Wednesday, March 17, 2021

মলদ্বার না কেটে রেকটাম ক্যান্সার অপারেশন by অধ্যাপক ডা: এ কে এম ফজলুল হক

রেকটাম বা মলাশয় ক্যান্সার হলে প্রচলিত অপারেশন হচ্ছে রেকটাম বা মলাশয় ও মলদ্বার কেটে ফেলে পেটে Colostomy বা কৃত্রিম মলদ্বার বানিয়ে সেখানে ব্যাগ লাগিয়ে দেয়া, যার মধ্যে সব সময় মল জমা হবে এবং রোগী মাঝে মধ্যে এটি পরিষ্কার করে নেবেন। তার স্বাভাবিক মলদ্বার থাকবে না এবং সারা জীবন ওই পথে আর পায়খানা হবে না কিন্তু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ফলে এখন স্বাভাবিক মলদ্বার রেখেই ক্যান্সারটি অপসারণ করা যায়। রোগী স্বাভাবিক পথেই পায়খানা করতে পারবেন। এ প্রযুক্তির ফলে ৭০-৮০ শতাংশ রেকটাম ক্যান্সার রোগী উপকৃত হবেন।

লক্ষণ কী?
মলদ্বারের দৈর্ঘ্য ৪ সেন্টিমিটার। মলদ্বারের ওপরের ১২ সেন্টিমিটার অংশের নাম রেকটাম। মলদ্বারে রক্ত যাওয়া এ রোগের প্রধান লক্ষণ। এ লক্ষণটিকে রোগীরা আমল দেন না। রোগী যদি এই রক্ত যাওয়ার কারণ ডাক্তার দিয়ে পুরোপুরি তদন্ত না করেই সিদ্ধান্ত নেন যে, এটি পাইলস থেকে হচ্ছে- সবচেয়ে বিপদটি তখনই ঘটে। এরপর মাসের পর মাস কেটে যায় পাইলস মনে করে। ইতোমধ্যে ক্যান্সার তার ডালপালা বিস্তার করতে থাকে। পেটে ব্যথা হতে থাকে, মল আটকে গিয়ে পেট ফুলে উঠতে পারে। তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে বিশেষ ধরনের পরীক্ষায় এ রোগ ধরা পড়ে। ততক্ষণে এ রোগটি সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়।

প্রথম দিকে রোগীর মলত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন আসে। মলত্যাগের বেগ হলে রোগী টয়লেটে যান এবং শুধু রক্ত ও মিউকাস যেতে দেখেন। এটি সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে হয়। রোগীরা এটিকে রক্ত আমাশয় বলে ধারণা করেন। ক্যান্সার যখন মলদ্বারের দিকে সম্প্রসারিত হয়, তখন মলত্যাগের পর ব্যথা শুরু হয়ে দীর্ঘক্ষণ চলতে পারে। রোগীদের যখন বলা হয় আপনাকে বিশেষ ধরনের পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে, কোনো ক্যান্সার আছে কি না। তখন তারা বলেন যে, স্যার আমি জানি এটি পাইলস। অনেক বছর ধরে চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে যে এখানে ক্যান্সার শুরু হতে পারে তা তারা খতিয়ে দেখতে চান না। সবচেয়ে অসুবিধা হলো পাইলস, ক্যান্সার, এনাল ফিশার সব রোগেই রক্ত যাওয়াই প্রধান লক্ষণ। আসলে কোন রোগটি হয়েছে তা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে একজন অভিজ্ঞ সার্জনই কেবল বলতে পারেন। এই ক্যান্সার যদি মূত্রথলি অথবা মূত্রনালী আক্রমণ করে তখন রোগী প্রস্রাবের কষ্টে ভোগেন এবং বারবার প্রস্রাব হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ ক্যান্সার যৌনপথে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ওই পথ দিয়ে রক্ত ও মিউকাস এমনকি মলও বেরিয়ে আসতে পারে।

বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সমলের সুপ্ত রক্ত পরীক্ষা সমলদ্বারের ভেতর আঙুল দিয়ে পরীক্ষা সপ্রকটসিগময়ডোস্কপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সকোলোনসকপি সবেরিয়াম এনেমা সসি-ই-এ (কার্সিনোএম্রাইওনিক এন্টিজেন) সআল্ট্রাসনোগ্রাম অব লিভার স আইভিইউ এক্স-রে সপেটের সিটি স্ক্যান।

প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি ও অত্যাধুনিক চিকিৎসা
অপারেশনই এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা। এ রোগে ঐতিহ্যবাহী অপারেশন হচ্ছে রেকটাম বা মলাশয় ও মলদ্বার কেটে ফেলে পেটে নাভির বাম দিকে কলোস্টমি বা কৃত্রিম মলদ্বার তৈরি করে দেয়া। যেখানে একটি ব্যাগ লাগানো থাকে যার ভেতর মল জমা হতে থাকে। যখন রোগীকে এ জাতীয় অপারেশনের ধারণা দেয়া হয় তখন অনেক রোগীই বলেন যে, স্যার মরে যাব তবু এমন অপারেশন করাব না। এসব রোগী এরপর হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন অপারেশন ছাড়াই চিকিৎসার জন্য। কিছু দিন চিকিৎসার পর হতাশ হয়ে যখন ফিরে আসেন তখন সম্পূর্ণরূপে সারিয়ে তোলার অবস্থা আর থাকে না। তখন রোগী মিনতি করে বলেন, স্যার ভুল হয়ে গেছে এখন কিছু একটা করুন।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আমরা ৭০-৮০ শতাংশ রেকটাম ক্যান্সার রোগীর মলদ্বার না কেটেই অপারেশন করতে পারি। যার ফলে স্বাভাবিক পথেই পায়খানা করতে পারবেন। এ প্রযুক্তিটির নাম হচ্ছে Stapling Technique (Disposble Circular Stapler, Proximate ILS, Proximate Linear Stapler এবং Roticulator)। ইতোমধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ’৯৮ তারিখ আমি দেশের ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল হলিফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে এরূপ একটি জটিল অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সফল অপারেশন করেছি। অপারেশনটি করতে আমাকে আমন্ত্রণ জানান দেশের বিশিষ্ট সার্জন ও আমাদের শ্রদ্ধাভাজনব্যক্তিত্ব ডা: জিয়াউল হক। রোগীর বয়স ৫০। বাংলাদেশ বিমানের অফিসার। অনেক দিন মলদ্বারে রক্ত যাচ্ছিল। হঠাৎ পেট ফুলে যাওয়ায় তাকে জরুরিভিত্তিতে অপারেশন করে এ ক্যান্সারটি শনাক্ত করেন ডাক্তার জিয়াউল হক।

এ অপারেশনের জন্য একবার ব্যবহার যোগ্য দু’টি যন্ত্র আমরা সিঙ্গাপুর থেকে এনেছিলাম আগেভাগেই। যন্ত্রটি কিছুটা ব্যয়বহুল। অপারেশনের সময় আমরা বৃহদান্ত্র ও রেকটামের নির্ধারিত অংশটুকু কেটে ফেলে দেই এবং এই যন্ত্রের সাহায্যে বৃহদান্ত্র ও রেকটামের অবশিষ্টাংশ সংযুক্ত করে দেই। তলপেটের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এই যন্ত্র ছাড়া এ জাতীয় অপারেশন করা প্রায় অসম্ভব। বিগত নয় বছর আমরা এ জাতীয় অত্যাধুনিক অপারেশন অনেক করেছি। এ অপারেশনের পর সাধারণত পেটে অস্থায়ী ভিত্তিতে ২-৩ মাসের জন্য একটি ব্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়। তিন মাস পর ওই ব্যাগটি (কলোস্টমি বা আইলিওস্টমি) আবার অপারেশন করে বন্ধ করে দিতে হয়। তখন রোগী স্বাভাবিক মলদ্বার দিয়ে মলত্যাগ করতে পারেন। যখন রেকটামের ক্যান্সার খুবই গভীরে থাকে, তখন হাত দিয়ে সেলাই করে খাদ্যনালী জোড়া লাগানো যায় বলে এ যন্ত্র ব্যবহার প্রয়োজন হয় না।

রেকটাম ক্যান্সার কেন হয়?
ধনী লোকদের এ রোগ বেশি হয়। মদ্যপান ও ধূমপান এর সম্ভাবনা বাড়ায়। খাবারে যথেষ্ট আঁশজাতীয় উপাদান থাকলে, যেমন- সবজি, ফলমূল এ রোগের সম্ভাবনা কমায়। ৪০ বছর বয়সের পরে এ সম্ভাবনা বাড়তে থাকে।

>>>লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব:) কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
>>>চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাত মসজিদ রোড (স্টার কাবাবসংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬

বাইসাইকেল যেভাবে বদলে দিয়েছে পৃথিবী

লণ্ডনের ফুটপাথে রাইড শেয়ারিং কোম্পানি ওফুর বাইসাইকেল
১৮৬৫ সালের শরৎকাল। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের ছোট্ট এক শহর আনসোনিয়া। একটি সরাইখানায় বসে দুজন লোক পান করছেন। একটু আগের এক পিলে চমকানো অভিজ্ঞতার পর নিজেদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন তারা।
কাছের এক পাহাড় থেকে ঘোড়া চালিত ওয়াগন চালিয়ে আনসোনিয়ার দিকে আসছিলেন তারা। পাহাড়ের ঢালু পথ বেয়ে যখন নামছেন, তখন হঠাৎ পেছন থেকে এক তীব্র চিৎকারে তারা চমকে গিয়েছিলেন। পেছন ফিরে তারা যা দেখেছিলেন, তাতে তাদের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল।
মনে হয়েছিল স্বয়ং শয়তান বুঝি তাদের পেছনে ধাওয়া করছে। পাহাড় থেকে দ্রুতবেগে নেমে আসছে কিছু। মাথাটি দেখতে মানুষের মতই, কিন্তু শরীরটি যেন কোন অজানা প্রাণীর।
ভয়ে তারা আরও জোরে চাবুক চালালেন ঘোড়ার পিঠে। আর পেছনের সেই অদ্ভূত প্রাণী তীব্র বেগে এসে রাস্তার ধারের খাদে গিয়ে পড়লো।
কল্পনা করুন তো সেই অদ্ভূত প্রাণী সেখান থেকে উঠে এসে এই দুজনের কাছে যখন নিজের পরিচয় দিলেন, তাদের কী অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। কালো চুলের সেই ফরাসী লোকটির শরীর কেটেকুটে গেছে, রক্ত ঝরছে। সমস্ত শরীর কাদা-পানিতে মাখামাখি। তার নাম পিয়ের লেলমো।
পিয়ের লেলমোর তৈরি ভেলোসিপেডে। ১৮৬৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এটি পেটেন্ট করেন।
এই তরুণ ফরাসী মেকানিক যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন মাত্র কয়েক মাস আগে। তিনি ফ্রান্স থেকে বয়ে নিয়ে এসেছেন নিজের তৈরি এক যন্ত্র। দুই চাকার পেডাল চালিত এই যন্ত্রটির তিনি নাম দিয়েছেন 'ভেলোসিপেডে।' এখন আমরা একে বলি বাইসাইকেল।
মঁশিয়ে লেলমো এর কিছুদিন পরেই তার এই আবিস্কার পেটেন্ট করেন। তবে তার সেই সাইকেলে তখনো কোন গিয়ার নেই। নেই কোন চেইন। ব্রেকও তখনো লাগানো হয়নি, যে কারণে সাইকেল নিয়ে পড়লেন রাস্তার ধারের খাদে।
তবে পিয়ের লেলমোর এই বাইসাইকেল মডেলটিকে কিছুদিনের মধ্যে ছাড়িয়ে গেলে নতুন এক বাইসাইকেল 'পেনি ফার্দিং'। এটির সামনের চাকাটি বিশাল বড়। পেছনেরটি ছোট। মঁশিয়ে লেলমোর ভেলোসিপেডের তুলনায় এটি চলে দ্বিগুণ গতিতে।
তখনকার দিনে কেবল কিছু দুরন্ত ছেলেই এই সাইকেল চালানোর সাহস করতো। পাঁচ ফুট উঁচু একটা দুই চাকার জিনিসে চড়ে দ্রুতবেগে চলার বিপদ ছিল অনেক। সামান্য বাধাতেই তারা সাইকেল থেকে ছিটকে পড়তো।
কিন্তু এর পর যে ধরনের 'নিরাপদ বাইসাইকেল' বাজারে এলো, সেটি বেশ জনপ্রিয় হলো। প্রযুক্তির দিক থেকে এটি আগেরগুলোর চেয়ে উন্নত। অনেকটা আজকের যুগের বাইসাইকেলের মতোই। দুটি চাকাই সমান, চেইন আছে, ডায়মন্ড আকৃতির ফ্রেম।
শিল্পীর আঁকা ছবিতে ১৮৬০ সালে লণ্ডনে পেনি ফার্দিং বাইকেল রেসের দৃশ্য।
তবে এই সাইকেলের গতি আসতো বড় চাকা থেকে নয়, গিয়ার থেকে। ভালো কাপড়-চোপড় পরেও এই সাইকেলে চড়া যেত। তবে একজন নারী প্রথমবারের মতো প্যান্ট পরে এই সাইকেল চালিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। অ্যাঞ্জেলিন অ্যালেন। ১৮৯৩ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক নগরীর উপকন্ঠে নিউওয়ার্কে এভাবে সাইকেল চালান।
সেসময় পুরুষদের একটি সাময়িকী তাকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিল। শিরোনাম ছিল, "পুরুষদের প্যান্ট পরেছে এই মহিলা!" অ্যাঞ্জেলিনা অ্যালেন ছিলেন তরুণী, সুন্দরী এবং ডিভোর্সী। কাজেই তাকে নিয়ে ছিল সবার বিপুল আগ্রহ।
বাইসাইকেল যেন মেয়েদের জন্য মুক্তি নিয়ে এসেছিল। আঁটোসাঁটো কোমরবন্ধ আর ফুলানো-ফাঁপানো স্কার্টের ঘেরাটোপ থেকে বেরুনোর দরকার ছিল তাদের। বাইসাইকেল সেই সুযোগ করে দিল। কারণ এসব পোশাক পরে তো আর বাইসাইকেল চালানোর সুযোগ নেই। আর সাথে নিয়ে কোন সঙ্গীও নিতে হচ্ছে না।
কিন্তু সমাজের রক্ষণশীলরা আঁতকে উঠেছিল। মেয়েরা এরকম পোশাকে বাইসাইকেল চালালে নৈতিক অধপতন ঘটবে বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল অনেকে। তারা বলছিল স্বমেহন বেড়ে যাবে, সমাজে পতিতাবৃত্তির বিস্তার ঘটবে। কিন্তু তাদের এসব প্রতিবাদ কিছুদিনের মধ্যেই হাস্যকর প্রমাণিত হলো।
সাইক্লিং ইতিহাসবিদ মার্গারেট গুরোফের মতে, মিজ অ্যালেন কী পোশাক পরেছিলেন সেটা নিয়েই কেবল মানুষ কথা বলছিল। কিন্তু তিনি কী করেছিলেন, সেটা নিয়ে কেউ ভাবছিল না। একটি মেয়ে একাকী রাস্তায় সাইকেলে চড়ছে, এটাকে অত বড় কেলেংকারি মনে হয়নি।
বাইসাইকেলে কাজে যাচ্ছে বেইজিং এর মানুষ। ১৯০০ সালের ছবি।
এর তিন বছর পর সুজান বি অ্যান্থনি নামের এক নারী অধিকার নেত্রী ঘোষণা করলেন যে বিশ্বে নারী মুক্তির জন্য অন্য যে কোন কিছুর চাইতে বাইসাইকেল অনেক বেশি বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছে।
বাইসাইকেল আজকের যুগেও নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম অস্ত্র।
২০০৬ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের সরকার মাধ্যমিক স্কুলগামী ছাত্রীদের বাইসাইকেল কেনার জন্য ভর্তুকি দেয়া শুরু করলো। মেয়েরা যাতে দূরের স্কুলে যেতে পারে, সেটা ছিল এর উদ্দেশ্য।
এই প্রণোদনা বেশ সফল হলো। মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়ার হারই শুধু বাড়লো না, তাদের ঝরে পড়ার হারও কমলো।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও মানুষের দিগন্ত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য বাইসাইকেল বেশ সহজ একটা উপায়। বাস্কেটবল সুপারস্টার লেব্রন জেমস ওহাইওতে তার নিজ শহরে একটি স্কুল স্থাপন করেছেন। এই স্কুলে প্রতিটি ছাত্রকে একটি করে বাইক দেয়া হয়।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, ছোটবেলায় যখন তিনি এবং তার বন্ধুরা বাইক চালাতেন, তখন তাদের মনে হতো তারা মুক্ত, স্বাধীন। পুরো পৃথিবী তাদের হাতের মুঠোয়।
এটা সত্যি যে সমাজের দরিদ্রদের জন্য বহু যুগ ধরেই বাইসাইকেল ছিল এমন এক প্রযুক্তি, যেটি তাদের স্বাধীনতা দিয়েছে। শুরুর দিকে এটি ছিল দামে ঘোড়ার চেয়ে সস্তা। অথচ ব্যবহারের দিক থেকে এটি দিয়ে একই ধরনের স্বাধীনতা পাওয়া যেত, অনেক দূরত্ব পাড়ি দেয়া যেত।
বাইসাইকেল নিয়ে একদল নারী। ১৯০০ সালের ছবি।
কিন্তু এই বাইসাইকেল কেবল সামাজিক পরিবর্তনই ঘটায়নি, এটি শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়।
উনিশ শতকের শুরুর দিকে মার্কিন সেনাবাহিনীর সমরাস্ত্র তৈরির জন্য এমন ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল, যেগুলো একদম একই মাপের, ফলে অদল-বদল করেও কাজে লাগানো যায়। কিন্তু বেসামরিক কারখানায় এ ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার তখনো বেশ ব্যয়বহুল ছিল।
এক্ষেত্রে বাইসাইকেল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করলো। উচ্চ মানের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য নানা জটিল পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, এই দুয়ের মাঝে বাইসাইকেল শিল্প একটি সংযোগ তৈরি করলো।
বাইসাইকেল বানানো হতো যেসব কারখানায়, সেখানে বেশ কিছু সহজ প্রযুক্তি এবং কৌশল উদ্ভাবন করা হয়। যেমন ঠান্ডা ধাতব পাতকে কিভাবে একটি আকৃতি দেয়া যায়, যা কীনা কম খরচেই করা সম্ভব মান বজায় রেখেই। বল বিয়ারিং, নিউমেটিক টায়ার, গিয়ার এবং ব্রেকের নানা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলো তারা।
পরবর্তীকালে কিন্তু বাইসাইকেল শিল্পের এসব প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে গাড়ি শিল্পে। হেনরি ফোর্ড তার কারখানায় এসব প্রযুক্তি এবং কৌশল ব্যবহার করেছেন।
নিরাপদে ব্যবহার করা যায় এমন ধরনের বাইসাইকেল বিশ্বে প্রথম তৈরি করা হয় ১৮৮৫ সালে ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রিতে রোভারের কারখানায়।
ভারতের বিহারে বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে মেয়েরা।
এটা কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে পরবর্তীকালে রোভার গাড়ি নির্মাণ শিল্পে একটি কোম্পানিতে পরিণত হয়।
সাইকেল তৈরি দিয়ে শুরু করে গাড়ি নির্মাণ শিল্পে উত্তরণের পথটি বেশ স্পষ্ট।
জাপানে শিল্পের আধুনিকীকরণে একইরকম ভূমিকা রেখেছিল বাইসাইকেল।
জাপানের আধুনিক শিল্পায়নের প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ১৮৯০ সালে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বাইসাইকেল আমদানি করা হতো। এরপর এসব বাইসাইকেল সারাই করার দোকান হতে থাকে। এর পরের ধাপে স্থানীয়ভাবে বাইসাইকেলের খুচরো পার্টস তৈরি শুরু হয়। একজন দক্ষ কারিগরের জন্য যা মোটেই কোন কঠিন কাজ নয়।
এর মাত্র দশ বছরের মধ্যেই জাপানের নিজস্ব বাইসাইকেল শিল্প দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে সবকিছুই তৈরি হতো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল, ততদিনে জাপানে বছরে তৈরি হচ্ছে প্রায় বিশ লাখ বাইসাইকেল। জাপানে এক নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে তখন।
বাইসাইকেল কারখানার জন্য উদ্ভাবন করা প্রযুক্তি পরে ব্যবহৃত হয়েছে গাড়ি তৈরির কারখানায়।
বাইসাইকেলকে পুরোনো দিনের প্রযুক্তি বলে ভাবার একটা প্রবণতা আছে। কিন্তু তথ্য এবং গবেষণা বলে ভিন্ন কথা।
মাত্র ৫০ বছর আগেও পৃথিবীতে গাড়ি আর বাইসাইকেল তৈরি হতো প্রায় সমান সমান সংখ্যায়। কিন্তু এরপর গাড়ির উৎপাদন বাড়তে থাকে, বাইসাইকেলের কমতে থাকে। এক সময় বাইসাইকেলের তুলনায় গাড়ি তৈরি হতে থাকে তিনগুণ বেশি। কিন্তু এখন আবার সময় পাল্টাচ্ছে। বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বাইসাইকেলের উৎপাদন গাড়ির তুলনায় আবার দ্বিগুণ হয়েছে। বছরে এখন বাইসাইকেল তৈরি হচ্ছে প্রায় ১২ কোটি।
সামনের দিনে বাইসাইকেলই আবার আমাদের পথ দেখাবে, কথাটা যতই অদ্ভুত শোনাক না কেন।
আমরা এখন আগাচ্ছি এমন এক যুগের দিকে, যেখানে চালকবিহিন গাড়ি চলবে রাস্তায়। কেউ আর গাড়ি রাখবে না, দরকার হলে স্মার্টফোনে গাড়ি ডাকবে, বা ভাড়া নেবে।
যদি সেরকমই ঘটে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যতের বাহন কী হবে?
উত্তরটা খুব সহজ- বাইসাইকেল।
জাপানের একটি কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে বাইসাইকেল। ১৯৫৩ সালের ছবি।
বিশ্বে এখনই এক হাজারের বেশি বাইক শেয়ারিং স্কীম আছে। আছে কোথাও জমা দিতে হয় না এমন ধরনের লাখ লাখ বাইসাইকেল, যেগুলো সহজেই ভাড়া নেয়া যায়। এরকম বাইকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। চলে এসেছে ব্যাটারি চালিত বাইসাইকেলও।
রাইড শেয়ারিং কোম্পানি উবার তো ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা এখন গাড়ির পরিবর্তে তাদের ব্যবসায় ইলেকট্রিক স্কুটার এবং বাইকের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেবে।
তবে এই বাইক ব্যবসায় কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে কয়েকটি কোম্পানি। তাদের বিপুল সংখ্যাক বাইক চুরি হয়েছে বা নষ্ট করা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়া হয়েছে। ফলে কোন কোন শহরে তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু এই ব্যবসা সামনে বাড়বে, তেমনটাই মনে হচ্ছে। কারণ যানজটে অচল হয়ে পড়া শহরগুলোতে বাইসাইকেলই পথ চলার সবচেয়ে সহজ উপায়।
বড় বড় শহরে গাড়ির দূষণের কারণেই অনেকে বাইসাইকেল চালাতে চান না। অনেকে দুর্ঘটনার ভয় পান।
কিন্তু ভবিষ্যতের নগরীগুলোতে যদি দূষণবিহীন ইলেকট্রিক কার চলে, যে গাড়ি কোন মানুষ চালাবে না, চালাবে অত্যন্ত সতর্ক রোবট, তখন হয়তো বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে।
ভবিষ্যতে আবার বাড়বে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা।

ক্যানসারের যে লক্ষণগুলো পুরুষদের খেয়াল করা উচিত

ক্যান্সার বা কর্কটরোগ অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগসমূহের সমষ্টি। এখনও পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পড়ে না, ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোন চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হয় না। বাস্তবিক অর্থে এখনও পর্যন্ত ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরোপুরি কার্যকর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি।
ক্যান্সার সারানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এই রোগ সারানোর সম্ভাবনা অনেকাংশ বেড়ে যায়। ২০০ প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার রয়েছে। প্রত্যেক ক্যান্সারই আলাদা আলাদা এবং এদের চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা। বর্তমানে ক্যান্সার নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে এবং এ সম্পর্কে নতুন নতুন অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
কিছু লক্ষণ রয়েছে যেগুলো দেখলে ধারণা করা যায় ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি এই লক্ষণগুলোর এক বা একাধিক আপনার মধ্যে থাকে তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চলুন পুরুষের ক্যানসার হওয়ার আগে যেসকল শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায় সেগুলো সম্পর্কে জেনে নেই।
১) নারীদের যেমন নিজেদের স্তনে পরিবর্তন দেখা গেলে স্তন ক্যান্সারের জন্য টেস্ট করাতে হয়, তেমনি পুরুষেরও যৌনাঙ্গ বিশেষ করে অণ্ডকোষে কোনোরকম পরিবর্তন দেখা গেলে অতিসত্বর ডাক্তারকে জানাতে হবে। অণ্ডকোষের আকার আকৃতিতে পরিবর্তন, স্ফীতি, ওজনে ভারী হয়ে যাওয়া- এইগুলো অণ্ডকোষের ক্যান্সারের লক্ষণ।
২) ত্বকে নতুন কোনো তিল, আঁচিল অথবা কালো দাগ ত্বকের ক্যান্সারের পূর্বাভাস দেয়। আপনি যদি দেখেন এগুলো আগের চাইতে আকারে বড় হচ্ছে বা ছড়িয়ে পরছে তবে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
৩) অনেক দিন ধরে মূত্রত্যাগের সময়ে ব্যথা, মূত্রের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, শুক্রাণুর সঙ্গে রক্ত যাওয়া এগুলো হতে পারে প্রস্টেট ক্যান্সারের লক্ষণ।
৪) দীর্ঘদিন ধরে মুখে কোনো ক্ষত বা ব্যথা থাকলে ডাক্তারকে জানান। আর যারা ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি নিঃসন্দেহেই বেশি।
৫) মলের সঙ্গে রক্ত গেলে তা পাইলস বা এ ধরণের রোগ হতে পারে তা সত্যি। কিন্তু এটা কোলন ক্যান্সারেরও লক্ষণ হতে পারে। ডাক্তারকে দেখিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।
৬) ঘন ঘন পেট ব্যথা, পেটের পেশিতে টান পড়া এবং সব সময় বমি বমি লাগাটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। এটা হতে পারে লিউকেমিয়া অথবা ইসোফ্যাগাল, লিভার, প্যানক্রিয়াটিক অথবা কলোরেকটাল ক্যান্সারের লক্ষণ। লিউকেমিয়ার আরেকটি লক্ষণ হচ্ছে ঘন ঘন জ্বর হওয়া, ফ্লু-এর মতো উপসর্গ দেখা দেয়া এবয় ইনফেকশন হওয়া। এইসব লক্ষণ দেখলে আজই ডাক্তারের কাছে দৌড়ান।
৭) গলা খুসখুস করা এবং ঢোক গিলতে কষ্ট হওয়া একদিকে যেমন গলা এবং পাকস্থলীর ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে, তেমনি হতে পারে লাংস ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ের উপসর্গ।
৮) ছোটখাটো ব্যথা পেলেই সহজে ত্বকে কালশিটে পড়ে যাওয়া, এমনকি কোনো কারণ ছাড়াই শরীরের এখানে ওখানে অযথাই কালশিটে পড়াটা হতে পারে লিউকেমিয়ার আরেকটি লক্ষণ।
৯) অতিরিক্ত ক্লান্তিও লিউকোমিয়ার লক্ষণ।
১০) প্রচণ্ড মাথাব্যথা মাইগ্রেনের সমস্যা তো বটেই। তবে বেশ কিছুদিন ধরে মাথা ব্যথা থাকলে ব্রেইন টিউমারের লক্ষণও হতে পারে।