Sunday, February 9, 2020

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকার ওপর কতটা আস্থা আছে মানুষের

বিশ্বজুড়েই টিকার ব্যাপারে মানুষের অবিশ্বাস বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে এর ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই আবার পিছিয়ে যেতে শুরু করেছে।
টিকার ব্যাপারে মানুষের মনোভাব জানার জন্য বিশ্বে এযাবতকালের সবচেয়ে বড় জরিপে দেখা যাচ্ছে অনেক অঞ্চলে টিকা সম্পর্কে মানুষের আস্থা একেবারেই কম।
বিশ্বের ১৪০টি দেশের এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষের ওপর জরিপটি চালায় যুক্তরাজ্যের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলকাম ট্রাস্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে দশটি বিষয়কে বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে বর্ণনা করছে, তার একটি হচ্ছে টিকা দেয়ার ব্যাপারে মানুষের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।
এই বিশ্ব জরিপে এমন অনেক লোকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে যারা বলছে টিকার ব্যাপারে তাদের খুব কমই বিশ্বাস বা আস্থা আছে।
যখন তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল টিকা নিরাপদ কীনা, এর উত্তরে:
•৭৯ শতাংশ বলেছেন তারা 'মোটামুটি' বা 'দৃঢ়ভাবে' এর সঙ্গে একমত।
•৭ শতাংশ বলেছেন তারা এব্যাপারে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত করেন।
•১৪ শতাংশ এর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছুই বলেননি।
আর যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল টিকা কতটা কাজ করে:
•৮৪ শতাংশ বলেছেন তারা মোটামুটি বা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে টিকা কাজ করে।
•৫ শতাংশ বলেছেন তারা মোটামুটি বা দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করেন।
•আর ১২ শতাংশ পক্ষে বা বিপক্ষে কিছুই বলেননি।
কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ
হাম বা এরকম অনেক মারাত্মক সংক্রমণের বিরুদ্ধে যে টিকা সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা, এটির অনেক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে।
বিশ্ব জুড়ে কয়েকশো কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে টিকা। বিশ্ব থেকে যে গুটি বসন্ত নির্মূল করা গেছে, তার পুরো অবদান এই গুটি বসন্তের টিকা। পোলিওর মতো রোগসহ আরও অনেক রোগ এখন নির্মূলের পথে।
কিন্তু অন্যদিকে হাম এবং আরও কিছু রোগ নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকজন টিকা দেয়া এড়িয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ টিকা সম্পর্কে তাদের ভীতি এবং ভুল ধারণা।
হাম খুবই মারাত্মক রোগ
ড: অ্যান লিন্ডস্ট্রান্ড বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তিনি বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।
"টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগের বিরুদ্ধে বিশ্বে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা কিন্তু ভেস্তে যেতে পারে টিকা দেয়া নিয়ে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে।"
"এসব রোগ আবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়লে সেটাকে আমরা একটা অগ্রহণযোগ্য পশ্চাৎযাত্রা বলেই গণ্য করবো।"
হাম আবার ফিরে আসছে
যেসব দেশে হাম প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, সেখানে আবার হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই নতুন করে হাম রোগের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে এর সংক্রমণ ছিল ৩০ শতাংশ বেশি।
কেউ যখন টিকা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সেটা যে কারণেই হোক, তা কেবল তাকেই সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে না, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
যখন একটি এলাকায় যথেষ্ট সংখ্যাক মানুষ হামের টিকা নেন, সেটি ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করে। এই বিষয়টিকে বিশেষজ্ঞরা বলেন 'হার্ড ইমিউনিটি।' অর্থাৎ পুরো জনগোষ্ঠীই তখন সংক্রমণ-প্রতিরোধী হয়ে উঠেন।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের ইমরান খান বলেন, "আমরা এখন খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ যদি অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষ হামের টিকা না নেয়, তখন এই রোগ আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমরা এখন সেটাই দেখছি।"
টিকার ব্যাপারে আস্থা কোথায় কম?
টিকা দেয়া কতটা নিরাপদ তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিয়তা কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয়ের কিছু অঞ্চলে।
যেমন ফ্রান্স। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের মতো ফ্রান্সেও নতুন করে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। সেখানে জরিপে দেখা যাচ্ছে, সেখানে প্রতি তিন জনে একজন মনে করে টিকা দেয়া নিরাপদ নয়। টিকা সম্পর্কে এরকম নেতিবাচক মনোভাব বিশ্বের আর কোন দেশে এত বেশি নয়।
টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কেও ফরাসীদের সংশয় অনেক বেশি। সেখানে ১৯ শতাংশ মানুষই মনে করে টিকা রোগ প্রতিরোধে খুব কার্যকর নয়। আর শিশুদের টিকা দেয়া যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মানতে নারাজ দশ শতাংশ ফরাসী।
ফ্রান্সে এতদিন শিশুদের জন্য তিনটি টিকা বাধ্যতামূলক ছিল। এখন সেখানে আরও ৮টি টিকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

প্রতিবেশি ইটালিতে ৭৬ শতাংশ মনে করে টিকা দেয়া নিরাপদ। ইটালিতে সম্প্রতি আইন করা হয়েছে টিকা না দেয়া শিশুদের স্কুলে নিষিদ্ধ করে। শিশুদের টিকা না দিলে বাবা-মায়ের জরিমানারও বিধান আছে। ইটালির সরকার এসব পদক্ষেপ নিয়েছে টিকাদানের হার কমে যাওয়ার পর।
যুক্তরাজ্যে এখনো পর্যন্ত এরকম কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, প্রয়োজনে টিকাদান বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি তারা বাদ দিচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২৬টি অঙ্গরাজ্যে ৯৮০টি হামের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ এবং পশ্চিম ইউরোপে ৭০ শতাংশের বেশি কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে টিকা দেয়া নিরাপদ। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কিছুটা তফাৎ আছে।
যেমন পশ্চিম ইউরোপে টিকা দেয়া নিরাপদ মনে করে ৫৯ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপে ৫০ শতাংশ।
ইউরোপে গত বছর সবচেয়ে বেশি হামের সংক্রমণ ধরা পড়েছে ইউক্রেনে (৫৩ হাজার ২১৮টি)। সেখানে মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ মনে করে রোগ প্রতিরোধে টিকা কার্যকর ভূমিকা রাখে। বেলারুশে এই হার ৪৬ শতাংশ, মলডোভায় ৪৯ শতাংশ এবং রাশিয়ায় ৬২ শতাংশ।
টিকার ব্যাপারে আস্থা কোন দেশে বেশি
স্বল্প আয়ের অঞ্চলগুলিতে বেশিরভাগ মানুষই টিকার ওপর আস্থা রাখে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপরে দক্ষিণ এশিয়া।। সেখানে ৯৫ শতাংশ মানুষই একমত যে টিকা দেয়া নিরাপদ। এরপরই আছে পূর্ব আফ্রিকা। সেখানে টিকায় আস্থার হার ৯২ শতাংশ।
টিকার ব্যাপারে আস্থা এবং এর কার্যকারিতায় ভরসা রাখেন বাংলাদেশ এবং রুয়ান্ডার প্রায় সব মানুষ। সেখানে নানা রকমের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও টিকাদানের হারে দারুণ সাফল্য পাওয়া গেছে।
রুয়ান্ডা হচ্ছে বিশ্বের প্রথম নিম্ন আয়ের দেশ যেখানে সব তরুণীকেই এইচপিভি টিকা দেয়া হয়। এই টিকা জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
মিঃ খান বলেন, "টিকাদানের হার বাড়ানোর জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা নেয়া হলে কী অর্জন করা যায়, এটা তারই উদাহারণ।"

টিকা নিয়ে কেন মানুষ সন্দিহান
জরিপে দেখা গেছে, বিজ্ঞানী, ডাক্তার এবং নার্সদের ওপর যাদের আস্থা বেশি, টিকা দেয়াকে তারাই বেশি নিরাপদ বলে মনে করে। অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে যারা বিজ্ঞান, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্যের খোঁজ-খবর নিয়েছে তাদের ক্ষেত্রেই টিকার ব্যাপারে অবিশ্বাস বেশি।
ওয়েলকাম ট্রাস্টের রিপোর্টে অবশ্য কেন টিকার ব্যাপারে মানুষের আস্থা কম, তা খুব বেশি খতিয়ে দেখা হয়নি। তবে গবেষকরা বলছেন, এক্ষেত্রে অনেক কারণ থাকতে পারে।
একটা কারণ হতে পারে আত্মতুষ্টি। কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন রোগ যদি বিরল হয়ে পড়ে, তখন তার বিরুদ্ধে টিকা নেয়া আর অতটা জরুরী বলে মনে নাও হতে পারে।
সব ঔষধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। টিকার বেলাতেও তাই। কিন্তু টিকার ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপক পরীক্ষা চালানো হয় যাতে এটিকে নিরাপদ এবং কার্যকর করা যায়।
ইন্টারনেটের যুগে টিকার ব্যাপারে মানুষের উদ্বেগ এবং অবিশ্বাস মূহুর্তেই অনেকের সঙ্গে শেয়ার করা যায়। এর ফলে টিকা সম্পর্কে এমন অনেক কথা ছড়িয়ে পড়ছে, যা মোটেও তথ্যনির্ভর নয়।
জাপানে এইচপিভি টিকা সম্পর্কে লোকজনের উদ্বেগ এবং স্নায়বিক সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা ব্যাপক প্রচার পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে টিকাদানের ব্যাপারে মানুষের আস্থায় ফাটল ধরে।
একই ভাবে ফ্রান্সে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকার ব্যাপারে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগটা ছিল, সরকার বিপুল পরিমাণে এমন ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা কিনেছে, যেগুলো খুব দ্রুত তৈরি করা হয়েছে এবং এর ফলে এগুলো নিরাপদ নয়। এই দাবির কোন ভিত্তি ছিল না।
যুক্তরাজ্যেও এমন কিছু ভুল তথ্য প্রচার হচ্ছিল যেখানে এমএমআর (মামস, মিজেলস, রুবেলা) টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে বলে দাবি করা হচ্ছিল।
ডঃ লিন্ডস্ট্রান্ড বলেন, "এ ধরনের সন্দেহ এবং উদ্বেগ দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের খুব ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া। যাতে তারা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে টিকা দেয়ার সুপারিশ করতে পারেন। যাতে তারা টিকা দেয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যেসব প্রশ্ন এবং উদ্বেগ, তার জবাব দিতে পারেন।"
(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সাহায্য করেছেন বেকি ডেল, ক্রিস্টিন জিভান্স, ডেভি লোইজু, স্কট জার্ভিস এবং কাটিয়া আর্টসেনকোভা। )
টিকা দেয়ার ব্যাপারে আস্থার অভাব আছে কিছু দেশে

বাংলাদেশের ইসলামি প্রকাশনায় রাষ্ট্র ও রাজনীতি: প্রকাশকরা বলছেন ‘চিন্তার বিস্তৃতি’ by শফিক রহমান

বাংলাদেশে ইসলামি প্রকাশনা বলতে এক সময় শুধু সহজ আমল বা ইসলামী অনুশীলনভিত্তিক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। ষাটের দশকে এসে ওই ধারার পরিবর্তন ঘটে। তখন থেকে ইসলামী সাহিত্যে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংবিধান, আইন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারনা, ইত্যাদি সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশ এবং ধর্মের আসল উদ্দেশ্যগুলো যুক্ত হতে থাকে। সমকালীন ইসলামি চিন্তক, লেখক, গবেষক ও অনুবাদকদের হাত ধরে ওই ধারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে।
ব্রিটিশ শাসনোত্তর যুগে বাংলাদেশে ইসলামি সাহিত্য রচনা ও বিকাশের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমাজ-সংস্কারক ও ইসলামি চিন্তাবিদ আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (১৮৯৬—১৯৬৯)। বর্তমান যুগে পশ্চিমা দুনিয়া যখন ‘সন্ত্রাসের’ সঙ্গে ‘জিহাদকে’ গুলিয়ে ফেলছে তারও প্রায় ৭০/৮০ বছর আগে আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী জিহাদকে সজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: “জিহাদ অর্থ যুদ্ধ-বিগ্রহ, লুটতরাজ, জুলুম-অত্যাচার নয়। জিহাদ অর্থ যার যা আছে তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে খরচ করা।…কিতাব লিখে, বক্তৃতা দিয়ে দুর্নীতি দমন করে সুনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও জিহাদ।”
সহজ ইসলামী অনুশীলনের জন্য নেয়ামুল কোরআন, মুকসেদুল মুমেনিন, বেহেস্তি জেওর (অনুবাদ), আমপারার (আরবি ও কোরআন শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ), ইত্যাদি প্রকাশনাগুলোর যে সীমাবদ্ধ ছিল তা অতিক্রম করে জিহাদের গুরুত্ব ও ফযিলত, ধর্ম ও রাজনীতি, ভোটারের দায়িত্ব ও ভোট সম্পর্কে শরীয়তের নির্দেশ এবং ধর্মের আসল উদ্দেশ্য কী, ইত্যাদি শিরোনামে বই লিখেছেন শামসুল হক ফিরিদপুরী। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি প্রকাশনা জগতে নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার-সমাজ, ব্যবসা-অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতি ঘনিষ্ট বই।
প্রকাশনা সংস্থা বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্সের দুই শতাধিক বইয়ের তালিকায় যুক্ত হওয়া তেমনই একটি বই ‘আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলাম’। বইটিতে লেখক আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া কোরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংবিধান, আইন, মানবাধিকার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারনা। তুলে ধরেছেন পারস্য সাম্রাজ্য, গ্রীক সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য এবং মদীনার ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র দর্শনের নানা দিক। এরই ধারাবাহিকতায় আধুনিক রাজনীতিতে প্রবর্তিত রাজনৈতিক দলের প্রকারভেদ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রাজনৈতিক দলব্যবস্থায় জনগণের বহুদলে বিভক্তি, অন্ধভক্তি, ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তার উন্মেষের পথে বাধাসহ মোট ছয়টি ক্ষতিকর দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে তিনি যে বিষয়টির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন সেটা হলো- দলীয় রাজনীতিতে দলীয় স্বার্থচিন্তা জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে অনুপ্রাণিত করে।
বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স প্রকাশিত ইসলামী বিপ্লব: পথ ও পদ্ধতি, জিহাদ কি ও কেন, সভ্যতা-সংকট দিগ-দর্শন, আধুনিক যুগে খেলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা, ইসলামী আন্দোলন: জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা, রাজনীতিতে আলিমসমাজের প্রভাব (বাংলাদেশ ১৯৭২-২০০১) এবং ইসলামী আন্দোলন ও উলামাসমাজসহ নানা বইয়ের মধ্যে আরেকটি তাত্ত্বিক বই ‘পশুবাদ-পুঁজিবাদ-সমাজবাদ’। বইটিতে লেখক অধ্যাপক মাওলানা আবদুল্লাহ ফারূকের যুক্তিতে উঠে এসেছে পুঁজিবাদ ও পাশবতন্ত্রের অপর পিঠ থেকে কিভাবে জন্ম নিল সমাজবাদের ধারনা। তুলে ধরেছেন ‘দুর্বল খেয়ে সবল বাঁচে’ কিংবা ‘সবলকে নিপাত করে দুর্বল বাঁচে’ পারস্পরিক ধ্বংসকারী এই দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ।
প্রবীণ আলেম ও প্রবীণ পুস্তক বিক্রেতারা জানান, বাংলাদেশে ইসলামি পুস্তক প্রকাশনা গড়ে উঠেছিল পুরান ঢাকার চকবাজার শাহী মসজিদ মার্কেটকে ঘিরে। আর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে ছিল রহমানিয়া লাইব্রেরী, হামিদিয়া লাইব্রেরী এবং এমদাদিয়া লাইব্রেরী। এর মধ্যে রহমানিয়া লাইব্রেরীর বহুল প্রকাশিত বই ছিল নেয়ামুল কোরআন, মুকসেদুল মুমেনিন। এছাড়া সংস্থাটি প্রকাশ করতো নবী রাসুলসহ মুসলিম মনীষীদের জীবনী। এধরনের সহজ ও স্বাভাবিক আমল ভিত্তিক বইয়ের পাশাপাশি হামিদিয়া লাইব্রেরীর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা ছিল শায়খুলহাদীস মরহুম মাওলানা আজিজুল হকের বুখারি শরীফের অনুবাদ। আর এমদাদিয়া লাইব্রেরীর খ্যাতি ছিল ইমাম গাজ্জালির কিমিয়ায়ে সাহাদাত এর (সৌভাগ্যের পরশমনি) অনুবাদ নিয়ে। এছাড়া পাকিস্তান ভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা ‘তাজ কোম্পানির’ শাখাও ছিল ঢাকাতে। যাদের প্রকাশনায় ছিল মুলত কোরআন শরীফ, কাসাসুল আম্বিয়া (আম্বিয়াদের কিসসা কাহিনি), তাজকেরাতুল আউলিয়া (আউলিয়াদের জীবনী ও অলৌকিক ঘটনাভিত্তিক) ইত্যাদি। পাকিস্তানের মূল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ না থাকলেও ঢাকাতে এখনও তাজ লাইব্রেরী ও তাজ কোম্পানি নাম নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা আছে। যাদের খ্যাতি ওজিফা ও দোয়া দুরূদের বই বই প্রকাশে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চকবাজারকেন্দ্রীক ইসলামি বইয়ের বাজার উঠে গেছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম কেন্দ্রীক ইসলামি বইয়ের বাজারও ঝিমিয়ে পড়েছে। পাঠ্যবই, শিক্ষা সহায়ক বইসহ সৃজনশীল ও মননশীল বই বিক্রয়ের হাব হিসেবে পরিচিত বাংলাবাজার এখন ইসলামি বইয়েরও হাব। সেখানে ইসলামি প্রকাশনা সংস্থা ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটি বহুতল মার্কেট গড়ে উঠেছে। যার নামও দেয়া হয়েছে ‘ইসলামী মার্কেট’। মার্কেটটির সভাপতি এবং ইসলামি বইয়ের আমদানিকারক মো. জালাল আহমেদ জানান, তাঁরও ব্যবসার সূচনা ছিল চকবাজারের শাহী মসজিদকেন্দ্রীক। যেখানে আরো দোকান ছিল গোটা পঞ্চাশেক। কিন্তু ২০০৮ সালের দিকে পুস্তক ব্যবসায়িরা চকবাজার ছাড়তে শুরু করেন। ২০১০ সালের মধ্যে সবাই বাংলাবাজারে স্থানান্তর হয়েছেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে বাংলাবাজারে শুধু ইসলামি বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শতাধিক। বই বিক্রেতা ও আমদানিকারকের সংখ্যা তারও দ্বিগুণ।
সম্প্রতি বাংলাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, আদি এমদাদিয়া লাইব্রেরী ভেঙ্গে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন এক সময় যে এমদাদিয়ার কর্মচারি ছিলেন তিনিও এমদাদিয়ার নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। ফলে দেখা যাচ্ছে এমদাদিয়া পুস্তকালয়, এমদাদিয়া প্রকাশনী, এমদাদিয়া কুতুবখানাসহ নান নামের প্রতিষ্ঠান। এছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠানে মধ্যে রয়েছে জাদীদ প্রকাশন, হুদহুদ প্রকাশন, মুস্তাখাব প্রকাশনী, আল-কাউসার প্রকাশনী, মাকতাবাতুল ইলম, মাকতাবাতুল আশরাফ, মাকতাবাতুল হেরা, মাকতাবাতুল আযহার ইত্যাদি। রাজধানীর মধ্যবাড্ডাকেন্দ্রীক মাকতাবাতুল আযহারের ১৫৩টি বইয়ের মধ্যে রয়েছে খেলাফত ও রাষ্ট্রনীতি: ইসলামী দৃষ্টিকোণ, ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ, মুসলমানদের পতনে বিশ্বমানবতা কী হারালো, ডিজিটাল ছবি ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া সম্পর্কে ইসলামের বিধান, সাদ সাহেবের একটি বিতর্কিত তাফসির, ওয়াহাবী আন্দোলন ও উলামায়ে দেওবন্দ এবং আধুনিক লেনদেনের ইসলামী বিধান শিরোনামের নানা বই।
মাকতাবাতুল হেরার ১৪৬টি বইয়ের তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে আরব বিশ্বে ইসলামি শাসনের পতন ও তার নেপথ্যকথা, সাংবাদিকতার শরয়ী নীতিমালা, ভোট ও নির্বাচনের শরয়ী বিধান, নাঙ্গা তলোয়ার, কোন পথে ইউরোপের ইসলাম, নাস্তিকতার স্বরূপ সন্ধানে, আমদানি-রপ্তানি: প্রচলিত রূপ ও শরয়ী রূপরেখা, বেচাকেনার জায়েয-নাজায়েয পদ্ধতিসহ নানা বই।
আর মাকতাবাতুল আশরাফের দুই শতাধিক বইয়ের মধ্যে ভিন্ন ধারার কয়েকটি হলো ইসলাম ও আধুনিকতা, খৃষ্টধর্মের স্বরূপ, খৃষ্টধর্ম না মৌলবাদ, শেয়ারবাজার, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং, পারিবারিক কলহ ইত্যাদি।
এসব বইয়ের কোনোটি মৌলিক কোনোটি আবার অনুবাদ। আর অনুবাদ হয়ে বাংলাদেশে যাঁর বই সবচেয়ে বেশি ছাপা হচ্ছে তিনি হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুফতী তক্বী উসমানী। রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবারসহ নানা জীবনঘনিষ্ঠ বই যেমন, ইসলাম আধুনিক অর্থনীতি ও ব্যবসানীতি, ইসলাম ও আধুনিক অর্থব্যবস্থা, মুসলিম পারিবারিক আইন ও ইসলাম, পারিবারিক কলহ, বিবাহ ও তালাক ইত্যাদি রয়েছে এই তালিকায়।
এছাড়া অনুবাদ হচ্ছে তক্কী উসমানীর ছেলে ড. মাওলানা ইমরান আশরাফ উসমানী, ভারতের মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী, উর্দূ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাওলানা মুহাম্মাদ তাহের নাক্কাশ, সিরিয়ার শায়খ আলী তানতাবী, সৌদি আরবের ড. আয়েয আল করনী, মিশরের শায়খ মুহাম্মদ সিদ্দিক আল মিনশাবিসহ সমকালীন আরও অনেক লেখকের বই।
তবে রহমানিয়া, হামিদিয়া ও এমদাদিয়ার ধারা ভেঙ্গে তাত্বিক ও দর্শনভিত্তিক ইসলামী প্রকাশনায় যিনি পাইওনিয়ার ছিলেন তিনি হলেন বহুল পঠিত ও প্রচারিত ইসলামিক সাময়িকী মাসিক মদিনার সাবেক সম্পাদক মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন খান।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত মদিনা পাবলিকেশন্সের ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে আরেক ইসলামি সাময়িকী মাসিক পাথেয়র সম্পাদক মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, ‘আমাদের ছাত্রজীবনে বাংলায় ইসলামি লেখা ছিলই না বলা যায়। মাওলানা আকরাম খাঁন এবং কবি গোলাম মোস্তফার কিছু লেখা পড়েছি। আর ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি গান। তবে বাংলায় ইসলামি লেখা প্রসারে মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের ভূমিকা অপরিসীম। তিনিই প্রথম মদিনা পাবলিকেশন্সের ব্যানারে নানা আঙ্গিকের ইসলামি বই অনুবাদ ও প্রকাশ করতে শুরু করলেন। তাঁর সম্পাদিত মাসিক মদিনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে মদিনা পাবলিকেশন্সের প্রকাশনা প্রায় তিন শতাধিক। মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের ছেলে মোস্তফা মঈন উদ্দিন খান যাঁর দায়িত্বে চলছে মদিনা পাবলিকেশন্স। তিনি বলেন, ইসলামি লেখক-গবেষক যাঁরাই বাবার কাছে আসতেন তাঁদেরকে তিনি বলতেন- বাংলাদেশের বাস্তবতায় লিখবেন কিন্তু প্রকাশক পাবেন না। তাই নিজের লেখা নিজেকেই প্রকাশ করতে হবে এই প্রস্তুতি হাতে রাখতে হবে। মূলত বাবা সেই কাজটিই করেছেন। নিজে লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন আবার নিজেই প্রকাশ করেছেন।
মোস্তফা মঈন উদ্দিন খান জানান, বাংলাবাজারকেন্দ্রীক ‘ইসলামী মার্কেট’ প্রতিষ্ঠায়ও মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের অবদান ছিল।
ইরানী বিপ্লব ও তুরস্কের এরদোগান প্রসঙ্গ
চল্লিশ বছর আগে ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্ব ইরানে যে বিপ্লব সংঘঠিত হয় তার ঢেউ এসে বাংলাদেশেও লাগতে শুরু করেছিল। ইরানের ওই বিপ্লবকে বলা হচ্ছিল ‘ইসলামি বিপ্লব’। কিন্তু মাওলানা মুহিউদ্দিন খান বললেন, ‘নির্ভেজাল শিয়া বিপ্লব’। এছাড়া অনুবাদ করে প্রকাশ করলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুহাম্মদ মনযুর নোমানীর বই ‘ইরানী ইনকিলাব: ইমাম খোমেনী ও শিয়া মতবাদ’।
সাম্প্রতিক সময়ে আবার ইসলামি প্রকাশ ও প্রকাশনায় গুরুত্ব পাচ্ছে তুরস্ক ও এরদোগান প্রসঙ্গ। প্রকাশনা সংস্থা গার্ডিয়ানের তালিকায় রয়েছে ‘আতাতুর্ক থেকে এরদোয়ান: বদলে যাওয়া তুরস্কের ১০০ বছর’, ‘এরদোয়ান: দ্যা চেঞ্জমেকার’, ‘আমার দেখা তুরস্ক: বিশ্বব্যবস্থায় নতুন শক্তি তূর্কি জাতির ভেতর-বাহির’। এছাড়া বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্সের তালিকায়ও রয়েছে ‘ঢাকা ইস্তাম্বুল আঙ্কারা’ শিরোনামের আরেকটি বই। যেখানে লেখক আতাতুর্ক থেকে এরদোগান পর্যন্ত রাজনৈতি পটপরিবর্তনের নানা দিক তুলে ধরেছেন।
ফলে ফজিলত নির্ভর প্রকাশনায় নয়, গবেষণা ভিত্তিক প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা চলছে ইসলামের সৌন্দর্য।