Thursday, August 7, 2025

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি ফুটবলের ‘পেলে’

ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড সুলেইমান আল–ওবেইদ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্য পেতে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনি জনতার ওপর ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালালে প্রাণ হারান ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএএফ) গতকাল তাদের ওয়েবসাইটে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সুলেইমানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

পিএএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্যের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শহীদ হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় ও বিচ সার্ভিসেস দলের তারকা সুলেইমান আল–ওবেইদ। ফিলিস্তিন ফুটবলে সুলেইমান “দ্য গ্যাজেল (হরিণ)”, “দ্য ব্লাক পার্ল (কালো মুক্তা)”, “হেনরি অব প্যালেস্টাইন” এবং “পেলে অব প্যালেস্টাইন ফুটবল” নামে পরিচিত ছিলেন। পাঁচ সন্তান রেখে মারা গেছেন ফিলিস্তিন ফুটবলের এই পেলে।’

গাজায় জন্ম নেওয়া সুলেইমান সার্ভিসেস বিচ ক্লাবের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর পশ্চিম তীরে গিয়ে সেখানকার ক্লাব আল আমারি ইয়ুথ সেন্টারে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত খেলেন। ২০১০–১১ মৌসুমে ফিলিস্তিনের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ জেতেন সুলেইমান। আল আমারি ছেড়ে আল শাতিয়া ক্লাবে এক মৌসুম খেলেন সুলেইমান। এরপর গাজা স্পোর্টস ক্লাবের হয়ে সাউদার্ন গভর্নরেটস প্রিমিয়ার লিগে ২০২৬–১৭ মৌসুমে ১৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পরের মৌসুমে আল খাদামা ক্লাবের হয়েও লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।

পিএএফের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, দুর্দান্ত গতি ও দক্ষতার জন্য ২০০৭ সালে ফিলিস্তিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেন সুলেইমান। ২০১৩ সালে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলার আগে ২৪ ম্যাচে করেন ২ গোল। এর মধ্যে সুলেইমানের বিখ্যাত গোলটি ২০১০ সালে পশ্চিম এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপে। ইয়েমেনের বিপক্ষে ‘সিজর্স কিকে’ চোখধাঁধানো গোলটি করেছিলেন।

সুলেইমানের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি এরিক ক্যান্টোনা নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে লিখেছেন, ”‘সাহায্য পাওয়ার আশায় রাফায় অবস্থান করার সময় ফিলিস্তিন জাতীয় দলের তারকা সুলেইমান আল–ওবেইদকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। তাকে “ফিলিস্তিনের পেলে” ডাকা হতো। আমরা তাদের আর কত গণহত্যা করতে দেব? ফিলিস্তিন মুক্ত হোক।’”

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘লম্বা ক্যারিয়ারে সুলেইমান আল–ওবেইদ ১০০–এর বেশি গোল করে ফিলিস্তিন ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকায় পরিণত হয়েছিলেন।’ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খেলাধুলা ও স্কাউটিং–সংশ্লিষ্ট পরিবারে শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬৬২, যেটা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্মূলীকরণ যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন–সংশ্লিষ্ট মৃত মানুষের সংখ্যা ৩২১। এর মধ্যে রয়েছেন খেলোয়াড়, কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, রেফারি ও ক্লাবের বোর্ড সদস্য।’

তবে গত ২৩ জুলাই পিএএফের এক্সে করা পোস্টের বরাত দিয়ে ফুটবলপ্যালেস্টাইন ওয়েবসাইট জানিয়েছে, গত ৬৬৯ দিনে ইসরায়েলের হামলায় ৪০০–এর বেশি ফুটবলার নিহত হয়েছেন। সেই পোস্টে তখন জানানো হয়েছিল, সর্বশেষ ৬৫৬ দিনে খেলাধুলা ও স্কাউটিং–সংশ্লিষ্ট ৮০০–এর বেশি নিহত হয়েছেন ইসরায়েলের হামলায়।

গত ২৯ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফিলিস্তিন অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছে, শুধু জুলাই মাসেই গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের হামলায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি অ্যাথলেট নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘একেকটি দিন যায় আর ফিলিস্তিনের ক্রীড়াঙ্গনে বিয়োগান্ত ঘটনার নতুন অধ্যায় যোগ হয়।’

গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি; তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম প্রেসটিভি।

সুলেইমান আল–ওবেইদ
সুলেইমান আল–ওবেইদ। এক্স

ফিলিস্তিনি কিশোরের চোখে গুলি, গাজায় চরম দুর্ভিক্ষ

খাদ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া গাজার এক কিশোর আব্দুর রহমান আবু জাজারের চোখে গুলি করেছে ইসরাইলি সেনারা। এতে সে তার বাম চোখের দৃষ্টি হারাতে বসেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১১৯ জনের মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপ বা ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাত্র একদিনেই ইসরাইলিরা কমপক্ষে ৯২ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে ৫৬ জন খাদ্যের খোঁজে বেরিয়েছিলেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। অবরুদ্ধ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় মানুষ এখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় জীবন যাপন করছে। তারা পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষের শিকার।

১৫ বছর বয়সী আবু জাজার বলেন, আমি ভেবেছিলাম এটা আমার শেষ মুহূর্ত। মৃত্যুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে এক চোখে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা আবু জাজার জানালেন, তিনি রাত ২টার দিকে খাদ্য বিতরণ পয়েন্টে যান। বলেন, এই প্রথমবার আমি ওদিকে গিয়েছিলাম। ভাইবোনদের জন্য কিছু খাবার জোগাড় করতে গিয়েছিলাম। ঘরে কিছুই নেই। তিনি জানিয়েছেন, পাঁচ ঘণ্টা পর গাজা শহরের আশপাশের আল-মুনতাযাহ পার্ক পর্যন্ত পৌঁছান। বলেন, তখন আমরা দৌড়াচ্ছিলাম আর ওরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। আমি আরও তিনজনের সঙ্গে ছিলাম, তিনজনই গুলিবিদ্ধ হয়। হঠাৎ মনে হল আমার শরীর দিয়ে বিদ্যুৎতের মতো কিছু বয়ে বেড়াচ্ছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল কেউ আমাকে ইলেকট্রিক শক দিচ্ছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। অচেতন হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে এলে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় আছি। পাশে থাকা  লোকগুলো জানায়, সে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

চিকিৎসক তার চোখের সামনে একটি মোবাইল ফোনের আলো ধরেন এবং জিজ্ঞেস করেন, সে আলো দেখতে পাচ্ছে কিনা। সে কোনো আলো দেখতে পায়নি। চিকিৎসক নিশ্চিত করেন, তার চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা শেষে আবু জাজার বলেন, আল্লাহর রহমতে দৃষ্টিশক্তি ফিরবে বলে আশা করছি। ওদিকে মাত্র একদিনেই ইসরাইলি হামলায় ৯২ জন নিহত হয়েছেন। হাসপাতালের সূত্র অনুযায়ী, ইসরাইলি সেনারা জিএইচএফ পরিচালিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে বারবার গুলি চালাচ্ছে। মে মাসে এই সংস্থা কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে কমপক্ষে ১৩০০ খাদ্যগ্রহীতাকে ইসরাইলি সেনারা গুলি করে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ এবং শিশুদের মৃত্যু
গাজায় প্রতিদিন খাদ্যের জন্য হাহাকার বাড়ছে। ইতিমধ্যে ১৭৫ জন, যার মধ্যে ৯৩ জন শিশু, দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কারণে মারা গেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংস্থাসমূহের সমন্বয়ে গঠিত গ্লোবাল নিউট্রিশন ক্লাস্টার জানিয়েছে, ৬০০০-এর বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। আল জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি দিয়ের আল-বালাহ থেকে বলেন, প্রতিদিন মাত্র ৮০ থেকে ১০০ ট্রাক ত্রাণ গাজায় প্রবেশ করছে, যা পুরো জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল। ইসরাইলের তথাকথিত মানবিক বিরতি যে কার্যত মিথ্যা, সেটাই প্রমাণ হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মানুষ এক বস্তা গমের জন্য যুদ্ধ করছে, একটা খাদ্য প্যাকেটের জন্য হন্যে হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন শুধু খাবার না পাওয়ার যন্ত্রণা নয়, বরং খাদ্য ট্রাকের কাছে গেলেও মানুষ গুলি খাচ্ছে। মানে শুধু ক্ষুধার মৃত্যু নয়, বরং ক্ষুধা মেটাতে গিয়েও ফিলিস্তিনিরা প্রাণ হারাচ্ছেন।

mzamin

ত্রাণ নিতে গিয়েছিল শিশুটি, চোখে গুলি ছুড়ল ইসরায়েলি সেনারা

আবদুল রহমান আবু জাজারের বয়স ১৫ বছর। ক্ষুধায় কাতর পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবারের সন্ধানে বেরিয়েছিল শিশুটি। কিন্তু কপাল মন্দ। চোখে গুলিবিদ্ধ হয়েছে জাজার। ঘটনাটি ঘটেছে ফিলিস্তিনের গাজা নগরীতে। জাজারের বাঁ চোখে গুলি করেছেন ইসরায়েলি সেনারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণকেন্দ্রে গিয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ জাজারের চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, নির্বিচার বোমা হামলার শিকার অবরুদ্ধ গাজার বাসিন্দারা অনাহারে রয়েছেন।

বাঁ চোখে সাদা রঙের ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা জাজার আল-জাজিরাকে জানায়, একবার গুলি লাগার পরও ইসরায়েলি সেনারা তাঁকে লক্ষ্য করে অনবরত গুলি ছুড়তে থাকেন। তখন জাজারের মনে হয়েছিল, ‘এই বুঝি শেষ। মৃত্যু সন্নিকটে।’

দিবাগত রাত প্রায় দুইটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল বলে জানায় জাজার। সে বলে, ‘এবার প্রথম আমি ত্রাণ সরবরাহকেন্দ্রে গিয়েছিলাম। আমার ও ভাইবোনদের খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। আমরা খাওয়ার জন্য কিছুই পাইনি। তাই সেখানে গিয়েছিলাম।’

অনেক ভিড়ের মধ্যে গাজা নগরীর আল-মুনতাজাহ পার্কের ওই কেন্দ্রে পৌঁছাতে জাজারের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। জাজার বলে, ‘আমরা দৌড়াচ্ছিলাম। ঠিক তখন ওরা (ইসরায়েলি সেনারা) গুলি করা শুরু করে। আমি আরও তিনজনের সঙ্গে ছিলাম। তিনজন আহত হই।’

জাজার আরও বলে, ‘গুলি চালানোর পরপরই শরীরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো কিছু অনুভব করলাম। এরপর আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি, জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফেরার পর আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করেছি, আমি কোথায়?’

তখন আশপাশের লোকজন জাজারকে জানান, সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। জাজার আরও বলে, ‘ওরা অনবরত গুলি ছুড়ছিল। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। দোয়া পড়ছিলাম।’

জাজারের চোখে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। তবে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে শিশুটি বলে, ‘আশা করি, আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে।’

বাঁ চোখে গুলিবিদ্ধ ফিলিস্তিনি কিশোর আবদুল রহমান আবু জাজারের অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে
বাঁ চোখে গুলিবিদ্ধ ফিলিস্তিনি কিশোর আবদুল রহমান আবু জাজারের অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

নেতানিয়াহুর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের কাছে ইসরায়েল এখন বর্জনীয় রাষ্ট্র: বেনেট

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

২০২১ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিউ রাইট পার্টির এই নেতা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। গতকাল তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও কট্টর ডানপন্থী লিকুদ পার্টির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তাঁরা ইসরায়েলকে ‘বর্জনীয়’ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন।

বেনেটের মতে, নেতানিয়াহুর সরকারের কার্যক্রমের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ আরও বাড়ছে। নেতানিয়াহু সরকার ইসরায়েলের পক্ষে প্রচার চালানোর কাজটিও ঠিকভাবে করছে না বলে মনে করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসিসহ কয়েকটি শহরে ১০ দিন কাটানোর পর এসব মন্তব্য করেন বেনেট।

সাবেক এ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নানা সমস্যা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকটের জন্য এখন ইহুদিদের দোষারোপ করা হচ্ছে। দুই পক্ষের রাজনীতিবিদেরাই এ দোষারোপ করছেন।

বেনেটের দাবি, তিনি তাঁর জীবনে কখনো এমন ভয়াবহ মাত্রার ইহুদিবিদ্বেষের ঢেউ দেখেননি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দুই দলেরই সমর্থন হারাচ্ছে ইসরায়েল।

বেনেটের দাবি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের অনেক সদস্য ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এ ছাড়া গাজায় ফিলিস্তিনিদের চলমান অনাহারের কারণে বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর পক্ষেও ইসরায়েলকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য–উপাত্তও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নিয়ে বেনেটের মূল্যায়ন সঠিক।

গ্যালাপের একটি নতুন জরিপে দেখা গেছে, ৩২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে সমর্থন জানাচ্ছেন। যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১০ শতাংশ কম।

২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত করা ওই জরিপের তথ্য বলছে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। ৫২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক নেতানিয়াহুকে নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, যা দেড় বছর আগের তুলনায় অনেক বড় পরিবর্তন।

গ্যালাপ বলছে, এর আগে ১৯৯০-এর দশক থেকে চালানো বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রতি এতটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়নি। তারা বলেছে, ক্রমাগত ভাবমূর্তির অবনতি হচ্ছে।

বেনেট মনে করেন, ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণ গাজার যুদ্ধ নয়; বরং দেশের প্রচারণার কাজ ঠিকমতো না হওয়া।

বেনেট বলেন, ‘আমার মনে হয় সরকার এখনো বিপর্যয়ের মাত্রাটা বুঝতে পারেনি। আর সে কারণে দুই বছর হয়ে গেলেও আমরা কোনো তথ্যকেন্দ্র করতে পারিনি, আমাদের কাছে উত্তর নেই, কিছুই নেই। আমাদের বন্ধুরা তথ্য চাইছেন, সত্য জানতে চাইছেন, জবাব চাইছেন; কিন্তু আমরা কিছু বলতে পারছি না। তাঁরা তো জানেন না কাকে ফোন করবেন।’

নেতানিয়াহুর দপ্তরের কর্মকর্তাদেরও আক্রমণ করেছেন বেনেট। তাঁর অভিযোগ, নেতানিয়াহুর দপ্তরে তথ্যসংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা কাতার থেকে অর্থ নিচ্ছেন।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নেতানিয়াহুর দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে কাতারের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রয়েছে। ওই দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, মানি লন্ডারিং, ঘুষ গ্রহণ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। ফাইল ছবি: এএফপি

ঐতিহাসিক মিসাইল চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালো রাশিয়া

আমেরিকা ও রাশিয়া একে অপরের বিরুদ্ধে পরমাণু যুদ্ধ ঘোষণার মেজাজে। সম্প্রতি দু’টি মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিনকে রুশ জলসীমার কাছে মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এবার পালটা আমেরিকার সঙ্গে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের নিষেধাজ্ঞা মানবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সোভিয়েত যুগের চুক্তির প্রতি বাধ্যতামূলক শর্তগুলো বর্তমানে আর নেই। মস্কো আর পূর্ববর্তী বিধিনিষেধগুলো মানতে বাধ্য নয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলোই ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি অস্থিরতা তৈরি করছে। যা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির। এই অবস্থায় আমেরিকার সঙ্গে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। একাধিক পথে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন ট্রাম্প। একদিকে যেমন ভারতসহ রাশিয়ার বাণিজ্যবন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে বাড়তি শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছেন, তেমনই সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্র মেদভেদেভের যুদ্ধবিষয়ক মন্তব্যের পর দু’টি মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিনকে রুশ জলসীমার কাছে ‘উপযুক্ত অঞ্চলে’ মোতায়েনের নির্দেশ দেন। এরই পালটা এলো মস্কোর তরফ থেকে।

রাশিয়ার দাবি, পাশ্চাত্যের দেশগুলোই ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি করছে। যা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকির। এই অবস্থায় আমেরিকার সঙ্গে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তি (আইএনএফ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) চুক্তি ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তৎকালীন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান এই চুক্তির মাধ্যমে ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করার বা পরীক্ষা করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

চুক্তির অংশ হিসেবে উভয় পক্ষের ২,৬০০ টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, যা পারমাণবিক এবং প্রচলিত উভয় ধরনের ওয়ারহেডকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আকাশ থেকে নিক্ষেপিত বা সমুদ্র থেকে নিক্ষেপিত অস্ত্রের আওতায় পড়ে না। ‘কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি’ নামে পরিচিত নতুন ‘স্ট্রাটেজিক আর্মস রিডাকশান ট্রিটি’ চুক্তিটি রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শেষ প্রধান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি। ২০১০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে। এটি ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হয়।

সূত্র: আলজাজিরা

mzamin

ইসরায়েল গাজা পুরোপুরি দখল করবে কি না, সেটি তার ব্যাপার: ট্রাম্প

ফিলিস্তিনের গাজা পুরোপুরি দখল করতে চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে বাধা না দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকেরা জানতে চান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা পুরোপুরি দখলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না—এমন খবর নিয়ে তাঁর কী মত। জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি এখন গাজার মানুষের ‘খাবারের ব্যবস্থা’ নিয়ে বেশি মনোযোগী।

ট্রাম্প বলেন, ‘বাকিটা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারি না। এটা মূলত ইসরায়েলের বিষয়।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল গাজায় নজিরবিহীন ও নৃশংস তাণ্ডব শুরু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে প্রতিবছর দেওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা আরও বাড়িয়েছে।

ইসরায়েল গাজার অধিকাংশ অংশকে সামরিক এলাকা ঘোষণা করে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে এনে সীমিত কিছু জায়গায় গাদাগাদি করে রেখেছে। ফলে এ উপত্যকার প্রায় ৮৬ শতাংশই এখন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে।

তবে অবশিষ্ট যেসব এলাকায় এখনো সামরিক অভিযান হয়নি, সেখানেও সেনা অভিযান চালালে ফিলিস্তিনিদের জীবন আরও হুমকির মুখে পড়বে। কারণ, প্রতিদিন বোমা হামলার পাশাপাশি ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজার মানুষ চরম খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

নেতানিয়াহু গাজা পুরোপুরি দখলের যে পরিকল্পনা করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে, তাতে হামাস ও অন্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর হাতে আটক ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মিরোস্লাভ জেনচা গতকাল সতর্ক করে বলেন, গাজা পুরোপুরি দখলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ ডেকে আনতে পারে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জেনচা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এ বিষয়ে স্পষ্ট। গাজা একটি ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সেটি এমনই থাকতে হবে।

২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে তাদের সেনা ও বসতি তুলে নেয়। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল গাজার আকাশপথ, উপকূলীয় জলসীমা ও প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করায় অঞ্চলটি তখনো ‘কার্যত দখলাধীন’ অবস্থায় ছিল।

২০২৩ সালের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই উগ্রপন্থী ইসরায়েলি নেতারা গাজায় আবার সামরিক ঘাঁটি ও বসতি গড়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

নেতানিয়াহু সম্প্রতি বলেছেন, ইসরায়েল গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দিতে চায়। তাঁর এ পরিকল্পনা জাতিগত নিধনের শামিল। এ পরিকল্পনাকে গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প নিজেও সমর্থন করেছিলেন।

তখন ট্রাম্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন, গাজা খালি করে সেখানে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ (সৈকতের অবকাশ শহর) তৈরি করা যেতে পারে।

গাজায় আরও বড় পরিসরে সেনা অভিযান চালাতে চায় ইসরায়েল—সম্প্রতি এমন খবরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, গাজায় এখন নিহত মানুষের সঙ্গে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি তীব্র খাদ্যসংকট ছড়িয়ে পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবেশ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত সংস্থা গ্লোবাল হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) পরিচালিত কিছু কেন্দ্রই এখন ফিলিস্তিনিদের খাদ্যের একমাত্র উৎস।

তবে বিতর্কিত সংস্থাটির কেন্দ্রগুলোর দিকে খাবার আনতে গিয়ে শত শত ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এ সংস্থাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। যদিও জাতিসংঘকে সহায়তা বিতরণের অনুমতি দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী আহ্বান চলছে।

সম্প্রতি ইসরায়েল কিছু খাদ্যবাহী ট্রাক ও আকাশপথে ত্রাণ সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে। তবে এখনো এসব সহায়তা গাজার বাসিন্দাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

উত্তর গাজায় জিএইচএফের কেন্দ্রগুলোর বাইরেও ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

গতকাল ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজায় মানবিক সহায়তা হিসেবে ছয় কোটি ডলার দিয়েছে। এর মধ্যে তিন কোটি ডলার গেছে জিএইচএফের তহবিলে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা জানেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি গাজায় ছয় কোটি ডলার দিয়েছে। এতে প্রচুর খাবার পাঠানো হয়েছে। বাস্তবে অনেক খাবারই পাঠানো হয়েছে। কারণ, গাজার মানুষ খাবারের দিক দিয়ে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি জানি, ইসরায়েল এ সহায়তা বিতরণে আমাদের সাহায্য করবে। অর্থের দিক থেকেও সাহায্য করবে। আমাদের সঙ্গে আরব দেশগুলোও আছে। তারাও অর্থ দিয়ে ও সম্ভবত বিতরণেও আমাদের সাহায্য করবে।’

প্রসঙ্গত, ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর তাদের হামলায় এখন পর্যন্ত ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজায় যা ঘটছে, তা গণহত্যার শামিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

ইসরাইল গাজা দখল করে নিলে বাধা দেবেন না ট্রাম্প

ইসরাইল যদি পুরো গাজা ভূখণ্ড দখল করতে চায়, তবে তাতে বাধা দেবেন না যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মূলত গাজাবাসীর জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, বাকি বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি কিছু বলতে পারি না। সেটি অনেকটাই ইসরাইলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

উল্লেখ্য, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অনেকবার গাজাকে দখল করে নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি গাজাকে এক ‘জনবিচ্ছিন্ন দ্বীপে’ পরিণত করার হুমকি দেন। তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গাজাকে খালি করে সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের ‘রিভেরা’ বানানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনিও গাজাকে দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা দেন। সম্প্রতি গাজায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষাবস্থা দেখা দিয়েছে তাতে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্স, বৃটেন সহ আরও কিছু দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘ বার বার সতর্ক করছে। বলছে, গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। শিশুরা অনাহারে মারা যাচ্ছে। মানুষ খাবারের জন্য পাগলের মতো আচরণ করছে। কিন্তু তাতে নেতানিয়াহু বা ডনাল্ড ট্রাম্প কারো টনক নড়ছে না। তবে এরই মধ্যে গাজার মানুষ অনাহারে থাকার কথা স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলকে বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরাইল তাদের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বর্তমানে গাজার ৮৬ শতাংশ ভূখণ্ড পরিণত হয়েছে সামরিক এলাকায়। এই সংকুচিত অঞ্চলে ইসরাইল যদি সামরিক অভিযান আরও বাড়ায়, তবে তা গাজাবাসীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা পুরোপুরি দখল করার পরিকল্পনা করছেন। সেই খবরও নানা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সেখানে এখনও হামাস ও অন্য গোষ্ঠীর হাতে বন্দি থাকা ইসরাইলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের শীর্ষ কর্মকর্তা মিরোস্লাভ জেনকা মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, গাজার পূর্ণ দখল বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এই বিষয়ে স্পষ্ট। গাজা ভবিষ্যত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই থাকতে হবে। ২০০৫ সালে ইসরাইল গাজা থেকে সেনাবাহিনী ও বসতি প্রত্যাহার করলেও, আন্তর্জাতিক আইনবিদদের মতে গাজা এখনো ‘কার্যত দখলকৃত’ অঞ্চল। কারণ ইসরাইল এখনও গাজার আকাশপথ, জলসীমা এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

২০২৩ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ডানপন্থী ইসরাইলি নেতারা আবার গাজায় সেনা উপস্থিতি ও বসতি স্থাপন পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। এমনকি নেতানিয়াহু নিজেও ইঙ্গিত দেন, তিনি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ সরিয়ে দিতে চান- যা এক প্রকার জাতিগত নিধন হিসেবেই বিবেচিত হবে। এই পরিকল্পনার সঙ্গে আগেই একমত হন ট্রাম্পও। তিনি ফেব্রুয়ারিতে মন্তব্য করেন, গাজা থেকে সমস্ত জনগণকে সরিয়ে সেখানে একটি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’ নির্মাণ করা যেতে পারে। এদিকে গাজায় ইসরাইলের সম্ভাব্য আরও বড় মাপের স্থল অভিযান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ সেখানে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্চ মাস থেকে ইসরাইল প্রায় সব ধরনের ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে মার্কিন-সমর্থিত জিএইচএফ-এর পরিচালিত সহায়তা কেন্দ্রগুলোই একমাত্র খাদ্য প্রাপ্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় বহু ফিলিস্তিনি ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তবুও যুক্তরাষ্ট্র জিএইচএফকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জাতিসংঘকে সহায়তা বিতরণের দায়িত্ব দিতে আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু তাতে কেউ কান দিচ্ছে না।

কয়েক দিনে ইসরাইল কিছু ট্রাক এবং বিমান থেকে খাদ্য বিতরণের অনুমতি দিলেও এই সহায়তা গাজার বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। এ অবস্থায় মঙ্গলবার ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, তার প্রশাসন গাজায় খাদ্য সহায়তার জন্য ৬০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০ মিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে জিএইচএফকে। তিনি বলেন, আমরা সম্প্রতি গাজাবাসীর জন্য প্রচুর খাদ্য, সত্যি বলতে প্রচুর সরবরাহের জন্য ৬০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছি। তারা যে ভালো অবস্থায় নেই, সেটি সবার জানা। ট্রাম্প আরও বলেন, আমার মনে হয় ইসরাইল আমাদের সঙ্গে এই সহায়তা বিতরণে এবং অর্থায়নে সহযোগিতা করবে। এছাড়া আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও অনেকে অর্থায়ন ও বিতরণে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

mzamin