Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts
Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts

Tuesday, April 7, 2026

ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ বাড়াচ্ছে বায়ুদূষণ, ঢাকাসহ কয়েক শহর ঝুঁকিতে by পার্থ শঙ্কর সাহা

ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য, ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু ঝুঁকিসহ নানা রোগের কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি বছরের মধ্য–ফেব্রুয়ারির এক সকাল। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের বহির্বিভাগে দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫ বছরের আবুল কাশেম। তিনি দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের রোগী। শীতের শেষ সময়ে তা আরও বেড়েছে। নগরীর আদাবরের বাসিন্দা আবুল কাশেম বলেন, ‘শীতটা আগের চেয়ে কমেছে, কিন্তু কাশি থামে না।’ চিকিৎসকেরা তাঁকে বলছেন, তাঁর সমস্যা শুধু বয়সজনিত নয়, বাতাসের দূষণও বড় কারণ।

কাশেমের মতো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে টিবি হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ৭২। আর গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৮ হাজার ৬১১। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রোগী বেড়েছে চার শতাধিক। চিকিৎসকেরা বলছেন, বক্ষব্যাধি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীর এই ঊর্ধ্বগতি বিচ্ছিন্ন নয়; এর পেছনে বায়ুদূষণের ভূমিকা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।

বায়ুদূষণ যে শুধু ফুসফুসের রোগের কারণ, তা নয়। গবেষণা বলছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি, ডায়াবেটিসের আশঙ্কা, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি, এমনকি বিষণ্নতার ছায়াও। বাংলাদেশে বায়ুদূষণ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, বিষয়টি কেবল পরিবেশগত সংকট নয়। এটি এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট।

ঢাকা, রাজশাহী, গ্রামীণ এলাকা—বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত গবেষণাগুলো একসঙ্গে যে চিত্র তুলে ধরছে, তা উদ্বেগজনক। দূষণ বাড়ছে। বাড়ছে দূষণজনিত অসুখ–বিসুখ। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। দূষণ নিয়ে নানা প্রকল্প আর সেগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যে চাপা পড়ছে মানুষের কষ্টের কথা। এ ছাড়া শীত মৌসুমে যে সামান্য বৃষ্টি হতো, তা–ও কমছে। ধুলাবালুর এ সময়ে বৃষ্টিতে দূষণ কিছুটা কমার সুযোগও কমে যাচ্ছে।

ধূলিকণার সঙ্গে বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

বাংলাদেশে দ্রুত ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে সাধারণত কারণ হিসেবে বেশি শোনা যায় খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম, স্থূলতা, বংশগত ঝুঁকি, মানসিক চাপ ইত্যাদি। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, ডায়াবেটিস বাড়ার পেছনে আরেকটি বড় ‘অদৃশ্য’ চালক হিসেবে কাজ করতে পারে বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা।

এই গবেষণা করা হয়েছে দেশব্যাপী পরিচালিত জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (২০২২) তথ্য নিয়ে। ফলাফলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাতাসে খুব সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম ২ দশমিক ৫ যত বাড়ে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও তত বাড়ে। বিশেষভাবে, পিএম ২ দশমিক ৫ যদি প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম করে বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ে ১০ শতাংশ বেশি বাড়ে।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশ যদি বাতাসকে কিছুটা পরিষ্কার করতে পারে (অর্থাৎ বছরজুড়ে পিএম ২ দশমিক ৫ কমিয়ে আনতে পারে), তাহলে জনসংখ্যা পর্যায়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

পিএম ২.৫ আসলে কী

পিএম ২.৫ বলতে বোঝায় বাতাসে থাকা এমন সূক্ষ্ম কণা, যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম। মানুষের চুলের তুলনায়ও বহুগুণ ছোট, যা চোখে দেখা যায় না। কিন্তু নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষকেরা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এসব ধূলিকণা শরীরে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং ইনসুলিন কাজ করার প্রক্রিয়ায় বাধা তৈরি করতে পারে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেল

গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির রোগতত্ত্ব বিষয়ের গবেষক জুয়েল রানা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই জরিপে দুই ধাপে নমুনা নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক ১৫ হাজার ২৪৯ জন জরিপে অংশ নেন। পরবর্তী ধাপে যাঁদের ডায়াবেটিসের ওষুধ নেওয়ার তথ্য নেই, তাঁদের বাদ দিয়ে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাখা হয় ১৩ হাজার ৯৬৫ জন (নারী ৭ হাজার ৭১২; পুরুষ ৬ হাজার ২৫৩)।

জুয়েল রানা প্রথম আলোকে বলেন, এসব ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি ২০২২ সালের পর থেকে পরের তিন বছর কতটুকু বায়ুদূষণের সংস্পর্শে এসেছেন, তা নির্ণয় করা হয়। তাঁরা যে এলাকায় বাস করেছেন, যে বাসায় থেকেছেন, সেখানে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে।

প্রশ্ন ছিল এভাবে যে ডায়াবেটিক রোগীর বায়ুদূষণের প্রভাব দেখা হয়েছে এর জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? উত্তরে জুয়েল রানা বলেন, যখন দূষিত বায়ু কেউ নিশ্বাসের মাধ্যমে নেয়, তখন শরীরের মধ্যে একধরনের প্রদাহ তৈরি হয়। মানুষের শরীরে যে ইনসুলিন তৈরি হয়, তার কার্যকারিতা কমে আসে। আর ব্যাহত হলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লেই ডায়াবেটিস বেড়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে পিএম ২.৫ যদি ১০ ইউনিট বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। যেসব এলাকায় বাতাস সবচেয়ে দূষিত, সেখানে ডায়াবেটিসের হারও সবচেয়ে বেশি। মহিলা, ওজন বেশি, উচ্চ রক্তচাপ আছে, বয়স বেশি এবং যাঁরা শহরে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বায়ুদূষণজনিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আরও বেশি। যেমন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীর মতো জেলাগুলোয় বায়ুদূষণ ও ডায়াবেটিস—দুটিই একসঙ্গে বেশি দেখা গেছে।

যদি বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারে, তাহলে দেশে ডায়াবেটিসের হার ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক মানুষ, শহরের বাসিন্দা, স্থূল ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে থাকা মানুষ সুফল পাবেন সবচেয়ে বেশি হবে।

সরকারের নির্ধারিত বায়ুমান লক্ষ্য (১৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করা গেলে দেশের ২৫টি জেলায় ডায়াবেটিস কমার হার জাতীয় গড় (৬ দশমিক ৬ শতাংশ) থেকেও বেশি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি উপকার দেখা গেছে সেই জেলাগুলোয়, যেখানে ডায়াবেটিসের হার বেশি এবং একই সঙ্গে বায়ুদূষণের মাত্রাও অত্যন্ত বেশি। যেমন নারায়ণগঞ্জে ডায়াবেটিস কমার সম্ভাবনা প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। যেসব জেলায় এই স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে, সেসব এলাকায় বায়ুদূষণের উৎসও আলাদা ধরনের। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া, ইটভাটা, বন্দরভিত্তিক দূষণ, খনিশিল্প, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষণ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জাহাজভাঙাশিল্প। কিছু এলাকায় বায়ুদূষণের মাত্রা জাতীয় গড়ের কাছাকাছি হলেও স্বাস্থ্যগত লাভ বেশি হতে পারে।

২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট হয় দূষণে

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (ক্রিয়া) বাংলাদেশের বায়ুদূষণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘বাংলাদেশে সূক্ষ্ম কণাদূষণের জনস্বাস্থ্য প্রভাব’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন গত বছরের ১৮ জানুয়ারি ক্রিয়ার নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ড্যানিয়েল নেসান, হুবার্ট থিয়েরিও ও জেমি কেলি। সম্পাদক ছিলেন জোনাথন সাইডম্যান।

গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পিএম ২.৫ দূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ জনের অকালমৃত্যু ঘটছে। এর বড় অংশই হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও ফুসফুস ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণেই বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে।

এ ছাড়া বছরে প্রায় ৬ লাখ ৬৮ হাজার হাঁপানিজনিত রোগে জরুরি বিভাগে ভর্তি, প্রায় ২৬ কোটির বেশি কর্মদিবস নষ্ট, ৯ লাখের বেশি অপরিণত (সময়ের আগে) জন্ম এবং প্রায় ৭ লাখ কম ওজনের নবজাতকের জন্মের সঙ্গে সূক্ষ্ম কণাদূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি বলছে, যদি বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় মান (ঘনমাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জন করতে পারে, তবে অকালমৃত্যু প্রায় ১৯ শতাংশ কমতে পারে। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের নির্দেশিকা (৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারে) অর্জিত হলে মৃত্যুহার প্রায় ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

গবেষণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও দেশের কোনো অঞ্চলই নিরাপদ সীমার মধ্যে নেই। সুতরাং কঠোর বায়ুমান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন ছাড়া এই স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

বায়ুদূষণ ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি: দুই শহরের গল্প

বায়ুদূষণ যে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তা আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখিয়েছে, সূক্ষ্ম দূষিত কণা (পিএম ২.৫) মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে ঢাকার মতো উচ্চ দূষণপ্রবণ নগরে। ‘এয়ার পলিউশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ ইন ঢাকা অ্যান্ড রাজশাহী’ শীর্ষক এ গবেষণায় ঢাকা ও রাজশাহীর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বায়ুদূষণ ও বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত নেচার সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি।

গবেষণাটি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত একটি ক্রস-সেকশনাল পর্যবেক্ষণভিত্তিক সমীক্ষা। দুই শহর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারী নির্বাচন করা হয় নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করে। সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

বায়ুদূষণের তথ্য নেওয়া হয় সরকারি পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের উপাত্ত থেকে। গড় বার্ষিক পিএম ২.৫ মাত্রা ছিল ঢাকায় প্রায় ৭৬–৮২ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার আর রাজশাহীতে প্রায় ৪২–৪৮ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। অর্থাৎ ঢাকায় সূক্ষ্ম দূষিত কণার মাত্রা রাজশাহীর তুলনায় প্রায় ১.৭ গুণ বেশি।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় ৪৬–৫০ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার উপসর্গ পাওয়া গেছে। রাজশাহীতে এ হার ছিল ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ঢাকায় বিষণ্নতার হার অন্তত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী ঢাকায় ৪০ থেকে ৪৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে। কিন্তু রাজশাহীতে বিষণ্নতা দেখা গেছে ২৫ থেকে ২৯ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে। রিগ্রেশন বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ স্কোর ০.৮ থেকে ১.২ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবক নিয়ন্ত্রণের পরও।

ঢাকায় মানসিক চাপ ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশ মানুষের মধ্যে। রাজশাহীতে এই হার ২০ থেকে ২৩ শতাংশ। গবেষণায় ব্যবহৃত মাল্টিভেরিয়েট রিগ্রেশন মডেলে দেখা গেছে, উচ্চ দূষণপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের মাঝারি–তীব্র বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা ১.৬ থেকে ১.৯ গুণ বেশি। বয়স, আয়, শিক্ষা ও ধূমপানের মতো ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণ করার পরও এই সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ থাকে। নারী, নিম্ন আয়ের মানুষ ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ঢাকার উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। রাজশাহীর তুলনায় ঢাকায় বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে প্রতিষ্ঠিত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপাত্তের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ১৬ জুন যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাজশাহীর বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা (১০ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ১৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এটা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমে ২০১৬ সালে দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রামে। দুই বছর আগে এ শহরে আরও ক্ষুদ্র ধূলিকণা (২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের) প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৬ সালে এটি প্রায় অর্ধেক হয়ে দাঁড়ায় ৩৭ মাইক্রোগ্রাম।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের যে ১০টি শহরে গত (২০১৫ ও ২০১৪) দুই বছরে বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণা কমেছে, এর মধ্যে রাজশাহীতে কমার হার সবচেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৬৭ শতাংশ।

সেই উদাহরণ সৃষ্টিকারী শহরের বায়ুদূষণ এখন প্রবল আর এতে মানুষের ওপর প্রভাবও পড়ছে ব্যাপক হারে, এমনটাই মনে করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেসপেরটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দূষণের প্রভাবে আগে শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার রোগী যেমন ছিল গত দুই–তিন বছরে তা অনেক বেড়েছে। এ সংখ্যা বাড়ছেই।

হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে

ঢাকায় বায়ুদূষণের সূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) যত বাড়ছে, হৃদ্‌রোগে মৃত্যুঝুঁকিও তত বাড়ছে—এমনটাই প্রমাণ করেছে ‘ইফেক্টস অব ফাইন পার্টিকুলেট ম্যাটার এয়ার পলিউশন অন কার্ডিওভাসকুলার মর্টালিটি ইন ঢাকা ২০০২–২০২৪’ শীর্ষক গবেষণা।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, পিএম ২.৫ প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদরোগজনিত মৃত্যু গড়ে ৩.১ শতাংশ বাড়ে। এখানে মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শীতকালে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময়ে প্রায় ২৮.৭ শতাংশ হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ, বায়ুদূষণ ঢাকায় হৃদ্‌রোগের একটি বড় এবং তাৎক্ষণিক ঝুঁকির কারণ।

গবেষকেরা ২০২০–২০২৪ সময়ে ঢাকার চারটি প্রধান সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাসভিত্তিক হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেন। একই সময়ের পিএম ২.৫ মাত্রার উপাত্ত নেওয়া হয় পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। আবহাওয়া–সংক্রান্ত তথ্য (তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ইত্যাদি) সংগ্রহ করা হয় নাসা পাওয়ার প্রকল্প থেকে, যাতে আবহাওয়ার প্রভাব বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

মোট মৃত্যু ও ঝুঁকির পরিমাণ

গবেষণার ব্যাপ্ত সময়ে মোট ১৭ হাজার ৫৩১টি হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পিএম ২.৫ মাত্রা প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বৃদ্ধি পেলে একই মাসে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যু ৩.১ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (৯৫ শতাংশ বিশ্বাসযোগ্যতা সীমা: ১.১ শতাংশ থেকে ৫.২ শতাংশ)। অর্থাৎ এই সম্পর্কটি পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, মোট হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশ পিএম ২.৫ এক্সপোজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ দূষণমাত্রা কমানো গেলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অকালমৃত্যু প্রতিরোধ সম্ভব।

ঋতুভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীতকালে পিএম ২.৫-এর প্রভাব বেশি তীব্র। শীতকালে হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর ২৮.৭ শতাংশ পিএম ২.৫-এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে গরমকালে এই হার ছিল মাত্র ৭.১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দূষণ ও নিম্ন তাপমাত্রার সম্মিলিত প্রভাবে শীতকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে।

ডেঙ্গুর মৃত্যুহার বাড়াচ্ছে দূষণ

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সঙ্গে যে বায়ুদূষণের সম্পর্ক আছে, তা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায়। এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন সাময়িকীতে গত ২৯ জানুয়ারি এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী শাকিরুল খান এ গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তিনি জাপানের ওইতা ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল অ্যান্ড লোকাল ইনফেকশাস ডিজিজ সেন্টারে শিক্ষকতা করছেন। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ও জাপানের ১২ জন বিজ্ঞানী।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশসহ যেসব দেশে বায়ুদূষণ বেশি, সেসব দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বের গড় মৃত্যুহারের চেয়ে অনেক বেশি। আবার এসব দেশের যেসব এলাকা বেশি দূষিত, মৃত্যুহারও সেসব এলাকায় বেশি।

গবেষণায় বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বা পিএম ২.৫ এবং দূষণকারী অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকির পরিসংখ্যানগতভাবে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফুসফুস ও রক্তনালিতে প্রদাহ বাড়ে। এর ফলে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেছেন।

২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ডেঙ্গুপ্রবণ ২০টি দেশে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া পিএম ২.৫–এর মান এবং সামাজিক–অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত সূচক একত্র করে এ গবেষণা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি পিএম ২.৫–এর সংস্পর্শ ও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণে ‘জেনারালাইজড লিনিয়ার মিক্সড–ইফেক্টস মডেল’ ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক শাকিরুল খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি প্রথম বৈশ্বিক গবেষণা, যেখানে প্রমাণ করা হয়েছে যে বায়ুদূষণের কারণে ডেঙ্গু যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। আমরা দেখেছি, দূষণপ্রবণ দেশগুলোয় ডেঙ্গু তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী। ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমরা এত দিন মূলত মশা নিয়ন্ত্রণের দিকেই গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু এই গবেষণা দেখাচ্ছে, বায়ুদূষণ কমানোও ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।’

বৃষ্টি কমে আসা ও উষ্ণতর শীত

শুধু দূষণ নয়, জলবায়ুর পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশক বা তার বেশি সময়ে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমছে, শীতের তীব্রতা হ্রাস পাচ্ছে, মৌসুমি ধরন বদলাচ্ছে।

সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ এ মাসে সাধারণত ৪২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বৃষ্টি হয়েছিল ৩ মিলিমিটার। অথচ এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ ৯ মিলিমিটার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে ৯৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস বৃষ্টিশূন্য ছিল। অথচ জানুয়ারিতে সাধারণত ৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।

শীতকালে বৃষ্টি কম হলে বাতাসে জমে থাকা দূষিত কণিকা ধুয়ে নামার সুযোগ কমে যায়। ফলে উচ্চমাত্রার দূষণ দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রার উল্লম্ব স্তরবিন্যাস ও কম আর্দ্রতা—সব মিলিয়ে শীতকালে দূষণ আটকে থাকে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তিনি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, দুই দশক ধরেই বিশেষ করে দেশের মধ্যাঞ্চল, উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে কমছে শীতের দিনের সংখ্যা। বাড়ছে উষ্ণতা। বায়ুদূষণে এর প্রভাব পড়ছে।

দূষণ যেভাবে শরীর ক্ষয় করছে

এ প্রতিবেদন শুরু হয়েছিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের টিবি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে। হাসপাতালের পরিচালক আয়েশা সিদ্দিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার যে রোগী ভর্তি হয়েছে, তা গত পাঁচ বছরে হয়নি। দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখানে আসা রোগীরা কাছাকাছি এলাকার। কিন্তু এ অবস্থা রাজধানীর সর্বত্র। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দেশেরও সর্বত্র।’

খ্যাতনামা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আসিফ মুজতবা মাহমুদ বলেন, দূষিত বায়ু সরাসরি ফুসফুসের মধ্যে যায়। ফুসফুসের একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা রয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলো কোষ আছে যেগুলো এই সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলে। পিএম ২.৫–সহ নানা ধরনের দূষক যখন ফুসফুসে যায়, তখন কর্মরত কোষের ক্ষতি ঘটিয়ে থাকে। স্বাভাবিক যে অক্সিজেনের প্রবেশ ও কার্বন ডাই–অক্সাইড বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া, তা ব্যাহত হয়। ফলে শুধু ফুসফুস নয়, হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে মস্তিষ্কের ওপরও প্রভাব পড়ে।

দূষণ কেবল পরিবেশের বিষয় নয়; শ্বাসকষ্টের রোগীর সঙ্গে এখন হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে জটিল স্বাস্থ্যচিত্র তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যানবাহনের ধোয়া নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, শিল্পকারখানায় মানদণ্ড কঠোর করা, ইটভাটা সংস্কার, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও নগর সবুজায়ন—সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি বদলানো কঠিন। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও শুষ্ক মৌসুমে দূষণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।

ডা. আয়েশা সিদ্দিকা বললেন, ‘রোগী আসছেন চিকিৎসা দিচ্ছি। ওষুধ তো আছে, কিন্তু বাতাস? তাকে শুদ্ধ করবে কে?’

প্রশ্নটি শুধু এক চিকিৎসকের নয়—এটি এক শহরের, এক দেশের। প্রতিদিনের নিশ্বাসে যদি অদৃশ্য ঝুঁকি ঢুকে পড়ে, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা যতই শক্তিশালী হোক, সংকট কমবে না। দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন—এই দুই সংকটকে মাথায় রেখেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়
নদীর পাড় ঘেঁষে বানানো হয়েছে ইটভাটা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধলেশ্বরী সেতুসংলগ্ন এলাকায়। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

Wednesday, January 21, 2026

কুমিল্লায় রাতের আঁধারে কাটা হলো শতবর্ষী ৭টি গাছ, নগরবাসীর ক্ষোভ

কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ থেকে মেডিক্যাল কলেজ সড়কে শতবর্ষী সাতটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সড়ক প্রশস্ত করার কথা বলে সম্প্রতি রাতের আঁধারে গাছগুলো কাটা হয়।

এ ছাড়া কুমিল্লা ইপিজেডের সীমানাপ্রাচীর লাগোয়া এলাকা থেকে ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অন্তত ৩০টি বিভিন্ন ধরনের গাছ কাটা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকেরা।

টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কের পাশে আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের মূল ফটকের দুই পাশে শতবর্ষী দুটি রেইনট্রি গাছ ছিল। বিশালাকৃতির গাছগুলো দেখে সবাই মুগ্ধ হতেন। আজ বেলা ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গাছগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। সড়কের ডান পাশে উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয় ঘেঁষে পড়ে আছে বড় বড় কয়েকটি গুঁড়ি।

উপজেলা পরিষদ থেকে একটু সামনে যেতেই হাউজিং এস্টেট গোলমার্কেট সড়কের মাথায় ২০০ বছরের বেশি পুরোনো একটি বটগাছ ছিল। আজ বুধবার সরেজমিন দেখা গেল, গাছটির গোড়ার অংশ উপড়ে ফেলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ঢুলিপাড়া এলাকায় নার্সারির সামনে ও কুমিল্লা কেটিসিসির সামনে আরও দুটি শতবর্ষী রেইনট্রি গাছ কাটা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় ২০ দিন আগে রাতের আঁধারে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। পরে টুকরা টুকরা করে নিয়ে যাওয়া হয়। গাছগুলো পুরো এলাকায় ছায়া দিত। টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। ওই কাজের জন্য গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে তাঁরা জানেন।

টমছমব্রিজ-মেডিক্যাল কলেজ সড়কটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতাধীন। বর্তমানে সড়কটির উন্নয়নকাজ করছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন।

গাছগুলো কারা কেটেছে জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘সড়কটি সওজের হলেও সিটি করপোরেশন আমাদের না জানিয়ে গত বছর দরপত্র আহ্বান করে। এরপর ঠিকাদার কাজও শুরু করেন। পরে আমাদের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এবারের জন্য তাদের উন্নয়নকাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো কীভাবে কাটা হয়েছে, সেটা আমি বলতে পারব না। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনই ভালো বলতে পারবে।’

জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন-উদ্দিন চিশতী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বা চলমান কাজের ঠিকাদার কোনো গাছ কাটেননি। গাছগুলো সওজ নিলামের মাধ্যমে ২০২০ সালে বিক্রি করলে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সওজের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী হয়তো বিষয়টি জানেন না। এ জন্য তিনি বলতে পারছেন না। যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই গাছগুলো কাটা হয়েছে বলে জেনেছেন। এখন সিটি করপোরেশন কাজ করছে বলে অনেকে মনে করছেন, তারা গাছগুলো কেটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে কিছুই জানে না।’

আদর্শ সদর উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সড়ক প্রশস্ত করতে গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কাগজপত্র ঘেঁটে জানতে পেরেছি, ২০২০ সালে মোট সাতটি পুরোনো গাছ নিলামের মাধ্যমে কেটে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে সওজ। সাতটি গাছের মধ্যে দুটি মেহগনি আর বাকি পাঁচটি রেইনট্রি। বটগাছটি বুনো গাছ হওয়ায় সেটি নিলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ওই সাতটি গাছের মধ্যে একটি কোনো কারণে কয়েক বছর আগে কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন ছয়টি কাটা হয়েছে। এগুলো সওজের নিলামে পাওয়া ঠিকাদার বা তাঁর পক্ষের লোকজনই কেটেছেন বলে জেনেছি।’

২০২০ সালের নিলামে ২০২৬ সালে কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে—জানতে চাইলে সওজের কুমিল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আদনান ইবনে হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামে এসব গাছকাটার প্রক্রিয়া শুরু হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কয়েক বছর সময় লাগে। এই ক্ষেত্রেও তেমনটা হতে পারে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না।’

শতবর্ষী গাছ কাটায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর। তিনি বলেন, ‘গাছগুলো ঠিক কবে লাগানো হয়েছে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আকার দেখেই বোঝা যায়, এগুলো শতবর্ষী। নিলামের ছয় বছর পর কীভাবে গাছগুলো কাটা হলো, এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। ২০০ বছরের পুরোনো বটগাছটি না কাটলেও পারত। এভাবে শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার আগে বেশি করে গাছ লাগানোর দরকার ছিল। তা না করে উল্টো পরিবেশের বারোটা বাজানো হচ্ছে।’

কেটে ফেলা শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে সড়কে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ-মেডিকেল কলেজ সড়কের আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে
কেটে ফেলা শতবর্ষী গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে সড়কে। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা নগরের টমছমব্রিজ-মেডিকেল কলেজ সড়কের আদর্শ সদর উপজেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে। ছবি: আবদুর রহমান

Friday, April 25, 2025

চুইংগাম চিবাতে ভালোবাসলে জেনে রাখুন কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন by রাফিয়া আলম

পরিবেশে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক অর্থাৎ প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। খাবার কিংবা পানীয়তে মিশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকও হতে পারে ঝুঁকিপূর্ণ।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক চুইংগামে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ছোট্ট একটা চুইংগাম মাইক্রোপ্লাস্টিকে ভরপুর থাকে। শিশুরা তো বটেই, বড়দের মধ্যেও অনেকে চুইংগাম পছন্দ করেন।

ঠিক কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন

কিছু চুইংগাম বানানো হয় প্রাকৃতিক উপকরণে, কিছু আবার কৃত্রিম উপকরণ দিয়েও তৈরি হয়। তবে যে উৎস থেকেই চুইংগাম তৈরি হোক না কেন, তা রাবারের মতো একটু আঠালো ধরনেরই হয়। এই দুই ধরনের চুইংগাম থেকেই সমান পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বলছিলেন ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডা. সাইফ হোসেন খান।

একটা চুইংগামের ওজন ২ থেকে ৬ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাত্র ১ গ্রাম চুইংগাম থেকেই গড়ে ১০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয়। এমনকি কিছু চুইংগামের প্রতি গ্রাম থেকে আসতে পারে ৬০০ মাইক্রোপ্লাস্টিকও। তার মানে একটা ছোট্ট চুইংগাম থেকেই শতসহস্র মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশে যেতে পারে আমাদের লালায়।

খাবার খাওয়ার পর তা যেমন পরিপাক হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক কিন্তু সেভাবে পরিপাক হয় না, রয়ে যায় অবিকৃত। লালায় মিশে যাওয়ার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়তে পারে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে। সেখান থেকে রক্তেও পৌঁছে যেতে পারে এই ছোট্ট কণা। আর রক্তের মাধ্যমে চলে যেতে দেহের পারে যেকোনো অংশেই। মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও জমা হতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক।

মাইক্রোপ্লাস্টিকে যেসব ক্ষতি হয়

দেহের যেকোনো অঙ্গে জমা হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হয়, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিতে ডায়াবেটিস এবং হৃদ্‌রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। তা ছাড়া দেহের হরমোনের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে একজন নারী কিংবা একজন পুরুষের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কোনো অঙ্গে অধিক পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হলে সেই অঙ্গের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতিধারণের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই শিশুদের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

শেষ কথা

মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব বিষয়ে এখনো গবেষণা চলমান। তবে যতটা জানা গেছে, তা খুব একটা স্বস্তির নয়। দীর্ঘ মেয়াদে অনাকাঙ্ক্ষিত বহু সমস্যা এড়াতে আমাদের জীবনধারা এমনভাবে গড়ে তোলা ভালো, যাতে অতিরিক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের দেহে প্রবেশ করতে না পারে। চুইংগামে যেহেতু অনেকটা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, তাই যেকোনো বয়সেই চুইংগাম কম খাওয়া উত্তম।

চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে
চুইংগাম থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিঃসৃত হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ছবি: সংগৃহীত

Tuesday, October 22, 2019

ভয়ঙ্কর প্লাস্টিক দূষণ, বছরে ক্ষতি ৬১৫০ কোটি টাকা by জিয়া চৌধুরী

পরিবেশ ও জীবনের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে উঠছে প্লাস্টিক বর্জ্য। অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ায় দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। এভাবে চলতে থাকলে প্লাস্টিক বর্জ্য দেশে বড় বিপদ ডেকে আনতে  পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকাসহ সব বড় শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় পুনর্ব্যবহার করা যাচ্ছে না এসব পণ্যের।
পাশাপাশি সিটি করপোরশেনগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য আলাদা গ্রেডিং ও ব্যবস্থাপনা না করায় গৃহস্থালির প্রাকৃতিক বা অরগানিক বর্জ্যও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রাকৃতিক বর্জ্যের সাথে মিশে এসব প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশে। সরাসরি দূষণের পাশাপাশি জলাশয়ে গিয়ে মিশে জলজ প্রাণির জীবনচক্রে প্রভাব ফেলছে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য। বছরের পর বছর ধরে ঠিকে থাকা এসব প্লাস্টিক পণ্য বিরূপ প্রভাব ফেলছে মানুষের খাদ্যচক্রেও।
ওয়েস্ট কনসার্ন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে দেখা গেছে, বছরে বাংলাদেশে অন্তত ১০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে যার বেশিরভাগ পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে না। শুধুমাত্র প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের কারণে বছরে ৬১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি রুখতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলাদা নীতিমালা প্রণয়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গ্রেডিং সিস্টেম ও জিরো ওয়েস্ট পদ্ধতির চালুর সুপারিশ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। এরই মধ্যে, দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু করে দিয়েছেন অনেকে।
পুরনো ফেলে দেয়া প্লাস্টিক থেকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী পণ্য তৈরিসহ বিদেশেও রপ্তানি করা শুরু করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। তারা বলছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে সরকার এখনো মনোযোগী নয়। বেসরকারিভাবে অনেকে উদ্যোগ নিলেও সরকারি প্রণোদনার অভাবে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ‘বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাব ও পুনর্ব্যবহার’ বিষয়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষক ও দুইজন শিক্ষার্থী একটি গবেষণা করছেন।
অতিরিক্ত মাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহারকে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে গবেষণায়। তবে প্লাস্টিক বর্জ্য শুধুই সংকট নয় সম্ভাবনা বলেও মনে করছে ওই গবেষণা দল। শাবিপ্রবি’র রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও গবেষণা দলের সদস্য মো. মাহমুদুল হাসান গতকাল মানবজমিনকে বলেন, গৃহস্থালি, অফিস ও কারখানার প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের একটা বড় সুযোগ রয়েছে। তবে হতাশার বিষয়, আমরা এখনো সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নিতে পারিনি। শাবিপ্রবি’র ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ সালে প্রতিদিন দেশে প্রায় ৫ হাজার ৬০ টন বর্জ্য তৈরি হতো। বছরে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ লাখ টন। তবে, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হবে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বছরে যার পরিমান দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ লাখ টনে। বর্জ্য অপসারণে নাগরিকদের তেমন কোন অংশগ্রহণ নেই বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল জনসংখ্যার অধিকাংশই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় না হওয়ায় এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও সেবা সংস্থাগুলোকে আরো উদ্যোগী হতে হবে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
দেশের রাজধানী খোদ ঢাকাতেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র দেখা গেছে, যেখানে মাত্র শতকরা ৩৭ ভাগ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। গত প্রায় এক দশকে দেশে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার প্রসঙ্গে কিছুটা ইঙ্গিত করা হয়েছে ওই গবেষণায়। মিউনিসিপ্যাল সলিড ওয়েস্টে (এমএসডব্লিউ) দিন দিন প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। দেশের নগর ও শিল্প এলাকায় খাবার ও কাগজ জাতীয় বর্জ্যের পরেই সবচেয়ে বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক থেকে। এমনকি গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকায়ও প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, পিইটি বোতল ও গৃহস্থালি কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহারের কারণে পলি বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে।
২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল এই এক দশকে দেশের নগর এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা প্রায় ২.৬০ ভাগ। এই সময়ে শহর ও পৌরসভা এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনের হার বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা প্রায় ৩.৩০ ও ৩.৭৩ ভাগ। বেশ কয়েকটি সংগঠন ও সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে এসব প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা প্রায় ৭২ ভাগ পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে দেশে বছরে প্রায় ৬১৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলেও গবেষণায় জানানো হয়েছে।
এছাড়া, দেশের ভেতরে প্রায় ৫ হাজার ছোট-বড় প্লাস্টিক কারখানায় বছরে ৪ হাজার টন প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন হয়। এসব পণ্যের চার ভাগের প্রায় এক ভাগ বর্জ্য হিসেবে থেকে যাচ্ছে, যা পুনরায় ব্যবহার হচ্ছে না। উৎপাদিত বর্জ্যের শতকার মাত্র ২৮ ভাগ পুনরায় ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে, এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করলে জ্বালানি তেলের বড় যোগান হবে বলেও শাবিপ্রবির গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে, এনভায়রন্টমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে।
সংগঠনটির মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, গৃহস্থালি কাজে বহুবার ব্যবহার করা যায় এমন প্লাস্টিক পণ্য দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কার কারণ হচ্ছে মাত্র এক বার ব্যবহার করা হয় এমন প্লাস্টিক সামগ্রী। সামাজিক অনুষ্ঠান ও খাবারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব পণ্য। তবে সিঙ্গেল ইউজড প্লাস্টিক পণ্যের কারণে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমান বাড়ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে বলে জানান এসডো’র মহাসচিব। শাহরিয়ার হোসেন মানজমিনকে জানান, ই-বর্জ্যের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগেই থাকে প্লাস্টিক। প্রচলিত বর্জ্য থেকে আলাদা করে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন ও সেবা সংস্থাগুলো কোন উদ্যোগ নেয়নি। প্রচলিত গৃহস্থালির প্রাকৃতিক বর্জ্যের সঙ্গে ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে অপসারণ করার ফলে ক্ষতির মাত্রা আরো বেশি হচ্ছে। পোড়ানোর পর, তা মাটি ও জল ও বাতাসে মিশে থাকছে। প্রভাব ফেলছে মানুষের খাদ্যচক্রেও।
শাহয়িরার হোসেন আরো বলেন, গৃহস্থালি ও বাসাবাড়ির প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বর্জ্য অর্গানিক। তবে, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে কোন আলাদা পদ্ধতি না থাকায় পচনশীল বর্জ্য কোন কাজে আসছে না। সিটি করপোরেশন থেকে লাল, হলুদ ও সবুজ তিন রংয়ের আলাদা চিহ্নিত ক্যানে বর্জ্য সংগ্রহে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। পাশাপাশি, এসব বর্জ্য ডাম্পিয়ের সময় প্লাস্টিক বর্জ্যকে আলাদা চেম্বারে রেখে অর্গানিক বর্জ্য থেকে সার বা প্রয়োজনীয় কাজে লাগানো সম্ভব বলেও মত তার। তিনি আরো বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রসেসের দিকে মনোযোগী হতে হবে। যাতে করে, বর্জ্যের পরিমাণ না বাড়ে, পুনর্ব্যবহার বাড়াতে হবে। এদিকে, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনরায় ব্যবহার করে আবারো পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে ইনোকা বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. নিয়ামুল কবির মিঠু বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব। সরকারকে এমন উদ্যোগে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, যারা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী পণ্য তৈরি করছে তাদেরও প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে, দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে যাওয়া সম্ভব।

Monday, October 14, 2019

ঢাকার প্রাচীন খিরিবৃক্ষ by মোকারম হোসেন

প্রায় এক যুগ আগে কৃষিবিদ এস এম কামরুজ্জামানের সহায়তায় নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার সুকাশ ইউনিয়নের দুলশি গ্রামে গিয়েছিলাম একটি অচিন বৃ‌ক্ষের পরিচয় জানতে। বিশালাকৃতির এই বৃক্ষÿ তখন আমার কাছেও অচেনা। গাছটি ঘিরে স্থানীয়ভাবে অনেক লোকগল্প প্রচলিত। স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করেন, গাছটির কিছু আধ্যাত্মিক ক্ষমতা রয়েছে। এ কারণে গাছটি সংরক্ষণের ব্যাপারেও তাঁরা সোচ্চার। ঢাকায় ফিরে গাছটিকে খিরিবৃক্ষ হিসেবে শনাক্ত করে প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন লিখি। এটি মূলত সফেদা পরিবারের গাছ। তারই সূত্র ধরে আমাকে অনেকেই ঢাকার লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের এই গাছের খোঁজ দিয়েছেন। গাছটি দেখতে গেলাম একদিন। দেখে মন ভরে গেল। গড়নটা এতই নিখুঁত, যেন টবের মধ্যে বসানো একটি গাছ। ডালপালাগুলো ঝুরির মতো নেমে এসেছে চারপাশে। খোলা মাঠের ধারে বিশাল ছাতার মতো রাজসিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় লোকজন মনে করেন গাছটি শতবর্ষী। জানামতে, ঢাকায় রমনা পার্কে এদের একটিমাত্র নিকটাত্মীয় আছে। সেটির বৈজ্ঞানিক নাম Manilkara kaukii।
খিরিবৃক্ষ বা খিরনি গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Manilkara hexandra। দেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে এ গাছ দেখা যায়। একই কারণে এ গাছকে দুর্লভ এবং বিপন্ন মনে করা হয়। বিশাল আকৃতির চিরসবুজ বৃক্ষ এটি। প্রসারিত মুকুট, বাকলে দুধের মতো ল্যাটেক্স আছে। পাতা সরল, ডালের আগায় দলবদ্ধভাবে জন্মে এবং ঝুলে থাকে। ফুল হালকা হলুদ বর্ণের। ফল রসাল, জলপাই আকৃতির, পাকলে লাল হয়। খাওয়া যায়। কাঠ মজবুত, আসবাব তৈরিতে কাজে লাগে। ফুল ও ফলের মৌসুম অগ্রহায়ণ থেকে শ্রাবণ। বীজ থেকে চারা হয়। আদি আবাস শ্রীলঙ্কা।
ঢাকার লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণের খিরিবৃক্ষ। ছবি: লেখক

Monday, September 23, 2019

পরিবেশ দূষণ: আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে দূষণ করছে সিটি করপোরেশন?

সাভারের আমিনবাজারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিল বা বর্জ্য ফেলার জায়গাটির পরিবেশ ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৭ সালে। ডাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের দায়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে সর্বোচ্চ জরিমানা করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। তাদের অভিযোগ,পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই এখানে বর্জ্য ফেলছে ডিএনসিসি।
২০০৭ সাল থেকে সাভারের আমিনবাজারের এ জলাভূমিকে ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে ঢাকা সিটি করপোরেশন। বর্তমানে এখানে প্রতিদিন উত্তর সিটির ৫৪ টি ওয়ার্ডের প্রায় ৩২০০ টন বর্জ্য ফেলা হয়।
আমিনবাজার ল্যান্ডফিল: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে পরিবেশ দূষণ?
৫০ একর জায়গা জুড়ে এখানে ময়লা ফেলবার কথা থাকলেও বাস্তবে ময়লা ফেলা হচ্ছে আরো বেশি জায়গায়। ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা উপচে পড়ছে এখানকার পানিতেও।
আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের পাশেই বলিয়ারপুর এলাকা। বর্জ্যের তীব্র দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ এ এলাকায় বসবাসকারীদের জীবন। অর্থনৈতিকভাবেও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা।
ডাম্পিং স্টেশন হওয়ার আগে এখানে নিয়মিত মাছ ধরতেন বলিয়াপুরের স্থানীয় বাসিন্দা হামিদা ও তার স্বামী।
হামিদা বলেন, ''এখানে ময়লা ফেলার স্টেশন করার পর থেকে এ পানির মাছ আর খাওয়া যায় না। মাছে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ।''
আরেক বাসিন্দা হাসেরা জানান, ''আমি ফসল বুনি কিন্তু পানিতে ময়লার কারণে এখন আর ফসল হয় না। আমিনবাজারের যত ময়লা আছে সব পানিতে ভেসে ক্ষেতের ভেতরে গিয়ে ঢোকে।''
বলিয়ারপুরের নৌকার মাঝি ছিলেন হোসেন মিয়া। একসময় এখানে পর্যটকেরা নৌকায় চড়তে আসত।তবে এখন দুর্গন্ধের কারণে এখানে কেউ আসে না। ফলে দুই সন্তানের এই জনককে এখন মাঝির কাজ ছেড়ে দিয়ে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে হয়।
মি. মিয়া বলেন, ''আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এত অসুখ বিসুখ হতো না। এখন বাচ্চাদের প্রতি সপ্তাহে ডায়রিয়া-আমাশয় লেগেই থাকে।''

পানিতে ময়লা ফেলে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব?

মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষণের অভিযোগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে আমিনবাজারে ময়লা ফেলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে হাইকোর্ট। তবে তৎকালীন অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে দুই মাস পরেই ঐ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় আপিল বিভাগ।
আমিনবাজারের বর্জ্যের স্তুপ উচ্চতায় নয় মিটার যা প্রায় একটি দোতলা বাড়ির সমান
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দাবি, 'পরিবেশসম্মতভাবেই' এখানে বর্জ্য ফেলছেন তারা। দূষণ এড়াতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে জানান ডিএনসিসি'র বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শফিকুর রহমান ।
মি. রহমান বলেন, ''ভূগর্ভের পানি যেন দূষিত না হয় সেজন্য আমিনবাজারে দুটি লিচেট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে।বায়ু দূষণ রোধে সয়েল কাভারের কাজ করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কেন আমাদেরকে দূষণের দায়ে অভিযুক্ত করছে - তা তারাই বলতে পারবে।''
তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা) এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি মনে করেন, পানিতে ময়লা ফেলে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অসম্ভব ব্যাপার।
এ ল্যান্ডফিল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর তীব্র বিরোধীতা করে আসছে তাঁর সংগঠন 'বেলা'।
১২ বছর আগে এ ল্যান্ডফিলের বিরুদ্ধে বেলা'র করা মামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ''সিটি করপোরেশন তখন কতগুলো বিষয় কোর্টে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। বলা হয়েছিল সাংঘাতিক পরিবেশসম্মত করে ফেলা হবে।"
"নিচে কংক্রিট ঢালাই দেয়া হবে, কোনো রকম লিচিং হবে না। সেই যুক্তির ১২ বছর পার হয়েছে, একটা ইটও তারা সেখানে গাড়তে পারেনি।''

বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে দুই সিটি মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৭-১৮ সালে শুধুমাত্র ঢাকা উত্তর সিটিতেই বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে ২১.৯৩ ভাগ।
ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা উপচে পড়ছে এখানকার পানিতেও
ক্রমবর্ধমান বর্জ্যের হারের কথা মাথায় রেখে আরো দুটি ল্যান্ডফিল চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। আমিনবাজারের এ ল্যান্ডফিলটি সম্প্রসারণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিও চেয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে ল্যান্ডফিল স্থাপনের কোনো আইনি নির্দেশনা নেই। তবে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দর, মহাসড়ক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে ল্যান্ডফিল স্থাপন করতে হবে। আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ক্ষেত্রে এ মানদণ্ডের কোনটিই অনুসরণ করা হয়নি।
রাষ্ট্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট দর্শন থাকা জরুরী বলে মনে করেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, ''সিটি করপোরেশনের কাজ সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এক জায়গা থেকে ময়লা নিয়ে আরেক জায়গায় ফেলা নয়।''
পরিবেশ নিয়ে বহুদিন ধরে সোচ্চার থাকা এই আইনজীবী মনে করেন পরিবেশসম্মত উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে নাগরিকদের কম বর্জ্য উৎপাদনে সচেতন করতে হবে। না হয় ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
লন্ডন ভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এ বছরের তালিকা অনুযায়ী বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহর গুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান তৃতীয়।
এ তালিকায় অর্ন্তভুক্তির পেছনে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও পরিবেশ দূষণের দায়ও কম নয় বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা) এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

Tuesday, September 17, 2019

পশ্চিমাদের বর্জ্য নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে ক্ষোভ কেন?

নানা ইস্যুতে বিবাদ হতে পারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে। এই মুহূর্তে ব্রিটেনের উপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে শ্রীলংকা। আর তার ইস্যু হল আবর্জনা।
ব্রিটেন থেকে পাঠানো ১১১টি কন্টেইনার ভর্তি বর্জ্য নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে শ্রীলংকায়।
দ্বীপ রাষ্ট্রটি দাবি করছে ব্রিটেন যেসব বর্জ্য পাঠিয়েছে সেগুলো এখনই ফেরত নিতে হবে।
তাদের অভিযোগ এর মধ্যে ভয়াবহ বিপজ্জনক সব বর্জ্য রয়েছে।
এমনকি মৃত মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
বর্জ্য ভর্তি কন্টেইনারগুলো এই মুহূর্তে দেশটির বন্দরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছে আমদানিকারক কোম্পানি।
যার মধ্যে ২০১৭ সালে আসা কন্টেইনারও রয়েছে। এগুলো থেকে এখন ভয়াবহ গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এই বর্জ্য সমুদ্রে মিশে যাওয়ার আশংকা করছে শ্রীলংকা।

পুনর্ব্যবহারের কথা বলে ধোঁকা?

পশ্চিমা দেশগুলো থেকে উন্নয়নশীল এশিয়ান দেশগুলোতে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং-এর কথা বলে প্রচুর বর্জ্য পাঠানো হয়।
বিশ্বের সবচাইতে বড় উদ্বেগগুলোর একটি এখন বর্জ্য।
২০১৮ সালে চীন ঘোষণা দিয়েছে যে তারা পশ্চিমা কোন দেশের প্লাস্টিক বর্জ্য আর গ্রহণ করবে না।
এর ফলে এখন সেসব বর্জ্য অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে।
কিন্তু এই বছরের মে মাসে ফিলিপাইন ৬৯ টি বর্জ্য ভর্তি কন্টেইনার কানাডায় ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও একই কাজ করেছে সাম্প্রতিক সময়ে। একই কাজ করেছে কম্বোডিয়া।
এই মাসের শুরুতে তারাও ৮৩ টি কন্টেইনার যুক্তরাজ্যে ও কানাডায় ফেরত পাঠিয়ে বলেছে, "কম্বোডিয়া কোন ডাস্টবিন নয়"।
এই দেশগুলোর অভিযোগ পুনর্ব্যবহারের কথা বলে ধোঁকা দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো।
এসব বর্জ্যের মধ্যে প্রচুর ক্ষতিকর আবর্জনা পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।
পশ্চিমা দেশগুলো আসলে তাদের ডাস্টবিন বা আবর্জনা ফেলার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শ্রীলংকায় বন্দরে পরে আছে ১১১টি কন্টেইনার ভর্তি বর্জ্য।
মানুষ যত বাড়ছে আবর্জনা তত বাড়ছে। বিশ্বের সবচাইতে বড় উদ্বেগগুলোর একটি এখন বর্জ্য। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য।
সেগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নানা দেশ। আবার একই সাথে এসব বর্জ্য আমদানি করে সেগুলো পুনর্ব্যবহার করার একটি ব্যবসাও দাঁড়িয়েছে।
অনেক সময় কয়েক হাত ঘুরে সেগুলো কোন তৃতীয় বিশ্বের দেশে পৌছায়।

পশ্চিমাদের ময়লা ফেলা ভাগাড় নয়

শ্রীলংকায় পরিদর্শকরা সেখানে ফেলে যাওয়া কন্টেইনারগুলোর পরিদর্শনের পর কিছু ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে।
সেগুলো নিয়ে দেশটির সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলছে তোলপাড়।
কলোম্বোতে ব্রিটিশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ করেছে দেশটির কিছু পরিবেশবাদী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
বর্জ্য আমদানি করে সেগুলো পুনর্ব্যবহার করার একটি ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেছে।
তারা যেসব প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন সেগুলোর একটি বার্তা হচ্ছে তাদের দেশ 'পশ্চিমাদের ময়লা ফেলা ভাগাড় নয়'।
এখানে প্রতিবাদকারীদের একজন বলছেন, "আমি এখানে এসেছি আমার ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। আমরা একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ। আমাদের নিজেদের সমস্যার কোন অন্ত নেই। অন্যদের বর্জ্যের দায়িত্ব আমরা কিভাবে নেবো?"

ব্রিটেনের বক্তব্য

ব্রিটেনের পরিবেশ বিষয়ক অধিদপ্তর বিবিসিকে জানিয়েছে তারা শ্রীলংকার বিষয়টি তদন্ত করছে।
তবে তারা বলছে, এই বর্জ্য সরাসরি ইংল্যান্ড থেকে অবৈধভাবে পাঠানো হয়েছে কিনা সেটি প্রমাণ করতে পারলে তবেই সেগুলো ফেরত নেয়া হবে।
একজন শ্রীলংকান আমদানিকারক যিনি বর্জ্যগুলো এনেছেন তাকেই সেগুলো ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রমাণ সাপেক্ষে যারা এই বর্জ্য অবৈধভাবে ব্রিটেন থেকে রপ্তানির সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া সহ অনেক দেশ পশ্চিমা বর্জ্য ফেরত পাঠাচ্ছে।

Monday, September 16, 2019

ভবিষ্যতে খাবার সংকটে পোকামাকড়ই সমাধান!

টিভি পর্দার জনপ্রিয় চরিত্র বেয়ার গ্রিলসকে নিশ্চয়ই চেনা আছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিভাবে টিকে থাকতে হয় সেসব ব্যাপারে তার মত দক্ষ খুব কম লোকই আছেন। বেয়ার গ্রিলসকে টিভি পর্দায় নানা প্রজাতির কীট পতঙ্গ খেতে দেখে নাক মুখ বিকৃত করেননি এমন লোকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। কিন্তু এমন যদি হয় ভবিষ্যতে আপনাকেও হাঁটতে হচ্ছে সেই পথে? বেয়ার গ্রিলসের মতই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে আপনি খাচ্ছেন ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা পোকামাকড়?
সত্যি কথা বলতে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আর ভবিষ্যত পৃথিবীর খাদ্য সমস্যার সমাধান হিসেবে এমন উদ্যোগ গ্রহণের পক্ষেই ধীরে ধীরে মতামত গড়ে উঠছে বিজ্ঞানীদের মাঝে। গবাদিপশুর খামারের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভূমি এবং পানি দূষণ ঘটছে। সেই সাথে দূষিত হচ্ছে চারপাশের বাতাস। খামার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ধ্বংস হচ্ছে বনভূমি। সেই সাথে গবাদিপশুর শ্বাস থেকে নির্গত গ্রিন হাউজ গ্যাস সব মিলিয়ে পরিবেশের জন্য সব দিক থেকেই বেশ ক্ষতির কারণ গবাদি পশু প্রতিপালন। সেদিক থেকেই নতুন দিনের বিবেচনায় ঠাঁই পাচ্ছে উদ্ভিদ এবং পোকামাকড়। তবে পোকামাকড় হবে জেনেটিক প্রযুক্তির যেন অল্প খেলেই আপনি পেতে পারেন পরিপূর্ণ পুষ্টি!
সম্প্রতি ফ্রন্টেয়ার ইন সাসটেইনেবল ফুডস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত আমেরিকার টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে উদ্ভিদভোজী কীটপতঙ্গের মাংস, এর পুষ্টিবৃদ্ধি এবং অন্যান্য বিষয়ে ব্যাপক আকারে গুরুত্ব প্রদান করা হয়। গবেষকরা দাবি করেন, ল্যাবরেটরিতে উৎপন্ন এইসব পোকা সাধারণ প্রোটিন উৎসের সমান পুষ্টি দিতে সক্ষম হবে।
গবেষণা প্রবন্ধের মূল লেখক নাটাইলি রুবিও বলেন, ‘পরিবেশ, গণস্বাস্থ্য এবং প্রাণীজীবনের উন্নয়নে আমাদের কার্যক্রম বর্তমান গবাদিপশু প্রতিপালন পদ্ধতির কারণে অনেকখানিই ব্যাহত হচ্ছে। তাই আমাদের লক্ষ্য সময়ের সাথে টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা প্রচলন করা’।
জীন প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভুত প্রোটিন উৎস বা ল্যাবে উৎপন্ন পোকার মাধ্যমে মাটি ও পানি দূষণের পাশাপাশি বনায়ন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্য নষ্টের বিরুদ্ধে ভাল একটি অবস্থান নেয়া যাবে বলে বিশ্বাস করেন গবেষক দল। যদিও এর বিপরীতে ভারী প্রোটিনের চাহিদা কতটা কমবে এবং উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীলতা কতটা নেমে আসবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
কিন্তু বিষয়টা যখন খাদ্য সংক্রান্ত তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর স্বাদ কেমন হবে? খেয়ে কি আসলেই তৃপ্ত হওয়া যাবে? জেনেটিক প্রযুক্তির ফলে পোকা মাকড়ের মাঝে বাড়তি পুষ্টি এবং প্রোটিন সররাহের পাশাপাশি কি স্বাদও পরিবর্তন করা সম্ভব?
এই প্রশ্নের জবাবে রুবিও জানান, এখনই এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। খুব ভাল সম্ভাবনা থাকা স্বত্তেও এখনই এইসব পোকামাকড় খাবার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য একেবারেই প্রস্তুত নয়। আমরা এখনো দুইটি মূল বিষয়ে নিজেদের উন্নতি করতে চাইছি। প্রথমত, প্রতিটি পতঙ্গের চামড়া নিয়ে ব্যাপক পরিমাণ চর্বি এবং মাংসের আলাদা আলাদা স্তর গড়ে তোলা। আর দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে এতে সত্যিকারের মাংসের স্বাদ নিয়ে আসা। এজন্য আমরা মাশরুমের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছি যা বেশ সম্ভাবনাময় একটি বিকল্প হতে পারে।
এছাড়া একইসাথে বেশ কিছু পোকার সংকরায়নের মাধ্যমেও স্বাদে নতুন কিছু আনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা। কিন্তু গবেষয়াণ শেষে তাদের এই উদ্যোগ ঠিক কতটা মেনে নিবে পৃথিবীর মানুষ বা অতিরিক্ত পোকামাকড় ভক্ষণের কারণে প্রকৃতিতে জীবের ভারসাম্য কতটা রক্ষা হবে সে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তথ্যসূত্র: সায়েন্স ডেইলি

Monday, July 29, 2019

দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ by সঞ্চিতা সীতু

হালদা নদী ও পানগাঁও-এর কন্টেইনার দূষণের অভিযোগ উঠেছে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, পরিবেশ দূষণের বিষয়টি মাথায় রেখেই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্র বন্ধ রেখে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
সম্প্রতি হালদা নদী দূষণের কারণে একটি কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদফতর। অন্যদিকে পানগাঁও ইনল্যাণ্ড কন্টেইনার টার্মিনালের কাছে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দূষণ দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।
তরল জ্বালানি নির্ভর কেন্দ্র থেকে পরিবেশ দূষণ হওয়ার কথা না থাকলেও বাস্তবে ঠিকই দূষণ হচ্ছে। দূষণ বন্ধে কেন্দ্রগুলোর কিছু মানদণ্ড মেনে চলার কথা থাকলেও খরচ বাঁচাতে সেগুলো মেনে চলা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর থেকে অভিযোগ এসেছে। আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি। পরিবেশের বিষয়ে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে পরিবেশ বাঁচাতে হবে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ দূষণ রোধে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, জ্বালানি সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম এবং পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বৈঠক করেছেন।
বর্জ্য তেল নিঃসরণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী দূষণের অভিযোগে গত ১৭ জুলাই হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয় পরিবেশ অধিদফতর। পাশাপাশি ইটিপি নির্মাণ এবং অয়েল সেপারেটর কার্যকর না করা পর্যন্ত কেন্দ্রটি বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরিবেশ অধিদফতর জানায়, গত ৯ জুলাই হাটহাজারীর কেন্দ্রটি থেকে বর্জ্য ফেলে হালদা নদী দূষণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে শুনানিতে ডেকে সব প্রমাণের ভিত্তিতে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১২ সালের মার্চে কেন্দ্রটি উদ্বোধনের পর পরই দুই দফা পরিবেশ দূষণের অভিযোগের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।
অন্যদিকে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কেরাণীগঞ্জের পানগাঁও আইসিটির কাছে এপিআর এনার্জি নামের একটি কোম্পানি ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে। তারা এই কেন্দ্রটি স্থানান্তরের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছে।
গত ৪ জুলাই পাঠানো চিঠিতে তারা জানায়, পানগাঁও ইনল্যাণ্ড কন্টেইনার টার্মিনালের (আইসিটি) কাছে এপিআর এনার্জির বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া, উচ্চ তাপমাত্রা এবং শব্দদূষণের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস এবং সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকেই শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের নানান সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন।
এ অবস্থায় তারা ফার্নেস তেলে চালিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এছাড়া জায়গাটি বুঝিয়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেনারেটরগুলো হতে নির্গত ধোঁয়া, উচ্চ তাপমাত্রা ও শব্দদূষণ বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও অনুরোধ করেছে তারা। প্রসঙ্গত, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রটি স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্জ্য গিয়ে পড়ছে হালদায় (ছবি সংগৃহীত)

Tuesday, July 16, 2019

গাছে পেরেক পুঁতলেই জরিমানা

পশ্চিমবঙ্গে গাছে পেরেক লাগানোর বিরুদ্ধে চালু হতে যাচ্ছে নতুন আইন। বিধি অনুসারে গাছের গায়ে পেরেক পোঁতা হলে জরিমানা করা হবে। বিধানসভার চলতি বর্ধিত বাজেট অধিবেশনে পুর দপ্তর রাস্তা, হাসপাতাল-সহ প্রকাশ্য জায়গায় থুতু ফেলা বন্ধে আইনে সংশোধনী এনেছে। এই আইনের আওতাতেই বিধি তৈরি করে পুর-এলাকায় গাছের গায়ে পেরেক পোঁতা বন্ধ করার ব্যবস্থা হচ্ছে।
বিধি নিয়ে বিধানসভায় কংগ্রেস বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, গাছের গায়ে পেরেক পুঁতে বিজ্ঞাপন দেয়ার প্রবণতা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। অথচ আমরা বলে থাকি, একটি গাছ একটি প্রাণ। পথে পথে ছোট-বড় গাছে পেরেক পুঁতে বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে দেওয়া আমাদের সকলেরই নজরে পড়লেও কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন ছাড়া কেউই প্রতিবাদ জানান না। গাছকে পেরেক পুঁতে ক্ষত-বিক্ষত করা যে অন্যায় সেই সচেতনতাই নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হয়নি।
তাই যারা এগুলি লাগান তাদের কেউ বাধাও দেন না। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতারা এ নিয়ে ভাবিত নন। সরকারি স্তরে কোনো ব্যবস্থা নেবার নজির নেই। এক পরিবেশকর্মী জানান, গাছ কাটা ঠেকাতে আইন থাকলেও গাছের গায়ে পেরেক দিয়ে বিজ্ঞাপন সাঁটা মোকাবিলায় কোনো বিধি নেই রাজ্যে। গাছে পেরেক লাগানোর  প্রবণতা রোধে প্রশাসনিক স্তরে সার্বিক পদক্ষেপও কখনো হয়নি। তবে এই প্রথম গাছে পেরেক পোঁতা বন্ধে পুর-আইনের আওতায় বিধি তৈরি করতে চলেছে রাজ্য।

Wednesday, April 24, 2019

প্লাস্টিকের বদলে কলাপাতা!

প্লাস্টিক দূষণ কমাতে পুরো পৃথিবীই এখন বদ্ধপরিকর। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে এবং পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তুলতে চেষ্টার কমতি নেই দেশগুলোর। প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করার এই চেষ্টায় এবার দারুণ এক পদক্ষেপ নিল থাইল্যান্ডের একটি সুপারমার্কেট। প্লাস্টিকের ব্যাগের বদলে ভোক্তাদের কলাপাতায় মুড়ে সবজি সরবরাহ করছে তারা!
উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই শহরের রিমপিং সুপারমার্কেট এই অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সুপারমার্কেটটির এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পারফেক্ট হোমস চিয়াংমাই’ নামের একটি পেজ থেকে ছবিগুলো শেয়ার করা হয়। ছবিগুলোতে দেখা গেছে, শসা, শাক, পেঁয়াজ কলিসহ নানা রকমের সবজি কলাপাতা দিয়ে মুড়ে আঁশ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ক্রেতারা প্লাস্টিক ব্যাগের বদলে এই কলাপাতায় মুড়ে রাখা সবজিই কিনে নিচ্ছেন সানন্দে।
পারফেক্ট হোমস চিয়াংমাই এক ব্লগ পোস্টে লিখেছে, ‘রিমপিং সুপারমার্কেটে এমন একটি দৃশ্য দেখার পর আমরা সেটি শেয়ার না করে পারিনি। ক্রেতাদের জন্য দোকানে কাপড়ের ব্যাগ কেনা বা ধার নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো সতেজ কলাপাতায় মুড়ে আঁশ দিয়ে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করার পর থেকে ১৭ হাজারের বেশিবার শেয়ার হয়েছে পোস্টটি। পোস্টের নিচে ৬০০–এর বেশি ইতিবাচক মন্তব্য এসেছে। ফেসবুকের পাশাপাশি টুইটারেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এই উদ্যোগ।
একজন লিখেছেন, ‘ধারণাটি অসম্ভব পছন্দ হয়েছে। আর কোনো প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নয়।’ আরেক জনের বক্তব্য, ‘ছোট ছোট এই উদ্যোগই বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। পরিবর্তন আসছে। সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় আছি।’
জাতিসংঘের মতে, প্লাস্টিক ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ কোটি নবায়ন–অযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। গত ৭০ বছরে ৮০০ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদিত হয়েছে, যা সাগরতলে অবস্থিত জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।

Monday, November 19, 2018

বায়ুদূষণে কেমন আছেন দিল্লির রিক্সাওয়ালা!

‘আমার চোখ জ্বালাপোড়া করে, যখন রিক্সার চালাই তখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। শরীর আর চলে না। দিল্লির বিষাক্ত কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবার কথা বলে আমার শরীর। কিন্তু পরিবারকে চালানোর জন্য আমাকে এ কাজ চালিয়ে যেতেই হবে। কোথায়  যাবো আমি? রাস্তাই তো আমাদের ঘর।’-  দিল্লির রাস্তায় রিক্সা চালানোর এমন অভিজ্ঞতায় বিবিসিকে জানিয়েছেন সঞ্জয় কুমার নামের একজন রিক্সাচালক। বলছিলেন বায়ু দূষণের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।
সঞ্জয় জানান, পাঁচ বছর আগে তিনি চাকরির খোঁজে বিহার থেকে দিল্লিতে যান।
কিন্তু চাকরি না পেয়ে অবশেষে পেটের দায়ে আর পরিবারের কথা  ভেবে রিক্সা চালানো শুরু করেন। রিক্সা চালিয়ে তিনি যা আয় করেন তা দিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকা সম্ভব নয়। তাই তিনি ফুটপাতে থাকতে শুরু করেন।
তিনি বলেন, আমি বিছানায় ঘুমানোর আশা করি। কিন্তু জানি সেটা অনেক দূরের স্বপ্ন। আমি ভালো খাবার আশা করি। কিন্তু সেটাও দু®প্রাপ্য। এসব কিছু না হোক, কমপক্ষে বিশুদ্ধ বায়ুতে নিঃশ্বাস নেবার আশা করতেই পারি। কিন্তু শীতের সময়টাতে সেটাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আপনার আরামদায়ক একটি  বাড়ি আছে। আর আমাকে তো সব সময় রাস্তাতেই থাকতে হয়।

দিল্লির বায়ু দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে পার্শ্ববর্তী রাজ্য পাঞ্জাবের কৃষকরা ফসলি জমি পরিষ্কার করার জন্য আগুন লাগিয়ে দেবার কারণে বায়ু দূষণের মাত্রা আরো খারাপ হয়ে যায়। এছাড়া দিওয়ালিতে বাজি পোড়ানোর কারণে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস মিশে দূষণ আরো তীব্রতর করে।
সঞ্জয় কুমারের মতো আরো এক রিক্সাচালক জয় চাঁদ যাদব। পশ্চিম বাংলা থেকে সাত বছর আগে দিল্লিতে গেছেন। বলছিলেন, বিরতি নেয়ার কোনো সুযোগ নাই। আমি দিনে ৩০০ রুপি আয় করি। তার কিছু অংশ দিয়ে পরিবারের জন্য খাবার কিনি, আর বাকিটা সঞ্চয় করি। আমার পরিবার আমার উপর নির্ভরশীল। তাই নিঃশ্বাস নিতে যত কষ্টই হোক না কেন, কাজ চালিয়ে যেতেই হবে।
তিনি আরো বলেন, আমি মাঝেমধ্যে না খেয়েই রিক্সা চালাই। আমি সেটা কোনোভাবে চালিয়ে নিতে পারি। কিন্তু বায়ুর অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, আমার মনে হয় বুকের উপর ৫০ কেজি নিয়ে আমি রিক্সা চালাচ্ছি।

সঞ্জয় কুমার আর জয় চাঁদ যাদবের মতো দিল্লিতে হাজার হাজার রিক্সাচালক রয়েছেন। শীতকালে দিল্লির বায়ু দূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রা থেকে ৩০ গুণ দূষিত হয়ে পড়ে। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রিক্সাচালকরা। রিক্সা চালানোর সময় শ্বাসযন্ত্রে বেশি চাপ পড়ে। এতে করে বাতাসে মিশে থাকা পিএম২.৫ নামের বিষাক্ত ক্ষুদ্র কণা শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করে রক্তে মিশে যায়। এতে করে তাদের শারীরিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বিষয়টি আমলে  নিয়েছে। রায়ু দূষণ স¤পর্কে সম্প্রতি এক শুনানিকালে আদালত সরকারকে বলেছেন, ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়া কোনো সমাধান নয়। রিক্সাচালকদের এটা বলা সম্ভব নয় যে, বাইরে কাজ করতে যাওয়া নিরাপদ নয়। আপনাকে ঘরে থাকতে হবে। এটি খুবই সংকটময় পরিস্থিতি। বিচারক বলেন, যত রিক্সাচালককে আমি দেখেছি, তারা সবাই কাঁশছে অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করছে। কিন্তু এসব কিছুর পরও রিক্সাচালকরা এখনও রাস্তাতেই রয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন বিষাক্ত বায়ুর মধ্যেই রিক্সা চালাচ্ছে।

Monday, September 17, 2018

পরিবেশ দূষণে বাংলাদেশে এক বছরে মৃত্যু ৮০ হাজার, পবা'র প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের কারণে এক বছরে ৮০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। তাছাড়া, পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলিতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বছরে ৬৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (এক মার্কিন ডলার ৮৪ টাকা হিসেবে)। দূষণের এ ক্ষতি ২০১৫ সালের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পারালকার বলেছেন, নগরাঞ্চলে দূষণ ও পরিবেশের অবনতি হওয়ায় বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। এর ফলে দেশটির ভালো প্রবৃদ্ধিও এখন হুমকির মুখে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশগত দূষণ ও ঝুঁকির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকার একটি দেশ বাংলাদেশ। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সারা বিশ্বে পরিবেশ দূষণজনিত কারণে মৃত্যুর গড় হার যেখানে ১৬ শতাংশ। সেখান বাংলাদেশে মৃত্যু হার ২৮ শতাংশ, ভারতে ২৬ দশমিক ৫, পাকিস্তানে ২২ দশমিক ২,আফগানিস্তানে ২০ দশমিক ৬,  শ্রীলঙ্কায় ১৩ দশমিক  এবং মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, বৃহত্তর ঢাকার  বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধাতব কণার কারণে প্রায় ১০ লাখ মানুষ  দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধির বিকাশসহ স্নায়ুজনিত ক্ষতি হচ্ছে। গর্ভপাত এবং মৃত শিশুর জন্মদানের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া, জলাভূমি দখল ও বিপজ্জনক বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলাসহ দূষণ ও পরিবেশগত অবনতি নারী, শিশু ও দরিদ্রদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ছোট শহরগুলোও পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান রেডিও  তেহরানকে বলেন, পরিবেশবাদীরা এতদিন ধরে যেসব আশংকার কথা বলে আসছিল  তা ভয়াবহ সত্য হয়ে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দেশের পরিবেশ আইন যথাযথভাবে কার্যকর করার জন্য সরকারকে আন্তরিক হবার পরামর্শ দেন।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, ‘বিগত এক দশকে বাংলাদেশ তার নীতি ও আইনগত কাঠামোর উন্নতি করেছে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে।

বছরে ৮০ হাজার মৃত্যু, ৫২,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি

বছরে বাংলাদেশের মানুষের মোট মৃত্যুর ২৮ ভাগই মারা যাচ্ছেন পরিবেশ দূষণজনিত নানা রোগে। এটি সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। এ ছাড়া ২০১৫ সালে পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মোট ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকায় ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর শহরাঞ্চলে নানা দূষণের কারণে বছরে আর্থিক  ক্ষতি হচ্ছে ৫২ হাজার কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত শহরাঞ্চলে পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ অবস্থায় কার্যকর নীতি ও আইনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ঠেকানোর তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের পরিবেশগত সমীক্ষা-২০১৮’র প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পারালকার, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনজুরুল হান্নান খান, বিশ্বব্যাংকের প্রোগ্রাম লিডার সঞ্জয় শ্রীবাস্তব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। বলা হয়, ৭ থেকে ৮ প্রবৃদ্ধির একটি উচ্চতর মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশকে এখনই, বিশেষ করে শহর এলাকায় দূষণ রোধ করতে ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেছে, শহরাঞ্চলে এই দূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তারা বলছে, দূষণের কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে যেখানে ২৮ শতাংশ মৃত্যু হয় সেখানে মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ভারতে ২৬ দশমিক ৫। পাকিস্তানে ২২ দশমিক ২। আফগানিস্তানে ২০ দশমিক ৬। শ্রীলঙ্কায় ১৩ দশমিক ৭।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দূষণের কারণে বাংলাদেশের বছরে ৬৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়, যা মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পারালকার বলেন, নগরাঞ্চলে দূষণ ও পরিবেশের অবনতি হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। এর ফলে দেশটির ভালো প্রবৃদ্ধিও এখন হুমকির মুখে। এজন্য বিশ্বব্যাংক জলাভূমি দখল, ক্ষতিকর বর্জ্য ঠিকমতো না ফেলা ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়েছে। আর এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে নারী, শিশু এবং দরিদ্র মানুষের।
বিশ্বব্যাংকের হিসেবে যে গার্মেন্ট খাত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই খাত থেকেই প্রতি বছর ২৮ লাখ টনেরও বেশি বর্জ্য তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই দরিদ্র, সিসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধির বিকাশসহ স্নায়ুজনিত ক্ষতি হতে পারে। গবেষণাটি বলছে, এর ফলে নারীর গর্ভপাত এবং মৃত শিশুর জন্মদানের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। বলা হচ্ছে, বৃহত্তর ঢাকার যেসব এলাকা ভারী ধাতবের কারণে দূষিত সেখানে সাধারণত দরিদ্র মানুষেরাই বসবাস করে। গবেষণায় বিশ্বব্যাংক জানায়, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ, সুপেয় পানির অপর্যাপ্ততা, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যবিধি, খাবার পানিতে আর্সেনিক ও পেশাগত কারণে সৃষ্ট দূষণে মানুষের জীবন থেকে ২০ লাখ ২৬ হাজার বছর সমপরিমাণ সময় হারিয়ে গেছে।
ঢাকা শহরে যতো জলাভূমি ছিল গত ৪০ বছরে তার ৭৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। এসব জলাভূমি ভরাট করে সেখানে বাড়িঘর তোলার কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ছোট ছোট শহরগুলোও পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দূষণের কারণে ২০১৫ সালে শহরটির বাসিন্দাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে ৫ লাখ ৭৮ হাজার বছরের সমপরিমাণ সময়। গত ৪০ বছরে নগরায়ন এবং শিল্পায়নের কারণে রাজধানী ঢাকা ৭৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়েছে। বিপরীতে নানা ধরনের দূষণের শিকার ঢাকা, যার বেশিরভাগই হচ্ছে আশেপাশের এলাকার ইট ভাটার কারণে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ভালো নীতি গ্রহণের মাধ্যমে দূষণ কমাতে চায় সরকার। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে আমরা নানা দূষণের শিকার। ইটভাটাসহ বেশকিছু বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যা পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাবে বলে আমরা আশা করছি।
পরিবেশ দূষণে সেন্টমার্টিন তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারাতে বসেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করা হবে। সব পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শেষ। কিছুদিনের মধ্যেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। একইসঙ্গে দখলকৃত সব জমি উদ্ধারে কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ৬০০ মামলা করা হয়েছে, যেগুলো চলমান।
আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সামনের সংসদ অধিবেশনে নতুন পরিবেশ আইন উঠছে। তাছাড়া, গ্রুপ অব কোম্পানিগুলো যেন নদী দূষণ করতে না পারে, এজন্য নজরদারি হচ্ছে। বুড়িগঙ্গাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

Tuesday, June 5, 2018

প্লাস্টিকের দূষণে বছরে মারা যায় ১০ কোটি সামুদ্রিক প্রাণী by সঞ্চিতা সীতু ও সাদ্দিভ অভি

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী-নালা, খাল-বিল ও উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে। এরমধ্যে আবার এক কোটি ৩০ লাখ টন প্লাস্টিক আবর্জনা সমুদ্রে পড়ে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এতে  প্রতিবছর ১০ কোটি সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে আজ  (৫ জুন) পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত জাতিসংঘের কনফারেন্স অব হিউম্যান এনভায়রনমেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি ইতিহাসে প্রথম পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘ। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই দিবসটি আলাদা আলাদা শহরে, আলাদা আলাদা প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হয়। এবার ‘প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করি, না পারলে বর্জন করি’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে  দিবসটি। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ বাণী দিয়েছেন।
জাতিসংঘের পরিবেশ প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক ব্যবহার হয় প্যাকেজিংয়ে। এ খাতে প্রায় ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ, বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনে ব্যবহার হয় ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, অটোমোবাইলে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ইলেকট্রনিক্সে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কৃষিতে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। বছরে বিশ্বে ৫০ হাজার কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ উৎপাদন করা হয়। দুনিয়াজুড়ে প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিকের বোতল বিক্রি হয়। প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনে প্রতিবছর এক কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়।
পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানি করে। এ থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। এরমধ্যে ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্লাস্টিক, যার পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৭০০ টন। বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৫০ শতাংশ রিসাইকেল করা হয়।
প্লাস্টিক ব্যাগের কারণে দূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এই ব্যাগ কখনও মাটিতে মিশে যায় না। আর যত্রতত্র ফেলে দেওয়ার ফলে এটি তৈরি করে জলাবদ্ধতা। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলো দিয়ে ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ পলিথিনের হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শপিং মল, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কাপড়ের দোকান, জুতার দোকান, ফ্যাশন হাউস, বিভিন্ন কোম্পানিসহ সারাদেশের বাণিজ্যিক বিতানগুলো টিস্যু ব্যাগ ব্যবহার করছে। নিষিদ্ধ পলিথিন ও টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ফলে কাগজ, পাট ও কাপড়ের ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এতে হাজার হাজার ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। লাখ লাখ শ্রমিক, বিশেষ করে নারী-শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছে।
যে প্লাস্টিক রিসাইকেল করা যাবে, তা ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেছেন, এখানে রি-ইউজ কিংবা রিসাইকেলের কথা বলা হয়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য। এমন নয় যে, ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্লাস্টিক এখন সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। প্যাকেজিং থেকে শুরু বাড়ির দরজা পর্যন্ত প্লাস্টিকের ব্যবহার। তাই আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে আগে। আমি সেই প্লাস্টিক ব্যবহার করবো না যে প্লাস্টিক রি-ইউজ কিংবা রিসাইকেল করা যায় না।
পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘পলিথিনের ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি এতটাই ভ্রাম্যমাণ যে, এদের ধরা খুব মুশকিল। ছোট ঘরের মধ্যে মেশিন বসিয়ে ইচ্ছামত প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরি করছে। আবার সামগ্রিকভাবে যে বন্ধ করে দেবো উৎপাদন, সেটাও সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে আমাদের এগোতে হবে। অন্যান্য দেশ পলিথিনের যে বিকল্প ব্যবহার করে, তা দেশে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’
একই ভাষায় কথা বলছেন পরিবেশবাদীরাও। তারা বলছেন, প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের প্রচার-প্রসার বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে হবে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘পলিথিনের বিকল্প যেসব জিনিস রয়েছে, সেগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। এগুলো নিয়ে কোনও প্রচারণা হচ্ছে না, মানুষকে জানানো যাচ্ছে না। পাটের তৈরি সামগ্রী আছে, কাগজের তৈরি নানা সামগ্রী আছে। এগুলো ব্যবহারে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানুষ যদি সচেতন হয়, পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে ধারণা পায়, তাহলে পলিথিনের ব্যবহার কমে আসবে। তখন উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাবে।’
এদিকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ১০০টি ঐতিহাসিক স্থান পরিচ্ছন্ন করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু ফেলে দেওয়া জিনিসকে ময়লা না বলার প্রচারণায় কাজ করছে। রাস্তার পাশের সংগৃহীত প্লাস্টিক সামগ্রী দিয়ে তারা ব্যাগ তৈরি করছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করবে।
দিবসটি উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়। পরিবেশ অধিদফতর ও বন অধিদফতর থেকে স্মরণিকা ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এর পাশাপাশি র‍্যালি, সচেতনতামূলক কার্যক্রমও হাতে নিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর।
পরিবেশ দিবসের মূল অনুষ্ঠান হবে ২৬ জুন। পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সরোয়ার ইমতিয়াজ হাসমী বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দিবসটিতে আমাদের র‍্যালি, প্রচারণাসহ বেশ কিছু কর্মসূচি রয়েছে। মূল অনুষ্ঠান হবে ২৬ জুন আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন মাঠে। পরিবেশ মেলা হবে, সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে পরিবেশ খাতে অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে গুণীজনদের সম্মাননা পদক দেওয়া হবে।’
এর আগে দিবসটি উপলক্ষে গত ৩০ মে শিশু একাডেমিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে পরিবেশ অধিদফতর। এছাড়া, পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, লিফলেট তৈরি করে মানুষকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

Sunday, March 27, 2016

অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণ রোধে উন্নত মানের চুলা by বিয়ন লোমবোর্গ

উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো তৃতীয়টি।
বাড়ির ভেতরে খোলা আগুনে রান্নার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তা এক দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট ধূমপান করার সমপরিমাণ হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি ১০টি বাড়ির মধ্যে প্রায় ৯টি বাড়ি অভ্যন্তরীণ বায়ুদূষণের শিকার। এসব বাড়িতে রান্নার জন্য কাঠ ও অন্যান্য জৈব জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। ঘরের ভেতরে খোলা আগুনে রান্নার ফলে ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক ও হৃদ্রোগের মতো মারাত্মক সব ব্যাধিতে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এ রকম অভ্যন্তরীণ দূষণ ১০-১৫ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী।
এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই বলা যায়, বাড়ির ভেতরের বায়ুদূষণ কমানোর বিষয়ে এখন আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার। এ ব্যাপারে আমাদের করা একটি গবেষণায় বাড়ির ভেতরে মারাত্মক বায়ুদূষণ হ্রাসের ব্যাপারে দুটি প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমত, মানুষ হয় একই জৈব জ্বালানি বারবার ব্যবহার করতে পারে। তবে তা করতে হবে আরও উন্নত মানের রান্নার চুলা ব্যবহার করে, যা অনেক কম ধোঁয়া নিঃসরণ করে অথবা তারা জৈব জ্বালানির পরিবর্তে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহার করতে পারে, যা অনেক বেশি পরিচ্ছন্নভাবে রান্নার কাজটি করে।
ঘরের ভেতরে বায়ুদূষণ রোধ করার সবচেয়ে সস্তা উপায় হলো উন্নত রান্নার চুলা তৈরিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা। এই চুলায় সাধারণত একটি চিমনি থাকে, যা ঘরের ভেতরে ধোঁয়া উদ্গিরণ না করে বাইরে করে এবং তাপের অপচয় রোধ করে রান্নার হাঁড়িতে তাপ ছড়িয়ে দেয়। গতানুগতিক চুলা বা খোলা আগুনে রান্নার চেয়ে এই চুলায় রান্না করা বেশি আরামদায়ক এবং পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর। এ ধরনের একটি চিমনিসহ দ্বিমুখী চুলা তিন বছর স্থায়ী হয়। এই চুলা ব্যবহারে পরিবারপিছু বছরে খরচ হবে এক হাজার টাকা। এর উপকারিতা অনেক। যদি বাংলাদেশের তিন কোটি পরিবারের সবগুলোই গতানুগতিক চুলার পরিবর্তে উন্নত রান্নার চুলা ব্যবহার করে, তাহলে প্রতিবছর ৩৩ হাজারেরও বেশি মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। প্রতিটি মানুষ গড়ে আরও ২৮ বছর বেশি বেঁচে থাকবে, যার অর্থমূল্য প্রায় ৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিটি পরিবার অসুস্থতার কয়েকটি দিন কম যাপন করবে, যার অর্থমূল্য আরও ২৬০ টাকা।
এ ছাড়া প্রতিটি পরিবারে রান্নার সময়ও দৈনিক ১৫ মিনিট করে বাঁচবে, কারণ উন্নত রান্নার চুলাগুলো দ্রুত কাজ করে এবং যেহেতু এতে কম জ্বালানির প্রয়োজন হয়, তাই এটা প্রতিদিনের জ্বালানি সংগ্রহ করার সময়কে অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। সব মিলিয়ে এই সুবিধার অর্থমূল্য আরও ২০০০ টাকা। ঘরের ভেতরে বায়ুর মান উন্নয়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে আমরা আরও বিকল্প চিন্তা করতে পারি। তা হলো ব্যাপকভাবে এলপিজির ব্যবহার। এটি খুব পরিচ্ছন্নভাবে রান্নার কাজটি করে, প্রায় একটি বৈদ্যুতিক চুলার মতোই। এলপিজির ব্যবহার অনেক বেশি সুবিধা দেবে। এটা ৯১০০০ হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে, যার অর্থমূল্য প্রায় ২১ হাজার ৮০০ টাকা বা পরিবারপিছু ৭ হাজার ৩০০ টাকা। এটি পরিবারপিছু প্রায় ৭০০ টাকার অসুস্থতার খরচ কমাবে, রান্নার গতি বৃদ্ধি করবে প্রায় ৪০ মিনিট এবং জ্বালানি সংগ্রহের পুরো সময়টা বাঁচিয়ে দেবে, যার নিট অর্থমূল্য প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকা।
কিন্তু এলপিজির খরচটাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে বছরে খরচ পড়বে প্রায় ১০,০০০ টাকা, যার সঙ্গে যোগ হবে ২০০০ টাকার জ্বালানি খরচ। তবে সব মিলিয়ে আপনি প্রায় ১২,০০০ টাকা খরচ করে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ টাকার সুফল পাবেন। তাই এলপিজি ব্যবহারের জন্য আপনার আর্থিক ক্ষতি হবে না।
তবে এ-ও ঠিক যে সবচেয়ে দামি বিকল্পই সেরা বিকল্প নয়। সস্তা বিকল্পও অনেক সময় বেশি উপকার করে। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যয়বহুল বিকল্পগুলো সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আয় রয়েছে এমন অনেক দেশ রান্নার কাজে বেশি অর্থ খরচ করে এলপিজির মতো আধুনিক জ্বালানি ব্যবহার করছে।
কিন্তু উন্নত মানের চুলা চালু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে দেখা গেছে, অনেক পরিবারকে নতুন উন্নত মানের চুলায় অভ্যস্ত করানোটা কঠিন। প্রতিটি পরিবার উন্নত চুলাতে অভ্যস্ত না হতে পারলে স্থানীয় বায়ুদূষণ বৃদ্ধির কারণে খুব কমই সুফল পাওয়া যাবে।
তাই বায়ুদূষণ কম হয় এমন রান্নার চুলা ব্যবহারের সুবিধা জানিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। তবেই এর সুবিধা সম্পর্কে সবাই জানতে পারবে। এ-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর উচিত হবে ক্রেতার পছন্দ অনুযায়ী চুলাগুলো তৈরি করা। এবং চুলা কেনার জন্য পরিবারগুলোকে একাধিক কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত, যা তাদের জন্য আরও সাশ্রয়ী হবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: তাসনুভা বাশার
ড. বিয়ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

Thursday, February 18, 2016

সুন্দরবনের ক্ষতি জেনেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কার স্বার্থে? -জাতীয় কমিটির নেতাদের প্রশ্ন

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা মহানগরের পদযাত্রা পূর্ব সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিশ্ব ঐতিহ্য, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের রক্ষা বর্ম সুন্দরবন এমনিতেই বিপর্যস্ত। এরপরও ওই এলাকায় রামপাল-ওরিয়ন বিদ্যুৎ প্রকল্প হলে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে- একথা স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও বলেছেন। জাতিসংঘ, রামসারও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারপরও সুন্দরবনের ক্ষতি জেনেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কার স্বার্থে? নেতৃবৃন্দ ১০ থেকে ১৫ মার্চ সুন্দরবন অভিমুখে জনযাত্রা সফল করে নেতৃবৃন্দ সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে জাতীয় জাগরণ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত সমাবেশে নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে এই প্রশ্ন রাখেন।
ঢাকা মহানগরের সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর আলম ফজলুর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাসদের জুলফিকার আলী। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, ডা. সাজেদুল হক রুবেল, বাসদের বজলুর রশীদ ফিরোজ, কমিউনিস্ট লীগের নজরুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের ফিরোজ আহমেদ, সিপিবির খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আকবর হোসেন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির খায়রুল ইসলাম সবুজ, বাসদ মার্কসবাদী ফখরুদ্দিন কবির আতিক ও নগরনেতা খোরশেদ আলমসহ প্রমুখ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, এখানে দেশের মানুষের স্বার্থ নেই, স্বার্থ আছে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। সুন্দরবনকে আমরা ধ্বংস হতে দিতে পারি না।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, সরকারের ভুলনীতি ও দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ খাত ব্যক্তি মালিকদের দখলে চলে যাচ্ছে। জাতীয় কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প পথ দেখিয়ে আসছে। অথচ এখনকার ও বিগত দিনের সরকারগুলো সে পথে হাটেনি।
নেতৃবৃন্দ সুন্দরবন রক্ষায় নীতিমালা প্রণয়ন-বাস্তবায়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিকল্প জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণের দাবি জানান।
নেতৃবৃন্দ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে অগ্রসর করতে হলে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রধান খাত ধরে দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

Sunday, February 7, 2016

গাছ থেকে পড়ছে কাক, তারপর মরছে

গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে কাক, কিছুক্ষণ পরই মারা যাচ্ছে। এক সপ্তাহে রাজশাহী নগরে এভাবে শতাধিক কাকের মৃত্যু হয়েছে। আর অধিক সংখ্যক কাক মারা গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে। বিষয়টিতে লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকার একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে অসুস্থ ও মরা কাকের নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের গাছগুলোতে অনেক কাক থাকে। স্থানীয় লোকজন জানান, গত মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ এসব গাছ থেকে কাক মাটিতে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশকিছু কাক মারাও যায়। এ ছাড়া নগরের শালবাগান, উপশহর ও সাহেববাজার এলাকার রাস্তার ধারে বেশ কিছু কাক মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টা আমিও শুনেছি। তবে ঠিক কী কারণে কাক মারা যাচ্ছে, আমার জানা নেই।’ মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা মানুষের জন্য খারাপ কি না, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে বলা যাচ্ছে না।’
রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারুক হোসেন বলেন, বিভিন্ন জায়গায় কাক মরে পড়ে থাকতে দেখে ভয় হচ্ছে। হয়তো কোনো ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কাকের মৃত্যু হচ্ছে। এখন এর থেকে মানুষের কোনো ক্ষতি হয় কি না, তা নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার।
এদিকে কাকের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গতকাল শুক্রবার ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) একটি বিশেষজ্ঞ দল এসেছিল। দলের সদস্যরা নগরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অসুস্থ ও মৃত কাকের লালা, রক্ত ও মল সংগ্রহ করে নিয়ে গেছেন। যোগাযোগ করা হলে এই দলের কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।