Monday, November 11, 2013

মত দ্বিমত- দেশে জরুরি অবস্থা জারির পাঁয়তারা by ইনাম আহমদ চৌধুরী

নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। একদিকে বিরোধী দলের সহিংস হরতাল অন্যদিকে সরকারের ধরপাকড়। এ পরিস্থিতিতে জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কী ভাবছে রাজনৈতিক দল?

মত দ্বিমত- হরতালের নামে তারা সহিংসতা চালাচ্ছে by ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন

নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। একদিকে বিরোধী দলের সহিংস হরতাল অন্যদিকে সরকারের ধরপাকড়।

মিসর- এক খাঁচা, দুই প্রেসিডেন্ট by কামাল গাবালা

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের আরও ১৪ জনের বিচার কার্যক্রম একটি আদালত আগামী ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করার এক দিন পর আমি এই নিবন্ধ লিখছি।

সফলদের স্বপ্নগাথা- তখন আমি ম্যাজিশিয়ান: হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে, ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর। তিনি একাধারে নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রনির্মাতা।

আলোর মশাল by নুহাশ হুমায়ূন

আমার বয়স তখন এগারো। একমাত্র চেনা পথটা ধরে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি। যাচ্ছি আমার মায়ের বাসা থেকে বাবার বাসায়। অনেকে জানতে চায়, বাবা-মা আলাদা হয়ে গেলে বাচ্চাদের কেমন লাগে।

সংঘাতের রাজনীতিকে দিন স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ ধোলাই- এখনই উপযুক্ত সময়

অনেক আগে ঢাকায় ধোলাই খাল নামে একটা খাল ছিল। আজ সেই খাল নেই, কিন্তু ধোলাই আছে। এখনো বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে সাইনবোর্ডে লেখা থাকে, ‘এখানে জামাকাপড় ধোলাই করা হয়’।

কে নেবে দায়, কে করবে বিচার? by মোর্শেদ নোমান

‘মন্টু তো কোনো রাজনীতি করত না, কিন্তু রাজনীতির শিকার হলো। কে এর বিচার করবে?’ বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন পরেশ পাল।

১২ হাজার ভোটারের তথ্য গায়েব

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অণু বিভাগের তথ্যভান্ডার থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ১২ হাজার ৮২৫ জন ভোটারের তথ্য গায়েব হয়ে গেছে। ওই ভোটারদের পূরণ করা পুরোনো তথ্য ফরম থেকে তথ্য নিয়ে আবার তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাদিক বলেছেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক নয়। হারিয়ে যাওয়া এসব তথ্য ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তথ্য হারানোর বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন নিবন্ধন অণু বিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) কর্নেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেউদ্দিন।

সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোনো ভোটার তথ্য নতুন করে তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শেষ হয়েছে গত রোববার। এরপর ভোটারদের ছবি বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। কাজটি করতে গিয়ে নিবন্ধন অণু বিভাগ আগারগাঁওয়ের নিজস্ব দপ্তরে বাইরের লোকজনের যাতায়াত, এমনকি নিজস্ব কর্মকর্তাদের গতিবিধির ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অনেকটা কঠোর নিরাপত্তায় তাঁরা নতুন তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছেন। ভোটারদের পূরণ করা তথ্য ফরম সব সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। যেসব ভোটারের তথ্য গায়েব হয়েছে, তাঁদের তথ্য ফরম সংরক্ষিত না থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার তথ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। সে ক্ষেত্রে নতুন করে ভোটার করতে হতো। ২০০৯-১০ সালের কোনো এক সময়ে সোনারগাঁ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১২ হাজার ৮২৫ জন ভোটারের তথ্য তথ্যভান্ডার থেকে মুছে যায়। কর্মকর্তাদের ধারণা, ভোটার তথ্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে স্থানান্তরের সময় অণু বিভাগের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) শাখার অসতর্কতায় এসব ভোটারের তথ্য মুছে যায়। কমিশনের কাছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ছাপানো ভোটার তালিকা থাকায় ইউপি ও পৌর নির্বাচনের সময় বিষয়টি নিয়ে তাঁদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি।

ডলারের মূল্য হ্রাস, চাল ও সবজির দাম বৃদ্ধি by ড. আর এম দেবনাথ

বাজারে ডালের দাম কম, চালের দাম বেশি। মোবাইলে মেসেজ দেখলাম, ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানির দাম কমছে ২০ শতাংশ। অন্যদিকে বাজারে সবজির দাম বেশি। বর্তমানে দেশে চলছে এক অনিশ্চয়তার খেলা। রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা, অর্থনীতি ও ব্যবসায় অনিশ্চয়তা। রাজনীতি অর্থনীতিকে গ্রাস করছে, অর্থনীতি রাজনীতিকে গ্রাস করছে। এই খেলায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত, চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, মধ্যবিত্ত, নিুমধ্যবিত্ত ও বেকার মানুষ। লাভবান পাইকারি-খুচরা ব্যবসায়ীরা। এই যেমন সর্বশেষ রাজনৈতিক কর্মসূচি- চারদিনের হরতাল, ১০ থেকে ১৩ তারিখ। হরতাল শুরু হওয়ার আগের দিনই চালের দাম বেড়ে গেল কেজিতে প্রায় এক টাকা। এর আগে গত এক মাসে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে পাঁচ-সাত টাকা করে। যে মোটা চাল ৩২-৩৩ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ৪০ টাকা কেজি। নাজিরশাইলের দাম কেজিতে বেড়েছে পাঁচ টাকা। এটা কি শুধু হরতালের কারণে? না, তা নয়। চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে পবিত্র ঈদের আগ থেকে। হরতাল-ভয়তাল বেশতি সুযোগ। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি শুধু ‘সাপ্লাই চেইন’ বিনষ্ট হওয়ার জন্য নয়, নয় শুধু সরবরাহ ঘাটতির জন্য। এতে যোগ হয়েছে পাইকারি-খুচরা ব্যবসায়ী ও মিলারদের সীমাহীন লোভ।
আমাদের দুঃখ, ব্যবসায়ী ভাইয়েরা গ্রাহকদের কখনও একটু স্বস্তি দেন না। বৃষ্টিতে দেন না, রোদে দেন না, সরবরাহে ঘাটতি হলে দেন না, সরবরাহে উদ্বৃত্ত দেখা দিলে দেন না, সরকার কর কমালেও দেন না। এমনকি ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ী ভাইয়েরা পবিত্র রোজার মাসে, কোরবানির ঈদেও কাউকে একটু স্বস্তি দেন না। যদি দিতেন, তাহলে তারা চালের দাম বাড়াতেন না। চালের সরবরাহে কি ঘাটতি সত্যি সত্যি? বাদামতলীর চালের ব্যবসায়ীরা মিটফোর্ড-সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচটা দখল করে চালের স্টক করেন অবৈধভাবে। দেখলাম, সেই স্টকে কোনো ঘাটতি নেই। দেশে চালের উৎপাদনও রেকর্ড পরিমাণ। চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। সরকারের গুদামেও প্রচুর চাল। আটা আমদানিও যথেষ্ট। আগামী ফসলের আগমনী বার্তাও ভালো। তাহলে এ মুহূর্তে চালের এই দাম বৃদ্ধি কেন? এই বৃদ্ধির পরিমাণটা কি মাত্রাতিরিক্ত নয়? এতে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? অবশ্যই সাধারণ মানুষ। আমাদের মূল্যস্ফীতি যে পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়, তাতে চালের ‘ওজন’ যথেষ্ট। চালের দাম বৃদ্ধি মানে মূল্যস্ফীতি বাড়া। মূল্যস্ফীতি বাড়া মানে লোকের সঞ্চয় কমা, সঞ্চয় কমা মানে বাজারে সঞ্চয়ের অভাব হওয়া। এক সমস্যায় ১০ সমস্যার সৃষ্টি। কিন্তু তা সত্ত্বেও চালের দাম বৃদ্ধি ঠেকানো এক অসম্ভব ব্যাপার। দু’দিন পরপর যদি টানা তিন-চারদিনের হরতাল ডাকা হয়, যদি কোনো কারণে অবরোধের ডাক আসে, তাহলে ব্যবসায়ী ভাইয়েরা কেন বসে থাকবেন? পুঁজি তাদের বাড়বেই। অতিরিক্ত মুনাফা তাদের হবেই। ধর্ম-নৈতিকতা তাকে নিরস্ত করতে পারবে না। মজার বিষয়, দেশে যারা ধর্ম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করছেন, তারাও কিন্তু এ বিষয়ে চুপ। তারা মহিলাদের গৃহবন্দি করা নিয়েই ব্যস্ত। মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে, অতিরিক্ত সুদের ব্যবসার বিরুদ্ধে কিন্তু তারা নিশ্চুপ। মজার দেশ, তাই না!
শুধু তো চালের দাম বৃদ্ধি নয়, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শাকসবজির দাম। এখন শীতকাল- নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ। নতুন সবজি উঠেছে। কিন্তু সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। দু’-একটির দাম কম থাকলেও বেশিরভাগের দাম কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। কাঁচা মরিচের দামের কথা নাইবা বললাম। এদিকে মসুর ডালের কেজি ১১০ টাকা। মুগের ডাল এক কেজি ১৩০ টাকা। চিনির কেজি ৪০ টাকা। পেঁয়াজ? পেঁয়াজের কেজি দেশীটা ১১০ টাকা। কোন দিকে যাবে মানুষ? বলাই বাহুল্য, আজকের দাম্য বৃদ্ধির একটা বড় কারণ টানা হরতাল। তবে তা একমাত্র কারণ নয়। হরতাল না হলে অবশ্যই মানুষ বেশ কিছুটা স্বস্তি পেত। হরতালের কারণে ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা দিতে পারবে না। ঘরে ভাত থাকবে না উচ্চমূল্যের জন্য- এ এক বিশাল অবিচার নয় কি? শুধু ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, কৃষক যারা সবজি ফলায়, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত। ঢাকার আশপাশ অঞ্চলের সবজিচাষীদের মাথায় হাত। সবজি ঢাকায় আসছে না। কাজেই তারা কোনো দামই পাচ্ছে না। অনেক সবজি বুড়ো হয়ে জমিতেই পচবে। একেই বলে সর্বনাশের সর্বনাশ। এর থেকে আমাদের মুক্তি নেই।
আসা যাক ডলারের মূল্যের দিকে। চালের দাম বাড়ছে, সবজির দাম বাড়ছে। কিন্তু কমছে ডলারের দাম। ২০১২ সালের দিকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যখন সবাই মনে করেছিল ডলারের দাম ১০০ টাকায় পৌঁছবে। ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা তো হৈ চৈ শুরু করে দিয়েছিলেন। আতংকিত হয়ে আমিও অনেক লিখেছি। সামনে দুর্দিন, ভীষণ দুর্দিনÑ আমিও লিখেছি। এখন যেমন চলছে ভারতে। ভারত বহুদিন তার ‘রুপিকে’ অবমূল্যায়িত (আন্ডারভ্যালুড) করে রাখে। ২০১৩ সাল তাদের রুপির জন্য দুর্দিন। রুপির দামে অধঃপতন ঘটে। দৃশ্যত এতে আমাদের লাভ। বহুদিন পর আমরা ডলারের বিপরীতে রুপি মার খাওয়ায় ‘হুণ্ডিতে’ বেশ ভালো দর পাচ্ছিলাম। ভারত এখন যে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন ডলারকে নিয়ে, আমরা বাংলাদেশে এমন একটা বাজে সময়ের আশংকা করেছিলাম। না, আমাদের আশংকা বাস্তবে রূপ নেয়নি। ডলারের দাম বহুদিন পর টাকার বিপরীতে কমেছে। এখন ডলারের দাম ৭৭-৭৮ টাকা। কার্ব মার্কেটে অবশ্য বেশি। সরকারিভাবে দাম ৮০ টাকার নিচেই। এই মূল্য হ্রাস বা মূল্যের স্থিতিশীলতা সম্ভব হয়েছে অনেক কারণে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠিন ঋণনীতি অনুসরণ করছে। সরকারি ব্যাংকের প্রচুর উদ্বৃত্ত টাকা থাকলেও তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা সীমিত করে দেয়া হয়েছে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণপ্রবাহের হিসাব দিতে হয়। ঋণ বরাদ্দের কাজ কঠিন করা হয়েছে। ১০ কোটি টাকার নতুন ঋণ দিতে এখন ইন্টারনাল অডিটের সম্মতি লাগবে। যার কাজ ছিল ঋণ পরবর্তী কাজ, এখন তাকে ঋণ পূর্ববর্তী পর্যায়ে জড়িত করা হয়েছে। ঋণের সিলিং বেঁধে দেয়া হয়েছে। আমদানি নীতি কঠোরতর করা হয়েছে। অনেক আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে সরকারি ব্যাংকের ঋণপ্রবাহ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে বৃদ্ধি পাওয়া তো দূরের কথা, হ্রাস পেয়েছে। বড় বড় ঋণ দেয় সরকারি ব্যাংক। তা বস্তুত বন্ধ। বড় বড় ঋণ হয় প্রকল্প ঋণ। প্রকল্প ঋণ হলেই আমদানির জন্য বড় বড় ‘এলসি’ হয়। ঋণপত্র হলেই ডলারের চাহিদা বাড়ে। প্রকল্প ঋণ নেই তো ডলারের চাহিদাও নেই। অনেক আমদানি নিরুৎসাহিত হওয়ায় সেই খাতেও ডলারের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আমদানিযোগ্য পণ্যের দাম এখন কম। তেলের দাম কম। তেলের আমদানিতে প্রচুর ডলার লাগে। এসব কারণে ডলারের চাহিদা বাজারে কম। ক’দিন আগে ঈদ গেল। হজ গেল। তখন সাময়িকভাবে অল্পস্বল্প ডলারের চাহিদা বেড়েছিল। ডলারের চাহিদা অবশ্য কার্ব মার্কেটে ভালো। এর রয়েছে ভিন্ন কারণ। যাদের টাকা আছে, রোজগার আছে, বাইরে ছেলেমেয়ে আছে, ব্যবসা আছে- তারা সমানে দেশের বাইরে টাকা পাঠাচ্ছে। নির্বাচন অনিশ্চিত হওয়ায়, কী হয় কী হয় অবস্থায় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা টাকা পাচারের কাজ করছে।
এদিকে ডলারের চাহিদা কমলেও ডলারের সরবরাহ মোটামুটি ঠিক আছে। রেমিটেন্সও ভালো, গার্মেটস রফতানিও ভালো। ফলে শনৈঃ শনৈঃ বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এতে অনেকেই উৎফুল্ল। প্রচুর টাকা রিজার্ভে। এ টাকা উন্নয়নের জন্য খরচ করা যায়। করা যায়- কিন্তু এই ডলারের মালিক কৃষকের ‘পোলারা’। ডলার নিতে হলে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকায় তা কিনতে হবে। সরকারের টাকা কোথায়? নেই। অতএব ওই চিন্তা বাদ। এছাড়া আগের হিসাব এখন বাতিল। বলা হতো, তিন মাসের আমদানির সমপরিমাণ ডলার রিজার্ভে থাকা দরকার। এখন বলা হচ্ছে, তিন মাস নয়, ছয় মাস। কারণ ঝুঁকি বেড়েছে। আমদানিযোগ্য পণ্যের মূল্য যখন তখন বাড়তে পারে। ‘ডেফার্ড এলসির’ জন্য ডলার রাখতে হবে, ব্যবসায়ীরা ডলারে যে ঋণ করেছে তা পেমেন্টের জন্য ডলার রাখতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব ‘ডলার রিজার্ভ’ ‘ডলার রিজার্ভ’ বলে হৈ চৈ করার কিছু নেই। বরং উল্টো ফল আছে। ডলারের মূল্য হ্রাস, রিজার্ভ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে রেমিটেন্সের একটা অংশ আবার হুণ্ডিতে আসছে। হুণ্ডিতে রেমিটেন্স আসে বরাবরই। এখন এর পরিমাণ আবার বাড়ছে। কোনো দেশপ্রেমই ‘হুণ্ডি’ প্রবণতা হ্রাস করতে পারছে না। এটা হচ্ছে ডলারের মূল্য হ্রাসের প্রথম ফল। দ্বিতীয় ফল অবশ্য আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্য হ্রাস। আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি, সেগুলোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে। এসবের দাম অভ্যন্তরীণ বাজারে কমার কথা। কিন্তু তা কমেনি। এর কোনো সুবিধা সাধারণ মানুষ পায়নি। এ লাভটা পকেটস্থ হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ডলারের দাম কমায় ভারতীয় পণ্য আমাদের কাছে সস্তা হয়েছে। ফলে ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানির কাজ কিছু বিঘিœত হচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের পোশাক ভারতীয়দের কাছে ব্যয়বহুল হয়েছে। তবে উল্টো বিষয়ও আছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট কারখানার জন্য তুলা-সুতা আমদানি করে। এর মূল্য এখন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের কাছে কম। অতএব এখানে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে।
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন... by পলাশ কুমার রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি ইউনিটে ছয় হাজার ৬৬৮টি আসনের বিপরীতে দুই লাখ ৬২ হাজার ৯০৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। অর্থাৎ প্রতিটি আসনের জন্য ৩৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী। ১ নভেম্বর শুক্রবার ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সত্ত্বেও মুঠোফোন এবং হাতঘড়িসহ নানা পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তরপত্র লেখার ক্ষেত্রে বেশকিছু শিক্ষার্থী জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। ১ নভেম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতি অর্থাৎ মুঠোফোনের সাহায্যে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো এবং প্রতিশ্র“ত টাকা না দেয়াকে কেন্দ্র করে অপহরণ ইত্যাদি কারণে বেশ ক’জনকে আটক করা হয়। ডিজিটাল জালিয়াতি রোধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ৮৬টি কেন্দ্রে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি বলে অনুমেয়। অনেকে হয়তো চিন্তা করতে পারেন, দেশে এতশত সমস্যা ও সংকট থাকার পরও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে লিখতে বসেছি কেন? এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে, আমরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা সংকটের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছি। না চাইলেও হাজারও সমস্যার আবর্তে জড়িয়ে পড়ছি আমরা। সমস্যা আর সমস্যা। অর্থনৈতিক সমস্যা, রাজনৈতিক সংকট, পারিবারিক কলহ, নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি, বেকারত্ব, মাদকের সহজলভ্যতা, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, ব্যক্তিস্বার্থে আদর্শকে জলাঞ্জলি দেয়া, তোষামোদি করা, ক্ষমতাশালীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, ধর্মীয় শিক্ষার নামে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করা ইত্যাদি হাজারও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। প্রতিনিয়ত যেন নিত্যনতুন সংকট আর সমস্যার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ছি আমরা। উদ্ভূত সমস্যাগুলো প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ না করে শুধু লোক দেখানো কিছু পরিকল্পনা প্রণয়ন করে হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া রাষ্ট্রের যেন আর কোনো দায়দায়িত্ব নেই, এমন করেই চলছে আমাদের বর্তমান ও নিকট অতীতের দিনগুলো।
লাখ লাখ শিক্ষার্থী, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চ শিক্ষার জন্য এবারের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে তারাই আগামী দিনে বাংলাদেশের যোগ্য উত্তরসূরি। তাদের মধ্যে কেউ প্রধানমন্ত্রী হবে, সরকারি আমলা হবে, রাজনীতিক হবে, চিকিৎসক হবে, বুদ্ধিজীবী হবে, সাংবাদিক হবে, আইনজীবী হবে, বিচারক হবে, প্রকৌশলী হবে। তারা নানা পেশায় নিজের যোগ্যতার পরিচয় দেবে। যেসব শিক্ষার্থী এসব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোতে পড়বে তারা কি জানে যে, তাদের পেছনে রাষ্ট্রকে মোটা অংকের টাকা খরচ করতে হয় (যা দেশের জনগণের কষ্টার্জিত টাকা)। দেশের জনগণ এবং অভিভাবকদের টাকায় লেখাপড়া শেষে এসব শিক্ষার্থী যখন দেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পায় তখন তারা দেশের সাধারণ মানুষজনের কথা কতটা চিন্তা করে? তখন তাদের অনেকেই পদ-পদবি, পদমর্যাদা আর সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকাক্সক্ষায় ব্যস্ত সময় কাটায়। দেশের মানুষের সেবা করার প্রবল আকাক্সক্ষা ও অনুভূতি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। অন্যের চেয়ে আরও ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য যা করার ঠিক তাই করে থাকে তারা। একটা অন্ধ প্রতিযোগিতার মতো চলতে থাকে তাদের। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তারা কতকিছুই না করে! কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের চেয়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার প্রতি তাদের প্রবল আকর্ষণ থাকার কারণে ওইসব সরকারি আমলার কাছ থেকে তৃণমূল মানুষজন সেবা থেকে বঞ্চিত হন ।
আমরা একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে ক্রমশই সহিষ্ণুতা এবং প্রেম উঠে যাচ্ছে। এর স্থানে হিংসা, বিদ্বেষ, রোষ, কলহ, পরনিন্দা, ক্রোধ, পরশ্রীকাতরতা, অসহিষ্ণুতা স্থান করে নিয়েছে। খুব দ্রুত ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা তো রয়েছেই। পরিবারে এবং সমাজে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যে প্রক্রিয়াতেই হোক ক্ষমতায়িত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করার প্রতিযোগিতাও বেশ লক্ষণীয়। সাধারণ ও নিরীহ মানুষজনকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের হয়রানি করার মহোৎসবও চলে। একদিকে ক্ষমতার লড়াই অন্যদিকে দায়িত্বে গাফিলতির মানসিকতা এসবই দেখতে হচ্ছে আমাদের।
একটা আদর্শ রাষ্ট্র বিনির্মাণের জন্য যা যা করার প্রয়োজন, তা না করে আমরা শিশুকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এবং চাকরি পাওয়া পর্যন্ত পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে শুধুই প্রতিযোগিতা দেখছি। প্রতিযোগিতা থাকা অবশ্যই ভালো, যদি সেখানে মানবীয় মূল্যবোধের সংমিশ্রণ থাকে। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগিতায় একজনকে হেয় করে, একজনকে খাটো করে, একজনকে অপমানিত করে উপরে ওঠার পরিকল্পনা থাকে বলে আমরা একজন অপরজনকে সহ্য করতে পারি না। হিংসা-বিদ্বেষ আর চাতুরিতাপূর্ণ সমাজে আমরা পরস্পর দলাদলি করে বেঁচে আছি আর কী!
এবারের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছে আমাদের প্রত্যাশা- তারা আগামী দিনে বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্যতার পরিচয় দেবে। তাদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু সেটা মানবীয় মূল্যবোধসম্পন্ন। তারা অন্যের দিকে তাকিয়ে পরশ্রীকাতরতায় ভুগবে না বরং তারা কর্মময় জীবনে মেধা-বুদ্ধি, যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের উপরে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। জনগণের তথা রাষ্ট্রের টাকায় চিকিৎসক হয়ে, প্রকৌশলী হয়ে, বিজ্ঞানী হয়ে, বিচারক হয়ে জনগণের সেবা করার মনোভাব যেন উঠে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমরা সম্মিলিতভাবে দেশটাকে এগিয়ে নিতে চাই। এ জন্য অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে দায়িত্বশীল মনোভাব বজায় রাখতে হবে। আজকের যুবকরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। তারাই আমাদের সঠিক পথের ঠিকানা জানাবে। তারা যেন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখে বরং আমরা সাধারণ নাগরিকেরা তাদের কাছে আরও বেশি কিছু আশা করি। আমরা অজানা গন্তব্যে চলছি, এখন প্রয়োজন আদর্শিক নেতার নেতৃত্ব। এবারের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যেই হয়তো সেই নেতা লুকিয়ে রয়েছে, আমরা তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। আমরা এ অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ-সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য যোগ্য নেতার নির্দেশনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মানসিকভাবে দৃঢ় ও প্রতিশ্র“তিশীল বন্ধুদের সালাম এবং স্যালুট জানাই। তাদের কর্মময় জীবনের পরীক্ষাগুলোয় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। চাটুকারিতা, তদবির করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানো অথবা তোষামোদি তাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনধারায় যেন নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। এর পরিবর্তে নীতি-নিষ্ঠা বজায় রেখে সব প্রতিবন্ধকতা জয় করার সদিচ্ছা ও সংকল্প নিতে হবে; তবেই আমরা সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারব।
পলাশ কুমার রায়, আইনজীবী; আহ্বায়ক, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (সুপ্রা)

অপরিণামদর্শী রাজনীতি ত্যাগ করতে হবে by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

অপরিণামদর্শী রাজনীতির কারণে চরম অনিশ্চয়তায় আছে বাংলাদেশের মানুষ। সামনের কয়েকটি মাস দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে শংকা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। মানুষ স্বস্তিতে নেই। দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, নির্বাচন হবে কিনা; হলেও কিভাবে হবে, সব দলকে নিয়ে হবে নাকি একতরফা হবে- এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মাঝে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছে। এজন্য নিজেদের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করেছে। নির্বাচনে কেউ আসুক না আসুক, সংবিধানের দোহাই দিয়ে তারা নির্বাচন করতে চায়। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে শোচনীয় ব্যর্থতার সমাধান খোঁজার পরিবর্তে নিত্যনতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। তারা জেনেশুনে নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে একটা চরম নৈরাজ্য ও অচলাবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা সরকারের কর্তব্য। কিন্তু মনে হয়, সরকার ইচ্ছা করেই তা করছে না। তারা বিরোধী দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারের এ পরিকল্পনা কোনোদিনই বাস্তবায়ন হবে না।
রাজনীতিকদের অবশ্যই একটি দল থাকে, থাকে দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি। তবু একজন রাজনীতিকের চিন্তা থাকতে হয় সর্বজনীন, সবার চিন্তাই তাকে করতে হয়। এ বাস্তবতা যদি রাজনীতিকরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে দেশ বিভক্ত হয়; জাতি বিভক্ত হয়, চূড়ান্তভাবে তা রাষ্ট্র ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ঠিক এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতাসীনদের অপরিণামদর্শী রাজনীতির কারণে এখানে ধর্মে-ধর্মে, ভাইয়ে-ভাইয়ে তৈরি হয়েছে বিরোধ, মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, ধর্মীয় উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে; সর্বোপরি রাষ্ট্রের পরতে পরতে বিরোধ ও হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একই ধর্ম ও ভাষার মানুষের মধ্যে এমন বিভক্তি তৈরি করা নিশ্চয় একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। এ বিভক্তির ফলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ছে রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে। দেশের শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। সম্ভাবনাময় তৈরি পোশাক শিল্প চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, জিডিপি নিচের দিকে নামছে।
নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে বাংলাদেশ অনিবার্য ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে এ দেশের রাজনীতিকরাও। একটি অনিবার্য সংঘাত ও রক্তপাত বাংলাদেশের দোরগোড়ায়, যা ধ্বংস করবে সব স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। ধ্বংস করবে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ধারা, মানুষ হারাবে তাদের ভোটের অধিকার। ধ্বংস করা রাজনীতিকদের কাজ নয়, রাজনীতিকদের কাজ গড়া। যেটুকু উন্নতি বাংলাদেশের হয়েছে, তা জাতি হিসেবে আমরা এক থাকার কারণেই হয়েছে আর এটি করেছেন রাজনীতিকরাই। এখনও যে বিপদ বাংলাদেশের সামনে কড়া নাড়ছে- রাজনীতিকদের ঐক্যই এ বিপদ থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে পারে।
সংবিধান, আইন সবকিছুই পরিবর্তন সম্ভব হয়, যখন সবাই এক হয়। মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা রাজনীতিকদের কাজ নয়। এখন রাজনীতিকদের এক হওয়ার সময়, সময় দেশপ্রেম জাগ্রত করার; সময় বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়ার, কারণ বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নজর কাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ এগিয়ে এসেছে, আমেরিকা এগিয়ে এসেছে; এগিয়ে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব বিশ্ব, চীন, ভারত, কানাডা ও অন্য সব রাষ্ট্র। এক কথায়, এসব দেশ বাংলাদেশের ভালো চায়; বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতি অব্যাহত রাখার স্বার্থেই রাজনৈতিক সংকট সমাধানে এসব দেশ এগিয়ে এসেছে। এসব দেশের উপলব্ধিতে হয়তো এসেছে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব দেশ একটি পক্ষপাতহীন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিকদের পরামর্শ দিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের রাজনীতিকদের উচিত এসব দেশের আবেগের মূল্য দেয়া।
ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে আগামী জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নির্বাচনের ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ভরশীল। বাংলাদেশ বিশ্বে কোন মর্যাদায় আসীন হবে- তা নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের ওপর। এ নির্বাচন একতরফা করার চিন্তা করা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের অসীম সম্ভাবনা ধ্বংস করার শামিল। দেশের ভালো চাইলে প্রধান একটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চিন্তা মাথা থেকে অবশ্যই ঝেড়ে ফেলতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা করতে হবে।
ভোটের রাজনীতিতে শাসক দল এতটা অসহায় হয়ে পড়েছে যে, সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা শুনলেই তারা ভয় পায়। সংবিধানের দোহাই দিয়ে বিএনপিকে বাদ দিয়ে একটা যেনতেন নির্বাচন করাই ক্ষমতাসীনদের এখন একমাত্র সান্ত্বনা। পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হারার পর ক্ষমতাসীনরা বুঝতে পারছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই তারা একতরফা নির্বাচনের পথে পা বাড়িয়েছে।
একতরফা কোনো নির্বাচনের পরিবেশ দেশে এখন আর নেই। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় দেশে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, মানুষ যার যার ভোট নিজে দিতে শিখেছে; এখন ইচ্ছা করলেও একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারেন না বা দেয়ার পরিবেশও নেই। তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম বহুদূর এগিয়েছে। বলা যায়, বিশ্বমানের গণমাধ্যম বাংলাদেশে কাজ করছে, যারা মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। একে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতা কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নেই। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যেই যে কোনো খবর সম্প্রচার হয়ে যায় বিশ্বজুড়ে। তাই নির্বাচনে জালিয়াতি বা ভোট ডাকাতি করে কেউ পার পাবে না। ফুটেজ থেকে যাবে গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে; এ ভয়ে নির্বাচনে জালিয়াতি বা ভোট ডাকাতি করতে কেউ উৎসাহী হবে না।
তাছাড়া একতরফা নির্বাচন করার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বর্তমানে বাংলাদেশে নেই। একতরফা নির্বাচনের মানসিকতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল বেশিদূর এগোতে পারবে বলে মনে হয় না। এরই মধ্যে সব দল একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। বিরোধী জোটের বাইরেও জাতীয় পার্টি, গণফোরাম, সিপিবি, বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ আরও অনেক দল একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।
একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের কোনো ফায়দা আছে বলে মনে হয় না। একতরফা নির্বাচন করে দেশ ও দলের ক্ষতি করে কোনো লাভ নেই। একতরফা নির্বাচনে গঠিত সরকারের স্থায়িত্ব হবে ক্ষীণ, যেমনটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি। দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার পর সুষ্ঠু নির্বাচন হলে লাভ নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশের ক্ষতি না করে- আগে। কেবল তাহলেই দেশ উপকৃত হবে। উপকৃত হবে দেশের মানুষ।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে না নিয়ে, লগি-বৈঠার আন্দোলন করে দেশে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়েছিল। ফলে দেশে ১/১১’র আবির্ভাব ঘটেছিল। ১/১১’র দুই বছরের দুঃশাসনের পর দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলে, ১/১১’র দুই বছরে দেশ অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে; ক্ষতির শিকার হয়েছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও দেশের সাধারণ মানুষ। কাজেই দেশের ক্ষতি করে পরে সুষ্ঠু নির্বাচন করে লাভ নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে দেশের ক্ষতি না করে। তাহলেই রাজনীতিকদের ভাবমর্যাদা বাড়বে, অনভিপ্রেত ও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ঐক্যের দিক থেকে একটা নজির স্থাপন করেছিল। কিন্তু এটি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন জাতি হিসেবে সব দিক থেকেই আমরা বিভক্ত। ক্ষুদ্র একটি আঘাত সহ্য করার মতো শক্তিও আমাদের নেই। বিভক্ত জাতি সাহসহীন, আশাহীন বিপন্ন এক জাতিতে পরিণত হয়। সবকিছু বিপন্ন হওয়ার আগে সরকারের উচিত বিরোধী দলকে আস্থায় নেয়া এবং সংকট দূর করে দেশকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে ধাবিত করা। এর জন্য সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি শাসক দলকে অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে, জাতীয় ঐক্যের পথ প্রশস্ত করতে হবে; হিংসা-বিদ্বেষ ও অনৈক্য-বিভাজনের রাজনীতি দিয়ে বর্তমান ক্রান্তিসময় অতিক্রম করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বাংলাদেশ নিয়ে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কি বড় মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশের সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিকে সামনে নিয়ে হঠাৎ একটি নতুন প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রচারণাটি হল, ঢাকায় হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রাখার প্রশ্নে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মতানৈক্য ঘটেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনার সাম্প্রতিক দিল্লি-ওয়াশিংটন ছোটাছুটি তার প্রমাণ। ওয়াশিংটন বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল এবং দিল্লি আওয়ামী লীগকে সমর্থনদানে অনড় থাকতে চাইছে। এই প্রচারণায় বেশি হাওয়া দিচ্ছেন ড. ইউনূসের ক্যাম্পের দুটি মিডিয়া। ড. ইউনূসও এখন দেশে-বিদেশে প্রকাশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইনে নেমেছেন। সম্প্রতি তিনি এক সম্মেলনে যারা গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কিত বর্তমান সরকারের আইন সংশোধন করবে না তাদের ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংক সংক্রান্ত আইনটি বাতিল করে ব্যাংকটি ড. ইউনূসের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। সুতরাং এই নোবেলজয়ী যে বিএনপিকেই ভোটদানের জন্য দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে সরকারই ক্ষমতায় বসুক, তাকে সমর্থন দেয়া বা না দেয়ার ব্যাপারে ভারত এবং আমেরিকা দুই দেশই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। দিল্লিতে বিজেপি সরকার ও ওয়াশিংটনে বুশ প্রশাসন ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রতি তাদের যে আনুকূল্যের মনোভাব ছিল, পরবর্তীকালে আমেরিকায় ওবামা ও দিল্লিতে কংগ্রেস সরকারের আমলে তা অনেকটাই পাল্টে যায়।
এই পাল্টানোর পেছনে ছিল ‘ইসলামিক টেরোরিজম’ দমনে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সমস্বার্থভিত্তিক ঘনিষ্ঠতা এবং প্রতিযোগী বিশ্বশক্তি হিসেবে চীনের উত্থানকে ঠেকানোর জন্য দিল্লিকে ব্যবহারে ওয়াশিংটনের আগ্রহ। ফলে মনমোহন সরকার পরমাণু সহযোগিতার প্রশ্নে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করে তার দেশীয় বাম মিত্রদের চটাতে দ্বিধা করেননি।
দিল্লি ও ওয়াশিংটনের এস্টাবলিশমেন্টের একটা বড় অংশ মনে করে বাংলাদেশে সেক্যুলারিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে হবে না। জঙ্গিবাদ দমন সহজ হবে। অন্যদিকে বিএনপি ক্ষমতায় এলে জামায়াত ও জঙ্গিবাদী বিভিন্ন গ্র“পের ওপর তার নির্ভরতার দরুন জঙ্গিবাদ মাথা তোলার আশংকাই বেশি। এই সহজ সরল হিসাব থেকেই বাংলাদেশের সম্পর্কে নিজেদের নীতিনির্ধারণ করছে দিল্লি ও ওয়াশিংটন। বাংলাদেশের কোনো দলের প্রতি অতিরিক্ত প্রেমের দরুন এই নীতি নির্ধারিত হয় না। তাছাড়া বাংলাদেশের তেল, গ্যাস, নৌঘাঁটি, নৌবন্দর, ট্রানজিট সুবিধা ইত্যাদি নিয়েও বিবেচনা তো আছেই।
এজন্য সেক্যুলারিস্ট ও জঙ্গিবিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি দিল্লি ও ওয়াশিংটনের নীতি বর্তমানে অনুকূল হলেও বিএনপিকেও তারা চটাতে চায় না। এজন্যই ভারতের অর্থমন্ত্রী থাকাকালে প্রণব মুখার্জি ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন এবং ভারত কোনো বিশেষ দলের বন্ধু নয় বলে তাকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। বরং খালেদা জিয়াই প্রণব বাবু রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকায় এলে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে যাননি। এর পেছনেও বিএনপি-নেত্রীর একটি কূটকৌশল কাজ করেছে। তিনি ইঙ্গিতে ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগের মতো তিনি দুই দেশের সঙ্গেই সমান সম্পর্ক রাখতে চান না। তিনি আমেরিকার মিত্রতাকেই বেশি দাম দেন।
এটা ওয়াশিংটনের এস্টাবলিশমেন্টের আরেকটা অংশকে খুশি করেছে। তারা ভারতের ঘনিষ্ঠ মৈত্রী চায়, কিন্তু উপমহাদেশে আমেরিকাকে ডিঙিয়ে তার একাধিপত্য চায় না। তাই পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে জঙ্গি দমনে ভারতের চাপ সে মানছে না এবং আফগানিস্তানে তালেবানদের ‘ভালো অংশের’ সঙ্গে আপস করতে এগোতে গিয়ে দিল্লির অসন্তোষকে সে গ্রাহ্য করছে না। বাংলাদেশেও জামায়াতকে তারা ‘পোষ্য ও বশমানানো মৌলবাদী’ মনে করে এবং বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে তা উপমহাদেশে তার আধিপত্যবাদী স্ট্র্যাটেজির বেশি সহায়ক বিবেচনা করে। তাই বলে বহু সাধনায় পাওয়া ভারতীয় মিত্রতা ক্ষুণ্ন হতে পারে এ ধরনের কোনো বড় ঝুঁকি সে নেবে না।
এক্ষেত্রে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মনান্তর নেই, কৌশলের পার্থক্য আছে। দিল্লি আওয়ামী লীগকে বিশ্বস্ত মিত্র মনে করে, কিন্তু নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখার ব্যাপারে উৎসাহী নয়। উৎসাহী হলে তিস্তা, ছিটমহল, টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্তে নিত্য হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়গুলো মীমাংসা না করে ঝুলিয়ে রাখত না। বিজেপির কোনো কোনো নেতা তো প্রকাশ্যেই বলেছেন, বিএনপি বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকলে তাদের সুবিধা। বিএনপির ভারত বিরোধিতার নীতিকে ছুতো হিসেবে খাড়া করে গঙ্গা ও তিস্তার পানি থেকে শুরু করে সব বিষয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধ জিইয়ে রাখা যায় এবং বাংলাদেশকে তার প্রাপ্য না দিলেও চলে। জিয়াউর রহমান থেকে এরশাদের সামরিক শাসনামলে তারা গঙ্গার এক ফোঁটা পানি বাংলাদেশকে দেয়নি কিন্তু হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর গঙ্গার পানি নিয়ে ত্রিশ বছর মেয়াদি চুক্তি করতে হয়েছে।
এই হিসাবটা দিল্লির কংগ্রেস সরকারের মাথাতেও আছে। সুতরাং পূর্ব ভারতে তাদের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় স্বার্থে হাসিনা সরকারকে যতটা সুবিধা না দিলে নয়, ততোটাই তারা দিচ্ছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সব সমস্যার মীমাংসা করছেন না। এই ব্যাপারে কংগ্রেস সরকারের চাণক্য নীতিও রয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিজেদের স্বার্থে তারা অবশ্যই ক্ষমতায় দেখতে চান; কিন্তু বিএনপিকেও হাতছাড়া করতে চান না। প্রণব বাবু অর্থমন্ত্রী হিসেবে ঢাকায় এসেই ছুটে গিয়েছিলেন বিএনপি-নেত্রীর দর্শনে। আবার দিল্লি বিএনপি-নেত্রীকে দিল্লি সফরে আমন্ত্রণ জানিয়ে মহা-আড়ম্বরে তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন। তাদের ভাবনা, যদি আখেরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
এই ব্যাপারে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের কূটনৈতিক খেলা আরও একটু স্পষ্ট। বাংলাদেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে যাওয়ার পর বিএনপির অনুকূলে জনসমর্থন ঘুরছে এটা অনুমান করে ওয়াশিংটনও বাংলাদেশ-নীতিতে তার নতুন অবস্থান দ্রুত নিতে চেয়েছিল। এই অবস্থানটি হল বিএনপিকে এই বলে আশ্বস্ত করা যে, ওয়াশিংটন প্রয়োজনে তাকে সমর্থন দেবে। লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গেও এজন্যই মার্কিন দূতের সাক্ষাৎকার। উদ্দেশ্য তাকে বাজিয়ে দেখা। আমেরিকা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না এ কথা জানানোর জন্য মার্কিন দূত তারেকের সঙ্গে দেখা করেননি।
এ কাজটা আমেরিকা ভারতের বেলাতেও আরও ন্যক্কারজনকভাবে করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস-নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বিশাল নির্বাচন জয় দ্বারা ক্ষমতায় আসার পর স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কলকাতায় ছুটে যান মমতার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। দিল্লির কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রককে ডিঙিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ছোটা, এটা ছিল বিশ্ব কূটনীতিতে অকল্পনীয় ঘটনা।
এটাও কংগ্রেসের বদলে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থনদানের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মোড় পরিবর্তন ছিল না। তখন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আকস্মিকভাবে যে একটা মমতা-হাওয়া দেখা দিয়েছিল, তাতে আগেভাগেই মার্কিন প্রশাসন মমতা ব্যানার্জিকে একটু বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। আরও চেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট-প্রভাব উচ্ছেদ করার জন্য মমতাকে কতটা ব্যবহার করা যায় তা দেখতে। বাংলাদেশেও সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর বিএনপি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হবে এই সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় ওয়াশিংটন তারেক রহমানকে বাজিয়ে দেখতে চেয়েছে। চেয়েছে বিএনপি বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলে তার সরকারকে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকতে না দিয়ে কতটা মার্কিন স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে তা বুঝে নিতে। বিএনপি বা তারেককে সমর্থন জানাতে এই সাক্ষাৎকার নয়। ভারতের একশ্রেণীর পত্রিকায় এ সম্পর্কে (তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনায়) যে আশংকা ও গুজব ছড়ানো হয়েছে, বাংলাদেশের একশ্রেণীর মিডিয়া সেই তিলকে তাল করে প্রচার করেছে। বিশেষ করে ইউনূস শিবিরের মিডিয়া দুটি।
ভারতেও একশ্রেণীর বিগ মিডিয়া, বিশেষ করে বিজেপি ও নরেন মোদিকে যারা দেশটির পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী দেখতে চায়, তারা দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বাংলাদেশসহ কোনো কোনো বিষয়ে যে সূক্ষ্ম রাষ্ট্রীয় স্বার্থগত মতপার্থক্য আছে (যা আগেও ছিল) তাকে বড় করে দেখিয়ে বর্তমানে নানা ধরনের খবর, খবরভাষ্য ছাপাচ্ছে। বাংলাদেশের যে মহলগুলো এবং তাদের মিডিয়া আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত দেখতে চান, তারা তা লুফে নিয়ে নিজেরা বড় বড় মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করেছেন।
ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা দিল্লি ছুটেছিলেন বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নীতিকে প্রভাবিত ও পরিবর্তিত করার জন্য নয়। ভারতকে প্রভাবিত করতে হলে ওয়াশিংটন ঢাকায় নিযুক্ত এক জুনিয়র কূটনীতিককে দিল্লি পাঠিয়ে ভারত সরকারকে বিব্রত ও বিরক্ত করবেন না। তারা পররাষ্ট্র দফতরের উচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে পাঠাতেন। ‘ওয়াশিংটন পোস্টের’ খবরে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ড্যান মজিনা দিল্লিতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি সে সম্পর্কে দিল্লির মনোভাবে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে কিনা তা জানতে এবং ঘটে থাকলে তা ওয়াশিংটনকে জানাতে। মজিনা তাই দিল্লির পর ওয়াশিংটনে ছুটেছেন। তারপরই খবর প্রকাশিত হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ওবামা মার্কিন পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের উপমহাদেশ সংক্রান্ত ব্যাপারে ভারতের নীতির সঙ্গে সমন্বয় বিধান করে চলার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতের একশ্রেণীর বিগ মিডিয়া (নরেন মোদির সমর্থক) যে কারণে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বিদ্যমান নানা বিষয়ের (বাংলাদেশসহ) ছোট ছোট মতপার্থক্যগুলোকে এখন বড় রকমের মতান্তর বলে প্রচার শুরু করেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী একশ্রেণীর বিগ মিডিয়া, বিশেষ করে ইউনূস শিবিরের মিডিয়া দুটি সেই প্রচার লুফে নিয়ে আরও বড়ভাবে প্রচারণা শুরু করেছেন একই কারণে।
এক গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে ড. মুহম্মদ ইউনূসের হাসিনা-ফোবিয়া এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তিনি এবং তার অনুগত সুশীল সমাজটি (এবং তার দুটি মিডিয়া) যে কোনো মূল্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দেখতে চান। এতে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ক্ষমতায় আসুক এবং দেশের চরম ক্ষতি হোক তাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এই লক্ষ্যে ড. ইউনূস তো বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছেনই; তার ওপর ওবামা প্রশাসনের একাংশকেও প্রভাবিত করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। এটা আমার অভিযোগ নয়, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর।
এই লক্ষ্যে এই শিবিরের দুটি মিডিয়া পরপর দুটি উদ্দেশ্যমূলক জনমত সমীক্ষা প্রকাশ করে পশ্চিমা দাতা দেশগুলোসহ ভারত ও আমেরিকাকে (এবং দেশের ভোটারদেরও) বোঝানোর চেষ্টা করছেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন-জয়ের সম্ভাবনা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, বাড়ছে বিএনপি-জামায়াতের। এভাবে দেশে-বিদেশে তারা একটি ‘সাইকি’ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। এখন শুরু হয়েছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে স্বাভাবিক ছোটখাটো মতপার্থ্যক্যগুলোকে বড় করে দেখিয়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি নিশ্চিত করতে। দেখা যাক, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বনাম ষড়যন্ত্র এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয়!

দেশে জরুরি অবস্থা জারির পাঁয়তারা

নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি
নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। একদিকে বিরোধী দলের সহিংস হরতাল অন্যদিকে সরকারের ধরপাকড়। এ পরিস্থিতিতে জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কী ভাবছে রাজনৈতিক দল?
সরকার ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে এমন কদর্যভাবে সংলাপ ও সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দেবে, দুই দিন আগেও তা প্রশ্নাতীতভাবে অনুধাবিত হয়নি। সরকারি কর্মকাণ্ড প্রথম দৃষ্টিতে আকস্মিক হরতালের আহ্বানপ্রসূত বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অনুসৃত ঘটনাপ্রবাহ হচ্ছে সম্পূর্ণভাবেই পূর্বপরিকল্পিত। ‘পথ হারাবে না বাংলাদেশ’—এই থিমের পটভূমে প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল সমমর্মিতাময় প্রীতি-সিক্ত একটি মিলনমেলা। তথ্যমন্ত্রীসহ সরকারি-বিরোধী দল এবং সমাজের উল্লেখযোগ্য বহু লোকের ছিল সমাগম, শুভেচ্ছা বিনিময়, মতামত আদান-প্রদান। ওখানে মনে হচ্ছিল সত্যিই বুঝি রাজনীতির বহমান ঘূর্ণাবর্তে বাংলাদেশ পথ হারাবে না। কিন্তু সামান্য ক্ষণের ব্যবধানেই সরকারি দলের হঠকারী সিদ্ধান্ত আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিল। ওই অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে যে তিনজন এবং ওই রাতেই খালেদা জিয়ার বাসভবন থেকে বেরোবার সময় যে দুজনকে দৃশ্যত কারণ না দেখিয়েই গ্রেপ্তার করা হলো, মূলে তার কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার। হরতাল আহ্বান ও পালন, পিকেটিং,
শান্তি ভঙ্গকারী কোনো কর্মকাণ্ড থেকে এ পাঁচজনের দূরত্ব সর্বাধিক। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সরকারের আলোচনা এবং এমনকি সংসদে মত প্রকাশের পথও সজোরে রুদ্ধ করে দেওয়ার অপপ্রচেষ্টার অঙ্গ। সরকারি দল কিছুতেই চাইছে না বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার মতো একটি অবস্থা সৃষ্টি হোক। বিএনপির নির্বাচনে যোগদান মানেই আওয়ামী লীগের পরাজয়—এই সত্য উপলব্ধি থেকেই সরকারি দলের এই উদ্ধত, অস্থির ও অবিমৃশ্যকারী আচরণ। মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার সংসদ সদস্য। এম কে আনোয়ার সংসদে বিএনপির প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাখ্যা দিয়ে তা যে আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদিত হতে পারে, তার উল্লেখ করেন। মওদুদও সংসদে বিএনপির একজন মুখপাত্র। দুজনই অসুস্থ। সংসদ চলাকালে গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় নিয়মরীতি-প্রথা লঙ্ঘন করে তাঁদের গ্রেপ্তার করার অর্থই হচ্ছে সংসদে যোগদান করা কিংবা সংলাপে তাঁদের ভূমিকা নেওয়াকে অসম্ভব করে তোলা। রফিকুল ইসলাম মিয়ারও সংলাপে এবং অংশগ্রহণে একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার কথা এবং তিনিও আইনগত ও সংসদীয় কর্মকাণ্ডে পারদর্শী। আবদুল আউয়াল মিন্টু ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। আর চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস ছিলেন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সংযোগের যোগসূত্র। তাঁদেরও গ্রেপ্তার করে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হলো। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে র‌্যাব-বিজিবি-সশস্ত্র পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় যানবাহন যেমন জলকামান, পুলিশ আর্মড কার, প্রিজন ভ্যান ইত্যাদির মহাজমায়েত দেখে মনে হচ্ছে অফিসে কাউকে ঢুকতে বা তা থেকে কাউকে বেরোতে না দিতে সরকারি প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
সেখানে দলের অন্যতম যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ছাড়া কেউ নেই। এ যেন রণপ্রস্তুতির আয়োজন। ওদিকে চেয়ারপারসনের বাসভবনও চারদিকে পুলিশ বাহিনী পরিবৃত। দলের কাউকে আসতে-যেতে দেওয়া হচ্ছে না। চেয়ারপারসন শনিবার রাতে নিজের কার্যালয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেও যেতে পারেননি। অর্থাৎ তিনি যে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, তার পথ-সুযোগও সম্পূর্ণ বন্ধ। এর আগেই এক স্বৈরাচারী আদেশে সর্বপ্রকার সমাবেশ, এমনকি অভ্যন্তরীণ সভা, মানববন্ধন, মিছিল পুলিশের বিনা অনুমতিতে (যা পাওয়াও কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ) নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় বিএনপির হরতাল-অবরোধ জাতীয় কর্মকাণ্ড ছাড়া উপায় থাকবে না। এবং সেগুলোকে সহিংস করে তোলা অতীব সহজ। বর্তমান অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন এবং মতবিনিময় সম্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথাই অবান্তর। তা ছাড়া অন্য নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার-হয়রানি-নির্যাতন একটি বিভীষিকাময় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সুতরাং সংলাপ-সমঝোতা এবং বিএনপির অংশগ্রহণ সরকারের নীলনকশা অনুযায়ীই এখন অসম্ভব এবং অবাস্তব করে তোলা হলো। এবং এটা এমন সময়,
যখন বিএনপি আলোচনা-সংলাপে যেতে দুই হাত, এক পা বাড়িয়েই আছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু করেছে। অর্থাৎ এটি আরেকটি সংকেত—‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’। বলা হচ্ছে ‘সর্বদলীয় সরকার’ হবে। এই তথাকথিত সর্বদলীয় সরকারে যে মহাজোটের চার দলই থাকে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ। জাসদ (ইনু) এবং বর্তমানেই যূথবদ্ধ মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি নিয়ে তাকে ‘সর্বদলীয়’ নাম দেওয়া হবে ধিক্কারযোগ্য একটি প্রহসন। প্রধান বিরোধী দল এবং তার সহসঙ্গীরা না যোগদান করলে এই নির্বাচনকে কোনো অবস্থাতেই সর্বদলীয় নাম দেওয়া যেতে পারে না। সুতরাং প্রস্তাবিত এই নির্বাচন হবে একদলীয়, স্বৈরাচারী এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাহলে সরকার কোন পথে এগোচ্ছে? পরিষ্কারভাবে অগ্রহণযোগ্য এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টা তো ‘জরুরি অবস্থা’কেই ডেকে আনার পাঁয়তারা। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে সেটাই সরকারি দলের ইচ্ছা ও কর্মসূচি। বাংলাদেশ যেন এবার সত্যিই পথ হারাল এবং দুঃখের কথা, তা হলো প্রবীণতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগেরই ‘কল্যাণে’। nসেটি হলে ইতিহাস তাদের কোনোকালেই ক্ষমা করবে না।
ইনাম আহমদ চৌধুরী: উপদেষ্টা, বিএনপির চেয়ারপারসন।

শ্রমিকদের বঞ্চনা আর কত?

তৈরি পোশাকশিল্প
তাজরীনের শ্রমিকদের রক্তের দাগ শুকাতে না-শুকাতেই রানা প্লাজায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটল। এত বড় বিপর্যয়ের ঘটনায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে লাখ লাখ শ্রমিক যখন রাস্তায় নেমে আসেন, মালিকপক্ষ এবং সরকার তা সামাল দেওয়ার কৌশল হিসেবেই তখন মজুরির বিষয়টি সামনে আনে। মজুরি বোর্ড সর্বসাকল্যে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা নিম্নতম মজুরির প্রস্তাব করেছে। ২০১০ সালে ঘোষিত নিম্নতম মজুরির চেয়ে অঙ্কের হিসাবে দুই হাজার ৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধি পেলেও বড় ধরনের ফাঁকি আছে। যেমন খাদ্য আর যাতায়াতের ভাতা বাবদ ৫০০ টাকা এবার যুক্ত করা হয়েছে। এত দিন শ্রমিকেরা মজুরির বাইরেই এ সুবিধা পেতেন। ফলে তাঁর প্রকৃত আয় তো আরও কমে গেল। যাঁদের জন্য এই নিম্নতম মজুরি, সেই হেলপাররা সংখ্যায় ২০ শতাংশ। অন্যান্য গ্রেডের শ্রমিকেরা, যাঁদের সংখ্যা বেশি, সেসব গ্রেডে আনুপাতিক হারে বেসিক খুবই কম বৃদ্ধি করা হয়েছে। অপর দিকে আট হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি শ্রমিকদের সর্বসম্মত দাবি। কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, প্রথমত, ২০১০ সালে যে কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছিল, সেটি সেই সময়ে শ্রমিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেই মজুরি এবার যদি দ্বিগুণও হয়, তাতে অনেকেই বগল বাজাতে পারেন কিন্তু শ্রমিক সন্তুষ্টি অর্জন হবে না। দ্বিতীয়ত, মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি কতটুকু শ্রমিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেছেন? দর-কষাকষিটা এমন, শ্রমিকপক্ষ দুই হাজার টাকা ছাড় দেয়, মালিকপক্ষ ২০০ টাকা বাড়ায়।
আবার শ্রমিকপক্ষ দাবি ৫০০ টাকা কমালে মালিকপক্ষ আরও ৫০ টাকা দিতে রাজি হয়। এভাবেই লেখা হয় শ্রমিকের ভাগ্য। শ্রমিক এখানেও প্রতারিত। মালিকপক্ষ প্রস্তাবে স্বাক্ষর না করে সভা থেকে ওয়াকআউট করেছে। প্রস্তাবিত মজুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এই কৌশল অনেক পুরোনো। বিষয়টা এমন যে মালিকেরা এটাই দিতে চান না, তোমরা মেনে নাও। এ অবস্থা সরকারের জন্য মালিকদের খুশি রেখে, শ্রমিক ঠকিয়েও শ্রমিকবন্ধু সাজার দারুণ সুযোগ। আবার কেউ কেউ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ধোয়া তুলে আন্দোলনের রাশ টেনে ধরতে চাইছেন। ভুলে যাচ্ছেন, শ্রমিকেরা আরও কয়েক বছরের জন্য আটক হতে যাচ্ছেন অন্যায্য মজুরির বন্দিশালায়। তাঁরা ভুলে যান শ্রমিকের দাবিকে ধারণ করতে না পারলে আন্দোলনের রাশ টানা তো দূর, নাগালও পাওয়া যায় না। পরে ষড়যন্ত্র খুঁজতে হয়। চতুর্থ বিষয়টি আট হাজার টাকার যৌক্তিকতা। আট হাজার টাকার বিপক্ষে একটি বাদে আর কোনো যুক্তিই শোনা যায় না বা হালে পানি পায় না। আর যে যুক্তিটি দিয়ে মালিকপক্ষ মজুরি কম দিতে চাইছে, অন্যথায় শিল্প বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে,
সেটি কিন্তু যুক্তি নয়, দোহাই। এই দোহাই দিয়ে সবই জায়েজ করা যায়। অনিরাপদ কারখানায় শ্রমিক মরে। কারণ, শিল্পের সক্ষমতা নেই। শ্রমিকের কোনো অধিকার শ্রমিক পায় না। কারণ, শিল্পের সক্ষমতা নেই। এই দোহাই দিয়ে, শিল্প বাঁচানোর কথা বলে মালিকেরা কত সুবিধা আদায় করেন, অন্যায়-অপকর্ম ঢাকেন। শ্রমিক না বাঁচলে কি শিল্প বাঁচে! গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ অন্যান্য পোশাকশ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বোর্ডের প্রস্তাব ও মালিকদের অযৌক্তিক অবস্থানের প্রতিবাদ জানিয়েছে। দাবি করেছে, প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করার। এই শিল্পে তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ছেই। অবৈধ ছাঁটাই, বরখাস্ত, নির্যাতন, হামলা-মামলার মাধ্যমেই শ্রমিকদের দমন করা হয়। জরুরি প্রশ্নটি হলো, প্রস্তাবিত মজুরি কি শ্রমিকদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে? দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই প্রধান খাতটি কি লুটের ধারায় গলগণ্ডের মতো বাড়তে থাকবে? মালিকদের পক্ষ থেকে শিল্পের সক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে। এখন তো আনাচকানাচে পোশাক কারখানা গড়ে উঠছে। অক্ষম-অদক্ষ একজন মালিককে সক্ষম করার যে দায়িত্ব মালিকপক্ষ বোধ করছে, সেটা ভালো। তা করতে গিয়ে চরম শোষণ ও শ্রম লুণ্ঠন শ্রমিকের ওপর কী প্রভাব ফেলছে,
এটা ভাববে কে? তৈরি পোশাক খাতকে একটা আদর্শ শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে মালিক আর সরকারের কোনো দায়িত্ব নেই? সক্ষমতার বিষয়টি তাঁরা একতরফাভাবেই বোঝেন, আমাদের তো অনুরূপ বোঝাতে চাইলে হবে না। শিল্প রক্ষার সঙ্গে শ্রমিকের সক্ষমতার সম্পর্ক বিবেচনায় নিতে হবে। আজ যখন অসংখ্য শ্রমিক শ্রমশক্তি হারিয়ে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝায় পরিণত হচ্ছেন, সে দায়দায়িত্ব মালিকদের নিতে হচ্ছে না। পোশাকশ্রমিকেরা গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকের সস্তা শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলা পাঁচ হাজার ৮০০ জন মালিকের উদ্দেশে জিজ্ঞাসা, যাঁদের সস্তা শ্রমে দেশ চলে, গত ৪০ বছরে তাঁদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি? শ্রমিকের সন্তান তো স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। বরং উল্টো দিকে শ্রমিক লাশ হয়ে, পঙ্গু হয়ে বাড়ি ফিরছেন। যে বৃদ্ধ মা-বাবাকে প্রতিপালন করার কথা, উল্টো তাঁদের বোঝায় পরিণত হচ্ছেন। এই তীব্র শ্রম শোষণ শিল্পের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। তাই অপকৌশল আর চতুরতা পরিহার করে মজুরি পুনর্বিবেচনা করা এবং নিম্নতম মজুরি আট হাজার টাকার দাবি বাস্তবায়ন করা জরুরি।
জলি তালুকদার: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।
Joly_talukder@yahoo.com

হরতালের নামে তারা সহিংসতা চালাচ্ছে

নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি
নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি। একদিকে বিরোধী দলের সহিংস হরতাল অন্যদিকে সরকারের ধরপাকড়। এ পরিস্থিতিতে জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কী ভাবছে রাজনৈতিক দল? এ সম্পর্কে পড়ুন দুই নেতার মন্তব্য দেশের রাজনীতিতে যে হঠাৎ করে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, জনগণ গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছে, সে জন্য মূলত বিরোধী দলই দায়ী। দুই দফায় ১২০ ঘণ্টা হরতাল পালন করে আবার তারা জনগণের ওপর ৮৪ ঘণ্টার হরতাল চাপিয়ে দিয়েছে। বিরোধী দল দীর্ঘদিন ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও সেই তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা কী করে প্রতিষ্ঠা করা যাবে, সে সম্পর্কে কোনো ফর্মুলা এখনো পর্যন্ত তারা দিতে পারেনি। মনে রাখতে হবে, সংবিধানের মৌলনীতির পরিপন্থী বলেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন। এখন এই ব্যবস্থার পুনর্বহাল করা হবে আদালতের রায়ের লঙ্ঘন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ নির্দলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা এতটাই অবাস্তব যে তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছেন, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন সম্ভব না হলে সে বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ এটি একটি হাস্যকর প্রস্তাবে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সর্বদলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটি যেমন বাস্তবসম্মত, তেমনি সংবিধানের মৌলনীতিরও সমর্থক। আমরা শুরু থেকে বলে এসেছি,
যা করার সংবিধানের ভেতরেই করতে হবে; সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না। নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছেন। সমস্যা সমাধানে বরাবরই আমরা আলোচনার কথা বলে এসেছি। বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা ডেকে ৬০ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করে আলোচনার জন্য দুই দিনের সময়সীমা বেঁধে দিলেন। আসলে তিনি সময় দিয়েছিলেন মাত্র ২৪ ঘণ্টা। প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বিরোধী দলের নেতার দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই তাঁকে টেলিফোন করে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় গণভবনে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বিরোধী দলের নেতা হরতালের দোহাই দিয়ে সেই আমন্ত্রণ নাকচ করে বলেন, তিনি ২৯ অক্টোবরের পর যেকোনো সময় আলোচনায় বসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই আমন্ত্রণ এখনো বহাল আছে। কিন্তু বিরোধী দল আলোচনার পথে না গিয়ে হরতালের নামে সারা দেশে সন্ত্রাস ও সহিংসতা চালাচ্ছে। বোমা মেরে মানুষ মারছে, যানবাহন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার বলে বিরোধী দল দাবি করে। কিন্তু হরতালের নামে রাস্তায় জবরদস্তি করা, বোমা-ককটেল নিক্ষেপ করে মানুষ মারা, রেললাইন উপড়ে ফেলা কিংবা যানবাহনে আগুন দেওয়া কিংবা জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক অধিকার হতে পারে না। এ অবস্থায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য সরকার যদি কোনো আইনি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, তাহলে দোষ দেওয়া যায় না। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই যে বিরোধী দল হরতালের নামে জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে চলেছে,
তার উদ্দেশ্য কিন্তু নির্বাচন নয়। এসবের মাধ্যমে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করে অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে। পাকিস্তান আমল থেকে এ দেশের মানুষ বহু হরতাল দেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হরতালের চিত্র একেবারেই আলাদা। আগে কখনোই হরতালের আগে থেকে গাড়ি ভাঙচুর বা জ্বালাও-পোড়াও করা হতো না। কিন্তু বিরোধী দল এখন হরতাল ডেকেই গাড়ি ভাঙচুর করতে নেমে যায়। এমনকি গণমাধ্যমের অফিস ও গাড়িও তাদের হামলার শিকার হচ্ছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে এই নৃশংসতা চলতে পারে না। গত কয়েকটি হরতালের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে জামায়াত-শিবিরই এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছে। হাইকোর্টের রায়ে দলটির নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর দলটি এখন অরাজকতা চালাচ্ছে। এর আগে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে কী ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল, তা দেশবাসী জানে। বিরোধী দলের রাজনীতি এখন আর বিএনপির হাতে নেই, জামায়াত-শিবিরই নিয়ন্ত্রণ করছে। বিএনপি অতিমাত্রায় তাদের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক দিনে বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন। সেটি করা হয়েছে নির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতেই। এর সঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতি ও সংলাপকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। এত কিছুর পরও রাজনীতিতে যাতে সুস্থিরতা থাকে, সবাই মিলে যাতে নির্বাচনটি করা যায়,
সে জন্য আমাদের আলোচনার প্রস্তাব এখনো বহাল আছে। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতায় যেতে হলে নির্বাচনের বিকল্প নেই। অনেকেই বিরোধী দলের অফিসে ও খালেদা জিয়ার বাসভবনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধী দলের নেতার নিরাপত্তার দায়িত্বও সরকারের। সেখানে যদি তাঁর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে বলে সরকারের কাছে প্রতীয়মান হয়, তাহলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এটাই স্বাভাবিক। আমরা এখনো চাই বিএনপিসহ সব বিরোধী দল নির্বাচনে আসুক। সর্বদলীয় সরকারে যোগ দিয়ে তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করুক। আর যদি বিএনপি একেবারেই না আসে, তাহলেও নির্বাচন হতে হবে। সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে ১৮-দলীয় জোটের অনেক শরিক নির্বাচনে অংশ নেবে। এমনকি বিএনপিরও অনেক নেতা নির্বাচনের দিকেই ঝুঁকে পড়বেন। ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন: উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।

হিন্দুদের হুমকি দিয়ে টাকা আদায়, তাদের ওপর আক্রমণ এবং সাম্প্রদায়িকতা by বদরুদ্দীন উমর

২০১২ সালে কক্সবাজারে বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণের পর কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের নানা জায়গায় হিন্দু মন্দির, হিন্দুদের বাড়িঘর আক্রমণের ঘটনা প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। এসব আক্রমণে প্রাণহানি না হলেও হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে ও ভেঙেচুরে ধ্বংস করে তাদের সম্পত্তির অনেক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষত সরকারি দল ও সংবাদপত্রে অনেক কথাবার্তা ও আলোচনা হলেও কোনো পুলিশি তদন্ত কোথাও হয়নি। বৌদ্ধদের ওপর গত বছর এত বড় আক্রমণের পর সরকার তাদের মন্দির আবার নির্মাণ করে তাদের ক্ষতিপূরণের কিছু ব্যবস্থা করলেও সে ঘটনার ওপর কোনো তদন্ত হয়নি। কারও শাস্তি হয়নি। এ কারণে মন্দির পুনঃনির্মাণ করে দেয়া সত্ত্বেও সরকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় বৌদ্ধদের অনেক ক্ষোভ আছে। মন্দির পুনঃনির্মাণের ফলে এলাকার বৌদ্ধদের মধ্যে কোনো খুশির ভাব নেই।
বৌদ্ধদের ওপর সেই বড় রকম আক্রমণের সময় সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই অপর পক্ষের ওপর দোষ চাপিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে অনেক প্রচার করেছিল। আসলে সেই আক্রমণের ঘটনা কোনো দলের পক্ষ থেকে ঘটানো হয়নি। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্য দলের লোক, এমনকি কোনো দলে নেই এমন লোকেরাও সেই কাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল। সরকারি দল আওয়ামী লীগের কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত না থাকলেও তাদের লোকজন বেশ ব্যাপকভাবে বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকা এবং তার প্রমাণ অগ্রাহ্য করার মতো অবস্থা না থাকার কারণেই সরকার তা নিয়ে কোনো তদন্ত করেনি। কারও শাস্তির ব্যবস্থা না করে সরকারি খরচে বৌদ্ধদের মন্দির পুনঃনির্মাণ করে দিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের খুশি করতে চেয়েছিল। বিষয়টি বৌদ্ধদেরও চোখ এড়িয়ে যায়নি। এ জন্য মন্দির নির্মাণ এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সেগুলোর উদ্বোধন উপলক্ষে স্থানীয় বৌদ্ধদের মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। যা দেখা গিয়েছিল তার মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু ছিল না।
বৌদ্ধদের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রে যেমন, হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ক্ষেত্রেও তেমনি। হিন্দুদের ওপর বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ হলেও সেগুলোর কোনোটিরই তদন্ত হতে দেখা যায় না! তার জন্য কারও শাস্তি হয় না!! অতি সম্প্রতি পাবনা ও লালমনিরহাটে হিন্দুদের ওপর আক্রমণের কতকগুলো ঘটনা ঘটেছে। পাবনার ঘটনাবলীর ওপর যে রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তার দিকে তাকালে এ বিষয়টি বোঝার কোনো অসুবিধা হবে না। বিগত আগস্ট মাস থেকেই পাবনার সাঁথিয়ার একাধিক স্থানে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। হয়তো এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকবে যার কোনো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
কয়েক যুবক ২৪ আগস্ট সাঁথিয়ার বনগ্রাম গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক গোপালচন্দ্র ঘোষের কামরায় ঢুকে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে লাঠি, লোহার রড, হাতুড়ি ইত্যাদি দিয়ে মারধর করে। এই মারধরের কারণ চাঁদাবাজদের দুই লাখ টাকা দিতে তার অস্বীকৃতি। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তিনি কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কিছু না করায় এবং তারা তার পরিবারের লোকদের অপহরণের হুমকি দেয়ায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করেন। গোপালচন্দ্র চাঁদাবাজদের কোনো টাকা দেয়ার কথা স্বীকার না করলেও স্থানীয় লোকজন বলেন, তিনি তাদের এক লাখ সত্তর হাজার টাকা দিয়েছেন। সাংবাদিকদের সামনে তিনি বিশেষ কিছু না বললেও একথা বলেন, ‘হিন্দু পরিবার ও হিন্দু ব্যবসায়ীরা নিয়মিত চাঁদাবাজির শিকার, কিন্তু জীবনের ভয়ে তারা এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস করেন না।’ (Daily Star, 07.11.2013)
স্থানীয় লোকজন বলেন, চাঁদাবাজদের নেতা ফজলুর খান বিগত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে, কিন্তু তার দলের অন্য লোকরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়। তারা বলেন, ২০ জনের একটা গ্র“প সরকারি দলসহ সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে হিন্দুদের ওপর এই নির্যাতন চালায়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এদের পেশিশক্তিকে কাজে লাগায়। এদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা কোরবান আলী বলেন, এই চাঁদাবাজরা কোনো রাজনৈতিক দলের লোক নয়। এরা স্রেফ ক্রিমিনাল। (Daily Star, 07.11.2013)
সাঁথিয়া বিএনপির সভাপতি মাহবুব মুরশেদ জ্যোতি দাবি করেন, এই ক্রিমিনালরা আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে থেকেই তাদের অপরাধমূলক কাজকর্ম করে এবং তাদের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে এই দুর্বৃত্ত গ্র“পের লোকদের স্পর্শ করার ক্ষমতা কারও নেই, কারণ পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই নেয় না। (Daily Star, 07.11.2013)
গোপালচন্দ্র ঘোষের ওপর আক্রমণের মাসখানেক পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর নির্বাচনী এলাকা বনগ্রাম বাজারে ওই চাঁদাবাজরা সীমা জুয়েলারিতে গিয়ে তিন লাখ টাকা দাবি করে। দোকানের মালিক বাঁশি রাজবংশী টাকা দিতে অস্বীকার করায় তাকে তারা টেবিল ফ্যান দিয়ে আঘাত করে। তিনি সে যাত্রায় তাদের মিষ্টি খাওয়ার নাম করে আট হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করলেও পরে এলাকার একশ’র বেশি ঘর এবং দোকানপাট ভাংচুর ও লুটপাটের সময় তার দোকানও আক্রান্ত হয়। অধিকাংশ হিন্দু পরিবার ও ব্যবসায়ীকে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাঁদাবাজদের এই গ্র“পকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু তারা পুলিশ অথবা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কোনো অভিযোগ করেন না জীবন বিপন্ন হওয়ার ভয়ে। কিছুসংখ্যক মুসলমান ব্যবসায়ীকেও নিয়মিত চাঁদা দিতে হয় এই চাঁদাবাজদের (Daily Star, 07.11.2013)। একশ’ হিন্দুর বাড়িঘর-দোকানের ওপর আক্রমণের জন্য স্থানীয় লোকেরা পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেন। বনগ্রাম বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফিকুর রহমান ডেইলি স্টারের রিপোর্টারকে বলেন, অধিকাংশ হিন্দু ব্যবসায়ী গোপনে চাঁদাবাজদের টাকা দিতে বাধ্য হন। বনগ্রাম বাজারে ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৩৪৩। তাদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা ৯৯। বনগ্রামে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৯০০। এদের এক-তৃতীয়াংশ হিন্দু, যারা ভয়ভীতির মধ্যেই বসবাস করেন।
শাহপাড়া ও ঘোষপাড়া এলাকায় একশ’ ঘর হিন্দুর ঘরবাড়ির ওপর আক্রমণের চারদিন পর ৬ নভেম্বর সাঁথিয়া এলাকার সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও স্থানীয় প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানককে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় যান। সেখানে তারা হিন্দুদের ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। মিঠু ও রুবেল নামে দুই চাঁদাবাজ ক্রিমিনালকে স্থানীয় প্রশাসন আয়োজিত তাদের সেই মিছিলে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়! ডেইলি স্টার পত্রিকায় তাদের ছবি প্রতিমন্ত্রী টুকুর ঠিক পেছনেই স্লোগান দেয়া অবস্থায় দেখা যায়! এই ছবি দেখে স্থানীয় লোকজন ও আক্রান্ত হিন্দু পরিবারের সদস্যরা জোরের সঙ্গে বলেন, তারা দু’জনই লুটপাট ও ভাংচুরে অংশগ্রহণ করেছিল। এছাড়া পার্শ্ববর্তী গ্রাম গৌরীপুরের বাসিন্দা অ্যানি নামে একজন চোর ও চাঁদাবাজকেও এই মিছিলে দেখা যায়। সেও হিন্দুদের ওপর হামলায় অংশগ্রহণ করে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অন্য দুই মন্ত্রী, পুলিশের আইজি, র‌্যাবের বড়কর্তা প্রমুখসহ একটি বড় সরকারি দল নিয়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে আক্রমণের প্রতিবাদ মিছিল করলেও আজ পর্যন্ত চাঁদাবাজ ক্রিমিনালদের কাউকেই গ্রেফতার করা বা কোনোভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। সরকারি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে এই দুর্বৃত্তরা সম্পর্কিত না থাকলে প্রশাসন ও পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তা কি সম্ভব ছিল? মন্ত্রী ও পুলিশ-র‌্যাব কর্মকর্তাদের মিছিলে কিভাবে এলাকার সব থেকে ভয়াবহ চাঁদাবাজ ক্রিমিনালরা অংশগ্রহণ করতে পারে? এর ব্যাখ্যা কী?
আসল কথা হল, এই চাঁদাবাজ ক্রিমিনালদের কোনো প্রকৃত রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এরা সুযোগ-সুবিধামতো সব দলেরই লোক। সব দলই এদের ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে নিজেদের রাজনীতির কাজে লাগায়। বর্তমানে যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, এ জন্য এই দুর্বৃত্তরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সরকারের আশ্রয়ে থেকেই নিজেদের সব অপরাধমূলক কাজ ও সেই সঙ্গে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করে। হিন্দুদের ওপর এই আক্রমণকে আওয়ামী লীগ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বুদ্ধিজীবী এবং অন্য অনেকেও সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যায়িত করে। তারা প্রচার করে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং হিন্দুরা তার শিকার হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সে রকম কিছু হচ্ছে না। বাংলাদেশে এখন চারদিকে ব্যাপকভাবে লুটতরাজ, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য চলছে। এসব যে চলছে তার রিপোর্ট প্রতিদিনই সংবাদপত্রে ভূরি ভূরি পাওয়া যায়। এই লুটতরাজ, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের কোনো সাম্প্রদায়িক চরিত্র নেই। সাধারণভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই এর শিকার। তবে কোনো কোনো জায়গায় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদের ওপর এই আক্রমণ তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক নেই।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ৭ নভেম্বর পাবনার বনগ্রাম সফর করেন। সে সময় তিনি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টুকুর সঙ্গে মিছিলে অংশগ্রহণকারী কয়েকজনের ছবি পাবনার সহকারী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট আবু বকর সিদ্দিককে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন, যেখানে স্থানীয় লোকদের সহায়তায় সাংবাদিকরা ক্রিমিনালদের চিহ্নিত করতে পারেন, সেখানে পুলিশ কেন তা পারে না? এর জবাব সবারই জানা। কাজেই এ নিয়ে এখানে বেশি আলোচনার কিছু নেই। এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে বলা দরকার তা হল, বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লোক পাবনার এই ঘটনাসহ এ ধরনের অন্য ঘটনার উল্লেখ করে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে যেভাবে কথাবার্তা বলেন, তার মধ্যে সত্যতা বলে কিছু নেই। আসল কথা হল, বাংলাদেশে এখন চারদিকে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের বিস্তার হয়েছে এবং তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সুযোগে সব রকম ক্রিমিনাল তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যতই জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, ততই তারা এ ধরনের ক্রিমিনালদের নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। কিন্তু অবস্থা এতই ভয়াবহ যে, এই অরাজকতা এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে একে নিয়ন্ত্রণ করা কারও পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে সমাজে কারও নিরাপত্তা বলে কিছু থাকছে না। হরতালের পর হরতাল দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এখন এই অরাজকতা রাস্তাতেও ছড়িয়ে দিয়েছে। হিন্দুদের ওপর এখন যেভাবে আক্রমণ হচ্ছে, একে ওই পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে হবে। এই আক্রমণে স্থানীয় মুসলমানরা অংশগ্রহণ করছেন না, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় যেমন ঘটে থাকে। উপরন্তু তারা এর বিরোধিতা করছেন। তাছাড়া সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে হিন্দুরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানদের ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
হিন্দুদের ওপর আক্রমণকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আইন-শৃংখলার অবনতি এবং অরাজকতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে না দেখে যারা সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে দেখেন, তারা ভারতের বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর প্রশংসাভাজন হতে পারেন। কিন্তু এর দ্বারা এই পরিস্থিতির বিকৃত ব্যাখ্যাই করা হবে এবং এর দ্বারা পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো পথ তো পাওয়া যাবেই না, উপরন্তু সে চেষ্টা বিপজ্জনকভাবে বিপথগামী হবে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

হাসিনা সরলেও খালেদা নির্বাচনে আসবেন না

রাশেদ খান মেনন
রাশেদ খান মেননের জন্ম ফরিদপুরে, ১৯৪৩ সালে। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকা কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং পরের বছর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থায় প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেন; পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ডাকসুর সহসভাপতি নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি। তিনি ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাংসদ নির্বাচিত হন। সংসদে শিক্ষাবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
প্রথম আলো  প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দিচ্ছেন কি?
রাশেদ খান মেনন  প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা মনে করি, তাতে সংকটের একটি সমাধানসূত্র পাওয়া যেতে পারে। আমাদের দল সেই মন্ত্রিসভায় যোগদানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী যখন মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তখন তো সাড়া দেননি।
মেনন  দুই সরকারের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেটি ছিল পরিপূর্ণ শাসন পরিচালনা। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে যখন আমরা ১৪ দল করেছিলাম তখন কথা ছিল একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন ও একসঙ্গে সরকার গঠন। কিন্তু নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার আমাদের কথা আমলে নেয়নি। এই বিবেচনায় ২০১১ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি মন্ত্রিসভায় যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে তখন প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। আর সর্বদলীয় সরকার হলো নির্বাচন নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায়। দুটোকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
প্রথম আলো  কবে নাগাদ সর্বদলীয় সরকার গঠিত হচ্ছে?
মেনন  এটি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে আছে। তবে বর্তমান সরকার পদত্যাগের পরই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে বলে আমাদের ধারণা।
প্রথম আলো  মহাজোটের শরিক হিসেবে শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখছেন?
মেনন  সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই আছে। তবে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকার জরিপ ও প্রতিবেদনমতে, সরকারের সাফল্যের পরিমাণই বেশি। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, খাদ্য, শ্রমিকস্বার্থ রক্ষায় সরকারের সাফল্য রয়েছে। আবার বিদ্যুতে সাফল্য থাকলেও রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের কারণে জনগণের ওপর চাপ বেড়েছে। শেয়ারবাজারের ঘটনায় যে সংবেদনশীলতা আশা করা গিয়েছিল, অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকেও সেটি পাওয়া যায়নি। হল-মার্কসহ অন্যান্য আর্থিক কেলেঙ্কারিতে সরকার কিছু করছে না বলেই জনমনে ধারণা রয়েছে।
একই সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশ চারটি ক্ষেত্রে জাতিসংঘের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছে। মানুষের আয় বেড়েছে। দারিদ্র্য কমেছে।
প্রথম আলো  আপনারা একসময় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। কিন্তু এখন যে সরকারটির সঙ্গে আছেন, সেই সরকারটি ধনতন্ত্রেরই সমর্থক। বিষয়টি কি স্ববিরোধী নয়?
মেনন  এ কথা ঠিক যে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ঘোষণা করলেও পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে সরে আসে এবং নব্বইয়ের দশকে তারা ধনতান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করে। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সরকার যেসব অর্থনৈতিক নীতি নিয়েছে, তাতে গরিববান্ধব কর্মসূচি অগ্রাধিকার পেয়েছে। সরকারের প্রথম দুটি বাজেটেও তার স্বাক্ষর রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে আমাদের যে পার্থক্য আছে, তাও আমরা বলেছি, এখনো বলছি।
প্রথম আলো  মহাজোটের শরিক হিসেবে গত পাঁচ বছরে যেসব দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে, আপনারা তার দায় নেবেন কি?
মেনন  আমরা সরকারের ভালো কাজকে যেমন সমর্থন করেছি, তেমনি ভুলত্রুটির সমালোচনাও করেছি। সংসদে আমার বক্তৃতা-বিবৃতি লক্ষ করলে দেখবেন, আমরা সরকারের সমালোচনা করতে দ্বিধা করিনি।
প্রথম আলো  সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা সেতু নির্মাণ। কিন্তু করতে পারেনি। এ ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখছেন?
মেনন  বিশ্বব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণেই সমস্যাটি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একবার বিশ্বব্যাংকের সহায়তা ছাড়া নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কথা বলেছিলেন। আমরাও তাঁর এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু অর্থমন্ত্রী ও আমলাতন্ত্র সবকিছু লেজেগোবরে করে ফেলে।
প্রথম আলো  এটি কি নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না?
মেনন  কিছুটা তো ফেলবে। একটি বড় কাজ সরকার করতে পারেনি। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ক্ষুব্ধ হবে।
প্রথম আলো  নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল দুই মেরুতে। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছেন। বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া তাঁরা নির্বাচনে যাবেন না। এ সংকটের সমাধান কী?
মেনন  বিরোধী দলের আন্দোলনের লক্ষ্য নির্বাচন নয়। তাদের লক্ষ্য হলো দেশকে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধারায় নিয়ে যাওয়া, যেমনটি তারা পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে করেছিল। এ কারণেই তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঐক্য করেছে। তাদের সব কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতটি দেখুন। জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে নিয়ে আসেন এবং খালেদা জিয়া প্রথমবার ক্ষমতায় এসে তাঁর নাগরিকত্ব দেন এবং দ্বিতীয়বার জামায়াতের নেতাদের মন্ত্রী করেন। ২০০১-২০০৬ সালে জামায়াতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করার কাজটি বিএনপিই করেছে। ১৯৯২ সালে গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে যাঁরা গণ-আদালত করেছিলেন, খালেদা জিয়া তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা পর্যন্ত দিয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো আদালতের রায়ের মাধ্যমে যে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়েছে, সেটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেশকে প্রতিবিপ্লবী ধারায় নিয়ে যাওয়া।
প্রথম আলো  নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীও ছিল। তখন কেন তাদেরকে আন্দোলনের সহযাত্রী হিসেবে মেনে নিলেন?
মেনন  অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে জামায়াতে ইসলামীও সমান্তরালভাবে আন্দোলন করেছে। আসলে সেটি সত্য নয়। তারা তিন জোটের সঙ্গে লিয়াজোঁ করার চেষ্টা করলেও আমরা রাজি হইনি। তিন জোটের ঘোষণায় স্পষ্ট করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ধারায় দেশ পরিচালনার কথা ছিল। সেখানে জামায়াতের আসার প্রশ্নই ওঠে না। বরং রাজশাহীতে রিমু হত্যার পর পঞ্চম সংসদে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছিল। সংসদের তৎকালীন উপনেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী কথাও দিয়েছিলেন, আইনি পথেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে। তাই এখন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার যে দাবি উঠেছে, সেটি নতুন নয়।
প্রথম আলো  কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগও তো জামায়াতকে সঙ্গী করেছে?
মেনন  আওয়ামী লীগ বলছে, এটি তারা কৌশল হিসেবে নিয়েছিল। পরের নির্বাচনে জামায়াতের আসন ১৮ থেকে ৩-এ নেমে এসেছিল। তার পরও বলব, আওয়ামী লীগের সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। তারা দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারেনি।
প্রথম আলো  বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে তো রাষ্ট্রাদর্শ নয়, নির্বাচন। বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে।
মেনন  এটি তাদের আসল কথা নয়। ২০০৭ সালে তারা যখন একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিল, তখনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ফেলল। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি এবং দুই বছরের জন্য সেনা-সমর্থিত সরকার কায়েম হলো। বিএনপির নেত্রী এবারই নির্বাচন বর্জনের কথা প্রথম বলছেন না, ২০০৮ সালের নির্বাচনও তিনি বর্জন করতে চেয়েছিলেন। দেশি-বিদেশি চাপে তিনি পারেননি। এরপর ২০১০ সালে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলো, যা করেছিলেন তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান। এটি বিএনপির পক্ষে হজম করা কঠিন। তাদের গত দুই বছরের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে আমরা কী দেখতে পাই? মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বললেও তারা বাতিল হয়ে যাওয়া পঞ্চম সংশোধনী পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ কারণেই তারা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তারা হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামিয়েছে. তাদের ১৩ দফা সমর্থন করেছে। হেফাজতের ১৩ দফাকে সমর্থন করলে তো বাংলাদেশ রাষ্ট্র, গণতন্ত্র কিছুই থাকে না। জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে নেমে আসার জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২৪ অক্টোবর থেকে সরকার অবৈধ বলে ঘোষণা করলেন। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে নাস্তিকদের আন্দোলন বলে হেফাজতিদের উসকে দিলেন। এসব কর্মকাণ্ড ও বক্তৃতা-বিবৃতি প্রমাণ করে যে বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজত রাষ্ট্রের প্রতিবিপ্লবী ষড়যন্ত্রই চালাচ্ছে।
প্রথম আলো  কিন্তু বিএনপির আশঙ্কা, বর্তমান সরকারপ্রধানের অধীনে নির্বাচন হলে ব্যাপক কারচুপি হবে, জনরায় বানচাল হয়ে যাবে।
মেনন  এটি জিয়া বা এরশাদের জমানা নয় যে চাইলেই কেউ নির্বাচনে কারচুপি করতে পারবে। এখন ভোটার পরিচয়পত্র আছে, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স আছে, সর্বোপরি আছে স্বাধীন গণমাধ্যমের তীক্ষ দৃষ্টি। এসব এড়িয়ে কারও পক্ষেই নির্বাচনে যে কারচুপি করে ফল পক্ষে নেওয়া যায় না, তার প্রমাণ পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন।
প্রথম আলো  বিরোধী দল তো শুধু নির্বাচন বর্জনের কথা বলছে না, নির্বাচন প্রতিহত করার কথাও বলছে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?
মেনন  সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে সমঝোতার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনটি করা। বিএনপি যদি নির্বাচনে না-ই আসে এবং নির্বাচন ঠেকাতে চায়, তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়বে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে তো নির্বাচনের বিকল্প নেই।
প্রথম আলো  সমঝোতার জন্য সর্বশেষ ব্যবসায়ীরাও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারও পরিণাম হতাশাব্যঞ্জক।
মেনন  আমি তো মনে করি, বিএনপি যদি নির্বাচন করে, আলোচনার সুযোগ এখনো আছে। আর যদি নির্বাচন না করতে চায়, তাহলে সরকার যে প্রস্তাবই দেবে, তারা তা প্রত্যাখ্যান করবে।
প্রথম আলো  বিএনপির নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে মনে হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানের পদে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না থাকলে তারা নির্বাচনে আসবে।
মেনন  আমার ধারণা, নির্বাচনকালীন সরকারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও তারা নির্বাচনে আসবে না। দলের স্থায়ী কমিটির প্রায় সব সদস্যই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষপাতী। কিন্তু খালেদা জিয়া নির্বাচনে আসার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
নির্দলীয় সরকারের যে প্রস্তাব খালেদা জিয়া দিয়েছেন, তা বাস্তবসম্মত নয় বুঝতে পেরেই বিএনপির নেতা এম কে আনোয়ার সরকারপ্রধানের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তারপর কিন্তু বিএনপি সে অবস্থান থেকে সরে আসে। তারা এখন নির্বাচন বানচাল করতেই তৎপর। পঁচাত্তরের পর তারা যে প্রতিবিপ্লবী ধারায় বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা হলো ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা। সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ ইত্যাদিও এই ষড়যন্ত্রের অংশ।
প্রথম আলো  পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে তৃতীয় শক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারে বলেই অনেকে আশঙ্কা করছেন।
মেনন  আমি মনে করি, এবারের বিরোধটা শুধু নির্বাচন নিয়ে নয়। বিরোধ হলো বাংলাদেশ প্রগতির ধারায় থাকবে, না প্রতিবিপ্লবী ধারায় যাবে। সে ক্ষেত্রে সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি প্রগতির পক্ষে থাকবে বলেই আশা করি এবং তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেখছি না। বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা জনগণ সমর্থন দেবে না।
প্রথম আলো  স্বাধীনতার পর যেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে এখন জোট বেঁধেছেন। এটি কি রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা নয়?
মেনন  দুটো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের ভিন্নতা ছিল দেশ গড়ার মত ও পথ নিয়ে। কিন্তু এখন লড়াই হচ্ছে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিয়ে। দেশটি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায় থাকবে, না প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে চলে যাবে। তাই এবারের ঐক্য কেবল নির্বাচনী ঐক্য বলা ঠিক হবে না।
প্রথম আলো  আপনি একসময় বলেছিলেন, সংসদ ভেঙেই নির্বাচন করতে হবে। এখনো সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়নি।
মেনন  আমি এখনো মনে করি, সংসদ ভেঙেই নির্বাচন হওয়া উচিত।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
মেনন  ধন্যবাদ।

আক্রান্তের পাশে দাঁড়াও

সন্ত্রাসের শিকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা
রামু থেকে পাবনার সাঁথিয়া। সংখ্যালঘুরা কেবল নির্যাতনের শিকার হলেই পত্রিকার হেডলাইনে পরিণত হন। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ধ্বংসযজ্ঞের স্মারক হিসেবে পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় তছনছ হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, আগুনে পোড়া বসতভিটা, আহাজারিরত হিন্দু নারী, বড়জোর লুণ্ঠিত বাড়ির উঠানে পুলিশের উপস্থিতি—যা দিয়ে আক্রমণ-পরবর্তী একধরনের রাষ্ট্রীয় স্বস্তি তৈরি করা হয়। যদিও এসব মেটাফোর দিয়ে সংখ্যালঘুদের অন্তর্গত আতঙ্ক ও সামষ্টিক হতাশার সামান্যই প্রকাশ করা যায়।
হামলার দিন ২ নভেম্বর রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কালীপূজা ও দীপাবলি উৎসব ছিল। কে জানত, প্রদীপ কিংবা মোমবাতির মৃদু আলোর বদলে ২৬টি বসতভিটা পুড়ে যাওয়ার আগুনে প্রকাশ্য দিবালোকে ধ্বংসের দীপাবলি হবে, যা পোড়াবে এমনকি দেবালয়ও। সাঁথিয়ার বনগ্রামে আক্রমণের শিকার পরিবারগুলোর বসবাস বাজার, মহাসড়ক এবং পুলিশ স্টেশন থেকে খুব দূরে নয়। সংখ্যালঘুদের ব্যবসাকেন্দ্র ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের আগে ভাঙচুর ও লুণ্ঠন করা হয়েছে। সাধারণভাবে আক্রমণকারীদের আমজনতা মনে হলেও তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। হামলার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগমন প্রতিহত করতে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। হামলার কারণ হিসেবে ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রধান অভিযুক্ত দশম শ্রেণীর ছাত্র, যার আদৌ ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে কি না, কিংবা সে ছবি আঁকতে পারে কি না, তা আক্রমণকারীরাও নিশ্চিত করতে পারেনি।
অভিযুক্ত ছাত্রের বাবা একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী, যার ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট নেই। মাত্র কয়েক মাস আগে রামুতে ঠিক একই অভিযোগ তুলে কী ঘটেছিল, তা আমাদের অজানা নয়। সামনেই দেশের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর এই হামলা নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির আগাম আলামত কি না, তা-ও ভেবে দেখতে হবে। কেননা, ২০০১ সালের ঘটনা আমরা এখনো ভুলে যাইনি। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রমাগতভাবেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। সারা বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বেদখল হয় এবং তাঁরা ভীষণ আতঙ্কে ভুগতে থাকেন, বিশেষ করে যেসব পরিবারে কিশোরী-তরুণী থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নাজুকতা আরও বেশি। কোনো ধরনের আইনি প্রতিকারের সম্ভাবনা না থাকায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, যা তাঁদের আপসকামী ও পলায়নপর করে তোলে। সংখ্যালঘুদের পক্ষে এ কথা ভাবা অসম্ভব যে তাঁরা ক্ষতিপূরণ পাবেন, ন্যায়বিচার পাবেন, কিংবা ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার শিকার হবেন না। সাঁথিয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন তাদের দায় এড়াতে পারে না। স্থানীয় জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ কথিত অভিযুক্ত ছাত্রের বাবাকে প্রাণে রক্ষা করার মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে।
তবু লুণ্ঠন ও ধ্বংস থামানো যায়নি। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো কারণ ছাড়াই যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা যায়। এতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের তরফ থেকে খুব স্বল্পমাত্রার সীমাবদ্ধ প্রতিরোধ হবে, যাতে এক কাপড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নির্যাতিত ব্যক্তিরা আশ্বস্ত হতে পারেন না। তবে তাঁরা সান্ত্বনা পেতে পারেন এই ভেবে যে, তাঁদের আক্রমণের কারণ হিসেবে এখনো অন্তত যেকোনো একটি অজুহাত সামনে আনা হচ্ছে। যেখানে কোনো কারণ ছাড়াই আক্রমণ সংগত, সেখানে অজুহাত প্রদর্শন একধরনের ভদ্রতাই বটে! এই পরিস্থিতিতে আমরা কয়েকটি দাবি তুলে ধরছি। এক. এ ঘটনার তদন্ত করা হোক; দুই. দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক; তিন. ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে; চার. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত এলাকায় মোতায়েন রাখতে হবে; পাঁচ. সব রাজনৈতিক দলকে স্থানীয় পর্যায়ে অঙ্গীকার করতে হবে যে, যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করবে এবং সংখ্যালঘুরা কোনো রাজনৈতিক দলের ‘খেলাধুলা’র শিকার হবেন না; ছয়. প্রশাসন এবং সব সামাজিক-রাজনৈতিক নেতাকে আক্রান্ত পরিবারগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে। লেখকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

বিএনপির নেতাদের আটক

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার করা হলো বিএনপির পাঁচ শীর্ষস্থানীয় নেতাকে। ফলে, তাদের পূর্বঘোষিত হরতালের দৈর্ঘ্য আরও ১২ ঘণ্টা বেড়ে গেল। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, আজ রোববার সকাল ছয়টা থেকে আগামী বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত হরতাল। যে হরতাল ঠেকানোর জন্য গ্রেপ্তার, তার ফল হলো জনগণের আরও ভোগান্তি। তাই প্রশ্ন জাগে, এ ধরনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সরকার কী অর্জন করতে চায়? একদিকে আলোচনার আহ্বান, অন্যদিকে সম্ভাব্য আলোচনাসঙ্গীদের গ্রেপ্তারে সরকারের আচরণের স্ববিরোধিতাই ধরা পড়ল। মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, এম কে আনোয়ার, আবদুল আউয়াল মিন্টু ও শিমুল বিশ্বাসের গ্রেপ্তারের কায়দাটাও শোভন ছিল না। প্রকাশ্য অনুষ্ঠান থেকে বেরোবার পথে সোনারগাঁও হোটেলের সামনের রাস্তা থেকে যেভাবে প্রথম তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাতে মনে হয় সরকার তাঁদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং ফৌজদারি মামলার অপরাধী মনে করছে।
অবশ্য যে মামলায় এই গ্রেপ্তার, তা ফৌজদারি চরিত্রেরই। সেই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় নেতাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা জিয়ার বাসভবন এবং গুলশান কার্যালয় ও নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের চারপাশেও পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। নির্বাচন আয়োজনের প্রাক্কালে সরকারের এ রকম ‘হার্ড লাইন’ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিস্থিতির বদলে অস্থিতিশীলতারই ইঙ্গিত দেয়। জনগণ যখন সংকটের অবসান চাইছে, তখন এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘হরতাল করে মানুষ খুন ও মানুষ খুনের পরিকল্পনা করার’ অপরাধে বিএনপির নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ তাঁদের ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার জন্যও আদালতে আবেদন করেছে। রাজনৈতিক নেতারা হরতালের ঘোষণা দেন, তাঁদের সেই ঘোষণায় সাড়া দিয়ে দলীয় কর্মীরা হরতাল বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এটা বলা যায় না যে তাঁরা সরাসরি হত্যা-নাশকতা ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত।
কর্মীদের যেকোনো কাজের জন্য নেতৃত্বকে নৈতিকভাবে দায়ী করা যায়, কিন্তু এক ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য অন্য ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া যায় না। পাশাপাশি, বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের যেভাবে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, তাতে মনে পড়ে যায় বিগত জরুরি অবস্থার সময় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের কথা। এভাবে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ মামলা ও ধরপাকড় আশির দশকের স্বৈরতন্ত্রী আমলের কথাও মনে করিয়ে দেয়। সরকার একদিকে সর্বদলীয় সরকার গঠন করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতাদের আটক করছে। সুতরাং, এই গ্রেপ্তারের পেছনে কেবল সরকারের অসহিষ্ণুতাই নয়, বিশেষ কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা থাকা সম্ভব। এবং সেই পরিকল্পনা যে আলোচনামুখী নয়, সেটাও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপিও এখন ‘মনের সুখে’ হরতাল দিয়ে যেতে পারবে। এভাবে সমঝোতার সুযোগ নষ্ট করার পরিণতি যা-ই হোক, তার দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।