Sunday, February 25, 2018

রাখাইনে আছে মাত্র ৭৯ হাজার রোহিঙ্গা -ইরাবতির প্রতিবেদন

ফাইল ছবি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত বছরের আগস্টে অভিযান শুরুর পর থেকেই প্রাণ বাঁচাতে প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ পালিয়ে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তির পরও তাদের আসা বন্ধ হয়নি। গতকাল শনিবার মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাখাইনে বসবাসরত তিনটি শহরের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯০ শতাংশকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে সেনাবাহিনী। ২৫ আগস্টের পর ওই অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান জোরদার করলে ৬ লাখ ৮৮ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখন রাখাইনের তিনটি শহরে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা মাত্র ৭৯ হাজার ৩৮ জন। সরকারি ও আন্তর্জাতিক এনজিও সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যমটি।
ইরাবতি উদ্বাস্তু হওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বের করতে রাখাইনের তিনটি শহরের সরকারি প্রতিবেদন সংগ্রহ করে করেছে। ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে রাখাইনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট (জিএডি)।
এটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। জিএডির প্রতিবেদন ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি জিএডির প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরের জাতিসংঘের মানবিক সহযোগিতাবিষয়ক সংস্থা ওসিএএইচএর তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পর্যালোচনা করেছে। ওসিএইচএর তথ্যমতে, ২৫ আগস্ট থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ লাখ ৮৮ হাজার পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত করা হয়েছে।
জিএডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর নিপীড়ন শুরুর আগে মংডু, বুথিডং ও রাথিডংয়ে ৭ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাস করত। মংডুর একজন সরকারি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, এই পরিসংখ্যান ২০১৬ সালে সংগ্রহ করা। এ তথ্যের সঙ্গে ওসিএইচএর আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধনের তথ্য পর্যালোচনা করে বলা হয়, ওই সব এলাকা থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ রোহিঙ্গাকেই দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ এখনও সেখানে রয়েছে। তবে এই ৯০ শতাংশের মধ্যে যারা মারা গেছেন, নিখোঁজ হয়েছেন বা গ্রেফতার হয়েছে তাদের ধরা হয়নি।
পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, আক্রান্ত এলাকাগুলো থেকে যে ১০ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে  আসেননি, তাদের সংখ্যা ৭৯ হাজারের মতো। ফলে বাকি প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজারকেই জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। জিএডির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাথিডংয়ের ৬ শতাংশ, বুথিডংয়ের ৮৪ শতাংশ ও মংডুর ৯৩ শতাংশ জনসংখ্যাই ছিল রোহিঙ্গা। প্রতিবেদনে অবশ্য তাদের 'রোহিঙ্গা' বলে উলেল্গখ করা হয়নি। ওই প্রতিবেদনে তাদের 'বাংলাদেশি' লেখা হয়েছে।
জিএডির প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে উলেল্গখ করা হয়নি- প্রতিটি শহরে রোহিঙ্গা ও রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর কতটি গ্রাম রয়েছে। এতে শুধু মোট গ্রামের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। মংডু ও বুথিডংয়ের জিএডি কর্মকর্তাদের মতে, মংডুর ৩৬৪টি গ্রামের মধ্যে ২৭২টি রোহিঙ্গাদের, যা ওই এলাকার মোট গ্রামের ৭৪ শতাংশ। সেনাবাহিনীর নির্মূল অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অন্তত ৭০টি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। বুথিডংয়ের ৩৩৯টি গ্রামের মধ্যে ১৩৭টিই রোহিঙ্গাদের, যা শহরটির মোট গ্রামের ৫১ শতাংশ। শহরটির এক উচ্চপদস্থ জিএডি কর্মকর্তা জানান, এখানকার অন্তত ৩০টি গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে।
রাথিডংয়ে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সংখ্যাগুরু। আগস্টের সহিংসতা শুরুর আগে সেখানে ২২টি রোহিঙ্গা গ্রাম ছিল। রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে জানা যায়, সেখানে এখন মাত্র দু-তিনটি গ্রাম টিকে আছে। বাকিগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে তোড়জোড়ের মধ্যেই বাংলাদেশে অবস্থানরত ডক্টরস উইদাউথ বর্ডার্সের জরুরি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সমন্বয়ক কেট নোলার জানান, এখনও প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশে শতাধিক রোহিঙ্গা আসছেন। তিনি বলেন, আগের মতো বিশাল সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের ঢল না নামলেও এখনও প্রতি সপ্তাহেই এ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা নাফ নদ পাড়ি দিয়ে প্রবেশ করে চলেছেন। তারা রাখাইনে নিজেদের বাড়িতে নিরাপদ বোধ করেন না। সেখানে তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়।
রাখাইনে ৩ বোমার বিস্ম্ফোরণ : এদিকে বিবিসির খবরে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তেতে তিনটি বোমা বিস্ম্ফোরিত হয়েছে। এতে এক পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হন। গতকাল ভোরে সিত্তে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণসহ আশপাশের এলাকায় এ বিস্ম্ফোরণ ঘটে। এ হামলার পেছনে কে বা কারা রয়েছে, তা জানার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। মাত্র তিন দিন আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাশিওতে এক বিস্ম্ফোরণে নিহত হন দু'জন ব্যাংক কর্মকর্তা।।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ চালানো রাখাইন রাজ্যের রাজাধানী সিত্তে। এই রাজ্যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কথিত হামলার জবাবে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

পাকিস্তান মডেল? -আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়

১৯৫০-এর দশকের গোড়ায় লাহৌরে সামপ্রদায়িক সংঘাত এমন মাত্রায় পৌঁছাইয়াছিল যে, শেষ অবধি সেনার ডাক পড়িল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনিবার পর সেনাদের যখন ব্যারাকে ফিরিয়া যাওয়ার পালা, তখন সেই বাহিনীর প্রধান নাকি একটি অনুরোধ করিয়াছিলেন- বাহিনীকে বাড়তি দুইদিন লাহৌরে রাখিবার অনুমতির অনুরোধ। সম্মতি মিলিলো। সেই দুইদিনে শহর পরিষ্কার করিয়া, ভাঙা রাস্তা সারাইয়া, গাছ পুঁতিয়া, বেআইনি কাঠামো ভাঙিয়া শহরের চেহারা পালটাইয়া দিয়া ফিরিয়া গেল সেনাবাহিনী। মানুষ অতি খুশি। কয়েক বৎসর পর, ১৯৫৮ সালে, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল যখন গণতান্ত্রিক শাসনকে সরাইয়া সামরিক শাসন চালু করিবার হুকুম দিলেন, মানুষ অসন্তুষ্ট হয় নাই।
সেই সামরিক শাসনের ট্র্যাডিশন- রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ- শেষ অবধি পাকিস্তানকে কোথায় লইয়া গিয়াছে, জানিতে গবেষণা করিতে হয় না। ভারত ও পাকিস্তান-  ১৯৪৭-এর আগস্টের দুই জাতকের যাত্রাপথ গত সাত দশকে যতখানি ভিন্ন হইয়াছে, রাজনীতির সহিত সামরিক বাহিনীর নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিতে পারা এবং না পারা তাহার অন্যতম কারণ। লাহৌরের আখ্যানটি জরুরি, কারণ সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীকে কোন চোখে দেখিতেছে, তাহা যে নির্ণায়ক হইতে পারে না, এই আখ্যানটি সেই সাক্ষ্য দেয়। জওহরলাল নেহরুর ভারত সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও উচ্চাশা হইতে দূরে রাখিতে পারিয়াছিল। নরেন্দ্র মোদির ভারত কি নেহরু যুগের সেই অভিজ্ঞানটিকেও মুছিয়া দিতে তৎপর? ‘পাকিস্তান মডেল’-ই তাহার লক্ষ্য?
‘যে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতার উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করা চলে না, সেই বাহিনী দেশের পক্ষে অতি বিপজ্জনক।’ ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের এক সমাবেশে এই কথাগুলো বলিয়াছিলেন জওহরলাল নেহরু। বিপিন রাওয়াত তখনও জন্মান নাই। কিন্তু, কথাগুলো নিশ্চয় তাহার শোনা। সেনাবাহিনীকে কেন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই থাকিতে হইবে, কেন সেনার রাজনৈতিক উচ্চাশা থাকিতে পারে না- সে বিষয়ে ভারতে এতদিন নেহরুর মতবাদই গ্রাহ্য ছিল। সরকারের সামান্য সমালোচনা করিয়া জেনারেল কারিয়াপ্পা নেহরুর নিকট তিরস্কৃত হইয়াছিলেন এবং সেই তিরস্কারই সম্পর্কের সুর বাঁধিয়া দিয়াছিল। সেনাবাহিনী কখনও সীমারেখা অতিক্রম করে নাই। রাওয়াত অসমে গিয়া যে মন্তব্যগুলো করিয়া আসিলেন, তাহাতে এই রেখা ভাঙিবার চেষ্টাটি স্পষ্ট। এই প্রথম কোনো সেনাপ্রধানের বক্তব্যে ধর্মীয় বিভাজন এতখানি প্রকট, রাজনৈতিক আনুগত্যের সংকেত এত তীব্র। অনুমান করা চলে, সীমা অতিক্রম করিবার ছাড়পত্র তিনি প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানে পড়িয়া লইয়াছেন।
 সেনাপ্রধানের অনধিকারচর্চায় প্রধানমন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানান নাই। জানাইবেন, সেই ভরসাও ক্ষীণ। তাহার আমলে ভারতে সেনাবাহিনীর- অথবা, ‘সিয়াচেনের ঠাণ্ডায় দেশের সীমান্ত রক্ষায় অতন্দ্র জওয়ানের’- রাজনৈতিক ব্যবহার নজিরবিহীনভাবে বাড়িয়াছে। মানুষের মনে সেনাবাহিনীর প্রতি যে শ্রদ্ধা আছে, তাহাকে নিজেদের দিকে টানিয়া লইবার জন্য বিজেপির নেতারা সুকৌশলে সেনা ও সরকারের পরিচিতিকে ‘অদ্বৈত’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিতে চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। জেনারেল ভি কে সিংহের মন্ত্রিত্বপ্রাপ্তিও বেনজির- সেনাপ্রধানের রাজনৈতিক উচ্চাশার এহেন স্বীকৃতি ভারত আগে কদাপি দেয় নাই। আশঙ্কা, রাওয়াতরা নিজেদের উচ্চাশা পূরণে আরো তৎপর। মোদি ভুলিয়াছেন, সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে সরকার ও সেনার মধ্যবর্তী পাঁচিলটি ভাঙিলে তাহার পরিণতি শেষ অবধি সুখকর হয় না। পাকিস্তান ঠেকিয়া শিখিতেছে। মোদির ভারত কি সেই বহুমূল্য শিক্ষা লইতে চাহে? পাকিস্তানই কি তাহার জীবনের ধ্রুবতারা?

বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের নিন্দা ও সেনাবাহিনীকে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে বলেছে আসু

চীন ও পাকিস্তানের মদদে আসামে তথাকথিত বাংলাদেশীদের অনুপ্রবেশ বিষয়ে ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের মন্তব্যে ভারতের বিভিন্ন মহলে ঝড় বইছে। এর মধ্যে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) এর প্রেসিডডেন্ট বদরুদ্দীন আজমল বলেছেন, আমরা সেনা প্রধানকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এই বিষয়ে তাঁকে ভুল তথ্য দিয়ে ভুল পথে পরিচালনা করা হয়েছে। আমরাই একমাত্র দল যারা বলছে, আমাদের সীমান্তে কেউ অনুপ্রবেশ করে তাহলে গুলি করে তা বন্ধ করা উচিত।  রাওয়াত দাবি করেছেন, আসামে শাসক বিজেপির চেয়ে বদরুদ্দিন আজমলের অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ)-এর প্রভাব বাড়ছে। ভারতকে অস্থির করতে পাকিস্তান ও চীন জোট বেধে বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের আসামে ঢোকাচ্ছে। তিনি অবশ্য সরাসরি চীন ও পাকিস্তানের নাম নেননি।
এদিকে ‘বাংলাদেশী খেদাও’ আন্দোলনের মূল নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম সংগঠন অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) গতকাল গৌহাটিতে এক মিশ্র বিবৃতিতে বলেছে, আসামে অনুপ্রবেশ বন্ধে সেনাবাহিনী প্রধানের বক্তব্য আংশিক সমর্থনের পাশাপাশি বিরোধীতাও করেছে। আবার পৃথক এক বিবৃতিতে তারা জাতীয় নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার বিষয়ে ঢাকায় বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মন্তব্যের সমালোচনা করেছে। গতকাল আসাম ট্রিবিউন এই খবর দিয়ে বলেছে, আসু বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের নিন্দা করে বলেছে, ঢাকার তরফে এধরণের মন্তব্য গ্রহনযাগ্য নয়। আসু মনে করে বাঙলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ বন্ধে সেনাবাহিনীর একটি ভূমিকা আছে। সীমান্ত জুড়ে এবিষয়ে তাঁর উচিত তবে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।  বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, পৃকৃত সত্য হলো প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অনুপ্রবেশ ইস্যুতে একটি সেমিনার আয়োজন করেছিল। এবং সেখানে সেনাবাহিনী প্রধান কিছু উৎসাহব্যঞ্জক পর্যবেক্সণ তুলে ধরেছিলেন। আমরা তার বিবৃতিকে ইতিবাচক অগ্রগতি বলে মনে করি। আবার সেনা প্রধান যেভাবে অভেধ অভিাবাসীদের সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়ে যে বক্কব্য রেখেছেন, তার আমরা বিরোধীতা করি। সেনা প্রধান অবৈথ অভিবাসনের সমস্যার বিষয়ে বাংলাদেশের ভূমি সংকটের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তিনি দৃশ্যত ভুলে গেছেন যে, যা ঘটছে তা অভেদ অভিাসন। আর সেটা বন্ধ করতে সংবিধান অনুযায়ী তাদেরই দায়িত্ব পালন করার কথা। সেনা প্রধান যেন বলতে চাইছেন যে, ভূমি সংকটের কারণে বাংলাদেশ থেকে মানুষ আসছে সেহেতু আসাম যদি ত্রিপুরায় পরিণত হয় তাহলেও আসামবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সেনা প্রধানের মুখে এধরণের মন্তব্য কেবল সীসান্ত জুড়ে অভেধ অভিাসনকেই আরো উৎসাহিত করতে পারে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সেনা প্রধান বলেছেন, ইন্ডয়ানস এবং নন-ইন্ডয়ানসের মধ্যে কোনো পার্থক্য তৈরি করা উচিত নয়। এধরণের উপদেশ গ্রহণযোগ্য নয়। 
আসু আরো বলেছে, ৮৫৫ জন শহীদের রক্তের বিনিময়ে আসাম চুক্তি হয়েছে, সুতরাং অনুপ্রবেশ সমস্যা এই আসাম চুক্তির আলোকে নিষ্পন্ন হতে হবে। তারা বলেছে, আইএম(ডিটি) অ্যাক্ট বাতিল হওয়ার পরে এআইডিএফ এর জন্ম হয়েছে। সুতরাং এটা সবারাই জানা যে, এই সংগঠনটি সবসময় অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে আসছে।    
এদিকে বিশিষ্ট ভারতীয় ভাষ্যকার মনোজ যোশী ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন, জেনারেল রাওয়াতের বক্তব্য নিঃসন্দেহে এখতিয়ারবহির্ভূত, এমনকি তা অজ্ঞতাপ্রসূত। আসামের রাজনীতিতে কে কত জনপ্রিয় তা নিয়ে তাঁর মন্তব্য করা তার সাজে না। একটি দল অন্যটির চেয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার নানা কারণ থাকতে পারে।  মনোজ যোশী পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, গত তিন বছরের নির্বাচনী ফলাফলে (আসাম বিধানসভার) দেখা যায়, এআইইউডিএফ ও বিজেপি কংগ্রেস এই তিন দলেরই আসন বেড়েছে বা কমেছে। ২০০৬, ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে এআইএইউডিএফ পেয়েছিল যথাক্রমে ৯, ১২.৬ ও ১৩ শতাংশ, বিজেপি পেয়েছিল যথাক্রমে ৯, ১২ ও সাড়ে ২৯ শতাংশ ভোট। আসামে কংগ্রেস কখনও ৪০ ভাগ ভোটও পায়নি। কংগ্রেস পেয়েছে যথাক্রমে ৩১, ৩৯ ও ৩১ শতাংশ ভোট। একসময়ের বড় দল বিজিপির জনপ্রিয়তা কমে ২০০৬ সালে ২০ শতাংশে, ২০১১ সালে ১৬ শতাংশে এবং ২০১৬ সালে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যান্য দলের জনপ্রিয়তাও নিম্মমুখী, কমিউনিস্ট পাটির্র অস্তিত্বই বিলীন হতে চলেছে।
এমন প্রমাণ নেই যা দিয়ে সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত অথবা অন্য কেউ দাবি করতে পারেন যে, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান ও চীন আসামে লোক ঢোকাচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের পুরোটাই কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এবং এরপরও যদি সেনাপ্রধান নিরাপত্তাসংকটের আশঙ্কা করলে তিনি বিএসএফ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে পারেন।  জেনারেল রাওয়াত আগেও বিতর্কিত কথাবার্তা বলেছেন। মনে হচ্ছে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে কৌতূক করছেন। মনে হচ্ছে, সরকার তাঁকে ঠিকমতো তদারকি করছে না।  আবার অবসরের পরে রাজনীতিতে আসার লোভ তিনি সামলাতে পারছেন না। ভারতের জন্য এমন কিছুই ভালো ফল বয়ে আনবে না।
মনোজ যোশী তাঁর নিবন্ধে অবশ্য বলেছেন, বর্তমানে এমন কোনো অবস্থা বিরাজমান নেই, যাতে বাংলাদেশ আসামের এই তথাকথিত অভিবাসীদের নিতে রাজি হবে। সেনাপ্রধান রাওয়াত তাঁর বক্তব্যে অবশ্য এটাও কবুল করেছেন যে, তাদের আর বের করে দেওয়া সম্ভব নয়,তাই তাদের মূল স্রোতে একীভূত করা এবং যারা সমস্যা সৃষ্টিকারী তাদের আলাদা করা দরকার।
আসামে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করার কাজ এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে। কিন্তু এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর কাজের কোনো যোগসূত্র নেই। কাজটি কীভাবে করা হবে, তা সেনাবাহিনীর পরিধিতে পড়ে না। এবিষয়ে  ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য’ না করে বিষয়টিকে সংবেদনশীলভাবে মোকাবেলা করা  জরুরি বলেও তিনি মত দেন।

প্রতিবন্ধী পাঁচ ছেলেকে নিয়ে বিপাকে মোজাম্মেল by শাহ্‌ আলম শাহী

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে একই পরিবারের ৫ প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়েছে একটি পরিবার। চরম দুঃখ-কষ্টে দিনাতিপাত করছে তারা।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার ৪নং আটগাঁও ইউনিয়নের  লোহাগাঁও গ্রাম। গ্রামের মৃত এমারউদ্দীনের ছেলে মোজাম্মেল হক ওরফে বুধু। আর বুধুর পরিবারে ৫ প্রতিবন্ধী ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মোজাম্মেল হক ওরফে বুধু ১৯৯৬ সালে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর গ্রামে আবেদ আলীর মেয়ে বিউটি আরা খাতুনকে বিয়ে করে।
বিয়ের কিছুদিন পর তাদের ঘরে এক এক করে ৬টি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। একমাত্র তৃতীয় ছেলে রিয়াদ (১৪) ছাড়া বাকি ৫টি ছেলে সন্তানই শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধীরা হলেন, সবচেয়ে বড় ছেলে বিপ্লব (১৮), মিরাজ ওরফে রাসেল (১৫), রাজু (৯), রিশাত (৭) ও জীবন (৪)। একই পরিবারের ৫টি সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়ায় গ্রামের কিছু কুসংস্কার মনের মানুষ ভালো চোখে দেখে না তাদের। সমাজে তারা ভালোভাবে খেলাধুলা, মেলামেশা এবং চলতে পারে না অনেকের সঙ্গে। অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থেকে সময় কাটাতে হয় তাদের। প্রতিবন্ধী হওয়ায় পিতামাতাকেই দেখাশোনা করতে হয় তাদের। এদিকে সংসারের ৮ জন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে অসহায় পিতা মোজাম্মেল হক বুধুকে কাজ করতে হয় চায়ের দোকানে। প্রতিদিন হাজিরা ২০০ টাকা দিয়ে তার সংসার চালাতে হয়। মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে ৮ জন মানুষকে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত দেয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে মোজাম্মেলের। চাষাবাদের জন্য বিঘা খানিক জমি বর্গা চুক্তি দিয়ে চাষও করেন তিনি। জীর্ণশীর্ণ একমাত্র কুঁড়েঘরে একত্রে স্বামী-স্ত্রী ও ৬ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন তারা। একই পরিবারের ৫ জন প্রতিবন্ধী মানুষ থাকার পরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিমুখ আচরণে দীর্ঘদিন ধরে সরকার থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা পায়নি তারা। অবশেষে বোচাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফরহাদ হাসান চৌধুরী ইগলুর প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে মিরজা ওরফে রাসেল মাসিক ৫০০ টাকা ও ২০১৭ সালের জুলাই মাস থকে বিব মাসিক ৬০০ টাকা করে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে। যা থেকে কিছুটা হলেও অভাব লাঘব হয়েছে তাদের।
প্রতিবন্ধীদের মা বিউটি খাতুন জানান, একটি স্বাভাবিক সন্তান মানুষ করতেও খুব কষ্ট করতে হয় কিন্তু পরপর ৫টি প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে যে কি অমানুষিক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা কেউ অনুভব করেনা! আমার প্রতিবন্ধী ৫ সন্তান যে কি শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের সঙ্গে কেউ মিশতে চায় না। খেলাধুলা করে না। বাড়ির বাইরে গেলে অন্যরা তাদের দেখে বিরূপ মন্তব্য করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী হলেও তাদের  বোঝা হিসেবে না নিয়ে অন্যান্য স্বাভাবিক সন্তানের মতোই মানুষ করতে হচ্ছে তাদের। সমাজের কিছু মানুষ নানা রকম কটূক্তি করে। সহ্য করেই শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে দিন পার করতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্ম নিলেও প্রতিটি সন্তানকেই মায়ের মমতা দিয়ে ভালোবাসি আমি। তাদের লেখাপড়া জন্য ভর্তি করে দিয়েছি হাট মাধবপুর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে। সপ্তাহে ৫ দিন স্কুলের অটোতে করেই নিজেই ৫ সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাই ও নিয়ে আসি। তারা এখন স্কুলে যেতে পেরে খুব খুশি। স্কুলে খেলার সাথী ও শিক্ষকদের সঙ্গে মিশতে পেরে তারা এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। প্রতিদিন বাড়িতেও পড়াতে বসাই তাদের।
বাবা-মায়ের ইচ্ছা যতটুকু সম্ভব লেখাপড়া করে তারা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের সমাজে বোঝা নয় সম্পদ হিসেবে দেখার কারণে এই পরিবারটির মনে আশা জেগেছে তাদের বাকি তিনটি সন্তানই প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন।
লোহাগাঁও গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক মিজানুর রশিদ জানান, বর্তমান সরকার যেভাবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে এগিয়ে এসেছে, তাতে আমরা আশাবাদী এই পরিবারটির দীর্ঘদিনের অভাব অনটন দূর হবে। শুধু সরকার নয়, সমাজের বিত্তবান মানুষকে এদের পাশে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ৪নং আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কফিল উদ্দীন জানান, আমরা এই অসহায় পরিবারটির পাশে আছি এবং থাকবো। এদের জন্য যা করার দরকার আমাদের পরিষদ তা করবে। বোচাগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আহসান হাবিব জানান, একই পরিবারের ৫ জন প্রতিবন্ধী একটি ব্যতিক্রম বিষয়। ইতিমধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর বোচাগঞ্জ অফিস থেকে দুজনের ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাকি তিন জনকেও ভাতার আওতায় আনা হবে।
‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনে জন্য’ এই উক্তিটি যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি মন থেকে মনে করেন তাহলে সমাজের অবহেলিত এই অসহায় প্রতিবন্ধীদের পাশে এসে দাঁড়াবেন এটাই কাম্য প্রতিবন্ধী পরিবার ও সচেতন মহলের।

মার্চেই মধ্যম আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বের সামনে মাথা নিচু করে বাঁচতে চাই না, আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচব ইনশাআল্লাহ। রোববার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসির প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৫ ও ২০১৬ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
এ বছর পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ নিজ অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ২৬৫ শিক্ষার্থীকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়। এর মধ্যে ২০১৫ সালের জন্য ১২৪ ও ২০১৬ সালের জন্য ১৪১ শিক্ষার্থী এ পদকে ভূষিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষাই উন্নত জাতি গড়তে পারে। দেশে কোনো ব্যক্তিই নিরক্ষর থাকবে না। সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কোনো শিক্ষার্থীকে যাতে বসে থাকতে না হয়, সে জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে সরকার। শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ১৯৯৬ সালে একটিমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। আমরা এখন প্রতিটি জেলায় ক্রমান্বয়ে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা কৃষির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের ঘরের ছেলেরা যাতে ঘরে খেয়ে পড়াশোনা করতে পারে তার ব্যবস্থা করছি। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের থেকে মেধাবী। তাদের মেধা বিকাশের চর্চা ও বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। আমরা এর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম।

ভারতের সেনাপ্রধানের মন্তব্য কোনো মানদণ্ডেই স্বাভাবিক নয় -দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘জনসংখ্যাতত্ত্বে বিপর্যয়’ ও একটি ‘পরিকল্পিত অভিবাসন’  নিয়ে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত যে মন্তব্য করেছেন তা কোনো মানদণ্ডেই স্বাভাবিক নয়। প্রকাশ্য জনসভায় রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে থাকার একটি দীর্ঘ ও সুস্থ রীতি আছে ভারতীয় সার্ভিস প্রধানদের। কিন্তু এ সপ্তাহে দিল্লিতে এক সেমিনারে সে অবস্থান থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন বিপিন রাওয়াত। তিনি তখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক, ধর্মীয় পরিচয়, জনসংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে অভিবাসী যাওয়ার দুটি কারণ আছে। তার প্রথমটি হলো, বাংলাদেশের ভেতরে প্রচণ্ড চাপ।
তিনি বলেন, অন্য ইস্যুটি হলো সুপরিকল্পিত অভিবাসন। এটা ঘটার কারণ হলো আমাদের (ভারতের) পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী। এটি একটি প্রক্সি যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, এই কৌশলকে সমর্থন করছে ‘আমাদের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী’। তিনি এর মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে পাকিস্তান ও চীনকে বোঝাতে চেয়েছেন। সেনাবাহিনী একেবারে নীরব থাকে না। তবে তারা এসব ক্ষেত্রে স্বল্পভাষী। এমন বক্তব্য দেয়ার মাধ্যমে তাদের সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার ঘটনা বিরল। প্রকৃতপক্ষে এরকম মন্তব্য করা থেকে নিজেরা বিরত থাকা ভারতীয় গণতন্ত্র ও সেনাবাহিনী উভয়ের জন্যই সুখকর। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশও স্বাধীনতা অর্জন করে। তাদের তুলনায় ভারত সেনাবাহিনীকে সফলতার সঙ্গে রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছে। এ বিষয়টি পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয়।
সরকার থেকে আলাদা করার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। জনগণের আস্থা অর্জন করছে তারা। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও উপ-আঞ্চলিক অস্থিরতার সময়ে তারা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে। তাদেরকে মাঝে মাঝেই এসব কাজে ডাকা হয়। তাই বলে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে দেবে সরকার এমন না। এক্ষেত্রে বাধা রয়েছে। এটা হলো ভারসাম্যতা, যাকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এ জন্যই পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে  জেনারেল রাওয়াতের ‘সম্ভবত’ অপ্রস্তুত পর্যবেক্ষণ দুর্ভাগ্যজনক। তার এ বক্তব্যের ফলে ভারতের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বিরোধিতাপূর্ণ ‘রিজয়েন্ডার’ আসার ঝুঁকি রয়েছে। দেশের ভেতরেই বৈরী প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এরই মধ্যে কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট থেকে। জেনারেল রাওয়াত অভিযোগ করেছেন যে, ভারতীয় জনতা পার্টি যতটা দ্রুত গতিতে আসামে প্রভাব বিস্তার করেছে তার চেয়ে বেশি গতিতে আসামে প্রভাব বিস্তার করছে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট। তাই জেনারেল রাওয়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন এ ফ্রন্টটির প্রধান মাওলানা বদরুদ্দিন আজমল। তিনি বলেছেন, সংবিধান যতটুকু দায়মুক্তি দেয় তার চেয়ে অনেক বেশিদূর গিয়েছেন জেনারেল রাওয়াত। আরেকটি রাজনৈতিক দলের প্রধান টুইট করেছেন। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে মন্তব্য করা সেনাপ্রধানের কাজ নয়। জেনারেল রাওয়াতের মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে গত মাসে জেনারেল রাওয়াত জম্মু ও কাশ্মীরের সরকারি স্কুলগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি দুটি মানচিত্রের কথা বলেন- ‘একটি হলো ভারতের এবং অন্যটি হলো জম্মু ও কাশ্মীর’। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের শিক্ষামন্ত্রী কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। এমনকি যদি ওই বক্তব্যগুলো ‘গুড ফেইথ’ বা ভালো বিশ্বাস থেকেও দেয়া হয়, তাহলে বিষয়টি হলো, তা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে। এটা সেনাবাহিনীর দৃঢ়তা বৃদ্ধিতে কোনো সহায়ক হবে না। তারা যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি প্রতিষ্ঠান এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে।  
(দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র অনুবাদ)

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ

বর্তমান নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম নয়। ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা মতোই চলছে ওই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এমন নানা অভিযোগ তুলে দেশের বিশিষ্টজনরা স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের তাগিদ দিয়েছেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তারা এ তাগিদ দেন। স্কলার, প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন ‘দ্য ঢাকা ফোরাম’ এ আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে রাজনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাক্তন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ফোরাম প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রদূত এম. সিরাজুল ইসলাম। আলোচনায় বক্তারা নির্বাচন ছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সহ সম-সাময়িক বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন। তারা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। বক্তারা স্পষ্ট করেই বলেন, দেশের স্বার্থেই একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। কিন্তু এমন নির্বাচনের আশা এখনও দেখা যাচ্ছে না মন্তব্য করে তারা বলেন, একদল নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। অন্য দল বন্দী। এমনকি একটি বড় দলের চেয়ারপারসনও জেলে। এতে জনমনে সন্দেহ তৈরির যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে যে সবার অংশগ্রহণ ছাড়াই ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন চায়।
অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, বিদ্যমান পরিবেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো আশার আলো নেই। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া ও নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি আমলে নেয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরিতে এখনও ইসি কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের কোনো তৎপরতাও নেই। বরং তারা বলছে নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করা যাবে না। এটা হতে পারে না। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করা ইসি’র সাংবিধানিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য যা যা করা দরকার, তা-ই তাদের করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতীয় সেনা প্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে হাফিজউদ্দিন খান বলেন, এখনও ওই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ হয়নি, এটা দুঃখজনক।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের  প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী অভিযোগ করেন বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ভারত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন হলে ভারত নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। সেভেন সিস্টারে শান্তি থাকবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যেও এটি বলেছেন। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দীন আহমেদ অবশ্য এখনই হাল ছেড়ে  দেয়া ঠিক হবে না মন্তব্য করে বলেন, সবাই হতাশ হলে চলবে না। আমি আশাবাদী অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে। এটি দেশের জন্যই হতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক অর্জন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ অর্জন ধরে রাখতে হলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতেই হবে। আলাপ-আলোচনার সুযোগ না থাকলে গণতন্ত্র ও সুশাসন থাকবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, আমাদের বড় ব্যর্থতা দেশে সরকার আছে কিন্তু জনগণ ভোট দিতে পারছে না। আমরা এমন এক পদ্ধতি চাচ্ছি, যার দ্বারা জনগণের পার্লামেন্ট গঠিত হয়। বর্তমান অবস্থায় সুশীল সমাজের কিছু করার নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সবাই ভয়ভীতি আর আতঙ্কের মধ্যে আছে। গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে চাটুকার আর দুর্নীতিবাজদের বিজয় হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেখানে জনগণের ভোটের অধিকার থাকে না সেখানে চাটুকারিতা থাকে। দুর্নীতি থাকে। নির্বাচনে চুরি বা দুর্নীতি সব দুর্নীতির জন্মদাতা। আজকে বাংলাদেশে চাটুকার আর দুর্নীতিপরায়ণরা একটা ক্লাস আর বাকি নাগরিকরা একটা ক্লাস। এ অবস্থার অবসান হতে হবে। বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ভোটে যাওয়ার সাহস নেই মন্তব্য করে ব্যারিস্টার মইনুল বলেন, অনেকে স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত স্বাধীনতার চেতনা সূর্য কিংবা চাঁদের আলো (সান লাইট বা মুন লাইট) নয়। গণতন্ত্রই স্বাধীনতার চেতনা। যারা গণতন্ত্রবিরোধী তারা স্বাধীনতার চেতনার বিপক্ষ শক্তি। তার মতে, তিনিসহ যারা গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকারের কথা বলেন তারাই প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি।
অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। আর বিরোধীরা ঘরেও অনুষ্ঠান করতে পারছেন না। ইসি বলছেন, তারা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবেন। কিন্তু তার কোনো আলামত নেই। ইসি’র ভূমিকা কী, এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইসি কোনো পদক্ষেপ নেবে, তা বিশ্বাস করারও কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংসদও তাই একদলীয় হয়ে গেছে। বিএনপির ওই নেতা বলেন, প্রশাসন দলীয়করণের চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। আর বিচার ব্যবস্থা, সেখানে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে জরুরি হচ্ছে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান। এগুলো ছাড়া গণতন্ত্র চর্চা সম্ভব নয়। সবশেষ মার্কিন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এত ক্ষমতাধর ব্যক্তি ট্রাম্প, কিন্তু তাকেও অভিবাসন বিল নিয়ে ধাক্কা খেতে হয়েছে। কারণ সেখানে ইনস্টিটিউশনস বা সিস্টেম রয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও হয়েছিল সংবিধানের কথা বলে। কোনো দলই তাদের নিজেদের দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা করে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আজ অবধি কোনো দল কথা বলেনি। যদিও এটি গণতন্ত্র চর্চার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্রের দুর্বলতার বড় কারণ নাগরিক সমাজের দুর্বলতা। জনগণ বুঝতে পারে নির্বাচন প্রহসন হবে। তিনি রাজনৈতিক দলের বাইরে নাগরিক সমাজের একটি নিরপেক্ষ ‘প্ল্যাটফর্ম’ গঠন করার পরামর্শ দেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে কূটনীতিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আশা অনেকটা নিভে গেছে। ৫ই জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না, তা বিশ্বাস করার মতো উপাদান কমই আছে। কোনো দলের জন্য নয়, দেশের স্বার্থে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জরুরি। তা না হলে দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ব্যারিস্টার রুমিনা ফারহানা বলেন, কোনো সভ্য রাষ্ট্রে নির্বাচন নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা থাকে না। নির্বাচন কি আদৌ হচ্ছে? নির্বাচনটি কি রকম হবে? সেখানে কি বিরোধী দল অংশ নেবে? যদি অংশ নেয় তবে নির্বাচন কি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে? আমি কি আমার ভোটটি দিতে পারবো? ভোটটি কি গণনা হবে? এমন প্রশ্ন কারো মুখে শোনা যায় না। কিন্তু আমাদের এখানে মুখে মুখেই তা শোনা যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সিরিয়া নিয়ে শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ এখন এমন এক জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বড় শক্তিধর দেশগুলো সেখানকার নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে দিয়ে প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে - তাতে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এবার কি পরাশক্তিগুলোর নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ বেধে যাবে? বিবিসির সেবাস্টিয়ান আশার লিখছেন, সিরিয়ার সরকার এবং তার বিরোধীদের মধ্যে যে সঙ্ঘাত থেকে এই সঙ্কটের সূচনায় হয়েছিল - তা এখন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। দেশটি এখন পরিণত হয়েছে নানা শক্তির পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে। বাইরের যেসব শক্তি আগে কূটনীতির পথে ছিল, তারা এখন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের পথে নেমে পড়েছে। রাশিয়া আর ইরান হচ্ছে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জড়িত - আর্থিক, সামরিক, রাজনৈতিক সব দিক থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত কম জড়িত কিন্তু এ কারণেই তাদের স্পষ্ট বা নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা নেই। তুরস্ক আরেকটি জড়িত দেশ কিন্তু তারা বিদ্রোহীদের সমর্থন করলেও কুর্দিদের ঠেকাতে বেশি আগ্রহী। দক্ষিণে আছে ইসরাইল - তারা লেবাননের ১৬ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় যেমন, তেমনি সিরিয়ার ক্ষেত্রেও প্রধানত নিরব ভূমিকা রেখে চলেছে। তারা সিরিয়ায় কথিত ইরানি ঘাঁটি এবং হেজবোল্লাহর অস্ত্র সরবরাহের মত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতেই আক্রমণ সীমিত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক, কুর্দি,
এমনকি বাশার আসাদ সরকার - এদের প্রত্যেকেরই স্বার্থ অপরের বিপরীত। কিন্তু প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে তৎপরতা চালানোর কারণেই তাদের সরাসরি সঙ্ঘাত হয় নি। শুধু ইসলামিক স্টেটের মোকাবিলা করার সময়ই তারা তাদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে একসাথে কাজ করেছে।  কিন্তু ইসলামিক স্টেটের পরাজয়ের ভেতর দিয়ে পরিস্থিতিতে এক নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে কুর্দিরা আইএসকে তাড়ানোর সময় আরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে - আর তা তুরস্ককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। রাশিয়া এবং ইরান সিরিয়ার গভীরে তাদের অবস্থান পাকা করে ফেলেছে - যার পাশাপাশি বাশার আসাদের বাহিনী নতুন নতুন এলাকা পুনরুদ্ধার করছে। ইসরাইল দেখছে যে হেজবোল্লাহ এবং ইরান তার সীমান্তের আরো কাছাকাছি চলে এসেছে - যা তাকে সতর্ক এবং অপেক্ষাকৃত সক্রিয় করে তুলেছে। এ অবস্থায় এমন ঝুঁকি আছে যে প্রক্সিদের যুদ্ধ এখন তাদের পেছনে যে শক্তিগুলো পেছন থেকে সুতো নাড়ছে - তাদের সরাসরি যুধে পরিণত হয় কিনা। তা হবে ঘটনাপ্রবাহের এক খুবই বিপজ্জনক মোড় বদল। পেছনের শক্তিগুলো সব সময়ই অতীতে এরকম সম্ভাবনা দেখা দিলে সঙ্ঘাত থেকে পিছিয়ে এসেছে। কিন্তু এ নিয়ে খুব আশ্বস্ত হওয়া যায় না। যদিও এরকম যুদ্ধের কথা শুনতে অদ্ভূত শোনাতে পারে, কিন্তু গত কিছুদিনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ক'দিন আগেই সিরিয়ান ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ভুপাতিত হয়েছে। ইসরাইলি আকাশসীমার ভেতরে একটি ইরানি ড্রোন ঠেকিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি রিপোর্ট বেরিয়েছে যে মার্কিন-কুর্দি ঘাঁটির দিকে এগুনোর সময় মার্কিনীদের হাতে কয়েকজন রুশ ভাড়াটে সৈন্য নিহত হয়েছেন। তুরস্ক সিরিয়ান কুর্দিদের ওপর হামলা শুরু করেছে - যাতে তারা সরাসরি আমেরিকানদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে, যদিও তারা আবার নেটো মিত্র। এর ফলে সিরিয়ার বাইরের শক্তিদের একটা সর্বগ্রাসী সঙ্ঘাতের আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে। এমন কিছু যদি না-ও হয় - অন্তত সিরিয়া সঙ্কটকে তা আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে।

৩০ দিন পর হিজাব পরতে পারবে বেলজিয়ামের ছাত্রীরা

স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধের ঘোষণাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে বেলজিয়ামের একটি আদালত। আদালত রায়ে বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী। হিজাবের ওপর কর্তৃপক্ষের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে দেশটির ম্যাশেমকেলেন অঞ্চলের একটি স্কুলে ১১ জন অভিভাবক আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত বলেছে, তারা মানবাধিকার বিষয়ক ইউরোপীয় চুক্তির আলোকে এই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করছে। তাই সব ইউরোপীয় দেশেরই তার নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া উচিত। আদালতের এই রায় অনুযায়ী ওই ছাত্রীরা আগামী ৩০ দিন পর থেকে নিজ পছন্দ মতো হিজাব পরতে পারবে। বেলজিয়ামের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংগঠন বেলজিয়াম দিয়ানেত ফাউন্ডেশনের জেনারেল ম্যানেজার কসকুন বেয়াজগুল বলেছেন, তার সংগঠন এই মামলায় ছাত্রীদের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বলেন, এই দেশের এ ধরনের মামলার জন্য এই রায়টি উদাহরণ হয়ে থাকবে। ২০১৫ সালে বেলজিয়ামে ফ্লেমিশ কমিউনিটি এডুকেশ স্কুল কর্তৃপক্ষ সরকারি স্কুলগুলোতে হিজাব নিষিদ্ধ করেছিল।

পায়ে হাঁটার স্বপ্ন পূরণে কঠোর সাধনা

এখন স্বপ্ন শুধু নিজের পায়ে হাঁটার। তা ছাড়া আর কিছুই চান না ৩৩ বছরের হুয়ান পেদ্রো ফ্রাঙ্কো। বিশ্বের সব চেয়ে স্থূলকায় ব্যক্তি হিসেবে ২০১৬ সালে গিনেস বুকে নাম তুলেছিলেন উত্তর মেক্সিকোর এই বাসিন্দা। তখন তার ওজন ছিল ৫৯৫ কিলোগ্রাম। সে সময় সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী ছিলেন হুয়ান। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবিটিস ছাড়াও ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওজন না কমালে বাঁচানো মুশকিল হবে হুয়ানকে। তখনই ডবল গ্যাসট্রিক অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। সেই থেকে লড়াইয়ের শুরু। মায়ের সাথে হুয়ান চলে আসেন গোয়াদালাহারার আগুয়াকালিয়ানতেস শহরে। সেখানেই বেরিয়াট্রিক সার্জন জোস আন্তনিও কাসতেনেডার ক্লিনিকে হুয়ানের চিকিৎসা শুরু হয়। হাইপোথাইরয়েডের রোগী হুয়ানকে ছয় মাস ডায়েটে রাখা হয়। পাশাপাশি, শরীরচর্চাও করতেন। ২০১৭ সালের মে মাসে তার প্রথম অস্ত্রোপচারটি হয়। আর তাতে প্রায় ৮০ শতাংশ ওজন কমে। ছয় মাস পরে আরো একটি অস্ত্রোপচার করা হয়। যার মাধ্যমে তার পাকস্থলীর আকার ছোট করে দেন চিকিৎসকেরা। ভাগ করে দেয়া হয় অন্ত্রটিও। ফলও মিলেছে তাতে। এখন ৩৩ বছরের হুয়ানের ওজন ৩৪৫ কিলোগ্রাম। তবে এখনও হুয়ানের চব্বিশটা ঘণ্টাই কাটে বিছানায়, নাকে অক্সিজেনের টিউব গুঁজে। সূর্যের আলোর অভাবে তার ত্বকের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবে বিছানায় শুয়েও কিছু না কিছু করার চেষ্টা করেন হুয়ান। কখনও রুমাল বুনে তো কখনও মিষ্টি বানিয়ে, সংসারে সাহায্য করার চেষ্টা করেন।
তবে এখন বেশির ভাগ সময়ই শরীরচর্চা করেন। কখনও ওজন তুলছেন, তো কখনও হাত সাইকেল নিয়ে প্যাডেল করছেন। এখনও পর্যন্ত কোনো মতে ওয়াকারে উঠে প্রথম পা ফেলতে সক্ষম হয়েছেন হুয়ান। কিন্তু তার জীবনের সব চেয়ে বড় স্বপ্ন, আবার নিজের পায়ে হেঁটে বেড়ানো। আর তার জন্য সমস্ত কষ্ট সহ্য করতে রাজি আছেন। আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে হুয়ানের আরো কিছুটা ওজন কমবে বলেই আশাবাদী চিকিৎসক কাসতেনেডার। বললেন, ‘‘আমি খুশি যে সমস্তটাই পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে। প্রতিদিন আরো বেশি করে চেষ্টা করছেন হুয়ান, নিজের জীবনটাকে সঠিক জায়গায় ফেরাতে।’’ পারিবারিক সূত্রের খবর, বরাবরই স্বাস্থ্যবান ছিলেন হুয়ান। তবে ১৭ বছর বয়সে একটি গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হন। আর তার পর থেকেই তরতরিয়ে বাড়তে থাকে ওজন। হুয়ানের চিকিৎসক দল জানালেন, এখনও পায়ে লিম্ফোদেমার সমস্যা রয়েছে তার। এখনও পর্যন্ত তাদের কাছে হুয়ানের শারীরিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। দাবি, যত দিন না হুয়ানের বিপদ পুরোপুরি কাটছে, তত দিন পর্যন্ত হুয়ানের উপরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবেন তারা। জাতিসঙ্ঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের অন্তত ৫৮ শতাংশ মানুষই অতিরিক্ত মেদের সমস্যায় ভোগেন। মেক্সিকো অন্যতম দেশ, যেখানে এই সমস্যা প্রবল।

গৌতায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো প্রতিবাদ হচ্ছে না : এরদোগান

তুরস্কের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যে বিশ্বব্যাপী অপপ্রচার চলছে, তা সফল হবে না বলে দাবি করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তিনি বলেন, তুরস্কের বিরুদ্ধে তথ্য যুদ্ধ চলছে। মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। শনিবার দেশটির ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে) প্রাদেশিক কংগ্রেসে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
-খবর আনাদুলু সংবাদ সংস্থার। তিনি বলেন, সিরিয়ায় আমাদের অভিযান নিয়ে অপপ্রচার চালাতে তারা বিভিন্ন স্থূল ছবি ব্যবহার করছে। আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিকৃত ছবি উপস্থাপন করা হচ্ছে। সিরিয়ার আফ্রিন থেকে ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তুরস্ক ২০ জানুয়ারি অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ শুরু করেছে। এ অভিযানে বেসামরিক লোকদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এরদোগান। তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষকে হামলা করি না। এ ধরনের প্রবণতা আমাদের রক্তে নেই। সিরিয়ার গৌতার পূর্বাঞ্চলে যে হত্যাকাণ্ড চলছে, তার বিরুদ্ধে কোনো জোরালো প্রতিবাদ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরদোগান প্রশ্ন রাখেন- গৌতায় যে হত্যাকাণ্ড চলছে, তা নিয়ে কোনো দেশ জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বলে আপনি শুনেছেন? তারা সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু তারা গৌতার অধিবাসীদের অধিকার নিয়ে কিছু বলেন না।

আমানত ও ঋণ অনুপাত সীমায় ছাড় চান ব্যাংক উদ্যোক্তারা

ব্যাংক খাতের অস্থিরতা কাটাতে আগের আমানত ও ঋণের অনুপাত সীমা (এডিআর) বহাল চান ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। নতুন অনুপাত সীমার কারণে বিনিয়োগ কমে যাবে-এমন যুক্তি দেখিয়ে উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতারা সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ও গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে চিঠি দিয়েছেন। জানা গেছে, সরকারের উচ্চপর্যায়েও দেখা করে বিষয়টি অবহিত করেছেন বিএবির নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে হঠাৎ করে বেসরকারি ব্যাংক থেকে তহবিল প্রত্যাহার না করে, সে জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। বিএবি নতুন করে যেসব দাবি তুলেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো, এডিআর আগের অবস্থায় ফেরানো, চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সরবরাহ বৃদ্ধি, আবাসন খাতের ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখার বিধান পুরোপুরি তুলে দেওয়া এবং এডিআর সীমা থেকে কৃষি ঋণকে বাদ দেওয়া। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিল প্রত্যাহার বিষয়েও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন বিএবির নেতারা। এর আগে একই বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে গভর্নর বলেছিলেন, ‘একটি বেসরকারি ব্যাংক খারাপ অবস্থায় পড়ে গেছে। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত সরিয়ে নিতে চাইছে। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্ক আগে শেয়ারবাজারে ছিল, এখন ব্যাংকে চলে আসছে।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে নতুন এডিআর সমন্বয়ের সময় জুন থেকে বাড়িয়ে ডিসেম্বরে নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি আবাসন ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ২ শতাংশের পরিবর্তে ১ শতাংশ করেছে। বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।
সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে হঠাৎ করে টাকা তুলে না নেয়, এ জন্য পদক্ষেপ চেয়েছি।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, নতুন আমানত ও ঋণসীমার ফলে বাজারে তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে। আমানত কমে যাওয়ায় উচ্চমূল্যে তা সংগ্রহে ব্যাংকগুলো তৎপর হয়ে উঠেছে। এতে আমানতের সুদহার বেড়ে যাচ্ছে। উচ্চমূল্যে আমানত সংগ্রহের কারণে ঋণের সুদহারও বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে দ্রব্যমূল্যও বেড়ে যাবে। সুদহার বাড়লে বিনিয়োগও কমে আসবে। এ জন্য প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য এডিআর ৮৫ শতাংশ ও ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ শতাংশে ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয় চিঠিতে। বর্তমানে এই হার যথাক্রমে ৮৩ দশমিক ৫ ও ৮৯ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সম্পর্কে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমে গেছে, পাশাপাশি রপ্তানিও কমেছে। ভোগ্যপণ্য আমদানি বন্ধ করা যাবে না, অন্যদিকে রপ্তানি আর প্রবাসী আয়ও বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে ডলার সংকট হচ্ছে। আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে পর্যাপ্ত ডলার মিলছে না। এতে সময়মতো দায় পরিশোধ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ডলারের দামও বেড়ে যাচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ডলার সরবরাহের প্রয়োজন। এ ছাড়া কৃষি খাতের ঋণ নিয়ে বলা হয়েছে, কৃষি বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক। ঋণ বিতরণের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের হাতে থেকে যাওয়া টাকা অন্য ব্যাংকে দেওয়া হয়। এ জন্য ব্যাংকগুলো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, মুনাফা হারাচ্ছে। কৃষিঋণের সুদহার ৯ শতাংশ, যা বর্তমানে আমানত হারের চেয়ে কম। বাধ্যতামূলক কৃষিঋণ দিতে গিয়ে এডিআর বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে কৃষিঋণকে এডিআর হিসাবায়ন থেকে বাইরে রাখার দাবি জানিয়েছে বিএবি। আবাসন ঋণ নিয়ে বলা হয়েছে, আবাসন ঋণ শতভাগ নিরাপদ। এরপরও আবাসন খাতের নিয়মিত ঋণের বিপরীতে ২ শতাংশ সাধারণ সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে। এর কোনো সন্তোষজনক কারণ নেই। এ জন্য আবাসন ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি না রাখার দাবি জানিয়েছে বিএবি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র দেবাশিস চক্রবর্ত্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে এডিআর সমন্বয়ের সময় বাড়ানো হয়েছে, আবাসন ঋণেও সঞ্চিতি কমানো হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানি না।’এর আগে ব্যাংক কোম্পানি আইন পরিবর্তনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেন বিএবির নেতারা। তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এই আইনের সংশোধনী পাস হয়। এতে আমানতকারীদের অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

প্রশ্ন ছাপাতেই হেলাফেলা! by সাহাদাত হোসেন পরশ

কারা কীভাবে চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তা এখনও সুনির্দিষ্টভাবে বের করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে প্রশ্ন ছাপাতেই যে বড় ধরনের হেলাফেলা ছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এরই মধ্যে। বিজি প্রেসে যে প্রক্রিয়ায় এসএসসির প্রশ্নপত্র ছাপা হয়েছে, তাতে যে কারও পক্ষে সেখান থেকে সহজেই প্রশ্ন ফাঁস করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। আশ্চর্যের বিষয়- এসএসসির প্রশ্নপত্র ছাপা হওয়ার পর তার মূল প্লেট ধ্বংস করা হয়নি। মূল প্লেট রেখে দেওয়া হয়েছিল অরক্ষিত অবস্থায়। সেখান থেকে যে কারও পক্ষে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সম্ভব। এমনকি প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর হাতে হাতে প্যাকেজিং করেন বিজি প্রেসের কর্মচারীরা। কারও হাতের ছাপ ছাড়া অটোমেশন পদ্ধতিতে প্যাকেজিং করার ব্যবস্থা না থাকায় সেই প্রক্রিয়া থেকেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বিজি প্রেসে যে পদ্ধতি ব্যবহার করে সিসিটিভি বসিয়ে প্রশ্নপত্র ছাপানোর সঙ্গে জড়িতদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়, তাতেও রয়েছে 'শুভঙ্করের ফাঁকি'। সিসিটিভিতে মুভিং সিস্টেম বসানো। এতে একপাশ ঘুরে আসার সময় সিসিটিভির আওতার বাইরে থাকছে অন্য পাশ। সমকালের অনুসন্ধান ও পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সদস্যদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য- বর্তমানে যে পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ছাপা হয়, তাতে প্রশ্ন ফাঁস মোকাবেলা করা কষ্টসাধ্য। এরই মধ্যে পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সদস্যরা বিজি প্রেসের প্রশ্ন ছাপানোর পদ্ধতির বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন। তাদের পর্যালোচনায় এরই মধ্যে প্রশ্ন ছাপাতেই ত্রুটি ধরা পড়েছে বেশ কিছু। তারা বলছেন, যদি ছাপা হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে হয়, তাহলে প্রশ্ন মুদ্রণ পদ্ধতি পুরোপুরি ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে। বর্তমানে বিজি প্রেসে যেভাবে প্রশ্নপত্র ছাপা হয়, তাতে একটি প্রশ্নপত্রের পাণ্ডুলিপি গ্রহণ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং হওয়া পর্যন্ত ২০০-২৫০ জন সম্পৃক্ত থাকেন সংস্থাটির। সার্বক্ষণিক প্রশ্নপত্র নিয়ে কাজ করেন তারা। সবাই তখন প্রশ্নটি দেখতে পারেন। এতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নটি আয়ত্তে আনা সম্ভব তাদের পক্ষে। এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপা হতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই মাসের বেশি। প্রতিটি প্রশ্নের দুটি করে সেট ছাপা হয়েছিল। ছাপা হওয়ার পর প্রশ্নের প্রুফ দেখতে ১৫-২০ জনের একটি দল থাকে।
পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় মনিটরিং কমিটির সদস্য ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসির (উত্তর) দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হক সমকালকে বলেন, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র ছাপা হয়, তার পরিবর্তন করা জরুরি। ম্যানুয়ালি এত লোকের সংশ্নিষ্টতার ভেতর দিয়ে প্রশ্ন তৈরি করা হলে ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকবেই। কম লোকের সংশ্নিষ্টতার ভেতর দিয়ে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশের পর্যবেক্ষণ সংশ্নিষ্টদের জানানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটিও হয়েছে। তারা এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বিজি প্রেসে গতকাল সরেজমিন গিয়ে এ ব্যাপার কথা বলতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির উপপরিচালক আবদুল মালেককে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ করেননি তিনি।
সংশ্নিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের মনে হয়েছে তিনভাবে এসএসসির প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকতে পারে- এক. ছাপা হওয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িত কোনো অসাধু চক্রের মাধ্যমে, দুই. প্রশ্নপত্র ট্রেজারি হয়ে কেন্দ্র পর্যন্ত যাতায়াতের সময়, তিন. প্রশ্নপত্র খোলার ঠিক আগ মুহূর্তে কারও মাধ্যমে। তবে তারা মনে করছেন, যে পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে বিজি প্রেসে পাঠানো হয়, তাতে ছাপাখানায় আসার আগে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার সুযোগ কম। কারণ প্রশ্ন তৈরি করার জন্য আলাদা আলাদা প্রশ্ন প্রণেতা ও মডারেটর থাকেন। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত। ১২টি পৃথক প্রশ্ন তৈরি করার পর লটারি করে তার মধ্যে থেকে দুটি নির্বাচন করা হয়। কোন দুটি ছাপা হওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছে, তা কোনো মডারেটরের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। দুটি প্রশ্ন নির্ধারিত হওয়ার পর তা ছাপানোর জন্য পরীক্ষার অন্তত দুই মাস আগে পাঠানো হয় বিজি প্রেসে। এরপর শুরু হয় ছাপার কাজ। ছাপা হওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রশ্ন পাঠানো হয় ট্রেজারিতে। এরপর ট্রেজারি হয়ে তা চলে যায় কেন্দ্রে। সংশ্নিষ্টরা এরই মধ্যে তথ্য পেয়েছেন এবার এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন বিজি প্রেসে ছাপানোর পর তার মূল প্লেট ধ্বংস করা হয়নি। কেন এই প্লেট রেখে দেওয়া হয়েছিল- গোয়েন্দাদের তার সদুত্তর দিতে পারেনি বিজি প্রেসের সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা।
আট সুপারিশ :প্রচলিত পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আটটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এরই মধ্যে। তা হলো- এমসিকিউ বাতিল করতে হবে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে। পরীক্ষা সংক্রান্ত বর্তমান আইন সংশোধন করে প্রশ্ন ফাঁসে জড়িতদের বিচার করতে হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কোচিং সেন্টার স্থায়ীভাবে বন্ধ করা। পরীক্ষাকেন্দ্রে ছাত্র-ছাত্রীদের নির্ধারিত সময়ে তল্লাশি করে প্রবেশ করাতে হবে। কারও কাছে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাওয়া গেলে তার পরীক্ষা বাতিল বলে গণ্য হবে ও তাকে আইনের আওতায় আনার কথাও বলা হয়। পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকদেরও অধিক সচেতন হতে বলা হয়েছে।
কেন ডিজিটালাইশেজন হচ্ছে না প্রশ্নপত্র ছাপার পদ্ধতি :বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিজি প্রেসের কর্মচারীদের আটক করা হয়। ২০১৪ সালে সরকারি ছাপাখানা বিজি প্রেসের অফসেট শাখার কর্মচারী আবদুল জলিলকে সোমবার আটক করা হয়। ২৮ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল তার কাছ থেকে। পরে জানা যায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিক্রি করে আবদুল জলিল ওই অর্থ পান। একই ঘটনায় বিজি প্রেসের কম্পোজিটর এ টি এম মোস্তফা, তার স্ত্রী লাবণী বেগম ও আরেক কর্মচারী শহীদুল ইসলাম ফকিরের নামও এসেছিল। ২০১৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে ৯ জনকে আটক করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওই সময় গোয়েন্দারা জানান, ওই চক্রের সঙ্গে বিজি প্রেসের এক অসাধু কর্মচারী জড়িত। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যখনই ছাপা হয়, তখনই ওই কর্মচারী প্রশ্ন মুখস্থের পর বাইরে জুয়েল নামের একজনকে লিখে দিত। এর পর জুয়েল তা দিত সাত্তারের কাছে। সাত্তারের মাধ্যমে তা চলে যেত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিজি প্রেসের এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৪ সালে বিজি প্রেসের ছাপার কাজ পুরোপুরি ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডিজিটালাইজেশন করতে অর্থ বরাদ্দের একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া আছে। তবে সেটা পাস না হওয়ায় তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল করা সম্ভব হয়নি এখনও।

ট্রাম্পের কর সংস্কারে বাফেটের লাভ ২৯ বিলিয়ন ডলার

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর সংস্কারের কারণে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের মুনাফা বেড়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার। গতকাল শনিবার বাফেটের প্রতিষ্ঠান বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে তাদের রেকর্ড পরিমাণ প্রান্তিক ও বার্ষিক মুনাফার তথ্য প্রকাশ করেছে। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
গত বছরের ডিসেম্বরে কর সংস্কার নীতির আওতায় করপোরেট করহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ শতাংশ নির্ধারণ করে ট্রাম্প প্রশাসন। কর সংস্কারের মধ্য দিয়ে এত দিন উচ্চকরের দেশ হিসেবে থাকা যুক্তরাষ্ট্র বাকি উন্নত দেশগুলোর গড় করহারের কাতারে শামিল হয়েছে। তবে এই কর সংস্কার নীতির পক্ষে নন বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যান ওয়ারেন বাফেট। কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে এক চিঠিতে সাফ বলেছেন, ‘এবার আমাদের লাভের একটা বড় অংশ বার্কশায়ার থেকে আসেনি। মাত্র ৩৬ বিলিয়ন মুনাফা এসেছে বার্কশায়ারের কাজ থেকে। বাকি ২৯ বিলিয়নই এসেছে গত ডিসেম্বরে কর সংস্কার থেকে।’ গত মাসে ব্রিটিশ ব্যাংক বার্কলেস জানায়, কর সুবিধার বড় সুবিধাভোগী হবে ওয়ারেন বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে। প্রাথমিক সংস্কারেই এই কোম্পানির ১২ শতাংশ মুনাফা বাড়বে। বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেটের বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ৮৭ বিলিয়ন ডলার। ধনীর তালিকায় তাঁর আগে রয়েছেন মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস ও আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ডিসেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কর সংস্কার বিল পাস হওয়ার পরপরই সমালোচনা ওঠে, এর থেকে লাভবান হবেন কেবল ধনীরা। যদিও রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ করনীতি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মজীবী এবং মধ্যবিত্তদের সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ ও মুসলিম-বিরোধিতা বাড়তে পারে

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো: ভারতীয় সেনাপ্রধান বলেছেন, চীনের সহায়তায় পাকিস্তান বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে পাঠাচ্ছে। ভারতের সেনাপ্রধানদের মুখে সাধারণত রাজনৈতিক বক্তব্য শোনা যায় না। এমন মন্তব্যের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?
ইমতিয়াজ আহমেদ: এ ধরনের বক্তব্য দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমাদের দেখা দরকার যে তিনি কেন এ কথা বলেছেন। বক্তব্যটি পরিষ্কারভাবেই রাজনৈতিক, তাই এর পেছনে সেনাপ্রধানের নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। তিনি অবসরে যাবেন, সরকারি দল বিজেপিকে হয়তো কোনো কারণে তুষ্ট করতে চাইছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর চলমান নির্বাচনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
প্রথম আলো: এই মন্তব্য দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে?
ইমতিয়াজ আহমেদ: আসলে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ বা এ ধরনের কথাবার্তা ভারতের রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। এর মূল কারণ আসলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হয়। ক্রমাগত এসব বলার ফলে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলেও এর একটা প্রভাব পড়েছে। এসব বক্তব্য ভারতে বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব বাড়াতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও আমরা একই চর্চা দেখেছি ও দেখি। এখানেও ভারত-বিরোধিতার রাজনীতির চেষ্টা হয়। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে ওই মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। ভারতীয় সেনাপ্রধান যে মন্তব্য করেছেন তার সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক-দুই ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আগেই বলেছি ভারতে বাংলাদেশ ও মুসলমান-বিরোধিতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বাড়তে পারে ভারত-বিরোধিতা। এ ধরনের মন্তব্য আসলে বাংলাদেশের ভারতবিরোধীদের খুশি করবে, কারণ একে তারা সহজেই কাজে লাগাতে পারবে।
প্রথম আলো: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে উদ্বিগ্ন না হতে বলেছেন। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মধ্যে কি কোনো অস্বস্তি দেখা দিয়েছে? যে কারণে প্রধানমন্ত্রী ভারতকে আশ্বস্ত করলেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ: আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেছেন।
প্রথম আলো: তার মানে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের অস্বস্তি রয়েছে এবং সে কারণেই ভারতীয় সাংবাদিকেরা এমন প্রশ্ন করেছেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ: আসলে চীন-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি খুব জটিল।’ ৬২ সালের যুদ্ধের ছায়া এখানে ভূমিকা পালন করে। সেই যুদ্ধে পরাজয়ের বিষয়টিকে ভারত সব সময় মাথায় রাখে। ভারতের চলচ্চিত্র, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় ও রাজনীতিতে এসব বিষয় চর্চা হয়। আবার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে দেখবেন একক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য চীনের সঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে যত শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা করতে গেছে, সবচেয়ে বেশি গেছে চীনে। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভারতের কোনো প্রতিবেশী দেশ যখন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করতে চায়, তখন ভারত তা মানতে ও পছন্দ করতে চায় না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে তোমরা চীনের সঙ্গে যেমন উন্নয়নের স্বার্থে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করো, আমরাও তা-ই করছি।
প্রথম আলো: ভারতের বিচলিত হওয়ার পেছনে কী কাজ করেছে বলে মনে করেন? চীনের প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর, বিশাল আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি? নাকি চীন থেকে বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা?
ইমতিয়াজ আহমেদ: সমস্যা হচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে মাত্রায় পরিশীলিত হওয়া উচিত, কার্যত তেমন নয়। ভারত হয়তো ভেবেছিল গত নির্বাচনে তারা যেভাবে বর্তমান সরকারকে সমর্থন করেছে তাতে বাংলাদেশ তাদের চাওয়ার বাইরে কিছু করবে না। কিন্তু বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে, তাদের কাছ থেকে সাবমেরিন কিনেছে-এসব হয়তো ভারত ভালো চোখে দেখছে না। যদি এমন ভেবে থাকে তবে বলতেই হবে যে ভারতে পররাষ্ট্রনীতির পরিপক্বতার অভাব রয়েছে।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি যে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। এটা কেন হচ্ছে বলে মনে করেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ: ভারতের চিন্তায় প্রতিবেশী দেশের দুটি মডেল রয়েছে বলে মনে হয়। একটি পাকিস্তান ও অন্যটি ভুটান। প্রতিবেশী দেশগুলোকে তারা এভাবেই দেখতে চায়। ভারতকে এটা বুঝতে হবে যে প্রতিবেশীদের এভাবে দেখা যায় না। বাংলাদেশ কোনোভাবেই পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। আবার ভুটানের অনেক কিছু যেভাবে ভারত নিয়ন্ত্রণ করে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা করা সম্ভব নয়। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এসব করতে গিয়ে ভারত তার অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেসব দেশে ভারত-বিরোধিতা বেড়েছে। রাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের ক্ষেত্রে এখন দেখবেন যে সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে একধরনের মতৈক্য হয়েছে। কিন্তু ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনছে না। ভারত নিজে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোকে তা করতে দেবে না-এমন নীতি পরিপক্বতার লক্ষণ নয়।
প্রথম আলো: কিন্তু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তো শুধুই অর্থনৈতিক নয়। সামরিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা এবং সেখান থেকে সমরাস্ত্র কেনার বিষয়টি তো দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে।
ইমতিয়াজ আহমেদ: বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। কোনো দেশ যখন অস্ত্র কেনে তখন স্বাভাবিকভাবেই সে নিকট প্রতিবেশী দেশের চেয়ে আলাদা ও ভিন্ন ধরনের অস্ত্র কিনতে চায়। এটা ভারতের না বোঝার কোনো কারণ নেই। বিশ্বের সব দেশ তা-ই করে। আপনি এর আগে চীন থেকে সাবমেরিন কেনার কথা বলেছেন। ভারতের বোঝা উচিত যে এখন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়েছে। এই সমুদ্রসীমা পাহারার প্রয়োজন রয়েছে। জলদস্যুদের তৎপরতা ও অবৈধভাবে মাছ ধরা ঠেকানোর বিষয়টি খুবই জরুরি। এসব ঠেকাতে আমাদের নৌবাহিনীর জন্য অনেক জাহাজ কেনার চেয়ে সাবমেরিন কেনা অনেক সাশ্রয়ী উদ্যোগ। ভারত পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশ, শক্তিশালী নৌবাহিনী রয়েছে তাদের। এখন বাংলাদেশ চীন থেকে অস্ত্র কিনলে বা দুটি সাবমেরিন কিনলে ভারত যদি তা মেনে নিতে না পারে, তাহলে তো বিপদ।
প্রথম আলো: এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে চীন-ভারতের প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইমতিয়াজ আহমেদ: আগেই বলেছি চীন-ভারত প্রতিযোগিতার কিছু মানসিক দিক রয়েছে, আবার রয়েছে কিছু কৌশলগত দিক। মানসিক দিক থেকে ভারতের অবস্থানের কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। আসলে ভারতের ব্যবসায়ীরা চীনকে যতটা বোঝেন, ভারতের আমলারা তা বোঝেন না। ভারত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না হলেও ভারতের অনেক ব্যবসায়ী কিন্তু তা চান। এখন চীনের সঙ্গে একধরনের বিরোধ টিকিয়ে রাখার পেছনে কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। ভারত যদি এটা দেখাতে পারে যে চীনের সঙ্গে তার বৈরিতা রয়েছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমের কাছ থেকে কিছু সুবিধা আদায় করা সম্ভব। ভারত এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এর সুবিধা নিয়েছে। পারমাণবিক ও সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাচ্ছে। ভারত জানে যে চীনের সঙ্গে বৈরিতা থাকলেও তারা একে সংঘাতের পর্যায়ে নিয়ে যাবে না। কৌশলগত কারণেও চীন-বিরোধিতা বা একটি বৈরিতার পরিস্থিতি জারি রাখা জরুরি।
প্রথম আলো: এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ কীভাবে একই সঙ্গে দুই বড় ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে?
ইমতিয়াজ আহমেদ: সম্পর্ককে ব্যাপকভাবে অর্থনীতিকেন্দ্রিক করে ফেলা উচিত। ভারত ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ নিতে পারে। এই তিন দেশের অর্থনৈতিক উদ্যোগে সব পক্ষই লাভবান হবে। বিশেষ করে ভারতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সেখানকার জনগণেরও অর্থনৈতিক উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশের এখানে বড় ভূমিকা পালন করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এই বড় দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো শত্রুতা বা প্রতিযোগিতা নেই, ভূখণ্ডগত কোনো সমস্যাও নেই।
প্রথম আলো: রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের বর্বরতা এবং শরণার্থী সংকটে আমরা দেখলাম ভারত ও চীন স্পষ্টতই মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, কিন্তু ভারতের মিয়ানমারের পক্ষ নেওয়া বিস্ময়কর। বাংলাদেশ কেন ভারতকে পাশে পেল না?
ইমতিয়াজ আহমেদ: আমি মনে করি, ভারত আসলে বড় ভুল করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নেতৃত্ব দেওয়ার ও ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তা জাতি নিধন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারত একাত্তর সালে বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল ও সে জন্য দেশ হিসেবে বিশ্বে যে সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করেছিল, রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে চুপ থেকে ভারত তার সেই অবস্থানকে অনেকটাই দুর্বল করেছে। ভারতের এটা বোঝা উচিত যে চীনের অর্থনৈতিক শক্তির ধারেকাছে যাওয়ার অবস্থায়ও ভারত নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেরও সেই অবস্থা নেই। ফলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ভারত চীনের সঙ্গে পেরে উঠবে না। আর মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক তাতে দেশটিকে ভারত চীনের কাছ থেকে নিজের বলয়ে আনতে পারবে না। মাঝখান থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের জনগণের সমর্থন হারিয়েছে এবং দেশটির ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণকে হতাশ করেছে। চীন থেকে সাবমেরিন কেনা বা আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ভারত এমনটি করেছে কি না, কে জানে।
প্রথম আলো: রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ: চীন নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে ভেটো দিয়েছে। এরপর আমরা দেখেছি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং সমস্যা সমাধানে তিন পর্যায়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। মিয়ানমারে গিয়েও তিনি একই প্রস্তাব দিয়েছেন। এর ওপর ভিত্তি করেই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার চুক্তি করেছে। আমরা দেখলাম যে চীন যে রকমই হোক একটি ভূমিকা পালন করেছে। ভারত কিন্তু কোনো ভূমিকা রাখতে পারল না।
প্রথম আলো: মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে তা কতটুকু কার্যকর হবে, সেই সংশয় কিন্তু দিনে দিনে জোরদার হচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন বাংলাদেশের তরফে কিছু করণীয় আছে কী?
ইমতিয়াজ আহমেদ: আমরা দেখেছি যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের অবস্থান কাছাকাছি। কিন্তু এই সংকট সমাধানে দেশ দুটির করণীয় রয়েছে। আমি মনে করি শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুকে বিবেচনায় নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উচিত বেইজিং ও দিল্লি সফর করা। এ ধরনের সফর অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ তো সব সময়ই দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা ও সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় নিয়েছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির জন্য চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করার সব উদ্যোগ নিয়েও বাংলাদেশ মূলত ভারতের আপত্তির কারণে তা করেনি।
ইমতিয়াজ আহমেদ: চীনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অন্য দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলের পার্থক্য রয়েছে। চীন সম্পর্ক তৈরি করার জন্য সময় নিয়ে লেগে থাকে। কোনো কিছুতে বাধা এলে তারা তা বাদ দিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করে। পুরোনো কিছু নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। তারা অপেক্ষা করার নীতি নেয়। সোনাদিয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ রাজি হয়নি, এতে কিন্তু চীন দমে যায়নি বা এতে বিরক্তি প্রকাশ করেনি। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে এসেছেন এবং বিপুল সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি নিয়েই এসেছেন। বাংলাদেশের উচিত এ ধরনের কাঠামো যাতে সবাই মিলে করা যায়, তেমন উদ্যোগ নেওয়া। প্রয়োজনে ভারত ও চীনের যৌথ বিনিয়োগেই গভীর সমুদ্রবন্দর হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর হলে তার ফল ভারত ও চীনসহ আশপাশের অনেক দেশই ভোগ করতে পারবে। কলম্বো সমুদ্রবন্দরে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। সেই বন্দর কিন্তু ভারত ব্যবহার করছে। কারণ, বন্দর তো শুধু একটি দেশের সুবিধার জন্য তৈরি হয় না।
প্রথম আলো: সম্প্রতি দিল্লিতে এক সেমিনারে ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের তরফেই বলা হয়েছে যে ভারতীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশ যথাযথ মনোযোগ পায় না, অথচ এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। আপনার মন্তব্য কী?
ইমতিয়াজ আহমেদ: ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা প্রতিবেশী দেশগুলোকে মানচিত্রের বিবেচনায় দেখেন। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ছোট। কিন্তু এটা বুঝতে হবে যে মানচিত্র সবকিছু বলে না। সেখানে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, কৌশলগত গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব-এসব দেখা যায় না। সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার আকার মানচিত্রে দেখে এর গুরুত্ব বিবেচনা করলে হবে না। বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম দেশ। এত জনসংখ্যার একটি দেশকে যেকোনো বিবেচনাতেই উপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ভারতকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের স্বার্থ জড়িত আছে। বাংলাদেশের অনুন্নয়ন বা অস্থিতিশীল ভারতের জন্য ভালো কিছু নয়। বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের চেয়ে ভালো করছে। এখন ভারত কি এতে ঈর্ষান্বিত হবে নাকি এই অগ্রগতিকে সমর্থন করবে। ভারতকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশ বা প্রতিবেশীদের যেকোনো উন্নয়ন ভারতের নিজের স্বার্থেই জরুরি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। মানচিত্র দেখে প্রতিবেশীদের বিবেচনা করার মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের গত একতরফা নির্বাচনকে ভারত কোনো রাখঢাক না করেই সমর্থন করেছিল। সামনে নির্বাচন আসছে। এবার ভারতের অবস্থান কী হতে পারে বলে মনে করেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ: গত চার বছরে ভারতের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। সরকারি দলকে সহায়তা করলেই সবকিছু মিলবে-এমন ধারণা যে ভুল, তা হয়তো তারা টের পেয়েছে। আসলে আগে যে ধরনের নির্বাচন বাংলাদেশে হয়েছে তা করা গেছে আমাদের নিজস্ব রাজনীতির সমস্যার কারণে। এবার ভারত কোনো দলের পক্ষে সরাসরি থাকতে চাইবে বলে মনে হয় না। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের দিকেই তাদের আগ্রহ থাকবে বলে মনে হয়।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
ইমতিয়াজ আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

অধ্যক্ষ ও তদন্ত কমিটি

রংপুরের কারমাইকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবদুল লতিফ মিয়ার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ: দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ। কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁর ‘অপকর্মের’ বিচার চাইছেন, তাঁর অপসারণের দাবিতে তাঁরা আন্দোলনও করছেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পর্যন্ত পালিত হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তালা পর্যন্ত ঝুলিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এই অধ্যক্ষ যেনবা রহস্যময় ক্ষমতার অধিকারী। রহস্যটা এ কারণে যে, বহু আগে থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি শাস্তি থেকে পার পেয়ে আসছেন। যেমন ১৯৯৯ সালে প্রভাষক থাকা অবস্থায় পদোন্নতি পরীক্ষায় তিনি নকলসহ ধরা পড়েছিলেন। এই অপরাধের দায়ে সরকারি কর্ম কমিশন তাঁকে নয় বছরের জন্য পরীক্ষায় বসার অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও চাকরিতে তাঁর উন্নতি হয়েছে, তিনি অধ্যক্ষ পর্যন্ত হয়েছেন। কিন্তু কেমন অধ্যক্ষ? তাঁর কলেজের শিক্ষকদের অভিযোগ এ রকম: অধ্যক্ষ হিসেবে কারমাইকেল কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রায় দেড় বছরে আবদুল লতিফ ওই কলেজের অন্তত দুই কোটি টাকা নানা কৌশলে আত্মসাৎ করেছেন। তাঁর অর্থ আত্মসাতের খাতগুলোর মধ্যে এমনকি পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্দেশিকা বিক্রি পর্যন্ত আছে। পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে ফি নেওয়া হয়, সেখান থেকেও তিনি টাকা আত্মসাৎ করেন বলে তাঁর সহকর্মীরা অভিযোগ করেন। একটি উদাহরণ এ রকম: কলেজে ২০১৪ সালের মাস্টার্স শেষ পর্ব পরীক্ষা, যা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালে, সেই পরীক্ষার ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা হয়। অধ্যক্ষ আবদুল লতিফ সেখান থেকে ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছেন ‘অডিট খরচ’-এর নাম করে।
ওই পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এ টি এম রিয়াজুল ইসলাম স্বয়ং অভিযোগ করেছেন, অধ্যক্ষ আবদুল লতিফ তাঁর কাছ থেকে দুই দফায় ওই টাকা নিয়েছেন। অধ্যক্ষ আবদুল লতিফ তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ ভিত্তিহীন, ষড়যন্ত্রমূলক ইত্যাদি বলে নাকচ করেছেন। কিন্তু কলেজটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবি থেকে সরেননি, তাঁরা তাঁর বিচার ও অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের আন্দোলন এবং এ সম্পর্কে প্রথম আলোয় সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাঁর প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। গত সোমবার সেই তদন্ত কমিটি রংপুরে গিয়ে তদন্তকাজ শুরু করে। কিন্তু সেই তদন্ত কমিটির আচরণ ও কথাবার্তা সম্পর্কে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেসব অভিযোগ করছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে তদন্ত কমিটির আচরণ তদন্ত করার জন্যই আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। অভিযোগ হলো, তদন্ত কমিটি ঢাকা থেকে রংপুরে গিয়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ আবদুল লতিফকে সঙ্গে নিয়েই ‘মধ্যরাতে’ও তদন্তের কাজ করে। তার আগে তদন্ত কমিটির সদস্যরা স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাদের ডেকে নেন, যাঁরা অধ্যক্ষের পক্ষে রয়েছেন। মোদ্দাকথায়, অধ্যক্ষ আবদুল লতিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা তাঁরই পক্ষ নিয়েছেন। যদিও তদন্ত কমিটির সদস্যরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবু নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে তাঁদের তদন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তাহলে এখন করার কী আছে? আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা? না, আমরা বলি, এবার দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টা খতিয়ে দেখুক।

সবার জন্য নাগরিক পেনশন! by তোফায়েল আহমেদ

২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এই বাজেটে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে লাগাতার তৃতীয় মেয়াদের সরকারের শাসনদর্শন, উন্নয়ন ও সেবাকৌশল এবং কর্মসূচির রূপরেখা। এসব দর্শন ও কৌশলের অংশ হিসেবে ‘জাতীয় নাগরিক পেনশন’ ব্যবস্থার একটি রূপরেখা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতির বিষয় সম্প্রতি জানা গেল। ১ ফেব্রুয়ারি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ফান্ড হস্তান্তরের একটি পাইলট প্রকল্প উদ্বোধনকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী দুজনই সব নাগরিকের জন্য পেনশন-ব্যবস্থা প্রবর্তনে সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত তিনটি বাজেটেই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ আশা করা হচ্ছিল, বিশেষত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৫ সালে ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ গৃহীত হওয়ার পর থেকে সর্বজনীন নাগরিক পেনশন বিষয়ে নাগরিক প্রত্যাশা বাড়তে থাকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তুতিপর্বে অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিবের এ বিষয়ে প্রদান করা বক্তব্য অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ২৩টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪৮টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। এসব কর্মসূচির মধ্যে সরকারি বাজেটে যে বরাদ্দ, তা এককভাবে ছয় লাখের মতো সরকারি কর্মচারীর জন্য ২৫ শতাংশ এবং আরও ৪-৫ শতাংশ দরিদ্র পুরুষ-নারীদের মধ্য থেকে প্রায় ৩০ লাখ, যাঁরা ৬৩ (নারী) ৬৫ (পুরুষ) বছর বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি মাসে দেওয়া হয়। দেশে সাধারণভাবে বয়স্কদের জন্য পৃথকভাবে অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম যথা স্বাস্থ্য, আবাসন ও নিয়মিত আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি স্বকর্মে নিয়োজিত, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, বেসরকারি চাকরিজীবী, যাঁরা সারা জীবন বা জীবনের একটি বড় সময় রাষ্ট্রকে নিয়মিত কর দিয়ে এসেছেন, তাঁদের জন্য কোনোরূপ পেনশন-ব্যবস্থা এ দেশে নেই। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ যুগপৎভাবে ‘মধ্যম আয়ের’ দেশ এবং একটি আদর্শ ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্র’ হয়ে উঠতে পারে। সেই লক্ষ্যে দেশের প্রবীণ নাগরিকদের সচ্ছল, নিরুদ্বেগ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনব্যবস্থার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সর্বজনীন নাগরিক পেনশন, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সেবাদানের বাস্তব কার্যক্রম প্রয়োজন। মন্ত্রণালয় তথা সরকারের বিবেচনার জন্য সেই লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ দেওয়া হলো। প্রথমত, জাতীয়ভাবে নাগরিক পেনশন-ব্যবস্থা প্রবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। তবে জীবনচক্রের ভিত্তিকে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় বেসরকারি চাকুরে ও প্রবীণদের জন্য যে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় ২০১৫ সালের কৌশলপত্রে উল্লেখ রয়েছে, তা যথেষ্ট বাস্তবসম্মত নয়। এখানে তিন স্তরে বেসরকারি ব্যক্তিদের পেনশনের প্রথম স্তর হচ্ছে অতিদরিদ্র বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য সরকারি অর্থে ন্যূনতম আয়ের সংস্থান; দ্বিতীয় স্তরে আনুষ্ঠানিক বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য ‘কনট্রিবিউটরি পেনশন স্কিম’ এবং তৃতীয় স্তরে হচ্ছে স্বেচ্ছায় স্ব-অর্থে গৃহীত বেসরকারি পেনশন স্কিম। এই তিন স্তরের পেনশন-ব্যবস্থাকে কোনোভাবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পেনশন-ব্যবস্থার সুগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা যায় না।
জাতীয় নাগরিক পেনশন-ব্যবস্থা হিসেবে একটি ব্যবস্থা চালু করতে হলে প্রথম অগ্রাধিকার হবে একটি ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ’ গঠন, যা অবশ্য অর্থসচিবের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হবে ‘জাতীয় পেনশন তহবিল গঠন’। এই তহবিলের বহুমুখী উৎস থাকতে পারে। প্রধান উৎস হবে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর প্রদানকারীদের আয়করের একটি অংশ। অর্থাৎ প্রতিবছর যাঁরা আয়কর দিয়ে থাকেন, তাঁদের আয়করের নির্দিষ্ট একটি অংশ ২-৩ শতাংশ জাতীয় পেনশন তহবিলে হস্তান্তর। দ্বিতীয় উৎস হিসেবে সরকার প্রতিবছর বাজেট থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ স্থানান্তর করবে। তৃতীয় উৎস হবে কর্মকর্তা-কর্মচারী (সরকারি-বেসরকারিনির্বিশেষে) চাকরিজীবীর নিজের এবং সংগঠনের প্রদেয় অংশ। এভাবে যে অর্থ প্রতিবছর জাতীয় পেনশন তহবিলে জমা হবে, তা সরকার বিভিন্ন লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করে ওই তহবিলের আকার ও পরিমাপ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করবে। বর্তমান জনমিতি কাঠামোয় ষাটোর্ধ্ব বয়সের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশের কাছাকাছি। আগামী ২৫ বছরে তা ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। ওই জনসংখ্যার পেনশন প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান সামনে রেখেই এই তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করতে হবে। আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বেসরকারি কর্মচারীদের পেনশন-ব্যবস্থা তাঁদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যস্ত করা বা আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরের ব্যক্তিদের জন্য তাঁদের নিজস্ব কনট্রিবিউশন সংগ্রহ বা বিশেষ বিমা-ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনাগত দিক থেকে সুবিধাজনক হবে বলে মনে হয় না। ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ’ নামক একটি নতুন একক সংগঠনের আওতায় সরকারি-বেসরকারি সব ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে একীভূত হওয়াই যুক্তিযুক্ত। এ বিষয়ে একটি কমিশন করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ গ্রহণ করা উচিত। শুধু নির্বাচন সামনে রেখে জনতুষ্টির জন্য অপরিকল্পিতভাবে তাড়াহুড়া করে কিছু করা উচিত হবে না। এ বিষয়ে বিবেচনার জন্য শুধু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করব। প্রথমত, সরকারি কর্মচারীদের বিরাজমান পেনশন-ব্যবস্থায় আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য দুটি বিষয় এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক পেনশনের জন্য একটি বিষয়। সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনযোগ্য বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মচারীদের অনেকে পুরোনো বেতন স্কেলে অবসরে গেছেন এবং অবসরকালে পুরো পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড নগদায়ন করেছেন। বর্তমানে তাঁদের অনেকে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। তাঁদের বয়স ৬২ থেকে ৮০ পর্যন্ত হতে পারে। তাঁরা বর্তমানে মাসে সামান্য চিকিৎসাভাতা ও উৎসবভাতা পেয়ে থাকেন। এসব বয়স্ক মানুষ আগামী অর্থবছর থেকে যত দিন বেঁচে থাকবেন, ওই সময়ের জন্য তাঁদের পুনরায় সরকারি কর্মচারীর প্রাপ্য পেনশনের নিয়মে মাসিক পেনশনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করব। এটি সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের প্রতি মহানুভবতা হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই স্কিমের আওতায় পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রতিবছরই হ্রাস পাবে এবং ১০ বছরের মধ্যে শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। এই খাতে সরকারের ব্যয় ১০-১৫ কোটি টাকার বেশি হবে না। তা ছাড়া ১০ বছর ধরে নিয়মিত আয়কর প্রদানকারী যাঁরা ৬০-৬২ বছর বয়সসীমা অতিক্রম করেছেন, কিন্তু কোনো সরকারি পেনশন স্কিমের আওতাভুক্ত নন, আগামী অর্থবছর থেকে তাঁদের প্রদত্ত আয়করের আনুপাতিক একটি হার নির্ণয় করে নাগরিক পেনশনের আওতাভুক্ত করা যেতে পারে। এভাবে নাগরিক পেনশনের সূচনা আয়কর প্রদানকারীদের দিয়েই শুরু করা যেতে পারে।  সর্বজনীন নাগরিক পেনশন চালু হলে তা ধনী ও দরিদ্র সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়কর প্রদান একটি প্রধান নির্ণায়ক হওয়া উচিত। বর্তমানে বেসরকারি চাকরিজীবীরা, প্রতি মাসে বেতনের উৎসে যাঁদের আয়কর কাটা হয়, সেই আয়করের কোনো সুবিধাই তাঁরা ভোগ করেন না। সন্তানের শিক্ষা, নিজের ও পরিবারের চিকিৎসা, আবাসন—কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ কোনো অগ্রাধিকার নেই। সে কারণে সরকারকে কর দেওয়া নিরর্থক মনে হয়। জাতীয় নাগরিক পেনশনে আয়কর প্রদানকারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হলে দেশে কর প্রদানকারীর সংখ্যা ও হার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে আমাদের ধারণা।
ড. তোফায়েল আহমেদ: নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক
tofail101@gmail.com

চীন দেশের রঙ্গ by আতাউর রহমান

রসগল্প কেবল হাসির খোরাকই জোগায় না, বিভিন্ন দেশ ও জাতির আচার-আচরণ, দেশপ্রেমের নিদর্শন, জাত্যভিমান, অহংবোধ, নির্বুদ্ধিতা, চাটুকারিতা, পরশ্রীকাতরতা, কৃপণতা, কূটবুদ্ধি, যৌনজীবন ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক তথ্যও প্রদান করে। এতদর্থে চীনাদের সম্পর্কিত গল্প-চতুষ্টয় পরিবেশন করা হলো:
এক. চীন দেশের লি ওয়াংয়ের প্রতিবেশীর দুই বউ, দুজনেই মোটামুটি সুন্দরী। লি ওয়াং উক্ত প্রতিবেশীর বড় বউয়ের কাছে প্রেম নিবেদন করে গালিগালাজ খেল, কিন্তু ছোট বউ কর্তৃক তার প্রেম প্রত্যাখ্যাত হলো না। ঘটনাচক্রে কিছুদিন পর প্রতিবেশী হঠাৎ পটোল তুললে সে ছোট বউয়ের পরিবর্তে বড় বউকেই বিয়ে করে বসল। অতঃপর বন্ধুবান্ধব ও পরিচিত লোকজনের ক্রমাগত প্রশ্নের উত্তরে সে জানাল, ‘ছোট বউ চরিত্রহীনা; কিন্তু বড় বউ সতী-সাধ্বী, পরপুরুষ প্রেম নিবেদন করলে তাকে গালিগালাজ করে, তাড়িয়ে দেয়। ওকে বিয়ে করব না তো করব কাকে?’
দুই. লি শাওচি নামে আরেক চীনা বিয়ে করেছে। ওর মনে সন্দেহ, বউয়ের বয়স অনেক বেশি, যদিও দেখায় কম। কিন্তু বউ কিছুতেই বয়স বেশি স্বীকার করতে চায় না। জিজ্ঞেস করলেই বলে, ‘বাইশ কি তেইশ’। একদিন সে এক বুদ্ধি খাটাল। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলতে লাগল, ‘যাই, রান্নাঘরে গিয়ে লবণের বয়ামটা ঢেকে রেখে আসি। নইলে ইঁদুরে সব লবণ খেয়ে সাবাড় করে ফেলবে।’ বউ এটা শুনে আনমনে বলে উঠল, ‘চল্লিশ বছর ধরে এই শহরে আছি; ইঁদুরে লবণ খায়, এটা কোনো দিন শুনিনি।’ ব্যস, তার যা জানার জানা হয়ে গেল।
তিন. একটি সমৃদ্ধ চীনা রেস্তোরাঁর ঠিক পাশেই এক গরিব লোকের লন্ড্রি দোকান ছিল। লোকটা প্রতিদিন তার ভাতের বাটিসহযোগে রেস্তোরাঁর যতটা সম্ভব কাছে চেয়ার নিয়ে বসত এবং খেতে খেতে রেস্তোরাঁর ক্ষুধা উদ্রেককারী সুঘ্রাণ শুঁকত। একদিন সে তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি বিল পেল, সেটাতে লেখা ছিল ‘খাদ্যের সুঘ্রাণ নেওয়ার জন্য’। সে তার লন্ড্রিতে ফিরে গিয়ে ক্যাশবাক্স নিয়ে বেরিয়ে এল এবং প্রতিবেশীর কানের কাছে সেটা ঘর্ঘর শব্দে বাজাতে বাজাতে প্রতিবেশীর উদ্দেশে বলল, ‘আমি এতদ্বারা আমার টাকার শব্দ শুনিয়ে আপনার খাদ্যের ঘ্রাণের বিল পরিশোধ করলাম।’
চার. নিউইয়র্কের চায়না টাউনে সব দোকানই চীনাদের। তো জনৈক পর্যটক একদা চায়না টাউনে পরিভ্রমণকালে একটি দোকানের সামনে সাইনবোর্ডে ‘লারস ওলাফসেনস লন্ড্রি’ দেখতে পেয়ে কৌতূহলবশত ভেতরে প্রবেশ করল। কারণ, মালিকের নামটি চীনা নয়, বরং ওটা স্পষ্টতই সুইডিশ নাম। ভেতরে প্রবেশ করে সে কাউন্টারের পেছনের বুড়ো চীনাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনিই বুঝি লন্ড্রির মালিক? কিন্তু আপনার নাম তো লারস ওলাফসেন হওয়ার কথা নয়।’ বুড়ো একগাল হেসে জবাব দিল, ‘আপনি ঠিকই ধরেছেন। ব্যাপার হচ্ছে বহু বছর পূর্বে আমি যখন ইমিগ্র্যান্ট হয়ে এ দেশে আসি, তখন নিবন্ধন অফিসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। আমার সামনে এক ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক। নিবন্ধনকারী মহিলা তাঁকে নাম জিজ্ঞেস করাতে তিনি বললেন ‘লারস ওলাফসেন’। অতঃপর আমার পালা; নাম জিজ্ঞেস করতেই আমি বললাম, ‘সেম তিং (Sem Ting) ওটাই আমার নাম। কিন্তু তিনি বুঝলেন ‘সেইম থিং (Same thing)। অতএব আমিও নিবন্ধিত হলাম লারস ওলাফসেন নামে এবং অদ্যাবধি ওই নামটিই আমি বহন করে চলেছি।’ অতঃপর চীনের সিনচিয়াং প্রদেশের উইঘুর জাতিসত্তার ঘরে ঘরে সুপরিচিত নাসিরুদ্দিন আফেন্দির রসগল্প। প্রসঙ্গত, ইংরেজি ভাষায় একটি শব্দ ইনুএনডো (Innuendo), যেটার অর্থ হচ্ছে কটাক্ষ বা বক্রোক্তি। দয়া করে আপনারা কেউ গল্পগুলোতে ‘ইনুএনডো’ খোঁজার চেষ্টা করবেন না। আমার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে আপনাদের কিছু বিমল আনন্দের খোরাক জোগানো।
এক. সিংহাসনে আরোহণ করে চীনের নতুন রাজা রাজ্য নিয়ে কখনো মাথা ঘামাতেন না। বিদেশি দূতদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আবোল-তাবোল বকতেন। তিনি একবার আফেন্দিকে তাঁর উপদেষ্টা নিযুক্ত করলে আফেন্দি প্রস্তাব করলেন, ‘আপনি সিংহাসনে বসলে আমি আপনার পায়ে একটা লম্বা দড়ি বেঁধে দড়ির অপর প্রান্ত ধরে থাকব এবং আপনি কোনো বেফাঁস কথা বললেই আমি দড়ি ধরে টান দেব। তখন আপনি চুপ করে যাবেন।’ রাজা সানন্দে সম্মতি দিলেন। পরদিন প্রতিবেশী এক দূত রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি দূতকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আপনার দেশের বিড়াল ও কুকুরেরা কি খুব হাসিখুশি? গরু আর ছাগলেরাও কি খুব শান্ত ও সুস্থ?’ আফেন্দি তৎক্ষণাৎ রাজার দড়ি ধরে টান দিয়ে তাঁকে চুপ করিয়ে দূতকে ব্যাখ্যা দিলেন, ‘আমাদের রাজা একজন অতি বিজ্ঞ ব্যক্তি, তাঁর কথার অর্থ সাধারণভাবে বোঝা দুরূহ। তিনি বিড়াল ও কুকুর বলতে আপনার দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের এবং গরু ও ছাগল বলতে ওখানকার জনসাধারণকে বোঝাচ্ছেন।’ দূত এতে সন্তুষ্ট হয়ে প্রস্থান করলেন। অতঃপর রাজা রাগত কণ্ঠে আফেন্দিকে বলতে লাগলেন, ‘আমার কথার অর্থ যদি সঠিকই ছিল, তাহলে তুমি আমার পায়ের দড়ি ধরে টান দিলে কেন? তোমাকে আমি শূলে চড়াব।’ অনেক কষ্টে আফেন্দি সেই যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন।
দুই. একবার স্থানীয় এক জমিদার নাসিরুদ্দিন আফেন্দিকে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আচ্ছা বলতে পারো, প্রজারা সাক্ষাতে আমার প্রশংসা আর অসাক্ষাতে নিন্দা ও টিটকারি করে কেন?’ আফেন্দি প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘হুজুর, আমার বেয়াদবি নেবেন না। এর কারণ কিন্তু আপনিই। আপনি কথা বলেন এক রকম আর কাজ করেন তার উল্টোটা। তাই আপনার মোসাহেব প্রজারা আপনাকে সন্তুষ্ট রাখতে আপনার সামনে গুণকীর্তন করলেও পেছনে আপনাকে গালমন্দ ও টিটকারি করে মনের ঝাল মিটিয়ে নেয়।’ কথাগুলো খুব গম্ভীরভাবে বলে আফেন্দি সেখান থেকে চলে এলেন। প্রসঙ্গত, চীনাদের মধ্যে যে সমস্ত মজাদার অযৌক্তিক বিশ্বাস প্রচলিত, সেগুলোর কতক হচ্ছে: ১. গোঁফ রাখা দুর্ভাগ্যের কারণ; ২. সবুজ টুপি মানে আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে প্রতারণা করছে; ৩. ৪ সংখ্যাটা অপয়া, কিন্তু ৮ সংখ্যাটা খুবই উত্তম।
আতাউর রহমান ডাক বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা

বস্তিতে নারীর স্বাস্থ্যসেবা

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ‘চাইল্ড ওয়েল বিয়িং সার্ভে ইন আরবান এরিয়াজ অব বাংলাদেশ ২০১৬’ শীর্ষক জরিপে দেশের প্রধান প্রধান শহরে বস্তির নারীদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং মেয়েদের বাল্যবিবাহের যে নাজুক চিত্র বেরিয়ে এসেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, শহরাঞ্চলের বস্তিতে ৬৪ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রসব-পূর্ব সেবাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পান না। বস্তির বাইরে শহরের অন্য এলাকায় এসব সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকেন ৩৯ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা। এ ছাড়া বস্তিতে ১৫ বছরের আগেই এক-চতুর্থাংশের বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। আর বস্তির বাইরে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে এক-পঞ্চমাংশ মেয়ে। তবে বস্তিতে ১৮ বছরের আগে বাল্যবিবাহের এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলের বস্তির নারীদের স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে। অন্তঃসত্ত্বা নারীরা যদি প্রসব-পূর্ব সেবা না পান, তাহলে তাঁদের প্রসবকালীন জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে তাঁদের মৃত্যুও হতে পারে। অর্থাৎ বলা যায়, বস্তির ৬৪ শতাংশ নারী মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে থাকেন। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) সম্প্রতি প্রকাশিত মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাতৃমৃত্যুর হার লাখে ১৯৬। অর্থাৎ, ১ লাখ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। আর এই মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রসব-পূর্ব সেবা না পাওয়া।
মা ও শিশুস্বাস্থ্যে অসামান্য অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল হেলথ ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক ‘সাউথ-সাউথ পুরস্কার’ অর্জন করে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন সত্য, কিন্তু নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হয়নি এখনো। এ জন্য সরকারকে আরও অনেক কাজ করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যও তা জরুরি। আমরা চাই দেশের প্রত্যেক নারী সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। প্রত্যেক নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে। এখন সরকারের উচিত বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং জরিপে উঠে আসা তথ্য থেকে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে কোথায় কী সীমাবদ্ধতা আছে, তা চিহ্নিত করে সেসব সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ রোধেও সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা, সরকারের নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ হয়েই চলেছে। বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় ১৮ বছরের আগে বাল্যবিবাহের হার ৬৭ শতাংশ। এটা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। কেন বস্তি এলাকায় বেশি বাল্যবিবাহ হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা ও সামরিকীকরণের বিপদ by হাভিয়ের সোলানা

বিশ্বের মহাক্ষমতাধর দেশগুলোর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে বিশ্বে আবার বহুমেরুত্ব ফিরে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের পুনর্বার জেগে ওঠা এবং রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন এই শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সামরিক গতির প্রধান দিক হয়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বসার প্রথম বছরেই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিবেশ শীতল হয়েছে; পাশাপাশি তার শত্রুদেশ বলে বিবেচিত দেশগুলোর সঙ্গেও তার সম্পর্ক শীতলতর হয়েছে। পাঁচ বছর আগে সি চিন পিং যখন চিনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপের ভিত্তিতে ‘মহাশক্তিধরদের নতুন ধরনের সম্পর্ক’ শীর্ষক একটি সম্পর্কের ধারণা দেন। এই সম্পর্কের ধারা অনুসরণ করে একটি ক্ষমতাধর দেশ অন্য একটি ক্ষমতাধর দেশের জাতীয় স্বার্থকে সম্মান করবে বলে তিনি মত দেন। কিন্তু চীন মুখে ভালো ভালো কথা বললেও সব সময় সেসব কথা যে অনুসরণ করে না, তা দক্ষিণ চীন সাগরে তার একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা দেখেই বোঝা যায়।
তা ছাড়া চিন পিংয়ের কূটনৈতিক বিভাগের চেয়ে পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা দেখেও তাঁর সেই বক্তব্যের স্ববিরোধিতা লক্ষ করা যায়। এমনকি চিন পিং সবাইকে অবাক করে দিয়ে সামরিক উর্দি পরার আগ্রহ পর্যন্ত দেখিয়েছেন। অন্যদিকে গত দশকে রাশিয়া সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দুটি ভূখণ্ডে দখলাভিযান চালিয়েছে এবং সামরিক খাতে ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি’ নামে একটিমাত্র পারমাণবিক চুক্তি হয়েছে এবং এটি এখনো বলবৎ আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়েই উভয়ের বিরুদ্ধে ওই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। বর্তমানে মহাশক্তিগুলোর মধ্যে যে পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটিকে আমাদের অতিরঞ্জিত করা ঠিক হবে না। গত তিন মাসে মার্কিন প্রশাসন ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি, ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি ও নিউক্লিয়ার পশ্চার রিভিউ গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশ করেছে। এসব নথিতে চীন ও রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় বিচার করলে দেখা যাবে, সবচেয়ে বড় হুমকিটি কিন্তু চীন বা রাশিয়া থেকে আসছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের বিভ্রান্তিকর পররাষ্ট্রনীতির মধ্যেই এই হুমকি নিহিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এতকাল ধরে বৈশ্বিক বিষয়ে খবরদারি করে আসছে। কখনো কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে গেছে, কখনো কারও সমর্থনে কাজ করেছে। এভাবেই দেশটি এগিয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ঐতিহ্যবাহী কৌশল থেকে সরে এসে অভ্যন্তরীণ স্বার্থের বিষয়ে বেশি জোর দিতে চেয়েছেন। এতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষাকৃত কম হস্তক্ষেপের সুযোগে, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। এটি সামরিক প্রতিযোগিতাকে অনিয়ন্ত্রিত অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। স্মরণে রাখা জরুরি, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের ইস্যুতে নাক গলাবেন না বললেও সম্প্রতি সামরিক সম্ভারের দম্ভ দেখিয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনকে ভয় দেখাতে চেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বিশ্বের এক নম্বরে। এই ব্যয়ের পরিমাণ দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের ব্যয়ের তিন গুণ এবং তৃতীয় স্থানে থাকা রাশিয়ার ব্যয়ের প্রায় নয় গুণ। এর পরে থাকা আটটি দেশের সমান তার সামরিক ব্যয়। বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক পারমাণবিক চুল্লি তার দখলে। এরপরও ট্রাম্প তাঁর দম্ভ প্রকাশ করতে গিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। নিউক্লিয়ার পশ্চার রিভিউয়ের নথিতে যুক্তরাষ্ট্রকে তার অন্তর্মুখী অবস্থান থেকে সরে এসে আগের মতো বৈশ্বিক বিষয়ে অগ্রণী হতে বলা হয়েছে। এতে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য আসবে এবং রাশিয়ার উদ্ধত তৎপরতাকে কিছুটা নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হবে। এতে বিশেষ করে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে না, বরং অনেকাংশে কমে যাবে। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তি সঞ্চয় ছাড়াও চীন ও রাশিয়ার বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। চীন ও রাশিয়াকে বিনা বাধায় সমরাস্ত্রের পাহাড় গড়তে দেওয়া আগুনের ওপর জ্বালানি ফেলে দেওয়ার নামান্তর। ফলে বিশ্বকে নতুন পারমাণবিক হুমকি থেকে বাঁচানোর স্বার্থে হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্মুখী নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উত্তর কোরিয়ার রাশ টেনে ধরতে হবে। নতুন একটি সামরিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার উত্তেজনা থেকে বিশ্বকে নিরাপদ করতে ট্রাম্পকে তাঁর নীতি অবশ্যই বদলাতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
হাভিয়ের সোলানা ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব

জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা

গত ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা উপেক্ষা করে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় বিষখালী, পায়রা, বলেশ্বর নদ-নদীসহ বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা ধরা হচ্ছে। আর তা করা হচ্ছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে! শনিবার প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে একশ্রেণির অসাধু জেলে দিনরাত জাটকা ধরছেন। এটা শুধু ওই তিনটি নদীতে ঘটছে না। উপকূলীয় নদীতে জাটকা ধরার মহোৎসব চলে। যাঁদের এসব প্রতিরোধ করার কথা তাঁরাই উল্টো জাটকা ধরতে জেলেদের সহযোগিতা করলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদৌ কোনো লাভ আছে কি? উপজেলার কাকচিড়া ও চরদুয়ানি ইউপির চেয়ারম্যান এবং বেশ কয়েকজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে জেলেদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে জাটকা শিকারের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, কোস্টগার্ডের সদস্য ও নৌ-পুলিশের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। উৎকোচের বিনিময়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জাটকা নিধনে জেলেদের সহায়তা করার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যাঁরা এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত,
তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এ বিষয়ে সরকারের নীতি-পরিকল্পনায়ও ঘাটতি আছে। উপকূলীয় এলাকাসহ নদ-নদীতে আট মাস জাটকা শিকার নিষিদ্ধ হলেও সরকার জেলেদের খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে মাত্র চার মাস-মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। বাকি চার মাস জেলে পরিবারের সদস্যদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। এ অবস্থার উত্তরণে সরকারের উচিত ওই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আশার কথা বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে। রপ্তানির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা প্রত্যাহারেরও ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে জেলেরা উৎসাহিত হবেন। অন্যদিকে ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে বা এ নিষেধাজ্ঞা যে উদ্দেশ্যে, সেই ফল পেতে হলে এ সময়ে জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের প্রতি নজর দিতে হবে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় তাঁদের আরও বেশি সহযোগিতা দেওয়া যেতে পারে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, জাটকা শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার ট্রলার, জ্বালানি এবং জনবল-সংকট রয়েছে। তাই নিয়মিত অভিযান চালানো যায় না। সরকারকে এসব দিকেও নজর দিতে হবে। এরপরও যদি কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকা ধরেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

নিষেধাজ্ঞায় না দমলে কিমকে ‘ফেইজ টু’ হুমকি ট্রাম্পের

উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির লাগাম টানতে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞায় কাজ না হলে অন্য পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, নিষেধাজ্ঞাও পিয়ংইয়ংকে না দমালে যুক্তরাষ্ট্র ‘ফেইজ টু’-এর (দ্বিতীয় ধাপ) পথে হাঁটবে, যা ‘বিশ্বের জন্য খুব, খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে’।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি, ২৭টি প্রতিষ্ঠান ও ২৮টি জাহাজের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ঘোষণা করা হয়। এটি এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা। খবর রয়টার্সের। জাতিসংঘের অন্য এক নিষেধাজ্ঞার আওতায় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও কালো তালিকায় রাখার প্রস্তাব করেছে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। এর ‘লক্ষ্য হচ্ছে- উত্তর কোরিয়ার তেল ও কয়লা বিক্রির অবৈধ চোরাচালানি বন্ধ করা’। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এ নিষেধাজ্ঞায় এক তাইওয়ানি নাগরিকের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে চীন, হংকং, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের বেশ কয়েকটি জ্বালানি ও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান।

পাক-ভারত সীমান্তে ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলাবর্ষণ

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ২০০৩ সালের পর গত এক সপ্তাহ ধরে তীব্র আন্তঃসীমান্ত গোলবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ভারতনিয়ন্ত্রিত উরি গ্রামের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলেছে পাকিস্তান। এর পর সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তবে বৃহস্পতিবার থেকেই লোকজনকে গ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। শনিবার সন্ধ্যায় এক হাজার গ্রামবাসীকে শহরে অপসারণ করা হয়েছে। উরিতে পরিচালিত দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের জন্য সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন। ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গোলাবর্ষণের পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছেন। গত সোমবার থেকে দুই পক্ষ থেকে প্রতিদিনই গোলাবিনিময়ের ঘটনা ঘটছে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে পাকিস্তানের দিক থেকে গোলবর্ষণ শুরু হয়। সীমান্তবর্তী তিনটি গ্রাম চুরান্দা, সিলিকোট ও তিলাওয়ারিতে গোলা আঘাত হানলে বেশ কিছু বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। সিলিকোট গ্রামের এক অধিবাসী বলেন, এর পর লাউডস্পিকার দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা তাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলেছেন। তারা আমাদের দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে গ্রাম ছাড়তে বলেছেন।
এতে সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে চলে যাচ্ছেন। বরমুল্যা শহরের ডেপুটি কমিশনার নাসির নাশাখ বলেন, পাকিস্তানের দিক থেকে গ্রামবাসীকে চলে যেতে বলার ঘোষণা তিনি শুনেছেন। এটি হতে পারে সামরিক কৌশল। আতঙ্ক ছড়াতে তারা এমন ঘোষণা দিতে পারেন। ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেন, নিয়ন্ত্রণরেখায় পাকিস্তান তাদের অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের আওতা বাড়াতে চাইছে। যেটি পীর পাঞ্চল পর্বতমালা পর্যন্ত সীমিত ছিল। তবে পর্বতমালার দক্ষিণ দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীও প্ররোচনামূলক ভূমিকা নিয়েছে। তারা পাকিস্তানি সেনাদের চাপে রাখতে চাচ্ছে। এ অঞ্চলে পাকিস্তান উরির মতোই পদক্ষেপ নিচ্ছে। শনিবার উরি সেক্টর থেকে গ্রামবাসীকে সরাতে ভারত সরকার অ্যাম্বুলেন্স ও প্রাইভেটকার ব্যবহার করছে। স্বেচ্ছায় উরি শহরের একটি স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন গ্রামবাসী। উরির উপবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট ড. সাগর ডি বলেন, পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাকর। ৭-৮ হাজার লোক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা হাজারখানেক লোককে শহরে সরিয়ে নিয়েছি। তবে সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের ঘোষণা নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তান অস্ত্রবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কর্নেল রাজেশ খালিয়া বলেন, বিনা উসকানিতেই উরি সেক্টরে পাকিস্তান বাহিনী গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছে। আমরাও পাল্টা গোলাবর্ষণ করছি।

মেধা পাচার রোধে পদক্ষেপ চাই

মেধা পাচার যে কোনো দেশের জন্য অভিশাপ। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে দেশের উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। মেধাবী শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, বিশেষজ্ঞ এবং দক্ষ জনশক্তি যাতে দেশত্যাগ করে বিদেশকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে স্থায়ীভাবে বেছে না নেয় এ জন্য সব দেশেই বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়। বস্তুত সব উন্নয়নশীল দেশ থেকেই মেধা পাচার হয়ে থাকে।
প্রকৃত দেশপ্রেমিক না হওয়ার কারণে অর্থের লোভে কেউ কেউ দেশত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমায়, তারা আর ফিরে আসে না। মেধা পাচারের কারণে আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের উচ্চশিক্ষিত পিএইচডি ডিগ্রিধারী, প্রকৌশলী, ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিজ্ঞানীসহ সবাইকে বিনীত অনুরোধ করছি, বিদেশের মায়া ত্যাগ করে দেশকে আরও বেশি ভালোবাসুন। সুজলা সুফলা, শস্য-শ্যামলা এদেশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, রয়েছে সুন্দরবন। এ রকম আরও অনেক কিছুর নাম উল্লেখ করা যায় যা দেখে বিদেশিরাও বিস্মিত হন। আমাদের দেশের রয়েছে অনেক সম্ভাবনা। এসব সম্ভাবনা সবার সামনে তুলে ধরার জন্য নিতে হবে বহুমুখী পদক্ষেপ। মেধা পাচার রোধে কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মুন্নাফ হোসেন
সহকারী শিক্ষক, ফুলবাড়িয়া
ময়মনসিংহ

বাংলাদেশে কোনো সুকুমার রায় নেই by বদরুদ্দীন উমর

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী যে সর্বাত্মক সশস্ত্র আক্রমণ করেছিল তার মুখে দাঁড়িয়ে এ দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনার কোনো ক্ষমতা তো নয়ই, চিন্তাও তৎকালীন প্রধান দল আওয়ামী লীগ অথবা তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছোটখাটো কোনো দলেরই ছিল না। কাজেই তারা পাকিস্তানের আক্রমণের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে উপস্থিত হয়েছিল। এরপর ভারত যা করেছিল তার জন্য অনেকে ভারতের ওপর দোষারোপ করে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ভারতকে ‘দোষ’ দেয়ার কিছু নেই। মনে রাখা দরকার, ভারত একটি শক্তিশালী পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। এখানকার জনগণের ওপর বেপরোয়া, নির্মম ও নৃশংস সামরিক আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তান যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, সে পরিস্থিতির ব্যবহার ভারত নিজের পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থেই স্বাভাবিকভাবেই করেছিল।
এ প্রসঙ্গে এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, ভারত সরকার এভাবে সুযোগের ব্যবহার করলেও ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সমর্থন করেছিলেন এবং এ যুদ্ধে যথাসাধ্য সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক নিরাপদ দূরত্বে যেসব উচ্চ মাপের আমলা ও বুদ্ধিজীবী ইউরোপ, আমেরিকায় সেখানকার সরকারের ও শাসক শ্রেণীর সমর্থন আদায়ের জন্য তদবির করেছিলেন, তারা পরবর্তীকালে ‘মুক্তিযোদ্ধার’ তকমা বুকে ঝুলিয়ে অনেক পরিচিতি ও সুযোগ-সুবিধা অর্জন করলেও মূল শ্রমিক, মধ্যবিত্ত পরিবারের যে হাজার হাজার যুবক নিঃস্বার্থভাবে যুদ্ধে জীবন দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তাদের মূল্যায়ন হয়নি এবং যারা সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অনেক বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন তাদের ভূমিকা এখন বিস্মৃতির অন্ধকারে। স্বাধীনতার পর ভারতকে অর্থাৎ ভারত সরকারকে বাংলাদেশের ‘শ্রেষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বন্ধুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ভারতের থেকে এরপর কোনো বন্ধুসুলভ আচরণ পাওয়া যায়নি। না পাওয়ারই কথা। কারণ ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিল তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিযুক্ত করতে এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশকে তাদের ওপর নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত করে ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে। সে দুই উদ্দেশ্যই সফল হয়েছে। বাংলাদেশের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ভারত ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে প্রকৃতপক্ষে কিছুই দেয়নি। উপরন্তু নিজের শক্তির জোরে এবং তাদের ওপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক নির্ভরশীলতার কারণে এদেশ থেকে তারা যা চেয়েছে তাই তারা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। তিস্তার পানির মতো অতি প্রয়োজনীয় দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং নানা ধরনের অজুহাত ও টালবাহানা করে আজ পর্যন্ত তারা পানি টেনে নিজেদের দিকেই রেখেছে এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করার শর্ত তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তারা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের নদীবন্দর তারা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছে। জনগণ এসবের বিরোধিতা করলেও তার কোনো মূল্য সরকারের কাছে নেই। বন্ধুরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য তাদের কাছে তুলনায় অনেক বেশি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এখন সামগ্রিকভাবে যে দুর্যোগের মধ্য দিয়ে চলছে এসব হল তারাই এক খণ্ডচিত্র। কিন্তু খণ্ডচিত্র হলেও এর ফলাফল বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ। কিন্তু শুধু ভারতই নয়, চীন, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোও এখন বাংলাদেশের ওপর নানাভাবে তাদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের অবস্থা ‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, এসো হে দ্রাবিড় চীন’-এর মতো। বড় বড় প্রকল্পের জন্য ঋণ নেয়া হচ্ছে উন্নয়নের নামে। এসব দেখিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলে ঢেঁড়ি পেটাচ্ছে সরকার। কিন্তু এই প্রকল্পগুলোর দ্বারা উন্নয়ন যাই হোক, এগুলো যে একেকটি চুরি-দুর্নীতির বড় বড় আখড়া এতে সন্দেহ নেই। এজন্য প্রতিটি বড় প্রকল্পের যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় সেটা দফায় দফায় বৃদ্ধি করা হয়। দুই, তিন, এমনকি চারগুণ পর্যন্ত।
পদ্মা সেতু নিয়ে সরকার ঢাকঢোল পেটাতে ব্যস্ত। ইতিমধ্যে এ সেতুর নির্মাণ ব্যয় দু’বার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখন এই বৃদ্ধি তৃতীয়বার হওয়ার পথে!! সব আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী উড়াল সেতু থেকে নিয়ে প্রতিটি প্রকল্পে বাংলাদেশে ব্যয়ের পরিমাণ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের থেকে দুই-তিনগুণ করে বেশি! ব্যয়ের এই আধিক্য যে চুরি-দুর্নীতির ব্যারোমিটার এতে আর সন্দেহ কী? এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ‘সংসদীয় গণতন্ত্রের জয়যাত্রা’ অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ সরকার ‘সুষ্ঠু’ ও ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন ও পুলিশকে ‘গণতন্ত্রের বন্ধু’ হিসেবে ব্যবহার করছে। সব বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ-মিছিল এবং অন্যায়ভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে দমন করছে। বিরোধী দলের বিভিন্ন অংশের লোকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে, বেপরোয়াভাবে মানুষকে গ্রেফতার করে জেলে আটক করছে। আদালতের রায়ে অনেকে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারের মুখপাত্ররা বলছেন, এসবই আদালত করছে। তাদের কোনো হাত নেই!! আদালতের রায়ের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল!! তবে দেখা যাচ্ছে, আদালতের রায় যখন তাদের স্বার্থের পক্ষে তখন তারা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যখন আদালতের রায় তাদের পক্ষে অসুবিধাজনক, তাদের স্বার্থের পক্ষে ক্ষতিকর, তখন তারা আর আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। এটা না হলে দেশের প্রধান বিচারপতিকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগে বাধ্য করতেন না। এসব দিকে তাকিয়ে মনে হয়, দেশে এখন এদের ওপর কবিতা বা ছড়া লেখার জন্য সুকুমার রায়ের মতো একজন প্রতিভাশালী কবির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হায়, বাংলাদেশ। এখানে কোনো সুকুমার রায় নেই।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল