Showing posts with label কুলদীপ নায়ার. Show all posts
Showing posts with label কুলদীপ নায়ার. Show all posts

Saturday, August 25, 2018

কুলদীপ নায়ার (১৯২৩-২০১৮)

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক, বিশ্লেষক কুলদীপ নায়ার আর নেই। বুধবার গভীর রাতে দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার জীবনাবসান হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পুরো উপ-মহাদেশেই জনপ্রিয় ছিলেন কুলদীপ নায়ার।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনেও কাজ করেছেন তিনি। গণতন্ত্রের পক্ষে সদা সরব এই সাংবাদিক শাসকমহলের সমালোচনায় মুখর ছিলেন বেশির ভাগ সময়। কারাভোগও করতে হয়েছে তাকে ।কুলদীপ নায়ারের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ই আগস্ট বৃটিশ ভারতের পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে। আইন শাস্ত্রে লেখাপড়া করেও তিনি কর্মজীবন শুরু করেন উর্দু পত্রিকা দৈনিক আনজামের একজন রিপোর্টার হিসেবে। ভারতের ইংরেজি দৈনিক ইনডিয়ান এক্সপ্রেস এবং স্টেটসম্যান সম্পাদনা করা কুলদীপ নায়ার ছিলেন সেইসব সাংবাদিকদের একজন, যারা সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে জরুরি অবস্থা জারির বিরোধিতায় সরব হয়েছিলেন। প্রতিবাদী হওয়ায় তাকে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। কুলদীপ নায়ার ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে ভারতের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
ধর্মীয় উগ্রবাদের পাশাপাশি উগ্রজাতীয়তাবাদের বিরোধিতায় সরব এই কলামনিস্ট শেষ বয়সে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য। গণতন্ত্রকামী এই অধিকারকর্মী তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে লিখে গেছেন ১৫টি বই। তার আত্মজীবনী বিয়ন্ড দ্য লাইনসে ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি ইতিহাসের নানা অধ্যায় উঠে এসেছে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই পুত্রসন্তান রেখে গেছেন। কুলদীপ নায়ারের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বহু মানুষ। এক টুইটে মোদি বলেছেন, কুলদীপ নায়ার আমাদের সময়ের এক মহান বুদ্ধিজীবী ছিলেন। মতামত প্রকাশে স্পষ্টভাষী ও নির্ভীক ছিলেন তিনি। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে তার অবস্থান, উন্নত ভারতের জন্য তার নিবেদন সবসময় মনে থাকবে। তার মৃত্যুতে গভীর শোক।
পুরো উপমহাদেশব্যাপী কুলদীপ নায়ারের বিরাট প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনামের এক লেখায়। তিনি লিখেছেন, কুলদীপ নায়ারের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন আন্তরিক ও বিশ্বস্ত বন্ধুকে হারাল, ভারত হারাল ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের একজন বিবেকবান রক্ষককে। পাকিস্তান হারাল দুই প্রতিবেশীদের মধ্যে বৃহত্তর বোঝাপড়ার অতন্দ্র কণ্ঠস্বর। দক্ষিণ এশিয়া হারাল সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বত্র সর্বাধিক জোরালো বক্তব্যের অধিকারী ব্যক্তিত্বকে। সাংবাদিকতা হারাল এই পেশার নীতি-আদর্শের জন্য অতুলনীয় উদাহরণকে। আর মানবতা হারাল মানুষের শুভবোধে ওপর প্রকৃত আস্থাশীল একজনকে।

Saturday, March 10, 2018

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ চাপের মুখে by কুলদীপ নায়ার

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এতটাই চাপের মুখে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে দেয়া পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রকৃত কিনা। বিচারকরা দৌড়ের ওপর আছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথিত মতে তাদের ওপর অসন্তুষ্ট। একজন বিচারক বিদেশে গেছেন। কিন্তু তিনি আর নাও ফিরতে পারেন। কারণ বলা হয়ে থাকে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে নেই। এটা বোধগম্য যে, যদি তিনি কখনো ঢাকায় ফেরেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কিছু একটা ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে তার শঙ্কা আছে। সত্যি বলতে কি, সমগ্র বিচার বিভাগ বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
আমি বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে সাফাই বক্তব্য দিচ্ছি না।  কিন্তু ওই রায়ের পেছনে শেখ হাসিনার হাত রয়েছে বলে অনুভূতি এতটাই জোরালো যে, রায়টি তার ‘ফেস  ভেলু’তে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না। বিশেষ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শাস্তিদান কালে বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য’ ও সামাজিক মর্যাদা’ বিবেচনায় তাকে তিনি কম মেয়াদি সাজা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো  বিদেশি অনুদান থেকে পাওয়া তার পরিবারের দ্বারা পরিচালিত জিয়া এতিমখানা পরিচালনার তহবিল থেকে ২১ মিলিয়ন টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। তার সঙ্গে তার ছেলেসহ আরো পাঁচ জন ১০ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেন, জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট কেবল কাগজে কলমে টিকে আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তার তিন সহযোগী জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট থেকে আরো সাড়ে ৩১ মিলয়ন টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। রায়ের প্রাক্কালে বেগম খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাকে একটি মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার কথায়, ‘আমি বিশ্বাস করি, সব অভিযোগ থেকে আমাকে রেহাই দেয়া হবে। এটা একটি মিথ্যা মামলা। আমি ও আমার পরিবারকে হয়রানি করার জন্য এসব মামলা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই রায় যদি ক্ষমতাসীন সরকারকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা একটি কলঙ্কিত ইতিহাস সৃষ্টি করবে। খালেদা জিয়া আরো বলেছিলেন, তাকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে আদালতকে ব্যবহার করা একটি নজির। তিনি আরো বলেছিলেন, আমি সব ধরনের ফলাফল মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি জেল বা শাস্তিকে ভয় পাই না। অমি আমার মাথা নত করব না। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি ভিন্নতর কোনো রায় না দেন, তাহলে এই রায় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিচারিক আদালতের রায় পাওয়ার একদিন পরে রায়কে চ্যালেঞ্জ করে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন। ১২২৩ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে তার আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান খালেদা জিয়া কেন মুক্তি পাবেন তার সপক্ষে ২৫টি যুক্তি দেখিয়েছেন। এর সারকথা হচ্ছে রাজনীতি থেকে তাকে বিদায় দিতেই মামলাটি পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগ শেখ হাসিনার সরকার নাকচ করেছেন। আদালতের কর্মকর্তারা বলেছেন, দুই সদস্যের হাইকোর্ট বেঞ্চে এই আপিলের শুনানি চলতি সপ্তাহের শেষে শুরু হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাটি হলো তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এক ডজন দুর্নীতি মামলার অন্যতম। বেগম জিয়া গত এক দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালে তিনি ইতিমধ্যে একটি সাধারণ নির্বাচন বয়কট করেছেন, আর সেটা তখন বিরাট প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল। কিন্তু বেগম জিয়া এবারে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা আলমগীর বলেছেন, বেগম জিয়াকে ছাড়া তাদের দল নির্বাচনে যাবে না। তার কথায়, ‘বেগম জিয়াকে ছাড়া কোনো জাতীয় সাধারণ নির্বাচন হবে না।’ এদিকে শেখ হাসিনার সরকার বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে তাদের কিছু করার নেই। বিএনপি আসুক আর না আসুক, যথারীতি ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
মিডিয়া সমালোচনার মুখে শেখ হাসিনা বলেছেন, ওই দুর্নীতি মামলা বেগম জিয়ার সমর্থকরাই ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করেছিল। ওই সময়ে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন ওই  অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিল। তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপি যদি রায়ের কারণে নির্বাচন বর্জন করে তাহলে আমরা তো নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারি না। ১৯৯১ সাল থেকে বেগম জিয়া তিন বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি এখন ৩০টির বেশি অভিযোগের মুখোমুখি রয়েছেন। এর মধ্যে দুর্নীতি থেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আছে। বিএনপি ওই কারাদণ্ড ঘোষণার পরে দ্রুততার সঙ্গে তার ছেলেকে তার পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এমনকি মন্তব্য করেছেন, এই সিদ্ধান্তে বিএনপির ‘নৈতিক দারিদ্র’ প্রকাশ পেয়েছে। এটা প্রশংসনীয় যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিচার বিভাগ স্বাধীনতা বজায় রাখছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সুপ্রিম কোর্টে তাকে দণ্ডিত করার পাশাপাশি বলেছিলেন তিনি আদালত ও সংসদের ভেতরের ও বাইরের জনগণকে বোকা বানোনোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কখনই সমগ্র সত্য নিয়ে আদালতের সামনে উপস্থিত হননি।
নওয়াজ শরীফ রায় গ্রহণ করে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি আবার জনগণের কাছে ফিরে যাবেন। ফোডার স্কামে রাচি হাইকোর্টে দণ্ডিত রাষ্ট্রীয় জনতা দল প্রধান লালু প্রসাদ যাদবের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। এ রকম আরো উদাহরণ রয়েছে, যেখানে রাজনীতিকদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। এরকম ভুরি ভুরি নজির আছে যেখানে রাজনীতিকরা এমন পরিস্থিতি থেকে পুনরায় ফিরে এসেছেন। রাজনীতিতে নিজদের প্রাসঙ্গিক রাখতে তারা উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটা সংস্কার আনা দরকার, যাতে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকরা চিরজীবনের জন্য রাজনীতিতে অযোগ্য থাকেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘সরকারে ‘অপরাধী রাজনীতিকদের’ কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। কিন্তু এই বিষয়ে পরিবর্তন আনার দায়িত্ব আদালত নির্বাহী বিভাগের হাতে ন্যস্ত করেছেন। কিন্তু এটা এখনো পর্যন্ত কাজ করেনি। সুপ্রিম কোর্ট কিভাবে আশা করতে পারেন যে, নির্বাহী বিভাগ এটা ভবিষ্যতে করবে?’
(কুলদীপ নায়ার, ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। লেখাটি ডেকান হেরাল্ডে সমপ্রতি প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ)

Sunday, February 14, 2016

মুজিব নন হাসিনা by কুলদীপ নায়ার

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে যেন আত্মবিশ্বাস ঠিকরে পড়ছে। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো আমি ঢাকা সফর করি। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার চার মাসের মধ্যে। ঢাকা তখন ছিল ছোট্ট একটি শহর, নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের চাহিদা মেটাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছিল। এ শহরের পুরনো গভীর সবুজ গিলে ফেলেছে বহুতল ভবন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু, এ গল্প কম-বেশি দুনিয়ার প্রত্যেক রাজধানীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ব্যতিক্রম সম্ভবত ইসলামাবাদ। এ শহরটি এখনও নিজের উন্মুক্ততা ও গাছগাছালি ধরে রেখেছে।
১৯৭২ সালে ঢাকা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ছিল দীর্ঘ সারি। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল লাগেজ। কিন্তু আমি শুনতে পাই যাত্রীরা ‘জয়বাংলা’ বলে স্লোগান দিচ্ছে, যেন তারা ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’তে (প্রমিজড ল্যান্ড) ফিরে এসেছে। আমি যখন শহর ঘুরতে বের হয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলো মূল্যায়ন করলাম, আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, এ দেশ আসলে পারবে তো! ৪০ বছর পর বিলাসবহুল এক বিমানবন্দর ও যাত্রীদের সুশৃঙ্খল সারি আপনাকে উত্তর দিয়ে দেবে, বাংলাদেশ পেরেছে!
আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, এ দেশ অনেক সংশয়বাদীকে ভুল প্রমাণ করেছে। দেশ ও দেশের বাইরে কর্মরত মানুষের কঠোর পরিশ্রম একদমই বৃথা যায়নি। বর্তমানে দেশটির প্রবৃদ্ধি ৬.৪ শতাংশ। অথচ, যে দেশটি থেকে বাংলাদেশ আলাদা হয়েছে, সেই পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ২.৩ শতাংশ। আরও স্থিতিশীল ও উন্নত ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশিরা উন্মুখ হয়ে আছে বলে মনে হয়েছে আমার।
এটাই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের তীব্র পার্থক্য। কয়েকদিন আগেই আমি পাকিস্তান সফর করেছি। এ দেশটির চেহারা রীতিমত হতোদ্যম, ভবিষ্যতে কী হবে কেউ জানেই না। দেশটিতে সন্ত্রাসবাদের ভয়ও মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। অপরদিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করেছেন মৌলবাদীদের প্রতি কোনো মার্জনা না দেখিয়ে। আর উলফার মতো সংগঠনকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে, যারা একসময় বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কার্যক্রম চালাতো।
একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নোবেল লরিয়েট মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি আমি। তিনি তিক্ত কিংবা হতোদ্যম- কোনোটিই ছিলেন না। দরিদ্র মানুষকে আরও কীভাবে সহায়তা করা যায়, এ নিয়ে তার পরিকল্পনার ব্যাপারে তিনি আলোচনা করেছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, সারাবিশ্ব থেকে ১০৮টি গ্রামীণ ব্যাংক তার কাছে সংহতির বার্তা পাঠিয়েছিল। আমি ভেবে অবাক হই, হাসিনা যদি তাকে দেশের ‘অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ’ হিসেবে নিয়োগ করতেন, তাহলে বাংলাদেশ কতই না উপকৃত হতো! বাংলাদেশের জন্য সব দ্বার উন্মুক্ত হতো। তাকে অপসারণ করে বদনাম কুড়িয়েছেন হাসিনা। এটা আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও, হাসিনা অনুতপ্ত নন।
হাসিনার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো যে, তার মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণতার ছাপ আছে। তিনি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সহ্য করেন না। আমি দেখেছি, ইন্দিরা গান্ধী কিভাবে একই বিষয়গুলো ধারণ করেছিলেন। আর তার পিতা জহরলাল নেহরুর স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছিলেন। রাষ্ট্রকাঠামোতে ভারসাম্য বজায় রাখতে যেন ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায় সে লক্ষ্যে নেহরু সেগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ক্ষতি করে গিয়েছিলেন, তা থেকে এখনও ভারত সেরে উঠতে পারেনি।
প্রখ্যাত আইনজীবী কামাল হোসেন আমাকে বলেছেন, ইউনূসের মামলা লড়ার সময় তিনি এমনকি ঠিকঠাক একটি শুনানিও পাননি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শাসকরা বিচার বিভাগের ওপর চাপ দিয়ে থাকেন বলে শোনা যায়। বাংলাদেশও হয়তো এর কোনো ব্যতিক্রম নয়।
শেখ হাসিনার অগণতান্ত্রিক আচরণ আরও ক্ষতি ঘটাতে পারে, কারণ সন্ত্রাসবাদী ও চরমপন্থি শক্তিগুলো ওত পেতে আছে। তারা ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি যাচাই করেছে এবং তাদেরই কয়েকটি হরতালের মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি অনুকূল বলেও বুঝতে পেরেছে। হাসিনা সচেতন যে, তার জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী।
তিনি বিরোধীদের চিন্তা করতে দিতে চান না যে, রাজপথ দখল ও হরতাল ডাকার সময় চলে এসেছে। হরতাল এ দেশের বিরোধী দলগুলোর একটি বাতিক, অপরদিকে দেশের জন্য সর্বনাশ।
বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমান বিরোধী দলকে বিলুপ্ত করেছিলেন, যখন তিনি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। দেশে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদপত্র তিনি চেয়েছিলেন; ঠিক যেমনটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল প্রাভদা ও ইজভেস্তিয়া পত্রিকা। তিনি ছিলেন এমন এক আইকন যাকে জনগণ অত্যন্ত পছন্দ করতো। তাদেরকে তিনি যে কোনো কিছুই বোঝাতে পারতেন। তার কন্যা হাসিনার ওই মর্যাদা কিংবা তুমুল সমর্থন- কোনোটিই নেই। তিনি কেবল নিজের ক্ষতির পাশাপাশি পুরো জাতির ক্ষতিই করবেন।
(লেখক: কুলদীপ নায়ার ভারতের একজন প্রবীণ ও খ্যাতিমান সাংবাদিক। এ নিবন্ধটি নয়াদিল্লিভিত্তিক দ্য সানডে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ। ভাষান্তর: নাজমুল আহসান)

Saturday, February 13, 2016

অসহিষ্ণুতা ও বৈরিতা নয় by কুলদীপ নায়ার

পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে নিরাপত্তা জোরদার [ফাইল ছবি]
পাঠানকোটে যা হলো তা আসলে রোগ নয়, রোগের লক্ষণ। রোগটা হলো ঘৃণা, যা ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের মনে গেঁথে গেছে। ১০ বছর আগে মুম্বাই হামলার মধ্যে আমরা সেই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ দেখেছি, আর এবার পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলার মধ্য দিয়ে আমরা আবারও সেই ঘৃণার রূপ দেখলাম।
দেশভাগের সেই ভার এখনো আমরা বহন করে চলেছি, ১৯৪৭ সালের পর তিনটি প্রজন্ম এসেছে, তাতেও সে ভার লাঘব হয়নি। এই ঘৃণা ক্রমেই বাড়ছে, কারণ দেশ দুটির মানুষের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই।
সবার ওপরে রয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাস বিকৃতি, তারা পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুদের খুব বাজেভাবে চিত্রিত করে, যদিও দেশটির উদার মানুষের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সেই পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করা হয়েছে। তারপরও পাকিস্তানের ইতিহাসে মোহাম্মদ গজনবীকে গৌরবান্বিত করা হয়, যিনি কিনা গুজরাটের বহু প্রাচীন সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। এদিকে ভারতের কিছু চরমপন্থী মানুষ ভারতের ইতিহাস পুনর্লিখন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভারত রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ায় তাঁরা তেমন একটা সুবিধা করে উঠতে পারেননি। তাঁরা এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কারণ কিছুটা হলেও তো তাঁরা সাড়া পাচ্ছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি পাঠানকোটের হামলা তদন্ত করে আক্রমণকারীদের শাস্তি দেবেন। তাঁর এই ঘোষণা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমানাহীন অন্ধকার সুড়ঙ্গে আলোর ঝলকানি সৃষ্টি করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে নওয়াজ শরিফের এই আত্মপ্রত্যয়কে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত। বস্তুত তিনি শান্তিকামী মানুষ, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি সফল হবেন?
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ নওয়াজকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় যে পারভেজ মোশাররফের এখন বিচার হচ্ছে। পারভেজকে যে জামিন দেওয়া হয়েছে, তাতেই বোঝা যায়, নওয়াজের ওপর সামরিক বাহিনীর কতটা চাপ রয়েছে। পাকিস্তানে শেষ কথা বলার মালিক হচ্ছে সেনাবাহিনী, তারা আর যা-ই করুক, একজন সাবেক সেনাপ্রধানকে তো আর ফাঁসিকাষ্ঠে পাঠাতে পারে না, সে তাঁর অপরাধ যতই ঘৃণ্য হোক না কেন।
এতে আরও বোঝা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি সামরিক কর্মকর্তা হলে পাকিস্তানের আইন কতটা অসহায় হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সে জায়গায় পড়ে নেই। সামরিক বাহিনী যদি সামান্য পরিমাণেও যুক্ত থাকে, তাহলে সেসব দেওয়ানি মামলার বিচার সামরিক আদালতে হয়। সেখানে ধর্মবিরুদ্ধ কাজের বিচার করে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো, যাদের দেখভাল করার মতো কর্তৃপক্ষ নেই, এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালতও ওই সব আদালতকে তত্ত্বাবধান করতে পারেন না। নওয়াজ শরিফ যদি কোনো আইনসংগত কথাও বলেন, তাহলে সেটা তাঁর সাহসিকতা, কারণ একদিকে সামরিক বাহিনী, আর অন্যদিকে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো তাঁর ওপর নজর রাখছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আচমকা লাহোর সফর করে নওয়াজের ভাবমূর্তি বাড়িয়ে দিয়েছেন। মোদি বুঝতে পেরেছেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ভারতের সঙ্গে সংলাপের বিরোধী। আর সে কারণেই ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকের সূচি পুনর্নির্ধারিত হয়েছে, সেটা ভেঙে যায়নি।
এই বোঝাপড়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতেও পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব টগবগ করে ফুটছে। চরমপন্থীরা শত্রুতা জিইয়ে রেখে বাজিমাত করতে চায়। সে কারণে তারা চায় না, দেশ দুটি কাছাকাছি আসুক। এমনকি তারা কিছু কিছু মসজিদ ও মন্দিরে নারীদের প্রার্থনা করা বন্ধ করতে চেয়েছিল।
মহারাষ্ট্রের মন্দিরে নারীদের যারা ঢুকতে দিতে চায়নি, সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, আমি তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু আমার অপেক্ষাটা খুবই অপ্রয়োজনীয় ছিল। চরমপন্থী হিন্দুরা নারীদের সামনে রেখে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করেছে, এর মাধ্যমে তারা সমস্যা আরও জটিল করে তুলেছে। কিন্তু সরকারের এই চরমপন্থীদের শাস্তি দেওয়া উচিত।
তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমি দেখেছি, তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, নারীরা প্রবেশ করলে পবিত্র স্থানের পবিত্রতা বিনষ্ট হবে। কেউ কেউ আবার যুক্তি দেন, ‘আমরা তাদের যথেষ্ট জায়গা দিয়েছি।’ তাদের কথা শুনে আমি যারপরনাই ভীতবিহ্বল হয়েছি, কারণ আমি বুঝতে পারি না, মন্দিরের ভেতরে নারীরা প্রার্থনা করতে পারবে না, এমন আদেশ দেওয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে।
মহারাষ্ট্র সরকারও দৃশ্যত পক্ষপাতদুষ্ট। তারা বিষয়টিকে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশকে তা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। ওদিকে কেন্দ্রের মোদি সরকারও এই ভঙ্গুর যুক্তির আড়ালে গা ঢাকার চেষ্টা করছে যে আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু এটা নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। পুরুষদের মতো নারীদেরও ধর্মীয় স্থানে ঢোকার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। চরমপন্থীরা যুদ্ধটা জিতে গেছে, তারা আবারও প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় কঠোরতা ভাঙার লড়াইয়ে তারা জিতে যেতে পারে।
সৌভাগ্যবশত, এই বিষয়ে কিছু শহরে মিছিল-সমাবেশ হয়েছে। কিন্তু সেটা এতই সীমিত ছিল যে তাতে বোঝা যায়, মন্দিরে নারীদের প্রার্থনা করার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও অনেক দূর যেতে হবে। আমি জানতে পেরেছি, মসজিদেও নারীরা নামাজ পড়তে পারেন না। যেমন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত আলী মসজিদে নারীদের ঢোকা বারণ।
কয়েক বছর আগে এক কান্নাড়া (দক্ষিণ ভারতীয়) চলচ্চিত্র অভিনেত্রী বলেছিলেন, তিনি কেরালার এক মন্দিরে দেবতার মূর্তি স্পর্শ করেছেন। এরপর যেন ধরণিতে নরক নেমে এল, সেই দেবতার ভক্তরা খেপে গিয়ে এককালের সুন্দরী অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। কেরালার উচ্চ আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছিল, যদিও আদালত ছয় বছর পরে তা ভিত্তিহীন বলে বাতিল করে দিয়েছিলেন।
বস্তুত, ভারতের আরও কিছু মন্দিরে নারীদের ঢোকা বারণ। এর মধ্যে রয়েছে হিমাচল প্রদেশের বাবা বালক নাথ মন্দির, রাজস্থানের প্রভু কার্তিক মন্দির ও আসামের প্রভু সাত্রা মন্দির। অনেক আগের কথা, তবু আমার এখনো মনে আছে, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একজন পারসিককে বিয়ে করেছিলেন বলে তাঁকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
একই ব্যাপার ঘটেছিল কর্ণাটকের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী কে জে ইয়েসুদাসের বেলায়, তাঁকে বিখ্যাত গুরুভায়ুর মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, যদিও তিনি নিজেই শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত ছিলেন। আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে, যেখানে সাবেক ইউনিয়নমন্ত্রী বায়েলার রবির নাতির অন্নপ্রাশনের পর মন্দিরকে শুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, শিশুটির দাদি খ্রিষ্টান ছিল। শিশুটির মা ও বাবা দুজনেই হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও এ কাজ করা হয়েছিল!
এসব উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, দেশে যে অসহিষ্ণুতার আবহ ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, তা বোঝানো। জাতিকে এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

Friday, February 12, 2016

বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে by কুলদীপ নায়ার

ঢাকায় পৌঁছার পর আপনার বুঝতে খুব বেশি সময় লাগবে না যে, এটাই সেই দেশ, যা তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। দূরবর্তী ও শোষণকারী পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানিদের যে বৈপ্লবিক চেতনা উদ্দীপ্ত করেছিল তার বিন্দুমাত্রও এখন নেই।
আরও খারাপ বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন! তার বিরোধী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কমেছে।
যদি কোন দেশ তার পায়ের বেঁড়ি ছিড়তে চায় তাহলে তাদেরকে পরাধীন করে রাখতে পারবে না কোন দেশÑ এটা প্রমাণ করতে ৪৫ বছর আগে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেগেছিল এ দেশের মানুষ ও মুক্তিবাহিনী। তাদের তেমন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিরাট মাপের একজন নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন তার নেতা। কিন্তু তিনি যখন ঢাকা সফর করলেন এবং ঘোষণা দিলেন উর্দুই হবে রাষ্ট্রীয় ভাষা তখনই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন শেখ মুজিব।
পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের পরিচয় ছিল পশ্চিমাদের আধিপত্যের অধীনে। তারা বুঝতে পারলেন তাদের বাস্তবধর্মী পরিচয়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে পাঞ্জাবি সংস্কৃতি। যখন তারা তাদের সংস্কৃতিকে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করলেন তখনই পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাদের ওপর শুরু করে নৃশংসতা।
এমনকি, শেখ মুজিব যখন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা সহ্য করতে পারেন নি তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের মূল শক্তি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানের পতনের জন্য যদি কাউকে দায়ী করা হয় তাহলে তিনি হলেন ভুট্টো। তিনি এককভাবে ক্ষমতা হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার মূল বিরোধিতা আসে জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে, যারা এখনও ধর্মের কার্ড ব্যবহার করছে। জামায়াতকে দেখা হয় পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে। বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা যে নৃশংসতা চালিয়েছিল সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত জামায়াত পরোক্ষভাবে হলেও নিন্দা জানায় নি।
আমি মনে করেছিলাম জামায়াতে ইসলামীর বয়স্ক নেতাদের ফাঁসি দেয়াতে মনোভাবে বিরাট কোন পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আমার বিস্ময়ের বিষয় হলো, আমি দেখলাম যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেয়াতে জনগণ খুশি।  পাকিস্তান একটি ইসলামিক দেশ এবং ইসলামিক উম্মার একটি অংশ। তাই হয়তো পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে নীরব জামায়াত।
একসময় বামদের একটি শক্তি হিসেবে দেখা হতো। তারা তাদের ক্যাডার সহ সেই আবেদন হারিয়েছে। পেশাদারিত্ব আকর্ষণ করছে তরুণদের। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন। কারণ, সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ঘুষ দুর্নীতি। এই ধারা সারা বাংলাদেশে বিদ্যমান।
তবু মন্দের ভাল যে, জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পছন্দ করে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা তাদের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটায়। বেশি দিন আগের কথা নয়, জনগণের অসন্তোষ এক সময় রাজপথে বিক্ষোভে রূপ নিতো। তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতো। বিলম্বে হলেও এর প্রভাব পড়তো জনগণের ওপর। বাজারঘাটে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেত। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেত। এতে শুধু তাদেরই ক্ষতি হতো। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তৈরি পোশাক উৎপাদনের পরিবেশ ধ্বংস করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না। এই শিল্পটি হলো রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র বড় উৎস। চালিকাশক্তি হলো সম্পদ, যা গুটিকয় হাতে জমা থাকে। তারা শুধু ব্যবসায়ই নির্দেশনা দেয় তা নয়। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও নির্দেশনা দেয়। অনেক শিল্পপতি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবিশেষকে পার্লামেন্টে যাওয়ার জন্য অর্থ দিয়ে থাকেন, যাতে তারা রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে পারেন। সরকারের গৃহীত কর্মসূচিতে তারা প্রভাব ধরে রাখতে পারেন।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা শুধু নামমাত্রই। সম্পাদকদের স্বাধীনতা আছে এতটুকুই যে, তাদের মালিক তাদের কাছে কি চান। আদর্শগতভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কোন পথে ধাবিত হচ্ছে এ প্রশ্নটি আমি অনেকজনকে করেছিলাম। রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক শিক্ষাবিদ আমাকে বললেন, বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে এবং তিনি জানেন না কোন পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ।
শেখ হাসিনার প্রধান শক্তি হলো নয়া দিল্লি, যারা তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন তার প্রতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রকাশ্যে বলছে যে, নিজের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের কারণে ভারতের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছেন হাসিনা। তিনি কোন সমালোচনা সহ্য করেন না। তার সমালোচকরা ক্ষতির মুখে পড়ে, যাতে তারা বুঝতে পারেন তিনি ও ভারত সমার্থক হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশে কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও যদি নির্বাচন হয় তাহলে আগেভাগেই বলে দেয়া যায় যে, শেখ হাসিনা পরাজিত হবেন না। জামায়াতের সঙ্গে আঁটঘাট বাঁধার কারণে বেগম খালেদা জিয়াও নিজের জনপ্রিয়তা  বাড়াতে পারেন নি। প্রকৃত অর্থে তিনি শাস্তির মুখোমুখি, যা তিনি এড়াতে পারবেন বলে মনে হয় না।  
যা হোক একটি বিষয় নিশ্চিত যে, যখনই নির্বাচন হোক খালেদা এবার তা বর্জন করবেন না। বিএনপি বুঝতে পেরেছে যে, জাতীয় সংসদে যদি তাদের সামান্য সংখ্যক সদস্যও থাকেন তাহলে তারা জনগণের কাছে শেখ হাসিনার ভুলভ্রান্তিগুলো তুলে ধরতে পারবেন। দেশের স্বার্থ এখন যেভাবে দেখা হয় আগে কখনো সেভাবে দেখা হয়নি। কারণ, এখন হাসিনা ও খালেদা দু’জনের বিষয়েই মানুষের মোহমুক্তি ঘটেছে। তবে এ দু’বেগমই বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য পরিণতি। তাতে জনগণের কাছে তারা যতটাই অজনপ্রিয় হোন না কেন।
কুলদীপ নায়ার। ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক, কলামনিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, লেখক। ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষে একজন মনোনীত সদস্য ছিলেন তিনি।
দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ

Friday, February 5, 2016

উদারতার বিকল্প নেই by কুলদীপ নায়ার

ফারুক আবদুল্লাহ শ্রীনগর থেকে প্রকাশিত এক উর্দু জার্নালে লিখেছেন, তাঁর মরহুম পিতা শেখ আবদুল্লাহ এটা জানতে পারলে খুশি হতেন যে কাশ্মীরের তরুণেরা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বন্দুক তুলে নিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা ফারুকের কল্পনা ছাড়া কিছু নয়।
এমনকি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোরও একই মনোভঙ্গি ছিল। তিনি কাশ্মীরে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়েছিলেন এই আশায় যে কাশ্মীরিরা ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দাবি জানাবে। কিন্তু তিনি ভুল প্রমাণিত হন। কাশ্মীরিরা প্রকৃতিগতভাবে গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ছিল, ফলে তারা ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার বিরুদ্ধে ছিল। এই পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের কাশ্মীরিরা নিজেরাই চিহ্নিত করেছিল, তারা তাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
শেখ সাহেবকে আমি খুব ভালোভাবে চিনতাম। জরুরি অবস্থার সময় তিন মাস কারাভোগ করে মুক্তি পাওয়ার পর শ্রীনগরে গিয়েছিলাম, শেখ সাহেবের কার্যালয়ে খবর দেওয়ার পর তিনিই প্রথম হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁর সেদিনের কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে: ‘আব তুম ভি হাজি হো যাওগে’, অর্থাৎ তুমি তো হাজি হয়ে গেলে। এর মাধ্যমে তিনি জেলখানাকে তীর্থস্থানের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিহার জেলে আমার কারাবাসের ব্যাপারে কথা বলেছিলেন শেখ। ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের বিরুদ্ধে শক্ত কথা লেখার কারণে আমার কারাবাস হয়েছিল। আমার ঘটনায় শেখ সাহেবের নিজের কারাবাসের কথাও মনে পড়ে যায়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তাঁকে তামিলনাড়ুর কোডাইকানাল কারাগারে আটক রেখেছিলেন। তিনি নেহরুর এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে দিল্লিতে এলে নেহরুর বাসাতেই থাকতেন। এমনকি তাঁর কারাভোগের পর তিনি নেহরুর বাসায় যেতেন, কারণ নেহরু এ ঘটনায় নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
যাঁরা নিরন্তর এ কথা বলে যাচ্ছেন যে কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাঁরা ভুল এ কারণে যে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ছাড়া বাকি বিষয়ে কেন্দ্রকে জম্মু ও কাশ্মীরে হস্তক্ষেপ করতে হলে সেখানকার রাজ্যসভার অনুমতি নিয়েই তা করতে হবে। অন্য কথায় এই অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য একধরনের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে, যেটা ভারতের অন্য রাজ্যগুলো করে না। এর পরিণতি হিসেবে শেখ সাহেবকে রাজ্যের সংবিধান সভায় এই প্রস্তাব পাস করাতে হয় যে জম্মু ও কাশ্মীর দ্ব্যর্থহীনভাবে ভারতে যোগ দেবে। সেটা করার আগে পাকিস্তান কেমন রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে, তিনি সেটা ঠাহর করার জন্য সাদিক সাহেবকে পাকিস্তানে পাঠান, এই সাদিক সাহেব পরবর্তীকালে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।
এরপর সাদিক সাহেবের কাছ থেকে পাকিস্তানের হালচাল জানার পর তিনি সময়ক্ষেপণ না করেই ভারতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফসল হিসেবে তাঁর অন্তরে ছিল বহুত্ববাদের বীজ। যে গণতান্ত্রিক ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে, সেই ভারতই তাঁর কাম্য ছিল, অন্যদিকে পাকিস্তান তখন ইসলাম গলাধঃকরণে ব্যস্ত।
সময়ের পরিক্রমায় হিন্দু-মুসলমান চ্যালেঞ্জ ও পাল্টা চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকলে তার মধ্যে একমাত্র শেখ সাহেবই উদার কণ্ঠস্বর হিসেবে অটল থাকেন। মনে আছে, তিহার কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় কারাগারের অন্য বন্দীরা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন শেখ সাহেবকে এই জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আহ্বান করি, কারণ দেশের সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে।
শ্রীনগরে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হলে তিনি বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জরুরি অবস্থার সমালোচনা করে বিবৃতি দেন। ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন, এই বিবৃতির পেছনে আমার হাত রয়েছে। কিন্তু যাঁরা জরুরি অবস্থার সময় কারারুদ্ধ হয়েছিলেন, এই বিবৃতির কারণে তাঁরা নৈতিক শক্তি লাভ করেন। পুরো জাতিই তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, সে সময় কারও কথা বলার সাহস ছিল না, সবাই ছিল ভীত। জাতি সঠিক ও বেঠিকের এবং নৈতিক ও অনৈতিকের মধ্যে পার্থক্য করতে ভুলে গিয়েছিল।
শেখ সাহেব যখন কথা বলতেন, তখন সারা জাতিই তাঁর কথা শুনত, কারণ তাঁর কথা রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে যেত। এই প্রক্রিয়ায় তিনি জনগণের প্রকৃত আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি কখনোই রাজ্য ও রাজনীতির সংকীর্ণতার মধ্যে ঢোকেননি। লোকে তাঁকে বড় নেতাই বলে মনে করতেন। ফলে তিনি যখন কথা বলতেন, তখন রাজনৈতিক দলগুলোও তাঁর কথা শুনত।
ফারুক আবদুল্লাহ বরং শেখকে কাশ্মীরের মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ করে তাঁকে ক্ষুদ্র করেছেন। তিনি নয়াদিল্লিকে এ কথা বলে তিরস্কার করতে পারতেন যে তারা কাশ্মীরে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যার কারণে সেখানকার তরুণদের অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছে, তারা নিজেদের অঙ্গীকার রাখতে পারেনি: কেন্দ্রের হাতে মাত্র তিনটি বিষয় থাকবে—প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ। আর অন্যগুলো থাকবে রাজ্যের হাতে।
ফারুক আবদুল্লাহ আগে যা বলেছিলেন, সেটা বরং গঠনমূলক ছিল। তিনি বলেছিলেন, ভারতের উচিত নিয়ন্ত্রণরেখা মেনে নেওয়া আর ইসলামাবাদকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর অন্তর্ভুক্ত করে নিতে দেওয়া, যেটা এ মুহূর্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধীনে রয়েছে। ফারুক নিজের মাথায় পেরেক ঠুকেছেন, কারণ ভারত ও পাকিস্তান প্রায়ই এই নিয়ন্ত্রণরেখার লঙ্ঘন নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত হয়।
সে তাদের আকাঙ্ক্ষা বা কৌশল যা-ই হোক না কেন, উভয় পক্ষকেই এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে নিয়ন্ত্রণরেখাই হলো আন্তর্জাতিক সীমানা। ভারত ও পাকিস্তান নিজে থেকে এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে এ পর্যন্ত দুবার যুদ্ধ করেছে। তাদের হাতে এখন পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, ফলে তারা আর যুদ্ধ করতে পারে না।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পাঠানকোট হামলার পরে ভারতীয়দের ভীতি লাঘব করে ভালো কাজই করেছেন। তিনি আরও তত্ত্বতালাশ করছেন। কারণ ভারত তাঁকে যেসব তথ্য দিয়েছে, সেগুলোই যথেষ্ট নয়। তিনি মুম্বাই হামলার সঙ্গে জড়িত মাসউদ আজহারকে কারাবন্দী করেও ভালো করেছেন।
একই সঙ্গে দেশ দুটির পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক এই হামলার পর বাতিল না হয়ে পুনর্নির্ধারিত হয়েছে, হামলার পর যেটা আশঙ্কা করা হয়েছিল। নওয়াজ যে চাপের মুখে কাজ করছেন, নয়াদিল্লি তা বুঝতে পেরেছে। কারণ পাকিস্তানে শেষ কথাটা বলে সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাপ্রধানের গুরুত্ব কতটা তা বোঝা যায় দুটি ঘটনা থেকে, নওয়াজ শরিফ সেনাপ্রধানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইরান ও সৌদি আরবে নিয়ে গিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান যে বৈঠকেই থাকেন, নওয়াজ তাঁকে নিজের সমমর্যাদা দেন, এটা আমাকে দুঃখ দেয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ট্র্যাজেডি হচ্ছে, সেসব দেশে সেনাবাহিনী একবার সরকারের অংশীদার হয়ে গেলে তারা আর ব্যারাকে ফিরে যায় না।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

Wednesday, January 27, 2016

পুরস্কারের রাজনীতি by কুলদীপ নায়ার

প্রজাতন্ত্র দিবসে যাঁরা পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি অশ্রদ্ধা পোষণ করি না। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই নিজের কাজে চূড়ান্ত উৎকর্ষ অর্জন করেছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু বাকিরা মূলত ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে এই পুরস্কার পেয়েছেন। ঘটনাচক্রে এবার ক্ষমতাসীন দল হচ্ছে বিজেপি। আগের কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ আছে যে তারা নিজেদের পছন্দমাফিক মানুষদের এই পুরস্কার দিয়েছে।
এই ব্যাপারটা ভারতের সংবিধানপ্রণেতাদের চিন্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা পুরস্কার বাতিল করেছিলেন। এ কারণেই ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে যখন গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি এই ধারায় ছেদ টানেন। এই ধারাটা শুরু করেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, যেসব ব্যক্তি সাহিত্য, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের জগতে উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন, তিনি তাঁদের সম্মানিত করতে এই পুরস্কার চালু করেন। তবে এ পুরস্কারের সঙ্গে টাকা দেওয়া হতো না, কারণ এটা এতই সম্মানিত পুরস্কার ছিল যে তা টাকার মূল্যে মাপা যেত না। নেহরুও এই পুরস্কার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে চাননি। তিনি কস্মিনকালেও ভাবেননি, এই পুরস্কারের মনোনয়ন রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হবে, সরকার তার চাটুকারদের দল সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেবে।
আমার মনে আছে, আজ থেকে ৫০ বছর আগে যখন এই পুরস্কার চালু হয়, তখন সেটা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন নেহরু স্বয়ং। পরবর্তীকালে এই কাজটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়, যেটা আবার দেখভাল করতেন ওই মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব। তিনি আবার এই দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত তথ্য কর্মকর্তার ওপর অর্পণ করেন। আর এভাবেই এ কাজ আমার হাতে চলে আসে, কারণ তখন আমি ছিলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা।
এই পুরস্কারের মনোনয়ন প্রক্রিয়াটা ছিল স্বেচ্ছাচারী, অর্থাৎ তার নির্দিষ্ট নীতি ছিল না। প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য কয়েকজন মন্ত্রী অনেকের নাম প্রস্তাব করতেন, আর আমি তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে সেগুলো ফাইলবন্দী করতাম। আর প্রজাতন্ত্র দিবসের এক মাস আগে আমি ওই নামগুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা করতাম। তবে আমাকে এ কথা অবশ্যই বলতে হবে যে এই তালিকা প্রণয়নে আমি নিয়ম অনুসরণ করিনি। এরপর আমি ওই তালিকাটি দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসচিবের কাছে পাঠিয়ে দিতাম, তারপর সেটা যেত স্বরাষ্ট্রসচিবের দপ্তরে, আর শেষমেশ তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর টেবিলে যেত। আমি যে তালিকা করতাম, সেটার তেমন নড়চড় হয়েছে বলে আমি দেখিনি।
কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজটা ছিল মানপত্র লেখা, এ কাজের জন্য আমি একটি অভিধান বা রোজেটের থিসোরাস খুলে বসতাম। ক্ষেত্রবিশেষে আমি জীবনী নিয়ে বসতাম। মূলত এসব বিবরণে ওই ব্যক্তির কিছু বিবরণ থাকত, অর্থাৎ তিনি কি একজন বিজ্ঞানী, একাডেমিক নাকি অর্থনীতিবিদ। এতে আমার কিছুটা সুবিধা হতো, কিন্তু তার ভিত্তিতে মানপত্র প্রণয়ন করা বেশ কঠিন কাজ ছিল।
এই পুরো প্রক্রিয়া এতটা অগোছালো ছিল যে শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। আদালত বলেন, এই মনোনয়নের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হোক, বিরোধী দলের একজন নেতা যার সদস্য হবেন। তবে এই কমিটি গঠিত হওয়ার পর এই কাজে কিছুটা শৃঙ্খলা আসে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই মানপত্র প্রণয়নের কাজ আমাকেই করতে হয়েছে।
নামের গেজেট নোটিফিকেশনের খসড়া প্রণয়ন করত রাষ্ট্রপতি ভবন। আমার মনে আছে, একবার রাষ্ট্রপতি মিসেস ল্যাজারাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও সুপারিশ করি, যাতে এই বিখ্যাত শিক্ষাবিদ মিসেস ল্যাজারাসকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়, আর সে মতে গেজেট নোটিফিকেশন প্রস্তুত করে তা জনসমক্ষে প্রকাশও করা হয়।
সেতার বাদক বিলায়েত খান পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে তাঁর কনিষ্ঠদের যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, সেটা তিনি নিতে পারেন না। এতে বোঝা যায়, ভারতে ভুল সময়ে ও ভুল মানুষকে ভুল পুরস্কার দেওয়ার প্রবণতা আছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ওই নোটিফিকেশন দেখে বললেন, তিনি তো তাঁর নার্স ল্যাজারাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন, অন্ধ্র প্রদেশের কারনুল থেকে হায়দরাবাদে আসার সময় এই নার্স তাঁর শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা করেছিলেন। তখন আমরা সবাই খুব বিব্রত হই যে একজন ভুল মানুষকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না, কারণ তাঁর নামটি ইতিমধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। সেবার দুজন ল্যাজারাসকে ওই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
দুই বছর আগে যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, তখন তারা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত হোটেলওয়ালা সন্ত সিং চাতালকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দেয়, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ঝুলছিল। এ নিয়ে শোরগোল পড়ে গেলেও কংগ্রেস সরকার তখন সাফাই গেয়ে বলল, তিনি ভারতীয় হিসেবে একজন পরিচিত ব্যক্তি, যিনি বিদেশে দেশের নাম সমুজ্জ্বল করেছেন। আবার এমন ঘটনাও আমরা দেখেছি, যেখানে পুরস্কারের জন্য মনোনীত ব্যক্তিরা এই কারণে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন যে নির্বাচকেরা তাঁদের কাজ মূল্যায়ন করার যোগ্য নন।
যে শিক্ষাটা নিতে হবে তা হলো আদৌ পুরস্কার থাকা উচিত কি না। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল নিজের কর্মী বা দলের সঙ্গে যারা কোনো না কোনোভাবে যুক্ত, তাদের ‘স্বীকৃতি’ দিতে চায়। এর আসল লক্ষ্যটা এ কারণেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। যেমন শচীন টেন্ডুলকারের কথাই ধরুন না কেন, সন্দেহ নেই, ডন ব্র্যাডম্যানের পর তিনই ছিলেন বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। কিন্তু যখন হকির জাদুকর ধ্যান চাঁদের নাম ভারতরত্ন পুরস্কারের জন্য বিবেচনাই করা হলো না, তখন কি তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া উচিত হয়েছে? কিংবদন্তির অ্যাথলেট মিলখা সিং পদ্ম পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভারতরত্ন ছাড়া অন্য পুরস্কারের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ নেই, কারণ এর আগেই তাঁর ছেলেকে পদ্ম পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে রোমিলা থাপার পদ্ম প্রত্যাখ্যান করে আরেকটি দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজের সমকক্ষদের দ্বারা মূল্যায়িত হতে চান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের দ্বারা নয়। বিখ্যাত সেতার বাদক বিলায়েত খান পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ দুটোই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই যুক্তিতে যে তাঁর কনিষ্ঠদের যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, সেটা তিনি নিতে পারেন না। এতে বোঝা যায়, ভারতে ভুল সময়ে ও ভুল মানুষকে ভুল পুরস্কার দেওয়ার প্রবণতা আছে।
উল্লিখিত নজির থেকে বোঝা যায়, এসব পুরস্কার স্রেফ মেধার বিবেচনায় দেওয়া হয় না। এই অভিযোগ থেকেই যাবে, কারণ নির্বাচকদের সরকারই মনোনীত করে। বিরোধী দলের কাউকে নিলেও কাজ হবে না, কারণ সেখানে তিনি সংখ্যালঘু হয়েই থাকবেন। এই পুরস্কারের গুরুত্ব নিয়েও দেশে বিতর্ক হওয়া উচিত। হয়তো এখন তার গুরুত্ব তেমন একটা নেই, স্বাধীনতার পর যেমনটা ছিল।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

Saturday, December 26, 2015

সহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্র হয় না by কুলদীপ নায়ার

‘আমি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ’—সোনিয়া গান্ধী কেন এ কথা বললেন, তার মর্ম আমি বুঝতে পারলাম না। ব্যাপারটা ছিল বিলুপ্ত পত্রিকা ন্যাশনাল হেরাল্ড-সংক্রান্ত, যে পত্রিকাটি সরকারের কাছ থেকে ৯০ কোটি রুপি ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেয়নি। ফলে আদালত এই ফেরত না দেওয়ার ঘটনাটিকে ‘অপরাধমূলক’ কাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ওদিকে সোনিয়াপুত্র রাহুল গান্ধীও আদালতের এই রায়কে তাঁদের ও কংগ্রেস পার্টির বিরুদ্ধে মোদির ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, এটা তো আদালতের সিদ্ধান্ত, এর মধ্যে সরকার এল কোত্থেকে?
রাহুলের এই কথায় জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে—এই আশঙ্কায় কংগ্রেস ভোল পাল্টেছে। দলটি আদালতের রায় থেকে রাহুলের মন্তব্যকে বিযুক্ত করার চেষ্টা করছে। ওদিকে কংগ্রেসের সাবেক আইনমন্ত্রী কপিল শিবাল রাহুলের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য সমর্থন করে বলেছেন, এটা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিজেপি সরকারের প্রতিশোধ। দেখা যাচ্ছে, সোনিয়া ও রাহুল দুজনেই এই ঋণের প্রসঙ্গটির রাজনীতিকীকরণ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা আসলে এই ঋণ পরিশোধ করতে চান না। মা ও ছেলে উভয়ই মোদি ও বিজেপি সরকারকে অযথা এর মধ্যে টেনে এনেছেন।
সোনিয়া গান্ধী তাঁর শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর মতোই আচরণ করছেন। সোনিয়া ক্ষমতায় থাকলে হয়তো শাশুড়ির পদাঙ্কই অনুসরণ করতেন। তিনি হয়তো জরুরি অবস্থা জারি করে সংবিধান স্থগিত করতেন, তারপর হয়তো গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতেন এবং বিনা বিচারে লাখ খানেক লোককে জেলে পুরতেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের সঙ্গে মামলায় হেরে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, আদালত তাঁকে ক্ষমতার অপব্যবহার করার জন্য ছয় বছরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তখন তিনি লোকসভা থেকে পদত্যাগ না করে জরুরি অবস্থা জারি করেন আর নিজের অবৈধভাবে নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারটি জায়েজ করার জন্য ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে আইন সংশোধন করেন। সংসদও সেটা অনুমোদন করে। ওই সময় সংসদে কোনো বিরোধী দলই ছিল না। কারণ, তিনি বিরোধী দলের সাংসদদের গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা আর সংসদে বাগড়া দিতে না পারেন।
কংগ্রেস পার্টি আসলে এটা বুঝতে পারেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি দল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরোধী দলও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়।
কংগ্রেস পার্টি আসলে এটা বুঝতে পারেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি দল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরোধী দলও গুরুত্বপূর্ণ এখন কথা হচ্ছে, মোদি সরকারের যত পাপই থাকুক না কেন, বহুত্ববাদের ধারণা বিনষ্ট করার লক্ষ্যে আগে যেসব আইন হয়েছে, তার জন্য তো বিজেপিকে দায়ী করা যায় না। তবে সামগ্রিকভাবে এর মূল দায় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি), যার লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এটা ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক ধারণাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে গণতান্ত্রিক ভারত সংবিধানে স্থান দিয়েছে।
মোদি সরকারের ওপর আরএসএসের আছর আছে। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস বিজেপির নেই। যেমন, তারা বহুত্ববাদের গায়ে হাত দিতে চায় না। কারণ তারা জানে, অধিকাংশ ভারতীয়ই ধর্মনিরপেক্ষতার পাল্টা প্রপঞ্চ হিসেবে হিন্দুত্বকে গ্রহণ করবে না।
তবে এটা দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার যে মোদি সরকার ভারতে অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি করেছে, যার কারণে শুধু মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সামগ্রিকভাবে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে দেশে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য আরও আরও বিনিয়োগ দরকার, সে দেশকে ডানপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়া কাজের কথা নয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে অভিনন্দন জানানো উচিত। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যে অচলাবস্থা ছিল, তিনি সেটা ভেঙেছেন। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না করলে ভারত তার সঙ্গে কথা বলবে না—ভারতকে এমন কট্টর অবস্থান থেকে তিনি সরিয়ে এনেছেন। ভারতের স্বার্থেই তিনি নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তবে এসব পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল, বহু বছর এমনিতেই নষ্ট হলো।
সারা দেশেই তাঁর উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। নয়াদিল্লি মানুষের আকাঙ্ক্ষার সম্মান দেয়, যে মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে চায়। সমস্যাটা পাকিস্তানের, সেখানে উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর আধিপত্য আছে। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করার ব্যাপারে ইসলামাবাদের ওপর চাপ রয়েছে। তারপরও এটা বুঝতে হবে যে এই বন্ধুত্বের বিকল্প নেই। সেটা আজ হোক বা কাল, এই দুই দেশের সামনে স্রেফ একটা সুযোগই রয়েছে। অবশ্য উভয় পক্ষেরই কিছু অংশ বিষয়টা বোঝে। কিন্তু তারা কমজোর, মৌলবাদীরা তাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
গত সাত দশক আমরা নিরর্থক অনেক কিছুই করলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সম্পর্কের মধ্যে বৈরিতার বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান এ পর্যন্ত দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ করেছে, তা ছাড়া কারগিলে তারা একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ করেছে। দুই পক্ষেরই হাজার হাজার সেনা মারা গেছে। কাশ্মীর হচ্ছে রোগের লক্ষণ, এটা রোগ নয়। এই রোগটা হচ্ছে আস্থার ঘাটতি। সময় এসেছে, এখন আমাদের এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে এই দেশ দুটি প্রতিবেশীর মতো স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারবে।
এই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা দূর করার জন্য পাকিস্তানকে পাঠ্যবই বদলাতে হবে, স্কুলের জন্য জারি করা পরিপত্র বদলাতে হবে। কথা হচ্ছে, হিন্দু মৌলবাদ ও মুসলিম মৌলবাদ একই জিনিস, তাদের মধ্যে পার্থক্য নেই।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

Sunday, December 20, 2015

ভারত-পাকিস্তান আলোচনার বিকল্প নেই by কুলদীপ নায়ার

হিম শীতের মধ্যে হঠাৎ করেই যেন গ্রীষ্মের আবির্ভাব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দৈবাৎ ১৬০ সেকেন্ডের সাক্ষাতের কারণে বরফ গলতে শুরু করেছে। যদিও আগে মনে হয়েছিল, বরফ এত জমাট বেঁধে গেছে যে তা আর গলবে না। এই উল্টো গতি দেখে বোঝা যায়, পার্থক্যগুলো অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। আসল কারণ সম্ভবত অহমবোধ, ওটাকে সামাল দিতে হবে।
ভারত এই অবস্থানে অনড় ছিল যে তারা সন্ত্রাসবাদ ছাড়া অন্য বিষয়ে কথা বলবে না, রাশিয়ার উফায় বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে এই বিষয়টা সমাধান-অযোগ্য বলে মনে হয়েছিল। আবার পাকিস্তান মনে করেছে, আসল বিষয় অর্থাৎ কাশ্মীরের ‘প্রসঙ্গ’ যদি আলোচ্যসূচির শীর্ষে না থাকে, তাহলে কথা বলার কোনো মানে হয় না। এই কারণেই আলোচনা আর চলতে পারেনি। এর পাশাপাশি পাকিস্তান দাবি করে আসছিল, তারা হুরিয়াত নেতাদের সঙ্গে বসতে চায়। আলোচনা অগ্রসর না হওয়ার এটিও একটি কারণ।
দৃশ্যত মনে হচ্ছে, দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে জমে বরফ হয়ে আছে, তাই এই বরফ গলাতে হবে। তাদের মধ্যে দূরত্বও সৃষ্টি হয়েছে। একবার তাদের প্রধানমন্ত্রীরা বৈঠকে মিলিত হলে এই যুদ্ধংদেহী অবস্থান আর থাকবে না, এতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অর্থবহ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। যাঁরা কাঠামোভিত্তিক আলোচনার কথা বলেন, তাঁরা এটা বোঝেন না যে আলোচনার ইচ্ছা না থাকলেই মানুষ এসব কারণের দোহাই দেয়। আর যখন গঠনমূলক আলোচনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, তখন অন্য সবকিছু পেছনে চলে যায়। তখন প্রধানমন্ত্রীরাও অহম ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেছেন, এ বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে। অর্থাৎ কিছু শর্ত মানা না হলে আলোচনা হবে না বলে তাঁদের যে পূর্ব অবস্থান ছিল, সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে।
আমি চার দশক ধরে উপমহাদেশের ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর রাখছি। আমি অনুধাবন করেছি, আস্থাহীনতা বা অবিশ্বাসের কারণেই এই দেশ দুটির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মনে করতেন, এই অবিশ্বাস হচ্ছে রোগের লক্ষণ, সেটা নিজে রোগ না হলেও। আর রোগটি হচ্ছে ভারতবিরোধী অনুভূতি।
পাকিস্তানও একই কথা বলতে পারে। তারপরও এই সত্য এড়িয়ে যাওয়া যাবে না যে দেশ দুটির মধ্যে আস্থা না থাকলে কোনো আলোচনাই ফলপ্রসূ হতে পারে না। এ কারণেই অনেক চুক্তি এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। তা সে তাসখন্দ চুক্তি বা শিমলা চুক্তি হোক, বন্ধুত্বের শুভ শব্দগুলো কখনোই বাস্তব হয়নি। কেউ একে অপরকে বিশ্বাস করে না। এমনকি আজও সেই একই গল্প চলছে। দেশভাগ ও মুসলমানদের স্বদেশ পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার সময় যে পরিবেশ ছিল, আজও সেই পরিবেশই বিরাজ করছে। বস্তুত এই অবিশ্বাস বরং ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যকার অবিশ্বাস একটুও কমেনি। ফলস্বরূপ এখনো দুটি দেশেই সংখ্যালঘুদের ওপর নৃশংস হামলা হচ্ছে, সেই খবরও আমরা পাচ্ছি।
সন্দেহ নেই, দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা হবে, যদিও ভারত হয়তো তা শুরু করতে একটু অনাগ্রহী হবে। কারণ, এতে ওই সুপ্ত শত্রুতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। উভয় পক্ষকেই বৈরিতার পুরোনো অধ্যায় বন্ধ করতে হবে, তাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। এটা খুব কঠিন মনে হয়। তবু পাকিস্তান সৃষ্টির পর তারা যদি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র কথা শুনত, তাহলে পরিস্থিতি হয়তো আরেকটু সহজ হতো। তিনি বলতেন, এখন থেকে আপনারা আর হিন্দু বা মুসলমান নন, এখন আপনারা ভারতীয় ও পাকিস্তানি হয়ে উঠেছেন। সেটা ধর্মীয় বোধ থেকে না হলেও অন্যভাবে।
পাকিস্তান জিন্নাহ্র আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তারা পুরোপুরি ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে গেছে, যেখানে ধর্মীয় শক্তিগুলোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে এখন হিন্দুদের সংখ্যা ২ শতাংশেরও কম, অনেকেই তো ভারতে চলে এসেছিলেন বা বাঁচার জন্য ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। যখন ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলো, তখন পাকিস্তানের অনেক হিন্দু মন্দির ও শিখ গুরুদুয়ারা ধ্বংস করা হয়েছিল।
এই পরিপ্রেক্ষিতে কাশ্মীর নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার কারণ আমাদের বোধগম্য। ফারুক আবদুল্লাহ ঠিকই বলেছিলেন, কাশ্মীর পাকিস্তানের অধীনে থাকলে সে তারই অংশ হবে আর ভারতের অধীনে যে ভূমি থাকবে তা নয়াদিল্লির সঙ্গেই থাকবে। কিন্তু তিনি আরেকটি কথা বলেছিলেন, সেটা হলো ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই কাশ্মীর থেকে চলে যেতে হবে, এটা বাস্তবসম্মত বা বাস্তববাদী কথা নয়।
ভালো হোক বা মন্দ হোক, যুদ্ধবিরতির জায়গাটা নিয়ন্ত্রণরেখায় পরিণত হয়েছে। সেটা এখন আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একতরফা এই রেখা পরিবর্তন করার চেষ্টা করায় নানা বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছে, যা আমরা অতীতেও দেখেছি। কাশ্মীরিরা আজ বিভাজিত, ফলে এটা করার চেষ্টা হলে তাদের সঙ্গে অন্যায় হবে। কিন্তু তারা কাশ্মীরের দুটি অংশকে এক করার জন্য আন্দোলন করছে না, সে তারা রাজপথে যতই নামুক না কেন। মনে হচ্ছে, তারা যেন যুদ্ধবিরতি রেখা নিয়েই সন্তুষ্ট।
লে. জেনারেল খুলওয়ান্ত সিং সে সময় ওই অভিযানটি পরিচালনা করেছিলেন। তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ভারত ওই রকম সুবিধাজনক অবস্থায় থাকার পরও তিনি থেমে গিয়েছিলেন কেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, সরকারের নির্দেশেই তাঁকে থামতে হয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, কাশ্মীরের যে অংশে পাঞ্জাবি ভাষী মানুষ থাকে, সে অংশটি ভারত নিতে চায় না।
ফারুক আবদুল্লাহর জানা উচিত, কাশ্মীরের কাশ্মীরি ভাষী অংশটা ভারতের সঙ্গেই আছে। উপত্যকার ওপারে পাঞ্জাবি ভাষী মুসলমানরা থাকে, কাশ্মীরিদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা সত্য যে পুরো কাশ্মীরের শ্রীনগরের অধীনেই থাকা উচিত। কিন্তু রাজ্যটি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে রাজ্যটি একদম খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে।
সেই বন্দোবস্তটি বাতিল করা হলে ভারত ও পাকিস্তান উভয়কেই অনেক মূল্য দিতে হবে। তাদের দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে। এটা কাশ্মীরিদের জন্য ন্যায্য না হলেও এ পরিস্থিতিতেই তাদের থাকতে হবে, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থা বুঝেই তাদের থাকতে হবে। তাদের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ লাগলে তা পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নেবে, সেটা হলে তো আমাদের কারও অস্তিত্বই থাকবে না।
আলোচনা ছাড়া রাস্তা নেই। ভারত ও পাকিস্তানকে এক টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থা থাকলেই কেবল এ অঞ্চলে সমৃদ্ধি আসতে পারে, আমাদের সামনে ইউরোপের দৃষ্টান্ত আছে। তারা শত শত বছর একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, অথচ তাদের একটি অর্থনৈতিক ইউনিয়ন আছে, যার মাধ্যমে গ্রিসের মতো মুমূর্ষু রাষ্ট্রও সাহায্য পাচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান এই উদাহরণ থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

Thursday, December 10, 2015

এখনো বিভাজনের কাল চলছে by কুলদীপ নায়ার

ভারত সাম্প্রদায়িকতা তুলে ধরছে,
আজ একুশ শতকে, এ ভারত আমাদের অচেনা
ভারতের অন্যতম শীর্ষ অভিনেতা আমির খান যে অনুষ্ঠানে বললেন, তাঁর স্ত্রী বলেছেন, সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করার জন্য তাঁদের অন্য দেশে চলে যাওয়া উচিত কি না, সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। না, তাঁর কণ্ঠে তিক্ততা ছিল না, ছিল কিছুটা দুঃখবোধ। তারপরও আমিরের কথা আমাকে নাড়া দিয়েছে। সম্ভবত, পুরো জাতিকেই সেটা নাড়া দিয়েছে।
এর আগে আমি কখনোই মনে করিনি যে পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে গেছে যে আমির খানের মতো মানুষকে ভাবতে হয়, তাঁকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। তাহলে তো আমিরের সম্প্রদায়ের ক্ষমতাহীন মানুষেরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ভারতের ৫০০ শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী আসলে কোন কারণে বিভিন্ন পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা বোধগম্য। এটা আসলে তাঁদের মর্মবেদনা প্রকাশের তরিকা। আর যাঁরা সেই পর্যায়ে যাননি, তাঁরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
আমিরের মন্তব্যে সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ভাবা উচিত, সংখ্যালঘুদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল কেন? এমনকি তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও পরিশীলিত মানুষ আমির খানও মনে করেন, তিনি অনিরাপদ। এর পরিণামে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাঁর ওপর হামলে পড়েছে, আক্ষরিকভাবে তাঁকে হেনস্তা করেছে। বিজেপি বলেছে, ভারত যাঁকে আমির খান বানাল, সেই তিনিই কিনা এমন অকৃতজ্ঞের মতো কথা বললেন। তিনি আজ এ জায়গায় এসেছেন কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে। ভারত অভিনয়ের জন্য তাঁকে মূল্যায়ন করেছে।
আমি মনে করি, এমন কিছু ঘটেনি যে আমির সম্পর্কে এমন কথা বলা যায়। তাঁর অনুভূতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আমাদের সবাইকে অন্তর্বীক্ষণ করতে হবে, আমির খানের মতো মানুষ যিনি দেশজুড়ে এত সমাদৃত ও প্রশংসিত, তাঁকে কেন এমন কথা বলতে হলো। এই কথা বলার পরিণাম কী হবে, সেটা নিশ্চয়ই তিনি ভেবে দেখেছেন। তিনি একজন সংবেদনশীল মানুষ। তিনি নিশ্চয়ই মনে করেছেন, ভারতে যেভাবে অসহিষ্ণুতা শিকড় গেড়ে বসেছে, তাতে তাঁর মতো একজন মানুষও সেখানে অনাবশ্যক হয়ে পড়েছেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারও সন্দেহ নেই, আর তাঁর পুরো জীবনই তো একটা উন্মুক্ত খাতার মতো।
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে যে বিতর্ক হচ্ছে, সেটা তেমন স্বাস্থ্যকর নয়। তিনি এ কথা কেন বললেন, তার সম্ভাব্য কারণ খোঁজা উচিত। জাতিকে এই প্রশ্ন পূর্ণাঙ্গরূপে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের উচিত, নিজেদের নিরাপদ মনে করা। কারণ, তাঁরা যেটা বলেন, সমাজে তার প্রতিক্রিয়া হয়, সংখ্যাগুরুর কথার ক্ষেত্রে তা হয় না।
দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, বিভাজনই কিন্তু এখন পর্যন্ত মূল বিষয়। বিভাজন একটা বাস্তবতা। জওহরলাল নেহরু ও সরদার প্যাটেল এটা মেনে নিয়েছিলেন, যাঁরা তখন স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এটা সত্য যে তাঁরা দুজনেই দেশভাগ মেনে নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু যখন তাঁরা মনে করলেন যে ব্রিটিশ শাসন অবসানের আর রাস্তা নেই, তখন তাঁরা ভারত ভাগ করতে রাজি হলেন।
গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন যখন দেশভাগের পালে হাওয়া দিলেন, তখন মহাত্মা গান্ধী তাঁর কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে তিনি কিছু করতে নারাজ ছিলেন। কিন্তু যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি বললেন, তাঁরা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে মীমাংসা ছাড়াই দেশ ত্যাগ করবেন, তখন নেহরু ও প্যাটেল সত্যের মুখোমুখি হয়ে দেশভাগ মেনে নিলেন, যদিও অনেক দুঃখ ও বেদনা নিয়ে।
এটা সত্য যে ধর্মের ভিত্তিতে যে বিভাজন রেখা টানা হলো, তার ফলাফল বিপর্যয়কর। ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য মানুষকে এই মূল্য দিতে হয়েছে। দুঃখজনকভাবে বিব্রতকর সত্য হচ্ছে, দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের জাতশত্রুতে পরিণত হয়। এর জন্য দুই তরফের রাজনীতিকদেরই দায়ী করতে হবে। বিশেষ করে পাকিস্তানের রাজনীতিকেরা এখনো বিভাজনের পথেই হাঁটছেন।
ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছিল, এটা শুধু কথার কথা। রাজনৈতিক নেতারা শান্তি ও বন্ধুত্বের অনেক আশ্বাস শোনালেও মানুষ এক দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গেছে, যেখানে তাদের সম্প্রদায়ের মানুষ থাকে। ইতিহাসে এর আগে এমন রক্তাগঙ্গা সৃষ্টি হয়নি, দুই সম্প্রদায়ের মোট প্রায় এক কোটি মানুষ মারা গেছে এবং তার কয়েক গুণ ঘরছাড়া হয়েছে।
এখনো সেই ক্ষত শুকায়নি। এর বিপরীতে ভারত-পাকিস্তান তিনটি যুদ্ধ করেছে, আর দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাও নেই। ভারতের মুসলমানরা সংখ্যায় ১৫ কোটি হলেও তারা সেখানে গুরুত্ব হারিয়েছে আর পাকিস্তানের হিন্দুরা দেশটির জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান নিজেকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করল, তারা সেই ধারায় সংবিধানও প্রণয়ন করল। ওদিকে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলো। দেশটির ৮০ শতাংশ মানুষ হিন্দু হলেও হিন্দুরা এমন একটি সংবিধান অধিকতর শ্রেয় মনে করল, যার মুখবন্ধেই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা রয়েছে। সেখানে আইনের সামনে সবাই সমান আর ধর্মের কারণে কেউ নিকৃষ্ট নয়। যদিও এই রাষ্ট্রের পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা খুবই নগণ্য।
ভারতে এখন ভোটারদের মধ্যে বিভেদ নেই, স্বাধীনতার আগে যেটা ছিল। ফলে সংখ্যালঘুরা সেখানে অসহায় নয়। কিন্তু নির্বাচন হয়ে গেলে অন্য বিষয়গুলো সামনে চলে আসে, আর মুসলমানরা উপেক্ষিত হয়। নির্বাচনের আগে যেমন থাকে, নির্বাচনের পরও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার বিভেদই প্রধান হয়ে ওঠে। ভারত এখনো এই পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

Monday, June 15, 2015

কূলদীপ নায়ারের চোখে মোদির ঢাকা সফর

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাবেক কূটনীতিক কূলদীপ নায়ার। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর। তার লেখার বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-
ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটি হয়েছে অসময়ে। দেখে মনে হয়েছিল তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পড়তি ইমেজ ঠেকাতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। তিনি সেখানে কেবল ভারতবিরোধী অনুভূতিকেই আরও তীব্রতর করে তুলেছেন। কেননা, নয়া দিল্লিকে নিরপেক্ষ হিসেবে মনে হয়নি।
আমি জানি না কেন, এবং কতদিন ধরে আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। এটা সত্য যে, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করেছেন। কিন্তু এ পরিচয়ের কারণেই হাসিনা সংবিধান ও প্রচলিত নিয়মনীতিকে অবজ্ঞা করার অধিকার পেতে পারেন না।
একটি উদাহরণ দেখুন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। শাসক দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক হারে বাক্সে ব্যালট পেপার ঢোকানো হয়েছে। ভোটার ও অন্যদের কাছে চিত্রটি ভয়াবহ হয়ে ধরা দেয়। শেখ মুজিব নিশ্চিতভাবে তার কবরে ঘুমিয়ে পড়ছেন। তিনি রাওয়ালপিন্ডির সামরিক জান্তা শাসকদের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ অক্ষকে শক্তি জুগিয়েছে ঢাকায় মোদির সফর। কিন্তু হাসিনা এরপরও নিজের জন্য কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করতেনই। প্রকৃতপক্ষে, যে দাম্ভিক উপায়ে নিজের চারপাশের ভিন্নমত তিনি দমন করেছেন, তাতে তার ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সন্দেহ জন্মে। মুক্ত রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক পথে শাসনের প্রতি কি তার কখনই দৃঢ় আস্থা ছিল?
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হচ্ছে, তিনি যে উপায়ে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনকে অপদস্থ করেছেন, সেটি। কামাল হোসেন তার বাবা শেখ মুজিবের একজন সহকর্মী। সারা জীবন ধরে নীতি আঁকড়ে থাকার কারণে তিনি একজন কিংবদন্তি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করাটা ছিল একটি হঠকারী কাজ। তবে এটিও সত্য যে, হাসিনা এটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নির্বাচনে জেতার জন্য তিনি যে কোন কিছু করতে পারেন। তারপরও, বিএনপি যদি অংশগ্রহণ করতো, তাহলে এর সামান্য কয়েকজন প্রার্থী হলেও জিতে আসতো। এর ফলে মানুষের সামনে হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা তারা করতে পারতো।
নিঃসন্দেহে, সাধারণ নির্বাচন শাসকদের ভাগ্য নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা, এর মাধ্যমে যাচাই করা যেত, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যেসব প্রতিশ্রুতি শাসক দল দিয়েছে, তা তারা পূরণ করতে পেরেছে কিনা।
ভারত অনেক ভাগ্যবান। কারণ, যেভাবে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ করে গেছেন, তা এখনও কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্রকে কক্ষচ্যুত করেছিলেন। তিনি কেবল গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধই করেননি, অনেক মৌলিক অধিকারকেও বাতিল করেছিলেন। কিন্তু মানুষ বিষয়গুলোকে ভালভাবে নেয়নি। নির্বাচনে মানুষ নিজেদের দমিত ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিল। এটা অভাবনীয় ছিল যে, এমনকি মহান ইন্দিরা গান্ধীও পরাজিত হতে পারেন!
১৯৮০ সালের দিকে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্রেফ দায়িত্ব পালনকারী আমলাদেরও শাস্তি দেয়ার পথ বের করে নিয়েছিলেন। এটা দুঃখজনক যে, পূর্বের জনতা সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল বলে যাকেই সন্দেহ করেছিলেন তিনি, তার বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নেয়া হয়েছিল। জরুরি অবস্থার রচয়িতা ভারতের কংগ্রেস পার্টি শেষ পর্যন্ত শিক্ষা পেয়েছিল। দলটি নিজেদের কুকর্ম নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু দলটি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছে তা দেখাই আমার স্বপ্ন। কারণ, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে।
শাসনের প্রতি গণমানুষের কিছু একটা বলার অধিকার থেকে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশটি মত প্রকাশের প্রাণশক্তি হারিয়েছে। অথচ এটি এক সময় এ জাতির ছিল। এটিই স্বয়ং একটি অবনমন। কিন্তু এটা আরও মর্মভেদী একটি বিষয় যে, এ পরিবর্তনটা করছে এমন এক পরিবার, যারা পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতা থেকে জাতিকে মুক্ত করেছিল।
এর জন্য হাসিনা ছাড়া কাউকে দায়ী করার নেই। তিনি নিজেই গণতন্ত্রের অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে ফেলছেন। শেখ মুজিবের কন্যা এমনটি করছেন- এটা কেবল হতাশাজনকই নয়, অপ্রতিভ একটি বিষয়। তিনি জাতিকে শিকল পরাতে পারেন, এমন ভাবনাটাও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এটা হতে পারে। কেননা, তিনি সঠিক ও ভুল এবং নৈতিক ও অনৈতিকের মধ্যের রেখাটি মুছে ফেলেছেন।
হাসিনা স্বৈরশাসকের প্রতিচ্ছবির প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ অবস্থার মধ্যে মোদির সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যজনক। তার উচিত ছিল বাংলাদেশের কোথাও বলা যে, এ দেশটি বিপ্লব থেকে সৃষ্ট। তাই দেশটির উচিত সে ধরনের ভাবনার দীপ্তি ছড়ানো অব্যাহত রাখা। কিন্তু তিনি বরং হাসিনাকে আশ্বস্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ হতাশ। কেননা, মানুষ তার কাছে এমন কিছু লক্ষণ প্রত্যাশা করছিল, যাতে মনে হয়, হাসিনা যেভাবে দেশ চালাচ্ছেন, তাতে ভারত খুশি নয়। 
এটা সত্য যে, মোদি ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছেন। এ চুক্তিটি নিয়ে যখন সংসদে আলোচনা করা হয়, তখন এর পক্ষে সব দলের সমর্থন ছিল। তবে অবশ্যই, চুক্তিটি বাস্তবায়নের কৃতিত্ব তার। পাশাপাশি উপকারী ও চমৎকার প্রতিবেশীর সঙ্গে চুক্তিটিতে সমর্থন দেয়ায় সব রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিল তার। তার জন্য ‘বার্লিন ওয়াল’ পতনের কৃতিত্ব নেয়াটা অভদ্রতাসুলভ।
মোদি পাকিস্তানের সমালোচনা থেকে দূরে থাকবেন, এটাই আমি প্রত্যাশা করি। এর মানে এই নয় যে, সমালোচনাটা অযৌক্তিক। কিন্তু তিনি যখন বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সৌহার্দ্যরে কথা বলছেন, তখন ইসলামাবাদকে সমালোচনা করা এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তার উপলব্ধি করা উচিত, যেমনটি তার পূর্বসূরিরা করেছেন, একদিন অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বাজার থাকবে। একদিন ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের মানুষ তিস্তার পানি নিয়ে একটি চুক্তির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মন্তব্যটি সহায়ক ছিল না। কারণ, মোদির ঢাকা যাত্রা শুরুর আগেই সুষমা জানিয়ে দেন, সফরের আলোচ্যসূচিতে তিস্তা নেই। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরে অংশ নেয়াটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এ থেকে ঢাকার ইঙ্গিত পাওয়া উচিত যে, তিস্তা সমস্যার সমাধানের বিষয়টি নয়া দিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। মোদির সফরে যেহেতু চুক্তিটি হয়নি, এর মানে এটি ধরে নেয়া উচিত নয় যে, ভারত নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি নয়। প্রকৃতপক্ষে, মোদির সফর থেকে ঢাকার এ বার্তা নেয়া উচিত, প্রক্রিয়া যেহেতু শুরু হয়েছে, সমাধান হতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে।

Wednesday, February 18, 2015

ভারত- ‘সাম্প্রদায়িকতাই আসল সমস্যা’ by কুলদীপ নায়ার

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর নিপীড়নমূলক জরুরি অবস্থার সময় যে দু-একটা ভালো কাজ করেছিলেন তার একটি হচ্ছে, সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেক্যুলারিজম ও সোশ্যালিজম শব্দ দুটি ঢোকানো। তার পরে মোরারজি দেশাই ক্ষমতায় এসেই সংবিধানে ইন্দিরা গান্ধী আনীত সব সংশোধনী মুছে দেন, তবে প্রস্তাবনায় আনীত এই সংশোধনী রেখে দেন। বিজেপির পূর্বসূরি জন সংঘ এতে আপত্তি তোলেনি। তারা জনতা পার্টির সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। জন সংঘের বড় নেতা এল কে আদভানি ও অটল বিহারি বাজপেয়ি এই সেক্যুলারিজম ও সোশ্যালিজম শব্দ দুটি রেখে দেওয়ায় যারপরনাই উল্লসিত হয়েছিলেন। এ দুজন পরবর্তীকালে জনতা পার্টিতে যোগ দেন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপনে এ শব্দ দুটি উহ্য থাকার ব্যাপারটি সরকারের ‘প্রকৃত’ ইচ্ছা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, এটা পরিষ্কার। মন্ত্রণালয় তার ভুল স্বীকার করেছে। ব্যাপারটি সেখানেই ও তখনই শেষ হওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু বিজেপির প্রধান অমিত শাহ নিজেই এই বিতর্ক জারি রেখেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, পুরোনো প্রস্তাবনাই আসলে প্রকৃত প্রস্তাবনা। তবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন, এই বিতর্ক জারি থাকার কারণ হচ্ছে প্রস্তাবনার নতুন ভাষ্যে এই শব্দ দুটি নেই।
আইন ও বিচারমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদের কথায় বিভ্রান্তি আরও ডালাপালা মেলেছে। তিনি বলেছেন, এই শব্দ দুটি বাদ দেওয়ার ঘটনা নতুন করে বিতর্কের অবকাশ সৃষ্টি করেছে। আইনমন্ত্রী সংবিধানের পবিত্রতা না বুঝে এমন কথা বলেছেন, যা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে। আর তাঁর মতো উদার মানুষ এমন কথা বলবেন, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ শব্দ দুটি যখন যুক্ত করা হয়, তখন এ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।
এই নাটক থেকে একটি সিদ্ধান্তই টানা যায়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক পার্টি (আরএসএস) চায় না এ শব্দ দুটি সংবিধানে থাকুক। তারাই তো বিজেপিকে পথ দেখায়। দেশব্যাপী এ নিয়ে হইচই শুরু হওয়ায় বিজেপি বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি এগোয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চুপ ছিলেন। তিনি হয়তো দলের সভায় পরামর্শ দিয়েছেন, ভারত সংবিধান থেকে এ দুটি প্রপঞ্চ বাদ দিতে এখনো প্রস্তুত নয়। আরএসএস সম্ভবত বিষয়টিকে বিপরীত ভাষ্য হিসেবেই নিয়েছে, পরাজয় নয়। পরিস্থিতি অনুকূল হলে তারা আবার ফিরে আসবে।
এটা সত্য, কংগ্রেসের ক্রমহ্রাসমান ভূমিকার কারণে সেক্যুলারিজম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও আদর্শিকভাবে তারা সেক্যুলার। কিন্তু এই দল ও আদর্শ সমার্থক নয়। কংগ্রেস কাজেকর্মে এ পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে সেক্যুলারিজম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে দলটি আদর্শকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে।
সেক্যুলারিজমের প্রতি কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী ও তাঁর ছেলে রাহুল গান্ধীর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু রাজ্য পর্যায়ে নেতারা ভোটের জন্য সংকীর্ণতার পথে হাঁটতে কসুর করেন না। শোনা যায়, সোনিয়া এতে অখুশি। কিন্তু এঁদের দল থেকে বিদায় করা আত্মঘাতী হতে পারে।
কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মার ভাষ্যমতে, কংগ্রেস মাঠ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। আগামী মার্চে তারা এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। তার পরও দলটি বুঝতে পারছে না যে তারা কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে। কর্মীদের মোহভঙ্গ ঘটেছে। তারা বুঝে গেছে যে কংগ্রেস যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সেক্যুলারিজম ও সোশ্যালিজমের মূল্যবোধ থেকে সরে গেছে।
মহাত্মা গান্ধী এখনো আইকন। কিন্তু দলটি এমন কিছু মানুষকে জায়গা দিয়েছে, যারা গান্ধীর খুনি নাথুরাম গডসের মূর্তি স্থাপন করতে চায়, যে ব্যক্তি গান্ধীকে গুলি করে খুন করেছিল। সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার নাম কোথাও শোনা যায়নি। কিন্তু কিছুদিন আগে রাজস্থানের একটি আন্ডারপাস গডসের নামে নামকরণের কথা ওঠে। বামপন্থী দল, কংগ্রেস ও অন্যান্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর উচিত, নিজেদের কর্মসূচি ও কীভাবে তারা সেটা বাস্তবায়ন করছে, তা বিশ্লেষণ করা। গডসে হিন্দুত্ববাদের প্রতিমূর্তি। মহাত্মা গান্ধী এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধেই প্রাণপণ সংগ্রাম করেছেন।
সমাজতন্ত্র নেহরুর জীবদ্দশায় সমাজতান্ত্রিক ধারায় পরিণত হয়। কারণ, তিনি বুঝেছিলেন যে এই আদর্শের চর্চা করা কঠিন কাজ। বিগত বছরগুলোতে এই ধারণা এত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সরকারি খাত ব্যাপারটিই দৃশ্যপটের বাইরে চলে গেছে। অথচ সরকারি খাতেরই সবকিছুর প্রাধান্যে থাকা উচিত ছিল। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি খাতকেই প্রধান খাত বানিয়ে ফেলেছে, কারণ তারাই দলগুলোকে নির্বাচনী খরচ জোগায়। বড় রকমের নির্বাচনী সংস্কার না করলে এই আঁতাত শিগগির ভাঙা যাবে না।
জনকল্যাণ সমাজতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, কিন্তু তা সমতার ধারণার ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়লে বা শিল্পায়ন হলে সম্পদ সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদদের মধ্যকার গাঁটছড়ার কারণে দ্রুত উন্নতি সম্ভব হয় না। লালফিতার কথা বাদই দিলাম, রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির কারণে আমাদের শক্তি ক্ষয় হয়, যার বলে সমাজ অনেক এগোতে পারত।
সাম্প্রদায়িকতাই আসল সমস্যা। ‘ঘর ওয়াপসি’ বা ঘরে ফেরা কর্মসূচি আমাদের সবার সম্মিলিত ও জোরদার প্রতিক্রিয়ার কারণে সফল হতে পারেনি। এখনো খ্রিষ্টানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। কিন্তু সংখ্যায় তারা কম হওয়ায় নির্বাচনের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কিঞ্চিৎকর। সেটা না হলে বিজেপি সরকার বড়দিনের দিন ‘সুশাসন দিবস!’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারত না। দিল্লির আর্চবিশপ বলেছেন, এটা ঘৃণা ছড়ানোর নীতির ফসল।
মুসলমানরা ভারতের ১৫ শতাংশ। তারা ন্যায্য পাওনা পেয়েছে, বিশেষ করে চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে। তাদের পাশে ঠেলে দেওয়ার যে নিরন্তর চেষ্টা সমাজে জারি আছে, সেটা তারা থামিয়ে দিতে পেরেছে। তাদের ভোট তো কাজে লাগে। আকবরউদ্দিনের ধর্মীয় আহ্বানে সাড়া না দিলে তাদের মধ্যে অন্তত এই ধারণা শেকড় গাড়বে যে ধর্মনিরপেক্ষতার বিকল্প নেই।
তার পরও জাতিকে ভাবতে হবে, কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সে আপস করতে বাধ্য হয়েছে। আজ মওলানা আবুল কালাম আজাদ ও খান আবদুল গাফফার খানের মতো মানুষকে কতজন স্মরণ করে? যারা মুসলিম লিগের উত্থানের সময় সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। খান সাহেবকে তো সীমান্ত গান্ধী বলা হতো। তাঁদের দূরদৃষ্টি ছিল। আজ সেটা নেই।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

Monday, November 3, 2014

ভারত- দুর্নীতিবাজদের বিচার করতে হবে by কুলদীপ নায়ার

একসময় আমি লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার ছিলাম। সে সময়ের কথা মনে পড়ছে। কারণ, তখন টাকার সমস্যা এত প্রকট হয়েছিল যে নয়াদিল্লি থেকে জানানো হয়, লন্ডনে বসবাসরত ভারতীয়দের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু সেখানে জার্মান রাষ্ট্রদূত আমাকে যে কথা শোনান, তাতে আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হয়। তিনি বলেন, সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের এত পরিমাণ টাকা গচ্ছিত আছে যে তাঁরা অনায়াসে কয়েকটা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অর্থ সরবরাহ করতে পারেন। এই অবৈধ বিদেশি ব্যাংক হিসাব নিয়ে শোরগোল তৈরি হওয়ায় যাঁরা এই বিতর্কের আগে সাধারণ ক্ষমার আওতায় পড়েছিলেন, তাঁদের নাম সবাই ভুলে যায়। স্বাভাবিকভাবে, এসব মানুষ প্রধান দুই দলভুক্ত: কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, এই হিসাবধারীরা এত টাকা কোথায় পেলেন, তার অনুসন্ধানও কেউ একটিবার করেননি। আর ব্যাপারটি বন্ধ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও কোনো কথা নেই।
বিদেশে টাকা জমানো একটি অপরাধ। সে কারণে যাঁরা বিদেশে টাকা লুকিয়েছেন, তাঁরা সবাই দোষী। সরকার কেন তাঁদের নাম লুকাতে চায়, সেটা সত্যিই আমাদের বোধগম্য নয়। নিশ্চিতভাবেই কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়ই এর জন্য দায়ী। ফলে তাঁদের নাম প্রকাশ পেলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, সে কারণেই দল দুটি চায় না যে নাম প্রকাশিত হোক।
সত্য হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে থাকে। সে টাকার বারো আনাই অবৈধ, আর সেই অবৈধ টাকা লুকানোর স্বর্গ হচ্ছে এই দেশগুলো। ফলে মানুষও এ টাকা সম্বন্ধে জানতে পারে না, আবার তাঁরা বিপুল অঙ্কের করও ফাঁকি দিতে পারেন।
ভারতের জনগণের উচিত জার্মানিকে ধন্যবাদ দেওয়া, কারণ তারাই এসব নাম জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিয়েছে। একটি জার্মান ব্যাংক কেমনভাবে যেন এই তালিকা পেয়ে যায়। তারপর তারা সেটি ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। ভারতের কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কৃতিত্ব এখানে নেই। আবার জার্মানি কেন এই নামগুলো ভারতের কাছে হস্তান্তর করল, সেটাও তেমন একটা বোধগম্য নয়। ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে এটা ছিল নয়াদিল্লির ওপর একরকম চাপ প্রয়োগ, তাহলে সেটা কার্যকর হয়েছে।
জনগণ যখন জানতে পারল যে ৮০০ জন ভারতীয়র বিদেশে টাকা আছে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। নিঃসন্দেহে আরও অনেক নামই প্রকাশিত হয়নি। এটা শুধু বরফখণ্ডের ওপরের অংশ, যার বেশির ভাগটাই পানির নিচে। বিদেশে যে পরিমাণ টাকা জমা আছে, তার পরিমাণ ছয় লাখ কোটি রুপি।
যা-ই হোক, সরকারের হাতে এখন এই হিসাবধারীদের তালিকা আছে। খবর বেরিয়েছে, তাঁরা এ টাকা পেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে। রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মধ্যেই দোষী ব্যক্তিদের ধরার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ সাত মাস পর তিনি কেবল ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছেন।
মনমোহন সিংয়ের সরকার কেন তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিল না, তার ব্যাখ্যা কংগ্রেসের মুখপাত্র দেননি। এরূপ অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর আসলে কেউই দেন না। নাম প্রকাশের ব্যাপারটাও এর মধ্যে পড়ে।
মোদি সরকারেরও পবিত্র কিছু ব্যাপার আছে। তারা করপোরেট খাতের কিছু কোম্পানির নাম প্রকাশ করেছে, আবার কিছু বাদ দিয়েছে। সম্ভবত যে কোম্পানিগুলোর নাম এসেছে, তারা মোদি-জাদুতে বিমোহিত হয়নি। আর এই করপোরেট খাতে গুরুত্ব দেওয়া আসলে রাজনৈতিক খাত থেকে দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। এর মাধ্যমে জনগণকে এটাও বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যে এই অবৈধ টাকা আসলে করপোরেট জগতের সৃষ্ট, রাজনীতিকদের এখানে কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু এটা কালোটাকা, এটা অর্জিতও হয়েছে অবৈধ উপায়ে। ফলে রাজনীতিকদেরই এর দায় নিতে হবে, সরকার বা বিরোধী দল যেখানেই তঁারা থাকুক না কেন। তাঁরা দুর্নীতির প্রতি চোখ বুজে ছিলেন।
আমরা আশা করেছিলাম, মোদি রাজনীতির এই কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কাজ করবেন। কারণ, তিনি সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার কথা বলেছিলেন।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি তাঁর কথা রাখতে পারেননি। তিনি রাজনীতিক ও আমলাদের দুর্নীতি করার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই যা। কিন্তু দুর্নীতি মোটেও কমেনি।
এখন মোদি যদি সব নাম প্রকাশ করে দেন, তাহলে কিছুটা হলেও তাঁর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা যায়। সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বিচারের ব্যাপারটি নির্ভর করছে তথ্য-প্রমাণের ওপর। এতে অন্তত তিনি দুর্নীতিবাজদের নাম গোপন করার কলঙ্ক থেকে রেহাই পাবেন।
হ্যাঁ, এখন যা বলব তা দুর্নীতির কোনো নজির না হলেও এতে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এই দেওয়ালিতে নাকি তিন হাজার কোটি টাকার বাজি পোড়ানো হয়েছে—শুনে তো আমার অক্কা পাওয়ার দশা। আর দসরায় যে টাকা খরচ হয়েছে, সেটা এর বাইরে, তার অঙ্কও কয়েক কোটির কম নয়।
যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেয়ে রাতে ঘুমাতে যায়, সেখানে এরূপ দুর্নীতির খবর চেপে যাওয়া বা অযাচিত ব্যয় করা আসলে সেই অভুক্ত মানুষগুলোর প্রতি দায়িত্বহীনতার শামিল; একই সঙ্গে এটা মানবতার চরম অবমাননাও বটে। এর প্রতিবাদে মানুষকে রাস্তায় নেমে গলা ফাটাতে দেখছি না। সমাজে একরকম নিস্পৃহতা দেখা যাচ্ছে, কারণ যাঁরা এই প্রতিবাদ করেন বা জনমত গঠন করেন, তাঁরাও এ সমস্যার অংশে পরিণত হয়েছেন। ফলে তাঁদের তরফ থেকে কোনো সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

Saturday, September 6, 2014

বিজেপি ও কংগ্রেসের বিকল্প খুঁজছে জনগণ by কুলদীপ নায়ার

উপনির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে, দলগুলোকে রণক্লান্ত মনে হচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাদের অবস্থান এখন নিম্নমুখী। সমস্যাটা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা নিচ্ছে না। প্রতিটি নির্বাচনেই ভোটারদের ক্রমেই মোহভঙ্গ ঘটছে। এটা পরিষ্কার যে বিজেপি এত আসন পাওয়ার পরও ভোটাররা সে স্রোতে একদম ভেসে যাননি। তাঁরা এমন এক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে এই গেরুয়া শক্তির রাশ টেনে ধরবে।
উপনির্বাচনগুলো ছিল আসলে বিজেপি এবং কংগ্রেস, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও নিতীশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর সমন্বয়ে গঠিত নতুন ঐক্যের জন্য একটি পরীক্ষা। দেখা গেল, উপনির্বাচনগুলোতে নতুন সেক্যুলার জোট বিজেপির বিরুদ্ধে ভালো করেছে। যদিও লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় উপনির্বাচনে বিজেপিরই ভালো করার কথা। এই ফলাফল নতুন জোটের মনোবল বাড়াবে, বিশেষত কংগ্রেসের মতো একটি মহিরুহ ও পুরোনো দলের ক্ষেত্রে তা একটি বড় ব্যাপারই হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলে নিশ্চিতভাবে বিজেপিতে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপি ফ্রন্ট গঠনে সাহস দেখালেও সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের ১১টি আসনে উপনির্বাচনের আগে জনমত পাঠের ক্ষেত্রে দলটিকে কুশলতার পরিচয় দিতে হবে।
বিজেপির নতুন সভাপতি দলে পাইকারি হারে পরিবর্তন এনেছেন, ফলে উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনের ফলাফল দলটির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এল কে আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশির মতো ঝানু নেতাদের দলটির সংসদীয় সভায় স্থান না পাওয়াটা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে। অমিত শাহ এই ১১টি আসনই নিজেদের ঝুলিতে পুরতে চান, কারণ এই উপনির্বাচনকে রাজ্যটির ২০১৭ সালে অনুষ্ঠেয় রাজ্যসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপিকে কংগ্রেস ও সাম্যবাদী পার্টির সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে নামতে হবে, এই দল দুটি ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে শাহকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হবে। লোকসভা নির্বাচনে শাহ প্রায় এককভাবেই উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ৭০টি আসনে বিজেপিকে জিততে সহায়তা করেছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি সভাপতির পদ পেলেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
মনে হচ্ছে, মোদি-জাদুর আমেজ ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও বিহারের ১৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই চার মাসের মধ্যেই ভোটাররা কেন এভাবে বিজেপির দিক থেকে মুখ ফেরানো শুরু করেছেন, সেটা গভীর বিশ্লেষণের ব্যাপার। এটা সত্য, দলটি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন খুব কঠিন, সেটা একটা আংশিক কারণ বটে। দলটি কীভাবে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ক তেমন কোনো প্রস্তুতি তাদের নেই।
বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, আর বাস্তবায়ন হয় খুব সামান্যই। দলগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে জয়লাভ করা, ফলে জনগণের উপলব্ধি হয় খুব দ্রুত। ভোটাররা এক দলকে বাদ দিয়ে আরেক দলকে বেছে নেন, প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁরা আশা করেন আগের চেয়ে এবার ভালো হবে। আর আশা পূরণ করতে না পারলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট দলকে শাস্তি দেন। যেমন, কংগ্রেস লোকসভায় এবার মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছে, এমনকি বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যে ৫৫টি আসনের দরকার হয়, সেটাও তারা পায়নি।
মধ্যপ্রদেশে আসন হারানো অমিত শাহ ও শিবরাজ সিং চৌহান উভয়ের জন্যই সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চৌহান সম্প্রতি দলটির সংসদীয় বোর্ডে ঠাঁই পেয়েছেন, এই বোর্ড দলটির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সভা। না, শুধু কংগ্রেস প্রার্থীর জয়-ই নয়, ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রার্থীর পরাজয়ই তাদের বেশি পোড়াবে। কেননা, এই চার মাস আগের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশের ২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল।
বিহারে লালু-নিতীশ যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে এই উপনির্বাচনের জয় বিপুল প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। এই দুই ঝানু রাজনীতিবিদ খুব সুপরিকল্পিতভাবে একটি রাজনৈতিক জুয়া খেলেছেন, সেখান থেকে ফলও এসেছে ভালো। বিহারের রাজনীতিতে ভোটের অঙ্ক ও বর্ণপ্রথার সমীকরণ তাঁরা ভালোই বোঝেন, ফলে তাঁরা জানতেন, উপনির্বাচনে জিততে হলে তাঁদের সম্মিলিতভাবে লড়াইটা করতে হবে।
সন্দেহ নেই, তাঁদের এই জয় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। বিজেপিবিরোধী দলগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি হবে। আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে সেটা বিজেপিকে ভালোভাবেই ভোগাতে পারে। বহুজন সমাজবাদী পার্টির মায়াবতী উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনে মুলায়ম সিং যাদবের এরূপ একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ, সমাজবাদী পার্টি যে মায়াবতীকে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিল, সে বেদনা এখনো তিনি ভোলেননি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মায়াবতীর আস্থা তাঁরা অর্জন করতে পারলে তিনি হয়তো এ প্রস্তাবে সাড়াও দিতে পারেন।
যাই হোক, এই উপনির্বাচনের ফলাফল বিজেপিবিরোধী শিবিরে আনন্দের বারতা পৌঁছে দিয়েছে। এখন সবাই হয়তো এরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা করবেন। সিপিএমের নেতা প্রকাশ কারাত বলেছেন, সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বিজেপিবিরোধী জোটগুলো ভালো করেছে, ফলে বিজেপি ঠেকাতে সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ঐক্য করা যেতে পারে। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর ও সিপিএমের কিছু অমীমাংসিত ব্যাপার রয়েছে। ‘বিজেপি এখন ক্ষমতায়, ফলে আমরা এখন বিজেপিকে ঠেকাতে চাই। কিন্তু আমরা কংগ্রেসের নীতিরও বিরোধী’, তিনি বলেছেন।
পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, অসাম্প্রদায়িক দলগুলোর একটি শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ভোটাররা কংগ্রেস ও বিজেপির বাইরে একটি বিকল্প খুঁজছে। জনগণ গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শাসন চায়, আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের লক্ষ্যও ছিল তা–ই।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

Monday, November 4, 2013

হিন্দু-মুসলমান-দলিত- ভারতে মৌলবাদের উত্থান by কুলদীপ নায়ার

মৌলবাদ আবারও তার জঘন্য মাথা তোলা শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) খোলাখুলি জানিয়েছে যে তারা সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করবে।

Friday, September 20, 2013

অর্থনীতি- গভীর গাড্ডায় ভারত by কুলদীপ নায়ার

ভারত যে অর্থনৈতিক গাড্ডায় পড়েছে, তা দুনিয়ার লোক জেনে গেছে। যা এখনো সবাই জানে না তা হলো, এই ব্যাধির কারণ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত।

Saturday, July 13, 2013

ভারত জনগণের সন্দেহের চোখে রাজনৈতিক দলগুলো by কুলদীপ নায়ার

ভারতের মনমোহন সরকারের বিগত ১০ বছরে রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ওপর থেকে মানুষের আস্থা চলে যাওয়াটাকেই আমার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় বলে মনে হয়।