Monday, December 9, 2024
শৈশবের স্কুলে গিয়ে আপ্লুত উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত
পিতার কর্মসূত্রের কারণে উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের শৈশব ও কৈশোর কাটে যশোরে। এ সময় তিনি যশোর জিলা স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯৫৮ সালে পিতার বদলিজনিত কারণে তিনি জিলা স্কুল ছেড়ে চলে যান। তারপর কেটে গেছে ৬৬ বছর। গত শুক্রবার রাষ্ট্রীয় কাজে যশোর আসেন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। ওঠেন যশোর সার্কিট হাউসে। সার্কিট হাউসের দক্ষিণ প্রাচীর ঘেঁষা যশোর জিলা স্কুল। সার্কিট হাউসে প্রবেশ করেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম শেষ করে স্কুলে বেড়াতে যাবেন। ফলে শুক্র ও শনিবারের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রোগ্রাম শেষ করে তিনি গতকাল সকালে বিমানবন্দরে যাওয়ার আগেই বেলা সাড়ে ১০টার দিকে ছুটে যান নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্কুলের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রধান শিক্ষকের রুমে ভিড় করতে থাকেন। এ সময় উপদেষ্টা নিজে উঠে গিয়ে উপস্থিত সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। খবর পেয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকর্মী ছুটে যান জিলা স্কুলে এবং উপদেষ্টার কাছে তাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে তাদের কী করণীয় সে সম্পর্কে উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করেন। উপদেষ্টা বলেন, ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবিলা করতে আমাদের সকল ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। ভারত ভিসা বন্ধ করে দেয়ায় আমাদের তেমন একটা ক্ষতি হয়নি; ক্ষতি যা হওয়ার তা তো ভারতের হচ্ছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু ভারতের যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা সে পুষিয়ে নেবে কি করে। তিনি ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবিলায় সর্বস্তরের ছাত্র জনতাকে সরব হওয়ার আহ্বান জানান।
পরে তিনি বিদ্যালয়ের পরিদর্শন বইতে তার মন্তব্য লিখে স্বাক্ষর করেন। এর আগের দিন রাতে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সব রাষ্ট্রীয় প্রটোকল উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের বেশে যশোর শহরের কালেক্টরেট চত্বর, প্যারিস রোড় খ্যাত বই মার্কেট, পিঠা পুলির দোকান ও ধর্মতলায় গরুর খাঁটি দুধের চায়ের দোকান ঘুরে ঘুরে দেখেন। এক পর্যায়ে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন প্যারিস রোড়ের রাস্তার পাশে টুলে বসে যান এবং যশোরের স্মৃতিবিজড়িত চিতই পিঠা, কুলি পিঠা, ভাপা পিঠা, ছিটরুটি ও হাঁসের মাংসের স্বাদ গ্রহণ করেন। পরে তিনি ধর্মতলায় যান এবং রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে গরুর খাঁটি দুধের চা পান করেন। এ সময় তার সঙ্গে ২/১ জন সরকারি অফিসার ছাড়া কোনো পুলিশ প্রোটেকশন বা সরকারি কোনো প্রটোকল ছিলো না এবং তিনি তা নিতে চাননি। এ সময় উপদেষ্টা রাস্তার পাশে বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের নানা সমস্যা ও তার সমাধানের নানা দিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। এবং বিভিন্ন বিষয়ে সাধারণ মানুষকে তিনি পরামর্শ প্রদান করেন।
এ সময় সাধারণ মানুষকে বলতে শোনা যায়, সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা তরিকুল ইসলাম মন্ত্রী থাকাকালীন এভাবেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে চায়ের দোকানে বা রাস্তার পাশের ওষুধের দোকানে বা গাড়ি খানা রোডের মানবাধিকার সংগঠনের অফিসে বা দৈনিক মানবজমিন পত্রিকা অফিসে বসে সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নিতেন। তাদের নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। আজ ১৫ বছর পর সরকারের একজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টা ঠিক সেইভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলেন। এটাই পরিবর্তন। এর জন্যই ছাত্র-জনতা জুলাই বিপ্লবে অকাতরে প্রাণ দিয়ে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে দিয়েছে। আজ দেশে সত্যিকারের গণমানুষের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
Friday, November 22, 2024
বৃটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসে কনফারেন্স: ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নির্বাচন হতে পারে বললেন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন by আরিফ মাহফুজ
বৃটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) বিকালে মানবাধিকার সংগঠন ‘ভয়েস ফর বাংলাদেশ’ আয়োজিত কনফারেন্স শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে না গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতো। সেটা দেশের জন্য ভালো হতো না।’
‘ডিসকাশন অন ডেমোক্র্যাটিক কলাপ্স অ্যান্ড রিবিল্ডিং অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন হাউস অব লর্ডসের সিনিয়র সদস্য আলেকজান্ডার চার্লস কার্লাইল কিউসি। কনফারেন্স পরিচালনায় ছিলেন ভয়েস ফর বাংলাদেশের ফাউন্ডার ও ব্রডকাস্টার আতাউল্লাহ ফারুক। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
কনফারেন্সে ৫ই আগস্টের আগে ও পরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন আলোচকরা। এ সময় গত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট বিরোধী অবস্থানে পাশে থাকায় যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সবাইকে ধন্যবাদ জানান ভয়েস ফর বাংলাদেশের ফাউন্ডার আতাউল্লাহ ফারুক। তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছর বাংলাদেশে কোনো বাক স্বাধীনতা ছিল না। মিথ্যা মামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এখন আমরা কথা বলতে পারছি। স্বাধীনভাবে নিজ দেশে ভ্রমণ করতে পারছি।’
কনফারেন্সে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান লেবার এমপি ড. রুপা হক।
সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী পল স্কালি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। তার সঠিক তদন্ত শেষে যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে এ ধরনের ঘটনার পুররাবৃত্তি না হয়।’
কনফারেন্সে নিজের বক্তব্যে লর্ড হোসাইন বলে, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সকল সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে সব ধরনের সহায়তা পাবে।’
কনফারেন্সে টেরোরিস্ট সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধের আহ্বান জানান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ার সাবেক প্রধান আব্বাস ফায়েজ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী মাইকেল পোলাক বাংলাদেশে নিজের দুই বার সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘তিনি নিশ্চিত এবার যখন বাংলাদেশে যাবেন, তখন অনেক মুক্ত অনুভব করবেন।’
এছাড়াও কনফারেন্সে আলোচক হিসেবে অংশ নেন আইনজীবী ও কলামিস্ট-ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ। পাশাপাশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

Thursday, November 21, 2024
আহতদের চিকিৎসায় বিলম্বের জন্য দেশের দুর্বল ব্যবস্থাপনা দায়ী: উপদেষ্টা সাখাওয়াত by আরিফ মাহফুজ
মঙ্গলবার ভয়েস ফর বাংলাদেশ কর্তৃক বৃটিশ পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষ হাউস অব লর্ডস-এ আয়োজিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্যানেল আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এই মন্তব্য করেন। লর্ড হোসাইনের সভাপতিত্বে কী নোট স্পিকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
কনফারেন্স শেষে বাংলাদেশি কমিউনিটির গণমাধ্যমকর্মীদের নানা প্রশ্নের জাবাব দেন এম সাখাওয়াত হোসেন। আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় বিলম্ব হচ্ছে কেন? এর উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের দেশের চিকিৎসা বাবস্থাতো আপনারা ভালো করেই জানেন। সাধারণ একজন লোক যদি চিকিৎসার জন্য যায় তাকে চিকিৎসা করতে কত দিন লাগে। আমাদের ব্যবস্থাপনাটা খুবই দুর্বল।
আপনি বলেছেন শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে দেয়া হয়েছে; উত্তরে তিনি বলেন, আমি পালিয়ে যেতে দেয়া হয়েছে বলেনি। আমার কথাটা আবার শুনেন যেটা আমি বলেছি উনি যদি থাকতেন তাহলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। পুলিশ আত্মসমর্পণ করার পর যেভাবে সবাই গণভবনের দিকে আসছিলো, গণভবনের দেয়াল ভেঙ্গে যেত। ভেতরেই তাকে ছিড়ে ফেলতো। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি এটি দেশের জন্য খুব ভালো হতো না।
সম্প্রতি দুই উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে ছাত্রদের আপত্তির বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা আপনারা জিজ্ঞেস করেন যারা নিয়োগ দিয়েছেন তাদের। যাদের কথা বলেছেন তারা কীভাবে নিয়োগ পান আমি বলতে পারবো না।
কনফারেন্স অন্যান্য প্যানেল মেম্বাররা ছিলেন লর্ড কার্লাইল, সাবেক বৃটিশ মন্ত্রী পল স্কালী, বৃটিশ এমপি রুপা হক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সাউথ এশিয়া এক্সপার্ট আব্বাস ফয়েজ ও ব্যারিস্টার মাইকেল পলক, ব্যারিস্টার নাজির আহমেদ প্রমুখ।

Sunday, August 4, 2024
আমার অচেনা দেশ by ড. এম সাখাওয়াত হোসেন
শুধু আবু সাঈদের মৃত্যুই নয় বেশির ভাগ মৃত্যুই হয়েছে গুলির আঘাতে এবং অর্ধেকের বেশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্র- যার মধ্যে কলেজ এবং স্কুলের ছাত্রও রয়েছেন। এদের মধ্যে প্রায় ছয় জন ছাত্রীও রয়েছেন। এ ধরনের এবং এসব মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
যদিও সরকার একক বিচারপতির নেতৃত্বে আবু সাঈদের মৃত্যুর (যদি আমার অনুমান সঠিক হয়) বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের হুকুম দিয়েছেন; তবে এতগুলো আন্দোলনরত ছাত্রের মৃত্যুর প্রতিটির কোনো অনুসন্ধান হবে কিনা জানা যায়নি। যেমন জানা যায়নি- এ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত সহিংসতার অনেক বিষয়। এসব মৃত্যুর কারণও হয়তো জানা যাবে না- বুলেটে না প্যালেটে। এ আন্দোলনে বেশ কিছু সংরক্ষিত স্থানে হামলা হলো আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করার বেশ কয়েকদিন পার হওয়ার পর। এর মধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্কের কেন্দ্র, বিআরটিএ ভবন। যেখানে ঢাকা শহর তথা অন্যান্য জেলার যানবাহনের বিভিন্ন ডিজিটাল খতিয়ান হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। বিআরটিএ ভবনের অদূরেই সেতু ভবন; সেখানেও ভাঙচুর এবং আগুন লাগানো হয়েছিল। প্রশ্ন থাকে, এসব স্থাপনা সংরক্ষিত স্থাপনা; যাকে নিরাপত্তার আলোকে ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ (কচও) হিসেবে লিস্ট পুলিশের হাতে থাকার কথা। এই স্থাপনাগুলোকে যেকোনো আন্দোলন অথবা নাশকতার মতো অবস্থা হলে এসব সংরক্ষিত স্থান (কেপিআই) অবশ্য নিরাপদ করার জন্য প্রতিরক্ষা করবার কথা। এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষা করার কল্পে বাড়তি বা অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করার কথা। এরই আওতায় কারাগারও অন্তর্ভুক্ত- বিশেষ করে নরসিংদীর কারাগার। যেখানে বেশ কয়েকজন কথিত জঙ্গিরাও ছিলেন।
আমি কেপিআই বা সংরক্ষিত স্থাপনাগুলোর বিষয় আগেও বলেছি। এগুলো সময় সময় পরিবর্ধন এবং পরিবর্তন হতে থাকে। সংযোজন ও বিয়োজন হতে থাকে। যত নতুন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বাড়তে থাকে তত বাড়তে থাকে তালিকা। এসব তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর, জেলা পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর নিকট রক্ষিত। আমার এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো দৃশ্যত এসব স্থাপনা, বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশন, ডাটা সেন্টার এবং বিআরটিএ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য কেপিআই বর্ণিত রক্ষা ব্যবস্থা ছিল কিনা? থাকলে ঘণ্টাব্যাপী কর্মকর্তাদের মতে, কথিত দুষ্কৃতকারীরা হামলা চালালো কীভাবে? রাস্তায় নয়, হতাহত হওয়ার কথা ছিল ওই সব স্থাপনার আশপাশে তেমনটি শোনা যায়নি। জানা যায়নি- আক্রমণকারীদের কতোজন হতাহত হয়েছিল? কাজেই ধরে নেয়া হয় কেপিআই (কচও) হওয়া সত্ত্বেও এবং ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (ঝঙচ) থাকা সত্ত্বেও মেট্রোরেল স্টেশনসহ সব প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণে কেন ঝঙচ মানা হয়নি? এগুলো সংরক্ষণের ঝঙচ মোতাবেক কাদের বা কার দায়িত্ব ছিল? আমি মনে করি সরকারের এ বিষয়ে ব্যাপক তদন্ত এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে তাদের খুঁজে বের করার আগে সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরির হোতাদের চিহ্নিত করা উচিত এবং ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণের জন্যও এ ধরনের তদন্তের প্রয়োজন। এসব স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা কেন প্রতিহত করা গেল না। অন্যতম স্থাপনা নরসিংদীর জেলা কারাগার আক্রমণ এবং প্রায় ৯শ’ কয়েদি যার মধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক কথিত জঙ্গি- যেখানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের বেশ কিছু কয়েদি ছিল। কারাগারও নিশ্চয় সংরক্ষিত স্থাপনা বা কেপিআই (কচও)। এমন স্থাপনার সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে এটা রক্ষা কেন করা গেল না? এই আক্রমণের সময় কতোজন হতাহত হয়েছিল জানা যায়নি। প্রশ্ন থাকে কীভাবে (কতোগুলো) রাইফেল বা আগ্নেয়াস্ত্র লুট হলো। দুষ্কৃতকারী শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে এসব স্থাপনা অরক্ষিত কেন ছিল এবং কার ব্যর্থতা তা খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।
মাত্র কয়েকদিন আগে চ্যানেল একাত্তরের একটা এক্সক্লুসিভ ভিডিও দেখলাম- যেখানে দৃশ্যত কথিত টোকাইরা অনায়াসে সেতু ভবনের খোলা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে প্রথমে গাড়িতে পরে হয়তো মেইন অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অথচ সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতাই দেখা যায়নি। ভবনটি মহাখালি ফ্লাইওভার সংলগ্ন। ওই এলাকায় ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসংখ্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দুষ্কৃতকারীরা কীভাবে নির্বিঘ্নে আগুন লাগিয়ে চলে গেল? এগুলো কিসের আলামত? প্রশ্ন হলো যে এরা কারা? ভবনের দায়িত্বে কারা ছিল এবং কেন সুরক্ষিত ছিল না? এর উত্তর কে দেবে?
এ লেখার মধ্যেই কয়েকটি প্রিন্ট মিডিয়ায় যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে ২১৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে- যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন ১৪৭ জনের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। তার মতে আরও বাড়তে পারে। এ ধরনের মৃত্যুর কথা এমন একটি দেশে, যে দেশ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হয়েছে। গণতান্ত্রিক বলে দাবিদার বাংলাদেশে অতীতে এমন মৃত্যুর খবর শোনা যায়নি। আমরা এখনো নিশ্চিত নই যে, কতোজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে মনে হয় কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা দেরিতে হলেও সঠিক তথ্য বের করে ফেলবে।
যাই হোক, কতোজনের মৃত্যু হয়েছে সেটা মুখ্য নয়, মুখ্য হলো একটি জীবনেরও এভাবে অবসান গ্রহণযোগ্য ও কাম্য নয়। যেসব স্থাপনা নষ্ট হয়েছে যেগুলো আবার নতুনভাবে তৈরি করা যাবে তবে পৃথিবীর সমস্ত অর্থ দিয়ে আবু সাঈদ সহ যে দুই শতের বেশি, যার প্রায় ৭৫ ভাগ ছাত্র ও যুবক, তাদের কী আমরা ফিরে পাবো? এভাবে এত প্রাণ শুধুমাত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া স্মরণকালের ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তারা হয়তো আইনের ফাঁকফোকর থেকে ত্রাণ পাবেন কিন্তু কোনোদিন কি বিবেকের অবক্ষয়ে জ্বলবেন না? ইতিহাস তা বলে না। ঝযড়ড়ঃ ঃড় করষষ? কেন? আমরা কি যুদ্ধে রয়েছি? পুলিশের হাতে স্বয়ংক্রিয় ৭.৬২ রাইফেল যার একটি বুলেট মানে নির্ঘাত মৃত্যু। পুলিশের হাতে এ অস্ত্র দেয়া হয় কোনো ইমার্জেন্সি মোকাবিলায়। প্রশ্ন কেন এভাবে পুলিশের অ্যাকশনে যেতে হবে। সে দৃশ্যগুলো যখন দেখেছি তখন আমার মনে হলো আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো ছায়াছবির দৃশ্য দেখছি। তবে প্রতিপক্ষ- ছাত্র-জনতার হাতের অস্ত্র ছিল ইটের টুকরো আর লাঠি, খুঁজছিলাম কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র- পাইনি অবশ্য। সরকার সমর্থিত ছাত্রদের কাছে দেখেছি। প্রশ্ন থাকে তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এমন আক্রমণাত্মক অবস্থানে গেল? এর জবাব কী শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেবে- না তাদের নিয়ন্ত্রকরা দেবেন? কেন আমাদের সাধারণ পুলিশের হাতে এমন স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র? আমরা এই পরিবর্তন দেখেছি তথাকথিত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর পর। সাধারণত নগর পুলিশের কাছে যে ধরনের সরঞ্জাম থাকে তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জলকামান সহ রঙিন পানির কামান, বড়জোর ছররা বন্দুক বা শটগান থাকার কথা। যদিও রয়েছে সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস- এগুলো অবশ্যই দাঙ্গা দমানোর হাতিয়ার কিন্তু আমরা যা দেখলাম তাহলো একতরফা যুদ্ধ। স্বাধীন দেশে এমন কিছু দেখবো ভাবিনি।
যুদ্ধের ময়দানেও যুদ্ধ করার কতোগুলো নিয়মনীতি থাকে; যেখানে যুদ্ধাহত অথবা আহত প্রতিপক্ষ সৈনিককে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হয়; কিন্তু এ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহতকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। এটা শুধু অমানবিকই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। এসব ধারণকৃত দৃশ্য বহির্বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে। আমি জীবনের এতগুলো বছরে কোনো দেশের সাধারণ মানুষের আন্দোলনে হেলিকপ্টার থেকে সাউন্ড গ্রেনেড বা অন্য অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখিনি। যা বাংলাদেশে গত জুলাই মাসে দেখলাম। আমি হতবাক।
এ সময়ে পৃথিবীর দুটি দেশে বেসামরিক জনগণের আন্দোলনে পুলিশের তৎপরতা দেখেছি। এর একটি আফ্রিকার দেশ কেনিয়া অপরটি ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। কেনিয়াতে শাসক রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটোর বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্দোলনে পুলিশ- জনতার সংঘর্ষ চলেছে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস আর জলকামান ব্যবহার করেছে- কোথাও ৭.৬২ রাইফেল যত্রতত্র ব্যবহার করেনি। অকাতরে মানুষ মরেনি, মরেনি কোনো ছাত্র বা ছাত্রী। তথাপি একজনের মৃত্যু হয়েছে কথিত দুর্বৃত্ত পুলিশের ক্যানেস্তারে এবং একজন সাংবাদিক গান শটে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এই আক্রমণকে ইচ্ছাকৃত বলা হয়েছে। সাংবাদিক ইউনিয়ন সঙ্গে সঙ্গে সে দেশের ‘স্বাধীন পুলিশ ওভারসাইট অথরিটির’ কাছে দ্রুত তদন্ত চেয়েছে; যাতে ওই পুলিশকে দোষী সাব্যস্ত করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।
আর একটি ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাত এবং সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডে আহত হলেও ব্যাপক নিহত হওয়ার অভিযোগ না উঠলেও হানাহানিতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বলা হয়ে থাকে দু’পক্ষের সংঘর্ষে মৃত্যু হয়েছে। তথাপি আমেরিকান অর্গানাইজেশন উদ্বিগ্ন। যাই হোক উপরের দু’টি দেশ যেখানে বেসামরিক মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে সংঘর্ষ বিদ্যমান সেখানে এমন মৃত্যু ও আহতের মিছিল দেখা যায়নি। আগেও পত্রপত্রিকায় মৃত্যুর যে সংখ্যা পাওয়া গেল তার প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ ছাত্রছাত্রী এবং কয়েকজন স্কুলের এবং কোলের শিশুও রয়েছে। এদের সিংহভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেলের গুলিতে। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে এ ধরনের মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের ইতিহাসে এমন মৃত্যুর উদাহরণ ১৯৮৯ সালে চীনের তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে ছাত্র ও জনসাধারণের রিফর্ম-এর দাবির বিরুদ্ধে প্রায় দশ হাজার ছাত্র-জনতার মৃত্যু হয়েছে বলে কথিত। সেখানে আন্দোলন ও অকুতোভয় মৃত্যুর প্রতীক হয়ে অমর শহীদ হয়েছিলেন নাম না জানা এক তরুণ; যিনি দু’হাত প্রসারিত করে সেনাবাহিনীর ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন- তিনি ট্যাংক ম্যান নামে বিশ্বে পরিচিত। তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সের ছাত্র ছিলেন। বিশ্বের বহু জায়গায় এই ভাস্কর্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুটা হলেও রংপুরের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ এমনই প্রতীক হয়ে পড়েছেন বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে প্রায় ২১৬ জনের মৃত্যু চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে যা ঘটে গেল- এত মৃত্যু, এত রক্ত, যেভাবেই চিত্রায়িত করুক না কেন এ হত্যাকাণ্ডে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যু নিয়ে সুবিধাবাদীরা যে ব্যাখ্যাই দিক না কেন তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উপসংহারে পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, সরকার বা সমাজের এক শ্রেণির মানুষ যারা ক্ষমতা ভোগ করছেন, তারা এ হত্যাকাণ্ডের দায়-দায়িত্ব কতোখানি নেবেন? আর যারা ‘ট্রিগার চাপার’ সময় একবারও পরিণতির কথা ভাবেননি। হয়তো বলবেন, এটা ছিল তাদের দায়িত্ব। কিন্তু দায়িত্ব কি নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর ট্রিগারে বিবেকহীনভাবে চাপ দেয়া? সংরক্ষিত স্থাপনাগুলো রক্ষার দায়িত্ব কি ছিল না? এত মৃত্যু, এত লাশ যাদের কারণে হয়েছে/পড়েছে- তারা কী কোনো না কোনো সময় বিবেকের তাড়নায় তাড়িত হবেন না? নিজের সন্তানদের দিকে চোখ তুলে কীভাবে তাকাবেন। একবারও মনে হবে না তাদের এক সদস্যের আকুতি, ‘স্যার একটা মানুষ মারতে ক’টা বুলেট লাগে’ তখন ওই সদস্যের নিজের সন্তানের বুক ঝাঁঝরা হয়েছিল তারই কোনো সহকর্মীর গুলিতে। এর উত্তর খুঁজছি।
এখন হাজার হাজার তরুণ জেল হাজতে আর কয়েক হাজার হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তারপরেও অভিযান থামছে না। একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সহিংস হওয়ার পর অধিকারের দাবিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং অভিভাবকদের ধৈর্য ধরার আকুতি জানাচ্ছি।
লেখক: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Sunday, November 25, 2018
নির্বাচন ব্যর্থ ও প্রশ্নবিদ্ধ হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায় -এম সাখাওয়াত হোসেন

বর্তমানে তিনি সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স অব নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সম্মানিত ফেলো।
এম সাখাওয়াত হোসেন ওই নিবন্ধে আরো লিখেছেন, যদি কোনো দেশের নির্বাচন ব্যর্থ ও প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে সেদেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়। যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনো শিকড় গাড়েনি সেসব দেশে কোনো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে কিনা বুঝতে কিছু ত্রুটি পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ১. ভোটারদের হুমকি প্রদান। ২. ব্যালট বাক্স ছিনতাই। ৩. নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিজ ক্ষমতা ব্যবহার। ৪. ভোট ক্রয়। ৫. জোরপূর্বক কেন্দ্র দখল। ৬. একাধিক ভোট প্রদান। ৭. আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর পক্ষপাতমূলক ব্যবহার। ৮. সংখ্যালঘু নির্যাতন। ৯. ব্যালট পেপার ফুরিয়ে যাওয়া। ১০. নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ভুল গণনা ও ১২. নির্বাচনী আইন প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের জন্য আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সঙ্গে গণতন্ত্র ও ইতিবাচক নির্বাচনী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। নির্বাচন পূর্ববর্তী সময় ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। এতে নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বাড়বে। নির্বাচন কমিশনকে একাই ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হতে হবে। আগামী নির্বাচনে বিরোধী দল অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কিছু দল নিজ আদর্শ বিসর্জন দিয়ে জোট গঠন করায় নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি নতুন ও অ¯পষ্ট অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
উইন্সটন চার্চিল বলেছেন, কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অবশ্যই ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালীন একজন ভোটার যাতে তার প্রতিনিধি নির্বাচনে মুক্তভাবে ভোট দিতে পারেন সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের উপর নির্ভর করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংজ্ঞা একেক রকম হতে পারে। নির্বাচন অবাধ হতে পারে কিন্তু তারপরেও সেখানে কারচুপির মাধ্যমে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের অর্থ হচ্ছে নির্বাচনের ফলে ভোটারদের ইচ্ছা সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হবে। ভোটার, সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনটিকে কিভাবে দেখছে তার উপরে একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে। যদিও বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা ফলাফল মেনে নিলেও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
এম সাখাওয়াত হোসেন আরো লিখেছেন, আমরা জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ একটি সদস্য দেশ। আমরা জাতিসংঘ ও অন্যান্য কনভেনশনেরও একটি অংশ। আমাদের অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রকৃত বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা আছে। এমন নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকারের দায়বদ্ধতা রয়েছে। এক্ষেত্রে ভোটারদের স্বাধীনতা একটি বড় বিষয়। ভোট দেয়ার অধিকারকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে এবং ভোটারদের পছন্দকে সত্যিকার অর্থে প্রয়োগ করতে দিতে হবে। এটা হলো সরকার ও নির্বাচনকালী প্রশাসন উভয়ের পবিত্র দায়িত্ব। ১১তম জাতীয় সংসদ সির্বাচন হতে যাচ্ছে অপ্রত্যাশিত অনেকগুলো কারণে এক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। কারণ, সংবিধানের ১২৩ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। তাই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে পরিপক্ব আচরণ দেখাতে হবে। জাতি একটি সুন্দর নির্বাচন চায় এবং ভোটারদের ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিফলন দেখতে চায়। সাধারণ মানুষ আশা করে, আগামী নির্বাচন হবে বিশ্বাসযোগ্য, সবার অংশগ্রহণমুলক এবং ভোটাররা ভীতিহীন পরিবেশে তাদের নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিতে অবাধে ভোট দিতে পারবেন। পবিত্র দায়িত্ব পালনে নির্বাচনী প্রশাসনকে হতে হবে মুক্ত। আমরা আশা করি, রাজনীতির মাঠে থাকা সব রাজনৈতিক দল অনুধাবন করবে যে, বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের সব ইতিবাচক সূকচকের সঙ্গে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে, যদি যদি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা যায়। সর্বোপরি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, যে কোনো দেশের টেকসই অগ্রগতির মাধ্যম হলো গণতন্ত্র। হতে পারে সে দেশটি উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশ।
Thursday, November 15, 2018
পোস্টার দেখলেই তো বোঝা যায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা কোথায়? -সাক্ষাৎকারে এম সাখাওয়াত হোসেন by মরিয়ম চম্পা

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এত বছরের একটি রাজনৈতিক সংকট দুটি সেটিং বা সংলাপে সমাধান হবে- এটা আশা করা যায় না। এটা আশা করা অনেক বেশি হয়ে যাবে। তবুও বলা যায় যে, দেরিতে হলেও সরকারের তরফ থেকে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং পাশাপাশি যারা অংশ নিয়েছে উভয়কেই স্বাগত জানানো উচিত।
কিন্তু তারপরও বেসিক কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনটা কতটুকু ফেয়ার হবে এবং ভোটাররা কতটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারবে। প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে এই কারণে যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে যেখানে সংসদ রেখে এবং ৩৫০ জন এমপি স্বপদে থেকে নির্বাচন করবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমপিরা তৃণমূলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন। গত দশ বছরে পালাক্রমে একধরনের প্রভাব বলয় তারা সৃষ্টি করেছে। সেখানে এমপিরা অকার্যকর থাকবেন এটা ঠিক কথা নয়। সর্বোপরি আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায় পর্যন্ত তাদের প্রভাবটা থেকে যাবে।
সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হয় এবং একইসঙ্গে ভোটারদের কাছে এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কাছে যদি গ্রহণযোগ্য হয় ও জেনারেল পারসেপশন যদি ভালো হয় তাহলেই এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। কারণ ২০১৪ সালের নির্বাচন ভালো হয় নি বলে পরবর্তী কোনো নির্বাচনই ভালো হয় নি। সব নির্বাচনে একই ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। কেন্দ্র দখল, জালভোট সব ঘটনাই ঘটেছে। যেখানে নির্বাচন কমিশনকে অতটা কার্যকর দেখা যায় নি। কাজেই আসন্ন নির্বাচনটা ভালো হলে বাকি নির্বাচনও ভালো হবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, বাংলাদেশে প্রত্যেকটি নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকটে থেকে কাজ করেছে। কিছু কিছু নির্বাচন কমিশন সে আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেও অনেক কমিশনই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে নি। যারা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে তারা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পেরেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ভালো হয় নি বলে ওটার কনটিনিউটি বজায় রয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের দেশের যে সব প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিক ধারা ও জবাবদিহিতা অব্যাহত রাখার কথা সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এখান থেকে যদি আমরা বেরিয়ে আসতে না পারি তাহলে সমস্যা রয়েই যাবে।
নির্বাচনে সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমত যেকোনো নির্বাচনে নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সিকিউরিটি অব ম্যান অ্যান্ড ম্যাটারিয়ালস। যেহেতু ১ দিনে ৩শ’ আসনে নির্বাচনটা করা হয় এবং প্রতিবছর ভোটার এবং ভোটিং সেন্টার সব মিলিয়ে ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে পাহারা দেয়ার জন্য যে পরিমাণ ফোর্স দরকার সেই ফোর্স কিন্তু কখনোই পাওয়া যায় না। তখন ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার হিসেবে সেনাবাহিনীকে ডাকা হয়। সরকারের আওতায় যেহেতু আর কোনো রিজার্ভ ফোর্স নেই তাই এই সীমিত পরিসরে সেনাবাহিনীকে দিয়ে একদিনের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয় কারণ পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকার কথা থাকলেও প্রতিনিয়ত তারা বিশ্বাস যোগ্যতা হারাচ্ছে। কাজেই সেখানে সামরিক বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। তাদের কেউ খুব একটা প্রভাবিত করতে পারে না। একইভাবে ম্যাজিস্ট্রেসি অর্ডারের বাইরে তাদের কোনো কার্যকারিতাও থাকে না।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, এর জন্য দায়ী আমাদের পলিটিক্যাল সিস্টেম ও কালচার। পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ে তোলার জন্য যে পদ্ধতি এখন পুরো দুনিয়াতে আছে সেগুলোতে আমরা এখনো যাই নি। আমরা সঠিক লোক নির্বাচন করে সঠিক জায়গায় দেই নি। এর কারণ হচ্ছে আমি যাকে দেবো তাকে বা সেই প্রতিষ্ঠানকে আমার মতো চলতে হবে। অন্যথায় তাকে বিতাড়ন, বা চরিত্র হনন করা হবে। এটা যদি হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠান মানে এই নয় দালানকোঠা ও বাড়ি-গাড়ি বানালাম, পতাকা দিলাম। এগুলো হচ্ছে অবকাঠামো। আমি অবকাঠামো বানালাম কিন্তু গায়ে রক্ত দিলাম না। ভাবার জন্য ব্রেইন দিলাম না। শোনার জন্য, দেখার জন্য, কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় সব যদি না থাকে তাহলে সুন্দর অবকাঠামো দিয়ে কি হবে? আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুন্দর অফিস আছে কিন্তু গায়ে রক্ত নেই, চিন্তা করার ব্রেইন নেই।
বিরোধী রাজনৈতিক জোট ঐক্যফ্রন্টের আবির্ভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট ছোট দলগুলো বড় দলের সঙ্গে ভিড়ে যায়। সে হিসেবে ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে বলা যায় যে, এক্ষেত্রে উভয় দিকেই লাভবান হয়েছে। বিএনপির এই মুহূর্তে নেতৃত্ব নেই। সেখানে ড. কামাল হোসেনের মতো ইন্টারন্যাশনাল ফিগারের নেতৃত্ব পাওয়া অনেক বড় একটি বিষয়। তিনিও বহু আগে থেকেই রাজনীতি করতেন। এদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে তিনি জড়িত। সবচেয়ে বড় কথা তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর। তাকে নেতা হিসেবে সামনে রাখা এবং তার সঙ্গে একাত্মতা স্বীকার করা, সেদিক থেকে মনে করি ঐক্যফ্রন্টের একটি প্লাস পয়েন্ট আছে। সম্প্রতি তাদের সংলাপের কারণে রাজনীতিতে যে একটি গুমোট হাওয়া ছিল সেখানে নাড়া পড়েছে। আমরা আশাবাদী যে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী একটানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরে তার অন্যান্য অবদানের মধ্যে এই সংলাপটি যদি সফল করতে পারেন সেটা হবে খুবই ভালো একটি উদ্যোগ।
সিভিল সোসাইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, সিভিল সোসাইটি বলতে আমরা স্বল্প পরিসরে বুঝি ১০ জন লোক টকশোতে কথা বললো তারাই সিভিল সোসাইটি। এমনটা নয়। এটা আইনজীবী থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই যাদের কথাবার্তা ও চিন্তাধারা সমাজকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে। সমাজের মানুষের ভালোর জন্য, গণতন্ত্রের ভালোর জন্য সরকার বা তার প্রতিষ্ঠানকে চাপ প্রয়োগ করবে- সেটাই সিভিল সোসাইটি। বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি গড়ে ওঠেনি কখনো। এটা শুনতে যদিও খারাপ শোনা যাবে। বাংলাদেশে যেটা গড়ে উঠেছে সেটা হচ্ছে মোরাললেস চাটুকার সোসাইটি। এবং তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। আজকে কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা নানা ভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। কাজেই হয়রানির মধ্যে থেকে সিভিল সোসাইটির মুভমেন্ট হয় না। বাকিরা তো চাটুকার টাইপের। তাদের ভাব অনেকটা এমন যে, আপনি সরদার আর আমি ঝাড়ুদার। ঝাড়ু দিয়ে সব পরিষ্কার করে দেবো। তারা খুব অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। এজন্য দোষারোপ করা যেতে পারে ১৯৭২ থেকে ’৯১-এর পরিস্থিতিকে। বঙ্গবন্ধুর সময়েও সিভিল সোসাইটির বিষয় ততোটা গুরুত্ব পায় নি। সিভিল সোসাইটি বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কারণ হালুয়া-রুটি তাদের সামনে চলে এসেছে। সহজভাবে যদি বলি বাংলাদেশে কোনো সিভিল সোসাইটি দেখি না। অথচ পৃথিবীর বহু দেশে ঐতিহাসিকভাবে সিভিল সোসাইটির কারণে অনেক বিপ্লব এসেছে।
অবাধ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমত হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তারপর হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই লক্ষ্যে কাজ করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব কিন্তু সরকার এবং সরকারের ইনস্টিটিউশন ও সিভিল সোসাইটির। সেটা যদি না হয় তাহলে গত ৫ বছরের মারামারি-হানাহানি, গুম-খুন ৪০ দিনে ঠিক করা যাবে না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলা হচ্ছে অথচ সেটা আগেই তো ছিল না। এই ৪০ দিনে কি করে হবে? পোস্টার দেখলেই তো বোঝা যায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা কোথায়? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে এখন যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, টাকার মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। যার টাকা আছে সেই নির্বাচন করে। অথচ দেখা যাবে রাজনীতি বিষয়টা কি সেটাই অনেকে জানে না।
Tuesday, June 27, 2017
হনুজ দিল্লি দূর অস্ত by এম সাখাওয়াত হোসেন

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করায় সুযোগ হয়েছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় এই ঐতিহাসিক সরকারি বাসভবনটির কিয়দাংশ দেখবার। রেইসিয়ানা পাহাড় কেটে এই ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল বৃটিশ ভারতের শাসক বৃটিশ উপনিবেশিক শক্তির ধারক বাহক ভাইসরয় হাউস হিসেবে। হার্বাট বেকারের তত্ত্বাবধানে এবং যার নকশায় এই ভবনটি তৈরি হয়েছিল তার নাম এডউইন ল্যান্ডসির লুটিয়েন্স (Edwin Landseer Lutyens)। এই ব্যক্তিই বর্তমানের নতুন দিল্লিরও নকশা করেছিলেন। তার সহযোগী ছিলেন মি. হার্বাট বেকার (Herbert Baker)। এ কারণে ভারতের রাজধানী নতুন নতুন দিল্লিকে অনেক সময় লুটিয়েন্স দিল্লি বলা হয়। এই দিল্লিই ঐতিহাসিক ভারতের অষ্টম, জনান্তরে দশম দিল্লিস্থিত রাজধানী। যাই হোক দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের বিস্তারিত বিবরণে পরে আসবো।
ইতিপূর্বেই আমি দুবার দিল্লিতে এসেছিলাম এবং সপ্তাহখানেক সময় করে কাটিয়েছিলাম। জীবনে দিল্লিতে প্রথম এসেছিলাম ২০০৯ সালে নির্বাচন কমিশনে থাকাকালে ভারতের পনেরতম সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। তারপর আরেকবার এসেছিলাম ২০১০ সালে যখন আমি নির্বাচন সংস্কার নিয়ে গবেষণা করি। আর তৃতীয়বার ২০১৬ সালে এসেছিলাম আরেক গবেষণার কাজে। যতবারই দিল্লিতে এসেছি ততবারই মনে হয়েছে দিল্লিকে তেমনভাবে দেখা হয়নি, যেমনভাবে আমি দেখতে চেয়েছি। আমি বহু দেশের রাজধানীতে গিয়েছি। যার মধ্যে রোম নগরীও রয়েছে। তথাপি আমার মনে হয় যে দিল্লির ইতিহাসের বৈচিত্র্যের ধারেকাছেও বিশ্বের আর কোনো রাজধানী নেই। প্রথমবার এসেই মনে হয়েছিল কত পরিচিত এই শহর। কারণ উপমহাদেশের ইতিহাস যেদিন আমার পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় এসেছিল সেদিন থেকেই আমি এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছি। সেই ইতিহাস পড়া আজও শেষ হয়নি।
দিল্লির বর্ণনা দিতে গিয়ে বোধকরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার কয়েক পঙ্ক্তি মনে পড়ে। এর চাইতে ভালো বর্ণনা কেউ দিতে পারেনি বলে মনে হয়। অবশ্য তিনি তার কবিতায় ভারতবর্ষের কথা বললেও তা দিল্লির জন্যও প্রযোজ্য। তিনি লিখেছিলেন-
‘হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য
হেথা দ্রাবিড় চীন
শকহুনদল পাঠান মোগল
এক দেহে হলো লীন।’
রবীন্দ্রনাথের কবিতার এই পঙক্তিতে যেন ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। দিল্লির মসনদে বসে ভারতবর্ষ শাসন করেছে আর্য, অনার্য, মোগল, পাঠান, গোত্র না জানা ক্রীতদাস, ইংরেজ। এমন বিচিত্র সাম্রাজ্যের ইতিহাস অন্য কোনো শহরে পাওয়া কল্পনাই করা যায় না।
আধুনিক ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি পক্ষান্তরে দিল্লি যতই আধুনিক হোক না কেন- নতুন বা পুরাতন দিল্লি দেখেছে সাম্রাজ্য আর শাসকদের উত্থান আর পতন। এই উত্থান আর পতনের সঙ্গে জড়িত ছিল তৎকালীন উপমহাদেশের ভাগ্য। দিল্লি শহরটি যত আধুনিকই হোক না কেন এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাম্রাজ্যের উত্থান পতনের ধ্বংসস্তূপ। রয়েছে বিভিন্ন ধর্মের, গোত্রের শাসকদের উত্থান আর পতনের করুণ চিহ্ন। এই শহর গড়ে উঠেছে সাতটি রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে। অনেকের মতে দশ হতে বারোটি শহরও হতে পারে। এ শহরের এসব পুরাতন সমাধিস্থল আর শ্মশানঘাট মনে করিয়ে দেয় উপমহাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। এ ইতিহাস কারও পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই শহরে আসলেই জড়িয়ে পড়তে হয় ইতিহাসের সঙ্গে। নাটক, নভেল আর ভ্রমণ কাহিনীর উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে দিল্লির বৃহৎ উদ্যানগুলোতে আর রাজপথ, অলিগলি অথবা পুরাতন শহর জুড়ে। কত জাতির রক্ত ঝরেছে এই শহরে। কত সুখ-দুঃখের ইতিহাস আর অজানা গল্প রয়েছে দিল্লির প্রতিটি পাথরের নিচে। এমনই অনুভূতি হয়েছিল আমার প্রতিবারের দিল্লি সফরে।
প্রথমবার যখন দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাই চেষ্টা করেছিলাম কিছু অজানা ইতিহাস জানতে। কিছু পেয়েছি কিছু পাইনি। দিল্লির সাতটি রাজধানীর নাম এখনো তেমনই রয়েছে যেমন কিনা রাই পিলোথরা সবচাইতে পুরাতন শহর বলে নথিভুক্ত রয়েছে। এই শহরটি পৃত্থিরাজ চৌহান-এর তৈরি। এর ধ্বংসবিশেষ এখনো দৃশ্যমান। জায়গাটি কুতুব মিনারের কাছাকাছি। মেহেরুলী এখানেই কুতুব মিনারসহ বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে ফিরোজ শাহ তুগলকের সমাধি ও তার তৈরি ওই সময়কার সবচাইতে বৃহৎ মুসলিম পাঠস্থান মাদরাসা, সূফী বখতিয়ার উদ্দিন কাকীর সমাধি আর সামসি তালাব, ‘শিরি’, খিলজিদের রাজধানী, ফিরোজাবাদ, গিয়াসউদ্দিন তুগলকের তৈরি শহর। যমুনা নদীর তীরে ফিরোজ শাহ কোটলা, বর্তমানে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম এই সুলতানের নাম ধারণ করে রয়েছে।
তুগলকাবাদ গিয়াসউদ্দিন তুগলকের শহর এখন শুধুমাত্র একটি পরিত্যক্ত বিশাল আয়তনের পাথরের তৈরি দুর্গ। ওই সময়কার অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমসাময়িক ছিলেন দিল্লির অন্যতম সূফী সাধক নিজামউদ্দিন আউলিয়া। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ছিলেন উপমহাদেশের সবচাইতে খ্যাত সূফী সাধক খাজা মঈনউদ্দিন চিশতির শিষ্য এবং কুতুবউদ্দিন কাকীর শিক্ষানবিশ। নিজামউদ্দিন আউলিয়া ক্রমেই বিখ্যাত হয়ে উঠেন এমন কি তিনি সূফী সাধক হিসেবে কুতুবউদ্দিন কাকীর চাইতে বেশি খ্যাত হন। ওই সময়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের নিকট নিজামউদ্দিন দারুণ একজন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। নিজামউদ্দিনের এ খ্যাতি গিয়াসউদ্দিন তুগলককে দারুন ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। আমি কথা বলছি ১৩ শতাব্দীর আশেপাশের দিনগুলোর কথা। গিয়াসউদ্দিন তুগলক যখন তার শহর তৈরি করছিলেন ওই সময়ই নিজামউদ্দিন তার দরবারে, যা এখন এই সাধকের মাজার, খনন করছিলেন বিশাল এক তালাব (পুকুর), যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে মাজারের পেছনে। ওই দীঘি খননের জন্য প্রয়োজন ছিল বহু কর্মীর। অপরদিকে দিল্লির সুলতানের শহর তৈরিতে কর্মীর অভাব হয়ে পড়লে নিজামউদ্দিনকে সুলতান তার কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন। নিজামউদ্দিন আউলিয়াকে সুলতানের দরবারে ডেকে পাঠালে আওলিয়া সে ডাকে সাড়া দেননি।
গিয়াসউদ্দিন তুগলক তখন বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত। বাংলায় বিদ্রোহ থামাতে দিল্লি ছাড়লেন কিন্তু তার পূর্বেই তিনি মনঃস্থির করেছিলেন যে রাজদ্রোহের অপরাধে ফিরে এসে আউলিয়াকে চরম শাস্তি দেবেন। তুগলক বাংলার বিদ্রোহ দমন করে ফিরে আসবার পথে আবার তার সংকল্পের কথা প্রকাশ করলে আউলিয়ার শিষ্যরা আউলিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। নিজামউদ্দিনের তখন অনেক বয়স। তিনি তার অনুরাগীদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তুগলককে দিল্লি পর্যন্ত আসতে দাও’- বলে যে উক্তি করেছিলেন তা উপমহাদেশে আজও উচ্চারিত হয়। ধ্যানরত আউলিয়া বলেছিলেন ‘হুনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ ‘দিল্লি এখনো বহু দূরে’। গিয়াসউদ্দিন তুগলক দিল্লি পর্যন্ত আসতে পারেননি। পথে তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলকের তৈরি অভ্যর্থনা মঞ্চ হতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মহাক্রমশালী গিয়াসউদ্দিন তুগলকের সমাধি রয়েছে পরিত্যক্ত তুগলকাবাদের দুর্গের অদূরে জনমানবশূন্য নির্জন জায়গায় আর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার থাকে লোকে লোকারণ্য। নিজামউদ্দিন আউলিয়া আরো ভবিষ্যদ্বাণী করে তুগলকাবাদ সম্পর্কে বলেছিলেন ‘ইয়া রাসেগা গুজর ইয়া রহেগা উজার’ (এটা হয় থাকবে পরিত্যক্ত অথবা বসবাস করবে গুজারা। [যারা মহিষ চড়ায়]) এমনই রয়েছে তুগলকাবাদ। এখান থেকে যে শিক্ষা নেয়া উচিত আমাদের সময়কার নেতাদের, ক্ষমতার দাপট চিরস্থায়ী নয়। চিরস্থায়ী নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মতো নিঃস্বদের।
গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার পুত্র মোহাম্মদ বিন তুগলক তৈরি করলেন মেহেরুলী এবং তুগলকাবাদের মাঝামাঝি নতুন শহর ‘জাহানপনা’। এখানে অনেক দিন ইবনে বতুতা অবস্থান করেছিলেন। পরে তুগলক রাজধানী দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলেন জাহানপনাতে। জাহানপনা এখন ধ্বংসস্তূপ।
মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ এবং অনেকটা খেপাটে ধরনের। তিনি অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যার যৌক্তিকতা ওই সময়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। যেমন হঠাৎ দিল্লি হতে রাজধানী দক্ষিণে নিয়ে যেতে তিনি দিল্লিবাসীদের জোর করে নিয়ে যান। কথিত রয়েছে যে, একজন বিকলাঙ্গ ভিক্ষুককেও তিনি বাদ দেননি। আবার কয়েক বছর পর ফিরে আসেন দিল্লিতে। নিয়ে আসেন সব নাগরিকদের। এসবের জন্য তাকে উদাহরণ করেই ‘বাংলা ভাষায়’ যুক্ত হয়েছে প্রবাদবাক্য ‘তুগলকি কারবার’- যখন যা খুশি তাই করা। মোহাম্মদ বিন তুগলক ছিলেন ওই সময়কার প্রবল পরাক্রমশালী স্বৈরাচার। তুগলকরা এখনো একই রকম আছেন। অনেক তথাকথিত নির্বাচিত অনির্বাচিত শাসকরা ‘তুগলকি কারবারে অভ্যস্ত- আজ এক কথা কাল তার উল্টো। মোহাম্মদ বিন তুগলকের সমাধি কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাস্ত করে শেরশাহ তৈরি করেছিলেন শেরগড়। শেরগড় লালকিল্লার কাছাকাছি জায়গায় আর পুরাতন কিল্লা ঘিরে। এখানেই এই পুরাতন কিল্লাতেই লাইব্রেরির সিঁড়ি হতে বাবরপুত্র হুমায়ুন পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
দিল্লির পুরাতন শহরের মধ্যে এখনো যা আবাদ রয়েছে- তা হলো শাহজাহানাবাদ যা বর্তমানে পুরাতন দিল্লি বলে পরিচিত। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লিই দিল্লির সপ্তম শহর। এই পুরাতন দিল্লিই ইতিহাসে ভরপুর। এখানেই শাহজাহানের বড় সন্তান জাহানারা তৈরি করেছিলেন ‘চাঁদনী চক’। এখানে বড় চওড়া রাস্তার মাঝে ছিল ছোট পানির তালাব আর ফোয়ারা। রাস্তার দু’ পাশে প্রবাহিত পানি যার উপরে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরিয়ে চকচক করতো। তাই জাহানারা নাম রেখেছিলেন চাঁদনীচক। এখন শুধুমাত্র চাঁদনী চক-এর নামটিই রয়েছে। প্রথমবার যখন পুরাতন দিল্লি তথা শাহজাহানাবাদে আসি তখন ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম এখনকার
অবস্থা দেখে। পুরাতন ঢাকার চাইতে বড় এ ঐতিহাসিক শহরটি এখন হতশ্রি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা আর মানুষের ভিড়। পাইকারি বাজার। এক সময়ের ঝলমলে এই শহরের বিখ্যাত গলিগুলো গন্ধ আর পুতময় হয়ে রয়েছে।
এক সময়ের ‘চাঁদনীচক’ যখন প্রথমবার দেখি বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ইতিহাসের গন্ধ পেয়ে। মনে হয়েছিল শাহজাহানাবাদের অলিতে-গলিতে ইতিহাস। বড় বড় হাভেলী আর কুচাগুলোর প্রতিটির অতীতই একেকটি বড় ইতিহাস। সুখ-দুঃখ, জৌলুস, প্রেম, বঞ্চনা, জীবন-মৃত্যু- সবই ধারণ করে কয়েকশত বছরের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রত্যেকটি পুরাতন জরাজীর্ণ এক সময়ের সুরম্য হাভেলী আর কুচাগুলো। এখন এটি একটি সাধারণ চৌরাস্তা- এর এক পাশে ছিল একটি অতিথিশালা যা এখন নেই সেখানেই রয়েছে টাউন হল। শাহজাহানাবাদ বা বর্তমানের পুরাতন দিল্লির স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবার ভারত বিখ্যাত। এখানে এখনো ঐতিহ্যবাহী মোগল খাবার পাওয়া যায়। এখানে পরের দিকের মোগলদের পাচকদের এক বংশধরের একটি রেস্তরাঁ রয়েছে যার নাম ‘করিমস্’, উপমহাদেশ খ্যাত এই রেস্তরাঁ। এখানে পরিবেশিত হয় সবধরনের কাবাব এবং মাংসের পরিবেশনা। মাৎস হিসেবে ব্যবহার হয় মুরগি এবং ছাগল বা বকরি। মোগলরা তাদের রাজত্বকালে তাদের হিন্দু প্রজাদের দিকে লক্ষ্য রেখেই গো-মাংস ভক্ষণকে নিরুসাহিত করেছিলেন। তাই এ অঞ্চলে কোরবানি ঈদ ‘বকরা ঈদ’ নামে পরিচিত।
শাহজাহানাবাদে অনেকগুলো বাজার ছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পণ্যের বাজার। এখনো এই সব বাজার রয়েছে। তবে এগুলো এখন পাইকারি বাজার। তবে খুচরা বাজারও রয়েছে। শাহজাহানাবাদ গড়ে উঠেছিল দিল্লির মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর তীর ধরে। যমুনা তীর ধরেই গড়ে উঠেছিল ভারতের শত শত বছরের মুসলিম সাম্রাজ্য। লক্ষণীয় বিষয় যে, মোগল স্থাপন্যের সবচাইতে দর্শনীয় এবং বিশ্বের বিস্ময় আগ্রার তাজমহল এবং মোগলদের রাজধানী বলে কথিত আগ্রার দুর্গ গড়ে উঠে যমুনা নদীর তীরে।
যমুনা নদী তখন উন্মত্ত যৌবনা। দূর্গের পেছনে দেয়ালঘেঁষা। টলটল পরিস্কার পানির প্রবাহ। সূর্যের আলোতে চিকচিক করত। এ নদীর পানি সরবরাহ হত দূর্গ আর শাহজাহানাবাদে। এখন সেই যমুনা নদী খুঁজে পাওয়া যায় না। দূর্গ হতে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে সরে গিয়েছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বস্তি আর পানি হয়েছে দূষিত। তবুও এই যমুনা নদী কালের সাক্ষী। অগণিত সাম্রাজ্যের উত্থান আর পতনের সাক্ষী।
অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন ওই সময়কার মুসলিম শাসকরা গঙ্গার তীরে তেমন কোনো স্থাপনা তৈরি করেননি; কারণ ওই নদীটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র নদী। তবে অনেক শাসকদের উপর মন্দির বিনষ্ট করার ঐতিহাসিক অভিযোগ রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকরা মনে করেন মধ্যযুগে ধর্মস্থানের ওপর হামলা করার অন্যতম কারণ ছিল দুর্গের ভেতর হতে শত্রুসেনাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে আসার কৌশল। হয়তো ঠিক, হয়তো ঠিক নয়- এটি নিয়ে বিতর্কের অভিপ্রায় আমার নয়।
শাহজাহানাবাদ বা পুরাতন দিল্লির আকার অনেকটা পানের মতো ছিল। এ শহরের প্রান্তে রয়েছে লালকিল্লা। লালকিল্লার লাহোর গেট হতে সোজা পশ্চিম দিকে প্রধান সড়ক যার মাঝ প্রান্তে ছিল চাঁদনী চক। প্রায় শেষ মাথায় রয়েছে একটি বৃহৎ মসজিদ; এগুলো তৈরি করেছিলেন শাহজাহানের অন্য দুই পত্নী। এর মধ্যে একজন বেগম আকবরি মহল। অপরজন বেগম ফতেহপুরী যার নামে পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ফতেহপুরী মসজিদ। কথিত যে, তিনি এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই দুই বেগমের সমাধি রয়েছে আগ্রার তাজমহলের প্রধান প্রবেশ পথের পাশে। আকবর মহলের তৈরি মসজিদটি ১৮৫৮ সালে কোম্পানির হুকুমে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় শাহজাহানাবাদের বহু মসজিদ আর মোগল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। চাঁদনী চকের মূল সড়কে যুক্ত হয়েছে গলি, কুচা। আর শহরটি ছিল দেয়ালঘেরা যার নিয়ন্ত্রণ হতো বারটি গেটের মাধ্যমে। প্রতিটি গেটের বিভিন্ন নাম ছিল। এখনো কয়েকটি গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে তবে দেয়াল প্রায় নেই বললেই চলে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়ার পর বৃটিশ বাহিনী কয়েকটি গেট ছাড়া ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করেছিল শহরের দেয়াল। আজও পাঁচটি মূল গেট দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তার মধ্যে সবচাইতে ঘটনাবহুল এবং বহুভাবে আলোচিত ৫টি গেট বা দরওয়াজার অন্যতম বর্তমানে খুনি দরওয়াজা হিসেবে পরিচিত। এটি ছিল শাহজাহানাবাদে প্রবেশের প্রথম দরওয়াজা। এই দরওয়াজাটি তৈরি করেছিলেন শেরশাহ সুর যিনি এটা শেরগড়ে প্রবেশের অন্যতম দরওয়াজা হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরে সম্রাট শাহজাহান তার প্রাচীর শহর শাহজাহানাবাদের প্রধান ফটকে উন্নীত করেন। এখানে হালেও বহু ঘটনার জন্ম হয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন ঐতিহাসিক কারণেই ‘এই দরওয়াজা, যা এখন রাস্তার ডিভাইডার-এর মাঝে, জায়গাটি অভিশপ্ত তাই বৃষ্টিতে রক্ত ঝরে। আমি প্রথমবার গাড়ি হতে নেমে এ দরওয়াজা বা গেট দেখতে। গেটটি তিনতলা উপরে সৈনিকদের বিশ্রামের জায়গা করা ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানেই যুবরাজ জাহাঙ্গীর তার পিতা আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক সময়ে যুদ্ধে আকবরের অন্যতম রত্ন ও যোদ্ধা আবুল ফজলকে হত্যা করেছিলেন। তার শিরশ্ছেদ করে মাথা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। আরো পরে ১৮৫৭ সালে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যখন শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মেজর হাডসনের নিকট আত্মসমর্পণ করেন ওই সময়ে তার তিন পুত্রসহ আরো অনেককে এই দরওয়াজার প্রাঙ্গণে গুলি করে হত্যা করে শিরশ্ছেদ করে লটকিয়ে রেখেছিল।
মেজর হাডসন যিনি নিজেও আরো পরে লক্ষ্ণৌতে সিপাহীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তার দেহকেও লটকিয়ে রাখা হয়েছিল। লক্ষ্ণৌ-এর লা মার্টিনিয়ার কলেজের এক কোনায় রয়েছে মেজর হাডসন-এর সমাধি। মেজর হাডসন প্রথমে ছিলেন একজন ভাড়াটে সৈনিক। তার ক্যাভেলারি পরে বৃটিশ ভারত বাহিনীতে ‘হাডসন হর্স’ নামে আত্মীকরণ করা হয়েছিল। আমি ২০১৬ সালে ইয়াঙ্গুনে বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিতে গিয়েছিলাম। যাই হোক কিংবদন্তি রয়েছে যে, এই গেটের উপরে বৃষ্টির পানি পড়লে রক্তের রং ধারণ করে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন যে, এখানে যে পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তাতে লোহার উপাদান বেশি বলে মরিচার রংয়ে পানির রং বদল হয়।
আর দুটি গেট যার মধ্যে একটি ১৮৫৭ সালের ক্ষত নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার নাম কাশ্মিরী গেট। মূলত এই গেটের পতনের পরেই ১৮৫৭ সালের সিপাহীরা পরাজিত হন। আর দক্ষিণ প্রান্তে এখনো দাঁড়িয়ে তুর্কম্যান গেট।
বলছিলাম শাহজাহানাবাদের কথা। তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল এই শহর। লালকেল্লা হতে ‘চাঁদনীচক’ পর্যন্ত ছিল উচ্চবিত্তদের বাস আর উচ্চমার্গের বিপণী বিতান। চক কোতোয়ালি (পুলিশ থানা), হতে চাঁদনীচক স্কয়ার ছিল দ্বিতীয় ভাগ। এ জায়গাতেই ছিল উচ্চবিত্তদের বাজার। কবি-সাহিত্যিকদের বাস ও আড্ডাখানা। মীর্জা গালিবের বাসস্থানও এরই ধারেকাছে। শেষবার দিল্লি সফরকালে গিয়েছিলাম মীর্জা গালিবের বাসস্থান দেখতে। যার বেশি অংশই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল বহু আগে। তবে পরে ভারত সরকার একাংশ উদ্ধার করে গালিব ট্রাস্ট বানিয়েছেন। এখন সে অংশ গালিবের জাদুঘর।
শেষ অংশ ছিল চাঁদনীচক হতে ফতেহপুরী মসজিদ পর্যন্ত। এখানে এখন এশিয়ার সবচাইতে বড় মসলার পাইকারি আড়ত।
‘চাঁদনীচকের’ আবাসনগুলো ছিল তিন স্তরের। প্রথম স্তর হাভেলী। প্রাসাদের মতো বাড়িগুলো ছিল উঁচু দেয়ালঘেরা। মালিকরা ছিলেন আমীর, ওমরাহ বা নবাব এবং তৎকালীন সমাজের উচ্চ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। এরা ছিলেন মোগল দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। একটি হাভেলী যা এখনো বিখ্যাত এবং সবচাইতে বড় নাম চুনীমল হাভেলী। আমি দেখতে গিয়েছিলাম ওই হাভেলীটি। দ্বিতীয় স্তর ছিল কুচা। এখানে একই পেশার মানুষরা থাকতেন। তৃতীয় স্তর কাটরা। এখানে পেশাদারদের কর্মক্ষেত্র ও বাসস্থান একই জায়গায় ছিল। এই দুই স্তরই ছিল মহল্লা।
চাঁদনীচকের দক্ষিণ পাশে ‘জোহরী বাজার’ এক সময় অলংকারের বড় বাজার ছিল। এখনো কিছু রয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর মহিলাদের অন্যান্য পরিধেয় জড়ির কাজ করা কাপড় ও তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজার। সমগ্র ভারতে সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। এখানেই প্রথমবার আমার পরিচয় হয়েছিল একজন রিকশাচালক আহমেদ গিয়াসের সঙ্গে। যিনি ৮০ রুপির বিনিময়ে বহু গলি আর কুচা দেখিয়েছিলেন। তিনি এই জায়গারই বাসিন্দা। কথায় কথায় জেনেছিলাম যে, প্রায় দশ পুরুষ ধরে তারা মোরিগেটের বাসিন্দা। এখন তারা রিকশা আর ভ্যানগাড়ির ব্যবসা করেন। তিনি মাঝে মধ্যে মনমতো যাত্রী পেলে এলাকা ঘুরিয়ে দেখান। আমাকে দেখেই তিনি ঠাওর করেছিলেন যে, এ জায়গা দেখতে এসেছি। বাংলাদেশি শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তার দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষিত করে তুলবার। তবে তার শঙ্কা ছিল সরকারি চাকরি না পাবার। তার তথ্য মোতাবেক এখানে একসময় সব বড় ব্যবসায়ীরাই ছিলেন মুসলমান। কিন্তু প্রথমবার ১৮৫৭ সালে পটপরিবর্তন হয় আর দ্বিতীয়বার ১৯৪৭ সালের দিল্লি রায়টের পরে মাত্র দশ ভাগে নেমে আসে মুসলমান ব্যবসায়ীদের সংখ্যা। ১৯৪৭ সালের পাঞ্জাব বিভক্তির পর পশ্চিম পাঞ্জাবের ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে উদ্বাস্তু হওয়া শিখদের এখানে এবং ধারেকাছে ক্যারলবাগে পুনর্বাসন করা হয়। এখানে যে সব মুসলমানরা রয়ে গিয়েছিল তাদেরকে একপ্রকার যুদ্ধ করেই থাকতে হয়েছে। তার পূর্ব-পুরুষরা এভাবেই রয়ে গিয়েছিলেন।
আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, এখানকার মুসলমান ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় তেমন মনোযোগী নয়। ফটকাবাজারি করা ছাড়া আর তেমন কিছু নেই। বয়স্করা আড্ডা আর কবুতর বাজি করে অতীতের প্রজন্মের স্বর্ণযুগের আলোচনায় তৃপ্ত হয়ে থাকেন। আহমেদ গিয়াস বলেছিলেন, এখানকার বহু বিত্তশালী যাদের হাভেলীগুলো এখনো দাঁড়িয়ে- তা তারা বিক্রি করে অনেকেই পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। আহমেদ গিয়াস দুঃখ করে বলেছিলেন যে, তার মুরুব্বিদের কাছ থেকে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা শুনেছেন। বললেন যে, তিনি শুনেছিলেন- মুসলমানদের পতন তাদের কারণেই হয়েছে। যেদিন বাহাদুর শাহ জাফরকে হাডসনের নেতৃত্বে শিখ পল্টন এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখন এখানকার ধনাঢ্য মুসলমানরা টিকে থাকবার জন্য হাত মিলিয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে। এমন কি মীর্জা গালিবও কোম্পানির সিপাহীদের সঙ্গে মদ খেয়ে মাতাল হয়েছিলেন। অথচ তিনি ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের মোশাহেবার রত্ন। এসব কথা বিস্তারিতভাবে তার দাদার কাছে শুনেছিলেন। তিনি আমাকে অনেক গলি কুচাতে ঘুরিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, রাজিয়া সুলতানার সমাধিতে নিয়ে যেতে পারবে কিনা। বলেছিলেন ওই জায়গা শাহজাহানাবাদেই। তবে গলির মধ্যে এ সময় যেতে বহু সময় লাগবে। তাই আর যাওয়া হয়নি। এরপরেও আর যাওয়া হয়নি। রাজিয়া সুলতানা ইলতুতমিশ-এর কন্যা ভারতবর্ষের প্রথম নারী সুলতান। আর মুসলমানদের শত শত বছরের শাসনকালের একমাত্র নারী শাসক। এর পরে আরেক নারী দিল্লি মসনদে সদর্পে ছিলেন তার নাম ইন্দিরা গান্ধী।
আহমেদ গিয়াস শিখদের গুরুদুয়ারা শিসগঞ্জ সাহেব, যেখানে আওরঙ্গজেব নবম শিখগুরুর শিরশ্ছেদ করিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন। আমি যেতে চেয়েছিলাম লালকুয়া বাজার হয়ে তুর্কম্যান গেটের দিকে। এই জায়গাটির বহু ঘটনা খুশবন্ত সিং-এর বইতে পড়েছিলাম। আহমেদ গিয়াস নিয়ে যেতে সাহস পায়নি। কারণ ওই এলাকায় দিল্লির বেশির ভাগ হিজড়াদের বাসস্থান। এদের এখানে আবাস মোগল সময় হতে। এদের মধ্য হতে মোগল হেরেমের রক্ষী নিয়োজিত হতো। অনেক ঘুরিয়ে গিয়াসউদ্দিন আমাকে দিল্লির তথা ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ জামে মসজিদের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলেন। সামনেই চোর বাজার। জামা মসজিদ এখন ওয়াক্ফ সম্পত্তি। পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। ১৮৫৭ সালের পর কোম্পানির সৈনিকরা ‘আস্তাবল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল শাহজাহানের আরেক কীর্তি, এই মসজিদ কিন্তু ওই সময়ের ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের সায় না থাকায় রয়ে গিয়েছিল। ১৮৫৭ সালে মোগলদের পতনের পর কোম্পানির শাসকরা পরবর্তী দুই বছর দিল্লিতে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রেখেছিল। ভয় পেয়েছিল আরেক উত্থানের। অবশ্য সিপাহী বিদ্রোহ বা প্রথম স্বাধীনতা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশ হতে ইংরেজদের বিতারিত করতে পলাশী যুদ্ধের ১০০ বছর পর। দিল্লির জামা মসজিদ তৈরি করেছিলেন রেড সেন্ড স্টোন দিয়ে। শাহজাহান পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেব এর চাইতে কিছুটা বড় একই ধাঁচের লাল পাথরের মসজিদ তৈরি করেন লাহোরে। যার নাম বাদশাহী মসজিদ। মসজিদটি তৈরি করেন তার দাদার নির্মিত লাহোর দুর্গের সামনে।
প্রথম সফরে দুপুরে ইচ্ছা হয়েছিল পুরাতন দিল্লিতেই খাবার খেতে। পরাটাওয়ালি গলির অনেক নাম শুনেছি। সেখানে চল্লিশ রকমের পরাটা পাওয়া যায়- এমনটাই শোনা যায়। গিয়েছিলাম ওই গলিতে। রিকশা নিয়েছিলাম। কোন কোন গলি দিয়ে টাউন হলের সামনে অত্যধিক সরু গলির মুখে থামিয়ে রিকশাচালক দেখিয়ে দিলো ইতিহাসখ্যাত পরাটাওয়ালি গলি। গলির ভেতরে মাত্র চার পাঁচখানা দোকান এখনো অবশিষ্ট। সবগুলোই প্রায় দেড়শত বছরের পুরনো। এক দোকানে বসে পরিচয় হলো ইকবাল আলীর সঙ্গে। দুই ভাই বংশপরম্পরায় চালিয়ে আসছে এই ছোট পরিসরের দোকান। সামনে বড় কড়াইতে ঘি ফুটছে। একজন দ্রুত হস্তে পরাটা বানিয়ে ঘিয়ের মধ্যে ডুবিয়ে ভেজে নিয়ে তুলে দিচ্ছে খদ্দেরদের প্লেটে। তিন রকমের সবজি ফ্রি। চাইলে আরো পাওয়া যায়। এমন কোনো ধরনের পরাটা নেই যা চাইলে পাওয়া যায় না। অনেক পরাটার নাম শুনলেও চল্লিশ ধরনের পরাটা হতে পারে তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। এক প্লেটে দুটো পরাটা সঙ্গে সবজি চাটনি। অপূর্ব তার স্বাদ। ইকবাল আলীও তার সুখ-দুঃখের কথা জানালেন। বলেছিলেন, এ ব্যবসা ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাত্র চারটি দোকান রয়েছে। বাকিগুলো বিভিন্ন রকমারি শাড়ি-গহনার দোকানে রূপান্তরিত হয়েছে। বললেন, হয়তো এক দু’বছর পর আসলে এটাও বন্ধ পাবেন। নিজাম-এ (নিজামউদ্দিন আউলিয়ার নামে স্থান ও রেলওয়ে স্টেশনের নাম) ছোট রেস্তরাঁ নিয়েছি সেখানেই চলে যাবো। এবার গিয়ে মাত্র তিনটি দোকান পেয়েছিলাম। ভাটিয়া নামক একজনের দোকানে নাস্তা করেছিলাম।
তিনি জানালেন, ‘এখন পরাটা লোকে তেমন খেতে চায় না। ঘিয়ে ডুবিয়ে এই পরাটা স্বাস্থ্য সচেতন লোকে তো একেবারেই খায় না। তার উপরে ডায়াবেটিস আর হৃদরোগের ঝুঁকি। তেমন আড্ডাও হয় না। পেছনে পণ্ডিত নেহেরুর ছবি দেখিয়ে ভাটিয়া বললেন, আমার দাদা এলাকায় কংগ্রেস নেতা ছিলেন। তারই আমন্ত্রণে পণ্ডিত নেহেরু স্বাধীনতার আগে রাস্তার ওপারে আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। এখান থেকে পরাটা নেয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইকবাল আলীর কথা। বললেন, নিজাম-এ খোঁজ করলে পাবেন।
আমি প্রথমবার যখন ইকবাল আলীর দোকান থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে বের হয়েছিলাম প্রায় একদিনের অভিজ্ঞতা আর মোগলদের তৈরি জৌলুসময় এই শহরের কথা চিন্তা করতে করতে ইহিাসে ডুবে গিয়েছিলাম। একদা প্রাচ্যের গর্ব এই শাহজাহানাবাদ, বর্তমানের পুরাতন দিল্লি, যে শহরের পতন হয়েছিল চারশ’ বছর আগে সেই শহর এখন মৃতনগরী। বাকি নেই কোনো জৌলুস। মানুষ আর ঠেলাগাড়ি, হট্টগোল, গালাগালি আর দোকানের বিশ্রি চেহারার পেছনের ইতিহাস ধুলোয় ডাকা পড়ছে। একদা মোগল বংশের উচ্চবিত্তদের বাসস্থানগুলো, গজল আর উর্দু শায়েরীর গুঞ্জনে মুখরিত হতো। আজ গোডাউনে পরিণত হয়েছে। বহু হাভেলী ধ্বংসপ্রায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ধ্বংসপ্রায় এক সময়ের ভারতের রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেনের বংশধরদের হাভেলী আর কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আসকার হাভেলী যেখানে শত বছর পূর্বে জওহরলাল নেহেরু আর কমলা দেবীর জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এক সময়ের জৌলুসপূর্ণ শাহজাহানাবাদ, যে শহরকে নাদির শাহ তিনদিন ধরে লুট করেছিলেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল কোহিনূর হীরক খণ্ড। সেই শহর আজ অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোও মনে করিয়ে দেয়ার অবস্থায় নেই। আমি প্রথমবার পুরাতন দিল্লি বা শাহজাহানাবাদে গিয়ে যখন চারদিকে দেখছিলাম তখন যেন চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ইতিহাস উঁকি দিয়ে গিয়েছিল। হয়তো যারা শাহজাহানাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য এ জায়গা কেবলমাত্র ছোট ছোট কারখানা আর বৃহৎ সস্তা, খুচরা আর পাইকারি বাজারের ধূসর দালানকোঠাগুলো মাত্র। অনেকেই হয়তো আসতেও চাইবে না। কিন্তু যারা প্রকৃত ভ্রমণ পিপাসু, যারা ভ্রমণে ইতিহাস খোঁজ করেন, পুরাতন দিল্লি এখনও সেই ইতিহাসের জৌলশময় দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দেবে। এখনকার মূল বাসিন্দারা কঠিন জীবনযাপন করে আসছেন।
এই শাহজাহানাবাদ এক সময় সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। ছিল উর্দু ভাষার কবি-মহাকবিদের মিলনস্থল। ফার্সি ভাষা চর্চার কেন্দ্র যার নেতৃত্ব দিতেন মোগল দরবারের রাজকুমার বা রাজকুমারীরা। এখনো অনেক ক্ষয়িষ্ণু পরিবারের সদস্যরা কিছু ধরে রাখবার চেষ্টা করছেন। হয়তো কয়েকটি বিবর্ণ বাঁধানো ছবি আর পুরাতন গড়গড়াটা পরিষ্কার করে অতীত জীবনের স্মৃতি হাতরিয়ে বেড়াচ্ছেন। বেশির ভাগ উর্দু সংস্কৃতি আর গজল কবিতার ধারকরা পাকিস্তানে চলে গিয়েছেন। ইতিহাস হয়ে থাকা অনেক বড় বড় নামের কবিদের অস্তিত্বই নেই। জউখ এখন লক্ষ্ণৌয়ের রেললাইনের ধারের কোনো কবরে শুয়ে আর মীর্জা গালিব নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের প্রবেশমুখে উন্মুক্ত আকাশের নিচে অযত্নে অবহেলায় রয়েছেন।
এক সময় শাহজাহানাবাদে পড়ন্ত বিকেলে ছাদের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবুতরবাজরা কবুতরবাজি করতেন। এ খেলা ছিল বড় বড় হাভেলীর নবাবদের। মোগল সম্রাট আকবরের শখ ছিল কবুতরবাজি। যার নাম রেখেছিলেন ‘ইসকবাজি’। সে সময় হতেই উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পরে এ শখের খেলা। একজনের কবুতরের ঝাঁক অন্য কবুতরের সঙ্গে খেলা দেখাতে দেখাতে নিজের ঝাঁকের সঙ্গে নিয়ে আসা। ইতিহাসে বর্ণিত যে, সম্রাট আকবরের প্রায় বিশ হাজার কবুতর ছিল। এসব কবুতরের জন্য অর্থ বরাদ্দ ছিল। ছিল পরিচর্যার জন্য বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তাগণ। আকবরের এই শখ ছিল বাল্যকাল থেকেই। হবেই বা না কেন, মাত্র ১২ বছর বয়সকালে পিতৃবিয়োগ ঘটলে মাতা হামিদা বানুর হাত ধরে সিংহাসনে বসেছিলেন। কাজেই বাল্যকালের শখ রাজকীয় শখে পরিণত হয়েছিল। আকবরের কবুতরের ঝাঁকের মধ্যে পাঁচশত কবুতর ছিল বিশেষ ধরনের। এদের জন্য ছিল বিশেষ ব্যবস্থা। তিনি নিজে তার প্রিয় কবুতরগুলোকে নাম দিয়েছিলেন। সম্রাট শাহজাহান তার দাদার এই গুণটি পেয়েছিলেন। ওই সময়ে বিকেলে শাহজাহানাবাদের আকাশে কবুতরের পাখা ঝাপটা আর তাদের নিয়ন্ত্রকদের তীক্ষ্ণ শিসের বা অন্যান্য আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠতো শাহজাহানাবাদ।
এখনো শাহজাহানাবাদে বিকেলে চলে কবুতরবাজি। তবে এখন আর এ খেলা নবাব বা রাজকুমারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এ খেলা চলে এসেছে সাধারণ মানুষের আঙ্গিনায়। এখনো উড়তে দেখা যায় সিরাজী, লাল খাল, আজাদী, গোলে, মাসাককলি এবং কাবুলী কবুতরের ঝাঁক। এখনো কবুতরের ঝাঁকে ঝাঁকে প্রতিযোগিতা হয়। এখনো অন্য ঝাঁক হতে কবুতর ছিনিয়ে আনবার কৌশল শেখানো হয়। ছাদের উপর হতে ডাক শোনা যায় ‘আও আও’। তবে যা দেখা যায় না অতীতের সেই চাকচিক্য আর কবুতরবাজিতে শাহজাহানাবাদ মাতিয়ে রাখা। এখনো হুক্কার চলন থাকলেও নাকে আসে না বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি তামাকের ঘ্রাণ। নবাব আর সম্রাটদের হুক্কা এখন ‘সিসায়’ পরিণত হয়েছে। সুগন্ধি তামাকের জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে মাদক আর তৈরি হয়েছে ‘সিসা’ বার। এর ব্যাপ্তি আরেক মোগল শহর জাহাঙ্গীরনগর- এখনকার ঢাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
কবুতরবাজি লক্ষ্ণৌ আর দিল্লি হয়ে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহরগুলোতে পৌঁছেছে। মহাজিরদের কল্যাণে পাকিস্তানের শহর করাচিতেও পৌঁছেছিল। আমার কৈশোর কেটেছিল এই শহরে। আমারও শখ ছিল কবুতরবাজির। প্রায় দেড়শত কবুতর ছিল আমার সংগ্রহে। এগুলো সবই পুরাতন স্মৃতি।
শাহজাহানাবাদ আজ স্মৃতির গহ্বরে ঠিক যেমনি শাহজাহানের পিতার তৈরি ঢাকার ঐতিহ্য। পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্য এখন সেকেলে। আধুনিক হবার প্রতিযোগিতায় সমাজের অবক্ষয়, যার উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি।
শাহজাহানাবাদ আর চাঁদনীচক ক্রমশই ইতিহাসের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো আর কয়েক দশক পর ‘শাহজাহানাবাদ’-এর নাম ইতিহাসে খুঁজে নাও পাওয়া যেতে পারে। পুরাতন দিল্লি হয়তো থাকবে না। হয়তো পুরাতনের উপরেই গজিয়ে উঠতে পারে নতুন শহর। যে শহরের নিচে হারিয়ে যাবে মোগলদের ঐতিহ্য, জৌলুসভরা কাহিনী আর খণ্ড খণ্ড কাহিনী শোনাবার মতো আহমেদ গিয়াস আর ইকবাল আলীদের মতো ব্যক্তিরা। কতজনই বা জানেন যে ‘চাঁদনীচক’ নামটি যিনি দিয়েছিলেন সেই মোগল শাহজাদী ‘জাহানারা’, শাহজাহান কন্যা আজ নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজার প্রাঙ্গণে উন্মুক্ত কবরে শায়িত। মাঝেমধ্যে দু’একজন দর্শনার্থী খুঁজে বের করেন জাহানারার সমাধি।
প্রথমবার দিল্লিতে এসেই গিয়েছিলাম দিল্লির সূফী সম্রাট হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারে। এক ঐতিহাসিক স্থান। প্রবেশপথে আমীর খসরুর মাজার যিনি উপমহাদেশে কাওয়ালীর প্রচলন করেছিলেন। তিনি নিজে কাওয়ালীর জন্য কবিতা, কাসিদা আর গজল লিখতেন। তিনি আওলিয়ার প্রধান শিষ্য ছিলেন। পরিচিত হন সূফী সাধক হিসেবে। বিখ্যাত হয়ে উঠেন সূফী সাধক হিসেবে। মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে মোগল বংশের বহু বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধি যার মধ্যে অন্যতম জাহানারা।
নিজামউদ্দিন আওলিয়ার দরগাতে সারা বছরব্যাপী প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। সমাগম হয় সকল ধর্মের মানুষের। ভাবতে অবাক হতে হয় কিভাবে পরাক্রমশীল সুলতানদের সময়ে একজন সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেন অতীব সাধারণ মানুষের ‘মসিহা’। উপমহাদেশের সূফীদের ভক্ত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের মানুষ। আওলিয়ার সঙ্গে সুলতানদের সম্পর্ক যে মধুর ছিল না তার বিবরণ আগেই দিয়েছি। হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া যখন সূফী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন তখন জালালউদ্দিন খিলজি দিল্লির মসনদে। তিনি কোনোদিন জালালউদ্দিনের ধারে কাছেও ঘেঁষেননি। বেশ কিছুক্ষণ ছিলাম এই ঐতিহাসিক চত্বরে কেবলই মনে পড়ছিল তার উক্তি- ‘হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’। ছোটবেলা হতেই শুনেছি এ বাক্য। তখন জানতাম না এর ইতিহাস।
নিজামউদ্দিন হতে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দিল্লির অষ্টম শহর ‘লুটিয়েন্স দিল্লি’ বা নয়াদিল্লি। এ স্বাধীন ভারতের রাজধানী। প্রথমবারও দেখেছি। এবারও দেখলাম। লুটিয়েন্স একমাত্র তাজমহল ছাড়া তৎকালীন ভারতের কোনো স্থাপনাকেই শৈল্পিক মনে করেননি। তিনি বৃটিশ রাজের জন্য তৈরি করেছিলেন সর্বাধুনিক রাজধানী। তৈরি করেছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সরকারি আবাসস্থান যা আজ ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। যার কথা প্রারম্ভে বলেছি। ইন্ডিয়া গেটে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অন্যতম প্রশস্ত রাজপথ যার এখনকার নাম জনপথ তার অপর প্রান্তে রেইসিয়ানা পাহাড়ের অপর প্রান্তের বিশাল প্রাসাদটি দেখা যায় না। ক্রমেই সামনের দিকে এগুলে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের উদয়ের মতো উপরে উঠতে থাকে এই প্রাসাদ। এবারই দেখবার সুযোগ হয়েছিল ভেতরের কিছু অংশ, বিশেষ করে দরবার হল আর অশোকা হল। ১৯১১ সালে কলকাতা হতে রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করলেও ১৯৩১ সালের আগে শেষ করতে পারেনি নতুন দিল্লির কাজ। যখন নতুন দিল্লি পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ওই সময় হতেই ভারতবর্ষে বৃটিশরাজের সূর্য অস্তগামী এরপর মাত্র ১৬ বছর টিকে ছিল বৃটিশ রাজ। যখন নতুন রাজধানীর পরিকল্পনা করা হয় তখন বৃটিশ রাজ ৫০০ শ’ বছরের রাজত্বের পরিকল্পনায় বিভোর ছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে ১৮৫৭-এর ঘটনা ভারতের জাতীয়তাবাদের নতুন রূপ দিবে। ওই বিদ্রোহের পর মাত্র ৯৯ বছরই টিকেছিল সমগ্র ভারতে বৃটিশ রাজ।
যাই হোক বর্তমানের রাষ্ট্রপতি ভবন, তৎকালীন ভাইসরয় প্রাসাদ, নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৯৩১ সালে, ওই সময়ে খরচ হয়েছিল ৪,৭৭,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড। এই ভবনের মোট কক্ষ সংখ্যা ছিল ৩৫৫টি। বর্তমানে ১৯০০০ ঘন মিটার আয়তনের এই ভবনে রয়েছে ৩৪০টি কক্ষ। আমাকে যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, তার এ ভবনে ৮ বছরের কর্মকালে পঞ্চাশটি রুমের বেশি দেখতে পারেননি। রাজকীয় ভবনই বটে।
এই ভবনটি তৈরিতে কোনো স্টিল ব্যবহার হয়নি। ব্যবহার করা হয়েছিল ৭০০ মিলিয়ন ইট আর ৩.৫ মিলিয়ন ঘন মিটার পাথর। ওই সময় বাগানের পরিচর্যার জন্য নিয়োজিত ছিল ৪১৮ জন মালী। এখন এ সংখ্যা অনেক কম।
এই ভবনের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। আর স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিয়োজিত হয়েছিলেন সি রাজা গোপালচারি। তিনি সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। তিনি ভাইসরয়দের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল শয়নকক্ষে থাকেননি। তিনি বেছে নেন ছোট একটি কক্ষ যা আজও রাষ্ট্রপতির বাসকক্ষ। ওই শয়নকক্ষটি এখন অতিথিশালা।
দিল্লি আমাকে সব সময়েই রোমাঞ্চিত করে। মনে হয় এত বিশাল ইতিহাস যার পরিমাপ সম্পূর্ণভাবে এক জীবনে করা সম্ভব নয়। বিচিত্র ইতিহাস এই নগরীর। দিল্লির ইতিহাস প্রভাবিত করে রেখেছিল সমগ্র উপমহাদেশ। লাহোর-দিল্লি-ঢাকা প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। মাঝে মধ্যে ভাবতেও অবাক লাগে কিভাবে দিল্লি হতে ১২০০ মাইল অতিক্রম করে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজি ১২০১ সাল হতে ১২০৪ সালের মধ্যে বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করে বাংলার ভাগ্য দিল্লির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল। সেই বন্ধন কি এখনো কেটেছে? মনে হয় না অন্তত ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে পিতা জাহাঙ্গীরের নামে তৈরি শহর জাহাঙ্গীরনগর আর পুত্র শাহজাহানের তৈরি শাহজাহানাবাদের সঙ্গে একটা বিশাল যোগসূত্র তো ইতিহাস স্বীকৃত। তবে পর্যায়ক্রমে সে যোগাযোগ যথেষ্ট শিথিল হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর এখন ঢাকা আর শাহজাহানাবাদ পুরাতন দিল্লি। অনেক স্মৃতি আর অনেক ইতিহাস এসব জায়গা দেখতে হলে যা প্রয়োজন তাহলো ঐতিহাসিক অনুভূতির।
(এই প্রবন্ধটি লেখকের অনবদ্য ভ্রমণ কাহিনী ‘কত জনপদ কত ইতিহাস’ হতে সংকলিত।)
সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০১৭
Saturday, March 5, 2016
কেমন হবে এবারের নির্বাচন by এম সাখাওয়াত হোসেন
অপর দিকে বাংলাদেশ তথা পাকিস্তান সময় থেকে যেভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হতো, তার আদল বদলেছে। হালের পৌরসভা নির্বাচনের মতোই ইউনিয়ন পরিষদের একমাত্র চেয়ারম্যান পদেই দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে দলীয়ও বলা যাবে না। কারণ, শুধু চেয়ারম্যান দলীয় হলেও পরিষদ আগের মতোই থাকছে। এ কারণেও তৃণমূল পর্যায়ের এই নির্বাচনও বেশ জটিল হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০টি চেয়ারম্যান পদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছে বা হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টিই বাগেরহাট জেলায়। এ কাণ্ডও ঐতিহাসিক। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যায়ের নির্বাচনে এতসংখ্যক চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হননি। অন্তত আমার জানামতে নয়।
অবশ্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যাপক নির্বাচনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে। নির্বাচন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যাঁরা প্রচুর গবেষণা করছেন, তাঁদের মতে, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় যদি একবার বিপর্যয় ঘটে, তবে ওই নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থার ওপর জনগণ যেমন আস্থা হারায়, বেপরোয়া হয়ে ওঠে, মরিয়া প্রার্থীরা যেকোনো উপায়ে নির্বাচনকে নিজের অনুকূলে আনতে চান। এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায়ও ধস নামে। অবশ্য তাঁদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটে উঠতি গণতন্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে। অবশ্য এসব গবেষণার ক্ষেত্র আফ্রিকা এবং দু-একটি এশিয়ান রাষ্ট্র, যার মধ্যে ফিলিপাইন অন্তর্গত ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বিগত নির্বাচনগুলো বিশেষ করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হতে পারে। গবেষণার বিষয় হতে পারে কেন বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পরের নির্বাচন, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ এবং পরবর্তী নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা গেল না।
যা-ই হোক, আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা যে ভঙ্গুরের পথে, তা নিয়ে বড় গবেষণার প্রয়োজন নেই। দৃশ্যমান যে তেমনটি হয়েছে। এমনিতেই বাংলাদেশের সব স্তরের নির্বাচনগুলোর মধ্যে সর্বকালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সব সময়ই জটিল এবং সর্ববৃহৎ নির্বাচন
বলে বিবেচিত। শুধু প্রথম ধাপেই প্রায় ৩৯ হাজার ৪৩০ জন বিভিন্ন স্তরের প্রার্থীর সমাবেশ ঘটেছে। এই ধারায় ৪ হাজার ২৭৯ ইউনিয়নে সর্বমোট কত প্রার্থী হবেন, তা অনুমেয়। প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারের এই নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করার কথা রয়েছে।
শুধু নতুন নতুন চ্যালেঞ্জই নয়, প্রথম ধাপে যেসব অঞ্চলে নির্বাচন হচ্ছে, সেসব অঞ্চল বাংলাদেশের দুর্গম অঞ্চলগুলোর অন্যতম। এ অঞ্চলে রয়েছে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। বঙ্গোপসাগরের মোহনার চরাঞ্চলগুলোর ইউনিয়ন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাদেশের অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন অঞ্চল চর কুকরি–মুকরি ইউনিয়ন, ভোলা জেলার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নগুলো, যার মধ্যে মনপুরা উপজেলা অন্তর্গত। লক্ষ্মীপুর, ফেনী অঞ্চলের চরাঞ্চল, বাগেরহাটসহ সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলের ইউনিয়নগুলো। এগুলো সাধারণ অবস্থায়ও আইনশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের নিম্ন অঞ্চল ও চরগুলোতে সব সময় জলদস্যুদের আতঙ্কে থাকেন সাধারণ জনগণ। কাজেই এসব অঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর নির্বাচন এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। কাজেই বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দৃশ্যমান অনিয়ম ও সংঘাত যোগ হলে এবারের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ তো হবেই, সংঘাতময়ও হয়ে উঠতে পারে। এ সংঘাত শুধু সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যেই নয়, সরকারি দল ও অন্যান্য দলের আন্তদলীয় কোন্দলে রূপ নিতে পারে।
যেমনটি আগেই বলেছি যে এবারই প্রথম দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে, যার পরিসর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্বাচন বলে আখ্যায়িত। ২০১১ সালের শেষ নির্দলীয় নির্বাচনেও কয়েক ধাপে নির্বাচন হয়েছিল। তখন এক ধাপের ফলাফল অন্য ধাপকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তবে এবার বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। এতগুলো নির্বাচন এক দিনে অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়, অবশ্যই ধাপে ধাপে করতে হবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার চলমান পদ্ধতির অবশ্যই পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। পৃথিবীর প্রায় সব দলীয় পরিচয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচনের ফলাফল একটি নির্ধারিত দিনে প্রকাশ করা হয়, যাতে আগাম প্রভাব না পড়ে। আগাম প্রভাব পড়লে সে নির্বাচনকে অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য বলা যায় না। কারণ অতি সহজ। এক অঞ্চলের নির্বাচনের ফলাফল বাকি নির্বাচনকে ও নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবেই। এ বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা বা চিন্তাভাবনা আদৌ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। এই বিষয়টি অবশ্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ইউপি নির্বাচন ২০১৬, কতখানি সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট সন্দেহ ইতিমধ্যেই জন্মাতে শুরু করেছে, বিশেষ করে যে ধরনের পরিস্থিতির আলামত দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনকে অনুকূলে আনার নানা ধরনের কৌশল বিভিন্ন নির্বাচনে বিভিন্নভাবে গ্রহণ করে থাকে। প্রতি নির্বাচনে প্রতিবার একই ধরনের কৌশল গৃহীত হয় না। বুথ দখল সবচেয়ে সহজ পন্থা। তবে অনেক সময় বিভিন্ন পন্থার সঙ্গে বুথ দখল করা হয়। সম্পূর্ণ নির্বাচনে যেসব জায়গায় কোনো শক্তিশালী দলীয় প্রার্থীর হারার আশঙ্কা থাকে, সেসব জায়গায় বেআইনিভাবে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ হয় বেশি। আমাদের মতো দেশে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা সরকারি দলেরই বেশি। এই প্রভাবের মাত্রা বৃদ্ধি পায় যখন দলীয় সরকার ধারাবাহিকভাবে একাধিক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকে এবং থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকে। দলীয় সরকারের হাত ততই শক্ত হয়, যখন বিরোধী পক্ষ দুর্বল হতে থাকে।
এমন কথাই বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত। নির্বাচন কেন বিতর্কিত বা পরাজিত হয়, তেমন একটি গ্রন্থে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ‘কমপেরেটিভ পলিটিকস’-এর প্রফেসর পিপ্পা নরিস তাঁর গবেষণাধর্মী পুস্তক হোয়াই ইলেকশন ফেইলস (Why Election Fails) প্রারম্ভে নির্বাচন বিতর্কিত, মানসম্পন্ন না হওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার যত সব কারণ উল্লেখ করেছেন, তাতে বলেছেন যে ক্ষমতাসীনেরা যখন প্রতিপক্ষের নির্বাচনী চ্যালেঞ্জকে বিভিন্ন কৌশলে ভোঁতা করে এসব কৌশলেরও ফিরিস্তি দিয়েছেন, যা আমরা বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করেছি।
অনেক কৌশলের মধ্যে কিছু কিছু কৌশল প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন বাইরে নিজস্ব সমর্থকদের বিশাল লাইন এবং ওই লাইন ধীরগতিতে বুথে প্রবেশ করে এবং একই সময়ে বুথের ভেতরে বুথ দখল করে ব্যালট ছিনতাই করে বাক্স ভর্তি করা হয়। এ পদ্ধতিকে বুথ জ্যাম বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করতে গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের বুথে প্রবেশাধিকার খর্ব করা হয়। অপর কৌশল যা কার্যকর বলে প্রতীয়মান, তা হচ্ছে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রদানে বাধা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে প্রত্যাহার অথবা কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে বাতিল করা। এসবই নির্বাচনকে অনুকূলে আনতে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যবহার করে থাকেন। গবেষকদের মতে, এ ধরনের অরাজকতা তখনই সম্ভব, যখন নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থা বা নির্বাচন কমিশন কার্যকারিতা হারায় বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে নত হয়।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আসন্ন ইউপি নির্বাচনের যে হালচিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে নির্বাচন কমিশন অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে।অন্যথায় যেসব অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বা হচ্ছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারত বা পারে। অতীত পর্যালোচনা করলেই বর্তমান পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পায়। বিশ্বব্যাপী বর্তমান ব্যবস্থাপনায় গণমাধ্যম নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সহায়ক শক্তি। কাজেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত নির্বাচনী ব্যত্যয়গুলো নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা উচিত। মৌখিক অভিযোগও গুরুতর অভিযোগ। তা ছাড়া, নির্বাচনকে ন্যূনতম পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে ‘রি-অ্যাক্টিভ’ নয় ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ হতে হবে। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কমিশনের জন্য শক্ত চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ তারা কীভাবে মোকাবিলা করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে এই কমিশন ইতিহাসে কীভাবে চিহ্নিত হবে। এটাই হয়তো তাদের শেষ বড় ধরনের নির্বাচন।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
Friday, February 19, 2016
পৌরাণিক কাহিনির পুনরাবৃত্তি যেন না হয় by এম সাখাওয়াত হোসেন
এই পৌরাণিক কাহিনির সেই ঘটনা আজও উপমা হিসেবে আমরা ব্যবহার করি। এর মানে হলো দেখতে সহজ-সরল বিষয়, কিন্তু যা নাড়া দিলে সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষতি হতে পারে বা অনেককেই বিব্রত করতে পারে, এমনকি সমাজের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। আমরা ব্যক্তি হিসেবে অথবা রাষ্ট্রের কোনো পক্ষ হিসেবে অজান্তে সহজ-সরল বিষয় মনে করে এমন বিষয়ে নাড়া দিই, যা রাষ্ট্রের, তথা সমাজে নানা ধরনের বিব্রতকর, এমনকি জটিল সমস্যায় ফেলে দিতে পারে।
প্যান্ডোরার বাক্স খোলার মতো নানা ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটে থাকে, তবে তা যদি সরকারি, আধা সরকারি অথবা সরকার-সমর্থিত কোনো সংগঠন দ্বারা হয়, তা হিতে বিপরীত হতে পারে। ইদানীং বাংলাদেশের প্রধান ও অন্যতম দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার যে মামলার পর মামলা হচ্ছে এবং যে কারণে হচ্ছে, তাতে সরকার ও সরকারের মূল দলের কতখানি উপকার হবে, আমার মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে ধারণা করা সম্ভব নয়। তবে যে প্রেক্ষাপটে এসব মামলা হচ্ছে, সে প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণে বলা যায়, আমাদের দেশে ভুল করার পর অথবা কোনো অন্যায় আচরণ করার পর ভুল স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশ করে ভুল স্বীকার করার জন্য মানসিক ও নৈতিক সাহসের প্রয়োজন। এমন ঘটনা আমাদের দেশের ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কমই শোনা বা দেখা গিয়েছে। যেভাবেই হোক, মাহ্ফুজ আনাম অকপটে স্বীকার করে সেই সৎ সাহস দেখিয়েছেন।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সমাজের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের অনেকের কর্মময় জীবনের জানা-অজানা অনেক ভুলের জন্য প্রতিষ্ঠান এবং দেশের বহু আইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে যথেষ্ট ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেন। এ উপমহাদেশেরই বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ দুঃখ প্রকাশ করে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, এমন নজির রয়েছে এবং জনগণও যে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করেছেন, তারও নজির রয়েছে।
এমন ঘটনার নজির ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও রয়েছে। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, যিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিজয় এনে দিয়েছিলেন, তাঁর দল এবং তাঁর ভরাডুবি হয়েছিল। এর প্রেক্ষাপট ছিল ভারতে লম্বা সময়ের জন্য জরুরি অবস্থায় শাসন আর নিপীড়ন, ব্যাপক দুর্নীতি ও অপশাসন। ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন, জনগণের কাছে তাঁর কৃতকর্ম ও ভুল পদক্ষেপের জন্য ক্ষমা না চাইলে তাঁর ও তাঁর দল কংগ্রেসের রাজনীতি নির্বাসিত হতে পারে। তিনি পাঁচটি বছর তাঁর অপশাসনের জন্য জনগণের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাঁকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। এখান থেকেও আমাদের রাজনৈতিক দল, নেতা ও প্রভাবশালীরা শিক্ষা গ্রহণ করেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জনগণ আশা করেছিলেন, দল হিসেবে বিএনপি ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যা আজ পর্যন্ত করেনি। শুধু বিএনপিই কেন, কেউই করেনি।
আমাদের দেশে ভুল করার পর অথবা কোনো অন্যায় আচরণ করার পর ভুল স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশ করে ভুল স্বীকার করার জন্য মানসিক ও নৈতিক সাহসের প্রয়োজন এক-এগারো বলে পরিচিত জরুরি অবস্থার সময়ের সেই ঘটনা এখন এত দূর গড়িয়েছে এবং শুধু একটিই নয়, দু-একটি বাদে সব পত্রিকাতেই একই ধরনের খবর ছাপা হয়েছিল। মাহ্ফুজ আনামের বক্তব্য থেকে জানা যায়, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে খবর জোগান দেওয়া হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোনো বিষয়ে তথ্য প্রদান করলে বা প্রতিবেদন তৈরি করলে, তার কিছু তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন হয়। এসব তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করার পদ্ধতিও রয়েছে। এগুলো বেশির ভাগই জোগাড় করা হয় নিজস্ব পদ্ধতিতে এবং যার বিরুদ্ধে বা কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে মূল তথ্য বেশির ভাগ সময়ই গোয়েন্দা সংস্থা কর্তৃক নিয়োজিত অথবা অনেকে অনেক ধরনের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো কারণে প্রদান করে থাকে। এর বিনিময়ে নানা ধরনের সুবিধা বা প্রলোভন অথবা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে থাকে। এসবই বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দা তৎপরতার স্বীকৃত পদ্ধতি।
এসব পদ্ধতি অনেকের কাছে অনৈতিক মনে হলেও বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য সংগ্রহের প্রধান ও কার্যকর পদ্ধতিই হলো হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স। বিশ্বব্যাপী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অন্যতম সোর্স হলো ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’। এক-এগারোতেও এ দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এর ব্যতিক্রমে তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে মনে হয় না। এ কারণেই প্রারম্ভে প্যান্ডোরার বাক্সের প্রসঙ্গ টেনেছিলাম।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যাঁকে কেন্দ্র করে ওই সময়ে এ ধরনের খবর পরিবেশন করা হয়েছিল, ওই সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বা তাঁর তরফ থেকে কোনো ধরনের ব্যবস্থার কথাও শোনা যায়নি। তা ছাড়া, তিনি আগেও ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্তও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কাছে এসব তথ্য অজানা থাকার কথা নয়, তথাপি তিনি উদারতা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ওই সময়ের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত, তিনি জানেন কারা, তাঁর বিরুদ্ধে কী করেছেন। তথাপি তিনি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখেছেন। ক্ষমা করায় তাঁর উচ্চতা আরও বেড়েছে বৈ কমেনি।
ডেইলি স্টার-এর সম্পাদকের বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা নিয়ে দেশে-বিদেশে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে, যা গণতন্ত্রের অন্যতম অঙ্গ গণমাধ্যমকে কতখানি প্রভাবিত করবে, তা দেখার বিষয় হবে। যেহেতু মামলাগুলো বিজ্ঞ আদালত গ্রহণ করেছেন, কোথাও কোথাও সমনও জারি করা হয়েছে, কাজেই দেশের সাধারণ মানুষও অপেক্ষা করবে বিচারের এবং বিচারের পরিণতির। আমরা আশা করি, দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের বিকাশ হোক এবং এর ভিত মজবুত হোক, যাতে আমাদের অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে কখনোই পড়তে না হয়। অগণতান্ত্রিক পরিবেশে সমাজ, রাষ্ট্র ও সুস্থধারার রাজনীতি বিকশিত হতে পারে না।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
Sunday, January 17, 2016
চরম সংকটে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা by এম সাখাওয়াত হোসেন
কয়েকটি পত্রিকার বিস্তারিত তথ্য বিবরণে (প্রথম আলো, আমাদের সময়; ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬) এবং দু-একটি বেসরকারি টেলিভিশনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা সত্যিই হতাশাজনক। কারণ, মূল নির্বাচনে যা-ই হয়ে থাক না বা হয় না কেন, অতীতে ওই সব বিচ্যুতি ইতিপূর্বে স্থগিত নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়নি। স্থগিত বা পুনর্নির্বাচন সাধারণত এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, যেখানে ফাঁকফোকর যেমন থাকে না, তেমনি নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করায় কোনো সমস্যাই থাকে না। হাতে গোনা কয়েকটি এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা আমাদের নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কোনো বড় ঘটনা হওয়ার কথা নয়। অতীতে এ ধরনের নির্বাচন নিয়ে সংবাদপত্র বা অন্যান্য মিডিয়ায় এতখানি জায়গা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলেও মনে হয় না।
অন্যান্য স্থগিত কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে জাল ভোটের মহোৎসব হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। তবে মাধবদী পৌরসভার সম্পূর্ণ ১২টি কেন্দ্রের যে বিস্তারিত তথ্য ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬-এর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তা নির্বাচন বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করার ইচ্ছা রাখেন, তাঁদের জন্য একটি ‘কেস স্টাডি’ হতে পারে। ওই উপনির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীই জয়ী হয়েছেন, হয়তো সুষ্ঠু ভোট হলেও তিনিই নির্বাচিত হতেন। এসব নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের এত বড় ব্যবস্থাপনার মধ্যে কেন এমন হবে, তা গবেষণার বিষয় হতে পারে।
প্রকাশিত তথ্যমতে, মাধবদী নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য প্রায় শতাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১২টি কেন্দ্রের জন্য আটজন নির্বাচনী কর্মকর্তাকেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা যায় যে এসব কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এমতাবস্থায় এমন কারচুপি, জাল ভোট আর কেন্দ্র দখল কেন এবং কীভাবে হতে পারে? এতসংখ্যক সদস্য থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কি একেবারেই অন্ধকারে ছিল? তথ্যে প্রকাশ যে ওই পৌরসভার ভোট গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের একজন অতি অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি কী দেখেছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনে কী তথ্য দিয়েছিলেন, তাও জানা যায়নি। এত বেষ্টনীর মধ্যেও দুটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণের পর প্রকাশ্যে দখল করা হয়েছিল। ওই কেন্দ্রগুলো স্থগিত করা হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এত কিছুর পরেও কেন এই নির্বাচনকে বৈধ করতে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণা করলেন? তিনি কি এ অরাজকতার খবর পাননি? এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনের কী করণীয় ছিল বা করতে পারত? এতসব কাণ্ড যখন চলছিল তখন নির্বাচন কমিশনে কী ধরনের তথ্য আসছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনই দিতে পারবে। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচন কমিশনের না জানার কথা নয়। মাধবদী ঢাকা থেকে তেমন দূরেও নয়।
মাধবদীর নির্বাচন পর্যালোচনায় বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে, যার দু-একটির সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রথমই প্রশ্ন ওঠে যে সরকারি দলের প্রার্থী, যাঁদের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এগিয়ে থাকার কথা, তাঁদের পক্ষে কেন নির্বাচনে তথ্যমতে কারচুপির পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছে? সরকারি দলের বিপক্ষে মূলত যে দলটি রয়েছে, তাদের সাংগঠনিক অবস্থা দৃশ্যত দুর্বল এবং জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে প্রায় প্রতিদিন সরকারি দলের মুখপাত্ররা বলে থাকেন। এমনকি ইদানীং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেফাঁস অহেতুক মন্তব্যও তাদের বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা হয়। তথাপি সরকারি দলের প্রার্থীকে এমন অবস্থায় কেন যেতে হলো?
কারচুপি নানাবিধ কারণে হয়ে থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। এলবার্টো সিম্পস তাঁর গবেষণা পুস্তক হোয়াই গভর্নমেন্টস অ্যান্ড পার্টিস ম্যানিপুলেট ইলেকশনস (Why Governments and Parties Manipulate Elections) উল্লেখ করেন যে মূলত দুটি কারণে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে কারচুপির আশ্রয় নেয়। প্রথমত, প্রধানত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নেয়। অবশ্য যদি প্রতিপক্ষ দুর্বল এবং প্রতিহত করার মতো অবস্থায় না থাকে। যদিও এখানে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সংস্থার কার্যকারিতার উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী পর্যায়ে কারচুপির আশ্রয় নেওয়ারও বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অবশ্য বিজয় নিশ্চিত করার বিষয়টি যেমন থাকে, তেমনি বিপক্ষকে শক্তিমত্তা প্রদর্শনের বিষয়টিও থাকে। অনেক সময় অনেক শক্তিশালী প্রার্থী, যাঁর বিজয় নিশ্চিত, এমন ক্ষেত্রেও ব্যাপক কারচুপির আশ্রয় নিয়ে থাকেন ওপরে উল্লেখিত কারণে এবং তিনি যে ব্যাপক জনপ্রিয় তার প্রমাণ দিতে। হয়তো এসবের প্রয়োজন হয় না, তথাপি কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। অবশ্য এসব গবেষণা আমাদের মতো আফ্রো-এশিয়ান দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। এই গবেষক মনে করেন যে এভাবে যারা বা যে দল বিজয়ী হয়, তাদের এ জয় জনসমর্থিত বা বৈধ না হলেও প্রতিপক্ষকে দুর্বল প্রমাণ করা এবং জনগণকে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়ে থাকে।
উপরিউক্ত গবেষণায় অনেক ফাঁকফোকর থাকলেও এমন কারচুপির নজির এন্তার। আমরা ইদানীং নির্বাচনে যে ধরনের কারচুপির উদাহরণ দেখছি, তা বিশ্লেষণ করলেও এমনই বিষয় দৃশ্যমান হয়। বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচন যদি সরকারি দলের জনপ্রিয়তার এবং প্রতিপক্ষকে আরও দুর্বল করার বিষয়টি যুক্ত থাকে। অবস্থাদৃষ্টে তেমনই মনে হচ্ছে। সরকারি দলের সমর্থিত প্রার্থীদের সিংহভাগ হয়তো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে জয়ী হতেন বলে অনেকেই মনে করেন। এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারি দল কতখানি লাভবান হয়েছে, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
আমি যে গবেষণার কথা বলেছি তা তাত্ত্বিক হলেও এর প্রতিফলন অনেক দেশের নির্বাচন পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশন বা নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সংস্থার করণীয় তেমন আলোচনায় আসেনি। নির্বাচন যাতে ব্যাপক কারচুপির মুখে না পড়ে, সে কারণে আমাদের মতো দেশে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন সংবিধান দ্বারা গঠিত হয়েছে। সংবিধানের আওতায় প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য করার জন্য। বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হতে হলে নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করতেই হবে। বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সংবিধান ক্ষমতা দিয়েছে।
বিদ্যমান নির্বাচনী আইন মোতাবেক নির্বাচন চলাকালীন যেকোনো সময়ে যদি প্রতীয়মান হয় যে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য বা অবাধ হচ্ছে না, কমিশন তার ক্ষমতা বলে আংশিক অথবা সম্পূর্ণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। অপরদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা বেসরকারিভাবে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কাছে আইনানুগ কতখানি ক্ষমতা রয়েছে তা তেমনভাবে উল্লেখ না থাকলেও সংবিধানের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, যদি কমিশন সে ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে দৃঢ় মনোভাব পোষণ করে। অবশ্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে, যদি সে ধরনের দৃঢ়চেতা কমিশন কার্যকর থাকে। মাধবদী একটি উদাহরণ হয়ে থাকত যদি নির্বাচন কমিশন পুনরায় স্থগিত করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিত। হয়তো উচ্চ আদালতে এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ হতে পারত, তাতে বিপরীত সিদ্ধান্ত হলেও নৈতিকভাবে নির্বাচন কমিশন জয়ী হতো।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে আমাদের মতো দেশের এহেন পরিস্থিতিতে কারচুপি ঠেকাতেই এত আইন এবং যজ্ঞ করতে হয়, যার উদাহরণ মাধবদী। তথাপি কারচুপি ঠেকানো যায়নি কেন? কেনই-বা নির্বাচন চলাকালীন কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি, তার উত্তর নির্বাচন কমিশনই দিতে পারবে।
নির্বাচন কমিশনের হাতকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা অনেকেই বলে থাকেন। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এখানে যে ফাঁকফোকর রয়েছে তার প্রতিকারে আইনের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তার বেসরকারিভাবে ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করার নিশ্চিত ক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে আইনে উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে করি। তবে যত আইনই থাকুক বা সংযোজন করা হোক না কেন, তা প্রয়োগ না করলে দৃশ্যমান কারচুপি ঠেকানো সম্ভব নয়। এ আলোচনা শেষ করব মাও সেতুংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে। ‘ইট ইজ নট দ্য গান বাট মেন বিহাইন্ড দ্য গান মেটারস’ (কামান নয়, কামানের পেছনের মানুষই গুরুত্বপূর্ণ) অর্থাৎ আইন প্রয়োগ না করলে আরও শত আইন করেও লাভ হবে না। আইন প্রয়োগকারীরা যদি তা প্রয়োগ না করেন বা করতে উৎসাহী না হন তবে আইন থেকেও কোনো লাভ নেই। মাধবদীর পুনর্নির্বাচন এমনই একটি উদাহরণ।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
Thursday, January 7, 2016
পৌর নির্বাচন ২০১৫- ৭৪ শতাংশ ভোটকে স্বাভাবিক বলা যাবে না by এম সাখাওয়াত হোসেন
নির্বাচনের তফসিলের পরে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ছিল ২৩৪টি পৌরসভা, যার মধ্যে সাতটি পৌরসভা নির্বাচন করতে হয়নি। কারণ মেয়র পদসহ বেশ কিছু কাউন্সিলর পদও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ভোট গ্রহণ হয়নি। এটাও বাংলাদেশের পৌর নির্বাচন-২০১৫-এর বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকবে। ওই সাতটি বাদ দিলে ফল পাওয়া গেছে ২০৭টিতে এবং ২০টি পৌরসভার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ স্থগিত করায় বাকি ১৯টিতে আংশিক ফলাফল পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ ফলাফল হয়নি বিধায় স্থগিত রয়েছে।
এ ভোটের মেয়রভিত্তিক দলওয়ারি ফলাফল উল্লেখ করার তেমন প্রয়োজন না থাকলেও পরিসংখ্যানের ছোট বিশ্লেষণ উল্লেখ করছি। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সরকারি দল আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৬৮টি, অন্যতম বৃহত্তম দল বিএনপি ২২; বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাপা একটি এবং অন্যান্য পেয়েছিল ২৬টি, যার মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত তথাকথিত বিদ্রোহীরা। এই বিদ্রোহী জয়ী প্রার্থী এবং স্থগিত ২০ পৌরসভার বিজয়ীরা স্বীয় দলে ফিরে গেলে এবং স্থগিত পৌরসভাগুলোর নির্বাচন শেষ হলে সরকারি দলের সংখ্যা আরও বাড়বে।
যা-ই হোক, বিএনপি প্রায় সাত বছর পর স্বীয় দলীয় প্রতীক নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ছিল, এটা ওই দলের জন্য বড় স্বস্তি হতে পারে। তবে ওই দলের এমনভাবে হেরে যাওয়ার কারণগুলো কী, তা দলটির বিচার-বিশ্লেষণে বের হবে। এই নির্বাচনে জাতীয় সংসদের জন্য নিবন্ধিত ৪০টি দলের ২০টি দল অংশগ্রহণ করলেও তাদের দলের অবস্থান তৃণমূলে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তার প্রমাণ এই নির্বাচন। এমনকি জাতীয় পার্টিও তার ভোটব্যাংকের সমর্থন পায়নি, যেমন পায়নি বিএনপি। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান খুবই নাজুক থাকলেও তাদের ভোটের শতাংশ ছিল ৩২ দশমিক ৪৯ এবং প্রাসঙ্গিক পর্যায়ে আসন ছিল ২৯টি। অপরদিকে আওয়ামী লীগের আসন ছিল ২৩০টি এবং প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ৪৮ দশমিক ১৩, প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
এবারের পৌরসভা নির্বাচন কেমন হয়েছে, এমনটাই প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের পরপরই। কারণ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গণমাধ্যমে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে এ নির্বাচনও ২০১৪ সাল থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে যে নেতিবাচক সংস্কৃতির মাত্রা দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে তেমন উন্নত হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকারের এই মেয়াদকালে নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় যে নিম্নমুখিতা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে, ভবিষ্যতে তার উন্নতির লক্ষণ দেখা যাবে বলে মনে হয় না। ২০০৮ সালের পরে ২০১৩ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের ওই মেয়াদের কোনো নির্বাচন নিয়ে তেমন বড় কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যৌক্তিকতা ওই সময়ের জাতীয় সংসদে একাধিকবার রেফারেন্স হিসেবে উত্থাপিত হয়েছিল। তবে বিদ্যমান সংসদে এমন দাবি আর উচ্চারিত হয়নি।
আগেই বলেছি যে শুধু প্রতীক ছাড়া ২০১১ সালের নির্বাচনেও দলের সদস্যরাই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের নির্বাচনের সঙ্গে এ নির্বাচনের সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি। এ তুলনার জন্য ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক প্রাপ্ত ২০৭টি পৌরসভার গড় ভোটের ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশ (৭৪%)।
এবং উল্লেখিত পত্রিকার তথ্যমতে মেয়র পদে এই পরিসংখ্যানে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ৭৪টি পৌরসভায় এবং ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে ৬৩টি পৌরসভায়। তার মানে ২০৭টি পৌরসভার মেয়র পদের মধ্যে ১৩৭টিতে ৭৫ শতাংশের ওপরে ভোট পড়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পৌরসভায় গড়ে ৯০ শতাংশ ভোট পড়েছে। নলডাঙ্গার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট পড়েছে শতভাগ, যেমন ছিল যশোরের এমএম কলেজের কেন্দ্রটিতে। দৈবক্রমে ধরা পড়েছিল যশোরের ওই কেন্দ্র। কারণ, তিনটার সময় সেখানে ভোট গণনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
লক্ষণীয়, এসব জায়গায় গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শুধু মেয়র পদে গড়ে ৭৪ শতাংশ এবং ৭৫ থেকে ১০০ ভাগ ভোট পড়া অবাক কাণ্ড। কারণ, নিকট অতীতে কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ হারে ভোট পড়ার উদাহরণ নেই এবং সোজা অঙ্কে তেমনটা সম্ভব নয়। ২০১১ সালের পৌর নির্বাচন যদি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তবে ওই সময়ে নির্বাচন হয়েছিল পাঁচ ধাপে, জানুয়ারি ১২, ১৩, ১৭, ১৮ ও ২৭। ২৫৪টি পৌরসভায়। ওই নির্বাচনে ৫৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং আওয়ামী লীগ ১১৬টি মেয়র এবং বিএনপি ১০৬টি পেয়েছিল। ওই নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি একটি আসন পেয়েছিল। ২০১১ সালে ভোটের শতাংশ নিরীক্ষণ করলে প্রতীয়মান হবে যে প্রায় ৫৭ শতাংশ গড় ভোট মানে ৬০ শতাংশের ওপরে তেমন ভোট পড়েনি। ওই সময়ে প্রায় সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গড়পড়তা ভোটের শতাংশ প্রায় কাছাকাছি ছিল।
আমাদের দেশের সব স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত একাধিক ব্যালটে ভোট হয়ে থাকে। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের জন্য একটি করে ব্যালট পেপার ভোটারকে দেওয়া হয়। আমাদের ভোট প্রদানের জন্য ব্যালট-ব্যবস্থা এখনো যান্ত্রিক বা বৈদ্যুতিক নয়, তাই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, ভোটার নিশ্চিত করা থেকে ব্যালট বাক্সে তিনটি ব্যালট পেপার প্রবেশ করানো পর্যন্ত সর্বনিম্ন দুই থেকে পাঁচ মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। বয়স্ক এবং নারী ভোটারদের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তিন থেকে পাঁচ মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়।
ভোট সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটায় শেষ করতে প্রতি বুথে ৩৫০ থেকে ৪০০ ভোটারের ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। এই বিভাজনে কেন্দ্রের মোট ভোটারের ভিত্তিতে বুথ বা ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়। কাজেই ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০টি এবং সর্বনিম্ন ১২ থেকে ১৫টি ভোট হতে পারে। ৩০টি ভোটের হিসাবেও ধরলে সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত আট ঘণ্টায় ২৪০টি ভোট হতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা বলে যে একটি বুথে এক ঘণ্টায় ২০ থেকে ২৫টি ভোট পড়তে পারে। অবশ্য বৈদ্যুতিক ভোটিং মেশিন হলে এর অধিকসংখ্যক ভোট নেওয়া সম্ভব।
অভিজ্ঞতার আলোকে এটি পর্যবেক্ষণমাত্র, তবে পত্রপত্রিকার তথ্যে বহু জায়গায় সকালে ভোটার সমাগম বেশি ছিল, সে ক্ষেত্রেও ভোট গ্রহণের গতি ২০ থেকে ৩০টির বেশি হওয়ার কথা নয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও বৈদ্যুতিন মিডিয়ার তথ্য মোতাবেক দুপুর ১২টার পর থেকে ভোটার সমাগম একেবারেই কম ছিল। অবশ্য ওই সময়ে ভোট পড়েছে অস্বাভাবিক গতি ও সংখ্যায়। নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী প্রদত্ত ব্যালট পেপারের গণনা এবং ভোটের ফলাফলে ব্যবহৃত ফরম পর্যালোচনা করলে কোনো গরমিল থাকলে তা সহজেই ধরা পড়বে।
আলোচিত ফরম দুটির সরল ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে পাঠকদের বোধগম্য হয়। বিধিমোতাবেক ভোটের আগে প্রাপ্ত ব্যালট পেপারের মোট সংখ্যার বিপরীতে ব্যবহৃত মোট পেপারের সংখ্যা উল্লেখ করতে হয়, যার মধ্যে ব্যালট বাক্স থেকে প্রাপ্ত ব্যালট টেন্ডারকৃত, আপত্তিকৃত, হারিয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া ইত্যাদির যোগফল প্রাপ্ত ব্যালটের সমান হতে হবে। অন্যথায় বিধির ব্যত্যয় হবে, যা আইনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়। পৌরসভার ক্ষেত্রে মেয়র এবং কাউন্সিলরদের ব্যালটের হিসাব আলাদাভাবে দিতে হবে। বাক্স থেকে প্রাপ্ত ব্যালট পেপারের সংখ্যা মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের সমান হতে হবে। কাজেই কোনো কেন্দ্রে ৩০০টি ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হলে তা সব পদের জন্যই সমান হতে হবে। কোনো পদের হারে তারতম্য হলে সে ক্ষেত্রে কারচুপি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষর এবং এজেন্টদের প্রতিস্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই গণনার কপি ব্যাগে এবং এক কপি নির্বাচন কমিশনে অবশ্যই প্রেরণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে প্রাপ্ত ফলাফলের ফরমের সঙ্গে ব্যালট পেপারের পরিসংখ্যান এবং বৈধ ভোট খতিয়ে দেখতে পারে। অপর দিকে একজন ভোটারের তিনটি ব্যালট গ্রহণ করার আগে প্রতিটির মুড়িতে স্বাক্ষর এবং টিপসই প্রদান বাধ্যতামূলক। মুড়িতে টিপসই না থাকলে তা বৈধ ব্যালট বলে গণ্য করা যায় না। তবে মুড়ি কেন্দ্র থেকে সিলগালা করা অবস্থায় রিটার্নিং অফিসে আনা হয়, যা পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য মামলার আলামত হিসেবে রক্ষিত থাকে; অবশ্য যদি কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতের আশ্রয় নেন।
যা-ই হোক, পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণে প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোট এবং তদূর্ধ্ব বৈধ ভোট প্রাপ্তিকে স্বাভাবিক বলা যায় না। দৃশ্যত, বেশির ভাগ শান্ত পরিবেশ থাকলেও তথ্যে প্রকাশ যে ব্যালট স্টাফিং হয়েছে কক্ষের বা বুথের ভেতরে। ওপরে বর্ণিত হিসাবের আঙ্গিকে মেলালে হয়তো তা সহজে ধরা যায়, তবে সে ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশন ও আদালতের ভূমিকা হবে মুখ্য। সেসবের ভিত্তিতে মনে করা স্বাভাবিক যে ২০১৪ সালের পর থেকে নির্বাচন সংস্কৃতির নিম্নগামী চলনে তেমন পার্থক্য দেখা যায়নি।
পরিশেষে বলতে হয়, বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশেই যে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ নির্বাচন হয়, তা নয়। উন্নত বিশ্বের নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে শতভাগ শুদ্ধ হয় না আর উঠতি অথবা নতুন গণতান্ত্রিক দেশে ব্যবস্থাপনা নয়, কারচুপির কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয়। আর দুটো একত্র হলে তাকে সুষ্ঠু বা প্রায় সুষ্ঠু নির্বাচন বলা যায় কি না, তা ভেবে দেখার বিষয়। নির্বাচন কতখানি গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তার সঠিক বিচার করতে পারেন অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ও অংশগ্রহণকারী ভোটাররা।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
Wednesday, December 30, 2015
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির ভূমিকা by এম সাখাওয়াত হোসেন
ওপরের বক্তব্যের সত্যতা প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই দেখা যায়। মারাত্মক কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে চৌদ্দগ্রামে দুই পক্ষের সংঘাতের কারণে শুধু উভয় পক্ষের সমর্থকেরা আহতই হননি, বরং জাতীয় মহাসড়ক বন্ধ করে গাড়ি পোড়ানো ও দোকান ভাঙচুরের মহা উৎসব লেগেছিল। সাভারে সরকার-মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রতিপক্ষ বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে হামলা করেছেন বলে পত্রপত্রিকায় তথ্য প্রকাশ। পটুয়াখালীতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির নেতা আলতাফ হোসেনের গাড়িবহরে প্রতিপক্ষের হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এবং ২০ জনের ওপরে আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম, নাটোর, চাঁদপুর, লক্ষ্ণীপুর, পাবনা, নেত্রকোনা, সরিষাবাড়ীতে। নড়িয়ায় আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থীর ওপর হামলা করেছেন একই দলের বিদ্রোহী পার্থীর সমর্থকেরা। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘন। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রথম বড় ঘটনা ঘটেছিল ফুলপুর পৌরসভায় দুই মন্ত্রীর উপস্থিতি এবং একজন মন্ত্রীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ দিয়ে। অবশ্য স্থানীয় তদন্তে ওই দুই মন্ত্রী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রমাণিত না হওয়ায় ইসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ নির্বাচনী আচরণবিধির ২২ অনুচ্ছেদ এবং এর শর্তাংশ পাঠে প্রতীয়মান হয় যে দুই মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। একজন স্থানীয় মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তাঁর সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন দলীয় মেয়র পদপ্রার্থী—এমনই সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রপত্রিকায়।
এমতাবস্থায় নির্বাচনী পরিবেশ যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনুকূলে থাকছে না, তা তাদের কিছু বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান। একপর্যায়ে একজন কমিশনার সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপের আকুতি জানিয়ে একধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের দায়দায়িত্ব একমাত্র ইসির, তা হোক না সংবিধানের আওতায় পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণোদিত আইন দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সংবিধানের ১১৯ ধারা মতে, নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার জন্য। বস্তুতপক্ষে নির্বাচন কমিশনকে যতখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো সাংবিধানিক অথবা আইন দ্বারা গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়নি। কাজেই কমিশনকে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যেসব জায়গায় হানাহানি হয়েছে, সেসব জায়গায় নির্বাচন স্থগিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের প্রার্থিতা বাতিল করার মতো পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশন নিতে পারে বা নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা দেখাতে পারে। কয়েকটি জায়গায় পৌরসভা বিধিমালার ধারা ৩২ অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করি, মুখে সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গে শক্ত অবস্থান থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গুরুতর বিধি ভঙ্গের মতো ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইন শুধু কাগজে–কলমেই থেকে যাবে।
যদিও সংবিধানে নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য অনুষ্ঠিত করার মূল দায়িত্ব ইসির। তবে দশক দুয়েকের মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রয়োজন শরিকদের পূর্ণ সহযোগিতা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের মধ্যে সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সহযোগী ভূমিকা স্বীকৃত। এ ধরনের সহযোগিতা যেমন সহজে পাওয়া যায় না, তেমনি সহযোগিতা আদায় করার প্রচেষ্টা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে, তা অনেকটা উপলব্ধি করা গিয়েছিল বিগত উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়। অতীতের অনিয়মগুলো আমলে নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারত। কিন্তু সেটি হয়নি। মূলত এ কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে আসছে এবং কমিশনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
বর্তমানে পৌরসভা নির্বাচনের একাংশ, বিশেষত মেয়র পদে দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটিও অতি দ্রুত নেওয়া হয়েছে। ততোধিক ত্বরিতগতিতে নির্বাচন অায়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় শরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা সম্ভব হয়নি, যে কারণে নির্বাচন কমিশনকে বেগ পেতে হচ্ছে। অপর দিকে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রথম থেকেই আচরণবিধির খুব একটা তোয়াক্কা করেনি, যা দলের তরফ থেকেও দলীয় প্রার্থী ও সমর্থকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে পরিবর্তন করার পেছনের জোরালো যুক্তি ছিল, এসব নির্বাচনে প্রার্থীদের ওপর দলের কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তেমনটা শুধু দলের স্বার্থেই হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বা প্রশাসনে সহযোগিতা করা হয় না, যা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। নির্বাচনী আইন ও বিধির প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও দলের এবং দলের প্রার্থীদের। কিন্তু আমাদের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কমিশন রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা তো পায়ই না, বরং উল্টো নানা চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়।
সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পেতে হলে ইসির সহযোগী হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তা প্রয়োজন। এর প্রথম ধাপ রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রার্থী নির্বাচন। দলের প্রার্থী নির্বাচনের বাঁধাধরা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বিশ্বের কয়েকটি দেশে আইন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সিংহভাগ দেশে এ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া প্রতিটি দলের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বলেই স্বীকৃত। তবে উঠতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আইন দ্বারা কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। তবে স্বীকৃত দুটি পদ্ধতি হচ্ছে—এক. দলের তৃণমূলে তৈরি তালিকা থেকে শীর্ষস্থানীয় বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত করা, তবে শর্ত থাকে যে তৃণমূল পর্যায়েও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে গঠিত বোর্ড কর্তৃক ক্রম অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা। দুই. তৃণমূল পর্যায়ে গোপন ভোটের মাধ্যমে প্যানেল তৈরি করা। সূত্রমতে, প্রথম প্রক্রিয়াটিও পুরোপুরিভাবে গ্রহণ না করার কারণে তথাকথিত ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’র জন্ম দেয়, যার উদাহরণ এই নির্বাচনে বিদ্যমান। পৌরসভা নির্বাচনে তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে বিপাকে দেশের দুই বৃহত্তর দল। এ কারণেও আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশ হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। এসব যেমন দলের কাঠামো ও নির্বাচনী পরিবেশের হিতে যায় না, তেমনি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবশ্য একটি স্বীকৃত ধারায় প্রার্থী নির্বাচন করা উচিত, তা না হলে নতুন রাজনীতিবিদদের যেমন উত্থান হবে না, তেমনি মেধাবী তরুণদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করা যাবে না।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী মিডিয়া। ইসিকে হতে হবে মিডিয়াবান্ধব এবং সহযোগিতা নিতে হবে তাদের কাছ থেকেও। অতীতে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া উভয়ই নির্বাচন কমিশনকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছিল। নির্বাচনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরতে মিডিয়াকে অবাধ বিচরণ করতে দেওয়া উচিত। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে প্রবেশ করার ওপর কড়াকড়ি আরোপ এবং ভোটের অগ্রগতি ও আইনশৃঙ্খলা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার প্রক্রিয়াকে সীমিত করা অথবা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। মিডিয়া, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে নির্বাচন কমিশনের চোখ-কান হিসেবে গণ্য করা হয়। অতীতে মিডিয়ার সহযোগিতা নির্বাচনের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তাই মিডিয়াকে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, একটি বলিষ্ঠ, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই যে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে, তেমনটি নয়। কারণ, এর সহযোগী শরিকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য স্বাধীনচেতা ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com
BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1536)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




