Thursday, June 30, 2016

‘সিলেটের মানুষ দেয় বেশি, পায় কম’

সিলেট শহরে যেতেই দেখা যাবে অসংখ্য মার্কেট–হোটেল। বড় বড় ভবন। কিন্তু কোনো শিল্পকারখানা চোখে পড়বে না। প্রশ্ন জাগবে, তাহলে সিলেটবাসী কি শিল্প স্থাপনে অনাগ্রহী? তাঁরা কি শুধুই ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা লন্ডনযাত্রায় উৎসাহী? সিলেট তিন-তিনজন ‘সফল’ অর্থমন্ত্রী উপহার দেওয়া সত্ত্বেও শিল্পায়নে এলাকাটি পিছিয়ে আছে। কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতেই সোমবার সন্ধ্যায় স্থানীয় এক হোটেলে সিলেটের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করি। সেদিন ছিল একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের ইফতার পার্টি। এ কারণে প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে সেখানে পেয়ে যাই। আলোচনায় ছিলেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি মাসুদ আহমেদ চৌধুরী, সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মো. লায়েছ উদ্দিন, মুকির হোসেন চৌধুরী, এমদাদ হোসেন, এ টি এম শোয়েব, বশিরুল হক, সিলেট সিএনজি পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুজ্জামান চৌধুরী দুলু, তৌফিক মজিদ লায়েক প্রমুখ। প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ী নেতারা বললেন, সিলেটের ব্যবসায়ীরা শিল্পকারখানা করতে চান না, এ কথা ঠিক নয়।
শিল্প প্রতিষ্ঠায় তাঁদের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। কিন্তু একটি অঞ্চলকে শিল্পায়িত করতে যে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, তার কিছুই এখানে নেই। জানতে চাই, কী রকম? তাঁরা বললেন, সিলেট দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত। রাজধানী ও সমুদ্রবন্দর থেকে অনেক দূরে। তদুপরি যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক।  পাল্টা প্রশ্ন করি, সিলেট ও ঢাকার মধ্যে বাস ও ট্রেন সার্ভিস আছে। আছে বিমান সার্ভিসও। এই সুবিধা তো অনেক স্থানে নেই। একজন ব্যবসায়ী নেতা জানান, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট সড়কটি খুবই বেহাল। যানজট লেগে থাকে। সড়কটি অপ্রশস্ত হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ কারণেই আমরা ঢাকা-সিলেট সড়কটি চার লেন করার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেটি দুই লেনের বেশি করতে রাজি হলো না। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেন করা হলো। অথচ সড়কপথে সিলেট অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন। আমরা কী দোষ করলাম? আমি বলি, অবশ্যই আপনারা কোনো দোষ করেননি। ভবিষ্যতে হয়তো সিলেট-ঢাকা সড়ক চার লেন হবে। তাঁরা বললেন, যখন সেটি হবে তখন আর চার লেনে কাজ হবে না। ছয় লেন দরকার হবে।
অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটের ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সব মনোযোগ ঢাকায়। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো কীভাবে চলছে; দেখার কেউ নেই। একজন ব্যবসায়ী নেতা বললেন, সিলেট-চট্টগ্রাম সড়কটি সোজাসুজি নয়। অনেক ঘুরে আসতে হয়। সিলেট-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ও সরাসরি ট্রেন সার্ভিস হওয়া প্রয়োজন। তাঁর কথায় যুক্তি আছে। শিল্পের কাঁচামাল কিংবা উৎপাদিত পণ্যটি সহজে আনা–নেওয়া করতে না পারলে উদ্যোক্তারা সেখানে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করবেন কেন? ব্যবসায়ীদের মতে, কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গেই সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর নয়। সিলেটের সঙ্গে এ অঞ্চলের অন্যান্য জেলা যথাক্রমে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সড়কগুলো আরও শোচনীয়। অনেক সড়কই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। একজন জানালেন, সিলেট–ভোলাগঞ্জ–কোম্পানীগঞ্জ সড়ক দিয়ে দেশের ৯০ শতাংশ পাথর পরিবহন করা হয়। সেই সড়কটির অবস্থা এতই শোচনীয় যে ৩০ কিলোমিটার যেতে ১০–১৫ ঘণ্টা লেগে যায়। ব্যবসায়ী নেতারা শিল্পের জন্য জমিসংকটের কথাও বললেন।
পর্যটন এলাকা বলে যত্রতত্র শিল্পকারখানা করা যায় না। সে জন্য সরকারের উচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো রক্ষা করে শিল্পের জন্য জমির বন্দোবস্ত করা। সরকার হবিগঞ্জের বাহুবলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেখানে শিল্প করার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এখনো নেই। সেটি কবে হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত নন ব্যবসায়ীরা। সিলেটকে ঘিরে যে পর্যটনবলয় গড়ে উঠেছে তাতে পর্যটকদের আকর্ষণ করার উপায় কী? জবাবে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একজন বললেন, সাম্প্রতিক কালে অনেকগুলো পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আছে মনোমুগ্ধকর বেশ কিছু রিসোর্ট বা অবকাশ কেন্দ্র। এখন অনেকে কক্সবাজার-রাঙামাটি না গিয়ে সিলেটে আসেন। কিন্তু সমস্যা হলো যোগাযোগ। রাস্তায় নামলেই তাঁরা দুর্ভোগে পড়েন। এ ছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। ফলে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় একজন পর্যটক এত সব ঝক্কি-ঝামেলা করে কেন আসবেন? আমি জিজ্ঞেস করি, অভিযোগ আছে সিলেটের মানুষ কারখানা না বানিয়ে ভবন বানান।
প্রত্যুত্তরে সিলেট চেম্বারের এক পরিচালক বললেন, ভবন বানানোর কারণ আছে। এতে কোনো ঝুঁকি নেই। জমি ও ভবনের দাম কমে না। কিন্তু শিল্প করতে গেলে পদে পদে বাধা। গ্যাস–সংকটের কারণে সিলেট অঞ্চলে বহু ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। সরকার ২০০৯ সালে গ্যাস–সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক–ই–ইলাহীর নেতৃত্বে কমিটি করলেও সেটি খুব কাজে আসেনি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কমিটি সারা দেশে এক হাজার প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস–সংযোগ দেওয়ার সুপারিশ করলেও কর্যকর হয়েছে খুবই কম।
সিলেটের ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করলে, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করলে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবেই। তাঁদের আক্ষেপ হলো, সিলেটে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উৎপাদিত হলেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়নি। বিদ্যুৎ থাকলেও সঞ্চালন লাইন খারাপ। দিনে অন্তত দু–তিন ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। সিলেটে দুটো ওষুধ কারখানা আছে। আলাপ প্রসঙ্গে একটি কারখানার স্বত্বাধিকারী তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বললেন, এখানে কারখানা চালানোর দক্ষ লোক পাওয়া যায় না। ঢাকা ছেড়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীরা আসতে চান না। কারখানার একটি যন্ত্র নষ্ট হলেও ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়। এখানে মেরামতের সুযোগ নেই।
সিলেটের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। ওখানে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অংশে সড়কগুলো এত খারাপ যে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন। নাজুক যোগাযোগব্যবস্থা ও অপ্রতুল অবকাঠামোর কারণে অনেক স্থলবন্দর অকেজো পড়ে আছে। স্থলবন্দরে ওয়েব হাউস না থাকায় রোদ ও বৃষ্টিতে পণ্য নষ্ট হয়। এর বাইরে যেসব সমস্যার কথা তাঁরা বললেন, তার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার। এখনো ১২-১৪ শতাংশ হারে ঋণ নিতে হয়। তাঁদের মতে, সুদের হার একক ​িডজিটে আনা জরুরি। এটি অবশ্য সারা দেশেরই সমস্যা। ব্যবসায়ী নেতারা কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘সিলেটের মানুষ দেয় বেশি, পায় কম।’ কীভাবে? তাঁরা বললেন, সিলেট অঞ্চলের মানুষই সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। তাঁরা কর-ভ্যাট বেশি দেন। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারের উন্নয়নকাজ তেমন হচ্ছে না। বললাম, অর্থমন্ত্রী সিলেটের সন্তান। তাঁকে সমস্যাগুলো জানিয়েছেন কি না? তাঁরা বললেন, ‘হ্যাঁ, জানিয়েছি। একাধিকবার তাঁর সঙ্গে বসেছি। তিনিও সমস্যাগুলো জানেন। কিছু কিছু সমাধানের চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু আমলাতন্ত্র সহজে নড়ে না।’
সিলেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার তথা শিল্পায়নের জন্য সরকার কী করতে পারে? তাঁরা বললেন, ‘আমরা পুঁজি চাই না। চাই নীতি-সহায়তা। অবকাঠামোর উন্নয়ন ও গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা।’ তাঁদের দাবি, অবিলম্বে ঢাকা-সিলেট সড়ক চার লেন করতে হবে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে হবে। এখন মাত্র একটি বিমান বাইরে থেকে সরাসরি সিলেটে আসে। কিন্তু এখান থেকে কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট যায় না; ঢাকা হয়ে যায়। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সিলেট-চট্টগ্রাম সরাসরি রেল সার্ভিস চালু করতে হবে। যেমনটি হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে। চট্টগ্রাম-সিলেট বিমান সার্ভিস চালু করা দরকার। একই সঙ্গে তাঁরা সিলেট-গুয়াহাটি বিমান সার্ভিস চালুর দাবিও জানান। তাঁদের মতে, এটি চালু হলে কেবল সিলেটবাসী নন, সীমান্তবর্তী ভারতের নাগরিকেরাও লাভবান হবেন। গুয়াহাটি অনেক দূরের বলে তাঁরা সিলেট বিমানবন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী।
আলোচনায় আসে ঢাকা-সিলেট-গুয়াহাটি বাস সার্ভিসও। তাঁরা জানান, বর্তমানে সপ্তাহে এক দিন বাস চালু আছে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে মানুষ যেতে ভয় পায়। কয়েক বছর আগেও তামাবিল-শিলং কিংবা শিলং-গুয়াহাটি সড়কটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন দুটো সড়কই মসৃণ ও প্রশস্ত। ভারত অসমতল পাহাড়ি এলাকায় যদি এ রকম রাস্তা করতে পারে, বাংলাদেশ পারবে না কেন? ব্যবসায়ী নেতারা সিলেটে শিল্পায়নের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দাবি করেন। তাঁরা মনে করেন, ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা সত্ত্বেও সীমান্তবর্তী এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে উত্তর-পূর্ব ভারতে রপ্তানি অনেক বাড়বে। কেননা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পণ্য নিলেও তার পরিবহন ব্যয় যা বাড়বে, এখানে উৎপাদিত পণ্য তার চেয়ে কম পড়বে। প্রাণ-আরএফএল সেই নজির স্থাপন করেছে। অন্যরা পারবে না কেন?
আগামীকাল: সিলেটে রাজনীতি আছে, রাজনীতি নেই
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

‘না ভোট’ বেড়েছে যে কারণে

এমনটা আগে ছিল না ভারতবর্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে। যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী পছন্দ না হলে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতেন না বা ভোট বর্জন করতেন। ফলে জানাও যেত না ওই সব প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের সমর্থন কতটুকু বা অনীহা কতটুকু। কত শতাংশ ভোট ওই প্রার্থী পেলেন বা কত শতাংশ ভোটার ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিলেন বা ভোট দিতে অনীহা প্রকাশ করলেন। তাই কারা প্রার্থীকে পছন্দ করছেন না তা জানার জন্য ভোটবাক্সে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বিধান চালু করার জন্য ভারতে বহু দেনদরবার হয়েছে। দাবি উঠেছে অন্তত ভোট বাক্স বা ভোটযন্ত্রে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম রাখা হোক। ভোটাররা জানাক কোন প্রার্থী তাদের পছন্দ বা অপছন্দের। অথবা কোনো প্রার্থীই তাদের পছন্দ নয়। অবশেষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচন কমিশনকে এক নির্দেশে জানিয়ে দেন ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রে (ইভিএম) চালু করা হোক ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম।
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশন ভোটযন্ত্রে এরপর চালু করে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম। ভোটযন্ত্রে প্রার্থী তালিকার একেবারে শেষ প্রান্তে রাখা হয় ‘না ভোট’ বা নোটায় (None Of The Above) ভোট দেওয়ার বোতাম। এই নির্দেশের পর প্রথম ‘না ভোট’ দেওয়ার বিধান চালু করা হয় ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে ‘না ভোট’ পড়ে ৫৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪টি। ২০১৪ সালের সর্বশেষ এই লোকসভা নির্বাচনে ‘না ভোট’ বেশি পড়ে তামিলনাড়ুতে। এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮২ হাজার ৬২টি। দ্বিতীয় স্থানে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৬টি ‘না ভোট’ পড়ে। আর এবার বিধানসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৫৩৩টি, আসামে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬টি, কেরালায় ১ লাখ ৭ হাজার ২৩৯টি ও পদুচেরিতে মাত্র ১৩ হাজার ২৪০টি ‘না ভোট’ পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘না ভোট’ পড়ে ৮ লাখ ৩১ হাজার ৮৪৫টি।
ভোটের ফলাফল বের হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, ২৯৪টি বিধানসভার আসনে এবার কমবেশি ‘না ভোট’ পড়েছে। বাঁকুড়া জেলার ছাতনা আসনে সবচেয়ে বেশি ‘না ভোট’ পড়েছে। এই সংখ্যা ৭ হাজার ৭০৯। আর সব থেকে কম ‘না ভোট’ পড়েছে হাওড়ার উত্তর আসনে। ১ হাজার ৭০টি। মুখ্যমন্ত্রী মমতার কলকাতার ভবানীপুর আসনেও ‘না ভোট’ পড়েছে ২ হাজার ৪৬১টি। এই কেন্দ্রে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাসমুন্সি। আবার এই ‘না ভোট’ ভাগ্য ফিরিয়ে দিয়েছে অন্তত ২৫ জন প্রার্থীর। কারণ, ওই সব আসনে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান ‘না ভোটে’র চেয়ে কম ছিল। ফলে রায়দিঘির তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় এবং চন্দননগরের তৃণমূল প্রার্থী সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন জয়ী হতে পেরেছেন। ঠিক তেমনি জয়ী হয়েছেন বালুঘাটের বাম কংগ্রেস জোট প্রার্থী বিশ্বনাথ চৌধুরী এবং কুশমন্ডীর বাম কংগ্রেস জোট প্রার্থী নর্মদা রায়। আবার বাঁকুড়ার বড় জোড়ার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী এবং পান্ডুয়ার তৃণমূল প্রার্থী ফুটবলার রহিম নবীও হেরেছেন। এখানে ‘না ভোটে’র যদি একটা অংশ তাঁরা পেতেন তবে জিততে পারতেন এবার তাঁরা। এভাবে এবার রাজ্যের অন্তত ২৫টি আসনে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। অথচ এই ‘না ভোট’ দাতারা যদি জয়ী বা পরাজিত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতেন, তবে ফলাফল অন্য রকম হতো। পরাজিত প্রার্থীরা জিততে পারতেন। জয়ী প্রার্থীর ব্যবধান বাড়ত।
তাই এবারের ভোট থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, মানুষের মধ্যে ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কেন এই প্রবণতা বাড়ছে তা নিয়ে কথা হয় বেশ কজন ভোটারের সঙ্গে। তাঁরা বলেছেন, এখন ভোটের রাজনীতিতে অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। প্রার্থী মনোনয়নে দল এখন বিত্তবান প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাজনৈতিক যোগ্যতা না থাকলেও আর্থিক যোগ্যতা প্রার্থিতা নির্বাচনে তাঁদের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থীরা আর ঠাঁই পাচ্ছেন না এখন ভোটের বাজারে। ঠাঁই পাচ্ছেন বিত্তশালী আর এলাকার ‘মাসলম্যানরা’। ফলে যোগ্য প্রার্থীদের যেমন ঠাঁই দিচ্ছেন না রাজনৈতিক দলের নেতারা, তেমনি অনেক মানুষও মনোনীত প্রার্থীদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে বাড়ছে ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা। অথচ এমনটা ছিল না এই রাজ্যের রাজনীতিতে। বিভিন্ন দল ঠাঁই দিত যোগ্য ও রাজনীতি নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করা ত্যাগী, দেশপ্রেমী ও নিঃস্বার্থ প্রার্থীদের। সমীক্ষায়ও দেখা গেছে, ভোটাররা চাইছেন ভালো মানুষ। যাঁরা দেশ ও সমাজের কাজ করেন। দেশ নিয়ে ভাবেন। উন্নয়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধ্যানধারণা আবর্তিত হয় দেশপ্রেম নিয়ে। অর্থের প্রতি যাঁর মোহ কম, মোহ বেশি দেশপ্রেম আর দেশসেবার প্রতি। সেই সব প্রার্থী এলে হয়তো ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা কমবে। বাড়বে রাজনীতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

তুরস্কের সীমান্তের সংঘাত দেশের ভেতর ছড়াচ্ছে

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে
গত মঙ্গলবার রাতে জোড়া বিস্ফোরণ ও নির্বিচারে
গুলির ঘটনার পর সেখানে পুলিশের সতর্ক প্রহরা। এএফপি
তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের আত্মঘাতী বোমা হামলা এ বছরে দেশটিতে সংঘটিত হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে নিশ্চিতভাবেই এ ধরনের হামলা দেশটিতে প্রথম নয়। গণমাধ্যমে তুরস্কের পুলিশের দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে এবং এর সীমান্ত এলাকাগুলোয় আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ব্যাপকসংখ্যক লোকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব গ্রেপ্তারের সময় দেশটির শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, আইএস এর প্রতিশোধ নিতে পারে। সাম্প্রতিকতম এ হামলার আগে ইস্তাম্বুলে এ বছরেই তিন-তিনটি সন্ত্রাসী হামলা হয়। আর এ কারণেই শহরটিতে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আগের তিন হামলার সঙ্গে আইএস ছাড়াও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সশস্ত্র শাখা কুর্দিস্তান ফ্রিডম হোয়াকসের (টিএকে) সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এক মাসেরও কম সময় আগে আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলায় ইস্তাম্বুলে ১২ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়।
ওই হামলার দায়ও স্বীকার করে টিএকে। সংগঠনটি তাদের ওয়েবসাইটে তুরস্কে আসতে চাওয়া পর্যটকদের উদ্দেশ্যে সাবধানবাণী প্রকাশ করে, ‘আপনাদের জন্য তুরস্ক আর নিরাপদ নয়।’ ওই হামলার কারণ প্রসঙ্গে টিএকে বলে, কুর্দি অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই তারা এ হামলা চালিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে আঙ্কারায় দুটি প্রথম বোমা হামলারও দায় স্বীকার করে সংগঠনটি। ওই দুই হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। গত বছরের অক্টোবরে আঙ্কারায় কুর্দি এবং বামপন্থী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত এক শান্তি মিছিলে দুটো আত্মঘাতী হামলা হয়। ভয়াবহ ওই হামলায় নিহত হয় ১০৩ জন। আড়াই শতাধিক মানুষ এতে আহত হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে বোমা হামলাকারী একজন মুসলিম জঙ্গি ছিল বলে তদন্তকারীরা শনাক্ত করেন। ইস্তাম্বুলে এবারের হামলায় আইএসকে দায়ী করার পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের মানুষের মধ্যে এখন যে শঙ্কাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো, সীমান্তে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাত এখন দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে।
গত বছর পিকেকের সঙ্গে সরকারের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে কুর্দি-অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ঘটতে শুরু করে।তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ বাড়ছে। আগের হামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের পর্যটনশিল্প বেশ ধাক্কা খেয়েছে। পর্যটন তুরস্কের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। টুইটারে তুরস্কের নাগরিক সেদা জেন বলেছেন, ‘যেকোনো জনবহুল এলাকায় বোমা হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কা মানুষের মধ্যে জেঁকে বসেছে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে মোটেও তৎপর বলে মনে হয় না। মানুষের ভীতির বিষয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। দেশে এই প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানগুলো প্রায় পর্যটকশূন্য।’ টুইটারে মন্তব্যকারীদের অনেকেই তুরস্কের অভ্যন্তরে এসব হামলায় বাইরের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করেন। তেভিক ওকুতান নামে একজন টুইট করেছেন, ‘আমাদের শত্রুরা চায় না দেশে পর্যটক আসুক। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এখনই সময়।’

অস্ত্রের জবাব অস্ত্রে: ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জঙ্গিবাদ মোকাবিলা এবং আইএস দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে।’ মঙ্গলবার ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক হাজার সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, জঙ্গিদের ‘ওয়াটার বোর্ডিং’ কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদের পন্থাটি যথেষ্ট ছিল না। যারা মানুষের শিরশ্ছেদ করছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এটি একটি সামান্য ব্যাপার। ‘ওয়াটার বোর্ডিং’ পদ্ধতিতে বন্দীর চোখ ও নাকের ওপর কাপড় দিয়ে পানি ঢালা হয়।
এতে তাঁর মধ্যে পানিতে ডুবে মরার আতঙ্ক তৈরি হয়। আফগানিস্তান দখলের পর গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে আটক বন্দীদের পানিতে চুবিয়ে নির্যাতন করার অপবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ নিষ্ঠুর জঙ্গিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে একই আচরণ করতে হবে। অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে। ওয়াটার বোর্ডিং পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ কোনো ভালো ব্যাপার নয়। কিন্তু শত্রু যখন শিরশ্ছেদ করছে, তখন এটা মামুলি ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেরাই জানি না কি করছি, আমাদের কোনো নেতৃত্ব নেই।’ এসব কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জঙ্গিবাদ দমনে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অবস্থানকে দুর্বল বলে সমালোচনা করেন।

Wednesday, June 29, 2016

সহমর্মিতার মাস রমজান

ইসলাম সাম্য ও মৈত্রীর ধর্ম। মৈত্রীর জন্য প্রয়োজন সাম্য, সাম্যের জন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সমবেদনা বা সম উপলব্ধি ও সম অনুভব। রমজান মাস সাম্য, মৈত্রী, সমবেদনা ও সহমর্মিতা সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখে। হাদিস শরিফে রাসুল (সা.) বলেন: ‘রমজান হলো সমবেদনা ও সহমর্মিতার মাস।’ (বায়হাকি)। রমজান মাসে ধনীরা গরিবের দুঃখ বুঝবে; ক্ষুধায় জঠর জ্বালা অনুভব করবে। ইফতারে অনুভব করবে ক্ষুৎপিপাসায় কাতর অসহায় মানুষের খাবারের প্রতি কী দুর্নিবার আকর্ষণ। সম্মান করতে শিখবে খাদ্যকে; মর্যাদা দিতে শিখবে ক্ষুধার্ত মানুষকে। বুঝবে কেন অসহায় গরিব মানুষ দুমুঠো অন্নের জন্য অন্যের ঘরে কাজ করে। কেন প্রসূতি মা তাঁর নাড়িছেঁড়া বুকের ধনকে কয়েকটি টাকার বিনিময়ে অচেনা কারও কাছে বিক্রি করে দেন। উপলব্ধি করবে দুস্থ-গরিব অসহায় মানুষ ফুটপাতে ফেলে রাখা বর্জ্যের স্তূপ থেকে পচা খাবার কেন তুলে মুখে পুরে দেয়। অনুভব করবে ক্ষুধায় কাতর মানুষ কীভাবে তার আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়, মর্যাদা ভুলে যায়, মান-ইজ্জত বিকিয়ে দেয় খাবারের জন্য। তাদের ঘৃণা ও উপেক্ষা নয়, তাদের জন্য ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। এটুকু অনুভূতি যদি জাগ্রত না হয় তাহলে রোজা ও রমজান উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
জাকাতের শাড়ি কাপড়
অনেক জায়গায় দেখা যায় ‘এখানে জাকাতের শাড়ি কাপড় ও লুঙ্গি পাওয়া যায়’ মর্মে ব্যানার ঝুলিয়ে কিছু কম দামি নিম্নমানের শাড়ি কাপড় ও লুঙ্গি বিক্রি করা হয়। কিছু জাকাতদাতা আছেন যাঁরা এগুলো কিনে গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করেন। এতে জাকাতকে অসম্মান করা হয়, জাকাত গ্রহীতাকে অসম্মান করা হয়; মানবতাকে অসম্মান করা হয়। এসব শাড়ি ও লুঙ্গি দেখলেই চেনা যায় এটি করুণার দান; যাতে ব্যবহারকারীর আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হয়। যা পরে কোনো ভালো জায়গায় যেতে দ্বিধা বোধ করেন। রমজানের শিক্ষা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) বলেছেন: ‘মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ করবে না, কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, আরব-অনারবের পার্থক্য নেই; ক্রীতদাস ও কর্মচারীকে নিজ ভাইয়ের সমান মর্যাদা দেবে; তোমরা যা খাও তাদের তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরিধান করো তাদেরও তা পরিধান করাবে।’ (বুখারি)।
কাউকে অসম্মান করা কবিরা গুনাহ
জাকাত প্রদান ফরজ ও সদকা আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু কোনো মানুষকে হেয় জ্ঞান করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কারও সম্মানহানি করা নাজায়েজ, হারাম ও কবিরা গুনাহ। সুতরাং ফরজ জাকাত ও ওয়াজিব সদকা আদায় করতে গিয়ে এই কবিরা গুনাহের মতো হারাম ও নাজায়েজ কাজ করা মোটেই উচিত নয়। প্রকারান্তরে যা বাস্তবে ঘটে থাকে।
ধনীর সম্পদে গরিবের পাওনা
অনেকেই জাকাত ও সদকা দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। এটা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ জাকাত ও সদকা দয়ার দান নয়, এটি ধনীর সম্পদে গরিবের প্রাপ্য অংশ। যা তারা দাবি না করলেও বা না চাইলেও পরিশোধ করতে হবে; তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যেহেতু এটি তার পাওনা, সুতরাং প্রাপককে সসম্মানে তা প্রদান করতে হবে; যাতে তিনি তা পেয়ে সন্তুষ্ট হন। মুজতাহিদ ফকিহগণের মতে, সদকা ও জাকাত এমনভাবে দেওয়া উত্তম, যা গ্রহীতা স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে টাকাই অগ্রগণ্য। কেননা, এর দ্বারা গ্রহণকারী নিজের রুচিমতো প্রয়োজন মেটাতে পারেন। যদি কোনো কাপড় বা খাদ্যদ্রব্য অথবা অন্য কোনো বস্তু কিনে দেন তাহলে মানসম্পন্ন জিনিসই দেওয়া উচিত। এমন শাড়ি বা লুঙ্গি দেওয়া উচিত, যা পরে তিনি কোনো উন্নত পরিবেশে একটি ভালো মজলিশে বা কোনো অনুষ্ঠানে যেতে পারেন এবং স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ বোধ করেন। (আল ফিকহুল ইসলামি)।
ইতিকাফ অবস্থার কী করা যায় বা যায় না
ইতিকাফকারী মসজিদের মধ্যে ইতিকাফরত অবস্থায় চাইলে বা প্রয়োজন হলে ও আয়োজন করা গেলে বিয়েশাদি করতে বা করাতে পারবেন। কারণ এটি একটি সুন্নত আমল, যা ইতিকাফের পরিপন্থী নয় এবং এর দ্বারা ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না। এমনকি ইতিকাফ অবস্থায় বিবাহ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় আলোচনা ও সিদ্ধান্ত মসজিদে হতে পারে। (আল বাদায়ে ওয়াস সানায়ে)। ইতিকাফ অবস্থায় ইতিকাফকারী প্রয়োজনে মসজিদের ভেতরে মোচ ছাঁটতে ও নখ কাটতে পারবেন। তবে এই মাসআলা তাঁদের জন্য যাঁরা দীর্ঘ সময় তথা ১০ দিন, ২০ দিন, ৩০ দিন বা ৪০ দিন একাধারে ইতিকাফ করবেন। তাঁদের জন্য মসজিদের বাইরে গিয়ে ক্ষৌরকর্ম করাও জায়েজ আছে। কিন্তু অল্প সময় অর্থাৎ ১০ দিনের চেয়ে কম সময় ইতিকাফকারীর জন্য এসব উচিত নয়। এগুলো ইতিকাফের পরেও করতে পারবেন।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্‌ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

ছেলেশিশুকে রান্নাবাটি খেলতে শেখান

জীবনসঙ্গীর প্রতি কর্মজীবী নারীর অনেক অভিযোগ। গৃহব্যবস্থাপক নারীকেও মুখ বুজে অনেক কিছু হজম করতে হয়। অভিযোগের মধ্যে অন্যতম, ঘরের কাজে পুরুষ হাত দিতে চান না। ভাবেন, ওটা নারীদের একচেটিয়া। কিন্তু যে নারী তাঁর সঙ্গী পুরুষটির মতোই কর্মক্ষেত্রে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ঘরে ফেরেন, তাঁরও তো শরীর। না, তাঁকে ঘরে ফিরেই সঙ্গীর হুকুম তামিল করতে হবে। রান্নাবান্না, খাবার পরিবেশন, সন্তান ও বয়স্কদের দেখাশোনা, অতিথি আপ্যায়ন, ঘর গোছানো—সবই নারীর কাজ। এসব কি নারীশরীরের মতোই ঈশ্বর-নির্ধারিত? নারীকে এসবের দায়িত্ব কে দিয়েছে? এই সমাজ, এই পুরুষসমাজ। পুরুষেরও দুটি হাত, নারীরও। কোনো কাজ পারা না-পারা অভ্যাস ও অনুশীলনের বিষয়। একসময় যখন নারীরা শুধুই ঘরের কাজ করতেন, তখন না হয় এসব অত্যাচার কিছুটা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু স্বনির্ভর-সচেতন নারীর প্রশ্নের কী জবাব দেওয়া যাবে? তাঁদের বোঝালে তো চলবে না যে এগুলো পুরুষের কাজ, ওগুলো নারীর। যুক্তি কোথায়? জেন্ডার ধারণার উন্মেষ ও বিকাশের ধারাবাহিকতায় নারী বুঝতে শিখেছেন ধর্ম-সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নিজেদের সুযোগ-সুবিধার জায়গাটা পাকা করে রাখার জন্য ক্ষমতাধর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরোপিত অনুশাসন ছাড়া এখানে অন্য কোনো বিধিবিধান নেই। উন্নত বিশ্বে তালাকের হার অনেক বেশি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ তালাকই নাকি নারীর তরফ থেকে আসে। কেন?
প্রধান কারণগুলোর মধ্যে পুরুষ সঙ্গীরা এখনো নারী সঙ্গীর কাছে সংসারের সব কাজ ও সন্তান লালনের যাবতীয় কর্তব্য আশা করেন। বিয়ে বিশেষজ্ঞ ড. উইলিয়াম এইচ ডরোথির মতে, আমেরিকায় ৭৩ শতাংশ বিয়েই ভেঙে যায় অঙ্গীকার ভঙ্গের কারণে। অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম সংসার ও সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যাপারে পুরুষ সঙ্গীর অপারগতা। এই সেদিন একজন নারীবিষয়ক গবেষক বলছিলেন, নারীদের আত্মত্যাগের কারণেই সংসারগুলো টিকে আছে। তিনি শিক্ষিত, কর্মজীবী নারীদের সংসারের দিকেই মূলত ইঙ্গিত করেছিলেন। এখনো আমাদের মজ্জায়-মননে নারী-পুরুষের শ্রমবিভাজনের ধারণা সমানভাবে বিদ্যমান। এমনকি শিক্ষিত নারীও ভাবেন, পুরুষের পেশিবহুল হাত সংসারের কোমল কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত নয়। একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী মা বিদেশে ছেলের বাসায় গিয়ে দেখেন, পুত্রবধূ রান্না করছেন আর পুত্র বাসন মাজছেন। দেখে তিনি আড়ালে চোখের পানি মুছে পুত্রের হাত থেকে বাসনপত্র কেড়ে নিয়ে ‘এসব কি পুরুষ মানুষের কাজ?’ বলে নিজেই লেগে পড়লেন সে কাজে। যেমনটি পোশাকশিল্প কারখানায় নমনীয় আঙুলকে সুই-সুতোর সূক্ষ্ম কাজের উপযোগী বিবেচনা করে নিম্ন মজুরির শ্রমিক পর্যায়ে কেবল নারীকেই নিযুক্ত করা হয়। অপরদিকে শ্রমবিভাজনের প্রচলিত প্রথায় কৃষিকাজ বা নির্মাণশ্রমে পুরুষের একাধিপত্য বিবেচনা করা হলেও নারীকে এসব কাজে অন্তর্ভুক্ত করাতে সুবিধাভোগী পুরুষ সম্প্রদায়ের উৎসাহের কমতি নেই।
কিন্তু নারীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ নৈব নৈব চ। জেন্ডার সমতায় বিশ্বাসী স্বামীও বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘আমি ঘরের কাজে আমার স্ত্রীকে সাহায্য করি।’ আহা! যেন ঘরটা কেবল তাঁর স্ত্রীর। তিনি সাহায্য করে নারী জাতিকে উদ্ধার করছেন। সংসার নারী-পুরুষ উভয়েরই। সন্তানও উভয়ের। নারীকে দশভুজা, সর্বংসহা ধরিত্রী, প্রকৃতিতুল্য ইত্যাদি গালভরা নামে আখ্যায়িত করলে নারী আর আহ্লাদিত হন না। তিনি চান সমান সমান। তিন বোনের একটা ছোট ভাই। ছোটবেলায় বোনেরা রান্নাবাটি খেললে ভাইটাও বল-বন্দুক ফেলে বোনদের সঙ্গে রান্নাবাটি খেলাতেই অধিক উৎসাহ বোধ করত। মা আতঙ্কিত। ছেলের আবার একি মেয়ে-মেয়ে খেলা! অথচ বড় হয়ে সংসারী হলে সেই ছেলেটির স্ত্রীর মতো সুখী খুব কম মেয়েই হয়েছেন। একটা পরিবারে ছেলে ও মেয়েশিশু পাশাপাশি বড় হলে তারা অভিভাবকদের মানসিকতায় বেড়ে ওঠে। বাবা-মা নিজেদের মধ্যে যেমন আচরণ করেন, শিশুরাও সেটাই শিখে নেয়। মেয়েশিশুটিকে মায়ের মতো নতমুখী মেয়েমানুষ হিসেবে তৈরির যাবতীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। আর ছেলেটিকে বলা হয় বাবার মতো হতে, যে বাবা গটমটিয়ে ময়লা জুতো পরে পরিষ্কার ঘরে বীরদর্পে প্রবেশ করেন, বাইরে পরা জামা-জুতো ইতস্তত ছুড়ে ফেলেন, নানা পদে সাজানো খাবার টেবিলে বসে প্রতিটা পদের খুঁত বের করে চেটেপুটে খান, টিভির রিমোট কন্ট্রোল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে চায়ের হুকুম চালাতে থাকেন।
বেশির ভাগ পুরুষেরই ধারণা, ঘরের কাজ কোনো কাজই না। যেন ওগুলো রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে নারীরা করে থাকেন। গৃহিণী নারীকেও ‘আপনি কী করেন’ জিজ্ঞাসা করলে তিনি লাজনম্র বদনে ‘আমি কিছু করি না’ বলেন। এ শুনে নারীবাদীরা গোস্যা করেন, বলেন, কী অন্যায় কথা! আরে, আপনি গৃহব্যবস্থাপক। উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন আবার বলছেন কিছু করেন না? কিন্তু যে কাজের বিনিময়ে কোনো অর্থ উপার্জিত হয় না, তাকে তো অর্থনীতির সংজ্ঞায় কাজ বলা যাবে না। নারীর দোষ কোথায়? কেবল গালভরা পদবিতে তাঁর চিড়ে ভিজবে? পুরুষও ভাবেন যে কাজে পয়সা আসে না, তা করে লাভ কী? কিন্তু নারী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হচ্ছেন দিন দিন। স্বনির্ভরতা তাঁকে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাবান করে তুলছে। শুধু বাইরের কাজই নয়, এ ডিজিটাল যুগে ঘরে বসেও নারীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। কাজের পরিধি বাড়ছে। এরই সঙ্গে মজ্জায়-মননে জমে থাকা চিরকালীন ধারণা পুষে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ কখনো কখনো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়লেও তা মোটা দাগে খুব সুফল বয়ে আনছে না দেশে-বিদেশে কোনখানেই, বিশেষ করে সন্তানদের জন্য। ঘরের কাজ কোনো অংশেই সামান্য নয়। এ কাজ ভাগাভাগি না করার কারণে যদি সংসার ভাঙে, তার ভার কেন বইবে সন্তানেরা? একটা কুমানসিকতা ভাঙা কি সংসার ভাঙার চেয়েও কঠিন? ছেলেশিশুর হাতে খেলনা পিস্তল তুলে দিয়ে কী পরিণতি হচ্ছে পৃথিবীর, তা প্রতিদিনের সংবাদমাধ্যমই বলে দিচ্ছে। তাই ছেলেশিশুকেও খেলনা-পাতিল দিয়ে ঘরকন্নার কাজ শেখাতে হবে। না হলে কবি আর কত কাল গাইবেন—
‘সংসার মানে ব্যর্থ বাসনা বেদনার জলাভূমি,
সংসার মানে সংসার ভাঙা সংসার মানে তুমি’।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
muslima.umme@gmail.com

ইইউ পার্লামেন্টে তোপের মুখে নাইজেল ফারাজ

নাইজেল ফারাজ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের গণভোটের রায়ের পর এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। পুরো আলোচনায় দেশটির ইইউ ত্যাগের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিক দল ইউকে ইনডিপেনডেন্স পার্টির (ইউকিপ) নাইজেল ফারাজ ছিলেন সমালোচনা ও ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। গত বৃহস্পতিবার গণভোটের পর গতকালই প্রথম এ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গৃহীত এক প্রস্তাবে ইইউ থেকে বিদায়প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার জন্য লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ফিফটি দ্রুত সক্রিয় করতে যুক্তরাজ্যের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এদিকে ব্রেক্সিট ভোটের পর গৃহ–বিবাদে জর্জরিত যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টিতে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হয়ে হেরে গেছেন দলনেতা জেরেমি করবিন। তঁার বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৭২টি, পক্ষে ৪০টি। তবে করবিন বলছেন, দলের প্রতি ‘বেইমানি’ করে তিনি পদত্যাগ করবেন না।
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের অধিবেশনের পর গতকাল রাতে ইইউর সদর দপ্তর ব্রাসেলসে জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। গণভোটের পর তাঁদের মধ্যে এটাই প্রথম বৈঠক। ব্রাসেলসে পৌঁছে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি ইউরোপের নেতাদের জানাব যে, যুক্তরাজ্য আর ইইউতে থাকছে না। তবে আশা করব এই বিদায়প্রক্রিয়া হবে গঠনমূলক।’ আজ সকালে ইইউ নেতারা আবার প্রাতরাশ আলোচনায় বসবেন। তবে সেই বৈঠকে ক্যামেরনের না থাকার সম্ভাবনা বেশি। নাইজেল ফারাজ গতকাল ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে সমালোচনার বাণে বিদ্ধ হন। তাঁকে উদ্দেশ করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ-ক্লদ জাঙ্কার বলেন, ‘আপনারা ইইউ থেকে বের হয়ে যেতে লড়াই করেছেন। ব্রিটিশ জনগণও বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাহলে আপনারা এখানে কেন?’
জঁ-ক্লদ জাঙ্কার যুক্তরাজ্যকে জোট ত্যাগের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বলেন এ সময়। তাঁর তোপ এখানেই থামেনি, তিনি নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইইউর সদস্য হিসেবে যুক্তরাজ্যের দেওয়া আর্থিক সহায়তা নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলেন। পার্লামেন্টে উদারপন্থী গ্রুপের প্রতিনিধিত্বকারী বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাই ভেরোফস্টাড বলেন, গণভোটে ফারাজ নাৎসি ধারায় প্রচারণা চালিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি অভিবাসীদের নিয়ে একটি পোস্টারের বক্তব্যও পড়ে শোনান। নাম উল্লেখ না করে ভেরোফস্টাড ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে প্রচার চালানো বরিস জনসনকেও তীব্র আক্রমণ করেন। বরিস জনসন ইতিমধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ভেরোফস্টাড বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে একজন স্বার্থপর মানুষ সবকিছু করতে পারে।’
তোপের মুখে নাইজেল ফারাজ তাঁর বক্তব্যে পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেন, ‘আপনাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। যুক্তরাজ্যই ইইউ ত্যাগকারী সর্বশেষ দেশ হবে না।’ ম্যার্কেলের হুঁশিয়ারি: ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ ঝড় বয়ে যাওয়ার আগে নিজ দেশের পার্লামেন্টে কঠোর ভাষায় কথা বলেন জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায়ের বিষয়ে আমার শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশরা ইইউ ছাড়ার আলোচনায় নিজেদের পছন্দ বা সুবিধামতো সবকিছু করলে চলবে না।’ ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টানা দরকার: পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্র বলছে, সময় এসেছে ইউরোপিয়ান কমিশনের রাশ টেনে ধরার। জঁ-ক্লদ জাঙ্কারকে বরখাস্ত করার দাবি করেছে পোল্যান্ড। ব্রেক্সিটের ফলে সামরিক শক্তি খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি সংস্থাটির প্রতিরক্ষা আরও সুসংহত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

‘যুদ্ধ করে কাশ্মীর জয়’ সম্ভব নয়

পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার বলেছেন, পাকিস্তানের পক্ষে ‘যুদ্ধ করে কাশ্মীর জয় করা’ সম্ভব নয়। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতেই এই বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। দেশটির বেসরকারি জিও টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। হিনা রব্বানি বলেন, প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। কেবল আলোচনার মাধ্যমেই সামনে এগোনো সম্ভব। তিনি দাবি করেন,
পাকিস্তান পিপলস পার্টি ক্ষমতায় থাকার সময় ভিসা সহজীকরণ, বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক করাসহ বিভিন্ন উপায়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সব ধরনের চেষ্টা করেছে। যেহেতু নওয়াজ শরিফ আরও বেশি জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আছেন, তাঁর পক্ষে আরও বেশি অগ্রগতি অর্জন সম্ভব। পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হিনা রব্বানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দিকে ‘ঝুঁকে থাকে’ মূলত দেশটির শক্তিশালী অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ঐতিহ্যের কারণে।

এখনই বড় রকমের নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র

সুসান রাইস
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যবাসীর রায়ে এখনই বড় রকমের কোনো নিরাপত্তাগত উদ্বেগ দেখছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস গত রোববার বলেন, যুক্তরাজ্যের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায়ের কারণে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগ ‘তুলনামূলকভাবে কম’। সুসান রাইস বলেন, সন্ত্রাস দমন ও অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের অব্যাহত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে তাঁর দেশ কাজ করে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে ‘অ্যাসপেন আইডিয়াস ফেস্টিভাল’-এ দেওয়া বক্তৃতায় রাইস এ মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পরস্পর ঘনিষ্ঠ অংশীদার ও মিত্র হয়ে থাকবে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদের সম্পর্ক আরও নিবিড় করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও আলোকপাত করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের আলোচিত গণভোটের ফল জানার পরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রথম কী বলেছিলেন—জানতে চাইলে রাইস হতাশা প্রকাশের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময় দুই নেতা নিজেদের আলাপে গণভোটের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে কথা বলেছেন। গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য সফরের সময় ও গত মে মাসে জাপানে জি-৭ বৈঠকে ওবামা ইইউর সঙ্গে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের বাকি মেয়াদে এ দুই নেতা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাবেন এবং আগামী জুলাইয়ে ওয়ারশতে অনুষ্ঠেয় ন্যাটো শীর্ষ বৈঠকে তাঁরা সাক্ষাৎ করবেন বলেও সুসান রাইস জানান।

Tuesday, June 28, 2016

অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় যাবে না ইইউ

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট প্রাঙ্গণে গতকাল লন্ডনের সাবেক
মেয়র ও ব্রেক্সিটপন্থী অন্যতম শীর্ষ নেতা বরিস
জনসন। তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের
উত্তরসূরি বিবেচনা করা হচ্ছে। ছবি: এএফপি
গণভোটে দেশের মানুষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিলেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তাঁর দেশ এখনো প্রস্তুত নয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার প্রস্তাব না দেওয়া পর্যন্ত এগোতেও রাজি নন ইইউর নেতারা। গত বৃহস্পতিবারের গণভোটের পর গতকাল সোমবার প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন বলেন, ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে তাঁরা প্রস্তুত নন। তিনি বলেন, ‘সেটি শুরু করার আগে আমাদের ঠিক করা দরকার, ইইউয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরনটা কেমন হবে।’ ইতিমধ্যেই নিজের পদত্যাগ ঘোষণাকারী ক্যামেরন বলেন, তাঁর স্থলাভিষিক্ত যিনি হবেন, তিনিই এ সম্পর্কের বিষয়টি নির্ধারণ করবেন। এ ছাড়া ইইউতে থাকার পক্ষে লোকজন দ্বিতীয় গণভোটের যে দাবি তুলেছেন, তা নাকচ করে দেন ক্যামেরন। গতকাল বার্লিনে জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজি বৈঠক করেন। বৈঠকের পর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেন, ‘আমরা তিন দেশ একটি বিষয়ে সম্মত হয়েছি। তা হলো লিসবন চুক্তির আর্টিকেল ফিফটি খুব পরিষ্কার। সেখানে বলা আছে, ইইউর কোনো সদস্যরাষ্ট্র জোট ছেড়ে বের হয়ে যেতে চাইলে তা তারা ইউরোপীয় কাউন্সিলকে জানাবে।’
ম্যার্কেল আরও বলেন, যুক্তরাজ্য যদি জোট ছাড়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানায়, তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্য তাদের সিদ্ধান্ত জানানোর পরই কেবল ইউরোপীয় কাউন্সিল নির্দেশিকা তৈরি করবে। সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ এবং প্রধানমন্ত্রী রেনজি যুক্তরাজ্যের ইইউ থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব দ্রুত করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে ইইউকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার আহ্বানও জানান তাঁরা। এদিকে হোয়াইট হাউস বলেছে, ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বিদায়প্রক্রিয়া যেন নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ হয়। বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক গণভোটে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন ৫২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক। শুক্রবার এ ফলাফল প্রকাশের পর দেশটির পুঁজিবাজারে ব্যাপক ধস নামে। দেশটির অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন গতকাল পুঁজিবাজার শান্ত রাখার প্রয়াসে বাজারে লেনদেন শুরুর আগেই বেশ সকালে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য যুক্তরাজ্যের রয়েছে। গতকাল দেশটির শেয়ারবাজার কিংবা পাউন্ডের দরে নতুন করে বড় ধরনের কোনো পতন হয়নি।

লেবার পার্টিতে গৃহবিবাদ তুঙ্গে

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন
ইইউ প্রশ্নে গণভোটের পর থেকে প্রচণ্ড চাপের মুখে।
গতকাল লন্ডনের বাসা থেকে বের হওয়ার সময়
এভাবেই ক্যামেরাবন্দী হন তিনি। রয়টার্স
যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেওয়ার পর দেশটির বিরোধী দল লেবার পার্টিতে চরম গৃহবিবাদ শুরু হয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের পদত্যাগ এবং একজনের বরখাস্তের পর দলটির নেতা জেরেমি করবিন প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছেন। ইইউ গণভোট বিষয়ে লেবার নেতার বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে পদত্যাগী সাত নেতা হলেন হেইডি আলেকজান্ডার, ইয়ান মারে, গ্লোরিয়া দ্য পিয়েরো, লিলিয়ান গ্রিনউড, লুসি পাওয়েল, কেরি মাক্যার্থি ও সীমা মালহোত্রা। তাঁরা সবাই ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্য। এর আগে ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বেনকে দলনেতা করবিন বরখাস্ত করেন। এরপরই দলে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং একে একে ওই নেতারা পদত্যাগ করেন। হিলারি বেন দলনেতা করবিনকে তাঁর নেতৃত্বে আস্থা হারানোর কথা বলার পর তাঁকে বরখাস্ত করা হয়। বেন বলেছিলেন,
জেরেমি করবিন ভালো ও ভদ্র মানুষ, কিন্তু তিনি নেতা নন। বেন বরখাস্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। গতকাল রোববার দিনের প্রথম দিকেই পদত্যাগ করে বসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার। করবিনকে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, ‘আমি একজন নীতিমান মানুষ হিসেবে আপনাকে সম্মান করি। কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের দেশের যে চাহিদা, তা মেটানোর মতো সক্ষমতা আপনার নেই।’ ছায়া মন্ত্রিসভার পরিবেশমন্ত্রী কেরি ম্যাকার্থি এবং শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েলের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে লেবার নেতৃত্বের পদত্যাগী সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শক্তিশালী ছায়া মন্ত্রিসভার অর্ধেক সদস্যই পদত্যাগ করবেন।

অরক্ষিত গুহাচিত্র

সোমালিয়ার সোমালিল্যান্ডের রাজধানী হারগিসা থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে উষর লাস গিল এলাকায় চোখে পড়বে প্রাচীন পাহাড়। ফ্রান্সের একদল প্রত্নতাত্ত্বিক ২০০২ সালে সেই পাহাড়ের গুহায় আবিষ্কার করেছেন নব্য প্রস্তরযুগীয় শিল্পীদের আঁকা গুহাচিত্র। আফ্রিকা মহাদেশের এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো ও অবিকৃত গুহাচিত্রের নমুনা এগুলো। অমূল্য এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমলাতান্ত্রিক কারণে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। লাস গিলের পাহাড়ি গুহায় গেলে পর্যটকদের চোখে পড়বে সাদা ও লাল রঙে আঁকা কৃষ্ণসার হরিণ, গরু-মহিষ, জিরাফ এবং কাঁধে তির-ধনুকওয়ালা প্রাচীন শিকারিদের ছবি। গবেষকেরা বলছেন, প্রায় পাঁচ হাজার বছর বা তারও আগে এসব ছবি আঁকা হয়েছিল। সমস্যা হচ্ছে,
পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে এসব গুহাচিত্র নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক কারণে জাতিসংঘ বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সংগঠন এগুলো সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে পারছে না। সোমালিল্যান্ড নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক বিশ্বে তার স্বীকৃতি সোমালিয়ার স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য হিসেবেই। লাস গিলের পর্যটন এলাকার ব্যবস্থাপক আবদিসালাম সাবেল্লেহ বলেন, ‘এ ছবিগুলো একেবারেই অনন্য। এ ধরনের ছবি পুরো আফ্রিকার অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। এই মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব বাঁচিয়ে রাখতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’

Monday, June 27, 2016

যুক্তরাজ্যের সামনে ৫ চ্যালেঞ্জ

ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট
পড়ার পর ইইউপন্থীরা গতকাল লন্ডনে বিক্ষোভ করেন
এবং পুনরায় গণভোট গ্রহণের দাবি তোলেন। এএফপি
গণভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়েই যেতে হচ্ছে যুক্তরাজ্যকে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘ব্রেক্সিট’ প্রক্রিয়া শুরুর পর যুক্তরাজ্যকে মোকাবিলা করতে হবে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেগুলো হলো:
অভিবাসন: যুক্তরাজ্য সরকার দেশটিতে ইইউ অভিবাসীদের আগমন হ্রাস করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ার মতো পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা চালু তথা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিম্ন দক্ষতার কর্মীদের প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করা হবে। ইইউর অনেক চাকরিপ্রত্যাশীকে যুক্তরাজ্য ছাড়তেও বলা হতে পারে।
তবে প্রথমেই যুক্তরাজ্যকে সে দেশে অবস্থানরত প্রায় ২২ লাখ ইইউ কর্মীর মর্যাদা স্পষ্ট করতে হবে। এটি নির্ধারণ করতে গিয়ে এই কর্মীদের পারিবারিক পুনর্মিলন বা অবাধ চলাচলের নিয়মকানুন কড়াকড়ি করা হতে পারে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এটা হয়তো হবে না। তবে এটাও ঠিক, ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশে যুক্তরাজ্যের প্রায় ২০ লাখ নাগরিক বাস করছেন। তাই ইইউ কর্মীদের নিশানা করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে যুক্তরাজ্যকেও পাল্টা ব্যবস্থার সম্মুখীন হওয়া লাগতে পারে।
বাতিল হবে যুক্তরাজ্যের বিশেষ চুক্তি: প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের স্বার্থ রক্ষায় ইইউর সঙ্গে এক বিশেষ চুক্তিতে উপনীত হন। এর অধীন দেশটিকে জোটে অন্য সদস্যদের তুলনায় এক বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। নিশ্চয়তা দেওয়া হয় জোটের বিশাল অভিন্ন বাজারে বৈষম্যের শিকার না হওয়ারও। বিনিময়ে যুক্তরাজ্যও ইউরোজোনের ঐক্য সুসংহত করার পথে বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এখন এই মর্যাদা ও নিশ্চয়তা খোয়াতে হতে পারে যুক্তরাজ্যকে।
ইইউ ছাড়ার সময়সীমা নাও বাড়তে পারে: গণভোটে জয়ী হলেও এখনই ইইউ ছাড়ছে না যুক্তরাজ্য। জোট ছাড়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হতে দুই বছরের মতো লাগবে। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন আগামী অক্টোবরের মধ্যে পদত্যাগ করে তাঁর উত্তরসূরির ওপর এ প্রক্রিয়া শুরুর কাজ অর্পণ করতে চান বলে জানিয়েছেন। লিসবন চুক্তির ৫০ ধারা অনুযায়ী, দুই বছরের এ সময়সীমা শুধু তখনই বাড়ানো সম্ভব, যখন ইইউর ২৮ সদস্যের সবাই এ বিষয়ে একমত হবে। আবার ইইউ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দেশটি কার্যত জোটের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে না।
নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক: ইইউ ও যুক্তরাজ্যের নতুন বাণিজ্য সম্পর্ক কী হবে, তা নির্ধারণে আলোচনা জোট ছাড়ার মেয়াদ দুই বছরের মধ্যে শুরু হতে পারে; যদিও সেটা আবশ্যক নয়। কিন্তু ইইউ যদি আলোচনা শুরু করতে যুক্তরাজ্যের আনুষ্ঠানিক বিদায় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চায়, তবে তা পাঁচ বছর বা আরও বেশি সময়ের জন্য পেছাতে পারে। ফলে যুক্তরাজ্যের রপ্তানিকারকদের নতুন ইইউ আমদানি শুল্ক দিতে হবে। সম্মুখীন হতে হবে শুল্কমুক্ত বাধার। যেমন ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে সম্মুখীন হতে হয়। ইইউর অভিন্ন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশ সুবিধাও হারাতে হবে যুক্তরাজ্যকে। এ ছাড়া কানাডা, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৫৩টি দেশের সঙ্গে ইইউর যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে, তা-ও আর যুক্তরাজ্যের জন্য প্রযোজ্য হবে না।
বাজেটে আর অবদান নয়: আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্য আর এ জোটের বাজেটে কোনো অবদান রাখতে পারবে না। এতে প্রতিবছর এ বাজেটে দেওয়া তার প্রকৃত অর্থ নিজ ঘরেই থেকে যাবে। এটা জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতে বা জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার কাজে আংশিক ব্যয় হতে পারে; যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ব্রেক্সিটের প্রচারকেরা। কিন্তু ইইউর বাজেটে অবদান না রাখার কারণে যুক্তরাজ্যের বিপুলসংখ্যক কৃষক এ জোটের দেশ থেকে সরাসরি কোনো অর্থ সহায়তা পাবেন না।

দিল্লির মর্যাদা বাড়াতে গণভোট চান কেজরিওয়াল

অরবিন্দ কেজরিওয়াল
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিল ব্রেক্সিট। পূর্ণ রাজ্যের দাবিতে এবার দিল্লিতেও গণভোট করার কথা তিনি জানিয়ে দিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব এর ফলে এক অন্য মাত্রা পেতে চলেছে। রাজধানী হওয়ার সুবাদে দিল্লি রাজ্যের মর্যাদা পেলেও পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়। এই রাজ্যের পুলিশ ও জমি যথাক্রমে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীন। দিল্লির সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নির্দেশ প্রাধান্য পায়। কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালে তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি বারবার পূর্ণ রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন করেছে। তবে ব্রেক্সিটের পরপরই দিল্লিতে গণভোটের কথা তোলায় বিজেপি ও কংগ্রেস দুই দলই তার বিরোধিতা শুরু করেছে। বিজেপি বলেছে, অপশাসন আড়াল করতে আম আদমি দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে।

Sunday, June 26, 2016

ক্যামেরনের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

ডেভিড ক্যামেরন
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের থাকা না-থাকার গণভোট নিয়ে বড় রকমের বাজি ধরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তাতে হেরে যাওয়ার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। ডেভিড ক্যামেরনের নেতৃত্বেই ইইউ থেকে বেরিয়ে গেল যুক্তরাজ্য। ইতিহাস তাঁকে সেভাবেই মনে রাখবে। এই গণভোটকে একটা পরীক্ষা হিসেবে নিয়েছিলেন ক্যামেরন। ভেবেছিলেন এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ পার্টিকেও ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন। কিন্তু গণভোটে অংশগ্রহণকারী যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ নাগরিক ইইউ ত্যাগ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরপর আগামী অক্টোবরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে ক্যামেরন বলেছেন,
তিনি ইইউতে থাকার পক্ষে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ক্যামেরন যুক্তরাজ্যে ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এ সময় তাঁর সরকারের পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন নিয়ে কনজারভেটিভ পার্টি ওই সরকার গঠন করেছিল। তবে ২০১৫ সালের মে মাসের নির্বাচনে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এর আগের বছরও দেশটিতে একটি গণভোটের পরীক্ষা হয়, তবে সেই বাধা উতরে যায় কনজারভেটিভ পার্টির সরকার। সেই গণভোটে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেয় স্কটল্যান্ড।

কারও কাছে ‘বড় আঘাত’ কারও মতে ‘কঠিন পরীক্ষা’

বারাক ওবামা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্বনেতারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের অনেকেই ভোটের আগে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়া উচিত হবে না বলে মন্তব্য করেছিলেন। গতকাল ফল ঘোষণার পর প্রায় সবাই বলেছেন, যুক্তরাজ্যবাসী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রতি তাঁরা শ্রদ্ধাশীল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাজ্যবাসীর সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রদ্ধা রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইইউ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য অংশীদার’। তিনি আরও বলেন, লন্ডনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আগের মতোই থাকবে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘আমি অবশ্যই বলব, ভিন্ন রকম ফল আশা করেছিলাম।’ অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আয়-উপার্জন যাতে এ ঘটনায় বিঘ্নিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের প্রধান কাজ।’
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে সমৃদ্ধ করতে কেউই নিজের দেশের অর্থ ঢালতে রাজি হবে না। শরণার্থীর মতো সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তা যুক্তরাজ্যবাসীর মনঃপূত নয়। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল যুক্তরাজ্যবাসীর রায়কে ইইউর ওপর একটি ‘বড় আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রতিফলিত হয়েছে গণভোটের রায়ে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ গণভোটের রায়কে ইউরোপের জন্য ‘মহাপরীক্ষা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এক জরুরি বৈঠকের পর ইইউ নেতৃত্ব যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার সিদ্ধান্তে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করলেও দেশটির জনগণের রায়ের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা জানান। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জঁ-ক্লদ জাংকার বলেন, ২৭ সদস্যের জোট তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নেবে।

গণভোটে তছনছ বৃটেন by মতিউর রহমান চৌধুরী

একটি গণভোট শুধু বৃটেনকেই নয়, গোটা ইউরোপীয় রাজনীতি, কূটনীতি ও অর্থনীতির হিসাব-নিকাশকে এলোমেলো করে দিয়েছে। বাকি বিশ্বকেও কম চমকে দেয়নি এ গণভোট। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধী লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন-এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। তিনিও ক্যামেরনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। এখন একটি আগাম নির্বাচন এবং সেই সঙ্গে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক লন্ডন মেয়র বরিস জনসন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভের নাম আলোচনায় এসেছে। স্কটল্যান্ডে ইতিমধ্যে দ্বিতীয় গণভোটের কথা উঠেছে। বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। আর খোদ ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউ’র প্রভাবশালী রাজধানীগুলোতে নানামাত্রিক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
৭২ শতাংশ মানুষ গণভোটে অংশ নেন। আর ৫১ দশমিক ৯ ভাগ ভোট পড়ে বৃটেনের ইইউ ত্যাগের পক্ষে, যা অনেকের মতে বৃটেনের স্বাধীনতার স্বপক্ষে এক গণরায়। নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিয়ে মিস্টার ক্যামেরন কিছুটা নাটকীয়ভাবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে স্ত্রী সামান্থাকে সঙ্গে নিয়ে প্রেসের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। গণভোটের আগেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, মিস্টার ক্যামেরনের টোরি দলীয় নয় মন্ত্রী এবং ১৩৭ এমপি তার নিজের পক্ষ ত্যাগ করেছেন। ক্যামেরন তার বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি মনে করি না বৃটেনকে পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে যেতে চালকের ভূমিকায় থাকা আমার জন্য ঠিক হবে’।
পদত্যাগের আগে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে তিনি শলাপরামর্শ এবং তাকে সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করেন। উল্লেখ করা যায় যে, ক্যামেরনের পদত্যাগের সাংবিধানিক কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। সম্পূর্ণ নৈতিকতার কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, গণভোটের ফল প্রকাশের পর বৃটিশ পাউন্ডের অস্বাভাবিক দরপতনে বৃটিশ জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে। এ মুহূর্তে তিনটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে। 
এক. বৃটেনকে এক রাখা সম্ভব হবে কি না
দুই. পাউন্ডের দরপতন ঠেকানো যাবে কি না
তিন. শত শত বছরের বৃটিশ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা যাবে কি না।
শরণার্থী সমস্যাটাও এখন প্রকটভাবে উঠে এসেছে। আর এ সমস্যাটিই গণভোটে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে। তবে সবাই একবাক্যে বলছেন, এটা গণতন্ত্রের বিজয়। এখানে ফ্লোর ক্রসিং কোনো সমস্যা হয়নি, কনজারভেটিভ এবং লেবার পার্টি, দুই দলের লোকজনই উভয়পক্ষে ছিলেন।
ওদিকে ইইউ থেকে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিধানে লেখা আছে লিসবন চুক্তির ৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে। আর এই চুক্তিবলেই ইইউ গঠিত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। আর এটা প্রয়োগ করেই বৃটেনের একটি পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভার পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট থেকে বেরিয়ে আসতে আগামী দুই বছরের ক্রান্তিকালের প্রক্রিয়াটি ততটা মধুর না হয়ে কিছুটা তিক্ততা দেখা দিতে পারে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বৃটিশ বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ ইইউ থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে সরব ছিলেন। বিশেষ করে রেস্টুরেন্টের মালিকরা। তাদের ধারণা, বৃটেন যদি ইইউ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে তারা লাভবান হবেন। কিন্তু যাদের হাতে নেতৃত্ব যাচ্ছে তাতে করে বাংলাদেশীরা লাভবান হবেন কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এখানে বলে রাখা ভালো, দশম শতাব্দীতে গড়ে ওঠা কিংডম অব ইংল্যান্ড ১৭০৭ সালে যুক্তরাজ্যে রূপান্তরিত হওয়া পরবর্তী ৩০৯ বছরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দেশটি ইতিহাসে এই প্রথম স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব জড়িত এমন একটি গণভোটে অংশ নিলো। আর যে গণভোটের ফলাফল বৃটেনের ভবিষ্যতকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। ২৩শে জুনকে বৃটেনের ইতিহাসে একটি লাল হরফে লেখা দিন বলা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টির নেতা নাইজেল ফ্যারাজ ২৩শে জুনকে স্বাধীনতা দিবস বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
গণভোটে ত্যাগের রায়
ঐতিহাসিক এই গণভোটে ১ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৭৪২ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ২৪১ জন। ভোটে অংশ নিয়েছেন ৩ কোটিরও বেশি ভোটার।
লন্ডন ও স্কটল্যান্ডের ভোটাররা ব্যাপকহারে ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষ বিপুলভাবে সরে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। আর উত্তর ইংল্যান্ডেই মানুষ বেশি। ওয়েলস ও ইংলিশ-শায়ারের ভোটাররাও ইইউ ছাড়ার পক্ষে বিপুল হারে ভোট দিয়েছেন।
এ গণভোটে অংশগ্রহণার্থীর সংখ্যা গত সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও ছিল বেশি।
পদত্যাগের ঘোষণা ক্যামেরনের
গণভোটের ফল আসার পরই আবেগি বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এ সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরন। ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘ব্রেক্সিট নামের বিরূপ পানিতে আমি আর রাষ্ট্র নামের এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হতে পারবো না’। এভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২৩ মিনিটে ক্যামেরন যখন ডাউনিং স্ট্রিটে বেরিয়ে আসেন তখন তাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি স্বীকার করে নেন, দেশ চালাতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। আবেগ সংবরণ করে তিনি নিজেকে সামলে নেন। আবার বক্তব্য দেন। বক্তব্য শেষ হতেই স্ত্রী সামান্থার হাত ধরেন। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে তা এড়িয়ে সোজা কালো দরজা দিয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের ভিতরে চলে যান। ব্রেক্সিট ভোট বিজয়ী হওয়ায় ক্যামেরনের প্রতিক্রিয়ার জন্য গতকাল সকাল থেকেই বিশ্ব মিডিয়ার সাংবাদিকরা জড়ো হতে থাকেন ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে। তাদের মধ্যে অসংখ্য প্রশ্ন জমা হতে থাকে ডেভিড ক্যামেরন কী ঘোষণা দিতে পারেন তা নিয়ে। এ সময় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকে টিভির হেলিকপ্টার। ১০ ও ১১ ডাউনিং স্ট্রিটে তখনও উড়ছে দুটি ইউনিয়ন পতাকা। ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দাঁড়িয়ে ডেভিড ক্যামেরন বললেন, আমি এই দেশকে ভালোবাসি। এর সেবা করতে পেরে নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। আমাদের একজন নতুন প্রধানমন্ত্রী থাকা উচিত এখন।
কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?
ক্যামেরনের পদত্যাগের ঘোষণার পর কে হবেন পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তা নিয়ে চলছে জল্পনা। প্রচারণা চালানোর সময় ক্যামেরন বলে আসছিলেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়বেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের ঘোষণাই দিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী। এবার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কে হবেন তাহলে পরবর্তী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী?
প্রত্যাশিতভাবেই ফেভারিট তালিকার শীর্ষে আছেন লন্ডনের সাবেক মেয়র বরিস জনসন। এই প্রভাবশালী রাজনীতিক এবার ইইউ ছেড়ে বৃটেনের চলে যাওয়ার পক্ষে (ব্রেক্সিট) ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন।
বলতে গেলে ব্রেক্সিট প্রচারণার মূলব্যক্তিই হয়ে ওঠেন বরিস জনসন। পুরো লড়াইটা হয়ে দাঁড়ায় তার ও প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের মধ্যে! ব্রেক্সিটের আগে থেকেই অবশ্য তাকে রক্ষণশীল কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। এমনকি তাকে হবু প্রধানমন্ত্রী বলতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি অনেকে। ব্রেক্সিট প্রচারণায় অবদান ও প্রভাবের দরুণ তার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আরো উজ্জ্বল। কনজারভেটিভ দলের পরবর্তী নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রকৃতপক্ষে তারই বেশি। কিন্তু প্রচারণার সময়, তিনি কিছু অসমীচীন কাজ করেছেন, যা তার সম্ভাবনার ক্ষতি করতে পারে। এরপরও জনমত জরিপ থেকে শুরু করে জুয়াড়িদের বাজিতেও অন্যদের তুলনায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বরিস জনসন।  এছাড়া আছেন অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবোর্ন। যদিও দলীয় প্রভাবের দিক থেকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিছিয়ে পড়েছেন তিনি। ইইউতে রয়ে যাওয়ার পক্ষে তার মতো প্রচারণা চালিয়েছেন যে প্রভাবশালী নেতারা, তারাও কনজারভেটিভহোম জনমত জরিপে ভালো করেননি। এ তালিকায় আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে এবং বিচারমন্ত্রী মাইকেল গোভ। থেরেসা মে’কে গণভোটের আগেও অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রার্থী ভাবা হতো।

গণতন্ত্রের বেদিতে উৎসর্গিত এক প্রধানমন্ত্রী by সাজেদুল হক

আবেগ। কান্না। প্রত্যাশিত কিন্তু অভাবনীয় এক ঘোষণা। ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে রচিত হলো গণতন্ত্রের বেদিতে এক প্রধানমন্ত্রীর উৎসর্গিত হওয়ার নতুন ইতিহাস। আর বিশ্ববাসী দেখলো রাজমঞ্চ থেকে এক রাজনীতিবিদের বিদায়ের আখ্যান। ছয় বছরের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে যিনি বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। এই তো কয়দিন আগেই স্ত্রী সামান্থা ক্যামেরনের জন্য পুরনো একটি গাড়ি কিনে আলোচনায় এসেছিলেন। সমালোচিত হয়েছিলেন পিতার নাম পানামা পেপারসে প্রকাশিত হওয়ার পর। ছবিটির সূত্র জানা নেই। তবে ট্রেনে জনমানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন ডেভিড ক্যামেরন- এমন একটা ছবি প্রায়ই দেখা যায়। যা একজন প্রবল প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর সাদাসিধে জীবনযাপনের দিকেই ইংগিত করে। রাজনীতিতে তার অভিষেক ছিল চমক জাগানিয়া। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন। কিছু বছর পর ২০১০ এবং ১৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টির জন্য নিয়ে আসেন অভাবনীয় বিজয়। যা তাকে মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে প্রভাবশালী কনজারভেটিভ নেতায় পরিণত করে। অক্সফোর্ডপড়ুয়া ক্যামেরন খ্যাতি পেয়েছিলেন শেষ মুহূর্তে যেকোনো সমস্যার সমাধান দেয়ার কারিগর হিসেবে। ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারি এবং স্কটল্যান্ডের গণভোট উতরে যান তিনি। ছেলে ইভানকে হারানো ব্যক্তি ক্যামেরনের জীবনের সবচেয়ে বিয়োগান্তক অধ্যায়।
 রাজনীতিবিদ ক্যামেরন শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাজিটিতে হেরে গেলেন। বৃটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা প্রশ্নে বিতর্কের মধ্যে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এ ভোটকে কেন্দ্র করে দৃশ্যত দুই ভাগ হয়ে গেছে বৃটেন। ভোটের হারেও তার প্রমাণ। ৫২ বনাম ৪৮। নেশন ডিভাইডেড- এ শিরোনাম ইকোনমিস্ট সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ব্যাপারেই ব্যবহার করতো। এবার বৃটেনের ব্যাপারেও ব্যবহৃত হয়েছে তা। তবে বিয়োগান্তক এ ভোট ঐক্যবদ্ধ বৃটেনের ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। গণভোটের আওয়াজ উঠেছে স্কটল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডেও।
তবে এই পরিণতির জন্য ডেভিড ক্যামেরন তার নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকেউ দায়ী করতে পারেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকা নিয়ে নিয়ে তার দলের ভেতরে ওঠা বিতর্কের পটভূমিতে ২০১৩ সালে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, পুনরায় নির্বাচিত হতে পারলে এ প্রশ্নে তিনি গণভোটের আয়োজন করবেন। সম্প্রতি লেবার পার্টির এমপি জো কক্সের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর গণভোটের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি উঠেছিল। বিপুল সংখ্যক মানুষ এ ব্যাপারে ডেভিড ক্যামেরনের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু জবাবে ক্যামেরন বলেছিলেন, এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই।
প্রাচীন গ্রিসে জন্ম নেয়া গণতন্ত্রকে ইতিহাসে বারবার পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গণতন্ত্রের একটি প্রধানতম দুর্বলতা হচ্ছে- সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত ইতিহাসে সবসময় সঠিক হিসেবে প্রমাণিত হয় না। কখনো কখনো দেখা গেছে, তা ভুল এবং ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল গুনতে হয় পুরো মানবজাতিকেই। বেক্সিট ভোট ইউরোপজুড়েই হাহাকার তৈরি করেছে। দিনটিকে ইউরোপের ইতিহাসে একটি দুঃখজনক দিন হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে গণতন্ত্রে জনগণের অভিপ্রায়ই যে শেষ কথা পদত্যাগের ঘোষণা দিতে এসে তা মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শুধু সংসদীয় গণতন্ত্র আছে তাই নয়, আমাদের শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে সে প্রশ্নেও মাঝে মাঝে জনগণকে জিজ্ঞাসা করা উচিত। আর আমরা সেটাই করেছি। বৃটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাদের ইচ্ছাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।’
গণতন্ত্রের বেদিতে নিজের ইচ্ছা-অভিপ্রায়কে কবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। যা শুধু বৃটেন নয়, সারা পৃথিবীর গণতন্ত্রসেবীদের জন্য এক ধরনের শিক্ষা। আর ক্যামেরন পৃথিবীর রাজনীতিবিদদের এ বার্তাও দিলেন, কথা দিলে তাদের কথা রাখতে হয়। কোন কোন সমর নায়ক ও রাজনীতিবিদ বলার চেষ্টা করেন, গণতন্ত্র একেক দেশে একেক রকম হবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, গণতন্ত্রের রকমারি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। ভালো হোক, মন্দ হোক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছাই গণতন্ত্রের শেষ কথা। এর কোন ব্যতিক্রম নেই।

Saturday, June 25, 2016

যুক্তরাজ্যবাসীর রায় জানা যাবে আজ

ইইউ প্রশ্নে গণভোটে ভোট দেওয়ার পর লন্ডনের
এক কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
ডেভিড ক্যামেরন ও তাঁর স্ত্রী সামান্থা। ছবি: এএফপি
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকা না-থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যে ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট শুরু হয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। আজ শুক্রবার সকাল নাগাদ গণভোটের ফল জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গণভোটের আগাম ফলাফল জানার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি এবার। গণমাধ্যমগুলোকে বুথফেরত জরিপ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের গণভোটের সময়ও বুথফেরত জরিপের সুযোগ ছিল না। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসের তৃতীয় এই গণভোটে সব মিলিয়ে মোট ভোটার প্রায় ৪ কোটি ৬৫ লাখ। এই গণভোটে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি স্পেন উপকূলের অদূরের ব্রিটিশ শাসিত ক্ষুদ্র ভূখণ্ড জিব্রাল্টারের অধিবাসীরাও তাঁদের রায় দিয়েছেন। গণভোটের ব্যালট পেপারে ভোটারদের প্রতি প্রশ্ন রাখা হয়েছে, ‘যুক্তরাজ্যের ইইউর সদস্য হিসেবে থাকা উচিত, নাকি ইইউ ত্যাগ করা উচিত?’ প্রত্যেক ভোটারকে থাকা না-থাকার যেকোনো একটি অপশনে টিক দিতে হবে। প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে যে পক্ষ অর্ধেকের বেশি ভোট পাবে, সেই পক্ষ জয়ী বলে বিবেচিত হবে। ফলাফল গণনার জন্য যুক্তরাজ্যকে ৩৮২টি এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। সেখানে প্রতিটি ব্যালট পরীক্ষা করা হবে। প্রতিটি এলাকার ভোটার উপস্থিতি ঘোষণা করা হবে। এরপর ভোট গণনা শুরু হবে। ২৮ দেশের ইইউতে থাকা না-থাকা নিয়ে যুক্তরাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গণভোটের আগে চার মাস ধরে চলে প্রচার-প্রচারণা। তবে ভোট উৎসবে বাদ সাধে বৃষ্টি। লন্ডন শহরের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির কারণে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনসহ প্রধান রাজনৈতিক নেতারা ইইউতে থাকার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। অভিবাসনবিরোধী দল ইউকে ইনডিপেনডেন্টস পার্টি (ইউকিপ) এবং ক্যামেরনের মন্ত্রিসভার বিদ্রোহী সাত সদস্য ইইউবিরোধী প্রচারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের ১৩৭ জন এমপি ও লেবার দলের ১০ জন এমপি ইইউর বিপক্ষে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। ইইউতে যুক্তরাজ্যের থাকা না-থাকার বিতর্কে বিশ্বনেতারাও যোগ দেন। এর আগে ১৯৭৫ সালে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কমিউনিটিতে (ইইসি) যোগ দেওয়ার প্রশ্নে গণভোটে ৬৭ শতাংশ পক্ষে ভোট দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। ইইসিই পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রূপ নেয়।

আটলান্টিকও জয় করল সৌরবিমান

স্পেনের স্যান পাবলো বিমানবন্দরে সোলার ইম্পালস্
২ অবতরণ করার পর দৌড়ে যান পাইলট বার্ট্রান্ড
পিকার্ড (লাল জ্যাকেট পরা)। রয়টার্স
সৌরশক্তিচালিত বিমান ‘সোলার ইম্পালস-২’ সফলভাবে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছে। কোনো সৌরবিমানের এটাই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এ মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রথম ঘটনা। সোলার ইম্পালস-২ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে গত সোমবার যাত্রা শুরু করে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে স্পেনের মাটিতে অবতরণ করে। আটলান্টিকের ওপর দিয়ে দীর্ঘ ৭০ ঘণ্টার যাত্রায় ৬ হাজার ২৭২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় বিমানটি। পরীক্ষামূলকভাবে এই যাত্রা শেষ করে সোলার ইম্পালস-২ গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের কিছু আগে স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় সেভিল বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে। তখন সেখানে উপস্থিত লোকেরা হাততালি দিয়ে বিমানচালক ও সুইজারল্যান্ডের দুঃসাহসী অভিযাত্রী বার্ট্রান্ড পিকার্ডকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
বিমানটি চালিয়ে স্পেনে অবতরণ করানোর পর এর মোনাকো মিশন কন্ট্রোল সেন্টারকে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পিকার্ড বলেন, এই যাত্রা ছিল খুবই চমৎকার। সকালে বিমানটি যখন এর গন্তব্যে পৌঁছানোর কাছাকাছি পথে, তখন বিমানযাত্রার সাপোর্ট টিম তাদের অফিশিয়াল টুইটারে বলে, ‘একটা স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে।’ বিশ্বভ্রমণের ১৫তম যাত্রায় সোলার ইম্পালস আটলান্টিক পাড়ি দিল। গত বছরের ৯ মার্চ আবুধাবি থেকে এর বিশ্বভ্রমণ শুরু হয়। ইতিমধ্যে বিমানটি শুধু সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল পাড়ি দেয়। আটলান্টিক পাড়ির যাত্রায় বিমানচালক পিকার্ড ককপিটে বসে সামান্য সময় নিদ্রায় কাটান। এ নিয়ে গত বুধবার সকালে তিনি টুইটারে লেখেন, ‘রাতে দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি সয়ে ও সামান্য নিদ্রা কাটিয়ে আমি দিনের প্রথম আলোটুকু দেখতে পেলাম।’ পরে লেখেন, তিনি তাঁর বিমানের পেছনে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটকে উড়তে দেখেছেন।

Friday, June 24, 2016

বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা এত বাড়ল কীভাবে? by আকবর হোসেন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এক বছরের ব্যবধানে দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট জনসংখ্যার ১০.৭ শতাংশ।
সে হিসেবে এক বছরে হিন্দু জনগোষ্ঠি প্রায় ১৫ লাখের মতো বেড়েছে বলে ধারনা পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ের আদমশুমারিতে দেখা গেছে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠির সংখ্যা কমেছে।
উনিশ একান্ন সালে যে আদমশুমারি হয়েছিল তাতে বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠির ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে আসে ১৪ শতাংশে। আর সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এটা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশে।
বিভিন্ন আদমশুমারিতে যেখানে ক্রমাগতভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠি কমার পরিসংখ্যান রয়েছে, সেখানে পাঁচ বছরে মোট জনসংখ্যার ১০.৭ শতাংশ হিন্দু জনগোষ্ঠি হয়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই প্রতিবেদন অনেককেই অবাক করেছে। প্রতি দশ বছর পরপর আদমশুমারি করার কথা থাকলেও দুটি আদমশুমারির মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিবছর আরো একটি জরিপ করা হয়। সেটি হচ্ছে ‘ স্যাম্পল ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিকস।’
এই প্রকল্পের প্রধান এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক উল্লেখ করেন ২০১৪ সালে ১৫০০টি জরিপ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে সেটি বাড়িয়ে ২০১২টি এলাকা করা হয়েছে।
তিনি বলেন নমুনা এলাকা বাড়ানোর কারণে হিন্দু জনগোষ্ঠির সংখ্যাও বেড়েছে।
তিনি বলেন, “একেকটা নমুনা এলাকায় ১০০-১৫০টি পরিবার আছে। এই নতুন নমুনায় হয়ত বা হিন্দু কমিউনিটির লোকজন বেশি থাকতে পারে।”
নমুনা এলাকা বাড়ানো হলেও হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি কতটা সঠিক সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক ড: মো: মঈনুল ইসলাম বলেন জরিপের নমুনায়ন যথাযথ হয়েছে কিনা সেটি দেখতে হবে। সে কারণে জরিপের ফলাফল উঠা-নামা করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের ক্ষেত্রে জন্মহার কম। সেজন্য হঠাৎ করে যদি হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসে তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে বলে মন্তব্য করেন ড: ইসলাম।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর যুগ্ম পরিচালক আশরাফুল হক বলেন তারা সর্বশেষ যে ২০০০ জরিপ এলাকায় হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৯ হাজার। সেটিকে পুরো বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে গড় হিসেব দেখানো হচ্ছে যে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৫ লাখ।
মি: হক বলেন এটিকে পুরো বাংলাদেশের সঠিক চিত্র হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, “সারা বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা বেড়েছে এটা আমি বলতে পারিনা।”
তিনি বলেন ২০১১ সালের আদমশুমারিতে যে তথ্য আছে সেটিকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরতে হবে। আদমশুমারির মাধ্যমে পরিপূর্ণ গণনা উঠে আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার মধ্যে হিন্দু জনগোষ্ঠি ৮.৫ শতাংশ এবং মুসলমানদের অনুপাত ৯০.৪ শতাংশ।
সে হিসেবে বাংলাদেশে মোট হিন্দু জনগোষ্ঠির সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ। অন্যদিকে মুসলমান জনগোষ্ঠির সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি।
বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠির সংখ্যা এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে বলছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো।

Thursday, June 23, 2016

পলাশীর বিপর্যয়ের জন্য মূলত ব্রিটেনই দায়ী ছিল -পার্সটুডে

পলাশী যুদ্ধের একটি দৃশ্য (ইনসেটে) নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা (আর্ট ছবি)
আজ ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশী ট্রাজেডি দিবস। ২৫৯ বছর আগে এ দিনে পলাশীর আম বাগানে ইংরেজদের সঙ্গে এক প্রহসনের যুদ্ধে বৃহত্তর 'বাঙ্গালা' তথা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ঘটে। ফলে অস্তমিত হয় বৃহত্তর বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য।
ইরানি বংশোদ্ভূত ও শিয়া মুসলিম এই নবাবের বেদনাদায়ক মৃত্যু হলেও উপমহাদেশের মানুষ নবাবকে আজও শ্রদ্ধা জানায়। তার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাদের কারোই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি।
নানা ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবাবের সেনা বাহিনীর তুলনায় ইংরেজদের সেনা সংখ্যা ছিল অনেক কম। সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা না হলে নবাবের বিজয় ছিল সুনিশ্চিত।
সে যুগে ইংরেজরা বাণিজ্যের অজুহাতে এবং ছলে-বলে কৌশলে বিশ্বের নানা দেশে সার্বিক কর্তৃত্ব ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। মোঘলদের দুর্বলতার সুযোগে তারা বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার পায় ভারতে। এরপর অর্থনৈতিক শোষণের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও নাক গলাতে থাকে ইংরেজরা। তাদের ষড়যন্ত্রমূলক ও উস্কানিমূলক পদক্ষেপ ক্ষুব্ধ করেছিল স্বাধীনচেতা নবাব সিরাজকে।
খ্রিস্টীয় ১৭৫৬ সনের ২০ জুন সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজদের শিক্ষা দিতে ও তাদের দম্ভ কমাতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করেন। কারণ, সামরিক আস্তানায় পরিণত হওয়া এ দুর্গ হয়ে পড়েছিল বাংলার স্বাধীনতার প্রতি মারাত্মক হুমকি। এ দুর্গের সামরিকীকরণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন নবাব। কিন্তু ইংরেজকে তার এই আপত্তিকে অগ্রাহ্য করায় দুর্গটি দখল করতে বাধ্য হন নবাব সিরাজ।
এ সময় জন জেপানিয়াহ হলওয়েল নামের এক ধূর্ত ইংরেজ 'কোলকাতার অন্ধকূপ হত্যা' নামের একটি আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে নবাবকে গণহত্যাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। এই গাঁজাখুরি কাহিনীতে বলা হয় যে, ১৪৬ জন ইংরেজকে ১৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪ ফুট প্রস্থের একটি গর্তে রাখায় তারা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে। হলওয়েল নিজে ওই ঘটনায় বেঁচে যায় বলে দাবি করে।
গবেষক ও ঐতিহাসিকরা এই কাহিনীকে একটি পুরোপুরি মিথ্যা কাহিনী হিসেবে অস্বীকার করে আসছেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তার লেখা "An Advanced History of India" শীর্ষক বইয়ে অন্ধকূপ হত্যা বা 'ব্ল্যাক হোল স্টোরি'-কে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশ পণ্ডিত ও গবেষক জে.এইচ লিটলও "The 'Black Hole'—The Question of Holwell's Veracity" বা 'অন্ধকূপ হত্যা- হলওয়েলের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন' শীর্ষক প্রবন্ধে হলওয়েলের বর্ণিত এই কাহিনীকে 'বড় ধরনের ধোঁকা' বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতবর্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে ও এই লক্ষ্যে ব্রিটেনের লোকদের ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই এই কাহিনী রচনা করা হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
আলীবর্দী খাঁর পর তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে বসেন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বা মতান্তরে ১৮ বছর। ইংরেজরা ছাড়াও তরুণ নবাবের শত্রু ছিলেন রাজ সিংহাসনের জন্য লালায়িত মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা পাকাপোক্ত করে।
ষড়যন্ত্র কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমিচাঁদকে ‘এজেন্ট' নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীর জাফর তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আব্দুল হাদীকে সেনাপতি করেন। কিন্তু কূটচালে পারদর্শী মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরীফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য ‘কাল' হয়ে দাঁড়ায়।
[মুসলিম বিশ্বে কুরআনকে অপব্যবহারের রাজনীতি শুরু করেছিল ইসলামের ইতিহাসের ম্যাকিয়াভেলি তথা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও তার সুযোগ্য উপদেষ্টা আমর ইবনে আস। সিফফিনের যুদ্ধে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র সেনাদলের হাতে যখন মুয়াবিয়ার বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল তখন আমর ইবনে আস মুয়াবিয়ার একদল সেনার বর্শা বা তরবারির আগায় কুরআনের পৃষ্ঠা বেঁধে আলীর সেনাদলকে বিভ্রান্ত করার কৌশল প্রয়োগ করে। এ কৌশল সফল হয়েছিল। হযরত আলী যতই বোঝাচ্ছিলেন যে এটা হচ্ছে ধোঁকাবাজি, ওরা তথা মুয়াবিয়া-চক্র প্রথমেই কুরআনের শান্তির বাণীকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিন্তু বিভ্রান্ত সরলমনা সেনারা যুদ্ধ না থামালে উল্টো আলীকেই হত্যা করবে বলে হুমকি দিতে থাকে। কবি নজরুল এ প্রসঙ্গে এনেছেন তার কবিতায় এভাবে:
এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান ! ]

ইংরেজ কর্তৃক পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, নবাবের নিষেধ সত্ত্বেও ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার, বিদ্রোহী কৃষ্ণ বল্লভকে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দান প্রভৃতি কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল প্রায় ৮ টার দিকে ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মীর মর্দান ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের পরাজয় ঘটে। ফলে বাংলার স্বাধীনতা প্রায় দু'শ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার বা মতান্তরে এক লাখ সেনা আর ইংরেজদের পক্ষে মাত্র ৩ হাজার সৈন্য। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী ও কুচক্রী মীরজাফর, রায় দুর্লভ ও খাদেম হোসেনের অধীনে নবাব বাহিনীর একটি বিরাট অংশ পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কার্যত কোনো অংশগ্রহণই করেনি।
ঐতিহাসিক ড. রমেশ চন্দ্র লিখেছেন, ‘নবাব ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানার পর যদি মীর জাফরকে বন্দি করতেন, তবে অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারী ভয় পেয়ে যেতো এবং ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলে পলাশীর যুদ্ধ হতো না।'
ঘৃণ্য মীর জাফরের কুষ্ঠরোগে মারা যায়। ইংরেজরা প্রথমদিকে ইয়ার লতিফকে হাত করে তাকে নবাব বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে তারা মীরজাফরকেই তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য বেশি উপযোগী ভেবে মীরজাফরের নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে এগিয়ে যায়।
বাংলাপিডিয়ায় পলাশীর যুদ্ধের পটভূমি ও যুদ্ধের বিবরণ সম্পর্কে লেখা হয়েছে:
"১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজউদ্দৌলার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নওয়াব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। নবীন নওয়াব প্রথম বারের মত বাংলায় কোম্পানির অবৈধ কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর তিনটি প্রধান অভিযোগ ছিল: অনুমতি ব্যতীত ফোর্ট উইলিয়মে প্রাচীর নির্মাণ ও সংস্কার, ব্যক্তিগত অবৈধ ব্যবসা এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা দস্তকের নির্লজ্জ অপব্যবহার এবং নওয়াবের অবাধ্য প্রজাদের বেআইনিভাবে আশ্রয় প্রদান। উল্লিখিত অভিযোগসমূহের মীমাংসার জন্য পদক্ষেপ নিতে নওয়াব ব্রিটিশদের আহবান জানান এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিরসনের জন্য কলকাতায় অনেক প্রতিনিধিদল পাঠান। নওয়াব কোম্পানির নিকট কৃষ্ণদাসকে তাঁর হাতে সমর্পণের দাবি করেন এবং নতুন প্রাচীর ভেঙে ফেলতে ও কলকাতার চারদিকের পরিখা ভরাট করতে নির্দেশ দেন। নওয়াবের যে বিশেষ দূত এ সকল দাবি সম্বলিত চিঠি নিয়ে কলকাতায় যান ইংরেজরা তাকে অপমানিত করে। কলকাতার ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক যে চরম অপমানজনকভাবে নওয়াবের প্রতিনিধি নারায়ণ সিংহকে বিতাড়িত করে তা সবিস্তার শুনে নওয়াব অত্যন্ত রাগান্বিত হন। নওয়াব তৎক্ষণাৎ কাসিমবাজার কুঠি অবরোধের আদেশ দেন। কুঠির প্রধান আত্মসমর্পণ করে কিন্তু কলকাতার ইংরেজ গভর্নর অবাধ্যতা ও একগুঁয়েমি প্রদর্শন করেন। ফলে নওয়াব কলকাতা অভিযান করে তা দখল করে নেন। এ পরাজয়ের পর বাংলায় কোম্পানির পুনঃপ্রতিষ্ঠা দুই উপায়ে করা সম্ভবপর ছিল, হয় নবাবের নিকট আত্মসমর্পণ নচেৎ পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বল প্রয়োগ। বাংলায় যে সকল ব্রিটিশ ছিল তারা অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর জন্য মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জে জরুরি খবর পাঠায়। সেখান হতে রবার্ট ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াটসনের অধীনে একদল ব্রিটিশ সৈন্য বাংলায় পাঠানো হয়। তারা ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা পুনরুদ্ধার করে এবং নওয়াবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের সঙ্গে আলীনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। ...
কিন্তু ইংরেজরা সন্ধির শর্তাদি অগ্রাহ্য করতে থাকায় যুদ্ধের চাপা উত্তেজনা চলতে থাকে। তারা নওয়াবের প্রতি বিরূপ পারিষদদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মুর্শিদাবাদ দরবারে কিছু প্রভাবশালী অমাত্য নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি যে অসন্তুষ্ট ছিল তা অস্বীকার করা যায় না। নওয়াবকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। তবে ব্রিটিশগণ সক্রিয়ভাবে এ ষড়যন্ত্রে জড়িত না হলে আদৌ কোন পলাশী ‘বিপ্লব’ সংঘটিত হওয়া সম্ভব হতো কিনা তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। ....
অনেক ঐতিহাসিক যদিও দৃঢ়ভাবে মত পোষণ করেন যে, ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীগণই সহযোগিতা লাভের আশায় পরিকল্পিত ‘বিপ্লব’ ঘটানোর জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তবুও দলিলাদির সঠিক ও সতর্ক বিশ্লেষণে সন্দেহাতীত ভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশরাই তাদের পরিকল্পিত ‘বিদ্রোহ’ বাস্তবায়নের জন্য নওয়াব দরবারের বিরুদ্ধবাদীদের সমর্থন আদায়ের জন্য যোগাযোগ করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ….
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। মীর মর্দান, মোহন লাল, খাজা আব্দুল হাদী খান, নব সিং হাজারী প্রমুখের অধীন নওয়াব সেনা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালায়, অন্যদিকে মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভরামের অধীন নওয়াবের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সেনা নিষ্ক্রিয়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে ও পরিস্থিতি অবলোকন করে। এমনকি বেশ কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধের পরও চূড়ান্ত কিছু ঘটে নি। ক্লাইভ এমন প্রতিরোধ পাবেন আশা করেন নি এবং এই মর্মে জানা যায় যে, ‘দিনে যথাসম্ভব তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে’ ক্লাইভ রাতের অন্ধকারে কলকাতা পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছিলেন। কিন্তু বেলা তিনটার দিকে কামানের গোলা মীর মর্দানকে আঘাত হানে এবং এতে তাঁর মৃত্যু হয়।
মীর মর্দানের মৃত্যুতে হতভম্ব নওয়াব মীরজাফরকে ডেকে পাঠান এবং তাঁর জীবন ও সম্মান রক্ষার জন্য তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন। মীরজাফর নওয়াবকে ঐ দিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং পরদিন সকালে নতুন উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করার পরামর্শ দেয়, আর এ খবর শীঘ্র ক্লাইভের নিকট পৌঁছানো হয়। পরামর্শমত নওয়াবের সেনানায়কেরা পিছুতে থাকলে ইংরেজ সেনারা নতুন করে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায় এবং ফলে নওয়াব বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে যত্রতত্র পালিয়ে যায়। অপরাহ্ণ ৫টার দিকে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় এবং বিজয়ী ক্লাইভ বীরদর্পে তখনই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন। জন উড নামে জনৈক ব্রিটিশ সৈন্য পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিল, তার মতে ‘এটাই ছিল সেই বিশিষ্ট ও চূড়ান্ত যুদ্ধ যেখানে কোন ব্যাপক আক্রমণ ছাড়াই রাজ্য জয় করা হয়’।
ষড়যন্ত্র এবং পরবর্তীকালে ‘পলাশী-বিপ্লব’ ইংরেজদের দ্বারা শুধু উদ্ভাবিত ও উৎসাহিতই হয় নি, বরং যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা দেশিয় ষড়যন্ত্রকারীদের ব্রিটিশ পরিকল্পনা সমর্থন করতে প্রলুব্ধ করে। সাধারণ ধারণা - ষড়যন্ত্রটি ছিল ভারতজাত, এর পেছনে ব্রিটিশদের পরিকল্পিত কোন কূটকৌশল ছিল না, ষড়যন্ত্রের মূলে বা এর উত্তরণে তাদের অতি সামান্য ভূমিকা ছিল কিংবা কোন ভূমিকাই ছিল না, এটি ছিল বাংলার ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ যা ‘অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্রিটিশদের জড়ায়’ এবং বাংলায় ব্রিটিশ বিজয় ছিল প্রায় সম্পূর্ণ আকস্মিক, এ কথাগুলি এখন ধোপে টেকে না। ইংরেজরা তাদের ষড়যন্ত্রের জোরে ও সিরাজউদ্দৌলার সভাসদদের বিশ্বাসঘাতকতার দরুণ পলাশীতে বিজয়ী হয়। নওয়াবের পরাজয় ছিল রাজনৈতিক, সামরিক নয়।"
পলাশীর বিপর্যয়ের ফলে গোটা ভারতবর্ষে ব্রিটেনের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ভারতে নানা সময়ে ব্রিটেনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ এবং শত্রুতামূলক নানা নীতির কারনে কোটি কোটি বাঙ্গালীসহ অন্তত দশ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। দেশীয় শিল্প, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজ-ব্যবস্থারও হয়েছে অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে, মুসলমানরা হয়ে পড়ে সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর। অথচ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর বাংলার মুর্শিদাবাদসহ ভারতের নানা শহরের সম্পদ লুট করে ইংরেজরা সংগ্রহ করেছে তাদের দেশকে সম্পদশালী করার নানা উপাদান।