Sunday, February 2, 2025

ট্রাম্পইজম যুক্তরাষ্ট্রকে কোথায় নেবে? by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

ডনাল্ড ট্রাম্প। এক বিস্ময়কর নাম। আলোচিত নাম। সমালোচিতও। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের মসনদের মালিক। মেয়াদ আগামী চার বছর। এ সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে পারেন। আবার সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের এক নম্বর শক্তিধর দেশ। কিন্তু ট্রাম্প যেসব নীতি অবলম্বন করছেন তাতে তিনি এই অবস্থান থেকে নামিয়ে ফেলতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রকে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ তার এবারের মূলমন্ত্র। নির্বাচনী প্রচারণায় এই মন্ত্র ছিল ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রেট করতে গিয়ে ভূখণ্ড বিস্তৃত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন একাধিকবার। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বহু লাখ বিদেশি অবৈধ অভিবাসীকে বের করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী কাজ করছে বর্ডার গার্ডস সহ সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই কার্যত হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি ডেনমার্কের অধীনে থাকা গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নেবেন। তিনি মনে করেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকা অত্যাবশ্যক। এখানেই থেমে থাকেননি। পানামার নিয়ন্ত্রণে থাকা পানামা ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, ওই ক্যানেল নিয়ন্ত্রণ করছে চীনা সেনারা। এটা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তবে পানামা সরকার ট্রাম্পের এ বক্তব্যকে খণ্ডন করেছে। তারা বলেছে, সেখানে চীনের কোনো উপস্থিতি নেই। ট্রাম্প আরও ভয়ের যে কথা বলেছেন, তা হলো কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য বানাতে চেয়েছেন। বলেছেন, এ জন্য অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করবেন। অর্থনৈতিক শক্তির ব্যবহার বলতে বোঝায় সাধারণত নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপকে। ২০শে জানুয়ারি শপথ নেয়ার সময় তিনি সম্প্রসারণবাদ নিয়ে কয়েকবার কথা বলেছেন। এর বাইরে ওইদিনই তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্বাহী আদেশ দেন। তার দাবি এই সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি অর্থ দিচ্ছে। অন্যদের এক্ষেত্রে বাজেট বাড়িয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার আহ্বান জানান ট্রাম্প। কিন্তু তার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেডরোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান। পরে জানানো হয়, ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। একই সময়ে বাতাসে অনেক খবর ভাসে। শোনা যায়, তিনি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। যদি তা-ই হয়, তাহলে ইউরোপ অরক্ষিত হয়ে পড়তে পারে। এসব সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। কারণ, এর প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গেলে বিদেশি শক্তির ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এই চুক্তির ফলে প্যাসিফিক রিম বলে পরিচিত ১১টি দেশের মধ্যে বাণিজ্য হতো। এই চুক্তির অংশ ছিল না চীন। ফলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভালোভাবে ব্যবসা করতে পারতো। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, এই চুক্তিটি ত্রুটিপূর্ণ। এতে পরে চীনের যুক্ত হওয়ার জন্য একটি পেছনের দরজা খোলা রেখেছে। এ কারণে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর টিপিপি’র অংশীদাররা এর নতুন নাম দেন- কমপ্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রোগ্রেসিভ অ্যাগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (সিপিএটিপিপি)। তখন ব্যাপকভাবে সমালোচনা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ করতে পারে চীন এবং এর মধ্যদিয়ে ওই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পাবে চীন। অর্থাৎ চীনকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেন ট্রাম্প। ফলে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় ওই চুক্তিতে যুক্ত হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে চীন। এ সময় চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলে- এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের নেতৃত্ব দৃঢ় হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প শুধু এই নীতি করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের জন্য সফর নিষিদ্ধ করেন। যুক্তরাষ্ট্র- মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করেন। পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ বিষয়ক একটি পলিসি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বাস্তবায়ন করেন। ২০১৮ সালে চীনের বিরুদ্ধে শুরু করেন বাণিজ্য যুদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু বলে পরিচিত উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু তা সম্পন্ন করতে পারেননি। এবারও তিনি তেমন কোনো উদ্যোগ নেবেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কোভিড-১৯ মহামারিকালে স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি মানতে গড়িমসি করেন ট্রাম্প। এক পর্যায়ে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০১৯ সালে তাকে কংগ্রেসে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বাধা দেয়ার অভিযোগে অভিশংসিত করা হয়। ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় উস্কানি দেয়ায় অভিযুক্ত হন। তবে পরে দু’টি অভিযোগ থেকেই তাকে খালাস দিয়েছে সিনেট। তিনি আবারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। আবারো যেসব নীতি হাতে নিয়েছেন তাতে যুক্তরাষ্ট্র পুঁজিবাদী ধারণাকে সামনে নিয়ে এগুতে পারে। এর মধ্যদিয়ে তারা বিপুল অর্থের মালিক হতে পারে। এমনকি সাম্রাজ্যবাদের দিকে ধাবিত হতে পারেন ট্রাম্প। যেমনটি ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার অপেক্ষায় যখন ছিল বিশ্ব, তখন বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারিত্ব ও সাম্রাজ্যবাদী যুগের মধ্যে তুলনা করতে থাকেন কেউ কেউ। এরই মধ্যে প্রটেকশনিজম বা সংরক্ষণবাদী হিসেবে একটি যুগের চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্র ১৮৯০-এর দশকে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী ছিল। কারণ, তখন শুল্ক আরোপের একটি সিস্টেম ছিল। এখন দৃশ্যত তিনি বিংশ শতাব্দীর শেষে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের মতো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। বিষয়টি ভূরাজনীতিতে একটি আতঙ্কের সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বড় রকম অর্থনৈতিক ও সামরিক সংঘাতও হতে পারে। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক একজন ইতিহাসবিদ ডানিয়েল ইমারওয়াহর বলেন, আমরা বিশ্বকে গ্রাস করার আরও একটি পুরনো সংস্করণ দেখতে পাচ্ছি। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে নিজেদের সীমান্ত থেকে বহু দূরে অবস্থানরত চীন বিভিন্ন ভূখণ্ড তাদের অধীনে নিতে পারে। এ জন্য তিনি বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা পানামা ক্যানেল নিয়ন্ত্রণ করছে বেইজিং। একই সঙ্গে চীন ও তার মিত্র রাশিয়া আর্কটিক সমুদ্রপথ ও মূল্যবান খনিজ তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে। একই সময়ে চতুর্দিকে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব সহ কিছু দেশের উত্থান ঘটছে। ভেনিজুয়েলা ও সিরিয়ার মতো দেশ ঘূর্ণাবর্তে এবং তারা বাইরের প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ১৮৮০-এর দশক এবং ১৮৯০-এর দশকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই ছিল। কিন্তু কোনো একক দেশ আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। বেশির ভাগ দেশ ছিল অধিক মাত্রায় শক্তিধর। এর ফলে এশিয়া থেকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চল পর্যন্ত যুদ্ধ হয়েছে। বিরোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন করে মানচিত্রের সীমানা আঁকা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড, পানামা ক্যানেল এমনকি কানাডাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার বিষয়টি সম্প্রসারণবাদ। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়ে ইতিহাসবিদ ইয়ান টাইরেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের দখলদারিত্ব বজায় রাখার চর্চা করে, চেষ্টা করে। তারা যেসব এলাকাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বলে মনে করে তখনই এমন করে। ট্রাম্প কানাডা, মেক্সিকো, চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তাতে এসব দেশের বাণিজ্যই যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন নয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। শুল্ক বাড়ানোর পর ভোক্তারা চাহিদা কমিয়ে দিতে পারেন। তাতে বাজার অর্থনীতিতে বড় রকমের আঘাত লাগতে পারে। যদি সেটাই হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এদিক দিয়ে চীনের উত্থান ঘটতে পারে। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ, আফ্রিকার কিছু দেশকে নিয়ে বড় একটি বলয় তৈরি করে ফেলতে পারে। তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার যে হুমকি দিয়েছেন তার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মিউট বোরাপ এগেদে এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মিত্তি ফ্রেডেরিকসেন। ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, সীমান্তের ওপর সম্মানজনক পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ আছে ডেনমার্কের। এ বিষয়ে নরডিক দেশগুলো, ইউরোপ এবং ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর পরিষ্কার বার্তা আছে। গ্রিনল্যান্ড হলো ডেনমার্কের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ। ইউরোপিয়ান অঞ্চলে এমন হুমকিতে বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তারা ট্রাম্পের হুমকিকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। সর্বশেষ ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক রাসমুসেন প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডকে পাবেন না ট্রাম্প। গ্রিনল্যান্ড হলো গ্রিনল্যান্ড। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ডের মানুষ গ্রিনল্যান্ডিক। বার বার আমরা বলে আসছি, এই দ্বীপের মানুষরাই তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু ট্রাম্প বার বার ওই দ্বীপ দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। কানাডাকে দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। এসব হুমকিতে এক রকম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে চীন যে তাইওয়ানকে তাদের নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান ব্যক্ত করেছে ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন। ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদেই সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে ২০১৫ সালে করা ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন। উল্টো তিনি ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।  ওই চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে এসে সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অনেক চেষ্টা করলেও তেমন কোনো ফল হয়নি। উল্টো ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডের প্রথম সারির কয়েকজন নেতা নিহত হন। তীব্র ইরান বিরোধী ট্রাম্প এবার ইরান ইস্যুতে কি অবস্থান নেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে তিনিও জো বাইডেনের মতো কঠোর ইসরাইলপন্থি এটা আগের মেয়াদেই প্রমাণ দিয়েছেন। বরং বাইডেনের চেয়ে তিনি একটু বেশি ইসরাইলপন্থি। তার হুমকিতে হামাস যদিও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করেছে, তা কতোদিন স্থায়ী হয়- সেটা এখন দেখার বিষয়। 

ডনাল্ড ট্রাম্প যা করছেন তাকে কেউ কেউ ট্রাম্পইজম বলে অভিহিত করছেন। তিনি বিগত সময়ে এবং এখনো বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্যকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অভিবাসনবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশ ও ভারতের অভিবাসীরাও। ভারতীয় মিডিয়ায় প্রকাশ ভারত ১৮ হাজার অভিবাসীকে ফেরত নেয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এ সংখ্যা পরিষ্কার করে বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কোনো বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে দ্বিপক্ষীয় বিষয়, আঞ্চলিক ও বিশ্ব নিরাপত্তার ইস্যু আলোচিত হয়েছে। উঠেছে প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, ওই সংলাপে নাকি বাংলাদেশ ইস্যুও উঠেছিল। তবে বাংলাদেশ নিয়ে কি আলোচনা হয়েছে তা জানা যায়নি। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার দহরম মহরম সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এবারো কি তাই হবে? ট্রাম্প যখন ভারতীয় অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেবেন, তখনই এ সম্পর্ক সম্পর্কে আন্দাজ করা যাবে। তাছাড়া সবেমাত্র ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু। এখনই ভারতের সঙ্গে তার সমীকরণ কেমন হয় তা বোঝা দুরূহ।
ডনাল্ড ট্রাম্প ২০শে জানুয়ারি শপথ নিয়ে হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে যান। এ সময়ে বিশ্বের বহু দেশ আন্দাজ করে নিয়েছে তার অধীনে তাদের প্রত্যাশা কি হবে এবং তাদের সামনে যা আসতে চলেছে তার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। এই পলিসির মধ্যে তিনি যেসব নীতি গ্রহণ করেছেন তাতে কি যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শক্তিধর এক নম্বর আসন ধরে রাখতে পারবে! অথবা তারা কি যে অবস্থায় আছে তার থেকে আরও উপরে উঠে আরও শক্তিশালী হবে! নাকি যুক্তরাষ্ট্র নিজে নিজেই ধসে পড়বে! বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এখন এই আলোচনা। কারণ, ট্রাম্প শপথ নেয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তার দাবি, এই সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র একাই সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে আসছে। অন্যদেরকেও তাদের আর্থিক অনুদানে ভারসাম্য রক্ষার আবেদন দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ২০২৩-২০২৪ সময়কালে বাজেট ছিল ৬২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই দিয়েছে শতকরা ১৮ ভাগ। যার পরিমাণ দাঁড়ায় কমপক্ষে ১২২ কোটি ডলারের অনেক বেশি। ট্রাম্প চাইছেন এই অর্থ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে না দিয়ে তার দেশের মানুষের সেবায় ব্যবহার করতে। তাতে যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যে শূন্য আসন তৈরি হবে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, তা ওই অর্থ দিয়ে পূরণ করা যাবে না। এ বিষয়টি যখন ট্রাম্প প্রশাসনে আলোচনা হচ্ছে, তখন শোনা যাচ্ছে তিনি এ সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করছেন। এর বাইরে ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন নির্বাচিত হয়ে এসে সেই চুক্তিতে ফিরে গেছেন। আবারো ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার কথা ভাবছেন। তিনি এবার ক্ষমতায় এসেছেন জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে। অর্থাৎ মার্কিনিদের স্বার্থকে বড় করে দেখিয়েছেন। তিনি মার্কিনিদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন বেশ কয়েকটি। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো- অবৈধ লাখ লাখ অভিবাসীদের বের করে দেবেন। মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করবেন। পানামা ক্যানেল, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবেন। গালফ অব মেক্সিকোর নাম পাল্টে দিয়ে নতুন নাম রাখবেন গালফ অব আমেরিকা। কানাডা, চীন, মেক্সিকো সহ বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে বিপুল পরিমাণে শুল্ক আরোপ করবেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো অভিবাসীর সন্তান জন্ম নিলে তারা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে না। একদিনের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। ইত্যাকার প্রতিশ্রুতিতে মার্কিনিরা তাকে ক্ষমতায় এনেছে। ট্রাম্প ২০শে জানুয়ারি শপথ নেয়ার পরই প্রথম ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানাকে বর্ধিত করার কথা বলেছেন। আসলে এর মধ্যদিয়ে তিনি গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে নেয়ার কথা বুঝিয়েছেন। ২৫শে জানুয়ারি তিনি গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প ওই দ্বীপটিকে দখল করে নেয়া সম্পর্কে বলেছেন- আমরা মনে করি এটা আমরা নিয়ে নেবো। এই দ্বীপে বসবাস করেন প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ। তাদেরকে আমরা আমাদের সঙ্গে পেতে চাই। এর আগে ট্রাম্প যখন এই দ্বীপকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে নেয়ার দাবি করেছিলেন, তখন ডেনমার্ক এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে তার বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এক ফোনকলে কথা বলেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মিত্তি ফ্রেডারিকসেন। ফোনালাপটি ছিল উত্তপ্ত। সেখানে ফ্রেডারিকসেন জানান, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়। উল্লেখ্য, ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময় আর্কটিক অঞ্চলের এই বিশ্বাল দ্বীপটি কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে গেছে। তবে তিনি এয়ারফোর্স ওয়ানের প্রেসরুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে নতুন করে কথা বলেন। ট্রাম্প বলেন, আমি জানি না ডেনমার্ক কেন এটার দাবি করছে। যদি তারা এটা (যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে) হতে না দেয়, তাহলে তা হবে খুবই অবন্ধুত্বসুলভ কাজ।  কারণ, এই গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষাটা মুক্ত বিশ্বের জন্য প্রয়োজন। বিশ্বকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য আমি মনে করি আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেবো। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করার নেই। কারণ, শুধু যুক্তরাষ্ট্রই সেখানে স্বাধীনতা দিতে পারে। তারা (ডেনমার্ক) পারে না। শুধু গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার হুমকি দিয়েই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। একই সঙ্গে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য বানানোর হুমকি দেন। বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কানাডাকে অঙ্গরাজ্য বানাতে অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে পারেন। তারও কড়া জবাব দিয়েছে কানাডা। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি ক্ষমতার প্রথম দিনেই থামিয়ে দিতে পারবেন ইউক্রেন যুদ্ধ। অবশ্য, তিনি এ নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। 

চীন-রাশিয়া কী এক হচ্ছে: ডনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি মোকাবিলা করতে চীন ও রাশিয়া কি এক হচ্ছে? ২০শে জানুয়ারি ট্রাম্প শপথ নেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই ভিডিওকলে কথা বলেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সবচেয়ে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শি জিনপিংকে একজন ‘প্রিয় বন্ধু’ সম্বোধন করে পুতিন বলেছেন- বাইরের চাপ থাকা সত্ত্বেও বন্ধুত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং সমর্থনের ভিত্তিতে রাশিয়া ও চীন তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। পক্ষান্তরে পুতিনকে কৌশলগত সহযোগিতা গভীর করতে, পারস্পরিক সমর্থনকে উন্নত করতে এবং বৈধ স্বার্থের সেফগার্ড দেয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান শি জিনপিং। ওদিকে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি চীনকে একটি নির্যাতনকারী বা অপব্যবহারকারী (অ্যাবিউজার) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সতর্ক করেন এই বলে যে, যদি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করতে ব্যর্থ হয় তাহলে মস্কোর সামনে বড় বিপদ আসতে চলেছে। শি জিনপিংকে পুতিন বলেন, ইউক্রেন নিয়ে যেকোনো সমাধান হতে হবে রাশিয়ার স্বার্থকে সম্মান জানিয়ে। ওই ফোনকলের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন পুতিনের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ। বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ দিচ্ছে তারা। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ২০২৩ সালে রেকর্ড ২৪০০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। ২০২১ সালের পর এই পরিমাণ শতকরা কমপক্ষে ৬৪ ভাগ বেশি। উশাকভ বলেন- যদি ট্রাম্প টিম আগ্রহ দেখায় তাহলে পারস্পরিক সুবিধা এবং সম্মানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রস্তুত পুতিন ও শি জিনপিং। তিনি আরও জানান- এই দুই নেতার মধ্যে ফোনকলের কোনো সম্পর্ক নেই ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানের। তাদের মধ্যে কল স্থায়ী হয় প্রায় দেড় ঘণ্টা। এমন এক প্রেক্ষাপটে টেলিফোনে কথা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র। যত যাই বলা হোক, চীনের মন পাওয়া বা রাশিয়ার মন পাওয়া এতটা সহজ হবে না ট্রাম্পের জন্য। কারণ, এদের কারও বিষয়ে তার নীতি সুখকর নয়। ফলে তাকে মোকাবিলা করতে একজোট হতে পারে চীন ও রাশিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন কি কথা হলো: কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে প্রথম আলোচনা করেছে চীন। দুই দেশকে সব দিক থেকে ঠিক উল্টো পিঠের বলে বিবেচনা করা হয়। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের বিরুদ্ধে তিনি বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু এবার দ্বিতীয় মেয়াদে এসে কী করবেন! আগেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করবেন। কিন্তু বেইজিং আশা প্রকাশ করেছে যে, সুপরিচিত চীন বিশেষজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দুই দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য গঠনমূলক পদক্ষেপ নেবেন। এ নিয়ে শুক্রবার মার্কো রুবিওর সঙ্গে আলোচনা করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। এ সময় তিনি নিজেদের নেতাদের নির্দেশনা অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক সঠিক পথে নেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শুক্রবার ওয়াং ই’র সঙ্গে প্রথম টেলিফোনে কথা বলেন মার্কো রুবিও। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে নতুন প্রশাসনে এই দুই শীর্ষ কূটনীতিকের এটাই প্রথম টেলিসংলাপ। এতে ওয়াং ই’কে মার্কো রুবিও বলেন, চীনের সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের স্বার্থ থাকবে সর্বাগ্রে। এ তথ্য জানানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে। এতে আরও বলা হয়, এই অঞ্চলে মিত্রদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্ষতিকর পদক্ষেপের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক এবং তাইওয়ান ইস্যুতে আলোচনা করেছেন। ওয়াং ই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওকে বলেছেন, চীন এবং মার্কিন জনগণের জন্য, শান্তিপূর্ণ বিশ্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য ভবিষ্যতে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেবেন বলে আমি আশা করি। কিন্তু ফেনটালাইন বাণিজ্যে বেইজিংয়ের ভূমিকার কারণে চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শতকরা ১০ ভাগ শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছে বলে বুধবার জানান ট্রাম্প। এরপর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই টেলিসংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, রুবিওকে ওয়াং বলেছেন, তাদের রাষ্ট্রের প্রধানরা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং সম্পর্ক কেমন হবে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ওয়াং ই বলেন, দুই দেশের টিমের উচিত তাদের রাষ্ট্রের প্রধানদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, মতপার্থক্য দূর করা, সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, স্থিতিশীলতাকে উৎসাহিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি সুস্থ ও টেকসই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটানো। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেন একটি নতুন যুগের সূচনা হয়, তেমন সঠিক পথ খুঁজে বের করার তাগিদ দেন তিনি। গত সোমবার শপথ নিয়ে ক্ষমতায় বসেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার আগে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তিনি ফোন করেন। এই ফোনকলে দুই নেতা একমত হন যে, বড় সব সমস্যা সমাধানে তারা একটি কৌশলগত যোগাযোগ চ্যানেল সৃষ্টি করবেন। বৃহস্পতিবার ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য রাখেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অত্যন্ত সুসম্পর্ক চান তিনি। তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে সাহায্য করতে পারে চীন। বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার খুব ভালো ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তিনি আশা করেন এর ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছতে পারবেন। সোমবার তিনি বলেন, চীন সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন তিনি। এ বছর খুব তাড়াতাড়ি তিনি চীন সফরে যাবেন। এর আগে ক্ষমতার প্রথম মেয়াদের প্রথম বছরে দ্রুততার সঙ্গে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন ট্রাম্প। উভয়ে উভয়কে যথাক্রমে ফ্লোরিডা এবং বেইজিংয়ে বিলাসবহুল অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সম্পর্ক একটি বাণিজ্য যুদ্ধ থামাতে পারেনি। পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করেছে এক দেশ অন্য দেশের বিরুদ্ধে। এতে বিশ্ব জুড়ে সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিনেটে কনফার্মেশন শুনানিতে মার্কো রুবিও বলেছেন, চীন বিশ্বাস করে যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২০ থেকে ৩০ বছর বিশ্বে আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে থাকবে। তবে ওয়াং ই বলেন, কাউকে ছাড়িয়ে যেতে বা কারও স্থান দখল করার মানসিকতা নেই চীনের। তিনি বলেন, তবে আমাদের উন্নয়নের বৈধ অধিকারকে সুরক্ষিত রাখবোই আমরা। তাইওয়ান ইস্যুতে তিনি বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই ওই দ্বীপটি চীনের অংশ। চীনের কাছ থেকে তাকে কখনো বিচ্ছিন্ন হতে দেবে না চীন। ওদিকে গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ান বেইজিংয়ের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কখনোই ওই দ্বীপরাষ্ট্রকে শাসন করেনি। অন্যদিকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের আইনের অধীনেই তারা এই অস্ত্র বিক্রি করে। কিন্তু তা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্কে টান ধরেছে।
সৌদি আরব আগেই নতজানু: সৌদি আরবকে হুমকি দেয়ার আগেই সে নতজানু হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর ক্ষমতার মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃতক্ষেত্রে এবং বাণিজ্যে ৬০,০০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। ট্রাম্পকে এরই মধ্যে এ কথা জানিয়ে দিয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি আরবের সরকারি বার্তা সংস্থা এ খবর প্রচার করেছে। তার ওপর ভিত্তি করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, দুই নেতা টেলিফোনে কথা বলেছেন। ক্রাউন প্রিন্স বলেছেন- তিনি আশা করেন ট্রাম্প প্রশাসন আগে দেখা যায়নি এমন অর্থনৈতিক সুযোগ ও সমৃদ্ধি সৃষ্টি করতে সংস্কার করবেন। তবে ৬০ হাজার কোটি ডলারের সূত্র কি সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি মোহাম্মদ বিন সালমান। বলেননি এই অর্থ সরকারি নাকি বেসরকারি খাত থেকে আসবে। কীভাবে সেই অর্থ বিনিয়োগ হবে তাও বিস্তারিত বলেননি তিনি। ক্রাউন প্রিন্স যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বলেছেন, যদি আরও সুযোগ আসে তাহলে এই বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। উল্লেখ্য, ক্ষমতার প্রথম মেয়াদে সৌদি আরব সহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দহরম মহরম। সৌদি আরব সফরে এসে সেই সম্পর্ককে আরও জোরালো করেন দুই নেতা। ট্রাম্পকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা দেয়া হয় সৌদি আরবে। তার মধ্যে তিনি সোর্ড ড্যান্স (তরবারি হাতে বিশেষ নাচ) দেন। বিমান বাহিনীর জেট বিমান ফ্লাইপাস্ট দেয় তাকে। ট্রাম্পের জামাই এবং সাবেক সহযোগী জারেড কুশনারের গঠন করা একটি প্রতিষ্ঠান এই দেশে বিনিয়োগ করেছে দুইশত কোটি ডলার।   

ট্রাম্পইজম যুক্তরাষ্ট্রকে কোথায় নেবে?

মানবাধিকার সুরক্ষায় করণীয় by আব্দুল কাইয়ুম

মানুষের অধিকারই মূলত মানবাধিকার। শাব্দিক দিক দিয়ে এটি বেশ ছোট হলেও এর বুৎপত্তিগত অর্থের আয়তন বিশাল। এ ছাড়া বাস্তব ক্ষেত্রেও সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোধহয় এটিই। কেননা, সব কিছুর উপরে মানুষ তার অধিকার নিয়েই বাঁচতে চায়। এভাবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের ইস্যুটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদনে সমপ্রতি পতিত সরকারের আমলে ঘটা মানবাধিকারের ভয়াবহ যে চেহারা প্রকাশিত হয়েছে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মানবাধিকারের এমন কোনো বিষয় নেই যা লঙ্ঘন করেননি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল। বিরোধী মত দমনে জোরপূর্বক গুম, হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, একের জন্য অন্যকে সাজা দেয়া, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ থেকে শুরু করে মানুষের সকল অধিকারকেই ভূলুণ্ঠিত করেছে বিগত আওয়ামী রেজিম। যা পুনর্গঠনে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ উত্থাপন করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

বলা বাহুল্য যে, নিজেদের তৈরি রাজনৈতিক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়েই মানবাধিকারের এমন করুণ পরিণতি ঘটিয়েছে আওয়ামী লীগ। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের অধিকার রক্ষায় থাকবে সোচ্চার, তারা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত। আওয়ামী লীগ নিজ দলের স্বার্থেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছে। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। কথা উঠেছে র‌্যাব বিলুপ্তির। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর জন্য মানবাধিকার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে বিশেষ তাগিদ দেয়া হয়েছে।
তবে এই সুপারিশ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় কোথায়? আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)। তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আওয়াজ জোরালো হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের অপেক্ষাতেই রয়েছে দলটি। তাদের চাপ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইউনূস সরকার যে সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ সময় পাচ্ছে না তা নিশ্চিত। তবে দেশে মানবাধিকার বলবৎ করতে হলে দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদে সংস্কার প্রক্রিয়া জারি রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এক্ষেত্রে তারা ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগকে অবর্ণনীয় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। সময় নিয়ে হলেও মানবাধিকার সমুন্নত করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার না থাকলেও যেন এই সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান থাকে- সে লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আগামী মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক ওই মানবাধিকার সংস্থা।

দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যারাই সরকারে গিয়েছে তারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী দলকে দমন করতে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুমের নজির রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও বিকল্প শক্তির প্রয়োজন। বিশেষ করে মানবাধিকারকে সমুন্নত করে ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত করাই এখন রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। যার জন্য প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক শক্তির। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের জন্য যুগান্তকারী একটি সুযোগ তৈরি করেছে। কেননা, এই আন্দোলন কেবল সরকার পতনের আন্দোলন নয়, বরং সকল বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার গভীর পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করেছে। বিগত সময়ে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের ফলেই পুলিশের তাজা বুলেটের সামনে বুক চেতিয়ে প্রতিরোধ গড়েছে ছাত্র-জনতা। এই প্রেক্ষাপটে দেশে মানবাধিকার পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখন প্রয়োজনীয় বিষয়।

গত ১৫ বছরে দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যেগুলোর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যত্যয় ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে নতুন আরেকটি রাজনৈতিক শক্তি অপরিহার্য। কেননা, জুলাই বিপ্লবের পর মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি’র উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। সমপ্রতি অনলাইন প্ল্যাটফরম ‘ডাক্কা রিভিউয়ের’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেখা গেছে- মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি আসলে তেমন কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠন-ছাত্রদলও ‘স্মার্ট পলিটিক্স’ করতে পারেনি। যার ফলে বিপ্লবের পরেও ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদলের অবস্থান খুব শক্তিশালীভাবে দেখা যায়নি। বিএনপি’র ৩১ দফা বেশ আশাব্যঞ্জক, ধরে নিলেও বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি না থাকলে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ঠিক পথে রাখা কিংবা তারা বিপথে পরিচালিত হলে তাদের রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আর বিএনপিকে মোকাবিলা করা কঠিন হলে দেশের মানবাধিকার আবারো চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই রাজনৈতিক সুশীলদের অনেকেই মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে জনগণের অধিকার সুরক্ষায় নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

মানবাধিকার সুরক্ষায় করণীয়

ততদিন ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে তো? by শামীমুল হক

প্রিয় হাসু আপা, বিগত প্রায় ষোলটি বছর যে আন্দোলন দমিয়ে রেখেছেন আপনি, ক্ষমতা থেকে পালানোর ছয় মাস যেতে না যেতেই সেই আন্দোলনের পথেই হাঁটতে হলো আপনাকে? আপনিসহ আপনার দলের নেতারা তখন দম্ভ নিয়ে বলতেন, হরতাল জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। যদিও বিরোধী দল খুব কমই হরতাল ডেকেছে। কারণ হরতালের দিন আপনার সড়ক পরিবহনের নেতারা গাড়ি চলবে বলে ঘোষণা দিতেন। বিরোধী দলকে তো হরতালের দিন মাঠেই নামতে দেননি। যদিও দুই একজন নেমেছেন তাদের গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছেন। এসব করার পর আপনাদের দলের সাধারণ সম্পাদক সব সময় ব্যঙ্গ করে বলতেন, কোথায় গেল আন্দোলন? আন্দোলন দমনে যে শিক্ষা আপনি দিয়ে গেছেন এসব কি এখন আপনার দলের উপর পড়বে না বলে মনে করছেন? আর বিশেষ করে আন্দোলন করার লোক কোথায়? আপনার দলের নেতাকর্মীরা তো এখন পলাতক। কেউ বিদেশে। কেউ কারাগারে। যারা দেশে আছেন তারা তো নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয় দিতেই ভয় পান। মাঝে মাঝে দুই/একজন কর্মীকে দেখা যায়। তাদের মুখে মাস্ক পরা। এই যখন অবস্থা তখন আন্দোলনের ডাক দিয়ে কি বুঝাতে চাইছেন?

হাসু আপা, আজ আর কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে চাই না। কারণ আন্দোলনের ডাক যখন দিয়েছেন তখন মনে হচ্ছে আপনি চাঙ্গা। প্রতিপক্ষকে দেখেই ছাড়বেন। বেশ ভালো। তবে গত ষোল বছরে আপনার আমলের আন্দোলন দমনের চিত্র চোখ বুজে একটু দেখে নিয়েন। তাহলে আপনার জন্যই ভালো হবে। আরেকটি কথা হয়তো আপনি জানেন, তারপরও বলছি- দেশের মানুষ কিন্তু আপনাকে এত সহজে আপন করে নিবে না বলেই মনে হয়। আপনার জানার জন্য বলছি, ক’দিন ধরে আপনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা ফেসবুকে এক আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর খোলা চিঠি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি কি লিখেছেন একটু চোখ বুলিয়ে নিন। তাহলেই বুঝতে পারবেন আপনাকে নিয়ে কে কি ভাবছে। লেখাটির শিরোনাম দিয়েছে ‘কান ফেলে শুনুন’।
আপনি ক্ষমতায় থাকতে কথাগুলো কখনোই বলতে পারতাম না। কারণ লেখাটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার দলীয় উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা আমার বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে আমাকে জানে মেরে ফেলতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতো না। দলীয় ফোরামে যদিও আপনার অনেক সমালোচনা করেছি কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে এসব কথা বলবার মতো সাহস আমার কেন বাংলাদেশে কারোই ছিল না। প্রথম থেকে যদি বলি, তবে বলতে হয়, আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ দল চালাবার মতো মেধা, প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা আপনার ছিল না। শুধু দলের ঐক্যের প্রতীক বিবেচনায় সেদিন বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে আপনাকে ওই আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। প্রয়াত জনাব মালেক উকিল সাহেবের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেই কিন্তু আওয়ামী লীগ বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ৩৯টি আসন পেয়ে তারা বিরোধী দলের আসন অর্জন করেছিল। বঙ্গবন্ধুর পতনের পর অনেকেই বলাবলি করছিল, আওয়ামী লীগ আগামী একশ’ বছরেও রাজনীতিতে ঠাঁই পাবে না। কিন্তু সেটি পেয়েছিল আপনার নেতৃত্ব ছাড়াই।
দ্বিতীয়ত, আপনি দলের ভেতর কোনো নেতৃত্বের বিকাশ একেবারেই সহ্য করতে পারেন নি। আপনার পিতা ভুলবশত তাজউদ্দীনকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলেন। আর আপনি সংজ্ঞানে কামাল হোসেনের মতো মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তোফায়েল, রাজ্জাক সাহেবদের মতো ত্যাগী নেতাদের নানাভাবে অপদস্থ করেছেন। তাদের জনপ্রিয়তা আপনি মেয়েলি প্রতিহিংসায় সহ্য করতে পারেননি।  অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এসব নেতার অবদান জ্বলজ্বল করে এখনো জ্বলছে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী সাহেবকে আপনি ধরে রাখতে পারেননি।
তৃতীয়ত, অতো বড় দলের নেতা হিসেবে কী বলা উচিত আর কী উচিত নয়- এই জ্ঞান আপনার ছিল না। আপনি কথা বলতেন সাধারণ মানুষের মতো ঝগড়ার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। সেসব কথায় বড় নেতা কিংবা দেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কোনো ছাপ ছিল না। মাধুর্যহীন, প্রতিহিংসার বাক্য এবং শব্দ আপনার বক্তব্যকে অত্যন্ত নিম্নমানের বক্তব্যে পরিণত করতো। একটি বক্তব্যের পনের আনা জুড়ে থাকতো বিরোধীদের সমালোচনা। আর সে সমালোচনায় কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা একেবারেই ছিল না। ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণের রোষানল।
চতুর্থত, বঙ্গবন্ধু একটা বিশেষ আদর্শকে সামনে রেখে বাকশাল কায়েম করতে চেয়েছিলেন। আর আপনি একমাত্র ক্ষমতাকে ধরে রেখে লুটপাটের আদর্শ কায়েম করার জন্য স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আপনার লক্ষ্য ছিল শুধুই ক্ষমতা এবং এক ভীতিকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আপনার সামান্য সমালোচনা করেও কতোজন যে গুরুদণ্ড এমনকি জীবন পর্যন্ত হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি নিজেও কিছুটা ভুক্তভোগী হয়ে সন্দ্বীপ পর্যন্ত দেখে এসেছি। সেটি ছিল পুরাকালের দ্বীপান্তরের মতোই।
পঞ্চমত, এদেশের মানুষ দুইবার আপনাকে খাতির করে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাকি তিনবার আপনি নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি করে, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। তারপরও আপনি এখনো প্রশ্ন করেন, আমার কি অপরাধ ছিল? এটা তো একটা প্রতিবন্ধীর প্রশ্ন। আপনার তো আর কোনো অপরাধ করার প্রয়োজন নেই। শুধু এই বিনা ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই যেকোনো শাস্তি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আপনি যদি আপনার অপরাধ না বুঝতে পারেন তাহলে আপনাকে প্রতিবন্ধী ছাড়া ভদ্রভাবে আর কী বলা যায়।
ষষ্ঠত, আপনাকে থামাবার বা সাবধান করার কোনো মানুষ ছিল না। আপনার চারপাশে ছিল কেবল মেরুদণ্ডহীন স্বার্থ উদ্ধারকারী কিছু তোষামোদকারী। আপনি পাগলের প্রলাপ বকলেও তারা উলুধ্বনি দিয়ে তা সাপোর্ট করতো। আপনি একটা পরিশীলিত জনবহুল সভায় দাঁড়িয়েও মুখে লাগাম দিতে পারেন নি। কাউকে কাক বলেছেন, কাউকে পদ্মা সেতু থেকে টুস করে ফেলে দিয়ে পদ্মায় চুবাতে চেয়েছেন। এসব একজন প্রধানমন্ত্রীর মুখে মানায়? হ্যাঁ মানায়। আপনার মতো ক্ষমতালোভী এরচেয়ে ভালো কথা আর কী বলতে পারে।
১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাংলাদেশের প্রথিতযশা সকল বুদ্ধিজীবী আপনার পক্ষে ছিলেন। কারণ আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তারা আপনাকে সাবধান করে ‘সাধু সাবধান’ রচনা করতেন। কিন্তু আপনি তাদের সকলের মুখেই চুনকালি মেখেছেন। এজন্য ২০১৪ থেকে আপনি তাদের দিক থেকে একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৪-এ এসে তারা কেউই আপনার পাশে ছিল না। শুধু আপনার ঠোঁটের জন্য আপনার পতন বারো আনা ত্বরান্বিত হয়েছে। আদালতও একবার আপনার জিহ্বা সংবরণ করার জন্য হুঁশিয়ার করেছিল। কিন্তু আপনার স্বভাব আপনি বিন্দুমাত্র পরিত্যাগ করতে পারেননি। আপনি প্রচুর মিথ্যা কথা বলতেন যা একজন রাষ্ট্রনায়ককে মানায় না। জয়-পরাজয় নিয়েই তো রাজনীতি। আপনি কখনো হেরে যাবেন এটা ভাবতে পারেন নি। আপনার আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ থেকে বহুদূর সরে এসেছিল। আপনার আওয়ামী লীগ একেবারে গ্রাম পর্যন্ত টাউট-বাটপার আর মাস্তান তৈরি করেছিল। বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন একটা মধ্য চরিত্রের সেবক শ্রেণি। আর আপনি গড়ে তুলেছিলেন একটা সন্ত্রাসী লুটেরা শ্রেণি। আপনি কখনোই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেননি। আমলা কামলা আর প্রতিরক্ষার মানুষ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন শুধু আপনার ক্ষমতার জন্য। কিন্তু কে আর চিরকাল ব্যবহৃত হতে চায়? আপন বিবেচনা থেকেই তারা একদিন পিছুটান দিতে বাধ্য হয়।
আপনি উন্নয়নের ঘ্যানর ঘ্যানর ফিরিস্তি আওড়ান যা খুবই বিরক্তিকর। কান ঝালাপালা হয়ে গেছে জনগণের।  জনগণ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তারচেয়ে বেশি চায় তার রাজনৈতিক অধিকার তথা ভোটাধিকার। আপনি সেই পবিত্র অধিকার পদদলিত করেছেন। যা আপনার সমস্ত উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছে। আপনার হাতে সুযোগ ছিল ইতিহাস রচনার। আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। আপনার আর কি চাই। অর্থ-সম্পদ থাকবে আপনার পায়ের নিচে। আপনি হতে পারতেন নির্লোভ ত্যাগী মহীয়সী। কিসের অভাব আপনার। আপনি সেসব না করে লুটপাটে নামলেন নিজেই। আর পিওনকে বানালেন চারশ’ কোটি টাকার মালিক। জনসভায় দাঁড়িয়ে পাগল আর উন্মাদের মতো আপনি আবার সেসব কথা গর্বের সঙ্গে বলে বেড়ান। এদেশের মানুষকে আপনি নির্মমভাবে আশাহত করেছেন। মানুষের অনেক প্রত্যাশা ছিল আপনার কাছ থেকে। আপনি সে প্রত্যাশার মোটেও যোগ্য ছিলেন না। আপনার কোনো সংশোধন নেই। আজ ভারতে বসেও আপনি যে প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য প্রদান করেন তাতে আপনাকে পাগল ছাড়া আর কী বলা যায়?
আওয়ামী লীগ আর রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না, একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমি তা মনে করি না। হয়তো আসবে। কিন্তু সেটি বহুদূরের পথ। বাইরে বাধার দরকার নেই। আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ প্রজন্ম কোনমুখে দাঁড়াবে জনগণের দরজায়? বদলাতে হবে। খোল নলচেসহ। সেটি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ততদিনে ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে কিনা কে জানে। যাই হোক একটি প্রগতিশীল পার্টির কর্মী হিসেবে মনে করি আপনার ফিরে আসা না আসা কোনো ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। যেটি বিক্রি করে আপনি খেয়েছেন। আর ভবিষ্যতে তা বিলীন হওয়ার পূর্বাভাস আমাদেরকে ব্যথিত করে। তবে এদেশের জনগণ বড়ই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে জানে। তারা সময়মতো রুখে দাঁড়াবেই। রক্ষা করবে তাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। সেটি ইতিহাসের অবধারিত নিয়মেই হবে।
আর শেষে আপনাকে বলি, স্বভাব পাল্টান। সেটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাজে না লাগলেও বৃদ্ধ বয়সে আপনার নিজের কাজে লাগবে। আগেই বলেছি- এসব কথা আগে হয়তো বলতে পারতাম না। এখন বলছি। জানি দৈবাৎ যদি ক্ষমতায় ফিরে আসেন তবে আমাকেই আগে খুঁজবেন। কারণ আপনি সংশোধন হবেন না। হবেন আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ।
দেখলেন তো আপা, আপনার দলীয় বুদ্ধিজীবী কি বলেছেন? এমন কথা সারা দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন কি করবেন আপনিই ভালো জানেন। তারপরও দূর থেকে আপনার মঙ্গল কামনা করি সব সময়।

ততদিন ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবে তো?

টিউলিপের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে বৃটিশ গোয়েন্দা দলের ঢাকা সফর

বৃটেনের সাবেক ট্রেজারি মিনিস্টার এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিক এখন মহা দুশ্চিন্তায়। কেননা একের পর এক তার অপকর্মের সংবাদ প্রকাশ করছে বৃটেনের সংবাদমাধ্যমগুলো। স্থানীয় সময় শনিবার দ্য মেইল অন সানডেকে উদ্ধৃত করে ডেইলি মেইল অনলাইন জানিয়েছে, গত মাসে ঢাকা সফর করেছে বৃটেনের জাতীয় অপরাধ তদন্ত সংস্থা (এনসিএ)। এসময় বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী তদন্তকারীদের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে একটি বৈঠক করেছে সংস্থাটি। মূলত টিউলিপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করতেই বৃটেনের গোয়েন্দারা ঢাকায় এসেছিলেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

ডেইলি মেইল বলছে, এ তথ্য সামনে আসার পর এখন বৃটেনের তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ টিউলিপের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ইমেইল রেকর্ড খতিয়ে দেখতে চাইতে পারে। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের সন্মুখীনও হতে পারেন হাসিনার ভাগ্নি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগে টিউলিপের মা শেখ রেহানা সহ তার পরিবারের চার সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে বাংলাদেশ দুর্নীতিদমন কমিশন। রাশিয়ার মালিকানাধীন রোসাটম নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণে নির্মিত হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০১৩ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি ছবিতে টিউলিপকেও দেখা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশের সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে টিউলিপের ‘বিচার’ করার প্রস্তাব দিয়েছে বৃটেনের তদন্তকারী সংস্তা এনসিএ। সূত্রটি বলছে, বৃটেনের হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেটের এমপি টিউলিপের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য প্রমাণ সংগ্রহের প্রচেষ্টা শুরু করতে পারে বৃটেনের গোয়েন্দারা।

কোনো বৃটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি বিদেশে ঘুষ নেয়ার বিষয় প্রমাণিত হয় তাহলে ২০১০ সালের ঘুষ আইনের অধীনে তার বিচার করে বৃটেনের সরকার। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশি এক কর্মকর্তা জানিয়েছে ঢাকার অনুরোধেই গোপনে ওই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিলেন বৃটিশ তদন্তকারীরা।

কয়েক সপ্তাহ সহিংস বিক্ষোভের পর আগস্টে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারত চলে যান শেখ হাসিনা। তার পতনের পর দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা সফর করেছেন বৃটিশ তদন্তকারীরা। শেখ হাসিনা ছিলেন একজন স্বৈরশাসক- যাকে রোল মডেল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন টিউলিপ। ক্ষমতায় টিকে থাকতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হাসিনা। তার শাসনামলে প্রতি বছর দেশ থেকে ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বৃটেনের অপরাধ তদন্ত বিষয়ক গোয়েন্দারা প্রথম ঢাকা সফর করেছিলেন গত অক্টোবরে। তখন বাংলাদেশ থেকে লুট হওয়া কোটি কোটি টাকা উদ্ধারে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তারা। কেননা হাসিনার মিত্ররা লুট করা অর্থ বৃটেনে পাচার করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এবারের বৈঠকে এনসিএ’র সদস্যরা টিউলিপের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য সম্পর্কে জানতে চান।

প্রসঙ্গত, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ডেইলি মেইলে প্রকাশ হওয়ার কয়েক দিন পরই দুর্নীতিদমন মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন টিউলিপ। এর কয়েকদিন পর হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে লন্ডনের কিংস ক্রসে দুই শয়নকক্ষ বিশিষ্ট একটি ফ্ল্যাট উপঢৌকন পাওয়ার খবর প্রকাশ করে গণমাধ্যমটি। পরে দ্য মেইল অন সানডে পত্রিকার খবরে প্রকাশ করা হয় ২০২২ সালে কীভাবে উপঢৌকন পাওয়া ফ্ল্যাটের বিষয়য়ে মিথ্যা বলেছিলেন টিউলিপ। উপহার পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে টিউলিপ তখন বলেছিলেন ফ্ল্যাটটি তাকে তার বাবা-মা কিনে দিয়েছে।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখনও অস্বীকার করছেন টিউলিপ। বর্তমানে বৃটেনের ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির একজন সংসদ সদস্য তিনি। তার দল টিউলিপের পক্ষ নিয়ে বলেছে, এনসিএ অথবা বাংলাদেশের কোনো তদন্তকারী এখনও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি এনসিএ কর্তৃপক্ষ।

mzamin

তোফায়েল আহমেদ এখন নির্বাক, ভাবলেশহীন

তোফায়েল আহমেদ এখন কেমন আছেন? রাজনীতির সেই নায়ক কী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অন্তহীন কৌতূহল নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে রাজনীতিকরা জানার চেষ্টা করছেন। আমাদের অতিথি প্রতিবেদক এস চৌধুরী গিয়েছিলেন সরজমিন দেখতে তোফায়েল আহমেদ কেমন আছেন, কী করছেন। তার ভাষ্য,  রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ এখন ভাবলেশহীন। দিন- রাতের অধিকাংশ সময় কাটে তার বনানীর বাড়িতে।  যে বাড়িটি একসময় কোলাহলে গমগম করতো।  সে বাড়িটি এখন প্রায় নিষ্প্রাণ। মানুষ থাকলেও বোঝার উপায় নেই কেউ বাড়িটিতে বসবাস করছেন। যে মানুষটি এ বাড়ির প্রাণ ছিলেন, সে মানুষটিকে ঘিরে বাড়ির সবাই অহরাত্রি ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। তার অসুস্থতা পরিবারের সবাইকে এখন প্রাণহীন করে দিয়েছে। সবার উদ্বেগ বটবৃক্ষসম সেই মানুষটিকে নিয়ে। সবাই তার আবেগ-অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে চান। দেখতে চান আগের মতো প্রাণোচ্ছল মানুষটির হাঁটাচলা, রাগ-অনুরাগ। কিন্তু সময় যেন সেদিকে যেতে রাজি নয়। বিধাতাও বোধ হয়, সে ডাক শুনছেন না।

এক সময় এ বাড়িটি খুব ভোরে কোলাহলমুখর হয়ে উঠতো। গভীর রাত অব্দি মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে। যারা আসতেন তাদের লক্ষ্য ছিল প্রিয় নেতাকে দেখা অথবা নিজের কাজটি করিয়ে নেয়া। এক সময় সকাল-বিকাল বা রাতে পালা করে বাড়িটির নিচ তলায় বসতেন তিনি। সেখানে এক পাশে ছোট্ট স্টাডি রুম, যেখানে দেশি-বিদেশি হাজারো বই। কত্তো কি বিষয়ে লেখা বই সেসব। কখনো নিবিষ্ট মনে বই পড়তেন তিনি, কখনো বা টেলিফোনে প্রয়োজনীয় কথোপকথন সারতেন। যারা খুব ঘনিষ্ঠজন তাদের প্রায় সবাই এ কক্ষে যেতে পারতেন। পাশেই বিশাল এক ড্রয়িং রুম। সেখানে দেয়াল জুড়ে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐতিহাসিক নানা ছবি, মার্বেল পাথরের তৈরি বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিনন্দন অ্যান্টিকস শোভা পাচ্ছে। এখানে দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় নেতাকর্মী, সুহৃদসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে বসে তাদের সমস্যা-সংকট শুনতেন তিনি। প্রায় সবাই তার অকৃপণ সহযোগিতা নিয়ে আনন্দিত মনে ফিরতো। স্থানগুলো আগের মতো থাকলেও এর সঙ্গে মিতালী গড়া মানুষটি সেরকম নেই।  তোফায়েল আহমেদ ইতিহাস জন্ম দিয়ে হয়ে আছেন ইতিহাসের বরপুত্র। বাঙালির মুক্তি আন্দোলন ও বাংলাদেশের জন্মসূত্রের সঙ্গে মিশে থাকবেন তিনি অনন্তকাল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত থাকবেন আপন সৌকর্যে। নামের দিক থেকে তিনি স্বপ্নময়-সুন্দর-উদার। কর্মেও তার ছোঁয়া রেখেছেন বিভিন্ন সময়। কিন্তু হঠাৎ করে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন দৈনন্দিন  ব্যতিব্যস্ততা থেকে। এখন তিনি কোনো কিছু বোঝার মতো অবস্থায় নেই। প্রায় বিনষ্ট স্মৃতিশক্তি তাকে অনেকটাই অনুভূতিহীন করে দিয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কেউ দেখতে এলে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন।

তোফায়েল আহমেদ তার পুরো জীবনের অধিকাংশ সময় আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। দেশের রাজনীতি ও আন্দোলন থেকে শুরু করে বিশ্বের তাবৎ রাজনীতি ও সেসব দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল তার নখদর্পণে। শুধু কি ইতিহাস; বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কেও ভালো জ্ঞান রাখতেন। খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবন-যাপন সবকিছুতেই তার দখল ছিল। বাংলাদেশসহ বৃটিশ বা ভারত উপমহাদেশের রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ তিনি এক পলকে তারিখ ধরে বলতে পারতেন। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসও বলতে পারতেন অনর্গল। সে কারণে তাকে অনেকেই ‘ইতিহাসের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন।  কিন্তু আজ যেন তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। স্মৃতিশক্তির অবনমন তাকে করে তুলেছে অসহায়। এই যে, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন বা চলমান অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড এর কোনো কিছুই তিনি আঁচ করতে পারছেন না।

ভয়াবহ স্ট্রোকের কারণে শরীরের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে।  এর ফলে স্মৃতিভ্রষ্টতা তাকে আড়ষ্ট করে ফেলায় তিনি চেনাজানা জগতের কিছুই ঠাওর করতে পারছেন না। বর্তমানে তার বাঁ হাত ও পা একেবারেই অবশ।  চলাফেরায় অক্ষম। মাঝে-মধ্যে নিকটজনেরা বাড়ির চৌহদ্দীতে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘুরিয়ে আনেন সতেজ বাতাসের সঙ্গে মেলবন্ধনের আশায়। কিন্তু তা তিনি অনুভব করতে পারেন না। পারেন না কথা বলতে। কমে গেছে খাওয়া-দাওয়াও। যার প্রভাব পড়েছে শরীরে। অনেকটাই শুকিয়ে গেছেন। অধিকাংশ সময় বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার দিন-রাতের দুই- তৃতীয়াংশ সময়ই ঘুমিয়ে থাকেন। হাঁটতে পারেন না। শারীরিক জটিলতার কারণে প্রায়ই তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি এতটাই নাজুক  যে, চাইলেও চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

তোফায়েল আহমেদের পরিবারের একাধিক সদস্য জানান, প্রায় তিন বছর আগে প্রথম দফায় স্ট্রোক করার পর তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি করোনায় আক্রান্ত হন। সে সময় তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কিছুটা ভুলোমনা হয়ে যান। এরপর ২য় দফা স্ট্রোকে আবারো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটলে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন দাপুটে এই নেতা। ফলে ২৪-এর ঘটনা প্রবাহের পর ভোলায় তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে হওয়া মামলা বা বিএফআইইউ কর্তৃক ব্যাংক হিসাব স্থগিতের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। পরিবারের কেউ এসব বিষয়ে তাকে কোনো কিছু অবহিত করেননি।

সমপ্রতি তোফায়েল আহমেদের জামাতা  ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত তোফায়েল আহমেদ চলমান কোনো কিছুই বোঝার মতো পরিস্থিতিতে নেই। ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন ও তার স্ত্রী ডা. তসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী (তোফায়েল আহমেদের মেয়ে) বাংলাদেশের এই অতিচেনা মানুষটির সার্বক্ষণিক দেখভাল করেন।
তোফায়েল নামের আরবি অর্থ স্বপ্নময়, চিন্তামুক্ত, উদ্যমী। ইসলামিক স্কলাররা এ নামের অর্থ সুন্দর, দৃঢ়, সম্মানিত বলেও উল্লেখ করেছেন। বাংলায় আহমেদ নামের অর্থ হলো মহৎ, প্রশংসিত। সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করলে এর সবগুলো অর্থই খুঁজে পাওয়া যাবে তোফায়েল আহমেদের ক্ষেত্রে। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের অন্যতম নাম তোফায়েল আহমেদের সেই কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুলের কথা আজও অনেকের মন ছুঁয়ে যায়। তার সেই পেটানো শরীরের ছন্দবদ্ধ হাঁটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। আর টানা বক্তৃতা দেয়ার গুণটি রপ্ত করতে চাইতেন সতীর্থরাসহ উত্তরসূরি রাজনীতিবিদরা।   

অকুতোভয় তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২শে অক্টোবর তৎকালীন বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ভোলা জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে। তার পিতা মৌলভী আজহার আলী, মা ফাতেমা বেগম। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে এমএসসি পাস করেন। ১৯৬৪ সালে ভোলা শহর নিবাসী সম্ভ্রান্ত আলহাজ মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তিনি পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র কন্যা তসলিমা আহমেদ জামান (মুন্নী) পেশায় চিকিৎসক।
বর্তমানে ৮২ বছর বয়সী তোফায়েল আহমেদ কলেজজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহ-সভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফা কর্মসূচি হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তোফায়েল আহমেদ। সে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দানে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসক। ২৩শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের উপস্থিতিতে জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন তিনি। সে সময় স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে পদত্যাগে বাধ্য করতে ছাত্র সমাজের যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা ছিল তার মূল নেতৃত্বে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।  

১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তৎকালীন তারুণ্যের অহংকার তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭০ সালের ২রা জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন তরুণ এই নেতা। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তখন তার বয়স মাত্র ২৭ বছর। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন টগবগে তরুণ তোফায়েল। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই বছরের ১০ই এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিব নগরে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ’ ও ১৭ই এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার প্রতিষ্ঠার তিনি অন্যতম সংগঠক।  ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক গৃহীত ও বলবৎকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়’ তার সক্রিয় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।

১৯৭২ সালের ১৪ই জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তিনি দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

১৯৭০ থেকে ২০২৪- সর্বমোট ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৯২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এই পদে ছিলেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে’ তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোলা-২ আসন থেকে বিজয়ী তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সরকারে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতলেও মন্ত্রিত্ব পাননি, তবে জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান।

আজীবন রাজনীতিতে নিবেদিত ও বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের রাজনীতির ব্যাঘ্রশাবক তোফায়েল আহমেদ এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তাকে সংস্কারপন্থি বলে মনে করা হতো। এক পর্যায়ে তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়া বিয়োগান্তক ১৫ই আগস্ট উপলক্ষে শেখ হাসিনা তার লেখা ‘বেদনায় ভরা দিন’-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদের পাশাপাশি দলের যাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদের নামও এসেছে। এর আগেও ওই ঘটনার জন্য তাকে ঘিরে বিতর্ক ছিল। কিন্তু সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে আলো ছড়িয়েছেন এই আজন্ম রাজনীতিক।  
জীবন সায়াহ্নে এই অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে সেটা বোধহয় কখনো ভাবেননি জনতা ও নেতাদের নেতা তোফায়েল আহমেদ। কিন্তু প্রকৃতির খেয়াল বা বিধাতার ইচ্ছার বাইরে যাওয়ার সাধ্য প্রাণিকুলের নেই। হয়তো এ অবস্থায়  নির্বাক তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাজনীতির এই প্রবাদ পুরুষের মনে ঘুরে বেড়ায় কবিগুরুর সেই পংক্তিমালা-  ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার...’।

সূত্র- জনতার চোখ 

mzamin

তোষামোদ নয়, উন্নয়নে প্রয়োজন দেশপ্রেম by প্রণব মজুমদার

দেশ থেকে টাকা পাচার ১৬ বছর ধরে নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের ‘দেশপ্রেমিকগণ’ টাকা পাচার করতে শুরু করেন। বৈশ্বিক আর্থিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হয়। পাচার হওয়া গন্তব্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড।

আমাদের অনেক প্রভু! দেশে কিংবা বিদেশে। আপাতত বিদেশি প্রভুদের নিয়েই বলি। বিদেশি প্রভুরা আমাদের পরামর্শ দেন। উপদেশ দেন। খবরদারি তো আছেই! তাদের উপদেশ দেয়ার সংস্কৃতি দেশ জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি। দীর্ঘ সাড়ে চার যুগের অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার বদৌলতে প্রভুদের প্রকৃতি বুঝতে পেরেছি। ঋণের শর্ত হিসেবে কোন খাতে ভর্তুকি কমাবো বা প্রত্যাহার করে নেবো, শুল্কনীতি কী হবে, সেবাপণ্যে কোথায় বৃদ্ধি করবো এসব শর্ত আমাদের সরকারগুলোকে মানতে হয়। বিদেশি প্রভুরা আমাদের দেন কম; নিয়ে যান বেশি। সাম্রাজ্যবাদী স্ব্বরূপও তেমন। সহকর্মী প্রয়াত প্রবীণ প্রতিবেদক প্রফুল্ল কুমার ভক্ত দৈনিক সংবাদে লিখলেন- ‘বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংকের ভাবী!’ নব্বইয়ের দশকে এমন প্রতিবেদন মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে রসালো এবং হাস্যকর মনে হয়েছিল! পরে দেশের সচেতন মানুষ মন্তব্যটিকে সত্য বলেই ভেবেছে।

আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধের পথে কেন যেন হাঁটতে পারে না! সফরকৃত যুক্তরাষ্ট্রের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের চেয়ার অ্যালেক্স সোরোস ও প্রেসিডেন্ট বিনাইফার নওরোজির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ক’দিন আগে বৈঠক করেন বর্তমান সরকারপ্রধান। অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে তার সরকার বিপর্যস্ত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অর্থনীতি পেয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে তথ্য তুলে ধরেন। তা ফিরিয়ে আনার জন্য ‘সম্পদ শনাক্তকরণ’ কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশকে সহায়তা করার অনুরোধ জানান।

দেশ থেকে টাকা পাচার ১৬ বছর ধরে নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের ‘দেশপ্রেমিকগণ’ টাকা পাচার করতে শুরু করেন। বৈশ্বিক আর্থিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গড়ে প্রতি বছর ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। এরমধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বড় অংশই দেশ থেকে পাচার হয়। পাচার হওয়া গন্তব্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, অষ্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্থিক খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির (জিএফআই) পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার বা ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
শুধু ব্যক্তি উদ্যোগেই নয়, অর্থপাচার প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে দেশের একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি বেসরকারি ব্যাংকও। দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, গেল প্রায় দেড় যুগে দেশীয় ১৯টি ব্যাংকে আত্মসাৎ করা মাত্র ২৪টি ঋণ কেলেঙ্কারির মাধ্যমেই প্রায় একশ হাজার কোটিরও বেশি টাকা পাচার হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আর্থিক খাতে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। সে ধারাবাহিকতায় বিগত ১৬ বছরে অনিয়ম ও দুর্নীতি নিরুপণের উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছরে অর্থপাচার বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। টাকা পাচারের বিষয়টিকে অর্থনীতিতে ক্ষতিকর ‘টিউমার’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, বিগত সরকারের আমলে অর্থনীতি ও সম্পদের বড় অংশ এই ক্ষতিকর টিউমার চুষে নেয়। শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি মনে করে, প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৪ শতাংশের পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাস আয় থেকে যত অর্থ এসেছে, এর এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ অর্থ এক বছরে পাচার হয়। বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে যত অর্থ আসে, এর দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ পাচার হয়। সার্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। এতে মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে পড়ার শঙ্কার কথা বলা হয়। ৩৯৭ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে সব মিলিয়ে ২২টি ক্ষেত্রে আলোকপাত করা হয়। শ্বেতপত্রে বলা হয়, টাকা পাচারের জন্য দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের ক্রীড়নক, আমলাদের মধ্যে একধরনের অনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে। ঘুষ-দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ, মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে বাণিজ্য ব্যাংক থেকে চুরি করা টাকা, খেলাপিঋণের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেখানো, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, কর ফাঁকি এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হয়।

অর্থপাচার নিয়ে গবেষণা করে, এমন কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ধৃতি দিয়ে শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের ৫৩২টি বাড়ি বা সম্পদ আছে, যার মূল্য সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কর্মসূচিতে মনোনীত হয়েছেন। ২০২৩ সালে ইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ কোটি ডলার পাচার হয়।
সরকারি বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে, তাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এই অর্থ সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ইত্যাদি খাতে ব্যয় হয়েছে। এ থেকে ঘুষ হিসেবেই দিতে হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ঘুষ নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগীরা।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘুষের টাকার মধ্যে ৭৭ হাজার থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা গেছে আমলাদের কাছে। রাজনৈতিক নেতা ও তাদের সহযোগীদের কাছে গেছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর ঠিকাদারেরা দেশে ও বিদেশে এ অর্থ পৌঁছে দিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও আমলাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে। তাদের বড় অংশ থাকেন বিদেশে।

প্রধান উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন যে বিপর্যস্ত অর্থনীতি আমাদের। বলতেই হয়, ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নাজুক অবস্থা। পুঁজিবাজার পতনবৃত্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। রফতানির চাকা ঘুরছে না। বিনিয়োগ আশাব্যঞ্জক নয়। শুধু প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছাড়া দেশ অর্থনীতির সকল সূচকই নিম্ন্নমুখী। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তো বাড়ছেই। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে যা পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করবে। এতে প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর।
দুর্নীতিতে বিশ্বে আমরা শীর্ষস্থানে ১৬ বছর ধরে নয়। আগেও আমরা এ জন্য বিশ্বদরবারে বেশ সমালোচিত ছিলাম। ৫৩ বছরে এ পর্যন্ত দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থপাচার হয়েছে তার হিসাব বের করা জরুরি। দেশের ব্যাংক লুট করে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে দেশপ্রেমিকেদের জমাকৃত সে অর্থ বের করে নিয়ে আসা যায় না কি?

দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই। নিজ স্বার্থরক্ষায় কাজ করি। দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও। হালুয়া-রুটির ভাগাভগি। আখের গোছানো আমাদের ধর্ম।
অর্থনীতিতে অমিত সম্ভাবনার সুজলা সুফলা সোনার বাংলাকে বঞ্চিত করে বিদেশকে আমরা ভালোবেসেছি। সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় বাড়ির মোহ দেশকে উন্নতির পথে নেয়নি মোটেও।  প্রভু দাতাদের তোষামোদ করছি; বিদেশি ঋণে নিজেদের দায় ভারী করছি। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণের নামে বিশৃঙ্খলিত করেছি। বিনিয়োগের নামে অনাবাসী বাংলাদেশি এবং প্রভুদের নানা ধরনের সহায়তাদানের নীতি দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, কবি ও অর্থকাগজ সম্পাদক
reporterpranab@gmail.com

mzamin

ড. ইউনূস: না বললেও চলতো

সামরিক শাসন জারি আর তা থেকে বেরোনোর চ্যালেঞ্জই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়- ‘বাঘের পিঠে চড়ে বসা’। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠানগুলোর বিধ্বস্ত অবস্থায় ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ওলট-পালটের মধ্যদিয়ে সৃষ্ট সরকারের হাল ধরেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দেশ পরিচালনা, রাষ্ট্র-সংস্কারের বজ্র কঠিন প্রত্যয় এবং সুষ্ঠু ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর- এই তিন চ্যালেঞ্জে পড়ার পরিস্থিতি কি বাঘের পিঠে চড়ে বসে বা নিরাপদে নেমে যাওয়ার চেয়ে ভয়ঙ্কর নয়? পাঁচ মাসের পর বর্তমানে নানা কারণেই কি পরিস্থিতি অনিশ্চিত-অনির্দেশ্য হয়ে উঠছে না? এখন কি ভাবছেন ড. মুহাম্মদ ইউনুস? কোন পথে এগোবেন? কেউ বলতে পারেন, আমরা খামোখা একটা মনগড়া রূপকল্প গড়ছি, আদতে ইউনূস সাহেবের কপালে কোনো দুশ্চিন্তার রেখা নেই, মোটেও ঘামছেন না তিনি। এই যে বিদেশি অতিথি বা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন। বিদেশে নানা সম্মেলনে তাকে মর্যাদা দেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের ত্রাতা হিসেবে। ডানপন্থি একটা নজিরবিহীন বিপ্লবের বিজয়ী রূপে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’ থেকে যেসব গুঞ্জন ভেসে আসে অথবা তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারীরা যখন বাইরে এসে যেসব বলেন অথবা সব ছেড়ে-ছুড়ে চলে যাওয়ার যে কথাগুলো তিনি একান্তে উচ্চারণ করেন, তখন তো নানা চিন্তার ডাল-পালা গজায়। কোথায় তার তাবত দুশ্চিন্তার উৎপত্তি কেন্দ্র? প্রস্থান বিন্দু কি অতো দ্রুত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে? অথচ এমন সৌভাগ্য আর বাংলাদেশের কোনো সরকার প্রধানের হয়নি। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না, বর্তমান জাতীয় দুর্যোগ রোধে একটা শক্তিশালী জাতীয় ঐক্যের গাঁট বন্ধন তৈরিতে ড. ইউনূসের বিকল্প আছে কিনা অথবা তার নিয়তে কোনো ভেজাল আছে। তার প্রতি জাতির আস্থা প্রগাঢ়। ভারত বাদে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক সমর্থন তার ঝুলিতে। হবেই বা না কেন? আর কোনো নোবেল বিজয়ী এমন দায়িত্ব পেয়েছেন কি?। ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলা, পাচার হওয়া টাকা দ্রুত ফেরত আনার উদ্যোগ, ডলারের দরপতন ঠেকিয়ে দেয়া, রপ্তানি বাড়ানো, ফ্যাসিবাদীদের বিচারের ব্যবস্থা করা, সংস্কার কমিশনগুলো গঠন ও সক্রিয়করণ- এ সব তো সাহসী কৃতিত্ব। ভারত বা আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে কোনো আর্জিই করতে পারছে না। কেননা পশ্চিমা বিশ্বে ড. ইউনূসের ইমেজ বড্ড শক্ত। মার্কিন মুল্লুকে ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে অধিষ্ঠানের পরও  ডেমোক্রেট-ঘনিষ্ঠ ড. ইউনূসের তেমন সমস্যা হয়নি। আর রোহিঙ্গা বিদ্বেষী আরাকান আর্মির উত্থানের পরবর্তী অবস্থাকে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্কের মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষ করার সম্ভাবনাটুকুও তার কাছে রয়েছে। কিন্তু ড. ইউনূস এও ভাবছেন, কেন বিদেশি সাংবাদিকরা বার বার জানতে চাইছে, তার সময়ে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানের আশঙ্কা আছে কিনা। এ শঙ্কা নিশ্চয়ই পশ্চিমের। কিন্তু বিদেশের জমিনে ফুরফুরে হাওয়া তো বাংলাদেশের মাটিতে এখন বইছে না। সরকারের নির্বীয়তায় তারা হতাশ হচ্ছে। জিনিসপত্রের দামে ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং জনমনে ক্ষোভ তো তিনি ঠেকাতে পারছেন না। আওয়ামী সিন্ডিকেট তো এখন বিরোধীদলীয় সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ছেই। লুটপাট বা তদ্বির বাণিজ্য কি বন্ধ হয়েছে? গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা মনে হচ্ছে সরকার ফেলে দেয়ার মধ্যে আটকে আছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের আযান দিচ্ছে। কিন্তু তারা এই হাইফেন বা মধ্যবর্তী সরকারকে দাবি-দাওয়ার আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা দ্রব্যমূল্য সামাল দেয়ার কাজে সহযোগিতা করছে না। বিএনপি ও জামায়াত ব্যস্ত তাদের সমর্থক আমলাদের ভালো পদায়নের তদবিরে। অবশ্য পুলিশ ছাড়া বাকিগুলোতে জামায়াত এগিয়ে। ছাত্র সমন্বয়করাই রাজপথে নানা আন্দোলনের বা চক্রান্তমূলক তৎপরতার মোকাবিলা করছেন। খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলছেন, পুলিশ সেভাবে কাজ করছে না। সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ মাঠে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সশস্ত্র বাহিনী ইউনূস সরকারের প্রতি অনুগত। কিন্তু তাদেরও আলাদা ভাবনা থাকতে পারে। মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কর্মকাণ্ডে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়ে নানান আলোচনা আছে। তার উপর বিএনপি’র সমর্থক ভোগী রাষ্ট্রপতির নীরবতাও জল্পনা আছে। বলতে দ্বিধা নেই, ড. ইউনূস রাজনীতির ক্ষেত্রে নানা সন্দেহে বিদ্ধ হয়ে পড়েছেন। অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্ব চাইছে ড. ইউনূস তাদের হয়ে উঠুক। তাদের রাজনৈতিক দল গঠন করা নিয়ে ড. ইউনূস সমর্থন করলেও তিনি রাজনীতি করবেন না- এটা নিশ্চিত। কিন্তু মধ্যবর্তী সরকারের রাজনীতিতে যোগ দেয়া বা সরকারের কোলে থেকে রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টার পর্ব থেকে তিনি কতখানি দূরে থাকতে পারবেন?

উপদেষ্টারা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন না। যা কিছু বলার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবই বলছেন।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের চাপ দিয়ে বিএনপি তাকে ব্যস্ত রেখেছে। বিএনপিও চাইছে ইউনূস তাদের সম্ভাব্য ভোট বিজয়ের সারথি হোন। ছাত্র নেতৃত্ব ও বিএনপি’র মধ্যে রাজনৈতিক কাইজ্যায় জামায়াত চতুর নিরপেক্ষতার আশ্রয় নিয়েছে, যদিও তাদের মন-মগজ ছাত্রদের দিকে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা ড. ইউনূস কতগুলো দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। একদিকে সরকারের সংস্কার সাধনের প্রতিজ্ঞা অন্যদিকে তা শ্লথ করার জন্য রাজনীতিকদের ঠোঁট টেপা হাসি। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য ছাত্র-জনতার আকুতির বিপরীতে প্রচলিত রাজনীতিকদের অদৃশ্যমান অনীহা। অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র নিয়ে বিলম্বিতকরণের পদক্ষেপ তার প্রমাণ। আরেক দ্বন্দ্বের কথা আগেই বলেছি, সামষ্টিক অর্থনীতির ‘মন্দ নয়’ যাত্রার বিপরীতে ব্যক্তি অর্থনীতির দুর্বিষহ পাগলাটে আচরণ। আওয়ামী লীগের আবার মাঠে নামার চক্রান্তও ’৭২-র সংবিধানের প্রতি বিএনপি’র এক ধরনের সমর্থন আরেকটা অশান্তির জানান দিচ্ছে। রাজনীতি সচেতন মহলে এমন কানাঘুষা আছে যে ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদের মতোই সরকার পরিচালনা বা নির্বাচনী রোড ম্যাপ অথবা পরবর্তী সরকারের যারা আসীন হতে পারে- যে সব বিষয়ে ড. ইউনূসের চিন্তা-ভাবনার সম-অংশী নন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান নিয়ে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার এক ধরনের নীতি। অন্যদিকে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার নীতিতে বিপ্লবের অন্তরালে ছাত্রশিবির ঘেঁষাদের প্রভাব লক্ষণীয়। এই দুই দৈনিকের নীতি দ্বন্দ্ব যা, উপদেষ্টা পরিষদের নেপথ্য-বিভক্তি তেমন। উপদেষ্টাদের বেশির ভাগ দ্বিতীয় মতকে সামনে রেখেই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। তাদের নেপথ্যে জামায়াতের ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। সদ্য অনুষ্ঠিত ফ্রান্স অলিম্পিকের একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের মেয়েরা উগ্রবাদীদের জন্য খেলতে পারছে না। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয় কি? বাকি উপদেষ্টারা কেউ একক ভূমিকায় অথবা বিএনপি’র প্রতি সহানুভূতিশীল। আরও শোনা যায়, উপদেষ্টাদের কাজকর্মে কিছুটা হতাশ ড. ইউনূস তার সরকারকে গতিশীল করতে উপদেষ্টামণ্ডলীর পরিসর বাড়াতে চাইছেন। এক ধরনের জাতীয় চেহারায় তিনি সরকারকে দিতে চান। কিন্তু তাকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আর রাজনৈতিক চাপের কাছেও তিনি অসহায় হয়ে পড়ছেন। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক দলগুলো কতখানি মানবে, জুলাই ঘোষণাপত্র কীভাবে প্রণীত হবে, ছাত্রদের রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ পরবর্তী পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে এবং আওয়ামী লীগ বা তার পেছনের ভারতের নেপথ্য ভূমিকা কী হবে-এসব নানা বিষয়ে অদূর ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চেহারা সাব্যস্ত হবে। পরিস্থিতি হয়তো বা ড. ইউনূসের নিয়ন্ত্রণের আরও বাইরে চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এখনো ড. ইউনূসকে বাস্তবোচিত, সাহসী ও প্রজ্ঞামূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এনজিও-প্রশাসক থেকে সরকারের নির্বাহী প্রধানের চেতনাগত দূরত্ব যতখানি, ড. ইউনূসেরও তাই। কিন্তু বিশ্ব চেতনায় সমৃদ্ধ এবং বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি দরদী ব্যক্তিত্ব ড. ইউনূসকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কবি নজরুলের পঙ্‌ক্তিটি খুবই প্রাসঙ্গিক- ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ, কাণ্ডারী আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ।’ ড. ইউনূস আরও বেশি সুখ্যাতির জন্য বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দায়িত্ব নিয়েছেন, এমনটি মানুষ বিশ্বাস করে না। সুখ্যাতির জন্য সৎকর্ম করা মহান আল্লাহ্‌র পছন্দ নয়। একমাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টিই সৎকর্মের লক্ষ্য। বিশ্বের নীতি পরিচালকদের আরও প্রশংসা অর্জন নিশ্চয়ই তার লক্ষ্য নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, অন্যের স্তুতি পেতে যারা সৎকর্ম করে, শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ্‌ তাকে বলবেন, তাহলে ওদের কাছেই যাও।

mzamin