Sunday, July 11, 2010

দেশ কি সঠিক পথে চলছে by সোহরাব হাসান

প্রথমেই কবুল করে নিচ্ছি, শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার পূর্ববর্তী খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকারের মতো অথর্ব নয়, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে না, সমস্যা এড়িয়ে চলার চেয়ে মোকাবিলার চেষ্টা তাদের আছে। কৃষি ও শিক্ষাসহ কয়েকটি খাতে সরকার গত ১৮ মাসে যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, তাতেও সন্দেহ নেই। জ্বালানি-সংকট সমাধানেও নেওয়া হয়েছে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি বেশ কিছু পরিকল্পনা। খালেদা জিয়ার কথিত ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’র স্থলে শেখ হাসিনার ‘দুই বিশাল প্রতিবেশী’র সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার উদ্যোগও সর্বমহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এত সব ইতিবাচক দিক সত্ত্বেও সরকার আগামী সাড়ে তিন বছর দেশ সুষ্ঠুভাবে চালাতে পারবে কি না, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষায় তারা সফল হবে কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এ জন্যই দেড় বছরের মাথায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশ কি সঠিক পথে চলছে? বিরোধী দলের প্রতি সরকারের আচরণ কি যুক্তিসংগত? তারা কি কাজের চেয়ে অকাজকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে না (যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে আমরা কোনোভাবে অকাজ বলে মনে করছি না)? ক্ষমতাসীনদের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড দেশবাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে।
বিএনপি আমলে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল ও শিবিরের সন্ত্রাস-দখলবাজি ছিল, এ কথা কেউ অস্বীকার করবে না। সে সময়ে দেশে দুঃশাসন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বোমাবাজি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাও সত্য। জোট সরকার শুরু থেকে বিরোধী দলকে দমন-পীড়নে ব্যস্ত ছিল। তুলনায় শেখ হাসিনার সরকার প্রথম ১৫ মাস মোটামুটি সহনীয় রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে পেরেছিল বলা যায়। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতার ভাষায় ‘হঠাৎ কোন ভূত’ সরকারের ঘাড়ে চেপে বসল? রাস্তায়, ঘরে—যেখানেই পাচ্ছে সরকারের র‌্যাব-পুলিশ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের লাঠিপেটা করছে, রিমান্ডে নিচ্ছে। অন্যদিকে সরকার-সমর্থক যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিরোধী দলের ওপর চড়াও হচ্ছে। এসব কিসের আলামত?
সরকারের মন্ত্রী-সাংসদেরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিএনপি আমলের সন্ত্রাস-মাস্তানির কথা ফলাও প্রচার করলেও নিজেদের আমল সম্পর্কে কিছু বলেন না। কেউ কেউ আওয়ামী রাজনীতির শতভাগ বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে এমন প্রচারও চালান যে বঙ্গবন্ধুর সৈনিকেরা কোনো অন্যায় করতে পারে না। ছাত্রদল ও শিবির কর্মীরা নাকি সরকারি দলে অনুপ্রবেশ করে এসব মাস্তানি-চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন। তাঁদের এসব দাবি যে কত অসার, বিভিন্ন স্থানে সরকারি ছাত্র ও যুব সংগঠন কর্তৃক দখলবাজি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপর্যুপরি সংঘাত-সংঘর্ষই তার প্রমাণ। প্রধানমন্ত্রীর ‘মৃদু ও কঠোর ধমক’ও ছাত্রলীগ নামধারী সংগঠনটিকে সন্ত্রাস-সংঘর্ষ থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। যার সর্বশেষ উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মারামারি। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকতে একবার ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে বইখাতা তুলে দিয়েছিলেন; কিন্তু এখনকার ছাত্রলীগের কর্মীরা সেই বইখাতা ছুড়ে ফেলে ছুরি, চাকু, কিরিচ, রামদা ও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। গত ১৮ মাসে কেবল জাহাঙ্গীরনগরেই তাঁরা ৫০ বার সংঘাতে লিপ্ত হয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যতই প্রগতিশীল ও একমুখী শিক্ষানীতি জাতিকে উপহার দিন না কেন, ছাত্রলীগের কর্মীরা অস্ত্রমুখী শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। তাঁদের সন্ত্রাসের কারণে দেশের বেশ কটি বিশ্বদ্যািলয় এখন বন্ধ। আমরা ১৯৭৪ সালে ছাত্রলীগের অন্তর্দ্বন্দ্বে মুহসীন হলের সাত ছাত্র হত্যার কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়ও ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ ছিল ছাত্রলীগ, এখনো।
২৭ জুন হরতালের দিন পুলিশের আচরণ ছিল মারমুখী। এর পক্ষে না হয় জনজীবনের নিরাপত্তার যুক্তি ছিল। কিন্তু ৭ জুলাই এক ঘণ্টার মানববন্ধনের মতো নিরীহ কর্মসূচি পণ্ড করার কী কারণ থাকতে পারে? এ ধরনের চণ্ডনীতি সরকারের গোঁয়ার্তুমি বজায় রাখলেও রাজনৈতিক সংঘাত বাড়াবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হরতালের দিন ছাত্রলীগের মাস্তানির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর কথা মেনে নিলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীর জন্য বিএনপিকে এবং শিবিরের সন্ত্রাসের জন্য জামায়াতকে দোষারোপ করা যায় না।
ঢাকা শহর রক্ষায় ড্যাপ (ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান) বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিল। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সোয়া কোটি মানুষকে রক্ষায় এর বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীও এর বাস্তবায়ন চান। কিন্তু সরকারি দলের স্থানীয় সাংসদদের ভূমিকা কী? তাঁরা শুধু ড্যাপ বাস্তবায়নেরই বিরোধিতা করছেন না, সরাসরি ‘ভূমিদস্যুদের’ পক্ষ নিয়েছেন, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। এত দিন সরকারের ভালো ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের বিরোধিতা করতেন আমলারা। এখন সেই ভূমিকায় নেমেছেন সাংসদেরা। তা হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে কীভাবে?
আমরা হরতালের রাজনীতির বিরোধিতা করি। কেন করি? পিকেটিংয়ের নামে হরতালে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি দলের সাংসদ কিংবা নেতারা যখন একই কাজ করেন, তখন তা কী করে সমর্থনযোগ্য হয়? ৩ জুলাই গাজীপুরে দুই সাংসদের নেতৃত্বে ড্যাপের বিরুদ্ধে সমাবেশ ডাকা হয়েছিল। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু সাংসদদ্বয়ের সমাবেশটি আর শান্তিপূর্ণ থাকেনি। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ ও দুই শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করেন। কেবল ড্যাপ নয়, সরকারের আরও অনেক গণমুখী পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারি দলের সাংসদদের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপে। তাঁদের হাতে সাধারণ মানুষ নাজেহাল হচ্ছে। নদী, খাল, বিল ও জলাভূমিও দখল হয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি-জামায়াত সরকার দেশে-বিদেশে ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিল বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর কারণে। ভিন্নমতের লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে অন্যায়ভাবে তারা গ্রেপ্তার করেছে, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালিয়েছে। তারা জজ মিয়ার কল্পকাহিনি সাজিয়েছে। এখনো যদি সেই একই প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল ও ভিন্নমতের লোকদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়, তা হলে ‘জঙ্গি তোষণকারী’ বিএনপি ও ‘সাচ্চা গণতন্ত্রী’ আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়?
বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ মারার নাম আইনের শাসন নয়। কোনো সভ্য দেশে এটি চলতে পারে না। উচ্চ আদালতের নির্দেশ, মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগ, বিদেশিদের ভর্ৎসনাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৌরাত্ম্য থামাতে পারছে না। সরকারের দাবি, নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধরা হচ্ছে। সেই তথ্যপ্রমাণ তারা আদালতে হাজির করুক। অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত শাস্তি ভোগ করবেন। দিনের পর দিন রিমান্ডে নিয়ে জবানবন্দি নেওয়ার তো প্রয়োজন নেই। গয়রহ মামলা বিচারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
বিএনপির যে কর্মীরা আগুনে পুড়িয়ে গরিব ট্যাক্সিচালককে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নিলে সবাই সমর্থন জানাবে। কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু একটি ঘটনার দায় পুরো দলের নেতৃত্বের ওপর চাপিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। তা ছাড়া রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হয়। পুলিশি অভিযানে বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত সরকার (নির্বাচিত ও অনির্বাচিত) এসেছে, সবাই পূর্ববর্তী সরকারের দুঃশাসন-দুর্নীতিকে হাতিয়ার করেছে। কিন্তু বিদায় নেওয়ার সময় তারা নিজেদের অন্যায়-দুর্নীতি ও দুঃশাসনে এতটাই ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে যে, জনগণ আগের কথা ভুলে গেছে। খুব দূরের উদাহরণ দেব না, ২০০১ ও ২০০৮ সালের কথা ভাবুন।
মহাজোট সরকার মাত্র দেড় বছর পার করেছে। সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় আসেনি। তবে পিলখানা ট্র্যাজেডি সত্ত্বেও প্রথম বছরে যেভাবে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল, তা প্রশংসার দাবি রাখে। দ্বিতীয় বছরে এসে মনে হচ্ছে, তারা তালগোল পাকিয়ে ফেলছে। একের পর এক বিরোধীদের জন্য এত ফ্রন্ট খুলেছে যে সামাল দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। জনগণ যুদ্ধাপরাধসহ সব অপরাধের বিচার চায়। বিচার না চাইলেও বিচার করা সরকার বা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে তাকে সব রাগ বা অনুরাগের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পিপলস পারস্পেকটিভ বা জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও সরকারকে মাথায় রাখতে হয়। সামরিক শাসকেরা যত ভালো কাজই করুন না কেন, শেষ বিচারে বৈধতা পায় না। এমনকি ১/১১-পরবর্তী সামরিক বাহিনী-সমর্থিত জরুরি সরকারও বৈধতা লাভে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকারের বড় শক্তি জনসমর্থন, পুলিশ বা র‌্যাব নয়। ইতিমধ্যে সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী ও নেতা আপন ‘কৃতিত্বে’ এতটাই মশগুল যে তাঁরা ভাবছেন, আগামী দু-চার মেয়াদে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যাপারই নয়। বিএনপির নেতারাও একই মনোভাব পোষণ করতেন। জনগণই যে শেষ বিচারক, সে কথাটি ক্ষমতাসীনেরা প্রায়শ ভুলে যান। না হলে বিএনপি আমলের মতো মন্ত্রী ও সাংসদেরা সোনার চাবি উপহার নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করতেন না।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সহকারী সচিব উইলিয়াম জে চার্লস সার্টিফিকেট দিয়েছেন, বাংলাদেশ নাকি ঠিকমতোই চলছে। প্রধানমন্ত্রীও মনে করেন, দেশ সঠিকভাবেই চলছে। সরকারি দলের নেতারা, মন্ত্রীরা সভা-সমাবেশে জোর হাততালি পাচ্ছেন। কিন্তু দেশ ঠিকভাবে চলছে না। চললে দেড় বছরের মাথায় হরতালের গজব আসবে কেন, সংসদে বিরোধী দলের আসনগুলো গাছ কেটে নেওয়ার পর শূন্য গুঁড়ির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে কেন?
দেশ সঠিকভাবে চলা মানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় চলা নয়। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে সরকার ও বিরোধী দলের চলা। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে সংসদকে রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র করা, সব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হওয়া। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালানো নয়, অভিযুক্তেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে সরকার ও বিরোধী দল, মন্ত্রী ও সাংসদের একযোগে কাজ করা। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের মুখোমুখি অবস্থান নয়, যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা। দেশ সঠিকভাবে চলা মানে আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়, সরকারি জমিজমা, নদী, খাল তথা সবকিছু দখল করা নয়।
দেশ কি সঠিকভাবে চলছে? এর সহজ উত্তর, চলছে না। এ জন্য কে বেশি বা কম দায়ী, সে বিতর্ক না করেও যে কথাটি বলতে চাই তা হলো, ‘এ আমার, এ তোমার পাপ’। আমাদের পাপের ভার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যাতে অনন্তকাল বইতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলব মাননীয় সরকার ও সদাশয় বিরোধী দলকে। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

ইউরোপে বর্ণবাদ ও অর্থনৈতিক মন্দা by জয়তি ঘোষ

ইউরোপের চলতি অর্থনৈতিক মন্দার নানা অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাতের ভেতর বর্ণবাদী ও বিদেশি-বিদ্বেষী মনোভাবের প্রত্যাবর্তন অপেক্ষাকৃত কম মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এই বিষয়টি ইতিমধ্যে সমস্যা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে গত দশকে যখন ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো অভিবাসনের ওপর বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানায় এবং অভিবাসী ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত রোমা জনগোষ্ঠীর মানুষদের বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্তভাবে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন একে সমস্যা হিসেবে না দেখে উপায় নেই।
অর্থনৈতিক সংকট যত গভীরে আঘাত হানছে আর সরকারের কৃচ্ছ্র পদক্ষেপের ফলে আরও বেকারত্ব বেড়ে চলেছে, ক্ষুদ্র পরিবারচালিত ব্যবসা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে, অনিবার্যভাবে ততই জনমনে তিক্ততা ও রোষ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতেও বাড়বে। বিপদ হলো এই রোষ ক্ষমতাধর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিকে চালিত হবে না। এমনকি যেসব সরকার বাজারের হুকুম অত্যন্ত নমনীয় হয়ে তালিম করে গেছে, তাদের বিরুদ্ধেও যাবে না। বরং সহজে আক্রমণ করা যায় এমন নাজুক লক্ষ্যবস্তুর ওপরই আঘাত আসবে। এ ক্ষেত্রে স্পষ্টতই অভিবাসীরা হবে হামলার লক্ষ্যবস্তু। তাদের তো খুব সহজেই জাতিগত পার্থক্যের বোধ থেকে আলাদা করা যায়।
সাধারণত এই সমস্যাটিকে যতটা ছোট সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, আসলে তার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা। ইউরোপের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি দিন দিন অভিবাসীদের শ্রমের ওপর অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। অবশ্য বহু আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, এখন ইউরোপেও ক্রমবর্ধমান হারে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশক এবং ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধময়তার পাশাপাশি বয়সী জনসংখ্যার জনসংখ্যাতাত্ত্বিক চাপ যোগ হওয়ায় কৃষি খামার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, নির্মাণশিল্প এবং নানা খাতে চাকরির জন্য শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়েছিল। ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে শুরু করে পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের সাবেক সমাজতন্ত্রী দেশগুলো থেকেও নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা এসেছেন। বৈধ ও অবৈধ দুই পথেই। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা অত্যন্ত কম মজুরি, নিম্নমানের আবাস ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এবং অবিরত নিরাপত্তাহীনতাকে সহ্য করে নিচ্ছেন শুধু নিজেদের জীবনযাত্রার মান কোনোরকমে উন্নত করা এবং স্বদেশে বসবাসরত স্বজনদের অর্থ প্রেরণের আশায়।
ইউরোপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ইন্ধন ও সহায়তা জুগিয়েছে সস্তা শ্রম। এই সস্তা শ্রমের ফলে কেবল নিয়োগদাতার লাভই বাড়েনি, কম দামে পাওয়ার কারণে স্থানীয় মানুষের পণ্য ও সেবা ভোগের পরিমাণও বেড়েছে। আর এসব অভিবাসীর উৎপাদনশীল ভূমিকা দৃশ্যমান আর আড়ালের নানা কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ছড়ানো।
ইতালির কথাই ভেবে দেখুন। মাত্র এক প্রজন্মের ভেতর দেশটি শ্রমের নিট রপ্তানিকারক দেশ থেকে অন্যতম অভিবাসীগ্রহীতায় পরিণত হয়েছে। ইতালির কৃষি মূলত অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল। উত্তর ইতালির কৃষিক্ষেত্র থেকে শুরু করে কালাব্রিয়ার ফলবাগান পর্যন্ত সবখানে আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকদেরই প্রাধান্য দেখা যায়। ফ্লোরেন্স আর বোলোগনার কারখানাগুলোতে তালিকাভুক্ত এক লাখ ২০ হাজার চীনা শ্রমিক কাজ করছেন, হয়তো তালিকাবহির্ভূত আরও অনেকে আছেন। তাঁরা পাশাপাশি কাজ করেন আলবেনিয়া, ইউক্রেন, রোমানিয়া ও সাবেক যুগোশ্লাভিয়াসহ পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের দেশ থেকে আসা আরও অধিকসংখ্যক শ্রমিকের সঙ্গে। পশুসম্পদ ব্যবস্থাপনা, মালামাল পরিবহন, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য অপসারণ, আরও নানা ধরনের নোংরা, কঠিন বা বিপজ্জনক (3D-dirty, difficult, dangerous) কাজ বহুলাংশে অভিবাসীরাই করেন।
এগুলো অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের অনেক দৃশ্যমান রূপ। নারী অভিবাসী শ্রমিকের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্র তত্ত্বাবধানের অর্থনীতি, বিশেষত ঘরের এবং গৃহস্থালি কাজে। ইতালির বহু শহর ও নগরে অভিবাসী নারী শ্রমিকেরা (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফিলিপাইন থেকে আসা) শিশু পালন, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের দেখাশোনা করা এবং গৃহ পরিচর্যার মতো কাজ করেন (যদিও অভিবাসী নারী শ্রমিককে হয়তো নিজের সন্তান পালনের ভার বাড়িতে অন্য কারও ওপর দিয়ে যেতে হয়)।
তবে ইউরোপের অর্থনীতির এই সমৃদ্ধিতে ধস নামার সঙ্গে সঙ্গে অভিবাসীদের সম্পর্কে স্থানীয়দের ধারণা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। এমনকি যাঁরা বর্ণবাদী মতাদর্শ দ্বারা সরাসরি চালিত হচ্ছেন না, তাঁদের ধারণাতেও এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এমন কিছু কাজ আছে যেগুলো অভিবাসী শ্রমিক ছাড়া এখন আর চলবে না। কেননা, স্থানীয়রা এসব কাজ আর করতে চায় না অথবা পারে না। কিন্তু অভিবাসীদের হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। কেবল স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতিই নয়, স্থানীয়দের কাজের সুযোগের ক্ষেত্রেই অভিবাসীদের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মজুরি কমে যাওয়া, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি, জনপরিসরকে অনিরাপদ বানিয়ে ফেলার মতো নানা কারণ সৃষ্টির জন্য অভিযোগের তীরটিও তাদের দিকে। কালাব্রিয়ায় দাঙ্গার পর স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ছিল আপত্তিকর। এই দাঙ্গার ফলে অধিকাংশ অভিবাসী শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: ‘অনেক ইতালীয় নাগরিক বহুল ব্যবহূত একটি কথা বারবার উচ্চারণ করছিল, “আমরা বর্ণবাদী নই, কিন্তু...”।’ শেষ পর্যন্ত তারা যেটি বলতে চেয়েছে তা হলো, ইতালীয়দের জীবনধারণই যেখানে খুব কষ্টকর, সেখানে অভিবাসীরা না থাকলেই ভালো হতো।
এই কয়েক ধরনের শক্তির সম্মিলন থেকে সাম্প্রতিক বর্ণবাদী সহিংসতা বৃদ্ধি আর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বর্ণবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ব্যাপারে অন্তত অংশত হলেও ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। ইউরোপের নানা প্রান্তে রোমা বসতিগুলোর ওপর হামলার ঘটনা এখন অনেক ঘন ঘন দেখা যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ ইতালির কালাব্রিয়া এবং মে মাসে স্পেনের বার্সেলোনায় জাতিগত দাঙ্গা ঘটেছে। তা ছাড়া গ্রিসেও এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে (অভিবাসীদের প্রতি আচরণের দিক থেকে ইউরোপে গ্রিস সবচেয়ে বাজে রেকর্ডের অধিকারী)। ইউরোপের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ইতালির নর্দার্ন লিগ, বেলজিয়ামের ভ্লামস ব্লক, ডেনমার্কের ড্যানিশ পিপলস পার্টি, ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফ্রন্ট, যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি, স্পেনের মোভিমেন্তো সোশাল এস্পানল এবং পর্তুগালের ন্যাশনাল রিনিউয়াল পার্টির মতো ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের হার বেড়েছে। হাঙ্গেরিতে কট্টর ডানপন্থী দল জোবিক চলতি বছরের এপ্রিলে দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংসদে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে। ১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা আছে সাবেক ক্ষমতাসীন দল সোশালিস্ট পার্টির পরই। সোশালিস্ট পার্টি পেয়েছে ১৯ শতাংশ ভোট। মার্চ মাসে ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে ন্যাশনাল ফ্রন্টের নির্বাচনী পুনর্জাগরণ দেখা গেছে। নেদারল্যান্ডের গত জুন মাসের সাধারণ নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী দল ফ্রিডম পার্টি জয়লাভ করেছে।
ইউরোপিয়ান এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটসের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যে ২২টি দেশে জরিপ চালানো হয়েছে সেখানে কোনো গড়পড়তা রোমা অধিবাসী প্রতিবছর গড়ে ৪.৬ বার নানাভাবে বৈষম্যের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। কর্মসংস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে এই বৈষম্য ঘটে। আর তাদের ওপর প্রত্যক্ষ সহিংসতার ব্যাপার তো রয়েই গেছে। রোমা অধিবাসীদের পর আফ্রিকানরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। আফ্রিকান অভিবাসীদের প্রায় অর্ধেকই জীবনে কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছে, আর রোমাদের তুলনায় তাদের শারীরিকভাবে আক্রান্ত হওয়া এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা আরও বেশি।
অভিবাসী শ্রমিকের জন্য অব্যাহত অর্থনৈতিক চাহিদা এবং তাদের উপস্থিতির ব্যাপারে স্থানীয়দের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ—এই দুইয়ের মধ্যে অস্বস্তিকর ও অমীমাংসিত এক সম্পর্ক ইউরোপে বিদ্যমান। বর্তমানে সম্পর্কের অধোগতি এই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্রতর করবে। এসব সমস্যার বিষয়ে ইউরোপের সরকারগুলো সরাসরি কোনো সাড়া না দিয়ে সব ভুল পদক্ষেপ নিচ্ছে: একদিকে তারা অভিবাসনবিরোধী আবেগকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে স্থানীয় অধিবাসী এবং অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও আরও কমিয়ে আনছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার অর্থনৈতিক নীতি এবং সহিষ্ণুতা ও বিভিন্ন জাতিসত্তার মিশ্রণে সমতা সাধনের সামাজিক নীতি এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি অর্থপূর্ণ হতো।
ফরেন পলিসি ইন ফোকাস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
জয়তি ঘোষ: ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক; ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স অ্যাসোসিয়েটসের (আইডিয়াস) নির্বাহী সম্পাদক।

নেপথ্যের বিষয় কিন্তু উপেক্ষার নয় by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

আমার এক অধ্যাপক বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার পর আক্ষেপ করে আমাকে বলেছিলেন, আমাদের লেখাপড়া হালে যে কী পর্যায়ে চলে গেছে, বলতেই কষ্ট হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়া ছেলে-মেয়েদের সবচেয়ে ভালো শিক্ষার্থী বলে বোর্ড সনদ দিয়েছে। কিন্তু আমার কাছে কষ্টের কারণ হলো, এরা দু-একজন বাদে সবাই হতাশ করেছে।’ অধ্যাপক বন্ধু লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নিতে গিয়ে ইংরেজি ভাষাজ্ঞান সম্পর্কে জানতে শিক্ষার্থীদের অতি সাধারণ একটি বাংলা বাক্য ইংরেজি করতে বলেছিলেন। এ অভিজ্ঞতা কেবল ওই অধ্যাপকের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকেরই আছে। এই অবস্থার জন্য আমরা দুষব কাকে? আদতে যেটা ঘটছে তা হলো, শিক্ষার্থীরা গোড়া থেকেই দুর্বল হয়ে গড়ে উঠেছে। দুর্বল, দক্ষতাবিহীন বুনিয়াদি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তাদের।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করে অনেকেই দায়ী করেন বুনিয়াদি শিক্ষার প্রথম ধাপ প্রাথমিক শিক্ষাকে। যদিও প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থা নিয়ে এন্তার লেখালেখি হয়েছে দেশে, কিন্তু ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। গলদটা রয়েছে এই শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে নিয়োজিত শিক্ষাদাতাদের মধ্যে। মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক সনদধারী শিক্ষকেরা শিক্ষার এই স্তরের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি একটি প্রজ্ঞাপন আমার চোখে পড়েছে, মাধ্যমিক পরীক্ষায় ২.০০ সিজিপিএ পাওয়া নারী-প্রার্থী এবং উচ্চমাধ্যমিকে ২.০০ সিজিপিএ পাওয়া পুরুষ-প্রার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আবেদন করতে পারবেন। বর্তমান সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে। শিক্ষানীতির বাস্তবায়নও শুরু হচ্ছে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার স্তর বৃদ্ধি করে পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেও এই সুপারিশ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বুনিয়াদি শিক্ষার এই স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাবে। কিন্তু সমস্যা তো অন্যত্র। এবং সে সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। সমস্যা থাকছে শিক্ষকদের যোগ্যতার বিষয় নিয়েও।
প্রাথমিক শিক্ষা হলো একেবারে ভিত গড়ে ওঠা পর্যায়ের শিক্ষা। বলা হয়ে থাকে, এই শিক্ষাস্তরে শিক্ষার্থী রিডিং, রাইটিং ও কাউন্টিং শিখবে। শিক্ষার মজবুত প্লাটফরম এভাবেই গড়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। একজন পাশ্চাত্য পণ্ডিত শিশুর শিক্ষার এই পর্যায়কে তুলনা করেছেন একদলা নরম-কর্দমাক্ত মাটির সঙ্গে। শিশু ওই কাদার মতোই, এই কর্দম অবস্থায় যে রূপ দেওয়া হবে, পরবর্তীকালে শুকনো অবস্থায় সে রূপই লাভ করবে। মাটিকে কর্দম অবস্থায় নানা উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি করে নিতে হয়। কোনো উপাদান মেশাতে ভুলে গেলে শুকনো মাটিতে সেটি মেশানো আর সম্ভব হবে না। চমৎকার এই কথাটি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের ক্ষেত্রে অধিকতর প্রযোজ্য।
আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অযত্ন ও অবহেলার শুরু হয়েছে ১৯ শতকের শেষ দশক থেকে। এ সময় থেকে প্রয়োজনীয় তত্ত্বাবধানের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে এই শিক্ষাব্যবস্থা। তবে ২০ শতকের শুরু থেকে এর খানিকটা উন্নতি হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে সংবিধানের ১৫ ও ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে এবং ১৯৭৪ সালে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেও প্রাথমিক শিক্ষার ওপর বেশ খানিকটা নজর দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে সংবিধানে ব্যবস্থামতে সরকার কর্তৃক জারি করা জাতীয়করণ ডিক্রির অন্তর্ভুক্ত করা হয় দেশের ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে। কিন্তু এখানে অন্য সমস্যা রয়েই গেল। দেশের প্রায় সমানসংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় এ সময়ও বেসরকারি থেকে যায়। এই বেসরকারি স্কুলগুলোর অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। যদিও এর কিছু কিছু স্কুল সরকারি অনুদান পেতে থাকে, বাকিরা থেকে যায় বাইরে।
এসব কারণে বলা যায়, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার পরিমণ্ডলে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আজ পর্যন্ত আসেনি। ’৭৪-এর শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে যে নতুন কৌশল প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা আদৌ বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতি হয়েছে ১৯৮১ সালের প্রাথমিক শিক্ষা আইনে। এ সময়ের সরকার স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করলে সব ভেস্তে যায়।
আগেই উল্লেখ করেছি, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার স্তর অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত বৃদ্ধি করে শিক্ষা ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে এই শিক্ষাকর্মে নিয়োজিত শিক্ষকদের শিক্ষার মান নিয়ে। এযাবৎ যাঁরা প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাদান করে আসছেন, শিক্ষক হিসেবে তাঁদের যোগ্যতা কতটুকু? এ প্রসঙ্গে আমার শোনা একটি গল্প বলছি:
এক পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গেছেন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন পাশের গ্রামের হাইস্কুলে যান। এ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তাঁর খানিকটা ভূমিকাও ছিল। তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করলেন ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু কথা বলবেন। স্কুলের বড় একটি শ্রেণীকক্ষে সে ব্যবস্থা হলো। ভদ্রলোক ছিলেন ইতিহাসের ছাত্র। ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন—এশিয়ার কোন প্রান্তে বাংলাদেশ, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে কখন থেকে মানববসতির শুরু, কোন কোন রাজবংশ এখানে শাসন করেছে ইত্যাদি। ভদ্রলোক একপর্যায়ে তাঁর কথা বলা থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হাজার বছর আগে তো এ দেশে বৌদ্ধ পাল রাজারা শাসন করেছেন; তার আগে কারা এ দেশে রাজত্ব করেছেন? ছাত্র-ছাত্রীরা উত্তর দিতে না পারায় ইতিহাসেরই শিক্ষক, প্রধান শিক্ষকের কাছে ভদ্রলোক উত্তরটি জানতে চান। প্রধান শিক্ষক সঠিক জবাব তো দিতেই পারেননি, অধিকন্তু এমন একটি উদ্ভট উত্তর দিলেন, যাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের কালানুক্রমটাই সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলতে হয়। এটাই আমাদের বুনিয়াদি পর্যায়ের শিক্ষাদানে নিয়োজিত শিক্ষকদের যোগ্যতার উদাহরণ।
শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন আশু প্রয়োজন। তবে কাজটি অত্যন্ত দুরূহ, সন্দেহ নেই। দক্ষতা, দূরদৃষ্টি, আন্তরিকতা আর নিষ্ঠার সঙ্গে সে কাজ করতে হবে। বুনিয়াদি পর্যায় থেকেই ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে হবে। এরাই তো হবে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির ফিডার। দেশ পরিচালনার ভবিষ্যৎ কর্মী তো এদের মধ্য থেকেই আসবে। এ সমস্যার সমাধানে পথ একটাই। তা হলো, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত সেরা শিক্ষার্থীদের এই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাদান কাজে নিয়োগ করা। উচ্চতর প্রারম্ভিক বেতন স্কেল দিতে হবে তাঁদের। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পেলে তাঁরা যে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেতেন, খানিকটা হলেও তার কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকলে আমার বিশ্বাস, এই পর্যায়ে অনেক নিবেদিতপ্রাণ উদ্যমী যুবক এই মহৎ কাজে নিজেদের জড়াতে চাইবেন। তবে, এসব ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগই বড় কথা।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

দুরবস্থার জন্য সামরিক শাসকেরাই দায়ী by আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে, তা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত? এ ব্যাপারে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই বা কী করণীয়? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক উপাচার্য।

ছাত্ররাজনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। ছাত্ররাজনীতি ছাত্রদের এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি শক্তি। বারবারই তা প্রমাণিত হয়েছে। এই শক্তি ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে অধিকার আদায়ে যেমন সরব ছিল, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও বারবার জেগে উঠেছে। সর্বশেষ এক-এগারোর সময়ে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারেও এই ছাত্রসমাজই নেতৃত্ব দিয়েছে। কাজেই ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিপক্ষে আমি। তবে এই কলুষিত ছাত্ররাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
অতীতে কখনো কখনো ছাত্ররা নিজেরাই আন্দোলন শুরু করেছে। আবার কখনো অন্যরা আন্দোলন শুরু করেছে, ছাত্ররা এতে যোগ দিয়েছে। শ্রমিকেরা একসময় আন্দোলনের ব্যাপারে সোচ্চার ছিল। কিন্তু আদমজীসহ বিভিন্ন বড় বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকেরা আর আগের মতো ঐক্যবদ্ধ নয়। এখন একমাত্র শক্তি হিসেবে টিকে আছে এই ছাত্রসংগঠনগুলোই।
আজকের ছাত্ররাজনীতির যে কলুষতা, সেটি এক দিনে আসেনি। সামরিক ও স্বৈরশাসকেরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করেছে। কারণ তারা আইয়ুব খানকে এই ছাত্রদের হাতেই পর্যদুস্ত হতে দেখেছিল। তখন নিজেদের কার্যসম্পাদন করতে অছাত্রদের নেতৃত্বে আনা শুরু করে। নষ্ট হয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় আজ ছাত্রসংগঠনগুলোর এই অবস্থা।
আজকে অধিকাংশ ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছে অছাত্ররা। এরা কোনো কালে ছাত্র ছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। অনেকে আবার বিবাহ করে সন্তানের জনক। এরা সংগঠনকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। ছাত্রসমাজ বা দেশের কল্যাণে তাদের কিছু যায়-আসে না। কিন্তু পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ছাত্রনেতা তারাই ছিল যারা ক্লাসে নিয়মিত যেত, পাঠাগারে তাদের যাতায়াত ছিল নিয়মিত, হলের ডাইনিংয়ে সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে তারা খাওয়াদাওয়া করত। এরই ফাঁকে অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা আন্দোলন, মিছিল-মিটিং করত। তারা ছাত্ররাজনীতিকে ‘রাজনীতি’ হিসেবে দেখেনি। একে আত্মস্থ করেছিল ছাত্রদের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে।
স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পর দেখা গেল, জাতীয় দলগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা শুরু করে। এটিও ছিল সামরিক শাসনের ফল, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ছাত্ররাজনীতি যেন স্বাধীনভাবে চলতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ছাত্ররাজনীতির মধ্য থেকেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব উঠে আসবে। আর এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই হল সংসদ ও ছাত্র সংসদগুলোর মাধ্যমে নেতৃত্ব সৃষ্টি করে। কিন্তু সামরিক শাসনামলে এই সংসদগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। নেতৃত্বে এমন কিছু লোককে নিয়ে আসা হয়েছে, যারা ছাত্রদের কল্যাণের বদলে অকল্যাণই বেশি চায়।
ছাত্ররা চায়, সংগঠনগুলো ছাত্রদের দিয়েই চলুক। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে আবারও যোগ্য নেতৃত্ব নিয়ে আসা গেলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু এটি সম্ভব হচ্ছে না ছাত্রসংগঠনগুলোর কারণেই। এর নেতৃত্বে যারা আছে তারা সংগঠনগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে বলে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে চাচ্ছে না। এ সমস্য থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সরকার ও বিরোধী দলসহ সবাইকে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে।
এ ছাড়া বর্তমান সাংঘর্ষিক অবস্থার জন্য কিছু উপসর্গ রয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই ব্যর্থতার ফল। নানাবিধ সমস্যায় ছাত্ররা ক্ষিপ্ত থাকে। আর এ কারণে ছোটখাটো ঘটনাই বিস্ফোরণ আকারে দেখা দেয়। আবাসিক সমস্যা এর প্রধান কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এখনো একই বিছানায় দুজন ছাত্রকে ঘুমাতে হচ্ছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ছাত্রদের ন্যূনতম সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের ক্ষমতাশীল ছাত্রসংগঠনকে ঝেঁটিয়ে বের করে দেওয়া, হল প্রশাসনে রাতারাতি পরিবর্তন আনাও অন্যতম কারণ। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের কারণে রাতারাতি সব প্রভোস্টকে বদল করে দেওয়া হয়। সবাইকে এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে যে এটি মুক্তবুদ্ধির জায়গা। এখানে চাপিয়ে দিয়ে কিছু করা যাবে না। এখানে সবাই থাকবে। কাউকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে এবার ক্ষমতা বদল হলেও হলগুলোতে প্রশাসন বদল হয়নি। যারা দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসের বাইরে ছিল, তারা এখন ক্যাম্পাসে এসে বিরোধী ছাত্রসংগঠনকে সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু হওয়া উচিত, ক্যাম্পাসে সবাই থাকবে।
অনেকেই ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে বলেন। আমি সেই রকম মনে করি না। তবে অবশ্যই সেই রাজনীতি হতে হবে কলুষতামুক্ত। আদর্শগতভাবে মিল থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছাত্রসংগঠনগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া। ওপর থেকে নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। যারা ছাত্র তাদেরই কমিটিতে আসা উচিত। প্রতিবছর সংগঠনগুলোর সম্মেলন হতে হবে।
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অরক্ষিত জাতীয় জাদুঘর - নিদর্শনের বিস্তারিত তালিকা তৈরি করুন

আমাদের জাতীয় জাদুঘরের অবস্থাটা অদ্ভুত। গত রোববার খবর বেরোল, জাদুঘর থেকে দুটি পদক ও ২৪টি মুদ্রা খোয়া গেছে। কিন্তু এটা অনুমান মাত্র। নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না, ঠিক কতটি নিদর্শন কবে চুরি হয়েছে। দ্বিতীয় তলার ২১ নম্বর গ্যালারির তিনটি শোকেসের নিদর্শনের মধ্যে গরমিল ধরা পড়েছে গত এপ্রিল মাসে। তারপর তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে তদন্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেই তদন্ত নিষ্ফল, কারণ ২১ নম্বর গ্যালারিতে কী প্রকারের কতটি নিদর্শন ছিল, তার কোনো হিসাব নেই, আদৌ কখনো হিসাব করা হয়েছিল কি না, কেউ জানে না। তা হলে কী খোয়া গেছে, কতটি খোয়া গেছে, তা নির্ণয় করা কীভাবে সম্ভব?
গরমিল লাগছে শুধু চোখের দেখায়। মনে হচ্ছে, কী যেন নেই, যা আগে ছিল। এই হলো আমাদের জাতীয় জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা! কী প্রকারের মোট কতটি নিদর্শন জাদুঘরে রয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত তালিকা (ইনভেন্টরি) নেই। বহু বছর ধরে কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি। তাহলে কী করে চলছে আমাদের জাতীয় জাদুঘর? কী পদ্ধতিতে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হচ্ছে জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো? আসলে সংরক্ষিত হচ্ছে, নাকি দিনে দিনে নীরবে গোপনে নিদর্শনগুলোর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তাও নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা কঠিন।
কিন্তু কেন জাদুঘরে সংরক্ষিত নিদর্শনের বিস্তারিত তালিকা বা হিসাব নেই? জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জাদুঘরের অভ্যন্তরে একটি চক্র আছে বলে মন্তব্য করেছেন, যারা চায় না জাদুঘরের নিদর্শনগুলোর হিসাবসংবলিত একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হোক। তিনি মহাপরিচালক থাকার সময় বেশ কয়েকবার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন জাদুঘরেরই কয়েকজন কর্মকর্তার অসহযোগিতার কারণে।
বুঝতে কষ্ট হয় না, নিদর্শনের হিসাব না থাকলে চোরদের সুবিধা হয়। নিদর্শন চুরির সাম্প্রতিক ঘটনা প্রসঙ্গে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন মন্তব্য করেছেন, চুরির ধরন থেকে তাঁর মনে হয়েছে, জাদুঘরের ভেতরের লোকেরাই এর সঙ্গে জড়িত। পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে, শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছে। কিন্তু জাদুঘরের মহাপরিচালক প্রকাশ চন্দ্র দাস বলছেন, ঠিক কোন সময় নিদর্শনগুলো খোয়া গেছে, তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না বলে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের দুর্লভ সব নিদর্শন চুরি-পাচারে লিপ্ত চক্রের জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থা আর কী হতে পারে?
জাতীয় জাদুঘরের অভ্যন্তরের ওই চোর চক্রটি গুঁড়িয়ে দিতে হবে। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের জাতীয় জাদুঘর এমনভাবে চলে না। জাদুঘরে সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত প্রতিটি নিদর্শনের আলোকচিত্র, ডিজিটাল ইমেজ ও বিস্তারিত বিবরণসহ বিশদ তালিকা করে সেগুলো কাগুজে দলিল আকারে ও কম্পিউটারে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া আশু প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পুরো জাদুঘরের প্রতিটি বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস -জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

এত দিন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর শোনা গেছে। এবারে ফাঁস হলো সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। জালিয়াত চক্র প্রশ্নপত্র ফাঁস করেই ক্ষান্ত হয়নি, কথিত সেই প্রশ্ন নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষার মহড়া দিয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে রংপুরে। শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে একটি বেসরকারি বিনোদনকেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালে ১৬০ জন পরীক্ষার্থী ও দালাল গ্রেপ্তার হয়েছে পুলিশের হাতে। যে কারণে শনিবারের নির্ধারিত শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাটি স্থগিত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাধ্যমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় এক লাখ ৩২ হাজার প্রার্থীর পরীক্ষা দেওয়ার কথা। আগেভাগে পুলিশ টের না পেলে জালিয়াত চক্র পার পেয়ে যেত। শিক্ষার্থী ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি-অনিয়ম চলে আসছে বহুদিন থেকে। কিন্তু এখানে জালিয়াত, প্রশ্নপত্র ফাঁস করার পর জালিয়াত চক্রের বিকল্প পরীক্ষার আয়োজনও সম্ভবত এটাই প্রথম। এর বিনিময়ে তারা পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পরীক্ষার্থীর বাইরে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা দালাল গোছের লোক, ঘটনার পার্শ্বচরিত্র মাত্র। আসল অপরাধীরা আড়ালেই রয়ে গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারীও আছেন। তাঁর সঙ্গে আরও কে কে জড়িত, তাও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কারও যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা কেউ ঘটাতে পারে না।
নতুন শিক্ষানীতি জনমনে যতটা আশা জাগিয়েছিল, এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা তার চেয়েও বেশি হতাশায় ফেলে বৈকি। অতএব, রংপুরে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার মহড়ায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরাও দায় এড়াতে পারেন না। কর্মজীবন শুরু না হতেই যাঁরা অসাধু উপায়ের আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের শিক্ষক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। পরীক্ষার তারিখ পুনর্নির্ধারণের আগেই প্রার্থী তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দিতে হবে।

১৩৫ দিন পর অনশন ভাঙলেন গুইলারমো

কিউবার শীর্ষ ভিন্নমতাবলম্বী গুইলারমো ১৩৫ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার অনশন ভেঙেছেন। সরকার ৫০ জনের বেশি রাজবন্দীকে মুক্তির আশ্বাস দেওয়ার পর তিনি অনশন ভাঙলেন।
অনশন ভাঙার পর গুইলারমো এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমার এই অনশনের মাধ্যমে কেউ হারেনি, আবার কেউ জেতেনি। জিতেছে কিউবা, জয় হয়েছে দেশের মানুষের।’
অনশন শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে গুইলারমোকে সান্তা ক্লারা শহরের একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। ওই সময় আরেক ভিন্নমতাবলম্বী অরল্যান্ডো জাপাতা ৮৫ দিন অনশনের মাথায় মারা যান।
গত বুধবার সরকার আকস্মিকভাবে ৫২ জন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিতে রাজি হয়। ২০০৮ সালে রাউল কাস্ত্রো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম এত বেশি বন্দীকে মুক্তির ঘোষণা দিল সরকার। কিউবা সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ।

হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫

ভারতের হরিয়ানা ও পাঞ্জাব রাজ্যে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫ জনে পৌঁছেছে। বন্যায় প্লাবিত হয়েছে রাজ্য দুটির শতাধিক একর জমি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হরিয়ানা রাজ্যের আম্বালা ও কুরুক্ষেত্র জেলা। ঘাগ্যার ও তানগ্রি নদী এবং শতদ্রু-যমুনা সংযোগ খালের বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়া গেছে।
প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে হরিয়ানার কিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পর্যাপ্ত উদ্ধার তৎপরতা না চালানোয় ও ত্রাণ সরবরাহ না করায় হরিয়ানার বন্যাদুর্গত বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কুরুক্ষেত্রের বাসিন্দা রমেশ শর্মা জানান, পানির উচ্চতা সামান্য কমেছে। কিন্তু প্রশাসন থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাইনি।

যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া নৌ-মহড়ার পরিকল্পনা

পীতসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নৌ-মহড়ার আয়োজন করবে দক্ষিণ কোরিয়া। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ কথা জানান। প্রতিবেশী দেশ উত্তর কোরিয়ার উসকানিমূলক তৎপরতাকে নিরুৎসাহ করতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এই মহড়ার কঠোর বিরোধিতা করেছে চীন।
মুখপাত্র ওন তায়ে-জায়ে বলেন, এই নৌ-মহড়ার তারিখ ও প্রণালি এখনো ঠিক হয়নি। তবে এটি ঠিক যে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ সামরিক মহড়া চলবে। তিনি বলেন, উত্তর কোরিয়া পীতসাগরে দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে যে বেআইনি কাজ করেছে, তাদের এই উসকানিমূলক আচরণ দমাতেই যৌথ নৌ-মহড়া চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
চীন গত বৃহস্পতিবার এই নৌ-মহড়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এখন এই দুই দেশের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে, মহড়ার আয়োজন করে উত্তেজনা আর না বাড়াতে অনুরোধ করেছে চীন।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তল্লাশি

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি কৌঁসুলিরা গতকাল শুক্রবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের সমালোচনামূলক একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে প্রচারের ঘটনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এথিকস কর্মকর্তারা অবৈধভাবে তদন্ত করেন, এ অভিযোগের ভিত্তিতে এ তল্লাশি চালানো হয়। একজন কোরীয় নাগরিক ওই ভিডিওচিত্র প্রচার করেন বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, কৌঁসুলিরা কার্যালয়ের কম্পিউটার সার্ভার ও চারজন এথিকস কর্মকর্তার নথিপত্র জব্দ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওই চার কর্মকর্তা ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ওপর নজরদারি চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওই কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট লি মিউং বাকের সমালোচনামূলক একটি ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে প্রচার করার পর ওই তদন্ত চালানো হয়। এ খবর সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি কৌঁসুলিদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এথিকস কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হচ্ছে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজ সম্পর্কে তদন্ত করা। কর্মকর্তারা জানান, এথিকস কর্মকর্তারা কোনো সাধারণ নাগরিকের ব্যাপারে তদন্ত চালাতে পারেন না।

কাশ্মীরের আরও কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে গতকাল শুক্রবার কারফিউর আওতা বাড়ানো হয়েছে। উত্তরে কুপওয়ারা ও হান্দওয়ারা, দক্ষিণে কাকপোরা ও পুলওয়ামা এবং পূর্বে গান্ধেরবাল শহরে নতুন করে কারফিউ জারি করা হয়েছে। সহিংসতাপ্রবণ সোপোরে, শ্রীনগর ও অনন্তনাগেও কারফিউ বলবৎ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সহিংসতা প্রতিরোধে আমরা কারফিউর আওতা বাড়িয়েছি।’ পুলিশ জানায়, গতকাল সোপোরে শহরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গুলি ও গ্রেনেড হামলায় একজন পুলিশ ও একজন আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য আহত হন। ভারতীয় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সেখানে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা সেখানে নতুন করে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। গত দুই দশকের মধ্যে কাশ্মীরে সবচেয়ে বড় ভারতবিরোধী বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে তৃতীয় দিনের মতো কারফিউ বহাল রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বুধবার সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়।
জুনের মাঝামাঝি সময়ে ভারতবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও গুলি ছোড়ার ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক ছাত্র নিহত হয়। তখন থেকে চলতে থাকা এই বিক্ষোভ সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
কাশ্মীরের কট্টরপন্থীরা এক বিবৃতিতে জানায়, কোনো এলাকায় কারফিউ শিথিল করা হলে সেখানকার জনগণকে রাজপথে নেমে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকায় দ্বিতীয় দিনের মতো কাশ্মীরে স্থানীয় পত্রিকাগুলোর কোনো সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। সেখানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর সংবাদ সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ভারত সরকারের।

অবৈধ কাঠ আমদানি নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট

অবৈধভাবে কাটা গাছের কাঠ আমদানি নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর অবৈধ কাঠ আমদানির কারণে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বেশ কয়েকটি দেশের বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পার্লামেন্টে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ইইউ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে কাঠ আমদানি করতে হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে প্রমাণ করতে হবে কোন জায়গা থেকে তা আমদানি করা হচ্ছে। আইন মেনে না চললে ওই কোম্পানিকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। এ-সংক্রান্ত আইনটি কত কঠোর হবে তা নিয়ে কয়েক বছর আলোচনা ও তর্কবিতর্কের পর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

জ্যোতি বসুর নামে সংগ্রহশালা

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নামে কলকাতায় একটি সংগ্রহশালা গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে সিপিএম। বৃহস্পতিবার জ্যোতি বসুর ৯৭তম জন্মদিনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে কোথায় সংগ্রহশালা হবে তা এখনো ঠিক হয়নি।
সল্টলেকের যে ভবনে জ্যোতি বসু জীবনের শেষ ২২টি বছর কাটিয়ে গেছেন, সেই ইন্দিরা ভবনে জ্যোতি বসুর সংগ্রহশালা গড়ার দাবি জানিয়েছেন পথের পাঁচালির কর্ণধার রমলা চক্রবর্তী। তিনি কলকাতার উপ-শহর নিউ টাউন এবং কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের নামকরণও জ্যোতি বসুর নামে করার দাবি জানান। তাঁর যুক্তি, জ্যোতি বসুই সবচেয়ে বেশি এই ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভা করেছেন।
এদিকে গত ১৭ জানুয়ারি জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ যাত্রায় তিনি যে ধুতি, পাঞ্জাবি, জহর কোট, চশমা এবং কালো রঙের পাম শু পরেছিলেন তা এখনো সংগ্রহ করে রেখেছে কলকাতার পিজি হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব জিনিস ফিরিয়ে দিতে চাইছে।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একটানা ২৩ বছর এ পদে থাকেন তিনি।
জন্মদিন পালিত: জ্যোতি বসুর ৯৭তম জন্মদিন ৮ জুলাই কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়েছে। ১৯২৪ সালের এই দিনে জ্যোতি বসু কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তবে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার বারুদি হচ্ছে তাঁর পৈতৃক ভূমি। তাঁর শৈশবও কেটেছে ওই বারুদি গ্রামেই। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তিনি কলকাতায় পরলোকগমন করেন।
জ্যোতি বসুর জন্মদিন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার বিকেলে কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা হলে জ্যোতি বসুর একটি পূর্ণায়ব তৈলচিত্রের আবরণ উন্মোচন করেন ভারতের লোকসভার সাবেক স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। তৈলচিত্রটি এঁকেছেন প্রখ্যাত চিত্রকর ওয়াসিম কাপুর। এ ছাড়া দিবসটি পালনে জ্যোতি বসু স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ফোরাম অব পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’।

সারকোজিকে অবৈধভাবে অর্থ দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন ক্লেয়াও

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজিকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য অবৈধভাবে অর্থ দেওয়ার অভিয়োগ অস্বীকার করেছেন লরিয়েল কোম্পানির সাবেক কোষাধ্যক্ষ ক্লেয়াও টিবাউট। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করে ক্লেয়াও গতকাল শুক্রবার পুলিশকে বলেন, তিনি কখনোই বলেননি যে সারকোজি লিলিয়ান বেটেনকোর্টের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ নিয়েছেন।
লিলিয়ান ফ্রান্সের সবচেয়ে ধনাঢ্য নারী। তিনি বিশ্বখ্যাত প্রসাধন সামগ্রী লরিয়েলের মালিক। তাঁর সাবেক কোষাধ্যক্ষ ক্লেয়াও। তাঁর বরাত দিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সারকোজি ২০০৭ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় লিলিয়ানের কাছ থেকে অবৈধভাবে প্রায় দেড় লাখ ইউরো নিয়েছিলেন।

১৩০তম জন্মদিনের কেক কাটলেন তিনি

শতায়ু হওয়ার সৌভাগ্য বিরল। জর্জিয়ার আন্তিসা খিভিচাভা শতবর্ষ পার করেছেন অনেক আগেই। গত বৃহস্পতিবার ১৩০তম জন্মদিনের কেক কাটেন তিনি। খিভিচাভা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ বলে দাবি করছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ। ১৮৮০ সালের ৮ জুলাই তাঁর জন্ম। ১৯৬৫ সালে চা-শ্রমিকের চাকরি থেকে অবসরে যান তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৫ বছর।
জর্জিয়ার বিচার বিভাগের জন্মনিবন্ধন শাখার মুখপাত্র জিওজি মিউনিশভিলি বলেছেন, পশ্চিম জর্জিয়ার এক পাহাড়ি এলাকায় বসবাস খিভিচাভার। তাঁর রয়েছে ৪০ বছরের এক নাতি। তিনি জীবনে কখনো স্কুলে যাননি। এ কারণে অন্য কোনো ভাষা, এমনকি জর্জীয় ভাষাও শেখা হয়নি তাঁর। স্থানীয় মিনগ্রেলিয়ান ভাষায় কথা বলেন তিনি।
নিজের ১৩০তম জন্মদিনের উৎসবে জাঁকালোভাবে হাজির হন তিনি। এ সময় তাঁর পরনে ছিল উজ্জ্বল বর্ণের পোশাক, মাথায় ছিল স্কার্ফ; ঠোঁটে ছিল হালকা লাল লিপস্টিক। তিনি বলেন, ‘শারীরিকভাবে আমি সব সময় সুস্থ ছিলাম। সারাটা জীবন আমি কাজ করেছি। কি বাড়ি কি চাকরিস্থল—সব জায়গায় কাজ করেছি।’
খিভিচাভার বয়স তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি। তাঁর জন্মনিবন্ধনের সনদ হারিয়ে গেছে। তবে সোভিয়েত আমলের দুটি নথি বের করেছেন জন্মনিবন্ধন শাখার মুখপাত্র মিউনিশভিলি। তিনি দাবি করেছেন, এসব দলিলে খিভিচাভার জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে। এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে খিভিচাভার প্রতিবেশী, বন্ধু ও বংশধরেরা।

ব্যভিচারী নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা না করার সিদ্ধান্ত ইরানের

ব্যভিচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত এক নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে না বলে জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার লন্ডনে ইরানি দূতাবাসের বিবৃতির বরাত দিয়ে ব্রিটেনের প্রভাবশালী টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে এ কথা জানা যায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ব্যভিচারের দায়ে দোষী ৪৩ বছর বয়সী ওই নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হবে না। ওই নারীর মৃত্যুদণ্ড কীভাবে কার্যকর করা হবে তা অবশ্য খোলাসা করা হয়নি। এর আগে ইরানের বিচার বিভাগ অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর ওই নারীকে এভাবে হত্যার রায় দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে এ নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০০৬ বা ২০০৭ সালে ওই নারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর আগেও বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্ক রাখার অপরাধে তাঁকে ৯৯ বার দোররা মারা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ বলেন, ‘পাথর ছুড়ে হত্যা করা একটি মধ্যযুগীয় শাস্তি। এই শাস্তি কার্যকর করা হলে তা হবে আন্তর্জাতিক আবেদনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন।’
ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মার্ক টোনার বলেন, ‘পাথর ছুড়ে হত্যা করা একটি বর্বরোচিত কাজ। বিশ্বের যেকোনো স্থানে এভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রথার নিন্দা জানাই আমরা।’ ইরান যে কঠোর ধরনের ইসলামিআইন অনুসরণ করে, সে অনুযায়ী বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের শাস্তি ১০০টি দোররা। বিয়ের পর কেউ ব্যভিচারের অপরাধকরলেতার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

চীনে গুঁড়ো দুধে আবার ক্ষতিকর মেলামিন

চীনে ৭৬ মেট্রিক টন গুঁড়ো দুধ আটক করা হয়েছে। ক্ষতিকর মাত্রায় রাসায়নিক উপাদান মেলামিন থাকায় এসব দুধ আটক করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চীনে দুই বছর আগে মেলামিন-মিশ্রিত দুধ খেয়ে ছয় শিশুর মৃত্যুর পর আবারও এ ঘটনা ঘটল। চীনের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গতকাল শুক্রবার এ খবর প্রকাশ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গানসু প্রদেশ থেকে ৭৬ মেট্রিক টন গুঁড়ো দুধ আটক করা হয়। এর মধ্যে ১২ টন প্রক্রিয়াজাত করা দুধ রয়েছে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে যে মাত্রায় মেলামিন গ্রহণযোগ্য, তার চেয়ে ৫০০ গুণ বেশি রয়েছে। এ ব্যাপারে আর বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
দ্য বেইজিং নিউজ জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জিলিন ও এর পাশের কিনঘাই প্রদেশেও মেলামিন-মিশ্রিত গুঁড়ো দুধ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় কিনঘাই প্রদেশের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডংইউয়ান ডেইরি ফ্যাক্টরির দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন কোম্পানির ‘লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ লিইউ ঝানফেং ও উৎপাদন ব্যবস্থাপক ওয়াং হেইফেং। এ ঘটনা তদন্তে জিলিন প্রদেশে তদন্ত শুরু হয়েছে।
গানসু প্রদেশের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যুরোর উপপ্রধান ওয়াং ঝোংজি বলেন, মেলামিন-মিশ্রিত যেসব দুগ্ধজাত পণ্য বাজারজাত করা হয়েছে, তা সংগ্রহ করে ধ্বংস করা হবে। তবে কী পরিমাণ পণ্য বাজারজাত করা হয়েছে তা জানাতে পারেননি তিনি।
চীন সরকার বলেছে, মেলামিন-যুক্ত সব দুগ্ধজাত পণ্য আটক করে ধ্বংস করা হবে। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এমন পণ্য এখনো বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে মেলামিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মেলামিন সাধারণত প্লাস্টিক, সার ও কংক্রিট তৈরিতে ব্যবহূত হয়। দুগ্ধজাত পণ্যে এর ব্যবহার অবৈধ হলেও দিন দিন এর ব্যবহার বাড়ছে। দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মেলামিন ব্যবহার করে দুধে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। মেলামিনের কারণে কিডনিতে পাথর ও মূত্রজনিত নানা জটিলতা দেখা দেয়।
২০০৮ সালে চীনের ২২টি কোম্পানির উৎপাদিত দুগ্ধজাত পণ্যে মেলামিন পাওয়া যায়। এসব কোম্পানির দুধ পান করে কমপক্ষে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়। অসুস্থ হয়ে পড়ে আরও তিন লাখ শিশু। ওই সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা দুগ্ধজাত পণ্যও ফেরত নেয় চীন। ওই ঘটনায় ২১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে দুজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় জড়িত মূল প্রতিষ্ঠান সানলু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লুলা বচন

প্লাতিনি সম্পর্কে
মিস্টার প্লাতিনি, আপনি ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে (১৯৮৬) বের করে দেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। তার পরও একজন অসাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে আমি আপনাকে পছন্দ করি।
বেকেনবাওয়ারকে
মিস্টার বেকেনবাওয়ার, আপনার একাগ্রতা ও শৃঙ্খলার জন্য আপনাকে আমি পছন্দ করি। আমার এবং পেলের পর আপনিই আমার দেখা সেরা খেলোয়াড়।
টিসেরার প্রতি
রিকার্ডো টিসেরাকে (ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি) বলেছি, ২০১১ সালের ১ জানুয়ারিতে আমি যদি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট না-ও থাকি, সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমি যা পারি, সমর্থন দিয়ে যাব।
আফ্রিকার জনগণকে
আফ্রিকান ভাইদের সফল আয়োজন আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। আর ব্রাজিলিয়ানরা চ্যালেঞ্জ পছন্দ করে।

আফ্রিকা-বন্দনায় তারকারাজি

আফ্রিকা—এই সেদিনও নামটা শুনলেই ইউরোপ-আমেরিকা নাক সিটকিয়েছে। সেই আফ্রিকায় গত এক মাসে কী না হলো? কে না এলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়? হলিউড তারকা ডন ট্রাভোল্টা, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, রক তারকা মিক জ্যাগার থেকে শুরু করে বিল ক্লিনটন, অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পদচারণে মুখর হয়ে উঠল আফ্রিকা।
এই সব মহা মহা তারকাকে দক্ষিণ আফ্রিকায় টেনে নিয়ে এল বিশ্বের বৃহত্তম আনন্দযজ্ঞ বিশ্বকাপ। বিশ্বের নামজাদা তারকারা শুধু খেলা দেখতে এলেন, দ্যুতি ছড়ালেন, তা নয়; যাওয়ার সময় দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভাসিয়ে গেলেন প্রশংসার বন্যায়। তারকাদের সুর মিলে গেল সেপ ব্ল্যাটারের সঙ্গে।
ব্ল্যাটারের ব্যাপারটা আলাদা। দক্ষিণ আফ্রিকান বিশ্বকাপ জঘন্যতম আয়োজন হলেও তাঁকে বলতে হতো সেরা আয়োজন। একে তো ফিফা সভাপতি হিসেবে তিনি এটা বলতে বাধ্য। তার ওপর আবার দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ আনায় ভদ্রলোকের বিশেষ চেষ্টার ইতিহাস আছে।
সব মিলিয়ে ব্ল্যাটার নিজের করণীয় কাজটাই করলেন। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগে আরও একবার ঘোষণা করে দিলেন, গর্ব করার মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ‘আফ্রিকা এখন গর্ব করতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা গর্ব করতে পারে, গর্ব করতে পারে আফ্রিকার ফুটবল। আমরা প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। আমি আজ খুবই তৃপ্ত একজন সভাপতি।’
ফিফা সভাপতির তৃপ্তি নানাভাবে ঝরে পড়ছে কণ্ঠে। প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকার স্টেডিয়ামগুলোকে, ‘স্থাপত্যের দিক থেকে দেখতে গেলে বলতে হয়, এই স্টেডিয়ামগুলো একেকটি রত্ন। এগুলো সত্যি সত্যিই অসাধারণ। স্টেডিয়ামের যেখানেই দর্শক বসুন না কেন, তিনি মাঠের পুরোটুকু দেখতে পেয়েছেন। ইউরোপিয়ান এমন একটা দেশও পাওয়া যাবে না, যেখানে এতগুলো উচ্চমানের স্টেডিয়াম আছে।’
ব্ল্যাটারের এই আফ্রিকা-বন্দনায় কেউ তাঁর স্বার্থ, উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু এই একই রকম বন্দনা শোনা যাচ্ছে বিশ্বকাপ ঘুরে যাওয়া তারকাদের কাছ থেকেও। তারকারা তো এমন বক্তৃতা করে কথা বলছেন না। তাই তাঁরা বেছে নিয়েছেন টুইটারকে।
সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট টুইটারকে বিশ্বকাপ উপলক্ষে তাদের সব রেকর্ড প্রায় নতুন করে লিখতে হচ্ছে। আগে প্রতি সেকেন্ডে যেখানে গড়ে ৭৫০টি পোস্ট আসত, বিশ্বকাপের সময় এক সেকেন্ডে সর্বোচ্চ তিন হাজার ২৮৩টি পোস্ট আসার ঘটনাও ঘটেছে!
এই পোস্টদাতাদের তালিকায় তারকারাও আছেন। তাঁরা টুইটার-পোস্টে আফ্রিকা-বন্দনায় মেতেছেন। আফ্রিকান বিশ্বকাপে পপ গায়িকা সাকিরা এতটাই মজেছেন যে তিনি লিখেছেন, ‘আমি চাই না বিশ্বকাপ এখনই শেষ হয়ে যাক। আসুন, আমরা সবাই মিলে ফিফাকে বলি, মাসখানেক লম্বা করতে! কি বলেন, হবে না?’
আমেরিকার হিপ হপ গানের দল ‘ব্লাক আইড পিজ’ গ্যালারিতে নিজেদের ছবি তুলে সেটা পোস্ট করেছে। সঙ্গে লিখেছে, ‘২০ বছর আগে কেউ কল্পনাও করেনি, পুরো বিশ্ব একদিন দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে আসবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে। ঐতিহাসিক ব্যাপার।’ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটা আফ্রিকানরা দারুণভাবে পালন করতে পেরেছে বলেই ধারণা গায়ক অ্যাকনের। তিনি লিখেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা রকস! এমন জায়গাতেই আসতে হয়। থ্যাংক ইউ দক্ষিণ আফ্রিকা।’
সাবেক সুপার মডেল কিমোরা লি সিমনস যাওয়ার সময় দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য তাঁর কষ্টের কথা জানিয়ে গেছেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে। সবাইকে ভালোবাসা ও সহানুভূতির জন্য ধন্যবাদ। আমরা আবার ফিরে আসব।’
এখন তো পুরো বিশ্বের বলার কথা—আমরা আবার ফিরে আসব।

স্পেন না হল্যান্ড—দ্বিধায় রোমারিও

আগামীকাল ফাইনাল। মুখোমুখি হবে ইউরোপীয় ফুটবলের দুই পরাশক্তি স্পেন ও হল্যান্ড। যারাই জিতুক, প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে পাওয়ার পরমানন্দে নাচে-গানে মেতে উঠবে। তা কোন দলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফিটা দেখার বাসনা আপনার? ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক রোমারিও কিন্তু পড়ে গেছেন উভয় সংকটে। কোনোভাবেই এক দলকে বেছে নিতে পারছেন না।
বলতে পারেন, ফাইনালের আগে তাঁর হূদয়টা দ্বিখণ্ডিত। এক ভাগ চাইছে হল্যান্ড জিতুক, অন্য অংশ সমর্থন দিচ্ছে স্পেনকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ জয়ের মিশন ব্যর্থ করে দিয়েছে হল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে ডাচদের কাছে হেরেই হতাশা আর অপমানের লজ্জা মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে গেছে ব্রাজিল। রোমারিওর তাই হল্যান্ড-বিদ্বেষী হয়ে স্পেনকেই সমর্থন দিয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু তিনি তা পারছেন না। তাঁকে সেই পথে হাঁটতে দিচ্ছে না তাঁর খেলোয়াড়ি জীবন। যে জীবন তাঁকে হতে দিচ্ছে না স্পেন-বিদ্বেষীও।
কারণ খেলোয়াড়ি জীবনে রোমারিও যেমন হল্যান্ডে ক্লাব ফুটবল খেলেছেন, তেমনি খেলেছেন স্পেনেও। যে কারণে এই দুই দেশের ফুটবলের প্রতিই তাঁর অগাধ ভালোবাসা। খেলোয়াড়ি জীবনের স্মৃতিবিজরিত দুই দেশের ফাইনাল রোমারিওকে তাই বানিয়ে দিয়েছে ‘নিরপেক্ষ’ সমর্থক। খেলোয়াড়ি জীবনের সেই স্মৃতিচারণা করে রোমারিও বলেছেন, ‘দুটি দেশেই খেলার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। পিএসভি আইন্দহোফেনের হয়ে হল্যান্ডে খেলেছি সাড়ে পাঁচ বছর, এর পর বার্সেলোনায় দেড় বছর কাটিয়ে খেলেছি ভ্যালেন্সিয়ায়। সত্যিই আমার হূদয়টা দুই ভাগে বিভক্ত।’
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি—সবাই বিদায় নিয়েছে। তবে রোমারিও মনে করছেন সেরা দুটি দলই ফাইনালে উঠেছে, ‘দুটি দলই সেরা ফুটবল প্রদর্শন করেছে। আর এ জন্যই তারা ফাইনালে।’
হূদয় দ্বিধাবিভক্ত। তাই একক কোনো দলকে সমর্থন করাটা তাঁর জন্য হয়তো কঠিনই হবে। কে চ্যাম্পিয়ন হবে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারছেন না ব্রাজিলের হয়ে ৭০ ম্যাচে ৫৫ গোল করা এই স্ট্রাইকার। তবে জয়ী যে ফুটবলই হবে, এতে সন্দেহ নেই তাঁর, ‘কে চ্যাম্পিয়ন হবে, এটা বলা কঠিন। তবে এই দুটি দল যখন খেলবে, সত্যিকারের জয়টা হবে ফুটবলের।’
ব্রাজিল এবার পারেনি। তবে নিজেদের দেশে ২০১৪ বিশ্বকাপের সাফল্য নিয়ে রোমারিও এখনই স্বপ্ন দেখতে শুরু করছেন, ‘ব্রাজিলের বিশ্বকাপটা হবে সম্ভবত সেরা। আমরা ব্রাজিলিয়ানরা সেই মুহূর্তটির অপেক্ষাই করছি। এটিকে সত্যিকার উৎসবে রূপ দিতে পারার ব্যাপারে আমরা আত্মবিশ্বাসী। একই সঙ্গে আশাবাদী, মাঠে আমাদের ফুটবলাররাই চ্যাম্পিয়ন হবে। ২০০২-এর পর সেটিই হবে আমাদের ফুটবলের জন্য সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।’

ম্যানইউকে ‘না’ স্নাইডারের

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে এল। ক্লাব ফুটবলের ডামাডোলও বেজে উঠতে শুরু করছে। ‘কে চ্যাম্পিয়ন হবে’ বা ‘কোন দল হবে তৃতীয়’; এসব আলোচনার মধ্যে ঘুরেফিরে আসছে দলবদল নিয়ে গুঞ্জন। আপাতত গুঞ্জন হল্যান্ডের প্লে-মেকার ওয়েসলি স্নাইডারকে ঘিরে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড চাইছে স্নাইডারকে—কথা হচ্ছে এ রকমই। কিন্তু স্নাইডার বলে দিলেন—‘আমি ইন্টার মিলানেই থাকছি।’
১৯৯১ সালে আয়াক্সের যুব প্রকল্পে ফুটবলে হাতেখড়ি কিশোর স্নাইডারের। ২০০২ সালে বিখ্যাত এই ডাচ ক্লাবেই শুরু হয় তাঁর পেশাদারি ফুটবল-যাত্রা। ৫ বছর আয়াক্সে কাটিয়ে ২০০৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। দুই বছর না যেতেই রিয়াল ছেড়ে দেয় স্নাইডারকে। এর পর থেকে ইন্টার মিলানে স্নাইডার।
সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে ইন্টারের হয়ে ট্রেবল জিতেছেন। সময়টা খুবই ভালো গেছে ডাচ প্লে-মেকারের। ‘মিলান তো আমার হূদয়ে রাখা। ইন্টার মিলানের হয়ে গত মৌসুমে সবকিছুই জিতেছি (ইতালিয়ান লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ)। আমি ইন্টার মিলানেই থাকছি, আগামী মৌসুমে আমি ইন্টার মিলানেই খেলব’—বলেছেন স্নাইডার।
ম্যানইউ ২৫ মিলিয়ন ইউরো প্রস্তাব দিয়েছে তাঁকে। এটা জেনে ভালোই লাগছে স্নাইডারের, ‘আমি ভালো খেলছি বলেই ওরা আমাকে চায়। আমার ভালোই লাগছে। তবে আমি ইন্টারেই থেকে যাচ্ছি’—এই বিশ্বকাপে এরই মধ্যে ৫টি গোল করা ডাচ প্লে-মেকার ঠিক করে ফেলেছেন তাঁর ভবিষ্যৎ।

ফাইনালে থাকছেন নাদাল

আর সহ্য করতে পারছেন না রাফায়েল নাদাল। তাঁর দল ফাইনালে উঠে গেছে, আর তিনি পড়ে থাকবেন দূরে! আগে শোনা গিয়েছিল, ফাইনাল দেখতে নাও যেতে পারেন। এবার খবর পাওয়া গেল, সকার সিটি স্টেডিয়ামে স্পেনের ‘বিজয়’ দেখতে হাজির থাকবেন সদ্যই আরেকটি গ্র্যান্ড স্লামের মালিক হওয়া নাদাল।
বর্তমান টেনিসের এক নম্বর তারকা নাদাল সব সময়ই ফুটবলের খুব ভালো সমর্থক, দর্শক। সময়-সুযোগ হলেই নিজের দেশ স্পেনের অনুশীলন বা খেলা দেখতে চলে যান। নিজে রিয়াল মাদ্রিদের ভক্ত। আবার চাচা মিগুয়েল নাদাল ছিলেন বার্সেলোনার এবং স্পেন দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। সেই সুবাদে ফুটবলের সঙ্গে নাদালের সম্পর্কটা আসলে রক্তের। খেলা দেখতে বসে পড়েন টেলিভিশনে।
সেমিফাইনালে জয়টাও সেভাবেই দেখেছেন। স্পেন দলকে ‘বিশ্বকাপ ফাইনালের স্বপ্ন বাস্তব’ করতে দেখে মহা উচ্ছ্বসিত ক্লে-কোর্টের এই জীবন্ত কিংবদন্তি। নাদাল বলেছেন, এই জয়ে স্পেন তার অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে জেগে উঠবে। তাঁর মতে, এখন স্পেনের যে ফর্ম, তাতে বিশ্বকাপ তারা জিতবেই, ‘আমরাই সেরা এবং আমরা জিতব। আমাদের দলটা খুবই সমন্বিত। ফলে আমাদের জয়টা প্রাপ্য।’
ফুটবলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাকে এবার অর্থনৈতিক পর্যায়েও নিয়ে গেলেন নাদাল। কিনে নিয়েছেন দারুণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে অস্তিত্ব বিলীন হতে বসা রিয়াল মায়োরকার অংশীদারি। লা লিগায় পঞ্চম দল হিসেবে গত মৌসুম শেষ করা মায়োরকার ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। জুন মাসে ক্লাবটিকে টেনে তোলার জন্য একটি ‘কনসোর্টিয়াম’ তৈরি করেছে মায়োরকার মানুষ সাবেক কোচ লোরেনজো সেরা ফেরার।
এই কনসোর্টিয়ামে যোগ দিয়েছেন নাদালও। ক্লাবটির ওয়েবসাইটে নাদাল বলেছেন, ‘রিয়াল মায়োরকাকে সহযোগিতা করতে পারাটাই একটা সম্মানের ব্যাপার। আমি যেভাবে পারি, সেভাবে সহযোগিতা করতে চাই। মায়োরকার স্থানীয় লোকদের নেওয়া এই প্রকল্পের অংশীদার হতে পেরেই আমি গর্বিত।

সান্ত্বনা পুরস্কার পাচ্ছেন মুলার

সকার সিটি স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে ফিফা জ্যাঁ-পল ব্রিগার যতটা রহস্য করে বিশ্বকাপের সেরা যুব খেলোয়াড়দের সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করলেন, ততটা রহস্য এর মধ্যে ছিল না। অনেক সাংবাদিকই তাঁদের খাতায় প্রথমে এই তিনটি নামই লিখে রেখেছিলেন—জার্মানির টমাস মুলার, মেক্সিকোর জিওভানি ডস সান্টোস ও ঘানার আন্দ্রে আইয়ু। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের পরিচালক তাই কাল যখন তাঁদের নাম ঘোষণা করলেন, অনেকেরই মুখে মুচকি হাসি। ভাবখানা এমন, এর মধ্যে রহস্যটা কোথায়, আমরা তো জানতামই!
ব্রিগার তিনজন খেলোয়াড়ের নাম ঘোষণা করে তাঁদের এই বিশ্বকাপ কীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন, সাংবাদিকেরা ফিসফাস করেন, ‘হয়েছে, হয়েছে। আমরা সব জানি।’
একেবারেই সঠিক নির্বাচন। সামান্য বিতর্কের কালো দাগও এতে লাগার কথা নয়। কিন্তু সেরা যুব খেলোয়াড়ের পুরস্কারটি শেষ পর্যন্ত কার হাতে উঠতে যাচ্ছে? এটাও সম্ভবত ঠিক হয়ে আছে। কে আবার? ২০ বছর বয়সী জার্মান স্ট্রাইকার টমাস মুলার!
টমাস মুলারকে স্ট্রাইকার বলাটা কি ঠিক হলো? ২০ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় তাঁর শরীরে যেন ৩২ বছর বয়সী একটা মাথা নিয়ে খেলেছেন। কখনো খেলেছেন উইঙ্গার হিসেবে। কখনো মিরোস্লাভ ক্লোসার পেছনে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে, আবার কখনো হয়ে গেছেন খাঁটি মিডফিল্ডার। চারটি গোল করেছেন, বানিয়ে দিয়েছেন তিনটি। দুই পায়ের সঙ্গে তাঁর মাথাটাও যেন স্বয়ংক্রিয়, বাজপাখির চোখে খুঁজে নেন সঠিক পাসটা—সব্যসাচী খেলোয়াড়। অথচ মাত্রই গত মার্চে জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ওই প্রীতি ম্যাচে খেলেছিলেন ৬৬ মিনিট পর্যন্ত। তার পর জার্মানি তাঁকে সংবাদ সম্মেলনে পাঠালে বিজয়ী দলের কোচ ডিয়েগো ম্যারাডোনা কী অপমানটাই করলেন! ‘এখানে এই ছেলেটা থাকলে আমি থাকব না’ বলে উঠে গেলেন ম্যারাডোনা। ‘এই ছেলেটা’ বলতে ম্যারাডোনা বুঝিয়েছিলেন বলবয়। সেই বলবয়ই চার মাস পর কেপটাউনের গ্রিন পয়েন্ট স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার আরেকটি স্বপ্ন খুন করায় নেতৃত্ব দিলেন প্রথম গোল করে। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে হারল চার গোলে। ম্যারাডোনা মুলারকে চিনেছেন। তাঁকে চিনেছে সারা বিশ্বই।
জার্মান কিংবদন্তি যে গার্ড মুলারের ‘অপয়া’ ১৩ নম্বর জার্সিটাকে গায়ে তুলেছেন টমাস মুলার, তিনিই তাঁকে দেখছেন জার্মান ফুটবলের পয়মন্ত এক আবিষ্কার রূপে, ‘ও অনেক দূর যাবে। ওর বয়সে আমিও এমন ছিলাম না।’ গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১টি গোল করেছিলেন, দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ড মূলত ডুবল তাঁর ২ গোলেই। পেলে ও বেকেনবাওয়ারের পর এত কম বয়সে বিশ্বকাপ নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচে একাধিক গোল আর কেউ করতে পারেননি। ৬২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৬৬ গোলের মালিক জার্ড মুলারের জহুরি চোখ জহর ঠিকই চিনতে পেরেছে।
কিন্তু মুলার একটা দুঃখ বয়ে বেড়াচ্ছেন বুকে। দুটো হলুদ কার্ডের বেড়াজালে আটকে খেলতে পারলেন না সেমিফাইনাল। দর্শক হয়ে স্পেনের কাছে সেমিফাইনালে স্বপ্ন শেষ হতে দেখলেন জার্মানির। ডারবানের মোজেস মাভিদা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে চূর্ণ করে শুরু হয়েছিল জার্মানির স্বপ্নদৌড়, সমাপ্তিও হলো সেখানেই। পুরো জার্মান শিবিরে মুলার তাই আনন্দের পাশে একটা হতাশারও নাম। সমর্থকেরা বলছে, মুলার থাকলে জার্মানিকে হারানো যেত না। জার্মান সাংবাদিকেরা বলছেন, মুলারের অভাবটাই বড় হয়ে দেখা দিল আসল ম্যাচে। কোচ জোয়াকিম লো মুলারের জন্য এখনো ‘হাহাকার’ করছেন, ‘মুলার থাকলে ম্যাচের ফল অন্যরকম হতেই পারত।’
মুলারের বুকের মধ্যে কী ঝড় বইছে, সেটি কেবল তিনিই বুঝবেন। তবে একটা স্বগতোক্তি হয়তো করছেন বায়ার্ন মিউনিখের তরুণ তুর্কি, ‘এ রকম অর্জনের মুহূর্তেই কী যেন ঘটে যায় জার্মানির! ২০০২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কার্ডের খাঁড়ায় কাটা পড়লেন মাইকেল বালাক, আর এবার কোয়ার্টার ফাইনালে আমি।’
জার্মানির নতুন এই ‘পোস্টার-বয়ের’ সামনে বিশ্বকাপের বড় একটা পুরস্কারের হাতছানি এখনো আছে। আজ পোর্ট এলিজাবেথে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়ের জালে আরও বার দুয়েক বল পাঠাতে পারলে সোনার জুতাও উঠতে পারে তাঁর পায়ে। না হলে সেরা যুব খেলোয়াড়ের পুরস্কার তো রইলই। ডস সান্টোস আর ঘানার কিংবদন্তি আবেদি পেলে তনয় নিশ্চিত করেই তাঁর পেছনে থাকবেন। কিন্তু এই পুরস্কার তাঁকে আরও কষ্টই দেবে। গতবার এই পুরস্কার যেমন কষ্ট দিয়েছিল সতীর্থ লুকাস পোডলস্কিকে।

সেরার দৌড়ে তিন স্প্যানিশ

পাওলো রসি, মারিও কেম্পেসদের পাশে নাম লেখানোর সুযোগ এসে গেছে ডেভিড ভিয়া ও ওয়েসলি স্নাইডারের সামনে। বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জয়ের সুযোগ। ৫টি করে গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন দুই ফাইনালিস্ট দলের দুই খেলোয়াড় ডেভিড ভিয়া ও ওয়েসলি স্নাইডার। ফিফার প্রকাশ করা গোল্ডেন বলের দাবিদারদের তালিকাতেও আছে এই দুজনের নাম।
ফিফার মহাসচিব জেরোম ভালকে ও অ্যাডিডাসের প্রধান নির্বাহী হার্বাট হেইনার গতকাল ঘোষণা করেছেন গোল্ডেন বলের লড়াইয়ে থাকা ১০ জনের নাম। এই ১০ খেলোয়াড়কে বেছে নিয়েছে ফিফার ‘টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’। একই সঙ্গে ফিফার এ কমিটি তিনজনকে বেছে নিয়েছে টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য ‘সেরা তরুণ খেলোয়াড়’ হিসেবে।
গোল্ডেন বলের ক্ষেত্রে বাকি সিদ্ধান্তটা এখন সাংবাদিকদের হাতে। বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া প্রত্যেক সাংবাদিক এই তালিকার খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে যাঁর যাঁর পছন্দ অনুযায়ী গোল্ডেন বল, সিলভার বল ও ব্রোঞ্জ বলের জন্য ভোট দিতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত ভোটের বিবেচনায় বিজয়ী তিনজনের নাম ঘোষণা করা হবে ফাইনালের পর।
ফাইনালের পর ঘোষণা করা হবে সেরা তরুণ খেলোয়াড়েরও নাম। তবে এই নামটি ফিফার টেকনিক্যাল কমিটিই নির্বাচিত করবে। সেরা তরুণ খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে আলোচিত জার্মান খেলোয়াড় টমাস মুলারের সঙ্গে আছেন ঘানার আন্দ্রে আইয়ু ও মেক্সিকোর জিওভানি ডস সান্তোস।
গোল্ডেন বলের দাবিদারদের তালিকায় মূলত স্পেনেরই দাপট। ভিয়ার সঙ্গে তালিকায় আছেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও জাভি। এ ছাড়া আরেক ফাইনালিস্ট হল্যান্ডের আরিয়েন রোবেন ও ওয়েসলি স্নাইডার আছেন তালিকায়। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়া জার্মানির মেসুত ওজিল, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগারও আছেন। বাদ যাননি উরুগুয়ের ডিয়েগো ফোরলানও। সেমিফাইনালে উঠতে না পারা আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিও আছেন তালিকায়। তবে তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে এমন একটি নাম, যা দেখে অনেকেই বিস্মিত হতে পারেন—ঘানার আসামোয়া জিয়ান।
আনুষ্ঠানিকভাবে গোল্ডেন বল বা টুর্নামেন্ট-সেরার পুরস্কার চালুর পর থেকে এই পুরস্কার পেয়েছেন পাওলো রসি (১৯৮২), ডিয়েগো ম্যারাডোনা (১৯৮৬), সালভাতোর শিলাচি (১৯৯০), রোমারিও (১৯৯৪), রোনালদো (১৯৯৮), অলিভার কান (২০০২) ও জিনেদিন জিদান (২০০৬)।

জার্মানিই তৃতীয় হবে

জার্মানি-উরুগুয়ে আজ তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। এমন ম্যাচ আসলে কেউই খেলতে চায় না। সেমিফাইনালে হারের ঘা তো এখনো শুকোয়নি। তবে দুদলের জন্য এই ম্যাচ একটা সুযোগও বটে। সমর্থকদের অন্তত একটা ধন্যবাদ দেওয়া এবং কিছুটা গৌরব ও নিজেদের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা তো যাবে।
এসব ভেবে দুদলই জিততে চাইবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এমন ম্যাচ থেকে প্রেরণা খুঁজে পাওয়া এবং নিজের সেরাটা খেলা কঠিনই।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তি সেমিফাইনালের আগে বিদায় নিয়েছে। তাদের ফাঁক গলে বেরিয়ে গিয়ে সেমিফাইনালে খেলেছে ছোট্ট দেশ উরুগুয়ে। এটা উরুগুয়ের জন্য খানিক গর্বের, যা তাদের দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপ। উরুগুয়ে তাদের প্রাপ্তির জন্য গর্ব করতে পারে। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে লাতিন দেশটি।
উরুগুয়ের আছে ডিয়েগো লুগানোর মতো একজন গ্রেট দলনেতা। আছে ডিয়েগো ফোরলান, যে কিনা এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্ট্রাইকার। তবে এসবের মাঝেই তুলে আনতে হচ্ছে সেই ঘটনাটি। কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিপক্ষে গোললাইন থেকে হাত দিয়ে বল ঠেকিয়েছে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ। উরুগুয়ের জন্য এটা সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী এক স্মৃতি হয়ে রইবে। সুয়ারেজের ওই ঘটনা ঘানাকে জিততে দেয়নি কোয়ার্টার ফাইনালে।
এটা কি লজ্জার? অবশ্যই নয়। ভাবুন তো, এমন অবস্থায় পড়লে আমরা কী করতাম? সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে সুয়ারেজকে এবং এর জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়েছে। পেশাদার ফুটবলার হিসেবে আর অন্য কিছু করার আসলে সুযোগই ছিল না।
জার্মানি এই টুর্নামেন্টে এসেছিল একের পর এক ছোট আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটা দল নিয়ে। চোটের শিকার হয়ে মূল খেলোয়াড়েরা আসতেই পারল না। একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে আমরা কিছু তরুণ খেলোয়াড়কে জোর করেই নিয়ে এসেছি, যাদের সামনে এখনো প্রচুর সময় পড়ে আছে। তারা অসাধারণ খেলল। ওজিলের খেলা তো রোমাঞ্চকর, মুলারও তা-ই। সামনে এগিয়ে যেতে কোচ কোয়াকিম লোর জন্য অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। আগামী চার বছরে এই দল আরও অভিজ্ঞ হবে। আরও শক্তিশালী হবে। আগামী বিশ্বকাপ ব্রাজিলে। সেই টুর্নামেন্ট জয়ের জন্য অন্যতম ফেবারিট হবে জার্মানি।
আমি দেখতে চাইব রক্ষণ ভাগের ভেঙে পড়া ঠেকানোর জন্য দল একটা পথ খুঁজে নেবে। যদিও এটা যেকোনো দলের জন্যই কঠিন। আমরা স্পেনের দিকে তাকাতে পারি এবং তাদের কাছ থেকে শিখতে পারি জমাট এলাকায় পাসিং এবং মুভমেন্ট করতে হয় কীভাবে। তবে যত যা-ই বলি, সময় এখন আমাদের।
এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটা সম্ভবত অনেক উন্মুক্ত হবে। ফল আসবে জার্মানির পক্ষেই। মুলার ফিরছে। আমি দেখতে চাইব প্রতি আক্রমণে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দেবে জার্মানি। যেভাবে তারা ধ্বংস করেছিল অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনাকে। উরুগুয়ে আক্রমণে থাকারই চিন্তা করবে বেশি এবং সেটা হলে পেছনে আমরা খালি জায়গা পেয়ে কাজে লাগাতে পারব।
একই সঙ্গে উরুগুয়ের আক্রমণ ভাগে আছে সুয়ারেজ, ক্যাভানি ও ফোরলান, যারা সুযোগ তৈরি করবে, কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে। গোল করে খেলা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে ফোরলান। এটা তার কাছে প্রত্যাশিতই।
এই ম্যাচে চার-পাঁচটি গোল হতে পারে এবং আনন্দদায়ী দারুণ এক ম্যাচ হতে পারে। আমার মতে, উরুগুয়ের চেয়ে শক্তিশালী জার্মানি এবং তৃতীয় স্থানটা জার্মানিই পাবে। দুদলের খেলোয়াড়, সমর্থক ও ফুটবলবিশ্বের জন্য এটা আসলে উপভোগের ম্যাচ। যা-ই অর্জন হোক, ভবিষ্যতের জন্য তা কমও নয়। আশাবাদী চোখ নিয়ে আগামী দিনগুলোর দিকে তাকানোরই সময়।

দুটি ভুল

গতকাল প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত আফ্রিকার উপহার ‘নতুন চ্যাম্পিয়ন’ লেখাটিতে দুটি তথ্যবিভ্রাট ঘটে গেছে। লেখা হয়েছে, হল্যান্ড ছাড়া শুধু হাঙ্গেরিই দুটি ফাইনাল খেলেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, দুটি ফাইনাল খেলেও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি, এমন দল আরেকটি আছে—চেকোস্লোভাকিয়া (১৯৩৪ ও ১৯৬২)। এবার স্পেনের আগে প্রথম ম্যাচ হেরেও ফাইনালে ওঠার ঘটনাও দুটি নয়, তিনটি। ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইতালির কথা লেখা হয়েছে। বাদ পড়েছে পশ্চিম জার্মানি, যারা ১৯৮২ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার কাছে হারার পরও ফাইনালে উঠেছিল। ফাইনালে ইতালির কাছে হারায় শেষ আর শুরুতে মিল ছিল জার্মানদেরও।

বিশ্বকাপ ও সোহরাব-রুস্তম প্রসঙ্গ

ম্যারাডোনা কি স্পেন-জার্মানির সেমিফাইনালটা দেখেছিলেন? দেখলে তাঁর নিশ্চয় খুব দুঃখ লাগছিল, কেন তিনি রিকেলমেকে ২৩ জনের দলে রাখেননি। রিকেলমে গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার ছিলেন। কিন্তু এবারের কোচ ম্যারাডোনার সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারণে তিনি দলে থাকতে পারেননি। যদি রিকেলমে থাকতেন আর ভেরনকেও নামাতেন ম্যারাডোনা সেদিন, তাহলে জার্মানির হাতে আর্জেন্টিনার এই ভোগান্তিটা হতো না। অন্যদিকে স্পেনের কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক এমনি এমনি রিয়াল মাদ্রিদের কোচ ছিলেন না বোঝা গেল তাঁর মুনশিয়ানায়। দেল বস্ক জাভি আর ইনিয়েস্তাকে দিয়ে সারাক্ষণ মাঝমাঠ দখলে রাখলেন, ফলে জার্মানি নিচ থেকে মাঝমাঠ হয়ে সামনে আক্রমণে আসতেই পারল না, যে কৌশলটা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। তার পরও দেল বস্ক কৌশলে জার্মানির কোমরটা ভেঙে রেখেছিলেন।
স্পেনের বিরামহীন পাসের সৌন্দর্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন স্বয়ং পিকাসো এসে বল দিয়ে মাটিতে আলপনা আঁকছেন। কম্পিউটার গ্রাফিক-শিল্পীরা স্পেনের পাসগুলোর ছক বের করলেই বোঝা যাবে, ফুটবল যতটা না পায়ের, তার চেয়ে বেশি মস্তিষ্কের। ভিসেন্তে দেল বস্ক বরাবরই ছিলেন ব্রাজিলের দুঙ্গার বিপরীত অবস্থানে। দুঙ্গা সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করে জয়কে বড় করে দেখেছিলেন। এই চিন্তার ট্র্যাজিক পরিণতিও আমরা দেখেছি। আর দেল বস্ক ফাইনালে উঠেও বলছেন, হল্যান্ডের বিপক্ষে স্পেন বনিতো (সুন্দর) ফুটবল খেলবে। এই সৌন্দর্যের জন্যই জার্মানির সঙ্গে খেলায় স্পেন বল অধিকারের কেরামতিতে প্রতিপক্ষকে আচ্ছন্ন করে রাখলেও একবারও মনে হয়নি যে তারা ভয়ংকর সরীসৃপ ‘কমোডো ড্রাগনের’ মরণকামড় দিয়ে জার্মানির টুঁটি চেপে ধরেছে। বরং মনে হয়েছে, কোনো সাপ যেন মাথার দোলানি দিয়ে শিকারকে সম্মোহিত করে রেখেছে।
তবে স্পেন ফাইনালে যাওয়ায় ম্যারাডোনার নিশ্চয় অত বড় দুঃখ হবে না, যদিও ঈর্ষা হতে পারে। আর্জেন্টিনা তো স্পেনেরই উপনিবেশ ছিল। আর্জেন্টিনার ভাষাও স্প্যানিশ। প্রতি বিশ্বকাপের অনুষ্ঠানে ঔপনিবেশিক শাসক দেশগুলোর সঙ্গে সাবেক উপনিবেশগুলোর মেলা বসে যেন। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের ১-০ গোলের হারের কথা বারবার কেন উঠে আসে? শুধু এ জন্য নয় যে, এটি একটি বিরাট অঘটন ছিল—ফুটবলে আনকোরা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পরাশক্তি ইংল্যান্ডের হার। আরও একটা মর্যাদার ব্যাপার ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তো এককালে ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ছিল। তাদের ভাষাও এক—ইংরেজি। ঔপনিবেশিকতার তাত্ত্বিক আলোচনায় এই সম্পর্কটা হলো পিতা-পুত্রের। ভাষা এক সে কারণে। কিন্তু ভাষা ভিন্ন হলে সম্পর্কটা হয়ে যায় মাস্টার ও নেটিভ—যেটা ইংল্যান্ড-ভারতের সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
খেলার মাঠ থেকে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা কাগজে-কলমে দূরে থাকলেও ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশিত দেশগুলোর মধ্যে খেলা হলে সম্পর্কটা অনেক সময়ই প্রীতিপূর্ণ না হয়ে সোহরাব-রুস্তমের মতো যুধ্যমান হয়ে পড়ে।
পিতা-পুত্র সোহরাব আর রুস্তম অবশ্য পরস্পরকে না চিনেই দ্বন্দ্বযুদ্ধে নেমেছিলেন, কিন্তু ব্রাজিল আর পর্তুগাল যখন গ্রুপ পর্বে খেলতে নামল, দেখলাম যে প্রথম আধঘণ্টায় দুই পক্ষে হয় ১৭টা ফাউল।
দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ইগোর লড়াইটা এমনকি টিভির পর্দায়ও যেন স্পর্শ করা যাচ্ছিল।
পর্তুগালের রাগ, ব্রাজিল তার এককালীন উপনিবেশ হয়ে, তার ভাষায় কথা বলে কেন পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো। আর ব্রাজিলের রাগ, কী করে ইঁদুরের মতো পুঁচকে একটা দেশ হাতির মতো বিশাল ব্রাজিলকে পরাধীন করে রেখেছিল। খেলায় এসব বৈরিতা যে সচেতনভাবে কাজ করে তা নয়, তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা অনেক সময় ব্যাখ্যা করে—কোন দেশ কোন দেশের বিরুদ্ধে কেন আগুয়ান হয়ে খেলে। যেমন ক্রিকেটে অ্যাশেজ। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট লড়াইটা হচ্ছে মর্যাদার লড়াই। কিসের মর্যাদা? পিতার কাছে পুত্রের মর্যাদা, পুত্রের কাছে পিতার মর্যাদা।
এটাও উল্লেখ্য যে ফেরদৌসী রচিত পারস্য মহাকাব্য শাহনামা থেকে যে ইংরেজ কবি ‘সোহরাব ও রুস্তম’ আখ্যানটি অবলম্বন করে ইংরেজিতে চমৎকার একটি দীর্ঘ কবিতা লেখেন, সেই ম্যাথ্যু আর্নল্ড ছিলেন ভিক্টোরিয়া যুগ তথা ঊনবিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান কবি। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মধ্য গগনে, কাজেই আর্নল্ডের কাব্যিক মনে দূরপ্রাচ্যের এই ঘটনাটা আবেদন সৃষ্টি করেছিল। কেননা, ব্রিটেনের তরফ থেকে এই প্ররোচনার প্রয়োজন ছিল যে যদি পিতার দেশের প্রতি পুত্রের দেশের আনুগত্য না থাকে, তাহলে সোহরাব-রুস্তমের মতো ট্র্যাজেডি অনিবার্য। বলা বাহুল্য, ম্যাথ্যু আর্নল্ড এবং তাঁর সমকালীন শিক্ষিত ইংরেজরা সাম্র্যাজ্যবাদকে শুভ ও কল্যাণীয় মনে করতেন।

ফাইনালের বাঁশরিয়া

পুলিশ আর রেফারির মধ্যে মিল কোথায়? সাধারণ একটা মিল, দুজনের কাছেই থাকে বাঁশি। আরও কিছু মিল থাকলেও থাকতে পারে। সেটি সবচেয়ে ভালো জানার কথা হাওয়ার্ড ওয়েবেরই। ভদ্রলোক পেশায় শুধু রেফারিই নন, পুলিশও!
ইংল্যান্ডের সাউথ ইয়র্কশায়ারের এই পুলিশ সার্জেন্ট আগামীকাল পুলিশের খুঁতখুঁতে চোখ নিয়েই নামবেন জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিচালনের দায়িত্ব যে বর্তেছে তাঁরই কাঁধে। একই মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ আর বিশ্বকাপ—দুটো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে দায়িত্ব পালন করা প্রথম রেফারিও হতে যাচ্ছেন ওয়েব। রেফারিংয়ের কাজটা যেন নির্বিঘ্নে করতে পারেন, সে জন্য তাঁকে পুলিশের চাকরি থেকে দেওয়া হয়েছে পাঁচ বছরের ছুটি। ওয়েবের এই ‘কৃতিত্বে’ ইয়র্কশায়ার পুলিশও নিশ্চয়ই গর্বিত!
ইংলিশরাও হয়তো খুশি। যাক, অন্তত ফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব তো থাকছে। তবে স্পেন মোটেও খুশি হতে পারছে না। এবারের বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করেছিলেন স্প্যানিয়ার্ডরা। ওই অঘটনের ম্যাচের দায়িত্বে ছিলেন ওয়েব। যে ম্যাচে স্পেনের দুটো পেনাল্টির দাবিতে সাড়া দেননি এই ৩৮ বছর বয়সী। সেই দুঃখ তো আছেই, স্পেন ওয়েবকে তাদের জন্য অপয়াও ভাবতে পারে। ইতালিকে ৩-২ গোলে স্লোভাকিয়া যে হারিয়ে দিল, ওই ম্যাচের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। এক বিশ্বকাপে দু-দুটো অঘটনের সাক্ষী হয়ে আছেন। কাল না জানি কী হয়!
ভয়ের কিছু নেই। রেফারিং নিয়ে তুমুল বিতর্কের এই বিশ্বকাপে ওয়েব এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ধারাবাহিক। ১৫টি পেনাল্টি আর ১৬টি লাল কার্ডের কোনোটাই তাঁর হাত দিয়ে হয়নি। মুণ্ডিত মস্তক, পেল্লায় শরীর—দেখতে ষন্ডামার্কা চেহারা হলেও মুখে সব সময়ই বন্ধুসুলভ হাসি। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে রাখতে হয়, সেটি ভালোই জানা আছে তাঁর। ২০০৫ সালে ফিফার রেফারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে তাঁর দ্রুত উন্নতি চোখে পড়ার মতো। ফিফা সেটারই স্বীকৃতি দিল ফাইনালের দায়িত্ব দিয়ে।
এত বড় একটা দায়িত্ব পেয়েছেন, ওয়েবের স্ত্রী কে ওয়েব খুশি নিশ্চয়ই। মনের ভেতর যা-ই থাক, মিসেস ওয়েব কিন্তু এই বলে খোঁচা দিলেন, মাঠে ২২ জন খেলোয়াড়কে ওয়েব কী করে সামলান, সেটি তাঁর মাথাতেই ঢোকে না। ব্রিটেনের জিএমটিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জানি না কাজটা ও কীভাবে করে। নিজের বাচ্চাদেরই তো ও সামলাতে পারে না। ফুটবল মাঠ কী করে সামলায়, কে জানে!’
রহস্য একটা আছে নিশ্চয়ই। না হলে দুই দশক ধরে কাজটা তিনি কীভাবে করে আসছেন। হ্যাঁ, এর মধ্যে তাঁকে নিয়ে বিতর্ক যে হয়নি, তা নয়। সেটি কোন রেফারিকে নিয়ে হয় না। ওয়েব সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিলেন ২০০৮ ইউরোয়, যখন তাঁর এক সিদ্ধান্তে পোল্যান্ডের বিপক্ষে যাওয়ার পর সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘ওকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করছে’ মন্তব্য করেছিলেন। পরে অবশ্য পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন তাঁর কাছে।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে রেফারিং শুরু করা ওয়েব গত ৩৬ বছরে প্রথম ইংলিশ রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের দায়িত্ব পালন করবেন। সর্বশেষ ১৯৭৪ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি বনাম হল্যান্ড ফাইনালে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইংল্যান্ডের জ্যাক টেলর। ওই ম্যাচে টেলর দুবার বাজিয়েছিলেন পেনাল্টির বাঁশি। প্রথমটি আবার ছিল একদম ম্যাচের শুরুতেই। বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রথম পেনাল্টি ছিল ওটাই।
বোঝাই যাচ্ছে, টেলর কী পরিমাণ স্নায়ুর পরীক্ষা দিয়েছিলেন। সপ্ততিপর বৃদ্ধ টেলর আশ্বস্ত, দরকার পড়লে ওয়েবও আগামীকাল সেটি দেবেন, ‘দুই বছর ধরে ওর উন্নতি আমি নজরে রেখেছি। ওকে ফাইনালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছি। ও সত্যিই এটার যোগ্য।’
রেফারিং জিনিসটা বোধ হয় ওয়েবের রক্তেই আছে। তাঁর বাবা-চাচাও ছিলেন এই পেশায়। বাবা বিলি জিএমটিভিকে বলেছেন, ‘আমি আমার ছেলেকে দায়িত্বটা নিতে অনুপ্রাণিত করেছি। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো বিস্ময় হয়ে আছে। আমার ছেলে বিশ্বকাপের ফাইনালে দায়িত্ব পালন করছে, এটি যেন আমি কল্পনাও করতে পারছি না!’
বিলির আর কল্পনা করে কাজ নেই। তিনি বরং আরেকটা দিন অপেক্ষা করুন। সকার সিটিতে ওয়েব লম্বা ফুঁ দেবেন বাঁশিতে। আর সেই ফুঁতেই শুরু হয়ে যাবে বিশ্বকাপের আসল লড়াই।

দুই সতীর্থ যখন প্রতিপক্ষ

একই ক্লাবে খেলেন দুজন। ভাগাভাগি করে নেন ক্লাবের আনন্দ-বেদনা। জাতীয় দলে সে সুযোগ নেই, দুজনের দেশ আলাদা। অবশ্য বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে দুজনের মুখেই এখন হাসি। তবে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে এক দিনই পরই। একজনের হাসি আরও চওড়া হবে, মুছে যাবে আরেকজনের মুখের হাসি। পেপে রেইনার চাওয়া, ফাইনাল শেষে হাসি মুছে যাওয়া সেই ব্যক্তিটি তিনি নন, হবেন ডির্ক কিউট।
ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে একসঙ্গে খেলেন স্পেনের গোলকিপার পেপে রেইনা ও হল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ডির্ক কিউট। এখন দুজন দুই শিবিরে, তবে যোগাযোগ ঠিকই হচ্ছে। দুই দলের মহারণের আগে রেইনা হাসিমুখে বললেন, ফাইনাল শেষে হাসি দেখতে চান না বন্ধুর মুখে ‘ডির্কের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হচ্ছে। হল্যান্ড ফাইনালে ওঠার পর ও আমাকে ফোন করেছিল, আমরা ফাইনালে ওঠার পর আমি করেছিলাম ওকে। একটা ব্যাপার এখন অন্তত নিশ্চিত, লিভারপুলের কেউ শিরোপা জিতবে! তবে আশা করি, রোববার ডির্কের মুখের হাসি আর থাকবে না।’
প্রথম ম্যাচে একটির পর আর গোল না পেলেও হল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কিউট। বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হয়েও রেইনার অবশ্য মাঠে নামা হয়নি। স্পেনের গোলবার সামলাচ্ছেন সর্বকালের সেরা গোলরক্ষকদের একজন ইকার ক্যাসিয়াস।