Friday, October 22, 2010

গল্প- 'হাসে বাঁকা চাঁদ' by আহসান হাবিব বুলবুল

এত আবেগ, এত আনন্দ, এত উচ্ছ্বাস আর কখনো দেখিনি। এখানে সেখানে ছেলেমেয়েরা জটলা করছে। হেমন্তের শেষ বিকেলে প্রকাণ্ড সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পাশ্চিমে ঢলে পড়ছে। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভায় অকাশ বিচিত্র হয়ে উঠেছে।
মেঘের পর মেঘ রঙের আবির মেখে যেন ছুটে চলেছে। লাল নীল আকাশটা যেন ছেলেমেয়েদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

গল্প- 'বড়বাড়ির জঙ্গলে' by শরীফ আবদুল গোফরান

অশ্বদিয়ার অমূল্য বাবু একজন দুখি মানুষ। নামটা যেমন তার অমূল্য, তেমনি দুঃখেরও শেষ ছিলো না। সে ছিলো ছোটখাটো দুর্বল, ভীতু। এই মানুষটি একসময় গাঁয়ের স্কুলে মাস্টারি করতেন।
কিন্তু ছেলেরা তার কথা মোটেও শুনতো না। কাসে ভীষণ গণ্ডগোল করতো। হেডমাস্টার সামুছল হক এক সময় অমূল্য বাবুকে ডেকে বললেন, ‘এভাবে তো চলতে পারে না। আপনি বরং কাল থেকে আর কাস নেবেন না। কেরানি স্যারকে সহযোগিতা করবেন। ওটাই আপনার চাকরি।’

গল্প- 'পরিবর্তন' by বিশ্বাস আবুল কালাম

সন্ধ্যেবেলা পড়তে পড়তে অকস্মাৎ বাইরে বের হয়ে এল টিপু। তার চোখে-মুখে এখন শিশু ছাড়িয়ে কৈশোরের রঙ্গমঞ্চ। এটা ওটা নিয়ে একটু একটু করে চিন্তা করতে শিখেছে সে।
টিপুর মন এখন চিন্তাদ্রোহী। আর যারা এভাবে অল্প বয়স থেকে চিন্তার সাথে বিদ্রোহ করে তারাই সমাধান পায়। আর তারাই পারে জীবনকে উচ্চ রাজ শিখরে সমর্পণ করতে।

গল্প- 'মিতুর জ্যোৎস্না রাত' by আবদুল্লাহ আল হোসাইন

গভীর রাত, এখন আর কেউ জেগে নেই, সকলে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। চারদিকে কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না, মাঝে মাঝে দুই-একটা কোকিলের ডাক ছাড়া।
মানুষের কোলাহল বন্ধ হয়ে গেছে আরো অনেক আগেই। প্রচণ্ড গরম। বিদ্যুৎ না থাকায় রুমটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন। মশাও বেশ রেগে আছে, যেন তাদের কোন দাবি-দাওয়া মেনে নেয়া হয়নি। মিতু দরজা খুলে আকাশের দিগন্তে তাকালো।

গল্প- 'জিয়ানার আনন্দ-অভিমান' by বেগম রাজিয়া হোসাইন

মাত্র বার পার হয়ে তেরতে পা দিয়েছে জিয়ানা। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কত আদর-স্নেহ-ভালোবাসা। নানু বলেন, চোখের মণি। মামারা বলে, মানিক সোনা। ছোট্টবেলা থেকে এই আজ পর্যন্ত জিয়ানার এমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই যা দুঃখকে বহন করে। ফুরফুরে এ আনন্দময় জীবন।
ও মা-বাবার সঙ্গে মাঝে মাঝে নানু বাড়ি যায়। ওর নানুবাড়ি একটি নদীর পাড়ে। নদীর নাম মহানন্দা। আনন্দ যেন কেবল ছুঁই ছুঁই করে। ঢেউগুলো মৃদু বাতাসে খেলা করে ঠিক ঘাসফড়িংয়ের মতো। ঘাস নেই, পানিতেই আছড়ে পড়ে।

গল্প- 'এক মুঠো স্বপ্ন' by কাজী রিচি ইসলাম

মিরা নামের ছোট মেয়েটি পড়ে ক্লাস ফাইভে। পড়াশোনায় খুব অমনোযোগী। স্কুলও তার কাছে ভালো লাগে না। শুধু কান্নাকাটি করে বলে, আমি যাব না, স্কুলে আমার ভালো লাগে না।

কেন ভালো লাগে না? জিজ্ঞেস করলেই মিরা উত্তর দেয়, স্কুলের ধরাবাধা নিয়ম আমার একটুও ভালো লাগে না। এতো পড়া, আমার অনেক কষ্ট হয়। ক্লাসে পড়া না পারলে কান ধরে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু তবুও মিরাকে স্কুলে যেতে হয় তার মায়ের জন্য। মা মিরাকে জোর করে স্কুলে নিয়ে আসেন। বেচারা মিরা বহু কষ্টে স্কুলের সময়টুকু পার করে।

গল্প- 'মাটির গন্ধ' by জুবায়ের হুসাইন

অবশেষে মুনিয়া ও মুরাদেরই জয় হলো। বাবা ও মা রাজি হয়েছেন আজকের ছুটির দিনে বেড়াতে যেতে। তবে কোন আত্মীয়’র বাড়ি না; ওরা বেড়াতে যাবে খোলা আকাশের নিচে।
অর্থাৎ প্রকৃতির সবুজ প্রান্তরে, যেখানে দিগন্ত জুড়ে কেবল সবুজ ফসলের মাঠ- মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে মাটির রাস্তা, রাস্তার ধারে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাবলা গাছ, ক্ষেতের মাঝে মাঝে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে খেজুর ও তাল গাছগুলো। খই গাছও দু-একটা চোখে পড়বে।

গল্প- 'বোকাইকে কেউ বুঝি ডাকলো' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

খুব বকুনি খেল আজ বোকাই। ও পড়াশোনায় ভালো, দু-একবার পড়ে যে কোন কবিতা দিব্যি মুখস্থ বলে দিতে পারে। ঝটপট অঙ্ক কষতে পারে ও বকুনি খাবে কেন? তাও কিনা রিনি ম্যাডামের কাছে? যার মুখে সারাক্ষণ মিষ্টি হাসি মাখামাখি হয়ে থাকে।
ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গে খুব হাসে ও। চোখ একটুও ভিজে ওঠে না ওর। তিতির, অন্তু, দীপু অবাক হয়ে যায়। বোকা বলেই তো বোকাই কাঁদে না।

গল্প- 'নাকিবের একা একা ঝিল দেখা' by হারুন ইবনে শাহাদাত

সবুজ সুন্দর গ্রাম। দিগন্ত প্রসারিত ফসলের মাঠ। মাঝে একটি ছোট ঝিল। ঝিলে আষাঢ়, শ্রাবণ, কার্তিক, অগ্রহায়ণ এই চার মাস পানি থাকে। কাকের চোখের মত স্বচ্ছ টলটলে পানি। পানির নিচে মাছেরা খেলা করে।
দুপুরের প্রখর রোদের সময় পানি যখন খুব গরম থাকে মাছগুলো ঝিলের একেবার মাঝে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সকাল বিকেল তারা ঝিলের কিনারে এসে মুখ তুলে, তারপর আবার টুপ করে ডুব দেয়।

গল্প- 'উসামার বায়না ও আইলার জন্য ভালোবাসা' by চেমন আরা

কয়েকদিন ধরে বড় ছেলে উসামা বায়না ধরেছে এক জোড়া জুতার। বাবা উদাসীন স্বভাবের মানুষ। ঘরে থাকলে লেখাপড়া আর অফিসের সময় অফিসে যাওয়া এ নিয়েই তার বেশির ভাগ সময় কাটে। বাবার গুরুগম্ভীর এই স্বভাবের সঙ্গে ছেলে-মেয়েরা পরিচিত। তাই তাদের আবদার, দাবি, কথাবার্তা সব তাদের মায়ের সঙ্গে।

গল্প- 'উরুমকিতে আর্তনাদ' by আহমদ মতিউর রহমান

এক.

ছোট্ট পরিপাটি শহর উরুমকি। ঝকঝকে তকতকে এর রাস্তাঘাট। শাঁ শাঁ বেগে ছুটে চলেছে যানবাহন। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এই শহরটির আদি বাসিন্দাদের মনে রয়েছে কত না মর্মবেদনা। উইঘুর মুসলমানরা ছিল এই শহরের মূল জনশক্তি। শান্তিপ্রিয় উইঘুরি জাতিগোষ্ঠী নিয়ে কত না শান্ত ও ছিমছাম ছিল এই জনপদ আর এই জনপদের মানুষ।
মাঝখান থেকে কী হয়ে গেল। একটা ভয়াবহ দমকা হাওয়া আর প্রচণ্ড একটা ঝড় যেন সব তছনছ করে দিয়ে গেল। মনটা ভারি হয়ে আছে ইলহামের। এই পরিস্থিতিতে কার বা মন ভাল থাকে।

গল্প- 'টবের গোলাপ' by দিলারা মেসবাহ

ফয়সলের মনের আকাশে থোপা থোপা কালো মেঘ। রোজার আজ সাতাশ তারিখ- পবিত্র শবে কদর। সবাই রাত জেগে নামাজ পড়বে, ইবাদতে মশগুল হবে। দেখতে দেখতে ঈদের সেই চিকন একফালি সোনার বরণ চাঁদ উঠবে। অন্যবার এই সময় ফয়সলের মনে আনন্দ ধরে না। এবার কেন যে মন কেমনের ভূতটা মাথায় চেপে বসে আছে। সওয়ার হয়েছে ঘাড়জুড়ে। নামছেও না, নড়ছেও না। কী দশা? মা আরিফা খানম ফয়সলের দিকে আজ খুব খেয়াল করছেন, জহুরি চোখ মেলে নিরিখ করছেন। দুপুরে ছেলের গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘কিরে বাবা তোর শরীর খারাপ নাকি? ক’দিন থেকে দেখছি মুখে হাসি নেই। কেমন যেন হয়ে গেছিস, ব্যাপার কী বাপধন?’

কথাগুলো হালকা চালে বললেন বটে তবে মায়ের বুকের ভেতর মহলে একটু যেন কেঁপে উঠল। সংসারে এই একটি মাত্র পুত্রধন!

আইসিসিও নামাচ্ছে ছদ্মবেশী এজেন্ট

সত্যিই তাহলে নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ডকে অনুসরণ করতে যাচ্ছে আইসিসি! ছদ্মবেশী সাংবাদিক ব্যবহার করে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছিল পত্রিকাটি। এবার আইসিসি পরিকল্পনা করছে, ক্রিকেটে দুর্নীতি ঠেকাতে তারাও মাঠে নামাবে ছদ্মবেশী এজেন্ট।
পরিকল্পনাটা এখনো বিবেচনাধীন। তবে অনুমোদিত হলে আগামী মাসে শুরু হতে যাওয়া অ্যাশেজ এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে শুরু বিশ্বকাপেই এটির প্রয়োগ হতে পারে। বাজিকর সেজে খেলোয়াড়দের ফোন দেওয়ার জন্য এমন ছদ্মবেশী এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আইসিসির আগামী বৈঠকেই আলোচনা হবে। সে রকমই জানিয়েছেন, আইসিসির প্রধান নির্বাহী হারুন লরগাত, ‘আমরা আমাদের মতো করে খেলোয়াড়দের প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবছি। দেখতে চাইছি তারা এ নিয়ে রিপোর্ট করে কিনা। আমরা আসলে একটু ব্যতিক্রমীভাবে ভাবতে চাইছি।’
আইসিসির এই প্রস্তাবিত ছদ্মবেশীরা বাজিকর সেজে ফোন করবেন বিভিন্ন খেলোয়াড়কে। ফোনে তাঁদের ম্যাচ পাতানোর, স্পট ফিক্সিং করার প্রস্তাব দেওয়া হবে। আইসিসি দেখতে চায়, এই ধরনের ফোনে কোন খেলোয়াড় কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান। এই দেখার ব্যাপার তো থাকছেই। সঙ্গে ফোন পাওয়া খেলোয়াড়টি নিয়মমতো আইসিসিকে এই প্রস্তাবের ব্যাপারে জানান কি না, তাও দেখতে চায় আইসিসি। না জানালেই শাস্তি দেওয়ার বিধান রাখা হবে বলে ভাবছে আইসিসি।
আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আইন অনুযায়ী এই ধরনের প্রস্তাবের কথা সঠিক কর্তৃপক্ষকে না জানানো হলে সতর্ক করে দেওয়া, জরিমানা করা থেকে শুরু করে নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তি পর্যন্ত হতে পারে।
আইসিসির এমন পদক্ষেপ রোমাঞ্চপ্রিয়দের পছন্দ হতে পারে। কিন্তু ক্রিকেটাররা, অন্তত অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এসিএ) পরিষ্কার বিরোধিতা করছে এই পদক্ষেপের। এসিএর প্রধান নির্বাহী পল মার্শ বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ‘অযৌক্তিক’ ও ‘বেআইনি’।
মার্শ বলছেন, তাঁরা এখনো নিশ্চিত নন, শুধু খেলোয়াড় ‘ধরা’র জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না। তাঁরা আইসিসির কাছে এ ব্যাপারে পরিষ্কার ব্যাখ্যা চাইবেন। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা যা-ই হোক, এমন কিছু হলে সেটা ক্রিকেটারদের জন্য ক্ষতিকর হবে বলেই ধারণা মার্শের, ‘এটা খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য দুশ্চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। ক্রিকেট থেকে তাদের মনোযোগটাও এতে সরে যাবে।’

‘অখন মরা ছাড়া কোনো বুদ্দি নাই’ by মোছাব্বের হোসেন

মেয়েটার নাম ঐশী। হয়েছে ফুটফুটে আর চঞ্চল। এখানে-সেখানে ছোটাছুটি করছে আর দুষ্টুমিতে মেতে আছে সে। অথচ কী আশ্চর্য, সন্তানের এই দাপাদাপি, চঞ্চলতা কিংবা দুষ্টুমি কোনোটাই দেখতে পারছেন না তার বাবা-মা! কোনো দিনও দেখতে পাননি। এ জীবনে হয়তো দেখাও হবে না।
ঐশীর বাবা-মা দুজনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ঐশীর মা রানু বেগমের যখন দুই বছর বয়স, তখন টাইফয়েডে উপযুক্ত চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে তিনি অন্ধ হয়ে যান। অল্প বয়সেই রানু বাবা হারান। এরপর বড় বোন রীতা বেগম বোনকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। রীতা গার্মেন্টসে কাজ নেন। স্বামীও কাজ করেন। ভালোই চলছিল সংসার। ছোট বোন রীতা অন্ধ তো কী হয়েছে, তাকে লেখাপড়া করাতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো আপস করেননি তিনি। একে একে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়তে অনেক খরচ। তার পরও প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে প্রতিবন্ধকতা। বছর দুই আগে ইডেন কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস বিভাগ থেকে পাস করে স্নাতক হয়েছেন রানু। নিজের প্রচণ্ড আগ্রহ আর বোনের সাহায্য রানুকে এনে দিয়েছে এই সাফল্য। কিন্তু সফল হওয়ার হাসিমাখা মুখ খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। রানু বেগমের বড় বোন রীতা বেগমের সংসারে নেমে এল অশান্তি। তাঁর স্বামী অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রইলেন। বাধ্য হয়ে বাইরের কাজ কমিয়ে দিতে হলো। অসুস্থ স্বামী, তিন সন্তান আর অন্ধ বোনকে নিয়ে চোখে-মুখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলেন রীতা বেগম। বোনটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক। এই মেয়েকে বিয়ে করবে কে? বড্ড চিন্তায় পড়ে গেলেন রীতা বেগম। এদিকে একটি প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এক ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় রানু বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয় মনোয়ার হোসেনের। তিনিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তবে বিএ পাস করেছেন। পরিচয় থেকে এ সম্পর্ক একসময় পরিণয়ে রূপ নেয়। রানু বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় মনোয়ার হোসেনের। বেকার মনোয়ার হোসেনও নিরুপায়। থাকতে শুরু করেন স্ত্রী রানু বেগমের বোনের বাসায়। এদিকে অসহায় বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারেন না রীতা বেগম। তাঁর একার আয়ে এত বড় সংসার চলে না। বড় ছেলেটা এখনো স্কুল ছাড়েনি। তার পরও বুকে পাথর বেঁধে তাকে কাজে পাঠান তিনি। আয় যা হয় তা খুবই কম।
এদিকে রানু বেগমের কোলজুড়ে আসে ঐশী। আরও একটি মুখ বাড়ে। একদিকে অসুস্থ স্বামী-সন্তান, অন্যদিকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বোন, তাঁর স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন রীতা বেগম? সাহায্য করার মতো কেউ নেই তাঁর। কথাগুলো বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠেন রীতা বেগম। বারবার মূর্ছা যান। আঁচল দিয়ে চোখ মোছার কথা ভুলেই যান। ওদিক থেকে কার যেন ডাক আসে, সেদিকে সাড়া দিতে রীতা বেগম চলে যান। এবার কথা বলি রানু বেগম ও তাঁর স্বামী মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে।
‘অল্প কয়েক মাস আগে একটা বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির ব্যবস্থা কইরে দেন এক আপা। সেই মগবাজারে। যাইতে-আসতে ডেইলি ৫০ টাকা খরচ হইয়া যায়। আর দুপুরে খাইতে পারি না। ব্যাগটা তো ছোট, খাবারও নিতে পারি না। জানটা বের হয়ে যায়।’ বলতে বলতে থামেন রানু বেগম। রানু বেগমের কথা শুনে বোঝা যায়, তাঁর কাজটা টেলিফোন অপারেটরের। এ থেকে তিনি যা বেতন পান, তার বেশির ভাগই যাওয়া-আসা করতে খরচ হয়ে যায়। আর অন্ধ মানুষ, এত দূরে যেতে-আসতে পথে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলে মানুষ নানাভাবে হেয় করার চেষ্টা করে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে স্ত্রী ও নিজের শিক্ষাজীবনের নানা পরীক্ষা পাসের সনদগুলো সামনে এগিয়ে দেন মনোয়ার হোসেন। ‘এত কষ্ট কইরা ল্যাখাপড়া করছি, মানুষের কতা শুনছি, তার পরও তো থামি নাই। কিন্তু অখন আমরা কী করতে পারি। কোন কাজ নাই। অর (রানুর) বইন তো আমাদের অনেক দিন থাকতে দিছে। হ্যায়ও আর পারতাছে না। অখন আমাদের মরা ছাড়া কোনো বুদ্দি নাই।’
কথাগুলো বলতে বলতে মনোয়ার হোসেন মাথা নিচু করে চোখ কচলাতে থাকেন আর তাঁদের সন্তান ঐশীকে ডাকতে থাকেন। মা-বাবার এমন কথা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি ঐশী, কিন্তু এটা যে কষ্টের কোনো বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, এটি বোধহয় আঁচ করতে পেরেছে এই অবুঝ শিশুটি। তাই তো তার হাসিমাখা মুখটিতে সহসাই রাজ্যের অন্ধকার এসে নেমেছে।
বাড়ি ভাড়াসহ অন্য সব খরচ বেড়েই চলছে। বোনও যেমন নিরুপায়, তেমনি নিরুপায় রানু ও তাঁর স্বামী মনোয়ার। বাড়ির পাশে ছোট একটি দোকান দিতে পারলে কোনোভাবে চলে যেত এই অভাবের সংসারটি। কিন্তু সে সামর্থ্য কি আর তাঁদের আছে?

তথ্য পাওয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম by মশিউল আলম

গত বছর তথ্য অধিকার আইন বলবৎ হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আইনটি ব্যবহার করে কিছু তথ্য পেতে উদ্যোগী হয়। তথ্য কমিশন সূত্রে জানা গেল, আইনটি প্রয়োগের সর্বপ্রথম উদ্যোগ এটিই। কিন্তু প্রথম বলে নয়, যে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বেলাকে যেতে হয়েছে, তা এককথায় দৃষ্টান্তমূলক। বাংলাদেশে জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার বাস্তবায়নের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হয়ে থাকবে। এ থেকে অনেক কিছু শেখার, অনেক বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ মিলবে।
২০০৯ সালের ১ জুলাই তথ্য অধিকার আইন বলবৎ হয়েছে, বেলা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে একটি চিঠি লিখেছে জুলাইয়ের ৮ তারিখে। রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান স্বাক্ষরিত সে চিঠিতে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পাশে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভবনটি নির্মাণের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্য জানতে চায়। কিন্তু ১৭ আগস্ট পর্যন্ত বেলা সে চিঠির কোনো উত্তর পায়নি। অথচ তথ্য অধিকার আইনের ৯(১) ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তথ্য চাওয়ার তারিখ থেকে ‘অনধিক ২০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করিবেন।’ ৯(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘অনুরোধকৃত তথ্যের সহিত একাধিক তথ্য প্রদান ইউনিট বা কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্টতা থাকিলে অনধিক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উক্ত অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করিতে হইবে।’ ৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো কারণে তথ্য প্রদানে অপারগ হইলে কারণ উল্লেখ করিয়া আবেদনপ্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তিনি উহা অনুরোধকারীকে অবহিত করিবেন।’ অর্থাৎ মোট ৩০ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ১০ দিনের মধ্যে রাজউক থেকে বেলার একটি চিঠি পাওয়া আইন অনুযায়ী অবশ্য-প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তা ঘটেনি। তথ্য প্রদানে অপারগতার কারণ উল্লেখ করে বিষয়টি রাজউকের পক্ষ থেকে বেলাকে জানানো হয়নি। অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনের তথ্য প্রদানসংক্রান্ত ৯ নম্বর ধারার সব উপধারার বিধান এরই মধ্যে লঙ্ঘিত হয়েছে।
প্রথম চিঠি পাঠানোর পর উত্তরের জন্য বেলা অপেক্ষা করেছে ৩৯ দিন। তারপর ১৮ আগস্ট ২০০৯ তারা রাজউককে দ্বিতীয়বার চিঠি লেখে। সে চিঠিতে বেলা তাদের প্রার্থিত তথ্যের কথা আবার উল্লেখ করে এবং তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবারও সেসব তথ্য সরবরাহের অনুরোধ জানায়। বেলা এবার চিঠিটি লেখে রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-৪ বরাবর এবং অনুলিপি পাঠায় রাজউকের চেয়ারম্যান ও প্রধান তথ্য কমিশনারকে। কিন্তু এবারও রাজউক থেকে বেলার কাছে কোনো উত্তর আসে না। এই নীরবতা চলে প্রায় চার মাস। ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯ বেলা আবার রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠায় এবং তাঁকে জানায় যে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও বিজিএমইএ ভবনের নির্মাণসংক্রান্ত কোনো তথ্য বেলার হস্তগত হয়নি। বেলা তৃতীয়বারের মতো রাজউককে একই অনুরোধ জানায়। এবার বেলা আরও একটি তথ্য জানতে চাইল: তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদে রাজউক কাকে নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এবারও বেলা রাজউক থেকে কোনো সাড়া পেল না।
এভাবে ৮ জুলাই ২০০৯ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত অতিক্রান্ত হয় মোট প্রায় পাঁচ মাস। আইন অনুযায়ী যে প্রক্রিয়া নিষ্পন্ন করতে হবে মোট ৩০ দিনের মধ্যে, তা অনিষ্পন্ন রয়ে গেল প্রায় ১৫০ দিন। এবার বেলা আইন অনুযায়ী চিঠি লিখল আইনে উল্লিখিত ‘আপিল কর্তৃপক্ষে’র কাছে: রাজউকের ক্ষেত্রে এটা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এ বছরের ২০ জানুয়ারি বেলা এ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি লিখে তাদের আপিল জানাল। বেলা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখল: ‘...বারবার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও অদ্যাবধি এ সম্পর্কিত কোনো তথ্য বেলার হস্তগত হয়নি।..রাজউক চেয়ারম্যানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে আপনার বরাবর অত্র আপিল আবেদন প্রেরণ করা হলো এবং...রাজউককে নিম্নলিখিত তথ্যগুলি ১৫ দিনের মধ্যে বেলা বরাবর প্রেরণের নির্দেশ প্রদানের জন্য আপনাকে অনুরোধ জানানো হলো...।’ বেলা এই চিঠির একটি করে অনুলিপি প্রধান তথ্য কমিশনার ও রাজউকের চেয়ারম্যানকেও পাঠায়। কিন্তু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছ থেকেও কোনো উত্তর এল না। বেলা অপেক্ষা করল আরও এক মাস। না রাজউক, না গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়—কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই বেলা কোনো উত্তর পেল না।
অতঃপর বেলার সামনে খোলা রইল মাত্র একটি পথ: তথ্য কমিশনের শরণাপন্ন হওয়া। সংক্ষুব্ধ সংস্থাটি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৫ অনুযায়ী তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ নিয়ে হাজির হলো এ বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এটি একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি: বেলা তথ্য কমিশনকে বলতে পারল না যে তারা কিছু তথ্য চেয়ে আবেদন করে সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তাদের বলতে হলো, তারা তথ্য চেয়ে রাজউক বরাবর তিনবার আবেদন জানিয়েছে এবং রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বরাবর একবার আপিল আবেদন করেছে। কিন্তু রাজউক বা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়—কোনো তরফ থেকে কোনো সাড়াই মেলেনি বলে বেলা ধরে নিচ্ছে তাদের তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এটা অদ্ভুত পরিস্থিতি এ কারণে যে, তথ্য অধিকার আইনে বলা হয়েছে: ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো কারণে তথ্য প্রদানে অপারগ হইলে অপারগতার কারণ উল্লেখ করিয়া আবেদনপ্রাপ্তির ১০ (দশ) কার্যদিবসের মধ্যে তিনি উহা অনুরোধকারীকে অবহিত করিবেন।’ [ধারা ৯(৩)] কিন্তু বেলার ক্ষেত্রে যা ঘটল তাকে কী বলে বর্ণনা করা যায় জানি না; কেননা এর কোনো প্রতিকার নেই। আইনেও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি; তথ্য কমিশনও নিজ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি যে কেন বেলার তথ্যপ্রাপ্তির উপর্যুপরি অনুরোধের ব্যাপারে কোনো কিছু বেলাকে অবহিত করা হলো না। জনস্বার্থ মামলার ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান ও যথেষ্ট প্রভাবশালী একটি সংস্থার উপর্যুপরি আবেদনই যদি এভাবে মাসের পর মাস উপেক্ষা করা হয়, কোনো উত্তর দেওয়ারই প্রয়োজন বোধ না করা হয়, তাহলে একজন সাধারণ নাগরিক কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে আবেদন জানালে তার সে আবেদন কতটুকু গুরুত্ব পেতে পারে, তা ভেবে আগে থেকেই হতাশ বোধ হতে পারে।
পরিস্থিতি অদ্ভুত আরও একটি কারণে। বেলা বিজিএমইএর ভবনটি সম্পর্কে রাজউকের কাছে তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। এ আইন অনুযায়ী কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাইতে হলে আবেদন জানাতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর। কিন্তু বেলা যখন রাজউকের কাছে প্রথম আবেদন জানায়, তখন রাজউক তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ করেনি। তৃতীয়বারের চিঠিতে বেলা রাজউকের কাছে তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম জানতে চায়। কিন্তু রাজউক বেলাকে তাও জানায়নি। তথ্য কমিশন বেলার অভিযোগ পাওয়ার পর ১২ এপ্রিল ২০১০ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব বরাবর একটি চিঠি লিখে মন্ত্রণালয়ের জন্য তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তার আপিল কর্তৃপক্ষের নাম, পদবিসহ বিস্তারিত তথ্য ছক আকারে চেয়ে পাঠায়। তথ্য কমিশন কোনো সাড়া না পেয়ে ২৫ মে ২০১০ আবার ভারপ্রাপ্ত সচিবকে একটি চিঠিতে আগের চিঠির কথাগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে লেখে, ‘...আপনার ব্যক্তিগত দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক আপনার মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তার আপিল কর্তৃপক্ষের নাম, পদবিসহ বিস্তারিত তথ্যাদি ছক মোতাবেক পত্রপ্রাপ্তির ৭ (সাত) দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনকে অবহিত করার জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় বেলা কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগটি কমিশন আমলে নিয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।’ তথ্য কমিশনের এই চিঠির অনুলিপি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, রাজউকের চেয়ারম্যান, বেলার নির্বাহী পরিচালক এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছেও পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীর নজরে আনার জন্য তাঁর একান্ত সচিবকে অনুরোধ জানায় তথ্য কমিশন।
কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। মে ও জুন মাস চলে গেল। জুলাইয়ের ২২ তারিখে বেলা রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর আবার একটি চিঠি লিখল, যার বিষয়: ‘নোটিশ অব ডিমান্ড ফর জাস্টিস’। সে চিঠিতে বেলা তার তথ্য চাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সংক্ষেপে স্মরণ করিয়ে দিল এবং শেষে লিখল: ‘...তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৯ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে দাবিকৃত তথ্য প্রদান না করা এবং ধারা ২৪ অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তি না করা আপনার ব্যর্থতার পরিচায়ক। এমতাবস্থায় বেলা দাবিকৃত তথ্যগুলি আগামী ৭ (সাত) দিনের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারী বরাবর প্রদানের দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা প্রহণ করা হবে।’
এরপর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে তাঁদের নাম, পদবি ইত্যাদি তথ্য কমিশনে পাঠায়। কিন্তু বেলা যে তথ্য চেয়েছে, তা সরবরাহ করেনি। তথ্য কমিশন ২৬ জুলাই ২০১০ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও রাজউকের চেয়ারম্যানকে একই চিঠিতে লেখে, ‘বেলার অভিযোগ সম্পর্কে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনকে জানাতে হবে। অন্যথায় তথ্য কমিশনের কাছে বেলার দাখিলকৃত অভিযোগটি আমলে নিয়ে কমিশন পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
তারও প্রায় দুই মাস পর ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১০ বেলা রাজউকের কাছ থেকে বিজিএমইএ ভবনটির নির্মাণ সম্পর্কে প্রার্থিত তথ্যগুলো পেয়েছে। এ সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় যেসব খবর এরই মধ্যে ছাপা হয়েছে, তথ্যগুলো মোটের ওপর সে রকমই। যেমন—নকশা অনুমোদনের আগেই বিজিএমইএ ভবনটি নির্মাণ করা করেছে; হাতিরঝিল লেক উন্নয়ন প্রকল্পের ৫ দশমিক ২৩ কাঠা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; বুয়েটের সমীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভবন নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ অমান্য করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া, নির্মাণাধীন ভবনের নকশাবহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ না নেওয়া বা এ বিষয়ে অঙ্গীকারনামা দাখিল না করা ইত্যাদি।
অবশ্য এসব বিষয় আমাদের এ লেখার আলোচ্য নয়। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি বাস্তবে কতটা দুরূহ এবং কী কী কারণে তা দুরূহ বলে দৃশ্যমান ও প্রতীয়মান হচ্ছে, তা ভেবে দেখা দরকার। নাম প্রকাশ না কারার শর্তে সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিজেএমইএ ভবনটি একটি “স্পর্শকাতর” ভবন। আইন লঙ্ঘন করে, লেকের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত করে ভবনটি নির্মিত হয়েছে—এমন খবর প্রচারিত হলে বহির্বিশ্বে আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হতে পারে; ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’ নাগরিক সমাজের একজন বিশিষ্ট নেতা কথাচ্ছলে সেদিন বললেন, যে ভবনে দু-দুজন প্রধানমন্ত্রীর নামফলক রয়েছে, সেটির নির্মাণে নিয়মকানুন মানা হয়েছে কি না, এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা কে পছন্দ করবে?
রাজউক কর্তৃপক্ষ বেলার চাওয়া তথ্য সরবরাহ করতে দীর্ঘদিন গড়িমসি করেছে কি এসব কারণেই? গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও কী নিষ্ক্রিয় থেকেছে একই কারণে? কিন্তু সরকার যখন জনগণের হাতে গোপনীয়তা ছিন্ন করার একটি আইনি হাতিয়ার তুলে দিয়েছে, তখন কি সব পক্ষেরই জানা থাকার কথা ছিল না যে, কোনোভাবেই বেলার চাওয়া তথ্যগুলো গোপন রাখা সম্ভব নয়? যদি বিজেএমইএ ভবনটি এক বিশেষ ব্যতিক্রমী বিষয়ও হয়ে থাকে, তবু তথ্য অধিকার আইন অনুসরণের যে ঢিলেঢালা প্রবণতা বেলার আবেদনের ক্ষেত্রে লক্ষ করা গেল, তা থেকে সংশয় জাগে: খোদ তথ্য কমিশনসহ আইনটি প্রয়োগের সমুদয় ব্যবস্থা দুর্বল বলে জনমনে প্রতিভাত না হয়।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

ইভ টিজিং বন্ধে আমাদের দায়িত্ব by উম্মে মুসলিমা

সাধারণত কিশোরী বা যুব নারীরা ইভ টিজিংয়ের শিকার হলেও বয়সী ও শিশুরাও এর হাত থেকে রেহাই পায় না। শুধুই কি রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজের সামনে নারীরা ইভ টিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন? ঘরের ভেতরে যে নারীটি গৃহসহকারী তিনি কতখানি নিরাপদ ঘরের পুরুষদের থাবা থেকে? অফিস-আদালতে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর নারী কর্মচারীরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন, সমপর্যায় বা নিম্নপর্যায়ের পুরুষ সহকর্মী দ্বারা প্রতিনিয়তই হয়রানির শিকার। এখনো কর্মক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা নগণ্য। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর নারী কর্মচারীরা নিতান্তই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে চাকরি করেন। নারী কর্মকর্তারা ক্যারিয়ার-সচেতন। ব্যক্তি-পরিবারে সচ্ছলতার প্রয়োজন ব্যতিরেকেও সুশিক্ষিত নারী আত্মপরিচয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে চান, উত্তরোত্তর উন্নতি বা অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন কর্মক্ষেত্রে যোগদানের জন্য নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের এ অনগ্রসর সমাজে একটা চাকরি যেখানে সোনার হরিণ, সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, অশোভন আচরণ বা পেশাগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলেই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে নিম্নপদস্থদের কথা তো বলাই বাহুল্য। মোটা অঙ্কের টাকা-পয়সার বিনিয়োগ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাকরিলাভ অসম্ভব। চাকরি হারানোর ভয়ে এসব নারী নীরবে-নিভৃতে সব ধরনের হয়রানি হজম করে যান। আর না হলে বদলি আতঙ্ক।
কিছুদিন আগে ইভ টিজিং নিয়ে আলোচনার সময় আইনমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন ‘কেন ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানির ঘটনা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে, এর কোনো সামাজিক গবেষণা হয়েছে কি না? সামাজিকভাবে ছেলেমেয়েরা কতটা বিনোদন বা সাংস্কৃতিক বলয় পাচ্ছে, সেটিও খেয়াল রাখা উচিত। একজন অভিযুক্তকে জেলে পাঠিয়ে দিলেই হবে না, তাকে সংশোধনীমূলক ব্যবস্থায় গড়ে তুলতে হবে।’
ইভ টিজিং নিয়ে অনেক সভা, সেমিনার, কর্মশালা, আলোচনা, লেখালেখি, শোভাযাত্রা ইত্যাদি হচ্ছে। কীভাবে এটাকে প্রতিরোধ করা যায়, এর প্রতিকার কী—এ নিয়েই আলোচনা মূলত কেন্দ্রীভূত। একদিন কোনো এক প্রাইভেট চ্যানেলে সংগীত পরিবেশনের সময় আলাপচারিতায় জনপ্রিয় শিল্পী আনুশেহ আনাদিল বলছিলেন—‘কোনো ছেলেকে ইভ টিজিংয়ে উদ্যত হতে দেখলেই টেনে এক চড় কষে দিতে হবে। অথবা স্যান্ডেল খুলে পেটাতে হবে। অপরাধীরা স্বভাবতই ভীরু হয়। সাহসের সঙ্গে ওদের মোকাবিলা করতে হবে’। কিন্তু এ রকম পারে কজন? আবার এ দেশে উল্টোটা ঘটাও অসম্ভব নয়। যে ইভ টিজিং করছে তার দলই ভারী। দল বেঁধে মেয়েটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে কুরুক্ষেত্র ঘটে যাবে। তখন থানা পুলিশে টানাটানি। এবং শেষমেশ মেয়েটিকেই সব অপবাদ মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। ঘরে ফিরেও তাকে শুনতে হবে ‘কী দরকার ছিল এসব নাটক করার? এখন পাড়ায় মুখ দেখানো যাবে?’
আইনমন্ত্রী আসল জায়গাটি চিহ্নিত করতে সচেষ্ট হয়েছেন—ইভ টিজিং কেন? আমাদের গোড়ায় ফিরে যেতে হবে। এর কারণ আর কিছুই নয়—সেই আদি এবং অকৃত্রিম পুরুষতন্ত্র। জন্মের পর মেয়েশিশুটি শিশু থাকে খুব অল্পদিন। সমাজ ও পরিবার তার ভেতর যত দ্রুত সম্ভব নারী হয়ে ওঠার বীজ বপন করতে শুরু করে। মেয়েদের জোরে কথা বলতে নেই, মুখ নিচু করে চলতে হয়, জোরে হাসতে নেই, ঘরের কাজ করতে হয়, সন্ধ্যের আগেই ঘরে ফিরতে হয়, লাজুক হতে হয়, পরের ঘরে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হয়, সাত চড়ে রা না করার সদ্গুণ অর্জন করতে হয় ইত্যাদি। সিমোন দ্য বুভোয়ার তাই বড় আক্ষেপে বলে গেছেন, ‘পিতামাতারা আজও কন্যাদের তাদের বিকাশের জন্য বড় না করে বড় করে বিয়ের জন্য। তারা এর মাঝে এত বেশি সুবিধা দেখতে পায় যে তারা নিজেরাই এটা চাইতে থাকে। এর ফল হচ্ছে যে তারা সাধারণত হয় কম প্রশিক্ষিত, ভাইদের থেকে তাদের ভিত্তি হয় কম দৃঢ়, তারা তাদের পেশায় মন দেয় অনেক কম। এভাবে তারা নিজেদের নষ্ট করে, থেকে যায় নিম্ন স্তরে, হয় নিকৃষ্ট এবং গড়ে ওঠে দুষ্টচক্র: পেশাগত নিকৃষ্টতা তাদের ভেতরে বাড়িয়ে তোলে একটি স্বামী লাভের আকাঙ্ক্ষা।’
প্রকৃতপক্ষে নারী পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। নারীর সকল প্রকার অমর্যাদা, অধস্তনতা, নির্যাতন, পীড়ন, বন্দীদশা ও যাবতীয় দুরবস্থার জন্য পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবই যে দায়ী তা সুশিক্ষিত বিবেকবান মানুষের অস্বীকার করার উপায় নেই। এখনো নারীকে একজন মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিতে পুরুষকুল অপারগ।
সুতরাং, যত দিন না পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবার- সমাজ থেকে দূর হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রে নারী বৈষম্যের শিকার হতেই থাকবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মূল কথাই হলো নারীকে শুধু নির্বোধই ভাবা হয় না, বরং কোনো কঠিন, শ্রমসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য অনুপযোগীও মনে করা হয়।
তাই পরিবারেই জন্ম নেয় ইভ টিজিংয়ের ধারণা। নারীর প্রতি সমাজ ও সংস্কৃতি সৃষ্ট যেসব বিধিনিষেধ আরোপিত সেগুলোই প্রকারান্তরে ইভ টিজিংকে উসকে দেয়। একটা পরিবার যদি বাড়ির ছেলে ও মেয়েটির প্রতি সমান আচরণ প্রদর্শন করে তাহলে কেউ নিজেকে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন এবং কেউ নিজেকে নিম্নপর্যায়ভুক্ত ভাবার সুযোগ পাবে না। আমি পুরুষ, আমিই শ্রেষ্ঠ—এ ধারণা যখন বড়দের আচরণে ছোটদের প্রভাবিত করে তখন কোনো উপদেশ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কাজে লাগে না। হয়তো ছেলে ও মেয়েশিশুর প্রতি স্নেহ-মমতার পার্থক্য নিরূপণ করা যায় না কিন্তু মায়ের প্রতি বাবা বা পরিবারের অন্যদের কর্তৃত্ব ও উৎপীড়ন মেয়েশিশুটির মনে যে গভীর ছাপ ফেলে দেয় তাতে সে নিজেকে মায়েরই সমগোত্রীয় ভাবতে শুরু করে এবং একই সঙ্গে ছেলেশিশুটি বাবার মতো কর্তৃত্বপরায়ণ হতে উৎসাহিত বোধ করে। মেয়েটি ভাবে এ বুঝি পৃথিবীর নিয়ম। কারণ, ছেলেদের মতো আচরণ করতে দেখলে বাড়ির সবাই হা হা করে তেড়ে আসে। জাত গেল। বলে, ‘এসব ছেলের সাজে, তোমার নয়।’ ছেলেটি দেখতে দেখতে বড় হয় যে তার বোনটি একটি নিচু স্তরের জীব। তাহলে দুনিয়ার তাবৎ মেয়েই দ্বিতীয় সারির। আবার যেসব পরিবারে কেবল ছেলে বা কেবল মেয়ে তারা কি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি সদয়? না, তাদেরও আছে সব অনাচার সহ্য করা মুখ বুজে থাকা মা। তাদের আছে বন্ধু, আছে সমাজ, আছে স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কারণ, সহশিক্ষার স্কুলগুলোতেও ছেলে ও মেয়েদের প্রতি শিক্ষকদের আচরণ ভিন্ন। ছেলেরা যে ধরনের খেলা করবে মেয়েরা তা করতে পারবে না। মেয়েদের বুড়িছুটে কোনো ছেলে যোগ দিতে গেলে ‘মেয়েমানুষ’ ‘মেয়েমানুষ’ বলে তাকে নাজেহাল করবে। যেন মেয়েমানুষ হওয়া এক ধরনের পাপ। এসব ছেলেই একটু বড় হয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। কারণ, মেয়েদের সম্মান করার সংস্কৃতি তারা ঘরে বা বাইরে কোথাও পায়নি। মেয়েদের দুর্বল হতে শিক্ষা দেওয়া হয়।
তো মেয়েশিশুকে রান্নাবাটি, লিপস্টিক-নেইলপলিশ, পুতুলবউ দিয়ে কোমল করে গড়ে তোলা আর ছেলেশিশুকে বন্দুক, কলকবজা আর ব্যাটবল দিয়ে মহাপরাক্রমশালী করে তোলারই প্রতিফলন ইভ টিজিং। একটা পরিবারে ছেলেশিশুটি যেদিন দেখবে তার মা, চাচি বা অন্যান্য নারী-পুরুষ সদস্য কর্তৃক প্রদেয় মর্যাদা, সম্মান আর সমানাধিকারের মধ্যে বসবাস করছেন সেদিন তার চোখে বাইরের নারীও সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র আচরণে যতক্ষণ না পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার করছে, ততক্ষণ সভা-সেমিনারে ইভ টিজিং প্রতিরোধে যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, এমনকি আইন প্রণয়ন করেও ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’র প্রবাদমুক্ত হওয়া সম্ভব হবে না।
উম্মে মুসলিমা: লেখক ও গল্পকার।
lima_umme@yahoo.com

বিচার প্রশাসনে প্রহসন by মিজানুর রহমান খান

বিচার প্রশাসনে ঠিক দলীয়করণ চলছে না। চলছে অন্য কিছু। আরও ক্ষতিকর কিছু, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করছে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের ফলে যত বড় সুফল আশা করেছিলাম তা মিলছে না।
এক যুগ্ম জেলা জজ বদলি চেয়েছিলেন। মাদারীপুর থেকে ঢাকায় আসবেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০১ তিনি আবেদন করেন। সেটা পৃথক্করণের আগের কথা।
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, তখনকার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ, তখনকার ডেপুটি স্পিকার। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, তখন পরিবেশমন্ত্রী। আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, তখন বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী। আমির হোসেন, তখন খাদ্যমন্ত্রী। মোহাম্মদ নাসিম, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আবদুর রাজ্জাক, তখন পানিসম্পদমন্ত্রী। মন্ত্রী সাতজন। প্রায় সবাই ডাকসাইটে। সবাই ওই জজকে ঢাকায় আনতে জোরালো সুপারিশ করেন। এই জজ মুক্তিযোদ্ধা। ঘরে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি রাখেন। তাঁর প্রয়াত শ্বশুর আওয়ামী লীগের টিকিটে তিন মেয়াদে সাংসদ। শাশুড়ি আইভি রহমানের সঙ্গে মহিলা সংস্থার সক্রিয় নেত্রী ছিলেন। এ রকম একটি বিরল আবেদন দাখিল হলো। এর পরও আওয়ামী লীগ চার মাস ক্ষমতায় থাকল। কিন্তু ওই জজ বদলি হতে পারলেন না। এতে আমরা প্রমাণ পাই, আওয়ামী লীগপন্থী হলেই কাজ হয় না। আরও কিছু চাই। সেটা না থাকলে ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। এরপর আসে ২০০৬ সাল। একটি বেনামী চিঠি আসে। তাতে ওই জজের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ। দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাব খাটানোর দীর্ঘ ফিরিস্তি। মওদুদ আহমদ আইনমন্ত্রী। ৪ জানুয়ারি ২০০৫ সচিবকে তিনি লিখলেন, রিপোর্ট দিন। ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৫ তাঁর নামে অভিযোগনামা তৈরি হলো। সেখানে শুধু বলা হলো, ‘আপনি বদলির আবেদনপত্রে কয়েকজন মাননীয় মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশ গ্রহণ করেন, যা একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার জন্য অনুচিত।’ ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী বিধি মোতাবেক অসদাচরণের পর্যায়ভুক্ত অপরাধ।
৮ নভেম্বর ২০০৭। আইন মন্ত্রণালয়ের আদেশে লেখা হলো, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে আপনার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মোকদ্দমা করা হয়েছিল। এতে বিভিন্ন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশ প্রকাশ পায়। তবে দুর্নীতির কোনো অপরাধ প্রমাণ হয়নি। সরকার আপনাকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তা অনুমোদন করেননি। তাঁরা ১৯৮৫ সালের আইনের ৪(২)ক বিধি মোতাবেক ভর্ৎসনা প্রদানের জন্য অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ভাগ্যিস সুপ্রিম কোর্ট মাননীয় সুপারিশদাতাদের মান রক্ষা করেছিলেন! এ ঘটনার এখানেই ইতি ঘটে। কিন্তু এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন) খারাপের জন্য তাঁকে পরে অতিরিক্ত জেলা জজ করা হয়নি। ওই জজ ২০০৯ সালে অবসরে যান। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা-পাবলিক সারভেন্টদের বয়সসীমা বৃদ্ধি করেন। মাত্র তিন জজ এর সুবিধা পান। ওই জজ তাঁদের অন্যতম। তিনি তাই চাকরি ফিরে পান। এখন তাঁর আশা, অতিরিক্ত জেলা জজ হবেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আজও ঢাকায় বদলি হতে পারেননি। তাঁর কর্মস্থল এখন নীলফামারী। তাহলে আমরা দেখলাম, কট্টর ‘আওয়ামী লীগার’ হয়েও ঢাকার কর্মস্থল তাঁর জুটল না।
২৮ মার্চ, ২০০৮। ফুলকোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকদের সভা) ৪০ জন অতিরিক্ত জেলা জজকে জেলা জজ পদে উন্নীত করার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। এর মধ্যে অন্তত ১৬ জনের এসিআরে নানা নেতিবাচক মন্তব্য ছিল। যেমন বিচারকাজে অদক্ষতা, পক্ষপাতিত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা সন্তোষজনক না থাকা, জীবনযাত্রার ধরন আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না থাকা ইত্যাদি। কিন্তু এসব তাঁদের পদোন্নতি পেতে বাধা হয়নি।
এর আগে (প্রধান বিচারপতির কাছে প্রথম ১০০ দিনের চাওয়া) লিখেছিলাম, গোটা অধস্তন আদালত তাকিয়ে আছেন ঢাকা জেলা জজ পদে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার দিকে। আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। সরকারের কিংবা আইন মন্ত্রণালয়ের বা মহলবিশেষের পছন্দের লোকই নিয়োগ পেলেন। আমরা অবাক হলাম। কিন্তু কারণ বুঝলাম না। অন্তত ১৯০ জন জেলা জজকে ডিঙানো হলো। সর্বকনিষ্ঠকে নিয়োগের এই ঘটনাকে কী বলা হবে? যোগ্যতম ব্যক্তি বলেই কি? এ যোগ্যতার রূপ ও মানদণ্ড কী? এসিআরে বিরূপ মন্তব্য থাকা ওই ১৬ জনের তিনি ছিলেন অন্যতম। ২০০৮ সালে দেশে জরুরি অবস্থা ছিল। তাঁর পদোন্নতি পেতে অসুবিধা হয়নি। এই জজ ও তাঁর পরিবার ভৈরবে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রপতির পরিবারের সঙ্গে তাঁদের জানাশোনা লোকের জানা। অনেক পাঠক হয়তো ভাববেন, আমরা দলীয়করণ কিংবা পরিবারতন্ত্রের দৃষ্টান্ত খাড়া করছি। এবার মুশকিলে ফেললেন। তাহলে আমাদের যে একটা সদুত্তর পেতেই হবে। ওই বিচারকের চাকরিজীবনের প্রায় অর্ধেক সময় (সাতটি কর্মস্থল) কী করে ঢাকায় কাটল? ২০০৪ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বদলি হন। এর ৯৫ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার পদে যোগ দেন। একটানা পাঁচ বছর ঢাকায় কাটান। ২০০৯ সালে নরসিংদীতে বদলি হন। ৫১ দিনের মাথায় দুদকের মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) হয়ে ফেরেন। কী জাদু। মুক্তিযোদ্ধা ওই বিচারক বেচারা। তিনি আওয়ামী মন্ত্রীদের সুপারিশ জোগাড় করেন, কিন্তু ঢাকায় একটি বদলি জোটে না।
আরেকটি উদাহরণ দিই। ঢাকায় কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ জেলা জজকে (যাঁর অবসর আসন্ন। বিধিমতে, তাঁর বদলি এখন শর্তসাপেক্ষ) খুলনায় বদলির প্রস্তাব করা হয়েছে। ৬ অক্টোবর ২০১০ আইন মন্ত্রণালয়ের ওই প্রস্তাব-সংক্রান্ত চিঠিটি একটি খাসা দলিল বটে। আগের লেখায় বলেছিলাম, একটি বদলি নীতিমালা হোক। ঢাকায় যাঁদের দীর্ঘকাল কেটেছে, তাঁদের বদলি করা হোক। এই মুহূর্তে পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে ঢাকায় থাকা জজের সংখ্যা প্রায় এক ডজন হবে। আসলে কতিপয় চেনামুখের একটি বলয় গড়ে উঠেছে। এঁরা ঘুরেফিরে ঢাকায় থাকেন। সে কারণে ৬ অক্টোবরের চিঠিটির একটি বাক্য আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। এতে লেখা আছে, ‘ঢাকায় তাঁর একটানা প্রায় পাঁচ বছর কর্মকাল হয়েছে। ফলে তাঁকে অন্যত্র বদলি করা আবশ্যক।’ আমরা আশা করব, এতে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়, এর মধ্যে সরকারি নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অন্তত সুপ্রিম কোর্ট সেভাবে নেবেন। সেটা নিতে তাঁরা ব্যর্থ হলে প্রহসন থামানো যাবে না।
আইন মন্ত্রণালয়ের তিন উপসচিব পদে তিন জজকে ‘সততা, যোগ্যতা ও দক্ষতা’ বিবেচনায় বদলির প্রস্তাব করা হয় একই দিনে। এতেও অভিনবত্ব আছে। তবে এটাই হোক প্রকৃত নীতি। এসব হয়তো ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিএ কমিটির বৈঠকে গেছে। প্রধান বিচারপতি জিএ কমিটি পুনর্গঠন করেছেন। হাইকোর্টের তিন বিচারক—আনোয়ারুল হক, এ কে এম ফজলুর রহমান ও হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীকে নিয়ে এই কমিটি হয়েছে। প্রথম দুজন জেলা জজ ছিলেন। তাই অনেকেই কমিটির পয়লা সিদ্ধান্তে বজ্রাহত হয়েছেন। কারণ, এক দিনও কোনো জেলায় জজিয়তি (জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে) করেননি। তেমন ব্যক্তি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হবেন, সেটা গত ২০০ বছরে কেউ কল্পনা করেনি। তা ছাড়া এর আরও মাত্রা আছে। এক অর্থে এটা একটা অভ্যুত্থান। কারণ, ঢাকার জেলা জজ ছিলেন জ্যেষ্ঠ তালিকার শীর্ষে। তিনিই ছিলেন সমিতির সভাপতি। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তাঁকে এক বছর যেতেই সরানো হয়। অথচ যোগ্য বিবেচনায় তাঁকে হাইকোর্টের বিচারক করতে সুপারিশ করেছিলেন প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন।
দুজন জ্যেষ্ঠ বিচারককে ডিঙিয়ে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের আগেই একটি রিট করা হয়েছিল। এতে প্রতিকার চাওয়া হয়, প্রধান বিচারপতি নিয়োগে যাতে জ্যেষ্ঠতা বজায় রাখা হয়। এর শুনানি মুলতবি আছে। আমরা মনে করি, ঢাকা জেলা জজ নিয়োগের বৈধতাও রিটে চ্যালেঞ্জযোগ্য। ওই বিচারকের এসিআরে একাদিক্রমে চার জেলা জজ মন্তব্য করেছিলেন, তাঁর মামলা নিষ্পত্তির হার ‘অপর্যাপ্ত’। আওয়ামী ঘরানার অথচ অধিকতর যোগ্য এবং এসিআরও নিষ্কণ্টক, এ রকম জজ প্রথম জ্যেষ্ঠ ১০০ জনের মধ্যেও ছিল না, সেটা আমরা স্বাভাবিক বলে ভাবতে পারি না। আমরা ভাবতে পারি না, জোট সরকারের আমলে (২০০৬) একজন জেলা জজ (তিনি আবার ওই জজের ভগ্নিপতি) কী করে দূতাবাসে বদলি হন, এখনো বহাল থাকেন? আমরা বুঝতে পারি না, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কেন চিঠি দেয়। সুপ্রিম কোর্ট কী করে তা মেনে (গত অক্টোবর) নেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি পদে এক জেলা জজকে বসান। একজন লিয়েনে জাতিসংঘ মিশনে দুবার গেছেন। তাই বলি, বিচার প্রশাসনে প্রহসন চলছে।
প্রধান বিচারপতির একক ইচ্ছায় জিএ কমিটি হয়। কেবল হাইকোর্ট বিভাগ থেকে এতে বিচারক নেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এই ধারা চলছে। তবে এর মাধ্যমে সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটছে। জিএ কমিটিতে আপিল বিভাগের বিচারক রাখতে হবে। সংখ্যা বাড়াতে হবে। জিএ কমিটি ভেঙে নতুন আঙ্গিকে কোনো কাঠামোর কথাও ভাবা যায়। জরুরি অবস্থায় আমরা প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিনের একটি অত্যাশ্চর্য সংস্কার প্রস্তাবের কথা স্মরণ করতে পারি। তিনি ফুলকোর্টে প্রস্তাব এনেছিলেন, জিএ কমিটির সুপারিশ আর ফুলকোর্টে যাবে না। সেই সুপারিশ প্রধান বিচারপতির কাছেই পেশ করতে হবে এবং তিনিই তা চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করবেন। এ থেকে আমরা গন্ধ পাই। প্রধান বিচারপতিরা জজ নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগের একটা প্রবণতা দেখান। এটি মূলগতভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এটাই আমাদের পেছনে ফেলতে হবে।
১৯৯৬ সালে ফুলকোর্টের একটি সিদ্ধান্ত ছিল। তাতে প্রধান বিচারপতিকে জজ বদলি ইত্যাদি প্রশ্নে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে ফুলকোর্ট সেটা বাতিল করেন। তাঁরা জিএ কমিটিকে সব এখতিয়ার দিয়েছেন। আসলে ওই সিদ্ধান্তও সংবিধানসম্মত হয়নি। কারণ, আপিল বিভাগকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। তবে এখন জিএ কমিটিকে এড়িয়ে কাউকে বদলি করা একেবারেই বেআইনি হবে। সরকারি ইচ্ছায় সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার দপ্তরে অপসারণ ও আগমনী গান বড় বেসুরো ঠেকছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটা লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট কি রণে ভঙ্গ দিলেন? ১১ অক্টোবর ২০০৯ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার মো. শওকত হোসেন (বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারক) আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সেটি জজদের কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাসহ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রদান ও বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের পর সুপ্রিম কোর্ট একটি অবস্থান নিচ্ছিলেন। তাঁরাও প্রয়োজনে কোনো বিচারককে বদলির প্রস্তাব করতে পারবেন। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় তা মানতে রাজি হয়নি। এখানে একটা পরিহাস আছে। আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে থাকা জজ সাহেবরাই সরকারকে (মহলবিশেষ) পরামর্শ দেন যে এসবে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার নেই। আর তাঁরাই যখন সুপ্রিম কোর্টে প্রেষণে আসেন, তখন তাঁরাই উল্টো পরামর্শ দেন। এর মানে হলো, ‘ক্ষমতা, তোমায় বড় ভালোবাসি।’
দুই তরফেই আমরা অবশ্য অস্বচ্ছতা ও অন্যায্যতা দেখেছি। এর বহু প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। তবে আমাদের একটি জায়গায় দাঁড়াতে হবে। আর সেটা হলো, বিচারক নিয়ন্ত্রণের ভরকেন্দ্র একটিই থাকবে। আর সেটা হতে হবে সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত মানে কী, সেটা ঠিক করতে হবে। কোনো ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ, ব্যক্তির মেজাজ-মর্জিনির্ভর কোনো সিদ্ধান্তকে সুপ্রিম কোর্টের বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। আইন মন্ত্রণালয় চাইছে, তারা যখন খুশি যাঁকে ইচ্ছা তাঁকে বদলির প্রস্তাব দেবে। সুপ্রিম কোর্ট রাজি না হলে অগ্রাহ্য করবে। কিন্তু নিজ থেকে বিকল্প প্রস্তাব বা সুপারিশ দিতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্ট ইদানীং সেই ফতোয়া মেনে নিচ্ছেন। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও হুমকির মুখে পড়ছে।
সুপ্রিম কোর্টকে অবশ্যই অধিকতর উন্নত ও স্বচ্ছ প্রস্তাব দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে উপযুক্ত পাঠ দিতে হবে। শুধু সংবিধান ও রায় দেখিয়ে এ ধরনের অধিকারের অসতর্ক কিংবা অন্যায্য অনুশীলন সুফল দেবে বলেও মনে হয় না।
আমরা পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে মাতম দেখছি। অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি অনেক উত্তেজনাকর উক্তি দিচ্ছেন। আমরা শিগগিরই মুদ্রিত অবস্থায় নতুন সংবিধান পাচ্ছি। শুধু আফসোস হলো, সংশোধনীগুলোর সঙ্গে শাসনগত গুণগত মান বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এসব সংশোধনীর আত্মা ও শ্বাসযন্ত্র হলো রাজনীতি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের অন্যতম মৌলিক কাঠামো। সেই স্বাধীনতা বাহাত্তরে মূল সংবিধানেই ন্যুব্জ ছিল। কারণ, বিচার বিভাগ কার্যকরভাবে পৃথক না করে তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। উপরন্তু চতুর্থ সংশোধনীতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো ১১৬ অনুচ্ছেদ। এটা বাহাত্তরের সংবিধানের আদলে (তাহলে সব ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট ফিরে পাবেন) ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা না পাওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘বাদ্যযন্ত্রের দূরবর্তী শব্দ’ হয়েই থাকবে। এটা বিচারপতি মো. আবদুল মতিনের উপমা। ১০ বিচারকের মামলায় তিনি যথার্থ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সে কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলাম। কিন্তু কথায় চিঁড়ে ভেজে না।
বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয়ে আদালত তাঁবে রাখতেই এককাট্টা। অনেকে সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন সচিবালয়ের কথা বলেন। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতিকে সচিবালয় গঠনের তাগিদ দিয়েছিলেন। সেই বিষয়ে বঙ্গভবন থেকে একটি পত্র পাঠানো হয় আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ে। সেটি ফিতাবন্দী হয়ে থাকার কথা, থাকছেও তা-ই।
একটি বিকল্প বলি। একটু নাটকীয় বটে। এত নাটকীয়তার মধ্যে বলতে দোষ কী! মাসদার হোসেন মামলার শুনানি কিন্তু এখনো চলমান। এখানে একটি সম্প্রসারিত বিচারিক উদ্যোগ হতে পারে। আদালতের স্বাধীনতায় সরব আইনজীবীদের কমতি নেই! তাঁদের বক্তব্য শুনে বর্তমান ১১৬ অনুচ্ছেদকে (যা দিয়ে সরকার নিম্ন আদালতের হাত মোচড়ায়) সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী ঘোষণা করা সম্ভব মনে করি। এবং সেই রায়েই বলে দেওয়া যায়, বাহাত্তরের সংবিধানে মূল ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনরুজ্জীবিত হলো। সংসদের দরকার নেই। বিজি প্রেস থেকে ছেপে নিলেই হলো। আহা এমন যদি হতো!
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

শিশুদের জন্য শিশুপার্ক

শিশুপার্কগুলো যে আর শিশুদের নেই তা এই নগরবাসীর অজানা নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট হলো যে তিনি নিজেও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। তিনি রাজধানী ঢাকার বেদখল হয়ে যাওয়া সব শিশুপার্ক উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনার জন্য তাঁকে সাধুবাদ জানাই। তবে নির্দেশনার যথাযথ বাস্তবায়নের বিষয়টিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বেদখল হয়ে যাওয়া শিশুপার্ক উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের খবর যেদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সেদিনই প্রথম আলো পত্রিকায় দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারে ওয়াসার ব্যর্থতার খবর ছাপা হয়েছে। এ মাসের মধ্যেই ঢাকার ছয়টি খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা ছিল ঢাকা ওয়াসার। গত সোমবার মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে তা না করেই ফিরে আসতে হয়েছে ওয়াসাকে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংগঠন তাদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত জায়গা ছাড়তে অস্বীকার করায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে হয়েছে। কোনো কিছু বেদখল হয়ে গেলে তা উদ্ধার করা সব সময়ই কঠিন। রামচন্দ্রপুর খালে ওয়াসা উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হওয়ায় এই বিষয়টি আবার স্পষ্ট হলো।
বেদখল হয়ে যাওয়ার পর দখলমুক্ত করার চেয়ে সরকারি কোনো সম্পত্তি যাতে কেউ দখল করতে না পারে, সেদিকে অব্যাহত নজরদারির বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করেও তা ধরে রাখা যাবে না। নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষাসংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স অক্টোবর মাসের মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের ছয়টি খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদের জন্য ঢাকা ওয়াসাকে নির্দেশ দিয়েছে। কাজটি সফলভাবে ঢাকা ওয়াসা করতে পারলেও দুদিন পর যে আবার অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠবে না তার নিশ্চয়তা কী?
শিশুপার্কগুলো দখলমুক্ত করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশ দিয়েছেন, সে ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রথমত, বেদখল হয়ে যাওয়া শিশুপার্কগুলো দখলমুক্ত করার কাজটি সহজ নয়। সে ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থান ও আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে শিশুপার্ক দখলমুক্ত করার বিষয়টি যাতে সাময়িক একটি বিষয়ে পরিণত না হয় এবং কেউ যাতে আবার দখল করে নিতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শিশুপার্কগুলো দখলমুক্ত করার যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা কার্যকরভাবে পালিত হবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

তেল নিয়ে তেলেসমাতি -সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি

ভোজ্যতেল দুর্লভ না হলেও দুর্মূল্য হয়ে উঠেছে। বাঙালির পক্ষে তেল ছাড়া কোনো ভোজন, আহার বা খাওয়া সম্ভব নয়। সয়াবিন ও পাম তেল চাল-ডাল-লবণের মতোই নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কিন্তু দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে নিত্যই যা প্রয়োজন, সেই তেল কিনতে তুমুল পেরেশানির মধ্যে পড়তে হচ্ছে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষকে।
মঙ্গলবারের প্রথম আলোর প্রধান প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, তেলের দাম বাড়ছে অযৌক্তিকভাবে। সরকারের ট্যারিফ কমিশন অনুসন্ধান চালিয়ে দেখিয়েছে, লাভসহ সব খরচ ধরেও লিটারপ্রতি দাম ১০ থেকে ১২ টাকা বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। গত এক বছরে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা ২১ ও ৩৭ টাকা। এ নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক কথা বলা হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ অবধি কোনো সুরাহা করতে পারেনি। কিন্তু এই ফাঁকে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে শত শত কোটি টাকা।
সমস্যার দায় কেউ স্বীকার করতে চাইছেন না। আমদানিকারকেরা দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার দোহাই, পাইকারেরা বলছেন খুচরা বিক্রেতাদের কথা আর খুচরা বিক্রেতারা দোষ দিচ্ছেন পাইকারদের। কিন্তু প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিন তরফই কমবেশি দায়ী। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় স্থানীয় বাজারে দাম ১০-১২ টাকা বেশি। পাইকারদের সঙ্গে যোগসাজশে ডিও ব্যবস্থার সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরাও দাম বাড়াচ্ছেন। দেখাদেখি খুচরা বিক্রেতারাও মুনাফার ভাগ বাড়িয়ে রাখতে পিছপা হচ্ছেন না। এই ত্রিমুখী চাপে সাধারণ ক্রেতারা জেরবার।
সমস্যার প্রতিকারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকাতে ডিও প্রথা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিও প্রথার মাধ্যমে উৎপাদকের কাছ থেকে পাইকার হয়ে বাজারে আসতে আসতে তেলের দাম কয়েক দফা বেড়ে যায়। এটি বন্ধ করা গেলে সুফল আসবে। ব্যবসায়ীরাও এর বিপক্ষে নন। কিন্তু এটি এমনভাবে করতে হবে, যাতে বাজারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না পড়ে। দ্বিতীয়ত, আমদানিমূল্যের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের অযৌক্তিক ব্যবধানের জন্য ডিও ছাড়া অন্য কিছু কারণও দায়ী। তাই আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। দুঃখজনক যে, দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যতটা গর্জাচ্ছে, ততটা বর্ষাচ্ছে না। সরষের মধ্যেই ভূত থাকলে তা দিয়ে দাম বাড়ানোর ভূত তাড়ানো সম্ভব হবে না। বাণিজ্যমন্ত্রী একটি চক্রের প্রভাবের কথা বলেছেন, কিন্তু সেই চক্রকে নিয়ন্ত্রণের দায় তো স্বয়ং তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রণালয়েরই।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারকে স্বয়ংক্রিয় ভাবার অন্ধ বিশ্বাস প্রচলিত। কিন্তু বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে, দাম বাড়ানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী বাণিজ্যিক অপশক্তি নিয়ন্ত্রণে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। গত বছর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যানও সেটাই দেখিয়েছেন। বাজারকে অতিমুনাফাকামী অপশক্তির হাত থেকে মুক্ত রাখতে সরকারি হস্তক্ষেপের বিকল্প নেই। বাংলাদেশেও দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া বৃদ্ধি থামাতে সেই সরকারি হস্তক্ষেপ এখন খুবই প্রয়োজন।

ইরাকে পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে বোমা হামলা নিহত ৮

ইরাকের তিকরিতে পুলিশের এক কর্মকর্তার বাড়িতে গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে বোমা হামলায় আটজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছে। হামলার সময় তারা ঘুমিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে দুই বছরের এক শিশু রয়েছে। পুলিশ এ কথা জানায়।
পুলিশের বিশেষ বাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাইস রশিদের বাড়িতে গতকাল রাত তিনটার দিকে এ বোমা হামলা চালানো হয়।

পশ্চিবঙ্গে আলিগড়ের ক্যাম্পাসের অনুমোদন

পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় ভারতের ঐতিহ্যবাহী আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা দেবীসিং পাতিল। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ এবং কেরালার মালাপ্পুরমে এই ক্যাম্পাস গড়া হবে।
বৃহস্পতিবার আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক পি কে আবদুল আজিজ এই খবর দিয়ে বলেছেন, চলতি শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই দুটি ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম শুরু হবে।

মেক্সিকোতে শতাধিক টন গাঁজা আটক

মেক্সিকোর সেনাবাহিনী গত সোমবার দেশটির টিজুয়ানা শহরে অভিযান চালিয়ে ১০৫ টনেরও বেশি গাঁজা আটক করেছে। এগুলোর মূল্য ৩৫ কোটি ডলার। দেশটির সেনাবাহিনী এ তথ্য জানায়।
সেনাবাহিনী জানায়, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর সীমান্তবর্তী টিজুয়ানা শহরের কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ওই গাঁজা আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ১০ হাজার বাদামি ও রুপালি রঙের প্যাকেটে করে গাঁজাগুলো রাখা হয়েছিল। কয়েক মাসে মেক্সিকোর বিভিন্ন স্থান থেকে এসব গাঁজা সংগ্রহ করা হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ১১ মাদকব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে।
গত বছর মেক্সিকোর সেনাবাহিনী দুই হাজার ১০৫ টন গাঁজা আটক করেছিল। মেক্সিকো বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাঁজা রপ্তানিকারক দেশ। গাঁজা বিক্রি করে মেক্সিকোর মাদকব্যবসায়ীরা শত শত কোটি ডলার আয় করে থাকেন।

চীনের কয়লাখনিতে আটকে পড়া সব শ্রমিকের মৃত্যু

চীনের কয়লাখনিতে বিস্ফোরণের ঘটনায় আটকে পড়া ৩৭ জন শ্রমিকের সবাই মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সর্বশেষ পাঁচ শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। সে দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ কথা জানায়।
গত শনিবার হেনান প্রদেশের ইউঝু শহরে কয়লাখনিতে গ্যাস বিস্ফোরণের পর ২৩৯ জন শ্রমিক নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারলেও বাকি ৩৭ জন আটকে পড়েন। এর পর থেকে ৩০০ উদ্ধারকর্মী তাঁদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন।
আটকে পড়া শ্রমিকদের মধ্যে ২৬ জনের মৃত্যুর খবর জানা গেলেও ১১ জনের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। চায়না ডেইলি গত সোমবার এক প্রতিবেদনে জানায়, ওই ১১ জন শ্রমিকও মারা গেছেন। ২০০৮ সালেও ওই খনিতে গ্যাস বিস্ফোরণে ২৩ জনের মৃত্যু হয় বলে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে।
নিরাপত্তাহীনতার কারণে চীনের খনিগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে স্বীকৃত। গত বছর দেশটিতে খনি-দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৬০০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
এ বছর চীন সরকার এক হাজারের বেশি অবৈধ খনি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে চীন তাদের খনিশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীনের খনিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই অভিবাসী শ্রমিক।

আফগান যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করতে চান প্রিন্স উইলিয়াম

ছোট ভাই হ্যারির পর এবার আফগান রণাঙ্গনে গিয়ে কাজ করতে চান ব্রিটেনের সিংহাসনের দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম। এ ব্যাপারে তিনি সংকল্পবদ্ধ। গতকাল মঙ্গলবার একটি তথ্যচিত্রে তাঁর এই ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা হয়।
কয়েক সপ্তাহ আগে ২৮ বছর বয়সী প্রিন্স উইলিয়াম ব্রিটেনের রয়্যাল এয়ারফোর্সের সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কো-পাইলট হিসেবে প্রথম দায়িত্ব পালন করেন।
এ বছরের শুরুতে উইলিয়ামের বতসোয়ানা সফরের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রে তিনি বলেন, তাঁর ইচ্ছা আফগানিস্তানে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা। সেখানে ব্রিটেনের প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে। ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে তারা তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়ছে।
২০০৮ সালে উইলিয়ামের ছোট ভাই প্রিন্স হ্যারি (২৬) আফগানিস্তানে ১০ সপ্তাহ থেকে সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন। পরে হ্যারির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ব্রিটেনের হাউসহোল্ড ক্যাভালরি রেজিমেন্টের একজন কর্মকর্তা হিসেবে আফগানিস্তানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে চান উইলিয়াম। এই রেজিমেন্টের কিছু ইউনিটের সেনারা এখন আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করছে। স্কাই ওয়ান টেলিভিশনের জন্য নির্মিত তথ্যচিত্রে উইলিয়াম বলেন, ‘আমার মন পড়ে আছে সেনাবাহিনীতে। কাজেই আমি প্রথমে সেখানে যোগ দিতে চাই। আমার একটি আফসোস, এখনো আফগানিস্তানে যেতে পারিনি।’
২০০১ সালে আফগানিস্তানে জোট বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে এ পর্যন্ত ৩৪০ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছে।

ন্যাটোর ট্যাংকারে ফের আগুন

পাকিস্তানে গতকাল মঙ্গলবার বন্দুকধারী ব্যক্তিরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর দুটি ট্যাংকার জ্বালিয়ে দিয়েছে। বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজধানী কোয়েটার ১৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ওই ঘটনা ঘটে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানে ন্যাটোর ট্যাংকারে এটি দ্বিতীয় হামলা।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দাস্ত বাদো শহরে দুজন বন্দুকধারী ব্যক্তি প্রথমে ন্যাটোর দুটি ট্যাংকার থামিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর তারা ট্যাংকারে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে একটি মোটরসাইকেলে করে তারা পালিয়ে যায়। এর আগে সোমবার বেলুচিস্তান প্রদেশে ন্যাটোর তিনটি ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়।
সপ্তাহখানেক আগে পাকিস্তান ১১ দিন বন্ধ রাখার পর দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার প্রদেশের তোরখাম সীমান্ত পথটি ন্যাটোর চলাচলের জন্য খুলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার পর ওই পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

সিয়াওবোকে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি

এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী চীনের কারাবন্দী মানবাধিকারকর্মী লিউ সিয়াওবোর সঙ্গে তাঁর ভাইকে দেখা করতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ। হংকংভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংগঠন গতকাল মঙ্গলবার এ কথা জানায়।
ইনফরমেশন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি জানায়, কারাগারের একটি কক্ষে অন্য পাঁচজনের সঙ্গে বন্দী সিয়াওবোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর ভাই লিউ সিয়াওগুয়াং। সিয়াওবোর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। মুক্তি দেওয়া না হলে অন্তত তাঁকে বেইজিংয়ের কোনো ভালো কারাগারে স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছেন সিয়াওগুয়াং।
মানবাধিকার সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘লিউ সিয়াওগুয়াং আমাদের জানিয়েছেন, চলতি মাসেই তিনি কারাগারে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁকে অনুমতি দেয়নি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের জিনঝু কারাগারে বন্দী আছেন সিয়াওবো। সেখানকার বন্দীদের সঙ্গে প্রতি মাসে নিকটস্থ আত্মীয়দের প্রত্যেককে একবার দেখা করতে দেওয়া হয়। কাজেই সিয়াওবোর সঙ্গে তাঁর ভাইকে দেখা করতে না দেওয়া নিয়ম-নীতির লঙ্ঘন।’
মানবাধিকার সংগঠনটি আরও জানায়, লিউ সিয়াওগুয়াং সর্বশেষ তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন গত জুলাই মাসে। তাঁদের ৮২ বছর বয়সী বাবা খুবই অসুস্থ। সিয়াওবোকে মুক্তি দেওয়া না হলে তিনি ছেলের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।
সিয়াওবোর স্ত্রীও বেইজিংয়ে কারাবন্দী আছেন। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার দুই দিন পর ১০ অক্টোবর তিনি স্বামীর সঙ্গে দেখা করেন।

লাদেনের পাকিস্তানে থাকার খবর নাকচ করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায় আরামে বাস করছেন বলে প্রকাশিত খবরের সত্যতা নাকচ করেছে পাকিস্তান। গত সোমবার ন্যাটোর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন বার্তা সংস্থা সিএনএনের ওয়েবসাইটে খবরটি প্রকাশিত হয়।
একই দিন খবরটির সত্যতা নাকচ করে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিক বলেন, ‘ওসামা বিন লাদেন বা আল-কায়েদার দ্বিতীয় প্রধান আইমান আল জাওয়াহিরি বা মোল্লা ওমর পাকিস্তানে রয়েছেন বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, আমি জোরালোভাবে তা নাকচ করছি।’ তিনি বলেন, ‘লাদেনসহ সব সন্ত্রাসী ইসলাম ও পাকিস্তানবিরোধী। ভাড়াটে খুনি তারা। তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য পেলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সিএনএনের এই খবরকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের গায়ে কলঙ্ক লেপনের জন্য খবরটি রটানো হয়েছে।

অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে যাচ্ছেন না ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আসন্ন ভারত সফরের সময় পাঞ্জাবের অমৃতসরে যাবেন না বলে জানানো হয়েছে। ভারতের ওয়াকিবহাল একটি সূত্র এ তথ্য জানায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
আগামী ৬ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফর শুরুর কথা রয়েছে। এই সফরে অমৃতসরে স্বর্ণমন্দির পরিদর্শনের কথা ছিল প্রেসিডেন্ট ওবামার।
‘উপকরণগত’ কারণে প্রেসিডেন্ট ওবামা অমৃতসরে যাবেন না বলে জানানো হয়েছে। তবে সেই কারণ সম্পর্কে আর বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফর সামনে রেখে গত মাসে হোয়াইট হাউসের একটি দল সে দেশ সফর করে। অমৃতসরে স্বর্ণমন্দির পরিদর্শনের সময় প্রেসিডেন্ট মাথা ঢাকার জন্য কী ব্যবহার করবেন—এমন প্রশ্ন করা হয় ওই দলকে। পরে ওই দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বর্ণমন্দির পরিদর্শনের সময় ঐতিহ্যবাহী রুমাল দিয়ে মাথা ঢাকবেন না। এতে তাঁকে মুসলমানের মতো দেখা যাবে। তাঁরা এটা এড়াতে চাইছেন।
উল্লেখ্য, স্বর্ণমন্দির পরিদর্শনের সময় সবাইকে রুমাল দিয়ে মাথা ঢেকে নিতে হয়। এটা ওই মন্দিরের অনেক পুরোনো একটি রীতি।

চেচেন পার্লামেন্টে জঙ্গি হামলা নিরাপত্তারক্ষীসহ নিহত ৮

রাশিয়ার চেচনিয়া প্রজাতন্ত্রের পার্লামেন্টে গতকাল মঙ্গলবার জঙ্গিদের হামলায় নিরাপত্তারক্ষীসহ চারজন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। নিরাপত্তারক্ষীদের গুলি ও আত্মঘাতী বোমায় হামলাকারী চার জঙ্গিও নিহত হয়।
রাজধানী গ্রোজনিতে পার্লামেন্ট ভবনে গতকাল খুব সকালের দিকে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে স্পিকারসহ অনেককে জিম্মি করে ফেলে। ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিযান চালিয়ে জিম্মিদের মুক্ত করে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় জঙ্গিদের চারজনের সবাই এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিন নিরাপত্তারক্ষী ও পার্লামেন্টের এক কর্মকর্তা নিহত হন।
পার্লামেন্টের মুখপাত্র জেলিম ইয়াখিখানভ বলেন, ‘পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে তারা (জঙ্গিরা) আমাদের জিম্মি করতে চাইছে। আমরা পার্লামেন্টের তৃতীয় তলায় আশ্রয় নিই। অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম।’
চেচনিয়ার নেতা রমজান কাদিরভ রাশিয়ার বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সকে জানান, প্রায় ২০ মিনিটের অভিযানে জিম্মিদের উদ্ধার করে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি বলেন, জিম্মিদের সবাইকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে নিরাপদে পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, স্পিকার দুকুভাখা আবদুরাখমানভকে সশস্ত্র নিরাপত্তা গাড়িতে করে পার্লামেন্টের বাইরে নিয়ে আসা হয়। তিনি অক্ষত আছেন। বার্তা সংস্থাটি আরও জানায়, ঘটনার সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয় দুই জঙ্গি এবং অন্যরা নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে মারা যায়।
রাশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রশিদ নুরগালিয়েভ গতকাল চেচনিয়া সফরে ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধারের ঘটনাকে সাফল্য হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, চেচনিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় খুবই দক্ষতার সঙ্গে এই উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন করেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে নর্দার্ন ককেসাস অঞ্চলে একের পর এক বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাশিয়াকে। চেচনিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ করেছে রুশ বাহিনী। এরপর ১৯৯৯ সালে আবারও যুদ্ধ শুরু হয় চেচনিয়ায়। বিদ্রোহীরা সেখানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এরপর এক দশক সেখানে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান চালায় রাশিয়া। গত বছরের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা এ অভিযান শেষ করে।
কাদিরভের নেতৃত্বে বিগত সময়ে চেচনিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়। অবশ্য এর মধ্যেও সেখানে প্রায়ই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্স ও জার্মান নেতার সঙ্গে মেদভেদেভের আলোচনা
ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি ও জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ। ফরাসি ও জার্মান নেতার সঙ্গে এই আলোচনার সময় চেচনিয়ায় হামলার খবর জানতে পারেন মেদভেদেভ। তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। পরে একটি সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল।

কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চায় হুররিয়াত

কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে এবার তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চাইছে জম্মু ও কাশ্মীরের সর্বদলীয় হুররিয়াত কনফারেন্সের নেতা-কর্মীরা। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে গত সোমবার থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানান হুররিয়াত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান মিরওয়াইজ ওমর ফারুক।
এ দিকে কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে গতকাল মঙ্গলবার আহত এক জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সেনাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে তিনি আহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। একই দিন শ্রীনগরে একজন কট্টরপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মাসরাত আলম নামের এই নেতা চলমান ভারতবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলে পুলিশ জানায়।
গত রোববার হুররিয়াত কনফারেন্সের সাধারণ সভায় কাশ্মীরের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভায় সবাই একমত হয়েছেন যে কাশ্মীর নিয়ে সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে ভারত ও পাকিস্তান ব্যর্থ হওয়ায় তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চাইবেন।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফরে আসার আগে তাঁরা এ ব্যাপারে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শেষ করবেন। ওমর ফারুক বলেন, জন্মু ও কাশ্মীরের জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এই সমস্যা সমাধানে দুই দেশ ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ লাগবে। তাঁর মতে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ বাধলে তা বিশ্বের শান্তি নষ্ট করবে।
হুররিয়াতের চেয়ারম্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বিশ্বের অনেক গোলযোগপূর্ণ এলাকায় প্রতিনিধি পাঠিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, তাই কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও তারা প্রতিনিধি নিয়োগ করুক।
হুররিয়াতের পক্ষ থেকে ২৭ অক্টোবরকে কালো দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৯৪৭ সালের এই দিনে কাশ্মীরে প্রথম সেনাবাহিনী প্রবেশ করে। ওই দিন জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে বন্ধ্ পালনেরও ডাক দিয়েছে তারা।
এ দিকে পুলিশ জানায়, উত্তরাঞ্চলীয় বান্দিপোড়া জেলায় সোমবারের বন্দুকযুদ্ধে আহত ওই জঙ্গি একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেন। তবে সেনারা ওই মসজিদে অভিযান চালায়নি বা সেখানে গুলিবিনিময়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। মসজিদে অবস্থানকালে রক্তক্ষরণে জঙ্গি মারা যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারতবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মাসরাতকে গ্রেপ্তারে আমরা সফল হয়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে।’

রম্য গল্প- 'তুচ্ছ ঘটনা' by মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

রমজানের শেষের দিকে বাজার যেমন গরম হয়ে ওঠে; তেমিন মানুষের মাথাও থাকে গরম। তুচ্ছ বিষয় নিয়েও ঘটে যায় সাংঘাতিক হৈচৈ। সংযমের মাসের এ সময়টিতে সংযম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
শহরের মানুষ সব সময়ই ব্যস্ত। রমজানে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার কারণে ব্যস্ততা আরো বেশি। তবু তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র্র করে জটলা পাকিয়ে তামাশা দেখার লোকের অভাব নেই শহরে।

গল্প- 'নদী কত দূর' by অজিত হরি সাহু, অনুবাদ- হোসেন মাহমুদ

একটি বালক এবং নদীর মধ্যে দণ্ডায়মান ছিল একটি পর্বত। বালকটির বয়স ছিল কম, নদীটি ছিল ছোট, কিন্তু পর্বতটি ছিল বিরাট।  ঘন জঙ্গলে ঢাকা পর্বতটি নদীকে আড়াল করে রেখেছিল। কিন্তু বালকটি জানতো যে নদীটি সেখানে আছে এবং কোথায় আছে, দেখতেই বা কেমন। সে নিজের চোখে নদীটি দেখেনিÑ কিন্তু গ্রামের মানুষদের কাছে নদীটির কথা সে এত বেশি শুনেছিল যে তার মনের ভেতর একটি সুস্পষ্ট ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল। নদীতে মাছ আছে, পাথর আছে, স্রোত আছে আর স্রোতের ঘূর্ণি আছে। আসলেই নদীটি সম্পর্কে জানতে তার কিছুই বাকি ছিল না শুধু বাকি ছিল নদীর পানি স্পর্শ করা এবং নিজের চোখে দেখা।

গল্প- 'নতুন জীবনের গল্প' by মুহিব্বুর রহমান রাফে

জ্যামের মধ্যে বাসে বসে থাকাটা যে কী বিরক্তিকর! অসহ্য গরম। আষাঢের মাঝামাঝি চলছে অথচ আকাশ ফকফকা। বৃষ্টির নাম নিশানাও নেই। জামাটা ঘামে ভিজে জবজব করছে। এর মাঝে আবার জামার মধ্যে কী যেন একটা ঢুকে কুটকুট করছে। হাত ঘুরিয়ে যে বের করার চেষ্টা করবে তারও জো নেই। বাস ভর্তি মানুষের নিঃশ্বাসগুলো এক হয়ে যেন অক্সিজেনগুলোকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতে চাইছে।
মুড়ির মতো গাদাগাদি করে ভর্তি বাসটির সামনের সিটে বসে আছে মানিক। সিটে বসেও স্তস্তি নেই। সামনের লোকগুলো বারবার এসে তার গায়ের ওপর পড়ছে। একদম গা ঘেঁষে একজন বৃদ্ধ লোক, বোঝাই যাচ্ছে গরমে কাহিল হয়ে পড়েছেন। যখনই কোন মোড়ে এসে বাস থামছে, লোক ওঠানামা করছে, সে এসে প্রতিবারই মানিকের গায়ের ওপর পড়ছে। মানিক যারপরনাই বিরক্ত।

গল্প- 'বুবুর জন্য' by জুবায়ের হুসাইন

হঠাৎ করে আকাশটা কেমন জানি মেঘলা হয়ে উঠল। পড়ন্ত বিকেলের রক্তিম আভা কেবল চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। একটু পর সন্ধ্যা নামবে।
কিছুক্ষণ আগেও আকাশটা জুড়ে টুকরো টুকরো সাদা মেঘেরা উড়ে চলছিল পেঁজা তুলোর মতো। গলার মালা তৈরি করে কয়েকটা পাখিও উড়ে গেছে, দেখেছে ও। মিলন বলেছে ওগুলো গাঙচিল। দিনের শেষে নীড়ে ফিরছে।

গল্প- 'দ্বীপ রহস্য-০০১' by হারুন ইবনে শাহাদাত

এক.
‘ওখানে কী ঘটেছে? ওরা কাঁদছে কেন?’ জিয়াদ ওর বন্ধুদের নিয়ে ঘটনার উৎসের দিকে এগিয়ে যায়।
: কান্নাকাটি করছেন কেন? কী হয়েছে?
: আমার ছেলেকে সাগর গ্রাস করেছে।
: ‘সাগরে ডুবে মরেছে?’ জিয়াদ জানতে চায় না।
: তা তো জানি না? সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি।
: ‘বাবা, গতকাল থেকে আমার ছেলেটিকেও খোঁজে পাচ্ছি না।’ ভিড় ঠেলে কান্নাজড়িত গলায় আরেকজন বলেন।
: ‘মানে কী বলছেন?’ চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করে জিয়াদ।

গল্প- 'নীয়নের মোবাইল পকেট' by ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

আবছা ভোরে ঘুম ভেঙে যায় নীয়নের। এখনও ভালো করে সকাল হয়নি।
জানালার পরদা সরে গেছে অনেকখানি। নকশা করা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে নীয়ন দেখতে পায় আমলকী, নারকেল, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা গাছগুলোতে ছোট ছোট পাখি উড়ছে। আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি। এক ফালি মেঘলা আকাশকে দেখতে পায় নীয়ন। এ সময় মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামে, কখনও আষাঢ়ের বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ে। দারুণ লাগে নীয়নের।
ভাবতে ভাবতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে। বুকের ভেতরটা আনন্দে দুলে ওঠে ওর।
ভীষণ খুশির দিন। আজ শুক্রবার, ছুটি-ছুটি-ছুটি। দুই অক্ষরের শব্দটি ভেজা ভেজা এই ভোরকে আরও সুন্দর করে তোলে।
স্কুল নেই, আব্বুর অফিস নেই, আম্মু কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ান, দু’দিন তারও ছুটি। তাই বাড়িতে কোন ছুটোছুটি নেই, ঢিমে তেতালায় চলে।

গল্প- 'শুভরা জানতে চায়' by জুবাইদা গুলশান আরা

আমি ছেলেটাকে দেখেছি সেই ছোট্টবেলায়। ঐ যে, যখন বড়রা খাওয়া-দাওয়া সেরে ভাত-ঘুম দেয়। আর আমার মতো উড়নচণ্ডী ছোট্ট দস্যি ছেলে-মেয়েরা ডিঙি মারতে বেরোয়, সেই সময়ে। অর্থাৎ ঠিক দুপুর বেলা। আমি তখন অঙ্ক নিয়ে হিসাব করছি কিন্তু অঙ্কটা ভারী বেয়াড়া। কিছুতেই মিলছে না। কী যে করি! দুপুর বেলার রোদ্দুরে মজা করে পায়ের বুড়ো আঙুলে ঢিল ঠেলে ঠেলে ধুলো ওড়ানো, অথবা ঠ্যাংভাঙা বিড়ালছানাকে ভয় দেখানো, কোনোটাই ভাল মতো হচ্ছে না! পেন্সিলটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জানালার গ্রিলের সামনে দাঁড়াই। তখন দেখি ছেলেটা আমার জানালার বাইরে, একটা ঘুড়িকে রেলিংয়ের ভেতর থেকে টেনে বের করার চেষ্টায় ব্যস্ত। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে বলিÑ এই তুই কেরে? ও মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে ঘুড়িটা ঢুইক্যা গেছে। বাইর করতে পারতাছি না। আমি বলিÑ দাঁড়া আমি এদিক থেকে আস্তে করে বের করে দিই।
বেশ খানিকটা কসরৎ করে শেষ অবধি দুই জন মিলে লাল। সাদায় মেশা ঘুড্ডিটাকে বের করে গ্রিলে বাইরে ছেড়ে দিই। মুখ ভরে হেসে ওঠে ও। তারপর ঘুড়ি লাটাই সামলে এক লাফে নেমে যায়। বলে, যাই গা।

গল্প- 'জোড়া ঘোড়া' by মাখরাজ খান

জমিদার আর প্রজার ঘোড়া। মাঠে তাদের কথাবার্তা হয়। কথা বলতে বলতে বন্ধুত্ব। একবার কথা বলতে শুরু করলে যেন আর শেষ হতে চায় না। তারা কথা বলতেই থাকে সুখ-দুঃখের কথা, ভালো লাগা-মন্দ লাগার কথা। হঠাৎ একদিন জমিদারের ঘোড়ার মনে হয়, কার সাথে কথা বলছি, কার সাথে বন্ধুত্বের জুড় বেঁধেছি। ও কি আমার সমান, ও তো সাধারণ জাতের একটা ঘোড়া, যার না আছে মান ইজ্জত, না আছে ভাল থাকার জায়গা। মাঠে আর কোনো ঘোড়া নেই বলে ওর সাথে কথা বলেছি। তাই বলে কি ও আমার বন্ধু হয়ে গেছে, আমার বন্ধু হতে পারে অন্য কোনো জমিদারের ঘোড়া। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একদিন প্রজার ঘোড়ার কাছে বলেই ফেললো
দেখ, তোমার মনিব যেমন সাধারণ মানুষ আর তুমিও তেমনি সাধারণ ঘোড়া। আমার মনিব জমিদার। তিনি আমাকে চিনির শরবত খাওয়ান, ছোলা খাওয়ান।