Friday, May 15, 2026
জাতিসংঘের প্রতিবেদন: জলবায়ু বিপর্যয়ে এক দশকে ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত
‘নো স্কেপ-২: দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ বা ‘পালানোর পথ নেই-২: আগামীর দিশা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা, ঝড়, খরা ও তীব্র তাপমাত্রার মতো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ও সংঘাত বাড়ছে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে আঘাত হানা বিভিন্ন দুর্যোগ, যেমন বন উজাড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাস্তুসংস্থান ধ্বংস, খাবার ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।
সংঘাত ও জলবায়ুর কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে—এমন দেশের সংখ্যা ২০০৯ সাল থেকে তিন গুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। এরপরও দুর্দশাগ্রস্ত ও সংঘাতে জর্জর যেসব দেশে শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে, ওই দেশগুলো প্রয়োজনের চার ভাগের এক ভাগ জলবায়ু সহায়তা পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা না রেখেও বাস্তুচ্যুতদের অনেক সময় দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে।
দেশে দেশে দুর্যোগ
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে শরণার্থী ও অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের চার ভাগের তিন ভাগ এমন সব দেশে বাস করছে, যেগুলো উচ্চ বা চরম জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ে আক্রান্ত। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ইউএনএইচসিআর যতবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, তার তিন ভাগের এক ভাগের কারণ ছিল বন্যা, খরা, দাবানলসহ অন্যান্য চরম আবহাওয়া-সংক্রান্ত ঘটনা।
উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের মে মাসে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলের রিও গ্রানদে দো সুল রাজ্যে ভয়াবহ বন্যার কথা বলা হয়েছে। ওই বন্যায় ১৮১ জনের মৃত্যু হয়। বাস্তুচ্যুত হয় ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ৪৩ হাজার শরণার্থী ছিল। এর আগের বছরে এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় মোচা।
আফ্রিকার দেশ চাদে ১৪ লাখের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থী বসবাস করে। শুধু ২০২৪ সালেই বন্যার কারণে দেশটিতে ১৩ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ও আশ্রয়শিবির ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সুদানের শরণার্থীরা প্রতিদিনের ১০ লিটারের কম পানি পাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব মিলিয়ে আফ্রিকার ৭৫ শতাংশ ভূখণ্ডের অবস্থা খারাপ হচ্ছে।
যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০৪০ সাল নাগাদ চরম জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে পড়া দেশের সংখ্যা ৩ থেকে বেড়ে ৬৫–তে পৌঁছাতে পারে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ গাম্বিয়া, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, সেনেগাল ও মালির ১৫টি শরণার্থীশিবির বছরে প্রায় ২০০ দিন বিপর্যয়কর তাপমাত্রার মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, ‘চরম জলবায়ুর প্রভাব থেকে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে তহবিলে কাটছাঁট। আমরা যদি স্থিতিশীলতা চাই, তাহলে মানুষ যেখানে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ করতে হবে। বাস্তুচ্যুত হওয়া থামাতে জলবায়ু তহবিল সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে।’
পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে এগিয়ে চীন
আজ শুরু হওয়া কপ৩০ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন ১৯৪ দেশের প্রতিনিধিরা। প্যারিস চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সে বিষয়ে আলোচনা করবেন তাঁরা। একই সঙ্গে কীভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করা যায় এবং দরিদ্র দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হবে।
তবে এসব লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ব্রাজিলের কূটনীতিক আন্দ্রে কোরেরা দো লাগো বলেন, জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো এই সংকট নিরসনের লড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়েছে। তবে ভালো করছে চীন। দেশটি সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করলেও পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী। অন্য দেশগুলোকে এটি অনুসরণ করতে হবে।
জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় শিকার দ্বীপরাষ্ট্রগুলো। জাতিসংঘে পালাউয়ের রাষ্ট্রদূত এবং ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জোটের (এওসিস) মুখপাত্র ইলানা সেইড দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বড় পরিসরে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য একটি বৈশ্বিক পথরেখা তৈরি করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন যতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা খুবই সামান্য। আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া জানি না, আমরা কোথায় যাচ্ছি।’
কপ৩০-এর আয়োজনে ব্রাজিল এমন বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে, যেগুলো নিয়ে এরই মধ্যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধ, ২০৩০ সালের মধ্যে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তিন গুণ বাড়ানো এবং জ্বালানিবিষয়ক দক্ষতা দ্বিগুণ করা। তবে এওসিস আরও বেশি কিছু চায়। তাদের ভাষ্য, নীতি নির্ধারণ ছাড়া দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য পূরণ হবে না।
| ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে কাসিম উদ্দিনের। সম্প্রতি নদের এই চরে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ২৯ অক্টোবর কুড়িগ্রামে। ছবি: রয়টার্স |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ by ভি এস নাইপল

‘শোনো বাবা, আমি কি ভিতরে আসতে পারি?’ সে আমাকে বলল। লোকটি বেশ খাটো, পরনে সাদা শার্ট ও কালো ট্রাউজার। মাথায় টুপি।
‘আপনি কি চান?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘তোমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চাচ্ছিলাম।’ সে বলল।
আমাদের উঠোনে চারটি পামগাছ ছিল, সেখানে বেশ কয়েকটি মৌমাছির চাক ছিল। আমি ঘরের দিকে কয়েক পা এগিয়ে চেঁচিয়ে বললাম – ‘মা, দরজায় একজন লোক আছে, আমাদের মৌমাছিগুলো একবার দেখতে চায় বলছে!’
মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লোকটির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে কর্কশ গলায় বললেন – ‘কি চাওয়া হয়?’
‘আপনাদের মৌমাছিগুলো দেখতে চাচ্ছিলাম।’ লোকটি বলল।
তার ইংরেজি খুব গোছানো। বোঝাই যাচ্ছিল এটা তার মাতৃভাষা নয়। মাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। মা আমাকে বললেন – ‘যতক্ষণ উনি থাকেন, তুই এখান থেকে এক পাও নড়বি না।’
‘ধন্যবাদ ম্যাডাম! আপনার অশেষ মেহেরবানি।’ সে খুব ধীরে ধীরে গুছিয়ে কথাটা বলল, যেন প্রতিটি শব্দ তার টাকা দিয়ে কেনা! আমরা পামগাছের নিচে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে বসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মৌমাছিগুলো দেখলাম।
‘মৌমাছি দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। তোমার কেমন লাগে?’ লোকটি বলল।
‘আমার অত সময় নেই।’ বললাম আমি।
সে গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকালো। ‘আমি এ-কাজই করি। এটা-ওটা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। শুধু পিঁপড়ে দেখতে দেখতেই আমি দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারি। তুমি কি কখনো পিঁপড়েদের লক্ষ করে দেখেছ? কিংবা মাকড়সা, কেন্নোই – এদের ভালো করে দেখছ?’
আমি মাথা নাড়ালাম। ‘আপনি আসলে কী করেন, বলুন তো?’
সে উঠে দাঁড়াল – ‘আমি কবি’।
‘খুব ভালো কবি?’ আমি কোনোরকম ভণিতা না করেই জানতে চাইলাম।
‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি।’ সে অকপটে বলল।
‘আপনার নামটা কি একবার বলবেন?’
‘বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ।’
‘বি মানে কি বিল?’
‘ব্ল্যাক। ব্ল্যাক ওয়ার্ডসওয়ার্থ। সাদা ওয়ার্ডসওয়ার্থ ছিলেন আমার ভাই। আমাদের আত্মা একটাই। আমি খুব ক্ষুদে একটা ফুলকেও সকালের মতোই শুভ্র ও মহৎ মনে করি; আর সেটা দেখে আমার কান্না পায়।’
‘কেন? এতে কান্না পাওয়ার কি আছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘বুঝলে না বালক! তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে। তুমিও যে একজন কবি, তুমি কি জানো সেটা? এবং একজন কবি যখন-তখন যে-কোনো কারণে কাঁদতে পারে!’
আমি না হেসে পারলাম না!
‘তুমি তোমার মাকে পছন্দ করো?’ সে জানতে চাইল।
‘করি, তবে আমাকে যখন মারে না, তখন।’
সে তখন তার পেছনের পকেট থেকে একটা ছাপা কাগজ বের করে বলল – ‘এই কাগজে মাকে নিয়ে লেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আছে। আমি এটা বিক্রি করব। কোনো দরদাম চলবে না, একদাম – চার টাকা।’
আমি ভেতরে গিয়ে মাকে বললাম – ‘মা, তুমি কি চার টাকা দিয়ে একটি কবিতা কিনবে?’
মা রেগে গিয়ে ভদ্রতার মাথা খেয়ে বলল – ‘ওই ফালতু লোকটাকে গিয়ে বল, ও যদি এখনই আমার সীমানা থেকে বেরিয়ে না যায়, আমি তার লেজ টেনে ছিঁড়ে ফেলব; কি, কানে যায় আমার কথা?’
‘মার কাছে এখন চার টাকা নেই।’ আমি বাইরে এসে বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থকে বললাম।
‘এখানেই তো কবির ঐতিহাসিক পরাজয়!’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল।
তারপর সে তার কাগজটি যথাস্থানে রেখে দিলো। মার কথায় কিছু মনে করেছে বলে মনে হলো না।
আমি বললাম – ‘এভাবে কবিতা বিক্রি করে বেড়ানো কি ভালো দেখায়? খুব বেশি কি বিক্রি হয়?’
‘এখন পর্যন্ত এক কপিও হয়নি।’
‘তাহলে আপনি এভাবে ঘুরেঘুরে কবিতা বেচে বেড়াচ্ছেন কেন?’
‘এর ফলে আমি অনেক কিছু দেখার সুযোগ পাই। আর আমি সবসময় কবিদের সাক্ষাৎ পেতে চাই।’
‘আপনি কি সত্যি সত্যিই আমাকে কবি মনে করেন?’
‘তুমি আমার চেয়ে কোনো অংশে কম নও।’ সে উত্তরে বলল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ চলে যাওয়ার পর আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম যেন তার সঙ্গে ফের আমার দেখা হয়।
এক সপ্তাহ পর, আমি যখন স্কুল থেকে ফিরছিলাম তখন মিগুয়েল স্ট্রিটের এক বাঁকে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
‘আমি অনেকক্ষণ থেকে তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’
‘এ কয়দিনে একটা কবিতাও কি বিক্রি করতে পারলেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে মাথা নাড়াল। বলল – ‘আমার উঠোনে এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ আমগাছটি আছে। এখন গাছে আম পেকে টসটস করছে। আমি তোমাকে আম খাওয়ার দাওয়াত দিতে এসেছি।’
সে আলবার্তো স্ট্রিটের এক মোড়ে এক কামরাবিশিষ্ট একটি বাসায় বসবাস করত। বাড়ির সামনেটা সবুজে ভরা। সেখানে বিশাল এক আমগাছ আছে, আর আছে নারিকেল ও তালগাছ। জায়গাটি জঙ্গল হয়ে আছে, দেখে মনে হয় শহরের বাইরে কোথাও এসেছি। এখান থেকে রাস্তার ওপারের বিশাল বিশাল দালানকোঠা দেখা যায় না।
সে একটুও বাড়িয়ে বলেনি, আমগুলো সত্যিই চমৎকার। আমি প্রায় আটটা সাবাড় করে ফেললাম। আমের হলুদ রস আমার কনুই চুইয়ে জামায় লেগে গেল। আমি যখন বাড়ি ফিরলাম, মা বললেন – ‘এতক্ষণ কোথায় ছিলি, হতচ্ছাড়া? ভেবেছিস খুব বড় হয়ে গেছিস, যেখানে খুশি যেতে পারবি, তাই না? যা, আমার জন্য একটা কঞ্চি কেটে আন।’
মা আমার কাটা কঞ্চি দিয়ে আমাকেই পেটালেন – আচ্ছা পিটুনি পেটালেন! আমি কাঁদতে কাঁদতে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম – আর কিছুতেই বাড়ি ফিরব না। বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থের বাড়িতে গেলাম। আমার নাক রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘কান্না এবার থামাও। চলো কোথাও ঘুরে আসি।’
আমার কান্না থেমে গেল। তখনো বেশ জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম। আমরা হাঁটতে বের হলাম। এসটি অ্যাভিনিউয়ের ভেতর দিয়ে সাভান্নাহ হয়ে রেসকোর্সে চলে গেলাম।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলল – ‘এসো, দুজনে ঘাসের ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি। আমি চাই তুমি এখন চিন্তা করে দেখবে ওই তারাগুলো আমাদের থেকে কত দূরে অবস্থান করছে।’
তার কথামতো আমি চিন্তা করা শুরু করলাম। তার উদ্দেশ্যটা একটু পরই পরিষ্কার হলো। নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছিল। একই সঙ্গে খুব মহান আর বিশাল মনে হচ্ছিল, ঠিক ওই আকাশটার মতো; জীবনে আর কখনো কোনোদিন এই অনুভূতি হয়নি। আমি আমার সমস্ত ক্রোধ, অশ্রু ও আঘাতকে ভুলে গেলাম। যখন আমি বললাম যে, আমার খুব ভালো লাগছে, সে তখন এক-এক করে তারাদের নাম বলতে লাগল। তখনই একটা টর্চের আলো এসে আমাদের মুখের ওপর পড়ল। দেখলাম – পুলিশের লোক, ঘাস থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
‘তোমরা এখানে কী করছ?’ পুলিশটি জিজ্ঞেস করল।
বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ উত্তরে বলল – ‘নিজেকে আমি চল্লিশ বছর ধরে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফিরছি।’
আমরা খুব দ্রুত বন্ধু হয়ে গেলাম। সে আমাকে বলল – ‘তুমি কাউকে কখনো আমার সম্পর্কে বলবে না। আমার ওই গাছগুলো সম্পর্কেও নয়। সমস্ত বিষয়টা গোপন রাখবে। কাউকে বললেই আমি কিন্তু ধরে ফেলব, কারণ আমি কবি।’
আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম, এবং আজ অবধি আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তার ছোট্ট বাড়িটি আমার ভালো লাগত। এত সুন্দর, গোছানো ও পরিষ্কার! তবে বেশ নিঃসঙ্গ দেখাত। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘আপনি উঠানের আবর্জনাগুলো কেটে ফেলেন না কেন? জায়গাটা আরো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।’
‘শোনো, তোমাকে তাহলে ঘটনাটা বলেই ফেলি – একদা একটা মেয়ে আর একটা ছেলের সাক্ষাৎ ঘটল এবং তারা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেল। ফলে তারা বিয়ে করে ফেলল। ছেলেটি শব্দ বুনতে ভালোবাসত, আর মেয়েটি ভালোবাসত ঘাস, ফুল আর গাছপালা। তারা একটি কক্ষে বেশ সুখেই দিনযাপন করছিল। তারপর একদিন মেয়েকবিটি ছেলেকবিকে বলল – আমরা পরিবারে আর একজন কবিকে পেতে চলেছি। কিন্তু সেই কবির আর জন্ম হয়নি; কারণ মেয়েটি মারা গেল। এবং শিশুকবিটি মায়ের সঙ্গে, মায়ের ভেতরে সমাধিস্থ হলো। ছেলেটি খুব কষ্ট পেল। সে প্রতিজ্ঞা করল যে বাগানের একটি জিনিসও সে আর কোনোদিন স্পর্শ করবে না। কাজেই বাগানটি রয়ে গেল, বেড়ে উঠল, তারপর একসময় জঙ্গলে পরিণত হলো।’ বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ গল্পটি এখানেই শেষ করল।
আমি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকালাম। তাকে আরো বয়স্ক দেখাচ্ছিল। আমি তার গল্পটি বুঝতে পারলাম। আমরা সেদিন দীর্ঘ পথ হেঁটেছিলাম। বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম, তারপর গেলাম রক গার্ডেনে। সন্ধের আগ দিয়ে চ্যান্সেলর হিলে উঠলাম, দেখলাম – সমস্ত জায়গাটাকে অন্ধকার কেমন করে গিলে ফেলল। তারপর আবার শহরের বাতিগুলো শহরটাকে অন্ধকারের হাত থেকে উদ্ধার করল।
সে প্রতিটি কাজ এমন মনোযোগ দিয়ে করত, মনে হতো যেন জীবনে প্রথম সেই কাজটি করছে। আর মনে হতো, যেন ঈশ্বরের উদ্দেশে সবকিছু করছে। সে আমাকে বলত – ‘এখন আইসক্রিম খেলে কেমন হয়?’ এবং আমি যখন বলতাম – ‘মন্দ হয় না’। সে খুব গম্ভীর হয়ে বলত – ‘এখন আমরা কোন দোকানের সেবা গ্রহণ করব?’ যেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সে এটা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলত – ‘আমার মনে হয়, ওই দোকানের সঙ্গে এ-ব্যাপারে আলোচনায় বসা যেতে পারে!’ তখন পৃথিবীকে আমার খুব উপভোগ্য বলে মনে হতো।
একদিন, যখন আমি তার উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাকে বলল – ‘আমার খুব গোপন একটা বিষয় আজ তোমাকে বলব।’
‘খুউব গোপন কিছু?’ – আমি জানতে চাইলাম।
‘এ মুহূর্তে তা তো বটেই।’
আমি তার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকে তাকাল। আমি ভেতরে ভেতরে বেশ শিহরিত হলাম। সে বলল – ‘মনে রেখো, এটা শুধু তোমার আর আমার ভিতরে। একটি কবিতা লিখছি।’
ওহ, সেই কথা! বেশ হতাশ হলাম শুনে। আমি আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু শোনার অপেক্ষায় ছিলাম।
‘কিন্তু এটা ভিন্ন ধাঁচের একটি কবিতা।’ সে বলল। ‘এটা পৃথিবীর সব থেকে মহৎ একটি কবিতা।’
আমি শিস দিলাম।
সে আরো বলে – ‘এটা নিয়ে আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। আজ থেকে বাইশ বছর পরে কবিতাটি শেষ করব। তাও সেটা সম্ভব হবে আমি যে গতিতে এখন লিখছি সেটা ধরে রাখতে পারলে।’
‘তুমি তাহলে প্রচুর লেখ?’ আমি বললাম।
‘এখন আর না। এখন আমি প্রতিমাসে একটা করে লাইন লিখি। তবে নিশ্চিত করি যেন ওটাই শ্রেষ্ঠ লাইন হয়।’
‘গত মাসের শ্রেষ্ঠ লাইনটা কী?’ আমি জানতে চাইলাম।
সে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর বলল – ‘অতীত বড় বিধুর, বিষণœময়।’
‘বেশ ভালো লাইন।’ আমি বললাম।
‘আমি আমার একটি মাসের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে জ্বালিয়ে কবিতার একটি লাইনে ঘনীভূত করতে চাই। তাই বাইশ বছর পরে আমি যে-কবিতাটি লিখব সেটা বিশ্বমানবতার সংগীত হয়ে উঠবে।’
আমি খুব বিস্মিত হলাম।
আমাদের হাঁটা চলতেই থাকল। একদিন ডকসাইটে সি-ওয়ালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমি বললাম – ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থ, যদি আমি এই পিনটি পানিতে ফেলে দিই, তোমার কি ধারণা এটি ভেসে থাকবে?’
‘পৃথিবীটা বড় আজব। ওটা ফেলে দাও, দেখি কী ঘটে!’ সে বলল।
পিনটি ডুবে গেল।
আমি বললাম – ‘এ-মাসের লাইনটি কতদূর?’
সে আর কোনো লাইন শোনায়নি। শুধু বলত – ‘এই তো চলে এসেছে … হয়ে যাবে …।’
আমরা তখন সি-ওয়ালের ওপরে বসে যাত্রীবাহী জাহাজগুলোকে বন্দরে ভিড়তে দেখতাম। পৃথিবীর সেই শ্রেষ্ঠ কবিতাটি আমার আর শোনা হয়নি।
আমার মনে হতো, সে একটু জলদিই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।
‘তুমি কীভাবে বেঁচে আছ?’ – একদিন জানতে চাইলাম।
‘মানে, তুমি বলতে চাইছ আমি কীভাবে আয়-রোজগার করি?’
আমাকে তোতলাতে দেখে সে মৃদু হেসে বলল – ‘আমি ক্যালিপসোর সময়ে ক্যালিপসো গেয়ে বেড়াই।’
‘তাতেই তোমার হয়ে যায়?’
‘খুব ভালোমতোই।’
‘কিন্তু তুমি যখন পৃথিবীর বিখ্যাত কবিতাটি লেখা শেষ করবে তখন তো তুমি বেশ ধনী হয়ে যাবে?’
সে কোনো উত্তর করল না।
একদিন তাকে আমি তার সেই ছোট্ট ঘরটিতে দেখতে গেলাম। সে শুয়ে ছিল। খুব বয়স্ক আর ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার এই অবস্থা দেখে আমার কাঁদতে ইচ্ছে করছিল।
‘কবিতাটি আসতে আসতে কোথায় যেন থমকে গেছে।’ সে বলল।
সে তখন জানালা দিয়ে বাইরের নারিকেল গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমার উপস্থিতি টের পায়নি। ‘যখন আমার বয়স বিশের কাছাকাছি ছিল, নিজের ভিতরে একটা শক্তি অনুভব করতাম।’ তারপর আমার চোখের সামনেই তাকে আরো বুড়িয়ে ও ক্ষয়ে যেতে দেখলাম। ‘কিন্তু, সেটা ছিল অনেক অনেক দিন আগে।’
তার কথা শুনে, সবকিছু এতটাই তীব্রভাবে আমার চেতনায় এসে ধরা দিলো যে, মনে হলো মা আমার গালে কষে একটা থাপ্পড় মারল। মৃত্যু তার সংকুচিত হয়ে আসা মৃতপ্রায় মুখম-লে জীবন্ত হয়ে উঠল – এটা যেন সবার জন্যই উপস্থিত হয়েছিল।
সে আমার দিকে তাকাল, আমার চোখে পানি দেখে উঠে বসল।
‘এদিকে এসো।’ বলল সে। আমি তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসলাম।
সে আমার চোখের দিকে তাকাল, বলল – ‘তুমিও তাহলে এটাকে দেখতে পাচ্ছ? আমি জানতাম, তোমার চোখদুটো কবির চোখ।’
তাকে একটুও চিন্তিত দেখাচ্ছিল না। তার বোকার মতো শান্ত চেহারা দেখে আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম।
সে তার শুকনো বুকে আমাকে টেনে নিল। ‘তুমি কি চাও আমি তোমাকে এখন একটা মজার গল্প বলি?’ তারপর আমার ভেতরে উৎসাহ জোগাতে হেসে উঠল। কিন্তু আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
সে বলল – ‘যখন আমি গল্পটি বলা শেষ করব, আমি চাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে এবং আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তুমি এখন আমাকে প্রতিশ্রুতি দেবে।’
আমার কণ্ঠস্বর যেন রুদ্ধ হয়ে আসছিল!
সে বলল – ‘বেশ, তবে শোনো। আমি তোমাকে ওই ছেলে কবি ও মেয়ে কবিকে নিয়ে যে-গল্পটা বলেছিলাম, তোমার মনে পড়ে? ওটা সত্য ছিল না। গল্পটা আমি তোমাকে বানিয়ে বলেছিলাম। তোমাকে কবিতা এবং আমার বিখ্যাত কবিতাটি নিয়ে যে-সমস্ত কথা বলেছি তাও সত্য নয়। এটা তোমার জীবনে শোনা সব থেকে মজার বিষয় হলো না?’
কিন্তু তার কণ্ঠস্বর আস্তে আস্তে ক্ষয়ে যেতে লাগল।
আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। একজন কবির মতো যা কিছু দেখলাম তাই দেখে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ছুটে এলাম।
এক বছর পরে এলবার্তো স্ট্রিট ধরে একা হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই কবির বাড়ির কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। এটা ঠিক অদৃশ্য হয়েও যায়নি, মনে হচ্ছে কে বা কারা যেন গুঁড়িয়ে ফেলেছে। বেশ বড় দোতলা একটি ভবন জায়গাটি দখল করে নিয়েছে। সেই বিশাল আমগাছটিসহ, নারিকেল ও তালগাছটিও কেটে ফেলা হয়েছে। এখন সেখানে শুধু ইট, পাথর আর লোহা দেখা যাচ্ছে – যেন বি. ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোনোদিনই ছিল না এখানে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
চিঠিপত্রঃ সাইবার বুলিং থেকে কি নারীদের মুক্তি নেই by সামিয়া জামান
ঘটনা-২: শোভার (কাল্পনিক নাম) নাম ও ছবি ব্যবহার করে কেউ একজন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে এবং সেই অ্যাকাউন্ট থেকে শোভার আত্মীয়দের বিভিন্ন রকম অশ্লীল ছবি পাঠানো হচ্ছে, শোভার ছবি দিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অশ্লীল ছবি বানানো হচ্ছে এবং তা ফেসবুকে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে শোভা ও তার পরিবারকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
আমরা উপরিউক্ত ঘটনা দুটি সাইবার বুলিংয়ের আওতায় ফেলতে পারি। সাইবার বুলিং হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খুলে তার ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক করা, পাসওয়ার্ড চুরি করা, পর্নোগ্রাফির ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে কাউকে বিব্রত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে দেখতে পাই, ‘এ বছরের জানুয়ারিতে একটি ছাত্রীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার একটি আইডি খোলা হয় এবং সেই ছাত্রীর ছবি অন্য কারও আপত্তিকর ছবির সঙ্গে সম্পাদনা করে একের পর এক আপলোড করতে থাকে এবং ছাত্রীর আত্মীয়দের আইডিতে ছবিগুলো দেওয়া হয় ও হুমকি দেওয়া হয়।’
এ রকম ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটেই চলেছে। আমরা গত দুই বছরে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) আসা অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছবি ও পরিচয় গোপন করে ভুয়া আইডি খুলে ভুক্তভোগীর ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ করে, এ রকম অভিযোগ এসেছে ৪৩ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক, পাসওয়ার্ড চুরি করে অ্যাকাউন্টের দখল নেওয়া, এ রকম অভিযোগ ১৩ শতাংশ, পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে টাকা বা সুবিধা আদায় করার অভিযোগ ১৭ শতাংশ।
মুঠোফোনে কল করে বা খুদে বার্তা পাঠিয়ে হয়রানি ১০ শতাংশ; বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল শব্দ, লেখা, ছবি বা ভিডিও হয়রানির অভিযোগ ৯ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে আরও ৮ শতাংশ।
সাইবার বুলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হেনস্তার স্বীকার হন নারীরা। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর পিসিএসডব্লিউ যাত্রা শুরু করে। তখন থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ বছরে ২১ হাজার ৯৪১ নারী এ সংস্থার কাছে হয়রানির অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৮৮৯টি অভিযোগ এসেছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে ৭৮৯টি অভিযোগ।
এ ছাড়া ৯৯৯–এর উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির অভিযোগের গত চার বছরের কল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিন দিন এমন ঘটনা বেড়ে চলেছে। এই জরুরি নম্বরে ২০১৮ সালে ৬৯২টি, ২০১৯ সালে ৭৩৭টি, ২০২০ সালে ৮৯৫টি এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৭১টি কল এসেছিল। ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসে এসেছে ১ হাজার ৪৪৪টি কল। অর্থাৎ মাসে গড়ে ১৪১টি অভিযোগ। অর্থাৎ সাইবার বুলিং দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও বেড়ে গেছে।
সাইবার অপরাধ দূর করতে সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। সাইবার নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে প্রণয়ন করা হয় তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, যা ২০১৩ সালে আবার সংশোধন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি বহন, বিনিময়, মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা, বিক্রি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ২০১৩ সালে সাইবার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়।
সাইবার বুলিংয়ের অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে ডিজিটাল আইন-২০১৮–তে। ধারা-২৮ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করে বা করায়, যাহা ধর্মীয় অনভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ বছর কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’
ধারা-২৯ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’
ধারা-৩১ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা আইনশৃঙ্খলতার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৭ (সাত) হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত।’
সাইবার বুলিং সমাজকে একপ্রকার অসুস্থ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়তই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার। তাই সাইবার বুলিং প্রতিকারে সমাজের প্রত্যেক মানুষের সাইবার আইন মেনে চলা উচিত। সমাজে সাইবার বুলিং সম্পর্কে সচেতন করা উচিত, সমাজে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষতিকর দিক ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত এবং আমাদের সাইবার বুলিং থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। দেশ ও সমাজকে এই মানসিক অসুস্থতা থেকে রক্ষা করা উচিত।
* সামিয়া জামান
- শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
- ই–মেইল: samiyazaman21@gmail.com
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1308)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...