Saturday, February 3, 2018

ক্রীড়া পরিষদ আইন কি যুগোপযোগী by পবিত্র কুন্ডু

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইনের (১৯৭৪) প্রস্তাবিত সংশোধনী যাচাই-বাছাইয়ের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গেছে। ধরে নেওয়া যায়, এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়ে জাতীয় সংসদে গেলেই আইনটি নতুন রূপে প্রণীত হয়ে যাবে। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার বলেছিলেন, সামরিক সরকারগুলো অধ্যাদেশ জারি করে যে সংশোধনী এনেছে, তা বাতিল করে আইনটি যুগোপযোগী করে বাংলায় প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছিল। আসলে আইনটির মৌলিক পরিবর্তন হচ্ছে না। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সাধারণ পরিষদে অর্থ,
পরিকল্পনা, স্বরাষ্ট্র, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবেরা যুক্ত হচ্ছেন। কার্যনির্বাহী পরিষদে রাখা হয়েছে ক্রীড়া, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের। বলা হচ্ছে খেলাধুলার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ আছে বলেই এই মন্ত্রণালয়গুলোর প্রতিনিধিত্ব জরুরি। গোটা ক্রীড়াঙ্গন অবশ্য আশায় ছিল, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন সংশোধিত ও পরিবর্ধিত হয়ে যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন ২০১৭ পাওয়া যাবে, সেটি হবে একটি মাইলফলক । জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে ‘দ্বৈত শাসনের’ অবসান ঘটবে। ৪৪ বছর ধরে চালু একটি অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল হবে। প্রথমে ‘দ্বৈত শাসন’ বিষয়টির ব্যাখ্যা দেওয়া যাক। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ হলো ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ক প্রতিষ্ঠান। সরকার সমস্ত ক্রীড়া কার্যক্রম ও উন্নয়নের সমন্বয় সাধন করবে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বাস্তবায়ন করবে সরকারি নীতিমালা। বর্তমান আইনে মন্ত্রণালয়ের প্রধান ও উপপ্রধান (এখন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী) প্রতিষ্ঠানটির প্রধান (চেয়ারম্যান) ও উপপ্রধান (ভাইস চেয়ারম্যান) হিসেবে থাকেন। কারণ এতে কাজের পুনরাবৃত্তি হয়। মন্ত্রীরা ক্রীড়া পরিষদে যে সিদ্ধান্ত নেন, তা-ই আবার মন্ত্রণালয়ে যায় তাঁদের অনুমোদনের জন্য। তা ছাড়া নিজের অধীন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়াটা মন্ত্রীকে মানায়ও না। অগণতান্ত্রিক ধারাটা হলো ২০ (ক)। এই ধারাবলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কারণ না দেখিয়েই যেকোনো ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটি ভেঙে দিতে পারে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় এই ধারা প্রয়োগ করে ভেঙে দিয়েছিল ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচিত কমিটি। ফিফা নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশকে। সেই ঘটনা দেশবাসী ভুলে যায়নি। একটি নতুন আইন করতে গেলে বা আইনের সংশোধনী আনতে গেলে সেটি নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত, তাঁদের মতামত নেওয়া উচিত। কিন্তু বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষকদের দাবি, তাঁদের সেভাবে জানানোই হয়নি বিষয়টি! পরে কেউ কেউ এ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন, যদিও মৃদুস্বরে। যুব ও ক্রীড়া সচিব আসাদুল ইসলাম সেদিন বলছিলেন, ‘আমরা জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে জানিয়েছিলাম। তারা এই সংশোধনীর ব্যাপারে মত না জানালে কী করার আছে?’ ফেডারেশনগুলো মতামত জানায়নি বলে আইনটি সত্যিকারের ক্রীড়াবান্ধব ও যুগোপযোগী হতে পারবে না? ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার যখন ক্রীড়া পরিষদ আইন প্রণয়ন করে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন ছিল ছোট। সময়ের প্রবহমানতায় ছোট্ট ক্রীড়াঙ্গন এখন অনেক বড়, পত্রপল্লবে সুশোভিত। খেলা এখন শুধু খেলাই নয় বা নিছক চিত্তবিনোদনের মাধ্যমও নয়; শ্রমঘন শিল্প, ব্যবসা।
ক্রীড়া সাফল্যে যেমন দেশের গৌরব বাড়ে, তেমনি অর্থও উপার্জিত হয়। আর অর্থযোগ হলে কিছু ‘অনর্থযোগ’ও হয়। শিকড় গাড়ছে ক্রীড়া দুর্নীতি। ক্রিকেটে ঢুকে পড়েছে জুয়া। দুর্নীতি দমনের জন্য ক্রীড়া পরিষদ আইনে ধারা রাখা উচিত ছিল। ক্রীড়া ট্রাইব্যুনাল গঠনের সুযোগ রাখা যেত। খেলাধুলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ক্লাবগুলো সমাজসেবা অধিদপ্তর বা যৌথ মূলধনী কোম্পানিতে নিবন্ধিত। এদের ব্যাপারে ক্রীড়া আইনে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। ১৯৯৮ সালে প্রণীত ক্রীড়া নীতি অনুযায়ী ক্রীড়া পরিষদ, ক্রীড়া পরিদপ্তর ও ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একই ছাতার নিচে আনতে পারলে ভালো হতো। কেননা, দেশবাসী দেখছে, ভিন্ন তিনটি প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করায় ক্রীড়া উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। ২০০৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, খেলাধুলা শিক্ষা, শারীরিক সুস্থতা ও বিশ্বশান্তির সহায়ক। জাতিসংঘের চোখ দিয়ে দেখলেও দেশের একমাত্র ক্রীড়া আইনটিকে আধুনিক ও মানসম্পন্ন করে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমান সরকার সুযোগ পেয়েও সেটি করল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার প্রণয়ন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন। ক্রীড়াঙ্গনেও গণতন্ত্রের হাওয়া ঢোকে ওই সময়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে সম্পন্ন করে নির্বাচন। শেখ হাসিনার সরকারের তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের একমাত্র ক্রীড়া আইনটি সমস্ত অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে আধুনিক ও যুগোপযোগী কেন হবে না,
সেটাই প্রশ্ন।
পবিত্র কুন্ডু প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার স্বার্থে by আলী রীয়াজ

গত ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিভায় প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ অনুমোদিত হওয়ার পর দেশ-বিদেশে এই আইনের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে ২০১৬ সালে এই আইন প্রস্তাব হিসেবে উপস্থাপনের পর যেসব সমালোচনা হয়েছিল, বিভিন্ন বৈঠকে যেসব নেতিবাচক দিক চিহ্নিত করা হয়েছিল, সরকার কার্যত সেগুলো আমলে নেয়নি।
যৎকিঞ্চিৎ যে সংশোধন বা পরিবর্তন হয়েছে, তাতে এই আইনের উদ্দেশ্য বা মর্মবস্তুর কোনো বদল ঘটেনি। এই আইনের বিরুদ্ধে গত কয়েক দিনের আলোচনায় যে বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে তা হচ্ছে কী করে এই আইন দেশে সাংবাদিকতার জন্য এক বিরাট প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হবে। এ প্রসঙ্গে কুখ্যাত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার বিভিন্ন বিষয়কে ৪টি ভাগে ভাগ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় (ধারা ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১) সংযুক্ত হওয়ার বিষয় বিস্তারিতভাবেই আলোচিত হচ্ছে। নতুন আইনের ৩২ ধারা এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়; এই ধারার একটি ব্যাখ্যা অনুযায়ী অনুমোদন ব্যতিরেকে সরকারি তথ্য সংগ্রহ করলে তাকে গুপ্তচরবৃত্তি বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। ফলে এই আইনের ভেতরে এমন ব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়েছে, যা কেবল শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিরুদ্ধেই নয়, কার্যত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পথকেই প্রশস্ত করেছে। অনুমোদিত খসড়ায় এই আইনের আওতায় সরকারি তথ্য সুরক্ষার যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাতে যে জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়নি, সেটা সহজেই বোধগম্য। যে দেশে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করার পর সবাই উৎফুল্ল হয়েছিল, সেই দেশে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এত দিন ধরে যে আইসিটির ৫৭ ধারা বজায় ছিল, সেটাই ছিল মর্মান্তিক, দুর্ভাগ্যজনক। এখন তার বদলে এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় যুক্ত হচ্ছে; যুক্ত হতে চলেছে সেই সব ধারা ও শাস্তি, যা আসলে ১৯২৩ সালের দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের ৩ ধারায় গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধের শাস্তির বিধানাত্র (টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের বিবৃতি, যুগান্তর, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। ঔপনিবেশিক শাসনের ভূত এখন স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকদের মাথায় ভর করেছে; পার্থক্য কেবল অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল। কয়েক দিন ধরে আলোচনা–সমালোচনায় এই আইনের প্রত্যক্ষ এবং আশু যেসব প্রতিক্রিয়া পড়বে বলে বলা হচ্ছে, এর অধিকাংশই সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপরে। কিন্তু এই আইনের ভার কেবল যে সাংবাদিকদেরই বইতে হবে, তা নয়।
বাংলাদেশ বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, বিশেষত যাঁরা ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসে স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে চান, তাঁদের জন্য এই আইনে এমন অনেক কিছুই আছে, যা তাঁদের উদ্বিগ্ন করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব নিয়ে সমাজবিজ্ঞানের গবেষক বা শিক্ষকদের মধ্য থেকে এমন কোনো শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এটুকু যদিও বলা হচ্ছে যে এই আইনের বিভিন্ন বিধান ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে’। কিন্তু এই বক্তব্য যথেষ্ট নয়, সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা দরকার কী কী বিধান উদ্বেগের জন্ম দেয়। উদাহরণ হিসেবে আইনে উল্লিখিত ‘রাষ্ট্রের সুনাম’ ‘ভাবমূর্তি’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’–এর প্রসঙ্গ স্মরণ করতে চাই। এসব শব্দ সাধারণ আলোচনায় যতটা সহজে ব্যবহারযোগ্য, আইনের মধ্যে প্রবেশ করলে তা আর সহজ বিষয় থাকে না। কেননা সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়ার দরকার হয়ে পড়ে। এসব ধারণার কি অভিন্ন এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সংজ্ঞা নির্ধারণের উপায় আছে? আইনের ২১ ধারার প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে (বিবিসি বাংলা, ২৯ জানুয়ারি ২০১৮)। একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমি মনে করি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু স্বাধীনতার চেতনার ভিন্ন ব্যাখ্যা অন্যরা দেন এবং তাঁদের সেই ব্যাখ্যাকে কোনো অবস্থাতেই আমি একেবারে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। আমি তাঁদের ওপরে আমার ব্যাখ্যাকে আরোপ করতে চাই না যেমন, এটা আশা করি যে তাঁরা আমার ওপরে তাঁদের ব্যাখ্যাকে চাপিয়ে দেবেন না। এখন এই আইনের পরে একজন গবেষক কি এই বিষয়ে গবেষণা এবং প্রকাশনা করতে পারবেন, এই বিতর্কে নির্ভয়ে অংশ নিতে পারবেন? এই আলোচনা, বিতর্ক কি ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে বিবেচিত হবে? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ধরনের লেখালেখি হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও হবে, এটা নিশ্চিত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর পটভূমি বিষয়ে পশ্চিমা একাডেমিক জগতে যে কটি বই সবচেয়ে আলোচিত হয়, তার একটিও বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা ইতিহাসবিদের লেখা নয়; শুধু তা–ই নয়,
এসব রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনায় বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত। এই আইন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় অনুৎসাহিতই করবে। আমি মনে করি, প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনবিষয়ক বিতর্কে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অনালোচিত। সেই আলোচনা করার দায়িত্ব গবেষকদের, যাঁদের কণ্ঠস্বর এখনো শুনতে পাইনি। আমি যেসব ধারার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, সেগুলো জামিন অযোগ্য অপরাধের তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ। প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত কর্মকর্তাকে বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, এমনকি ‘অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনা রয়েছে’—এমন ক্ষেত্রেও এই ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তার অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে একজন গবেষক এতক্ষণ আলোচিত বিষয়গুলোতে ভবিষ্যতে ‘আপত্তিকর’ গবেষণা করতে পারেন, এই অভিযোগে আটক হতে পারেন? এই প্রশ্নকে অনেকেই অতিশয়োক্তি বলে মনে করতে পারেন, কিন্তু গত কয়েক বছরে আইসিটি আইনের ব্যাপক অপপ্রয়োগ দেখে কি এই আশঙ্কাকে একেবারে অমূলক মনে হয়? বিস্মৃত হওয়ার উপায় নেই, ২০১২ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত আইসিটি আইনে ১ হাজার ৪১৭টি মামলা হয়েছিল; এর ৬৫ শতাংশ হয়েছিল ৫৭ ধারায়। অনুমোদিত আইনে মামলার সংখ্যা কত বাড়বে, তা কি আমরা অনুমান করতে পারছি?
আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক

ছাত্ররাজনীতিতে সরকারি রাহু by আনু মোহাম্মদ

শিক্ষা খাত যে কীভাবে শাসকনীতি ও নৈরাজ্যের শিকার, তার বহু প্রকাশ দেখছি আমরা। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকেরা একের পর এক ঢাকার রাস্তায় অবস্থান-অনশনে দিন-সপ্তাহ-মাস পার করেছেন গত কিছুদিনে। তাঁদের দাবি প্রধানত নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হলেও তা শিক্ষা খাতকে নৈরাজ্য থেকে উদ্ধারের লক্ষ্যকেই হাজির করে। সব নাগরিকের শিক্ষা যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নয়, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশই যে একমাত্র করণীয়, সেই তাগিদই উপস্থিত হচ্ছে বারবার। রাজপথে যখন শিক্ষকেরা অনশনে, তখন শিক্ষার নৈরাজ্যের আরেকটি চিত্র প্রকাশিত হয়েছে সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানের সরকারি ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের তাণ্ডব এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সন্ত্রাস তারই আরেকটি নমুনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদী সমাবেশ-মিছিলের ওপর তাদের আক্রমণ চলছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উপাচার্য ও প্রক্টরই শিক্ষক। কিন্তু তাঁদের অনেকের মধ্যেই শিক্ষকের চাইতে পুলিশ বা আমলা বা সরকারদলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করার প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে বেশি। সন্ত্রাস দমনে তাঁদের আগ্রহ নেই, কেননা সন্ত্রাসীদের তাঁরা নিজেদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করতে চান। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তো সরকারি দলের কমিটিতেই আছেন। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান ও গভর্নর মোনায়েম খান সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ) তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে ক্রমবর্ধমান গণপ্রতিরোধকে বাধা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল।
তারা প্রতিবাদের সব তৎপরতা নিশ্চিহ্ন করার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ত্রাস ছড়াত, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করত, এমনকি শিক্ষকদেরও রেহাই দিত না। ইতিহাস পর্যালোচনায় পরিষ্কার দেখা যায় যে ছাত্রসংগঠনের সহিংস আচরণ বা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্র-সমর্থিত সহিংসতা পাকিস্তানের এই সামরিক শাসনের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। দুঃখজনকভাবে এই প্রবণতা দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও থেমে যায়নি, বরং প্রতিটি সরকারের আমলে আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। কাজেই শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতির সন্ত্রাস প্রকৃতপক্ষে সব ছাত্রসংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়, তা প্রধানত ‘শাসক দলের ছাত্রসংগঠনের’ প্রবণতা। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ছাত্ররাজনীতির সমস্যা নয়, এটি সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের রোগ ও ভোগের প্রকাশ। ঘটনাক্রম দেখলে এটি স্পষ্ট হয় যে সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠন সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পেশিশক্তি হিসেবেই কাজ করে। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন সর্বজনকথা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮) ১৯৮০–এর দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালে তারা ১০ দফা দাবি প্রণয়ন করে। এর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করার পর এর বিপরীত যাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছে ৯০-পরবর্তী সরকারগুলো। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ভয়ংকর আকার নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কৌশলপত্র, এডিবির উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পসহ নানা ঋণনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়ন শিক্ষাবণিকদের জন্য শিক্ষা খাত উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয়ে উইকেন্ড, ইভনিং নামে বাণিজ্যিক তৎপরতা দিনে দিনে বাড়ছে। স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেও বাণিজ্য ও শিক্ষার ধসও বাড়ছে। অন্যদিকে একই সময়কালে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়েছে। ১৯৯১ থেকে কোথাও আর কোনো ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সরকারি দলের একাধিপত্য হলে হলে শিক্ষার্থীদের জীবনকে বিভীষিকাময় করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারি দল ও সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে ভিন্নমত প্রকাশের পথে বিঘ্নœ সৃষ্টির নানা পথ নিয়েছে, নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খবরের কাগজের অসংখ্য প্রতিবেদন দেখিয়েছে, কীভাবে ভূমি ও দোকান দখল, দরপত্র ছিনতাই আর বিরোধিতাকারীদের দমন করতে ভাড়াটে মাস্তান হিসেবে সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা কাজ করছেন। কীভাবে এমনকি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বেতন বাড়ানো বা শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের দমন করার জন্য এই সংগঠনকে ব্যবহার করছে। এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দমন করতে মিথ্যা মামলা দিয়েছে প্রশাসন, ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীদের ওপর—এ রকম উদাহরণ অনেক। এসবের বিনিময়ে সরকারপন্থী সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা যা চান তা-ই করার বিশেষ অধিকার অর্জন করেন। এসবের মধ্যে ছিনতাই, যৌন হয়রানির পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা আদায় সবই অন্তর্ভুক্ত। ১ বৈশাখ নববর্ষের উৎসবে যৌন হয়রানির সিসিটিভি ছবি থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা ধামাচাপা দেওয়ায় প্রমাণিত হয় যে এতে তাদের ক্ষমতাপুষ্ট লোকজনই জড়িত ছিল। খুন, চাপাতিসহ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ত্রাস সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা বহুবার খবর হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশ্বজিৎ হত্যার ভিডিও থাকায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দায়িত্ব সরকার অস্বীকার করতে পারেনি, প্রবল জনমতের কারণে বিচারও হয়েছে। কিন্তু প্রধান আসামিরা সফলভাবে পলাতক থেকেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুবায়ের হত্যার ক্ষেত্রেও ঘটনা একই। অর্থ-সম্পদের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে নিজ সংগঠনেই বহু খুনাখুনিতে ছাত্রলীগের কর্মীরাও অনেকে হতাহত হয়েছেন, এসব নিয়েও অনেক খবর প্রকাশিত হয়েছে।
‘ছাত্ররাজনীতি’র তাই দুটি প্রধান ধারা: একটি ধারা ক্ষমতাসীন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর রাজনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের কাছাকাছি থাকে; অন্যটি তাদের বদলানোর জন্য লড়াই করে। প্রথম ধারাটি সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে প্রকটভাবে প্রকাশিত, যা ক্ষমতাসীন দলকে প্রতিনিধিত্ব করে আর দখলকারী, লুটেরা, দুর্নীতিবাজসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের ভাড়াটে সৈনিকের মতো ভূমিকা পালন করে। এই ধারা তরুণদের শক্তি অবক্ষয়ের দিক নির্দেশ করে। দ্বিতীয় ধারাটি দৃঢ়ভাবে সংগঠিত নয়, পৃষ্ঠপোষণ পায় না, রাষ্ট্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে, সে কারণে পুলিশসহ ক্ষমতার নানা খুঁটির বৈরী আচরণ পায়। কিন্তু এই দ্বিতীয় ধারাটিই সমাজে নতুন জন্মের শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চা থেকে এখন অনেক দূরে। শাসক দলের ছাত্রসংগঠন যার প্রতিনিধিত্ব করে, তা আসলে একধরনের জমিদারি ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে। এসব প্রতিষ্ঠানে তাই ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুস্থ বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি এখনো একটি স্বপ্ন আর অব্যাহত লড়াইয়ের বিষয়। তারপরও অনেক প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রতিটি সরকারের সময় সরকারপন্থী ছাত্রসংগঠনের সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রের বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ঠিকই সরব হয়েছে শিক্ষার্থীরা। ‘সাধারণ ছাত্র ঐক্য’, ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা’, ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’, ‘নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ’, ‘বেতন-ফি বৃদ্ধিবিরোধী ছাত্র ঐক্য’, ‘ভ্যাট নাই’ ‘ধর্ষণ প্রতিরোধ মঞ্চ’, ‘সুন্দরবনের জন্য আমরা’, ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষা তরুণ সমাজ’, ‘ছাত্রসংসদের দাবিতে ছাত্রসমাজ’, ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী’ ইত্যাদি ব্যানারের অধীনে নতুন নতুন মঞ্চ দেখা গেছে গত কয়েক বছরে। যদিও এসব নতুন মঞ্চের কোনো স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামো নেই, তবু শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশকে তাদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা প্রমাণিত। এর সঙ্গে বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও বাম সংগঠনগুলোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের আহ্বানে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তার মুখ্য স্লোগান ছিল বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্রোধ, হুমকি এবং তাদের উচ্ছেদ করার ঘোষণা। অন্যায় নিপীড়ন বা বৈষম্যের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিবাদী ধারাই ক্ষমতাবানদের কাছে বাম হিসেবে নিন্দিত, তা কেউ কোনো সংগঠনে থাকুক বা না থাকুক। বামদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের এই ক্রোধ কেন? কারণ এরাই ছাত্ররাজনীতিকে সরকারি রাহু থেকে মুক্ত করতে চায়; বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, নিয়োগে অনিয়ম, বেতন-ফির অযৌক্তিক বৃদ্ধি ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করে, নির্বাচিত ছাত্রসংসদের কথা বলে, সন্ত্রাস ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়; এরাই দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; এরাই সীমান্ত হত্যা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এরাই সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে লড়াই করে; ফিলিস্তিনসহ দেশে দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। সুতরাং, এটা খুবই বোধগম্য যে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাণিজ্য থেকে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, দেশ-বিদেশের মানুষ ও প্রকৃতিবিনাশী তৎপরতায় লিপ্ত নানা গোষ্ঠী এই সক্রিয় তরুণদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত থাকে। আর এ কারণেই প্রতিবাদের এই ধারাই নানা হতাশা আর নৈরাজ্যের মধ্যে বাংলাদেশ সমাজের জন্য আশার শক্তি তৈরি করে।
আনু মুহাম্মদ অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
anu@juniv.edu

কোল্ড স্টার্ট : পাকিস্তানকে শাস্তিদানে ভারতের রণকৌশল by সাহাদত হোসেন খান

পাক-ভারত সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাপূর্ণ। তবে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ ও ২০০১ সালে ভারতের পার্লামেন্টে সন্ত্রাসী হামলায় এ দু’টি দেশের সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে। তবে পরমাণু অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ায় একে অপরকে সমীহ করে চলে। যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে দু’টি দেশ পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা মাথায় রাখে। চিরশত্রু হওয়ায় তারা একে অন্যের ধ্বংস কামনা করে। ভারত ইতোমধ্যে পাকিস্তানকে পরমাণু হামলা চালানোর সুযোগ না দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিম সীমান্তে দ্রতগতিতে সৈন্য সমাবেশে ‘কোল্ড স্টার্ট’ নামে একটি সামরিক ডকট্রিন বা রণকৌশল গ্রহণ করেছে। ন্যাটোর কাছ থেকে ভারত এ ধারণা লাভ করেছে। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত ব্যাটল গ্রুপ এ হামলা পরিচালনা করবে। ভারত দীর্ঘ দিন ধরে কোল্ড স্টার্টের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে। অবশেষে ২০০৪ সালের ২৮ এপ্রিল এ রণকৌশলের অস্তিত্ব স্বীকার করে। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনব্যাপী আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ও ১৯৭১ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা এ নয়া প্রতিরক্ষা কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। কোল্ড স্টার্ট রণকৌশলের আওতায় নির্দেশ জারি করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আক্রমণাত্মক তৎপরতা চালানো হবে। বিমানবাহিনী ও পদাতিকবাহিনীর সহায়তায় ভারতের সাঁজোয়া বহর তড়িৎগতিতে শত্রু ভূখণ্ডে ঢুকে পড়বে। ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী তাদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান বাহিনীর ওপর আকস্মিকভাবে হামলা চালাবে। পাঞ্জাব ও রাজস্থানের অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে সাঁজোয়াবাহিনী আক্রমণে নেতৃত্ব দেবে।
এ পরিকল্পনায় গতি ও ব্যাপক গোলাবারুদ, সাঁজোয়া বহর ও পদাতিকবাহিনীর সহযোগিতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এ সম্মিলিত ব্যাটল গ্রুপ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে প্রবেশ করবে। পরিকল্পনায় বিমানবাহিনীর পর্যাপ্ত সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে আগ্রাসী রণকৌশল- কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন গ্রহণ করা হলেও ভারত সরকার কিংবা সে দেশের সশস্ত্রবাহিনী কখনো তা স্বীকার করেনি। ২০০৪ সালের ১৮ এপ্রিল সেনা সদর দফতরে এক সম্মেলনে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নয়া ডকট্রিন প্রকাশ করে। কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি নয়া কৌশল গ্রহণের কথা চিন্তাভাবনা করছিল। ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ এ প্রয়োজনীয়তাকে জোরদার করে তোলে। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি জেনারেল বিপিন রাওয়াত ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় এ রণকৌশলের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজের ভাষায়- ১৯৪৭ সাল থেকে ভারতের প্রতিরক্ষা রণকৌশল ছিল ‘অনাক্রমণাত্মক’ এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা। ‘হোল্ডিং কোরের’ (প্রতিরক্ষামূলক কোর) ওপর নির্ভর করে বৈরী শক্তির অগ্রযাত্রা রোধ করা ছিল ভারতের ইতঃপূর্বের রণকৌশল। কোল্ড স্টার্ট হচ্ছে- ১৯৪৭ সালের পরবর্তীকালে অনুসৃত রণকৌশল থেকে একটি বিচ্যুতি। ভারতের সাবেক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কৃষ্ণস্বামী সুন্দরজি হলেন ‘হোল্ডিং কোর’ প্রতিরক্ষা কৌশলের উদ্ভাবক। তিনি সাতটি কোরকে পাকিস্তান সীমান্তে মোতায়েন রাখার এ কৌশল প্রণয়ন করেন। পাকিস্তানের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা ছিল ‘হোল্ডিং কোর’-এর প্রাথমিক দায়িত্ব। স্ট্রাইক কোর হচ্ছে- ভারতের আক্রমণাত্মক সামর্থ্যরে উৎস। যান্ত্রিক পদাতিক ও ব্যাপক গোলন্দাজ সহায়তা নিয়ে তিনটি স্ট্রাইক কোর গঠন করা হয়। ভারত দাবি করছিল, সীমান্তের কাছাকাছি স্ট্রাইক কোর মোতায়েন করা হয়েছিল। ২০০২ সালে অপারেশন পরাক্রম পরিচালনার সময় জেনারেল সুন্দরজির রণকৌশলের সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাঁচজন মুখোশধারী ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে হামলা চালালে তারা হামলাকারীরাসহ ১২ জন নিহত ও ২২ জন আহত হয়। ভারত বরাবরই পাকিস্তানকে তাদের বিরুদ্ধে প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য দোষারোপ করছে। ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে হামলার জন্য কাশ্মিরি মুজাহিদদের সন্দেহ করা হয়। কেননা, মাত্র দু’মাস আগে জয়েশ-ই-মোহাম্মদ কাশ্মিরের রাজ্যসভায় হামলা করে। ভারত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পায়, জয়েশ-ই-মোহাম্মদ ও লস্কর-ই-তৈয়বা এ হামলা চালিয়েছে। অনুরূপ তথ্য পেয়ে দেশটি ‘অপারেশন পরাক্রম’ পরিচালনা করে। ২০০২ সালে ‘অপারেশন পরাক্রম’ পরিচালনা করার সময় পাকিস্তান সীমান্তে সৈন্য সমাবেশে ভারতের অন্তত দু’মাস লেগে যাওয়ায় বিদ্যমান রণকৌশল পরিবর্তন করে কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন গ্রহণ করা হয়। অপারেশন পরাক্রমে সৈন্য মোতায়েনে বিলম্ব হওয়ায় প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে বিরত থাকতে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আসে। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হলে ভারত ও পাকিস্তান যুুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। দু’দেশের চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে ভারত এ আগ্রাসী সামরিক মহড়া চালায়। এ রণকৌশলের লক্ষ্য ছিল, ভারতীয় সৈন্যদের বিরামহীন হামলার সুযোগ দেয়া এবং পাকিস্তানের প্রতিশোধমূলক পরমাণু হামলা প্রতিরোধ করা। ২০০১ সালে ডিসেম্বরের শেষ দিকে উভয় দেশ তাদের নিজ নিজ সীমান্তের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে এবং কাশ্মির সীমান্তে মর্টার ও কামানের গোলাবিনিময় করে।ভারতের সামরিক বিশ্লেষকেরা এ উপসংহারে উপনীত হন, জেনারেল সুন্দরজির প্রতিরক্ষা কৌশল ক্রটিপূর্ণ।
তিনটি কারণে এ প্রতিরক্ষা কৌশলকে সন্ত্রাসবাদী হামলা অথবা অন্য পরোক্ষ চ্যালেঞ্জের জবাব দানে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। : (১) স্ট্রাইক কোর আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করায় যথাসময়ে মোতায়েন করা ছিল দুুরূহ। (২) স্ট্রাইক কোর মোতায়েনে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হওয়ায় তড়িৎ হামলা চালানো সম্ভব ছিল না, ততক্ষণে পাকিস্তান পাল্টা সৈন্য সমাবেশে পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যেতো। (৩) আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর আক্রমণাত্মক তৎপরতা চালানোর ঘাটতি থাকায় হোল্ডিং কোর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সামরিক তৎপরতা চালাতে পারেনি। ভারত বরাবরই কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে এসেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ভি কে সিং বলেন, কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিন বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। সার্র্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে আমাদের কয়েকটি জরুরি পরিকল্পনা ও বিকল্প ব্যবস্থা আছে। তবে তিনি প্রো-অ্যাক্টিভ স্ট্যাটেজির অস্তিত্ব স্বীকার করে পরোক্ষভাবে কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেন। ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশোবন্ত সিনহা এ ধরনের আক্রমণাত্মক রণকৌশলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলেন, কোনো ধরনের কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিনের অস্তিত্ব নেই। সাবেক সেনাপ্রধান ব্যক্তিগতভাবে এ কথা বলেছেন। আমি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এমন কিছু থাকলে আমি জানতাম। ভারত অস্বীকার করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় সেনাবাহিনী রাজস্থানে দ্বিতীয় কয়েকটি সামরিক মহড়া চালায়। ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তান সীমান্তের কাছে বিকানার ও সুরতগড়ে ভারত ‘অপারেশন বিজয় বাবা’ সাঙ্কেতিক নামে একটি সামরিক মহড়া চালায়। এ মহড়ায় ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন শাখার ৫০ হাজার সৈন্য অংশগ্রহণ করে। মহড়ার মূল লক্ষ্য ছিলÑ সৈন্য সমাবেশে উল্লেখযোগ্যভাবে দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস। ২০০২ সালে অপারেশন পরাক্রমে সৈন্য সমাবেশে সময় লেগেছিল ২৭ দিন। অপারেশন বিজয় বাবায় সৈন্য সমাবেশে সময় লাগে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। ২০১১ সালের জুলাইয়ে ভারত দেড় শ’ কিলোমিটার পাল্লার টেকটিক্যাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্রহার’-এর পরীক্ষা চালায়। পাকিস্তানের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধে অগ্রসরমান ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যাটল গ্রুপগুলোকে প্রচলিত গোলাবারুদের ছত্রছায়া প্রদানে এ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়। একই বছরের শেষ দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের কোল্ড স্টার্ট রণকৌশলের প্রমাণ দিতে সাউদার্ন কমান্ড হেডকোর্য়ার্টারের অধীনে ‘অপারেশন সুদর্শন শক্তি’ সাঙ্কেতিক নামে দু’দশকের মধ্যে বৃহত্তম সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। অপারেশন সুদর্শন শক্তিতে স্থল ও বিমানবাহিনীর কার্যক্রমে সমন্বয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়। আনুমানিক ৬০ হাজার সৈন্য ও রাশিয়ায় তৈরি টি-৭২ ও টি-৯০ এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি অর্জুন ট্যাঙ্কসহ ৫০০ সাঁজোয়া যান তাদের লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানে। মহড়ায় গোলন্দাজবাহিনী সহায়তা দেয়। সামরিকবাহিনী চালকবিহীন সদ্যপ্রাপ্ত গোয়েন্দা বিমান ও প্রিসিশন গাইডেড বোমাও ব্যবহার করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কোর কমান্ডার সম্মেলনে ভারতের কোল্ড স্টার্ট ডকট্রিনের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পাকিস্তানি প্রচারমাধ্যম ও জেনারেলরা এ রণকৌশলের সমালোচনা করেন। তারা দাবি করছেন, প্রতিশোধমূলক পরমাণু হামলার সুযোগ না দিয়ে সীমিত পরিসরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে শাস্তিদান এ রণকৌশলের লক্ষ্য হলেও ভারতীয় সেনাবাহিনী নিশ্চিত হতে পারছে না, যে পাকিস্তানি নেতৃত্ব প্রতিশোধমূলক পরমাণু হামলা থেকে বিরত থাকবেন। ভারতের আগ্রাসী রণকৌশলের জবাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল তারিক মজিদ ২০১০ সালকে প্রশিক্ষণের বছর হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দেশটি আজম-ই-নাউ সাঙ্কেতিক নামে একটি বৃহত্তম যৌথ সামরিক মহড়া চালায়। এ ছাড়া পাকিস্তান সামরিকবাহিনী পরমাণু বোমাবহনে সক্ষম ‘নসর’ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করে। এ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, পাকিস্তান কোল্ড স্টার্টকে একটি হুমকি হিসেবে দেখছে ও এ ক্ষেপণাস্ত্রকে কোল্ড স্টার্ট প্রতিহত করার একটি অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাকিস্তান বিমানবাহিনী, ভারতীয় বিমানবাহিনীর তৎপরতা ও সৈন্যসমাবেশ সম্পর্কে যথাসময়ে তথ্য প্রদানে সক্ষম। পাকিস্তানে বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ড দু’টি। একটি হচ্ছেÑ বিমানবাহিনীর প্রতিরক্ষা কমান্ড ও আরেকটি- সেনাবাহিনীর বিমানপ্রতিরক্ষা কমান্ড। পাকিস্তানের আকাশ রক্ষা করা হচ্ছে বিমানবাহিনীর প্রতিরক্ষা কমান্ডের দায়িত্ব এবং সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো রক্ষা করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর বিমানপ্রতিরক্ষা কমান্ডের দায়িত্ব। বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোল্ড স্টার্ট রণকৌশল গ্রহণ করে ভারত আগের থেকে বেশি লাভবান হয়নি। এ রণকৌশল জেনারেল সুন্দরজির উদ্ভাবিত হোল্ডিং কোর প্রতিরক্ষা কৌশলের মতো স্থবির। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর কোল্ড স্টার্ট রণকৌশলের দুর্বল ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়ে যায়। যেকোনো সন্ত্রাসী হামলার জবাবে পাকিস্তানে পাল্টা হামলা চালানো কোল্ড স্টার্টের লক্ষ্য হলেও ভারত সেই লক্ষ্যের ধারেকাছে যেতে পারেনি।

সমাধান বের করতে হবে সু চিকেই by স্যার জন জেনকিন্স

পুলিশ পোস্টে স্বঘোষিত রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী হামলা এবং তার জবাবে সেনাবাহিনীর ব্যাপক ও নির্মম অভিযানের পর গত আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যা ঘটেছে তা নিয়ে লিখেছি। নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের ফলে তখন থেকেই ভীত-সন্ত্রস্ত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশমুখী ঢল নামে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা সাত লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে।
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের স্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রথম স্টেট কাউন্সিলর ক্রমাগত সব কিছু অস্বীকার করে গেছেন এবং এই কুকর্মের সহায়তাকারী হিসেবে নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করেছেন। আমার সর্বশেষ কথায় ব্যাখ্যা করেছি, কেন এসব অভিযোগকে মিথ্যা মনে করি। আমি মনে করি, এসব অভিযোগ অবহেলার প্রতিফলন অথবা মিয়ানমারের ইতিহাস না বুঝতে পারা এবং ক্ষমতার শেকড়ে থাকা সেনাবাহিনীর সাথে মুখোমুখি হতে সু চির ক্ষমতা সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির বহিঃপ্রকাশ।  সবকিছুর পরও, সু চি রাখাইন পরিস্থিতির ওপর জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের রিপোর্ট অনুমোদন করেছেন। ওই রিপোর্টের সূচনা বক্তব্যে সু চি পরিকল্পিতভাবে পুলিশ পোস্টে পরিকল্পিত হামলার বিষয়টিকে খুবই হালকাভাবে তুলে ধরেছেন। এরপর ওই রিপোর্টে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী যেন যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো যায় এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বৈরী মনোভাব, রোহিঙ্গাদের প্রতি বিরূপ জনমত এবং দেশের বাইরে থেকে অব্যাহত সমালোচনার প্রেক্ষাপটে সু চি নিজেই আন্তর্জাতিক পরামর্শক সভা গঠন করেছেন। গত সপ্তাহে সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সময়কালের একজন কর্মকর্তা এবং নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, জ্বালানিমন্ত্রী ও জাতিসঙ্ঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিল রিচার্ডসন রাখাইনে তার প্রথম সফরে পরামর্শক সভার বৈঠকে যোগ দিয়ে পরিস্থিতির উন্নয়নের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং একই সাথে পদত্যাগ করে এ বিতর্ক আরো উসকে দিয়েছেন। গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করায় এ ঘটনা মানুষের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং সু চি আরেক দফা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হলেন। এমনকি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রিচার্ডসন বলেন যে, তিনি মনে করেন মিয়ানমারের শেষ ভরসা একমাত্র সু চি। বিগত সপ্তাহে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল রোডে যখন পায়চারী করছিলাম, পূর্ব লন্ডন মসজিদের বাইরের জনবহুল মার্কেটে দেখলাম রোহিঙ্গাদের জন্য বহু সাহায্য তোলার বাক্স এবং সাধারণ মানুষ এতে ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, এই ইস্যু তাদের মনে কতটা দাগ কেটেছে। এটাও ভেবেছি, এই ইস্যুর বাস্তবতা অনুযায়ী জাতিগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের কতটা সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া এবং একটি সমাধানে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কতটা ভূমিকা পালন করা উচিত। রিচার্ডসনের সমালোচনা করেছেন ওই সভার আরেক সদস্য, দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী রোয়েল্ফ মেয়ের। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘মিস্টার রিচার্ডসন মন্তব্য করতে খুব বেশি সময় নেননি। আমার মনে হয়, এটা ঠিক হয়নি এবং তার জন্য এমন মন্তব্য শোভনীয় হয়নি। আমাদের দেয়া পরামর্শ সরকার ভালোভাবেই শুনেছে এবং গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। এসব পরামর্শ বাস্তবায়নে আমরা তাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবো।’ এ পরামর্শ সভার প্রধান, থাইল্যান্ডের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী সুরাকিয়ার্ত সাথিরাথাই তার দলের প্রথম রাখাইন সফর নিয়ে সাংবাদিকদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা কফি আনান কমিশনের ৮৮টি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি।
আইনের শাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন স্টেট কাউন্সিলর। আমার মনে হয়, সামনে এগিয়ে যাওয়ার এটাই সঠিক পথ।’ পরামর্শ সভা নিয়ে রিচার্ডসনের সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের খোলা মন নিয়ে আসতে হবে এবং বাস্তবায়ন পরিষদের সাথে এক সুরে কথা বলতে হবে। ইউনিসেফের নির্বাহী উপ-পরিচালক জাস্টিন ফরসিথ বৃহস্পতিবার বিবিসিকে বলেন, শরণার্থীদের পক্ষ থেকে রোমহর্ষক ও গ্রহণযোগ্য অভিযোগ পাওয়ার পরও আমাদের মনে রাখতে হবে, রাখাইনে যা হচ্ছে তার পেছনে সু চি নন, কাজ করছে সেনাবাহিনী। একই কথা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। উপরিউক্ত ব্যক্তিদের কথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সমালোচকদের এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির স্থিতিশীল ও মানবিক সমাধান খুঁজে না পাওয়ার দায় সরলভাবে সু চির ওপর দিয়ে চাপিয়ে দেয়া উচিত হবে না। আমি বিশ্বাস করি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিজের অবস্থান থেকে তিনি তার সাধ্য মতো সবই করছেন। কিন্তু তিনি প্রতিনিয়ত কঠিন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করছেন। যখনই তিনি আন্তর্জাতিক চাপে ব্যক্তিগতভাবে পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসছেন, তখনই এসব প্রতিকূলতা তার ক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো, পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হয়ে যাওয়ার পর বাস্তবিক অর্থে আমরা এখন কি দেখতে চাই রাখাইনে ক্ষমতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর কার্যকর উপস্থিতি? আর এটাই মূলত ওই এলাকায় সমন্বিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, সহিংসতায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনঃগঠন, মৌলিক চাহিদা পূরণের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা এবং ঘৃণাত্মক ও উসকানিমূলক আচরণ আইনের আওতায় আনতে সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারকেও সাহায্য করবে। দীর্ঘ মেয়াদে এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে করে সরকার সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সেনাশাসিত একনায়কতন্ত্র থেকে বের হয়ে একটি সত্যিকারের দায়িত্বশীল, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে এবং চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারে। সব মিলিয়ে সু চিকে খুব প্রয়োজন। তাকে ছাড়া স্থায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। সমস্যার সমাধানের মানসিকতা থেকে এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো নয়, বরং বাস্তব সহযোগিতাভিত্তিক যৌক্তিক প্রস্তাবনা সংবলিত গঠনমূলক সমালোচনা করা হলে তা খুবই ভালো। একই সাথে, তা ওই বিষয়কে ব্যাপক পরিসরে শনাক্তকরণ এবং স্থিরকরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। মেয়ের, ফোরসিথ এবং সাথিরাথাই যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলো ছাড়া বাকিসব অপ্রয়োজনীয় নীতিবাক্য কচলানোর মতোই বিপজ্জনক।
‘আরব নিউজ’ থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম।
* স্যার জন জেনকিন্স: ‘পলিসি এক্সচেঞ্জ’র সিনিয়র ফেলো। তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত। ২০১৫ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত। ২০১৭ সাল পর্যন্ত মানামাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটেজিক স্টাডিজে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়ের ফেলো।

খুচরা বাজারে সবজির দাম পাইকারির দ্বিগুণ

রাজধানীর কাওরান বাজার। মূলত সবজির পাইকারি বাজার হিসেবেই এর খ্যাতি। এ বাজারে গতকাল প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকা। মাত্র ১০০ গজ দূরে কাওরান বাজার সিটি করপোরেশন সুপার মার্কেট খুচরা বাজারে একই মুলা বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে। হাতিরপুল বাজারে এ মুলাই ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। একই মুলা মতিঝিলের রাস্তায় ২০ থেকে ২৫ টাকায় এবং খিলগাঁও এলাকায় ভ্যানে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার কাঁচা বাজারগুলোয় রীতিমতো নৈরাজ্য চলছে। পাইকারি বাজারের সাথে খুচরা দামের সামঞ্জস্যতা নেই। মিল নেই এক বাজারের সাথে অন্য বাজারের। পাইকারি বাজার থেকে সবজি কিনে সামান্য দূরে এনেই দ্বিগুণ দাম হাঁকেন খুচরা বিক্রেতারা। একই বাজার থেকে কিনে এনে একেক দোকানি বিক্রি করছেন একেক দরে। আর যারা ভ্যান কিংবা মাথায় ফেরি করছেন তাদের দাম অন্যরকম। বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি পাইকারিতে ১৫ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে পাইকারি থেকে অন্তত ২০ টাকা বাড়িয়ে খুচরাপর্যায়ে শিম ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শালগম ৩০ থেকে ৪০ টাকা, চিচিঙ্গা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করল্লা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, গাজর ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বেগুন ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। শীতের মওসুমে সবজির এমন অযৌক্তিক দামে ক্ষুব্ধ ক্রেতাসাধারণ।
মালিবাগ কাঁচাবাজারে কথা হয় গৃহিণী সালমা আকতারের সাথে। তিনি বলেন, আমরা প্রায়ই খুচরা দোকানদার থেকে সবজি কিনি। তাই তারা বেশি নিচ্ছে না কম নিচ্ছে সেটি তারতম্য করতে পারি না। তবে এবারে শীতের মওসুমে সবজির দাম আগের থেকে বেশি। তিনি বলেন, বাজার মনিটরিং না থাকলে খুচরা দোকানিরা তো বাড়তি লাভ করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। বাড়তি দামের পক্ষেও যুক্তি রয়েছে খুচরা বিক্রেতাদের। খিলগাঁও কাঁচাবাজারের বিক্রেতা সোলায়মানের দাবি, বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি। কাজেই কোনো কিছু কম দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। তার মতে, সবজি বিক্রি করে যে লাভ হয় তা দিয়ে কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। দোকান ও বাসার ভাড়া দিতে হয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল দিতে হয়। চাল, ডাল, লবণ ও তেল কিনতে হয়। সব কিছুরই তো দাম বেশি। সবজির দাম কম হওয়ার সুযোগ কই? খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত বড় পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৬২ টাকায়। এ ছাড়া আদা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ভারতীয় মসুরের ডাল ৮০ টাকা এবং দেশি ডাল ১১০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়। আটার কেজি ৩৪ থেকে ৩৫, ময়দা ৬০ থেকে ৬৫, সয়াবিন তেলের লিটার ১০৫ থেকে ১১০ টাকা এবং ডিমের ডজন বিক্রি হয় ৯০ টাকায়। মাছের বাজারে গতকাল প্রতি কেজি রূপচাঁদা ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা, ইলিশ মাছ ৬৫০ থেকে ১৭০০ টাকা, কাতলা ২৮০ থেকে ৩৫০, রুই মাছ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, টেংরা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, চিংড়ি ৪৬০ থেকে ১০০০ টাকা, তেলাপিয়া ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, পাঙ্গাশ ১২০ থেকে ১৮০ বিক্রি  হয়। বাইম, বোয়াল, আইড়, পোয়া, পাবদা প্রভৃতি বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। এ দিকে সপ্তাহের ব্যবধানে চালের বাজারে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। মোটা স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকা, বিআর ২৮ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৬২ থেকে ৬৫ টাকা, নাজিরশাইল মানভেদে ৫৫ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা যায়।

রূপচর্চায় হলুদ

প্রাচীনকাল থেকে হলুদ আমাদের সৌন্দর্য চর্চায় অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় আমাদের দেশে বর-কনের গায়ে হলুদের একটি রীতি যুগ যুগ ধরে প্রচলিত আছে। প্রবাদ আছে হলুদের ছোঁয়ায় বিয়ের কনের রূপ-লাবণ্য ফুটে ওঠে। সৌন্দর্য চর্চায় এখন নানা রকম উপাদান ব্যবহৃত হয়; কিন্তু হলুদের ব্যবহারের উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা চিরকালই অপরিবর্তনীয়। ত্বকের যত্নে কাঁচা হলুদের ব্যবহার সব সময়ই একটি মূল উপাদান। সৌন্দর্য চর্চায় নানাভাবে আমরা হলুদের ব্যবহার করে থাকি। হলুদের জাদুকরী ছোঁয়ায় ত্বকের আভা ও কোমলতা ফুটে ওঠে রূপলাবণ্যে।
ফেসপ্যাক হিসেবে হলুদের ব্যবহার
রোদে পোড়া ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে হলুদের তৈরি ফেসপ্যাকগুলো দ্রুত কাজ করে। কাঁচা হলুদ বাটা, কাঁচা দুধ অথবা টকদই একসাথে মিশিয়ে ত্বকে লাগালে এবং ১৫ মিনিট পর তা ধুয়ে ফেললে ত্বকের কালচে ভাব দূর হয়ে ত্বকের উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। ত্বকের মেচতা ও বলিরেখা সারাতে হলুদ বাটা, বেসন, কাঁচা দুধ একসাথে মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের বলিরেখা ও মেচতার সমস্যার চমকপ্রদ সমাধান হয়। কাঁচা হলুদ অ্যান্টিওক্সিডেন্ট হিসেবেও বেশ কার্যকরী। ত্বকে ব্রণ এবং ব্রণের দাগ দূর করতে কাঁচা হলুদ বাটা, লেবুর রস, কেশর একসাথে মিশিয়ে ত্বকে লাগিয়ে ১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিনের ব্যবহারে ত্বকের দাগ ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাবে। ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখতে ১ চা চামচ হলুদ বাটা, ১ চা চামচ মধু, ১ চা চামচ দুধ,
২চা চামচ বেসন মিশিয়ে একটি প্যাক তৈরি করুন। এটি ত্বকে মেখে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে অন্তত দুইবার এ প্যাকটি ব্যবহার করলে ত্বকের আভা লাবণ্য, উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে। শুষ্ক, স্বাভাবিক, তৈলাক্ত ও মিশ্র ত্বকের জন্য হলুদের ব্যবহার সব ফেসপ্যাকেই হয়ে থাকে। কাঁচা হলুদ বাটা, কমলার খোসা বাটা, মুলতানি মাটি, মধু একসাথে মিশিয়ে হাত, মুখ, পায়ে লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বক থাকবে উজ্জ্বল, কোমল, মসৃণ। মানবদেহ থেকে টক্সিন বের করে ত্বককে উজ্জ্বল করতে আধা কাপ হলুদের রস ও আধা চা চামচ মধু মিশিয়ে খেতে হবে। নারিকেল তেলের সাথে হলুদ বাটা মিশিয়ে পায়ের গোড়ালিতে কিংবা পায়ের তলার ফাটা অংশে মেখে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে নিলে পায়ের ত্বক কোমল-মসৃণ হবে এবং পা ফাটার সমস্যা থেকে মুক্ত হবেন।

ডায়াবেটিস সম্পর্কে এসব জেনে রাখা দরকার

এখন তো ঘরে ঘরে একজন করে ডায়াবেটিস রোগী। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আগামী দিনে ডায়াবেটিসের প্রকোপ যে আরো ভয়ানক ভাবে বাড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তো প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। ডায়াবেটিস রোগকে চিকিৎসা পরিভাষায় ডায়াবেটিস মেলিটাস নামেও ডেকে থাকেন।
এটি একটি মেটাবলিক ডিজঅর্ডার। এই রোগ হলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস মূলত দু ধরনের হয়, টাইপ-১ ডায়াবেটিস এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগীর শরীরে পর্যপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি হতে পারে না। ফলে রক্তে ব্লাড সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে শুরু করে। আর এমনটা হলে বারবার প্রস্রাব চাপা, ক্ষিদে বেড়ে যাওয়া, ক্লান্তি, ওজন হ্রাস অথবা বৃদ্ধি, ক্ষত শুকতে দেরি হওয়া এবং মাথা যন্ত্রণা হওয়ার মতো লক্ষণগুলি দেখা যায়। এই প্রবন্ধে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রসঙ্গে কিছু জরুরি তথ্য় পরিবেশন করা হল যা সবার জেনে নেয়া আবশ্যক।
ফ্যাক্ট ১ : এই ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা অল্প বিস্তর মিষ্টি খেতেই পারেন। তাতে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মিষ্টির দিকে ফিরেও তাকাবেন না।
ফ্যাক্ট ২ : অনেকে মনে করেন জিনগত কারণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়। এই কথা সম্পূর্ণ সত্যি নয়। কারণ একাধিক কেস স্টাডি করে দেখা গেছে বেশির ভাগ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী তাদের জীবনযাত্রার কারণে এই রোগে আক্রান্ত হন। খুব কম ক্ষেত্রেই জিনগত কারণে এই রোগ হয়ে থাকে।
ফ্যাক্ট ৩ : সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে যেসব নারীর পলিসিসটিক ওভারিয়ান সিনড্রম আছে তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এমনটা হয় মূলত কিছু হরমোনের পরিবর্তনের কারণে।
ফ্যাক্ট ৪ : মা যদি স্বাভাবিকের থেকে বেশি ওজনের বাচ্চা প্রসব করেন তাহলে আগামী সময়ে গিয়ে তার টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। এমনটা হয় মূলত হরমোনের পরিবর্তন এবং ওজন বৃদ্ধির কারণে।
ফ্যাক্ট ৫ : ঠিক সময়ে যদি টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা শুরু করা না হয় তাহলে শরীরে শর্করার মাত্রা বেড়ে গিয়ে ওজন বৃদ্ধি এবং কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই যথা সময়ে এই রোগের ট্রিটমেন্ট শুরু করাটা মাস্ট!
ফ্যাক্ট ৬ : ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করার পাশাপাশি রোগী যদি নিয়মিত শরীরচর্চা করেন এবং ডায়েটের দিকে খেয়াল রাখেন তাহলে অনেকাংশেই টাইপ-২ ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

আইফোনের জন্য হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচার

এখন যোগাযোগের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ। আর রোজ নতুন নতুন ফিচার্স নিয়ে এসে গ্রাহকদের ঝঞ্ঝাট কমানোয় মোটেই কোনো ঘাটতি রাখছে না ফেসবুকের মালিকানাধীন এই মেসেজিং অ্যাপটি। সম্প্রতি ব্যবহারকারীদের জন্য আরো দারুণ একটি ফিচার নিয়ে এসেছে হোয়াটস অ্যাপ। গাড়ি চালাতে চালাতে এবার আরো সহজ হোয়াটস অ্যাপ।
আইফোন এবং আইপ্যাডে হোয়াটসঅ্যাপ ২.১৮.২ ভার্সন আপডেট করলেই ব্যবহারকারীরা পেয়ে যাবেন নতুন এক ফিচার্স। অ্যাপল আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে এসেছে কার-প্লে ইন্টিগ্রেশন। এর মাধ্যমে আপনাকে পুশ নোটিফিকেশন অন করলেই আপনি কথপোকথন চালাতে পারবেন খুব সহজেই। আইফোন ও আইপ্যাড ব্যবহারকারীরা হোয়াটস অ্যাপের ২.১৮.২ ভার্সন আপডেট করলে কার-প্লে ড্যাসে হোয়াটস অ্যাপের আইকন দেখতে পাবেন। তারপর সিরি ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে আপনার কনট্যাক্ট লিস্টে থাকা ব্যক্তিদের সহজেই হোয়াটস অ্যাপের মেসেজ দেখতে ও পাঠাতেও পারবেন।

বইমেলায় বিশেষায়িত বই ‘হ্যাকিংয়ের গোলকধাঁধা’

প্রতিনিয়ত আমরা তথ্যপ্রযুক্তির সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছি। আমাদের দৈনন্দিন সব কাজই হয়ে পড়ছে প্রযুক্তি নির্ভর। তবে যথাযথ নিরাপত্তার অভাবে হ্যাক হতে পারে যেকোনো সিস্টেম এবং তা প্রায়শই হয়েও উঠছে, আর এর ফলে কোটি টাকার লোকসান হওয়ারও সম্ভাবনা আছে।
তাই দেশের সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত বাগস-বাউন্টি প্লাটফর্ম ‘বাগসবিডি’ (www.bugsbd.com)-এর প্রচেষ্টায় সাইবার নিরাপত্তার এই বিষয়টিকে বিস্তারিত তুলে ধরতেই সাইবার সিকিউরিটির দুই গবেষক, দিলোয়ার আলম ও মনিরুজ্জামানের লেখা ‘হ্যাকিংয়ের গোলকধাঁধা’ বইটি এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে নিরাপদ থাকতে হলে সচেতনতার পাশাপাশি জানতে হবে নিরাপদ থাকার কৌশলগুলোও। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে অধিকাংশ মানুষ সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে অজ্ঞ। বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা ও হ্যাকিং সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এ বইটিতে। বইটি পাওয়া যাচ্ছে বাংলা একাডেমীর লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের ২৪ নং স্টলে। এর মূল্য ২৮৫ টাকা হলেও বইমেলায় বিশেষ ছাড় চলছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধক টিকা ব্যবহারেই তিন শিশুর মৃত্যু

ফিলিপাইনে ডেঙ্গু প্রতিরোধক টিকা ডেঙ্গভ্যাক্সিয়ার ব্যবহারের পর মারা যাওয়া ১৪ শিশুর মধ্যে তিনজনের প্রাণহানির জন্য প্রতিষেধকটি দায়ী বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিপাইন সরকার জানিয়েছে, ডেঙ্গভ্যাক্সিয়ার ব্যাপকভিত্তিক টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত না।
খবর রয়টার্সের। বিশ্বের প্রথম ডেঙ্গুর টিকা বাজারে ছেড়েছিল ওষুধপ্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্যানোফি। গত বছরের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, যারা কখনো ডেঙ্গুর ভাইরাসে আক্রান্ত হননি, ডেঙ্গুর টিকা তাদের শরীরে মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই খবর জানার ফিলিপাইনে হুলস্থুল পড়ে যায়। কারণ ২০১৬ সাল থেকে দেশটিতে আট লাখেরও বেশি স্কুলগামী শিশুকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের টিকা দেয়া হয়েছিল। স্যানোফির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, যে পরিবারগুলো তাদের সন্তান হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা সহানুভূতি প্রকাশ করছি।আমরা বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গু আক্রান্ত কয়েক কোটি মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে চেয়েছি। গত বছরের নভেম্বরে ফিলিপাইনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত করেন। এই টিকা দেয়ার পর দেশটিতে যে চৌদ্দটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাতে এর কোন অবদান আছে কিনা, তা জানতে দশ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের নির্দেশ দেন। শেষ পর্যন্ত তিনটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে ডেঙ্গভ্যাক্সিয়ার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।

জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিবেদনে সই করলেন না তারিক রামাদান

ব্রিটিশ সরকারের উপদেষ্টা ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক রামাদান তার বিরুদ্ধে আনা যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফরাসি ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার পর তাকে একটি প্রতিবেদনে সই করতে বলা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। গত বছরের অক্টোবরে হিন্দা আয়ারি ও নাম প্রকাশ না করা আরেক নারী রামাদানের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে পৃথক দুটি মামলা করেন। ২০০৯ ও ২০১২ সালে তারা ধর্ষণের শিকার হন বলে দাবি করেছেন। খবর বিবিসি, আল-জাজিরা ও ওয়াশিংটন পোস্টের ফরাসি পুলিশ জানিয়েছে, সুইস নাগরিক রামাদানের বিরুদ্ধে মাস তিনেক ধরে তদন্ত চলছে। আয়ারির বিরুদ্ধেও পাল্টা মানহানির মামলা করেছেন রামাদান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের শত্রুরা তার বিরুদ্ধে অপ্রপ্রচারে নেমেছে। প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে গত বুধবার ফরাসি পুলিশের হাতে তিনি আটক হয়েছেন।রামাদানকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে কিনা, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেট সেই সিদ্ধান্ত নিবেন। রামাদানের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগটি তোলেন হিন্দা আয়ারি। যিনি এক সময় ইসলামের কট্টর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ও নারীবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।
মিসরীয় ইমাম ও মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল-বান্নার নাতি তারিক রামাদান মুসলমানদের কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, তিনি এমন এক ইসলামের কথা প্রচার করছেন, যেটা ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গতিহীন। ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে তা উঠিয়ে নেয়। ২০১৬ সালে আয়ারি একটি বই লিখেন, যাতে চার বছর আগে প্যারিসের একটি হোটেল কক্ষে নিজের ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিবরণ দেন। তবে সেখানে তিনি কোন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। এক সময়ের কট্টর ইসলামপন্থী বলে পরিচিত আয়ারি ২০১৫ সালে ফ্রান্সে শার্লি হেবদো হামলার পর নিজেকে একজন উদারপন্থী বলে ঘোষণা করেন। একই বছর তিন সন্তান সঙ্গে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ইসলামিক মৌলবাদ থেকে নারীদের সুরক্ষা করতে বর্তমানে তিনি লিবেরাট্রিকস নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান পরিচালন করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ইউজেন রোগান বলেন, রামাদান একজন বিখ্যাত মুসলিম হওয়ায় তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। ইউরোপীয়ানদের একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে।

ফ্রান্সে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত: নিহত পাঁচ

ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে সেনাবাহিনীর দু`টি প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে পাঁচজন নিহত হবার খবর পাওয়া গেছে। বিবিসি সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় পর্যটন নগর সেন্ট-ত্রোপেজ থেকে প্রায় ৩০ মাইল উত্তর-পশ্চিমের ছোট শহর ক্যাব্যাস ও কারকেসের মধ্যবর্তী একটি বনভূমিতে আর্মি’স স্কুল অব লাইট অ্যাভিয়েশনের(ইএএলএটি)-এর দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় দুটি হেলিকপ্টারে থাকা ৬ আরোহীর মধ্যে পাঁচ জনই নিহত হয়েছেন। তবে ষষ্ঠ আরোহীকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঠিক কী কারণে হেলিকপ্টার দু'টি বিধ্বস্ত হয়েছে তা এখনো পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। তবে জায়গাটি বসতিহীন হওয়ায় অন্য কেউ হতাহত হয়নি। ইতিমধ্যে ২০ সেনা সদস্য এবং ৩০ পুলিশ কর্মকর্তাসহ দুটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

রাশিয়াকে রুখতে আমেরিকার ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক পরমাণু অস্ত্র!

মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদফতর পেন্টাগন নতুন পরমাণু নীতি ঘোষণা করেছে। এতে দাবি করা হচ্ছে, মস্কোকে মোকাবেলায় ছোট আণবিক অস্ত্র তৈরি করবে আমেরিকা। ‘নিউক্লিয়ার পোসচার রিভিউ’ বা এনআরপি নামে শুক্রবার মার্কিন এ নীতি প্রকাশ করা হয়। রাশিয়াকে মোকাবেলা করার উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করল পেন্টাগন যার মাধ্যমে ওবামা আমলের পরমাণু নীতির অবসান হলো বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পরমাণু অস্ত্রের ভূমিকা কমিয়ে আনার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যাও কমানোর নীতি অনুসরণ করেছিলেন তিনি। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস সূচনা বক্তব্যে নতুন নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা হচ্ছে বাস্তবতার নিরীখে পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং বিশ্ব বিষয়টি সেভাবেই দেখবে বলে তিনি আশা করেন। তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার পরমাণু সক্ষমতা বাড়ানো এবং তাদের কৌশল ও অস্ত্রের ধরনের মোকাবলায় মার্কিন সরকার এ ব্যবস্থা নিচ্ছে। পেন্টাগন ধারণা করছে, রাশিয়া মনে করে আমেরিকার পরমাণু অস্ত্র এতো বেশি বড় যে, তা খুব বেশি কার্যকরী নয়। সে কারণে পেন্টাগন ছোট আকারের পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। আমেরিকা যদিও ছোট পরমাণু অস্ত্র বানানোর কথা বলছে যার শক্তি হবে ২০ কিলোটনের কম তারপরও তা অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে আমেরিকা যে বোমা ফেলেছিল, এসব ছোট পরমাণু বোমার ধ্বংস-ক্ষমতা তার মতোই হবে। আমেরিকার হাতে ব্যাপক ধ্বংস-ক্ষমতার হাজার হাজার পরমাণু বোমা রয়েছে।

পাকিস্তানি জঙ্গিবিমানের সাফল্য : ‘দৃষ্টিসীমার বাইরে’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

পাকিস্তানে তৈরি জেএফ-১৭ জঙ্গিবিমান থেকে সফলতার সঙ্গে ‘দৃষ্টিসীমার বাইরে’ ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে দেশটির বিমান বাহিনী। একে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী এবং পুরো জাতির জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা বলে উল্লেখ করেছে দেশটির গণমাধ্যম। শুক্রবার পাকিস্তানের সোনমিয়ানি ফায়ারিং রেঞ্জ থেকে জেএফ-১৭ বিমান উড্ডয়ন করা হয় এবং বিমান থেকে ধীর গতির লক্ষ্যবস্তুর ওপর ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ এবং ‘ইনফ্রারেড’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
পাকিস্তান বিমান বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমান থেকে ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল সোহেল আমান সরাসরি এ মহড়া দেখেন। মহড়ায় বিমান পরিচালনা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য অত্যন্ত উঁচুমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তৃতায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান সোহেল আমান অসাধারণ এ শক্তি অর্জনের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি বলেন, আজকের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো জেএফ-১৭ বিমান যুদ্ধক্ষেত্রে বহুমূখী ভূমিকা পালনের ক্ষমতা রাখে। তিনি এ বিমানকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেন। বিমানটি তৈরিতে পাকিস্তান ও চীনের যেসব কর্মী ভূমিকা রেখেছেন তাদেরও প্রশংসা করেন এয়ার চিফ মার্শাল সোহেল আমান।

সু চি’র বাসভবনে পেট্রোল বোমা হামলাকারী গ্রেফতার

মিয়ানমারে দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি’র বাসভবনে যে পেট্রোল বোমা হামলা চালানো হয়েছে সেই হামলাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হামলাকারী তার অপরাধ স্বীকার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, লোকটি মানসিক ভারসাম্যহীন। বৃহস্পতিবার সু চি'র লেকের পাড়ের বাগানবাড়িতে এ হামলা চালানো হয়।
এ সময় তিনি সেখানে ছিলেন না। এই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে কর্মকর্তারা উইন নাইং (৪৮) নামের এক ব্যক্তিকে শুক্রবার ভোরে গ্রেফতার করেছে। ইয়াঙ্গুন পুলিশ ফেসবুকে জানিয়েছে, ‘লোকটি একটি বোতলে পেট্রোল ভরে ওই বাড়ির কম্পাউন্ডের ভেতর নিক্ষেপ করার কথা স্বীকার করেছে।’ তিনি একটি আবাসন কোম্পানীতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন বলে পুলিশ ফেসবুকে জানায়। পুলিশ জানায়, লোকটি ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বলেই তাদের ধারণা। তবে তারা তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

যুবরাজ মোহাম্মদ-জেনারেল বাজওয়ার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া রিয়াদে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রেডিও পাকিস্তান এ খবর জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয়ে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। বৈঠকে সৌদি আরবের মন্ত্রিপরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট উপস্থিত ছিলেন। পাকিস্তানি সেনাপ্রধান পৃথক বৈঠকে সৌদি আরবের পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রিন্স ফাহদ বিন তুর্কি বিন আব্দুল আজিজের সাথে বৈঠকে উভয় দেশের সামরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। গত দুই মাসের মধ্যে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের এটা দ্বিতীয়বার সৌদি আরব সফর।

এখনো তাজা শোকের ক্ষত

• ৮ জনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় অগ্রগতি এক বছরেও হয়নি।
• জামিনে মুক্ত চালক ও সহকারী
খাগড়াছড়ির আলুটিলার আলোক নবগ্রহ ধাতু চৈত্য বৌদ্ধবিহারের পুণ্যার্থীদের ওপর বেপরোয়া চালকের ট্রাক তুলে দেওয়ার ঘটনার প্রথম বর্ষপূর্তি আজ। গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারির এই দিনে ঘটে যাওয়া ওই দুর্ঘটনায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা আটজন পুণ্যার্থী নিহত হন। বছর ঘুরতে চললেও ঘটনার পর পুলিশের দায়ের করা মামলায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছেন মামলার দুই আসামি চালক ও চালকের সহকারী। এ কারণে হতাশ নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। সেদিনের দুর্ঘটনায় নিহত উচনু মারমা (১৬), নেইম্রা মারমা (৪০), ববি মারমা (১৫), টুনটুনি মারমা (৭), অং ক্যা চিং মারমা (১৬) ও মাথিন মারমা (৭)—এই ছয়জনই জেলার মহালছড়ি উপজেলার চৌংড়াছড়ি গ্রামের বাসিন্দা। নিহত অপর দুজন হলেন রামগড়ের চাথোয়াই মারমা (১৫) ও মাটিরাঙ্গার পলু মারমা (১৬)। আলুটিলা দুর্ঘটনার এক দিন পর ৪ ফেব্রুয়ারি মাটিরাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক মো. মোজাহের হোসেন বাদী হয়ে ট্রাকচালক মো. পলাশ (৪৫) ও তাঁর সহকারী নুরুজ্জামানের (১৭) বিরুদ্ধে মামলা করেন। দুই আসামিকে অভিযুক্ত করে একই বছরের ৩০ এপ্রিল খাগড়াছড়ি বিচারিক আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে বলে জানান মাটিরাঙ্গা থানার ওসি সৈয়দ জাকির হোসেন। ঘটনার পর চালক ও সহকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও বর্তমানে তাঁরা জামিনে মুক্ত আছেন। খাগড়াছড়ি আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. আরিফ ইকবাল বলেন, মামলাটি বিচারের জন্য খাগড়াছড়ি মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই মামলায় ২০ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তবে সাক্ষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,
এ পর্যন্ত তাঁরা আদালতে হাজির হওয়ার কোনো নোটিশ পাননি।  খাগড়াছড়ি সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম চৌংড়াছড়ি পাহাড়ি গ্রামের অবস্থান। গ্রামের বাসিন্দারা সবাই মারমা সম্প্রদায়ের। গতকাল শুক্রবার ওই গ্রামে গিয়ে শোকাবহ পরিবেশ দেখা গেছে। আজ শনিবার নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে গ্রামে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন, ফানুস ওড়ানো ও ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গ্রামবাসী। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক জামিনে মুক্তি পেয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। ট্রাকচাপায় নিহত উচনু মারমার মা মিপ্রু মারমা বলেন, ছেলেটা নেই, এটা এখনো বিশ্বাস হয় না। দুর্ঘটনার সময় তাঁর ছেলে উচনু এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। অনেক কষ্টে ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে এতদূর এনেছেন। ঘাতক ট্রাক সব শেষ করে দিল। অথচ এক বছরেও ছেলের হত্যাকারীদের বিচার হয়নি। চৌংড়াছড়ির একটি দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত রনি মারমা (২২) ও চিংলা মং মারমা (১৩)। দুজনের পা ভেঙেছিল। এখনো সেরে ওঠেননি তাঁরা। দুর্ঘটনার সময় রনি মারমা মহালছড়ি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারেনি। সুস্থ হতে তার আরও এক বছর লাগবে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

লন্ডনে বাংলাদেশিকে হত্যাকারীর ৪৩ বছরের কারাদণ্ড

গত রমজানে লন্ডনের একটি মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের ওপর চালানো এক সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাকরাম আলী (৫১)। ওই ঘটনায় আটক হামলাকারী ড্যারেন অসবর্নকে ৪৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে এ রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারক চিমা গ্রাব ওই হামলাকে একটি সন্ত্রাসী আক্রমণ আখ্যায়িত করেন বলেন, উগ্রবাদী চিন্তা থেকে বর্ণবাদী আদর্শের প্রভাবেই মুসলিমদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করে ওই হামলা চালানো হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার জুরিবোর্ডের ১১ সদস্য সর্বসম্মতভাবে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার দায়ে অসবর্ণকে দোষী সাব্যস্ত করে। আটকের পর থেকে রায় ঘোষণা পর্যন্ত হামলাকারী অসবর্ণ মোট ২২৪ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। তার মোট সাজা থেকে এই সময়টি বাদ যাবে বলে জানিয়েছেন আদালত। গত বছরের জুন মাসে উত্তর লন্ডনের ফিন্সব্যারি পার্ক মসজিদে তারাবির নামাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন মুসল্লিরা। এ সময় মুসল্লিদের ওপর ভ্যানগাড়ি উঠিয়ে দেন ৪৮ বছর বয়সী হামলাকারী অসবর্ন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু ঘটে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মাকরাম আলীর। আহত হন আরও ৯ জন। ৬ সন্তানের জনক মাকরাম আলী নামাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন। আশপাশের লোকজন হামলাকারীকে ঘটনাস্থলেই আটকে ফেলেন। পরে তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। সেদিন হামলাকারী অসবর্ন বলছিলেন,
তিনি সর্বোচ্চসংখ্যক মুসলিমকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। তবে শুনানিতে তিনি দাবি করেন, যখন হামলা চালানো হয়েছিল, তখন চালকের আসনে ছিলেন ‘ডেইভ’ নামের অন্য একজন। আদালত এটিকে অপরাধ ঢাকতে অসবর্নের বানানো গল্প বলে আখ্যায়িত করেন। ওয়েলসের বাসিন্দা অসবর্ন ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে কয়েক শ মাইল পাড়ি দিয়ে এসে লন্ডনে মুসল্লিদের ওপর ওই হামলা চালান। শুনানিতে বলা হয়, অসবর্ন ১৫ বছর বয়স থেকে নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। গত ৩০ বছরে তিনি ১০২টি অভিযোগে মোট ৩৩ বার আদালতে হাজির হয়েছেন। হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তাঁর মধ্যে বর্ণবাদী চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ইন্টারনেটে মুসলিম-বিদ্বেষী বিভিন্ন নেতার বক্তব্য শুনতেন বলে আলামত মিলেছে। মাকরাম আলীর মেয়ে রোজিনা আখতার বলেন, ঘটনাস্থলের পাশেই তাদের বাসা। ফলে এ পথে হাঁটতে গিয়ে বাবা হারানোর দুঃসহ যন্ত্রণা তাঁদের মনে পড়ে। মাকরাম আলীর জীবনে কোনো শত্রু ছিল না মন্তব্য করে তিনি বলেন, বাবার এমন মৃত্যু তাঁরা মানতে পারছেন না। ছয় সন্তানের জনক মাকরাম আলী ১০ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। বাংলাদেশে তাঁদের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথে। হামলাকারী অসবর্নের বাবা ৭৩ বছর বয়সী জন অসবর্ন ডেইলি মেইলকে বলেন, জীবনের বড় একটি সময় তিনি বিদেশে কাটিয়েছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। তাঁর অনেক মুসলিম বন্ধু রয়েছে জানিয়ে জন বলেন, ছেলের এই কর্ম তাঁর জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে।

খনিতে আটকে থাকা ৯০০ শ্রমিক উদ্ধার

দক্ষিণ আফ্রিকায় সোনার খনিতে আটকে পড়া নয় শতাধিক শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ডিপার্টমেন্ট অব মিনারেল রিসোর্সেস আজ শুক্রবার সকালে উদ্ধারের খবর নিশ্চিত করে। এর আগে ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মাটির এক কিলোমিটার গভীরে ৯৫৫ জন শ্রমিক আটকা পড়েন। ২৪ ঘণ্টা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধারকর্মীরা অবশেষে একটি লিফটে বিদ্যুৎ-সংযোগ দিতে সমর্থ হন। তবে প্রকৌশলীরা তখনো জরুরি জেনারেটর-ব্যবস্থা চালু করতে সমর্থ হননি।
জোহানেসবার্গ থেকে ২৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ওয়েলকোম শহরে এই খনিটি অবস ্থিত। সাইবানি-স্টিলওয়াটার নামের একটি কোম্পানির তত্ত্বাবধানে রয়েছে এটি। খনিটির ২৩টি ভাগ রয়েছে এবং ভূমি থেকে এটি প্রায় ১০০০ মিটার গভীরে।শ্রমিকদের উদ্ধারের পর সেবা দিতে বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে রয়েছে। এর আগে পরিচালন প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র জেমস ওয়েলস্টেড জানিয়েছিলেন, কারও অবস্থা খুব খারাপ—এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে খাদ্য ও পানি সরবরাহ পৌঁছানো সম্ভব হয়। বিশ্বের প্রধান সোনা উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকার এ শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। ২০১৭ সালে দেশটিতে খনি দুর্ঘটনায় ৮০ জনের বেশি হতাহত হন।

তিনি জানতেন, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্বপূর্ণ by মিজানুর রহমান খান

বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞার পদত্যাগে কোনো বিস্ময় নেই, এটা আকস্মিক নয়। সরকার ও আদালতের সংশ্লিষ্ট মহলের এটা প্রায় সবারই জানা ছিল, তাঁকে ডিঙানো হলে তিনি পদত্যাগ করবেন। কারণ, অনেক আগে থেকে তিনি প্রায়ই এটা প্রকাশ্যে বলতেন।  এমনকি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছেও বারবার বলেছেন, জ্যেষ্ঠতার নীতি মানা না হলে তিনি থাকবেন না। তাই মনে হয় সরকার ভেবেচিন্তেই তাঁর পদত্যাগ এবং বিব্রত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছে। তবে সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ এটা এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা কার্যত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলে আওয়ামী লীগের যুক্তি ও ব্যাখ্যা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি ওই রায়ে আরও বলেছিলেন, ‘প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি (পারসেপশন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (ভাইটাল) ভূমিকা রাখে।’ এ ছাড়া ২৮ বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির নেতা হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে যে প্রস্তাব পাস করিয়েছিলেন, গতকাল তার আরেকটি লঙ্ঘন তিনি তাঁর নিজের জীবনেই প্রত্যক্ষ করলেন। এরশাদের সামরিক শাসনে তিনি জেলও খেটেছিলেন। গত ৯ বছরে তৃতীয়বারের মতো জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি পদে আপিল বিভাগের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হলো। আওয়ামী লীগের গত সাত বছরে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি পদত্যাগ করলেন। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার প্রস্থানপর্বে ওয়াহ্হাব মিঞার ভূমিকা সরকারের জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল। অনেকে এটা তাঁর আপসকামিতা হিসেবে দেখেন। তাই কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেছিলেন যে তিনি হয়তো প্রধান বিচারপতি হতে পারেন। প্রধান বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে আনা সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া লিখিত বিবৃতির বিচারিক যথার্থতা নিয়ে অনেকেই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছিলেন। ১৯৮৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী অবসরে গেলে জেনারেল এরশাদ কর্মে প্রবীণতম বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে চাননি। তখন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সম্পাদক হিসেবে তাঁর আনা প্রস্তাব পাস হয়েছিল: আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারককেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা ‘সাংবিধানিক রেওয়াজ ও ঐতিহ্য’। বহুল আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা গত ১০ নভেম্বর পদত্যাগ করেন। বিচারপতি সিনহা তাঁর পদত্যাগপত্রে ‘কারণ’ ব্যাখ্যা করেছেন। মনে হয়, বিদায়ী প্রধান বিচারপতি সিনহার স্বাভাবিক অবসরের তারিখটি পেরোনোর অপেক্ষায় ছিলেন রাষ্ট্রপতি। ৩১ জানুয়ারি সিনহার অবসরে যাওয়ার তারিখের পরেই নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে গত ৯ বছরে অনেক পর্যবেক্ষকের মতে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ তৃতীয়বারের মতো আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারককে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে। এর আগে একজন বিচারককে একাধিকবার ডিঙানোর পরেও তাঁর প্রধান বিচারপতি হওয়ার নজির ছিল। কিন্তু বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞার অবসরে যাওয়ার তারিখ ছিল আগামী ১০ নভেম্বর। আর নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির অবসরের তারিখ ২০২১ সালে। তাই বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞার পক্ষে প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা আর নেই।
দুবার ডিঙানো
এর আগে ২০১০ সালে বিচারপতি এম এ মতিনকে ডিঙিয়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে প্রধান বিচারপতি করা হয়। এর প্রতিবাদে বিচারপতি এম এ মতিন আর আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এজলাসে বসেননি। অপর বিচারপতি শাহ আবু নইম মোমিনুর রহমানকে ডিঙিয়ে ২০১১ সালে বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনকে প্রধান বিচারপতি করার পরদিন তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। একটি মাত্র বাক্যে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র লিখেছিলেন। তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে কোনো কারণ ব্যাখ্যা করেননি বলে জানা গেছে। বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির চেয়ে দেড় বছর আগে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। পদত্যাগী বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা ও নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি যথাক্রমে ১৯৯৯ সালে এবং ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম হাইকোর্টের বিচারক হন। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ উভয়ে একই দিনে আপিল বিভাগের বিচারক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
বিলম্বের নেপথ্যে
আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক এর আগে প্রথম আলোকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার অবসরের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের যোগসূত্র নাকচ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটল। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তাঁর পদত্যাগপত্রে কিছু মন্তব্য করেছিলেন। এ কারণে তাঁর পদত্যাগপত্র ‘গ্রহণ’ করলেও প্রধান বিচারপতি পদ শূন্য বা সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদের আওতায় অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। জানতে চাওয়া হলে আইনমন্ত্রীর পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কখনো কি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে?’ তিনি কি এক বাক্যের একটি নিরীহ পদত্যাগপত্র দিয়েছেন? এর উত্তরে আইনমন্ত্রী অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি এক বাক্যের পদত্যাগপত্র দেননি। আইনমন্ত্রী নিশ্চিত করেছিলেন যে ষোড়শ সংশোধনীর রায় প্রসঙ্গে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্রে মন্তব্য করেছিলেন। এ ছাড়া মনে হয়, সরকার সিনহার পদত্যাগের ঝড়ের পরে আপিল বিভাগে আরেকটি সম্ভাব্য পদত্যাগের চাপ কমাতেও সময় নিয়েছিল।
দুধভাত
ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে পদত্যাগী বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে গত বুধবার নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষে যেসব যুক্তি দেন, তা নাকচ হয়ে যায়। ওই রায়ে বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা বলেছিলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রবর্তন করা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুরোপুরি সংবিধানসম্মত এবং বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর অধীনে নির্বাচন করার কোনো বিকল্প নেই। কোনোভাবেই এটা গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথক্করণ, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।’ ২০০৬-০৮ সালে সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থার অপব্যবহারের জন্য তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, ব্যর্থতা ব্যক্তির, ব্যবস্থার নয়।
বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের দ্বারা নির্বাচনকালীন সরকারের পক্ষে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর আসীন থাকার ধারণা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নির্বাচিত ও অনির্বাচিতদের যুক্তি খণ্ডন করে তিনি লিখেছিলেন, ‘সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরে প্রধান উপদেষ্টা ও বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা সমান্তরাল হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দল যদি সরকারি প্রশাসনকে ব্যবহার করে কারচুপি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের নির্বাচিত ঘোষণা করে, তাহলেও তাদের সংবিধানের ৬৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত বোঝাবে না। তেমন সংসদকে সত্যিকার অর্থে বৈধ বা সার্বভৌম বলা যাবে না। সেই সংসদের জনপ্রতিনিধিত্ব চরিত্র থাকবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’ ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত ওই পর্যবেক্ষণের পাঁচ বছর পরে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা ২০১৭ সালের ৩ জুলাই আলোচিত ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়েও পুনরায় লিখেছিলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, একটি “পোশাকি গণতন্ত্র” “প্রকৃত গণতন্ত্রকে” ধ্বংস করে দিয়েছিল।’ নির্বাচনকালীন সরকারের যে ধারণা সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার দিয়েছেন, তার বিপরীতে একটা জোরালো ব্যাখ্যা তাঁর রায়ে উল্লিখিত আছে বলে মনে হয়। শেখ হাসিনা সংসদে পুনরায় বিএনপির ‘সহায়ক সরকারকে’ সংবিধান পরিপন্থী বলেছেন। আর বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বিলুপ্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই বাংলাদেশের জন্য একান্ত দরকারি মনে করেছিলেন।ক্ষমতাসীন দল থেকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচন হওয়ার বহুল ব্যবহৃত উদাহরণের বিরুদ্ধে তাঁর উত্তর, ‘অন্তর্বর্তীকালীন বা নিয়মিত সরকারের ধরন কী হবে তা প্রতিটি জাতি তার প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট করে এবং তা নিয়ে তাদের গর্বিত হওয়ারও সুযোগ থাকে। নির্বাচনকালে মন্ত্রিসভা ক্ষমতায় থাকলে দলের সঙ্গে তাদের শক্তিশালী সংশ্লিষ্টতা থাকে। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা তাঁদের সব ধরনের সরকারি সুবিধাসহ নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এ কারণে জনপ্রশাসন তাঁদের প্রভাবে নাজুক থাকে এবং এ কারণে তাঁরা নির্বাচনে কারচুপি করতে সক্ষম হন। অথচ অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার সেভাবে প্রভাবিত হওয়ার কারণ থাকে না।’ ত্রয়োদশ সংশোধনী একটি সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা তাঁর রায়ের উপসংহারে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে একবাক্যে সহমত পোষণ করেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। মামলার রায়ে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের দ্বারা রায় পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি ভিন্নমত দিয়েছিলেন। লক্ষণীয় যে ষোড়শ সংশোধনীর সর্বসম্মত রায়ে তিনি আরও লিখেছিলেন, সংসদের পাস করা আইন বাতিলে আদালতের এখতিয়ারের বিধান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই করে গেছেন, যা পরে কখনো খর্ব করা হয়নি। ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ১৬ তম সংশোধনী না থাকার যুক্তিও তিনি তাঁর রায়ে দিয়েছিলেন। পদত্যাগী বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিঞা সংসদের উদ্দেশে নির্দিষ্টভাবে এই মন্তব্যও করেছিলেন যে, ‘সংবিধানের সংশোধনী দুধভাতের মতো হওয়া উচিত নয়। আমি এটা বলছি কারণ ৩০ জুন ২০১১ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পাস করানো হয়েছিল, সেটা মাত্র ৩ বছর ২ মাস ১০ দিন যেতেই ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করা হলো।’ জামালপুরের মাদারগঞ্জ থেকে তিনি ময়মনসিংহ বারে ১৯৭৪ সালে একজন সাধারণ আইনজীবী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ঢাকায় তাঁর দীর্ঘকালীন সিনিয়র ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান। ছাত্রজীবনে কোনো সংগঠন করেননি। দুই ছেলে (প্রকৌশলী ও আইনজীবী), এক মেয়ে (ব্যাংকার)। স্ত্রী গৃহবধূ। উত্তরায় প্লট পেয়েছিলেন, এখনো খালি পড়ে আছে। ঢাকায় বাড়ি নেই।

পথ পথিকের by মামুনুর রশীদ

ফুটপাতে মানুষ হাঁটবে, মানুষের এইটুকু অধিকারের কথা বলতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হামলার শিকার হতে হয়েছে। দেশের একমাত্র মহিলা মেয়র ফুটপাতে মানুষের অধিকার কায়েমের কথা বললেন। এ কথা স্বীকার্য যে পথ পথিকের। শতসহস্র বছর ধরে মানুষ পর্বতগাত্রে, সমতলভূমিতে, খেতের আল দিয়ে পথ নির্মাণ করেছে। সে সময় পদব্রজের। পায়ে হেঁটে পরিব্রাজকেরা শত শত মাইল ভ্রমণ করেছেন। যন্ত্রসভ্যতার কালে অবশ্য মানুষের পথ সংকুচিত হয়েছে। ফুটপাত নামক অপরিসর পথপার্শ্বে তার ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই স্থানটুকু বহু বছর ধরেই দখল করে নিয়েছে দোকানি-হকার। পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দোকানির দেশও বলা যায়। যেখানে-সেখানে দোকান। পথে, স্টিমার-লঞ্চের ঘাটে, বাসস্টেশনে, ট্রেনস্টেশনের বিধিবদ্ধ দোকান বাদ দিয়ে পুরো এলাকাই দোকানিদের দখলে। দেশের শহর এলাকাগুলোতে নিত্যনতুন দোকানের ছড়াছড়ি। পৌর প্রশাসন স্টেডিয়াম, জলাশয়, খেলার মাঠ, সিনেমা হল, নাট্যমঞ্চ, লাইব্রেরি-সব জায়গায় দোকানের জায়গা অধিকার করেছে এবং বিপুল অর্থের লেনদেনের ব্যবস্থা হচ্ছে। দোকান মানেই অর্থ। আজকে আর হাটবাজারের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট এলাকাও নেই।
উপজেলা শুধু নয়, একেবারে গাঁও-গ্রামেও মার্কেট শুধু নয়, সুপারমার্কেটের দালান গড়ে উঠেছে। ঢাকা এখন দোকানের নগর। দেশের সিনেমা হলগুলো রাতারাতি সুপারমার্কেটে রূপান্তরিত; এমনকি নাট্যমঞ্চগুলো ভেঙেও সেখানে মার্কেট করতে হবে। জেলা শহরগুলোতে জিনিসপত্রের দোকান ছাড়াও কিছু শিক্ষার দোকান গড়ে উঠেছে। কোচিং সেন্টার নামে এসব শিক্ষা ধ্বংসের সর্বগ্রাসী দোকানিরা পোস্টার-ফেস্টুন দিয়ে একেবারেই শহরের দিগন্তকে ঢেকে ফেলেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ঢাকার বাইরের শহরগুলোও জনাকীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং কিছুটা প্রবৃদ্ধি বাড়ার ফলে দোকানপাটের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এই শহরগুলোতে কেনাকাটাও প্রচুর। সব ব্র্যান্ডের দোকানও রয়েছে এসব শহরে। সেখানেও ফুটপাত সংকুচিত। কোথাও কোথাও ফুটপাতের ওপর মোটামুটি দোকানপাটের একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও পাকা। চার লেনের বেশ কয়েকটি রাজপথ হয়েছে। ঢাকা-টাঙ্গাইলের যেটুকু রাস্তা চার লেন হয়েছে, সেখানে দুটি লেন মোটামুটি গাড়ির গ্যারেজ ও দোকানপাট দখল নিয়ে নিয়েছে। রাস্তা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা না জেনে, না বুঝে যার যার সুবিধামতো বেচাকেনার জায়গা যদি হয়ে যায়, তাহলে এত বড় বড় রাস্তা করে কী হবে? আর সেই রাস্তা দিয়ে কি চলাচলের সুবিধা হবে? দেশে প্রচুর রাস্তাঘাট হয়েছে সন্দেহ নেই কিন্তু যানজট তবু কমছে না। কয়েকটি প্রধান রাস্তা ব্যবহারে বিশৃঙ্খলা। ঢাকা শহরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এখনো রয়ে গেছে সেই প্রাচীন ম্যানুয়েল পদ্ধতির। কয়েক বছর আগেও লাল বাতি, সবুজ বাতি, হলুদ বাতির স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল, এখনো তা চালু আছে কিন্তু যন্ত্রকে অমান্য করে তা মানুষ হস্তগত করেছে। বিপুল বিশাল এই শহরের জটিল যান নিয়ন্ত্রণ কতিপয় ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে কী করে সম্ভব? আর ওই যে অসহায় বাতিগুলো দিনরাত জ্বলে জ্বলে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল হচ্ছে, তার টাকা কে দেবে? এই অসহায় নাগরিকেরাই তো। এই ব্যবস্থার মধ্যে গাড়ি চালান, বিশেষ করে ক্ষমতাবানদের গাড়ির চালকেরা আইন অমান্য করে উল্টো পথে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মোটরসাইকেল আরোহী। সময় বাঁচাতে গিয়ে এই চালকেরা ট্রাফিক আইন অমান্য করে উল্টো পথে এমনকি ফুটপাত দিয়েও গাড়ি চালাচ্ছেন। গাড়ির মালিকদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশ বা সার্জেন্ট যে কত অসহায়, তার অনেক ঘটনাই শহরবাসী জানে। মোটরসাইকেল ফুটপাতের পথিকের অধিকার কেড়ে নিয়ে এখন তাদের রাস্তা বানিয়ে ফেলেছে। যতটুকু রাস্তা আছে সে অনুপাতেই গাড়িঘোড়া থাকা প্রয়োজন। ঢাকা বা দেশের বড় শহরের মধ্যে কত গাড়ি, রিকশা, ট্যাক্সি, মোটরসাইকেল চলতে পারে, তার পরিসংখ্যান কোথায় আছে জানি না। তবে সাধারণ জ্ঞানে গাড়ির চাপ থেকে অনুমান করা যায়, পরিমাণের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি গাড়ি রয়েছে। তবু প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি বিক্রি হচ্ছে এবং সেগুলো রাস্তায় নামছে।
চট্টগ্রাম বন্দরেও রাতদিন গাড়ি খালাস হচ্ছে। জার্মানি, জাপানসহ অন্যান্য দেশে গাড়ি কিনে পনেরো বছর রুট পারমিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এখানে এক দিনও না। রাজস্ব বিভাগ গাড়ির ওপর কর বাড়িয়ে সরকারের আয় বাড়াচ্ছে বটে কিন্তু জনজীবন যে পর্যুদস্ত হচ্ছে সেদিকে খেয়াল করছে না। আবার ব্যাংকগুলো গাড়ি কেনার ঋণ দিতে গাড়ির দোকানে গিয়ে ধরনা দিচ্ছে। গাড়ির জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি গ্যাসের মজুতও কমে আসছে। বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির প্রয়োজন পড়বে শিগগিরই। হাজার হাজার গাড়ি বিক্রি হচ্ছে কিন্তু সে তো বিদেশি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি। দেশে কি একটা গাড়ির কারখানা হতে পারে না, যেখানে গাড়ির এত বড় বাজার? রাশিয়ার জার পিটার দ্য গ্রেট একবার বলেছিলেন, ‘আমি রাশিয়ার জার না হয়ে পোল্যান্ডের শ্রমিক হলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতাম; কারণ, আমার দেশে একটিও গাড়ির কারখানা নেই। এখন তো যৌথ মালিকানাধীন গাড়ির কারখানা সম্ভব।’ ফুটপাত দখলের প্রয়োজন দরিদ্র হকারদের স্বার্থে যে নয়, তা প্রমাণের অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। সবটাই ক্ষমতাবানদের কালোটাকা উপার্জনের উপায়। পথঘাট যে মানুষের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে, একটা চরম বিশৃঙ্খলা এবং সময়ের বিশাল অপচয় হচ্ছে, যার ফলে মানুষের জন্য নগর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কি আমরা তাকাব? নাকি নগরের ভিআইপিদের স্বার্থে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাকে অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ওপর ছেড়ে দেব? এই শহরের মধ্যেই যদি সেনানিবাস এলাকায় স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল কঠোরভাবে কার্যকর রাখা যায়, তবে সর্বত্র তা সম্ভব নয় কেন? আমাদের সরকার সবকিছু একাই করতে চায় তার প্রশাসনের মাধ্যমে। জনগণকেও সম্পৃক্ত করা দরকার। পাড়া-মহল্লার নাগরিকদের এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। উল্টো পথের গাড়ি, মোটরসাইকেল বা রিকশাচালকদের বিরুদ্ধে জনগণও পুলিশকে সহযোগিতা করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। একটি দেশের শৃঙ্খলা বোঝা যায় রাস্তায় নামলে। দেশটা যেহেতু সবার, তাই একটি বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রের নাগরিক কে হতে চায়?
মামুনুর রশীদ অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক।

জনতুষ্টিবাদ সেখানে কতটা ভিন্ন? by স্লাভোমির সিয়েরাকোভস্কি

গণভোটের মধ্য দিয়ে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়া-২০১৬ সালের এই দুটি ঘটনা জনমনে এই ধারণা সৃষ্টি করেছিল যে পূর্ব ইউরোপীয় ঘরানার জনতুষ্টিবাদ গোটা পশ্চিম সমাজকে গ্রাস করতে চলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। ‘টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জ’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্টিন ইয়ারম্যান, ইয়াসা মুঙ্ক ও লিমুর গুলচিন যেমনটা দেখিয়েছেন: একমাত্র ইউরোপের কমিউনিস্ট-পরবর্তী পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতেই জনতুষ্টিবাদ নিয়মিত ভিত্তিতে প্রসারিত হচ্ছে।
প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোকে এই মতাদর্শ পরাজিত করে আসছে। পূর্ব ইউরোপের ১৫টি দেশের সাতটিতেই এখন জনতুষ্টিবাদী ধারার দল ক্ষমতায়, আরও দুটি দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে তারা আছে; আর তিনটিতে তারা প্রধান বিরোধী শক্তির ভূমিকায়। মার্টিন ইয়ারম্যান, ইয়াসা মুঙ্ক ও লিমুর গুলচিন আরও দেখিয়েছেন, ২০০০ সালে পূর্ব ইউরোপের মাত্র দুটি দেশে জনতুষ্টিবাদী দলগুলো মাত্র ২০ শতাংশ বা তার সামান্য কিছু ভোট পেয়েছিল। ওই অঞ্চলের অন্তত ১০টি দেশে সেই পরিমাণ ভোট এখন তারা পাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপে জনতুষ্টিবাদ প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠার নেপথ্যে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কাজ করেছে, কাগুজে তথ্য-উপাত্তের বাইরে সেগুলোকেও আমাদের আমলে নিতে হবে। প্রথমেই বুঝতে হবে, পশ্চিমা গণতন্ত্রে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ধর্মী যে ভারসাম্যের রেওয়াজ আছে, পূর্ব ইউরোপে স্পষ্টতই তার ঘাটতি আছে। পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির চেয়ারম্যান ও দেশটির কার্যত প্রধান শাসক জারোস্লাভ কাসজিনস্কির মতো ট্রাম্প চাইলেই বিচারিক সিদ্ধান্তকে উড়িয়ে দিতে পারেন না অথবা নিরাপত্তা বাহিনীকে বিরোধী শক্তির ভূমিকায় ঠেলে দিতে পারেন না। ট্রাম্প ও তাঁর নির্বাচনী প্রচার দলের সদস্যদের সঙ্গে রাশিয়ার যোগসাজশ থাকার বিষয়টি তদন্ত করছেন যে স্পেশাল কাউন্সেল রবার্ট মুয়েলার, তাঁর দিকটি দেখলেও জিনিসটা বোঝা যাবে। মুয়েলারকে নিয়োগ দিয়েছেন মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল রড রোজেনস্টেইন। রোজেনস্টেইন সরাসরি ট্রাম্পের অধীনে সরকারি চাকুরে। মুয়েলার ও রোজেনস্টেইন-দুজনকেই যখন-তখন বরখাস্ত করার ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতে আছে। তারপরও তিনি তাঁদের বরখাস্ত করার সাহস দেখাচ্ছেন না। কিন্তু কাসজিনস্কির ক্ষেত্রে একই কথা বলা যাবে না। পূর্ব ইউরোপীয়দের সঙ্গে পশ্চিমাদের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, পূর্ব ইউরোপীয়রা পশ্চিমাদের চেয়ে বেশি বস্তুবাদী চেতনা ধারণ করে। দৃশ্যমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিতে পূর্ব ইউরোপীয়রা পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক বেশি জোর দিয়ে থাকে। সমাজবিজ্ঞানী রোনাল্ড ইঙ্গলেহার্ট এটিকে বলেছেন, ‘বস্তুবাদোত্তর চেতনা’। এই পার্থক্যের একটি লক্ষণীয় দিক হলো, পূর্ব ইউরোপীয় সমাজগুলোতে বাক্স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত উদারপন্থী প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হয় বেশি। এতে খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই। আসলে পূর্ব ইউরোপে উদারনৈতিকতাবাদ পশ্চিম থেকে আমদানি হয়ে এসেছে।
ট্রাম্প ও ব্রেক্সিট ইস্যু দিয়ে বিচার না করলেও চলবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক উদারনৈতিকতাবাদের দিক থেকে বহু আগে থেকেই যূথবদ্ধ। পূর্ব ইউরোপের দলগুলোর মধ্যে বর্তমানে ডানপন্থী বনাম বামপন্থী অবস্থা নয়, বরং ‘ঠিক’ বনাম ‘বেঠিক’ অবস্থা চলছে। জার্মানির উদারনীতি বিরোধী কট্টর তাত্ত্বিক কার্ল স্মিথের ‘হয় মিত্র, নয় শত্রু’ মতবাদ তাঁরা ভালোভাবেই গ্রহণ করেছেন। সেখানকার প্রতিটি দল নিজেদের প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী মনে করে। প্রতিপক্ষকে তারা অবৈধ মনে করে। পরস্পরকে তারা শুধু পরাজিত করতে চায় না, একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চায়। পশ্চিম ইউরোপে এমনটা নয়। পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপীয় জনতুষ্টিবাদের আরেকটি বড় পার্থক্য হলো, পূর্ব ইউরোপে শুধু শ্রমিকশ্রেণির সমর্থনই নয়, মধ্যবিত্তের সমর্থনও তারা পায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, কমিউনিস্ট-পরবর্তী সময়ে পোল্যান্ডের মানুষ, তাদের তখনকার ও এখনকার জীবন-জীবিকার মান নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না। সেখানকার ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মনে করেন, সে দেশের আর্থিক অবস্থা সন্তোষজনক। আর ভোটাররা তাঁদের বিচার বিভাগ, শরণার্থী অথবা অন্য কোনো বিষয়ে নিজেদের মতামত খুব একটা প্রকাশ করেন না। এর বদলে তাঁরা তাঁদের নেতাদের বক্তব্যকেই বেদবাক্য বলে মেনে নেন।
স্লাভোমির সিয়েরাকোভস্কি ওয়ারশতে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির পরিচালক

৮ ফেব্রুয়ারি কী হবে by সোহরাব হাসান

প্রশ্ন উঠেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি কী হবে?
প্রথমেই পাঠককে জানিয়ে রাখি, বাংলাদেশে দিন-তারিখ ধরে কিছু হয় না। অতীতে আমরা অনেক ট্রাম্প কার্ডের বয়ান শুনেছি। কিছু হয়নি। বড় বড় অঘটন ঘটে হঠাৎ করেই। তাই ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়ে একটি ক্ষীণ আশা যে হয়তো তেমন কিছু ঘটবে না। প্রায় চার বছর বিচারিক কার্যক্রম চলার পর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে কয়েক দিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও অন্যতম আসামি। এ জন্যই বাড়তি কৌতূহল ও চাপান-উতোর। মামলার রায় সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল বিএনপি এখন মুখোমুখি। বিশেষ করে, গত মঙ্গলবার আরেকটি মামলায় (জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) হাজিরা শেষে খালেদা জিয়া আদালত থেকে ফেরার পথে পুলিশের ওপর হামলা ও প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে বিএনপির কয়েক শ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃত নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়ও রয়েছেন। অনেককে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। সরকারের দাবি, যাঁরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছেন, তাঁদেরই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাহলে শত শত নেতা-কর্মীকে কেন পাকড়াও করা হচ্ছে? কেন ঢাকার বাইরেও অভিযান চালানো হচ্ছে?
সরকার বিএনপির নেতা-কর্মীদের এই আকস্মিক হামলায় কিছুটা ভয় পেয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। এ কারণে রাস্তায় তারা যাতে বড় কোনো সমাবেশ ঘটাতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। প্রথমে বিএনপির চিন্তা ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি বড়সড় জমায়েত থেকে খালেদা জিয়া আদালতে যাবেন মামলার রায় শুনতে। আনুষ্ঠানিক কোনো জমায়েত নয়। তাঁর গাড়ি যেই পথে যাবে, সেই পথে দলের নেতা-কর্মীরাও থাকবেন। কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনার পর সরকারের লাগাতার গ্রেপ্তার অভিযানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সরকারের অভিযান মোকাবিলায় বিএনপি কী কৌশল নেয়, সেটা দেখার বিষয়। তারা কি সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হবে, নাকি এক পা এগিয়ে দুই পা পেছানোর’ নীতি অনুসরণ করবে? মঙ্গলবারের ঘটনায় বিএনপির নেতারাও অনেকটা হতভম্ব। তাঁরা মনে করেন, সেদিনের ঘটনা ছিল সরকারের ফাঁদ, দলের কিছু কর্মী না বুঝে তাতে পা দিয়েছেন। এ অবস্থায় বিএনপি ৮ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে কোনো সংঘাতে যেতে চায় না। দলের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, মামলার রায় যা-ই হোক না কেন, মামলাটি যেভাবে প্রচারিত হয়েছে, রায় ঘোষণার আগেই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যেভাবে খালেদা জিয়াকে গালমন্দ করা হচ্ছে, তাতে রাজনৈতিকভাবে বিএনপিই লাভবান হবে। আজ হোটেল লা মেরিডিয়ানে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক বসছে। ৭০০ জন আমন্ত্রিত হয়েছেন। এই বৈঠকে তৃণমূলের নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করার কথা। ২০১৭ সালের মার্চে কাউন্সিলের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক হচ্ছে। যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস অন্তর তাদের বসার কথা। বিএনপির নেতারা এ-ও মনে করেন, দলের চেয়ারপারসনের মামলা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড আবেগ আছে। সে ক্ষেত্রে এমন কিছু করতে হবে, যাতে কর্মীরা চাঙা থাকেন। রায়ের পর প্রতীকী হলেও কিছু কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকতে চাইছে বিএনপি। অন্যদিকে সরকারের চিন্তাভাবনা হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় নিয়ে বিএনপি যাতে নিজেদের ‘শক্তি প্রদর্শন’ করতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকা। নতুন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, ‘অরাজকতা হলে মানুষের জানমাল রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেবে পুলিশ।’ সব সরকারই মানুষের জানমাল রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়ে থাকে। কিন্তু সেই কঠোর অবস্থান যে কখনো কখনো আরও বেশি জানমালের ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে, সেটি তারা খেয়াল রাখে না। ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন যদি বিএনপির নেতা-কর্মীদের ঢাকায় আসা ঠেকাতে ঢাকার সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাতে তো ঢাকা এবং এর আশপাশের জেলাগুলোর জনজীবন স্থবির হয়ে পড়বে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
প্রতিবার সরকার জননিরাপত্তা রক্ষার নামে বিরোধী দলের (বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি) কর্মসূচি মোকাবিলায় সবকিছু বন্ধ করে দেবে এবং সাধারণ মানুষ অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হবে, এটি চলতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকার নিজেকে ডিজিটাল দাবি করছে আর বিরোধী দলকে মোকাবিলায় সেকেলে অ্যানালগ অস্ত্র ব্যবহার করে চলেছে। মাননীয় ডিজিটাল মন্ত্রী বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলার একটি ডিজিটাল পদ্ধতি উদ্ভাবন করলে দেশবাসী উপকৃত হবে। আবার এক দশকের বেশি সময় ধরে রাস্তায় থাকা বিএনপিকেও বুঝতে হবে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে কিংবা প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনিয়ে নিলেই আন্দোলন চাঙা হয় না। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা কোনোভাবে চান না জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু ঘটুক, যা আগামী নির্বাচন নিয়ে দল যে আন্দোলনে আছে, তাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কেননা এই মামলায় খালেদা জিয়ার জেল-জরিমানা হলেও সরকার তাঁকে নির্বাচন বা রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারবে না। তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করে অনায়াসে জামিন নিতে পারবেন। এ ব্যাপারে তাঁদের যুক্তি হলো ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী দুদকের মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। পরে তিনি আপিল করলে হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিল ঘোষণা করেন। এরপর দুদক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে হাইকোর্টকে পুনরায় শুনানির জন্য বলেন। সেই ঝুলন্ত রায় নিয়েও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মন্ত্রিত্ব করছেন।বিএনপির নেতাদের ধারণা, সরকার এই মামলাকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে, যাতে বিএনপি আগামী নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু এবার তাঁরা ২০১৪ সালের মতো ভুল করতে চান না। বিএনপির কোনো কোনো নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, আওয়ামী লীগকে আর ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, একটি মামলার রায়ে বিএনপির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না। আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করা উচিত। অন্যদিকে সরকারেরও উচিত হবে না ৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে কেন্দ্র করে এমন অবস্থা তৈরি করা, যাতে ঢাকার জনজীবন অচল হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। সে ক্ষেত্রে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের একই সুযোগ থাকতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গতকালও বলেছেন, বিএনপি না এলে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। তবে শুধু কথা বললেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এখন ফেব্রুয়ারি মাস। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছে। সেই গ্রন্থমেলা যেন এক দিন বা এক মিনিটের জন্যও ব্যাহত না হয়, সেদিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সেটাই হবে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন।
সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি
sohrabhassan55@gmail.com

বড়দের খেলার পুতুল

চীনে নারী-পুরুষের অনুপাতে ব্যাপক তারতম্য দেখা দিয়েছে। নারীর তুলনায় বেড়ে গেছে পুরুষের সংখ্যা। বিয়ের জন্য সেখানে কনে অপহরণের ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এই অবস্থায় পুরুষদের একাকিত্ব ঘোচাতে নারীর আদলে ‘স্মার্ট’ পুতুল তৈরি করছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। এই পুতুল কথা বলতে পারবে, বাজনা শোনাতে পারবে। আবার প্রয়োজন হলে বাসনকোসন ধোয়ার কাজও তদারকি করবে! চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্দরনগরী দালিয়ানে রয়েছে ‘এক্সডল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর কারখানাতে তৈরি হচ্ছে নারীর আদলে পুতুল। শুধু পুতুল তৈরি করেই ক্ষান্ত হননি এক্সডলের প্রোগ্রামাররা। পুতুলে মানুষের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতেও দিনরাত পরিশ্রম করছেন তাঁরা। কথা শেখানো হচ্ছে নতুন পুতুলকে। একটি চেয়ারে বসিয়ে পুতুলকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তোমার নাম কী?’ জবাবে পুতুলটি রোবটের মতো বলে ওঠে, ‘আমার নাম হুসিআদি। তবে তুমি আমাকে বেবি বলেও ডাকতে পারো। কিন্তু মন ভালো না থাকলে আমি কোনো উত্তর দেব না।’ একটি ছোট প্রশ্নের জবাবে অনর্গল এত কথা বললেও, পুতুলটির ঠোঁট কিন্তু নড়ছিল না। অর্থাৎ কিছু রেকর্ড করা উত্তর দিচ্ছিল হুসিআদি। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্সডল বলেছে, এ ধরনের প্রোটোটাইপ পুতুলের মধ্যে আগামী বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যোগ করার পরিকল্পনা আছে তাদের। এতে পুতুলগুলো অনেকটাই মানুষের মতো হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকলে এই পুতুলই চীনের হাজারো অবিবাহিত পুরুষের একাকিত্ব দূর করতে পারবে। বর্তমানে চীনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। দেশটিতে এখন নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা ঢের বেশি। অঙ্কের হিসাবে ৩ কোটি ৩৬ লাখ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, নারী ও পুরুষের সংখ্যায় এই তফাত তৈরি হয়েছে আগে নেওয়া এক সন্তান নীতির কারণে। এ ছাড়া বিয়ের পর ছেলে সন্তানই চান দেশটির বেশির ভাগ দম্পতি। এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে সেখানে অবৈধ গর্ভপাতও ঘটছে অহরহ। এসবের প্রতিক্রিয়ায় চীনে এখন প্রতি ১০০ জন মেয়ের বিপরীতে জন্ম নিচ্ছে ১১৪ ছেলে। এক্সডল কোম্পানির বিপণন পরিচালক উ জিংলিয়াং বলেছেন, তাঁদের তৈরি পুতুল চীনের সামাজিক সমস্যা মেটাতে পারবে। তিনি বলেন, ‘চীনে নারীদের সংখ্যা কমে গেছে। এ কারণেই এসব পুতুলের চাহিদা রয়েছে। তবে শুধু যৌনতার কথা ভেবেই পুতুল তৈরি করা হচ্ছে না। এগুলো আপনার সঙ্গে কথোপকথন চালাতে পারবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সহকারী বা অভ্যর্থনাকারী হিসেবেও কাজ করতে পারবে।’ হুসিআদির দাম পড়বে চার হাজার মার্কিন ডলার। একটি মোবাইল অ্যাপ বা মৌখিক নির্দেশনায় পুতুলটি চালানো যায়। ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত এই পুতুল ব্যবহারকারীর মৌখিক নির্দেশনার উত্তর দিতে পারে। পুতুলের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ২ থেকে ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। প্রতি মাসে ৪০০টি পুতুল তৈরি করছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এক্সডল। ভবিষ্যতে চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

১৩ বছর ধরে দূষিত দুধ খাচ্ছে শিশুরা!

ফ্রান্সের দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ল্যাকটালিস বলেছে, শিশুদের জন্য তৈরি দুধে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়ে থাকতে পারে। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে ল্যাকটালিস অন্যতম। সম্প্রতি এর তৈরি শিশুখাদ্যে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার দূষণ ধরা পড়ার পর ফ্রান্স ও বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টিন শিশুখাদ্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। ল্যাকটালিসের সিইও ইমানুয়েল বেসনি বৃহস্পতিবার ফরাসি পত্রিকা লেস ইকোকে বলেছেন, দুধ তৈরির কারখানা এই দূষণের উৎস হতে পারে। সালমোনেলায় দূষিত দুধ পান করে শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর গত বছর প্রকাশিত হয়। ওই দূষিত দুধ ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলের একটি কারখানায় উৎপাদিত হয়েছিল। ইমানুয়েল বেসনি বলেছেন, একই ধরনের সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া ২০০৫ সালের কিছু সংক্রমণের জন্যও দায়ী। এটি হতে পারে যে তখন থেকেই বিভিন্ন কারখানায় ওই ব্যাকটেরিয়ার দূষণ শুরু হয়েছিল। ২০০৫ সাল থেকে শিশুরা দূষিত দুধ পান করছে—এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফরাসি সংস্থা দ্য ইনস্টিটিউট পাস্তুর জানায়, ২০০৫ সাল থেকে ফ্রান্সে দুই শরও বেশি শিশু সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার দূষণে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৮ জনের অসুস্থতা ধরা পড়ে। ২০০৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪১। এ ছাড়া ২০০৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ২৫ শিশুর শরীরে সালমোনেলার সংক্রমণ পাওয়া যায়।

হোঁচট খেয়ে মধ্যপথে ট্রাম্প by অনুপম দেবাশীষ রায়

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেওয়া প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শোনাল ঠিক প্রেসিডেন্টদের মতো। কেবল নির্বাচনের খাতিরে যে আক্রমণাত্মক আগ্রাসী প্রার্থী রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন চেয়েছিলেন, গত বুধবার রাতের ভাষণে মনে হলো, তিনিই ভেতরে-ভেতরে একজন রিপাবলিকান। ভোটে জয়ের খাতিরে আগ্রাসী আর আক্রমণাত্মক রূপ ধরেছিলেন। একেবারে একজন মার্কামারা রিপাবলিকানের মতো করে ট্রাম্প আওড়ালেন দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ আর আমেরিকান ড্রিমের বুলি, ঠিক যেন তিনি আশির দশকের রোনাল্ড রেগান। তিনি বললেন সমন্বয়ের কথা, একতার কথা। শতবর্ষী মিঠে কথার রাজনীতির সংস্কৃতি অনুসারে তিনিও দেখালেন স্বপ্ন, সেই পর্যন্ত পৌঁছানোর বাস্তবতাকে পুরোপুরি আবছা রেখেই। তবে যদিও ট্রাম্প একজন রাজনীতিবিদের মতো করে কথা বলতে বা স্ক্রিপ্ট পড়তে শিখে গেছেন, তাঁর পৃথিবী এখনো রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর ভাষণ শুনতে শেখেনি। যাঁরা ট্রাম্পকে ভালোবেসেছিলেন তাঁর সোজাসাপটা বক্তব্যের জন্য, তাঁর অনড় অবস্থানের জন্য আর তাঁর অরাজনীতিবিদসুলভ আচরণের জন্য, তাঁদের কাছে এই জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ বরং একটি হৃদয়ভঙ্গেরই কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের খুশি করবার জন্য কি যথেষ্ট বুলি আওড়াননি ট্রাম্প? তা আউড়েছেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের বিল গ্যালস্টনের মতে, তাঁর এই আবৃত্তি পুরোপুরি মিছে কথাও নয়। আমেরিকার অর্থনীতি আসলেই ফুঁসে উঠেছে, আয় বাড়ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে। ট্রাম্পের নেতৃত্বে এরই মাঝে পাস হয়েছে ট্যাক্স রিফর্ম, রক্ষণশীল বিচারকেরা পেয়েছেন আসন আর ওবামাকেয়ারের দারুণ অজনপ্রিয় স্বাস্থ্যবিমা কেনার বাধ্যবাধকতা গিয়েছে আস্তাকুঁড়ে (যদিও ওবামাকেয়ার পুরোপুরি বাতিলের বিষয়টি দারুণ হোঁচট খেয়ে পড়েছে)। কাজেই ভালো অর্থনীতিতে টিকে থাকা সব প্রেসিডেন্টের মতোই সব গুণ নিজের বলে দাবি করে বসেছেন ট্রাম্প। যদিও এর অনেকটাই তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে। উপাত্ত আসলেই বলছে যে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বেকারত্বের হার রেকর্ড পরিমাণে কমেছে, তবে এই কমার ধারা শুরু হয়েছিল সেই ২০১০ সালে। উপাত্ত আরও বলছে, আমেরিকার ঋণের বোঝাও বেড়েই চলেছে আর ট্রাম্পের নীতির কারণে আগামী দশকে তা এক ট্রিলিয়ন পেরোবে। তবে এসব ক্ষতিকর উপাত্ত লুকিয়ে ফেলা ট্রাম্পের জন্য কোনো ব্যাপারই নয়।
যতই তাঁর বিরোধীরা মাইক হাঁকাক না কেন, ট্রাম্পের কাছে টুইটার আছে! এ জন্যই বলছি যে ট্রাম্পের আজকের ভাষণটি আরেকটু হলেই সফল হয়ে যেত, যদি তাঁর সমর্থকেরা মধ্যপন্থী রক্ষণশীল হতেন। ট্রাম্পের আজকের ভাষণ আবারও প্রমাণ করেছে যে তিনি রক্ষণশীলদের বলে দেওয়া পথেই হাঁটছেন। তবে ট্রাম্পের জন্য দুঃসংবাদ হলো, তাঁর সমর্থকেরা খুব একটা মধ্যপন্থী নন যে এতে তাঁদের মন গলবে। তাঁর সত্যিকারের জীবন-মরণ সমর্থকেরা অনেক বেশি ভাবেন বরং অন্য একটি ইস্যু নিয়ে, যেটি নিয়েই ট্রাম্প কথা বলে ফেলেছেন বড্ড বেশি। আর সব ছেড়েছুড়ে কেবল অভিবাসন নিয়েই সবিস্তারে আলোচনা করতে গেছেন তিনি, আর সেটা বলতে গিয়েই বলে ফেলেছেন আপসের কথা। বলেছেন যে সীমান্তদেয়ালের জন্য ২৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ আর আইনগত অভিবাসন সীমিত করার বিনিময়ে তিনি দেড় মিলিয়নের বেশি কাগজবিহীন অভিবাসীকে নাগরিকত্বের সুযোগ করে দেবেন। তবে আইনি অভিবাসনের গলা টিপে ধরার কারণে আর বাজেটের থেকে দেয়ালের নামে টাকা নিয়ে যাওয়ার কারণে ডেমোক্র্যাটরা বা স্বাধীন মধ্যবামপন্থীরা এই আপসে রাজি হবেন বলে মনে হয় না। সত্যিকারের আপসে আসতে গেলে আর মধ্যপন্থীদের দলে টানতে গেলে ট্রাম্পকে আরও অনেক ছাড় দিতে রাজি হতে হবে। কাজেই আজকের ভাষণের মধ্য দিয়ে মধ্যপন্থীদের সঙ্গে পাওয়ার বদলে বরং নিজের দলের কড়া ডানপন্থীদের সমর্থন হারাতে বসেছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ (ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী) এরই মাঝে বলেছেন, কাগজহীনদের নাগরিকত্বের কথা বলে ট্রাম্প তাঁর প্রতিশ্রুতির খেলাপ করছেন। যে অতি ডান ব্রাইটবার্ট নিউজ তীব্রভাবে ট্রাম্পের পক্ষের শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, তাঁরাই এখন ট্রাম্পের বদনাম করে তাঁকে ডাকছেন ‘অ্যামনেস্টি ডন’ বা ক্ষমার সরদার। ডানপন্থী থিংক ট্যাংক হেরিটেজ অ্যাকশন ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও যত তীব্রভাবে তাঁর সমালোচনা করা যায়, ততটুকুন করছে। এর সব ঘটে গেছে আজকের ভাষণের আগেই। আর আজকের এই ভাষণে তাঁর এই সমালোচিত প্রকল্পের কথা আবারও আউড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বরং নিশ্চিত করলেন যে তাঁর অন্তঃপ্রাণ সমর্থকদের সবাই তাঁর প্রতিশ্রুতিতে আপসের কথা শুনছেন। কাজেই যে মুলা ঝোলানো রাজনীতির থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় ট্রাম্পকে তাঁরা ভোট দিয়েছেন, অনেকের কাছে মনে হবে যে ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে ঠিক সেই মুলা ঝোলানোর রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন ডিসির বাতাস আর রাজনৈতিক বাতাসার মিঠে ভাষা শিখতে শুরু করেছেন। তাঁর ভাষণ তাই সেই মিঠে ভাষার ওপরে ভাসা প্রচারণা আর ভবিষ্যৎ স্বপ্নের মাঝেই সীমিত থাকা উচিত ছিল। তা না করে বরং ট্রাম্প কথা বলতে গিয়েছেন তাঁর প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আর বেছে নিয়েছেন ঠিক সেই প্রকল্প, যেটি হয়তো ভেঙে দেবে তাঁর কঠিনতম সমর্থকদের হৃদয়। ট্রাম্পের সমর্থকেরা আজ টিভি খুলেছিলেন তাঁদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের হালখাতা দেখতে, তার বদলে ট্রাম্প তাঁদের ধরিয়ে দিয়েছে আদিম অকৃত্রিম মুলা, যার স্বাদ পেয়েই এত দশক ধরে রাজনীতিবিমুখ হয়ে ছিল আমেরিকার সুপ্ত সংখ্যাগুরু। কাজেই এই ভাষণের পর রিপাবলিকানরা যখন নির্বাচনে লড়তে যাবেন সামনের দিনে, তখন হয়তো তাঁদের হাতেও হারিকেন ধরিয়ে দেবে সুপ্ত জনতা—হয়তো লুপ্ত হয়ে যাবে তাদের ট্রাম্পকার্ড। অনুপম দেবাশীষ রায়: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ছাত্র, হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি, ওয়াশিংটন ডিসি।