Showing posts with label WikiEducation. Show all posts
Showing posts with label WikiEducation. Show all posts

Saturday, November 14, 2015

একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন জরুরি by আমিরুল আলম খান

শিক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে জোর আলোচনা চলছে। ঠিক এ মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, পদোন্নতি, আর্থিক সুবিধাদি নিয়ে আন্দোলন। তাঁদের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে শেষ পর্যন্ত গোঁফ নামাতে রাজি হয়েছেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রী। তাঁর এই শুভবুদ্ধির উদয়কে সাধুবাদ জানাতে হবে। শিক্ষকদের এসব দাবির পাশাপাশি তাঁদের দায়িত্ব, কর্তব্য নিয়েও কথা উঠেছে। সে কথায় অভিযোগের সুর, আর সে তির শিক্ষকদের দিকেই। জনগণের পক্ষ থেকে ওঠা এসব কথা বেমালুম অস্বীকার করা একেবারেই অনুচিত হবে।
জনগণের প্রত্যাশাগুলো কী কী? তাঁরা চান সন্তানেরা যেন উপযুক্ত শিক্ষা পায়, তারা যেন প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে, যেন তারা উপযুক্ত পেশায় নিয়োজিত হতে পারে। শিক্ষকদের কাছ থেকে এই হলো তাঁদের প্রত্যাশা। কিন্তু অভিযোগ, কোনো কোনো শিক্ষক সে দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন না। এ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করাও যাবে না। তবে সমাজকেও বুঝতে হবে, শিক্ষক কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নন। যে সামাজিক পরিবেশে একজন শিক্ষক বেড়ে উঠেছেন এবং বসবাস করছেন, সেই সামাজিক পরিবেশের প্রভাব অন্যান্য পেশাজীবীর মতোই তাঁদের ওপরও পড়ে। সমাজ যখন দুর্বৃত্তায়িত, শিক্ষকও তখন তার শিকার। তাকে আলাদাভাবে দোষারোপ করা অনুচিত। কিন্তু আজ এখানে ভিন্ন একটি বিষয়ে কিছু বলা প্রয়োজন বোধ করছি। আলোচনা করতে চাইছি বাংলাদেশে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের সুযোগসুবিধা নিয়ে।
বাংলাদেশে মূলধারার শিক্ষার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের মোটা দাগে চার ভাগে ভাগ করা যায়, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষক পদে যোগদানে যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁদের এই পেশায় প্রবেশের আগেই (প্রি-সার্ভিস) শিক্ষকতা-বিষয়ক পড়াশোনা বাধ্যতামূলক নয়, বা দেশে তেমন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়নি। ব্রিটিশ যুগে আজকের বাংলাদেশে ৪৪টা গুরু ট্রেনিং স্কুল ছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে করা হয়েছে প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই)। ঠিক এই মুহূর্তে দেশে ৫৯টি পিটিআই আছে। সেখানে চাকরিতে যোগদানের পর এক বছর মেয়াদি (ইন-সার্ভিস) সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন কোর্স করানো হয়। এখন তার অবসান ঘটিয়ে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন নামে দেড় বছরের একটি কোর্স সেখানে চালু করা হচ্ছে, যা দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশাগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকতার জন্য শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন স্নাতক আবেদন করতে পারেন। সেই সঙ্গে ব্যাচেলর অব এডুকেশন ডিগ্রি থাকলে ভালো হয়। অন্যথায়, চাকরিতে প্রবেশের পর তিনি এই ডিগ্রি অর্জন করে নিজেকে একজন যোগ্য শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
কলেজ পর্যায়ে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করা আছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকসহ (সম্মান) মাস্টার্স ডিগ্রি। সেখানে প্রার্থীকে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। সব পর্যায়ে দ্বিতীয় শ্রেণি/সমমানের গ্রেড থাকতে হবে। একটির বেশি তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি/সমমান থাকলে চলবে না। তিনি একজন বিষয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। বেসরকারি কলেজের জন্য শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোনো উচ্চতর ডিগ্রি, যেমন এমএস/এমফিল বা পিএইচডি তাঁকে তেমন কোনো অগ্রাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হতে সাহায্য করে না।
সবচেয়ে অবাক বিষয়, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে যাঁরা গ্রহণ করবেন, কলেজ পর্যায়ে হলে তাঁদের শিক্ষা বিষয়ে কোনো ডিগ্রি—ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড), মাস্টার অব এডুকেশন (এমএড) প্রয়োজন হয় না। চাকরিতে প্রবেশের পরও শিক্ষা বিষয়ে কোনো ডিগ্রিই বাংলাদেশের কলেজশিক্ষকদের জন্য আবশ্যকীয় নয়। এমনকি, কারও যদি শিক্ষা বিষয়ে কোনো ডিগ্রি থাকেও, তার কোনো মূল্য নেই কলেজশিক্ষায়। বর্তমান দুনিয়ায় শিক্ষায় ডিগ্রি (ডিগ্রি ইন এডুকেশন) ছাড়া শিক্ষকতা করা বোধ হয় কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব! বেসরকারি কলেজশিক্ষকদের সারা জীবনে মাত্র একবার পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ আছে, প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার। এরপর তিনি উপাধ্যক্ষ/অধ্যক্ষ হতে পারেন। কিন্তু আর কোনো সোপান তাঁদের নেই।
আর সরকারি কলেজশিক্ষকদের পদোন্নতির শর্ত হচ্ছে চার মাসের বুনিয়াদি ট্রেনিং আর বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। পদ শূন্য সাপেক্ষে পদোন্নতি পাওয়া যায় কোনো বিষয়ভিত্তিক নতুন জ্ঞান যাচাই বা পেশাগত ট্রেনিং বা গবেষণাপত্র প্রকাশ ছাড়াই। পদোন্নতির কোনো স্তরেই এসবের প্রয়োজন হয় না। তাহলে একজন পেশাজীবী শিক্ষক হিসেবে তিনি কীভাবে তাঁর সঠিক দায়িত্ব পালন করবেন? কীভাবে তিনি নিজেকে আরও যোগ্য শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলবেন?
প্রশ্ন হচ্ছে এই দায় কার? রাষ্ট্রেরই এই দায় বলে আমি মনে করি। কেন শিক্ষকতায় পেডাগজি (শিক্ষাবিজ্ঞান) জানা আবশ্যকীয় করা হবে না? এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। আমি মনে করি, কলেজশিক্ষকদের পেডাগজি বাধ্যতামূলক করা উচিত। চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিএড/এমএড ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিশেষ ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা, পদোন্নতির ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করা উচিত। এবং অন্যদের প্রথম দুই বছরের মধ্যে বিএড ডিগ্রি অর্জন করা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এ জন্য বাংলাদেশে কতটুকু সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে? সত্যি কথা বলতে কি, এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো প্রস্তুতিই নেই। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়া দেশে মাত্র ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে এই ডিগ্রি প্রদানের মানসম্মত ব্যবস্থা আছে। দেশে বেসরকারি শ দেড়েক প্রতিষ্ঠান বিএড কোর্স করালেও তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবাই ডিগ্রি বিক্রির বাণিজ্যে মেতেছে বলে অভিযোগ আছে।
এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে দেশে কোনো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়নি। এমনকি এমন কোনো দাবিও শিক্ষকদের তরফ থেকে কখনো করা হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কলেজশিক্ষকদের শতকরা ৯০ ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষাবিজ্ঞানে ডিগ্রি একান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে করেন।
এই অবস্থার অবশ্যই অবসান হওয়া জরুরি। আজ যখন সর্বস্তরের শিক্ষক তাঁদের মর্যাদা রক্ষায় রাস্তায় যৌক্তিক আন্দোলন করছেন, তখন তাঁদের এ দাবিও তোলা জরুরি যে তাঁদের পেশাগত মান উন্নয়নের জন্য বিএডসহ উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য দেশে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে। দেশ-বিদেশে তাঁদের শিক্ষা-বিষয়ক উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষাভ্রমণ, গবেষণা করার সুযোগ দিতে হবে। তাঁদের জন্য অবশ্যই মানসম্মত জার্নাল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশ–বিদেশে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। বিভিন্ন স্তরে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। চাকরির দৈর্ঘ্য (লেংথ অব সার্ভিস) ধরে পদোন্নতি প্রথার অবসান করতে হবে।
শিক্ষকতায় যোগদানে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবীরা সুযোগ পেতেন। এখন সেখানে দলবাজদের প্রাধান্য। মেধা নাকি সেখানে মূল্যহীন। বঞ্চনা এখন তার নতুন উপসর্গ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দেশ–বিদেশে নানা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। নানা গবেষণায় নিয়োজিত থাকেন তাঁরা। পদোন্নতির জন্য গবেষণা এবং পাবলিকেশন বাধ্যতামূলক। তারপরও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের সুনাম ধরে রাখতে পারছে না। শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
আমরা জানি, এসব কাজ রাতারাতি হবে না। কিন্তু সরকার এবং শিক্ষক সমাজকে এসব বিষয়ে এখনই উদ্যোগী হয়ে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন সাধন করতে হবে। অন্যথায় আজকের দিনে দ্রুত বিকাশমান পৃথিবীর সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ব। একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি। সেখানে শিক্ষা-বিষয়ক গবেষণা হবে, ভালো শিক্ষক তৈরির জন্য শিক্ষা দেওয়া হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সম্প্রতি থাইল্যান্ড নতুন উদ্যোগ নিয়ে প্রমাণ করতে চাইছে, শিক্ষায় বিনিয়োগের চেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ দ্বিতীয়টি নেই। আমাদেরও তা উপলব্ধি করতে হবে।
আমিরুল আলম খান: শিক্ষাবিদ।
amirulkhan7@gmail.com

Friday, October 30, 2015

শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়ত্ব ও হতাশা by আবুল মোমেন

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে উদ্ভূত সমস্যাকে সরকার পাশ কাটাতে চাইছে। শিক্ষামন্ত্রীর একটি মন্তব্যে বোঝা যায়, তাঁরা অনন্যোপায়। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, যত সুপার টেকনোলজি ব্যবহার করা হোক না কেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না। যারা অপরাধী, তারা সুপার টেকনোলজির চেয়েও এগিয়ে থাকে (দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ অক্টোবর, ২০১৫)। শিক্ষামন্ত্রীর কথায় ফাঁসের সত্যতার স্বীকৃতি মেলে, যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অস্বীকৃতির সংস্কৃতি ধরেই চলছে।
যে তরুণেরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ভিত্তিতে গৃহীত পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলেছে, তাদের দাবির নৈতিক ন্যায্যতা অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থেকে আমরা বুঝতে পারি, এখানে আদতে কচি-মাথার নীতিবোধ আর পাকা-মাথার বাস্তব বুদ্ধির টানাপোড়েন চলছে। সরকার হয়তো ভাবছে, এ পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হলে কৃতকার্য হয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা না পাল্টা আন্দোলনে নামে। রীতিমতো সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে যাবে সরকার। এই সম্ভাব্য বিপদ তারা ডেকে আনতে চাইছে না।
নাগরিক সমাজ নিশ্চয় ফাঁস বা দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা এবং নৈতিক ন্যায্যতার পক্ষেই থাকবে। কিন্তু এটি একটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন বলে ক্ষতিগ্রস্ত অকৃতকার্য ছাত্রদের পক্ষে ব্যাপক ছাত্র-তরুণ ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা ঘটবে কি না সন্দেহ। নৈতিকভাবে দুর্বল সমাজ অনবরত ছোট-বড় নৈতিক ত্রুটিকে উপেক্ষা করে এবং আপস করেই চলতে অভ্যস্ত। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর সততার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখেছেন, যা আজকের দিনে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দুর্লভ। তাঁর সরল উক্তির মধ্যে এ সমাজে সৎ মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। এখানে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। কেননা, সমাজে সততা অসহায় এতিম থাকবে, বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
অন্যান্য ক্ষেত্রের কায়েমি স্বার্থের তুলনায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুর্নীতির ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। এর সঙ্গে একদিকে ছাত্র-তরুণদের বৈষয়িক ও নৈতিক স্বার্থ জড়িত আর অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির প্রশ্ন যুক্ত। আমরা অনেক কাল ধরে বলে আসছি, শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য যদি হয়ে ওঠে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া, তাহলে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতির চক্র সহজে ভাঙা যাবে না। কিন্তু পাকেচক্রে আমরা সেই চক্রের জালেই আটকেছি। আজকে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা—প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত—মূলত সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে পরীক্ষার সম্পর্ক যে অঙ্গাঙ্গি, তা সবাই মানবেন। বিভিন্ন পর্বান্ত বা চূড়ান্ত পর্বের শেষে সনদ ও ডিগ্রি শিক্ষার ফসল বৈকি। কিন্তু তার মূল্য কি ব্যক্তিনিরপেক্ষ, অর্থাৎ মানুষটির চেয়েও বেশি?
শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং অনুসৃত নীতির কারণে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই আজ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এ কারণে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সবারই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়েছে পরীক্ষার ফলাফল। ফলাফল-নিবেদিত ব্যবস্থায় পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য উল্লিখিত ত্রিপক্ষ সব সময় মরিয়া হয়ে থাকে। সবাই যেন রেসের ঘোড়া—প্রথম হওয়ার জন্য টগবগ করে ছুটছে। জয়ের লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত উদগ্র চাহিদার ফলে পরীক্ষাকে ঘিরে জুয়াড়িদের আবির্ভাব হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সফল হওয়ার সহজ ও কার্যকর পন্থার সন্ধান করতে করতে স্কুলকেও পাশ কাটিয়ে পরীক্ষায় সিদ্ধিলাভের দক্ষ মোক্ষম পদ্ধতি ও ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে এই আক্কেলমন্দরা—তার নৈতিক ভিত্তি না থাকুক। গড়ে উঠেছে নোট বই ব্যবসা কোচিং সেন্টার এবং মডেল টেস্ট পদ্ধতি। মানতেই হবে, বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ব্যবস্থা। এখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রদের ফরজ কাজ—নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকে পাঠগ্রহণ নয়—কোচিং সেন্টারে উপস্থিত থাকা ও অবিরত মডেল টেস্ট দিয়ে পরীক্ষার্থী হিসেবে দক্ষ ও পোক্ত হয়ে ওঠা। নকল বন্ধের জন্য নোট বই বন্ধ করার জিহাদে নেমেছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, কিন্তু ব্যবস্থার কারণে পরীক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও চাহিদা মেটাতে শিক্ষা-জুয়াড়িদের নোট বইসহ সব ব্যবসা বেশ জাঁকিয়েই চলছে।
এভাবে আমরা একেবারে নিচের শ্রেণি থেকে ছাত্রদের শিক্ষার্থী সত্তার অকালমৃত্যু ঘটিয়ে তাদের পরীক্ষার্থী সত্তার বিকাশ ঘটাচ্ছি—সেটা শেষ পর্যন্ত উগ্র রূপই ধারণ করে এবং পরিণতিতে মানবিক মূল্যবোধ, সামান্য নীতিবোধেরও আকাল দেখা দেয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একে অন্যের দেখাদেখি ভীত-বিভ্রান্ত অভিভাবকেরা কোনো ঝুঁকিতে যেতে চান না। একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই সন্তানকে কোচিং সেন্টারের বা বাড়তি গৃহশিক্ষক জিম্মায় দিয়ে হাঁফ ছাড়েন। পুরো স্কুলজীবনে পিএসসি-জেএসসি-এসএসসি শিশুর অবসর, বিনোদন, খেলাধুলা, বেড়ানো, সৃজনশীল কাজ, সাহিত্যপাঠ, এমনকি বাবা-মা-স্বজনদের সঙ্গে নির্মল সময় কাটানো—সবকিছুই শিকেয় ওঠে। এভাবে কেবল ছাত্রের মানুষ হওয়া কঠিন হচ্ছে তা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এবং এই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সৃষ্ট ভাগ্যান্বেষণের সুযোগ নিতে তৎপর ‘বুদ্ধিমানদের’ মনুষ্যত্ব বোধ ক্রমেই বিলুপ্ত হবে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা দুর্নীতি পিছু ছাড়বে না।
এভাবে বেড়ে উঠে অধিকাংশ শিশু প্রায়ই কৃতিত্বের সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ ডিগ্রিধারী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-আমলা হলেও সমাজচিত্র কী বলছে? ভালো মানুষের আকাল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না? এভাবে চললে সব প্রতিষ্ঠান, সব ব্যবস্থা ঘুণে ধরবে। চক-মিলানো রাস্তা, ভবন বাড়বে, চকচকে-ঝকঝকে মানুষ হয়তো বাড়বে, তবে দখলদারি, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, নেশা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদি থামবে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাবে না?—বালাই ষাট, এমন কথা মানতে নেই! বাঙালি এতটা অক্ষম জাতিতে পরিণত হয়নি। কেননা, এ ফাঁস কার গলায় শক্তভাবে লাগছে? অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গলায় এবং পরিণামে দেশের। আমাদের ধারণা, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা সঠিক হলে এবং সে অনুযায়ী মানুষ, অবশ্যই কর্মদক্ষ মানুষ, তৈরিতে যথার্থ পদ্ধতির আশ্রয় নিলে দুর্নীতির ফাঁসে শিক্ষাকে ফাঁসি দিতে হয় না। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। বিষয়টি বুঝে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টা সরকার বা শিক্ষামন্ত্রী যে বোঝেন না, তা নয়। বোঝেন বলেই ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালেই শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, তিন মাসের মধ্যে কমিটি খসড়া রিপোর্ট দেয় এবং আনন্দের বিষয় ছিল অতীতের ধারা ভেঙে এ প্রতিবেদনটি সর্বমহল গ্রহণ করেছে। এটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের কথা থাকলেও মোটের ওপর এটি ধরে এগিয়ে গেলে শিক্ষার ব্যাধি—মুখস্থ, নোট বই, পরীক্ষা ও ফল-কেন্দ্রিকতা কাটিয়ে ওঠা যেত।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরীক্ষা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু থাকবে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে অনুশীলনের অংশ হিসেবে। ঘন ঘন পরীক্ষার ফলে জ্ঞানানুশীলনের ধারাবাহিকতায় বাধা বা ছেদ পড়তে থাকলে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায় প্রশ্নের উত্তর-আকারে জ্ঞানের বিষয়টিকে দেখতে। জ্ঞানের বা বিষয়ের অখণ্ডতা ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তাদের ধারণা তৈরি হয় না। এ রকম ব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে, বড় হয়েও, কোনো পূর্ণাঙ্গ বই পড়া, জটিল ব্যাখ্যা বা দুরূহ বিষয় ধৈর্য ধরে পড়া, শোনা বা বোঝার অভ্যাস তৈরি হয় না। এতে মানুষটার সর্বনাশ হয়ে যায়। কারণ, এতে শিক্ষার যে চূড়ান্ত লক্ষ্য একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা এবং তাই প্রকৃত স্বাধীন এবং তাই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তির যোগ্যতা দেওয়া, তা সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। কেবল একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের বিবেচনা ও দায়িত্ব বোধ তৈরি হয় এবং তাই নিজের নিজের মর্যাদার পরোয়া করেন। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে তাঁর চরিত্র গঠিত হয়। তেমনি মানুষ প্রশ্ন ফাঁস করাকে হীন কাজ বলে বুঝতে পারেন এবং বড় কথা হলো, এর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে তাঁর রুচি ও নৈতিকতায় বাধবে। ভালো মানুষ ও মানবিক সমাজ নির্মাণে উপযুক্ত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশ-র্যাব-ডিবি, সিসি ক্যামেরা-টহলদারি-নজরদারি, জঙ্গিবাদ-নেশাগ্রস্ততা-অপরাধ, রাজনীতির দেউলিয়াপনা-সংস্কৃতির সংকট-সমাজের অবক্ষয়, কর্তৃত্ববাদী শাসন ইত্যাদি কেবল বাড়তে থাকবে। তখন হয় মনে হবে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো গুরুতর বিষয় নয় অথবা তা জেনেও এ উৎপাত মেনে নিতে হবে।
এটা আদতে গুরুতর বিষয়। কেননা, এতে সমাজে শিক্ষার সংকট লেগেই থাকবে, তেমনি থাকবে জাতির চরিত্র গঠনের সমস্যা। প্রশ্ন হলো যে কথাটা আমরা জানি এবং মানি, যে কারণে ক্ষমতায় এসে সরকার শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল, তিন মাসে প্রতিবেদন প্রণয়ন এবং সে বছর থেকেই তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল, তাকে কেন উপেক্ষা করা হচ্ছে? আমরা জানি না অর্থের অভাবে না অন্য কোনো কারণে সরকার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে হাত দিচ্ছে না। তবে এটা স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে বরাদ্দ রেখে সংখ্যাগত উন্নতি সম্ভব হলেও গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়। তার জন্য অন্তত আন্তর্জাতিক মান ৬ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমান পরীক্ষার ফলের পেছনে ছুটে সংখ্যাগত সাফল্য আসবে, কিন্তু গুণগত মান অর্জন ঠেকে থাকবে। এ বাস্তবতায় যে একদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ঠেকানো যাবে না এবং অন্যদিকে সমস্যার
জবাব দিয়ে গুণগত মান অর্জনের অভীষ্ট পথে চলা সম্ভব নয়, তা বুঝে শিক্ষামন্ত্রীকে বারবার হয় অসহায়ত্ব নয়তো হতাশা প্রকাশ করতে হবে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

Wednesday, October 21, 2015

এনালগ থেকে ডিজিটাল by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

‘পরীক্ষার আগের রাতেই বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নপত্র হাতে পেতাম। বন্ধুদের মাধ্যমে এগুলো আমার কাছে আসতো। রাতে পাওয়া প্রশ্নপত্র পরদিন পরীক্ষার হলে প্রশ্নের সঙ্গে প্রায় মিলে যেত। এজন্য কিছু টাকাও দিতে হয়েছে। পরীক্ষা ভাল হলেও মনে মনে নিজকে অপরাধী ভাবতাম।’
কথাগুলো বলেছেন সাদ্দাম হোসেন। তিনি এখন রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েশন লেভেলে পড়াশোনা করছেন। থাকেন আজিমপুরে। ২০১৩ সালে বাণিজ্যিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ড থেকে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। ২০১৪ সালে রাজবাড়ী থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে শিশু টুম্পা (ছদ্মনাম)। এই পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ওই পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে তার ছোট চাচা এই প্রতিবেদককে বলেন, পরীক্ষার আগের রাতেই তারা বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে যেতেন। ডিজিটাল পদ্ধতিতে, কখনওবা ফেসবুকের সুবাদে। তা হুবহু মিলে যেত। এই যদি হয় আমাদের পরীক্ষার অবস্থা, তাহলে শিক্ষার্থীরা কি শিখবেন বলে তিনি নিজেই প্রশ্ন করেন। একই পরীক্ষায় ঢাকা থেকে অংশগ্রহণকারী অপর আরেক শিশু পরীক্ষার্থীর বাবা জিয়া উদ্দিন বাবুল বলেন, দেশে কি পরীক্ষা আছে? তার ছেলের পরীক্ষার সময়ে ওর বন্ধুরা ফোন করে করে পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন দিয়েছে। যা পরীক্ষায় হুবহু এসেছে। শিশুরা প্রশ্ন হাতে পেলে পড়তে চায় না বলে উল্লেখ  করেন তিনি।
শুধু সাদ্দাম ও টুম্পা নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস থামানো যাচ্ছে না। প্রাইমারি থেকে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা- কোন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয় না- এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া এখন কঠিন। সমপ্রতি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর তা নিয়ে দেশব্যাপী ঝড় উঠেছে। এখনও পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে রয়েছে।
নকল প্রবণতা কমে যাওয়ার পর অব্যাহতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরীক্ষায় একটি বা দুটি প্রশ্নের উত্তর নকল করে দেয়া যায়। কিন্তু ফাঁস হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি প্রশ্নই আগে থেকে জেনে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী উত্তর তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে পরীক্ষা বলতে প্রশ্ন কমন পড়ার যে অনিশ্চিয়তা বা ভাল ফলাফল করার জন্য যে প্রস্তুতি তার কোনটাই নেয়ার আগ্রহ থাকে না শিক্ষার্থীদের। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করছে। তাদের মতে, প্রশ্ন ফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু বিচার হয় না। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচার তদন্তের আড়ালে হারিয়ে যায়। নকল বন্ধের মতো প্রশ্ন ফাঁস রোধেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়? ফাঁস হয় কোথা থেকে: শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা বলছেন, প্রশ্ন ফাঁসে এক ধরনের মহোৎসব চলছে। সব পরীক্ষায়ই প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। কিন্তু যারা ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এক ধরনের লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি তদন্তে কি প্রমাণ পেল, কারা দায়ী তা প্রকাশ করছে না।
বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, চার জায়গা থেকে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে প্রথম তীর সরকারি ছাপাখানা বিজি প্রেসের দিকে। দ্বিতীয়ত, যারা প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত। তৃতীয়ত, যেখানে প্রশ্নগুলো সংরক্ষিত আছে। চতুর্থত প্রশ্ন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরবরাহের সময়। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন বিক্রি এখন সবচেয়ে সহজ ও লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সিন্ডিকেটের কাছে। এক রাতেই প্রশ্নপত্র বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে অপরাধী চক্র। একের পর এক ফাঁস হচ্ছে পাবলিক ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে।
টিআইবির গবেষণায় বলছে, প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন ফাঁসের সম্ভাব্য ঝুঁকি থাকে। প্রশ্ন প্রণয়ন ও চূড়ান্তকরণ পর্যায়ে: পিইসিই, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট  বোর্ডের নির্দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশ্নকর্তা নিয়োগ করার জন্য শিক্ষক বাছাই করার মধ্য শুরু হয় প্রশ্ন প্রণয়নের প্রাথমিক কার্যক্রম। শিক্ষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।  পরে এ বিষয়কে পুঁজি করে নিজ নিজ স্কুল ও কোচিং সেন্টারে সাজেশন হিসেবে ওই প্রশ্নগুলো দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের দ্বারা প্রশ্ন চূড়ান্ত হয়ে যায় বলে এই পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একাংশের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকার সুযোগ রয়েছে। আবার মডারেশন পর্যায়ে প্রশ্ন চূড়ান্ত হয়ে যায় বলে এই পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের একাংশের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা থাকার সুযোগ থেকে যায়।
প্রশ্ন ছাপানোর পর্যায়ে:  কম্পোজার প্রশ্ন দেখার সুযোগ পান বলে কম্পোজ করার সময়ে একাংশর মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি থাকে। ছাপানোর কাঝে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের এককভাবে বা গোষ্ঠীগতবাবে প্রশ্ন মুখস্থ করে প্রশ্ন ফাঁস করার তথ্য পাওয়া যায়। ডিজিটাল পেপার কাউন্টার পদ্ধতি না থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও প্রশ্ন গণনা ও প্যাকেট করার সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি থেকে যায় বলে টিআইবির গবেষণায় ওঠে এসেছে। এছাড়া বিতরণের আগে সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের কিছু লোকের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হতে পারে।
প্রশ্ন বিতরণ পর্যায়ে: প্রশ্ন সংরক্ষণ ও বিতরণের সময় ছাপাপনো প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে ফাঁস হওযার তথ্য এসেছে।
২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁস: একের পর এক ফাঁস হচ্ছে পাবলিক ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।  প্রভাবশালীদের কেউ কেউ এবং  প্রশাসনিক কিছু কর্মকর্তা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতিতে সবকিছুর পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসেও এসেছে আধুনিকায়ন, ফাঁসের ধরনেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। পূর্বের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন প্রশ্ন ফাঁসে ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ঘড়ি ও ইন্টারনেট।
অনেক ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না তারা। ফলে আইনের ফাঁকফোকর এবং সরকারি ছত্রছায়ায় তাদের সমর্থক শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র সব সময়ই শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এতে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েই চলছে।
২০১০ সালের ৮ই জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ২০১০ সালের ২১শে জানুয়ারি। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে অনার্স প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষার তিনটি সেটের সবটাই ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ওই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। প্রশ্ন ফাঁসের সিন্ডিকেটের কয়েক তাৎকালীন বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদের ছাত্রলীগ কর্মী  সুমন ও সূর্যসেন হলের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের টিটুসহ ৫জন গ্রেপ্তার ও তদন্ত কমিটিও করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রটি আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়।
২০১০ সালের ২৮শে আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ২০১০ সালের ৮ই জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭শে জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১২ বছরের ৩ আগস্ট জতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষায় হলের প্রশ্নের শতভাগ মিলে গেলেও ওই পরীক্ষা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১শে সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই এটিরও প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষার আগের রাতে এবং পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার সব বিষয়ে প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ই অক্টোবর পিএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে। ওই বছরের ২১ ও ২২শে নভেম্বর শিশু শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার (পিএসসি) গণিত ও বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়।
ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। গত বছর ১২ অক্টোবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার পশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে।
 ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও গত পাঁচ বছরে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ একটি নিয়মিত ঘটনা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন বিষয়ের মোট ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের পিইসিই (প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী) ও জেএসসি পরীক্ষার সব পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস:  এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও প্রথমে গণহারে সবাই পায় না। সিন্ডিকেট চক্র পরীক্ষার কয়েক দিন আগে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা চায়। যারা টাকা পরিশোধ করে, শুধু তাদেরই বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধরন বদলেছে। এতে ফাঁসের আগেই তথ্য পাওয়া, অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তির আওতায় আনা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ কারণে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। পরীক্ষার হল থেকে সিন্ডিকেট চক্র প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তা কারেকশন করে সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ রাখা অসদুপায় অবলম্বনকারী প্রার্থীদের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক বছর এমন ঘটনা প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অহরহ ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা পরীক্ষার হলে মোবাইল, সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। পরীক্ষার্থী হল থেকে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করার অপরাধে অনেকেই হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তবে কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনা, হল পরির্দশকদের শিথিলতা, নিরাপত্তা ও কড়াকড়ি নির্দেশ না থাকার কারণে প্রশ্ন ফাঁসের নতুন কৌশলকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

Wednesday, October 14, 2015

‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যু’ by গোলাম ফারুক

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয় মৃত বা মৃতপ্রায়—বেশি দিন আগের কথা নয়, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম ও মনোভাব পর্যালোচনা করে ২০১০ ও ২০১৫ সালে প্রকাশিত দুটি নিবন্ধে ব্রিটিশ তাত্ত্বিক টেরি ইগলটন এই মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেননি যে উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাকচিক্য কিংবা ধনদৌলতে ঘাটতি পড়েছে। বরং তা আরও বেড়েছে। ঘাটতি পড়েছে মানবিক বিদ্যাশিক্ষায়। আধুনিক পুঁজিবাদের তল্পিবাহক হতে গিয়ে মানবিক বিষয়গুলো শিকেয় তুলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন ‘করপোরেট প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ কিংবা ‘করপোরেট গবেষণাকেন্দ্রে’ পরিণত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকাই, তাহলে দেখব ইগলটন যে অর্থে বলেছেন সে অর্থে তো বটেই, স্বাভাবিক অর্থেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মৃতপ্রায়। উচ্চমার্গীয় শিক্ষা নিয়ে মাথা ঘামানোর ফুরসত তো রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের নেই-ই, এমনকি টাকাকড়ি নিয়ে আসতে পারে, এ রকম শিক্ষাও তাদের কাছে গরিবের ঘোড়ারোগ বলে ভ্রম হয়। কেন এ রকমটা ঘটে, কেনই-বা এ রকম ঘটা উচিত নয় আর কী করলে উচ্চশিক্ষা, ইগলটন কথিত সেই মর্যাদা না পেলেও, অন্তত সাধারণভাবে বেঁচে থাকবে।
বিষয়টা কি এমন যে উচ্চশিক্ষার চাহিদা নেই বলে রাষ্ট্র পরিচালকেরা একে উপেক্ষা করেন? বরং প্রচুর চাহিদা আছে এবং তা পূরণ করতে গিয়েই দরিদ্র ও ক্ষেত্রবিশেষে অপরিণামদর্শী সরকারগুলো শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করে। দেখা যাক চাহিদাটা কেমন। প্রথমত, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ এশিয়ায় বাস করে। উপরন্তু, তাদের অধিকাংশই তরুণ (২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ১৮ বছরের নিচে)। স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাদের আবহে বেড়ে ওঠা এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী উদ্যমী ও ইগলটনের অর্থে না হলেও, শিক্ষাপিপাসু। এই এলাকার মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক। এমনকি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত ধনবান ও ক্ষমতাশালী লোকেরাও নিজেদের নামের পাশে ‘বিএসসি’ লিখে সম্মানিত বোধ করেন। এতদঞ্চলে উচ্চশিক্ষার চাহিদা বাড়ার আরও কারণ হচ্ছে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে অহেতুক বিরূপ ধারণা, দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং কৃষি খাতের তুলনায় শিল্প ও সেবা খাতের উন্নতি।
চাহিদার তুলনায় আর্থিক অসংগতিই কি উচ্চশিক্ষায় ধস নামার একমাত্র কারণ? তা নয়। বরং উচ্চশিক্ষাই হতে পারে আর্থিক সচ্ছলতা লাভের কার্যকর ও টেকসই হাতিয়ার। সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েই সরকারগুলো উচ্চশিক্ষাকে ইগলটনের ভাষায় ‘জীবন’ দান করতে না পারলেও লাভজনক করতে পারে। একটি দেশের সরকার যদি গবেষণায় বিনিয়োগ করে, সে দেশের অর্থনীতি চাঙা হতে সময় লাগে না। রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্টে ১ শতাংশ অগ্রগতি হলে উৎপাদন বাড়ে ০.০৫ থেকে ০.১৫ শতাংশ। ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আরও চমকপ্রদ। সেখানে উচ্চশিক্ষায় প্রতিটি ডলারের বিনিয়োগ সুদে-আসলে ফেরত এসেছে। সেখানকার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষিত মানুষের উপার্জনে পার্থক্য হয় প্রায় ২৫ থেকে ১১৯ শতাংশ। যদি কোনো দেশের নাগরিকেরা এক বছর বেশি পড়ার সুযোগ পায়, সে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ থেকে ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক গ্র্যাজুয়েট দিয়ে আর আধুনিক অর্থনীতিকে সামলানো সম্ভব নয়।
উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগে আশু লাভ হয় না। তবে তা কেবল ইগলটনের ‘উচ্চশিক্ষার’ ক্ষেত্রে খাটে, বিশ্ববিদ্যালয়রূপী ‘করপোরেশন প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ বা ‘করপোরেশন গবেষণাকেন্দ্রের’ ক্ষেত্রে খাটে না। আমার ধারণা, দক্ষিণ এশিয়ার কর্তাব্যক্তিরা হয় এই দুই ধরনের উচ্চশিক্ষার পার্থক্য সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন না অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা গবেষকেরা যে উচ্চশিক্ষাকে লাভজনক করতে পারবেন, এ রকম ভরসা পাচ্ছেন না। তাই গবেষণার এত আকাল। মজার ব্যাপার হচ্ছে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা থাকলেও পাকিস্তানি গবেষকেরা এ ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছেন। যেমন ২০০২ সালে ওই দেশের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল ৮০০ আর ২০১১-তে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২০০-তে (অবশ্য তাদের মান নিয়ে অনেকের সংশয় আছে)। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নেপালে। মাত্র ১ শতাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পিএইচডি প্রদান করে।
এসব কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশ পিছিয়ে আছে। আমরা যদি ২০১২-১৩ সালের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব টিএইচই (টাইমস হায়ার এডুকেশন) র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ১০০টা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এই অঞ্চলের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। তবে প্রথম ৪০০টির মধ্যে ভারতের তিনটি আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) আছে। আর কিউএস র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম ৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতের চারটি আইআইটি এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’ স্থান পেয়েছে। অন্য দেশগুলোর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান খুবই হতাশাজনক।
সরকারগুলোর (ভারত ছাড়া) পক্ষ থেকে এই হতাশাজনক পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলেও বেসরকারি খাত এগিয়ে আসছে। তৈরি হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আর উচ্চবিত্ত, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরা চলে যাচ্ছে বাইরে। যেমন ২০১১-১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে ৫৯ হাজার, বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ৪১, নেপাল থেকে ২ হাজার ৮২২, পাকিস্তান থেকে ১ হাজার ৯০০ এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ১ হাজার ৪১২ জন পোস্টগ্র্যাজুয়েট ছাত্র কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গেছে।
এখন দেখা যাক দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশে কীভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ হয়েছে। এই অঞ্চলে ১৯৮০-এর দশকে যেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বই ছিল না, মাত্র দুই দশকে তার ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে। যেমন ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৫৯ শতাংশ বেসরকারি (এখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরা হয়নি) এবং তা দ্রুত বিকাশমান। আফগানিস্তানের অবস্থাটাও অনেকটা একই রকম। আনুপাতিক হারে এই দুটি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃদ্ধির হার প্রায় সমান সমান এবং এতদঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। এরপরেই পাকিস্তানের অবস্থান। ওখানে ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। তবে ওখানকার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি সরকারি টাকায় চলে না। প্রচুর বিনিয়োগ করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে ২০০৮-এর পর সরকার হঠাৎ করে এক বছরের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বাজেট ৮৩ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এখন ওদের ট্রাস্টি বোর্ড ছাত্র-বেতন এবং কিছু বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে অর্থসংস্থান করে। ভারতে ৩৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সরকারি বিধিনিষেধের কারণে বেসরকারি খাতটি এখনো বিকশিত হয়নি।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ভারতে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কম, তার কারণ সরকারি বিনিয়োগ। দেশটির ১১তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষা খাতের বরাদ্দ নয় গুণ বাড়ানো হয়েছে। সেখানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রের পেছনে সরকারি ব্যয় সবচেয়ে বেশি—জিডিপি পার ক্যাপিটার ৬৯ দশমিক ৭ শতাংশ (২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী)। বাংলাদেশে সবচেয়ে কম ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ (২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী); নেপালে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ (২০১০) ও শ্রীলঙ্কায় ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ (২০১০)। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের হিসাব পাওয়া যায়নি।
এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। উপর্যুক্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা যদি উচ্চশিক্ষা উন্নয়নের সূচক হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এগিয়ে আছে; যদি ছাত্র-বেতনে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রণোদনা মনে করা হয়, তাহলে শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশ এগিয়ে আছে; যদি উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা বা উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা উচ্চশিক্ষা বিকাশের পূর্বশর্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে; যদি জিডিপি বৃদ্ধির হার উচ্চশিক্ষার সহায়ক হয়, তাহলেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পরেই। সাম্প্রতিক কালে কিছু প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরও, বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে মূলত সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে।
সরকারি বিনিয়োগ কমানোর অর্থ হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা আরও প্রকট। প্রথমত, এরা ছাত্র-বেতনের ওপর নির্ভর করে, বিদেশের মতো ফান্ড দিয়ে সাহায্য করবে এ রকম বড় করপোরেট পুঁজি এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, সম্ভবত অর্থাভাবেই, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যূনতম যা যা প্রয়োজন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নেই। তৃতীয়ত, পদোন্নতির জন্য কিছু নামকাওয়াস্তে গবেষণা হলেও সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এরা পিএইচডি/এমফিল কোর্স চালু করতে পারেনি। চতুর্থত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় অবস্থাপন্ন ও মেধাবী ছাত্রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক দরিদ্র ও কম মেধাবী ছাত্ররা এখানে ভর্তি হয়। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এ রকম: যাদের সরকারি ভর্তুকির (প্রায় ৯০ শতাংশ) দরকার নেই, তারাই তা ভোগ করে আর যাদের দরকার তারা ক্ষেত্রবিশেষে জায়গাজমি বিক্রি করে কোনোরকমে লেখাপড়া চালিয়ে যায়।
এ রকম অবস্থায় বড়জোর বিশ্ববিদ্যালয়মুখী কিছু বেসরকারি ‘করপোরেট প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ তৈরি হতে পারে, ‘করপোরেট গবেষণাকেন্দ্র’ নয়। এখন হয় সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে, নাহয় ভারতের মতো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে পাকিস্তানের মতো খালি বিনিয়োগ বাড়ালেই হবে না, দেখতে হবে এই বিনিয়োগ যেন যোগ্য প্রশাসক ও মেধাবী ছাত্র-শিক্ষকের হাতে পড়ে লাভজনক হয়ে ওঠে—প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাবলম্বী হয়। তাতে ইগলটনের ‘মৃত্যু’ এড়ানো যাবে কি না বলা মুশকিল, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যে অন্তত লাভজনক করপোরেট গবেষণাকেন্দ্রে পরিণত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তথ্যসূত্র
১। Higher education in South Asia (২০১৩), দ্য ইকোনমিস্ট
২। Higher education across Asia (২০১১), এডিবি
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

Thursday, October 8, 2015

মেধাবী বনাম নকলবাজ by আসিফ নজরুল

মেয়েটি প্রতিবন্ধী বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। একটু বড় হওয়ার পর থেকে তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। এসএসসি আর এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ ছিল। সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য কঠোর প্রস্তুতি ছিল। পরীক্ষার প্রশ্নও তার জন্য সহজ ছিল। কিন্তু সে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেই বুঝে যায় হবে না তার। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে—এই গুঞ্জন তার কানে আগেই পৌঁছেছিল। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল গুঞ্জন নয়, এটিই সম্ভবত সত্যি। তার কেন্দ্রেই কেউ কেউ আনন্দে উদ্বেল হয়ে আছে ১০০টির মধ্যে ১০০টি অবজেকটিভ প্রশ্ন কমন পড়েছে বলে। কীভাবে সম্ভব এটি? পরীক্ষাকেন্দ্রেই নির্দ্বিধায় বলাবলি হয়েছে যে প্রশ্ন পেয়েছিল কেউ কেউ পরীক্ষার আগে। ফেসবুকে সেই প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল। এবার আগেই ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পেয়ে উল্লসিত কারও কারও ফেসবুকের কথোপকথনের স্ক্রিনশট এল মেয়েটির প্রোফাইলে।
মেয়েটি আমার স্ত্রীর নিকটাত্মীয়। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার স্বপ্নভঙ্গের পর সে কারও সঙ্গে কথা বলেনি। নিজের ফেসবুকে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাস দিয়ে সে তার হাহাকারের কথা জানিয়েছে। তার প্রশ্ন: আগে প্রশ্ন পেয়ে নকলভাবে যারা পাস করেছে, তাদের কী অধিকার আছে ডাক্তারি পড়ার? মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার সময়ও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। এবারও এটি হওয়ার পর সে লিখেছে, এ দেশে পড়াশোনা করার ইচ্ছাই চলে গেছে তার!
এই মেয়েটির মতো লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন হরণ করা হয়েছে এসএসসি, এইচএসসি, ভর্তি, নিয়োগের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অজস্র ঘটনায়। বহুবার এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে, বহু প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, বহু ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিছুতেই সরকারের টনক নড়েনি। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এবার যা হলো—এত প্রমাণ, এত প্রতিবাদ আর এত লেখালেখি—তারপরও কি কিছুই হবে না?
আমরা কি তাহলে আমাদের সন্তানদের এই বার্তাই দিচ্ছি যে পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই, নিজের ভাগ্য গড়তে হলে জালিয়াতি করা শিখতে হবে? যারা জালিয়াতি করতে পারবে, তারাই ভালো জায়গায় পড়বে, ভালো চাকরি পাবে? যাদের জালিয়াতি করার বা অসৎ হওয়ার মানসিকতা বা রুচি নেই, তাদের বুকে রক্তক্ষরণ নিয়ে বাঁচতে হবে, হয়তো সারা জীবন এর মাশুল দিতে হবে নানাভাবে?
আর যারা বিভিন্ন পরীক্ষায় জালিয়াতি করেছে বা করবে, তাদের পাপের মাশুল দিতে হবে গোটা জাতিকে। যদি ১০০ জনের মধ্যে অর্ধেকও হয় এমন, তাহলে এরা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে করতে নিজেরাই বড় জালিয়াত আর দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠবে। অন্তত তা হওয়ার প্রণোদনা পাবে। মেধা নয়, জালিয়াতি আর চৌর্যবৃত্তিকে এভাবে পুরস্কৃত করে আমরা এ কোন অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি আমাদের তরুণ সমাজ আর দেশকে?
২.
আমাদের প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। আবার তিনিই বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন কি না, তা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে খতিয়ে দেখা হয়নি। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, খতিয়ে দেখার আগে উনি প্রশ্ন ফাঁস হয়নি এই দাবি করেন কীভাবে? প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে—এমন অভিযোগকে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের জন্য এত দক্ষতা সরকারের যেসব এজেন্সি দেখাতে পারে, তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের নমুনা পাচ্ছে না, তা তো হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা অবশ্যই সরকারের জানার কথা। প্রশ্নপত্র ফাঁস তাই বলে শিক্ষামন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রীর নির্দেশে হতে পারে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেও হতে পারে না। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বেপরোয়া অন্যায় করতে হলে সরকারের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের কারও কারও সঙ্গে যোগসাজশ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
আমাদের মনে আছে, ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা চলাকালীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দপ্তর থেকে কমিশনের সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজ, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ভান্ডাররক্ষক রেজাউল করিম ও তাঁদের সহযোগী ঈশান ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যা ব। তখন র্যা ব জানিয়েছিল যে এই চক্রটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে ১৫ লাখ টাকা, জুডিশিয়াল সার্ভিসে নিয়োগ দিতে ১০ লাখ টাকা এবং কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ছয় লাখ টাকা করে নিত।
র্যা ব তখন দাবি করেছিল, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই চক্রটির মূল হোতা ওমর সিরাজ। র্যা বের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ৩ অক্টোবর তিনি মারা যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠছে, এটি কেন ঘটল? ওমর সিরাজের বিচারকাজ সম্পন্ন হলে ভুয়া প্রশ্নপত্র তৈরি বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো সম্পর্কে অনেক প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যেত। এমন একজন ব্যক্তি র্যা বের রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মারা যাওয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অন্যদের নাম জানার সুযোগ থাকল না। এই মৃত্যু স্বাভাবিক কারণেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের নির্মমতাও বিস্ময়কর। এই প্রতিবাদকারীরা সরকারের পতন চায়নি, সরকারবিরোধী কোনো স্লোগান দেয়নি। তারা শুধু তদন্ত আর পুনরায় পরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। এই দাবির উত্তর কি রাইফেলের বাঁট দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো আর মেয়েদের চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া হওয়া উচিত? তাহলে কি এমন কিছু ক্ষমতাধর ব্যক্তি এতে জড়িত যে কোনো সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠলে যেভাবেই হোক তার কণ্ঠরোধ করতে হবে?
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একবার বলেছিলেন যে প্রশ্নপত্র ফাঁস সরকারের জীবন-মরণ সমস্যা। যদি তা-ই হয়, তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো অভিযোগ উঠেছে এমন একটি পরীক্ষাও বাতিল করা হয়নি কেন? কেন বছরের পর বছর ধরে এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না? কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বহু প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি? জামিলুর রেজা চৌধুরী, জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালসহ বহু বরেণ্য ব্যক্তি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নানা প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব পরীক্ষা করে দেখা দূরের কথা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে আন্তরিক ও অর্থবহ কোনো পরামর্শসভাও সরকারকে আমরা আহ্বান করতে দেখিনি।
৩.
প্রশ্নপত্র ফাঁসের পাশাপাশি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নানা বৈষম্যের অভিযোগ আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছি। বিএনপি-জামায়াত আমলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌখিক পরীক্ষাকালে বৈষম্যের শিকার হতেন বলে অভিযোগ ছিল। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এমন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ শোনা যায়। এ ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের প্রতি অবিচারের অভিযোগও বহু পুরোনো। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এসব বৈষম্যের সংস্কৃতি এখন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে ছাড়িয়ে প্রায় সর্বজনীন হতে চলেছে। অন্ধ দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রকোপে সাধারণ নির্বিরোধী তরুণ সমাজও এখন নানা অনিশ্চয়তার বলি হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলছি, কিছুদিন আগে বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছিল। এই পরীক্ষার জন্য প্রায় আড়াই বছর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীরা। নানা ধাপের পরীক্ষা শেষে লিখিত পরীক্ষার ফল যখন বের হলো, দেখা গেল মেধা আর কোটায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের আলাদা করার কোনো উপায় নেই। কোটাধারীদের উৎপাতে এমনি সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের ঢোকার সুযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। মেধা আর কোটার আলাদা তালিকা না থাকার কারণে এবার আর বোঝারই উপায় রইল না যে আসলে মেধাবীদের ঠিক কতটুকু সুযোগ দেওয়া হলো, আর কতটুকু কোটার নামে পছন্দের প্রার্থীদের চাকরিতে ঢোকানোর জন্য রাখা হলো। পিএসসিকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানাল যে তাড়াহুড়া করে রেজাল্ট প্রস্তুত করার কারণে আলাদা কোনো তালিকা তৈরি করা যায়নি!
এত বড় খামখেয়ালিপনা নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হলো না দেশে। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নন-ক্যাডার নামের যে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তার অস্বচ্ছতা নিয়েও কথা বলি না আমরা। অথচ ভুক্তভোগীরা জানেন এসবের কত যন্ত্রণা। আমাকে একজন মেইল করেছেন। তাঁর কথাই তুলে ধরছি: ‘কত নির্ঘুম রাত, কষ্ট, পরিশ্রম আর সাধনার ছিল ৩৪তম বিসিএস। ২৯ আগস্ট রাত ৯টায় আমাদের সেই সাধনা, কষ্ট আর অমানুষিক পরিশ্রম নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করা হলো। নন-ক্যাডার নামক প্রহসনের নাটক মঞ্চস্থ করা হলো ৬১৮৫ জন মেধাবীর সঙ্গে। প্রিলি, রিটেন, ভাইভা পাস, কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে চাকরি নেই। তাহলে ২.৫ বছর আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিল কেনো? পদ স্বল্পতা বলছে অথচ রেজাল্ট নিয়ে কি কারচুপি হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মেধা আর কোটা আলাদা না করে মনগড়া রেজাল্ট দিয়েছে!’
হতে পারে এসব অভিযোগে অতিশয়োক্তি রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বা নিয়োগ দুর্নীতির কিছু অভিযোগ সত্যি না–ও হতে পারে। কিন্তু ১০টি পরীক্ষার মধ্যে সাত–আটটিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে বাকিগুলোতেও ফাঁস হয়েছে—এই আশঙ্কা জাগাই স্বাভাবিক বঞ্চনাবোধ রয়েছে এমন তরুণদের মধ্যে।
এমন বঞ্চনাবোধ দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের মধ্যে হতাশাবোধ জাগাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানা অনিয়মের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশের মধ্যে নৈতিকতাবোধের মারাত্মক সংকট তৈরি করছে। এই পরিস্থিতির অবসান ঘটানো অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য পদক্ষেপের সূচনা হতে পারে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করা এবং অন্তত উত্তীর্ণ ও অপেক্ষমাণ তালিকাভুক্তদের পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
মূল কথা হচ্ছে, একটা কিছু সরকারকে করতেই হবে। ভর্তি, নিয়োগ আর স্কুল সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও নানা দুর্নীতির অভিযোগ একটি জাতি অনাদিকাল বহন করতে পারে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Sunday, October 4, 2015

পরীক্ষা মানেই প্রশ্ন ফাঁস! হতাশ শিক্ষার্থী চাকরিপ্রার্থী ও অভিভাবক by মেহেদী হাসান

পরীক্ষা মানেই প্রশ্নপত্র ফাঁস; এটিই যেন এখন স্বাভাবিক ঘটনা। প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায়ও এখন এটি ঘটতে শুরু করেছে। পাবলিক পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ পরীক্ষায় একের পর এক ঘটে চলেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। ২০০৯ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যে পরিমাণ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি অতীতে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় মোট ৬৩টি বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অপর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় একই সময়ে ৩০টিরও বেশি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছরে প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ড সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরি প্রার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যেও দীর্ঘ দিন ধরে বিরাজ করছে তীব্র ক্ষোভ এবং হতাশা। বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রমাণিত হলেও বাতিল করা হয়নি পরীক্ষা। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে মূল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেলেও অনেক সময় কর্তৃপক্ষ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। কখনো কখনো সাজেশন বলেও বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন কোনো নজিরও চোখে পড়ছে না। অনেকের মতে এসব কারণেই থামছে না প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারি।
গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন কারণে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় একের পর এক কেলেঙ্কারি যেন লেগেই আছে। এ মুহূর্তে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে আন্দোলনে মাঠে রয়েছেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা।
চলমান শিক্ষক আন্দোলনের মধ্যেই ঘটে যায় দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন তথা ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলন শেষ না হতেই আবার মাঠে নামলেন মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার আগের রাত থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে এবং এ অভিযোগে সরকারি চাকরিজীবী ও চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃতদের একজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বরের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা।
পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস উৎসব
২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ সাল ছিল পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের হিড়িকের বছর। ২০১৪ সালে বছরজুড়ে একের পর এক পাবলিক পরীক্ষায় ঘটতে থাকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা। সমাপনী, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মুড়ি মুড়কির মতো মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র। এ ছাড়া জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষায়ও তখন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে।
২০১৪ সালে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রতিটি বিষয়ে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং অভিযোগ আসতে থাকে। ফাঁস হওয়া অনেক প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার হলের প্রশ্নপত্র হুবহু মিলে যায়। তারপরও একটি পরীক্ষা স্থগিত ছাড়া অন্যসব পরীক্ষা চালিয়ে নেয়া হয়। ২০১৪ সালে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এইচএসসির। পরিস্থিতি বেগতিক আকার ধারণ করায় স্থগিত করা হয় ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। তবে বাংলা, ইংরেজি প্রথম পত্র, গণিত, রসায়ন, পদার্থ বিজ্ঞানসহ বিষয়ের প্রশ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। এ সত্ত্বেও এসব পরীক্ষা বাতিল করা হয়নি।
২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাথমিকের সমাপনী পরীক্ষায়ও একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস ঘটতে থাকে। ২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে ধুমধামের সাথ।
২০১৩ সালে সমাপনী পরীক্ষায় ইংরেজি এবং বাংলা বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে প্রমাণিত হয়। ইংরেজি ৮০ এবং বাংলা ৫৩ শতাংশ প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে। তবু এ পরীক্ষা বাতিল হয়নি। প্রাথমিক ও গণশিা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এস এম আশরাফুল ইসলাম তখন জানান তদন্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রমাণিত হয়েছে। তবে পরীা বাতিল করা হচ্ছে না।
২০১২ সালেও সমাপনী পরীক্ষায় বাংলা ও গণিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালে সমাপনী পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন জেলায় দায়ীদের শাস্তি দিয়েছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার অনেকে অনলাইনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রণালয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু তারপরও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার গত ৪ ডিসেম্বর নেত্রকোনা কেন্দুয়ায় একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেলেও এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের এসএসসি ও সমানের পরীায়ও সব প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। গণিত, ইংরেজি প্রথম পত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ২০১৩ সালে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীায় ইংরেজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন, হিসাববিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিা অধিদফতর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নিয়োগ পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এমন মহামারী আকার ধারণ করেছে যে, সরকারি সর্বোচ্চ নিয়োগ পরীক্ষা তথা বিসিএস পরীক্ষায়ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনা ঘটল। ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক নিয়োগ, বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, থানা ও উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও), মেডিক্যাল, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ উঠেছে। ইসলামী ব্যাংকেরও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে ২০১২ সালে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীা ও অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীা। একই কারণে প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগের পরীক্ষাও ১৭ জেলার বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ৩১ মে ফাঁস হয়ে যায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীার প্রশ্ন। ওই দিন বিকেল ৪টায় পরীা থাকলেও সকাল ৯টা থেকেই হাতে লেখা প্রশ্ন পরীক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ার পর ১২ জুন ওই পরীা বাতিল করা হয়।
২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীা হলেও পরীা বাতিল হয়নি। একই বছর ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিাকর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। একই বছর ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীা স্থগিত করা হয়। একই বছর ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীা বাতিল করে কর্তৃপ।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২০১২ বছরের ৩ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীায় হলের প্রশ্নের হুবহু মিল থাকলেও পরীা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই এটিইও পদে প্রিলিমিনারি পরীা হয়। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর পিএসসি পরীা স্থগিত করে। ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর প্রাইমারি স্কুলে প্রধান শিক নিয়োগ পরীার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে।
ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে গড়ে উঠছে জালিয়াতচক্র। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ চক্র প্রশ্ন ফাঁসসহ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে উত্তর বলে দেয়ার কৌশল রপ্ত করে ভর্তি ইচ্ছুকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ চক্রের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতোমধ্যে। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এ চক্র প্রযুক্তির সাহায্যে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলন করছে মেডিক্যালে ভর্তি ইচ্ছুকরা। গত ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তারা পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। এর আগেও ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। সে বছর ৩০ সেপ্টেম্বর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়। ৫২টির মধ্যে ৪১টি প্রশ্ন মিলে যায় ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে।
প্রশ্ন ফাঁসের রেকর্ড
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে গত ছয় বছরে । ১৯৭৯ সালে এসএসসি পরীায় সর্বপ্রথম প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১৯৭৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ২৯ বছরে ৫৫টি পরীার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। আর গত ছয় বছরে ৩০টিরও বেশি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁস, মামলা ও তদন্ত
বিভিন্ন পরীায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গত ছয় বছরে রাজধানীতে ৭০টি মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলায় শাস্তি পাওয়ার তেমন নজির নেই। অনেকে প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়েছে। অনেক মামলা আর সচল নেই। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অনেক তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তে অনেক ঘটনা প্রমাণ হয়েছে। তদন্তে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে অনেক সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু তারও তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত একটি তথ্যে দেখা যায়, গত ৩৫ বছরে অন্তত ৭৮টি পরীার প্রশ্ন ফাঁস হলেও তদন্ত কমিটি হয়েছে ২৩টিতে। আর বাতিল ও স্থগিতের ঘটনা ঘটেছে ১২টির মতো পরীক্ষায় ।
বার্ষিক পরীায়ও প্রশ্ন ফাঁস!
কুড়িগ্রামের চিলমারি উপজেলায় গত বছর ডিসেম্বর মাসে মাধ্যমিক স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ১ ডিসেম্বর উপজেলার সব উচ্চবিদ্যালয়ে চারটি সেটের মাধ্যমে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে বার্ষিক পরীা শুরু হওয়ার পর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটে বিভিন্ন স্কুলে।
টিআইবির অনুসন্ধান
গত ৫ আগস্ট রাজধানীতে টিআইবির প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৪০টি ধাপে প্রশ্ন ফাঁস হয়। তার মধ্যে ২৩টি ধাপ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মডারেশন, বিজি প্রেসে কম্পোজ, প্রুফ দেখা, সিলগালা করা ও বিতরণ এবং পরীার দিন পরীা কেন্দ্রে শিকদের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে শিাবোর্ড, মাধ্যমিক শিা অধিদফতর, প্রাথমিক শিা একাডেমি, কোচিং সেন্টার, গাইড বই ব্যবসায়ী ও সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন সরাসরি জড়িত। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে আকারভেদে ২০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের লেনদেন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এ চারটি পাবলিক পরীার প্রশ্ন প্রণয়ন, মডারেশন, ছাপানো, সংরণ ও বিতরণের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এ গবেষণা কার্য পরিচালনা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৯ সালে প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতা শুরু হলেও ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৪ শিাবর্ষ সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে। গত চার বছরে গবেষণার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন পাবলিক পরীায় ৬৩টি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল ও আত্মীয়স্বজন এ চারটি মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের হাতে পৌঁছায়।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেণে দেখা যায়, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশীজন জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণে এবং তদারকির সাথে সম্পৃক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, প্রশ্ন প্রণয়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির সাথে অনেকের সম্পৃক্ততাও প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথাকথিত সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখা ও প্রশ্নপত্র দিয়ে শিার্থীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টিকে অস্বীকার করার প্রবণতা, বিষয়টি ‘সাজেশন কমন পড়া’, ‘গুজব’ বলে অস্বীকার করা, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি নীতি। এ ছাড়া পাবলিক পরীা অপরাধ আইনে শাস্তি কমানো, কোচিং বাণিজ্যে বন্ধে প্রণীত নীতিমালা অস্পষ্টতা, গাইড বই বন্ধে আইনের শিথিলতা, বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না করা, প্রশ্ন ফাঁসের সাথে যুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়া, একই শিক প্রতিবছরই প্রশ্ন প্রণেতা হিসেবে নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর তদারকি ও প্রয়োজনীয় পদেেপর ঘাটতি, পরিবর্তিত শিা ও পরীা কাঠামোর ওপর শিকদের যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রশিণের অভাব, বিজি প্রেসে পর্যাপ্ত তদারকি ও নিরাপত্তা না থাকা, শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিকল্প প্রশ্ন না থাকা, প্রশ্ন গণনায় ম্যানুয়ালি করা, সচেতনতার ঘাটতি। এর ফলে সার্বিক শিা কাঠামোতে নৈতিকতার অবয়, শিার গুণগতমানের অবনতি পরিলতি হচ্ছে। একে শিার্থীদের মাঝে পড়াশোনার ঘাটতি, মেধাবীদের তুলনায় রেজাল্টে কম মেধাবীরা এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতায় ল্য করা গেছে।
নৈতিকতার বিপর্যয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, প্রশ্ন ফাঁস ঘটনার সাথে আমাদের সমাজের অনৈতিকতার বিপর্যয়ের চিত্রও প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সমাজে অনৈতিকতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মা-বাবাও দৌড়াচ্ছেন সন্তানের জন্য ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করার জন্য। সন্তানও মা-বাবাকে দ্বিধাহীনভাবে বলছে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন জোগাড় করে দেয়ার জন্য। মা-বাবা সে আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন। কারণ প্রশ্ন জোগাড় করতে না পারলে তার সন্তানতো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একেবারে কোমল অবস্থায়ই একজন শিশুকে অনৈতিকতার দিকে ধাবিত করা হচ্ছে । মা-বাবা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী মিলে সবাই অনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই যে চিত্র এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক জাতির জন্য।
প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। গত ২৭ নভেম্বর অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজটুয়েন্টিফোরডটকম-এ তিনি লিখেছেন ‘ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এই নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার কি এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে? নেই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও থাকবে না। শুধু আমাদের দেশেই কিছু আমলা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ একটা শিাব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয়, সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব?’
জাফর ইকবাল লিখেছেন ‘এই দেশের শিাব্যবস্থার হর্তাকর্তা বিধাতারা, আপনাদের কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করি, আমাদের দেশের শিশুদের আপনারা মুক্তি দিন। এই শিশুগুলো যদি কোনো পরীা না দিয়ে শুধু বইগুলো নাড়াচাড়া করে সময় কাটিয়ে দিত তাহলে অন্তত তাদের একটা সুন্দর শৈশব থাকত, তারা অন্তত অন্যায় করা শিখত না। আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার দরকার নেই, দোহাই আপনাদের, তাদের ক্রিমিনাল করে বড় করবেন না! ’
হতাশায় মেধাবীরা
‘প্রশ্ন যদি হবে ফাঁস পড়ব কেন বার মাস’ স্লোগান ধারণ করে বর্তমানে আন্দোলন করছেন মেডিক্যাল ভর্তি ইচ্ছুকরা। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে অনেক অমেধাবী যেমন পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছে তেমনি অনেক অমেধাবীরা ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে। আবার অনেক অযোগ্যরা পাচ্ছে ভালো চাকরি। না পড়েই যদি প্রশ্ন ফাঁসের কারণে এসব পাওয়া যায় তাহলে মেধাবীরা ১২ মাস কষ্ট করে কেন পড়বে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই জাতির কাছে। এ প্রশ্ন সত্যিই অনেক বেদনার অনেকের কাছে।
রাজধানীর হলিক্রস কলেজের অভিভাবক সালমা নাজু জানান, এইচএসসি পরীক্ষার সময় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তার মেয়ে ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে। এ কলেজের মেয়েরা সবাই পড়াশুনায় ভালো। কিন্তু পরীক্ষার সময় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিয়ে অন্যদের কাড়াকাড়ির দৃশ্য দেখে তার মেয়েসহ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরা কান্না ধরে রাখতে পারেনি। সারা বছর এত কষ্ট সাধনার পর এখন সবাই পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়ে যাচ্ছে এবং পরীক্ষার খাতায় তা গড় গড় করে লিখে দিয়ে আসছে। সালমা নাজু জানান, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার সময় সে এবং তার মেয়ে যে মানসিক কষ্ট পেয়েছেন তা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না।
প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং বেদনার চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন অসংখ্য মেধাবী ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী এবং তাদের মা-বাবা। রাজধানীর বিভিন্ন নামকরা কলেজের এইচএসসি পড়–য়া শিক্ষার্থীরা আগের বছরগুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের স্মৃতিচারণ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা দেখেছে কিভাবে তাদের সামনে অমেধাবীরা, যারা হয়তো ঠিকমতো পাসই করতে পারত না তারাও জিপিএ ৫ পেয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছে ফল প্রকাশের পর। তাদের মতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা এবং উদারনীতিতে খাতা মূল্যায়নের কারণে ভালোমন্দ সব একাকার হয়ে গেছে। সারা বছর তাদের পরিশ্রম মূল্যহীন হয়ে গেছে।

Saturday, October 3, 2015

পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন চান শিক্ষামন্ত্রী, ডিআরইউতে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষার পদ্ধতি পরবির্তনের পক্ষে মত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, আমি পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের পক্ষে। মাস ভরে পরীক্ষা হয়। এতদিন প্রশ্নপত্র পাহারা দেয়াওতো কঠিন। মন্দ লোকেরা এই সুযোগ নেয়। শুক্রবার বিকেলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা এবং বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দুই-তিন মাস ধরে পরীক্ষা চলায় ক্লাস বন্ধ থাকে। সময় নষ্ট হয়। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি তো আছেই। এই জন্য পাবলিক পরীক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তন প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা চলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া প্রসঙ্গে বিকল্প চিন্তা প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেন।
ডিআরইউর সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে এ বছর এসএসসিতে ১৭ জন, ও লেভেলে দুইজন এবং এইচএসসির ১২ জন কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে তিন হাজার টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি ও ক্রেস্ট তুলে দেয়া হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যত সুপার টেকনোলোজি ব্যবহার করা হোক না কেন প্রশ্নপত্র ফাঁস পুরোপুরি ঠেকানো যাবে না। যারা অপরাধী তারা সুপার টেকনোলোজির চেয়েও এগিয়ে থাকে। তাছাড়া চাইলেও সুপার টেকনোলজি চালু করা সম্ভব না।
শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের কথা উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ঘুষ দিয়ে যদি চাকরি নিতে হয় তাহলে সেই শিক্ষক পড়াবেন কীভাবে? তার কাছ থেকে কতটুকু দায়িত্ববোধ আশা করা যায়?
তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সারাদেশে পিএসসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। এতে অনিয়ম করার সুযোগ বন্ধ হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আক্ষেপ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো শিক্ষার মান তেমন উন্নত করা যায়নি। আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন ৫৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। আমরা এসেই তাদের নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেই। এই সময়ের মধ্যে কেউ নিজস্ব ক্যাম্পাসে যায়নি। পরে আমরা ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে বাধ্য করেছি।
২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা করা হয়েছে জানিয়েছে তিনি বলেন, কথা না শোনায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল করেছি। কিন্তু তারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে এখনও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ডিআরইউ’র সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন, ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক আরিফুর রহমান, ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আহবায়ক ডিআরইউর সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, সদস্য সচিব সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস মোবারক প্রমুখ।
ডিআরইউর কল্যাণ সম্পাদক শাহনাজ শারমিনের সঞ্চালনায় অভিভাবকদের মধ্যে এহসানুল হক বাবু, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফরাদ, আর্শিয়ানা চৌধুরী বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মানবজমিনের সিনিয়র সাংবাদিক আওলাদ হোসেনের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। তিনি গত বৃহস্পতিবার রাতে ইন্তেকাল করেন।

Monday, September 28, 2015

শিক্ষক, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম by গোলাম ফারুক

বহুদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। আমি নিজে ছাপোষা শিক্ষক বলে শিক্ষক-সম্পর্কিত ঘটনাটা ঠিকই মনে আছে। কোনো এক অজপাড়াগাঁয়ে এক হতভাগা শিক্ষক ছাত্র পড়ানোর কাজ পেলেন। ছাত্রদের বাগানের লাউটা-মুলাটা ছাড়াও পারিতোষিক হিসেবে সামান্য কিছু অর্থপ্রাপ্তি হতো বলে কষ্টেসৃষ্টে তাঁর দিন চলে যেত। এই স্বল্প বেতনটুকুও যে তিনি নিয়মিত পেতেন তা নয়, তবু ঘাড় গুঁজে নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছিলেন।
কয়েক মাস ওঁর গোবেচারা স্বভাব লক্ষ করে গ্রামের বুদ্ধিমান মাতব্বরটির মনে হলো যে বেতন না দিয়েও তো ওঁকে দিয়ে বেগার খাটানো যায়। বেতন বন্ধ হলো। মাতব্বরটি যা ভেবেছিলেন তা-ই। তিনি প্রতিবাদ করেন না, যানও না। পেটেভাতে থাকেন আর ছাত্র পড়ান। এর বেশ কিছুদিন পর, বলা নেই কওয়া নেই, বাক্স-পেটরা নিয়ে একদিন তিনি হঠাৎ উধাও। তাতে যে কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হলো, তা নয়। চতুর মাতব্বর কয়েক দিনের মাথায় আরেকজন শিক্ষক জোগাড় করে ফেললেন। কিন্তু মাথায় হাত পড়ল সেদিন, যেদিন নতুন শিক্ষক দেখলেন, ছেলেমেয়েরা সব বর্ণমালা উল্টো করে লেখে। ওদের এভাবেই শেখানো হয়েছে; পুরোনো গোবেচারা শিক্ষকটি এভাবেই বেগার খাটানোর প্রতিশোধ নিয়ে গেছেন।
বেচারা শিক্ষকের প্রসঙ্গ আপাতত থাক। তার আগে ১৯৭০ দশকের সমাজতত্ত্ববিদ ওয়ালরস্টাইনের চোখ দিয়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কটা একটু ঝালিয়ে নিই। ওয়ালরস্টাইন বলেছেন, পৃথিবী তিন ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হচ্ছে ‘সেন্টার’, যা গঠিত হয় উন্নত রাষ্ট্রগুলো দিয়ে। সবচেয়ে দুর্বল অংশ হচ্ছে ‘পেরিফেরি’, যেখানে দরিদ্র দেশগুলো অবস্থান করে। আর মাঝখানের জায়গাটা হচ্ছে ‘সেমি–পেরিফেরি’, যার প্রায় সব কটি রাষ্ট্র ‘পেরিফেরি’ থেকে উঠে এসে অনিবার্যভাবে যত দ্রুত সম্ভব ‘সেন্টারের’ দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এখন দেখা যাক, যে উন্নত রাষ্ট্রটি ‘সেন্টারে’ যায়, তা কীভাবে যায় বা টিকে থাকে। ওয়ালরস্টাইন বলছেন, তার আসল জোরটা শিক্ষায়, গবেষণায়, আবিষ্কারে। তারা এসব ক্ষেত্রে প্রভূত বিনিয়োগ করে বাজারে একেবারে আনকোরা নতুন পণ্য ছেড়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে। একচেটিয়া ব্যবসার থলথলে মুনাফা ছাড়া ‘কেন্দ্রে’ টিকে থাকা যায় না। ফলে, নতুন পণ্যটির উৎপাদন-কলাকৌশল যখন জানাজানি হয়ে যায়, তখন তাদের আরেকটি পণ্য আবিষ্কার করতে হয়। সে জন্য সেখানে শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ একটি অনিবার্য ও নিরন্তর প্রক্রিয়া।
উল্টো দিকে কিছু রাষ্ট্র ‘পেরিফেরিতে’ পড়ে থাকে, কারণ তাদের অদক্ষ শ্রম ও সামান্য কিছু প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই নেই। তবু এখান থেকে কিছু রাষ্ট্র যে ‘সেমি–পেরিফেরিতে’ যেতে পারে, তার কারণ তাদের শ্রমদক্ষতার উন্নয়ন। শ্রমদক্ষতার পূর্বশর্ত যেহেতু শিক্ষা, তাই যারাই ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ গেছে বা যেতে চাইছে, তারাই সাধ্যমতো বা কখনো সাধ্যের বাইরে গিয়ে শিক্ষায় বিনিয়োগ করছে। যেমন: মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, কিউবা ইত্যাদি। এমনকি সৌদি আরবের মতো দেশ প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাজেটের বৃহদংশ ব্যয় করে শিক্ষায়। এ তো গেল বাংলাদেশের চেয়ে যাদের জিডিপির আকার বড়, তাদের কথা। বাংলাদেশের চেয়ে দরিদ্র অনেক দেশও এ ব্যাপারে অনেক এগিয়ে গেছে। যেমন: উগান্ডা তার বাজেটের ১৬ শতাংশ, টোগো ১৭, বুরুন্ডি ২২, লেসেথো ২৪ ও তাঞ্জানিয়া ২৬ শতাংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করে। অথচ বাংলাদেশ, যা ২০২১ সালে ‘সেমি-পেরিফেরিতে’ ঢোকার আশা করে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছে তার বাজেটের মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা জিডিপির ২ শতাংশ।
অবশ্য বাজেট বেশি হলেই যে শিক্ষা উন্নত হবে বা সে কারণে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিশ্বব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা–বিষয়ক এক প্রতিবেদনের ‘ইকোনমিক রিটার্নস টু ইনভেস্টমেন্ট ইন এডুকেশন’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অনেক দেশেই শিক্ষা-বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নতির মধ্যে পজিটিভ কোরিলেশন পরিলক্ষিত হয়নি। এর কারণ, বিনিয়োগ হয়েছে শিক্ষার প্রসারে, মানে নয়। কোথাও হয়তো অনেক আয়োজন করে ছাত্রদের শুধু মুখস্থ করার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু উন্নত চিন্তা-দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়নি; কোথাও হয়তো ঝোঁকটা ছিল শুধু ছাত্রসংখ্যা বাড়ানোর দিকে, কিন্তু শিক্ষককুল রয়ে গেছেন আগের মতো অদক্ষ, অপ্রতুল, অবহেলিত, নিম্ন আয়ের ‘গোবেচারা’ আজ্ঞাবাহক।
বাংলাদেশ ২০২১ ও ২০৪১ সালে যথাক্রমে ‘সেমি–পেরিফেরি’ ও ‘সেন্টারে’ যাওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং শিক্ষা-বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, তা জিডিপির আকার অনুযায়ী বাড়ছে না। ২০০৯-১০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেখান থেকে পরের বছর কমে হলো ১৩ দশমিক ৬১, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৩ দশমিক ১৩, ১২ দশমিক ৩২, ১১ দশমিক ৫৮, ১১ দশমিক ৭ এবং সর্বশেষ এ বছর তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে। ফলে বলা যায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় শিক্ষায় বিনিয়োগ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে।
এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তাতে কী এমন ক্ষতি হচ্ছে? শিক্ষার যেটুকু উন্নতি হচ্ছে, তাতেই তো নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে বাংলাদেশ। খাঁটি কথা। কিন্তু ভবিষ্যতে কি এই গতি ধরে রাখা যাবে? জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাবে না। তাঁদের মতে, সন্তোষজনক অগ্রগতি চাইলে, অর্থাৎ একটি দেশের জনশক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইলে তার জিডিপির ৬ শতাংশ বা বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করা উচিত। এর কম হলেই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না তা নয়—বাংলাদেশ তার প্রমাণ—কিন্তু টেকসই উন্নয়ন চাইলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সমান্তরালভাবেই শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এবার দেখা যাক জিডিপির যে সামান্য অংশ বাংলাদেশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করে, তা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না। সুখের কথা, অনেকটাই হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ‘যুগান্তকারী’ পরিবর্তন আনতে পারে বললেও ভুল হবে না। যেমন: শিক্ষানীতি প্রণয়ন, কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরি, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন, ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, ই-বুক প্রণয়ন, নারীশিক্ষার প্রসার, মাদ্রাসাশিক্ষা আধুনিকীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি, যা না হলে উপর্যুক্ত সব অর্জনই শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে, সেই শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধির কথা নিয়ে সরকার তেমন কিছু করছে না। অবশ্য একেবারে ভাবছে না বললে ভুল হবে। শিক্ষামন্ত্রী বারবারই এ প্রসঙ্গ তোলেন, কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটে না।
শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বৃদ্ধি না হলে শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন যে কার্যকর হয় না, তার অন্তত দুটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে কমিউনিকেটিভ অ্যাপ্রোচ চালু এবং প্রশ্নের ক্ষেত্রে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন—এই চমৎকার উদ্যোগগুলো উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে শুধু যে মাঠে মারা যাচ্ছে তা নয়, শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়াতেও তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ কথা এখন প্রায় কেউই অস্বীকার করেন না যে বাংলাদেশে শিক্ষার ‘প্রসার’ সন্তোষজনক। কিন্তু ‘মান’ নিয়ে যে দ্বিমত আছে, তা এ কারণেই। শিক্ষকেরা ক্লাসে পড়াতে পারছেন না, এমনকি ঠিকমতো প্রশ্নও করতে পারছেন না, ফলে দায় এড়ানোর জন্য পরীক্ষার খাতায় বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের খুশি করে নিজেরা নিরাপদে থাকছেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে যেসব উল্লেখযোগ্য সাফল্য ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে, তা অর্জন করতে শিক্ষকদের সাহায্যের প্রয়োজন হয়নি। এসব কাজ আমলা, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি কনসালট্যান্টরাই করেছেন। কিন্তু এর পরের ধাপ—শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন, নতুন পাঠ্যবই পড়ানো, সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করা, আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করা—তো শিক্ষকদেরই বাস্তবায়ন করতে হবে। সেখানেই সমস্যা। কম বেতনে, বিনা পুরস্কারে এবং নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্লাস উপচে পড়া ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা অপ্রণোদিত শিক্ষকদের পক্ষে একেবারে অসম্ভব না হলেও দুরূহ তো বটেই।
শিক্ষকদের এই বেহাল অবস্থা নতুন নয়। প্রায় সব দেশে শিক্ষকেরা চিরকালই অবহেলার শিকার হয়েছেন। কারণ, শিক্ষা কখনো সরাসরি উৎপাদনশীল খাত বলে বিবেচিত হতো না। যখন থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ধারণা জনপ্রিয় হলো বা শিক্ষা আধুনিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়াল, তখন থেকে রাষ্ট্রগুলো শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডে (শিক্ষকদের) গুরুত্ব দেওয়া শুরু করল। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, উন্নত ও সত্যিকার অর্থে উন্নয়নপিপাসু প্রায় সব দেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা প্রায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশ সরকারও যে তা উপলব্ধি করেনি তা নয়, কিন্তু হয় অর্থাভাবে বা অন্য কোনো অজানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।
কিন্তু যেভাবেই হোক, শিক্ষকদের বেতন-মান-মর্যাদা বাড়াতেই হবে। দারিদ্র্য ও অবহেলায় পীড়িত, কুণ্ঠিত, ন্যুব্জদেহ এই শিক্ষককুলের পক্ষে সরকার-পরিকল্পিত আধুনিক শিক্ষার গুরুভার বহন করা সম্ভব নয়। তাঁরা হয়তো জোরেশোরে এর প্রতিবাদ করবেন না। কিন্তু গল্পের সেই ‘গোবেচারা’ শিক্ষকের মতো ক্লাসে না পড়িয়ে, খাতা না দেখে কেবল সোজা প্রশ্ন করে এবং বেশি বেশি নম্বর দিয়ে ছাত্রদের পাস করিয়ে দেবেন—অথর্ব প্রজন্ম তৈরি করে, ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায়, নীরবে, নিভৃতে এক নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়ে নেবেন।
সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে যে এই প্রলয়ংকরী ঘটনা যেন না ঘটে। শিক্ষকেরা যেন মনপ্রাণ দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার সুযোগ ও প্রণোদনা পান। একমাত্র তাঁদের তৈরি শিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিই বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারে।
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

Sunday, August 2, 2015

পড়ালেখায়ও কর দিতে হবে! by আলী ইমাম মজুমদার

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অর্থ আবশ্যক। এ অর্থের প্রধান উৎস জনগণের দেওয়া কর। সেই কর কোথা থেকে আসবে আর ব্যয় হবে কোথায়, তা চূড়ান্ত করার দায়িত্ব আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদকে দিয়েছে। ধরে নেওয়া যায়, আয় হবে অধিকতর সক্ষমদের কাছ থেকে। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখা এবং এর কল্যাণধর্মী চরিত্র বা বৈশিষ্ট্যের চাহিদা অনুযায়ী হবে ব্যয়। সংবিধানের প্রস্তাবনায়ও ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য’ নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বিবেচনা করা যায় যে শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রের সহায়তা থাকবে সর্বতোমুখী। এর জন্য ব্যয় করবে সামর্থ্য অনুসারে। অবশ্য গোটা শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যয়ভার আমাদের মতো দেশের সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এই ব্যয়ের অংশীদার হতে হবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকেও। তা–ই হয়ে চলছে দীর্ঘকাল যাবৎ। প্রয়োজনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হলেও এ ব্যবস্থাই আমাদের সমাজে ক্রমান্বয়ে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে অবদান রাখছে। এই ব্যয়কে একটি সামাজিক বিনিয়োগ বলেই বিবেচনা করা হয়। তাই এ খাতে করারোপ করে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের মূলনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, ৪ জুন ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আয়ের ওপর ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। পরে সাড়ে ৭ শতাংশ বহাল রাখা হয়। তাঁর মতে, শিক্ষাসহ অন্যান্য সামাজিক খাতে অধিকতর বিনিয়োগের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর সংগ্রহ করা যৌক্তিক। আলোচনা প্রাসঙ্গিক যে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর করারোপ করা হলেও তা আদায় করা হবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই। সংসদে প্রতিনিধিত্বের ধরনে বিভিন্ন দল থাকলেও মূলত কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই। সে কারণে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সংসদে কেউ সোচ্চার হননি। তবে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে পত্রপত্রিকায়। এর সমর্থক কারও মতে, সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাই এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন। তঁাদের আরেকটু বেশি ব্যয় করা অসংগত হবে না। তবে প্রায় বিনা মূল্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল কলেজের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ আসন থাকলে এত অধিক টাকা ব্যয় করে খুব কমসংখ্যকই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পথে চলতেন। কেউবা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেশন জট, মন্দ ছাত্র রাজনীতিসহ কোনো কোনো কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। তাঁদের সেই যাওয়াও যৌক্তিক। এর জন্য তাঁরা দিচ্ছেন চড়া মাশুল। আবার কর দেবেন কেন এবং কী যুক্তিতে?
যতটুকু জানা যায়, এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩টি, শিক্ষার্থী আছেন সাড়ে চার লাখ। তেমনি ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আছেন ২০ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব তো ছিল রাষ্ট্রের। তা করা হলো না। বরং উল্টো কর বসিয়ে আরও ব্যয়বহুল করে পথের বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে উচ্চ–মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাশাপাশি নিম্ন–মধ্যবিত্ত শ্রেণিরও প্রচুর ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। সরকারের কোনো ব্যয় ছাড়াই তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। এতেও বাধা! এর নৈতিক দিকটি কোথায় তা বোঝা দুর্বোধ্য। পাশাপাশি এই স্তরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রায় বিনা মূল্যে পড়ছেন। তা পড়ুক। সরকারের সামর্থ্য থাকলে সেখানে আরও ব্যয় করা উচিত। সে দাবিও সবাই করেন। তবে যাঁরা সেগুলোতে পড়তে পারেন না বা পড়েন না কোনো না কোনো কারণে, তাঁদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ কেন?
বলা হয়, বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠান অযৌক্তিক হারে ছাত্র-বেতনসহ অন্যান্য ফি নিচ্ছে। অভিযোগ অনেকাংশে সত্য হতে পারে। আর তা ঠেকানোর জন্য তো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সরকার রয়েছে। তা না করে এ ধরনের করারোপ তো ছাত্রছাত্রীদের বোঝা আরও বাড়াল। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুটি কয়েক উঁচু মানসম্পন্ন। তবে বেশির ভাগই নয়। আর সেসব প্রতিষ্ঠানে কিন্তু খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করছেন অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরাই। আর মানের এই দুর্বলতা দূর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো ভূমিকাই তো লক্ষণীয় হয় না। সেদিন শিক্ষাসচিব রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে মন্তব্য করলেন—একটি ভালো স্কুলের সুযোগ-সুবিধাও এগুলোতে নেই। তিনি সাহস করে সত্য কথা বলেছেন। তবে এদের পরিচালনার অনুমতি কারা দিল? আর সময়ান্তরে নবায়ন করছে কারা? নিজ ক্যাম্পাসে যাওয়ার একটি সময়সীমা একবার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সিংহভাগ ক্ষেত্রেই তেমন কিছু হয়নি। কিছুই হয়নি, যারা আদেশকে মানল না তাদের। সময়ান্তরে পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর দায়িত্বও নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে। তাদের জনবল বা অন্য কোনো সক্ষমতার অভাব থাকলে তা দূর করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। জানা যায়, আরও শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন বিবেচনাধীন আছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ক্ষেত্রে এতৎসংক্রান্ত দায়িত্ব স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয়ের। নামকাওয়াস্তে রোগী নিয়ে একটি হাসপাতাল জরাজীর্ণ কিছু যন্ত্রপাতি নিয়েই শুরু করছে চিকিৎসা শিক্ষার ন্যায় জটিল কাজ। অনুমোদন ও সময়ান্তরে নবায়নও হয়। ডিগ্রি নিয়ে বের হন শিক্ষার্থীরা। আর এ দোষ তো তাঁদের নয়। যাদের এ অব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের। সেই অক্ষমতার মাশুল দেবেন ছাত্রছাত্রীরা, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
১৯৯২ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ঠিক তেমনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোও। এখানে ব্যয়ের অতিরিক্ত আয় উদ্যোক্তা, ট্রাস্টি বা বোর্ড সদস্যরা কেউ ভাগাভাগি করে নিতে পারেন না। তা ব্যয় করতে হয় ভবন নির্মাণ, গবেষণাগার ও পাঠাগার সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের বর্ধিত বেতন-ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া ইত্যাদি কাজে। কেউ তা না করে বাঁকা পথে নিতে চাইলে তা ঠেকানোর দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদার করা হলে এমনটা হবে না। তবে প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি সরকারের সময়ে কয়েকটি ব্যতিক্রম বাদে তাদের সমর্থিত ব্যক্তিদেরই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তনের পর পরিচালনা পর্ষদের হয় কিছু চেহারা বদল। এমনকি বদলে যায় প্রতিষ্ঠানটির নাম। এই সুবিধার বিষয় মাথায় রেখে এমন নাম বদল বারবার হচ্ছে, এমনটাই দেখা যায়। তাদের কার্যক্রমের ওপর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ওপর কর বসিয়ে কিছু টাকা আয় হলেও এগুলোর মানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো কারণ নেই। এমনিতেই আমাদের দেশে শিক্ষায় বিনিয়োগ কম বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মধ্যেও যেটুকু বেসরকারি বিনিয়োগ আসছে, তার ওপর কর বসানোয় তা–ও নিরুৎসাহিত হবে।
কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ অযৌক্তিক। এটা সংবিধান প্রদত্ত আমাদের শিক্ষা লাভের অধিকারের পরিপন্থী। তা সত্ত্বেও সরকার তা করে চলেছে। কিছুকাল আগে থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীরা সাড়ে ৭ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর দিয়ে যাচ্ছে সরকারকে। তবে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সাড়ে ৪ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব, প্রতিবাদের মুখে সরকার তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এ বছর বর্ধিত হারেই কর আরোগিত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী দেশে প্রায় সব ক্ষেত্রেই করের ছড়াছড়ি। সেখানেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়ে গেছে করের আওতার বাইরে।
বরং তারা সেবামূলক সংস্থাগুলো থেকে কিছু ছাড় পায়। দিতে হয় না পৌর কর। এটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার যে সরকারের এসব শিক্ষার্থীর জন্য যে অর্থ ব্যয় করার কথা ছিল, তা করতে হচ্ছে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সেই দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে তো তাঁরা আশা করতেই পারেন সরকারি সহায়তা। করের বোঝা নয়। পড়ালেখা করতেও যদি কর দিতে হয়, তা সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক অঙ্গীকারের পরিপন্থীই হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

Tuesday, July 7, 2015

উচ্চশিক্ষার নিম্ন যাত্রা! by সোহরাব হাসান

উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনটি নামকরা সংস্থার তিনটি প্রতিবেদন। যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) শিক্ষার মান, গবেষণাসহ বিভিন্ন মানদণ্ডে ২০১৫ সালে এশিয়ার যে ১০০টি মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে, তার কোথাও বাংলাদেশের নাম নেই। এ তালিকায় জাপান ও চীনের প্রাধান্য রয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ও জায়গা করে নিতে পেরেছে। সাংহাইভিত্তিক একাডেমিক র্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি (এআরডব্লিউইউ) ২০১৩ সালে বিশ্বের ৫০০টি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা দিয়েছে, তাতেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পায়নি। এটি এশিয়ার টিএইচই নামে পরিচিত। একই সময়ে কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি নামে আরেকটি সংস্থা ৩০০ এশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মানক্রম করেছে, তাতে বাংলাদেশের একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পেয়েছে। অথচ এই তালিকায় ভারতের ১১টি ও পাকিস্তানের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। আর শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে চীনেরই আছে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা পাকিস্তানেরও নিচে নেমে গেলাম!
একটি দেশ কখন বড় হয়? যখন দেশটি শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে যায়। একটি দেশ কখন শিক্ষায় এগিয়ে যায়? যখন সেই শিক্ষা যুগের চাহিদা মেটায়, অর্থনীতির ভিতকে শক্তিশালী করে এবং মানবিকবোধের বিকাশ ঘটায়। সেই শিক্ষা নতুন নতুন আবিষ্কার করে, প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটায় এবং তৈরি করে একটি সুদক্ষ ও সংস্কৃতিমনস্ক জনগোষ্ঠী। এর কোনো বিচারেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উত্তীর্ণ হয় না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে কেরানি বানানো কিংবা পাকিস্তান আমলে বশংবদ আমলা তৈরির যে শিক্ষা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে তারই অন্ধ ও অক্ষম অনুকরণ চলছে। আমরা একের পর এক শিক্ষানীতি করেছি, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের জন্য যে নিষ্ঠা ও অনুশীলন দরকার, সেটি করতে আমরা প্রস্তুত নই। অন্যান্য বিষয়ের মতো শিক্ষা-সমস্যারও শর্টকাট সমাধান খুঁজছি।
ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষাকে বলা হয় ভবিষ্যতের বিনিয়োগ, যার প্রতি আমরা অমার্জনীয় অবহেলা ও উদাসীনতা দেখিয়ে এসেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রম, বিষয় যে দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, তিনটি সংস্থার জরিপই তার প্রমাণ।
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। পাকিস্তান আমলে হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-বিদেশের মেধাবীদের আকৃষ্ট করলেও এখন করতে পারছে না। মেধাবী শিক্ষার্থীদের একাংশ পাঠ শেষ হওয়ার আগেই বিদেশে পাড়ি জমায়, আরেক অংশ পাঠ শেষ করে। আবার কেউ বিদেশ থেকে ফিরে এলেও দলীয় ও গোষ্ঠী রাজনীতির কারণে থাকতে পারেন না। কেন এমনটি হলো? একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ছিল বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এই দুটো প্রতিষ্ঠানের বর্তমান হাল কী? সেখানে গবেষণায় কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে? একই কথা প্রযোজ্য চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ প্রথম প্রজন্মের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, শিক্ষক-প্রশাসনসহ ক্যাম্পাসের গাছপালাকে দিয়েও তাদের বন্দনা গাওয়ানো হয়। তাহলে মেধাবীরা কেন থাকবেন?
বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে যুক্তি, তর্ক ও গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে স্বপ্ন দেখাবে, পথের দিশা দেবে। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় রাজনীতির চর্চায় যতটা সক্রিয়, জ্ঞানচর্চায় ততটা উদাসীন। এখানে ছাত্ররাজনীতির নামে হল দখল, ক্যাম্পাস দখলের মহড়া চলে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্ররাজনীতির কারণে কলুষিত ছিল। এখন শিক্ষকদের মধ্যেও সেই রাজনীতি ঢুকে গেছে। আগের আমলে ১০০ অমেধাবীকে জায়গা দিলে পরের আমলে ২০০ অমেধাবীকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢোকানো হয়। এখানে গবেষণার জন্য কোনো তহবিল থাকে না; অথচ বিপুল অর্থ ব্যয় করে নতুন নতুন বিভাগ খোলা হচ্ছে। কেন এসব বিভাগ, উত্তর নেই।
আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলছি, অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো রয়ে গেছে অ্যানালগ পদ্ধতিতে। স্বাধীনতার পর শিক্ষা নিয়ে আমরা একের পর এক পরীক্ষা করে চলেছি। কিন্তু আসল যে পরীক্ষা, অভিন্ন ধারার একটি শিক্ষাব্যবস্থা, তা গড়ে তুলতে পারিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রসার হয়তো ঘটছে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হয়তো গড়ে উঠেছে, কিন্তু আমরা মান ধরে রাখতে পারিনি। আমরা পরীক্ষায় পাসের হার বাড়িয়েছি; কিন্তু একটি সম্পন্ন শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি।
২...
ঢাকা শহরের নিউমার্কেট-ধানমন্ডি এলাকায় দুটি পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি ঢাকা কলেজ ও বেসরকারি ঢাকা সিটি কলেজ। দুটোই রাজধানীর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের পর দুটোতেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।
কিন্তু সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই মর্মে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাবে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই থাকবে।
এই যে সরকারি ও বেসরকারি ভাগাভাগি, সেটি কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? সরকার কি ধরে নিচ্ছে, সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালো লেখাপড়া হচ্ছে, সুতরাং সেগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়াই উচিত। আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান যেহেতু খারাপ, সেহেতু সেগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে দেওয়াই শ্রেয়। সরকারের এই চিন্তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি পুরোনো ও জটিল সমস্যার অতি সরলীকরণ সমাধান বলেই ধারণা করি। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো মনে করছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যতীত দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঠিকমতো চলছে। অতএব, তাদের ওপর আরও দায়িত্ব চাপানো হোক। কিন্তু বাস্তবতা হলো কোনোটাই ঠিকমতো চলছে না।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সময়ের প্রয়োজনে। যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কলেজ পর্যায়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে পারছিল না, তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে। এখানে দলীয় লোকদের বসানো হয়, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন বা মান ধরে রাখার চেয়ে দলবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় শাসনামলে একজন উপাচার্য প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় নানা কেলেঙ্কারি ঘটান। তিনি নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করে অপ্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ করতে থাকেন। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও তারা ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। একদা বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষমতার হাতবদলের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামীপন্থী হয়ে যান। কিন্তু যাঁদের জন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর সুবিধা-অসুবিধার কথা কেউ ভাবেননি। একসময় তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মানে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তরপত্র গায়েব ও অমেধাবী লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তিন বছরের স্নাতক কোর্স কিংবা চার বছরের স্নাতক সম্মান কোর্স শেষ হতে যথাক্রমে পাঁচ ও ছয় বছর লেগে যেত। পরীক্ষা চলত বছরজুড়ে। বর্তমান উপাচার্য সেশনজট কমাতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতির খুব উন্নতি হয়নি। এখনো দেড় থেকে দুই বছরের সেশনজট চলছে। অতটা প্রকট না হলেও এই সমস্যা সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই কমবেশি আছে। সময়মতো ভর্তি, সময়মতো কোর্স শেষ করতে পারছে না কেউই।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনুধাবন করতে হবে যে উচ্চশিক্ষার সমস্যাটি বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকা না-থাকার নয়। সমস্যাটি হলো মানের, গুণের, মেধার, চিন্তার, যা শিক্ষার কোনো স্তরেই নিশ্চিত করা যায়নি। আমরা উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি। কিন্তু তাঁরা কী শিক্ষা পেলেন, এই শিক্ষা নিয়ে কর্মজীবনে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন কি না, সেসব বিষয়ে চিন্তাভাবনা আগেও ছিল না, এখনো নেই। একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর কোর্স খোলা হয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। এ সমস্যা বেসরকারি-সরকারি দুটোতেই সমভাবে আছে। শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির কারণ মেধাবী শিক্ষকের অভাব। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ নেই। ঠিকমতো ক্লাস-পরীক্ষাও হয় না। এ অবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি ভাগ করে তাৎক্ষণিক সমাধান খোঁজা তুঘলকি সিদ্ধান্ত বলেই মনে হয়। আমাদের পূর্বাপর সরকারগুলো শিক্ষানীতি, ইতিহাসের অদলবদল, পাসের হার, সৃজনশীল প্রশ্ন ইত্যাদি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও শিক্ষার মানের প্রতি কখনোই মনোযোগ দেয়নি।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষা (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখের মতো; যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই প্রায় ২১ লাখ। এই ২১ লাখের মধ্যে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে সাত লাখ। সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সাত লাখ শিক্ষার্থী একদিকে থাকবেন, ১৪ লাখ অন্যদিকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি সরকারি কলেজের তুলনায় তো বটেই, খোদ ঢাকা কলেজও ফলাফলে ঢাকা সিটি কলেজ থেকে পিছিয়ে আছে। একইভাবে ঢাকা নটর ডেম কলেজের কথা চিন্তা করুন। সরকারের এই প্রস্তাব কার্যকর হলে সেটিও যাবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজটি সরকারি হওয়ার কারণে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এখন সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অবকাঠামো, লোকবল, শিক্ষার্থী, শিক্ষকের সংখ্যা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু কারও মাথাব্যথার অর্থ এই নয় যে মাথা কেটে ফেলতে হবে।
সরকার যখন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপাতে চাইছে, তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কী? কোনোটিতে উপাচার্য অপসারণের জন্য আন্দোলন চলছে, কোনোটিতে উপাচার্য-সহ-উপাচার্য দ্বন্দ্ব চরমে, কোনোটিতে ছাত্রলীগ নিজেদের মারামারিতে লিপ্ত কিংবা কোনোটিতে প্রশাসন নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। অতএব, তাদের ওপর বাড়তি দায় চাপানো কতটা সমীচীন হবে, তা আরও একবার ভেবে দেখুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
hsohrab55@gmail.com