Tuesday, June 30, 2020

মহান আমেরিকান রস পেরট সিনিয়রের কীর্তিগাঁথা by ইকরাম সেহগাল

রস পেরট সিনিয়র ও ইকরাম সেহগাল (বাঁয়ে)
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এই মহান বৃদ্ধলোকটি যখন হেরে যান, তখন তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ডালাসে রস পেরট সিনিয়রের মৃত্যুর খবরটি এসেছিল কষ্টের খবর হিসেবে। এটা ছিল ব্যক্তিগত দুঃখের খবর। কারণ তার ছেলে রস পেরট জুনিয়র আমার অন্যতম সেরা বন্ধু।

টেক্সাসে ১৯৩০ সালে মহামন্দার সময় সাধারণ অবস্থায় জন্মগ্রহণকারী পেরট নিজের চেষ্টায় বিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন। একবার এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন যে তিনি বাস করেন এক ‘আমেরিকান স্বপ্নের মধ্যে,’ যে স্বপ্ন দেখে অনেকে তাদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে ভাগ্য বদলাতে আমেরিকায় পাড়ি দেয়।

তিনি সাত বছর বয়সে সংবাদপত্র বিতরণের কাজ করেন। প্রতি দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তিনি পত্রিকা বিলি করতেন। ১৯৫৩ সালে মার্কিন নেভাল একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েট করে তিনি চার বছর নৌবাহিনীতে কাজ করেন। এখানেই তিনি প্রথম কম্পিউটার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। এতে তিনি যে আগ্রহ লাভ করেন তাই তাকে দুটি ডাটা প্রসেসিং কোম্পানির মাধ্যমে ভাগ্য গড়তে সহায়তা করে। তিনি বড় ধরনের মুনাফা নিয়ে ১৯৯০-এর দশকে কোম্পানি দুটি বিক্রি করে দেন।

রস পেরট সিনিয়র ১৯৫৭ সালে নৌবাহিনী ত্যাগ করে আইবিএম সেলসম্যান হন। আইমিএমের সিইও যখন দেখলেন যে এই লোক কমিশনের মাধ্যমে তার চেয়ে বেশি উপার্জন করছেন, তখন তিনি তার আয় হ্রাস করার জন্য কমিশনে সীমা নির্ধারণ করে দেন। পেরট সিনিয়র প্রথম মাসেই ওই সীমায় পৌঁছে যান।

সেলসম্যান হিসেবে তিনি খুবই ভালোভাবে সার্ভিসিংয়ের অভাবের বিষয়টি অবগত ছিলেন। এর ফলে আইবিএম তাদের পূর্ণ ধারণ ক্ষমতায় কম্পিউটার বিক্রি করতে পারছিল না। তিনি বিষয়টি আইবিএমের ব্যবস্থাপকদের অবহিত করলেও তারা তাতে কর্ণপাত করেনি। হতাশ হয়ে রস সিনিয়র ১৯৬২ সালে আইবিএম ত্যাগ করেন।

তিনি মাত্র ১০০০ ডলার পুঁজি নিয়ে ইলেকট্রনিক ডাটা সিস্টেমস (ইডিএস) গঠন করে বিক্রয়োত্তর সেবার দিকে মনোযোগ দেন। ড. ইহসান ও আমি যখন ইডিএস পরিদর্শনে গিয়েছিলাম, তখন তিনি তার স্ত্রীর কাছ থেকে উদ্যোগের প্রথম বিনিয়োগ হিসেবে পাওয়া ঐতিহাসিক ১০০০ ডলারের চেকটি গর্বভরে আমাদের দেখিয়েছিলেন।

আজকের কঠোর বাস্তবতা হলো, বিশ্বজুড়ে আইবিএমের সবচেয়ে লাভজনক অংশ হলো আইমিএম গ্লোবাল সার্ভিসেস। রস সিনিয়র শেষ পর্যন্ত ১৯৮৪ সালে ২.৪ বিলিয়ন ডলারে ইডিএস বিক্রি করেন জেনারেল মটর্সকে। তিনি ১৯৮৮ সালে পেরট সিস্টেমস প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৯ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি ডেল সিস্টেমস কিনে নেয় ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে।

দুর্দান্ত ভিশনের অধিকারী উদ্যোক্তা রস সিনিয়র স্টিভ জবসের উদ্যোগে ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। তবে এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ত্যাগ করেন। এরপর তার সাফল্য কাহিনী ছিল ‘নেক্সট’।

পেরট সিনিয়র তার দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন, এই দেশের কল্যাণে যত্নবান ছিলেন। তার এত টাকা তাকে উদ্ধত করেনি, তার দেশের জনগণের ভাগ্য সম্পর্কে উদাসীন হননি।

ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধবন্দীদের সাথে কঠোর আচরণের খবর পেয়ে তিনি ১৯৬৯ সালে সংগঠিত চেষ্টায় বিমান থেকে খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী ফেলার চেষ্টা করেন। এই চেষ্টাটি সফল হয়নি। তিনি এই কাজে কেবল হ্যানয় বা মস্কোর কাছ থেকেই বাধার মুখে পড়েননি, সেইসাথে ওয়াশিংটনেও বৈরী অবস্থায় পড়েন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ সমাপ্তির অনেক পরও তিনি এই যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আবিষ্ঠ ছিলেন। প্রতিটি যুদ্ধবন্দীর নিরাপদে ফেরা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার জন্য তিনি প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন।

তার কোম্পানিতে কর্মরত দুই কর্মী ১৯৭৮ সালে শাহের পতন্মুখ সরকারের সাথে চুক্তিগত বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতির অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়। কোম্পানিকে বলা হয়, তাদের মুক্তির জন্য ১২ মিলিয়ন ডলার দিতে হবে। কার্টার প্রশাসনের উদাসিনতা লক্ষ্য করে এবং তার কর্মীদের ভাগ্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি অবসরপ্রাপ্ত স্পেশাল ফোর্সেস অফিসার কর্নেল আর্থার সাইমন্সের নেতৃত্বে একটি উদ্ধার মিশন গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে শাহের নির্বাসনবিষয়ক বিশৃঙ্খলার মধ্যে তারা প্রথমে কিছুই করতে পারেননি। তবে বিপ্লবী জনতা তেহরানের কাসর কারাগারে হামলা চালিয়ে এক হাজার বন্দীকে মুক্ত করলে তাদের সুযোগ আসে। পেরট ও সাইমন্স অবশেষে তাদের সহকর্মীদের পেয়ে তাদেরকে ভ্যানে চড়িয়ে নিয়ে আসেন। তাদের এই উদ্ধার অভিযানটি ছিল রোমহর্ষক।

এই ঘটনাতে উদ্দীপ্ত হয়ে কেন ফোলেট ‘অন উইয়িং অব ইগলস’ ও টেলিভিশন মিনি সিরিজ নির্মাণ করেন। কর্মীদের উদ্ধারে তার এই উদ্যোগের ফলে তার জাতীয় স্বীকৃতি মেলে।

তিনি কখনো সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ না করেই ১৯৯২ সালে এক টকশোতে ঘোষণা করেন যে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। প্রচারণাকালে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট, চাকরির জন্য বিদেশে আউটসোর্সিংয়ের কথা তুলে ধরেন।

তিনি নর্থ আমেরিকান ফ্রি ট্রে এগ্রিমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলেন, এমনটা হলে প্রধানত এশিয়ানদের কাছে আমেরিকানরা চাকরি হারাবে।

তিনি আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন। এ দিক থেকে তিনি ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বসূরী। পেরটের ছোট সরকার ও বিশ্বায়নবিরোধী দাবির কারণেই ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ১৯৯২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৩৯ ভাগ জনমত পেয়ে এগিয়ে থাকা অবস্থাতেই অজ্ঞাত কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যান।

তবে অনুসারীদের অনুরোধে আবার নির্বাচনে এসেছিলেন ১ এপ্রিল। কিন্তু তখন আগের ধারাটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে তিনি হয়েছিলেন তৃতীয়। বিল ক্লিনটন পেয়েছিলেন ৪৫ ভাগ, জর্জ বুশ ২৭.৫ ভাগ আর তিনি ১৯ ভাগ। মার্কিন নির্বাচনের ইতিহাসে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীর এটিই সেরা সাফল্য।

রাজনৈতিক পরিকল্পনা ত্যাগ করে ১৯৯৬ সালে তিনি তার ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পেরট সিস্টেমস করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইওর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০০ পর্যন্ত তিনি ছিলেন কোম্পানিটির প্রধান। ৭০ বছর বয়সে তিনি তার ছেলে রস পেরট জুনিয়রের কাছে দায়িত্বভারটি অর্পণ করেন।

তবে দেশ নিয়ে তার উদ্বেগ কখনো কমেনি। আমেরিকার জাতীয় ঋণ নিয়ে তিনি চিন্তায় ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি তার দেশবাসীকে সচেতন করতে থাকেন।

আমি ১৯৯৪ সালে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ছেলে জারারের গ্রাজুয়েশনের সময় আমি প্রথম রস পেরট সিনিয়রকে দেখি। তিনি ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ভালো বক্তা। পরে তার ছেলে রস পেরট জুনিয়রের সুবাদে আমি পেরট পরিবারের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল পেরট সিনিয়রের সাথে সাক্ষাত করার। ২০১৩ সালে প্রথম সাক্ষাতের সময় তার বয়স ছিল ৮৩ বছর।

রস জুনিয়রও অন্যদের মতো ধনী নন। তিনি তার পিতার মতোই দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ মানুষ। তিনিও নানা সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন।

ডাভোসে পাকিস্তান ব্রেকফাস্টে আমার একটি বড় সাফল্য ছিল রস জুনিয়রের উপস্থিতি। তিনি টানা কয়েক বছর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ব্রেকফাস্টে ২০১২ ও ২০১৩ সালে ইমরান খান (তখন তিনি ছিলেন স্রেফ একজন পরিচিত রাজনীতিবিদ) উপস্থিত ছিলেন, তখন তিনিও ছিলেন। তিনি তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই লোক নিকট ভবিষ্যতে তোমাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার কথা সত্যে পরিণত হয়েছে।

জর্ডানের আম্মানে কয়েক বছর আগে গত ইস্ট ওয়েস্ট ইনস্টিটিউট (ইডব্লিউআই) ডিরেক্টর্স বোর্ড মিটিংয়ে রস জুনিয়র ও আমার উভয় পরিবার দারুণভাবে একত্রিত হয়েছিলাম।

রস পেরট সিনিয়রের মৃত্যুর পর এক বিবৃতিতে পেরট পরিবার যথার্থভাবেই বলেছে যে ব্যবসা ও জীবনে রস ছিলেন সৎ ও কাজের লোক। একজন দেশপ্রেমিক আমেরিকান, বিরল ভিশনের অধিকারী, নীতিবান ও গভীর সহানাভূতিসম্পন্ন লোক হিসেবে তিনি সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধফেরত সৈনিকদের প্রতি অটল সমর্থন ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছেন।

টেক্সাসের পেরটরা সত্যিই মহান আমেরিকান পরিবারগুলোর অন্যতম।

>>>লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Sunday, June 28, 2020

কেরান হজে করণীয় by মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী

হজের মাসগুলোতে একসঙ্গে ওমরা ও হজ উভয়টির ইহরাম বেঁধে প্রথমে ওমরা পালন করে ইহরাম না খুলে ওই একই ইহরামে হজ সমাপন করাকে হজে কেরান বা কেরান হজ বলে।
১. প্রথমে ওমরা ও হজ উভয়টার নিয়তে ইহরাম বাঁধবে। ইহরাম বাঁধা ফরজ।
২. বায়তুল্লায় প্রবেশ করে তাওয়াফে ওমরা বা ওমরার তাওয়াফ আদায় করবে। এই তাওয়াফ ফরজ।
৩. তাওয়াফের পর ওমরার সায়ি করবে। এই সায়ি ওয়াজিব।
৪. তারপর তাওয়াফে কুদুম করবে। মিকাতের বাইরে থেকে মক্কায় প্রবেশকারীদের জন্য এই তাওয়াফ সুন্নত।
৫. তারপর সায়ি করবে। এই সায়ি ওয়াজিব। কেরানকারীর জন্য এই সায়ি এখানেই করে নেওয়া উত্তম। না করলে তাওয়াফে জিয়ারতের পর এই ওয়াজিব সায়ি আদায় করতে হবে।
৬. ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় থেকে আদায় করবে। এটা সুন্নত।
৭. ৯ জিলহজ সূর্য ঢলে পড়া থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত উকুফে আরাফা (আরাফায় অবস্থান) করবে। উকুফে আরফা হজের প্রধান ফরজ।
৮. ৯ জিলহজ রাতে উকুফে মুজদালিফা (মুজদালিফায় অবস্থান) করবে। এটা ওয়াজিব।
৯. ১০ জিলহজ মিনায় এসে জামারায়ে আকাবায় (বড় শয়তানকে) কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
১০. তারপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
১১. তারপর মাথা মু-ন করে বা চুল ছোট করে ইহরাম খুলবে। এই মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করা ওয়াজিব।
১২. তাওয়াফে জিয়ারত করা ফরজ।
১৩. ১১ ও ১২ জিলহজ প্রতিদিন তিন জামারায় কংকর নিক্ষেপ করবে। এই কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।
১৪. বিদায়ি তাওয়াফ করবে। এই বিদায়ি তাওয়াফ ওয়াজিব। মক্কা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিদায়ি তাওয়াফ করলে হজে কেরানের কার্যাবলি শেষ হবে।
ইহরাম অবস্থায় করণীয় : নির্দিষ্ট পোশাক পরিধানপূর্বক (পুরুষের জন্য) হজ অথবা ওমরা কিংবা হজ ও ওমরা উভয়টির নিয়ত করে বায়তুল্লাহ শরিফের তাওয়াফ এবং সাফা-মারওয়ার সায়ি করার পর মাথা মু-ন করে বা চুল ছোট করে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত অবস্থাকে ইহরাম বলে।
যেখান থেকে ইহরাম বাঁধে : হজ বা ওমরার উদ্দেশে রওনা হলে মিকাত অর্থাৎ শরিয়ত কর্তৃক ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করার আগেই ইহরাম বেঁধে নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান প্রভৃতি পূর্বঞ্চালীয় লোকদের জন্য এই নির্ধারিত স্থানটি হলো ইয়ালামলাম (মক্কা থেকে দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত একটি পাহাড়ের নাম)। এর আগে অবশ্যই ইহরাম বেঁধে নেবেন। বিমানবন্দরে গিয়ে বা হাজীক্যাম্প থেকে রওনা হওয়ার আগে বাসায় বা মসজিদে যে কোনো জায়গায় এহরাম বাঁধা যায়। যারা মদিনা শরিফ আগে যাওয়ার ইচ্ছা করবেন, তারা বিনা ইহরামে রওনা হতে পারেন। মদিনা জিয়ারতের পর যখন মক্কা শরিফের উদ্দেশে রওনা হবেন, তখন মদিনা থেকে মক্কা শরিফ গমনকরীদের মিকাত যেহেতু জুলহুলাইফা, তাই জুলহুলাইফা নামক স্থান থেকে বা মদিনা থেকেই ইহরাম বেঁধে মক্কা শরিফে রওনা হবেন। যারা মক্কা শরিফে থাকা অবস্থায় নফল ওমরা করতে চান ইহরাম বাঁধার জন্য তাদের হারামের সীমানার বাইরে গিয়ে ইহরাম বেঁধে আসতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে উত্তম স্থান হলো তানয়িম। বর্তমানে সেখানে মসজিদে আয়েশা নামক একটি মসজিদ আছে। সেখানে গিয়ে ইহরাম বেঁধে এসে নফল ওমরা করবেন। জেরানা নামক স্থান থেকেও ইহরাম বেঁধে আসা যায়।
>>>মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী

Wednesday, June 24, 2020

ইতিহাসের আড়ালে ভাটির বাঘ শমসের গাজী by মঞ্জুর মোর্শেদ রুমন

বঙ্গবীর শমসের গাজী ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরার রোশনাবাদ পরগনার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ‘ভাটির বাঘ’ বলে পরিচিত। শমসের গাজী নবাব সিরাজ উদ দৌলার পর ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে প্রথম নিহত হন। ইতিহাসের আড়ালে থাকা ভাটির এ বাঘকে নিয়ে লিখেছেন মঞ্জুর মোর্শেদ রুমন-
বাংলার ইতিহাসে যে কয়জন ক্ষণজন্মা পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন তাদের মধ্যে শমসের গাজী অন্যতম। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজ বণিক ও দেশীয় দোসরদের বিশ্বাসঘাতকতা আর ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য যখন অস্তমিত হয়, ঠিক তখনই বাংলার পূর্ব দিগন্তে এই শমসের গাজীর অভ্যুদয় ঘটেছিল। তবে তার বীরত্বপূর্ণ অবদান নিয়ে ইতিহাসবিদগণ খুব একটি নির্মোহ আলোচনা করেছিলেন বলে মনে হয় না।
গাজীর জন্ম ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিজকুঞ্জরা গ্রামে ১৭০৫ মতান্তরে ১৭০৬ খ্রিস্টাব্দে। অল্প বয়সে পিতৃহারা হন শমসের গাজী। অভাবের সংসার থাকা সত্ত্বেও তিনি ছোটবেলায় দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন। একদিন মায়ের বকুনি খেয়ে ফেনী নদীর তীরে বসে কাঁদছিলেন। তখন শুভপুরের তালুকদার জগন্নাথ সেন শমসেরকে দেখতে পান। দয়াপরবশ হয়ে তিনি শমসেরকে শুভপুর নিয়ে যান।
শুভপুরের তালুকদারের কোন সন্তান ছিল না। সেখানে স্নেহ-মমতার মধ্যে বেড়ে উঠতে থাকেন শমসের গাজী। লেখাপড়ার পাশাপাশি কুস্তি, লাঠিখেলা, তীর-ধনুক চালনায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে শিকারে গিয়ে একটি হিংস্র বাঘকে হত্যা না করে জীবিত বন্দি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন।
তালুকদার জগন্নাথ সেনের মৃত্যুর পর যুবক শমসের গাজী শুভপুরের খাজনা আদায় শুরু করেন। শুরু হয় তার উত্থান। তখন ‘বাংলার বীর’ বা ‘ভাটির বাঘ’ হয় তার উপাধি। সে সময় তিনি চোর, ডাকাত ও জলদস্যুদের রুখতে শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলেন। শমসের গাজী ছিলেন প্রজাদরদি। পাহাড়িয়া ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলে তিনি কৃষকের এক বছরের খাজনা মওকুফ করে দেন। পরবর্তী তিন বছর মহারাজের রাজকোষে খাজনা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। এতে ত্রিপুরা মহারাজ ক্ষিপ্ত হয়ে প্রায় ৭ হাজার সৈন্য পাঠায় গাজীকে উচ্ছেদ করার জন্য। ফল হয় বিপরীত। শোচনীয় পরাজয়ে প্রাসাদ ছেড়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করেন।
ত্রিপুরা রাজ্যের বিরাট অংশ শমসের গাজীর করতলে এসে যায়। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কসবা, কুমিল্লার চান্দিনা, চৌদ্দগ্রাম, সমগ্র ভুলুয়া (বর্তমান নোয়াখালী), সমগ্র ফেনী, নিজামপুর পরগনা থেকে ইসলামাবাদ (চট্টগ্রাম) পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ রাজ্যের রাজধানী ছিল ত্রিপুরার উদয়পুর। কৃষক-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অধিকার করে নেন জমিদারি। প্রজাবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে রোষানলের শিকার হন ত্রিপুরারাজের। শুরু হয় তুমুল লড়াই। গর্জে ওঠেন ভাটির বাঘ। তার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ে ইংরেজ বেনিয়ারা।
ইতোমধ্যে প্রজা সাধারণের কল্যাণে স্ত্রীর নামে রাস্তা নির্মাণ, বাজার বসানো, মায়ের নামে দীঘি খনন, মগ এবং জলদস্যুতার হাত থেকে রক্ষা করে গাজী তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তবে এতে বাধ সাধে ইংরেজরা। তারা তার জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে পড়ে। ভাবেন, যেভাবে তার জনপ্রিয়তা আর সৈন্য বাড়ছে, একসময় তা ইংরেজদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ইংরেজরা তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। ঘেরাও করে গাজীর আস্তানা। বন্দী করে তাকে। তারপর মুর্শিদাবাদে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে এ বীরকে।
এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে পতন হয় আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের। বাংলা হারায় আরেক নবাবকে। সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি এ নির্মম হত্যাকাণ্ডকে। এখনো স্থানীয়রা তার স্মৃতি রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। যদিও নবাব শমসের গাজীর বংশধর পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঞাঁ স্মৃতি ধরে রাখতে শমসের গাজীর বাঁশেরকেল্লা রিসোর্টটি তৈরি করেছেন।

Tuesday, June 23, 2020

নবাব সিরাজের পরিবারের কী পরিণতি হয়েছিল?

সিরাজউদ্দৌলা তার নানা নবাব আলীবর্দী খানের কাছ থেকে ২২ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালে বাংলার নবাবের ক্ষমতা অর্জন করেন। তাঁর সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছে নবাবকে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে লোক পাঠান। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌলা মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার-ভাটার ফলে হঠাৎ পানি কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তাঁর নৌকা চরে আটকে যায়।
তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের কাছে বাজারে আসেন। সেখানে কিছু লোক তাঁকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর কাশিমের সৈন্যবাহিনীকে খবর দেয়। কথিত আছে, এক ফকির এখানে নবাবকে দেখে চিনে ফেলে। ওই ফকিরকে নবাব এক সময় শাস্তি দিয়েছিলেন। ফলে সেই ফকির নবাবের খবর জানিয়ে দেয়।
মীর কাশিমের বাহিনী এসে সিরাজউদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দি হওয়ার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা বেগম এবং চার বছরের কন্যা উম্মে জহুরা। পরদিন ৪ জুলাই মীরজাফরের আদেশে তার ছেলে মীরনের তত্ত্বাবধানে মুহম্মদী বেগ নবাবকে হত্যা করে।
নবাবের মৃত্যুর পর স্ত্রী লুৎফুন্নেসা এবং তাঁর শিশুকন্যাকে মীর জাফরের ছেলে মীরনের নির্দেশে ঢাকায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সিরাজের পতনের পূর্ব পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা ঘষেটি বেগমকে ব্যবহার করলেও পতনের পর আর তাঁকে কোন সুযোগই দেওয়া হয়নি। এ সময় তারা তাঁদের মা শরফুন্নেসা, সিরাজের মা আমেনা, খালা ঘষেটি বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর শিশুকন্যা সবাইকে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দি করে রাখে।
ঢাকার বর্তমান কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা প্রাসাদে তাঁরা বেশ কিছুদিন বন্দি জীবন যাপন করার পর মীরনের নির্দেশে ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে নৌকায় করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। ক্লাইভের হস্তক্ষেপে শরফুন্নেসা, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা এবং তাঁর শিশুকন্যা রক্ষা পান। পরবর্তীতে তাঁদের মুর্শিদাবাদে আনা হয়। ইংরেজ সরকারের দেওয়া সামান্য বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তাঁদের জীবন ধারণ করতে হয়। সিরাজের মৃত্যুর দীর্ঘ ৩৪ বছর পর লুৎফুন্নেসা ১৭৯০ সালে মারা যান।
মীর জাফর ও মীরন পরাজিত নবাব সিরাজকে হত্যার পর আমেনা এবং পরিবারের অন্যান্য নারীদের কয়েকটি নিকৃষ্ট নৌকায় চড়িয়ে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে ও অবহেলার সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরে পাঠিয়ে দেন। ‘সিয়ারুল মুতাখখেরিন’র লেখক গোলাম হোসাইন তাবাতাবাই লিখেছেন, ‘সিরাজ পরিবারকে জাহাঙ্গীরনগর পাঠানোর কিছুদিন পর মীরন জাহাঙ্গীরনগরের শাসনকর্তা যশরথ খানকে লিখিত নির্দেশ দেয়, যাতে তিনি দু’জন হতভাগ্য বয়স্কা মহিলাকে (ঘষেটি বেগম ও আমিনা) হত্যা করেন।’
কিন্তু শাসনকর্তা যশরথ খান এ নারী ও তাঁদের স্বামীদের কাছে তাঁর উন্নতি ও অন্নের জন্য ঋণী ছিলেন। তাই তিনি মীরনের এই ঘৃণ্য নির্দেশ পালন করতে অসম্মতি জানান। পরে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে সিরাজের মা আমেনা এবং খালা ঘষেটি বেগম দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর তাঁদের পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।

কুখ্যাত জগৎশেঠের কুকর্ম by গোলাম মাওলা রনি

কুখ্যাত জগৎশেঠের নাম জানেন না, এমন শিক্ষিত লোক ভারতবর্ষে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নবাব সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর এবং জগৎশেঠ- এ তিনটি নামের ত্রিমাত্রিক রসায়নে ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর এবং চক্রান্তের রাজনীতি বাংলা-বিহার ও উড়িষ্যাকে এমনভাবে সর্বনাশ করে দিয়েছিল, যার কারণে পুরো ভারতবর্ষকে ২০০ বছর ধরে ব্রিটিশদের গোলামি করে ইতিহাসের দায় শোধ করতে হয়েছিল। পলাশী যুদ্ধপূর্ব সময়ে বাংলার অর্থনীতি ছিল ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। অন্য দিকে, পুরো ভারতবর্ষ ছিল তামাম দুনিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নততর ও শ্রেষ্ঠতম। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমল থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সাল অবধি অর্থাৎ দুই হাজার বছরের অধিক সময় ধরে যে ভারতবর্ষ অর্থবিত্ত, জ্ঞানগরিমা, শিল্প-সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে সারা দুনিয়ার কাছে অনুসরণীয় ছিল, যেই ভূখণ্ডটি একজন জগৎশেঠ এবং তার চেলাচামুণ্ডাদের কারণে যে অন্ধকার যুগের মধ্যে পড়ে যায়, তা থেকে আজ অবধি আমরা কেউই বের হয়ে আসতে পারিনি।
ভারতবর্ষের পরাধীনতা তথা বাংলার ভাগ্যবিপর্যয়ের প্রসঙ্গ তুললে সবাই একবাক্যে পলাশীর যুদ্ধের নির্মম প্রহসনের কথা বলে থাকেন। অন্য দিকে পলাশীর কথা বলতে গেলে সবাই একবাক্যে মীর জাফর আলী খানকে বিষোদগার করেন এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। অথচ পলাশীর ট্র্যাজেডি-পূর্ব এবং তৎপরবর্তী ঘটনার প্রধান হোতা বা নাটের গুরু জগৎশেঠ সম্পর্কে আমরা খুব কমই আলোচনা করি। একজন লোভী, দুশ্চরিত্র ও ধান্ধাবাজ ব্যবসায়ী রাষ্ট্রক্ষমতাকে নিজের তাঁবেদার বানিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে প্রথমে পুরো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেয়া এবং পরবর্তীকালে সেই পথ অনুসরণ করে পুরো ভারতবর্ষের স্বাধীনতা হরণের যে ঘটনা ঘটেছে, তার দ্বিতীয় নজির মহাকালের ইতিহাসে নেই। ফলে ইতিহাসের নির্মম বিচারে জগৎশেঠ নামটি আবু জেহেল, আবু লাহাব ইত্যাদি নামের মতোই ঘৃণিত ও পরিত্যাজ্য বলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অর্থাৎ পলাশীর নির্মম ঘটনার পর আজ অবধি কোনো পিতামাতা তার আদরের সন্তানের নাম জগৎশেঠ রেখেছে, এমন খবর আমার জানা নেই।
এখন প্রশ্ন হলো- জগৎশেঠ কেন এত ঘৃণিত হলেন! এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলাপের আগে জগৎশেঠের পরিচয় এবং তৎকালীন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজনীতি নিয়ে দু-চারটি কথা বলা দরকার। ব্যক্তি জগৎশেঠ সম্পর্কে যত দূর জানা যায়, তাতে প্রতীয়মান হয়- তিনি তার জীবৎকালে সমগ্র ভারতবর্ষ এবং ভারতের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যকারী দেশ, জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বজনপরিচিত এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সমসাময়িক দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। হুন্ডি, টাকা পাচার, টাকা লগ্নি, বাট্টা ইত্যাদি কাজ করার জন্য ভারতবর্ষ, মধ্য এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য প্রভৃতি অঞ্চলের বাণিজ্য রুট, বন্দর এবং রাজধানীগুলোতে জগৎশেঠের ব্যাংকের শাখা বিস্তৃত ছিল।
তিনি জাতিতে মাড়োয়ারি হলেও তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমি ছিল তৎকালীন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদ। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ভারতবর্ষের সর্বত্র দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের আধিপত্য ক্রমান্বয়ে শিথিল থেকে শিথিলতর হতে থাকে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ঘনিষ্ঠ সুবেদার তথা প্রাদেশিক গভর্নরেরা যার যার মতো স্বাধীনভাবে রাজকার্য চালাতে আরম্ভ করলে দিল্লির সিংহাসনে আসীন আওরঙ্গজেব-পরবর্তী মোগল সম্রাটেরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে দিল্লির নামমাত্র কর্তৃত্ব স্বীকার করে প্রাদেশিক গভর্নরেরা প্রথমে যে যার মতো চলতে আরম্ভ করলেন এবং পরবর্তীকালে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত আরম্ভ করে দিলেন। ফলে বাংলা থেকে দাক্ষিণাত্য ও অরুণাচল থেকে কাবুল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল এবং বহিরাগত শক্তির নাক গলানোর পাশাপাশি রাজ দরবারগুলোতে জগৎশেঠের মতো ধুরন্ধর ব্যবসায়ীদের আধিপত্য বহুগুণ বেড়ে গেল।
সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তার নাতি আজিমউসসান যখন বাংলার গভর্নর ছিলেন, তখন সম্রাট তার বেহিসেবি এবং উচ্ছৃঙ্খল নাতির কর্মকাণ্ডের লাগাম টেনে ধরার জন্য সুবেদার মুর্শিদকুলি খানকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। মুর্শিদকুলি খান ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, অতিশয় বিচক্ষণ এবং ব্যতিক্রমী রাজ আনুগত্যের প্রতীক। তিনি বাংলা থেকে এত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দিল্লিতে পাঠাতে লাগলেন, যা না হলে হয়তো দিল্লি সালতানাতে বিদ্রোহ দেখা দিত। রাজস্ব আদায় এবং তা যথানিয়মে দিল্লিতে প্রেরণ নিয়ে মুর্শিদকুলি খানের সাথে শাহজাদা আজিমউসসানের বিরোধ দেখা দিলে তিনি সম্রাটের পরামর্শে অর্থ মন্ত্রণালয় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুর্শিদকুলি খান অনেকটা স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন। ১৭০৭ থেকে ১৭১৭ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লির তৎকালীন মোগল সম্রাট প্রথম বাহাদুর শাহ, জাহান্দার শাহ এবং ফররুখ শিয়ারের নামমাত্র অধীনতা স্বীকার করেন এবং ১৭১৭ সালে নিজেকে নবাব ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা আরম্ভ করেন।
মুর্শিদকুলি খান প্রথমে দেওয়ান বা অর্থমন্ত্রী, তারপর সুবেদার বা গভর্নর এবং শেষে নবাব হিসেবে বাংলা শাসন করেন প্রায় ২৭ বছর। এই ২৭ বছরে বাংলা প্রদেশ সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে ধনসম্পদ, সুশাসন, সামরিক শক্তিমত্তা, বৈদেশিক বাণিজ্য তথা রফতানি এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাপকাঠিতে উল্লেখযোগ্য সুনাম ও সমৃদ্ধি অর্জন করে। মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর তার জামাতা সুজাউদ্দিন বাংলার সিংহাসনে বসেন ১৭২৭ সালে। তিনি অত্যন্ত উঁচু মার্গের ভালো মানুষ এবং সুশাসক ছিলেন। কোনো রকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই তিনি তার শ্বশুরের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যে সুশাসন অক্ষুন্ন রেখে রাজ্য পরিচালনা করেন ১৭৩৯ সাল অবধি। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র সরফরাজ খান নবাব হন মাত্র এক বছরের জন্য। সরফরাজ খানের তারুণ্য ও অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে তার সেনাপতি আলিবর্দী খান বাংলার মসনদ অধিকার করেন ১৯৪০ সালে।
আলিবর্দী খান অত্যন্ত দক্ষ শাসক, ব্যতিক্রমী সামরিক প্রতিভা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খান ও নবাব সুজাউদ্দৌলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনজীবনে সর্বাধিক নিরাপত্তা বিধান করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফলে ১৭৫৬ সালে তার মৃত্যুর পর তিনি তার তরুণ দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলার জন্য যে রাজ্য রেখে গেলেন সেটির জৌলুশ, সামরিক শক্তিমত্তা, রাজভাণ্ডারের টইটম্বুর অবস্থা এবং রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক জীবনে সুখশান্তি ও স্থিতিশীলতার সাথে তুলনা করা যায়, এমন কোনো রাজ্য ভারতবর্ষ তো দূরের কথা- এশিয়ার কোথাও ছিল না।
বাংলার উল্লিখিত স্বর্ণযুগে দেশ-বিদেশের বেনিয়ারা সদলবলে এ দেশে আসতে থাকেন। ইউরোপ, আরব, মধ্য এশিয়া, চীন, পারস্য প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা অঞ্চলে তাদের বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করতে থাকলেন। অন্য দিকে, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, মোহনচাঁদের মতো ধুরন্ধর মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ ভারত ছেড়ে বাংলায় এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন শুরু করেন। জগৎশেঠ গং টাকা রোজগার করতে করতে একসময় ধনসম্পদের আধিক্যের কারণে প্রকৃতির অভিশাপের কবলে পড়েন। প্রকৃতির সাধারণ নিয়ম হলো- মানুষ যথাযোগ্য পরিশ্রম করে অর্থবিত্ত অর্জন করবে এবং সেই অর্থ নিজের জন্য এবং অপরের জন্য হিতকর উপায়ে খরচ করবে। কোনো মানুষ যদি বিনা পরিশ্রমে অর্থবিত্ত লাভ করে, তবে তারা কৃপণ ও অলস হয়ে যায়। তাদের ধৈর্য-সহ্য শক্তি কমে যায় এবং সমাজ সংসারের সবাইকে সে সন্দেহের চোখে দেখে। অন্য দিকে, যারা অবৈধভাবে বেশুমার অর্থবিত্ত হাসিল করে তারা স্বাভাবিক মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ মানসিক বৈকল্য অথবা বিকৃত রুচির কবলে পড়ে নিজেকে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ জন্তুতে পরিণত করে ফেলেন।
জগৎশেঠের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তাকে একজন বিকৃত রুচির ভারসাম্যহীন পাষণ্ড বলেই মনে হয়। ধারণা করা হয়, তিনি তার পৈতৃক নিবাস গুজরাট ত্যাগ করে বাংলায় এসেছিলেন নবাব আলিবর্দী খানের শাসনামলের প্রথম দিকে। রাজ আনুকূল্য এবং বাংলার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের কারণে জগৎশেঠের অর্থবিত্তের পরিধি সীমানা অতিক্রম করে এমন অবস্থায় পৌঁছে, যা সমসাময়িক দুনিয়ায় বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। তার ধনলিপসার সাথে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং বাংলার সিংহাসনকে তাঁবেদার বানানোর স্বপ্ন দিনকে দিন বাড়তে থাকে। নবাব আলিবর্দী খাঁর আমলে জগৎশেঠরা টুঁ-শব্দটি করতে পারেননি নবাবের কঠোর অনুশাসন, দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব এবং বিচক্ষণতার কারণে। আলিবর্দী খানের মৃত্যুর পর তার তরুণ দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা যখন নবাব হলেন, তখন জগৎশেঠদের লোভ রীতিমতো লালসায় পরিণত হলো। তারা তরুণ নবাবকে নিজেদের ইচ্ছেমতো পুতুলের মতো ব্যবহার করে নিজেদের লুটেরা মনোবৃত্তি চরিতার্থ করার অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। পরবর্তীকালে তারা একজন ব্যক্তিত্বহীন, স্বার্থপর, বিবেকহীন কাপুরুষের সন্ধান করতে গিয়ে মীর জাফরকে পেয়ে যান এবং তাকে কেন্দ্র করে দেশ-জাতির সর্বনাশ করার চক্রান্ত আরম্ভ করেন।
জগৎশেঠের ইতিহাস সম্পর্কে আজকের নিবন্ধে আমি আর বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। কারণ, ১৭৫৬ থেকে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের দিন পর্যন্ত বাংলার তৎকালীন রাজনীতিতে জগৎশেঠরা কী কী করেছিলেন তা আমরা কমবেশি সবাই জানি। পলাশী-পরবর্তী সময়ে জগৎশেঠদের কী ধরনের নির্মম ও করুণ পরিণতি হয়েছিল, তা-ও অনেক পাঠক জানেন। কাজেই ওসব বিষয় আলোচনা না করে জগৎশেঠদের চরিত্র নিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করব। জগৎশেঠদের মতো চরিত্রহীন ব্যবসায়ী নামধারী দুর্বৃত্তরা যেমন অতীতকালে ছিলেন, তেমনি বর্তমান জমানাতেও রয়েছেন। এই শ্রেণীর লোকদের কোনো স্থান-কাল-পাত্র নেই; নেই কোনো বিশেষ ভাষা বা ধর্ম।
তাদের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো- তারা প্রথমে কিছু দিন ব্যবসা-বাণিজ্য করে বিত্তবৈভব অর্জন করে। তারপর টাকা ও ক্ষমতার লোভে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে নির্লজ্জ, বেহায়া ও বেপরোয়া হয়ে পড়েন। তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতির কেন্দ্রস্থলের মূল চরিত্রে অভিনয় করার জন্য পাপেট বা পুতুল জাতীয় শাসকরূপী মীর জাফর তৈরি করার জন্য সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে নিজেদের কাক্সিক্ষত মীর জাফর পাওয়া গেলে বা পয়দা হলে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজভাণ্ডার উভয়টি বগলদাবা করে নারকীয় তাণ্ডব শুরু করে দেন।
যুগ-যুগান্তরের রাজনীতির সাথে জগৎশেঠদের রয়েছে বহুমাত্রিক রসায়ন। এই রসায়নের কারণে কখনো-সখনো মীর জাফরেরা তাদের পাপেট রাজনীতি মঞ্চায়িত করার জন্য চেষ্টা-তদবির করে সমাজ-সংসারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বড় শয়তান-মেঝো শয়তান ও ছোট শয়তানরূপী জগৎশেঠদের কুড়িয়ে এনে সিংহাসনের আশপাশে জায়গা করে দেন। তারপর তাঁবেদার জগৎশেঠদের সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ লুট, জনগণের আমানত লুট এবং ব্যবসা-বাণিজ্য কুক্ষিগত করে নিজেদের ঔরসজাত সন্তানসন্ততি, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যে মীরন, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ ও মোহাম্মদী বেগের মতো দুরাচার সৃষ্টি করে ফেলেন। এই শ্রেণীর মীর জাফরেরা তাদের পালিত জগৎশেঠদের লেলিয়ে দিয়ে বিদেশী বেনিয়ারূপী দানবদের নিজ দেশে ঢুকিয়ে তাবৎ ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি কাজকর্ম, ব্যাংক-বীমা, অবকাঠামো উন্নয়ন, গৃহায়ন ও গণপূর্তের মতো স্পর্শকাতর সিভিল কনস্ট্রাকশনের পাশাপাশি অর্থভাণ্ডার ও অস্ত্রভাণ্ডারের কর্তৃত্ব ও চাবিকাঠিও বিদেশীদের হাতে তুলে দেন।
জগৎশেঠ এবং মীর জাফর যেন একই বৃত্তের দুটো ফুল। তাদের পারস্পরিক লেনদেন, মহব্বত ও সোহবত যেন হংস-মিথুনের রসায়ন সৃষ্টি করে। তাদের চিন্তা-চেতনা-আত্মার মিল দেখেই কবি-সাহিত্যিকেরা ‘হরিহর আত্মা’ নামের বাগধারা রচনা করতে পেরেছেন। তারা একই সাথে বেড়ে ওঠেন- একই সাথে ভোগবিলাসে মত্ত হন এবং খোদায়ি গজবে একই পরিণতি ভোগ করে ভবলীলা সাঙ্গ করেন। তাদের তিরোধানের পর জাতীয় জীবন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এমন বীভৎস বিপর্যয় নেমে আসে, যার কারণে সব মানুষ, জন্তু-জানোয়ার এবং বৃক্ষলতা তাদের অভিসম্পাত করতে থাকে। ফলে জগৎশেঠ ও মীর জাফরেরা কিয়ামত পর্যন্ত জমিনে মানুষের ঘৃণা-অভিশাপ এবং বিরক্তির বিমূর্ত উপলক্ষ হিসেবে অমরত্ব লাভ করেন।
লেখক : গোলাম মাওলা রনি। সাবেক সংসদ সদস্য

কাশ্মীরে যে বাঙালি নেতার ‘পিতৃঋণ’ শোধ করল বিজেপি by রঞ্জন বসু

বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যমা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়
তার নাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পুরো বাহান্ন বছরও বাঁচেননি, কিন্তু স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়েকজন বাঙালি রাজনীতিবিদ সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব রেখে যেতে পেরেছেন তিনি তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

তার আরও একটা পরিচয়, তিনি ছিলেন ‘জনসঙ্ঘে’র প্রতিষ্ঠাতা। এই জনসঙ্ঘই পরে ভারতের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি নামে আত্মপ্রকাশ করেছে, যে দল আজ দেশের ক্ষমতায়। সেই হিসেবে বিজেপির শীর্ষ নেতারা সকলেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তাদের দলের আদি জনক হিসেবে মানেন।

কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর থেকেই সংবিধানের ৩৭০ ধারার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পার্লামেন্টে কাশ্মীরের এই বিশেষ অধিকারের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছেন, তারপর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর ফরমানকে অস্বীকার করে শ্রীনগর অভিমুখে যাত্রা করে কাশ্মীরে বন্দি থাকা অবস্থাতেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রাণ দিয়েছেন।

গত ৫ আগস্ট সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই বিতর্কিত ধারা বিলোপ করার কথা ঘোষণার পর বিজেপি নেতাদের কথায় আর স্মৃতিচারণায় ঘুরে ফিরে আসছেন সেই শ্যামাপ্রসাদ।

রাজ্যসভায় বিজেপির এমপি ও সুপরিচিত বাঙালি চিন্তাবিদ স্বপন দাশগুপ্তর কথায়, ‘আজ বাঙালি হিসেবে আমাদের বড় গর্বের দিন। বিজেপির আদি প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রায় সাত দশক আগে যে ধারা বিলোপের দাবি জানিয়েছিলেন, তার দল সেই স্বপ্নকে অবশেষে সত্যি করল।’

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি আরও বলছিলেন, ‘বলা হয় পিতৃঋণ আর মাতৃঋণ না কি কখনও শোধ করা যায় না। হয়তো ঠিকই, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ যেখানেই থাকুন তিনিই যে আজ সবচেয়ে পরিতৃপ্ত হতেন তাতে কোনও সংশয় নেই।’

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম উপাচার্য, শিক্ষাবিদ ও বিচারপতি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি নিজেও ব্যারিস্টার হয়েছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার সামলেছেন। অবিভক্ত বাংলায় এ কে ফজলুল হকের (শেরে বাংলা) মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রীও ছিলেন।

দেশভাগের পর জহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি দেশের বাণিজ্য তথা শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।

কিন্তু পণ্ডিত নেহরুর সঙ্গে মতবিরোধের জেরেই পরে কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন শ্যামাপ্রসাদ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের সহযোগিতা নিয়ে গঠন করেন জনসঙ্ঘ, তিনি ছিলেন সে দলের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি।

১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দক্ষিণ কলকাতা সংসদীয় আসন থেকে ভোটে জিতে সংসদে যান শ্যামাপ্রসাদ। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে সংসদেও তার বহু ভাষণ স্মরণীয় হয়ে আছে।

সে সময় বিখ্যাত হয়েছিল তার তোলা স্লোগান, ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান আর দো নিশান নেহি চলেঙ্গে।’

তখন কাশ্মীরের জন্য একটি ও বাকি দেশের জন্য আরেকটি - ভারতে এই দুটো সংবিধান চালু ছিল (‘দো বিধান’)।

কাশ্মীরে রাজ্য সরকারের প্রধানকেও বলা হত উজির-এ-আজম বা প্রধানমন্ত্রী ('দো প্রধান'), এবং ভারতের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি কাশ্মীরের ছিল নিজস্ব পতাকাও (‘দো নিশান’)।

এই দু’রকমের বিধান, প্রধান আর নিশান বাতিলের দাবি নিয়েই সরকারি নির্দেশ অগ্রাহ্য করে কাশ্মীরে পা রাখেন তিনি ১৯৫৩ সালের জুনে। কিন্তু শেখ আবদুল্লার সরকার তাকে বন্দি করার পর জেলে কম্বল পর্যন্ত দেয়নি বলে অভিযোগ, যার পরিণতিতে তিনি প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২৩শে জুন রহস্যময় এক পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমানে বিজেপির একটি গবেষণামূলক শাখা প্রতিষ্ঠান ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশন’।

ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও বিজেপির পলিসি রিসার্চ সেলের সদস্য অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলছেন, ‘৩৭০ ধারার অবলুপ্তি না-হলে কাশ্মীর যে কিছুতেই বাকি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম হতে পারবে না, সেই বাস্তবতা দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন তিনি।’

‘শুধু তা-ই নয়, নিজের কথাকে কাজে করে দেখাতে তিনি নিজের জীবন পর্যন্ত বলিদান দিয়েছেন। কাশ্মীরে যে ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটা প্রমাণ করেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মোৎসর্গ–আজ সেই বলিদান পরিপূর্ণতা পেল’, বাংলা ট্রিবিউনকে বলছিলেন তিনি।

বস্তুত, বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদের নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দল যে বহুদিন পর্যন্ত পায়ের তলায় তেমন একটা জমি খুঁজে পায়নি, এই তথ্যটা এই সেদিনও বিজেপি নেতৃত্বের প্রবল অস্বস্তির কারণ ছিল।

বিজেপির এক শীর্ষ নেতা ও কেবিনেট মন্ত্রীর কথায়, ‘আড়াই মাস আগে লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরুনোর পর যখন দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আঠারোটি আসন পেয়েছে ও তৃণমূলের ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, সে দিন থেকেই কিন্তু আমাদের সেই অস্বস্তি দূর হওয়া শুরু।’

‘আর এদিন ৩৭০ ধারা বিলোপ করার মধ্যে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদকে তার হাতে গড়া দল চূড়ান্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালো’, বলছিলেন বিজেপির ওই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

Saturday, June 20, 2020

বছরে বিশ্বজুড়ে আড়াই কোটি শরণার্থী পাড়ি দেন ২শ’ কোটি কিলোমিটার পথ

প্রথম কোনো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতে বিশ্বের আড়াই কোটি শরণার্থীকে বছরে পাড়ি দিতে হয় ২শ’ কোটি কিলোমিটার পথ। দক্ষিণ সুদানের শরণার্থীরা কেনিয়া পৌঁছানোর জন্য পাড়ি দেন কমপক্ষে ৬৪০ কিলোমিটার। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীরা    বাংলাদেশে আশ্রয় খুঁজে পেতে পাড়ি দেন ৮০ কিলোমিটার। এসব তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন। এ খবর দিয়ে নাইজেরিয়ার অনলাইন লেজিট লিখেছে, শরণার্থীদের এই দুর্ভোগের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে নাইজেরিয়ায় এক কিলোমিটার পথ হাঁটার কর্মসূচি নিয়েছিল ইউএনএইচসিআর, ক্রস রিভার রাজ্যের স্টেট ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি ও অন্যান্য অংশীদাররা। এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘স্টেপ উইথ রিফিউজি’। এতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল ইংরেজিতে লেখা ‘আই স্ট্যান্ড উইথ রিফিউজি’ বা আমি শরণার্থীদের পক্ষে। এই কর্মসূচিতে অংশ নেন নাইজেরিয়ার ক্রস রিভার রাজ্যে ইউএনএইচসিআরের সাব অফিসের প্রধান মুলুগেতা জেওদি।
সারা বছরে বিশ্বজুড়ে শরণার্থীরা যে পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেন সেই দূরত্ব অতিক্রমের জন্য বিশ্বের সব মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ওই কর্মসূচি থেকে।
এই পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় রোববার নাইজেরিয়ার রিভার ক্রস রাজ্যের ওগোজা’তে। নাইজেরিয়ার রিভার ক্রস এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্যামেরুনের শরণার্থীকে ঠাঁই দিয়েছে স্থানীয় সরকার। তাই র‌্যালি করার জন্য ওই স্থানটিকে বেছে নেয়া হয়। এতে অংশ নিয়ে মুলুগেতা জেউদি এই কর্মসূচি সম্পর্কে বলেছেন, ইউএনএইচসিআর বিশ্বজুড়ে নতুন প্রচারণা বিষয়ক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তাতে প্রতি বছর শরণার্থীরা যে পরিমাণ পথ হাঁটেন সেই সমান পথ হাঁটতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। তার মতে, বিশ্বজুড়ে শরণার্থীরা বছরে যে পরিমাণ পথ পরিভ্রমণ করেন তা একত্রিত করে হিসাব করা হয়েছে। এসব মানুষ প্রতি বছর পালিয়ে প্রথম একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছতে বহু দূরের পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হন। এ সময় মুলুগেতা জেউদি ২০১৬ সালের প্রসঙ্গ সামনে টেনে আনেন। তিনি বলেন, কেনিয়ার শরণার্থীদের তুরস্কে পাড়ি দিতে হয়েছে ২৪০ কিলোমিটার। কেনিয়া পৌঁছাতে দক্ষিণ সুদানের শরণার্থীরা পাড়ি দেন ৬৪০ কিলোমিটার। আর মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পৌঁছতে পাড়ি দেন ৮০ কিলোমিটার।
রোববারের ওই সংহতি র‌্যালিতে অংশ নিয়েছিলেন ক্রস রিভার স্টেট ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির (সিমা) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক প্রিন্সউইল আয়িম। তিনি বলেছেন, নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শরণার্থীরা যে ঝুঁকিপূর্ণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন তার প্রতি সংহতি জানিয়ে এক কিলোমিটার হাঁটার কর্মসূচি পালন করেছেন তারা। তিনি আরো বলেন, নিজেদের মাতৃভূমিতে সহিংসতা ও নানা সংকটের কারণে বেশিরভাগ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি আরো জানান, ক্রস রিভার রাজ্যে বর্তমানে ২৭ হাজারের বেশি শরণার্থী অবস্থান করছেন। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে যেসব রাজ্য তার মধ্যে তারা অন্যতম। এই রাজ্যে ক্যামেরুন থেকে যাওয়া শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকর সুবিধা দিচ্ছেন গভর্নর বেন আয়াদে। তিনি চান, এসব মানুষ যেন ভালো খাবার পায়।
ওগোজাতে ক্যামেরুনের শরণার্থীদের নেতা ইতাকওয়া ইতিয়েনে। তিনি ইউএনএইচসিআর এবং রাজ্য সরকারের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ওই রাজ্যে অবস্থান করে তারা ভালো আচরণ প্রদর্শন করে যাবেন বলেও জানিয়েছেন।

Thursday, June 18, 2020

বাড়িতে লুকানো এলার্জেন by অধ্যাপক ডা: মো: শহীদুল্লাহ্

বাড়িঘরের ধুলাবালি, মাকড়সার জাল, ডাস্ট মাইট, ছত্রাক, ইত্যাদির সংস্পর্শে এলে অনেক সময় হাঁচি হয়, কাশি হয়, হাঁপানি হয়, শরীর চুলকায়, ইত্যাদি। এগুলো হচ্ছে ‘এলার্জেন’। বাড়িঘরে এসব এলার্জেন লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো পরিষ্কার রেখে হাঁচি-কাশি, হাঁপানি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।
বিছানাপত্র : বিছানার চাদর, বালিশের কভার, বালিশ, লেপ, তোষক, মেট্রেস, কাঁথা-কম্বল- এগুলোতে থাকে ধুলাবালি ও ডাস্ট মাইট। বিছানার ধুলাবালি আর ডাস্ট মাইট থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বিছানার চাদর, বালিশের কভার, লেপের কভার ধুয়ে দিতে হবে। লেপ, কাঁথা, কম্বল রোদে দিতে হবে। তোষক, মেট্রেসও রোদে দেয়া উচিত। রোদের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিতে হাউজ ডাস্ট মাইট মারা যায়।
আসবাবপত্র : চেয়ার, টেবিল, সোফা, খাট, আলমারি, ওয়্যারড্রোব, ইত্যাদির উপরে ও ফাঁকে ফাঁকে ধুলাবালি ও ডাস্ট মাইট থাকে। আর্দ্র জায়গা হলে ছত্রাকও জন্মায়। ছত্রাকও এলার্জেন। এগুলো প্রতিদিনই ঝাড়া মোছা করতে হবে।
কারপেট, ম্যাট : ঘরের মেঝেতে বিছানো কারপেট ও ম্যাট প্রচুর ধুলা ও ডাস্ট মাইট জমা হওয়ার উৎকৃষ্ট স্থান। নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। মেঝেতে কারপেট বা ম্যাট বিছানো না থাকলে প্রতিদিনই ঘর ঝাড়– দিয়ে ঘরের মেঝে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে।
দরজা, জানালা, দরজা-জানালার পর্দা : দরজা জানালা ও দরজা-জানালার পর্দায় জমে থাকে ধুলাবালি, মাকড়সার জাল, ডাস্ট মাইট। নিয়মিত ঝেড়ে মুছে দরজা জানালা পরিষ্কার রাখতে হবে। দরজা-জানালার পর্দা ঘন ঘন ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে।
রান্নাঘর : আর্দ্র রান্নাঘরে বাসা বাঁধতে পারে ছত্রাক। রান্নাঘরের ধোঁয়া, তা ও এলার্জেন। কাজ শেষে রান্নাঘর ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে শুকনো রাখতে হবে। রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া বাইরে বের করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
বই পুস্তক : টেবিলে, বইয়ের তাকে বা আলমারিতে রাখা বই দীর্ঘদিন নাড়াচাড়া না করলে এগুলোতে ধুলা জমে, ডাস্ট মাইট বাসা বাঁধে। বই যত্ন করে শুধু তুলে না রেখে নিয়মিত নাড়াচাড়া করতে হবে, পড়তে হবে। তাহলে পরিষ্কার থাকবে। ধুলা জমবে না, ডাস্ট মাইট ছত্রাক বাসা বাঁধতে পারবে না।
শিশুর খেলনা : শিশুর নরম খেলনা, যেগুলোর উপরে কাপড়ের আবরণ বা প্রাণীর লোমের মতো থাকে, সেগুলোতে ধুলা ও ডাস্ট মাইট জমে থাকে। ধোয়া যায়, এমন খেলনাগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে। অন্যগুলো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, কমিউনিটি বেজ্ড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ

Wednesday, June 17, 2020

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে যেসব খাবার by আহমেদ শরীফ

ইসবগুল
খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের অভাবসহ বেশ কিছু কারণে কোষ্ঠকাঠিন্যের জটিলতা দেখা দিতে পারে। কিছু খাবার নিয়মিত খেলে দূরে থাকতে পারবেন কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে। তবে তারপরেও সমস্যার সমাধান না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
আঁশযুক্ত খাবার
অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া চাই প্রতিদিন। শিম, ডাল, বাদাম, ওটমিল, বিভিন্ন ধরনের শাক, সবজি, তাজা ও শুকনো ফল রাখতে পারেন মেন্যুতে।
তিলের বীজ
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে তিলের বীজ খুবই কার্যকর। সিরিয়াল বা সালাদের সাথে খেতে পারেন তিলের বীজ। এছাড়া গুঁড়ো করে স্ন্যাকসের উপর ছিটিয়েও খাওয়া যায়।
গুড়
রাতে ঘুমানোর আগে এক টেবিল চামচ তরল গুড় খেলে মুক্তি পাবেন কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে।
পুদিনা ও আদা চা
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে পুদিনা পাতা বা আদাযুক্ত চা বেশ উপকারী।
লেবুর শরবত
লেবুর শরবতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড শরীর থেকে টক্সিন বের করে দেয়। এতে করে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়। প্রতিদিন সকালে তাজা লেবুর রস একটি গ্লাসের পানিতে মিশিয়ে পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর হবে। হজমের সব জটিলতারও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে।
জেনে নিন
*কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে।
*কুসুম গরম পানির মধ্যে  অল্প করে ইসবগুল ও কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে পান করুন। উপকার পাবেন।
*ব্যায়াম কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১৫ মিনিট হাঁটলেও উপকার পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপারে সচেতন হোন by অধ্যাপক ডা: মো: শহীদুল্লাহ্

ডেঙ্গু জ্বর একটি মশাবাহিত ও ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে এ জ্বর হয়। সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পাঁচ-ছয় দিন পরই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। লিখেছেন অধ্যাপক ডা: মো: শহীদুল্লাহ্

ডেঙ্গু জ্বর হলে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি জ্বর হতে পারে। জ্বর সাধারণত সাত দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে মাঝখানে চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে জ্বর একটু কমতে পারে। শরীরে কাঁপুনি ও ঘাম দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পিঠে ব্যথা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং ত্বকে হামের দানার মতো দানা বা র‌্যাশ বের হতে পারে। পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয় বলে ডেঙ্গু জ্বরের অন্য নাম ‘হাড় ভাঙা জ্বর’ বা ‘ব্রেক বোন ফিভার’। কোনো কোনো ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে রক্তের অণুচক্রিকার সংখ্যা খুব কমে যায়।

ফলে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। শরীর থেকে বাইরেও রক্তক্ষরণ হতে পারে।
এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর ছড়ায়। ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর রক্তে ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানোর সময় ডেঙ্গু ভাইরাসগুলো মশার শরীরে প্রবেশ করে। এর এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ওই জীবাণুগুলো সংক্রমণ উপযোগী হয়। তাই ডেঙ্গু জ্বরের রোগীকে কামড়ানোর এক থেকে দুই সপ্তাহ পরে ওই মশা অন্য সুস্থ মানুষকে কামড়ালে এই জীবাণুগুলো ওই সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ডেঙ্গু জ্বর হয়। এডিস মশার শরীরে একবার ডেঙ্গু ভাইরাস প্রবেশ করলে মশাটি মারা না যাওয়া পর্যন্ত এই ভাইরাস বহন করতে থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি ‘জ্বর’ হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে শুরু করে ‘জ্বর’ হওয়ার পাঁচ দিন পর পর্যন্ত মশার কামড়ের মাধমে অন্য মানুষের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াতে পারে। যেকোনো ব্যক্তিরই ডেঙ্গু জ্বর হতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন প্রকার রয়েছে। যেকোনো এক প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাস দিয়ে কারো একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে সেই প্রকারের ভাইরাস দিয়ে তার আর ডেঙ্গু জ্বর হয় না। কিন্তু অন্য আর তিনটি প্রকারের ডেঙ্গু ভাইরাসের যেকোনো প্রকারের ভাইরাস দিয়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার সংক্রমণ হতে পারে।

কোথায় বেশি হয়
শহরাঞ্চলেই ডেঙ্গু জ্বর বেশি হয়। কারণ, শহরাঞ্চলে এডিস মশার বংশ বিস্তার করার সুযোগ বেশি। সেখানে গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ছাদের ওপরে ফুলের টব, পরিত্যক্ত নারকেলের মালা বা ডাবের খোসা ইত্যাদিতে জমে থাকা পরিষ্কার এবং অল্প পরিমাণ পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। সাধারণত বর্ষাকাল এবং বর্ষার পরপরই ডেঙ্গু জ্বর বেশি হয়।

জটিলতা
ডেঙ্গু জ্বরের কারণে নানান জটিলতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার সংক্রমণের সময়েই এরূপ হয়। রক্তের অণুচক্রিকার সংখ্যা খুব বেশি কমে গিয়ে রোগীর শরীর থেকে অনেক রক্তক্ষরণ হতে পারে। এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার’। অনেক সময় রোগীর রক্তের পরিমাণ ও রক্তচাপ অত্যধিক কমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে বলে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’। রক্তক্ষরণ ও শকের কারণে রোগী মারাও যেতে পারে।

চিকিৎসা
ডেঙ্গু জ্বরের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সাবধানতা অবলম্বন করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই ডেঙ্গু জ্বর নিজে থেকে ভালো হয়ে যায়। তবে রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময় করার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হয়। জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ প্রয়োজন হয়। এসপিরিন-জাতীয় ওষুধ দেয়া হয় না। রোগীকে পর্যাপ্ত পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। এ ছাড়া পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে স্বাভাবিক খাবারও খেতে হবে। রোগীকে মশারির মধ্যে বিশ্রামে রাখতে হবে।

কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও এর কামড়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীরও উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে তার শরীর থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে না পারে।

এডিস মশা প্রতিরোধ করা
এডিস মশা প্রতিরোধ করতে হলে এসব মশার বংশ বিস্তারের স্থানের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ার, নারকেলের মালা বা ডাবের খোসা ইত্যাদি যেন যেখানে সেখানে পড়ে না থাকে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, নারকেল বা ডাবের খোসা- এগুলোতে যেন চার-পাঁচ দিনের বেশি সময় ধরে পানি জমে থাকতে না পারে। বাড়িঘরের আশপাশে কীটনাশক ওষুধ স্প্রে করে এডিস মশা মারা যেতে পারে।

এডিস মশার কামড় প্রতিরোধ করা
এডিস মশা দিনের বেলায়ও কামড়ায়। তাই দিনের বেলায়ই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অতএব, দিনের বেলায়ও এডিস মশার কামড়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। লম্বা হাতাযুক্ত জামা এবং শরীর ঢাকে, এরূপ পোশাক পরিধান করলে মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। মশারি, মশার কয়েল, স্প্রে ইত্যাদি ব্যবহার করলেও মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া : ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে মশারির ভেতরে বিশ্রামে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে, যেন তাকে মশা কামড় দিতে না পারে এবং অন্য মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।

>>>লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ, ময়মনসিংহ

Tuesday, June 16, 2020

খাসা ঘর বানানোর জায়গা নেই বাবুই পাখিদের by রিপন দে

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে। বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তাই? কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়। পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।
কবি রজনীকান্ত সেনের এই কবিতাটি পড়িয়ে ছোটবেলায় আমাদের শিক্ষকরা সততা আর নৈতিকতা শিক্ষা দিতেন। নিজে লড়াই করে স্বাধীনভাবে বাঁচার শিক্ষা দিতেন। নিজের কাজকে ভালোবাসা ও সম্মানের শিক্ষার উদাহরণ হিসেবে বাবুই পাখি আমাদের খুব প্রিয়।
একটা সময় আশপাশে প্রচুর তাল গাছ ছিল। আর সেই গাছে প্রকৃতির নিপুণ শিল্পী বাবুই বাসা বাঁধতো পরম যত্নে। ধৈর্য নিয়ে আপন মনে বুনতো নিজ বাসা। তবে এই পাখিকে আমরা শুধু পরিশ্রমী আর সততার প্রতীক হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাদের শিল্পগুণের পেছনে রয়েছে আরেক কাহিনী। আর সেটি তার প্রেমিকাকে খুশি করার অদম্য বাসনা।

বাবুই পাখির যখন প্রজনন মৌসুম আসে তখন পুরুষ বাবুইটি একের পর এক বাসা গড়তে থাকে তার প্রেমিকাকে খুশি করতে। একেকটি পুরুষ বাবুই এক থেকে ২০টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরির কাজ শেষ হলে সুরে সুরে তার প্রেমিকাকে আহ্বান জানায়। তার ডাকে কাছে আসে স্ত্রী বাবুই পাখি। এসেই পরখ করে দেখে কেমন হলো তার বাসা। যদি সে বাসা পছন্দ হয় এবং নিরাপদ মনে করে তবেই সে মিলিত হয় পুরুষ বাবুইর সঙ্গে। তাদের বাসায় ডিম আসে বাচ্চা ফোটে। একই সঙ্গে একটি পুরুষ বাবুই একাধিক সংসার গড়ে তাই এতো বাসা তৈরি করে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এম এ তাহের জাগো নিউজকে জানান, বাবুই পাখি সাধারণত তিন ধরনের বাসা তৈরি করে। নিচের দিকে অনেক লম্বা সরু একটা রাস্তা থাকে, যে রাস্তা দিয়ে বাসার ভেতরে ঢোকে। এমন বাসা অনাগত ছানার জন্য নিরাপদ। আরেক ধরনের বাসার বেশিরভাগ অংশ খোলা থাক। এমন বাসা বানানোর পেছনের কারণ হচ্ছে, বাবুই পাখিটি এই বাসায় বিশ্রাম করে বা এখানে বসে আশেপাশে সতর্ক পাহারা বসায়। আরেকটি বিশেষ ধরনের বাসা বানায়, যার ভেতরে দুইটি অংশ থাকে। সে বাসায় সংসার ছানাসহ বিশ্রামের আলাদা জায়গা থাকে।
কিন্তু চিরচেনা সেই দৃশ্যের দেখা এখন আর তেমন মেলে না। কারণ উঁচু তাল, নারিকেল ও সুপারি গাছ কমে যাওয়ায় বাসা বুনার উপযুক্ত স্থান হারাচ্ছে ক্রমশ। অতি লোভে দামি গাছ লাগানোর জন্য গাছপালা কেটে ফেলছে। ফলে বিপদে পড়ছে বাবুই পাখিরা।

বাসা তৈরির জন্য বাবুই পাখির প্রথম পছন্দ তাল গাছ। এরপর নারিকেল বা সুপারি গাছ। এই সব গাছের পাতার সাথে অন্য লতাপাতা মিশিয়ে তারা বাসা গড়ে। উপরে বাসা বানানোর কারণে সে নিরাপদে থাকতে পারে। তাল গাছ বা নারিকেল গাছের এতো উপরে থাকে সেখানে সাধারণ অন্য কোনো কিছুর নাগালের বাইরে থাকে।
সেই বাবুই পাখি ২০/২৫ বছরের ব্যবধানে চরম সংকটে পড়েছে। এতোটাই সংকটে যে বাধ্য হয়ে কলা গাছ বা বিভিন্ন ঝোপে বাসা বানাচ্ছে। বাবুই পাখি প্রজননের এই সময়টায় আরও বেশি বিপদে পড়েছে। কলা গাছের মতো নিচু গাছে ঝুকি আছে জেনেও বাসা তৈরি করছে তারা। যেই বাসা থেকে বাচ্চারা ঢিল মেরে তাদের ডিম নষ্ট করে দিচ্ছে, তবুও এই নিচু জায়গা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মানুষের হিংস্র থাবার কাছে হার মেনেছে বাবুই পাখির জীবনের মায়া। এমন কিছু বাসার ছবি কেরানিগঞ্জে কয়েকটি এলাকায় দেখতে পান বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এম এ তাহের।
তিনি জানান, অতি লোভে আমরা তাল গাছ কেটে অন্য গাছ লাগাচ্ছি। তার ওপর কিছু কুসংস্কার আছে। গ্রামের মানুষ মনে করে তাল গাছে ভূতে বাসা বাধে। আর সে ধারণা থেকেই বেশিরভাগ তাল গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। জ্ঞানের অভাবে টাকার লোভে প্রকৃতি ধ্বংস করে চলেছি উন্নয়নের প্রতিযোগী হয়ে। তাদের এই অবস্থা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কী করছি আমরা তাদের সাথে! নির্লজ্জের মতো মাথা নিচু করে রইলাম। এতটা পাষাণ আমরা কী করে হলাম? একটি গাছ কেটে কয়টি গাছ লাগিয়েছি আমরা তা কি ভেবে দেখেছি কখনো? আমি প্রথম দেখলাম কলা গাছের ডালে এবং কাশবনে বাসা বানাতে আর কেউ দেখেছে কি না, আমার জানা নাই। কতোটা বিপন্নর কাতারে চলে যাচ্ছে বাবুইপাখি। প্রকৃতি না বাঁচলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে?

এ বিষয়ে পাখিবিদ এস আই সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, এই পাখির বাংলা নাম : দেশি-বাবুই, ইংরেজি নাম : Baya Weaver, বৈজ্ঞানিক নাম Ploceus philippinus। সাধারণত মে থেকে আগস্টের মধ্যে বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। একটি পুরুষ পাখির একাধিক বাসা ও পরিবার থাকতে পারে। এরা সাধারণত ২ থেকে ৪টি ডিম দেয়। ডিম ফুটে ছানা বের হতে ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। মেয়ে পাখি একা ডিমে তা দেয়। একটি ছানা ১৪ থেকে ১৬ দিনে নিজের মতো চলার সক্ষমতা অর্জন করে। বাবুই পাখিদের খাদ্য তালিকায় আছে ঘাস-বীজ, খাদ্যশস্য ও পোকা-মাকড়।
তিনি আরও জানান, বাবুই পাখি তাল, নারকেল, সুপারি, খেজুর ও বাবলা গাছে বাসা করে থাকে। তবে বাসা বাধার জন্য সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তাল গাছ। কিন্তু প্রকৃতি উজাড় করে তাল গাছ কেটে তাদের আবাসন আমরা ইতোমধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি।

আজকের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়া, এবং একটি লাথি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ! by হাসান মাহবুব

আজ যখন ক্রোয়েশিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে, প্রতিটি ক্রোয়েশিয়ানের মনে একবার হলেও একটি ছবি ভেসে উঠবে। ছবিটিতে ক্রোয়েশিয়ার (সাবেক যুগোশ্লোভিয়া) খেলোয়াড় জভনিমির বোবান একজন পুলিশকে লাথি মারছেন।
আপাতদৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। তবে এটাই হয়ে আছে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক। এটা কোনো সাধারণ কিক না। ইতিহাসে এর পরিচয় “The kick that started a war” নামে। যুগোস্লোভিয়া দেশটা বড় গোলমেলে ছিলো। সেখানে সার্ব, ক্রোয়াট, স্লোভানিয়ান, মন্টেনেগ্রিন ইত্যাদি বিভিন্ন রকম জাতিসত্তার মানুষ বাস করতো। মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর ১৯৮০ এর পরে অস্থিতিশীল সময়টায় ক্রোয়াটরা তাদের হতাশা এবং অস্থিরতা ঢাকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলো ফুটবলকে। তাদের প্রাণপ্রিয় ক্লাব ডায়নামো জাগরেবের খেলার সময় স্টেডিয়ামে গান গেয়ে, শ্লোগান তুলে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেতো।
এমনই এক সময়ে ১৩ই মে ১৯৯০ সালে ডায়নামো জাগরেব মুখোমুখি হলো সার্বিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেডের সাথে। ডায়নামো জাগরেবের সমর্থকরা, যারা ব্যাড ব্লু বয়েজ নামে পরিচিত ছিলো, প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো সহিংসতা মোকাবেলার। তারা অনেকেই ক্রোয়েশিয়ান মিলিটারির সাথেও যুক্ত ছিল। ওদিকে রেডস্টার বেলগ্রেডের সমর্থকরাও ছিলো কুখ্যাত। খেলা শুরু হলো এক বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিতে। মাত্র দশ মিনিট চলেছিলো ম্যাচটি, এরপরই শুরু হয় দাঙ্গা। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত দাঙ্গাগুলোর একটি।
আর এমন সময়েই জভনিমির বোবান আসেন ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে, তার উড়ন্ত লাথি দিয়ে। পুলিশ একজন ক্রোয়াট সমর্থককে ধরে রেখেছিলো, যেন বেলগ্রেড থেকে আসা গুন্ডাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। ওদিকে বেলগ্রেডের গুণ্ডারা চালিয়ে যাচ্ছে তাণ্ডব। ছুটে এলেন বোবান। উড়ন্ত লাথি মারলেন পুলিশকে, মুক্ত করলেন তার জাতভাইকে।
এরপর আর পরিস্থিতি সামলে রাখা সম্ভব ছিলো না কারো পক্ষেই। পরবর্তী এক ঘন্টা ধরে স্টেডিয়ামে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চলে, যার নমুনা ইতিহাসে নেই।
বোবান পরে বলেন...
  • *“আমি আমার খ্যাতি, যশ, পরিচিতি, কিছুরই তোয়াক্কা করিনি। আমি জীবন বাজী রেখেছিলাম একটি আদর্শের জন্যে, ক্রোয়েশিয়ার জন্যে”।
জভনিমির বোবানের এই লাথি আক্ষরিক অর্থেই ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। এসি মিলানে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার কাটানো বোবান পরে ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে বিশ্বকাপেও অংশ নেন ১৯৯৮ সালে। এখন তিনি ফিফার ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল।
আপনারা যারা খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে অনিচ্ছুক, তারা এই ঘটনাটা একটু মনে রাখবেন।
আর একটা কথা, ১৯৯৩ সালে ক্রোয়েশিয়ার ১১৯ তম র‍্যাংকিং নিয়ে কথা হচ্ছে, ব্যাপারটা বোঝা গেছে এখন? ক্রোয়েশিয়া তখন কেবল যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হয়েছে। ফিফাতে কেবল রেজিস্টার্ড হয়েছে। সেজন্যেই তাদের র‍্যাংকিং তলানিতে ছিলো। তারা মোটেও দুর্বল দল ছিলো না। অখণ্ড যুগোস্লাভিয়া ভেঙে সেসব দেশ হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবগুলোই বিশ্বকাপ খেলেছে।
ক্রোয়াটরা মুক্তিকামী বীরের জাত, আমরাও। তাদের ছিলেন বোবান, আমাদের ছিলেন শহীদ জুয়েল, মুশতাক। আফসোস একটাই, লুকা মডরিচরা খেলতে নামার সময় এখনও সেই যুদ্ধবিদ্ধস্ত অবস্থা থেকে উঠে আসার স্মৃতি স্মরণ করেন, আর আমাদের নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা পাল্লা দিয়ে বান্ধবী তৈরি করেন।
এভাবেই পার্থক্য তৈরি হয়, এ কারণেই আমরা পিছিয়ে যাই বারেবার।

Monday, June 15, 2020

গল্প- বিশ্বনাগরিকের স্থানীয় সংকট

ইনানি যখন জেটির কাছাকাছি এসে পৌঁছয়, তখন ন্যাভাল অ্যাভিনিউর দিকটা থেকে আসা কিছু ফ্লুরোসেন্ট, কিছু সোডিয়াম আর কিছু মার্কারির সম্মিলিত আলোক পুরো এলাকাটাকে একেবারে উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। সল্টগোলা ক্রসিংয়ের দিক থেকেই হতে পারে একটা লং-ভেহিক্যাল গজরাতে গজরাতে চলে যায়। নভো কি রিজেন্ট কি বিমান যে-কোনো একটা পেস্নন আসেত্ম নেমে আসে রানওয়েতে। গতি এবং শব্দ মিলিয়ে বোঝা গেল মাঝারি ধরনের পেস্নন এবং অবশ্যই যাত্রীবাহী। বহুদিন পর সে এলো এদিকটায়। কী বলা যাবে একে – মিরাকল! পতেঙ্গার ছেলে ইনানি নিজের বাড়ির কাছে এলো অনেকদিন পরে এবং এলো ইউরোপ থেকে। একানববইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে বাবা-মাকে হারিয়ে ঝড়ের তোড়ে সে কোথায় গিয়ে পড়ে। আর কোনোদিনই দেখা হয় না তার বাবা-মার সঙ্গে। একটা বিদেশি এনজিওর বদৌলতে চাকরি জোটে। তারপর বহু কায়দাকানুন করে সে একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলে একটা বিদেশি জাহাজে। মেডিটেরানিয়ান অঞ্চলের সেই জাহাজ তাকে নিয়ে যায় মাল্টায়। এখন সে মাল্টার নাগরিক। ইতালীয় সিসিলির দক্ষক্ষণে গোজো কমিনো আর মাল্টা। এগুলোর মধ্যে সবচাইতে বড় দ্বীপ মাল্টা। চট্টগ্রামের ছেলে ইনানি এখন মাল্টাবাসী। বিশ্বাস করা কঠিনই বটে। চাকরি নিয়েছে এমভি আর্থার বলে একটা জাহাজে। মূলত ওষুধের চালান নিয়ে আসে ওদের জাহাজ। সিঙ্গাপুর, মাদাগাস্কার, সাউথ আফ্রিকা এসব দেশ ছাড়াও ছোট ছোট দ্বীপ সিসিলি, সিরাকুজ, কর্সিকা, মেসিন্না, সার্দিনিয়া সবই খানিকটা করে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে তার। শৈশবের বন্ধু খুরশিদকে সে খুঁজে পেয়েছে এই বিশ^-পর্যটনের জলভ্রমির মধ্যেই। গত বছর দেখা হয়েছিল সিঙ্গাপুরে। দলবেঁধে মারলায়ন দেখতে গিয়েছিল ইনানির জাহাজের লোকেরা। সেই মারলায়ন যেখানে একটা আধা সিংহ আর আধা মৎস্যকন্যার মুখগহবর থেকে অবিরাম ঝর্ণার ধারার মতো জলপ্রবাহ গলগলিয়ে বেরোতেই থাকে। অনেক লোকের ভিড়ে জায়গাটা তখন গমগমে। সেলফি তুলতে গিয়ে মারলায়ন-মূর্তিটার খুব কাছে এগিয়ে যেতেই জলের কিছুটা ছাঁট তার মোবাইল সেটের কাচে এসে পড়তেই সেটা মুছতে-মুছতে অকস্মাৎ লক্ষ করে, পাশেই তার ছোটবেলার বন্ধু খুরশিদ দাঁড়িয়ে। ওর চোখে গুচ্চির বাদামি সানগস্নাস।

আসলে সে ছিল খুরশিদই। পলিটেকনিক থেকে ডিপেস্নামা করে শেষে বহু চেষ্টা-তদবির করে নিজেকে সে বিশ্বের শ্রমবাজারের উপাদানে পরিণত করতে পেরেছে। তার চাকরি অর্কিড পস্নাজায়। সিঙ্গাপুরের গার্ডেন বাই দ্য বে-র মধ্যকার সেই পস্নাজায় পৃথিবীর প্রায় সব অর্কিড পাওয়া যায়। হলুদ, বেগুনি, গোলাপি এরকম দুর্লভ সব রঙের অর্কিড। তবে তার ডিপেস্নামা ডিগ্রির সঙ্গে অর্কিডের কোনো সম্পর্ক নেই। তাকে বলা যায় একজন বাগান পরিচর্যাকারী। থাকে লিটল ইন্ডিয়ায়। আর কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে আড্ডা দেয় মোস্তাফা সেন্টারে। ইনানির সঙ্গে দেখাটাকে দৈবই বলতে হবে। কাঠগড়ে তাদের বাড়িতে বহুবার গেছে ইনানি। সল্টগোলা থেকে কাঠগড় খুব দূরে নয়। কিন্তু বাবা-মা হারানো ইনানির সঙ্গে তার আকস্মিক বিচ্ছেদে খুরশিদ বেশ মর্মাহতই হয়ে পড়ে। অনেক খোঁজ করেও যখন আর হদিসের সম্ভাবনা নেই তখন ভাবল, একবার ফেসবুকে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। আর তখনই মারলায়নের জলের ছিটকানো প্রবাহের নিচে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার শৈশবের বন্ধুর। আর সে যে কী উচ্ছ্বাস দুজনের। তারা ভুলেই যায় যে তারা বিদেশের মাটিতে। অস্ফুটে বেরোয় ইনানির কণ্ঠ থেকে – দোস্ত, তুই এ্যাডে! খুরশিদও হতভম্ব – তুই হাচা-হাচা ইনানি না? নাকি অন্য কনো ক্যা? না, সে ইনানিই এবং সানগস্নাসটা চোখ থেকে খুলে যে হাতে নিয়েছিল সে খুরশিদই। তারপর তারা সেই সন্ধ্যায় ঘুরে বেড়াল মেরিনা বে-র আলোছায়াময় মায়াবি অঞ্চলে। লেজার শো দেখাচ্ছিল রাত্রির পটভূমিতে। আর চীনা নববর্ষের উদ্যাপন চলছিল চারদিকে। ডাম্পলিং নুডল্স, মমো অন্থন আর একদম বিন থেকে গুঁড়ো করা ব্রাজিলের কালো কফি। দুই বন্ধু যেন ঈনা উদ্যাপনের ছদ্মবেশে বাংলা নববর্ষ উপভোগে মেতে উঠেছিল।

ইনানির জীবনটা খুরশিদের কাছে মনে হলো এক রহস্য আর রোমাঞ্চকর কাহিনির চাইতেও ভিন্ন। যে-ছেলে সাঁতার জানতো না বলে কখনো বাড়ির কাছের সমুদ্রে যায়নি, সে কিনা চাকরি করে জাহাজে মানে সারাক্ষণ জলের ওপর বসবাস তার। না জানলেও শিখতে তাকে হয়েছে। অনেকবার খুরশিদ তাকে বলেছে, হোটেল আগ্রাবাদে গিয়ে নন্দীবাবুকে ধরে সাঁতারটা শিখে নে। নন্দীবাবুর ছেলে থাকে ডুলাহাজারায়। একবার হাত ভেঙে শেষে ওখানকার সমেত্মাষ ডাক্তারের চিকিৎসায় ভালো হয় খুরশিদ। সমেত্মাষের পরিচিত হলো নন্দীবাবুর ছেলে মিহির। সেই ইনানি সাঁতার শিখেছে গিয়ে মাল্টায়। কোথায় হলো আগ্রাবাদ হোটেলের নন্দীবাবুর সাঁতার আর কোথায় গোজো কমিনো মাল্টার সাঁতার। গোজোতে আছে ডয়েজ্রা বে, বালুটা বে আর গোল্ডেন বিচ। তারপর ধরো যেখানটায় ও শিখেছিল – ওরা বলে মাল্টিজ আর্চিপেলাগো। মাল্টা গোজো আর কমিনো থেকে প্রায় দুশো কিলোমিটার বিসত্মৃত তটরেখা। সাদা বালু আর নীল জলের এক স্বপ্নিল আয়োজন সেখানে। কোথাও জলের মধ্যে পাথরের পাহাড় মাথা তুলে রয়েছে, যেনবা প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভাস্কর্য সব। শত শত পর্যটকের ভিড়ে এলাকাটা সারাক্ষণ আন্দোলিত। কেউ রোদে শুয়ে, কেউবা ক্যানো নিয়ে ছুটে চলেছে জলের বুক চিরে। খুরশিদ তাকে একদিন খাওয়ালো বাসমতি হোটেলের ভাত-তরকারি-ফিরনি, আরেকদিন ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি। সিঙ্গাপুরে সবই সুলভ। যে-জিনিস দেশে মেলে না, তা সিঙ্গাপুরে অনায়াসলব্ধ। বিদায়বেলায় কথা থাকলো এপ্রিলে যখন ইনানির জাহাজ ওষুধের চালান নিয়ে চট্টগ্রামে ভিড়বে, তখন দেখা হবে দুই বন্ধুর। তখন খুরশিদেরও ছুটি মিলবে সিঙ্গাপুরের অর্কিড পস্নাজা থেকে।

আজকাল লোকেরা খুব সমুদ্রে যায়। মানে সমুদ্রসৈকতে। এলাকাটা ছুটির দিন ছাড়াও মুখরিত থাকে। ইপিজেডের শ্রমিক বিদেশি কর্মী কিংবা অন্যান্য জেলার পর্যটক – আসছে আর যাচ্ছে। শহর থেকে এবং শহরের দিকে যানবাহন আর লোক চলাচলের মুহুর্মুহু ব্যস্ততা মন্দ লাগে না দেখতে। জাহাজের ভ্রাম্যমাণ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত ইনানির মনে হয়, এইসব ভিড়, কোলাহল আর ব্যস্ততাই আসলে তার সংস্কৃতি। মাঝে মাঝে জাহাজ থামলে, থেমে বিশ্রামের বাঁশিতে কিছুদিনের জন্যে স্থিরতা নিয়ে এলে মাল্টার নির্জন নাগরিকতার মধ্যে সে বড় উপদ্রুত বোধ করতে থাকে। মনে হতে থাকে, ভালোই ছিল গতির মধ্যে থাকা। একটা চলমান আবর্ত যেন তাকে জীবনের চক্রের মধ্যে গতিময় করে সচল রেখে দেয়  সারাটা ক্ষণ। আরো একটা পেস্নন সাঁই করে নেমে এলে সাদাটে আলোর মধ্য দিয়ে দেখা গেল খুরশিদকে। ন্যাভাল এলাকার কাছেই একটা রেস্টুরেন্ট আর তার লাগোয়া খানিকটা ছায়া-ছায়া একটা জায়গায় ওরা বসে। জায়গাটাকে বলা যায় একটা চওড়া চাতাল। ব্যাগ থেকে একটা বোতল বের করে খুরশিদ। সিঙ্গাপুরে দুজনে খেয়েছিল লাগার, ডেনমার্কের। সেখানেও অ্যালকোহল থাকে। খুরশিদ ভাবলো, বন্ধু ইনানি যতই দেশি বন্ধু হোক, এক অর্থে সে তো বিদেশিই বটে। সিঙ্গাপুরে এক বন্ধের দিনে আঙ্গুলিয়া মসজিদের মাঠে বসে আড্ডা দেওয়ার সময় কেউ একজন বলছিল, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ মূলত চট্টগ্রামের মানুষ – গ্রামটার নামও মনে আছে, কদলপুর। রাউজান না রাঙ্গুনিয়া কোথায় যেন। তাহলে চট্টগ্রামের মানুষ ভাসতে ভাসতে কই চলে গেল আর গোটা বিশ্ব জানে, আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হলেন মাহাথির। সেদিক থেকে দেখলে পতেঙ্গার সে মানে ইনানির মধ্যেও নিশ্চয়ই লুকোনো থাকলেও থাকতে পারে ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা।

কে বলবে ইনানি ইউরোপীয় লোক। দেখে কারো বোঝার জো নেই। বুঝবেই বা কেন। যদিও বাদামি চামড়ারও বহু লোক ইউরোপীয় নাগরিক। আর এ-যুগের বৈশ্বিক গ্রামব্যবস্থায় ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়া কেবল মানচিত্রের ব্যাপার। কত লোক, খুরশিদ দেখেছে, থাকে হয়তো সিঙ্গাপুরের ঝুরংয়ে কিন্তু অনলাইনে যেসব ডাটা বিশেস্নষণ করছে চাকরির জন্যে, সেগুলো আসছে হয়তো জাপান কি থাইল্যান্ড থেকে। কিন্তু ঘাসের ওপর বসতে বসতে খুরশিদ যখন বলে, দোস্ত তোত্তে মনত্ আছে না, আঁরার ধর্মর স্যারোরে আঁরা মলই মাস্টর কইতাম? হাসতে হাসতে ঘাসের ওপর বসে উচ্ছ্বসিত ইনানি, হ্যাঁ, স্পষ্টই মনে পড়ে তার মলই মাস্টারের কথা। পড়া না পারলে কান মলে দিত, তাই ওঁর নাম মলই মাস্টর। বেঁচে আছে কিনা কে জানে। তখনই অর্ধেকের বেশি চুল পেকে গিয়েছিল। না, মরে গেছেন তিনি। সৌদি আরবে গিয়েছিলেন হজ করতে। কিন্তু মৃত্যুবরণ করেছেন দুর্ঘটনায়। তবু লোকে, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা মহাখুশি – ভিড়ের ওপর ভারী ক্রেন পড়লে একসঙ্গে বহু লোকই মারা পড়ে; কিন্তু তাদের আত্মীয়রা বিমর্ষ হয় না কেউ শুনে। পবিত্র মাটিতে মৃত্যু মানে তাদের মনে ভিন্ন এক তাৎপর্যে অনূদিত হলে তারা প্রত্যেকেই গায়েবানা জানাজা আর জিয়ারত সেরে মিসকিন খাইয়ে ভাবে, আহা, এরিম্মা মরণ কজনে পায়!

পকেট থেকে রুচি চানাচুরের প্যাকেট আর কাঁধের চামড়ার ব্যাগ থেকে কাঠ-রঙের হুইস্কির বোতলটা বের করে আনে খুরশিদ। উঠে খানিকটা এগোলে একটা বাঁক পেরোলেই ইনানিদের জাহাজটা দেখা যায়। আসার সময় ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করেছিল, কোথায় যাওয়া হচ্ছে, ফিরবে কখন। ক্যাপ্টেন ম্যাকেঞ্জি জানে, মাল্টার নাগরিক হলেও ইনানি আসলে চট্টগ্রামের মানুষ। কাজেই নিজের মাটি কাছে পেয়ে ছেলেটা না-হয় একটু আদিখ্যেতা করলোই। তাতে কার কী এমন ক্ষতি! কিন্তু জাহাজ ছেড়ে কিছুদূর আসতেই, সম্ভবত সিকিউরিটির লোক, হাঁকে – গোয়িং হোয়ার? প্রশ্ন সে ইংরেজিতেই করে এবং সেটি অশুদ্ধ হলেও বোঝে ইনানি। উত্তরে সে কোনো এক অনির্দেশ্য দিকে ইঙ্গিত করে বলে, আঁর বাড়ি অ্যাডে। তখন সেই ইউনিফর্ম-পরা লোকটা হে হে করে হেসে বলে, তইলে তো আর কনো অসুবিধা নাই। কিন্তু অসুবিধা যে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে আসবে সেটা না খুরশিদ, না ইনানি কেউই ভাবতে পারেনি। ধরো, সমুদ্রঘেঁষা জায়গাটায় সারাক্ষণই লোকজনের আনাগোনা। কে কোন তালে থাকে দেখে বোঝা মুশকিল। অবশ্য পুলিশ থাকে এক তালেই। তারা প্রায় সারাক্ষণ সন্দেহের বড়শি ঝুলিয়ে দিয়ে রাখে কখন শিকার পড়বে। পড়েও। সমুদ্রের ওপার থেকে, কাছাকাছি নানান জায়গা দিয়ে চোরাই মাল ঢুকে পড়ার ঝুঁকি সারাটা প্রহর। নৌ-পুলিশের টহল-বোট কিছুক্ষণ পরপরই ঢেউ তুলে ছুট দেয়। আর স্থলভাগেও প্রহরা বিরাজমান। জায়গাটা আবছায়াময়, খানিকটা আলো আর খানিকটা আঁধারে ঢাকা। চানাচুরের মোড়কটা চিরে নিয়ে বোতলের ছিপি খুলে খুরশিদ কেবল দুটো পস্নাস্টিকের ওয়ান-টাইম গস্নাসে ঢেলে নিয়েছে, চুমুক দেয়ওনি, তখনই আচমকা দুটো পুলিশ হামলে এসে পড়ে তাদের ওপর। চমকায় ওরা। কোথায় ছিল, মাটির নিচে বুঝি। প্রায় নিঃশব্দেই উদয় ঘটে ওদের। একই সঙ্গে গাম্ভীর্য আর বিদ্রূপাত্মক স্বর তাদের –

: কী, মিয়ারা, আসর জমাইয়া বসছো দেহি? জানো না, এইহানো মদ্যপান করা নিষেধ!

অনিবার্য বিপদের ঝুঁকি ওরা টের পায়; কিন্তু খুরশিদ তত ঘাবড়ায় না। বেশ একটা বন্ধুত্বপূর্ণ চাহনি স্থাপন করে সে পুলিশদের একজনকে বলে, না, আমার বন্ধু বিদেশি তো, আসছে, সেই জন্য ওকে আপ্যায়ন করতেছি আর কী। বিদেশিরা তো খাইলে আপত্তি নাই। কী বলেন – তাই না? কাকে সে বলে সে ঠিক বোঝে না। তবে দুজনের মধ্যে যে-কোনো একজনকে সেটা বলা যায়। তখন দাড়িঅলা পুলিশটা কণ্ঠে ঠাট্টা বা উপহাস কিংবা ব্যঙ্গ যাই বলা হোক মিশিয়ে বলে, কী ব্যাপার, দেইখ্যা তো মনে অয় বোতল কেবল খোলা অইছে। আর প্যাটেও অহনও যায় নাই। না খাইয়াই মাতাল অইয়া গেলা নাকি? ইশারায় ইনানি খুরশিদকে কিছু একটা বোঝাতে চাইলেও সে-কথায় কান না দিয়ে খুরশিদ জোর প্রতিবাদ জানায় পুলিশের – আমরা এখনো কিছুই খাই নাই আর আমরা মিথ্যাও বলি না। আমার এই বন্ধু বিদেশি, সে এই দেশের নাগরিক না। ওর উত্তর শুনে পুলিশদুটো পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। দুজনেরই চোখেমুখে অবিশ্বাস। একজন আবার এককাঠি সরেস। দুম করে প্রশ্ন করে বসে ইনানিকে লক্ষ করে – কী নাম তোমার কও দেহি?

: ইনানি। ওর উত্তর।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমন প্রশ্নের হামলা ঘটবে সেটা ভাবেনি খুরশিদ। চোখে ইশারা দেওয়ার কথা ভাবছিল কিংবা কোনো একটা ইঙ্গিত দেয়। সেও কম যায় না। পুলিশকে পালটা প্রশ্ন তার – ও বাংলা বোঝে না, ইংরেজিতে বলেন। শুনে দুই পুলিশ এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে হাসতে হাসতে। ওরা ধরেই নিয়েছে তারা দুজনই মাতলামো করছে। কিন্তু আচমকা হাসি থামিয়ে দিয়ে দুজনেই বেশ গম্ভীর হয়ে পড়ে। যারা মদ না খেয়েই মাতলামো করতে চাইছে তারা কি আসলেই মাতাল নাকি অভিনয় করে মাতালের। কাছেই বিমানবন্দর এবং কাছেই সমুদ্রবন্দরও। কাজেই যতটা সহজ মনে করা যাচ্ছিলো ওরা এবং বিষয়টা, ততটা সহজ হয়তো নয়। হতে পারে তারা ইয়াবার কারবারি কিংবা অন্য কোনো চালানের দফাদার। খুরশিদের মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশটা স্পষ্ট ব্যঙ্গের সুরে পালটা আক্রমণ করে তাকে, ইংরেজি যদি না বুঝতো তাইলে উত্তর দিলো কেমনে? শুনে সহসা যুক্তি খুঁজে পায় না খুরশিদ। সত্যি কথা, শব্দ একটাই, কিন্তু সে-শব্দটা একটা প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর – মানে সে তার নামটাই বলেছে পুলিশের প্রশ্নের জবাবে। তবু খুরশিদ প্রতিবাদী – আরে ভাই মিথ্যা বলবো কেন, তিনি আমাদের দেশের নাগরিক নন, ওনার দেশ হইলো মাল্টা। ইনানিও সেইসঙ্গে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়। এবারে পুলিশ ওদের ধমক লাগায় –

: দুনিয়ার এত দ্যাশ থাকতে মাল্টা লইয়া টানাটানি করতাছো ক্যান? মাল কি বেশি টানছো নাকি?

খুরশিদ ততক্ষণে হুইস্কির বোতলটাতে ছিপি লাগিয়ে দিয়েছে। বোতল থেকে ঢেলে নেওয়া মদসহ পস্নাস্টিকের গস্নাসদুটো ছুড়ে ফেলে দিয়েছে ঝোপের দিকে। ওর এসব কা- দেখে একটা পুলিশ আচমকা এসে ওকে জাপটে ধরে, এই যে আলামত নষ্ট করবার লাগছো তাই না? কাজ হবে না। চলো আমাদের সঙ্গে। দেখি তোমাদের আসল উদ্দেশ্য কী সেটা অহনই বার করতাছি। বলেই পুলিশ দুজন ওদেরকে পাকড়াও করে। খুরশিদের বয়ে আনা ব্যাগ ব্যাগের মধ্যকার বোতল গুছিয়ে নিয়ে তাড়া লাগায় খুরশিদ এবং ইনানি দুজনকেই। কিন্তু নাছোড় খুরশিদও। শৈশবের বন্ধু বলেই নয়, সে তো আসলেই অন্য দেশের নাগরিক। তাই অন্য দেশের নাগরিকের সম্মান রক্ষা করাটা তার অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য। পুলিশ তাদের ভুল বুঝলে তাতে তার ক্ষতি হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু তার বন্ধু কেন অপমানিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কণ্ঠে সজোর একটা ভঙ্গি করে আগুয়ান পুলিশকে বলে সে, শোনেন ভাই, আপনেরা মন দিয়া কথাটা শোনেন, আমার এই বন্ধু বাংলাদেশি না, বিদেশি। হয়তো পুলিশেরাও খানিকটা ধর্তব্যে নেয় তাকে – ঠিক আছে তোমার পাসপোর্ট দেখাও। খুরশিদ ভেবেছিল, ইনানি পকেট থেকে পাসপোর্টটা বের করলেই তারা আপদমুক্ত হবে; কিন্তু বাঘের ভয় ছাড়াই রাত হয়ে যায়। পাসপোর্টটাই জাহাজে নিজের কামরায় রেখে এসেছে ইনানি। সে-কথা সে বলেও সরল স্বীকারোক্তির মতো। বলে সে মাতৃভাষা বাংলাতেই। একবার যখন ওরা বুঝেই গেছে সে বাঙালি, তাহলে আর অভিনয়ে কাজ নেই ভেবে সে জবাব দেয় –

: ভাই শোনেন, ভুলবশত পাসপোর্টটা জাহাজে রাইখ্যা আসছি।

: কোন জাহাজ? একটা পুলিশ প্রশ্ন করে।

: ওই যে একটু সামনে আগাইলেই দেখা যায় – এমভি     আর্থার, মাল্টার জাহাজ।

ইচ্ছে করলে হয়তো কথাটা বিশবাস করা যেত। কিন্তু পুলিশ তা করে না। বরং উপহাসের সুর ওদের তীক্ষন হয় – এতক্ষণ বললা বিদেশি লোক, এহন বলো পাসপোর্ট নাই, ফ্যালায়া আসছো জাহাজের মধ্যে। তোমাদের উদ্দেশ্যটা কী কও তো দেহি? ইনানি দেখল পুলিশদুটো ক্রমে ঘোরেল হয়ে পড়ছে। তারা হয়তো তাদের পিছু ছাড়ার লোকও না। একটা বুদ্ধি খেললো মাথার ভেতরে। গলাকে যতটা সম্ভব নরম করে সে বলতে থাকে – ভাই শোনেন, আপনে ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে জাহাজে আমার রুমে আসেন। আমি আপনাকে দেখাবো, রুমে আমার কাপড়-চোপড় আছে, বাংলা পেপার আছে, বাংলা বই আছে মানে গল্প-উপন্যাসের বই আছে। আর আপনাকে আমার পাসপোর্টটাও দেখাবো। আসেন। বলে ইনানি প্রায় করজোড়ে মিনতি করতে করতে দুই পুলিশকেই সঙ্গে নিতে উদ্যত হয়। খুরশিদও সমর্থন জোগায় বন্ধুকে, হুম, দোস্ত তুমি ঠিকই বলছো, হ্যাঁ-হ্যাঁ, চলেন-চলেন, জাহাজে চলেন। কিন্তু পুলিশের স্বভাবই এমন, তারা কোনো কিছুতেই দ্রুত আস্থাশীল হয় না। তাদেরকে বলেই দেওয়া আছে – দুই চোখের আড়ালে আরো দুই চোখ রাখতে হয়, সেই দুই চোখের নাম অবিশ্বাসীর চোখ। কোনো কিছুই প্রথম দফায় বিশ্বাস করা যাবে না।

পুলিশ দুজনের কী হয় কে জানে। তাদের ইশারা-ইঙ্গিতের পাঠোদ্ধার খুরশিদ-ইনানির কাজ নয়। তারা তাদের মাল্টা, জাহাজ, পাসপোর্ট রেখে আসা এসব গল্পে কোনো আস্থাই রাখতে চায় না। উলটো খুরশিদ এবং ইনানিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে প্রায় আদেশের সুরে বলতে থাকে – শোনো, তোমাদের কাছে নিষিদ্ধ বস্ত্ত মদের বোতল পাওয়া গেছে। তোমরা আসামি। এখন আমরা যা বলি মন দিয়া শোনো। দুজনে খাড়াও এইহানে। একজন পুলিশ তাদের দুজনকে হাতে-কলমে পাশাপাশি দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা দেখিয়ে দিতে থাকে। আর অন্যজন তখন তার পকেট থেকে মোবাইল সেটটা মুঠোয় বাগিয়ে ধরে। তার কাঁধে বন্দুক, মাথায় টুপি, গায়ে ইউনিফর্ম এবং হাতে মোবাইল সেট। সেটটা কী বোঝা দুরূহ তবে আয়তাকার ও চওড়া সেই সেট হতে পারে অপ্পো, হতে পারে স্যামসাং কিংবা সিম্ফনি, তবে আইফোন নয়, যার হাতে মোবাইল নেই তারও কাঁধে বন্দুক এবং অন্যসব আনুষ্ঠানিকতার বিন্যাস। তবে একটু আগেই তার হাতে যে-ব্যাগটা ধরা ছিল এবারে সেটার মধ্যে দুই হাত গলিয়ে দিয়ে সে বোতলটা বের করে আনে। বোতলটার আদি মালিক খুরশিদ এবং সেটির সম্ভাব্য ভোক্তা তারা দুই বন্ধু। দুজনেই আমতা-আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করলে দুই পুলিশ প্রায় সমস্বরে ধমক লাগায় –

: যা বলি করো, নইলে প্যাঁদানি চেনো?

দুজনেই মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ, সেটা চেনে তারা। দুই বন্ধু শৈশবের দুই সহচর যাদের একজন স্বদেশি এবং ভাগ্যের ফেরে আরেকজন বিদেশি, পাশাপাশি দাঁড়ায় এবং বোতলটা হাতে ধরে রাখে সেটির মূল মালিক খুরশিদই। তবে একটা কাজ ইনানিকেও করতে হয়। তাকে একটা হাত রাখতে হয় তার বন্ধুরই কাঁধে। সেটা হয়তো অপ্রত্যাশিত দৃশ্য নয়। কেননা, বন্ধু তো বন্ধুর কাঁধে হাত রাখতেই পারে। দৃশ্য হিসেবে ফ্রেমটিকে সত্যের প্রতিফলনই বলতে হবে; কিন্তু সেই দৃশ্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ততক্ষণে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে দুজনের নিকটেই। শেষ চেষ্টা চালায় ইনানি, শোনেন ভাই, আপনারা যা ভাবতেছেন আমরা তা না। আমি বহুদিন পর আমার দোসেত্মর দেখা পেলাম তো তাই একটু আনন্দ করতে চেয়েছিলাম। তাছাড়া আমি তো এদেশের নাগরিকও না, আমি মাল্টার নাগরিক। আমার পাসপোর্টটা আছে জাহাজের মধ্যে। পুলিশদের বিরক্তি বাড়ে। ভাবে, ব্যাটারা আবার বিদেশ জাহাজ মাল্টা পাসপোর্ট এসব উজির-নাজির মারতে শুরু করেছে। তারা আরো বিরক্ত হয় দেখে, মদ না খেয়েই ছেলেদুটো মাতলামো শুরু করেছে, খেলে না জানি কী করে। আবার, আগের সন্দেহটাও সংশয়ে ফেলে, নাকি অভিনয় করছে মাতালের। যাহোক, যা করার দ্রুত করতে হবে। মোবাইল সেটটা বাগিয়ে ধরে উদ্যত এক পুলিশ হামলে পড়ে, হ্যাঁ হ্যাঁ রেডি রেডি রেডি! খুরশিদের হাতে বোতল-ধরা এবং তার কাঁধে ইনানির একটা হাত রাখা। ফ্রেমের একদিকে সমুদ্র, ওপরে আকাশ আর নদীর ওপারের সবুজ রেখা এখন কালচে মেরে গেছে।

: হে-হে-হে। ছবি তোলা শেষ। আমার মোবাইলের ক্যামরাটা ৫ পিক্সেলের, বুঝলা, খারাপ অইবো না।

তখন হর্ন-বাজানো একটা জাহাজের শব্দ শোনা যায়। সম্ভবত বহির্নোঙরে ভিড়ছিল। আবার, প্রায় একই সময়ে পেস্ননও নেমে আসে একখানা। একটু এগিয়ে গেলেই বাঁক পেরোলে ইনানিদের এমভি আর্থার জাহাজটা। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে – বলবে নাকি আরো একবার, জাহাজে গেলেই পাসপোর্টটা দেখানো যায়। কিন্তু পুলিশদের হাতে হয়তো অত সময় নেই তার কথা শোনার। তবে অন্য কথা শোনার সময় পুলিশের হাতে তখনো থাকে। কেননা, ওদেরই একজন তখন ইনানি এবং খুরশিদকে লক্ষ করে বলতে থাকে –

: জাহাজের গল্প থাক। জেটির কাছে বহু জাহাজ আছে, সেটা সকলেরই জানা। অন্য গল্প করো। কিন্তু ইনানি জাহাজ ছেড়ে অন্যদিকে যেতে চাইলেও পারে না। কারণ, জাহাজই তার চাকরি, জাহাজই তার জীবন। তাই সে মাল্টা থেকে ওষুধের চালান নিয়ে আসা নোঙর-করে রাখা এমভি আর্থারের দিকে এগোবার চেষ্টা করে খুরশিদকে নিয়ে। আর দুটো পুলিশ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে খুরশিদ এবং ইনানি দুজনকেই টানতে থাকে উলটো দিকে। জাহাজটা ততক্ষণে নোঙরশেষে নিঃশব্দ। নেমে আসা পেস্ননের প্রপেলারও ঘূর্ণন থামিয়ে বিশ্রামে।

কালি-মাখা মেঘ ওপারে আঁধার by সুলাইমান সাদী

আষাঢ়ের প্রথম দিন। বৃষ্টি দিয়েই বর্ষাকে আমন্ত্রণ জানাল প্রকৃতি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ছাটে বর্ষার প্রথম ভোরটি ছিল অপরূপ। আকাশ জুড়ে খেলেছে মেঘেরা। ফাঁকে ফাঁকে সোনালি সূর্য। শেষ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপের পর হঠাৎ প্রকৃতির এ শান্তিময় আয়োজন সত্যিই স্রষ্টাকে মনে করায়।

মনে পড়ে কবিগুরুর আষাঢ় কবিতাটিও— নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে...

কবিগুরু রবীন্দ্রণাথ ঠাকুরের অমোঘ এ ডাক কি সত্যিই বৃষ্টির দিনে ঘরে বসে থাকার আহবান? পাড়ার ছেলেরা কি তাই মনে করে? বর্ষার প্রথম বৃষ্টি কে না উপভোগ করতে চায়?

পাড়ার শিশু-কিশোর, ঘরের ষোড়শী যুবতী, নতুন বিয়ে করা জামাই-বউ, ষাটোর্ধ্ব দাদা-দাদু; সবার ভেতরেই আষাঢ়ের বর্ষা নামিয়ে দেয় প্রাণের চঞ্চল ধারা। সবাই কবিগুরুর ঘরের বাইরে যাওয়ার নিষেধের বেড়া ভেঙে মেতে উঠতে চায় রিনিঝিনি বর্ষার উচ্ছ্বাসে।

কবিগুরু কেন, কেউই কারো নিষেধ মানে না বর্ষার আগমনী উৎসবে মেতে উঠতে। ঋতু বদলের অশুভ লক্ষণের কথা জেনেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ বাঁধায় অনেকে। জ্বরের ঘোরে টিনের চালের নিচে বৃষ্টির ঝুমঝুম বাজনা কতটা মধুর, যারা উপভোগ করেনি তাদের জীবনই বৃথা।

প্রতিবছরই বর্ষা এসে ধুয়ে মুছে দেয় আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ। ধুয়ে দেয় আমাদের ভেতরে জমে থাকা বেদনার জঞ্জালও। বর্ষার বৃষ্টিমুখরতা জীবনে ফিরিয়ে আনে নতুন করে বাঁচার ভরসা। সজীব প্রকৃতিতে আরো সতেজ করে তোলে যাপনের উদ্যম।

বর্ষায় বিশেষ করে গ্রামের মানুষের কাজকর্ম কম থাকায় দিন কাটে বিভিন্ন ঘরোয়া খেলা, গল্পস্বল্প, পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর আয়োজনে। আর এসব আয়োজনকে আরো জমিয়ে তোলে বর্ষার ফলেরা।

ফলের ঋতু গ্রীষ্ম হলেও বর্ষার ফলেরও বাহার কম নয়। জৈষ্ঠ্যের পাকা আম, কাঠাল আর লিচুর দাপট শেষ হতেই শুরু হয় ফলের মহড়া। পেয়ারা, লটকন, আমড়া, জাম্বুরা, জামরুল, ডেউয়া, কামরাঙা, কাউ ও গাবের মতো বিচিত্র স্বাদের ফলগুলো বর্ষার মাহাত্ম্য যেন আরো বাড়িয়ে তোলে। রূপবতী ঋতুরানী বর্ষা হয়ে ওঠে রসেরও রাজকুমারী।

বোশেখের ঝড়ে আম কুড়াতে যেমন সুখ, আষাঢ়ের বৃষ্টিতে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে জাম জাম্বুরা কুড়ানোর আনন্দও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিশেষ করে আধা কাঁচা জাম্বুরা দিয়ে বৃষ্টিমুখর উঠোনে ফুটবল খেলার আনন্দ তো ধরে রাখার মতোই নয়।

ফলের পাশাপাশি ফুলের সাজও কম নয় বর্ষায়। বর্ষায় বিলের পদ্ম আর শাপলা ফুল না তুললে তো উৎসবই জমে না। এছাড়া ঘাসফুল, দোলনচাঁপা, সুখদর্শন, দোপাটি আর স্পাইডার লিলির মতো সুন্দর ফুলগুলো এ ঋতুর সেরা উপহার।

সবার আগে বর্ষার আগমনের জানান দেয় কদম ফুল। তাই বর্ষা এলেই এ ফুলের কথা উঠে আসে সবার আগে। গাছে গাছে ছেয়ে যায় সাদা কদম। ফুটে চালতা ফুলও। কবিরা এসব নিয়ে লিখেছেন কত ছন্দ।

বর্ষা ছড়া আর কবিতারও ঋতু। আবহমান বাংলার কবিকুল ছঋতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছড়া-কবিতা লিখেছেন বর্ষা নিয়ে। কবিগুরু রবীন্দ্রণাথ ঠাকুর আরো যেমন বলছেন—

বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,/আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,
কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার/ঘনিছে দেখ্ চাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলছেন—

আজিও তেমনি করি/আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে/ভারত-ভাগ্য ভরি।

আকাশ ভাঙিয়া তেমনি বাদল/ঝরে সারাদিনমান।

দিন না ফুরাতে দিনের সূর্য/মেঘে হলো অবসান।

কবি ফররুখ আহমদের সেই মিষ্টি ছড়াটি তো এখনো লেগে আছে ঠোঁটে—

বৃষ্টি এল কাশবনে/জাগল সাড়া ঘাসবনে/বকের সারি কোথা রে/লুকিয়ে গেল বাঁশবনে।

নদীতে নাই খেয়া যে,/ডাকল দূরে দেয়া যে,/কোন সে বনের আড়ালে/ফুটল আবার কেয়া যে।

আড়ম্বরপূর্ণ এ ঋতুর বিড়ম্বনাও কিন্তু কম নয়। বর্ষা নিয়ে প্রায় সব কবিরই উচ্ছ্বাস আর প্রসংশা প্রশ্নাতীত হলেও একজন তরুণ কবিকে বর্ষা নিয়ে কবিতা রচনাকারী কবিদের সমালোচনা করতেও দেখেছিলাম। তার মতে বর্ষা নাকি মনমরা করে দেয় মানুষকে। থামিয়ে দেয় জীবনের গতি। আটকে ফেলে জনজীবনের স্রোত।

কথাগুলো খারাপ শোনালেও এর সত্যতা কোনো অংশে কম নয়। বিশেষ করে নাগরিক জীবন অচল হয়ে পড়ে প্রায় এ ঋতুতে। হাজার হাজার মানুষের চাকরি, ব্যবসা, কাজকর্মে মারাত্মক ব্যঘাত ঘটে বৃষ্টি-বিড়ম্বনায়।

নাগরিক জীবন এমনিতে যান্ত্রিক গতিতে চলার পরও অভাবের শেষ থাকে না, তার ওপর পুরো একটা মৌসুম যদি গাঁয়ের কৃষকদের মতো বসে শুয়ে কাটাতে হয় তাহলে তো অচলাবস্থা তৈরি হবেই।

শুধু তাই নয়, বর্ষার পানির সঙ্গে অনেক সময় নানা রোগ, জীবণু, মহামারি ইত্যাদিও হানা দেয়। প্রকৃতিতে একধরনের ভেজা ভেপসা ভাব ধরে যায়। এতে জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি, যক্ষ্মা ছাড়াও বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয় অনেকে।

তাই বর্ষার আনন্দ ভালোভাবে উপভোগ করতে হলে এ মৌসুমে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যগত নিয়ম মেনে চলতে হবে। নিজের ঘরবাড়ি, আশপাশ সবসময় পরিস্কার পারিচ্ছন্ন রেখে মৌসুমটা কাটাতে পারলে আনন্দে কোনো রকমের ঘাটতি পড়ার কথা নয়। শুধু প্রয়োজন একটু সচেতনতার।

Friday, June 12, 2020

গল্প- দেবী বিসর্জন by নরক নন্দিনী

রামপুর জমিদারবাড়ি।

সেকেলে হলেও এর গঠনশৈলী মজবুত হওয়ায় আজও টিকে আছে বেশ ভালোভাবেই। বড় পুকুর আর পাড়ের বহু পুরনো গাছপালায় জায়গাটাতে যেন অন্য এক জগত তৈরি করেছে। এ বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে বিষ্ণু ঠাকুরের একখানা দোচালা মাটির ঘর, বহু কষ্টে শেকড় আঁকড়ে পড়ে রয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা যেন নিতান্তই দায়ে পড়ে। নড়বড়ে খুঁটি আর আধপচা শন বাড়িটির দুর্দশাকে প্রকট করলেও, অর্থাভাবে সেদিকে আর তাকানো হয়ে ওঠেনি ঠাকুরমশাইয়ের। এদিকে মেয়েটাও নয় বছরে পা দিতে চলেছে। তারও বিয়ের সময় ঘনিয়ে আসছে। তাই মধ্যবয়স্ক সুশ্রী কপালে অজান্তেই কিছু ভাঁজ পড়েছে। সেদিকেও নজর দেয়া হয়নি তার। সেই সকাল থেকে বিন্দি ব্যস্ত, ভারি ব্যস্ত। বিষ্ণু চাট্যুজ্যে আর অমলা দেবীর একমাত্র কন্যা সে। জন্মের সময় মায়ের মৃত্যু হওয়ায় বাবাই তার সব। ঘরের সব কাজ সে ছোট থেকেই করতে শিখেছে। তার কাজ দেখে চাট্যুজ্জে মশাই ভাবেন, ”অমলা, তুমি আমার বিন্দিমায়ের মাঝেই বিরাজ কচ্চো তা আমি বুঝি। তোমার মতোই লক্কিমন্ত হয়েচে আমার মাটা।” জমিদারবাড়ির আশপাশের বৈচিফল, বেতফল, বড় পুকুরের পানিফল সবই যেন অলিখিত দলিলে বিন্দির দখলে। সেই নিয়েই সে মহাব্যস্ত। কোন ভোরে সে কাজ সেরে চলে আসে তার ফলসংগ্রহে। কটা বৈচি আর একমুঠো বেতফল তুলে নিয়ে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে বড় পুকুরঘাটে। এসবের যেন একচ্ছত্র অধিপতি সে।

আশেপাশে যে দুচার ঘরে ছেলেমেয়ে আছে, তাদের এ সীমানায় ঢোকা বারণ। সবাই বলে তেনারা এখানে সর্বক্ষণ বাস করেন। তাদেরকে বিরক্ত করলে সংসারে অনর্থ ঘটবে।

তাই তারা পা বাড়ায় না এদিকে।

পূজোটা বেশ ধুমধাম করে হয় রামপুরে। বিষ্ণু ঠাকুরই পূজা করেন। তার পূর্বপুরুষরা বংশানুক্রমে জমিদারবাড়ির প্রধান পুরুত ছিলেন বটে। কিন্তু এখন জমিদারির সঙ্গে সঙ্গে সেসবও অতীত। এবারের পুজোর শেষেই মেয়েটার বিয়ে দেয়ার ইচ্ছে ঠাকুরের। চোখ বোজার আগে মেয়েটার একটা গতি করে যেতে চান তিনি।

অষ্টমীর দিন আজ। সন্ধিপুজোর বিশেষ আয়োজন। দেবীপক্ষের অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে এ পূজা করা হয়। দুই তিথির সন্ধিক্ষণে বলেই এ পূজাকে সন্ধিপূজাও বলা হয়। প্রতিবছর অঞ্জলি দেবার জন্য শিউলি ফুল এনে দেয়ার বায়না ধরে বিন্দি, তবে এবার আর তা করেনি। সে দেখেছে, জমিদারবাড়ির পিছন দিকের পাচিলের ওপাশে বেশ বড় একখানা গাছ আছে। ফুল ঝরে মাটি একেবারে ঢেকে থাকে। সে নিজেই সেখান থেকে ফুল কুড়িয়ে আনবে। শাড়িখানা ভালো করে কোমরে পেঁচিয়ে দেয়ালের ফাটল থেকে বেরনো পাকুড় গাছের শেকড়খানা যেই না দুহাতে ধরেছে অমনি শুনতে পেলো, ”মা বিন্দি। কোতায় গেলি আমার মা?”। “বাবা পিরে এয়েচে।” এটা বুঝেই সে দেয় ছুট ঘরের দিকে। তার সাধের শিউলি সেই মাটিতেই ফের হুটোপুটি খেলো।

“কিরে মা কোতায় ছিলি এতোকন?”

_” একটু ওদিকপানে গেচিলুম বাবা। কিচু লাগবে বাবা? এনে দিতে হবে?”

_” না রে মা। তোকে দেকতে পেলুমনে তাই ডাকলুম।”

_”বাবা পূজো কত্তে যাবেনে?”

_” যাব মা যাব। চল তুইও আমার সাতেই চল। একবারে অঞ্জলি দে আসবি।”

_”চলো বাবা।”

,অঞ্জলিশেষে ফেরার পথে পথ আগলে দাঁড়ালো কেতু ঘটক। ছুঁচলো ডগার ছাতাখানা বগলে চেপে খয়েরে লাল করা দাঁতে বিগলিত হাসল।

_ পেন্নাম হে ঠাকুরমশায়।

_পেন্নাম।

_ তে কেমন আচেন বলুন, বহুদিন হলো দেকা হয়নে।

_এই তো ঠাকুর যেমন রেকেচেন। তা তোমার কি খবর কেতু?

_আমি তো বালোই আচি। ঠাকুর ঠাকুর করে আপনি যদি চান তো আরো একটু বেশি বালো তাকতে পারি।

_ঠিক বুজলেম নে। একটু খোলাসা করো তো বাপু।

টুপ করে একমুখ পানের পিক ফেলে স্বভাবসুলভ বিগলিত হাসি হেসে কেতু বললে –

_  হাতে এককানা জম্পেশ পাত্তর এয়েচে ঠাকুরমশায়। যেমন তার রূপ তেমন তার টাকা-পয়সা। একেবারে সোনার টুকরো যাকে বলে।

_ তা নাম কি তার? বয়স কত? আর বাড়ি বা কোতায়?

_ আহ ঠাকুরমশায়, পুরুষমানুষের আবার বয়ে়স দিয়ে কি হবে। নাম তার হরিশ মুকুজ্জ্যে। পাশের গ্রামের নলেন মুকুজ্জ্যের চেলে।

_সে-কি! তার তো গেলো মাসে বৌ মরেচে। আর বয়েস তো তিরিশের কম হবেনে। আমার যে একরত্তি মে। একমাত্তর মে-টাকে দোজবরে বে দেবো?

_ঠাকুরমশায় কি যে বলেন। দোজাবর আবার কি? বয়েসই বা এমন কি বেশি। সোনার আংটি আবার সোজা আর বাঁকা। গঞ্জে তার কাঠ চেয়ারের ব্যবসা আচে। বিঘত জমিজমা। এ পাত্তর হাতচারা করবেননে ঠাকুরমশায়। মে আপনার রাজরানী হয়ে তাকবে।

_ আমায় একটু বাবতে দাও কেতু। তোমায় পরে জানাবো। ঠিক আচে ঠাকুরমশায় আপনি ভাবুন। তবে দেকবেন ভাবতে-ভাবতে যেন আবার পাত্তর না হাতচারা হয়ে যায়। আসি তাহলে। পেন্নাম।

_পেন্নাম।

ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে বাড়ীর পথ ধরলেন বিষ্ণু চাটুজ্জ্যে।

সকালে স্নান সেরে সূর্যপ্রণাম করলেন বিষ্ণুমশাই। আজ বিজয়া দশমী। মায়ের সামনে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। আজ আর ঘরের দিকে খেয়াল করার সময় হলো না তার। বললেন, মা বিন্দি, তাড়াতাড়ি মন্দিরে চলে আসিস মা।

ঠিক আচে বাবা।

নিজের কাজ সেরে স্নান করে নিল বিন্দি। মায়ের একখানা লালপেড়ে গরদ বেশ করে জড়িয়ে পরলো। দুপায়ে মোটা করে আলতা রাঙিয়ে নোলক দুলিয়ে বেড়িয়ে পড়লো ঘর থেকে। পথে নামতেই মনে পড়ে গেল শিউলি ফুল দিয়ে অঞ্জলী দেবার কথা।

_একোনো বেশ সময় আচে। ফুলগুলো নেই (নিয়েই) আসি।

পাঁচিলে গজানো পাকুড় গাছের ডাল বেয়ে তরতর করে উঠে গেল পাঁচিলের ওপরে। তারপর একলাফে মাটিতে। মাটিতে নেমেই চোখে পড়লো রাশি রাশি শিউলি ফুল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে শাড়ির কোচর ভরে কুড়াতে শুরু করলো। নিজের আগমনী বার্তা যেন এই ফুলের সুবাসেই পাঠান মা। কি তার মাতাল করা ঘ্রাণ! প্রাণ ভরে যায়। কোচর ভরে উঠতেই বিন্দির মনে পরে যায় সময়ের কথা।

_ইস বড্ড দেরি করে ফেললুম। এখনই যেতে হবে।

পাঁচিলের ওপরে দ্রুত ওঠার জন্য দেয়ালের পাশে উঁচু করে রাখা পুরনো ইটের স্তুপের দিকে পা বাড়ায় বিন্দি। প্রথম ইটে পা রাখতেই একটা তীব্র যন্ত্রণা। আঁচল ঢেলে পরে সব ফুল। দুহাতে ডান পা চেপে ধরে লুটিয়ে পরে সে। দুচোখ তার অন্ধকার হয়ে আসে। চিৎকার করে বাবা বলে ডাকে। চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। দূরে কোথাও একটা কাক বলে, কা…. কা।।

ঠাকুরমশায় একবার এদিকওদিক তাকান।

_নাহ মেয়েটাকে চোখে পড়চেনে।

তাকে পূজো করতে হয়। উচ্চ উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজে চারপাশটা মাতোয়ারা হয়ে উঠলো। চাটুজ্জ্যে  মশাইয়ের কন্ঠে সুনিপুণ কারুকার্যে উচ্চারিত হতে থাকলো,

” ঔঁজয়তিমঙ্গলা……..”

ধীরে ধীরে চারপাশ ধোঁয়ায় আধার হয়ে এলো ঠিক বিন্দির দৃষ্টির মত। তার বড় জলতেষ্টা পাচ্ছে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ওঠার ক্ষমতা তার হলো না। মায়ের কথা বড্ড মনে পড়চে। মুখটা আঁধার। গলার ভেতরটায় কেমন তেতো তেতো ঠেকছে। উঠে আসতে চাইছে সবটা।

_চারপাশের হাওয়া কি সব শুষে নিলেন পবন দেব?

শ্বাস টানতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার।

সব কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছে।

আরতিশেষে ধ্বনি তহচ্ছে, ” যাদেবিসর্বভূতেসু…… নমনমহ!”

পুষ্পবৃষ্টি শুরু হলো দেবীর বেদিতে। ওদিকে বিন্দির শ্বাস উঠেছে। মুখ ভরে গেছে ফেনায়। বিষহরী তাকে সৌভাগ্যময় মৃত্যু দিচ্ছেন। সাজ সাজ রবে চলছে এই দেবী বিসর্জনের প্রস্তুতি।

পুষ্পাকীর্ণ পায়ে ধীরে ধীরে বিসর্জন চলছে বিষ্ণু চাটুজ্জ্যের একমাত্র গৃহদেবীর।

Thursday, June 11, 2020

পেহলু খান মারা গেছে হৃদরোগে, সম্ভবত গরুর গোশত খাওয়াতে তার এমন অবস্থা হয়েছিল by জয়নাব সিকান্দার

পেহলু খান মারা গেছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।
সম্ভবত তার গরুর গোশত খাওয়ার অভ্যাসের কারণে এমনটা হয়েছে। তিনি যদি পবিত্র গোশত না খেতেন, তবে ৫৫ বছর বয়সেও ২০১৭ সালের এপ্রিলে রাজস্থানের আলওয়ারে গোরক্ষাকারীদের লাঠি আর রডের প্রহার আরো ভালোভাবে হজম করতে পারতেন। কোলেস্টরলে হয় হৃদরোগ। আর গরু-সম্পর্কিত পেটানোর বাস্তব ঘটনার আলোকে আমি বিশ্বাস করি যে গরুর গোশতের অভিশাপেই তার মৃত্যু হয়েছে।
ভারতের বর্তমান পরিবেশে এবং দাঙ্গাবাজদের সহিংসতা সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় উপনীত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতি নিয়ে ভয়ঙ্কর চিন্তা আমার মনে ভর করেছে। কিভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হওয়া কোনো ব্যক্তি (সামাজিক মাধ্যমে যে অপরাধটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে) ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন?

শিকার ব্যক্তিকে অবশ্যই অপদস্ত হতে হবে
আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে পেহলু খান ছিলেন ভুল। রাকবর খান, মোহাম্মদ আখলাক এবং অন্য আরো অনেকের (যাদের নাম গরুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো বলে মনে হবে না) মতো পেহলুরও অপদস্ত হওয়া যৌক্তিক ছিল। যদিও জয়পুরের গরুর হাট থেকে গরু কেনার নথিপত্র পেহলু খানের কাছে ছিল, কিন্তু আমি নিজেকে বোঝাতে চাই যে তার নিয়ত ভালো ছিল না। তিনি গরুগুলোর কী গতি করতেন তা কি কেউ জানে? তিনি কি রাতের আঁধারে এগুলোকে হত্যা করতেন না? সেগুলো রান্না করে বা কাবাব বানিয়ে খেতেন না? তাই যদি হবে তবে তথাকথিত গোরক্ষকেরা তো, যারা দলবেঁধে চলাচল করে, তারা তো ঠিইই করেছে। তারা ছিল সত্যনিষ্ঠ মিশনে, ঐশী ইচ্ছায় তারা সাড়া দিয়েছে।
এমনটা না হলে কেন গোরক্ষকরা কেন সবসময় বিজয়ী দলে থাকবে? ঐশী আলোতেই তারা নিজেদের পথ দেখে, পবিত্র গরুর ক্ষতি করে এমন ব্যক্তিদের হত্যা করে একেবারে ঠিক কাজটিই করে। গোরক্ষার জন্য অভিযুক্ত ছয়জনের আদালতের বাইরে দেয়া স্লোগান শুনেছেন? ‘ভারত মাতা কি জয়!’ ভারত ও এর বিচারব্যবস্থা দীর্ঘজীবী হোক।

অনেক ভুল পেহলু খানের
তবে বিচার কিন্তু অন্ধ নয়। বিচার থাকে কাগজে-কলমে। আমার সহানুভূতি পেহলু খানের প্রতি নয়, ভারতের বিচারব্যবস্থার প্রতি। তিনি যদি নিজেই নিজের খুনের ব্যবস্থা করে থাকেন, তবে কী করার আছে? এটা কি একজন সাইকোপ্যাথের ভয়াবহ ইচ্ছা নয়?
কিন্তু পেহলু খান তা না করে থাকলেও তার বয়স ও বিস্মৃতপরায়ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা কি সফলভাবে যুক্তি তুলে ধরেননি যে পেহলু খান পুলিশের কাছে দেয়া তার প্রথম বিবৃতিতে হামলাকারীদের নাম বলতে পারেননি? ফলে পাঁজরের কয়েকটা হাড় ভাঙ্গার পর যদি ফুসফুসে পানি আসার কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকলে তা কি কোনো ব্যাপার?
মৃত্যুর সময় দেয়া বক্তব্যে পেহলু খান তার খুনিদের নাম বলে গিয়েছিল। কিন্তু তা তো যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক তার বিবৃতি দেয়ার মতো অবস্থা আছে কিনা সে সার্টিফিকেট ছাড়াই বেহরর থানার কর্মকর্তা রমেশ সিনসিনওয়ার তার বক্তব্য রেকর্ড করেছিলেন। আদালতে কাজে লাগবে, এমন করে তিনি সাক্ষী দিতে পারেননি। এটা তার ব্যর্থতা।
এমনকি তার খুনের ভিডিও, যেখানে পরিষ্কারভাবে হামলাকারীদের দেখা যাচ্ছে, কাজে লাগল না, পেহলু খান ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবে তা প্রত্যায়ন করতে না পারায়। কাজটি ছিল তদন্ত কর্মকর্তার। কিন্তু তিনি দুই বছরের মধ্যেও তা করতে পারেননি। এতে কি আমি বিস্মিত? না। একে বলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ। আচ্ছা পেহলু খানের পরিবার কি ভিডিওটি এডিট করেছিল? অসম্ভব কি?
তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে, পেহলু খান ঠিকভাবে মারাও যেতে পারেননি। তিনি চিকিৎসকদের বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছিলেন। তার ময়না তদন্তে দেখা যায়, তিনি মারা গেছেন আহত হয়ে। আবার এক সরকারি চিকিৎসক বলতে চেয়েছেন তিনি মারা গেছেন হৃদরোগে। এই চিকিৎসক আরো বলতে চেয়েছেন যে ট্রাকে গরু ওঠানোর সময় গরুর সাথে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে থাকতে পারেন পেহলু। কী গোলকধাঁধা।

পেহলু খান যা কখনো পাবেন না
পেহলু খানের সবচেয়ে বড় পাপ হলো এই যে তিনি ভারতীয়দের সহানুভূতি আদায় করতে পারেননি। তার মধ্যে এমন কিছু ছিল যার ফলে তিনি এমনকি ৪৪ জন সাক্ষীর একজনকেও আদালতে হাজির করতে পারেননি। ভিডিওটি ধারণকারী দিল্লির কনস্টেবল পর্যন্ত তার প্রতি বৈরী হয়ে পড়েছিলেন। এনডিটিভির স্টিং অপারেশনে এক হত্যাকারীর গর্ব করে স্বীকারোক্তি প্রদানও যথেষ্ট ছিল না। ওইসব সাংবাদিক দেশবিরোধী। আমাদের উচিত হবে না তাদের কথা বিশ্বাস করা।
পিটিয়ে হত্যার যেসব খবর ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে পেহলু খানেরটি তার অন্যতম। প্রাইমটাইমেও এক্সক্লুসিভ ফুটেজ প্রকাশিত হয়েছে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে তা দেখেছে। সামাজিক মডেল বদলে গেছে। একসময় ‌‘ক্রাইম পেট্রোলে’ বিচার পাওয়ার কথা বলা হতো। এখন টিভিতে খুনিদের দেখা যায়। আমাদের মধ্যে থাকা ধর্ষকামকে তৃপ্ত করা হচ্ছে।

পেহলু খানের রাজনীতি
তারপর পেহলু খানকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি রাজনীতি করতে দেয়া হলো। আর তা করা হয়েছে কেবল রাজনীতিবিদদের ফায়দা হাসিলের জন্য। ঘৃণার অবসানের নামে ভোট চাওয়া হয়েছে। কখনো বলা হয়নি যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, রাজস্থানের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার পিটিয়ে মারার যে আইন বদলাতে যাচ্ছে, তার প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছে সেখানকার বিরোধী দল বিজেপি।
কিন্তু বিদ্যামান আইনেও তো পেহলু খানের হত্যাকারীদের বেকসুর খালাপ দেয়া হয়েছে। কেন? আসলে ন্যায়বিচারের চেয়ে রাজনীতি অনেক বড় বিষয়।

পেহলু খানকে ভুলে যান, ঠিক আছে?
পেহলু খানের ভুল ছিল তিনি ভুল ব্যবসা করতেন। গরু পোষা মুসলিমদের কাজ নয়। পবিত্র গরু নিয়ে মুসলিমদের করা ঠিক নয়। এ কারণে ওই ছয় খুনির উচিত হবে গরুসংশ্লিষ্ট কাজ করায় পেহলু খানের বিরুদ্ধে মামলা করা। কেবল তার বিরুদ্ধে নয়, তার ছেলেদের বিরুদ্ধেও মামলা করা উচিত ছিল গরু পরিবহনের দায়ে। ভালো হয় পেহলু খানের কাহিনীটি একেবারেই ভুলে যাওয়া এবং সেইসাথে এটকে একটি মিথ্যা ঘটনায় পরিণত করা। জাতীয়তাবাদবিরোধী ভাবাবেগ চাপা দেয়ার জন্য একসময় বলা হতো বিচারব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়েছে, নৈতিকতা ভেঙে পড়েছে।

>>>লেখক: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও লেখক

Wednesday, June 10, 2020

ইংরেজি ভাষার ক্রিকেট উপন্যাস by শারমিন সুলতানা

প্রথম আলো, ১৪ জুন ২০১৯: ইংরেজদের মাধ্যমে কমনওয়েলথ দেশগুলোতে জনপ্রিয় হওয়া ক্রিকেটকে উপজীব্য করে ওই সব দেশে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে বেশ কিছু উপাখ্যান। উইকিপিডিয়া এবং বিভিন্ন সূত্র ঘেঁটে তৈরি করা হয়েছে ইংরেজি ভাষার কয়েকটি ক্রিকেট উপন্যাস নিয়ে এই লেখা।
ইংরেজি ভাষা ও ক্রিকেট—ভারতবর্ষ থেকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ান ভূখণ্ড—সবখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যের পরবর্তীকালে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয়তার পরিচায়ক হয়ে বিকশিত হয়েছে। খোদ ব্রিটিশ ইংরেজি সাহিত্যে ক্রিকেটের সংক্রমণ ভীষণ রকম। চার্লস ডিকেন্সের পিক উইক পেপার (১৮৩৬)-এ কাল্পনিক ক্রিকেট দল সর্ব-মাগলটনের বিপক্ষে ডিংলি ডেল দলের ক্রিকেট ম্যাচের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা সম্ভবত উপন্যাসে সবচেয়ে প্রাচীন ক্রিকেটীয় উপাদান। তারপর টমাস হিউজের টম ব্রাউন’স স্কুল ডেইজ–এ (১৮৫৭) ক্রিকেট উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে। টমাস হিউজের এই উপন্যাসের একটি বখাটে চরিত্র হ্যারি ফ্লাশম্যান শতবর্ষ পরে জর্জ ম্যাকডোনাল্ড ফ্লেজারের ‘ফ্ল্যাশম্যান’ সিরিজে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমর্স ও ড. ওয়াটসন ‘দ্য ফিল্ড বাজার’ গল্পে ক্রিকেটবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সিগফ্রিড সাসুনের মেমোয়ারস অব ফক্স হান্টিং ম্যান (১৯২৮); ডরোথি সেয়ার্স, এজি ম্যাকডোনাল্ড প্রমুখের লেখায় ক্রিকেট নানা পরিসরে, বর্ণনাশৈলীতে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এঁদের কোনো উপন্যাসই পুরোপুরি ক্রিকেট উপন্যাস নয়, এখানে ক্রিকেট এসেছে কেবল অনুষঙ্গ হয়ে। কিন্তু ক্রিকেট উপন্যাসে মূলত ক্রিকেট গল্পের মূল চরিত্রের মতো গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ে ডরোথি সেয়ার্সের ‘লর্ড পিটার উইমসি’ সিরিজেও ক্রিকেটের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
ইংরেজি সাহিত্যের প্রাথমিক ক্রিকেট উপন্যাস হিসেবে বলা যায় দুটি বইকে—পি জি উডহাইসের মাইক (১৯০৯) ও স্মিথ ইন দ্য সিটি (১৯১০)। মাইক উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মাইক জ্যাকসন, এক ক্রিকেটপাগল পরিবারের ছোট ছেলে। মাইকের ক্রিকেটের প্রতি আসক্তি এবং ক্রিকেটার হয়ে ওঠাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। এই উপন্যাসের ধারাবাহিকতায় স্মিথ ইন দ্য সিটিতে মাইক জ্যাকসন এবং তার ফ্যাশনসচেতন বন্ধু স্মিথের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম এবং ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা—এই দুইয়ের সংকটকে চিত্রায়িত হতে দেখা যায়।
হিউ দে সেলিনকোর্ট গ্রামীণ ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন দুটি উপন্যাস—দ্য ক্রিকেট ম্যাচ (১৯২৪) ও দ্য গেম অব দ্য সিজন (১৯৩৫)। ব্রুস হ্যামিলটনের প্রো: অ্যান ইংলিশ ট্র্যাজেডি (১৯৪৬), হ্যারল্ড হবসনের দ্য ডেভিল ইন দ্য উডফোর্ড ওয়েলস–এ–ও মিশে আছে ক্রিকেট। উইলিয়াম গডফ্রে, জে এল কর ও ডগলাস অ্যাডামসও ক্রিকেট নিয়ে লিখেছেন উপন্যাস। অ্যডামসের ‘হিচ হাইকার’ সিরিজের উপন্যাস লাইফ, দ্য ইউনিভার্স অ্যান্ড এভরিথিং–এ (১৯৮২) কল্পবিজ্ঞানের সম্মিলন ঘটেছে, ‘অ্যাশেজ’ নিয়ে বিকল্প বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে। আবার আইরিশ লেখক জোসেফ ও’ নিলের নেদারল্যান্ডস ও পল হুইলারের বডি লাইন—এই দুই উপন্যাসের গল্পও আবর্তিত হয়েছে ক্রিকেট নিয়ে। এ তো গেল ইংরেজ রচিত ইংরেজি ক্রিকেট-সাহিত্য। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের সাম্রাজ্য যত দূর ছিল, সবখানে নিজের অস্তিত্ব ভালোভাবেই পোক্ত করেছে ক্রিকেট, সাবেক শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া ইংরেজি ভাষা ও ক্রিকেট—এই দুটো ব্যাপার আত্তীকৃত করে উপনেবিশিত দেশগুলোয় লেখা হয়েছে এন্তার সাহিত্য।
ভারতবর্ষে ক্রিকেট-উন্মাদনা তো অবিশ্বাস্য রকমের। জনপ্রিয় সাহিত্যে, বিশেষত ইংরেজি ভাষায় রচিত উপন্যাসে ক্রিকেট উপস্থাপিত হয়েছে নিবিড়ভাবে, রচিত হয়েছে বেশ কিছু ক্রিকেট উপন্যাস। এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ হলেন মালগুড়ি ডেজখ্যাত লেখক আর কে নারায়ণ। তাঁর স্বামী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস সচেতনভাবে ক্রিকেট উপন্যাস না হলেও ঘটনাপ্রবাহ এবং চরিত্রগুলোও ক্রিকেটের ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারে না। দক্ষিণ ভারতে কল্পিত ছোট শহর মালগুড়িতে বালক স্বামীনাথ ও তার বন্ধুরা ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে তোলে একটি ক্রিকেট ক্লাব। স্বামীনাথ তার বোলিং কৌশলে দক্ষতার জন্য উপন্যাসে পরিচিতি পায় বিখ্যাত ইংরেজ ক্রিকেটার মরিস টেটের নামে। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে চরিত্রগুলো ক্রিকেট নিয়ে সব সময় নিয়োজিত থাকলেও এবং এখানে অনেক খ্যাতিমান ক্রিকেটারের নাম নেওয়া হলেও এ উপন্যাসে কোনো ক্রিকেট ম্যাচের বিবরণ পাওয়া যায় না।
বর্তমানকালে ভারতের জনপ্রিয় ধারার ইংরেজি ভাষার লেখক চেতন ভগতের থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ একটি ক্রিকেট উপন্যাস। এ উপন্যাস থেকে ক্রিকেটপ্রধান চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে বলিউডে—কাই পো চে নামে। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ঈশান ক্রিকেটপাগল তরুণ। তার বন্ধু গোবিন্দ, ক্রিকেট সরঞ্জামের দোকান চালায়। ঈশান আবিষ্কার করে আলী নামের মুসলিম বালককে, যে একজন অসাধারণ ব্যাটসম্যান। বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রেম ও সংস্কারের পরতে পরতে থ্রি মিসটেকস অব মাই লাইফ-এ মিশে আছে ক্রিকেট।
দ্য হোয়াইট টাইগারখ্যাত বুকারজয়ী লেখক অরবিন্দ আদিগার সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত ক্রিকেট উপন্যাস সিলেকশন ডে (২০১৬)। ২০১৮ সালে এই উপন্যাস থেকে নির্মিত একই নামের একটি সিরিজ প্রকাশিত হয় নেটফ্লিক্সে। উপন্যাসে দুই ভাই মোহন, কুমার ও তার বাবার ক্রিকেট-জ্বরের গল্প উঠে এসেছে। স্থানীয় আচারবিক্রেতা বাবার ইচ্ছা, তার ছেলেরা শচীন টেন্ডুলকারের মতো ক্রিকেটার হোক, আর এ জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। ক্রিকেটে পুঁজিবাদের আগ্রাসন, ভারতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বিপুল তারকাখ্যাতি এবং এই পপ কালচারে বিভ্রান্ত নিম্নবিত্ত বাবার স্বপ্ন ও তার ছেলেদের স্বতন্ত্রতা—এসব সংঘাতে এগিয়ে চলে গল্প। পুরো উপন্যাসে রয়েছে উত্তেজনাময় ক্রিকেট ম্যাচের স্নায়ু অবশ করা নিখাদ বর্ণনা।
অরবিন্দ আদিগার ক্রিকেট উপন্যাস নিয়ে লিখতেই মনে এল অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট সাহিত্যের কথা। কারণ, অরবিন্দ আদিগা একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় লেখক, তাঁর সিলেকশন ডে উপন্যাসের পটভূমি ভারত হলেও তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট কথাসাহিত্যের নাম খুঁজলে চলে আসবে ‘টবি জোনস’ সিরিজের নাম। মিশেল প্যানক্রিজ ও অস্ট্রেলিয়ার খ্যাতিমান পেসার ব্রেট লির লেখা মোট পাঁচটি ক্রিকেট উপন্যাস নিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে এই সিরিজ। এখানে দেখা যায়, টবি জোনস নামের এক তরুণ ক্রিকেটারকে, সাফল্য ও ব্যর্থতার একপর্যায়ে যে আবিষ্কার করে সময় পরিভ্রমণ করতে পারে সে। উইজডেন ক্রিকেট আলম্যানাকের যেকোনো স্কোরকার্ডের দিকে তাকিয়েই অতীতের সেই ম্যাচে চলে যেতে পারে সে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলীয় লেখক ম্যালকম নক্স লিখেছেন অভিনব ক্রিকেট–রহস্য উপন্যাস আ প্রাইভেট ম্যান (২০০৪)। সিডনিতে অনুষ্ঠিত পাঁচ দিনব্যাপী টেস্ট ম্যাচের অন্তরালে দুর্ধর্ষ খুনের রহস্য উদ্​ঘাটন করেন লেখক, পাশাপাশি গল্পের অনেকখানি ব্যাপ্তিজুড়ে থাকে ক্রিসের ক্রিকেট ক্যারিয়ার বাঁচানোর লড়াই।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডের নিজস্ব কিছু ক্রিকেট উপন্যাস আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মিশেল ও’ লরির আউট অব ইট (১৯৮৭)। এখানে মধ্য আশির দশকের একটি এক দিনের ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ কাহিনি উপস্থাপন করেছেন তিনি, যেখানে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট দলের বিপক্ষে তৎকালীন বিখ্যাত গায়ক ও তারকাদের একাদশকে খেলতে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে জিমি হেনডিক্স ও জ্যানিস জ্যাপলিনও আছেন। নিউজিল্যান্ডের মতো আরেক দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কারও রয়েছে গর্ব করার মতো কিছু ক্রিকেট সাহিত্য। লঙ্কান ঔপন্যাসিক শিহান করুনাতিলাকা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস চায়নাম্যান: দ্য লিজেন্ড অব প্রদীপ ম্যাথিউ-এ ক্রিকেটকে আশ্রয় করে শ্রীলঙ্কার সমাজবাস্তবতার গল্পই বলেছেন।
ক্রিকেট ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের জল-হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেলেও এখানে তেমন কোনো ক্রিকেট উপন্যাস মেলে না। তবে ভি এস নাইপলের গল্পসমগ্র মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯)-এ পোর্ট অব স্পেনের শহরতলিতে নিম্নবিত্ত জীবনে ক্রিকেটকে মিশে থাকতে দেখা যায়। আর আর্ল লাভলেসের ইজ জাস্ট আ মুভি উপন্যাসের (২০১২) ‘ফ্র্যাঙ্কলিন ব্যাটিং’ নামের অধ্যায়টি ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটকেই চিত্রায়িত করে।
আর শেষে লিখতে হবে এ কথা যে ক্রিকেটটা ভালো খেললেও ইংরেজি ভাষায় লেখা উপন্যাসে ক্রিকেট এখনো অনুপস্থিতই থেকে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশ।