Wednesday, July 2, 2014

‘ধস থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংক খাতকে ঢেলে সাজানো যেতো’ -ড. মুহাম্মদ ইউনূস

ব্যাংকিং খাতে বিশাল ধস এ খাতের কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ আসলেও তা করা যায়নি বলে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন এ থেকে শিক্ষাও নেয়া যায়নি। ধস থেকে শিক্ষা নিয়ে এ খাতকে ঢেলে সাজানো যেত। সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানে তরুণরা সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করে বিভিন্ন্ উদ্যোগ গ্রহণ করবে। বুধবার বেসরকারি ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘স্যোসাল বিজনেস ইয়ুথ কনভেনশন’ শীর্ষক সেমিনারের সমাপনী অধীবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং ইউনূস সেন্টার যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক আবদুর রবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ, ইউনিভার্সিটি ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি ড. এবিএম শহিদুল ইসলাম, প্রো-ভিসি অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদ।

ড. ইউনূস বলেন, আমাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যার টাকা আছে তাকেই অর্থের জোগান দেয়া হয়। যার টাকা নেই সে সুযোগ পায় না। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোও যার অর্থ নেই, তাকে ঋণ দেয় না। এ অবস্থা ভেঙ্গে দিতে হবে। সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে হবে। সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করে তরুণরা যে উদ্যোগ গ্রহণ করবে, এ তহবিল থেকে তাদেরকে সহায়তা করতে হবে। এটি সম্ভব হলে আয়ের বৈষম্য কমবে, বেকারত্ব দূর হবে। এলাকাভিত্তিক সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করা হলে সমাজের-মানুষের সমস্যা নিরসন হবে। ফলে সৃষ্টি হবে বেকারবিহীন বিশ্ব, যেখানে গরীব বলে কেউ থাকবে না। তিনি বলেন, আমাদের তরুণরা কিছুটা হতাশ। তার নিজের ভবিষ্যত, সমাজের ভবিষ্যত ঠিকভাবে দেখতে পায় না। সামাজিক ব্যবসার ধারণা তাকে স্বস্তি দিয়েছে। নিজেদের যোগাযোগ-সৃষ্টিশীলতার ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ তারা এ ব্যবসায় কাজে লাগাতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে সমাজেও ব্যপক পরিবর্তন আসবে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে ‘সামাজিক ব্যবসা’  কোর্স পড়তে চাইছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্বপ্ন পূরণ হলো না সোনাক্ষি সিনহার

চলতি প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় এখন পার করছেন সোনাক্ষি সিনহা। এরই মধ্যে সালমানের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করে দারুণ সফলতা পেয়েছেন তিনি। সালমানের বাইরেও বর্তমানে বড় বড় অভিনেতার বিপরীতেই কাজ করছেন শত্রুঘœ সিনহা কন্যা। যশরাজ ফিল্মস, আরবাজ খান ফিল্মসসহ একাধিক আলোচিত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারের কমপক্ষে পাঁচটি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এখন কাজ করছেন তিনি। তবে সোনাক্ষির জন্য সবচেয়ে বড় একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন পরিচালক রাজকুমার হিরানী। এ পরিচালক নিজের পরবর্তী ছবিটি নির্মাণ করতে যাচ্ছেন আমির খানকে নিয়ে। আর আমিরের বিপরীতে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন সোনাক্ষিকে। আমিরের সঙ্গে অভিনয়ের স্বপ্ন দীর্ঘদিন লালন করেছিলেন এ অভিনেত্রী। কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করলো ছবিটি তাকে না করার জন্য। পরিচালক আসছে সেপ্টেম্বরে ছবিটির শুটিং এরই মধ্যে পাকাপাকি করেছেন আমিরের সিডিউল অনুযায়ী। কিন্তু সোনাক্ষি সেপ্টেম্বরে উড়াল দিচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্য একটি ছবির শুটিংয়ে অংশ নিতে। এ কারণে আর আমিরের সঙ্গে অভিনয় করা হলো না তার। সোনাক্ষির প্রিয় অভিনেতাদের মধ্যে আমির ও সালমান অন্যতম। সাল্লুর সঙ্গে দুটি ছবিতে কাজ করা হলেও শেষ পর্যন্ত আমিরের সঙ্গে কাজ করতে না পারায় বেজায় মন খারাপ সোনাক্ষির। নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করছেন তিনি। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় বিষয়টি টুইটারেও শেয়ার করেছেন তিনি। এখানে তিনি লিখেছেন, আমি বলিউডে আমির ও সালমান খানের সঙ্গে কাজ করার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু আমিরের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছাটি অধরাই রয়ে গেলো। কারণ, প্রস্তাব পাওয়ার পরও আমি তা গ্রহণ করতে পারলাম না। এরকম মন খারাপ আমার আগে কখনও হয়নি। এটা আসলে আমার দুর্ভাগ্য। তবে অপেক্ষায় থাকবো এমন আরও একটি প্রস্তাবের জন্য।

সার্টিফিকেটের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বিজ্ঞানীরা কি করবেন? by শামীমুল হক

মন্ত্রণালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কি করছে- এ প্রশ্ন আজ যে কেউ করতেই পারেন। টিআইবি অনুসন্ধান করে জানান দিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার টাকা দিলেই সার্টিফিকেট মেলে। অর্থাৎ লেখাপড়া না করেও যে কেউ হতে পারছেন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। হতে পারছেন বিজ্ঞানীও। টাকা দিলেই এসব সার্টিফিকেটের মালিক হতে পারছেন যে কেউ। তাহলে আর লেখাপড়ার কি দরকার? টাকা হলেই হলো। মন্ত্রণালয়ই করবে কি? যেখানে এসএসসি আর এইচএসসিতে পরীক্ষকদের বলে দেয়া হচ্ছে কাউকে ফেল করানো যাবে না। পাস করাতে হবে। লিখলেই দিতে হবে নাম্বার। ওই লেখা সঠিক হোক আর বেঠিক হোক। তা-ই করা হচ্ছে। এর ফল পাচ্ছি আমরা। এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্টে দেখা যায় ৯২ ভাগ পাস করছে। কিন্তু গত ক’বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে জিপিএ-৫ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাননি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আর এ পাওয়া অনেক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। এই যে গণহারে পাস করে দেয়ার যে কুফল তা ভবিষ্যতে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এর ফল জাতিকেই বহন করতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে অনেকে ভর্তি হয়েছেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে আগাগোড়া টাকা আর টাকা। ভর্তি হওয়ার পর অনেকে টাকা দিতে না পেরে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে এমন নজিরও আছে ভূরিভূরি। আবার দিনের পর দিন ক্লাস না করে, পরীক্ষা না দিয়ে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট অর্জন করার ঘটনাও ঘটছে। যার ইতিবৃত্ত টিআইবির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হলো, টিআইবিকে এ অনুসন্ধানের সুযোগ দেয়া হলো কেন? এর আগেই মন্ত্রণালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এসব বিষয় অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে তা বন্ধ হয়ে যেতো। ভিসি, প্রো-ভিসি, এমনকি ট্রেজারার নিয়োগেও টাকা দেয়া হচ্ছে। এখানে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমতি দিতে গিয়েও লাগে টাকা। যেখানে গোড়াতেই গলদ, যেখানে ভিসি নিয়োগে টাকা লেনদেন হয়, সেখানে সার্টিফিকেট বিক্রি তো হবেই। ছোটবেলায় পড়েছি, পুঁথিগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা, নহে ধন হলে প্রয়োজন। ঠিক এমনটাই হয়েছে এ ক্ষেত্রে। পরের হাতে ধন থাকলে নিজের প্রয়োজনের সময় তা পাওয়া যাবে না। কাজেই ধন সব সময় নিজের হাতেই রাখতে হবে। লেখাপড়া না করে যদি সার্টিফিকেট অর্জন করি তাহলে এ সার্টিফিকেটে কি কাজে আসবে? একজন ইঞ্জিনিয়ার হাতে কলমে শিখে ইঞ্জিনিয়ার হবেন। এটাই নিয়ম। কিন্তু যিনি হাতে কলমে না শিখে, লেখাপড়া না করে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট নিয়ে নিজের ওজন বাড়ান তাদের কথা ভিন্ন। তারা টাকা দিয়ে সবকিছুই কিনতে চান। ভালবাসা থেকে শুরু করে সবকিছুই তারা টাকার অঙ্কে মাপেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশে মন্ত্রণালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কেন রয়েছে? রাজধানী ঢাকায় একেকটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে চালানো হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। চালানো হচ্ছে কলেজ। সম্প্রতি একটি কলেজে গিয়ে দেখা গেছে। এর একটি ভবন এখানে তো অন্য ভবন আরও ২-৩টা বাড়ি দূরে। ভাড়া নেয়া বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে ২০ থেকে ২২ জন বসতে পারছে। তাদের নিয়েই ক্লাস করানো হচ্ছে। আর বাইরে বিলবোর্ড টাঙিয়ে বলা হচ্ছে আমরা স্বল্প সংখ্যক ছাত্র/ছাত্রীকে নিয়ে ক্লাস করছি। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অনেকে এগিয়ে আসেন। কিন্তু কলেজ দেখে কেউ ফিরে যান, কেউবা মনের ইচ্ছার বাইরেও দিয়ে যান। কারণ তারা অসহায়। প্রশ্ন, দেশের শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? শিক্ষার মূল লক্ষ্য কি এখন শুধুমাত্র বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে? পৃথিবী যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় সেখানে আমরা বিজ্ঞান থেকে দূরে কেন? আমরা বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারছি না কেন? আমাদের দেশে বিজ্ঞানের ব্যবহার থেকে অপব্যবহারই হচ্ছে বেশি। কাজ থেকে অকাজে লাগাচ্ছি বেশি। এ কারণেই বিজ্ঞান অভিশাপ হয়ে দেখা দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে সব শ্রেণীর শ্রমই পাওয়া যায়। একেবারে নিচু লেভেলের শ্রমিক থেকে শুরু করে মধ্য লেভেল এমনকি উচ্চ পর্যায়ের শ্রমও পাওয়া যায় সস্তায়। পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে এ শ্রম অনেক সস্তা। তারপরও আমরা এগোতে পারছি না। কারণ, আমরা সব সময় ফাঁকি দিতে পছন্দ করি। ফাঁকি দেয়াই আমাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। কাজের প্রতি নিষ্ঠা, শ্রমের মর্যাদা দিতে আমরা শিখিনি। কাউকে শ্রমের মর্যাদা দিতে দেখলে তাকে পাগল বলে আখ্যা দিই। তাকে নিয়ে কৌতুক করি। আমরা দিন রাত মেধা খাটাই কিভাবে কি করলে দুর্নীতি করা যাবে। কিভাবে ব্যাংকের ভল্ট থেকে সিঁদ কেটে টাকা লুট করা যাবে। কিভাবে অন্যকে ঠকিয়ে নিজে এগিয়ে যেতে পারবো। কিভাবে শ্রমিককে ঠকিয়ে নিজে লাভবান হতে পারবো- এসব দিন-রাতের ভাবনা আমাদের। তারপরও এদেশের সাধারণ নারী সেলিনা জাহান আইডিবি পুরস্কার পান। কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো এ নারী বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে উঁচুতে তুলে ধরেন। সম্প্রতি তিনি সৌদি আরবের জেদ্দায় এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে সৌদি বাদশাহ’র কাছ থেকে পুরস্কার নেন। পান সম্মননা আর ২৫ হাজার ডলার পুরস্কার। অসামান্য এ নারী বিজ্ঞান থেকে দূরে থেকেই এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করেন না রাসায়নিক সার, পোকা মারার বিষ। তিনি মান্ধাতা আমলের গোবর ও ছাই অবলম্বন করে এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। জয় হোক নরসিংদীর সেলিনা জাহানের। মাথা নিচু হয়ে আসে ওই নারীর কাজে। উচ্চ শিক্ষার কারিগর যারা ৫০ হাজার টাকায় তুলে দেন সার্টিফিকেট সেলিনা জাহানের কাছ থেকে তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। তাই রাজধানীর অট্টালিকা থেকে ছুটে যান নরসিংদীতে। সেলিনা জাহানকে দেখুন। দেখবেন বিশ্ব দেখছেন। আর শিখছেন অনেক কিছু।

বেহাল সড়ক মহাসড়ক by আহমেদ জামাল

বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত সকল সড়ক-মহাসড়কে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অসহায় যাত্রীরা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থা, যত্রতত্র দখলসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত অন্তঃহীন দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছে মানুষ। রাজধানী থেকে বাইরে যেতে কিংবা রাজধানীতে ঢুকতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে থাকতে হচ্ছে রাস্তায়। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়, ক্ষয় হচ্ছে শারীরিক শক্তি। অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশু এবং বয়স্করা। রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মহাসড়কের কয়েকশ’ কিলোমিটার এলাকায় এই দুঃসহ অবস্থা বিরাজ করছে। যোগাযোগমন্ত্রীর নিত্য  দৌড়ঝাঁপেও উন্নতি হচ্ছে না। ফলে ঈদে পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছে ভুক্তভোগীরা। সড়ক পথের দুর্গতি নিয়ে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার ঝড় উঠে। সড়ক পথের এই ঝক্কি এড়াতে কিছু অবস্থা সম্পন্ন ব্যবসায়ী,শিল্পপতি,রাজনীতিক হেলিকপ্টার ভাড়া করে গ্রামে যাতায়াত শুরু করেছেন। কিন্তু এই সামর্থ্য যাদের নেই তারাই আছেন বিপাকে। সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে চার লেন সড়ক নির্মাণের কাজে ধীরগতি, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি এবং দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সড়কের এ দূরবস্থা। খানাখন্দে ভরা এসব সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজটের। এতে করে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় যেতে কিংবা ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে যাত্রীদের দুর্ভোগের অন্ত নেই। বিশেষ করে দীর্ঘ যানজটে যাত্রীদের অধিকাংশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। পরিস্থতি এতটাই  শোচনীয় যে, দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা কোন কোন ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লেগে যায়। প্রায়শই এমন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন স্বয়ং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও। গত শনিবার চট্টগ্রামে যানজট নিরসনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের কাজে চীনা কোম্পানি সিনো হাইড্রোর গাফিলতি তুলে ধরে তিনি বলেন, চার লেন প্রকল্পের কাজের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়ক সংস্কারের বিষয়টি চুক্তিতে থাকলেও সিনো হাইড্রো চুক্তি অনুযায়ী কাজ করছে না। অথচ কন্ট্রাক্টে নতুন রাস্তা বানানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক  মেরামতের কথা ছিল। তিনি বর্ষা এবং রমজানের মধ্যে মহাসড়কে ভয়াবহ দুর্ভোগ থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে সবাইকে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান। এদিকে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তাগিদ দিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি। পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও মহাসড়ক সংস্কারে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, একদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন নির্মাণ কাজ ধীরগতিতে চলছে। অন্যদিকে অনেকদিন ধরে এ সড়কের সংস্কার হচ্ছে না। যে কারণে এ সড়কটি এখন খানাখন্দে এতোটাই বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে যে, ছোট-বড় দুর্ঘটনায় প্রতিদিন হতাহতের ঘটনা ঘটছে। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট এখন নিত্যদিনের চিত্র। মহাসড়কের গৌরীপুর, চান্দিনা, কুমিল্লা পদুয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, বারইয়ারহাট, মিরসরাই সদর, নিজামপুর ও বড় দারোগারহাট অংশের প্রায় ১০০ কিলোমিটারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এর মধ্যে  ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের ওই অংশে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে বলে পরিবহন চালকেরা জানিয়েছেন। বারইয়ারহাটের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার রাস্তার পুরোটাই এবড়োখেবড়ো। কয়েক দিন আগে সড়কের বড় গর্তগুলো দায়সারাভাবে ভরাট করা হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই আগের রূপে ফিরে গেছে সড়কটি। অভিযোগ উঠেছে, সড়ক সংস্কারের নামে গর্তের মধ্যে বড় বড় পাথর ঢেলে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। ট্রাকচালক আমির হোসেন বলেন, লোড গাড়ি নিয়ে সড়ক পার হতে গিয়ে মনে হয়, পুলসিরাত পার হচ্ছি। ভয় হয়, কখন জানি এক্সেলেটর ভেঙে যায়। সওজের আওতাধীন আরও একটি ব্যস্ততম সড়ক হচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এই সড়কের অন্তত ৫০টি পয়েন্টে রাস্তার অবস্থা বেহাল। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কলকারখানার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার। ডুবছে রাস্তা। কোথাও কোথাও মহাসড়ক ধারণ করেছে ডোবা ও খালের আকৃতি। বাড়ছে দুর্ঘটনা। সংস্কার নেই ১০ বছরেও। নেই ড্রেনেজ সিস্টেম। রাস্তায় রাস্তায় অবৈধ টার্মিনাল, বাজার। নষ্ট হচ্ছে জোড়াতালির সংস্কার। নিম্নমানের ইট দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে গর্ত। সব মিলিয়ে এই রুটে ৫০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা যান চলাচলের উপযোগিতা হারিয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। দেশের বেশ কয়েকটি সড়ক-মহাসড়কেই এমন বেহাল পরিস্থিতি বিরাজমান। খুলনা-ঢাকা মহাসড়কের যশোর সদর উপজেলার জামতলা এলাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা হয়ে যায়। সড়কটির বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এতে ধীরে ধীরে যান চলায় সৃষ্টি হয় যানজটের। এই সড়কের নওয়াপাড়া ভাঙা গেট, গোপালপুর গেট, রূপদিয়া, রাজারহাট, মুড়ুলী মোড়সহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত। বিভিন্ন স্থানে ইট ফেলে গর্ত ভরাট করেছে সওজ। কিন্তু বৃষ্টি হলে এই ইটের ওপর দিয়ে গাড়ি দ্রুত গতিতে চলতে পারে না। দ্রুত এসব গর্ত ভরাট করা না হলে ঈদে ঘরমুখী মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়বে। চার লেনে উন্নীত করার কাজের জন্য যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়কে। সড়কের ওপর নির্মাণসামগ্রী ও নির্মাণযন্ত্র রাখার ফলে মাঝে-মধ্যেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যানবাহন শ্রমিকেরা জানান, ঈদের আগে উন্নয়নকাজ বন্ধ না রাখলে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ফুটপাত ও সড়কের ওপর বাজার বসিয়ে যান চলাচল বিঘ্নিত করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ওই এলাকায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার যানজট লেগে থাকে। দীর্ঘদিনেও সংস্কার না হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক। খানাখন্দে ভরা এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ইট, সুরকি, বালু আর পিচ-খোয়া উঠে ৩৭ কিলোমিটার এই সড়কের বিভিন্ন অংশে অনেক খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় বরিশালের বাকেরগঞ্জ-চান্দখালী-বরগুনা সড়কের এখন করুণ অবস্থা। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কাদা-পানিতে চারদিক সয়লাব। চাঁদপুর ও কুমিল্লার মধ্যবর্তী ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ মতলব-গৌরীপুর (বাবুরহাট-মতলব-পেন্নাই) সড়কটির করুণ অবস্থা। সড়কের ঢাকিরগাঁও, নবকলস, বরদিয়া, ভাঙ্গারপাড়, ধনারপাড়, নাগদা, আশ্বিনপুর, নায়েরগাঁও, নৈয়াইরবাজার, নারায়ণপুর অংশের রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে। সরে গেছে ইট, বালু ও খোয়া। সড়কটির কমপক্ষে ৩০টি স্থান দেবে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ৬২ হাজার কিলোমিটার সড়কের অবস্থা নাজুক। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ১২ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক এবং এলজিইডি-নিয়ন্ত্রিত ৫০ হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এসব পাকা সড়কের বেশ কিছু অংশ এতটাই খারাপ যে নতুন করে নির্মাণ না করলে যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। এসব রাস্তা ভাঙাচোরা, বিপজ্জনক খানাখন্দে ভরপুর। অনেক জায়গায় সংস্কারের বালাই নেই। এলজিইডি’র আওতায় জেলা সংযোগসহ উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামীণ পর্যায়ে পাকা সড়ক রয়েছে ৮০ হাজার ৪৪৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৫০ হাজার কিলোমিটার সড়কের অবস্থা খুবই নাজুক। ভুক্তভোগীদের মতে, নির্মাণের পর থেকে এসব সড়কে সামান্য বিটুমিনের প্রলেপও পড়েনি। চলমান বর্ষায় এসব সড়কের অবস্থা দিন দিন আরও করুণ হচ্ছে। এতে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষ মারাত্মক সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে ।

জঙ্গিদের ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা

বাগদাদের কাছে জারফ আল-শাখার শহরে গতকাল জঙ্গিদের
সঙ্গে সংঘর্ষের একপর্যায়ে দেয়ালঘেরা জায়গায় আশ্রয়
নেন ইরাকি বাহিনীর সদস্যরা। রয়টার্স
ইরাকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দি লেভান্ট (আইএসআইএল) ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার অংশ নিয়ে গঠিত ‘খিলাফতে’র খলিফা ঘোষণা করা হয়েছে গোষ্ঠীর নেতা আবু বকর আল-বাগদাদিকে। এদিকে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় তিকরিত শহর থেকে জঙ্গিদের হটাতে সরকারি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খবর এএফপি ও বিবিসির। কঠোর ইসলামি অনুশাসন চালুর মাধ্যমে একটি খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই জিহাদি সংগঠনের দীর্ঘদিনের খায়েশ। সম্প্রতি ইরাকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর দখলের পর জঙ্গিরা এরই মধ্যে এ ধরনের কড়া অনুশাসন চালু করেছে। সর্বশেষ গত রোববার তারা ইন্টারনেটে প্রকাশিত একটি অডিওবার্তার মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিল। পাশাপাশি এখন থেকে আইএসআইএলের নাম পরিবর্তনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি সংগঠনটি বলেছে, এখন থেকে তারা কেবল ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিতি পাবে। বিবিসির মধ্যপ্রাচ্য সম্পাদক জেরেমি বাউন বলছেন, আইএসআইএলের এই ঘোষণা বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স প্রতিষ্ঠিত সীমানাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আইএসআইএলের অডিওবার্তায় বলা হয়, তাদের ইসলামি রাষ্ট্রের বিস্তৃতি হবে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা আলেপ্পো থেকে পূর্ব ইরাকের দিইয়ালা প্রদেশ পর্যন্ত। বর্তমানে ওই এলাকা জঙ্গিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আর সংগঠনের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি হবেন এই রাষ্ট্রের খলিফা। তিনি পরিচিতি পাবেন ‘খলিফা ইব্রাহিম’ নামে। অডিওবার্তায় দাবি করা হয়, এখন থেকে বিশ্বের সব মুসলমানকে এই নতুন নেতার প্রতি ‘আনুগত্য প্রদর্শন’ এবং ‘গণতন্ত্রসহ পাশ্চাত্যের সব ময়লা-আবর্জনা’ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আল-কায়েদার জন্য চ্যালেঞ্জ: বাস্তব ময়দানে আইএসআইএলের এই ঘোষণার তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব না থাকলেও, এটা জঙ্গিগোষ্ঠীর আত্মবিশ্বাস কতটা বেড়েছে, তার ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি এটা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার জন্যও সুস্পষ্ট চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন তাঁরা। এই আল-কায়েদা থেকেই বেরিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় আইএসআইএল। কাতারের দোহাভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক চার্লস লিস্টারের মতে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক জিহাদের ক্ষেত্রে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর সবচেয়ে বড় ঘটনা। তিনি বলেন, ‘এটা আন্তদেশীয় জিহাদবাদের নতুন যুগ শুরুর ইঙ্গিত হতে পারে...।’ আইএসআইএলই এখন সবচেয়ে ধনী জিহাদি গোষ্ঠী। বিভিন্ন দেশে তাদের সদস্য রয়েছে। নানা ঘটনা পরিক্রমায় আয়মান আল-জাওয়াহিরির নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা এখন অনেকটা কোণঠাসা। এমন প্রেক্ষাপটে বাগদাদির নেতৃত্বাধীন আইএসআইএলই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী জিহাদি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার বিদেশি যোদ্ধা থাকা গোষ্ঠীটি অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের কলাকৌশলের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রচারণায়ও তারা সমান পারদর্শী। তিকরিতে লড়াই অব্যাহত: তিকরিত শহর থেকে জঙ্গিদের হটাতে সরকারি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন দিক দিয়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য তিকরিত অভিমুখে রওনা হয়েছেন। যুদ্ধবিমান থেকে শহরটি বিভিন্ন জঙ্গি অবস্থানে বোমা ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া শহরটির চারপাশে সম্মুখযুদ্ধ চলছে। তবে প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে কাছের দিজালা শহর থেকে সেনাদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। গত ১১ জুন তিকরিতের দখল নেয় জঙ্গিরা। এদিকে ইরাকের বিভিন্ন এলাকা সুন্নি জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় ইরাকে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। রাজধানী তেল আবিবে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, কুর্দিরা যোদ্ধা জাতি। তারা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিয়েছে। তাই তারা স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য।

এক বক্তৃতায় হিলারি পাবেন ২২৪০০০ ডলার!

হিলারি ক্লিনটন
বক্তা হিসেবে বেশ সুখ্যাতি রয়েছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের। হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর বক্তব্য দিয়ে তিনি আয়ও করেছেন ঢের। তবে স্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও কম কীসে? একটি বক্তব্য দিয়ে সাবেক এই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা আয় করতে যাচ্ছেন, তা চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতোই। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। বিল ক্লিনটন হোয়াইট হাউস ছাড়েন ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। আর হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ ছাড়েন ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে। এই ১২ বছরে বিল ক্লিনটন বিশ্বব্যাপী ৫৪২টি বক্তব্য দিয়ে আয় করেছেন ১০ কোটি ৪১ লাখ মার্কিন ডলার। ক্লিনটন পরিবারের আর্থিক বিবরণীর একটি পর্যালোচনা থেকেই পাওয়া গেছে এ তথ্য। হিসাব করলে দেখা যায়, বিল ক্লিনটন গড়ে প্রতিটি বক্তব্য দেওয়ার জন্য নিয়েছেন দুই লাখ মার্কিন ডলার। আর হিলারি আগামী অক্টোবর মাসে একটি বক্তব্য দেওয়ার জন্য যে অর্থ নিতে যাচ্ছেন, তা এই গড়ের চেয়ে ঢের বেশি।
তিনি ওই সময়ে লাস ভেগাস বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তব্য দেবেন। এ জন্য নেবেন দুই লাখ ২৪ হাজার মার্কিন ডলার। অবশ্য হিলারির সহযোগীরা বলছেন, এই অর্থ যাবে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের তহবিলে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান ও রক্ষণশীল সমালোচকদের মতে, হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্তাদের মধ্যে সম্ভবত বিল ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটনই ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। যৌথভাবে তাঁদের উপার্জনের পরিমাণটা ২০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এই দম্পতির মেয়ে চেলসি ও তাঁর স্বামী মার্ক মেজভিনস্কি নিউইয়র্কের ম্যানহ্যাটনে এক কোটি ডলার দিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বক্তা হিসেবে প্রভাবশালী ও সুন্দর বাচনভঙ্গি সম্পন্ন রাজনীতিকদের বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিরাট চাহিদা থাকে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্লিনটন দম্পতি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শিল্পগোষ্ঠী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেই মূলত প্রতিবছর লাখ লাখ ডলার আয় করেছেন। প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একটি পর্যাবেক্ষণে দেখা যায়, একটা সময় বিল ক্লিনটন এক সপ্তাহ ইউরোপ সফরকালে বক্তৃতা করে আয় করেছিলেন ১৪ লাখ মার্কিন ডলার।

লিবার্টি মেডেল পেল মালালা

মালালা ইউসুফজাই
পাকিস্তানের আলোচিত নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাই যুক্তরাষ্ট্রের লিবার্টি মেডেল পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থিত ন্যাশনাল কনস্টিটিউশন সেন্টার থেকে এ খবর জানানো হয়েছে। খবর এপির। ২০১২ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের মিঙ্গোরা এলাকায় বাসে করে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তালেবান জঙ্গিদের হামলার শিকার হয় নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা। ওই ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সোচ্চার হন মানবাধিকারকর্মীরা। পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণার পর রোববার ১৭ বছর বয়সী মালালা বলে, ‘লিবার্টি পুরস্কার পাওয়া সত্যিই একটা সম্মানের বিষয়।’
১৯৮৯ সাল থেকে লিবার্টি মেডেল দেওয়া হচ্ছে। প্রথমবার পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল পোল্যান্ডের ট্রেড ইউনিয়নবিষয়ক সংগঠন সলিডারিটির প্রতিষ্ঠাতা লিচ ওয়ালেসাকে। এরপর বিভিন্ন সময় এ পুরস্কার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। হিলারি পুরস্কারটি পান গত বছর, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে। আগামী ২১ অক্টোবর পুরস্কারটি মালালার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেন্টারের বর্তমান চেয়ারম্যান ফ্লোরিডার গভর্নর জেব বুশ বলেন, ‘সমতা ও স্বাধীনতার জন্য মালালার সাহসী সংগ্রাম প্রমাণ করে, একজন আবেগপূর্ণ ও দায়িত্বশীল নেতাই সংস্কারের জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার শক্তি রাখেন। এ ক্ষেত্রে বয়স কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।’

বুলেট রুখবে মাকড়সার সুতো

বুলেটপ্রুফ এই পোশাকের বদলে আসবে
মাকড়সার সুতোর পোশাক
বুলেটপ্রুফ গাড়ি, জ্যাকেট, হেলমেটের পর এবার আসছে বুলেটপ্রুফ পোশাক।মাকড়সার রেশম থেকে এই পোশাক তৈরি করা হবে। ভবিষ্যৎ সৈনিকদের গায়ে দেখা যেতে পারে এই পোশাক। নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। খবর পিটিআইয়ের। মাকড়সার রেশম উৎপাদনের জন্য গবেষকদের প্রথমে রেশমগুটির বংশগত পরিবর্তন আনতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ল্যানসিংভিত্তিক ক্রেইগ বায়োক্র্যাফট ল্যাবরেটরিজের সিইও কিম টম্পসন বলেন, ‘মাকড়সার রেশম প্রকৃতিগতভাবেই অসাধারণ সম্পদ। আপনি একটি মাকড়সার জালের কথা ভাবুন। মাকড়সাটি তার জালে একটি ক্ষিপ্রগতির প্রাণীকে আটকে ফেলতে পারে। তেমনিভাবে মাছি বা অন্য কোনো উড়ন্ত পোকামাকড়কেও ধরে ফেলতে পারে। প্রকৃতিই তাকে এভাবে সৃষ্টি করেছে।’ কিম টম্পসন বলেন, রেশম প্রকৃতিগতভাবে সম্প্রসারিত হয়।
শিকারের পেছনে ছুটতে গিয়ে মাকড়সার গতি প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে যায়। তখন সে তার শিকার পোকামাকড়ের শক্তি শুষে নেয়। মাকড়সার রেশম দিয়ে সৈনিকদের পোশাক বানানোর ভাবনাটি নিয়ে ১০ বছর কাজ করছেন টম্পসন। অনেক কোম্পানিকে তিনি এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে দেখেছেন। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন এই গবেষক বলেন, একটি রেশমগুটির বংশগত পরিবর্তন সাধন করে মাকড়সার রেশম উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি একবার শেষ করতে পারলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের রেশমের বহুল ব্যবহার দেখা যাবে বলেও তিনি স্বপ্ন দেখছেন।

রিহানার অভিনব উদ্যোগ

বর্তমান সময়ের বিশ্বনন্দিত পপ তারকা রিহানা। গান দিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোচনায় আসাতেও  অভ্যস্ত এখন তিনি। বিশেষ করে নিজের শরীর প্রদর্শনের জন্যই অপেক্ষায় থাকেন এ তারকা। আর তার জন্য অবলম্বন করেন অভিনব পন্থা। টুইটারে কাছাকাছি সময়ে নিজের একাধিক নগ্ন ছবি পোস্ট করে আলোচনা-সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন এই গায়িকা। রিহানা ক’দিন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন নিজের নতুন গান ও ভিডিও নিয়ে খুব শিগগিরই হাজির হবেন। নিজের কথা তিনি রাখছেন। কিছুদিনের মধ্যেই নিজের নতুন মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করবেন তিনি। তবে এখানেও চমক রাখছেন রিহানা। এই ভিডিওর জন্য পুরো শরীরে ট্যাটু আঁকিয়েছেন তিনি। কোন ধরনের পোশাকে নয় নগ্ন শরীরের ট্যাটু পরে গানটিতে পারফর্ম করতে দেখা যাবে তাকে। এরই মধ্যে গানটির শুটিং শুরু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তার আগে গানে রিহানাকে যে লুক দেয়া হয়েছে, তার একটি ফটোসেশন করা হয়েছে। যদিও এই ছবিগুলো এখনও প্রকাশ করা হয়নি। পুরো শরীরে ট্যাটু এঁকে তাতে পারফর্ম করার অভিনব উদ্যোগটি নিয়েছেন রিহানা নিজেই। পুরো ভিডিওটিতে এমন উপস্থাপনের মাধ্যমে নাচতে দেখা যাবে তাকে। খুব শিগগিরই শরীরে ট্যাটু আঁকা ছবিগুলোও টুইটারে প্রকাশ করবেন বলেও জানিয়েছেন রিহানা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, পুরো শরীরে ট্যাটু এঁকেছি। ব্যাপারটা খুব এনজয় করছি আমি। নিজেকে আয়নার সামনে দেখতে অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে এটাও এক ধরনের পোশাক। খুব তাড়াতাড়ি আমার এই লুকের ছবি আপনাদের জন্য টুইটারে প্রকাশ করবো। আর ভিডিওটির কাজও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে শেষ করবো। আশা করছি দর্শকদের খুব ভাল লাগবে।

ব্রাজিলিয়ান দর্শকের বেশির ভাগই শ্বেতাঙ্গ

বিশ্বকাপের খেলাগুলোতে উপস্থিত ব্রাজিলিয়ানদের বেশির ভাগ দর্শকই শ্বেতাঙ্গ আর ধনবান। একইসঙ্গে তারা বামপন্থি প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট। রোববার প্রকাশিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে ব্রাজিল ও চিলির মধ্যকার ম্যাচটি যারা মাঠে বসে দেখেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ পুরুষ, ৬৭ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ ও ৯০ ভাগই মধ্যবিত্ত বা ধনী। তবে স্টেডিয়ামে খুব কমসংখ্যক উঠতি মধ্যবিত্ত মানুষকে দেখা গেছে। ব্রাজিলের উঠতি মধ্যবিত্ত জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের পেছনে মূলত বর্তমান প্রেসিডেন্ট রুসেফ ও তারই সহকর্মী আগেরবারের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভার কৃতিত্ব আছে বলে স্বীকার করা হয়। মোট দর্শকের মাত্র ৯ শতাংশ হচ্ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এই নিম্ন-মধ্যবিত্তদের মাসিক আয় ৫০০ থেকে ২০০০ ডলার। অথচ ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশই এই নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হলেও, এই বিশ্বকাপের অধিকাংশ আসন শ্বেতাঙ্গদেরই দখলে। তবে এই দর্শকদের ৫৫ শতাংশই রুসেফের সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট। জরিপে আরও মজার কিছু তথ্য উঠে এসেছে। ৬১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দিলমা রুসেফকে দুয়োধ্বনি দেয়া ঠিক হয়নি ব্রাজিলিয়ান দর্শকদের। আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে পুনরায় অংশ নেবেন রুসেফ। তবে এখনই তাকে দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি ও ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনে রেকর্ড ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার দায়ে গণরোষের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে তিনি এখনও অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে ভাল অবস্থানে আছেন। সিএনআই-আইবোপ কর্তৃক এই মাসের প্রথম দিকে আয়োজিত এক জরিপে দেখা গেছে ৩৯ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়ে তিনি সকল সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষে আছেন। সেই জরিপে আরও দেখা গেছে, তার নিকটতম সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলের সিনেটর আয়েসিও নেভেসের আছে ২১ শতাংশ জনসমর্থন। আর সোশ্যালিস্ট সাবেক গভর্নর এডুয়ার্ডো ক্যামেপাসের আছে ১০ শতাংশ জনসমর্থন।

মেসির চমকেই আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে

মেসি গোল করেন নি তবে করিয়েছেন তার অসামান্য দক্ষতায়। অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার মাত্র দুই মিনিট আগে ডি মারিয়ার দারুণ গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিলো আর্জেন্টিনা। আজ রাতেই যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যে জয়ী দল কোয়ার্টার ফ্ইানালে খেলবে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ড খেলায় ৯০ মিনিটে কোন দলই গোল করতে পারেনি। সাও পাওলোতে আরেনা করিন্থিয়ান্স-এ  বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় আর্জেন্টিনা বেশ কয়েকবার গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি। সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ডও। কাগজে কলমে ২০০০০ আর্জেন্টাইন সমর্থক খেলা দেখদে ঢুকলেও  প্রায় সারা গ্যালারি জুড়েই দেখা গেছে তাদের জার্সি। আর্জেন্টাইন সমর্থক হবে প্রায় ৪০০০০। দু’তিন জায়গায় দেখা যায় লাল জার্সি গায়ে সুইস সমর্থক। তবে আসনসংখ্যা ছিল ৬২৩২২, যার অনেকই শুন্য পড়ে ছিল। দুই দলের খেলোয়াড়দের ফাউল করে খেলার প্রবণতা খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। আগুয়েরোর পরিবর্তে আজ মাঠে নেমেছেন লাভেজ্জি। ম্যারডোনাকে মাঠে দেখা না গেলেও উপস্থিত ছিলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে। তাকে মাঠে স্বাগত জানান ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্লাটার। দেখে মনেই হয়নি এই সুইজারল্যান্ড দল প্রথম পর্বে ফ্রান্সের কাছে ৫-২ গোলে হেরেছিল। উল্টো প্রথমার্ধে অন্তত দুটি আসল সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ডই। আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩ পদ্ধতিতে আর সুইজারল্যান্ড ৪-৫-১ পদ্ধতিতে খেলা শুরু করে।

ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন

ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৪’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত আইনটিতে বলা হয়েছে, কেউ লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ, বিক্রয় ও ব্যবহার করতে পারবে না। ফরমালিন উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতি রাখাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনের এ খসড়া সংসদে বিল আকারে পাস হলে এর আওতায় একটি বিধি প্রণয়নের পর আইনটি প্রয়োগ করা হবে। আমরা আশা করব, এ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হবে।
দেশে ফরমালিনের অপব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় এ ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে একটি কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ বর্তমানে জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ ও জাতীয় ভোক্তা সমিতির এক যৌথ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ৪০০ টন ফরমালিন দুধ, মাছ, সবজি, ফল ইত্যাদিতে মেশানো হচ্ছে। ফরমালিনের অন্যান্য ব্যবহার থাকলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা মূলত খাদ্যদ্রব্যকে টার্গেট করেই বেশি ফরমালিন আমদানি করছে। ফরমালিন ব্যবহারযোগ্য ক্ষেত্রগুলোয় সম্মিলিতভাবে বছরে যেখানে ১০০ টনেরও কম পরিমাণ ফরমালিন ব্যবহৃত হয়, সেখানে আমদানি করা হয় প্রায় ৫০০ টন ফরমালিন। এ থেকেই বোঝা যায় খাদ্যদ্রব্যে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ফরমালিনের কতটা অপব্যবহার হচ্ছে। কাজেই এর আমদানি ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি অনুধাবন করে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। তবে আইনটি এমন হওয়া উচিত যাতে এতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে, যার সুযোগে কেউ ভিন্ন নামে ফরমালিন আমদানি করতে পারে।
জানা যায়, সরকার গত কয়েক বছরে ফরমালিন আমদানিতে নজরদারি বাড়ানোর কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফরমালিনের পরিবর্তে আমদানি করছে ফরমালডিহাইডসহ এমন কিছু রাসায়নিক দ্রব্য, যেগুলো ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উল্লেখ্য, ফরমালডিহাইড পানিতে মেশালেই পরিণত হয় ফরমালিনে। ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে আরও যেসব রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করা হয় সেসবের মধ্যে রয়েছে ফরমালডিহাইড সলিউশন, মিথানল, মিথানল সলিউশন, মিথাইলডিহাইড, মিথাইলডিহাইড সলিউশন, প্যারাফরমালডিহাইড, প্যারাফরমালডিহাইড সলিউশন, প্যারাফর্ম, ফর্মাজিন ইত্যাদি। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগ ফলপ্রসূ করতে চাইলে ভিন্ন নামে ফরমালিন আমদানির এ সুযোগ বন্ধ করতে হবে। খাবারে কোন মাত্রার ফরমালিন থাকলে তা অপরাধ হিসেবে আমলে নেয়া যাবে, আইনে তারও উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেছেন, আইন হওয়ার পর আরও বিধি তৈরি করে এর আওতা নির্ধারণ করা হবে। সেক্ষেত্রে আইনের সব ফাঁকফোকর বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে, এটাই কাম্য। নয়তো আরও অনেক আইনের মতো এ আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে যাবে। কেননা দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। অসাধু ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁক খুঁজবেই। ফাঁক রেখে আইন করে কোনো লাভ নেই।

মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণে আইন হচ্ছে by বিএম জাহাঙ্গীর

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। অমুক্তিযোদ্ধা কেউ যাতে মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেতে না পারে সেজন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একটি খসড়া প্রস্তাবনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সংজ্ঞার বিষয়টি আইনে উল্লেখ থাকবে।
এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রদান নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে নানা বিতর্ক চলে আসছে। কিছু কিছু অভিযোগ যে একেবারে অসত্য, তা নয়। ইতিমধ্যে কিছুসংখ্যক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করে তাদের সনদ বাতিলসহ গেজেট থেকে নামও বাদ দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় একটি বিতর্কমুক্ত স্বচ্ছ ও নির্ভুল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করার ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে সংজ্ঞা নির্ধারণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, খসড়া প্রস্তাবে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধার উপাধি বা সনদ পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে আট ধরনের যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, যেসব ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতে যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, লেখক, সাংবাদিক বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অবদান রেখেছেন। যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে ভূমিকা রাখা ছাড়াও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যারা বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর সদস্য ছিলেন। যেমন- কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আনসার বাহিনী প্রভৃতি। আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ভারতের ত্রাণশিবিরে অবস্থান করলেও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমন ব্যক্তি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পুলিশ, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। মুুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অথবা মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব গণপরিষদ সদস্য। সবশেষে বিশ্ব জনমত গঠনে সক্রিয় বাংলাদেশী নাগরিকরা।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে আরও কিছু সিদ্ধান্ত আইনে উল্লেখ থাকবে। এগুলো হল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার নামের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাব প্রদান। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠনকে জনমত গঠন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন, সাংবাদিক, লেখক, গায়ক, শিল্পী, খেলোয়াড় ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদান করা। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তিদের অবদান বিবেচনা করে খেতাব প্রদান। বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা প্রদান অব্যাহত রাখা। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ২ বছরের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করে দেয়া। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য সেল গঠন এবং এই সেলের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। নাটক, সিনেমা, মুভি, স্মৃতিকথা, গান লেখার জন্য সেল গঠন (মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা ইত্যাদি আন্দোলন), অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাস্তবায়ন, পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, অত্যাচার, বৈষম্য, সঙ্গীত, নাটক রচনায় সরকারি অনুদান প্রদান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিশু, কিশোর, যুব, পেশাজীবী সংগঠন গঠন করা এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফাউন্ডেশন-কর্তৃপক্ষ গঠন।

ফরমালিন কতটা ক্ষতিকর by ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ

বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, প্যারাসাইট ও ছত্রাকের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য মাছ চাষে স্বল্পমাত্রার ফরমালিন ব্যবহারের বিধান থাকলেও মাছ, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণে ফরমালিনের ব্যাপক ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ রাসায়নিক পদার্থটি দ্রবণ হিসেবে ব্যবহার করলে শুধু মাছ নয়, হরেকরকম ফলমূলও বেশ তাজা ও সতেজ থাকে, দেখতে খুব আকর্ষণীয় দেখায়। পচন রোধে মৃতদেহ, মৃত জীবজন্তু বা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফরমালিন দ্রবণে ডুবিয়ে বহুদিন সংরক্ষণ করা যায়। অথচ এ ধরনের একটি বিষাক্ত দ্রব্য সাম্প্র্রতিককালে অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করে মানুষকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। ফরমালিন ব্যবহার শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের আশপাশের অনেক দেশেই ফরমালিন ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইন্দোনেশিয়ার খাদ্য ও ওষুধ সংস্থা, যাকে সংক্ষেপে বিপিওএম বলা হয়, এক সমীক্ষায় দেখতে পায়, একশ্রেণীর অসাধু ও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী খাদ্যদ্রব্য, বিশেষ করে মাছ, টফু ও আর্দ্র নুডুলস সংরক্ষণে ব্যাপকভাবে ফরমালিন ব্যবহার করে আসছে।
অসাধু ব্যবসায়ীরা মাছ ও খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন মেশান- এটি সত্যি হলেও মূল সমস্যাটা সেখানে নয়। কী মাত্রায় ফরমালিন মেশানো হয়েছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে বিভিন্নভাবে ফরমালিন প্রয়োগ করা যায়। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাছের মধ্যে ফরমালিন প্রয়োগ করা ছাড়াও স্প্র্রে করাসহ ফরমালিনে ডুবিয়ে মাছ, ফলমূল বা খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখা যায়। স্বল্পমাত্রায় ফরমালিন শরীরের ক্ষতি করার কথা নয়। মাছ, মাংস, ফলমূল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবেই ফরমালডিহাইড উপস্থিত থাকে। প্রতি কিলোগ্রাম আপেলে ৬.৩ থেকে ২২.৩ মিগ্রা, কলায় ১৬.৩ মিগ্রা, বিটে ৩৫ মিগ্রা, পেঁয়াজে ১১ মিগ্রা, ফুলকপিতে ২৭ মিগ্রা, আঙ্গুরে ২২.৪ মিগ্রা, নাশপাতিতে ৩৮.৭-৬০ মিগ্রা, গরুর মাংসে ৪.৬ মিগ্রা ফরমালডিহাইড থাকে। প্রতিদিন আমরা প্রকৃতি ও পরিবেশ থেকে কম-বেশি ফরমালডিহাইড শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করি। কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও বাষ্পের মধ্যেও ফরমালিন থাকে, যা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে ঢুকছে। সিগারেটের ধোঁয়া, এমনকি বৃষ্টির পানিতেও ফরমালডিহাইড থাকে। ফরমালডিহাইড শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি প্রাকৃতিক উপাদান। তবে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালডিহাইড বিষাক্ত। ফরমালিনের কারণে কার কতটুকু ক্ষতি হবে, তা নির্ভর করে ফরমালিনের মাত্রার ওপর।
প্রিয় পাঠক, এবার আপনাদের অবগতির জন্য ফরমালিনের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উপস্থাপন করতে চাই। ফরমালিন বর্ণহীন তীব্র ঝাঁজালো এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। ফরমালডিহাইড পানিতে সহজে দ্রবণীয়। পানিতে ৩৭ শতাংশ ফরমালডিহাইড এবং ০.১৫ শতাংশ মিথানলের দ্রবণকে ফরমালিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ফরমালডিহাইড শরীরে পুঞ্জীভূত হয় না। ফরমালডিহাইড হল একটি মধ্যবর্তীকালীন রূপান্তরিত রাসায়নিক পদার্থ এবং প্রতিটি কোষেই ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়। ফরমালডিহাইড অত্যন্ত ক্রিয়াশীল এবং প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিডের সঙ্গে বন্ধনে মিলিত হয়। রক্তে ফরমালডিহাইডের হাফলাইফ (যে সময়ের মধ্যে কোনো রাসায়নিক পদার্থের পরিমাণ বা মাত্রা অর্ধেকে নেমে আসে) মাত্র ৯০ সেকেন্ড। ফরমালডিহাইড অক্সিডাইজড (রাসায়নিক রূপান্তর) হয়ে অতিদ্রুত ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়, যা প্রস্রাবের মাধ্যমে এবং কিছু অংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়ে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। তাছাড়াও ফরমালডিহাইড শরীরে প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড সংশ্লেষণের আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুখ ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালিন আমাদের দেহে প্রবেশের সুযোগ পায়।
মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে দেখা গেছে- গলাধঃকরণ করা হলে ফরমালিন বিষাক্ত হতে পারে। আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বা আকস্মিক ভুল-ভ্রান্তির কারণে ফরমালডিহাইড ব্যবহারে মুখ, গলা, অন্ত্র জ্বলে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ফরমালডিহাইড শরীরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে যকৃতে (লিভার) ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়ে মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস (রক্তের অম্লত্ব বৃদ্ধি) উৎপন্ন করে। ফরমিক অ্যাসিড শ্বাস-প্রশ্বাস প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটানো ছাড়াও যকৃত ও কিডনি ধ্বংস করতে পারে। পরিস্থিতি তীব্র হলে শরীরে খিচুনি ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রেও বিষাদগ্রস্ততার (ডিপ্রেশন) কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ৩১৭-৪৭৫ মিলিগ্রাম ফরমালিন ৭০ কিলো ওজনের একজন মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। ফরমালিনে মিথালনের উপস্থিতি মানুষের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটায়। ফরমালিনের ছিটা চোখে পড়লে অস্বস্তি ছাড়াও চোখের দৃষ্টিশক্তি লোপ পেতে পারে।
ফরমালডিহাইড মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উপসংহারে এসেছে যে, বারবার ও দীর্ঘ সময়ের জন্য ফরমালডিহাইডের সংস্পর্শে মানবদেহের নাক, ফুসফুস, গলায় ক্যান্সার উৎপন্ন করে। ফরমালডিহাইড নিজে ক্যান্সার উৎপন্ন করে অথবা এ মরণঘাতী রোগ সৃষ্টিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর ও কুকুরের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ফরমালিনের কারণে পাইলোরাসে অ্যাডেনোকারসিনোমার মতো অন্ত্রের ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। অন্যান্য পরীক্ষাও দেখা গেছে, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালিন গ্রহণের কারণে গার্মেন্ট শ্রমিকদের গলা, সাইনাস, নাকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। প্রতি লিটারে ০.৫-২.০ মিগ্রা ফরমালিন চোখ, নাক, গলার সংস্পর্শে এসে জ্বালা-যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। প্রতি লিটারে ৩-৫ মিগ্রা ফরমালিন চোখে পানি আনতে পারে। ১০-২০ মিগ্রা ফরমালিনের কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট বাড়ে। ২৫-৩০ মিগ্রা ফরমালিন শ্বাসনালীতে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি করে। ১০০ মিগ্রা ফরমালিন স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফরমালডিহাইড শরীরে প্রবেশ করাটা যেমন বিপজ্জনক, গলাধঃকরণ তেমনি বিপজ্জনক। চামড়ার সংস্পর্শে ফরমালিন এলে চামড়া পুড়ে যেতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের এলার্জির উপদ্রব দেখা দিতে পারে। বেশিমাত্রায় ফরমালিন শরীরে ঢুকলে কোষের প্রতিটি উপকরণের সঙ্গেই তা বিক্রিয়া করার ক্ষমতা রাখে এবং এর ফলে কোষ তথা প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বিঘ্ন ঘটায়।
ফরমালিনে মিথানলের উপস্থিতি ফরমালডিহাইডের প্রতিক্রিয়ার মাত্রা বৃদ্ধি করে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। কারণ মিথানলও লিভারে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়, যা রক্তের অম্লত্বের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। রক্তে অম্লত্ব বৃদ্ধি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে। ফরমালডিহাইড দ্রবণে থাকলে তা ফরমিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়। ফরমিক অ্যাসিড ক্ষত সৃষ্টিকারী বস্তু। সুতরাং ফরমালডিহাইড ও ফরমিক অ্যাসিড মাত্রাভেদে শরীর-চামড়ার সংস্পর্শে এলে জ্বালা-পোড়া ছাড়াও স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন রেখে যেতে পারে। ক্ষয়িষ্ণু বলে ফরমালিন চোখেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফরমালিনের মতো ক্ষয়িষ্ণু পদার্থ চোখের দৃষ্টিশক্তির অবনতি ঘটানো ছাড়াও দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারে।
ফরমালিন থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য কোনো ম্যাজিক ফর্মুলা নেই। ফরমালিনের ব্যবহার আমাদের জন্য এক মহাবিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারপরও ছোটখাটো কিছু পরামর্শ হয়তো পাঠকদের ফরমালিনের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারে।
এক. আমদানিকৃত মাছে ফরমালিন মেশানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। সুতরাং বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মাছ কেনার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উত্তম।
দুই. পরিচিত বাজার বা দোকানদারের কাছ থেকে মাছ বা ফলমূল কিনলে ফরমালিনমুক্ত মাছ বা ফলমূল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তিন. মাছ টিপে দেখুন। আঙুল দিয়ে টিপলে অস্বাভাবিক শক্ত মনে হলে তাতে ফরমালিন থাকার সম্ভাবনা বেশি। মাছ নাকের কাছে নিয়ে শুকে দেখতে পারেন, ঝাঁজালো গন্ধ নাকে লাগে কি-না। ফরমালিন ঝাঁজালো হয়।
চার. মাছ বা ফলমূল কিনে এনেই পানিতে ডুবিয়ে রাখুন বেশ কিছুক্ষণ। দরকার হলে দু’-একবার পানি বদলে নিতে পারেন। মাছ বা ফলমূলের গায়ে ফরমালিন থাকলে তা পানিতে অনেকটা দ্রবীভূত হয়ে যাবে। সম্ভব হলে মাছ বা ফলমূল ভালো করে ঘষেমেজে ধুয়ে নিন কাটার আগে।
পাঁচ. ফরমালডিহাইডযুক্ত মাছ বা ফলমূল ধোয়া পানি যেন শরীরের সংস্পর্শে না আসে। এ ব্যাপারে শিশুদের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে।
ছয়. স্বল্প পরিমাণ ফরমালিন শরীরে মেটাবলাইজড (রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় পদার্থে পরিণত করা) করতে পারে, যা শরীরের জন্য তেমন ক্ষতিকর নাও হতে পারে।
সাত. সুষম পুষ্টিকর খাবার ও ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান। শরীরে ঢুকলে আমাদের শরীরের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা ফরমালিনের মতো বিষাক্ত ও ক্ষতিকর উপাদান প্রতিরোধ বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
আট. মাছ ৫ শতাংশ ভিনেগার (এক লিটার পানিতে ৫০ মিলিলিটার ভিনেগার) দ্রবণে ১৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে ফরমালিনমুক্ত হতে পারে।
নয়. ভ্রাম্যমাণ আদালতের তদারকি বাড়ালে ফরমালিনের অপব্যবহার অনেক কমে যাবে
দশ. ফরমালিনের ব্যবহারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করুন এবং তা প্রতিহত করার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। স্বস্তির ব্যাপার হল- সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ প্রচেষ্টাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
এগার. ভয়ভীতি নয়; উপস্থিত বুদ্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে ফরমালিন সমস্যার সমাধান করতে হবে।
বার. স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাদের কিছু পড়াশোনাও দরকার।
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
drmuniruddin@gmail.com

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সফরের মাধ্যমে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকারের ইতিবাচক যাত্রা নির্দেশ করে। বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভিসানীতি কিছুটা শিথিল করেছে দিল্লি আন্তঃসীমান্ত রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি হবে, গুয়াহাটি-শিলং-এর সঙ্গে ঢাকা পর্যন্ত নতুন বাস সেবা চালু হবে। এছাড়া ভারত কথা দিয়েছে, ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে দেয়া হবে। দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, এটা অনুপ্রেরণাদায়ক যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রোধন্মোত্তভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর পরও, নতুন সরকার ঢাকার সঙ্গে সমপর্ক রক্ষার ব্যাপারে পূর্ববর্তী মনমোহন সরকারের পদচ্ছাপই অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও মনমোহন সরকারও বাংলাদেশের জন্য নেয়া মৌলিক উদ্যোগগুলো সমপন্ন করতে পারেনি। দ্বিপক্ষীয় সমপর্ক অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়ে সুষমা স্বরাজ কথা দিয়েছেন, বিষয়টি তার সরকার সেই উদ্যোগগুলো বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা করে যাবে। তবে বাংলাদেশকে হতাশ করে যে, তিনি এর জন্য নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা বেঁধে দেননি। পার্লামেন্টে নিজেদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়, বিজেপি’র এখন কেবল নিজ দলের ভেতরই ঐকমত্য সৃষ্টি করতে হবে যে, স্থলসীমান্ত চুক্তি উভয় দেশের জন্যই লাভজনক। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে মোদি সরকারের প্রয়োজন হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন গলানো। এর জন্য মমতাকে দেয়া সুষমার ফোনকলের চেয়েও বেশি কিছুর প্রয়োজন হবে। সুষমার ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার বার্তাটি হচ্ছে, নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের ঢাকা-দিল্লি সমপর্কে বিশাল গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি সুষমা স্বরাজ ইউপিএ সরকারের অবদান স্বীকার করেছেন এই বলে যে, গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে অনেক বড় বড় চুক্তি সমপাদিত হয়েছে। নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাংলাদেশী পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজার উন্মুক্ত করা, সীমান্ত পরিকাঠামো, জ্বালানি ও দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়গুলোতে অগ্রগতির কথাও বলেছেন তিনি। ঢাকার সহযোগিতা ভারতের প্রাচ্য নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও দেখবে ইউপিএ সরকারের সমপর্কের ধারাবাহিকতা একটি নতুন পর্যায়ে এসে পৌঁছে কিনা। ভারতের মূল সংযোগ হতে হবে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে। কিন্তু সুষমা স্বরাজ যেমনটি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই প্রচেষ্টা থাকতে হবে। আমরা বাংলাদেশের সমাজের প্রতিটি অংশকে আস্থায় নিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। বাংলাদেশ এখনও অভ্যন্তরীণ বিশাল অশান্তির পর্যায় থেকে উত্তরণ করতে পারেনি। তবে সুষমা স্বরাজ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে নিবৃত্ত থেকেছেন। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বিরোধীদলীয় নেত্রী না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও একটি ভাল পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ভারত যে এখনও বিএনপিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল মনে করে, সেই ইঙ্গিতই দেয়া হলো।

রক্তপাত এড়ালো ব্রাজিল গুলি ও বোমার ঘটনা ফাঁস

অল্পের জন্য ব্রাজিলে গোলাগুলি হলো না। বোমা পাতা হয়েছিল কিনা তা এখনও অনুদঘাটিত। তবে রক্ত ঝরেনি। ফুটবল রক্তাক্ত হয়নি। সভ্যতা লজ্জিত হয়নি।  তিন শ’ কোটি মানুষ, যারা ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচটি উপভোগ করছিলেন সারা বিশ্ব জুড়ে তারা আতঙ্কিত, চিন্তিত হতে পারতেন।
কিন্তু কিছুই ঘটলো না। এতবড় উত্তেজনা কাকপক্ষী টের পেলো না। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচকে কেন্দ্র করে দু’টি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে সাও পাওলোর শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ফোলহা দ্য এস. পাওলো। একটি বোমা পাতার ষড়যন্ত্র। অন্যটি সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গুলি করার পরিকল্পনা।
জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ১২ই জুনের ম্যাচটি চলছিল। ম্যাচটি উপভোগ করছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ। তাঁর পাশে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং ফিফা প্রেসিডেন্ট সেফ ব্লাটার ও অন্য অতিথিবৃন্দ। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত স্পেশাল ফোর্সের কাছে আগেই ইঙ্গিত ছিল যে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের আশঙ্কা আছে। সেকারণে নিরাপত্তাকর্মীদের একটি চৌকস দল মঞ্চ ঘিরে একটি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যূহ তৈরি করে। হঠাৎ একজন স্নাইপার (গুপ্তঘাতক) ‘সন্দেহভাজন’ অস্ত্রধারী ব্যক্তির গতিবিধি লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন যে পুলিশের পোশাক পরা রহস্যজনক অস্ত্রধারী প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসফের  কাছাকাছি  অগ্রসর হচ্ছেন।

গত ২৮শে জুন ফোলহা যখন প্রথম খবরটি প্রকাশ করে তখন তারা বলেছিল গুপ্তঘাতক ওই অস্ত্রধারীকে গুলি করে হত্যা করার অনুমতি চেয়ে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু দ্রুতই এই রুদ্ধশ্বাস নিরাপত্তা নাটকের অবসান ঘটে যখন জানা যায় যে, ওই অস্ত্রধারী ব্যক্তি একজন পদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তাঁর টিমের কাছে খবর ছিল যে দিলমা রুসেফের কাছাকাছি বোমা পোঁতা হয়েছে। তাই তিনি কড়া নজরদারি চালাচ্ছিলেন। তবে এটা নিয়ে অঘটন না ঘটলেও বিষয়টিকে নিরাপত্তাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফোলহার প্রতিবেদনমতে, এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে পুলিশ বিভাগ ও সাও পাওলো স্টেট পুলিশের মধ্যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কারণ তারা ঘটনাস্থলে গুপ্তঘাতকের উপস্থিতি নিয়ে দু’ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। পুলিশ বিভাগের স্পেশাল রেসকিউ টিমের স্নাইপার সদস্য বলছেন, তিনি সন্দেহ করেছেন যে, ট্যাকটিকাল অ্যাকশন টিমের (গ্যাট) ইউনিফর্ম পরা অফিসারকে তিনি সন্দেহ করেন। কারণ, ওই সময়ে সেখানে থাকার জন্য তিনি অনুমোদিত ছিলেন না। গুপ্তঘাতক রেডিওতে তাঁর উপর মহলকে জানিয়েছিল যে, একজন সন্দেহভাজন অস্ত্রধারীকে মঞ্চের খুব কাছে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছে। স্টেডিয়ামের কমান্ড সেন্টারে এই খবর পৌঁছানোর পর তারা নিশ্চিত করে যে, এই সময়ে গ্যাটের কোন কর্মকর্তার সেখানে থাকার কথা নয়। আসলে গ্যাটের কেউ নেই। তখন সন্দেহ গভীর হয় যে, লোকটি আসলে অফিসারের উর্দি পরা হলেও প্রকৃতপক্ষে একজন ক্রিমিনাল। তখনই তাকে গুলি করার পরিকল্পনা করা হয়। উপর মহলের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়। অনুমতি আসতে বিলম্ব ঘটছিল। কারণ হুকুমদাতারা শলাপরামর্শ করছিলেন যে, এখন গুলি চালানোর পরিণতি কি হতে পারে। ম্যাচ ভ-ুল না হলেও বিশাল একটি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘ মহসচিবের উপস্থিতিতে গুলি বর্ষণ এবং একজনকে হত্যার ঘটনা ঘটালে ব্রাজিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নেতিবাচক শিরোনাম হবে। আবার একই সঙ্গে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয় ছিল।

গুলি চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না করা নিয়ে স্টেডিয়ামের কমান্ড  কন্ট্রোল, যেখানে ওই দুই পুলিশ বাহিনী ছাড়াও সেনাবাহিনীর অফিসাররা ছিলেন, যারা উদ্বোধনী ম্যাচের অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা ঘামছিলেন। সময় যতই গড়াচ্ছিল, ততোই তারা দিশাহারা হচ্ছিলেন, তবে অল্পকালের মধ্যেই টিভি মনিটরের ইমেজ বিশ্লেষণে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন। তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিনি শনাক্ত করেন যে, সন্দেহভাজন অস্ত্রধারী আসলে আর কেউ নন, একজন গ্যাট অফিসার। তবে এই অফিসারটিকে সেদিন খুব সমম্ভবত ঘটনাস্থল ত্যাগ না করতে বলা হয়েছিল।
ফোলহার এই রিপোর্ট প্রকাশের পর মিডিয়ায় এটা ঝড় উঠেছে। দু’দিন আগে ফক্স স্পোর্টসকে এক ই-মেইলে সাও পাওলো কর্তৃপক্ষ বলেন, কখনওই গুপ্তচর ওই অফিসারকে গুলি করার অনুমতি চাননি। ফক্স স্পোর্টস বলেছে, এটা তাদের আগের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।              
এদিকে পাবলিক সিকিউরটি সেক্রেটারি ফার্নান্দো গ্রেলা ভিয়েলা উভয় পুলিশ প্রধানের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়েছেন। সত্যিই কি ঘটেছিল, তার বিবরণ এখনও অপ্রকাশিত। চারদিকে আলোড়নের মধ্যে পুলিশ বিভাগ স্বীকার করেছে, সেদিন যেটা ঘটেছে সেটা একটি নিরাপত্তা ব্যর্থতা তবে গুরুতর কিছু নয়। যোগোযোগ সংক্রান্ত একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। তবে বড় ধরনের কিছু ঘটার আগেই সেটা সামলানো সম্ভব হয়েছে।
ফোলহা লিখেছে, একটি বোমা পোঁতার হুমকি ওই সময়ে সেখানে ছিল কিনা, গ্যাটের ওই অফিসারের ওই সময়ে সেখানে উপস্থিতি স্বাভাবিক ছিল কিনা তার কোন ব্যাখ্যা এখনও দেয়া হয়নি। এমনকি কোন বিষয়ে তদন্ত এখনও চলমান কিনা সে বিষয়ে তারা নীরব রয়েছে। ফোলহা সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু তার কোন জবাব আসেনি। এটাও পরিষ্কার যে, ওই সময়ে ওই গ্যাট কর্মকর্তার সেখানে থাকার জন্য অনুমোদিত ছিলেন না। বোমার সন্ধানে তিনি সেখানে ছিলেন, এই দাবি করা হলেও কারা কিভাবে বোমা হামলার খবর দিল, তা-ও রয়ে গেছে অপ্রকাশিত। 

ভারত নয়, আওয়ামী লীগই দায়ী- সাক্ষাৎকারে বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যা নিষ্পত্তি হওয়ার জন্য ভারত নয়, দায়ী আওয়ামী লীগ। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার শুধুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে। কোন বিশেষ দল বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়, দু’দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নয়া দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক হওয়া উচিত। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে। ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এতে তিনি বলেন, বর্তমানে যে সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় তারা অবৈধ। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে ভারতের ইউপিএ সরকার চাপ সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকার বিভিন্ন ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশকে ভারত বিরোধী কর্মকা- বে্যবহার করতে দেবো না। রোববার খালেদা জিয়া তার অফিসে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক শুভজিৎ রায়কে এ সাক্ষাৎকারটি দেন। এতে তিনি ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছে তার প্রত্যাশা, ভারতের বিগত ইউপিএ সরকারের বিষয়ে তার চিন্তাভাবনা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ কেমন ছিল?
এটা ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার। সুষমা খুব চমৎকার মানুষ। আমরা দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সীমান্ত হত্যাকা-ের মতো বিষয়। এ বিষয়ে সুষমা বলেছেন, তারা এ হত্যাকা- শূন্যতে নামিয়ে আনতে কাজ করে যাবেন। তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, এটা বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেছেন। কথার মধ্যে এমন সব প্রসঙ্গ এসেছে। শীতের সময় পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়, তখন জনসাধারণ পানি না দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ভারতের বিরুদ্ধে। ভারতকে একটি বড় প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে। আমাদের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত। ফলে সেখানে সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে মানুষ হত্যা করা হলে তাতে জনসাধারণ ক্ষিপ্ত হয়, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তিনি আমাদের উদ্বেগের বিষয় মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি শুনেছেন আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যেসব বিষয় এখনও সমাধান করা হয় নি তা নিয়ে উদ্বেগের কথা এবং জনগণ টু জনগণ সম্পর্ক শক্তিশালী করা নিয়ে আমার প্রস্তাব।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রতি নরেন্দ্র মোদি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন বলে আপনি মনে করছেন?
এখনও তাদের অবস্থান পরিষ্কার নয়। আমি নরেন্দ্র মোদির কাছে দু’টি চিঠি লিখেছি। একটি লিখেছি নির্বাচনে তার বিজয়ের পর। আরেকটি চিঠি লিখেছি তার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর। কারও প্রত্যাশা হতে পারে নতুন সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পন্থা খুঁজবে। নরেন্দ্র মোদি তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কের নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তার শুভ উদ্যোগ ও দূরদৃষ্টির প্রকাশ পেয়েছে। এটা মেনে নেয়া হয় যে, আমার প্রয়াত স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এখন থেকে তিন দশকেরও বেশি আগে সার্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখন মোদি এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। আমরা মনে করি এটা এ অঞ্চলের জন্য একটি ভাল উদ্যোগ। আমরা চাই আমাদের দেশের উন্নয়ন। পাশাপাশি আমরা ভারতেরও উন্নয়ন চাই।
প্রশ্ন: একজন নেতা হিসেবে মোদির বিষয়ে আপনি কি ভাবছেন?
মোদিকে বিচারের দায়িত্ব ভারতের জনগণের। তার সুশাসন ও অর্থনীতি যদি ভারতের জনসাধারণের জন্য হয় তাহলে তাকে তারা স্বাগত জানাবেন।
প্রশ্ন: তিনি কি আপনাকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন?
হ্যাঁ। আমি তাকে যখন অভিনন্দন জানিয়েছিলাম তখন আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে। তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
প্রশ্ন: আপনি কি ভারত সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন?
আপনি জানেন দেশের এখন কি পরিস্থিতি। আমি এখন ভীষণ ব্যস্ত। এ দেশে গণতন্ত্র নেই। শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। তারা চাইছেন অবাধ, সুষ্ঠু, পক্ষপাতহীন ও সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন।
প্রশ্ন: এ দেশে নির্বাচনের সময় ভারতের সাবেক সরকার আপনাকে সমর্থন করে নি বলে কি আপনি হতাশা বোধ করেন?
তাদের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, এইচ এম এরশাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত। অন্যথায় নির্বাচন হবে না। পাশাপাশি মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসবে। তিনি আমাদেরকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি। আমরা কেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবো না সে বিষয়ে আমরা তাকে বলেছি। আমরা একটি রাজনৈতিক দল। আমরা আন্ডারগ্রাউন্ডের কোন সংগঠন নই। কিন্তু নির্বাচন যদি অবাধ না হয় তাহলে এতে অংশ নেয়ার কোন অর্থই থাকতে পারে না। পরে এরশাদ প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তারও পরে কেন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার একটি ভূমিকা রাখলো তা আমি বুঝতে পারি না। এরশাদ বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এক্ষেত্রে নির্বাচনকে যারা স্বীকৃতি দিয়েছে তাদের মধ্যে ভারত-ও রয়েছে। এমনকি কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘ বলেছে তারা একদলীয় নির্বাচন সমর্থন করে না। নির্বাচনে কোন পর্যবেক্ষক ছিল না। তাই তারা এ নির্বাচনকে মেনে নিতে পারে নি। এদেশের মানুষও এ নির্বাচনকে মেনে নেয় নি। তাই এ সরকার অবৈধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদেরকে শিগগিরই নতুন নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছে যে, দেশের ভিতরে ও বাইরে তাদের কোন বৈধতা নেই। আওয়ামী লীগ আমাদেরকে বলছে যে, প্রথমে তোমরা আমাদেরকে বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দাও তারপরে আমরা আলোচনায় যাবো। সুতরাং তারা যে অবৈধ তা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আমি সুষমা স্বরাজকে বলেছি যে, কোন দেশই এমন নির্বাচন প্রত্যক্ষ করে নি যেখানে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এমন হতে পারে ২ জন, ৪ জন বা ৫ জন। তাই বলে ১৫৪ জন? মন্ত্রিপরিষদের সব মন্ত্রীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। সেখানে একজন ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো হয়েছিল এটা দেখাতে যে, নির্বাচনে তার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
প্রশ্ন: কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ও বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মধ্যে পার্থক্য কি বলে আপনি মনে করেন?
এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি সরকারের বিচার করা কঠিন। এ বিচার করার দায়িত্ব ভারতের জনগণের এ কথা আমি আগেও বলছি। তবে যে কোন পরিবর্তন ভাল কিছুর আশা জাগায়। আমাদের আগ্রহ হলো এটা দেখা যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কি ঘটছে। এ অঞ্চলে কি ঘটছে। মোদি সরকার জোর দিয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখানে উল্লেখ করার মতো পরিবর্তন হলো- তারা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কে জোর দেয় নি।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নি?
এটা বাংলাদেশের জনমানুষের ধারণা। বস্তুত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সব বড় বড় সমস্যা রয়ে গেছে তা সমাধান করতে না পেরে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাদের সদিচ্ছার অভাব ছিল।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন ভারতের ওই সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের খুব বেশি ঘনিষ্ঠ ছিল এবং এতে বাংলাদেশের শুভ হয় নি?
আবারও বলি এটা এখানকার মানুষের ধারণা। বাংলাদেশের মানুষ আসলে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখায় আন্তরিক। কোন বিশেষ দল বা ব্যক্তি নয়, এ সম্পর্ক হওয়া উচিত দু’দেশের মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। আমি কাউকে দায়ী করতে চাই না। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদেরকে এমনটা করতে বাধ্য করেছে। তাই ভারত সরকার তাদেরকে সমর্থন দিয়েছে। এমনকি এখনও এ বিষয়ে কথা বলেন এরশাদ। তিনি বলেন, তিনি নির্বাচনে যান নি। তাকে নির্বাচনে যেতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ জন্য তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু তার সেই চিঠি গৃহীত হয় নি। তাই ধারণা প্রচলিত আছে যে, ভারত সরকার ওই নির্বাচনে একটি ভূমিকা পালন করেছিল।
প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে বিরোধিতা করেছেন। তার এ ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যদিও বাংলাদেশের মানুষ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারে নি। শেষ মুহূর্তে ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় নি মমতার বিরোধিতার কারণে। বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃতপক্ষেই কিছু জানতে পারে নি যে, আসলে কি ঘটেছে। মমতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয় নি। আমি জানি না কে এ চুক্তিতে বাধা দিয়েছেন। আমাদের সরকার মমতার কথা বলে। হাসিনা-ও তাই বলেন।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন যে, সীমান্ত চুক্তি সামনে এগিয়ে নিতে পার্লামেন্টে তা তুলতে সক্ষম হবে বিজেপি, অথবা আবারও মমতা এতে বাধা সৃষ্টি করবেন অথবা বিজেপির আসাম ইউনিট এতে বাধা সৃষ্টি করবে?
ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। বাংলাদেশ তা ওই বছরেই অনুমোদন করেছে। কিন্তু ভারত এখনও তা করতে পারে নি। ছিটমহলের মানুষগুলো অপরিসীম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দীর্ঘদিন তারা অনিশ্চিত এক অবস্থায় বসবাস করছেন। দু’দেশের ওপরই এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এখন ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বিজেপি। এটা আশা করা যায় যে, এ সমস্যার সমাধান হবে শিগগিরই।
প্রশ্ন: আপনি দু’দফায় যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন আপনি দেখেছেন ভারতের তিনজন প্রধানমন্ত্রী। আপনি কিভাবে পিভি নরসিমা রাও, অটল বিহারী বাজপায়ী ও মনমোহন সিংয়ের মধ্যে রেটিং করবেন?
তারা সবাই চমৎকার মানুষ। মনমোহন সিং অতিশয় ভদ্র মানুষ। অতি বিনয়ী। বাজপায়ী একজন সিনিয়র ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে আমার মতবিনিময় হয়েছে। আমি ভারত সফরকালে নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমি বলতে চাই না কে ভাল কে মন্দ। তারা সবাই ও ভারতে বর্তমানে মোদির অধীনে নতুন সরকার সবাই বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যে সব ইস্যু এখনও সমাধান করা যায় নি তা সমাধান করা উচিত।
প্রশ্ন: কিন্তু তারা তো এসব ইস্যুর কোন সমাধান দিতে সক্ষম হন নি?
এখনও তারা সেটা করতে পারেন নি। তাই আমরা আশা করছি যে, আগের সরকার যা করতে পারে নি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি তা করতে পারবেন।
প্রশ্ন: বিএনপির বিগত সরকারের সময়ে ভারতবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকা- নিয়ে একটি উদ্বেগ ছিল। আপনি ভারতকে কিভাবে আশ্বস্ত করবেন?
এ উদ্বেগ ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে। বিএনপি সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই প্রচারণা চালানো হয়েছিল। ভারত বা যে কোন প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে আমরা কখনওই বাংলাদেশের ভূখ-কে ব্যবহার করতে দেবো না। এটা আমাদের প্রতিশ্রুতি। আমরা এর প্রমাণও দিয়েছি।
আরেকটি উদ্বেগ রয়েছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে।
আমি সংখ্যালঘু শব্দটি ব্যবহার করি না। আমি বলি, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে সমান অধিকার। বিএনপি সরকারের সময়ে তারা ভাল ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে সেই পরিস্থিতির অনেক অবনতি হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে মন্দির। কেউই নিরাপদ নয়। যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল তখন আমি ছিলাম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তখন যারা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল অনতিবিলম্বে আমি তাদের দমন করেছিলাম। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের টেলিভিশন কভারেজ বন্ধ করেছিলাম। হিন্দু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে আমার মন্ত্রীরা কাটিয়েছেন বিনিদ্র রজনী।
প্রশ্ন: মোদি সরকার অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে যে অবস্থান নিয়েছেন তাতে কি আপনি উদ্বিগ্ন?
নির্বাচনী প্রচারণা থেকে অনেক বার এ কথা আমরা শুনেছি। এ কথা আমরা অতীতেও শুনেছি। কেউই অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেন নি যে, ভারতে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসী রয়েছেন। সুষমা স্বরাজ এ ইস্যুটি উত্থাপন করেন নি। নির্বাচনের সময় মানুষ অনেক কথাই বলেন জেতার জন্য। আমরাও অনেক কথা বলি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তার সব কিছুই বাস্তবায়ন করতে হবে। আমি মনে করি না যে, অনেক বাংলাদেশী ভারতে যান। তারা তো এখানেই ভাল আছেন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে দু’টি পরিবার প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। আগামী বছরগুলোতেও কি এ ধারা অব্যাহত থাকবে?
এটা ঠিক না। যেহেতু মুজিবুর রহমানের অবদান আছে, জিয়াউর রহমানের অবদান আছে তাই তাদের পরিবার সম্মান পায়। এ জন্যই জনগণ তাদের ওপর আস্থা রাখেন। দেখুন, এটা শুধু রাজনীতির জন্যই নয়। একজন ব্যারিস্টারের ছেলে ব্যারিস্টার হন। ডাক্তারের ছেলে হন ডাক্তার। ব্যবসায়ীর ছেলে হয় ব্যবসায়ী। তাই রাজনীতিও পরিবারের আগ্রহী সদস্যদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। তারপর তা যায় জনগণের কাছে। যাকে তারা গ্রহণ করেন। এটাই হলো মূল কথা। জনগণ যদি গ্রহণ না করেন তাহলে তারা তো রাজনীতিতে ঠাঁই পাবে না।
প্রশ্ন: বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সম্পর্ক কি রকম?
আদর্শগত কোন মিল নেই। আমরা কট্টর ডান বা বামপন্থি নই। আমরা মধ্যপন্থি। আপনি যদি অতীত ইতিহাসের দিকে যান তাহলে দেখবেন ১৯৮৬ সালে এরশাদ যখন নির্বাচন দিতে চাইছিলেন তখন জামায়াতের সঙ্গে হাতে হাত রেখে চলেছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে এখন যে সহযোগিতা তা হলো নির্বাচনকেন্দ্রিক। তারা কোন কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আমরা কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। এর বাইরে কিছু নেই। তারা তাদের আদর্শ অনুসরণ করে। আমরা আমাদেরটা।
প্রশ্ন: গত ছয় বছরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে হাসিনার চেয়ে আপনি আলাদা কি করেছেন?
আওয়ামী লীগ সরকারের মতো আমরা নই। আমরা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার ক্ষেত্রে সার্কের অধীনে যে বিধান আছে তার আলোকে সব ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে করার জন্য জোর আহ্বান জানিয়েছি। আমি এ ইস্যুতে খুব জোর দিচ্ছি যে, দু’দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। বিভক্তি ও ঔপনিবেশিক শাসন আতঙ্ক ও অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। আমাদের দু’দেশের মধ্যেই এমন কিছু অংশ আছে যারা অব্যাহতভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং তা অব্যাহত রাখে। তাই এটা অত্যাবশ্যক যে, নতুন একটি ভিত্তি তৈরি করতে আমাদেরকে একত্রে কাজ করতে হবে। এর প্রথম পদক্ষেপ হলো, আমাদেরকে আলোচনায় বসতে হবে। পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে হবে। বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে পারে তাহলে জনগণ টু জনগণ সম্পর্ক উৎসাহিত করবে। সার্কের মতো সংগঠনকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিস্তৃত করতে হবে। সমস্ত ক্ষেত্রে বাড়াতে হবে সহযোগিতার হাত।

আবারও মেসি চমক by তালহা বিন নজরুল

আবারও মেসি চমক, আবারও জয় আর্জেন্টিনার। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর হাঁপ ছেড়ে বাঁচা। আর্জেন্টাইন শিবিরের স্নায়ুছেঁড়া উত্তেজনার অবসান ঘটে খেরার যখন বাকি ছিল মাত্র তিন মিনিট। আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণ বিফল হয়ে যাচ্ছিল সুইস রক্ষণভাগে। সবার মধ্যে প্রস্ততি টাইব্রেকারের। এমন সময়ে মাঝমাঠ থেকে সেই মেসির অসাধরণ টান। বল নিয়ে ছুটছেন বিশ্বসেরা তারকা, আটকানোর চেষ্টায় ব্যস্ত একাধিক ডিফেন্ডার। দেরি করলেন না বার্সেলোনার এ তারকা। দেখলেন ডান দিকে দিয়ে ফাঁকায় আছেন রিয়াল মাদ্রিদের ডি মারিয়া। মাপা ক্রস, বল পেয়ে গেলেন ডি মারিয়া। এবার আর মিস করেননি। তার বাম পায়ের তীব্র গড়ানো শট বারের কোনা দিয়ে বেনালিওকে ফাঁকি দিয়ে স্পর্শ করে জালে। আনন্দে শুন্যে লাফিয়ে উঠলেন মারিয়া, সঙ্গে বিশ্বের আনাচে কানাচে থাকা সব আর্জেন্টানইন সমর্থকরাও। ভাষ্যকারের তীব্র আওয়াজ; হোয়াট এ গোল! পারফেক্ট পাস, পারফেক্ট ফিনিশিং। এই খেলায় ডি মারিয়া অন্তত ১২টি শট নেন সুইজারল্যান্ডের গোলে। বিশ্বকাপে সেই ১৯৯৬ সালের পর কোন একটি খেলায় আর্জেন্টিনার একজন খেলোয়াড়ের সর্বাধিক শট। তার খেলায় অনেকে হতাশ হলেও তার অব্যাহত প্রচেষ্টায় কেউ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারবেন না। ইরানের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় খেলায়ও শেষ মিনিটে লিওনেল মেসির দুর্দান্ত গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। গোল খাওয়ার পর সর্বাত্মক আক্রমণে গোল পরিশোধের চেষ্টা করে সুইজারল্যান্ড। সুযোগও পেয়ে গিয়েছিল তারা। একেবারে পোস্টের কাছ থেকে হেড করেছিলেন বদলি খেলোয়াড় ডিজামালি। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার এবং সুইজারলান্ডের। বলটি সাইড বারে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বলটিও তার পায়ে লাগে বটে কিন্তু বাইরের দিয়ে চলে যায়। শেস মুহুর্তে সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষকও আক্রমণে উঠে আর্জেন্টিনার সীমানায় চলে যান। অতিরিক্ত সময়ের তিন মিনিটে ডি মারিয়ার তীব্র গতির একটি শট বেনালিও বাঁদিকে ঝাপিয়ে ডান হাতে পাঞ্চ করে ফিরিয়ে দিয়ে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচান সুইজারল্যান্ডকে। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ছয় খেলার মধ্যে পাঁচটিতেই জিতেছে এর আগে।

সাও পাওলোতে আরেনা করিন্থিয়ান্স-এ  বিশ্বকাপ ফুটবলের দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় আর্জেন্টিনা সুইজারল্যান্ড খেলায় ৯০ মিনিটে কোন দলই গোল করতে না পারায় অতিরিক্তি সময়ে খেলা গড়ায়। এবার দ্বিতীয় পর্বের সাত খেলার মধ্যে চারটিই শেষ হলো অতিরিক্ত সময়ে, যার দু’টি নিস্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। বেশ কয়েকবার গোলের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি। সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ডও। দুই দলের খেলোয়াড়দের ফাউল করে খেলার প্রবণতা খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। আগুয়েরোর পরিবর্তে মাঠে নামেন লাভেজ্জি। ম্যারডোনাকে মাঠে দেখা না গেলেও উপস্থিত ছিলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে। দেখে মনেই হয়নি এই সুইজারল্যান্ড দল প্রথম পর্বে ফ্রান্সের কাছে ৫-২ গোলে হেরেছিল। উল্টো প্রথমার্ধে অন্তত দুটি আসল সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ডই। আর্জেন্টিনা ৪-৩-৩ পদ্ধতিতে আর সুইজারল্যান্ড ৪-৫-১ পদ্ধতিতে খেলা শুরু করে। আর্জেন্টিনার আক্রমণে ডান দিকে ছিলেন লাভেজ্জি। আর বামে ছিলেন হিগুয়াইন। আর মাঝেখানে মেসি স্বয়ং। মাঝমাঠে ডি মারিয়া, সেন্টার মিডফিল্ডে মাসকেরানো আর গাগো ছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা গেছে ডি মারিয়াকে। তিনি অপ্রতিরোধ্য গতি ও শৈলীতে ব্যাতিব্যস্ত রাখেন সুইস রক্ষণভাগকে। তবে এক হিসাবে দেখা ৯০ মিনিটে তার পা থেকে বল বেদখল হয়েছে ৩৭ বার। যদিও শেষ কাজটি করেছেন সেই ডি মারিয়া।
৬৭ মিনিটে মেসি একটা সুযোগ তৈরি করেও সফল হতে পারেন নি। বঙের ওপরে বুক দিয়ে নামিয়ে হাফ ভলি মারেন মেসি। কিন্তু তার তীব্র শটের বল বারের উপর দিয়ে চলে যায়। এর ১০ মিনিট পর বঙের ভেতরে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ঢুকে বাঁ পায়ে তীব্র শট নিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু বেনাগলিও শুয়ে পড়ে তা আটকে দেন। বিরতির পরপরই হিগুয়াইনের তীব্র হেডের বল চমৎকারভাবে বারের উপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন সুইস গোলরক্ষক দিয়েগো বেনালিও। ৩৪ মিনিটে সুইসরা আরেকটি সুযোগ পায় ফি কিক পেলে। কিন্তু শাকিরির বাঁকানো শট রোমেরো ফিরিয়ে দেন। ৩৯ মিনিটের সময় একটা সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন নি সুইস আক্রমণভাগের জসিপ দারমিচ। পাল্টা আক্রমণ থেকে বল পেয়ে ছুটছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনার সব ডিফেন্ডার পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। সামনে কেবল গোলরক্ষক রোমেরো। কিন্তু দ্রুত ধাবমান জসিপ বঙের কোনা থেকে বলটি সোজা তুলে দেন রোমেরোর হাতে। প্রথম ৫ মিনিটে মেসিকে দেখাই যায়নি। আর্জেন্টিনাও শুরু করে বেশ শান্ত ও ধীরে। যেন তাড়াহুড়োর কি আছে। আমরাই তো জিতবো। মেসির আসল টান দেখা যায় খেলা ১৫ মিনিটের সময়। কাগজে কলমে ২০,০০০ আর্জেন্টাইন সমর্থক খেলা দেখতে ঢুকলেও  পুরো গ্যালারি জুড়েই দেখা গেছে তাদের জার্সি। আর্জেন্টাইন সমর্থক হবে প্রায় ৪০,০০০। দু’তিন জায়গায় দেখা যায় লাল জার্সি গায়ে সুইস সমর্থক। তবে আসনসংখ্যা ছিল ৬২৩২২, যার অনেকই শুন্য পড়ে ছিল।

ইরাকে পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা, স্পিকার নির্বাচন হয়নি

ইরাকে জাতিগত সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার নতুন পার্লামেন্টের সম্মিলিত অধিবেশন বসেছে। তবে বর্তমান সংকট নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ফলে পার্লামেন্টে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কয়েকজন সদস্য পার্লামেন্ট থেকে ওয়াকআউটও করেন। এদিকে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ২০০ সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। খবর এএফপি ও রয়টার্সের।
মার্কিন কংগ্রেসের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘বাগদাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, পৃষ্ঠপোষক ব্যবস্থা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও ২০০ সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছি। মার্কিন নাগরিক ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য এসব সেনা মোতায়েন করা হবে। তারা প্রয়োজনে লড়াইয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকবে।’

>>আইএসআইএল জঙ্গিরা ইরাক ও সিরিয়ার অধিকৃত এলাকা নিয়ে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলে সোমবার সিরিয়ার রাক্কার রাস্তায় ট্যাংক নিয়ে উল্লাস করে জঙ্গিরা l রয়টার্স
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, ইরাকে মার্কিন দূতাবাস ও নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য এর আগে পাঠানো সেনাদল গত রোববার বাগদাদে পৌঁছায়। সর্বশেষ আরও সেনা পাঠানোর ফলে তাদের মোট সংখ্যা হবে ৭০০। সুন্নিপন্থী ইসলামিক স্টেট অব দ্য ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্টের (আইএসআইএল) জঙ্গিরা গত তিন সপ্তাহে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকা দখল করে। তারা সেখানে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দিয়েছে।
ইরাকি পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু: গত এপ্রিলে নির্বাচিত পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে গতকাল। বিশ্বনেতারা ও ধর্মীয় নেতারা জঙ্গিসংকট মোকাবিলায় ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেও গতকাল পার্লামেন্টে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তাঁরা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কাজটিও পূরণ করতে পারেননি। পারেননি পার্লামেন্টের স্পিকার নির্বাচন করতে।
এর আগে অধিবেশনে পার্লামেন্টের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার মেহদি আল-হাফিদ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, দেশকে ‘সঠিক’ পথে চালিত করতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা দরকার। ইরাকে এখন যে নিরাপত্তা বিপত্তি দেখা দিয়েছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
দেশকে নৈরাজ্য থেকে রক্ষার জন্য একটি সমন্বিত নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে ইরাকি পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশন শুরু হয়েছে। সুন্নি জঙ্গিরা ইরাকে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। গেরিলা যোদ্ধা আবু বকর আল-বাগদাদিকে ‘খলিফা’ উল্লেখ করে আইএসআইএলের জঙ্গিরা নিজেদের অধিকৃত এলাকায় ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে।
স্বাধীনতার জন্য কুর্দিদের গণভোট হবে: ইরাকের কুর্দি সম্প্রদায় স্বাধীনতার জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই গণভোটে অংশ নেবে। তাদের নেতা মাসুদ বারজানি গতকাল এই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটের জন্য এখনই সঠিক সময়। কারণ, স্বঘোষিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরাকে ইতিমধ্যেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
বারজানি বলেন, ‘কুর্দিস্তানে আমরা গণভোটের আয়োজন করব এবং জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানাব। আমি গণভাটের তারিখ নির্ধারণ করতে পারছি না। অবশ্যই এতে কয়েক মাস লেগে যাবে।’

খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক- অভিযান হতে হবে নিখুঁত

মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে যে কঠোর আইনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উৎসাহজনক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সমস্যা শুধু ফরমালিনই নয়, খাদ্যে আরও অনেক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়, যা বন্ধ করতে না পারলে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি দিনের পর দিন বাড়তেই থাকবে। ফরমালিন বন্ধের কথা নিরাপদ খাদ্য আইনের (২০১৩) ২৩ ধারায়ও আছে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য, যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, সোডিয়াম সাইক্লামেট, ডিডিটি বা পিসিবি তেল প্রভৃতি কীটনাশক বন্ধের কথাও সেই আইনে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আইন কেবল খাতায় থাকাই কি যথেষ্ট? বাস্তবে এর ফলপ্রসূ প্রয়োগ না হলে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে মানুষ নিশ্চয়তা পাবে না।
পুলিশ অবশ্য বসে নেই। সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে অনেক আম ধ্বংস করেছে। কিন্তু এ সময় জানা গেল, আম, লিচু ও আপেলের ছয়টি নমুনা পরীক্ষা করে বিএসটিআই ফরমালিন পায়নি। এক মাস আগের এ পরীক্ষার ফলাফল যাচাই-বাছাইয়ের আগেই পুলিশের অভিযানে বোঝা যায়, সরকারের অন্তত এ দুটি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ আশ্বস্ত হবে কীভাবে? আর বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় ফরমালিন ধরা না পড়লেও নির্লিপ্ত থাকা যাবে না। আজ নেই, কাল যে থাকবে না, তার কী নিশ্চয়তা আছে? স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো বন্ধের জন্য যা কিছু করা দরকার, করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী দেশে বিভিন্ন রাসায়নিক পরীক্ষাগারে, আসবাবশিল্পে ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট কাজে ফরমালিন ব্যবহারের চাহিদা মাত্র ১০০ টন, অথচ দেশে আমদানি করা হয় ৫০০ টন। এ ছাড়া বিভিন্ন নামে হাজার হাজার টন ফরমালডিহাইড আমদানি হয় বলেও খবর পাওয়া গেছে।এক শ্রেণির অসাধু আমদানিকারক অতিরিক্ত ফরমালিন আমদানি করে খোলাবাজারে ছাড়ে বলেই এর অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তাই আমদানি পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে যেসব রং ব্যবহার করা হয়, তা স্বাস্থ্যসম্মত কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা দরকার। অতিমুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যে নির্বিচারে আসবাবে ব্যবহারের রং মেশায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে আইন প্রয়োগ করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। একবার নকল ওষুধ ধরতে গিয়ে মিটফোর্ডে ওষুধের পাইকারি বাজারে শুরু হয় ধর্মঘট। এবার আমে ফরমালিন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় হলো ফলের বাজারে ধর্মঘট। এ রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি কাম্য নয়। আইনের প্রয়োগ হতে হবে নিখুঁত। একদিকে যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন, অন্যদিকে এমন কড়া নজরদারি থাকতে হবে, যেন ফরমালিন বা অন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর সময় হাতেনাতে অপরাধীদের ধরা যায়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণসহ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে কারও কোনো আপত্তি থাকবে না। বাড়াবাড়ির কারণে অভিযান ব্যর্থ হলে ফরমালিনের অপব্যবহারকারীরাই উৎসাহিত হয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।

ক্ষমতার তোরণ থাকবে, আইন থাকবে না?- সাংসদ কামাল মজুমদার

সাংসদ যা করবেন, তা-ই কি আইন? মিরপুরের সরকারদলীয় সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদারের আচরণে সেটাই প্রতীয়মান হয়। সড়কে অবৈধভাবে নির্মিত কিছু তোরণ পুলিশ সরিয়ে ফেলায় তিনি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের অপসারণ দাবি করেছেন। এমনকি মিরপুরের একটি সড়ক অবরোধও করে রেখেছিল তাঁর লোকজন। সড়কে তোরণ নির্মাণ এবং তা অপসারণের মধ্যে যে কাজটি অবৈধ হয়েছে, আমরা তার শাস্তি দাবি করি।
একজন আইনপ্রণেতা যদি আইন ভঙ্গ করে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির তোরণ নির্মাণ করেন, তাহলে সেই আইনপ্রণেতাকে কি আইন ছাড় দেবে? তিনি শুধু অবৈধ তোরণ নির্মাণের নির্দেশই দেননি, পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছেন।জনগণের ভোগান্তি রোধে তিনটি তোরণ অপসারণের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে জনগণের আরও ভোগান্তি ঘটিয়েছেন।আইনে এ ব্যাপারে অস্পষ্টতা ও রহস্য নেই। সুস্পষ্টভাবেই সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার দুই দফায় আইন লঙ্ঘন করেছেন।একবার তোরণ নির্মাণ করে, দ্বিতীয়বার সড়ক অবরোধ করে।তিনি যদি সঠিক হন, তাহলে পুলিশ ভুল।আর পুলিশ যদি সঠিক কাজ করে থাকে, তাহলে অবশ্যই কামাল আহমেদ মজুমদার আইনের চোখে দোষী।এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী করবে?
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে হাজার হাজার তোরণ, ফেস্টুন, ব্যানার, বিলবোর্ড, পতাকা ইত্যাদি তৈরি করা হয়। প্রায় সব সড়ক ও সড়কের মোড়ে এগুলো স্থাপনও করা হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হওয়ার পাঁচ-ছয় দিন পরও এগুলো রাখার কোনো প্রয়োজন ছিল না। চোখের যন্ত্রণার কথা বাদই থাক, রাস্তার ওপর তোরণ বানানো হলে যান চলাচলে অসুবিধা হয়। ঢাকার অসহনীয় যানজটকে তা আরও দুঃসহ করে তোলে। এসবের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের কোনো সুযোগই নেই। মাত্র একটি ক্ষেত্রে (মিরপুরে) পুলিশের দায়িত্ব পালনে যে বাধা আসে, তা বুঝিয়ে দেয় যে এই বাংলাদেশে আইনের নিজের গতিতে চলার অবস্থা নেই।
কামাল আহমেদ মজুমদার পুলিশ ও জনগণের বিরুদ্ধে যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, এর আইনানুগ বিহিত না হলে পুলিশের পক্ষে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

এখনো বিবিসি ভরসা- বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক by আলী ইমাম মজুমদার

বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের জন্য বিবিসির (ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন) ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আছে। ১৯২২ সালে এক রাজকীয় সনদের মাধ্যমে এ বিধিবদ্ধ সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়, ক্রমান্বয়ে এর কলেবর বাড়ে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীনতার পক্ষশক্তির জন্য তথ্যনির্ভর খবরের বড় উৎস ছিল বিবিসি। শুধু শহর-নগরে নয়, গ্রাম-গ্রামান্তরেও সমাদৃত হয়েছে বিবিসির সংবাদ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে জোরদার করার মনোবলে প্রভূত ইতিবাচক অবদান রেখেছে। স্বাধীনতার পরেও সময়ে সময়ে এর খবরই শুনতে হতো আমাদের। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও বিবিসি ছিল বস্তুনিষ্ঠ খবরের প্রধান উৎস। শাসকের রক্তচক্ষু স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর উপেক্ষা করার সুযোগ ছিল খুবই কম। আর বেতার-টিভি ছিল সরকারি। তাই বিবিসিই ভরসা। বিশেষ ক্ষমতা আইনবলে সংবাদপত্র বন্ধ করার বিধানটি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে স্থায়ীভাবে রদ করে গেছেন। ১৯৯৬-এর পর বেসরকারি টিভি চ্যানেল আসতে শুরু করে। খবর প্রচারে সীমাবদ্ধতা ক্রমান্বয়ে কেটে আসছে। কিন্তু পুরোপুরি যে কাটেনি তাও মাঝেমধ্যে দেখা যায়।

কয়েক দিন আগে হঠাৎ করে দু-একটি সংবাদপত্র বিবিসি বাংলার সূত্রে খবর দিল, ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরায় ১০ হাজার টন চাল-গম পাঠাতে ট্রানজিট দিয়েছে বাংলাদেশ। এ দেশের নৌপথ ও আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে এ খাদ্যশস্য ৪৫ কিলোমিটার সড়কপথ পেরিয়ে আগরতলা যাবে। ত্রিপুরার খাদ্য ও গণবণ্টন দপ্তরের মুখ্য সচিবের বক্তব্য উল্লেখ করে বিবিসি খবরটি প্রচার করে। ভারতীয় পক্ষ আশা প্রকাশ করেছে এ ব্যবস্থা সফল হলে এভাবেই ত্রিপুরায় যাবে ভারতের অন্য অঞ্চলের পণ্যসামগ্রী। এ প্রক্রিয়ায় ট্রানজিট ফি বা অন্য কোনো মাশুল নেওয়া হবে কি না, এর কোনো জবাব দেয়নি ভারতীয় পক্ষ। ত্রিপুরায় চাল-গমের চালান পাঠানোতে বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহারে নীতিগত কোনো আপত্তি তেমন কেউ করার কথা নয়। তবে এ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের সম্পূর্ণ নীরবতা প্রক্রিয়াটিকে অস্বচ্ছ আর প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। অতীতেও ত্রিপুরায় পণ্যসামগ্রী ট্রানজিটে একই পথে একই ধরনের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। আর এরূপ হতে থাকলে অকারণ সন্দেহ আর বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ট্রানজিট কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। একটি সার্বভৌম অধিকারের ওপর অন্যকে শরিকদার করতে দেশের জনগণকে সুস্পষ্টভাবে জানানো দরকার।
ত্রিপুরা আমাদের অতি নিকট প্রতিবেশী একটি ছোট ভারতীয় রাজ্য। ১৯৭১ সালে এর লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ১৫ লাখ। সে সময়ে এ রাজ্য বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১৬ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। এ বিবেচনায় ত্রিপুরাবাসী বাংলাদেশের কাছে কিছু বেশি দাবি করতেই পারে।বাংলাদেশও এ বিষয়ে সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছে সময়ে সময়ে। আগে একবার খাদ্যশস্যের চালান গেছে বিনা মাশুলে।গেছে সে রাজ্যে ৭৬৩ মেগাওয়াট একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অতি ভারী মালামাল। এসব মালামাল দুর্গম পাহাড়ি পথে আনা প্রায় অসম্ভব ছিল। ২০১১ সালে সহযোগিতার হাত বাড়াল বাংলাদেশ।এ ধরনের ওভার ডাইমেনশনাল বিপুল পরিমাণ কার্গো পার করার জন্য কয়েকটি বিকল্প রাস্তা করা হয়। আখাউড়া রেলসেতু-সংলগ্ন স্থানে তিতাস নদের মূল স্রোতোধারায় বাঁধ দিয়ে ৪৫০ মিটার রাস্তাও নির্মিত হয়। কয়েক মাসব্যাপী চলে বিনা মাশুলে এ মালামাল পারাপারের কাজ। ২০১৩ সালের জুনে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হয়।অতিসম্প্রতি সুষমা স্বরাজের সফরকালে সিদ্ধান্ত হয়েছে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে পারবে।সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক।
এখানে উল্লেখ করা যায় যে আশুগঞ্জ থেকে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার দূরত্ব ৪৫ কিলোমিটার। আর কলকাতা থেকে গুয়াহাটি হয়ে এর দূরত্ব এক হাজার ৬৫০ কিলোমিটার। এমনকি স্থলপথেও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। তাহলে সহজে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করলে ত্রিপুরায় পণ্য পরিবহন ব্যয় ও সময় অনেকাংশে কমে যাবে। অন্যদিকে এ দেশের রাস্তা, বন্দর ও নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়তে থাকবে। নৌপথে জলযানের নির্গত বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি করবে। বাংলাদেশের কিছুটা প্রশাসনিক ব্যয়ও হবে। এসব দিক বিবেচনায় বেঁচে যাওয়া খরচের একটি অংশ ট্রানজিটের মাশুল হিসেবে ধার্য করা অত্যন্ত যৌক্তিক।শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে দু-একবার বিনা মাশুলে যেতে দেওয়া যায়। কিন্তু এ রকমই চলতে থাকা অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক।বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। তবে এটাও চায় যে তা হবে ন্যায্যতা ও বাস্তবতার আলোকে। ত্রিপুরার বিদ্যুৎ আমাদের বাজারমূল্য দিয়েই কিনতে হবে। তাই স্বাভাবিক। এ দুর্লভ জিনিস ভারত দিচ্ছে, তার জন্য আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞ। ঠিক তেমনি ট্রানজিটও একটি বিরল সুযোগ। এর বাজারমূল্য নির্ধারণ খুবই কঠিন। তবে খোলা মনে বাস্তবতার আলোকে আলোচনার মাধ্যমে একটি ন্যায়সংগত মাশুল ধার্য করতে আর বিলম্ব করা উচিত নয়। তদুপরি বৃহত্তর পরিসরে তা করতে হলে আগে অবকাঠামো জোরদার করা অত্যাবশ্যক।
এমনিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন আছে। উভয় দেশে এমন কিছু লোক আছে, যারা দেশ দুটোর মাঝে ভালো সম্পর্কের প্রতিকূলে থাকে। সুযোগ পেলেই তারা মাঠে নেমে পড়ে।বৃহৎ শক্তিশালী এ প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। ঠিক তেমনি সাতটি পার্বত্য রাজ্যের মধ্যে ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশও ভারতের কাছে একইভাবে প্রাসঙ্গিক।১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি কার্যকর করতে কিছু আইনি ব্যবস্থা ৪০ বছরেও নেওয়া হয়নি। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টনের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। এর একটি তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও চূড়ান্ত হয়ে তিন বছর ঝুলে আছে। সীমান্তে তুচ্ছ কারণে ভারতীয় রক্ষী বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা করছে। পৃথিবীর অনেক দেশের নাগরিক ভারতে পৌঁছে ভিসা নেওয়ার সুবিধা পান। কিন্তু যাঁরা সেটা পান না, তাঁদের মধ্যে আমরাও আছি। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি এ বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন নতুনভাবে। তাঁদের সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এল। আমরা আশা করতে থাকব, তাঁরা সমস্যাগুলোর প্রতি দ্রুত মনোযোগ দেবেন। অবশ্য সাম্প্রতিককালে ভারত থেকে আমরা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে পারছি। ত্রিপুরা থেকে আরও ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার আশ্বাস মিলেছে। কিন্তু মূল সমস্যাগুলো সমাধানে বারবার আশ্বাসের অতিরিক্ত আর কিছুই মিলছে না। তা সত্যেও আমরা চাই, দুটো দেশের মাঝে সম্পর্ক জোরদার হোক। কেটে যাক সব বিঘ্ন। এবারের সুষমা স্বরাজের সফরের পর উভয় পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে একটি চমৎকার সূচনা হয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের। সূচনা শুভ হোক, এ প্রত্যাশা রইল।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে বড় দেশ। সুতরাং প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব বেশি। সহযোগিতার ডালি নিয়ে তাদেরই এগিয়ে আসার কথা। ভারতের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দর কুমার গুজরাল প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে পাঁচ দফার একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর নীতিগুলো সমন্বিতভাবে গুজরাল ডকট্রিন নামে পরিচিত। এর প্রথম দফাটাই হচ্ছে ভারত তার প্রতিবেশীকে যতটুকু পারে দিয়ে যাবে। এর জন্য পারস্পরিক লেনদেনের কোনো বিষয় থাকবে না। সজ্জন এ প্রয়াত নেতার বাস্তবধর্মী নীতি ভারতের সরকারগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই অনুসরণ করে। বরং আমরা ছোট প্রতিবেশী হয়েও পারস্পরিক লেনদেনের ধার না ধেরেই যতটুকু পারি তা দিয়ে যাচ্ছি। গুজরাল ডকট্রিনের দ্বিতীয় তত্ত্বটি হচ্ছে, কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশ তার ভূখণ্ডকে অন্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে ক্ষতিকারক কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেবে না। অতীতে যা-ই হোক, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ অবিচলভাবে এ নীতি অনুসরণ করছে।
বাংলাদেশ সরকারের ভারতনীতি বিশেষ করে ট্রানজিটের ব্যাপারে জনমনে তেমন নেতিবাচক কোনো মনোভাব নেই। কিন্তু সংশয় দেখা দেয় যখন এসব সিদ্ধান্ত হয় অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। মালামাল পরিবহনের জন্য বারবার কোনো মাশুল না নেওয়ার নীতিও প্রশ্নবিদ্ধ। এ-বিষয়ক চুক্তি বা সম্মত যৌথ কার্যবিবরণী হওয়ার খবর সরকার আমাদের গণমাধ্যমকে সরাসরি দেয়নি। এটা বিস্ময়কর ঠেকে যখন এ খবর পেতে আমাদের বিবিসির ওপরই ভরসা করতে হয়।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

‘বিহারি’সহ সব সংখ্যালঘুর কাছে ক্ষমা চাই by মহিউদ্দিন আহমদ

গত শবে বরাতের রাতের পরদিন ১৪ জুন সকালে মিরপুরের কালশী বিহারি ক্যাম্পে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ওপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং টিভি-রেডিওতে যত সব খবর এবং প্রথম আলোতে সৈয়দ আবুল মকসুদ ও ফারুক ওয়াসিফসহ আরও কয়েকটি পত্রিকায় যেসব সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় লিখেছেন, তাতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সবার কাছে আমার একটিই কথা: ক্ষমা করুন। যে মোহাম্মদ ইয়াসীনের স্ত্রী, তিন ছেলে, তিন মেয়ে ও এক নাতিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তাঁর কাছে এই সহজ-সরলÿ ক্ষমা প্রার্থনা যে একেবারেই, যথেষ্ট নয়, তা আমি নিশ্চিত জানি। আমার বা আমাদের যে কারও পরিবারে এমন, শুধু একজনের এমন, নৃশংস হত্যা আমাদের বিপর্যস্ত করে দেয়, সেই জায়গায় একজন মো. ইয়াসীনের এতজনের মৃত্যু—নারী, শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীকে পুড়িয়ে মারা—সেই মানুষটিকে আমার দেখার তীব্র ইচ্ছা হয়েছিল, কিন্তু আমি সাহস করে উঠতে পারিনি। আমি একজন বাঙালি, বাংলাদেশি—আমাকে দেখে তাঁর ক্ষোভ বা আক্রোশের কথা বলছি না, আমার দিকে করুণ দৃষ্টি দিয়েও তিনি যদি তাকান আর সেই চাহনিতে নিশ্চয়ই তাঁর এই আকুতিটুকু তো থাকবে—আমি, আমরা ‘বিহারি’ বলেই আমাদের ওপর এমন হত্যা, নির্যাতন, অপমান, বিচারহীনতা, তখন আমি কী জবাব দিতে পারি? বাংলাদেশে আমরা কয়েক লাখ সংখ্যালঘু অবাঙালি ‘বিহারি’কে সহ্য করতে পারছি না, অথচ পাকিস্তানের বাসাবাড়িতে কাজ করে এমন কয়েক লাখসহ কয়েক গুণ বেশি বাংলাদেশি এখনো পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে নিম্নমানের কাজ করে যাচ্ছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জেনেছি।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে দূরের লন্ডন থেকে একটু সম্পৃক্ত ছিলাম বলে অপরাধবোধটা বেশি মনে হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বল করে। আমার এই স্মৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে দুটি নাম, পল কনেট এবং ইলিন কনেট; তখন তাঁরা তরুণ এক দম্পতি। স্কুলশিক্ষক পল কনেট, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পক্ষে সার্বক্ষণিক ভিত্তিতে কাজ করার জন্য পল কনেট তাঁর চাকরিই ছেড়ে দিলেন—চাকরি ছেড়ে দিয়েছিেলন ইলিনও। এই ইলিন ’৭১-এর আগস্টে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বাংলাদেশের যশোর বর্ডার দিয়ে ঢোকার সময় ধরা পড়েলন এবং দীর্ঘমেয়াদি জেল দণ্ডে দণ্ডিতও হলেন। তখনই জানা গেল তাঁর গর্ভে বাচ্চা। ইলিন মুক্তি পেেলন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর।
এই পল কনেট দম্পতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে ম্যারিয়েটা—ম্যারিয়েটা প্রকোপে। দীর্ঘাঙ্গী, সুন্দরী অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্রী, ’৭১-এ তাঁর লন্ডনের বাড়িটিই দিয়ে দিয়েছিেলন ম্যারিয়েটা, যেখানে স্থাপিত হলো কনেট দম্পতির ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’-এর অফিস—বেশির ভাগ ব্রিটিশকে নিয়ে একটি সংগঠন। এই ম্যারিয়েটা আত্মহত্যা করেলন বাংলাদেশ থেকে ঘুরে গিয়ে ১৯৭২-এর প্রথম দিকে। ম্যারিয়েটাকে নিয়ে আমার কয়েকটি লেখার একটি ছাপা হয়েছিল এই প্রথম আলোতে, কয়েক বছর আগে, এক ডিসেম্বরে।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুদের শেখ হাসিনার আগের সরকার সম্মাননা দিল কয়েক দফায়, কিন্তু পল কনেট বা তাঁর স্ত্রীকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ব্যর্থতা ও হতাশাটা আমার বেশি মনে হচ্ছিল। কারণ, ’৭১-এ আমরা ঘনিষ্ঠ ছিলাম এবং আমাদের সরকারের গঠিত সম্মাননা কমিটির একজন সদস্য আমিও।
তারপর হঠাৎ সৌভাগ্য আমাদের। কয়েক বছর আগে, ‘অব অল প্লেসেজ’, কানাডায় এক ট্রেন জার্নিতে পল কনেটকে আবিষ্কার করলেন লে. জেনারেল হারুন–অর–রিশদ, আমাদের এক সাবেক সেনাপ্রধান। তাঁদের সম্মাননা জানানো হলো সিরিজের শেষ অনুষ্ঠানটিতে গত অক্টোবরের প্রথম দিকে। তখন পল ও ইলিন কনেটের আগ্রহে তাঁদের দেখিয়ে আনা হলো যশোর জেলও, যেখানে ইলিন জেল খেটেছেন।
আমাদের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মানিক, ব্যবসায়ী শিল্পপতি আবদুল মজিদ চৌধুরী, একাত্তরে যুক্তরাজ্যে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের প্রধান এ জেড মোহাম্মদ হোসেন এবং একাত্তরের লন্ডনে আমাদের ‘ফকির সমিতি’র সদস্যরা পল কনেট ও ইলিনকে সংবর্ধনা দিলেন এক সন্ধ্যায় ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে, যেখানে ১৯৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। আমি এই সংবর্ধনায় থাকতে পারিনি। কারণ, জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসেবে আমি তখন আলাদাভাবে নিউইয়র্কের পথে প্লেনে। তবে পরে, গত বছরের ৬ অক্টোবরের প্রথম আলোতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাঁদের জন্য দেওয়া আরেক সংবর্ধনায়, এখন প্রবীণ, এই যুগলের ছবিসহ ‘তারা বাংলাদেশের বন্ধু’ শিরোনামের খবরটি নিউইয়র্কে ইন্টারনেটে পড়েছি।

তিন.

এই পল কনেট ’৭২-এর ফেব্রুয়ারি কি মার্চের এক সকালে আমাকে টেলিফোন করলেন। আমাদের হাইকমিশন তখন নটিংহিল গেটের ২৪ পেমব্রিজ গার্ডেনে, এখন যেটি বাংলাদেশ সেন্টার।
পলের কণ্ঠ গম্ভীর, গত কয়েক মাসের পরিচিত ‘চিয়ারফুলনেস’-এর অভাব, তাঁকে বিচলিত মনে হচ্ছিল। বলেলন, মহিউদ্দিন, তোমাদের ওপর পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদে আমার ও ইলিনের ভূমিকা তুমি সম্যক অবহিত। মার্চের প্রথম থেকে আমরা বরফ, তুষারপাতেও লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে মোমবাতি হাতে ‘ভিজিল’ দিয়েছি। এখন মনে হচ্ছে, তোমাদের হাইকমিশনের সামনেও আমাদের দুজনকে ‘ভিজিল’ দিতে আবার আসতে হবে। আমাকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে তিনি বলতে থাকেলন, ব্রিটিশ পত্রপত্রিকা এবং টিভি-রেডিওতে খবর পাচ্ছি, খুলনাতে বিহারিদের ওপর তোমাদের বাঙালিরা খুন ও নির্যাতন শুরু করেছে। পল কনেট আরও বলতে থাকেলন, আমরা কিন্তু সব গণহত্যা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে। আমরা বাঙালিদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে ছিলাম, আমরা বাংলাদেশে সব অবাঙালি, বিহারিদের ওপর হত্যা, নির্যাতনের বিরুদ্ধেও থাকব।
পল কনেটকে সাক্ষাৎ করার জন্য দুপুরে মরহুম তসাদ্দুক আহমেদের পিকাডিলির ‘গঙ্গা’ রেস্টুরেন্টে লাঞ্চের দাওয়াত দিলাম। বললাম, তখন আরও কথা বলা যাবে। আর দ্রুত নতুন ডেপুটি হাইকমিশনার ফারুক চৌধুরীকে বিষয়টি জানালাম। পল কনেটকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বা হয়তো আমার ওপর আস্থার অভাবের কারণে ফারুক চৌধুরী বিষয়টা ‘টেক-ওভার’ করলেন, পল কনেটকে তিনিই লাঞ্চে দাওয়াত দিলেন এবং সেদিনের মতো পল কনেটকে সামাল দিলেন।

চার.

মুক্তিযুদ্ধ অর্জিত বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘুর ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ হবে—এমন তো কথা ছিল না। বাংলাদেশে যে এখন কোনো সংখ্যালঘুই নিরাপদ নয়। বুঝলাম, বিহারিরা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু যে বাংলাদেশের জন্য হিন্দু সংখ্যালঘুরা এমন দুর্ভোগ পোহাল ’৭১-এ, তারা কি নিরাপদে, শান্তিতে আছে? শান্তিতে কী আছে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা, আহমদিয়ারা? বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘুই কি শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপদে আছে?
আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না, সেদিন বিকেলে গণভবনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর চীন সফরের অর্জন এবং সাফল্যের ওপর প্রেস কনফারেন্স করলেন; কিন্তু মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, তাঁর গণভবন থেকে মাত্র দুই মাইল দূরে, একটি পরিবারের নয়জনকে এমনভাবে পুড়িয়ে মারা হলো, আর তিনি সমবেদনার একটি হরফও উচ্চারণ করলেন না!! যাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে তারা যদি পৈতৃক সূত্রে বিহারি অবাঙালি হয়েও থাকে, তারা কি মানুষ নয়? তাদের জন্য কি সহানুভূতি-সমবেদনা থাকতে নেই?
বিহারিরা, অবাঙালিরা ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে; তো চীনারাও তো প্রবলভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। ইয়াহিয়া খানকে দেওয়া তাদের অস্ত্র দিয়ে কত হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। চীনের ভেটোর কারণেই তো আমরা ’৭২-এ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারলাম না। আর চীন তো বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় স্বীকৃতি দিলই না। স্বীকৃতি দিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ১৫ দিন পর, ৩১ আগস্ট, ১৯৭৫-এ; স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর তালিকার সর্বশেষ দেশ হিসেবে। চীনের আমরা এখন এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, চীনের সব অতীত অপরাধ আমরা মাফ করে দিতে পারলাম। আর যারা ’৭১-এ জন্মায়নি বা শিশু ছিল, তাদের কেন পুড়িয়ে, গুলি করে মারা হচ্ছে!
মিরপুরের এসব ঘটনার জন্য অভিযুক্ত মিরপুরের সাংসদ ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ কয়েক বছর আগে পুলিশ সার্জেন্ট শরিফুল ইসলামকে মারধর করেছিলেন। শরিফুল ইসলামের অপরাধ, ইলিয়াস মোল্লাহর রাস্তায় আটকে থাকা গাড়িটি বের হওয়ার জন্য অন্য সব গাড়িকে সরিয়ে রাস্তা করে দেননি। তখন ইলিয়াস মোল্লাহকে আসামি করে যখন এই পুলিশ সার্জেন্ট থানায় মামলা করলেন, তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন মন্তব্য করেছিলেন—মামলা করতে গেলেন কেন তিনি। আমাদের বললেই তো মীমাংসা করে দিতাম। কী তামাশাই না করলেন সাহারা খাতুন!
মহিউদ্দিন আহমদ, সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

মোজাম্বিকে গণতন্ত্রের সংগ্রাম by মশিউল আলম

তাঁর মুখে সব সময় লেগে আছে অমায়িক হাসি৷ শনিবার বিকেলে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ‘দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট’ নামের এক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অনুষ্ঠানে তিনি যখন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কষ্টকর যাত্রার কথা বলছিলেন, তখনো তাঁর মুখে লেগে ছিল হাসি৷ হাসিমুখে তিনি বলছিলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন৷ গণতন্ত্র শুধু রাজনৈতিক দলের ব্যাপার নয়, শুধু নির্বাচন নয়, শুধু মিছিল, জনসভা, বিক্ষোভ-প্রতিবাদের অধিকারচর্চা করা নয়৷ গণতন্ত্র আরও অনেক বড় বিষয়৷ যে সমাজে মানুষের মনে গণতান্ত্রিক বোধ নেই, যেখানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গণতন্ত্র নেই, যেখানে মেয়েরা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না বা নিতে পারে না, সেই সমাজে গণতন্ত্র হয় না৷

>>জোয়াকিম শিজানো, মোজাম্বিকের সাবেক প্রেসিডেন্ট
তিনি জোয়াকিম শিজানো, ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন৷ তারও আগে ছিলেন পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মোজাম্বিককে মুক্ত করার লড়াই-সংগ্রামের অন্যতম নেতা৷ গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মোজাম্বিকান হিসেবে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার জন্য গিয়েছিলেন পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে৷ কিন্তু উপনিবেশবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে পড়াশোনা শেষ না করেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তানজানিয়ায়৷ সেখানে জড়ো হয়েছিলেন তাঁরই মতো আরও অনেক মোজাম্বিকান তরুণ-যুবক৷ তানজানিয়ার দারুস সালামেই ১৯৬২ সালে তাঁরা গঠন করেন ফ্রন্ট ফর লিবারেশন অব মোজাম্বিক (ফ্রেলিমো) নামের একটি সংগঠন, যার লক্ষ্য ছিল মোজাম্বিক থেকে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শোষণ-নিপীড়নের অবসান ঘটানো, একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে মোজাম্বিককে গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের ওপর মানুষের কোনো শোষণ-নির্যাতন থাকবে না, থাকবে না দারিদ্র্য, অনাহার, অশিক্ষা, অপুষ্টি৷ এক দশকের বেশি সময় ধরে ফ্রেলিমোর গেরিলারা পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান৷ একই সময়ে অ্যাঙ্গোলা, গিনি-বিসাউ, রোডেশিয়া (জিম্বাবুয়ে) দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আশপাশের দেশগুলোয় চলছিল উপনিবেশবিরোধী, শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনবিরোধী মুক্তিসংগ্রাম। ১৯৭৪ সালে পর্তুগালে এস্তাদো নভোর স্বৈরশাসনের পতন ঘটার পর ১৯৭৫ সালে মোজাম্বিক ও অ্যাঙ্গোলা থেকে পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসকদের বিদায় নিতে হয়। একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে মোজাম্বিক রাষ্ট্রের। কিন্তু শুরু হয় অভ্যন্তরীণ সংকট ও সহিংসতা, তা চলে পরবর্তী দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে।
সদ্য স্বাধীন মোজাম্বিকের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান ঘটে ফ্রেলিমোর। সংগঠনটি ইতিমধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলের রূপ নেয়। প্রথম প্রেসিডেন্ট সামোরা মাশেলের নেতৃত্বে শুরু হয় দেশগঠন, জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার পালা। রাজনৈতিক আদর্শ ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে ফ্রেলিমো বেছে নেয় সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক ধারা। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও কিউবাসহ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশগুলো তাদের প্রতি বাড়িয়ে দেয় সমর্থন-সহযোগিতার হাত। কিন্তু বিরুদ্ধতা ও বৈরিতা শুরু হয় বিতাড়িত ঔপনিবেশিক শাসকেরাসহ পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোর তরফ থেকে। মোজাম্বিক ও অ্যাঙ্গোলার সমাজতন্ত্র-অভিমুখী যাত্রায় বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যান দক্ষিণ আফ্রিকা ও রোডেশিয়ার সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী দক্ষিণপন্থী শাসকেরা। অ্যাঙ্গোলা ও মোজাম্বিকের অনুসরণে ওই দেশ দুটিতেও কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠদের শোষণমুক্তির আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে মোজাম্বিকে ফ্রেলিমো জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা ও দেশগঠনের প্রয়োজনে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ও ব্যাপক জাতীয়করণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। প্রেসিডেন্ট সামোরা মাশেল একদলীয় শাসনব্যবস্থা জারি করেন, পশ্চিমা ধারার বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পথ পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা ও রোডেশিয়ার বর্ণবাদী শাসকদের মদদে মোজাম্বিকে ফ্রেলিমো সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হয় প্রবল প্রতিরোধ। অচিরেই তা সহিংস রূপ ধারণ করে এবং ১৯৭৭ সালে শুরু হয় এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। পরবর্তী ১৬ বছর ধরে সহিংসতা ও অনাহারে প্রাণ হারায় ১০ লাখের বেশি মানুষ, বাস্তুচ্যুত হয় ৫০ লাখ। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, বেড়ে যায় দারিদ্র্য, অনাহার, অপুষ্টি। স্বাধীনতার স্বপ্ন পরিণত হয় এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। সুখী-সমৃদ্ধ, শান্তিময় ও সমতাপূর্ণ দেশ গঠনের স্বপ্ন হয়ে যায় সুদূরপরাহত।
সেদিন জোয়াকিম শিজানোকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনারা একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্তটি নিয়ে যে ভুল করেছিলেন, তা কি এখন উপলব্ধি করেন?’ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে তিনি বললেন, ‘না, ওটা কোনো ভুল ছিল না। ওটা ছিল ওই সময়ের বাস্তবতা। একদলীয় শাসন পশ্চিমা প্রচারযন্ত্রের দেওয়া নাম। আসলে মোজাম্বিকে তখন ফ্রেলিমো ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দলই তো ছিল না। ফ্রেলিমোই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন, যা মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছিল। বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা বলা যায় তখন, যখন অনেকগুলো রাজনৈতিক দল থাকে। মোজাম্বিকে তা ছিল না।’
কিন্তু তাহলে ফ্রেলিমো সরকারের বিরুদ্ধে যারা গৃহযুদ্ধ শুরু করেছিল, তারা কারা? কী চেয়েছিল তারা?
এই প্রশ্নের উত্তরে শিজানো বলেন, ‘ওটা গৃহযুদ্ধ ছিল না। পশ্চিমা প্রচারযন্ত্র ওটাকে গৃহযুদ্ধ বলে। আমরা বলি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যুদ্ধ। গৃহযুদ্ধ বাধে ঘরের ভেতরে, নিজেরাই যখন পরস্পরকে হত্যা করে। কিন্তু আমাদের দেশে ওটা শুরু করা হয়েছিল বাইরে থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকা আর রোডেশিয়ার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার সেটা করেছিল। তারাই রেনামো (মোজাম্বিকান ন্যাশনাল রেজিস্টেন্স) সৃষ্টি করেছিল, তাদের অর্থ ও অস্ত্র জুগিয়েছিল, প্রশিক্ষণ দিয়েছিল এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়েছিল।’
স্নায়ুযুদ্ধের সেই যুগে মোজাম্বিক যে একটা প্রক্সি যুদ্ধের কবলে পড়ে গিয়েছিল, শিজানোর কথায় তা আবারও স্মরণে আসে। তাঁকে বললাম, একইভাবে ফ্রেলিমো পেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন-সহযোগিতা। জানতে চাইলাম, মোজাম্বিকের ওই ভ্রাতৃঘাতী ‘গৃহযুদ্ধ’ বা ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যুদ্ধ’ যে আসলে ছিল দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার দুই শিবিরের মধ্যকার লড়াইয়েরই একটা অংশ, সে কথা ভেবে আজ তাঁর কী অনুভূতি হয়। তিনি বললেন, অতীত নিয়ে তাঁর ও তাঁর সহযোদ্ধাদের কোনো আক্ষেপ-অনুশোচনা নেই। ভুলভ্রান্তি নিশ্চয়ই হয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতির ফেরে সেগুলো হয়তো অনিবার্য ছিল। ‘স্বাধীনতার পরে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের কাছেও সমর্থন-সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সমর্থন দেয়নি। আমাদের মুক্তি আন্দোলন ছিল তাদের স্ট্যাটাস কোর জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক শিবির আমাদের সমর্থন-সহযোগিতা দিয়েছিল। কিন্তু সে জন্য আমরা তাদের বশংবদ হয়ে চলিনি। তারা পিরিস্ত্রোইকা শুরু করার আগেই আমরা আমাদের সংস্কার শুরু করেছি। কারণ আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, সোভিয়েত স্টাইলের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে অনেক দুর্বলতা আছে। আমরা বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেছি সোভিয়েতদের আগেই।’
জানতে চাইলাম, ‘গৃহযুদ্ধ’ বা ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যুদ্ধ’ শেষ হলো কীভাবে? শিজানো বললেন, ‘সেটা ছিল ভীষণ কঠিন এক কাজ। সহিংসতা চলেছে কত বছর ধরে! হানাহানির মধ্যে যে শিশুর জন্ম হয়েছে, সে এখন তরুণ। হয়তো তার বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি। এখন তাকে যদি বলি, তোমার বাবাকে যারা মেরে ফেলেছে, তাদের ক্ষমা করে দিতে হবে, তুমি কি রাজি? কে রাজি হয়, বলুন? কেউ মানে না আমাদের কথা। কাউকেই বোঝানো যায় না যে ক্ষমা করতে হবে, আবার মিলেমিশে একসঙ্গে বসবাস করতে হবে। নইলে শান্তি আসবে না, ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর হবে না। দু-তিন বছর ধরে আমরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করি এবং শেষ পর্যন্ত সফল হই। মানুষ বুঝতে পারে, ক্ষমা করতে হবে, সন্তানসন্ততিদের জন্য একটা বাসযোগ্য শান্তিময় দেশ গড়তে হলে অতীতের তিক্ত বৈরিতা ভুলে যেতে হবে।’
ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিরাট পরিবর্তন ঘটে যায়, স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। ১৯৯২ সালে মোজাম্বিকের ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির পরিসমাপ্তি ঘটে। তারও দুই বছর আগে ১৯৯০ সালে দেশটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, বাজার অর্থনীতি, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গেও মোজাম্বিকের ফ্রেলিমো সরকারের সমঝোতা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকা রেনামোর গেরিলাদের মদদ দেওয়া বন্ধ করে। ১৯৯৪ সালে বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, জোয়াকিম শিজানো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, ফ্রেলিমো পার্লামেন্টেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
তার পর থেকে মোজাম্বিকে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। শিজানো ১৯৯৯ সালের নির্বাচনেও দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী মোজাম্বিকে একই ব্যক্তি পর পর তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন, কিন্তু ২০০৫ সালের নির্বাচনে তিনি আর প্রার্থী হননি। নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়েছেন দলের পরবর্তী পর্যায়ের নেতার কাছে। সে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন ফ্রেলিমোর আরেক নেতা আরমান্দো গুয়েজুবা। এখনো তিনিই দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। মোজাম্বিক আয়তনে বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু লোকসংখ্যা মাত্র দুই কোটি ৪০ লাখ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, কিন্তু দারিদ্র্য ব্যাপক। ১৯৭৫ সালে যখন স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশটির প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষ ছিল অতিদরিদ্র। নিরক্ষরতার হার ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। এখন শিক্ষার হার বেড়েছে অনেক, দারিদ্র্য কমেছে। জলবিদ্যুৎ গেছে গ্রাম পর্যন্ত। শিজানো জানালেন, ৩০ শতাংশের বেশি নারী সদস্য আছেন পার্লামেন্টে। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার কয়েক বছর ধরে ৮ শতাংশের ওপরে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, যে দেশে একদলীয় শাসন চলেছে প্রায় দুই দশক ধরে, যে দেশের মানুষ নিজেদের মধ্যে লিপ্ত ছিল ১৬ বছর ধরে, সেই দেশে দুই দশক ধরে কার্যকর রয়েছে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। পার্লামেন্ট কাজ করছে, সরকারি দল ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আলোচনা-বিতর্ক হচ্ছে। মোট কথা, একটা সচল রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে আফ্রিকার এই দরিদ্র দেশ, যেখানে বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য নেই। বাংলাদেশে তো গৃহযুদ্ধ হয়নি, বড় দুই দলের কর্মী-সমর্থকেরা তো লাখে লাখে পরস্পরকে হত্যা করেনি। এই দেশে কেন গণতান্ত্রিক রাজনীতি দীর্ঘ আড়াই দশকেও কার্যকর হলো না?
মশিউল আলম: সাংবাদিক৷