Wednesday, September 3, 2014

একবিংশ শতকে গণতন্ত্র by জোসেফ ই. স্টিগলিৎজ

টমাস পিকেটির সাম্প্রতিক গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফাস্ট সেঞ্চুরি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্য উন্নত দেশগুলোয় বেশ সাড়া ফেলেছে। এতে বোঝা যায়, দুনিয়ায় বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। দুনিয়ার শীর্ষ ধনীদের হাতে সম্পদ ও অর্থ জমা হচ্ছে। ব্যাপারটা একরকম প্রতিষ্ঠিত হলেও পিকেটির এই গ্রন্থ আবারও চোখে আঙুল দিয়ে এ সত্য আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে।

এই গ্রন্থে মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ৩০ বছর সম্পর্কে নতুন ভাবনার খোরাক রয়েছে। এই পর্যায়কে ইতিহাসের এক অস্বাভাবিক সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পিকেটি। এ সময় সামাজিক একতা ছিল অস্বাভাবিক রকম, কালের আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহের ফলে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। সমাজে যে সমৃদ্ধি এসেছিল, সবাই কমবেশি তা ভোগ করেছে, সব শ্রেণির মানুষেরই জীবনমান উন্নত হয়েছে। তবে সমাজের সবচেয়ে নিম্নকোটির মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি।

পিকেটি ১৯৮০-এর দশকে রোনাল্ড রিগ্যান ও মার্গারেট থ্যাচারের ‘সংস্কার’ কর্মসূচিতে আলোকপাত করেছেন, যে কর্মসূচি থেকে সৃষ্ট প্রবৃদ্ধির ফল কমবেশি সবারই ভোগ করার কথা। কিন্তু এই সংস্কারের ফলে দেখা গেল, প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে গেছে। আর যতটুকু প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তার ফল ভোগ করেছে উচ্চকোটির কিছু মানুষ।

কিন্তু পিকেটি তাঁর এই গ্রন্থে অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু মৌলিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সম্পদ/উৎপাদনের অনুপাতে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। অর্থনীতির সাধারণ সূত্রে এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কথা, ফলে মুনাফার পরিমাণ কমে আসার কথা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পুঁজি বিনিয়োগ থেকে সৃষ্ট মুনাফার পরিমাণ না কমে
উল্টো মজুরির পরিমাণ কমে এসেছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে চার দশক আগের তুলনায় বর্তমানে গড় মজুরির পরিমাণ ৭ শতাংশ কম।

এর সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, সম্পদ বৃদ্ধির পরিমাণ উৎপাদনশীল পুঁজির বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আমাদের হাতে তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, সেটাও এই ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলে যায়। সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হচ্ছে ভূমি ও বাড়ির মূল্যবৃদ্ধি। ২০০৮ সালের আর্থিক খাতের মন্দার আগে দুনিয়ার অনেক দেশেই স্থাবর সম্পত্তির বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থনীতির সেই ত্রুটির এখনো পূর্ণাঙ্গ সমাধান হয়নি। এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটার কারণ হচ্ছে বড়লোকদের মধ্যে ‘অবস্থানগত’ পণ্য ক্রয়ের প্রতিযোগিতা—সমুদ্রসৈকতে একটি বাড়ি বা নিউইয়র্ক সিটির পঞ্চম অ্যাভিনিউতে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা প্রভৃতি।
কখনো কখনো নগদ অর্থ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে ‘অপরিমেয়’ সম্পদ থেকে পরিমেয় সম্পদে বিনিয়োগ সরিয়ে নেওয়ার খুব সামান্যই সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিবর্তনকে অর্থনীতির সামগ্রিক অবনতি হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়। একচেটিয়া ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে বা ব্যাংক ও অন্যান্য ফার্ম যদি ক্রেতাদের আরও শোষণ শুরু করে, তাহলে দেখা যাবে, তারা বলছে অমুক ব্যাংক বা ফার্মের মুনাফা বেড়েছে। আর সেটা পুঁজিতে পরিণত হলে বলবে আর্থিক সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু সেটা হলে নিশ্চিতভাবেই সামাজিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, অর্থনৈতিক দক্ষতা হ্রাস পায়; যদিও দাপ্তরিকভাবে সম্পদের পরিমাণ বাড়ে। আমরা তখন এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে যে মানবীয় পুঁজির অবমূল্যায়ন হয়, সেটা চোখে দেখি না—শ্রমিকদের সম্পদ।
তার পরও ব্যাংকগুলো যদি তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ক্ষতির সামাজিকীকরণ ঘটায় বা অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ ধরে রাখতে পারে, তাহলে দেখা যাবে, আর্থিক খাতে পরিমাপযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। করদাতাদের সম্পদের পরিমাণ যে সংগতিপূর্ণভাবে কমছে, সেটা আমরা পরিমাপ করি না। একইভাবে, করপোরেশনগুলো সরকারকে অধিক মূল্যে তাদের পণ্য কিনতে বাধ্য করলে (বড় বড় ওষুধ কোম্পানি যেটা সফলতার সঙ্গে করেছে) বা কম মূল্যে সরকারি সম্পদ লাভ করলে (খনি কোম্পানিগুলো যেটা করেছে) দেখা যায়, তাদের পরিসম্পদ বেড়েছে; যদিও সাধারণ নাগরিকদের সম্পদের পরিমাণ বাড়ে না।

ফলে, এদের সম্পদ বাড়লেও আমরা দেখছি শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না বা বৈষম্য বাড়ছে। এটা বাজার অর্থনীতির সাধারণ সূত্রও নয়। এটাকে আমি ‘নকল পুঁজিবাদ বলি’। বাজার কীভাবে কাজ করে বা কীভাবে কাজ করা উচিত, সেটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার; এই ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে পারেনি। উল্টো এমন নিয়ম করে রাখা হয়েছে যে এই বিকৃত বাজারব্যবস্থা টিকে থাকছে, যে বাজারে করপোরেশন ও ধনী ব্যক্তিরা সবাইকে শোষণ করছে।

হ্যাঁ, বাজার শূন্যের মধ্যে থাকে না। খেলার কিছু নিয়ম থাকতে হবে, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেটা নির্ধারণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মতো অন্য দেশগুলোয় উচ্চমাত্রার অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকলে তা ক্রমেই রাজনৈতিক বৈষম্যের দিকে ধাবিত হয় এবং হচ্ছেও তা-ই। এরূপ ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বিকাশের সুযোগও অসম হয়ে যায়। সমাজের গতিও থমকে যায়।
ফলে, পিকেটি যে আরও তীব্র বৈষম্যের কথা বলছেন, সেটা অর্থনীতির কোনো অপরিবর্তনীয় নিয়ম নয়। কিছু পরিবর্তন আনা গেলে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব, সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা যাবে: স্থাবর সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি ও উত্তরাধিকারী কর, শিক্ষার আওতায় বাড়াতে ব্যয় বৃদ্ধি, ট্রাস্টবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ, করপোরেট পরিচালনা-পদ্ধতি সংস্কার করে কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি, ব্যাংকের শোষণ বন্ধ করতে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রভৃতি।

খেলার নিয়মকানুন ঠিকভাবে প্রবর্তন করতে পারলে ১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে যে দ্রুত ও সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, সেটা আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব, যে ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তরাই সবচেয়ে লাভবান হয়েছিল। আজ এই একবিংশ শতকে আমরা পুঁজি নিয়ে চিন্তিত নই, আমাদের মাথাব্যথার বিষয় হচ্ছে গণতন্ত্র।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জোসেফ ই. স্টিগলিৎজ: নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ।

খেসারত ৩০ হাজার কোটি টাকা মাত্র by মুনির হাসান

দেশের কর্মবাজারের হাল-হকিকত জানার জন্য গিয়েছিলাম এক মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞের কাছে। তাঁর কাছে জানলাম, কেবল আড়াআড়িভাবে নয়, ওপর-নিচেও বড় হচ্ছে দেশের কর্মবাজার। তবে, তিনি জানালেন মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপক বা কর্মকর্তা তৈরিতে আমরা ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ছি। জানালেন ওই মুহূর্তে তাঁর কাছে ৪০টি পদের জন্য চাহিদা আছে, কিন্তু সঠিক ব্যক্তিকে বের করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তিনি হিসাব করে দেখালেন, আগামী ১০ বছরে শুধু যদি এই ব্যাপারে আমরা জোর না দিই, তাহলেই একটা বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
আমাদের দেশে ২০২৩ সাল নাগাদ বছরে কমপক্ষে এক লাখ মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের কর্মীর প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ডজন খানেক বহুজাতিক ও দেশীয় বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান মিলে সে সময় হয়তো বা হাজার বিশেক মধ্যপর্যায়ের কর্মী তৈরির সক্ষমতা তৈরি হবে। বাকি ৮০ হাজার!
আমার মনে পড়ল বছর খানেক আগে ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে প্রকাশিত সিলিকন ইন্ডিয়া নামের একটি পত্রিকার একটি ছোট্ট খবর। ওই খবরে বলা হয়েছে, দেশটির বাংলাদেশ প্রবাসীরা ২০১২ সালে ভারতে মাত্র ৩০ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠিয়েছেন! একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী সেই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন এবং তাঁদের বেশির ভাগের কর্মক্ষেত্র গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও এনজিও। ভবিষ্যতে এই আয়
আরও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। (<http://www.siliconindia.com/ news/business/15-Nations-Sending-Highest-Remittances-to-India-nid-147515-cid-3.html>) বেশ কিছুদিন আগে আমাকে এক গার্মেন্টস কর্মকর্তা বলেছিলেন যে কম-বেশি প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার শ্রীলঙ্কান কর্মী কাজ করছেন আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে। তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া যায়, যখন দেখি ঢাকা-কলম্বো নিয়মিত বিমান যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বেড়েছে!
বৈশ্বিক গ্রামে দক্ষ কর্মীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেখানে জোর করে বাধা দেওয়ারও কিছু নেই। কিন্তু এসব পরিসংখ্যান থেকে আমাদের শেখা দরকার, কেন আমাদের দক্ষতার ঘাটতি হচ্ছে। যে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, সেখানে কেন হরেদরে কর্মীরা বিদেশ থেকে আসবেন। বিদেশি বিশেষজ্ঞ থাকবেন, নতুন প্রযুক্তি কর্মী থাকবেন কিন্তু ম্যানেজার কিংবা ফ্লোর ম্যানেজার কেন বিদেশ থেকে আসবেন!
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঁধে দোষ চাপানোর সুযোগ নেই। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ সদ্য স্নাতক শিক্ষার্থীদের বিষয় এটি নয়। মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মী প্রকৃতপক্ষে ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ হয়ে ওঠেন। কাজে প্রথমত তাঁকে উচ্চতর পদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করতে পারেন। এর জন্য তাঁকে নিয়োগকর্তার আস্থাও অর্জন করতে হবে। ঠিক এই জায়গাতেই আমরা হয়তো ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ালে তাঁরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাবেন। যদি অনেক অনেক কর্মীর দক্ষতা বাড়ানো না যায়, তাহলে সংখ্যাস্বল্পতার সুযোগে এই বাজারে কর্মীদের চড়া মূল্য দিয়েই কিনতে হবে নিয়োগকর্তাকে। যেমনটি ঘটছে আমাদের গার্মেন্টস বা বস্ত্রশিল্পে। যদি এই দুই খাতে কর্মীদের মানোন্নয়নের জন্য বছরে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়, তাহলে সেটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ১৫ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় করবে।
বিশ্বব্যাপী এটি সুবিদিত যে বড় কোম্পানির জন্য দক্ষ কর্মী সরবরাহের কাজটি করবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রেসিডেন্টও তাঁর প্রতিবছরের বাজেটে এই খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখেন এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের নানা রকম সুবিধা নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে তেমন কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায় না। যদিও অত্যন্ত চমৎকার বাক্যসংবলিত নীতিমালা এবং অ্যাকশন প্ল্যানের কোনো অভাব নেই। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাঁর উদ্যোগ সম্প্রসারণের জন্য প্রশিক্ষণ, পুঁজি কিংবা বাজার সহায়তার কোনোটিই সময়মতো পান না। একইভাবে যাঁরা নতুন উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের সহায়তা করার জন্য তেমন কোনো সংগঠিত উদ্যোগ নেই। অথচ প্রায় ৩০০ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে বসে থাকা এসএমই ফাউন্ডেশন ইচ্ছা করলেই প্রথমে ঢাকায় এবং পরে অন্যান্য স্থানে এসএমই পরিচর্যাকেন্দ্র (এসএমই ইনকিউবেশন) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আগ্রহী হবু উদ্যোক্তারা এসব কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস ন্যূনতম খরচে অবস্থান করতে পারবেন। এখানে থাকবে সবার জন্য দরকারি সেবা। থাকবে আইনি ও ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংযোগ। একজন উদ্যোক্তা তাঁর উদ্যোগ শুরু করে ছয় মাসের মধ্য গুছিয়ে এখান থেকে চলে যাবেন। তখন নতুন একজন উদ্যোক্তা ওই জায়গাটা ব্যবহার করতে পারবেন। আর যেহেতু এই ধরনের ইনকিউবেশনের উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী রয়েছে, কাজেই এটি চালু করার জন্য কোনো নতুন গবেষণা বা বিদেশ সফরেরও প্রয়োজন নেই।
দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এসবের বাইরে নিজেদের নানা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এমন একটি ফেসবুক-ভিত্তিক গ্রুপ ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব https://www.facebook.com/ groups/uddokta/’-এ বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছেন। তাঁরা পরস্পরকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। তাঁদের স্লোগানটি বর্তমানে এতই জোরালো হয়ে উঠেছে যে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স কিংবা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদও এখন এই স্লোগানের মতো করে তরুণদের উৎসাহিত করতে নেমে পড়েছেন। এসব উদ্যমী তরুণের ‘পথে নেমে পথ চেনা’ সফল হবে, যদি আমরা তাঁদের পাশে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারি। তখনই কেবল বছর বছর দক্ষতা ঘাটতির পরিমাণ দেখে আমাদের আঁতকে উঠতে হবে না।

মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়কারী, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

মোদিরাজের ১০০ দিনের চড়াই-উতরাই by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

দেশের মানুষ পাঁচ বছরের জন্য যাদের দেশ শাসনের দায়িত্ব দিয়েছে, তাদের কাছে প্রথম ১০০ দিন কাটানো আহামরি কিছু নয়। তবু এক হাজার ৮২৫ দিনের মেয়াদের প্রথম ১০০ দিন উদ্যাপনের একটা ঘটা ইদানীং ভারতে বেশ দেখা যাচ্ছে। এর একটা কারণ যদি হয় জোট-জামানায় সরকারের মেয়াদপূর্তির নিশ্চয়তা ঘিরে ঘোর সংশয় সৃষ্টি হওয়া, অন্যটি তাহলে সকাল দেখে দিনটা কেমন যাবে, তা অনুমানের চেষ্টা। নিজের ক্ষমতায় শাসকের আসনে বসলেও নরেন্দ্র মোদির সরকারের শত দিন পূর্তি নিয়ে ভারতে তাই বেশ হইচই শুরু হয়েছে।

এই ১০০ দিন মোদির সরকারের কেমন কাটল? প্রশ্নটা নাড়াচাড়ার আগে এটা বলা ভালো যে সত্যি সত্যিই এই সরকারটা একান্তভাবে মোদিরই সরকার। তিনি কেমন ধরনের, তাঁর দেশ শাসনের স্টাইল কেমন, তিনি কতটা টিম ম্যান, তাঁর পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা-মন্দ লাগা সব বিষয়েই মোটামুটি একটা ধারণা তিনি এই কদিনে দিতে পেরেছেন। প্রথম ১০০ দিনে আর কিছু হোক না হোক, মোদি এটা বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন, তাঁর সরকারে এক থেকে ১০০ নম্বরে একমাত্র তিনিই। বাকি সবাই অকিঞ্চিৎকর।
মোদি আরও একটি কাজ করেছেন। ‘বিড়াল প্রথম রাতেই মারতে হয়’ এই আপ্তবাক্যটি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ১০০ দিনের মধ্যেই লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর জোশি, যশবন্ত সিং, যশবন্ত সিনহাদের মতো নেতাদের তিনি হেলায় ছেঁটে ফেললেন! মন্ত্রী তো করলেনই না, দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দিলেন না। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘কিকড আপস্টেয়ার্স’, সেটা করে আদভানি-জোশিকে দলের ‘মেন্টর’ করে দিলেন। এর আগে মন্ত্রীদের পছন্দমতো সহায়ক নিয়োগেও তিনি রাশ টেনেছেন। সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছেন আমলাদের সঙ্গে। দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা পরিশ্রম করছেন এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের ওপর জোর দিতে সততাকে হাতিয়ার করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সব ফাইলে তিনি চোখ বোলাচ্ছেন। মোদি প্রকাশ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ‘না ম্যায় খাউঙ্গা, না কিসিকো খানে দুঙ্গা’। মানে, নিজে ঘুষ খাব না, কাউকে খেতেও দেব না। এই হুঁশিয়ারির পরপরই কয়েকটি খবর হাওয়ায় ভাসতে লাগল যেগুলোর একটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের ছেলেকে নিয়ে। খবরটি হলো, রাজনাথ-তনয় পঙ্কজ নাকি দিল্লি পুলিশে পোস্টিংয়ের জন্য কারও কারও কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। মোদি তা জানতে পেরে পঙ্কজকে বাড়িতে ডেকে সাবধান করে বলেছেন, যে টাকা তিনি নিয়েছেন তা যেন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দেওয়া হয়। খবরটি একাধিক কাগজে বেরিয়েও যায়। ক্ষুব্ধ রাজনাথকে শান্ত করতে অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় এবং দলের সভাপতি অমিত শাহ সক্রিয় হলেন। কিন্তু উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনে পঙ্কজের টিকিটের দাবি অগ্রাহ্য হলো। সব মিলিয়ে এই ১০০ দিনে মোদি তাঁকে ঘিরে ভয়, ভক্তি ও সমীহের একটা ঘেরাটোপ তৈরি করে ফেলেছেন। এতে দেশশাসন ঠিকঠাক হবে কি না, সেই হিসাব-নিকাশ পরে।
বহুদিনের কতগুলো প্রথাও মোদি ভেঙেছেন। একটা প্রথা হলো সাংবাদিক, মন্ত্রী, অফিসার ও পরিবারবর্গের বিশাল দল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশসফরে যাওয়া। প্রথা অনুযায়ী অন্তত ৩৫ জন সাংবাদিক বিনা ভাড়ায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হতেন। কোনো কোনো প্রধানমন্ত্রী ১৫ জন আত্মীয় নিয়েও বিদেশে গিয়েছেন। সেই সঙ্গে একাধিক মন্ত্রী ও অগুনতি আমলা। মোদি তালিকা ছেঁটে দিয়েছেন। আকাশবাণী, দূরদর্শন, সংবাদ সংস্থা পিটিআই এবং এএনআই ছাড়া আর কোনো সাংবাদিককে সফরসঙ্গী করছেন না। প্রথা মেনে কোনো অভিজ্ঞ সাংবাদিককে তিনি মিডিয়া উপদেষ্টাও করেননি। মোদি জমানায় মন্ত্রীদের হুট বলতে মিডিয়ার সামনে আসা প্রায় বন্ধই বলা যায়। বিদেশসফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্যন্ত তিনি সঙ্গী করছেন না। নিচ্ছেন সেই মন্ত্রীদের, যাঁদের নেওয়া জরুরি এবং সংশ্লিষ্ট আমলাদের।
এহেন প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম ১০০ দিনে আর একটা কাজের কাজ করেছেন। যোজনা কমিশন নামে সাদা হাতিটার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটিয়েছেন। স্বাধীনতার পরে সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের সময় যা প্রয়োজন ছিল, আজ তা অপ্রয়োজনীয়ই শুধু নয়, বিকাশের গতি রোধ করার দায়েও অভিযুক্ত। অনাবশ্যক সরকারি খরচ কমানোর জন্য মন্ত্রিসভার বহর মাত্রাছাড়া করেননি। বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ও করছেন। মন্ত্রী-সান্ত্রিদের হুট বলতে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাতেও রাশ টেনেছেন। তাঁর সম্মতি ছাড়া কোনো মন্ত্রী কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। ক্ষমতা এভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়া ভালো না মন্দ, সেই বিচারের সময় এখনো আসেনি।
অর্থনীতির অনিশ্চয়তা বেশ কিছুটা কমেছে। এর একটা কারণ অবশ্যই মোদির আগমনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা। দ্বিতীয় কারণ বিশ্ববাজারের মন্দাভাব ক্রমেই কেটে যাওয়া। ফলে প্রবৃদ্ধির হারে হেরফের ঘটছে। (এর মূল কৃতিত্ব অবশ্যই মনমোহন সিংয়ের
সরকারের প্রাপ্য। তাঁর নীতির সুফল মোদির খাতায় জমা হচ্ছে।) আগের সরকারের নীতি স্থবিরতা এই সরকারে দেখা যাচ্ছে না।
সংসদে সংখ্যাধিক্য মোদিকে এই সুবিধা এনে দিয়েছে। কাজেই শিল্পোদ্যোগীরা নতুন উদ্যমে কাজে নামছেন। দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটা ভালো লক্ষণ।
কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে খারাপ লক্ষণ চোখ টানছে। প্রথমটি অবশ্যই সাম্প্রদায়িক অসম্প্রীতি, দ্বিতীয়টি পশ্চিম প্রান্তের চির বৈরী প্রতিবেশীকে ঘিরে। লাল কেল্লা থেকে ভাষণে মোদি যতই জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতায় ১০ বছরের বিরতির আবেদন জানান, তাঁর দল
কার্যত তাঁকে অগ্রাহ্য করে সেই বিষ ছোবল মেরেই চলেছে। তাঁর সুগ্রীব দোসর অমিত শাহ যে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন, তাতে ‘লাভ জিহাদ’ মাথাচাড়া দিয়েছে। মুজাফ্ফরনগর পেরিয়ে দাঙ্গার আগুন মীরাটে ছড়িয়েছে। অনুপ্রবেশকে হাতিয়ার করে পুব সীমান্তের রাজ্যগুলোতে বিজেপি মাথাচাড়া দিচ্ছে। উত্তর প্রদেশের উপনির্বাচনে প্রচারের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে গোরক্ষপুরের সাংসদ গেরুয়াধারী মহন্ত অদ্বৈতনাথকে, যাঁর স্বপ্ন হিন্দুস্তানকে শুধু হিন্দুদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। বিষ ছড়ানোর যে প্রতিযোগিতা গো বলয়ে শুরু হয়েছে, একটা সময় তা যে মোদির উন্নয়নের স্লোগানকে পরিহাস ও বিদ্রূপ করবে, তা না বোঝার মতো অর্বাচীন নরেন্দ্র মোদি নন। অথচ তিনি নীরব! অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র!
পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা মোদি খুব ভেবেচিন্তে নিয়েছেন বলে মনে হয় না। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে একটা পরিকল্পনা, যা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কোনো রাষ্ট্রনায়ক নিতেন না। দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক ইসলামাবাদে হওয়ার কথা ছিল ২৫ আগস্ট। ১০ আগস্ট পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত হুরিয়ত নেতাদের ফোন করে দিল্লি ডেকে পাঠান। ১৩ আগস্ট সংবাদপত্র সেই খবর ছাপিয়েও দেয়। কাজেই হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের খবরটি আচমকা বা অজানা ছিল না। এ ধরনের আলোচনা বাজপেয়ি বা মনমোহন সব জমানাতেই সব দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে পাকিস্তান রুটিন মাফিক করে এসেছে এবং ভারতের তা জানাও। এমনকি, হুরিয়ত নেতাদের পাকিস্তানে গিয়ে কথা বলাতেও ভারত অতীতে অনুমতি দিয়েছে। নওয়াজ শরিফ যখন দেশের উগ্রপন্থীদের হুমকি অগ্রাহ্য করে মোদির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এলেন এবং হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি অগ্রাহ্য করার সাহস দেখালেন, তখন হুরিয়ত প্রসঙ্গকে মাত্রাছাড়া গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা বাতিল করে মোদি বাতাবরণটাই শুধু বিষিয়ে দেননি, পাকিস্তানি রাজনীতিতে নওয়াজ শরিফকেও দুর্বল করে দিলেন। গণতন্ত্রী শরিফকে দুর্বল করলে উগ্রপন্থী ও মৌলবাদীদেরই যে পোয়াবারো হয়, মোদি বুঝেও কেন তা বুঝলেন না, সেটা এক অপার বিস্ময়!
তাহলে মোদি সরকার তা করল কেন? কারণটা জম্মু-কাশ্মীরের নির্বাচন। মোদি-শাহ জুটির নজরে জ্বলজ্বল করছে এই রাজ্যের বিধানসভার ভোট, যে রাজ্যে আজ পর্যন্ত কোনো হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী হননি। অমিত শাহ কাশ্মীরে গিয়ে সে কথা জানিয়েও এসেছেন, ‘এই রাজ্যের একতা ও অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে একটা জাতীয়তাবাদী সরকার গঠনই আমাদের লক্ষ্য। কাশ্মীরকে শেষ করে দিয়েছে আবদুল্লাহ ও মুফতি পরিবার। এঁদের হাত থেকে এই রাজ্যকে মুক্ত করতে হবে।’
মোদি-শাহ জুটির সেই পরিকল্পনার নাম ‘মিশন ৪৪’।
মোদি-শাহ জুটি স্বপ্ন দেখলেও জম্মু-কাশ্মীরকে বিজেপির দখলে আনা নিতান্তই কঠিন কাজ। যে তিনটি অঞ্চলে এই রাজ্য বিভাজিত, সেগুলোর মধ্যে জম্মুতে দলের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ভালোই। লাদাখ অঞ্চলের একমাত্র লোকসভা আসনে এই প্রথম বিজেপি জিতেছে। কিন্তু আবদুল্লাহ পরিবারের ন্যাশনাল কনফারেন্স, মুফতি পরিবারের পিডিপি এবং কংগ্রেসের মুঠোর বাইরে উপত্যকা এযাবৎ কোথাও যায়নি। সেখানে বিজেপির উপস্থিতি দ্বিতীয়ার চাঁদের মতোই। সেই বিজেপিকে তাহলে কোন ভরসায় রাজ্যে ক্ষমতায় দেখতে চাইছেন মোদি-শাহ জুটি?
জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার মোট আসন ১১১। কিন্তু ২৪টি আসন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে হওয়ায় আজ পর্যন্ত কোনো দিন ওই আসনগুলোতে ভোট করানো যায়নি। ফলে রাজ্য বিধানসভায় কার্যকর আসনসংখ্যা ৮৭। এই ৮৭ আসনের মধ্যে জম্মুতে রয়েছে ৩৭টি, লাদাখে চারটি ও কাশ্মীর উপত্যকায় ৪৬টি আসন। মোদি–হাওয়ায় ভর দিয়ে গত লোকসভা ভোটে বিজেপি গোটা রাজ্যে ৩৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে এগিয়ে ছিল। এগুলোর মধ্যে জম্মুতেই ছিল ৩০টি। শাহ চাইছেন মোদির উন্নয়নের স্লোগান এবং হিন্দুত্বে ভর দিয়ে জম্মু ও লাদাখের ৪১টি আসনই দখল করতে। কঠিন কাজ সন্দেহ নেই। সেই কঠিন কাজে সফল হলেও ক্ষমতা দখলের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৪৪টি আসন। তার মানে, উপত্যকার ৪৬ আসনে ভাগ বসাতে হবে। তা করতে অমিত শাহ উপত্যকার তিনটি ছোট অথচ প্রভাবশালী দলের সঙ্গে জোট বাঁধার রাস্তায় অনেকটা এগিয়েছেন। এই দলগুলোর মধ্যে রয়েছে সাজ্জাদ লোনের পিপলস কনফারেন্স, ইমাম খোমেইনি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টি। কারগিল-জানস্কার অঞ্চলে ট্রাস্টের প্রভাব আছে। আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টির প্রভাব রয়েছে বারামুলা ও অনন্তনাগে। সাজ্জাদ লোনের সমর্থকেরা কমবেশি উপত্যকার সর্বত্র। এই অঙ্কের সঙ্গে বিজেপি মেশাতে চাইছে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের স্বার্থ। পণ্ডিতদের পুনর্বাসনের জন্য গত বাজেটে ৫০০ কোটি রুপি বরাদ্দও হয়েছে।
কিন্তু এসবই শেষ পর্যন্ত সব নয়। দরকার বাড়তি কিছু। পাকিস্তানকে ধমকে-চমকে আলোচনার রাস্তা ফের বন্ধ করে উপত্যকায় নিজেদের প্রাধান্য কায়েমের স্বপ্নকেই সাকার করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদির দল। তাঁর ১০০ দিনের ভালো-মন্দের খতিয়ানের জন্য নিদেনপক্ষে আরও ১০০ দিন অপেক্ষাতেই থাকা যাক।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

কয়টি বা কীভাবে খুন ‘সিরিয়াস কিছু’? by এ কে এম জাকারিয়া

সামান্য কিছুতেই আমরা নাগরিকেরা কাতর হয়ে পড়ি। আমাদের চিত্ত সম্ভবত একটু বেশিই দুর্বল। তা না হলে বাসার মধ্যে টিভি উপস্থাপক ফারুকীকে কুপিয়ে হত্যা বা এর পরদিন মগবাজারে তিনজনকে গুলি করে মেরে ফেলার মতো ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নিয়ে আমরা হায় হায় শুরু করি কেন! আর এসবে ঘি ঢালার জন্য সাংবাদিকেরা তো রয়েছেনই। আমাদের মতো দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলানো আসলেই খুব কঠিন কাজ।
‘ফারুকী হত্যাকাণ্ড ও মগবাজারের তিন খুনের ঘটনা সিরিয়াস কিছু না। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সাংবাদিকেরা যেভাবে প্রশ্ন করছেন, তেমন সিরিয়াস কিছু না। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট)। জনগণের উদ্বেগ কমাতে কত ব্যাখ্যাই না দিতে হলো স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে! তিনি গিয়েছিলেন ‘ফরমালিন প্রতিরোধে সরকারের সাফল্য ও পরবর্তী করণীয়’ নিয়ে এক আলোচনায়। কোথায় ‘সরকারের সাফল্য’ নিয়ে কিছু আলোচনা হবে, সেখানে নাছোড়বান্দা সাংবাদিকেরা পড়ে রয়েছেন ফারুকী হত্যা ও তিন খুনের মতো ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা নিয়ে! আমাদের সাংবাদিকদের যে কবে বিচার-বুদ্ধি হবে!
দুর্বল চিত্তের জনগণ ও আমাদের মতো বিচার-বুদ্ধিহীন সাংবাদিকদের নিয়ে বড়ই বিপদে আছে সরকার। এ ধরনের জনগণের জন্য দৃঢ়চিত্তের একজনকেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মানায়। দুর্বল চিত্ত নিয়ে আর যা-ই হোক, মন্ত্রীই হওয়া যায় না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো কোনোভাবেই নয়। দেশে কত খুনখারাবি হবে, তাতে ঘাবড়ে গেলে চলবে কীভাবে! বাসায় ঢুকে কুপিয়ে খুন বা একসঙ্গে গুলি করে তিনজনকে মেরে ফেলা—এসবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যদি আমাদের মতো ভেঙে পড়েন, তাহলে তো চলবে না! বোঝা গেল স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নার্ভ শক্ত আছে, সেটা আমাদের এক বড় ভরসার জায়গা। এসব ঘটনায় কাতর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধ আর অপরাধীদের দমনে কঠোর কাউকেই তো আমাদের দরকার।
সবকিছুই ঠিক আছে, কিন্তু সাংবাদিকের বেয়াড়া মনে যে কত প্রশ্ন জাগে। টিভি উপস্থাপক মাওলানা ফারুকী তাঁর বাসায় খুন হলেন, তাঁকে ঘরভর্তি স্বজনদের মধ্যে কুপিয়ে মেরে ফেলা হলো, মগবাজারে এলোপাতাড়ি গুলি করে একসঙ্গে তিনজনকে মেরে ফেলা হলো, এসব যদি ‘সিরিয়াস কিছু নয়’ হয়, তবে সিরিয়াস বিষয়টি আসলে কী? ‘সিরিয়াস’ শব্দটির অর্থই বা কী? অভিধান এ সমস্যার কোনো সমাধান দিতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, কোনটি সিরিয়াস আর কোনটি সিরিয়াস না, এটা একজন ব্যক্তির ধারণার বিষয় এবং তা নিয়ে মানুষে মানুষে ভেদ হবে। তবে এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের মতো জনগণ বা সাংবাদিকদের ভেদটি মনে হয় অস্বাভাবিকভাবেই বেশি। এটা আসলেই বুঝতে পারছি না যে কতগুলো খুন হলে বা কত নির্মমভাবে খুনের ঘটনা ঘটলে তাকে ‘সিরিয়াস’ বলে ধরে নিতে হবে। আর কতটা কম হলে আমরা ‘সিরিয়াস কিছু নয়’ বলে মেনে নেব।
এগুলো পুরোনো প্রশ্ন, হয়তো অর্থহীনও। এ ধরনের প্রশ্নের জবাবও কখনো মেলে না। সেই কবে মার্কিন গায়ক, শিল্পী ও লেখক বব ডিলান লিখে ও গেয়ে প্রশ্ন তুলে গেছেন, ‘হাউ মেনি ডেথস উইল ইট টেক টিল হি নোউজ দ্যাট টু মেনি পিপল হ্যাভ ডাইড’। কলকাতার কবীর সুমন এর বাংলা করে গাইলেন, ‘কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে’। প্রশ্ন তোলা আর গেয়ে যাওয়াই সার, যার বা যাদের জবাব দেওয়ার কথা, ভাবার কথা, তারা এসবকে পাত্তা দিলে তো!
‘এগুলোর তদন্ত চলছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডগুলোর মোটিভ নিয়ে কাজ করছি। তদন্ত করা হচ্ছে। শিগগিরই এর প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।...ফারুকী যেভাবে খুন হয়েছে, তা ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা করেনি, পেশাদার সন্ত্রাসীরা করেছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একজনকে ধরা হয়েছে। মগবাজারের ঘটনা রেলের জমি দখল নিয়ে হয়েছে। যে সন্ত্রাসী এটা করেছে, তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেকোনো সময় আমরা তাকে গ্রেপ্তার করব’ (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট)। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী খুনখারাবিগুলোর ব্যাপারে নেওয়া উদ্যোগের কথা জানিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন এভাবেই। কিন্তু যে খুনগুলোকে তিনি ‘সিরিয়াস’ বলেই মানছেন না, সেগুলোর ‘সিরিয়াস’ তদন্ত হবে, সেই ভরসা কি জনগণ পাচ্ছে? তিনি এ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার জন্যও জনগণকে পরামর্শ দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এসব কথাবার্তায় জনগণের উদ্বেগ কতটুকু দূর হলো কে জানে, তবে তিনি খুনগুলোকে ‘সিরিয়াস’ মনে না করায় খুনিরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও পেতে পারে!
বাংলাদেশ এক ঘটনাবহুল দেশ। একদিকে সাংবাদিকেরা খুনোখুনির ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নিয়ে মাতামাতি করেন, তো অন্যদিকে সুশীল সমাজ মাঠে নামে ক্রসফায়ার বা গুম নিয়ে। ‘মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করে তারা গুম-ক্রসফায়ারের শিকার হওয়া লোকজনের স্বজনদের জড়ো করে। সেখানে এই স্বজনেরা বক্তব্য দেন, কাঁদেন, তাঁদের ছোঁয়াচে কান্না অন্যের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। এসব নিয়ে আবার পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন হয়, ছবি ছাপা হয়। বেচারা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আসলেই স্বস্তি নেই, এ নিয়ে সাংবাদিকেরা আবারও ধরেছেন তাঁকে। ব্যাখ্যা দিলেন তিনি, ঘটনাগুলো ‘গুম’ নয় অপহরণ, গুম বলতে কোনো শব্দ নেই।
কে আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে বোঝাবে, শব্দটি ‘গুম’-এর জায়গায় ‘অপহরণ’ হলে স্বজনহারাদের দুঃখের একটুও হেরফের হবে না। তাঁরা হারানো প্রিজনকে ফেরত চান, সেই ব্যবস্থা যদি তিনি করে দিতে না পারেন, তবে তা গুম বা অপহরণ যা-ই হোক, তাতে কার কী এসে-যায়! ফারুকী বা মগবাজারে খুন হওয়া তিনজনের স্বজনেরা যখন শোনেন, এই খুনের ঘটনাগুলো ‘সিরিয়াস’ কিছু নয়, তখন কী তাঁদের কষ্টটা আরও বাড়ে না? নিহত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না, কিন্তু স্বজনদের বাড়তি কষ্ট না দিলেই কী নয়!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

সেকালের রাজনৈতিক নেতাদের গল্প by সৈয়দ আবুল মকসুদ

উপমহাদেশের রাজনীতি তখন অতি উত্তপ্ত। ব্রিটিশ শাসকদের থেকে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অল্প আগে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে অহি-নকুল সম্পর্ক। দুই পক্ষে চলছে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, তবে তা অশালীন ও ইতর ভাষায় নয়। মহাত্মা গান্ধী ও কায়েদে আজম জিন্নাহ দুই দলের শীর্ষ নেতা। শেষ মুহূর্তে একটা সুরাহা করা যায় কি না, তার জন্য দুই নেতাকে একত্রে বসার তাগিদ সবার। গান্ধীজি সব সময়ই রাজি ছিলেন, জিন্নাহ শেষমেশ সম্মত হন। জিন্নাহ পায়ে চোট পেয়েছিলেন হোঁচট খেয়ে, বললেন, আমি গান্ধীর ওখানে যেতে পারব না। (প্রকৃতপক্ষে ফরাসে স্যুট পরে বসার ভয়ে তিনি যাননি, অথবা গান্ধীর কাছে তিনি যাবেন না।) গান্ধী বললেন, আমিই যাব তাঁর বাড়িতে। এবং গেলেন। পোর্চে এসে পাশ্চাত্য কায়দায় গান্ধীজিকে অভ্যর্থনা জানান জিন্নাহ।

ড্রয়িংরুমে গিয়ে দুই নেতা চেয়ারে বসলেন খুব কাছাকাছি কিন্তু কোনাকুনি। সাহেবদের মতো চেয়ারে বসে বিশেষ স্বস্তিবোধ করতেন না গান্ধীজি। যা হোক, গান্ধীজি প্রথমেই জিগ্যেস করলেন, কায়েদে আজম, আপনার পায়ের অবস্থা কী?
গান্ধী বয়সে বড়। জিন্নাহর চেয়ে বড় নেতা শুধু নন, মহান মানুষ। জিন্নাহ বললেন, ব্যথা এখনো আছে। গান্ধী বললেন, কোথায়? জিন্নাহ তাঁর নিপাট ইস্তিরি করা প্যান্ট একটু তুলে দেখালেন, গোড়ালির কিছু ওপরে।
চেয়ার থেকে নেমে গান্ধী জিন্নাহর মাংসবিহীন পায়ের ব্যথার জায়গাটায় হাত বুলিয়ে কিছু টোটকা ওষুধ বাতলালেন। গান্ধীজির মতো মানুষ তাঁর পায়ে হাত বোলানোতে কঠিন-হৃদয় জিন্নাহ প্রতিপক্ষ নেতার প্রতি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে থাকবেন। যদিও তিনি তাঁর নীতি-আদর্শের প্রশ্নে আপস করেননি।
অনেকেই জানেন না গান্ধীজি একজন ভালো প্রাকৃতিক চিকিৎসক ছিলেন। নিজের ও অন্যের চিকিৎসা করতেন প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে, গাছগাছড়ার পাতা ও ছালের রস খাইয়ে বা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে। গান্ধীবাদীদের আলাদা চিকিৎসাব্যবস্থা আছে। গান্ধী প্রাকৃতিক চিকিৎসাকেন্দ্র দিল্লি থেকে আমি সপ্তাহ খানেকের সবক নিয়েছিলাম। ওই পদ্ধতির চিকিৎসায় মোটামুটি ভালো থাকি। তবে জিন্নাহর গান্ধীর ডাক্তারিতে বিশ্বাস ছিল না। বড় বড় ডাক্তার তাঁর পায়ের ব্যথা দূর করে বর্তে গিয়েছিলেন। উভয়েই গুজরাটি হওয়ায় গান্ধীজি কথা বলেছিলেন মাতৃভাষায়, জিন্নাহ ইংরেজিতে বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। গান্ধীর ওষুধের ব্যবস্থায় থ্যাংকস দিয়েছিলেন।
সেই এক সময় ছিল, যখন সম্ভ্রান্ত ঘরের সত্যিকারের সুশিক্ষিত মানুষেরাই রাজনীতি করতেন। ইতর প্রকৃতির, অর্ধশিক্ষিত, ছোটলোকেরা (বিত্তহীন হলেই বা নিরক্ষর হলেও একজন ছোটলোক হয় না।) তখন রাজনীতির আসরে স্থান পেতেন না। সেকালে কারও ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেন না কেউ। যত কট্টর প্রতিপক্ষই হোক, সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলতেন। কংগ্রেস ও লীগের নেতাদের নীতি-আদর্শ যা-ই হোক, তাঁরা বড় ঘরের সন্তান ছিলেন বলে তাঁদের ভাষা ছিল সংযত।
১৯৩০ দশকের শেষ দিকে সুভাষচন্দ্র বসু শুধু বাংলার অবিসংবাদিত নেতা নন, সমগ্র ভারতের জনপ্রিয় নেতা। ১৯৩৮-এ হরিপুরা অধিবেশনে নেতাজি সর্বসম্মতিক্রমে কংগ্রেসের সভাপতি হন। সেকালে ১০০ বছর কেউ দলের সভাপতির পদ আঁকড়ে থাকতেন না। প্রতিবছর গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের নির্বাচন হতো। ১৯৩৯-এ ত্রিপুরি কংগ্রেসে গান্ধীজির সমর্থিত দক্ষিণপন্থী জোটের প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে নেতাজি সভাপতি পুনর্নির্বাচিত হন। বাংলার যুবসমাজ গান্ধীজির ওপর খুবই ক্ষিপ্ত। এর মধ্যে গান্ধীজি কলকাতা ও পূর্ববঙ্গে সফরে আসার ঘোষণা দেন। তাঁকে প্রতিহত করার ডাক দেয় কংগ্রেসের সুভাষপন্থী তরুণসমাজ। গান্ধীপন্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য। তারা হাওড়া স্টেশনে গান্ধীকে নামতেই দেবেন না। নেতাজি পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়ে তাঁর অনুসারীদের সংযত থাকতে অনুরোধ করেন। অনুসারীদের বলেন, বাংলায় মহাত্মার অমর্যাদা হলে তা হবে আমারও অমর্যাদা। তার পরেও স্টেশনে কিছু গোলযোগ হয়েছিল। তার জন্য নেতাজি দায়ী নন। সুভাষ বসুর প্রতি গান্ধীজি সুবিচার করেননি, কিন্তু সেই সুভাষই তাঁকে ‘ভারতের জাতির জনক’ বলে প্রথম সম্বোধন করেন। সেই থেকে ‘জাতির জনক’ কথাটি উপমহাদেশের তিন দেশেই প্রচলিত হয়। ‘জাতির জনক’ কথাটির জনক নেতাজি সুভাষচন্দ্র।
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জেনারেল কারিয়াপ্পা ও জেনারেল আইয়ুব খান একত্রে কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পর ভারত-পাকিস্তান প্রথম যুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন জেনারেল কারিয়াপ্পা এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল আইয়ুব। সেই যুদ্ধের সময় থেকে দুই দেশ পরস্পর শত্রু। আইয়ুবের সিনিয়র ছিলেন কারিয়াপ্পা। আইয়ুব তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব চমৎকার। সম্ভবত ১৯৬৩ বা ’৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব জেনারেল কারিয়াপ্পাকে পাকিস্তান সফরে আমন্ত্রণ জানান। ভারতীয় জেনারেল বলেন, তিনি চট্টগ্রামে কয়েকটি দিন কাটাতে চান। আইয়ুব বলেন, আলবত। রাওয়ালপিণ্ডি থেকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয় জেনারেল কারিয়াপ্পাকে সর্বোচ্চ আতিথেয়তা দিতে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের এক জেনারেলকে বলা হয়, কারিয়াপ্পা চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা পছন্দ করেন না। তাঁর জন্য জোগাড় করো ফরাসি দেশের সবচেয়ে দামি মদ। আইয়ুবের হুকুমে তখন বাঘের চোখ পর্যন্ত জোগাড় করা সম্ভব। জেলা প্রশাসক সুরার কার্টনটি নিজের হাতে জেনারেলের কামরায় তাঁর টেবিলের ওপর রেখে আসেন। পানপাত্র ও ফ্রিজে পর্যাপ্ত বরফ।
চট্টলায় এত দর্শনীয় জায়গা থাকতে জেনারেল কারিয়াপ্পা বললেন, ডিসি সাহেব, আমাকে আপনাদের খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়টা দেখাতে পারেন কি না। তাজ্জবের কথা! এত কিছু থাকতে খাস্তগীর বালিকায় কেন? তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হায়, হৃদয় খুঁড়ে স্মৃতি বা বেদনা জাগাতে কে না ভালোবাসে? বিষয়টি নিয়ে আমি পরে বিস্তারিত লিখব। দক্ষিণ এশিয়ার যে জাঁদরেল জেনারেল পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করেন, তাঁকে পরাজিত করেছিল সুদূর অতীতের কোনো এক সময় খাস্তগীরের কারও ডাগর চোখ।
পঁয়ষট্টির সেপ্টেম্বর যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাট্রুপার জেনারেল কারিয়াপ্পার ছেলে ক্যাপ্টেন কারিয়াপ্পা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। কীভাবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের কানে যায় সে খবর। আইয়ুব বলেন, অন্য বন্দীদের সঙ্গে ওকে তো তোমরা জেলে ঢোকাতে পারো না। আমার বন্ধুর ছেলে। মাথার পাতলা চুল চুলকে প্রেসিডেন্ট বলেন, ওকে বরং রাষ্ট্রপতি ভবনে নিয়ে এসো। এখানেই সাবজেল বানিয়ে রাখো কয়েক দিন, ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত। সে আমার অতিথি। ছেলের মতো।
আইয়ুব অভিজাত পরিবারের মানুষ ছিলেন না। একজন রিসালদারের ছেলে। আলীগড়ে পড়ালেখা করেছেন। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ব্রিটিশ রাজকীয় সেনাবাহিনীতে। সৌজন্য, ভদ্রতা কাকে বলে তা জানতেন। ছিলেন সামরিক একনায়ক, কিন্তু দক্ষ প্রশাসক। পুরো ষাটের দশকে আমরা রাজপথে স্লোগান দিয়েছি তাঁর রাজত্বের ধ্বংস কামনা করে। যেসব নেতার পেছনে থেকে স্লোগান দিয়েছি, তাঁদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রী।
আইয়ুব পাকিস্তানে গণতন্ত্র হত্যা করেন। তাঁর আমলে পাকিস্তানের দুই অংশের গণতান্ত্রিক নেতা ও বিশেষভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনপন্থী নেতাদের তিনি জেলখানার আতিথেয়তা দিয়েছেন। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান এবং আইনমন্ত্রী এস এম জাফরদের প্ররোচনায় শেখ মুজিবকে নানাভাবে ফাঁসানোর ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এখন অনেকের বিশ্বাস হবে না যে সেই আইয়ুবই আগরতলা মামলা তুলে নেওয়ার পর ইসলামাবাদে তাঁর রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে বঙ্গবন্ধুকে একাকী আমন্ত্রণ করে একত্রে নৈশভোজ করেন। সেদিন খ্যাতিমান তথ্যসচিব আলতাফ গওহর কী কাজের অজুহাতে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন কাছে থেকে তাঁদের কথাবার্তা শুনবেন। আইয়ুব বলেন, আপনার এখানে থাকার দরকার নেই। চলে যান। গণদাবির কারণে কয়েক দিন পরেই আইয়ুব পদত্যাগ করেন। অনুমান করি, সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুর কাছে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে অতীতে বৈরী আচরণ করার জন্য।
রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকবেই। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতাদের মধ্যে মতৈক্য থাকলে ভারতবর্ষ ভাগ হতো না। একমাত্র মহাত্মা গান্ধী ছাড়া দুই দলের সব নেতাই ছিলেন ক্ষমতালিপ্সু। হিজ ম্যাজেস্ট্রি ব্রিটিশরাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঘোষণা দিয়েছেন ১৪-১৫ আগস্ট মধ্যরাতে দুই দলের নেতাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, যে ক্ষমতা ১৯০ বছর আগে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত ও হত্যা করে এবং বাহাদুর শাহ জাফরকে মিয়ানমারে নির্বাসন দিয়ে। দুই পক্ষের নেতাদের মধ্যে তিক্ততা চরমে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন যিনি, সেই নবাবজাদা লিয়াকত আলী খানের মাতৃভূমি মধ্যপ্রদেশ। চিরদিনের জন্য তিনি স্বদেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। যাওয়ার দুই দিন আগে সম্ভবত ১২ আগস্ট রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নবাবজাদাকে তাঁর বাড়িতে খেতে ডাকেন। প্রেসকে জানানো হয়নি। চুপচাপ খাওয়া-দাওয়া করে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিদায় জানান।
সেকালের রাজনীতিকেরা ছিলেন অন্য রকম। কল্পনাও করা যায় না যে গান্ধী জিন্নাহকে উদ্দেশ করে বলছেন, হাঁটু থিকা পাও ভাইঙ্গা ইয়া কইরা দিমু। কিংবা ভারত ভাগের সময় নেহরু লিয়াকতকে বলছেন, আর কোনো দিন ভারতের মাটিতে আইলে ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিমু। অথবা আইয়ুব কারিয়াপ্পার ছেলেকে গ্রেপ্তারের কথা শুনে বলছেন, বাপের মতোই শয়তান অইছে, ওই বাছুরডারে হাজতে ঢুকাইয়া উত্তম-মধ্যম দ্যাও। তা ছাড়া মাথা ফাটিয়ে দিলেও কেউ কারও জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন না। এসব প্রসঙ্গে কথা অমার্জনীয় ও জঘন্য অপরাধ। কোনো নারী, তা তিনি কোনো নগরের মেয়রই হোন বা যিনিই হোন, তাঁকে টিভি টক শোতে কোটি কোটি দর্শকের সামনে তুই তোকারি করা বা তাঁর দিকে ঘুষি পাকিয়ে ধেয়ে যাওয়া খুবই বর্বর দৃশ্য।
বহুদলীয় গণতন্ত্রে নেতারা প্রতিপক্ষের সমালোচনা করবেন, আক্রমণ করবেন রাজনীতির ভাষায়। শত্রুকে নিন্দা করারও একটা ভাষা আছে, মাত্রা আছে; তা অতিক্রম করলে যিনি করেন তা তাঁর গায়েই এসে পড়ে, যাঁর উদ্দেশে করা হয় তাঁর কোনোই ক্ষতি হয় না, বরং উপকার হয়। তাঁর প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়ে।
সেকালের নেতাদের ব্যর্থতা এখানে যে তাঁরা আমাদের আদব-কায়দা, সৌজন্য, ভদ্রতা ও ঔচিত্যবোধ কিছুই শিখিয়ে দিয়ে যাননি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আত্মহত্যা: যা ভেবে দেখা জরুরি by সেজান মাহমুদ

আগস্ট, ২০১৪ সালে কণ্ঠশিল্পী ন্যান্সির আত্মহত্যার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে দুটি উল্লেখযোগ্য রিপোর্ট বা মতামত প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোয়। কিন্তু আত্মহত্যার ওপর দরকারি আলোচনার পরও এ নিয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় একেবারেই উপেক্ষিত হয়েছে দুটো লেখায়। সেই বিষয়গুলো শুধু বাংলাদেশের পত্রিকায় আলোচিত হয়নি তা নয়, বরং বিশ্বের চিকিৎসক সমাজ তথা সমাজবিজ্ঞানীদের মধ্যেও প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে অনেক দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে প্রতিবছর আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে; অর্থাৎ প্রায় প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন মানুষ বেছে নেয় আত্মহননের পথ। বাংলাদেশে ২০১১ সালের হিসাবে ১৯ হাজার ৬৯৭ জন আত্মহত্যা করেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০২ থেকে ২০০৯ মোট ৭৩ হাজার ৩৮৯ জন আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে, যাদের বেশির ভাগই অল্প বয়সী এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী।
আত্মহত্যা মানুষ কেন করে, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। আশির দশক পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করতেন, গভীর বিষণ্নতা এবং অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন সিজোফ্রেনিয়া, বাই-পোলার, মুড ডিজর্ডার ইত্যাদির সঙ্গেই শুধু আত্মহত্যা জড়িত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় ১০ শতাংশ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোনো রকমের মানসিক রোগ জড়িত ছিল না। শুধু তা-ই নয়, আত্মহত্যার রোগীদের মস্তিষ্কের গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক পদার্থ এগুলোর মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া যাচ্ছে একজন সাধারণ সুস্থ মানুষের তুলনায়। বিজ্ঞানীরা আরও খুঁজে পেয়েছেন জিনেটিক বা বংশগতির সূত্র। প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই বংশগতির বা জিনেটিকের যোগসূত্র একেবারে প্রমাণিত। সেই সঙ্গে সামাজিক, পরিবেশগত কারণ এবং অন্যান্য ঝুঁকি মিলিয়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান একটি রোগের কারণগুলোকে একেবারে ছেঁকে আলাদা করে তুলে নিয়ে আসতে পারে, আর এই বিদ্যাকে বলে ‘এপিডেমিওলজি’। এই বিদ্যায় দেখা যায় একটি রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘মাল্টিফ্যাক্টরিয়াল’ বা ‘বহুমুখীন কার্যকারণে’ যুক্ত। আমি বিষয়টি ডায়াবেটিসের সঙ্গে তুলনা করি, যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে। কারও যদি বংশে ডায়াবেটিস থাকে, সেই সঙ্গে ওই ব্যক্তি শারীরিক পরিশ্রম না করে বেশি বেশি শর্করাজাতীয় খাবার খায়, অতিরিক্ত ওজন অর্জন করে, তাহলে তার ডায়াবেটিস হবে। কিন্তু এগুলো অনেকখানি প্রতিরোধ করা যায় এবং ডায়াবেটিসকে অনেক দিন আটকে রাখা যায়। তাহলে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে তা হবে না কেন? এ ক্ষেত্রে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো আত্মহত্যাকে এখন পর্যন্ত কেউ ডায়াবেটিসের মতো রোগ হিসেবে দেখছে না। এ জন্যই চিকিৎসকেরা, বিশেষ করে আমেরিকার মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞরা ‘আত্মহত্যা’ বা ‘আত্মহত্যার প্রবণতা’কে একটি রোগ হিসেবে ‘ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্যাল ম্যানুয়েল অব মেন্টাল ডিজর্ডারস’-এর পঞ্চম ভার্সনে (ডিএসএন-৫) রোগ হিসেবে বিবেচনার সুপারিশ করেছেন। এই সুপারিশ কার্যকর হওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এবার আসছি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যা নিয়ে সবচেয়ে মর্মান্তিক এবং প্রাচীন একটি আইনের বিষয় নিয়ে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে আত্মহত্যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আসলে খোদ ইংল্যান্ডেও ১৯৬১ সালের আগে আত্মহত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ ছিল। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে যে ‘পেনাল কোড’ (১৮৬০) গ্রহণ করে, তা মূলত সেই ব্রিটিশ আমলের আইনের অপভ্রংশ। যদিও ১৯৭১ সালের পরে বাংলাদেশে কাউকে আত্মহত্যার চেষ্টার জন্য সাজা দেওয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই; তার পরও এই আইনের সংশোধন অবিলম্বে প্রয়োজন; কারণ এর সামাজিক প্রভাব অনেক ব্যাপক। আমরা কি একজন ডায়াবেটিসের রোগীকে ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য বা অন্য কোনো রোগীকে উল্টো আইনসংগত সাজা দিই? অবশ্যই না। সে ক্ষেত্রে আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার প্রবণতাকে একটি রোগের মতো আমলে নিতে যেখানে বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা একযোগে উপদেশ দিচ্ছেন, সেখানে আমরা কেন তা গ্রহণ করব না? তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশ কেন এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে? আমরাও দেখতে চাই বাংলাদেশে এ রকম কোনো অমানবিক এবং অযৌক্তিক আইন নেই!
আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে সবাইকে একযোগে কাজ করা উচিত। একাধারে মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারও জ্বর হলেই যেমন প্যারাসিটামল খেতে হয়, তেমনি বিষণ্নতা বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনে ওষুধ নেওয়া জরুরি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত কারণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে, বাংলাদেশের সমাজে নারীরা অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং অনেক ক্ষেত্রে অসহায়। তাদের যেকোনো পরিস্থিতিতে ‘স্টিগমা’ নিয়ে বিচার না করা, সামাজিকভাবে ভিকটিমকে গ্রহণ করা, সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়া থেকে আড়ালে রাখা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করা যে ‘আত্মহত্যা একটি অসুখ, যা ঠেকানো সম্ভব এবং আমরা সব সময় তোমাদের পাশে আছি’, এই জাতীয় শক্তিশালী মেসেজ দেওয়া অনিবার্য। সেই মান্ধাতার আমলের আইনকে উৎখাত করে এবং দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার প্রবণতাকে রোগ হিসেবে নিয়ে এই মহান পদক্ষেপটি নিতে পারে বর্তমান সরকার।
ব্রিটিশ কবি থমাস শ্যাটারটন আত্মহত্যা করেছিলেন এই বলে যে ‘আমার মতো কোমল হৃদয়ের জন্য এই নির্মম পৃথিবী যোগ্য নয়।’ কেউ পৃথিবীর অযোগ্যতা, কেউ দেশের অযোগ্যতা, কেউ পরিবারের অযোগ্যতা, কেউ বা ব্যক্তির অযোগ্যতাকে অজুহাত করে এই আত্মহননের পথে যেতে পারে। আমাদের উচিত সামাজিকভাবে আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বাড়িয়ে দেওয়া, বন্ধুত্ব বাড়িয়ে দেওয়া, ভালোবাসা বাড়িয়ে দেওয়া। সামাজিকভাবে আমরা যেন কোনো অজুহাত সৃষ্টি করে না দিই; কারণ জীবন বড় মূল্যবান সম্পদ, জীবন একটাই। এই জীবন থমাস শ্যাটারটনের কবিতার মতো রোমান্টিক হোক, তাঁর জীবনের মতো যেন অকালে, অকারণে ঝরে না যায়; এই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার!!
সেজান মাহমুদ: চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও লেখক। ফ্লোরিডা এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক।

৩০ বছর জেল খাটার পর ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত ২ ভাই by কাজী আরিফ আহমেদ

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনার একটি কারাগারে ১১ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জীবনের সুদীর্ঘ ৩০টি বছর জেল খেটেছেন মানসিক প্রতিবন্ধী দুই সৎ ভাই। এর মধ্যে এক ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায়, কারাগারের একটি বিশেষ সেলে এতগুলো বছর রাখা হয়েছিল তাকে। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি যে, সম্প্রতি ডিএনএ পরীক্ষা করার পর তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। স্থানীয় একটি কাউন্টি আদালতের বিচারক ওই দুই জনকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়ার রায় দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। নর্থ ক্যারোলাইনায় ১৯৮৪ সালে ১১ বছরের কিশোরী সাবরিনা বুউয়িকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মানসিক প্রতিবন্ধী দুই সৎ ভাই হেনরি ম্যাককলাম (৫০) ও লিওন ব্রাউন (৪৬) দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। বড় ভাই হেনরির বয়স ৫০ বছর হলেও, তার মানসিক গঠন এখনও ৯ বছরের শিশুর মতোই। গ্রেপ্তারের সময় তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৯ ও ১৫ বছর। এতোগুলো বছর পর অপরাধস্থল থেকে সংগৃহীত ডিএনএ’র নমুনা পরীক্ষা অপর এক ব্যক্তির দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করছে। প্রকৃত অপরাধী ওই ব্যক্তিও একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটছে। নর্থ ক্যারোলাইনা ইনোসেন্স ইনকোয়্যারি কমিশন এ তদন্ত পরিচালনা করে ও ডিএনএ পরীক্ষা করে। ১৯৮৪ সালে যখন এ ঘটনা ঘটে, অপরাধস্থলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সন্দেহের জেরেই তাদের দু’ জনকে কয়েক সপ্তাহ পর গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৫ ঘণ্টা টানা জিজ্ঞাসাবাদের পর হেনরি তার দোষ স্বীকার করেছিলেন। সেখানে তার পক্ষে কোন আইনজীবী বা পরিবারের সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। তার ছোট ভাইও একরকম বাধ্য হয়ে স্বীকারোক্তি দেন। পরে তাদের যখন আদালতে তোলা হয়, তারা বলেছিলেন যে মিথ্যা স্বীকারোক্তিতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। দুর্বল মামলা সত্ত্বেও দুই ভাইকে মৃত্যুদ- দেয় আদালত। ব্রাউনের শাস্তি লাঘব করে পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে শুধু ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে হেনরি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ৩০টি বছর ছিলেন মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। মিথ্যা স্বীকারোক্তির পরও তারা নিজেদের বারবার নির্দোষ দাবি করেছিলেন ও বেশ কয়েকবার আপিল করেছিলেন। কিন্তু, কোন ফল হয়নি। অবশেষে, ২০১০ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা ইনোসেন্স ইনকোয়্যারি কমিশন মামলাটি হাতে নেয় এবং তাদের তদন্তে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়।

প্রতিবন্ধী ক্লদিও এখন প্রেরণার উৎস

জন্মের সময় ডাক্তাররা তার মা’কে বলেছিলেন, তাকে যেন মরে যেতে দেয়া হয়। কেন না তিনি খুব বিরল একটি শারীরিক ব্যতিক্রম নিয়ে জন্মেছিলেন। এর ফলে তার মাথা পেছন দিকে উল্টো হয়ে ফিরে থাকে। কিন্তু এত বড় একটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ব্রাজিলের মন্তে সান্তো এলাকার ক্লদিও অলিভেইরা ডাক্তারদের সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়ে আজ হিসাবরক্ষক হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বনে গেছেন সাধারণ মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি বলেন, আমার শিশুকাল থেকেই আমি নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখতাম। অন্যের ওপর নির্ভর করাটা মোটেই পছন্দ করতাম না। এখন হিসাবরক্ষণ, ক্লায়েন্টদের জন্য গবেষণা ও পরামর্শ দিয়ে থাকি। আমি টিভি চালু করা, নিজের মুঠোফোন হাতে তুলে নেয়া, রেডিও চালু করা, কমিপউটার ও ইন্টারনেট চালানো শিখেছি। এ সব কিছুই নিজে নিজে শিখেছি। ক্লদিও নিজের মুখের ভেতর পুরে রাখা একটি কলম দিয়ে টাইপ করেন, ফোন ও কমিপউটার চালান। তার নিজের ওপর বিশ্বাস তাকে আজ শিক্ষাক্ষেত্রে সফল করেছে। বর্তমানে তিনি ফেইরা ডি সান্তানার স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। যখন তিনি জন্ম নিয়েছিলেন, তখন ডাক্তাররা তার মাকে বলেছিল, এই শিশু বেশিদিন বাঁচবে না।

তার মা মারিয়া হোসে বলেন, মানুষ বলাবলি শুরু করলো, এই শিশু মারা যাবে। কারণ সে জন্ম নেয়ার সময় খুব কষ্টে নিঃশ্বাস নিতো। অনেকে বলতো, তাকে খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই, সে ইতিমধ্যেই মারা যাচ্ছে। কিন্তু আজ কেবল সুখ। কেননা, ক্লদিও আজ অন্য একজন মানুষের মতোই। সে এভাবেই গড়ে উঠেছে বাড়িতে। আমরা কখনওই তাকে ঠিক করার চেষ্টা করিনি। সবসময় চাইতাম অন্যরা যেভাবে করে, সেও যাতে সাধারণ কাজগুলো সেভাবে করতে পারে। তাই সে আজ আত্মবিশ্বাসী। সে রাস্তায় হাঁটার সময় লজ্জা পায় না। সে তখন গান গায়, কিংবা নাচে। আট বছর বয়সে ক্লদিও হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁটা শুরু করে। এর আগে তাকে অন্যদের বহন করে নিয়ে যেতে হতো সবখানে। তার পরিবার বাড়ির মেঝে পরিবর্তন করেছিল, যাতে তিনি ভাল করে হাঁটতে পারেন। ক্লদিওর খাট, বাতি বা অন্যান্য সুইচ একটু নিচু জায়গায় রাখা বা বানানো হয়েছিল, যাতে তিনি নিজেই সে সব ব্যবহার করতে পারেন। নিজের অস্বাভাবিক গড়নের কারণে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে পারেন না ক্লদিও। তাই তার জন্য স্বাধীনভাবে থাকাটা ছিল খুব কষ্টের। কিন্তু তবুও তিনি নিজের মায়ের কাছে স্কুলে যাওয়ার জন্য আবদার শুরু করে। একসময় তিনি অন্যদের মতোই স্কুলে যেতে শুরু করেন। ডাক্তাররা সমপ্রতি তাকে পরীক্ষা করেছেন। এরপর তার সমস্যাকে বলছেন, আর্থ্রোগ্রিপোসিস নামের খুব বিরল একটি ব্যাধি। তারা মনে করেন, তার পায়ে ও বাহুতে সমস্যার কারণে সে সব ঠিকমতো প্রসারিত হতে পারে না।
ক্লদিও বলেন, আজ আমার নিজেকে ভিন্ন কিছু মনে হয় না। আমি স্বাভাবিক একজন মানুষ। আমি আমার নিচু হয়ে যাওয়া মাথা দেখি না। আমি এই কথাটাই আমার অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যে বলে থাকি। এখন মানুষের সঙ্গে কথা বলাটা আরও সহজ হয়ে গেছে। আমি এটি নিয়ে আর ভয় পাই না। আমি বলতে পারি যে, আমি পেশাদার, আন্তর্জাতিক বক্তা এবং আমি সারা বিশ্ব থেকে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ পাই।

বেশির ভাগ পাকিস্তানি চান স্থিতিশীলতা

ইসলামাবাদে অবস্থান নেওয়া নওয়াজ সরকার পতনের আন্দোলনকারীরা
গতকাল সকালে লাইনে দাঁড়িয়ে নাশতা নেন। সরকারের পদত্যাগের
দাবিতে অনড় ইমরান খান ও তাহির উল-কাদরির সমর্থকেরা
পার্লামেন্ট ভবনের আশপাশে অবস্থান নিয়েছেন। রয়টার্স
তিন সপ্তাহের বেশি আগে আন্দোলন শুরু করার সময় পাকিস্তানের রাজনীতিক, সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের চিন্তাটা ছিল এমন, পুরো জাতি তাঁর পেছনে এককাট্টা হবে। রাজধানী ইসলামাবাদে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ দেখে ভড়কে গিয়ে গদি ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। কারণটাও অনুমান করে নিয়েছিলেন ইমরান খান: নওয়াজের ক্ষমতার প্রথম বছরটা কেটেছে চরম নড়বড়ে অবস্থার মধ্য দিয়ে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় যেসব সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, এই এক বছরে তা আরও শোচনীয় হয়েছে। সেই সঙ্গে নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি আর নানা দুর্নীতির অভিযোগে সরকার জেরবার। কিন্তু সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুর পর প্রকৃতপক্ষে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। আন্দোলনকারীরা ইসলামাবাদ কাঁপিয়ে দিলেও জনগণের বড় একটা অংশই ইমরান খান ও তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ইমরান ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সরকার পতনের যে আন্দোলনে নেমেছেন, তাঁর বিপক্ষের পাল্লাই বেশি ভারী। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের প্রায় পুরোটাই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে নওয়াজের পদত্যাগের বিরুদ্ধে। এমনকি পার্লামেন্টে তাঁর ঘোর বিরোধীরাও এই কথা বলছেন। দেশের ব্যবসায়ী সমাজ, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, আইনজীবী ও আদালতও সরকার এবং সংবিধানের পক্ষে জোরদার সমর্থন ব্যক্ত করছেন। সবাই নওয়াজ শরিফের সমর্থক, বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তানের প্রায় কেউই আরেকটি সংকট, আরও বেশি বিশৃঙ্খলা বা অস্বাভাবিকভাবে সরকার পরিবর্তন দেখতে চায় না। কারণ, এসব হলেই সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষভাবে দেশের চালকের আসনে চলে যেতে পারে।
ইমরান খানের আন্দোলন শুরুর পর জনমত পরিস্থিতি এমন হবে, তা আগে আন্দাজ করা যায়নি। ইমরানের উপদেষ্টারা তাঁকে বলেছিলেন, আন্দোলন শুরু হলে নওয়াজের প্রশাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। নওয়াজ লেজ গুটিয়ে দেশ ছেড়ে পালাবেন। আর পাকিস্তানিরা তাঁর বিদায়কে সাদরে গ্রহণ করবে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জনগণের অবস্থান মূলত স্থিতিশীলতার পক্ষে। মূলত এই জায়গাটাতেই ইমরান খান ও তাঁর উপদেষ্টাদের (যাঁদের অনেকেই সাবেক সামরিক সরকারের সময়কার মন্ত্রী ও গোয়েন্দা-প্রধান) অনুমানে ভুল হয়েছে। পাকিস্তান দশকের পর দশক সেনাশাসন, রাজনৈতিক অরাজকতা, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ইসলামি চরমপন্থার বাড়বাড়ন্ত প্রত্যক্ষ করেছে। জনগণ দেখেছে, নব্বইয়ের দশকে একটার পর একটা সরকার এসেছে আর পড়ে গেছে। তারা এ ধরনের অস্থিতিশীলতার ইতি দেখতে মরিয়া। তবে চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য লোকজন নওয়াজ ও ইমরান দুজনের ওপরই নাখোশ। অনেকেই মনে করেন, নওয়াজ আগে একরোখাভাবে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান না করলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। স্বজনপ্রীতি করেও তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইমরান খান নিজেকে ‘অধিনায়ক’ এমনকি ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে দেখতে নাছোড় অবস্থান নিয়েছেন। সুতরাং, সম্ভাব্য সেনা অভ্যুত্থান বা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে নওয়াজকে উৎখাতের চেষ্টার পাশাপাশি চলমান সংকট নিরসনে দৃশ্যমান যেসব সমাধান রয়েছে, তার কোনোটিতেই দেশের বেশির ভাগ লোকের সায় নেই। বরং, তারা চায় স্থিতিশীলতা আর নিরাপত্তা। বর্তমান পরিস্থিতিতে লোকজন গণতন্ত্রের প্রতি বিরক্ত হতে পারে, তবে স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার প্রতি কোনোভাবেই নয়।

৩০ মিনিটেই ইবোলা পরীক্ষা

জাপানের একদল গবেষক গতকাল মঙ্গলবার দাবি করেছেন, তাঁরা নতুন এমন একটি পদ্ধতি বের করেছেন—যা শরীরে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে কি না তা মাত্র ৩০ মিনিটেই শনাক্ত করতে পারবে। তাঁরা বলছেন, চিকিৎসকেরা নতুন এই পদ্ধতি ব্যবহার করলে আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে এই প্রাণঘাতী রোগ নির্ণয় করা যাবে। খবর এএফপির।
অধ্যাপক জিরো ইয়াসুদার নেতৃত্বে নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদলটি বলছে, ইবোলা পরীক্ষায় পশ্চিম আফ্রিকায় বর্তমানে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে নতুন এই পদ্ধতি তার চেয়ে ব্যয় সাশ্রয়ীও। বার্তা সংস্থা এএফপিকে টেলিফোনে অধ্যাপক ইয়াসুদা বলেছেন, এখন যে প্রক্রিয়ায় ইবোলা পরীক্ষা করা হয়, নতুন পদ্ধতি তার চেয়ে সহজ। অধ্যাপক ইয়াসুদা বলেন, নতুন যে পদ্ধতি বের করা হয়েছে এটিকে তিনি ‘প্রাথমিক পদ্ধতি’ বলছেন। এটি শুধু রক্তের নমুনা ও শরীরের অন্য কোনো তরল পরীক্ষা করে ইবোলা ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি শনাক্ত করতে পারে।

প্যারিস ভুলে যাচ্ছে হেমিংওয়েকে!

প্যারিসে নিজের বাড়ির সামনে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল খ্যাতিমান মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের। তিনি ১৯২০ সালে প্রথমবার সেখানে থাকা শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহরটিকে দখলদার জার্মান বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার নেপথ্যে তিনিও ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সেই ঘটনার ৭০ বছর পর ফ্রান্স থেকে লেখকের স্মৃতি একরকম হারিয়ে যেতে বসেছে। খবর বিবিসির। ২০ বছর আগেও চিত্রটা ছিল অন্য রকম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য-পাস তরুণেরা প্যারিসের বিভিন্ন ক্যাফেতে বসে হেমিংয়ের মতো লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এখন সাহিত্যিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সেই নবীন লেখকদের সংখ্যা কমে গেছে। হেমিংওয়ে প্যারিসের যে এলাকায় থাকতেন, সেই লেফট ব্যাংক ও বইয়ের দোকান শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি একসময় ছিল পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য। 
মুভেবল ফিস্ট নামের স্মৃতিকথায় প্যারিসের অনেক রাস্তাঘাটের উল্লেখ করেছিলেন হেমিংওয়ে। লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পরও মার্কিন সেনাবাহিনীর পঞ্চম পদাতিক ডিভিশনের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন হেমিংওয়ে। সাংবাদিকতা করলেও নিজের চারপাশে যুদ্ধের আবহ তৈরি করে নিয়েছিলেন। তাঁর হোটেলকক্ষে থাকত গ্রেনেড ও সামরিক পোশাক-পরিচ্ছদ! ফ্রান্সের মুক্তিকামী যোদ্ধাদের একটি অংশের ওপর হেমিংওয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল। ১৯৪৪ সালের ২৫ আগস্ট জার্মান বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে হেমিংওয়েও প্যারিসে ঢুকেছিলেন। তাঁর নানা গল্পে রিট্জ হোটেলের বিবরণ আছে। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করেন হেমিংওয়ে। ১৯২৮ সালে হোটেলটির ভূগর্ভস্থ কক্ষে সংরক্ষণের জন্য হেমিংওয়ে দুটি ট্রাংকে বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি রেখে গিয়েছিলেন। সময় বদলেছে। প্যারিসের তরুণ-তরুণীদের কাছে এখন কদর পাওয়া মুখগুলো বদলে গেছে। তবু সেই ১৯২০-এর দশকের প্যারিসের কিছু স্মৃতি কখনোই হারিয়ে যাবে না। আজও যখন কোনো তরুণকে বৃষ্টিভেজা প্যারিসের কোনো ক্যাফের জানালার পাশে বসে স্বপ্নাবিষ্ট অবস্থায় পেনসিল কামড়াতে দেখা যায়, তখন এ শহরের বহু বছর আগের কোনো দৃশ্যই যেন মনের গভীরে উঁকি দিয়ে যায়।

দুই সপ্তাহে কিয়েভ দখল করতে পারি

ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, তাঁর দেশ চাইলে দুই সপ্তাহে কিয়েভ দখল করতে পারে। ইতালির লা রিপাবলিক পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশনের চেয়ারম্যান হোসে মানুয়েল বারোসোর কাছে এ দম্ভোক্তি করেছেন পুতিন। তবে রাশিয়ার সরকারি দপ্তরগুলো পুতিনের কথিত এ উক্তির কথা কার্যত অস্বীকার করেছে। এদিকে রাশিয়া গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, ইউক্রেন পরিস্থিতি ও পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা নিজেদের সামরিক নীতি বদলাবে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশনের চেয়ারম্যান হোসে মানুয়েল বারাসো বলেছেন, পুতিন তাঁকে কিয়েভ দখল করে নেওয়ার ক্ষমতার কথা বলেছিলেন গত ২৯ আগস্ট। এ সময় তিনি টেলিফোন আলাপে ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের সামরিক সহযোগিতা করার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছিলেন। বারোসো বলেন, তখন পুতিন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘বিষয় সেটি নয়। আমি যদি চাই, তবে দুই সপ্তাহে কিয়েভ দখল করতে পারি।’ পুতিনের এ কথিত মন্তব্য নিয়ে ক্রেমলিন বলেছে, বারাসো গোপনীয়তা ফাঁস করেছেন। প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওই উক্তিকে খণ্ডিতভাবে নেওয়া হয়েছে। এর অর্থও ভিন্ন। এদিকে গতকাল রাশিয়া বলেছে, ইউক্রেন সমস্যা ও পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি তার সামরিক নীতি বদলাবে।
রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সহকারী সচিব মিখাইল পোপভ বলেছেন, নতুন সামরিক নীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে ক্রমাবনতিশীল সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটবে। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা আরআইএকে পোপভ বলেন, ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অস্ত্র-সরঞ্জাম অনেক বর্ধিত আকারে রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে। ন্যাটোর কার্যকলাপ রাশিয়ার প্রধান বৈদেশিক হুমকি। ক্রেমলিনের এ উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, ন্যাটোর নতুন পরিকল্পনা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নেতারা রাশিয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে এর আরও অবনতি দেখতে চায়। তবে রাশিয়ার এ নতুন সামরিক নীতি কী হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি পোপভ। ইউক্রেনে অব্যাহত যুদ্ধাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো জানায়, ‘রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসনের’ হাত থেকে সংস্থার পূর্ব ইউরোপীয় সদস্যদের নিরাপত্তা দিতে কয়েক হাজার সেনার একটি বাহিনী মোতায়েনের কথা ভাবা হচ্ছে। ন্যাটোর মহাসচিব অ্যান্ডারস ফগ রাসমুসেন বলেছেন, জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে তৈরি সেই সম্ভাব্য বাহিনী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মোতায়েন করা যাবে। তিনি দাবি করেন, এটি ১৯৯৭ সালে ন্যাটো-রাশিয়া সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটাবে না। ওই সমঝোতায় পূর্ব ও মধ্য ইউরোপে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। ন্যাটোর ওই নতুন পরিকল্পনা এ সপ্তাহে ওয়েলসে অনুষ্ঠেয় শীর্ষ বৈঠকে অনুমোদিত হতে পারে।

নদী সাঁতরে হাসপাতালে গেলেন অন্তঃসত্ত্বা!

নয় মাসের সন্তান গর্ভে নিয়ে সাঁতরে নদী পার হলেন এক ভারতীয় নারী। বর্ষায় বাড়বাড়ন্ত নদী। খরস্রোতো নদীতে তখন ১২ থেকে ১৪ ফুট উঁচুর ঘূর্ণায়মান প্রবাহ। কিন্তু তার চিন্তা কেবলই অনাগত সন্তানের নিরাপত্তা। নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপগ্রামে নেই কোনো হাসপাতাল বা প্রসবের জরুরি ব্যবস্থাও।
সন্তানকে বাঁচাতে হলে সন্তানসম্ভবা ইয়েল্লাওয়ার পাড়ি দিতেই হবে এই নদী। কিন্তু কোনো নৌকা বা অন্যকিছু না থাকায় সম্বল শুধু শুকনো লাউ। এই সম্বল করে প্রায় এক কিলোমিটার সাঁতরে মূলভূমিতে যেতে পারলেই কেবল দেখা মিলবে হাসপাতালে যাওয়ার পথের। অনাগত সন্তানের নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা করতে ওই শুকনো লাউয়ের খোল সম্বল করেই নদীতে নেমে পড়লেন সন্তানসম্ভবা মা। পাশে অবশ্য সাঁতরেছেন বাবা-ভাইসহ আর ক’জন পুরুষস্বজন। এভাবেই সাঁতরে নদী পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের কৃষ্ণা নদীর ছোট্ট দ্বীপগ্রামের বাসিন্দা ইয়েল্লাওয়া (২২)। ইয়েল্লাওয়া বলেন, হাসপাতালের বিলের ব্যাপারে তারা ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন।

গীতা উপহারে অন্যরা ক্ষেপে যাবেন : মোদি

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবেকে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ‘ভগবত গীতা’ উপহার দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার এই গীতা উপহারে কথিত ধর্মনিরপেক্ষ সমালোচকরা ক্ষেপে যাবেন বলে আগাম মন্তব্য করেছেন মোদি। মঙ্গলবার মোদি বলেন, ‘আমার গীতা উপহার সহ্য হবে না সেক্যুলার বন্ধুদের। তাদের অন্তর্দহন শুরু হয়ে যাবে। আর সেই ক্ষোভ ঝাড়বেন হয়তো টেলিভিশন টকশো’তে।’ ভারতে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমবারের জাপান সফরে যান দলটির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
পাঁচ দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজোকে গীতা উপহার দিয়ে মোদি বলেন, ‘আমি সম্রাটকে ভগবত গীতা উপহার দিয়েছি। কারণ এর চেয়ে মূল্যবান কোনো বস্তু আমার কাছে নেই। এর চেয়ে মূল্যবান কিছু পৃথিবী আর পেতে পারে না।’ মোদি বলেন, আমার সেক্যুলার বন্ধুরা হয়তো বলবেন, ‘মোদি জানেন না তিনি নিজেকে কী ভাবেন।

ইতিহাসের এক আকরগ্রন্থ by আলী রীয়াজ

ইতিহাস রচনার দুটি উৎস: একটি হচ্ছে দলিল-দস্তাবেজ, আর অন্যটি হলো অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান বা তাদের স্মৃতিকথা। এগুলো এককভাবে ইতিহাস তৈরি করে না। কিন্তু এই দুইয়ের সার সংগ্রহ ও সংকলন করেই আমরা ইতিহাস রচনা করি। সে কাজ ইতিহাসবিদের। জনাব এ কে খন্দকার বীর উত্তম ইতিহাসবিদ নন—কিন্তু তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশগ্রহণকারী, যুদ্ধের সামরিক নেতা এবং অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর এই বই ১৯৭১: ভেতরে বাইরে সে কারণেই ইতিহাসের একটি অন্যতম আকরগ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যাঁরা বুঝতে চান, যাঁরা বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে চান, তাঁদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য বলেই আমার মনে হয়েছে।
বইটি বেরোল এমন এক সময়ে, যখন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন চরিত্রের ভূমিকা, ঘটনাপরম্পরা নিয়ে আলোচনার তাগিদ সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, বিভিন্ন ঘটনার বিভিন্নমুখী ব্যাখ্যা আমরা দেখতে পাচ্ছি, ক্ষেত্রবিশেষে জ্ঞাত তথ্যগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ইতিহাসের একটি পর্বেই যথেষ্ট নয়, কেবল একবার লিখলেই ইতিহাস লেখা শেষ হয় না। গবেষকদের কাজ হচ্ছে জানা তথ্যকে ঝালিয়ে দেখা, নতুন উৎসের অনুসন্ধান করা এবং কোনো কিছু নজর এড়িয়ে গেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা। কোনো ঘটনার একটা মাত্র ভাষ্য থাকে না; আমাদের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন বয়সে শোনা এবং তার সামঞ্জস্য ও অসামঞ্জস্য বিচার করা। সেই বিবেচনায়ও এই বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রাসঙ্গিকভাবে আরেকটি দিকের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত GARY BASS-এর লেখা BLOOD TELEGRAM এবং SRINATH RAGHANAN-এর 1971/GLOBAL HISTORY OF THE CREATION OF BANGLADESH তার প্রমাণ।
কিন্তু এসব বইয়ে লক্ষণীয়ভাবে বাংলাদেশের কণ্ঠ অনুপস্থিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যেসব পাঠ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব কণ্ঠস্বর না থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। আর তা ঘটেছে, কেননা গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশের ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দেশের বাইরের পাঠক, বিশেষজ্ঞ ইংরেজিভাষী পাঠকের জন্য না ভালো বিশ্লেষণ, না আকরগ্রন্থ—তা দলিলনির্ভরই হোক, কি অংশগ্রহণকারীর বয়ানেই হোক—উপহার দিতে পারেননি। যা আছে তা স্বল্পসংখ্যক এবং ঘটনার মাত্রা বিবেচনায় অকিঞ্চিৎকর।
শ্রদ্ধাভাজন এ কে খন্দকার তাঁর এই বইয়ে কতকগুলো বিষয়ে আলোকপাত করেছেন, যা নিয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা হলেও তাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তার সংখ্যা অনেক। আমি কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দেব।
স্বাধীনতার ঘোষণা: ‘ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক আগে শেখ সাহেব ইপিআরের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন। এই তথ্যটি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ (পৃ. ৫৭) জনাব খন্দকার এ বিষয়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদেরও উদ্ধৃতি দিয়েছেন: ‘একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম “স্যার, বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আপনি কি তাঁর কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা পেয়েছিলেন?” উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “না, আমি কোনো নির্দেশ পাইনি” (পৃ. ৪৩)। লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ব্যক্তি স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নানা কথা বলেন। সেগুলো সত্য কি অসত্য, তা জানার উপায় নেই। এগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে কেউ কোনো দলিল উপস্থাপন করেননি। আমার মনে হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা আবেগপ্রসূত।’ (পৃ. ৫৩) এ বিষয়ে আমাদেরকে প্রাথমিকভাবেই নির্ভর করতে হয়েছে বিদেশি সংবাদপত্রের প্রতিবেদক ও বিদেশি রাষ্ট্রের গোপন নথির ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং নিরাপত্তাবিষয়ক দলিল-দস্তাবেজ যদিও এই সাক্ষ্য দেয় যে ২৬ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন—এর কোনো দলিল আমরা এখনো দেখিনি।
প্রাসঙ্গিকভাবে, জিয়াউর রহমান কর্তৃক ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ প্রসঙ্গটিও তিনি উত্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘মেজর জিয়ার ঘোষণাটিকে কোনোভাবেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলা চলে না। মেজর জিয়া রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন না বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেবার উপযুক্ত ব্যক্তিও ছিলেন না।’ (পৃ. ৬০)
বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যকার অনৈক্যের বিষয়, তাঁদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট বক্তব্য ও উদাহরণ রয়েছে। এ কালে এগুলো অজ্ঞাত নয়। অতীতে মঈদুল হাসানের মূলধারা ৭১ গ্রন্থে আমরা তার বিস্তারিত জানি। কিন্তু বইয়ের ৮১ ও ৮৫ পৃষ্ঠায় যে বিশৃঙ্খলা, তদুপরি ‘দৃঢ় সংকল্পের অভাব’-এর কথা জানা যায়, তা নিঃসন্দেহে আমাদের মনোযোগ দাবি করে। তবে এখন এ ঘটনাবলির বিভিন্ন বর্ণনা থেকে মাঝে মাঝে মনে হয় যে সৌভাগ্য আওয়ামী লীগের তখনকার ‘জ্যেষ্ঠ’ নেতাদের হাতে এর নেতৃত্ব ছিল না। তাজউদ্দীন আহমদের বদলে অন্য নেতৃত্ব হলে সম্ভবত বাংলাদেশ স্বাধীনই হতো না। সেটি এখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যাপারেও প্রযোজ্য।
এ বইয়ের লেখক ১৯৭১ সালে রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি সেনা কর্মকর্তা এবং শীর্ষপর্যায়ের সামরিক নীতিনির্ধারক। সেই বিবেচনায় তিনি সামরিক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রশাসনের বিষয়ে যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যকার বিরোধ (পৃ. ১১৬-১১৭), বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং বিষয়ে তাঁর মতামত (পৃ. ৯৩-৯৫) মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্যই নয়, স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাস লিখছেন, তাঁদের জন্য বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্র তৈরি করবে—আমি এটাই আশা করি।
মুক্তিযুদ্ধের একটি স্বল্পালোচিত বিষয় হলো মুজিববাহিনী। যদিও এ বিষয়টি স্বল্প-উল্লিখিত নয়। মুজিববাহিনীর শীর্ষ নেতাদের কেউ এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেননি। সেখানে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত অধ্যায় রচনার জন্য এ কে খন্দকার আরও এক দফা প্রশংসার দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে আমি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই ১৩৮ পৃষ্ঠার দিকে। জনাব খন্দকার লিখেছেন: ‘মুজিববাহিনীর সদস্যদের শেখ মুজিব বা দেশের প্রতি আনুগত্য সন্দেহাতীত ছিল না।’ (এর পরের অংশগুলো আমি ইচ্ছে করেই উদ্ধৃত করছি না। পাঠকেরা নিজেরাই তা জেনে নেবেন আশা করি।)
সব শেষে একটা প্রশ্ন করার তাড়না অনুভব করছি। কোনো লেখক কখন, কী লিখবেন—পাঠক হিসেবে আমরা, রাষ্ট্র বা সমাজ তা নির্ধারণ করতে পারে না। একজন লেখক তাঁর প্রাণের তাগিদ বা প্রয়োজনেই লিখবেন। আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে তা সব পরিমাণে সত্য। সম্ভবত তার চেয়ে বেশি। কিন্তু যখন তার সঙ্গে একটি জাতির জন্মের ইতিহাস সংশ্লিষ্ট, যখন লেখকের জ্ঞাত অনেক ঘটনাই তাঁর ভাষায় ‘আবেগপ্রসূত’ভাবে সত্য/অসত্যভাবে বলা হচ্ছে, তখন তাঁর এই ভাষ্য শোনার জন্য আমাদের কেন ৪৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে—সেই প্রশ্ন আমাকে নিঃসন্দেহে ভাবিত করে। এতটা অপেক্ষাও কি আজকের চলমান বিতর্ককেই সাহায্য করেনি? এ প্রশ্ন তোলার অর্থ এই নয় যে এসব বিষয়ের অবতারণা করা যাবে না, বরং অন্যদের উৎসাহিত করা, যেন তাঁরা আর বিলম্ব না করেন।
(ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে গতকাল ১৯৭১: ভেতরে বাইের বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে পঠিত। বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন)

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।