Saturday, May 31, 2014

রাজনীতির গুণ, মিলেমিশে খুন! by সোহরাব হাসান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরের শেষ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীতে সংঘটিত খুনের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই দলে ঢুকে এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই যদি আওয়ামী লীগে ঢুকে উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, বিশিষ্ট আইনজীবীদের খুন করে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কী করছেন? তাঁদের দায়িত্ব কি বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদের সাদরে দলে নিয়ে আসা, নাকি এই দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা যাতে দলে না ঢুকতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা?

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও একটি সত্য প্রকাশ পেল যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত আওয়ামী লীগে ইচ্ছা করলেই দলের আদর্শের বিরোধী ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারক বিএনপির নেতা-কর্মী এবং মৌলবাদী জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে৷
সম্প্রতি ফেনী ও নারায়ণগঞ্জে যে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার মূল হোতা ও নেপথ্যের কুশীলবদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অাধাআধি সত্য মিলবে৷ পুরো সত্য হলো, আওয়ামী লীগের পুরোনো মাস্তান ও গডফাদাররা নিজেদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে এবং দলের ভেতরেই প্রতিপক্ষ শক্তিকে ঘায়েল করতে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত-িশবিরের সন্ত্রাসীদের ফুলের মালা দিয়ে দলে নিয়ে আসেন৷ বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেনও হয়৷ যিনি টাকা দিয়ে দলে আসেন, তিনি তো সেই টাকা উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেনই৷ কিন্তু যেসব নামীদামি নেতা টাকার বিনিময়ে এসব অনুপ্রবেশকারীকে বরণ করে নেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, যাঁরা ঘটাতে সহায়তা করেছেন, তাঁদের মধ্যে বনেদি ও নবাগত আওয়ামী লীগার যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিরোধী দলের নেতা–কর্মীরাও৷ অনেক সময়ই পুরোনোদের কনুইয়ের গুঁতায় ঠেলে দিয়ে দলে নবাগতরাই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন৷ বিরোধী দলের নেতাকে কাঁচপুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখার কাজে যদি কোনো নবাগত সন্ত্রাসীকে ব্যবহার করা হয়, সেই ব্যক্তিটি যে নিজেকে দল ও সরকার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করবেন, তাতে সন্দেহ কী?
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় আসামি হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান বিএনপি-জামায়াতের লোক যেমন আছেন, তেমনি আছেন বনেদি আওয়ামী লীগাররাও৷ চোরে চোরে মাসতুতো ভাই৷ এক দলের সজ্জন নেতাদের সঙ্গে অন্য দলের সজ্জন নেতাদের যেমন সৌহার্দ্য ভাব গড়ে ওঠে, তেমনি এক দলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অন্য দলের সন্ত্রাসীদের আঁতাত হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়৷ রাজনীতিতে প্রথম পক্ষ যত ক্ষীয়মাণ হচ্ছে, দ্বিতীয় পক্ষ ততই বলবান হচ্ছে৷
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন স্বৈরাচারী এরশাদের দোসর ও জাতীয় যুব সংহতির নেতা নাসিম ওসমানের হাত ধরে আশির দশকের শেষে রাজনীতিতে আসেন৷ নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই নূর হোসেন বিএনপিতে যোগ দেন এবং স্থানীয় বিএনপির সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের প্রধান লাঠিয়াল হন৷ কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮ সালে নূর হোসেনকে যিনি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমান৷ ১৫ বছর পর এসে প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারী ও বনেদির সংজ্ঞা কীভাবে ঠিক করবেন?
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনও পালিয়ে গিয়েছিলেন৷ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালালেও সবাই তো শামীম ও হোসেনদের মতো পালিয়ে যাননি৷ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গুরু-শিষ্য দুজনই এলাকায় ফিরে আসেন৷ সে সময়ে শামীমের অসুবিধা ছিল, তাঁর আসার আগেই ২০০৮ সালের নির্বাচনটি হয়ে গেছে৷ তিনি সাংসদ হতে পারেননি৷ আর নূর হোসেনের সুবিধা ছিল, তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর হন এবং দলের ও প্রশাসনের সহায়তায় নিজে খুদে মাফিয়া হয়ে ওঠেন৷ তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য উত্থান রহিত করার কেউ ছিল না৷ যখন একজন খুদে মাফিয়া টাকা দিয়ে সবকিছু কিনতে পারেন, তখন তিনি কাউকেই পরোয়া করেন না৷ আর গুরুর সঙ্গে নূর হোসেনের হৃদয়ের বন্ধন এতটাই অবিচ্ছেদ্য যে সাত খুনের পরও তা ছিন্ন হয়নি৷ বহুল আলোচিত অডিও টেপে দেখা যায় যে শামীম ওসমান তাঁকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুপরামর্শ দিয়েছেন৷
প্রধানমন্ত্রী যাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলছেন, তাঁরা কেন এক দল ছেড়ে অন্য দলে যান, সেই কথাটি উল্লেখ করলে দেশবাসী পরিষ্কার ধারণা পেত৷ যেহেতু বিরোধী দলে থেকে এসব দখলদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস করতে তেমন সুবিধা হয় না, র‌্যাব-পুলিশের নজরদারিতে থাকতে হয়, সেহেতু তাঁরা বরাবর সরকারি দলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই একবার এদের পিজিপি বা প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন৷ তিনি কি হিসাব করে দেখেছেন, ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে এই পিজিপি সদস্যদের সংখ্যা কত?
প্রধানমন্ত্রীর কথা সত্য হলে আওয়ামী লীগে এ রকম দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা দলে এসে িনর্বিঘ্নে খুনোখুনিও করতে পারেন৷ আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নীরব দর্শকের মতো তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন৷
আর অনুপ্রবেশকারীরা সব সময় সরকারি দলে যায় কেন? এর মাধ্যমে তাঁরা দুটি সুবিধা আদায় করেন৷ প্রথমত, বিগত আমলের সব অপকর্মের দায়মুক্তি৷ দ্বিতীয়ত, নতুন করে অপকর্মের ছাড়পত্র৷ তাঁরা যেহেতু সরকারি দলে নাম লিখিয়েছেন, সেহেতু নতুন অপকর্মে লিপ্ত হতে কোনো বাধা নেই৷ আর প্রশাসনের ঘাড়ে কটি মাথা যে তারা সরকারি দলের এমন খুদে মাফিয়া ও নির্বাচিত কাউন্সিলরের গায়ে হাত দেয়৷ নূর হোসেন অনেকের চেয়ে চালাক ছিলেন বলেই তিনি শুধু দলের ক্ষমতার ওপর ভরসা না করে টাকার ক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন৷ শোনা যায়, তাঁর হাত এতই লম্বা যে সেটি নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসনের ছোট লাটদের ছাড়িয়ে ঢাকার সচিবালয় তথা বেইলি রোড-মিন্টো রোড-হেয়ার রোড পর্যন্ত প্রসারিত ছিল৷
ফেনীর একরামুল হত্যার ঘটনাটি আরও জটিল৷ এখানে একদা গডফাদার জয়নাল হাজারী যেসব শিষ্য-প্রশিষ্য তৈরি করেছিলেন, তাঁরাই পরবর্তীকালে বিভিন্ন ফেঁকড়ায় ভাগ হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একের পর খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন৷ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জয়নাল হাজারী গঠন করেন প্রাইভেট বাহিনী৷ তিনি যত দিন ফেনীতে ছিলেন, তত দিন তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না৷ কিন্তু ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে তিনি ভারতে পালিয়ে যান৷ তখন তাঁর শিষ্যরা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে কেউ তাঁর পক্ষে কেউ বিপক্ষে অবস্থান নেন৷ নিজেদের শক্তি বাড়াতে এঁদের কেউ বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পক্ষে টেনে আনেন৷ ফলে একদা চট্টগ্রামে শিবিরের ঘাতক বাহিনীর সদস্যও আওয়ামী লীগের ছায়াতলে এসে আগের অভিজ্ঞতা ঝালাই করতে থাকেন৷ ফেনীতে আওয়ামী লীগের উঠতি নেতারা প্রতিপক্ষের শক্তি খর্ব করতে এঁদের ব্যবহার করেন৷
জাতীয় রাজনীতিতে যত বিরোধই থাক না কেন স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি এমনকি জামায়াতের নেতারাও একসঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য, ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি করে থাকেন৷ এসব ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন চরম শত্রু হন, তেমনি বিরোধী দলে থাকা প্রতিযোগী হয়ে ওঠেন পরম বন্ধু৷
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন ও ফেনীতে একরাম হত্যার আসামিদের তািলকা দেখলে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নামই এসেছে৷ অনেকের ফোনালাপের বিষয়াদি জনসমক্ষে প্রকাশিত৷ তাই বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে ঢুকে সব খুন ও সন্ত্রাস করছেন বলা সত্যের অপলাপ বলেই মনে করি৷
জাতীয় রাজনীতিতে যখন আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ, তখন স্থানীয় পর্যায়ে কেবল নারায়ণগঞ্জ বা ফেনী নয়, বহু স্থানে আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশের গূঢ় রহস্যটা কী? রহস্যটা হলো, রাজনীতি এখন নীতি ও আদর্শ পেছনে ফেলে হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার৷ সেই সুবিধা আদায়ের পথে যখন কেউ কাউকে পথের কাঁটা মনে করছেন, তাঁতেই সরিয়ে দিচ্ছেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর কায়দায়৷
আমাদের জাতীয় নেতারা আলোচনা করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন দিতে না পারুন, একে অপরের বিরুদ্ধে যত খুশি বিষোদগার করুন না কেন, তাঁদের অনুসারীরা মিলেমিশেই খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন৷ অন্তত নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা তাই প্রমাণ করছে৷ রাজনীতির এই বিধ্বংসী ও বিনাশী প্রবণতাকে কেবল অনুপ্রবেশকারী সমস্যা বলে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না৷ প্রধানমন্ত্রী কী বলেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

মোদি সরকার: বন্ধু কার? by আসিফ নজরুল

এই পৃথিবী বিজয়ীর বন্দনা করে, পরাজিতের বিচার করে। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ না করলে বা সেখানে না হেরে গেলে, তিনিই হতেন বিশ্বজয়ী। এটিলা দ্য হান, আলেকজান্ডার কিংবা জুলিয়াস সিজারের মতো তার জন্যও হতো বীরবন্দনা৷ ইংরেজির বদলে আমরা হয়তো শিখতাম জার্মান ভাষা। থ্যাঙ্ক ইউ না বলে বলতাম ডাঙ্কেশুন্! এখনকার বিশ্বে বিজয়ী শক্তি আমেরিকা। না হলে জাপানে পারমাণবিক বোমা মারার জন্য কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ইরাক আর আফগানিস্তানে গণহত্যার জন্য তাদের রাষ্ট্রনায়কদের বিচার হতো আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে৷ বিজয়ী বলে তারাই বরং সারা বিশ্বে সবক দিয়ে বেড়ায় মানবাধিকারের। অন্য দেশ লুট করে, সংখ্যালঘুদের নিপাত করে আর নিজের দেশের গরিব মানুষকে জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়ে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ এখন বাদবািক বিশ্বকে শিক্ষা দেয় রাষ্ট্রীয় নীতিশাস্ত্রের।

এমন এক বিশ্বে অভূতপূর্বভাবে বিজয়ী নরেন্দ্র মোদির বন্দনা বিস্ময়কর নয়। স্বাধীনতার পর ৬৬ বছরের মধ্যে ৩২ বছর সরাসরিভাবে এবং আরও ১০ বছর মনমোহনের মাধ্যমে ভারত শাসন করা নেহরু পরিবার ও কংগ্রেসকে তিনি প্রায় সর্বস্বান্ত করে দিয়েছেন ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনে। গুজরাটের কসাই হিসেবে পাশ্চাতে্য একসময় অবাঞ্ছিত মোদিবন্দনায় তাই শামিল হয়েছে উন্নত-অনুন্নত সব বিশ্ব। মোদি সাম্প্রদায়িক, মোদি নারীবিমুখ, মোদি অভিবাসীবিরোধী, মোদি নির্মম। সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে মোদির বিজয়। মোদি এককভাবে সারা ভারতে উড়িয়েছেন বিজেপির বিজয় পতাকা। জয়ের পরও চলছে তাঁর বিজয়রথ। প্রথমবারের মতো তাঁর শপথে তিনি শামিল করিয়েছেন এই অঞ্চলের সরকারপ্রধানদের৷ প্রথম সিদ্ধান্তেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতরত্ন উপাধি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আবারও জয় করে নিয়েছেন ভারতীয় অহং৷
মোদির জয়ে আমাদেরও খুশি না হয়ে উপায় নেই। মোদির জয়ে খুশি হয়েছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ। গোপনে গোপনে খুশি হওয়ার কথা জামায়াতে ইসলামীরও। ক্যু করে গড়ে তোলা জাতীয় পার্টি এখন নিজেই তার দলের ভেতর আওয়ামী ‘ক্যু’-তে দিশেহারা। তা না হলে মোদিবন্দনায় শামিল হতে হয়তো দেখা যেত এরশাদকেও।
মোদির শুধু বন্দনা হলে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এতেই থেমে থাকবে না। মোদির মন পাওয়ার জন্য বিএনপি আর আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে, প্রয়োজনে দেশের স্বার্থকে বন্ধক রেখে। যেকোনোভাবে ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় সবকিছু দিয়ে দিয়েছে ভারতকে। বাকি আছে শুধু সরাসরি সড়কপথে ট্রানজিট। ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজনে তাও ভারতকে দিয়ে দিতে পারে সরকার। আবার ক্ষমতায় যেতে মরিয়া বিএনপি একই রকমভাবে মোদির মন খুশি করতে রাজি হয়ে যেতে পারে যেকোনো শর্তে। মোদি সরকারের এই সুযোগ নিতে পিছপা হওয়ার কথা নয়! ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ দমন, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং এসব রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট খুব লোভনীয় হওয়ার কথা মোদির কাছে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কি এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে দেশের স্বার্থের কথা ভাববে, নাকি নিজেদের ক্ষমতায়নের কথা?

২.

বিএনপি নেত্রী বলেছেন, বিজেপির বিজয়ে নয়, তারা আসলে খুশি হয়েছেন কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণে৷ কংগ্রেস সরকারের সক্রিয় সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সম্ভব হয়েছে, কংগ্রেসের মতোই পরাজয় বরণ করার কথা যে দলের, সেই আওয়ামী লীগ একতরফা ও অদ্ভুত এক নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় এসেছে৷ কংগ্রেস সরকারের একজন আমলা বাংলাদেশে এসে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকানোর জন্য এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ‘পরামর্শ’ দিয়েছিলেন৷ সেই কংগ্রেস নিজের দেশের মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ধরাশায়ী হয়ে বিদায় নিয়েছে৷ বিএনপি তাই খুশি হতে পারে। কিন্তু মোদি যেভাবে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিতাড়িত করার হুমকি দিয়েছেন, তাতে খুব একটা বিচলিত কেন হয়নি বিএনপি?
মোদি মুসলমান আর বাংলাদেিশবিদ্বেষী—এ ধরনের প্রচারণা আছে, বহু লোক তা বিশ্বাসও করেন। বাংলাদেিশ জাতীয়তাবাদ আর ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তা উভয়ে বিশ্বাসী বিএনপি কি সেটিও আমলে নিচ্ছে খুশি হওয়ার আগে? পানি আগ্রাসন, সীমান্তে কড়াকড়ি এবং অপদখলীয় জমি প্রত্যর্পণে কংগ্রেসের চেয়েও বেিশ কড়া নীতি গ্রহণ করার কথা বিজেপির। মোদির বিজেপি মোররািজ দেশাইয়ের জনতা দল বা অটল বিহাির বাজপেিয়র বিজেপি নয়। এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে জাতীয় স্বার্থই বিবেচনা করা হবে, তা মোদির বিজেপি পরিষ্কার করে বলেছে বহুবার। বিএনপি কি আদৌ বিচলিত তা নিয়ে?
মোদির বিজয় না হোক, কংগ্রেসের পরাজয়ে বিএনপির আনন্দ, তা না হয় বুঝতে পারা গেল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার মোদির বিজয়ে আসলে খুশি কি? কংগ্রেস আওয়ামী লীগের সহজাত বন্ধু৷ কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই স্বাধীনতাসংগ্রামের মালিকানা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দল দুটোর নেতাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ও কালোত্তীর্ণ সম্পর্ক। বিজেপির সঙ্গে এসব মিল নেই আওয়ামী লীগের; বিজেপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দলটির নেতাদের ঘনিষ্ঠতার কথাও শোনা যায় না৷ তবু আওয়ামী লীগ সরকার মোদিকে সর্বতোভাবে স্বাগত জানিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকেরা হয়তো বুঝতে পারেননি মোদির শপথ নিতে দেরি হতে পারে, নাহলে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হয়তো দেখতাম মোদির শপথ অনুষ্ঠানে৷ সেটি হলে আওয়ামী লীগ তো বটে, হয়তো বাংলাদেশের জন্যও ভালো হতো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি অবশ্য কিছুটা হলেও সামাল দিয়েছেন আমাদের িস্পকার৷ মোদির সঙ্গে আলোচনা শেষে তাঁর উচ্ছ্বাস আর কৌশল এই বার্তা দিয়েছে যে কংগ্রেসের মতো বিজেপির ক্ষেত্রেও একই ভারতনীতি অনুসরণ করবে বর্তমান সরকার। মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছেন, তিস্তা চুক্তি আর সীমান্ত চুক্তি মোদি ‘সক্রিয় বিবেচনার’ আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব অবশ্য বলেছেন, এগুলো তিনি ‘বিবেচনার’ আশ্বাস দিয়েছেন৷ অথচ মাত্র গতকাল তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্য সরকারগুলোর স্বার্থ নিশ্চিত করা তার সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন মোদি৷ মোদি কি মমতাকে চটিয়ে বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দেবেন? এটি ‘সক্রিয়ভাবে’ আদৌ কি বিবেচনা করবেন? মনে হয় না৷
িস্পকার শিরীন শারমিনের বক্তব্য আবারও একধরনের অসার আশাবাদ তৈির করেছে সম্ভবত৷ মোদির সঙ্গে বৈঠকে সীমান্ত অনুপ্রবেশকারী বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল৷ ভারতীয় সচিবের বক্তব্যে আমরা জেনেছি, বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন মোদি। শিরীন শারমিন কি তখন ‘অবৈধ বাংলাদেিশদের’ বিতাড়ন করা হবে বলে মোদির বক্তব্যে বাংলাদেশের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছিলেন? মনে হয় না। সেটি হলে তিনি সীমান্ত বিষয়ে আলাপ হয়েছে, এটি তাঁর বক্তব্যে চেপে যেতেন না। তাঁর এ ধরনের মনোভাবে ইঙ্গিত রয়েছে যে সীমান্তে ভারতীয় কড়াকড়ি নিয়ে কংগ্রেস আমলের মতো বিজেপি আমলেও যতটা পারা যায় ‘পিঠ পেতে কিল হজম’ করার নীতি গ্রহণ করবে আওয়ামী লীগ সরকার।

৩.
এসব উৎকণ্ঠা দেশের অসুস্থ রাজনীতির কারণে৷ ২০০৬ সালে বিএনপি এবং ২০১৩-১৪ সালে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, যেনতেন নির্বাচন করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর দল দুটো৷ ২০০৬ সালে দেিশ-বিদেিশ বিভিন্ন মহলের সোচ্চার প্রতিবাদের কারণে বিএনপি তা করতে পারেনি। ২০১৩-১৪ সালে সেই সোচ্চার ভূমিকা অনেকেই পালন না করার জন্য এবং ভারত সরকারের অন্ধ সমর্থনের জোরে আওয়ামী লীগ তা করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ কি তার প্রতিদান দেবে না, বিশেষ করে ভারতকে?
শেখ হাসিনার প্রথম সরকারসহ নব্বই-পরবর্তী তিনটি সরকারের আমলে ভারতকে একতরফাভাবে বহুকিছু দিয়ে দেওয়া হয়নি৷ শেখ হাসিনার দ্বিতীয় আমলে তা হয়েছে। সেটি যে ক্ষমতায় থাকার জন্য কংগ্রেস সরকারের অন্ধ সমর্থনের আশায়, তা বহু মানুষ বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করার কারণও আছে। কংগ্রেসের বদলে বিজেপি এসে এ রকম সমর্থন দিলে বর্তমান সরকার ভারত তোষণনীতি অব্যাহত রাখবে, এটি তাই স্বাভাবিক। ক্ষমতায় যাওয়ার তথা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন পেলে বিএনপিও দেশের স্বার্থ নিয়ে খুব ভাববে বলে মনে হয় না।
অথচ দেশের প্রধান দুটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সবার আগে প্রয়োজন মোদি সরকারের বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করা। ডন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন, মোদি বহুজাতিক করপোরেশনের পাহাড়, জঙ্গল আর নদী নিয়ে ব্যবসা নিরাপদ করার জন্য এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা নিজের দেশের গিরব ও প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে নির্মম হতে পিছপা হবেন না। তাঁর মতে, মোদির উন্নয়ন মডেল উচ্চমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের জন্য৷
মোদির উন্নয়ন মডেলে প্রতিরোধ এলে, উন্নয়ন ব্যাহত হলে তিনি ধর্মান্ধতার রাজনীতির খেলা খেলতে পারেন। স্ক্রোল-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের রাজনীতি-বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফি জ্যাফরেলো বলেছেন, মোদির প্ল্যান ‘এ’ হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এটি ব্যর্থ হলে তাঁর প্ল্যান ‘বি’ হবে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উসকে দেওয়া৷ গার্ডিয়ান পত্রিকায় পঙ্কজ মিশ্র এসব দিকের ইঙ্গিত করে মোদির ক্ষমতারোহণকে একটি নতুন বিপৎসংকুল অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মোদি যদি সত্যিই হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করেন, তাহলে সীমান্ত দিয়ে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের পুশ-ইন করার চেষ্টা হবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নতুন করে আক্রান্ত হবে৷ মোদি এসব না করলেও ভারতের কাছ থেকে পানি, মাটি আর সীমান্ত নিরাপত্তার বহু অধিকার রয়ে যাবে অনাদায়ি।
এসব নিয়ে হয়তো ভাবছেন আমাদের রাজনীতিবিদেরা৷ কিন্তু আমার সন্দেহ, তার চেয়ে বহুগুণে তাঁরা ভাবছেন মোদির সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার কথা।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভাষাবিদ জাহাঙ্গীর তারেক by রফিকুল ইসলাম

বিশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সৃজনশীল ও মননশীল প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছিল, যাঁদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রয়াত। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মুহম্মদ আব্দুল হাই, সৈয়দ আলী আহসান, মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ প্রমুখ। ষাটের দশকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেক সৃজনশীল ও মননশীল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব ছিলেন; যাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কবি ও কথাসাহিত্যিক আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ এবং বহুভাষাবিদ, বিশিষ্ট অনুবাদক, তুলনামূলক সাহিত্যবিশারদ জাহাঙ্গীর তারেক। আমাদের এই আলোচনা বহু গুণে গুণান্বিত জাহাঙ্গীর তারেককে নিয়ে। তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এম এ পাস করার পর বছর পাঁচেক বিভিন্ন বেসরকারি ও সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।

>>সপরিবারে জাহাঙ্গীর তারেক
১৯৬৯ সালে জাহাঙ্গীর তারেক ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে প্যারিস গমন করেন। বস্তুতপক্ষে প্যারিসে জাহাঙ্গীর তারেকের নতুন জীবনের সূচনা হয়, যেখানে তিনি ফরাসিসহ একাধিক বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করেন। ফ্রান্সে তিনি প্রথমে ফরাসি ও ইংরেজি সাহিত্যে দুটি এমএ ডিগ্রি এবং তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ফরাসি দেশে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের পর ১৯৭৪ সালে দেশে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং কিছুদিন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি ফরাসি ভাষার সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে যোগদান করেন এবং একসময় এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিযুক্ত হন। ১৮ বছর অধ্যাপনার পর ২০০৯ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ২০১০ সালের ২৯ জুন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার আগে পর্যন্ত তিনি ওই ইনস্টিটিউটে ফরাসি ভাষার সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ছিলেন।
জাহাঙ্গীর তারেক বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, আরবি, ফার্সি ভাষা জানতেন। বাংলা থেকে প্রধানত বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষা এবং এসব ভাষা থেকে বাংলায় তিনি নিয়মিত অনুবাদ করতেন বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম ও দলিলপত্র। ফরাসি, স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান ভাষায় তিনি নজরুলের নির্বাচিত কবিতা সংকলন অনুবাদ করেন, যা নজরুল ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত হয়। বাংলায় অনুবাদ করেছেন গুস্তাভ ফ্লবেরের বিখ্যাত উপন্যাস মাদাম বোভারি।
১৯৯২ সালে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ থেকে প্রকাশিত ৫০ জন ফরাসি ও বাঙালি কবির রচনার অনুবাদগ্রন্থে জাহাঙ্গীর তারেকের অনেকগুলো অনুবাদ রয়েছে। এ বইটির বাংলাদেশ অংশের অনবদ্য ভূমিকাটিও তাঁর রচনা। তিনি বাংলা একাডেমির বাংলা-ইংরেজি ও ইংরেজি-বাংলা অভিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
জাহাঙ্গীর তারেক অধ্যাপনা, অনুবাদকর্ম এবং বিভিন্ন ভাষা চর্চায় তাঁর জীবন অতিবাহিত করে গেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ ও নীরব জ্ঞান সাধনায় নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর মতো জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে বিরল।
আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে আমি বহু গুণী শিক্ষার্থীর সংস্পর্শে এসেছি, যাঁদের মধ্যে অনেকেই সৃজনশীল প্রতিভার অধিকারী। তুলনামূলকভাবে মননশীল প্রতিভার অধিকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। যার একটা কারণ হয়তো এই যে মননশীল কাজে অধিক পরিশ্রম করতে হয়। যে কারণে বাংলা বিভাগ থেকে মননশীল অপেক্ষা সৃজনশীল প্রতিভা বেরিয়েছে বেশি। যে কজন মননশীল প্রতিভার অধিকারী বাংলা বিভাগ থেকে বেরিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে জাহাঙ্গীর তারেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এর কারণ হয়তো এই যে তিনি ইংল্যান্ড না আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ না করে ফরাসি দেশে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। ফরাসি দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার একটি বিষয় ছিল বহুভাষাজ্ঞান এবং এমন বিষয় নিয়ে বিদ্যা চর্চা করা। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র পদাঙ্ক অনুসরণ করে জাহাঙ্গীর তারেক বাংলা ও ইংরেজি ছাড়া ফরাসি, জার্মানিসহ আরও কয়েকটি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং সেই সব ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু অনুবাদ সম্পাদন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাগার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে ফরাসি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় একটি ক্ল্যাসিক গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ। অপরদিকে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ ফরাসি, স্প্যানিশ ও ইতালিয়ান ভাষায় প্রকাশ করেন, যা এর আগে আর কারও দ্বারা সম্ভবপর হয়নি। তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রি ছিল তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে।
সবচেয়ে যেটি বিস্ময়কর যে জাহাঙ্গীর তারেকের মধ্যে তাঁর এই বিদ্যা, বুদ্ধি ও মনীষা নিয়ে কোনো রকম অহমিকা বা গর্ব ছিল না। তিনি যেহেতু স্বল্প ও মৃদুভাষী ছিলেন এবং তাঁর অধিকাংশ সময় কাটত দেশি–বিদেশি ভাষা ও সাহিত্যচর্চায়, সে কারণে তাঁর যোগ্য সম্মান বা প্রচার তিনি এ দেশে পাননি। জাহাঙ্গীর তারেক আমাদের দেশের একজন ব্যতিক্রমধর্মী পণ্ডিত ও মনীষী ছিলেন।
ড. রফিকুল ইসলাম: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইউল্যাব, ঢাকা৷

প্রশ্নপত্র ফাঁস- জয় ফাঁসুরেরা! by ফারুক ওয়াসিফ

পরীক্ষার মধ্যে অগ্নিপরীক্ষাই চরম৷ প্রাচীনকালে সাধুরা আগুনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতেন৷ যিনি জাদুবলে অক্ষত থাকতেন, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে কারও আর সন্দেহ থাকত না। কিন্তু রামায়ণের সীতা বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিতে দিতে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে মাটিকে মা ডেকে তার মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা আর বিসিএস পরীক্ষা তেমনই অগ্নিপরীক্ষাসম ঘটনা। সেই প্রথম শ্রেণিতে যে একবার পরীক্ষায় বসতে হলো, তার পর থেকে ‘যতই পড়িবে, ততই ভুগিবে’ অবস্থা। সীতার মতো আধুনিক পরীক্ষার্থীদেরও তো ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে পারে। উপর্যুপরি প্রশ্নপত্র ফাঁস তাদের মুক্তির পথ খুলে দিয়েছে। যাঁরা এই মহান কাজে নিয়োজিত, তাঁরা অবশ্যই পুরস্কারের যোগ্য কাজ করছেন।

ফাঁস শব্দটির আরেকটা মানে ফাঁসি৷ যাঁরা ফাঁসিতে মৃত্যু নিশ্চিত করেন, তাঁদের বলা হয় ফাঁসুরে৷ ফাঁসিতে রক্ত ঝরে না, অস্ত্র লাগে না। তাই ফাঁসির মাধ্যমে হত্যা বিনা রক্তপাতে যুদ্ধজয়ের মতোই মানবিক ও অহিংস পদ্ধতি। এ জন্য জেলখানায় ফাঁসুরেদের বেতন দিয়ে রাখা হয়। যাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের খেলায় শিক্ষার ফাঁসি দিচ্ছেন, তাঁদেরও ফাঁসুরে বলতে পারি। তাঁরাও বিনা রক্তপাতে শিক্ষাকে ধ্বংস করছেন এবং শিক্ষার্থীদের মাথা থেকে শিক্ষার ভাইরাস তাড়াচ্ছেন। পেশা হিসেবে এঁদের স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন৷

যুক্তরাজ্যের সংগীত দল পিংক ফ্লয়েডের ‘অ্যানাদার ব্রিক ইন দি ওয়াল’ (১৯৭৯) গানটি আশির দশকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পায়৷ সত্তর দশকে ভারতের নকশাল আন্দোলনের তরুণেরা বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের জন্য বইপুস্তক, সার্টিফিকেট ইত্যাদি পোড়াত৷ পিংক ফ্লয়েডের গানটি যেন এই আন্দোলনেরই আমেরিকান প্রতিধ্বনি। গানটির একটি কথা হলো, ‘উই ডোন্ট নিড নো এডুকেশন’ অর্থাত্ আমাদের কোনো শিক্ষার প্রয়োজন নেই। এসবের মাধ্যমে ভীতিকর শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষকদের কঠোর অনুশাসন এবং অর্থক্ষমতাকামী শিক্ষাকে তাঁরা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন৷ এ জন্য তাঁদের এত কঠিন রাস্তা নিতে হয়েছিল, কারণ তাঁদের দেশে আমাদের মতো দক্ষ ফাঁসুরে ছিল না। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গেরিলা কৌশলের চেয়ে আর কোনো সহজ পথের কথা কেউ জানে না।

এটা চলছে এবং চলবে বলেই মনে হচ্ছে। ধীরে ধীরে ফাঁসের অবদান গণতান্ত্রিকও হচ্ছে। ফাঁসের ফজিলত কেবল শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, শিক্ষকদের জন্যও নাজেল হচ্ছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজশাহীতে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। মেসে মেসে এবং ফটোকপির দোকানে তা দেদারসে বিক্রিও হয়েছে। সবই ঠিকঠাক চললেও বাদ সাধছেন একদল পুরোনোপন্থী শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক৷ তাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। শুক্রবারই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল অবস্থান ধর্মঘট করে প্রতিবাদ করেছেন৷ কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী অটল মনোভাব নিয়ে বলছেন, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে না, যা দেখা যাচ্ছে সেটা সাজেশন৷ এ রকম অব্যর্থ সাজেশন যাঁরা দেন, তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতা না থেকে পারে না। এমন বিস্ময়কর প্রতিভাদের রক্ষা করা অবশ্যই বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব বটে!

ফাঁসুরেরা তাই বিপ্লবী দায়িত্ব পালনই করছেন। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে অনেক ছেলেমেয়েই কারাগারের সঙ্গে তুলনা করে। শিক্ষা তাদের শ্রম, সময় ও বয়স কেড়ে নেয়। প্রকৃতিতে কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। আর কোনো প্রাণীকে স্কুল-কলেজে যেতে হয় না, পরীক্ষায় বসতে হয় না, বিদ্যার বোঝা বইতে হয় না। এ জন্যই তারা স্বাধীন৷ স্বর্গেও কোনো পরীক্ষার বালাই নেই। মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সামাজিক স্বপ্ন হলো সাম্যবাদ। সেখানেও ক্যারিয়ার তৈরির জন্য পরীক্ষা দিতে হবে না; এমনটাই জানি৷ তা ছাড়া দিবারাত্র কঠিন পড়ালেখা করে পরীক্ষা দিতে জাতির যে মূল্যবান ক্যালরি খরচ হয়, কোচিং সেন্টারের সাজেশন ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কৌশলে সেটা বাঁচতে পারে। কে কত প্রশ্ন ফাঁস করতে পারে, তার প্রতিযোগিতা এ দেশে কোচিং সেন্টারের বিকাশের স্বার্থেই জরুরি৷ এতসব কারণে শিক্ষাকে ফাঁসি দেওয়ার রক্তপাতহীন এই পদ্ধতিকে স্থায়ী করা দরকার। নতুন জাতি গঠনে এর অবদান অস্বীকার করা হবে আহাম্মকি। বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারকে ফ্যাসিবাদী সরকার বলে থাকে৷ আমার মনে হয়, তারা ভুল করছে৷ এই সরকারের আমলে প্রায় সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যেভাবে ফাঁস হয়েছে, তাতে একে ফ্যাসিবাদী না বলে ফাঁসিবাদী বলা যেতে পারে৷

পরাধীনতা আর শিক্ষা সমার্থক৷ ইংরেজের শাসনে পরাধীনতা আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় একই সময়ে চালু হয়৷ দেশ স্বাধীন হলেও আজও সেই পদ্ধতিই চলছে। সুতরাং স্বাধীন দেশের স্বাধীন তারুণ্যের কাজ হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের পথে পরাধীনতার শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘শিক্ষা’ দেওয়া৷ আমাদের তরুণদের পড়ালেখা করে দেশের ভার নেওয়ার প্রয়োজন নেই৷ সেই দায়িত্ব গডফাদারদের আর বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিলেই চলে। দায়িত্ব নেওয়া, বড় পদে চাকরি করায় অনেক ঝক্কি৷ তাঁদের এতসব ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্তি দিতেই লাখ লাখ বিদেশি বাংলাদেশের বড় বড় চাকরি ও ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছেন৷ অন্যদিকে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বেকারদের দলে নাম লেখাচ্ছেন। স্নাতকদেরও ৪৭ শতাংশই বেকার৷ ওদিকে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সস্তা মজুরের অভাবে সমস্যা হচ্ছে। স্নাতক ও উচ্চশিক্ষিতদের দিয়ে এই অভাব পূরণ হওয়ার নয়৷ তা ছাড়া বাংলাদেশে শিক্ষিতদের চেয়ে কম শিক্ষিত পোশাকশ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনেক বেশি৷ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফজিলত হলো: এতে শিক্ষার গুরুত্ব কমবে, বেকারত্ব বাড়বে৷ ফলে দামি চাকরিগুলো বিদেশিদের দিয়ে বেকারদের শ্রমবাজারে পাঠাতে পারব৷ জোগান বাড়লে দাম কমে৷ শ্রম আরও সস্তা হলে বিদেশিরা আরও শ্রম কিনতে আসবে এবং সস্তা শ্রমের আড়ত হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম অটুট থাকবে৷ ফাঁসুরেরা আমাদের এই অমিতসম্ভাবনার সামনেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এত যুক্তির পর ফাঁসুরেরা যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী প্রতিভাবান সংগ্রামী, তাতে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয়৷ বিশ্বে এ ধরনের ফাঁসুরেদের বিপুল কদর৷ কম্পিউটারের গোপন তথ্য যাঁরা ফাঁস করেন, তাঁদের হ্যাকার বলে৷ অনেক দেশেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাঁদের মোটা বেতন দিয়ে রাখে৷ যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সিআইএর গোপন দলিল ফাঁস করে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ও এডওয়ার্ড স্নোডেন বিশ্বনন্দিত হয়েছেন৷ অনেকেই এঁদের পুলিত্জার অথবা নোবেল পুরস্কার দেওয়া দরকার বলে মনে করেন৷ আমাদের ঘরে ঘরে যে এ রকম অ্যাসাঞ্জ ও স্নোডেন তৈরি হয়ে আছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়া তা কি জানতে পারতাম? প্রতিভা আগুনের মতো, চাপা দিয়ে রাখা যায় না৷ আমাদের মিনি অ্যাসাঞ্জরা শিক্ষা বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা আর শিক্ষা দপ্তরের জারিজুরি যেভাবে ফাঁস করেছেন, তা অতুলনীয়৷ সাংবাদিকেরা আজকাল গোপন তথ্য ও দলিল ফাঁস করতে যেখানে ব্যর্থ, সেখানে ফাঁসুরেরা নিজেদের পেশায় দুর্ধর্ষ রকম সফল৷ ইদানীং তো বিভিন্ন নেতানেত্রীর ফোনালাপ থেকে শুরু করে পেশাদার খুনিদের সলাপরামর্শ ফাঁস হচ্ছে৷ প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে ক্ষমতাবানদের গোপন কথা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাঁড়ির খবর সব ফাঁস হচ্ছে৷ জাতি হিসেবে আমরা যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফাঁসবাজির প্রতিভা দেখাচ্ছি; তা নিশ্চয়ই আশার কথা৷ শুনেছি ফাঁসির দাবিতে বড় আন্দোলন করা এক নেতার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল প্রশ্নপত্র ফাঁস করা দিয়ে৷ আজ যাঁরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের বীরত্ব দেখাচ্ছেন, তাঁরা আসলে দেশবাসীকে আরও বড় আকারে আলোড়িত করার প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছেন৷ মর্নিং শোজ দ্য ডে৷

বাঙালি প্রতিভা ও সম্পদের কদর করতে জানে না৷ উলুখাগড়ার মহারাজকে একবার তাঁর বন্ধু জরির নাগরা জুতো উপহার দিলেন৷ বেচারা হঠাত্ মহারাজা; তাই বুঝতে পারলেন না এই জরিবাঁধানো নৌকার মতো বাঁকা জিনিসটা কোথায় পরতে হয়৷ দেখতে তো রাজমুকুটে যে জরি-মুক্তাখচিত জিনিসটা থাকে, তার মতোই দেখায়৷ অনেক চিন্তাভাবনার পর এক প্রভাতে নাগড়াই জুতা দুটির একটিকে পাগড়ির মাথার সঙ্গে লাগিয়ে তিনি দরবারে দেখা দিলেন৷ ফাঁসুরেরা আমাদের সম্পদ, প্রতিভার শিরোমণি৷ সরকার যে তাঁদের দমন না করে বরং মাথায় তুলে দেশবাসীকে ‘শিক্ষা’ দিচ্ছে; এ জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানাতেই হয়৷ জয় ফাঁসুরে!

প্রশ্নপত্র ফাঁস- গ্রন্থনা: ফাহমিদা আলম

প্রশ্নটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ?
এবার আর কেউ আটকাতে পারবে না
লেখাপড়াটা এইবার তুমি ভেস্তে দিতে পারো
মাকে বলে দাও বই তুমি ধরছ না।
প্রশ্নটা আমি পেয়ে গেছি বেলা সত্যি
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা ব্যস
স্টার্টিংয়েই আমি ফাটিয়ে দেব, একশত ভাগ কনফার্ম
চুপ করে কেন বেলা কিছু বলছ না?
এটা কি ২ ৪৪ ১১৩৯?
বেলা বোস তুমি উঠেছ কি টেবিল ছেড়ে?
১০-১২ সেট ভুয়া প্রশ্ন পেরিয়ে আসলটা পেয়েছি
দেব না কিছুতেই আর হারাতে
হ্যালো ২ ৪৪ ১১৩৯
ওঠো না বেলা টেবিল ছেড়ে একটিবার
ব্যালেন্স নিচ্ছে কেটে এই হাড়কিপটে মুঠোফোনে
জরুরি খুব জরুরি দরকার।
এ প্লাস এবার পেয়ে যাব বেলা সত্যি
এত দিন ধরে এত অপেক্ষা
রাস্তার কত ফটোকপির দোকানে
প্রশ্নের খোঁজে ঘুরেছি দুজনে
রুদ্ধশ্বাস কত প্রতীক্ষা
আর কিছুদিন তারপর বেলা ফলাফল
কলেজের ওই দেয়ালের কালো বোর্ড
দুনম্বরির জঞ্জালে ভরা প্রশ্ন ফাঁসের শহরে
তোমার আমার নতুন কারবার
চুপ করে কেন একি বেলা তুমি পড়ছ?
প্রশ্নটা আমি পেয়ে গেছি সত্যি
লেখাপড়া আর বই ঘাঁটাঘাঁটির সময় গেছে পেরিয়ে
হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?
এটা কি ২ ৪৪ ১১৩৯...

 অঞ্জন দত্তের ‘বেলা বোস’ গানের কথা অবলম্বনে মাজহারুল আনাম

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, সুপারিশ পর্যালোচনার এখনই সময়
বাংলার মানুষ উপকারের কদর বোঝে না। ভেজাল তরমুজেরও দাম আছে। কিন্তু যারা মানুষের উপকার করে, সমাজে তাদের কোনো দামই নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটাই ধরুন। দেশের আপামর শিক্ষার্থীদের উপকার করার জন্যই কিন্তু ফাঁস করা হয়েছিল এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন। কী মহৎ একটা উদ্যোগ! উন্নত অনেক দেশেই কিন্তু ওপেন বুক পরীক্ষা-পদ্ধতির প্রচলন আছে। আগে থেকে প্রশ্ন বলে দেওয়া—অনেকটা সে রকমই। এমনিতে শিক্ষার্থীদের অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর পড়তে হয়। কিন্তু সব প্রশ্ন তো পরীক্ষায় আসে না। যেটা আসবে না, সেটা পড়ে লাভ কী? সময় নষ্ট। তা ছাড়া পাঠ্যবইয়ে সময়ের মর্যাদা সম্পর্কে বড় বড় কথা লেখা আছে। এ জন্য যে প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় আসবে, সেগুলো আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে ফাঁস করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর রপ্ত করে ছিনিয়ে এনেছে কাঙ্ক্ষিত ফরমালিনমুক্ত ফল। সময়ও বাঁচল, পরিশ্রমও হলো কম।  কিন্তু মানুষ অন্যের সুখ সহ্য করতে পারে না। শিক্ষার্থীদের এই সুখ মানতে পারল না কেউ। এখন সারা দেশে প্রশ্ন ফাঁসের বিপক্ষে গড়ে উঠেছে জনমত। প্রশ্ন ফাঁস কীভাবে রোধ করা যায়, তা নিয়ে চলছে নানা পরিকল্পনা, সুপারিশ, যার কোনো দরকারই ছিল না। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু প্রশ্ন ফাঁসের বিপক্ষে। সুতরাং, গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখার স্বার্থে প্রশ্ন ফাঁস রোধে প্রস্তাব না দিলেই নয়। অনেক প্রস্তাব নিয়েই চিন্তা করা হচ্ছে, কিন্তু অত্যন্ত সহজ একটা বিষয় কেউ ভাবছে না, তা হলো প্রশ্ন ছাড়া পরীক্ষাব্যবস্থা। পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নই থাকবে না। শিক্ষার্থীরা বই পড়ে কী শিখল, তা নিজেরাই খাতায় লিখবে। প্রশ্ন না থাকলে ফাঁস হওয়ার কোনো আশঙ্কাও থাকবে না। আর পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে, এ নিয়ে থাকবে না কোনো ভয়। শিক্ষার্থীরা মহা উৎসাহে পরীক্ষা দেবে। আশা করি, কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটি নিয়ে পর্যালোচনা করবে।

মোদি সরকার: বন্ধু কার?

নরেন্দ্র মোদি: ভারতের প্রধানমন্ত্রী
এই পৃথিবী বিজয়ীর বন্দনা করে, পরাজিতের বিচার করে। হিটলার রাশিয়া আক্রমণ না করলে বা সেখানে না হেরে গেলে, তিনিই হতেন বিশ্বজয়ী। এটিলা দ্য হান, আলেকজান্ডার কিংবা জুলিয়াস সিজারের মতো তার জন্যও হতো বীরবন্দনা৷ ইংরেজির বদলে আমরা হয়তো শিখতাম জার্মান ভাষা। থ্যাঙ্ক ইউ না বলে বলতাম ডাঙ্কেশুন্! এখনকার বিশ্বে বিজয়ী শক্তি আমেরিকা। না হলে জাপানে পারমাণবিক বোমা মারার জন্য কিংবা লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ইরাক আর আফগানিস্তানে গণহত্যার জন্য তাদের রাষ্ট্রনায়কদের বিচার হতো আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে৷ বিজয়ী বলে তারাই বরং সারা বিশ্বে সবক দিয়ে বেড়ায় মানবাধিকারের। অন্য দেশ লুট করে, সংখ্যালঘুদের নিপাত করে আর নিজের দেশের গরিব মানুষকে জোর করে যুদ্ধে পাঠিয়ে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ এখন বাদবািক বিশ্বকে শিক্ষা দেয় রাষ্ট্রীয় নীতিশাস্ত্রের। এমন এক বিশ্বে অভূতপূর্বভাবে বিজয়ী নরেন্দ্র মোদির বন্দনা বিস্ময়কর নয়। স্বাধীনতার পর ৬৬ বছরের মধ্যে ৩২ বছর সরাসরিভাবে এবং আরও ১০ বছর মনমোহনের মাধ্যমে ভারত শাসন করা নেহরু পরিবার ও কংগ্রেসকে তিনি প্রায় সর্বস্বান্ত করে দিয়েছেন ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনে। গুজরাটের কসাই হিসেবে পাশ্চাতে্য একসময় অবাঞ্ছিত মোদিবন্দনায় তাই শামিল হয়েছে উন্নত-অনুন্নত সব বিশ্ব। মোদি সাম্প্রদায়িক, মোদি নারীবিমুখ, মোদি অভিবাসীবিরোধী, মোদি নির্মম। সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে মোদির বিজয়। মোদি এককভাবে সারা ভারতে উড়িয়েছেন বিজেপির বিজয় পতাকা। জয়ের পরও চলছে তাঁর বিজয়রথ। প্রথমবারের মতো তাঁর শপথে তিনি শামিল করিয়েছেন এই অঞ্চলের সরকারপ্রধানদের৷ প্রথম সিদ্ধান্তেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভারতরত্ন উপাধি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে আবারও জয় করে নিয়েছেন ভারতীয় অহং৷ মোদির জয়ে আমাদেরও খুশি না হয়ে উপায় নেই।
মোদির জয়ে খুশি হয়েছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ। গোপনে গোপনে খুশি হওয়ার কথা জামায়াতে ইসলামীরও। ক্যু করে গড়ে তোলা জাতীয় পার্টি এখন নিজেই তার দলের ভেতর আওয়ামী ‘ক্যু’-তে দিশেহারা। তা না হলে মোদিবন্দনায় শামিল হতে হয়তো দেখা যেত এরশাদকেও। মোদির শুধু বন্দনা হলে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এতেই থেমে থাকবে না। মোদির মন পাওয়ার জন্য বিএনপি আর আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবে, প্রয়োজনে দেশের স্বার্থকে বন্ধক রেখে। যেকোনোভাবে ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় সবকিছু দিয়ে দিয়েছে ভারতকে। বাকি আছে শুধু সরাসরি সড়কপথে ট্রানজিট। ক্ষমতায় থাকার প্রয়োজনে তাও ভারতকে দিয়ে দিতে পারে সরকার। আবার ক্ষমতায় যেতে মরিয়া বিএনপি একই রকমভাবে মোদির মন খুশি করতে রাজি হয়ে যেতে পারে যেকোনো শর্তে। মোদি সরকারের এই সুযোগ নিতে পিছপা হওয়ার কথা নয়! ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ দমন, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং এসব রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ আরও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট খুব লোভনীয় হওয়ার কথা মোদির কাছে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কি এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে দেশের স্বার্থের কথা ভাববে, নাকি নিজেদের ক্ষমতায়নের কথা?
২. বিএনপি নেত্রী বলেছেন, বিজেপির বিজয়ে নয়, তারা আসলে খুশি হয়েছেন কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণে৷ কংগ্রেস সরকারের সক্রিয় সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সম্ভব হয়েছে, কংগ্রেসের মতোই পরাজয় বরণ করার কথা যে দলের, সেই আওয়ামী লীগ একতরফা ও অদ্ভুত এক নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় এসেছে৷ কংগ্রেস সরকারের একজন আমলা বাংলাদেশে এসে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকানোর জন্য এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ‘পরামর্শ’ দিয়েছিলেন৷ সেই কংগ্রেস নিজের দেশের মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে ধরাশায়ী হয়ে বিদায় নিয়েছে৷ বিএনপি তাই খুশি হতে পারে। কিন্তু মোদি যেভাবে ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বিতাড়িত করার হুমকি দিয়েছেন, তাতে খুব একটা বিচলিত কেন হয়নি বিএনপি? মোদি মুসলমান আর বাংলাদেিশবিদ্বেষী—এ ধরনের প্রচারণা আছে, বহু লোক তা বিশ্বাসও করেন। বাংলাদেিশ জাতীয়তাবাদ আর ধর্মভিত্তিক জাতিসত্তা উভয়ে বিশ্বাসী বিএনপি কি সেটিও আমলে নিচ্ছে খুশি হওয়ার আগে? পানি আগ্রাসন, সীমান্তে কড়াকড়ি এবং অপদখলীয় জমি প্রত্যর্পণে কংগ্রেসের চেয়েও বেিশ কড়া নীতি গ্রহণ করার কথা বিজেপির। মোদির বিজেপি মোররািজ দেশাইয়ের জনতা দল বা অটল বিহাির বাজপেিয়র বিজেপি নয়। এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে জাতীয় স্বার্থই বিবেচনা করা হবে, তা মোদির বিজেপি পরিষ্কার করে বলেছে বহুবার। বিএনপি কি আদৌ বিচলিত তা নিয়ে? মোদির বিজয় না হোক, কংগ্রেসের পরাজয়ে বিএনপির আনন্দ, তা না হয় বুঝতে পারা গেল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার মোদির বিজয়ে আসলে খুশি কি?
কংগ্রেস আওয়ামী লীগের সহজাত বন্ধু৷ কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগ উভয় দলই স্বাধীনতাসংগ্রামের মালিকানা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতিতে সিদ্ধহস্ত। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দল দুটোর নেতাদের মধ্যে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক ও কালোত্তীর্ণ সম্পর্ক। বিজেপির সঙ্গে এসব মিল নেই আওয়ামী লীগের; বিজেপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দলটির নেতাদের ঘনিষ্ঠতার কথাও শোনা যায় না৷ তবু আওয়ামী লীগ সরকার মোদিকে সর্বতোভাবে স্বাগত জানিয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকেরা হয়তো বুঝতে পারেননি মোদির শপথ নিতে দেরি হতে পারে, নাহলে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হয়তো দেখতাম মোদির শপথ অনুষ্ঠানে৷ সেটি হলে আওয়ামী লীগ তো বটে, হয়তো বাংলাদেশের জন্যও ভালো হতো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি অবশ্য কিছুটা হলেও সামাল দিয়েছেন আমাদের িস্পকার৷ মোদির সঙ্গে আলোচনা শেষে তাঁর উচ্ছ্বাস আর কৌশল এই বার্তা দিয়েছে যে কংগ্রেসের মতো বিজেপির ক্ষেত্রেও একই ভারতনীতি অনুসরণ করবে বর্তমান সরকার। মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছেন, তিস্তা চুক্তি আর সীমান্ত চুক্তি মোদি ‘সক্রিয় বিবেচনার’ আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব অবশ্য বলেছেন, এগুলো তিনি ‘বিবেচনার’ আশ্বাস দিয়েছেন৷ অথচ মাত্র গতকাল তাঁর দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্য সরকারগুলোর স্বার্থ নিশ্চিত করা তার সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন মোদি৷ মোদি কি মমতাকে চটিয়ে বাংলাদেশকে তিস্তার পানি দেবেন? এটি ‘সক্রিয়ভাবে’ আদৌ কি বিবেচনা করবেন? মনে হয় না৷ িস্পকার শিরীন শারমিনের বক্তব্য আবারও একধরনের অসার আশাবাদ তৈির করেছে সম্ভবত৷ মোদির সঙ্গে বৈঠকে সীমান্ত অনুপ্রবেশকারী বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল৷ ভারতীয় সচিবের বক্তব্যে আমরা জেনেছি, বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন মোদি। শিরীন শারমিন কি তখন ‘অবৈধ বাংলাদেিশদের’ বিতাড়ন করা হবে বলে মোদির বক্তব্যে বাংলাদেশের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছিলেন? মনে হয় না। সেটি হলে তিনি সীমান্ত বিষয়ে আলাপ হয়েছে, এটি তাঁর বক্তব্যে চেপে যেতেন না। তাঁর এ ধরনের মনোভাবে ইঙ্গিত রয়েছে যে সীমান্তে ভারতীয় কড়াকড়ি নিয়ে কংগ্রেস আমলের মতো বিজেপি আমলেও যতটা পারা যায় ‘পিঠ পেতে কিল হজম’ করার নীতি গ্রহণ করবে আওয়ামী লীগ সরকার।
৩. এসব উৎকণ্ঠা দেশের অসুস্থ রাজনীতির কারণে৷ ২০০৬ সালে বিএনপি এবং ২০১৩-১৪ সালে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, যেনতেন নির্বাচন করে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে বদ্ধপরিকর দল দুটো৷ ২০০৬ সালে দেিশ-বিদেিশ বিভিন্ন মহলের সোচ্চার প্রতিবাদের কারণে বিএনপি তা করতে পারেনি। ২০১৩-১৪ সালে সেই সোচ্চার ভূমিকা অনেকেই পালন না করার জন্য এবং ভারত সরকারের অন্ধ সমর্থনের জোরে আওয়ামী লীগ তা করতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ কি তার প্রতিদান দেবে না, বিশেষ করে ভারতকে? শেখ হাসিনার প্রথম সরকারসহ নব্বই-পরবর্তী তিনটি সরকারের আমলে ভারতকে একতরফাভাবে বহুকিছু দিয়ে দেওয়া হয়নি৷ শেখ হাসিনার দ্বিতীয় আমলে তা হয়েছে। সেটি যে ক্ষমতায় থাকার জন্য কংগ্রেস সরকারের অন্ধ সমর্থনের আশায়, তা বহু মানুষ বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করার কারণও আছে। কংগ্রেসের বদলে বিজেপি এসে এ রকম সমর্থন দিলে বর্তমান সরকার ভারত তোষণনীতি অব্যাহত রাখবে, এটি তাই স্বাভাবিক। ক্ষমতায় যাওয়ার তথা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন পেলে বিএনপিও দেশের স্বার্থ নিয়ে খুব ভাববে বলে মনে হয় না। অথচ দেশের প্রধান দুটি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সবার আগে প্রয়োজন মোদি সরকারের বৈশিষ্ট্য বোঝার চেষ্টা করা। ডন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অরুন্ধতী রায় লিখেছেন,
মোদি বহুজাতিক করপোরেশনের পাহাড়, জঙ্গল আর নদী নিয়ে ব্যবসা নিরাপদ করার জন্য এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা নিজের দেশের গিরব ও প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে নির্মম হতে পিছপা হবেন না। তাঁর মতে, মোদির উন্নয়ন মডেল উচ্চমধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের জন্য৷ মোদির উন্নয়ন মডেলে প্রতিরোধ এলে, উন্নয়ন ব্যাহত হলে তিনি ধর্মান্ধতার রাজনীতির খেলা খেলতে পারেন। স্ক্রোল-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের রাজনীতি-বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফি জ্যাফরেলো বলেছেন, মোদির প্ল্যান ‘এ’ হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এটি ব্যর্থ হলে তাঁর প্ল্যান ‘বি’ হবে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উসকে দেওয়া৷ গার্ডিয়ান পত্রিকায় পঙ্কজ মিশ্র এসব দিকের ইঙ্গিত করে মোদির ক্ষমতারোহণকে একটি নতুন বিপৎসংকুল অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মোদি যদি সত্যিই হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি করেন, তাহলে সীমান্ত দিয়ে তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’দের পুশ-ইন করার চেষ্টা হবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নতুন করে আক্রান্ত হবে৷ মোদি এসব না করলেও ভারতের কাছ থেকে পানি, মাটি আর সীমান্ত নিরাপত্তার বহু অধিকার রয়ে যাবে অনাদায়ি। এসব নিয়ে হয়তো ভাবছেন আমাদের রাজনীতিবিদেরা৷ কিন্তু আমার সন্দেহ, তার চেয়ে বহুগুণে তাঁরা ভাবছেন মোদির সমর্থন নিয়ে ক্ষমতার যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার কথা।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনীতির গুণ, মিলেমিশে খুন!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরের শেষ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীতে সংঘটিত খুনের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই দলে ঢুকে এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে৷ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরাই যদি আওয়ামী লীগে ঢুকে উপজেলা চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, বিশিষ্ট আইনজীবীদের খুন করে থাকেন, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কী করছেন? তাঁদের দায়িত্ব কি বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদের সাদরে দলে নিয়ে আসা, নাকি এই দুষ্ট চরিত্রের লোকেরা যাতে দলে না ঢুকতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা? প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আরও একটি সত্য প্রকাশ পেল যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত আওয়ামী লীগে ইচ্ছা করলেই দলের আদর্শের বিরোধী ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারক বিএনপির নেতা-কর্মী এবং মৌলবাদী জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারে৷ সম্প্রতি ফেনী ও নারায়ণগঞ্জে যে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার মূল হোতা ও নেপথ্যের কুশীলবদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অাধাআধি সত্য মিলবে৷ পুরো সত্য হলো, আওয়ামী লীগের পুরোনো মাস্তান ও গডফাদাররা নিজেদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে এবং দলের ভেতরেই প্রতিপক্ষ শক্তিকে ঘায়েল করতে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত-িশবিরের সন্ত্রাসীদের ফুলের মালা দিয়ে দলে নিয়ে আসেন৷ বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেনও হয়৷ যিনি টাকা দিয়ে দলে আসেন, তিনি তো সেই টাকা উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেনই৷ কিন্তু যেসব নামীদামি নেতা টাকার বিনিময়ে এসব অনুপ্রবেশকারীকে বরণ করে নেন, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছেন, যাঁরা ঘটাতে সহায়তা করেছেন,
তাঁদের মধ্যে বনেদি ও নবাগত আওয়ামী লীগার যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিরোধী দলের নেতা–কর্মীরাও৷ অনেক সময়ই পুরোনোদের কনুইয়ের গুঁতায় ঠেলে দিয়ে দলে নবাগতরাই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন৷ বিরোধী দলের নেতাকে কাঁচপুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখার কাজে যদি কোনো নবাগত সন্ত্রাসীকে ব্যবহার করা হয়, সেই ব্যক্তিটি যে নিজেকে দল ও সরকার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করবেন, তাতে সন্দেহ কী? ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় আসামি হিসেবে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান বিএনপি-জামায়াতের লোক যেমন আছেন, তেমনি আছেন বনেদি আওয়ামী লীগাররাও৷ চোরে চোরে মাসতুতো ভাই৷ এক দলের সজ্জন নেতাদের সঙ্গে অন্য দলের সজ্জন নেতাদের যেমন সৌহার্দ্য ভাব গড়ে ওঠে, তেমনি এক দলের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অন্য দলের সন্ত্রাসীদের আঁতাত হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়৷ রাজনীতিতে প্রথম পক্ষ যত ক্ষীয়মাণ হচ্ছে, দ্বিতীয় পক্ষ ততই বলবান হচ্ছে৷ নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন স্বৈরাচারী এরশাদের দোসর ও জাতীয় যুব সংহতির নেতা নাসিম ওসমানের হাত ধরে আশির দশকের শেষে রাজনীতিতে আসেন৷ নব্বইয়ে এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই নূর হোসেন বিএনপিতে যোগ দেন এবং স্থানীয় বিএনপির সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের প্রধান লাঠিয়াল হন৷ কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৮ সালে নূর হোসেনকে যিনি ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন, তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমান৷ ১৫ বছর পর এসে প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশকারী ও বনেদির সংজ্ঞা কীভাবে ঠিক করবেন? ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবির পর শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনও পালিয়ে গিয়েছিলেন৷ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালালেও সবাই তো শামীম ও হোসেনদের মতো পালিয়ে যাননি৷
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গুরু-শিষ্য দুজনই এলাকায় ফিরে আসেন৷ সে সময়ে শামীমের অসুবিধা ছিল, তাঁর আসার আগেই ২০০৮ সালের নির্বাচনটি হয়ে গেছে৷ তিনি সাংসদ হতে পারেননি৷ আর নূর হোসেনের সুবিধা ছিল, তিনি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর হন এবং দলের ও প্রশাসনের সহায়তায় নিজে খুদে মাফিয়া হয়ে ওঠেন৷ তাঁর এই অপ্রতিরোধ্য উত্থান রহিত করার কেউ ছিল না৷ যখন একজন খুদে মাফিয়া টাকা দিয়ে সবকিছু কিনতে পারেন, তখন তিনি কাউকেই পরোয়া করেন না৷ আর গুরুর সঙ্গে নূর হোসেনের হৃদয়ের বন্ধন এতটাই অবিচ্ছেদ্য যে সাত খুনের পরও তা ছিন্ন হয়নি৷ বহুল আলোচিত অডিও টেপে দেখা যায় যে শামীম ওসমান তাঁকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুপরামর্শ দিয়েছেন৷ প্রধানমন্ত্রী যাঁদের অনুপ্রবেশকারী বলছেন, তাঁরা কেন এক দল ছেড়ে অন্য দলে যান, সেই কথাটি উল্লেখ করলে দেশবাসী পরিষ্কার ধারণা পেত৷ যেহেতু বিরোধী দলে থেকে এসব দখলদারি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস করতে তেমন সুবিধা হয় না, র‌্যাব-পুলিশের নজরদারিতে থাকতে হয়, সেহেতু তাঁরা বরাবর সরকারি দলে আশ্রয় নিয়ে থাকেন৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই একবার এদের পিজিপি বা প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন৷ তিনি কি হিসাব করে দেখেছেন, ১৯৯৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগে এই পিজিপি সদস্যদের সংখ্যা কত? প্রধানমন্ত্রীর কথা সত্য হলে আওয়ামী লীগে এ রকম দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা দলে এসে িনর্বিঘ্নে খুনোখুনিও করতে পারেন৷ আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নীরব দর্শকের মতো তা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন৷ আর অনুপ্রবেশকারীরা সব সময় সরকারি দলে যায় কেন? এর মাধ্যমে তাঁরা দুটি সুবিধা আদায় করেন৷ প্রথমত, বিগত আমলের সব অপকর্মের দায়মুক্তি৷ দ্বিতীয়ত, নতুন করে অপকর্মের ছাড়পত্র৷ তাঁরা যেহেতু সরকারি দলে নাম লিখিয়েছেন, সেহেতু নতুন অপকর্মে লিপ্ত হতে কোনো বাধা নেই৷ আর প্রশাসনের ঘাড়ে কটি মাথা যে তারা সরকারি দলের এমন খুদে মাফিয়া ও নির্বাচিত কাউন্সিলরের গায়ে হাত দেয়৷ নূর হোসেন অনেকের চেয়ে চালাক ছিলেন বলেই তিনি শুধু দলের ক্ষমতার ওপর ভরসা না করে টাকার ক্ষমতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন৷ শোনা যায়, তাঁর হাত এতই লম্বা যে সেটি নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসনের ছোট লাটদের ছাড়িয়ে ঢাকার সচিবালয় তথা বেইলি রোড-মিন্টো রোড-হেয়ার রোড পর্যন্ত প্রসারিত ছিল৷
ফেনীর একরামুল হত্যার ঘটনাটি আরও জটিল৷ এখানে একদা গডফাদার জয়নাল হাজারী যেসব শিষ্য-প্রশিষ্য তৈরি করেছিলেন, তাঁরাই পরবর্তীকালে বিভিন্ন ফেঁকড়ায় ভাগ হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে একের পর খুনের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন৷ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জয়নাল হাজারী গঠন করেন প্রাইভেট বাহিনী৷ তিনি যত দিন ফেনীতে ছিলেন, তত দিন তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না৷ কিন্তু ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে তিনি ভারতে পালিয়ে যান৷ তখন তাঁর শিষ্যরা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে কেউ তাঁর পক্ষে কেউ বিপক্ষে অবস্থান নেন৷ নিজেদের শক্তি বাড়াতে এঁদের কেউ বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পক্ষে টেনে আনেন৷ ফলে একদা চট্টগ্রামে শিবিরের ঘাতক বাহিনীর সদস্যও আওয়ামী লীগের ছায়াতলে এসে আগের অভিজ্ঞতা ঝালাই করতে থাকেন৷ ফেনীতে আওয়ামী লীগের উঠতি নেতারা প্রতিপক্ষের শক্তি খর্ব করতে এঁদের ব্যবহার করেন৷ জাতীয় রাজনীতিতে যত বিরোধই থাক না কেন স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি এমনকি জামায়াতের নেতারাও একসঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য, ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি করে থাকেন৷ এসব ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন চরম শত্রু হন, তেমনি বিরোধী দলে থাকা প্রতিযোগী হয়ে ওঠেন পরম বন্ধু৷ নারায়ণগঞ্জে সাত খুন ও ফেনীতে একরাম হত্যার আসামিদের তািলকা দেখলে স্থানীয় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার নামই এসেছে৷ অনেকের ফোনালাপের বিষয়াদি জনসমক্ষে প্রকাশিত৷ তাই বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগে ঢুকে সব খুন ও সন্ত্রাস করছেন বলা সত্যের অপলাপ বলেই মনে করি৷ জাতীয় রাজনীতিতে যখন আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতকে একচুলও ছাড় দিতে নারাজ, তখন স্থানীয় পর্যায়ে কেবল নারায়ণগঞ্জ বা ফেনী নয়, বহু স্থানে আওয়ামী লীগে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশের গূঢ় রহস্যটা কী? রহস্যটা হলো, রাজনীতি এখন নীতি ও আদর্শ পেছনে ফেলে হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার৷ সেই সুবিধা আদায়ের পথে যখন কেউ কাউকে পথের কাঁটা মনে করছেন, তাঁতেই সরিয়ে দিচ্ছেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর কায়দায়৷ আমাদের জাতীয় নেতারা আলোচনা করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন দিতে না পারুন, একে অপরের বিরুদ্ধে যত খুশি বিষোদগার করুন না কেন, তাঁদের অনুসারীরা মিলেমিশেই খুনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন৷ অন্তত নারায়ণগঞ্জ ও ফেনীর ঘটনা তাই প্রমাণ করছে৷ রাজনীতির এই বিধ্বংসী ও বিনাশী প্রবণতাকে কেবল অনুপ্রবেশকারী সমস্যা বলে পার পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না৷ প্রধানমন্ত্রী কী বলেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

His friend died in a car accident and he sat next to him for more than 6 hours Alakh and trying to wake him up and protect it from passers-by and cars!

His friend died in a car accident and he sat next to him for more than 6 hours Alakh and trying to wake him up and protect it from passers-by and cars!

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার by সাজেদুল হক

ইস্যু মূলত তিনটি। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন, মানবাধিকার আর যুদ্ধাপরাধের বিচার। তিন ইস্যুতেই সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। দিল্লির মসনদে পরিবর্তন চাপা উত্তেজনা তৈরি করেছে ঢাকায়। সরকার আর বিরোধী শিবিরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। পশ্চিমা দুনিয়ার অবস্থান আগ থেকেই পরিষ্কার। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগাদা দিয়ে আসছিল তারা। শুরু থেকে একমাত্র ভারতই ছিল ‘একদলীয়’ নির্বাচনের পক্ষে। পরে অবশ্য ‘লাভের’ রাজনীতিতে চীন আর রাশিয়াকেও কাছে টানতে সক্ষম হয় সরকার। তবে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ওপর পশ্চিমা দুনিয়ার চাপ যে অব্যাহত রয়েছে তা পরিষ্কার। সর্বশেষ বিদায়ী জার্মান রাষ্ট্রদূত আলব্রেখট কনজে বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তাই যেন উচ্চারণ করলেন। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ নানা রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। কিন্তু আগামী মাস এবং বছরগুলোতে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, তার ধরন অতীতের চেয়ে আলাদা হবে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে ইউরোপের অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। তবে অতীতের চেয়ে ভবিষ্যৎ বেশি গুরুত্বপূর্র্ণ এটাই আমার উত্তরসূরিকে বলে যাব।

যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে অবশ্য শুরুর দিন থেকেই চাপের মুখে ছিল সরকার। আন্তর্জাতিক দুনিয়া এ বিচারের পক্ষে থাকলেও সবসময় বিচারের আন্তর্জাতিক মান রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ বিচারের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড  হলেও গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে তার ব্যাপারে সরকারকে আপিল দায়েরের সুযোগ দেয়া হয়। পরে সরকারের আপিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়। তবে যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনোভাবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনে জামায়াতের বিচারের বিপক্ষে মত দিয়েছেন আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। আইন সংশোধন না করে এ বিচার করা যাবে না বলে মনে করেন তিনি। যুদ্ধাপরাধ বিচার ইস্যুতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের ইস্যুটিও পরিষ্কার হয়ে যায় তার কথায়। তিনি বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে সরকার বদ্ধপরিকর, কিন্তু অবশ্যই আইনের সুনির্দিষ্ট বিধান প্রতিপালন করে। বিচার যাতে কোনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেজন্য এসব ব্যাপারে আইনের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবকিছু বিবেচনা করে জামায়াতকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বিষয়টি আরও ভাবনা-চিন্তা করে নিতে হবে। এখন সেটার সময় নয়। আজ জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হবে, কাল আইন পরিবর্তন করা হবে, আমি এর পক্ষে নই। আমাকে সারা পৃথিবীতে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে কাদের মোল্লার ব্যাপারে। কোন বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুলুক আমি তা চাই না।’ যদিও জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোন ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তবে জামায়াতের বিচার ইস্যুতে তার এ বক্তব্য আকস্মিক নয়। গত কয়েক মাসেই স্পর্শকাতর বেশ কিছু ইস্যুতে সরকারের মনোভাবে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। গণজাগরণ মঞ্চের ওপর থেকে সরকারের সমর্থন প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে-বাইরে তোলপাড় চলছে। এরই মধ্যে মঞ্চ দুই ভাগ হয়ে গেছে। মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। অন্যদিকে, জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা নিয়েও কিছুদিন ধরে গুঞ্জন চলে আসছে। হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে বন্ধুত্বের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারপক্ষও এ ব্যাপারে নীরবতা পালন করে আসছে। তবে যুদ্ধাপরাধ বিচার ইস্যুতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারের ওপর বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য চাপ প্রয়োগ করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। গণতন্ত্রের ইস্যুটি সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ইস্যুটি মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। দলটির নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটিতে রায় ঘোষণা করবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ১৬ই এপ্রিল থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী এবং নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর মামলা। এ তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতার রায়কে সামনে রেখে জামায়াতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বিশেষ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে। যে কারণে তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন জামায়াত। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক দুনিয়া এখন আরও সক্রিয় বলে জামায়াতেরও একটি সূত্র দাবি করেছে। জামায়াতের এক নীতিনির্ধারক এ ব্যাপারে বলেন, আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি সরকার কার্যকর করে ফেলবে তা অনেকেই বিশ্বাস করেননি। যে কারণে এখন তারা সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, গুম-খুন ঘিরে মানবাধিকার ইস্যুতেও সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুন এবং ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হকের নির্মম হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক দুনিয়ার নজর কেড়েছে। এর আগে বিএনপি ও জামায়াতের বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে গুম ও ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগ রয়েছে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বিরুদ্ধে। হিউম্যান রইটস ওয়াচ এরই মধ্যে র‌্যাব বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা র‌্যাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। পশ্চিমা কূটনীতিকরা একাধিক মাধ্যমে গুম-খুনে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরেও র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি জোরালো হচ্ছে।
৫ই জানুয়ারি নির্বাচন প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। সব সময়ই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে আসছে তারা। বিপরীত অর্থে ভারতও অবশ্য একই অবস্থানে ছিল। ‘একদলীয়’ নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। চীনের অবস্থান ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় চীন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে সমর্থনই করেছে। একই অবস্থান রাশিয়ারও। সাম্প্রতিক নানা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবা খেলার ঘুঁটি হিসেবে যেন বাংলাদেশও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভারতের মসনদ থেকে কংগ্রেসের বিদায় আর নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নতুন করে ঢাকায়ও তৈরি হয়েছে নানা সমীকরণ। চাউর রয়েছে ভারতের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির প্রতি সমর্থন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। টানাপড়েন কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক নতুন যুগে প্রবেশের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখবে বলে ঢাকার কোন কোন পর্যবেক্ষক মনে করেন। তাদের মতে, ভারত যদি বাংলাদেশের ব্যাপারে নিরপেক্ষ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে একটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানে ঢাকার ওপর চাপের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে। যদিও অতীতে বহু চাপই শেখ হাসিনার সরকার অগ্রাহ্য করেছে। তবে বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের নীতিতে কোন পরিবর্তন আসে কি না তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খোলাসা হয়ে যাবে। ঢাকার মসনদের জন্য সামনের দিনগুলো ইন্টারেস্টিং হবে বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

মিষ্টি কুমড়ার ৫ বিস্ময়কর স্বাস্থ্য-উপকারিতা

মিষ্টি কুমড়ার অপরিহার্য কিছু গুণাগুণ সম্পর্কে হয়তো আমাদের অনেকেরই জানা নেই। এই সবজিটি পুষ্টি উপাদানে ভরপুর এবং সে অর্থে একে প্রকৃতির পুষ্টি উপাদানের ‘পাওয়ারহাউজ’ বলা যেতে পারে। মিষ্টি কুমড়ায় রয়েছে বহু অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ভিটামিন, যেমন- ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই। কপার, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানেও সমৃদ্ধ এ সবজিটি। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই একে ‘সুপারফুড’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মিষ্টি কুমড়ার প্রধান ৫টি গুণাগুণ এখানে উপস্থাপন করা হলো:

চোখের জন্য: মিষ্টি কুমড়ায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, যা চোখে ছানি পড়া ও দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। খাদ্য তালিকায় নিয়মিত এ সবজিটি রাখার ফলে আপনার দৃষ্টিশক্তি আরও প্রখর হবে এবং চোখের ছোটখাটো কিংবা মারাত্মক কোন সমস্যায় পড়তে হবে না।

ত্বকের জন্য: ত্বকের সুরক্ষায় মিষ্টি কুমড়ার ভূমিকা অসামান্য। ত্বক সুরক্ষাকারী উপাদান বিটা ক্যারোটিন প্রচুর পরিমাণে রয়েছে এ সবজিতে, যা আপনার ত্বককে আরও মসৃণ ও কমনীয় করে তোলে। এতে ফ্যাটি অ্যাসিড থাকায় ত্বকে সহজে বলিরেখা বা ভাঁজ পড়বে না। মিষ্টি কুমড়ায় ভিটামিন সি থাকায় ত্বক হয় লাবণ্যময়। এতে আলফা ক্যারোটিন জাতীয় উপাদান থাকার ফলে বার্ধক্যও আসে দেরিতে।

ওজন কমাতে: মিষ্টি কুমড়ায় কোন সম্পৃক্ত চর্বি বা কোলেস্টেরোল নেই এবং এতে ক্যালোরির মাত্রাটাও সামান্য। এতে রয়েছে পুষ্টিকর আঁশ। এ সবজিটি কোলেস্টেরোল নিয়ন্ত্রণ করতে ও ওজন কমাতে বিশেষভাবে সহায়তা করে।

দাঁত ও হাড়ের জন্য: মিষ্টি কুমড়ার শাঁসালো অংশে এবং এর বীজ বা দানায় প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম থাকায় এটি হাড় ও দাঁতের ক্ষয়রোধ করে। নিয়মিত মিষ্টি কুমড়া খাওয়ার অভ্যাস আপনার দাঁত ও হাড়কে করবে আরও মজবুত।

রোগ প্রতিরোধে: মিষ্টি কুমড়ায় রোগ প্রতিরোধকারী বহু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। হার্টের অসুখ, হাইপারটেনশন, বাত ইত্যাদি মারাত্মক সব রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর এ সবজিটি। বয়সজনিত কারণে মাংসপেশীর যে রোগ হয়, তাও প্রতিরোধ করে মিষ্টি কুমড়া।

নতুন নূসরাত by মাহমুদ মানজুর

মিডিয়ায় পা রাখতে না রাখতেই সবার নজর কেড়েছেন প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দিয়ে। বছর দুই না গড়াতেই দেশের অন্যতম গ্ল্যামারাস ব্যস্ত ভিজে হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করেছেন। প্রেমকেন্দ্রিক মধুর গুঞ্জন রটেছে মডেল-নায়ক নিরবের সঙ্গে। অবশ্য প্রেমকেন্দ্রিক মাস ছয়েকের এ গুঞ্জন এখন ছাইচাপা পড়েছে। জানা গেছে, প্রেম নেই, উড়ে গেছে। তাই তো শেষ ছয় মাস প্রেম-গুঞ্জনহীন সরস সময় পার করছেন নূসরাত ফারিয়া। টিভি উপস্থাপনা সমানগতিতে চললেও খুব সম্প্রতি নতুন চমক দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েছেন চিত্রনায়িকা সাজার। তাও আবার জনপ্রিয় নির্মাতা রেদওয়ান রনির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘মরীচিকা’র নায়িকা! ছবিতে নূসরাতের পাশাপাশি নায়ক-নায়িকা রূপে আরও থাকছেন তাহসান এবং মীম। এরই মধ্যে চলচ্চিত্রটিতে কাজ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। তবে শুটিংয়ের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। নূসরাত জানান, মাসখানেকের মধ্যেই শুটিংয়ে নেমে পড়বো। এখন চলছে মানসিক প্রস্তুতি পর্ব। প্রথম চলচ্চিত্র বলে কথা!

মানসিক প্রস্তুতি তো লাগবেই। তাই তো সাম্প্রতিক সময়ে গ্ল্যামারাস এবং স্মার্ট নূসরাতকে প্রায়ই দেখা যায় রগরগে এক্সপ্রেসন কিংবা খুল্লামখুল্লা ড্রেসআপে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নূসরাত নিজেই নিজের বেশ কিছু খোলামেলা ছবি প্রকাশ করছেন। আর কমেন্ট-লাইক বক্সে মিলছে উপচে পড়া ভিড়। যার পুরোটাই দারুণ এনজয় করছেন নূসরাত। মিডিয়ায় মাত্র দুই বছর বয়সী নূসরাত চলচ্চিত্রে পা রাখতে না রাখতেই নিজেকে প্রমাণ করতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এ বিষয়ে অবশ্য তার সরাসরি কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠজনের আলাপে এটাই স্পষ্ট, নূসরাত নাচতে নেমে ঘোমটা টানার মেয়ে নন। তাই তো ‘মরীচিকা’র শুটিংয়ের আগেই ফেসবুকে ড্রেস ট্রায়াল দিচ্ছেন। বাজিয়ে দেখছেন ভক্ত-বন্ধু-দর্শক-সমালোচকদের। তা ছাড়া ‘মরীচিকা’য় নূসরাতের চরিত্রটিও নাকি এমনই- খানিক খোলামেলা, খানিক ওভার স্মার্ট। উল্লেখ্য, দুই বছরের সফল উপস্থাপনা ক্যারিয়ারে নূসরাত ফারিয়া অসংখ্য নাটক এবং বিজ্ঞাপনের অফার পেয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র দু’টি বিজ্ঞাপন চিত্রের মডেল হয়েছেন। অভিনয় করেননি একটি নাটকেও। কারণ শুরু থেকেই তার পরিকল্পনা ছিল অভিনয় করলে চলচ্চিত্র দিয়েই শুরু করবেন। নূসরাতের ভাষায়, আসলে আমি মূলত উপস্থাপনাটাই এনজয় করছি এখনও। নাটকে অভিনয় করার ইচ্ছে সে অর্থে কখনও জাগেনি। কারণ আমি বরাবরই চেয়েছি অভিনয়ের শুরুটা চলচ্চিত্র দিয়ে করতে। সে ক্ষেত্রে রনি ভাইয়ের ‘মরীচিকা’ আমার জন্য বেস্ট অফার ছিল। তাই সাত-পাঁচ না ভেবে সই করে ফেলেছি। আশা করছি নতুন কিছু করতে পারবো। কথা দিচ্ছি ‘মরীচিকা’তে নতুন নূসরাতকে পাবেন সবাই।

স্নোডেনকে দেশে ফিরতে বললেন জন কেরি

এডওয়ার্ড স্নোডেন
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা নথি ফাঁস করে হইচই ফেলে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা—এনএসএর সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি৷ গত বুধবার এক সাক্ষাৎকারে স্নোডেন দেশে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করার পর কেরি এ কথা বললেন৷ খবর বিবিসির৷
জন কেরি বলেন, ‘স্নোডেন যদি আমেরিকায় বিশ্বাস করেন, তবে তাঁর আমেরিকার বিচারব্যবস্থার ওপরও আস্থা রাখাউচিত৷ তাঁর উচিত দায়িত্ব নেওয়া এবং দেশে ফিরে আসা৷’ তিনি আরও বলেন, ‘স্নোডেন যদি দেশে ফিরতে চান, তাহলে আমরা আজই তাঁর জন্য বিমানের ব্যবস্থা করব৷’

মিসরে একতরফা নির্বাচনে সিসিই প্রেসিডেন্ট

আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি
মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ধারণামতোই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন৷ অধিকাংশ ব্যালট গণনার পর গতকাল বৃহস্পতিবার দেখা যায়, তিনি ৯৬ দশমিক দুই শতাংশ ভোট পেয়েছেন৷ খবর এএফপির৷ স্থানীয় সময় দুপুরের আগে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, মোট ৩৫২টি গণনাকেন্দ্রের মধ্যে ৩২১টির ফলাফল এসে গেছে৷
অবসরপ্রাপ্ত ফিল্ড মার্শাল আল-সিসির পক্ষে ভোট দিয়েছেন অন্তত দুই কোটি ১০ লাখ ভোটার৷ ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ মুরসির সমর্থক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের কার্যক্রম তাঁর পতনের পর সরকারি দমন-পীড়নে সীমিত হয়ে আসে৷ একপর্যায়ে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধও করা হয়৷ তাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সিসির বিজয় প্রায় নিশ্চিত ছিল৷ তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থী হামদিন সাবাহি এ পর্যন্ত মাত্র তিন দশমিক আট শতাংশ ভোট পেয়েছেন৷ ২০১২ সালের নির্বাচনে তিনি মুরসির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন৷ জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী গত বছর উৎখাত করে৷ আল-সিসিই এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন৷ পরে মুরসির সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযান চালানো হয়৷ এতে অন্তত এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়৷ এ ছাড়া ১৬ হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়৷ মোট পাঁচ কোটি ৪০ লাখ ভোটারের মধ্যে অন্তত ৪৬ শতাংশ এবারের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র আল-আহরাম৷
তবে সিসি আরও বেশি ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশা করেছিলেন৷ উপস্থিতির হার কম হওয়ায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি সিসির কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে৷ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া গত মঙ্গলবারের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও পরে সেনা-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ ভোটগ্রহণের সময়সীমা একদিন বৃদ্ধি করে৷ তবে গত বুধবার অনেক কেন্দ্রেই ভোটার উপস্থিতি ছিল না বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়৷ ফলে ভোটগ্রহণে ‘অনিয়মের’ অভিযোগ এনে বামপন্থী হামদিন সাবাহির সমর্থকেরা প্রতিবাদ জানান৷ প্রভাবশালী সংগঠন নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের অনুপস্থিতির কারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে৷ এ ছাড়া উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ বেশ কয়েকটি সংগঠনও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি৷ একজন নির্বাচনী কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত সময় মঙ্গলবার পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র প্রায় ৩৭ শতাংশ৷ মিসরে গত কয়েক বছর ধরে চলমান বিশৃঙ্খলার পর কঠোর হাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কিছুটা জনসমর্থন অর্জন করেছেন সিিস৷ প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর সমর্থকেরা জাতীয় পতাকা নিয়ে রাজধানী কায়রোসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিজয় উদ্যাপন করেন৷ মিসরের ইতিহাসের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে উৎখাতের প্রতি সমর্থনের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এ নির্বাচনে বড় আকারের ভোটার উপস্থিতির জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন সিসি৷

পাকিস্তানকে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে: সুষমা

সুষমা স্বরাজ
ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়৷ কিন্তু সে জন্য দেশটিকে ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে৷ তা না হলে সব আলোচনা বোমা বিস্ফোরণের শব্দে চাপা পড়ে যাবে৷ গত বুধবার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি এ কথা বলেন৷ খবর এনডিটিিভ ও পিটিআইয়ের৷ সুষমা বলেন, ভারতের শক্তি বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরাই হবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম কাজ৷ এ ছাড়া, প্রতিবেশী দেশ, কৌশলগত অংশীদার, আফ্রিকা, আসিয়ানভুক্ত দেশ, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সচেষ্ট থাকবেন তিনি৷
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে সুষমা বলেন, মোদি সেদিনই তাঁকে (নওয়াজ) স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, বোমা বিস্ফোরণ অব্যাহত থাকলে দুজনের আলোচনা কোনো কাজে আসবে না৷ কেরির ফোন: ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদার করার কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে গত বুধবার রাতে সুষমা স্বরাজকে ফোন করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি৷ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার টুইটার বার্তায় এ কথা জানান৷

Friday, May 30, 2014

গারোদের শেষকৃত্য অতীত বর্তমান by আবু সাঈদ কামাল

গারোদের আদি ধর্ম মতে তাদের কোনো সদস্য মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে রাং-থ্রাম বাজিয়ে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা হয়। শোক সংবাদ শুনে আত্মীয়স্বজনরা ছুটে আসে। মৃত ব্যক্তিটি যদি পুরুঘ হয়, তাহলে মৃত্যু সংবাদ প্রথম পাঠাতে হয় মৃতের মাতৃগোষ্ঠীর কাছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় গারো পুরুষদের সাধারণত স্ত্রীর বাড়িতে চলে যেতে হয়। মৃত্যুর সংবাদ শুনে মা-বাবা তড়িঘড়ি চলে আসতে পারেন না। আর্থিক অবস্থাভেদে মা-বাবাকে ষাঁড় বা গরু, ছাগল, শূকর, মোরগ-মুরগি ইত্যাদি সঙ্গে নিয়ে যেতে হয় মৃতের বাড়িতে। সাংসারেক গারো সদস্যের মৃত্যুর পর তার মায়ের গোত্রের মেয়েরা এসে মৃতকে স্নান করায়। মৃত ব্যক্তি ধনী হলে সে ক্ষেত্রে চু বা গারো মদ দিয়ে তার মরদেহ স্নান করানোর নিয়ম রয়েছে। আবার গরিব হলে জল দ্বারা স্নান করানো হয়।
সাংসারেক গারোরা জন্মান্তরে বিশ্বাসী। হিমাংশু মজুমদার তার ভারতের আদিবাসী গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মৃত্যু সম্পর্কে গারোদের বিশ্বাস; শরীরের মাঝে আত্মা বাস করে। মৃত্যুর ফলে আত্মা শরীর ছেড়ে মাংরু এবং মাংরাম নামক স্থানে চলে যায়। মাংরু এবং মাংরাম হল আত্মার ভালো-মন্দের বিচারের স্থান। যতদিন না পুনর্জন্ম হয় ততদিন আত্মা সেখানে স্থায়ী হয় বলে তাদের বিশ্বাস। তাদের মতে মৃত্যুর কারণ অনুযায়ী আত্মার পরিণতি ঘটে। যেমন কেউ ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করলে সে গোবরে পোকারূপে পুনর্জন্ম নেয়। আবার বাঘ বা হাতির আক্রমণে নিহত হলে বা মারা গেলে সে জন্তুরূপে জন্ম নেয়। কখনও আর মানুষরূপে পুনর্জন্ম নিতে পারে না।
অন্যদিকে সুভাষ জেংচাম তার ‘বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায়’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, গারোদের (সাংসারেক গারোদের) বিশ্বাস জন্মান্তর গ্রহণের প্রস্তুতি পর্বে বিদেহী আত্মা সাময়িকভাবে চিকমাং পাহাড়ে অবস্থান করে। এ চিকমাং পাহাড়টি গারো পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। যা বাংলাদেশের কলমাকান্দা দুর্গাপুর এলাকা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সড়কপথে ভ্রমণ করলে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা পথে শ্যামগঞ্জ থেকে শুরু করে নেত্রকোনা ঠাকুরাকোনা থেকেও উত্তর দিগন্ত বরাবর তাকালে চিকমাং পাহাড় চূড়াটি দেখা যায়। তারপর যতই উত্তরে যাওয়া যায় চিকমাং পাহাড়ের চূড়াটি ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুভাষ জেংচামের মতে চিকমাং পাহাড় চূড়াটি দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো।
মৃতদেহ সৎকারের ক্ষেত্রে গারোদের ভিন্ন ভিন্ন গোত্রে ভিন্ন ভিন্ন রীতি প্রচলিত। কোনো কোনো গোত্রে মরদেহ আগুনে পোড়ানো হয়। আবার কোনো গোত্রে মাটিতে সমাহিত করা হয়। অবশ্য মাটিতে পুঁতে রাখার রীতি শুধু বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন কেউ যদি কলেরা, বসন্ত, কুষ্ঠ, কালাজ্বরের কবলে পড়ে মারা যায়, তাদের মরদেহ মাটিতে পুঁতে দেয়া হয় বা সমাধিস্থ করা হয়। সময় তাদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র মরদেহের সঙ্গে দেয়া হয়। বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যু হলে সে ক্ষেত্রে মরদেহ কাঠের বেদিতে দাহ করার রীতি রয়েছে। তারা সদলবলে শোভাযাত্রা করে মরদেহ গাংচি বা খাটিয়ায় করে দাহ করার জন্য শ্মশানে নিয়ে যায়। দাহ স্থানে প্রথমে চার কোণে চারটি খুঁটি পুঁতে তার ওপর বড় বড় কাঠ সজ্জিত করা হয়। এ ক্ষেত্রেও মৃতের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র শবদাহের সময় সঙ্গে দেয়া হয়। কারণ তাদের বিশ্বাস মৃতের আত্মাকে বিভ্রান্ত করার জন্য পরপারে অপদেবতা ওঁৎ পেতে থাকে। তখন মৃতের ব্যবহার্য ওই সব তৈজষপত্র বা অন্যান্য জিনিসপত্র ওই অপদেবতাকে দিয়ে মৃতের আত্মা নির্বিঘ্নে তার গন্তব্যে চলে যেতে পারে। মৃতদেহকে কাঠের ওপর রেখে তারপর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সাধারণত দাহ কাজে মাদার বা পারিজাত গাছের কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। দাহ করা মরদেহের অদগ্ধ হাড় ও চিতার ছাই একটি পাত্রে পুরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়। মৃতের সঙ্গে দেয়া জিনিসপত্র অদগ্ধ অবস্থায় থাকলে মৃতদেহ দাহকারী স্বজনেরা সেগুলো নিয়ে যেতে পারে। অতঃপর সে স্থানে ছোট ত্রিকোণাকৃতির একটি ছোট ঘর তৈরি করে খড় দিয়ে ছেয়ে রাখা হয়। সে ঘরকে বলা হয় দেল্লাং। গারোদের বৃহৎ বার্ষিক অনুষ্ঠান ওয়ানগাল্লা। কোনো কোনো গোত্রের রীতি অনুযায়ী ওই ওয়ানগাল্লা বা চুগান পালনের সময় ওসব দেল্লাং বা খ্রমগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মৃতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়।
এ কথা সত্য যে গারোদের আদি ধর্মে বিশ্বাস তথা সাংসারেক সদস্যের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। শতকরা তা তিন থেকে পাঁচ ভাগের বেশি হবে না। ১৮৬৩ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি, রোববার মি. ব্রনসন নামক জনৈক শ্বেতাঙ্গ ব্যাপটিস্ট মিশনারি আসামের গৌহাটির অদূরে সুখেশ্বর ঘাট নামক স্থানে উমেদ ও রামখে নামে দুজন গারো যুবককে প্রথম খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করেন। সেই থেকে গারোরা খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবে ধর্মান্তরিত হতে শুরু করে। এখনও সে প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। অবশিষ্ট তিন থেকে পাঁচ ভাগ গারো, যারা এখনও আদি ধর্মে বিশ্বাস নিয়ে আছে, তারাও বোধ হয় এক সময় খ্রিস্টান হয়ে যাবে। অতি অল্প সংখ্যক আদি ধর্ম বিশ্বাসী গারো বা সাংসারেক যারা আজও আদি রীতি মেনে চলছে, তা একদিন শূন্যের কোঠায় পৌঁছবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধর্মান্তরিত গারোরা তাদের আদি সামাজিক নিয়মাচারের বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসতে পারেনি।
সাংসারেক রীতি অনুযায়ী কোনো গারো সদস্য মারা গেলে সেখানে রাং থ্রাম বাজিয়ে শোক সংবাদ প্রচার করা হতো, এখন সে স্থান দখল করেছে খ্রিস্ট রীতির ঘণ্টাধ্বনি। ধর্মান্তরিত কোনো গারো সদস্য মারা গেলে মৃত্যু সংবাদ এখনও প্রথমে তার মাতৃগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো হয়। মৃত্যু সংবাদ শুনে এখনও সীমান্তের ওপারে তথা মেঘালয়ে ধর্মান্তরিত গারোদের আত্মীয়স্বজনরা মৃতের বাড়িতে যাওয়ার সময় গরু-ছাগল-শূকর-হাস-মুরগি ইত্যাদি নিয়ে যায়। ওসব পশু-পাখি মেরে সেগুলোর মাংস দিয়ে মৃতের বাড়িতে ভোজনানুষ্ঠান করা হয়। কিন্তু এপারে অর্থাৎ বাংলাদেশে খ্রিস্টান গারোরা অবশ্য মৃত্যু সংবাদ শুনে ছুটে আসে। যথারীতি খ্রিস্ট নিয়মে মৃতকে কবর দেয়া হয়। তবে মৃতের বাড়িতে কোনো ভোজনানুষ্ঠান হয় না। মৃত্যুর কিছুদিন পর অনুষ্ঠানটি করা হয়, সে সময় আত্মীয়স্বজনরা তাদের সামর্থ্যানুযায়ী গরু-ছাগল-শূকর-হাস-মুরগি ইত্যাদি নিয়ে এসে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। ধর্মান্তরিত গারোরা এখন ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করে শুধু অতীত ঐতিহ্য রক্ষার জন্য, ধর্ম বিশ্বাসের কারণে নয়। গারোদের শেষকৃত্য এখন না পুরোপুরি খ্রিস্ট ধর্ম রীতিতে, না আদি সাংসারেক রীতিতে হচ্ছে। বরং বলা যায় উভয় রীতির গ্রহণযোগ্য এক সমন্বিত নিয়মে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ধর্মান্তরিত গারোদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান।

নিউ মিডিয়া by নাজিব তারেক

ভারতীয় ষড়ঙ্গ বা নন্দনতত্ত্ব (এটাকে বৈদিক নন্দনতত্ত্ব বলাই যৌক্তিক) শিল্পের যে সীমানা বর্ণনা করে তাহাতে চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত, ক্রীড়া ইত্যাদি ১৮ রাজ্য নিয়ে শিল্প রাষ্ট্র। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য মাত্র। কিন্তু ইউরোপে আর্ট (Art) বলতে চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বোঝায়, ইউরোপের ভূমিতে সংগঠিত যে যুদ্ধকে আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বলে জানি তাহার পটভূমিতে ইউরোপীয় দাদারা (Dada) চিত্রকলা ও ভাস্কর্য-এর সনাতন ধারণার বাইরে কিছু উপস্থাপনের যে প্রয়াস নিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় স্থাপনাশিল্প বা Installation, ধারণাশিল্প বা Conceptual Art, তামাশাশিল্প বা Performance ভিডিওআর্ট (Vedio Art) ইত্যাদীর জাল বিছিয়ে দেয়া হল সারা বিশ্বে। যাকে আজ নিউ মিডিয়া নামে বয়ান করা হয়।
আমরা জানি ইউরোপীয় চিন্তাশীলতায় সৃষ্টিশীলতা অর্থ নতুন চিন্তার সন্ধান, শিল্পের প্রধান উদ্দেশ্যও তাই নতুন কল্পনার সন্ধান ও তা উপস্থাপনের কৌশল উৎদ্ভাবন। রেনেসাঁ থেকে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত একাডেমি (অপধফবসু) বা প্রতিষ্ঠান পুরনো কল্পনা ও কৌশলের নিরিখে নতুন কল্পনা ও কৌশলকে গ্রহণ করেছে। এটাই ছিল শিল্প না কারুকর্ম তা নির্ধারণের পদ্ধতি। একাডেমি নির্ধারণ করে দিত কোনটি শিল্প কোনটি নয়। আর সমাজ এ নির্ধারণের ভার একাডেমিকে প্রদান করে নিশ্চিন্তে সুখনিদ্রা দিত, দেয়, দিচ্ছে...*
ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লবের (industrial revolution) পর প্রতিচ্ছায়াবাদী (Impressionism) চিত্রকর ও তাদের সমর্থকরা এ ব্যবস্থাকে মেনে নিতে অস্বীকার করল। তারপর সময়ের দৌড়ে এলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব-বিমূর্ততা (Abstract), ঘনকবাদ (Surreal), df (Fav), দাদা (Dada), প্রকাশবাদ (Expressionism), বিশ্বযুদ্ধ-পরাবাস্তব (Surreal), বিশ্বযুদ্ধ-আমেরিকান বিমূর্ততা-cc (PoP), অপ (Op) বা দৃষ্টি বিভ্রম ইত্যাদি, শতাব্দীর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজকের নিউ মিডিয়া (New Media)। ওহ! ইউরোপীয় (বা পশ্চিমা) একাডেমির নতুন শাস্ত্র।
হ্যাঁ এ গ্লোবাল বাজারে নিজের উৎপাদিত পণ্য বেচতে এ শাস্ত্রকে তো মানতেই হবে। শিল্পী আমার হতেই হবে, আমার ভাবনা কিংবা চিন্তাহীন ভাবনাকে নিউ মিডিয়ার মোড়কে ছেড়ে দিলেই কেল্লাফতে। ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন, ক্যাম্প, আরও কত কি আছে আমায় শিল্পী ঘোষণা করার জন্য। ছিলেন সমালোচকেরা, তারা আজো আছেন; এসে গ্যাছেন শিল্প রক্ষক বা কিউরোটরেরাও। সব শেষে একাডেমি আর পুরস্কারের ঝাঁপি তো আছেই।
আই. এস. ও. মোহর বা শিল আমাদের সব পণ্যের গায়েই লাগাতে হবে, নচেৎ গ্লোবাল বাজারে তা বিকোবে না। আমার অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগে যে গার্মেন্ট শিল্প, অথবা উত্তর আমেরিকা-ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য-পূর্ব এশিয়ার বাজারে আমার যে জনশক্তি, যা আমার অর্থনীতিকে চালাচ্ছে, তা সবই গ্লোবাল বাজারকে সেবা দেয়ার জন্য। আমার শিল্পকেও তাই বৈশ্বিক ধারণায় পুষ্ট হতে হয়। ইংরেজরা আমাদের আর্ট স্কুল বানানো শিখিয়েছে, আর্ট বলতে শিখিয়েছে। আমার কোটি মানুষের শিল্প শিক্ষা সে স্কুলেই হতে হবে, অৎঃ হতে হবে। আর কতখানি শিখলাম বর্তমানে তার পরীক্ষা হবে নিউ মিডিয়া শাস্ত্র অনুসারে। হাজার বছর প্রাচীন ষড়ঙ্গ আমার শাস্ত্র নয়।
বদলেয়ার বলেছিলেন শিল্পী রচনা করেন আজানা বাজারের জন্য। নিউ মিডিয়ার বাজারটি কি অজানা?
মান বা গুণ বিচার, এটাই সামন্ত ও বুর্জোয়া পদ্ধতি, সমাজতন্ত্র এ পদ্ধতিরই আর এক রূপ হতে পারে মাত্র। পূর্ব পুরুষের বা অগ্রজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় বাস করার জন্য এটাই এখন পর্যন্ত সর্বত্তম উপায়। আর এটা না মানতে চাইলে-মুখের সামনে যা পাও খাও, মরে অথবা বেঁচে থেকে প্রমাণ কর এটা বিষ না পুষ্টিবর্ধক খাদ্য। তবে এ পদ্ধতি মানবার ফল হল মানুষ নামক প্রাণীটি জঙ্গলবাসী প্রাণী থেকে সামাজিক প্রাণীতে রূপান্তরিত হয় মাত্র। মানুষ অধরাই রয়ে যায়।

টমাস মানর শেষ উপন্যাস কনফেশন অব ফেলিক্স ক্রুল by সরকার মাসুদ

ভিক্টোরীয় যুগের কবিদের শেষ প্রতিনিধি হচ্ছেন সুইনবার্ন। ঠিক তেমনি, টমাস মান ক্লাসিক্যাল ঘরানার শেষ ঔপন্যাসিক। ১৯৫৫ সালে (ওই বছর তার মৃত্যুও হয়, ১২ আগস্ট) ৭৯+ বয়সের Confessions of Felix Krull উপন্যাসের প্রথম খণ্ড লিখে তিনি আরও একবার প্রমাণ করেছেন সে কথা। সেই সঙ্গে পাঠক আরেকবার চমকিত এবং গভীরভাবে বিনোদিতও হয়েছেন। The Magic Mountain, Death in Venice, Tonio Kroger, The Holy Sinner প্রভৃতি গল্প উপন্যাসে দেখা যায় পুঙ্খানুপুঙ্খতা, বুদ্ধিদীপ্ত বর্ণনার অতিরেক। মানের রচনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দীর্ঘ- ক্লান্তিকর রকমের দীর্ঘ। টমাস মানের একাধিক নায়ক সেই ধরনের মানুষ যারা শিল্পী এবং অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত। বলা যায় এ জাতীয় নায়ক পরিকল্পনা ছিল কথাশিল্পী মানের স্বভাবগত। এবং শিল্পী চরিত্রটি তার যাবতীয় সীমাবদ্ধতা ও ঔজ্জ্বল্য নিয়েই সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে তার লেখায়। তুলনায় ‘Confessions of Felix Krull’ (ফেলিক্স ক্রুলের স্বীকারোক্তি) বইটি স্পষ্ট ব্যতিক্রম। এ উপন্যাসের নায়ক ফেলিক্স একজন প্রতারক, চোর এবং জালিয়াত যা একেবারে অভাবিত। কেননা উপন্যাসকারের শিল্প রুচির সঙ্গে তা খাপ খায়নি।
ফেলিক্স ক্রুলের বীজ লেখকের মাথায় পড়েছিল আনুমানিক চল্লিশ বছর আগে। Stories of Three Decades বইয়ে মান ফেলিক্সের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা সাজিয়ে গল্প লিখেছিলেন। তারপর সুদীর্ঘকাল সেই টুকরো টুকরো ঘটনাবলীকে পূর্ণাঙ্গ জীবন কাহিনীতে রূপান্তরিত করার আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন শুধু। সেই আশা পূরণ হয়েছে লেখকের জীবনসায়াহ্নে। অন্যতম প্রধান কারণ, মাঝখানের বছরগুলোতে টমাস মান The Magic Mountain, The Holy Sinner, Death in Venice প্রভৃতি উপন্যাস রচনায় ব্যস্ত ছিলেন।
এখন আমরা উপন্যাসটির ভেতরে প্রবেশ করব। ফেলিক্স এক অন্তঃসারশূন্য বিত্তবান পরিবারের সন্তান। বাবা মদ ব্যবসায়ী। একটা পর্যায়ে আয় কমে এলেও ব্যয় প্রবণতা, হৈ-হল্লা আর জাঁকজমকে মগ্ন গোটা পরিবার। এমন পরিবেশে বড় হচ্ছিল ফেলিক্স। শিশু বয়সেই সে পিতার সই জাল করা শিখেছিল; উদ্দেশ্য স্কুল পালানো। অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠলে ফেলিক্সের বাবা আত্মহত্যা করেন। নিরুপায় মা হোটেল খোলেন। বোন থিয়েটারের নর্তকি হন। ফেলিক্স পথে নামে সৌভাগ্যের খোঁজে। ফেলিক্স প্রথমে কৌশল করে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়টি এড়াতে পারে। এরপর সে ফ্রাঙ্কফুট যায়। সেখানে নাম-ডাক আছে এরকম এক গণিকার সহকারী হিসেবে কিছুদিন কাজ করে। তারপর প্যারিসে চলে আসে। এখানেই আরম্ভ হয় তার আসল কর্মকাণ্ড।
প্যারিসের এক হোটেলে লিফটবয়ের চাকরি নেয় ফেলিক্স। লিফটে ওপর-নিচ করে আর ভাবে, কীভাবে সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এ মহানগরে। তার আগে, সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময়, কাস্টমসে তল্লাশি চলাকালে ফেলিক্স এক মহিলার গয়নার বাক্স চুরি করে। তার হাতে এখন গয়না বিক্রির টাকা, পরিমাণে কম নয়। উপরন্ত ফেলিক্স সুঠাম শরীরের টগবগে যুবক। সে অফিস-আওয়ারে লিফট চালায় আর অন্য সময় ঘুরে বেড়ায় নানা জায়গায়। নিরুদ্বেগ দিন কাটছিল তার। ডানায় যেন পাখা গজিয়েছে। একদিন মধ্যবয়স্কা এক ধনী লেখিকা তার প্রতি আকৃষ্ট হন। কয়েকদিন পর লেখিকাটি ফেলিক্সকে রাতে ডাকেন এবং তার শয্যাসঙ্গিনী হন। ঘটনাচক্রে লেখিকা জানতে পারেন যে, তার হারিয়ে যাওয়া গয়নার বাক্সটি সরিয়েছে ফেলিক্স। কিন্তু মহিলার মধ্যে মনোবিচলনের কোনো ভাব দেখা যায় না। লেখিকার স্বামী খুবই ধনাঢ্য ব্যক্তি কিন্তু আহাম্মক ধরনের মানুষ। অলংকার চুরির বিষয়টি জানতে পারলে রেগে ওঠা তো দূরের কথা তাকে হয়তো অনেক বেশি পরিমাণ গয়না কিনে দেবেন। এরকম এটা-ওটা ভেবে লেখিকা ফেলিক্সকে বেশ কিছু টাকা দান করেন। আর্থিকভাবে বেশ সচ্ছল হয়ে ওঠে ফেলিক্স। তার আছে আরেক দুর্লভ সম্পদ ভরা যৌবন এবং সুঠাম দেহ। প্যারিসের নাইট-ক্লাবগুলোতে তার পা পড়তে শুরু করল। মহানগরীর নৈশ জীবনে, ক্রমে, সে হয়ে উঠলো প্লে-বয়।
দিনের বেলা হোটেলের সামান্য চাকুরে, রাতের বেলা মধুলোভী ভ্রমর। কিন্তু এর ভেতর ফেলিক্সের মর্মযাতনাও আছে। কারণ সে তো লিফটম্যান হতে চায়নি। সে চেয়েছে জীবনে সম্মানজনক প্রতিষ্ঠা, যদিও তা সুদূর পরাহত; কেননা অল্প বয়সেই সে চরিত্র খুঁইয়েছে। ফেলিক্সের ছিল মানুষকে ভোলোবাসার আশ্চর্য ক্ষমতা। তার রূপ-যৌবনে আকৃষ্ট এবং কথা-বার্তায় মুগ্ধ হয় এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর মেয়ে। মেয়েটি তার প্রেমে পড়ে। সে প্রেমের আকর্ষণ এমনই যে, সে ফেলিক্সের সঙ্গে বিছানায় যেতেও প্রস্তুত। ওদিকে বিহ্বল, অপ্রস্তুত ফেলিক্স সবিনয়ে এড়িয়ে যায় মেয়েটিকে। এ কঠিন মানস পরিস্থিতি কোনোমতে সামলে নেয় সে। এরপর ভেনোসতা নামের এক শিল্পীর সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। ফেলিক্সের এ শিল্পী বন্ধুটি প্যারিসে এসেছে ছবি আঁকা শিখতে। জাজা নামে একটি তরুণীর সঙ্গে তার গভীর প্রেমের সম্পর্ক। শিল্পীর পিতা মার্কুইস ছেলের প্রতি রীতিমতো ক্ষিপ্ত। জাজা থিয়েটারে গান করে এবং সে মডেলও।
জাজার হাত থেকে ছেলেকে রক্ষা করার জন্য ভেনোসতার বাবা-মা এক ফন্দি আঁটেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, ছেলেকে এক বছরের জন্য বিশ্বভ্রমণে পাঠাবেন। যুক্তি দেন, এ ভ্রমণ তার শিল্পীমানসকে প্রসারিত করবে। ভোনোসতা পড়ে গেল বিপদে। একদিকে জাজার আকর্ষণ, অন্যদিকে পিতা-মাতার অবাধ্য হলে পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা। এহেন উভয় সংকটে ফেলিক্স এগিয়ে আসে। মানুষ ভেনোসতা সম্বন্ধে আগে থেকেই তার কিছু ধারণা ছিল। এবার সে শিল্পী ভেনোসতার স্বভাবের খুঁটিনাটি জেনে নেয়। তারপর শিল্পীর বদলে সে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। ভেনোসতার হাতের লেখা নিখুঁতভাবে নকল করে ভেনোসতা সেজে বাবা-মাকে চিঠিও লেখে।
এভাবে ফেলিক্স ঘুরতে ঘুরতে পর্তুগালে এসে পড়ে। রাজধানী লিসবনে একই সঙ্গে এক মা ও তার মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় ফেলিক্সের। সম্পর্ক অচিরেই প্রেমের দিকে মোড় নেয়। এখানেই অসম্পূর্ণ অবস্থায় শেষ হয় উপন্যাসটি।
টমাস মান ১৯২৯ সালে নোবেল প্রাইজ জিতেছিলেন। দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন তিনি। মোটা মোটা বই লিখে অনেক গভীর ও নাতিগভীর ভাবনা তিনি শেয়ার করেছেন বিশ্বব্যাপী ছড়ানো পাঠকদের সঙ্গে। মান যেমন ভাবগম্ভীর প্রকৃতির লেখক তেমনি তার পাঠকরাও সচরাচর গম্ভীর। মান এবার চাইলেন গম্ভীর পাঠকের মুখে হাসি ছড়াতে। এ হাসি গভীর আত্ম উপলব্ধি এবং জটিল জীবন পরিস্থিতি থেকে উৎসারিত। ‘ঈড়হভবংংরড়হং ড়ভ ঋবষরী কৎঁষষ’ রচনার ভেতর দিয়ে তার ওই চাওয়া সার্থক হয়েছে। এ বই একটি সফল কমিক নভেল। এ ধরনের উপন্যাস জার্মান সাহিত্যে বিরল। মানের লেখার জাদুতে ফেলিক্স ক্রুল হয়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্যের স্মরণযোগ্য চরিত্র। লেখকের ব্যক্তিগত নোট থেকে জানা যায়, ফেলিক্সের গল্প একাধিক খণ্ডে শেষ করার ইচ্ছা ছিল টমাস মানের। কিন্তু তার আগেই চিরবিদায় নিতে হয় তাকে।
ফেলিক্সের মতো একটি নেগেটিভ চরিত্রের আড়ালে মর্মদহন বিরল দক্ষতায় তুলে আনতে পেরেছেন মান। আত্মসম্মানসচেতন ধনী লেখিকা (যিনি বুদ্ধিজীবীও বটে) শারীরিক পরিতৃপ্তির জন্য চাকরপ্রতিম এক ফিলট বয়ের (ফেলিক্স) কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন এবং পরে শিকার হয়েছেন অনিবার্য মানসিক অস্বস্তির। এসব বিষয়ও প্রশংসনীয় ভঙ্গিতে চিত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। উপন্যাসটি মূলত কমিক মেজাজের হলেও তার ভেতরের অশ্র“বিন্দুগুলো তাকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা।

বেসিক ব্যাংকে বিপর্যয়

একটা সময় রাষ্ট্রীয় খাতের বেসিক ব্যাংক ছিল একটি আদর্শ ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থেকেও বাংলাদেশে কীভাবে একটি ব্যাংক বছরের পর বছর মুনাফার মুখ দেখতে পারে ও দক্ষভাবে পরিচালিত হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল বেসিক ব্যাংক। যেহেতু অনেক ছোট পরিসরে ও অল্প শাখা নিয়ে পরিচালিত হতো, সেহেতু এর ওপর নজরদারিও ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু গত পাঁচ বছরে রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, বিশেষত চেয়ারম্যান ঋণ বিতরণ থেকে নিয়োগ পর্যন্ত—সর্বত্র নিয়মকানুন উপেক্ষা করে ব্যাংক পরিচালনা করতে থাকায় এখন এই ব্যাংকটি রাষ্ট্রের জন্য নতুন এক বোঝায় পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আর্থিক খাতে একটি বড় ক্ষত তৈরি করা হয়েছে। অথচ প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে গত তিন বছরে বিভিন্ন সময়ে বেসিক ব্যাংকের বিপর্যয়ের চিত্রটি জনসমক্ষে প্রকাশ পেয়েছে। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পর্ষদ চেয়ারম্যান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে নিজের নিবিড় যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংকের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদ ব্যাংকের রীতি–বিধি অনুসরণ না করে ও যাচাই-বাছাইয়ের তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে ধরা পড়ে যে অন্তত ৬৭ জন গ্রাহককে দুই হাজার ৫৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ অনিয়ম করা দেওয়া হয়েছে। আবার নানা কৌশলে জালিয়াতি করে পর্ষদের সহযোগিতায় ব্যাংক থেকে অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি তুলে নেওয়ার বিষয়টি দুই বছর আগেই ধরা পড়ে। এর মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে; কিন্তু মাঝপথে তা থেমে যায়।
উদ্বেগজনক হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় ব্যাংকটির ঋণ–পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। আর তাই অনিয়মের বিষয় চিহ্নিত করার পরও তা প্রতিকারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বেসিক ব্যাংকের বিষয়ে বরাবরই নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিলেও কোনো কাজ হয়নি। বরং প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনকে ‘অজ্ঞতাপ্রসূত’ ও ‘অতিরঞ্জন’ বলে সমালোচনা করা হয়েছে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গত রোববার অপসারণ করা হয়। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম ও বিপর্যয় ঘটানোর মূল দায়দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের। আর তাই গোটা পর্ষদ ভেঙে না দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বরং আরও আগেই এটা ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল। হল-মার্ক কেলেঙ্কারির পর যদি সোনালী ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করা যেতে পারে, তাহলে কেন বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ নয়— এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে এই সুপারিশ করেছে। এটি বাস্তবায়ন করা না হলে সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয় আর্থিক খাতে অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা উৎসাহিত করার মন্দ দৃষ্টান্তই স্থাপন করবে।

প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ মাতৃত্ব

প্রজনন স্বাস্থ্য বলতে প্রজননতন্ত্রে সামগ্রিক সুস্থতা েবাঝায়। একজন গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য প্রসবের যাবতীয় সেবা এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা পাওয়ার অবশ্যই অধিকার রাখেন। এটা গর্ভবতী নারীর সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। নারীর গর্ভধারণ ও শিশু জন্মদানের প্রক্রিয়া প্রত্যেক মায়ের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় স্ত্রীর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতার জন্য সবার আগে তাঁর স্বামীর সহযোগিতা প্রয়োজন। একজন মা যদি গর্ভধারণে পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, গর্ভধারণের আগে নিজেকে প্রস্তুত করেন, প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে মা ও শিশুর সুস্থতা কোনো জটিল বিষয় হবে না। সন্তান ধারণ বিষয়টিকে নারীর ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে দরিদ্র পরিবারে গর্ভবতীর প্রতি বিশেষ যত্ন ও নিয়মিত চিকিৎসাব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অনেক অসচ্ছল পরিবারে গর্ভবতী নারী যথাযথ প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান না। এভাবে পারিবারিক অসচেতনতা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার নিম্নমুখী মান, ভুল চিকিৎসা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামি সর্বোপরি নারীর প্রতি পরিবারের পুরুষের অবহেলার কারণে নারীরা যথাযথ মাতৃস্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ সন্তান গর্ভে আসার মুহূর্ত থেকেই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে সুস্থ শিশুর জন্ম দেওয়া সম্ভব এবং মাতৃস্বাস্থ্য নিয়েও কোনো চিন্তা করতে হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ ও দাওয়া (ওষুধ) দুটিই পাঠিয়েছেন এবং প্রতিটি রোগেরই ওষুধ পাঠিয়েছেন।
সুতরাং তোমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করো।’ (মিশকাত ও আবু দাউদ) মায়ের বয়স, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং গর্ভকালীন খাবারের সঙ্গে মা ও শিশুমৃত্যুর হারের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে গর্ভবতী মায়ের অপরিমিত খাবার একটা সাধারণ ব্যাপার। খাদ্যের বেলায় আর্থিক সংগতি যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী কুসংস্কার অর্থাৎ শিক্ষার অভাব। মাতৃগর্ভে ভ্রূণের যথাযথ পরিপুষ্টি প্রয়োজন। ভ্রূণের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। তাই গর্ভবতী মায়ের সুষম খাদ্য ও পুষ্টিমানের বাড়তি খাবারের দরকার। বিশেষ করে, গর্ভধারণের শেষের তিন-চার মাস থেকে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন খুবই বেশি। এ জন্য সুস্থ ও সবল শিশু পেতে হলে গর্ভাবস্থায় মাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য খেতে দিতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সন্তানের বাবার দায়িত্ব হলো মায়ের খাওয়া-পরার উত্তম ব্যবস্থা করা।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-২৩৩) সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর খাবারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা (স্বামীরা) যা খাবে, তাদের (নারীদের) তা-ই খেতে দেবে।’ গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ ও ঘন ঘন সন্তান জন্মদানের কারণে মেয়েদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, ফলে মারাত্মক অসুস্থতার কারণে মাতৃমৃত্যুর মতো বেদনাদায়ক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। তাই প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। মাতৃমৃত্যু রোধ ও অসুস্থতার হার কমানোর জন্য প্রজনন বয়সী মা এবং জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরিবার পরিকল্পান সেবা প্রদানকারীদের যথাযথ যোগাযোগ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্য সুঠাম ভাবী প্রজন্ম সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সুঠাম কার্যকর সন্তানসন্ততি উৎপাদন করে উন্নত দেশ-জাতি ও পৃথিবীকে মানুষের বসবাস উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। এ জন্য মুসলিম পরিবারে নারীর গর্ভধারণ থেকে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত মাকে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা, সৎ পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে একাধিকবার প্রয়োজনীয় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ ইসলামের বিধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) যথার্থই বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা করো।
কারণ যিনি রোগ দিয়েছেন, তিনি তার প্রতিকারের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’ একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় প্রসূতিকালীনও নারী শ্রমিকেরা মাতৃকল্যাণ সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। অথচ গর্ভকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, বিশেষ যত্ন, খাদ্য ও পুষ্টি পাওয়া যেকোনো নারীর আইিন অধিকার। মাতৃত্ব অর্জন নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বও বটে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও মানবসমাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য মাতৃত্ব লাভ জরুরি। তাই কর্মজীবী নারীরা যেন নিরাপদে মাতৃত্ব লাভের সুযোগ পান, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও মালিকসহ সবার; কারণ এটি নারী শ্রমিকের আইিন অধিকার। প্রকৃতপক্ষে নিরাপদে মা হওয়া প্রত্যেক নারীরই ন্যায়সংগত অধিকার। এর সঙ্গে সভ্য দেশ ও উন্নত জাতি গঠনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাধারণত বাল্যবিবাহ ও গর্ভসঞ্চার, অপরিকল্পিত গর্ভধারণ, কিশোরী মায়ের পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ, সুচিকিৎসার অভাব প্রভৃতি কারণে নারীর নিরাপদে মা হওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তাই প্রজনন স্বাস্থ্যসচেতনতা, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ, মাতৃমৃত্যু রোধ করা এবং পরিবার পরিকল্পনাকে গতিশীল করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবায় মসজিদের ইমাম-খতিবদের ভাষণের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে জেগে উঠতে পারে প্রজনন স্বাস্থ্যসচেতনতাবোধ। মূলত জাতি-ধর্ম-দল-মতনির্বিশেষে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কার্যকর ভূমিকার ফলেই প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, জন-উর্বরতা, শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ, গর্ভবিরতিকরণ, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি-সংক্রান্ত জ্ঞান ও যথাযথ ব্যবহার—এসব মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ে সমাজে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি হতে পারে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

সরকার, তুমি তার by আনিসুল হক

এই গল্পটা বলেছিলেন আব্রাহাম লিংকন।
আব্রাহাম লিংকন সবে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। গৃহযুদ্ধের পরে।
দলে দলে লোকে তাঁর কাছে এসে বলতে লাগল, ‘আমরা দেশের জন্য অনেক স্বার্থ ত্যাগ করেছি। পদ চাই। আমাদের মূল্যায়ন করুন।’
তখন আব্রাহাম লিংকন এই গল্পটা করেন।
এক রাজা বেরোবেন শিকারে। তিনি মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজকের আবহাওয়া কেমন? পথে ঝড়বৃষ্টি হবে না তো?’
মন্ত্রী বললেন, ‘না না, আজ ঝড়বৃষ্টি হবে না। আবহাওয়া চমৎকার।’
কিছুদূর যাওয়ার পর এক ধোপার সঙ্গে দেখা। ধোপা বললেন, ‘রাজামশাই, বেশ তো চলেছেন, কিন্তু সামনে তো ঝড়বৃষ্টি হবে।’
রাজা এগোলেন। ঝড়বৃষ্টির কবলে পড়লেন।
তখন তিনি ওই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে সেই পদে বসালেন ধোপাকে।
ধোপা বললেন, ‘রাজামশাই, যখন ঝড়বৃষ্টি হয়, তখন আমার গাধার কান নড়ে। গাধার কান নড়া দেখে আমি বুঝেছিলাম, আজ বৃষ্টি হবে।’
রাজা তখন ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাটাকে মন্ত্রী বানালেন।
তখন হলো আসল বিপদ। রাজার সভাসদেরা দলে দলে এসে রাজাকে ঘিরে ধরলেন, ‘আমরাও তো গাধা। আমাদেরও মন্ত্রী বানান।’
আব্রাহাম লিংকন কেন এই গল্পটা বলেছিলেন, আমার জানা নেই, কিন্তু একটা কিছু অনুমান তো করে নিতেই পারি। এখন, এই মুহূর্তে কেন এই গল্পটাই মনে পড়ে গেল, তারও কোনো ব্যাখ্যা খঁুজে পাচ্ছি না।
একটা সূত্র খঁুজে পাওয়া যাচ্ছে অবশ্য। ‘জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার’—সেই বিখ্যাত গেটিসবার্গ ভাষণ দেওয়া আব্রাহাম লিংকনের কথা এত বছর পরেও আমাদের জন্য আলোর দিশা দেখাতে পারে বটে।
লিংকনের গল্প থেকে অন্তত এই উপদেশটা পাওয়া যায়, কোনো মন্ত্রী কাজে না লাগলে তাঁকে বরখাস্ত করো।
২৯ মে প্রথম আলোয় হাসান ফেরদৌসের কলাম ছাপা হয়েছে, ‘সরকার, তুমি কার?’ ওই লেখায় তিনি আমাদের শুনিয়েছেন ম্যাসাচুসেটস থেকে নির্বাচিত মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনের গল্প, শুনিয়েছেন উদারনৈতিক এই সিনেটরের লেখা আ ফাইটিং চান্স বইয়ের কথা। এলিজাবেথ ওয়ারেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকও৷ বলেছেন, ‘সরকার হচ্ছে ফুলবাগানের মতো, সময়মতো যত্ন না নিলে তাতে আগাছা জন্মে, পরগাছা আশ্রয় নেয়।’
হাসান ফেরদৌসের লেখা পড়ে বুঝলাম, আমাদের দেশে সরকারের অবস্থা তেমনই হয়েছে; খুনি, দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজেরা সরকার নামের বটবৃেক্ষর গায়ে পরগাছার মতো জন্ম নিয়েছে। এ থেকে মুক্তির উপায় খঁুজতে হাসান ফেরদৌস এলিজাবেথ ওয়ারেনের পরামর্শেরই শরণাপন্ন হয়েছেন৷ ওয়ারেন বলছেন, সমাজ ও সরকারকে বদলাতে ক্রমাগতভাবে লড়ে যেতে হয়, সেই লড়াই দীর্ঘ, বন্ধুর; তবে শেষ পর্যন্ত বিজয় আসেও।
অগ্রজপ্রতিম লেখক হাসান ফেরদৌসের সঙ্গে দ্বিমত করছি না, তবে আমি আরও কাছের উদাহরণ দিতে চাই। একটা সরকারের বা এই সরকারের কী করা উচিত, তার একটা অপরূপ ব্যবস্থাপত্র তৈরি ও উপস্থাপন করা আছে। সেটার ৫০ ভাগও যদি মান্য করা হয়, বাংলাদেশ সোনার বাংলায় পরিণত হবে। এই ব্যবস্থাপত্রটা দিয়েছিলেন, না, আর কেউ নন, স্বয়ং শেখ হাসিনা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাঁর নেতৃত্বে মহাজোট তিন-চতুর্থাংশ আসনে জয়লাভ করার পর তিনি একটা সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। সে সময়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ৩১ ডিসেম্বর ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর আগে-পরেও শেখ হাসিনার বিভিন্ন ভাষণে এবং আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব সুবচন উচ্চারিত হয়েছিল।
শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না, আমরা সংঘাতের রাজনীতি বর্জন করতে চাই, দেশে একটা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘এ কথা সত্য যে আমাদের অনেকেই বিএনপি-জামায়াতের প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়েছি, সর্বস্ব হারিয়েছি, কিন্তু যেহেতু আমরা জয়লাভ করেছি, আমাদের ক্ষমা করে দিতে হবে এবং সবাই মিলে একসঙ্গে দেশের ভালোর জন্য কাজ করে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই বিশাল জয় তখনই সার্থক হবে, যখন আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে এবং কষ্টার্জিত স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়িত করা যাবে।’

‘আমরা বিরোধী দলকে তাদের আসনসংখ্যা দিয়ে বিবেচনা করব না। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল সরকারেরই একটা অংশ, তাদের ইতিবাচক অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদকে কার্যকর করা যাবে।’ এক বিদেশি সাংবাদিক সাংসদদের দুর্নীতি বিষয়ে প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, কারণ এটা আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। আমি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফল আমাকে ঘটাতেই হবে। এ জন্য সবার সহযোগিতা আমি চাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নতুন সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমানো, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে একটা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত ডিজিটাল সোনার বাংলা গড়ে তুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাবে। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনে নিয়োগ-পদোন্নতির মাপকাঠি হবে যোগ্যতা, দলীয় পরিচয় বা আনুগত্য নয়।’এর আগে-পরে তিনি বহুবার বলেছেন, ‘অপরাধী যে দলেরই হোক না, অপরাধী হলো অপরাধী, এটাই একমাত্র বিবেচ্য, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও এসব কথা সুন্দরভাবে বলা আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে। মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা হবে। একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রশাসনে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধা হবে নিয়োগ ও পদোন্নতির ভিত্তি। স্থানীয় সরকারগুলোকে কার্যকর করা হবে। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করা হবে।
এখন আমাদের সবার উচিত, ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া শেখ হাসিনার ভাষণটির কপি পকেটে রেখে দেওয়া ও সকাল-সন্ধ্যা একবার করে পড়ে নেওয়া। অপরাধীর কোনো দল নেই। সে অপরাধী, এটাই তার একমাত্র পরিচয়। এই সূত্র যদি আমরা মেনে চলতাম, আজ কোনো অপরাধীই কি ছাড়া পেত? তাহলে কি দেশ খুনখারাবি, গুম-অপহরণের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারত?
অল পাওয়ার টেন্ডস টু করাপ্ট অ্যান্ড অ্যাবসল্যুট পাওয়ার করাপ্টস অ্যাবসল্যুটলি। সব ক্ষমতাই দুর্নীতিগ্রস্ত করতে চায়, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দুর্নীতিগ্রস্ত করে নিরঙ্কুশভাবে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকটন (১৮৩৪-১৯০২) এই কথা বলেছিলেন। অ্যাকটন ইনস্টিটিউটের প্রকাশনায় বেন মরিল নামের একজন লেখক সহজ ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ‘ক্ষমতা যিনি পান, তাঁর কিন্তু মানুষের খারাপ করার ইচ্ছা থাকে না। তিনি আসলে ভালোই করতে চান। এটা তাঁর দায়িত্ব। কিন্তু মানুষ তো আসলে বোঝে না, ভালো কী। কাজেই এটা তাঁর দায়িত্ব মানুষকে তাঁর ভালোটা করতে সাহায্য করা। মানুষ ভালো বোঝে না, আমি বুঝি, আমার দায়িত্ব মানুষের ভালো করা৷ কাজেই মানুষের মঙ্গলের জন্য কল্যাণের জন্য আমি একচ্ছত্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করি। সেটার প্রয়োগ করি।’ এখানেই শুরু হয় বিপদটা।
বেন মরিল বলেছেন, ‘তখন এমন আইন প্রণয়ন করতে হয়, প্রয়োগ করতে হয়, যাতে মানুষের ভালো করার দায়িত্বটা বাধাহীনভাবে পালন করা যায়। যাদের ভালো করার জন্য এটা করা হচ্ছে, তাদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হয়। আর তখন চারপাশে এমন বন্ধু ও সহকর্মী এসে জোটে, যারা সারাক্ষণ তার প্রশংসা করে, আর নিজেরাও অন্যদের দমন করার মধ্যেই আনন্দ খঁুজে পায়। আর এসব সভাসদ পাত্রমিত্র অমাত্যকে অন্যায়ভাবে কাজ দেওয়া, ব্যবসা দেওয়া, লাভ দেওয়ার ঘটনা ঘটতেই থাকে। দীর্ঘদিন ধরে যিনি ক্ষমতায় আছেন, তিনি মনে করেন, ক্ষমতাই জ্ঞান। জনগণ তাঁকে নির্বাচিত করেছেন, এটা কেবল তাঁকে ক্ষমতা দেয়নি, জ্ঞানও দিয়েছে।’
আস্তে আস্তে সবচেয়ে ক্ষমতাবানই সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাঁর আশপাশে সুবিধাভোগী পরামর্শকেরা তাঁর এই ধারণার গোড়ায় নিত্য জল দিতে থাকেন।
তিনি আস্তে আস্তে ভুলে যান, কোনটা ক্ষমতা আর কোনটা দুর্নীতি। এ দুটোর মধ্যে তিনি আর পার্থক্য করতে পারেন না।
আব্রাহাম লিংকন দিয়ে শুরু করেছিলাম। তাঁকে দিয়েই শেষ করা উচিত। তাঁর একটা উক্তি: আমার প্রবল ভয় তোমার বিফলতা নিয়ে নয়, আমার
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো, সেই ব্যর্থতা নিয়েও তুমি সন্তুষ্ট কি না।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।