Monday, August 19, 2024

'ইন্দিরা গান্ধীর মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুলি করুন', বিতর্কিত পোস্ট ঘিরে চাঞ্চল্য by সেবন্তী ভট্টচার্য্য

‘ইন্দিরা গান্ধীর মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গুলি করুন। আপনি যদি এটি করতে না পারেন তবে আমি নিরাশ করব না।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে এই বিতর্কিত পোস্ট করায় কৃত্তি শর্মা নামে এক কলেজ ছাত্রীকে কলকাতার তালতলা থানার পুলিশ গ্রেফতার করলো। লেককটাউনের এক আবাসন থেকে আটক করা হয় ওই পড়ুয়াকে। তিনি বি’কম দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া।এমনকী আরজি করে কান্ডে নির্যাতিতার নাম ও ছবি পোস্টও নাকি করেছিলেন ওই ছাত্রী। কলকাতা পুলিশ এই ঘটনার বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছে, "অভিযুক্ত যার  ইনস্টাগ্রাম আইডি 'কৃতিসোশ্যাল', তিনি  আরজি কর হাসপাতালের সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কিত তিনটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট করেছিলেন ৷ তার মধ্যে নির্যাতিতার পরিচয় ও ছবি পোস্ট, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য এবং হুমকি-সহ দুটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে এবং এই পোস্টগুলি উস্কানিমূলক এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।"

মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় এই পোস্ট। বিষয়টি পুলিশের নজরে আনে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ এক্স হ্যান্ডেলে তা তুলে ধরে লেখেন, ‘এবার কি ঘুরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাণনাশের বার্তা বাজারে ছাড়া শুরু?’ বিষয়টি শোরগোল শুরু হতেই তদন্তে নামে কলকাতা পুলিশ। এর পর সোমবার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে তালতলা থানার পুলিশ।

এদিকে আর জি করের মৃত তরুণী চিৎসক যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন আগেই আন্দাজ করা হয়েছিল। সোমবার ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বলা হয়েছে, তাঁকে গলা টিপে, নাক-মুখ চেপে ধরে খুন করা হয়। ফরেন্সিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের কথায়, এমন নৃশংস কাজ করতে গেলে একাধিক ব্যক্তির প্রয়োজন। কারও একার পক্ষে একইসঙ্গে গলা টিপে, নাকমুখ চেপে ধরে খুন করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন একটাই, খুনের আগেই কি তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল? নাকি, খুনের পর ধর্ষণ করা হয়? ফরেন্সিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের কথায়, তা নির্ভর করবে পারিপাশ্বিক পরিস্থিতির উপর। মৃত্যুর আগে অথবা পরে তরুণীকে নির্যাতন করা হয়েছিল। গণধর্ষণও চলে।

'ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করুন', আরজিকরকাণ্ডে মোদিকে ৭০ পদ্ম সম্মান প্রাপক চিকিৎসকের চিঠি

মানবজমিনঃ কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে খুনের ঘটনায় এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হস্তক্ষেপের দাবি তুলে সরব হলেন অন্তত ৭০ জন পদ্ম সম্মান প্রাপক চিকিৎসক। মোদিকে উদ্দেশ্য করে চিঠিতে তারা লিখেছেন, আরজিকর হাসপাতালে যা ঘটেছে তাতে স্পষ্ট যে, এই ধরনের নৃশংসতা প্রতিরোধ করতে যত দ্রুত সম্ভব কড়া পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। দেশের সাংসদ, নীতি নির্ধারক সংস্থাগুলোর কাছে আমাদের আবেদন অবিলম্বে এই বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেয়া হোক। চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘আমরা সম্প্রতি কলকাতার আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গভীর যন্ত্রণার সাথে আপনাকে এই চিঠি লিখছি। দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে আপনার কাছে আমাদের নিবেদন, এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপনি অবিলম্বে এবং ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করুন। এই ধরনের বর্বরতা চিকিৎসকদের সেবার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যে সব নারী স্বাস্থ্যসেবা পেশার সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের সহিংসতা মোকাবিলার জরুরি প্রয়োজনে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’

চিকিৎসকদের তরফে আরও জানানো হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা রুখতে ২০১৯ সালে ‘দ্য প্রিভেনশন অফ ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট ডক্টরস, মেডিক্যাল প্রফেশনালস অ্যান্ড মেডিক্যাল ইনস্টিটিউশন বিল’ প্রস্তুত করা হয়েছিল। যা এখনও পর্যন্ত সংসদে পেশ হয়নি। চিকিৎসকদের দাবি, দেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন তারা যাতে নির্ভয়ে রোগীদের পরিষেবা দিতে পারেন তার জন্য অবিলম্বে এই বিল পাস করানো হোক। চিকিৎসকরা প্রধানমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে পাঁচটি দাবি তুলে ধরেছেন, এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ, যৌন সহিংসতায় জড়িতদের কঠোর ও সময়াবদ্ধ শাস্তি, হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষার জন্য একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য সম্ভাব্য কঠোরতম শাস্তি।

সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস

কড়া পদক্ষেপ বৃটেনের: নারীদের ওপর চরম দুর্ব্যবহার এবার জঙ্গি কার্যকলাপের আওতায়!

মানবজমিনঃ প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্য সরকার নারীদের ওপর চরম দুর্ব্যবহারকে সন্ত্রাসবাদের একটি রূপ হিসাবে বিবেচনা করার পরিকল্পনা করছে। টেলিগ্রাফ এখবর জানিয়েছে। নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতার ক্রমবর্ধমান ঘটনা মোকাবেলা করার জন্য যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব ইয়েভেট কুপার সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন যা বর্তমান আইনের ফাঁক-ফোকরগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে এবং উদীয়মান মতাদর্শগুলো বিশেষ করে অনলাইন মিসজিনিস্টিক ঘটনাগুলো  অধ্যয়ন করতে সাহায্য করবে। এই পদক্ষেপ নারীর প্রতি সহিংসতাকে একইভাবে দেখবে যেভাবে উগ্র ডানপন্থী চরমপন্থাকে দেখা হয় । সন্ত্রাসদমন আইন নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে সেদেশের প্রশাসনে। নতুন কী কী উপায়ে নারীবিদ্বেষ ছড়াচ্ছে দেশে, সেই নিয়েও বিশদ ভাবনা চিন্তা চলছে। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কুপার জানান, “বহুদিন ধরেই উগ্রপন্থার নতুন ধারাগুলো নিয়ে সরকার খেয়াল করেনি। অনলাইন থেকে শুরু করে পথেঘাটে- সর্বত্র হুহু করে বেড়েছে সন্ত্রাসবাদী মানসিকতা। বিশেষ করে যুবসমাজ বারবার জড়িয়ে পড়েছে এমন কার্যকলাপে।”  প্রস্তাবিত আইনের অধীনে স্কুল শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক হবে, যে ছাত্রদের মধ্যে চরম দুর্ব্যবহারের লক্ষণ প্রকাশ পাবে তাদের সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচিতে রেফার করা হবে। যে কাউকে এই প্রোগ্রামে রেফার করা হবে  স্থানীয় পুলিশ তাদের মূল্যায়ন করে দেখবে এবং তাদের আচরণ সংশোধনের চেষ্টা করা হবে।

অ্যান্ড্রু টেটের মতো মিসজিনিস্টিক প্রভাবশালীরা তাদের অনুগামীদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদীদের মতোই অনলাইনে কিশোর ছেলেদের উগ্রবাদী করছে৷  গত মাসে বৃটেনের পুলিশের তরফে নারীবিদ্বেষ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, নারী এবং মেয়েদের উপর হিংসার ঘটনা বেড়েই চলেছে। বিষয়টা জাতীয় বিপর্যয়ের সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তার পরেই সন্ত্রাস আইন ভেবেচিন্তে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে  প্রশাসন।

সূত্র : এনডিটিভি

হাসিনাকে পালাতে কেন বাধ্য করা হয়েছিল? by ইন্তিফার চৌধুরী

'ইন্নি, আমরা স্বাধীন!’ আমার ২৬ বছর বয়সী চাচাতো ভাই বাংলাদেশের শাহবাগ থেকে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন,যখন লক্ষাধিক মানুষ গত ৫ আগস্ট দেশের সংসদ ভবনের দিকে একটি বড় প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো। এর পরেই সোশ্যাল মিডিয়া একটি নতুন খবরে প্লাবিত হয়,  ‘একটি নতুন স্বাধীনতা’। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও  প্রতিবাদী জনতার দাবির মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্জন্ম। এটি ছিল কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতার চূড়ান্ত পরিণতি, যার জেরে প্রায় ৩০০ জন মারা  যান এবং হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কী ঘটছে?

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের  জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ কোটার বিরুদ্ধে গত মাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা এই পদ্ধতিটিকে পক্ষপাতদুষ্ট  বলে মনে করে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি জানায়। প্রতিবাদ যত বাড়তে থাকে বাংলাদেশের ভুয়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা  পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। বিক্ষোভ দমাতে সরকার মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় , দেশব্যাপী শুট-অন-সাইট কারফিউ জারি করে এবং রাস্তায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করে। সরকারের সহিংস প্রতিক্রিয়া দ্রুত বিক্ষোভকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জনগণের অভ্যুত্থানে’ রূপান্তরিত করে, যার লক্ষ্য হাসিনা এবং তার আওয়ামী লীগ দলের  পতন। ছাত্র বিক্ষোভকারী, পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের পর সুপ্রিম কোর্ট চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা  কোটা মাত্র পাঁচ শতাংশে নামিয়ে আনে ।

এই ছাড় সত্ত্বেও, বিক্ষোভকারীরা  সংঘর্ষে নিহতদের জন্য জবাবদিহির দাবি অব্যাহত রাখে। হাসিনার পদত্যাগের দাবি বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং  নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত-ই-ইসলামী দল দ্বারা সংগঠিত হয়েছে বলে সরকার অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেছিল।

প্রধানমন্ত্রী হাসিনা প্রতিবাদকারীদের অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিদ্রোহকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন।  যার ফলে রাজনৈতিক আস্থার তীব্র ক্ষয় হয়। শেখ হাসিনা  ৩ আগস্ট  ছাত্রনেতাদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দিলে আন্দোলনের  একজন সমন্বয়কারী আন্তরিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। ৪ আগস্ট দিনটি বাংলাদেশের নাগরিক অস্থিরতার ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক দিনগুলোর একটি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে।  সেদিন  কমপক্ষে ৯৮জন নিহত এবং শতাধিক আহত হন । সরকার বিরোধী মনোভাব দ্রুত জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার প্রতিবাদকারীদের ভয় দেখায়, আহতদের চিকিৎসা সেবা দিতে অস্বীকার করে এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করে  হাজার হাজারকে মানুষকে গ্রেপ্তার করে । অস্থিরতা বাড়ার সাথে সাথে ক্ষমতার উপর হাসিনার দখল দুর্বল হয়ে পড়ে , অবশেষে তিনি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

বৈষম্য ও ক্রোধ

কোটা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত জনগণের অসন্তোষ প্রকাশ পায়। দমনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ, দুর্বল অর্থনীতি এবং বৈষম্য, যুব বেকারত্ব এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মতো  সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সরকারের অক্ষমতার জন্য বাংলাদেশিরা দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুব্ধ ছিলেন । ২০০৯ সালে হাসিনা  ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছে যা মূলত পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ এই অঞ্চলে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটিতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়েছে এবং গত ২০ বছরে ২৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সাফল্যের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।  সবথেকে বেশি লাভবান হয়েছেন ধনীরা যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এসেছেন । জনসংখ্যার সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ দেশের আয়ের ৪১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে নিচের স্তরের ১০  শতাংশের কাছে পৌঁছায় আয়ের মাত্র ১.৩ শতাংশ  । দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪০ শতাংশকে "NEET" হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল - যার অর্থ এরা “not in employment, education or training.” অর্থাৎ এদের কোনো  কর্মসংস্থান নেই।  এমনকি কেউ কেউ পর্যাপ্ত শিক্ষা বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্তও   নয়।  বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা তাদের স্বল্প-শিক্ষিত সহকর্মীদের তুলনায় উচ্চ বেকারত্বের  সম্মুখীন হয়েছেন। ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এই দুর্ভোগকে  আরও জটিল করে তুলেছে । সরকার এক বছরে তিনবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় ইউটিলিটি খরচ বেড়ে যায় অনেকটাই । তাই কোটা আন্দোলনের থেকেও  এই ক্ষোভ বিশেষভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক যুবকদের জন্য পুঞ্জীভূত হতে শুরু করেছিল । তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট:  সুষ্ঠু নির্বাচন, সরকারের জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পুনরুদ্ধার ।

গণতন্ত্রে উত্তরণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। দেশটি দুর্নীতি, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের অধিকার হরণ এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নে জর্জরিত হয়ে পড়ে । এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেপ্তার, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। নির্বাচনও অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। জানুয়ারিতে অত্যন্ত বিতর্কিত একটি নির্বাচন যা হাসিনাকে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিল, প্রধান বিরোধীরা সেটি বয়কট করেছিল। কারণ নির্বাচনের আগে তাদের অনেক নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তলানিতে চলে যাওয়া গণতন্ত্রের উত্তরণের আশা জাগিয়েছে। তরুণরা তাদের  চেতনা এবং সংহতির মাধ্যমে হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা প্রযুক্তিকেও সমানভাবে কাজে লাগিয়েছে। ইন্টারনেট এবং মোবাইল পরিষেবার ওপর সরকারি ক্র্যাকডাউন সত্ত্বেও  দেশে এবং বিদেশে বিক্ষোভকারীদের একত্রিত করতে তারা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এখন প্রতিযোগীতামূলক নির্বাচন এবং একটি নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন।  উচ্চ শিক্ষিত এবং গণতন্ত্রের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, তরুণ বাংলাদেশিরা - বিশেষ করে নারীরা  পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর দ্বারা প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালে উদাহরণস্বরূপ মাত্র ০.২৯ শতাংশ সংসদ সদস্যর বয়স  ৩০বছরের কম ছিল এবং ৫.৭১ শতাংশের বয়স ছিল ৪০ বছরের কম। বর্তমানে  ক্ষমতার শূন্যতা দেশের তরুণদের সামনে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নের একটি উল্লেখযোগ্য সুযোগ উপস্থাপন করে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা  দেশের যুব সমাজকে  বিক্ষোভের দিকে পরিচালিত করে । পর্যাপ্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং অংশগ্রহণ ব্যতীত দেশের যুব সমাজের মধ্যে  রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। যা  গণতান্ত্রিক পতনের ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। সামনের রাস্তা আরো চ্যালেঞ্জে ভরা।  ইতিমধ্যেই  বাংলাদেশের তরুণরা তাদের অধিকার এবং  ভবিষ্যতের জন্য লড়াইয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের  প্রস্তুতি প্রদর্শন করেছে।

লেখক : অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির লেকচারার

(ডন থেকে)

থাইল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হলেন পেতংতার্ন

বিবিসি বাংলাঃ থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ধনকুবের থাকসিন সিনাওয়াত্রার মেয়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছে দেশটির পার্লামেন্ট।

৩৭ বছর বয়সী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা হবেন দেশটির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তার ফুফু ইংলাক সিনাওয়াত্রা থাইল্যান্ডের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

গত বুধবার থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্রেথা থাভিসিনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার দু’দিন পর তাকে নিয়োগ দেওয়া হল। তাদের দু’জনেই ফেউ থাই পার্টির নেতা। ২০২৩ সালের নির্বাচনে ফেউ থাই পার্টি দ্বিতীয় হয়েছিলো এবং একটি ক্ষমতাসীন জোট গঠন করেছিলো।

মিজ পেতংতার্ন এখন থাইল্যান্ডের স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো কঠিন কাজের মুখোমুখি হয়েছেন। সামরিক অভ্যুত্থান সামাল দেওয়া এবং আদালতের হস্তক্ষেপ এড়িয়ে টিকে থাকাটাও তার জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জের বিষয়। আদালতের হস্তক্ষেপের কারণে তার দলের নেতৃত্বে পূর্ববর্তী চারটি প্রশাসন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে।

“আমি সত্যিই আশা করি যে আমি মানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাস পুনঃস্থাপন করে দিতে পারবো– সকল থাই জনগণের জীবনমানের উন্নয়নে আমরা সুযোগ তৈরি করতে পারি,” শুক্রবার নির্বাচনের পর তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এ কথা বলেন।

তিনি খুব অভিভূত হয়ে বলেছিলেন যে উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে।

তিনি এও স্বীকার করেছেন যে তিনি “না সেরা, না সবচেয়ে প্রতিভাবান।”

"কিন্তু আমি সবসময় মনে করি আমার একটি দৃঢ় ইচ্ছা আছে এবং আমার একটি ভালো দল আছে। আমার দল মজবুত, অভিজ্ঞ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আমরা সকলে একই ধারণা পোষণ করি। এগুলো আসলে এমন কিছু, যা আমার কাছে খুব মূল্যবান,” তিনি বলেন।

পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে তার পক্ষে ৩১৯টি ভোট পড়েছে। আর বিপক্ষে ভোট পড়েছে ১৪৫টি। মিজ পেতংতার্ন হলেন গত দুই দশকে সিনাওয়াত্রা পরিবার থেকে প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া চতুর্থ ব্যক্তি।

তার বাবা থাকসিন সিনাওয়াত্রা ও ফুপু ইংলাক সিনাওয়াত্রাসহ অপর তিনজন সামরিক অভ্যুত্থান বা সাংবিধানিক আদালতের রায়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।

দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে একবার কারাগারে যাওয়া একজন প্রাক্তন আইনজীবীকে মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দেওয়ার কারণে ওই একই আদালত বুধবার মি. থাভিসিনকে বরখাস্ত করেছে।

শুক্রবার মিজ পেতংতার্ন বলেছিলেন যে তিনি মি. থাভিসিনের বরখাস্তের বিষয়টি জানতে "দ্বিধান্বিত" এবং "খুব মর্মাহত" হয়েছিলেন।

মি. থাভিসিন ও নিজের পরিবারের সাথে কথা বলার পর মিজ পেতংতার্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ''দল ও দেশের জন্য কিছু করার এখনই সময়'', তিনি বলেন।

তিনি আরও বলেন যে তার বাবা মি. থাকসিন তাকে “নিজের সেরাটা দিয়ে” কাজ করার উৎসাহ দিতে ফোন করে বলেছিলেন যে, তিনি তার বৃদ্ধ বয়সে এসে মেয়েকে এই দায়িত্ব পেতে দেখে উৎফুল্ল।

থাইল্যান্ডের স্কুল এবং যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন মিজ পেতংতার্ন। সিনাওয়াত্রা পরিবারের মালিকানাধীন রেন্ডে হোটেল শিল্প গোষ্ঠীতে কয়েক বছর কাজ করেছেন তিনি। তার স্বামী ওই শিল্প গোষ্ঠীর উপ-প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত।

২০২১ সালে তিনি ফেউ থাই-এ যোগ দেন এবং ২০২৩ সালের অক্টোবরে দলের নেতা হিসাবে নিযুক্ত হন।

তার নিয়োগ থাইল্যান্ডের শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন শক্তি এনেছে। ফেউ থাই-এর সদস্যরাও হয়তো আশা করছেন যে তিনি দলের রাজনৈতিক ভাগ্য পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করতে পারেন।

মি. থাকসিন ২০০১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু ২০০৬ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার দ্বিতীয় মেয়াদের কার্যকাল হঠাৎ শেষ হয়ে যায়।

দীর্ঘ ১৫ বছর নির্বাসিত থাকার পর তিনি গত অক্টোবরে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী স্রেথা থাভিসিনকে নির্বাচিত করার কয়েক ঘণ্টা আগে থাইল্যান্ডে ফিরে আসেন।

তার পুরাতন রক্ষণশীল শত্রুদের সাথে দর কষাকষি করার শর্তেই তাকে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা এখন ফেউ থাইয়ের সাথে জোটে রয়েছে।

গত জুন মাসে তার বিরুদ্ধে রাজতন্ত্রের অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। তিনি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব, যিনি দেশটির র সবচেয়ে কঠোর ‘লেস ম্যাজেস্ট’ আইনের মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

বুধবারের রায়ে মি. থাভিসিনকে বরখাস্ত করাটা মি. থাকসিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার উপর লাগাম টানার জন্য একটি সতর্কবার্তা, বিষয়টি এখন অনেকে এভাবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ এখনও ফেউ থাইয়ের উপর তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

মি. থাকসিনের বোন মিজ ইংলাক ২০১১ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাকেও অযোগ্য ঘোষণা করেছিলো আদালত। তার সরকার দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলো। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী এখনও নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।

মিজ পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা গত বছরের নির্বাচনে ফেউ থাইয়ের প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন, যা তার অনেক ভক্তদের মুগ্ধ করেছিলো।

"আমি মনে করি, আট বছর পর জনগণ অভ্যুত্থানের চেয়ে ভালো রাজনীতি, দেশের জন্য ভালো সমাধান চায়," সে সময় তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন। "তারা এমন নীতি চায় যা তাদের জীবনকে উন্নত করবে।"

নির্বাচনে জয়ী মুভ ফরোয়ার্ডকে সামরিক বাহিনী নিযুক্ত সেনেট দ্বারা সরকার গঠনে বাধা দেওয়া হয়েছিলো। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মি. থাভিসিনকে ফেউ থাই-নেতৃত্বাধীন জোট গড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলো।

এই মাসের শুরুর দিকে সাংবিধানিক আদালত মুভ ফরোয়ার্ডকে অযোগ্য ঘোষণা করেছে এবং এর ১১ জন নেতাকে এক দশকের জন্য রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের যত কারণ by প্রশান্ত কুমার শীল

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বাংলাদেশের। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয়েছে চরম ক্ষমতাধর শেখ হাসিনার। অনেক দিন ধরে কিছু একটা লিখবো বলে ভাবছিলাম কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না কোনোভাবেই। কখন যে আবার কার বিরাগভাজন হয়ে যাই, কে জানে? আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয়ে আমার বেশ সরব উপস্থিতি থাকলেও বন্ধুরা প্রায়ই খোঁচায় আমি কেন চুপ এখন। যেহেতু  আমি একজন শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাই তাড়াহুড়ো করে কোনো মন্তব্য করা যে সমীচীন হবে না এটা আমি বুঝি। যাই হোক শেষমেষ লিখেই ফেললাম সাত পাঁচ না ভেবেই শেখ হাসিনার পতনের চূড়ান্ত খতিয়ান।

এখন মোটামুটি সবাই বুঝতে পেরেছে শেখ হাসিনা কেন এভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন? কী কী অপরাধ তিনি করেছেন যার দরুণ তাকে এই শাস্তি পেতে হলো। এক-দুই করে তা লিখতে গেলে, প্রথম কারণ হবে চূড়ান্ত ঔদ্ধত্য। অনেক দিন ধরেই কারও কোনো পরামর্শ তিনি শুনতেন না। তার সম্পর্কে এমনও শোনা যেতো গাছের পাতাও নাকি তার ইশারা ছাড়া নড়তো না। নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতেন প্রশাসনকে। তিনিই ছিলেন নাকি সবকিছুর অধিকর্তা। রাস্তার ড্রেনেজের স্লাব মেরামত হোক কিংবা মন্ত্রণালয়ের হাজার কোটি টাকা প্রকল্পের অনুমোদনই হোক তিনি ছিলেন সবার শেষ কথা।

দ্বিতীয় কারণ হলো নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে গণতন্ত্রের কফিনের শেষ পেরেক গেঁথে দেয়া। বিরোধী দল ও ভোটারবিহীন পাতানো নির্বাচন দিয়ে তিনি পেয়েছেন গণতন্ত্র হত্যাকারীর তকমা। যদিও প্রচার মাধ্যমে বিশ্বকে তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন তিনিই হলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি অন্ধ অনুগত আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করে রেখেছিলেন। বানিয়েছিলেন নির্লিপ্ত, অকার্যকর ও দলদাসে।

তৃতীয়, বিচার বিভাগকে নিজের ও দলের সুবিধামতো পরিচালনা করা। চতুর্থ, আইনের শাসনের অবলুপ্তি ঘটানো। পঞ্চম, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি রোধে চরম ব্যর্থতা, যার দরুন সর্বত্র হাহাকার সৃষ্টি হওয়া। ষষ্ঠ, ছাত্রলীগের অতি সক্রিয়তা ও অবাধ্য রাজনীতি। সপ্তম, আর্থিক খাতে চরম লুটপাট। ব্যাংকিং ও শেয়ার বাজারকে পুরোপুরি ধ্বংস করা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুণ্ঠনরাজ ও বড় বড় লুণ্ঠনকারী (আর্থিক দেউলিয়া) সৃষ্টি করা।

অষ্টম, সংখ্যালঘুর সুরক্ষার নামে তাদের জমি, বাড়ি ও ঘর দখল নেয়া। আর শারদীয় দুর্গাপূজা আসলে অনুভূতি সন্ত্রাসের নামে সংখ্যালঘুদের পাশবিক নির্যাতন করা। জনমনে বিভেদ ও রাজনৈতিক ধুম্রজাল তৈরি করে প্রকাশ করা যে, হিন্দু মানে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আওয়ামী লীগের শাসনকালে হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছে। বরং হিন্দুদের ব্যবহার করে অপকৌশলে ছিনিয়ে নিয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সহযোগিতা ও সহমর্মিতা।

নবম, নেতা মন্ত্রীদের বেফাস ও আলটপ্পা মন্তব্য। সঙ্গে কুকথার রাজনীতির মিশ্রণ করে প্রচ্ছন্ন হুমকি ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভুত্ব বিস্তার। এসব বে-লাগাম কুট মন্তব্যে জনগণ অত্যন্ত বিরক্ত ছিল। গুজবের মতো সস্তা রাজনৈতিক কৌশল ও নেতাদের রাশভারি শব্দ চয়ন ও ছিল পুরো দলকে খাদের কিনারায় টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শেষ কারণ হলো দুর্নীতির বহরে বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর সংযুক্তি। মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো তথ্য আসবে পরিসংখ্যান ঘাটলে। রীতিমতো চোখ ছানাবড়া হবে। ছোটবেলায় ‘পুকুর চুরি’-র অর্থ জেনেছিলাম, গত ১৫ বছর ধরে তা দেখেছি সযত্নে। সমাজের মাথা যারা, সেসব রাঘব বোয়াল খাল-বিল, নদী, সাগর, পাহাড়, জঙ্গল এমন কি বালি সব হাপিশ করে দিয়েছে গোগ্রাসে। গণমাধ্যমে তাদের নাম শুনলেই কেমন জানি নিঃস্ব মনে হয় নিজেকে। এক-একজনের চুরির বহর হাজার-হাজার কোটি টাকা। আজিজ, বেনজীর কিংবা আবেদ আলীর দুর্নীতির পসরা মগের মুল্লুককেও পরাস্ত করবে। চুরির টাকার বেশিটাই নাকি বিদেশে পাচার করেছে তারা। বছর দুয়েক আগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, অর্থ পাচার কি করে রোখা যায়? কি করে বিদেশে গচ্ছিত টাকা দেশে ফেরানো যায়, তা তার জানা নেই। এসব দায়িত্ব জ্ঞানহীন বক্তব্যে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জনগণ বুঝতে পেরেছে এসব আষাঢ়ে গল্প বলে তাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তারা।

সহ্যের সীমা না-পেরোলে নাকি বিপ্লব হয় না। শেখ হাসিনার উপর আপামর সাধারণ মানুষ থেকে ছাত্র-জনতা কতোটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে, এই বিপ্লব তার প্রমাণ। নাহলে শুধু একটা কোটা আন্দোলনে সরকার পড়ে যায়? ছাত্র-জনতার অহিংস আন্দোলনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগে গুলি মেরে প্রাণ কেড়ে নেয়ার বাড়াবাড়ি সহজভাবে নেয়নি জনগণ। তাই তো রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছেন বিজয় অর্জিত হবে তাদের একদিন। রবীন্দ্রনাথের একটি কথা এখন বেশ মনে পড়ছে আমার। তার ছোট গল্প জীবিত ও মৃতের একটি লাইন ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই।’ আবু সাঈদ মরে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এটা সুনিশ্চিত লক্ষ কোটি বিপ্লবীদের তিনি রসদ জুগিয়েছেন তার এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে। আমাদের ছাত্র-জনতার তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা, নতুন বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। এই আন্দোলন শুধু এমফিল কিংবা পিএইচডি থিসিসের গবেষণার খোরাক হবে না বরং এটি রচনা করবে গণজাগরণের বীজমন্ত্র। সামনের দিনে আর কোনো শাসক ছাত্রদের উপর আঘাত করতে সাহস করবে না, ভাববে দশবার।

একটি নির্মোহ সত্যি হলো, একদা জনপ্রিয় ও দেশবাসীর ‘চোখের মণি’ শেখ হাসিনা কোনো এক গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে রাতারাতি  ‘চোখের বালি’ হয়ে যাননি। তার এই বিবর্তন ঘটেছে ধীরে-ধীরে। এখন যে-বিশ্লেষণে তিনি ভূষিত, প্রবল সমালোচিত ও জনগণের একাংশের কাছে ঘৃণিত, সেই ‘স্বৈরতন্ত্রী’ তকমা পাওয়ার পিছনে ভারতের অবদান কম নয় এটা সবাই বুঝে। ভারত সরকারের প্রবল সহযোগিতায় তার ক্ষমতার চরিত্রটি তিনি পোক্ত করেছেন বেশ দানবীয়ভাবে। তবে এটা ঠিক ভারতের নরেন্দ্র মোদী যদি আগামীবার ক্ষমতায় না আসে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেয়াও একপ্রকার কঠিন হবে তা কি তিনি জানেন?  
তার শাসন আমলে একের-পর-এক নির্বাচনকে তিনি প্রহসনে পরিণত করেছেন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারত নীরবই শুধু থাকেনি, সমর্থনের ডালি নিয়ে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রধানত এই কারণে গণতন্ত্রপ্রিয় বাংলাদেশের এক বিরাট অংশের কাছে ভারত অ-জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পরপর ৩টি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর ‘বন্ধু’ থেকে ‘শত্রু’-তে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। অগণতন্ত্রী হাসিনার অধঃপতনের দায় ভারত এড়াতে পারে না। এখন সময় এসেছে নতুনভাবে নিজেদের মেলে ধরার। নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করার।

এখন প্রশ্ন শেখ হাসিনা কেন পালালেন? অনেকে বলবে জনরোষে কিংবা গণভবন ঘেরাও এর আশঙ্কায়। তবে এটা ঠিক জনমত যেভাবে তৈরি হয়েছে পুলিশ কিংবা অন্য কোনো বাহিনী দিয়ে এটি আর দমিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। অন্য একটি কারণ হতে পারে শেখ হাসিনা জানতেন তার বাবার চরম পরিণতির কথা। তাইতো তিনি আর ঝুঁকি নিতে চাননি। ১৫ই আগস্ট এর মতন আরেকটি ইতিহাসের তাইতো তিনি পুনরাবৃত্তি হতে দেননি। গণমাধ্যমে যে খবর এসেছে তার হাতে সময় ছিল মাত্র ৪৫ মিনিট। এত কম সময়ে আসলে তার আর অন্য কিছু করার উপায় ছিল না?

শেখ হাসিনার শাসন আমলে আসলেই কী তিনি কোনো ভালো কাজ করেননি? পদ্মা সেতু হোক, ফ্লাইওভার হোক কিংবা মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধি হোক। জনগণ কি ভুলে গেছে এসব? আসলে আন্দোলন দমনের নামে তিনি যে নৈরাজ্য ও রক্তের বন্যার ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তার এসব ভালো কাজের ফিরিস্তি তখন আর ধোপে টেকে না হয়ে যায় অমূলক। মানুষ তখন এসব ডিজিটাল উন্নয়নের কথা ভুলে যায় এক নিমেষে। মনে রাখে ঘাত-প্রতিঘাত, সংগ্রাম ও হরিলুটের কথা। অতিরিক্ত ক্ষমতার মোহ ও দম্ভ মানুষকে যে উন্মাদ ও বীভৎস করে তোলে তার প্রমাণ তিনি স্বয়ং নিজে। তিনি চাইলে সবকিছুর একটা সুন্দর পরিসমাপ্তি করতে পারতেন। কিন্তু করলেন না তার কিছু চাটুকার, সুবিধাবাজ ও ধুরন্ধর  সহযোগীদের কথায়। তিনি যে ভুল এটা তো এখন প্রমাণিত। তাকে যে অন্ধ করে রাখা হয়েছে এটাও সত্য। যে পাপ করে তাকে তো শাস্তি ভোগ করতেই হবে। প্রাকৃতিক আইন তো এটির হেরফের করে না। ইতিহাস কিন্তু কোনো পাপীকে ক্ষমা করে না। এখন দেখা যাক তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোনদিকে যায়। তিনি পালিয়ে কি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব কিংবা প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছেন এটি হয়তো সময়েই বলে দেবে।

লেখক: গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
vprashantcu@gmail.com

আন্দোলনে আহতদের হাহাকার: এখন ফ্রি চিকিৎসা মিলছে, এতদিনে নিঃস্ব অনেকে by সুদীপ অধিকারী

বৈমষ্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন অনেকে। নতুন সরকারের ঘোষণার পর বর্তমানে হাসপাতালের পক্ষ থেকে ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হলেও এতদিনে নিঃস্ব হয়ে গেছে অনেকের পরিবার। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রোগীরা বলছেন, হাসপাতালে যতদিন আছি চিকিৎসা বিনামূল্যে পেলেও বাড়ি ফেরার পর দীর্ঘদিন ধরে চলা এই চিকিৎসা ব্যয় কীভাবে জোগাড় করবো তাই নিয়ে আছি দুশ্চিন্তায়।

গতকাল সরজমিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির নিচতলার ক্যাজুয়ালিটি-২ এর ৫৬টি বেডের সব কয়েকটিতেই ছাত্র  আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৫৬ জন রোগী। গুলির আঘাতে ছিন্নভিন্ন হওয়ায় এদের কারোর পা কেটে ফেলা হয়েছে। কারোর আবার পায়ে লোহার রড লাগানো হয়েছে। কারোর আবার গুলি লেগে হাড় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এমনই একজন মেহেদী আলম। গত ১৮ই জুলাই গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে গত একমাস ধরে পঙ্গুর ক্যাজুয়ালিটি-২ এর জি-০১ নম্বর বেডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর চার বোন দুই ভায়ের সংসারের হাল ধরতে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় আসেন মেহেদী। গুলশান-১ নম্বর এলাকায় একটি ফুলের দোকানে কাজ করতেন তিনি।

কাজ শেষ করে রাত আটটার পর মধ্য বাড্ডার বাসায় ফিরছিলেন। এরমধ্যেই গুলিবিদ্ধ হন মেহেদী। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে নেয়া হয় স্থানীয় একটি হাসপাতালে। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেলে। ঢাকা মেডিকেল থেকে ওই রাতেই আনা হয় পঙ্গুতে। মেহেদীর বড় বোন ডালিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত আমার ভায়ের ৭টা অপারেশন করা হয়েছে। আরও কয়টা করা লাগবে তার ঠিক নেই। এ পর্যন্ত হাসাপাতালে চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া দিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। বর্তমানে ফ্রি চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ওর পায়ের হাড় গুঁড়া গুঁড়া হয়ে গেছে। নার্ভ (শিরা) ছিড়ে গেছে। সুস্থ হতে অনেক সময় লাগবে। তাই বাড়িতে ফেরার পর কীভাবে সেই টাকা জোগাড় করবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

গত ১৮ই জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে একই ওয়ার্ডের জি-৬ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন পল্লবী মাজেদুল ইসলাম মডেল হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মো. সিফাত। তারও গুলি লেগে ডান পায়ের হাঁটুর জয়েন্টের হাড় ভেঙে যায়। সিফাত বলেন, ওইদিন আমি সন্ধ্যার পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় অবস্থান করছিলাম। রাত ৯টার দিকে হঠাৎ একদল পুলিশ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে এগুতে থাকে। এ সময় আমরা সকলে ভয়ে দৌড়ানো শুরু করি। আমি দৌড়ে প্রায় ৫০/৬০ জনকে অতিক্রম করে চলে আসি। এরপর হঠাৎ আমার পায়ে গুলি লাগলে আমি পড়ে যাই। ওই সময় আমার বন্ধুরা আমাকে উদ্ধার করে আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমাকে এখানে পাঠানো হয়। সিফাতের মা বলেন, আমার ছেলের হাঁটুর জয়েন্টের হাড় ভেঙে গেছে। গত একমাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি। সুস্থ হতে আরও কয়দিন লাগবে তা জানা নেই। প্রতিদিন বাসায় যাওয়া, আসা, খাবার খাওয়া, চিকিৎসা ব্যয় দিয়ে  হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আমাদের ৭৫ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসাসহ টেস্ট, ওষুধ ফ্রী দেয়া হচ্ছে। কিন্তু খরচ যা, তা আগেই হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া, যাওয়া-আসা  তো আছেই। এরপর হাসপাতাল থেকে বাসায় যাওয়ার পর কতো কী লাগবে তা আল্লাহ জানে। সিফাতের বেডের পাশেই জি-৭ নম্বর বেডে মাসখানিক ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেলিভারিম্যান শিমুল আহমেদ। গত ১৯শে জুলাই তিনিও গুলিবিদ্ধ হন মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায়। তার গুলি লাগে ডান পায়ের উরুতে। শিমুল বলেন, আমার বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে। আমি ঢাকায় দোকানে দোকানে মাল ডেলিভারি দিই। সেদিন আমার কাজ বন্ধ থাকায় আন্দোলনে যোগ দিই। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ আন্দোলনকারীদের ওপর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকা থেকে গুলি করছিল পুলিশ। গুলির শব্দ শুনে আমি ও আমার বন্ধুরা মিরপুর ১১’র দিকে দৌড়ানো শুরু করি। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন পার করতেই গলির মধ্য থেকে কে বা কারা গুলি ছোড়ে। সেই গুলি লেগে আমার পা রক্তাক্ত হয়। বন্ধুরা তখন আমাকে উদ্ধার করে আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমাকে এখানে পাঠানো হয়। প্রথম দুই-তিন দিনেই আমার ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন বাসায় ফেরার পর তো সহজে কোনো কাজে যোগ দিতে পারবো না। তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় আছি।

গত ১৮ই জুলাই উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে কাজ শেষ করে মালিকের বাসায় গাড়ি রেখে বের হচ্ছিলেন প্রাইভেটকার চালক মো. আরাফাত হোসেন। বাসা থেকে বের হওয়ার কিছু দূর যাওয়ার পরই পুলিশের ছোড়া গুলি তার বাম পায়ে হাঁটুর নিচের হাড় ভেদ করে চলে যায়। শিরা ছিড়ে যায়। হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয় তার পা। এক পা হারিয়ে এখনো পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি-২ ওয়ার্ডের জি-৩৮ নাম্বার বেডে কাতরাচ্ছেন আরাফাত। তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের পক্ষ থেকেই সব চিকিৎসা, টেস্ট, ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর আগেই ধারদেনা করে প্রায় ৮০ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। হাসপাতালে থাকাকালীন তো চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাকি জীবনটা বৌ-বাচ্চা নিয়ে কী করবো তাই ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না। তিনি বলেন, আমার পা নেই। ৭ বছরের বাচ্চাটার ভবিষ্যৎ কী হবে তাও ভাবতে পারছি না। আপাতত গ্রামের বাড়ি পাবনাতে চলে যাবো। তারপর কী করবো জানি না।

আরাফাতের পাশের বেড জি-৩৭ এ চিকিৎসা নিচ্ছেন তিতুমীর কলেজের ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালমান হোসেন। ১৯শে জুলাই দুপুর আড়াইটার দিকে রামপুরা এলাকায় তারও বাম পায়ে গুলি লাগে। তিনি বলেন, আমরা সেদিন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে অবস্থান নিই। পুলিশের সঙ্গে আমাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল। আমরাও সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, পুলিশও গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছিল। এরই একপর্যায়ে রামপুরার কাছে আমার পায়ে গুলি লেগে বের হয়ে যায়। সেখান থেকে আমাকে ধরাধরি করে সকলে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ওইদিন রাতেই পঙ্গুতে আনা হয়। প্রথমে কয়দিন হাসপাতালে এসেও ভয়ে ছিলাম। এখন স্বাভাবিক। সালমানের মা বলেন, ফোন বন্ধ করে আন্দোলনে চলে যেত। বাসায় ফিরে আবার ফোন দিয়ে বলতো সব ঠিক আছে। এরই মধ্যে ওর পায়ে গুলি লাগে। এখন ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।

পরিবারের হাল ধরতে ববগুনার বেতাগী উপজেলায় পড়ালেখা করলেও গত মাসে ঢাকায় আসেন ডিগ্রি ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মামুন। কাজ নেন বিস্ট্র রেস্টুরেন্টে। ১২ দিন কাজের মাথায় গত ১৯শে জুলাই রামপুরা এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। সেদিন থেকেই ভর্তি রয়েছেন পঙ্গু হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি-২ এর জি-১৩ নম্বর বেডে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত লাখ টাকার উপরে খরচ হয়ে গেছে। বর্তমানে ফ্রি চিকিৎসা পেলেও বাড়িতে ফিরে কী করবো, কী খাবো, কীভাবে সংসার চালাবো তাই নিয়ে আছি দুশ্চিন্তাই। বাবা বৃদ্ধ হয়েছে। তেমন কিছুই করে না। বড় ভাইয়ের মাথায় সমস্যা। আর আমি যে কবে সুস্থ হবো তার ঠিক নেই। আমাদের পরিবারটা ভেসে যাবে।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)’র পরিচালক অধ্যাপক কাজী শামীম উজ্জামান বলেন, আমাদের এখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের সকলের খরচ আমরা বহন করছি। আমাদের এখানে বর্তমানে ১৪৪ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, অপারেশন সব আমরা বিনামূল্যে দিচ্ছি। যারা গুরুত্বর আহত তাদেরকে আমার ভর্তি করে চিকিৎসা দিচ্ছি। আমরা এসব রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড একটা ওয়ার্ড করেছি।

উল্লেখ্য, এ ছাড়াও রাজধানীর ছয়টি সরকারি হাসপাতালে এ রকম ৪৩৯ রোগীর চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে ১৭৫ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪১ জন, চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ৩২ জন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ৩০ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে ১২ জন আছেন। এর বাইরে বেশকিছু আহত ব্যক্তি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ভারত কেন ‘চোখের বালি’ by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন মোটামুটি সবাই বুঝতে পেরেছে শেখ হাসিনাকে কেন এভাবে সব ছেড়েছুড়ে দেশত্যাগী হতে হল। কী-কী অপরাধ তিনি করেছেন যার দরুণ তাকে এই শাস্তি পেতে হল। এক-দুই করে তা লিখতে গেলে, প্রথম কারণ হবে– চূড়ান্ত ঔদ্ধত্য। অনেক দিন ধরেই কারও কোনও পরামর্শ তিনি শুনতেন না।

নিজের ইচ্ছামতো চলতেন। দ্বিতীয় কারণ, নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকগুলো গেঁথে দেওয়া, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে অন্ধ অনুগত আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করা। তৃতীয়, বিচারবিভাগকে নিজের ও দলের সুবিধামতো চালনা করা। চতুর্থ, আইনের শাসনের অবলুপ্তি ঘটানো। পঞ্চম, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি রোধে চরম ব্যর্থতা,
যার দরুণ সর্বত্র হাহাকার সৃষ্টি হওয়া। এবং ষষ্ঠ– দুর্নীতি। শেষের এই কারণ, মানে, দুর্নীতির বহর বাংলাদেশে ভয়ংকর। মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো।

ছোটবেলায় ‘পুকুর চুরি’-র অর্থ জেনেছিলাম। ১২ বছর ধরে বাংলাদেশে যাওয়ার সুবাদে দেখছি, পুকুর চুরি করা সে-দেশে কোনও অপরাধই নয়। তা ছিঁচকে চোরের কাজ। সমাজের মাথা যারা, সেসব রাঘব বোয়াল খালবিল, নদী, সাগর, পাহাড়, জঙ্গল সব হাপিশ করে দিচ্ছে! এক-একজনের চুরির বহর হাজার-হাজার কোটি টাকা। চুরির টাকার বেশিটাই বিদেশে পাচার হয়ে গিয়েছে। বছর দুয়েক আগে সে-দেশের অর্থমন্ত্রীকে সংসদে বলতে শোনা গিয়েছিল, অর্থ পাচার কী করে রোখা যায়, কী করে বিদেশে গচ্ছিত টাকা দেশে ফেরানো যায়, তা তাঁর জানা নেই। তিনি সদস্যদের পরামর্শ দিতে বলেছিলেন।

সহ্যের সীমা না-পেরলে বিপ্লব হয় না। শেখ হাসিনার উপর আপামর বাংলাদেশি কতটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে, এই বিপ্লব তার প্রমাণ। এ থেকে আমাদের দেশেরও অনেক কিছু শেখার আছে। ১৫ বছর ধরে ভারত-ই তো হাসিনার সবচেয়ে বড় খুঁটি।
সত্যি হল, একদা জনপ্রিয় ও দেশবাসীর ‘চোখের মণি’ শেখ হাসিনা কোনও এক গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণে রাতারাতি ‘চোখের বালি’ হয়ে যাননি। তাঁর এই বিবর্তন ঘটেছে ধীরে-ধীরে। এখন যে-বিশেষণে তিনি ভূষিত, প্রবল সমালোচিত ও জনগণের একাংশের কাছে ঘৃণিত, সেই ‘স্বৈরতন্ত্রী’ তকমা পাওয়ার পিছনে ভারতের অবদান কম নয়।

একের-পর-এক নির্বাচনকে তিনি প্রহসনে পরিণত করেছেন। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারত নীরবই শুধু থাকেনি, সমর্থনের ডালি নিয়ে দৃঢ়ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রধানত এই কারণে গণতন্ত্র-প্রিয় বাংলাদেশের এক বিরাট অংশের কাছে ভারত অ-জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পরপর তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর ‘বন্ধু’ থেকে ‘শত্রু’-তে পরিণত হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। গণতন্ত্রী হাসিনার অধঃপতনের দায় গণতন্ত্রী ভারত এড়াতে পারে না।

ভারতের উপর রাগের আরও অনেক কারণ আছে। গত ১২ বছরে বহুবার বহুভাবে সেসব কারণের উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের স্পর্শকাতরতার প্রতি আন্তরিক হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। দুই দেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি যাদের জানা, তারা জানে, খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশে সবচেয়ে ঘৃণিত শব্দ ছিল ‘ট্রানজিট’। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহণের আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু খালেদা সরকার
রাজি হয়নি। হাসিনার রাজত্ব শুরু হওয়ার পর ‘ট্রানজিট’ শব্দটির জায়গা নেয় ‘কানেক্টিভিটি’। ধীরে ধীরে জল, স্থল,
রেল, অন্তরিক্ষ সর্বত্র যোগাযোগ বেড়েছে। মানুষজনকে সেজন্য বিক্ষোভে ফেটে পড়তে দেখা যায়নি। কারণ তারা বুঝেছিল, এতে তাদেরও লাভ।

কিন্তু সেই সমর্থন অসন্তোষও সৃষ্টি করেছিল। পণ্য পরিবহণের ‘ট্রানজিট ফি’ কত হওয়া উচিত, তা নির্ধারণে হাসিনা এক কমিটি গঠন করেন। কমিটি টন প্রতি ১ হাজার ৫২ টাকা ফি আদায়ের সুপারিশ করেছিল। অথচ, শেষ পর্যন্ত অঙ্কটা দাঁড়িয়েছিল ২০০ টাকারও কম। ব্যাপক প্রচার চলেছিল, ভারতের চাপের মুখে হামাগুড়ি দিতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ভারতের বিরুদ্ধে ‘দাদাগিরি’-র অভিযোগ সেই শুরু।


তারপর দিন যত এগিয়েছে তত বেড়ে গিয়েছে– ‘ভারত শুধু নিতে জানে, দিতে জানে না’ প্রচার। আদানিদের হয়ে নরেন্দ্র মোদির তদবিরের কাহিনি, গোড্ডার বিদ্যুৎ ‘বেশি দামে কিনতে বাধ্য করা’, বাণিজ্য রফতানির ক্ষেত্রে হাজারটা ‘নন-ট‌্যারিফ বেরিয়ার’ সৃষ্টি, ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে ‘অমসৃণ’ যাত্রা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হওয়া, ঋণ সদ্‌ব‌্যবহারে দীর্ঘসূত্রতা ও অস্বাভাবিক শর্ত এবং তিস্তা চুক্তির অধরা থেকে যাওয়া বিদ্বেষের মাত্রা চড়িয়েছে। ছোটখাটো কিছু বিষয়ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ অকারণে বাড়িয়ে দেয়। যেমন, স্থল ও বিমানবন্দরে কাস্টমস বা ইমিগ্রেশনে অহেতুক বিলম্ব ও কর্মীদের দুর্ব্যবহার।

যে হাসপাতাল চিকিৎসা-বাবদ একজন ভারতীয়র কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেয়, সেই হাসপাতাল বাংলাদেশির কাছ থেকে সেই রোগের চিকিৎসা বাবদ নেয় প্রায় দ্বিগুণ। পাশাপাশি ভারতের ভিসা পাওয়া ও লটারি জেতা প্রায় সমতুল্য। বিরামহীন হাহাকার। কেন যে ভিসা সমস্যার সুরাহা হয় না, কেউ জানে না। বারবার এসব বিষয় দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তোলা হয়েছে, বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, অথচ সুরাহা হয়নি। পেঁয়াজ, গম বা চিনির মতো পণ্যের রফতানি ভারত যাতে হুটহাট বন্ধ না করে সেজন্য হাসিনা নিজেও দরবার করেছেন। লাভ হয়নি। একদিকে এসব অসন্তোষ ও অপ্রাপ্তি, অন্যদিকে বাংলাদেশি জনতাকে ‘উইপোকা’ বলে অপমান করা বৈরিতা ও বিদ্বেষের মাত্রা তীব্রতর করেছে। ক্রিকেট মাঠে ভারতের বিরোধী পক্ষকে প্রাণঢালা সমর্থন কিংবা স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তিতে মোদিকে আমন্ত্রণের প্রতিবাদে দেশজোড়া বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ ভারতের প্রতি বাংলাদেশি জনতার ঘৃণার তীব্রতার প্রমাণ। এসবও হয়তো চাপা পড়ত গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করাতে ভারত হাসিনাকে বাধ্য করালে। ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’ তা করেনি। এই বিপ্লব বুঝিয়ে দিল সম্পর্কের ‘সোনালি অধ্যায়’-এর ঠুনকো পর্ব কোনগুলো। দেশান্তরি হাসিনা এখন নিশ্চয়ই বুঝেছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরি কিন্তু তার চেয়েও জরুরি গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা এবং আইন যে সবার জন্য এক– তা নিশ্চিত করা।

‘বিশ্বস্ত প্রতিবেশী’ ও ‘পরম বন্ধু’ দেশের এই বিপ্লব থেকে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরও কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমন– সম্পর্ক পোক্ত হয় আধার সম্মানজনক হলে, সমান-সমান হলে, দু’-পক্ষই নিজেদের জয়ী ভাবলে। হাসিনা বরাবর ভেবে এসেছেন,
অন্যদেরও বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীরা স্বাধীনতা বিরোধী, ইসলামি মৌলবাদী শক্তি। ভারতের বর্তমান শাসককুলও কী আশ্চর্য, যে কোনও বিরোধিতাকে দেশদ্রোহ, সন্ত্রাসবাদী ও দেশের ঐক্য বিনষ্টকারী বলে দাগিয়ে দিচ্ছে। সংসদ থেকে ক্ষুব্ধ বিরোধীরা ওয়াক আউট করলে অধ্যক্ষকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ওরা দেশকে দুর্বল করতে চায়, সংবিধানের শাসন চায় না। হিন্ডেনবার্গের তথ্য নিয়ে জেপিসি তদন্তের দাবিকে ‘অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য’ সৃষ্টির চক্রান্ত বলছে।

সন্দেহ নেই, এই পালাবদলে ভারত সতর্ক ও উদ্বিগ্ন। হাসিনা যে নির্ভরতা ও নিশ্চিন্ততা দিয়েছিলেন, বর্তমান শাসকের কাছ থেকে তা এখনই আশা করা বৃথা। সব ডিম একই ঝুড়িতে রাখার বিপদ ও ঝুঁকি কী, ভারত এখন তা টের পাচ্ছে। ভুল শোধরাতে বাড়তি কদম হাঁটতে হবে। এই মুহূর্তে অপেক্ষার নীতি একমাত্র বিকল্প। তা করার সঙ্গে সঙ্গেই ভারত জানিয়ে দিয়েছে, সে দেশের জনগণের স্বার্থই মুখ্য। দেশ পরিচালনায় নতুন শাসক কুল কত দক্ষ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন অদূরভবিষ্যতে বোঝা যাবে। উপদেষ্টারা সফল হলে একরকম, ব্যর্থ হলে অন্যরকম। কী হবে সেই আগাম হদিশ কারও জানা নেই। এটুকু বুঝছি, পিকচার অভি বাকি হ্যায়।

সূত্র- সংবাদ প্রতিদিন

হাসিনার স্বৈরশাসনে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, সংস্কারের পর নির্বাচন

ক্ষমতা ধরে রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে  দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই সংস্কার জরুরি। আর এটি করতে হলে যৌক্তিকভাবেই সময়ের প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশবাসী সেই সময় দিবে এমনটা আশা করে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে টেকসই সমৃদ্ধির জন্য সবার দৃঢ় সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন।

গতকাল রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রধানদের নিয়ে ওই ব্রিফিং হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা নিজের দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বিদায়ী শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি এবং চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়েও কথা বলেন। ড. ইউনূস বিদেশি দূতদের বলেন, পরিস্থিতি ক্লোজ টু নরমাল, এটা পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থাতে ফেরানোই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায়োরিটি। তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। প্রশাসনে অনিয়ম আর দুর্নীতি সর্বত্র। সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে। ক্লোজডোর কূটনৈতিক ব্রিফিং শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

সংস্কার শেষে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন হবে: বিদেশি বন্ধু উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস খোলাসা করেই বলেন, দেশের কাঠামোগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পর যত দ্রুত সম্ভব অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ যত দ্রুত সম্ভব একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এমনটা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তবে এর আগে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের আমূল সংস্কার করতে হবে, যার মধ্যদিয়ে ভোটের সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে। প্রধান উপদেষ্টা ব্রিফিংয়ের সূচনাতে বলেন, বাংলাদেশের বন্ধুদের মধ্যে থাকতে পেরে আনন্দিত। দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বিপ্লবের সাক্ষী হয়েছে। শেখ হাসিনার নৃশংস স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল লাখো বীর ছাত্র-জনতা। কিন্তু তার দলের ছাত্র সংগঠন ও শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ভয়াবহতম বেসামরিক গণহত্যা করার পর শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। আমি সেই সমস্ত বীর ছাত্র এবং নিরীহ মানুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, যারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন। আমাদের সামপ্রতিক স্মৃতিতে অন্য কোনো দেশের ছাত্রদের তাদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য এত মূল্য দিতে হয়নি; যেখানে একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়সঙ্গত এবং পরিবেশবান্ধব দেশের স্বপ্ন দেখতে হয়েছে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের নির্মম নৃশংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার দমন করা হয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম তাদের ভোটাধিকারের চর্চা না করেই বেড়ে উঠেছে। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট হয়েছে। আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে লুণ্ঠন করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় কোষাগার। তবে হ্যাঁ, দেশ নিয়ে ছাত্রদের একটি স্বপ্ন আমাদের মুগ্ধ করেছে, যে স্বপ্ন একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। ছাত্ররা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখছে যেখানে মানুষ তাদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে, নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। সরকার গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা সমুন্নত রাখবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক শক্তির সহায়তায় কাজ চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিস্থিতি নিশ্চিত হবে। সব ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা দেশে জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলনে নিহত হওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘের তদন্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, তিনি চান এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তদন্তে জাতিসংঘকে বাংলাদেশ সরকার সহায়তা দেবে। ড. ইউনূস বিদেশিদের বলেন, বাংলাদেশ যতগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে, তার সব বাস্তবায়ন করবে সরকার। তিনি বলেন, নতুন যাত্রার এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের সাহসী ছাত্র ও জনগণের জন্য আমাদের জাতির স্থায়ী পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের যাত্রাটা কঠিন। তাদের আকাঙ্ক্ষা আমাদের পূরণ করতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সেটা হয়, ততই ভালো। আমরা বিশ্বাস করি, একটি নতুন গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের যাত্রাপথে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সব বন্ধু ও অংশীদারেরা আমাদের সরকার ও জনগণের পাশে দাঁড়াবে।

ব্রিফিং শেষে গণমাধ্যমকে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৮ই আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেয়ার পর ড. ইউনূস প্রথমবারের মতো বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করলেন।
শফিকুল আলম জানান, প্রধান উপদেষ্টা কূটনীতিকদের জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তার সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্ধৃত করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে উল্লেখ করে প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের  নিরপেক্ষ তদন্তে জাতিসংঘ তদন্ত দলকে স্বাগত জানিয়েছেন। ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা উল্লেখ করে তিনি কূটনীতিকদের বলেন, আমাদের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এই দেশের পুনঃনির্মাণের জন্য আপনাদের পূর্ণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। ছাত্র-জনতার প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ড. ইউনূস বলেন, তারা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে সচেষ্ট, যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে, থাকবে বাকস্বাধীনতা, থাকবে মানবাধিকার। একইসঙ্গে জাতিগত নৃগোষ্ঠী, লৈঙ্গিক ও অন্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। গণমাধ্যম সংস্কার বিষয়ে ড. ইউনূস কূটনীতিকদের বলেন, শেখ হাসিনার সরকার মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন নিবর্তনমূলক আইন করেছিল। এখন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র সমাজ ও জন-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে বলে জানান তিনি। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই মুহূর্তে আর্থিক খাতে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। আমরা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। তবে কেউ বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ কাঠামো বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে তা কোনোভাবে সহ্য করা হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি এমন সময় দায়িত্ব নিয়েছি যখন দেশের অনেক কিছু চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল।

প্রেস সচিব জানান, প্রধান উপদেষ্টা বিদেশি বন্ধুদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যত আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছে, যত আইনি বাধ্যবাধকতা আছে সেগুলো মেনে চলা হবে।
রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়াসহ মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান ড. ইউনূস। ওই কূটনৈতিক ব্রিফিংকে নতুন সরকার প্রধানের সঙ্গে বিদেশি বন্ধুদের ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ বা শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় বলে উল্লেখ করেন প্রেস সচিব।

সরজমিন নোয়াখালী: এক একরামেই হাজার কোটি টাকা পাচার by মারুফ কিবরিয়া

একরামুল করিম চৌধুরী। নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। সদর ও সূবর্ণচর দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনের দায়িত্বে থাকলেও গত ১৬ বছরে নিয়ন্ত্রণ করেছেন গোটা নোয়াখালী। একরামুল করিমের দুর্নীতি অনিয়ম জেলার মানুষের মুখে মুখে। টানা চারবারের এমপি থাকা অবস্থায় টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি থেকেই কামিয়েছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, পুরো নোয়াখালীতে নিজ বলয়ে গড়েছেন একাধিক বাহিনী। হাজার কোটি টাকার মালিক হলেও দেশে দৃশ্যমান বড় কোনো সম্পদ গড়েননি একরাম ও তার পরিবার। অনিয়মে আয় করা টাকা পাচার করেছেন বিদেশে। ভিয়েতনামে গড়েছেন ব্যবসা ও সম্পদ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৬ বছরে একরামুল করিম চৌধুরীর ইশারায় সব অপকর্ম চলতো এই শহরে। কোনো ভিন্নমতের জায়গা ছিল না। বরং বিরোধী মত দমন করে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেন সাবেক এই এমপি। পাশাপাশি নিজের অবস্থান পোক্ত করতে পরিবারের সদস্যদেরও জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে বসান। এ ছাড়া তাদের একাধিক ব্যক্তিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি বানিয়েছেন অনেকটা গায়ের জোরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুধু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেই  কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন একরাম। নোয়াখালীতে যত সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার সবকটির ঠিকাদার ছিলেন তার নেতৃত্বে। যেসব কাজের টেন্ডার হতো সেখান থেকে কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ কমিশন দিতে হতো সাবেক এই এমপিকে। এই কমিশনের পরিমাণ ১০ শতাংশ অবধি গিয়ে ঠেকতো কাজের ধরনভেদে।  কিছু ক্ষেত্রে বেশিও নিয়েছেন একরাম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, এলজিইডি ও পিডব্লিউডি, ডিসি অফিস, বিএডিসির টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে একটি নিজস্ব বাহিনী তৈরি করেছেন। সেই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ পিন্টু ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান জাবেদ। পিন্টু জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া সড়ক ও জনপথের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলা লিটন। এ ছাড়াও এখানে দায়িত্ব পালন করেন আবু তাহের ও জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মোজাম্মেল হক মানিক নামের আরও দুই আওয়ামী লীগ নেতা। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের জন্য আগের মতো অস্ত্রবাজি বা গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে হুমকি-ধমকির প্রয়োজন না হলেও ই-টেন্ডারের এই যুগে অফিস ম্যানেজ করে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী ঠিকাদারদের ননরেসপনসিভ দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিতে কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন জাবেদ। এই অপকৌশলের বাইরে কিছু ঠিকাদার শিডিউল কিনলেও তাদের ফোনে ড্রপ করতে নিষেধ করা হয়। যেকোনো কাজ দেয়ার বিনিময়ে দলীয় ফান্ডের কথা বলে ঠিকাদারের কাছ থেকে নেয়া হয় ৬ পার্সেন্ট টাকা। আর নিজেদের নামে কাজ বের করে বিক্রি করলে জাবেদ ও পিন্টু নেন আরও ১০ পার্সেন্ট। মোট ১৬ পার্সেন্ট কমিশনের এই টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় এমপি একরামুল করিমের কাছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য সাবেক এই এমপি নোয়াখালী জেলা সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজীম প্রধান, সহকারী সুরুজ, জহির মোল্লাদের দিয়ে ওষুধ, হাসপাতাল সরঞ্জামাদি বাইরে বিক্রি করাতেন। সে সঙ্গে হাসপাতালের যত কেনাকাটা হতো তাও তাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করাতেন। এ ছাড়া হাসপাতালের এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্যও করাতেন সাবেক এমপি একরামুল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেন্ডারবাজির অন্যতম হোতা জাবেদ মামা বাহিনীর প্রধান হিসেবেও পরিচিত। তার বাহিনীতে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। মামা বাহিনী নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন জাবেদের কথিত ভাগ্নে রকি।  টেন্ডারবাজির পাশাপাশি শহরে চলাচলকারী ১৩ হাজার সিএনজি থেকে নোয়াখালী সদরের বিভিন্ন স্থান থেকে মামা বাহিনী চাঁদা আদায় করতো। যদিও বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী জেলা সদরে দুই হাজার সিএনজির রেজিস্ট্রেশন দিতে পারবে। কিন্তু সেখানে জাবেদ পিন্টু ও মানিকরা ক্ষমতা প্রয়োগ করে ১৩ হাজার রেজিস্ট্রেশন দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। অতিরিক্ত ১১ হাজার সিএনজি মালিকের কাছ থেকে ৬০ হাজার করে রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ আদায় হয়েছে। সিএনজির নিবন্ধন ও সড়কের চাঁদা থেকে মাসে শতকোটি টাকা আয় হতো। যার একটি ভাগ চলে যেত এমপি একরামের কাছে।  

নিয়োগ বাণিজ্য: সাবেক এই এমপির আয়ের আরেকটি বড় উৎস ছিল নিয়োগ বাণিজ্য। জেলা উপজেলায় যত সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হয়েছে সেখান থেকে কমিশন দিতে হয়েছে। চাকরি না পেয়েও অনেককে টাকা দিতে হয়েছে। জানা যায়, পুলিশের নিয়োগে একরাম তার বাহিনীর মাধ্যমে কমিশন নিয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। গত ১৩ বছরে যতবার নিয়োগ হয়েছে ততবারই এই বাবদ কমিশন তাকে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে নিয়োগের বাবদও তিন লাখ টাকা করে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতিতে নিমজ্জিত একরামের পরিবারও: একরামের ভাগ্নে কবিরহাট পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক রায়হান। বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসে গত পনেরো বছরে তিনি কবিরহাট পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সুযোগে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। তার স্ত্রী ব্যবহার করেন প্রায় কোটি টাকা দামের গাড়ি। এই রায়হান কবিরহাট থানা হামলা মামলার এক নম্বর আসামি। স্থানীয়রা জানান, ২০১৪ সালের ৬ই মার্চ গভীর রাতে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতাকে আটকে রাখার খবর পেয়ে মদ্যপ অবস্থায় কবিরহাট থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় মেয়র রায়হানের নেতৃত্বে। পরে ওবায়দুল কাদের ও একরামুলের প্রভাবে তিনি বেঁচে যান। কবিরহাট পৌরসভা যেখানে অনিয়মই, নিয়ম। রায়হান গত ১৩ বছরে বাজার ইজারা, টোল আদায়, সিএনজি স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখেন তার অনুসারীদের দিয়ে। অল্প দরে বাজার ইজারা দেখিয়ে নিজে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। একাধিক সূত্র জানায়, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় তিন বছরের বেতন বকেয়া রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক সন্ধ্যায় তার আয়োজনে বসতো মদের আসর। গত ১৩ বছর আঁকড়ে ছিলেন কবিরহাট প্রেস ক্লাবের সভাপতি পদও। কবিরহাট উপজেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে ১০ পার্সেন্ট করে কমিশন আদায় করতেন। অপরদিকে, অন্যায় অনিয়মে পিছিয়ে ছিলেন না মেয়রের আপন ছোট ভাই কবিরহাট পৌরসভা আওয়ামী লীগের সদস্য মামুনুল হক মামুন। চলতি বছরের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। মামুন তার ভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে করতেন তদবির।  অনেক অসহায় মানুষের থেকে সে হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের অর্থ। কিন্তু অনেকের কাজ না হলেও তিনি আর টাকা ফেরত দেননি। অসহায় মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারেনি। মেয়র পরিবারের দখলে রয়েছে কবিরহাট বাজারের অনেক খাস জায়গা।  

শিউলী একরাম: একরামুলের স্ত্রী ও কবিরহাট উপজেলা পরিষদের টানা তিনবারের চেয়ারম্যান। স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে লুটে নিয়েছেন টিআর, কাবিখাসহ বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ। তার সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের বিষয়টি  কবিরহাট উপজেলায় ওপেন-সিক্রেট। এজন্য মাঝে মাঝে স্বামীকেও পাত্তা দিতেন না শিউলী। নিজের টাকায় জেলা শহর মাইজদীর বালুর মাঠ এলাকায় গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন।  

সাবাবের বিতর্কিত নানা কাহিনী: বাবার অঢেল সম্পদের কারণে শুরু থেকে বেপরোয়া ছিলেন সাবাব। নানা কারণে দেশব্যাপী খলনায়ক হিসবে তার একটি পরিচিতি দাঁড়ায়। ২০১৮ সালের জুন মাসে রাজধানীর মহাখালীতে সাবাবের গাড়ির ধাক্কায় সেলিম ভূঁইয়া নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। পরে ৩০ লাখ টাকায় এ ঘটনা সমঝোতার অভিযোগ উঠে নোয়াখালী-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে কবিরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় মায়ের প্রতিপক্ষ প্রার্থী আলাবক্স তাহের টিটুর অনুসারীদের ওপর গুলি চালানো হয় সাবাবের নেতৃত্বে। এতে টিটুর ৫ অনুসারী গুলিবিদ্ধ হন। সাবাব ২০২৪ সালে সূবর্ণচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাৎক্ষণিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম অভিযোগ করেন, বাবার ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ফলাফল বানচাল করে সে আমার জয়কে ছিনিয়ে নেয়। ওই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে তিনি লিখিত অভিযোগ করেন।  

একরাম এখন কোথায়?
নোয়াখালীর ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে হাতিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী স্ত্রী ছেলেসহ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৪ এমপি লাপাত্তা। কিন্তু ৫ই আগস্ট দুপুর থেকে এমপি একরামুল  নোয়াখালীর কবিহাটের নিজ বাড়িতে ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি নেতা জানান, নোয়াখালী জেলা বিএনপি’র সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি ও একরামুলের বাড়ি পাশাপাশি এলাকায়। বিএনপি নেতা হায়দার বিএসসির যোগসাজশে একরামুল করিম চৌধুরী ও তার ভাগ্নে কবিরহাট পৌরসভার মেয়র রায়হান নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়র রায়হানের স্ত্রীর ব্যবহৃত গাড়িটিও হায়দার বিএসসির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে তিনি গাড়িটি সরিয়ে ফেলেন। তারা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও।    
অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা বিএনপি’র সভাপতি গোলাম হায়দার বিএসসি দাবি করেন, বিষয়টি পুরোপুরি মিথ্যা। বিএনপি’র অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকারের আমলে মামলা হয়েছে এবং জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে।    
এসব বিষয়ে জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবদুর রহমান বলেন, গত ১৬ বছরে এমপি থাকা অবস্থায় একরামুল কবির পুরো নোয়াখালীবাসীকে জিম্মি করেন। আমাদের বিএনপি’র কয়েক হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে তিনি তার নিজস্ব বাহিনী দিয়ে আগলে রেখেছেন। অনিয়ম দুর্নীতির মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ অর্থ আয় করেছেন।

হলফনামায় একরামের যত সম্পদ: হলফনামায় তার এমন সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকার। ১০ বছরের ব্যবধানে তার সম্পদের পরিমাণ ফুলেফেঁপে উঠলেও কমেছে তার ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। ২০১৮ সালের হলফনামায় তার ব্যাংক ঋণ ৪ কোটি ১০ লাখ ৭ হাজার ৫৩৯ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। আর ২০০৮ সালে তার হলফনামায় ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩৯ হাজার ৭২০ টাকা। এ ছাড়া ২০১৮ সালে দেয়া হলফনামা অনুযায়ী একরামুলের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি ৬০ লাখ ৯০ হাজার টাকা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে,  একরামুল করিম চৌধুরী নিজ নামে দেখিয়েছেন ১ কোটি ৩০ লাখ ৫৬ হাজার ২৮০ টাকার কৃষি জমি, ১১ লাখ ২৯ হাজার টাকার অকৃষি জমি, ২৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার ১৪৫ টাকা মূল্যের ভবন, বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট এবং ১১ হাজার টাকার শেয়ার।

অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে একরামুল করিম চৌধুরীর ব্যাংকে জমা রয়েছে ২ কোটি ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৮ টাকা এবং সঞ্চয়পত্র রয়েছে ৮৩ লাখ ১৪ হাজার টাকার। এ ছাড়া ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ২০২ টাকা মূল্যের গাড়ি, ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা মূল্যের স্বর্ণ, ৩ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র এবং ৩ কোটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৮ টাকা ব্যবসায় পুঁজি রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়।

হলফনামায় একরাম ও তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণ কম হলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তার বেশির ভাগ সম্পদই ভিয়েতনামে। দেশ থেকে পাচার করে সেখানে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়েন তিনি।

যেভাবে উত্থান একরামের:  নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসন থেকে দলের মনোনয়ন পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতিতে দ্রুত নিজ বলয় গড়ে তুলেন। স্থানীয়রা জানান, ’৭৩-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নৌকার প্রার্থী আবদুুল মালেক উকিলের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নেন একরামুলের বাবা ইদ্রিস মিয়া। বাবার পক্ষে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করা একরামুল স্বরূপে ফেরেন ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তিনি নোয়াখালী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে নোয়াখালী-৫ আসনে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। ওই নির্বাচনে সেখানে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু বিএনপি’র শক্তিশালী প্রার্থী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের কাছে তাদের ভরাডুবি হয়। তখন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একরামুল করিম চৌধুরীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে অন্তত এক ডজন মামলা করেন ওবায়দুল কাদেরের অনুসারীরা।

৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: সিলেটে আলোচনায় ফয়সল

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে নতুন সারকারখানা নির্মাণকালীন সময়ে দুর্নীতির মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন আলোচিত স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ডিএম ফয়সল। প্রথমে তিনি ব্যবসায়ী হলেও পরে শ্রমিক লীগ নেতার আড়ালে স্থানীয় এমপি’র আস্থাভাজন হিসেবে দু’হাতে টাকা কামিয়েছেন। এখন তার বিরুদ্ধে শতকোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ৫ই আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর সিলেটের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার সহ নানা ঘটনায় আলোচিত হচ্ছেন ডিএম ফয়সলের নাম। ফয়সল আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তিনি মানতে নারাজ। ব্যক্তিগত কাজে দুবাইয়ে রয়েছেন বলে জানান। দেশের অন্যতম বড় শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির অবস্থান সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। শেখ হাসিনা সরকারের মেয়াদের সময় পুরাতন সারখানার পাশে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি নির্মাণ করা হয়। নতুন করে ঢেলে সাজানো হয় সবকিছু।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি খাত হচ্ছে প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানার অভ্যন্তরে ৪৫টি ভবন নির্মাণ করা হয়। অফিসারদের জন্য আরও ৯৮টি ভবন নির্মাণ হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে; এসব নির্মাণে দুর্নীতির মচ্ছব চালিয়েছেন ডিএম ফয়সল। নিজে কয়েকটি ভবনে কাজ করার পাশাপাশি প্রায় সবক’টি ভবনের কাজই হয়েছে সমঝোতার মাধ্যমে। ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার সমঝোতা করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর বাইরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে কমিশনও নিয়েছেন। এখন এই ভবনগুলোর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বসবাসকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোনো কোনোটিতে চুঁইয়ে পড়ছে পানিও। সারকারখানার সিভিল শাখার ডেপুটি চিফ বিকাশ ঘোষ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে মসজিদের ফাটল মেরামত করা হয়েছে। অন্যান্য ভবনের মেরামতের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। যখনই ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তারা কাজ করছেন। এই ভবনগুলোর বয়স বেশিদিন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এদিকে- ভবন নির্মাণে কাজ করেছিল কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারা জানিয়েছেন- ৪৫টি ভবনের কাজ সমঝোতার মাধ্যমে হয়েছে। আর এই সমঝোতার মূল নায়ক ডিএম ফয়সল। সারকারখানা বাজার সংলগ্ন কলাবাগান এলাকায় তার বিলাসী অফিস ছিল। ওই অফিসে বসে সব কিছুই পরিচালিত হতো। সেখান থেকে কাজ পাইয়ে দেয়া, কমিশন আদায় করা, নতুন করে কাজ বাগিয়ে আনা সহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সমঝোতার টাকা রাখা হতো ফয়সলের কাছে। পরে ওই সব টাকা তিনি ঠিকাদারদের ফেরত দেননি। মেরিনা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী হেমায়েত আহমদ জানিয়েছেন, তিনি এখনো প্রায় ১২ লাখ টাকা ডিএম ফয়সলের কাছে পাবেন। সে তার কোম্পানির নাম দিয়ে প্রথমে কাজ করে নিজেকে ঠিকাদার হিসেবে প্রস্তুত করেছেন। পরবর্তীতে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কিন্তু তার কোম্পানির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সেভেন পাওয়ার কনস্ট্রাকশনের পরিচালক মাহবুবুল হক জানিয়েছেন- তিনি এখনো ৬ লাখ টাকা ফয়সলের কাছে পাবেন। একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে সকল কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে জিম্মি করে ফয়সল কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার দাপটের কাছে সবাই অসহায় ছিলেন। প্রথমে এমপি ও পরে দলীয় পদের জোরে সে এসব কাজ করেন। এ ছাড়া, রাহাত নামের আরও এক ঠিকাদারের ১১ লাখ টাকা এবং কমপক্ষে ১০-১২ জন ঠিকাদারের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। স্থানীয় সিবিএ’র শ্রমিকরা জানিয়েছেন; ফয়সল স্থানীয় এমপি’র আস্থাভাজন ছিলেন। এ কারণে ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিকেন্দ্রিক সব জায়গাতেই তার প্রভাব ছিল। তার বিলাসী কার্যালয়ে এসে থানার ওসি সহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বসে আড্ডা দিতেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির মামলায় ফেরারি আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হোসেন খোকন সহ কয়েকজন ছিলেন তার শেল্টারদাতা। সারকারখানাকেন্দ্রিক কাজে তারা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন। শ্রমিক, কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- শাহজালাল সারকারখানার কাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ কামিয়েছে মেসার্স ফয়সল অ্যান্ড কোম্পানি ও মেসার্স মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্স। তাদের মতে; ফয়সল দু’হাতে টাকা আয় করে সিলেট নগরে বাড়ি, ঢাকার মিরপুরে নিজস্ব অফিস ও বাড়ি এবং কানাডায় বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন; ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে আবাসিক ভবন নির্মাণে একক আধিপত্য বিস্তার করে ফয়সল বাগিয়ে নিতে থাকেন একের পর এক কাজ। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু কাজের অগ্রগতি দেখতে ফেঞ্চুগঞ্জ ছুটে আসেন। সারকারখানার ভিআইপি গেস্ট হাউজে বসে চুক্তি হয় শিল্পমন্ত্রীর এলাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের সঙ্গে ডিএম ফয়সলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফয়সল অ্যান্ড কোম্পানির। ওই দুইটি প্রতিষ্ঠান  যৌথভাবে ফেঞ্চুগঞ্জ সারকারখানায় কাজ করে। শুধু কাজ নয় বলা যায় সারকারখানার সব কাজ বণ্টন এবং নিয়ন্ত্রণ হয় ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। শাহজালাল সারকারখানার উৎপাদন শাখা সূত্র জানায়- নবনির্মিত শাহজালাল সারকারখানা ২০১৫ সালে টেস্ট রানে যায়। ওই সময় চীনা প্রকৌশলীরা বেশ কিছুদিন ইউরিয়া সারের পরীক্ষামূলক উৎপাদন করে। শাহজালাল সারকারখানা দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১৭৬০ টন। সারকারখানায় পরীক্ষামূলক ইউরিয়া সার উৎপাদন করা হয় ৩০ হাজার টনের অধিক। বিপুল পরিমাণের ওই সারের কোনো হিসাব ছিল না, কারণ ওইগুলো পরীক্ষামূলক উৎপাদন ছিল। বিদ্যমান ওই সারগুলো ফয়সল অনায়াসে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ উঠে। কারণ ওই সময় ফয়সল অ্যান্ড কোম্পানি ও মেসার্স মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্স  ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে সার পরিবহনের কার্যাদেশপ্রাপ্ত ছিল। প্রতি টন ইউরিয়ার বিক্রয় মূল্য ২০ হাজার টাকা হলে পরীক্ষামূলক উৎপাদিত ৩০ হাজার টন সার বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছে ৩০ কোটি টাকা। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোপাল চন্দ্র জানিয়েছেন- নানা অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পূর্বের যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা এসব করেছেন। এখন অবশ্য সবকিছু নিয়ম মতো চলছে বলে জানান তিনি। ডিএম ফয়সলের বক্তব্য: ফেঞ্চুগঞ্জের ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি নির্মাণের সময় তিনি কোনো দুর্নীতি করেননি বলে জানান স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ডিএম ফয়সল। বলেন- অন্যান্য ঠিকাদারের মতো তিনিও একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছেন। এমপি’র নির্দেশে মূল সিন্ডিকেটে ছিলেন তার ভাতিজির জামাই সৈয়দ তৌফিকুল হাদী সহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা খোকন সহ কয়েকজন। তারাই মূলত এমপি’র শেল্টারে এসব করেছেন। তাকেও ওদের টাকা দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা আমেরিকায় বসেও তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা চাচ্ছে। আর পরীক্ষামূলক উৎপাদিত সার পরিবহনে তার প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল না। সেটি দুর্নীতি করেছে মেসার্স মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিকপক্ষ। এ কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার পর তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। এ ছাড়া যেসব ভবনের কাজ হয়েছে সেগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই হয়েছে টেন্ডারের মাধ্যমে। সমঝোতায় কম সংখ্যক বিল্ডিংয়ের কাজ হয়েছে। ঢাকা কিংবা কানাডায় তার কোনো সম্পদ নেই।

দুই মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বাড়িতে টিউলিপের থাকার বিষয়ে সংসদের স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারকে তদন্তের আহ্বান by আরিফ মাহফুজ

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রের মালিকানাধীন ২ মিলিয়ন পাউন্ডের বাড়িতে ব্রিটিশ মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে  ‘দ্য মেইল অন সানডে’ প্রশ্ন উত্থাপন করার পর সংসদীয়  স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারকে এ বিষয়ে তদন্ত খোলার আহ্বান জানানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। গত সপ্তাহে দ্য মেইল প্রকাশ করে যে, লেবার মন্ত্রী টিউলিপ উত্তর লন্ডনে তার মালিকানাধীন একটি ফ্ল্যাট থেকে দুই বছর আগে কোটিপতি ব্যবসায়ী আব্দুল করিমের মালিকানাধীন কয়েক মাইল দূরে একটি পাঁচ বেডরুমের বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন। বাড়িটির মূল্য ২ মিলিয়ন পাউন্ড। করিম হলেন টিউলিপের খালা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার মিত্র। সেই মিত্রর মালিকানাধীন ২ মিলিয়ন পাউন্ডের বাড়িতে টিউলিপ সিদ্দিক ভাড়া থাকছেন বলে জানিয়েছিলেন।  কিন্তু করিমকে কত ভাড়া দিচ্ছেন তা বলতে রাজি হননি টিউলিপ। এরপরই সংসদীয় স্ট্যান্ডার্ড কমিশনারকে এনিয়ে তদন্ত খোলার আহবান জানানো হয়। লেবার সূত্র জানিয়েছে, টিউলিপ  নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তার ফ্ল্যাট থেকে সরে গেছেন  এবং বাজারের মাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাড়া পরিশোধ করছিলেন।

বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই লাশ হলো রাব্বি by মো. আল-আমিন সরকার

‘পোলাডায় কইছিল বিদেশ যাইয়া আমারে আর কাম করতে দিবো না, অবসর দিবো। বন্ধুরে বাঁচাইতে যাইয়া অহন সে নিজেই চিরতরে অবসরে চইলা গেল’ মাধবদীতে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীর গুলিতে নিহত রাব্বির পিতা আব্দুল খালেক মানবজমিন প্রতিনিধির কাছে এভাবেই আক্ষেপ করে একমাত্র ছেলেকে হারানোর ঘটনা তুলে ধরেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ২০শে জুলাই মাধবদীর শেখেরচর মাজার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন চেয়ারম্যান মার্কেটের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় আশিকুল ইসলাম রাব্বি (২০)। তাদের বাড়ি মাধবদীর মেহেরপাড়া ইউনিয়নের ভগীরথপুর গ্রামে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় ফার্মেসি মালিক আবুল খায়ের জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে কারফিউ এর প্রথমদিন বেলা ১২টার পর শেখেরচর মাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিজিবির টহল টিম এসে হঠাৎ রাস্তায় চলাচলকারী লোকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় ভয়ে সবাই দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করলে বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে দোকান খুলে তিনি রাস্তার ওপরে একাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকার খবর পান। এদের মধ্যে একশ’ গজ ব্যবধানে পড়ে থাকা আলী হোসেন ও নাহিদ নামে ২ ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। অন্যদিকে মুন্না নামে একজন আহত হয়ে রাস্তার উপরে পড়েছিল। সে শেখেরচর বাজারে কাপড়ের দোকানে কাজ করতো। কিছুক্ষণ পর রাব্বি এসে ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনের সহযোগিতায় তার বন্ধু মুন্নাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

এ সময় রাব্বি বাজার থেকে মুন্নার চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা উত্তোলন করে। উক্ত টাকা মুন্নার সঙ্গে হাসপাতালগামী লোকদের হাতে বুঝিয়ে দিতে গেলে বিজিবি টহল টিম পুনরায় এসে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে বুকের ডানপাশে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাব্বি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়।

রাব্বির বাবা জানান, তার ২ মেয়ে ১ ছেলের মধ্যে রাব্বি ছিল মেজো। আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্য অস্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়ে ছেলেকে আর পড়াতে পারেনননি। অটোরিকশা চালিয়ে তিনি পরিবারের ভরণপোষণ চালাতেন। গেল কোরবানির ঈদের বারোদিন আগে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। ছিনতাইকারীরা তাকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তখন স্থানীয় একটি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে পুনরায় একটি অটোরিকশা কিনে নিজেই সেটা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় রাব্বি। তিনি আর জানান, ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে শিগগিরই রাব্বির ব্রুনাই চলে যাওয়ার কথা ছিল। অনেক কষ্টে ধারদেনা করে ছেলের বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ইতমধ্যে এজেন্সিতে রাব্বির কাগজপত্রও চলে এসেছিল। সে বলেছিল বিদেশ গিয়েই তার বাবাকে আর কাজ করতে দিবে না, বিশ্রাম দিবে; কিন্তু সেই সুখ কপালে আর আসলো না।

রাব্বির মা শামসুন্নাহার জানান, সকালে তার সঙ্গে নাস্তা সেরে বাড়ির পাশেই ক্যারাম খেলছিল রাব্বি। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দিক থেকে ছুটে আসা লোকজনের কাছ থেকে মুন্না নামে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় রাব্বি। সেখানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ বন্ধুকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলেও নিজেকে বাঁচাতে পারেনি সে। বিজিবির ছোড়া গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাব্বি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ঘরটা শূন্য হয়ে গেল। কি দোষ ছিল আমার ছেলের? আমি কার কাছে বিচার চাইবো?’ এভাবে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয় তিনি দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি এই আকুতি জানান।

যশোরে লাপাত্তা ১৩২৩ জনপ্রতিনিধি

স্থানীয় সরকারের মাঠ পর্যায়ের সকল দপ্তর অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিরা বর্তমানে এলাকাছাড়া। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এসব কথিত জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের পিঠ ও অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বাঁচাতে এলাকা ছেড়েছেন। ফলে বর্তমানে জেলার এই চার স্তরের ১৩২৩ জন জনপ্রতিনিধির প্রায় সকলেই পলাতক জীবনযাপন করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। যশোর জেলার জেলা পরিষদ,  উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় এই চার স্তরে বিগত বছরগুলোতে ভোটারবিহীন নির্বাচনে  ১৩২৩ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। এর মধ্যে জেলার ৯১টি ইউনিয়নে ৯১ জন চেয়ারম্যানসহ ১১৮৩ জন, জেলার ৮টি উপজেলায় উপজেলা চেয়ারম্যান ও ২ জন করে ভাইস চেয়ারম্যান মিলে ২৪ জন, ৮টি পৌরসভায় ১০৪ জন এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ ১২ জন জনপ্রতিনিধি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জেলায় কর্মরত ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত এসব নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল বর্জন করায় একতরফা ভোটে এসব জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। ন্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনের আগে বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল সেই নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয়ায় কোনো নির্বাচনেই ৫-১০ শতাংশের বেশি ভোট কাস্ট হয়নি। একই পরিস্থিতি ছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার একদিন পর রাষ্ট্রপতি সংসদীয় ক্ষমতাবলে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

ফলে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরগুলো কাগুজে-কলমে কার্যকর থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদের সকল সদস্য লাপাত্তার খবরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে তথাকথিত নির্বাচিতরা গাঢাকা দেয়। এর ফলে স্থানীয় সরকারের এ সকল দপ্তরের সেবা কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। সূত্র বলছে বিগত নির্বাচনী খেলার মাধ্যমে যারা জনপ্রতিনিধির তকমা গায়ে জড়িয়ে এসব চেয়ারে বসেছিলেন তাদের অধিকাংশ সমাজের খারাপ লোক হিসেবে পরিচিত। এসব জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই  বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, হুন্ডি ও স্বর্ণের পাচার, নারী ও শিশু পাচার, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা রকম সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। যার কারণে এরা দিনে দিনে জনশত্রুতে পরিণত হন। এদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় দানব হিসেবে জনগণের কাছে চিহ্নিত ছিলেন। তাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পর্যন্ত সাহস পাননি। চুন থেকে পান খসলেই এসব নামধারী জনপ্রতিনিধি ও তাদের ক্যাডারদের হাতে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বহু মানুষ। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রেহায় পাননি। এসব ঘটনার প্রতিবাদে কেউ আইনের আশ্রয় নিতেও সাহস দেখাননি। পুলিশি ভূমিকা ছিল দলীয় ক্যাডারদের মতোই। কেউ পুলিশের কাছে কোনো নালিশ বা অভিযোগ দায়ের করার সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য অভিযুক্তকে জানিয়ে দিতো পুলিশের সদস্যরা। ফলে অভিযোগকারীকে ফের হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হতো। ফলে ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বা কথা বলার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। দীর্ঘদিন বিএনপি, জামায়াতসহ সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল দফায় দফায় আন্দোলন করেও এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটাতে না পারায় সরকারি দলের এসব নেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই পর্যায়ে জুলাই গণবিপ্লব এবং ৫ই আগস্ট মহাবিপ্লবের পর সরকারের পতন ঘটলে নামধারী এসব জনবিছিন্ন জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের প্রাণ ও জানমাল রক্ষায় গা-ঢাকা দেয়। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধির তমকা গায়ে জড়িয়ে  যারা বিগত দিনে সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান তারা এলাকা ছেড়ে দেন। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা তৌহিদ চাকলাদার ফন্টু, যশোর পৌরসভার মেয়র মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার হায়দার গণি খান পলাশ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুজ্জামান পিুকল, চৌগাছা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম হাবিব, পৌর মেয়র আল মামুন হিমেল, ঝিকরগাছা পৌরসভার মেয়র মোস্তফা জামাল পাশা, উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম মনির, মণিরামপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন লাভলু, পৌর মেয়র মাহামুদুল হকসহ জেলার সকল উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বররা রাতারাতি এলাকাছাড়া হয়েছেন।  
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন, নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তুহিন, লেবুতলার চেয়ারম্যান আলিমুজ্জামান মিলন, উপশহরের চেয়ারম্যান এহসানুর রহমান লিটু, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দাউদ হোসেন, বারীনহরের চেয়ারম্যাান ইদ্রিস আলী, আরবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহারুল ইসলাম, দেয়াড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান আনিচ, নরেন্দ্রপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাজু আহমেদসহ সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বররা পালিয়ে গেছেন।  ফলে দীর্ঘদিন এসব জনপ্রতিনিধিদের চেয়ারগুলো অরিক্ষত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে জানা গেছে, যারা এলাকা ছেড়েছেন তারা প্রায় সকলেই নির্যাতনকারী, লুটপাটকারী, সন্ত্রাসী, মাদক ও অস্ত্রের চোরকারবারি ছিলেন। এদের ভয়ে জনগণ সব সময় তটস্থ থাকতেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে এদেরকে কেউ ধাওয়া দেয়ার আগেই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সরে পড়েছেন। কারণ তাদের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তাই তাদেরকে এলাকায় কোনো জায়গা হয়নি।
এ বিষয়ে যশোর জেলা পরিষদের  প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, গত ৫ই আগস্টের পর থেকে অদ্যাবধি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা মেম্বারগণ কেউ অফিসে আসেননি। ফলে কাজকর্মে কিছুটা গতি হারিয়েছে। যশোর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানরা কেহ অফিস করছেন না। ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটছে। একই ধরনের কথা বলেন যশোর পৌরসভার সিইও। যার প্রেক্ষিতে গত ১৪ই আগস্ট সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপন জারি করে পলাতক জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে স্ব স্ব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ করে সিইও বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের কর্মক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। যার কারণে বর্তমানে কাজ চালিয়ে নেয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং রাজপথের বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ভোটারবিহীন স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচন বাতিল করে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোরে স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক  রফিকুল হাসান বলেন, বর্তমান সরকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত। বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিরা অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় সরকারের কাজকর্মে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এখন এই বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে তা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনে আমরা যারা দায়িত্বে আছি তারা কাজ করবো।

মেট্রোরেল: যাত্রীদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের ধর্মঘট

চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত মেট্রোরেল। তবুও চালু করা যাচ্ছে না মেট্রোরেল। খোদ মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণেই মেট্রোরেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ঢাকাবাসী। সরকার পতনের পর ছয় দফা দাবিতে মেট্রোরেলের ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন। এসব দাবির মধ্যে তাদের বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির বিষয় রয়েছে। তাদের দাবি পূরণ না হলে অনিদিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণাও দিয়েছেন। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন মেট্রোরেলের যাত্রীরা। সড়কে যানজট আর ভোগান্তির মধ্যেই চলাচল করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীর।

মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা যায়, মেট্রোরেল চালু করার জন্য কারিগরি কোনো ত্রুটি নেই। শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ ও কাজিপাড়া স্টেশন যাত্রীসেবা দেয়া ছাড়া মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্তই মেট্রো চালানো যাবে। দীর্ঘদিন মেট্রোরেল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কয়েকদিন ট্রায়াল রান করতে হয়।

তারপর যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে মেট্রোরেল। কিন্তু মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে সেটি আটকে রয়েছে। মেট্রোরেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, ট্রেন অপারেটর, স্টেশন কন্ট্রোলার, টেকিনিশিয়ানরা ধর্মঘট দিয়েছে। এই কারণে মেট্রোরেল চালানো যাচ্ছে না। মেট্রোরেলের ট্রায়াল রানের জন্য তাদের লাগবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ৫-৬ দিন ট্রেন চালিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু তারা কাজে না ফেরায় আমরা সেটা করতে পারছি না।

গত ১৭ই আগস্ট মেট্রোরেল চলাচল করার কথা ছিল। কিন্তু ১৫ই আগস্ট ডিএমটিসিএল সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৭ই আগস্ট থেকে মেট্রোরেল পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছয় দফা দাবি মেনে না নিলে তারা কাজে ফিরবেন না। এসব দাবিতে বেতন বৃদ্ধি, বকেয়াসহ সিপিএফ সুবিধা, পদ্দোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণ, পরিবহন ব্যবস্থা ও বৈষম্যমূলক বহিঃপ্রকাশ বন্ধ করার কথা উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সরকার পতনের পর মেট্রোরেল বন্ধ রেখে এসব দাবি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী সাতদিনের মধ্যে মেট্রোরেল চালু করার কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মেট্রোরেল চালু করতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ চলছে। এটার (চালু করতে) দুটো সমস্যা ছিল। একটা সমস্যা ছিল যে বোর্ডের সদস্য ছিল না। সেটা আমরা আজই করে ফেলেছি। ওই বোর্ডের একটা সভা হবে কাল (সোমবার)। সভার পরে লাইনগুলো চেক করতে দুই-চারদিন লাগবে। আমাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাহেব আছেন, তিনি আমাদের সময় দিয়েছেন এটা আগামী সাতদিনের মধ্যে চালু করার চেষ্টা করবেন।

মেট্রোরেল বন্ধ থাকার কারণে ঢাকার সড়কে বেড়েছে যানজট। বিশেষ করে মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্রোরেলের রুটে পরিবহনের চাপ বেড়েছে। শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, বিজয়সরণি, মিরপুর এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যানজটের মধ্যে গরম আর লক্কর-ঝক্কর বাসে চলাচল করায় ভোগান্তি বেড়েছে এই রুটের যাত্রীদের। তারা বলছেন, সড়কে শূঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষার্থীরা মাঠে পরিশ্রম করছে, অথচ মেট্রোরেল বন্ধ রেখে যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি করছেন। তারা মেট্রোরেল চালু রেখে তাদের দাবির ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারতেন। তামিম ইসলাম নামে এক মেট্রোযাত্রী বলেন, মেট্রোরেল দ্রুত চালু করে দেয়া উচিত। যাদের জন্য এখনো মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলবো কর্তৃপক্ষকে। জাবেদ ইকবাল নামের আরেক যাত্রী বলেন, অনেক দিন ধরে শুনছি মেট্রোরেল চালু করা হবে। কিন্তু তাও করা হচ্ছে না।

এখন তো সবকিছু স্বাভাবিক চলছে তাহলে মেট্রোরেল বন্ধ রেখে জনভোগান্তি করার কোনো মানে নেই।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত ১৮ই জুলাই ঢাকায় মিরপুর-১০ এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ পুলিশ বক্সে অগ্নি সংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। ওই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওভারব্রিজের ওপর। সংঘর্ষ চলমান থাকায় তখন মেট্রোরেলের মিরপুর ১০, মিরপুর ১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ওই সময়ে অন্য স্টেশনগুলোতে চলছিল মেট্রোরেল। একইদিন বিকাল ৫টার দিকে ডিএমটিসিএল এক বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিবার্য কারণবশত জননিরাপত্তার স্বার্থে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সর্বশেষ মেট্রো ট্রেন বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। আজ (ওইদিন) আর কোনো মেট্রো ট্রেন চলাচল করবে না।’ তবে ওই বিজ্ঞপ্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।

উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে বছরে ক্ষতি ৪৫ হাজার কোটি টাকা: সিপিডি

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)

বছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং বেসরকারি কোম্পানির কাছে বকেয়া বিল রয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে চুক্তির আওতায় ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে প্রতিবছর ৩৭ হাজার ৯৩ কোটি টাকার বাড়তি বোঝা টানতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। গতকাল ধানমণ্ডির সিপিডি কার্যালয়ে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার সিপিডি’র প্রস্তাবনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এসব তথ্য তুলে ধরেন।

এতে দ্রুত বিদ্যুৎ ক্রয়ের বিশেষ আইন বাতিলসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে ১৭টি প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। যেগুলো বাস্তবায়ন জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারকে এগুলো বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে কুইক ইনহ্যান্সমেন্ট অব ইলেক্ট্রিসিটি অ্যান্ড পাওয়ার সাপ্লাই অ্যাক্ট, ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান (আইইএমপি), ন্যাশনাল এনার্জি পলিসি ও রিনিওয়েবল এনার্জি পলিসি সংস্কারের জোর দাবি জানায় সিপিডি।

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রথমে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কারে মনোনিবেশ করতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহিতা বাড়াতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)কে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বৈষম্য দূরীকরণ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এই সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রথমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বিশেষ আইন ২০১০ বাতিল করতে হবে। তৃতীয় পদক্ষেপ হতে হবে, যেসব কোম্পানি বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির জন্য অযাচিতভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করতে হবে।

এ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার কথাও জানান তিনি। টেকসই জ্বালানি রূপান্তরে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে জোর দিতে হবে।

তিনি বলেন, ২০৪১ সালে বিদ্যুতের চাহিদা হতে পারে ২৭ হাজার মেগাওয়াট, রিজার্ভ মার্জিনসহ ৩৫ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনায় ৫৮ হাজার মেগাওয়াট ধরা হয়েছে লক্ষ্যমাত্রা, যা অযৌক্তিক। এই অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি খাত এলএনজি, কয়লা আমদানির মতো অবকাঠামো তৈরির চাপ দিতে পারে। তাই এটার সংশোধন দরকার বলে আমরা মনে করছি।

নিবন্ধে বলা হয়, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা দরকার। এর মধ্যে আছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিইআরসি’র ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে ধীরে ধীরে। আইন সংশোধন করে কমিশনকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এটিকে যুগোপযোগী করে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা দরকার। বিপিসি ও পিডিবি থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না। তথ্য নিয়মিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। বিপিসি’র স্বয়ংক্রিয় দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া ত্রুটিযুক্ত। এখানে মুনাফা দেখা হয়েছে, ভোক্তাস্বার্থ দেখা হয়নি। গত পাঁচ বছরে বিপিসি ও পিডিবি’র বার্ষিক প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করা জরুরি। তবে এর দায়িত্ব দেশের কোনো অডিট ফার্মকে না দিয়ে আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মকে দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি হলে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে বলে মনে করে সংস্থাটি।

সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনটি ধাপে ছয় মাস, এক বছর ও তিন বছরের রূপরেখা তৈরি করতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার। দ্রুত সংস্কারের বিষয়গুলো এ সময়ের মধ্যে রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীন কমিটি গঠন করে বিদ্যুৎ খাতে ভুতুড়ে বিল তদন্ত করতে হবে প্রথম ছয় মাসেই। ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতে নো ইলেক্ট্রিসিটি, নো পে অনুযায়ী, চুক্তি সংশোধন করলে, ভর্তুকির চাপ কমবে। গ্রাহককে বাড়তি দাম দিতে হবে না বলেও আমরা মনে করছি। তিনি বলেন, দুর্নীতির চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে বিভিন্ন নীতি। দেড় থেকে দুই গুণ বেশি চাহিদা হিসাব করে প্রক্ষেপণ তৈরি করা হয়েছে। এমন নীতি তৈরিই করা হয়েছে একটা গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে।

সিপিডি বলছে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো আন্তর্জাতিক চাপে যেন আবার দেশি কয়লা উত্তোলনে জোর দেয়া না হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তবে এটা যেন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিভিত্তিক না হয়। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে তারা আসতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত সূচনা হতে পারে। ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চলমান থাকবে। চীনের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এএফবি’র মতো বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থার সঙ্গে ব্যাপক অংশীদারিত্ব তৈরি হতে পারে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের দাবি জানিয়েছে সিপিডি। একই সঙ্গে নতুন করে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমাদেরকে এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হয়ে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এডিপিতে এলএনজি সংশ্লিষ্ট যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলোর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’

যেভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন সিলেটের রুবায়েদ by ওয়েছ খছরু

‘নামাজ থেকে বের হতেই সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলে পড়ে মসজিদের মুসল্লিদের ওপর। আমরা কয়েকজন দৌড়ে চলে যাই দোতলায়। সেখানে গিয়েও রেহাই নেই। হাতে থাকা রামদা, দা দিয়ে আমাকে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলছি; ‘আমি দোকানে কাজ করি। আমাকে মেরো না।’ কে শোনে কার কথা। কোপাতেই থাকে। রক্ত ঝরছিল শরীর থেকে।- এ কথা বলছিলেন সিলেটের হাসপাতালের বেডে থাকা রুবায়েদ ইসলাম। ৪ঠা আগস্ট তার উপর চলেছে ছাত্রলীগের নির্মম অত্যাচার। বলেন, ‘আবার জীবন ফিরে পাবো, ভাবিনি।

ওরা আমাকে নির্মমভাবে কুপিয়েছিল।’ রুবায়েদ ইসলামের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁওয়ের নিজগাঁও গ্রামে। নগরের নয়াসড়কের রান্না বিরানী হাউসে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছিল। ঘটনার দিন মসজিদে আসরের আজান হওয়ার একটু পর নামাজ পড়তে যান রুবায়েদ। বাইরে তখন শান্ত পরিবেশ। কিন্তু নামাজ চলার সময়ই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নয়াসড়ক এলাকা। নামাজ শেষ করে যখন মুসল্লিরা বের হচ্ছিলেন তখন তাদের উপর হামলা চালায় কয়েকজন সশস্ত্র কর্মী। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে দৌড়ে দোতলায় উঠে যান তিনি। এমন সময় ছাত্রলীগের ৬-৭ জন সশস্ত্র কর্মী তাদের অনুসরণ করে দোতলায় ওঠে। হাতের কাছে পেয়ে যায় রুবায়েদকে। রামদা দিয়ে প্রথমেই রুবায়েদের মাথায় কয়েকটি কোপ দেয়। এরপর শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতারি কোপ। অজ্ঞান হয়ে পড়েন রুবায়েদ। কিছু বলতে পারেননি। এরপর দু’জন তার হাত ও পায়ে ধরে দোতলা থেকে নিচে আঁচড়ে ফেলে। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেতলে যায়। গতকাল মানবজমিনকে রুবায়েদ জানান, সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীরা হায়েনার মতো আমার চুল ধরে টেনে টেনে সড়কে নেয়। এরপর কয়েকজন লাথির পর লাথি মারতে থাকে। এমন সময় আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি আমাকে সড়কে ফেলে ফুটবলের মতো লাথি দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা কাজিটুলা পিউরিয়ার সামন পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওখানে একটি ভবনে আমাকে ফেলে চলে যায়। তিনি জানান, এ সময় আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও পারিনি। শরীর দিয়ে অবিরত রক্ত ঝরছিল। ভবনের মালিক আমাকে টেনে একটি রিকশায় তোলেন। এরপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। একদিন পর আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি হাসপাতালের আইসিইউতে আছি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রুবায়েদ ইসলামকে গুরুতর অবস্থায় রিকশায় করে পার্শ¦বর্তী সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ার কারণে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। অজ্ঞান অবস্থায় থাকার একদিন পর তার জ্ঞান ফিরে। পরে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়। রুবায়েদ এখন হাসপাতালের ২৩নং ওয়ার্ডের ১ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন। তার বেডের পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে জাতীয় পতাকা। কোপানোর ফলে তার গোটা শরীরই ক্ষত বিক্ষত। বামহাত ভেঙে গেছে। ডান হাতের কয়েকটি আঙ্গুলও ভেঙে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসা ব্যয় বলতে কিছুই নিচ্ছেন না। তবে, ওষুধের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাকে নিজেই। জানালেন, আইসিইউতে থাকার সময় বিল হয়েছিল ২৩ হাজার টাকা। সেটি পরিশোধ করেন তার দোকানের মালিক। ওষুধ কিনতে অনেকেই সহযোগিতা করছেন। কিন্তু এখনো শরীরে শক্তি পাচ্ছেন না। দু’একদিনের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড় দেয়া হবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে পরিবার এখন দুশ্চিন্তায়। হাসপাতালে দেখতে গতকাল গিয়েছিলেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. মুনতাসির আলীসহ দলের কর্মীরা। রুবায়েদের উপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা শুনে তিনি নিজেই আপ্লুত হয়ে পড়েন। এভাবে কোনো মানুষ অন্য আরেকজন মানুষের উপর অত্যাচার করতে পারে তিনি ভাবতেও পারছেন না। তবে; বাস্তবে রুবায়েদের উপর তাই ঘটেছে। মো. মুনতাসির আলী মানবজমিনকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে যারা এখনো জীবিত অবস্থায় ভর্তি আছেন তাদের একেকজনের গল্প খুবই মর্মান্তিক। তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় তাদের পোষ্য বাহিনী যে নির্যাতন চালিয়েছে তা অতীতে কখনোই হয়নি। এত মানুষের প্রাণও যায়নি। তিনি বলেন, আমাদের উচিত যারা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের এই বীরদের শক্তি ও সাহস দেয়া সবার কর্তব্য। তারাই আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। 

ক্লাসে ক্লাসে শূন্যতা

একগুচ্ছ ফুল হয়ে ক্লাসে ফিরলো শফিক উদ্দিন আহম্মেদ আহনাফ। তবে সশরীরে নয়। স্মৃতি হয়ে। আহনাফের বসার জায়গাটা ফাঁকা রেখে বসেছে সবাই। গতকাল আহনাফের শূন্যতার ছবি ব্যাপকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের পোশাক পড়ে পরীক্ষা দিচ্ছেন। এরই মাঝে একটি স্থানে ফুলের তোড়া রাখা। কাগজে লেখা ‘শফিক উদ্দিন আহমেদ’।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে শতাধিক শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছেন। আহত হয়ে বহু শিক্ষার্থী কাতরাচ্ছেন হাসপাতালের বেডে। অসুস্থ অনেকে বাসায় থাকলেও ফিরতে পারছেন না ক্লাসে।
গতকাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করেছে। সহপাঠীরা ক্লাসে ফিরলেও আন্দোলনে নিহত ও আহতদের শূন্যতা ভর করেছে তাদের ওপর।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সফল হয়েছে। তারা ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ ছাড়েনি। দাবি আদায় করেই ছেড়েছে। আন্দোলনের তোড়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ছুটি শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসে বসা। আনন্দের মুহূর্ত, স্মরণীয় সময়। কিন্তু এবারের দৃশ্যটা একেবারেই ভিন্ন। ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ফিরলেও রয়েছে বন্ধু হারানোর বেদনা। আশা করা যায় ক’দিন বাদে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে পরিস্থিতি। তবে ক্লাসে ফিরবে না কয়েকশ’ শিক্ষার্থী। যারা আন্দোলনে ‘শহীদ’ হয়েছেন।

গতকাল বিএএফ শাহীন কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন আহনাফ। বয়স সবে ১৭, ছিলেন ব্যবসা শিক্ষা প্রশাসনের শিক্ষার্থী। ইচ্ছা ছিল ব্যান্ড দল গড়ে তোলার। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নিয়মিত মুখ আহনাফ। গত ৪ঠা আগস্ট রাজধানীর মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হন। সেখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থান করছিলেন আহনাফ। তারা থাকতেন রাজধানীর মধ্য পাইকপাড়ায়। বাবা-মা বার বার আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলেও শুনতেন না। এদিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তার মা ফোন দেন আহনাফকে। ঘণ্টাখানেক পর আহনাফ তার মাকে জানিয়েছিলেন, মিরপুর ১০ নম্বরে আছেন। এটাই ছিল আহনাফের সঙ্গে মায়ের শেষ কথা। কিছু সময় পর একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে মিরপুরের একটি হাসপাতালে ডাকা হয়। সেখানে এক ব্যক্তি আন্দোলনে মারা যাওয়া কয়েকজনের ছবি দেখান। সেই ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবি ছিল আহনাফের।  এরপর আহনাফের পরিবারের সদস্যদের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে মর্গে আহনাফের লাশ পান পরিবারের সদস্যরা। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাদির কবরে আহনাফকে দাফন করা হয়।

পরিবারের বরাতে জানা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে শুরু থেকেই আহনাফ সোচ্চার ছিল। আন্দোলনে অংশ নিয়ে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটে আহত হয়ে সে একবার বাসায় ফিরেছিল। আহনাফ তার মা আর খালাকে বলতেন, তোমাদের মতো ভীতু মা-খালাদের জন্য ছেলেমেয়েরা আন্দোলনে যেতে পারছে না। ১৯৭১ সালে তোমাদের মতো মা-খালারা থাকলে দেশ আর স্বাধীন হতো না।
আহনাফের মা সাফাত সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, আন্দোলনে যেতে বাধা দিলেই আহনাফ বলতো, সে সাঈদ-মুগ্ধ ভাইদের মতো সাহসী হতে চায়। তাদের মতো কিছু হলে তারা গর্ব করে বলতে পারবেন, আমরা আহনাফের মা-খালা। শেষ পর্যন্ত আহনাফ হয়েছেও তাই।

বিএএফ শাহীন কলেজের ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক বোরহান উদ্দিন জানান, একাদশ শ্রেণির হিসাব বিজ্ঞান পরীক্ষার সময় এ উদ্যোগ নেয়া হয়। তিনি বলেন, আহনাফের জায়গা কেউ নিতে পারবে না। ও একজন বীর। আমরা ওকে বীর হিসেবেই মনে রাখবো। এ ভাবনা থেকেই আমরা আজ ওর আসনে ফুলের তোড়া রেখেছিলাম।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধিকাংশই খোলেনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, দীর্ঘদিন পর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসতে শুরু করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাসে ফিরতে শুরু করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। যদিও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কিছুটা কম। তবু দীর্ঘ এক মাস পর ক্লাসে ফিরতে পেরে খুশি শিক্ষার্থীরা। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ২০টিরও অধিক বিভাগ ক্লাস কার্যক্রম শুরু করেছে। বাকি বিভাগগুলো খুব দ্রুত সময়ে ক্লাসে ফিরবেন বলেন জানান। তবে শিক্ষার্থীরা ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছে। সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা আবারো পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দেবে বলে আশা করছেন শিক্ষকরা। পড়াশোনার ক্ষতি পোষাতে বদ্ধপরিকর শিক্ষকরা। এদিকে কোটা সংস্কারের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাছাড়াও হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ক্যম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করেছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) ও প্রক্টরিয়াল বডি পদত্যাগ করেছে। আবার ট্রেজারার ও প্রো-ভিসি (প্রশাসন) এর কক্ষ তালাবদ্ধ করে রেখেছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবক শূন্য হয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, অনিশ্চয়তার মধ্যেই গতকাল খুলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রক্টর, প্রভোস্টসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে এ নিয়ে কৌতূহল ছিল সবার মাঝে। প্রথম দিন কোনো বিভাগেই নিয়মিত ক্লাস অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে মনোবিজ্ঞানসহ কিছু বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়েছে পরীক্ষা। প্রভোস্ট না থাকায় হলগুলোর নিয়মিত কাজেও ছিল স্থবিরতা। তবে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অফিস কর্মকর্তরা। সেখানে শুরু হয়েছে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, ভিসি, দুই প্রো-ভিসি, প্রক্টরিয়াল বডির সব সদস্য এবং হল প্রভোস্টরা পদত্যাগ করেছেন। এমতাবস্থায় সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা থাকলেও রোববার এক অফিস আদেশে এটি স্থগিত করা হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের হলের আসন বরাদ্দ দিয়েই খুলবে ক্যাম্পাস। তবে প্রশাসন না থাকায় কবে নাগাদ খুলবে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, রোববার থেকে সকল বিভাগে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও স্বাভাবিক হয়নি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর, প্রাধ্যক্ষসহ পদত্যাগ করেছেন ৭৫ জন ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ফলে অভিভাবকহীন এ বিদ্যাপীঠে ক্যাম্পাস খুললেও শুরু হচ্ছে না ক্লাস-পরীক্ষা। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে আইন, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং ফোকলোর বিভাগে একটি করে ক্লাস হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকি সকল বিভাগের ক্লাসরুমে তালা ঝোলা অবস্থায় দেখা যায়।

ড. ইউনূসের বিচার স্থগিতের প্রতিবাদকারী ৫ ভিসি বহাল তবিয়তে

নোবেল জয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার প্রক্রিয়া স্থগিতের দাবির প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিদানকারী বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে পদত্যাগ করলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন কয়েকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। পদত্যাগ না করে অজ্ঞাত স্থান থেকে ক্যাম্পাস পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন তারা। প্রতিটি ক্যাম্পাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ ছাত্ররা তাদের পদত্যাগের দাবিতে আল্টিমেটাম প্রদান, কুশপুত্তলিকা দাহসহ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলেও তারা পদত্যাগ  না করায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন  ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। ২০২৩ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো সেই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দুর্নীতিবাজ উপাচার্যরা হলেন- সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ডা. মো. জামাল উদ্দিন ভূঞা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড.  মো. আব্দুল বাসেত, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড.  এ কে এম জাকির হোসেন ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আবুল কাশেম চৌধুরী। গণমাধ্যমে পাঠানো সেই বিবৃতিতে বলা হয়, গত বছরের ২৮শে আগস্ট কয়েকজন নোবেল বিজয়ী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজের সদস্য বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রদত্ত এক খোলা চিঠিতে বাংলাদেশের শ্রম আইনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এটি সার্বভৌম একটি দেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ। দেশের বিবেকবান নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ার ওপর এ ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই যে, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন। অতএব আমরা মনে করি, এ ধরনের চিঠি প্রদানের মাধ্যমে বিবৃতিদাতাগণ অনৈতিক, বেআইনি ও অসাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন। এ ধরনের বিবৃতি বা খোলা চিঠি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বাংলাদেশের আইনে শ্রমিকদের প্রদত্ত অধিকার সংক্রান্ত বিধানাবলির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এ ধরনের বিবৃতি ও চিঠি প্রদান করে বিবৃতিদাতা সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও নোবেল বিজয়ীগণ প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থি কাজকেই উৎসাহিত করতে চেয়েছেন।

হাসিনার পরিণতি ভারতের জন্য শিক্ষা -ডনের প্রতিবেদন

বিষয়টা কাকতালিয় মনে হতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকা থেকে পালাতে বাধ্য করার মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৯ সালের পরেও তাদের ক্ষমতা স্থায়ী হবে বলে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এমনভাবে কথা বলেছেন মনে হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি না থাকলে দিল্লি ধ্বংস হয়ে যাবে। ৪ আগস্ট ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, বিরোধী দল বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টায় ব্যস্ত। তাদেরকে স্পষ্ট করে দিতে চাই, ২০২৯ সালের পরেও মোদিই আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে আগে এমন বক্তব্য দিয়েছেন অমিত।

পাকিস্তানের ডন পত্রিকা ১৮ই আগস্ট ‘নেইবারস: হাসিনা’স লেসন ফর নিউদিল্লি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভারতের এখন হাসিনার পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। অর্থাৎ যারা ভারতে এমন ক্ষমতার ভবিষ্যদ্বানি করছেন তাদের হাসিনাকে দেখে নিজেদের শুধরে নিতে হবে। কেননা ১৫ বছর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পরও হাসিনাকে লজ্জাজনকভাবে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ডনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে কয়েক মাস আগে দেশটিতে যে নির্বাচন হয়েছে সেখানে যারা সাংসদ হয়েছেন তাদের এই বার্তা দেয়া যে, নির্বাচনে ভোটাররা মোদির শাসনের বিরুদ্ধে যে তিরস্কার করেছে তা খুব বেশি গুরুত্বের সাথে নেয়ার কিছু নেই। যেহেতু ভারতের পার্লামেন্টে এখন একটি উদ্দীপ্ত বিরোধী দল রয়েছে তাই মোদির দল বেশ উদ্বিগ্ন।

কেননা আগের মতো এবার বিচার বিভাগ এবং আমলাতন্ত্রের অনেকেই মোদির প্রতিহিংসামূলক এজেন্ডা বাস্তবায়নে উৎসাহী নাও হতে পারে। মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যেও অবাধ্যতার গুঞ্জন রয়েছে যা জনগণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শেখ হাসিনাও মোদির মতো এ বছরের শুরুতে একক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। সেই নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতার বড়ই অভাব ছিল। নির্বাচনে কোনো বিরোধী দল ছিলনা। কেননা তারা হাসিনার অধীনে নির্বাচন বর্জন করেছিল। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের কোনো লক্ষণ ছিল না হাসিনার নির্বাচনে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন মোদিও নির্বাচন কমিশনের উপর প্রভাব বিস্তার করে ক্ষমতায় এসেছেন। বিজেপি চেয়েছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে দূরে থাকুক। এছাড়া বিরোধী দলের অনেক নেতাকেই বিভিন্ন মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছিল মোদি প্রশাসন। কিন্তু ঢাকায় কিছুদিন আগে যা ঘটে গেল তা থেকে মোদি এবং তার দলকে শিক্ষা নেয়া উচিত।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস শেখ হাসিনা সরকারের বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন, হাসিনা সরকার ছিল একটি মিথ্যা তৈরির কারখানা। একের পর এক মিথ্যা বলে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন হাসিনা। যা প্রতিটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পলিসি।

একই ধরণের পলিসি মোদি সরকারের তথ্য ও পরিসংখ্যানের দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্ট হয়েছে। তবে এমন আচরণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থি। এতে গণতন্ত্রিক স্বাস্থ্যও খারিজ হয়ে যায়। যারমাধ্যমে প্রবল অস্থিরতা তৈরি হয়। মোদি সরকার এখন ডিজিটাল পাল্টফর্মে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিগত দশ বছরে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে জাতীয় শাসনের সমস্যা এবং জাটিলতা নিরসনে মোদি সরকার ব্যর্থ। মোদির গত দশ বছরের শাসনের পর সমাজে অন্যায় এবং বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। দেশে অগণতান্ত্রিক ধারা সৃষ্টি হয়েছে। অমিত শাহ যাই বলেন না কেন তাদের বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। কেননা বাংলাদেশে স্পষ্ট হয়েছে যে, কুক্ষিগত ক্ষমতা কিভাবে গণতন্ত্রের কাছে ফিরিয়ে আনতে হয়।