Wednesday, June 30, 2010

ডলুরার সেই পবিত্রভূমি by মৃত্যুঞ্জয় রায়

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি। দেশের একটা জায়গায় গিয়ে ছোটবেলার এ ছড়াটা বেশ মনে পড়ল। জায়গাটার নাম ডলুরা। সুনামগঞ্জের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা গারো আদিবাসী-অধ্যুষিত একটা গ্রাম। একাত্তরের দিনগুলো তো মেঘে-ঢাকা দিনের মতোই ছিল অন্ধকার, বিভীষিকাময়, বর্ষার বৃষ্টি ফোঁটার মতো লাখো-কোটি বাঙালির অশ্রুবিন্দুতে সিক্ত। একদিন মেঘ ফুঁড়ে হেসেছিল সূর্য, ছুটে গিয়েছিল অন্ধকার, বাদলের ধারা—আমাদের অশ্রুবিন্দুগুলো। স্বাধীনতার টকটকে লাল সূর্যে হেসেছিল নতুন দেশ বাংলাদেশ। বাদলে সিক্ত হয় মাটি, সিক্ত সেই বসুন্ধরার বুকে বাদল শেষে হেসে ওঠে ফসলের সম্ভার। লাখো-কোটি বাঙালির অশ্রুতে-রক্তে সিক্ত হয়েছিল যে মাটি, সেই মাটির বুকে জন্ম নিয়েছিল এক আশ্চর্য আনন্দপুত্র বাংলাদেশ। বিজয়ে আমরা উল্লাসে মেতেছিলাম। কিন্তু সেই বিজয়ের আনন্দের মধ্যেও ছিল চাপা কান্না, বলতে না-পারা স্বজন হারানোর বেদনা। সেসব বেদনা বুকে নিয়েই আমরা বেঁচে আছি, এখনো স্বপ্ন দেখি শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশের। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই সুনামগঞ্জ শহর থেকে সুরমা নদীর হল্লারঘাট পার হয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম ডলুরা সীমান্তে ঘুমিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় চিরনিদ্রায় শায়িত আটচল্লিশজন শহীদের সেই পবিত্রভূমিতে।
সুরমা পেরিয়ে হল্লারঘাট থেকে একজন গারো কৃষক আন্দ্রেয়াজ দান্দালী আমাকে একটা ভাড়ার মোটরসাইকেলে করে রওনা হলেন নারায়ণতলার দিকে। ও গ্রামেই তাঁর বাড়ি। সুন্দর পাকা পথ। যেতে যেতে বাঁ দিকের একটা মাঠ দেখিয়ে জানালেন, ওইখানে ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের ফাঁড়ি। লোকেরা বলত লালবাড়ি। ওখান থেকেই তারা সুরমার এপারে বিভিন্ন গ্রামে অপারেশন চালাত। পাকা রাস্তার দুই পাশে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি, গাছগাছালি, ফসলের মাঠ, সমতল ভূমি। দেখতে দেখতে আমরা নারায়ণতলা মিশনে পৌঁছে গেলাম। পথে পড়ল চৌমুহনী বাজার। এরপর যেতে যেতে ঘরবাড়ি একটু পাতলা হয়ে এল। দেখতে পেলাম নতুন গড়ে কিছু ওঠা হালকা কুঁড়েঘর, নতুন নতুন বসতি, রক্তরাঙা ফুল ফোটা শিমুলগাছ আর বাঁশঝাড়। আলগা বালুর পথ। তবে ডলুরা গণকবর পর্যন্ত রাস্তাটা পাকা। শহীদদের কবরের কয়েক হাত পেছনেই নোম্যানস-ল্যান্ড, এর কয়েক হাত দূরেই ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের কঠিন বেড়া। ওপারে মেঘালয়ের সুউচ্চ খাসিয়া পাহাড়। আন্দ্রেয়াজ জানালেন, গ্রামটাতে এখনো প্রায় আড়াই শ ঘরে গারো আদিবাসীর বাস রয়েছে। সেখানেই মেঘের পাহাড় মেঘালয়ের কোলঘেঁষে ডলুরা গণকবরে লালনুড়ির বালুর বুকে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন আটচল্লিশজন শহীদ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ডলুরা ছিল বালাট সাব-সেক্টরের অধীন। সেই সাব-সেক্টরে তখন যুদ্ধ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. লুৎফর রহমান ওরফে জজ মিয়া। তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, এখনো একাকী থাকলে গুলি আর বোমার শব্দ শুনি। সুনামগঞ্জে মার্চের পর থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়। ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ফলে অনেক লোক তখন ঢাকা ত্যাগ করে তাদের গ্রামের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসতে থাকে। কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে আরও নিরাপদ জায়গার খোঁজে চলে যায় রিফিউজি ক্যাম্পে। আবার কেউ কেউ সীমান্ত পেরিয়ে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে। ফিরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ডলুরা সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় এবং মেঘালয়ে যাওয়ার জন্য যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকায় রোজই বিপুল লোক এ পথে আসতে থাকে। কমান্ডারের নির্দেশ ছিল, এসব লোককে যেন আমরা ঠিকমতো সেবা দিই, আশ্রয় দিই। প্রায় প্রতি রাতেই আমরা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে দু-চারজন লোকের থাকার ও খাবারের ব্যবস্থা করতাম। মনে পড়ে ভালো লাগে যে তখন সিলেটের এম সি কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ, ভৈরব কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা এ পথে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য আসত মুক্তিযোদ্ধা হতে, যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। তাই কৌশলগত কারণে এ জায়গাটা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য তারা সুরমা নদীর এ পারে ক্যাম্প স্থাপন করে ভারতগামী লোকদের আসা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তবুও তারা বিভিন্ন ঘুরপথে ঝুঁকি নিয়ে আসতে থাকে। এরপর শুরু হয় ডলুরা ও তার আশপাশে আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ, কাউন্টার-অ্যাটাকে ওরাও যেমন মরতে থাকে, তেমনি আমাদেরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারান। তাঁদের শবদেহগুলো গ্রামবাসী ও সহযোদ্ধারা এই ডলুরা সীমান্তে এনে সমাহিত করেন। মো. মন্তাজ মিয়া, মো. রহিম বখত, মো. ধনু মিয়া, মো. কেন্তু মিয়া, অধর দাস, কবীন্দ্র নাথ—এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে সমাহিত করা হয়। যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে, নামফলকে শুধু সেই আটচল্লিশজনের নামই আছে। ফলকে নাম নেই, এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধাও এখানে সমাহিত আছেন বলে তিনি জানান। তাঁদের পরিচয় হয়তো কেউ কখনো জানবে না। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমা তো কখনো মুছে যাবে না। তিনি বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা তো নিজের নামের জন্য যুদ্ধ করেননি, যুদ্ধ করেছিলেন একটা দেশের নামের জন্য। তাই ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা সম্মিলনীর সৌজন্যে স্বাধীনতাসংগ্রামের শহীদদের স্মরণে সেখানে গড়ে উঠেছে ডলুরার সেই পবিত্রভূমি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা, ডলুরা সমাধিস্থলের পবিত্রভূমির মতো দেশটাও পবিত্র হোক।

শিক্ষকদের একাল ও সেকাল by গোলাম মুরশিদ

‘বিশ্ববিদ্যা লয়’ নামে সম্প্রতি একটি ছোট্ট লেখা লিখেছিলাম। তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে বড়। অনেকগুলো ই-মেইল পেয়েছি। দুটি আবার দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের। তাঁরা বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন খুব কম। তারই জন্য শিক্ষার মান নেমে গেছে। তা ছাড়া তারই জন্য তাঁরা বাড়তি আয়ের ধান্ধায় থাকেন। এ ছাড়া একজন মাননীয় অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যার চর্চাও যে হয়, একটি প্রকাশিত নিবন্ধে তা বলেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের চর্চা হবে—এটাই তো প্রত্যাশিত। বিদ্যা চর্চা হয় না, তা কোথাও বলিনি। তবে ছাত্রদের রাজনীতি-রাজনীতি না-বলে দলের দালালি বলাই ভালো, এবং শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলের দালালি ও দলাদলির ফলে শিক্ষার মান দারুণ নিচে নেমে গেছে এবং বিদ্যার চর্চা প্রায় লোপ পেয়েছে—সেটাই আমার বক্তব্য ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝেঁটিয়ে রাজনীতি দূর করতে না পারলে শিক্ষার মান যে আবার উন্নত হবে না, এটা আমি মনেপ্রাণেই বিশ্বাস করি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো। বিনিময়ে ছাত্র নামধারী কিছু মাস্তান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নগদ অথবা সুবিধা পায়। টেন্ডারবাজি করে। নিজেদের মধ্যেও ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে হানাহানি করে।
শিক্ষকেরা সমাজের বহির্ভূত মানুষ নন। তাঁদের রাজনৈতিক আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁরা রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী হলে জ্ঞানচর্চার প্রতি সুবিচার করতে অথবা নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। তাই শিক্ষকদের রাজনীতি এবং নির্বাচনও বন্ধ করতেই হবে। এ জন্য প্রথমেই দরকার অরাজনৈতিক ব্যক্তির উপাচার্য হওয়া। সরকারের পরিবর্তনেও উপাচার্যের পরিবর্তন হবে না—তাঁর নিয়োগের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সেই বিশ্ববিদ্যারয়ের উপাচার্য হতেই পারবেন না। নয়তো তিনিও আগের সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দলীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বেন। কাউকে সুবিধা দেবেন, কাউকে প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবেন। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবেন না।
আমার লেখাটার গোড়াতেই বলেছিলাম, ‘অনেক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আছে।’ আহমদ শরীফ তো বেশি দিন আগে মারা যাননি! কেবল প্রফেসর হওয়ার জন্য গবেষণা করেননি তিনি। প্রফেসর হয়েও গবেষণা করেছেন। এমনকি, অবসর নেওয়ার পরও। হুমায়ুন আজাদও এমনই আরেকটি নাম। প্রফেসর হয়ে যাওয়ার পরেও অনেক লিখেছেন। সিরাজুল ইসলাম সত্তরের ঘরে পা দিয়েও এখনো এশিয়াটিক সোসাইটিতে বসে কাজ করেই যাচ্ছেন। অন্যকে দিয়েও কাজ করাচ্ছেন। তাঁর সামনে প্রমোশনের কোনো বন্দর নেই। জ্ঞানের আনন্দেই জ্ঞান চর্চা করছেন। সালাহউদ্দীন আহমদ অবসর নিয়েছেন অনেক কাল আগে। আজও লিখেই যাচ্ছেন, সিরিয়াস গবেষণা না করলেও। শিশির কুমার ভট্টাচার্য অবসর নিয়েছেন কয়েক বছর আগে। তারপর থেকে লিখছেন। কিন্তু আমার বক্তব্য ছিল বেশির ভাগ শিক্ষক কী করছেন—সে সম্পর্কে।
সেই বেশির ভাগ শিক্ষক, বিশেষ করে ঢাকা অথবা তার কাছাকাছি যাঁরা আছেন, তাঁরা গবেষণা, অধ্যাপনা এবং লেখার কাজ করেন সামান্যই। উপার্জনেই তাঁদের আগ্রহ। সত্যি সত্যি যে বেতন তাঁদের দেওয়া হয়, তা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সংসার চালানোও সহজ নয়। তাঁদের থেকে খারাপ ছাত্ররা তাঁদের চেয়ে ভালো অবস্থাতে আছেন—এটা দেখেও তাঁরা ক্ষুব্ধ হন। তাই বাড়তি আয়ের জন্য তাঁরা উৎসুক হয়ে থাকেন। অন্য সবার যখন গাড়ি আছে, তখন তাঁদেরও গাড়ি আবশ্যিক। প্রতিবেশীরা জীবনযাত্রায় যে চমক দেখাচ্ছেন, তা না দেখিয়ে তাঁরা থাকেন কীভাবে? তাহলে সন্তান এবং স্ত্রীর কাছে মান থাকে না।
এসব সত্ত্ব্বেও শিক্ষকেরা যদি চোখ বুজে না থাকেন, তাহলে তাঁদের স্বীকার করতেই হবে যে, তিয়াত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের আইন থেকে তাঁরা দল পাকিয়ে অনেকে ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছেন। কেউ কেউ আখেরও গুছিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের চর্চা বৃদ্ধি পায়নি। মানুষ যদি কেবল পঞ্জিকার হিসেবে জ্যেষ্ঠত্ব লাভ করে এবং খবরের কাগজে প্রবন্ধ লিখে প্রফেসর হতে পারে, তাহলে গবেষণা করার কোনো দরকার পড়ে না। তাও জুনিয়র শিক্ষকেরা কিছু কিছু কাজ করে মাঝেমধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কজন প্রফেসর কী গবেষণা করেন? আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁরা একটা গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন? সাধারণত করেন না। কারণ, প্রফেসর পদের মোক্ষ তাঁরা অর্জন করেছেন। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা এবং কনসালটেন্সি করে অতিরিক্ত আয়ও করেন। গাড়ি তো আগেই কিনেছেন। এমনকি কারও কারও বাড়ি অথবা ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নও পূরণ হয়েছে। সুতরাং আর লিখে কী হবে? ফালতু গবেষণা দিয়ে গৌরব আসবে? অথবা গৌরবে পেট ভরবে?
দেশের আর পাঁচজন মানুষ যখন তুলনামূলক কম শিক্ষা নিয়েও বেশ করে খাচ্ছেন, তখন বর্তমান যুগের প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বাড়ি-গাড়ি-সঞ্চয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু উপার্জনই যদি প্রধান লক্ষ্য হয়, তাহলে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে গ্রহণ না করে অন্য কোনো অর্থকরী পেশাই তাঁদের বেছে নেওয়া উচিত ছিল। শিক্ষকতার সঙ্গে একটা আদর্শ এবং মহান ব্রতও থাকে। সেটা ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। ডাক্তারদের সম্পর্কেও এই একই কথা প্রযোজ্য। তাঁরা কোনো না কোনো মেডিকেল কলেজে চাকরি করেন—সে কেবল প্যাডে লিখে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য। নয়তো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আনেন রোগী দেখে অথবা না দেখে। নানা রকমের অদরকারি পরীক্ষা করিয়ে তার ভাগ নিয়ে।
ডিরোজিও, ডিএলআর, রামতনু, বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, হেরম্ব মৈত্র—চিরকালই বিরল। ১৮৫০-এর দশকে বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম। তা সত্ত্বেও কেবল শিক্ষানীতিতে সরকারের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না বলে, আদর্শের কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ লোকেরা তখন নাকি তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘বিদ্যাসাগর চাকরি ছাড়লে খাবেন কী করে?’ তার উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, তিনি আলু পটোল বিক্রি করবেন, তাও ভালো। কিন্তু আপস নয়।
হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পিএইচডি, ইংরেজিতে। ইংরেজি বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। দেশবিভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালও হয়েছিলেন। খুব সাধারণ মানুষের মতো সাদামাটা জীবনযাত্রা ছিল তাঁর। রাজ্যপাল থাকার সময়েও নিজের ভৃত্য তাঁর রান্না করে দিত। মারা যাওয়ার সময়ে সারা জীবনের সঞ্চয় ১৭ লাখ টাকা, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গিয়েছিলেন।
বদরুদ্দীন উমর ১৯৬৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন। সেকালের বিবেচনায় ভালো আয় ছিল, প্রভাব-প্রতিপত্তিও ছিল। কিন্তু বামপন্থী রাজনীতি করে সমাজের সেবা করবেন বলে পদত্যাগ করেন। স্ত্রীর ব্যাংকের চাকরি ছাড়া তাঁর সামনে তখন কোন অবলম্বন ছিল না ।
শিবনারায়ণ রায় মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতবিদ্যা বিভাগের প্রধানের চাকরি থেকে পাঁচ বছর আগেই অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন—শুধু লেখালেখি করবেন আর জিজ্ঞাসা পত্রিকা চালাবেন বলে। শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন খুব অভাবের মধ্যে।
শিক্ষকতা এমনই একটি পেশা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে খানিকটা আত্মত্যাগ, জ্ঞানের সাধনা এবং ছাত্রদের শেখানোর আগ্রহ। প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং। পারিবারিক কারণে এবং ক্রমবর্ধমান সংসারের খরচ জোগাতে অসমর্থ হওয়ায় ’৮৩ সালের ডিসেম্বরে আমি শিক্ষকতায় ইস্তফা দিয়ে লন্ডনে একটা চাকরি নিয়েছিলাম। ততদিনে আমার শিক্ষকতা হয়েছিল ২০ বছর। কিন্তু ব্যাংকে ১০ হাজার টাকাও ছিল না। ১৮ বছর চাকরি করে লন্ডনে নির্ধারিত সময়ের চার বছর আগেই আমি যখন অবসর নিয়েছিলাম, তখন ব্যাংকে আমার পাঁচ হাজার পাউন্ডও জমা হয়নি। তবু অবসর নিয়েছিলাম, শুধু লিখব বলে। আর সবিনয়ে বলতে পারি, তখন থেকে প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো গ্রন্থ প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছি। এসব গ্রন্থ কারও কোনো কাজে লাগবে কি না, তা ভেবে দেখিনি। অথবা এসব গ্রন্থ থেকে যে রয়্যালটি পাওয়া যায়, পাউন্ডের হিসেবে তা সামান্যই। কিন্তু লেখাই আমার নেশা। সত্তরের কোঠায় পড়েও এই নেশা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার পর ডজনখানেক বই বোধ হয় লিখেছি।
গোলাম মুরশিদ: গবেষক।

হরতাল, পুলিশ ও নারী by সৈয়দ আবুল মকসুদ



জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে উপমহাদেশে প্রথম হরতাল পালিত হয় মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে। সেটা ১৯১৮ সালের কথা। তার আগে ‘হরতাল’ শব্দটি প্রচলিত ছিল না। হরতাল ডাকায় এবং তা পালনের প্রস্তুতি নেওয়ায় গান্ধীজি, মওলানা আজাদ সোবহানি, ডা. সাইফুদ্দিন কিচলুসহ বহু নেতার ওপর সেদিন সরকারি নির্যাতন নেমে এসেছিল। যেমন ২৭ জুন হয়েছে মির্জা আব্বাস, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি প্রমুখ নেতার ওপর।
৯২ বছর যাবৎ আমাদের দেশে হরতাল হচ্ছে। গত শতাব্দীর বিশের দশকে হরতালের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী, তাঁর একমাত্র ছেলে চিররঞ্জন দাশসহ অসংখ্য পিকেটার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কবি নজরুল ইসলামকেও আটক করা হয়েছে। তাঁদের হাড্ডি ভাঙা হয়নি।
পাকিস্তানি ২৪ বছরে সবচেয়ে বেশি হরতাল ডেকেছেন মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু। আমরা তাতে অংশ নিয়েছি। জীবনে একবারই মাত্র মোনায়েমি পুলিশের পরশ পেয়েছি। হরতাল-মিছিলে পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধেই। সংঘর্ষ বাধুক আর না বাধুক, পিকেটারদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক শ্যালক-ভগ্নিপতির নয়। অর্থাৎ মধুর নয়।
সেই পাকিস্তানি আমলে আমাদের নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে পুলিশের ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়েছে। এরশাদ শাহীতেও তিনি, সাহারা খাতুনসহ আরও বহু নারীনেত্রী পুলিশের নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। বেগম জিয়ার দুই জামানায় সাহারা খাতুনের সঙ্গে পুলিশের আচরণ ছিল নিন্দনীয়। সে সম্পর্কে আমি বীর উত্তম কাজী নূরুজ্জামানের নয়া পদধ্বনি, কাজী শাহেদ আহমদের খবরের কাগজ ও আজকের কাগজ এবং মতিউর রহমানের ভোরের কাগজ-এ আমার কলামে প্রতিবাদ করেছি। সৌভাগ্য কাকে বলে—আজ মতিয়া আপা শুধু নন, সাহারা খাতুনও মন্ত্রী এবং পুলিশেরই মন্ত্রী। পুলিশ এখন যা করবে তার দায়দায়িত্ব তাঁকেই বহন করতে হবে।
হরতালের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে মহানগর পুলিশ কমিশনারের গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে তিনি আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা। হরতালের দিন টিভি সংবাদ দেখে মনে হলো তিনি জেনারেল ডায়ারের ভূমিকা পালন করছেন। ৯২ বছর আগে জেনারেল ডায়ার জালিয়ানওয়ালাবাগে গুলি চালানোর হুকুম দিয়েছিলেন। আমাদের পুলিশকর্তা অবশ্য সে ধরনের হুকুম দেননি। তিনি বলেছেন পেটাতে। শুধু পুরুষকে নয়, নারীকেও বেদম পেটাতে। পুরুষ পিকেটাররা তো পেটানি খাবেই, এবার পেটানো হয়েছে নারীদের। নির্মম পেটানি। বীভৎস লাঠিপেটা। মেয়েদের পিঠ-পাঁজর-কোমর ও হাত-পায়ের হাড় গুঁড়ো করা হয়েছে। এক মহিলাকে দেখলাম, তিনি পুলিশের হাতে-পায়ে ধরছেন, তবু তিনি মাফ পাননি।
আমরা মনে করছি এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। একটি নির্বাচিত সংসদ ও সরকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখছি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের চেয়ে বেশি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দিল্লির পুলিশ কমিশনার গত ৬২ বছরে মিডিয়ায় যত বক্তব্য দিয়েছেন, আমাদের ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার গত ৬২ সপ্তাহে তার চেয়ে বেশি বক্তব্য দিয়েছেন। এবং সেই বক্তব্যে শাসকের সুর। ধমকের ভাব। পুলিশ কর্মকর্তাকে দোষ দেব না। সরকারের আশীর্বাদ নিয়ে অথবা সরকারের আশীর্বাদ পেতেই তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে ধারণা করি, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, মোরারজি দেশাই, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এসব অফিসারি তোষামতি রাজনীতি অনুমোদন করতেন না। গণতন্ত্রে সেটা করা হয় না। ভারতে হয় না, ব্রিটেনে হয় না, ফরাসি দেশেও হয় না।
স্বামীরা স্ত্রীদের পেটাচ্ছে ঘরের মধ্যে। বখাটেরা বদামি করছে রাস্তার মধ্যে বা আম-জামগাছের আড়াল থেকে। পুলিশ মেয়েদের গায়ে লাঠি দিয়ে পেটায় রাস্তার মধ্যে। হাজার হাজার মানুষের সামনে। ১২ বছর আগে যেদিন পুলিশ এক নারীর ওপর হামলা করে এবং তার কাপড় খোলে, আমি তার পরদিন সংবাদ-এ প্রথম-পাতা মন্তব্যে ঘৃণা প্রকাশ করেছিলাম। এখন আর কোনো কিছুতেই ঘৃণা হয় না। হরতালের দিন টিভিতে মহিলাদেরকে নির্মম মারধর দেখে আমার বারবার শুধু মনে হচ্ছিল: এই পুলিশরা কি ভুলে গেছেন যে তারা কোনো-না-কোনো নারীর গর্ভেই জন্মেছেন। হরতাল-সমর্থক মেয়েরা বিএনপির লোক কি না, সেটা বিবেচ্য নয়। নারী নারীই। আওয়ামীপন্থী হোক বা বিএনপিপন্থীই হোক—নিজের কন্যা হোক বা অন্যের মেয়ে হোক, খালা-ফুফু, নানি-দাদি হোক—সবাই যে আমাদের মা। এ বোধ থাকা দরকার।
হরতাল সফল হওয়ায় বিএনপির নেতারা জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জনগণ হরতাল সফল করেনি। হরতাল সফল করেছে সরকার। কারও যদি ধন্যবাদ প্রাপ্য হয়, তাহলে তা প্রাপ্য সরকারের। বেগম জিয়া হরতালের ঘোষণা দেওয়ার ঘণ্টাখানেক পর থেকে হাহাকার শুরু হয়—হরতাল দিচ্ছে, সব গেল, কলকারখানা গেল, অর্থনীতি গেল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার গেল এবং ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনাও নস্যাৎ হয়ে গেল। শুধু নেতারা নন, সরকারপ্রিয় উপসম্পাদকীয় লেখকেরা দুই হাতে লিখেছেন হরতালের বিরুদ্ধে। নেতাদের বক্তৃতা ও কলাম লেখকদের রচনায় ফল হয়েছে এই যে, জনগণ মনে করেছে, হরতাল তো আমরা কোনো দিন দেখিনি। হরতাল জিনিসটি যখন এতই খারাপ, সুতরাং তা না হয় একটি দিন পালন করেই দেখি। সুতরাং হরতাল সফল হয়ে গেল।
যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁদের উচিত একটু আক্কেল করে কাজ করা।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

পর্যটনশিল্পের বিকাশে বিল পাস -পর্যটনের দিক উন্মোচন সময়ের প্রয়োজন

বছরের পর বছর পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত হলেও, কথাকে কাজে পরিণত করার উদ্যোগের অভাব ছিল। সম্প্রতি সংসদে পর্যটনশিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে বিল পাস হওয়ার অর্থ, সরকার অবহেলিত এই খাতের প্রতি মনোযোগী হয়েছে। ওই বিলে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ ও বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার বিধান রাখা হয়েছে। আশা করা যায়, এতে করে নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকাগুলোর নিজস্বতা রক্ষা পাবে। বিলটি পাসের মাধ্যমে বহুদিনের প্রতিশ্রুতি পূরণের শুভ সূচনা হলো, এখন দরকার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
সাবেকি সব ধ্যানধারণা অতিক্রম করে বিশ্বায়িত পৃথিবীতে পর্যটন বিরাট অর্থকরী খাত হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। যোগাযোগের অভূতপূর্ব বিকাশ একে সম্ভবও করে তুলেছে। অনেক দেশই পর্যটন খাত থেকে প্রচুর বিদেশি মুদ্রা আয় করে থাকে। আধুনিক নগরকেন্দ্রিক মানুষের কাছে পর্যটন কেবল আর শখের বিষয় নয়, কর্মক্লান্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে সাময়িক নিস্তার পাওয়া প্রয়োজন। এ কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নিয়মিতভাবে বিপুল পর্যটকের ঢল এখন পূর্বের দেশগুলোর দিকে ছুটি কাটাতে আসে। এই ঢল থেকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য অবারিত হলেও, বাংলাদেশ নিজেকে পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় করায় তেমন কিছুই করেনি।
পর্যটকদের প্রথম চাহিদা হলো নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া পর্যটকেরা নিরাপদ বোধ করবে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নৈসর্গিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ উপভোগের যোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পর্যটকেরা ভবন বা শপিং মল দেখতে কোনো দেশে যায় না। তারা চায় মানুষ ও প্রকৃতির আতিথেয়তায় শান্তি আর আনন্দ। অন্যদিকে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তদের মধ্যেও বেড়ানোর আকর্ষণ বাড়ছে। দেশের সমুদ্র, বন, পাহাড়, নদী, হাওরসহ প্রকৃতির শোভা উপভোগের তৃষ্ণা তাদেরও কম নয়। পর্যটনশিল্পের বিকাশ তাদের স্বার্থেও দরকার। কোনো দেশ যদি সেই দেশের মানুষকে স্বস্তি ও আনন্দ দেয়, তাহলে অন্য দেশের পর্যটকদেরও তা ভালো লাগার কথা।
একই সঙ্গে খেয়াল করা দরকার, পর্যটনের বিকাশ মানে শুধু পুরো দেশকে বিদেশিদের মনোরঞ্জনের জন্য মেলে ধরা নয়। বরং স্থানীয় প্রাকৃতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যতটা সুন্দর, অতিথিপরায়ণ ও নিষ্কলুষ থাকবে, ততই তা অপরের চোখে সুন্দর বলে ধরা দেবে। এই চেতনায় পর্যটনশিল্পের নতুন দিক উন্মোচন এখন সময়েরই প্রয়োজন।

গাজায় ত্রাণবোঝাই জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি গাজায় ত্রাণবোঝাই জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে। তারা জানায়, সুয়েজখাল দিয়ে জাহাজ প্রবেশের অনুমতি না থাকায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মিসরের একজন কর্মকর্তা তাদের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জাহাজটি ইরানের বন্দর আব্বাস বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে বলা হয়, দখলদার ইসরাইলের আরও বিধিনিষেধ আরোপ এবং সুয়েজখাল দিয়ে জাহাজ প্রবেশের বাধার কারণে রেড ক্রিসেন্ট গাজায় মানবিক সাহায্য পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছে।
সুয়েজখাল প্রশাসন জানায়, তারা সুয়েজখাল দিয়ে ইরানের কোনো জাহাজ গাজায় পৌঁছানোর কোনো অনুরোধ পায়নি। সুয়েজখাল প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কোনো ত্রাণবাহী জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না, এমন কিছু আমরা ইরানকে জানাইনি এবং আমরা ইরান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো অনুরোধও পাইনি। সুয়েজখাল কর্তৃপক্ষ ইরানের জাহাজের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেনি।

চাল ডাল তেলের দাম -মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিশেষ উদ্যোগ দরকার

বাজারে চাল, ডাল, তেল ও চিনির দাম বাড়তির দিকে। গত সপ্তাহের তুলনায় সব ধরনের চালের দাম মণপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়েছে। এটা বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ, দেশের খেটে খাওয়া মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। আর গরিবের প্রোটিন (আমিষ) হলো ডাল। ভোজ্যতেল ও চিনি খাদ্যতালিকার শীর্ষে থাকে। এসব পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ দরকার। মনে রাখতে হবে, ব্যবসায়ীদের ওপর বলপ্রয়োগে দাম কমানো যাবে না, অর্থনৈতিক উপায়গুলোর ওপর জোর দিতে হবে।
এর একটি হলো চালের ওপর চাপ কমাতে গম আমদানি করা। ইতিমধ্যে সরকার ভারত থেকে পাঁচ লাখ টন গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কম। আর দেশে যেহেতু গমের উৎপাদন বেশি নয়, তাই আমদানি করলে সমস্যা হবে না। বরং সরকার কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ভিজিডি, ভিজিএফ প্রভৃতি কর্মসূচিতে ওই গম বিতরণ করতে পারবে। সরকারের গুদামে চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে তার শুভ প্রভাব পড়বে বাজারে।
আরেকটি উপায় হলো, আমন মৌসুমে ভালো ফলনের বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া। বন্যার পানিতেও বাড়ে এ রকম স্বর্ণা সাব-২ ও বিআর-১১ সাব-১। এই দুটি উচ্চফলনশীল ধানের ব্যাপক প্রসারের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গুদাম নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। বর্তমানে গুদামে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন চাল রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। দরকার অন্তত ২০-২৫ লাখ চাল ধারণের সক্ষমতা অর্জন। নির্মাণাধীন গুদামগুলোর কাজ অবিলম্বে শেষ করা হলে অতিরিক্ত তিন লাখ মেট্রিক টন চাল রাখার ব্যবস্থা হবে। এদিকে জোর দেওয়া হোক। আমনের ভালো ফলনের বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি ও গুদামে চাল রাখার সক্ষমতা বাড়াতে পারলে আড়তদারেরা চাল ধরে রাখার চেষ্টা করবেন না। এতে বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
আমাদের চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ডাল আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডালের দাম বাড়লে দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ে। তাই দেশে ডালের উৎপাদন বাড়ানোর সক্রিয় উদ্যোগ দরকার। উত্তরাঞ্চলে পানি কম, সেখানে ডাল চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। বাজেটে এ রকম কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। ডাল চাষে বিশেষ বরাদ্দ দিলে সুফল পাওয়া যাবে।
পাশাপাশি খাদ্য পরিবহন যথাসম্ভব নির্ঝঞ্ঝাট করতে না পারলে বাজার-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। এক ট্রাক চাল উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসতে পথে পথে চাঁদা দিতে হয়। প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহল, পরিবহনমালিক বা শ্রমিক ইউনিয়নের কিছু নেতা-কর্মী এবং এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। খাদ্য পরিবহনে কোনো রকম বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। এভাবে বাজারশক্তির স্বাধীন ভূমিকা পালনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হলে মূল্য স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে।
অন্তত চাল, ডাল, তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। এটা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনের কাছাকাছি পৌঁছেছেন বিজ্ঞানীরা

ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাকেন্দ্র লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (এলএইচসি) গবেষণারত বিজ্ঞানীরা বলেছেন, তাঁরা মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উন্মোচনের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এলএইচসি আগের তুলনায় দ্বিগুণ হারে প্রোটন কণিকা চূর্ণ করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই তারা ‘বিগ ব্যাং থিউরি’ বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের প্রামাণ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবে। একই সঙ্গে ‘ঈশ্বর কণিকা’ বলে পরিচিত ‘হিগস্ বোসন পার্টিকল’ নামের কল্পিত সাব অ্যাটমিক কণিকাও শনাক্ত করা যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন। পদার্থবিজ্ঞানী আঁদ্রে গুলুতভিন জানান, বর্তমানে তাঁরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ হাজার প্রোটন কণিকার সংঘর্ষ ঘটাচ্ছেন।
ইউরোপভিত্তিক পরমাণু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান অরগানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ (সার্ন) ফ্রান্স-সুইজারল্যান্ড সীমান্ত এলাকায় ২৭ কিলোমিটারের বৃত্তাকৃতির এলএইচসি মেশিনটি স্থাপন করে। প্রায় আলোর সমান গতিতে পরস্পর বিপরীতমুখী দুটি প্রোটন স্রোত ওই সুড়ঙ্গে সক্রিয় করে প্রোটন কণিকার মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। দুটি স্রোতের সংঘর্ষে প্রোটনের কণাগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে নতুন কণার সৃষ্টি হয়। গত নভেম্বরে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সফলভাবে এই প্রোটন স্রোতের সংঘর্ষ ঘটাতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ফার্মি ন্যাশনাল এক্সেলেটর ল্যাবরেটরি (ফার্মিল্যাব) এখন পর্যন্ত পদার্থ কণিকা ভাঙার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত হলেও বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এলএইচসি এ ক্ষেত্রে শিগগিরই ফার্মিল্যাবকে ছাড়িয়ে যাবে।
গত কয়েক মাসে এলএইচসির প্রকৌশলীরা প্রোটন স্রোতের শক্তি ও গতি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়েছেন। গত সপ্তাহান্তে তিনটি প্রোটন কণিকাগুচ্ছের দুটি স্রোতের সংঘর্ষ ঘটানো হয়। একেকটি ‘গুচ্ছে’ ১০ হাজার প্রোটন কণিকা ছিল।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ২০১৩ সালের মধ্যে তারা এলএইচসিতে ১৪ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রোভোল্টের শক্তি উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এলএইচসি কাজ করলে তাঁরা হিগস্ বোসনও শনাক্ত করতে পারবেন। এ ছাড়া মহাবিস্ফোরণের পর কীভাবে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল, তার একটি ধারণাও তাঁরা পাবেন।
এলএইচসির প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষে দায়িত্বরত মাইক ল্যামোন্ট বলেন, প্রোটন কণিকায় যত বেশি সংঘর্ষ ঘটানো সম্ভব হবে হিগস্ বোসন শনাক্তসহ অন্যান্য রহস্য উদ্ঘাটনের সম্ভাবনা তত বেশি উজ্জ্বল হবে। ল্যামোন্ট জানিয়েছেন, তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে একটি কণিকা স্রোতের ভেতরে ২০ হাজার ৮০৮টি কণিকা গুচ্ছের প্রতিস্থাপন। ২০১৬ সালের মধ্যে তাঁরা এ লক্ষ্যে পৌঁছাবেন বলে মনে করছেন।

সাজার বিরুদ্ধে পাঁচ মার্কিন নাগরিকের আবেদন

পাকিস্তানে সাজাপ্রাপ্ত পাঁচ মার্কিন নাগরিক গতকাল সোমবার আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেছেন। তাঁদের আইনজীবীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা এবং নিষিদ্ধ সংগঠনকে অর্থ সহযোগিতার অভিযোগে গত সপ্তাহে এই পাঁচ মার্কিন নাগরিককে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার রুপি করে জরিমানা করা হয়।
সাজাপ্রাপ্ত পাঁচ মার্কিন নাগরিক হলেন মিসর, ইরিত্রিয়া, পাকিস্তান ও ইয়েমেনের বংশোদ্ভূত ওমর ফারুক, ওয়াকার হুসাইন, রামি জামজান, আহমেদ আবদুল্লাহ মিনি ও আম্মান হাসান ইয়ামের। তাঁদের বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছর। গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর সারাগোধা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী হাসান কাচেলা বলেছেন, পাঁচ মার্কিন নাগরিক সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে লাহোর হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।
সারগোধার একটি রুদ্ধদ্বার আদালতে গত বৃহস্পতিবার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে পাঁচ মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগ থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইনজীবীরা আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ২০ বছর করে সাজা দেওয়ার আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
অভিযুক্ত মার্কিন নাগরিকেরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তাঁরা পাকিস্তানে এসেছিলেন। সেখান থেকে মানবিক কাজে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁদের আফগানিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল।

ভারত ও কানাডার মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি

ভারত ও কানাডা গত রোববার বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। কানাডার টরন্টোতে সম্পাদিত এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন ভারতের আণবিক শক্তি বিভাগের সচিব শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্স ক্যানন। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার উপস্থিত ছিলেন। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর জোট জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি দেশ দুটি এই চুক্তি করে।
এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে পঁচিশ বছরের বিদ্যমান অবিশ্বাস ও সন্দেহের অবসান হলো। কানাডীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারত তাদের প্রথম পরমাণু বোমা তৈরি করে। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল।
১৬ বছর আগে আই কে গুজরালের পর এই প্রথম ভারতের সরকার-প্রধান হিসেবে মনমোহন সিং কানাডা সফর করছেন। কর্মকর্তারা জানান, এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত পরমাণু জ্বালানির উৎস হিসেবে কানাডা থেকে পরমাণু সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম আমদানি করতে পারবে। এই পরমাণু জ্বালানি এশীয় দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
২০০৮ সালে পরমাণু জ্বালানি, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী দেশগুলোর গোষ্ঠী ভারতের ওপর থেকে ৩৪ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এরপর ফ্রান্স ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে কানাডা হচ্ছে ভারতের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ অষ্টম দেশ।
ভারত ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী পরমাণু বর্জ্য নিরাপদ স্থানে ফেলার ও পরমাণুবিষয়ক নিরাপত্তা রক্ষা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সত্তর দশকের গোড়ার দিকে কানাডার কাছ থেকে কেনা পরমাণু চুল্লি ব্যবহার করে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে ভারত। এ ব্যাপারে মনমোহন সিং বলেন, ভারতে পরমাণু উপাদান বা পরমাণু সরঞ্জাম যাই থাকুক না কেন, তা ইচ্ছামতো লক্ষ্যহীন কাজে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই।

নতুন সংবিধানকে অনুমোদন দিল জনগণ

কিরগিজস্তানের জনগণ গত রোববার অনুষ্ঠিত গণভোটে সে দেশের নতুন সংবিধানটি অনুমোদন করেছেন। এই সংবিধান পার্লামেন্টকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাস করার পরিকল্পনার পক্ষে।
গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই গণভোটের আয়োজন করেছে।
কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে কিরগিজ ও উজবেকদের মধ্যে কয়েক দফা জাতিগত দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার প্রায় দু সপ্তাহ পর এই গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। ওই দাঙ্গায় শত শত লোক প্রাণ হারায়।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বলেছে, ৯০ দশমিক সাত শতাংশেরও বেশি ভোটার নতুন সংবিধানকে সমর্থন জানিয়েছে। প্রায় আট শতাংশ এর বিরোধিতা করেছে।
কমিশন জানায়, প্রায় ২৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন।
দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট রোজা ওতুনবায়েভা বলেন, তাঁকে এখন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত করা হবে এবং এরপর তিনি একটি সরকার গঠন করবেন। আগামী অক্টোবর মাসে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওতুনবায়েভা ২০১১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ইসরায়েলকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না তুরস্ক

ইসরায়েলকে তুরস্কের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাতোলিয় এ তথ্য জানিয়েছে।
বার্তা সংস্থাটি জানায়, প্রধানমন্ত্রী কানাডায় সাংবাদিকদের বলেন, গত ৩১ মে গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহরে হামলার জের ধরে ইসরায়েলের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ওই হামলায় আট তুর্কি নাগরিক নিহত হয়। তবে ইসরায়েল বলছে, তার কমান্ডো বাহিনী প্রতিরক্ষা কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ হামলা চালিয়েছে।
এ ঘটনার পর তুরস্ক ইসরায়েল থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয় এবং যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিত করে। তুরস্ক জানায়, ইসরায়েল এই হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করা পর্যন্ত তুরস্ক তার রাষ্ট্রদূতকে সেখানে পাঠাবে না।

উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাব দাবি ওবামার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিন্দা প্রস্তাব আনার দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, পিয়ংইয়ংয়ের সাম্প্রতিক ‘যুদ্ধংদেহী আচরণ’ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এ দিক বিবেচনা করে চীনকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি তার অন্ধ সমর্থন দানের নীতি পরিহার করতে হবে। রোববার কানাডার টরন্টোতে জি-৮ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ওবামা এ কথা বলেন। তবে উত্তর কোরিয়া বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী ও হুমকিমূলক নীতির পরিপ্রেক্ষিতে তারা অবশ্যই পরমাণু সক্ষমতা বাড়াতে সচেষ্ট হবে।
গত মার্চে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ পীত সাগরে এক বিস্ফোরণে ডুবে যায় এবং এতে ৪৬ জন নাবিকের মৃত্যু হয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তদন্ত শেষে জাহাজটি উত্তর কোরিয়ার ছোড়া টর্পেডোর আঘাতে ডুবেছে বলে নিশ্চিত করার পর দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। উত্তর কোরিয়া প্রথম থেকেই এ ঘটনায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছে। এ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মিউং বাক যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কামনা করলে প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার আশ্বাস দেন।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা টরন্টোতে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, উত্তর কোরিয়া যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেচনায় সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও যুদ্ধংদেহী আচরণ করছে, সে বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সামনে খোলাসা করা এখন প্রধান কাজ। ওবামা বলেন, উত্তর কোরিয়াই যে দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে, তা বহুজাতিক তদন্তে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এর পরও দক্ষিণ কোরিয়া অসাধারণ ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে। ওবামা বলেন, এ অবস্থায় চীনকে উত্তর কোরিয়ার প্রতি অন্ধভাবে সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তিনি জি-৮ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিন তাওয়ের সঙ্গে দেখা করেন। ওবামা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হুর সঙ্গে উত্তর কোরিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর আশা, প্রেসিডেন্ট হু উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের গুরুত্ব বুঝতে পারবেন।
তবে ওবামার এসব বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে গতকাল সোমবার উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, কোরীয় উপসাগরের ঘটনার জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে হুমকিমূলক নীতি গ্রহণ করছে তাতে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু শক্তি বৃদ্ধি জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে ঠিক কী উপায়ে পরমাণু শক্তি বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে ওই বিবৃতিতে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়া তার যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাসহ বেশ কিছু শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উত্তর কোরিয়া সিউলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনে তারা দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর হামলা চালাবে বলেও হুমকি দিয়েছে।

যেভাবে ফিরে এল হারানো স্মৃতিশক্তি

নতুন করে সাজানো বিয়ের অনুষ্ঠান ফিরিয়ে এনেছে এক বৃদ্ধের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিশক্তি। ৬৫ বছর বয়সী এই ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড স্টুয়ার্ট। কর্মজীবনে তিনি একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পুরো কৃতিত্ব স্ত্রী ভ্যালেরির।
১৯৮৪ সালে এক দুর্ঘটনায় মরতে মরতে বেঁচে ওঠেন ডেভিড। কিন্তু হারিয়ে ফেলেন স্মৃতিশক্তি। নিজের স্ত্রী ও ছেলেদের চিনতে পারছিলেন না তিনি। এ নিয়ে বড্ড বিপাকে পড়েন তাঁর স্ত্রী। স্বামীর হারানো স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে একের পর এক চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন ভ্যালেরি। বিয়ের সেই ছবিগুলো ডেভিডকে নিয়মিত দেখাতে থাকেন। কিন্তু এতে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এভাবে কেটে যায় ২৫টি বছর।
সম্প্রতি ৪০তম বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে অভিনব এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ভ্যালেরি। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানটিকে ডেভিডের সামনে নতুন করে তুলে ধরেন। এতে বর সেজে ডেভিড যখন শপথ নিচ্ছিলেন, এ সময় খুলে যায় তাঁর স্মৃতির বন্ধ দুয়ার। একে একে আপনজনদের চিনতে পারেন তিনি।
ডেভিড বলেন, ‘বেদির ওপর দাঁড়িয়ে যখন আমি শপথ নিচ্ছিলাম, এ সময় সাঁ করে ফিরে আসে হারানো স্মৃতিশক্তি। বিয়ের সেই অনুষ্ঠানের কথা দিব্যি মনে পড়ে যায়। আর আমি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি। ঘাড়ের পেছনের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায় ফড়ফড়।’

মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ৪৫% লভ্যাংশ অনুমোদন

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৪৫ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বোনাস শেয়ারে ৫ শতাংশ ও নগদে ৪০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করা হবে।
চট্টগ্রামের একটি হোটেলে গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির ৩১তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এই লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়। একই দিনে কোম্পানির চতুর্থ বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান আনোয়ারুল করিম সভাপতিত্ব করেন। এতে কোম্পানির পরিচালকদের মধ্যে এ কে মহিউদ্দিন আহমদ, সালমা আখতার জাহান ও বিপিসির বিপণন পরিচালক মুহাম্মাদ নূরুল আলম, অর্থ পরিচালক মো. ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী, পরিচালক ইকবাল হোসেন, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এমডি মো. কুদরত-ই-এলাহী ও কোম্পানিসচিব শরীফ আশরাফউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

ল্যানের তার পুড়ে ডিএসইর লেনদেন এক ঘণ্টা বিঘ্নিত

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন বিঘ্নিত হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোরে বৃষ্টিজনিত বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে মতিঝিলের ইস্পাহানি ভবনের সামনে ডিএসইর লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্কের (ল্যান) ৫০ গজ তার পুড়ে যায়। ফলে বেলা ১১টায় ডিএসইর প্রধান সার্ভার চালু হলেও লেনদেন শুরু হয়নি।
জানা গেছে, ল্যান লাইন পুড়ে যাওয়ার কারণে ৫০টি ব্রোকারেজ হাউস শুরুতে লগইন করতে পারেনি। এতে করে লেনদেন এক ঘণ্টা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। যারা লগইন করতে পারেনি তাদের এই সময় ডায়ালআপ পদ্ধতিতে লগইন করতে বলা হয়। দুপুর ১২টার মধ্যে ২৩৮টি ব্রোকারেজ হাউসের মধ্যে ২২৪টি লগইন করতে সক্ষম হলে লেনদেন শুরু হয়। পরে সময় আধা ঘণ্টা বাড়িয়ে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
যোগাযোগ করা হলে ডিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়, ল্যান লাইন পুড়ে যাওয়ার কারণে অনেক ব্রোকারেজ হাউস ঠিকমতো লগইন করতে পারেনি। তাই এক ঘণ্টা দেরিতে লেনদেন শুরু হয়। বিঘ্নিত এলাকায় সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে সরকারি সংস্থা। আজকে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী লেনদেন শুরু হবে বলে ডিএসই থেকে জানানো হয়।
অবশ্য লেনদেন বিঘ্নিত হলেও গতকাল এক হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। তবে সূচক কিছুটা পড়ে গেছে। গতকাল সাধারণ সূচক ১১ দশমিক ২১ পয়েন্ট কমে ডিএসই সূচক ৬২০১ দশমিক ৪৯ পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়ায়।
লেনদেন হওয়া শেয়ারগুলোর মধ্যে দাম বেড়েছে ৮১টির, কমেছে ১৫৮টি ও অপরিবর্তিত থাকে পাঁচটির।
গতকালের লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় ছিল তিতাস গ্যাস, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, বেক্সিমকো, এবি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য। বেশি দাম বেড়েছে এমন শীর্ষ ১০টি শেয়ারের তালিকায় আছে গ্ল্যাক্সোস্মিথ, ইউসিবিএল, ইউএলসি, ফুওয়াং সিরামিকস, যমুনা ওয়েল, ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স, ষষ্ঠ আইসিবি, চতুর্থ আইসিবি, তৃতীয় আইসিবি ও বিডি ফাইন্যান্স।

আখাউড়া স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি আজও প্রায় বন্ধ

আগরতলার শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরির দাবিতে ধর্মঘট করায় আজ মঙ্গলবারও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে সিমেন্ট, পাথর ও চিটাগুড়সহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। তবে সকালে ইলিশসহ প্রায় ২০০ ঝুড়ি মাছ রপ্তানি হয়েছে।
এর আগে গতকাল সোমবার ভারতে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ত্রিপুরার বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ১২ ঘণ্টার হরতাল পালন করায় এ স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ছিল।
আখাউড়া স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী মো. আব্বাস মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগরতলার শ্রমিকদের ধর্মঘটের কথা ব্যবসায়ীদের আগে থেকে না জানানোয় বন্দরে রপ্তানি পণ্যবোঝাই শতাধিক ট্রাক আটকা পড়েছে। রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টির কারণে প্রায় ৫০ ট্রাক সিমেন্ট নষ্ট হতে চলেছে।
আখাউড়া স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মো. আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, আগরতলা শুল্ক বিভাগ দুপুর ১২টার পর শ্রমিকদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে বলে জানালেও তারা দুপুর একটা পর্যন্ত কিছুই জানায়নি। ফলে বন্দরে আজ আর আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আখাউড়া স্থল বন্দরটি প্রায় শতভাগ রপ্তানিমুখী। গত দুই দিন বন্দর দিয়ে রপ্তানি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রায় এক কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

গোল নিয়ে শোরগোল

মেসি-কাকা-রোনালদোরা নন, এবার বিশ্বকাপে সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র নিঃসন্দেহে রেফারিরা। কাকা-কেওয়েল-কাহিলের লাল কার্ড কিংবা ফ্যাবিয়ানোর হ্যান্ডবল—এগুলোকে বড় কেলেঙ্কারির উদাহরণ হিসেবে মনে করা যায়। এ ছাড়া ছোটখাটো কেলেঙ্কারি এরই মধ্যে সংখ্যাতীত হয়ে গেছে।
তবে সব কেলেঙ্কারিকে ছাড়িয়ে গেল গত পরশুর দুই ম্যাচ। শেষ ষোলোর দুই ম্যাচে দুই গোল নিয়ে রেফারিদের কাণ্ড রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে ফুটবল-দুনিয়ায়। গোললাইনের বেশ ভেতর থেকে বল ফেরার পরও ইংল্যান্ড গোল পায়নি। আর পরিষ্কার অফসাইডে দাঁড়িয়ে থেকেও গোল পেয়ে গেলেন কার্লোস তেভেজ।
বক্সের বাইরে থেকে আচমকা ল্যাম্পার্ডের নেওয়া দুর্দান্ত শট বারে লেগে আছড়ে পড়েছিল জার্মান গোললাইনের ভেতরে, সেখান থেকে বল আবার বারে লেগে বাইরে পড়ে। বল খুব দ্রুত চলে যাওয়ায় লাইন্সম্যান গোললাইনের আশপাশেও ছিলেন না। তাই তিনি বুঝতেই পারলেন না, গোল হয়েছে কি না।
কিন্তু পর মুহূর্তেই টেলিভিশন রিপ্লেতে সারা দুনিয়া তো বটেই, জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলোয়াড়েরাও দেখলেন, বল ভেতর থেকে এসেছে! তাহলে এটা গোল না কেন? এই প্রশ্নটাই উল্টে গেল আর্জেন্টিনার বেলায়।
লিওনেল মেসি যখন বল বাড়ালেন, তখন তেভেজ তখন পরিষ্কার অফসাইডে। অথচ সেটি কিনা বুঝতে পারলেন না লাইন্সম্যান। ফলে তেভেজের হেডকে গোল বলে ঘোষণা করা হলো।
ইংল্যান্ড গোলটা না পাওয়ায় খুব দুঃখ প্রকাশ করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। চিরকাল ইংল্যান্ডের ঘোরতম শত্রু বলে পরিচিত ম্যারাডোনা বলছেন, ‘আমি কখনোই ইংল্যান্ডকে পছন্দ করি না। তার পরও আমরা দেখলাম এই গোলটা বাতিল হয়ে না গেলে ওরা অন্তত ২-২ করে খেলা অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যেতে পারত।’
আবার যেই না নিজেদের গোলের প্রসঙ্গ এল, সেই ম্যারাডোনা বলছেন, রেফারির সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে! তিনি বরং উল্টো বললেন, ‘আমাদের মেসিকে এত আক্রমণ করা হলো, চারদিক থেকে লাথি মারা হলো—রেফারি কিছু বললেন না। সেটা নিয়ে তো আমরা কিছু বলছি না।’
সে ম্যারাডোনা কিছু বলুন আর নাই বলুন, এই দুই গোল-কেলেঙ্কারিতে আবার আলোচনায় চলে এসেছে ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার। সেই ১৯৬৬ সালে জিওফ হার্স্টের শর্টটি বারে লাগার পর গোললাইন অতিক্রম করেছিল কি না তা নিয়ে আজও তর্ক করে ইংলিশ ও জার্মানরা।
সে সময় প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন তো আছে। এখন কেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে না? যার শট থেকে ইংলিশদের ওই ‘গোল’ হলো, সেই ল্যাম্পার্ড বলছেন, ‘আমরা বিশ্বকাপের আগে একটা মিটিং করছিলাম। সেখানে কে যেন বলছিল, ফুটবলে লাখ লাখ আইন বিভিন্ন সময় বদলানো হয়েছে, যেগুলো খেলাতে কোনো প্রভাবই ফেলে না। অথচ যে ব্যাপারটা বিশাল প্রভাব ফেলে সেই ব্যাপারটাতেই কোনো পরিবর্তন নেই!’
গোললাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের জোর দাবি করছেন সাবেক ইংলিশ তারকা অ্যালান শিয়ারারও, ‘সাবেক সব পেশাদার ও তারকা এটা দেখতে চান। একজন লোক ছাড়া সবাই এই গোললাইন প্রযুক্তি দেখতে চায়।’
সেই একজন লোক কে? পরিষ্কার উত্তর, সেপ ব্ল্যাটার। গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে যখনই আলোচনা হয়েছে, তখনই ফিফা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপক্ষে। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে এর ব্যবহার খুব ব্যয়বহুল হবে বলে এবং খেলাটির মানবিক আবেদন কমে যাবে দেখে তাঁরা গোললাইন প্রযুক্তির বিপক্ষে।

আবার সরব ‘কাইজার’

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার বিশ্বে একজনই। কিন্তু এই বিশ্বকাপে তিনি যা শুরু করেছেন, তাতে বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ একাধিক বেকেনবাওয়ারের অস্তিত্ব খুঁজতে না নামলেই হয়। আজ এই কথা তো কালই তার উল্টোটা!
তীর্যক সব শব্দ ব্যবহারে দুই দফায় সমালোচনার জন্য ইংল্যান্ডের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন নিজে থেকে। নিজেকে দাবি করেছিলেন ইংল্যান্ড এবং ইংলিশ ফুটবলের সমর্থক বলে। দুই দিনের ব্যবধানে সেই বেকেনবাওয়ারের মুখে আবার ইংল্যান্ডের তাচ্ছিল্য! বেকেনবাওয়ারের এবারের তাচ্ছিল্যটি যুক্তিসংগতই। কারণ নিজ দেশের এমন জয়ের পর বেকেনবাওয়ার বলতেই পারেন ‘আমরা ইংল্যান্ডকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি।’
ব্লুমফন্টেইনে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল জার্মানি-ইংল্যান্ড। এই ম্যাচে বেকেনবাওয়ারের জার্মানি ইংল্যান্ডকে ৪-১ গোলে হারিয়ে পৌঁছে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। ইংল্যান্ড ছিন্নভিন্নই বটে। কিন্তু দু দিন আগে যিনি নিজে থেকে বলেছেন, তিনি ইংল্যান্ড ফুটবলের বড় ভক্ত সেই বেকেনবাওয়ারের মুখে কথাটা একটু বেমানানই শোনায়। তা ছাড়া ‘কাইজার’ বলেছেনও তো তাচ্ছিল্যের সুরেই, ‘ইংল্যান্ড ছিল ডুবে যাওয়া এক দল। তারা আমাদের কাছেই আসতে পারেনি। আমরা আসলে ইংল্যান্ডকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি। প্রতিটি বিভাগেই আমরা ছিলাম সেরা।’
ম্যাচে ইংলিশ মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের একটি নিশ্চিত গোল বাতিল হয়েছে রেফারির ভুলে। কথার তোড়ে ইংলিশদের স্রেফ পাড়ার দল বানিয়ে উড়িয়ে দিলেও ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের গোলটি যে গোল ছিল, তা মানতে আপত্তি নেই কাইজারের, ‘বাতিল ওই গোলটি লাইনসম্যানের দেখা উচিত ছিল। কারণ ওটা গোলই ছিল। তবে সৌভাগ্য যে আমরা আরও দুটি গোল যোগ করেছি। নইলে এটা নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা হতো।’
১৯৭৪ বিশ্বকাপজয়ী বেকেনবাওয়ারের আরেক সতীর্থ গুন্টার নেটজার মনে করেন, গোললাইনের কাছে প্রযুক্তির ব্যবহার করাই ঠিক না। তাতে আরও বিভ্রান্ত বাড়ে, ‘এই গোল বাতিলের পর ভিডিওর বিপক্ষেই বলব আমি। এটা খারাপ। ফুটবল কখনো নির্ভুল নয়, ফুটবল সব সময়ই নাটক। ফুটবলাররা অনেক ভুল করে এবং এ কারণেই খেলাটা এত আবেগের।

কিংবদন্তি মেসি

বিশ্বকাপের অর্ধেক যেতে না যেতেই আলোচনাটা স্তিমিত হয়ে গেছে। অথচ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত বিশ্বসেরার প্রশ্নে লিওনেল মেসি, না ওয়েইন রুনি—এই আলোচনা চায়ের কাপে বেশি ঝড় তুলেছিল। তবে এই তুলনাটা যেন ডিয়েগো মিলিতোর সামনে করতে যাবেন না! তিনি হেসে ফেলবেন।
হ্যাঁ, মেসি-রুনির তুলনা শুনে মিলিতো প্রকাশ্যেই হেসে ফেললেন। বললেন, এদের এক জনের সঙ্গে আরেক জনের তুলনা করার নাকি কোনো সুযোগই নেই, ‘ইংলিশরা বা যে কেউ যখন মেসির সঙ্গে রুনিকে মেলাতে চেষ্টা করে, আমার হাসি পায়। কোনো সন্দেহ নেই, রুনি ভালো খেলোয়াড়। কিন্তু ওকে মেসির পর্যায়ে ভাবাটাও একটা ভুল। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই করা উচিত না।’
মিলিতো বরং ঘোষণা করে দিচ্ছেন, বর্তমান সময়ের আর কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গেই মেসির তুলনা হতে পারে না। কারণ, মেসি ‘সর্বকালের সেরা’ হতে যাচ্ছেন, ‘মেসি যখন অবসর নেবে, ওকে হয়তো সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বলা হবে। তার সঙ্গে এই সময়ের একজন খেলোয়াড়ের কীভাবে তুলনা করেন! বিশেষত সেই খেলোয়াড়, যে এখনো কোনো দিন বর্ষসেরাই হতে পারেনি!’
মিলিতোর মেসি-ভক্তি এখানেই শেষ না। তিনি বলছেন, এরই মধ্যে ‘কিংবদন্তি’ হয়ে যাওয়া মেসির সঙ্গে কাকা-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরও তুলনা চলতে পারে না, ‘তাদের সঙ্গেও তুলনা চলে না। আর রুনি? নাহ, নাহ! রুনি হয়তো এখন বিশ্বের সেরা ২০ খেলোয়াড়ের একজন হবে। কিন্তু এতে সে মেসির ধারে-কাছেও তো আসতে পারে না। মেসিকে প্রতি ম্যাচে পাঁচ থেকে ছয়জন খেলোয়াড় মার্ক করে। রুনির ক্ষেত্রে তো তা ঘটে না। ঘটনা যাই হোক, এই ছেলেটা (মেসি) এরই মধ্যে কিংবদন্তি হয়ে গেছে।’

চালিয়ে যেতে চান ক্যাপেলো

জার্মানির কাছে ১-৪ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে ইংল্যান্ডের। বিশ্বকাপ যেখানে শেষ, ঠিক সেখানেই যেন ইংলিশ ফুটবলে নানামুখী বিতর্কের শুরু।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোর দায়িত্বে থাকা না-থাকা নিয়ে। ২০১২ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও পরশু ম্যাচের পর সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ক্যাপেলো। তবে পরদিনই মত পাল্টে থেকে যাওয়ার কথা বলেছেন, ‘এই চাকরিটা আমার পছন্দ। আমি ইংল্যান্ড দলের ম্যানেজার থাকতে চাই।’ ক্যাপেলো আরও জানিয়েছেন, এই চাকরিটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক বড় বড় ক্লাবের প্রস্তাবেও নাকি রাজি হননি।
ক্যাপেলো থাকতে চাইলেই তো আর হলো না। তাঁকে দায়িত্বে রাখবে কি না ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, সেটিও প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে সপ্তাহ দুয়েক অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। ‘আমি আজ (কাল) স্যার ডেভের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি তাঁদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছেন’—বলেছেন ক্যাপেলো।
ক্যাপেলোর দল পরিচালনা সঠিক ছিল কি না, নানা মুখে ফিরছে এই প্রশ্নও। ইতালিয়ান এই কোচ যাঁকে দলে নেননি, সেই মাইকেল ওয়েন ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোচের কৌশলের কড়া সমালোচনা করলেন ওয়েন, ‘পৃথিবীতে এমন একজনও নেই, যিনি আমাদের বোঝাতে পারবেন, জার্মান খেলোয়াড়েরা আমাদের চেয়ে ভালো, কিন্তু আমাদের দল দেখার পরই আমার মনে হয়েছে, এই দল হারবে। কৌশলের দিক দিয়েই আমরা হেরে গেছি।’
ইংল্যান্ডের এই পরাজয়ের পর ল্যাম্পার্ড কি আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলে যাবেন? ‘ইংল্যান্ডের পক্ষে আমি আরও খেলে যেতে চাই’—বলেছেন ল্যাম্পার্ড।

দায় স্বীকার

পদত্যাগ করেছেন ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জাঁ-পিয়েরে এস্কালেটস। দলের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন ফ্রান্সের ইউরো ২০১৬ আয়োজক হওয়ার প্রার্থিতাকে সফল করতে। তা আর কী করবেন, বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে কাল পদত্যাগই করে বসলেন ৭৫ বছর বয়সী এস্কালেটস।

হেনিন-শারাপোভার হার

উইম্বলডনে মেয়েদের কোর্টে কালকের দিনটি এক নম্বরদের জন্য ছিল মিশ্র অনুভূতির। বর্তমান এক নম্বর খেলোয়াড় সেরেনা উইলিয়ামসের সঙ্গে কোর্টে নেমেছিলেন তিন সাবেক নাম্বার ওয়ান খেলোয়াড় জাস্টিন হেনিন, কিম ক্লাইস্টার্স ও মারিয়া শারাপোভা। সেরেনা ও ক্লাইস্টার্স জয় নিয়ে কোর্ট ছাড়লেও বাকি দুজন হেরেছেন।
এক কোর্টে মুখোমুখি হয়েছিলেন ফিরে আসা দুই রানি—কিম ক্লাইস্টার্স ও জাস্টিন হেনিন। এই দুই বেলজিয়ান-কন্যার লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়েও ৩-১-এ জিতেছেন টেনিস-মম ক্লাইস্টার্স।
প্রথম সেটটা ২-৬ গেমে হারলেও ক্লাইস্টার্স পরের দুটি সেট সহজেই (৬-২ ও ৬-৩) জিতে নিয়েছেন। ২৭ বছর বয়সী ক্লাইস্টার্স শেষ আটে খেলবেন ভেরা জভোনেরেভার বিপক্ষে। রুশ জভোনেরেভা হারিয়েছেন সার্বিয়ান ইয়েলেনা জাঙ্কোভিচকে।
সেরেনা উইলিয়ামসের মুখোমুখি হয়েছিলেন সাবেক এক নম্বর শারাপোভা। সেরেনার কাছে ৬-৭ (১১/৯) ও ৪-৬ গেমে হেরেছেন তিনি।

মাঝমাঠ যখন ব্যবধান গড়ে দেয় by গোলাম সারোয়ার টিপু

বল পজেশন রেখে টুকটুক করে আক্রমণে যাওয়া বনাম গতির ওপর ভর করে দ্রুত ঢুকে পড়া—এমন একটা ছবি আঁকা হয়ে যাচ্ছে মনে। আর্জেন্টিনা-জার্মানির কোয়ার্টার ফাইনাল এর চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু দেবে কি না দেখার অপেক্ষায় রইলাম।
পরশু দুই দল দ্বিতীয় রাউন্ডের বাধাটা এত সহজে পার হবে ভাবিনি। বিশেষ করে জার্মানির সামনে ইংল্যান্ডের খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়া খানিক অবিশ্বাস্য। কেন ইংল্যান্ডের এই পতন?
মাঝমাঠ—মাঝমাঠই আসলে অনেকটা ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। জেরার্ড, ল্যাম্পার্ডদের নিয়ে ইংল্যান্ডের মাঝমাঠটা কাগজে-কলমে বেশ শক্তিশালী। কিন্তু মাঠে জার্মানির মাঝমাঠ ছিল সক্রিয় এবং আক্রমণ গড়ায় কার্যকর। মূলত এই জায়গায় মার খেয়েছে ইংল্যান্ড। জার্মানির মাঝমাঠ অনেক বেশি পরিশ্রম করেছে, যার প্রতিফলন ৪-১ স্কোরলাইনে।
অ্যাটাকিং থার্ডে জার্মানি ছিল ধারালো, ইংল্যান্ড তেমন নয়। রানিং এবং ‘কমন’ বলে জয় জার্মানির। সর্বোপরি জার্মান মানসিকতারও জয়। ওফ, অসাধারণ! মানসিকতার দিক থেকে ইংল্যান্ডকে পরিষ্কার পেছনে ফেলেছে জোয়াকিম লোর দল।
গতি আর শক্তির ওপর দ্রুত বল চালানো, সুযোগের ব্যবহার, ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, ম্যান টু ম্যান এবং জোনাল মার্কিং—তারুণ্যের দল জার্মানি এই বিভাগগুলোতে স্পষ্টই এগিয়ে থাকার ফল পেয়েছে। ক্লোসা, মুলারদের গোল করার ক্ষুধার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অসাধারণ সব ফিনিশিং, গোলের বানে ভেসে যাওয়াই তো স্বাভাবিক ছিল ইংল্যান্ডের!
ইংল্যান্ডের ১১ জন খেলোয়াড়ই যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে থাকল! এই দলের পক্ষে তো আসলে কিছু করা প্রায় অসম্ভব। তার ওপর রক্ষণভাগ যদি একের পর এক ভুল করে যায়, তাহলে শোধরানোর সুযোগ কোথায়!
ল্যাম্পার্ডের ওই শটটা ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ার পর গোললাইন অতিক্রম করেছে, ওটা গোল। সহকারী রেফারির দৃষ্টি কীভাবে তা এড়িয়ে গেল, বোধগম্য নয়। তবে ওই গোল হলেও খেলার ফল কী হতো, আলোচনা করে এখন আর লাভ নেই। ২-১ থেকে ফল তো হলো ৪-১!
ভূপৃষ্ঠ থেকে একটু উঁচুতে খেলা হওয়ায় বলের বাউন্স এবং গতি ছিল বেশি। তা হোক, দু দলই খেলাটা শুরু করল লম্বা পাসে। জার্মানি যতটা নিখুঁতভাবে পাসিং করে গেল, ইংল্যান্ড তা পারল না। চাপের কারণেই কিনা দ্বিতীয়ার্থে প্রচুর মিস পাস করল ইংল্যান্ড। ওয়েইন রুনি গোটা ম্যাচে একটি কি দুটি শট নিয়ে তাও বাইরে মারল। তাকে নিয়ে এত মাতামাতি ইংলিশ মিডিয়ার! ইংলিশরা পারেও।
আর্জেন্টিনার আগের ম্যাচগুলোর পর বলেছি, তারা প্রতি ম্যাচেই উন্নতি করছে। আজও একই কথাই বলতে হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে গোল পাচ্ছে, খেলায় ছন্দ এবং ধার দুটোই, মাঝেমধ্যে লাতিন ঝলক—এই আর্জেন্টিনার পক্ষে বিশ্বকাপ জেতা অসম্ভব কিছু মনে হচ্ছে না আর।
মেসিকে অন্যদিনের মতো উজ্জ্বল লাগেনি। সারাক্ষণ কড়া পাহারায় থাকলে এমন হতেই পারে। তার পরও নিজের কাজটা ঠিকই করে গেছে। প্রথম গোলটা মেসি তৈরি করে দিয়েছে, তবে গোলদাতা তেভেজ ছিল ছিল পরিষ্কার অফসাইডে। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ তুলনামূলক এদিন জমাট ছিল বেশি। মেক্সিকানরা গোলে শট নিয়েছে বটে, কিন্তু তা দূর থেকেই।

সান্তা ক্রুজের চোখে ইতিহাস

এর আগে সাতবার বিশ্বকাপে খেলেছে প্যারাগুয়ে। কিন্তু কখনোই দ্বিতীয় রাউন্ডের বাধা পেরিয়ে ওপরে উঠতে পারেনি। অষ্টমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসে এবারও দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রেখেছে লাতিন দেশটি। প্যারাগুয়ের স্ট্রাইকার রক সান্তা ক্রুজ দুই চোখ ভরে স্বপ্ন দেখছেন দ্বিতীয় রাউন্ড পেরিয়ে এবার নতুন ইতিহাস গড়ার। ওয়েবসাইট।
শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ে এর আগেও নাম তুলেছে বারতিনেক। কিন্তু এই ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে। অতীত জেনেও সান্তা ক্রুজ ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছেন, কারণ এবার তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রতিপক্ষ জাপান!
এশিয়ার পরাশক্তি হলেও বিশ্বকাপে জাপান ‘পুঁচকে’ দলই। ভাগ্যগুণে এই ‘পুঁচকে’ দলই যখন সামনে তখন ইতিহাস গড়তে আরেকবার ভাগ্যের সহায়তা প্রার্থনা করছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা। বলেছেন, ‘অতীতে আমরা যা করতে পারিনি, এবার তেমন কিছু করেই ইতিহাস গড়তে চাই।’
ইতালির সঙ্গে ড্রয়ের পর স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে জয় এবং শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ড্র। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে প্যারাগুয়ে। তার পরও তাঁর দলের পারফরম্যান্স নাকি ভালো ছিল না! বলেছেন, ‘আমরা খুব সুসংগঠিত দল ছিলাম না। আক্রমণে অনেক সমস্যা ছিল। যা ছিল অনভিজ্ঞতায় ভরা।’
২০০২ ও ২০০৬-এর পর এবার তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে আসা সান্তা ক্রুজের বয়স ২৮ পেরিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। তাই এবারই কিছু একটা করতে চান। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে তো সেই ইঙ্গিত নেই! দল এগিয়ে গেলেও সান্তা ক্রুজ গোল করতে পারেননি একটিও। ইতালির বিপক্ষে গোল করেছিলেন ডিফেন্ডার আন্তলিন আলকারাজ। স্লোভাকিয়ারর বিপক্ষে গোল করেছেন মিডফিল্ডার এনরিক ভেরা ও ক্রিস্তিয়ান রিভেরোস। তবে এ নিয়ে তাঁর হতাশা নেই, ‘গোল না পাওয়া নিয়ে আমি চিন্তা করছি না।’

মেসিকেই ভয় জার্মানদের

২০০৬ বিশ্বকাপের বার্লিন স্টেডিয়ামের ছবিটা কি মনে আছে আপনার? টাইব্রেকে হেরে মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছে আর্জেন্টিনা। কোচ হোসে পেকারম্যান বেরিয়ে যাচ্ছেন ডাগ-আউট থেকে। বেঞ্চে বসে থাকা ১৯ বছর বয়সী খেলোয়াড়টি ঠিক যেন বুঝে উঠতে পারছেন না, তাঁর কী করা উচিত। ঘটমান ঘটনাপ্রবাহে একটু যেন হকচকিত!
সেই তরুণের বয়স এখন ২৩। সেদিনের উঠতি তারকাই আজ ফুটবল-বিশ্বের মহাতারকা। লিওনেল মেসি—গত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পেকারম্যান যাঁকে মাঠেই নামাননি শেষ পর্যন্ত। আজও আর্জেন্টাইনরা মনে করে, পেকারম্যানের এই সিদ্ধান্তই শেষ চারে যেতে দেয়নি আর্জেন্টিনাকে।
মেসির সামনে সুযোগ এসেছে চার বছর আগের আক্ষেপ মুছিয়ে দেওয়ার। কোয়ার্টার ফাইনালে সেই জার্মানিকেই যে পাচ্ছে আর্জেন্টিনা! ‘সেই জার্মানি’টা বলা বোধ হয় ভুল হলো। নিজেদের মাঠে গত বিশ্বকাপে যেমন খেলেছে জার্মানি, তার চেয়েও তারুণ্যের জয়গান গেয়ে চলা এই জার্মানি যেন আরও দুর্ধর্ষ। তার পরও মিরোস্লাভ ক্লোসারা সমীহ করছেন আর্জেন্টিনাকে। এই আর্জেন্টিনার মূল অস্ত্রটার নাম যে মেসি!
ইংল্যান্ডকে আগের ম্যাচে গুঁড়িয়ে দিয়ে আসার পর ক্লোসা বলেছেন, ‘আমরা আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের তুলনা করতে চাই না। আর্জেন্টিনা অন্য মাপের একটা দল। মূল ব্যাপারটাই হলো পুরো একটা দল হয়ে খেলা, যেটি ইংল্যান্ডের ছিল না।’
গত বিশ্বকাপে রবার্তো আয়ালার গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। একটা সময় তাদের সেমিফাইনাল নিশ্চিতই মনে হচ্ছিল। কিন্তু শেষ দিকে ৮০ মিনিটে গোল শোধ করে দেন ক্লোসা। ওই ম্যাচের কথা ভালোমতোই মনে আছে বিশ্বকাপে এক ডজন গোলের মালিক ক্লোসার, ‘এরপর আর্জেন্টিনার অনেক কিছুই পাল্টেছে। জার্মানিরও। মনে আছে, সেবার মেসি বেঞ্চেই বসে ছিল।’
এবারও মেসিকে নিষ্ক্রিয় রাখতে চায় জার্মানরা। সামি খেদিরা যেমন বলছেন, ‘মেসির বিপক্ষে খেলা কঠিন। পুরো ৯০ মিনিট ওকে আটকে রাখা কোনো খেলোয়াড়ের পক্ষে সম্ভব নয়। দলগত প্রচেষ্টা এবং সম্ভবত একাধিক খেলোয়াড়ই থাকবে ওকে আটকে রাখতে। তবে এও বলে রাখছি, আর্জেন্টিনাকে আমরা ভয় পাচ্ছি না, ওদের হারানো অবশ্যই সম্ভব।’

আবার অধিনায়ক মাশরাফি

ঠিক এক বছর আগে প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন। পেয়ে প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই পড়লেন ইনজুরিতে। অধিনায়কত্ব থেকে তো বটেই, দূরে সরে গিয়েছিলেন মাঠ থেকেও। ইনজুরি কাটিয়ে আরও আগেই মাঠে ফেরা মাশরাফি বিন মুর্তজা এবার ফিরে পেলেন অধিনায়কত্বও। বিসিবি কাল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জানাল—ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে পাঁচ ওয়ানডের সফরে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি।
উস্টারশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ততা আছে, ব্যাট হাতে ফর্মটাও খুব ভালো যাচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে সাকিবই নাকি আপাতত দূরে সরে থাকতে চেয়েছেন অধিনায়কত্ব থেকে। কাল তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেই বিসিবি থেকে মাশরাফিকে জানানো হয়েছে নতুন করে অধিনায়কত্ব দেওয়ার কথা। সহ-অধিনায়ক করা হয়েছে তাঁর অনুপস্থিতিতে গত এক বছর দলকে নেতৃত্ব দেওয়া সাকিব। বাংলাদেশ দল আগামীকাল ভোরে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে ৮ জুলাই, ট্রেন্ট ব্রিজে।
নতুন করে অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মাশরাফি বলেছেন, ‘মাত্রই জানলাম...এখনো বুঝতে পারছি না, কী বলব। তবে আত্মবিশ্বাস আছে, পারফর্ম করেই নেতৃত্ব দেব দলকে।’ ঠিক এক বছর আগে গত বছরের জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন মাশরাফি। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের প্রথম টেস্টেই ইনজুরিতে পড়ায় সহ-অধিনায়ক সাকিবকে দেওয়া হয় অধিনায়কের দায়িত্ব।
ইংল্যান্ড সফরে ভালো কিছুর আশাই করছেন মাশরাফি, ‘প্রথম টার্গেট অবশ্যই ভালো খেলা। এশিয়া কাপটা আমাদের ভালো যায়নি। আশা করি, ইংল্যান্ড থেকে ভালো কিছু নিয়ে ফিরতে পারব।’

ম্যারাডোনা এখন শান্তিদূতও! by পবিত্র কুন্ডু



মাঠে খেলছেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, ডাগ-আউটে আরেক সাবেক বিশ্বসেরা। এমন একটা দল দর্শক-সাংবাদিকদের পতঙ্গের মতো টানবে, জানাই ছিল। কিন্তু সেই টান কতটা, সেটা বোঝা গেল পরশু সকার সিটি স্টেডিয়ামে। মেসি-ম্যারাডোনার দলের টানে বিশাল মিডিয়া সেন্টারটাও ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ছোট সে তরী’ হয়ে গেল।
ফিফা আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল, অত্যধিক চাহিদার কারণে অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকা সব সাংবাদিককে ম্যাচ টিকিট দেওয়া যাবে না। কপাল পুড়ল বিশ্বকাপ থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকা বাংলাদেশের অভাগা সাংবাদিকদের। তবে মনের মধ্যে একটা সান্ত্বনা অন্তত জমা হলো। ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, কোরিয়ার ওরা যখন টিকিট পায়নি, আমাদের তো না পাওয়ারই কথা। অতএব বিশালাকৃতির এলসিডি টিভিগুলোই আমাদের সহায় হলো। মেসি, তেভেজ, হিগুয়েইন, দস সান্তোস, হাভিয়ের হার্নান্দেজদের নৈপুণ্য দেখলাম মিডিয়া সেন্টারে বসে।
মাঠে খেলা দেখি, কিন্তু একটু পরপরই চোখ চলে যায় ডাগ-আউটে। সেখানে ম্যারাডোনা তাঁর সরব উপস্থিতি জানান দেন বারবার। হাত নেড়ে খেলোয়াড়দের ইশারা করেন। একটা সুযোগ হাতছাড়া হলে দুই হাত ওপরে তুলে হতাশায় লাফ দেন। চিৎকার করে কী যেন বলতে চান খেলোয়াড়দের। কিন্তু কথা ততদূর পৌঁছায় না। মূকাভিনয় করে যান আর্জেন্টাইন ফুটবলের দেবতা। কানে কথা পৌঁছাবে কী? ভুভুজেলা আছে না! ওগুলো শুধু আর দক্ষিণ আফ্রিকানদের সম্পত্তি নয়। সব দেশের সব বয়সী দর্শকের হাতে উঠে গেছে। পরে হয়তো কোনো এক সময়ে হিসাব করা হবে, এই প্লাস্টিকের বাঁশি কতগুলো গোল হতে দেয়নি, আর কতগুলো গোল প্রতিপক্ষের জালে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এখন এটা আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকার গর্বের প্রতীক। ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার পর্যন্ত এটির দারুণ ভক্ত। তাঁর কাছে এটি বাতিল করে দেওয়ার আবেদন উঠলেই তিনি হা-রে-রে করে উঠছেন। সাংবাদিক সমাজ নিশ্চিত, ব্ল্যাটার টুর্নামেন্ট শেষে বাক্সভর্তি ভুভুজেলা নিয়ে যাবেন তাঁর জুরিখের বাড়িতে। বিশ্বকাপের সফল আয়োজনের তৃপ্তিতে সংগীতরসিক এই সুইস ওটা বাজাবেন মাঝেমধ্যেই। আবার মন খারাপ হলেও হয়তো হাতে তুলে নেবেন।
মন খারাপ হওয়ার কোনো লক্ষণ তাঁর মধ্যে এখনো দেখা যায়নি। গ্যালারিতে বিভিন্ন দেশের রাজা-উজিরদের দেখছেন। দেখছেন গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা, নর্তক-নর্তকীদের। কদিন গ্যালারি মাতিয়ে গেলেন বিল ক্লিনটন। এখনো আছেন গায়ক মিক জ্যাগার। সত্যিই আছেন কি না হলফ করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, ইংল্যান্ডের জালে ওদিন জার্মানদের শ্যুটিং প্র্যাকটিস করতে দেখে দৃশ্যত জ্যাগারকে বিষণ্ন লাগল।
আরেকজনকে বিশ্বকাপের অনেকেই এখানে বিষণ্ন দেখবে বলে ভেবেছিল। নিদেনপক্ষে তাঁর ক্রুদ্ধ চেহারা। রেফারির দিকে তেড়ে যাচ্ছেন, অঘটন ঘটিয়ে ফেলছেন সংবাদ সম্মেলনে। যেমন করে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তাঁকে নিষিদ্ধ থাকতে হয়েছে মাস তিনেক।
কিন্তু না, তিনি আশ্চর্য রকমের ধৈর্য দেখাচ্ছেন। মাঠে শান্তি স্থাপনে ভূমিকা রাখছেন। তেভেজের প্রথম গোলের পর পুরো মেক্সিকো শিবির খেপে গেল রেফারির ওপর। পরিষ্কার অফসাইড থেকে গোল। ইতালীয় রেফারি রবার্তো রসেত্তি বিরতির সময় ড্রেসিংরুমে যাওয়ার সময় পড়লেন বিপদে। তাঁর ওপর হামলে পড়লেন মেক্সিকোর রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়েরা। শান্তি স্থাপনে এগিয়ে এলেন কে? ডিয়েগো ম্যারাডোনা।
রসেত্তিকে তবু ম্যারাডোনা রক্ষা করেছেন। কিন্তু ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচের উরুগুইয়ান রেফারি হোর্হে লরিয়েন্দাকে তিনি বাঁচাতে পারবেন না। শারীরিকভাবে আক্রান্ত না হলেও এরপর তিনি শুধু ইংলিশ মিডিয়ার কাঁটার খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত হতে থাকবেন। ইংলিশ মিডিয়া কতটা বিষাক্ত তা কি আর জানেন না আর্জেন্টিনার ছিয়াশি বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক!
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কীভাবে হয়! এই ইংল্যান্ড ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল পেয়েছিল বল গোললাইন অতিক্রম না করা সত্ত্বেও (অন্তত জার্মানরা এখনো তা-ই মনে করে)। আর এ ম্যাচে বল গোললাইন পেরিয়ে যাওয়ার পরও ইংল্যান্ডকে গোল দিলেন না এই রেফারি।
ইংল্যান্ড-জার্মানি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করেছে। ৩ জুলাইয়ের কোয়ার্টার ফাইনালে কি আর্জেন্টিনা-জার্মানি ম্যাচও তা-ই করবে? গত বিশ্বকাপের শেষ আটে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছিল জার্মানি। এবার কি তাহলে আর্জেন্টিনার জয়ের পালা? এই জয়টা কি হবে মেসির গোলে? তেভেজের আলোকোজ্জ্বল নৈপুণ্যের পরও মেসির নাম সবার মুখে। কারণ, মেসির গোল না পাওয়া যে এখন বিশ্বকাপের দুঃখ হয়ে রয়েছে।

Tuesday, June 29, 2010

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লড়াই

ফাইনালের আগে দুই দলের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে এর আগেই একখণ্ড ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা লড়াই দেখা যাবে আজ প্রিটোরিয়ার লফটাস ভার্সফেল্ড স্টেডিয়ামে। অবাক হচ্ছেন? জাপানের রক্ষণ আর প্যারাগুয়ের আক্রমণভাগের বড় দুই ভরসা যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার! একজন মার্কাস তুলিও তানাকা, ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত জাপানিজ। আরেকজন লুকাস ব্যারিয়স। জন্ম, বেড়ে ওঠা—সব আর্জেন্টিনায় হলেও এখন খেলছেন প্যারাগুয়েতে।
বিশ্বকাপের আগে তুমুল আলোচনায় ছিলেন দুজনই। প্রস্তুতি ম্যাচে ৩টি গোল করেছিলেন দুজনই। তবে ব্যারিয়স তিনবারই গোল করেছেন প্রতিপক্ষের জালে, আর তুলিও দুবার নিজেদের জালে! দিদিয়ের দ্রগবার হাতটাও কিন্তু তিনিও ভেঙেছিলেন!
ব্যারিয়সের ইচ্ছে ছিল আর্জেন্টিনার হয়েই খেলার। কিন্তু এত এত তারকার ভিড়ে সুযোগ পাচ্ছিলেন না দেখে কদিন আগে বেছে নিয়েছেন মায়ের দেশ প্যারাগুয়েকে। ৩টি প্রস্তুতি ম্যাচে ৩ গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁকে নিয়ে ভুল করেনি প্যারাগুয়ে। গ্রুপের তিন ম্যাচে গোল না পেলেও নিজের জাত চিনিয়েছেন অসংখ্য সুযোগ সৃষ্টি করে। বক্সের ভেতর ক্ষিপ্রতার জন্য ‘প্যান্থার’ উপাধি পেয়ে যাওয়া স্ট্রাইকার আজ গোলটাও পেতে চাইবেন।
জন্ম-বেড়ে ওঠা ব্রাজিলে বলেই হয়তো বল পায়ে তানাকা রোমাঞ্চ-প্রিয়, ডিফেন্ডার হলেও ঘোরাফেরা করেন প্রতিপক্ষের সীমানায়। ক্লাব ফুটবলে মিডফিল্ডার ও স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেনও বেশ কিছু ম্যাচ। তবে রক্ষণ সামলানোটাই সবচেয়ে ভালো পারেন। বছর চারেক ধরেই ‘ব্লু সামুরাই’দের ডিফেন্সের বড় ভরসা। এই বিশ্বকাপেও খেলেছেন দুর্দান্ত। ব্যারিয়স-সান্তা ক্রুজদের সামলানোর পাশাপাশি আজ তিনি হানা দেবেন প্যারাগুয়ের ডিফেন্সেও।

‘আম-কাঠলি’ by আকমল হোসেন

ফল তো কমবেশি বারো মাসই পাওয়া যায়। কিন্তু কিছু ফল আছে মেঘ-বাদলার সঙ্গে যাদের ঘোরতর সম্পর্ক। এই ফলগুলো যেন মাস-মৌসুম ঠিক করে একসঙ্গে মিলেমিশে গাছে আসে। গ্রীষ্ম ও বর্ষায় রং বদলায়, একসঙ্গে পাক ধরে। আম, কাঁঠাল, আনারস, জাম, লিচু—আরও অনেক জাতের স্থানীয়-অস্থানীয় ফল আছে, যা এই মৌসুমে গাছে গাছে তার রূপ-লাবণ্য মেলে ধরে। ফলের পাকা ঘ্রাণে মথিত হয় বাতাস। দেখতে ও স্বাদে আলাদা হলেও এই ফলের সবাই সবার প্রতিবেশী। জাতপাত যা-ই হোক, তারা পাতে প্রায় একসঙ্গেই ওঠে।
এখন সময় যদিও এই ফল-ফলারির ওপর তার ছোবলটা বেশ ভালোই দিয়েছে। অনেক ফলই আর দেখা যায় না। তবু আম, কাঁঠাল বা আনারস—এগুলো কমবেশি এখনো আছে। উপায় নেই তার থেকে চোখ ফেরানোর। দানাদার, কাঁটাঅলা ও টসটসে ফল দেখা যাবে, আর জিবে জল আসবে না—এটাও ভাবা মুশকিল। কিন্তু এই দেখাদেখি বা ঘরে বসে পরিবার-পরিজন নিয়ে একান্তে ফলভোজন। এর মধ্যেই ফলের মৌসুমটা ফুরিয়ে যেতে পারে না।
আর সম্ভবত একসঙ্গে এত ফল আসে বলেই এই ফলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অনেক পারিবারিক ও সামাজিক পার্বণের। শুধু মৌলভীবাজারই নয়, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অনেক এলাকায় ঘরে ঘরে এখন চলছে ‘আম-কাঠলি’ দেওয়া-নেওয়া। ধনী-দরিদ্র বলে কথা নেই। যাঁর যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কমবেশি ফল নিয়ে মেয়ের বাড়িতে ছুটছেন সবাই। আম-কাঠলি উপলক্ষে মেয়ের বাড়িতে জমে উঠছে উৎসবের আনন্দ। জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে মেয়ের বাড়িতে মৌসুমি ফল দেওয়ার এ রেওয়াজ এই অঞ্চলটিতে যুগযুগের। আর এই রেওয়াজকে পালক দিতেই মৌসুমি ফলের বাজার এখন কেনাবেচায় রমরমা হয়ে উঠেছে।
মৌলভীবাজার শহরে এই সময়ে মৌসুমি ফলের সবচেয়ে বড় বাজার বসে কোর্ট মার্কেটে। শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়ার ব্রাহ্মণবাজার, রবিরবাজার, কমলগঞ্জের আদমপুর, রাজনগরের টেংরাবাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁঠাল ও আনারস নিয়ে আসেন পাইকারেরা। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার কাঁঠাল ও আনারস বিক্রি হচ্ছে এই খুচরা বাজারে। কোর্ট মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতা-বিক্রেতার হই-হুল্লোড়ে এখন বাজারটি জমজমাট। বাজার ভাসছে পাকা কাঁঠাল ও আনারসের ঘ্রাণে। ছোট ট্রাক, মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ঠেলাগাড়িতে বোঝাই করা হচ্ছে কাঁঠাল, আনারস, আম ও খই। এগুলো আম-কাঠলি হিসেবে মেয়ের বাড়িতে পাঠানো হবে।
কেনাকাটায় ব্যস্ত সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের দুঘর গ্রামের সুফিউর রহমান বললেন, ‘আমি মেয়ের বাড়িতে আম-কাঠলি দেব বলে কেনাকাটা করছি। জ্যৈষ্ঠ বা আষাঢ় মাসে এই অঞ্চলের লোকজন মেয়ের বাড়িতে আম-কাঠলি দিয়ে থাকেন। এটা অনেক দিন ধরে চলে আসছে।’ সফিউর রহমান জানান, তিনি মেয়ের বাড়িতে পাঠানোর জন্য কাঁঠাল, আনারস, আম ও খই কিনেছেন। স্থানীয় লোকজন জানালেন, জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই মেয়ের বাড়িতে একধরনের প্রতীক্ষা থাকে বাবার বাড়ি থেকে আম-কাঠলি যাওয়ার। বাবা-মা বা অভিভাবকেরাও মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। মেয়ে নাতি-নাতনি পেয়ে গেলেও বাবার বাড়ি থেকে আম-কাঠলি পাঠানো হয়ে থাকে। তবে নতুন বিয়ে হলে আম-কাঠলি দেওয়ার ধুমধাম বেশি হয়ে থাকে। নতুন মেয়ের বাড়িতে প্রথম আম-কাঠলি পাঠাতে ফলের পরিমাণ বেশিই দেওয়া হয়। সঙ্গে থাকে মিষ্টি। দুই পক্ষের আত্মীয়স্বজন মেয়ের বাড়িতে ভিড় করে। খানাপিনায় ছোটখাটো বিয়ের মতো হয়ে যায় আয়োজন। কোনো কোনো অভিভাবক আছেন, তাঁরা যে শুধু মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে থাকেন, এমন নয়। ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকেও আম-কাঠলি পেয়ে থাকেন। যদিও বিত্তবানদের ক্ষেত্রে এই উৎসব আনন্দেরই। দরিদ্র মানুষের এই প্রথা মানতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয়। তবু হাত-পা গুটিয়ে থাকেন না তাঁরাও। মেয়ের মান রাখতে, জামাই, নাতি-নাতনি ও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকদের খুশি করতে দু-চারটা কাঁঠাল, দুই-চার হালি আনারস, এক-দুই কেজি আম ও এক কেজি খই নিয়ে হলেও মেয়ের বাড়িতে যান। এটাই নিয়ম, এটাই প্রথা। আম-কাঠলি দিতে না পারলে কোনো কোনো পরিবারে মন কষাকষির ঘটনাও ঘটে।
কোর্ট মার্কেটে প্রায় ১৫ বছর ধরে মৌসুমি ফল বিক্রি করেন ওয়াহিদ মিয়া। তিনি বলেন, কেউ মেয়ের বাড়ি, কেউ বোনের বাড়ি আম-কাঠলি দেওয়ার জন্য গাড়ি ভরে ফল কিনে নিচ্ছেন। সাধারণত গাড়ি দিয়ে যাঁরা নিচ্ছেন, তাঁরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার ফল কিনছেন। ওয়াহিদ মিয়াসহ অন্য খুচরা বিক্রেতারা জানান, কোর্ট মার্কেটে এখন প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ জন বিক্রেতা কাঁঠাল ও আনারস নিয়ে বসছেন। প্রতিদিন ছয় থেকে সাত লাখ টাকার আম, কাঁঠাল ও আনারস বিক্রি হচ্ছে। এই মার্কেটের বড় ক্রেতাই হচ্ছেন আম-কাঠলির ক্রেতা। বাজারে থাকতে থাকতেই ছয়-সাতটি গাড়ি আম-কাঠলি নিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে গেল। অভাব-অনটন, টানাপোড়েন যা-ই থাক, আম-কাঠলির পুরোনো এ প্রথাটি এই অঞ্চলে পারিবারিক বন্ধনের সম্পূর্ণ আলাদা এক উচ্ছ্বাস।

ভারতে হিটলার কেন জনপ্রিয় by আলী রীয়াজ

ভারতে হিটলারকে নিয়ে নির্মিতব্য একটি ছায়াছবি বিষয়ে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেটা হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও টের পাওয়া যাচ্ছে। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে এ নিয়ে উৎসাহ ও বিতর্কের কারণ সহজেই অনুমেয়। হিটলারকে নিয়ে যেকোনো ছবি তৈরি হলেই তা বিশ্বের গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করে—এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি। তা ছাড়া ভারতের চলচ্চিত্র জগতের খবরাখবর এখন হলিউডের চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ প্রায় এক দশক ধরে সাধারণ শ্রোতা-পাঠকের মনোযোগের বিষয় হলেও স্লামডগ মিলিয়নিয়ার ছবিটি অস্কার পাওয়ার পর চলচ্চিত্রের বাইরের জগতের মানুষও কমবেশি খবরাখবর রাখেন বলিউডে কী হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মাই নেম খান ছবিটি একশ্রেণীর দর্শকের কাছে আবেদন রেখেছে। অতীতে দীপা মেহতার তৈরি ছবি ওয়াটারও অনেকের মনোযোগ পেয়েছিল। তবে এখন ডিয়ার ফ্রেন্ড হিটলার নামের নির্মিতব্য ছবিটি যে কারণে সংবাদে উঠে এসেছে, তা ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ নয়, হিটলারের বিষয় নিয়ে। হিটলারের শেষ দিনগুলো এবং তাঁর প্রেমিকা ইভা ব্রাউনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এ ছবি। এর নাম অবশ্য অন্যসূত্রে প্রাপ্ত—হিটলারের কাছে লেখা গান্ধীর দুটি চিঠি। হিটলারের জীবন, বিশেষ করে শেষ দিনগুলো নিয়ে এটাই প্রথম চলচ্চিত্র নয়। ২০০৪ সালে জার্মান-অস্ট্রিয় যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল ডাউনফল নামের একটি ছবি। এ ছবি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ছবি হিসেবে ২০০৫ সালে অস্কারের জন্য মনোনয়নও পায়। অনেকেরই হয়তো স্মরণে থাকবে, ছবিটির প্রদর্শনী শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জার্মানির পত্রপত্রিকায় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল; হিটলারকে মানবিকভাবে দেখানো কতটা গ্রহণযোগ্য? শুধু হিটলারই নয়, তাঁর চারপাশের মানুষেরা, যাঁরা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা, তাঁদের সহানুভূতির সঙ্গে দেখানো হয়েছে বলেও বিতর্ক হয়েছে।
ফলে হিটলার নিয়ে ছবি তৈরি হলে তা যে বিতর্কের ঝড় তৈরি করবে, ছবির পরিচালক, প্রযোজক বা সংশ্লিষ্টরা তা জানতেন না, তা নয়। ২০০৯ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক মুসোলিনির গোপন প্রেমিকা আইডাডেলসার ও তাঁর ছেলের জীবন নিয়ে তৈরি ছবি ডিনসেরে (যার অর্থ হচ্ছে বিজয়ের জন্য) ও খানিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। তবে এ ছবিতে মুসোলিনির প্রতি কোনোরকম সহানুভূতি ছিল না বলে এ নিয়ে হইচই হয়েছে কম।
ভারতে নির্মিতব্য ছবি নিয়ে বিতর্কের সূত্র ধরে একটা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, যা কেবল ছবির আলোচনা করলেই বোঝা যাবে না। সেটা হলো: ভারতে হিটলার কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন? বিবিসির মুম্বাই সংবাদদাতা জুবায়ের আহমেদ জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে লিখেছেন, হিটলার মেমোরাবিলিয়া—অর্থাৎ হিটলার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্মৃতিমূলক বিষয় এখন ভারতে বেশ জনপ্রিয়। হিটলারের লেখা বইটির বেশ কাটতি রয়েছে। ২০০৯ সালে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল, ছয় মাসে নয়াদিল্লিতে বইটির ১০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। হিটলারে আত্মজীবনী মাইন কাম্ফ বইটি যাঁদের কাছে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে, তাঁরা বয়সে তরুণ, ব্যবসায় প্রশাসন বা এ জাতীয় বিষয়ের ছাত্র। অনেক গণমাধ্যম এ খবর দিয়েছিল, তরুণেরা হিটলারকে একজন সফল ব্যক্তি বলে বিবেচনা করেন; তাঁদের বিবেচনায় হিটলারের একটি ‘ভিশন’ (রূপকল্প) ছিল, পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবায়নে প্রচেষ্টা ছিল এবং সাফল্যও ছিল। ব্যবস্থাপনার একটি পাঠ্যপুস্তক হিসেবে মাইন কাম্ফ পড়ছেন ছাত্ররা এ ধরনের সংবাদও এসেছিল।
কোনো বই পড়ার ব্যাপারে আপত্তি করার জন্য এ প্রসঙ্গের অবতারণা করছি না। হিটলারের আদর্শ বোঝার জন্য নাৎসিদের ভয়াবহ আচরণের ভিত্তি বোঝার জন্য এ বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু ভারতে এটা কেবল সেখানেই সীমাবদ্ধ আছে কি না আমি সে প্রসঙ্গটি তুলতে উৎসাহী। ২০০৬ সালে মুম্বাইতে ‘হিটলার ক্রস’ বলে একটি রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছিল, সেটা হয়তো অনেকেরই মনে থাকবে। প্রবল আপত্তির মুখে মালিক শেষ পর্যন্ত ওই রেস্তোরাঁর নাম বদল করতে বাধ্য হন। এ রেস্তোরাঁটি নতুন নামে এখনো টিকে আছে কি না আমার জানা নেই।
ভারতের রাজনীতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক শক্তি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের আদর্শের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কি না সেটাও ভাবার বিষয়। বিজেপির আদর্শিক নেতা গোলওয়ালকার ১৯৩৯ সালে জার্মানদের শুদ্ধি অভিযান, বিশেষ করে ইহুদি নিধনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। তার ভাষায় ‘এ থেকে হিন্দুস্তানে আমাদের ভালো কিছু শেখার আছে।’ ১৯৪৯ সালে হিন্দুত্ব আদর্শের উদ্ভাবক ভীর সাভারকার লিখেছিলেন, আমরা যদি জার্মানদের মতো শক্তিশালী হতে পারি, তবে ভারতের মুসলমানদের জার্মান ইহুদিদের মতো অবস্থা হবে। ১৯৯২ সালে মুম্বাই দাঙ্গার আগে শিব সেনা নেতা বালঠাকরে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি মাইন কাম্ফ বইটি নেন এবং ‘‘ইহুদি’’ শব্দের বদলে সেখানে ‘‘মুসলমান’’ শব্দটি বসান, তাহলে বুঝতে পারবেন, আমি কী বিশ্বাস করি।’ এসব উদাহরণ স্পষ্টতই আদর্শিকভাবে নাৎসিদের সঙ্গে ভারতীয় বিজেপির এক ধরনের সাদৃশ্য তৈরি করে। সে কারণেই ভারতে যখন হিটলারের আত্মজীবনী গ্রন্থ জনপ্রিয়তা লাভ করে, তরুণেরা হিটলারকে আদর্শ বলে বিবেচনা করে, তখন তা কেবল বইয়ের জনপ্রিয়তা ভাবা যায় না।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, হিটলারের প্রতি আকর্ষণ কেবল হিন্দুত্ববাদী তরুণদের মধ্যেই লক্ষণীয় নয়; যেখানেই উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেখানেই হিটলার ও নাৎসিদের আদর্শ অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ইতিহাসবোধের অভাব ঘটলে, সহনশীলতার আদর্শকে জলাঞ্জলি দিলে এ ধরনের উগ্র মতবাদ জায়গা করে নেয়।
ভারতে হিটলারকে নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের শুরু হয়েছে, তার একটা ইতিবাচক দিক হলো এই রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো উত্থাপন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যাঁরা একে নেহাত-ই চলচ্চিত্রবিষয়ক বিতর্ক বলে মনে করছেন, আমি তাঁদের সঙ্গে একমত হতে রাজি নই। আমার বিশ্বাস, ভারতীয় রাজনীতির মধ্যেই এ জনপ্রিয়তার উপাদান আছে। পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দিতে চাই, একটি রাজনৈতিক আদর্শ কেবল প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা পায় না; বরং একটি আদর্শের ভিত্তি তৈরি হয় আস্তে আস্তে দৈনন্দিন জীবনাচরণের মধ্যে। ‘পাবলিক কালচার’ বা সাধারণ জীবনের প্রতিদিনের আচার-আচরণ, বিশ্বাস, কর্মকাণ্ড এমন ব্যবস্থা তৈরি করে, যার মধ্যে দিয়ে একটা আদর্শ দাঁড়াতে পারে। ভারতে বিজেপির উত্থানের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন সাংস্কৃতিক শুদ্ধতার আন্দোলনের নামেই দলের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এটা কেবল হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ও আন্দোলনের জন্য প্রযোজ্য, তা নয়। বাংলাদেশের চারপাশে তাকালে গত দশকের সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনগুলো লক্ষ করলে এর ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।
ইলিনয়, ২৩ জুন ২০১০
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভারসিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে.. by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

তুমুল তর্ক বেধেছে, বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে। তর্কের শেষ নেই। বিশ্বাসীরা প্রায়ই হেরে যাচ্ছেন। চাক্ষুষ প্রমাণ দানে অসমর্থ তাঁরা। একজন অবিশ্বাসী এসে জানালেন, ‘দল পরিবর্তন করছি।’ কোটরে বাসা বেঁধেছে যে কর্কট (ক্যানসার) রোগ, চিকিৎসকেরা মুখ কালো করে রায় দিয়েছেন, এ অসুখ সারার নয়। পেটের অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে, মৃত্যু এসে আলিঙ্গন করবে সহসাই। এরই মধ্যে পেলাম অভয় মন্ত্র। ভালো হয়ে যাব, তাঁর কথামতো চললে। এক মাস চলেছি কথামতো পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে। আমাকে দেখুন। ক্যানসার নেই, রেডিওলজি, এমআরআই টেস্ট বলছে, আমি ক্যানসারমুক্ত।
টাইম ম্যাগাজিনে বের হলে নড়েচড়ে বসেন সবাই। বলেন, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০০৯-এর পত্রিকাটি আপনার আছে? যেখানে জেফরি ক্লুগার ফেঁদেছেন প্রবন্ধ, নাম: দি বায়োলজি অব বিলিফ, বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পরকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে পরাস্ত করে চলেছেন, তার খবর। এর পরই এলিস পার্কের ফোরাম: ফেইথ অ্যান্ড হিলিং। ক্যামব্রিজের ফেনোমনোলজি ইনস্টিটিউটে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি, ফি-বছর আমন্ত্রণ পাই। দুই বছর পরপর ‘রিজন ও ফেইথ’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হয়তো কোনো দিন যাওয়ার সুযোগ হবে, হয়তো হবে না।
মরণের পরে কি এ নিয়েই ভাবনা! চিকিৎসাশাস্ত্র ও ধর্ম দেহের যত্নের কথা বলে। চিকিৎসাশাস্ত্র মৃত্যুর পরবর্তী ভাবনা নিয়ে নিশ্চুপ, বিজ্ঞানও তা-ই। ইহুদিরা জীবনের পর সম্বন্ধে প্রায় কিছুই বলে না, বরং বলে, পৃথিবীটাকে ভালো করে ঝালিয়ে দেখো, যা কিছু এর মধ্যেই। খ্রিষ্টধর্ম দেখায় দোজখ ও বেহেশতের স্বপ্ন। ইসলামও তা-ই। বৌদ্ধরা দেখায় পুনর্জন্মের স্বপ্ন, সর্বশেষে নির্বাণ। হিন্দুত্ব শেখায় পুনর্জন্ম, কর্মশেষের পরিণতিতে। তাওইজম শেখায় জীবন ও মৃত্যুর সূত্র খুবই ক্ষীণ। বেহেশত ও দোজখ বলে কিছু নেই।
মস্তিষ্ক নিয়ে যত গবেষণা তার ছিটেফোঁটাও এসে পৌঁছেছে বলে মনে হয় না। শত বই বেরুচ্ছে বছরে মস্তিষ্ক নিয়ে নানা জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে। বর্ডার্স ও বার্নস অ্যান্ড নোবেলে ভিড় করে আছেন উৎসাহীরা। ছয় হাজার রোগীর মধ্যে পরীক্ষা হয়েছে, মাঝেমধ্যে প্রার্থনায় অংশ নেন যাঁরা। কয়েক শ পৃষ্ঠা ফলাফল। বর্তমান নিবন্ধের জন্য অল্প একটু:
১. প্রার্থনালয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারীদের আয়ুষ্কাল দুই থেকে তিন বছর বর্ধিত হয়েছে।
২. ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ৮২ জন কালো ব্যক্তি চার্চে যাতায়াত করেন। ৯২ জন কালো ব্যক্তি বিশ্বাস করেন যে ধর্ম তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয়। শতকরা ৫৫ জন সাদা ধর্মে বিশ্বাসী।
৩. উপবাস বা রোজায় অংশ নিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য ফলাফল পাওয়া গেছে। নিষ্কৃতি পেয়েছেন ক্যালরি থেকে, প্রথম লিভারে, ফ্যাট ও প্রোটিন ডিপজিট থেকে। দেহের মস্তিষ্কের খাদ্য বন্ধ হওয়ার পর অন্য পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনা খানিকটা হলেও উন্মুক্ত। ‘Disconnect, if you wish to connect with the other.’ মুঠোফোন নিবৃত্তির বিজ্ঞাপন নয়, ইন্দ্রিয়দ্বার বন্ধের ঘোষণা। ‘চন্দ্রমুখ’, আইপড, টিভি, সিনেমা, ধূমপানের মতো শত আয়োজন উপেক্ষা করো, দেহমনকে করো প্রস্তুত।
৪. পেটে খেলে এক রকম সয়, না খেলে অন্য রকম। ফলাফল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করেনি। সবার জন্য ফলাফল এক। কেউ ভেবেছেন ভালো হতে হলে বিশ্বাসের কাছে যেতে হবে। অন্ধ বিশ্বাস। যাজকের কাজ হলো রোগীর বিশ্বাসের মান নির্ধারণ করা। যতটুকু বিশ্বাস ততটুকু ওষুধ, ততটুকু নিরাময়। সোজা ব্যাপার। বিশ্বাস ঈশ্বরের প্রতি যতটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
আফ্রিকায় খ্রিষ্টধর্মের সাফল্যের চাবিকাঠি প্রচারকদের নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। দেশে দেশে পাদ্রিরা ছুটে গেছেন গভীরারণ্যে কুষ্ঠের সেবায়, পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে গেছেন ম্যালেরিয়ার সন্ধানে, গলগণ্ড, আর্সেনিকের সন্ধানে। তাবলিগরাও নেই পিছিয়ে। কাঁধে নিয়েছেন বায়োকেমিক, হোমিওপ্যাথি বড়ি ও পিতলের তাবিজ। দেহ একটি মন্দির, তার প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য ও সুচেতনা।
জগতে এখন পাওয়া যাচ্ছে নানা নিরাময় কেন্দ্রের খবরাখবর। চিকিৎসক, মনোরোগ চিকিৎসক, ধর্মচারী, পবিত্র আবহ সৃষ্টিকারী প্রার্থনার শুভ নিয়ামক যেখানে একত্র হয়েছেন। তুরস্কে দেখে এসেছি দরবেশী নৃত্যের আয়োজন, পাহাড়ি উষ্ণ প্রস্রবণের পাদদেশে, প্রতি প্রাতে ইমামের শুভদৃষ্টি অসুখকে করে বিদূরিত। ‘সোহ্বৎ-ই-ফকির’ এই নিরাময় শর্তের অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের নবীজি চিকিৎসক ছিলেন না। সাধারণের জন্য ছিল তাঁর উপদেশাবলি। ‘সুস্থ জীবন ও সুস্থ পরিবেশ’ অধ্যায়ে ৭/৮ পৃষ্ঠা মুহাম্মদের [দ.] নাম গ্রন্থে। যখনই বৃষ্টি হতো বৃষ্টিতে ভিজতেন নবী। ‘একদিন হঠাৎ মেঘের বর্ষণ শুরু হলো। বর্ষার ঘনঘটা। পৃথিবী স্নাত হতে লাগল। নবীজি তাঁর পবিত্র সুন্দর গায়ের চাদর খুলে আল্লাহ্র করুণাধারাকে সমস্ত দেহমন দিয়ে উপভোগ করলেন। বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি। সর্বাঙ্গ ভিজে গেল বৃষ্টির জলে। একজন সাহাবী বললেন, ‘আপনি যে একেবারে ভিজে গেছেন।’ নবীজি বললেন: ‘ঠিক বলেছ, এ মেঘ যে আল্লাহ্র সৃষ্টি। এর বর্ষণ তো তাঁরই করুণাধারা। সিক্ত হয়ে ধন্য হলাম আমি।’
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: লেখক ও সংগীত ব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

হরতাল পালন, না ভীতি উদযাপন by মশিউল আলম

গাবতলী থেকে গুলিস্তান যাবে বলে যাত্রী নিয়ে একটি বাস ফার্মগেটে এসে থেমে গেল। বাসটির চালক ও তাঁর সহযোগী যাত্রীদের উদ্দেশে সমস্বরে বলে উঠল, ‘নামেন নামেন, বাস আর যাইব না।’ যাত্রীদের মধ্য থেকে একজন রাগী স্বরে জানতে চাইল, ‘কেন যাবে না?’
‘সামনে রিস্কের ব্যাপার,’ বাসের কন্ডাক্টর বোঝাতে লাগলেন ওই যাত্রীকে। আশপাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকটি বাস দেখিয়ে তিনি যাত্রীকে বললেন, ‘ওই যে দেখেন, গুলিস্তানের দিকে কুনো বাসই যাইতাছে না।’
পল্টন-গুলিস্তান, অর্থাৎ রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়; হরতাল, অবরোধ, সমাবেশসহ যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচির মূল কেন্দ্র এবং সে-কারণে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনাগুলো ওই এলাকা বা তার আশপাশেই ঘটে বেশি। হরতালের দিনে যাত্রীসুদ্ধ বাস নিয়ে সেদিকে যাওয়ার বিপদ সম্পর্কে বাসগুলোর ড্রাইভার-কন্ডাক্টররা সচেতন ও সাবধানী। সব যাত্রী নেমে গেলে বাসটির তরুণ চালককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গুলিস্তানের দিকে কোনো গণ্ডগোলের খবর কি আপনারা পেয়েছেন?’ তাঁর উত্তর, ‘না। কিন্তু রিস্ক লইতে চাই না।’
তার আগে, সকাল সাড়ে নটার দিকে শ্যামলীতে এক দোকানের একটি বাদে সব ঝাঁপ বন্ধ দেখে এগিয়ে গিয়ে দোকানের কর্মীদের জিজ্ঞাসা করি, হরতাল বলে তাঁদের এই সাবধানী ব্যবস্থা কি না। উত্তরে এক কর্মী বললেন, ‘বহুত দিন পর হরতাল দিছে না? কী হয় না হয়!’
রিকশাচালকেরা যাত্রী নিয়ে দূরের গন্তব্যে যেতে রাজি হচ্ছেন না। রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখে কয়েকজন রাস্তার পাশে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তাঁদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আপনারা কি হরতাল করছেন?’ একজন বললেন, ‘না, ভয়ে ভয়ে আছি। এত পুলিশ-র‌্যাব দেইখ্যা মনে হয় গণ্ডগোল হইতে পারে।’ আরেকজন বললেন, ‘ধরেন, একখান ইটা আইসা ঘাড়ে পড়ল, বা ধরেন, আপনারে বাড়ি লাগাইল, চিন্তার বিষয় আছে না?’
শ্যামলী সিনেমা হলের মোড় ও আশপাশ এলাকায় অধিকাংশ দোকান বন্ধ, মিরপুর রোডে বাস, ট্যাক্সি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিরল। মানুষ হেঁটে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। মোড়ে পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যদের জটলা। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা শুরু করি। হরতালে জনগণের সাড়া কেমন দেখছেন? আমার এ প্রশ্নের উত্তরে একজন মৃদু হেসে বললেন, ‘ডাক দিলেই তো হরতাল হয়ে যায়। আর কিছু করা লাগে না।’ বললাম, ‘রাস্তায় আপনাদের সংখ্যা বেশি দেখতে পেলে তো মানুষ ভাবে, গণ্ডগোল হতে পারে।’ পুলিশ সদস্যের উত্তর, ‘স্বাভাবিক, গণ্ডগোল তো হইতেই পারে। হরতাল মানেই গণ্ডগোলের সম্ভাবনা।’
‘সব হরতালের ক্ষেত্রেই তো এমন কথা বলা যায়। আজকের হরতাল কিন্তু বেশ টাইট মনে হচ্ছে।’—আমার মন্তব্যে পুলিশের সদস্য বললেন, ‘অনেক দিন হরতাল ছিল না। মানুষ বুঝতে পারতেছে না, ঘর থেকে বারাইব, না ঘরেই থাকা নিরাপদ। দোকানপাট খুলতেও দোনোমনা করতেছে। সবার মনেই ভয়।’
সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত আদাবর, রিং রোড, শ্যামলী সিনেমা হলের মোড়, সেখান থেকে হেঁটে মিরপুর রোড ধরে কলেজ গেট হয়ে আসাদ গেট পর্যন্ত যেতে যেতে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি হরতাল প্রসঙ্গে। আসাদ গেটে গুলিস্তানগামী একটি বাসে উঠে ফার্মগেটে নামতে বাধ্য হয়েছি। কারণ বাসটির চালক ও কন্ডাক্টর আর কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সাহস করেননি। ফার্মগেটে অনেক মানুষ, প্রত্যেককেই ঘর থেকে বেরোতে হয়েছে কোনো না-কোনো জরুরি কাজে। তাঁদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারি, একান্তই জরুরি না হলে তাঁরা হরতালের মধ্যে ঘর থেকে বের হতেন না। যেমন, কল্যাণপুর থেকে আসা এক যুবক বললেন, তাঁকে যেতে হবে শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে। কিন্তু বাস ফার্মগেটের পর আর শাহবাগের দিকে যাচ্ছে না বলে তিনি হেঁটেই রওনা হয়েছেন শাহবাগের উদ্দেশে। বাসায় স্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন, দুপুরের পর হরতাল একটু শিথিল হলে তিনি যেন বের হন। কিন্তু তবুও তিনি বেরিয়েছেন: ঝুঁকি নিয়ে।
বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও বয়সের যত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, সবাই প্রকাশ করেছেন অজানা আশঙ্কা ও ভীতির কথা। প্রত্যেকেই ঘর থেকে বের হয়েছেন মনের মধ্যে একটা ঝুঁকির বোধ নিয়ে। বিএনপির এই হরতালের ইস্যু কী, কেন তারা হরতাল ডেকেছে, তা বলতে পারলেন না একজনও। দুপুরের একটু পরই বার্তা সংস্থার খবরে জানা গেল, বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করছে। সোমবারের সংবাদমাধ্যমে হয়তো দেখা যাবে, বিএনপির নেত্রী হরতাল সফল করার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে—বিষয়টি বোধ হয় পুরোপুরি এ রকম নয়। আসলে জনজীবনে স্বাভাবিক ছন্দের যে পতন দেখা গেছে, তার কারণ একটা সাধারণ ভীতি, অজানা শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার বোধ। হরতালে মানুষের মনে কাজ করে নিরাপত্তাহীনতার উদ্বেগ, কী হয় না-হয়—এমন শঙ্কা।
জনগণকে এই শঙ্কার মধ্যে ফেলার অধিকার কি কারোর আছে? হরতালের ডাক দিলেই জনমনে যে ভীতি ও অজানা আশঙ্কার সঞ্চার ঘটে, তার ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে হরতালের বৈধতা প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। যে কর্মসূচি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার বিপন্নতার মুখে পড়ে, নিরাপদে চলাফেরা ও জীবিকা অর্জনের পথে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, তেমন কর্মসূচি সম্পর্কে গুরুতর পুনর্বিবেচনা আশু কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সংসদে ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে হরতালের মতো জবরদস্তিমূলক, নাগরিক অধিকার খর্বকারী রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়, সে বিষয়ে ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ঢাকা, ২৭ জুন ২০১০
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

মাই লর্ড মেয়র মন্জুর আলম by মিজানুর রহমান খান

চট্টগ্রামের মেয়রকে ‘মাই লর্ড মেয়র’ হিসেবে সম্বোধন করতে চাই। কারণ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি সামন্তসমাজের প্রতিচ্ছবি দেখি। দেখি তেমনই সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। ফিউডালিজমের বাংলা হলো সামন্ততন্ত্র। ১৬১৪ সালে শব্দটির প্রয়োগ শুরু। আপনারা লক্ষ করেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলের প্রতীকে হয় না। তবুও আমরা দুই পরীক্ষিত বন্ধুর দেখা পাই। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মন্জুর আলমকে রাজধানীতে আসতে দেখি। তাঁরা প্রধান দুই দলের নেতার কাছে দোয়া নিয়েছেন। জনাব চৌধুরী কায়ক্লেশে তাঁর সংশয়গ্রস্ত আনুগত্য নবায়ন করেন। মন্জুর আলম জিয়ার প্রথম সমাধি জিয়ারত করেন। তাঁর ভাইকেও বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে ফুল নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যায়। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলে তিনি নিজেই ছুটে আসতেন। এসব ঘটনা প্রমাণ দেয়, স্থানীয় নির্বাচন নয়, চট্টগ্রামে একটা কেন্দ্রীয় নির্বাচন হলো। আর এই কেন্দ্র কোনো রকম বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী নয়।
মিলটা দেখুন। মধ্যযুগীয় সামন্তসমাজে লর্ড ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। লর্ড কথাটি বহু দেশে বহু অর্থে ব্যবহূত হয়। আমাদের দেশে বিচারপতিদের লর্ড সম্বোধন করা হয়। তার উৎপত্তি সম্ভবত প্রাচীন জার্মান উপজাতীয় প্রথায়। এই লর্ড মানে ‘রুটিরক্ষক’। অস্ট্রেলিয়া, কানাডার প্রধান নগরপিতাদের এখনো বলা হয় লর্ড মেয়র। ব্রিটেনে রাজা ছিলেন প্রধান লর্ড। আমরা ব্রিটেনের বিবর্তন মনে রাখব। মন্জুর আলমকে লর্ড মেয়র সম্বোধন করলাম। সেটা ‘রাজার খাস ভাড়াটে’ অর্থে। মধ্যযুগীয় ব্রিটেনের অনুসরণে।
রানি এলিজাবেথ আজও প্রধান লর্ড। কিন্তু ওই খোলসটুকু মাত্র। ভেতরে গণতন্ত্র। সামন্তসমাজে রাজাদের কাছে বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের শপথ নিতে হতো। জনগণ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। চট্টগ্রামে মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকবে।
মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজে দুজন ব্যক্তির মধ্যে এই শপথ হতো। আমাদের সমাজেও এর বাস্তব অনুশীলন চলছে। মহিউদ্দিন ও মন্জুর ঢাকায় এসে শপথ নেন। এই শপথই আমাদের সমাজের চালিকাশক্তি মনে হয়। মধ্যযুগে যে আনুগত্য দেখাত, তাকে বলা হতো ‘ভেসাল’ বা দাসখতদাতা। যার কাছে শপথ বা দাসখত দেওয়া হতো, তাঁর ছিল লর্ড উপাধি। আমাদের সমাজে এখন লর্ড নেই। আছে অন্য নামে। এরাই ভাইয়া। চাচা। বড় ভাই। কখনো আপা, ম্যাডাম ইত্যাদি। ২২ জুন মন্জুর সাংবাদিকদের বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তিনি ‘আজীবন বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা’ করেছেন।
লর্ড-ভেসাল শপথের সময় একটি চুক্তি হতো। ভেসাল বলত, আপনার অবাধ্য হব না। লর্ড বলত, তোমাকে আমি সুরক্ষা দেব। রাতবিরাতে ফুলের তোড়া হাতে ছোটাছুটির মধ্যে আমরা উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে সেই মধ্যযুগীয় চুক্তির ছায়া দেখি।
নির্বাচনের আগে দুই নেতা ঢাকায় ওই শপথ পাঠ করেন। নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এটা করতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। কারও পক্ষেই তা এড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ ক্ষমতার রাজনীতিটা চট্টগ্রামের মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে না। ভোটাররা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করলে বাংলাদেশে গোত্র গণতন্ত্রের এতটা বাড়বাড়ন্ত হতো না। ঢাকায় ওই যে শপথ হলো, এর মাধ্যমে তারা আসলে চট্টগ্রামকে ‘ভেসেল স্টেট’ বা পুতুল নগরে নামিয়ে আনল। বড় নেতা-নেত্রীরা চাইবেন না, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চাইবে না, অথচ স্থানীয় জনগণ চাইবে বলে সেটা মানতে হবে, সেটা হবে না। আর সেটা যখন হয় না বা নামকাওয়াস্তে কিছু হয়, তখন সেখানে স্থানীয় সরকার আর থাকে না। স্থানীয় শাসন কায়েমের প্রশ্ন মাঠে মারা পড়ে।
চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে আমরা খোলস-গণতন্ত্রের মহড়া দেখি। কিন্তু গণতন্ত্রের বিজয় দেখি না। লাতিন শব্দ মেয়র। এর অর্থ মহত্তম। প্রায় ১১০০ বছর আগে এডওয়ার্ড দ্য এলডারের আমলে এই পদটির জন্ম। পরিহাস হলো, সম্রাটের অনুগত ও বিশ্বস্তরাই এ পদ পেতেন। আজও সেই আনুগত্যই বড় পরীক্ষা। প্রার্থী হতে হলে তা অর্জন করতে হবে। ভোটের পরে তাকে রক্ষা করতে হবে।
১৮৮২ সালে ব্রিটেনে প্রথম মেয়র নির্বাচন আইন হয়। সে আইনে কিন্তু মেয়রের মেয়াদ এক বছর নির্দিষ্ট হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যথাসময়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হতে হবে। আমার কাছে মনে হলো, কথাটা ১২৮ বছর দূর থেকে ভেসে এসেছে। মেয়াদ শেষে যাতে নির্বাচন না হয়, সে জন্য কৌশলের কোনো অভাব নেই। ওই আইনেই কিন্তু নির্দিষ্ট ছিল, প্রতিবছর ৯ নভেম্বর নির্বাচন হবে। ব্রিটেনের শুরুটা এমন ছিল। এখন কোথাও মেয়াদ বেড়েছে। ভাবুন তো, আমরা কেন গণতন্ত্র শেখার পর্বে এখন এমন আইন তৈরি করি না।
সব রকম উদাহরণই আছে। কোনটা আমরা নেব। দেখব। শিখব। সেটাই বড় বিষয়। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে মেয়রের মেয়াদ ছয় বছরের। বেলজিয়াম অনির্দিষ্টকাল মেয়াদে। অনেক দেশে কেন্দ্রীয় সরকার মেয়র নিয়োগ দেয়। অনেক দেশে আমাদের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা হলো নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা মেয়র নির্বাচন। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়রদের অনেকেই স্বৈরশাসক হয়ে উঠছেন। যে মডেলটা আমাদের দেশে এখন চলছে, সেটায় ত্যক্তবিরক্ত ব্রিটেন। একজন নির্বাচিত মেয়র, সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন আমলা। দুজন মিলে কাউন্সিলরদের পাত্তা না দেওয়া। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরের অধিকাংশ সময় সম্ভবত এটাই চালিয়েছেন।
এক দশক ধরে ব্রিটেন এই প্রশ্নে অস্থিরতা দেখাচ্ছে। ৩৭টি স্থানে গণভোট হয়েছে। মাত্র ১২টিতে প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচন সমর্থিত হয়েছে। বাকি ২৫টিতে কাউন্সিলরদের ভোটে মেয়র নির্বাচনের পরোক্ষ ব্যবস্থা সমর্থিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই পরোক্ষ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিন সদস্যের স্থানীয় সরকার কমিশন পরোক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচনের সুপারিশ করে। আওয়ামী লীগ এই বিধান বিলোপ করেছে। পরোক্ষ ভোট শুনলে অনেকে আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তো পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। সেটা কি আইয়ুবের মডেল? এই তুলনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
গত ১৭ জুনের ভোটে শুধু কাউন্সিলর নির্বাচন হতে পারত। ৪১ জনের যে কেউ মেয়র হতে পারতেন। তখন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসত প্রতিটি ওয়ার্ড। গণমাধ্যম শুধু দুজনকে ঘিরে মাতামাতি করল। মোনায়েম খাঁ শুধু পিন্ডির মনোভঞ্জনে আগ্রহী ছিলেন। আমাদের এই ব্যবস্থায় ঢাকাকে বানালাম পিন্ডি। নব্য পিন্ডিকে সন্তুষ্ট রাখাটাই মাই লর্ড মেয়রের চ্যালেঞ্জ। এখানে বীরত্ব কিংবা অবাধ্যতার সুযোগ নেই। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার কোনো ফাটাফাটির খবর নেই। ‘বিএনপির সময় যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছি, সেভাবে আমি আওয়ামী লীগের সময় পারিনি’, জনাব চৌধুরীর মুখে এ কথা বহুবার শোনা গেছে। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেনকে নিয়ে শেখ হাসিনার আদৌ কোনো অস্বস্তি আছে বলে আমরা জানি না।
আমি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের বড়ই মিল পাই। তখন রাজারাই ছিলেন ফিউডাল লর্ড। কাউন্টরা (রাজার সহচর) উঁচুতে ছিলেন। সামন্ত প্রভুরা ছিল নিচু। কাউন্টরা অর্পিত ক্ষমতা (ডেলিগেটেড পাওয়ার) ভোগ করতেন। কিন্তু ফিউডাল লর্ডদের সেই সুযোগও ছিল না। দয়াপরবশ হয়ে রাজারা যতটুকু ক্ষমতা দিতেন, সেটুকুই তাঁদের ভোগ করতে হতো। আমাদের মেয়র, সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, যেখানে যাঁর নাম যাই হোক, তাঁরা সেই ফিউডাল লর্ড। কেউ কাউন্ট। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এই ভূখণ্ডে তাঁরা যে যাই হোন, জনগণের অর্পিত প্রকৃত দায়িত্ব তাঁরা পালন করেন না। সামন্ততন্ত্র আর গণতন্ত্র পাশাপাশি চলে না। উপজেলা প্রশাসনকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে সামন্ততন্ত্রে কুঠারাঘাত পড়বে। তাই তা দেওয়া হয় না। স্থানীয় শাসনের উত্থান ঘটলে সংসদের মুখোশটা খুলে পড়বে। তাই স্বায়ত্তশাসনকে দুই বড় দল যমের মতো ভয় পাচ্ছে। দুদক, মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তথ্য কমিশন—সবটাকেই সুতো দিয়ে বাঁধার প্রবণতা। সবশেষ বিটিআরসিকে পদানত করার সূত্র ওই একই।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ঢাকাভিত্তিক সরকারের দয়াভিক্ষায় টিকে থাকে। অথচ প্রজাতন্ত্রের মালিকেরা তাদের স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবের সেই স্বায়ত্তশাসনের স্বাদ। প্রদেশ, রাজ্য বলা হয়নি ঠিকই, নামকরণ একটা করেছিল। ‘প্রশাসনিক একাংশ’। থমাস জেফারসন ও জেমস মেডিসনেরা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে পতাকা দিয়েছিলেন। সংবিধান দিয়েছিলেন। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা অতটা ভাবেননি। তবে তাঁরা ছায়াটা নেন। কখনো মনে হয় সেটা দিলেই বুঝি ভালো হতো। বাংলাদেশে প্রদেশ ও ফেডারেল সরকার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। চট্টগ্রামে ১৭ লাখ ভোটার। তরুণ ভোটার পাঁচ লাখ। ভুটানের লোকসংখ্যা সাত লাখ। চট্টগ্রাম মহানগরে লোকসংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। এর চেয়ে কম লোকসংখ্যার দেশের সংখ্যা ৮০টির বেশি হবে।
প্রশ্ন হলো, আমাদের মাই লর্ড মেয়রগণ তাঁদের শহরগুলোকে প্রকারান্তরে আর কতকাল ভেসেল স্টেট হিসেবে গণ্য করে চলবেন? মোঙ্গল শাসক ও তাঁদের চেলাচামুণ্ডারা ছিলেন মারকুটে। নগরগুলোর লর্ডরা তা টের পেতেন। তাই তাঁদের নগর আক্রমণের আগেই আত্মসমর্পণ করতেন। এর মূলমন্ত্র ছিল একটাই—শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন। এটাই লিটমাস টেস্ট। বাংলাদেশেও টেস্ট ওই একটাই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর আনুগত্যবিচ্যুতি দেখা দিয়েছিল। তিনি অনেকগুলো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি নগর সরকারের স্বপ্ন দেখতেন। এসব বিষয় ওই আনুগত্যের সঙ্গে যায় না। মন্জুর আলম আনুগত্যের পরীক্ষায় এ পর্যন্ত উত্তীর্ণ। সেটা জনাব চৌধুরীরও জানা। মন্জুর আলম গত ২২ জুন জনাব চৌধুরীর বাসভবনে যান। জনাব চৌধুরীর শোবার ঘরে পর্যন্ত তাঁর প্রবেশাধিকার রয়েছে। সম্পর্কটা এমনই অন্তরঙ্গ। জনাব চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরে মন্জুর আলমকে সর্বোচ্চ নয়বার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেন।
আমরা চট্টগ্রামের নগর-রাজনীতিতে কোনো মৌলিক গুণগত পরিবর্তন আশা করছি না। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, গণতন্ত্র শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালু হবে—এসব অলীক স্বপ্ন। কিছু ক্ষেত্রে যা বিএনপি তা-ই আওয়ামী লীগ। মাই লর্ড মেয়র সে রকম একটি চরিত্র। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। তাঁর পিতা একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। এর সুফল তিনি নেবেন। তাঁর ব্যক্তিগত সততার সুনাম আমরা শুনেছি। সে জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। মহিউদ্দিন ৫০ বছর আর নতুন মেয়র রাজনীতিতে আছেন ৪০ বছর। মহিউদ্দিন ‘আমৃত্যু’ রাজনীতি করবেন। জনাব আলমের সামনে সংসদ নির্বাচনের টিকিট ঝুলছে। তদবির করে আর হতাশ হতে হবে না। হয়তো তিনি কার কাছ থেকে নেবেন, সেটা একটা প্রশ্ন।
মাই লর্ডকে প্রশ্ন করুন। কবে অবসর নেবেন। তিনি অবমাননা বোধ করবেন। মহিউদ্দিন সম্পদের বিবরণী দেননি। কাউন্সিলরদের কাছ থেকে আদায় করেননি। একই পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন নতুন মাই লর্ড। তাঁর ব্যক্তিগত সততা হয়তো থাকবে। কিন্তু উল্লিখিত লর্ড-ভেসেল শর্ত তাঁকে মানতে হবে। শর্ত ভাঙতে চাইলে তিনিই ভেঙে যাবেন। তেমন ঝুঁকি নেওয়ার লোক তিনি নন বলেই শুনিছি। চ্যালেঞ্জ নিতে সংকল্প হচ্ছে? আচ্ছা নিন। নাগরিকদের পক্ষে এই একটি কাজ করে দেখান। লর্ড-ভেসেলের সুতাটা ছিন্ন করুন। অবসরের ঘোষণা দিন কিংবা নিজের ও পোষ্যদের সম্পদ ও দায়দেনা এবং স্বার্থের সংঘাতের বিবরণী প্রকাশ করুন। মাই লর্ড মেয়র, আপনাকে আমরা অভিনন্দন জানাব। অপেক্ষায় রইলাম।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

ভিস্যাট বন্ধ -বিকল্প ব্যবস্থা না রাখা অপরিণামদর্শিতা

কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখার ব্যবস্থা ভিস্যাট বন্ধ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিসিএল)। ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের জন্য একটিমাত্র সাবমেরিন কেব্ল সংযোগের বাইরে কোনো বিকল্প তাই আর খোলা রইল না। এত দিন ভিস্যাটের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলে বিকল্পভাবে অথবা জরুরি অবস্থায় ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগের কাজ চালাতে পারত। বিকল্প না রেখে ভিস্যাট বন্ধের এই সিদ্ধান্তকে সংশ্লিষ্ট সবাই বিতর্কিতই মনে করছেন।
ভিস্যাট হলো কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হওয়ার প্রযুক্তি। বিটিআরসি ভিস্যাট বন্ধের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধের কথা বলেছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ভিস্যাট ব্যয়বহুল হওয়ায় একে ব্যবহার করে ভিওআইপি ব্যবসা মোটেই লাভজনক নয়। সুতরাং ভিওআইপি বন্ধ করার জন্য ভিস্যাট বন্ধ করার কথা বলা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার শামিল। বিটিআরসি তাহলে কোন উদ্দেশ্যে ভিস্যাট বন্ধ করে দিল, তা জানা প্রয়োজন। ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির পক্ষ থেকে বিটিআরসির এই সিদ্ধান্তকে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট যুক্ততার প্রধান উপায় হলো সাবমেরিন কেব্ল। কিন্তু দেখা যায়, মাঝেমাঝেই সমুদ্রের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই কেব্ল কাটা পড়ে সেই সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৫৭ লাখ আর কম্পিউটারের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের সামনে সাবমেরিন কেব্ল সংযোগ বন্ধ থাকার সময় কোনো বিকল্প আর রইল না। আচমকা ভিস্যাট ব্যবহার বন্ধ করা তাই অপরিণামদর্শী কাজ। সরকারের উচিত, ভিওআইপি বন্ধের আরও কার্যকর পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া, বিকল্প সাবমেরিন কেবলের বন্দোবস্ত রাখা। এক বিকল্প বন্ধ করার আগে আরও সহজ ও আইনানুগ বিকল্পের ব্যবস্থা থাকা উচিত।

হরতালে বাড়াবাড়ি -সংসদই হোক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু



রোববারের হরতাল নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল—দুই পক্ষই যে আচরণ করেছে, তাতে রাজনৈতিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকেই বাড়িয়ে তুলল। বিএনপি শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের ওয়াদা করলেও শনিবার মধ্যরাতে রাজধানীতে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জনমনে যে ভীতির সঞ্চার করেছে, তার জবাব কী? অন্যদিকে হরতালের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণের মধ্যেও ছিল বাড়াবাড়ি, যা সমর্থনযোগ্য নয়।
বিএনপির নেতাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিনা উসকানিতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ পুরো অসত্য নয়। সরকার কাউকে ধরে নিতে বললে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেঁধে নিয়ে যায়, সে উদাহরণেরও অভাব নেই। কয়েকটি স্থানে বিরোধী দলের কর্মীদের ওপর হামলা এবং হরতাল-সমর্থকদের বাড়াবাড়িও পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। হরতালের আগের রাতে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জনমনে ব্যাপক ভীতি সঞ্চার করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। যে বা যারাই এ অপকর্ম করুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। বিএনপি হরতালকে সফল বলে দাবি করে জনগণের প্রতি যে অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছে, তাতেও নতুনত্ব কিছু নেই। প্রতিবারই হরতাল সফল করার জন্য বিরোধী দল এবং প্রত্যাখ্যান করার জন্য সরকার জনগণকে সাধুবাদ জানিয়ে থাকে। কিন্তু জনজীবনের সমস্যা নিয়ে আদৌ তারা বিচলিত বলে মনে হয় না।
হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতি দেশের কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। বর্তমান বিরোধী দল যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো আমরা হরতালের বিরোধিতা করেছি। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় হরতালই প্রতিবাদের একমাত্র ভাষা নয়। হরতালে কোনো সরকারের পতন হয় না বরং এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ ও জনগণ। এমনকি এর মাধ্যমে হরতাল পালনকারীদেরও কোনো লাভ হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জ্বালাও-পোড়াও করে জনসমর্থন বাড়ানো যায় না। সরকার কোনো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নিলে তার প্রতিবাদ জানানোর উপযুক্ত স্থান হলো সংসদ। তা ছাড়া সভা-সমাবেশের মাধ্যমেও জনগণকে সজাগ করা যেতে পারে। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের চেয়ে জনগণের সমস্যা নিয়ে তাঁদের বোঝাতে পারলে যে জনসমর্থন পাওয়া যায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনই তার প্রমাণ।
বিরোধী দল জনজীবনের সমস্যা সমাধানে যেসব দাবি সামনে নিয়ে এসেছে তার যৌক্তিকতা নেই, সে কথা বলব না। তবে তা পূরণের স্থান নিশ্চয়ই রাজপথ নয়। তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রচার চালাতে পারে। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই ধ্বংসাত্মক হতে পারে না। বর্তমানে বাজেট অধিবেশন চলছে। বিরোধী দলের কর্তব্য হবে, সংসদে গিয়ে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জনজীবনের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলো তুলে ধরা। অন্যদিকে সরকারেরও উচিত হবে, শক্তি প্রয়োগের বদলে বিরোধী দলের ন্যায়সংগত দাবিদাওয়া আমলে নিয়ে সুস্থ রাজনৈতিক স্থিতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। দলীয় অহমিকা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সরকার ও বিরোধী দল দেশ ও জনগণের কল্যাণে একযোগে কাজ করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

চীনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী উ গুয়ানজং আর নেই

চীনের আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম জনক উ গুয়ানজং শুক্রবার মধ্যরাতে বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাঁর অনেক চিত্রকর্ম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
উ হচ্ছেন চীনের ইতিহাসে প্রথম চিত্রশিল্পী জীবদ্দশায় যাঁর চিত্রকর্ম ব্রিটিশ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাঁর ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। পশ্চিমা চিত্রকলার সঙ্গে দেশীয় চিত্রকলার সংযোগ ঘটিয়ে তিনি নতুন ধারার এক শিল্পের সূচনা করেছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, মৃত্যুর আগে উ তাঁর পাঁচটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম হংকং মিউজিয়াম অব আর্টকে দান করে গেছেন।

নতুন কমান্ডার আফগান যুদ্ধনীতিতে পরিবর্তন আনবেন না

ন্যাটো জোটের নতুন কমান্ডার আফগান যুদ্ধের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনাবেন না বলে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইকে এ নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছেন, পূর্ববর্তী কমান্ডার জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টালের নীতির কারণে আফগানিস্তানে বেসামরিক লোকজনের হতাহতের সংখ্যা কমেছে। তাই এই নীতি নতুন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউসের সময়েও অব্যাহত রাখা হবে।
এদিকে পদচ্যুত হওয়ার আগে সাবেক কমান্ডার ম্যাকক্রিস্টাল আফগান যুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ছয় মাসেও আফগান যুদ্ধের কোনো উন্নতি আসবে না। লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্ট গতকাল রোববার এ কথা জানিয়েছে।
আফগানিস্তানে গত শনিবার পাঁচ বিদেশি সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে এক মার্কিন সেনাসদস্যসহ দুজন মারা গেছেন। পূর্বাঞ্চলে বোমা হামলায় মারা গেছেন আরও দুজন। তাঁদের মধ্যেও একজন মার্কিন সেনা রয়েছেন। এ নিয়ে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে নিহত বিদেশি সেনাসদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯। গত নয় বছরের মধ্যে এক মাসে এত বেশি বিদেশি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। নিহত সেনাদের মধ্যে ৫২ জনই যুক্তরাষ্ট্রের।
আফগান প্রেসিডেন্ট কারজাই সব সময় বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির এড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো না গেলে তালেবানের বিরুদ্ধে ন্যাটো জোটের চলমান অভিযানে সফলতা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসনের সমালোচনা করায় ম্যাকক্রিস্টালকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পদচ্যুত হওয়ার আগে আফগান যুদ্ধ নিয়ে ম্যাকক্রিস্টাল ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। সেখানে ম্যাকক্রিস্টাল বলেন, পরবর্তী ছয় মাসে আফগান যুদ্ধের কোনো পরিবর্তন হবে না। ফাঁস হওয়া সামরিক নথিপত্রের বরাত দিয়ে ইন্ডিপেন্ডেন্ট এ কথা জানিয়েছে। এ মাসের গোড়া দিকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পত্রিকাটি ম্যাকক্রিস্টালের বরাত দিয়ে জানায়, বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান বাধার মুখে আফগানিস্তানের দুর্নীতি ও নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। স্থিতিশীল আফগানিস্তানের জন্য দুর্নীতি দমন এবং সেখানে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না। তাদের মান উন্নয়নের জন্য জরুরি সরঞ্জাম দরকার। দেশের ওপর আফগান সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আটক ইসরায়েলি সেনার মুক্তির দাবিতে পরিবারের মিছিল

হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে মুক্ত করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য তাঁর পরিবারের সদস্যরা গতকাল রোববার থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেছেন। তাঁদের এ মিছিল চলবে টানা ১২ দিন। এ সময় তাঁরা লেবানন সীমান্তের কাছে মিজেপ হিলা থেকে রাজধানী জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হবেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবনের কাছেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন। তাঁদের এ মিছিলে হাজার হাজার সাধারণ ইসরায়েলিও যোগ দিয়েছে।
গাজা নিয়ন্ত্রণকারী জঙ্গি সংগঠন হামাস ইসরায়েলি সেনা গিলাদ শালিতকে আটক করে চার বছর আগে। তাঁকে মুক্ত করার জন্য ইসরায়েল হামাসের সঙ্গে অনেক দেন-দরবার করলেও কাজ হয়নি। তাঁর মুক্তির বিনিময়ে হামাস ইসরায়েলের হাতে বন্দী শত শত হামাস নেতা-কর্মীর মুক্তি দাবি করে আসছে। কিন্তু ইসরায়েল ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করায় শালিত এখনো বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থার অবসানের জন্য শালিতের বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা গতকাল তাঁদের নিজ শহর মিজেপ হিলা থেকে রাজধানী অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন আরও দুই হাজার ইসরায়েলি। ফলে মিছিলটি বিশাল আকার ধারণ করে।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা ‘শালিত এখনো জীবিত, শালিতকে মুক্ত করার সময় এসেছে’ ইত্যাদি স্লোগান লেখা ব্যানার বহন করে। ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মিছিলটি আগামী ১২ দিনের মধ্যে রাজধানী জেরুজালেমে পৌঁছাবে।
মিছিলে অংশ নেওয়া গিলাদ শালিতের বাবা নোয়াম শালিত জানান, শালিতকে না নিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন না।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ইস্তফা

ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় গতকাল রোববার পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। জানা গেছে, মন্ত্রী হিসেবে প্রচণ্ড কাজের চাপে থাকায় রাজ্যে দলীয় কাজে প্রয়োজনীয় সময় দিতে না পারার জন্য প্রণব মুখোপাধ্যায় ইস্তফার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ইস্তফাপত্র গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন রাজ্য বিধান সভায় কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের নেতা মানস ভূঁইয়াকে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের পৌর নির্বাচনে কংগ্রেসের ব্যাপক পরাজয়ের হার মেনে নিতে না পেরেই প্রণব মুখোপাধ্যায় এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

গিনিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনিতে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৫৮ সালে স্বাধীনতালাভের পর দেশটিতে সামরিক ও বেসামরিক স্বৈরশাসন জারি ছিল। সর্বশেষ সামরিক শাসক সেক্যুবা কোনাতের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গতকাল রোববার এ নির্বাচন হয়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, সারা দেশে ভোটকেন্দ্র ছিল আট হাজার ২৬১টি। প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা একজন নারীসহ মোট ২৪ জন। তবে শীর্ষস্থানীয় তিন প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন সেল্লু দালেইন ও সিদইয়া তৌরি এবং সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা আলফা কন্ডি।
সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, তিন দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
জেনারেল সেক্যুবা কোনাতে ভোটারদের যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান।

ইউরোপের অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা

বিক্ষোভ সমাবেশে ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে জি-২০ সম্মেলনের প্রথম দিন শেষ হয়েছে। বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ১৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্মেলনে সদস্যদেশগুলোর নেতারা প্রথম দিনেই ইউরোপের অর্থনৈতিক নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়েও আলোচনা করেন তাঁরা।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ উন্নত দেশের নেতারা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় পরিচালন ব্যয় ও বাজেট কমানো এবং বিক্রয় কর বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
টরন্টো শহরের মেট্রো কনভেনশন সেন্টারে গত শনিবার রাতে বিশ্বের বিকাশমান অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংগঠন জি-২০ সম্মেলন শুরু হয়।
সম্মেলনকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক অস্থিরতা রোধ, বেকারত্ব ঠেকানোসহ বিভিন্ন দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিক্ষোভকারীদের কালো হেলমেট ও কালো কাপড়ে মাথা ঢেকে পুলিশের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়। তারা নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ইউনিভার্সিটি এভুসু ও কলেজ সড়কের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসে ছোড়ে। রাবার বুলেটে একজন ফটোসাংবাদিক গুরুতর আহত হন। একজন বিদেশি সংবাদিক অভিযোগ করেন, পুলিশ তাঁর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাঁকে পরিচয়পত্র দেখাতে বলে।
কিং ও বে স্ট্রিট এলাকায় বেলা তিনটার দিকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার আগেই গাড়ি তিনটি পুড়ে যায়। শনিবার টরন্টোর রেলওয়ে জংশন ইউনিয়ট পুরোপুরি বন্ধ ছিল। সিএন টাওয়ার এলাকা থেকে শুরু করে কিং কুইন্স স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, ইয়াং স্ট্রিট ও ইউনিভার্সিটি সড়কে দিনভর বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের লাঠিপেটা ও রাবার বুলেটে শতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হয়।
টরন্টোর পুলিশপ্রধান বিল ব্লেয়ার বলেন, ‘টরন্টো শহরের ইতিহাসে বিক্ষোভ ঠেকাতে এই প্রথম পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এমন বিক্ষোভের ঘটনা আমরা কখনো দেখেনি।’ পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ১৫০ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী ভিক টোয়েস বলেন, ‘আমরা বিশ্বনেতা ও সম্মেলনের প্রতিনিধিদের নিরপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতি কানাডার জনগণের জন্য দুঃখজনক।’
বিক্ষোভকারীদের এতটা সহিংস হয়ে ওঠার কারণ হিসেবে গণমাধ্যম বিশ্লেষকেরা জানান, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত সম্মেলনের চেয়ে এবারের সম্মেলনে কানাডা ৫১ গুণ অর্থ বেশি খরচ করেছে। সম্মেলনের নিরাপত্তায় ৯০ কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। অথচ বর্তমানে কানাডায় বেকারত্বের হার নয় শতাংশ।
সম্মেলনে ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী গুইদো ম্যানতেগা ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলো বাজেট কমালে তাতে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হবে। এতে ব্রাজিল, চীন, ভারতসহ বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়নশীল বিশ্ব ও বিকাশমান অর্থনীতির দেশের নেতারা তাঁর কথা সমর্থন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ঘাটতি মোকাবিলায় বেশ কিছু কঠোর কর্মসূচি নেওয়ায় মন্দা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে। এখন ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘আমাদের মত বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোতে সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া আর্থিক ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। ঘাটতি মোকাবিলায় আমাদের জাতীয় ব্যয় কমাতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবারই একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।’
সম্প্রতি গ্রিসের আর্থিক ধসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইউরোপীয় নেতারা বলেন, কেবল বাজেট কমিয়ে তারা আর্থিক সংকট মোকাবিলা করে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তারা বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর রাজস্ব আদায় বাড়ানোর প্রস্তাবকে তাঁরা স্বাগত জানান। কিন্তু তা আয়কর বৃদ্ধি না করে বিক্রয় কর বাড়ানোর মাধ্যমে করা যেতে পারে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেন, উন্নত দেশগুলোকে তিন বছরের মধ্যে তাদের ঘাটতি অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে কর্মসংস্থানের। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গর্ভপাতের জন্য সরকার কোনো অর্থ ব্যয় করবে না। হার্পার ইরাক-উত্তর কোরিয়ার উচ্চাভিলাষী পারমাণবিক নীতির সমালোচনা করেন।

‘এমভি এজিয়ান গ্লোরি’ ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে

পশ্চিমবঙ্গে গত শুক্রবার আটক হওয়া জাহাজ ‘এমভি এজিয়ান গ্লোরি’ ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জাহাজটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর হওয়ায় কোনো তল্লাশি ছাড়াই তা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কলকাতা বন্দর থেকে এটি পাকিস্তানে যাওয়ার কথা।
বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে সন্দেহে ভারতীয় নৌবাহিনী জাহাজটি পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্রসীমা থেকে আটক করে। গতকাল রোববার দুপুরে তা কলকাতা বন্দরে নেওয়া হয়। এর আগে জাহাজের ক্যাপ্টেন অস্ত্র ও গোলাবারুদের কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে পুলিশ জাহাজে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, জাহাজটিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর সরঞ্জাম রয়েছে। নথিপত্রের সঙ্গে জাহাজের সরঞ্জামের গরমিল থাকায় চিঠিতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। এতে আরও জানানো হয়, জাহাজের কন্টেইনারে যে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ রয়েছে তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে যোগ দেওয়া পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের সেনাবাহিনীর। এতে কোনো অবৈধ অস্ত্র নেই। অন্যদিকে, লাইবেরিয়া সরকারও ভারতকে চিঠি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, জাহাজটি লাইবেরিয়া থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশে ছেড়ে আসে।
জাহাজটি আটকের পর এর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ভারত সরকার নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যোগাযোগ করে। তাদের চিঠি পেয়ে জাহাজে তল্লাশি থেকে বিরত হয় ভারত সরকার।
পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে কলকাতা বন্দরে নেপালের কন্টেইনার খালাসের পর জাহাজটি যথারীতি পাকিস্তানের করাচি বন্দরে যাবে।

জনবহুল অস্ট্রেলিয়া চান না গিলার্ড

অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড জনবহুল অস্ট্রেলিয়া নীতিতে বিশ্বাসী নন। তিনি সরকারের জনসংখ্যা বাড়ানোর নীতিতে পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গিলার্ড বলেছেন, প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্য জনসংখ্যা নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘বড় অস্ট্রেলিয়ায় আমি বিশ্বাসী নই।’
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীজুলিয়া গিলার্ড গতকাল রোববার নাইন নেটওয়ার্ককে এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘কেভিন রাড জনবহুল অস্ট্রেলিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আমি তাঁর সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করি। আমরা টেকসই অস্ট্রেলিয়া চাই।’
অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে দুই কোটি ২০ লাখ লোক রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড জন্মহার ও অভিবাসন বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৫০ সাল নাগাদ এই জনসংখ্যা তিন কোটি ৬০ লাখে উন্নীত করার আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু গিলার্ড বলেন, এভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় পানি ও খাদ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে।
গিলার্ড বলেন, ‘সাড়ে তিন কোটি বা চার কোটি লোকে আমি বিশ্বাসী নই। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে সিডনি, মেলবোর্ন অথবা কুইন্সল্যান্ডে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আপনার দিকে চেয়ে থাকবেন এবং বলবেন, এসব লোক যাবেটা কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের একটা টেকসই অস্ট্রেলিয়া দরকার। যেটা হবে আমাদের অভয়ারণ্য, আমাদের বাড়ি।’
তবে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দক্ষ অভিবাসী এখনো প্রয়োজন। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া এখনো অব্যাহত রাখবে ক্যানবেরা। আমি চাই না দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাক। কিন্তু এটাও চাই না—অস্ট্রেলিয়ার কিছু এলাকায় ২৫ শতাংশ লোক বেকার থাকুক।’
রক্ষণশীল বিরোধী শিবির প্রধানমন্ত্রী গিলার্ডের জনসংখ্যা নীতির সমালোচনা করে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর এ নীতি টেকসই জনসংখ্যার পরিপন্থী। তবে যাঁরা বলছেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ অস্ট্রেলিয়াতে নেই, তাঁরা নতুন প্রধানমন্ত্রীর নীতির প্রশংসা করেছেন।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নেতা কেলভিন থম্পসন বলেছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানদের কল্যাণের কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ অস্ট্রেলিয়ানরা খাদ্য ও পানিসংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। আবাসন সংকট, কার্বন নিগর্মন ও ক্রমবর্ধমান যানজট সমস্যা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত। নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান ও বন্য জীবজন্তুর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত বৃহস্পতিবার শপথ নেন জুলিয়া গিলার্ড।

আরামিটের ৬৫% লভ্যাংশ অনুমোদন

আরামিট লিমিটেড ২০০৯ সালের শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৬৫ শতাংশ লভ্যাংশ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বোনাস শেয়ারে ৫০ ও নগদ ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের একটি হোটেলে গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির ৩৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এ লভ্যাংশ অনুমেদান করা হয়।
কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় অন্যান্যের মধ্যে পরিচালক মো. রেজাউল করিম, মো. ইফতিখার-উজ-জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, আরামিট লিমিটেড ২০০৯ সালে ১০ কোটি ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার করপূর্ব নিট মুনাফা এবং আট কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার টাকার কর-পরবর্তী নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এই মুনাফা আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৫২ ও ১৬ দশমিক ৮১ শতাংশ বেশি।
আলোচ্য ২০০৯ সালে কোম্পানি আমদানি শুল্ক, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ জাতীয় কোষাগারে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রদান করেছে।

লালপুর চিনিকলে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই

নাটোরের লালপুর উপজেলার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন বা সহ-উৎপাদন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ২৫০ কোটি টাকা লাভ হবে বলে সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬০ কোটি টাকা এবং এটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে প্রায় দুই বছর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা দেশে কিছুটা হলেও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এবং অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ও মৌসুমি শ্রমিকদের জন্য সারা বছর কাজের সুযোগ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের জন্য ২০০৭ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই দায়িত্ব পালন করছে। প্রতিনিধিদলটি সম্প্রতি প্রাথমিক জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার (বিএসএফআইসি) একটি প্রতিনিধিদল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন প্লান্ট স্থাপনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার জন্য লালপুর আসে। বিএসএফআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও প্রকৌশল) মো. আবুল কাশেমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলটিতে ছিলেন সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল হক, প্রধান রসায়নবিদ লোকমান হোসেন, প্রধান তড়িৎ প্রকৌশলী জোতিশময় বড়ুয়া ও প্রধান পূরপ্রকৌশলী ইনতাজ আলী। এ সময় মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল হক, সিবিএ সভাপতি খন্দকার শহিদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার কামালসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মো. আবুল কাশেম স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কো-জেনারেশন বা সহ-উৎপাদন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সব দিক ইতিবাচক রয়েছে। এখানে তিনটি টারবাইনের পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হলে প্রতিদিন নয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এর মধ্যে ২ দশমিক ৫ থেকে তিন মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এই চিনিকলে ব্যবহূত হবে। অবশিষ্ট ছয় থেকে সাড়ে ছয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লালপুর, বাগাতিপাড়া, বাঘা ও চারঘাট উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডেও কিছু পরিমাণে দেওয়া সম্ভব হবে।
আবুল কাশেম আরও জানান, এই প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আখ মাড়াই মৌসুমে আখের ছোবড়া ও কয়লা এবং অন্য সময় কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে এখানে প্রতিদিন ৭৩৫ মেট্রিক টন সাদা চিনি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বর্তমানে এই চিনিকলে মাড়াই মৌসুমে গড়ে ১২০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়।
চিনিকলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজুল হক বলেন, এখানে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের সব সুবিধা ও সুষ্ঠু পরিবেশ রয়েছে।
চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি খন্দকার শহিদুল ইসলাম প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।