Saturday, August 16, 2025

কারাগারে শীর্ষ ফিলিস্তিনি বন্দিকে হেয় করেছে সেই বেন গভির

ফিলিস্তিনের গাজাবাসীকে হেয় করতে বার বার উস্কানিমুলক পদক্ষেপ নিচ্ছে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গভির। কয়েকদিন পর পরই পূর্ব জেরুজালেমে মুসলিমদের পবিত্র স্থাপনাগুলোতে, মসজিদে প্রবেশ করে বার বার বিতর্ক সৃষ্টি করেছে সে। এবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন ফুটেজে দেখা গেছে, কারাগারে সবচেয়ে পরিচিত ফিলিস্তিনি বন্দি মারওয়ান বারগুতিকে অপমান করছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ভিডিওটির নিন্দা করেছে। এর উপপ্রধান হুসেইন আল-শেখ একে আখ্যা দিয়েছেন মানসিক, নৈতিক ও শারীরিক সন্ত্রাসের চূড়ান্ত রূপ বলে। ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটিতে বহু বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বারগুতিকে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। তাকে বয়সী ও দুর্বল চেহারায় দেখা যাচ্ছে।

ভিডিওতে বারগুতিকে বেন গভির বলেন,  তুমি জিতবে না। যে ইসরাইলের জনগণের সঙ্গে ঝামেলা করবে, যে আমাদের সন্তানদের হত্যা করবে, যে আমাদের নারীদের হত্যা করবে, আমরা তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেব। বারগুতি কিছু বলার চেষ্টা করলে বেন গভির বলে ওঠে, ইতিহাসজুড়েই তোমার এটা জানা দরকার।

এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, ৬৬ বছর বয়সী মারওয়ান বারগুতি ২০ বছরেরও বেশি ইসরাইলে বন্দি। ওই সময় এক হামলায় পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এর পরিকল্পনার দায়ে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তিনি বর্তমানে পাঁচটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অতিরিক্ত ৪০ বছরের সাজা ভোগ করছেন। তবে মতামত জরিপগুলোতে নিয়মিত দেখা যায়, বারগুতি ফিলিস্তিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা রয়েই গেছেন। এমনকি ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বা হামাস নেতাদের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন। তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রভাবশালী দল ফাতাহর জ্যেষ্ঠ নেতা। দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার (২০০০-২০০৫) সময়ে তার ভূমিকার কারণে ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। ভিডিওটি প্রথমে বৃহস্পতিবার বেন গভিরের সমর্থকদের মেসেজিং গ্রুপে ছড়ায়, পরে সে নিজেই এটি তার এক্স অ্যাকাউন্টে শেয়ার করে। মন্ত্রী বলে, প্যালেস্টাইন লিবারেশনের বিভিন্ন শীর্ষ কর্মকর্তারা তার বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন শুনে সে এটি ‘বারবার বলবে, কিন্তু কখনো ক্ষমা চাইবে না।’

ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর থেকে বারগুতিকে একাকী কারাবাসে রাখা হয়েছে। গত বছর তারা অভিযোগ করে যে তাকে কারাগারের ভেতরে নৃশংসভাবে প্রহার করা হয়েছে। তবে তা ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে। নতুন ভিডিওর প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের প্রধান আবদুল্লাহ আল যাঘারি অভিযোগ করেন, ইসরাইল তাকে হত্যা করতে ও কারাগারে থাকা নেতাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। বারগুতি তাদের মধ্যে একজন, যাদের মুক্তি হামাস দাবি করেছে অবশিষ্ট জিম্মিদের বিনিময়ে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইল তাকে মুক্তি দেবে না। ভিডিওতে দেখা যায়, বেন গভির কথা বলার সময় বারগুতি- যিনি সাবলীলভাবে হিব্রু বলতে পারেন, তিনি মাথা নাড়ছেন এবং কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভিডিওর ক্লিপ শেষ হয়ে যায়। বারগুতির স্ত্রী ফাদওয়া তার স্বামীর অনুসারীদের প্রতি আহ্বান জানান ভিডিও থেকে কেবল একটি স্থিরচিত্র ব্যবহার করতে, যা তার মতে তার শক্তি প্রকাশ করে। 

mzamin

গাজায় জাতিগত নির্মূল অভিযানে ইসরায়েল কি স্থানীয় বেদুইন যোদ্ধাদের ব্যবহার করছে

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত জুনে স্বীকার করেছিলেন, তাঁর দেশ হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গাজার পপুলার ফোর্সেস মিলিশিয়াকে অস্ত্র ও সমর্থন দিচ্ছে।

টুইটারে পোস্ট করা একটি ছোট ভিডিওতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এতে কী সমস্যা? এটা শুধু ইসরায়েলি সেনাদের জীবন রক্ষায় কাজে লাগছে।’

যদিও পপুলার ফোর্সেস বলতে তিনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি নেতানিয়াহু। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েল এই মিলিশিয়া ও তাদের নেতা ইয়াসির আবু শাবাবকে সমর্থন করছে, যেন গাজায় জাতিগত নির্মূল অভিযানের পেছনে একটি ফিলিস্তিনি চেহারা দেখিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করা যায়।

৩১ বছর বয়সী আবু শাবাব গাজার তারাবিন বেদুইন গোত্রের একজন সদস্য। তাঁর নাম গাজা যুদ্ধের আগে তেমন একটা শোনা যায়নি। মাদকসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে ২০১৫ সাল থেকে তিনি কারাবন্দী ছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল গাজায় আক্রমণ শুরু করলে যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে যান।

মিসরের সিনাই অঞ্চল হয়ে গাজায় মাদক পাচার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, আইএসআইএলের (আইএসআইএস) সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী গাজায় মাদক পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে। অনেকের বিশ্বাস, আইএসআইএলের সঙ্গে আবু শাবাবের সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু আবু শাবাবের আইএসআইএল–সংশ্লিষ্টতার বিষয়কে ইসরায়েল আমলে নেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল বরং তাঁকে গাজায় জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ব্যবহার করছে।

আবু শাবাবের উত্থান

প্রায় ১০০ যোদ্ধা নিয়ে পপুলার ফোর্সেস নামে একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন আবু শাবাব। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়েই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়েছিলেন আবু শাবাব।

তা সত্ত্বেও বিভিন্ন ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু শাবাবের উপস্থিতি সরব ও সংগঠিত। সম্প্রতি তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। সেখানে দাবি করেছেন, গাজার ফিলিস্তিনিরা আর হামাসকে চান না।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সম্ভবত গাজার বাইরে আবু শাবাবকে ঘষেমেজে তৈরি করে সংবাদমাধ্যমের সামনে পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শেহাদা বলেন, ‘গত এক দশকে সমাজের সঙ্গে আবু শাবাবের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি পরিচিত কেউ ছিলেন না। তিনি মূলত অন্যদের সামনে উপস্থাপন করা একজন মুখপাত্র।’

নিজের গোত্র তারাবিন পর্যন্ত গাজায় আবু শাবাবের আজকের ভূমিকা সমর্থন করে না। এটি প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে আবু শাবাবকে পরিত্যাগ ও ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ধরনের প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়ার ঘটনা খুব বিরল।

গাজার দক্ষিণের শহর রাফায় ইসরায়েলের আক্রমণের পর গত বছরের মে মাসের শেষ দিক থেকে আবু শাবাবের নাম ছড়াতে শুরু করে।

শেহাদা বলেন, ‘এক মাস পর আবু শাবাবের গ্যাং প্রকাশ্যে আসে এবং গাজায় প্রবেশ করা খাদ্য ও ত্রাণসহায়তার বিপুল অংশ পরিকল্পিতভাবে লুট করা প্রধান গ্যাংয়ে পরিণত হয়।’

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজায় প্রবেশ করা প্রতি ১০ ট্রাকের মধ্যে প্রায় ৯টিই লুট করা হয়েছে।

শুরুতে ইসরায়েল এ লুটের জন্য হামাসকে দায়ী করেছিল। কিন্তু মানবিক সহায়তাদানকারী সংস্থাগুলো সে দাবি খণ্ডন করে। এমনকি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

বরং আন্তর্জাতিক সহায়তাকর্মীরা বলেছেন, পরিকল্পিতভাবে ত্রাণ লুটের পেছনে রয়েছেন আবু শাবাব ও তাঁর দল।

ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে পাওয়া জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে আবু শাবাবকে গাজায় ‘পরিকল্পিত ও ব্যাপক লুটপাটের পেছনে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি’ হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বছরের শুরুর দিকে গাজায় যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি হয়েছিল সে সময়ে আবু শাবাব নিখোঁজ হন। মার্চে ইসরায়েল একতরফাভাবে ওই যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়। মে মাসের মাঝামাঝি আবার প্রকাশ্যে আসেন আবু শাবাব। বিশেষ করে ওই সময়ে তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল যখন গাজায় সামান্য পরিমাণ ত্রাণ ঢুকতে দেওয়া শুরু করে।

শেহাদা বলেন, ‘আক্ষরিক অর্থে (যেদিন থেকে ত্রাণ প্রবেশ শুরু হয়) ঠিক সেদিনই আবু শাবার হঠাৎ আবার প্রকাশ্যে আসেন। তিনি ইসরায়েলের অনাহারে রাখার অভিযানের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলকে এ ব্যাপারে (ত্রাণ লুটপাট) পুরোপুরি দায়মুক্তির সুযোগ দিচ্ছেন এবং ইসরায়েল অন্য কাউকে দিয়ে সহজে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করার সুযোগ পাচ্ছে।’

জাতিগত নির্মূল অভিযানে সহায়তা করা এক ফিলিস্তিনি মুখ

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিতে তাঁদের জন্য নির্ধারিত ত্রাণ লুট করাই নয়, বরং আবু শাবাব ও তাঁর মিলিশিয়া দল গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল অভিযানের বিস্তৃত পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও অবদান রাখছে।

চলতি বছর আবু শাবাব ও তাঁর দল এ ভূমিকা পালনে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
আল-শাবাকা নামে একটি ফিলিস্তিনি নীতি নেটওয়ার্কের মার্কিন নীতি ফেলো তারিক কেনি শাওয়া বলেন, ‘ইসরায়েল বর্তমানে আবু শাবাবের সঙ্গে সম্পর্কিত মিলিশিয়া দলগুলো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। দেশটি আশা করছে, তাদের ব্যবহার করে তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প এলাকা আরও বাড়াবে এবং ওই মিলিশিয়ারাই সেসব এলাকা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। এভাবে ইসরায়েল নিজেদের ওপর থেকে এলাকা দখলে রাখার বোঝা কমাতে চায় এবং একই সঙ্গে জাতিগত নির্মূল অভিযান সহজতর করতে চায়।’

গত মাসের শুরুতে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাত্জ ছয় লাখ ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণ গাজায় একটি অস্থায়ী শিবিরে সরে যাওয়ার এক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি ওই পরিকল্পনাকে ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ বলে উল্লেখ করেন।

কাৎজের এ পরিকল্পনা সে সময়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। বিভিন্ন মানবিক সংগঠন থেকেও ওই পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।

আবু শাবাবের মিলিশিয়া দল দক্ষিণ গাজায় এমন সব স্থাপনা তৈরি করছে, যেগুলো বিশ্লেষকেরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বলে উল্লেখ করছেন। ক্যাম্পগুলো তৈরির লক্ষ্য সেখানে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়া এবং সেখান থেকে পাঁচ লাখের বেশি মানুষকে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করা।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফেলো ওমর রাহমান বলেন, ‘এসব ক্যাম্প তৈরির উদ্দেশ্য হলো, ফিলিস্তিনিদের সেখানে রাখা; যতক্ষণ না ফিলিস্তিনিদের গাজার বাইরে পাঠানোর সুযোগ আসে। সেটা হতে পারে মিসর বা কোনো তৃতীয় দেশ।’

ফিলিস্তিনিদের ছোট ছোট শিবিরে ঠাসাঠাসি করে রাখা এবং পরে সীমান্ত পার করে মিসরে পাঠানোর পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

এরই মধ্যে মিসর ফিলিস্তিনিদের সে দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

শেহাদা আল–জাজিরাকে বলেন, ‘ইসরায়েল বুঝতে পেরেছে, যদি (ইসরায়েলি বাহিনী) রাফায় একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিচালনা করে, সেটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই তারা তাদের এ অভিযানে এমন একটি মুখ বেছে নেবে যিনি একজন ফিলিস্তিনি, ফিলিস্তিনিদের মতো পোশাক পরবেন, ফিলিস্তিনি পতাকা বহন করবেন ও আরবি ভাষায় কথা বলবেন।’

এসব তৎপরতার পাশাপাশি আবু শাবাব ফেসবুকে দুটি অত্যন্ত কার্যকর প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ প্রচারণা দীর্ঘ যুদ্ধে হতাশ গাজার বাসিন্দাদের তাঁর শিবিরে আশ্রয় নিতে প্রলুব্ধ করতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েল যদি ফিলিস্তিনিদের সেখানে জোর করে ঠেলে পাঠাতে শুরু করে।

কেনি শাওয়া বলেন, আবু শাবাবের মিলিশিয়ারা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ছোট ছোট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প চালাচ্ছেন এবং সেগুলো মানুষের জন্য ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে প্রচার করছেন, যেখানে তাঁরা সহায়তা পেতে ও তাঁবু স্থাপন করতে পারেন।

গাজা ধ্বংস করে এবার দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল
গাজা ধ্বংস করে এবার দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

রাজশাহীতে ৪ জনের লাশ উদ্ধার: ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’

রাজশাহীতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করে নিজেই আত্মহত্যা করেছেন এক যুবক। লাশের পাশে পাওয়া চিরকুটে এমনটাই লিখে গেছেন তিনি। গতকাল সকালে একই ঘর থেকে তাদের চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের কোনো একসময় তাদের মৃত্যু হয় বলে ধারণা করছে পুলিশ।

নিহতরা হলেন- মিনারুল ইসলাম (৩৫), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (২৮), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলা (৪)। তাদের বাড়ি পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামে। এলাকাটি রাজশাহী  মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মতিহার থানার আওতায়। মতিহার থানা-পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করেছে। এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলামত সংগ্রহ করে। তদন্তকালে তাদের বাড়ি থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মিনারুলের লেখা। চিরকুটে ঋণের দায়ে ও খাওয়ার অভাবে স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যার পর আত্মহত্যার কথা লেখা আছে।

চিরকুটের এক পাতায় লেখা আছে, ‘আমি মিনারুল নিচের  যেসব লেখা লিখবো সব আমার নিজের কথা লিখে যাচ্ছি। কারণ, আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাবো। এই মৃত্যুর জন্য কারও কোনো  দোষ নেই। আমি মিনারুল প্রথমে আমার স্ত্রীকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিমকে ( ছেলে) মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে (মেয়ে)  মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছি।’ আরও লেখা আছে, ‘আমাদের চারজনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার স্ত্রী-সন্তান না  দেখে এবং বাপের বড় ছেলে  যেন জানাজায় না আসে। আমাদের চারজনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা যেন টাকা না দেয়। এটা আমার কসম।’

চিরকুটের অপর পাতায় লেখা আছে, ‘আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম। কারণ আমি একা যদি মরে যাই তাহলে, আমার স্ত্রী-সন্তানরা কার আশায় বেঁচে থাকবে? কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমরা বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম সেই ভালো হলো। কারও কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমার জন্যে কাউকে মানুষের কাছে  ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য অনেক মানুষের কাছে ছোট হয়েছে। আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। আমি চাই সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।’

সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান রাজশাহী নগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, স্ত্রী এবং মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।  ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো মনে হচ্ছে। মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে সেটা ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে। আত্মীয়-স্বজনরা পুলিশকে বলেছেন, চিরকুটের লেখাটা মিনারুলেরই। সেখানে আর্থিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আমরা বিষয়গুলো তদন্ত করবো। মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানান, ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রাথমিভাবে মনে হচ্ছে মিনারুলের চিরকুটে লিখে যাওয়া ঘটনাগুলোই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সঠিক ঘটনা তদন্তের পরই জানা যাবে।

mzamin
রাজশাহীর পবায় একই পরিবারের ৪ জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি

পিআর বিতর্কে বাড়ছে উত্তাপ by আহমেদ জামাল

সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। যা আলোচনার টেবিল থেকে ছড়িয়ে পড়ছে রাজপথে। যদিও অপ্রচলিত এই পদ্ধতির নির্বাচন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর। তারপরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপিসহ সমমনা কয়েকটি দল। তারা সভা-সমাবেশে পিআর পদ্ধতির দাবিতে জোরালো বক্তব্যের পাশাপাশি জনমত গঠনে তৎপর। এজন্য ধারাবাহিক সভা- সমাবেশ এবং গোলটেবিল বৈঠকসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে ইতিমধ্যে।

সর্বশেষ বুধবার রাজধানীর বিজয়নগরে রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। তবে এক ধাপ এগিয়ে ইসলামী আন্দোলন একই দিন সিইসি’র সঙ্গে দেখা করে এই ইস্যু নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা না করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে ‘গলায়  গামছা কোমরে রশি লাগতে পারে’ বলে মন্তব্য করেছে দলটি।

অপরদিকে বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলো এই পদ্ধতির ঘোর বিরোধী। তারা বলছেন- আপাতত অপ্রচলিত এই পদ্ধতির নির্বাচনের সুযোগ নেই। কারণ ভোটাররা এই পদ্ধতির নির্বাচনের সঙ্গে পরিচিত নয়। এ অবস্থায় রাজনৈতিক টানাপড়েনের কবলে পড়ছে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন।  এনিয়ে চলছে নানামুখী গুঞ্জন। বাড়তি যোগ হয়েছে এনসিপি’র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ‘ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না’ মন্তব্য।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের  একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষিত হয়েছে সম্প্রতি। তবে দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। এ অবস্থায় সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পক্ষে-বিপক্ষের বক্তব্য রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
এ ব্যাপারে জামায়াতের  সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ৫৩ বছর দেশে আসনভিত্তিক নির্বাচন হয়েছে, আমরা এবার দলভিত্তিক নির্বাচন চাই। এতে প্রত্যেকটি ভোটের মূল্যায়ন হবে। তিনি বলেন, এত বছর ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন পদ্ধতি চলে আসছে। বর্তমান সরকার সংস্কারের মাধ্যমে জাতিকে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ। সরকারের সেই ওয়াদা পূরণ করতে হলে পিআর মানতে হবে। অন্যথায় দেশ তো অনিশ্চয়তার দিকে যাবেই। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, রাষ্ট্রের সংস্কার নয়, শুধু নির্বাচনসংক্রান্ত যেসব সুপারিশ অতি জরুরি, অন্তত নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান জড়িত, সেগুলোর সংস্কার করে নির্বাচন দিতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও গণহত্যার বিচার ছাড়া জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনের পক্ষে নয়। তিনি আরও বলেন, আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি নির্বাচন নয়; এটি একটি বিপ্লব-পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের সুযোগ। ফ্যাসিস্টদের বিচার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মধ্যদিয়েই একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।

প্রসঙ্গত, পিআরের পক্ষে জনমত গঠনে গত ২৮শে জুন রাজধানীর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন। সেখানে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতির বিষয়টি বেশ জোরালোভাবে তুলে ধরেন বিভিন্ন দলের নেতারা। সেদিন ডান ঘরানার ১০টি রাজনৈতিক দল একমঞ্চে উঠে পিআর পদ্ধতির যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছেন, এ পদ্ধতি না হলে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। মূলত ওই দিন থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। যদিও ওইদিনই বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস পিআর পদ্ধতির বিরোধিতা করে বলেছেন, একটি গোষ্ঠী নির্বাচনকে পিছিয়ে দিয়ে জাতির সর্বনাশ করতে চাচ্ছে। তবে এই দাবির পক্ষের দলগুলো তাদের অবস্থানে অনড়। গত ১২ই জুলাই পিআর প্রায়োগিক প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে এবং দেশের শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও অংশীজনদের মধ্যে বোঝাপড়া আরও নিবিড় করতে রাজধানীর একটি হোটেলে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করছে ইসলামী আন্দোলন। বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমাজের নানা পেশার অংশীজনেরা সেই গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন।

জানা যায়, গত ১৩ই জুন লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের ফলে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী নেপথ্যে থেকে ইসলামী দলগুলোকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে কয়েক দফায় আলোচনা করে অবশেষে ২৮শে জুন ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশে এক মঞ্চে ওঠেন তারা। ওই মঞ্চ থেকে বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন কথা বলেন বক্তারা। তবে ওইদিনই এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যারা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়, তাদের উদ্দেশ্য আছে। তারা নির্বাচন বানচাল করতে চায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন সম্ভব নয়। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এদিকে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোকে নিয়ে গত  ১৯শে জুলাই রাজধানীর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামী বিশাল শোডাউন করে। সেখানেও পিআর দাবি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়।

পিআর নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমদ বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো একটি গৌরবোজ্জ্বল গণ-অভ্যুত্থানের পরও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, একটি চেতনাদীপ্ত রক্তস্নাত অভ্যুত্থানের পরে দেশের রাজনীতিতে এই সহিংসতার মূল কারণ অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে আমাদের অবশ্যই শঙ্কিত হতে হয়। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব বলেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সুস্থ করতে এবং রাষ্ট্রপরিচালনায় দেশের সকল নাগরিকের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে পিআর নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। সুতরাং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সরকারকে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
mzamin

শেখ মুজিব জাতির পিতা নন, তবে তার ত্যাগ স্বীকার করি

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা নন, তবে আমরা স্বাধীনতা অর্জনে তার ভূমিকা এবং ত্যাগ স্বীকার করি। তিনি বলেন, তার শাসনামলের জাতীয় ট্র্যাজেডিকেও স্মরণ করি। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন।

পোস্টে নাহিদ লেখেন, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের একটি ঔপনিবেশ রাজ্যে পরিণত হয়। তার সময়েই ১৯৭২ সালে গণবিরোধী সংবিধান আরোপিত হয় এবং লুটপাট, রাজনৈতিক হত্যা ও একদলীয় বাকশাল একনায়কতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।

আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির অন্তরালে মুজিব পূজা ও মুক্তিযুদ্ধ পূজা একটি রাজনৈতিক ভক্তি হিসেবে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। অত্যাচার, লুটপাট করার পাশাপাশি নাগরিককে প্রথম শ্রেণি ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। এটি গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে আধুনিক জমিদারি ছাড়া কম কিছুই ছিল না। তবুও মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমগ্র জাতির সংগ্রাম। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে তার পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে জবাবদিহিতাহীন শাসন এবং মুজিবীয় নামের আড়ালে দুর্নীতি ও দমনপীড়নকে ন্যায্যতা দিয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জনগণের বিদ্রোহ এই জমিদারিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি, পরিবার, মতাদর্শকে আর কখনো নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নিতে বা বাংলাদেশের ওপর ফ্যাসিবাদ আরোপ করতে দেয়া হবে না। জাতির পিতা অভিধাটি ইতিহাসের কোনো অংশ নয়, বরং রাষ্ট্রকে সংকুচিত করে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বানানোর হাতিয়ার। বাংলাদেশে সব নাগরিকের অধিকার সমান, আর কোনো একক ব্যক্তি এটির মালিকানা দাবি করতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধ নামে মুজিববাদ একটি ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ। আমাদের সংগ্রাম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিস্ট আদর্শের বিরুদ্ধে। মুজিববাদ ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের একটি আদর্শ। এর মানে হলো জোরপূর্বক গুম, হত্যা, ধর্ষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা। মুজিববাদ মানে- ইসলামোফোবিয়া, সাম্প্রদায়িকতা এবং সংখ্যালঘুদের ভূমি দখল। এর মানে- বিদেশি শক্তির কাছে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিক্রি করা। ষোলো বছর মুজিবকে রাজনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল অস্ত্র হিসেবে। আর এই মতবাদের আড়ালে ছড়িয়েছিল গুম, খুন, লুটপাট ও গণহত্যা।

মুজিববাদ একটি আস্ত বিপদের নাম উল্লেখ করে এনসিপি’র এই নেতা বলেন, এটিকে পরাজিত করার জন্য রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সকল নাগরিকদের জন্য আমাদের সংগ্রাম হলো একটি প্রজাতন্ত্র, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যেখানে কোনো দল, বংশ, নেতা জনগণের ওপরে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশ কারও সম্পত্তি নয়, এটা গণপ্রজাতন্ত্র।

mzamin

শেখ মুজিব যেভাবে ‘দ্বিতীয়বার’ খুন হলেন by মহিউদ্দিন আহমদ

আমরা কথা বলছি ১৫ আগস্ট নিয়ে। আজ কারও চোখে ‘বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী’, কারও কাছে ‘নাজাত দিবস’। দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন শেখ মুজিবুর রহমান।

এ দেশে একটা রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গৃহযুদ্ধ চলছে ষাটের দশক থেকেই। একদল মনে করেন, ‘শেখ মুজিব না জন্মালে বাংলাদেশ হতো না’। আরেক দল মনে করেন, মুজিব হচ্ছেন ‘জাতীয় বিশ্বাসঘাতক’।

এক দল মুজিবের মাজার গড়ে তাঁর বন্দনায় ব্যস্ত। অন্য দলটি তাঁর বাড়ি-ভাস্কর্য ভাঙেন। তাঁরা একে অপরের ধ্বংস চান। দুই দলেই আছেন বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী। বিপরীত মেরুর এই চিন্তার মধ্যে একটা নিষ্পত্তির সম্ভাবনা অকল্পনীয়।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আওয়ামী লীগের নেতা তাজউদ্দীন আহমদ মনে করতেন বাঙালির ‘পয়লা নম্বর শত্রু’ আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে মনে করতেন ‘দুই নম্বর শত্রু’। অনুগতরা তো সব সময় সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, প্রশস্তিগাথা লেখেন।

কেউ কেউ বলেন, একটি লোক কেমন তা জানতে হলে তার শত্রু কী বলে, সেটি জানা দরকার। শত্রুর চোখে কেমন ছিলেন মুজিব? তাঁর সম্পর্কে এই দুই ‘শত্রু’ কী বলেছেন, তা উল্লেখ করছি।

ভুট্টো বলছেন: একাত্তরের জানুয়ারিতে যখন ঢাকায় যাই, তখন আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোভাবে জানতে এবং বুঝতে পেরেছি। তাঁকে আমার মনে হলো অসম্ভব বিনয়ী। যে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা আছে, সেসব নিয়ে তিনি যুক্তিসহকারে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেন। যেসব ব্যাপারে তাঁর ধারণা নেই, সে বিষয়গুলো তিনি অল্প কথায় সারেন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ভাসা-ভাসা এবং কিছু মৌলিক বিষয়কে খুব সহজ চোখে দেখেন। আমার ধারণা ভুল হতে পারে, যদিও মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোনো পূর্বসংস্কার নেই।…মুজিবের কাছে ন্যায্যতা হলো বাংলার স্বাধীনতা আর আমার কাছে হলো পাকিস্তান টিকিয়ে রাখা; মুজিব মনে করেন ছয় দফা হলো জনগণের সম্পত্তি, আমার কাছে জনগণের সম্পদ হলো পাকিস্তান। আমাদের মতাদর্শ ছিল সাংঘর্ষিক (জুলফিকার আলী ভুট্টো, দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি)।

মুজিব সম্পর্কে ইয়াহিয়ার ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীত: মুজিবকে আমি আবেগতাড়িত, প্রচারসর্বস্ব ও অপরিপক্ব লোক মনে করি। ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর শুরু। সেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে পারেননি। সোজা কথায়, তিনি হলেন একজন আন্দোলনকারী। চিন্তা ও বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, তাঁকে খুব সহজেই প্রলোভিত করা যায়। তাঁর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, তিনি কথা রাখেন না। তাঁর ওপর ভরসা করা যায় না। মুজিব সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন হলো, নিজেকে যতই চালাক এবং অন্যের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে বলে মনে করুন না কেন, আসলে তিনি বোকা। যেকোনো সুবিধাবাদী লোক তাঁকে প্রতারিত করতে পারে। তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এবং ভুট্টোর ফাঁদে পড়েছেন। তাঁকে নিয়ে কে কী করছে, এটা তিনি বোঝেননি (১৯৭৮ সালে লাহোর হাইকোর্টে রিট আবেদনে সংযুক্ত ইয়াহিয়া খানের জবানবন্দি)।

ভুট্টো পাকিস্তান ভাঙার জন্য মুজিবকে দায়ী করেছেন। ইয়াহিয়া পাকিস্তান ভাঙার জন্য মুজিব এবং ভুট্টো উভয়কেই দায়ী করেছেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব দেশের প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে দর-কষাকষির ম্যান্ডেট পান। আলোচনা ভেঙে গেলে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী হামলা চালায়। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুজিব গ্রেপ্তার হয়ে পাকিস্তানে যান। অন্যরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান ভারতে।

রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির (পরে নাম হয় কমিউনিস্ট পার্টি) অন্যতম নেতা গিওর্গি ভ্যালেন্তিনোভিচ প্লেখানভ ১৮৯৮ সালে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নামে একটি বই লেখেন। তাঁর মতে, মানুষ তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলির কারণে ইতিহাসে বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন। তাঁর মধ্যে এমন সব গুণের সমাবেশ ঘটে, যার ফলে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন মহান। তাঁরা হলেন ‘মেন অব ডেসটিনি’। তাঁরা এমন সব চিন্তা নিয়ে আসেন, মানুষের মনোজগতে যা প্রচ্ছন্ন থাকে। তাঁরা এটাকে নাড়া দেন, উসকে দেন, ধারালো করেন। মুজিব এ কাজটা করেছিলেন।

মুজিব অনুপস্থিত থাকলেও তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। গ্রামের মানুষ তাঁর জন্য নফল রোজা রেখেছে। একসময় দেশ পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়েছে। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিব দেশে ফিরে সরকারের হাল ধরেন। এ পর্বের তিনিই নায়ক।

বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর, এ সময়টা ছিল টালমাটাল। দেশটা গরিব। মানুষের আকাঙ্ক্ষা আকাশছোঁয়া। রাষ্ট্র নতুন। জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মুজিব তাল মিলিয়ে চলতে পারেননি। রাষ্ট্র ও সরকারের সে সক্ষমতা ছিল না। ছিটেফোঁটা কিছু আইন বানিয়ে এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় মনোরম শব্দাবলি বসিয়ে ঔপনিবেশিক কাঠামো এবং স্থিতাবস্থা রেখে দেন তিনি। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরকারি দলের লোকেদের লুটপাট আর সন্ত্রাস, বিরোধী দলের দায়িত্বহীন আচরণ, দুর্ভিক্ষ সামলাতে সরকারের ব্যর্থতা, একদলীয় ‘বাকশাল’ সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা নিয়ে নেওয়া, নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া, সামরিক-অসামরিক দ্বন্দ্ব—এগুলোই একটা ভয়ংকর পরিবর্তনের শর্ত তৈরি করে দিয়েছিল। চাটুকার পরিবেষ্টিত মুজিব মানুষের মন বুঝতেই পারেননি। পরিবর্তনটি এল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট।

১৫ আগস্ট মুজিব সপরিবার নিহত হন। এর দুটি দিক আছে। এক. সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন। দুই. সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাবিহীন লোকেদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা।

বাকশাল ছাড়া সব দল এই অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানায়। মুজিবের সমর্থকেরা ওই সময় কেউ পথে বের হননি। তাঁরা কেউ হতবাক, কেউ কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কেউ গ্রেপ্তার, কেউ পলাতক। চাটুকারেরা মুহূর্তেই হাওয়া। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে যিনি ছিলেন স্মরণকালের জনপ্রিয়তম নেতা, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরশাসক হিসেবে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ কবিতাটির বিয়োগান্ত প্রতিচ্ছবি দেখলাম আমরা।

১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনের অধীনে রাজনৈতিক দলবিধির আওতায় আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হয়। দলের ভাঙন ঠেকাতে ১৯৮১ সালে মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী বানিয়ে নিয়ে আসা হয় নয়াদিল্লি থেকে। শুরু হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে পারিবারিক পরম্পরা। হাসিনার মিশন, শেখ মুজিবের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা। দুই পর্বে চার মেয়াদে ক্ষমতার চূড়ায় থেকে তিনি এটি করেন। সরকারি অফিসের দেয়ালে সরকারপ্রধানের পাশাপাশি মুজিবের ছবি প্রদর্শিত হতে থাকে। অগুনতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক আর স্থাপনায় তাঁর নাম জুড়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে মুজিব পরিবারের কাছের ও দূরের সব সদস্যের নামে হয় নানান স্থাপনা।

হাসিনা দেশটাকে পারিবারিক তালুক বানিয়ে ফেলেন। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট, দুঃশাসন, ভিন্নমত দমন, গণগ্রেপ্তার, হত্যা ও গুম। নির্বাচনী ব্যবস্থা তছনছ করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাঁকে সরানোর কোনো পথ তিনি রাখেননি। এভাবেই তাঁর পতনের সব শর্ত নিজেই তৈরি করেন, যেমনটি করেছিলেন তাঁর পিতা।

অবশেষে এল সেই ডি-ডে, চব্বিশের ৫ আগস্ট। এ ক্ষেত্রে পিতার সঙ্গে কন্যার একটা অমিল আছে। পিতা পালাননি। বুলেটে তাঁর শরীর ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল। কন্যা প্রাণভয়ে চম্পট দেন। আত্মীয়দের নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ করে দেন। অনাত্মীয়দের ফেলে যান।

পঁচাত্তরের পরে মুজিবের ভাবমূর্তি যেটুকু পুনরুদ্ধার হয়েছিল, হাসিনার বাড়াবাড়িতে সেটি ধসে যায়। আওয়ামী বলয়ের বাইরে নাগরিকদের কাছে হাসিনা ফ্যাসিস্ট। আর মুজিব হয়ে যান ফ্যাসিবাদের আইকন। হাসিনার অপশাসনের দায় মুজিবের নয়। যেহেতু হাসিনা মুজিব নামক বটিকা ফেরি করে দেশ শাসন করতেন, স্বাভাবিকভাবেই মুজিব গণরোষের শিকার হন। দেশে মুজিববিরোধী মনস্তত্ত্ব জোরালো হয়ে ওঠে। অখণ্ড পাকিস্তান তত্ত্বের ফেরিওয়ালারা সেই স্রোতে সওয়ার হন তাঁদের পুরোনো হিসাব মেলাতে।

হাসিনা প্রাণে বাঁচেন। জনরোষ গিয়ে পড়ে মুজিবের ওপর। ঝড় বয়ে যায় তাঁর নামে করা সব স্থাপনা, ভাস্কর্য আর বত্রিশ নম্বরের বাড়িটির ওপর। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তিনি বুক পেতে গুলি নিয়েছিলেন। চব্বিশে এসে হাসিনা তাঁর মৃত পিতার ‘দ্বিতীয় মৃত্যু’­ নিশ্চিত করেন। এটি ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

হাসিনা সরকারের পতনের পর ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়, ছয় মাস পর ভেঙে ফেলা হয়
হাসিনা সরকারের পতনের পর ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়, ছয় মাস পর ভেঙে ফেলা হয়। ছবি: প্রথম আলো