Saturday, May 17, 2014

ভাড়াটে মানুষের দেশ by আসিফ নজরুল

কিছুদিন আগে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে ‘ভাড়া খাটছে ছাত্রলীগ’। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাঁ টাকার বিনিময়ে অপহরণ করে মানুষকে বন্দী রাখছেন খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে। এর আগে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার পর মানুষ হত্যার কাজে ভাড়া খাটেন র‌্যাবের কোনো কোনো সদস্য, এমন সাক্ষ্য-আলামত পাওয়া গেছে। অভিযোগমতে, এসব হীন অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে সরকারি গাড়ি, কার‌্যালয়, নৌকা এমনকি সরকারি রশি! ছাত্রসমাজ আমাদের ভবিষ্যৎ, ছাত্রলীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জ্বলন্ত মশাল। র‌্যাব অপরাধ দমনে গঠিত বিশেষায়িত বাহিনী। এদের কেউ কেউ যদি অপরাধ করার কাজে ভাড়া খাটে, তাঁহলে আমাদের খুব বিচলিত হওয়া উচিত। কিন্তু আসলেই কি খুব বিচলিত আমরা সবাই? নারায়ণগঞ্জে সাতটি লাশ একসঙ্গে ভেসে উঠে আমাদের চেতনায় আছড়ে না পড়লে কিংবা প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে নিহত নজরুলের শ্বশুর মুখ না খুললে র‌্যাবের ভাড়া খাটা নিয়ে এতটা বিচলিত কি হতাঁম আমরা? এ ঘটনার পরপরই ছাত্রলীগ ভাড়ায় অপহরণ না করলে আদৌ কি এভাবে আলোচিত হতো বিষয়টি?

মোদি-ডকট্রিন ও প্রধানমন্ত্রীর ভুল সংকেত by মিজানুর রহমান খান

ভারতে পালাবদল মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি দোষারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যকে সময়োপযোগী বা সমীচীন বলা যাবে না৷ এতে কোনো কূলই রক্ষা পাবে না৷ একজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘ভয়ানক ভুল’ বলেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন৷ অনেেকর মতে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার ব্যাপারে মমতাকে দায়ী করা আসলে দিল্লির অপারগতা কিংবা অজুহাত৷ মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর থেকেই মমতা আলোচনায়৷ শেখ হাসিনা নীরবতা ভাঙলেন এমন একটি সময়ে, যখন অবৈধ বাংলাদেশি ইস্যুতে মোদির অন্যায্য মন্তব্যের (‘১৬ মের পরে অবৈধ বাংলাদেিশদের বহিষ্কার করা হবে’) বিরুদ্ধে মমতাই সবচেয়ে বেশি জোরালো অবস্থান নিয়েছেন৷ যদিও ২০০৫ সালে আমরা এই মমতাকেই একই মনোভাব নিয়ে লোকসভায় স্পিকারের মুখের ওপর ফাইল ছুড়তে দেখেছি৷

গুম, খুন রোধ: কিছু করণীয় by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

দেশজুড়ে এখন একটাই আলোচনা, নারায়ণগঞ্জের গুম ও খুন। বিশেষ করে, র্যাবের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় এই আলোচনা এক অন্য মাত্রা পেয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে, প্রকৃত অপরাধী ও তাদের সহযোগী কারা। অনেকে বলেন, ‘সরকারই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। সরকারের প্রশ্রয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। সরকার চাইলে আজই সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে ইত্যাদি।’ এ ধারণাগুলো সত্য না অসত্য, তা বলা কঠিন। কিন্তু এটা ঠিক যে সমাজের বহু লোক বিশ্বাস করেন, সরকারের প্রশ্রয়ে এ ধরনের ঘটনা (গুম, খুন) ঘটে চলেছে। সরকার যদি কোনো রাজনৈতিক কারণে বা সরকারপ্রধানের কারণে প্রকৃত আসামি ধরতে না চায়, তাহলে আমরা অসহায়। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ধরা, আইনের আশ্রয়ে আনা ও আইনের পথে মামলাকে এগিয়ে নেওয়া—এ সবই সরকারের কাজ। কোনো সংক্ষুব্ধ পরিবার, ব্যক্তি বা সংগঠন চাইলেও এই কাজগুলো করতে পারবে না। এখানেই নাগরিক সমাজ অসহায়।

কেলেঙ্কারি- ‘স্বর্ণভীতি’ by এ কে এম জাকারিয়া

সমস্যাটিকে ‘স্বর্ণভীতি’ হিসেবেই উল্লেখ করতে হচ্ছে। কারণ, ভীতিটি স্বর্ণ-সংক্রান্ত, এবং ভয়টি সংক্রমণের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তা না আবার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে পড়ে! অতএব স্বর্ণ থেকে দূরে থাকো শত হাত! জাতীয় পরিবেশ পদক থেকে এবার নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে সোনাকে। এই সিদ্ধান্ত পরিবেশ পদকবিষয়ক জাতীয় কমিটির, এবং তা ‘সর্বসম্মত’। এবার যাঁরা পরিবেশ পদক পাবেন, তাঁরা কিছুটা দুর্ভাগাই। ‘স্বর্ণপদক’ পাওয়ার তৃপ্তিটি তাঁদের আর হবে না। এবারের পদক মানে টাকা! ক্রেস্ট একটি থাকবে বটে, তবে সেখানে আর যা-ই হোক, সোনা বলে কিছু থাকবে না।

‘হাতি খাদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে’- খেয়েদেয়ে কাজটি হচ্ছে পদত্যাগ by এ কে এম জাকারিয়া

হাতির খাদে পড়ার সঙ্গে চামচিকার লাথি মারার সম্পর্কটি আমাদের সমাজে অনেক পুরোনো৷ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী তাঁর বর্তমান দশা সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে এই আক্ষেপই জানিয়েছেন৷ ‘হাতি খাদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে’৷ ফলে, এমন একটি পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের উচিত ‘হাতিকে’ সহযোগিতা করা৷ এখানে হাতির চরিত্রটি যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী নিজে, তা স্পষ্ট৷ কিন্তু চামচিকার চরিত্রগুলো যে কারা, তা ধোঁয়াশাই রয়ে গেল৷ এরা কি তাঁর দল বা সরকারের কেউ কেউ, নাকি ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো শক্তি’? আরও একটি বিষয় বোঝা যাচ্ছে না, সাংবাদিকেরা কীভাবে ‘হাতির’ প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন!

পতনের বিপরীতে একজন সুমাইয়া by আনিসুল হক

সুমাইয়া বিনতে আফসারদের দিকে তাকিয়ে আছি, যখন কোথাও কোনো আশার আলো দেখছি না। সুমাইয়া ক্লাস নাইনের ছাত্রী। ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে। তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাস দেড়েক আগে। তাদের স্কুলে গিয়েছিলাম কিশোর আলোর হয়ে। গল্প লেখা ও আঁকা বিষয়ে কথা বলতে। মঞ্চে ছেলেমেয়েদের ডেকে এনে নানা কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। তারাও নানা প্রশ্ন করছিল। হঠাৎই সুমাইয়া মাইকে বলল, ‘একটা প্রশ্ন আছে।’
আমি বললাম, ‘বলো।’

ভারতে পদ্মফুল পশ্চিমবঙ্গে ঘাসফুল

বুথফেরত সমীক্ষার সব ফলই পক্ষে! প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী আগে থেকেই সাজাতে শুরু করেছেন তার ‘মন্ত্রিসভা’। এমন পরিস্থিতি ভারতবাসী স্মরণযোগ্যকালে দেখেছে কি না সন্দেহ! আর কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ? বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল সত্যি হলে, যে রাজ্যের কার্যত কোনো ভূমিকাই থাকার কথা নয় নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে। লোকসভার ফলাফলে তার আগ্রহের জায়গা কী? শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৭-১১ মিনিট) মমতার দল তৃণমূল পেয়েছে ৩৪ আসন। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ১৯টি আসন পেয়েছিল! তখন ‘পরিবর্তনে’র পালে সদ্য হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। জোটসঙ্গী কংগ্রেস এবং এসইউসি-ও ছিল মমতার পাশে! তিন দলের জোট পেয়েছিল মোট ২৬টি আসন। দু’বছর পর ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস-তৃণমূল মিলে ধরাশায়ী করেছিল বামফ্রন্টকে। লোকসভাওয়ারি পরের ভিত্তিতে সেই ‘জোট’ এগিয়ে ছিল ৩২টিরও বেশি আসনে। কংগ্রেস পেয়েছিল ৪২টি আসন। তৃণমূল একা পেয়েছিল ১৮৪টি বিধানসভা (বিভিন্ন উপ-নির্বাচন এবং দলবদলের জেরে পরে তা আরও বেড়েছে)। অর্থাৎ, সেই নিরিখে তাদের প্রাপ্য অন্তত ২৬টি লোকসভা। গতবছর পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফল ধরলে আবার একলা লড়েই তৃণমূল প্রায় ৩০টির মতো লোকসভা আসনে এগিয়ে। বস্তুত, পঞ্চায়েত ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতেই লোকসভায় একলা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মমতা। বুথফেরত সমীক্ষাও বলছে, তৃনমূল এখনও এগিয়ে রাজ্যে। কিন্তু কতটা?
প্রশ্ন সেটাই। কংগ্রেস ছাড়া একা লড়ে ক’টি আসন পাবেন মমতা? তার এবং কংগ্রেসের ভোট কাটাকাটির সুযোগ কতটা পাবে বিরোধী বামেরা? আরও জরুরি প্রশ্ন- বিজেপি কতটা কাড়তে পারবে তার পালের হাওয়া? ২০১৬’র বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যে বিজেপির ক্রমান্বয়ে উত্থান ঠেকাতে এবং নিজের ‘অস্তিত্ব’ রক্ষার তাগিদে আবার কংগ্রেসের সঙ্গেই জোট বাঁধতে হবে মমতাকে? এদিকে, গোটা ভারতে পদ্মফুলে ছেয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গে সেই ঘাসফুলই ফুটল। শুক্রবার সকালে গণনা শুরুর একটু পর থেকেই অবশ্য বোঝা গিয়েছিল যে বুথ ফেরত সমীক্ষার আভাস ছাড়িয়ে জয়ের রেখা অনেক দূর এগোতে চলেছে। শেষমেশ রাজ্যের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৩৪টি-তেই ফুটল ঘাসফুল। কাজে এলো না নমো, রাগা বা বামেদের বারবার খুঁচিয়ে তোলা সারদা-ইস্যু থেকে টেট কেলেংকারি। বরাবরের প্রধান শত্র“ সিপিএম প্রায় মুছে যাওয়ার পথে। তবু দুপুর পেরিয়েও কালীঘাট থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একটু বেলা হতেই তার বাড়ির সামনে ভিড়। জড়ো হন সাংবাদিক থেকে কর্মী-সমর্থক সবাই। মমতা ব্যানার্জির ভাই কার্তিক ব্যানার্জি মাইক্রোফোন হাতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করেন। রয়েছে নিরাপত্তা কর্মী, পুলিশ। বাড়ির বাইরে বাজছে রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ তো দূরের কথা, অর্ধেক দিন কেটে যাওয়ার পরও কোনো প্রতিক্রিয়াই পাওয়া গেল না তৃণমূল নেত্রীর। বিকাল সাড়ে তিনটে নাগাদ প্রথম ক্যামেরার সামনে এলেন মমতা। যথেষ্ট সংযতভাবেই নির্বাচনী ফলে আনন্দ প্রকাশ করেন তিনি। এই দিনটা সাধারণ মানুষকেই তিনি উৎসর্গ করলেন বলে জানান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সবার উদ্দেশে তার ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন প্রকাশ করেন মমতা ব্যানার্জি।
পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় দফার নির্বাচন থেকেই উঠেছিল সন্ত্রাসের অভিযোগ। রিগিং, বুথ জ্যাম, বিরোধীদের ওপর আক্রমণ- বাদ যায়নি কিছুই। পশ্চিমবঙ্গের ভোট-ছবি বিহার, উত্তরপ্রদেশের থেকেও খারাপ বলে জানিয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশনও।

আনন্দ-উৎসবে মাতোয়ারা বিজেপি

ভারতের রাজধানী দিল্লির অশোকা রোডের বিজেপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন নির্বাচনের বিজয়ের আনন্দে উৎসবে মেতে উঠেছে। বিজেপির কার্যালয়ে ছাড়িয়ে পুরা অশোকা রোডে ছড়িয়ে পড়েছে এই আনন্দ উৎসব। উৎসবের আয়োজন প্রস্তুতি সবই ছিল। শুধু অপেক্ষা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ফল পাওয়ার। শুক্রবার সকালে ভোট গণনা শুরুতেই প্রতিপক্ষের চেয়ে গুণিতক হারে এগিয়ে যেতে থাকে বিজেপি। আর সঙ্গে সঙ্গে নাচতে থাকে বিজেপি কার্যালয়। চারদিকে থেকে আসতে থাকে বিজেপির হাজার কর্মী সমর্থক। সকাল ১০টা নাগাদ পোস্টাল ব্যালটের ফল গণনায় বিজেপির জয়-জয়কার শুরু হয়ে যায়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে এনডিএ নয়, খোদ বিজেপিই ৩০ বছরের ইতিহাস ভেঙে লোকসভা নির্বাচনে একক দল হিসেবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে। আর অপেক্ষা কেন? শুরু হয়ে যায় ভারতীয় জনতা পার্টির কর্মী-সমর্থকদের বিজয় উদযাপন। সারা দেশের মতো রাজধানীতেও রাস্তায় নেমে আসে কর্মী-সমর্থকরা। আতশবাজি, স্লোগান আর ড্রামের আওয়াজে দিল্লি মুখরিত হয়ে ওঠে। কার্যালয় সংলগ্ন সামনের রাস্তাটি তাদের জন্যই বরাদ্দ করে দেয়া হয়।
বন্ধ করে দেয়া হয় যান চলাচল। এই সড়কটি পরিণত হয় নেতাকর্মীদের উৎসবের মাঠে। আতশবাজি পুড়িয়ে আর ঢোলের তালে তালে নেচে গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে গেরুয়া শিবির। একের পর এক আতশবাজি পুড়তে থাকে। কর্মীদের হাতে প্ল্যাকার্ড আর বুকে মোদির ছবি সম্বলিত পোশাক। চারদিকে উড়ছে দলের গেরুয়া ও সবুজ রঙের পতাকা। ভোটের ফল প্রকাশ উপলক্ষে বৃহস্পতিবারই বড় পর্দায় ফল দেখার ব্যবস্থা করা হয় বিজেপি কার্যালয়ে। আর সেই বড় স্ক্রিনে সকাল থেকেই ফল প্রকাশ দেখছিলেন নেতাকর্মীরা। সকাল ১০টা বাজতেই সে আসর বড় উৎসবে পরিণত হয়। পাঞ্জাবি, গুজরাটিসহ নানা সংস্কৃতির বাজনা পরিবেশ মুখরিত করে তোলে। উৎসাহী নেতাকর্মীরা নৃত্য শুরু করে সে বাজনার তালে তালে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দও গলায় তুলে নেন ঢোল। ১ লাখ লাড্ডু বিতরণ করা হয়। বিজেপির অফিসের সামনে উপস্থিত সবাইকে লাড্ডু প্যাকেট বিতরণ করা হয়। এছাড়া ২০ লাখ টাকার আতশবাজি পোড়ানো হয়। রাস্তার পাশে চলে মোদির জন্য প্রার্থনা। একজনকে দেখা যায় দুহাতের তালুতে প্রদীপ জেলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে। শুধু বিজেপি অফিসের সামনেই নয়, সারা দেশেই সকাল থেকে মন্দিরে মন্দিরে চলতে থাকে মোদির বিজয়ের জন্য প্রার্থনা। ভেতরে টাঙ্গানো হয় বিরাট বিরাট প্যান্ডেল। সেখানেই বড় স্ক্রিন জুড়ে মোদি ও বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার দৃশ্য। বাজতে থাকে ‘আছে দিন আনেআলে হে’ গান। প্রদর্শন করা হয়, বড় পোস্টারে ভারতবাসীকে ধন্যবাদ দিয়ে মোদির ছবি।

পাপের ৬৬ বছর! by আসজাদুল কিবরিয়া

ফিলিস্তিনিদের ‘নাকবা’র ৬৬ বছর পূর্ণ হলো৷ আরবি শব্দ নাকবার অর্থ মহাবিপর্যয়৷ বলপূর্বক ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক পত্তন ও স্বাধীনতা ঘোষণা৷ ৬৬ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তেলআবিবে জায়নবাদী নেতা বেন গুরিয়ান এই ঘোষণা দেন৷ তার পরদিন ১৫ মে আরব দেশগুলো একযোগে ইসরায়েল আক্রমণ করলেও শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে আমেরিকা-ব্রিটেনের অস্ত্র-সমর্থনপুষ্ট ইসরায়েলের কাছে৷ ১০ লাখের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন আরব দেশে আশ্রয় নেয়৷ সেই শরণার্থী জীবন চলছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে৷ আর ইসরায়েল দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও সম্পদ দখল করে নিচ্ছে, নিত্যনতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করছে, ধ্বংস করে দিচ্ছে ফিলিস্তিনি আরবদের শত শত বছরের পুরোনো জনপদগুলো৷

কফিনে করে ফিরছে বাংলার বীরেরা by ফারুক ওয়াসিফ

‘তাজা হাওয়া বয়/ খুঁজিয়া দেশের ভুঁই,/ ও মোর বিদেশি যাদু/ কোথায় রহিলি তুই৷’
পোড়োজমি, টি এস এলিয়ট

নাটকের বাঁ আড্ডার সংলাপে ওদের ‘ফকিরের পুত’ বলবেন না৷ সৌদি আরব থেকে কফিনে করে যারা ফিরছে, তারা আমাদের বীর৷ তাদের অভিবাঁদন জানানো জাতীয় কর্তব্য৷ এ রকম ছয় বছরে ফিরেছে ১৪ হাজার জন৷ দলে দলে তারা জীবনযুদ্ধে প্রবাঁস যায়৷ দলে দলে লাশ হয়ে ফেরে৷ এ দফায় এক দলে ফিরছে নয়জন৷ সবাঁই ‘মেড ইন বাঁলাদেশ’—তাজরীন আর রানা প্লাজার শ্রমিকদের মতো৷ বাঁলাদেশ বিদেশে কফিন রপ্তানি শুরু করেছে৷ ওই ১৪ হাজার শ্রমিকের জন্য ১৪ হাজার কফিন রপ্তানি করতে পারলে বেশ ব্যবসা হতো৷ আরব দেশে কফিন বেচার বুদ্ধিটা সরকাঁর ভেবে দেখতে পারে৷

টানাপোড়েন বাড়বে না কমবে? by আলী রীয়াজ

ভারতের নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের ফলে এটা নিশ্চিত যে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। ১০ বছর পরে ভারতের ক্ষমতাঁয় পরিবর্তনের ফলে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন ঘটবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন অনেকেরই মনে। এই প্রশ্নের প্রধান কারণ এটা নয় যে দেশের ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থী দল ভারতীয় জনতাঁ পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতাঁসীন হচ্ছে।

মগের মুল্লুক! by হাসান ফেরদৌস

বাংলাদেশে একসময় মগদের ভীষণ উপদ্রব ছিল৷ সে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা৷ আরাকান, অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে আসা মগ জলদস্যুরা সে সময় বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব বানিয়ে বসে৷ ফরাসি পরিব্রাজক বার্নিয়ের সে কথা বর্ণনা করে লুণ্ঠন ও অত্যাচারের যে বিবরণ দিয়েছেন, তা পড়ে এখনো আমাদের রক্ত হিম হয়ে আসে৷ ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করার পর মগদের সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান হয়৷ আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য সপ্তদশ শতক নয়, আজকের বাংলাদেশ৷ সরকারদলীয় সাংসদ ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সম্প্রতি রেগেমেগে অভিযোগ করেছেন, দেশটা একদম মগের মুল্লুক হয়ে উঠেছে৷ নারায়ণগঞ্জের সাত গুম-খুন; থুক্কু, গুম তো বলা যাবে না, বলতে হবে নিখোঁজের ঘটনায় আইন প্রয়োগকারীদের অকর্মণ্যতার দিকে আঙুল তুলে তিনি মন্তব্য করেছেন, মানুষ অভিযোগ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাচ্ছে, আর তারা বসে বসে হিসাব-নিকাশ করছে কার অভিযোগ নেবে, কারটা নেবে না৷ ‘এটা কি মগের মুল্লুক? এটা আইনের বরখেলাপ৷’

পতনের বিপরীতে একজন সুমাইয়া

সততার জন্য পুরস্কৃত সুমাইয়া
সুমাইয়া বিনতে আফসারদের দিকে তাকিয়ে আছি, যখন কোথাও কোনো আশার আলো দেখছি না। সুমাইয়া ক্লাস নাইনের ছাত্রী। ঢাকার রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে। তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মাস দেড়েক আগে। তাদের স্কুলে গিয়েছিলাম কিশোর আলোর হয়ে। গল্প লেখা ও আঁকা বিষয়ে কথা বলতে। মঞ্চে ছেলেমেয়েদের ডেকে এনে নানা কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। তারাও নানা প্রশ্ন করছিল। হঠাৎই সুমাইয়া মাইকে বলল, ‘একটা প্রশ্ন আছে।’ আমি বললাম, ‘বলো।’ সে বলতে লাগল, ‘গত বছরের কথা। আমি জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষা দিচ্ছি। বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার সময় শোনা গেল, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আমার কোনোই ইচ্ছা নেই যে আমি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দেখব। বিজ্ঞান পরীক্ষার আগে জোর গুজব, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। আমি সেসবে কান না দিয়ে বাসায় নিজের মতো করে পড়ছি। বন্ধুবান্ধব প্রশ্নপত্রের কপি নিয়ে বাসায় চলে এল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, প্রশ্নপত্রটা একবার দেখে নেওয়া উচিত। বাসারও কারও কারও একই মত। আমি আমার ভাইয়া-আম্মুকে স্পষ্ট বলে দিলাম, আমি প্রশ্নপত্র দেখব না। তাঁদের মুখ দেখে মনে হলো, তাঁরাও চান আমি প্রশ্নপত্র দেখি। আমি নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। নিজের মতো প্রস্তুতি নিলাম। পরের দিন পরীক্ষা দিতে গেলাম। পরীক্ষা ভালো হলো। পরে আমি ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে আসল প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখলাম। কিছুই মেলেনি। পরীক্ষা আমার ভালো হয়েছিল। আমার সততার পুরস্কার আমি পেয়েছি। আমি উত্তরা থানার মধ্যে পঞ্চম হয়ে বৃত্তি পেয়েছি। স্যার, এই রকম ক্ষেত্রে আমাদের কী করা উচিত, যখন চারপাশ থেকে চাপ আসে কোনো অনৈতিক কাজ করার জন্য?’ আমি বললাম, ‘তুমি তো আসলে আমাকে কোনো প্রশ্ন কেরানি। তোমার কথার মধ্য দিয়ে আমাদের চির পুরোনো সত্য বার্তাটাই দিয়েছ। সততাই সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।’ আমরা সবাই মিলে তালি দিলাম সুমাইয়ার জন্য।
কিছুদিন আগে আবার গেছি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। বইমেলা চলছিল তখন। গিয়ে দেখি, কলেজের দেয়ালে সুমাইয়ার ছবি। কলেজের অধ্যক্ষ তাকে পুরস্কার দিচ্ছেন তার সততার জন্য। দেখে খুব ভালো লাগল। এই সুমাইয়ারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তারা যখন দেশের ভার নেবে, সেদিনকার বাংলাদেশটা নিশ্চয়ই অন্য রকম হবে। কিন্তু বর্তমানের বাংলাদেশের দিকে কে তাকাবে? দুই দিন আগে রাতের বেলা ই-মেইল পেলাম। এক পরীক্ষার্থী রসায়নের ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে রেখেছে প্রমাণ হিসেবে। আমাকে পাঠিয়েছে, আর পাঠিয়েছে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে। গতকাল আমি ই-মেইলের জবাব দিলাম, বললাম, এই প্রশ্ন কি মিলেছে পরীক্ষার আসল প্রশ্নের সঙ্গে? মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের কাছ থেকে জবাব এল, ‘আমি অনেকগুলো প্রশ্নই পেয়েছি। বেশির ভাগই পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে মিলে গেছে।’ মুহম্মদ জাফর ইকবাল এ নিয়ে আগেই কলাম লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি একটিবারও ভাবিনি আমার দেশের সরকার, সরকারের শিক্ষাব্যবস্থা এই পরীক্ষার ব্যাপারে তাদের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসে থাকবে। তারা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হতে দেবে আর সেটি নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র দায়িত্ববোধ থাকবে না। এই সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে আমি অনেক কাজ করেছি। এখন আমি একধরনের বিস্ময় নিয়ে এই মন্ত্রণালয়টির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না, যখন দেখি, এই দেশের এত বড় বিপর্যয় নিয়ে তাদের কোনো রকম প্রতিক্রিয়া নেই!’ মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার কোনো বিষয়ে যখন লেখেন, তখন সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। স্যার নিজেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নানা রকমের কাজ করে দিয়েছেন, তাঁর কলামেই সে কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো রকমের বিকার লক্ষ করা যাচ্ছে না। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের

নিরাপত্তা নাগরিকের অধিকার

মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক সংরক্ষিত এবং নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের রক্ষাকবচ। অন্য মানুষকে নিরাপদ রাখা ও বাঁচতে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে অন্যতম। কোনো ব্যক্তি, সংঘ, সংগঠন, বহিঃশত্রু বা স্বয়ং রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে উদ্যত হতে পারে না; বরং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে বাধ্য থাকবে। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) জনগণকে উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের জানমাল ও ইজ্জত-আবরু তোমাদের পরস্পরের কাছে পূত-পবিত্র।’ (বুখারি) তাই সমাজজীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বজায় রাখা অবশ্যকর্তব্য ও ইমানি দায়িত্ব। সামাজিক সম্প্রীতি, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চেতনা, অর্থনৈতিক দর্শন ও আদল-ইনসাফের মাধ্যমে অপরাধ দমন কৌশল ইসলামকে দিয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকের জীবনের মূল্য আইনের চোখে সমান। কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে ফেলে, তাহলে একজন মুসলিম নাগরিককে হত্যার জন্য যেমন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, ঠিক অনুরূপভাবে এ ক্ষেত্রেও হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া শরিয়তের বিধান। যেহেতু মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা কোরো না।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৩) সুতরাং কোনো মানবসন্তানকে অপহরণ, গুম, খুন ও নরহত্যা করা ইসলামসম্মত নয়। নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তিপণ আদায়ের জন্য জোরপূর্বক ধরে নিয়ে খুন করা, মেরে ফেলা বা গুপ্তহত্যা করা ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
নবী করিম (সা.) কখনো একজন নিরপরাধ মানুষকে অস্ত্রের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রকাশ্যে বা গুপ্তহত্যা করেননি। অন্যায়ভাবে মানুষকে গুম করে নির্মমভাবে হত্যা করে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিনষ্ট করা কবিরা গুনাহ৷ এর ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার পুরো মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল; আর কেউ কারও প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর পুরো মানবগোষ্ঠীকে প্রাণে রক্ষা করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩২) মানবসমাজে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি ও সন্ত্রাস দমনে শান্তির ধর্ম ইসলাম জোরালো দিকনির্দেশনা দিয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে কঠিন শাস্তি আরোপ করেছে। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত আইনে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী খুনিদের উপযুক্ত ন্যায়বিচার করা হয়, তাহলে আর কেউ জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে দুঃসাহস পাবে না। পবিত্র কোরআনে হত্যাকাণ্ডকে মহা অপরাধ সাব্যস্ত করে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে হত্যা করার শাস্তির কঠোর বিধান সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো মুমিনের জন্য সমীচীন নয় যে সে অন্য মুমিনকে হত্যা করবে, অবশ্য ভুলবশত করে ফেললে অন্য কথা। আর কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯২-৯৩) মনুষ্য সমাজে যেভাবে অপহরণ, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ফেতনা-ফাসাদ ও সন্ত্রাসবাদ চলছে, সর্বস্তরে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে, এতে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম ব্যাঘাত হচ্ছে,
তেমনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে জননিরাপত্তার দারুণভাবে ব্যাঘাত ঘটছে। যেসব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন স্থানে নানা পর্যায়ে সন্ত্রাস, গুপ্তহত্যা ও প্রকাশ্য দিবালোকে নরহত্যা, অপহরণ, গুম, খুন-খারাবিসহ ইসলামবিরোধী মানবতাবিবর্জিত ধ্বংসাত্মক পৈশাচিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, বাস্তবে তারা মনুষ্যত্ব ও বিবেকহীনই বটে। এসব অপহরণ, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ফেতনা-ফাসাদ প্রতিরোধে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার কথা ও কলমের জিহাদ অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা, সমাজে ফেতনা-ফাসাদ, মানবিক বিপর্যয়, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়েও জঘন্যতম অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিজি) নাগরিক অধিকার ছাড়া কোনো মানুষ নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারে না। যে সমাজে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হয়, সে সমাজে আইনের শাসন নেই। মানুষের জানমালের নিরাপত্তাই যদি বিঘ্নিত হয়, তবে মানুষ সমাজে কীভাবে শান্তিতে বসবাস করবে? কোনো অপশক্তির কাছেই যেন জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় আর মানবতা বিব্রত না হয়! প্রতিপক্ষের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের অনিবার্য পরিণতিতে অপহরণ, গুম, খুন, নির্মম হত্যাকাণ্ড, অমানবিকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় ঘৃণা ব্যক্ত করা যায়, জোরালো প্রতিবাদ জানানো যায়, জনগণের জানমাল রক্ষায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় এবং সংগ্রামী সচেতন মানুষের সেটাই করণীয়। জননিরাপত্তায় ব্যর্থ হলে শান্তিপ্রিয় যেকোনো মানুষের ওপরই জিঘাংসার হিংস্র কালো থাবা নেমে আসতে পারে। তাই দেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে মানবাধিকার সুরক্ষায় ও নিরাপদ জীবনযাত্রার পরিবেশ সৃষ্টিতে সমাজে নরহত্যার মতো জঘন্য অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ইসলামের ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের বিকল্প নেই।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

‘স্বর্ণভীতি’

সমস্যাটিকে ‘স্বর্ণভীতি’ হিসেবেই উল্লেখ করতে হচ্ছে। কারণ, ভীতিটি স্বর্ণ-সংক্রান্ত, এবং ভয়টি সংক্রমণের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে তা না আবার পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে পড়ে! অতএব স্বর্ণ থেকে দূরে থাকো শত হাত! জাতীয় পরিবেশ পদক থেকে এবার নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে সোনাকে। এই সিদ্ধান্ত পরিবেশ পদকবিষয়ক জাতীয় কমিটির, এবং তা ‘সর্বসম্মত’। এবার যাঁরা পরিবেশ পদক পাবেন, তাঁরা কিছুটা দুর্ভাগাই। ‘স্বর্ণপদক’ পাওয়ার তৃপ্তিটি তাঁদের আর হবে না। এবারের পদক মানে টাকা! ক্রেস্ট একটি থাকবে বটে, তবে সেখানে আর যা-ই হোক, সোনা বলে কিছু থাকবে না। ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কমিটির সব সদস্য সোনার মেডেল না দেওয়ার পক্ষে মত দেন। ফলে দুই ভরি সোনার দাম নগদে ও একটি ক্রেস্ট দেওয়া হবে’—পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন এভাবেই। পরিবেশমন্ত্রীর ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির’ বিষয়টি নিশ্চয় অনেক পাঠকই বুঝে গেছেন। যাঁদের ধরতে অসুবিধা হচ্ছে, তাঁদের জন্য পুরোনো খবরটি ধরিয়ে দিচ্ছি; বাংলাদেশ সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী বিদেশি বন্ধুদের কয়েক পর্যায়ে সম্মাননা জানিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুষ্ঠান করে তাঁদের ক্রেস্ট দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে শুরুতে আমরা জানলাম, এই ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে। পরে বের হলো, ১৬ আনাই মিছে। মানে, এখানে সোনা বলে কিছু নেই। এসব নিয়ে তদন্ত হয়েছে এবং জানা গেছে, এর মাধ্যমে সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্ত কমিটি এ জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী,
সাবেক সচিব ও বর্তমান সচিবকে দায়ী করেছে। এটাই হচ্ছে ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির’ সংক্ষিপ্ত বয়ান। ফলে ‘স্বর্ণ’ বা এ ধরনের কিছুর ধারেকাছেও যেতে চায়নি পরিবেশ মন্ত্রণালয়। তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এই ‘স্বর্ণভীতি’ যে ‘বঞ্চিত’ করবে অনেককেই! যাঁরা পদক পাবেন, তাঁরা বড় মুখ করে বলতে পারবেন না যে পরিবেশ নিয়ে কাজ করে ‘স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন। বঞ্চিত হবেন স্বর্ণপদক সরবরাহ করে, এমন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা পরিবেশমন্ত্রীর যদি কোনো ঠিকাদার ভাগিনা থেকে থাকেন, তিনি (কারণ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ক্রেস্ট সরবরাহের ঠিকাদারির কাজটি যে দুজন পেয়েছিলেন, তঁাদের একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাগিনা)। টাকা সরবরাহ করার জন্য তো আর কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া যাবে না। সোনা ছাড়া যে ক্রেস্ট বানানো হবে, তার ১৬ আনা মিছে করার সুযোগও তো থাকছে না! বড় বেশি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ পদকবিষয়ক জাতীয় কমিটি। পরিবেশ মন্ত্রণালয় যদি আগের রীতি অনুযায়ী স্বর্ণপদক দেওয়াতেই স্থির থাকত, তবে কী এমন ক্ষতি হতো! পরিবেশ পদক দেশের লোকজন পায়৷ যাঁরা পদক পাবেন, তাঁরা বাংলাদেশের বাস্তবতা জানেন। ১৬ আনা মিছে হলেও তাঁরা খুব অবাক হতেন না৷ তাঁদের কেউ পদকপ্রাপ্তির অনুষ্ঠানে কষ্টিপাথর নিয়ে আসবেন বলেও মনে হয় না! অনুষ্ঠান পার হয়ে গেলেই তো হলো। এখানে বিদেশি বন্ধুদের কাছে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ারও কোনো ব্যাপার নেই। ফলে পরিবেশ পদক যদি ১২ বা ১৬ আনা মিছেও হতো, তাতেও তদন্ত কমিটি করার জন্য খুব চাপ হতো বলে মনে হয় না। আর তদন্ত কমিটি গঠন বা কেউ কেউ দোষী সাব্যস্ত হলেই বা কী!
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঘটনায় তদন্ত হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মন্ত্রী, সচিবেরা। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর মুখে শুনলাম, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অনেক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং অ্যাকশনে যেতে বলেছেন।’ সেই ‘অ্যাকশন’ কবে বা কখন শুরু হবে, তা নিয়ে অবশ্য কোনো মন্তব্য নেই মন্ত্রীর। হয়তো বিপদে পড়বেন কয়েকজন আমলা, কিন্তু অভিযুক্ত সাবেক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কী অ্যাকশনে যাবেন বর্তমান মন্ত্রী! সোনার পদক নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ভয়টি তো অহেতুকই! আগেই বলেছি, সংক্রমণের ভয় পেয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রোগ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে সংক্রমণের ভয়। পরিষ্কার থাকতে চেয়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়, এবং তা মাথা কেটে। কারণ, মাথা থাকলেই তো মাথাব্যথা। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ পথ। প্রতিষেধক নেওয়ার মতো জটিল পথ খোঁজার সময়, ধৈর্য বা আন্তরিকতা পরিবেশ মন্ত্রণালয় বা আমাদের কারোই তো এখন আর নেই!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

ভিয়েতনামে সহিংস বিক্ষোভ, ১৬ চীনাসহ ২১ জন নিহত

নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় ভিয়েতনামে কর্মরত চীনা
নাগরিকেরা সেভয় রিং প্রদেশের সীমান্ত দিয়ে
গতকাল কম্বোডিয়ায় চলে যাচ্ছেন। রয়টার্স
ভূখণ্ড নিয়ে ভিয়েতনামে চীনবিরোধী বিক্ষোভ রক্তাক্ত সহিংসতায় রূপ নিয়েছে৷ ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলীয় হা তিন প্রদেশে গত বুধবার রাতে সহিংসতায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন৷ এঁদের মধ্যে প্রায় ১৬ জন চীনা নাগরিক৷ তবে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিহতের সংখ্যা একজন বলে উল্লেখ করা হয়৷ দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধপূর্ণ এলাকায় চীনের তেল অনুসন্ধানের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার ওই বিক্ষোভ শুরু হয়৷ সহিংস বিক্ষোভকারীরা বুধবার রাতে ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় ইস্পাত প্লান্টে হামলা চালায়৷ এর কয়েক ঘণ্টা আগে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় হো চি মিন শহরের একটি শিল্প এলাকায় বেশ কয়েকটি বিদেিশ মালিকানাধীন কারখানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়৷ ভিয়েতনামে তাইওয়ানের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ গ্রুপ ফরমোজা প্লাস্টিকস গ্রুপ৷ হা তিন প্রদেশের শিল্প জোনে তাদের মালিকানাধীন একটি ইস্পাত কারখানায় বুধবার সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে৷ ২০১৭ সালে ওই ইস্পাত প্লান্টটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা৷ গতকাল প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বুধবার তাদের ইস্পাত কারখানায় ভিয়েতনাম ও চীনা কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে৷ এতে একজন চীনা নাগরিক নিহত ও ৯০ জন আহত হন৷
ভিয়েতনামের দক্ষিণ এলাকার শিল্প জোনগুলোতে মঙ্গলবার যে চীনবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়, তার শুরুটা ছিল দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একটি তেল অনুসন্ধানের যন্ত্রপাতি স্থাপন নিয়ে৷ এলাকাটি ভিয়েতনাম নিজেদের বলে দাবি করলেও চীন সম্প্রতি সেখানে ওই যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ নিলে উত্তেজনা শুরু হয়৷ প্রতিবাদে ভিয়েতনামে চীনবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে৷ স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, শত শত বিক্ষোভকারী মঙ্গলবার হো চি মিন শহরের কাছে বিন দুং ও দোং নাই প্রদেশের শিল্প অঞ্চলে বিদেশি কারখানাগুলোয় আগুন লাগিয়ে দেয়৷ এর মধ্যে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন কারখানাও ছিল৷ পরদিন বুধবার দেশের অন্যান্য এলাকায়ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে৷ এদিকে আরও হামলার আশঙ্কায় চীনা নাগরিকেরা ভিয়েতনাম ছাড়তে শুরু করেছেন৷ ইতিমধ্যে শত শত চীনা নাগরিক ভিয়েতনাম থেকে স্থলপথে সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী কম্বোডিয়ায় পালিয়ে গেছেন৷ অনেকে বিমানযোগে ভিয়েতনাম ছাড়ছেন৷ সরাসরি চীনের টিকিট না পেলে অনেকে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ানসহ বিভিন্ন দেশের টিকিট কিনে ভিয়েতনাম ছাড়ছেন৷ ভিয়েতনামের একটি লোহা ও ইস্পাত কারখানায় কর্মরত চীনা নাগরিক সু ওয়েন হং বলেন, ‘আমরা ভিয়েতনাম ছাড়াই নিরাপদ মনে করছি৷ সব কারখানা জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি৷’ ১৯৯৭ সালে সীমান্ত নিয়ে ভিয়েতনাম ও চীন সংক্ষিপ্ত একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে চলতি ঘটনা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে৷ চলমান সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বেইজিং৷ অপরাধীদের শাস্তি ও ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষয়ক্ষতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশটি৷ রয়টার্স ও আল-জাজিরা৷

কেউ ২৭২ আসন না পেলে কী করবেন রাষ্ট্রপতি?

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কেউ এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে৷ আর যদি তা-ই হয়, তা হলে বেশি আসন পাওয়া দলকে সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ২৭২ আসন আছে দেখাতে অন্য দলগুলোর লিখিত সমর্থনপত্র হাজির করতে হবে৷ তার আগ পর্যন্ত সরকার গঠনে কাউকে আহ্বান নাও জানাতে পারেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি৷ ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হলে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্য কে সবচেয়ে উপযোগী হতে পারে, তা নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরামর্শ করছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব৷ এ পর্যন্ত পর্যালোচনায় তিনি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, সরকার গঠন করতে ইচ্ছা যারাই পোষণ করুক না কেন, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের প্রমাণপত্র হিসেবে আগে তাদেরকে নির্বাচন-পরবর্তী মিত্রদের কাছ থেকে লিখিত সমর্থন হাজির করতে হবে৷ সূত্র জানায়, ‘রাষ্ট্রপতি প্রণব নিশ্চিত করতে চান, যারাই সরকার গঠন করতে চায়, তারা যেন পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সমর্থনের সুবিধা ভোগ করতে পারে৷’ প্রণবকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, একটি পদক্ষেপই কেবল এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে৷ তা হলো নির্বাচন-পরবর্তী মিত্রদের কাছ থেকে লিখিত সমর্থন জোগাড় করা৷
১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও রাজীব গান্ধী সরকার গঠন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন৷ একপর্যায়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরমন জনতা দলের নেতা ভি পি সিংকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ জনতা দল কংগ্রেসের চেয়ে কম আসন পেলেও সরকার গঠনে প্রয়োজনীয়সংখ্যক আসন দেখাতে সক্ষম হয়েছিল৷ এই নজির অনুসরণ করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পরও৷ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মা অটল বিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷ মাত্র ১৬১ আসন পাওয়া বিজেপি এতে বিস্মিত হলেও সুযোগটি হাতছাড়া করেনি৷ দুই বছর পর বাজপেিয়র নেতৃত্বে বিজেপি জোট মোট আসন ২৭২-এর বেশি পেয়েছিল৷ এর পরও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কে আর নারায়ণন বিজেপিকে অন্য দলগুলোর কাছ থেকে নির্বাচন-পরবর্তী সমর্থনের বিষয়ে লিখিত আনতে বলেছিলেন৷ বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণবের এ ধরনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সোলি জে সোরাবজি বলেন, ‘সরকার গঠনে আমন্ত্রণ জানানোর আগেই প্রেসিডেন্টের লোকসভায় কোনো দল বা জোটের শক্তিমত্তা পরীক্ষা করার দরকার নেই৷ শক্তির পরীক্ষা হবে পার্লামেন্টে, রাষ্ট্রপতি ভবনে নয়৷ যদিও এ ধরনের লিখিত সমর্থন চাওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিকভাবে কোনো বাধা নেই, তার পরও শুনতে এটাকে কিছুটা অনৈতিক দাবির মতো লাগে৷’ টাইমস অব ইন্ডিয়া৷

আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস

ভোটের ফল প্রকাশের আগেই দুই প্রধান দল বিজেপি এবং কংগ্রেস শিবিরে সরকার গড়ার ভাবনাচিন্তা শুরু হয়ে গেছে। তবে বিজেপি শিবির অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাই তারা প্রকাশ্যেই সরকার গড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। তুলনায় কংগ্রেসের উদ্যোগ অনেকটাই সীমিত। কংগ্রেসের উদ্যোগ সীমিত হলেও এরই মধ্যে দলের উচ্চপর্যায় থেকে আঞ্চলিক দলগুলোকে বাজিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের সূত্রে জানা গেছে, দিল্লি থেকে ইতিমধ্যে কংগ্রেস নেতারা যোগাযোগ করতে শুরু করেছেন। কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তূণমূল নেতাদের ধারণা হয়েছে, কংগ্রেস এখনো মনে করছে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ২২০-২৩০ আসনের বেশি পাবে না। সেই আশায় ভর করে কংগ্রেস এখন আঞ্চলিক দলগুলোর সহায়তায় বিজেপিকে ঠেকাতে মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে। শুধু তৃণমূল কংগ্রেসকেই নয়,
ওডিশায় নবীন পট্টনায়েকের বিজু জনতা দল, বিহারে িনতীশ কুমারের জনতা দল (সংযুক্ত), তামিলনাড়ুর জয়ললিতার এআইএডিএমকেসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি দলের কাছেই কংগ্রেসের উচ্চপর্যায়ের তরফে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়। তাড়াহুড়ো না করে তারা ভোটের ফল প্রকাশ হওয়ার পরের পরিস্থিতি ভালো করে খতিয়ে দেখতে আগ্রহী। তবে কেন্দ্রে সরকার গড়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল যে নিজেও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেতে চায়, সে কথা নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেছেন। তৃণমূল সূত্র বলছে, বিজেপি শিবিরের একাংশের মধ্যেও এমন সংশয় রয়েছে, তারা জোট হিসেবে ২৭২ পেরোতে পারবে কি না৷ এ কারণেই নরেন্দ্র মোদি, রাজনাথ সিংরা এখনই সরকার গঠন নিয়ে নিজেদের মধ্যে বৈঠক শুরু করায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) নেতারা বিচলিত। সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত এই কারণেই মোদি,রাজনাথকে আগে আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে কথাবার্তা বলে সঙ্গে নেওয়ার উদ্যোগ নিতে চাপ দিচ্ছেন।