Sunday, January 25, 2015

অস্ত্র দেওয়া হয়েছে কি হা–ডু–ডু খেলার জন্য? -র‍্যাব প্রধানের প্রশ্ন

(খুলনায় র‌্যাব-৬-এর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। ছবি: ফোকাস বাংলা) র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেছেন, একটি বিশেষ মহল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে সেটিকে ‘সস্তা প্রচার’ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। তিনি বলেছেন, অপরাধ দমন করতেই সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্র দিয়েছে, ‘হা-ডু-ডু খেলার’ জন্য নয়।| আজ রোববার খুলনায় র‌্যাব-৬-এর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বেনজীর আহমেদ এ কথা বলেন। র‍্যাবের প্রধান বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি সস্তা প্রচার। একটি বিশেষ মহল এই প্রচারের সঙ্গে যুক্ত।’ তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা অপরাধ করবে আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা চেয়ে চেয়ে দেখবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কি অস্ত্র দেওয়া হয়েছে হা-ডু-ডু খেলার জন্য?’
এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে র‍্যাবের ডিজি সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘তাহলে বিচার-অন্তর্ভুক্ত হত্যাকাণ্ড কোনটি?’ অবরোধ কর্মসূচির নামে বিএনপি নাশকতা চালাচ্ছে অভিযোগ করে এটি প্রতিরোধে র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বেনজীর।
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় কয়েকজন র‌্যাব সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তাতে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়নি মন্তব্য করে বেনজীর আহমেদ বলেন, কারও ব্যক্তিগত অন্যায়ের দায় র‌্যাব বহন করবে না। বর্তমানে র‌্যাবে কোনো সংকট নেই বলেও মনে করেন তিনি। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন র‌্যাব-৬-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনামুল আরিফ, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার আবদুস সামাদ, জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল, ডিআইজি এম এম মনিরুজ্জামান ও পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি।

সঙ্কট নিরসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে এরশাদের চিঠি

চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংকট নিরসনে জাতীয় কনভেনশনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এ আহবান জানিয়ে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে এরশাদের তরফে। রোববার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। এরশাদ তার চিঠিতে লিখেছেন, আজকে যারা রাজনীতিতে আছেন-তাদের মধ্যে মনে হয় আমিই বয়সে প্রবীণ। হয়ত আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বেশি আছে- তথাপিও বয়সের দিক বিবেচনায় আমি সকল দলের নেতাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছি যে, আসুন, আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্ধারণের জন্য একত্রে মিলিত হই। তিনি বলেন, আমাদের নীতি-আদর্শের মধ্যে তফাৎ থাকবেই। কিন্তু জাতীয় কিছু মৌলিক প্রশ্নে আমরা অবশ্যই একমত হতে পারব। জনমনে শান্তি নেই। মানুষের নিরাপত্তা নেই। গোটা জাতি আজ আতঙ্কিত এবং দিশেহারা। বিরাজমান সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে বলে চিঠিতে শঙ্কা প্রকাশ করেন এরশাদ। এরশাদ বলেন, আমরা সবাই উপলব্ধি করছি, এই অবস্থায় কোন স্বাধীন সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক দেশ চলতে পারে না। বিরাজমান সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্থিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। চিঠিতে এরশাদ বলেন, আপনারা (আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল) সম্মত থাকলে সুবিধামতো কোন এক সময়ে উপযুক্ত স্থানে আমরা মিলিত হবার প্রস্তাব জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে আমি আপনাদের মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম। রোববার সন্ধ্যায় এই চিঠি প্রথমেই বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে পৌঁছে দেয়া হয়। এরশাদের এই চিঠি খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের কাছে পৌঁছে দেন জাতীয় পার্টির যুগ্ম দফতর সম্পাদক আবুল হাসান আহমেদ জুয়েল। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চিঠি পৌঁছে দেয়া হয়।

নাশকতা বন্ধ ও সংলাপের আহবান সম্পাদকদের

দেশে চলমান নাশকতা বন্ধের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক সমাধান বের করতে সংলাপে বসার আহবান জানিয়েছেন গণমাধ্যমের সম্পাদকরা। আজ তথ্য মন্ত্রণালয়ে সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে তারা এ আহবান জানান। বৈঠকে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মতামত দেন সম্পাদবৃন্দ। একই সঙ্গে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন মন্ত্রীরা। বৈঠক শেষে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি গোলাম সারওয়ার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। আমরা একমত হয়েছি শান্তির স্বপক্ষে। সবাই শান্তি চাই, অশান্তি চাই না। এই যে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও সন্ত্রাস চলছে আমরা সবাই এর বিরুদ্ধে। সবাই মনে করি এর রাজনৈতিক সমাধান হওয়া উচিত। আলোচনার মাধ্যমে সম্পাদকরা সমাধানের প্রস্তাব করেছি। আমরা মনে করি দেশ এভাবে চলতে পারে না। এর একটি সমাধান হতেই হবে। মানুষ কতকাল এই অসহায় অবস্থায় থাকবে। বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, গঠনমূলক আলোচনা করেছি। সম্পাদকদের মূল্যবান চিন্তাভাবনা ও পরামর্শ পেয়েছি। আমরা সকলে দেশে শান্তি চাই, কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ পেয়েছি। দেশ এগিয়ে যাক, শান্তিপূর্ণ থাকুক এ ব্যাপারে কোন রাজনীতি নেই, কোন মত নেই, কোন দল নেই।
তিনি বলেন, এটা ঠিক যে আলাপ-আলোচনার একটা পরিবেশ থাকে। সেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলেছি। সন্ত্রাসের কথা অনেকে বলেছেন, নাশকতার বিষয়ে অনেকে বলেছেন। সবচেয়ে বড় কথা দেশটা আমাদের সকলের। দেশ ও মাতৃভূমিকে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে ভাল রাখব। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পানি সম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, তথ্য সচিব মর্তুজা আহমেদসহ উর্ধতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদকদের মধ্যে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, নিউজ টুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিন, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, ডেইলি সান সম্পাদক আমির হোসেন, বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, সকালের খবর সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, আলোকিত বাংলাদেশ সম্পাদক কাজী রফিকুল আলমসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক এবং প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট ঢাকায় by মিজানুর রহমান

ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন নয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট। রোববার বেলা ৩টা ২৫ মিনিটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন নয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনার স্থলাভিষিক্ত হলেন। বার্নিকাট হলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চদশ রাষ্ট্রদূত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পদে গত ২২শে মে বার্নিকাটকে মনোনীত করেন। এরপর মনোনীত ব্যক্তি মার্কিন সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির শুনানিতে অংশ নেন? শুনানি শেষে ওই কূটনীতিকের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। ১৮ই নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সময় রাত ৮টা ২১ মিনিটের কিছু আগে কণ্ঠভোটে মার্কিন সিনেটে আরও চার জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বার্নিকাটের প্রস্তাবটিও চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়।
উল্লেখ্য, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন মার্সিয়া। তিনি পেশাদার কূটনীতিক। হোয়াইট হাউস গত বছরের ২২মে দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, মার্সিয়া বার্নিকাট বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়নের আগ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-সহকারী মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সেনেগাল ও গিনি বিসাউতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এর আগে ২০০৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক অধিদপ্তরে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভুটান বিষয়ক পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবসম্পদ বিভাগে জ্যেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মার্কিন সিনেটে ১৮ই নভেম্বরে তার  নিয়োগ প্রস্তবটি কনফারমেশনের জন্য ‘এঙিকিউটিভ ক্যালেন্ডার ৯৫৪ হিসেবে আসে’।

ওবামা-মোদি পরমাণু চুক্তি সই

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি পরমাণু চুক্তি সই হয়েছে। আজ রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ চুক্তিতে সই করেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও জি নিউজ-এর খবরে জানানো হয়, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউস গার্ডেনে ওবামা ও মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠক চলছে। এরই মধ্যে এ দুই সরকারপ্রধান ২০০৮ বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি (টু থাউজেন্ড এইট সিভিল নিউক্লিয়ার কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট) সই করেন। বেলা সোয়া তিনটার দিকে হায়দরাবাদ হাউসে এ দুই নেতার মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য তুলে ধরবেন এ দুই নেতা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আজ সকালে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত পৌঁছান বারাক ওবামা। এই সফরে ওবামার সঙ্গে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও আছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লিজুড়ে নেওয়া হয়েছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা। কাল সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ওবামা। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই প্রথম ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে থাকছেন।

ব্রিটিশ সরকারের মুসলিম নীতির কড়া সমালোচনা ওয়ার্সির

যুক্তরাজ্য সরকারের মুসলিম নীতির তীব্র সমালোচনা করে ক্ষমতাসীন দলের সাবেক চেয়ারম্যান ব্যারোনেস সাঈদা ওয়ার্সি বলেছেন, ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রতি সরকারের আচরণ সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করেছে। আজ ইংরেজি দৈনিক অবজারভারে প্রকাশিত কলামে ওয়ার্সি লেখেন, মন্ত্রিসভায় দায়িত্বপালনের সময় তিনি দেখেছেন, মুসলিমদের উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য কীভাবে উপেক্ষা করেছেন। পাকিস্তানের বংশোদ্ভূত সাঈদা ওয়ার্সি ব্রিটিশ মন্ত্রিপরিষদে দায়িত্ব পালন করা প্রথম মুসলিম। তিনি দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথবিষয়ক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং ফেইথ অ্যান্ড কমিউনিটিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গত অক্টোবর মাসে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বোমা হামলা চলাকালে ব্রিটিশ গাজা নীতিকে ‘নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ দাবি করে ওয়ার্সি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। সম্প্রতি প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিমদের নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর পরিপ্রে‌ক্ষিতে গত সোমবার যুক্তরাজ্যের কমিউনিটিজ সেক্রেটারি (সমাজকল্যাণমন্ত্রী) এরিক পিকলস দেশটির এক হাজার ইমামের কাছে ইসলামি উগ্রবাদ দমনে সহায়তা চেয়ে চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে মুসলিমরা ব্রিটিশ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন—এমন ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এর সূত্র ধরে ওয়ার্সি ব্রিটিশ সরকারের মুসলিম নীতির বিচ্যুতি তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন পরে কোনো ইস্যুতে কথা বললেন ওয়ার্সি। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের মুহূর্তগুলোর কথা তুলে ধরে ওয়ার্সি লেখেন, প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ব্রিটেনের ইহুদি কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের সমস্যা এবং উদ্বেগের কথা শোনেন। কিন্তু মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে একইরকম বৈঠকের অনুরোধ জানানো হলে প্রধানমন্ত্রী তাতে সায় দেননি। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে ওয়ার্সি সরকারকে সতর্ক করেছিলেন যে, ব্রিটেনে মুসলিমবিদ্বেষ একটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য সংস্কৃতিতে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে মুসলিমরা ঘৃণার শিকার হবেন। এরপর মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা এবং বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেনি। মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় ওয়ার্সি একটি সর্বদলীয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একমাত্র এরিক পিকলস ছাড়া কোনো মন্ত্রী ওই ওয়ার্কিং গ্রুপে যোগ দেননি। কেউ কেউ ওয়ার্সির ওই অনুরোধের জবাব পর্যন্ত দেননি। মুসলিমদের প্রতি সম্পর্ক নির্ধারণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছিল উল্লেখ করে ওয়ার্সি লেখেন, ওই কমিটি কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই মুসলিম ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে। এর ফলে মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ে এবং উগ্রবাদ দমনের কাজটিও অকার্যকর হয়ে ওঠে। ওয়ার্সি আরও বলেন, মুসলিমরা ব্রিটিশ মূল্যবোধের সম্পর্কে কথা বলবে, যখন তাঁরা বুঝবে যে তাঁদের কথা আমলে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাসে ঘাটতি থাকার কারণে সরকারের মহৎ উদ্দেশে পাঠানো চিঠি নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অবিশ্বাস দানা বাঁধলে বন্ধুত্বের হাতও সতর্কতা নির্দেশক তর্জনি বলে প্রতীয়মান হয়।

সংলাপ দাবিতে অনশনে বসবেন বি চৌধুরী

দেশের চলমান সংকট নিরসনে দুই নেত্রী সংলাপে না বসলে অনশন কর্মসূচি পালনের হুমকি দিয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিকল্প ধারা সভাপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এজন্য দুই জোটকে সাতদিন সময় বেধে দিয়েছেন তিনি। আজ দুপুরে বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আলটিমেটাম দেন। বিএনপির চলমান আন্দোলনকে সমর্থন করেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে আন্দোলনের ফলাফলে মানুষ কষ্ট পায় এমন আন্দোলনের সঙ্গে আমরা নেই। তিনি বলেন, নির্বাচনের বর্তমান পদ্ধতি বহাল রেখে আরও একটা নির্বাচন সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিবর্তন হতে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে আরও একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন যতক্ষণ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত না হয় ততদিন এই ধ্বংসাত্মক সহিংসতা চলবে। সংবাদ সম্মেলনের পর আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানানোর জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের কার্যালয়ে যান বি.চৌধুরী। কার্যালয় থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে সমবেদনা জানাতে এসে জানতে পারলাম তিনি ঘুমাচ্ছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি মনে করি তার ঘুমানোর বিকল্প নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আমি চলে এসেছি।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বার্ন ইউনিট কতটা প্রস্তুত? by মানসুরা হোসাইন

(শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন, প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগ। ছবি: জাহিদুল করিম) রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট হরতাল-অবরোধে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে পাঁচটি শয্যা খালি রাখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ইউনিটে কেউ সেবা নিতে আসেনি। এখানকার চিকিৎসকেরা বলছেন, এ হাসপাতালে যে বার্ন ইউনিট আছে, তা জনগণ তেমনভাবে জানে না। ফলে ঢাকা বা ঢাকার বাইরে যেখানেই লোকজন দগ্ধ হচ্ছে, তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভিড় করছে। ঘটনা ঘটার পর যারা আহত ব্যক্তিদের সাহায্য করছেন, তাঁদের কাছেও এ হাসপাতালের সেবার বিষয়ে তথ্য নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ​বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা চলমান হরতাল-অবরোধে আজ রোববার পর্যন্ত মোট ৮৬ জন দগ্ধ রোগী ভর্তি হন। এখন ভর্তি আছেন ৫০ জন। তবে রাজধানীতেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে হরতাল-অবরোধে দগ্ধ ব্যক্তিদের একজনও যাননি। আজ সকালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কর্মরত চিকিৎসকেরা জানালেন, তাঁরা দগ্ধ ও পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় প্রস্তুত আছেন। তবে শ্বাসনা​লি পুড়ে যাওয়া (গরম বাতাস নিঃশ্বাস দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলে) এবং পোড়ার পরিমাণ অনেক বেশি হলে এ মুহূর্তে তাঁদের ভর্তি করা যাবে না। কারণ, চার শয্যার নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রটি (আইসিইউ) চালু করা সম্ভব হয়নি। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য চারটি ভেনটিলেটর বাক্সবন্দী হয়ে আছে। গ্যাসের লাইনসহ আরও বেশ কিছু বাকি আছে। আইসিইউর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও এনেসথেসিস্টও নেই। এ দুটি পদ সৃষ্টির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে এখানে সরকার ‘সংযুক্তিতে’ এ পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে।
২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর হাসপাতালটির বার্ন, প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বিভাগ, আইসিইউ ও জরুরি বিভাগ কমপ্লেক্স উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যান্য বিভাগ চালু হলেও আইসিইউ চালু হয়নি। ইউনিটের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা আশা করছেন, খুব দ্রুতই এটি চালু করা সম্ভব হবে। হাসপাতালের বার্ন, প্লাস্টিক অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকটিভ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক আহমেদ সিরাজী প্রথম আলোকে বলেন, হরতাল-অবরোধে যারা তুলনামূলকভাবে কম পুড়েছে তাদের ভর্তি করতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এই রোগীরাও ঢাকা মেডিকেলে ভিড় করছে। এ ছাড়া দগ্ধ ও পুড়ে যাওয়ার পরই স্যালাইন দেওয়া, ড্রেসিং করাসহ প্রাথমিক পরিচর্যাটা খুব জরুরি। এখানকার ইউনিটে যে ধরনের রোগীই আসুক না কেন, তাদের প্রাথমিক পরিচর্যা দেওয়ার পরই অন্য হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। এতে করে রোগীদের জটিলতা ও মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হচ্ছে। মিরপুর, আগারগাঁও বা এ হাসপাতালের আশেপাশে যারা দগ্ধ হচ্ছে, তাদেরও ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছাতে সময় লাগছে বেশি। ফলে প্রাথমিক পরিচর্যাটা ব্যাহত হচ্ছে।
বার্ন ইউনিটে ১০টি পুরুষ এবং নারী ও শিশুদের জন্য ১০টিসহ মোট ২০টি শয্যা আছে। এ ছাড়া প্লাস্টিক সার্জারির জন্য আলাদা আটটি শয্যা আছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগের দোতলায় অবস্থিত এ ইউনিটে স্থায়ী চিকিৎসক আছেন আটজন। প্রতি সপ্তাহে ছয়জন করে ইন্টার্নি চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করেন। নার্স আছেন ১০ জন। বার্ন ও প্লাস্টিক ইউনিটের জন্য দুটি অপারেশন থিয়েটার আছে। তবে একটি অপারেশন থিয়েটার এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। উন্নতমানের লাইটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম এখানে বাক্সবন্দী করে রাখা আছে। ইউনিটের জন্য আলাদা অটোক্লেভ মেশিন, আলাদা ড্রেসিং রুম, দর্শনার্থীদের কাপড় পরিবর্তন করার জন্য নারী ও পুরুষের আলাদা ব্যবস্থা আছে। ভবিষ্যতে এটি ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ইউনিট হবে, সে প্রস্তুতি চলছে। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটটি চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত এখানে দুজন রোগী মারা গেছেন। একজনের বয়স ছিল ৯৫ এবং আরেকজনের ৬৫ বছর। এ ছাড়া তাঁরা হাসপাতালে এসেছিলেন অনেক দেরি করে। আহমেদ সিরাজী বলেন, বিদেশে ঘটনা ঘটার পরপরই রোগীরা বার্ন ইউনিটে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ততটা আশা করা কঠিন। তবে থানা পর্যায়ে অবস্থিত স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দিলে অন্ততপক্ষে প্রাথমিক সেবাটা পেতে পারে রোগীরা। এরপর তারা ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ যেসব জায়গায় বার্ন ইউনিট আছে, সেখানে যেতে পারে। আর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ইউনিটটিতে দক্ষ জনবল বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। এই চিকিৎসকের পরামর্শ, পোড়ার পরই কমপক্ষে আধা ঘণ্টা পোড়া জায়গায় সাধারণ পানি ঢালতে হবে। ডিম, পেস্ট, গোবর, আলু বাটাসহ কোনো কিছুই পোড়া জায়গায় না লাগিয়ে পরিষ্কার কাপড় পেচিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি।

‘সংলাপকে লাথি মার’- বললেন বাদশা

চলমান সঙ্কট সমাধানে চারদিক থেকে আসছে সংলাপের তাগিদ। এমন অবস্থায় সংলাপ আহবানকারীদের প্রতি বিদ্রুপের তীর ছুড়লেন ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। এ বাম নেতা আজ ১৪ দলের বৈঠকে বলেন, ‘লাথি মারো সংলাপে’। চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে বিএনপির। এবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। শেখ হাসিনার সৌভাগ্য। আল্লাহ তাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। রাজধানীর পুরানা পল্টন পিকিং গার্ডেনে ঢাকা মহানগর ১৪ দলের এ সভার আয়োজন করে সাম্যবাদী দল। সভায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উদ্দেশ্যে বলেন, পেট্রলবোমায় মানুষ হত্যা করবেন, আর আমরা আপনার সঙ্গে আলোচনা করবো, এটা চিন্তা করাও আপনার মহাপাপ। আপনার সঙ্গে আলোচনা হবে না। পাপের শাস্তি আপনি পাবেনই। তিনি বলেন, ঢাকা পাহারা দিতে আমরা কমিটি করছি। কোন এলাকায় যাতে কেউ পেট্রোল বোমা না মারতে পারে, সে ব্যবস্থা আমরা করবো।সাম্যবাদী দলের ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক বাবুল বিশ্বাসের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য রাখেন গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, বাসদের আহবায়ক রেজাউর রশিদ, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ।

ইরান প্রশ্নে মোসাদ ও নেতানিয়াহুর অনৈক্য

ইরানের উপর নতুন করে অবরোধ আরোপের ব্যাপারে মার্কিন আইনপ্রণেতা ও ওবামা প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সতর্ক করে দিয়েছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মোসাদের মতে, ইরানের উপর নতুন অবরোধ আরোপের অর্থ হবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান আলোচনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়া। ইরানের উপর নতুন মার্কিন অবরোধ আরোপের বিষয়ে মোসাদের এ অবস্থান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর অবস্থানের বিপরীত। নেতানিয়াহু ইরানের উপর নতুন করে মার্কিন অবরোধ আরোপের কট্টর সমর্থক। এ খবর দিয়েছে ব্লুমবার্গ। বেশ কয়েকজন মার্কিন সিনেটর ইরানের উপর নতুন করে অবরোধ আরোপে আগ্রহী। কিন্তু এ পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে ছয় বিশ্বশক্তির আলোচনায় বিঘœ ঘটাতে পারে আশঙ্কায় এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে অবরোধ আরোপের যে কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি নিজের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। গত মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, এ ধরণের পদক্ষেপ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেবে। তবে ওবামার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান দলীয় ¯িপকার জন বোয়েনার বুধবার ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে কংগ্রেসে ইরানের উপর অবরোধ আরোপের প্রয়োজনীয়তা স¤পর্কে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ নিয়ে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে শীতল অবস্থা বিরাজ করছে মার্কিন কংগ্রেসের। ওবামা প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে আরেক দেশের সরকার প্রধানকে আমন্ত্রণের বিষয়টি ভালো চোখে নেয়নি হোয়াইট হাউস। নেতানিয়াহুর সঙ্গে বারাক ওবামা সাক্ষাৎ করবেন না বলেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যুক্তি দেয়া হয়েছে, কোনো সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান যখন নিজেদের মেয়াদের শেষমুহুর্তে থাকেন, তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে আসা নেতানিয়াহুর জনসমর্থন নিজ দেশে বৃদ্ধি করতেই কংগ্রেস থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করছেন। তবে জনমত জরিপ বলছে, তার দল আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে না-ও জিততে পারে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন মোতাবেক, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের উপর নতুন করে অবরোধ আরোপের প্রভাব স¤পর্কে ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মার্কিন সিনেটরদের সতর্ক করে দিয়েছে। বিশেষ করে, রিপাবলিকান সিনেটর মার্ক কির্ক ও ডেমোক্রেট সিনেটর রবার্ট মেনদেজের উত্থাপিত নতুন অবরোধ প্রস্তাবের বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়েছে মোসাদ। প্রস্তাবিত ওই বিলে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছা সম্ভব না হলে, দেশটির উপর অবরোধ বৃদ্ধি পাবে। মোসাদ বিরোধীতা করলেও, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কির্ক-মেনদেজ বিলের সমর্থক। বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি অজ্ঞাত ইসরাইলি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, নতুন করে ইরানের উপর অবরোধ আরোপ করা হলে তা হবে বিদ্যমান প্রক্রিয়া গ্রেনেড নিক্ষেপের সমতুল্য। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ইসরাইল সফর করা মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলকে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করে দিয়েছিলেন মোসাদ কর্মকর্তারা। সফরকারী দলের অন্যতম সদস্য রিপাবলিকান দলীয় সিনেটর জন বারাসো বলেছেন, বিভিন্ন ইসরাইলি কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা ওই সফরে অনেক সরকারী কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছি। সেখানে নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। ওই প্রতিবেদনে আরও দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, মোসাদ এজেন্টরা ওবামা প্রশাসনকে বলেছেন, নতুন ওই আইনের ফলে ভবিষ্যতে ইরানের উপর নতুন অবরোধ আরোপ হলে, আলোচনা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানের কূটনীতিকরা প্রায়ই বলেন, নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হলে, তারা আলোচনা ছেড়ে চলে যাবেন। তবে এটিই ইরান প্রশ্নে মোসাদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর বিরোধের প্রথম ঘটনা নয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সাবেক মোসাদ প্রধান মেইর দেগান জানিয়েছিলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নেতানিয়াহুর নির্দেশের সরাসরি বিরোধীতা করেছেন। ওই সময় ওবামাও ইরানের উপর হামলার সিদ্ধান্ত থামাতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে বোঝান।

পার্বতীপুরে তরুণকে হত্যা- আদিবাসীদের ৫৫টি বাড়িতে ভাঙচুর–আগুন, লুটপাট

(দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হাবিবপুর চিড়াকুটা গ্রামে আদিবাসীদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গতকাল দুপুরে তোলা ছবি l প্রথম আলো) দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বড়দল সরকারপাড়া গ্রামে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে গতকাল শনিবার সকালে আদিবাসীদের লাঠি ও তীরের আঘাতে শাফিউল ইসলাম (২০) নামের এক তরুণ নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর হাজারো নারী-পুরুষ আদিবাসীদের বাড়িঘরে ব্যাপকভাবে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটপাট চালায়। পুলিশ ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, সকাল সাড়ে আটটার দিকে বর্গাচাষি কামরুজ্জামান ও সবেদুল ইসলাম সেচযন্ত্র দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছিলেন। এ সময় জহুরুল হক ও তাঁর ছেলে ভবানীপুর কামিল মাদ্রাসার আলিম শ্রেণির ছাত্র শাফিউল ইসলামও সেখানে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তির-ধনুক হাতে ১৪ জন আদিবাসী এখানে আসেন। তাঁরা প্রথমে সেচযন্ত্রটি বন্ধ করে দেন। শাফিউল এর প্রতিবাদ করলে আদিবাসীরা লাঠি দিয়ে তাঁকে পিটিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। এ সময় একজন আদিবাসী একটি তির তাঁর পেটে ঢুকিয়ে দেন। একপর্যায়ে ছেলেকে রক্ষা করতে আসেন বাবা। আদিবাসীরা বাবা জহুরুল হকের মাথায়ও লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করেন। তিনিও মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্সে করে দুজনকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শাফিউল মারা যান। গুরুতর অবস্থায় জহুরুলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পার্থ সারথী রায় বলেন, জহুরুলের আঘাত গুরুতর। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহত শাফিউলের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলো থেকে হাজারো নারী-পুরুষ একজোট হয়ে আদিবাসী-অধ্যুষিত হাবিবপুর চিড়াকুটা গ্রাম ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে আক্রমণ চালিয়ে গ্রামটির ৫৫টি বাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা এ তাণ্ডব চলে। কয়েকজন আদিবাসী বলেন, হামলাকারীরা বাড়ি বাড়ি ঢুকে আদিবাসীদের সোনাদানা ও টাকাপয়সা ছাড়াও গরু-ছাগল, ধান-চাল, সেচযন্ত্র, থালাবাসনসহ অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এমনকি কয়েকটি বাড়ির আঙিনা থেকে নলকূপ খুলে নিয়ে যায়। গৃহবধূ নেলিমা হেমব্রম (২৮) জানান, গ্রামটিতে মোট ৫৫টি আদিবাসী পরিবারের বাস। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পুরো গ্রাম হাজারো নারী-পুরুষ ঘিরে ফেলে। পুলিশও উপস্থিত ছিল। পুলিশ গ্রাম থেকে ১৯ জন আদিবাসী পুরুষকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নারী-পুরুষো একযোগে বাড়ি বাড়ি হামলা চালায়। দুপুর ১২টায় ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো মানুষ বড়দল সরকারপাড়া গ্রামের বিরোধপূর্ণ জমির পাশে রাস্তায় ভিড় করছেন। সেখান থেকে উত্তর দিকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে হাবীবপুর চিড়াকুটা গ্রাম থেকে আদিবাসীদের পুড়ে যাওয়া বাড়ি থেকে ধোঁয়া উড়ছিল। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিটকে সেই আগুন নেভাতে দেখা যায়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জহুরুলের ছোট ভাই মো. জাহিদুল হক বলেন, হাবীবপুর মৌজায় আদিবাসীদের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ মোট জমির পরিমাণ ২১ একর। তাঁর বাবা মো. আলী দিনাজপুর শহরের মো. আজিজার রহমান চৌধুরীর কাছ থেকে ১৯৭৯ সালে ১৪ একর জমি কিনেছেন। কিন্তু জমিগুলো চাষ করতেন আদিবাসীরা। দুই বছর আগে আদিবাসীদের সঙ্গে আপস-মীমাংসা হয়। চার বিঘা জমি আদিবাসীদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকে জমিগুলো জহুরুল হক, জিয়াউল হক ও জাহিদুল হক চাষ করছেন। স্থানীয় মোস্তফাপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. মতিয়ার রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ২০ থেকে ২৫ জন আদিবাসী তির-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। পরে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর হাজারো মানুষ চোখের সামনেই লুটপাট করে বাড়িগুলো জ্বালিয়ে দিল। দুপুর ১২টার দিকে জেলা প্রশাসক আহমদ শামীম আল রাজী এবং পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা সবার সঙ্গে কথা বলেন এবং শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। আহমদ শামীম আল রাজী প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীদের বাড়িগুলো প্রশাসনের উদ্যোগে মেরামত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি করে চাল ও প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্র দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিন বলেন, আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চিড়াকুটা গ্রামে ২০ সদস্যের একটি পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে।

নামবেন নয়াদিল্লি প্রস্তুত জয়পুর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বহনকারী বিমানের অবতরণের জন্য বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে জয়পুরের সাঙ্গানির বিমানবন্দর। খারাপ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে বিমানের নির্দিষ্ট গতিপথ পরিবর্তন হলে ওই বিমানবন্দর ব্যবহার করা হবে। আজ (রোববার) নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে ওবামার অবতরণের কথা। ডিন এ জানায়, বৃহস্পতিবার নিরাপত্তাকর্মীদের একটি দল ওই বিমানবন্দরের যাবতীয় আয়োজন ও নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছে। বিমানবন্দরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘বিকল্প আয়োজন হিসেবে আমাদের বিমানবন্দর পুরোপুরি প্রস্তুত। ওবামার বিমানের গতিপথ পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে এটি ব্যবহার করা হবে।’ এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে তিনি অপরাগতা প্রকাশ করেন।
আগেই পৌঁছাল গাড়ি
ওবামা ভারতের মাটিতে পা রাখবেন আজ (রোববার) সকালে। আর একদিন আগেই ভারতের মাটি ছুয়েছে তার গাড়ি ‘দ্য বিস্ট’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভারত সফর উপলক্ষে দিল্লিতে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। রং-বেরঙের আলোকসজ্জা, নানা আয়োজনকে ছাপিয়ে ওবামার নিরাপত্তার বিষয়টি সবার উপরে উঠে এসেছে। সাত স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছেন ভারত। আকাশপথেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লিকে রাখা হয়েছে সুতীক্ষè নজরদারিতে। ওবামার নিরাপত্তায় কমতি রাখছে না যুত্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীও। ওবামার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ডগ স্কোয়াড ও এর চৌকস কর্মকর্তারা দিল্লিতে হাজির হয়েছেন দু’দিন আগেই। এবার ‘বিস্ট’ নামে পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের অতি সুরক্ষিত লিমুজিন গাড়িটি ইতিমধ্যে দিল্লিতে এসে পৌঁছেছে। একটি বিশেষ বিমানে করে আসা গাড়িটি দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পার্ক করে রাখা হয়েছে। দিল্লির সড়কপথে নিজস্ব বাহন ‘বিস্টে’ করেই যাতায়াত করবেন ওবামা। প্রথমদিকে গাড়ি ছাড়াই আসতে চেয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু মার্কিন নিরাপত্তা বিভাগের দুঃশ্চিন্তা কমাতে শেষপর্যন্ত গাড়িটিকেও সফরসঙ্গী করতে হল। সবচেয়ে সুরক্ষিত গাড়ি এটি। বাংলাদেশী মুদ্রায় এই বিলাসবহুল গাড়িটির দাম প্রায় ১২ কোটি টাকা (১৫ লাখ ডলার)।

ভবঘুরে রোনাল্ডো!

সকালের ভিড়ে ঠাসা মাদ্রিদের ব্যস্ততম রাস্তা প্লাজা দে কালাওয়ে। ধূসর রঙের জ্যাকেট, ট্রাউজার্স, পায়ে স্নিকার্স। অবিন্যস্ত, ভবঘুরে লোকটার মুখে একগাল দাড়ি। কেউ সেরকম পাত্তাও দিচ্ছিল না। মোটা লোকটার দাড়ি ও নোংরা জামাকাপড় দেখে অনেকে তো রীতিমতো এড়িয়েই চলছিল তাকে। হঠাৎ কোথা থেকে একটা বল চলে এলো লোকটার পায়ে। কয়েকবার জাগলিং করতে দেখা গেল তাকে। এবার দুয়েক জন তাকাতে শুরু করলেন। হঠাৎ দাড়ি আর পরচুলা সরে গেল। রাস্তার মানুষ তখন স্তম্ভিত। ভবঘুরে লোকটা তো তাদের দারুণ চেনা! এ তো আর কেউ নন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো! প্রতি সপ্তাহে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢোকে প্রায় তিন লাখ পাউন্ড। ফেরারি থেকে অডি, তার গ্যারেজ যেন গাড়ির জাদুঘর। কিন্তু তিনি যে এভাবে ভবঘুরের ছদ্মবেশে রাস্তায় নেমে পড়বেন, এটা বোধহয় কারও কল্পনাতেই আসেনি। সমর্থকদের অবিশ্বাস্য এক অনুভূতির স্বাদ দেয়ার জন্যই নাকি রোনাল্ডোর এই কীর্তি! বিখ্যাত স্প্যানিশ গায়ক হুয়ান পেনার মোবাইল ফোনে তোলা পুরো ঘটনাটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই ঝড় বয়ে যায়। টুইটার থেকে ফেসবুক- সমর্থকদের অবিশ্বাস্য প্রতিক্রিয়ায় ভরে যায়। বলা হতে থাকে, ভক্তদের জন্য মেসি যা কোনো দিন করার কথা ভাবতেও পারেন না, সেটাই করে দেখালেন রোনাল্ডো।
এক ক্ষুদে সমর্থক যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না নিজের চোখকে। রোনাল্ডো যখন জড়িয়ে ধরেন তার ক্ষুদে ভক্তকে, বিস্ময় মাখানো উচ্ছ্বাসে তার মুখে শুধু ছিল হাসি। সিআর সেভেনও প্রমাণ করলেন, ব্যালন ডি’অরের সোনার বলটার মতোই তার হৃদয়টাও সোনার। সাধারণ মানুষ তখনও ভাবতে পারছেন না, যাকে তারা ভবঘুরে ভেবে এতক্ষণ পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তিনিই বিশ্বের সেরা ফুটবলার! তবে বুঝতে পারার জন্য যতটুকু সময় লাগল, তার পরেই শুরু হয়ে যায় সেলফি তোলার আবদার। কেউ রোনাল্ডোর সই নিতে হুড়োহুড়ি করেন, তো কেউ আবার মোবাইলে তাকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমজনতার সঙ্গে মহাতারকার এমন চমকপ্রদ আদান-প্রদান ক্ষণিকের জন্য ব্যস্ত সড়কের সব কোলাহল যেন শুষে নেয়। সাম্প্রতিককালে রোনাল্ডো শুধুই বিতর্কিত কারণে শিরোনামে উঠে এসেছেন। ইরিনা শায়েকের সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার জন্যই হোক কিংবা ব্যালন ডি’অরে ভোট রিগিংয়ের জন্য, সিআর সেভেন নিয়ে শুধুই বিতর্ক। অভিনব এ ঘটনার পর রোনাল্ডো প্রমাণ করলেন ইরিনাকে হারালেও, সমর্থকদের ভালোবাসা এখনও হারাননি তিনি। ওয়েবসাইট।

নাটকে রিয়াজ-নোভা জুটিবদ্ধ

প্রথমবারের মতো নাটকে জুটিবদ্ধ হলেন চিত্রনায়ক রিয়াজ ও ছোটপর্দার অভিনেত্রী নোভা। রায়হান খানের রচনা ও পরিচালনায় ‘পুষ্প তোমার অপেক্ষায়’ নামের নাটকটির শুটিং এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। বিয়ের আগে এবং পরে প্রেমিক-প্রেমিকা ও স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা থাকা, হারিয়ে যাওয়া এবং তা ফিরে পাওয়ার আনন্দ নিয়েই নাটকের গল্প তৈরি হয়েছে বলে নির্মাতা জানান। রিয়াজের সঙ্গে অভিনয় প্রসঙ্গে নোভা বলেন, ‘আমার অনেক স্বপ্ন ছিল রিয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার। সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
নাটকে আমরা দু’জনই আন্তরিকতার সঙ্গে অভিনয় করেছি। রিয়াজ ভাইয়া অনেক কিছু শিখিয়েছেন। অনেক বেশি সহযোগিতাপরায়ণ তিনি।’ রিয়াজ বলেন, ‘নাটকের গল্পটা খুব ভালো লেগেছে। তাই কাজটি করেছি। নোভা অভিনয়ে বেশ সাবলীল। খুব সহজে চরিত্রের গভীরে যেতে পারেন। নাটকটি দর্শদের পছন্দ হবে।’ নাটকটি আসছে ভালোবাসা দিবসে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানিয়েছেন।

যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রলবোমা- ৯ জন আশঙ্কাজনক, ১৫ জনের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত by শেখ সাবিহা আলম

(পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ স্বামী আবুল হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে কাঁদছেন স্ত্রী রীমা বেগম। শুক্রবার রাতে যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুল এলাকায় বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হন আবুল হোসেনসহ ২৮ জন l ছবি: সাহাদাত পারভেজ) দগ্ধ হওয়ার পর টানা ১০-১৫ মিনিট রাস্তায় দৌড়েছেন আবুল হোসেন (৩০)। পুড়ে যাওয়া চামড়া ঝুলে পড়ছে, মাংস খুলে খুলে পড়ছে শরীর থেকে। একপর্যায়ে আতঙ্কিত-হতবিহ্বল মানুষ আবুল হোসেনকে পৌঁছে দিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে। গতকাল শনিবার বার্ন ইউনিটে আবুল হোসেনের ভাই মো. বিপ্লব হোসেন তাঁর ভাইয়ের বরাত দিয়ে বলছিলেন কথাগুলো। পাশে দাঁড়িয়ে আবুল হোসেনের স্ত্রী রিমা বেগম। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য স্পর্শ করতেই ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। কান্নার তোড়ে আর কথা বলতে পারলেন না। সাত বছরের ছেলে রিফাত নির্বাক মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। গাল বেয়ে যে চোখের পানি গড়িয়ে পড়েছে তার চিহ্ন স্পষ্ট। বার্ন ইউনিটে ৫ জানুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দগ্ধ হয়ে এসেছেন ৮৩ জন। এঁদের সবার জীবনের গল্প মোটামুটি একই রকম। অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক নিয়ে এঁরা ঘর থেকে বের হয়েছেন। বাড়ি ফেরেননি। দগ্ধ হয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকেরা বলছিলেন, গত শুক্রবার যাত্রাবাড়ীতে গুলিস্তান থেকে ভুলতাগামী গ্লোরী পরিবহনে পেট্রলবোমা হামলা সাম্প্রতিক সময়ের সব সহিংসতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এক সঙ্গে ২৯ রোগী, নয়জন আশঙ্কাজনক। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকেরা বলেছেন, ইউনিটে আসা রোগীরা শুধু দগ্ধই হননি, তিনজনের পা ভেঙে গেছে। কমপক্ষে ১৫ জনের চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাক ও কানেও স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে। কত দফা এঁদের অস্ত্রোপচার লাগবে, কত জায়গায় লাগবে, আদৌ তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি না, সে নিয়ে সংশয়ে আছেন চিকিৎসকেরা। দগ্ধদের তালিকায় আছেন ফার্মাসিস্ট, চাকরিজীবী, খুদে ব্যবসায়ী, ছাত্র। এঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত। বার্ন ইউনিটের দোতলায় যাত্রাবাড়ীতে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ রোগীদের জন্য খোলা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল গায়ে গায়ে রোগী, দর্শনার্থীর ভিড়। যাঁদের দগ্ধ হওয়ার পরিমাণ অল্প তাঁরা দিনভর সাক্ষাৎকার দেওয়ায় ব্যস্ত ছিলেন। কেউ গোঙাচ্ছিলেন, কেউ যন্ত্রণায় এতটাই ক্লিষ্ট যে খুব খেয়াল করে না দেখলে বোঝার উপায় নেই তিনি বেঁচে আছেন িক না। কারও কারও স্বজন একটানা কেঁদে চলেছেন, কখনো ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কখনো বিলাপ করে উঠছেন।
বার্ন ইউনিটের দোতলার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ছুটে আসে এক কিশোর। নাম মিরাজ হোসেন। এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। আকুল হয়ে জানতে চায়, ‘আমার আব্বু ভালো হবে? আচ্ছা সব রোগীর বিছানার কাছে লেখা ...শতাংশ বার্ন। এর মানে কী? বলেন না, আব্বু ঠিক হবে, আর আব্বুর মুখটা?’ মিরাজের বাবা মো. জাবেদ (৪২) গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকায় শুক্রবারও অফিসে যেতে হয়েছিল। তারপর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে। একই সময়ে আবুল হাসনাত নামের এক ব্যক্তিকে দেখা গেল খুব জোরে এক টুকরো কাগজ দিয়ে বাতাস করছেন ছোট ভাইটিকে। মো. সুমন তাঁর ভাই। শ্বাসতন্ত্র পুড়ে গেছে, গোটা মুখ পোড়া, চোখ বন্ধ। মনে হচ্ছিল এই বাতাসেই সব যন্ত্রণা জুড়াবে ভাইয়ের। মো. রুবেলের সঙ্গে গুলিস্তান থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। ২৪ বছর বয়সী দুই বন্ধু, একটি অক্সিজেন কোম্পানিতে একই সঙ্গে চাকরি করেন দুজন। পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে আছেন। তবে মো. রুবেলের অবস্থা আরও সংকটজনক। শ্বাসনালিসহ শরীরের ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। মো. রুবেলের ভাই মো. ইসমাঈল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, দগ্ধ রুবেল বাস থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যান। প্রাণের ভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকা মানুষেরা পোড়া এই মানুষটিকে মাড়িয়ে যান।
বসুন্ধরা সিটিতে একটি দোকানে কাজ করেন সালাউদ্দিন পলাশ (৩৬)। আঙুলের চামড়া ব্যান্ডেজের বাইরে ঝুলে ছিল। মুখ পুড়েছে, সারা শরীর ব্যান্ডেজে মোড়া, পা ভাঙা। কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। বারবার অস্বস্তির কথা জানাচ্ছিলেন স্ত্রী নাসরীনকে। দগ্ধদের তালিকায় আছেন ছাত্ররাও। তানবির তাঁদের একজন। মা রেখা বেগম ছেলের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন। তিনি বললেন, কবি নজরুল কলেজ থেকে ফরম আনতে গিয়েছিল ছেলে। তালিকায় আছেন ফার্মাসিস্ট দম্পতিও। স্ত্রী সাঈদা ফাতেমাকে অফিসের কাজে শুক্রবার বেরোতে হবে শুনে স্বামী ইয়াসির আরাফাতও সঙ্গে আসেন। দুজনেই দগ্ধ। একজন দোতলায় অন্যজন একতলায় চিকিৎসাধীন। সাঈদার পুরো মুখ বিকৃত হয়ে গেছে, গায়ে-হাতে ব্যান্ডেজ। তিনি বলছিলেন, ‘স্টপেজে নামার জন্য দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আধা মিনিট পরেই নামতাম। ঠিক তখনই হামলা। আফসোসের শেষ নেই। বাড়িতে তাঁর এক বছর চার মাসের ছোট্ট সন্তান।’
এত কষ্টের মধ্যেও ক্ষোভের কথা জানালেন জামদানি শাড়ির কারিগর মো. হারিসের স্ত্রী হেনা। স্বামী বসুন্ধরায় শাড়ি দিতে এসেছিলেন। শ্বাসনালি পুড়ে গেছে তাঁরও। বলছিলেন, ‘তারা কি করতাছে, দুই নেত্রী? তামাশা দেখে? আর কত তামাশা দেখব?’

বাল্যবিবাহ রোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে -প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠক

(প্রথম আলো কার্যালয়ে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। পাশে রাশেদা কে চৌধূরী l ছবি: প্রথম আলো) বর্তমান যুগে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিহার্য হলেও এই শিক্ষায় এখনো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কাজ করে। নিরাপত্তার অভাব, বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন কারণে এই শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কম। নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। এ জন্য দরকার সচেতনতা। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে মেয়েদের অংশগ্রহণের প্রতিবন্ধকতা: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। প্রথম আলোর উদ্যোগে ও ইউসেপ বাংলাদেশের সহযোগিতায় এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ছয় বছর আগে ২০০৯ সালে তাঁরা যখন সরকারের দায়িত্ব নেন, তখন পর্যন্ত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ছিল অবহেলিত। তখন দেশের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১ শতাংশ ছিল কারিগরি শিক্ষায়। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কারণে গত ছয় বছরে আট গুণ শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ৮ লাখ ২২ হাজার ৫৮৮। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৯২৪ জন নারী। বাকি প্রায় ছয় লাখ ছেলে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তাঁরা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্প-কারখানার সঙ্গে সংযোগ করে দেবেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে অনেকে আগ্রহও দেখিয়েছেন। কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, প্রতি বিভাগে একটি করে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করা হচ্ছে। এর মধ্যে চারটিতে পাঠদান চলমান ও তিনটির জন্য প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়াও ভর্তির ক্ষেত্রে নারীদের জন্য আলাদাভাবে ২০ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে।
দক্ষ জনবলের অভাবকে বড় সমস্যা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এখন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৪২০ জনকে সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ২০ জন করে পাঠানো হচ্ছে। এর বাইরে আরও ৪০০-৫০০ জনকে সংক্ষিপ্ত কোর্স করানো হচ্ছে। বাস্তবে বাজারে কি চাহিদা তা যদি উদ্যোক্তা, মালিক সবাই মিলে ঠিক করা যায়, তাহলে সুবিধা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। শ্রম অনুযায়ী মেয়ে ও ছেলেদের বেতন সমান করার জন্য মালিক-উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। ২০২১ সালের মধ্যে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ২০ শতাংশকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক ধারায় আনা হবে বলেও ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, মেয়েদের জন্য বিনিয়োগ করলে ভালো রিটার্ন আসে, এটা প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষার চেয়ে বড় বিনিয়োগ ও সুরক্ষা আর কিছু হতে পারে না। কারিগরি শিক্ষার শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে পড়ছে সে বিষয়ে চাকরি পাওয়া উচিত।
ইউসেপ, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকী হাসান কারিগরি শিক্ষার নারীদের নিয়ে নিজেদের করা একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বলেন, সাধারণ শিক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী পড়ছে তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ সাধারণ শিক্ষায় থাকতে চায়, ৩৭ শতাংশ সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতামূলক শিক্ষায় পড়তে চায় এবং মাত্র ২০ শতাংশ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আগ্রহী।
ঝরে পড়ার কারণ উল্লেখ করে জাকী হাসান বলেন, ২৭টি ঘটনার মধ্যে দেখা গেছে ১৫ জন ঝরে পড়েছে বাল্যবিবাহের কারণে। এ ছাড়া যাতায়াত, সামাজিক বাধা, নিরাপত্তার অভাবসহ আরও কিছু কারণের কথা উল্লেখ করেন তিনি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল হক তালুকদার বলেন, কারিগরি শিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বাধা নেই। বাধা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। আর এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি জানান, তাঁরা মেয়েদেরও এই শিক্ষায় আনতে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি তপন চৌধুরী বলেন, শিল্প-কারখানার চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম তৈরি করতে হবে। তিনি শিল্প-কারখানা ঢাকার বাইরে করারও পরামর্শ দেন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল সচিবালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী জনবল তৈরি হচ্ছে না, এটা সত্য। এ জন্যই সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল করেছে। ইউসেপ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা হওয়া মরিয়ম সুলতানা শোনান তাঁর জীবনের কাহিনি। তিনি জানান, তাঁর পড়ার মতো অবস্থা ছিল না। তখন ইউসেপ থেকে চার বছর পড়ে অষ্টম শ্রেণি পাস করেন। পরে সাধারণ শিক্ষায় পড়েন। তখন পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় অনেকে গার্মেন্টসে চাকরির পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ইলেকট্রনিকসের প্রতি। এরপর মাত্র এক হাজার টাকার বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। সেখানে ছেলেমেয়েদের বেতনের বৈষম্য প্রচণ্ড। ওই প্রতিষ্ঠানে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি প্রথম হন। তখন তাঁর বেতন ধরা হয় তিন হাজার টাকা, অথচ ছেলেদের পাঁচ হাজার টাকা। পরে আরেকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। এই সময় তাঁর বাবা মারা যান। পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ আসে। শেষ পর্যন্ত বিয়েটাও হয়ে যায়। এ সময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসার চিন্তা করেন। তাঁর স্বামী ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হওয়ায় বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেন। পরে আইপিএস ও ইউপিএসের ব্যবসা শুরু করেন। এখন অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজের থাকার জন্য ফ্ল্যাটও কিনেছেন, ব্যবসাও ভালো।
পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদ উল্লাহ আজিম বলেন, চাহিদা অনুযাযী কর্মসংস্থান করার জন্য শিক্ষাক্রম তৈরি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা চাহিদা মোতাবেক করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি জানান, বর্তমানে গার্মেন্টসে যত কর্মী আছেন তাঁর মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। ইউসেপের বোর্ড অব গভর্নরসের চেয়ারম্যান এম এ মতিন চৌধুরী বলেন, জীবনভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। শিল্প-কারখানায় মেয়েদের চাকরি দিতে চাইলে আবাসনের (ডরমেটরি) ব্যবস্থা করতে হবে। দাতা সংস্থা ডিএফআইডির মানব উন্নয়ন টিমের টিম লিডার ক্যারোলিনা সানার্স চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের প্রতি জোর দেন। আইএলওর উপদেষ্টা কিশোর কুমার সিং বলেন, যারা বস্তিতে থাকে তাদের শিক্ষায় নিয়ে আসা একটি চ্যালেঞ্জ।
নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের প্রথম সচিব (শিক্ষা) এলা দ্য ভোগ্দ বলেন, মেয়েদের নিরাপত্তা ও স্যানিটেশনের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেভ দ্য চিলড্রেনের উপকর্মসূচি পরিচালক নিশাত মির্জা বলেন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের জন্য আলাদা বাথরুম থাকতে হবে। ইউসেপ বাংলাদেশের পরিচালক হাবিবুর রহমান তাঁদের বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরেন।

অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ওরা by নুরুজ্জামান লাবু

অসহ্য যন্ত্রণা। কারও চোখ-মুখ ঝলসে গেছে, কারওবা হাত-পা কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশ। কেউ কথা বলতে পারছেন একটু-আধটু, কারও সেই শক্তিও নেই। চেহারায় ফুটে উঠছে যন্ত্রণায় কাতরানোর অভিব্যক্তি। মুখ ছাড়া শরীরের পোড়া অংশগুলোতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। হাতে কিংবা পায়ে লাগানো স্যালাইনের সূচ। কাউকে রাখা হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। কেউ আছেন সাধারণ বা অবজারভেশন ওয়ার্ডে। স্বজনদের সবার চোখ অশ্রুসিক্ত। প্রিয়জনের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে আছেন নিজেরাও। যেন দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফিরছে তাদের। কারণ যে স্বজন একদিন আগেও ছিল সুস্থ-সবল, এখন তার ঠিকানা ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিট। রাজনৈতিক সহিংসতার আগুনে শুধু নিজে নয়, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন। ধূলিস্যাৎ হয়ে গেছে সাজানো সংসার। হাতছানি দিয়ে ডাকছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে প্রতিদিনই একজন-দুজন করে সহিংসতার আগুনে পোড়া রোগী আসছিল। কিন্তু শুক্রবার রাতের চিত্র ছিল পুরোটাই ভিন্ন। একজন-দুজন নয়, একে একে ৩০ জন নারী-পুরুষকে নেয়া হয় বার্ন ইউনিটে। এদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল কাঠেরপুল এলাকায় গ্লোরি পরিবহনের একটি বাসে পেট্রল বোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এতে দগ্ধ হয় ওই বাসে থাকা অন্তত ৩০ যাত্রী। যাদের মধ্যে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন বার্ন ইউনিটের পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন।
ইয়াসিন আরাফাত (৩৫) ও সাদিয়া জাহান পারভীন (২৫)। স্বামী-স্ত্রী। ইয়াসিন চাকরি করেন গাজীপুরের এমএসটি ফার্মাসিউটিক্যালের কারখানায় ফার্মাসিস্ট হিসেবে। স্ত্রী সাদিয়া জাহান পারভীনও ফার্মাসিস্ট। তিনি চাকরি করেন সোমাটেক ফার্মাসিউটিক্যাল নামে আরেক প্রতিষ্ঠানে। ইয়াসিন গাজীপুরে থাকেন, আর স্ত্রী পারভীন থাকেন যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল কাঠেরপুল এলাকায়। শুক্রবার অফিস শেষ করে গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসেন ইয়াসিন। স্ত্রী অপর একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে ধানমন্ডি গিয়েছিলেন। দু’জন ধানমন্ডিতে একত্র হন। তারপর গুলিস্থান গিয়ে সেই গ্লোরি পরিবহনের বাসটিতে ওঠেন। ইয়াসিন আরাফাত বলছিলেন, কাঠেরপুলি এলাকায় বাসটি আস্তে যাচ্ছিল। তাদের নামার কথা সেখানে। সিট থেকে উঠেও দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মুহূর্তেই আগুনের গোলা এসে লাগলো বাসে। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো বাস। তিনি দৌড়ে দরজা দিয়ে নেমে গিয়েছিলেন। বাসের যাত্রীরা চিৎকার চেঁচামেচি করছে। যে যেভাবে পারছে পড়িমরি করে নামার চেষ্টা করছে। নেমেছিলেন তিনিও। কিন্তু পেছন ফিরে দেখেন স্ত্রী পারভীন নেই। মুহূর্তেই জ্বলতে থাকা বাসটিতে আবার উঠলেন, নাহ ভেতরে কেউ নেই। আবার নেমে আসেন ঠিকই, ততক্ষণে মাথার চুল, চোখ-মুখ ও দুই হাত আগুনে ঝলসে গেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই তার। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ইয়াসিনের সঙ্গে থাকা মামা সাইফুল জানান, ইয়াসিনের পেছনে থাকা তার স্ত্রী পারভীন আগুন দেখে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। শরীরের ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। আক্রান্ত হয়েছে শ্বাসনালীও। তাকে রাখা হয়েছে দোতালার ব্লু ইউনিটে। সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের রিম নামে দেড় বছরের একটি মেয়ে আছে। সে আছে দাদা-দাদির কাছে। সাইফুল বলেন, এই পরিবারটির এখন কি হবে। সুখের সংসারটি এভাবে তছনছ হয়ে গেল। আগুনে পোড়া এই ক্ষত তো তাদের সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
কেরানীগঞ্জের মামাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন নাজমুল হোসেন (২১)। রাতে গুলিস্থান হয়ে ভুলতা গাউছিয়ার বাসায় ফিরছিলেন। সঙ্গে ছিল বন্ধু সালমান সরকার হৃদয় (২০)। দুই বন্ধুই বাসের পেছন থেকে তিন নম্বর সিটে বসে ছিলেন। হৃদয় বলেন, হঠাৎ আগুন দেখে দাঁড়িয়ে যান তিনি। মাথা নিচু করে আগুনের আঁচ থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন প্রথমে। পরমুহূর্তেই জানালার গ্লাসটা এক লাত্থিতে ভেঙে সেখান দিয়ে বেরিয়ে আসেন। আর নাজমুল বেরোতে গিয়ে একবার পড়ে গিয়েছিলেন বাসের মাঝখানের করিডোরে। পরে সেই জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসেন তিনিও। নাজমুলের মুখসহ ১৩ শতাংশ পুড়ে গেছে। আর হৃদয়ের পুড়ে গেছে ৬ শতাংশ। হৃদয় জানান, আমার জ্যাকেটেও আগুন ধরেছিল। আমি নিচে নেমে মাাটিতে গড়াগড়ি করে আগুন নিভিয়েছি। নাজমুলের বাবা মো. হানিফ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলে মুগড়াপাড়া কলেজে ডিগ্রি পড়ার পাশাপাশি ভুলতা গাউছিয়া মার্কেটে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান করতো। তার আয়েই মূলত সংসার চলতো। এখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে পথে বসা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।  তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, যারা এ ধরনের কার্যকলাপ করে তাদের যেন দৃষ্ঠান্তমূলক বিচার হয়। গরিব মানুষ যেন চইল্যা ফিরা খাইতে পারে, সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে।
আলামীন হোসেন অপু (২৭) কাজ করেন একটি গার্মেন্টে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। সেখানেই থাকেন তিনি। দশ দিন আগে সন্তান হয়েছে তার। স্ত্রী-সন্তান রয়েছে শশুরবাড়ি গুলশানের নর্দ্দায়। শুক্রবারে গার্মেন্ট বন্ধ ছিল। এই সুযোগে শিশু সন্তানকে দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে নিয়ে যান মা রহিমা বেগমকেও। রাতে শশুরবাড়ি থেকে মা-ছেলে ফিরে যাচ্ছিলেন বাড়ি। গুলিস্থানে গিয়ে মাকে তুলে দেন দোহারের গাড়িতে। আর অপু নিজে ওঠেন গ্লোরি পরিবহনের সেই বাসে, রূপগঞ্জের কর্মস্থলে ফেরার জন্য। কিন্তু ফেরার পথেই দগ্ধ হন তিনি। কথা বলতে পারছিলেন না অপু। মা রহিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, দেশে এসব কি শুরু হইছে। আমার ছেলেডা আমারে ছাইড়া যাইতে না যাইতেই এমন পুইড়া গেল। এখন ওর ভবিষ্যৎ কি হবে? বলেই কাঁদছিলেন তিনি।
ভাতিজা আলামীনের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাচ্ছিলেন মোজাফফর মোল্লা (৬০)। সঙ্গে ছিল ভায়রা মান্নান, শাজাহান, ভাতিজা আলামীন ও আলামীনের বন্ধু রফিকুল একসঙ্গে যাচ্ছিলেন মেয়ের বাড়িতে। পথে আগুনে মোজাফফর মোল্লা, মান্নান, শাজাহান দগ্ধ হয়েছেন। আলামীন ও রফিকুল দ্রুত বের হয়ে যাওয়ায় বেঁচে গিয়েছেন অল্পের জন্য। মোজাফফর মোল্লার স্ত্রী বিউটি বেগম জানান, তারা মোহাম্মদপুর বেড়িবাধে থাকেন। বছর খানেক আগে আগুনে তাদের বস্তির ঘর ও দোকান পুড়ে যায়। বর্তমানে তার স্বামী জামাইয়ের দোকানে দিন হাজিরার বিনিময়ে বসতেন। এবার নিজেই পুড়ে আহত হলেন। বিউটি বেগম বলেন, গরিবের ওপর একের পর এক ঝড় আসতেছে। যারা রাজনীতি করে তাদের কিছু হয় না। পুইড়া মরতে হইতেছে আমাগো। এখন আমি স্বামীরে চিকিৎসা করামু কি দিয়া আর সংসার চালামু কি দিয়া। বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিউটি বেগম।
শুক্রবারের এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি দগ্ধ হয়েছেন রাজমিস্ত্রিদের ঠিকাদার নূর আলম (৪০)। স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে। শুক্রবার রাজধানীর মিরপুরে বোনের বাড়ি গিয়েছিলেন। রাতে সেখান থেকে ফিরছিলেন বাসায়। বাসে পেট্রবোমা নিক্ষেপে নূর আলমের শরীরের ৪৮ ভাগ ঝলসে গিয়েছে। দুই হাত, মুখ ও কোমর থেকে ওপরের অংশ পুরোটা ঝলসে গেছে আগুনে। মুখ ছাড়া পুরো শরীর ব্যান্ডেজে বাঁধা। কথা বলতে পারছে না। ঠোঁট ও চোখ ফুলে গেছে। আগুনে পুড়ে কিছুটা বিকৃত হয়ে গেছে মুখমণ্ডল। পাশে বসা শাশুড়ি শামেলা বলেন, এসব লেখে কি হবে? লিখলে কি ছেলেটা আগের মতো হবে? যারা আগুন দিয়া মানুষ পুড়াইতেছে তাদের ধরাইয়া দেন। তাদের শাস্তি দেন। দিনমজুর জমির আলী (৪৪) গাজীপুরের কাপাসিয়া হালমোড় এলাকায় থাকতেন। তার শ্বশুরবাড়ি রূপগঞ্জের বরফা এলাকায়। শাশুড়ি আম্বিয়া বেগমকে আনতে যাচ্ছিলেন রূপগঞ্জের বরফায়। গুলিস্থান থেকে গ্লোরি পরিবহনে উঠেছিলেন তিনি। দগ্ধ হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে। তার ছেলে রুবেল জানান, তার বাবার শরীরের ২০ ভাগ পুড়ে গেছে। রাতেই তারা মোবাইলে খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন।
বার্ন ইউনিটে দুই মন্ত্রী: রাজনৈতিক সহিংসতার আগুনে দগ্ধ হয়ে এখন পর্যন্ত ৭৮ জন ব্যক্তি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন। এর মধ্যে ৫২ জন এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যার মধ্যে ৩০ জন দগ্ধ হয়েছেন শুক্রবার রাতেই। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে দগ্ধ রোগীদের দেখতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এ সময় তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার প্রতিহিংসার আগুনে দগ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। বেগম জিয়া নিজেকে গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে দাবি করলেও বর্তমানে সন্ত্রাসের নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। দেশের জনগণ চায়, যারা সহিংসতা চালাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এখন হঠাৎ করে চোরাগোপ্তা হামলা হচ্ছে। হামলাকারীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে নাশকতা তৈরির রসদসহ অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গাড়িতে আগুন, বোমায় আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি, দগ্ধদের সুস্থ করে তুলুন। সরকার তাদের চিকিৎসা নিশ্চিতে সব ধরনের সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে অবরোধের আগুনে দগ্ধদের খোঁজ নিতে বার্ন ইউনিটে গিয়ে ভিড় না করতে মন্ত্রী, এমপিসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অবরোধের আগুনে যারা দগ্ধ হয়েছেন তাদের খোঁজ নিতে হলে হাসপাতালে এসে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নিন। তাদের সাহায্য করতে চাইলে করুন। আমরা কেউ ডাক্তার নই, দর্শনার্থী হিসেবে বার্ন ইউনিটে আসবেন না।
বিকালে বার্ন ইউনিটে যান সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসীন আলী। মহসীন আলী এসময় বলেন, বার্ন ইউনিটের ভেতরের দৃশ্য দেখার পর আমি বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমি তিন-চার দিন এখানে এসেছি। যারা এ ধরনের কাজ করেছে তারা মানুষ হলে তা করতে পারত না। তিনি দগ্ধদের জন্য আপাতত ৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন বলে জানান। মহসীন আলী বলেন, বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ বন্ধ করতে  আত্মরক্ষার জন্য গাড়ি চালকদের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্র দেয়া হবে। তিনি বলেন, পুলিশ-র‌্যাব যদি গুলি করতে চায় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি লাগে। কিন্তু চালকদের কাছে যদি লাইসেন্স করা অস্ত্র দেয়া হয় তাহলে তারা আত্মরক্ষার্থে নাশকতাকারীদের দমন করতে পারবে। তবে এটা তার ব্যক্তিগত মতামত বলেন জানান তিনি। বলেন, বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করবেন তিনি।

মিসরে বিপ্লবীরাই এখন কারাগারে

(মিসরে হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে আজ ২৫ জানুয়ারি। গত চার বছরে দেশটিতে কিছুই বদলায়নি। বরং আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী শাসন কায়েম হয়েছে। ছবি: এএফপি) ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বুঝি একেই বলে! মিসরে চার বছর আগে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনে লাখো বিপ্লবী রাজপথে নেমেছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখন কারাগারে। আর কারাগারে বন্দী ক্ষমতাচ্যুত মোবারক মুক্তির অপেক্ষায়। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, আজ ২৫ জানুয়ারি মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু গত চার বছরে মিসরে কিছু বদলায়নি। বিফলে গেছে সাড়াজাগানো ‘বিপ্লব’। ২০১১ সালে আরব বসন্তের অন্যতম ঘটনা ছিল মিসরে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ওই গণ-আন্দোলনে পতন ঘটে এক সময়ের লৌহমানব মোবারকের। নিহত হন আট শতাধিক বিক্ষোভকারী। বিপ্লব শেষে বন্দী হন মোবারক ও তাঁর বেশ কয়েকজন সহযোগী। বিক্ষোভকারীদের হত্যা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁদের বিচার শুরু হয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে এখন মিসরের শাসন ক্ষমতা এসেছে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির হাতে। তিনি ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান। মোবারকের শাসনামলের এই সেনা কর্মকর্তা উর্দি ছাড়লেও স্বৈরশাসনের দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত নন। বরং তাঁর কর্মকাণ্ডে যেন মোবারকের অপচ্ছায়াই মূর্ত হয়ে উঠছে। হত্যা ও দুর্নীতিসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ থেকে মোবারকের একের পর এক খালাস পাওয়ার ঘটনাকে এখন অনেক বিশ্লেষকই বাঁকা চোখে দেখছেন। বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে ২০১১ সালের ২৪ মে মোবারককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর আদেশ দেওয়া হয়। বিচারে ২০১২ সালের ২ জুন তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে আপিল কোর্ট মোবারকের ওই দণ্ডাদেশ প্রত্যাখ্যান করে মামলাটির পুনর্বিচার করার নির্দেশ দেন। গত বছরের নভেম্বরে ওই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে মোবারক ও তাঁর সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় তহবিলের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় ২০১৪ সালে মিসরের একটি আদালত মোবারককে কারাদণ্ডাদেশ দেন। কিন্তু আপিল আদালত ওই দণ্ড বাতিল করে পুনর্বিচারের আদেশ দেন। দিন কয়েক আগেই মোবারকের দুই ছেলে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। মোবারকসহ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা পুনর্বিচারাধীন রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হিউম্যান রাইটসের অভিযোগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের অব্যাহতি এবং রাজনৈতিক কর্মীদের কারাদণ্ড দিয়ে মিসরের বিচার বিভাগ দ্বৈতনীতি প্রদর্শন করছে। বিপ্লবে অংশ নেওয়া জিয়াদ আল-এলাইমি বলেন, মোবারকের রায় আমাদের এই বার্তা দেয় যে কর্তৃপক্ষ যতই দুর্নীতি ও নিপীড়ন করুক না কেন, তা কোনো বিষয় নয়। তাঁরা সব সময় শাস্তির বাইরে থাকবেন। এটা খুবই কষ্টদায়ক।’ এলাইমি বলেন, ২০১১ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হলে আমাদের ফাঁসি হতো। এখন আমরা আমাদের সেই রাজনৈতিক অবস্থানের মূল্য দিচ্ছি। বিপ্লবীরা বলছেন, ২০১১ সালে তীব্র গণ-আন্দোলনে তিন দশকের শাসক মোবারকের পতনের আনন্দ এখন নিরানন্দে পরিণত হয়েছে। মিসরের এখনকার শাসক মোবারকের চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী। বিনা অনুমতিতে বিক্ষোভ করার অভিযোগে মোবারক-বিরোধী গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক বিপ্লবী এখন কারাগারে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মোবারক-বিরোধী আন্দোলনের নেতা আহমেদ মাহের ও মোহাম্মদ আদেল। এ দুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। মোবারকের পতনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসি। ২০১৩ সালে সেনাবাহিনী তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান সিসি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোবারকের চেয়েও নিপীড়নমূলক শাসন প্রবর্তন করেছেন। দমন-পীড়নে সাবেক স্বৈরশাসককে ছাড়িয়ে গেছেন এই নব্য শাসক। সিসির আমলে নৃশংস অভিযানে মুরসি-সমর্থক ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে কারাবন্দী করা হয়েছে। গণহারে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ। মোবারক-বিরোধী বিপ্লবী জিয়াদ আল-এলাইমির ভাষ্য, ‘গত চার বছরে কিছুই বদলায়নি। আমরা এখনো একই স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ দেখছি। দেখছি একই দুর্নীতি, স্বাধীনতা হরণ।’

ভারত পৌঁছেছেন ওবামা

(ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও আছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লিজুড়ে নেওয়া হয়েছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও আছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লিজুড়ে নেওয়া হয়েছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা।) মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আজ রোববার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে পৌঁছেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে এই সফরে ওবামার সঙ্গে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও আছেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দিল্লিজুড়ে নেওয়া হয়েছে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা। আজ সকালে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পালামের এয়ারফোর্স স্টেশনে এসে পৌঁছায় ওবামাকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ান। সেখানে ওবামা ও মিশেলকে স্বাগত জানান মোদি। কাল সোমবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ওবামা। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই প্রথম ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি হচ্ছেন।
হোয়াইট হাউস বলেছে, গতকাল শনিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে (বাংলাদেশ সময়) যুক্তরাষ্ট্রের এন্ড্রুজ এয়ারফোর্স ঘাঁটি থেকে রওনা হয়েছেন ওবামা। জ্বালানি নিতে জার্মানির রামস্টেইনে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করে ওবামাকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ান। দুপুর ১২টায় প্রেসিডেন্ট ওবামা ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন। সেখানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওবামা রাজঘাটে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সেখানে বৃক্ষ রোপণও করবেন ওবামা।  এরপর প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে হায়দরাবাদ হাউসে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন ওবামা। সেখানে দুই নেতার ‘হাঁটতে হাঁটতে আলাপ’ চলবে বেলা পৌনে তিনটা পর্যন্ত। এরপর দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলবে। দুই পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দুই নেতা। বিকেল চারটা ১০ মিনিটে ওবামা-মোদি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ওবামা মৌর্য হোটেলে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবেন। সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে ওবামা আবার রাষ্ট্রপতি ভবনমুখী হবেন ভারতের রাষ্ট্রপতির দেওয়া রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগ দিতে। পরদিন ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন ওবামা। তিন দিনের সফরে এই প্রথম টানা দুই ঘণ্টা জনসমক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এভাবে খোলা আকাশের নিচে দেখা যাবে। প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠান শেষে ওবামা ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে দেওয়া সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। বিকেলে ইউএস-ইন্ডিয়া বিজনেস কাউন্সিল আয়োজিত সম্মেলনে দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি হবেন ওবামা ও মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এর বিশেষ পর্বে ওবামার কথা শোনা যাবে এদিন। ২৭ জানুয়ারি সকালে ওবামা নয়াদিল্লির সিটি ফোর্ট মিলনায়তনে বক্তৃতা দেবেন। এরপর তাঁর ও মিশেল ওবামার তাজমহলে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুতে সৌদি আরব যাওয়ার জন্য ওবামার তাজমহল দেখা হচ্ছে না। ওবামার সফরকে কেন্দ্র করে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে দিল্লিজুড়ে। গত শুক্রবার দুপুর থেকেই সরকারি ও বেসরকারি সব অফিস ছুটি হয়ে গেছে। ওবামা যে হোটেলে থাকছেন, সেই হোটেলের সব রাস্তা শুক্রবার থেকেই নিয়ন্ত্রিত। গোটা রাজপথ আজ তিন দিন ধরেই বন্ধ। ৭০টি উঁচু বাড়ির ছাদে হয়েছে পুলিশ মোতায়েন।

বার্ন ইউনিটই এখন বিপর্যয়ের মুখে

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট ১০০ শয্যার হলেও পোড়া রোগীর সংখ্যা এখন ৬০০। এর মধ্যে ৫১ জন হরতাল-অবরোধের আগুনে পোড়া। পেট্রলবোমায় দগ্ধ এত রোগীকে সামাল দিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স-ওয়ার্ডবয়-পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকট নিয়ে বার্ন ইউনিট নিজেই এখন বিপর্যয়ের মুখে। গতকাল শনিবার হরতাল-অবরোধে দগ্ধদের জন্য বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের দোতলার একটি কক্ষ ও বারান্দায় নতুন একটি ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। রোগীর চাপ সামলাতে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে ৫০ জন নার্স আনা হয়েছে, চাওয়া হচ্ছে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চিকিৎসক। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির বিভাগীয় প্রধান আবুল কালাম সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ৪৭ ধরনের সেবাসামগ্রী চেয়েছেন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন, বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির বিভাগীয় প্রধান আবুল কালাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক জুলফিকার আলী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক শামিউল ইসলাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু, নিউরোলজি, অর্থোপেডিকস ও নাক-কান-গলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকেরা গতকাল চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন ব্যক্তি দগ্ধ রোগীদের জন্য অনুদান দিয়েছেন। সেখান থেকে যখন যা প্রয়োজন তার জোগান দিয়েছেন। দিন-রাত ভুলে কাজ করছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে ইউনিটে ৩১ জন চিকিৎসক ৬০০ রোগীর জন্য তিনটি পালায় কাজ করছেন। তাঁরা হলেন সরকারের অনুমোদিত চিকিৎসক ৯ জন, ১৯ জন চিকিৎসক স্নাতকোত্তর শিক্ষা নিচ্ছেন এবং তিনজন অবৈতনিক চিকিৎসক। তিনটি পালায় নার্স কাজ করছেন ৭১ জন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন ১৬ জন। একজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁরা বলছিলেন, শুক্রবার যখন একসঙ্গে ২৯ দগ্ধ যাত্রী আসে, তখন নার্স ও ওয়ার্ডবয়দের সঙ্গে আনসারদেরও হাত লাগাতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দিনরাত কাজ করলেও রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন, সে কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। প্রতি পালায় ১০ জন চিকিৎসক। এঁরাই রোগী দেখছেন, এঁরাই জরুরি অস্ত্রোপচার করছেন, ভিআইপিরা আসছেন, তাঁদের প্রটোকলও দিচ্ছেন। আমি শুক্রবার ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। বাসায় ফিরেই হাসপাতালের ফোন। ভোররাত সাড়ে চারটা পর্যন্ত হাসপাতালে থেকে দুপুরে আবার এসেছি।’
গায়ে গায়ে রোগী: বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে শয্যা ১০০টি। গড়ে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী থাকেন। এই সংখ্যা এখন আরও বেড়েছে। গত শুক্রবার বাসে পেট্রলবোমা হামলায় ২৯ জনকে জায়গা দিতে বার্ন ইউনিটের দোতলায় গায়ে গায়ে বিছানা ফেলা হয়েছে। হরতাল-অবরোধে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাকাজের সমন্বয় করছেন চিকিৎসক লুৎফর কাদের। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আরও ছয়-সাতজন রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রটি ১০ শয্যার। এর পাঁচটিতে আগে থেকেই হরতাল-অবরোধে দগ্ধ রোগীরা আছেন। আর কোনো শয্যা খালি নেই। ফলে বাকিদের জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসকেরা বলেন, শ্বাসতন্ত্র পুড়ে গেছে যেসব রোগীর, তাঁদের শয্যার পাশেই ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এখন সংকটাপন্ন রোগীদের মধ্য থেকে যাঁরা বেশি সংকটাপন্ন, তাঁদের বেছে জায়গা দেওয়া হচ্ছে। রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দর্শনার্থীদের ভিড়ও। পুরো বার্ন ইউনিট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

১১ কারখানায় ৭৯ লাখ ডলারের রপ্তানি অর্ডার বাতিল by এমএম মাসুদ

চলমান হরতাল-অবরোধের কারণে ক্ষতির পরিমাণ জানিয়ে তথ্য পাঠাতে শুরু করেছে পোশাক কারখানাগুলো। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ কার্যালয়ে গতকাল পর্যন্ত এ ক্ষতির হিসাব পাঠিয়েছে ১১টি কারখানা। ১১টি কারখানার ১৫১ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পোশাক মালিকরা। এর মধ্যে শুধু রপ্তানি অর্ডার বাতিল হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৩,০৭৬ ডলারের। কারখানাগুলো হচ্ছে ম্যাগপাই নিটওয়্যার, ম্যাগপাই কম্পোজিট, ক্রিয়েটিভ উলওয়্যার, বেঙ্গল পোশাক ও আর্ভা টেক্সটাইল, হাই-ফ্যাশন কম্পোজিট, জেটএসবি গার্মেন্টস লি., করিম টেক্সটাইল লি., ফ্রেন্ডস স্টাইলওয়ার লি., সাসকোটেক্স (বিডি) লি. ও জুলফিকার ফ্যাশন লি.। বিজিএমইএ তথ্যমতে, গত ১৪ থেকে ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত অবরোধে ১১টি কারখানার ক্ষতি হয়েছে ১৫১ লাখ ১১,৩৫৯ ডলার। টাকার অঙ্কে ১১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৩,০৭৬ ডলারের, ডিসকাউন্ট বা মূল্যছাড় দিতে হয়েছে ১ লাখ ৬৭,৮১৮ ডলার, বিমানে পণ্য পাঠানোর কারণে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৫,৬৮৩ ডলার, দেরিতে পণ্য পাঠানোর কারণে ক্ষতি হয় ২৭ লাখ ১৩,৮৮১ ডলার আর ভাঙচুরে ক্ষতি হয় ৩৮ লাখ ৪০,৯০১ ডলার। এর আগে ২০১৩ সালে সহিংসতার সময় একই ভাবে ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করে বিজিএমইএ। ওই বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পোশাকশিল্প মালিকদের মূল্যছাড় দিতে হয়েছিল ৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য। আর বেশি অর্থ দিয়ে উড়োজাহাজে পাঠাতে হয়েছিল ৫৫০০ কোটি টাকার পণ্য। বিজিএমইএ বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তার হিসাব চেয়ে সদস্যদের কাছে চিঠি পাঠায়। তারপর ১৪ই জানুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পাঠিয়েছে কারখানাগুলো। বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম মানবজমিনকে বলেন, বায়ারস ফোরামের সঙ্গে কয়েকদিন আগে আমরা বৈঠক করি। ইউরোপ ও আমেরিকার ৯টি শীর্ষস্থানীয় বায়ার আমাদেরকে জানিয়েছেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কাছে তারা সাময়িকভারে অন্যত্র অর্ডার শিফট করছে। তারাও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। তিনি বলেন, একই কারণে অনেক বায়ার অর্ডার বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া কেউ কেউ হংকং, চীন, থাইল্যান্ডের মতো তৃতীয় দেশে গিয়ে অর্ডার আনতে বলছে। শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, তার ঘনিষ্ঠজনের কারখানার অর্ডার বিদেশে গিয়ে আনতে হয়েছে। এতে দেখা যায়, কথা ছিল আড়াই লাখ পিস শার্টের অর্ডার করা হবে। শেষ মুহূর্তে বায়ার দেড় লাখ পিসের অর্ডার দিয়ে বিদায় করছে। আজিম বলেন, আগের চেয়ে এ বছর ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাকের খুচরা বিক্রি বেড়েছে। সেই হিসাবে আমরা বেশি ক্রয়াদেশ পাওয়ার আশা করছিলাম। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ক্রয়াদেশই বাতিল হচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক কারখানার মালিকই স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৫ শতাংশ কম কার্যাদেশ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতাও কমিয়ে দিয়েছেন। জানা যায়, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পর পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের পাহারায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পাঠানো শুরু হয়। তত দিনে অনেকের গুদামেই রপ্তানিপণ্য জমে গিয়েছিল। সে জন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি ছিল। এবার টানা অবরোধের প্রথম দিন ৬ই জানুয়ারি থেকেই এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ায় সমস্যা কম হচ্ছে। তাছাড়া, এখন রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে মূলত গ্রীষ্ম মওসুমের পোশাক হওয়ায় পরিবহন কম লাগছে। শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, গত বারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কারণে এবার ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। তিনি বলেন, এখন ক্রয়াদেশ কম পেলে বিরাট সমস্যা হবে। কারণ ক্রয়াদেশের বিপরীতে ঋণপত্র খুলে মালিকেরা প্যাকিং ক্রেডিট নিতে পারেন। এটি না হলে অর্থসঙ্কটে পড়ে অনেকেই শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে পারবেন না। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, পোশাকখাতের প্রতিদিনের উৎপাদন মূল্য প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা। যদি কোন কারণে দিনের অর্ধবেলার উৎপাদন বিঘ্নিত হয় এতে ক্ষতি হয় ২১৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালে পোশাকখাতের রপ্তানি আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করতে হলে প্রয়োজন দৈনিক ৯০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করা। গড়ে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ১১ শতাংশে রাখা দরকার।

অবরোধের ২০ দিন আজ : আজ থেকে সারা দেশে ৩৬ ঘণ্টা হরতাল- লঞ্চসহ ১১ যানবাহনে আগুন, দগ্ধ ৫

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের মধ্যে গত শুক্রবার রাতে ও গতকাল শনিবারও বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চে আগুন ও ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেলে স্টিমারে বোমা মারা হয়েছে। এ ছাড়া চাঁদপুর, বরিশাল, রাজশাহী, গাইবান্ধা, নাটোর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে আগুন দেওয়া হয়েছে বাস-ট্রাক-অটোরিকশাসহ ১০টি যানবাহনে। এতে দগ্ধ হয়েছেন তিন চালকসহ পাঁচজন। মৌলভীবাজার, নোয়াখালী ও জামালপুরে ভাঙচুর করা হয়েছে ১৬টি যানবাহন। আর জামালপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা আগুন দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে টানা অবরোধের মধ্যে আবার দেশব্যাপী ৩৬ ঘণ্টা হরতালের ডাক দিয়েছে ২০-দলীয় জোট। গতকাল বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব ও ২০-দলীয় জোটের ১০ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এ হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। আজ রোববার সকাল থেকে আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এ হরতাল চলবে। গত বছরের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ৬ জানুয়ারি থেকে ২০-দলীয় জোটের ডাকে টানা অবরোধ চলছে। তবে সহিংসতা শুরু হয় এরও দুই দিন আগে থেকে। গত ২১ দিনে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। আগুন দেওয়া হয়েছে ৩১২টি যানবাহনে ও ভাঙচুর হয়েছে ৪০৮টি যানবাহনে।
ঢাকার বাইরে থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
গতকাল সন্ধ্যায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পন্টুনে ভিড়িয়ে রাখা এমভি টিপু-৬ লঞ্চে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে লঞ্চটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলার ১৬টি কেবিন সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
লঞ্চের কর্মীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি পিরোজপুরের হুলারহাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। এর আধা ঘণ্টা আগে হঠাৎ করে ছয়টার দিকে লঞ্চ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। পরে লঞ্চের লোকজন এসে দেখেন, ৩১৯ নম্বর কেবিনে আগুন জ্বলছে। দ্রুত লঞ্চের তৃতীয় তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদ পেয়ে দমকল বাহিনীর তিনটি ইউনিট ও লঞ্চের লোকজন ঘণ্টা খানেক চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
লঞ্চটির মালিক এবং অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল ও (যাপ) সংস্থার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া টিপু দাবি করেন, আগুনে লঞ্চের তৃতীয় তলার সম্পূর্ণ অংশ পুড়ে গেছে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) মো. কবিরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করা হয়েছে।
ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেলে গতকাল বিকেলে গাবখান সেতুর ওপর থেকে স্টিমার এমভি বাঙ্গালীতে কয়েকটি বোমা নিক্ষেপ করেছে দুর্বৃত্তরা। স্টিমারের প্রধান কর্মকর্তা মো. মাসুদ পারভেজ জানান, গতকাল সকালে স্টিমারটি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে গাবখান চ্যানেল অতিক্রমকালে সেতুর ওপর থেকে দুর্বৃত্তরা চার-পাঁচটি বোমা নিক্ষেপ করে। বোমার আগুনে জাহাজের আটটি এসি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজের লোকজন পানি ও বালু দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে।
জামালপুরে অবরোধের সমর্থনে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে জেলা বিএনপির উদ্যোগে শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিল চলাকালে শহরে ১০টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের মালিকানাধীন কয়েকটি বিলবোর্ড ভাঙচুর করেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনার পর বেলা তিনটার দিকে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে শহরের শফি মিয়ার বাজার এলাকায় অবস্থিত জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়াস সার্ভিসের কর্মীরা খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে করে বিএনপির অফিসে থাকা আসবাব পুড়ে যায়।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন অভিযোগ করেন, পুলিশের উপস্থিতিতে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে বিএনপির অফিসে আগুন দেন। দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানান।
তবে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নাঈম রহমান বিএনপির কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিলবোর্ড ভাঙচুর ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমকে নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের কটূক্তির প্রতিবাদে যুবলীগ একটি মিছিল বের করে মাত্র।
চট্টগ্রাম শহরতলির অক্সিজেন অনন্যা এলাকায় গতকাল সন্ধ্যায় কাগজবাহী একটি কাভার্ড ভ্যানে পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে কাগজবাহী একটি কাভার্ড ভ্যান অক্সিজেনের অনন্যা এলাকায় দিয়ে শহরের দিকে আসছিল। দুর্বৃত্তরা পেট্রলবোমা ছুড়লে গাড়িটি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত বালু ও পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বায়েজিদ থানার ওসি বাবুল চন্দ্র বণিক বলেন, পেট্রলবোমায় গাড়ির আসন ও ইঞ্জিন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চাঁদপুরে শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের ঘোষেরহাট এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ হতাহত হয়নি। তবে বিভিন্ন ধরনের মালামালসহ পুরো গাড়িটি পুড়ে যায়।
পুলিশ জানায়, সৌদিপ্রবাসী দুই ব্যক্তি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন ধরনের মালামাল নিয়ে চাঁদপুরের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁদের প্রাইভেট কারটি ঘোষেরহাট এলাকা অতিক্রমকালে দুর্বৃত্তরা সড়কে গাছ ফেলে গতিরোধ করে। এ সময় তাঁদের গাড়ি থেকে নামিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুড়ে যাওয়া গাড়িতে দুই সৌদিপ্রবাসীর সৌদি রিয়াল, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন ধরনের পাঁচ লক্ষাধিক টাকার মালামাল ছিল।
এ ছাড়া শনিবার ভোররাতে চাঁদপুরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। চাঁদপুর মডেল থানার ওসি আবদুল কাইয়ুম জানান, চাঁদপুর থেকে গ্যাস নিয়ে চান্দ্রা এলাকায় ফিরছিলেন সিএনজিচালক আনোয়ার হোসেন। পথে চান্দ্রা চৌরাস্তা এলাকায় দুর্বৃত্তরা অটোরিকশা থামিয়ে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অটোরিকশাটি পুড়ে যায় এবং চালক আনোয়ার হোসেন (২৫) গুরুতর আহত হন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।
বরিশাল মহানগরের আবদুর রব সেরনিয়াবাত সেতু এলাকায় শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বরিশালে ইউরিয়া সারবোঝাই একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে ট্রাকের চালক মো. শফিউদ্দিন (৪৫) ও তাঁর সহকারী মো. রুবেল (২২) আহত হন। তাঁদের গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শফিউদ্দিনের বাড়ি ভোলার চরনোয়াবাদ এবং রুবেলের বাড়ি খুলনার দৌলতপুরের মানিকতলায়।
চালক শফিউদ্দিন বলেন, সার নিয়ে তাঁরা খুলনা থেকে ভোলায় যাচ্ছিলেন। টোল দিয়ে সেতুতে ওঠার সময় দুই যুবক পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। মূহূর্তে ট্রাকে আগুন ধরে যায়। এতে তাঁদের দুজনের শরীরের বিভিন্ন অংশ আগুনে ঝলসে যায়। প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা চলন্ত অবস্থাতেই ট্রাক থেকে লাফিয়ে পড়েন।
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সাউদের খালপাড় নামক স্থানে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে শুক্রবার রাত ১১টার দিকে একটি পিকআপে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। চালক পান্নু সরদার (৪২) জানান, সড়কের পাশ থেকে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে সন্ত্রাসীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। বোমাটি গাড়ির পেছনে পড়ে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। তবে তিনি আহত হননি। গৌরনদী থানার ওসি মো. সাজ্জাত হোসেন জানান, এ ঘটনায় পুলিশ গতকাল মামলা করেছে।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুরিয়া এলাকায় গতকাল রাত নয়টার দিকে একটি পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-সংলগ্ন মুচিরতেকানী এলাকায় গতকাল সকাল নয়টার দিকে মালবাহী একটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় অবরোধকারীরা। এতে ট্রাকের ইঞ্জিনসহ কিছু মালামাল পুড়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পাইপসহ প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে ট্রাকটি ঢাকা থেকে গাইবান্ধা শহরে যাচ্ছিল।
নাটোরের লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া এলাকায় শুক্রবার রাতে পেট্রলবোমায় পুড়ে যায় একটি ট্রাক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কুল ভর্তি ট্রাকটি লালপুর-বনপাড়া সড়ক হয়ে সিলেটে যাচ্ছিল। ১১টার দিকে ওয়ালিয়া পুলিশ ফাঁড়ির পাশে ট্রাফিক মোড়ে পৌঁছার পর সাত-আটজন দুর্বৃত্ত গাছের গুঁড়ি ফেলে ট্রাকটি থামিয়ে দেয়। এ সময় উভয় দিক থেকে চারটি পেট্রলবোমা ছুড়ে মারলে ট্রাকটি দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ৩০ থেকে ৩৫ মিনিটের মধ্যে ট্রাকটি পুড়ে যাওয়ার পর ফাঁড়ির পুলিশ ও স্থানীয় দমকলকর্মীরা ঘটনাস্থলে আসেন। আগুনে ট্রাকের চালক লিটন আলী (২৬) ও কুলের মালিক ওসমান আলী (৪২) দগ্ধ হন।
ট্রাকটির মালিক আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ২২ বছর সৌদিতে ট্রাক চালিয়ে তিন মাস আগে বাড়িতে আইছি। নিজে একটা ট্রাকের মালিক হওয়ার স্বপ্ন থেকে তিন মাস আগে ৩৬ লাখ টাকা খরচ করে ট্রাকটা কিনেছিলাম। কিন্তু মুহূর্তে সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এত দিনের কষ্টের সব টাকা বিফলে গেল!’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাসে রাস্তায় ট্রাক নামাইছিলাম। কিন্তু নিরাপত্তা কই? পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই ওরা ট্রাকটি পোড়াল।’
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর শহরে গতকাল অবরোধকারীরা চারটি গাড়ি ভাঙচুর করে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বেলা তিনটার দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের সমর্থনে ১০-১২ জন যুবক পৌর শহরে ঝটিকা মিছিল বের করেন। একপর্যায়ে তাঁরা উত্তরবাজার এলাকায় একটি ট্রাক, একটি পিকআপ ভ্যান, একটি প্রাইভেট কার ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সামনের গ্লাস ভাঙচুর করে দ্রুত পালিয়ে যান।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের জুংলিপুর গ্রামের পাশে শুক্রবার রাত আটটার দিকে একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ইট ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এতে আরোহী বাবলু মিয়া (৪৫) ও তাঁর মেয়ে নুসরাত (৬) আহত হয়। তাঁদের রাতেই বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের বাড়ি উল্লাপাড়া উপজেলার খালিয়াপাড়া গ্রামে।
নোয়াখালী বেগমগঞ্জ উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় গতকাল সকাল আটটার দিকে সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় অগ্নিসংযোগ করে অবরোধকারীরা। সকাল সাড়ে আটটার দিকে সোনাইমুড়ী উপজেলার বগাদিয়া এলাকায় দুটি অটোরিকশা ভাঙচুর ও পৌরসভার আক্কাস আলীর মোড়ে আরেকটি অটোরিকশায় অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে অবরোধকারীরা।

‘এখন আমার সব শ্যাষ’

(ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নতুন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন দগ্ধ ব্যক্তিরা l ছবি: প্রথম আলো) তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণায় চিৎকার করে চলেছেন মো. খোকন। মুখ পুড়ে প্রায় অঙ্গার। সারা শরীরে ব্যান্ডেজ। এক বছরের উনাইশাকে কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ঢুকলেন স্ত্রী রত্না। স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন একবার। আর পারেননি। অন্যদিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন তিনি। মায়ের কান্নায় অঝোরে কাঁদতে থাকল কিছু বোঝার বয়স না হওয়া শিশু উনাইশাও। গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দেখা গেছে এই পরিবারটির করুণ অসহায়ত্বের দৃশ্য। গুলিস্তানের ফুটপাতে জুতা বিক্রি করেন খোকন। প্রতিদিনের মতো জুতা বিক্রি করে বাসযোগে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসায় ফিরছিলেন। পেট্রলবোমায় খোকনের শরীরের ২০ ভাগ পুড়ে গেছে। তাঁর চিৎকারে পুরো বার্ন ইউনিটে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। পিঠ বুলিয়ে দোয়া-দরুদ পড়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বোন সালমা আক্তার। খোকনের আহাজারি দেখে কাঁদতে থাকেন আশপাশে থাকা অন্য দগ্ধদের স্বজনেরাও। স্বামীর আর্তনাদ সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে শিশুসন্তানকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন স্ত্রী রত্না। কাঁদতে কাঁদতে খোকনের স্ত্রী রত্না প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের একমাত্র মেয়ে উনাইশার বাঁ পা জন্মগতভাবে একটু বাঁকানো। কিছুদিন পর ঢাকা মেডিকেলেই তার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা। এ জন্য কিছু টাকাও জমিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। এখন স্বামী লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে। রত্না বলেন, ‘এখন আমার সব শ্যাষ হইয়া গেছে।’

অবরোধের আগুন পণ্যবাজারে

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে বিপর্যস্ত দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিঘ্নিত হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই দাম বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের। তেল, ডাল, চাল, মসলাসহ মাছ, মাংস, মুরগির দাম ঊর্ধ্বমুখী। পণ্যভেদে দাম বেড়েছে ৫০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে পণ্য পরিবহন করায় খরচ বেড়েছে। বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে বাড়াতে হচ্ছে এসব পণ্যের দাম। অন্যদিকে সরবরাহ না থাকায় ফুরিয়ে যাচ্ছে মজুত। টানা অবরোধে রাজধানীতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিত্যপণ্যবাজারে লেগেছে এর উত্তাপ। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই দাম বাড়ছে বিশেষত সয়াবিন তেল, মশুর ডাল, চালসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এছাড়া সব ধরণের পচনশীল, কাঁচাপণ্যে দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। অবরোধ শুরুর আগে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৪৮৫ থেকে ৫০৫ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৫১৫ টাকা। আর খুচরা পর্যায়ে সমপরিমাণের তেলের দাম রাখা হচ্ছে ৫২০ থেকে ৫২৫ টাকা। একই পরিমাণের তেলের দাম গলিপথের অতি খুচরা দোকানিরা রাখছে ৬০০ টাকা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। যোগাযোগ করা হলে রূপচাঁদা কোম্পানির একজন ডিলার মানবজমিনকে জানান, অবরোধে গাড়ি ভাড়া বেড়ে গেছে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। সে কারণে কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রতিলিটার তেলে তিন থেকে চার টাকা বাড়ানো হয়েছে। চাল সরবরাহকারীরা বলছেন, অবরোধের কারণে দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো থেকে চালসহ পণ্যবাহী কোন ট্রাক আসতে পারছে না। যে ট্রাকগুলো ছাড়ছে সেগুলো নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ভাড়া নিচ্ছে। বাড়তি ভাড়ার কারণে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে পাইকারি বিক্রেতারা। রাজধানীর পাইকারি চালের বাজার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। নাজির ও মিনিকেটের দাম ৪ টাকা বেড়ে যথাক্রমে ৫০ ও ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে আটাশ চাল ৪১ টাকা বিক্রি হলেও এ সপ্তাহে তিন টাকা বেড়ে ৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গুটিস্বর্ণা চালের দাম ৩ টাকা বেড়ে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চাল ছাড়াও বেড়েছে মাংসের দাম। প্রতি কেজি ফার্মের মুরগি ১০ টাকা বেড়ে ১৩৫-১৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দর কেজি প্রতি ৩০ টাকা বেড়ে ৩৫০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। খাসির মাংস ৩০ টাকা দাম বেড়ে ৬০০ টাকা। গরুর মাংসের দর ১০ টাকা বেড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হালি প্রতি ডিমের দাম ২ টাকা বেড়ে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা। খোলা তেলের দর প্রতি কেজিতে ২৫ টাকা বেড়ে ১০০ টাকায় করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রসুনের দর ২০ টাকা বাড়লেও ১০০ টাকা বেড়েছে। চায়না আদা আগে ১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে হচ্ছে ২০০ টাকায়। কেজিপ্রতি মসুরের (দেশী উন্নত) ডাল বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকা, সাধারণ ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, বিদেশী সাধারণ ৮৮ থেকে ৯২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে জানান, সরবরাহ কম হওয়ায় খুলনায় নিত্যপণ্যের মধ্যে ভোজ্য তেল, পিয়াজ, রসুন ও কাঁচা মরিচের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। দাম বেড়েছে অন্যান্য পণ্যের। অবরোধের আগে এসব পণ্যের যে দাম ছিল তার থেকে কেজি প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকার বেশি দরে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। খুলনাসহ আশপাশের  যেসব জেলা থেকে পণ্য আসত  সেগুলো সময়মত আসতে না পারায় দাম বাড়ছে কাঁচা তরিতরকারির। খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৯৫ টাকা তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ টাকা। দেশী মসুরের ডালের দাম ছিল ১শ’ টাকা, বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ টাকা। আমদানি করা মসুরের ডালের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৬ টাকা। তবে বাজারে সব থেকে বেশি সংকট  তৈরী হয়েছে পিয়াজ ও ভোজ্য তেলের। খুলনার বাইরে থেকে সড়ক পথে পণ্যবাহী ট্রাক, বাসসহ কোন পরিবহণ আসছে না।
স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, অবরোধে ভোজ্য তেল, ডাল, চাল ও পিয়াজ, রসুন, আদাসহ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। স্থানীয়ভাবে সরবরাহ না থাকায় এসব পণ্য চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গ থেকে আমদানি করা হয়। এ কারণে এসব পণ্যের ঝুঁকি নিয়ে পরিবহণ করতে হয়। ময়মনসিংহের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোজ্য তেল লিটার প্রতি ১০ থেকে ১২ টাকা, মুসুরের ডাল প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকা, পিয়াজ প্রতি কেজি ৫ থেকে ৬ টাকা দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে চাল ও চিনির দামও বেড়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, হরতাল অবরোধে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বরিশালে দাম বেড়েছে সব ধরনের মাংস ও শিশু খাদ্যের। দুই সপ্তাহেরও বেশি টানা অবরোধে বরিশালে আমদানি করা খাদ্যের মজুদ শেষ হতে বসেছে। এরই মধ্যে বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু  করেছে। গতকাল বাজার ঘুরে দেখো গেছে ১১০ টাকার ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৪৫-১৫০ টাকায়। অবরোধে গতকাল ৩২০টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে। মাংস বিক্রেতারা জানান, এ অঞ্চলের গরু ভারত থেকে আসে। অবরোধের কারণে বেনাপোল থেকে গরুবাহী কোন ট্রাক আসছে না। একইভাবে পোল্ট্রি মাংশ যেমন ব্রয়লার, লেয়ার মুরগি আসে খুলনা/যশোর থেকে। গাড়ি না আসায় দাম বেড়েই চলেছে। বাজারে বর্তমানে ডানো লেক্টোজেন সেরিল্যাক, এ্যাংকর, নিডো, বায়োমেল, মাদার এসমাইল, ডিপলোমা, রোডকাউ সহ নানান ব্যান্ডের শিশু খাদ্যে দাম বেড়েছে। কোন কোন ব্যান্ডের শিশু খাদ্যে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি নেয়া হচ্ছে। মিনি প্যাক টুথপেস্ট এখন বরিশালের বাজার থেকে হাওয়া। গত এক সপ্তাহ পর্যন্ত সরবরাহ না থাকায় মুদির দোকানে এ পণ্যটি এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। পিয়াজের দাম প্রতিদিনই ১ টাকা ২ টাকা করে বাড়ছে। ২২ টাকার পিয়াজ গতকাল বিক্রি হয়েছে ৩২ টাকায়। প্রতিটি ট্রাক অকিরিক্ত ১৫/২০ হাজার টাকায় আনতে হচ্ছে বলে জানান আড়তদার এনায়েত হোসেন।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, অবরোধ ও হরতালের কারণে রাজশাহীতে আশাপাশের জেলা থেকে অধিকাংশ সময় ট্রাক আসছে না। যে ট্রাকগুলো ছাড়ছে সেগুলো দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে শ্যালো ইঞ্জিল চালিত ভটভটিতে করে রাজশাহীতে আশেপাশের জেলা থেকে সবজি ও চালের সরবারহ করা হচ্ছে। এতে পচনশীল দ্রব্যগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় অল্পদিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে ঢাকা থেকে ট্রাক ও ট্রেনে তেল, ডালসহ নিত্য পণ্যের সরবারহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। স্থানীয় বাজারে যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গতকাল মহানগরীর বাজারগুলোতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৮/১০ টাকা করে। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে ১/২ টাকা হারে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফুলকপি ১০, বাঁধাকপি ১০ টাকা, শিম ২০, প্রতি  কেজি গাজর ২৫, বিভিন্ন রকম শাক ২০ থেকে ৩০, আলু ১০-১৩, বেগুন ১২, কাঁচামরিচ ১০, পিয়াজ ২৮/৩০, প্রতি হালি কলা ১২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রায় সব ধরনের চালের দাম ৪/৬ টাকা হারে বেড়েছে। মিনিকেটের দাম ৬ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৪/৪৮ টাকায়। গত সপ্তাহে আটাইশ চাল ৩৭ টাকা বিক্রি হলেও এই সপ্তাহে দাম বেড়ে ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলের দাম লিটারে বেড়েছে ১০ টাকা। মসুর ডাল ১২০, মটোর ৭২/৮০, অ্যাঙ্কর ডাল ৪৫, খোলা আটা ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, রংপুরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক না থাকার অভিযোগে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। গতকাল শুক্রবার রংপুর সিটি বাজার, কামাল কাছনা বাজার, সিও বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে সরজমিনে দেখা যায় গত মাসে যে সয়াবিন তেল ৮৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো সেই সয়াবিন তেল বর্তমান বাজারে ১০৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই অবস্থা মসুর ডাল, আটাসহ বিভিন্ন পণ্যে। এসব পণ্যে কেজি প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্বাভাবিক গাড়ি চলাচল না থাকার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্য আসছে না।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান: বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যশোরের নিত্যনৈমিত্তিক পণ্যের বাজার। গতকাল যশোরের পাইকারি সবজির বাজারে প্রতি কেজি বেগুন ১০ থেকে ১২ টাকা, প্রতি কেজি গোল আলু ৮ থেকে ১০ টাকা, প্রতি কেজি ফুল কপি ৫-৬ টাকা, প্রতি পিচ বাঁধাকপি ৪-৫ টাকা, প্রতি কেজি সিম ৮-১০ টাকা, প্রতি কেজি পালং শাক ৬ -৮ টাকা, প্রতি কেজি লাল বা সবুজ শাক ১০-১২ টাকা, প্রতি কেজি মটরসুঁটি ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে বেচা বিক্রি হয়েছে। কৃষকরা বলছেন এভাবে চলতে থাকলে তাদের পক্ষে চাষাবাদ চালিয়ে নেয়া  অসম্ভব হবে পড়বে। অথচ খুচরা বাজারে এসব সবজির দাম হাকা হচ্ছিল কেজি প্রতি ৭-৮ টাকা বেশি দরে। এদিকে গতকাল যশোরের বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস  বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা দরে। যা কয়েক দিন আগেও ২৫০ টাকার মধ্যে বেচা কেনা হচ্ছিল। প্রতি কেজি খাসির মাংসের দাম গেছে ৫শ’ থেকে সাড়ে  ৫শ’ টাকার মধ্যে। প্রতি কেজি দেশী মুরগির দাম ছিল সাড়ে ৩শ’ থেকে ৩শ’ ৮০ টাকা দরে। প্রতি কেজি ফার্মের মুরগির দাম যাচ্ছে  ২শ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। যার আগের দামের তুলনায় কেজি প্রতি ৮০ থেকে ১ শ টাকা বেশি।
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান: টানা অবরোধে সরবরাহ কমে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন বাজারে চাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রায় সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৪-৫ টাকা করে বেড়েছে। জেলা শহরের পুরান থানা, বড়বাজার ও কাচারিবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে জানা গেছে, খোলা সয়াবিন তেল দুই সপ্তাহের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বোতলজাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলও। আলু, টমোটো, সিম, বেগুন, করলা, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, পেঁপেসহ প্রায় সব ধরনের সবজি কেজিতে ৫ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে সবজিসহ সবধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ায় অসন্তোষ জানিয়েছেন ক্রেতারা।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। টানা অবরোধের কারণে পণ্য সামগ্রীর সরবরাহ কম থাকায় দু’একদিনের মধ্যে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে বলে ক্রেতারা মনে করছে। পণ্যের স্টকও কমে যাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা গেছে, পিয়াজ ও রসুনের দাম বেড়েছে। অন্যান্য পণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকলেও যে কোন  সময় বেড়ে যাবে। পিয়াজের দাম ৩০ টাকা থেকে বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকায়। ৮০-৮৫ টাকার রসুন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০-৯৫ টাকায়। টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুনসহ শীতকালীন প্রতিটি সবজি কেজি প্রতি ২থেকে ৫টাকা বেড়েছে।

‘মুই কি বাচিম? মোর মেয়ে দুইটার কী হইবে?’

(রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবদুর রশিদ l ছবি: প্রথম আলো) ‘মুই কি বাচিম (বাঁচব)? মোর দুই মেয়ের বিয়া দিছি। বাকি মেয়ের দুইটার কী হইবে।’ ভেঙে ভেঙে কথাগুলো বলছিলেন পেট্রলবোমার শিকার আবদুর রশিদ। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন তিনি। তাঁর মুখমণ্ডলসহ শরীরের বেশির ভাগ অংশই পুড়ে গেছে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ভূষিরবন্দর সেতু এলাকায় গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ট্রাকে পেট্রলবোমায় চালকের সহকারী রশিদ ও চালক হামিদুর রহমান দগ্ধ হন। তাঁদের বাড়ি দিনাজপুর সদরে। দুজনেই এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই দুজনসহ বিভিন্ন স্থানে পেট্রলবোমার শিকার হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মোট আটজন। রশিদের সঙ্গে আছেন তাঁর স্ত্রী সুলতানা আকতার। কিছু বলার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। অঝোরে কাঁদছেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘ওমার (রশিদ) কিছু হইলে হামার সংসার চলবে কেমন করি। প্রতিদিনই চাউল লাগে। ভাত খাওয়া লাগে। পেট চলবে কেমন করি। যামরা (যারা) এইগলা (এগুলো) করেছে, তামারগুলার (তাদের) কি কোনো দয়া-মায়া নাই। ওমারগুলার কি কোনো ধর্ম নাই।’ রশিদের চেয়ে ট্রাকচালক হামিদুর রহমানের অবস্থা কিছুটা ভালো। তাঁর মুখসহ শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। হামিদুর জানান, পণ্য নিয়ে দিনাজপুর থেকে রংপুর এসেছিলেন। খালি ট্রাক নিয়া বাড়ি ফিরছিলেন। ভূষিরবন্দর সেতু এলাকায় পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই পাথর দিয়ে ট্রাকে ঢিল ছোড়া শুরু করে দুর্বৃত্তরা। পরে পেট্রলবোমা মারে। মুহূর্তেই ট্রাকে আগুন ধরে যায়। তিনি জানান, দুর্বৃত্তরা সাত থেকে আটজন আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। হামিদুরের স্ত্রী রেনু আকতার বলেন, ‘দুইটা ছাওয়া। এলা যে কী খামো, কেমন করি চলবে। দেশটাত কী যে আজাব পড়িল।’ বার্ন ইউনিট সূত্র জানায়, আবদুর রশিদের শরীরের শতকরা ৯৫ ভাগ পুড়ে গেছে। হামিদুর রহমানের মুখসহ শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। দগ্ধ ব্যক্তিদের চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি করা হচ্ছে না। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আবদুল কাদের খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবরোধে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’

নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা দিল্লি, ওবামা আসছেন আজ

নিরাপত্তার চাদরে ঘিরে ফেলা হয়েছে ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লি। আকাশপথে ৪০০ কিলোমিটার এলাকাকে আগামীকাল প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ঘোষণা করা হয়েছে নো-ফ্লাই জোন। বাণিজ্যিক বিমানের উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মোতায়েন করা  হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। চলছে মেট্রো স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তল্লাশি। দিল্লির বহুতল ভবনে অবস্থান নিচ্ছে সশস্ত্র স্নাইপার। আজ তিন দিনের ভারত সফরে দিল্লি পৌঁছানোর কথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। এ উপলক্ষে নয়া দিল্লির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। নিশ্চিত করা হয়েছে ৭ স্তরের নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান হিসেবে এটাই কোন মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম ভারত সফর। ভারতের উদ্দেশে গতকাল সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্ড্রুজ বিমান ঘাঁটি থেকে এয়ারফোর্স ওয়ানে যাত্রা শুরু করেন ওবামা। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাসহ আজ সকালে নয়া দিল্লি পৌঁছানোর কথা মার্কিন প্রেসিডেন্টের। তিন দিনের এ সফরের শেষ দিন ওবামার আগ্রা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তিনি ভারত সফর আগে ভাগেই শেষ করবেন। ভারত থেকে মঙ্গলবার তার যাওয়ার কথা রয়েছে সৌদি আরবে। মার্কিন সরকারের সূত্র এবং আগ্রা কমিশনার উভয়েই এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নয়া দিল্লির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রজাতন্ত্র দিবসে রাজধানীর আকাশপথে নো ফ্লাই জোন ৩০০ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৪০০ কিলোমিটার করেছে। পশ্চিমে জয়পুর এবং দক্ষিণে আগ্রা শহর এবং নিকটবর্তী পাকিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত তা বিস্তৃত করা হয়েছে। রাজপথে দুই ঘণ্টাব্যাপী সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে আকাশপথে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে বাণিজ্যিক বিমানগুলোর ওপর। অনুষ্ঠান সমাপ্তি হবে সামরিক বিমানের মহড়া দিয়ে। নিরাপত্তা জোরদার করতে নেয়া ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে, অতিরিক্ত পুলিশি টহল, মেট্রো স্টেশনগুলোতে অতিরিক্ত তল্লাশি, কঠোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া  মোটরসাইকেলে সঙ্গী বহন করা যাবে না। দিল্লিজুড়ে ৭০টিরও বেশি বহুতল ভবনে থাকছে স্নাইপার। ওবামার এ ভারত সফরে সঙ্গ দিচ্ছেন বড় একটি প্রতিনিধি দল। এর মধ্যে রয়েছেন উচ্চ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। নয়া দিল্লির পাম এয়ারফোর্স স্টেশনে পৌঁছানোর পর আজ স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে ওবামাকে স্বাগত জানানোর কথা ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির। এর পর মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ওবামার যাওয়ার কথা রয়েছে রাজঘাট। সেখানে একটি বৃক্ষরোপণ করবেন তিনি। হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, সেখান থেকে প্রেসিডেন্ট ওবামা হায়দরাবাদ হাউসে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে একান্তে মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন। এরপর প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন উভয় নেতা। পরে ৪টা ১০ মিনিটে তারা গণমাধ্যমের সামনে হাজির হবেন। সন্ধ্যা ৭:৩৫ মিনিটে মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারবর্গ আইসিটি মৌর্য হোটেলে ওবামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেখান থেকে ৮টায় প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নিতে ওবামা যাবেন রাষ্ট্রপতি ভবনে। আগামীকাল ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে সস্ত্রীক ওবামা উপস্থিত থাকবেন রাজপথে। পরে আবারও রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রণব মুখার্জির আমন্ত্রণে স্বাগত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। বিকালে ওবামা ও মোদি অংশ নেবেন সিইও ফোরাম গোলটেবিল বৈঠকে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বিজনেস সামিট নিয়ে বক্তব্য দেবেন উভয় নেতা। পর দিন ২৭শে জানুয়ারি সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিল্লির সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামে বক্তব্য দেবেন। সেখান থেকে পরে রওনা দেবেন সৌদি আরবের উদ্দেশে।

অনশনে বসবেন এরশাদ

দেশে বর্তমানে মহাদুর্যোগ চলছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বলেছেন, এ দুর্যোগ মানে বন্যা বা সাইক্লোন নয়। তার চেয়েও বড় দুর্যোগ। দেশ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। দেশকে রক্ষা করতে হলে আসুন সবাই এক টেবিেল বসি। আগামী দিনে রাজনীতি কিভাবে পরিচালিত হবে আলোচনা করি। শনিবার রাজধানীর ভাটারা এলাকায় জাতীয় পার্টি আয়োজিত শান্তি সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চলমান সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও অরাজকতা বন্ধের দাবিতে ঢাকা মহানগর উত্তর জাতীয় পার্টি এ শান্তি সমাবেশের আয়োজন করে। এরশাদ বলেন, বাংলাদেশ এখন অসুস্থ রাজনীতির শিকার। আমরা রাজনীতিবিদরা সবাই অসুস্থ। অসুস্থ রাজনীতিকে সুস্থ করতে আগে আমাদের সবার চিকিৎসা দরকার। সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে এরশাদ বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় শপথ গ্রহণ করে জানমালের দায়িত্ব তাদের। আজ কত মানুষের জানমাল চলে যাচ্ছে দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি না। সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি। কিন্তু জানমালের দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। তাদের লজ্জাও করছে না। আমাদের সামনে একটাই লক্ষ্য কি করে ক্ষমতায় থাকা যায়। অথচ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। শ্রমজীবীরা কিভাবে বাঁচবে সেই চিন্তা করছে। একটাই কথা সামনে কি হবে। এ দেশ আমরা চাইনি। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সব রাজনৈতিক দলকে জাতীয় কনভেনশন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে এরশাদ বলেন, আমি সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান করেছিলাম এবং চিঠি দিয়েছিলাম আসুন সবাই একসঙ্গে বসি। আলোচনা করি আগামীতে রাজনীতি কিভাবে চলবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিভাবে চলবে। আমরা কি মানুষ জ্বালিয়ে ক্ষমতায় থাকবো। দেশ ধ্বংস করে ক্ষমতায় থাকবো, না শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবো। আপনারা আসুন এক সঙ্গে বসি, কথা বলি কিভাবে আগামী দিনের রাজনীতি পরিচালিত হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ’৯০ সালে প্রতিহিংসার রাজনীতি সৃষ্টি করেছিলেন বেগম জিয়া। সেই দাবানল আজ বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে। এরশাদকে সবচেয়ে গণতন্ত্রী আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে বিএনপির আন্দোলন। এই দুই দল থেকে দেশের মানুষ মুক্তি চায়। ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি এসএম ফয়সাল চিশতীর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন প্রেসিডিয়াম সদস্য এমএ হান্নান এমপি, সুনীল শুভ রায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব বাহাউদ্দিন বাবুল, নুরুল ইসলাম নুরু, জাতীয় ছাত্রসমাজ সভাপতি সৈয়দ ইফতেখার আহসান হাসান প্রমুখ। রাজনৈতিক সহিংসতা, জ্বালাও-পোড়াও, দমন-নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা গতকাল গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় পার্টি রাজধানীর কাকরাইলে দলীয় কার্যালয়ের সামনে মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এ প্রতীকী গণ-অনশন কর্মসূচি পালন করবে। পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচিতে এরশাদ নেতৃত্ব দেবেন। বাবলা বলেন, জাতীয় পার্টি কোনো ধরনের সহিংস রাজনীতি বিশ্বাস করে না। বর্তমানে দেশে রাজনীতির নামে জ্বালাও-পোড়াও সহিংসতা আর দমন-নিপীড়ন চলছে। এ সহিংস রাজনীতি বন্ধ করার জন্য আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান দুই দফা শান্তি সমাবেশ করেছেন। একই সঙ্গে আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদও এ সব বন্ধ করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন।