক্ষর জাল করে স্কুলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা উঠিয়ে আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে সোনালি ব্যাংক পিএলসি মোকামতলা শাখা, বগুড়া জেনারেল ফান্ড থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে প্রায় লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন করে লোপাট করেন। একই সালে শিক্ষক কর্মচারীদের মাঝে ৪৫ হাজার টাকা বণ্টন করার কথা বলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উঠিয়ে তা নিজেই নিয়ে নেন।

২০২৩ সালে ইউনিক আইডি খোলার নামে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায়কৃত ৩০ হাজার টাকা তুলে কাজ না করে আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক। প্রশংসাপত্র প্রদান বাবদ শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা করে নিয়ে নিজের পকেটে উঠান। সরকারি বিধি মোতাবেক শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মচারীদের উচ্চতর বেতন প্রাপ্তির ব্যাপারে নানাভাবে হয়রানিও করেন তিনি। পীযূষ কান্তি সাহার অপসারণ চেয়ে গত ৭ই মে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকাবাসী ও শিক্ষক কর্মচারী সকলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন।

মানববন্ধন শেষে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার অপসারণ চেয়ে গণস্বাক্ষর সম্বলিত এক অভিযোগপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক জাহেদ আলম বলেন, প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহা আওয়ামীপন্থি হওয়ায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন এবং চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখান।

সহকারী শিক্ষক দুলালুর রহমান দুলাল বলেন, প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহা আমাদের সহকারী প্রধান শিক্ষক এ কে এম রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তার মানহানির চেষ্টা করছে। রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার বিরুদ্ধে অনেক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এর আগে আমরা সকল শিক্ষক মিলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিস ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। তার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং তার ফোনে খুদেবার্তা পাঠালে কোনো উত্তর জানাননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এ বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি তদন্ত করার জন্য। তদন্ত প্রতিবেদন দিলে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো।

mzamin

Thursday, April 3, 2025

মধ্যরাতে ওসির সঙ্গে মাতলামি, স্বেচ্ছাসেবক দলের তিনজন গ্রেপ্তার, পরে বহিষ্কার

বগুড়ায় মধ্যরাতে পুলিশের একজন ওসির সঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি করার অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা এলাকায় শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলামের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটে। তিনি পুলিশ সুপারের বাসায় ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সপরিবার যোগ দিতে এসেছিলেন। গ্রেপ্তারের আগে ওই তিন ব্যক্তি ওসির স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন বগুড়া শহর স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমিন (৩৬), স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আহসান হাবিব (১৮) ও নুরুল ইসলাম (১৮)। তাঁরা সবাই বগুড়া শহরের মালগ্রাম চাপড়পাড়ার বাসিন্দা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টা থেকে দুইটার দিকে শেরপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম পুলিশের গাড়ি নিয়ে চা পান করতে সাতমাথায় আসেন। এ সময় গাড়িতে ওসির স্ত্রী-সন্তান বসে ছিলেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রুহুল আমিন কয়েকজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে মধ্যরাতে সাতমাথা এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। পুলিশের গাড়িতে নারী দেখে স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই নেতা গাড়িতে বসা নারীর পরিচয় জানতে চান। এ নিয়ে ওসির সঙ্গে রুহুল আমিনের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। এ সময় সেখানে উপস্থিত সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সেরাজুল ইসলাম রুহুল আমিনসহ তিনজনকে আটক করেন।

জানতে চাইলে শেরপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে এসপি স্যারের বাংলোয় ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে সব থানার ওসিরা সপরিবার যোগ দেন। অনুষ্ঠান শেষে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে শেরপুরে ফেরার পথে সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সাতমাথায় চা পানের আমন্ত্রণ জানান। সাতমাথায় গাড়ি দাঁড় করানোর পর সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা কয়েকজন যুবক এগিয়ে এসে গাড়ির ভেতরে বসা আমার স্ত্রী-সন্তানের পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। সদর ফাঁড়ির পরিদর্শক সঙ্গেই ছিলেন। তিনি ওই যুবকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি গাড়ি নিয়ে শেরপুরে চলে এসেছি। পরে সেখানে কী হয়েছে সেটা বলতে পারব না।’

বগুড়া সদর থানার ওসি এস এম মঈনুদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি মধ্যরাতে সাতমাথায় মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি এবং সাধারণ মানুষকে উত্ত্যক্ত করছিলেন। এসপি স্যারের বাংলোয় অনুষ্ঠান শেষে শেরপুর থানার ওসি তাঁর গাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সাতমাথায় চা খেতে এলে তাঁর সঙ্গেও ওই মদ্যপ ব্যক্তিরা মাতলামি ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ ছাড়া তাঁরা বেশ কয়েকজন ব্যক্তির ওপরও চড়াও হন। পরে তাঁদের আটক করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকের দেওয়া সনদ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। মদ পানের অপরাধে ওই তিনজনের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ বুধবার তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে রুহুল আমিন বা তাঁর সহযোগীদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সরকার মুকুল এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রুহুল আমিনকে বহিষ্কারের তথ্য জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার রুহুল আমিন বগুড়া শহর স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে থাকা দুজন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেউ নন। রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তারের পর ওসি আমাকে সদর থানায় ডেকেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর চিকিৎসকের সনদ দেখিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, রুহুল আমিন মদ্যপ ছিলেন। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের কাছে বগুড়া মডেল জেলা। এখানে সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কেউ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। মদ পান করে মাতলামি করায় রুহুল আমিনকে ইতিমধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ 

বগুড়ায় মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি। মঙ্গলবার গভীর রাতে সদর থানায়
বগুড়ায় মদ্যপ অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে অশালীন আচরণ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার তিন ব্যক্তি। মঙ্গলবার গভীর রাতে সদর থানায়। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, October 27, 2024

‘যারা আয়নাঘর বানিয়েছিল তাদের ছাড় দেয়া হবে না’ by প্রতীক ওমর

ফ্যাসিবাদমুক্ত বৈষম্যহীন তারুণ্যনির্ভর মানবিক বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত জননেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দল-ধর্ম যার যার, এই বাংলাদেশ সবার। আমরা এমনটা বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। যেই তারুণ্যের বুকের রক্তের বিনিময়ে জাতি ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে আমরা সেই তারুণ্যনির্ভর, মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। একজন শিশু জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সে একজন নাগরিকের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে। বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ সাড়ে ১৫ বছরে দেশের মানুষকে শুধু খুন, গুম উপহার দিয়েছে। যার ফলে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তাদেরকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। যারা অপরাধ করেছে, দুর্নীতি করেছে, লুটপাট করেছে, বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, মানুষকে হত্যা করেছে, লাশের মিছিল তৈরি করেছে, আয়নাঘর বানিয়েছে তাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না। তিনি শনিবার বিকালে জামায়াতে ইসলামী বগুড়া শহর শাখার আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে জামায়াতে ইসলামী বগুড়া শহর ও জেলা শাখা আয়োজিত বিশাল সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী। আমন্ত্রিত অতিথির মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামী জয়পুরহাট জেলা শাখার আমীর ডা. ফজলুর রহমান সাঈদ, সিরাজগঞ্জ জেলা আমীর মাওলানা শাহীনুর আলম।
বগুড়া শহর সেক্রেটারি আ. স. ম আব্দুল মালেক, পূর্ব জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মানসুরুর রহমান ও পশ্চিম জেলা সেক্রেটারি মঞ্জুরুল ইসলাম রাজুর সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বগুড়া পশ্চিম জেলা আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হক সরকার, পূর্ব জেলা আমীর অধ্যাপক নাজিম উদ্দিন, শহর নায়েবে আমীর মাওলানা আলমগীর হোসাইন, পূর্ব জেলার নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল বাসেদ, পশ্চিম জেলার নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল হাকিম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক আব্দুল মতিন, ইসলামী ছাত্রশিবির বগুড়া শহর শাখার সভাপতি রেজওয়ানুল ইসলাম, বগুড়া পশ্চিম জেলা সভাপতি সাইয়্যেদ কুতুব সাব্বির, বগুড়া পূর্ব জেলা সভাপতি জোবায়ের আহম্মেদ প্রমুখ। সমাবেশে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ইঞ্জি. শামসুল হক।

mzamin

Friday, October 11, 2024

সাবেক এমপি হাবিব ও তার পুত্রের সম্পদের পাহাড় by প্রতীক ওমর

হাবিবর রহমান। বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসনের টানা তিনবারের সংসদ সদস্য। সরকারের নানা প্রকল্পে কাজ না করেই টাকা তুলেছেন টানা ১৫ বছর। ক্রমেই টাকার পাহাড় গড়ে তোলেন। এলাকার মানুষের চোখের সামনে রাষ্ট্রের টাকা, জনগণের টাকায় নিজের সম্পদ গড়ে তুললেন অথচ কেউ কোনো কথা বলার সাহস পায়নি। কথা বললেই মিথ্যে মামলায় জীবন ধ্বংস করে দিতো। হাবিব ও তার ছেলে আসিফ ইকবাল সনির দাপটে শেরপুর-ধুনটের কেউ কোনোকিছু করার সাহস পেতো না। হাবিব এক সময় পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। পরে সংসদ সদস্য (এমপি) হন। গত ১৫ বছরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নামে-বেনামে হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন হাবিব। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। আর শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দুদকের। ২০০৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর রাতারাতি কোটিপতি বনে যান তিনি। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংসদ সদস্য হওয়ার পর ছেলে আসিফ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়েন হাবিবর রহমান। ধুনটে জালশুকায় আদি বাড়ির পাশে ৭০ বিঘা বিল-বাইশা দখল করে তার সঙ্গে দেড়শ’ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তোলেন বাবু পার্ক সিটি। এ ছাড়া, ধুনট শহরে ২১ শতাংশ জায়গার ওপর বাণিজ্যিক ভবন, শেরপুরের ছনকায় ৫০ বিঘা জমির আসিফ ব্রিক ফিল্ড, শেরপুর শহরের দুবলাগাড়িতে ৩০ বিঘার উপর নির্মাণ করেছেন বাগানবাড়ি ও হিমাগার। অভিযোগ উঠেছে, শত কোটি টাকার সম্পদের বাইরেও তার আছে দেশ-বিদেশে আরও হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ। এসব সম্পদের উৎস তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি স্থানীয়দের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়ার কথিত এক সাংবাদিক ছিলেন হাবিবের অবৈধ টাকা আয়ের আদায়কারী। বিভিন্ন দপ্তর থেকে নানাভাবে ওই সাংবাদিকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করতো বাপ ও ছেলে। আদায়কৃত ঘুষের টাকার একটা অংশ পেতেন ওই কথিত সাংবাদিক। একটি টেলিভিশনের লোগো হাতে থাকতো ওই সাংবাদিকের। ফলে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করা সহজ হতো। প্রতিমাসেই আদায় হতো কোটি টাকার উপরে। কথিত ওই সাংবাদিক ২০১৮ সালে তার স্ত্রীর বড় ভাইকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে ধুনটে বদলি করে এনে বসান। ধুনটের চর এবং প্রত্যন্ত এলকায় কাজ করার নামে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ এনে লুট করে নিয়েছে ২০১৮ সাল থেকে শুরু করে ৫ই আগস্টের আগ পর্যন্ত। ওই কর্মকর্তা এখন বহাল তবিয়তে আছেন। ২০১৮ সালের আগেও ওই দপ্তর থেকে টাকা হরিলুটের সঙ্গে জড়িত ছিল হাবিব এমপির খাস লোক ওই সাংবাদিক। তার হাত দিয়েই সেই টাকার মোটা অংশ চলে যেতো এমপি এবং তার ছেলের ড্রয়ারে। অনুসন্ধানে তাদের দুর্নীতির আরও তথ্য বেরিয়ে আসছে। হাবিব ২০০৯ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ধুনটের দশ ইউনিয়নে লক্ষাধিক বড় গাছ কেটে নিয়েছেন। ওই গাছগুলো বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনবসতি রক্ষার জন্য লাগনো হয়েছিল। ওই গাছগুলো কাটার পর ধুনটে বন্যা নিয়ন্ত্রণ নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এমপিপুত্র সনি বেশির ভাগ সময় মাদকাসক্ত অবস্থায় থাকতো। একবার ধুনটে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে রাস্তার পাশে একটি বাড়ির ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। ওই ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছিল। পরে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মীমাংসা করেছেন।
বগুড়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সাবেক এমপি হাবিবের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে ঢাকা থেকে তদন্ত হচ্ছে। বড় বিষয় বিধায় আমাদের অফিসের কিছু করার নেই।
এদিকে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে পরিবারসহ আত্মগোপনে অভিযুক্ত হাবিবর রহমান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও নিহতের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। মামলা হয়েছে ধুনটের আলোচিত জ্যোতি হত্যার ঘটনাতেও। বিএনপি’র সাবেক এমপি গোলাম মো. সিরাজকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও বাপ-বেটার নামে সম্প্রতি মামলা হয়েছে।

mzamin

Monday, September 16, 2024

৩ শ’ ছররা গুলি মজিদের শরীরে: ‘টাকার অভাবে সুচিকিৎসা করতে পারছে না পরিবার’

২২ বছরের তরুণ আব্দুল মজিদ। দেশ ও জনতার মুক্তির সংগ্রামে অংশ নিতে তিনিও নামেন রাস্তায়। ছাত্র-জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের পতনের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। গত ৪ঠা আগস্ট দুপুরের পর বগুড়ার শেরপুর শহরে মিছিলে যোগ দেন আব্দুল মজিদ। মিছিলটি শেরপুর থানার সামনে পৌঁছালে থানা ভবনের ভেতর থেকে শটগানের গুলি ছোড়ে পুলিশ। গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এক যুবক। তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যায় আব্দুল মজিদ। পুলিশ আবারো গুলি ছুড়লে কোমর থেকে পিঠ পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয় আব্দুল মজিদ। আহত মজিদকে উদ্ধার করে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে তাকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বগুড়ার ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের বিশ্বহরিগাছা গ্রামের মোহাম্মদ সলিমুদ্দিন ও মোসা. রোকেয়া বেগম দম্পতির সন্তান আব্দুল মজিদ (২২)। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর পক্ষাঘাতগ্রস্ত মাকে নিয়ে দুই ভাই বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় কাজের সন্ধানে আসে। নিজস্ব জমিজমা, বাড়ি না থাকায় দুই ভাই মজুরিভিত্তিক লেদমিস্ত্রির কাজ করে। যে টাকা আয় হয়, তা দিয়েই চলতো তাদের সংসার। আবদুল মজিদের বড় ভাই রাকিব শেখ বলেন, ‘শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক্স-রে করে তার শরীরে অন্তত ৩০০টি ছররা গুলির চিহ্ন দেখা যায়। ৪ঠা থেকে ৭ই আগস্ট পর্যন্ত মজিদের চিকিৎসা চলে। এ সময় চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতটি ছররা গুলি বের করেন। ৭ই আগস্ট মজিদকে বাড়ি আনার পর ওই দিন আবারো যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে মজিদ। সেদিনই আবার তাকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে নেয়া হয় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ২২শে আগস্ট মজিদকে নেয়া হয় বগুড়ার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)-এ। ১লা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাসপাতালে মজিদের শরীরে আবারো অস্ত্রোপচার করে আরও সাতটি গুলি বের করেন চিকিৎসক দল। এরপর মজিদকে তারা আবার বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। গরিব পরিবারের সন্তান হওয়ায় টাকার অভাবে সুচিকিৎসা করাতে পারছে না পরিবার। ফলে সবার কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।’
রাকিব শেখ আরও বলেন, ছোট ভাই মজিদ আহত থাকায় তার উপার্জন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। মজিদের চিকিৎসার জন্য নিজেদের গচ্ছিত কয়েক হাজার টাকা ছিল সেটাও শেষ। ইতিমধ্যে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অন্তত আরও ৪০ হাজার টাকা ধারদেনা করে এ পর্যন্ত চিকিৎসা করিয়েছেন। সরকারি ভাবে সহযোগিতা না পেলে তার ভাইকে হয়তো বাঁচানো সম্ভব হবে না। শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী লিংকন বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ আবদুল মজিদের শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে গেছে। জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হতো।’
mzamin

Saturday, September 7, 2024

বগুড়ায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আন্ডারপাসের দাবি: ঝুঁকি নিয়ে প্রতি মিনিটে অর্ধশতাধিক মানুষের পারাপার by প্রতীক ওমর

মহাসড়কের উন্নয়নে ঢাকা পড়ছে হাসপতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশ পথ। রোগীবাহী এম্বুলেন্স ঘুরে আসতে হবে প্রায় এক কিলোমিটার। হাসপতালে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের বাইরে যাতায়াত করতেও শরীরের ঘাম ঝরাতে হবে। সড়ক বিভাগের এমন সিদ্ধান্তে মন খারাপ করেছে বগুড়াবাসী। তারা ইতিমধ্যেই হাসপাতালের জরুরি গেটে আন্ডারপাস রাখার দাবিতে ফুঁসে উঠেছেন। মানববন্ধন, বিক্ষোভ করেছেন। লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন সাউথ এশিয়ান সাব রিজিওনাল কো-অপারেশন বা সাসেক-২ প্রকল্পের কর্তৃপক্ষকে। ঘটনা উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় মেডিকেল বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক ফোরলেনে উন্নতি করার কাজ চলমান। সেই কাজের অংশ হিসেবে ওই মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে একটি আন্ডারপাস রাখা হয়েছিল।

হঠাৎ সড়কের সেই নকশা থেকে আন্ডারপাস উধাও হয়ে গেছে। জরুরি বিভাগের সামনে রাখা আন্ডারপাস করা হচ্ছে মেডিকেল কলেজ গেটের সামনে। বিষয়টি জানাজানি হলে বাঁধ সাধে এলাকাবাসী। তাদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে ইতিমধ্যে আন্দোলনে নেমেছে। তারা কলেজ এবং জরুরি বিভাগের দুই গেটেই আন্ডারপাস দাবি করছেন। একই দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও। তবে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সাসেক প্রকল্প-০২ ব্যবস্থাপক) আহসান হাবীব। বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক। এই মহাসড়কের সঙ্গেই হাসপাতালটির জরুরি বিভাগের গেট। এখানে প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় অর্ধশতাধিক অসুস্থ, সুস্থ, শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ পারাপার হয়। এ ছাড়া রোগীদের সুবিধার্থে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মাদ আলী হাসপাতাল থেকে অত্র মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেট পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তাটির সংযোগস্থল শেষ হয়েছে মেডিকেল কলেজের গেটে। কিন্তু জরুরি বিভাগের গেটে আন্ডারপাস না রাখার কারণে এসব নানাবিধ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে মেডিকেলমুখী মানুষেরা।
বিশেষ সূত্রে জানা যায়, প্রথমের দিকে সাসেক প্রকল্প-২ এর জরিপে ঢাকা-রংপুর এক্সপ্রেসওয়ের নকশাটিতে অত্র মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আন্ডারপাসের নকশা ছিল। তা পরবর্তীতে আন্ডারপাসটি করা হচ্ছে কলেজ গেটের সামনে। কিন্তু অপরিকল্পিতিভাবে জরুরি বিভাগকে বাদ দিয়ে অন্য জায়গায় আন্ডারপাসটি মেনে নিচ্ছে না স্থানীয়রাসহ বিভিন্ন মহল। এই বিষয়ে তারা বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি অব্যহত রেখেছেন। বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপিও প্রদান করেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তে মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনের আন্ডারপাসটি কলেজ গেটের সামনে নেয়া হয়েছে। তারা আরও বলেন কলেজের গেটটি সন্ধ্যার আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে করে মহাসড়কের উপর দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ও রোগীরা বাধ্য হয়ে যাতায়াত করবে। এ ছাড়া জরুরি বিভাগের গেটের সামনে ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অসুধের দোকান ও হোটেলসহ প্রায় ৩ শতাধিক দোকান রয়েছে। অর্থাৎ আন্ডারপাসটি কলেজ গেটে হওয়ায় কোনো সুবিধাই পাওয়া যাবে না। তাই আমাদের দাবি জরুরি বিভাগের সামনে আরও একটি আন্ডারপাস করতে হবে।
উল্লেখ্য, বিগত দিনে এখানে রাস্তা পারাপার করতে গিয়ে নানা ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া প্রায়ই দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে রোগী-স্বজন ও হাসপাতালে কর্মরতরা। ব্যস্ততম মহাসড়কটি হাসপাতালের সামনে হলেও যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ বা সড়ক নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
শজিমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন রোগী থাকেন দেড় হাজারের ওপরে। এ ছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। তাঁদের সঙ্গে থাকেন স্বজনরা।
এদিকে মহাসড়কের পাশে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার থাকলে সেখানে সড়ক নির্দেশিকাসহ সাইন সিগন্যাল থাকার কথা। কিন্তু বগুড়ার এই বৃহৎ হাসপাতালের সামনে তার কোনো চিহ্ন নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার সড়কে গতিরোধক নির্মাণের তাগাদা দিলেও তা করা হয়নি।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ মানবজমিনকে জানান, আমরা লিখিতভাবে, মৌখিকভাবে সড়ক কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি যে এখানে কলেজ গেট এবং মেডিকেলের জরুরি গেটে আন্ডারপাস রাখতে। এখানে দুই গেটেই মানুষ পারাপারের জন্য নিরাপদ রাস্তা প্রয়োজন। আশাকরি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সুরাহা করবেন।
মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণে চলমান সাসেক-২ প্রকল্পের বনানী থেকে মোকামতলা অংশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব জানান, তাদের প্রকল্পে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এমভিটি আন্ডারপাস রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দুর্ঘটনা কমবে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন জরুরি বিভাগের সামনে একটি এমভিটি আন্ডারপাস করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। নকশার কাজ চলছে। আশাকরি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যেই এটির অনুমোদন হয়ে যাবে।

Sunday, August 25, 2024

পুত্র ও ভাই মিলে এডিপি’র কোটি টাকা তছরুপ করেন সাবেক এমপি by প্রতীক ওমর

সাবেক এমপি সাহাদারা মান্নান। আসন সারিয়াকান্দি-সোনাতলা। আপন ভাই সোনাতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। পুত্র সারিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। একজন প্রকৌশলীর সহযোগিতা নিয়ে এডিপি’র কোটি টাকা কারসাজি করে পকেটস্থ করেছে। লুটপাটের রাস্তা পরিষ্কার করতে ভোট ডাকাতির মধ্যদিয়ে নিজের পুত্র ও ভাইকে সোনাতলা ও সারিয়াকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছেন সংসদ সদস্য সাহাদারা। পুত্র ও ভাই নির্বাচিত হয়ে শপথ গ্রহণের পর থেকেই তিনজনে মাঠে নেমে পড়ে বিভিন্ন অনিয়মে। এর মধ্যে নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা উত্তোলনসহ একক আধিপত্য বিস্তার উল্লেখযোগ্য। বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় এমন কর্মকাণ্ডের তথ্য মিলেছে মানবজমিনের অনুন্ধানে। কাগজে কলমে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র।

অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন স্থানে কাজ দেখিয়ে ও বিতরণকৃত মালামাল ক্রয়ের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান। এসব নানামুখী অনিয়ম করে ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। অন্যদিকে নিজ দলের নেতা কর্মীদের বিপদে ফেলে ইতিমধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন এসব অনিয়মের মাস্টারমাইন্ড বগুড়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহাদারা মান্নান শিল্পী ও সোনাতলা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট মিনহাদুজ্জামন লিটন। এতে করে এই ‘এডিপি’ প্রকল্পের বেশকিছু কাজ ঝুলে আছে। তবে কাজ ঝুলে থাকলেও এসব নির্মাণে সমুদয় অর্থ অনেক আগেই উত্তোলন করা হয়েছে।
এনুয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রোগাম (এডিপি)। বেশকিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করে এই প্রকল্পের কাজ করতে হয়। কী ধরনের কাজ করা যাবে আর কী ধরনের কাজ করা যাবে না তাও উল্লেখ করা আছে এই প্রকল্পের নির্দেশিকা বইটিতে। তবে এসব নিয়ম নীতির তোয়াক্কা কখনোই করা হয়নি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায়। দীর্ঘদিনের আওয়ামী শাসনামলে সবকিছুই নিজেদের একান্ত করে নিয়েছিলেন সাহাদারা মান্নান। তার নানা ধরনের কৌশলে লুটপাট গত কয়েক বছরে লুটপাট হয়েছে কোটি কোটি টাকা। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সরকারি খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য (এডিপি) অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সোনাতলায় করা হয়েছে তার উল্টো। এই প্রকল্পের সমুদয় অর্থ ব্যয় করা হয়েছে দলীয় কর্মকাণ্ড ও নিজেদের পকেট ভারী করতে।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরের বরাদ্দে যে কাজগুলো করা হয়েছে সরজমিন এসব দেখে চোখ কপালে ওঠার মতো। আড়াই লাখ টাকা ব্যয়ে বালুয়া ইউনিয়নের জুয়েলের বাড়ির তিন মাথা মোড় হতে শাহিদুলের বাড়ি পর্যন্ত যে রাস্তার বর্ণনা দেয়া আছে সেখানে মাত্র ৯০ ফিট রাস্তা সিসি ঢালাই করা হয়েছে। যাতে সর্বোচ্চ ব্যয় হয়েছে ৬০-৭০ হাজার টাকা। ১ লাখ ব্যয়ে শিহিপুরের রাস্তা, ২ লাখ ব্যয়ে গণসারপাড়ায় ইটের সোলিং, ১ লাখ ব্যয়ে গড়চৈতণ্যপুর কমারবাড়িতে সিসি ঢালাইকরণ, ১ লাখ ব্যয়ে দিগদাইড় উত্তরপাড়া মসজিদের নিকটে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে রংরারপাড়া দুলুর বাড়ির মোড়ে প্যালাসাইডিংকরণ, উত্তর আটকরিয়ায় আড়াই লাখ ব্যয়ে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে মহিচরণ বুলবুলের ‘ছ’ মিলের পাশে সিসিকরণ, ১ লাখ ব্যয়ে হড়িখালি টেকনিক্যাল কলেজ রোডে সিসিকরণ, দেড় লাখ ব্যয়ে ফুলবাড়িয়ায় ফাইদুলের বাড়ির মোড়ে সিসিকরণ, আড়াই লাখ ব্যয়ে পূর্ব তেকানী বড় মসজিদের পাশে প্যালাইডিং আড়াই লাখ ব্যয়ে পাকুল্লায় এনামুল বাড়ি টুটুলের পুকুর পাড়ে প্যালাসাইডিং করা হয়েছে। এসব কাজে ৩ ভাগের একভাগ অর্থও ব্যয় হয়নি। এ ছাড়া ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সোনাতলা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজ সংস্কারের নামে পুরোটাই পকেটে তোলা হয়েছে। ৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যয়ে উপজেলা পরিষদের ভেতরে জয় বাংলা ফোয়ারা নির্মাণ কাজটি কিছুটা হয়ে আটকে আছে। আড়াই লাখ ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু চত্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিটি একটু কাৎ হয়ে আটকে আছে।
সাড়ে ৪ লাখ ব্যয়ে আব্দুল মান্নান বাস্কেট বল গ্রাউন্ড নির্মাণের নামে কিছু ইট বিছানো হয়েছে। পাকুল্লা উত্তরপাড়া ব্রিজের পাশে ২ লাখ ব্যয়ে আরসিসিকরণের নামে নামমাত্র সিসিকরণ, শিহিপুর সরকার পাড়া মসজিদের কাছে সিসিকরণ উক্ত কাজগুলোর নামে লাখ লাখ টাকা পকেটে তুলেছেন উপজেলা প্রকৌশলী ও উপজেলা চেয়ারম্যান। এ ছাড়া গরিব দুস্থদের মাঝে সেলাই মেশিন, নলকুপ, প্লাস্টিকের চেয়ার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেঞ্চ বিতরণের নামেও করা হয়েছে হরিলুট।
প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে স্প্রে মেশিন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টিলের আলমারি, গরু খামারিদের মাঝে গামবুট, বিভিন্ন ক্লাবে ক্রীড়াসামগ্রী, ডেস্কটপ কম্পিউটার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারকার পেন, কলম, মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রেস্ট বিতরণসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ দেখানোর শতকরা ৮০ ভাগই ভুয়া। তবে যেটুকু বিতরণ হয়েছে এসব সামগ্রীগুলোর উপরে স্টিকার সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে যাতে লেখা রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কিংবা, নৌকায় ভোট দিন অথবা সাহাদারা মান্নান শিল্পীর পক্ষ থেকে। আবার বিভিন্ন সভা সমাবেশে কিংবা বিতরণকালে এনাউন্স করা হয়েছে যে, উপজেলা চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে এসব দেয়া হচ্ছে।
উক্ত প্রকল্পগুলোর জন্য যেসব কমিটি করা হয়েছে। সেগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া। কারণ যাদেরকে কমিটিতে রাখা হয়েছে তারা জানেই না যে এডিপি প্রকল্পের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য তারা। এই কমিটিগুলোর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে তারা যেন আকাশ থেকে পড়েন। কারণ এসবের তারা কিছুই জানেন না। উক্ত প্রকল্পের সদস্যরা দাবি তোলেন আমাদের নাম ভাঙিয়ে যারা লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হোক।
উপজেলা আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী বলেন, আমরা সারাজীবন দল করে কিছুই পাইনি। বরং এমপির পরিবারতন্ত্রের কাছে জুলুম, অত্যাচার-নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আজ এই বিপদের সময়ে তারা আত্মগোপনে চলে গেছে।
এ বিষয়ে সোনাতলা উপজেলা প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, বোঝেনি তো বাধ্য হয়ে এসব অনিয়মে সায় দিতে হয়েছে। এমপি উপজেলা চেয়ারম্যান যেসব করতে চাইছে আমাকেও তাই করতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন অসম্পূর্ণ যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো করতে ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ উত্তোলন করে পকেটে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এসবে যে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে তা স্বীকার করতেই হবে। যেসব কাজ এখনো শেষ হয়নি সেগুলোর বিল কীভাবে উত্তোলন করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন কী আর বলার আছে, বোঝেনি তো সব কেন করতে হয়েছে।
সাবেক সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান শিল্পী ও উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট মিনহাদুজ্জামান লিটন আত্মগোপনে থাকার কারণে তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

Wednesday, October 30, 2019

কুঁড়ার তেলের বিদেশযাত্রা by ফখরুল ইসলাম

*১০ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২টি কারখানা গড়ে উঠেছে।
*বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তেল।
*দাম সয়াবিন তেলের চেয়ে কিছুটা বেশি।
*২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে রপ্তানি হয় কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল।
*দেশে বছরে উৎপাদিত হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন তেল।
*সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়।

দেশে তো জনপ্রিয় হচ্ছেই, ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) এখন বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হচ্ছে বগুড়া থেকে। বর্তমানে এই তেল প্রধানত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। তবে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন—এসব দেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে।
স্বাধীনতার পর এবং আশির দশকেও দেশে প্রধান ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল ও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়তে থাকে। দেশে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাও। আর ভোজ্যতেল হিসেবে ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয় পাম তেল ও সয়াবিন তেল। কেউ কেউ অবশ্য সূর্যমুখী বা জলপাই তেলও (অলিভ অয়েল) রান্নায় ব্যবহার করেন।
একসময় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে অন্য ভোজ্যতেলের তুলনায় ধানের কুঁড়ার তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক মাত্রা কম। ধানের তুষ ছাড়ানোর পর চালের গায়ে বাদামি যে অংশ থাকে, সেখান থেকে এই তেল নিষ্কাশন করা হয়।
গত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধানের কুঁড়ার তেলের ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড ব্র্যান্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের আরেকটি কারখানা।
তবে উৎপাদনের মাঠে ভালোভাবে আছে এখন বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মজুমদার গ্রুপের তেলের ব্র্যান্ড ‘স্বর্ণা’। মজুমদার গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন তেল উৎপাদন হয় ৯০ থেকে ১০০ টন। এ ছাড়া রংপুরের গ্রিন অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজও কিছু তেল উৎপাদন করে।
মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করছি মূলত ভারতে। তবে বিশ্বব্যাপীই এই তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বছর বছর চাহিদা বাড়ছে।’
কুঁড়ার তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ২৫০–৩০০ টন এই তেল উৎপাদিত হয়। বছরে হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন। সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়।
তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিনের কুঁড়ার চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টন। দেশের চালকল থেকে বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি কুঁড়া উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মধ্যে কুঁড়ার তেলের অবদান সোয়া দুই থেকে আড়াই শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন।
তবে অন্যদের কাছ থেকে পরিশোধন করিয়ে নিয়েও এই তেল বাজারজাত করছে কয়েকটি বড় কোম্পানি। যেমন এসিআই। এসিআইয়ের রাইস ব্র্যান তেলের নাম ‘নিউট্রিলাইফ’। বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’। ‘নেচুরা’ নামের একটি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে।
এসিআই কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের বিজনেস ডিরেক্টর অনুপ কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এই পণ্যটির বিক্রির পরিমাণ যেহেতু বাড়ছে, অনুমান করা যায় যে সারা দেশে রাইস ব্র্যান তেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে, তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজার এখনো অত বড় হতে পারছে না।’
জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে অনুপ কুমার বলেন, ডাক্তাররাই বলছেন এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অরাইজানল রয়েছে এবং এই তেল মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। অরাইজানল ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ধারণা বোতলে তেলের রংটা একটু হালকা হলে ভালো হয়। কিন্তু তা করতে গেলে তেল থেকে উপকারিতা কম পাওয়া যেতে পারে।
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত এক লিটার কুঁড়ার তেলের দাম পাম ও সয়াবিন তেলের দামের চেয়ে একটু বেশি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম যেখানে ১০০ টাকার মতো, কুঁড়ার তেলের দাম সেখানে ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা।
কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই তেল যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায়, তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব। এদিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (বিসিএসআইআর) এক গবেষণাও বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি তা কুঁড়ার তেলে রয়েছে।
মজুমদার গ্রুপের চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘বড় সমস্যা কুঁড়ার সরবরাহ। যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই পরিমাণ কুঁড়া সব সময় পাওয়া যায় না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এ কারণেই। তবে সম্ভাবনা বিশাল। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে দরকার নগদ সহায়তা। ভারতে আমরা রপ্তানি করি ঠিকই, কিন্তু ভারতই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী।’

Saturday, September 21, 2019

পাখির চোখে বগুড়া (ফটোস্টোরি) by তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব

বগুড়া উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক নিদর্শন ও শিল্পের শহর। এটি রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত। দইয়ের জন্য বগুড়া বিখ্যাত। প্রাচীন বাংলার রাজধানী মহাস্থানগড় এখানেই অবস্থিত। ক্যামেরার কবি তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব ড্রোন দিয়ে ছবি তুলে খুঁজে পেয়েছেন বগুড়ার নান্দনিক সৌন্দর্য। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি স্থিরচিত্র নিয়ে এই ফটোস্টোরি।
বগুড়ার মহাস্থানগড় (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* মহাস্থানগড়। এর বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন পুন্ড্রনগরের সুদীর্ঘ প্রায় আড়াই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এটি বগুড়া জেলা শহরের ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত জায়গাটি পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত ও পাল শাসক বর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তী সময়ে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। দুর্গের বাইরে উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ৭-৮ কিলোমিটারের মধ্যে এখনও বিভিন্ন ধরনের বহু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে, যা উপ-শহরের সাক্ষ্য বহন করে।
বগুড়ার বেহুলার বাসরঘর (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* বেহুলার বাসরঘর। বগুড়া শহর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে ও মহাস্থানগড় থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে এটি অবস্থিত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে, আনুমানিক খ্রিষ্টাব্দ সপ্তম শতাব্দী থেকে ১২০০ শতাব্দীর মধ্যে এটি নির্মিত। গবেষকদের মতে, এটি ৮০৯ থেকে ৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেবপাল নির্মিত একটি বৈদ্যমঠ।
ভাসু বিহার (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* ভাসু বিহার। স্থানীয়ভাবে এই প্রত্নস্থল ‘নরপতির ধাপ’ নামে এটি পরিচিত। প্রায় ৮০০ প্রত্নবস্তুর মধ্যে ব্রোঞ্জের ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি, পোড়ামাটির ফলক ও পোড়ামাটির সীল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া সংগৃহীত হয়েছে মূল্যবান পাথরের গুটিকা, লোহার পেরেক, মাটির গুটিকা, নকসাংকিত ইট, মাটির প্রদীপ ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহারের দ্রব্যাদি ও প্রচুর মৃন্ময় পাথর টুকরা।
বগুড়ার এডওয়ার্ড পার্ক (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ার এডওয়ার্ড পার্ক (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* এডওয়ার্ড পার্ক। ১৯০১-১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। মহারানি ভিক্টোরিয়ার পুত্র আলব্রেট এডওয়ার্ডের নামানুসারে এর নামকরণ হয়। পার্কে তার একটি আবক্ষ মূর্তি আছে। পার্কের ভেতর আছে আনন্দ সরোবর, কৃত্রিম ফোয়ারা, গ্রিন হাউস, কৃত্রিম পাহাড়, উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি, শহীদ টিটু মিলনায়তন ও শিশুদের চিত্তবিনোদনের জন্য খেলাধুলার উপকরণ।
বগুড়ার সাতমাথা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ার সাতমাথা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* সাতমাথা। বগুড়া সদরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে বগুড়ার প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সাতটি সড়কের মিলিতস্থান এটি। এখানেই রয়েছে বগুড়া জিলা স্কুল, শহীদ খোকন পার্ক, জিপিও, সার্কিট হাউসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
বগুড়ার সাতমাথা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ার সাতমাথা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
সাতমাথা থেকে কবি নজরুল ইসলাম সড়ক (থানা রোড) দিয়ে এগিয়ে গেলেই বগুড়ার ব্যিখাত দইয়ের দোকানগুলো পাওয়া যায়।
চাতাল (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
চাতাল (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* চাতাল। উত্তরবঙ্গে দুপচাঁচিয়া উপজেলায় পাঁচ শতাধিক চাতাল ও চাল কল রয়েছে। উপজেলা সদর, তালোড়া, চৌমুহনী ও সাহারপুকুরে এ ধরনের মিল চাতাল বেশি। এই উপজেলা চাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মোকামে বিক্রি হয়। 
বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম। এর নাম ছিল বগুড়া বিভাগীয় স্টেডিয়াম। বগুড়া জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে বগুড়া পৌরসভার মালগ্রাম এলাকায় এর অবস্থান। এই স্টেডিয়ামে ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছিল। স্টেডিয়ামটিতে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ওয়ানডের মধ্যে চারটিতেই জিতেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিভিন্ন লিগের খেলা গড়ায় এই মাঠে।
সারিয়াকান্দি যমুনার চর (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
সারিয়াকান্দি যমুনার চর (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* সারিয়াকান্দি যমুনার চর। নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরকে স্থানীয়রা মনে করে ফসল উৎপাদনের চারণভূমি। যমুনার বুকে অনাবাদি জমিকে আবাদি জমিতে পরিণত করে বিভিন্ন সবজি ফসলের চাষ হয়।
বগুড়ায় শীতের সবজি (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ায় শীতের সবজি (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* শীতের সবজি। শীত মৌসুমে তোলা ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে শীতকালীন সবজি। গ্রীষ্মকালীন সবজির পরপরই জেলার কৃষকেরা শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি নেন। তখন সবুজে সবুজে শীতের সবজিতে ভরে ওঠে মাঠের পর মাঠ।
বগুড়ায় ধান কাটার মৌসুম (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
বগুড়ায় ধান কাটার মৌসুম (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* ধান কাটার মৌসুম। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকার মাঠে মাঠে রোপা-আমন মৌসুমে চলে ধান কাটার ধুম। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় সোনালি ধান মাড়িয়ে গোলায় ভরেন কৃষকেরা। তাদের চোখে-মুখে তখন দেখা যায় তৃপ্তির হাসি।
একপাশে সবুজ ক্ষেত, অন্য পাশে লাল মরিচের বন্যা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
একপাশে সবুজ ক্ষেত, অন্য পাশে লাল মরিচের বন্যা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
সবুজের বুকে লাল মরিচের রঙে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
সবুজের বুকে লাল মরিচের রঙে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি
লাল মরিচে রাঙা যমুনার চর (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
লাল মরিচে রাঙা যমুনার চর (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* লাল মরিচে রাঙা যমুনার চর। ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতে মনে হচ্ছে যেন, মরিচের লালগালিচা! বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার যমুনা নদীর বিভিন্ন চরে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মরিচের ক্ষেত। দিনভর ক্ষেতেই দেখা যায় মরিচের কেনাবেচা।
করতোয়া নদীতে হাঁস (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
করতোয়া নদীতে হাঁস (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* করতোয়া নদীতে হাঁস। রাজশাহী বিভাগের অন্তর্গত এই নদী খুব বেশি বড় নয়। এর একটি গতিপথ বর্তমানে বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় দিয়ে প্রবহমান। মহাভারতে বলা আছে, তিন দিন উপবাসের পর করতোয়া নদীতে ভ্রমণ করা অশ্বমেধার (ঘোড়া বলিদান) সমান পুণ্যের সমান।
যমুনা নদীতে জেলে নৌকা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
যমুনা নদীতে জেলে নৌকা (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* যমুনা নদীতে জেলে নৌকা। বগুড়ায় যমুনা নদীতে মাছ ধরার দৃশ্য নিত্যদিনের। জেলেরা নদীর তীরে ছোট ছোট নৌকায় দলবেবেঁধে বসবাস করেন। রাতে মাছ ধরে দিনে জাল মেরামতে ব্যস্ত থাকেন তারা। অনেকে জাল শুকাতে দেন।
সবুজময় বগুড়া (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
সবুজময় বগুড়া (ছবি: তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব)
* সবুজের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে বগুড়া জুড়ে। ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতে কী সুন্দর আবহ! এ যেন সবুজের সমুদ্র।

Monday, September 16, 2019

এক পরিবারেই ১৪ অন্ধ by খালিদ হাসান

জন্মই যেন আজন্ম পাপ তাদের। নিজের দাদা ও বাবা ছিলেন অন্ধ। কিন্তু বাপ-দাদার মতো তাদেরও যে অন্ধ হয়ে দুনিয়ায় আসতে হবে তা হয়তো জানা ছিল না কারও। শুধু তাই নয়- নিজের ভবিষ্যৎ সন্তানাদিও দেখতে পাবে না দুনিয়ার আলো, সে কথা জানলে হয়তো বিয়েই করতেন না তারা। নিজেদের মতো তিন বোনের ভাগ্য। আজ জন্মান্ধ হওয়ায় জীবনের স্বাদ আহ্লাদ আর সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখতে পান নি তারা। বগুড়ার শিবগঞ্জের ময়দান হাটা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম সোবাহানপুর পোড়াবাড়ি এলাকায় বাস করা জন্মান্ধ এক দুঃখী পরিবার। যে পরিবারের ১৭ জন সদস্যের ১৪ জনই জন্মান্ধ।
পিতা আব্দুল জব্বার আলী ছিলেন অন্ধ। তার ঘর আলোকিত করে তিন ছেলে ও তিন মেয়ে জন্ম নিলেও আলো ফোটেনি তাদেরও চোখে। বাবা আব্দুল জব্বারের মৃত্যুর পর মানুষের দুয়ারে সাহায্য চেয়ে চেয়ে বড় হয়েছেন শহিদুল, বুলু, টুলু, জহিলা, শহিদা ও মমেনা নামের ছয় ভাই বোন। তিন বোনকে বিয়ে দিয়ে নিজেরাও সন্তানের চোখে পৃথিবী দেখার আশায় করেছিলেন বিয়ে। কিন্তু জন্মান্ধ ও দুঃখী ছয় ভাই বোনের সে আশাও পূরণ হয়নি। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় তাদের সন্তানরাও জন্ম নেয় অন্ধ হয়ে। তিন বোনকে বিয়ে দিলেও গর্ভের সন্তানরা অন্ধ হয়ে জন্ম নেয়ায় তাদের তালাক দিয়ে সন্তানদের রেখে চলে যায় স্বামীরা। তাই বাধ্য হয়ে তিন ভাইয়ের সঙ্গে একই অন্নে মানুষের করুণায় মানবেতর জীবনযাপন করছে এই অন্ধ পরিবার। পরিবারের মেজ ভাই বুলু মিয়ার দুই মেয়ের মধ্য বুলবুলি নামের এক মেয়ে জন্ম নেয় অন্ধ হয়ে। বিয়ের পর বড়বোন জহিলার ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় রুমি, মীম ও জীম বাবু, মেজবোন শহিদার ঘরে শরীফ, শ্যামলী ও ছোটবোন মমেনার ঘরে জন্ম নেয় মানিক ও রাজিয়া নামের দুই ফুটফুটে সন্তান। কিন্তু জন্মান্ধ হওয়ায় এদের কেউই দুনিয়ার আলো দেখতে পায়নি। গরিব ও অন্ধ সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে তাদের তিন বোনের কপালে বেশিদিন জোটেনি স্বামীর সংসার। জন্মান্ধ ছোট ছোট বাচ্চাদের রেখে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটায় পাষণ্ড স্বামীরা। অবশেষে শিশু বাচ্চাদের নিয়ে অন্ধ ভাইদের সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালাচ্ছেন তারা। পরিবারের বড়ছেলে জন্মান্ধ শহিদুল ইসলাম জানান, আমাদের কেউ কাজে নেয় না। দেখতে পাই না বলে কোনো কিছু করতেও পারি না। তাই মানুষের কাছে সাহায্য চাই। আর এক ভাই বুলু মিয়া জানান, বাবার রেখে যাওয়া এই ছোট বাড়িতে অতিকষ্টে জীবন যাপন করছেন তারা। এদিকে, বোনেরাও জানালেন তাদের কষ্টের কথা। জানালেন ফুটফুটে শিশু সন্তানদের রেখে তাদের স্বামীরা ঘটিয়েছে বিবাহ বিচ্ছেদ। এখন মানুষের দুয়ারে ঘুরে ঘুরে সাহায্যের টাকায় অতিকষ্টে জীবন চালাতে হচ্ছে তাদের। এই ১৪ জন জনম দুঃখী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর মধ্যে মাত্র দুইজন পাচ্ছেন প্রতিবন্ধী ভাতা। বারবার ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যের কাছে ধরনা ধরেও আর কারো কপালে জোটেনি ভাতা কার্ড। স্থায়ী সাহায্যের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়াবে সরকার এমনটাই প্রত্যাশা এই অন্ধ পরিবারের।

Monday, August 5, 2019

যমুনার জলে মহিষ by সোয়েল রানা

প্রথম আলো, ০২ জুলাই ২০১৯: বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় পূর্ব তেকানী গ্রাম। পাশেই যমুনা নদী। উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে নদী ভরপুর। নিদাঘ দুপুরে মহিষের পাল নিয়ে নদীতে নাইতে যায় রাখালেরা। গরমে ঠান্ডা পানি পেয়ে মহিষদের আর পায় কে? গা ডুবিয়ে বসে যায় ওরা।
মহিষের পাল নাইতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যমুনায়মহিষের পাল নাইতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যমুনায়
পানিতে নেমেই তৃপ্ত মহিষপানিতে নেমেই তৃপ্ত মহিষ
নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গভীর পানিতেনিয়ে যাওয়া হচ্ছে গভীর পানিতে
দুরন্ত রাখাল বালকদুরন্ত রাখাল বালক
দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকাদীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকা
পানি থেকে তুলে আনাপানি থেকে তুলে আনা
শরীর জুড়িয়ে ফিরে আসছে মহিষগুলোশরীর জুড়িয়ে ফিরে আসছে মহিষগুলো
আয়, এবার ফিরে চলআয়, এবার ফিরে চল
হু-র-র-র....হাট!হু-র-র-র....হাট!

Wednesday, July 24, 2019

বগুড়ায় সাড়ে চার বছরে মাদক মামলা ১০ হাজার by প্রতীক ওমর

সারা দেশের ন্যায় বগুড়াতেও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকসেবী। বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যবসায়ীও। এই অন্ধকার জগতে শামিল হচ্ছে কিশোর, তরুণ-তরুণী। মধ্য বয়স্ক ব্যক্তিরাও কম নেই। মাদকের টেবিলে আসন পেতেছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত এক সঙ্গে। প্রতিদিন বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের থানাগুলোতে মাদকসেবী এবং কারবারি আটক হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। হাজতে যাচ্ছে।
কিন্তু কোনোভাবেই তাদের ভালো পথে ফেরানো  যাচ্ছে না। এদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার কার্যক্রমে হতাশ সাধারণ মানুষ। তাদের দৃশ্যত কোনো ভূমিকা না থাকায় দিন দিন মাদকসেবী এবং মাদক কারবারির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
‘বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। এসব মাদকাসক্তের ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। সমাজের বিত্তশালী থেকে শুরু করে নারী, শিশু ও কিশোররাও মাদকের সঙ্গে জড়িত।’
বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশ এন্টি ড্রাগ ফেডারেশন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে শতকরা ৯০ ভাগ কিশোর তরুণ মাদকের সঙ্গে যুক্ত। এদের ৪৫ ভাগ বেকার ও ৬৫ ভাগ আন্ডারগ্রাজুয়েট। উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যা ১৫ শতাংশ।
সরকারে মাদকবিরোধী নানা পদক্ষেপ, নানা উদ্যোগ তেমন কাজে আসছে না। দিন দিন কেন মাদকসেবী বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তরের প্রবেশদ্বার বগুড়ায় আশংকাজনক হারে মাদক কারবারি এবং সেবনকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত সাড়ে চার বছরে বগুড়ায় মাদক মামলা হয়েছে ১০ হাজার ৩০৭ মামলা। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪ হাজার ৩৭২ জন।
বগুড়া জেলার মাদক ও চোরাচালান উদ্ধার সংক্রান্ত বিবরণী: ২০১৫ সালে মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩১০, গ্রেপ্তার ১ হাজার ৭৯৩ জন। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ, ফেনসিডিল ২২ হাজার ৯৭৩ বোতল, গাঁজা ৬৯২ কেজি, হেরোইন ৪ কেজি ৭৯৩ গ্রাম ২৮৭ পুরিয়া, ইয়াবা ২৬ হাজার ১৯১ পিস, চোলাই মদ ১৭৮.৫ লিটার, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ১৪ হাজার ৭৩৯ অ্যাম্পুল, অ্যালকোহল ৩০৫ বোতল, জাওয়া ১ হাজার লিটার, স্প্রিট ৪০ বোতল, বিদেশি মদ ১১ বোতল, বাংলা মদ ৩৫ লিটার, বিয়ার ১২১ ক্যান।
২০১৬ সালে মামলার সংখ্যা ২ হাজার ১৮৫টি। গ্রেপ্তার ২ হাজার ৬০৯ জন। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ, ফেনসিডিল ১৭ হাজার ২২ বোতল, গাঁজা ৬৪৮ কেজি ৮৪৮ গ্রাম, হেরোইন ৯ কেজি, ইয়াবা ৭১ হাজার ১৮৫ পিস, চোলাই মদ ১ হাজার ২৩৫ লিটার, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ২৩ হাজার ৭৭০ অ্যাম্পুল, অ্যালকোহল ৭৫ বোতল, জাওয়া ১ হাজার ৫৯৭ লিটার, স্প্রিট ১ হাজার ৩১৪ লিটার, বিদেশি মদ ৯৪৫ বোতল, বিয়ার ১২২ ক্যান।
২০১৭ সালে মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৫১১টি। গ্রেপ্তার ৩ হাজার ১৪৭ জন। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ, ফেনসিডিল ৯ হাজার ২৬৮ বোতল, গাঁজা ৫৭৮ কেজি ৭৪০ গ্রাম, হেরোইন ৩ কেজি ৩৮৭ গ্রাম, ইয়াবা ১ লাখ ৮ হাজার ৫২৬ পিস, চোলাই মদ ৭ হাজার ১৯৮ লিটার, ওয়াশ ১৫০ লিটার, অ্যালকোহল ১৫০ বোতল ও ১০ লিটার, স্পিরিট ৮ হাজার ১৬০ লিটার, নেশা জাতীয় ইনজেকশন ৮ হাজার ১শ’ অ্যাম্পুল, এসিডফস ১৪৩ বোতল, বিদেশি মদ ১ বোতল।
২০১৮ মামলার সংখ্যা ২ হাজার ৮০০টি। গ্রেপ্তার ৩ হাজার ৮৯৭ জন। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ, ফেনসিডিল ১০ হাজার ৪২৪ বোতল, গাঁজা ৪৫২ কেজি ৭৩০ গ্রাম, হেরোইন ২ কেজি ৫৯৯ গ্রাম, ইয়াবা ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ পিস, চোলাই মদ ৪৬১ লিটার, ওয়াশ ১৫০ লিটার, অ্যালকোহল ৪১৪ বোতল, স্পিরিট ৩৮ লিটার,  নেশা জাতীয় ইনজেকশন ৭ হাজার ৯৮৩ অ্যাম্পুল।
২০১৯ সালের মে মাস পর্যন্ত মামলার সংখ্যা ১ হাজার ৫০১টি। গ্রেপ্তার ২ হাজার ৯২৬ জন। উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ, ফেনসিডিল ৬ হাজার ১৭৪ বোতল, গাঁজা ৭৯ কেজি ৫৫২ গ্রাম, হেরোইন ১৮১ কেজি ০৪ গ্রাম, ইয়াবা ৪৬ হাজার ৭৬৫ পিস, চোলাই মদ ৬৯২ লিটার, অ্যালকোহল ২৫ বোতল, বিদেশি মদ ১ বোতল, স্পিরিট ২৮.৬৮ বোতল,  নেশা জাতীয় ইনজেকশন ৯ হাজার ৪৩৭ অ্যাম্পুল।
অন্যদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার কার্যক্রমে হতাশ সাধারণ মানুষ। তাদের দৃশ্যত কোনো ভূমিকা না থাকায় দিন দিন মাদকসেবী এবং মাদক কারবারির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
দিন দিন কেন মাদক কারবারি এবং সেবক বাড়ছে, জানতে চেয়েছিলাম বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদের কাছে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, তরুণদের নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকে। পারিবারিক এবং সামাজিক ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করলে মাদকের হাত থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করা যাবে। বাংলাদেশে মাদক কোথা থেকে কীভাবে আসছে, আইশৃঙ্খলা বাহিনী মাদক আমদানি রোধ করতে পারছে না কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক বিভিন্ন রুটে প্রবেশ করে। ফেনসিডিল আসে ভারত থেকে। বাংলাদেশের অসংখ্য জায়গায় ভারতীয় সীমানা আছে। এগুলো সীমান্ত ব্যবহার করেই মাদক কারবারিরা বাংলাদেশে ফেনসিডিল আনছে। তাছাড়া মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা। এসব মাদকদ্রব্য আকারে ছোট, সহজেই বহনযোগ্য। ফলে, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েই তারা এসব নিয়ে আসছে। অপরদিকে তিনি আরো বলেন, এসব মাদক যাদের দ্বারা বহন করা হচ্ছে তারা একান্তই ছিন্নমূল মানুষ। ফলে পুলিশের হাতে এসব লোকজনই বেশি ধরা পড়ছে। আড়ালে থেকে যাচ্ছে আসল ব্যবসায়ীরা।
মাদকের করাল গ্রাস থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে বগুড়া সদর থানার ওসি (তদন্ত) রেজাউল করিম রেজারও পারিবারিক সচেতনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। তিনি মনে করেন, পরিবার থেকে মাদক বিষয়ে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। সন্তান কি করছে, কাদের সঙ্গে ঘুরছে- এসব বিষয় পারিবারিক ভাবে নজর রাখতে হবে।
এদিকে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বগুড়ার কার্যক্রমে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এই দপ্তর কি ভূমিকা পালন করছেন জানতে চাইলে বগুড়া অফিসের উপ-পরিচালক দিলারা রহমান কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

Sunday, June 30, 2019

মর্জিনা যেন সাফল্যের প্রতিচ্ছবি

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। বগুড়ার শেরপুরের মির্জাপুর ইউনিয়নের মদনপুর গ্রামের মূল সড়ক থেকে নেমে জমির আইল ধরে যেতে যেতে চোখে পড়ে টিনশেডের পাকা বাড়িটা। বাড়ির প্রধান ফটক থেকে একটু ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন নারী হাতে তৈরি করছেন পুঁথির ব্যাগ, ওয়ালম্যাট, ফুলের টবসহ নানা জিনিসপত্র। হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁরা এখন স্বাবলম্বী। এ কাজে তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছেন মর্জিনা খাতুন।
সেলাই ও হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে মর্জিনা এখন মাসে আয় করেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। গ্রামের অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী করার পথ দেখিয়েছেন তিনি। অবসর সময়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন মর্জিনা। এ পর্যন্ত অন্তত ৫০০ নারী তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে টাকা আয় করছেন। পরিবার নিয়ে তাঁরা সুখে–স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন।
গত শনিবার কথা হয় মর্জিনা খাতুনের সঙ্গে। এ সময় তিনি জানান তাঁর পরিশ্রম ও নানা অর্জনের কথা। মদনপুর গ্রামের কৃষক সুজির উদ্দিনের পাঁচ সন্তানের মধ্যে মর্জিনা রয়েছেন চার নম্বরে। মা জয়গুন বিবি গৃহিণী। ১৯৯৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় মর্জিনার। শ্বশুরবাড়িও একই গ্রামে। স্বামী বাসচালকের সহকারী (হেলপার) ছিলেন। বিয়ের পর তাঁকে সইতে হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা। বড় বোন মেরিনা বেগমের সহায়তায় পোশাক তৈরির কাজ শিখেছেন।
মর্জিনা খাতুন বলেন, বিয়ের পর বাবা তাঁকে দুই বিঘা জমি দিয়েছিলেন। ওই জমির আয় থেকে জায়গা কিনে বসতবাড়ি গড়েন। ওই বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে থাকতেন তিনি। স্বামীর সংসারে গেলেও লুকিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যান। স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে ২০০০ সালে দাখিল পাস করেন। পরে উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের সহায়তায় দুই বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১০ সাল থেকে তিনি ইউনিয়ন তথ্যসেবা ও ডিজিটাল সেন্টারে কাজ করছেন। অবশেষে ২০১৩ সালে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটান। পরের বছর আলিম পাস করেন মর্জিনা। ওই বছরই জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ–এর তালিকায় উপজেলা পর্যায়ে ২০১৪ সালে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে তৃণমূল নারী উদ্যোক্তা হিসেবেও তালিকাভুক্ত হন।
গ্রামের নারীদের সংসারের কাজের অবসরে পুঁথির ও প্লাস্টিকের তৈরি ব্যাগ ও ওয়ালম্যাট তৈরির কাজ শিখিয়ে দিচ্ছেন মর্জিনা খাতুন (মাঝে)। গত রোববার তোলা। ছবি: প্রথম আলো

Monday, June 17, 2019

সাংসদ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই ভাগ্য খুলেছে তাঁর by খোরশেদ আলম

হলফনামায় বলেছেন, তাঁর বার্ষিক আয় ৫ হাজার টাকা। ভোটে দাঁড়ানোর আগে জমা টাকা ছিল ৩০ হাজার। চলাফেরা করতেন একটি পুরোনো মোটরসাইকেলে। তবে সংসদ সদস্য হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই ভাগ্য খুলেছে তাঁর। চড়ছেন ৩৪ লাখ টাকার গাড়িতে।
আলোচিত এই সাংসদ হলেন বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের রেজাউল করিম। তাঁর দাবি, গাড়ি কেনার টাকা ‘উপহার’ হিসেবে পেয়েছেন। তবে এলাকায় প্রচার আছে, শাজাহানপুর উপজেলার অবৈধ ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তিনি এই গাড়ি কিনেছেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁর পেশা লেখা: ব্যবসা ও সাংবাদিকতা। তাঁর ও তাঁর ওপর নির্ভরশীল বার্ষিক আয় ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ সাংসদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর মাসিক আয় ছিল ৪১৭ টাকা।
হলফনামায় আয়ের উৎস বলা হয়েছে কৃষি ও ব্যবসা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে বছরে আসে ৩ হাজার টাকা। আর ব্যবসা থেকে বছরে আয় ২ হাজার টাকা। নির্বাচনের আগে তাঁর কাছে নগদ টাকা ছিল ৩০ হাজার। ব্যাংকে জমার পরিমাণও ৩০ হাজার টাকা। তাঁর মোটরসাইকেলের মূল্য ৫০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করেন।
তবে এলাকাবাসী জানান, রেজাউল করিমের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসাও নেই। বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা বুলেটিন-এর শাজাহানপুর উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। বাংলা বুলেটিন-এর সম্পাদক তারেক হাসান শেখ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, পত্রিকার শুরু থেকে রেজাউল করিম উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর মাসিক কোনো বেতন ছিল না। কেবল মাসে ১ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দেওয়া হতো। এখন আর সংবাদ পাঠান না, যোগাযোগও নেই। তাই সম্মানী ভাতাও দেওয়া হয় না।
তবে সাংসদ হওয়ার দুই মাসের মাথায় রেজাউল করিম টয়োটা কোম্পানির ‘নোয়াহ হাইব্রিড’ ২০১৫ সালের মডেলের একটি মাইক্রোবাস কিনেছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রমতে, চলতি বছরের ১২ মার্চ বিআরটিএ ঢাকার মিরপুর কার্যালয় থেকে মাইক্রোবাসটি নিবন্ধন করা হয় সাংসদ রেজাউল করিমের নামে। নম্বর ঢাকা মেট্রো-চ-১৯-৬৯০৯। ঠিকানা, সংসদ ভবন নম্বর ১, বাড়ি নম্বর ৫০৪, নাখালপাড়া, ঢাকা। রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেছেন, গাড়িটির দাম ৩৪ লাখ টাকা।
  • সাংসদ হওয়ার আগ পর্যন্ত রেজাউলের মাসিক আয় ছিল ৪১৭ টাকা।
  • নির্বাচনের আগে রেজাউলের কাছে নগদ টাকা ছিল ৩০ হাজার।
  • ব্যাংকে রেজাউলের জমার পরিমাণও ছিল ৩০ হাজার টাকা।
  • সাংসদ হওয়ার দুই মাসের মাথায় রেজাউল মাইক্রোবাস কিনেছেন।
এলাকায় প্রচার আছে, শাজাহানপুর এলাকার ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে গাড়ি কেনার টাকা নিয়েছেন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে শাজাহানপুর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুনেছি স্থানীয় অবৈধ কিছু ইটভাটা মালিকের কাছ থেকে তিনি (সাংসদ) টাকা নিয়েছেন। তবে এর সঙ্গে আমরা জড়িত নই।’
এই বিষয়ে সাংসদ রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো ইটভাটার মালিক তো পাগল হয়ে যাননি যে আমাকে টাকা দিবে। এটা প্রপাগান্ডা।’ তিনি দাবি করেন, গাড়ি কেনার পুরো টাকা তাঁর এক বন্ধু উপহার হিসেবে দিয়েছেন।
হঠাৎ কেন এই ‘উপহার’ দিলেন—এই প্রশ্নের জবাবে রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি সাংসদ হওয়ার পর খুশি হয়ে উপহার দিয়েছেন।’ তবে ওই বন্ধুর নাম জানতে চাইলে তিনি বলেননি। বন্ধুর ফোন নম্বর চাইলে সেটাও দেননি। বললেন, ‘সবাই তো সবার সঙ্গে কথা বলবে না।’
ভাগ্যের ফেরে সাংসদ
রেজাউল করিম সাংসদও হয়েছেন ভাগ্যের ফেরে। বগুড়া-৭ আসনটি ‘জিয়া পরিবারের আসন’ হিসেবে পরিচিত। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান গাবতলী ও পাশের উপজেলা শাজাহানপুর নিয়ে এ আসন গঠিত। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সব জাতীয় নির্বাচনেই এ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পান দলের গাবতলী উপজেলা শাখার মোরশেদ মিলটন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। আসনটি বিএনপিশূন্য হয়ে যায়। এখানে আওয়ামী লীগেরও প্রার্থী ছিল না। মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বড় অংশ ছিল স্বতন্ত্র প্রার্থী ফেরদৌস আরা খানের পক্ষে। তিনি গাবতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির আজম খানের স্ত্রী এবং শহর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক রফি নেওয়াজ খানের শাশুড়ি।
এই অবস্থায় ভোটের এক দিন আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিমকে সমর্থন দেয় স্থানীয় বিএনপি। ট্রাক প্রতীক নিয়ে তিনি ১ লাখ ৯০ হাজার ২৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর সাংসদ হওয়ার দুই মাসের মাথায় বদলে যায় আর্থিক অবস্থাও।
রেজাউল করিমের বাড়ি শাজাহানপুরের মাঝিড়া এলাকায়, বগুড়া-ঢাকা মহাসড়ক থেকে ১০০ মিটার পশ্চিম দিকে। সাংসদ হওয়ার পর বাড়ির সামনের সড়কের নামকরণ করা হয়েছে, ‘এমপি রোড’।

Monday, May 27, 2019

বগুড়ায় ডাকসু ভিপি নুরের ওপর হামলা

বগুড়ায় শহরে একটি ইফতার ও দোয়া মাহফিলে যোগ দিতে এসে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর ও তার সঙ্গীরা।  এ হামলায় আরও  ১৫ জন আহত হয়েছেন। পুলিশ নুরকে উদ্ধার করে প্রথমে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনার ছবি তোলায় যমুনা টিভির ক্যামেরাপারসন শাহনেওয়াজ শাওনকেও মারপিট করা হয়েছে।
২৬ মে রবিবার বিকালে শহরের পৌর পার্কের উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন চত্বরে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
বিকাল ৬টার দিকে নুরের সঙ্গে থাকা তার বন্ধু রুবেল বলেন, ‘স্থানীয় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এ ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে নুর অচেতন অবস্থায় আছেন। আমরা নুরকে ঢাকার দিকে নিয়ে যাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে ফোন না ধরায় জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক তিতাস এবং দায়িত্বশীল নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ডাকসুর নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে প্রতিপক্ষের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বগুড়া জেলা আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান রাকিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ওই ইফতার ও দোয়া মাহফিলে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরকে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের খবর পেয়ে সরকারি আজিজুল হক কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফের নেতৃত্বে ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী মিলনায়নের কাছে অবস্থান নেন। এর আগে পুলিশ দিয়ে অনুষ্ঠান না করতে হুমকি এবং ব্যানার সরিয়ে ফেলতে বলা হয়। বিকাল ৫টার দিকে একটি মাইক্রোবাসে ১৩ সঙ্গী নিয়ে নুর অনুষ্ঠানস্থলে আসেন। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা অতর্কিত হামলা চালায়। তারা ভিপি নুর ও অন্যদের বেধড়ক মারপিট করেন। কিল, ঘুষি, লাথি ও ইটপাটকেলের আঘাতে নুরসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন।’
রাকিবুল আরও বলেন, ‘হামলার ভিডিওচিত্র ধারণ করায় যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন শাহনেওয়াজ শাওনকেও মারপিট করা হয়েছে। এ সময় স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজ হাসান রক্তাক্ত নুরকে উদ্ধার করে রিকশায় বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর নুর ও তার সফরসঙ্গীরা মাইক্রোবাসে ঢাকার দিকে রওনা হন।’
রাকিব ছাত্রলীগের এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের গ্রেফতার এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মোস্তাফিজ হাসান জানান, ভিপি নুর ও তার সফর সঙ্গীদের ওপর ৩০-৪০ জনের একদল সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাউকে চিনতে পারেননি।
বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক রোকাইয়া আকতার জানান, তার কাছে নুর, রাতুল, আপন ও ফারুক নামে চারজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ভিপি নুরের মুখ ও কপালে আঘাত করা হয়েছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিক আমিন কাজল জানান, ভিপি নুর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন। তার চোখের ওপর সামান্য আঘাত লেগেছে এবং দাঁত থেকে রক্ত বের হয়েছে।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম বদিউজ্জামান জানান, ডাকসু ভিপি নুরকে কে বা কারা মারপিট করেছে জানা যায়নি। তিনি সামান্য আহত হয়েছেন। তবে ডাকসু ভিপি বগুড়া আসছেন সে বিষয়ে থানা পুলিশ কিছু জানে না।

ভিপি নুরের ওপর হামলা, ‘হালকা ধাক্কাধাক্কি’ বলছে ছাত্রলীগ

ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে বগুড়ায় গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক। নুরের ওপর বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ভিপি নুরসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
গতকাল শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ইফতার অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নূর।
রোববার বিকেলে বগুড়ার উডবার্ণ পাবলিক গ্রন্থাগারের মধ্যে নূরকে আহত করার এই ঘটনা ঘটেছে। আহত লোকজনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ভিপি নুরুল হক, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রাসুল ও বেসরকারি যমুনা টেলিভিশনের ভিডিওগ্রাফার শাহনেওয়াজ শাওন। ভিপি নুরকে প্রথমে বগুড়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন মোল্লা।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে আয়োজিত ইফতার ও দোয়া মাহফিলে যোগ দেওয়ার জন্য ভিপি নুরুলসহ ১৮ জন ঢাকা থেকে গত শনিবার বিকেলে বগুড়ায় আসেন। উডবার্ণ সরকারি গ্রন্থাগার মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। তবে আয়োজকেরা জানান, বেলা দুইটার দিকে শহরের স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মোস্তাফিজ হাসান নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা বলে তাঁদের এখানে কোনো অনুষ্ঠান করতে নিষেধ করেন। পরিদর্শক মোস্তাফিজ হাসান নিষেধ করার পর পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সদস্য এসে তাঁদের অনুষ্ঠান করতে নিষেধ করেন। এরপর তাঁরা অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য ভেন্যু নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ভিপি নুর ১৮ জনের একটি দল নিয়ে উডবার্ণ সরকারি গ্রন্থাগার চত্বরে আসেন। তবে পুলিশের লিখিত অনুমতি না থাকায় সেখানে অনুষ্ঠানের বাধা দেন সহকারী লাইব্রেরিয়ান রাজু আহম্মেদ। তাঁর সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছিলেন নুর। এর কিছুক্ষণের মধ্যে বগুড়া ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে একটি দল গ্রন্থাগার চত্বরে প্রবেশ করে। এরপর কোনো কথা বলার আগেই বগুড়া আজিজুল হক কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ ভিপি নুরকে ঘুষি মারেন। এরপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নুরের ওপর অতর্কিত হামলা করেন। মারপিট চলার সময় ভিডিও ধারণ বন্ধের হুমকি দিয়ে যমুনা টেলিভিশনের ফটোগ্রাফারকেও মারধর করেন ছাত্রলীগের সদস্যরা। সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা চলেও যাওয়ার পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভিপি নুরকে গ্রন্থাগারের প্রধান ফটকে ফেলে পেটান। এতে নুর ‘অজ্ঞান’ হয়ে গেলে তাঁকে রিকশায় তুলে দেন ছাত্রলীগের নেতা আবদুর রউফ। এরপর দলীয় স্লোগান দিতে দিতে ঘটনাস্থল থেকে খানিকটা দূরে টিটো মিলনায়তনে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ইফতার মাহফিলে যোগ দেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ইফতার উপলক্ষে বিকেলে থেকে টিটো মিলনায়তনে পুলিশের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। হামলার পর পুলিশের সদস্যরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত ছাত্রলীগের সদস্যদের সরিয়ে নেন।
পুলিশের এ দলে উপস্থিত ছিলেন স্টেডিয়াম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) মোস্তাফিজ হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে অনুষ্ঠানের বিষয়টি আগেই নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও ভিপি নুর ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সদস্যরা সেখানে ছিলেন। তবে ঘটনার খবর শুনে পুলিশ গ্রন্থাগার চত্বরে এসেছে। এখন আর কোনো ঝামেলা নেই।
গ্রন্থাগার চত্বরে অনুষ্ঠানের অনুমতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের বগুড়া শাখার আহ্বায়ক রাকিবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, হঠাৎ গতকাল শনিবার ইফতার মাহফিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ সদর থানাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু এরপর পুলিশ আরও অনুমতি দেয়নি। এই কারণে অন্য এলাকায় ইফতারের আয়োজনের কথা চলছিল। এর মধ্যেই ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা এসে ভিপি নুরকে মারধর করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, গ্রন্থাগারের কাছেই আজকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ইফতার মাহফিলের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্য গ্রন্থাগার চত্বর থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এই কারণে ছাত্রলীগের সদস্যরা সেখানে গিয়ে দেখেন,গ্রন্থাগার চত্বরে ভিপি নুর এসেছেন। এই সময়ে ভিপি নুরের সঙ্গে হালকা ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। আর সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়টি দুঃখজনক।
বগুড়ায় ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন ডাকসুর ভিপি নুরুল ইসলাম। এতে তিনি আহত হন। অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। বগুড়া, ২৬ মে। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, May 5, 2019

বগুড়া উপ-নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে কে হবেন প্রার্থী? by সালমান তারেক শাকিল

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আসন শূন্য ঘোষণার পর ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে এই আসনের উপ-নির্বাচন হওয়ার কথা জুনের মাঝামাঝি। কিন্তু এই উপ-নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু—তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। 
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, বগুড়া-৬ আসনে উপ-নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা এখনও কম। কারাবন্দি খালেদা জিয়া এই আসন থেকে দলের নিয়মিত প্রার্থী ছিলেন। খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রার্থী হন। এই আসন থেকে তিনি জিতেও আসেন। কিন্তু বিএনপির ছয় বিজয়ীর মধ্যে গত ২৫ এপ্রিল ১ জন ও ২৯ এপ্রিল ৪ জন শপথ নিলেও মির্জা ফখরুল নেননি। বিষয়টি নিয়ে মির্জা ফখরুল জানিয়ে আসছেন, দলের সিদ্ধান্তে কৌশলগত কারণেই তিনি শপথগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন।
এ ক্ষেত্রে বগুড়া উপ-নির্বাচনে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, এমন প্রশ্ন ছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের কাছে। তিনি বললেন, ‘যদি আমরা উপ-নির্বাচনে যাই, তাহলে তো মির্জা ফখরুলই প্রার্থী হবেন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, শনিবার (৪ মে) গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নিয়মিত বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেটি বাতিল করা হয়েছে। আগামী শনিবার (১১ মে) এই বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে আলোচনা হবে, বিএনপি বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না।’
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আরও বলেন, ‘উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো কি না, এ সিদ্ধান্ত আগে নিতে হবে দলকে। এরপরই বলা যাবে কে প্রার্থী হবেন।’
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য যদিও এ বিষয়টিতে মন্তব্যই করতে নারাজ। তাদের ভাষ্য, ‘উপ-নির্বাচন বা যেকোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করা হবে। গত ২৯ এপ্রিল সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার পক্ষ থেকে আসায় দলীয় নীতি-নির্ধারণী যেকোনও বিষয়ে এখন তাদের অনীহা তৈরি হয়েছে।’
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে বিএনপি। এ বছরে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনেও অংশ নেয়নি বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট। এ অবস্থান থেকে উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করারই কথা।
বিএনপির একাধিক প্রভাবশালী নেতা মনে করেন, মির্জা ফখরুলের শপথ গ্রহণ না করাটা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়টি যে ‘সরকারের প্রভাবে’ আটকে আছে, এ অভিযোগ বিএনপি গত দেড় বছর ধরেই করে আসছে। এ কারণে বিএনপির ৫ বিজয়ী শপথ নিলেও মির্জা ফখরুল শপথ নেননি।
বিএনপির একজন প্রভাবশালী ভাইস-চেয়ারম্যান বলেন, সরকার শেষ গোলে বিএনপির কাছে হেরে গেছে। মির্জা ফখরুল শপথ গ্রহণ না করায় সরকারের উচ্চপর্যায়েও স্বস্তি নেই।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রভাবশালী একজন সদস্য নিজের মতপ্রকাশ করেন এভাবে, ‘আমি তো মির্জা ফখরুলকে সরাসরি জিজ্ঞেস করিনি। জানতে চাইলে তিনি বিব্রত হবেন। প্রেসক্লাবের প্রোগ্রামে তিনি বলেছেন, দলের কৌশলেই শপথগ্রহণ করেননি। এছাড়া শপথ নিয়ে অন্য নেতাদের প্রশ্ন করা হলে তারা যে সত্যিই বলবেন বা সত্যিটাই জানেন, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।’
রাজনৈতিক একাধিকসূত্র জানায়, বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা করার আলোচনা চললেও বিএনপির সিনিয়র-পর্যায়ের একাধিক আইনজীবী মনে করেন, তা অনেক কঠিন। আইনত, খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় সাজা ভোগ করছেন। এখন তিনি জামিন পেলেও তার সাজা মিথ্যে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতার পথ খুলতে পারে সাজা মওকুফের মাধ্যমে। তা সম্ভব একমাত্র রাষ্ট্রপতির কাছে ‘মার্সি’ করার মাধ্যমে।
প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার মনোনয়নকে নির্বাচন কমিশন অবৈধ ঘোষণা করলে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী। ওই আপিল এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
জানতে চাইলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশন  তার প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করলে আমরা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। ওই রিট পিটিশনে হাইকোর্ট ডিভিশন নামঞ্জুর করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে আমরা সুপ্রিম কোর্টেও গেছি। সে আবেদন এখনও পেন্ডিং আছে। বিষয়টা হচ্ছে, হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশ আছে।’
উদাহরণ দিয়ে আমিনুল ইসলাম জানান, ‘এর আগে হাইকোর্টে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মহিউদ্দিন খান আলমগীরসহ অনেকেই কনভিক্টেট হওয়ার পরও নির্বাচনে প্রার্থিতা করেছেন। হাইকোর্ট ডিভিশন তাদের অ্যালাউ করেছেন। এমনকি লুৎফুজ্জামান বাবরও কনভিক্টেটেড হয়েছিলেন, তিনিও নির্বাচন করেছেন।’
অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ইস্যু যেহেতু একই, তাই আপিল বিভাগে  চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আদালতের আদেশ লাগবে। যেটি আপিল বিভাগে পেন্ডিং আছে, সেটি নিষ্পত্তি হতে হবে তার পক্ষে। তাহলেই তিনি যেকোনও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। আমরাও মনে করি, যেহেতু তার সাজা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি, সেহেতু তিনি যেকোনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।’
উল্লেখ্য, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুটি দুর্নীতি মামলার একটিতে ১০ বছর ও অন্যটিতে ৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

Wednesday, March 6, 2019

আলুর পাঁপড়ে জীবিকা by সোয়েল রানা

বগুড়ার গাবতলী উপজেলার একটি গ্রাম কুটামহিন। এখানকার নারীরা দল বেঁধে আলুর পাঁপড় তৈরি করেন। বাড়ির পুরুষেরা সেগুলো বাজারে বিক্রি করেন। পাঁপড় বিক্রির টাকায় চলে তাদের সংসার।






Tuesday, March 5, 2019

খরস্রোতা করতোয়া এখন মরা খাল by আনোয়ার পারভেজ

  • • নদী দখল করে স্থাপনা গড়ায় সংকুচিত হচ্ছে করতোয়া।
  • • ময়লা-আবর্জনা, বর্জ্যের দূষণে কালো হয়ে গেছে পানি।
  • • দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা নদীপারের মানুষের।
  • • জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সজিন নেই নদীতে।
একসময় খরস্রোতা এই নদীতে নৌকা চলত, জেলেরা মাছ ধরতেন, নৌকাবাইচে মেতে উঠত নদীপারের মানুষ। নদী ঘিরেই ছিল এখানকার কৃষি, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সংস্কৃতি।
বগুড়ার ‘হৃৎপিণ্ড’ বলে পরিচিতি সেই করতোয়া এখন দখল-দূষণে শ্রীহীন ও গতিহারা মরা খাল। নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা তৈরি করায় প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে করতোয়া। ময়লা-আবর্জনা, কারখানার তরল বর্জ্য ফেলার করণে দূষণে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে পানি। দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা নদীপারের মানুষের। জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সজিনেও নেই নদীতে।
বগুড়া শহরের বুক চিরে উত্তর-দক্ষিণ আড়াআড়িভাবে প্রবাহিত ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ করতোয়া। পরিবেশবাদী ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করতোয়ার অবস্থা খুবই নাজুক। উৎসমুখে জলকপাটের (স্লুইসগেট) কারণে অনেক আগেই নাব্যতা হারিয়েছে। এখন পাল্লা দিয়ে চলছে দখল ও দূষণ।
বগুড়ার ডেমাজানি মৎস্যজীবী সমিতির সহসভাপতি নিত্যনন্দ দাস বলেন, দুই যুগ আগেও করতোয়ায় স্রোতোধারা ছিল। নদীতে জাল ফেললেই হরেক প্রজাতির মাছ মিলত। ৩০ বছরে এই নদী থেকে কমপক্ষে ২০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত।
কবি ও প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার বলেন, গঙ্গার চেয়েও তিন গুণ বড় ছিল করতোয়া। দখল–দূষণে করতোয়া এখন মরা খাল। করতোয়ার উজান-ভাটি—সবখানেই শত্রু।
দূষণে বিপর্যস্ত করতোয়া
শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়ায় করতোয়ার পানিদূষণও সবচেয়ে বেশি বগুড়াতেই। দূষণের শুরু শহরতলির ঠেঙ্গামারায়। এখানে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস নদীতে নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে। পিছিয়ে নেই বগুড়া পৌরসভাও। পৌরসভার নালা দিয়ে সারা বছর করতোয়া তরল বর্জ্য পড়ছে, কয়েকটি স্থানের ময়লা-আবর্জনাও নদীতে ফেলছে পৌরসভা। শহরের অদূরে শাজাহানপুর উপজেলায় ভাদাই খাল মিশেছে করতোয়ায়। এই ভাদাই খাল দিয়ে সারা বছর বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য করতোয়ায় পড়ছে। সুবিল খালের তরল বর্জ্যও পড়ছে এই নদীতে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বগুড়া জেলা কমিটির সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, করতোয়ার মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর অন্যতম কারণ শহরের নালা-নর্দমার পানি নদীতে ফেলা।
দখলদারের কবলে করতোয়া
করতোয়া নদীর অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে জেলা প্রশাসন দীর্ঘদিন আগে উদ্যোগ নিলেও কোনো ফল আসেনি। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় শহর ও শহরতলির বিভিন্ন অংশে করতোয়া নদী দখলকারীর তালিকা তৈরি করে। ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৩৮ জন দখলদারের তালিকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। এর আগে জেলা প্রশাসন ২৭ দখলদার চিহ্নিত করে আরও একটি তালিকা করেছিল। ওই তালিকা ধরে হাতে গোনা দু–একটি স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছিল। তবে সেই অভিযানের পর নদীর জায়গা ফের দখল হয়।
সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে ৩০ দখলদারের একটি আংশিক তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও নদী কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তা নোটিশ বোর্ড কিংবা শহরের জনবহুল স্থানে টানানো হয়নি। আর পরিবেশবাদীরা এই তালিকাকে অসম্পূর্ণ বলে অভিযোগ তুলেছেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আলীমুন রাজীব বলেন, অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় জন্য বড় অঙ্কের তহবিল প্রয়োজন। নতুন তালিকায় পুরোনো অনেক দখলদারের নাম নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই নতুন করে চলছে দখল।
হাইকোর্টের নির্দেশও উপেক্ষিত
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) করতোয়ার দখলদার উচ্ছেদ ও পানির প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখতে ২০১৫ সালের ২২ জুন জেলা প্রশাসকসহ ২১ জনকে বিবাদী করে হাইকোর্টে রিট করে। হাইকোর্ট অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নদীতে সব ধরনের বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং দূষণ রোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন বগুড়া পৌরসভাকে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালির খুলশীতে করতোয়া নদীর উৎসমুখে নির্মিত জলকপাটের পরিবেশগত প্রভাব নির্ণয় করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পাউবোকে নির্দেশ দেন আদালত। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে সমন্বিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়।
জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসন, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী, বগুড়া পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পাউবোর বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এখন নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সিএস নকশা অনুযায়ী নদী খনন করা ছাড়াও পানি ধরে রাখার জন্য ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে নদীর উৎসমুখে নতুন করে জলকপাট নির্মাণ ছাড়াও বগুড়া শহরে নদীর দুই তীরে ২৭ কিলোমিটার নালাসহ সড়ক নির্মাণ, তরল বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হবে।