Sunday, January 19, 2020

তিতা স্বাদের করল্লা হাজার গুণে ভরপুর

করল্লা দেখতে সুন্দর কিন্তু স্বাদে তিতা, তবে অনেক উপকারী। হাজার বছর ধরে এটি ওষুধ হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। করল্লা শিশুদের একদমই পছন্দ নয়। তরকারি হিসেবে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। সব সময়েই পাওয়া যায় তবে গ্রীষ্মকালে চাহিদা বেশি। করল্লা ডায়াবেটিস, লিভার, কোষ্ঠ কাঠিন্য এবং কৃমি রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
করল্লার পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। ইংরেজিতে একে Balsam pear, alligator pear, bitter gourd, bitter melon, bitter cucumber ইত্যাদি বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Momordica charantia যা Cucurbitaceae পরিবারভুক্ত। এক প্রকার লতা জাতীয় উদ্ভিদ। এছাড়া ওকিনাওয়ার আদি ভাষা থেকে উদ্ভূত `গয়া` এবং সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত `কারাভেলা` নাম দুটিও ইংরেজি ভাষায় প্রচলিত। করল্লার আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ। যা ১৪শ’ শতাব্দিতে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। করল্লা আমাদের দেশে উচ্ছে ও উসতা নামেও পরিচিত।
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস : জগৎ: Plantae, শ্রেণীবিহীন: Angiosperms, বর্গ: Cucurbitales, পরিবার: Cucurbitaceae, গণ: Momordica, প্রজাতি: M. charantia.
বর্ণনা : করল্লা তেতো স্বাদযুক্ত এবং এর শরীর কাঁটার মত ওয়ার্টে ভরা। পরিণত অবস্থায় লম্বাটে, রঙ কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে কমলা বা লাল, দৈর্ঘ্য ১২-২৫ সেন্টিমিটার (৫-১০ ইঞ্চি), প্রস্থ ৫-৭ সেমি হয়ে থাকে। করল্লা কেটে লবণ পানিতে ডুবিয়ে রাখলে তিক্ততা কমে। দক্ষিণ এশীয় এই সবজি এখন সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে ক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
করলা গাছ কিউকার্বিটেসি অর্থাৎ শশা পরিবারের সদস্য। এটি একবর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ। একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল হয়। করলার বীজ এঁটেল মাটিতে ২.৫-৫ সেমি গভীরে এবং ৯০-১২০ সেমি দূরত্বে লাগাতে হয়।
প্রতি ১০০ গ্রাম করল্লায় পুষ্টি পরিমাণ : কার্বোহাইড্রেট ৩.৭০ গ্রাম, প্রোটিন ১ গ্রাম, ফ্যাট ০.১৭ গ্রাম, খাদ্য আঁশ ২.৮০ গ্রাম, নায়াসিন ০.৪০০ মিলিগ্রাম, প্যান্টোথেনিক এসিড ০.২১২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-এ ৪৭১ আই ইউ, ভিটামিন সি- ৮৪ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম- ৫ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম- ২৯৬ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম- ১৯ মিলিগ্রাম, কপার- ০.০৩৪ মিলিগ্রাম, আয়রন- ০.৪৩ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম- ১৭ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ- ০.০৮৯ মিলিগ্রাম, জিংক- ০.৮০ মিলিগ্রাম।
উপকারিতা : ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য করল্লা অধিক কার্যকরী। এর মধ্যে রয়েছে চ্যারান্টিন, ইনসুলিনের মত পেপটাইড এবং এলকালয়েড। এগুলো রক্তের সুগার কমিয়ে ডায়াবেটিসে উপকার করে। বাতের ব্যাথায় নিয়মিত করলা রস খেলে ব্যাথা আরোগ্য হয়। আর্য়ুবেদের মতে করলা কৃমিনাশক, কফনাশক ও পিত্তনাশক।
করল্লার জীবানু নাশক ক্ষমতাও রয়েছে। ক্ষতস্থানের উপরে পাতার রসের প্রলেপ দিলে এবং করল্লা গাছ সেদ্ধ করা পানি দিয়ে ক্ষত স্থান ধুলে কয়েকদিনের মধ্যেই ক্ষত শুকিয়ে যায়। অ্যালার্জি হলে এর রস দু’ চা চামচ দুবেলা খেলে সেরে যাবে।
করল্লা ল্যাক্সেটিভ পায়খানাকে নরম রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। জীবাণুনাশী-বিশেষ করে ই-কোলাই নামক জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর। ফলে ডায়রিয়াও প্রতিরোধ হয়। এছাড়া করল্লা নানা রকম চর্মরোগ প্রতিরোধ করতেও অত্যন্ত কার্যকর।
করল্লার জুস লিভারের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, রক্ত পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
করল্লায় আছে পালং শাকের চেয়ে দ্বিগুণ ক্যালসিয়াম আর কলার চেয়ে দ্বিগুণ পটাশিয়াম। আছে যথেষ্ট লৌহ, প্রচুর ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং আঁশ। ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি এন্টি অক্সিডেন্ট। যা বার্ধক্য ঠেকিয়ে রাখে, শরীরের কোষগুলোকে রক্ষা করে। আরও আছে লুটিন আর লাইকোপিন। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
এছাড়াও রক্তের চর্বি তথা ট্রাইগ্লিসারাইড কমায় করল্লা এবং ভাল কোলেস্টেরল এইচডিএল বাড়ায়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

হাতের কব্জির ব্যথা : কারণ ও চিকিৎসা by ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

কব্জির ব্যথা খুব সাধারণ একটি সমস্যা। হঠাৎ ইনজুরির কারণে কব্জিতে বিভিন্ন ধরনের ব্যথা হয়ে থাকে। মচকে গেলে কিংবা হাড় ভেঙে কব্জিতে বেশ ব্যথা হয়। তবে অনেক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার জন্য কব্জিতে ব্যথা হতে পারে, যেমন- বারবার কব্জিতে চাপ, বাত ও কারপাল টানেল সিনড্রোম। যেহেতু অনেক কারণে কব্জিতে ব্যথা হতে পারে, তাই কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি কব্জির ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। সঠিক রোগ নির্ণয় করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার ওপর নির্ভর করে আপনার কব্জির ব্যথার সঠিক চিকিৎসা। লিখেছেন ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল।
কব্জির ব্যথার উপসর্গ বিভিন্ন ধরনের হয়। এটি নির্ভর করে ঠিক কী কারণে ব্যথা হচ্ছে তার ওপর। যেমন- অস্টিও আর্থ্রাইটিসের ব্যথা ঠিক ভোঁতা ধরনের দাঁত ব্যথার মতো, অথচ টেনডনের প্রদাহ বা টেনডিনাইটিসের ব্যথা সাধারণত তীক্ষ ও ধারালো ধরনের।
কব্জির ব্যথার কারণ
কব্জি বা রিস্টজয়েন্ট হলো একটি জটিল সন্ধি যা তৈরি হয়েছে কয়েকটি হাড়ের সমন্বয়ে যেমন রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং আটটি ছোট ছোট কারপাল হাড়। এই কারপাল হাড়গুলো দুই সারিতে সাজানো। লিগামেন্টের শক্ত ব্যান্ড কব্জির হাড়গুলোকে একে অন্যের সাথে, রেডিয়াস ও আলনা হাড়ের নিম্নাংশ এবং হাতের হাড়গুলোকে সংযুক্ত করে। টেনডনগুলো হাড়ের সাথে মাংসপেশিকে সংযুক্ত করে। কব্জির যেকোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা হতে পারে এবং হাত ও কব্জির ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
কব্জি ব্যথার সাধারণ কারণগুলো এখানে বর্ণিত হলো :
১. ইনজুরি
হাতের ওপর ভর দিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেলে কব্জিতে খুব বেশি ইনজুরির ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে কব্জি মচকে যায়, কব্জিতে টান পড়ে এবং কব্জির হাড় ভেঙেও যায়। কব্জির বুড়ো আঙ্গুলের দিকে হাড়টির নাম স্কাফয়েড। এটি অনেক সময় ভেঙে যায়। এ ধরনের হাড় ভেঙে গেলে সাথে সাথে সেটা এক্স-রেতে নাও দেখা যেতে পারে। ব্যথা অনেক দিন থাকে, কব্জি নাড়াচাড়া করলে ব্যথা বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে হাত দিয়ে কাজ করা যায় না। প্লাস্টার করেও ব্যথার উপশম হয় না। অপারেশন করতে হয়। অনেক সময় স্কাফয়েড হাড় ভাঙলে হাড়ের মধ্যে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় এবং হাড়ের জোড়া লাগতে সমস্যা হয় যার ফলে ব্যথা হয় ও কব্জি নাড়তে অসুবিধা হয়। তখন অপারেশনের প্রয়োজন হয়। হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ে গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কলিস ফ্রাকচার হয়। এ ক্ষেত্রে রেডিয়াসের নিচের অংশ ভেঙে যায়। কব্জি ফুলে যায়।
কব্জি বারবার নাড়াতে হয় এমন যেকোনো কাজ যেমন- টেনিস বল খেলা থেকে শুরু করে বেহালা বহন করতে করতে কব্জির সন্ধির চার পাশের টিস্যুতে প্রদাহ হতে পারে কিংবা হাড় ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে কোনো বিরতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কব্জির কাজ করলে। বারবার চাপের ফলে হাতের কব্জির ব্যথার আরেকটি কারণ হলো ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজ। ব্যথা বুড়ো আঙ্গুলের মূলে অনুভূত হয়। ডি কোয়ার ভেইন’স ডিজিজে কব্জি নাড়তে খুব ব্যথা হয়, কাজ করতে অসুবিধা হয় এবং অনেক সময় কাজের পর ব্যথা বেশ বেড়ে যায়। বুড়ো আঙ্গুলে চাপ দিলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়।
২. আর্থ্রাইটিস বা বাতের ব্যথা
অস্টিও আর্থ্রাইটিস
সাধারণত কব্জিতে অস্টিও আর্থ্রাইটিস খুব কম হয়। কোনো লোকের কব্জিতে আগে ইনজুরি হয়ে থাকলে পরে অস্টিও আর্থ্রাইটিস হয়। এ ক্ষেত্রে কার্টিলেজ বা তরুণাস্থি ছিঁড়ে যায় বা ক্ষয় হয়।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস: এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তার নিজস্ব টিস্যুগুলোকে আক্রমণ করে। কব্জিতে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদি একটি কব্জি আক্রান্ত হয়, তাহলে সাধারণত অন্য কব্জিতেও এটি ঘটে।
৩. অন্যান্য রোগ ও অবস্থা
কারপাল টানেল সিনড্রোম: আপনার কব্জির তালুর দিকের অংশে একটি পথ রয়েছে যার নাম কারপাল টানেল; এর মধ্য দিয়ে মিডিয়ান নার্ভ অতিক্রম করে। মিডিয়ান নার্ভে চাপ পড়লে কব্জি ও হাতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। এ অবস্থার নাম কারপাল টানেল সিনড্রোম।
গ্যাংলিয়ন সিস্ট: কব্জির ব্যথার অন্যতম কারণ হলো এক ধরনের টিউমার জাতীয় ফোলা বস্তু থাকে যাকে গ্যাংলিয়ন বলে। এটি ওঠে টেনডনের আবরণী থেকে কব্জির পেছনে অথবা সামনের দিকে। কব্জি নাড়লে ব্যথা হয়। বড় গ্যাংলিয়ন সিস্টের চেয়ে ছোটগুলো বেশি ব্যথা সৃষ্টি করে।
কিয়েন বক্স ডিজিজ : এটি সাধারণত তরুণদের হয়। এ ক্ষেত্রে কব্জির লুনেট নামের ছোট হাড়টিতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে হাড়টি কোলাপস করে। লুনেট হাড়ের ওপরে চাপ দিলে ব্যথা লাগে এবং রোগী হাত মুঠো করে ধরতে পারে না।
কব্জি ব্যথার ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো হলো
কারো হাতের কব্জিতে ব্যথা হতে পারে- তা অল্প কাজ করুক কিংবা বেশি কাজ করুক না কেন। কিন্তু কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের কারণে এ ব্যথা বেড়ে যেতে পারে, যেমন-
খেলাধুলা করা: বিভিন্ন খেলাধুলায় কব্জিতে ইনজুরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বোলিং, গলফ, জিমন্যাস্টিক, টেনিস প্রভৃতি।
বারবার কাজ করা: বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হাত ও কব্জির যেকোনো কাজ বারবার করলে কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেসব মহিলা হাঁড়ি-পাতিল ধোয়াধুয়ি করেন বা বুননের কাজ করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা চুল কাটার কাজ করেন তাদেরও কব্জির ব্যথা বেশি হয়। যারা কম্পিউটার কিবোর্ডে টাইপ করেন, কম্পিউটার মাউস ব্যবহার করেন, হ্যান্ডবল খেলেন, সেলাই করেন, আঁকাআঁকি করেন, লেখালেখি করেন বা ভাইব্রেটিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যায়। আবার যাদের ডায়াবেটিস, লিউকেমিয়া, স্ক্লেরোডার্মা, লুপাস থাকে কিংবা থাইরয়েড গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করে তা হলে তাদের কব্জির ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ফ্যামিলি ফিজিসিয়ানের সাথে পরামর্শ করলে তারা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যেমন- রিউমাটোলজিস্ট, স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কিংবা অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে রেফার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে উপসর্গের বিস্তারিত বর্ণনা যেমন আপনার কোনো রোগ আছে কি না, বাবা-মা, ভাই-বোনের অন্য রোগ আছে কি না, আপনি কোনো ধরনের ওষুধ খেতে থাকলে তাও জানাতে হবে। কী ধরনের খাবার গ্রহণ করেন তা জানাবেন।
চিকিৎসা : হাতের কব্জির ব্যথার চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ভর করে ইনজুরির গ্রণ, স্থান ও তীব্রতা সর্বোপরি বয়স ও সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর। প্রথমত, আক্রান্ত হাতের কব্জিকে বিশ্রামে রাখতে হবে এবং যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণে কব্জিতে ব্যথা হয়ে থাকে তাহলে তার উপযুক্ত চিকিৎসা দিতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ যেমন- আইবুপ্রফেন ও অ্যাসিটামিনোফেন কব্জির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া যেতে পারে। হাড় ভাঙলে হাড়ের টুকরোগুলো সঠিক বিন্যাসে রাখতে হবে যাতে ঠিকমতো জোড়া লাগে; এ ক্ষেত্রে কাস্ট বা স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। কব্জিতে টান লাগলে বা মচকে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত টেনডন বা লিগামেন্ট যাতে সুরক্ষা পায় সে জন্য স্প্লিন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। আক্রান্ত হাতের কব্জিকে নড়াচড়া থেকে রক্ষা করার জন্য রিস্টব্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের প্রয়োজন হয়। যেমন- মারাত্মকভাবে হাড় ভাঙলে, কারপাল টানেল সিনড্রোমের উপসর্গ তীব্র হলে এবং টেনডন বা লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)

ঘাড় গুঁজে সারাক্ষণ মোবাইলে, ‘শিং’ গজাচ্ছে মাথার পেছনে : গবেষণা

দরকারে-অদরকারে মোবাইলে চোখ, ঘন ঘন সোশ্যাল মিডিয়ায় উঁকি। সারাক্ষণ হয় মাথা ঝুঁকিয়ে আঙুল চলছে মোবাইলে, নয়তো চোখের কাছে মোবাইল এনে ঘাড় ঝুলিয়ে ভিডিও কিংবা সিনেমা দেখা। চারপাশে চোখ চালালে এই অভ্যাস আমাদের প্রায় সব সময়ই চোখে পড়ে। আমরাও ব্যতিক্রম নই। চিকিৎসকরা এই অভ্যাস নিয়ে বহুবার সতর্ক করলেও টনক নড়েনি। তবে এবার বায়োমেকানিক্সের এক নতুন গবেষণা আবারও শঙ্কিত করছে।
একটি ছোট্ট যন্ত্র আর এতেই মানবদেহের কঙ্কাল বদলে যাচ্ছে অজান্তেই। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সানশাইন কোস্টের (ইইউএসসি) গবেষকদের দাবি, ঘাড় ঝুঁকিয়ে সারাক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনের ওপর চোখ রাখায় ‘শিং’ গজানোর উপক্রম তৈরি হচ্ছে মাথার পেছনের অংশে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, অতিরিক্ত মোবাইলের ব্যবহারে ঘাড় ও মাথা সংলগ্ন অঞ্চলের হাড় উঁচু হয়ে পাখির বাঁকানো ঠোঁট, হুক বা শিংয়ের মতো উঁচু হয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, মাথা ঝুঁকিয়ে মোবাইল স্ক্রিনে নজর রাখতে রাখতে কাঁধের দিক থেকে ওজন সরাসরি মেরুদণ্ডের উপর না পড়ে চলে আসছে ঘাড় ও মাথার পেছনের পেশীতে। ফলে ঘাড় ও মাথার সংযোগস্থলকে বেশি চাপ বহন করতে হচ্ছে ক্রমাগত। সেখানে থাকা টেন্ডন ও লিগামেন্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সেই চাপ। দিনের পর দিন সেই চাপ পেতে পেতে শরীর চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে সেখানকার চামড়া শক্ত করে তৈরি ফেলছে এই গ্রোথ।
বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের এক প্রতিবেদনে গবেষকরা জানিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মের ব্যবহারিক জীবনের ওপর প্রযুক্তির এই প্রভাব ভবিষ্যৎকে যে পথে ঠেলে দিচ্ছে, তা বেশ শঙ্কার।
মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রধান গবেষক ডেভিড শাহার বলেছেন, হঠাৎ করে এই পরিবর্তন আসে না। বছরের পর বছর একই ভাবে মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে এই সমস্যা তৈরি হয় শরীরে। মূলত ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত মোবাইল ঘাঁটার ‘অসুখ’ থেকেই এই রোগের জন্ম। সারাক্ষণ মোবাইল হাতে বুঁদ হয়ে থাকা মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্মই এর প্রধান শিকার।
অস্ট্রেলিয়ায় এই সমস্যাকে ইতোমধ্যে ‘হেড হর্ন’, ‘ফোন বোনস’বা ‘উইয়ার্ড বাম্পস’ নামে ডাকা হচ্ছে।কিন্তু কীভাবে এমন এক সিদ্ধন্তে এলেন গবেষকরা? ইউএসসির গবেষকরা মোট দু’দফায় এই পরীক্ষা চালিয়েছেন। প্রথম দফায় কেবল লাম্পের হদিশটুকু মিললেও তার বিস্তারিত কারণ বোঝার জন্যই পরের দফার সাহায্য নেন বিজ্ঞানীরা।
প্রথম দফায় বেশি সময় ধরে মোবাইল ব্যবহার করেন এবং ১৮-৩০ বছরের মধ্যে বয়স- এমন ২১৮ জনকে নিয়ে চলে পরীক্ষা। এক্স রে করা হলে প্রায় ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রেই উঁচু হয়ে ওঠা অংশের সন্ধান পান বিজ্ঞানীরা। করোটির পেছনে তৈরি হওয়া এই লাম্পের উচ্চতা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম। এর গ্রোথ মোটামুটি এক থেকে তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
প্রথম দফায় পাওয়া ফলের ওপর ভর করে চলে দ্বিতীয় দফার সমীক্ষা। ১৮-৮৬ বছর বয়সী প্রায় ১২০০ জনের ওপর চালানো হয় এই পরীক্ষা। সেখানে ফলাফল তো বদলায়ই না, উল্টো দেখা যায় এবার কয়েক জনের শরীরে এই লাম্বের উচ্চতা আরও বেশি। এর পরই করোটির অস্থি, মাথার পেছনের পেশী ও ঘাড়ের স্নায়ুর ওপর নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালান বিজ্ঞানীরা। আর তাতেই ‘ভিলেন’ হিসেবে উঠে আসে মোবাইল!
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ সমর চৌধুরী আনন্দবাজারকে বলেন, মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস নতুন নয়। ইদানিং এই প্রজন্মের হাতে সেই অভ্যাসই বদভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। যার ফলে এ ধরনের সমস্যা ধেয়ে আসে। টেক্সটিং থাম্ব-ও এমনই এক সমস্যা।
তিনি বলেন, সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জার কিংবা ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করতে গিয়ে টেক্সট করতে থাকেন মানুষ। এর ফলে আঙুল অবশ হয়ে নানা স্নায়বিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যথা তো বটেই, অনেক সময় অস্ত্রোপচারও করতে হয়। আমাদের শরীরে যে সব পরিবর্তনশীল অসুখ রয়েছে, তার মধ্যে এগুলো অন্যতম। এখনও সচেতন না হলে এর চেয়ে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
মুক্তি মিলবে কীভাবে?
  • • মোবাইল ব্যবহার করবেন না; এমন কথা বলার কোনো মানেই হয় না বলে দাবি চিকিৎসকদের। তবে এই ব্যবহারে রাশ টানার পক্ষপাতী তারা। তাদের মতে, কাজের সূত্রে খুব মোবাইল ঘাঁটতে হলে ফিটনেস এক্সপার্ট ও চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো অবসরে কিছু ব্যায়াম করুন। ফিঙ্গার এক্সারসাইজ ও ঘাড়ের কিছু ব্যায়ামে কিছুটা বিপদ মুক্ত হওয়া যায়।
  • • কাজের বাইরে মোবাইল ব্যবহারে রাশ টানতে হবে।
  • • মোবাইল ব্যবহারের সময় মাথার সোজাসুজি মোবাইল রাখুন, ঘাড় যেন বেশি না ঝোঁকে।
  • • উঁচু কিছুর ওপর মোবাইল স্ট্যান্ড রাখুন। এতে ফোন রেখে শুয়ে শুয়ে বা সোজা বসে সিনেমা বা দীর্ঘ ভিডিও দেখুন।
  • • প্রতি ১০ মিনিট অন্তর ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ঘাড়ের কিছু সহজ ব্যায়াম অভ্যাস করুন। যে সব ভিডিও ল্যাপটপে বা কম্পিউটারেও দেখা সম্ভব, সেগুলো সেভাবেই দেখুন।
  • • ল্যাপটপও উঁচু জায়গায় রাখুন।

বিস্কুট খেলেও ক্যান্সারের আশঙ্কা!

এই একটি খাদ্যে কাউকে কখনো না বলতে দেখবেন না। ন'মাসের বাচ্চা থেকে বুড়ো পর্যন্ত সবাই পছন্দ করেন। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই বিস্কুট একটি জনপ্রিয় স্ন্যাক্স। বিশেষ করে চাযের আড্ডায় বাঙালির প্রধান খাবার যেন বিস্কুটই। কিন্তু জানেন কি, এই বিস্কুট থেকে অস্বাভাবিক স্থুলতা, ডায়াবেটিস এমনকি ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে পারে?
ক্যান্সার এপিডেমিওলজি, বায়োমার্কাস অ্যান্ড প্রিভেনসন্স নামের একটি মার্কিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতিরিক্ত বিস্কুট ডেকে আনতে পারে মারাত্মক বিপদ। মার্কিন চিকিত্সক ও গবেষকদের মতে, বিস্কুট মানেই ময়দা যা তৈরির সময় ভিটামিনের দফারফা! ময়দা তৈরির সময় ফাইবার কমে যাওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত বিস্কুট খাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে বিস্কুট খাওয়ার ফলে ‘এন্ডমেট্রিয়াল ক্যান্সার’-এর ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা একটি সমীক্ষায় জানা গেছে, সুইডেনে ৬০ হাজারেরও বেশি মহিলা পেটের নানা সমস্যায় আক্রান্ত। আর আক্রান্তদের বেশির ভাগের মধ্যেই অতিরিক্ত পরিমাণে বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্কুটে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা আর ওজন অস্বাভাবিক হারে বাড়াতে থাকে। এই ট্রান্স ফ্যাটের কারণে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো নানা রোগের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। হঠাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

শ’ শ’ বছর ধরে ক্যান্সার ভারতে, পশ্চিমায়নের ভূমিকা নেই

ভারতে কয়েকশ’ বছর ধরেই ক্যান্সারের অস্তিত্ব বিরাজমান। এর সঙ্গে পশ্চিমায়ন বা আধুনিকায়নের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি নতুন গবেষণায় এই প্রমাণ মিলেছে। ‘হিস্টোরি অব দ্য গ্রোয়িং বার্ডেন অব ক্যান্সার ইন ইন্ডিয়া: ফ্রম অ্যান্টিকুইটি টু দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রবন্ধে ভারতে ক্যান্সারের ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। পরিশেষে গবেষকরা এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ভারতে ক্যান্সারের অস্তিত্ব বহুদিন ধরেই। এটি কোনো নতুন বিষয় নয়। এছাড়া বিভিন্ন মিডিয়ায় যেমনটা বলা হয়, ক্যান্সারের সঙ্গে পশ্চিমা সংস্কৃতি বিস্তারের কোনো সম্পর্ক নেই।
যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত কিংস কলেজের রবার্ট ডি স্মিথ ও কলকাতার টাটা মেডিকেল সেন্টারের মোহনদাস কে মল্লাথের লেখা ওই গবেষণা প্রবন্ধ জার্নাল অব গ্লোবাল অনকোলোজিতে প্রকাশিত হয়েছে।
এ খবর দিয়েছে দ্য ওয়্যার।
খবরে বলা হয়, স্মিথ ও মল্লাথের গবেষণায় দু’টি ধারণার ওপর নজর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, মানুষসহ প্রাণী অর্গানিজমে ক্যান্সার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকি হলো বয়স। মল্লাথ পরে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, এই গবেষণা প্রবন্ধ লেখার একটি কারণ ছিল এই যে, রোগিরা প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করেন, ভারতে কি ক্যান্সার মহামারি আকার ধারণ করেছে কিনা। অনেক রোগি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি বিড়ি খাই না, মদ খাই না, নিরামিষভোজী, তারপরও আমার কেন ক্যান্সার হলো?’
ভারতে আগে খরা, দুর্ভিক্ষ, সংক্রমণের কারণে স্বল্প আয়ু ও অকাল মৃত্যু ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। এখন এই সমস্যা কিছুটা উন্নতির দিকে হওয়ার পর মানুষের রোগের ক্ষেত্রে এক ধরণের পরিবর্তন এসেছে। এ কারণেই ক্যান্সার সহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ বেড়েছে।
এই গবেষণায় এই ধারণাও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ক্যান্সার নতুন একটি রোগ ও পশ্চিম থেকে আমদানি হয়েছে। গবেষকরা অতীত গবেষণা ও আর্কাইভ ঘেঁটে প্রমাণ করেছেন যে, ক্যান্সারের মতো অসুস্থতা ভারত উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই ছিল। ১৯ শতকের দিকে ক্যান্সার প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। বিংশ শতাব্দির পর থেকে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। কারণ ততদিনে শনাক্ত করার পদ্ধতি অনেক উন্নত হয়ে ওঠে।
গবেষকরা বলেন, প্রাচীন পুস্তক আথার্ভা বেদাতে কিছু রোগের লক্ষণের কথা বলা আছে যা অনেকটা পরিপক্ব ক্যান্সারের লক্ষণের সঙ্গে মিলে যায়। ক্যান্সারের মতো রোগ ও এর পথ্যের কথা বর্ণনা করা আছে আয়ুর্বেদ ও সিদ্ধার মতো প্রাচীন পুস্তকে। তবে ক্যান্সার আধুনিক নিয়মে শনাক্ত করা শুরু হয় ১৯১০ সালের দিকে। এছাড়া ১৮৬৬ সালে ৩০ জন ক্যান্সার রোগির ওপর গবেষণা চালিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ডব্লিউ জে এমসলি। সেখানে বলা হয়, এই রোগিদের ক্যান্সার হওয়ার পেছনে গাঁজা খাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
২০১৮ সাল নাগাদ ভারতে ক্যান্সার রোগির সংখ্যা ১১ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০৪০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্যান্সার থেকে মৃত্যুর হার দ্বিগুণ হয়েছে। মূলত, চাহিদা মোতাবেক ক্যান্সার সেবা উপলভ্য না হওয়াকেই এই রোগ এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া সরকারি খরচে গরিবদের ক্যান্সার চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে বেসরকারি চিকিৎসা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।