Wednesday, February 4, 2015

অবহেলিত জীবনের কিছু কথা by তৌহিদুল ইসলাম

সমাজের মানুষের জীবন যাত্রায় আলোচিত ব্যস্ততায় উন্নয়ন অবকাঠামো তা হতে পারে তার নিজের, পরিবারের, সমাজের ও দেশের। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজটাকে ভাবতে পছন্দ করি নিজের মত করে। তাও তো ভাবি এতেই বা কম কিসে। আমরা আমাদের সমাজকে ভাবি শ্রেণী ভেদে যদিও শ্রেণী অবস্থানটা আমাদের সৃষ্ঠ আমাদের সুবিধায়। উচু শ্রেণীর মানুষেরা চিন্তা করে মধ্যবিত্তদের মাধ্যমে কিভাবে নিচু শ্রেণীর মানুষদেরকে ব্যাবহার করা যায়। আমরা কেবলই ভাবতে পারি নিচুদেরকে শুধুমাত্র স্বার্থে ব্যবহারের কথা তারাও মানুষ তা আমরা কখনও চিন্তাও করিনা। বাংলাদেশের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে যে স্থান ধরা হয় সেটি হল ”ঢাকা”। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় মানুষ কাজের সন্ধানে নিয়মিতই আসছে, লক্ষ্য হল আয়ের মাধ্যমে খেয়ে পরে জীবন ধারণ করা। এরমধ্যে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, মূর্খ এমনকি অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ ঢাকায় আসে কোন সঠিক পথ নির্ধারন না করেই, ৮০ বছরের বৃদ্ধ হতে শুরু করে ৭ বছরের শিশুরাও ঢাকা আসে কিছু একটা হবে আশায়। এর কারন হিসেবে ধরা হয় ঢাকা কেন্দ্রিক কর্মকান্ড ও কর্ম এলাকা বিকেন্দ্রি করনে ব্যর্থতার কথা। আগতদের কেউ কেউ কোন না কোন পেশায় নিজেকে উপার্যনক্ষম করে তোলে আবার কেউ ঘরে ফিরে যায় কোন কুল না পেয়ে আর যারা ফিরে যায় না তাদের ভিতরে নিম্ন শ্রেনীর লোকেদের মধ্যে এই প্রবনতা বেশি যারা কিনা বাড়ি থেকে একটা বড় ধরনের দূর্ঘঠনার কারণে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ঢাকা আসে। নদী ভাঙ্গন, সংসারের অভাব, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, সৎমায়ের অত্যাচার, স্বামীর অত্যাচার, পারিবারিক নির্যাতন ও কর্মসংস্থানের খোঁজে প্রধান কারন হিসেবে এগুলোর প্রভাবই বেশি। ঢাকায় এসে কাজ পেতে তাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় সহ্য করতে হয় সীমাহীন নির্যাতন, আর যারা কোন কাজের ঠিকানা পায় না তারা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন রেল স্টেশনে, বাসস্টান্ডে, বড় বড় কাঁচা বাজার, সরকারী ভবন ও সপিং মলের বারান্দায় আশ্রয় নেয়। পেশা হিসেবে বেছে শহরের মানুষের ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ঠাংশ সংগ্রহ যাদেরকে অনেকেই আমরা “টোকাই” বলে ডাকি, কেউ ভিক্ষা করে কিছু টাকা সংগ্রহ করে বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালে হকারি করে, কেউবা আবার ভিক্ষাটাকেই পেশা হিসিবে গ্রহন করে। এত কিছুর মধ্যেও যারা নিজেকে সংগঠিত করতে পারেনা তারা শহরের বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ে ছিনতাই, চুরি থেকে শুরু করে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশি প্রবনতা হচ্ছে যৌনকর্মী ও নেশাদ্রব্য বিক্রয় বিপনন কাজে ব্যবহার। সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ তাদেরকে ব্যবহার করে এসব অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যায় নির্বিগ্নে। এক পর্যায়ে এসে এসব মানুষ রাস্তায় জীবন যাপন নিয়তি হিসেবে মেনে নেয় এবং হয়ে যায় পথবাসী, পথই তাদের একমাত্র উৎকৃষ্ট পরিচয়। শহরের জীবন যাপনের জন্য পথবাসীরা নিয়মিতই সংগ্রাম করে যা একজন সমাজের সাধারণ মানুষ কল্পনাও করে না। তারা আমাদের শহরের অনেক গুরুত্ত্বপূর্ণ কাজ করে যা একটি শহরকে সুন্দর রাখতে যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কতৃক নিয়োগকৃত পরিচ্ছন্ন কর্মীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পথবাসী তারা রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে গৃহস্থালীর বর্জ্য সংগ্রহ এমন কি শহরের গুরুত্ত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহ পরিচ্ছন্ন রাখতে দিনরাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। জীবন ধারণের জন্য যারা মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যাদির উচ্ছিষ্টাংশ সংগ্রহ করে তাদের কৃত্ত্বিটা যেন একটু বেশি কারন সকলেই তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যটি ব্যবহারের পর একটা অংশ মাটিতে ফেলে দেয় তারা তা সংগ্রহ করে। করছে এ মানুষগুলো। ঢাকার বাসায় বাসায় অনেক পথবাসী মেয়েরা গৃহীনিদের গৃহস্থালীর কাজে সহযেগীতা করে, বিশেষ করে ব্যসেলরদের জন্য এবং যারা স্বামী স্ত্রী উভয়ই চাকুরি করেন তাদের সংসার জীবন তো একজন কাজের মানুষ ছাড়া অচল। এসব পথবাসী মেয়েরাই কোনে কোন সময় উচ্চাভিলাসি মানুষের মনোরঞ্জনের খোরাকের পন্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হকার নাম শুনলেই কেমন একটা অলসতা লাগে কারণ তারা প্রয়োজনীয় সকল পণ্য আমাদের হাতের কাছে পেতে সহায়তা করে। তারা আমাদের নগর জীবনের সাথে অতপ্রত ভাবে জড়িত, এই জানজট পূর্ণ শহরের জীবনকে সহজ করে দিতে কত না প্রচেষ্টাই করছে তারা। হাজারও সংগ্রাম করে জীবিকার তাগিদে এসব মানুষ বছরের পর বছর ধরে নুন্যতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞিত হয়েও ঢাকা শহরে বসবাস করছে। আমরা কি পারব তাদের অবস্থানে থেকে নিজেদের জীবন পরিচালনা করতে? পারব কি সমাজের অবহেলার মুখে সেই সমাজের জন্যই কিছু করতে? অন্তত ভাবতে তো পারবো তারাও রক্তে মাংসে গড়া আমাদের মত মানুষ।
লেখক: শিক্ষার্থী, এগ্রিবিজনেস বিভাগ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ইমেইল: touhid_i@ymail.com

নিউ ইয়র্কে ট্রেন-জিপ সংঘর্ষ: নিহত ৭, আহত ১২

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের হোয়াইট প্লেইন্স এলাকায় একটি যাত্রীবাহী ট্রেন রেলট্র্যাকের ওপর আটকে যাওয়া একটি জিপ গাড়িকে ধাক্কা দিলে, ট্রেনটির ৬ যাত্রী ও গাড়ির চালক নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২ জন। তাদের অধিকাংশই ট্রেনটির সামনের বগির যাত্রী বলে প্রাথমকিভাবে জানা গেছে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নিউ ইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো একটি সংবাদ-সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। ট্রেনের ধাক্কায় গাড়িটি বেশ কয়েক মিটার দূরে ছিটকে পড়ে। এ ঘটনায় ট্রেনের সামনের বগিতে আগুন ধরে যায়। গাড়িটি রেল-ট্র্যাকে আটকে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। চালক গাড়িটি ধাক্কা দিয়ে সরানোর জন্য গাড়ির পেছনে ছিলেন। মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি (এমটিএ) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনটির মোট ৮টি বগিতে ৪০০ যাত্রী ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। আজ সকালে ওই রেললাইনের কয়েকটি অংশ ট্রেন চলাচলের জন্য খোলা হবে না। এর পরিবর্তে যাত্রীদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিতে শাটল বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কুয়োমো দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ঘটনাকে ধ্বংসাত্মক ও মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেন। তবে ট্রেনটির বেশি যাত্রী আহত না হওয়ায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন কুয়োমো।

তাইওয়ানে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ১২

(তাইওয়ানে নদীতে পড়া বিমান থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করার তৎপরতা। ছবি: এএফপি) তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের কাছে নদীতে ট্রান্স-এশিয়ার একটি বিমান পড়ে যাওয়ার ঘটনায় কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আজ বুধবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, অভ্যন্তরীণ আকাশপথে চলাচলকারী এটিআর ৭২-৬০০ বিমানটি ৫৮ আরোহী নিয়ে নদীতে পড়ার আগে একটি সেতুর সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে ভেতর থেকে এসব লাশ উদ্ধার করা হয়। মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। কিলাং নদীতে বিমানটি অর্ধনিমজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। উদ্ধারকারীরা বিমানটিকে কেটে ভেতরে আটকে পড়া আরোহীদের বের করছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ঘটনায় ১৬ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেককে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ওই বিমানের ৩০ আরোহী এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
তাইওয়ানে দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটির আহত এক যাত্রীকে সরিয়ে নিচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: এএফপি

এখনো জরুরি অবস্থার পরিস্থিতি হয়নি : সংসদে প্রধানমন্ত্রী, দেশে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে : ড. কামাল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের মানুষের জানমাল নিরাপত্তার জন্য আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি। এখনো দেশে ইমার্জেন্সি দেবার মতো পরিস্থিতি হয়নি। তিনি বলেন, টক শো করে নানাভাবে এসব স্বপ্ন দেখে কোন লাভ  হবেনা। দেশকে আবার ওই ধরণের অসাংবিধানিক পন্থায় আমরা কখনো ছেড়ে দিতে দেবনা এবং জনগনও এটা চায় না। আর কেউ যদি এটা করতে চায় জনগনই রুখে  দেবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।
বুধবার বিকেলে সংসদে প্রশ্নোত্তরে  বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ  তাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিকালে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়াার সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
তাজুল ইসলাম চৌধুরী অভিযোগ করেন টকশোতে  আন্দোলনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম উসকানি দেয়া হচ্ছে এবং মদদ দেয়া হচ্ছে। এগুলো বন্ধে প্রধানমন্ত্রী পদক্ষেপ নেবেন কিনা জানতে চান তিনি।
জবাবে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা টক শো করে  তাদের শুভ বুদ্ধি হবে কিনা বা বুদ্ধির গোড়ায় ধোয়াটা কে দেবে। কারণ তাদের টার্গেটতো আমি। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধেই বেশী বলে যেটা আমি দেখি। কাজেই এটা কে তাদেরকে বুঝাবে।  এর মধ্যে কিছু লোক আছে তারা বসে আছে গতান্ত্রিক নীতি ব্যবস্থা থাকলে  উনাদের খুব একটা ভালো লাগেনা। অসাংবিধানিকভাবে পন্থায়  ক্ষমতায় আসলে তাদের গুরত্ব বাড়ে। কখনোই অসাংবিধানিক পন্থা আনা যায় কিনা সেই চেষ্টায়ই ব্যস্ত। কিন্তু ভুলে গেছেন তারা  যে এবারের পার্লামেন্টে  সংবিধানের সংশোধন করে ৭ম অনুচ্ছেদে যে খ ধারা যুক্ত হয়েছে  সেই খ ধারায় স্পষ্ট লেখা আছে  কেউ যদি সংবিধান লংঘন করে  ক্ষমতা দখল করে তাহলে  শান্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে এমকি  এখানে ক্যাপিটাল পানিসমেন্টেরও ব্যবস্থা আছে।
৭৫ এ জাতির পিতাকে হত্যার পর  বাাংলাদেশে বাংলাদেশে বার বার ক্যু হয়েছে। প্রায় ১৮/১৯টা ক্যু হয়েেেছ এই বাংলাদেশে। বহু মানুষ মারা গেছে। বহু হতাহত হয়েছে। আমরা চাইনা এই দেশে আর ওই ধরনের ঘটনা ঘটুক। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল ৯১ থেকে ৯৬ সালে তাদের অপকর্মের কারনে অথবা ৮১,  সাল থেকে ৮২ সাল পর্যন্ত এরপর ৭৬ সাল থেকে ৮২ সাল পর্যন্ত বিএনপি যখন ক্ষমতায়  তখন তাদের অপকর্মের কারণে  এদেশে মার্শাল এসেছে, এদেশে অসাংবিধানিতক পন্থা এসেছে। আর  ৭৫ এ জাতির পিতাকে  হত্যার পর তখন মার্শাল জারি করে জিয়াউর রহমান অবৈধভাবেে ক্ষমতা দখল করেছে। ঠিক ২০০১ থেকে ২০০৬ বিএনপি ক্ষমতায় তাদের  দু:শাসন জঙ্গীবাদী কর্মকান্ড তাদের কারণেই আবার সেই ২০০৭ সালে  এক এগার এর ঘটনা ঘটেছে।  সেখানে ইমার্জেন্সি দেয়া হয়েছে। একটা কথা বিএনপি  ভুলে যায়  অনেকেই বলে হয়ে যাচ্ছে  ইমার্জেন্সি হয়ে যাচ্ছে। ইমার্জেন্সি লাগবে কেন ? আইন শৃংখলা রক্ষাকারি সংস্থা আছে। কিভাবে এধরণের সন্ত্রাস দমাতে হয় তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য  জনগন যখন আমাদের সাথে  আবশ্যই আমরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইয়াজ উদ্দিন সাহেব ইমার্জেন্সি দিতে পেরেছিলেন কারণ তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উনি নিজে অথ্যাৎ এক্সিকিউটিভ হ্যাড অথ্যাৎ সরকার প্রধানও সে রাষ্ট্রপ্রধানও তিনি। এখন যদি ইমার্জেন্সি দিতে হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে লিখে দিতে হবে রাষ্ট্রপতিকে তখন রাষ্ট্রপতি ইমার্জেন্সি ঘোষনা করতে পারবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, যারা ককটেল মারছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারি সজাগ। ইতিমধ্যেই অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা হুকুমদাতা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং অর্থের যোগান কোথা থেকে আসছে, অর্থ কে দিচ্ছে সেটাও আমরা খুজে বের করছি।। আর গান পাউডার বিক্রি, খোলা পেট্রোল বিক্রি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছি। আমি নির্দেশ দিয়ে দিয়েছি খোলা পেট্রোল বিক্রি করতে পারবেনা, গান পাউডার কোথা থেকে আসছে সেটাও খোজা হবে।  আর যেই বোতল করে ককটেলবানাে হচ্ছে সেই বোতল  কোথায় তৈরী হচ্ছে  সেটাও খুজে বের করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজেই আমরা এখানে চুপ করে থাকিনাই। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।  তবে টক শো অলাদের ব্যাপারে জানিনা।  টক কথা বলা তাদের অভ্যাস। বিরোধী দলকে ( জাতীয় পার্টি) বলবো টকশোঅলাদের ব্যাপারে আপনারাই যা পারেন বলেন।
দেশে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে : ড. কামাল
সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট আইনজীবি ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন দেশে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে মন্তব্য করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস্ত্র ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার আসল অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের রাজনীতি শুরু করছে।
ড. কামাল বলেন, কারা পেট্রল বোমা মারছে কে এগুলো বানাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করে সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে তারা মনে করছে আমরা ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছি। তিনি সকলকে বাড়ির ছাদে গিয়ে একযোগে স্বৈরাচার নিপাত যাক শ্লোগান দেয়ার আহবান জানান ।
ড. কামাল বলেন, এখন যা চলছে তা হলো প্রতারণার রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে সকাল তেকে রাত পর্যন্ত জাতির সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে।
গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মরহুম সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক এর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার ইডেন কমপ্রেক্সে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্মরণসভায় ড. কামাল হোসেন এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত by ড. পবিত্র সরকার -সাক্ষাৎকার গ্রহণে অজয় দাশগুপ্ত

ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের সন্তান পবিত্র সরকার। উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য উচ্চশিক্ষা পর্ষদে ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন ৬ বছর। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন ২৭ বছর। তিনি এ পর্যন্ত অন্তত ৬৪টি বই লিখেছেন। সম্পাদনা গ্রন্থসংখ্যা ৪৫টি। নাটক লিখেছেন। অভিনয়ও করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশ সরকার সম্মানিত করেছে। ঢাকায় এসেছেন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে। সমকালের সঙ্গে কথা বলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে
সমকাল :বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় এসেছেন। কেমন দেখছেন ঢাকা?
পবিত্র সরকার :আমি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের সন্তান। জন্মস্থান সাভারের বালিয়ারপুর। আর পোষ্যপুত্র হিসেবে বেড়ে ওঠা ঠাকুরবাড়ি পঞ্চাশ গ্রামে। এখানের অনেক কিছুই পরিচিত। প্রিয়জনের সানি্নধ্যে আসতে পারলে অবশ্যই ভালো লাগবে।
সমকাল : নিয়মিত আসা-যাওয়ার কথা বললেন। বিশেষ কোনো কারণ আছে, নাকি কেবলই বেড়াতে?
পবিত্র সরকার :ধামরাইয়ে আমার যমজ বোন থাকে। এক সময় আমরা দুই দেশের বাসিন্দা হয়ে পড়ি। আমি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাই। স্কুলটি ছিল নয়ারহাটের কাছে। আমার বোন লীলার মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। এখন সে ধামরাইয়ের কাছেই পুত্রবধূ ও দুটি নাতি নিয়ে থাকছে।
সমকাল :বোনের সঙ্গে ভিন দেশের নাগরিক হিসেবে প্রথম কবে দেখা?
পবিত্র সরকার :আশির দশকের শুরুতে সে ভারতে এলে দেখা হয়। মাঝে তিন দশকেরও বেশি সময় বয়ে গিয়েছে...।
সমকাল :তারপর?
পবিত্র সরকার :আবারও তিন দশক পর। ২০০৯ সালে আমি বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসি। তখন বোনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ খুঁজছিলাম। শামসুজ্জামান খান সাহেবকে বোনের গল্প বলি এবং মনোবাসনা ব্যক্ত করি। তিনি যে এত দ্রুত সবকিছু আয়োজন করে ফেলবেন, সেটা বড় বিস্ময়ের। একটি বড় গাড়িতে আমরা কয়েকজন মিলে বোনের শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম।
সমকাল :বাংলাদেশের সঙ্গে কাজের কোনো সূত্র রয়েছে?
পবিত্র সরকার : হ্যাঁ, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ সম্পাদনা করছি। বাংলাদেশ কেমন লাগছে, সে প্রশ্নে বলি_ এখানের বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে মেলামেশার তেমন সুযোগ হয় না। মুসলিম ও হিন্দু উভয় ধর্মের শিক্ষিত সমাজের সঙ্গেই বেশি জানাশোনা। আবার মধ্যে মুসলিমই বেশি। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে মনন-মানসে খুব একটা পার্থক্য আমাদের চোখে পড়ে না। তবে বাংলাদেশ যেহেতু স্বাধীন রাষ্ট্র, এখানের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত। তারা সহজেই ভাবতে পারে যে, দেশের ভেতরে উচ্চশিক্ষা নেবে কিংবা বাইরে গিয়ে পড়বে অথবা নিজের ভাগ্য গড়বে। তারপর পরিবারের কাছে ফিরে আসবে এবং দেশের কাজে লাগবে।
সমকাল : শিক্ষিতদের পাশাপাশি সামান্য লেখাপড়া জানা কিংবা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিতরাও কিন্তু বাইরে যাচ্ছে...।
পবিত্র সরকার :চট্টগ্রাম ও সিলেটের লোকেরা অনেক আগে থেকেই বাইরে যাচ্ছেন। এখন তো বাংলাদেশের ৮০-৯০ লাখ লোক দেশের বাইরে। তাদের পাঠানো অর্থ এখানের অর্থনীতির বড় ভিত এনে দিচ্ছে। দেশের গণ্ডি অতিক্রম করা মানেই পৃথিবীর বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা, জীবনের ব্যাপ্তি বুঝতে পারা। অনেকে কঠিন পরিবেশে কাজ করছে। ফেসবুকে প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কষ্টের জীবন দেখি। সৌদি আরবে কয়েক বছর বাংলাদেশের লোক যেতে পারেনি, সেটাও দেখেছি। এখন সে বাজার খুলে গেছে।
সমকাল :এখানে মূলত মধ্যবিত্ত সমাজের সঙ্গে মেলামেশা আপনার...।
পবিত্র সরকার :হ্যাঁ, তবে খানিকটা বিব্রতকর। তাদের আতিথ্য আমাকে অপ্রস্তুত করে। অতিথিপরায়ণ মানুষদের যতই দেখছি, মুগ্ধ ও অভিভূত হই। 'ঢাকার টুকিটাকি' নামে একটা বই আছে আমার। সেখানে বলেছি_ খাইয়ে খাইয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা হয় ঢাকায়। বলতে পারেন আন্তরিকতার আতিশয্য, যা পশ্চিমবঙ্গে পাই না।
সমকাল :বাংলাদেশের সাহিত্য প্রসঙ্গে আসি...।
পবিত্র সরকার :মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বেশি প্রকাশ পায়। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য বড় নগরকেন্দ্রিক, মধ্যবিত্তের অতিরিক্ত প্রভাব। পাশ্চাত্যের প্রভাব বেশ। যৌনতাও যথেষ্ট। বাংলাদেশের সাহিত্যে দেখি বিশাল জনগোষ্ঠীর কথা। এতে পাশ্চাত্য প্রভাবিত উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্তের কথা আছে, গ্রামের মানুষের কথাও উঠে আসছে। বলতে পারি যে, ব্যাপক সমাজের উপস্থিতি রয়েছে সাহিত্যে। তবে এ ক্ষেত্রে আমার সীমাবদ্ধতার কথাও বলে রাখতে চাই। আমার সাহিত্য পাঠের ব্যাপ্তি কম। গল্প-উপন্যাস কম পড়তে পারছি এখন। ভাষা, ব্যাকরণ, সমালোচনা_ এসব বেশি পড়তে হচ্ছে।
সমকাল :আপনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে এসেছেন। কেমন অনুভূতি?
পবিত্র সরকার :এ আয়োজন বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক। আরেকটু ব্যাপ্ত হলে ভালো হতো। তবে এরও প্রয়োজন রয়েছে। অনেক বছর পর এর আয়োজন। বাংলাদেশের সাহিত্য সৃষ্টিশীল। কবিতা সজীব। এখানের কবিতায় অন্য ধরনের প্রাণ আছে। কবিতার শব্দ প্রয়োগেই তা স্পষ্ট। প্রান্তিক মানুষের কথা আছে সাহিত্যে। মানুষের জীবন ফুটিয়ে তুলতে পারা সাহিত্যের বড় লক্ষণ।
সমকাল :বাংলাদেশের শিক্ষাচিত্র সম্পর্কে কেমন ধারণা পেয়েছেন?
পবিত্র সরকার : শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে আমার মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে কথা হয়েছে। সাড়ে চার কোটি স্কুল ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই প্রদানের ঘটনা আমার মতো আরও অনেককে মুগ্ধ না করে পারে না। সরকারের উদ্যোগে এত সংখ্যক বই প্রকাশ ও বিতরণ দারুণ কাজ। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে শুনেছি যে, কেবল বই বিতরণের জন্য ৪০ হাজারের মতো ট্রাকের প্রয়োজন পড়েছে। বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে ছাত্র ও ছাত্রীদের অনুপাত সমান সমান, এটাও বিস্ময়ের। এ এক অনন্য অর্জন। ভারতের সব রাজ্যে এমনটি দেখা যায় না। সেখানে অনেক রাজ্য নারী শিক্ষায় পিছিয়ে আছে। মেয়েদেরে পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়া হয় না, এমন এলাকাও রয়েছে।
সমকাল : বাংলাদেশেও নারী শিক্ষায় বাধা এসেছে...।
পবিত্র সরকার : হ্যাঁ, আপনারা এ বাধা জয় করতে পেরেছেন। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস সর্বত্র নারীর গর্বিত পদচারণা। এটা প্রেরণাদায়ক। পোশাকশিল্পের প্রাণ নারী শ্রমিকের হাতে। এখানে মেয়েরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর এভাবে উপস্থিতি একটি জাতির অগ্রগতির পরিচায়ক। নাটক, সাহিত্যকর্ম_ সর্বত্র দেখি নারীর অংশগ্রহণ। মেয়েরা খেলাধুলাতেও আছে বিপুল সংখ্যায়। একদিন তাদের মধ্য থেকেও বিশ্বমানের খেলোয়াড় বের হয়ে আসবে।
সমকাল : শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। এসব নতুন প্রতিষ্ঠানেও মান নিয়ে প্রশ্ন। কীভাবে দেখছেন বিষয়টি?
পবিত্র সরকার :মধ্যবিত্তের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষার দিকে লক্ষ্য রেখে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। পশ্চিমবঙ্গেও একই চিত্র। উচ্চতর পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানবিকবিদ্যার বিষয়গুলোর প্রতি তেমন নজর নেই। চাকরির বাজারই মূল লক্ষ্য। এগুলোতে পড়ার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সমকাল :গ্রন্থমেলা বা বইমেলা কেমন দেখছেন?
পবিত্র সরকার :পাঁচ বছর দেখছি এ মেলা। এ মেলার স্মৃতি একেবারেই ভিন্ন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় যারা আত্মদান করেছেন তাদের স্মৃতি এ মেলার সঙ্গে যুক্ত, যা জাতীয় জীবনের অনুষঙ্গ। এর আবেগ একেবারেই ভিন্ন। এ আবেগের পাশাপাশি আরেকটি দিক_ সারা বছরের প্রকাশনার এটাই একমাত্র উপলক্ষ। এর ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে। কলিকাতাতেও সেটাই দেখছি_ বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশনার আয়োজন। দেশের বাইরে যারা থাকেন, তারাও মেলা উপলক্ষে বই লেখেন। প্রকাশনা উপলক্ষে দেশে আসেন। বাংলাদেশেও এটাই ঘটছে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, কেবল এ সময়টিকেই কেন বেছে নেওয়া হয়। এ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে বাস্তবতা এটাই_ বইমেলা-নির্ভর প্রকাশনা শিল্প আমরা দেখছি।
সমকাল : বইমেলার আর কোনো বৈশিষ্ট্য নজরে এসেছে?
পবিত্র সরকার :কেবল মধ্যবিত্ত নয়, সাধারণ মানুষও আসছে বইমেলায়। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অভিভাবকরা বইয়ের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা। নতুনরা জানতে পারে_ বইয়ের ভেতর রয়েছে জাদু। সভ্যতার কেন্দ্র্রীয় বিষয় হচ্ছে বই।
সমকাল :পশ্চিমবঙ্গের বইমেলা সম্পর্কে বলুন।
পবিত্র সরকার : সেখানে কেন্দ্রীয় বইমেলা আছে, পাড়ায় পাড়ায় এর আয়োজন হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বাংলা বইয়ের এমন প্রাচুর্য আর কোথাও মিলবে না। এখানে দলে দলে কবিদের দেখি মেলায়। কবিতা উৎসব হয় ফেব্রুয়ারির শুরুতে।
সমকাল :বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী, এ প্রশ্ন করেন অনেকে। আপনি কী বলবেন?
পবিত্র সরকার :আমি সাহিত্যের এমন পাঠক নই যে, ভবিষ্যদ্বাণী করার যোগ্যতা রাখি। তবে একটা কথা বলতে পারি, নতুন লেখকরা যত বেশি উঠে আসবে ততই সাহিত্য টিকে থাকার ভিত পাবে। বাংলাদেশে যেসব লেখকের সঙ্গে আমার পরিচয়, তাদের বেশিরভাগকেই তরুণের দলে ফেলা যাবে না। যেমন জাফর ইকবাল। তবে তিনিসহ আরও অনেকেই তরুণ প্রজন্মের মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন। যতটা জানি, এখানে তরুণ লেখক সংখ্যা অনেক। তাদের জন্য বাংলা একাডেমির বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। বইমেলা ও জাতীয় কবিতা উৎসবে তরুণদের ভিড়। তরুণদের নিয়ে নানা ওয়ার্কশপ হয়। এসব কারণে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা-উদ্বেগের কিছু দেখি না। এটাও বলব যে, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কিন্তু বাংলাদেশের হাতেই নিহিত।
সমকাল :বাংলাদেশের এখন পরিস্থিতি কিন্তু ভিন্ন...।
পবিত্র সরকার :হ্যাঁ, অনিশ্চয়তা রয়েছে। মাঝে মধ্যে দুশ্চিন্তা হয়। ভারতকে নিয়েও আমার উদ্বেগ রয়েছে। এখন যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে তাদের ভাবনা-চিন্তা দুশ্চিন্তায় ফেলে। এখানে এসে সংবাদপত্রে দেখছি অনেক মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। আশা করব যে, শেখ হাসিনার সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবে। সাধারণ মানুষের ওপর আমি বিশ্বাস রাখি। তারা বিপদের শঙ্কা জেনেও বাংলা একাডেমির সাহিত্য আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। হরতাল-অবরোধ উপেক্ষা করে আসছে বইমেলায়। দুর্ভোগের মধ্যেও মানুষের মনোবল ভেঙে পড়ছে না। এটাই আশার দিক। আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে অনেক দেশের অতিথি এসেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হচ্ছে। সাধারণ মানুষের এ আয়োজনের প্রতি সমর্থন না থাকলে এটা করা সম্ভব হতো না। স্বাভাবিক পরিস্থিতি থাকলে যে ধরনের উপচেপড়া ভিড় হতো, সেটা হয়তো সম্ভব হয়নি।
সমকাল :এবারের সাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে বিশেষ কোনো ঘটনা বলবেন কী?
পবিত্র সরকার :সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সই ছিল না। বিষয়টি নিছক কথা প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে বলি। আমার জন্য পরম বিস্ময়ের ছিল যে, পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর সইসহ একটি বই পেয়ে যাই। এবারে বাংলাদেশ সফরে এ ঘটনাটিকে আমি বিশেষভাবে স্মরণে রাখব।
সমকাল : আপনাকে ধন্যবাদ।
পবিত্র সরকার : সমকাল পাঠকদের শুভেচ্ছা।

মিয়ানমারে এক টুকরো বাংলাদেশ by সোহরাব হাসান

গত ১৪ জানুয়ারি আমরা তিনজন যে ফ্লাইটে ব্যাংকক হয়ে ইয়াঙ্গুনে পৌঁছাই, সেই ফ্লাইটে চতুর্থ কোনো বাংলাদেশি ছিলেন না। কিন্তু ১৫ জানুয়ারি ফেরার পথে বেশ কজন তরুণ বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে পেলাম, যাঁরা ইয়াঙ্গুনে চাকরি করেন, কেউ সপরিবারে এসেছেন, কেউ বা একা এসেছেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ছুটি কাটাতে।
গত বছরের শুরুতে ঢাকা-ইয়াঙ্গুন সরাসরি ফ্লাইট চালু করে বাংলাদেশ বিমান। যাত্রীও কম নয়; কিন্তু ফ্লাইট সপ্তাহে এক দিন, সোমবার। ব্যবসা বা অন্যান্য কাজে যাঁরা যান, তাঁরা বিমানই পছন্দ করেন। মাত্র এক ঘণ্টার পথ। ব্যাংকক থেকে গেলে পুরো দিনটাই যাত্রাপথে চলে যায়।
যেকোনো দেশে বা শহরে দ্বিতীয়বার গেলে সাধারণত আকর্ষণ কমে যায়। কিন্তু ইয়াঙ্গুনে গিয়ে আমার সেটি মনে হয়নি। গত আট মাসের পরিবর্তনটিও চোখে পড়ার মতো। অনেক নতুন হোটেল নির্মিত হয়েছে। ফ্লাইওভার হচ্ছে। যেখান আমাদের একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে আড়াই-তিন বছর সময় লাগে, সেখানে তারা ১২ মাসে একেকটি বিশাল ফ্লাইওভার নির্মাণ করছে।
মিয়ানমারে প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসছেন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেল, গত বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ পর্যটক এসেছেন। এ কারণে ইয়াঙ্গুনে হোটেল ভাড়াও বেশি। মোটামুটি মানের হোটেলের জন্য দিনে ১০০ ডলার গুনতে হয়। টেলিনর মিয়ানমারের আয়োজন ছিল ১১ জানুয়ারি। তাই সরাসরি যাওয়ার উপায় ছিল না। গত মার্চ মাসে বিমানে আসা-যাওয়ার সময় অনেক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁরা বলেছিলেন, ইয়াঙ্গুনে বেশ কটি সংস্থায় শীর্ষ পদে বাংলাদেশি কর্মকর্তা আছেন। প্রথমেই নাম করতে হয় অ্যাকশন এইড মিয়ানমারের কান্ট্রি ম্যানেজার শিহাবউদ্দিন আহমদের; ইয়াঙ্গুনে যাওয়ার আগে তিনি ঢাকায় অ্যাকশন এইডে ছিলেন। তিন বছর ধরে তিনি সেখানে আছেন। স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
অ্যাকশন এইড মিয়ানমারের ৩০০ সার্বক্ষণিক কর্মী ও ৩০০০ মাঠকর্মীর মধ্যে বিদেশি আছেন ২২ জন; যার তিনটি বিভাগের প্রধান পদে তিনজন বাংলাদেশি—তৌহিদ ইবনে করিম (নীতি ও কর্মসূচি), ইমরানুল হক (অর্থ উপদেষ্টা), ফারুক আহমদ শিক্ষা উপদেষ্টা। প্যাক্ট মিয়ানমার নামে যে আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান আছে, তারও প্রধান একজন বাংলাদেশি, ফাহমিদুল করিম ভূঁইয়া। এ ছাড়া হেল্প এজ, কেয়ার, ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালেও বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। ব্র্যাক কাজ শুরু করেছে ২০১৪ সালের জুনে।
টেলিনরের আয়োজনে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলাম আমি ও মাসুদ রুমি। সেখানেই পরিচয় হয় সংস্থার তিন বাংলাদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে। করপোরেট রেসপন্সিবিলিটি বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ আবু হাসনাত মোহাম্মদ সুলতান রেজা, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস বিভাগের প্রধান সনদ পাল চৌধুরী, বাস্তবায়ন বিভাগের প্রধান শানসিল আহমেদ শিবলি। তাঁদের সঙ্গে আছেন আরও ১২ জন বাংরাদেশি কর্মী। এ ছাড়া টাওয়ার বানানোর কাজে বাংলাদেশ থেকে অনেক শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
শিবলিই পরিচয় করিয়ে দিলেন বিজন বিশীর সঙ্গে। তাঁর বাড়ি নেত্রকোনায়। বিখ্যাত লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বংশধর। ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশ সমিতির সম্পাদক বিজন বিশী ১৫ বছর ধরে ইয়াঙ্গুনে আছেন। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তিনি ইনসেফট্রার স্থানীয় প্রতিনিধিও। তাঁর সুবাদেই ইয়াঙ্গুনে অন্যান্য বাঙালি কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয় ও আড্ডা হলো।
ইয়াঙ্গুনে সব মিলিয়ে শ খানেক বাংলাদেশি পরিবার আছে, কেউ বা পরিবারছাড়া। কিন্তু সেখানে সবাই মিলে একটি বড় পরিবার গড়ে তুলেছে, সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে থাকে। বাংলা নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে সবাই একত্র হয়। আনন্দ-উৎসবে মাতে। সংস্কৃতিচর্চা করে। কখনো রাজধানী নেপিডো বা অন্য কোথাও বেড়াতে যায়। ইয়াঙ্গুনের বাংলাদেশ দূতাবাসও সব জাতীয় অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানায়। বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়েবসাইটে একটি বিজ্ঞপ্তি দেখলাম, মিয়ানমারে অবস্থিত বাংলাদেশি নাগরিকদের দূতাবাসে নাম-ঠিকানা দিতে বলা হয়েছে; যাতে তাদের বিপদে-আপদে সহায়তা করতে পারে। বিজন বিশী জানান, এখন দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন। মিয়ানমারে অনেকের বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা আছে। তাঁরা ভাবেন, বাংলাদেশ মানেই রোহিঙ্গা। এই ধারণাটি যে ঠিক নয়, তার প্রমাণ রেখেছেন ইয়াঙ্গুনে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা। তাঁরা সে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখে চলেছেন, সে কথা স্বীকার করেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিেশষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন একজন বাংলােদশি অর্থনীতিবিদ, মির্জা তৌহিদুল ইসলাম।
বিজন বিশীই পরিচয় করিয়ে দেন অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ম্যানেজার শিহাবউদ্দিন আহমদের সঙ্গে; তাঁর সূত্রে আলাপ হয় তৌহিদ ইবনে ফরিদ, ইমরানুল হক, ফারুক আহমেদ, ফাহমিদুল করিম ভূঁইয়া এবং আরও অনেকের সঙ্গে। ইয়াঙ্গুনে বাঙালি পরিবারগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য ও প্রীতি এতটাই গাঢ় যে রাতের খাবারটা তারা একেক দিন একেকজনের বাসায় সারে। ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি এ রকম দুটি পারিবারিক আয়োজনে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা হয়। বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে? তাঁরা বললেন, রাজনৈতিক সমস্যা তো মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডেও আছে। সে জন্য কথায় কথায় হরতাল-অবরোধ হয় না। শিহাব ভাইয়ের এ-লেভেল পড়ুয়া ছেলেকে পড়িয়ে যখন বর্মী শিক্ষিকা চলে যাচ্ছিলেন, তখন রাতের কথা ভেবে ছেলেই তাঁকে গাড়ি চালিয়ে তাঁর বাসায় পৌঁছে দিল; গৃহশিক্ষকের প্রতি এই সৌজন্যবোধ কি বাংলাদেশে আশা করা যায়?
২০০৮ সালে নার্গিস আঘাত হানার পর অ্যাকশন এইড মিয়ানমারে কাজ শুরু করে। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনসহ সবাই তাঁদের কাজের প্রশংসা করেছেন। শিহাব ভাই জানালেন, নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখানে বেশ জনপ্রিয়। তিনি যখন এসেছিলেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর কেবিনেটের সব সদস্যকে নিয়ে বসেছিলেন। আবারও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় গিয়ে আমার মনে হয়েছে, সেখানে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে স্থানীয় কর্মীদের সম্পর্কটি সমীহ ও শ্রদ্ধাবোধের। এখানে পদস্থের অহমিকা কিংবা অধস্তনের হীনম্মন্যতা নেই। সব অফিসেই ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন মার্কেটে বিপণনকর্মীর ৮০ শতাংশ নারী। একই সঙ্গে তাঁরা ঘরও সামলান।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানালেন, মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। এখানে চুরি-ডাকাতি হয় না বললেই চলে। মানুষ খোলা গাড়িতে করে বস্তায় ভরে টাকা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। কোনো সমস্যা হয় না। তাঁরা স্বীকার করলেন, ২০১১ সালে মুক্ত অর্থনীতি চালুর পর মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতা ব্যাপক বেড়েছে। কিন্তু এসব সংস্থায় যঁারা কাজ করেন, তাঁদের বাড়িভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। গত তিন বছরে বাড়িভাড়া বেড়েছে কয়েক গুণ। বাংলাদেশি দেড়-দুই লাখ টাকার নিচে কোনো বাড়ি পাওয়া যায় না। টেলিনরের এক কর্মকর্তা জানালেন, তিনি ৪ লাখ টাকায় বাড়িভাড়া নিয়েছেন, সেটির আয়তন ২ হাজার বর্গফুটের বেশি নয়।
প্যাক্ট মিয়ানমারের একজন কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারে তাঁদের কাজের সুবিধা হলো, নারী-পুরুষ উভয়েই শিক্ষিত। মেয়েরা সংসার ও বাইরের কাজ করেন। ফলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা আরও সহজ। অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশের মতো মিয়ানমারেও মেয়েরা আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে অনেক বেশি তৎপর। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে যেমন। সমাজটি মাতৃপ্রধান না হলেও পরিবারে নারীর ভূমিকাই বেশি।
মিয়ানমারের বেশির ভাগ মানুষ অং সান সু চির সমর্থক। এমনকি বিদেশিরাও নেত্রী হিসেবে তাঁকে পছন্দ করেন। তবে একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তা সু ফাউন্ডেশনের নামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে সুনজরে দেখছেন না। তাঁর মতে, রাজনীতিক হিসেবে অং সান সু চির দায়িত্ব নীতি প্রণয়নে সহায়তা করা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান চালানো নয়।
কোনো কোনো বাংলাদেশি কর্মকর্তা মিয়ানমারের মুক্ত পরিবেশ নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভয়, গ্রামগঞ্জ থেকে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক এখানে আসছেন। হঠাৎ মুক্ত হাওয়ায় এসে যদি তাঁরা কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলেন, তখন পুরো কমিউনিটির বদনাম হবে। তিনি ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে পানীয় বেচাকেনা কিংবা সেবনের ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। তাই বাংলাদেশি শ্রমিকদের কিছুটা নজরদারিতে রাখার কথাও বললেন এই কর্মকর্তা।
মিয়ানমারে আমরা যে এক টুকরা বাংলাদেশ দেখে এলাম, সেটি যেমন শান্ত, শ্রীমণ্ডিত, তেমনি প্রাণের ছোঁয়ায় ঋদ্ধ। পরিসরটি ছোট্ট বলেই হয়তো এই অনুভূতি টের পাওয়া যায়।
মিয়ানমারের বাংলাদেশিরা ভালো আছেন। সুখে ও শান্তিতে আছেন। অন্তত তাঁদের তো হরতাল-অবরোধের নামে বোমাবাজির শিকার হতে হয় না। সেখানকার আবহাওয়াও চমৎকার।
পরের কিস্তি: বাঙালি–রোহিঙ্গা বিতর্ক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।
সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

মোদি-ওবামার ফ্যাশন কূটনীতি by গৌতম লাহিড়ী

বারাক ওবামা বলছিলেন, 'নিউইয়র্কের ম্যাডিসন গার্ডেন স্কয়ারে মোদির অভ্যর্থনা বলিউড স্টারের মতোই।' হায়দ্রাবাদ হাউসের ভিড়ে ঠাসা সাংবাদিক বৈঠকে তখনও চোখে পড়েনি প্রধানমন্ত্রীর পিনস্ট্রাইপ সুটের দিকে। ক্যামেরাম্যানদের লেন্স জুম করতেই নজরে পড়ল স্ট্রাইপগুলো আসলে মোদির নিজের নাম 'নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি।' বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকজনই এমন সুট পরেন। আসলে এবার কূটনীতিতে বিবৃতি-চুক্তির হিসেবি শব্দ-কমা-অর্থবহ ফুলস্টপের সঙ্গে লাগল রঙ। কূটনীতি হলো রঙিন। এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে প্রেসিডেন্ট ওবামা-ফার্স্ট লেডি মিশেল হাতে হাত ধরে যখন নামলেন, তখন নিউইয়র্কের ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার বিভু মহাপাত্র টুইট করলেন ফার্স্ট লেডি উইথ মাই ডিজাইন। হাঁটু ছাড়ানো গাউনে কালো-সাদা জ্যামিতিক প্রিন্ট আর নীল ফুলের মোটিফ। পালাম এয়ারফোর্স বিমানবন্দর থেকে হায়দ্রাবাদ হাউস-রাষ্ট্রপতি ভবনের নৈশভোজ-রাজপথের কুচকাওয়াজ থেকে রিয়াদের জন্য প্লেনে ওঠা পর্যন্ত তিন দিনের মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরল সফরের মধ্যে মোদি বনাম ফার্স্ট লেডি মিশেলের নিঃশব্দ ফ্যাশন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কূটনীতির আঙিনা অতিক্রম করল। ভারতের কোনো সংবাদমাধ্যম এমন সাহস দেখায়নি। কিন্তু পশ্চিমা সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-ওয়াশিংটন পোস্ট পাঠকদের মধ্যে কুইক সমীক্ষা করে ঘোষণা করল, ফ্যাশনে মিশেল পরাজিত রাজনীতির সুপার মডেল মোদির কাছে। সফররত হোয়াইট হাউসের সাংবাদিকদের একজন বলছিলেন, এমন একটা চ্যালেঞ্জের কথা মোদি গত বছর ওবামাকে বলে এসেছিলেন। বোধহয় এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী মোদি বলছিলেন, 'আমি আর ওবামা ব্যক্তিগত বন্ধু। অনেক সময় টেলিফোনে গপ্পো করি, হাসি, মজাও করি।' সন্ধ্যায় নৈশভোজের সময় ওবামা বলছিলেন, 'আপনারা জানেন কি? মোদি ছেলেবেলায় কুমিরের মুখে পড়েছিল। লড়াই করে কোনো রকমে বেঁচে যায়। ও আমাকে এই গল্প করেছে।'
ভারত-আমেরিকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চুলচেরা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে পণ্ডিত মহলে চর্চা চলবেই। কিন্তু এবারের সফরের মোদি-ওবামার সখ্য এক বাড়তি সংযোজন_ এতে কোনো সন্দেহ নেই। কূটনৈতিক দেনা-পাওনার ক্ষেত্রে বডি ল্যাংগুয়েজ এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তবে কূটনৈতিক মহলে এই নিয়ে ততটা উৎসাহ নেই। এক কূটনীতিবিদ বলেছিলেন, 'জর্জ বুশ একবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে করমর্দন করে বলেছিলেন, তার চোখেই তিনি নিজের হৃদয় দেখতে পান। কিন্তু তারপর শীতযুদ্ধের নামে এখনও ঘটছে_ তাতে বলতে হয় পুতিনের চোখেই বোধহয় 'সর্বনাশ' লেখা ছিল। নিয়ম বদলে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে স্বাগত জানাতে এয়ারপোর্ট পেঁৗছে গেলেন। মিশেল ওবামার পোশাক ততক্ষণে সোশ্যাল মিডিয়ায় 'ফ্যাশন স্টেটমেন্ট' বলে ঝড় তুলে দিয়েছে। কিন্তু মোদি? ধূসর রঙের ফুলহাতা শার্ট-কঠিন রোমান কলারের কুর্তা। এটাই মোদি-কুর্তা। গায়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলোমেলো করা বুটিক প্রিন্ট গৈরিক শাল-আঁচলটা পার্সি ডিজাইন এমব্রয়ডারি। এমনটাই তিনি পরেছিলেন কাঠমান্ডুতে পরেশনাথ মন্দির দর্শনের সময়। এটাই শুভকর্মের বোধন-পোশাক।
জনতার সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য এমন পোশাকসচেতন রাজনৈতিক নেতা ইদানীং মেলা ভার। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলালের 'নেহরুর কুর্তার' পরে আর কোনো নেতার নামে কোনো পোশাক ব্র্যান্ড হয়েছে কি-না সন্দেহ। বহু নেতা-নেত্রীর পরিধান অনেক সময়েই ব্র্যান্ড হয়ে থাকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নীল পাড়ের আঁচলের সাদা শাড়ি আর হাওয়াই চপ্পল ছাড়া ভাবা যায় কি? সোনিয়া গান্ধীর শাড়ির ওয়ারড্রোব ফ্যাশন ডিজাইনারদের গবেষণার বিষয়। জয়ললিতার ফ্যান্সি স্যান্ডেল কিংবদন্তি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মোদির সভা-মিটিং-কনভেনশন-সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার মধ্যে এক নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে। ইদানীং কোনো জনসভায় বা রাষ্ট্রপতির ব্যাংকোয়েটে প্রধানমন্ত্রী মোদি কোন পোশাক পরবেন, তাই নিয়ে জল্পনা চলে। কখনও পুতিনের ব্যাংকোয়েটে লাল মাফলারের সঙ্গে ট্যুইড, কখনও পীত রঙের হালকা চালে উড়িয়ে দেওয়া স্কার্ফ। ধূসর হাঁস রঙের জ্যাকেট। প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজের দিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে উপস্থিত হলেন কালো গলাবন্ধ, মাথায় গুজরাতি 'বাঁধনি' পাগড়ি। লাল-সবুজ-কমলা রঙের সঙ্গে বিন্দু বিন্দু সাদা রঙ। ডাই করা হাতে বাঁধা পাগড়ি সাধারণত রাজস্থান ও গুজরাটের উৎসবের পোশাক। ভারতের ভোটারদের সিংহভাগ যুবা। সম্ভবত তাদের মনের ছোঁয়া পেতেই বোধ হয় রাজনীতিতে এমন রঙের দাঙ্গা লাগালেন মোদি।
প্রেসিডেন্ট ওবামার পোশাক সে তুলনায় অনেকটা সাদামাটা। বোধ হয় পোশাকের আভিজাত্য তার কাছে বেমানান। শিকাগো শহরে পুরনো পাড়ার একশ' বছরের বেশি সময়ের এক টেইলারিং শপ থেকেই এখনও তিনি সুট তৈরি করান। দুটি বোতাম খোলা একই ধরনের ডার্ক সুট পরেন বলে এটারও নাম হয়েছে ওবামা সুট। দিলি্লতে যে পোশাকে ওবামাকে দেখলাম সেটাই। সাদা শার্টের ওপরে কোট। গাঢ় নীল এবং লাল টাই। এবার দিলি্লতে বেশ ঠাণ্ডা ছিল। না হলে অনেক সময়ে পরনের কোটটা খুলে ফুল শার্টের হাতা দুটি থ্রি-কোয়ার্টার গুটিয়ে নেন। স্লিম-বয়ের চেহারা। তাই বোধহয় এত জনপ্রিয়।
তবে এবার সুপার হিট মোদি। 'নেমসেক' ফিল্মের আমেরিকান অভিনেতা কাল পেনের কথা মনে আছে? কিছুদিন আগেও প্রেসিডেন্ট ওবামার সাংস্কৃতিক সচিব ছিলেন। এবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এসেছেন। হায়দ্রাবাদ হাউসের বাগানে মিটিংয়ের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে 'সেলফি' তুলে টুইট করে দিলেন_ 'ইন্ডিয়ান মোদির সঙ্গে আমেরিকার মোদি।' কাল পেনের আসল নাম সুরেশ কলপেন মোদি। একদা গুজরাটের বাসিন্দা। মোদি-ওবামার বৈঠক নিয়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষণ করে পাঁচটি বিষয় চিহ্নিত করেছে। কীভাবে প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্টকে মুগ্ধ করলেন। তার একটা বিষয় হলো ফ্যাশন।
সমকাল প্রতিনিধি, নয়াদিলি্ল

সৌদি নেতৃত্বের নতুন বার্তা by মাসুম খলিলী

নতুন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাসাদে ক্ষমতা সংহতকরণ সম্পন্ন হয়েছে। সৌদি বাদশাহ তার বৈমাত্রেয় ভাই আবদুল্লাহর কাছ থেকে উত্তরাধিকার গ্রহণের পর এ পর্যন্ত অনেক রাজকীয় ফরমান জারি করেছেন। এর মাধ্যমে যেসব পরিবর্তন তিনি সম্পন্ন করেছেন তাতে সৌদি গন্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন বিন্যাসে সৌদি আরব তুরস্ক ও কাতারের সাথে ঐতিহ্যগত বিশেষ আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার দিকে ফিরে আসবে বলে মনে হচ্ছে। নতুন সৌদি নেতৃত্বের কাছে মিসরের বিতর্কিত শাসক জেনারেল সিসি আর ফাঁকা চেক পাবেন বলে মনে হচ্ছে না। যদিও তাকে এখনই পরিত্যাগ করা হবে এমন ভাবনার কারণ হয়তো বা নেই।
তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন
মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিস্ট দমনের অন্যতম নায়ক হিসেবে খ্যাত সাবেক সৌদি গোয়েন্দাপ্রধান প্রিন্স বন্দর বিন সুলতানের কাছ থেকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটিও নিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি এখন আর বাদশাহর উপদেষ্টার পদেও নেই। কার্যত এর মাধ্যমে বন্দর বিন সুলতানের সব ধরনের ক্ষমতার অবসান ঘটল। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে নির্মূল করার জন্য তিনি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারও ইতি ঘটছে বলে মনে হচ্ছে এ মুহূর্তে। এই দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়নের আরেক নায়ক ছিলেন রয়েল কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল, বাদশাহ আবদুল্লাহর একান্ত সচিব ও নিয়োগ কমিটির প্রধান খালিদ আল তুয়াইজরি। রাজ পরিবারের কেউ না হয়েও আমেরিকা থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি নিয়ে আসা এ লোক বাদশাহ আবদুল্লাহর আমলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিলেন। আরব আমিরাতের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স বিন জায়েদের সাথে যৌথ পরিকল্পনা নিয়ে মিসরে ড. মুরসির সরকারকে সরিয়ে সিসির নির্মম সেনা সরকার প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। সৌদি প্রশাসনের সর্বত্র থেকে ইসলামিস্টদের বিদায় করে লিবারেলিস্ট-সেকুলারিস্টদের বসানোর মূল কাজটিও করেন তিনি।  বাদশাহ আবদুল্লাহর দাফন সম্পন্ন করার আগেই যে দু’টি কাজ বাদশাহ সালমান সম্পন্ন করেন তার মধ্যে একটি হলো মুকরিন বিন আবদুল আজিজকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা আর বাকি কাজটি হলো খালিদ আল তুয়াইজরিকে রয়েল কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেলসহ রাষ্ট্রের সব পদ থেকে অপসারণ করা। অপসারণের পর কয়েক ঘণ্টা সময় দেয়া হয় তার কাগজপত্র নেয়ার জন্য। এর পর তাকে আর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সৌদি প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োজিত তার পরিবারের শতাধিক কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এই পদক্ষেপ এ অঞ্চলের অস্থিরতা দূর করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হয়।
রণশীল এবং উদার
সালমান দায়িত্ব নেয়ার পর সৌদি সমাজের ধর্মীয় প্রভাব শিথিল করার উদ্যোক্তা অনেককে বিদায় করার পাশাপাশি এসব পদে ঐতিহ্যবাদীদের নিয়োগ দান করা হয়েছে। একজন রণশীল ধর্মীয় নেতা সাদ আল-শেখরিকে বাদশাহ সালমান ব্যক্তিগত উপদেষ্টা করেছেন। তিনি অবশ্য ভারসাম্য রাখার জন্য আল আরাবিয়া সংবাদ চ্যানেলের সাবেক প্রধান উদারপন্থী তরুণ আদেল আল-তোরাইফিকে নতুন তথ্যমন্ত্রী করেছেন। ক্ষমতার নতুন বিন্যাসে ক্ষমতাধর হিসেবে নতুন দু’জনের আবির্ভাব হয়েছে। তারা হলেন নবনিযুক্ত ক্রাউন প্রিন্স স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মোহাম্মদ বিন নায়েফ এবং নবনিযুক্ত প্রতিরামন্ত্রী, রয়েল কোর্টের জেনারেল সেক্রেটারি এবং একটি নবগঠিত মন্ত্রিসভা কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন সালমান। বাদশাহর অপর ছেলে আবদুল আজিজ পেট্রোলিয়াম উপমন্ত্রী হয়েছেন। নতুন বিন্যাসে সৌদি আরবে ধর্মীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্যবাহী সুদাইরি পরিবারের সন্তানদের আবারো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছে। আবদুল্লাহর সময় তাদের অনেকে ছিটকে পড়েছিলেন। তবে পারিবারিক ভারসাম্যকে সালমান সমুন্নত রেখেছেন। তার নতুন পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হলো আবদুল্লাহর দুই ছেলে প্রিন্স মিশালকে রাজধানী রিয়াদের এবং প্রিন্স তুর্কিকে মক্কার গভর্নর পদ থেকে বিদায় করা। কিন্তু আবদুল্লাহর অপর ছেলে মুতায়েবকে ন্যাশনাল গার্ড প্রধান হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পদে আবদুল্লাহর অন্য এক ছেলেও বহাল রয়েছেন। নতুন ক্রাউন প্রিন্স মুকরিনের দুই ছেলেকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আবদুল্লাহর রাজত্বের শেষ বছরে রাজকীয় নিয়োগে ক্রাউন প্রিন্সের সাথে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে প্রিন্স মুতায়েব ও খালেদ তুয়াইজরির সাথে পরামর্শ করে। এসব নিয়োগের বেশির ভাগ এখন বাতিল হয়ে গেছে। বাদশাহ সালমান তার রাজত্বের সূচনা করেছেন জনগণের ভালোবাসা জয় করার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। তিনি রাষ্ট্রের সব কর্মচারীর জন্য দুই মাসের বেতন সমান বোনাস এবং সব অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর জন্য দুই মাস বোনাস পেনশন ঘোষণা করেছেন। বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্ররাও দুই মাস সমান অতিরিক্ত তহবিল পাবেন। এ জন্য ব্যয় হবে তিন হাজার কোটি ডলারের মতো। তেলের দাম কমে যাওয়ার জন্য আবদুল্লাহ যেখানে সরকারের খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেখানে নতুন বাদশাহ জনগণকে বিশেষ সুবিধা দিতে বিপুল তহবিল ব্যয় করছেন।
কৌশলগত ভ্রান্তি
সৌদি আরবের মতাদর্শগত প্রবণতা নিয়ে এখন যে রেষারেষি ও বিরোধ চলছে, তা রণশীল সৌদি ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। দেশটি সাফল্যের সাথে জাতীয়তাবাদী, নাসেরবাদী ও বাথ পার্টির উত্থানপ্রবণতা মোকাবেলা করেছে। একই সাথে দেশটির বামপন্থী ও বিপ্লবী সরকারের সাথে ইন্টারেকশনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সৌদি আরবের সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল দীর্ঘ দিন। সৌদি কৌশলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এটি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্ড খেলেছে। কৌশলগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভালো খেলা কিভাবে খেলতে হয় তাতে দক্ষতা অর্জন করেছে। বিভিন্ন সঙ্কটে সৌদি আরব সুষম নীতি বজায় রাখা এবং একটি শূন্য সমষ্টি সমীকরণের মধ্যে স্খলন এড়াতে সম হয়েছে। কারো সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে দক্ষতার সাথে আবার কারো সাথে সীমিত সঙ্ঘাতেও জড়িয়েছে। কিন্তু সব কিছু করা গেছে একধরনের ভারসাম্য বজায় রেখে এবং চূড়ান্ত কোনো লড়াইয়ে নিজে না জড়িয়ে। এভাবে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার হিসেবে থেকেছে। আর এ অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয় সঙ্ঘাত ও রেষারেষিতে চরমভাবে কোনো পক্ষ গ্রহণ না করে।
বাদশাহ আবদুল্লাহর পররাষ্ট্রনীতিতে শেষ দিকে এসে স্বাভাবিক এ সৌদি কৌশল থেকে বিচ্যুতি ঘটে। এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক অস্থির পরিস্থিতিতে এর প্রভাবই দেখা যাচ্ছে। দেশটির প্রতিবেশী ইয়েমেনের রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে হুতিদের কাছে। ইরান নিয়ন্ত্রিত এই বিদ্রোহী মিলিশিয়াকে মোকাবেলা করার মতো সুন্নি শক্তির মধ্যে এখন কেবলই রয়েছে আলকায়েদা। ইরাকে সুন্নি ভুক্তভোগীরা নির্বিচার গণহত্যার কাছাকাছি এবং অপমানের প্রান্তসীমায় পৌঁছার পরও সেখানকার অবস্থাকে উপো করেছে সৌদি আরব। এর ফলে তাদের রক্ষার জন্য আবির্ভূত হতে দেখা গেল আইসিসকে। সৌদি হিসাব-নিকাশ ও ভীতির কারণে সিরিয়ার বিপ্লব সাফল্যের মুখ দেখেনি। আর এ শূন্যস্থান দখল করেছে আলকায়েদা ও আইএস। এর বাইরেও দেখা গেছে রিয়াদের ফোকাস বারবার যথাস্থান থেকে সরে গেছে অন্যত্র। এর ফলে লেবানন হয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে। আরব বিশ্বে সবচেয়ে সুসংহত ব্লক হিসেবে চিহ্নিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) বিভক্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। কাতারকে অবরুদ্ধ করে রাখার হুমকি দেয়া হয়েছে। ওমান ইরানের সাথে একটি কৌশলগত মৈত্রী গড়ে নিজেকে প্রত্যাহার করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে।
মরহুম আবদুল্লাহর আমলে ফিলিস্তিন প্রশ্নেও সৌদি নীতি ছিল বিভিন্ন ত্রুটি, ব্যক্তিগত ধারণা ও মেজাজ মর্জিনির্ভর। মক্কায় ফিলিস্তিনি পুনর্মিলন সম্মেলন করার পর আবদুল্লাহ হামাসের সাথে একটি ব্যক্তিগত বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। ইসরাইলের গাজা যুদ্ধ এবং ইসরাইল-মিসরের অবরোধসংক্রান্ত ইস্যুতে সৌদি আরবের এক রকম নীরব অথবা ভুল পক্ষে অবস্থান ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জেরুসালেম রার দাবি করে ইরান যেখানে সাফল্যের সাথে ফিলিস্তিন কার্ড ব্যবহার করতে পেরেছে, সেখানে মরহুম বাদশাহ নিজের তলোয়ার ভেঙে শত্রুর সুবিধা করে দিয়েছেন। ইসরাইল-মিসরের গাজা অবরোধে নীরব সমর্থন দিয়ে ইরানি প্রভাব বলয়ে ঠেলে দিয়েছে ফিলিস্তিনিদের। ইয়েমেনের ব্রাদারহুড হিসেবে পরিচিত আল ইসলাহকে দুর্বল করতে আরব আমিরাতের হুতির সাথে গোপন সমঝোতাকে এগোতে দেয়ায় সেখানে এখন শিয়া মিলিশিয়ার অগ্রগতি রুখতে কাউকে পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান ইরানের প্রভাব মোকাবেলা করতে ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যপন্থী ইসলামি আন্দোলনের সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিদায়ী সৌদি শাসক সেই প্রয়োজন অনুভব করতে পারেননি। ফলে আইএস সৌদি সীমান্তে হানা দিলে নিজ দেশের অভ্যন্তরে যে রকম সাড়া পাওয়া উচিত ছিল সেটি পাওয়া যাচ্ছে না।
এটি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, আরব জাগরণ সৌদি রাজপরিবারের ক্ষমতার সামনে চ্যালেঞ্জ সৃর্স্টি করেছিল। আর এ জাগরণে ব্রাদারহুড ভূমিকা রাখায় তাদের প্রতি সৌদি দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্বিবেচনাও অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য বা মাত্রার যে বিষয়টি থাকা উচিত ছিল সেটি এমনভাবে উপেক্ষিত হয় যে, তা সৌদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মূল ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জনগণের বড় অংশের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে রাজপরিবারের। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি বিপ্লব রফতানির কথা বললে দেশটির প্রভাব বিস্তারের পথে বাধা দিতে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে। এসব ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য অর্জিতও হয়েছে। কিন্তু মধ্যপন্থী ইসলামি আন্দোলনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নির্মূল করার যে নীতির দিকে বাদশাহ আবদুল্লাহকে বন্দর-খালেদ চক্র ঠেলে দিয়েছে, তা সৌদি আরবের সার্বিক জনভিত্তিকে দুর্বল করেছে।
কাতার ও তুরস্কের সাথে দূরত্ব ঘুচবে
এরই মধ্যে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে আবদুল্লাহর নীতির সমালোচকেরা এখন নতুন বাদশাহর প্রশংসা করছেন। আবদুল্লাহ তার শাসনের শেষ বছরে অনেকটা বেপরোয়া ধরনের মনোভাব নিয়েছিলেন। সালমান চাচ্ছেন তার বড় ভাই বাদশাহ ফাহাদ আমলের সংযত মধ্যপন্থায় ফিরে যেতে। সেই সময় রাজপরিবার ইসলামপন্থী উদার নির্বিশেষে সবার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। নতুন বাদশাহ ধারাবাহিকতার ওপর জোর দিয়েছেন, কিন্তু তার মতার প্রথম সাত দিনে এমন কিছু হয়েছে যাতে এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে উল্লেখযোগ্যভাবে। রাজনীতির বাইরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। ফলে এখন দেখার ব্যাপার হলো বিদেশে কারা সালমান বা নায়েফের বন্ধু সেটি। বাদশাহ সালমানের ঘনিষ্ঠ হলেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ। সালমান বাদশাহ হওয়ার পর কাতারের ওপর বৃহৎ প্রতিবেশী সৌদি আরবের অবরোধ আরোপ বা জিসিসি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার যে হুমকি ছিল, তা এখন অতীতের বিষয়। একইভাবে মোহাম্মদ বিন নায়েফ হলেন সিনিয়র তুর্কি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ফলে এ দুই দেশের টানাপড়েনেরও অবসান ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। ২০১১ আরব বিপ্লবের পর তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব নিরসন; ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানের প্রসারিত প্রভাব মোকাবেলার জন্যই প্রয়োজন তা নয়, একই সাথে তার প্রয়োজন নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেও। এই ফাটল খুব সম্ভবত জোড়া লেগে যাবে।
ব্রাদার নির্মূলে বন্ধুহীন বিন জায়েদ!
ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের জন্য যেমন সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটতে পারে তেমনিভাবে বৈরী সম্পর্কের কারণে অবনতিও ঘটতে পারে। একসময় বিন নায়েফের সাথে যারা ব্যক্তিগত শত্রুতা করেছিলেন এখন হয়তো তাদের মূল্য দেয়ার সময় এসেছে। মোহাম্মদ বিন নায়েফ এখনো ভুলে যাননি যে, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স ও ব্রাদারহুড নির্মূল অভিযানের অন্যতম নায়ক মোহাম্মদ বিন জায়েদ ১২ বছর আগে রিচার্ড হাসের সাথে দুই ঘণ্টার কথোপকথনের সময় তখনকার সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মোহাম্মদের বাবা নায়েফ সম্পর্কে বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, ‘তাকে দেখে মনে হয় বানর থেকে মানুষ হয়েছে বলে ডারউইনের যে তত্ত্ব, তা সঠিক ছিল’।  আবুধাবির শাসকের সাথে নিষ্পত্তি করার মতো আরো স্কোর সম্প্রতি বিন নায়েফের ঝুলিতে জমা হয়েছে। আমিরাতের রাজকীয় আদালত নিয়ন্ত্রিত ইরেম নিউজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখপত্রে বলা হয়েছে, ‘বাদশাহ আবদুল আজিজের বিশিষ্ট নাতিদের মধ্যে থেকে মোহাম্মদ বিন নায়েফের নির্বাচনপ্রক্রিয়া পর্যবেকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সালমান এ নিয়োগের ব্যাপারে এলিজিয়েন্স কাউন্সিলের পরামর্শ নেননি।’ অথচ বাদশাহ আবদুল্লাহও এ ধরনের নিয়োগে পরামর্শ করেননি।  বিন জায়েদ চাচ্ছিলেন আবদুল্লাহর ছেলে মুতায়েব ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হোক। গোপন সৌদি তথ্যানুসারে আবদুল্লাহর আস্থাভাজন একান্ত সচিব খালিদ আল তুয়াইজরি মুতায়েবকে ডেপুটি যুবরাজ করতে পরিকল্পনা করেন। মিসরের সিসির অফিস ম্যানেজার আব্বাস কামিলের পাঠানো এক তথ্যেও মুতায়েব ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সালমানের ওপর অধিক চাপ প্রয়োগের আগেই বাদশাহ আবদুল্লাহ অসুস্থ হয়ে মারা যান।  তুয়াইজরি, প্রিন্স বন্দর ও বিন জায়েদ এখন সময়ের অন্তরালে চলে গেছেন। এখন তাদের মধ্যে দু’জন অন্তত ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়ে অতীত হয়ে গেছেন। তৃতীয় জনের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে, সেটি আগ্রহের সাথে অবলোকন করতে হবে। এর মাধ্যমে রিয়াদ থেকে কায়রো পর্যন্ত ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে যে চক্র ছিল, সেটিও ভেঙে গেল।
সিসি হারাতে পারেন ফাঁকা চেক
আবদুল্লাহর রাজত্বের সময় সৌদি রাজনীতিতে সবচেয়ে বেপরোয়া পপাত ছিল মিসর ইস্যুতে। হোসনি মুবারকের শাসন এবং তার সহযোগীদের পতনে যে বিপ্লবী জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, খালিদ আল তুয়াইজরির নেতৃত্বে একদল সেটিকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সৃষ্টি সৌদি রাজতন্ত্রের সামনে অনেক বড় ঝুঁকি হিসেবে বাদশাহর সামনে তুলে ধরে। এতে আবদুল্লাহ প্রভাবিত হয়ে সৌদি আরবের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে মুরসির সরকারকে উৎখাত করে মিসরে পাশবিক সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আরব আমিরাত-ইসরাইল পরিকল্পনার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে মিসর সহিংসতা ও গোলযোগের দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ফাঁদে পরিণত হয়। আসল বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগেই সামরিক অভ্যুত্থানের সমর্থনে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া ছিল আবদুল্লাহর জন্য ভয়ানক; বিশ্বের চোখের সামনে সামরিক জান্তা হাজার হাজার মিসরীয়ের রক্তসাগরে অবগাহনের পরও তাদের সমর্থন জানিয়ে যাওয়া ছিল তার জন্য আরো বেশি ভয়ানক। সিসি সরকারকে সমর্থন জোগানোর ধারণা আবদুল্লাহর মনে এত গভীরভাবে বদ্ধমূল করা হয়েছিল যে, তার পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে এটি। সিসির অনুরোধে আবদুল্লাহ তার জন্য এমন কিছু করেন, যাতে রাষ্ট্রের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিদ্যমান সৌদি মর্যাদার বিষয় পর্যন্ত বিবেচনায় আনা হয়নি। সিসির জন্য আবদুল্লাহ কাতারের সাথে নিজ দেশকে প্রায় যুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যান আর জিসিসিকে পৌঁছান বিপর্যয়ের প্রান্তসীমায়। এই সিসির সরকারের জন্য তুরস্কের সাথে সম্পর্কে বড় ফাটল সৃষ্টি করেন আবদুল্লাহ। তার পর বিস্ময়করভাবে ‘সন্ত্রাসী’ তালিকায় যোগ করেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নাম। অথচ পশ্চিমা সরকারগুলোও এ পদক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে নেয়নি। মিসরের অভ্যুত্থানের পক্ষে বেপরোয়া অবস্থানে সৌদি আরব তার কৌশলগত প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে খেলার মতো অনেক কার্ড নিজের হাতছাড়া করে। সৌদি নীতিতে অনুভূত প্রধান প্রতিপরে বিরুদ্ধে কৌশলগত জোট গড়ার স্বার্থে আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী তুরস্কের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার যে প্রয়োজন ছিল, সেটি বিসর্জন দেয়া হয় কেবল সিসির জন্য।
সৌদি রাজপ্রসাাদে এরই মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আল সিসি ও আমিরাতের বিন জায়েদ আবদুল্লাহর দাফন অনুষ্ঠান থেকে দূরে ছিলেন। যে সময়ে সিসির জন্য সৌদি নগদ সহায়তা অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন অধিক অস্থির হয়ে পড়েছে মিসরের পরিস্থিতি। সিনাইয়ে পূর্ণ স্কেলের সামরিক অভিযানের সাথে সারা দেশে বিক্ষোভ ক্রমবর্ধমান রূপ নিচ্ছে, যা কখনো শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। মিসরীয় পাউন্ডের দাম এখন স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কম। সিসির জন্য বিকল্প ক্রমেই সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। এটি মিসরীয় সেনাবাহিনীর জন্য মোটেই সুখকর নয় যে রিয়াদে তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক তুয়াইজরি হয়ে পড়েছেন কক্ষচ্যুত। এখন সালমান-নায়েফ মিসরকে যদি এই তহবিলের জোগান অব্যাহত না রাখার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে সিসির জন্য। এ ছাড়া প্রতিশ্রুত ও বাস্তব সাহায্য অবমুক্তির মধ্যেও একটি ব্যবধান থেকে যেতে পারে।
ভারসাম্যে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ
বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতির জন্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পুরনো নীতিতে প্রত্যাবর্তনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভবত বাদশাহ সালমান ও উপ-ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ সৌদি আরবকে সে দিকে নিতে চাচ্ছেন। তবে তার মানে এটি হবে না যে, সৌদি আরব মিসরে সিসির শাসনকে একবারে পরিত্যাগ করবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্রাদারহুডকে নিয়ে আসার একটি সমঝোতামূলক পদক্ষেপ সামনে হয়তো দেখা যেতে পারে। যার প্রয়োজনের কথা আল বারাদি তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন পরিস্থিতিতে সৌদি-তুরস্ক-কাতার সমঝোতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সিংহাসনে বাদশাহ সালমান আরোহণের পর সবার সাথে একটি ব্যাপক পুনর্মিলন ও আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি মধ্যপন্থী ইসলামি আন্দোলন এবং এরদোগান-তামিমের জন্য ভালো সুযোগ এনে দিতে পারে। এমনকি এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে মিসরকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিসির জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা তার জন্য একটি নিরাপদ প্রস্থানও নিশ্চিত করতে পারে। ব্রাদারহুডকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণারও পরিবর্তন হতে পারে। তিউনিসিয়ার আন নাহদা নেতা ড. রশিদ ঘানুশি আবদুল্লাহর মৃত্যুতে শোক জানাতে এলে সালমান নিজে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। ঘানুশি হলেন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ইসলামিস্ট (মুসলিম ব্রাদারহুড ঘরানার) নেতা, সৌদি আরবে যাকে এভাবে স্বাগত জানানো হলো। ওয়াক্ফ ও ইসলামিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে সুলায়মান এবি আল-খাইলের নিয়োগও সৌদি নীতি পরিবর্তনের আরেকটি লক্ষণ হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে।  সৌদি আরবের গত সপ্তাহের রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বিভিন্নমুখী পরোক্ষ ফলাফলও আসতে পারে। ব্রিটেনে ব্রাদারহুডের ব্যাপারে তদন্তকাজের সাথে জড়িত সিনিয়র ইউকে কর্মকর্তারা খুশি হবেন যে, তারা ব্রাদারহুডের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার ব্যাপারে যে অনুসিদ্ধান্তে এসেছেন, তা প্রকাশ করতে পারবেন। ডেভিড ক্যামেরনের নির্দেশে স্যার জন জেনকিন্সের নেতৃত্বে পরিচালিত এ তদন্তের রিপোর্টটি সৌদি আরব ও আমিরাতের চাপে তারা এত দিন প্রকাশ করতে পারেননি। সালমান বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত এ দুই দেশের নেতৃত্ব মিসরের সন্ত্রাসবাদে ব্রাদারহুডের কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়া ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করছিল। এর মাধ্যমে ব্রাদারহুড সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পাচ্ছিল। রিয়াদের নতুন কর্তারা এমন ধরনের একটি উপসংহারকে এখন স্বাগত জানাতে পারেন।

সুড়ঙ্গ মহলে ইঁদুর জীবন

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বেইজিংয়ে এসে বড়সড় ধাক্কা খান চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। প্রথমেই আবাসন সংকট। আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকায় ঠাসা বেইজিংয়ের অ্যাপার্টমেন্টগুলো সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ভাড়ার জোগাড় করতে গেলে পেটের খোরাকি থাকে না! চাকচিক্যের চমক জীবন ভুলে নেমে পড়ে সস্তা জীবনের খোঁজে। কোথায় একটু কম খরচে মাথা গোঁজা যায়। তখনই চোখ যায়, বেইজিংয়ের সুড়ঙ্গগুলোর দিকে। স্বপ্ন অগত্যা, বাস্তবায়নের চেষ্টায় বেছে নিতে হয় ‘ইঁদুর জীবন’। বেইজিংয়ে ইঁদুরের মতো মাটির নিচে গর্তবন্দি হয়ে বসবাস করছে অন্তত ১০ লাখ মানুষ। আন্ডারগ্রাউন্ড সুড়ঙ্গে সস্তায় থাকতে পারছেন তারা। সোমবার ডেইলি মেইল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেইজিংয়ের সুড়ঙ্গবাসী ‘ইঁদুর-জাতি’ নামে পরিচিত। ১৯৬৯ সালে স্নায়ুযুদ্ধ যুগে চীনের চেয়ারম্যান মাও সেতুর সোভিয়েত ইউনিয়নের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাটির নিচে অন্তত ২০ হাজার সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিলেন। ১৯৯০ সালের পর সেসব সুড়ঙ্গ হয়ে ওঠে গরিব মানুষের আবাসন। একমাসে মাত্র ৩০০ ইউয়ান (৪৮ ডলার) ভাড়া দিয়ে থাকতে পারেন দরিদ্ররা।
উপরে থাকতে হলে ভাড়া কয়েকগুণ বেশি। একটি শর্ট ফিল্মে সিম চি ইয়েন বলেন, ‘আমার বাবা আমার কাছে এসে বাসস্থান দেখে বললেন, ‘বাছা, এখানে থাকা মানায় না।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি যখন বাইরে যাই, মানুষ কি জানে যে আমি মাটির নিচে থাকি?’ মঙ্গোলিয়া থেকে ঝাংজি এসেছেন অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। জির বাবা-মা চান নিজ এলাকায় পুলিশ সদস্যের চাকরি নিতে। কিন্তু জি তার স্বপ্নে অনড়। তোংঝু থেকে লি ইয়াং বেইজিংয়ে এসে মৎস্য কর্মকর্তার চাকরির চেষ্টায় আছেন। বর্তমানে গাড়ি ম্যাকানিকের কাজ করছেন এবং টাকা বাঁচানোর জন্য এই সুড়ঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছেন। শু জানপিং তার পুরো পরিবার নিয়ে এখানে থাকছেন। তার ১৭ বছরের ছেলে ঝো জিংদি ও স্বামী ঝো হাইলানকে সাধারণ জীবনযাপনে খুশি। মাটির নিচে থাকার বেশকিছু সুবিধাও রয়েছে। গরমকালে ঠাণ্ডা ও শীতকালে উষ্ণতা অনুভূত হয়। শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থীসহ নিু আয়ের মানুষের টিকে থাকার একমাত্র আশ্রয় এ সুড়ঙ্গ।

শেষ চারে থাইল্যান্ডকে পেল বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ থাইল্যান্ড। মঙ্গলবার বি-গ্রুপের শেষ ম্যাচে বাহরাইনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে থাইল্যান্ড। শুক্রবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে এ-গ্র“পের রানার্সআপ বাংলাদেশের মোকাবেলা করবে থাইল্যান্ড। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে ০-১ গোলে হারলেও শ্রীলংকাকে সমান ব্যবধানে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয়। অন্যদিকে থাইল্যান্ড প্রথম ম্যাচে সিঙ্গাপুরকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল। প্রথম ম্যাচে জিতে পুরো তিন পয়েন্ট পেয়ে আগেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছিল থাইল্যান্ড। তাই মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তারা মাঠে নামে চাপমুক্ত থেকেই। অন্যদিকে আগের ম্যাচে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করাতে চাপের মুখে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। যদিও প্রথমার্ধের শুরুতে থাইল্যান্ডকেই চাপের মুখে ফেলেছিল বাহরাইন।
বারবার আক্রমণ করেও গোল আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। তাদের চেষ্টার সফলতা মেলে ৩৫ মিনিটে। নিজেদের ভুলে পিছিয়ে পড়ে বাহরাইন। বক্সের বাইরে থেকে থাইল্যান্ডের মিডফিল্ডার ভিরাসার্ট ছাওয়াতের ফ্রিকিক নিজেদের বক্সে ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই পাঠিয়ে দেন মিডফিল্ডার আবদুল্লা আলী (১-০)। প্রথমার্ধে আর কোনো গোল পায়নি থাইল্যান্ড। ৫৩ মিনিটে আরও একবার বাহরাইনের জালে বল পাঠায় নেভিব্ল– জার্সিধারীরা। প্রতিপক্ষের বক্সে বল নিয়ে ঢুকে পড়েন থাইল্যান্ডের অধিনায়ক পামপার্ক পাকর্ন। জোড়াল শটে লক্ষ্যভেদ করেন এ ফরোয়ার্ড (২-০)। ২-০ গোলে হারলে নিশ্চিত ঝরে পড়তে হবে টুর্নামেন্ট থেকে। ৫৬ মিনিটে মিডফিল্ডার ভিরাসার্ট ছাওয়াতের ক্রস থেকে বল পেয়ে বাহরাইনের জালে পাঠান পিমকন জাতুরং (৩-০)। এরপর আর ম্যাচে ফেরা হয়নি বাহরাইনের। তিন গোলের ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিল মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি।

ভারত সফরে বাংলাদেশ নিয়ে ওবামা-মোদির আলোচনা

বাংলাদেশে গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে গত ২৬শে জানুয়ারি ভারত সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল র‌্যাইনার। বাংলাদেশ প্রশ্নে শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের কথাও জানান ফিল র‌্যাইনার। গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের ফরেন প্রেস সেন্টারে ওবামার ভারত সফর নিয়ে আয়োজিত প্রেস কন্সফারেন্সে বাংলাদেশের সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারীর প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা জানান। নিউইয়র্কের ফরেন প্রেস সেন্টার থেকে ভিডিও কনফারেন্সে আনসারী  র‌্যাইনারের কাছে  জানতে চান, প্রেসিডেন্ট ওবামা  তার সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময় আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অথচ এ অঞ্চলের দেশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি অস্থির সময় এবং ক্রান্তিকাল পার করছে। মানুষ গণতন্ত্র, ভোট ও মানাবাধিকার রক্ষার জন্য সংগ্রাম করছে-এমন একটি বাস্তবতায় ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের চলমান অস্থিরতা ও চলমান আন্দোলন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার মূল্যায়ন কি? এ প্রশ্নের জবাবে র‌্যাইনার বলেন,  ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে  প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফর করেছেন, সে সময় সফর সঙ্গী হিসেবে  আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি,  প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি  ও নাগরিক শক্তির  যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সব সময় ভয় ভয় লাগে

*কলকাতা থেকে ফিরে কি শুটিং শুরু করেছেন?
**হ্যাঁ, শুটিং শুরু করেছি। নতুন ধারাবাহিক ‘সাপলুড’ু নাটকের শুটিং করলাম। শুটিং স্পট ছিল পুবাইল। এছাড়া পুরনো ধারাবাহিকের নাটকের সিডিউল দিয়েছি।
*রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঢাকার বাইরে শুটিং করছেন কীভাবে?
**কিছু করার নেই। নাটকটি গ্রামের গল্প নিয়ে তৈরি হচ্ছে। আল্লাহর নাম নিয়ে যাতায়াত করি। সব সময় ভয় ভয় লাগে। আমার নিজের জন্য কোনো চিন্তা নেই। শুধু ভাবি আমার কিছু হলে আমার মেয়ের কী হবে। এভাবে শুটিং করা যায় না।
*নতুন ধারাবাহিকের কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
**আরিফ খানের নতুন ধারাবাহিক ‘দলছুট প্রজাপতি’ নাটকটি এনটিভিতে প্রচার শুরু হয়েছে। বেশ কিছু পর্ব প্রচার হল। এরই মধ্যে ভালো সাড়া পেয়েছি। আশা করি, নাটকটি দর্শকরা আরও বেশি উপভোগ করবেন।
*প্রচারের অপেক্ষায় আছে কোন কোন ধারাবাহিক?
** ইদ্রিস হায়দারের ‘পালঙ্ক’, মাইনুল হাসান খোকনের ‘জীবনের গল্প’ ধারাবাহিকগুলো প্রচারের অপেক্ষায় আছে। এছাড়া আরও কয়েকটি নতুন নাটকের ব্যাপারে কথা হচ্ছে।
*নতুন বিজ্ঞাপনে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
**বিজ্ঞাপনটি নতুন নয়। গতবছর করেছিলাম। আমিতাভ রেজা নির্মাণ করেছিলেন। ইন্ডিয়ার পণ্য হওয়ায় তেমন দেখা যায়নি। এখন একটু বেশি প্রচার হচ্ছে। সবাই ভাবছে নতুন বিজ্ঞাপন।
*অন্যান্য বিজ্ঞাপনের খবর কী?
**পুরনো একটি চাটনির ও লন্ড্রি সাবানের বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। এছাড়া আরএফএলের নতুন একটি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছি। এখনও প্রচার হয়নি। তবে শিগগিরই প্রচার শুরু হওয়ার কথা আছে।
বিএম ইমরান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাস্তবতা by গোলাম মোহাম্মদ কাদের

আজকাল দুটি শব্দ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। কথার ফাঁকে যেকোনো প্রসঙ্গে এই শব্দগুলোর উল্লেখ প্রায়ই শোনা যায়। দুঃখের বিষয় হলো, অনেককে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে ঠিক এর বিপরীত কাজ করে যাচ্ছেন। যেসব কারণে বাংলাদেশের মানুষ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছিল এবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছে, সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলা যায়। সেখানে প্রথমত আসে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা। নিজের ভাষা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসহ আলাদা পরিচয় বাঁচিয়ে রাখা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র সত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের আত্মাহুতি এবং শুধু উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি আদায় এর দৃশ্যমান উদাহরণ।
আর একটি চাওয়া ছিল, বৈষম্যের অবসান। বাঙালি সম্প্রদায় যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করত, তাদের সরকারি দায়িত্বপূর্ণ পদ ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হতো। তাদের প্রতি পক্ষপাতমূলক অন্যায় আচরণ, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ, বঞ্চনা ইত্যাদির ফলে বাঙালিরা পাকিস্তানের অন্য নাগরিকদের তুলনায় নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করত।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা হিন্দুধর্মাবলম্বী ছিল, তাদের সাধারণ অন্যান্য বাঙালির তুলনায় অধিকতর বৈষম্যের শিকার হতে দেখা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা উপরিউক্ত সমস্যা সমাধানে প্রথমত দাবি উত্থাপন করে স্বায়ত্তশাসনের। অর্থাৎ নিজেরা নিজেদের শাসন করবে পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে থেকে। এ প্রত্যাশা পূরণের সংগ্রাম শুরু হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সেই দাবি দমিয়ে রাখতে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করে। একপর্যায়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে স্বকীয়তা রক্ষা, বৈষম্যের অবসান এবং নানা ধরনের সামাজিক অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তির জন্য তাদের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো প্রয়োজন; যার শাসন ও পরিচালন ভার নিতে হবে তাদের নিজেদের হাতে; এ ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। সে কারণে বাঙালি জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তান ভূখণ্ডের পূর্ব পাকিস্তান অংশ আলাদা হয় এবং সেখানে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় হয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে দেশটির নাম দেওয়া হয় ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের শাসন করার অধিকারসহ একটি সার্বভৌম ভূমি, যেখানে বাঙালিরা নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা নিয়ে সব ধরনের বৈষম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার পরিপন্থী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও তার ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলাদেশের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
প্রথমত, বাংলাদেশ হবে জনগণের দেশ এবং জনগণের দ্বারা পরিচালিত দেশ; অর্থাৎ গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত দেশ।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ হবে সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত, অন্যায়, অবিচার ও শোষণমুক্ত; অর্থাৎ অসাম্প্রদায়িক সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক দেশ।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় এ চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়। কিছু নমুনা নিচে উদ্ধৃত করা হলো:
প্রস্তাবনা: তৃতীয় প্যারা
‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে;’
প্রথম ভাগ: প্রজাতন্ত্র
১) বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র, যাহা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত হইবে।
‘৭।(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্ব কার্যকর হইবে।’
বাংলাদেশ জনগণের দেশ; জনগণ সব ক্ষমতার মালিক; জনগণ নিজের দেশ নিজেরাই শাসন করবে। প্রায় ১৬ কোটি জনসমষ্টির সবার সরাসরি অংশগ্রহণে দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি পরিচালনা অবাস্তব। সে কারণে সংবিধান অনুযায়ী জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে দেবে। এই প্রতিনিধিদের একটি অংশ তাদের হয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। অন্য অংশ জনগণের হয়ে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যক্রমের ভুলত্রুটি তুলে ধরে শাসকদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করবে। তারা বিভিন্নভাবে জনগণের মতামত তুলে ধরে শাসনকার্যে দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। জনগণ এ প্রক্রিয়া শুধু সরকার গঠনে নয়, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণে সক্ষম হবে।
এ পদ্ধতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য অবশ্যপালনীয় প্রথম শর্ত হলো, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচন। এর পরপরই প্রয়োজন কার্যকর সংসদ; যার জন্য সেখানে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি অনস্বীকার্য।
গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দেশে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রাধান্য লাভ করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন হয়; অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণ হ্রাস পায়; মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে সিংহভাগ আসনে নির্বাচনের তফসিল ও ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনের বস্তুগত কর্মকাণ্ড ঘটেনি। বাকি কিছুসংখ্যক আসনে যেখানে নির্বাচন হয়েছে, বলা হচ্ছে যে সেখানকার জনগণের ও প্রার্থীদের অধিকাংশের মতে ভোটারের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। এ ছাড়া প্রার্থীদের বেশির ভাগের ও এলাকাবাসীর অনেকের মতামত বা অভিযোগ, নির্বাচনে প্রকৃত ভোট প্রাপ্তির সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, পূর্বনির্ধারিত ফলাফল অনুযায়ী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আশা করি একটি বিষয়ে দ্বিমত নেই যে অধিকাংশ জনগণ ভোট দিতে পারেনি বা দেয়নি। কোনো দল বা ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল কি করল না, এ বিষয়টিকে তত গুরুত্ব দিয়ে না দেখলেও হয়তো চলে। কিন্তু জনসমষ্টির অধিকাংশ নির্বাচনে ভোট দেয়নি বা দিতে পারেনি—এ বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা, জনগণ ক্ষমতার মালিক; জনগণ কাউকে তার ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য নির্বাচিত না করলে সেই ক্ষমতা ব্যবহার কখনোই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না।
শুধু সরকার গঠন নয়, বিরোধী দলও ওই একই নির্বাচন প্রক্রিয়ার ফলে গঠিত হয়েছে। বিরোধী দল গঠনে সরকারি দল তার প্রতিপক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা দৃশ্যমান হয়েছে। তা ছাড়া অদ্যাবধি সংসদে প্রধান বিরোধী দল একই সঙ্গে সরকারের (মন্ত্রিসভার সদস্য থাকায়) অংশ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের অধিকাংশ সচেতন নাগরিকের মতে কার্যকর সংসদ আশা করা বাতুলতা মাত্র। তাদের মধ্যে এই উৎকণ্ঠাও লক্ষ করা যাচ্ছে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা, সেগুলোকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে সব সময় গণতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তবু ১৯৯১ সালের পর থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে জনমতের ভিত্তিতে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। এই গণতন্ত্রকে অনেকে ঠাট্টা করে এক দিনের গণতন্ত্র বা নির্বাচন দিনের গণতন্ত্র বলতেন। কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন সরকার ও তদীয় রাজনৈতিক দল নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছেমতো ফলাফল তৈরি করতে সক্ষম। সংবিধানের সংশোধিত নির্বাচন পদ্ধতির আওতায় ভবিষ্যৎ সব নির্বাচনে একই প্রক্রিয়ায় সরকারি দল নির্বাচনী ফলাফল নিজেদের অনুকূলে ইচ্ছেমতো করবে কি না, এ বিষয়ে এখন সব মহলে উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে গণতন্ত্রের প্রধানতম সুফল, জনগণের ইচ্ছানুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে এক দলের ও ব্যক্তির শাসন চিরস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্র; কিন্তু বাস্তবে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই; গণতন্ত্র বিপন্ন; যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বৈষম্যমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিষ্পেষণমুক্ত সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও দুর্নীতির ক্রমবিকাশ এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত ও সমালোচিত হতে দেখা যাচ্ছে।
আর একটি সমস্যা হলো বৈষম্য। দলীয়করণের ব্যাপক প্রভাবে বর্তমানে সরকারদলীয় ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য নাগরিকদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা, চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি সম্ভব হচ্ছে না বলে জনগণের উপলব্ধি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে বা অন্য সরকারি দপ্তরসমূহে, প্রশাসনে সরকারদলীয় লোকজনের জন্য সুবিধাজনক পৃথক ব্যবস্থা। স্পষ্টত, সাধারণ মানুষ ও সরকারদলীয় ব্যক্তিদের মধ্যে নিয়মনীতি ও আইন প্রয়োগে ব্যাপক পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ লক্ষ করা যায়। সরকারদলীয় ব্যক্তিরা যদি প্রথম শ্রেণির নাগরিক হন, সেখানে অবস্থাভেদে সাধারণ নাগরিকেরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি হিসেবে গণ্য হয়।
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেহারা, পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে বৈষম্যের অভিযোগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শুধু নয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকেও শোনা যায়। কাজেই বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনে যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
অতীত বলে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিকামী। মুক্তির চেতনা বাস্তবায়নে তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে, যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকে। মানুষ এখনো অপেক্ষায় আছে। তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তারাই, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সক্রিয়। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহল যত শিগগির এ বাস্তবতা উপলব্ধি করবে, ততই মঙ্গল তাদের নিজেদের, সঙ্গে দেশ ও জাতির।
গোলাম মোহাম্মদ কাদের: সাবেক মন্ত্রী, প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় পার্টি।

জেদাজেদির রাজনীতিতে রসাতলে যাচ্ছে দেশ by মইনুল ইসলাম

(কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত সোমবার গভীর রাতে বাসে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় ঘটনাস্থলেই সাতজন প্রাণ হারান। মরদেহগুলো উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয় l ছবি: প্রথম আলো) একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য সংলাপ শুরুর দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের লাগাতার অবরোধ এবং ক্ষণে ক্ষণে হরতাল কর্মসূচি এগিয়ে চলেছে প্রায় এক মাস যাবৎ। এটাকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে খালেদা জিয়া এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতারা যতই গলাবাজি করুন না কেন, পেট্রলবোমা মেরে পৈশাচিক কায়দায় পথেঘাটে মানুষ খুনের ও মানুষ পোড়ানোর মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির এই চরম জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস কোনো বিচারেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বিবেচিত হতে পারে না। বিএনপির নেত্রী নিজেকে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রাখার নাটক চালিয়ে তাঁর প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন, আর সুদূর লন্ডনে বসে তাঁর ছেলে তারেক রহমান রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছে। লন্ডন থেকে টেলিফোনের আদেশে খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে অনেকের অভিযোগ।
জামায়াত-শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডার ও ভাড়াটে বোমাবাজরাই পেট্রলবোমা মেরে মানুষকে অঙ্গার বানানোর মাঠপর্যায়ের প্রধান হুকুমবরদার। জামায়াত-শিবির তাদের ঘোষণামতো ২০১৩ সালের ‘গৃহযুদ্ধ’ আবার শুরু করেছে। মাঝখানের এক বছর শেখ হাসিনাকে বোকা বানিয়ে তারা হারানো শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধবিরতি পালন করেছিল মাত্র। সরকার ভেবেছিল, জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের রাজপথের তাণ্ডব ব্যতিরেকে বিএনপির যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রাম যেহেতু মাঠে মারা যাচ্ছে, তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতি ঘাতক-শিরোমণিদের দণ্ড বাস্তবায়নে কালক্ষেপণের মাধ্যমে ওই গোপন সমঝোতায় আসা তাদের জন্য স্বস্তিকর হবে। আমি বারবার বলে চলেছি যে এই অপকৌশল আখেরে সরকারের জন্য বুমেরাং হতে বাধ্য, কারণ বিএনপি-জামায়াতকে এভাবে আলাদা করে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই দুই দলের রাজনৈতিক দর্শনে যেহেতু মিল রয়েছে, তাই সাময়িক কৌশল হিসেবে মাঠে-ময়দানে কিছুদিন জামায়াত-শিবির নিজেদের গুটিয়ে রাখলেও যথাসময়ে তারা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করবেই।
গত এক মাসের চোরাগোপ্তা হামলায় বিএনপি নেতারা টাকার জোরে যেমনি ভাড়াটে বোমাবাজ ব্যবহার করছেন—তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে—তেমনি ক্রমেই জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের আবার সক্রিয় হওয়ার আলামতও মিলছে, বিশেষত দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোয়। জামায়াত-শিবিরের এহেন তাণ্ডব আগামী দিনগুলোয় আরও চরম আকার ধারণ করবে বলেই আমার আশঙ্কা। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশ মোতাবেক বিএনপির নেতা-কর্মীরা ‘কৌশলী অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন’ বলে বিএনপির নেতা মির্জা আব্বাস গত ৩০ জানুয়ারি তাঁর গোপন আস্তানা থেকে বিবৃতি দিয়েছেন।
আরেক বিবৃতিবিশারদ নেতা রুহুল কবির রিজভীকে বারিধারার গোপন আস্তানা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ওই ৩০ জানুয়ারি রাতে। একই রাতে খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-সংযোগ কেটে দিয়েছিল ডেসকো, যদিও ১৯ ঘণ্টা পর তা পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ও ডিশ/কেবলের সংযোগ এখনো পুনঃস্থাপিত হয়নি। বোঝাই যাচ্ছে, দুই নেত্রীর জেদাজেদির এই মহারণে পুড়ে বাংলাদেশটা ছারখার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা রণে ভঙ্গ দেবেন না। মনে হচ্ছে, দেশ জাহান্নামে গেলেও তাঁদের কিছু আসে-যায় না, ক্ষমতার মসনদের লোভ দুজনকে পুরোপুরি অন্ধ করে দিয়েছে। মানুষকে পুড়িয়ে লাশ বানানোর এই মধ্যযুগীয় বর্বরতা কত দিন চলবে?
অথচ এক বছর ধরে বিশ্বের সর্বত্র অন্যতম প্রধান আলোচনা-বিশ্লেষণের ফোকাস ছিল বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক সাফল্যের গাথা। বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের উত্তরণের সম্ভাবনাকে এখন আর অবাস্তব কল্পনা
বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, অনেক উন্নয়ন-বিশেষজ্ঞের কাছে দুর্জ্ঞেয় মনে হলেও সবাইকে স্বীকার করতে হচ্ছে যে দুই দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে উল্লেখযোগ্য গতিশীলতা সঞ্চারিত হয়েছে, তাতে বিশ্বের ‘নিম্ন-মধ্যম মাথাপিছু আয়ের’ দেশ হিসেবে ঘোষিত হওয়ার যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পূরণের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে বাংলাদেশ।
এই গতিশীলতা অর্জনের পেছনে যে পাঁচটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়, সেগুলো হচ্ছে: ১. বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে, বিশেষত ধান উৎপাদনে চমকপ্রদ সফলতা, ২. রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের দ্রুত বিকাশ, ৩. বিদেশে অভিবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স-প্রবাহের প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধির হার, ৪. অধ্যাপক ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক প্রবর্তিত ক্ষুদ্রঋণের কনসেপ্টটি গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে গ্রামীণ ব্যাংক ও এনজিওগুলোর ব্যাপক অংশগ্রহণে ক্ষুদ্রঋণের দ্রুত বিস্তার এবং ৫. ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রশংসনীয় অগ্রগতি। বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্যের এই পাঁচটি প্রধান ডাইমেনশনের কোনটা বেশি কৃতিত্বের দাবিদার, তা নিয়ে বেফজুল বিতর্কের অবতারণা করা আমার কাছে একেবারেই অপছন্দনীয়। কিন্তু যে কথাটা নির্দ্বিধায় বলা চলে তা হলো, এসব অর্জনের প্রতিটির মূল নায়ক বাংলাদেশের শ্রমজীবী জনগণ। তবে সরকারকেও কৃতিত্ব দিতে হবে। সে জন্য যখন কিছু কিছু বিদেশি খ্যাতনামা উন্নয়ন-চিন্তাবিদ বাংলাদেশের অর্জনকে ‘প্যারাডক্স’, রহস্যজনক বা অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করে বসেন এবং আমাদের দেশের কিছু কিছু নামজাদা অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞকে তাতে সায় দিতে দেখি, তখন আমার প্রচণ্ড রাগ হয়। কারণ, এই চমকপ্রদ অর্জনগুলোর পেছনে কোনো রহস্য নেই, কিংবা এ ক্ষেত্রে কোনোই প্যারাডক্স নেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের প্রবল তাণ্ডব সত্ত্বেও এই ইতিবাচক প্রবণতাগুলো ক্রমেই জোরদার হয়ে চলেছে। এর মানে হলো, যদি এ দেশের শাসকমহল ও আমলাদের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যেত এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে কিছুটা স্থায়িত্ব দেওয়া যেত, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে এত দিনে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে পারত। ছয় বছর ধরে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে অর্থনীতির এই ইতিবাচক প্রবণতাগুলো সারা বিশ্বের নজরে এসেছে এবং উন্নয়ন-চিন্তাবিদদের সপ্রশংস আলোচনা-বিশ্লেষণের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব মিডিয়াতেও ক্রমেই বাংলাদেশের এই সাফল্যগুলোর বর্ণনা প্রচারিত হচ্ছে। কারণ, যে বাংলাদেশকে একটা ‘তলাবিহীন ভিক্ষার ঝুলি’ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের লীলাক্ষেত্র হিসেবে সারা বিশ্ব চিনতে অভ্যস্ত ছিল, সেই দেশের এহেন সাফল্য বিশ্বের তাবৎ জনগণের কাছে অবিশ্বাস্য সুসংবাদ হিসেবে বিবেচিত হওয়াই স্বাভাবিক।
বর্তমান সরকার আরও চার বছর ক্ষমতায় থাকতে পারলে এই সাফল্যের কৃতিত্ব তাদের ভাগে যাবেই, সেটাই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিশেষ মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে। কারণ, সে ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষে যে জনপ্রিয়তার প্রবল জোয়ার পরিদৃষ্ট হয়েছিল, তা আর বেশি দিন নাও থাকতে পারে। বোধগম্যভাবেই তাঁরা আর শেখ হাসিনাকে সময় দিতে চাইছেন না। বর্তমান সংকট যতই দীর্ঘস্থায়ী হবে, তাঁদের পছন্দসই তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের আশঙ্কাও স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে থাকবে। এটাই তাঁদের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু তাঁদের এই চাওয়া পূরণ হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। ২০১৩-১৪ সালেও এটাই ছিল তাঁদের কৌশল, এবারও ওই খায়েশ চরিতার্থ করতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। কারণ, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে ওটা কোনো সমাধান হতে পারে না, মারাত্মক বিপর্যয়কর সংকটই শুধু ডেকে আনবে।
অতএব, এভাবে দুই পক্ষের এই অন্ধ একগুঁয়েমি আর দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া যায় না। বিএনপি-জামায়াতের মানুষ পোড়ানো ও বোমাবাজির এই সহিংস তাণ্ডবে দেশের সাধারণ জনগণের সহযোগিতা মিলবে না, এটা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান তাঁদের এই প্রাণঘাতী খেলা অচিরেই গুটিয়ে নেবেন বলে মনে হয় না। তবে পানি-গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা খাদ্য সরবরাহ আটকে দিয়ে খালেদা জিয়াকে তাঁর কার্যালয় থেকে বিতাড়নের যেসব কৌশলের কথা মন্ত্রী ও নেতাদের মুখে শোনা গেছে, তা কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না। এ ধরনের কোনো উদ্যোগ বরং তাঁর প্রতি সহানুভূতি আরও বাড়িয়ে দেবে; তাতে হিতে বিপরীত হবে। কার্যালয়ে টিকতে না পারলে অন্যত্র ঘাঁটি গেড়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে এই মানুষ পোড়ানোর খেলা অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া তেমন কঠিন নাও হতে পারে; এতে বরং তাঁর ‘আপসহীন’ নেত্রীর ইমেজ বাড়তে থাকবে।
আর মানবিক সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার ব্যাপারে তাঁর ঔদাসীন্য নতুন কোনো বিষয় নয়, এটা তাঁর আচরণে প্রায়ই প্রতিফলিত হয়ে থাকে। সাধারণ জনগণ এই মরণযজ্ঞের অসহায় শিকার হচ্ছে জেনেও তাঁর কোনো মানবিক সহমর্মিতা জাগ্রত হবে, কিংবা তিনি বিবেকের দংশন অনুভব করবেন, তা মনে হয় না। অপর দিকে শেখ হাসিনাও যদি প্রতিপক্ষের এহেন অন্যায় জবরদস্তির
কাছে নতিস্বীকার করেন, তাহলে সেটা আওয়ামী লীগের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অতএব, উভয় পক্ষের মুখ রক্ষার খাতিরে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। আর এই ভূমিকা পালন করতে দুই পক্ষের গোপন সম্মতিতে তাঁরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটি পদক্ষেপ আহ্বান করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি তাঁদের বঙ্গভবনে আলোচনার জন্য দাওয়াত দিতে পারেন। দাওয়াত পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খালেদা জিয়া অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করবেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করার পর একাদশ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারসম্পর্কীয় সংলাপ শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে, বিএনপির নেতাদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং সভা-সমাবেশ-মিছিলের ওপর আরোপিত বাধানিষেধ প্রত্যাহার করা হবে। আমার এই প্রস্তাব কি দুই নেত্রী বিবেচনা করে দেখবেন?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আর কত মৃত্যু, আর কত পোড়া মুখ- পেট্রলবোমায় পুড়ে অঙ্গার সাতজন by গাজীউল হক

(কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত সোমবার গভীর রাতে বাসে দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমায় ঘটনাস্থলেই সাতজন প্রাণ হারান। মরদেহগুলো উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয় l ছবি: প্রথম আলো) আবারও পেট্রলবোমা, আবারও নিভে গেল তাজা প্রাণ। এবার দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রলবোমার আগুন একসঙ্গে কেড়ে নিল নিরীহ সাধারণ সাতজন বাসযাত্রীর প্রাণ। বাসের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন অনেকেই। এর মধ্যেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান বাবা-মেয়ে, মা-ছেলেসহ ওই সাতজন। আহত হন আরও অন্তত ২৮ বাসযাত্রী। এঁদের মধ্যে তিনজনকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জগমোহনপুর এলাকায় গত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে যাত্রীবাহী ওই বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। আইকন পরিবহনের বাসটি কক্সবাজার থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল।
৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ ও মাঝেমধ্যে হরতাল চলছে ২০-দলীয় জোটের ডাকে। এ কর্মসূচির মধ্যে চলছে সহিংসতাও। প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। তবে পেট্রলবোমায় একসঙ্গে নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই সর্বোচ্চ।
পেট্রলবোমায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন যশোর শহরের সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা নুরুজ্জামান পপলু ও তাঁর মেয়ে যশোর পুলিশ লাইনস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশা তাসনিম; কক্সবাজারের চকরিয়ার আবু তাহের ও আবু ইউসুফ; নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালুচরপাড়া গ্রামের আসমা বেগম ও তাঁর ছেলে মো. শান্ত এবং ঢাকার কাপ্তানবাজার এলাকার মো. ওয়াসিম।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বাসের বেশির ভাগ যাত্রীই ঘুমিয়ে ছিলেন। জগমোহনপুর এলাকায় পৌঁছামাত্র সেখানে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা বাস লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছোড়ে। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন মারা যান। বাসযাত্রীদের আর্তচিৎকারে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। খবর পেয়ে পুলিশ স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়। চৌদ্দগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, সেখানে ১৯ জনকে ভর্তি করা হয়। এঁদের বেশির ভাগই বাস থেকে নামতে গিয়ে মাথা, হাত ও পায়ে আঘাত পান। কেউ কেউ সামান্য দগ্ধ হন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ হাসপাতালে নয়জনকে নেওয়া হয়। তাঁরা হলেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার শফিকুল ইসলাম (২৯), মো. জিলফত (২২) ও মো. জিলকদ (২১), মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার কমলনগরের ফারুক আহমেদ (৩৪), একই গ্রামের আলী হোসেন (২০), মো. শরিফুল (১৯), কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার প্রহরকান্দা গ্রামের রাশেদুল ইসলাম (৪২), ফরিদপুরের ভাঙা উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়ার আরিফ হোসেন (১৮) ও মো. হানিফ (৩৪)। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় শফিকুল, জিলফত ও রাশেদুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্য ছয়জন নিজ উদ্যোগে ঢাকায় চলে যান।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক মির্জা মু. তাইয়েবুল ইসলাম জানান, তাঁদের হাসপাতালে নয়জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। গুরুতর আহত তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। অন্য ছয়জনের শরীরের ৫ শতাংশের মতো করে পুড়ে গেছে।
পেট্রলবোমায় নিহত যশোরের নুরুজ্জামানের স্ত্রী মিতা মাহফুজা (৩৭) বলেন, ‘বেশির ভাগ যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে আগুন দেখে চিৎকার দিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ি। চেতনা ফিরে এলে দেখি, আমি চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আমরা চট্টগ্রাম থেকে ওই বাসে উঠেছিলাম। ছেলে, মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এ যাত্রাই আমার কাল হলো। স্বামী ও মেয়েকে হারালাম।’
যশোরে নুরুজ্জামানের বাড়িতে বিলাপ করছিলেন তাঁর বোন আফরোজা পারভীন। তাঁর সব ক্ষোভ যেন চলমান রাজনীতির ওপর। ‘পেট্রলবোমা জামায়াত মেরেছে, না আওয়ামী লীগ মেরেছে, তা আমরা জানি না। আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। মানুষের জীবন নিয়ে ওরা নাটক করছে’, বলেন তিনি।
পেট্রলবোমায় মা আসমা ও ভাই শান্তকে হারিয়েছেন মো. মুন্না। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে বাসে উঠি। কাঁচপুর গিয়ে আমাদের নেমে যাওয়ার কথা ছিল। তার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।’
চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার হাইওয়ে পুলিশের সার্জেন্ট নাজিম উদ্দিন বলেন, পেট্রলবোমায় প্রায় পুরো বাস পুড়ে গেছে। যাত্রীরা ঘুমিয়ে থাকায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীসহ মহাসড়ক পুলিশের কর্মকর্তারা গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুলিশ সুপার জানান, পেট্রলবোমায় ঘটনাস্থলেই সাতজন মারা গেছেন। লাশগুলো কুমিল্লার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে নেওয়া হয়। পরে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এসপি ও চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম চক্রবর্তী গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট দেশব্যাপী অবরোধ ডেকেছে। ওই অবরোধকে কেন্দ্র করেই ঘৃণ্য এ ঘটনা ঘটেছে।
মিয়াবাজার এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, একই রাত তিনটার দিকে মিয়াবাজার এলাকায় একটি লোকাল বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এই ফাঁকে জগমোহনপুর এলাকায় যাত্রীবাহী ওই বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। চৌদ্দগ্রাম জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত এলাকা বলে পরিচিত। তার পরও সেখানে পুলিশি তৎপরতা কম বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের। মহাসড়কের নিরাপত্তায় আনসার নামানো হলেও ওই গুরুত্বপূর্ণ স্পটে কোনো আনসার সদস্যের দেখা মেলেনি বলে জানান তাঁরা।
আটক ও তদন্ত কমিটি: চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি জানান, পেট্রলবোমা ছোড়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ২০ হাজার করে টাকা এবং আহত ব্যক্তিদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ধরিয়ে দিলে পুরস্কার: জগমোহনপুর এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় প্রতিবাদ সভা হয়েছে। এতে বক্তব্য দেন রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, মহাসড়ক পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. হাসানুজ্জামান কল্লোল ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার। সভায় রেলপথমন্ত্রী ওই ঘটনার জন্য জামায়াত-শিবির এবং একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে দায়ী করেন। পুলিশ সুপার পেট্রলবোমা নিক্ষেপকারীদের ধরিয়ে দিলে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। প্রতিবাদ সভায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়াও বিপুলসংখ্যক জনতা উপস্থিত ছিল।

পুড়ছে মানুষ জ্বলছে দেশ by আব্দুল কাইয়ুম

গতকাল ভোররাতে গুপ্ত ঘাতকেরা কুমিল্লায় বাসে পেট্রলবোমা মেরে কি নৃশংসভাবেই না সাতজন যাত্রীকে পুড়িয়ে মারল। এর আগের দিন ওরা গাজীপুরে চলন্ত ট্রেনেও পেট্রলবোমা মেরে পাঁচজনকে আগুনে পুড়িয়েছে। মনে হয় হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়েই আরও বেশ কিছুদিন চলতে হবে। এ অবস্থায় আমাদের বিনীত আবেদন, অন্তত পেট্রলবোমা ছুড়বেন না। আর রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলবেন না। কারণ, এগুলো কোনো রাজনীতি না। স্রেফ মানুষ খুন করা। এগুলো বন্ধ করুন। সহিংস রাজনীতির এই অস্ত্রটি যেভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে। কোনো সভ্য দেশে রাজনীতির নামে পেট্রলবোমা ছুড়ে নিরীহ মানুষ মারা হয় না। এভাবে কি রাজনৈতিক দাবি আদায় করা যায়? গতকাল পর্যন্ত ৩০ দিনের অবরোধে অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৩১ জন। নিহত ব্যক্তিদের সবাই সাধারণ মানুষ। পেট্রলবোমা মেরে তাঁদের হত্যা করার কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি সবাই সমর্থন করে। এ জন্য দরকার গণসমাবেশ। প্রবল জনমত। এগুলোই হবে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র। এভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে কারও আপত্তি থাকবে না। কিন্তু পেট্রলবোমা কেন? যে আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে করার কথা, সে আন্দোলন কেন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে? সরকারের তো কিছু হচ্ছে না। পুড়ে মরছে মানুষ। নষ্ট হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি। এই দেশ, এই মানুষ কি শুধু সরকারের? বিরোধী দলের নয়? পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে এক একটা সংসার। অনেক সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ পেট্রলবোমায় মারা যাচ্ছেন। এই গরিব মানুষদের পুড়িয়ে মারার অধিকার কারও নেই।
একইভাবে রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে মানুষ মারার আরেক জঘন্য পথ ধরেছে হরতাল-অবরোধকারীরা। এটাও একেবারে ঠান্ডা মাথায় খুন। রাতের অন্ধকারে কেন রেললাইনের নাটবল্টু খুলে রাখা হবে? এগুলো সন্ত্রাসীদের কাজ। একে রাজনীতি বলা যায় না। খুনোখুনি চলছে। এসব বন্ধ করতে হবে।
বিএনপি বলবে তাদের সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয় না, তাহলে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন কীভাবে করবে? খুবই যুক্তিসংগত কথা। বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে সরকার অন্যায় করেছে। সরকারের অনুমতি পায়নি বলে ওরা সমাবেশ করতে পারেনি। মানে বিএনপি খুব আইন মেনে চলে। আইনের প্রতি তাদের যদি এতই আনুগত্য, তাহলে ওরা পেট্রলবোমা মারছে কেন? এটা কি আইন সমর্থন করে? এটা তো খুনোখুনি।
তার চেয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিএনপি যদি নয়াপল্টনে তাদের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করত। বলত, সরকারের অন্যায় মানি না। যদি জোর করে সমাবেশ করত, সেটা কি পেট্রলবোমার চেয়ে ভালো হতো না? কিন্তু বিএনপি সেই প্রথাগত রাজনীতির পথে না গিয়ে সন্ত্রাসের রাজনীতির পথ গ্রহণ করেছে। এটাই তাদের বড় ভুল। রাজনীতি করতে হবে মানুষকে সঙ্গে নিয়েই। সেখানে সন্ত্রাসীদের সহায়তায় নাশকতার কোনো স্থান নেই।
বিএনপি নিশ্চয়ই বলবে, নয়াপল্টনে তালা, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তালা। পুলিশ দিয়ে ঘেরাও। যে যাচ্ছে তাকেই গ্রেপ্তার। এ অবস্থায় কীভাবে ওরা জোর করে সমাবেশ করবে। মানুষকে তো জড়ো হতেই দিচ্ছে না। সন্দেহ নেই যে এগুলো সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা। বলপ্রয়োগে রাজনীতি দমনের অপচেষ্টা করে অতীতে কেউ সফল হয়নি। এ কথা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ভালো আর কে জানে। তার পরও সরকার সেই অভিশপ্ত পথে চলছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
কিন্তু এ রকম দমননীতির মুখেও যে গণসমাবেশ-আন্দোলন করা যায়, সে তো এই হাল আমলেও দেখা গেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে বিএনপি প্রায় একই কায়দায় আওয়ামী লীগের সমাবেশ, মিছিল দমন করার পথ নিয়েছিল। তখন বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিমসহ আরও কত নেতাকে পিটিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছিল বিএনপির সরকার। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের অন্তত ২২ জন নেতা-কর্মীকে মেরে ফেলা হলো। এ কারণে তো তখন আওয়ামী লীগ বাসে পেট্রলবোমা মারেনি। সাধারণ মানুষ হত্যা করেনি। সরকারের অনুমতির তোয়াক্কা না করে সেদিন ওরা সভা-সমাবেশ তো কম করেনি। আন্দোলন তো থেমে থাকেনি।
তারও আগে ছিল আওয়ামী লীগের সরকার। তখনো সে সময়ের বিরোধী দল বিএনপির বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি হরতাল ডাকলেই সরকার তাদের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় শুরু করত। একবার পুলিশের ছররা গুলিতে বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকার সারা দেহ রক্তাক্ত হলো। সেই নির্যাতনের মুখেও তো বিএনপি গণ-আন্দোলনের পথ ছেড়ে পেট্রলবোমা তুলে নেয়নি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, কেউ আগে পেট্রলবোমার রাজনীতি করেনি। আমাদের দেশে কখনো এমন অমানবিক আন্দোলন হয়নি। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য কখনো এমন নৃশংসভাবে সাধারণ মানুষ মারা হয়নি। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটা নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবারের মতো এমন ব্যাপক হারে পেট্রলবোমা মারা হয়নি। এটা নতুন। দেখা দরকার কীভাবে এই বিষ আমাদের রাজনীতিতে ঢুকল।
এটা কেবল সেসব লোকই করতে পারে, মানুষের জন্য যাদের কোনো দরদ নেই। দেশের জন্য দরদ থাকলে কোনো দল রাজনীতির নামে এমন নৃশংসতা করতে পারে না।
সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলতে হয়, এই উপদ্রবটি এসেছে গত চার-পাঁচ বছরে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত-শিবির চক্র সক্রিয় হয়ে নাশকতার রাজনীতি জোরদার করেছে। আগে রগকাটা, গলাকাটার রাজনীতি চলত। এবার এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পেট্রলবোমা। রেললাইনে নাশকতা।
সরকার ও বিএনপি এখন রেষারেষির পর্যায়ে চলে গিয়েছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। এ রকম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কারণ, একদিকে সরকার ক্রমেই পুলিশের ওপর আরও বেশি হারে নির্ভরশীল হচ্ছে। আর অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে ২০-দলীয় জোটও পেট্রলবোমা-রেললাইনে নাশকতা আরও জোরেশোরে চালাতে শুরু করেছে। এই সর্বনাশা পথ থেকে সরে আসতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
সবাই বলছেন, আলোচনা। একমাত্র আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই এই অস্বাভাবিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। এটা ঠিক। কিন্তু সবাই বোঝেন ও জানেন যে, দুই পক্ষের কেউই এখনই সমঝোতার আলোচনায় বসতে রাজি নয়। ওরা শেষ দেখতে চায়। শেষ দেখতে দেখতে সবকিছু শেষ হয়ে গেলেও বোধ হয় তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এটা হবে এক আত্মঘাতী পথ।
তাহলে কি আমাদের চোখের সামনে জ্বলেপুড়ে সব শেষ হয়ে যাবে? না। উপায় আছে। বিশ্বে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা সমাধানের অযোগ্য। আজকের রাজনৈতিক হিংসা, হানাহানি থেকে বেরিয়ে আসারও পথ আছে। খোলা মন ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থাকলে সবই সম্ভব।
শুরু করতে হবে এভাবে। প্রথমে পেট্রলবোমা বন্ধ। রেললাইনে নাশকতা বন্ধ। এ দুটি বিষয়ে বিএনপির আপত্তি থাকার কথা নয়। কারণ যেখানে নাশকতা, সেখানে জনসমর্থন নেই। অন্যদিকে একই সঙ্গে বন্ধ করতে হবে বিএনপির বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন। বিএনপির চেয়ারপারসনের বাসায় বিদ্যুতের লাইন কাটা, টেলিফোন, ডিশ-লাইন, ওয়াইফাই লাইন কাটা, গেটে তালা, এসব নিম্নমানের কারসাজি একেবারে বন্ধ। সরকার যদি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মুক্তি দেয়, সভা-সমাবেশে বাধা না দেয়, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই সহনীয় হয়ে আসবে। এরপর হয়তো আলোচনার একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে এ বছর ফেব্রুয়ারির এই ভাষামাসের প্রথম দিনটি শুরু হয়েছে ৭২ ঘণ্টার হরতাল দিয়ে। বায়ান্নর ভাষাশহীদদের কথা স্মরণ করে কি এই মাসটি হরতাল-অবরোধের বাইরে রাখা যেত না? মহান একুশের এই মাসে আমরা ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব, ফুলে ফুলে ভরে দেব শহীদ মিনার। সেটাও কি অবরোধের মধ্যেই করতে হবে? যারা একুশের শক্তি সম্পর্কে সচেতন নয়, জানে না কী ভীষণ শক্তি ধারণ করে এই ভাষার মাস, ওরাই কেবল ভাষার মাসের অসম্মান করতে পারে।
মহান একুশকে সামনে রেখে সরকার ও বিরোধী দল যেন রাজনৈতিক হানাহানির অবসান ঘটায়। এতে হয়তো দুই পক্ষকে দু-এক কদম পিছিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দেশ এগিয়ে যাবে বেশ কয়েক কদম।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

ধর্ম, দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতি by তানজীনা ইয়াসমিন চৌধুরী

শুরুতেই বলা ভালো, আমি ইসলামিক স্কলার নই। তবুও ধর্মের ক্ষেত্রে দেশ ও সংস্কৃতিভেদে কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। আমার বর্তমান বসবাস জাপানে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ ধর্মবিমুখ। তাদের কিছু নির্দোষ প্রশ্ন তুলে ধরা যাক। যেমন_ আমাকে বলা হলো, 'অমুক তো কেক-ব্রেড, সর্টেনিংযুক্ত (প্রাণীজ ফ্যাট) কেক খায় না, ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার খায় না। তোমরা খাও কেন? তোমরা কি অন্যরকম মুসলমান? অন্য গোত্র?' বললাম, না, না, ইসলামে কোনো ক্লাস ডিভিশন নেই। 'তাহলে কি ও ভালো মুসলমান, তোমরা খারাপ মুসলমান?' আরেক দিনের ঘটনা_ ফিসফিস করে আমাকে দেখিয়ে আমার জাপানিজ প্রফেসর কাম ডিরেক্টরকে ক্লায়েন্টের প্রশ্ন : মেয়েটা মিসরীয়, ইরানি না তুর্কি? না না, বাংলাদেশি। বাংলাদেশি! বাংলাদেশি মেয়ে এমন মাথা ঢাকা সুট পরে? মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের চেহারা হলে দূরপ্রাচ্যের কোনো দেশের ধরে নিত। কারণ, ওদের কেউ কেউ টি-শার্ট, টপস, এমনকি শেপড গেঞ্জির সঙ্গেও মাথায় স্কার্ফ দিয়ে 'হিজাব' পরে। আরেকজন বলছিলেন_ 'রাস্তায় সেদিন বাঙালি এক পরিবারকে দেখেছি সাইকেল চালিয়ে যেতে।' কোন এলাকায়? 'গাক্কেনতসি।' গাক্কেনতসিতে তো এমন কোনো বাঙালি নেই! কেন মনে হলো যে ওরা বাঙালি? 'তোমার মতো মাথা ঢাকা ছিল!'
আমি নিশ্চিত, প্রবাসী বাঙালি নারীদের কমবেশী এ জাতীয় প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হয়। বিশেষ করে জাপানের মতো দেশে। এ ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকেই অনেক মেয়ে প্রবাস জীবনে হিজাব পরতে শুরু করে। উদাহরণ আমি নিজেই। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম। ১০ বছর থেকে পাঞ্জেগানা নামাজ, রোজা ফরজ; কামিজ-ওড়না বাধ্যতামূলক, স্কুল-কলেজে যাওয়ার সময় হিজাব পরেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেই বিয়ে হয়ে গেল, স্বামী বা আমি নিজেও কেন যেন আর তাগিদ অনুভব করলাম না হিজাবের। সেই তাগিদ পেলাম প্রবাস জীবনে। না, নিজের দেশের মতো রাস্তাঘাটে নোংরা দৃষ্টি থেকে বাঁচতে নয়। উপলব্ধি থেকে।
জাপানে আমাদের ছোট্ট শহরেই ৩০টির মতো দেশের মুসলিম দেখে নিজেই খুঁজতে শুরু করলাম, কেন আমাদের দেশে 'হিজাব' এত কম? কেন একেক দেশে হিজাবের রূপ একেক রকম? একটা দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ধর্মকে কতটা প্রভাবিত করে? সর্বোপরি আল কোরআনে হিজাবের নির্দেশনা কী দেওয়া আছে? খুব অল্প কথায় সুনির্দিষ্টভাবে আল কোরআনে সুরা আল নূরের আয়াত ৩০-৩১ এবং সুরা আহজহাবের আয়াত ৫৮-৫৯-এ 'মুসলিম নারী-পুরুষ' উভয়কেই শালীন পোশাক পরিধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিষ্কারভাবে প্রথমেই পুরুষের পর্দার কথা বলা হয়েছে। চোখ (দৃষ্টিকে অবনত) ও মনের পর্দা করতে। এরপর নারীর প্রতিও বলা হয়েছে, দৃষ্টিকে অবনত করতে, মনের পর্দা করতে এবং অতঃপর শরীরের পর্দা করতে। শরীরের পর্দা হবে এমন যে, নারীর সহজাত বা জন্মগত সৌন্দর্য ও সাধারণ অলঙ্কার (আটপৌরে ব্যবহার্য) ছাড়া অন্য কিছুই স্বামী এবং মাহরাম ব্যতীত কারও সামনে প্রদর্শিত হবে না। এখানে মাহরাম কারা তাও পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে। মাহরাম তারাই, যাদের সঙ্গে বিবাহ সম্পর্ক নিষিদ্ধ।
কাজেই বয়ঃপ্রাপ্ত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে সমানভাবে এর প্রয়োজনীয়তা একেবারে নিজের উপলব্ধি, উদাহরণ দিয়ে না বুঝিয়ে জোর করে মেয়েটাকে ধরে খালি বোরকা পরিয়ে দিলে চলবে না। কিংবা শুধু মেয়ের ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করে ছেলের চোখ, মন, দেহের পর্দার ব্যাপারে উদাসীন থাকলেও হিতে বিপরীতই হবে। আর ছেলেমেয়েতে এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা বৈপরীত্য আরেক প্রশ্নের জন্ম দেবে! মেয়ে দেখবে তার ভাই একটা ইভ টিজার আর বাবা-মা সেটা আমলেই আনেন না। এমন বাবা-মা কি মেয়ের কাছে যথাযথ সম্মান আশা করতে পারেন? উপরন্তু আপনার মেয়েই রাস্তায় একইভাবে অন্য যে ছেলে এমন শিক্ষা পায়নি তার দ্বারা অসম্মানিত হবে। তাই যার যার ঘর থেকেই শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে ধর্মীয় অনুশাসনেই।
মনে পড়ে যায় আমার দোতলায় থাকা থাই মুসলিম পরিবারের কথা। সদ্যজাত কন্যাসন্তান দেখতে গেছি_ দিন সাতেকের বাচ্চা। মাথায় হিজাব_ শরীরে শুধুই ডায়াপার! কারণ কী? মেয়ে না? হিজাব তো করতে হবে! এই হলো দেশভেদে হিজাবের ধারণা!
মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশের প্রতিবেশী বান্ধবী, ৫ সন্তান ও স্বামীসহ হজ করেছেন। আমাকে দেখলে আড্ডার শেষে অবশ্যই বলত_ 'কেন তুমি হিজাব করো না? কেন তুমি সাজসজ্জা করো?' কিন্তু আড্ডার ফাঁকে নামাজের সময় হলে আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য উসখুস শুরু করতে করতে তার নির্বিকার ভাব দেখে এক পর্যায়ে ওয়াক্ত চলে যাওয়ার আগে বাড়ি চলে আসতাম। নামাজ পড়ে পার্কে গিয়ে দেখতাম নামাজের ওয়াক্ত পার হয়ে গেলেও তিনি পার্কেই আছেন! আমি খুব অবাক হতাম যে, ইসলামের মূল পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে হলো নামাজ। আর হিজাব স্রেফ আরও অনেক ফরজের মধ্যে অন্যতম! মূল স্তম্ভের ৫ ফরজের চেয়ে দৃশ্যমান ফরজের প্রতি এত গুরুত্ব!
আল্লাহ কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না, মুসলিম মাত্রেরই তা জানা উচিত। বাংলাদেশের সমাজের প্রসঙ্গে আসি। বঙ্গের উৎস বিবেচনায় খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সাল থেকে বাংলাভাষী দ্রাবিড়, তিব্বতীয় ব্রাহ্মণদের পদচারণায় জাগ্রত এই ভূমিতে খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ থেকে ময়ুর, গৌড়, পাল সাম্রাজ্য পর্যন্ত চলল বৌদ্ধ শাসনামল। ১০৭০ সাল থেকে ১২০৪ পর্যন্ত স্থানীয় হিন্দু সেন শাসনামল। ১২০৪ সালে তুর্কি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি দিলি্লর সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের পৃষ্ঠপোষকতায় শাসক লক্ষণ সেনকে পরাস্ত করে মুসলিম শাসনামল শুরু করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পর্যুদস্তের পর ব্রিটিশ শাসন শুরু হয় বাংলায়। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের পর পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া স্থাপিত হয়, শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। এরপরের ইতিহাস সবার জানা।
লক্ষ্য করুন, আমাদের শাসকেরা (পাল শাসকরা ব্যতীত) কখনোই স্বদেশী বা বাঙালি ছিলেন না। কাজেই, তাদের মাধ্যমে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির পলিমাটি আমাদের সংস্কৃতিতে গোড়াপত্তন করে গেছে। আর ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভারত-পাকিস্তান হওয়ারও অনেক আগে বাংলাভাষীদের ভিত্তিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন। পরে তা-ই দেশভাগের সময় পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলা হয়েছে। কাজেই, আমরা আদতে আগে বাঙালির পরিচিতি পেয়েছি। অনেক পরে পেয়েছি মুসলমানের পরিচিতি। আমাদের সংস্কৃতিতেও তারই প্রতিফলন।
আরও অনুঘটক ছিল। ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন অপব্যাখ্যাজনিত অন্ধত্বের কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জ্ঞানচর্চায় ইংরেজদের সাহচর্যে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। তাদের এগিয়ে যাওয়া প্রগতিশীল, সংস্কারমুক্ত মুসলিমদের অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। কেউ কেউ পূর্ণ পশ্চিমা কেতায় চলতে চেয়েছে বা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য জাতিকে অনুসরণ করতে চেয়েছে। অবশ্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বেগম রোকেয়ার মতো অনেকেই স্বমহিমায় ভাস্বর ছিলেন নিজের শিকড়বিচ্যুত না হয়েই। ফলে বাঙালি মুসলিমের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পোশাক নিয়ে একটি বিভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা থেকেই গেছে।
অন্যদিকে পরবর্তীকালে মাদ্রাসার ধর্মীয় শিক্ষায় সাধারণত পরিবারের সবচেয়ে কম বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলেদের পাঠানো হতো। তাদের অন্য কোথাও ভবিষ্যৎ নেই বলেই আশঙ্কা হতো। ধর্মীয় বিভিন্ন ব্যাখ্যা তাদের মাধ্যমেই আমরা পেয়েছি। কিন্তু ধর্মের সঙ্গে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রয়োজনের বিষয়টি তারা কতটা ব্যাখ্যা করতে পেরেছিল?
মসজিদের শহর ঢাকায় জন্মানো ও বেড়ে ওঠা আমি জীবনেও কোনো মসজিদের সীমানা প্রাচীর ডিঙাতে পারিনি, অনুমোদন ছিল না। আর জাপানে এসে ৩০টিরও বেশি মুসলিম দেশের নারীদের সঙ্গে মসজিদকেন্দ্রিক নানা কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে কোনো বাধা নেই। মসজিদ আমার কাছে এখন নিষিদ্ধ কোনো জায়গা নয়। এখানে দেখেছি, অফিসের ড্রেসকোড ও হিজাবের মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বিধান করা যায়। দেখেছি মেয়ে হয়েও কীভাবে ঘরের ভেতরে ও বাইরে নিদ্বর্িধায় কাজ করা যায়।
প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়, ফুকুওকা, জাপান