Showing posts with label তরুণ প্রজন্ম. Show all posts
Showing posts with label তরুণ প্রজন্ম. Show all posts

Tuesday, October 27, 2026

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে সরকারের প্রস্তাব, আন্দোলন চলবে

ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। তবে এসব প্রস্তাব তাদের দাবি পূরণে যথেষ্ট নয় জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

সোমবার সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানান, কিছু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করা, স্কুল সংস্কারে ঋণ দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান ভর্তি পদ্ধতি অন্যায্য।

মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি লুই লেতুবলঁ বলেন, ‘আমাদের সব দাবি পূরণ হয়নি। যত দিন প্রয়োজন, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

তবে শিক্ষাক্ষেত্রে এসব প্রস্তাবের বিষয়ে সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। প্রস্তাবগুলোর বিস্তারিত জানাতে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তা-ও স্পষ্ট নয়।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সংখ্যালঘু সরকার বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছেছে। আগামী বছরের বাজেট নিয়ে সমঝোতা করাও কঠিন হয়ে উঠেছে।

শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নয় দিন আগে দেশটির কয়েক ডজন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে আন্দোলনে যোগ দেয় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কর্মীরা। জ্বালানির উচ্চমূল্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের জন্য পরিচিত এই আন্দোলনকারীরা।

মাখোঁ স্বীকার করেছেন, আগামী সপ্তাহান্তেও নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে বড় বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভের পর মার্সেই শহরের ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন ও জরুরি সেবাকর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকবে। একই সঙ্গে শহরের কেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে চলমান অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে কট্টর ডানপন্থী নেত্রী মেরিন লো পেনের জনসমর্থন বেড়েছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি এগিয়ে রয়েছেন। রোববার প্রকাশিত এক জনমত জরিপে তার সমর্থন ৩২ থেকে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কট্টর বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোর সমর্থন ১৭ শতাংশ।

কট্টর ডান ও বামপন্থীদের সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১ হাজার ৪৩৫

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ জানিয়েছেন, শনিবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে ১ হাজার ৪৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকটি শহরে কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে কট্টর বামপন্থী কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

তিনি বলেন, জাতীয়তাবাদী ও পরিচয়ভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার কথা বলে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছিল। নিস ও মনপেলিয়ের মতো কয়েকটি শহরে এসব গোষ্ঠী সংগঠিতভাবে উপস্থিত হয়ে মূলত কট্টর বামপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু করে।

অন্যদিকে, বিক্ষোভের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক দোকান বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফ্রান্সের বাণিজ্য ও শিল্প চেম্বারগুলোর নেটওয়ার্কের প্রধান আলাঁ দি ক্রেসেনজো বলেন, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

রেডিও ক্লাসিককে তিনি বলেন, দোকানিরা ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছেন। এভাবে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

২৬ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে হোটেল দ্য মাতিনিয়োঁর সামনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন শিক্ষার্থী ইউনিয়নের এক প্রতিনিধি। ছবি: রয়টার্স
২৬ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে হোটেল দ্য মাতিনিয়োঁর সামনে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন শিক্ষার্থী ইউনিয়নের এক প্রতিনিধি। ছবি: রয়টার্স

Monday, October 26, 2026

জেন-জি কেন বিদ্রোহ করছে by অস্কার বার্গলান্ড

বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের ঢেউ চলছে। এসব আন্দোলনের বেশ কিছুকে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ বলা হচ্ছে। ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণরা এসব বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের প্রজন্মকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে, এমন নানা সমস্যার প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমেছেন। ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ আগে বিক্ষোভ শুরু হয়। দেশটির স্কুলগুলোয় অর্থায়নের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার পরিস্থিতিও ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। এসব সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আরও জোরালো হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে সারা দেশে বিক্ষোভে পাঁচ লাখ থেকে আট লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ আন্দোলন’। গত সপ্তাহে এ আন্দোলনের নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়তে থাকায় এ গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।

স্পেনে আবাসন ব্যবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা এবং উচ্ছেদের হাত থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ আইন নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রথমে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে জোর করে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এরপর পার্লামেন্টে উচ্ছেদ থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার বহুল জনপ্রিয় একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পর মারিকারমেন মারা যান।

প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি আলাদা। তবে চলমান বিক্ষোভের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো বৈষম্য নিয়ে মানুষের ক্ষোভ। এই বৈষম্যের দুটি দিক রয়েছে। একটি শ্রেণিগত, অন্যটি প্রজন্মগত। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে ইউরোপজুড়ে বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আয়বৈষম্য বাড়ছে। সম্পদের বৈষম্যও দ্রুত গভীর হচ্ছে। ইউরোপের একসময় গর্বের বিষয় হিসেবে বিবেচিত কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর অবক্ষয় মানুষের জীবনে এ সংকটের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একসময় সবার জন্য উন্নত মানের সরকারি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য ছিল ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর। এর মাধ্যমে প্রত্যেকের জন্য জীবনযাপনের একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করার কথা ছিল। একই সঙ্গে এমন একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ছিল, যেখানে প্রত্যেকেই সাফল্য অর্জনের সুযোগ পাবেন। কিন্তু বছরের পর বছর কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক পরিচর্যা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কমে গেছে। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে এসব দায়িত্ব থেকে সরে আসছে। ফলে আয় ও সম্পদের বৈষম্য আরও বাড়ছে। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা অর্থ ব্যয় করে উন্নত সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু অনেকের পক্ষেই সেই সুযোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের প্রভাব তরুণরা প্রায়ই আরও তীব্রভাবে অনুভব করেন। তাদের জীবনে যুক্ত হয়েছে আরও নানা সংকট। একের পর এক ক্ষেত্রে তারা শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও হতাশাজনক হয়ে উঠছে। তাদের সামনে থাকা সুযোগও বাবা-মা ও দাদা-দাদির প্রজন্মের তুলনায় অনেক কম।

পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পিসা (PISA) পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা ও গণিতের পারদর্শিতায় যে বড় ধরনের অবনতি দেখা গেছে, তার পেছনে এ সংকটের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে সন্দেহ নেই। এই অবনতির একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। এর ফলে স্কুলে অনুপস্থিতিও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও একটি প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। শিক্ষাগত অর্জন কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার। এটিও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার আরেকটি দৃষ্টান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই, উভয়ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ধীরগতিতে এগিয়েছে। প্রযুক্তি খাতের বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবল তদবিরও এসব উদ্যোগের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও তরুণরা এআই বিপ্লবের প্রভাব অনুভব করছেন। কর্মসংস্থানে এআইয়ের প্রভাব এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে একটি বিষয় এরই মধ্যে স্পষ্ট। বিশেষ করে, চাকরির প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক কাজ ক্রমেই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।

জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আবাসন। এখানেও তরুণরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা তাদের আয়ের অনেক বেশি অংশ বাড়ি ভাড়া দিতে ব্যয় করছেন। অতীতের কোনো প্রজন্মকে এভাবে আয়ের এত বড় অংশ ভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হয়নি। এটিও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতারই ফল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকট। শাসনব্যবস্থার সব ব্যর্থতার মধ্যে এটিকেই সম্ভবত সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, ২০২০ সালে জন্ম নেওয়া মানুষের জীবন তাদের বাবা-মা ও দাদা-দাদির প্রজন্মের তুলনায় কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

বৈষম্য কম এমন সমাজ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় অনেক বেশি সক্ষম হবে। কারণ, এসব সমাজে মানুষ সম্মিলিতভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা ক্রমবর্ধমান বৈষম্যপূর্ণ সমাজের বিস্তার দেখছি। এসব সমাজে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দায় ব্যক্তি ও পরিবারের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে। অন্য কথায়, শাসনব্যবস্থার একাধিক ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা ক্রমে কমে যাওয়ার ফলে তরুণদের মধ্যে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্যারিস, নয়াদিল্লি, রোম ও মাদ্রিদের রাজপথে যে ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে এসব সংকট।

অনুমিতভাবেই, সরকারগুলোর প্রধান প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে দমনপীড়ন। বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং আন্দোলন দমনের যে প্রবণতা চলছে, এটি তারই অংশ। প্রতিবাদবিরোধী আইন প্রণয়ন, গ্রেপ্তার কিংবা পুলিশের সহিংসতা, নানা উপায়ে দমনপীড়ন বাড়ছে। কখনো কখনো এর ফলে প্রতিবাদী আন্দোলন থেমে যায়। আবার কখনো দমনপীড়ন আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। এখন পর্যন্ত ফ্রান্স ও ভারতের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজন তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করছে, এমন বৈষম্য ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলো দূর করার আন্তরিক উদ্যোগ। এসব সমস্যার সমাধান না হলে রাজনৈতিক সংকট অনিবার্য হয়ে উঠবে।

লেখক: ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক জননীতি ও সামাজিক নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক। প্রতিবাদী আন্দোলন ও দমনপীড়ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। আল-জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

জেন-জি কেন বিদ্রোহ করছে
জেন-জি কেন বিদ্রোহ করছে

Sunday, October 25, 2026

যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে ইতালিতে বিক্ষোভ-সহিংসতা

যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভ করেছেন মানুষ। শনিবারের এসব বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর এক সপ্তাহ আগে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

সম্ভাব্য সহিংসতা ও ভাঙচুর ঠেকাতে শহরগুলোতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক দোকানও বন্ধ রাখা হয়।

গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় কিছু দোকানে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার তুরিন, রোম ও বোলোনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। তবে মিলানে বিক্ষোভ ছিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ।

রয়টার্সের সাংবাদিকেরা মিলানে কোনো দোকানে লুটপাট বা সম্পদ ভাঙচুরের ঘটনা দেখেননি।

এদিকে, চলতি সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক ছড়িয়ে পড়ার পর গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয় কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

এর আগে ইতালির পুলিশ জানায়, গত সপ্তাহের বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘অক্টোবর ১৭ আন্দোলন’ সংগঠনের আয়োজনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে মিলানের পুলিশ সদর দপ্তরে নেওয়া হয়।

সূত্র: রয়টার্স

ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন সাধারণ মানুষ। ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স।
ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন সাধারণ মানুষ। ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স।

ফ্রান্স থেকে আলবেনিয়া, ইতালি-স্পেন-পর্তুগালে ছড়িয়েছে বিক্ষোভ

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নানা দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও পেনশন ও আবাসন সংকট, কোথাও শিক্ষা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে, আবার কোথাও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন মানুষ। এসব বিক্ষোভ ঘিরে কয়েকটি দেশে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়েছে।

আগের বিক্ষোভগুলোতে সহিংসতার ঘটনার পর ইউরোপের বিভিন্ন রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য, কোথাও কোথাও সেনাবাহিনীকেও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

ফ্রান্সে কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় এক হাজার সদস্য আহত হয়েছেন। শুধু প্যারিসেই আহত হয়েছেন প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী ও স্থানীয় বাসিন্দা।

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শনিবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে চলা ধারাবাহিক সংঘর্ষের মধ্যে সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং আটক করা হয়েছে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

ইতালির মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া, ফ্লোরেন্সসহ কয়েকটি শহরে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ বোতল, পাথর ও আতশবাজি ছোড়েন। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার আটটি শহরের বিক্ষোভ থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে পেনশনভোগী ও তাদের সমর্থকরা অবসরকালীন অধিকার রক্ষার দাবিতে মিছিল করেন। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বাড়ানো, ন্যূনতম পেনশন ন্যূনতম মজুরির সমান করা, নারী-পুরুষের পেনশন বৈষম্য কমানো এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থা বেসরকারীকরণের উদ্যোগ ঠেকানো ছিল তাদের প্রধান দাবি।

অন্যদিকে, পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন মানুষ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলন জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক অধিকার ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষের চিত্র তুলে ধরেছে।

সূত্র: ইউরোনিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভে চাবি হাতে অংশ নেন আন্দোলনকারীরা। ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: এপি।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভে চাবি হাতে অংশ নেন আন্দোলনকারীরা। ২৪ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: এপি।

Wednesday, October 21, 2026

ফ্রান্সের মতো একই বিপদের মুখে কি যুক্তরাষ্ট্রও

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি ঋণের চাপ ও সহিংস বিক্ষোভ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—একই ধরনের সংকটে কি পড়তে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও? দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে মিল রয়েছে। তবে অর্থনীতির কাঠামো, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় অবস্থানের কারণে তাদের ঝুঁকি এক নয়।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ফ্রান্সের মতো আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকটের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।

ফ্রান্সের সংকট কেন এত গভীর হচ্ছে?

ফ্রান্সের সংকট কেবল রাস্তায় বিক্ষোভ বা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব।

ফ্রান্সের অর্থনীতি চলতি বছর প্রায় ০.৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। দেশটির পার্লামেন্টে বিভক্তির কারণে বাজেট নিয়ে সমঝোতা কঠিন হয়ে পড়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সরকার ৫৪ বিলিয়ন ইউরোর সাশ্রয়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলেও ঘাটতি ৫ শতাংশ বা তার বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি ঋণও জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারকে একদিকে ব্যয় কমাতে হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের ক্ষোভ সামলাতে হচ্ছে। কর বাড়ানো বা সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়। আবার প্রয়োজনীয় সংস্কার পিছিয়ে দিলে ঋণের সুদ পরিশোধে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পরস্পরকে আরো জটিল করে তুলছে। উচ্চ সুদের হার সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ায়, আর দুর্বল প্রবৃদ্ধি রাজস্ব আয় ও ঋণ সামলানোর সক্ষমতাকে আরও চাপে ফেলে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণও কি একই পথে?

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো সরকারি ঋণ। দেশটির অর্থনীতি ফ্রান্সের তুলনায় অনেক বড় হলেও ঋণের বোঝা, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তে থাকা ব্যয় এবং জীবনযাত্রার খরচ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনও কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্তের মুখে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১২৫ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আকারের তুলনায় দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ অনেক বড়। একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ব্যয় কমানোর ব্যাপারে অনীহা দুই দেশের আর্থিক সমস্যাকে আরও জটিল করছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণ বেশি হলেই কোনো দেশ অবধারিতভাবে আর্থিক সংকটে পড়বে—এমন নয়। ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, সুদের হার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় সুবিধা হলো, আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা। বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডও আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের তুলনায় আলাদা সুযোগ রয়েছে।

তবে এই সুবিধা সীমাহীন নয়। ঋণ বাড়তে থাকলে এবং সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। ঋণ নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে রাজনৈতিক ক্ষোভও বাড়ে

ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবায় অর্থের ঘাটতি বড় ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়ে। একই সময়ে সরকার যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে অসন্তোষ আরো বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রেও জীবনযাত্রার ব্যয় একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু। রয়টার্সের ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানসাসে নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও জ্বালানি ও ডিজেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। কৃষকেরা শুল্কনীতি ও বাজার পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন। কানসাসে পেট্রলের দাম আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি ছিল বলে মোটরচালকদের সংগঠন এএএ জানিয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধান করা। অর্থনীতি ভালো চলছে—এমন সরকারি দাবি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মিললে সরকারের ওপর আস্থা কমতে পারে। আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি ক্ষোভ তখন রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করতে পারে।

তবে ফ্রান্সের বিক্ষোভের কারণকে শুধু অভিবাসন বা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয়, জনসেবার ঘাটতি ও রাজনৈতিক অসন্তোষের মতো একাধিক কারণ উঠে এসেছে।

ট্রাম্পের সতর্কবার্তা: যুক্তরাষ্ট্রও কি ‘ফ্রান্সের মতো জ্বলবে’?

ফ্রান্সের অস্থিরতা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেন, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রেও ফ্রান্সের মতো সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে এ আশঙ্কার পক্ষে ট্রাম্প কোনো প্রমাণ দেননি। তিনি ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভকে ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করেন। একই সমাবেশে অভিবাসন ও মুসলিমদের নিয়েও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন তিনি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সে কী ঘটছে, তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা যায়; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের বিজয়ই সহিংসতা নিশ্চিত করবে—এমন দাবি তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নয়।

ট্রাম্পের বক্তব্য তাই শুধু নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা নয়, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবেও বিবেচ্য। অর্থনৈতিক চাপ ও জনঅসন্তোষ যখন ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে, তখন প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো প্রায়ই প্রতিপক্ষের নীতিকে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার কারণ হিসেবে তুলে ধরে।

গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমছে কেন?

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যদি মনে করে তাদের ভোট, মতামত বা দৈনন্দিন সমস্যা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না, তাহলে অসন্তোষ বাড়তে পারে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১০ জুন ২০২৬ প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ৬৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ফ্রান্সে একই হারে—৬৯ শতাংশ—মানুষ নিজেদের দেশের গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করছে, তাতে অসন্তুষ্ট। ১৬টি উচ্চ আয়ের দেশের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে এ দুটি দেশেই অসন্তুষ্টির হার ছিল অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র নিয়ে সন্তুষ্টির হার ২০২৫ সালের ৩৭ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে কমে ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়।

এ পরিসংখ্যান দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সমস্যার মধ্যে শুধু অর্থনৈতিক মিল নেই; গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও উভয় দেশের জনগণের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

তবে গণতন্ত্র নিয়ে অসন্তুষ্টি মানেই মানুষ গণতন্ত্রের বিরোধী—এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই সমর্থন করে, কিন্তু মনে করে নির্বাচিত সরকার তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। এই ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে।

পিউয়ের জরিপ জনমতের চিত্র তুলে ধরে; এটি ভবিষ্যতে দাঙ্গা, রাজনৈতিক সহিংসতা বা আর্থিক বিপর্যয় ঘটবেই—এমন পূর্বাভাস দেয় না।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ঝুঁকি বাড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি উৎস হলো নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্য।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৫ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত বিশ্লেষণে ভি-ডেম ইনস্টিটিউট, ফ্রিডম হাউস এবং ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের সূচকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অবস্থানের অবনতি দেখা গেছে। ভি-ডেমের উদার গণতন্ত্র সূচকে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্কোর নেমে ০.৫৭-তে দাঁড়ায়, যা ওই মূল্যায়ন অনুযায়ী ১৯৬৫ সালের পর সর্বনিম্ন। বিশ্লেষণে আইনসভা ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক বিভাজন যখন এতটাই তীব্র হয় যে প্রতিপক্ষকে বৈধ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মানতে অনীহা তৈরি হয়, তখন নির্বাচনের ফল, আদালতের সিদ্ধান্ত কিংবা সরকারি নীতির প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে গণতান্ত্রিক সূচকের অবনতি থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রান্সের মতো দাঙ্গা ঘটবে। বরং এসব সূচক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে সতর্ক হওয়ার কারণ তুলে ধরে।

কেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ফ্রান্সের মতো নাও হতে পারে?

দুই দেশের ঋণ ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে মিল থাকলেও তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো এক নয়। ফ্রান্স ইউরোজোনের সদস্য। দেশটির আর্থিক পরিস্থিতি ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি, ইউরোজোনের ঋণবাজার এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মুদ্রা ডলারের বৈশ্বিক গুরুত্ব থেকে সুবিধা পায়। মার্কিন সরকারি ঋণপত্র আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে ঋণের চাপ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের সুযোগ ও আর্থিক নীতির পরিসর ফ্রান্সের মতো নয়।

দুই দেশের ঋণের বোঝা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে মিল থাকলেও ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বাড়তি সুবিধা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ঝুঁকি রয়েছে, কিন্তু ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি দেশটিতে অবিলম্বে তৈরি হবে—এমন আশঙ্কার ভিত্তি নেই।

এ সুবিধা অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সব ধরনের আর্থিক বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখে না। ঋণের সুদ বাড়তে থাকলে, বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

তাহলে সামনে কী অপেক্ষা করছে?

যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের মতো একই বিপদের মুখে কি না—এর উত্তর নির্ভর করছে ‘বিপদ’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তার ওপর। দুই দেশই উচ্চ সরকারি ঋণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বাজেট সংকট এবং রাজনৈতিক সমঝোতার চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারভিত্তিক আর্থিক সুবিধা তাকে কিছুটা বাড়তি সুরক্ষা দেয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও সরকারি সেবার মান নিয়ে দুই দেশেই উদ্বেগ ও জনগণের অসন্তোষ রয়েছে। গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তুষ্টি উভয় দেশেই বেশি। রাজনৈতিক মেরুকরণের এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক সমঝোতা কঠিন করতে পারে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু ফ্রান্সে যা ঘটছে, তা যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। সহিংস বিক্ষোভের আশঙ্কা একই রকমের নয়।

প্রশ্ন হলো, দুই দেশের সরকার আর্থিক বাস্তবতা ও জনঅসন্তোষ সামাল দিতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। ঋণ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা, জনসেবার মান বজায় রাখা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও সমঝোতা তৈরি করতে পারলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। বিপরীতে, সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক সংকটকে আরো গভীর করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সের মতো আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপের কিছু লক্ষণ বহন করছে, কিন্তু দুই দেশের পরিস্থিতি এক নয়। ডলারের বৈশ্বিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুযোগ দিলেও সেই সুবিধা অনন্ত নয়। ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে—তবে তা ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের অবধারিত পূর্বাভাস নয়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, মার্কেটওয়াচ, পিউ রিসার্চ সেন্টার ও সিএনএন

ফ্রান্সের মতো একই বিপদের মুখে কি যুক্তরাষ্ট্রও

ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন

রয়টার্সঃ ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় পুলিশকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সেনা মোতায়েন করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে এ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গত সপ্তাহের শেষদিকে সহিংসতা ও লুটপাট ঠেকাতে নিজেদের ব্যর্থতার কথাও স্বীকার করেছে সরকার।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেন, আগামী শনিবার নজিরবিহীন বা বিশাল আকারের নিরাপত্তা কড়াকড়ি থাকবে। তিনি আরো জানান, ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ এবং অন্যান্য শহরে দাঙ্গা ও লুটপাটের পর আপাতত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

পার্লামেন্টে উত্তপ্ত এক বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হবে। একইসঙ্গে শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল সুরক্ষিত রাখতে না পারায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে কৌশল ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

বিদ্যমান সংকটকে ‘সহিংসতা ও প্রজাতন্ত্রের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এই অস্থিরতার জন্য কট্টর বামপন্থিদের দায়ী করেন। অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থিদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার মান কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সরকার তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি।

সংঘর্ষের এই ভয়াবহতা এবং তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দৃশ্যমান অক্ষমতা পুরো ফ্রান্সকে স্তম্ভিত করেছে। আগামী বছর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থি ও কট্টর বামপন্থি প্রার্থীদের শক্তিশালী অবস্থান রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।

গত সপ্তাহান্তের সহিংসতার পর তুলনামূলক শান্ত একটি রাত কাটিয়েছে ফ্রান্স। অস্থিরতাকবলিত কয়েকটি এলাকায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক কারফিউ জারি করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফিরতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছে সরকার। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে জারি করা কিছু কারফিউসহ স্থানীয় পর্যায়ের এসব বিধিনিষেধ মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

লেকর্নু স্বীকার করেছেন, সপ্তাহান্তে সরকারের প্রতিক্রিয়ায় ঘাটতি ছিল। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থতা, পুলিশের স্থির অবস্থানভিত্তিক মোতায়েন এবং পূর্বনির্ধারিত পুলিশ সদস্যদের ছুটি বাতিল না করার সিদ্ধান্তকে তিনি ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করেন।

ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ। তিনি বলেন, ‘যা ঘটেছে, তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি আমার অংশের দায় স্বীকার করছি’।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনী মোতায়েন

ফরাসি বিক্ষোভকারীদের নতুন স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ’

গত সপ্তাহে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ । এ সময় অনেকের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি স্লোগান, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।

আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’ অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। আর ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। এ দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছে স্লোগানটি। বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট মনে হতে পারে।

তবে এর আক্ষরিক অর্থের চেয়ে তাৎপর্য অনেক বেশি। গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবের প্রতিবাদে তরুণদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই বিক্ষোভই পরে ব্যাপক অস্থিরতায় রূপ নেয়।

কোথা থেকে এ স্লোগানের উৎপত্তি

ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকেই স্লোগানটির সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন এমন এক ব্যক্তি বার্তাটি পাঠান।

বার্তার শুরুতে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’, যা ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণ বলে মনে হয়। এরপর ওই ব্যক্তি লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’

একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইল ব্যবহার করে একাধিকবার বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এসব প্রোফাইলে মামাদু ও আবদেল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি দেখা গিয়েছিল।

বার্তাগুলোর ভাষা হাস্যকর মনে হওয়ায় স্ন্যাপচ্যাটের অন্য ব্যবহারকারীরা সেগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এরপর কী ঘটেছিল

অনেক তরুণের সন্দেহ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই হয়তো এসব বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাদের ধারণা, তরুণদের কথাবার্তার ধরন অনুকরণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাস্যকরভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।

এরপর বিক্ষোভকারীরা ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ গ্রহণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষকে উপহাস করা।

এখন স্লোগানটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বর্ণগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাদের মতে, আলোচিত বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের ভুল বোঝা এবং তাদের সম্পর্কে পূর্বধারণা পোষণের বিষয়টিও তুলে ধরে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি স্পষ্ট করেনি যে তাদের কোনো এজেন্ট এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন কি না। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তদন্তকারীরা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন।

মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রেক্ষাপটে তদন্তকারীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারেন, যাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। সেই সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।’

কেন স্লোগানটি এত আলোড়ন তুলেছে

শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের কাছে স্লোগানটির অস্বাভাবিক ভাষা তাদের আন্দোলন এবং সরকারের অবস্থানের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের আন্দোলনের পেছনের বাস্তবতা ও তরুণদের ভাষা—দুটিই কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ফ্রান্সের একটি বিশিষ্ট ছাত্র সংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, ‘কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না।’

তার ভাষ্য, তরুণেরা এই বাক্যকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চান, তাদের আন্দোলনে নজরদারি ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাদের চোখ এড়ায় না। একই সঙ্গে সব বাধা সত্ত্বেও নিজেদের সংগঠিত করার সক্ষমতাও তারা তুলে ধরতে চান।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী সাদানি সাবাদি বলেন, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলোতে একধরনের পূর্বধারণা প্রকাশ পেয়েছে। তারা মনে করেন, যারা অবরোধ সৃষ্টি করছে বা সবকিছু ভাঙচুর করতে চাইছে, তারা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মানুষ।

প্যারিসের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী ফেদ্র কেমেনের মতে, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি রসিকতায় পরিণত হয়েছে, কারণ ‘এটি একজন তরুণের কথাবার্তা অনুকরণ করার অত্যন্ত বাজে চেষ্টা’।

তিনি আরো বলেন, ‘এটিকে বর্ণবাদী আচরণের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে সম্পত্তি ভাঙচুর করতে যারা আসবে, তারা আরব।’

ফ্রান্সের বাইরেও কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে স্লোগানটি

ফ্রান্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বেলজিয়াম ও জার্মানির বিক্ষোভেও ব্যবহৃত হয়েছে।

সুইডিশ পরিবেশবাদী কর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওতে স্লোগানটি পুনরাবৃত্তি করেন।

এই স্লোগানের জনপ্রিয়তা ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর কথাও মনে করিয়ে দেয়। সেখানেও শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন করছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকার ভারতীয়দের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে আখ্যায়িত করার পর আন্দোলনকারীরা সেই অপমানসূচক শব্দকেই নিজেদের আন্দোলনের নাম হিসেবে গ্রহণ করেন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ

ফ্রান্সের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত মাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েকশ স্কুলে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, আরো শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং অতিরিক্ত চাপপূর্ণ সময়সূচি পরিবর্তনের দাবি জানান।

অনেক বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি ঘটনায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া হয় কিংবা ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এসব ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ক্রমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য অধিকারভিত্তিক সংগঠনের জাতীয় আন্দোলন যুক্ত হয়। এর ফলে গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের কঠোর পদক্ষেপও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। গত মাস থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের অসদাচরণের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পুলিশ-নজরদারি সংস্থা।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ফরাসি বিক্ষোভকারীদের নতুন স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ’
ছবি: বিবিসি

জ্ঞানেশ কুমারকে সরালেও বিপদ, রাখলেও বিপদ—নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়ল মোদি সরকার by মো. আবু হুরাইরাহ্‌

একজন কর্মকর্তাকে বাঁচাতে রাজধানী অবরুদ্ধ করেছে ভারতের মোদি সরকার। ৩০ হাজার পুলিশ, হাজার হাজার আটক, তবু ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার প্রশ্নে অনড় তারা। বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ মানে অপরাধ স্বীকার, আর সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয় দিল্লি।

নয়াদিল্লিতে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর পুলিশের একটি দল ভেতরে ঢুকল। তাদের এগিয়ে আসতে দেখে অভিজিৎ দিপকে বললেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি। আপনাদের ভয় পাই না।’ তাঁর পোস্ট করা ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে দৃশ্যটি ধরা আছে।

মুম্বাই থেকে আসা ওই উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় ভারতে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা দিপকেকে (কয়েক দিন পর মুচলেকায় মুক্ত)। সঙ্গে আটক হন দুই সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা (তাঁদের কারা হেফাজতের মেয়াদ আরও দুই দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে)। রাঙ্কার পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওতে শোনা যায় দিপকের কণ্ঠ—‘এটা স্বৈরাচারী শাসন।’

দিনটি ছিল ১০ অক্টোবর। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছিল সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো। সরকার সেই সমাবেশ ঠেকাতে রাজধানীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। এরপরও জ্ঞানেশ কুমার নিজের পদে আছেন, আর সরকার তাঁর পাশে অনড় দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতাসীন বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে সরাসরি বলে দিয়েছেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনাই নেই।’

প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তাকে রাখতে সরকার এত বড় রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছে কেন? কী আছে এ লড়াইয়ের পেছনে, আর কেনই–বা সরকার এক পা-ও সরতে রাজি নয়?

অবরুদ্ধ রাজধানী

১০ অক্টোবর (শনিবার) বিক্ষোভের আগে নয়াদিল্লিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি মানুষের এই শহরে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের বেশি। লক্ষ্য ছিল একটাই, বিক্ষোভকারীরা যেন পার্লামেন্টের কাছে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন। এ জন্য যা যা করা হয়েছে:

—ট্রেন ও মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখা

—বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আটকে দেওয়া

—ব্যারিকেড দিয়ে যন্তর মন্তর বন্ধ করা

—শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি বসানো

—বাসে তল্লাশি, যানবাহন পরীক্ষা করা

—সিজেপি ও অন্যান্য সংগঠন যাতে অনলাইনে লোকজনকে সংগঠিত করতে না পারে, সে জন্য রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা

সমাবেশ শুরুর আগেই আটক করা হয় আন্দোলনের পরিচিত মুখ রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে। আটক হন বামপন্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরা। এ সংগঠন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) সঙ্গে যুক্ত। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও বহু স্বনামধন্য অধিকারকর্মীও আটক হন। টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও আটক করা হয়েছিল।

এত বাধার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নামেন। দিনভর পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মধ্যে চলে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। এক জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিলে তাঁরা অন্য কোনায় গিয়ে জড়ো হন। জনপ্রিয় বাজার দিল্লি হাটেও ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়, যদিও পুলিশ সেসব ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকেরাও রেহাই পাননি। সন্ধ্যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী ও ১৫ সাংবাদিককে আটক করে আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ ঘিরে আটক করা হয় প্রায় ৬০০ জনকে।

পরদিন ১১ অক্টোবর (রোববার) পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এসব আটককে অবৈধ বলে উল্লেখ করলে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে অভিজিৎ দিপকে এক্সে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য “অস্বস্তির কারণ”। এই দেশ আগে কখনো তাঁর চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরি করা লোক দেখেনি।’

সৌরভ দাস লেখেন, অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহি চেয়ে যাবে; ভয় দেখিয়ে বা কণ্ঠ রোধ করে তাদের থামানো যাবে না, তারা আরও শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে।

সরকারের এমন কড়াকড়ি দেখে অনেকের মনে পড়ছে সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সময় জারি করা জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথা।

একটি প্রতিবেদন, তারপর আগুন

এ বিক্ষোভের শুরুটা কীভাবে? ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুজন কমিশনার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারকে সেই উদ্বেগের কথা জানান। কিন্তু সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ তিনজনের মধ্যে দুজনই কুমারের সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভোটার তালিকার ভুল সংশোধনে বাধা দিচ্ছে। অথচ আইন অনুযায়ী এ সংশোধনের ক্ষমতা তাঁদেরই আছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন সিজেপি দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। কয়েকটি শহরে বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমে বড় আকার নেয়।

১৩ কোটি নাম উধাও

বিতর্কের কেন্দ্রে আছে ভোটার তালিকার এ বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এ উদ্যোগ শুরু হয়েছিল গত বছর, বিহার রাজ্যের নির্বাচনের আগে। সেখানে এখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায়। এখন ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে তালিকা পর্যালোচনা হয়েছে। উত্তর প্রদেশে এ যাচাই শুরু হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, সেখানে তালিকা থেকে ১৩ শতাংশ নাম বাদ গেছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন ভারতে নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটার তালিকায় নিজের নাম না পেয়ে বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে ভোটও দিতে পারেননি। বিরোধীদের দাবি, নির্বিচার নাম বাদ দেওয়া এবং দীর্ঘ আপিলপ্রক্রিয়ার কারণে দুই রাজ্যে লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে বিজেপি।

সংখ্যাটা বিশাল। বিজেপি নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে জানায়, যাচাইয়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। বিজেপির হিসাবে বাদ পড়াদের মধ্যে আছেন:

—২ কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তি মৃত

—৬ কোটি ৩০ লাখ ব্যক্তি আগের ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন

—১ কোটি নাম একাধিকবার রয়েছে

—৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি

নির্বাচন কমিশন অবশ্য বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কমিশনের দাবি, এসআইআরের উদ্দেশ্য ছিল শুধু তালিকা হালনাগাদ করা। এ জন্য মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ব্যক্তি বা একাধিক নির্বাচনী এলাকায় নাম থাকা ভোটারদের শনাক্ত করার কথা। প্রায় ১৩ কোটি নামকে এমন শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে।

কিন্তু কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, এর অর্থ এ নয় যে সব নামই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যোগ্য ভোটারদের আবার অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগও আছে।

বিরোধী দল ও সমালোচকদের কাছে এ ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে কৌশলগতভাবে কোটি কোটি ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ। তাঁদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক নাম যাচাই, আবার অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র দাখিল এবং ভুল সংশোধনের জটিল প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে যোগ্য ভোটারদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁদের আবার ভোটার হতে নিজেদের পরিচয় ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে এই ভোটারদের অনেকেও অভিযোগ করেছেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বাদ পড়াদের মধ্যে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটার তুলনামূলক বেশি। এসব জনগোষ্ঠীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম।

প্রক্রিয়াটির কারিগরি ত্রুটি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীরা বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের ফলেও কোটি কোটি ভোটার বাদ পড়ার প্রভাব পড়েছে, আর ওই নির্বাচনগুলোয় জিতেছে বিজেপি।

বিজেপির জবাব অন্য রকম। দলটির দাবি, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ নানা কারণেই তারা নির্বাচনে আধিপত্য ধরে রেখেছে। বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছে তারা।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কমিশন অস্বীকার করছে। তবে কমিশন স্বীকার করছে, কমিশনাররা আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে কমিশনের ভাষ্য, নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তা তোলা হয়েছিল।

ঝুঁকি কোথায়

সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে আছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশও। দেশের সবচেয়ে জনবহুল এ রাজ্যকে জাতীয় রাজনীতির প্রবণতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। বিরোধীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই পদ্ধতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁদের মতে, বিষয়টি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচনব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার যাচাই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানেশ কুমার পক্ষপাত করছেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় লাভবান হচ্ছে বিজেপি। এ জায়গা থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠেছে।

এখানেই আসে সেই প্রশ্ন: সরকার কেন সিইসি জ্ঞানেশকে ছাড়ছে না? রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রাজীব ভার্গব দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। দ্য ইনডিপেনডেন্টকে তিনি বলেন, প্রশ্নটি শুধু কুমার কেন পদত্যাগ করবেন না, তা নয়; সরকার তাঁকে রক্ষা করতে এতটা মরিয়া কেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভার্গবের কথায়, ‘কোনো সন্দেহ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ওই ব্যক্তিকে পদত্যাগ করাত।’

ভার্গব মনে করিয়ে দেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু নয়—এমন যুক্তিসংগত সন্দেহ দূর করা। ভার্গবের ভাষায়, ‘তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনকে ভার্গব হালকাভাবে দেখছেন না। তাঁর মতে, ওই প্রতিবেদনে কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের যথার্থতা অনেকটাই প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর যুক্তি, প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ তিন নির্বাচন কমিশনারেরই সেদিন পদত্যাগ করা উচিত ছিল।

‘তাঁরা (তিন কমিশনার) তা করেননি। এতে মানুষের এই সন্দেহই আরও জোরালো হয়েছে যে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পরস্পরের যোগসাজশে কাজ করছে।’

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ভার্গবের মতে, জ্ঞানেশের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার নির্বাহী বিভাগের বাইরে থেকে কাজ করার কথা। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিরা যখন কমিশনপ্রধানকে নিজেদের প্রশাসনেরই একজন সদস্যের মতো রক্ষা করেন, তখন আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়।

সরকার কেন ছাড়ছে না

আল-জাজিরা ও দ্য ইনডিপেনডেন্টের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে সরকারের অনড় অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, পদত্যাগ মানে স্বীকারোক্তি। আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নিলে ভোট চুরির বিষয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে ‘সচেতন’ প্রধানমন্ত্রী মোদির দুর্বলতাও প্রকাশ পাবে।

দ্বিতীয়ত, উত্তরসূরির অনিশ্চয়তা। ভার্গবের ধারণা, জ্ঞানেশ কুমারকে পদে রাখার পেছনে তাঁর সরে যাওয়ার সম্ভাব্য পরিণতির ভয় কাজ করতে পারে। সরকার চাইলে তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে বসাতে পারত এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থা ফেরানোর দাবি করতে পারত। কিন্তু ভার্গবের মতে, সরকার সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কারণ, জ্ঞানেশের উত্তরসূরি মোদি সরকারের স্বার্থের প্রতি অনুকূল হবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।

তৃতীয়ত, লড়াইটা একজন মানুষের নয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ (তিনি নিজের নামের সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো নাম ব্যবহার করেন না) বলেন, ‘বিষয়টি আসলে শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে নয়।’ তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘এর মধ্য দিয়ে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং বিজেপির স্বার্থ পূরণে কারসাজি করা হচ্ছে।’

অপূর্বানন্দের ব্যাখ্যায়, সরকার শুধু জ্ঞানেশকে নয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকেও রক্ষা করছে। একজন কর্মকর্তাকে বদলালেই নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাম্প্রতিক পদ্ধতি নিয়ে ওঠা মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান হবে না। জ্ঞানেশের পদত্যাগ দাবি না মেনে সরকার বরং কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলেও তিনি মনে করেন।

চতুর্থত, ‘অপরাজিত নেতা’র ভাবমূর্তি। মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মোদি এমন এক নেতার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান, যিনি জনদাবিতে কখনো নতিস্বীকার করেন না এবং যিনি অপরাজিত। তাই এবার তিনি আন্দোলনকারীদের সেন্ট্রাল দিল্লিতে জমায়েত হওয়া ঠেকাতে চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’

এখানে একটা বৈপরীত্যও আছে। নীলাঞ্জনের মতে, জনগণের দৃষ্টিতে মোদি এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে। অথচ দেশের প্রধান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্রের বড় অংশ ও সরকারি সংস্থাগুলো এখনো তাঁর শক্ত নিয়ন্ত্রণে। অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে মোদি যে সাধারণ মানুষকে সংকট থেকে বের করে আনার নেতা, সেই ভাবমূর্তি দ্রুত হারাচ্ছেন বলেও তিনি মনে করেন।

আলোচনা নয়: নীরবতা, তারপর শক্তি

বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় কেন বসছে না সরকার? ভার্গব বলেন, গণতন্ত্রে এ ধরনের বিরোধের মীমাংসা হওয়া উচিত সংসদে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু এসব পথ অকার্যকর মনে হলে ও আদালত সময়মতো সমাধান দিতে না পারলে—এ ঘটনায় যেমন ঘটছে—মানুষের মনে হতে পারে, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

ভার্গবের বিশ্লেষণে সরকারের কৌশল স্পষ্ট। প্রথমে নীরব থাকা, পরে শক্তি প্রয়োগ। প্রত্যাশা, একসময় জনরোষ এমনিতেই কমে আসবে। তাঁর ভাষায়, ‘এ সরকার বেশ একগুঁয়ে। কোনো দাবির প্রতিই সাড়া দেয় না। তাদের প্রতিক্রিয়া হলো শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা, নির্লজ্জভাবে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকা। আলোচনা বা কথোপকথনের বদলে নীরব থাকা, তারপর শক্তি প্রয়োগ করা। আর অপেক্ষা করা, কখন পরিস্থিতি ঠান্ডা হবে।’

এ নীরবতার প্রমাণ পাওয়া যায় অমিত শাহর আচরণে। মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের। বিক্ষোভ শুরুর পর তিনি দীর্ঘদিন মুখ খোলেননি। অবশেষে সম্প্রতি মুখ খুললেন। বারবার নির্বাচনে হারের পর নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার বদলে তিনি প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে আত্মসমালোচনার পরামর্শ দিলেন।

বিজেপির অন্য নেতারাও বিক্ষোভকে বৈধ ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের চোখে বিক্ষোভ ও অনলাইনে সরকারের সমালোচনা সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত রাজনৈতিক চেষ্টা। ১১ অক্টোবর দলটির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, তাঁদের ‘ব্যর্থ প্রদর্শনী পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে’। যন্তর মন্তরে যা ঘটছে এবং টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখানো হচ্ছে, তা ভারতের সামগ্রিক চিত্র নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভারতের পরিস্থিতি শান্ত।

অথচ গত জুলাইয়ে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তখন সরকার তরুণ সংগঠনগুলোর সঙ্গে সাময়িকভাবে আলোচনায় বসেছিল। এবার সাংবিধানিক ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের পদত্যাগের দাবির মুখে তারা অনেক বেশি কঠোর।

বিরোধীদের নিয়ে ‘গোপন হিসাব’

অপূর্বানন্দের বিশ্লেষণের আরেকটি দিক আছে, যা সরকারের নিরাপত্তা-তৎপরতাকে নতুন আলোয় দেখায়। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের মধ্য দিয়ে সরকার বিজেপির মূল সমর্থক গোষ্ঠীকে একটি বার্তা দিতে চাইছে। তা হলো, রাজনৈতিক বয়ান বাধার মুখে পড়লেও নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই। বিরোধীদের সমালোচনা মেনে নেওয়ার বদলে নিজেদের কর্তৃত্ব তুলে ধরতেই এই দমন-পীড়ন।

সিইসিকে বাঁচাতে মোদি সরকারের এমন অনড় অবস্থানের আরও একটি কারণ এই বিশেষজ্ঞ দেখেন। রাহুল গান্ধীর মতো বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার অর্থ হলো, তাঁদের দেশের বৈধ রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। অপূর্বানন্দ বলছেন, ক্ষমতায় থাকার ১২ বছরে বিজেপি তা করতে বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়েছে।

সীমানা পেরোচ্ছে আন্দোলন

বিরোধীরাও পিছিয়ে নেই। ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস তরুণদের সঙ্গে বিক্ষোভে নেমেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল সাংবাদিকদের জানান, বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁরা বিস্তারিত বৈঠক করেছেন। তাঁর কথা, ‘জ্ঞানেশকে বিদায় নিতেই হবে। আমরা পিছু হটব না।’

বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি দিল্লিতে নির্বাচনসংক্রান্ত এক বিক্ষোভে তাঁকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। ১০ অক্টোবরের সমাবেশের আগের শুক্রবার তাঁর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেয়। তাতে বলা হয়, বর্তমান সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক্সে লেখেন, ‘আটক, গ্রেপ্তার, কারাগার, লাঠিপেটা কিংবা ছররা গুলি ভারতের মানুষকে দমাতে পারবে না।’ তাঁর মতে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন।

দক্ষিণ ভারতেও জোট বিস্তৃত হচ্ছে। চেন্নাইয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। ভোটার তালিকার নানা অনিয়ম ও এসআইআরের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি আয়োজন করেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য বি মানিকাম ঠাকুর ও তামিলনাড়ু কংগ্রেস কমিটি (টিএনসিসি)। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক সাতটি দলের নেতারা সেখানে অংশ নেন।

৩ অক্টোবর এ জোটে যোগ দেওয়ার পর সিইসিবিরোধী কোনো বিক্ষোভে মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের দলের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। সাউথ ফার্স্টের খবর, কংগ্রেস নেতৃত্বের বরাতে জানা গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের নানা আলোচনা, প্রচার ও বিক্ষোভে অংশ নিতে বিজয় ও তাঁর দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাহুল।

আন্দোলন সীমানাও পেরিয়েছে। ১৫ অক্টোবর নিউইয়র্কে এশিয়ান আমেরিকান রাইটার্স ওয়ার্কশপের তহবিল সংগ্রহের এক নৈশভোজে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদী ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘ভারতে একটা ঘটনা ঘটছে বটে। পরিস্থিতি ফুটন্ত অবস্থায় রয়েছে।’

ভারতে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই লেখক। গেরুয়া শিবিরেরও সমালোচনা করেন। উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটা কথা বলব, যা হয়তো রেস্তোরাঁয় বলা উচিত নয়—ককরোচদের আন্দোলনকে “উদ্‌যাপন” করুন। ভারতের অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন পর আমাদের মধ্যে একটা আশার আলো জাগিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান।’

জুলাইয়ের স্মৃতি, সামনের পথ

এ আন্দোলনের সঙ্গে ভারতে জুলাই বিক্ষোভের তুলনা টানা হচ্ছে। গ্রীষ্মে গড়ে ওঠা সিজেপি তখন একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (নিটসহ) প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করেছিল।

কয়েক সপ্তাহের সেই আন্দোলনের মুখে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কগুলো অচল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। ভারতে মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘটনা খুবই বিরল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটি ছিল মোদির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

ভার্গবের মতে, সে সময় ২০ জুলাই পুলিশের নৃশংস দমন-পীড়নে একটি প্রজন্মের তরুণ ভোটারদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপরই সরকার পিছু হটেছিল। এতে বিরোধী নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়। অপূর্বানন্দ বলেন, তখন ‘তরুণেরা সরকারের আসল চেহারা দেখতে পেয়েছিল’। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষের চোখের সামনে বাস্তবতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এরপর মানুষ বিরোধীদের কথা শুনতে ও তাদের দেখতে শুরু করে। রাহুল গান্ধীকেও তারা স্পষ্ট বুঝতে শুরু করে।’

এ আন্দোলনের শক্তির একটি বড় উৎস জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ধরন। ভার্গব বলেন, তরুণ কর্মীরা ব্যঙ্গ, প্রচলিত রীতির বাইরে যাওয়া স্লোগান এবং এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করতে পারেন, যা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এড়িয়ে চলে। তাঁর মতে, এ আন্দোলন বিরোধীদের কাজের বিকল্প নয়; বরং তাদের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করছে।

তবে জুলাইয়ের মতো এবার দ্রুত সমাধান আসবে বলে মনে করেন না অপূর্বানন্দ। তাঁর কথায়, ‘এটা চলতে থাকবে। কারণ, এখন লড়াইটা সরকার ও জনগণের মধ্যে।’ জুলাইয়ে সরকার তরুণদের দাবির প্রতি সাড়া দিচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু এবারের বিরোধ সামলানো তাদের জন্য কঠিন।

সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে মোদি

সম্প্রতি মোদি ও তাঁর দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর উদ্‌যাপন করেছে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মোদি। ৭ অক্টোবর তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন।

কিন্তু বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে কখনোই এখনকার মতো এত দুর্বল দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ডনিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর আল-জাজিরাকে বলেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই চান না মোদির বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক। মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমতে শুরু করেছে বলে তিনি মনে করেন।

সঞ্জয় কাপুরের মতে, ‘বিজেপি ভয় পাচ্ছে যে জনমত দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। পরে ক্ষমতায় ফিরে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’

বিক্ষোভ এখন আর শুধু ভোটার তালিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। মোদি সরকারের আমলে গণতন্ত্র, ভিন্নমত প্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতাই বোধ হয় ব্যাখ্যা করে, একজন কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবি কেন এই সরকারের কাছে এত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার সরে গেলে সরকার বিরোধীদের অভিযোগে সায় দিয়েছে বলে ধরা হবে। ভাবমূর্তিতে চিড় ধরবে, আর জ্ঞানেশের উত্তরসূরি কেমন হবেন, তা-ও অনিশ্চিত। অন্যদিকে না সরলে বাড়তে থাকবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, রাস্তার বিক্ষোভ। আর তা ঠেকাতে না পারলে, গদিচ্যুতও হওয়া লাগতে পারে মোদিকে।

[তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, রয়টার্স, ইনডিপেনডেন্ট, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস]

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এক আন্দোলনকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। নয়াদিল্লি, ভারত
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এক আন্দোলনকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। নয়াদিল্লি, ভারত। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মোদির ছবি যুক্ত করে রাবনের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ছবি যুক্ত করে রাবণের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া (এনএসইউআই)। মঙ্গলবার নয়াদিল্লির রাইসিনা রোডে সংগঠনটির সদর দপ্তরে বিজয়া দশমী উপলক্ষে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। নির্বাচনে অনিয়ম, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বেকারত্বের প্রতিবাদে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে উৎসবের আবহকে প্রতিবাদের ভাষায় তুলে ধরে সংগঠনটি।

‘উঙ্গলি তো উঠেগি—রাবণ দহন’ শীর্ষক ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে এনএসইউআই অভিযোগ করে, যুবসমাজের সমস্যা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে সরকার।

রাবণের কুশপুত্তলিকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, অমিত শাহ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পাশাপাশি শিল্পপতি গৌতম আদানি ও মুকেশ আম্বানি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, বিজেপি নেতা দুষ্মন্ত গৌতম ও রাজনাথ সিংয়ের মুখাবয়বও ছিল।

প্রতীকী এ কর্মসূচির মাধ্যমে কথিত ‘ভোট চুরি’, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, জাতীয় সম্পদের অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতা এবং ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকির মতো বিষয়গুলো তুলে ধরতে চেয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি যৌন সহিংসতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে এনএসইউআই।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এনএসইউআইয়ের প্রতিবাদ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করে আসছে সংগঠনটি। এ কারণে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগও দাবি করেছে তারা।

এনএসইউআইয়ের জাতীয় গণমাধ্যমবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত রবি পাণ্ডে বলেন, ‘বিজয়া দশমী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। আজকের রাবণ দহনের মাধ্যমে এনএসইউআই ‘ভোট চুরি’, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, সম্পদের শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা এবং নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংবিধান, গণতন্ত্র ও ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’

সূত্র: দ্য ট্রিবিউন

মোদির ছবি যুক্ত করে রাবনের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে প্রতিবাদ
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপজুড়ে উগ্রপন্থার উত্থান, দুর্বল হচ্ছে মধ্যপন্থি রাজনীতি

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণঃ ইউরোপের প্রধান দেশগুলোতে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই জনসমর্থন হারাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের বোঝা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষকে উগ্র ডান ও বামপন্থি দলগুলোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে অর্থায়নের ঘাটতি নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেওয়া এই সংকটের বড় উদাহরণ। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ ও বেতনভোগী শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, উদার গণতন্ত্র উন্নত জীবন ও সমৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোকে এখন অনেকেই একই ধরনের রাজনীতির ধারক হিসেবে দেখছেন। এসব দলের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন—এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি, ঋণের ব্যয় ও সুদের হার বৃদ্ধির কারণে সরকারগুলোর পক্ষে জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় বড় পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফলে ফ্রান্সে মেরিন লো পেনের উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র‍্যালি ও জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর উগ্র বামপন্থি ফ্রান্স আনবোড—দুই ধারার দলই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। জার্মানিতে বাড়ছে উগ্র ডানপন্থি অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ও বামপন্থি ডি লিংকের সমর্থন।

আগামী এক বছরে স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে থাকায় ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো বাড়তে পারে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জ মেলোনিকেও কট্টরপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।

গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা কমছে

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে ইউরোপের বড় দেশগুলোতে অসন্তোষ বাড়ছে। ফ্রান্সে ৬৯ শতাংশ, স্পেনে ৬৮ শতাংশ, ইতালিতে ৬২ শতাংশ এবং পোল্যান্ডে ৪৭ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের কার্যক্রমে অসন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রেও এ হার ৬৯ শতাংশ।

অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী ও যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির অধ্যাপক ড্যারন অ্যাসেমোগলুর মতে, গণতন্ত্রের সংকটের পেছনে দুটি বড় ব্যর্থতা রয়েছে। প্রথমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে সমৃদ্ধি সুষমভাবে বণ্টনে ব্যর্থতা। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিতে শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির আধিপত্য বৃদ্ধি।

বিশ্বায়ন, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার ও আয়বৈষম্যের কারণে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা কমেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিও চাকরি ও জীবিকা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক ও অন্যান্য মৌলিক সেবার মান বজায় রাখতেও সরকারগুলোর ব্যর্থতা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

অ্যাসেমোগলুর মতে, উদার গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে।

জার্মানিতে মধ্যপন্থিদের সংকট

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানিতেও মধ্যপন্থি রাজনীতির ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী মধ্য-ডানপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) এবং মধ্য-বামপন্থি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এসপিডি) এখন জনসমর্থন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

অভিবাসন, চীনের বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়া, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা বাড়ছে। সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের মধ্যপন্থি নীতি ও ব্যাপক অভিবাসন গ্রহণের সিদ্ধান্তে সিডিইউর রক্ষণশীল সমর্থকদের একটি অংশ দূরে সরে যায়। সেই জায়গা দখল করেছে এএফডি।

বর্তমান জনমত জরিপের গড় হিসাবে জার্মানিতে এএফডির সমর্থন প্রায় ২৮ শতাংশ। সিডিইউ ও তাদের জোটসঙ্গী সিএসইউর সমর্থন ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ, গ্রিন পার্টির ১৫ শতাংশ এবং এসপিডির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। বামপন্থী ডি লিংকের সমর্থনও ১১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

এ পরিস্থিতিতে কার্যকর সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে মূলধারার দলগুলোর মধ্যে উগ্র ডানপন্থিদের মোকাবিলায় কী ধরনের নীতি নেওয়া উচিত, তা নিয়েও মতবিরোধ বাড়ছে।

ইউরোপের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনগুলো ইউরোপের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিভক্ত পার্লামেন্ট ও জোট সরকারে ছোট উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে মূলধারার দলগুলো আরো কট্টর অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যক্রমও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

আগামী বসন্তে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মেরিন লো পেন জয়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি, ইউরোর ভবিষ্যৎ, ন্যাটো ও ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সমর্থনে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মজুরি বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই এমন মানুষের জন্যও উন্নতির সুযোগ এবং প্রযুক্তির সুফল সবার মধ্যে বণ্টনের কার্যকর পরিকল্পনা।

ইউরোপজুড়ে উগ্রপন্থার উত্থান, দুর্বল হচ্ছে মধ্যপন্থি রাজনীতি
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়েই কেন রাজপথে তরুণরা, ছড়াচ্ছে প্রতিবাদের ঢেউ

বিশ্বের নানা প্রান্তে রাজপথে নামছেন তরুণেরা। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে, কোথাও পরীক্ষায় অনিয়ম ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে, আবার কোথাও দুর্নীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে ক্ষোভ জানাতে। দেশ ও পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও এসব আন্দোলনে একটি সাধারণ প্রশ্ন সামনে আসছে—তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার কতটা দায়িত্বশীল?

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংস্কার ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা—দেশ ভিন্ন হলেও তরুণদের ক্ষোভের জায়গায় মিল রয়েছে। ফ্রান্স, ভারত ও আলবেনিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের ঘটনাগুলো ব্যাপারটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি ছাড়িয়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল। গত বছরও মরক্কো, নেপাল, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে। এসব বিক্ষোভের পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল সরকারি সেবা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো বিষয় বারবার উঠে এসেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে ক্ষোভ

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা, শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিক্ষায় বৈষম্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন।

দেশটির বিভিন্ন শহরে স্কুলশিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা বিক্ষোভে অংশ নেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, শিক্ষকসংকট দূর করতে হবে এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কার করতে হবে।

বিক্ষোভে যোগ দেন সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও। শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনের বেশির ভাগ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশি বলপ্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি ছাপিয়ে আন্দোলনটি তরুণদের মতামত, অধিকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিচ্ছে।

ভারতে পরীক্ষা কেলেঙ্কারি থেকে রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবি

ভারতে তরুণদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের শুরু পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। পরে তা শিক্ষা খাতে জবাবদিহি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।

ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনটির কর্মীরা প্রথমে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মাঠে নামেন। পরে নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগ ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও দাবি ওঠে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের এই আন্দোলনের তাৎপর্য কেবল একটি পরীক্ষা কেলেঙ্কারি বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার সুযোগ, যোগ্যতার স্বীকৃতি, চাকরির সম্ভাবনা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা—সব মিলিয়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষ এতে প্রকাশ পাচ্ছে।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চ টিউশন ফি এবং তরুণদের জন্য সীমিত সুযোগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে টানা কয়েক দিন রাজধানীতে বিক্ষোভ চলে এবং তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি সরকারি ভবন ও ব্যাংকের শাখায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগের যথাযথ জবাব দেওয়া হচ্ছে না।

দেশটির দক্ষিণ উপকূলের কিছু অংশে বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা। সরকার অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে বিক্ষোভে সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় তার সরকার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না।

বিক্ষোভ-লুটপাটের পর মিলানে সেনা মোতায়েন করছে ইতালি

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর ইতালির মিলানে ৫০০ সেনা মোতায়েন করছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে সরকার। আগামী শনিবার আরো বিক্ষোভের কর্মসূচি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার নতুন কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিক্ষোভে সহিংসভাবে অংশ নেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান এবং ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেওয়া সন্তানের কর্মকাণ্ডের জন্য তার মা-বাবাকে আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পরও প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান

বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলনের আলোচনায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলন দ্রুতই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, দুর্নীতি, বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট ও জবাবদিহির দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আনে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলন দমনে সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরও আন্দোলনকালে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করে।

সরকারের পতনের পর তরুণদের সামনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি কমানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি গুরুত্ব পায়। কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণের মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত হয়নি।

২০২৪ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরুত্থান এবং সংস্কারের ধীরগতিতে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে সেই শক্তিকে রূপান্তর করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে কর্মসংস্থানও। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০২৫ সালের তরুণদের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশিত নীতিপত্রে বলা হয়েছে, দেশে ৮৫ লাখের বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নন। তরুণদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও কর্মসংস্থানের সংকট প্রকট। প্রতিবেদনে শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অসংগতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে তরুণদের প্রত্যাশা শুধু চাকরি পাওয়া বা নিয়োগব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সহিংসতার অবসান, দুর্নীতির বিচার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিও চান।

সংস্কার প্রশ্নে হতাশার আরেকটি দিক সামনে এসেছে ২০২৬ সালে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা কিছু সংস্কার অধ্যাদেশ নতুন সংসদে অনুমোদন পায়নি বা বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার, বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপও রয়েছে। এসব পরিবর্তন নিয়ে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তরুণদের আন্দোলন সরকার পরিবর্তনের মতো বড় রাজনৈতিক ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আরও কঠিন। আন্দোলনের মাধ্যমে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা পূরণ না হলে হতাশা আবারও নতুন রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।

নেপাল, মরক্কো ও অন্য দেশেও একই ধরনের ক্ষোভ

তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের এই ঢেউ শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালে নেপাল, মরক্কো, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া ও পেরুসহ বিভিন্ন দেশে তরুণেরা বিক্ষোভে অংশ নেন। এসব আন্দোলনের পেছনে ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।

নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা তরুণদের ক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে আন্দোলন দ্রুতই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার মতো দীর্ঘদিনের অভিযোগে বিস্তৃত হয়। বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিও ঘটে।

মরক্কোয় তরুণদের আন্দোলনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। বিশেষ করে বড় আয়োজন ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মৌলিক সেবার ঘাটতি তাদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

দেশভেদে আন্দোলনের সূচনা ও পরিণতি আলাদা হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: তরুণদের একটি অংশ কেবল অর্থনৈতিক সুযোগের অভাব নিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক—সেই প্রশ্নও তুলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হচ্ছে প্রতিবাদ

সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলনগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া, কর্মসূচি সমন্বয়, ভিডিও ও ছবি প্রকাশ এবং বিভিন্ন দেশের আন্দোলন সম্পর্কে জানা এখন আগের তুলনায় সহজ। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে থাকা তরুণেরাও এসব মাধ্যমের সাহায্যে একত্র হচ্ছেন।

অনেক আন্দোলনই কোনো একক নেতা বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের প্রতীক, স্লোগান ও কর্মপদ্ধতি এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনেও অনলাইন যোগাযোগ ও অফলাইন সংগঠিত প্রতিবাদ পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল।

তবে অনলাইনে সংগঠিত হওয়া মানেই আন্দোলনের দাবি পূরণ হয়ে যাওয়া নয়। সরকারের প্রতিক্রিয়া, আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কৌশল, জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিকল্পনা—এসব বিষয়ও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিক্ষোভ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করলেও অন্য ক্ষেত্রে দমন-পীড়ন বা অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ভবিষ্যৎ

বিশ্বজুড়ে এসব বিক্ষোভের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল সম্ভবত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা শেষ করে কাজ পাওয়া, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, সাশ্রয়ী জীবনযাপন, মানসম্মত সরকারি সেবা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের মতামতের প্রতিফলন—এসব প্রত্যাশা পূরণ না হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা জমতে পারে।

তবে সব আন্দোলনকে একই ধরনের বা একই উদ্দেশ্যের বলা যাবে না। কোথাও শিক্ষা সংস্কার প্রধান দাবি, কোথাও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, আবার কোথাও ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন মুখ্য। একই আন্দোলনের মধ্যেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও কৌশলে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

বিক্ষোভের মাধ্যমে তরুণেরা যে প্রশ্নগুলো সামনে আনছেন, সেগুলোর উত্তর শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে দেওয়া সম্ভব নয়। অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, শিক্ষায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হতে পারে।

তরুণেরা কী বলছেন?

বিশ্বজুড়ে তরুণদের আন্দোলন নিয়ে মতামত ও অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে। ফ্রান্স, ভারত, আলবেনিয়াসহ যেসব দেশে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে, সেসব দেশের তরুণদের কাছে জানতে চেয়েছে—কেন তারা রাজপথে নামছেন, তাদের চোখে আন্দোলনের গুরুত্ব কী এবং কী পরিবর্তন প্রয়োজন।

আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়া তরুণদের পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও জানতে চায় সংবাদমাধ্যমটি। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে; চাইলে পরিচয় গোপন রেখেও মতামত দেওয়া যাবে।

তরুণদের এই অভিজ্ঞতা জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংবাদ শিরোনামে বিক্ষোভের সংখ্যা, সংঘর্ষ কিংবা গ্রেপ্তারের খবর উঠে এলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা ও হতাশা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।

বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ আন্দোলন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: যে সিদ্ধান্তগুলো তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে, সেগুলোতে তাদের কণ্ঠ কতটা শোনা হচ্ছে? আর রাজপথে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের প্রত্যাশা কতটা বাস্তব সংস্কারে রূপ নিচ্ছে?

সূত্র: আলজাজিরা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান

বিশ্বজুড়েই কেন রাজপথে তরুণরা, ছড়াচ্ছে প্রতিবাদের ঢেউ

Monday, October 19, 2026

ইউরোপজুড়ে কেন বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণেরা

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও শিক্ষকের সংকট, কোথাও বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবার কোথাও দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকারবিরোধী বৃহত্তর বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। কয়েকটি দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংসতায়ও গড়িয়েছে।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ

ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ পর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ ক্লাসের সময়, শিক্ষকের ঘাটতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্পষ্ট পদ্ধতি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষক পদে শূন্যতা পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়মিত কয়েক মাস পর্যন্ত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়। এসব সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলনে পরে অন্যরাও যোগ দেন। তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ জানান। যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বাড়ানো এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুলেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ পর্যায় চলছে। দেশটিতে আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা।

স্পেনে বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদের প্রতিবাদ

স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ির দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজপথে নামেন অধিকারকর্মীরা। ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। একটি বিনিয়োগ তহবিল তার বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান তিনি।

বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের আবাসন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থি ও উগ্রডানপন্থি দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস হয়নি। এরপর ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দেন সানচেজ। সংস্কার কার্যকর করতে তার আরো বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

নির্বাচনের আগে পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে আবাসনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ পাস করাতে পারলে স্পেনের বিক্ষোভ কমতে পারে। সানচেজের সমাজতান্ত্রিক দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—দুই পক্ষই আগামী নির্বাচনে জিতলে আরো বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসন সংকট সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ

স্পেনের প্রতিবেশী পর্তুগালেও শনিবার আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রীয় এলাকায় জড়ো হন শত শত মানুষ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বাড়ির দাম ও ভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় আবাসন সংকট এখন দেশটির অন্যতম বড় উদ্বেগ।

ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ

ইতালির মিলানেও সংসার চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবারের মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও পরে সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর, পেভমেন্টের ব্লকসহ বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

ইতালিতে শনিবারই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের প্রথম দিন ছিল। এদিকে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাবের অভিযোগ

আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ রোববার ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা।

গত গ্রীষ্মে দেশটির উপকূলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভে কি পরিবর্তন এসেছে?

ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরো তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিদ্যালয় পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদেরও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর যে পরিকল্পনা ছিল, তা-ও বাতিল করেছে সরকার।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল ফরাসি প্রেসিডেন্টের দপ্তর।

তবে এসব পদক্ষেপে বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থি বিক্ষোভকারী ও লুটপাটকারীদের দায়ী করেছেন। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সরকার আরো ছাড় দিতে আগ্রহী নয়।

ফ্রান্সে বিক্ষোভের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে সরকার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দাবির বিষয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর।

স্পেনে আবাসনসংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব পার্লামেন্টের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে পাস করানো গেলে বিক্ষোভের চাপ কমতে পারে। তবে বাড়িভাড়া, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কত দ্রুত কমবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সব মিলিয়ে ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্থানীয় সমস্যা সামনে এলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে। যেমন—তরুণদের শিক্ষার সুযোগ, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয়। এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের দাবিতেই রাজপথে নামছেন তারা।

ইউরোপজুড়ে কেন বিক্ষোভ, কী চাইছেন তরুণেরা
প্যারিসের প্লাস দে লা রিপাবলিক-এ আয়োজিত এক বিক্ষোভের সময় কাঁদানে গ্যাসের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারীদের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স

Monday, October 12, 2026

আইফোনের লোভেই তাজমিন হত্যা? সিএনজিচালককে ঘিরে যত রহস্যের জট

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৩) হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। নিহতের ব্যবহৃত আইফোনের প্রতি লোভ থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয়েছে তাজমিনের আইফোন। ফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে ফোনটি উদ্ধার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র মেলানোর চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার সুমন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বলে তারা মনে করছেন। তবে তিনি একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর কথা রয়েছে।

বাসা থেকে বেরিয়ে দুই জেলায়, এরপর কুমিল্লায় ফেরা

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাচ্ছে। পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়।

পরে হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে তার হাতে মোবাইল ফোন এবং কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে সড়কের দিকে চলে যেতে দেখা গেলেও এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

সিএনজিতে ওঠার পর কী ঘটেছিল?

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় ফেরার জন্য তাজমিন একাই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠে। চালক সুমন তার হাতে থাকা আইফোন দেখতে পান। এরপর শহরের পথে না গিয়ে তিনি অটোরিকশাটি অন্য পথে নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের দাবি, সুমন মাদকাসক্ত অবস্থায় অটোরিকশা চালাতেন। তবে ঘটনার সময় তার শারীরিক অবস্থা এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর সম্পর্ক তদন্তের বিষয়।

তদন্তকারীদের ধারণা, আইফোনের প্রতি লোভ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে হত্যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পুরো বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে এখনো তদন্ত চলছে।

ধানক্ষেতের পাশে পড়ে ছিল সিএনজি, পরে মিলল মরদেহ

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে তারা ধানক্ষেতের পাশে অটোরিকশাটি পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামতও তাদের চোখে পড়ে। পরে আলামত অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে মরদেহ দেখতে পান তারা। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

অটোরিকশার সূত্র ধরে গ্রেপ্তার সুমন

মরদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করা অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন।

সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন। পরে তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।

সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন তিনি। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে।

আইফোনের তথ্যেই মিলবে কি সব প্রশ্নের উত্তর?

তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল এবং কুমিল্লায় ফিরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তার নতুন কিংবা পুরোনো পরিচিতদের কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া আইফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তাজমিনের চলাফেরা এবং যোগাযোগের সূত্রগুলো যাচাই করছে পুলিশ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে ঘটনার আগে ও পরে তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’

তাজমিনের হাতে থাকা একটি আইফোন কি শেষ পর্যন্ত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে প্রমাণিত হবে, নাকি তদন্তে বেরিয়ে আসবে আরও কোনো যোগসূত্র- এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

অভিযুক্ত সিএনজিচালক মো. সুমন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার জান্নাতুল তাজমিন। পুরোনো ছবি
অভিযুক্ত সিএনজিচালক মো. সুমন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার জান্নাতুল তাজমিন। পুরোনো ছবি

Tuesday, October 6, 2026

ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে টানা কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের বাধা, আটক ও নারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে আন্দোলন আরো জোরালো হয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১০ অক্টোবর আবারো দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন।

২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরবর্তী দুই দিনও অব্যাহত থাকে। বিক্ষোভকারীদের অনেকে চলমান কর্মসূচিকে ‘যন্তর-মন্তর ২.০’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এবার দিল্লি পুলিশ আগের তুলনায় আরো কঠোর অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীদের কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

রোববার দিল্লিতে সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর-মন্তর পর্যন্ত ‘সিটিজেন্স মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এর আগের দিন দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে কয়েকজন নারী সাংবাদিককে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর রোববার আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

এর মধ্যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কয়েকটি কলেজ ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে যন্তর-মন্তরে পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি একাকার হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দুই প্রতিবাদের বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা অভিযোগ করেন, পুলিশ যে গাড়িতে তাকে নিয়ে যায়, সেখানে কোনো নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন না। পরে তাকে যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইসার অভিযোগ, ওই সময় নেহা বোরার কাছে তার মোবাইল ফোনও ছিল না।

আন্দোলন চলাকালে আরো কয়েকজন নেতা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন। আম আদমি পার্টির কর্মীরাও বিপুলসংখ্যায় ইন্ডিয়া গেট এলাকায় বিক্ষোভে যোগ দেন। দলের দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকেও আটক করে পুলিশ।

পরে এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিওতে সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেন, ইন্ডিয়া গেটে তাকে পুলিশ উল্টো করে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় তার মুখ ধরা না পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবও পুলিশের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাদের জোর করে আটক করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি এক দিনের প্রতীকী প্রতিবাদ নয়; জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল করে। ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করে সংগঠনটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা যন্তর-মন্তর আবার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির কথা জানায়।

অন্যদিকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মুম্বাইয়ে ‘গর্জনা মোর্চা’ আয়োজন করে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ও রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস)। কর্মসূচিতে দুই ঠাকরে নেতাই অংশ নেন।

এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে বড় বিক্ষোভ হয়। পুলিশ অনুমতি না দিলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, সরকার এতটাই অযোগ্য যে দুই মাসের মধ্যে তাদের দ্বিতীয়বার বিক্ষোভে নামতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গান্ধী যদি ভারতের আত্মা হন, তবে আম্বেদকর দেশটির মেরুদণ্ড। তার দাবি, ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুই ভারতের জনগণকে ভোটাধিকার দিয়েছেন।

মুম্বাইয়ের ওই কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং সুরকার-গায়ক বিশাল দাদলানিও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধব ঠাকুরের শিবসেনাও এতে সমর্থন জানায়।

এদিকে মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ফের বড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি, আপনিও গুছিয়ে নিন, দিল্লি রওনা হতে হবে।’

দিল্লিতে যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার পাশাপাশি দিল্লি মেট্রোও ১০টির বেশি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। এরপরও বিপুলসংখ্যক মানুষ যন্তর-মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে। নেহা বোরা, প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জয় সিংসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও কাউকেই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

এদিকে নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সকালে এক্সে পোস্ট করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করা এবং তাদের ফর্ম-৬ পূরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, বুথ লেভেল কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন। তরুণ ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবিরও আয়োজন করা হবে।

কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি?

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া অপর দুই নির্বাচন কমিশনার গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের জানানো হয়নি। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং কথিত ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ পদক্ষেপ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী আপত্তি তুলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টিও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে এবং কমিশনের প্রতি আস্থা পুনঃস্থাপন করতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ প্রয়োজন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির
রোববার নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় দিল্লি পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

এক ভাই গুগল, আরেক ভাই মেটায় by ওমর কায়সার

প্রকাশ ১৬ নভেম্বর ২০২৫ঃ চাটগাঁইয়া পোয়া, মেডিত ফইরলে লোয়া। এ কথা আবারও প্রমাণ করলেন চট্টগ্রামের দুই সহোদর ইয়ামিন ইকবাল ও মোহাইমিন ইকবাল। চট্টগ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই দুই তরুণ তাঁদের মেধা, অধ্যয়ন ও প্রচেষ্টায় এখন দুই বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। বিশ্বের লাখ লাখ তরুণ যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করার স্বপ্ন দেখে, সে রকম দুটি প্রতিষ্ঠানে ইয়ামিন ও মোহাইমিন কাজ করার সুযোগ পেয়ে প্রমাণ করেছেন বিশ্বমানের প্রযুক্তি–দুনিয়ায় জায়গা করে নেওয়া কেবল স্বপ্ন নয়, বাস্তবও হতে পারে। বড় ভাই ইয়ামিন এখন গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর ছোট ভাই মোহাইমিন এ বছর ফেব্রুয়ারিতে যোগ দিয়েছেন বিশ্বের সেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটায়। মেটার অধীন চারটি প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও থ্রেডে প্রতি মাসে ৪০০ কোটি ব্যবহারকারী নিয়মিত সক্রিয় থাকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই নেট–দুনিয়ায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশের তরুণদের এক বিরাট অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হলেন দুই ভাই।

চট্টগ্রাম নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর চৌধুরীহাট এলাকার সাধারণ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন দুই ভাই। শুরু থেকেই তাঁরা ভাবতে শুরু করেছেন, পড়ালেখা মানে শুধু স্কুল–কলেজে যাওয়া–আসা নয়, প্রতিদিনের পাঠাভ্যাস থেকে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তাকে কাজে লাগাতে হবে। কিছু একটা করতে হবে। অনেক বড় কিছু করার স্বপ্ন তাঁদের সব সময় ছিল। ইয়ামিন ইকবাল পড়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট), বিভাগ—কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনের শুরু থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল প্রোগ্রামিং ও সমস্যা সমাধানে। সেই আগ্রহই তাঁকে নিয়ে যায় এক প্রতিযোগিতামূলক পথে, যার শেষপ্রান্তে অপেক্ষা করছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি গুগল। ২০২০ সালে ইয়ামিন গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল—সেই একই পথে হাঁটলেন ছোট ভাই মোহাইমেন।

মোহাইমিন ইকবাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনা করেছেন ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে। বড় ভাইয়ের সাফল্য তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। বড় ভাইয়ের দেখাদেখি তাঁরও আগ্রহ জন্মে প্রোগ্রামিংয়ের ওপর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন এবং নিজের দক্ষতা বাড়তে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। কোনো পুরস্কার পাব কি পাব না, জিতব কি না—এসব নিয়ে মোটেও ভাবতেন না। তিনি শুধু চেষ্টা করে গেছেন। এভাবে নিয়মিত সাধনার ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কিন্তু স্নাতক পাস করে বসে থাকার পাত্র নন তিনি। নিজ প্রচেষ্টায় উচ্চশিক্ষার চেষ্টা করতে থাকেন। অবশেষ যুক্তরাষ্ট্রের সান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। বিদেশের মাটিতে গিয়ে অচেনা পরিবেশে শুরু করলেন এক নতুন জীবন। এক নতুন সংগ্রাম। শিক্ষার পাশাপাশি তাঁকে করতে হয়েছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। করতে হয়েছে চাকরির সন্ধান। সে এক কঠিন সময়। চাকরি পাওয়া খুব একটা সহজ নয়। কারণ, সে সময় বিশ্বজুড়ে টেক কোম্পানিগুলো ছাঁটাই আর নিয়োগ স্থগিত করছিল।

মোহাইমিন বলেন, ‘এই কঠিন মার্কেটে ইন্টার্নশিপ পাওয়া খুবই টাফ ছিল। টেক কোম্পানিগুলো তখন ছাঁটাই করছিল, হায়ারিং প্রায় বন্ধ। হাজার হাজার আবেদনকারীর ভিড়ে মে ২০২৪-এ স্নোফ্লেক এ ইন্টার্নশিপ পেয়ে গেলাম। এটা আমার জন্য বিশাল জয় ছিল।’ সেই ইন্টার্নশিপের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চৌকস সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ শেখার সুযোগ পেলেন আর সময়কে কাজে লাগিয়ে পরিশ্রমের বিপরীতে কীভাবে কিছু অর্জন করতে হয় তা শিখলেন। এভাবে ইন্টার্নশিপও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কোম্পানিগুলো নিয়োগ বন্ধ রাখায় কোথাও থেকে পূর্ণকালীন চাকরির সুযোগ পাচ্ছিলেন না। তবে হতোদ্যম হয়ে পড়েননি। আর যাই হোক নিজের জীবনবৃত্তান্তে স্নোফ্লেকের নামটা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটা তাঁর অনেক বড় সঞ্চয়। আশায় দিন কাটাচ্ছিলেন। আর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন বিভিন্ন কোম্পানিতে। একের পর এক বড় কোম্পানিগুলো তাঁর প্রোফাইলের দিকে নজর দিতে শুরু করে। এরপর এল সেই শুভক্ষণ। অক্টোবর ২০২৪-এ মাইক্রোসফট এবং নভেম্বরেই মেটা থেকে আসে পূর্ণকালীন চাকরির প্রস্তাব। অবশেষে এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি যোগ দেন মেটায়।

মোহাইমিন তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘বিশ্বের দুই টেক জায়ান্ট মেটা ও মাইক্রোসফটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েছি। আমি মেটার অফার গ্রহণ করেছি। আমার আশা একদিন বাংলাদেশের নিজস্ব টেক জায়ান্ট থাকবে, যা সারা বিশ্ব ব্যবহার করবে।’ মোহাইমিনের সাফল্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সানাউল্লাহ চৌধুরী সে সময় মিডিয়ায় নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মোহাইমিন শুরু থেকেই পরিশ্রমী ও মনোযোগী ছাত্র ছিল। মেটা ও মাইক্রোসফটে সুযোগ পাওয়া শুধু তার নয়, আমাদের দেশের জন্যও গর্বের বিষয়।’ ইয়ামিন ও মোহাইমিন কি শুধু দুটি চাকরি পেয়েছেন? না। এটা দুই তরুণের পরিশ্রম, দৃঢ়তা ও কাজের প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন। পরিবার তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। মোহাইমিন বলেন, ‘আমাদের যা কিছু অর্জন তা হয়েছে আমার মায়ের অনুপ্রেরণায়।’

মায়ের এই বিশ্বাসই দুই সন্তানকে সাফল্যের এমন শিখরে নিয়ে গেছে। অগ্রজ ইয়ামিন সব সময় ছোট ভাইকে পথ দেখিয়েছেন। একসঙ্গে প্রোগ্রামিং নিয়ে আলোচনা, সমস্যা সমাধান ও কোড রিভিউ করা ছিল তাঁদের নিত্যদিনের কাজ। ইয়ামিন বর্তমানে গুগলে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন, আর তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো ছোট ভাইকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এই দুই ভাইয়ের গল্প সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের প্রযুক্তি-প্রজন্মের গল্প। প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাকরির সাক্ষাৎকার—সবকিছুই তাঁদের জন্য ছিল শেখার সুযোগ। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, দেশের বাইরে গিয়ে বড় কিছু করার আগে নিজের ভেতরের সক্ষমতাকে জাগানোই আসল বিষয়।

মোহাইমিন তরুণদের উদ্দেশে বলেন, ‘যারা গুগল, মেটা বা মাইক্রোসফটে কাজ করতে চায়, তাদের প্রোগ্রামিং মনোযোগ দিয়ে করতে হবে। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়তেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য বিভাগ থেকেও যদি প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষতা থাকে, তবু সম্ভব।’

ইয়ামিন আর মোহাইমিনের সাফল্য বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে নতুন বিশ্বাস জাগিয়েছে। তাঁরা জানিয়ে দিলেন—সাফল্য কেবল বিদেশি নয়, দেশীয় মেধা দিয়েও সম্ভব। তাঁরা দুজনই বিশ্বাস করেন, একদিন বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেবে।

ইয়ামিন ইকবাল ও মোহাইমিন ইকবাল
ইয়ামিন ইকবাল ও মোহাইমিন ইকবাল