Tuesday, February 3, 2015

জাতীয় ঐক্যমতের সরকার’ বিতর্ক by ফরহাদ মজহার

সম্প্রতি দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠন এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব করে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশান মিলনায়তনে ২৮ জানুয়ারি তারিখে ‘চলমান জাতীয় সংকট : উত্তরণের পথ’ শীর্ষক একটি সভা করেছেন। সেই সভায় বিচারপতি আব্দুর রউফ, খোন্দকার মাহবুব হোসেন, লে. ক. (অব:) মোহাম্মদ সেলিম, রুহুল আলম গাজীসহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার জন্য তাঁকে ও সভার উদ্যোক্তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। দৈনিক পত্রিকায় এ বিষয়ে খবর অনেকেই দেখেছেন। বলাবাহুল্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সময় পারস্পরিক আলাপ আলোচনা ও সমাধান অন্বেষণ অবশ্যই ইতিবাচক। সভায় ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠনের প্রস্তাব পেশ করা হবে তা আমি আগে জানতাম না এবং আমার সঙ্গে আগে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয় নি। ডক্টর এমাজউদ্দীন আহমদ ছাড়া কারা এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাও জানি না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল এবং সমাধানের নীতি ও কৌশল নির্ধারণ আগের যে কোন পরিস্থিতির তুলনায় কঠিন। এই ধরনের সংবেদনশীল সময়ে কোন প্রস্তাব পেশ করার আগে তা নিয়ে প্রচুর আলাপ আলোচনা দরকার এবং বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত হলেও কখন কিভাবে কোন ভাষায় তা হাজির করতে হবে সেই বিষয়েও বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া খুবই জরুরী।
এটা ঠিক যে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ কথাটি নামকরণের দিক থেকে আওয়ামী লীগের পুরানা রাজনীতির অনুরণন, এমনকি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ মার্কা ‘জাতীয় ঐকমত্য’কে প্রাধান্য দিয়েই নির্বাচন ও সরকার গঠন করেছে। হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননকে নিয়ে বর্তমানে যে সরকার রয়েছে সেটা জাতীয় ঐক্যের আওয়ামী ধারণা অনুযায়ী ‘ঐকমত্য’-এর সরকারই বটে। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আগামী দিনের জন্য এই ধরনের একটি সরকারের অধিক কিছু ভাবতে পারছেন কিনা সেটা স্পষ্ট নয়। তাঁর লেখালিখির মধ্যে আমি তা খুঁজে পাই নি। সে যাই হোক, সম্প্রতি তিনি শ্রীলংকার নির্বাচনী অভিজ্ঞতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে নির্বাচন হতে তো সমস্যা নেই’।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পরিস্থিতি কোনভাবেই শ্রীলংকার মতো নয়। শ্রীলংকায় হয়েছে বলে বাংলাদেশেই সেটা সম্ভব এটা ভাবার কোন কারণ নাই। কিন্তু তারপরও তিনি চাইছেন শেখ হাসিনার অধীনেই একটা নির্বাচন হোক। এ কথা বলার অর্থ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন না করে বিশ দলীয় জোট ভুল করেছে! এখন তা সংশোধন করতে হবে। তাই কি?
তাঁর হঠাৎ আন্দোলনের মাঝখানে একথা বলার অর্থ কি? আগামী দিনে শেখ হাসিনার সরকারে যেভাবে এরশাদ, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেনন আছে তেমনি কি তিনি বিএনপির নেতাদেরও যোগদান চান? তাঁর কাছে সম্ভবত রওশন এরশাদের অধিক মর্যাদা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাই। তিনি কি চান রওশন এরশাদের মতোই খালেদা জিয়া হাসিনার সরকারে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসাবে যোগদান করুক? বিরোধী দলের আন্দোলনে যারা অত্যাচার নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন ও বুকে গুলি নিয়ে শহীদ কিম্বা পঙ্গু হচ্ছেন আগুনে পুড়ে মরছেন সেই সকল নেতাকর্মীর কাছে এই ধরনের প্রস্তাব চরম অবমাননাকর বলে গণ্য হতে পারে। এই দিকগুলো বিবেচনায় না নিয়ে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করবার কথা বলা ঠিক হয় নি।
তারপরও বলব ডক্টর এমাজউদ্দীন আহমদ যা সঠিক মনে করেন তা বলার অধিকার তাঁর আছে এবং তার কিম্বা অন্য যে কারো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাতে আমার কোনই আপত্তি নাই। তবে ২৮ তারিখে সভায় যখন ঘোষণা করা হোল যে এই প্রস্তাবে আমি স্বাক্ষর করেছি তখন মঞ্চ থেকেই আমি প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। জানাতে হয়েছে বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির কোন দৃশ্যমান পরিণতি বিচার না করে এই ধরনের কোন প্রস্তাব আন্দোলন-সংগ্রামের বর্তমান চলমান মুহূর্তে আমি সমর্থন করি না, স্বাক্ষর করার প্রশ্নই আসে না। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো যেমন আছে তেমনি অক্ষত রেখে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক পক্ষের হাত থেকে আরেকটি পক্ষের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর আমার রাজনীতি না। এই রাজনীতি আমি করি না। সাত দফার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক জনগণকে সম্পৃক্ত করবার ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের আন্দোলনে ও কৌশলে ব্যর্থতা থাকতে পারে কিন্তু জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন চায়। অতএব আমাদের কাজ হচ্ছে ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তি আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কিভাবে বিকশিত হতে পারে তার প্রতি মনোযোগী হওয়া। নির্বাচন তো হতেই হবে। সেটা কখন কিভাবে কোন পদ্ধতিতে হবে সেটা আন্দোলনের সাফল্য বা পরিণতির ওপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন।
এরপরও কালের কণ্ঠ পত্রিকায় একটি খবর দেখে আমি অবাক হয়েছি। ‘শত নাগরিক’ নামক সংগঠনটির জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব হিসাবে কবি আবদুল হাই শিকদার স্বাক্ষরিত সংবাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে ড. এমাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাবে যারা ‘একমত পোষণ করেছেন’ তাদের নামের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আমার নাম দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! ফলে আমাকে আবারও প্রতিবাদ করতে হচ্ছে। আমি সুস্পষ্ট ভাবে সকলকে জানিয়ে দিতে চাই এই ধরনের প্রস্তাব বা উদ্যোগের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই এবং সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি কখনই কোন কালে ‘শত নাগরিক’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না বা যুক্ত নই। (দেখুন, ‘এমাজউদ্দীনের প্রস্তাবে শত নাগরিকের সমর্থন’)
যেখানে চলমান সংকট নিরসন দূরে থাকুক, তাকে আরো তিক্ত, কুৎসিত ও হিংস্র পর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য খালেদা জিয়ার বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হচ্ছে, তাকে না খেয়ে মারবার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ডিশ লাইন, ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন করা হচ্ছে সেই সময় শত নাগরিকদের উচিত ছিল ঐক্যবদ্ধ ভাবে রাস্তায় নেমে আসা, প্রতিবাদ করা এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নানাবিধ ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দেওয়া। কিন্তু সেই দিকে মনোযোগ না দিয়ে অনেককেই এখন দেখছি আওয়ামী লীগের অনুকরণ কিম্বা অনুরণনে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ঐকমত্য সরকার’ গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করছেন।
বিরোধীদের উপর সরকারি দলের কথা ও কাজে নিরন্তর নগ্ন ও কুৎসিত আক্রমণের মুখে ন্যূনতম প্রতিবাদে না গিয়ে উলটা সেই সরকারকে সাথে নিয়েই কি তারা ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের’ প্রস্তাব করছেন? কেন করছেন আমি জানি না। এই আবেদন নিবেদনের অর্থ কি তা আমি বুঝতে অক্ষম। ফলে আমার রাজনীতির সাথে ক্ষমতাসীনদের কাছে এই অবাস্তব আবেদন নিবেদনের কোন মিল আমি খুঁজে পাই নাই। চলতি রাজনৈতিক ক্রাইসিসে এটা কোন বাস্তবোচিত প্রস্তাব নয়। তাই আমি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই, যদি তাই হয়, তাহলে আমি তাদের সাথে একমত নই।
দুই.
‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ ধারণা যদি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে আসত তাতে হয়ত কিছু আবেদন থাকত। এটা বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে আসায় আমি মনে করি এই মুহূর্তে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনকে এই দাবি বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করতে পারে। দেশকে আরো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই ধরনের প্রস্তাব সাধারণ জনগণ বিশেষত যারা আন্দোলন সংগ্রামে জীবন দিচ্ছেন তাদের কাছে ষড়যন্ত্র গণ্য করবার কারণ হতে পারে। আশা করি যারা তার প্রস্তাব করছেন তারা এইসব বিবেচনায় নেবেন।
শেখ হাসিনা তো নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদি এটাই এখন চাই তাহলে তখন সেই প্রস্তাব লুফে নেওয়া হোলনা কেন? যারা ক্ষমতাসীন রয়েছেন তাদের সমর্থনের বাইরে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার ধরনের কোন অন্তর্বর্তী সরকার যদি আদৌ রাজনৈতিক কারণে গঠন জরুরী হয়ে পড়ে তাহলে ক্ষমতাবানরাই সেটা গঠন করে, তাহলে এখন এই ধরনের সরকার গঠনের শক্তির ভিত্তি কি? কারা এই সরকার গঠন করতে চাইছে? এটা কি আন্দোলন-সংগ্রামে বিজয়ী রাজনৈতিক পক্ষ? নাকি ক্ষমতাসীন সরকার সদাশয় হয়ে এই ধগ্রণর সরকার কবুল করবেন?
এই ধরনের প্রস্তাবের রাজনীতিকরণ না ঘটিয়ে অর্থাৎ এখনই সমাধানের প্রস্তাব হিসাবে পেশ না করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কিভাবে নতুন অন্তর্বর্তী ক্ষমতা তৈরি হয়, কিম্বা বিদ্যমান বাস্তবতা বিচার করে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। সেটা তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সতর্ক প্রজ্ঞার কাজ। এই ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো শুরুতেই উঠে আসে সেটা হোল কারা এই সরকার গঠন করবে? জাতীয় ঐকমত্যের সরকার তো বললেই গঠিত হয়ে যাবে না, বা চাইলেই গঠন করা যায় না; এর সঙ্গে সরাসরি ক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত। সেই ক্ষমতা তৈরি হবে কিভাবে? কিম্বা সেই ক্ষমতা হাজির থাকলে সেটা কোথায় কিম্বা কারা? যারা ক্ষমতায় আছেন এবং ক্ষমতাবান তারা এই ধরনের সরকার চাইবেনই বা কেন? কিম্বা এই ধরনের সরকার গঠন করবার ক্ষমতা যাদের আছে তারা আদৌ এই ধরনের সরকার গঠনে শক্তি জোগাবে কি? যদি ক্ষমতাসীনরা এই ধরনের সরকারে সমর্থন না দেয় অর্থাৎ যদি এই সরকার শেখ হাসিনার অধীন রওশন এরশাদ-ইনু- মেনন জাতীয় না হয় তাহলে এর পেছনের অনুমানটি কি? সেটা কি এই যে এর সমর্থন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, কিম্বা বিদেশী দেশগুলোর কাছ থেকে আসতে হবে। অতীতে আমরা এমন দেখেনি যে তা নয়, কিন্তু তা সবসময়ই জনগণের স্বার্থের বদলে বিদেশী স্বার্থ রক্ষার নির্দেশ পালনের বিপদে আমাদের নিক্ষিপ্ত করেছে। জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিকশিত না করে এবং জনগণের ওপর আস্থা না রেখে রাষ্ট্রের সশস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিম্বা বিদেশী কোন পরাশক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বিচক্ষণ কিম্বা আদর্শ রাজনীতি নয়।
কিন্তু তারপরেও বলা যায় বর্তমান জাতীয় সংকট থেকে বেরুতে হলে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক ভাবে প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাজনৈতিক মীমাংসার তর্ককে শুধু আইনী ও সাংবিধানিক তর্ক হিসাবে দেখা ও দেখাবার জন্য আইন পেশার অনেককেই অতি উৎসাহিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। যেমন এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা কী নিয়ে তা নিয়ে তারা বেজায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তারা এখনও বুঝতে পারেন না বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোন কন্সটিউটিউশনাল বৈধতার তোয়াক্কা করেনি। জনগণের ইচ্ছা ও আকাংখাই সকল ক্ষমতা এবং তার বৈধতার উৎস, উকিলদের ওকালতি নয়, কিম্বা কোন সংবিধানও নয়। উকিল মোক্তারের প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে প্রায়ই প্রকট রাজনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করে।
সংবিধানের বাইরে জনগণের ক্ষমতার ধারণা ও তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণের নাই তা নয়। একাত্তরতো বটেই। এমনকি সামরিক শাসক হুসেইর মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতাচ্যুতি কোনটিই সাংবিধানিক ভাবে হয় নি। ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা অর্থাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে তাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তকে পরে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও বাংলাদেশকে নতুন ভাবে গঠন করবার সম্ভাবনা তখন দেখা দিয়েছিলো। তাকে নস্যাৎ করে দিয়েই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে পুরানা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যার কুফল আমরা এখন হাড়ে হাড়ে ভোগ করছি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসাবে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এর প্রস্তাব কোন পরিণত বিবেচনা থেকে পেশ করা হয় নি। রাজনৈতিক প্রশ্নের রাজনৈতিক মীমাংসা কথাটা প্রচলিত হলেও তার মানে আসলে কী সে বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা আমাদের সমাজে হয় নি। গণ আন্দোলন ও রাজনীতিই একাত্তর কিম্বা সাতই নভেম্বরের মতো নির্ধারণ করে দেবে যে জনগণ কিভাবে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা করবে। এটা আইনী বা সাংবিধানিক ব্যাপার মাত্র নয়। কোন প্রস্তাব দিয়ে নয়, বরং সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সেই মুহূর্ত আদায় করে নিতে হয়। ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই বারবার দেয়।
তবে এত কিছুর পরেও অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের প্রস্তাবের ইতিবাচক দিক হচ্ছে নির্বাচনকেই সমাধান গণ্য করলেও বর্তমান সংকটের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার দিকটা তিনি নজরে এনেছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বন্ধ করে দিয়েছে। সংশোধনীতে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি এটা বদলাতে চান এবং যেসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সঙ্গে সংযুক্ত সেইসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও করতে চান। কিন্তু বর্তমান সংবিধান মানবিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করেছে এবং একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছে সেই বিষয়ে তিনি নীরব। তিনি ততোটুকুই সংস্কার চান যতোটুকু নির্বাচনের জন্য দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান জরুরী সেই প্রয়োজনীয়তার কোন ইঙ্গিতই তিনি দেন নি।
নির্বাচনের জন্য সংবিধানের সংস্কার বর্তমান সংবিধান রুদ্ধ করেছে, এটা তিনি ঠিক বলেছেন। যদি সংবিধান দিয়ে সংবিধান তিনি সংশোধন করতে চান তাহলে সেটা কি তিনি ক্ষমতাসীনদের দিয়ে করাবেন? সেটা হবে তাঁর ভাষায় বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা। অথচ সেটা সম্ভব নয় সেটাও তিনি জানেন। তাহলে সংবিধানের সংস্কার করতে হবে অসাংবিধানিক ভাবে। তাঁর ভাষায় ‘সংবিধান সংশোধন না করে’ করা। সেটা কেমন? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? এই মহৎ কর্ম নাকি করবেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সংবিধানে প্রেসিডেন্টের তো সেই ক্ষমতা নাই। তবুও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বলছেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে দিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করবেন। পরর্বর্তীকালে যে সংসদ গঠিত হবে ওই সংসদ প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশকে অনুমোদন দেবে। কায়দাটা পুরানা। অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা বদলাও, তারপর সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে ‘অবৈধ’ কাজ বৈধ করে নাও। কিন্তু প্রেসিডেন্ট অসাংবিধানিক ভাবে সংবিধান বদলাতে চাইলে তাঁকে তা করতে দেবে কে? তার কোন উত্তর আমার জানা নাই। শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের তা জানা থাকলে তিনি আশা করি আমাদের জানাবেন। যদি জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পই ক্ষমতার উৎস ও বৈধতা হয় তাহলে জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে বৈধতা নিতে এতো সাংবিধানিক ক্যারিকেচারের কী দরকার? (দেখুন, ‘প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে পারেন’, মানবজমিন ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
তিন.
আমার বিভিন্ন লেখায় আমি বারবার বলেছি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নির্বাচনে না, সেটা রাষ্ট্রগঠনের গোড়ায় নিহিত। একাত্তরে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এই ধরনের একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য যুদ্ধ করেছি ও জীবন দিয়েছি। স্বাধীনতার ঘোষণায় যা সুস্পষ্ট ভাবে ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে। এই ইতিহাস অস্বীকার করবার কোন সুযোগ নাই। কিন্তু স্বাধীনতার এই অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে একটি দলের আদর্শ ও কর্মসূচীকে বাংলাদেশের জনগণের সংবিধান হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশ বিভক্ত হয়েছে, সমাজ বিভক্ত হয়েছে আজ আমরা পরস্পরকে নির্মূল করতে উদ্যত। এই বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিকতায় আজ পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। তার সাংবিধানিক, আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আছে।
যে ফ্যাসিবাদ দেশে কায়েম হয়েছে তার সমাধান ফল চলতি কনস্টিটিউশনের মধ্যে নাই। ফলে নতুন ভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা জনগণকে ভাবতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবার ক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে যারা বাংলাদেশকে বিভক্ত, রক্তাক্ত, হানাহানি, হত্যা, গুম ও সহিংস দলবাজির ক্ষেত্রে পরিণত করেছে তাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক জনগণের লড়াই ছাড়া কোন স্থিতিশীল রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ গঠন অসম্ভব বলেই আমি মনে করি। সাধারণ মানুষ বারবার প্রাণ দিতে থাকবে এবং তার ফল নেবে দুই পক্ষের লুটেরা দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ বিভিন্ন গোষ্ঠি। নিজ কোটারি স্বার্থের জন্য যারা হেন কোন হীন কাজ নাই যা করে না, বা করতে পারে না। এই ভাবে দেশ চলতে পারে না।
যারা আমার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত তারা যেন বিভ্রান্ত না হন তার জন্য আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব বা উদ্যোগের সঙ্গে একমত হওয়া তো দূরের কথা আমার কোন দূরবর্তী সংশ্রবও নাই। এ ধরনের প্রস্তাব চলতি সংকট মিটাতে কাজে আসবে না। প্রেসিডেন্টকে দিয়ে অধ্যাদেশ জারির কথা এমনকি নতুন অন্তর্বর্তী ক্ষমতা তৈরি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে সংলাপ শুরুর প্রস্তাবও হতে পারে কিনা সে ব্যাপারেও আমার ঘোর সন্দেহ রয়েছে। রাজনীতির পক্ষগুলো যদি আদৌ কোন রাজনৈতিক সমাধান চায় তাহলে প্রস্তাব ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেই আসতে হবে।
২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। ২০ মাঘ ১৪২১। শ্যামলী।

সেই ফেরা আর হলো না by মনিরুল ইসলাম

(কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে মা–বাবার সঙ্গে তোলা এই ছবিটি মাইশা তার ফেসবুকে পোস্ট করেছিল। ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন ছবির দুই মানুষ—বাবা ও মেয়ে। সেখান থেকে ফেরার পথে আজ মঙ্গলবার ভোররাতে কুমিল্লায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় পুড়ে মারা গেছে মাইশা ও তার বাবা, মা হয়েছেন আহত।) কক্সবাজার থেকে আইকন পরিবহনের বাসে করে ফেরার পথে আজ মঙ্গলবার ভোররাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন যশোরের জাসদ নেতা নুরুজ্জামান পপলু ও তাঁর মেয়ে মাইশা তাসনিম। যশোর শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল সড়কে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল স্বজনেরা বিলাপ করছেন। নুরুজ্জামানের খালাত বোন আফরোজা পারভীন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘পেট্রলবোমা জামায়াত না আওয়ামী লীগ মেরেছে, তা আমরা জানি না। আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। মানুষের জীবন নিয়ে ওরা নাটক করছে।’
মাইশার বান্ধবী সানজানা ইসলাম নেহা জানাল, ‘গত শনিবার মাইশার সঙ্গে আমার ফেসবুকে সর্বশেষ কথা হয়। ফেসবুকে চ্যাট করার সময় ওকে লিখেছিলাম, “তুই চলে গেলি। তোকে অনেক মিস করছি।” জবাবে ও লিখেছিল, “তিন/চার দিন পরই তো ফিরে আসছি।” সেই ফেরা আর হলো না।’ বলেই নেহা কাঁদতে থাকে।
আফরোজা পারভীন বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার নুরুজ্জামান তাঁর ব্যবসার কাজে চট্টগ্রামে যাচ্ছিলেন। এ সময় মেয়ে মাইশা কক্সবাজারে বেড়ানোর বায়না ধরে। ওই বায়না তিনি আর ফেলতে পারেননি। স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে যান। সেখানে কাজ মিটিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যান। গতকাল রাতে আইকন পরিবহনে করে ফেরার সময় চৌদ্দগ্রামে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় বাসে আগুন ধরে যায়। এ সময় ভাবি কোনো রকমে জানালার কাচ ভেঙে বেরিয়ে আসেন। এর মধ্যে ভাই আর ভাইঝি পুড়ে মারা যায়।’ কক্সবাজারে বেড়াতে পেরে উচ্ছ্বসিত ছিল মাইশা। ১ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটার দিকে নিজের ফেসবুকে মা–বাবার সঙ্গে সমুদ্রের তীরে তোলা ছবি পোস্ট করে সে। এ নিয়ে বন্ধুদের কমেন্টসের জবাবও দেয়। সেই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে বাবা আর মেয়ে। স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে মা পাগলপ্রায়। পেট্রলবোমার আগুন মুহূর্তেই সব লন্ডভন্ড করে দিল। নুরুজ্জামান ছিলেন ঠিকাদার। এ ছাড়া তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) যশোর জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন বলে দলের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে। তাঁর মেয়ে মাইশা যশোর পুলিশ লাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ত। নিহত মাইশার বান্ধবী নেহা জানাল, স্কুলের শিক্ষা সফর নিয়ে অনেক পরিকল্পনা ছিল মাইশার। অবরোধের কারণে সেই সফর এখন স্থগিত। ‘কত্ত পরিকল্পনা ছিল ওর। কিছুই ওর দেখা হলো না, করা হলো না।’ মাইশার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল আজিজ বলেন, মাইশা অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পায়। প্রথম শ্রেণি থেকেই ও এই স্কুলে পড়ছিল। নিহত মাইশার বড় ভাই মাথিন ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি আর ওই দুর্ঘটনায় আহত মা মিলে লাশ নিয়ে ঢাকা থেকে যশোর যাবেন।

সেই রাতই কাল হলো মা-ছেলের by মনিরুজ্জামান

(দিনের তুলনায় রাতকে নিরাপদ মনে করে দুই ছেলে মুন্না আর শান্তকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে ফিরছিলেন মা আসমা আক্তার। কিন্তু সেই রাতই কাল হলো। আজ মঙ্গলবার ভোররাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোগনপুর এলাকায় আইকন পরিবহনের বাসে পেট্রলবোমা হামলায় পুড়ে মারা যান আসমা ও তাঁর ছোট ছেলে শান্ত। ছবি: সংগৃহীত) ‘মূলত নিরাপদে বাড়ি ফিরতেই ছেলেকে নিয়ে রাতে রওনা হয়েছিলেন আপা। তাঁর ধারণা ছিল, রাতের বেলা কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু সেই রাতই তাঁর জন্য কাল রাত হইল। বোন আর ভাগিনাকে পুড়ে মরতে হলো।’
কথাগুলো বলছিলেন আজ মঙ্গলবার ভোররাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোগনপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আইকন পরিবহনের বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়ে নিহত আসমা আক্তারের ছোট বোন হোসনা আক্তার (চুমকি)। এ ঘটনায় আসমার ছোট ছেলে শান্ত মিয়া (১৩) নিহত এবং বড় ছেলে মুন্না মিয়া (১৫) আহত হয়।
ক্ষোভের সঙ্গে চুমকি সরকারকে দায়ী করে বলেন, ‘সরকার একটু নমনীয় হলেও তো বিএনপি একটু শান্ত হতো। তাদের কারণেই আজকে আমার বোন আর ভাগিনাকে মরতে হলো।’ সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণেই এসব হামলা হচ্ছে, দাবি করে তিনি জড়িত লোকজনের শাস্তি দাবি করেন।
নিহত আসমার বাবার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় আসমা স্বামী মানিক মিয়াকে নিয়ে নরসিংদীর পলাশে থাকেন। গত শুক্রবার সকালে তিনি স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে মুন্না মিয়া ও শান্ত মিয়াকে নিয়ে নোয়াখালীতে শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। মুন্না পলাশ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। আর শান্ত একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গতকাল মঙ্গলবার রাতে আসমা ছেলেদের নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। আজ ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে আসমা ও তাঁর ছোট ছেলে শান্তসহ সাতজনের মৃত্যু হয়।
নিহত আসমার চাচাত ভাই মো. কামাল হোসেন বলেন, ঘটনার পরপর বড় ছেলে মুন্না বাস থেকে নেমে যায়। কিন্তু আসমা ও শান্ত বের হতে পারেনি। পরে মুন্না তাঁর বাবাকে মোবাইলে ঘটনা জানায়। পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাদাত হোসেন নিহত আসমা আক্তার ও তাঁর ছেলে শান্ত মিয়ার পরিচয় নিশ্চিত করেন।

হত্যার এক দিন পর লাশ ফেরত দিল বিএসএফ

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) একদল সদস্য বাংলাদেশে ঢুকে গুলি করে হত্যার এক দিন পর আজ মঙ্গলবার বিকেলে খেতমজুর নজরুল ইসলামের (৩৪) লাশ ফেরত দিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। হত্যার পর গতকাল নজরুলের লাশ সীমান্তের ওপারে নিয়ে যায় বিএসএফ। সেখানে ময়নাতদন্তের পর আজ নজরুলের লাশ হস্তান্তর করা হয়। গতকাল দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার বিনাইল ইউনিয়নের চাপড়া সীমান্তের ২৯৫ মেইন পিলারের কাছে বাংলাদেশের অন্তত ৫০ গজ ভেতরে নয়াপুকুরের পাড়ে ঢুকে এ হামলা চালায় বিএসএফ। এ সময় সাহাজুল ইসলাম (৪০) নামের আরেকজন খেতমজুর গুলিবিদ্ধ হন।
আজ বিকেল চারটার দিকে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার চাপড়া সীমান্তের ২৯৫ মেইন পিলারের কাছে নজরুলের লাশ হস্তান্তর করা হয়। ভারতের দ‌ক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট থানার পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) উৎপল চ্যাটার্জি নজরুলের লাশটি বিরামপুর থানার এসআই মমতাজুল হকের কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজিবি ২৯ ব্যাটালিয়নের রানীনগর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নজরুল ইসলাম ও ভারতের ৯৬ ব্যাটালিয়নের গুমসী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার কাশ্মীরি লাল। আরও উপস্থিত ছিলেন নিহত নজরুলের মামা মনসুর রহমান ও শ্যালক আরিফুল ইসলাম।
নিহত নজরুলের স্ত্রী পলাশী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সকালে একই গ্রামের মানিক মিয়া নামের এক ব্যক্তির জমিতে তাঁর স্বামী ধানের চারা রোপণ করছিলেন। আশপাশের খেতগুলোতে কাজ করছিলেন আরও ১০-১২ জন শ্রমিক। তাঁদের জন্য সকালের খাবার নিয়ে গেলে শ্রমিকেরা নয়াপুকুরে হাত-মুখ ধুতে যান। পুকুরের দক্ষিণ দিক থেকে বিএসএফের দুজন ও পশ্চিম দিক থেকে পাঁচজন সদস্য রাইফেল তাক করে আসতে থাকেন। এ সময় বিএসএফের সদস্যদের কাছে বাংলাদেশে আসার কারণ জানতে চান নজরুল। কোনো কথা না বলে তাঁকেই প্রথম গুলি করে বিএসএফ। গুলি তাঁর বুকে বিদ্ধ হয়। নজরুল সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে টেনেহিঁচড়ে নজরুলের লাশ সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়া হয়।

উড়োজাহাজ জব্দ- রাঙা প্রভাতের ভেতরে ৬১ কেজি সোনা

(শাহ্‌জালাল বিমানবন্দরে আটক স্বর্ণের বার ও চেইন l ছবি: প্রথম আলো) এবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নতুন কেনা উড়োজাহাজের কাঠামোর ভেতর লুকানো অবস্থা থেকে ৬১ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। ৪১৯ আসনের নতুন প্রজন্মের এই উড়োজাহাজটির (বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর) বিমানের দেওয়া নাম হচ্ছে রাঙা প্রভাত। ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা দামের উড়োজাহাজটি শুল্ক কর্তৃপক্ষ জব্দ করেছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার সকালে দুবাই থেকে যাত্রী নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে রাঙা প্রভাত। এরপর শুল্ক গোয়েন্দারা উড়োজাহাজটির ভেতরে বিশেষভাবে রক্ষিত সোনার বার ও অলংকার উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মইনুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ৪৮৫টি সোনার বার ও ১১৪টি সোনার চেইন পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে মোট ৬১ কেজি ২০০ গ্রাম সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
মইনুল খান বলেন, গোপন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা এ অভিযান চালান। তাঁদের কাছে তথ্য ছিল, সকাল সোয়া ১০টায় উড়োজাহাজটি অবতরণ করবে। কিন্তু তা প্রায় দুই ঘণ্টা আগে আটটা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। এ ছাড়া উড়োজাহাজটি বোর্ডিং ব্রিজের পরিবর্তে প্রকৌশল হ্যাঙ্গারের কাছাকাছি বে-তে ভেড়ানো হয়। তিনি বলেন, এসব বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানে ছিলেন এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ব্যাপক তল্লাশি চালানো পর উড়োজাহাজটির চারটি টয়লেটের আয়নার প্যানেলের স্ক্রু খোলার পর এর পেছনে বাক্সের মতো খালি জায়গায় ও বেসিনের দুই স্তর নিচে তৃতীয় স্তরে সুতা দিয়ে বেঁধে রাখা অবস্থায় এবং অক্সিজেন মুখোশ রাখার স্থানের পেছনে মোটা পাইপের প্রবেশ মুখে (মাস্ক চেম্বার) থেকে এসব সোনা উদ্ধার করা হয়।
ওই কর্মকর্তার মতে, এই ধরনের উড়োজাহাজের বিষয়ে পূর্ব প্রশিক্ষিত ও প্রকৌশল জ্ঞানসম্পন্ন বিমানকর্মীর যোগসাজশ ছাড়া এসব স্থানে সোনা রাখা এবং তা বের করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই উড়োজাহাজটি দুদিন পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রকৌশল হ্যাঙ্গারে যাওয়ার কথা ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তখন এসব সোনা বের করে বাইরে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল চোরাচালান চক্রের।
এই উদ্ধার অভিযানের খবর পেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবর রহমান শাহজালাল বিমানবন্দরে গিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় সন্দেহ হচ্ছে, এ ঘটনায় বিমানকর্মীদের কারও কারও সম্পৃক্ততা আছে। এ ঘটনায় কারা কারা জড়িত ছিল, তা আমরা খতিয়ে দেখছি। যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি বিমানের একটি উড়োজাহাজের মালামাল রাখার স্থান (কার্গো হোল) থেকে ১৪ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দুজন বিমানকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরপর গত ৩১ জানুয়ারি প্রায় দুই কোটি টাকার সোনাসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মচারী হাফিজুর রহমানকে আটক করেন শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
এরও আগে গত বছরের ২৪ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের (এয়ারবাস) ভেতর থেকে লুকানো অবস্থায় ১২৪ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় এনবিআর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১০ জনই বাংলাদেশ বিমানের কর্মী। এঁদের বিরুদ্ধে পরে বিমানবন্দর থানায় মামলা করা হয়েছে। অপর একটি সোনা পাচারের মামলায় বিমানের তিনজন পদস্থ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের এক হিসাবে বলা হয়, গত বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে তারা মোট ৬৫১ কেজি সোনা উদ্ধার ও ৭৫ জনকে আটক করেছে।

সরকারি জায়গায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা

(ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় সরকারি হালট দখল করে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা প্রতিহত করেছেন গ্রামবাসী। তাঁরা প্রাচীরের জন্য নির্মিত ১৮টি কলাম ভেঙে ফেলেছেন। পরে সেখানেই করেন মানববন্ধন। গত রোববার ডোবরা গ্রাম থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো) সরকারি জায়গা দখল করে পারটেক্স জুট মিল লিমিটেড কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন প্রাচীরের ১৮টি কলাম ভেঙে দিয়েছে এলাকাবাসী। গত রোববার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের ডোবরা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মিল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় মামলা করেছে। উপজেলা ভূমি কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ডোবরা মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের মোট ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ জমির সরকারি হালটে (সাধারণের চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা) সীমানাপ্রাচীরের জন্য গত বৃহস্পতিবার রাতে ১৮টি আরসিসি কলাম নির্মাণ শুরু হয়। গত শুক্রবার সকালে এলাকাবাসী নির্মাণকাজে বাধা দেয়। তখন দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহিদুজ্জমানকে জানানো হলে তিনি প্রাচীরের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
এলাকাবাসী জানান, এক দিন বিরতি দিয়ে রোববার সকাল থেকে মিল কর্তৃপক্ষ আবার প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করে। এরপর এলাকাবাসী সমবেত হয়ে বেলা ১১টার দিকে নির্মাণ করা কলামগুলো ভেঙে ফেলে।
সাতৈর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খোন্দকার সাজ্জাদ হোসেন জানান, হালটটি দখল হয়ে গেলে ডোবরা, শিবানন্দপুর, কেন্দু ডোবরা, লক্ষ্মীপুর ও মোহনপুর গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে মাঠ থেকে ধান কাটাসহ বিভিন্ন কাজের জন্য চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হবে।
উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের জরিপকারী (সার্ভেয়ার) এম মঞ্জু রোববার দুপুরে ওই হালটের মাপজোখ করেছেন। তিনি জানান, হালটটি অবস্থানভেদে ৩২ থেকে ৪০ ফুট প্রস্থ। মেপে দেখা গেছে, মিল কর্তৃপক্ষ হালটটির পাঁচ থেকে আট ফুট জায়গা দখল করে সীমানাপ্রাচীরের কলাম নির্মাণ করেছিল।
এ বিষয়ে পারটেক্স জুট মিল লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) কাওসার আলী মোল্লা বলেন, বড় ইন্ডাস্ট্রির সীমানাপ্রাচীর লাগে। এ জন্য তাঁরা কলাম নির্মাণ করেছিলেন। এই কলামগুলো হয়তো সরকারি জায়গায় ঢুকে গিয়েছিল। প্রশাসন মাপজোখ না করে পুনরায় কাজ করতে বারণ করেছিল। তাঁরাও আর কাজে হাত দেননি। কিন্তু রোববার কাজ শুরুর অজুহাত দিয়ে গ্রামবাসী নির্মাণ করা কলামগুলো ভেঙে ফেলেছে।

প্রতিবাদ জানাতে এসে বিবাদ

(সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গতকাল বিকেলে কর্মসূচি পালনকালে আমজনতার সদস্যদের শাসাচ্ছেন শিক্ষক নেতা ফারুক আহমদ (বাঁয়ে) । পুলিশ তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছে l ছবি: প্রথম আলো) কর্মসূচি এক! দেশজুড়ে নৈরাজ্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। কিন্তু সংগঠন ছিল দুটি। দুই পক্ষ একই সময়ে মাইক ব্যবহার করায় কারও বক্তব্যই ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে দুই পক্ষই মাইক বন্ধ করে দেয়। শুরু হয় বিবাদ-বিসংবাদ। তা থেকে হাতাহাতির উপক্রম। শেষে পুলিশ এসে তাঁদের নিবৃত্ত করে। গতকাল সোমবার বিকেলে সিলেট নগরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস) ও আমজনতা বাংলাদেশ নামের দুটি সংগঠনের কর্মসূচি পালনের সময় এ ঘটনা ঘটে।
বাকবিশিস সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের দাবিতে তারা জেলা ও মহানগর শাখার উদ্যোগে মানববন্ধনের আয়োজন করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বেলা তিনটার দিকে তাঁরা সেখানে গিয়ে দেখেন, একই দাবিতে আমজনতা বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘বিপন্ন মানবতা, পুড়ছে দেশ, মরছে মানুষ...’ ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি চলছে। মাইক ব্যবহার করে তাঁরা সে সময় বক্তব্য দিচ্ছিল। একই সময়ে বাকবিশিসও মাইক ব্যবহার করে মানববন্ধন থেকে বক্তব্য দিতে শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, বাকবিশিসের মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসাধারণ সম্পাদক ফয়েজ আহমদ বক্তব্য দেওয়ার সময় আমজনতার মাইক বন্ধ রাখতে বলা হয়। কিন্তু সেখানে গণদাবি পরিষদ নামের একটি সংগঠনের নেতা বক্তব্য দেওয়ায় মাইক বন্ধ করতে পারছিলেন না। এ সময় বাকবিশিসের নগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ জোর করে মাইক বন্ধ করতে গেলে তাঁর সঙ্গে আমজনতার নেতা-কর্মীদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে ফারুক আমজনতার নেতা-কর্মীদের দিকে তেড়ে গেলে হাতাহাতির উপক্রম হয়। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সেখানে গিয়ে দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করে। পরে আমজনতার মাইক বন্ধ রেখে বাকবিশিসের মানববন্ধন পালনের ব্যবস্থা করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমজনতার এক সদস্য অভিযোগ করেন, প্রবীণ এসব নেতাকে ফারুক আহমদ গালমন্দ শুরু করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল। আর ফারুক আহমদ দাবি করেন, তিনি কাউকে ধমক দেননি। ধমকা-ধমকির ছবি রয়েছে বলে তাঁকে জানালে ফারুক বলেন, ‘আমাদের ফয়েজ ভাই (আ.লীগ নেতা ও শিক্ষক) যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন ওদের অবস্থান কর্মসূচি থেকে দালাল বলা হয়। এ কথা শুনে কিছুটা রেগে গিয়েছিলাম আরকি!’

আরব বসন্ত: বিপ্লব শেষ হয়নি by কামাল গাবালা

২৫ জানুয়ারি বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকীতে মনটা খুব ভার। আকাশে-বাতাসে বিষণ্নতা ভেসে রয়েছে, যার মূল সুর হচ্ছে রক্ত, বিভাজন, মতানৈক্য ও বিষাদ। না, সেটা শুধু সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের মৃত্যুতে বিপ্লবের বার্ষিকী উদ্যাপন বাতিল করার কারণে নয় বা সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের দুই ছেলেকেই আদালতের সিদ্ধান্তে ছেড়ে দেওয়ার কারণে নয়, মিসরীয় নাগরিকের মধ্যেই এই দিবসের গুরুত্ব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বাড়ছে, সে কারণেও বটে। মিসরীয়রা তর্কে মেতে উঠেছে, ২৫ জানুয়ারি দিনটি আসলে কী: বিপ্লব-বিদ্রোহ, নাকি ষড়যন্ত্র—অনেকে যা দাবি করে থাকে।
কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার। ২০১৫ সালের এই ২৫ জানুয়ারিতে মিসরীয় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও সহিংস প্রতিবাদকারীদের মধ্যকার সংঘর্ষে ২৩ জন মারা যায় আর ৯৭ জন আহত হয়, সরকারি তথ্যমতে।
আরও বিয়োগান্ত ব্যাপার হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলাহীন সিনাই উপদ্বীপেও ২৫ জানুয়ারির পরে ৩০ জন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হয়েছেন।
মিসরীয়রা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন ব্রিটিশ লেখক রিচার্ড স্পেন্সার। যেসব আরব দেশে তথাকথিত আরব বসন্ত হয়েছে, সেখানকার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ-বিষয়ক এক নিবন্ধে তিনি তা উল্লেখ করেছেন। ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ২৩ জানুয়ারি তা ছাপা হয়। এই নিবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে: ‘আরব বসন্তের বিপর্যয়কর বিজয়’। এতে বলা হয়েছে:
‘ট্র্যাজেডি শব্দটির অধিক ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু আরব বসন্তের জন্য এটা যথাযথই মনে হয়। বিমান ধ্বংস, ভূমিকম্প, মারাত্মক অসুস্থতা—এগুলো সবই দুঃখজনক, বিপর্যয়করও বটে। কিন্তু তার মধ্যে গ্রিক নাটকের উপাদানের কিছু অভাব রয়েছে—দর্শক নিজের মুখে হাত রেখে নীরবে নিজের মধ্যে অভিনেতার প্রতি চিৎকার করে বলছে: এটা কোরো না, আক্ষেপ করবে।’
রিচার্ড স্পেন্সার বলেন, ‘রোববার আমরা হোসনি মোবারকের উৎখাতের লক্ষ্যে সংঘটিত প্রথম উন্মুক্ত প্রতিবাদের চতুর্থ বার্ষিকী উদ্যাপন করলাম। এরপর পার হওয়া প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে প্রতিবাদকারী, সরকার ও রাজনৈতিক আন্দোলন জড়িয়ে আছে। পশ্চিমা ও অন্য নেতাদের বারবার বলা হয়েছে, তারা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা বিপর্যয়ের সৃষ্টি করবে—তার পরও সেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।’
স্পেন্সার আরও বলেন, আরব বসন্তে টালমাটাল হওয়া দেশগুলোর মধ্যে মিসরই কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে সেটা হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও কারাগারে আরও হাজার হাজার নিপীড়িত মানুষের বিনিময়ে অর্জিত। সিরিয়ার দ্বন্দ্ব-সংঘাত শেষ হওয়ার আগে লাখো মানুষ মারা পড়বে এবং নিপীড়নের শিকার হবে। আর লিবিয়া তো ইসলামপন্থী, জাতীয়তাবাদী, ফেডারেলিস্ট ও অন্য নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। ইয়েমেনে শিয়া জঙ্গিরা (হুতি) প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘেরাও করে রয়েছে, আর বাকি দেশটা নিয়ন্ত্রণ করছে আল-কায়েদা।
বিদেশি বিশ্লেষকেরা এ বিষয়ে যা বলছেন, তা এক বিন্দুতে মিলে যাচ্ছে। স্পেন্সার বলেন, ২৫ জানুয়ারি এই বার্ষিকীর বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু মানুষ এটা পালন করবে, নীরবে। মিসরের বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা তাহরির স্কয়ারের বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরা অধিকাংশই এখন কারাগারে। অনেকেই মারা গেছেন। আর মিসরের পার্টি ও অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থানে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থাৎ, বিপ্লব বার্ষিকী উদ্যাপন করা ঠিক হবে, নাকি প্রতিবাদ করা উচিত?
এদিকে সরকার দেশজুড়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে। সরকার দাবি করছে, সন্ত্রাসবাদী মুসলিম ব্রাদারহুড ও তার মিত্ররা ২৫ জানুয়ারি বিশৃঙ্খলা, অন্তর্ঘাত ও সহিংসতা ঘটানোর হুমকি দিয়েছিল। ফলে তাহরির স্কয়ারে ঢোকার মুখে ট্যাংক বসানো হয়, এর প্রতিটি প্রবেশপথেই সশস্ত্র গাড়ি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।
মিসরীয়দের মধ্যে যতই বিতর্ক থাকুক, সময় আসবে, যেদিন মিসরীয়রা যথাযথভাবে এই বিপ্লব উদ্যাপন করবে; তা এই বিপ্লবকে ছিনতাই করার যতই অপচেষ্টা ও নেতৃস্থানীয় তরুণদের গালাগাল করা হোক না কেন।
‘২৫ জানুয়ারি...বিপ্লব সম্পন্ন হয়নি’—শিরোনামে সাংবাদিকতা সিন্ডিকেটের সাবেক প্রধান মাকরাম মোহামেদ আহমেদ বলেন, অধিকাংশ মিসরীয় বিশ্বাস করে, ২৫ জানুয়ারির ঘটনা জনপ্রিয় বিদ্রোহের তরিকায় পড়ে, তবে এর কোনো নেতৃত্ব ও সুনির্দিষ্ট পথ ছিল না। খুব নগণ্যসংখ্যক মানুষ মনে করে, এই বিপ্লব সম্পদসম, যা ব্রাদারহুডের ষড়যন্ত্রে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে আর নেতৃস্থানীয় তরুণেরা হাজারো দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে গেছে।
মাকরাম আরও বলেন, মিসরের স্বার্থেই ২৫ জানুয়ারি সংঘটিত হয়েছে। এটা মানুষকে বদলে দিয়েছে, নিপীড়ন চিরতরে শেষ করে দিয়েছে। এর ফলে দ্বিতীয় বিপ্লবের পথ তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদরহুডের শাসন শেষ হয়েছে। তিন বছরে দুই প্রেসিডেন্টের বিচার হয়েছে। ‘গণতন্ত্রই সমাধান’—এই স্লোগান সামনে রেখে মিসর সংস্কারের পথে হেঁটেছে।
২৫ জানুয়ারি বিপ্লব যে অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকেছে, তার শেষ প্রান্তে আলো দেখা যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। ২০১৩ সালের ৩ জুলাই যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল, তার অর্জনগুলো এতে প্রতিভাত হচ্ছে। বছরজুড়েই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন হয়েছে। মিসরীয় নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং একজন সর্বজনীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যিনি শুধু কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করেন না। এই কর্মসূচির তৃতীয় দিক বাস্তবায়নে আগামী মার্চে সংসদীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। আর দেশে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত স্থিতাবস্থা ফিরে এসেছে, মোবারকের পতনের পর সব নেতার ভুল, বাড়তি কথা ও অপরাধ সত্ত্বেও।
পর্যবেক্ষকেরা বলেন, তিউনিসিয়ার অবস্থা মিসরের চেয়ে অনেক ভালো। তাদের অবস্থা গাদ্দাফি-উত্তর লিবিয়ার মতো হয়নি বা আলী আবদুল্লাহ সালেহর পতনের পর ইয়েমেনের মতো হয়নি। আর ওদিকে সিরিয়া গৃহযুদ্ধের কারণে রক্তগঙ্গায় ভাসছে।
পর্যবেক্ষকেরা এ ভেবে বিস্মিত হন যে তিউনিসিয়া কীভাবে সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ পার হলো আর মিসরকে কেন এত দাম দিতে হচ্ছে।
উত্তরটা এ রকম: তিউনিসিয়ার বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। সেখানে সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটেছে খুব কম। একই সময়ে মিসর মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে এক অন্ধকার সময় পার করেছে। তারার মিসরকে ধর্মীয় রাষ্ট্র বানিয়ে এর চরিত্রই বদলে দিতে চেয়েছে। ফলে মানুষ এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত হয়, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ে। স্থিতাবস্থা পুনরুদ্ধারের স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনী তার লাঠি নিয়ে নামে, যেটা অনেকটা প্রবাদের পর্যায়েই চলে গেছে।
ওদিকে লিবিয়ায় দুই সরকারের শাসন চলছে। তাদের কেউ কাউকে স্বীকৃতি দেয় না। আর সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কোনো না কোনো পক্ষ নিয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। আর ইয়েমেনের বেশির ভাগ জায়গা সশস্ত্র হুতিদের দখলে চলে গেছে। পুরো দেশটিই সশস্ত্র লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে।
আরব বসন্ত নামক বিপ্লবের অভিঘাতে ২০১৫ সালটি আরব দেশের মানুষের জন্য নাটকীয়তা, দুর্ভাগ্যজনক প্রত্যাশা ও বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে। একতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য কী মূল্য দিতে হয়, তা শুধু আল্লাহই জানেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কামাল গাবালা: মিসরের আল-আহরাম পত্রিকা গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক।

ভূমিখেকোদের কবলে যমুনা- ‘প্রশাসন ম্যানেজ, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে’ by আব্দুল মোমিন

(পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটের পশ্চিম পাশে ১০০ থেকে ২০০ গজের মধ্যে যমুনা নদীর পার থেকে এভাবে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে ঘাট দুটি ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো) বিআইডব্লিউটিএ’র আওতাভুক্ত কোনো নদী বা নদীর পাড় থেকে মাটি কাটার অনুমতি না থাকলেও মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনার পাড় থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট। অভিযোগ উঠেছে, শিবালয় উপজেলা জাতীয় পার্টির (এরশাদ) সাধারণ সম্পাদক রমজান আলীসহ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী এই মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত। তাঁরা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে উৎকোচ দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করছেন। অভিযুক্ত রমজান আলী বলেন, ‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করা হয়েছে। সাংবাদিকদেরও ম্যানেজ করার জন্য যোগাযোগ করা হবে।’
বাংলাদশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা কার্যালয়ের বন্দর কর্মকর্তা মো. এনামুল হক বলেন, বিআইডব্লিউটিএর আওতাভুক্ত দেশের কোনো নদী বা নদীর পাড় থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয় না। বন্দর এলাকার আশপাশে মাটি কাটা ঝুঁকিপূর্ণ। মাটি কাটা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে তিনি জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেছেন। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা সূত্র জানায়, মো. হানিফ নামের এক ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নের ধুতরাবাড়ী মৌজায় তাঁর মালিকানাধীন জমি থেকে শর্তসাপেক্ষে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী রমজান আলী, শামীম হোসেন, মো. হানিফ, মোন্তাজ উদ্দিন ও আওলাদ হোসেন।
সূত্রটি জানায়, শর্ত অনুযায়ী সরকারি স্থাপনা থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে মাটি কাটা যাবে না। ক্ষতি করা যাবে না সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমি বা পরিবেশের। কিন্তু সেসব শর্ত না মেনে ২০ জানুয়ারি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, পাটুরিয়া ইউটিলিটি ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটের উজানে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ গজের মধ্যে নদীর পাড় থেকে দুটি স্থানে এস্কাভেটর দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। সেই মাটি ট্রাকযোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। ভরাট করা হচ্ছে সেসব এলাকার ফসলি ও নিচু জমি। প্রতি ট্রাক মাটি ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা জানান, মাটি কাটার স্থানের উত্তর পাশে ২০০ গজ দূরে পাটুরিয়া বাসটার্মিনাল ও পাটুরিয়া নতুন বাসটার্মিনাল সংযোগ সড়ক। মাটি কাটার কারণে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বর্ষা মৌসুমে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও সংযোগসড়ক ভাঙনের কবলে পড়তে পারে।
যোগাযোগ করলে মাটি কেটে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মো. হানিফ বলেন, এখানে মাটি কাটার কারণে সরকারি কোনো স্থাপনার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পার্টির নেতা রমজান আলীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস গতকাল রোববার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, কাগজপত্র দেখে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়ার মালিক স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি)। মাটি কাটার কারণে পাটুরিয়া ঘাট হুমকির মুখে পড়লে তিনি সরজমিনে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় কুমিল্লায় মধ্যরাতের হত্যাযজ্ঞ

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়ানো শেষে তিন বন্ধুকে নিয়ে রাতের বাসে ঢাকায় ফিরছিলেন ২৩ বছর বয়সী ফারুক আহমেদ। কিন্তু অর্ধেক পথ পার হওয়ার পরেই কুমিল্লায় তাদের বাসের ওপর পেট্রোল বোমা ছোঁড়া হয়।
আগুনে হাত পুড়ে যাওয়ায় তিনি আর বাড়িতে ফিরে যেতে পারেননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এই ওয়েল্ডিং শ্রমিকের চিকিৎসা চলছে। তবে এতে তার সাত সহযাত্রী আগুনে পুড়ে বাসের ভেতরেই কয়লা হয়ে গেছেন।
আহত হয়েছেন আরো প্রায় ২৫ জন। তাদের মধ্যে ফারুকসহ ছ’জনকে চিকিৎসার জন্যে বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়েছে যাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর।
ফারুক আহমেদ বলেছেন, তিনি ঠিক জানেন না কে বা কারা এই হামলা চালিয়েছে। কারণ সেসময় তিনিসহ বাসের প্রায় সব যাত্রীই ঘুমিয়ে ছিলেন।
তার অনুমান বাসটি তখন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে এবং রাত তখন আড়াইটা থেকে তিনটার মতো বাজে।
ঘুমের ঘোর কেটে যাওয়ার আগেই তিনি দেখতে পান যে বাসের চারদিকে আগুন জ্বলছে।
তিনি বলেন, ‘বাসের চারপাশে যখন আগুন জ্বলছে তখন এক বন্ধু আমাকে ডেকে তুললো। বললো, আগুন লাগছে। এক সেকেন্ডের মধ্যে আমি চারদিকে দেখি বাসের ভেতরে আগুন ছাড়া আর কিছুই নাই।’
তিনি তখন সাথে সাথে জানালা খুলে বাস থেকে লাফ দিয়ে অক্ষত অবস্থায় নেমে যান এবং বাসের ভেতরে আরো যারা ছিলেন তাদের খোঁজ নিতে শুরু করেন।
‘আমি দেখলাম রাস্তার ওপর একজন পুড়ছে। তিনি রাস্তায় পড়ে আছেন কিন্তু তার জামাকাপড় পুড়ছে।’
তাকে বাঁচাতে গেলে ফারুক আহমেদের হাত দুটো পুড়ে যায়। ডাক্তাররা বলছেন, তার শরীরের দুই শতাংশ পুড়ে গেছে।
কিন্তু তিনি যাকে বাঁচিয়েছেন তার পুড়েছে কুড়ি শতাংশ।
এক সপ্তাহ আগে কয়েক বন্ধুকে নিয়ে ফারুক কক্সবাজার গিয়েছিলেন বেড়াতে, কিন্তু হরতালের কারণে ফিরতে পারছিলেন না।
‘হোটেলে থাকছি, ঘুরছি আর খাচ্ছি। কিন্তু বাড়ি থেকে ফোনে বললো একটা জরুরি বিষয়ে বাড়িতে আসা দরকার। তখন বাসের টিকেট কিনে ঢাকার জন্যে রওনা দেই।’
কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসার পথে এই বাসটির ওপরেই ছোঁড়া হয় পেট্রোল বোমা
ফারুক আহমেদ মনে করেছিলেন বিশেষ ব্যবস্থায় হাইওয়েতে গাড়ি চলছে। তাই হয়তো কোনো অসুবিধা হবে না।
তিনি জানান, অর্ধেকটারও বেশি পথ ভালোভাবেই এসেছিলেন তারা। তারপরই হঠাৎ করে এই ‘দুর্ঘটনা’ ঘটেছে।
তিনি জানান যে বাসের কোনো সিট খালি ছিলোনা। তার ধারণা বাসটিতে ৫৫ থেকে ৬০ জনের মতো যাত্রী ছিল।
খবর পেয়ে ফারুকের মা মানিকগঞ্জ থেকে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন।
বিছানায় একমাত্র ছেলে ফারুকের মাথার পাশে বসেছিলেন তিনি।
বললেন, ‘ও বেড়াইবার গেছিলো। দরকার কইয়া আনাইছি। রাইত কইরা বাসে উইঠা ও বিপদে পাইড়া গেছে।’
সূত্র: বিবিসি

‘পুরো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’ -তপন চৌধুরী

তপন চৌধুরী
চলমান রাজনৈতিক অবস্থায় শুধু ব্যবসায়ীরা না, পুরো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি তপন চৌধুরী। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিটিএমএ কার্যালয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তপন চৌধুরী। ১২ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী কাল বুধবার শুরু হচ্ছে। এ জন্য এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। বাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাবে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়েও কথা বলেন।
চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে তপন চৌধুরী বলেন, ‘শুধু আমরা না, পুরো দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা কঠিন অবস্থার মধ্যে আছেন। বেশ কিছু ক্রেতা ইতিমধ্যে ফিরে গেছে। কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। ’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, ‘কারখানা চলছে। তবে বন্দর থেকে কাঁচামাল আনতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া গুনতে গিয়ে প্রতিদিনই ক্ষতি বাড়ছে। এমন অবস্থায় ক্রেতারা উল্টো দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে। তারা বলছে, “এই পরিস্থিতির মধ্যেও তোমাদের আমরা ক্রয়াদেশ দিচ্ছি। ” ভাষাটা এমন যে, ক্রেতারা আমাদের দয়া করছে। ’
সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভারত, চীন বা ভিয়েতনামের জন্য আলাদা কোন ভালোবাসা নাই। তারা যে দেশ থেকে কম দাম ও দ্রুত পণ্য সরবরাহ পাবে, সেখানেই কাজ দেবে। আমরা ক্রেতাদের এসব চাহিদা পূরণ করতে পেরেছি বলেই আজকের এই অবস্থান পৌঁছেছি। তাই কীভাবে আমরা বলি, সবকিছু সুন্দর চলছে। ক্রেতারা যাবে না। ’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান অবস্থা যত দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষয়ক্ষতি তত বাড়বে।
ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে সহায়তা চাইবেন কি না, জানতে চাইলে তপন চৌধুরী বলেন, ‘ক্ষতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়তই কথা হচ্ছে। আমাদেরও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ থাকতে হয়। আমরা তো সরকারকে বলতেই পারি, তবে সরকারই বা কোথা থেকে দেবে। আমাদের ইনকামের টাকাই তো রাজস্ব খাতে যায়। সরকার তো আর টাকা ছাপায় না যে, চাইলাম আর দিয়ে দিল। ’
বিটিএমএর সভাপতি বলেন, ‘আজ আমরাই যখন ক্ষতিগ্রস্ত, পুরো শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত, তখন সরকারের হাত কীভাবে শক্তিশালী হবে? সরকার তো আকাশ থেকে টাকা এনে দেবে না। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সরকার অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাধ্যমতো সহায়তা করবে। ’
বিটিএমএর সভাপতি তপন চৌধুরী বলেন, গত বছর প্রাইমারি টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাতে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। এটি তার আগের বছরের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অবকাঠামো, গ্যাস ও বিদ্যুৎ চাহিদামতো পাওয়া গেলে ২০২১ সালের মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ৫ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিটিএমএর সহসভাপতি ফজলুল হক, শওকত আজিজ ও আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, পরিচালক আবদুল মান্নান মিয়া, চ্যান চাওয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টাইগার লিন প্রমুখ।
পোশাক খাতের যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী শুরু কাল
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে দেশের উদ্যোক্তাদের পরিচয় ঘটানো ও স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে ১২ তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের যন্ত্রপাতির প্রদর্শনী কাল বুধবার শুরু হচ্ছে। বিটিএমএর সঙ্গে তাইওয়ানের চ্যান চাও ইন্টারন্যাশনাল ও হংকংয়ের ইর্য়োকার্স ট্রেড অ্যান্ড মার্কেটিং সার্ভিস কোম্পানি যৌথভাবে চার দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীটির আয়োজন করছে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিটিজি নামের এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
এবারের প্রদর্শনীতে ৩৩ দেশের ৮৮০ টি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। ১৬ টি হলে এসব প্রতিষ্ঠানের এক হাজার ৬০ টি বুথ থাকবে। প্রদর্শনীর এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে ১২ টি প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দেওয়া হবে। শনিবার পর্যন্ত প্রদর্শনী প্রতিদিন দুপুর ১২ টা রাত ৮ টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানান হয়, প্রদর্শনীর মাধ্যমে বস্ত্র ও পোশাকশিল্পের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্পিনিং, উইভিং, ডায়িং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং টেস্টিং, ওয়াশিং, এমব্রয়ডারি, সেলাইয়ে সর্বশেষ প্রযুক্তি ও উন্নতমানের যন্ত্রপাতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। প্রয়োজনে মেলা প্রাঙ্গণ থেকে কিনতেও পারবেন। গত বছর ডিটিজিতে ২০ কোটি ডলারে যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়।

বার্ন ইউনিটে ১৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

(ফেনীতে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ রাজমিস্ত্রি নওশেদ। তাঁর দেহের ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। পরম মমতায় যন্ত্রণাকাতর বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে ছোট্ট ছেলে আরিফ হোসেন। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের দৃশ্য l ছবি: আশরাফুল আলম) অবরোধ-হরতালে সহিংসতায় দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ১৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল সোমবার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন এ কথা জানিয়েছেন। সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে জানান, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ও হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে চিকিৎসাধীন ১৪ জনের অবস্থা বেশ খারাপ। বাকি রোগীদের অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে।
গতকাল বার্ন ইউনিটের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, অবরোধ-হরতাল চলাকালে আগুনে দগ্ধ ১০২ জন এ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৫২ জন। দগ্ধ হয়েছিলেন এমন ৪৩ জন রোগী চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে গেছেন। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গতকাল ৩৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, শিগগির ৫০০ শয্যার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ১০টি বিছানার ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১২টি বিছানার বার্ন ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সাতজন। সর্বশেষ গত রোববার দুপুরে মারা যান নূরে আলম। গত ২৩ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ ২৮ জনের মধ্যে তিনি একজন।

বাহাদুর শাহের সমাধি, ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস by সোহরাব হাসান

জীবনসায়াহ্নে নির্বাসিত সম্রাট বাহাদুর শাহ
বাহাদুর শাহ জাফরের একটি বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি: কী দুর্ভাগ্য জাফরের, যে জমিন সে ভালোবাসত/ সেই জমিনে তাঁর সমাধির জন্য দুই গজ জায়গা হলো না।
সত্যি, ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহের ঠাঁই হয়নি ভারতের মাটিতে। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে মিয়ানমারে নির্বাসনে পাঠান। ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর সেখানেই তিনি মারা যান।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ডালরিমপন তাঁর লাস্ট মোগল (২০০৬) বইয়ে লিখেছেন, ‘সিপাহি বিদ্রোহ যখন শুরু হয় তখন বাহাদুর শাহ দিল্লির একটি বাড়িতে ছিলেন। মিরাট থেকে ৩০০ জনের একটি বিদ্রোহী দল এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করে, যার মধ্যে সিপাহি ও অন্যান্য পেশার মানুষ ছিলেন। তাঁরা বাহাদুর শাহ জাফরকে এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে বললে তিনি রাজি হন। এরপর বাহাদুর শাহ হয়ে ওঠেন ভারতের কোটি কোটি মানুষের বিদ্রোহ ও ঐক্যের প্রতীক। ১৮৫৭ সালের জানুয়ারিতে মিরাট ও ব্যারাকপুরে শুরু হওয়া বিদ্রোহ সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু চার মাসের মাথায় ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমন করে এবং তারা কবি ও যুবরাজ মোল্লা ও কামাক্ষা, সুফি ও পণ্ডিত—সবাইকে পাকড়াও করে ফাঁসি দেয়, ধ্বংস করে প্রাসাদ, মসজিদ, ঈদগাহ, বাগান ও ঘরবাড়ি। ২১ সেপ্টেম্বর বাহাদুর শাহ আত্মসমর্পণের পরদিন মেজর উইলিয়াম হাডসন তাঁর দুই পুত্র মির্জা মোগল ও মির্জা খিলজি সুলতানকে গুলি করে হত্যা করেন। অবশ্য কয়েক মাস পর তিনিও লক্ষ্ণৌতে কুর্দি বেগমের হাতে নিহত হন।
১৮৫৮ সালের ২৭ জানুয়ারি দিল্লিতে বাহাদুর শাহের বিচার শুরু হয় এবং শেষ হয় ৯ মার্চ। আদালত তাঁকে মিয়ানমারে নির্বাসনে পাঠানোর সুপারিশ করেন। প্রথমে দিল্লি থেকে কলকাতায় এবং কলকাতা থেকে জাহাজে করে তাঁকে ইয়াঙ্গুনে পাঠানো হয়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জিনাত মহল, দুই পুত্র জওয়ান বখত ও আব্বাস বখত, পুত্রবধূ রওনক জাহান ও এক নাতনি।
ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত শোয়ে ডন প্যাগোডার পূর্ব পাশে ৬ জিওয়াকা সড়কের একটি বাড়িতে বাহাদুর শাহ ও তাঁর স্বজনদের রাখা হয়। তখন এটি ছিল সেনাছাউনি। তাঁদের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র চারটি কক্ষ। সেখানে বাহাদুর শাহকে লেখার কলম ও কাগজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর বাহাদুর শাহ মারা গেলেও নতুন বিদ্রোহের আশঙ্কায় সে খবরটি তখনই জানানো হয়নি। নেলসন ডেভিস ব্রিটিশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানান এক সপ্তাহ পর। দিল্লিতে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয় ১৫ দিন পর। জীবনের শেষ বেলায় তাঁর তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ডারিস লিখেছেন: আবু জাফর শুক্রবার ভোর পাঁচটায় মারা গেছেন। ওই দিন বিকেল পাঁচটায় তাঁর দাফন সম্পন্ন করা হয় ইসলামি রীতি অনুযায়ী। একজন মাওলানা তাঁর জানাজা পড়ান। পাঞ্জাব হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি জিডি গোমেজ তাঁর বই দ্য লাস্ট মোগল-এ লিখেছেন, তাঁর কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয় এবং ওপরে ঘাসের আচ্ছাদন।
১৮৬৭ সালে বাহাদুর শাহের পরিবারের সদস্যদের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। জিনাত মহল মারা যান ১৮৮৬ সালের ১৭ জুলাই। দীর্ঘ কারাবাসে জওয়ান বখতের স্ত্রী জামানি বেগম গুরুতর অসুস্থ এবং পরে অন্ধ হয়ে যান। শাহজাদা আব্বাস ইয়াঙ্গুনের এক মুসলিম ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করেন। তাঁদের বংশধরদের কেউ কেউ এখনো ইয়াঙ্গুনে বসবাস করছেন।
ভারতীয়রা দীর্ঘদিন বাহাদুর শাহের সমাধি সম্পর্কে কিছু জানতেন না। ১৯০৩ সালে ভারতের একটি প্রতিনিধিদল প্রথম বাহাদুর শাহর সমাধি পরিদর্শন করেন। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নের কারণে সেই সমাধিটি তখন আর চেনা যাচ্ছিল না। ১৯০৫ সালে ইয়াঙ্গুনের মুসলমানরা বাহাদুর শাহের সমাধি চিহ্নিত করার দাবি জানান; ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সমাধির ওপর পাথরখচিত ফলক বসায়, যাতে লেখা ছিল: বাহাদুর শাহ, দিল্লির সাবেক রাজা ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর এর কাছেই মারা গেছেন। স্থানীয় মুসলমানরা বাহাদুর শাহকে ক্ষমতাবান সুফি বাদশাহ হিসেবে সম্মান করেন এবং এখনো তাঁর কাছে দোয়া নিতে আসেন।
উইলিয়াম ডালরিমপনের ভাষায়, বাহাদুর শাহ ছিলেন একজন ক্যালিওগ্রাফার, সুফি, ধর্মতত্ত্ববিদ, মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের পৃষ্ঠপোষক ও আধ্যাত্মিক কবি। খুল্লিয়াতে জাফর নামে তাঁর একটি কবিতার সংকলন আছে। তিনি ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সমুন্নত রেখেছিলেন।
ইয়াঙ্গুনের আলো ঝলমল বিশালকায় ইমারতগুলোর মধ্যে এই প্রায় জীর্ণ দোতলা সমাধিটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। সমাধি অঙ্গনে ঢুকতেই বাঁ দিকে বাহাদুর শাহের কয়েকটি আঁকা ছবি ও ফলক চোখে পড়ে, ডান দিকে ছোট্ট অভ্যর্থনা কক্ষ। খোলা চত্বর পার হয়ে কিছুটা সামনে এগোতে বাঁ দিকের কক্ষে তিনটি কবর বাহাদুর শাহ জাফরের স্ত্রী জিনাত মহল এবং দুই পুত্র মির্জা জওয়ান বখত ও মির্জা শাহ আব্বাসের। দেয়ালে দুই যুবরাজের মাথায় বাবরি ও টুপি পরা ছবি। তার পাশে ১৮৭২ সালে জিনাত মহলের একমাত্র আলোকচিত্র, বাহাদুর শাহ ও জিনাত মহলের আরবিতে লেখা নিকাহ্নামা, আরেকটি ফলকে বাহাদুর শাহের হাতের লেখার ক্যালিওগ্রাফি শোভা পাচ্ছে। এই কক্ষে আরও আছে ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে শাহ জাফর ও তাঁর দুই পুত্রের ছবি, গায়ে চাদর, নির্লিপ্ত চোখ, পায়ে জুতা, জিনাত মহলের তরুণ বয়সের একটি ছবি, আরেকটি ফলকে শাহ জাফরের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ।
নিচের তলায় বাহাদুর শাহের সমাধি, সবুজ গিলাফে ঢাকা, অনেক দিনের পুরোনো। দেয়ালের একটি ছবিতে বাহাদুর শাহকে হুক্কা হাতে শোয়া অবস্থায় দেখা যায়, তাঁর জীবনের শেষ দিনের ছবি। আরেকটি ছবিতে সামরিক আদালতে বিচারের পর তাঁকে সেনা প্রহরায় নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য; তৃতীয়টিতে দেখলাম তিনি শিষ্যদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিচ্ছেন। সমাধির বাইরে দানবাক্স আছে, ভক্তরা যে যা পারেন সাহায্য করেন। ইয়াঙ্গুনের বাইরে থেকেও মুসলমানরা আসেন বাহাদুর শাহের সমাধি দেখতে। একজন খাদেম বললেন, এটি পরিচালিত হয় স্বেচ্ছাদানে; সরকার থেকে অর্থ নেওয়া হয় না। মিয়ানমারের মুসলমানরা তাঁকে শুধু শেষ মোগল সম্রাট হিসেবে দেখে না; দেখেন একজন সুফি ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে। অনেকে দরগাহে মানতও করেন। সামনের খোলা চত্বরের দেয়ালে ভারত ও পাকিস্তানের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কয়েকটি আলোকচিত্র। বাংলাদেশের কোনো নেতা এলেও তাঁদের ছবি নেই। বর্তমান সমাধি ভবনটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯১ সালে, ভারত সরকারের সহায়তায়। এর দেয়ালে লেখা আছে ‘এই হলটি সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গিত’।
অবিভক্ত ভারতের মানুষের কাছে বাহাদুর শাহের সমাধি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ১৯৪১ সালে বাহাদুর শাহের সমাধিতে ফুল দিয়েই ‘দিল্লি চলো’ প্রচারণা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ মিয়ানমার পার হয়ে পূর্ব ভারতের ইম্ফল পর্যন্ত দখল করে নিয়েছিল। ১৯৮৭ সালে রাজীব গান্ধী সমাধি পরিদর্শনকালে লিখেছিলেন, যদিও আপনি (বাহাদুর শাহ) ভারতের জমিন পাননি, তবে এখানে পেয়েছেন, আপনার নাম এখনো জীবন্ত। আমি ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।’
পরের কিস্তি: মিয়ানমারে এক টুকরো বাংলাদেশ
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

এক দেশে বাস, আরেক দেশে স্কুল

(সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলে যাচ্ছে মেক্সিকোর শিক্ষার্থীরা) ১৬ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী ফেবে আরা বসবাস করে এক দেশে আর তার স্কুল আরেক দেশে। সে থাকে উত্তর মেক্সিকোর শহর সিউদাদ হুয়ারেযে। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে স্কুল করতে যায় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের শহর এল পাসোতে।
‘আমি প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠি, তারপর সাড়ে ৬টার মধ্যে পুল পেরিয়ে ঢুকে যাই আমেরিকায়,’ প্রতিদিনের রুটিন ব্যাখ্যা করে বলছিল ফেবে।
‘এই সেতু অতিক্রম করা অনেকটা অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। তবে শীতকালে অভিজ্ঞতাটা একেবারেই উপভোগ করার মতো নয়।’
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকোর সীমান্ত পেরিয়ে ফেবে এবং তার ১০/১৫ জন বন্ধু যায় এল পাসোর স্কুল লিডিয়া প্যাটারসন ইনস্টিটিউটে, স্থানীয়ভাবে যাকে ডাকা হয় লা লিডিয়া নামে।
লা লিডিয়ায় আসা অনেক শিক্ষার্থীরই পাসপোর্ট মেক্সিকান। যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াতের জন্য তাদের রয়েছে স্টুডেন্ট ভিসা।

চীন-ভারত সম্পর্ক নতুন যুগে

চীন-ভারত সম্পর্ক এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বেইজিং সফরে গেলে শি জিনপিং এ মন্তব্য করেন। সোমবার গ্রেট হলে এক সাক্ষাতে জিনপিং বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরে আমার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।’ চীনা প্রেসিডেন্ট জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে। তিনি বলেন ‘আমার পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস রয়েছে নয়াদিল্লি-বেইজিংয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সমুজ্জ্বল।
আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নে যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।’ এ সময় তিনি মোদির নিজ শহরে দেয়া উষ্ণ আতিথ্যের প্রশংসা করেন। বাজার উন্মুক্তের আশা দিল্লির : ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও ভারত আশা করছে চীন তাদের কোম্পানির জন্য বাজার উন্মুক্ত করবে। একইসঙ্গে দিল্লি ভারতে চীনা কোম্পানিকে সহজে ব্যবসা করতে দেয়ারও অঙ্গীকার করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোববার ভারত-চীন মিডিয়া ফোরামে বক্তৃতাকালে বলেন, গত কয়েক দশক ধরে উভয় দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কারণে দু’দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ছে। চীন বর্তমানে আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বেইজিংয়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের চীন সফরের সময়েই বেইজিংয় এসেছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ। ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধন শক্তিশালী করতে সচেষ্ট চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফরের পর এশিয়া অঞ্চলে রাশিয়া ও ভারতকে কৌশলে কাছে রাখছে বেইজিং। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সার্গেই লাভরভকে বলেন, রুশ-চীন সম্পর্ক অত্যন্ত অসন্তোষজনক। গত কয়েক বছরে দুই দেশ উন্নয়ন ও কৌশলগত সম্পর্কে পরস্পরের কাছাকাছি এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।’
ভারত-মার্কিন সম্পর্ক চীনের হুমকি নয় : ওবামা
ভারত-মার্কিন সম্পর্ক চীনের জন্য হুমকি নয় বলে আশ্বস্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামার সর্বশেষ নয়াদিল্লি সফরে বেইজিংয়ের শীতল প্রতিক্রিয়া ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের চীন সফরের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। রোববার সিএনএনের একটি টকশোতে ওবামা বলেন, আমি বিশ্বাস করি সবার জন্য সমান লাভজনক নীতি অনুসরণের এখনই সময়। আমরা কিছু সাধারণ নীতি অনুসরণ করে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির দিকেই যাচ্ছি। অন্যের ক্ষতির মূল্যে নয় বরং পারস্পরিক উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্য দিয়েই এ সমৃদ্ধি সম্ভব। এ সব বিষয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে আমার। ওবামা আরও বলেন, অস্থিতিশীল, দরিদ্র ও খণ্ডিত চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাম্য নয়। শান্তিপূর্ণ উপায়ে চীনের সার্বিক অগ্রগতি দেখাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সুখকর।

আদালত নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য কতটা যৌক্তিক? by মিজানুর রহমান খান

কখনো বিরল সময় আসে যখন এটা ধরা পড়ে যায় যে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যদিও বা দুর্বলভাবে লেখা আছে কিন্তু নির্বাহী বিভাগ সেই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশেষ করে ক্ষমতার পৃথক্করণে, রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণে তাদের বিশ্বাস ঠুনকো। এবারে তা ঈষৎ মূর্ত হলো ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের মতো একটি ‘মামুলি’ বিষয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর তির্যক মন্তব্যে।  দুই যুযুধান বড় দল কখনো চায়নি, মূলত আদালতের রায়ের কারণেই, শক্তিশালী প্রশাসন ক্যাডারের বিস্ফারিত চোখের সামনে এক-এগারোর সরকারের সময় জবরদস্তি পৃথক্করণ ঘটেছিল। আমাদের অভিজাত আমলাতন্ত্র এটা মেনে নিতে পারেনি, তথাকথিত ভ্রাম্যমাণ আদালত করে বিচারে ভাগ বসিয়ে তারা যার বদলা নিয়েছে, নির্বাহী বিভাগের মুখপাত্র হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যেন এত দিনে সেই ধূমায়িত ক্ষোভের কথা জানালেন। অন্তত অনেকের কাছে এমনটা মনে হতে পারে। এখানে বলে নেওয়া ভালো, এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মনোভাবও ভিন্নতর কিছু ভাবার কারণ নেই। একটি রাষ্ট্র কাকে, কীভাবে, কী মর্যাদায় দেখে, তার একটা প্রতিফলন ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে ঘটে। বিষয়টি কিছুটা প্রতীকী হলেও আদতে এর মধ্যে শাসক ও রাষ্ট্রের চিন্তাভাবনার ছাপ মেলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) বিচারকদের মর্যাদা বাড়িয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় নৈতিকতাবিরোধী।’ গত ২৮ জানুয়ারি সংসদে জাতীয় পার্টির সদস্যের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তাঁর দায়মুক্তি বিবেচনায় যথাযথ নয় এমন কিছু মন্তব্য করেছেন। সংসদ নেতার এ রকম বক্তব্য অনেকের কাছেই অসংগত ও অস্বাভাবিক ঠেকতে পারে। বিচারিক আদালত হলো বিচারব্যবস্থার প্রাণ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বরাবরই বিচারকদের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ঠাওরেছে। তাই আমলাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেতন বাড়াতে গিয়েই জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন একদা মাসদার হোসেন মামলার জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বেতন-ভাতার সমস্যা আজও ঘুচল না। জেলা জজদের মর্যাদাক্রম নিয়ে আলোচ্য রিট মামলার উৎপত্তি। একটি উদাহরণ দিই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে দুই বন্ধু বের হলেন। একজন পিএসসির মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে ঢুকলেন। অন্যজন জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন। একজনের সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ সচিব। অন্যজনের সর্বোচ্চ পদ জেলা ও দায়রা জজ। অথচ ১৯৮১ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস ব্যাচের সদস্যদের এখনো ডিসিদের সমান মর্যাদায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ’৮৪-র প্রশাসন ক্যাডারের ব্যাচ থেকেও ইতিমধ্যে সচিব হয়েছেন। ইদানীং যুগ্ম সচিবদের গাড়ি কিনতে এককালীন ২৫ লাখ টাকা ও প্রতি মাসে ৪৫ হাজার টাকার রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দিয়েছে সরকার। জ্যেষ্ঠ জেলা জজরা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কারণ, তাঁরা এখনো যুগ্ম সচিব নন। যদিও শতকরা ২৫ ভাগের বেশি গরিব মানুষের দেশের যুগ্ম সচিবদের ২৫ লাখ টাকা দামের গাড়ির দরকার আছে কি না, সেটা করদাতার মনে বড় প্রশ্ন হওয়া স্বাভাবিক।
প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘নিজেরাই নিজেদের মর্যাদা বাড়ানোর রায় কোনোমতেই সমীচীন নয়। এ ধরনের রায় পক্ষপাতমূলক’, যখন তিনি বলেন, ‘এ রকম হলে যে যেখানে আছে, যার যার মতো করে সুযোগ নেবে। কোনো শৃঙ্খলাই থাকবে না’ তখন আমাদের মনে পড়ে এক-এগারোর পর কী করে জেনারেল পদ এবং ২০১২ সালে প্রায় এক ডজন সিনিয়র সচিবের পদ রাতারাতি সৃষ্টি হতে পেরেছিল। আর এই যে আমাদের বিদ্যমান প্রিসিডেন্স আদেশ, যা তৈরি হয়েছিল ’৮৬-র সেনাশাসনে, সেটা আমলাতন্ত্রের নিজেদের চাপানো রায় ছাড়া আর কী?
প্রধানমন্ত্রী মনে করেন ‘বিচার বিভাগের এই সিদ্ধান্তের ফলে একটি চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির উপক্রম হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি নিয়মনীতি আছে।’ ২০১০ সালে হাইকোর্টের শুনানিতে অ্যাডভোকেট রব চৌধুরী এই ‘নিয়মনীতির’ যুক্তি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে প্রিসিডেন্স রদবদল করা সরকারের কাজ, আদালতের নয়। হাইকোর্ট পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন, কথা সত্য। কিন্তু সরকারের যে নির্বাহী আদেশ অন্যায্য ও পীড়নমূলক, তার বৈধতা পরখ করতে আদালতের হাত লম্বা।
প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি উক্তি হলো, ‘আমাদের সংবিধানে বলা আছে, সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।’ না তো, এ কথা সংবিধান বলেনি। এ রকম সরলীকরণ সেই আমলারা করে থাকেন, যাঁরা কখনো পৃথক্করণ মানেননি, কখনো মানবেন না। হাইকোর্টের রায়ে একটি গাইডলাইন দেওয়া হয়েছিল। আট দফা নির্দেশাবলিতে যদিও জেলা জজ ও সমমর্যাদাসম্পন্ন বিচারকদের চিফস অব স্টাফদের ওপরে স্থান দেওয়ার কথা ছিল। ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের অপারেটিভ অংশে কিন্তু তাই বলে নির্দেশাবলিকে বাধ্যতামূলক করেনি। সেখানে বরং বলা আছে, জেলা জজদের ‘উপযুক্ত মর্যাদা’ দিতে।
গত চার বছর বসে না থেকে সরকার তো ওই গাইডলাইনের আলোকে একটা সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে পারত। ভারত সেই ১৯৭৯ সালে ভারতরত্ন খেতাবপ্রাপ্তদের সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের ওপরে স্থান দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের আমলা বা তদীয় সরকারগুলো কোনো বেসামরিক খেতাবধারী কাউকে জায়গা দেওয়ার কথা ভাবতে পারেনি। সরকার নিজে নিয়ম মানেনি, যা দীর্ঘকাল আগেই তার করণীয় ছিল, সেটা তো সে করেইনি, বরং উল্টো এখন সরকারপ্রধান আদালতকে দুষছেন। বলছেন, ‘কেউ যদি নিয়ম না মেনে হঠাৎ করে তাদের ইচ্ছামতো একটি ঘোষণা দিয়ে দেয়, তাতে বিশৃঙ্খলা হয়।’ সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক। আর সেটা ক্ষমতাসীনদের মুখেই এত দিন তারা যথেষ্ট শুনেছে। ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় এবং তাতে বর্ণিত দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার নির্দেশনা অগ্রাহ্য করা প্রসঙ্গে ‘বিশৃঙ্খলা’ শব্দটি আমরা কখনো শুনতে পাইনি। তবে মনোভাবের কথা যেটা শুরুতে বলেছিলাম, সেটা ‘সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ কথার মধ্যে সুস্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী কর্মচারী নন। বিচারকেরাও কর্মচারী নন। কিন্তু সচিবেরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। বিচারপতি মোস্তাফা কামাল মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে গেছেন। বলেছেন, ‘চাকরি সূত্রে বিচারকেরা কর্মচারী নন। কারণ, তাঁরা সার্বভৌম বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। মন্ত্রী ও সাংসদদের মতো তাঁরাও পাবলিক অফিস হোল্ড করেন।’ অথচ প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘আমার অবাক লাগে, কার অবস্থান কোথায়, সেটা সংবিধানে সুনির্দিষ্ট করা আছে।’
শেখ হাসিনা আশার একটি জায়গা রেখেছেন। বলেছেন, ‘বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দেশ নয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ কীভাবে চলে, সেটা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।’ একজন জ্যেষ্ঠ সচিব আমাকে বলেছেন, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদকে জেলা জজদের একটু ওপরে তুলে (কারও মতে পৃথক প্রিসিডেন্স করে দিয়ে) দিয়ে একটা আপসের কথা বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীও অবগত ছিলেন। পরে তা এগোয়নি। এখন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইনমন্ত্রী আলোচনা করছেন। সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ ভারতে ৬ নম্বর ক্রমিকে প্রধান বিচারপতির নাম আগে ও পরে স্পিকার আছেন। বাংলাদেশেও আগে তা-ই ছিল। এখন নেই কেন? পাকিস্তানের মতো আগে স্পিকার ও পরে প্রধান বিচারপতি না লিখলে কী ক্ষতি? ভারত ও পাকিস্তান দুটোই ফেডারেল সরকার। ভারতের কেন্দ্রীয় প্রিসিডেন্সে জেলা জজ নেই, পাকিস্তানে আছে। ভারতীয় রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্রীয় প্রিসিডেন্সের আলোকেই পৃথক আদেশ জারি করে থাকে। তবে রাজ্যগুলো কেন্দ্র থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মোদির গুজরাটে দেখলাম, প্রিন্সিপাল জজ (জ্যেষ্ঠতম জেলা জজ) রাজ্যসচিবের এবং জেলা ও দায়রা জজ যুগ্ম সচিবের সমান। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রিসিডেন্সে ফেডারেল সচিব বেশ ওপরে। তবে লক্ষণীয়, এর ২৪ নম্বর ক্রমিকে জেলা ও দায়রা জজ আর ২৬ নম্বর ক্রমিকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের নিচে ডিসিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। সুতরাং দুটি দেশের অভিজ্ঞতার নিরিখে প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য বিচার্য যে, ‘জেলা জজের মর্যাদা যদি সচিবের সমান হয়, তাহলে উচ্চ আদালতে যাঁরা আছেন, তাঁরা কোন মর্যাদায় যাবেন? যেতে যেতে তো মনে হয় তাঁরা রাষ্ট্রপতির ওপরেই চলে যাবেন।’
বিচারকদের বেতন-ভাতা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান আমাদের মাসদার হোসেন মামলার আদিতে নিয়ে গেছে। আগেই বলেছি, দুই দলই কখনো পৃথক্করণ চায়নি, চায় না। কারণ, আমলা দিয়ে দেশ শাসন কিংবা গদি সামলানোর প্রয়োজন এতটাই তীব্র যে নীতি–আদর্শ বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীনদের কথিতমতে বাস্তবানুগ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা আলাদা একটি পে–কমিশন করে বেতন বাড়িয়ে নিয়েছিল। সেটা নিয়েও নানা রকমের সমস্যা হয়েছিল। পরে আমরা বসে মিটমাট করে একটা জায়গায় গিয়েছি।’ আসল সত্যটা হলো এই যে ১৯৯৯ সালে মাসদার হোসেন মামলার রায় হলে আওয়ামী লীগ প্রমাদ গুনেছিল। রায় মতে, তারা জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন ও পে–কমিশন গঠন করতেই চায়নি। সে কারণে তারা এর বিরুদ্ধে রিভিউ করেছিল। কিন্তু তাতে তারা ১৮ জুন, ২০০১ হেরে যায়। এরপর বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পে–কমিশন যাও বা হলো, তার সুপারিশ তারা মানছে না।
শেষ করব প্রধানমন্ত্রীর কথায় ভরসা রেখেই। পে–কমিশনে বীতশ্রদ্ধ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আওয়ামী লীগের গত আমলে প্রশ্নের জবাবে আমাকে বলেছিলেন, বিচারকদের বেতন-ভাতা জানতে তিনি একটি দলকে ভারত পাঠিয়েছেন খোঁজ নিতে। আশা করব তিনি তাঁর সেই মিশনের ফলাফল জাতিকে অবহিত করবেন। বিচারকদের বেতন-ভাতা ভারত ও পাকিস্তানেও বহুগুণ বেশি। অধিকতর যোগ্যদের বিচারক করতে চাইলে এ পথে যেতে হবে। বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দেশ হতে পারে না। বিভিন্ন দেশ কীভাবে চলে, সেটা অবশ্যই আমাদের সবাইকে বিবেচনায় নিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক ৷
mrkhanbd@gmail.com

জার্মানি থেকে ভারত

মোটরসাইকেলেই বিশ্বভ্রমণের অভিযাত্রী স্টিফান রেইনার জার্মানি থেকে ভারতে পৌঁছেছেন। ৩২ বছর বয়সী এই মোটর অভিযাত্রীর প্রিয় বাহন ইয়ামাহ এক্সটিজেড ৬৬০।
গত বছরের ৩ অক্টোবর নিজের বাড়ি ফ্রেইবার্গ থেকে যাত্রা শুরু করে ১৬ হাজার কিমি. পথ পাড়ি দিয়ে গত মঙ্গলবার চেন্নাইয়ে পৌঁছেছেন। ওয়াগাহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন গত ৩ ডিসেম্বর দ্য হিন্দু

তিন দলের ত্রিমুখী আক্রমণ

নয়াদিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের আর তিনদিন বাকি। জমে ওঠা শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন তারকা রাজনীতিবিদরা। নগরীর বিভিন্ন জায়গায় বিজেপি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং আম আদমি পার্টি প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে জনসভা করতে দেখা যাচ্ছে। আগামী ৭ ফেব্র“য়ারি বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে প্রচারণাকালে তিন দলই একে অন্যকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করছে। সোমবার ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নতুন একটি পোস্টার প্রকাশ করে। এতে কেজরিওয়ালকে ব্যঙ্গ করে ধরনা রাজনীতির নেতা হিসেবে ব্যঙ্গ করা হয়। তাকে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। আম আদমি পার্টির প্রধান কেজরিওয়াল এজন্য বিজেপিকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। না হয় তিনি এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করারও হুমকি দেন।
এছাড়া কংগ্রেস মুখপাত্র অভিষেক মনু সিং সমাজকে বর্ণ ও গোত্রে বিভাজিত করার জন্য বিজেপিকে দায়ী করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রোববার আয়োজিত এক জনসমাবেশে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, উভয় দলই মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। ক্ষমতায় থাকাকালে কংগ্রেস দিল্লিবাসীর পানিসমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনডিএ সরকার পরে এ সমস্যার সমাধান করেছে। নরেন্দ্র মোদি কেজরিওয়ালের সমালোচনা করে বলেন, জনগণ একবারই ভুল করেছে, বার বার করবে না। এক বছর আগে দিল্লিবাসী অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভোট দিয়েছিল কিন্তু আপনারা তাদেরকে পেছন থেকে ছুরি মেরেছেন এবং তাদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছেন। দিল্লি প্রতারকদের আর ভোট দেবে না। সোনিয়া গান্ধী রোববার জনসমাবেশে বিজেপির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মোদি সরকার ভূমি দখলের পথ প্রশস্ত করেছে। তিনি মোদি ও কেজরিওয়ালের সমালোচনা করে বলেন, একজন হলেন প্রচারক, অন্যজন ধরনাবাজ।

মেসি-নেইমারে আলোয় বার্সা

কোপা দেল রে’র কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যাটলেটিকো বধের পর আরেকটি অগ্নিপরীক্ষায় উতরে গেল বার্সেলোনা। গোল আর পাল্টা গোলে দারুণ জমে ওঠা স্নায়ুক্ষয়ী এক ম্যাচে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ভিয়ারিয়ালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে কাতালানরা। রোববার ন্যুক্যাম্পে লা লীগার এই থ্রিলার ম্যাচে দু’বার পিছিয়ে পড়া বার্সার মান বাঁচিয়েছে সেই মেসি-নেইমার জুটি। প্রত্যাবর্তনের শুরু নেইমারের গোলে। এরপর জয়সূচক গোল করে তুলির শেষ আঁচড়টা টানেন মেসি।
বছরের প্রথম ম্যাচে হারার পর সব মিলিয়ে এটি বার্সার টানা অষ্টম জয়। সংকট কাটিয়ে বার্সাকে আলোয় ফিরিয়েছেন মূলত মেসি ও নেইমার। শেষ সাত ম্যাচে ১৭ গোল করেছেন এই লাতিন যুগল। ২৮ গোল করে লা লীগার টপ স্কোরার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। যথাক্রমে ২২ ও ১৫ গোল নিয়ে রোনাল্ডোর পেছনে আছেন মেসি ও নেইমার। পয়েন্ট টেবিলেও রিয়াল মাদ্রিদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে বার্সা। রোববারের রোমাঞ্চকর জয়ে শীর্ষে থাকা রিয়ালের (৫১) সঙ্গে ব্যবধান এক পয়েন্টে কমিয়ে এনেছে কাতালানরা (৫০)। ৪৭ পয়েন্ট নিয়ে তিনে রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। পরশু এস্পানলকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চারে উঠে এসেছে সেভিয়া (৪২)। পয়েন্ট টেবিলের ছয় নম্বর দল হলেও সব মিলিয়ে টানা ১৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ড নিয়ে ন্যুক্যাম্পে এসেছিল ভিয়ারিয়াল। কোপা দেল রে’র সেমিফাইালে মুখোমুখি হওয়ার আগে বার্সাকে যেন সতর্ক বার্তাই দিয়ে গেল তারা। যদিও ম্যাচে শুরুটা ভালোই করেছিল স্বাগতিকরা। ২১ মিনিটের মধ্যে দুই গোলে এগিয়ে যেতে পারত বার্সা। কিন্তু দু’বারই ফাঁকায় বল পেয়েও গোল করতে পারেননি লুইস সুয়ারেজ। উরুগুয়ের ফরোয়ার্ডের ব্যর্থতায় চাপে পড়ে যায় বার্সা। মেসিদের হতভম্ব করে ৩০ মিনিটে এগিয়ে যায় ভিয়ারিয়াল। খেলার ধারার বিপরীতে নিজেদের প্রথম আক্রমণ থেকেই গোল করে বসেন ভিয়ারিয়ালের চেরিশেভ।
বিরতির ঠিক আগে চলতি মৌসুমে নিজের ২২তম গোল করে বার্সাকে সমতায় ফেরান নেইমার। আসল নাটক জমে ওঠে দ্বিতীয়ার্ধে। চার মিনিটেই তিন গোল! ৫১ মিনিটে দুর্দান্ত এক প্রতিআক্রমণ থেকে ভিয়ারিয়ালকে ফের এগিয়ে দেন ভিয়েতো। দু’মিনট না যেতেই রাফিনহার গোলে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকরা। উজ্জীবিত বার্সা ৫৫ মিনিটে এগিয়ে যায় ৩-২ গোলে। পুরো ম্যাচে পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকা মেসি ডান-পায়ে দুর্দান্ত এক গোল করে সবটুকু আলো টেনে নেন নিজের দিকে। রোমাঞ্চকর জয়ের পর বার্সা বস লুইস এনরিকে মেতেছেন মেসি-নেইমার বন্দনায়, ‘তাদের মতো খেলোয়াড় দলে থাকাটা যেকোনো কোচের জন্য আশীর্বাদ। মুহূর্তেই তারা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।’ ডিপ থার্ডের বদলে ইদানীং মেসিকে ডানদিকের উইংয়ে খেলাচ্ছেন এনরিকে। দলের মঙ্গলের কথা ভেবেই নাকি এই পরিবর্তন, ‘দলের ভালোর জন্যই ফের মেসিকে উইংয়ে খেলানো হয়েছে। তবে মাঠজুড়ে খেলার স্বাধীনতা তার আছে। আসলে আমাদের চাওয়া, মেসির কাছে যেন আরও বেশি বল যায়।’ এএফপি/ওয়েবসাইট।

সাম্প্রতিক

সম্প্রতি অভিনেতা অপূর্বর ছেলে জায়ান ফারুক আয়াশ আট মাসে পা রেখেছে। এ উপলক্ষে গত শুক্রবার প্রথম আয়াশের বাবা অপূর্ব ও মা অদিতি আদরের ছেলের মুখে ভাত তুলে দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটালেন। এটি পুরনো রীতি হলেও সময়ের আধুনিকতায় এখন অনেকেই ভুলতে বসেছেন।
তবে কেউ কেউ সেই পুরনো ঐতিহ্য এখনও অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। অপূর্ব তাদেরই একজন। সেদিন ছোট্ট আয়াশকে দোয়া করতে হাজির হয়েছিলেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারিন। তারিনের কোলে ছোট্ট আয়াশ এবং পাশে অপূর্বর বিশেষ এই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছেন অভি মঈনুদ্দীন

পেট্রলবোমায় পুড়ে কয়লা সাতজন

(ছবি:-১ দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে বাসের ভেতরই সাতজন মারা যান। তাঁদের লাশ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়। ছবিটি সকাল আটটার দিকে তোলা। ছবি: এম সাদেক, কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামে ছবি:-২ আইকন পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসে আজ ভোররাতে পেট্রলবোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। পুড়ে যাওয়া বাসটিকে সকাল সাতটার দিকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ছবি: এম সাদেক, কুমিল্লা) ভোর হলো না। গন্তব্যে পৌঁছাও গেল না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। ভোররাতে গুপ্তঘাতকের মতো যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। বাসের মধ্যেই পুড়ে কয়লা হয়েছেন সাতজন। আহত ও দগ্ধ অন্তত ১৬ জন। আজ মঙ্গলবার ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়া বাজার-সংলগ্ন জগমোহনপুর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আইকন পরিবহনের বাসে এই হামলা হয়। আহত যাত্রী ও হাসপাতাল সূত্রের বিবরণ অনুসারে নিহত ব্যক্তিরা হলেন—যশোর সদর উপজেলার নুরুজ্জামান পাপলু ও তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে মাইশা, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার আবু তাহের ও আবু ইউসুফ, নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার আসমা বেগম ও তাঁর ছেলে শান্ত এবং ঢাকা কাপ্তানবাজারের ওয়াসিম।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন, প্লাস্টিক ও কসমেটিক বিভাগের সার্জন সহকারী অধ্যাপক মির্জ্জা মো. তাইয়েবুল ইসলাম বলেন, পুড়ে নিহত সাতজনের লাশ কলেজের মর্গে রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের বিবরণ থেকে জানা যায়, আইকন পরিবহনের বাসটি যাত্রী নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকা ফিরছিল। ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে বাসটি জগমোহনপুর এলাকায় পৌঁছে। এ সময় বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। সঙ্গে সঙ্গে বাসে আগুন ধরে যায়। আগুনে পুড়ে বাসের ভেতরই সাতজন মারা যান। আহত ও দগ্ধ হন অন্তত ১৬ জন।
আহত সাতজনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। দগ্ধ নয়জনকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। সেখান থেকে সাতজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়া সাতজন হলেন—কক্সবাজারের মো. হানিফ (৩৫) ও মো. রাশেদুল ইসলাম (২০), মানিকগঞ্জের মো. ফারুক আহমেদ (২৩) ও মো. জিলকদ (১৯), ফরিদপুরের মো. আরিফ শিকদার (৩০), নারায়ণগঞ্জের মো. শফিকুল ইসলাম (১৮) এবং মো. শরিফ (২৫)।
চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম চক্রবর্তী বলেন, দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধের ২৯ দিন আজ। এ ছাড়া রোববার থেকে চলছে ৭২ ঘণ্টার হরতাল।

৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ চলছে। এর দুই দিন আগেই সহিংসতার শুরু। সহিংসতায় এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আগুন দেওয়া হয়েছে চার শতাধিক যানবাহনে। আরও প্রায় ৫০০টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে।

রুশ পাঠাগারে আগুন

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর অন্যতম বৃহত্তম একটি ইন্সটিটিউটের লাইব্রেরি আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ১০ লাখেরও বেশি ঐতিহাসিক দলিলপত্র ধ্বংস হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। এ দুর্ঘটনাকে সাংস্কৃতিক ‘চেরনোবিল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ইন্সটিটিউট অব সায়েন্টিফিক ইনফরমেশন অন সোশ্যাল সায়েন্সেসের (আইএনআইওএন) দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। আগুন লাইব্রেরির দু’হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলেও অগ্নিনির্বাপক দলের প্রায় ২শ’ সদস্য শনিবার সন্ধ্যায়ও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। পরে মধ্যরাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্সটিটিউটটিতে এক কোটিরও বেশি দলিলপত্র রয়েছে।
এসবের মধ্যে ১৬শ’ শতকের পুরনো দলিলও রয়েছে। রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমির প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির ফোরতভের উদ্ধৃতি দিয়ে রাশিয়ার সংবাদ সংস্থাগুলো জানায়, ‘বিজ্ঞানের জন্য এটি বড় ধরনের ক্ষতি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম সংগ্রহ। সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের সমপরিমাণ বই ও দলিলপত্র এখানে রয়েছে।’ তিনি ১৯৮৬ সালে ঘটে যাওয়া পরমাণু দুর্যোগের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘যা ঘটেছে তাকে চেরনোবিল দুর্ঘটনার সঙ্গেই তুলনা করা যায়।’ ফোরতভ বলেন, লাইব্রেরির প্রায় ১৫ শতাংশ সংগ্রহ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হওয়া এসব সংগ্রহে স্লাভিক ভাষার মূল্যবান ডকুমেন্ট ছিল। আরও ছিল ব্রিটেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রেরও ডকুমেন্ট। তিনি কমারসেন্ট এফএম রেডিওকে বলেন, দলিলপত্র ধ্বংস হওয়ার অন্যতম কারণ অগ্নিনির্বাপক দলের ছোড়া পানি। আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা পানির কারণেই অনেক ডকুমেন্ট নষ্ট হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। রুশ সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা আগুন লাগার কারণ জানার চেষ্টা করছেন। তবে প্রাথমিকভাবে অগ্নিকাণ্ডের জন্য বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে দায়ী করা হচ্ছে। এএফপি।

দ্বিতীয় জাপানির শিরশ্ছেদ

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) দ্বিতীয় জাপানি জিম্মি কেনজি গোতোর শিরশ্ছেদের দাবি করে শনিবার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র নিন্দা জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, শনিবার রাতে ইন্টারনেটে ওই জাপানি সাংবাদিকের শিরশ্ছেদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটির যথার্থতা যাচাই করে জাপান বলেছে, ঘটনা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, জাপান সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবে না এবং আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশগুলোকে তার সহায়তা জোরদার করবে। তাদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতা করবে জাপান। আইএস তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশগুলোকে জাপান সহায়তা দেয়ার কারণেই দেশটির নাগরিকদের জিম্মি করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে। এর আগে জাপানের আরেক নাগরিক হারুনা ইউকাওয়ার শিরñেদের ভিডিও প্রকাশ করে আইএস। ওই ঘটনার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে গোতোর শিরñেদের ভিডিও প্রকাশ করা হল।
বিশ্বব্যাপী নিন্দা : শিরশ্চেদের এ ঘটনায় জাতিসংঘ, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন জাপানি সাংবাদিক কেনজি গোতোর ‘বর্বর হত্যাকাণ্ডের’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বানের মুখপাত্র বলেন, ‘মহাসচিব আইএস ও অন্যদের হাতে জিম্মি সবাইকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেয়ার জন্য আবারও আহবান জানিয়েছেন।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসের হাতে জাপানি নাগরিক ও সাংবাদিক কেনজি গোতোর ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ‘কেনজি গোতোর জঘন্য ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া ওলাঁদ বলেন, আইএসের হাতে জাপানি সাংবাদিক কেনজি গোতোর বর্বর হত্যাকাণ্ডের তিনি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোটও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এএফপি, বিবিসি।
কেনজি বেঁচে নেই!
ইসলামিক স্টেট (আইএস) জিহাদিদের হাতে জিম্মি দ্বিতীয় জাপানির মা ‘শোক প্রকাশের ভাষা খুঁজে’ পাচ্ছেন না। তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। রোববার গোতোর মা জুঙ্কো ইশিদো জানান, তিনি তার ছেলের মৃত্যুর কথা বর্ণনা করার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। তিনি টোকিওর উপকণ্ঠে তার বাড়িতে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টের। কিন্তু কেনজি বেঁচে নেই।’ এই শোকাহত মা আরও বলেন, ‘আমার ছেলের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমার যে কেমন লাগছে তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
জিম্মিকে বাঁচাতে ‘সবকিছু’ করবে জর্ডান
জিহাদি গোষ্ঠী আইএস তাদের হাতে আটক এক জাপানি সাংবাদিককে হত্যা করার পর জর্ডান ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর হাতে আটক তাদের এক পাইলটের জীবন বাঁচাতে সাধ্যমতো সবকিছু করার প্রতিজ্ঞা করেছে। সরকারের মুখপাত্র মোহাম্মদ আল-মোমেনি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পেত্রাকে বলেন, সরকার গত ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর জিহাদিদের হাতে আটক হওয়া পাইলট মাজ আল-কাসাসবেহর জীবন বাঁচাতে এবং তার মুক্তি নিশ্চিত করতে যা কিছু সম্ভব সবই করবে।

সাব্বির অহনার ষোল কলা

সুলতান মিয়া নামের একজন সহজ-সরল সাধারণ মানুষের গল্প নিয়ে সম্প্রতি নির্মিত হল টেলিফিল্ম ‘ষোল কলা’। সজল আহমেদের রচনায় এটি পরিচালনা করেছেন রিয়াজুল রিজু। গল্পে দেখা যাবে, সুলতান মিয়া গ্রামীণ হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো নিয়ে সব সময় মেতে থাকে। এতে সুলতান মিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাব্বির আহমেদ।
তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন অহনা। আরও অভিনয় করেছেন মামুনুর রশিদ, ডলি জহুর, দিলারা জামান, লাবণ্য লি-সহ আরও অনেকে। শিগগির এটি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান। প্রসঙ্গত, পরিচালক রিয়াজুল রিজু এ টেলিফিল্ম ছাড়াও সম্প্রতি মাসুম রেজার কাহিনী ও সংলাপে ‘বাপজানের বায়স্কোপ’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করছেন। ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

কুমিল্লায় বাসে পেট্রল বোমা হামলায় নিহত ৭ by জাহিদ হাসান

বিরোধী জোটের হরতাল-অবরোধের মধ্যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি বাসে পেট্রল বোমা হামলা চালিয়েছে দুবৃত্তরা। এতে এখন পর্যন্ত সাত জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৬ জন। গুরুত্বর আহত নয় জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোহনপুরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি নৈশ কোচ (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪০৪৮) মঙ্গলবার ভোর রাত সাড়ে ৩টার দিকে চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজারসংলগ্ন জগমোহনপুর নামক স্থানে পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা বাসটি লক্ষ্য করে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে বাসটির ভিতরে-বাইরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠে। এসময় বাসে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলে ৭ জন মারা যায়। খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দগ্ধদের মধ্যে ১০ জনকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, ১৬ জনকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়। এদের মধ্যে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৯ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এদের মধ্যে ৩ জনের অবস্থা আশংকাজনক। এছাড়া চৌদ্দগ্রাম হাসপাতালে নেয়া ১৫ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারী বিভাগের প্রধান ডা. মির্জা মো. তাইয়েবুল ইসলাম জানান, জিলকত, রাশেদুল ও শফিকুল নামে ৩ জনের অবস্থা আশংকাজনক। তাদের শরীরের ৭৪ থেকে ৭৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। এদিকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল, পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ সুপার জানান, দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার করতে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত আছে। রেলমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মুজিবুল হক এ হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন।

খালেদার ফোনালাপ: শিরোনামে ‘নাশকতা’ থাকলেও অডিওতে নেই! -ডয়চে ভেলে

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কয়েকটি কথিত ফোনালাপ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন অনেকে৷ পুরনো এসব অডিও-র শিরোনামে ‘নাশকতার’ কথা বলা হলেও কথোপকথনে শব্দটি পাওয়া যায়নি৷ বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার হওয়া অডিওগুলো বছরখানেক আগে ইউটিউবে আপলোড করা হয় বাংলালিকস নামক একটি অ্যাকাউন্ট থেকে৷ অডিওগুলোর শিরোনাম খালেদা জিয়ার নাশকতামূলক কর্মকান্ডের নির্দেশনা৷ চটকদার এই শিরোনাম যেকারো নজর কাড়লেও কথিত অডিওগুলো শুনে খালেদা জিয়া নাশকতামূলক কর্মকান্ডের কোন নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা, সেটা নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ নেই৷ কে বা কারা এসব ফোনালাপ রেকর্ড করে ইন্টারনেটে প্রকাশ করেছে, তা জানা যায়নি৷ তবে প্রকাশিত কথিত কথোপকথনে বিএনপি নেত্রী তাঁর নেতাকর্মীদের ভৎর্সনা করেছেন, রাস্তায় লোক নামাতে নির্দেশ দিয়েছেন৷ তবে কোন অডিওতেই নাশকতা কিংবা হামলা শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়নি৷ সুনির্দিষ্টভাবে কোথাও কিংবা কারো উপর হামলা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কথাও নেই৷ বাংলাদেশে ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, চার বছর আগে ঢাকায় বিএনপির একটি সমাবেশের সময় দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কয়েকটি টেলিফোন সংলাপের অডিও টেপ ঘুরছে ইউটিউবে, যাতে তাকে নেতাদের নানা নির্দেশ দিতে শোনা যায়৷

যেভাবে হত্যা করা হয় ইমাদ মুগনিয়েহকে

লেবাননের হিজবুল্লাহর কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়েহকে হত্যা করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ২০০৮ সালে এ দুই সংস্থার যৌথ পরিকল্পনায় সিরিয়ায় এক গাড়িবোমা বিস্ফোরণে নিহত হন ইমাদ মুগনিয়েহ। এ খবর দিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ২০০৮ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে একটি রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার পর গাড়িবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাকে হত্যা করতে একসঙ্গে কাজ করে সিআইএ ও মোসাদ। ওই গাড়ির পেছনে রাখা অতিরিক্ত চাকায় পুঁতে রাখা শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে নিহত হন তিনি। বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির নর্থ ক্যারোলিনা রাজ্যে এটি পরীক্ষাও করে দেখা হয়। বোমার ট্রিগার ছিল ইসরাইলের রাজধানী তেল আবিবে বসে থাকা মোসাদ এজেন্টদের হাতে। ওই সময় মোসাদ এজেন্টরা দামেস্কে সিআইএ এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিল। ধারণা করা হয়, হিজবুল্লাহর ওই জ্যেষ্ঠ নেতা মুগনিয়েহ ১৯৮০ সালের দিকে লেবাননে পশ্চিমা নাগরিকদের জিম্মি হিসেবে আটক রাখার মূল পরিকল্পনাকারী। এছাড়া ১৯৯২ সালে আর্জেন্টিনায় ইসরাইলি দূতাবাসে বোমা হামলার পেছনেও তাকে দায়ী করা হয়। ওই হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। ১৯৮৩ সালে বৈরুত বিমানবন্দরে মার্কিন মেরিন সেনাদের ব্যারাকে বোমা হামলায়ও তিনি জড়িত ছিলেন। ওই হামলায় ২৪১ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়। এছাড়া ১৯৮৫ সালে টিডব্লিউএ ফ্লাইট-৮৪৭ ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও তার সংশ্লিষ্টতার কথা জানা যায়। সে সময় মার্কিন নৌবাহিনীর এক ডুবুরি নিহত হয়েছিল। তবে মুগনিয়েহ হত্যার পেছনে সিআইএ’র জড়িত থাকার বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সিআইএ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যার পেছনে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন দরকার ছিল এবং সেই অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এছাড়া হত্যার নির্দেশে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল অ্যাটর্নি জেনারেল, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে। সাবেক ওই কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ইরাকে শিয়া জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহে সরাসরি জড়িত ছিলেন মুগনিয়েহ। ওই জঙ্গিরা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতো। তাদের মতে, যদিও এমন দেশের মাটিতে তাকে হত্যা করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাবস্থায় ছিল না, তবুও তার হত্যাকাণ্ডকে একরকম আত্মরক্ষা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাদের ভাষায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে মুগনিয়েহকে হত্যার অনুমতি পেতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। মুগনিয়েহকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সত্যিকার হুমকি হিসেবে প্রমাণ করতে হয়েছিল। একজন জানিয়েছেন, আমাদের প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, সে আমেরিকানদের জন্য অব্যাহত হুমকি। পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে, ইরাক যুদ্ধের সময় বুশ প্রশাসন হিজবুল্লাহর উপর বেশ কয়েকটি অভিযানের অনুমতি দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মুগনিয়েহ হত্যা অভিযান। বাগদাদে কাজ করা সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুগনিয়েহ ও তার সঙ্গে জড়িত যে কাউকে ‘খুঁজে বের করা, শায়েস্তা করা ও খতম করার’ বিষয়ে আমাদেরকে মুক্ত লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। অনেক বছর ধরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। এ ব্যাপারে আলোচনা করতে ২০০২ সালে ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট সেপশাল অপারেশন্স কমান্ডের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন এজেন্ট। সাবেক এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যখন আমরা তাদের বলি যে, আমরা মুগনিয়েহকে হত্যা করার সুযোগ খুঁজছি, তারা আক্ষরিক অর্থেই যেন চেয়ার থেকে পড়ে গিয়েছিল! তবে এটা নিশ্চিত নয়, কখন দুই সংস্থা বুঝতে পেরেছিল যে মুগনিয়েহ দামেস্কেই ছিলেন। তবে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে তাকে যৌথ অভিযান চালিয়ে হত্যা করার ব্যাপারে সিআইএ’কে প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরাইল। দুই সংস্থা মিলে তার জীবনধারা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। একইসঙ্গে চেহারা শনাক্ত করার একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে চিহ্নিত করা হয়। এরপরই তাকে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পরপরই হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য, তার ছেলে জিহাদ মুগনিয়েহ কয়েকদিন আগে সিরিয়ায় এক ইসরাইলি বিমান হামলায় এক ইরানি জেনারেল ও আরও পাঁচ হিজবুল্লাহ সদস্যসহ নিহত হন। জিহাদ মুগনিয়েহ ক্রমেই হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আভির্ভূত হচ্ছিলেন। ওই হামলার পাল্টা হিসেবে তিনদিন আগে হামাস ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী গোলা হামলা চালায়। এতে ২ ইসরাইলি সেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়।

কেন নয় সংলাপ সমঝোতা by জি. মুনীর

গত বছরের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন ও নানা বিতর্কে বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কটের বীজ বপন করা হয়েছিল, সেই সঙ্কট এখন পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে বিপুল আকার ধারণ করেছে। সরকার কথিত নিয়ম রক্ষার এ নির্বাচনের পর সব দলের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে পুরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার গোঁ ধরেছে। সরকারপক্ষের নেতানেত্রীরা এখন বলছেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী ট্রেন মিস করেছেন। এখন তাকে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার দল ও জোটের কথা হচ্ছেÑ ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। ছিল নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন, যেখানে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ছিল না। বাকি আসনগুলো সরকারি ১৪ দলীয় জোট ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। রওশন এরশাদকে দিয়ে করা হয়েছে সংসদে এক অদ্ভুত বিরোধী দল, যা সরকারেও আছে বিরোধী দলেও আছে। শুধু বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে তা নয়; ১৪ দলীয় সরকারি জোট ছাড়া দেশের বাকি সব রাজনৈতিক দল ও দলনিরপেক্ষ সুশীলসমাজ তাই মনে করে। আর দেশের বাইরে একমাত্র ভারত ছাড়া সব দেশ মনে করে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। তাদের সবার তাগিদ, সব দলের অংশগ্রহণে দ্রুত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন করা। কিন্তু সরকারের ধনুক ভাঙা পণÑ ২০১৯ সালের আগে আর কোনো নির্বাচন নয়, কোনো সংলাপও নয়। সরকারবিরোধী মহলের আরেকটি দাবি, একটি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। সরকারপক্ষের সেখানেও এক কথা, আগামী নির্বাচন হবে শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনে। সে নির্বাচনে বিএনপি এলে আসবে, না এলে নেই।
পুরো ২০১৪ সালটা গেছে মোটামুটি আন্দোলনহীন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট একের পর এক আহ্বান জানিয়েই এসেছে, সংলাপের মাধ্যমে দ্রুত নির্বাচন দিতে ও নির্বাচনের জন্য একটি সুস্থ পরিবেশ সৃষ্টি করতে, বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের ওপর দমনপীড়ন বন্ধ করতে, মামলা-হামলা বন্ধ করতে। কিন্তু সরকার সে পথে যায়নি। বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের ওপর মামলা-হামলা, দমনপীড়ন যথারীতি অব্যাহত থাকে এবং বিরোধী দলের নেত্রীকে আক্রমণ করে বাক্যবাণও অব্যাহত রাখা হয়। ২০১৪ সালের শেষে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে ৭ দফা প্রস্তাব দেন। তা-ও সরকারপক্ষ প্রত্যাখ্যান করে এবং বেগম জিয়াকে সভা-সমাবেশ করতে না দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। গাজীপুরে তাকে জনসভা করতে দেয়া হয়নি। ৫ জানুয়ারি ঢাকায় তাকে সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। মোটামুটি ৩ জানুয়ারি থেকে তিনি তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। অবরুদ্ধ হওয়ার পর থেকে ২০ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। তা এখনো চলমান। অবরোধ কর্মসূচিতে সারা দেশ প্রায় অচল। ব্যবসায়-বাণিজ্য ও অর্থনীতির চাকা অচল। এরই মধ্যে মানুষ পুড়িয়ে মারা, ক্রসফায়ার এবং সরকারবিরোধী ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ধরপাকড়, ক্রসফায়ার ও মামলা দায়ের সময়ের সাথে জোরদার হচ্ছে। চলছে ক্রসফায়ার ও অপহরণের ঘটনাও। সর্বশেষ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, বেগম জিয়া সংলাপ-সমঝোতা ছাড়া অন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার না করার ব্যাপারে অনড়। সরকারপক্ষ বলছে, বেগম জিয়ার সাথে কোনো আলোচনা নয়। দেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট নেই। আছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমস্যা। সরকার যে করেই হোক, কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনবে।
এমন যখন অবস্থা, তখন সরকার বেগম জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়। অবশ্য ২০ ঘণ্টা পর আবার বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়। কাটা রয়েছে ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন নয়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়ার কার্যালয়ের সব লাইনই কেটে দেয়া হবে। এ দিকে ৩১ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করতে প্রবেশের সময় ছয় মহিলা আইনজীবীকেও আটক করেছে পুলিশ। এ দিকে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের এক সভা রোববার সংসদ অধিবেশন শেষে জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত সে সভা বসেনি। এ সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়, তার ওপর হয়তো সরকারি মনোভাব কিছুটা আঁচ করা যেত।
এখন পর্যন্ত যা মনে হয়, দুই পক্ষই যার যার অবস্থানে অনড়। এ ধরনের জাতীয় সঙ্কটময় মুহূর্তে যখন সরকারপক্ষ ও সরকারবিরোধী পক্ষ একমত হতে পারে না, তখন সাধারণত বিবদমান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার পড়ে দেশের মালিক বলে পরিচিত ‘জনগণের’ ওপর। এরই নাম ‘গণভোট’ বা রেফারেন্ডাম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত শাসনামলে সংবিধান থেকে একতরফাভাবে সেই ‘গণভোটের’ বিধান বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে জনগণ আজ সে অধিকার হারিয়ে সরকারপক্ষ ও সরকারবিরোধীদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ বসে বসে দেখছে। আর এর আগুনে পুড়ে দেশের সাধারণ মানুষ আজ চরম দুর্ভোগের মুখে। আজকের এই যে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সঙ্কট, তারও সৃষ্টি করেছে এই আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে দেশের সব দলের তথা তিন জোটের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একতরফাভাবে বাদ দিয়ে।
আসলে গণভোটই বলেন আর নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনই বলেন, এসব সংবিধান থেকে তাড়ানোর পেছনের একটি নেপথ্য কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের অনেক কাজেই জনগণের সমর্থন নেই। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে জোরজবরদস্তি করে ক্ষমতার পাটাতন সুদীর্ঘ করার চিন্তাই তাদের পেয়ে বসেছে। একই কারণে ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার তথা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি থেকে আওয়ামী লীগ আজ দূরে সরে থাকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।
আজ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখে একই কথা, বেগম জিয়া বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। কিন্তু তিনি তো এ দেশে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন তো বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যায়নি। এরা আজ বারবার বলছেন, বেগম জিয়া সন্ত্রাসের রানী, জঙ্গিরানী, দুর্নীতিবাজ, তার সন্তানেরা দুর্নীতিবাজ। কিন্তু দেশের মানুষ তেমনটি মনে করে না। মানুষের ভাবনা ভিন্ন। এর বড় প্রমাণ আরাফাত রহমান কোকোর নামাজে জানাজায় মানুষের ঢল। আজ অনেকের মুখেই শুনি, তারেক জিয়া পাগলের মতো যা বকছে, তাতে করে বিএনপির জনপ্রিয়তা আজ শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাই যদি হয়, তাহলে তারেক জিয়াকে আরো বেশি বেশি করে কথা বলতে দেয়া উচিত। কারণ, তারেক জিয়া আরো কথা বললে বিএনপির জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠা ছাড়িয়ে ঋণাত্মক কোঠায় গিয়ে পৌঁছবে। আর বিএনপির জনপ্রিয়তা যদি শূন্যের কোঠায় গিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে, তবে একটি দলনিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সরকারের এত ভয় কেন। বেগম জিয়ার দাবি তো একটাই, জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেÑ এমন একটি নির্বাচন, যা জনগণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সে অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি অর্থবহ সংলাপ। তাহলে কেন সংলাপে বসতে সরকারপক্ষের এই অনীহা।
প্রকৃত সত্য হচ্ছে, বেগম জিয়া ও তার দল-জোট জনবিচ্ছিন্ন নয়। এর দৃশ্যমান প্রমাণ অনেক। যারা তা স্বীকার করতে চান না, তাদের চোখে তা দৃশ্যমান নয়। কারণ, এরা দলান্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা স্পষ্ট দেখতে পান। এরা দেখতে পান সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনে বেগম জিয়ার দলের প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয় লাভের বিষয়টি। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বেগম জিয়ার জনসভাগুলোতে মানুষের ঢল তারই জনপ্রিয়তার প্রমাণবহ। আর এর সর্বশেষ প্রমাণবহ ঘটনাটি হচ্ছে আরাফাত রহমান কোকোর নামাজে জানাজায় মানুষের ঢল নামার বিষয়টি। এ দেশের মানুষ যেভাবে আজো স্মরণে আনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার সেই অভূতপূর্ব জনসমাগমের ঐতিহাসিক নামাজে জানাজা, তেমনি আরাফাত রহমান কোকোর  নামাজে জানাজাটিই হবে এ দেশের একটি স্মরণীয় জানাজা।
আজ দেশে-বিদেশে চার দিকে একই উচ্চারণÑ দুই নেত্রীর সংলাপ সমঝোতা অভাবের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে। এমনকি বার্ন ইউনিটের এক ভুক্তভোগীর দাবি, দুই নেত্রী সংলাপে বসে এ বিরোধের নিষ্পত্তি করুক। তা না করে তাদের কেন কষ্ট দেয়া হচ্ছে। দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন দেশের সরকার, জাতিসঙ্ঘÑ সবার দাবি রাজনৈতিক সংলাপ। বেগম খালেদা জিয়ার দাবিও সংলাপের মধ্য দিয়ে সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। কিন্তু সরকারপক্ষ বলছে, কোনো সংলাপ নয়। তাদের কথা দাঁড়িয়েছেÑ কঠোর দমনপীড়ন করে যে করেই হোক ২০ দলীয় জোটকে নির্মূল করে দেশে শান্তি আনতে হবে। তাদের মতে, এটাই একমাত্র পথ।
বিবেকবানদের কথাÑ এ পথ ভুল পথ। নীতি-নৈতিকতা, গণতন্ত্র, সংবিধান কোনো কিছুই এ পথ সমর্থন করে না। জোরজবরদস্তির মধ্য দিয়ে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইতিহাসের নানা ঘটনাই এর প্রমাণ বহন করে। অতএব সংলাপ-সমঝোতার পথে হাঁটাই শ্রেয়। যে পথে কল্যাণ আমার আপনার সবার। অতএব কেন নয় সংলাপ-সমঝোতা।