Sunday, August 17, 2025

গার্ডিয়ানের রিপোর্ট: গাজা দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইল

গাজা সিটি থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তারা কয়েকদিন আগেই ঘোষণা দেয়- গাজা সিটি ও এর আশপাশের সব এলাকা দখল করে নেবে। এমন ঘোষণার পর জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে সেই দখল অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। সেই সঙ্গে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করবে। অর্থাৎ তাদের বৈধ আবাসন থেকে তাড়িয়ে দেবে।

অন্যদিকে হামলা চলছেই। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বশেষ হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি অভিযানে ইতিমধ্যেই সেখান থেকে কমপক্ষে ৬১ হাজার বেসামরিক নিহত হয়েছেন। সৃষ্টি হয়েছে দুর্ভিক্ষ। সেই অনাহারী, দুর্ভিক্ষকবলিত মানুষের ওপরও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, রোববার থেকে গাজার বাসিন্দাদের তাঁবু ও অন্যান্য আশ্রয় সরঞ্জাম দেয়া হবে যাতে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দক্ষিণে সরিয়ে নেয়া যায়। তবে তারা বলেনি কবে থেকে এই গণউচ্ছেদ শুরু হবে। ইসরাইল একাধিকবার তথাকথিত ‘নিরাপদ অঞ্চল’-এও বোমা বর্ষণ করেছে। শনিবার দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসিতে একটি শিশুকন্যা ও তার বাবা-মা নিহত হয়েছেন ইসরাইলি বিমান হামলায়। আল-মাওয়াসিকে এর আগে মানবিক অঞ্চল ঘোষণা করেছিল ইসরাইল।

আল-মাওয়াসি এখন গাজার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের একটি। কারণ ইসরাইল মানুষদের ওই নির্জন এলাকায় ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, আসন্ন অভিযান আল-মাওয়াসি, গাজা সিটি এবং কেন্দ্রীয় শিবিরগুলো- অর্থাৎ নুসেইরাত ও বুরেইজ শরণার্থী শিবির অন্তর্ভুক্ত করবে। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শনিবার নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ১৩ জনকে সেনারা গুলি করেছে।

এ সময় তারা উত্তর ও দক্ষিণে ত্রাণ সংগ্রহ কেন্দ্রের কাছে খাদ্য সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত কারণে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশু রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরাইলি অবরোধে সহায়তা না আসার কারণে অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা এখন ২৫১।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গাজা নগরীতে বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ অংশে এবং জয়তুন এলাকায় আবাসিক ভবনে ইসরাইলি বিমান হামলা বাড়ছে। হামাস বলেছে, শনিবার ওই এলাকায় যুদ্ধবিমান, কামান ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাস্সাল বলেন, জয়তুনে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেখানে আটকে আছে। তাদের বেশির ভাগই খাদ্য ও পানি বিহীন এবং জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিস থেকেও বঞ্চিত। তিনি এটিকে জাতিগত নির্মূল বলে অভিহিত করেন।
৪০ বছর বয়সী ঘাসান কাশকো পরিবার নিয়ে জয়তুনের একটি স্কুল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা ঘুমের স্বাদই ভুলে গেছি। অবিরাম বিস্ফোরণ আর ট্যাংকের গোলাবর্ষণে রাত-দিন একাকার হয়ে যাচ্ছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো, এমনকি ইসরাইলের ভেতরের সংগঠনও বলছে এটি গণহত্যা।

শনিবারের ঘোষণায় ইসরাইল জানায়, জাতিসংঘ ও অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে আশ্রয় সামগ্রী কারেম শালোম সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ গাজায় নেয়া হবে। তবে ইসরাইলি পরিদর্শন ও প্রশাসনিক জটিলতায় এতদিন অনেক সহায়তাই প্রবেশ করতে পারেনি। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে, গাজার দক্ষিণে মানুষ সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা কেবল দুর্ভোগ বাড়াবে। তবে তারা আশ্রয়ের প্রয়োজন স্বীকার করাকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, এই সুযোগ আমরা কাজে লাগাবো।

জাতিসংঘ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে, গাজা সিটি থেকে মানুষ উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার পরিবার ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে আরও নিমজ্জিত হবে। ফিলিস্তিনি ও জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলেছেন, গাজায় কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলেও নয়। সেখানে ইসরাইল লোকজনকে যেতে বলছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাতজ বলেন, নতুন অভিযানের পরিকল্পনা এখনো প্রণয়নাধীন। ফিলিস্তিনি সংগঠন ইসলামিক জিহাদ হামাসের মিত্র। সেনাবাহিনীর এই ঘোষণাকে তারা গাজা নগরী দখলের নির্মম অভিযানের অংশ এবং আন্তর্জাতিক আইনকে প্রকাশ্য উপহাস বলে আখ্যায়িত করেছে।

আলাস্কা শীর্ষ বৈঠক: পুতিন ১, ট্রাম্প ০ by হাসান ফেরদৌস

কূটনীতিকে যদি খেলার প্রতীক ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে অনায়াসেই বলা যায়, আলাস্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে এক গোলে জিতেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। শূন্য হাতে ঘরে ফিরেছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সেরা ‘ডিল মেকার’ হিসেবে পরিচয় করাতে ভালোবাসেন। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় বসামাত্রই তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। ছয় মাস চলে গেছে, যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। শুরুতে দোষ দিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে, হোয়াইট হাউসে ডেকে এনে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, এই যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে খেলার মতো কোনো তাসই তাঁর হাতে নেই। পরে মস্কোর আগ্রাসী বিমান হামলা থামাতে ব্যর্থ হয়ে চোখ ফেরালেন পুতিনের দিকে, বললেন লোকটা অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, কিন্তু সে সবই ফালতু। খেপে গিয়ে এমন কথাও বললেন, আগামী ১০–১২ দিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি না মেনে নিলে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।

অথচ নিষেধাজ্ঞা নয়, অতিরিক্ত বাণিজ্যশুল্ক নয়, উল্টো কোনো আগাম শর্ত ছাড়াই পুতিনের সঙ্গে তিনি আলাস্কায় শীর্ষ বৈঠকে সম্মত হয়ে গেলেন। আলোচনার বিষয়—ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি। অথচ সেই বৈঠকে ইউক্রেনের কোনো প্রতিনিধি নেই। নিউইয়র্ক টাইমস টিপ্পনী কেটে বলেছে, পুরো ব্যাপারটাই দুই পরাশক্তির মধ্যে আপসে দুনিয়া ভাগাভাগির মতো, ঠিক যেভাবে একসময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে দুই-তিনটি ঔপনিবেশিক শক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।

ট্রাম্প অবশ্য আশ্বাস দিয়েছিলেন, ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো চুক্তি হবে না। আলাস্কাতেই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ডেকে এনে ত্রিমুখী বৈঠক হবে, এমন কথাও বলেছিলেন। তা হয়নি, সম্ভবত পুতিনের অনাগ্রহেই জেলেনস্কির নাম বাদ যায়। তবে নিজের দুই সহকারী—বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সঙ্গে নিয়ে পুতিনের দুই সহকারীর সঙ্গে মুখোমুখি বসেছিলেন ট্রাম্প। মাঝখানে কোনো টেবিল নেই, মুখোমুখি তিনখানা করে চেয়ার বিছিয়ে বৈঠক। ট্রাম্প হয়তো বিশ্বাস করতেন, তিনি একবার যদি পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকে বসতে পারেন, তাহলে যুদ্ধবিরতিতে তাঁকে সম্মত করাতে সক্ষম হবেন। এর আগে একই কথা বলেছিলেন উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং-উন সম্বন্ধে। সেখানে চিড়ে ভেজেনি। একই ফলাফল পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেরও।

ইউক্রেনে হামলার জন্য পুতিন বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অনাহূত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। সেই পুতিনকে ট্রাম্প অ্যাঙ্কোরেজের বিমানবন্দরে লালগালিচা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করলেন। শুধু তা–ই নয়, পুতিন বিমান থেকে নামতে না নামতে তিনি দূর থেকে হাততালি দেওয়া শুরু করলেন। এমন দৃশ্য আগে কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না। ট্রাম্প তাঁর সরকারি গাড়ি ‘বিস্ট’-এ পুতিনকে নিজের পাশে বসালেন। সেটাও অভিনব। সেখানে তাঁদের দুজনের একান্তে কী কথা হলো, আমরা জানি না। পুতিন ভালোই ইংরেজি জানেন। অনেকেই বলছেন, গাড়িতেই ট্রাম্পকে খুশি করার মতো যা বলার তিনি বলে দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেছিলেন, প্রথম দুই-চার মিনিটের মধ্যেই তিনি বুঝে যাবেন যুদ্ধবিরতি অর্জন সম্ভব হবে কি না। যদি দেখেন, না, কোনো আশা নেই; তাহলে নিজেই সভা থেকে বেরিয়ে যাবেন। তিন-চার মিনিট নয়, আড়াই ঘণ্টা বৈঠক শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানালেন, খুব ভালো আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো ‘ডিল’ হয়নি। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়নি। এমনিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে ট্রাম্পকে থামানো কঠিন। কিন্তু এদিন ঘরভর্তি সাংবাদিক থাকলেও তাঁদের কারও কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়েই মঞ্চের পেছনে প্রস্থান করলেন।

যাঁরা পুতিনকে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তাঁরা বলছেন, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি আলাস্কার বৈঠকে আসেননি। এই মুহূর্তে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনারা স্বস্তিকর অবস্থায় আছেন। মস্কো বলছে, যুদ্ধে তারাই জিতছে। অতএব এই সময়ে যুদ্ধবিরতির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাহলে পুতিন আলাস্কায় এসেছিলেন কেন?

তিনি আসলে বিশ্বমঞ্চে আবার প্রবেশের এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। অন্য কেউ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তাঁকে সমান মর্যাদা দিয়ে নিজ দেশে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন। এটাই তাঁর জন্য মস্ত কূটনৈতিক জয়। ট্রাম্প যাতে অতিরিক্ত শুল্ক না বসায় বা অন্য কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি না করে, সে জন্য কিছু বাড়তি সময় সংগ্রহ তাঁর অন্য উদ্দেশ্য।

পুতিনের অন্য বড় জয় ছিল, এই যুদ্ধ বন্ধে কী কী শর্ত রয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর ‘মূল কারণ’গুলোর সমাধান করতে হবে। এ জন্য যা করতে হবে তার মধ্যে রয়েছে—ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ, তার ন্যাটো জোটে অংশগ্রহণ না করার নিশ্চয়তা এবং সেখানে নতুন নির্বাচন। অনুমান করা হচ্ছে, অপর যে শর্তটি তিনি ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, তা হলো, এরই মধ্যে পূর্বাঞ্চলের যে এলাকাগুলো মস্কো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, রাশিয়ার সীমানা হিসেবে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ট্রাম্প নিজেই ইউক্রেনের দখলকৃত এলাকা রাশিয়ার দখলে রাখার ব্যাপারে নিজের সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, যুদ্ধরত দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে জায়গা বদল করে নিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, রাশিয়া এরই মধ্যে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ জমি নিজের দখলে নিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য শূন্য ৮ শতাংশ রুশ জমি বা পাঁচ বর্গমাইল। তাহলে একে অপরের সঙ্গে কী বদলাবদলি হবে?

ইউক্রেনের শাসনতন্ত্রে বলা আছে, কোনো অবস্থাতেই দেশের কোনো জমি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। জেলেনস্কিও মুখে বলেছেন, ইউক্রেনের ‘দ্বিতীয় দেশভাগ’ মেনে নেওয়া হবে না। ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো শান্তিচুক্তি হবে না, জেলেনস্কি সে কথাও জানিয়ে দিয়েছেন।

ইউক্রেনে যুদ্ধ থামুক, তা যে শর্তেই হোক, এটা সম্ভবত ট্রাম্প চান। তিনি আশায় আছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি অর্জন সম্ভব হলে তিনি নির্ঘাত শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাবেন। এরই মধ্যে ইসরায়েল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার তাঁকে মনোনয়ন দিয়ে নোবেল কমিটির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ট্রাম্প নিজেও এখানে–সেখানে ফোন করে নিজের হয়ে তদবির করেছেন। সম্প্রতি জানা গেছে, নরওয়ের অর্থমন্ত্রীকে ফোন করে নোবেল পুরস্কারের বিষয়ে কথা বলেছেন।

* হাসান ফেরদৌস, লেখক ও প্রাবন্ধিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

 দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরের এলমেনডর্ফ–রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে, ১৫ আগস্ট ২০২৫
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরের এলমেনডর্ফ–রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে, ১৫ আগস্ট ২০২৫ ছবি: এএফপি

ভিডিও ভাইরাল: ২১ বছর ধরে কারাবন্দী বারগুতিকে হুমকি দিয়ে এলেন বেন–গভির

ইসরায়েলের কারাগারে গিয়ে সুপরিচিত ফিলিস্তিনি বন্দী মারওয়ান বারগুতিকে হুমকি দিচ্ছেন ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন–গভির। প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

ইসরায়েলি কারাগারের এ ভিডিওতে বেন–গভিরকে বলতে শোনা যায়, ‘ইসরায়েলের বিরোধিতা করলে যে কেউ “ধ্বংস” হয়ে যাবে।’

এ ভিডিওর মধ্য দিয়ে অনেক বছর পর বারগুতিকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দেখা গেল। ভিডিওতে তাঁকে বয়সের ভারে ক্ষীণ হয়ে পড়া, সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা একজন ব্যক্তি ও প্রায় অচেনারূপে দেখা যায়।

গত বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ওই ভিডিও। তাতে দেখা যায়, বেন–গভির বারগুতিকে বলছেন, ‘যে–ই ইসরায়েলের জনগণের সঙ্গে ঝামেলা করবে, আমাদের সন্তানদের হত্যা করবে, আমাদের নারীদের হত্যা করবে, তাঁকে আমরা ধ্বংস করে দেব। আমাদের হারাতে পারবে না।’

২০০৪ সাল থেকে কারাগারে আছেন ফিলিস্তিনি নেতা মারওয়ান বারগুতি। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) নিয়ন্ত্রণকারী দল ফাতাহর একজন শীর্ষ নেতা তিনি। ২০০০–২০০৫ সালে ফিলিস্তিনিদের দ্বিতীয় ইন্তিফাদায় (গণ–অভ্যুত্থান) নেতৃত্ব দেওয়ায় ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে তাঁকে নিশানা করে ইসরায়েল।

মারওয়ানের ছেলে কাসেম বারগুতি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ভিডিও প্রকাশের পর পরিবার গভীরভাবে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

কাসেম বলেন, ‘দুই বছর ধরে তাঁকে (মারওয়ান) হুমকি ও আক্রমণের একটি ধারাবাহিকতা চলছে। (গাজায়) যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার তাঁকে দুই বছর আগে আক্রমণ করা হয় এবং তিনি আহত হন।’

মারওয়ান বারগুতির ছেলে আরও বলেন, ‘আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন–গভির, যিনি ইসরায়েলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নেতৃত্বের প্রতিনিধি, তাঁর জীবনকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছেন।’

কাসেমের মতে, ‘স্পষ্টভাবে বলা যায় যে তাঁকে (মারওয়ান) তাঁর সেলের ভেতরে হত্যা করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতন করা ও নিশানা বানানো আসলে গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যারই অংশ।’

ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বেন–গভির কারা কমিশনার কোবি ইয়াকোবির সঙ্গে তেল আবিবের গানোট কারাগারে যান। সেখানে ‘বন্দী সন্ত্রাসী’দের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার বিষয়টি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা।

দীর্ঘদিন ধরে বারগুতি একাকী সেলে বন্দী। পাঁচ ইসরায়েলিকে হত্যার অভিযোগে তাঁকে পাঁচ দফা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অতিরিক্ত ৪০ বছরের সাজা দিয়েছেন ইসরায়েলি আদালত। বারগুতি এ আদালতের বৈধতা অস্বীকার করলেও নিজের পক্ষে কোনো সাফাই দেননি।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ বছর বয়সী বারগুতি যদি নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন, তবে তিনি সহজেই ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হবেন।

ফাতাহর সঙ্গে বারগুতির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। বর্তমানে ব্যাপক অজনপ্রিয় ‘ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ’ (পিএ)–এর সঙ্গে যুক্ত দলটি। অবশ্য তিনি ফিলিস্তিনি ঐক্যের একজন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন।

গত জানুয়ারিতে মিডল ইস্ট আই জানায়, গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বারগুতির মুক্তির জন্য মিসর ও কাতার, পাশাপাশি হামাসও ‘সব ধরনের উপায়’ ব্যবহার করছে।

আলোচনায় ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো হামলায় জিম্মি ইসরায়েলিদের বিনিময়ে যেসব বন্দী ফিলিস্তিনি নেতার নাম মুক্তির তালিকায় ছিল, বারগুতি তাঁদের শীর্ষে ছিলেন।

সূত্র আরও জানায়, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং মিসরের সাধারণ গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মেজর জেনারেল হাসান মাহমুদ রাশাদ ব্যক্তিগতভাবে বারগুতির মুক্তির পক্ষে উদ্যোগ নেন।

তবে অন্য একটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেছিল, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্ব টলে যেতে পারে, এ আশঙ্কায় পিএর শীর্ষ নেতারা তাঁকে বন্দী বিনিময় থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

নতুন ভিডিও প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার ফাতাহর সাবেক প্রার্থী ও বারগুতির সমর্থক আউনি আলমাশনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘বেন–গভির মনে করেন, তিনি এভাবে ফিলিস্তিনি জনগণকে অপমান করছেন।’

‘কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণ এবং মারওয়ানের সব অনুরাগী গর্বিত তাঁর কিংবদন্তি–সম দৃঢ়তা, মহান অবস্থান ও দখলদারের নৃশংসতার সামনে অনমনীয়তার জন্য’, যোগ করেন আউনি। তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার যে আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব মারওয়ান করছেন, তা কখনোই নিপীড়ন, অন্যায় কিংবা ঔদ্ধত্যে ভাঙা যাবে না।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা শুরুর পর ব্যাপক হারে ফিলিস্তিনি গ্রেপ্তার বা আটক ও ইসরায়েলি কারাগারের নীতিমালা কঠোর করার প্রবণতা বেড়েছে বলে জানাচ্ছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম।

বারগুতিকে বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তাঁর পরিবার। গাজায় সাম্প্রতিকতম তাণ্ডব শুরুর পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েলি কারারক্ষীদের আক্রমণে তাঁর মাথা, কান, পাঁজর, ডান হাত ও পিঠে আঘাত লাগে।

বেন–গভির অবৈধ ইসরায়েলি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রভাবশালী নেতা। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের জীবনের মান খারাপ করা তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই

বারগুতিকে প্রায়ই ‘ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেলা’ বলে ডাকা হয়। দখল করা পশ্চিম তীর ও গাজায় জনমত জরিপে বারগুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা
বারগুতিকে প্রায়ই ‘ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেলা’ বলে ডাকা হয়। দখল করা পশ্চিম তীর ও গাজায় জনমত জরিপে বারগুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা। ছবি : এএফপি

বৈঠকে পুতিন ‘স্পষ্টভাবে জয়ী’, ট্রাম্প ‘হারেননি’: সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, আলাস্কা শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘স্পষ্টভাবে জয়ী’ হয়েছেন। যদিও ইউক্রেন শান্তিচুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘হেরে যাননি’।

কেবল আবার বৈঠকের প্রতিশ্রুতি ছাড়া প্রায় তিন ঘণ্টার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে খুব বেশি কিছু পাননি। বোল্টন সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্প কিছুই পাননি। কেবল আরও বৈঠকের প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। অন্যদিকে পুতিন ‘সম্পর্ক পুনর্গঠনে অনেকটা এগিয়ে গেছেন। আমি সব সময়ই মনে করতাম, এটিই তাঁর মূল লক্ষ্য।’

বোল্টন আরও বলেন, ‘তিনি (পুতিন) নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা পেয়েছেন এবং কোনো যুদ্ধবিরতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়নি। পরবর্তী বৈঠকের তারিখও ঠিক হয়নি। জেলেনস্কিকে এসব কিছু এই সংবাদ সম্মেলনের আগে জানানো হয়নি।

যদিও কোনো স্পষ্ট ফলাফল বা দিকনির্দেশনা ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়েছে, তবু দুই নেতা একে ‘ফলপ্রসূ’ আখ্যা দিয়েছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখনো সেখানে পৌঁছাইনি, তবে সেখানে পৌঁছানোর ভালো সুযোগ আছে।’

বোল্টন বৈঠকের সময়কার ট্রাম্পের চেহারা নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় বলব, আমার মনে হয়েছে ট্রাম্পকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সত্যিই খুব ক্লান্ত। তিনি হতাশ নন, কিন্তু ক্লান্ত। এর মানে কী হতে পারে, সেটা ভেবে দেখতে হবে।’

ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, আলাস্কার বৈঠক ‘খুবই সফল’ হয়েছে। তবে তিনি এখন যুদ্ধবিরতির বদলে সরাসরি একটি শান্তিচুক্তি চান।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আলাস্কায় দারুণ ও সফল একটি দিন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক ভালো হয়েছে। এরপর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও কয়েকজন ইউরোপীয় নেতার সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত ফোনে কথা হয়েছে। এতে ন্যাটোর মহাসচিবও ছিলেন। সবার মত ছিল, ভয়াবহ এই যুদ্ধ শেষ করার একমাত্র উপায় হলো সরাসরি একটি শান্তিচুক্তি করা। শুধু যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়, কারণ, তা অনেক সময় টেকে না।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, আগামী সোমবার জেলেনস্কি তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন। এরপর নেতারা পুতিনের সঙ্গে একটি বৈঠকের আয়োজন করবেন।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরের এলমেনডর্ফ– রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে, ১৫ আগস্ট ২০২৫
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে) ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের অ্যাঙ্কোরেজ শহরের এলমেনডর্ফ– রিচার্ডসন সামরিক ঘাঁটিতে, ১৫ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স