Saturday, September 6, 2014

সায়ীদ স্যারের সঙ্গে জয়নাল ভাইয়ের ক্লিনিকে by আনিসুল হক

ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সাহেব ফোন করে বললেন, ‘আমরা জয়নাল আবেদিনের ক্লিনিক দেখতে ময়মনসিংহ যাচ্ছি। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যাবেন। আপনিও চলেন।’
না বলার প্রশ্নই আসে না। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আউয়াল সাহেব একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মসূচির একজন নিয়মিত সহযোগী। সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে আলাপ। একবার-দুবার এর-ওর জন্য চিকিৎসা সহায়তা নেওয়ার জন্য তাঁর ওপরে জুলুমও করেছি। অমায়িক ভদ্রলোক। একজন সৎ ও পরিশ্রমী প্রকৌশলীও যে সফল হতে পারেন, তিনি তাঁর উদাহরণ। আমি রসিকতা করে বলি, ডাব না কাটলে কী হয়? সঠিক উত্তর: নারকেল। ইঞ্জিনিয়ার সফল হলে কী হয়? আউয়াল সাহেবের মতো সফল উদ্যোক্তা হন। আর ব্যর্থ হলে কী হয়? আমার মতো লেখক-সাংবাদিক হন।
আর সঙ্গে যাবেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার। একটা দিন আমরা তাঁর সান্নিধ্য লাভ করতে পারব।
তাঁদের দুজনের চেয়েও বড় আকর্ষণ কিন্তু জয়নাল আবেদিন। তিনি ছিলেন একজন রিকশাচালক। ময়মনসিংহের গ্রামে অভাবের সংসার ছিল তাঁর। বাবার অসুখ হলো। কাছাকাছি কোনো চিকিৎসালয় নেই। অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ছুটছেন যুবক জয়নাল। চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা গেলেন তাঁর বাবা। জয়নাল আবেদিন ঢাকা চলে এলেন। রিকশা চালান। রোজ রিকশা চালিয়ে কিছু টাকা জমান। দিনে দিনে কিছু টাকা সঞ্চয় হলো। ফিরে এলেন ময়মনসিংহের দুর্গম প্রত্যন্ত গ্রামটিতে। সদর উপজেলার টানহাসাদিয়া গ্রামে। গড়ে তুললেন একটা চিকিৎসাকেন্দ্র। মমতাজ হাসপাতাল।
শুধু কি চিকিৎসালয়? সঙ্গে আছে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র।
জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে গত বছর থেকে পরিচয়। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ উপলক্ষে। সাদা দাড়ি। মাথায় টাক। গালটা ভাঙা। শরীরটাও ধনুকের মতো গেছে বেঁকে। কিন্তু তাঁর হাসিটা মনে হয় কোটি টাকা দামের। চোখের কোণে কোথাও একটুখানি বেদনা। দেখা হলেই তিনি হাত দুটো নিজের করতলে পুরে নেন। বলেন, ‘আপনি আমার ক্লিনিক দেখতে যাবেন না?’
আমি বলি, ‘যাব যাব, জয়নাল ভাই। যেতে তো হবেই।’
এটা কিন্তু কথার কথা। যাব বলে কত জায়গায় কোনো দিনও যাওয়া হলো না। কাজেই এটা সুবর্ণ সুযোগ জয়নাল আবেদিনের গ্রামে যাওয়ার। কিছুতেই এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।
বেশ সকাল সকাল আমরা রওনা দিলাম একটা ঝা চকচকে মাইক্রোবাসে। আজ থেকে দিন পঁচিশেক আগের কথা। আমাদের সঙ্গে আরও আছেন স্থপতি আকিল আখতার চৌধুরী। ঝিকির ঝিকির ময়মনসিং, আইতে যাইতে কত দিন। আমার ধারণা ছিল দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগবে। ১৩০ কিলোমিটারের বেশি পথ তো নয়। কিন্তু রাস্তার অবস্থা নাকি ভয়াবহ। তাই আমরা সিলেটের পথ ধরলাম। কিশোরগঞ্জ হয়ে যাব ময়মনসিংহ। কিন্তু পথ আর ফুরোয় না। সাড়ে সাতটায় উঠেছি গাড়িতে। সাড়ে ১২টায় পৌঁছাব আশা করি।
আবদুল আউয়াল সাহেব তাঁর মোবাইল ফোনে সিঙ্গাপুর শহরের ছবি দেখাতে লাগলেন। তিনি প্রায়ই সেখানে যান। সেখানের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর আগ্রহ আছে। দেখালেন, মাত্র কয়েক দশক আগেও সিঙ্গাপুর ছিল একটা জেলেপল্লি। ভাঙা ঘরদোরের সামনে সিঙ্গাপুরের জেলে নাগরিকেরা বসে আছেন। বন্যা হয়েছে। সব ডুবে গেছে। সেই সিঙ্গাপুর আজ কত উন্নত। আউয়াল সাহেব বললেন, আজ থেকে পাঁচ দশক আগে সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, তারা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। সবাই যেন খেতে পায়, পরতে পায়, বাসস্থান পায়। এ জন্য কী করতে হবে? প্রতিটি পরিবারকে দিতে হবে কর্মসংস্থান আর বাসস্থান। এ জন্য তারা গড়ে তুলল এমপ্লয়মেন্ট ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (ইবিডি) আর হাউজিং ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (এইচডিবি)। সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইওয়ের লেখা ফ্রম থার্ড ওয়ার্ল্ড টু দ্য ফার্স্ট বইয়ে একেবারে নিঃস্ব একটা দেশ থেকে উন্নত সিঙ্গাপুরে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথের বর্ণনা আছে।
প্রায় ছয় ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছালাম জয়নাল আবেদিনের ক্লিনিক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। এরপর আর পাকা রাস্তা নেই। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। লুঙ্গি পরিহিত জয়নাল ভাই দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর শুভ্রতাভরা হাসিমাখা মুখখানি নিয়ে। আমি হাঁটতে শুরু করলাম। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আর আউয়াল সাহেব উঠলেন রিকশাভ্যানে। কাদাভরা পথ। হাঁটা বেশ বিপজ্জনক। বহুদিন পরে দেখলাম মহিষের গাড়ি। বিপরীত দিক থেকে আসছে।
জয়নাল আবেদিনের ক্লিনিকে পৌঁছাতে প্রায় আধা ঘণ্টা লেগে গেল। ওপরে টিন। চারপাশে সাধ্যমতো ইটের দেয়াল। সেখানে একটা ছোট্ট ঘরে ওষুধের ডিসপেনসারি। একটা ঘরে কয়েকটা বেড। আরেক পাশে একটা পাঠশালা। অনেক বাচ্চাকাচ্চা এসেছে স্কুলে। শিক্ষকেরা পড়াচ্ছেন। তার পাশে স্কুল ও ক্লিনিকের খরচ নির্বাহ করার জন্য গরুর খামার। সামনে বেশ খানিকটা জায়গা। একটা পুকুরের মতো। সেখানে হাঁস ভাসছে। মাছের চাষ হচ্ছে। রোজ অনেক রোগী আসে এখানে চিকিৎসা নিতে। পাস করা চিকিৎসক আসেন সপ্তাহে দুই দিন। বাকি দিন পল্লি চিকিৎসকই রোগী দেখে ওষুধ দেন। ওষুধ দেওয়া হয় বিনা মূল্যে।
জয়নাল আবেদিন জানালেন, জরুরি রোগী এলে তাকে কোনো চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। কোনো চিকিৎসক নিজেও খবর পেলে চলে আসেন।
প্রতি মাসেই টাকা গুনতে হয়। প্রথম আলোয় তাঁর স্কুলের খবর প্রকাশিত হলে তিনি যে সাহায্য পান, সেই টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করা হয়েছিল। সেটা তিনি তুলে নিয়ে গেছেন। গরু কিনেছেন। সামনের ও পাশের জমি কিনেছেন। স্কুলঘরটা আরেকটু শক্তপোক্ত করা দরকার। আউয়াল সাহেব একটা ঘর তুলে দিচ্ছেন স্কুলের জমিতে।
আমি বলি, ‘জয়নাল ভাই, জমি কিনেছেন কি নিজের নামে?’
তিনি বলেন, ‘না না, সব ক্লিনিকের নামে। স্কুলের নামে। নিজের নামে কিছুই করি নাই। প্রতি মাসে কত খরচ। ১৫ লাখ টাকা থেকে মাসে কয়েক হাজার টাকা আসত। পোষাত না। এখন গরুর দুধ বিক্রি করি। জমির সবজি বিক্রি করি। ডিম বিক্রি করি। তবুও তো চলে না। স্কুলের শিক্ষকদের বেতন। কর্মচারীদের বেতন। তার ওপর রোজ দুই-তিন হাজার টাকার ওষুধ ফ্রি দিতে হয়।’
তিনি কিছু সাহায্য এদিক-ওদিক থেকে পান। প্যাসিফিক ফার্মাসিউটিক্যাল কিছু ওষুধ দেয়। জয়নাল আবেদিন চোখেমুখে অন্ধকার দেখেন।
প্রথম আলোর ময়মনসিংহ প্রতিনিধি কামরান পারভেজও এসেছেন। তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কাছে জানতে চান, কী রকম দেখলেন।
স্যারের মুখের দিকে তাকাই। স্যার কী বলবেন?
তিনি বলেন, ‘বিন্দু থেকে সিন্ধুর দিকে মানুষের অগ্রযাত্রাকেই দেখতে এসেছিলাম। জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে ২০০৭ সাল থেকেই আমার পরিচয়। বিরামহীনভাবে তাঁর কাজ আমি দেখেছি। সামান্য সম্বল নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। মানুষের ইছাশক্তি যত গভীর হয়, ততই মানুষ সফলতার দিকে এগিয়ে যায়।’
কিন্তু জয়নাল আবেদিনকে কী বলব? আমার সামনে যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ডম্যান অ্যান্ড সির দৃশ্যকল্প। বিশাল সমুদ্র। একজন বৃদ্ধ মানুষ একা একটা বিশাল মাছের সঙ্গে লড়ছেন। কিন্তু আমার কোনো বাস্তব কথা মনে পড়ছে না, যা আমি জয়নাল আবেদিনকে বলতে পারি। মাসে এক-দেড় লাখ টাকা কীভাবে আয় করতে পারবেন তিনি? এই দুর্গম গ্রামে এ তো অসম্ভব একটা কাজ।
জয়নাল আবেদিনকে সায়ীদ স্যার বলেন, ‘জয়নাল সাহেব, লেগে থাকবেন। ছাড়বেন না।’
আমি সব সময়েই স্যারের কাছে দিকনির্দেশনা পাই। এবারও বোধ হয় পেলাম। এ ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড। মানুষকে ধ্বংস করা যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত করা যাবে না।
চলে আসি আমরা পড়ন্ত বিকেলে। একই পথ ধরে। সেই হাঁটাপথ। দুধারে বর্ষাস্নাত পল্লিবাংলার বিস্তৃত শ্যামশ্রী। সাধ্যমতো মানুষের ঘরবাড়ি। সবুজ খেত। সরকারি বিদ্যালয়। খানিকটা হেঁটে এসে সেই মাইক্রোবাস।
গাড়িতে পুরোনো দিনের গান বাজে। গান শুনতে শুনতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জিজ্ঞেস করেন, ‘আচ্ছা বলো তো, কোন শিল্প কালোত্তীর্ণ হয়?’ স্যারের কাছেই উত্তরটা জানতে চাই আমরা। তিনি বলেন, ‘যা আমাদের স্মৃতিকে উসকে দেয়। যেমন ধরো, এই যে এই গানটা... আচ্ছা দেখো, কত গান এল-গেল, শচীন দেববর্মনের গান কেন এখনকার ছেলেমেয়েরাও শোনে?’
গাড়ি শহরের দিকে চলে আসছে। ঢাকার দিকে। মনের ভেতরে নানা রসায়ন ক্রিয়া করছে। একটা জীবন নিয়ে আমরা কী করলাম? কিছুই না। একজন রিকশা চালিয়ে তার সব সঞ্চয় দিয়ে একটা ক্লিনিক, একটা স্কুল, একটা প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালানোর চেষ্টা করছেন। আমরা কী করলাম?
‘ও মা, অনেক তোমার খেয়েছি গো, অনেক নিয়েছি মা/ তবু জানি নে-যে কী বা তোমায় দিয়েছি মা!/ আমার জনম গেল বৃথা কাজে/ আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে/ তুমি বৃথা আমায় শক্তি দিলে শক্তিদাতা।’
কী রকম আত্মপর হয়ে পড়েছি আমরা! দেশে এত বড় বন্যা চলছে, এত এত মানুষ পানিবন্দী! কিন্তু নাগরিক সমাজে কি কোনো বিকার দেখতে পাচ্ছেন?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

‘আমার চোখের পানির দাম নাই’ by আসিফ নজরুল

বয়স হলে চোখের পানি কি শুকাতে থাকে? আমি জানি না অন্য কারও হয় কি না। কিন্তু আমার হয়। গত ৩০ আগস্ট মৌলিক অধিকার রক্ষা কমিটি গুমের শিকার মানুষদের স্বজনদের নিয়ে একটি বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে তাঁরা একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছেন। শুনে চোখের পানি ধরে রাখা অসম্ভব। তাকিয়ে দেখি, ড. কামাল হোসেনের দুচোখভরা পানি। যতবার তাকাই, দেখি চোখে অশ্রু তাঁর। আমার তবু চোখে পানি আসে না। শুধু রাগে-দুঃখে শরীর গনগনে হয়ে ওঠে। এত সস্তা মানুষের জীবন, এত অবলীলায় প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে উধাও করে দেওয়া যায় এ দেশে?

মঞ্চে একসময় মাইকের সামনে আসে চৌধুরী আলমের ছোট মেয়ে। বিএনপির এই নগর কমিটির নেতাকে দিয়েই আওয়ামী লীগের আমলে হাইপ্রোফাইল গুমের শুরু, আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে। চৌধুরী আলমের পরিবার এরপর বহু জায়গায় ঘুরেছে, চৌধুরী আলম কিংবা তাঁর মৃতদেহ খুঁজেছে, আর বারবার হয়রানির শিকার হয়েছে। সামান্য আশ্বাস আগে পেত, কখনো বা
খোঁজখবর নিত কেউ কেউ। এখন কোনো আশ্বাস নেই, তাদের খোঁজও নেয় না কেউ! চৌধুরী আলমের ছোট মেয়ে এসব বলতে বলতে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই বোঝে, লাভ নেই এই কান্নায়! একসময় ভেঙেচুরে যায় তার অসহায় কণ্ঠ: ‘আমার চোখের পানির দাম নেই।’
কান্নাকাটি করে কিছু হবে না। কেউ ফিরিয়ে দেবে না তার বাবাকে! এই কিশোরী এখনি জেনে গেছে তা। কান্নায় ভাঙচুর মুখে আরও কিছু কথা বলে সে। কিছু বোঝা যায়, কিছু কান্নায় দ্রবীভূত হয়ে যায়। আমার কানে শুধু অবিনশ্বর হয়ে থাকে একটি বাক্য। ‘আমার চোখের পানির দাম নেই।’ মূল্যহীন চোখের জলে একসময় ভেসে যায় আমারও দুচোখ।
প্রথম আলো তার পরদিন শিরোনাম করেছে: ‘তারা কাঁদলেন, কাঁদালেন!’ হ্যাঁ, সেদিন আমার সবাই কেঁদেছি সেখানে। অবাক হয়ে এ-ও লক্ষ করেছি, কিছু মানুষ তাঁর স্বজনের হত্যাকাণ্ড বা গুমের বিচার পর্যন্ত চাইছেন না। তাঁরা শুধু জানতে চাইছেন, মেরে ফেলা হলে কোথায় পুঁতে (লক্ষ করুন, কবর নয়, একাত্তরের মতো পুঁতে রাখার জায়গা!) রাখা হয়েছে তাঁদের বাবা বা সন্তানকে! পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে শুধু দোয়া পড়তে চান তাঁরা! শুধু এটুকুর জন্য তাঁদের হৃদয়ছোঁয়া আকুতি জানাতে হচ্ছে দেশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী মানুষটির কাছে!
আমি জানি, আওয়ামী লীগের অনুগতরা এটুকু পড়ে ভাবতে শুরু করেছেন, বিএনপির আমলে কি হত্যাকাণ্ড হয়নি? তখন গুম হয়নি? হ্যাঁ হয়েছে! হয়েছে বলেই তার তীব্র নিন্দা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। আওয়ামী লীগ তখন বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল র্যাবকে বিলুপ্ত করার ও হত্যাকাণ্ডের বিচার করার। দলটির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার।
এবারের নির্বাচনে এসব প্রতিশ্রুতির ধারেকাছেও আর যায়নি আওয়ামী লীগ। বরং নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার যে অধিকার ছিল বাংলাদেশের মানুষের, তা এড়িয়েছে ৫ জানুয়ারির বিদঘুটে নাটক সাজিয়ে। এই নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য ঘটেছে অনেক গুমের ঘটনা, হয়তো ঘটবে আরও। সমালোচনার মুখে র্যাব সাময়িক বিরতি দিলে উদ্যোগী করা হবে হয়তো অন্য কোনো বাহিনীকে।
দুই.
র্যাব এখন কিছুটা নিরস্ত। পুলিশকে দিয়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল কাজ। পুলিশের তাতে হয়েছে পোয়াবারো। সন্ত্রাসীর সাহস বেড়েছে কয়েক গুণ। গুম কমেছে, বেড়েছে খুন। নদীতে ভেসে এসেছে লাশের পর লাশ! কার লাশ, কোথাকার লাশ, জানার উপায় নেই কারও।
এসব দেখে অতিষ্ঠ হয়ে আমাদেরই কেউ কেউ একদিন বলবেন, র্যাব সক্রিয় থাকলে এত খারাপ হতো না পরিস্থিতি। র্যাবের কর্তাব্যক্তিরা জানেন এসব। সে সময় আসা পর্যন্ত তাঁরা তাই বলে চুপচাপ বসে থাকেন না। বাঘা বাঘা জঙ্গি গ্রেপ্তার করেন! সারা দেশে বনজঙ্গল চষে ফেলে তাঁরা উদ্ধার করেন মারাত্মক সব অস্ত্রশস্ত্র! একবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে, এবার ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিবের সফরের ঠিক আগের দিন।
এ দেশে এমন রহস্যময় ঘটনাই ঘটছে। এবার অবশ্য কিছু বেরসিক পত্রিকা প্রশ্ন তুলেছে র্যাবের অস্ত্র উদ্ধারের সত্যতা নিয়ে। কেউ কিছু টের পেল না, কোথাও কোনো উদ্ধার অভিযানের আলামত নেই, কীভাবে হঠাৎ এত অস্ত্র উদ্ধার হলো দেশে! আর ভারতের কর্তাব্যক্তিদের সফরের আগে আগেই কেন বারবার অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে?
র্যাবের অবশ্য ভয় নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না তাদের। এমনকি এসব প্রশ্ন শুনতেও হবে না ভবিষ্যতে আর। কারণ, এসব নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা বেশি দিন থাকবে না গণমাধ্যমের। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, সম্প্রচার নীতিমালা, মানহানি আর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অভিনব সম্প্রসারণ আরও বেশি কণ্ঠরুদ্ধ করবে গণমাধ্যমের। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে র্যাবের কর্তারা ধরা পড়েছেন, র্যাবের সে ভয়ও কাটবে দ্রুত। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর তিরস্কার শুনেছেন হাইকোর্ট, অভিশংসনের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদের হাতে চলে এলে তিরস্কারের প্রয়োজনও ফুরাবে।
এরপর এমন এক সময় আসবে, হয়তো দেশে খুন বা গুম হলে জানতে পারব না আমরা। জানলে র্যাব, পুলিশ বা সরকারের ভাষ্য প্রচার করতে হবে গণমাধ্যমে। বেছে বেছে টক শোর এমন আলোচক আনা হবে, যাঁরা সম্প্রচার নীতিমালা অনুসারে ‘অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক’ কিছু না বলে সরকারের ভাষ্যের পুনরাবৃত্তি করবেন। আরও চালাকেরা বিএনপি আমলের তুলনায় এসব ঘটনা কম ঘটছে, এটি বারবার বলবেন। গুমের বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে বিশাল অস্ত্র উদ্ধার বা ভয়াবহ জঙ্গি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটবে, সন্ত্রাস দমনে ‘আঞ্চলিক’ সহযোগিতা জোরদারের জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘দ্বিপক্ষীয়’ আলোচনা জোরদার হবে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের সাফল্যের প্রবল প্রচারণায় তলিয়ে যাবে গুম বা খুনের খবর।
গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখন ঘরের বাইরে এসে চোখের পানি ফেলছেন। তখন হয়তো তাঁদের চোখের পানি ফেলতে হবে লুকিয়ে। যে পানির দাম নেই, তা দেশের ও নেত্রীর ইমেজের জন্য ক্ষতিকর! এমন ক্ষতি না করতে দিতে মরিয়া হয়ে থাকবে রাষ্ট্রযন্ত্র!
তিন.
সম্প্রচার নীতিমালা অনুসারে বিভ্রান্তিকর ও দেশের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর অনেক কিছু হয়তো বলা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এবার একটু দেশের ইমেজের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলি।
আমার ধারণা, র্যাব বা পুলিশের মধ্যে যাঁরা গুম বা খুনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন যে এ জন্য কোনো দিন তাঁদের বিচার হবে না। র্যাব বা পুলিশের ‘সুপারস্টার’ কর্মকর্তারা হয়তো এ-ও ভাবেন যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির আশঙ্কা সৃষ্টি হলে নিরাপদে মালয়েশিয়া, দুবাই কিংবা কিরিবাতি আইল্যান্ডে গিয়ে আয়েশে বাকি জীবন কাটানোর সামর্থ্য তাঁদের আছে। কাজেই তাঁদের চিন্তার কারণ নেই। আমি তাঁদের বলি, আপনাদের চিন্তার কারণ আছে।
বাংলাদেশ সাড়ে চার বছর আগে (২৩ মার্চ, ২০১০) রোম স্ট্যাটিউট অনুসমর্থন করেছে। এই অনুসমর্থনের মানে হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত করতে পারবেন। তবে যারা বিচার চাইবে, তাদের আগে প্রমাণ করতে হবে যে এই বিচার করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নেই।
রোম স্ট্যাটিউট অনুসারে সিস্টেমেটিক (পরিকল্পিত ব্যবস্থাধীন) ও ওয়াইডস্প্রেড (ব্যাপক) খুন বা গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের সংখ্যা অবশ্যই ব্যাপক। এটি যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের (যেমন: কোনো বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠান বা বিরোধী মহলকে দমানো) জন্য করা হয়, তাহলে তা সিস্টেমেটিক অপরাধ বলা যাবে। গুম বা খুনের অসংখ্য অভিযোগের বিচার যদি বছরের পর বছর না হয় (বিশেষ করে পুলিশ যদি মামলা গ্রহণেই অস্বীকৃতি জানায়), তাহলে রাষ্ট্র এর বিচার করতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক, তা প্রমাণ করাও কষ্টসাধ্য হবে না।
বিচার কখনো হবে না, এই আত্মবিশ্বাসে যারা গুম বা খুন করে, তাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে এসব অপরাধের বিচার হলে তা সংশ্লিষ্ট দেশটির জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর ইমেজ বয়ে আনে। আমাদের সতর্কবাণী সে কারণেই।
চার.
গুমের শিকার একটি পরিবারের চোখের পানির দাম হয়তো নেই। কিন্তু এমন অসংখ্য চোখের পানি এক হলে সেই স্রোতে ভেসে যায় সবচেয়ে নির্মম শাসকগোষ্ঠীও। দেশে না হলেও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয় সেনানায়ক, গোয়েন্দাপ্রধান এমনকি সরকারপ্রধানের। আমাদের বর্তমান সময়েই ঘটছে এসব।
চূড়ান্ত বিচারে কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। এই ইহকালে বিভিন্নভাবে বিচার হয়েছে অসংখ্য পরাক্রমশালী মানুষের। কখনো দেশের মানুষের আদালতে, কখনো সৃষ্টিকর্তার অপঘাতে, কখনো আন্তর্জাতিক বিবেকের মানদণ্ডে।
আমাদের পরাক্রমশালীরা কত দিন অবজ্ঞা করতে পারবেন এসব বাস্তবতা!
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রস্থানের কাছাকাছি ব্রিটিশরা by পিটার সাদারল্যান্ড

সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতাবিষয়ক গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বিরোধিতা শুরু হয়েছে। ব্যাপারটা তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, যুক্তরাজ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নবিষয়ক ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে জোরদার স্কটল্যান্ডেই।
যেমন, এ বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত একটি জরিপে দেখা যায়, জুন মাসে দেশটিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না-থাকার বিষয়ে যদি কোনো গণভোট হতো, তাহলে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে মত দিতেন, থাকার পক্ষে ভোট দিতেন ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু স্কটল্যান্ডে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একটি জরিপে দেখা যায়, সেখানকার ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যের ইউনিয়নে থাকার পক্ষে মত দেবেন, বিপক্ষে দেবেন ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যান্য জরিপেও দেখা গেছে, সামগ্রিকভাবে স্কটল্যান্ডের মানুষ ইংল্যান্ডের মানুষের চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে বেশি ইতিবাচক।
তবে ওপরের ফলাফল থেকে শুরুতেই কোনো সিদ্ধান্ত টেনে ফেলা ঠিক হবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না-থাকার ব্যাপারে ডেভিড ক্যামেরন যে গণভোটের প্রস্তাব করেছেন, সেটা হয়তো শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে না। তা ক্যামেরন ইউনিয়নে ব্রিটিশ সদস্যপদের শর্তাবলি সম্বন্ধে যতই পুনঃ আলোচনার কথা বলুন না কেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইউনিয়ন থেকে ব্রিটিশদের পদত্যাগের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে স্কটল্যান্ডবিষয়ক গণভোটের গুরুত্ব মৌলিকভাবে পাল্টে যাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ব্যক্তি ও ইউকে হাউস অব লর্ডসের নেতা জোনাথন হিল জ্যাক ক্লদ জাঙ্কারের নেতৃত্বে গঠিত নতুন ইউরোপীয় কমিশনের সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। ব্রিটিশরা ইউনিয়ন-সংক্রান্ত একটানা যে ভুল করে যাচ্ছে, সেই তালিকায় এটি নতুন সংযোজন। ক্যামেরনের মুখপাত্র জুলাইয়ে বলেছেন, কমিশনের নতুন সভাপতির সঙ্গে প্রথম বৈঠকে তিনি হিলকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করবেন। তবে জাঙ্কারের কার্যালয় থেকে খুবই শীতল একটি প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলা হয়েছে, নতুন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বসানো হবে আর ক্যামেরনের কাছে জাঙ্কারের কোনো ঋণ নেই।
কমিশনের প্রেসিডেন্ট পদে জাঙ্কারের নির্বাচনের বিরোধিতা করেছেন ক্যামেরন। ব্রিটিশ প্রেস তাঁকে হেনস্তা করতেও ছাড়েনি। ওদিকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে হিল কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র নন, ফলে জাঙ্কার যখন কমিশনের বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ দেবেন, ক্যামেরন তখন কিছুটা বিচলিত হবেন। বহু জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে স্থান দিতে হবে জাঙ্কারকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কাছ থেকে সে বিষয়ক অনুমোদন নেওয়াটাও খুব সহজ কাজ হবে না। আর ক্যামেরন যে জাঙ্কারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে উৎসাহ দেখাবেন না, তাতে কোনো বিস্ময় নেই, কিন্তু তাঁর বিরোধিতা ছিল খুব জোরালো।
ক্যামেরন কনজারভেটিভ পার্টির লোকদের আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন, তাঁর ইউরো-বিষয়ক সন্দেহবাতিকের কোনো কমতি নেই। এমনকি ক্যামেরন নাকি বলেছিলেন, জাঙ্কার নির্বাচিত হলে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে দেবে, এটি আসলে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। কারণ, ইউনিয়নে ব্রিটিশ সদস্যপদের চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে পুনরালোচনা হতে হলে সেটা অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে হতে হবে, কমিশনের সঙ্গে নয়।
ক্যামেরন জাঙ্কারের প্রার্থিতা বানচালের যে ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন, তার মধ্য দিয়ে তিনি যে ২০১২ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক কমপ্যাক্ট গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন, সেটা প্রতিভাত হয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ব্রিটিশ অবস্থানের প্রতি যে সমর্থন জানিয়েছেন, ক্যামেরন সেটাতে অতি গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ জার্মান ব্যক্তিই ক্যামেরনের এই স্বসৃষ্ট সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার হাত বাড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে ম্যার্কেল চাইলেই তেমন কিছু করতে পারবেন না।
ক্যামেরনের উপদেষ্টারা ম্যার্কেলের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তায় যদি অতি গুরুত্বারোপ করেন, তাহলে তাঁরা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভূমিকাকে খাটো করে দেখছেন। অনেক দিন ধরেই ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এটা পরিষ্কার করে বলে আসছে যে তারা কমিশনের সভাপতি নিয়োগসংক্রান্ত নবপ্রাপ্ত ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করবে, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। লিসবন চুক্তির মাধ্যমে তারা এ ক্ষমতা লাভ করেছে। কিন্তু ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক শক্তিগুলো জাঙ্কারকে সমর্থন দিতে গিয়ে নির্বাচন-উত্তর যে দ্রুত মতৈক্যে পৌঁছেছে, সে কারণে ক্যামেরন কিছুটা বেকায়দায় পড়ে গেছেন।
ইউনিয়ন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার যে ঘোষণা ক্যামেরন দিয়েছেন, তাতে সেখানে ব্রিটিশ আধিপত্য তো বাড়েইনি, উল্টো ক্যামেরন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব বিনষ্ট হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলো একে অপরকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবিলায় সহায়তা করে। কিন্তু ইউনিয়নে এই ধারণা ক্রমেই পোক্ত হচ্ছে যে ক্যামেরন এই সদ্বিশ্বাসের অপব্যবহার করছেন।
ফলে জাঙ্কার প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ বজায় রাখা কঠিন হবে, ক্যামেরনের এ রকম ভবিষ্যদ্বাণী এখন আপনাআপনি পূরণ হওয়ার পথে রয়েছে। জাঙ্কারের প্রার্থিতা রাজনৈতিক নীতির ব্যাপার। ক্যামেরন ঐতিহাসিকভাবে কেন্দ্রিকতা ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পক্ষপাতী অন্ধকার শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছেন, এমন কথা বলা হলে ইউরোপ থেকে ইংল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতার যে ধারণা রয়েছে, সেটাকে পাকাপোক্ত করা হয়, এদিকে ক্যামেরন আবার এ লক্ষ্যে সফল নন। স্কটল্যান্ডের ক্ষেত্রে আবার ব্যাপারটা ঠিক এ রকম নয়।
২০১৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্যামেরন যদি আবারও ক্ষমতায় আসেন, তাহলে ইউতে ব্রিটিশ সদস্যপদ টেকাতে তাঁকে অনেক বাধার পাহাড় পেরোতে হবে। না, শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোই নয়, তাঁর কনজারভেটিভ পার্টিও একপ্রকার চায় না ব্রিটেন ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে থাকুক। হ্যাঁ, ক্যামেরনের নিজের পুনঃ আলোচনার ফলাফলের ওপর অনুষ্ঠেয় গণভোটে ‘না’ রায় এলে সেটা গ্রহণ না করা তাঁর জন্য কঠিন হবে।
আগামী বছরের নির্বাচনে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের ইস্যুটি ঝুঁকির মুখে পড়বে। ব্রিটিশ ভোটাররা ইউরোপের ওপর তাঁদের রায়ের কী প্রভাব পড়বে, সেটা না বুঝে ভোট দিলে তা শেষমেশ বিয়োগান্ত হবে। একটা ব্যাপার মোটামুটি পরিষ্কার: স্কটল্যান্ড যদি সেপ্টেম্বরে আলাদা হওয়ার পক্ষে রায় দেয় আর তারপর ব্রিটেনের অবশিষ্ট অংশে যদি ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট হয়, তাহলে যাঁরা সদস্যপদ রাখার পক্ষে, তাঁদের পক্ষে জয়লাভ কঠিন হয়ে উঠবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
পিটার সাদারল্যান্ড: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান।

জোড়া চাপে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় by অমর সাহা

না, এমনটা ভাবেননি তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১১ সালের মে মাসে ৩৪ বছরের বাম জমানাকে ধুলোয় মিশিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর চোখমুখে ছিল দারুণ স্বপ্ন। বামফ্রন্ট শাসন করেছিল ৩৪ বছর। মমতার স্বপ্ন আরও বেশি দিনের। তিনি মনে করেছেন, এখনো গ্রামাঞ্চলে তাঁর দলের দুর্গ অটুট। তাই সব সভা-সমাবেশে তাঁর নেতা-মন্ত্রীরা বলেছিলেন, ৩০ বছরেও মমতাকে সরাতে পারবে না বিরোধীরা। বামফ্রন্ট তো এখন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। এসব স্বপ্ন আঁকড়ে ধরেই মমতা রাজ্য শাসনে ব্রতী হন। গত এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত হয় ভারতের লোকসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচন ঘিরে মমতা ও তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের চোখে ভাসে নতুন করে স্বপ্ন। মমতার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন। দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সমাবেশে সে কথা বলতেও দ্বিধা করেননি।
মমতার যুক্তি ছিল, লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট (ইউপিএ) বা বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) কেউই শাসনক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ছোট ছোট আঞ্চলিক দলের জোটই হবে সরকার গঠনের মূল শক্তি। আর সে ক্ষেত্রে তাঁর দল হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। নির্ণায়ক শক্তি। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দরাদরিতে সেই সুযোগ এসেও যেতে পারে মমতার। এই স্বপ্নে বিভোর মমতা লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নেমে বিভিন্ন জনসভায় বিজেপি ও তার প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে ছাড়েননি। তাঁকে কোমরে দড়ি দেওয়ার হুমকি দিতেও কুণ্ঠা বোধ করেননি।
অথচ নির্বাচনের ফলাফল মমতার সব স্বপ্ন উল্টে দেয়। বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায় আসেন। নরেন্দ্র মোদিই প্রধানমন্ত্রী হন। প্রথম রাজনৈতিক ধাক্কা খান মমতা। দ্বিতীয় ধাক্কা খান লোকসভা নির্বাচনের পশ্চিমবঙ্গের ফলাফলে। যে বিজেপি এই রাজ্যে প্রায় শূন্যের ঘরে ছিল, সেই বিজেপি লোকসভা নির্বাচনে ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে! মমতা তৃতীয় ধাক্কা খান সারদা কেলেঙ্কারি ইস্যুতে। পশ্চিমবঙ্গের এযাবৎ সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি এই সারদাগোষ্ঠীর ২২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি। ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তুলে নিয়েছিল তারা।
গত বছরের এপ্রিল মাসে এই সারদা কেলেঙ্কারির কথা প্রথম ফাঁস হয়। গত ৬ এপ্রিল সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেন ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইকে তাঁর পতনের কাহিনি নিয়ে ১৮ পাতার একটি চিঠিতে ২২ ব্যক্তির নাম লিখে চার দিন পর পশ্চিমবঙ্গ থেকে পালিয়ে যান। ওই চিঠিতেই তিনি উল্লেখ করেন মমতার দলের কয়েকজন মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক তাঁকে কীভাবে প্রতারিত করে কোটি কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। সুদীপ্ত সেন পালিয়ে আশ্রয় নেন জম্মু ও কাশ্মীরের একটি হোটেলে। সেখান থেকেই তিনি গ্রেপ্তার হন এপ্রিলের শেষে তাঁর দুই সহকর্মীসহ। তিনি এখনো কারাগারে।
এই ঘটনার পর মমতার সামনে নতুন করে আরেক বিপদ হাতছানি দেয়: সারদা বিপদ। তাই সারদার তদন্ত যেভাবেই হোক তার পুলিশ বাহিনী দিয়ে করাতে হবে। এই তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে চলে গেলে আর রক্ষা নেই। সুতরাং মমতা উদ্যোগ নেন সারদাকাণ্ড রাজ্যের সিআইডি পুলিশ দিয়ে তদন্ত করানোর। গঠনও করেন একটি বিশেষ তদন্ত দল। পাশাপাশি মমতা সারদার কাছ থেকে প্রতারিত সাড়ে ১৭ লাখ আমানতকারীর অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য গঠন করেন বিচারপতি শ্যামল সেন কমিশন। কমিশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে মমতা সারদা আন্দোলন স্তিমিত করার উদ্যোগ নেন।
কিন্তু নাছোড়বান্দা আমানতকারীরা। তাঁরা রাজ্যব্যাপী ছড়িয়ে দেন এই আন্দোলন। সারদাকাণ্ড সিবিআইয়ের মাধ্যমে তদন্ত করানোর দাবিতে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা হয়। কিন্তু রাজ্য সরকারের আপত্তিতে সেখান থেকে সুফল না পেলে এই মামলা শেষ পর্যন্ত ওঠে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে। অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট গত মে মাসে নির্দেশ দেন সারদার তদন্ত করবে সিবিআই। চতুর্থ ধাক্কা খান মমতা।
এখন এই সারদা মামলার তদন্ত করছে সিবিআই। সিবিআই ইতিমধ্যে জেরা শুরু করেছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও নেতাকে, যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে এই কেলেঙ্কারির অভিযোগ। গ্রেপ্তারও করেছে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে। সিবিআইয়ের পাশাপাশি সারদাকাণ্ড পৃথকভাবে তদন্ত করছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আরেকটি সংস্থা ইডি বা এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট। সেখানেও ইতিমধ্যে জেরা করা হয়েছে বলিউড তারকা ও তৃণমূল সাংসদ মিঠুন চক্রবর্তী, আরেক সাংসদ মহম্মদ ইমরানকে।
ফলে সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। উঠে আসছে এই কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কদের নাম। ফলে একদিকে বিজেপির উত্থান আর অন্যদিকে সারদাকাণ্ড—এই দুই চাপে মমতা আজ চরম অস্বস্তিতে। আর এই দুই চাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মমতা বাম দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বাম দল মমতার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ, যে মমতা এখনো প্রতিদিন বাম দলকে গালাগালি না করে মুখে অন্ন নেন না, সেই মমতার সুর বদলে গেলেও বাম দলগুলোর মন গলেনি তাতে।
২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপি কোমর বেঁধে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে। মমতার আশঙ্কা, বিজেপির এই উত্থান এবং সারদার চাপে শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন ঘটে না যায়। সে রকম কিছু যাতে না ঘটে সে জন্য তিনি মরিয়া হয়ে মিতালির হাত বাড়িয়েছিলেন বাম দলের দিকে। কিন্তু তাতে কোনো সুফল ফলল না। আর জাতীয় কংগ্রেস তো আগে থেকেই মমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আছে। ফলে মমতাকে এখন বিজেপির উত্থান এবং সারদার ভূত ভীষণভাবেই তাড়া করে ফিরছে।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

ঘাতক কাঁটায় বিদ্ধ গণমাধ্যম by সোহরাব হাসান

ত্রিপুরার টিভি চ্যানেল ভ্যানগার্ড ২৪-এর বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত সপ্তাহে আগরতলা গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের পাশেই আরশীনগর নয়, ত্রিপুরা। সেখানে যেসব পড়শি বসত করে, তারাও বাঙালি, আমাদের অত্যন্ত আপনজন। ভ্যানগার্ড ২৪-এর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে চিরকুট ব্যান্ডদলের শিল্পীরা দর্শক-শ্রোতাদের দারুণ মুগ্ধ করেছেন। এ রকম গানের ও প্রাণের সম্মিলনই পারে দু্ই দেশের সম্পর্ককে আরও নিবিড় ও সংহত করতে।
টিভি চ্যানেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেবক ভট্টাচার্য যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন, তার মোদ্দা কথাটি হলো পৃথিবীর সব দেশেই সাহসী গণমাধ্যমকে ঘাতক কাঁটার ওপর দিয়ে চলতে হয়। শাসকগোষ্ঠী থেকে শুরু করে মাফিয়া চক্র—সবাই চায় গণমাধ্যমকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এই কাঁটা কখনো আসে সরকারের কালো আইনরূপে, কখনো আসে রাজনৈতিক মস্তানদের পেশিশক্তি বলে।
অনুষ্ঠানে টিভি চ্যানেলটির দুটো আলোচিত নিউজ ভিডিও দেখানো হলো। গত লোকসভা নির্বাচনে ভ্যানগার্ড ২৪-এর একজন আলোকচিত্রী ত্রিপুরার একটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে পোলিং অফিসারের সামনে ব্যালট পেপারে দলীয় কর্মীদের সিল মারার ছবি তুলে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। আঞ্চলিক টিভি চ্যানেলটির এই সচিত্র খবর মুহূর্তে ভারতের প্রধান গণমাধ্যমগুলো লুফে নেয়। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, যে আলোকচিত্রী এই ছবি তুলেছেন, পুলিশ তাঁর নামে মামলা দিলেও ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। ওই আলোকচিত্রী এখন উচ্চ আদালতের কাছ থেকে আগাম জামিন নিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।
দ্বিতীয়টি হলো মাফিয়া চক্রের অপকর্মের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের হাতে টিভি চ্যানেলটির দুজন সাংবাদিকের অপহরণের ঘটনা। পরে টিভি চ্যানেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় ওই দুই সাংবাদিককে উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। ওখানে তবু রাষ্ট্রযন্ত্র ভোটকেন্দ্রের তোলা ছবিকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করেনি। এখানে সেটিও হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী আয়োজনটি ছিল অভিনব, ব্যতিক্রমী। কোনো মন্ত্রী, নেতা বা বিশিষ্ট ব্যক্তি নন, ‘সান্ধ্যনীড়’ নামে একটি বৃদ্ধাশ্রমের চারজন সদস্যকে দিয়ে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করানোর পাশাপাশি দেশ ও সমাজের জন্য তাঁদের অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। এভাবেই চার প্রবীণ নারী-পুরুষকে সম্মানিত করল ভ্যানগার্ড ২৪। টিভি চ্যানেলটি বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে উল্লিখিত তিন সাহসী সাংবাদিককে পুরস্কৃত করে।
একজন সাংবাদিকের বড় শক্তি সত্য। সেই সত্য যদি তিনি না বলতে পারেন, না লিখতে পারেন, তাহলে সাংবাদিকতা হিজ মাস্টার্স ভয়েসে পরিণত হয়। প্রায় সব দেশে শাসক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী সত্যকে কমবেশি ভয় পায়। একটি সরকার কতটা গণতান্ত্রিক ও সহিষ্ণু—তা পরিমাপ করার সহজ উপায় হলো গণমাধ্যমের প্রতি তারা কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
২.
শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকার সম্ভবত নিজের প্রতি অনাস্থার কারণেই মেয়াদের আট মাসের মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো ফ্রন্ট খুলে বসেছে। একদিকে তারা বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিচার করছে কথিত গাড়ি ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের মামলায়, অন্যদিকে গণমাধ্যমকে শায়েস্তা করতে একটার পর একটা আইন জারির পাঁয়তারা করছে। একটি সরকারের নিত্যনতুন আইন করার প্রয়োজন তখনই হয়, যখন তার পায়ের তলায় মাটি থাকে না। ১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশটি চালিয়েছিলেন কোনো আইন ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার ছাড়াই। আর গত শতকের নব্বইয়ে সব কালাকানুন পায়ে মাড়িয়েই এ দেশের মানুষ স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল। কোনো কালো আইনই কোনো সরকারকে রক্ষা করতে পারে না। বরং সেই সরকারের কালো আইনগুলো পরবর্তী সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন ও দ্রুত বিচার আইন—এ ধরনের অসংখ্য আইনের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
সম্প্রতি জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে সব মহলে বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় বইছে। সংগত কারণেই গণমাধ্যমের অংশীজনেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর আগে জেলা প্রশাসক সম্মেলন সামনে রেখে তথ্য মন্ত্রণালয় একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছিল, যার মূল কথা ছিল, জেলা প্রশাসকদের হাতে পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করার ক্ষমতা অর্পণ। কী ভয়ংকর কথা! একজন জেলা প্রশাসক চাইলেই যেকোনো পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে দিতে পারবেন।
কোনো আদালত নয়, প্রেস কাউন্সিল নয়—একজন আমলা মনে করবেন, এই পত্রিকাটি বের হওয়া উচিত কিংবা উচিত নয়। পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো খবর বা ছবি নিয়ে সরকার আপত্তি করতে পারে, আদালতে প্রতিকারও চাইতে পারে। কিন্তু পত্রিকার যে সংখ্যাটি প্রকাশিতই হয়নি, সেটি আগাম বন্ধ করার মতো কালো আইন আবারও দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে!
এই আইনের খসড়া নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রতিবাদ করলে সরকার কিছুটা পিছু হটে। কিন্তু এর কিছুদিন পরই আসে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার ঘোষণা। দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি টেলিভিশন-বেতারকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্যই নাকি এই নীতিমালা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘গণমাধ্যম যাতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, সে জন্য জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা করা হয়েছে।’ দায়িত্বশীল গণমাধ্যম আমরাও চাই। প্রশ্ন হলো, এই দায়িত্বের বিষয়টি কে ঠিক করবেন? করবেন গণমাধ্যমের অংশীজনেরা, অ্যাকেডেমিশিয়ানরা, আইন বিশেষজ্ঞরা। সরকার এখানে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল করার আগে তাঁর মন্ত্রীদের দায়িত্বশীল করেল দেশ অনেক বেশি উপকৃত হবে।
উদ্বেগের বিষয়, সরকার এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। অনলাইন সংবাদপত্রের জন্যও একই ধরনের নীতিমালা করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রধান তথ্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত সাব-কমিটি অনলাইন মাস মিডিয়া নীতিমালার খসড়াও প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত এই খসড়া পাস হলে অনলাইন সংবাদপত্রের ওপরও সরকারের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। সমালোচনার মুখে এখন মন্ত্রীরা বলছেন, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা বাধ্যতামূলক নয়, নির্দেশনামূলক। এই নীতিমালার ভিত্তিতে আইন হবে, কমিশন হবে এবং কমিশনই ঠিক করবে কীভাবে বেসরকারি বেতার-টেলিভিশন চলবে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কমিশনগুলোর হাল দেখে মনে শঙ্কা জাগে, জাতীয় সম্প্রচার কমিশনও আরেকটি হুকুমবরদার প্রতিষ্ঠান হবে কি না। শেখ হাসিনার প্রথম সরকার বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে বেতার-টিভির স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার জন্য কমিটি করেছিল। কমিটির লোকেরা হিল্লি–দিল্লি ঘুরে আসার পর একটি রিপোর্টও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সরকারের পছন্দ হয়নি। কেননা, এ রিপোর্ট বাস্তবায়িত হলে টিভি-বেতারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তাহলে কি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্যই এত আয়োজন, এত কমিশন, এত আইন?
সরকার বেসরকারি খাতে বেতার-টেলিভিশন করার অনুমতি দিয়েছে বলেই কি সরকারি বেতার-টিভি জবাবদিহির বাইরে থাকবে? রাষ্ট্রীয় বেতার-টিভি কি শুধু সরকারি দলের নেতা-নেত্রীদের ছবিই দেখাবে, বক্তৃতা শোনাবে? ভারতে আকাশবাণী বা দূরদর্শন পুরো সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা তো সারাক্ষণ ক্ষমতাসীনদের বন্দনা ও বিরোধীদের নিন্দামন্দ করে না।
সরকার নীতিমালা করে বলতে পারে না, কোন পত্রিকা কী লিখবে, কোন টেলিভিশন কী দেখাবে, কোন অনুষ্ঠান বা টক শোতে কাকে আনা হবে, কাকে আনা হবে না। বাক বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা আমাদের সংবিধানেই নির্দিষ্ট করা আছে। সেই সীমা সরকার, গণমাধ্যম কেউই লঙ্ঘন করতে পারে না।
৩.
সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে তাঁরা এখন যে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে এত তোলপাড় করছেন, তার প্রয়োজন ছিল না। গণমাধ্যম পরিচালনার জন্য আইন ও নীতিমালা তো আছেই। ১৯৭৪ সালে প্রণীত বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইনটি তঁারা একবার দেখে নিতে পারেন। প্রেস কাউন্সিল আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংবাদপত্র এবং সংবাদ পরিবেশকদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে সহায়তা করা।
প্রেস কাউন্সিলের নীতিমালায় বলা আছে, ১. জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জনগণকে জানানোর দায়িত্ব সংবাদিকদের। ২. সাংবাদিককে তাঁর পেশাগত দায়িত্বের প্রয়োজনে ব্যক্তি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহের কার্যকলাপ এবং দোষত্রুটি সম্বন্ধে সংবাদ ও মন্তব্য প্রকাশ করতে হয়। এ দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের জন্য সাংবাদিককে দুর্ভোগমুক্ত রাখা উচিত। ৩. অসংশয় সত্য সংবাদের নির্ভুলতা সঠিকভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব না হলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত সংবাদ জনস্বার্থের প্রয়োজনে শাস্তির ঝুঁকি ব্যতিরেকেই পরিবেশন করা যেতে পারে। ৪. অপরাধ ও দুর্নীতি প্রতিরোধের সামাজিক দায়িত্ব পালনে সংবাদপত্র সংবাদ সংগ্রহের জন্য এমন সব আইনত ও যুক্তিসংগত পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে, যেগুলো অন্যত্র গ্রহণযোগ্য নয়। গণব্যাধি (খবর) প্রকাশ করে, এ রকম সংবাদের ওপর সেন্সরের প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে। (সূত্র: সংবাদবিষয়ক আইন, গাজী শামছুর রহমান, বাংলা একাডেমী ১৯৮৪)
অন্যদিকে সরকার জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নামে যে নির্দেশনা জারি করেছে তার লক্ষ্যই হলো গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। প্রথমটি সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমের কাজের সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দিলেও দ্বিতীয়টিতে পদে পদে নিষেধাজ্ঞার কথা রয়েছে। মুদ্রিত ও বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের প্রকাশ ভিন্ন হলেও বিষয়বস্তু অভিন্ন। অতএব, এক নীতিতেই চলতে বাধা কোথায়?
সবশেষে প্রেস কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান গাজী শামছুর রহমানের একটি কথা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘দায়িত্ব যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংরক্ষণ এবং যেখানে স্বাধীনতার ওপর আঘাত আসতে পারে সরকারের তরফ থেকে, সেখানে সরকারের পক্ষে ওই গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেওয়া সমীচীন নয়।’ (সূত্র: ওই)
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

পাকিস্তান: ফের ভুল পথে by হাসান ফেরদৌস

কাল ভোরেই নতুন পাকিস্তান—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমরান খান কয়েক হাজার লোক নিয়ে ইসলামাবাদে ধরনা শুরু করেছিলেন। লক্ষ্য, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দখল। কাল সকালেই বিপ্লব—সে কথা শুনে এক পাকিস্তানি যুবক তাঁর বন্ধুকে ডেকে বললেন, ‘ভাই, আজ রাতেই যদি “ইনকিলাব” ঘটে যায়, তাহলে প্লিজ তুই আমাকে সকাল সকাল ডেকে দিস। তা না হলে আমি হয়তো পুরোনো পাকিস্তানেই রয়ে যাব।’
না, ইমরান খান ও তাঁর জিহাদি পার্টনার তাহির-উল-কাদরি সরকার উচ্ছেদের দাবি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু করেছেন, তার ফলে কোনো বিপ্লব ঘটেনি। দু-চারটি গাড়ি ভেঙেছে, সরকারি টেলিভিশন কেন্দ্রের কিছু সাজসরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও ইসলামাবাদের কনস্টিটিউশনাল অ্যাভিনিউ, যেখানে এই দুই নেতার অনুসারীরা ডেরা বেঁধেছেন, তার আশপাশে প্রস্রাবের নহর বয়ে গেছে। ব্যস, এই পর্যন্তই। নওয়াজ শরিফ যেখানে ছিলেন, সেখানেই আছেন। মাঝখান থেকে ইমরানের নিজের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ভেঙে দুই টুকরা হয়ে গেছে।
১৫ মাস আগে পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বিপুল ভোটাধিক্যে নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ বিজয়ী হয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতা গ্রহণ করে। অনেক পেছনে থেকে তৃতীয় স্থান দখল করে ইমরান খানের দল পিটিআই। ইমরান, যিনি আশা করেছিলেন এবার তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, নির্বাচনের ফলাফলে বড় রকমের ঘা খেয়েছিলেন। অবশ্য সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে তাঁর দল খাইবারপাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে। নির্বাচনের পরপর ইমরান ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছিলেন বটে, কিন্তু তেমন শোরগোল তোলেননি। নবনির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে আইন পরিষদে যোগও দিয়েছিলেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতে কী হলো কে জানে, তিনি ঠিক করলেন, ‘দুর্নীতিবাজ’ নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে, সে জন্য যদি ফের সেনাবাহিনী তলব করতে হয়, তাতেও পরোয়া নেই। (শুধু নওয়াজ শরিফকে হটালে পাকিস্তান রাতারাতি কীভাবে পরিস্থানে পরিণত হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা অবশ্য মিলল না)। এ কাজে তাঁর দোসর হিসেবে জুটল কানাডাপ্রবাসী এক জিহাদি নেতা। তাহির-উল কাদরি নামের সেই মোল্লা গত সপ্তাহে সময় বেঁধে দিয়েছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নওয়াজকে পদত্যাগ করতে হবে। এই নয়া জিহাদ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিজে ঘরে ফিরছেন না, শেষ গোসল তিনি নিয়ে ফেলেছেন, এখন দরকার হলে শহীদ হবেন। সে লক্ষ্যে লাঠি-সড়কি নিয়ে তাঁরা রওনা হলেন নওয়াজ শরিফের সরকারি বাসভবনের দিকে।
ইমরানের দলের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন, দলের নির্বাচিত সভাপতি জাভেদ হাশমি সাংবাদিক ডেকে সে কথা ঘোষণাও করেছিলেন। কিন্তু সে মতামত উপেক্ষা করে ইমরান একাই ঠিক করলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাওেয় তিনি নিজেই নেতৃত্ব দেবেন। (‘আমি দলের নেতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আমার ওপর ন্যস্ত,’ হাশমির প্রতিবাদের জবাবে ইমরান তাঁকে এ কথা বলেছিলেন।) অবশ্য রাত যেতে না যেতেই শোনা গেল, সেনাকর্তাদের সঙ্গে জিহাদি নেতার সলা–পরামর্শ হয়েছে, কাদরি সাহেব আপাতত আন্দোলন মুলতবি রাখছেন। ইমরান খানের সঙ্গেও সেনাকর্তাদের বাৎচিতের পর তাঁকে হাসিমুখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেল। তাঁর দলের এক মুখপাত্র এমন কথাও মুখ ফসকে বলে ফেললেন, সেনাবাহিনীর তরফ থেকে তাঁরা ‘সিগন্যাল’ পেয়েছেন।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে তার মেয়াদ পূরণ করার আগেই ক্ষমতা থেকে হটানোর পরিচিত ও নিয়মসিদ্ধ পথ পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোট উত্থাপন। ইমরান-কাদরি সে পথে না গিয়ে রাস্তা দখলের পথ বেছে নিলেন কেন, তা বোঝা কঠিন নয়। পার্লামেন্টে নওয়াজ শরিফের পক্ষে বিপুল সমর্থন রয়েছে। এই মুহূর্তে সরকার পতন হোক, সুস্থ মস্তিষ্কের কেউই সে দাবি সমর্থন করবেন না। ইমরানের নিজের দলের সদস্যরাই এ ব্যাপারে গররাজি। ইমরান তাঁদের নির্দেশ দিয়েছিলেন অবিলম্বে পদত্যাগ করতে। তাঁর দলের নয় সদস্য সরাসরি ‘না’ করে বসেন, বাকি ২৫ জন স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র না পাঠিয়ে পাঠালেন খোদ খানবাবার কাছে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে তাঁরা এখনো পুরোদস্তুর সাংসদ।
অনুমান করি ইমরান অপেক্ষায় ছিলেন, গণ-আন্দোলন তেতে উঠলেই সেনাবাহিনী নাক গলাবে, দেশরক্ষার তারাই তো শেষ ভরসা। সে কথার ইঙ্গিত দিয়ে ইমরান বারবার বলেছেন, ‘আম্পায়ার’ শিগগিরই হাত তুলবেন। কে এই আম্পায়ার তা তিনি খোলাসা করে বলেননি, তবে আকেলমন্দদের ধারণা, তিনি সেনাপ্রধান রাহিল শরিফের কথাই বলে থাকবেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সম্পর্ক ভালো নয়। ১৫ বছর আগে আরেক সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ তাঁকে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছিলেন। বর্তমান সেনাপ্রধান সেই একই পথ নিতে পারেন, এমন একটা অঙ্ক ইমরানের হয়তো থেকে থাকবে। গত এপ্রিলে বেসরকারি টিভি চ্যানেল জিও টিভির প্রধান হামিদ মির অজ্ঞাতনামা আততায়ীর হাতে আক্রান্ত হলে অভিযোগ উঠেছিল এর পেছনে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ আইএসআইয়ের হাত ছিল। সে কথায় আইএসআই-প্রধান ইসলাম নাখোশ হয়েছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নওয়াজ জিওর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে তাঁর আমন্ত্রণে নওয়াজ ভারতে গিয়েছিলেন ও মোদির সঙ্গে উপহার চালাচালি করেছিলেন। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় নেতার সঙ্গে তাঁর এই মাখামাখি পাকিস্তান সেনাবাহিনী খুব সুনজরে দেখছে না, সে কথা অনেকেই বলেছেন। ফলে, ‘আ যা’ বললেই পাকিস্তানের মহা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী দেশোদ্ধারের লক্ষ্যে মসনদে বসে পড়বে, ইমরানের এই বিশ্বাসের পেছনে যুক্তি থাকতেই পারে।
বোঝাই যাচ্ছে, ইমরান তাঁর নিজের জোরে ইসলামাবাদের রাস্তাঘাট বন্ধ করতে পারেন ও কনস্টিটিউশনাল অ্যাভিনিউর আশপাশে প্রস্রাবের নহরত বইয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। তিনি শহুরে মানুষ, তাঁর ডাকে শহরের ছেলেছোকরা বিস্তর জুটেছে, সঙ্গে কয়েক ডজন অভিজাত তারকা। ফলে মাগনা ফুর্তির জন্য লোক জমায়েতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু সরকার পতনের জন্য যে ‘মাসল’ দরকার, ইমরানের দলের তা নেই। সে জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে কাদরি ও তাঁর আনসার বাহিনীর ওপর। এই দুই দলের লোকজনের মনজিলে মকসুদ অভিন্ন হলেও তরিকা এক নয়। ইমরানের সমর্থকেরা যে রক কনসার্টে বোরকাবিহীন মেয়েদের সঙ্গে বল্গাহীন নৃত্যে লিপ্ত, তা দেখে কাদরির সমর্থকদের সঙ্গে তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে।
ইমরান ও কাদরি পাকিস্তানের আগাপাছতলা বদলে ফেলার যে দাবি তুলেছেন, তার যে কোনো গুণগত মূল্য নেই, সে কথা কেউ বলে না। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও সামরিক দুঃশাসনে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। নওয়াজ বা তাঁর জায়গায় অন্য যে কেউ আসুন, রাতারাতি এই অবস্থার বদল হবে না। শহুরে মানুষকে এক ছাতার নিচে আনার মাধ্যমে ইমরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরেছেন। তাঁর দাবির কারণেই পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানো হচ্ছে। ভোট কারচুপির দাবি মেনে নিয়ে নওয়াজ বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করেছেন। আরও দ্রুত ও ব্যাপক পরিবর্তন চাই, এমন দাবি উত্থাপন করে ইমরান যদি দেশের মানুষকে এক করতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু এ সবই করা দরকার গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ভেতর থেকে। রাজনৈতিক আন্দোলন অবশ্যই সেই পরিকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু আন্দোলনকে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর কাঁধে বন্দুক রেখে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা মোটেই গণতান্ত্রিক পথ নয়।
এ কথার আরও প্রমাণ মেলে ইমরানের দোসর জিহাদি নেতা কাদরিকে দেখে, গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর সমর্থন বড়জোর ঈষদুষ্ণ। কেউ কেউ তাহির-উল-কাদরিকে ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির সঙ্গে তুলনা করেছেন, তবে খোমেনি যে গণতন্ত্রের মানসপুত্র ছিলেন না, সে কথা বুঝিয়ে বলার নেই। শুধু কাদরি নন, ইমরান আম্পায়ার হিসেবে এমন এক চক্রকে বেছে নিয়েছেন, যারা আজীবন গণতন্ত্রের বিপক্ষে কাজ করেছে। ফলে তাঁর উদ্দেশ্যের সাধুতা মেনে নিলেও যে পথ তিনি বেছে নিয়েছেন, তাকে কোনোভাবেই হালাল বলা চলে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই যদি চলতি আন্দোলনের লক্ষ্য হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর ভেতর দিয়েই সে পরিবর্তন আনা সম্ভব, এই কথাটা ইমরান যত দ্রুত উপলব্ধি করবেন, তাঁর ও পাকিস্তানের জন্য ততই মঙ্গল।
মেয়াদ পূরণের আগেই ক্ষমতা ত্যাগের দাবি নিয়ে আন্দোলনের ইতিহাস একদম নতুন নয়। কিন্তু প্রায় কখনোই সে আন্দোলন সুফল বয়ে আনে না। থাইল্যান্ডে বিভক্ত নাগরিক আন্দোলনের ফলে সেখানে এখন সামরিক বাহিনী ক্ষমতায়। ইউক্রেনেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বহিষ্কার করার পর দেশটি এখন পুরোদস্তুর গৃহযুদ্ধের কবলে।
বাংলাদেশেও কেউ কেউ নির্বাচনের বদলে রাস্তা দখল করে ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। ইতিহাসের শিক্ষা তারা যদি মাথায় রাখে, আখেরে ভালো ফল মিলবে।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বন্ধু ফজলে বারী, স্মৃতি অক্ষয় হোক by আবুল মাল আবদুল মুহিত

আমার বন্ধু অধ্যাপক ফজলে বারী মালিক গত মাসের ৫ তারিখে ঢাকা থেকে আমেরিকায় যাওয়ার পথে ইস্তাম্বুলে মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বন্ধু ও পারিবারিক মহলে তাতা বলে পরিচিত আমার এই বন্ধুটি এ দেশে তেমন পরিচিত নন। কিন্তু অর্থ ও পদার্থবিদ্যায় তিনি সারা বিশ্বে একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি স্নাতক পর্যন্ত কলকাতায় পড়াশোনা করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৩ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর পর্বের ছাত্র ছিলেন। তাঁরা ভাইবোন দুজনে একই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর বড় বোন ছিলেন একসময়কার নামকরা গায়িকা ফরিদা বারী মালিক ওরফে বিথী। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল মাত্র তিন বছরের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়েই আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম। তিনি ক্যাম্পাসে নবাগত হলেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং ১৯৫৫ সালে আমি গ্রেপ্তার হলে আমার মুক্তির জন্য বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের প্রলয়ংকরী বন্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ঢাকায় ও তার নিকটস্থ গ্রামে (আগলা, পারিল নওয়াধা) ব্যাপক ত্রাণ ও পুনর্বাসনকাজ পরিচালনা করেন। সেখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফজলে বারী মালিক বেশ সাদাসিধে ও সরল মানুষ ছিলেন এবং সে জন্য তিনি খুব জনপ্রিয় ছিলেন বলে মনে হয় না। তবে ছোটবেলায় তিনি সমবয়সীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অথবা অনুজদের কাছে বড় ভাই হিসেবে খুবই সম্মান পেতেন।
তাঁর বাবা ছিলেন চুয়াডাঙ্গার বিখ্যাত প্রকৌশলী মালিক আবদুল বারী। তিনি বিগত শতাব্দীর ২০-এর দশকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় প্রকৌশলী সার্ভিসের সদস্য ছিলেন; যিনি পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্ভবত প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর নেন। অতঃপর তিনি ইস্ট পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেন। তাঁর মা ফিরোজা বারী মালিক সামরিক সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন; তবে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি ছিল সামাজিক অঙ্গনে নেত্রী হিসেবে। একটি মজার ব্যাপার হলো, তাঁর বিয়ে হয় ১৩ বছর বয়সে এবং সে সময় তাঁকে লেখাপড়ায় ব্যস্ত রাখেন এবং সর্বশেষে শান্তনিকেতনে পাঠিয়ে দেন তাঁর স্বামী। মালিক আবদুল বারীর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তাঁদের কেউই এখন জীবিত নেই। তবে তাঁর দুই জামাই আমাদের ঢাকার স্নায়ু সার্জন অধ্যাপক আবদুল মান্নান এবং লন্ডনে বাস্তুকলাবিদ হাসিনুর রেজা চৌধুরী এখনো জীবিত আছেন। আবদুল মান্নান কিছুদিন আগেই আওয়ামী লীগ থেকে সাংসদ ছিলেন। আমি বিস্তৃতই লিখছি, তার কারণ হলো ফজলে বারী মালিক এ দেশে অপরিচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ফজলে বারী জার্মানি গোটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চলে যান এবং ১৯৫৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর তিনি পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে বিজ্ঞান কর্মকর্তা হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। প্রিন্সট্রন বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরেট গবেষণা করতে কিছুদিনের মধ্যে চলে যান এবং তার পরেই আমেরিকায় অবস্থান নেন। সম্ভবত আমেরিকার দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ব্লুমিংটন ক্যাম্পাস ও সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির কার্বন ডেল ক্যাম্পাসে তিনি চাকরি করেন। তবে প্রায়ই ইউরোপ ও আমেরিকায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়া এবং পড়াশোনায় সময় কাটিয়েছেন। বাংলাদেশেও তিনি প্রায় প্রতিবছর আসতেন। এবার একটু দেরি করে এসেছিলেন। ইতালির ত্রিয়েস্ট শহরে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিউরিটিক্যাল ফিজিক্স নামে একটি উন্নতমানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে অধ্যাপক ফজলে বারী মালিক একজন পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর অন্যতম বন্ধু ও গবেষণায় সহযোগী ছিলেন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত আবদুস সালাম। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি কার্বন ডেলে অধ্যাপক ও ফিজিক্সের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। অধুনা প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে জীবন যাপন করছিলেন।
আমি ১৯৬৯ সালে আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসে চাকরি নিয়ে যাই। তখন আসলে ১৯৭০ সালে আমার এই বন্ধুটির সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের পক্ষেÿ প্রচার-প্রচারণায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে প্রথম শুনানি হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে; আমার বন্ধুটি এর আগে থেকেই ব্লুমিংটনে বাঙালিদের সংগঠন করতে থাকেন এবং নানাভাবে বাঙালিদের খবর সংগ্রহ করতে শুরু করেন।
কংগ্রেসম্যান গালাগার হাউস ফরেন রিলেশনস কমিটির এশিয়া প্যাসিফিক সাব-কমিটির সভাপতি হিসেবে ১১ মে তিনি একটি শুনানির ব্যবস্থা করেন। এ জন্য আমার বন্ধুটি তাঁর ব্যবহারের জন্য একটি নিবন্ধ পাঠান। নিবন্ধটির নাম হলো ‘রিসেন্ট কনফ্লিক্ট বিটুইন ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট পাকিস্তান’। ছাপার হরফে প্রায় ১০ পৃষ্ঠার ব্রিফটি আমার সম্পাদিত ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) প্রকাশিত আমেরিকান রেসপন্স টু বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়্যার বইয়ের ৪৩৭ থেকে ৪৪৬ পৃষ্ঠায় দেখা যেতে পারে। এই বইয়ে আমার বন্ধুটি একটি প্রবন্ধ লেখেন এবং সেই প্রবন্ধের একটি সংলাপ হিসেবে ওই ব্রিফটি সেখানে উদ্ধৃত করেন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ওয়াশিংটনে, সংবাদমাধ্যম, মার্কিন কংগ্রেস এবং শিক্ষা বলয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপক সমর্থন পায়। যদিও নিক্সন–কিসিঞ্জারের সরকারটি সব সময়ই বাংলাদেশের বিরোধিতা করে। ফজলে বারী মালিক ইন্ডিয়ানায় বাংলাদেশের প্রচারণা ছাড়াও আমেরিকার শিক্ষক ও সুধী সমাজের বিভিন্ন আসরে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং লবি করেন।
ফজলে বারী সারা জীবনই একা বসবাস করেন। কিন্তু তাঁর বাড়িটি বেশ, সব সময়ই সাজানো থাকত এবং সে ব্যাপারে আমি নিজেই সাক্ষী। মাত্র কয়েক বছর আগে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন যে একজন জাপানি নারীকে বিয়ে করবেন এবং করেও বসলেন। তিনি যখন তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় এলেন, তখন আমরা বিয়ের উৎসব পালন করি। তাঁদের মাত্র একটি মেয়ে। এবার তিনি যখন বেড়াতে এলেন, তখন বেশ ঘুরে বেড়ালেন এবং পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে তাঁর দেখাশোনাও অনেক হলো।
কী কারণে যে তাঁর পূর্বনির্ধারিত অবস্থান দীর্ঘায়িত করেন, আমি তা জিজ্ঞেস করিনি। ৮০ বছর বয়সেও সুস্বাস্থ্যের নিদর্শন তাঁর মধ্যে দেখা যেত। আমার স্ত্রী এবার মশকরা করে বললেন যে তাতা ভাই, আপনি তো যেমন, তেমন যুবকই থেকে গেলেন। আসলে তাঁর অনেক শারীরিক অসুবিধা ছিল, কিন্তু সেটা নিয়ে খুব কথা বলতেন না এবং খুব সাবধানে থাকতেন। তিনি ভালো খাবারে আনন্দ পেতেন, কিন্তু সব সময়ই পরিমিতি সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। এবার তাঁর বাংলাদেশ সফর নিতান্তই ছিল বিদায়ের জন্য প্রস্তুতি। প্রায় সব বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন। ঢাকায় অনেক ঘোরাফেরা করেছেন। বউ-বাচ্চা নিয়ে সর্বত্র বেড়িয়েছেন।
গত ৫ জুলাই আমি রাতে একটি টেলিফোন পেলাম, তাঁর ভাগনে মজহার বলল যে মামা ইস্তাম্বুলে মারা গেছেন এবং সেখানে বাচ্চা নিয়ে মামির খুব অসুবিধা হচ্ছে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের তুর্কি রাষ্ট্রদূতকে টেলিফোন করি এবং তিনি তাঁর মৃতদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেন। তাঁর কাছে আমি ও আমার বন্ধু পরিবার খুবই কৃতজ্ঞ। এতে তুর্কির বিমান সম্বন্ধে কিছু বক্তব্য না বললে চলে না। তাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ঢাকায় ভ্রমণে এসে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলের প্রতিশ্রুতি দেন এবং সেটা খুবই তড়িঘড়ি করে পালন করেন। তাদের ঢাকা থেকে প্রতিদিন ফ্লাইট রয়েছে। কিন্তু তারা এখানকার সফরকারীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। বিমানে তাদের সেবা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ইস্তাম্বুলে তারা যাত্রীদের হেস্তনেস্ত করে।
এই যেমন আমার বন্ধুটি মারা গেছেন, কিন্তু সে জন্য তারা কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি তার পরিবারকে ফোন করতেও কোনো সাহায্য তারা করেনি। আমি শুনেছি, তারা সব সময়ই যাত্রীদের সঙ্গে এ রকম দুর্ব্যবহার করে। তুর্কি এয়ারলাইনসের সেবা সম্বন্ধে আমার মনে হয় যথাযথ অভিযোগ করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। যা-ই হোক, এটি ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে গেল।
আমি আমার একটি অত্যন্ত জ্ঞানী ও সংবেদনশীল এবং সামাজিকভাবে সচেতন বন্ধু হিসেবে ফজলে বারী মালিককে আমার দেশে পরিচিত করার জন্য এই শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি। সারা জীবন তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে কাটিয়েছেন। তাঁর বন্ধু ও শিক্ষক অধ্যাপক ওয়ার্নার হাইসেনবার্গ এবং আবদুস সালাম দুজনই নোবেল লরিয়েট। তিনিও নোবেল পুরস্কারের জন্য আলোচনায় আসেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক আসরে ও গবেষণাক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। বাংলাদেশে অনেক ছাত্রছাত্রী তাঁর সহায়তায় উচ্চশিক্ষা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর অসংখ্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ তালিকা সম্বন্ধে কিছুদিন আগে আর একজন বিজ্ঞান বিষয়ে পারদর্শী লেখক অনেক কথা বলেছেন।
জয়তু ফজলে বারী মালিক। তোমার স্মৃতি অক্ষয় হোক, বন্ধুবর তাতা।
আবুল মাল আবদুল মুহিত: অর্থমন্ত্রী, সাংসদ।

বিজেপি ও কংগ্রেসের বিকল্প খুঁজছে জনগণ by কুলদীপ নায়ার

উপনির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে, দলগুলোকে রণক্লান্ত মনে হচ্ছে। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাদের অবস্থান এখন নিম্নমুখী। সমস্যাটা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা নিচ্ছে না। প্রতিটি নির্বাচনেই ভোটারদের ক্রমেই মোহভঙ্গ ঘটছে। এটা পরিষ্কার যে বিজেপি এত আসন পাওয়ার পরও ভোটাররা সে স্রোতে একদম ভেসে যাননি। তাঁরা এমন এক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে এই গেরুয়া শক্তির রাশ টেনে ধরবে।
উপনির্বাচনগুলো ছিল আসলে বিজেপি এবং কংগ্রেস, লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও নিতীশ কুমারের জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর সমন্বয়ে গঠিত নতুন ঐক্যের জন্য একটি পরীক্ষা। দেখা গেল, উপনির্বাচনগুলোতে নতুন সেক্যুলার জোট বিজেপির বিরুদ্ধে ভালো করেছে। যদিও লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় উপনির্বাচনে বিজেপিরই ভালো করার কথা। এই ফলাফল নতুন জোটের মনোবল বাড়াবে, বিশেষত কংগ্রেসের মতো একটি মহিরুহ ও পুরোনো দলের ক্ষেত্রে তা একটি বড় ব্যাপারই হয়ে থাকবে।
অন্যদিকে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলে নিশ্চিতভাবে বিজেপিতে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। বিজেপি ফ্রন্ট গঠনে সাহস দেখালেও সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের ১১টি আসনে উপনির্বাচনের আগে জনমত পাঠের ক্ষেত্রে দলটিকে কুশলতার পরিচয় দিতে হবে।
বিজেপির নতুন সভাপতি দলে পাইকারি হারে পরিবর্তন এনেছেন, ফলে উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনের ফলাফল দলটির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এল কে আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশির মতো ঝানু নেতাদের দলটির সংসদীয় সভায় স্থান না পাওয়াটা সত্যিই করুণার উদ্রেক করে। অমিত শাহ এই ১১টি আসনই নিজেদের ঝুলিতে পুরতে চান, কারণ এই উপনির্বাচনকে রাজ্যটির ২০১৭ সালে অনুষ্ঠেয় রাজ্যসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে।
উত্তর প্রদেশের এই নির্বাচনে বিজেপিকে কংগ্রেস ও সাম্যবাদী পার্টির সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে নামতে হবে, এই দল দুটি ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে শাহকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হবে। লোকসভা নির্বাচনে শাহ প্রায় এককভাবেই উত্তর প্রদেশের ৮০টি আসনের মধ্যে ৭০টি আসনে বিজেপিকে জিততে সহায়তা করেছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি সভাপতির পদ পেলেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হয়েছে।
মনে হচ্ছে, মোদি-জাদুর আমেজ ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও বিহারের ১৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই চার মাসের মধ্যেই ভোটাররা কেন এভাবে বিজেপির দিক থেকে মুখ ফেরানো শুরু করেছেন, সেটা গভীর বিশ্লেষণের ব্যাপার। এটা সত্য, দলটি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন খুব কঠিন, সেটা একটা আংশিক কারণ বটে। দলটি কীভাবে তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ক তেমন কোনো প্রস্তুতি তাদের নেই।
বছরের পর বছর ধরে নির্বাচনে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, আর বাস্তবায়ন হয় খুব সামান্যই। দলগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে জয়লাভ করা, ফলে জনগণের উপলব্ধি হয় খুব দ্রুত। ভোটাররা এক দলকে বাদ দিয়ে আরেক দলকে বেছে নেন, প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁরা আশা করেন আগের চেয়ে এবার ভালো হবে। আর আশা পূরণ করতে না পারলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট দলকে শাস্তি দেন। যেমন, কংগ্রেস লোকসভায় এবার মাত্র ৪৪টি আসন পেয়েছে, এমনকি বিরোধী দলের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যে ৫৫টি আসনের দরকার হয়, সেটাও তারা পায়নি।
মধ্যপ্রদেশে আসন হারানো অমিত শাহ ও শিবরাজ সিং চৌহান উভয়ের জন্যই সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চৌহান সম্প্রতি দলটির সংসদীয় বোর্ডে ঠাঁই পেয়েছেন, এই বোর্ড দলটির সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সভা। না, শুধু কংগ্রেস প্রার্থীর জয়-ই নয়, ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রার্থীর পরাজয়ই তাদের বেশি পোড়াবে। কেননা, এই চার মাস আগের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মধ্যপ্রদেশের ২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল।
বিহারে লালু-নিতীশ যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে এই উপনির্বাচনের জয় বিপুল প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। এই দুই ঝানু রাজনীতিবিদ খুব সুপরিকল্পিতভাবে একটি রাজনৈতিক জুয়া খেলেছেন, সেখান থেকে ফলও এসেছে ভালো। বিহারের রাজনীতিতে ভোটের অঙ্ক ও বর্ণপ্রথার সমীকরণ তাঁরা ভালোই বোঝেন, ফলে তাঁরা জানতেন, উপনির্বাচনে জিততে হলে তাঁদের সম্মিলিতভাবে লড়াইটা করতে হবে।
সন্দেহ নেই, তাঁদের এই জয় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। বিজেপিবিরোধী দলগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি হবে। আগামী রাজ্যসভা নির্বাচনে সেটা বিজেপিকে ভালোভাবেই ভোগাতে পারে। বহুজন সমাজবাদী পার্টির মায়াবতী উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনে মুলায়ম সিং যাদবের এরূপ একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। কারণ, সমাজবাদী পার্টি যে মায়াবতীকে ছুড়ে ফেলতে চেয়েছিল, সে বেদনা এখনো তিনি ভোলেননি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মায়াবতীর আস্থা তাঁরা অর্জন করতে পারলে তিনি হয়তো এ প্রস্তাবে সাড়াও দিতে পারেন।
যাই হোক, এই উপনির্বাচনের ফলাফল বিজেপিবিরোধী শিবিরে আনন্দের বারতা পৌঁছে দিয়েছে। এখন সবাই হয়তো এরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টা করবেন। সিপিএমের নেতা প্রকাশ কারাত বলেছেন, সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বিজেপিবিরোধী জোটগুলো ভালো করেছে, ফলে বিজেপি ঠেকাতে সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ঐক্য করা যেতে পারে। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর ও সিপিএমের কিছু অমীমাংসিত ব্যাপার রয়েছে। ‘বিজেপি এখন ক্ষমতায়, ফলে আমরা এখন বিজেপিকে ঠেকাতে চাই। কিন্তু আমরা কংগ্রেসের নীতিরও বিরোধী’, তিনি বলেছেন।
পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, অসাম্প্রদায়িক দলগুলোর একটি শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ভোটাররা কংগ্রেস ও বিজেপির বাইরে একটি বিকল্প খুঁজছে। জনগণ গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শাসন চায়, আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের লক্ষ্যও ছিল তা–ই।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

নিয়োগপর্বেই ওএসডি by আলী ইমাম মজুমদার

বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ইংরেজি প্রতিশব্দ অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি। এর সংক্ষিপ্ত রূপ ওএসডি শব্দটি বাংলাদেশে জনপ্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গনে বহুলভাবে ব্যবহৃত। তবে বাস্তব অর্থে এ শব্দটি পদের কর্মপরিধির সঙ্গে সংগতিহীন। কেননা, এই বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ বিশেষ কেন, সাধারণত কোনো দায়িত্বই পালন করেন না। বহন করেন না কোনো ভার। তাঁরা মাঝেমধ্যে অফিসে ঢুঁ মারেন। নেই তাঁদের কোনো অফিস কিংবা চেয়ার-টেবিল। তবে রয়েছে বেতন-ভাতাদি। প্রাধিকার অনুসারে বাড়ি-গাড়িও।

তবু ওএসডি করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রয়োজনে যেমন, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও ছুটিকালে। পদোন্নতিকালেও কিছু কর্মকর্তাকে পদায়নের আগে সাময়িকভাবে ওএসডি করার আবশ্যকতা থাকে। এগুলো করা হয় বেতন-ভাতাদি দেওয়ার সুবিধার্থে। তবে হাল আমলের পদোন্নতিতে তা-ও আবশ্যক হয় না। এখন পদ উন্নীত হলেও প্রায় ক্ষেত্রে কর্মকর্তার কার্যক্ষেত্রের আওতা একই থেকে যাচ্ছে। আবার শৃঙ্খলামূলক কোনো কার্যক্রম চলাকালেও প্রশাসনিক প্রয়োজনে ক্ষেত্রবিশেষে ওএসডি করা হয়ে থাকে। এসব ছাড়াও কর্তৃপক্ষের অপছন্দের কর্মকর্তাও ওএসডি হন প্রায়ই।
গত দুই যুগ তাঁদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছে। কেউ কেউ ওএসডি থাকেন বছরের পর বছর। তাঁদের গুটি কয়েক সৃজনশীল কিছু কাজ নিয়ে থাকলেও বেশির ভাগই করেন অকর্মণ্য জীবনযাপন। কারও বা এভাবেই অবসরের সময় চলে আসে। এ ধরনের ওএসডি করার প্রবণতা পাকিস্তান সময়কালেও দু-একটি ছিল বলে জানা যায়। লাহোর হাইকোর্টের এককালীন খ্যাতিমান প্রধান বিচারপতি কায়ানি চাকরিজীবনের শুরুতে আইসিএস ছিলেন। তিনি প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন একজন সিএসপি কর্মকর্তাকে এ ধরনের ওএসডি করা সম্পর্কে ক্ষোভ মিশ্রিত রসিকতা করে এক ভাষণে বলেছিলেন, ওএসডি প্রতিষ্ঠানটি হচ্ছে ডিডিটির মতো। এটা মনের জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। এরা সিএসপি-কুলের উৎকৃষ্ট শ্রেণি। এখানে কোনো কাজ না করেই পুরো বেতন পাওয়া যায়। তবে হাল আমলে এর মাত্রা আর আঙ্গিকে এ ধরনের রসিকতার সুযোগ চলে গেছে। কেননা, মানুষ অল্প শোকে কাতর হলেও অধিক শোকে হয়ে যায় পাথর।
প্রচলিত ধরনের ওএসডি-পর্ব প্রসঙ্গ আলোচনা অনেক হয়েছে। তবে চাকরির শুরুতেই ওএসডি করা সম্ভবত আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একেবারেই নতুন সংযোজন। যাঁরা এটা করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁরা নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য ‘স্মরণীয়’ থাকবেন। ‘পথিকৃৎ’ বিবেচিত হবেন ওএসডি হয়ে যাঁরা নতুন চাকরিতে যোগ দিলেন, তাঁরাও। খবরে প্রকাশ, সরকারের অনুমোদিত পদের চেয়ে এক হাজার ৬৪৭ জন চিকিৎসককে ওএসডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ‘কর্মস্থল’ নির্ধারিত হয়েছে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোয়। তাঁদের জন্য এখনই বছরে ব্যয় হবে ৩৫ কোটি টাকা। তাঁরা অতিসম্প্রতি নিয়োগ দেওয়া ছয় হাজার ২২১ জন চিকিৎসকেরই অংশ।
চিকিৎসকদের চাহিদা আমাদের আছে রাজধানী থেকে পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত। সে হিসাব করেই শূন্য পদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। যেকোনো ক্যাডারে প্রকৃত চাহিদার অনধিক ১০ শতাংশ অতিরিক্ত রাখা হয় প্রশিক্ষণ, ছুটি ও প্রেষণজনিত কারণে। দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও ছুটিতে থাকা কর্মকর্তারা ওএসডি হন। তবে ওএসডি হিসেবে নিযুক্তি দিয়ে রাজধানী ও এর আশপাশের অঞ্চলে সংযুক্ত করা একটি নজিরবিহীন অরাজক অবস্থা বললে অত্যুক্তি হবে না। নিয়োগের পরপর গণমাধ্যম মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সংখ্যাধিক্য নিয়োগের জন্য একে অন্যকে দায়ী করেছে। তবে বিএমএ মহাসচিব যথার্থই বলেছেন যে এ পদায়নের কারণে সরকার ও চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট সবাই বিব্রত।
শেষাবধি এসে মন্ত্রণালয় দিচ্ছে আরও একটি বিস্ময়কর যুক্তি। তাদের মতে, ২৫ হাজার সদস্যের ক্যাডারে দুই হাজার ৫০০ ওএসডি থাকতে পারেন। কিন্তু ওএসডি থাকার কথা তো শুধু দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও ছুটিকালে কিংবা কোনো শৃঙ্খলাজনিত কারণে। আর তা-ও নির্ধারিত পদসংখ্যার মধ্যে। নিয়োগকালে অতিরিক্ত নিয়োগ দিয়ে অবশ্যই নয়। তবু মন্ত্রণালয় আশা করছে, এই ওএসডি চিকিৎসকেরা পল্লি অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। নিয়মিত পদাধিকারীদের থেকে যা পাওয়া যায় না, তা ওএসডি পদধারীদের কাছে আশা করা হচ্ছে। আশাবাদ ভালো। তবে তা যৌক্তিক হওয়ার কথা নয় কি?
আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক উপজেলা থেকে পল্লি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। এসব স্থানে চিকিৎসকের পদও রয়েছে। সে পদের হিসাব ধরেই নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেসব স্থানে নিয়োগকৃত চিকিৎসকেরা সূচনা থেকেই ঢাকা কিংবা বড় শহরে বদলির অবিরাম চেষ্টা চালাতে থাকেন। আর তাঁদের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ অবস্থান করে কর্মস্থলে। এরূপ রাশি রাশি খবর পত্রপত্রিকায় আসছে সময়ে সময়ে। অবশিষ্ট অংশ শুধু বেতন নেওয়ার প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে করে যাওয়া-আসা। এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাজোট সরকারের গত মেয়াদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিতির জন্য বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে সাসপেন্ডও করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থা রয়েছে অপরিবর্তিত। এমনকি এবারের এত বেশি নিয়োগের পরেও তেমন কিছু উন্নতি হবে, এ দুরাশা অনেকেই করেন না।
স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক যতই সম্প্রসারিত হোক, প্রত্যন্ত পল্লির জনগণ চিকিৎসকদের খুব কম অংশের সেবাই পেয়ে থাকেন। মফস্বলে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকেরা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রেষণ, সংযুক্তি—ইত্যাদির নামে ঢাকার নামীদামি সরকারি হাসপাতালে চলে আসেন। মাত্র কয়েক মাস আগে একটি পরিসংখ্যান বেরিয়েছিল চিকিৎসকদের কর্মস্থল সম্পর্কে। রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোয় নির্ধারিত পদের দ্বিগুণ বা তারও বেশি ‘কর্মরত’ রয়েছেন। এখানেও কি আমরা তাঁদের সত্যিকার সেবা নিতে পারছি? আর জেলা সদরের নিচে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো চিকিৎসক-সংকটে থাকে। কোথাও নিযুক্তিই নেই আর কোথাও বা কাজির গরুর মতো শুধু কেতাবে আছে। স্মরণ করা যায়, একসময় এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো জেলা বোর্ডের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণে ছিল। এলএমএফ চিকিৎসকেরা সেখানে ছিলেন। ছিল তদারকি। তাই তাঁদের কর্মস্থলকে অবজ্ঞার সুযোগ ছিল না।
ওএসডি হিসেবে নিয়োগ নিয়ে কোনো কোনো পত্রিকা খবর করেছে, তদবিরের চাপে এই ওএসডি নাটক। হতেও পারে। তদবির হয়, এটা সত্য। তাই পদায়নের দায়িত্বটা যাঁদের ওপর, তাঁরা চাপের মুখে থাকেন। কিন্তু এর মাত্রা কি এমন পর্যায়ে যেতে পারে? ঢাকা কিংবা এর কাছাকাছি রাখার জন্য এক হাজার ৬৪৭ জন নবনিযুক্ত চিকিৎসককে ওএসডি করে পদায়ন করতে হবে? ধারাবাহিকভাবে আমাদের সরকারগুলো স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে উদার উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে চিকিৎসকদের মফস্বলে থাকার চরম অনীহা এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তা ছাড়া রাজধানীসহ বড় বড় শহরের সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মানও ক্রম নিম্নমুখী। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা নিজস্ব চেম্বার ব্যবসার স্বার্থে উপেক্ষা করছেন তাঁদের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে চুটিয়ে ব্যবসা করছে বেসরকারি হাসপাতাল। বিত্তবানেরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। বেসরকারি হাসপাতালও তাঁদেরই আওতায়। নিম্নবিত্ত কেন, মধ্যবিত্তশ্রেণির জন্যও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেওয়া দুরূহ। আর সমাজের ভাগ্যবঞ্চিত হতদরিদ্রশ্রেণি কার্যকর চিকিৎসাসেবার বাইরেই থাকছে। কেউ বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভিটেবাড়ি বিক্রি করেও চিকিৎসাসেবা নেয়। সরকারি বড় হাসপাতালে এ ধরনের রোগী এলে থাকে উপেক্ষিত। ফলে দালালের খপ্পরে পড়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে আর্থিকভাবে হয় বিপন্ন। দালালদের এ ধরনের ফাঁদ পাতাই থাকে সরকারি হাসপাতালের ভেতর ও বাইরে। আর এমনটা কীভাবে এবং কেন ঘটে, তা সহজেই অনুমেয়।
যত সমালোচনাই করা হোক, চিকিৎসকেরা সমাজের অতি প্রয়োজনীয় একটি অংশ। যথেষ্ট মেধাবী ছাত্ররাই কঠোর পরিশ্রম করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেন। আমাদের সবারই প্রয়োজন আছে তাঁদের কাছে। তাঁদের অনেকেই আমাদের অতি আপনজন। প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসকদের প্রতি শ্রেণি হিসেবে কোনো বৈরিতা কারও নেই। থাকতে পারে বিশেষ কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকদের জীবনধারণ ও কর্মপরিবেশ উন্নত করার জন্য আবশ্যক হলে সরকারের সামর্থ্যের মধ্যে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করা সংগত। পাশাপাশি তাঁরা সম্ভাব্য ভালো মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করবেন, এ প্রত্যাশাও যৌক্তিক। আজকাল শিক্ষিত বেশ কিছু লোক থাকছেন উপজেলা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ হাটবাজারের কাছাকাছি। সেখানে অন্য সরকারি কর্মকর্তারাও থাকেন। এসব স্থানে চাকরি করতে চিকিৎসকদের অনীহা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আরও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না নিয়োগপর্বেই এক হাজার ৬৪৭ জন চিকিৎসককে ওএসডি হিসেবে পদায়ন।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com